Wednesday, May 20, 2015

ধুঁকছে খুলনার বক্ষব্যাধি ক্লিনিক by শেখ আল-এহসান

৪০ বছরের বেশি পুরোনো, জরাজীর্ণ খুলনার বক্ষব্যাধি
ক্লিনিকের আধা পাকা ভবন l ছবি: প্রথম আলো
৪০ বছরের বেশি পুরোনো ভবন। নেই কোনো চিকিৎসা কর্মকর্তা। নেই পরামর্শকও (কনসালট্যান্ট)। একমাত্র এক্স-রে যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে আছে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। এখানেই শেষ নয়, ক্লিনিকটির ১৬টি পদের বিপরীতে জনবল আছে মাত্র নয়জন। একমাত্র পরীক্ষকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্রেই চলে রোগীদের চিকিৎসা। এভাবেই ধুঁকছে খুলনার বক্ষব্যাধি ক্লিনিক।
ক্লিনিকটির অবস্থান খুলনা নগরের খান এ সবুর রোডের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) সামনে। অবকাঠামো ও পরিবেশের জীর্ণ দশা দেখে কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, এখানে কোনো চিকিৎসা কার্যক্রম চলতে পারে। সে ক্ষেত্রে একমাত্র ভরসা সাইনবোর্ড।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, আধা পাকা ভবনটি খুবই জরাজীর্ণ। টিনের চালে মরিচা ধরেছে। ফুটো হয়ে গেছে কোথাও কোথাও। দেয়ালে ধরেছে ফাটল, পলেস্তারাও খসে পড়ছে। ভেতরে নেই রোগীদের পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা। ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, একজন সহকারী সেবিকা রোগীদের নামের তালিকা নিবন্ধন করছেন। একজন পরীক্ষক রোগীদের কফ পরীক্ষা করে একটি সাদা কাগজে সিল মেরে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন। আর সে অনুযায়ী ওষুধ দিচ্ছেন একজন ফার্মাসিস্ট। এর মধ্যে একজন আবার কফ পরীক্ষায় সহযোগিতা করছেন।
ক্লিনিক সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ক্লিনিকটির পরামর্শক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন শেখ আবদুল কাদের। গত ৩ জানুয়ারি তিনি অবসরে চলে যান। এর পর কনিষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে আতিয়ার রহমান শেখকে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ৭ এপ্রিল তিনি পদোন্নতি পেয়ে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি হয়ে যান। তার পর থেকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পদটি শূন্য। চিকিৎসা কর্মকর্তা (মেডিকেল অফিসার) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আবদুল গফফার। তিনিও এপ্রিল মাসে অভয়নগর থানায় বদলি হয়ে গেছেন। বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাকে (আরএমও) গত ৯ এপ্রিল বক্ষব্যাধি ক্লিনিকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু যোগদানের আগেই তাঁর বদলির আদেশ বাতিল হয়ে যায়।
ক্লিনিকের সেবিকা ও পরীক্ষকের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, একমাত্র এক্স-রে যন্ত্রটি নষ্ট হয়ে আছে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। আধুনিক যন্ত্র বরাদ্দ হলেও অবকাঠামোর জন্য তা স্থাপন করা সম্ভব হয় না। ফলে অন্য কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিবছর আধা পাকা ভবনটি জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করার চেষ্টা করা হয়। ক্লিনিকের ফার্মাসিস্ট অচিন্ত্য কুমার সরকার ও সহকারী সেবিকা তকদীর-এ-এলাহী বলেন, যক্ষ্মা রোগী শনাক্তের জন্য এক্স-রে খুবই প্রয়োজন। এ রোগের জীবাণু থাকে পাকস্থলীতে। অনেক সময় কফ পরীক্ষা করে তা শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তখন এক্স-রের প্রয়োজন হয়। মাসে গড়ে ৩০০ যক্ষ্মা রোগী এ ক্লিনিক থেকে চিকিৎসা নেন বলে জানান তাঁরা।
বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের এমন করুণ দশা সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন মো. ইয়াসিন আলী সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি ক্লিনিকটিকে ভালো রাখার। চিকিৎসক ও পরামর্শকও নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁরা ওপরের মহল থেকে বদলির আদেশ বাতিল করে আনেন। এক্স-রে মেশিন মেরামতের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগির সেটা চালু হবে।’
সিভিল সার্জন আরও বলেন, ক্লিনিকের অবকাঠামো নির্মাণ এবং চিকিৎসক ও পরামর্শক নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। গত জানুয়ারিতে বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের ওই জায়গায় অথবা খুলনা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের অবশিষ্ট জায়গায় একটি দ্বিতল ভবন তৈরির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য উপপরিচালক খন্দকার মিজানুর রহমান বলেন, পরামর্শক নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়। তাই সেটা মন্ত্রণালয় দেখবে। তবে চিকিৎসা কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আগ্রহী কাউকে পাওয়া না যাওয়ায় দেরি হচ্ছে।

ছাত্রলীগ কোনো দোষ করে না? by ফারুক ওয়াসিফ

যা কিছু ছাত্রলীগ করবে, তা-ই লিগ্যাল? সেসবের প্রতিবাদই শুধু ইললিগ্যাল?
ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে ছাত্রলীগের দশা হয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের মতো। সেবনে উপকারের চেয়ে অপকারই বেশি। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ছাত্রলীগ হলো বর্তমান ছাত্রলীগের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের মাছে ফরমালিন থাকে না, বাস্তবে থাকে। অপকর্মে অপকর্মে সংগঠনটি এতই ভারাক্রান্ত যে এর শক্তিমত্তাকে গোদা পায়ের সঙ্গে তুলনা দেওয়া চলে। গোদা পায়ে লাথি দেওয়া যায় না যেমন, তেমনি ছাত্রলীগকে দিয়ে তারুণ্যকে আন্দোলিত করা যাচ্ছে না। এদের পক্ষে সম্ভব কেবল সাধারণ নিরীহ মানুষকে দেখে নেওয়া। শিক্ষামুখী অথবা গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে না থাকতে থাকতে এই সংগঠনটিও এখন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মতোই মরা নদী হয়ে যাচ্ছে। এতে স্রোত নেই, পচন ও কচুরি জমা আছে।
যে সংগঠনের জনবল ও ক্ষমতা জনগণের কাজে লাগে না, তা কার কাজে লাগে? ক্ষমতার কাজে লাগে। সাম্প্রতিক কয়েকটি খবর থেকে ক্ষমতার ব্যবহারগুলো আসুন দেখি: জগন্নাথে প্রতিবাদকারীদের মারধর ছাত্রলীগের (প্রথম আলো, অনলাইন, ১৩ মে), সিলেটে ব্যবসায়ীকে গলা কেটে হত্যা: সিসি ক্যামেরায় শনাক্ত ‘খুনিরা’ ছাত্রলীগের (প্রথম আলো, ১২ মে)। সরকারি চাকরি করেও তাঁরা ছাত্রলীগে! (প্রথম আলো, ১১ মে)। জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাক্রমে শিক্ষিকা ও ছাত্রীদের যৌন হয়রানি ইত্যাদি। এভাবে তার আগের দিন, তার আগের দিন করতে করতে আর কত উদাহরণ খুঁজব? বলা হয়, পুলিশের যে সদস্যরা নানা অপকর্ম ও নির্যাতনে জড়িত বলে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা সবেমাত্র ছাত্রলীগ থেকে পুলিশে যোগদান করা নেতা। উল্টো ঘটনাও আছে। পুলিশের কোনো কোনো কর্মকর্তা এখনো ছাত্রলীগের বড় পদে শোভা পাচ্ছেন। পুলিশের ভেতর ছাত্রলীগ এবং ছাত্রলীগের ভেতর পুলিশ—যেভাবেই দেখুন, দুজনে দুজনার। ফলে ছাত্রলীগ পুলিশের মতো হয়ে উঠছে, আর পুলিশ হয়ে উঠছে ছাত্রলীগের মতো।
কিন্তু এটা কি কেবল ছাত্রলীগের দোষ? ছাত্রলীগকে নষ্ট করেছে কারা? কারা সন্ত্রাসীদের বিচার না করে নেতা হওয়ার সুযোগ দিয়েছে? ষাট থেকে নব্বই পর্যন্ত যখনই গণ-আন্দোলন হয়েছে, তখনই ছাত্রলীগ উজ্জ্বল হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার আন্দোলন শুরুর আগে ছাত্রলীগে মেধাবী ও তীক্ষ্ণ ছেলেমেয়েদের কম দেখা যেত। ভালো ছাত্ররা তখন করত ছাত্র ইউনিয়ন। যেই ছয় দফার জোয়ার এল, তরুণেরা ছাত্রলীগে নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পেলেন। তরুণদের আগুয়ান অংশ ছাত্রলীগে আসতে শুরু করে। একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা না হলেও, ছাত্রলীগ তখন গণসংগঠনের চরিত্রই অর্জন করেছিল।
নেতা হতে গেলে ছাত্রলীগের সমর্থন দরকার হতো। লেজুড়বৃত্তির রেওয়াজ তখনো দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ যখন দ্বিধান্বিত বা আপসপন্থী হয়েছিল, ছাত্রলীগ তখন দলের থেকে এগিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিত। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির মতো অনেক ঘটনা এর প্রমাণ দেবে। এমনকি এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও অন্যদের সঙ্গে ছাত্রলীগই ছিল সামনের সারিতে। সে সময় কোনো কোনো কঠিন মুহূর্তে ছাত্রলীগই মূল দলের চেয়ে এগিয়ে থেকে পথ দেখিয়েছে।
কিন্তু নব্বইয়ের পর থেকে যখন বড় দলগুলো ক্ষমতা অর্জন করে ধনসম্পদ বর্ধনকেই রাজনীতির লক্ষ্য করে তুলল, ছাত্রলীগের নেতৃত্বেও বদল আসতে শুরু করল। লেজুড়বৃত্তির সূচনাও তখন থেকেই। প্রতিবাদের সংগঠন থেকে ছাত্রলীগ পরিণত হলো কায়েমি স্বার্থের হাতিয়ারে।
বড় দলগুলো যে হারে দুর্বৃত্ত ধনীদের হাতিয়ার হয়ে উঠল, সেই হারে তাদের দরকার পড়ল মাঠপর্যায়ের লেঠেলদের। ছাত্রাবাস, এলাকা, ব্যবসা দখলে রাখায় এদের ব্যবহার শুরু হলো। অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব দলে আর সক্রিয় থাকা শুরু করলেন না যখন, তখন তো ছাত্রলীগই মিছিল-মিটিংয়ে লোক জমানো, প্রতিপক্ষকে ধাওয়ানোর প্রধান ভরসা হলো। গণ-আন্দোলন ও গণমুখী কর্মসূচিতে সমাজের সবচেয়ে ভালো অংশটাই সামনে চলে আসে। নইলে আন্দোলন হয় না, কর্মসূচি হালে পানি পায় না। কিন্তু যখন স্বৈরাচারী কাজকারবার চলে, রাজনীতির অপরাধীকরণ চলে, সমাজ ও রাষ্ট্রে অবক্ষয় থাবা গেড়ে বসে, তখন সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশ সামনে চলে আসে। ঘোলা পানিতে ভেদা মাছই ভেসে ওঠে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের এখন হয়েছে এই অবস্থা।
কেবল এদের ক্যাডাররাই নয়, অনলাইন-ফেসবুকেও লীগপন্থীদের ভাষাসন্ত্রাসে টেকা দায়। বঙ্গবন্ধুর ছবি ও মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ঝুলিয়ে জঘন্য ভাষায় গালিগালাজ করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকেই অপমান করা হয়। এভাবে আদর্শ জেতে হিংসাশী অসূয়া। মুক্তিযুদ্ধের নায়কদের সংগঠনের এমন অধঃপতন বিরল ঘটনা নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুবকর্মীরা আজ সে দেশের ত্রাস। চেতনাকেও নবায়ন করতে হয়, দলকেও নতুন বাস্তবতার উপযোগী করতে হয়। কোনো এককালে কেউ একটা সাঁকো দিয়ে পার হয়েছিল বলে, চিরকাল সেই সাঁকো মানুষ পারাপার করবে এমন বিশ্বাস অলীক। সাঁকো মেরামত করতে হয়, কিংবা আরও ভালো করে বানাতে হয়। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামে ত্যাগ ও নিষ্ঠার দরকার। আর ক্ষমতাসীন থাকার তরিকায় এখন দরকার হয় ত্রাস ও গ্রাসের কারবার।
ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতা জওহরলাল নেহরু একবার ছাত্রদের বলেছিলেন, স্বাধীন দেশে মারমুখো ছাত্র-আন্দোলনের দরকার আছে কি না? দরকার তখনই, যখন নাগরিকের স্বাধীনতা খর্ব হয়। স্বাধীন দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষের ছাত্রকর্মীদের ক্ষমতার রস থেকে দূরে থাকাই ভালো। মাছির ওড়াউড়ি শেষ হয় রসে নিমজ্জিত হয়ে। ছাত্রলীগ এখন ক্ষমতার রসে ততটাই নিমজ্জিত।
ছাত্রলীগ এখন আর নেতা জোগান দিতে পারছে না। এটা বোঝা যায় মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে। মন্ত্রীদের কতজন ছাত্রলীগ থেকে এসেছেন? ছাত্রলীগে যদি মেধাবীরা থাকতেনই, তাহলে আওয়ামী লীগকে বামদের থেকে লোক নিয়ে এসে মিন্ত্রসভা গঠন করতে হতো না। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন যিনি, তিনিও দলের বাইরে থেকেই এসেছেন।
ছাত্রলীগ থেকে ভবিষ্যতের সৎ নেতৃত্ব না এলেও একে ছাড়া নেতাদের চলবে না। রাজনীতির পিরামিডে ছাত্রলীগ হলো তলার ভিত। কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্তরা এই রাজনীতিতে লেগে থেকে কাজ করে না। দলের শক্তি সমাবেশ ও প্রাধান্য বিস্তারের কাজটা করে ছাত্র-তরুণেরা। যে নেতা যত বেশি এদের চালাতে পারেন, দলে তাঁর দাপট তত বাড়ে। আপত্তিকর ব্যবসা-বাণিজ্যের রেষারেষি সামলাতে, টেন্ডারবাজি, ভূমি-নদী-বস্তির দখলের জন্য, চাঁদা ও টোল আদায়ের জন্য ছাত্রলীগকে লাগবেই। বিরোধীদের দৌড়ের ওপর রাখার চিরাচরিত চাহিদা তো আছেই।
সুতরাং, ছাত্রলীগের যে সমস্যা, তার জন্য তারা যতটা-না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী ওপরের নেতারা। এঁরাই পদের টোপ, চাকরির লোভ, টাকার মোহ দিয়ে এদের ব্যবহার করেন। বিচার হলে, পদচ্যুত হলে, খুন হতে হলে ছাত্রলীগের কর্মীদেরই হতে হয়। টিকে গেলে এঁদেরই কেউ কেউ ধনকুবের হন, বাকিদের ভাগ্যে জোটে সরকারি-বেসরকারি কিছু চাকরি, ব্যবসা, পুলিশের পোশাক। যেগুলো তাঁদের নিয়মতান্ত্রিকভাবেই পাওনা, সেগুলোর জন্য তাঁদের দুই নম্বরি রাস্তা ধরতে হয়। ছাত্রলীগ না করলে যদি সুবিধা না মেলে, তাহলে তো সুবিধাবাদীরাই ছাত্রলীগ করবে। এতে দল গোদা পায়ের মতো ভারী ও মোটা দেখাবে, কিন্তু সত্যিকার জনস্রোতের সামনে তা অকেজো।
আওয়ামী লীগের উচিত এখন ছাত্রলীগকে ভেঙে দিয়ে একেবারে নতুনদের নিয়ে নতুন যুব-ছাত্র সংগঠন সৃষ্টি করা। কিন্তু মুশকিল হলো, লেজ গরুকে নাড়ায় না, গরুই লেজ নাড়ায়। আওয়ামী লীগ না বদলালে ছাত্রলীগের বদলের আশার গুড়ে তাই কাঁকরই মিলবে।
একবার এক বুড়ির সন্তান যুদ্ধে যাচ্ছে। তো মা তার ব্যাগে খাবারদাবার ইত্যাদি গুছিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বাবা, একটা করে শত্রু মারবি আর জিরিয়ে নিবি, শরীরটাকে কষ্ট দিবি না।’ তখন ছেলেটি বলল, ‘মা, কিন্তু ওরা যদি আমাকে মারে?’ বোকা মা মুখে হাত দিয়ে বলে, ‘সাট সাট! ওরা তোকে মারবে কেন? তুই ওদের কী ক্ষতি করেছিস?’ ছাত্রলীগকে যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁরা সোনার ছেলেদের কুকীর্তিকে সুকীর্তির তকমা পরিয়ে ক্ষতি ছাড়া আর কিছু করছেন না।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

সমঝোতার চেষ্টায় ছিলেন ওসি হেলাল! by কাজী আনিছ

হেলাল উদ্দিন, আব্দুল কাদের
পুলিশি নির্যাতনের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র আব্দুল কাদেরের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন খিলগাঁও থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেলাল উদ্দিন। দেওয়া হয়েছিল মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণের আশ্বাসও। কিন্তু কাদের রাজি হননি।
আব্দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায়ের আগের দিনও লক্ষ্মীপুরে আমার কর্মস্থলে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ওসি হেলালের কয়েকজন লোক। রায়ের দিনও প্রভাবশালীদের দিয়ে চাপ দেওয়া হতে পারে জেনে আমি আর আদালতে যাইনি। এ কারণে আপনারা আদালতে আমাকে দেখেননি।’
কাদেরকে নির্যাতনের ঘটনায় গত রোববার আদালত ওসি হেলালকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন। আদালত হেলালের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারিরও আদেশ দেন।
২০১১ সালের ১৫ জুলাই রাতে ইস্কাটন গার্ডেনের খালার বাসা থেকে ফজলুল হক মুসলিম হলে ফিরছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞানের ছাত্র আব্দুল কাদের। সেগুনবাগিচা এলাকায় গেলে তাঁকে আটক করে পুলিশ। এরপর তাঁকে খিলগাঁও থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন থানার ওসি হেলাল তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেন। তাঁর বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানায় ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগ ও অস্ত্র আইনে দুইটি মামলা করা হয়। মোহাম্মদপুর থানায় হওয়া গাড়ি ছিনতাইয়ের মামলায়ও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করলে বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে আইনসচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেন। তদন্তকালে ওসি হেলালসহ পুলি​শের তিনজন কর্মকর্তাকে বরখাস্তের নির্দেশও দেওয়া হয়। আইন মন্ত্রণালয় ও পুলিশের তদন্ত কমিটি কাদেরকে নির্দোষ উল্লেখ করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দেয়। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে ওসি হেলালের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সুপারিশ করা হয়। ২০১২ সালের ২৩ জানুয়ারি খিলগাঁও থানায় ওসি হেলালের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারা আসত আমি সবাইকে বলে দিতাম, আমার ঘটনা নিয়ে অনেকেই সম্পৃক্ত। বিষয়টি এখন আমার একার না। আমি তো আর সমঝোতা করতে পারি না। আমি বলতাম, আমি ওই দিনের কষ্ট-যন্ত্রণা ভুলতে পারি না, ভুলতে পারব না। সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে আসা কেউ আমার কষ্টটা বুঝে চলে যেতেন, কেউ বা মন খারাপ করতেন।’
কাদেরের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েছেন এমন একজনের সঙ্গে সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের কথা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, ওসি হেলালের পরিবারের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা আছে। মানবিক বিবেচনায় তিনি কাদেরের কাছে গিয়েছিলেন। কাদেরকে চার-পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার কথাও তিনি বলেছিলেন। তবে কোনো কাজ হয়নি।
এদিকে গতকাল ওসি হেলালের এক স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব বিষয় নিয়ে সরাসরি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন ওসি হেলাল দেশেই আছেন। ‘ওনার সিদ্ধান্ত কী?’—প্রশ্ন করলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই স্বজন বলেন, ‘রায় হওয়ার পর কেউ পালিয়ে যায়, কেউ বা আত্মগোপনে থাকে, আবার কেউ আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু আমাদের পরিবারের যে ব্যাকগ্রাউন্ড তাতে আমরা পালিয়ে কিংবা আত্মগোপনে থাকার মতো লোক নই। তাই তার আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তবে এসব বিষয় নিয়ে তাঁর (ওসি হেলাল) সঙ্গে কথা বলাও বিব্রতকর।’ ওই স্বজন আরও বলেন, ‘যদি সে (ওসি হেলাল) কাদেরকে নিজ হাতে আঘাত করে থাকে, তাহলে অবশ্যই অপরাধ করেছে। কিন্তু তার পরও এ রায়ের পর তাই আমরা কিছুটা বিপর্যস্ত, হতাশ।’ ওসি হেলালকে ​যে মোবাইল ফোন নম্বরে পাওয়া যাবে, তা তিনি দিতে রাজি হননি।

অভিবাসী সংকটে সহায়তায় রাজি মিয়ানমার

ইন্দোনেশিয়ার উপকূল থেকে আজ উদ্ধার হওয়া এক রোহিঙ্গা
অভিবাসন-প্রত্যাশী তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাচ্ছেন
আঞ্চলিক অভিবাসী সংকট সমাধানে প্রথমবারের মতো সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে মিয়ানমার। এত দিন দেশটি এই সংকটের দায় অস্বীকার করে আসছিল।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘অভিবাসী সংকট’ নিয়ে আজ কুয়ালালামপুরে ত্রিদেশীয় আলোচনার প্রাক্কালে এ বিষয়ে ইয়াঙ্গুন তাদের আগের কঠোর অবস্থানে পরিবর্তন আনল।
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কুয়ালালামপুরে ওই আলোচনায় মিলিত হবেন। সাগরে অসহায়ভাবে নৌকায় ভাসতে থাকা হাজারো অভিবাসন-প্রত্যাশীদের তীরে ভিড়তে না দেওয়ায় এই তিন দেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমালোচনার মুখে পড়ে। অভিবাসী সংকটের দায় অস্বীকার করায় মিয়ানমারের ভূমিকার নিন্দা জানায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
আঞ্চলিক ‘অভিবাসী সংকট’ নিয়ে সবশেষ পোপ ফ্রান্সিসের কাছ থেকেও মন্তব্য এসেছে। এর আগে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ব্যাপারে তাদের উদ্বেগ এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি মানবিক সহায়তার আহ্বান জানায়।
সম্প্রতি মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হয় থাইল্যান্ড সরকার। প্রায় তিন হাজার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অভিবাসন-প্রত্যাশীকে পাচারকারীরা জরাজীর্ণ ও ভিড়ে ঠাসা নৌকায় রেখে পালিয়ে যায়। একপর্যায়ে ওই অভিবাসন-প্রত্যাশীদের তীরে ভিড়তে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। এতে তারা ক্ষুৎপিপাসায় কাতর হয়ে এক দেশের জলসীমা থেকে আরেক দেশের জলসীমায় ঘুরতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে আজ ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের উপকূল থেকে ৪২৬ জন অভিবাসন-প্রত্যাশীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
মিয়ানমারে সহিংসতা ও ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে সে দেশ থেকে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে। বিশেষ করে তারা মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছে। এর দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে ইয়াঙ্গুন। এমনকি রোহিঙ্গাদের নিজেদের নাগরিক বলেও স্বীকার করতে নারাজ মিয়ানমার।
গত সোমবার মিয়ানমারের অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল এনএলডির এক মুখপাত্র ‘দেশহীন মুসলিম জনগোষ্ঠীকে’ নাগরিকত্বের সুযোগ দেওয়ার জন্য দেশটির সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এমন প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতির বরাত দিয়ে আজ জানায়, আঞ্চলিক অভিবাসী সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের সঙ্গে একমত ইয়াঙ্গুন। সমুদ্রে যারাই দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, তাদের মানবিক সহায়তা দিতে মিয়ানমার প্রস্তুত।
আঞ্চলিক অভিবাসী সংকটের দায় প্রশ্নে মিয়ানমার যে কিছুটা নমনীয় হয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতিটি সেটাই ইঙ্গিত করছে।

নেপালে মানবিক সঙ্কট, চারদিকে শুধু লাশ

চারদিকে লাশ আর লাশ। ধ্বংসস্তূপের নিচে শুধু লাশ। শিশুর লাশ। নারীর লাশ। মায়ের লাশ। বোনের লাশ। তার মাঝে এখনও রয়েছে জীবন্ত মানুষের বাঁচার শেষ আকুতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভূমিকম্পের পরবর্তী ৭২ ঘন্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা না গেলে তাদের প্রাণপ্রদীপ নিভে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। নেপালে এ এক অবর্ণনীয় দৃশ্য। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। একটি বহুতল ভবনের ধাক্কায় পড়ে আছে আরেকটি ভবন। যেকোন দিকে চোখ রাখলেই এমন ভয়াবহতাই ফুটে উঠছে। উদ্ধারকর্মীরা পরিস্থিতি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ছেন। তার ওপর একের পর এক ভূমিকম্পে পরিস্থিতিকে সঙ্গীন করে তুলেছে। ১৯৩৪ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ এই ভূমিকম্পে এরই মধ্যে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ২০০০। অসংখ্য মানুষ হয়েছে হয়েছেন আহত। এখন সরকার ও উদ্ধারকর্মীদের জন্য জীবিতদের উদ্ধার করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। জরুরি সহায়তা বিষয়ক প্রোগ্রাম আমেরিকেয়ারস এর ভাইস প্রেসিডেন্ট গারেথ ইঙ্গোগলিয়া বলেছেন , ঘটনার পরের ৭২ ঘন্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ের মধ্যে জীবিতদের উদ্ধার করা না গেলে তাদের প্রাণহানীর সমূহ আশঙ্কা থাকে। ৭২ ঘন্টা বা ৩ দিন পরে জীবিত মানুষকে উদ্ধারের সম্ভাবনা একেবারেই কমে যায়। ভূমিকম্পের পর আবার ভূমিকম্পে উদ্ধার অভিযান মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসা সেবা পৌঁছানো যাচ্ছে না। সব মিলে নেপালে সৃষ্টি হয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

নারীদের হয়রানি সামজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে

বাংলাদেশে জীবিকা, শিক্ষা এবং জীবন যাপনের চাহিদা পূরণে বহু মেয়েকে এখন ঘরের বাইরে বেরুতে হচ্ছে। কিন্তু রাস্তায়, পরিবহনে, উন্মুক্ত স্থানে, বাজারসহ বাইরে বিভিন্ন জায়গায় নারীরা প্রতিনিয়তই যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
নারীপক্ষ নামে একটি নারী আন্দোলন সংগঠনের সদস্য ফিরদৌস আজিম বলছিলেন, ঢাকায় সব রকমের নিরাপত্তা হীনতায় নারীরা ভোগেন। টিটকারি থেকে শুরু করে শারীরিক হামলা, সবরকমের ঘটনাই ঘটে।
পুরো আবহই এরকম যে, শ্রমজীবী নারী থেকে মধ্যবিত্ত নারী, কেউ একা চলাফেরা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না,তিনি বলেন।
মি. আজিম বলছিলেন, অনেক ক্ষেত্রেই এটা শারীরিক বিষয়ের চেয়ে মানসিকভাবে বেশি ভীতিকর হয়ে ওঠে। তবে শুধুমাত্র ঢাকায় নয়, সারাদেশেই নারীরা সমস্যায় রয়েছেন। এটা অনেকটা সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এরকম প্রেক্ষাপটে ‘নারীর জন্য নিরাপদ শহর গড়ার প্রতিশ্রুতি’ নিয়ে একশন এইড একটি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশসহ কুড়িটি দেশে একটি প্রচারণার উদ্বোধন করছে আজ।
ফিরদৌস আজিম বলছেন, এর ফলে নারীদের অগ্রযাত্রা অনেকাংশে ব্যাহত হচ্ছে। কারণ এ ধরণের ঘটনায় অনেক সময় নারীদের উপর উল্টো দোষ চাপানো হয়। ফলে নারীরাও তাদের সংকুচিত করে রাখেন।

অভিবাসীদের আশ্রয় দেবে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া

সমুদ্রে নৌকায় করে ভাসছে, এরকম প্রায় সাত হাজার অভিবাসন প্রত্যাশীকে সাময়িক আশ্রয় দিতে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে ওই বৈঠকে থাইল্যান্ডও অংশ নিয়েছে।
তিনটি দেশই অভিবাসীদের সবরকম সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যাতে, আন্তর্জাতিক সহায়তায় আগামী একবছরের মধ্যে তারা অন্য কোন দেশে তাদের আবাস খুঁজে নিতে পারে। নৌকায় ভাসতে থাকা মানুষদের অবস্থা নিয়েও দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
প্রধানত মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমরা পালিয়ে এসব দেশে যাবার চেষ্টা করছে। তাদের সাথে অনেক বাংলাদেশীও মালয়েশিয়া যাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোন কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এই সম্মেলনে অংশ নেয়নি মিয়ানমার।
ওদিকে সমুদ্রে ভাসমান বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের আশ্রয় দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ফিলিপাইন সরকার। সমুদ্রে ভাসমান অবৈধ হাজার হাজার অভিবাসীকে আশ্রয় দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে রাজধানী ম্যানিলা প্রশাসন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। দক্ষিণ-পূর্ব-এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো যখন মরিয়া অভিবাসীদের নিয়ে ‘পিং-পং খেলা’ খেলছে, তখন মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে চায় ফিলিপাইন। জাতিসংঘের শরণার্থী নীতির চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রসমূহের একটি ফিলিপাইন। মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মুসলমানরা যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি থেকে ও দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত বাংলাদেশীরা উন্নত জীবিকার আশায় পালিয়ে ফিলিপাইনে আশ্রয় নিতে যাচ্ছেন। এমন একটি সূত্র উল্লেখ করে স্থানীয় একটি সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের প্রায় ৮,০০০ অবৈধ অভিবাসীকে উপকূল থেকে ফিরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ফিলিপাইনের। এ ধরনের খবরের সত্যতা প্রত্যাখ্যান করেছে ম্যানিলা এবং অভিবাসীদের জন্য মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বেনিগনো অ্যাকুইনোর মুখপাত্র হারমিনিও কোলোমা বলেছেন, ফিলিপাইন বোটে থাকা মানুষদের প্রতি মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি করেছে ফিলিপাইন এবং ৭০’র দশকে ভিয়েতনামের আশ্রয় প্রার্থীদের জন্য একটি শরণার্থী কেন্দ্রও গড়ে তুলেছিল। কোলোমা আরও বলেন, জীবন বাঁচাতে আমরা আমাদের অংশের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবো। এদিকে ম্যানিলার এ বিবৃতি আশার আলো জাগাচ্ছে। এ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়াও  থাইল্যান্ড প্রায় ৩,০০০ অভিবাসীকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু, সাগরে ভাসমান অবস্থায় অনিশ্চিত জীবনের মুখে রয়েছেন আরও হাজার হাজার অভিবাসী। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)-এর মুখপাত্র জো লোওরি বলেছেন, এটা আশাব্যঞ্জক লক্ষণ। আমরা আশা করি, এ অঞ্চলের সরকারসমূহও তাদের নিজেদের অবস্থানেরও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাবেন। তিনি বলেন, আমরা ১০ দিন ধরে বলছি যে, সরকারসমূহের (ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড) উচিত অভিবাসীদের তীরে ভিড়তে দেয়া। আমরা জানিনা এ পর্যন্ত কতোজন প্রাণ হারিয়েছেন।

মানুষগুলোকে বাঁচাতে এখনই ব্যবস্থা নিন -জাতিসংঘের চার সংস্থা ও দপ্তরের যৌথ বিবৃতি

গভীর সাগরে ভাসতে থাকা হাজারো বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসনপ্রত্যাশী এবং এরই মধ্যে উদ্ধার হওয়া মানুষের প্রাণ রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের চারটি সংস্থা ও দপ্তর।
গতকাল মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের প্রতি ওই আহ্বান জানায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর), মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর), আন্তর্জাতিক অভিবাসনবিষয়ক সংস্থা (আইওএম) ও জাতিসংঘ মহাসচিবের আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ দূত (এসআরএসজি) ফর মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের কার্যালয়। আর এসব লোককে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ফিলিপাইন। খবর বিবিসি ও গার্ডিয়ানের।
সাগরে ভাসমান নারী-পুরুষ ও শিশুদের অমানবিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, উদ্ধার হওয়া লোকজন এবং বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে বিভিন্ন নৌযানে ভাসতে থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সুরক্ষা, নিরাপদে তীরে অবতরণের সুযোগ দেওয়া, জীবন বাঁচানোর বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া, অধিকার রক্ষা এবং মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য আমরা ওই দেশগুলোর নেতাদের প্রতি জোর আহ্বান জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে এসব বিষয়ে নয় দফা সুপারিশ করা হয়।
গণমাধ্যমের খবর ও মানবাধিকারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, গভীর সাগরে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি ও মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে প্রায় দুই মাস ধরে সাত-আট হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী ভেসে বেড়াচ্ছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে এই ব্যক্তিদের নিয়ে মর্মান্তিক যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে এটি নিশ্চিত যে সারা বিশ্বের অরক্ষিত মানুষেরা নিরাপত্তা ও মর্যাদার খোঁজে এবং নিপীড়ন, দারিদ্র্য, নানা রকমের বঞ্চনা, বৈষম্য ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে এ রকম বিপজ্জনক যাত্রাকে বেছে নিচ্ছেন। এই যাত্রা স্থল, নৌ বা আকাশ যে পথেই হোক না কেন, তা বৈশ্বিক ঘটনায় রূপ নিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত সাগরের বিপৎসংকুল যাত্রায় পা বাড়িয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ৮৮ হাজারের বেশি মানুষ। শুধু চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই পাড়ি জমানো মানুষের সংখ্যা ২৫ হাজার। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রযাত্রায় বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে তাঁদের প্রায় এক হাজার লোক মারা গেছেন। সমসংখ্যক লোক মারা গেছেন পাচারকারীদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বঙ্গোপসাগরে অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের শুধু ভাত খেতে দেওয়া ও যৌন নির্যাতনসহ সহিংসতার সম্মুখীন করা হয়েছে। নারীদের ধর্ষণ করা হয়েছে। শিশুদের বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন ও নির্যাতন করা হয়েছে। পুরুষদের মারধর ও সাগরে নিক্ষেপ করা হয়েছে।
ফিলিপাইনের প্রস্তাব: গভীর সাগরে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে ভেসে চলা মানুষগুলোকে আশ্রয়দানের প্রস্তাব দিয়েছে ফিলিপাইন। এই মানুষগুলোর জন্য থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া যখন তাদের সীমান্ত বন্ধ এবং অভিবাসনপ্রত্যাশী কোনো নৌকা কূলের কাছাকাছি ভিড়লে তা সাগরে ঠেলে পাঠাচ্ছে, ঠিক সে মুহূর্তে এই প্রস্তাব দিল ফিলিপাইন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর মধ্যে ফিলিপাইনই প্রথম ভাসমান এই মানুষগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব দিল। দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর ফোরাম আসিয়ানের সদস্য। গত কিছু দিন ধরে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা ওই তিন দেশের প্রতি সীমান্ত খুলে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিল। একই সঙ্গে চাপ দিচ্ছিল মানুষগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণের।
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট বেনিগনো অ্যাকুইনোর মুখপাত্র হারমিনিয়ো কলোমা বলেন, ‘নৌকারোহীদের প্রতি মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে ফিলিপাইন এবং সত্তরের দশকে ভিয়েতনামি অভিবাসীদের জন্য ব্যবহৃত আশ্রয়কেন্দ্র ইতিমধ্যে প্রস্তুত করার কাজ শুরু করা হয়েছে।’
কলোমা আরও বলেন, ‘জাতিসংঘ সনদের অধীন আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় এই মানুষগুলোর জীবন বাঁচাতে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। আমাদের প্রচলিত ও দীর্ঘদিনের ব্যবস্থার আলোকেই এ প্রচেষ্টা চালানো হবে।’
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, ফিলিপাইন সরকারের এই প্রস্তাব উদ্ধার হওয়া অভিবাসী ও সাগরে ভাসমান অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ে চলা সংকট সমাধানে দারুণ আশার সঞ্চার করেছে।
আইওএমের মুখপাত্র জো লোউরি বলেন, ‘এটা আশা জাগানোর মতোই চিহ্ন। সেই সঙ্গে আমরা আশা করব, এ অঞ্চলের সরকারগুলো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ে যে খেলা শুরু করেছে তা বন্ধ করবে।’
লোউরি আরও বলেন, ‘গত ১০ দিন ধরে আমরা বলছি, সরকারগুলোর উচিত মানুষগুলোকে তীরে ভিড়তে দেওয়া। আমরা জানি না, তাঁদের মধ্যে কতজন মারা গেছেন।’ তিনি বলেন, গত সপ্তাহে প্রায় ৩০০ যাত্রীবাহী একটি নৌকাকে নিয়ে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের ঠেলাঠেলির পর সেটির ভাগ্যে কী ঘটেছে তা সম্পর্কে আমরা এখন অনিশ্চিত। অন্তত তিন দিন ধরে এ সম্পর্কে আর কোনো কিছুই জানা যাচ্ছে না।
ফেরত আনা হবে আটক বাংলাদেশিদের: নৌকায় অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে কয়েকটি দেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের ফিরিয়ে আনবে জাতিসংঘ।
ঢাকায় আইওএমের মুখপাত্র আসিফ মুনীর গত রাতে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকারের এ ব্যাপারে একটি অনুরোধে তাঁরা সম্মতি দিয়েছেন। জরুরি ভিত্তিতে ১০ লাখ ডলারের একটি তহবিলও মঞ্জুর করা হয়েছে।
থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় দুই থেকে তিন হাজারের মতো বাংলাদেশি আটক রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইওএম জানিয়েছে, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও স্থানীয় বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর সহযোগিতায় এই বাংলাদেশিদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে।
আসিফ মুনীর জানান, প্রথমে মালয়েশিয়ায় আটক বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা হবে।

সালাহ উদ্দিনকে সিঙ্গাপুরে নিতে চান স্ত্রী- অন্য দেশে পাঠাতে আইনি জটিলতা by রাহীদ এজাজ

শিলংয়ে সালাহ উদ্দিন আহমদ
বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদকে চিকিৎসার জন্য শিলং থেকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যেতে চান তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ। তবে মেঘালয় রাজ্যে অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা থাকায় তা সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তিনি হয়তো শিলংয়ের বাইরে যাওয়ার অনুমতি পাবেন না।
এখানকার সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। তাঁরা বলেন, বিনা পাসপোর্টে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে ফরেনারস অ্যাক্ট, ৪৬ অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বাইরে পাঠানোর সুযোগ নেই।
হাসিনা আহমদ গতকাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো স্বামীর সঙ্গে সিভিল হাসপাতালে দেখা করেন। হাসিনা আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সিঙ্গাপুরের মতো তৃতীয় কোনো দেশে তিনি সালাহ উদ্দিন আহমদের চিকিৎসা করাতে চান। কারণ, ২০ বছর ধরে সেখানে তাঁর চিকিৎসা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গতকালও সালাহ উদ্দিনের কিছু স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো হয়। তাঁর কিডনিতে পাথর পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানান চিকিৎসক ডি জি গোস্বামী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘সালাহ উদ্দিন আহমদকে দেখতে গিয়েছি। তাঁর চর্মরোগের বিষয়টি দেখতে আমার সহকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছি। বুধবার অন্য দুই সহকর্মীকে নিয়ে তাঁর স্বাস্থ্যগত বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে আলোচনায় বসতে পারি।’
উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে তৃতীয় দেশে নেওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে ডি জে গোস্বামী বলেন, ‘এটি আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। তবে মেঘালয়ে সিভিল হাসপাতাল ছাড়াও উন্নত চিকিৎসার জন্য নেগ্রিমসের (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইন্দিরা গান্ধী হেলথ ও মেডিকেল সায়েন্স) মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় আইনজীবী এম এস কুরেশি এ বিষয়ে বলেন, এর আগে এখানে ফরেনারস অ্যাক্টের মামলাগুলোর সমাধান যেভাবে হয়েছে, এ ক্ষেত্রে সেভাবে না-ও হতে পারে। কারণ সালাহ উদ্দিন একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাঁর মতো ব্যক্তির ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশে চিকিৎসার বিষয়টি যেভাবে আসছে, সে সম্পর্কে ফরেনারস অ্যাক্টে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। ফলে মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ারÿক্ষমতা বিচারিক আদালতের নেই। শুধু হাইকোর্টই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সালাহ উদ্দিন তৃতীয় কোনো দেশে চিকিৎসার জন্য যেতে চাইলে আইনি জটিলতার কারণে তা সহজ হবে না। তা ছাড়া ইন্টারপোলের রেড নোটিশের কারণে কেন্দ্রীয় সরকার কতটা যুক্ত হবে, সেটিও ভাবনার বিষয়। সব মিলিয়ে আগামী শুক্রবারের মধ্যে তাঁকে আদালতে তোলা হবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।
এদিকে পুশব্যাক করার যে আলোচনা রয়েছে, আপাতত তা নাকচ করে দিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বিএসএফের ডিআইজি এস কে সিং প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হলে বিএসএফের মাধ্যমেই সেটি করার কথা। এখন পর্যন্ত সালাহ উদ্দিন আহমদকে পুশব্যাকের ব্যাপারে আমরা কিছু জানি না।’
আবার দেখা করলেন স্ত্রী: শিলং পৌঁছানোর পর গতকাল সকালে দ্বিতীয় দিনের মতো সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করেন তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ। স্বামীর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ওনার শরীর খুবই খারাপ। একটানা দুই মিনিট দাঁড়ালে হাত-পা কাঁপতে থাকে। উন্নত চিকিৎসা দরকার। হৃদ্রোগের সমস্যাও আছে। কিডনির সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে।
ভারতের চিকিৎসাব্যবস্থা তো যথেষ্ট উন্নত। তৃতীয় দেশে নিতে চাইছেন কেন? জবাবে হাসিনা আহমদ বলেন, ২০ বছর ধরে সালাহ উদ্দিনের সব চিকিৎসা সিঙ্গাপুরে হচ্ছে। হৃদ্রোগের জন্য তিনবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তাই সেখানেই নিয়ে যেতে চান।

পালপাড়ায় গণশুনানিতে মোরশেদের ফাঁসি দাবি

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার পালপাড়ায়
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গতকাল গণশুনানি
অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সন্ত্রাসী মোরশেদের নির্যাতনের
ঘটনা বর্ণনা করেন এক সংখ্যালঘু নারী l ছবি: প্রথম আলো
বগুড়ার পালপাড়া ‘পোড়ানো’ সন্ত্রাসী মোরশেদ আলম ছিঁচকে মাদকসেবী থেকে মাদকের ব্যবসা, খুন, চাঁদাবাজি, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। শুধু সংখ্যালঘু নারীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন নয়; নিজের স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগেও মামলা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। এক যুগ ধরে পালপাড়ার সংখ্যালঘু শতাধিক পরিবারের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানোর পর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া মোরশেদ সম্পর্কে এমন তথ্য দিয়েছে পুলিশ ও প্রতিবেশীরা। গত সোমবার রাতে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর কিছুটা স্বস্তি নেমে আসে এলাকায়। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে পালপাড়ায় পূজামন্দির চত্বরে মোরশেদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গণশুনানিতে সাক্ষ্যগ্রহণ করেন শাজাহানপুরের ইউএনও মোহাম্মদ রুবায়েত খান। এ সময় এসি ল্যান্ড রিভা চাকমা ও ওসি আবদুল মান্নান উপস্থিত ছিলেন। গণশুনানিতে মোরশেদের ফাঁসির দাবি জানায় ভুক্তভোগীরা।
প্রতিবেশীরা জানান, মোরশেদ কম বয়সেই সঙ্গদোষে মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ে। বিয়ের পর স্ত্রী-সন্তান ফেলে নেশার জগতে ডুবে যায়। নেশার টাকা জোগাতে এক সময় ছিঁচকে চুরিতেও জড়িয়ে পড়ে। এ সময় আড়িয়া এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী মশিউর রহমানের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে তার। জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদকসহ নানা মামলায় জড়িয়ে যায়।
শাজাহানপুর থানার ওসি আবদুল মান্নান জানান, ‘মাদক সেবনের কারণে স্ত্রীকে নির্যাতনও করত মোরশেদ। ২০১০ সালে নির্যাতনের অভিযোগ এনে স্ত্রী রুমি বেগম মোরশেদের বিরুদ্ধে বগুড়ার আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। ২০১২ সালে মাদকের মামলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে তিন মাসের এবং ২০১৩ সালের আরেকটি মামলায় ছয় মাসের কারাদণ্ড হয় তার। প্রতিপক্ষের লয়া মিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মোরশেদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা হয়।’
পালপাড়ার নির্যাতিত ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, ২০০৩ সাল থেকে মোরশেদের চাঁদাবাজি শুরু হয় পালপাড়ায়। ২০১২ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক কলেজছাত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে যায় সে। এক দিন পর তাঁর বাড়ি থেকে পুলিশ মেয়েটিকে উদ্ধার করলেও রাতেই মেয়েটির বাবা-মা সপরিবারে ভারতে চলে যান। ওই ঘটনার পর মোরশেদ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তার হাত থেকে বাঁচতে বেশ কয়েকটি পরিবার ভারতে চলে যায়। পালপাড়া মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোবিন্দ পালের ভাষ্য, আড়িয়াবাজারে সেলুন ব্যবসা করতেন ডাবলু পাল। কিছুদিন আগে তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা চায় মোরশেদ। চাঁদা না দিলে বউকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। দিশেহারা ডাবলু ভয়ে তিন দিনের মাথায় ভারতে পালিয়ে গেলেন।
আড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তসলিম উদ্দিন বলেন, মোরশেদ সঙ্গদোষে প্রথমে মাদক ব্যবসা এবং পরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। একসময় পালপাড়ার লোকজনের কাছে ত্রাস হয়ে ওঠে।
পুলিশি হেফাজতে থাকা মোরশেদ আলম বলে, ‘পালপাড়ার কাউকে নির্যাতন করিনি। চাঁদাবাজি বা ভাঙচুরের অভিযোগও ঠিক নয়। কলেজছাত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মোরশেদ বলে, ‘ওই মেয়ের সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।’
নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের সাক্ষ্য: সংখ্যালঘু পরিবারের ৩৪ জন নির্যাতিত নারী-পুরুষ গণশুনানিতে অংশ নিয়ে সন্ত্রাসী মোরশেদ ও তার সহযোগীদের অত্যাচারের সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ সময় তাঁরা মোরশেদের ফাঁসি দাবি করেন।
নির্যাতিত অঞ্জলি রানী পাল তাঁর সাক্ষে বলেন, ‘তিন সপ্তাহ আগে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরও তিনি পালপাড়া পরিদর্শনে আসেননি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাই।’

রোদ ও মেঘ হলেই স্কুল ছুটি by মনিরুল ইসলাম

ভূমিকম্পে বিদ্যালয় ভবনে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায়
যশোর সদর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের ৫৩ নম্বর এফএমবি
(ফরিদপুর, মনোহরপুর, বাঁশবাড়িয়া) সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হচ্ছে খোলা আকাশের
নিচে। সম্প্রতি তোলা ছবি l এহসান–উদ–দৌলা
গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে খোলা আকাশের নিচে পাঠগ্রহণ (ক্লাস) করতে হচ্ছে ওদের। বৃষ্টিতে ভেজার আশঙ্কায় আকাশে মেঘ জমলেই ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ পরিস্থিতিতে কোমলমতি শিশুরা পাঠে মনোযোগ দিতে পারছে না।
এ চিত্র যশোর সদর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের ৫৩ নম্বর এফএমবি (ফরিদপুর, মনোহরপুর ও বাঁশবাড়িয়া) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে ৪১১ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। শিক্ষক আছেন ছয়জন।
১৩ মে সকাল ১০টার দিকে সরেজমিনে দেখা গেল, বিদ্যালয়ের মাঠে গাছতলায় ছোট ছোট চটে বসে প্রথম শ্রেণির জনা পঞ্চাশেক শিশু ক্লাস করছে। এক নারী শিক্ষক পড়াচ্ছেন। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে কারও গায়ে রোদ পড়লে শিক্ষক বলছেন, ‘ছায়ার দিকে সরে বসো।’ শিক্ষার্থী চট গুটিয়ে যেখানে ছায়া আছে, সেখানে গিয়ে বসছে। এক ঘণ্টার মধ্যে একজন শিক্ষার্থীকে কমপক্ষে তিনবার নিজের জায়গা বদল করতে দেখা গেল।
অনিক নাঈম নামের এক শিক্ষার্থী বলল, ‘বেঞ্চি হলে ভালো হতো। বাড়ি থেকে চট বয়ে আনে বসতি ভালো লাগে না। রোদ আসলি সরে সরে বসতি হয়।’
অভিভাবক আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার মাইয়েডা ঝড়-বৃষ্টির খুব ভয় পায়। বাইরে বসতি হয় বলে বৃষ্টি হলে আর স্কুলে যেতে চায় না।’
স্কুল ক্যাম্পাসের টিনের চালার ভবনে গিয়ে দেখা গেল, দেয়ালজুড়ে ফাটল। জানা যায়, এ ভবনেই স্কুলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। এটির একটি ছোট কক্ষে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠাগার রয়েছে। আরেকটি লম্বা কক্ষে ক্লাস হতো।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিন উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, অন্তত ছয় বছর আগে ভবনটি মৌখিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তারপরও সেখানে পড়ানো হতো। সাম্প্রতিক কয়েক দফার ভূমিকম্পে ওই ভবনে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল (এলজিইডি) বিভাগের উপজেলা প্রকৌশলী বিদ্যালয় পরিদর্শন করে সেখানে আর না বসার জন্য সতর্ক করে গেছেন। ওই ভবনে প্রথম ও তৃতীয় শ্রেণির ক্লাস হতো। তাই এই দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাইরে পাঠদান করতে হচ্ছে।
স্কুলের তিনজন সহকারী শিক্ষক বলেন, আকাশে মেঘ জমলে বাইরে বসা শিশুদের ছুটি দিতে হয়। তীব্র রোদেও অনেক সময় ছুটি ঘোষণা করতে হচ্ছে। স্কুলের মূল ভবনে দুটি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে, সেখানে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠদান চালানো হয়।
জরুরি ভিত্তিতে ভবন চেয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যশোর সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু আবেদনে তেমন সাড়া মেলেনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি উপজেলা প্রকৌশলী বিদ্যালয়ের ওই ভবনটি পরিদর্শন করে মৌখিকভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছেন। জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবনের জন্য তাঁর লিখিত প্রতিবেদনটি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হবে। আপাতত স্কুলের পাঠদান চালিয়ে দেওয়ার জন্য টিনের এক চালার খোলা ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

ইছামতীর কচুরিপানায় দুর্ভোগ by বরুন রায়

পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ইছামতী নদীতে অত্যধিক
কচুরিপানা হওয়ায় স্থানীয় লোকজন গোসলসহ নানা
কাজ করতে পারছেন না। সম্প্রতি তোলা ছবি: প্রথম আলো
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় কচুরিপানার কারণে ইছামতী নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। এতে ইছামতীপারের অন্তত ১৫ গ্রামের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে দায়িত্ব নিয়ে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মধ্যে রশি টানাটানির কারণে থমকে আছে কচুরিপানা অপসারণের উদ্যোগ। ইছামতি নদীর এ অংশ সেচ প্রকল্পের অধীন।
এলাকাবাসী ও পাউবো সূত্র জানায়, ঘন কচুরিপানা জন্মানোয় পাঁচ-ছয় বছর ধরে গৃহস্থালির কাজে আগের মতো এ নদীর পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, কচুরিপানার কারণে ইছামতীতে নৌ চলাচলও বন্ধ। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে কচুরিপানা পচে যাওয়ায়। পচা কচুরিপানার দুর্গন্ধে একদিকে বসবাস যেমন মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি এই পানি পরিণত হয়েছে মশার প্রজননক্ষেত্রে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সোনাতলা গ্রাম থেকে ধুলাউড়ি পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার অংশজুড়ে জন্মেছে ঘন কচুরিপানা। কচুরিপানার কারণে কোথাও পানি দেখার উপায় নেই। প্রয়োজনের তাগিদে এলাকাবাসী কোনো কোনো স্থানে বাঁশের বেড়া দিয়ে কচুরিপানা ঠেকিয়ে সামান্য জায়গা বের করলেও সেই পানি দুর্গন্ধযুক্ত।
সাঁথিয়া পৌরসভার বাজার এলাকার ঘাটে কচুরিপানা সরিয়ে গোসল করতে থাকা দক্ষিণ বোয়ালমারী মহল্লার রহম আলী বলেন, ‘পচা পানিতে গোসল কইর্যাা গায়ে চুলকানি হয়া গ্যাছে। তার পরেও উপায় না থাকায় কচুরিপানা সরায়া আমাগরে গোসল করা লাগত্যাছে।’
পাইকশা গ্রামের বাসিন্দা কলেজশিক্ষক আবদুল খালেক বলেন, ‘১৫ গ্রামের মানুষের দুঃখ এই কচুরিপানা। বাড়ির পাশে পানিভর্তি নদী থাকা সত্ত্বেও সেই পানি ব্যবহার করা যায় না। বাধ্য হয়ে চরম আয়রনযুক্ত নলকূপের পানিতে গোসল ও রান্না করা লাগে।’
পাউবোর বেড়া শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী কবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রধান সেচখালটি (ইছামতী) ইজারা দিয়ে রাজস্ব আদায় করে জেলা প্রশাসন। কাজেই কচুরিপানা অপসারণের দায়িত্ব তাদের।’
সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, কচুরিপানা অপসারণের দায়িত্ব পাউবোর। আসলে তারা দায়িত্ব এড়াতে চায় বলেই জেলা প্রশাসনের ওপর দায় চাপাচ্ছে। যে অংশে কচুরিপানা রয়েছে, সে অংশ জেলা প্রশাসন কাউকে ইজারা দেয়নি।

আত্মসত্তার রাজনীতির স্ববিরোধ by কামাল দারভিস

কামাল দারভিস
যুক্তরাজ্যের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন থেকে বোঝা গেল, আত্মসত্তার রাজনীতি কীভাবে ইউরোপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি আসলে আত্মসত্তার রাজনীতির বামপন্থী রূপ, তাদের কারণে লেবার পার্টি স্কটল্যান্ড থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ফলে কনজারভেটিভরা সংসদে চূড়ান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ডেভিড ক্যামেরনের সরকার নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না–থাকা নিয়ে গণভোট আয়োজন করবেন। ক্যামেরন ব্রিটিশ পরিচয়ে জোর দিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের অভিন্ন স্বার্থের দিকে নজর দেননি। গণভোটের পরিণতিতে কী হবে, সে ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়।
বছরের পর বছর ধরে ইউরোপের রাজনৈতিক বিতর্ক মূলত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও নীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। কনজারভেটিভরা বেসরকারি খাত পরিচালিত অর্থনীতির কথা বলেছে, বাধাহীন বাজারের কথা বলেছে। তারা একদিকে কর কমাতে চায়, আরেকদিকে সরকারি ব্যয় হ্রাস করতে চায়। ওদিকে লিবারেল ও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা ব্যক্তিগত-মালিকানার অর্থনীতিতে সমর্থন দিয়েছিল। তারা বাজার, ইউরোপের অখণ্ডতা, বাণিজ্য বাড়ানোর পক্ষপাতী ছিল। এগুলোকে সহনীয় করার জন্য তারা আবার কর পুনর্বিতরণ, ট্রান্সফার, শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তা জাল, অবকাঠামো ও আর্থিক খাতে কিছু সরকারি মালিকানার কথা বলেছিল।
এই দ্বিমেরুভিত্তিক ব্যবস্থায় দলগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক নীতির কিছু ক্ষেত্রে মতানৈক্য থাকলেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ইউরোপীয় প্রকল্প, বিশ্বায়নকে পত্রপাঠ খারিজ না করে তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তাদের মধ্যে মতৈক্য আছে। কিন্তু পরিচয়ের রাজনীতির ক্রমবর্ধমান সফলতা ও নবসৃষ্ট নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের প্রভাবে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে। ২০ শতকের শুরুর ও মাঝের সময়ের ভূত কি আবার ফিরে আসছে?
ইউরোপের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কিন্তু এর আবার বৈশ্বিক তাৎপর্যও আছে। যেমন, মধ্যপ্রাচ্যে আত্মপরিচয়ের রাজনীতির সবচেয়ে অশুভ রূপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে: শিয়া ও সুন্নিদের মধ্যে সবচেয়ে বিশৃঙ্খল ও সহিংস সংঘাত, ইসলামিক স্টেট বা আইএসের উত্থানের মধ্য দিয়ে তা দেখা যাচ্ছে।
ধারণাকৃত পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের নির্বিষ ও সমৃদ্ধিকারী উপাদান রয়েছে, যেমন আঞ্চলিক ভাষার প্রচার। কিন্তু আত্মসত্তার রাজনীতির মুশকিল হচ্ছে, এর ফলে ‘ভেতরের’ সঙ্গে ‘বাইরের’ সংঘাত শুরু হয়। যে মনোভঙ্গি খুব সহজেই জাত্যভিমান, বিদ্বেষপ্রসূত বৈষম্য ও প্রকাশ্য শত্রুতা সৃষ্টি করতে পারে।
ইউরোপের এই আত্মসত্তার রাজনীতির পুনরুত্থানের অন্যতম কারণ হচ্ছে বিশ্বায়ন। এর ফলে যেকোনো দেশের মানুষের পক্ষে তার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠেছে। বটেই, বৈশ্বিক অর্থনীতি এতটাই আন্তর্দেশীয় ও বিশ্ববাজার এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে জাতীয় নীতি দিয়ে অতি চলিষ্ণু আন্তর্জাতিক পুঁজির অবাধ যাতায়াত ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্বায়ন সামগ্রিকভাবে সমৃদ্ধি এনেছে, কিন্তু তার ফসল নব্য অভিজাতদের ঘরেই উঠছে। অন্যদিকে ইউরোপের অনেক মানুষই নতুন প্রযুক্তি ও বিভিন্ন দেশে সহজলভ্য নিম্ন মজুরির শ্রমিকের কারণে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে না পারলে বা কিছু ক্ষেত্রে নতুন শিল্পে চলে যেতে না পারলে তাদের অর্থনৈতিক জীবন সংকুচিত হবে। সাম্প্রতিক অতীতে যে দেশগুলো আর্থিক মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, সেখানেই এই সুবিধাহীন মানুষের সংখ্যা বেশি। আর সেসব দেশ বেকারত্বেও জর্জরিত হয়ে পড়েছে।
কিন্তু যে মানুষেরা বিশ্বায়নের সুফল আপেক্ষিকভাবে বেশি ভোগ করেছে, তারাও বিশ্বায়নের কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে হতাশ। আর অভিবাসীদের মতো দরিদ্র অনাত্মীয় মানুষের জন্য তাদের করের টাকা ভর্তুকি হিসেবে ঢালা হবে, এটা নিশ্চয়ই তারা চাইবে না। এই কাতারে আরও আছে ফরাসি ভাষী বেলজিয়ান, দক্ষিণ ইতালীয় ও গ্রিক জনগণ।
এদিকে বাণিজ্য সংরক্ষণনীতি, ইউরোপীয় অখণ্ডতা ও অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের প্রশ্নে চরম ডান ও বামের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। যেমন, ফ্রান্সে ন্যাশনাল ফ্রন্টের অনেক সমর্থকই ৩০ বছর আগে কমিউনিস্টদের ভোট দিয়েছিল। আর ন্যাশনাল ফ্রন্টের অর্থনৈতিক কর্মসূচি অনেকটা বামফ্রন্টের (নির্বাচনী জোট, যার মধ্যে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি ও রেফট পার্টি আছে) মতোই। কিন্তু এই দলগুলো চরম ডানপন্থী দলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সেই মোহভঙ্গ হওয়া ভোটারদের দলে টানতে চাইছে। ফলে এসব বিষয়ে তাদের মানবিকতা চরম রাজনৈতিক অন্তরায়ে পরিণত হয়েছে। আর সম্প্রতি ভোটের নির্বাচনে যে চরম ডানপন্থীরা সফল হলো, এ বিষয়টিকেও তার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।
অন্যদিকে, এই আত্মসত্তার রাজনীতির উত্থান ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর জন্য বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মূলধারার রক্ষণশীলেরা ধনীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় এককাট্টা বলে সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, আজ তাদেরও জনপ্রিয় হওয়ার পন্থা খুঁজতে হবে। কিন্তু অভিবাসন ও মানবাধিকার প্রশ্নে তাদের আবার চরম ডানপন্থীদের কথা বলা চলবে না। ক্যামেরন ভারসাম্য প্রণয়নের এই সূক্ষ্ম খেলায় সফল হয়েছেন, সে কারণেই তিনি জিতেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রিপাবলিকান পার্টিও দলের মধ্যে এমন চরমপন্থীদের চাপে পড়েছে, তাদেরও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
ওদিকে মধ্য বামপন্থী দলগুলোর জন্য আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। ভোটারদের জন্য তাদের বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক কর্মসূচি হাজির করতে হবে, যেটা হবে বাজারবান্ধব ও আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উন্মুক্ত। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি-প্রকৃতিতে হতাশ হওয়া ৬০-৭০ শতাংশ জনগণের জন্যও দৃষ্টিগ্রাহ্য সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। বাম দলের অর্থনৈতিক নীতিকে যদি ডানপন্থী দলের অর্থনৈতিক নীতির দুর্বল অনুকরণ বলে মনে হয়, তাহলে জনগণের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র অংশটি জাত্যভিমানী দলগুলোতে ভিড় করবে। আর সেই দলগুলো তাদের বিশ্বায়নের প্রভাব থেকে বের করা যে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়, সেটা গিলবে।
স্পেন, তুরস্ক, ডেনমার্ক ও পর্তুগালের আসন্ন নির্বাচন এবং আগামী বছরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও এই চ্যালেঞ্জ নানা রূপে আবির্ভূত হবে। বিশেষ করে, বামপন্থীদের সমতা ও গণতন্ত্রের নীতি রক্ষা করতে হবে। আবার আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ বিশ্বায়নের অপরিবর্তনীয় প্রপঞ্চকে ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাখতে হবে। স্ববিরোধের বড় জায়গা হচ্ছে, আত্মসত্তার রাজনীতির এমন বাড়বাড়ন্ত হতে থাকলে কোনো সরকারের পক্ষে এর কারণগুলো আমলে নেওয়া সম্ভব হবে না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
কামাল দারভিস: তুরস্কের সাবেক অর্থমন্ত্রী।

যুক্তরাষ্ট্রে বাইক রাখা নিয়ে পাঁচ গ্রুপের গোলাগুলি

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে রোববার প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচ ‘মোটরবাইকার’ গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে ৯ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে প্রায় ১৮ জন। স্থানীয় সাংবাদিকদের পুলিশ বলছে, টেক্সাসের মধ্যাঞ্চল ওয়াকোর এক রেস্তোরাঁয় (টুইন পিকস স্পোর্টস বার অ্যান্ড গ্রিল) এ বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। এতে পাঁচটি চক্র অংশ নেয়। যেখানে বন্দুকযুদ্ধ চলে তার মাত্র ২৫ ফুট দূরে কিছু পরিবার ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ হতাহত হয়নি। ওয়াকো পুলিশের ধারণা, রেস্তোরাঁর পার্কিং স্পেসে বাইক রাখার জায়গা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্র“পগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। বাইকারদের পাঁচটি দল এ ঘটনায় জড়িত। এক প্রত্যক্ষদর্শীকে উদ্ধৃত করে ওয়াকো ট্রিবিউন-হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলে ওই রেস্তোরাঁর গাড়ি রাখার জায়গা রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। মাইকেল লোগান নামের ওই প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, অন্তত ৩০টি অস্ত্র থেকে কয়েকশ’ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। এতে ঘটনাস্থলেই আটজন নিহত হন, হাসপাতলে নেয়ার পর আরও একজনের মৃত্যু হয় বলে ওয়াকো পুলিশ জানিয়েছে।
ওই রেস্তোরাঁয় যারা খেতে এসেছিলেন এবং যারা কাজ করছিলেন, তারা সবাই গুলি থেকে বাঁচতে খাবার রাখার একটি হিমঘরে আশ্রয় নেন। পরে পুলিশ এসে পাহারা দিয়ে তাদের সরিয়ে নেয়। স্থানীয় পুলিশের মুখপাত্র সার্জেন্ট ডব্লিউ প্যাট্রিক সোয়ানটন জানান, মারামারি শুরু হয় ঘোষাঘুষি দিয়ে। এরপর চেইন, গদা, ছুরি এবং শেষপর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গ্রুপগুলো রীতিমতো যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। ‘আমার ৩৪ বছরের পুলিশের চাকরিতে এমন ঘটনা দেখিনি, চারিদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত’, বলেন সোয়ানটন। সার্জেন্ট সোয়ানটন জানান, গোলাগুলি শুরুর পর পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয় এবং অস্ত্রসহ অন্তত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। ‘বাইকারদের এসব গ্যাং খুবই ভয়ঙ্কর। বহু নিরীহ মানুষ হয়তো আজ আহত হয়েছে।’ এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা সরে গিয়ে শহরের অন্য কোথাও আবারও সংঘর্ষে জড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে, বন্দুক ও ছুরি হামলায় প্রায় ১৮ জন আহত হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একশরও বেশি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। টেলিভিশন ফুটেজে দেখা গেছে পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করছে, কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। প্রয়োজনে পুলিশ ভ্যানে করে অনেককে তুলেও নিয়ে যাচ্ছে। ফেসবুকে ওয়াকো পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো পুলিশ আহত হয়নি।

ইংলাকের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার দেশ ত্যাগে (বিদেশ ভ্রমণ) নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ব্যাংককের একটি আদালত। ক্ষমতায় থাকাকালীন চালে ভর্তুকি প্রকল্পে অবহেলার মামলার শুনানি চলাকালে মঙ্গলবার এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি বিতর্কিত চাল কেনা প্রকল্পে ভর্তুকিতে দায়িত্বে অবহেলা করেছেন বলে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমপক্ষে ১০ বছরের জেল হবে ইংলাকের। খবর বিবিসির। মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২১ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিতর্কিত এই মামলাটির প্রথম শুনানি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি চলাকালে ৪৭ বছর বয়সী ইংলাকের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ৩ কোটি বাথ (প্রায় ৯ লাখ মার্কিন ডলার) বন্ডের বিনিময়ে জামিন মঞ্জুর করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন চালে ভর্তুকি প্রকল্পে অবহেলা প্রদর্শন করেন ইংলাক। ফলে সরকারি কোষাগারের ১৮৪০ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়। মঙ্গলবার আদালতে হাজির হওয়ার পর সিনাওয়াত্রা সাংবাদিকদের বলেন, আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ অভিযোগ আনা হয়েছে। আমি নির্দোষ প্রমাণিত হব এবং এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এর আগে গত সপ্তাহে থাই সংবাদপত্রকে দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য আইনি লড়াই চালাতে প্রস্তুত। দেশটিতে ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় বসেন ইংলাক সিনাওয়াত্রা। ২০১৪ সালে দেশটির সাংবিধানিক আদালত ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাকে পদত্যাগ করার রায় দেয়। এরপর ওই বছরেরই মে মাসে সেনাবাহিনী তাকে পদচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার পার্লামেন্টে ভোটের মাধ্যমে ইংলাককে অভিশংসিত করে। পাশাপাশি রাজনীতিতে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছেন তিনি। ইংলাকের বড় ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদচ্যুত করেছিল সেনাবাহিনী। বর্তমানে তিনি নির্বাসনে রয়েছেন।

ইসলাম নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়ে নিজেই নিষিদ্ধ!

মাত্র দু’দিন আগে ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সার্কোজির দলের নেতা এবং ভেনেলে শহরের মেয়র রবার্ট শার্ডন হুংকার ছেড়ে বলেছিলেন, ‘২০২৭ সালের মধ্যে অবশ্যই ফ্রান্সে ইসলাম ধর্মকে নিষিদ্ধ করা হবে। এবং কেউ এই ধর্ম পালন করতে চাইলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হবে।’ তারপর দুই দিন না যেতেই এখন নিজের মেয়র পদেই ‘নিষিদ্ধ’ হওয়ার অপেক্ষায় আছেন শার্ডন।
তার দল ইউএমপি ইতিমধ্যে তাকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে এবং মেয়র পদ থেকেও তাকে বরখাস্ত করা হতে পারে। ইউএমপির ভাইস প্রেসিডেন্ট নাথালি কসিউস্কো মরিজে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘এ ধরনের অদ্ভুত মন্তব্য কোনোভাবেই ইউএমপির কর্মসূচির মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটায় না। আমি তার বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি।’ শার্ডন তার টুইটারে ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্য করার পরপরই নিকোলা সার্কোজি টুইট করে এর প্রতিবাদ জানান।

২০২০ সালের মধ্যে গলে যাবে ১০ হাজার বছরের প্রাচীন বরফ প্রাচীর

অ্যান্টার্কটিকার লারসেন বি আইস শেলফের রয়ে যাওয়া অন্যতম একটি অংশ নাটকীয়ভাবে গলতে শুরু করেছে এবং ২০২০ সালের মধ্যেই তা পুরোপুরি গলে যাবে বলে মহাকাশ গবেষণা সংস্থা- নাসার একটি গবেষণা প্রতিবেদনে আশংকা করা হয়েছে। ভূমির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ভাসমান বরফ প্রাচীরগুলোর মধ্যে একসময় অন্যতম পুরু ও বৃহদাকার হিসেবে বিখ্যাত ছিল লারসেন বি। এটি সৃষ্টি হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার বছর আগে। এ বরফ প্রাচীরটির আয়তন কমতে থাকার বিষয়টি প্রথমবারের মতো বিশ্বের নজরে আসে যখন ২০০২ সালে এর একটি অংশে ধস নামে। মাত্র ছয় সপ্তাহে বরফ প্রাচীরটির উল্লেখযোগ্য রকমের একটি বিশাল অংশের দ্রুত গলে যাওয়ার দৃশ্য অবলোকন করেন বিজ্ঞানীরা।
হিমবাহের সম্প্রসারিত রূপ- বিশাল বরফ প্রাচীর বা আইস শেলফ পৃথিবীর স্থল ও জলভাগের মধ্যকার প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। এ বরফখণ্ডগুলো গলে যাওয়ার মানে হচ্ছে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া। নাসা জানিয়েছে, লারসেন বি বরফ প্রাচীরের এ গলে যাওয়ার ধরন দেখে ধারণা করা হচ্ছে যে অ্যান্টার্কটিকা বর্তমানে ধারাবাহিকভাবে উষ্ণতর গ্রীষ্মের সম্মুখীন হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকা মানে হচ্ছে- তা পৃথিবীর জন্য একটি বড় ধরনের দুঃসংবাদ। ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাসে লারসেন বি’র আয়তন ছিল ৪ হাজার ৪৪৫ বর্গমাইল। ২০০২ সালের ফেব্র“য়ারিতে এর আয়তন মাপা হয় ২ হাজার ৫৭৩ বর্গমাইল এবং মাত্র এক মাসে তা আরও কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৩৭ বর্গমাইলে। বর্তমানে লারসেন বি’র অবশিষ্ট অংশের আয়তন মাত্র ৬১৮ বর্গমাইল। সিএনএন।

লুক ইস্টর দিন শেষ, এখন সময় অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির

এশিয়ায় ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের শেষ ধাপে সোমবার দু’দিনের সফরে দ. কোরিয়ায় পৌঁছেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বিনিয়োগ বাড়ানো তার এ সফরের মূল লক্ষ্য। বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৭টি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে। দেশটির প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হাইয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেন মোদি। বৈঠকে কূটনীতি থেকে অর্থনীতি এবং কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উভয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে মোদি বলেন, ‘লুক ইস্ট’ নয়, এখন সময় ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’র। প্রসঙ্গত ভারতের লুক ইস্ট পলিসি হচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে নয়াদিল্লির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বৈদেশিক সম্পর্ক বিস্তারের একটি কার্যকরী পরিকল্পনা নীতি। এ নীতির অন্যতম লক্ষ্য ভারতকে একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীনের কৌশলগত প্রভাব খর্ব করা।
ভারত এবং চীন নিজেদের মধ্যে আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় এ সম্পর্ক গড়ে তুললেও এর সঙ্গে জাপানের সংযুক্তি ধারণাটিকে কিছুটা হলেও পূর্ণতা দিয়েছে। তার সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়েছে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশ। অন্যদিকে, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির কেন্দ্রভূমি এশিয়া হওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি হচ্ছে ‘পিভট এশিয়া’। দক্ষিণ চীন সাগর, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনাবিষ্কৃত বিপুল সম্পদকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী দেশগুলোর এসব নীতি আবর্তিত হচ্ছে। ভারতের কংগ্রেস সরকার প্রণীত লুক ইস্ট পলিসি মোদির কাছে পানসে ঠেকে। তাই তিনি আরও প্রো-অ্যাক্টিভ পলিসি নেন, যার নাম ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’। এ নীতি গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের উদ্দেশে আমেরিকা থেকে বলা হয়, আমরা খুব ভালোভাবেই লুক ইস্ট নীতি সম্পর্কে অবহিত ছিলাম, কিন্তু আমরা অ্যাক্ট ইস্ট নীতির এ নতুন পরিবর্তনকে উষ্ণভাবে স্বাগত জানাই’। লুক্ট ইস্ট নীতি থেকে অ্যাক্ট ইস্ট নীতির মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে, এখন ভারত আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ভূমিকা রাখতে চায় এবং জাপান, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া আর আসিয়ানের সঙ্গে ভারতের বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি প্রধান ট্রেডিং নেশন হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে নিজের উত্থান চায়। আর তারই অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও নিবিড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ সফর করছেন মোদি।
চীন মঙ্গোলিয়া সফরের পর এবার দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর ও ভারতে সিউলের বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করছেন। দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বৈত কর পরিহার সংক্রান্ত চুক্তি, বিভিন্ন দ্রব্য আমদানি-রফতানির ব্যাপারে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ইত্যাদি বিষয়। ভারতের অবকাঠামো খাতে ১০০০ কোটি ডলার বিনিযোগ করতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। উল্লেখ্য, ভারতে প্রায় ৩০০ কোরিয়ান সংস্থা রয়েছে। এদেশে তারা প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সেদেশের প্রায় ৪০ হাজার কর্মী ভারতে কর্মরত। ভারতও প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। বহু ভারতীয় আইটি ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি কোরিয়ায় ব্যবসা করতে উৎসুক। এদিকে, মোদির হুন্দাই, স্যামসাং ও এলজি’র মতো বৃহত্তম কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। ভারতে এ তিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের ফার্ম রয়েছে। মোদি সফরকালে তার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

একজন অদ্ভুত মেয়রের গল্প by হাসান ফেরদৌস

বিশেষ ভঙ্গিমায় মেয়র আন্তানাস মকুস
বাংলাদেশের দুই প্রধান শহরের তিন মেয়রের নির্বাচন শেষ হয়েছে। এই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিস্তর বিতণ্ডা হয়েছে, কিন্তু মোদ্দাকথা হচ্ছে, আগামী পাঁচ বছর এই তিন মেয়র নিয়েই আমাদের কাজ করতে হবে। চাই বা না-চাই, তাঁরাই এখন আমাদের নগরপিতা। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই আমরা চাইব তাঁদের সাফল্য।
অন্তত একটি ব্যাপারে এই নির্বাচন থেকে আমরা আশার কারণ খুঁজে পাই। যাঁরা নির্বাচিত হলেন, তাঁদের অপেক্ষাকৃত তারুণ্য ও আপাতস্বচ্ছ ইমেজ। অন্য আরেকটি গুণ যা আমাকে উৎসাহিত করেছে তা হলো, তাঁদের অন্তত দুজন চমৎকার বাংলা বলেন। আমাদের সাংসদদের বাংলা জ্ঞানের সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, তাঁরা নিশ্চয় এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাবেন।
এই তিনজনের উদ্দেশে আজ আমি একজন মেয়রের গল্প বলতে চাই। কোনো পণ্ডিতি গল্প নয়, একদম সাদাসিধা একটি গল্প, তা থেকে দু-চারটে বুদ্ধি যদি তাঁরা ধার নেন, আমার ধারণা, তাহলে তাঁরা নিজেরাও উপকৃত হবেন, নগরবাসীও।
যাঁর কথা বলছি, তিনি কলম্বিয়ার রাজধানী বগোতার সাবেক মেয়র, আন্তানাস মকুস। পেশায় দার্শনিক—দর্শনশাস্ত্রে তাঁর পিএইচডি রয়েছে—একসময় বগোতার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি রাজনীতি করবেন, এ কথা মাথায় আনেননি কখনো। ১৯৯৩ সালে এক মহা হুলুস্থুল কাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করে ঠিক করলেন বগোতার মেয়র পদে নির্বাচন করবেন। কাণ্ডটা কী, সে কথায় পরে আসছি।
মকুস জাত শিক্ষক, মেয়র হিসেবে তিনি বগোতার ৫০ লাখ নগরবাসীকে নিজের ক্লাসরুমের ছাত্র বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার উদ্যোগ নিলেন। রাজনীতিবিদেরা যেমন তাঁদের ক্ষমতার শীর্ষ থেকে হুকুম চালাতে ভালোবাসেন, মকুস ছিলেন তার উল্টো। নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ও তার পাশাপাশি দায়িত্ব কী, সে কথা হাতে-কলমে দেখাতে বদ্ধপরিকর হলেন তিনি। ওপর থেকে নিচ—টপ ডাউন—এই পদ্ধতির বদলে তাঁর পথ ছিল নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন। প্রত্যেকে যদি প্রত্যেকের দায়িত্বটুকু পালন করে, তাহলে আমরা সবাই লাভবান হব, এই ছিল তাঁর প্রধান স্লোগান। কথাটা সোজা, কিন্তু তার পরও আমাদের মাথায় ঢোকে না, কারণ নিজের স্বার্থের বাইরে অন্যের কথা ভাবার অভ্যাস আমাদের নেই। মকুস সে অভ্যাসটা বদলিয়ে অংশগ্রহণের এক নাগরিক সংস্কৃতি নির্মাণের উদ্যোগ নিলেন। যেখানে কথায় কাজ হতো না, সেখানে তিনি হাতে-কলমে দেখিয়ে দিতেন। এই কাজটা করতে তিনি একদিকে যেমন সহজবোধ্য নানা প্রতীক ব্যবহার করেছেন, তেমনি মাইম, ক্লাউন ও থিয়েটারের নানা উপকরণ কাজে লাগিয়েছেন।
ব্যাপারটা উদাহরণ বুঝিয়ে বলা যাক।
মকুস যখন বগোতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন এই শহরের একটি প্রধান সমস্যা ছিল সড়ক দুর্ঘটনা, যার মূল কারণ সড়ক চলাচলের আইন না মেনে চলা। যারা আইন মানে না, মকুস তাদের চিহ্নিত করে লজ্জা দেওয়ার জন্য একদল মূকাভিনেতার সাহায্য নিলেন। সং সেজে এসব মূকাভিনেতা যারাই ট্রাফিক আইন ভাঙত, তাদের দিকে রঙিন বড় বড় কাগজ তুলে ধরতেন, যাতে লেখা থাকত, ‘ভুল ভুল’। তা দেখে রাস্তার সবাই হেসে খুন। প্রায় রাতারাতি বগোতার সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেক হয়ে গেল। পরীক্ষা নিয়ে দেখা গেল, অধিকাংশ মানুষ দিনদুপুরে সবার হাসির পাত্র হওয়ার চেয়ে আইন মেনে চলা অনেক বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে। আরও একটা কাজ করলেন মকুস। শহরের যেসব জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে, সেখানে তিনি রঙিন কালিতে নক্ষত্রের ছবি এঁকে দিলেন। উদ্দেশ্য, সে নকশার সামনে এলেই আপনার মনে পড়বে এখানে কোনো এক নিরীহ পথযাত্রী নিহত হয়েছে। বছর যেতে না যেতেই দেখা গেল বগোতার সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মৃত্যু নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে।
মেয়েদের ওপর যৌন অত্যাচার, সেটাও বগোতার দৈনন্দিন ঘটনা ছিল। রাত একটু বেশি গড়ালে মেয়েরা নিরাপদ বোধ করত না। মকুস প্রস্তাব করলেন, সপ্তাহের একটি রাতে নির্দিষ্ট সময়ের পর সব পুরুষেরা যাঁর যাঁর ঘরে থাকবেন। রাস্তায় থাকবে শুধু মেয়েরা। তাঁর সে প্রস্তাব শুনে নারী-পুরুষ সবাই হেসে খুন। অথচ প্রথম যেদিন ‘শুধু মেয়েদের জন্য রাত’ ঘোষিত হলো, প্রায় সাত লাখ মেয়ে মহা হুল্লোড় করে রাস্তায় নেমে আসে। সব পুরুষ না হলেও বগোতার অধিকাংশ পুরুষ ঘরে বসে ছিলেন। শুধু বসে নয়, ঘরকন্নার কাজ করে, ছেলেপুলের যত্ন নিয়ে তাঁরা রাত কাটান। বারান্দায় বা বাড়ির জানালা দিয়ে শিশুকে কোলে নিয়ে হাঁটছেন এমন কোনো পুরুষ দেখা গেলেই, সব মেয়েরা হইহই করে তাঁদের অভিনন্দন জানিয়েছে। হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার, অথচ কী সহজে মকুস বুঝিয়ে দিলেন, রাজপথ শুধু একা পুরুষের নয়, ঘরকন্নার কাজও শুধু মেয়েদের মাথাব্যথা নয়।
বগোতার এক বড় সমস্যা হলো পানি। তার চেয়েও বড় সমস্যা পানির অপচয়। এই অপচয় কমাতে মকুস সবাইকে অনুরোধ করলেন যখন যেভাবে সম্ভব পানির ব্যবহার সীমিত করতে। প্রথম নির্দেশ গেল সরকারি অফিস-আদালতে, সব ধরনের কর্মকর্তাদের কাছে। প্রতি সপ্তাহ শেষে মকুস সাংবাদিকদের ডেকে হিসাব দেওয়া শুরু করলেন, গত সাত দিনে কতটুকু পানি সঞ্চয় সম্ভব হয়েছে। অপচয়ের বিরুদ্ধে নাগরিক আস্থা অর্জনের পর তিনি দৃষ্টি ফেরালেন সাধারণ নাগরিকদের ওপর। কীভাবে পানির অপচয় কমানো সম্ভব, তা বোঝানোর জন্য মকুস জাতীয় টেলিভিশনে নিজের স্নানঘরে গায়ে-গতরে সাবান মেখে গোসলের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করলেন। সাবান মাখার সময় ট্যাপের পানি ছেড়ে রাখার বদলে তা বন্ধ রাখলেন, মুখে বললেন, ‘অতি সামান্য এই কাজ যদি আমরা সবাই করি, তাহলে প্রতি সপ্তাহে কী বিপুল পরিমাণ পানি বাঁচানো সম্ভব।’
গার্হস্থ্য সহিংসতা কমাতে আরেক বুদ্ধি আঁটেন মকুস। যারা সহিংসতার শিকার, এমন নারীদের তিনি প্রকাশ্যে তাঁদের নিগ্রহের গল্প শোনাতে ডাকলেন। বললেন, ‘তোমাদের ওপর যারা হামলা করেছে, তাদের ছবি দিয়ে পুতুল বানাও। তারপর সে পুতুলকে মানুষ ভেবে যা খুশি বলো বা চাও তো দু-চার ঘা লাগিয়ে দাও।’ দর্শক ও মানসিক বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে এই ‘নাট্যাভিনয়ে’ প্রায় ৪০ হাজার মেয়ে অংশ নেয়।
মকুসকে নিয়ে আরও অসংখ্য গল্প রয়েছে, একাধিক বই লেখা হয়েছে তাঁর প্রশাসনিক পদ্ধতি নিয়ে। এমনকি এক ঘণ্টার চমৎকার এক ডকুমেন্টারি পর্যন্ত তৈরি হয়েছে, যা আপনারাও দেখে নিতে পারেন এই ঠিকানায়: https://youtu.be/bwgWM3h_l-4
দরকার, মেয়র নির্বাচনকালে মকুস কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ছিলেন না, টেবিলের নিচ থেকে হাতানো কোনো অর্থ তাঁর ছিল না। প্রথম নির্বাচনী প্রচারণার সময় তাঁর নিজের পকেটে ছিল সাকল্যে ১০ হাজার ডলার। তাঁর একমাত্র পুঁজি ছিল ব্যক্তিগত সততা। বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে তিন বছর আগে গ্রিন পার্টির প্রার্থী হিসেবে দেশের প্রেসিডেন্ট পদে পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন মকুস। তাতে তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন, যদিও পরাজয়ের প্রধান কারণ ভোট গ্রহণের ঠিক আগে আগে ধরা পড়ে তিনি পারকিনসন্স রোগে ভুগছেন।
একদম হুট করে নির্বাচনী রাজনীতিতে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেন মকুস। সেটা ১৯৯৩ সালের কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের এক সভায় হট্টগোল থামাতে ব্যর্থ হলে তিনি নিজের প্যান্ট খুলে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তাঁর সে উদ্দেশ্য অর্জিত হয়েছিল, কিন্তু সমালোচনার মুখে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের পদ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
মকুস বিশ্বাস করতেন আইন, নৈতিকতা ও সংস্কৃতি যদি একে অন্যের সম্পূরক হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে এক নতুন নাগরিক সংস্কৃতি নির্মাণ সম্ভব। প্রত্যেক নাগরিকের লক্ষ্য আইন ভাঙা বা সরকারকে ফাঁকি দেওয়া নয়। আইন ভাঙা হলে অথবা সরকারি ভান্ডার থেকে চুরি করলে সে নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এ কথাটা কোনো নাগরিককে যদি বোঝানো যায়, তাহলে সে নিজের ব্যবহার বদলাবে। আর এ কথাটা বোঝাতে মকুস বগোতার মেয়র হওয়ার বদলে তাঁর এক নম্বর ‘জোকার’ হিসেবে নিজের স্থান নির্ধারণ করেছিলেন। সুপারম্যানের কায়দায় পোশাক পরে রাস্তায় হাঁটতেন, নিজের নাম দিয়েছিলেন সুপার সিটিজেন। বস্তুত, তাঁর ব্যবহার ক্লাউনের মতো মনে হলেও তিনি আসলে ক্ষমতার সমীকরণ একদম পাল্টে দিয়েছিলেন। নগরপিতা হিসেবে তাঁর কোনো ক্ষমতাই নেই, অথচ প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সম্মত হলে তারা প্রত্যেকে নাগরিক হিসেবে ক্ষমতাবান হয়ে উঠবে, এই ছিল তাঁর মোদ্দা ফিলোসফি।
নগরকে যদি সচল ও বাসযোগ্য করতে হয়, তো সবার আগে দরকার নগরের বাসিন্দাদের সে কথায় বিশ্বাসী ও নিজ দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠাবান হতে উৎসাহ জোগানো। মকুস এই কাজে নাগরিক শিক্ষা বা সিভিক এডুকেশনকে তাঁর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার করে তোলেন। আউগুস্তো বোয়ালের ‘থিয়েটার অব দি অপ্রেসড’ থেকে উপাদান ধার করে প্রত্যেক নাগরিককে একই সঙ্গে দর্শক ও অভিনেতার ভূমিকা প্রদান করেছিলেন। তিনি জানতেন, গল্পচ্ছলে নাগরিকদের যদি শিক্ষিত করা যায়, তাদের যদি জানানো হয় কোন ব্যবহার ঠিক, কোনটা বেঠিক, তাহলে অধিকাংশ নাগরিক তার ব্যবহার শুধরে নেবে। কিন্তু এমন কিছু করার আগে দরকার ব্যবহার শোধরানোর কথা যিনি বলবেন, তাঁর ব্যবহারটা যেন বিতর্কের ঊর্ধ্বে হয়। মকুস ছিলেন সেই রকম একজন বিতর্ক-ঊর্ধ্ব ব্যক্তি।
আমি বলি না আমাদের নতুন তিন মেয়র মকুসের মতো হবেন। মকুস একজন শিক্ষক, কলম্বিয়ার রাজধানীকে তিনি এক বিশাল ক্লাসরুম বিবেচনা করে সেখানে একের পর এক সামাজিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। আমাদের মেয়ররা কেউ শিক্ষক নন, তাঁরা ব্যবসায়ী। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই আমাদের এই আশ্বাস দিয়েছেন যে শহরের দায়িত্বভার তাঁরা নিচ্ছেন, তার দেখভালের কাজটুকু সাধ্যমতো করবেন। এ কাজে মকুস তাঁদের এক উদাহরণ হতে পারেন।
নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

কালভার্ট আটকে মাছ চাষ বিপাকে কৃষক ও জেলে

দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে পানির প্রবাহের তিনটি
বড় প্রতিবন্ধকতার কারণে এখন ওই অঞ্চলের
অন্য সেতুগুলো অকার্যকর হয়ে গেছে
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে মাছ চাষের জন্য সিমেন্টের দেয়াল তৈরি করে কয়েকটি কালভার্টের পানিপ্রবাহ আটকে দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি। বিল ভরাট করে করা হয়েছে পুকুর। এতে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও জেলেরা।
ইউনিয়নগুলোর বাসিন্দারা জানান, মেঘনার শাখা নদী উপজেলার শিমুলকান্দি, সাদেকপুর, শ্রীনগর ও আগানগর ইউনিয়নের পাশ ঘেঁষে প্রবাহিত। আবার শিমুলকান্দি ইউনিয়ন দিয়ে কোদালকাটির খাল নামে একটি দীর্ঘ খাল মেঘনার সঙ্গে মিলেছে। পানির সহজলভ্যতার কারণে চার ইউনিয়নের জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পান আর কৃষকেরা পান সেচসুবিধা। প্রবাহ ঠিক রাখতে সরকার চার ইউনিয়নে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে অন্তত ১০টি সেতু নির্মাণ করেছে। কিন্তু দুই কিলোমিটারের ব্যবধানে পানির প্রবাহের তিনটি বড় প্রতিবন্ধকতার কারণে এখন ওই অঞ্চলের অন্য সেতুগুলো অকার্যকর হয়ে গেছে। পাশাপাশি খাল, বিল ও নদী মরতে বসেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, এক বছর আগে দেয়াল তুলে উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের শ্রীনগর উচ্চবিদ্যালয়-সংলগ্ন একটি কালভার্ট বন্ধ করে দিয়েছেন এলাকার প্রভাবশালী ফুল মিয়া। এরই মধ্যে তিনি মাটি ভরাট করে ফেলেছেন। তবে জনতার বাধার মুখে কালভার্টের নিচ দিয়ে একটি পাইপের মাধ্যমে কোনো রকম পানি সরবরাহ সচল রাখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শিমুলকান্দি উপজেলার শিমুলকান্দি বাজারের কাছের কালভার্টটিরও একই অবস্থা। ওই কালভার্টে একই কায়দায় পানি আটকে দুই বছর ধরে মাছ চাষ করছেন ওই ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আফিকুল ইসলাম ওরফে হারিছ। আর তিন বছর আগে শ্রীনগর ইউনিয়নের বাউশমারা গ্রামে বিল ভরাট করে পুকুর তৈরি করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী কফিল উদ্দিন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্রীনগর, শিমুলকান্দিসহ কয়েকটি এলাকার কৃষকেরা জানিয়েছেন, পানির অভাবে এবার তাঁরা বীজতলা করতে পারেননি।
শিমুলকান্দি ইউনিয়নের সেতু-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে তাঁরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন তাঁরা কেই হাঁড়িপাতিল বিক্রি করেন। আবার কেই কামলার কাজ করেন।
শ্রীনগর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন বলেন, ফুল মিয়া ও কফিল উদ্দিন প্রভাবশালী। সে কারণেই কিছু করা সম্ভব হয়নি।
পানি আটকে দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ফুল মিয়া বলেন, বন্ধ করলেও কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, পাইপ দেওয়া আছে। আর কফিল উদ্দিন বলেন, ফুল মিয়া ও হারিছও তো একই কাজ করেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি খবর নেবেন। সত্যতা পেলে প্রতিকারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাষ্ট্র অসহায় মানুষকে নিয়ে পিংপং খেলছে by সাইমন টিসডাল

ভূমধ্যসাগরে অভিবাসন-প্রত্যাশীদের সলিলসমাধি নিয়ে অনেক শোরগোল হলেও সাগরে ভাসমান বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের হাজার হাজার শরণার্থী, আশ্রয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়নপ্রত্যাশী অভিবাসীদের করুণ দশা পশ্চিমের গণমাধ্যম ও রাজনীতিকদের দৃষ্টি এত দিন এড়িয়ে গেছে।
কিন্তু সম্প্রতি মালয়েশিয়ার টহল জাহাজ উদাসীনভাবে ৬০০ মানুষ বহনকারী দুটি নৌকা তাদের উপকূলে ভিড়তে না দিয়ে সাগরে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় এই বড় অভিবাসন-প্রক্রিয়ার দিকে দুনিয়ার দৃষ্টি ফিরতে পারে। মালয়েশিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডও একই কাজ করেছে।
মালয়েশিয়া সরকার তাদের বন্দর বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সে দেশের কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবার অভিবাসী বহনকারী দুটি নৌকা লাংকাওয়াই ও পিন্যাং দ্বীপে আটক করে তাদের আবার সাগরে ফিরে যেতে বাধ্য করে।
সবাই বিশ্বাস করে, এই নৌকা দুটিকেই পরে থাই জলসীমায় ভাসতে দেখা যায়। থাই কর্তৃপক্ষও তাদের স্বাগত জানায়নি। নৌকার ইংরেজি ব্যানার অনুসারে, এতে মূলত মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলমানরা ছিল।
‘এই যাত্রায় ১০ জন মানুষ মারা গেছে, আমরা তাদের মৃতদেহ সাগরে ফেলে দিয়েছি,’ স্থানীয় এক প্রতিবেদকের ভাষ্য অনুসারে, একজন অভিবাসী রোহিঙ্গা ভাষায় এ কথা বলেছেন। ‘আমরা দুই মাস ধরে সাগরে ভাসছি, আমরা মালয়েশিয়া যেতে চাই।’
নৌকায় হাড় জিরজিরে মানুষের মধ্যে অনেক শিশুও আছে। সাহায্য প্রদানকারী সংগঠনগুলোর হিসাব অনুসারে, সাগরে প্রায় ৬ হাজার মানুষ ভেসে বেড়াচ্ছে, তাদের যাওয়ারও জায়গা নেই। অন্যদিকে, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংগঠন বলছে, এই মানুষ ও অন্যদের ইচ্ছাকৃতভাবে সাহায্য না করার কারণে শিগগিরই ‘বৃহৎ মানবিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে’।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই অভিবাসীরা ক্ষুৎপিপাসায় আক্রান্ত। তারা অসুস্থতায় ভোগার ঝুঁকিতে রয়েছে। আর দেশগুলোর দায়িত্বজ্ঞানহীন আঞ্চলিক সরকারগুলো তাদের উদ্ধার না করে অন্যের ঘাড়ে সমস্যাটা ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করায় পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠছে।
‘থাই, মালয়েশীয় ও ইন্দোনেশীয় সরকার এই মানুষদের নিয়ে ত্রিমুখী পিংপং খেলা খেলছে। তাদের এটা বন্ধ করতে হবে। এই ভাগ্যবিড়ম্বিত নৌকায় ভাসমান মানুষের উদ্ধারে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে’—হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এশিয়ার ফিল রবার্টসন এ কথা বলেছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ‘ব্যাপারটা অত্যন্ত মর্মপীড়াদায়ক যে হাজার হাজার মানুষ এখন সাগরে ভাসছে, খুব বিপজ্জনকভাবে মৃত্যুর কাছাকাছি রয়েছে তারা, এমনকি এসব মানুষ এটাও জানে না যে তারা কোথায় আছে, আর সঙ্গে তো ক্ষুৎপিপাসা আছেই।’
ইন্দোনেশিয়া বলেছে, তারা ৪০০ অভিবাসী বহনকারী নৌকা ফিরিয়ে দিয়েছে। এদের ভাগ্যে কী জুটেছে, তা জানা যায়নি। এই নৌকা ফিরিয়ে দেওয়ার আগে প্রায় ১ হাজার অভিবাসী লাংকাওয়ায় আশ্রয় নেয়, আরও কয়েক শ মানুষ ইন্দোনেশিয়া পৌঁছায়।
থাইল্যান্ডের মতো মালয়েশিয়াও এই মানবিক সমস্যার কারণে পশ্চিমা পর্যটক হারাবে বলে আশঙ্কা করছে। ফলে তাদের রমরমা পর্যটন ব্যবসায় মন্দা সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তার উদ্বেগ আরও গভীর। সে দেশে ইতিমধ্যে ১ লাখ ৪৫ হাজার অভিবাসী আশ্রয় নিয়েছে, এদের মধ্যে ৪৫ হাজারই রোহিঙ্গা।
মালয়েশিয়ার উপস্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুনাইদি টুয়ানকু জাফর বলেছেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
‘আমাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করেন?’ ‘যেসব মানুষ আমাদের সীমান্ত অতিক্রম করছে, আমরা তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছি। আমরা তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করছি, কিন্তু তারা এভাবে দলে দলে আমাদের উপকূলে ভিড় করতে পারে না। হ্যাঁ, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা হয়, তার মধ্যে সমস্যা আছে...আপনি গণতন্ত্রের কথা বলবেন, আর নিজের জনগণকে আবর্জনার মতো মনে করবেন, যতক্ষণ না তারা অপরাধীদের মতো দেশ থেকে পালিয়ে যায়...মিয়ানমারকে আমরা শক্তভাবে জানাতে চাই, তাদের রাষ্ট্রকে জনগণের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হবে,’ তিনি বলেন।
এমন বক্তব্য কপটতা মনে হয়। ওবামা প্রশাসনের মতো আসিয়ানও ১৩ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে বৌদ্ধ-অধ্যুষিত ও সেনাশাসিত মিয়ানমার রাষ্ট্রের নির্দয় আচরণের ব্যাপারে নিশ্চুপ রয়েছে। তারা দেশটির অন্যান্য অন্যায়ের ব্যাপারেও নিশ্চুপ রয়েছে।
মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ নানা যন্ত্রণা ভোগ করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যেরও শিকার হয়েছে তারা। রোহিঙ্গারা খুব কমই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা লাভ করে, এমনকি তারা স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরাও করতে পারে না। অতীতে সেনাবাহিনী তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, বৌদ্ধ চরমপন্থীরা তাদের ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। এমন দৌড়ের ওপর থাকাই যেন তাদের ভবিতব্য।
মিয়ানমারে মার্কিন-সমর্থিত রাজনৈতিক উদারীকরণ সত্ত্বেও গত তিন বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা দেশত্যাগ করেছে। এদের অধিকাংশই জাহাজে চেপেছে, থাইল্যান্ডের আশ্রয়শিবিরে যাওয়ার জন্য পাচারকারীদের বিপুল টাকা দিয়েছে, আবার সেখানে গিয়ে তারা প্রায়ই শারীরিক নির্যাতন, প্রহার ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে।
সম্প্রতি থাই সরকার এসব শিবিরের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এতে পাচারকারীদের নৌকাগুলো সাগরে ভেসে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছে, আর তারা যেখানে-সেখানে ভাগ্যহত এসব মানুষের নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থানাসাক পাতিমাপ্রাকর্ন বলেছেন, তার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো শিবির না খুললেও তাদের স্বল্প মেয়াদে মানবিক সহায়তা দিতে রাজি। অন্যদিকে, এ অঞ্চলের সরকারগুলো মানব পাচার ও চোরাচালান রোধে ২৯ মে যৌথ প্রচেষ্টা নেওয়ার লক্ষ্যে বৈঠকে মিলিত হবে। এই চ্যালেঞ্জ যেমন কঠিন, তেমনি জরুরি।
সাগরপথে পালিয়ে যাওয়া ছাড়াও যে পরিমাণ মানুষ এই চেষ্টা করছে, তাদের সংখ্যাও বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হিসাব অনুসারে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে ২৫ হাজার রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি পাচারকারীদের নৌকায় উঠেছে। ২০১৪ সালের এ সময়ে যত মানুষ সে চেষ্টা করেছে, এই সংখ্যা তার দ্বিগুণ। এমন বিস্ময়কর সংখ্যাতত্ত্ব দেখে বোঝা যায়, মানুষ কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন ; গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া
সাইমন টিসডাল: গার্ডিয়ান-এর সহকারী সম্পাদক।