Wednesday, September 11, 2019

নেতানিয়াহুর ঘোষণা, মধ্যপ্রাচ্যে নিন্দার ঝড়

দখলীকৃত পশ্চিমতীরে বসতি সম্প্রসারণে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে ঘোষণা দিয়েছেন তার কড়া নিন্দা জানিয়েছে আরব দেশগুলো। আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হলে পশ্চিমতীরের জর্ডান উপত্যকা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দেন নেতানিয়াহু। মঙ্গলবার তার এ প্রতিশ্রুতির পর সৌদি আরব সহ মধ্যপ্রাচ্যে সমালোচনার ঝড় বইছে। তীব্র নিন্দা জানিয়ে এর সমালোচনা করেছে জর্ডান, তুরস্ক ও সৌদি আরব। জরুরি ভিত্তিতে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ডেকেছে সৌদি আরব। নেতানিয়াহুর এমন ঘোষণাকে আগ্রাসন আখ্যায়িত করে একে ভয়ংঙ্কর পদক্ষেপ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে আরব লীগ। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি কূটনীতিক সায়েব এরেকাত বলেছেন, এমন পদক্ষেপ হবে যুদ্ধাপরাধ। এতে শান্তি প্রতিষ্ঠার যেকোনো সম্ভাবনাকে কবর দেয়া হবে। এ খবর দিযেছে অনলাইন আল জাজিরা ও বিবিসি।
১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনের পশ্চিমতীর দখল করে আছে ইসরাইল। তবে এর সম্প্রসারণ করেনি তারা সেভাবে। অন্যদিকে অখ- ফিলিস্তিনকে ভবিষ্যত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে ফিলিস্তিনিরা। এর আগে নেতানিয়াহু বলেছেন, নিরাপত্তার জন্য জর্ডান উপত্যকায় সব সময় ইসরাইলের উপস্থিতি থাকবে। এখানে উল্লেখ্য, আগামী সপ্তাহে ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হতে নেতানিয়াহু এই টোপ ফেলেছেন এবার। তিনি মঙ্গলবার ইসরাইলি টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারিত এক ভাষণে বলেছেন, আমি আমার মূল উদ্দেশ্য ঘোষণা করছি। নতুন সরকার গঠনের পর জর্ডান উপত্যাকায় এবং ‘ডেড সি’তে  ইসরাইলের সার্বভৌমত্বের প্রয়োগ ঘটাব। তিনি আরো বলেন, ইসরাইলি নাগরিকদের কাছ থেকে তিনি যদি সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট পান তাহলে নির্বাচনের পর পরই এমন পদক্ষেপ নেবেন।
জর্ডান উপত্যকা ও উত্তরাঞ্চলীয় ডেড সি হলো পশ্চিমতীরের শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ। এসব এলাকায় বসবাস করেন প্রায় ৬৫,০০০ ফিলিস্তিনি এবং ১১,০০০ অবৈধ ইসরাইলি। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। ওদিকে আগামী সপ্তাহের নির্বাচনে নিজের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি নেতানিয়াহু। তাই তিনি ইহুদিদের সেন্টিমেন্টকে নাড়া দেয়ার জন্য এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছেন, পশ্চিতীরজুড়ে ইহুদি বসতির বিস্তার ঘটাবেন। তবে দীর্ঘ প্রতিক্ষীত যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনা প্রকাশের আগে ও প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পরামর্শ না করে এমন পদক্ষেপ নেয়া হবে না।

নিন্দার ঝড়
এই পদক্ষেপ নিয়ে যদি নেতানিয়াহু অগ্রসর হন তাহলে তাদের সঙ্গে যত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে এবং যেসব বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে তাদের তরফ থেকে, তার ইতি ঘটবে বলে মন্তব্য করেছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। আরো কড়া নিন্দা জানিয়েছেন ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ সতায়ে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগকে তিনি শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য একটি প্রধান ধ্বংসাত্বক ইস্যু বলে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, ফিলিস্তিনি ভূখন্ড নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হতে পারে না। আরব লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নেয়ার যেকোনো সুযোগকে এর মধ্য দিয়ে খর্ব করা হবে। অন্যদিকে ইসরাইলের এমন ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে উত্তেজনার জন্য একটি অত্রন্ত ভয়াবহতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সৌদি আরব। তারা এ বিষয়ে আলোচনা করতে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে।

‘যুদ্ধবাজ’ বল্টনকে বরখাস্ত করলেন ট্রাম্প

অনেক ইস্যুতে ভিন্নমত থাকায় ‘যুদ্ধবাজ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টনকে বরখাস্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে ট্রাম্প নিজেই টুইট করেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন, আমি জন’কে পদত্যাগ করতে বলেছি। তিনি মঙ্গলবার সকালে তা পাঠিয়ে দিয়েছেন আমাকে। ট্রাম্প আরো জানিয়েছেন নতুন একজন নিরাপত্তা উপদেষ্টা তিনি আগামী সপ্তাহেই নিয়োগ দেবেন। ট্রাম্প এক টুইটে বলেন, সোমবার দিবাগত রাতে জন বল্টনকে আমি জানিয়ে দিয়েছি, হোয়াইট হাউজে তার আর কোনো কাজ নেই। তার অনেক সাজেশনের সঙ্গে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করি। পশ্চিমা সব মিডিয়ায় এ খবর প্রচার হয়েছে।
আফগানিস্তান থেকে ইরান- সব বিষয়েই পররাষ্ট্রনীতির অনেক ইস্যুতে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ছিল তার বিরোধ বা দ্বিমত। তাকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কট্টর অবস্থানে থাকা নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তাকে বরখাস্ত করার বিষয়ে ট্রাম্পের টুইটের কিছুক্ষণ পরেই টুইট করেছেন জন বল্টন। তিনি তাতে পদত্যাগের ভিন্ন একটি আখ্যান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আমিই পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। জবাবে ট্রাম্প তাকে বলেছেন, বুধবার সকালে আসুন এ নিয়ে কথা বলি। এখানে উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদে জন বল্টন হলেন তৃতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এর আগে এ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন মাইকেল ফ্লিন এবং এইচআর ম্যাকমাস্টার। সবারই পরিণতি এক হয়েছে। তাদেরকে পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সর্বশেষ উপদেষ্টা জন বল্টন দায়িত্ব পালন করছিলেন ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে।
বরখাস্ত করার খবর যখন ছড়িয়ে পড়ল তখন জন বল্টন ফক্স নিউজের একজন উপস্থাপককে এ বিষয়ে টেক্সট ম্যাসেজ পাঠান। ওই উপস্থাপক তখন সরাসরি সম্প্রচারে ছিলেন। তাকে জন বল্টন জানান যে, তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদ ত্যাগ করেছেন। এছাড়া তিনি টেক্সট ম্যাসেজ পাঠান ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক রবার্ট কস্টার কাছে। এতে জন বল্টন লিখেছেন, যথাযথ উপায়ে আমি আমার বক্তব্য বলবো। আমার মূল উদ্বেগ হলো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে।
এখানে উল্লেখ্য, জন বল্টনকে বরখাস্ত করার ঘটনাটি আকস্মিক ও বিস্ময়কর। এ ঘটনার ঠিক দু’ঘণ্টা আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং অর্থমন্ত্রী স্টিফেন মনুচিনকে নিয়ে হোয়াইট হাউজে একটি ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেন জন বল্টন। এরপরই তাকে বরখাস্ত করার ঘোষণা আসে। ফলে এখন ভারপ্রাপ্ত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন চার্লস কুপারম্যান। তিনি জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপ-উপদেষ্টা।

হোয়াইট হাউজের সূত্রগুলো কি বলছে?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ, উপদেশ দিয়ে থাকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। কিন্তু জন বল্টনের অধীনে হোয়াইট হাউজের ভিতরে এটি আলাদা একটি সত্তায় পরিণত হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, হোয়াইট হাউজের ভিতরে অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা রাখতেন জন বল্টন। তিনি আলাদাভাবে সেখানে কর্মকা- পরিচালনা করতেন। ওই কর্মকর্তার মতে, বিভিন্ন মিটিংয়ে যোগ দিতেন না জন বল্টন। তিনি নিজেই নিজের কর্মকান্ড নির্ধারণ করতেন।
হোয়াইট হাউজের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বল্টনের নিজস্ব অগ্রাধিকারের বিষয় ছিল। তিনি কখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে জানতে চাইতেন না যে, ‘আপনার অগ্রাধিকার কি?’ এক্ষেত্রে অগ্রাধিকারে কি থাকবে তা নির্ধারণ করতেন বল্টন। ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক একজন সিনিয়র কর্মকর্তা সিবিএস’কে বলেছেন, বল্টন নিজে এমন সব পথ বা মহাসড়কে উঠে গিয়েছিলেন, যাতে প্রেসিডেন্ট সহ হোয়াইট হাউজের অনেক মানুষ আতঙ্কিত হয়ে উঠতেন।

কিভাবে ট্রাম্পের সঙ্গে মতপার্থক্য
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ছিলেন জন বল্টন। ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক ইস্যুত যে কন্টর অবস্থানে গিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, এর প্রধান কারিগর এই জন বল্টন। রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের নেতাদের সঙ্গে সম্প্রতি আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এতে বিরোধিতা করেছেন বল্টন। এখানেই শেষ নয়। তিনি উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া ও আফগানিস্তান নীতিতে অত্যন্ত কঠিন অবস্থান নিতে পরামর্শ দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ভিয়েতনামে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের মধ্যে যে সামিট হওয়ার কথা ছিল তা ভেঙে যাওয়ার জন্য জন বল্টনকে দায়ী করেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। কারণ, ওই সময় জন বল্টনের পরামর্শে এমন কিছু সমঝোতা-অযোগ্য দাবি তোলা হয়েছিল, যা প্রত্যাখ্যান করে পিয়ংইয়ং। এ ছাড়া তিনি তালেবানদের সঙ্গে শান্তি সংলাপের বিরোধিতা করেছেন। এমন একটি বৈঠক গত সপ্তাহান্তে হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এ জন্য তালেবান নেতাদের প্রথমবারের জন্য মুখোমুখি আলোচনায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করে দেন। ওই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে।
এ বিষয়ে ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন বলছে, ওই বৈঠক নিয়ে জন বল্টন যুক্তি দেখিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যাদেরকে সন্ত্রাসী গ্রুপ বলে চিহ্নিত করেছে তাদেরকে ক্যাম্প ডেভিডে আমন্ত্রণ জানানোর ফলে ভয়াবহ এক নজির স্থাপন হবে। যুদ্ধবাজ মানসিকতার জন্য পরিচিতি আছে বল্টনের। একবার ওভাল অফিসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই এ নিয়ে মজা করে বলেছিলেন, এমন কোনো যুদ্ধ নেই, যা জন বল্টন কখনো পছন্দ করেন না। অর্থাৎ সব যুদ্ধই পছন্দ তার। এই বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনিজুয়েলা নীতি ব্যর্থ হওয়ার জন্য ক্ষুব্ধ হন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি অভিযোগ করেন, তাকে ভুলপথে নিয়ে গেছেন বল্টন। বল্টন তাকে বুঝিয়েছেন ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা কত সহজ হবে।

ভারতের ‘মাল্টিপোলার এশিয়া’ ও চীন নীতি by জগন্নাথ পান্ডা

ভারত স্বপ্ন দেখে একটি ‘মাল্টিপোলার এশিয়া’। এখানে থাকবে অংশীদারিত্বের আঞ্চলিক নেতৃত্ব। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যেখানে বড় ও ছোট শক্তিগুলোর থাকবে সমান অবস্থান। এই মডেলটা এমন নীতির ওপর ভিত্তি করে যে, এশিয়ায় চীনের উত্থান আঞ্চলিক শক্তি কাঠামোকে ভারসাম্যহীন করে দিচ্ছে এবং ভারতের কৌশলগত পছন্দের ক্ষতি করছে। চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সংযুক্তি বৃদ্ধির মেকানিজম নয়াদিল্লিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে আরো উন্মুক্ত করেছে যখন, তখন আধিপত্য বিস্তারে চীনের কৌশলের বিষয়ে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।

তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ভারতের ‘মাল্টিপোলার এশিয়া’ দৃষ্টিভঙ্গি। প্রথমত, বৈশ্বিক শাসনে অধিকতর সমতা, বহুত্ববাদ ও প্রতিনিধিত্বমূলক করার লক্ষ্য ভারতের। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার কারণে কাঠামোগত সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে ভোগ করছে বেইজিং।
তাই বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেয়া বিষয়ক এসব পরিষদে, প্রাথমিকভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে, চীনের সঙ্গে সম শক্তি অর্জন করা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য। বৈশ্বিক পর্যায়ে এশিয়ায় জাপানের সঙ্গে, জার্মানি ও ব্রাজিলের সঙ্গে জি-৪ এর সঙ্গে নয়া দিল্লির জোট তার বহুত্ববাদী প্রবণতার প্রতিফলন ঘটায়।

দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে অংশীদারিত্বের ভূমিকা অবশ্যই এশিয়ার ছোট ও বড় শক্তিগুলোর থাকতে হবে। আসিয়ানকেন্দ্রিক কৌশলের প্রতি ভারতের সমর্থন এটাই নিশ্চিত করে যে, তারা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিকরণের বিষয়ে পরামর্শ বিষয়ক মেকানিজমকে গুরুত্ব দেয়, যেমনটি রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপের সঙ্গে তারা জোটবদ্ধ থেকে করে।
আঞ্চলিকভাবে, মাল্টিপোলার এশিয়া বা বহুত্বপন্থি এশিয়া ভারতের সমুদ্র অঞ্চলকে শক্তিশালী করবে। ভারত ও চীনের মধ্যে বিরোধপূর্ণ কোনো নৌ অঞ্চল নেই। কিন্তু ভিয়েতনামের সঙ্গে যৌথভাবে তেল অনুসন্ধান কাজে যোগ দেয়া সহ দক্ষিণ চীন সাগরে ভারতের বাণিজ্যিক উপস্থিতিতে বিরক্ত চীন। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা উপকূলে বার বার চীনের সাবমেরিনের দুঃসাহসিক অভিযানে বেশ অস্বস্তিতে আছে ভারত। নৌপথের সঙ্গে যুক্ত সিল্ক রোডের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে নৌবিষয়ক অবকাঠামো নির্মাণ করছে বেইজিং। এতে ভ্রু উত্থাপন করা হচ্ছে।

একটি ‘মাল্টিপোলার এশিয়া’র বিষয়কে সামনে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি হলো গণতান্ত্রিক, আইনভিত্তিক বিষয়; যা নৌচলাচলে স্বাধীনতা দেবে এবং তার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজন।  বেইজিংয়ের ‘গ্রে-জোন’ কৌশল দৃশ্যত এতটাই ক্রমবর্ধমান হারে ক্ষতিকর যে, বহু দেশের পক্ষেই তাদেরকে একা চ্যালেঞ্জ জানানো কঠিন হবে। এ অঞ্চলে চীন যেভাবে তার ক্ষমতার বিস্তার করছে তাতে ভারসাম্যতা আনার জন্য অধিকতর ‘অবাধ, মুক্ত ও সবার অংশগ্রহণমুলক ইন্দো-প্যাসিফিক’ ঐক্যমত হবে সমন্বিত প্রচেষ্টা।

ভারতের বহুত্ববাদের দিকে ধাবিত হওয়ার তৃতীয় স্তম্ভটি হলো বর্জনের পরিবর্তে সবার অংশগ্রহণমূলক। ‘মাল্টিপোলারিটি’তে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বহিঃশক্তিকে স্থান করে দেয় আঞ্চলিক নিরাপত্তা নির্মাণে অবদান রাখতে। এশিয়ার তিনটি বড় শক্তি ভারত, চীন ও জাপানের মধ্যে অংশীদারিত্বের নেতৃত্ব স্থাপনে আঞ্চলিক একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনে এটা অনুমোদন দেয় ভারতকে। নয়া দিল্লির দিক থেকে, যদি এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেয়া হয়, তাহলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘এশিয়া ফর এশিয়ানস’ প্রস্তাবনা থেকে যাবে একমাত্র উপায়। এর মধ্য দিয়ে এশিয়া হয়ে উঠবে চীন আধিপত্যের অঞ্চল।

ভারত দৃশ্যত এমনটা মনে করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে পুরোপুরি অনুমোদন না দিলেও সামরিক ও কৌশলগত দিক দিয়ে তারা হয়ে উঠবে শক্তিশালী অংশীদার। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম ২+২ সংলাপের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত স্বাক্ষর করেছে ‘কমিউনিকেশনস, কমপ্যাটিবিলিটি, সিকিউরিটি এগ্রিমেন্ট’ নামের চুক্তি। যদি ২০০৮ সালে স্বাক্ষরিত ‘সিভিল নিউক্লিয়ার এগ্রিমেন্ট’ স্বাক্ষর করাকে নতুন করে সূচনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে ২০১৬ সালের ‘লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট’ এবং ‘কমিউনিকেশনস, কমপ্যাটিবিলিটি, সিকিউরিটি এগ্রিমেন্ট’ ওই ধারাকে আরো বেশি শক্তিশালী করবে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি দিয়ে, চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অনাগ্রহিতাকে বোঝায় না। নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে লালন অব্যাহত রাখবে। ভারত বুঝতে পেরেছে যে, বৈশ্বিক ক্ষেত্রে চীনের অসন্তোষের করণীয় কমই আছে। তবে বেশি করণীয় আছে আন্তর্জাতিক অবকাঠামোতে, যেমন ব্রেটন উডস ইন্সটিটিউশনে। প্রেসিডেন্ট শির অধীনে চীনের পররাষ্ট্রনীতি কতটা সংস্কারবাদ হিসেবে দৃশ্যমান তা কোনো ব্যাপারই নয়। তবে প্রাথমিকভাবে আইএমএফ, ডব্লিউটিও এবং বিশ্ব ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব-আধিপত্যই প্রাথমিকভাবে বেইজিংয়ের অসন্তুটির বিষয়।

কম পশ্চিমা আধিপত্যবাদী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চীন অব্যাহতভাবে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন করে যাচ্ছে।  এক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে ভারত। প্রাথমিকভাবে ব্রেটন উডস ইন্সটিটিউটকে সংস্কারে চাপ প্রয়োগে চীনের সঙ্গে তারা কাজ করছে। নয়া দিল্লির প্রভাবকে স্বীকৃতি দেয়া শুরু করেছে বেইজিং। তারা নয়া দিল্লিকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের পূর্ণাঙ্গ সদস্য করেছে। এশিয়ান ইনফ্রাকস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে (এনডিবি) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে ভারতকে।

অন্য কথায়, আঞ্চলিক কৌশলগত অংশীদার হিসেবে চীনকে মেনে নেয়ার মধ্য দিয়ে চীনের কাছে পৌঁছাতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে শক্তিশালী করবে একটি ‘মাল্টিপোলার এশিয়া’। বহুত্বপন্থি নীতির এই কাঠামো ভারতকে উন্নততর অবস্থানে যেতে সহায়তা করবে। চীন সমর্থিত বা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ইন্সটিটিউশনগুলোর ভিতরে বা বাইরে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ না করলেও ভারত সুবিধা পাবে।
চীন সমর্থিত বহুজাতিক সংস্থা যেমন এআইআইবি, এনডিবি এবং এসসিও’কে স্বাগত জানিয়েছে ভারত। এআইআইবির দ্বিতীয় বৃহৎ অংশীদার হিসেবে নয়া দিল্লি সব সময় এটাকে এশিয়ার বহুদেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখছে সব সময়। এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবকাঠামো খাতে সুবিধা দেবে। তাই এআইআইবি’তে ভারতের যোগ দেয়াকে দেখা হয় একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে, যেখানে বহুদেশীয় প্রতিষ্ঠানে তারা পায় প্রশাসনিক বৃহত্তর ভূমিকা।

পক্ষান্তরে, সব সময়ই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) বিষয়ে শক্তিশালী আপত্তি ভারতের। সংযুক্তির উদ্যোগ হিসেবে বিআরআই-এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভারত। তারা বলেছে, এমন পদক্ষেপ অবশ্যই হতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়মনীতি, সুশাসন, আইনের শাসন, উন্মুক্ত, স্বচ্ছতা ও সমতার ভিত্তিতে। বিআরআই-এর চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরকে ভারত দেখে থাকে কৌশলগত বিরাট একটি অন্তরায় হিসেবে। কারণ, এক্ষেত্রে ভারতের ভূখন্ডের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে যে স্পর্শকাতরতা আছে তা উপেক্ষা করা হয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে এআইআইবি এবং বিআরআইয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো সার্বজনীন অংশগ্রহণ ও একতরফাপন্থি আদর্শের প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি, লিঙ্ক ওয়েস্ট পলিসি, কানেক্ট সেন্ট্রাল এশিয়া পলিসি ও সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রোথ ফর অল ইন দ্য রিজিয়ন (এএজিএআর)-এর মাধ্যমে এশিয়াজুড়ে কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভারতে রয়েছে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এটা তাদেরকে ‘মাল্টিপোলার এশিয়া’কে আলিঙ্গন করতে নেতৃত্ব দিয়েছে, যেখানে আঞ্চলিক সম্পর্কে বৃহত্তর ভূমিকা আছে নয়াদিল্লির। চীনের সঙ্গে জোটবদ্ধ হলে, চীনের উত্থানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই ভারতের সুরক্ষা ও উত্থান সমৃদ্ধ হবে।

(জগন্নাথ পান্ডা একজন রিসার্চ ফেলো। তিনি নয়া দিল্লিতে ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের ইস্ট এশিয়া বিষয়ক সেন্টার কো-অর্ডিনেটর। রুটলেজ স্টাডিজ অন থিংক এশিয়ার সিরিজ এডিটরও তিনি। আইডিএসএ’র ২০তম এশিয়ান সিকিউরিটি কনফারেন্সের সমন্বয়ক ছিলেন তিনি। তার এ লেখাটির বিস্তৃত প্রকাশিত হয়েছে ইস্ট এশিয়া ফোরাম কোয়ার্টারলি’তে)

প্রতিশোধমূলক পর্ন থেকেও ব্যবসা করছে পর্নহাব

পর্ণ স্ট্রিমিং সাইট পর্নহাবের মালিকরা "প্রতিশোধমূলক পর্ন" বা রিভেঞ্জ পর্ন থেকে লাভ করছেন বলে বিবিসি নিউজকে জানানো হয়েছে।
এবং এসব ভিডিওর বিরুদ্ধে একবার রিপোর্ট হওয়ার পর সেগুলোকে পুরোপুরি অপসারণ করা যায়না।
রিভেঞ্জ পর্ণ বলতে বোঝায়, যেখানে বিনা সম্মতিতে মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয়- যার বেশিরভাগই ছড়ানো হয় অনলাইনে।
আর এসবের উদ্দেশ্য থাকে ভুক্তভোগীদের চরম দুর্দশার মধ্যে ফেলা এবং বিব্রত করা।
এই ছবি বা ভিডিওগুলো দুইভাবে ছড়াতে পারে। প্রথমত, ব্যক্তির প্রাক্তন যৌনসঙ্গী ইচ্ছাকৃতভাবে সেটা ছেড়ে দিতে পারে।
আবার দুজনেরই অগোচরে তৃতীয় কোন ব্যক্তি তাদের ডিজিটাল আর্কাইভ অথবা আইক্লাউড থেকে কন্টেন্টগুলো চুরি করতে পারে।
"সোফি" নামে এক নারী বলেছেন যে, তার এমন একটি ভিডিও কেউ অনলাইনে আপলোড করার পর সেখানে কয়েক হাজারবার দেখা হয়।
এরপর থেকে তিনি ভীষণভাবে অপমানিত বোধ করছেন।
প্রচারণা গোষ্ঠী 'হ্যাশট্যাগ নট ইয়োর পর্ন' জানায় যে, এই জাতীয় কন্টেন্ট পর্নহাবের মালিকদের বিজ্ঞাপন থেকে আরও বেশি আয় করার উৎসাহ দেয়।
তবে পর্নহাব বলেছে যে, তারা রিভেঞ্জ পর্নের "তীব্র নিন্দা জানায়"।
তারা বলছে যে সোফির কাছ থেকে তারা কোন রেকর্ড বা ইমেইল পাননি।
এখন সোফি চাইছেন তাকে নিয়ে করা এই ভিডিও যেন নামিয়ে ফেলা হয়।
তার সেই প্রাক্তন প্রেমিকের সঙ্গে এখন যোগাযোগ আছে সোফির। এখন তারা চাইছে একসঙ্গে সমাধানের পথ খুঁজতে।

'হতবাক ও বিব্রত'

সোফি (ছদ্মনাম) বিবিসি'র ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ার প্রোগ্রামকে বলেন, আঠারো মাস আগে পরিবারের সাথে একদিন বেড়াতে বের হয়েছিলেন সোফি।
সেখানে তিনি তার মোবাইলে কিছু মিসড কল এবং ম্যাসেজ খুঁজতে তার ফোনটি পরীক্ষা করেছিলেন।
সোফির বোনের প্রেমিক সোফির ভিডিওগুলো বিশ্বের বৃহত্তম পর্ন ওয়েবসাইট-পর্নহাবে খুঁজে পান।
তারমধ্যে সোফির একটি ভিডিও শীর্ষ দশের তালিকায় উঠে আসে। যার ভিউয়ার সংখ্যা ছিল কয়েক লাখ।
"আমি হতবাক, বিব্রত এবং অপমান বোধ করেছিলাম," তিনি বলেন।
সোফি এর আগে তার প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে ছয়টি ভিডিও বানিয়েছিলেন - তবে কয়েক বছর আগে তাদের সম্পর্কই ভেঙে যায়। এরপরই তার ভিডিওগুলোকে আপলোড হতে শুরু করে।
অথচ এসব কন্টেন্ট অনলাইনে আপলোড দেয়ার কোন সম্মতি সোফি দেননি।
পর্নহাবে ভিডিওগুলি আপলোডের বিষয়ে সোফি জানার পর সংস্থাটি এক সপ্তাহের মধ্যে সেগুলি নামিয়ে ফেলে।
তবে, পর্নহাবের এই ছয়টি ভিডিও থেকে আরও প্রায় ১০০টি ভিডিও ক্লিপ তৈরি করার সুযোগ দিয়েছে এবং পরে সেগুলি সাইটে পুনরায় আপলোড করা হয়।
কিন্তু যখন তিনি সাইটে এই কথা জানান, তখন এর প্রতিক্রিয়ায় কিছু করা "খুব বেশি কাজে আসেনি", তিনি বলেন।
সোফি তখন অন্য একটি সংস্থার সাথে যোগাযোগ করেন, যারা মূলত পর্নহাবের ভিডিওগুলি নেওয়ার অনুরোধগুলো পরিচালনা করে, তবে তাদের কাছ থেকেও তিনি উত্তর পাননি বলে জানান সোফি।
তিনি পুলিশের কাছেও গিয়েছিলেন। আজ অবধি, কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।
হ্যাশট্যাগ নট ইয়োর পর্ন প্রচারণার কেট আইজ্যাকস বলেছেন যে রিভেঞ্জ পর্নকে প্রায়শই পর্নহাবের "অপেশাদার" বা "হোম-মেড" বিষয়বস্তু হিসাবে চিহ্নিত করা হত - জনপ্রিয় এই দুটি শব্দ দিয়েই ভিডিওগুলো অনুসন্ধান করা হতো যা বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য সাইটটিকে আরও মূল্যবান করে তুলেছিল।
সোফি এখন চান যে সাইটটি যেন এ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সাথে সাথে এ জাতীয় কন্টেন্ট মুছে ফেলতে আরও বেশি কাজ করে।
সেই সঙ্গে ভিডিওটি একবার নামানোর পরে যেন পুনরায় আপলোড হওয়া রোধ করা যায়।

'আমার পরিবারের উপর প্রভাব'

সোফি অনলাইনের যখন তার ভিডিওগুলি দেখতে পান তখন তিনি নতুন একজনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ছিল - এবং এই ঘটনা ওই দম্পতির উপর বেশ বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি করেছিল।
পর্নহাবের ভিডিওগুলি নিয়ে তার প্রেমিকের বন্ধুরা তার সঙ্গে মজা করতো।
সোফির একটি কিশোরী বয়সের মেয়েও ছিল, ওই ঘটনার পর থেকে তার মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আর আগের মতো হয়নি।
পর্নহাবের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কোরি প্রাইস বলেছেন: "পর্নহাবে আপলোড করা যেসব কন্টেন্ট আমাদের পরিষেবার শর্তাবলী সরাসরি লঙ্ঘন করে তা আমরা জানার সাথে সাথে সরিয়ে ফেলি।"
"২০১৫ সালে, আমাদের সমস্ত ভক্তদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য, আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে রিভেঞ্জ পর্নের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলাম। কারণ আমরা বিশ্বাস করি এগুলো এক প্রকার যৌন হয়রানি, এবং অনুমতি ছাড়া আপলোড করা এসব কন্টেন্ট সহজে সরানোর জন্য একটি ফর্ম চালু করা হয়।
"আমরা একটি অত্যাধুনিক তৃতীয় পক্ষের ডিজিটাল ফিঙ্গার-প্রিন্টিং সফটওয়্যারও ব্যবহার করি, যা প্রতিটি নতুন নতুন কন্টেন্ট আপলোডের আগে স্ক্যান করে দেখে। সেখানে দেখা হয় যে নতুন এই ভিডিওটি আগের কোন অননুমোদিত উপাদানের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে কিনা। এবং এটাও নিশ্চিত করা হয় যেন আসল ভিডিওটি একবার নামানোর পর আবার একই প্ল্যাটফর্মে ফিরে যেতে না পারে।"

চাঁদে পাঠানো ভারতের মহাকাশযানে আসলে কী ঘটেছে?

ভারতের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইসরো এখনও জানায়নি চাঁদের বুকে নামার কয়েক সেকেন্ড আগে ঠিক কী কারণে তারা অবতরণকারী যান বিক্রম-এর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সংস্থাটির সাবেক সদস্যরা বলছেন, আসলে কী ঘটে থাকতে পারে?
চন্দ্রযান-২ মহাকাশযানটি চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে ২০শে অগাস্ট এবং ৭ই সেপ্টেম্বর ভারতের সময় সন্ধ্যা নাগাদ চাঁদের বুকে অবতরণ করার কথা ছিল। এর একমাস আগে সেটি পৃথিবী থেকে চাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল।
বিক্রম নামের এই যানটি চাঁদে নামার কয়েক মুহূর্ত আগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যেটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামার কথা ছিল।
এরপরে সেই যানটিকে চাঁদের বুকে দেখা গেছে, কিন্তু এখনও বিজ্ঞানীরা সেটির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেননি।
পৃথিবী থেকে ওই অবতরণের চূড়ান্ত মুহূর্তটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। অবতরণের দৃশ্যটি টেলিভিশনেও সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল।
যখন চূড়ান্ত মুহূর্ত গণনা শুরু হয়, তখন যানটি সেকেন্ডে ১৬৪০ মিটার বেগে এগিয়ে যাচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রথম দুই ধাপে মনে হচ্ছিল বিক্রম পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তৃতীয় ধাপ, যেটি হোভারিং স্টেজ নামে পরিচিত, সে সময় সমস্যার শুরু হয়।
ইসরোর সাবেক সদস্য অধ্যাপক রোড্ডাম নরসিমহা বলছেন, সমস্যাটি হয়তো যানটির মূল ইঞ্জিনে শুরু হয়। পর্দায় যানটির চলাচল দেখে সেটিই মনে হচ্ছে।
''একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা হতে পারে, যানটি অনেক বেশি দ্রুত গতিতে নামতে শুরু করেছিল। চাঁদে অবতরণ করার সময় প্রতি সেকেন্ডে দুই মিটার গতিবেগে এটি নামার কথা ছিল। কিন্তু চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের কারণে এটা সম্ভবত আরো বেশি দ্রুত গতিতে নামছিল।''
তাঁর বিশ্বাস, এর কারণ হয়তো যতটা জোর তৈরি করা দরকার ছিল, মূল ইঞ্জিনটি হয়তো সেটা তৈরি করতে পারেনি এবং যতটা ধীর গতি তৈরি হওয়া উচিত ছিল, সেটাও হয়নি।''
এর ফলে যানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।
ভারতের প্রথম চন্দ্রাভিযানের প্রধান মায়লসোয়ামি আন্নাদুরাই বলছেন, গতির অনিয়মের কারণে দ্রুতগতিতে চাঁদে আছড়ে পড়ায় হয়তো যানটির ভেতর কোন একটা অংশ কাজ করছে না।
''খুব সম্ভবত মহাকাশযানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যখন আমরা তথ্যগুলো দেখবো, তখন পুরোপুরি বুঝতে পারবো কী হয়েছে।"
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের পরমাণু ও মহাকাশ নীতি বিভাগের প্রধান রাজ্যেশ্বরী রাজাগোপালান বলেছেন, সম্ভবত ইঞ্জিনের কোন ক্রুটি এর কারণ।
''সব তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন, কিন্তু কিছু একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে। যখন সেটি দ্রুতগতিতে অবতরণ করবে, তখন সেখানে প্রচুর ধুলাবালি উড়বে এবং মাধ্যাকর্ষণের কারণে মহাকাশযানটিকে অনেক নাড়াবে। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, যেকোনো একটি ইঞ্জিন হয়তো ঠিকভাবে কাজ করেনি।''
চন্দ্রযান-২ হচ্ছে ইসরোর নেয়া সবচেয়ে জটিল অভিযান।
এই মহাকাশযানের ভেতরে ২৭ কেজি ওজনের মুনরোভার রয়েছে, যেটির নাম প্রজ্ঞান। চার চাকার এই রোবট যানটি চাঁদের বুকের মাটি পর্যালোচনা করতে সক্ষম।
এই রোভারটির ৫০০ মিটার পর্যন্ত পরিভ্রমণের ক্ষমতা রয়েছে এবং ১৪দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। চাঁদের বুকের তথ্য ও ছবি নিয়ে সেটি পৃথিবীতে পাঠাতে পারে।
এই অভিযানের কয়েকটি উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে চন্দ্রপৃষ্ঠ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ, পানি ও খনিজের সন্ধান এবং চাঁদের ভূমিকম্প সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা।

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে তরুণদের দুর্বিষহ জীবন: -দ্য টাইমসের অনুসন্ধান

কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলে যখন গাছে গাছে লাল আপেল ধরেছে তখন সেখানকার তরুণরা নিজেদের বাঁচাতে লুকিয়ে  থাকছে এসব আপেল বাগানে। কাশ্মীরিদের স্বশাসনের অধিকার কেড়ে নেয়ার পর থেকেই তাদের ওপর নেমে এসেছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তীব্র নির্যাতন। গত একমাস যাবৎ কাশ্মীরে বাছবিচারহীনভাবে গ্রেপ্তার চালিয়ে আসছে দেশটির সেনারা। এ ক্ষেত্রে সবার আগে টার্গেটে পরিণত হয়েছে উপত্যকার তরুণরা। সমপ্রতি লণ্ডনভিত্তিক দ্য টাইমসের এক অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এসবের সত্যতাও।
কাশ্মীরি এক তরুণের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানতে পেরেছে ভারতীয় সেনারা একদিন আগেই তার এলাকা থেকে ৯ তরুণকে ধরে নিয়ে গেছে। এ সময় তাদেরকে জড়ো করে প্রচণ্ড মারধর করে ভারতীয় পুলিশ ও সেনা সদস্যরা। ওই তরুণ নিজের নাম প্রকাশ করতে চায়নি।
ইরফান আহমেদ নামের আরেক যুবক জানায়, আমি যখন দেখি সেনারা এসে আমার ছোট ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে তখন আমি ছাদ থেকে লাফিয়ে কোনোমতে বেঁচে যাই। তবে আমার ভয় হচ্ছে, ভারতীয় সেনারা আবার আসবে আমাকে খুঁজতে।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীরের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে দিল্লি। এই অঞ্চলটি কয়েক দশক ধরেই পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যেকার উত্তেজনার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। দিল্লির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রায় সমগ্র কাশ্মীরই কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। ভারত সরকার সেখানে ইন্টারনেট ও টেলিফোনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিসেবাগুলো বন্ধ রেখেছে। সন্ত্রাসবাদের দোহাই দিয়ে পুরো একটি অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে।
সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী কাশ্মীরে গত একমাসে দুই হাজারেরও অধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর ওপর পাথর ছোঁড়ার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেও চলছে দমনপীড়ন। কমপক্ষে ২ জন নিহত হয়েছে ভারতীয় বাহিনীর হামলায়। আটকদের কাশ্মীর ও কাশ্মীরের বাইরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। অনেক পরিবারই আছে যাদের তরুণ সদস্যরা নিখোঁজ রয়েছে।
অনেক কাশ্মীরিই দ্য টাইমসকে জানিয়েছে, তারা এখন সামরিক বাহিনীর আতঙ্কের মধ্যে বাস করছেন। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি যা করছেন তা এই অঞ্চলে আগুন লাগানো ছাড়া কিছুই না। অনেকেই বলছেন ৯০ এর দশকে যেরকম উত্তপ্ত ছিল কাশ্মীর সে অবস্থায় আবারো ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে। দ্য টাইমস কাশ্মীরের অন্তত ৬টি গ্রামে গিয়েছে সেখানকার অবস্থা জানতে। প্রতিটি গ্রামেই তরুণ কাউকে না কাউকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভয়ে সেখানকার তরুণরা পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, রাস্তায় বেরুলেই ধরে নিয়ে যাবে ভারতীয় সেনারা।
সেখানকার একটি গ্রামের এক নারী জানান, আমি জানি না আমার ছেলে এখন কোথায় আছে। গত সোমবার তাকে বাসার কাছ থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। এর তিন বছর আগে পুলিশের ছোড়া পেলেটের আঘাতে ওই তরুণ তার এক চোখ হারিয়েছিল। দ্য টাইমস জানিয়েছে, কাশ্মীরে এমন শত শত মানুষ আছে যারা সরকারি বাহিনীর হাতে অন্ধত্ব বরণ করেছেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গত এক মাসে নির্যাতনের অভিযোগ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। যদিও দেশটি এ ধরনের সকল দাবি উড়িয়ে দিচ্ছে। শোপিয়ান জেলায় পরিচিত এক সন্ত্রাসীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছে দ্য টাইমসের প্রতিনিধি। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ভারতীয় বাহিনী গত ৭ই আগস্ট তার আরেক ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে এবং তার ওপর অমানবিক নির্যাতন করেছে। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের কাছে মুখ খুললে ভয়াবহ পরিণতির হুমকিও দেয়া হচ্ছে পরিবারটিকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিবারের এক সদস্য বলেন, শুধুমাত্র একজন সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ার জন্য তার ভাইকে ধরে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্যাতন করা হয়েছে। তাকে প্রথমে ঝুলিয়ে পেটানো হয়েছে। তারপর বাধ্য করা হয়েছে পেট্রল খেতে। তার এক কাজিন বলেন, আমার ভাইয়েরা কেন সন্ত্রাসবাদে জড়াবে না? ভারতীয় বাহিনী তাদের ওপর যে জুলুম করছে তাদের কেউই আর কখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না।

সিলিকন ভ্যালির বিচিত্র জীবন by মাহফুজ রহমান

যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির বাসিন্দারা নিজেদের ভিনগ্রহী হিসেবে দাবি করলে অবাক হবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার এই প্রযুক্তি শহরের প্রতিবেশীরাও নিজেদের অন্য গ্রহের প্রাণী ভাবতে পারেন। তাঁদের শরীরেও যে দোলা দিয়ে যায় সিলিকন ভ্যালির ‘আউলা বাতাস’। এই শহর এমনই ‘আউলা’ যে কেউ কেউ দৈনিক ঘণ্টা দশেকের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আসেন অফিস ধরতে। কেউ কেউ এমন সব গাড়ির ফরমাশ দেন, যার কিনা কেবল নকশা হয়েছে। আবার অনেকেই বাস করেন ‘মাত্র এক মিলিয়ন ডলারে’ কেনা ফ্ল্যাটে। দুনিয়ার বাঘা বাঘা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের আঁতুরঘর হিসেবে খ্যাত সিলিকন ভ্যালির বিচিত্র জীবনযাপনে একটু উঁকি মারা যাক। >>লিখেছেন মাহফুজ রহমান 
১. ডুবন্ত বাড়ির দাম ১০ লাখ ডলার২০০৯ সালে সান ফ্রান্সিসকোর বে এরিয়ার মাটি ফুঁড়ে দাঁড়ায় মিলিনিয়াম টাওয়ার। ৫৮ তলার অট্টালিকাটি দাঁড়াতে না–দাঁড়াতেই তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, বছরে ২ ইঞ্চি করে অধঃগমন হচ্ছে এর। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী ১৭ ইঞ্চি তলিয়েছে, আর এক পাশে ঝুঁকে গেছে ৪ ইঞ্চির বেশি! অথচ এর একেকটি ফ্ল্যাটের দাম আকাশছোঁয়া—কমপক্ষে ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার! সান ফ্রান্সিসকোর বে এরিয়াতেই গড়ে উঠেছে সিলিকন ভ্যালি। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ধনী হর্তাকর্তাদের চাহিদাই মূলত মিলিনিয়াম টাওয়ারের দাম আকাশে উঠিয়েছে। এ নিয়ে বে এরিয়ার পুরোনো বাসিন্দাদের বিরক্তির অন্ত নেই।
২. রাত কাটে গাড়ি আর কনটেইনারেসান ফ্রান্সিসকোতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের বেতন গড়ে ১ লাখ ২৪ হাজার ডলার। চোখ কচলাচ্ছেন? একই এলাকার বাসাভাড়ার খবরটাও জেনে রাখুন। কর–টর দেওয়ার পর বেতনের যা থাকে, তার প্রায় অর্ধেকই গুনে দিতে হয় এক বেডরুমের একটি অ্যাপার্টমেন্টের জন্য! যেমন হাঁড়ি তেমন সরা। তাই সিলিকন ভ্যালির তুলনামূলক ‘দরিদ্র’ চাকরিজীবীরা অফিসের গাড়ি রাখার জায়গাগুলোকেই মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়েছেন। সেখানে তাঁরা ঘুমান রিক্রিয়েশনাল ভ্যানে—বাইরে থেকে গাড়ি কিন্তু ভেতরে ঘরের মতোই। গত কয়েক বছরে অফিসের বাইরে ভ্যানে দোকানও খুলে বসেছেন অনেক কর্মী। এঁদের বড় অংশের ঠিকানা আবার গুগলের প্রধান কার্যালয়ের পার্কিংয়ে। যাঁরা গাড়িতে রাত কাটাতে নারাজ, তাঁরা আবার ভিন্ন ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। পাশের শহর অকল্যান্ডে প্রচুর শিপিং কনটেইনার মেলে। সস্তায় একটা কিনে ফেললেই ঘর হিসেবে দিব্যি চলে যায়।
৩. মাত্র ১০ ঘণ্টার অফিসযাত্রাসিলিকন ভ্যালির ২০ শতাংশ কর্মী সান ফ্রান্সিসকোর বাইরে থাকেন। স্টকটন বা মডেস্টোর মতো শহরগুলো থেকে এই কর্মীরা সিলিকন ভ্যালিতে আসেন দেড় ঘণ্টায়। কিছু কর্মী আরও কয়েক কাঠি সরেস। বেন্ড ও অরিগনের মতো থাকা–খাওয়ায় তুলনামূলক সস্তা শহরে থাকেন এঁরা। সিলিকন ভ্যালিতে আসতে গাড়িতেই তাঁরা বসে থাকেন ১০ ঘণ্টা! এত ধৈর্য কোথায় পান কে জানে! আকাশপথে অবশ্য লাগে ৭০ মিনিট। এই সুবাদে বেন্ড ও অরিগন শহর দুটিতে বেডরুম ভাড়া দেওয়ার ব্যবসাও জমে উঠেছে।
৪. বক্তৃতার দাম ১০ হাজার ডলারদুনিয়ার প্রযুক্তি, বিনোদন আর ডিজাইনের ভূত–ভবিষ্যৎ নিয়ে বছরে একবার সম্মেলন হয়—যাকে বলে টেড কনফারেন্স। আর সেখানে বিশেষজ্ঞদের বক্তৃতা শোনার মঞ্চ তৈরি করে দেয় টেড টকস। সিলিকন ভ্যালির টেড এলএলসি নামের প্রতিষ্ঠানটির এই আয়োজনে কথা বলতে আসেন বাঘা বাঘা পণ্ডিত। ফলে তাঁদের বক্তৃতায় কান দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহীর সংখ্যা অনেক। সুবিধা হলো, বক্তৃতাগুলোর ভিডিও শুয়ে, বসে, খেতে খেতে আরামসে দেখে নেওয়া যায় একদম বিনা মূল্যে। কিন্তু টেড টকসের বক্তৃতা সরাসরি শোনার খরচা কত জানেন? ১০ হাজার ডলার মাত্র। তা–ও আবার আপনি যদি সেখানে যাওয়ার অনুমতিপত্র পান! দরখাস্ত দিয়ে এবং গাঁটের পয়সা খরচ করে বক্তৃতা শোনার এই আয়োজনকে কী বলা যায়? ভাষণবিলাস!
৫. রাস্তায় না নামাতেই গাড়ি বিক্রিসিলিকন ভ্যালির গাড়ি প্রসঙ্গ এলে ইলন মাস্কের নাম আসবেই। নতুনত্ব এবং পাগলামো—এই নিয়েই তাঁর টেসলা সিরিজ। টেসলার মডেল থ্রি নিয়েই কী ধুন্ধুমার ঘটে গেল! নকশা করে কেবল ঘোষণা দেওয়া শেষ, মানুষ রীতিমতো পাগল হয়ে গেল আগাম ফরমাস দেওয়ার জন্য। ‘গায়ের মূল্য’ ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ডলার। যা কি না টেসলার সব মডেলের মধ্যে তুলনামূলক সস্তা। যা হোক, টেসলা মডেল থ্রি আসছে শোনার পর সাড়ে চার লাখ মানুষ আগাম ফরমাশ দিয়ে রেখেছিল। আগাম ফরমাশে দিতে হয়েছিল আড়াই হাজার ডলার করে। আর অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছিল দুই বছরের বেশি সময়! এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্লাগ–ইন ইলেকট্রিক কারের সর্বকালের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া গাড়ির রেকর্ড গড়েছে টেসলা মডেল থ্রি।
৬. সাধারণ পানিকে ‘না’খাবারদাবার নিয়েও পাগলামো আছে সিলিকন ভ্যালিতে। বিশেষ করে পানি নিয়ে ‘জলঘোলা’ হয় প্রায়শই। এখানকার কিছু বাসিন্দা সাধারণ সুপেয় পানি পান করতে নারাজ। তাঁদের দরকার ঝরনার অপরিশোধিত পানি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ওতে পেটের বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট ব্যাকটেরিয়াই থাকে। কে শোনে কার কথা! দুপুরের খাবার নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। এ বিষয়ে দুটি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে সিলিকন ভ্যালিতে—হিউয়েল এবং সয়লেন্ট। নিত্যদিনের দুপুরের খাবারের চেয়ে নাকি তাঁদের বোতলভর্তি খাবার ‘অধিক ক্রিয়াশীল’।
৭. যাতায়াত মানেই ইলেকট্রিক স্কুটারআগেই জেনেছেন, বে এরিয়ার পুরোনো বাসিন্দারা সিলিকন ভ্যালির কর্মকাণ্ডে তিতিবিরক্ত। বে এরিয়াটি ছিল ভাবুক মানুষদের স্বর্গ। জীবন বিলাসবহুলই ছিল, আবার ভবঘুরে এক শিল্পীও সেখানে দিব্যি হাওয়া খেয়ে বেড়ানোর সুযোগ পেত। কিন্তু সিলিকন ভ্যালির যান্ত্রিক এবং কাঁচা টাকার জীবনযাপনের প্রভাব পড়েছে ব্যাপকভাবে। সবকিছুর দাম বেড়েছে, ভিড় বেড়েছে। শিল্পীজীবনে যা ভীষণ দুঃস্বপ্নের মতো। বিশেষ করে বে এরিয়ার রাস্তায় ইলেকট্রিক স্কুটারগুলো রীতিমতো উপদ্রব তাঁদের কাছে। বার্ড, লাইম এবং স্পিন নামের ভেঞ্চার ফান্ডেড প্রতিষ্ঠানগুলোই এর শুরু করেছিল। সিলিকন ভ্যালির লোকজনের প্রধান বাহন এখন এটাই।
>>>সূত্র: বিজনেস ইনসাইডার

জীবনবৃত্তান্ত চাওয়া শাসকদের ক্ষমতা প্রদর্শন: ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার

ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার
গত ছয় দশক ধরে অধ্যাপনা এবং গবেষণার কাজ করে আসছেন ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার। ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি জেএনইউতেও অধ্যাপনার কাজ করেছেন। দেশ বিদেশে একাধিক সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ইতিহাসবিদ হিসেবে তার প্রধান চর্চার বিষয় প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস। প্রকাশিত বেশ কয়েকটি বইয়ের মধ্যে ‘এ হিস্টোরি অফ ইন্ডিয়া’বহুল আলোচিত। দু’বার ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণে ভূষিত হয়েছেন, কিন্তু দু’বারই তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

সম্প্রতি তার কাছে দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) প্রশাসনের পক্ষ থেকে জীবনবৃত্তান্ত চাওয়া হয় এমিরিটাস অধ্যাপক পদ পুনর্মূল্যায়ন করার জন্য। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জেএনইউ’র পদক্ষেপ, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা এমন একটি পরিস্থিতিতে, এমন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রয়েছি, যখন আমাদের চিন্তাবিরোধী, বিদ্দ্বজ্জনবিরোধী, অ্যাকাডেমিকবিরোধী হতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

আপনার জীবনবৃত্তান্ত চাওয়া হয়েছে, কী বলবেন এ নিয়ে?
আমাকে এখন বলা হচ্ছে, মোট ১২ জনকে, যাদের বয়স ৭৫ পেরিয়েছে, তাদের সবার কাছেই নাকি এই জীবনবৃত্তান্ত চাওয়া হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি না হঠাৎ এ সিদ্ধান্ত তারা কেন নিলেন। দুনিয়ার কোথাও এমিরিটাস অধ্যাপকদের পুনর্মূল্যায়ন করা হয় না। যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনও অপরাধ করে থাকেন, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানহানি হয়েছে, সেক্ষেত্রে তার এমিরিটাস মর্যাদা বাতিল করা যেতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে এ মর্যাদা পুনর্যাচাই কোথাও করা হয় না।

জেএনইউ প্রশাসন তাদের বিবৃতিতে বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয় চাইলেই নাকি এ বিষয়ে পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে এবং এই নিয়ম নাকি এমআইটি এবং হারভার্ডেও রয়েছে, যা একেবারেই ঠিক নয়। কোন বিভাগে কতজন এমিরিটাস থাকবেন এর কোনও কোটা নেই, সব বিভাগে সমানুপাতে এমিরিটাস থাকবেন, এর পক্ষেও কোনও যুক্তি নেই। জেএনইউ সমাজবিজ্ঞান এবং মানবিকে বেশি ভাল, ফলে এই বিভাগ দুটি থেকে স্বাভাবিকভাবেই বেশি সংখ্যক সম্ভাব্য এমিরিটাস থাকবেন। যেহেতু এটি একটি সম্মানজনক পদ ফলে সংখ্যা কোনও বিষয়ই হতে পারে না। কোনওভাবেই কোনও নতুন এমিরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ আটকাচ্ছে না। প্রশাসন সম্ভবত এমিরিটাস অধ্যাপকের ব্যবস্থাটা বুঝতে পারেনি, সাধারণ অধ্যাপনার সঙ্গে ব্যাপারটা গুলিয়ে ফেলেছে।

আসলে যারা স্কুল আর ইউনিভার্সিটি প্রশাসনের পার্থক্য বুঝতে পারেন না, তারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দায়িত্ব নেন, তখন এরকমই হয়। আমি কালই ভাবছিলাম, আমার সঙ্গে অন্য যে দুজন ইতিহাসবিদ এমিরিটাস অধ্যাপক হয়েছিলেন, তারা হলেন সর্বপল্লী গোপাল ও বিপান চন্দ্র।

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি যে, ১৯৭০ সালে ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এমিরিটাস অধ্যাপক নিয়ে যে নিয়ম চলে আসছে, তার শর্তাবলী হঠাৎ বদল করার কথা ভাবা হল কেন। সম্ভবত নতুন সরকার তাদের পেশিশক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে এবং যারা আগে সম্মানিত হয়েছেন, তাদের প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করছে।

জেএনইউ-এর এমিরিটাস অধ্যাপনার কাজ আমার কাছে অত্যন্ত সমাদরের বিষয় দুটো কারণে। প্রথমত অপেক্ষাকৃত কমবয়সী স্কলার ও সহকর্মীদের সঙ্গে ভাবনার আদানপ্রদান করতে পারি এবং দ্বিতীয়ত যে প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে আমি সহায়তা করেছিলাম তার সান্নিধ্য অনুভব করতে পারি। আমরা কয়েকজন শুরু থেকে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিলাম, বৌদ্ধিকভাবে এবং প্রশাসনিক স্তরেও। এই যোগাযোগটা যাতে থাকে, সারাজীবন তা চেয়ে এসেছি। কিন্তু কেউ এমিরিটাস অধ্যাপক থাকলেন কি না, তার উপরে তার অ্যাকেডেমিক খ্যাতি নির্ভর করে না। এমিরিটাস মর্যাদা মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, যা বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক দুপক্ষের উপর নির্ভরশীল।

আমরা যারা শুরুতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলাম, তাদের একটা আইডিয়া ছিল। আমরা ভাবতাম ভারতীয়রাও এমন একটা বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে পারে, যা বিশ্বমানের এবং মহৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত গুণ সেখানে থাকতে পারে। এ গুণগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্ত চিন্তা, মুক্ত মনে প্রশ্ন করা, বিতর্ক, আলোচনা এবং উচ্চমানের অ্যাকাডেমিক সাফল্যও। অত্যন্ত খুশির ব্যাপার, আমরা এগুলো অর্জন করতে পেরেছি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পদক্ষেপ এবং সাম্প্রতিক আরও কিছু পদক্ষেপ দেখে এ কথাই মনে হয় যে, প্রশাসন যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে তাহলে জেএনইউ এতদিন ধরে যা করেছে সেগুলোকে পণ্ড করাই এর মূল উদ্দেশ্য এবং একে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্তরে নামিয়ে আনাই এসবের লক্ষ্য।

১৯৪৭ সালে এলাহাবাদে এক কনভোকেশনে জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, সব বিশ্ববিদ্যালয় যদি তাদের কাজ যথাযথভাবে করে, তাহলে তা দেশের পক্ষে এবং দেশের মানুষের পক্ষে যাবে। এখনকার ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবস্থা এবং দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়?

আমার ধারণা আমরা এমন একটি পরিস্থিতিতে, এমন একটা মুহূর্তে দাঁড়িয়ে রয়েছি, যখন আমাদের চিন্তাবিরোধী, বিদ্দ্বজ্জনবিরোধী, অ্যাকাডেমিক বিরোধী হতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের মঞ্চে প্রশ্ন করা, বিতর্ক আয়োজন করা, এবং মতামত ব্যক্ত করার ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের নিরুৎসাহ করা হচ্ছে। সাবেক অধ্যাপকের স্মরণে ভাষণের আয়োজন করার জন্যও অনুমতি নিতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় বলতে যা বোঝায় সে ধারণাকে ধ্বংস করার এই শুরু।

আমরা সারাজীবন ব্যয় করেছি প্রতিটি ছাত্র যাতে প্রশ্ন করে সে ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়ার জন্য- কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছে তেমনটাই কাঙ্ক্ষিত। প্রশ্ন করার মাধ্যমেই এবং সবকিছুকে প্রশ্ন করার মাধ্যমেই মনের বিস্তার হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন এমন একটা পর্যায় যখন মুক্ত চিন্তা করা যায়, অনিঃশেষ বিতর্ক করা যায়, আলোচনা করা যায়, পৃথিবীর যে কোনও বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।

আমার ধারণা, রেজিস্ট্রারের সাম্প্রতিক নির্দেশ এবং এ ধরনের আরও কিছু নির্দেশাবলীর মাধ্যমে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান, যারা ছাত্র এবং যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৌদ্ধিক মর্মস্থল তৈরি করেন, তাদের উপর কর্তৃত্ব প্রকাশ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ যেন সেই ঔপনিবেশিক সময়কাল, যখন প্রশাসন নজর রাখত কে কী পড়াচ্ছেন- সে সময়ে অনেক রকমের পঠনপাঠন নিষিদ্ধ ছিল, এবং যারা প্রশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতেন, তাদের মনে ভয় ধরানোর চেষ্টা করা হত। এই সময়কালে এ পরিবেশ কি ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা হচ্ছে, নাকি স্বাভাবিকভাবেই এ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে?

এ শুধু জেএনইউতেই ঘটছে না, বেশ কিছু অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং গবেষণা কেন্দ্রেও এমনটাই ঘটছে। ক্লাসে দুটি বাক্য সমালোচনামূলক বাক্য উচ্চারণ করার জন্য কলেজ শিক্ষকদের গ্রেফতার করা হচ্ছে কেন? সরকার এবং রাষ্ট্রকে এক করে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে কেন, যখন দুটো সম্পূর্ণ আলাদা? নিশ্চিতভাবেই সরাকরি নীতির সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রবিরোধী হওয়া নয়।

আমরা গণতন্ত্র বলতে যা বুঝে এসেছি তার সংজ্ঞা সম্ভবত বদলানো উচিত এবং বদলাতে থাকা উচিত। আমাদের নিজেদের মনে কারনো উচিত যে, এর মানে কী।

আমার কাছে এ ঘটনাটা ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এ এমন একটা বিষয় যা অত্যন্ত চিন্তার। এ ভাবে চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে। ২০১৫ সালের আগে জেএনইউতে যারা পড়িয়েছিলেন, তাদের যদি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে সে পুনর্মূল্যায়ন কেন, তা সহজেই অনুমেয়। তাদের বদলে কারা আসবেন তাও অনুমেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যবইতেই আমরা পড়েছি, ক্ষমতায় থাকার জন্য বিভিন্ন সংগঠন, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যারা রয়েছেন, তাদের বদলে নিজেদের লোক বসিয়ে থাকে। সমাজে এরকম অনেক সংগঠন রয়েছে, যারা এ পদ্ধতিতেই কাজ করে। ভুলে গেলে চলবে না, কল্পবিজ্ঞান ও উন্নততর প্রযুক্তি উভয়েই আসন্ন পৃ্থিবীর রোবটরাজের কথা বলছে।

বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপকদের এখন এলিট হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কেমনভাবে দেখছেন এ বিষয়টা?

আহ! যদি এলিট হতাম! জেএনইউয়ের সাম্প্রতিকতম ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে অ্যাকাডেমিকরা এলিট নন, কারণ প্রশাসন তাদের ক্রমাগত অপমান করে চলেছে। হ্যাঁ, বুদ্ধিজীবীরা এক অর্থে এলিট বটে, বুদ্ধিজীবীদের, লেখকদের এবং যারা গণ্ডির বাইরে গিয়ে ভাবতে পারেন, তাদের সম্মান করা হয় যে সমাজে সেখানে। আজকাল আমরা এ ধরনের মানুষদের ‘আর্বান নকশাল’ বলে থাকি, সে শুনতে যতই হাস্যকর হোক না কেন এবং তাদের জেলে পাঠিয়ে থাকি।

বিদ্দ্বজ্জন বিরোধিতার যে মনোভাব এই সমাজে খুব স্পষ্ট আমাদের সে ব্যাপারে সাবধান হতে হবে। ট্রোলিংয়ের মাধ্যমে বিশ্বাস উৎপাদন এর একটা চিহ্ন। যত বেশি ইতর ট্রোলিং, তত বেশি কার্যকর। এ একেবারে গোয়েবলসের ফর্মুলা, প্রচুর পরিমাণ মিথ্যা প্রতিনিয়ত বলা, কার্যকরভাবে বলার মাধ্যমে তা সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। যাদের ভাবার ক্ষমতা শূন্য, তারাই যে অটলভাবে ট্রোল করে যেতে পারে, এ কথাটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে। মিডিয়াকেও এই দিক থেকেই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কিছু মিডিয়া ট্রোলিংয়েরই নামান্তর হয়ে যায়নি কি! মিডিয়া যা বলে, তা গ্রহণ করে নেওয়ার ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কতজনের মন তৈরি হয়ে থাকে! বর্তমানে প্রান্তিক হয়ে থাকা যেসব মিডিয়া ট্রোলিংকে উৎসাহ দেয় না, তাদের ভূমিকা বাড়ানোর ব্যাপারে কি আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিত নয়!

এই বুদ্ধিজীবী বিরোধিতার একটা কারণ হল জনগণকে তাদের জীবনযাত্রা কীভাবে উন্নততর হবে, সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনায় উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে না। অর্থ রোজগার এবং স্ট্যাটাস প্রতিষ্ঠা করা অন্যায় নয়, কিন্তু মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ভিড়ের শাসনকে নিশ্চিহ্ন করারও একটা দিক তো রয়েছে। সে কারণে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে। একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার এগুলোই তো ভিত্তি। বর্তমান সময়ের উচ্চ মধ্যবিত্তদের রোল মডেল কেবলই অর্থোপার্জন এবং সামাজিক সম্মান প্রতিষ্ঠা।

অন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির কী অবস্থা এ দেশে? ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী রকম?
সব প্রতিষ্ঠানই একই রকম পরিবর্তনের মুখোমুখি, সামান্য কয়েকজন একে বিপজ্জনক বলে ভাবছেন। আমরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমাণ চিন্তা ব্যক্ত করছি না। সম্ভবত আমরা বুঝতে পারছি না যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতার উপর গণতন্ত্র কতটা নির্ভরশীল। একবার এ স্বাধীনতা খোয়াতে শুরু করলে, অগণতান্ত্রিক সমাজের দিকে আমাদের পতন শুরু হয়। গণতন্ত্রের অর্থই হচ্ছে চাপ দেওয়া, সে চাপ যেখান থেকেই আসুক না কেন। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, চাপ সর্বদাই রয়েছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো, সে চাপ কি ব্যবস্থার বদল ঘটাতে পারছে নাকি হাওয়ায় চাপ দিচ্ছে!

আমার বক্তব্য হরো, শিক্ষার মান যত কমবে, তত কম মানুষ স্বাধীনভাবে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানের মান খর্ব হবে, বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানের। এর ফলে গণতন্ত্র বিপুল ঝুঁকির জায়গায় পৌঁছে যাবে। মানের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানে যদি ক্ষয় হয়, তাহলে তা মেরামত করতে বহু বছর লেগে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সেখান থেকেই পেশাদারি দক্ষতা গড়ে ওঠে। এ ব্যাপারে দৃষ্টি দিতে হবে এবং আপটুডেট থাকতে হবে। তেমনটা ঘটছে না।

যেভাবে নিজের পতন ডেকে আনেন সুদান শাসক ওমর হাসান আল বশির

প্রায় ৩০ বছর ধরে সুদান শাসন করেছেন ওমর হাসান আল বশির। এই তিন দশকে বহু অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ ঠেকিয়ে টিকে ছিলেন তিনি। অবশেষে গত মাসেই তার পতন ঘটলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, আঞ্চলিক রাজনীতি বুঝতে না পারা ও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েই নিজের পতন ডেকে এনেছেন বশির। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রায় পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ঠিক কীভাবে তার এই দীর্ঘ শাসনের ইতি ঘটলো। মানবজমিন-এর পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।
১০ই এপ্রিল রাতে সুদানের গোয়েন্দা প্রধান সালাহ গোশ প্রেসিডেন্ট ওমর হাসান আল বশিরের সঙ্গে তার প্রাসাদে গিয়ে দেখা করেন। ওই বৈঠকে গোশ প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করেন যে, চলমান গণবিক্ষোভ তার শাসনের প্রতি কোনো হুমকিই নয়।
অথচ, ৪ মাস ধরে রাজপথে বশিরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে হাজার হাজার সুদানি। তারা গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক দুর্দশা অবসানের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। আন্দোলনকারীরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরেও তাঁবু স্থাপন করেছিলেন।
গোশ ও বশিরের মধ্যে ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা সহ মোট চারটি সূত্র জানান, গোশ তখন বলেছিলেন যে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে প্রতিবাদকারীদের জটলা নিয়ন্ত্রণে আনা হবে অথবা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
গোশের কথায় আশ্বস্ত হয়ে শান্তিতে ঘুমাতে যান বশির। ৪ ঘণ্টা পর ঘুম থেকে জেগে উঠে বশির বুঝে যান যে, সালাহ গোশ তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। প্রাসাদ রক্ষীরা সব চলে গেছেন। তাদের স্থলে প্রাসাদে অবস্থান নিয়েছে নিয়মিত সৈন্যরা। বশিরের বুঝতে আর বাকি রইলো না যে, তার ৩০ বছরের শাসনের ইতি ঘটেছে।
এই চূড়ান্ত সময়ে বশিরের সঙ্গে অল্প যে কয়েকজন ব্যক্তি কথা বলেছেন, তাদের একজন জানান, এই অবস্থা দেখে প্রেসিডেন্ট নামাজ পড়তে চলে যান। তার ভাষ্য, ‘নামাজ পড়া পর্যন্ত তার জন্য অপেক্ষা করে সেনা কর্মকর্তারা।’ কর্মকর্তারা বশিরকে জানান যে, সুদানের হাই সিকিউরিটি কমিটি (যার সদস্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনা, গোয়েন্দা ও পুলিশ প্রধান) তাকে ক্ষমতাচ্যুত করছে। কমিটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, দেশের নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই।
প্রাসাদ থেকে বশিরকে রাজধানী খার্তুমের কোবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ঠিক এই কারাগারেই তিনি নিজের হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পুরেছিলেন। তিনি এখনও ওই কারাগারেই রয়েছেন। ৩০ বছর ধরে যে বশির শক্ত হাতে বহু বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান চেষ্টা ঠেকিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়েছেন, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে কাঁচকলা দেখিয়েছেন, সেই বশিরের বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান যেন অত্যন্ত নিখুঁত ও মসৃণ ছিল। সবকিছু ঘটে যাওয়ার আগে বশির টেরই পাননি।
একজন সাবেক মন্ত্রী, বশিরের অন্দরমহলের একজন সদস্য ও অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় সরাসরি জড়িত একজন ব্যক্তি সহ মোট ৩টি সূত্র বশিরের পতনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে: বশির হয়তো সুদানের অভ্যন্তরীণ ইসলামিস্ট প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী ও সামরিক অংশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে ভীষণ দক্ষ ছিলেন, কিন্তু পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্যে তিনি একাকী হয়ে গিয়েছিলেন। তারা বর্ণনা করেন কীভাবে বশির সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে নিজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছেন। অথচ, ইতিপূর্বে আরব আমিরাতই সুদানের রাজকোষে কয়েক বিলিয়ন ডলার ঢেলেছিল। বশির অবশ্য ইয়েমেনে আমিরাতের স্বার্থ ঠিকঠাক মতোই রক্ষা করেছিলেন (ইয়েমেনে ইরানের বিরুদ্ধে প্রক্সি লড়াই চলছে আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের)। কিন্তু ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ যখন দেশের অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয় আকার ধারণ করে, পাশাপাশি রাজপথ দখলে নেয় বিক্ষোভকারীরা, বশির দেখতে পেলেন তার পাশে আর নেই ক্ষমতাধর, সম্পদশালী মিত্র আমিরাত।
সূত্রগুলো আরও জানায়, সামরিক জেনারেলরা বশিরের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সালাহ গোশ কারাবন্দি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে তাদের সমর্থন চান। অভ্যুত্থানের কয়েকদিন আগে, গোশ অন্তত একবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে আগেভাগেই জানিয়ে দেন কী ঘটতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আরব আমিরাত ও সৌদি আরব সরকার কোনো প্রশ্নের জবাব না দিলেও, জুনে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আনোয়ার গারগাশ টুইটারে বশিরের পতনের পর লিখেছিলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সুদানের সকল বিরোধী পক্ষ ও সামরিক পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। গারগাশ আরও বলেন, বশিরের দীর্ঘ একনায়কতন্ত্র ও মুসলিম ব্রাদারহুডের পর এখন সংবেদনশীল সময় চলছে সুদানে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গত, মুসলিম ব্রাদারহুড বশিরের মিত্র ছিল।
অথচ, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেও বশির ও আরব আমিরাতের সম্পর্ক অনেক উষ্ণ ছিল। সেবার বশির আমিরাতে গিয়ে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে আবুধাবিতে সাক্ষাত করেন। অপরদিকে ইয়েমেনে সৌদি-আমিরাত নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে অংশ নেয় ১৪ হাজার সুদানি সেনা।
তবে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ (সংক্ষেপে যাকে এমবিজেড ডাকা হয়) অন্য আরেক ক্ষেত্রেও বশিরের সহযোগিতা চাইছিলেন। আর তা ছিল, ইসলামিস্ট বা ব্রাদারহুডকে দমন করতে হবে। সুদানি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ কথা জানান।
রাজনৈতিক ইসলাম, অর্থাৎ ব্রাদারহুডকে ঠেকাতে আঞ্চলিক তৎপরতার নেতৃত্বে ছিল আমিরাত। সৌদি ও আমিরাত মনে করে, তাদের রাজতন্ত্রী শাসন ও এই অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি ব্রাদারহুড। ২০১১ সাল থেকে এই উদ্বেগ আরও তীব্র হয় সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের। কারণ সেই বছরই পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দিয়ে বয়ে যায় আরব বসন্ত, যার সবচেয়ে বেশি লাভ ঘরে তোলে মুসলিম ব্রাদারহুড। সৌদি ও আমিরাত ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ব্রাদারহুডের দাবি তারা শান্তিপূর্ণ।
২০১২ সালে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। মাত্র ১ বছর পরই তাকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী। পরবর্তী ১৮ মাসে সেনা শাসনাধীন মিশরকে সাহায্য হিসেবে ২৩০০ কোটি ডলার পাঠায় সৌদি আরব, আমিরাত ও কুয়েত। সুদানে ইসলামিস্টদের প্রভাব মিশরের চেয়েও বেশি। বশির নিজেও একটি ইসলামিস্ট জান্তার প্রধান হিসেবে ১৯৮৯ সালে ক্ষমতা দখল করেন। দেশটির সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী ও প্রধান মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণেও ইসলামিস্টরা। ওই বৈঠকে বশির ও এমবিজেড ঐক্যমত্যে পৌঁছেন যে, বশির ইসলামিস্টদের উৎখাত করবেন, বিনিময়ে সুদানকে আর্থিক সহায়তা দেবে আমিরাত। কিন্তু বশির বলেননি কীভাবে তিনি ইসলামিস্টদের দমন করবেন।
আবুধাবির সেই আলোচনার পর সুদানে কয়েক বিলিয়ন ডলার পাঠায় আরব আমিরাত। ২০১৮ সালের মার্চে আমিরাতি সরকারী বার্তা সংস্থা জানায়, সুদানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সহায়তার অংশ হিসেবে এবং বেসরকারী ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অংশ হিসেবে ৭৬০০ কোটি ডলার দিয়েছে আমিরাত।
বশিরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন ছিলেন তার কার্যালয়ের পরিচালক তাহা ওসমান আল হোসেন। তাকেই ইউএই’র সঙ্গে সম্পর্ক দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাহা ওসমান হোসেন একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। সহকর্মীরা জানান, তিনি ভীষণ উচ্চাবিলাশী ও দক্ষ একজন কর্মকর্তা। তার প্রভাব এত বেশি ছিল যে খোদ মন্ত্রীরাও তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেন। হোসেনকে এড়িয়ে বশিরের সঙ্গে মন্ত্রীরাও দেখা করতে পারতেন না। তাদের অভিযোগ ছিল, হোসেন নিজেই দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। একবার তিনি সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও সৌদি আরবের একটি সংবাদ সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেন।
বশিরের জাতীয় কংগ্রেস পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা গামার হাবানি বলেন, ‘বশিরের মনের ওপর জাদুকরি প্রভাব ছিল হোসেনের।’ তবে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান ও নেতৃত্বস্থানীয় রাজনীতিকরা। তারা প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তোলেন। গোয়েন্দা সংস্থা অভিযোগ করে, দুবাইয়ে হোসেনের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০৯ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে সৌদি আরব ও ইউএই। হোসেন অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
কিন্তু ২০১৭ সালের জুলাইয়ে জানাজানি হয়ে যায় যে, হোসেন সৌদি আরবের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। তখন তাকে বহিষ্কার করেন বশির। এরপর হোসেন রিয়াদে চলে যান ও সেখান থেকেই সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন।
হাবানি বলেন, ‘তাহা হোসেনের ঘটনা বশিরের মনে বিরাট দাগ কেটে যায়।’ আবার তাকে বহিষ্কারের বিষয়টি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
দুই বছর আগে হঠাৎ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও সৌদি আরব সম্পর্ক বিচ্ছেদ করে প্রতিবেশী দেশ কাতারের সঙ্গে। মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি কাতারের অব্যাহত সমর্থন নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। এই পরিস্থিতিতে বেশ জটিল অবস্থায় পড়ে যান সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির। সুদানের অর্থনীতি বাঁচাতে ইউএই’র মতো কাতারও কয়েক বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল। বশিরের ইসলামবাদী ঘরোয়া রাজনৈতিক মিত্ররা তাকে চাপ দেন, কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করা যাবে না। সুতরাং, এই সংকটে কোনো পক্ষে যেন বশির না যান। সাবেক উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার মতে, এই মিত্রদের বার্তা ছিল স্পষ্ট।
কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে।
পরের বছর ২০১৮ সালের মার্চে লোহিত সাগরবর্তী সুয়াকিন বন্দর উন্নয়নে কাতারের সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি সই করে সুদান। তার আগে অবশ্য বশির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন ইউএই ও সৌদি আরবের পক্ষে তিনি যাবেন না। অবশ্য তাদের বিরুদ্ধেও তিনি যাননি। কিন্তু ইউএই’র প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদকে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ইসলামপন্থীদের দমন করবেন, সেখান থেকেও তিনি সরে আসেন। জ্যেষ্ঠ ঐ সরকারী কর্মকর্তার মতে, দেশের শক্তিধর ইসলামপন্থী ব্যক্তিত্বদের শত্রু বানাতে ভয় কাজ করছিল বশিরের মনে। এই ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন আলি ওসমান তাহা, যিনি সাবেক প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ও তার উত্তরসূরি বাকরি হাসান সালেহ। এই দু’জনই বশিরকে ক্ষমতায় আনা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন।
২০১৮ সালের অক্টোবর নাগাদ, সুদান ফের অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হয়। দেশে খাদ্য, জ্বালানি ও মুদ্রা সংকট দেখা দেয়। বশিরের নিজ দল ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির বৈঠকে, দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য গামার হাবানি তাকে জিজ্ঞেস করেন, কেন ইউএই ও সৌদি আরব আর সাহায্য করছে না সুদানকে। বশির জবাবে বলেন, ‘আমাদের ভাইয়েরা চায়, আমি তোমাদের অর্থাৎ ইসলামিস্টদের ত্যাগ করি।’ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের দিকে, ইউএই সুদানে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। বশির দেশে ইসলামিস্টদের প্রভাব ক্ষুণœ না করায় স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ ছিল ইউএই। হাবানি বলেন, ‘যেহেতু বশির ইসলামিস্টদের পরিত্যাগ করতে ও কাতারের বিরুদ্ধে যেতে রাজি হননি, সেহেতু সৌদি আরব ও আমিরাত আর আর্থিক সহায়তা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সুদান কোনো পক্ষ নেবে না, সেটাই তারা মানতে রাজি নয়।’
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বশির দৃশ্যত নিজের ভাগ্য নিজেই নির্ধারণ করে ফেলেন। তখন দেশে ইতিমধ্যেই খাবারের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ওই সময় শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গঠিত সূরা কাউন্সিলের এক বৈঠকে বশির বলে ওঠেন, ‘আমরা সবাই ইসলামিস্ট! ইসলামিস্ট হতে পেরে আমরা গর্বিত।’ জ্যেষ্ঠ ওই কর্মকর্তার মতে, এই কথা বলার পর আর পেছন ফেরার কোনো উপায় ছিল না। এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে বশির ইসলামিস্টদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন না।
ততদিনে অর্থের জন্য হন্যে হয়ে ওঠেন বশির। তিনি চলে যান কাতারে। সাক্ষাত করেন আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে। বশিরের ঘনিষ্ঠরা বলেন, ওই বৈঠকের আগে কাতারি আমির তাকে এক বিলিয়ন ডলার দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সফর শেষে খালি হাতেই ফিরতে হয় তাকে। কেননা, আমির ওই বৈঠকে তাকে জানান ‘কিছু পক্ষে’র চাপে তিনি পূর্বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আমির জানাননি কারা তাকে চাপ দিচ্ছিল। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা অবশ্য বলেন, সুদানের প্রতি কাতারের সমর্থন দেশের জনগণের সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের জন্য। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, সুদানের প্রতি সাহায্য বন্ধে তৃতীয় কেউ কাতারকে চাপ দেয়নি। বরং, সুদানে কাতারের অর্থায়নে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এদিকে পর্দার আড়ালে বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনায়ও গতি পেতে শুরু করেছে। খার্তুমের কোবার কারাগারে (যেখানে এখন বশিরকে আটক রাখা হয়েছে) বন্দী থাকা এক বিরোধী নেতা বর্ণনা দেন কীভাবে গোয়েন্দা প্রধান গোশ অপ্রত্যাশিতভাবে ২০১৯ সালের জানুয়ারির দিকে তার সঙ্গে সাক্ষাত করেন। শুধু তিনি নন, কারাগারে বন্দী মোট ৮ জন বিরোধী নেতার সঙ্গে সাক্ষাত করেন গোশ।
গোশ তাদের বলেন, তিনি আবুধাবি গিয়েছিলেন। ইউএই তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জ্বালানি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়া হবে। তিনি সুদানের নতুন একটি রাজনৈতিক কাঠামো সৃষ্টির জন্য বিরোধী নেতৃবৃন্দের সহায়তা চান। গোশের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক সূত্র এই ঘটনা নিশ্চিত করেছে।
গোশ ১০ দিন পর আবারও কারাগারে যান। এবার তিনি ২৬টি কক্ষে যান। ওই বিরোধী নেতা বলেন, ‘ওই বৈঠকের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়। আমাদেরকে বিনামূল্যে সিগারেট দেওয়া হয়। কক্ষে টিবি দেওয়া হয়। তামাক দেওয়া হয়। আমরা খুব বিস্মিত হয়ে যাই এই ভেবে যে গোয়েন্দা প্রধান বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করছেন! কিন্তু যখন অভ্যুত্থান ঘটে, আমি বুঝে যাই কেন তিনি তা করেছিলেন।’
খার্তুমে কর্মরত একজন জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক, বশিরের ও গোশের ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি জানান, মধ্য ফেব্রুয়ারিতে বশিরের জন্য মর্যাদাবান প্রস্থানের প্রস্তাব দেয় ইউএই ও গোশ। ওই পরিকল্পনা মোতাবেক, দেশে নির্বাচন হবে এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বশিরই থাকবেন।
২২শে ফেব্রুয়ারি গোশ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বশির নিজ দল ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টির নেতার পদ থেকে সরে যাবেন এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে লড়বেন না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর এক টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে বশির পদত্যাগের ব্যাপারে কোনো শব্দই উচ্চারণ করেননি। তিনি পরে দলীয় কর্মীদের বলেন, গোশ বিষয়টি বাড়িয়ে বলেছে। এরপর বশিরের বিরুদ্ধে কার্যক্রমে আরও গতি পায়।
সুদানের বিরোধী দলগুলো ও সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইউএই। তখন ‘বশির-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি’ নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে আমিরাত। এ কথা জানান এক বিদ্রোহী নেতা ও উভয় পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী এক ব্যক্তি।
৬ই এপ্রিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশে প্রতিবাদের তাঁবু স্থাপন করে প্রতিবাদকারীরা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বশিরের বাসা থেকে বেশি দূরে নয়। কিন্তু সেদিন বশিরের জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা ওই বিক্ষোভকারীদের থামানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। হাবানি বলেন, ‘তখনই আমরা বুঝতে পারি সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলে নিতে যাচ্ছে।’ গোশ এই ফাঁকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সেনা প্রধান ও পুলিশ প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা একমত হন যে, বশিরের শাসনের ইতি ঘটানোর সময় এসেছে। গোশের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি জানায়, এদের প্রত্যেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ‘বশিরের দিন শেষ হয়ে এসেছে!’ বর্তমানে ক্ষমতাসীন ট্রাঞ্জিশনাল মিলিটারি কাউন্সিলের এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেন যে, গোশ এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকায় ছিলেন।
এই পুরো পরিকল্পনায় সবার শেষে যোগ দেন মিলিশিয়া নেতা জেনারেল মোহাম্মেদ হামদান দাগালো। তিনি বশিরের দীর্ঘদিনের মিত্র। দাগালোকে বেশিরভাগ মানুষ হেমেদি হিসেবে চেনে। তিনি সুদানের আতঙ্ক জাগানিয়া বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-এর প্রধান। ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এই প্যারামিলিটারি বাহিনীর সদস্য সংখ্যা হাজার হাজার। এই বাহিনীর হাতেই খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ। দাগালোও পরিকল্পনায় অংশ নিলে, আর কিছুই বাকি রইলো না বশিরের পক্ষে। ১১ই এপ্রিল বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
কয়েকদিন পর ইউএই ও সৌদি আরবের সঙ্গে বশিরের সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্বে থাকা হোসেন ফিরে আসান সুদানে। তিনি সেখানে সৌদি ও ইউএই প্রতিনিধিদলের অংশ ছিলেন। এই প্রতিনিধি দল সুদানের নতুন সামরিক শাসকদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। ২১শে এপ্রিল ইউএই ও সৌদি আরব জানায়, সুদানের জন্য ৩০০ কোটি ডলারের সাহায্য পাঠাবে তারা। জেনারেল হেমেদি পরবর্তীতে ঘোষণা দেন, সুদানের বাহিনী ইয়েমেনে থাকবে।
প্রায় কাছাকাছি সময়ে বিরোধী ও বিদ্রোহী বিভিন্ন গোষ্ঠী আবুধাবিতে আমিরাতি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করছিল। দারফুরের জাস্টিস অ্যান্ড ইকুয়ালিটি মুভমেন্ট নামে একটি বিদ্রোহী দলের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ তুগোদও সেই বৈঠকে ছিলেন। তিনি জানান, ওই বৈঠকে দেশে ঐক্যমত্য ও স্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের মতামত জানতে চায় ইউএই। তুগোদ বলেন, আমরা শান্তি প্রক্রিয়া ও যুদ্ধক্ষেত্রের সংঘাত সমাধানের ওপর জোর দিয়েছি।
বৃটিশ প্রিমিয়ার লিগের দল ম্যানচেস্টার সিটির মালিক ও আমিরাতি রাজপরিবারের সদস্য শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ান মূলত বিদ্রোহী ও আমিরাতের মধ্যকার যোগাযোগের বিষয়টি দেখভাল করেন। এ কথা জানান তুগোদ ও একজন মধ্যস্থতাকারী। এদিকে খার্তুমে আলোচনার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠাতে চেয়েছিল কাতার। কিন্তু কাতারের সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
বশিরের পতনের পর তার পুরোনো মিত্র জেনারেল হেমেদি এখন সুদানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তিনি ক্ষমতাসীন ট্রাঞ্জিশনাল মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান। সাবেক এই পশু ব্যবসায়ী ২০০৩ সালের দারফুর যুদ্ধে সবচেয়ে নৃশংস মিলিশিয়া কমান্ডার হিসেবে আন্তর্জাতিক কুখ্যাতি অর্জন করেন। তার মিলিশিয়া বাহিনীর বিরুদ্ধে গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া, বেসামরিক মানুষকে হত্যা ও ধর্ষণের মতো নৃশংসতা সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তবে বশির সরকারের মতো হেমেদি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এদিকে ১৩ই এপ্রিল ট্রাঞ্জিশনাল মিলিটারি কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন গোশ। এই গোয়েন্দা প্রধানকে প্রতিবাদকারীরা রীতিমতো ঘৃণা করে। তাদের চাপেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। গোশ এখন কোথায় তা জানা যায়নি। তবে খার্তুমে তার বাসভবনের পাশে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা গেছে।
এদিকে ৩রা জুন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে প্রতিবাদকারীদের অবস্থান গুঁড়িয়ে দেয় হেমেদির বাহিনী। প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলিও ছুড়ে তারা। বিরোধী দলের ডাক্তাররা বলছেন, ১০০ জনেরও অধিক নিহত হয়েছেন। সুদানি কর্তৃপক্ষ বলছে, ৬২ জন নিহত হয়েছেন। এরপর সৈন্যরা সেখান থেকে বিভিন্ন প্ল্যকার্ড ও ব্যানার সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এসব প্ল্যাকার্ডে বিভিন্ন স্লোগান লেখা ছিল। কিছু স্লোগানে লেখা ছিল, ‘আমরা মিশরের মতো হতে চাই না।’, ‘আরব আমিরাত ও সৌদি আরব, সুদানে হস্তক্ষেপ করা বন্ধ কর।’
(রয়টার্স অবলম্বনে।)

সড়ক দুর্ঘটনা বিরাট হত্যাকাণ্ডের মহড়া: -সাক্ষাৎকারে ইকবাল হাবিব

বাংলাদেশের সড়কে যেসব দুর্ঘটনা ঘটছে তা অবাঞ্ছিত এবং অবহেলাজনিত এক বিরাট হত্যাকাণ্ডের মহড়া। রেডিও তেহরানাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব
তিনি বলেন, মালিক-শ্রমিক সমিতির অবাঞ্ছিত, অযাচিত এবং দায়িত্ব কাণ্ডজ্ঞানহীন রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির বাধার মুখে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ও সড়কে নিরাপত্তা সৃষ্টিতে যথাযত উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে।
  • সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ জবাহদিহিতাহীন ও আইনের প্রয়োগহীন সড়ক ব্যবস্থাপনা।
  • সড়ক দুর্ঘটনারোধে শুধু প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জবাবদিহীতার মধ্য দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা তৈরি করা।
সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।
রেডিও তেহরান: জনাব ইকবাল হাবিব,  বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এবছর ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সারা দেশে ১২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৪ জন। আর আহত হয়েছেন ৩৩২ জন। এই যে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
ইকবাল হাবিব: প্রকৃত উদ্যোগ গ্রহণ না করাই মূলত সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়কে নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ বলে আমি মনে করি। আর এই প্রকৃত উদ্যোগ গ্রহণ করতে গেলেই মালিক-শ্রমিক সমিতির অবাঞ্ছিত, অযাচিত এবং দায়িত্ব কাণ্ডজ্ঞানহীন রাজনৈতিক এবং পেশিশক্তির বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। তাদের কারণেই প্রকৃত উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আমরা যখন কথা বলছি তখন সড়ক দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তার ব্যাপারে নানা আন্দোলন সংগ্রামের কারণে অনেকগুলো সুপারিশ ও নির্দেশনা এসেছে। একইসাথে উচ্চ আদালতেরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ফলে এ ব্যাপারে একটা প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। আমরা অদূর ভবিষ্যতে যথাযথ নিরাপত্তা সম্বলিত একটি সড়ক ব্যবস্থাপনার দিকে যাব। তবে এই যাব যাব যখন বলছি তখন আমাদের মহাসড়কগুলো সাংঘাতিকভাবে অরক্ষিত।
এবারের দুর্ঘটনাগুলো যদি একটু পর্যাবেক্ষণ করা যায় তাহলে দেখব, বিরাট অংশের দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে। এছাড়া অনেকগুলো দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল মহাসড়কে অবাঞ্ছিত অবৈধ ভটভটি ধরনের যেসব কনভার্টেট যান্ত্রিক বাহন তৈরি করা হয়েছে সেসব এবং এসবের চালকরা কখনও কোনো ধরনের আইন কানুন সম্পর্কে জ্ঞাত না পাশাপাশি লাইসেন্সও নেই। মূলত তাদের কারণেই বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এখন মোটরসাইকেলে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে সে ব্যাপারে বলব গত তিন চার বছরে দেশে মোটরসাইকেলের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আর এই প্রবলভাবে বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে- রাজনৈতিক কারণে আমাদের যুব সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ কোনো কাজ করতে পারছে না। তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। রাজনৈতিক কোনো না কোনো কারণে তারা হয়তো কোণঠাসা। তারা এই মোটর সাইকেলের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের একটা প্রচেষ্টার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। আর এই  যুব সমাজের মধ্যে একটা উদ্যমতা ও দুর্বিনীত মনোভাব আছে। রাজনৈতিক কারণে যখন কেউ চাপের মধ্যে থাকে তখন তাদের অভিব্যক্তি ও বোডি ল্যাঙ্গুয়েজ কার্যক্রম সবকিছুতেই কিন্তু মারদাঙ্গা মানসিকতা থাকে। আর এ বিষয়টি আমরা অনেক দিন থেকে বলছিলাম। পুরো শহরজুড়ে 'পাঠাও' উবার' এর মাধ্যমে দুর্ঘটনা প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এবারের ঈদ যাত্রায় বা ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে তা মোটরসাইকেল ও ভটভটিধরনের যেসব যান রয়েছে তাদের কারণে। আর তাদের কারণে বহু অমূল্য প্রাণ ঝরে গেছে। যে সংখ্যাটি আপনি বলেছেন সেটি নিবন্ধিত। এর বাইরে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং বহু প্রাণ হারিয়েছে। পুলিশি ঝামেলাসহ নানা কারণে এসব ঘটনা প্রকাশ্যে আসে নি। এ ধরনের বহু দুর্ঘটনার খবরও আমাদের কাছে এসেছে। অতএব সড়ক বা মহাসড়কে নিয়মকানুনহীন একটা কর্মসূচির মধ্যে থাকা হলে বা ছুটি ছাটার সময় মানুষের সফরের ব্যাপারটা যেহেতু একটু বেশি হয় ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে যা অবাঞ্ছিত এবং অবহেলাজনিত এক বিরাট হত্যাকাণ্ডের মহড়া।
রেডিও তেহরান:  সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রধানত আপনি কাকে বা কোন বিষয়টিকে দায়ী করবেন?
ইকবাল হাবিব: সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে আমি বলব জবাহদিহিতাহীন ও আইনের প্রয়োগহীন সড়ক ব্যবস্থাপনা। 
দ্বিতীয়ত কারণ হিসেবে আমি বলব, সড়কে করিডোরভিত্তিক যান চলাচলের নিরাপত্তাজনিত অবকাঠামো যথাযথকরণের অভাব।
তৃতীয়ত, সড়ক চলাচল ব্যবস্থার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দায়িত্ব কাণ্ডজ্ঞানহীন ও জবাবদিদিতার মনোভাভের অভাব।
চতুর্থত, সরকারি যেসব সংস্থা এসব দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের অবহেলা এবং তাদের পেশাগত দক্ষ জনগোষ্ঠীর অভাব এবং পরিবির্ততভাবে পুরো ব্যবস্থাকে সাজিয়ে একটি জনবান্ধব নিরাপদ  ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার উদ্যোগের অভাব। এগুলো মূল বিষয়। এরসঙ্গে সচেতনার অভাব রয়েছে। অবকাঠামোগত দিকের উন্নয়নে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের অভাব রয়েছে।
রেডিও তেহরান:  বলা হয়ে থাকে, দেশের চালক শ্রেণীর মধ্যে শিক্ষার আলো কম এবং তাদের অনেকেই মাদকসেবী। এদের কাছে মানবতাবোধ একদম তুচ্ছ। এই সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করা সম্ভব? কাউন্সেলিং কী এ বিষয়ে সমাধানের মাধ্যম হতে পারে?
ইকবাল হাবিব: আপনি যেসব কারণ বললেন তার সাথে আরও একটি কারণ যুক্ত করতে হবে। সেটি হচ্ছে চালকদের অনেকেই মানসিক এবং দৈহিকভাবে অসুস্থ। অনেক চোখে দেখেন না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এক্ষেত্রটিতে পরিশীলিত করণের উদ্যোগ নিতে হবে সরকার ও মালিক উভয়পক্ষের। যারা এরইমধ্যে চালক হয়েছেন তাদের যদি অবৈধ লাইসেন্স থাকে সেগুলোতে প্রক্রিয়ার মধ্যে আনতে হবে। আমাদের প্রশিক্ষণের স্কুলগুলোতে তাদের শারিরীক মানসিক পরীক্ষার  মাধ্যমে উপযুক্ততার ভিত্তিতে গাড়ি চালানোর অনুমতি দিতে হবে। এছাড়া আমাদের চালকের সংকট প্রচুর। সরকারি বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বেশি বেশি চালক প্রশিক্ষণ স্কুল তৈরি করে এ খাতে বিনিয়োগ করতে হবে যাতে অতি দ্রুততম সময়ে যোগ্য চালক তৈরি করতে হবে।এই প্রক্রিয়াটা মূলত উদ্যোগের অভাবে হচ্ছে না। কারণ চাহিদা আছে এবং আমাদের অসংখ্য বেকার ও অদক্ষ জনগোষ্ঠী রয়েছে। অথচ আমরা দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারছি না। আর অদক্ষ জনগোষ্ঠীর কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এ জায়গাতে আমাদের মনোযোগ ও  বিনিয়োগ জরুরিভিত্তিতে প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
রেডিও তেহরান: সড়ক দুর্ঘটনা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনা কী অসম্ভব? নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলার জন্য কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?
ইকবাল হাবিব: দেখুন, অবশ্যই সড়ক দুর্ঘটনা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব। শুধু তাই নয় দ্রুততম সময়ে সম্ভব। শুধু প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জবাবদিহীতার মধ্য দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা তৈরি করা।
করণীয় সম্পর্কে এরইমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ১১১ টি বিষয় দাখিল করা হয়েছে। যদিও আমরা সেটাকে ক্যাটিগরি করে দেখেছি যে এগুলো ৬৪ টির মধ্যে আনা সম্ভব। যারমধ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রম রয়েছে। এছাড়া আদালতের রায় আছে এবং প্রধানমন্ত্রীর গত দুই ঈদে দেয়া কতগুলো সুস্পস্ট অনুশাসন রয়েছে। আমি মনে করি শুধুমাত্র এগুলোতেই সময় নির্ভর পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করলে আমরা কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে সড়কের নিরাপত্তাকেও আনা সম্ভব একইসাথে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।
সড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা

জানা হল না এরশাদের সেই না বলা কথা

বহু আলোচিত- বহু সমালোচিত- বহু বিতর্কিত… বাংলাদেশের এক সময়ের শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জীবনভর থেকে গেলেন নানাবিধ চর্চায়। সামরিক শাসক থেকে ভোট-রাজনীতিবিদের খাতায় নাম লিখিয়েছিলেন। নামের পাশে জুটেছিল বেশ কিছু পরস্পর বিরোধী বিশেষণ। ‘স্বৈরশাসক’ থেকে শুরু করে ‘বিশ্ব বেহায়া’ পর্যন্ত বলা হয়েছে যাঁকে, বহু দুর্নীতি বা নারী কেলেঙ্কারীতে অভিযুক্ত হয়েছেন যিনি, সেই মানুষটিই আবার অনেকের কাছে ‘পল্লিবন্ধু’ বিশেষণও পেয়েছেন।
এরশাদ মারা গেলেন গত ১৪ জুলাই রবিবার বাংলাদেশি সময় সকাল পৌনে ৮টায়। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হল। গত ২৭ জুন সকালে অসুস্থবোধ করলে তাঁকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। তিনি হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর, আগের সেনাশাসকের মতো এরশাদও রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। এরশাদের সেই রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে বলা হয়েছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। আবার বাংলাদেশের কিছু সংবাদমাধ্যমের তথ্য, এরশাদের জন্ম বর্তমান ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটায়। এরশাদ আবার নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তাঁর জন্ম কুড়িগ্রামে মামা বাড়িতে। রংপুরে কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রাম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অ্যাডজুট্যান্ট, পশ্চিম পাকিস্তানের ৫৪তম ব্রিগেডের মেজর, তৃতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়ক এবং সপ্তম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এ সেক্টর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানেই ছিলেন এরশাদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়ার তত্য তুলে ধরে অনেকে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাকিস্তান থেকে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে ফেরেন। তার পর অন্য অনেকের মত তাঁকেও সেনাবাহিনীর চাকরিতে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হন তিনি। তখন তাঁর পদমর্যাদা ছিল কর্নেল। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর, জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হলে, এরশাদকে উপপ্রধান করেন। মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্তারা সে সময় এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে, জিয়ার পরিবার থেকে এরাশাদকেই দায়ী করা হয়েছিল। তবে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া একাধিকবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন, এ হত্যায় এরশাদকে অভিযুক্ত করে কোনও আইনি প্রক্রিয়াতেই যাননি। এ ছাড়া জিয়া হত্যার ঘটনার পর, নিহত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল মহম্মদ আবুল মঞ্জুরকে হত্যার দায়েও অভিযুক্ত ছিলেন এরশাদ। সে মামলার রায় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। অনেকের ধারনা, জিয়া হত্যায় নিজের জড়িত থাকার বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই মঞ্জুরকে হত্যা করান এরশাদ।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। নিজেকে সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে সামরিক শাসন জারি করে সংবিধান স্থগিত করেন। প্রথমে বিচারপতি এএফএম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়েছিলেন। কিন্তু সব ক্ষমতা ছিল এরশাদেরই হাতে। এক বছর পর আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন এরশাদ, যদিও এই ক্ষমতা দখল অবৈধ বলে পরে রায়  দেয় আদালত। ক্ষমতা দখল করে এরশাদ গড়ে তোলেন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় পার্টি’। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগে উপজেলা গঠন, তাতে নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন দিয়ে নিজের ক্ষমতা দখলকে পোক্ত করেন এরশাদ। এর পর ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ব্যাপক প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, অন্যান্য দল ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৮ সালে এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এনে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম  করেন, যা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বদলে দেয়। এ ছাড়া গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা-সহ নানা পদক্ষেপে বিতর্কিত ছিল এরশাদের ক্ষমতার যুগ।
এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। ১৯৮৩ সালে সালে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে গুলিতে প্রাণ হারান জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা-সহ বেশ কয়েকজন। সে সময় শিক্ষার্থীদের মরদেহও গুম করে ফেলে পুলিশ। তার পরের বছরই ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করে সেলিম-দেলোয়ারকে। একের পর এক আন্দোলন আছড়ে পড়তে থাকে এরশাদের মসনদে। শ্রমিক নুর হোসেন, বিএমএ নেতা শামসুল আলম মিলন ও ছাত্রনেতা নাজির উদ্দিন জেহাদকে হত্যা করা হয় এ সব আন্দোলনের নানা পর্যায়ে। ১৯৮ সালের ২৮ নভেম্বর এরশাদ বাংলাদেশে জারি করেন জরুরি অবস্থা। এর পর তুমুল আন্দোলনের মুখে, ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঘোষণা করে, তার দু’দিনের মাথায় ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
১৯৯০-এর গণ আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত এরশাদকে বন্দি করে তার বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু তার মধ্যেই চমক দেখিয়ে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে রংপুরের ৫টি আসনে বিজয়ী হন এরশাদ। গণ আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেও, পরের তিন দশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভাল মতোই টিকে থাকেন এরশাদ। বরং বলা যায়, আওয়ামি লিগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টিতে এরশাদ নিজের জায়গা ঠিক পেয়ে গিয়েছিলেন। কখনও আওয়ামি লিগের দিকে ঝুঁকে, কখনও বা বিএনপির দিকে ঝুঁকে নিজের পথ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
৪৩টি মামলা হয়েছিল এরশাদের বিরুদ্ধে। যার মধ্যে একটিতে খালাস পান। দুই মামলায় তিনি সাজা খাটেন। বাকি মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হলেও মঞ্জুর হত্যা মামলাটি ঝুলে ছিল তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।
রাষ্ট্রপতি থাকাকালে পাওয়া উপহার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ার মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত এরশাদকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়। তবে দুই যুগ পর হাইকোর্ট সেই সাজা বাতিল করে। জাপানি নৌযান কেনায় অনিয়মের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ড হয়। জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় এরশাদকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া সোনা চোরাচালান, টেলিকম দুর্নীতি, পোল্ট্রি ফার্ম দুর্নীতি মামলা, আয়কর ফাঁকি, জাহাজ কেনায় দুর্নীতি, রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম, হরিপুরে তেল অনুসন্ধানে দুর্নীতি এবং রাডার কেনায় দুর্নীতি-সহ বিভিন্ন অভিযোগে আরও ১৯টি মামলা ছিল এরশাদের বিরুদ্ধে।
১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান এরশাদ। এর পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হন তিনি। ২০১৪ সালে আওয়ামি লিগের নেতৃত্বে মহাজোট গঠিত হলে তাতে যোগ দেয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। নির্বাচনে মহাজোট জয়ী হলে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হন এরশাদ।
বাংলাদেশে প্রতি বারই নির্বাচন এলে উঠে আসতেন আলোচনায়, বড় দলগুলোর কাছে কদর বাড়ত তাঁর। ভোটের সময় সিদ্ধান্তহীনতা ভোগা তার নিয়মিত বিষয় ছিল। এই বিষয়টি ‘রাজনীতির বিনোদন’ হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশের মানুষ। এরশাদ নিজেও বলতেন, মনে অনেক কষ্ট নিয়েই তাঁকে সিদ্ধান্ত বারবার বদলানোর কাজটি করতে হয়। বলতেন, সময় হলে সব বলবেন তিনি। কিন্তু সেই সময় এল না আর। এসে গেল তার চলে যাওয়ার সময়। তাই জানা হল না  তাঁর সেই না বলা কথা।

এ বছরের শেষ নাগাদ আকাশে উড়বে পাকিস্তানের তৈরি জেএফ-১৭ ব্লক-থ্রি জঙ্গিবিমান by ফ্রান্জ-স্টিফান গাডি

জেএফ-১৭ ব্লক-থ্রি জঙ্গিবিমান
পাকিস্তান এরোনটিক্যাল কমপ্লেক্স ও চেংদু এরোস্পেস কর্পোরেশন (পিএসি/সিএসি)-এর তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-থ্রি মাল্টিরোল ফাইটার এয়ারক্রাফট চলতি বছরের শেষ দিকে আকাশে উড়বে।
এসব বিমান ২০২০ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে মোতায়েন শুরু করার কথা রয়েছে। ২০২৪ সালের মধ্যে ৫০টি জেএফ-১৭ ব্লক-থ্রি বহরে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে পিএএফের।
পিএসি কামরায় এয়ারক্রাফট ম্যানুফেকচারিং ফ্যাক্টরির (এএমএফ) চূড়ান্ত সংযোজন লাইনে এরই মধ্যে প্রবেশ করেছে ব্লক-থ্রি।
পিএসি চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল আহমেদ শাহজাদ এআইএন অনলাইনকে বলেছেন, ৫০টি ব্লক থ্রি এয়ারক্রাফটের প্রথম দুটির সাব-এসেমব্লিগুলো তৈরির কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এরপর ২০২১, ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে ১২টি করে বিমান তৈরি করা হবে। এ বছর আমরা আটটি ডুয়েল সিটার সংযোজন করবো, ২০২০ সালে করা হবে ১৪টি এবং বাকি চারটি ২০২১ সালে।
এসব বিমানের ৫৮ শতাংশ সরঞ্জাম তৈরি করে পাকিস্তান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে: ডানা, হরাইজন্টার টেইল, ভার্টিক্যাল টেইল ও ফরোয়ার্ড ফিউজেলাজ। অন্যদিকে সিএসি’র তৈরি ৪২ শতাংশ সরঞ্জামের মধ্যে মধ্য ও পেছনের ফিউজেলাজ রয়েছে। পাকিস্তানে সংযোজনের জন্য চীন থেকে এই বিমানের যন্ত্রাংশ নিয়ে আশা হয়। বছরে ২৫টি জেএফ-১৭ এয়ারক্রাফট তৈরির ক্ষমতা রয়েছে পিএসি’র।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বহরে বর্তমানে সক্রিয় ৮৫টি জেএফ-১৭ ব্লক-১ ও ব্লক-২ রয়েছে। পিএএফের সার্ভিসে মোট জেএফ-১৭ সংখ্যা ছিলো ৯৮। এই সংখ্যা ১১২ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। পাকিস্তানের প্রথম জেএফ-১৭ স্কোয়াড্রনে ১৪টি জেএফ-১৭ ব্লক-১ ফাইটর রয়েছে। ২০১০ সালে এই স্কোয়াড্রন গঠন করা হয়। পিএএফের বর্তমানে ছয়টি অপারেশনাল স্কোয়াড্রন রয়েছে।
জেএফ-১৭ দিয়ে পিএএফ তার বহরের পুরনো চেংদু এফ-৭ এবং ডসাল্টের মিরেজ থ্রি/ফাইভ ফাইটারগুলো বদলে ফেলছে।
জেএফ-১ ও ২ সংস্করণে রাশিয়ান ক্লিমভ আরডি-৯৩এমএ টারবোগান ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। ব্লক-থ্রিতে আরডি-৯৩এমএ বা চীনের ডব্লিউএস-১৩ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওয়েডিং শেমিং: অনলাইনে অন্যদের বিয়ে নিয়ে হাসি মশকরা করার বিষাক্ত জগত

আপনি হয়তো সদ্য বিয়ে করেছেন। এখনো নানা শুভেচ্ছা কার্ড আসছে, নানা জায়গায় দাওয়াত পাচ্ছেন, নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিয়ের নানা ঢঙের ছবি আপলোড করছেন, তাতে লাইক কমেন্টে ভরে যাচ্ছে।
আবার উল্টো চিত্রটা একবার কল্পনা করুন। কেউ একজন হয়তো আপনার বিয়ের পোশাক বা খাবারের তালিকার ছবি সামাজিক মাধ্যমে তুলে দিয়ে তার সঙ্গে ব্যঙ্গাত্মক একটি মন্তব্য জুড়ে দিল।
এরপর সেখানে আরো অনেকে আপনার আনন্দের দিনটাকে নিয়ে নানা হাস্যরসাত্মক, বিদ্রূপ করে মন্তব্য করতে শুরু করলো, সঙ্গে এলওএল চিহ্ন দিয়ে।
এভাবে অনলাইনে ওয়েডিংশেমিং বা বিয়ের অনুষ্ঠান ঘিরে লজ্জা দেয়া হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেকে। সারা পৃথিবীতে এ ধরণের গ্রুপের সংখ্যা বাড়ছে, যেখানে লোকজন এসে অন্যদের বিয়ে নিয়ে মজা করে।
বর্তমানে কানাডায় ফেসবুকের এরকম একটি গ্রুপে এক লাখ ২০ হাজার সদস্য রয়েছে। ফেসবুকে এরকম অন্তত ২০টি গ্রুপ আছে, যাদের সদস্য সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ৬২ হাজার পর্যন্ত।
যদিও এসব গ্রুপ 'প্রাইভেট', কিন্তু যে কেউ চাইলেই সেখানে যোগ দিতে পারে। শুধুমাত্র কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় এবং কয়েকটি ছবি শেয়ার করতে হয়, যার মধ্যে থাকতে হবে আপনার দেখা সবচেয়ে হাস্যকর বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি।
যদিও এসব গ্রুপে বর্ণ, ধর্ম, লিঙ্গ পরিচয় ইত্যাদি নিয়ে কোন বিভেদ না করার নীতিমালা আছে, কিন্তু গ্রুপের পোস্ট, ছবি বা মন্তব্যে সেটা আসলে কেউই খুব একটা অনুসরণ করে না।
সবচেয়ে বড় গ্রুপে ঢুকে দেখা গেলো, সেখানে বিয়ের নানা অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে, নানা জিনিসপত্রের ছবি রয়েছে। সেখানে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, ''এটা কেমন জামাকাপড় হলো, খুব বাজে লাগছে,'''সে আরো ভালো জামাই পেতে পারতো,'' এই লোকটা কি ওয়াকিং ডেডের কাছ থেকে কাপড়চোপড় ধার করেছে'' ইত্যাদি।
কিন্তু সব মন্তব্য বা ছবিই বিষাক্ত নয়। যেমন সবচেয়ে লাইক পাওয়া ছবির মধ্যে রয়েছে বিয়ে বাড়িতে একটি শিশুর ছবি, যে নিমন্ত্রণ ছাড়াই বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছে এবং সব ছবির মধ্যে ঢুকে পড়েছে।
বান্ধবীর সঙ্গে মিলে ফেসবুকে এরকম বড় একটি গ্রুপ পরিচালনা করেন বাইশ বছরের অ্যান্টন। তিনি মনে করেন না এর ফলে মানুষের বিষাক্ত আচরণ বেড়ে যাচ্ছে।
'' আমরা একবছরের কম সময়ের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার সদস্য পেয়েছি এবং প্রতিমাসে প্রায় দুই মিলিয়ন যোগাযোগ হচ্ছে। ইন্টারনেটের আর সব জায়গার মতো এখানেও ভালো, খারাপ আছে।''
'ওয়েডিং শেমিং' টার্মটি কখনো কখনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে বলে তিনি মনে করেন।
''অনেক মানুষ এই গ্রুপে এসে তাদের সৎ মতামত দিতে চায়। অনেক মানুষকে তারা সেরা বন্ধুর মতো মনে করে, অনেকে গল্প করে, অনেকে মজা করে। আপনি যদি অতীতের মন্তব্যগুলো ভালো করে দেখেন, তাহলে দেখবেন, তারা আসলে সৎ লোক,'' বলছেন অ্যান্টন।
''যদি সত্যিকারের খারাপ কোন মন্তব্য দেখা যায়, তাহলে আমরা ওই সদস্যকে স্থগিত বা সতর্ক হওয়ার জন্য বলি।'''
২০১৮ সালের অগাস্ট থেকে প্রথম অনলাইনে ওয়েডিং শেমিং বা বিয়ের বিষয় নিয়ে হাসি মশকরা করার চলটি শুরু হয়। তখন একটি গ্রুপের একটি পোস্টে একজন কনেকে নিয়ে লেখা হয় যে, সে বিয়ের সময় অতিথিদের কাছে বিয়ের জন্য ১৫০০ ডলার চেয়েছে।
মডেল ও সামাজিক মাধ্যমের তারকা ক্রিসি টেইজিন ওই গল্পটি শেয়ার করার পর সেটি ভাইরাল হয়ে যায়।
ওই গ্রুপের একজন মডারেটর মনে করেন, তারা বন্ধুত্বপূর্ণ একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন , যেখানে যেকেউ এসে তাদের হতাশার কথা জানাতে পারে।
''আমি এটাকে গুরুত্ব দেই না যে, অন্য কেউ আমাদের গ্রুপ নিয়ে কি ভাবছে। এটা এমন একটা জায়গা যেখানে মানুষজন এসে তাদের খারাপ বিয়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারে।''
এরপর থেকে এ ধরণের ফেসবুক গ্রুপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গ্রুপের একজন সদস্য ওরলা বলছেন, এটা শুধুমাত্র মজার করার জন্যই তিনি করেছেন।
''আমি পাগলাটে সব জিনিস আর কি সব মজার বিয়ের ঘটনা মানুষ ঘটাতে পারে, সেটা দেখতে পছন্দ করি।''
তবে ক্যাথরিন নামের আরেকজন সদস্য বলছেন, ''পুরো ধারণাটি আসলে খানিকটা লজ্জাজনক তো অবশ্যই- এটা নেতিবাচক ধারণার ওপরে তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমি এখানে বিনোদনের বিষয়টাকে গুরুত্ব দিতে চাই। অন্তত আপনি বুঝতে পারবেন যে, বিয়ের অনুষ্ঠানে কোন কাজটি করা উচিত নয়।''
মানুষজন তাদের নিজেদের বিয়ে নিয়ে যতটা গোপনেই পরিকল্পনা করুক না কেন, এখন একটা বার্তা পরিষ্কার হয়ে গেছে- ইন্টারনেটের এমন একটি জায়গা তৈরি হয়েছে, যেখানে একদল মানুষ এ নিয়ে মশকরা করার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। যারা অন্যদের বিশেষ এই দিনটিকে নিয়ে হাসিতামাশা করছে, যার অনেকগুলো অনেক সময় ট্যাবলয়েড ম্যাগাজিনগুলোয় ওয়েবসাইটে ছাপাও হচ্ছে।
অনলাইনে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য নিয়ে গবেষণা করেছেন মনোবিজ্ঞানী এমা কেনি। তিনি বলছেন, ''এই লোকদের অনেকের মধ্যে 'অন্ধকার ধরণের ব্যক্তিত্ব' আছে, যেখানে তাদের মধ্যে আত্মপ্রেম, অন্যদের নিজের পছন্দমতো বিচার করা এবং মানসিক বিকারের বিষয় রয়েছে।''
''সাধারণত যদি আমরা নোংরা কোন কাজ করি, তাহলে আমাদের নিজেকে নিয়ে খারাপ লাগে, অপরাধবোধ হয়। কিন্তু এই ব্যক্তিত্বের অধিকারী ব্যক্তিরা কোন নেতিবাচক ধারণা বোধ করে না, সুতরাং তারা অন্যদের নিয়ে যতটাসম্ভব বিদ্রূপাত্মক মশকরা করার চেষ্টা করে।''
এমা বলছেন, ''এই ব্যক্তিরা মনে করেন, যদি অন্য কেউ তাদের চেয়ে ভালো কিছু করে, আসলে সেটা করা তাদের উচিত হয়নি। এ ধরণের গ্রুপে এই ধরণের মানুষরা তাদের মতো অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ হয় এবং সবাই মিলে নিচু কর্মকাণ্ডের পরিবেশ খুঁজে পায়।''
এ ধরণের গ্রুপ থেকে সবাইকে দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন মনোবিজ্ঞানী এমা। '' যতই মানুষ এটা করবে, ততই সে অন্যদের জন্য খারাপ লাগার কারণ হতে থাকবে। একসময় মানুষজন হয়তো দানব হয়ে যেতে পারে এবং এই বিষাক্ততা তাদের বাস্তব জীবনেও ছড়িয়ে যেতে পারে। মানুষের এ ধরণের 'ওয়েডিং শেমিংয়ে' জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত, কারণ এটি তাকে একজন খারাপ মানুষ বানিয়ে ফেলতে পারে।''
হয়তো অন্য কারো বিয়ে নিয়ে কারো মতামত থাকতেই পারে। কিন্তু এ নিয়ে একজন অতিথির কাছে বা বর-কনের কাছে মন্তব্য করা এক জিনিস, আর হাজার হাজার অপরিচিত মানুষের কাছে তাকে ছোট করে তোলা ভিন্ন বিষয়।
দুঃখজনক হলো, এই বিষয়ে এসব গ্রুপের কোন চিন্তা নেই, যেহেতু প্রতি ঘণ্টায় অসংখ্য পোস্ট অ্যাপ্রুভ হচ্ছে আর প্রকাশিত হচ্ছে।
অনেকের বিয়ের ছবিতে মন্তব্যের সঙ্গে থাকে হাসির চিহ্ন হিসাবে এলওএল শব্দটি

আল-শাবাবের যৌনদাসীদের কথা

সোমালিয়ার আল-শাবাব জঙ্গিগোষ্ঠী কেবল যে কেনিয়ার পুরুষদেরই দলে টানছে তা নয়, সংগঠনটি যৌনদাসী হিসেবে কেনিয়ার মেয়েদেরও আটক ও পাচার করছে।
কেনিয়ার সালামা আলী যখন গত বছর তার নিখোঁজ দুই ভাইকে খোঁজা শুরু করেন তখন তিনি প্রতিবেশী দেশ সোমালিয়ার আল-শাবাব জঙ্গিগোষ্ঠীর ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে পারেন।
ওই সংগঠনটি কেবল যে কেনিয়ার পুরুষদেরই দলে টানছে তা নয়, সংগঠনটি যৌনদাসী হিসেবে কেনিয়ার মেয়েদেরও আটক ও পাচার করছে। ঘন জঙ্গলে ক্যাম্পে নিয়ে মেয়েদের ধর্ষণ করছে আল-শাবাবের জঙ্গিরা। ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া নারীরা কোনো ধরনের সহায়তা ছাড়াই গভীর জঙ্গলে সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। আর জঙ্গলে সেই সন্তানেরা বেড়ে উঠছে।
সালামা আলী নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহ এড়াতে গোপনে তাঁর ভাইদের খোঁজ শুরু করেন।
মোম্বাসায় তিনি এমন সব নারীদের সঙ্গে দেখা করেন, যাদের পুরুষ আত্মীয়রা নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া শুরু করেন তিনি।
'জানতে পারলাম, আমার মতো অনেকেই রয়েছেন।' -বলেন সালামা।
তবে জোর করে যেসব নারীদের সোমালিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাদের জীবনের ভয়াবহ কাহিনীর বিষয়েও জানতে পারেন তিনি।
মোম্বাসা ও কেনিয়ার অন্য উপকূলীয় অঞ্চল থেকে খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের তরুণী ও বয়স্ক নারীদের জোর করে তুলে নেওয়া হয়। ওই নারীদের প্রথমে বিদেশে বা অন্য শহরে ভালো পারিশ্রমিকের কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং পরে তাঁদের অপহরণ করা হয়।
আল-শাবাবের বন্দীশিবির থেকে ফিরে আসা নারীদের সহায়তা দিতে গত বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন সালামা। এই সংগঠনের কথা জানতে পেরে নির্যাতিত নারীরা তাঁর কাছে ছুটে আসেন এবং ওই সংগঠনে যোগদান করতে চান। কজন নারী আসেন বাচ্চাসহ, কজন ছিলেন এইডসে আক্রান্ত। ভয়ংকর অভিজ্ঞতার শিকার এই নারীদের কেউ আবার মানসিকভাবে অসুস্থ। তাঁরা সবাই ভীত।
আর ওই নারীদের মাধ্যমেই জানা যায় আল-শাবাবের বর্বরতার কথা।
"পরবর্তী প্রজন্মের যোদ্ধা জন্ম দেওয়ার জন্য আল-শাবাবের সংগঠিত কর্মসূচি রয়েছে" জানান আল-শাবাবের সাবেক এক যোদ্ধার স্ত্রী সারাহ।
অন্ধকার একটি ঘরে পর্দার আড়ালে থেকে বিবিসির সাংবাদিক নির্যাতিত এই নারীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।
এক নারী বলছিলেন "অনেক পুরুষ একের পর এক আসতো, আমাকে ধর্ষণ করতো। আমি তাদের সংখ্যাটা বলতে পারব না। তিন বছর প্রত্যেক পুরুষই আমার সঙ্গে শোবার জন্য এসেছে"।
"প্রতি রাতে একজন নারীর কাছে দুই থেকে তিনজন পুরুষকে আনা হতো। আমরা বারবার ধর্ষণের শিকার হতাম" -বলছিলেন নির্যাতনের শিকার আরেক নারী।
নির্যাতনের শিকার নারীরা বলেন, তাঁদের কাউকে কাউকে জোর করে আল-শাবাবের জঙ্গিদের স্ত্রী বানানো হতো। আর অন্যদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
সোমালিয়ায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে আল-শাবাব। তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। আল-শাবাবের হামলার শিকার হওয়া প্রতিবেশী দেশগুলো আফ্রিকান ইউনিয়নের বাহিনীর অংশ হিসেবে সেনা পাঠিয়েছে। এ ছাড়া আল-শাবাবের যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে সোমালিয়ার সঙ্গে সীমান্ত এলাকার ঘন জঙ্গলে অভিযান চালিয়ে আসছে কেনিয়ার সেনারা।
আল-শাবাবের হাতে বন্দী থাকা ২০ জনেরও বেশি নারীর সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি। তাঁরা সবাই জানিয়েছে, তাঁদের ঘন জঙ্গলে আটকে রাখা হয়েছিল। সালামার ওই সংগঠনের অন্যতম নতুন সদস্য হলেন ফেইথ (প্রতীকী নাম)। তিনি সম্প্রতি আল-শাবাবের হাত থেকে পালিয়ে এসেছেন।
ওই নারীর বয়স যখন ১৬ বছর, তখন এক দম্পতি তাঁকে চাকরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ১৪ জন যাত্রীর সঙ্গে তাঁকে একটি বাসে তোলা হয়েছিল। তাদের যে পানি দেয়া হয়েছিল তাতে চেতনানাশক ওষুধ মেশানো ছিল।
ফেইথ বলছিলেন, "চোখ মেলে দেখি, একটি ঘরে আমাদের রাখা হয়েছে। সেখানে দুজন পুরুষও রয়েছে। কালো কাপড় দিয়ে তারা আমাদের চোখ বেঁধে ফেলে। ওই ঘরেই তারা আমাদের ধর্ষণ করে"।
পরবর্তী সময়ে ফেইথকে আবার অচেতন করা হয়। জ্ঞান ফেরার পর তিনি দেখেন তিনি একটি ঘন জঙ্গলের ভেতর। সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর সেখানে তিন বছর কাটিয়ে দেন ফেইথ।
সোমালি একদল পুরুষের জন্য তাঁকে রান্না করতে হতো।
ধর্ষণের শিকার হয়ে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। ফেইথ বলছিলেন, "আমার দাদি ছিলেন ধাত্রী। তাই এ বিষয়ে আমার অল্প জ্ঞান ছিল। ঘন জঙ্গলে আমাকে একাই সবকিছু করতে হয়। শেষ পর্যন্ত আমি সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হই"।
বনের ভেতর ভেষজ গাছের সন্ধানে যাওয়া এক কবিরাজের মাধ্যমে সেখান থেকে পালিয়ে আসতে পারেন ফেইথ। বনের মধ্যে তাঁর সন্তান নগ্ন অবস্থায় বেড়ে উঠছিল। এখন শহুরে জীবনে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে শিশুটির। শিশুটি রাতে ঘুমাতে পারছে না। ফেইথ জানান, বনের মধ্যে পশুর মতো বেড়ে ওঠায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল শিশুটি।
ফেইথ ছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন নারী এভাবেই বনের মধ্যে সন্তান জন্ম দেয়ার কথা বিবিসিকে জানিয়েছেন।
আল-শাবাবের সাবেক এক যোদ্ধার স্ত্রী সারাহ বলেন, "এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। পরবর্তী যোদ্ধা তৈরির জন্য এটা আল-শাবাবের সংগঠিত কর্মসূচির অংশ। তিনি বলেন, মানুষ জোগাড় করে সোমালিয়ায় ঘন জঙ্গলে ক্যাম্পে রাখা বেশ কঠিন। আর এ ক্ষেত্রে শিশুদের সহজে ব্যবহার করা যায়"।
"আমি যে ক্যাম্পে ছিলাম, সেখানে অনেক নারীকে দিয়ে ক্যাম্পে আরও নারী সরবরাহের কাজ করানো হতো। সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য তারা নারীদের চাইত। ওই ক্যাম্পে থাকা ৩০০ নারীর বেশির ভাগই ছিল কেনিয়ার"-বলছিলেন সারাহ।
আল-শাবাবের হাতে বন্দী থাকা ২০ জনের বেশি নারীর সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি।