Tuesday, June 17, 2025

ইরানের যে প্রযুক্তির কাছে নাকানিচুবানি খাচ্ছে ইসরায়েল

বিশ্বের সব থেকে আধুনিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও ইরানের হামলা ঠেকাতে পারছে না ইসরায়েল। হাজার কিমি পথ পাড়ি দিয়ে ইরানের একের পর এক মিসাইল গিয়ে আঘাত করেছে ইসরায়েলের বিভিন্ন সুরক্ষিত স্থানে। ভেঙ্গে দিচ্ছে দেশটির সকল প্রতিরক্ষা বাধ। মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে সব অহংকার। তাহলে ইরানের কোন প্রযুক্তির কাছে নাকানিচুবানি খাচ্ছে ইসরায়েল?

মূলত তিন স্তরের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে ইসরায়েলের। স্বল্প মধ্যম ও দূরবর্তী যে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের মাটি স্পর্শ করার আগে আকাশেই ধ্বংস করে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে দেশটির। এতদিন ধরে এমনই গৌরব নিয়ে চলেছে ইসরাইলী প্রতিরক্ষাবাহিনী। কিন্তু সেই অহংকার মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে ইরানের হাইপারসনিক মিসাইল। শুরুতে সাধারণ মিসাইল দিয়ে হামলা চালিয়ে তেমন সাফল্য না পেলেও সুপারসনিকের জাদুতে এবার তছনছ হতে শুরু করেছে ইসরায়েলের সাজানো বাগান।  

হাইপারসনিক মিসাইল হলো এমন এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র, যা শব্দের গতির চেয়ে কমপক্ষে পাঁচ গুণ দ্রুত ছুটতে পারে। এরা এতটাই দ্রুত যে প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো অনেক সময় একে শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে না। প্রশ্ন হলো কত দ্রুতো ছুটতে পারে এই হাইপারসনিক?

শব্দের গতি যেখানে ঘণ্টায় ১ হাজার ২৩৫ কিমি সেখানে হাইপারসনিক গতি ঘণ্টায় ৬ হাজার ১৭৪ কিমি বা তার চেয়েও বেশি। একটি হাইপারসনিক মিসাইল ১ হাজার কিমি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে মাত্র ৮-১০ মিনিটে পৌঁছে যেতে পারে। 

হাইপারসনিক মিসাইল কীভাবে কাজ করে
লঞ্চ প্যাড থেকে উৎক্ষেপণ পর শুরুতেই মিসাইলটি উচ্চগতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এর পর ধীরে ধীরে গতি বাড়তে থাকে এমনকি রাডার ফাঁকি দিয়ে হঠাৎ দিক পরিবর্তন করতে পারে হাইপারসনিক। সব শেষ টার্গেটের ওপর নিখুঁত আঘাত হানে এই মারণাস্ত্র।

কেন এতটা বিপজ্জনক এই হাইপারসনিক মিসাইল

হাইপারসনিকের উচ্চ গতির কারণে রাডারে এই মিসাইল শনাক্ত করা খুবই কঠিন। এছাড়া নির্ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে এই মিসাইলের। এমনকি পারমাণবিক বোমা বহনের ক্ষমতা রাখে এটি। বর্তমান মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর এর কাছে।

ইরানের যে প্রযুক্তির কাছে নাকানিচুবানি খাচ্ছে ইসরায়েল

ইরান ইসরায়েল সংঘাতে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত চীন ও রাশিয়া, শুক্রবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তারা অবিলম্বে উত্তেজনা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে সতর্ক করেছে যে, এর ভয়াবহ বৈশ্বিক পরিণতি হতে পারে। খবর বিবিসি বাংলা।

চীন আবারও ইসরায়েল ও ইরানকে বলেছে, যেন তারা যেন পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ করে উত্তেজনা হ্রাসের পদক্ষেপ নেয়।

সোমবার এক বিবৃতিতে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, আমরা সব পক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছি যেন তারা অবিলম্বে এমন পদক্ষেপ নেয় যা উত্তেজনা কমাবে, এই অঞ্চলকে আরো বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেওয়া থেকে রক্ষা করবে। সেইসঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবে।

গতকাল রোববার আরেক মুখপাত্র বলেছিলেন, এই উত্তেজনা কমানোর প্রক্রিয়ায় চীন গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।

এরআগে গত ১৩ জুন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, তারা ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা লঙ্ঘনের বিরোধিতা করে।

সংবাদ সম্মেলনে এ-ও বলা হয়, যারা আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ায় বা সংঘাত সৃষ্টি করে, চীন সেই ধরনের যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। তারা চায়, সব পক্ষ যেন শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করে এবং উত্তেজনা যেন আর না বাড়ে।

চীনের এক মুখপাত্রকে ওই সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হয়—যদি আবার ইরানের ওপর হামলা হয়, তবে হরমুজ প্রণালী বন্ধের ইরানি হুমকিকে কি চীন সমর্থন করবে?

তিনি সরাসরি জবাব দেননি, বরং বলেছেন—এ ধরনের অনুমানভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ঠিক নয় এবং এই অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, সেটা কেউই চায় না।

ইসরায়েল ও ইরানে অবস্থিত চীনা দূতাবাসে হামলার পরে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে এবং চীনা নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসেও চীন একই রকম অবস্থান নেয়।

তখনকার চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজকে বলেছিলেন, অব্যাহত যুদ্ধ ও বিশৃঙ্খলা এ অঞ্চলের কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়।

তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সব পক্ষ বুঝেশুনে কাজ করবে, যেন পরিস্থিতি খারাপের দিকে না যায়। ওই একই মাসে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠকে ওয়াং ই বলেন, চীন যেকোনো উত্তেজনা ও সংঘাতের বিরুদ্ধে এবং কোনো ‘সামরিক কর্মকাণ্ড’ সমর্থন করে না।

তিনি জানান, চীন শান্তির পক্ষে থেকে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে। এছাড়াও, ২০২৪ সালের অক্টোবরেই জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধি ফু কং ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করেন।

তিনি ইরানে ইসরায়েলের হামলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ইসরায়েলকে সব ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানান।

সবশেষে, ২০২৫ সালের ১২ জুন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর বোর্ড অব গভর্নরস-এর এক ভোটাভুটিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানির আনা একটি প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় চীন ও রাশিয়া। ওই প্রস্তাবে ইরানকে তার পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি ভাঙার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

চীনের প্রতিনিধি লি সং বলেন, আন্তর্জাতিক সমাজ যেন অবরোধ, চাপ ও শক্তির হুমকি ব্যবহার না করে।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়াকে আজকের সমস্যার মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তোলপাড় চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সিনা ওয়েইবোতে ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষ নিয়ে অনেক হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ড করেছে। এর মধ্যে একটি সকাল ৮:৩৯-এ ট্রেন্ডিং সার্চ তালিকার শীর্ষে উঠে যায়, যেটি ১৬ কোটি বার দেখা হয়েছে এবং এতে ৭৬ হাজার মন্তব্য করা হয়।

চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত টিভি চ্যানেল সিসিটিভি এই সংঘাতের নতুন ঘটনাগুলো সোজাসুজি ওয়েইবোতে সম্প্রচার করেছে।

ওয়েইবোতে একজন বিখ্যাত ভাষ্যকার হু শিজিন লিখেছেন, ইরান এখন ঝাঁঝার মতো ছিদ্রযুক্ত হয়ে গেছে, কারণ মোসাদ বিপ্লবী গার্ডসের কমান্ডার-ইন-চিফ মেজর জেনারেল হোসেইন সালামি এবং অন্তত দুইজন পারমাণবিক বিজ্ঞানীর সঠিক অবস্থান নির্ভুলভাবে শনাক্ত করে এবং ইসরায়েলি বাহিনী তাদের হত্যা করে। তিনি এই কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসী হামলা বলেছেন।

আরেক ভাষ্যকার শেন ই ইরানের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানতে চান, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মহলের কেউ কি ইসরায়েলের সঙ্গে পদ্ধতিগতভাবে আঁতাত করেছে এবং বিদেশি শক্তিকে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ অভিযান চালাচ্ছে? অন্য একটি পোস্টে হু শিজিন ইরানের কঠোর ভাষা অথচ বাস্তবে প্রতিরোধহীন অবস্থাকে একটি ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এবং এটি চীনের জন্য একটি শিক্ষা বলেও মনে করেছেন যে, ক্ষমতাই একমাত্র নির্ধারক উপাদান এবং যে অবস্থানের পেছনে শক্তি নেই, সেটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।

জিভো শিয়াশি নামে একজন জাতীয়তাবাদী ব্লগার বলেছেন, ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে তুমি যদি হাঁটু গেড়েও বসো, তবু প্রতিপক্ষ তোমাকে ক্ষমা নাও করতে পারে।

তিনি লেখেন, সত্য কেবল লোহার মুষ্টির নিচে থাকে। তুমি যদি জেতো, তাহলে তুমিই ঠিক। এটাই হলো এই জঙ্গলসদৃশ পৃথিবীতে টিকে থাকার নিয়ম।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার লি শাওসিয়ান সিসিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সম্প্রতি ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে হওয়া ফোনালাপে ট্রাম্পের অবস্থান বাস্তবিক অর্থে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য ইসরায়েলকে সবুজ সংকেত দেওয়ার মতো ছিল।

ইরানকে কিভাবে সহায়তা করতে পারে রাশিয়া

ইসরায়েলের ইরান হামলা নিয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনগুলো খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত দুটি প্রধান চ্যানেল-রাশিয়া চ্যানেল ১ এবং চ্যানেল ওয়ান রিপোর্ট করেছে যে ইসরায়েল শুধু পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নয়, বেসামরিক এলাকাও লক্ষ্যবস্তু করেছে।

রাশিয়া চ্যানেল- ১ জানিয়েছে যে, এই প্রথমবারের মতো আবাসিক এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে দুটি চ্যানেলই জোর দিয়ে বলেছে, এসব এলাকায় ইরানের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা অবস্থান করায় এগুলো টার্গেট করা হয়। তবে এতে বেসামরিক লোকজনও নিহত হয়েছে।

টেলিগ্রামে জাপিসকি ভেটেরান নামের একটি চ্যানেল ধ্বংস হওয়া ভবন ও গাড়ির ছবি প্রকাশ করে ব্যঙ্গ করে লিখেছে, ‘এইসবই সম্ভবত সেই পারমাণবিক সামরিক স্থাপনা, যার কথা ইসরায়েল বলছিল’।

এখন দেখা যাক, তথাকথিত সভ্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আজ কী প্রতিক্রিয়া দেখায়।

ইউরি পডোলিয়াকা নামের একজন লেখেন, তিনি অপেক্ষা করছেন ইউরোপীয় গ্লোবাল গণতান্ত্রিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে এরকম সংঘাত সমাধানের পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো বিবৃতি আসে কি না। তিনি যোগ করেন, আমার মনে হয়, কিছুই বলা হবে না। আরও কিছু ভাষ্যকার ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের রাশিয়ার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করেন।

সার্গেই মার্কভ, প্রো-ক্রেমলিন ভাষ্যকার ও রাশিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য, বলেন, যদিও রাশিয়া সম্প্রতি ইরানের সঙ্গে একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তিতে সই করেছে, তবে তিনি মনে করেন না যে রাশিয়া এই সংঘাতে জড়াবে।

মার্কভ তার টেলিগ্রাম চ্যানেলে লেখেন, রাশিয়া ইরানের বন্ধু এবং রাজনৈতিক মিত্র, কিন্তু সামরিক মিত্র নয়।

তিনি আরও যোগ করেন, রাশিয়ার একমাত্র সম্ভাব্য ভূমিকা হতে পারে একটি রাজনৈতিক সমাধানে মধ্যস্থতা করা। তবে সেটা পরে হবে। এখন রাশিয়া ও অন্য সব দেশ সামরিক-মিসাইল পর্যায় পর্যবেক্ষণ করবে।

রাশিয়ার চ্যানেল ওয়ানের উপস্থাপক আরতিয়ম শেইনিনও টেলিগ্রামে একমত পোষণ করে বলেন, সবকিছুই খুব অনিশ্চিত।

সম্প্রতি ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার বিমান প্রতিরক্ষা শেল সরিয়ে নেওয়ার খবর ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো দ্বিমুখী খেলা খেলছে।

এদিকে, রাশিয়ান ফেডারেশন এবং ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের মধ্যে গত ১৭ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তিতে সামরিক সহযোগিতার উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত আছে। তবে এপ্রিল মাসে রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই রুডেনকো বলেন, যদি ইরান যুদ্ধে জড়ায়, তবুও রাশিয়া সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য নয়। 

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : সংগৃহীত
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : সংগৃহীত

ইরানে হামলা কি মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেবে by রবার্ট ফোর্ড

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক কঠোর হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে এক অশান্ত এবং উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একজন বিশ্লেষক বা কৌশলবিদ বলা যায় না। তিনি সিদ্ধান্ত নেন দ্রুত, অনেক সময় নিজেরই নেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও করেন। তিনি সোজা পথে হাঁটেন না। তবু তাঁর ২০২৫ সালের ১৪ মে রিয়াদ ভাষণ থেকে আমরা বুঝতে পারি, তিনি মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কী লক্ষ্য স্থির করছেন এবং কী ধরনের কৌশলকে তিনি সমর্থন করেন বা বর্জন করেন।

এই ভাষণটি ২০১৭ সালের একই স্থানে দেওয়া তাঁর আগের ভাষণের ধারাবাহিকতা। সেই ভাষণে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি হবে ‘নৈতিক বাস্তববাদ’।

ওবামা, বাইডেন ও ট্রাম্প—তিনজনই যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের অসন্তোষের কথা ভেবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ কম করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বুশ প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ, বিশেষ করে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রতি মার্কিন জনগণের বিরক্তি এই নীতিকে উৎসাহিত করেছে। ওবামা ও বাইডেন মানবাধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে তাঁদের প্রচেষ্টা বিশেষ সফল হয়নি।

ট্রাম্প শুরু থেকেই সরাসরি বলেছেন যে উদারনৈতিক বা লিবারেল আদর্শ দিয়ে কাজ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ঠিক করতে হবে বাস্তবতার ভিত্তিতে। আমরা ট্রাম্পের সেই কথারই স্পষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি তাঁর ইরান ও সিরিয়া নীতিতে।

২০১৭ সালের রিয়াদ ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, হঠাৎ করে সামরিক হস্তক্ষেপ বা শাসন পরিবর্তনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হবে না। তিনি সাবধান করেছিলেন যে এ রকম পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যে বিপর্যয় এবং চরমপন্থার উত্থান ডেকে আনতে পারে। ২০২৫ সালে একই বক্তব্যকে আরও জোর দিয়েছেন। বলেছেন যে শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকেও যুক্তরাষ্ট্র দূরে থাকবে। তিনি বলেন, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানো বা কাকে নেতৃত্বে রাখা উচিত, তা নির্ধারণ করার দিন শেষ।

এর ব্যতিক্রম ঘটেছিল ওবামা প্রশাসনে। ২০০৯ সালে কায়রোতে ওবামা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের সরকার কেমন হওয়া উচিত, তা সেই দেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেবে না। কিন্তু পরে তিনি মোবারক, গাদ্দাফি ও আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ট্রাম্প এ ধরনের নীতির দ্বিচারিতা পরিহার করতে চেয়েছেন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি বা গণতন্ত্র রপ্তানি করার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের সময় ও সম্পদ নষ্ট হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাক তার জ্বলন্ত উদাহরণ।

ট্রাম্পের ভাষণে বারবার এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হবে বাস্তবতার ভিত্তিতে। ২০২৫ সালে তিনি সরাসরি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য বড় বড় প্রকল্পের পেছনে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে কোনো লাভ হয়নি। তাই তিনি এই প্রকল্পগুলো বন্ধ করেছেন বা কাটছাঁট করেছেন। বহু এনজিও এবং সরকারি দপ্তরের কর্মী তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন।

তাঁর মতে, সংস্কার হবে ধীরে ধীরে। বিপ্লবের মতো আকস্মিকভাবে নয়। এ কারণেই তিনি ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাদের ধাপে ধাপে সংস্কার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতার পথে এগোনোকে তিনি প্রশংসা করেছেন।

সিরিয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নীতিও একই ধরনের। তিনি ২০১৭ সালে সিআইএর ব্যর্থ অস্ত্র প্রকল্প বন্ধ করেন। তিনি স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত বিদ্রোহীরা দুর্নীতিগ্রস্ত ছিল। নিজেদের স্বার্থের চেয়ে অর্থ উপার্জনে বেশি মনোযোগী ছিল তারা। অন্যদিকে আল-নুসরা ফ্রন্ট ছিল বেশি একনিষ্ঠ।

২০২৫ সালে ট্রাম্প সেই আল-নুসরা প্রধানের সঙ্গে হাত মেলান, যাকে একসময় সন্ত্রাসী বলা হতো। তিনি বলেন যে সিরিয়ার মতো দেশের জটিলতা সেই দেশের মানুষই ভালো বুঝবে। তাই সিরিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তরের সিদ্ধান্তটি তাদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। আর যদি প্রয়োজন হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দূর থেকে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কাজ করবে। সিরিয়ায় এখন মার্কিন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য নিরাপত্তা, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও বিদেশি যোদ্ধাদের বিতাড়ন এবং ইসলামিক স্টেট বন্দীদের বন্দিশিবিরের ভবিষ্যৎ ঠিক করা।

ট্রাম্প প্রশাসন সিরিয়ার ওপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। এর পেছনে যুক্তি হলো নতুন গৃহযুদ্ধ এড়িয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। তুরস্কের সঙ্গে কাজ করে সিরিয়ার নতুন সেনাবাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তুরস্কে নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্যবসায়ী টমাস বারাককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগ থেকে বোঝা যায় যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও ব্যবসার প্রসারই ট্রাম্পের লক্ষ্য।

ইরানের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প একই বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর কোনো স্থায়ী শত্রু নেই। ইরানে শাসন পরিবর্তন চান না তিনি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানই তাঁর পছন্দ। তবে তিনি কঠোরভাবে এ–ও বলেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত হতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না। তবে তাঁর পছন্দ সামরিক নয়, কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপ। তিনি ইরানের তেলের রপ্তানি শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কথা বলেছেন।

গত মে মাসে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, আলোচনার সময় ইরানে হামলা করা ঠিক হবে না। কিন্তু নেতানিয়াহু সেই কথা শোনেননি। ১২ জুন ইসরায়েল হামলা চালালে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসন স্পষ্ট করে বলেন, এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই। ট্রাম্পের যুক্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরা নেবে। এভাবেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলবে।

ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতির ভিত্তি মূলত ব্যবসা, বাণিজ্য এবং চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। তিনি চাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেরাই নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় নেতৃত্ব নিক। আর যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে, অর্থনৈতিক চুক্তি করবে। কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে খরচ করতে যুক্তরাষ্ট্র আর রাজি নয়। তিনি চান ইসরায়েলকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় নিয়ে আসা হোক। আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণ তাঁর এই কৌশলের অংশ।

তবে ফিলিস্তিনি জনগণের স্থান এই পরিকল্পনায় কোথায়, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে ভূমধ্যসাগরীয় দেশ ও তুরস্কের নেতাদের কথা শুনবেন। তবে নিজের সরকারি বিশ্লেষকদের মতামত নিতেও খুব একটা আগ্রহী নন তিনি।

* রবার্ট ফোর্ড, সিরিয়া ও আলজেরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত
- মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ম্যাগাজিন আল মাজাল্লা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: এএফপি

গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে

সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট স্বীকার করেছেন যে গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে। প্রায় ৫৫ হাজার মানুষকে মেরে ফেলা এ সংঘাতকে তিনি ‘ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন
সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট স্বীকার করেছেন যে গাজায় ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে। প্রায় ৫৫ হাজার মানুষকে মেরে ফেলা এ সংঘাতকে তিনি ‘ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যুদ্ধ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন ছবি: রয়টার্স

নেতানিয়াহুর মিত্র ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া ও মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ অভিযোগে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও নরওয়ের এ দুই কট্টরপন্থী মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে
নেতানিয়াহুর মিত্র ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া ও মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ অভিযোগে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও নরওয়ের এ দুই কট্টরপন্থী মন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ছবি: এএফপি

ইরান-ইসরাইল সংঘাত: তীব্রতর হচ্ছে যুদ্ধ

তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে যুদ্ধ। ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধ এখন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইসরাইলে মুহুর্মুহু হামলা করেছে ইরান। তাদের কথিত দুর্ভেদ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম’কে ছিন্নভিন্ন করে তেল আবিব সহ ইসরাইলের বিভিন্ন এলাকায় আঘাত করেছে ইরানের ব্যালিস্টিক  হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। অনেক স্থানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। রোববার দিবাগত রাত এবং সোমবার ভোরে চালানো এসব হামলায় ইসরাইলে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ৮ জন। আহত হয়েছে ৯০ জন। তার মধ্যে বেশির ভাগ মানুষের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। এ নিয়ে ইসরাইলে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪। অন্যদিকে ইরানে নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২২৪ জন। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে তেল আবিবে। যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কাছেই এ হামলায় দূতাবাসের বেশ ক্ষতি হয়েছে। ওদিকে ইরানে হামলা চালিয়ে রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ কাজেমি, তার ডেপুটি হাসান মোহাকিক সহ মোট তিনজন জেনারেলকে হত্যা করেছে ইসরাইল। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে এক ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর করেছে ইরান। এর আগে ইসরাইলের হামলায় রেভ্যুলুশনারি গার্ডের প্রধান হোসেইন সালামি, সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি, ডেপুটি অপারেশন্স মেহেদি রাবানি, ডেপুটি ফর ইন্টেলিজেন্স গোলাম রেজা মেহরাবি, এরোস্পেস প্রধান আলি আকবার হাজিজাদেহ সহ বিপুল সংখ্যক পরমাণুবিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন। ইসরাইল ধ্বংস করে দিয়েছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, তেলের ডিপো। একটি দেশের এসব কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দেয়ার পর তার আর মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কথা নয়। কিন্তু ইরান আগের চেয়ে বরং শক্তিশালী হয়ে, আরও মনোবল বৃদ্ধি করে ইসরাইলে হামলা জোরালো করেছে। এতে প্রমাণ হয়, সেখানে কমান্ডিং পজিশনে বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের চেইন অনেক দীর্ঘ। হাতেগোনা কয়েকজনকে হত্যা করে তাদেরকে দমানো যাবে না। তারা সেই ‘হাউস অব ডেড’-এর বসের মতো মুহূর্তেই রূপ পাল্টে পুনর্গঠিত হয়ে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। রোববার রাতে ইসরাইলের আকাশ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ‘বৃষ্টি’তে আলোকিত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দিক থেকে, নানা কৌশলে সেসব ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিব, কিরিয়াত গাট সহ বিভিন্ন শহরের আকাশকে আলোকিত করে আঘাত হানে টার্গেটে। এর ফলে তেল আবিবে চরম আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা ও হতাশা দেখা দেয়। সিএনএনের জেরুজালেম প্রতিনিধি জেরেমি ডায়মন্ড জানিয়েছেন, হামলার স্থানগুলোয় ছড়িয়ে আছে ধ্বংসাবশেষ। সেনা ও উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন। তেল আবিবের একটি আবাসিক এলাকার ওপর চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন অবস্থায় ইয়েমেন ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। চীন উভয় পক্ষকে সংযত থেকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ, সিরিয়ায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পক্ষে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাকে সহায়তা দিয়েছিল রাশিয়া, ইরান। তাদের মধ্যে ওই সময়ে চমৎকার সখ্য দেখা গিয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া এবার ইরানের পাশে প্রকাশ্যে না দাঁড়িয়ে গা বাঁচানো বিবৃতি দিচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কাজ করছেন বলে বলা হচ্ছে। ওদিকে, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় রাশিয়াকে সামরিক সহ বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা করেছে ইরান। এখন বিপদের দিনে তার পাশে নেই রাশিয়া। এর অর্থ ইরান খুব বেশি একা হয়ে পড়েছে। তার পাশে নেই স্বজাতি মুসলিমরা। নেই আঞ্চলিক দেশগুলো। এমন অবস্থায় ইসরাইলের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরান টিকে আছে- এটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। ইরান জানিয়েছে, চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনোরকম পারমাণবিক চুক্তিতে সম্মত হবে না তারা।

এদিকে রয়টার্স এক খবরে জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের পথে রওয়ানা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস নিমিটজ। জাহাজের অবস্থান শনাক্তকারী ওয়েবসাইট মেরিন ট্রাফিকের তথ্যে দেখা গেছে, সোমবার সকালে ইউএসএস নিমিটজ দক্ষিণ চীন সাগর ত্যাগ করে পশ্চিম দিকে যাত্রা করে। সপ্তাহের শেষদিকে রণতরীটির ভিয়েতনামের ডানাং বন্দরে নোঙর করার কথা থাকলেও সেই সফর বাতিল করা হয়েছে। এক কূটনীতিক জানিয়েছেন, হ্যানয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তাকে জানিয়েছে, উদ্ভূত সামরিক প্রয়োজনে ইউএসএস নিমিটজের ভিয়েতনাম সফর বাতিল করা হয়েছে। ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার মধ্যে এই খবর রীতিমতো উদ্বেগের।

এরমধ্যে ইরান প্রকাশ্যে পারমাণবিক কর্মসূচিতে প্রবেশ করতে চাইছে। পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বের হয়ে আসতে পার্লামেন্টে বিল উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে তারা। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেছেন, এনপিটি চুক্তি বাতিল করতে কাজ করছে ইরানের পার্লামেন্ট। যদিও তেহরানের অবস্থান গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির বিরুদ্ধে। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টের কারণেই এবার এত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ইরান। তবে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে দেশটি। ইতিমধ্যেই ইসমাইল ফকির নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে তারা। এ ছাড়া যারা ইসরাইলের ওই গোয়েন্দাদের সঙ্গে যুক্ত থাকার সন্দেহে আটক হয়েছেন তাদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলামহোসেই  মোহসেনি এজেই। বলেছেন, জায়োনিস্টদের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে কেউ  গ্রেপ্তার হলে খুব দ্রুতই তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

এদিকে ইরানের এক- তৃতীয়াংশ ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরাইল। দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফেই ডেফরিন টেলিভিশনে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানের মোট ক্ষেপণাস্ত্রের ৩০ শতাংশ ধ্বংস করা হয়েছে। এ কাজে অন্তত ৫০ যুদ্ধবিমান নিয়োগ করা হয়। ওই মুখপাত্র দাবি করেন, কমপক্ষে ১২০টি ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস করেছে তার দেশের সেনারা। সংঘাতের চারদিনে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ৩৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ড এ দাবি করেছে। তারা জানিয়েছে, প্রতি হামলায় ৩০ থেকে ৬০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। অন্যদিকে ইরানের দাবি তারা এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

ইরান-ইসরাইল সংঘাতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পাকিস্তান। অনির্দিষ্টকালের জন্য ইরানের সঙ্গে সীমান্তবর্তী সকল ক্রসিং বন্ধ করে দিয়েছে ইসলামাবাদ।  দেশটির বেলুচিস্তান প্রদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কাদির বখশ পিরকানি এএফপিকে বলেন, চাগাই, ওয়াশুক, পাঞ্জগুর, কেচ ও গাদার-এই পাঁচ জেলার সব সীমান্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। পাকিস্তানের এই পাঁচ জেলার সঙ্গে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। চাগাই জেলার সীমান্ত কর্মকর্তা আতাউল মুনিম বলেছেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ইরানে প্রবেশ বন্ধ থাকবে। তবে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। ইরান থেকে পাকিস্তানি নাগরিকদের দেশে ফেরার সুযোগও থাকছে। আতাউল মুনিম বলেন, সোমবার প্রায় ২০০ জন পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ফেরার কথা রয়েছে।

তেলের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী, হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ: দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান দেখা না যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ইতিমধ্যে গত সপ্তাহে ৭ শতাংশ দাম বাড়ার পর রোববার তেলের দাম আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে হয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৭৩.৮৫ ডলার, যা গত সপ্তাহের তুলনায় ১.২ শতাংশ বেশি। অপরদিকে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট তেলের দাম বেড়ে হয়েছে ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলার, যা ১ শতাংশ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। ওদিকে, সোমবার ভোরে ইসরাইলের উপকূলীয় শহর হাইফায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাধিক ভবন ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়। হামলার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হাইফার একটি তেল শোধনাগারের আশপাশে বিস্ফোরণ ঘটছে এবং আগুন জ্বলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির সম্ভাব্য বিঘ্ন এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার দিয়ে প্রতিদিন শতকরা প্রায় ২০ ভাগ বৈশ্বিক তেল সরবরাহ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা ওমানকেও টেনে আনে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়তে পারে। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার এই প্রবণতা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য অশনিসংকেত। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি খাতে চাপ আরও বাড়তে পারে।

সোমবার ভোরে ইরানের হামলার পর তেল আবিবে উদ্ধারকাজ চলছে
সোমবার ভোরে ইরানের হামলার পর তেল আবিবে উদ্ধারকাজ চলছে ছবি: রয়টার্স

ঝুঁকিতে বাংলাদেশের তেহরান মিশন by মিজানুর রহমান

ইরানে কর্মরত বাংলাদেশিরা মোটামুটি নিরাপদ। তবে ইসরাইলি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু তথা টার্গেটের মধ্যে পড়ে গেছে তেহরানস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের চ্যান্সারি কমপ্লেক্স। অন্তর্বর্তী সরকারের বিবেচনায় পাঠানো দূতাবাসের একটি রিপোর্ট হাতে পেয়েছে মানবজমিন। রিপোর্টে বলা হয়- বাংলাদেশ মিশন বিল্ডিংয়ের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইরানের একটি পরমাণু কেন্দ্রসহ কমপক্ষে দু’টি সংবেদশনশীল স্থাপনা রয়েছে, যাতে হামলার ক্রমাগত চেষ্টা করে যাচ্ছে ইসরাইল। ফলে বাংলাদেশ মিশন, আশপাশে বসবাসরত কূটনীতিক-স্টাফ এবং তাদের পরিবারের জীবন ও সম্পদ ঝুঁকিতে। তারা এক সেকেন্ডের জন্যও নিরাপদ নয়। সম্ভাব্য হামলায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আতঙ্কের মধ্য দিনাতিপাতকারী ওই সব কূটনীতিক ও স্টাফদের পরিবারকে শহরের ৩০-৪০ কিলোমিটার বাইরে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই মিশনে কর্মরতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে বলে রাতে ওই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তেহরানের বাইরে উপযুক্ত নিরাপদ আবাসস্থল খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন তেহরানের বাংলাদশ মিশনের পদস্থ এক কর্মকর্তা।

সেগুনবাগিচা এবং তেহরান মিশন জানিয়েছে- দেশটিতে থাকা প্রায় দুই হাজার বাংলাদেশির প্রায় সকলে এখন পর্যন্ত মোটামুটি নিরাপদে রয়েছেন। কারণ তাদের প্রায় সবাই তেহরানের বাইরে চলে গেছেন। ইসরাইল তেহরানকে টার্গেট করেছে এবং স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোকে নিখুঁত নিশানা করা হয়েছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, ইসরাইল সেনাবাহিনী তেহরান খালি করার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে এটাকে তারা বৈরুত বানাবে। তেহরান মিশন বিল্ডিংয়ের কাছাকাছি একটি ভবনে বাংলাদেশি একজন কর্মকর্তা পরিবার নিয়ে থাকেন। মাল্টিস্টোরেজ ওই বিল্ডিংয়ে ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। ২৩টি ফ্ল্যাট এরই মধ্যে খালি হয়ে গেছে। কেবলমাত্র ওই বাংলাদেশির পরিবার এখনো রয়েছেন বলে জানান ওই বাংলাদেশি কূটনীতিক। তবে তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব তাকে পরিবারসহ শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। ইরান পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে জানিয়ে সেগুনবাগিচা বলছে- প্রয়োজনে দূতাবাসের কার্যক্রমও অন্যত্র স্থানান্তর করার চিন্তাভাবনা চলছে। তেহরান মিশনের পাঠানো অপর এক রিপোর্টের বরাতে সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা মানবজমিনকে বলেন- রিপোর্ট যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে চ্যান্সেরি কমপ্লেক্স মোটেও নিরাপদ নয়। ওই ভবনের এক কিলোমিটারের মধ্যে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের অবস্থান। তাছাড়া সেখানে আরও একটি সংবেদনশীল অবকাঠামো রয়েছে। যা ইসরাইলি হামলার সম্ভাব্য টার্গেট। গত ক’দিনে এসব ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, তেহরানের প্রধান দুটি আইটি সেন্টারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেন্টারটি বাংলাদেশ চ্যান্সেরির খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ওই অবকাঠামোতেও যেকোনো সময় হামলার আশঙ্কা রয়েছে।

তেহরান থেকে বাংলাদেশিদের সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা: এদিকে ইরানে থাকা  কোনো বাংলাদেশি ঝুঁকিতে পড়লে তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এমনটাই জানিয়েছে সেগুনবাগিচা। বলা হয়েছে- ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্রের বড় একটি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে তেহরান এবং সেখানেই বাংলাদেশ দূতাবাসের অবস্থান। এ ছাড়া কিছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী তেহরানে অবস্থান করছেন। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রদূত, দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, তাদের পরিবারসহ প্রবাসী বাংলাদেশিদের তেহরানের বাইরে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজনে তাদের তৃতীয় দেশে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে নিরাপত্তা। তেহরানে থাকা বিপজ্জনক হলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়াই সঙ্গত। তিনি বলেন, তেহরানের অবস্থা বুঝে দূতাবাস এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। উল্লেখ্য, ইরানে বাংলাদেশ দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত, দুজন কর্মকর্তা, পাঁচজন কর্মচারী এবং তাদের পরিবারসহ প্রায় ৪০ জন রয়েছেন। রেডিও তেহরানে আট জন বাংলাদেশি ও তাদের পরিবারসহ রয়েছেন ২৭ জন। তেহরানে শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় ১০ থেকে ১২ জন। পেশাজীবী আছেন প্রায় ১০ জন। এ ছাড়া ২৮ জন বাংলাদেশির গত ১৩ই জুন দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা আটকা পড়েছেন। সব মিলিয়ে তেহরানে শতাধিক বাংলাদেশি রয়েছেন বলে রিপোর্ট পেয়েছে ঢাকা। ইরানের অন্যান্য জায়গায় প্রায় ৬০০ বাংলাদেশি আছেন, তারা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সে দেশে বসবাস করছেন। সেখানে বিয়ে করে তারা স্থায়ী হয়েছেন। এর বাইরে আরও প্রায় ৮০০ বাংলাদেশি ১০ বছরের বেশি সময় ধরে অবৈধভাবে ইরানে অবস্থান করে বিভিন্ন সেক্টরে চাকরিতে নিয়োজিত আছেন। প্রায় ২০০-এর মতো শিক্ষার্থী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন। এ ছাড়া মানব পাচারের ট্রানজিট দেশ হিসেবে ইরানে সবসময় ৩০০ থেকে ৫০০ বাংলাদেশি অবস্থান করেন অন্য দেশে পাচার হওয়ার অপেক্ষায়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। উল্লেখ্য, সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য হটলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। রোববার ইরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে  বলা হয়, ইরানে বসবাসরত সব বাংলাদেশি নাগরিকের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য দূতাবাস ইমারজেন্সি হটলাইন স্থাপন করেছে। এ ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে ইরানে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের + ৯৮৯৯০৮৫৭৭৩৬৮ ও + ৯৮৯১২২০৬৫৭৪৫ নম্বরে (হোয়াটসঅ্যাপ সহ) যোগাযোগ করতে পারেন।

mzamin

ইসরায়েলকে মোকাবিলায় ইরানের আর কী কী উপায় আছে by দোরসা জাব্বারি

টানা তিন দিন ধরে ইসরায়েলের হামলা মোকাবিলা করে যাচ্ছে ইরান। ইতিমধ্যে সামরিক নেতৃত্বের বেশ কয়েকজন সদস্যসহ ২৪০ জনের বেশি ইরানি নিহত হয়েছেন। তবে ইরান একক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে যেভাবে পাল্টা আঘাত হেনেছে, তা ইসরায়েল আগে কখনো অনুভব করেনি। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের বৃহত্তম শহরগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম হয়েছে, যার মধ্যে আছে তেল আবিব ও হাইফার মতো শহরও।

ইসরায়েল-ইরান উভয় পক্ষ কে কার কতটা ক্ষতি করেছে এবং ঠিক কোন স্থানগুলোয় আঘাত হেনেছে, অনেক ক্ষেত্রে তা স্পষ্ট নয়। কারণ, সামরিক হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্যগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে পাওয়া কঠিন। উভয় পক্ষের কাছে কত ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত আছে এবং ইসরায়েল ও ইরান কত দিন এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, তা–ও জানা কঠিন।

আমরা যা জানি, তা হলো ইরানের কাছে আছে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। যেখানে ধারণা করা হয়, তাদের কাছে বিভিন্ন পাল্লা ও গতির হাজার হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।

বর্তমান হারে সম্ভবত কয়েক সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রয়েছে ইরানের। ইসরায়েলের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির কারণ হতে এটি যথেষ্ট সময়। দেশটির মানুষ এমন হামলা ও ক্ষতির সঙ্গে অভ্যস্তও নয়; বিশেষ করে গাজা উপত্যকা, লেবানন ও ইয়েমেনের দুর্বল সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণ ছাড়া।

ইরান আরও প্রকাশ করছে—যেসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা করা হয়েছে, সেগুলোর চেয়ে আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র কতটা কার্যকর হতে পারে সেই সক্ষমতা। রোববার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছে।

ইসরায়েলের ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, ইরান আগের আক্রমণগুলোয় যেসব পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল, সেগুলোর তুলনায় রোববার ব্যবহার করা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শক্তি ও গতিতে আরও উন্নত।

অবশ্য ইরানের কাছে উন্নত এসব ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুত রয়েছে তা নয় এবং শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করতে করতে এটি ফুরিয়ে যাবে। তবে এরপরও সাধারণ মানের ক্ষেপণাস্ত্র, হাজার হাজার ড্রোনসহ এসব উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইসরায়েলের ক্ষতি করার জন্য ইরানের যথেষ্ট সামরিক ক্ষমতা রয়েছে। যারা বিশ্বাস করে যে স্বল্প মেয়াদে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি ইরানের নেই, তাদেরও ভুল প্রমাণ করতে পারবে তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ এড়ানো

ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্রগুচ্ছ ইসরায়েলের আয়রন ডোমকে গুরুতরভাবে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। যে কারণে ইরানের আক্রমণ প্রতিরোধ–প্রতিহত করার জন্য ইসরায়েলকে তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে বর্তমান সংঘাতের পক্ষ নয়; বরং তিনি হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানে, তবে এর পরিণতি মারাত্মক হবে। মার্কিন স্বার্থের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা সামরিক ঘাঁটিগুলোও আছে।

মার্কিন ঘাঁটি বা কর্মীদের ওপর আক্রমণই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ডেকে আনবে ইরানের জন্য, যে কারণে এমন আক্রমণ তারা এড়াতে চায়। তাই এ ব্যাপারে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করতে চাইবেন না অথবা ইসরায়েলের আক্রমণের সঙ্গে মার্কিন সামরিক শক্তিগুলোও যুক্ত হোক—এমন অজুহাত তৈরি করতে চাইবেন না। একটি যৌথ ইসরায়েলি-মার্কিন আক্রমণ ইরানের সবচেয়ে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থানগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করবে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলোয় অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো আক্রমণে যুক্ত হয়ে যেতে পারে, যেসব দেশ ইরানের প্রত্যক্ষ শত্রু নয় এবং তেহরান এই দেশগুলোকে সংঘাতে টানতে চাইবে না। এসব দেশ ইরানের জন্য সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ইরানের অন্যান্য বিকল্প আছে। ইরান ও ওমানের মধ্যে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার বারবার হুমকি দিয়েছে তেহরান। প্রতিদিন লাখ লাখ ব্যারেল তেলের পরিবহন হয় এ প্রণালি দিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন, এমন ঘটনা ঘটলে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার পর্যন্ত উঠে যাবে, যা গত শুক্রবার ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলার পর্যন্ত উঠে আবার কমে গিয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা ইরানিদের হাতে শক্তিশালী একটি তাস। লড়াই চলতে থাকলে স্বল্প মেয়াদে হলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার আশঙ্কা আছে।

থামার পথ কী হবে

তবে শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পথ খুঁজবে। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য আঞ্চলিক বড় যুদ্ধের আশঙ্কার অবসান ঘটবে। নয়তো ইরানের নিজস্ব অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার মুখেও পড়তে হবে দেশটিকে। ইরানের আরও জানার কথা, ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধ পরিস্থিতি সামলানোর সক্ষমতার একটা সীমা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের কারণে ইরানের চেয়েও আরও সহজে গোলাবারুদের মজুত পূরণ করার ক্ষমতা আছে তার।

ইরানের সরকার ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইসরায়েল যদি তার আক্রমণ বন্ধ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় ফিরেও আসতে সম্মত হয়, এরপরও তারা প্রতিশোধ নেওয়া চালিয়ে যাবে।

তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করবে। ট্রাম্পকে ইসরায়েল এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে থামানোর জন্য চাপ দিতে হবে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট তা করতে ইচ্ছুক কি না, সেটি স্পষ্ট নয়। এ সংঘাতের বিষয়ে ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। একদিকে তিনি লড়াইয়ের অবসান ঘটানোর জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছেন, একই সঙ্গে ইরানকে হুমকিও দিয়েছেন।

ইরান আরও জানে যে ট্রাম্প এমন ব্যক্তি নন, যাঁকে বিশ্বাস করা বা যাঁর ওপর নির্ভর করা যায়। গত সপ্তাহে ইরানে ইসরায়েলের হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রতারণামূলক আচরণ করেছে। ইসরায়েল হামলা করার পরিকল্পনা করছে, তা গোপনে জানা সত্ত্বেও রোববার ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা চলবে—এমন ভান করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।

তবু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তিই ইরানকে থামাতে সহায়তা করতে পারে। নয়তো ইরান এখন পর্যন্ত যে শক্তি প্রকাশ করেছে, তা বজায় রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠবে।

* দোরসা জাব্বারি ইরানি সাংবাদিক। আল–জাজিরা টিভি চ্যানেলে কর্মরত।
- আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিণতি কী by আব্বাস নাসির

যেকোনো সামরিক অভিযানের স্পষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত। ইসরায়েলেরও তা আছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশের নীরব সমর্থনে ইরানের ওপর যে বিপুল বিমান হামলা চালাচ্ছে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থামানো।

খোলাখুলি না বললেও এই আক্রমণের কিন্তু আরেকটি বড় উদ্দেশ্য ছিল ইরানে শাসন পরিবর্তন। ইসরায়েল চায় সেখানে এমন এক সরকার আসুক, যা তাদের অন্য মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের মতো হবে, যারা তেল আবিবের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে পারলে খুশি থাকবে। সেই সব মিত্র গাজা বা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের জাতিগত নির্মূল অভিযানে কেবল আনুষ্ঠানিক নিন্দা জানায়।

আর বড় কোনো যুদ্ধ শুরু করলে সুবিধা আছে। তাহলে গাজার ইতিহাসের নিকৃষ্টতম জাতিগত নির্মূল অভিযান থেকে বিশ্বের নজর ঘোরানো যায়। গাজায় খাদ্য অবরোধ ইউরোপের কিছু মিত্রদেশকে অস্বস্তিতে ফেলতে শুরু করেছিল। অথচ তারাও গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সহায়তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তো সরাসরি ইসরায়েলি বর্ণবাদী রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছে। গাজা রিভিয়েরা পরিকল্পনা করে ট্রাম্প দুই মিলিয়ন ফিলিস্তিনিকে জোর করে গাজা থেকে তাড়িয়ে সমুদ্রতীরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ার স্বপ্ন দেখছেন।

আসলে গাজার গণহত্যার মূল কারণ ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলায় ইসরায়েলি জিম্মি হওয়া নয়। তা স্পষ্ট হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূত স্টিভ উইটকফের কার্যক্রমে। তিনি একাধিকবার এমন চুক্তি থেকে পিছিয়ে গেছেন, যেগুলোতে হামাসের কাছে থাকা জিম্মিদের মুক্তি বা বিনিময়ের সম্ভাবনা ছিল। অথচ ইসরায়েলে শত শত ফিলিস্তিনি বন্দী রয়েছেন। এখনো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত নন। এখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু চেষ্টা করছেন যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনোভাবে যুদ্ধে জড়াতে।

ইসরায়েলের বিমান হামলায় লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় শীর্ষ জেনারেলসহ অনেকে নিহত হন।

এই প্রেক্ষাপটে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান এহুদ বারাক সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেই বলেন, ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন হয়তো কয়েক সপ্তাহ বিলম্বিত হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও যদি এই অভিযানে যোগ দেয়, তবু কয়েক মাসের বেশি দেরি করাতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘ওদের কাছে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ৪০০ কেজি মজুত আছে। সঠিক যন্ত্র থাকলে গ্যারেজে বসেই তা দিয়ে বোমা তৈরি হয়ে যাবে।’

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা আইএইএর প্রধান বলেছিলেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনাই শত শত গজ মাটির নিচে পুরোনো খনিতে লুকানো। বারাক বলেন, ‘এসব স্থাপনা আমাদের নাগালের বাইরে।’ তাঁর মতে, বিমান হামলার প্রাথমিক সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে এখন পারমাণবিক চুক্তি করতে হবে, গাজার যুদ্ধ থামাতে হবে এবং সৌদি আরবসহ এ অঞ্চলে শান্তি আনার চেষ্টা করতে হবে। এটা সহজ নয়, সময়সাপেক্ষ; কিন্তু করতে হবে।

বারাক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে আরও এগোনো কঠিন হবে। তাই ইসরায়েল বলুক যে আমরা যা সম্ভব করেছি, এবার তোমাদের পালা।’ বারাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্থলবাহিনী ছাড়া ইরানে শাসন পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি কোরিয়া, ভিয়েতনাম, আফগান যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘সেই সব যুদ্ধে কী হলো?’ তিনি সংশয় প্রকাশ করেন যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা অন্য কোনো মার্কিন নেতা, এমনকি জনগণ ইরানে সেনা পাঠাতে চাইবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে।

২০১৮ সালে ট্রাম্প একতরফাভাবে ওবামার করা চুক্তি বাতিল করেছিলেন। চুক্তি থাকলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থামিয়ে রাখা যেত। এর বিনিময়ে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হতো। চুক্তি বাতিল হওয়ায় ইরান আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পৌঁছায়। তাই বলা যায়, এই যুদ্ধ আসলে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য নয়, বরং ইরানকে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার কাছে নত হতে বাধ্য করার চেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত এই সংঘাতে কারা জয়ী হবে, তা দেখা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা অস্ত্রভান্ডার নিয়ে ইসরায়েল হয়তো ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে পরাজিত করতে পারে। ইরানের বিমানবাহিনী কার্যত অনুপস্থিত। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও দুর্বল।

প্রশ্ন হলো, ইরানের দুই হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কত দিন চলবে? তারপর কী হবে? এত বড় ক্ষতির পরও ইরান এখনো প্রতিরোধ করছে, পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু মাঝারি বা দীর্ঘ মেয়াদে কি তারা টিকে থাকতে পারবে? তৃতীয় পক্ষের কোনো উদ্যোগ কি যুদ্ধ থামাতে আসবে?

আর যদি ইরান আরও কোণঠাসা হয়, তাহলে কি তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, সম্পদ কিংবা তাদের মিত্রদের ওপর হামলা চালাবে? তাহলে এর প্রভাব শুধু লাখ লাখ মানুষের জীবন নয়, বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও পড়বে।

আব্বাস নাসির, সাবেক সম্পাদক, দ্য ডন
- দ্য ডন থেকে নেওয়া ইংরেজি থেকে অনূদিত

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিণতি কী

পাহাড়ে সম্পদশালী দরিদ্র ও দারিদ্র্যের কথা by বুদ্ধজ্যোতি চাকমা

পাহাড় ও সমতলের দারিদ্র্যে ভিন্নতা আছে। সমতলের প্রান্তিক মানুষ সম্পদের অভাবে দরিদ্র। আর পাহাড়ে মানুষ সম্পদের মধ্যে থেকেও দরিদ্র। অর্থাৎ তাঁরা সম্পদশালী দরিদ্র, সমতলের দরিদ্ররা সম্পদহীন দরিদ্র।

পাহাড়ে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ভূমি, ভূপ্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য, প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে গাছ-বাঁশ, নদ-নদী, খাল-ঝিরি-ঝরনায় প্রাকৃতিক পাথর ও বহু সম্পদের সম্ভার রয়েছে। প্রকৃতি প্রদত্ত এই সম্পদ অবারিত। চাইলেই আহরণ করা সম্ভব। কিন্তু এত বিশাল সম্পদের ভান্ডারে যুগ যুগ ধরে বসবাস করেও যুগে যুগে পাহাড়ের মানুষ, বিশেষ করে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা দরিদ্র। অথচ সমতল থেকে অনেক মানুষ এই পাহাড়ে এসে সম্পদ আহরণ করে বিত্তবৈভবের অধিকারী হয়েছেন। বিপরীতভাবে অধিকাংশ পাহাড়ি নিঃস্বই থেকে গেছেন।

রাঙামাটিতে গত ২৫ এপ্রিল আয়োজিত একটি সেমিনারে ঘুরেফিরে এই সম্পদশালী দরিদ্রের কথাই আলোচনায় উঠে এসেছে। সেমিনারের বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি বিকাশে করণীয়’।

সেমিনারের আয়োজক বৌদ্ধধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট। সেমিনারে তিন পার্বত্য জেলার চিন্তাশীল ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন। নির্ধারিত আলোচনার বাইরেও অনেকে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক অভিঘাত ও দারিদ্র্য নিয়ে মতামত দেন; বরং বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিকাশের বিষয়টি আলোচনায় গৌণ হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের দারিদ্র্য নিয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে। তিন পার্বত্য জেলার ১১টি পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশি। দারিদ্র্যও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মধ্যে বেশি।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, রাঙামাটিতে ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৩ জনের মধ্যে প্রায় ৫৭ দশমিক ২৫ শতাংশ, বান্দরবানে ৪ লাখ ৮১ হাজার ১০৬ জনে ৩০ দশমিক ৪৫ শতাংশ ও খাগড়াছড়িতে ৭ লাখ ১৪ হাজার ১১৯ জনে ৩৫ দশমিক ৯২ শতাংশ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। পাহাড়ি জনসংখ্যা রাঙামাটিতে ৫৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ, বান্দরবানে ৪১ দশমিক ১৪ ও খাগড়াছড়িতে ৪৮ দশমিক ৯২ শতাংশ।

প্যানেল আলোচক পুলক জীবন খীসার মতে, পাহাড়ের বৌদ্ধরা বৌদ্ধধর্মীয় তত্ত্বের জ্ঞানভিত্তিক কর্মবাদী দর্শন সম্পর্কে জানেন না। অথচ উন্নত দেশের মানুষ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী না হয়েও বৌদ্ধধর্মীয় তত্ত্বের চতুরার্য সত্য ও প্রতীত্য সমুৎপাদ নীতিকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে প্রয়োগ করে সাফল্য অর্জন করছে। উন্নতির শিখরে উঠে গেছে।

যেমন উন্নয়ন–পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়নে সমস্যা চিহ্নিত করা, সমস্যার কারণ নিরূপণ করা, সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এবং সমস্যার সমাধান করা—সবই বৌদ্ধধর্মীয় তত্ত্বের আলোকে করা হয়। যেমনটা বৌদ্ধধর্মে বলা হয়, পৃথিবীতে দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের নিরোধ আছে এবং দুঃখ নিরোধের উপায়ও আছে। অথচ পাহাড়ি বৌদ্ধদের এই তত্ত্বকর্মে প্রয়োগের বোধজ্ঞান নেই।

প্রাচীনকালে থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পদে সমৃদ্ধ। কিন্তু অধিবাসীরাও প্রাচীন সময় থেকে দরিদ্র; যদিও তাঁরা একসময়ে সুখী-সমৃদ্ধ সোনালি অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করেন। এখনো সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়ায় উন্নয়নের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় অঞ্চল।

পাহাড়ি ভূমিতে পরিবেশবান্ধব ফলদ-বনজ ও সবজিবাগান, ফলকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা, বনায়ন ও বনশিল্প উন্নয়ন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা, পাহাড়ে গবাদিপশুর খামার, ঝিরি-ঝরনায় ছোট ছোট বাঁধ নির্মাণ করে মাছ চাষ ও হাঁস–মুরগির পালন, নারীদের কুটির শিল্পের দক্ষতাকে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে নিয়ে আসা—এ রকম সম্পদ ও সম্ভাবনা সর্বত্র রয়েছে। কিন্তু এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই অঞ্চল দেশের দারিদ্র্য সূচকে বরাবরই অত্যন্ত নিচের স্তরে রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি।

পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের ২০২২ সালের দারিদ্র্য মানচিত্রে দেখা যায়, জাতীয়ভাবে দারিদ্র্যের হার ১৯ দশমিক ২ শতাংশ হলেও তিন পার্বত্য জেলায় ৪৮ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে অতিদরিদ্র্যের সংখ্যা বান্দরবানে ২৫ শতাংশ, খাগড়াছড়িতে প্রায় ১৬ শতাংশ ও রাঙামাটিতে সাড়ে ১৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা অনুযায়ী দৈনিক আয় ২ দশমিক ১৫ ডলার, অর্থাৎ ২৬২ টাকার নিচে হলে অতিদরিদ্র। আবার জাতীয় দারিদ্র্যসীমার মানদণ্ডে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত সেবা ক্রয়ের সামর্থ্য মাসিক ৮ হাজার ৮২২ টাকার নিচে হলে অতিদরিদ্র ধরা হয়। যদিও দারিদ্র্য মানচিত্রের তথ্যে বিতর্ক রয়েছে। যেমন তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যের হার বান্দরবানে ২০১৬ সালে ছিল ৬২ শতাংশ, সম্প্রতি প্রকাশিত মানচিত্রে হয়েছে ২৫ শতাংশ। খাগড়াছড়ির দারিদ্র্যের হার ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে নেমেছে।

প্রবীণ-নবীন অনেকের সঙ্গে সম্পদের মধ্যে থেকেও দারিদ্র্য দূর করতে না পারার কারণ নিয়ে কথা হয়েছে। তাঁরা বহুমাত্রিক কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দ্বিতীয়ত, শিক্ষা তথা গুণগত শিক্ষার সমস্যা, তৃতীয়ত, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া উন্নয়ন—এ প্রধান তিনটি বিষয়সহ আরও অনেক কারণ তুলে ধরা হয়। বস্তুত অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পাহাড়িদের আর্থসামাজিক উদ্যোগ ও অবস্থা, কোনোটাই স্থিতিশীল নয়। পার্বত্য চুক্তি নিয়ে মানুষের বিশাল আশা–আকাঙ্ক্ষা ছিল।

পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে, সবাই আত্মোন্নয়নে মনোনিবেশ করবেন। ১৯৯৭ সালে চুক্তির পর কয়েক বছর পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণও ছিল। আজ পাহাড়িদের যা উন্নয়ন স্থিতি, অধিকাংশই সেই সময়ের কয়েক বছরের মধ্যে হয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে। মানুষের উন্নয়নযাত্রার উদ্যোগে একেবারে ভাটা না পড়লেও স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলে। শুধু খেয়েপরে বেঁচে থাকার কাজ ছাড়া মানুষ স্থায়িত্বশীল পরিকল্পনা নিয়ে মাঝারি ও বৃহৎ পরিসরে উন্নয়নে হাত দিতে পারছে না। কিছু করতে গেলেই নানামুখী চাপ ও ভয়ের মুখে পড়তে হয়। এই অবস্থায় পার্বত্য অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার কমানো যায়নি। অশান্ত ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রধান পিছুটান হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর্থসামাজিক উন্নয়নে শিক্ষার নিম্নহার একটি বড় বাধা। বিশেষ করে সম্পদের মধ্যে থেকেও দরিদ্র থাকা পাহাড়ি মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রধান বাধা বলা যেতে পারে। পার্বত্য চুক্তি পরে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ এবং পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এখানকার মানুষ দাবি করেছিলেন, পাহাড়ে দারিদ্র্য দূর করতে হলে শিক্ষাকেন্দ্রিক উন্নয়ন জরুরি। এখানে সম্পদের অভাব নেই, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব আছে। মানুষ সম্পদ আহরণ করে নিজেদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারছে না। তাঁদের দারিদ্র্য কমানো যাচ্ছে না।

দুর্গম এলাকার প্রতিটি পাড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করা সম্ভব নয়। সেখানে ছোট ছোট কয়েকটি পাড়া নিয়ে শিক্ষা ক্লাস্টার করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা দরকার। ওই আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আশপাশের পাড়াগুলোর যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশনসহ সব উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হোক। এভাবে ২৫ থেকে ৩০ বছরের জন্য স্বল্প ও মধ্য মেয়াদের উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা সম্ভব হবে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী মানে সৃজনশীল জনশক্তি। তাঁরাই বিদ্যমান সম্পদ কাজে লাগিয়ে নিজেদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন করে নিতে সক্ষম হবেন।

পার্বত্য চুক্তির পরে হাজার হাজার কোটি টাকা উন্নয়নে ব্যয় হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় চাহিদা ও বাস্তবতার আলোকে উন্নয়ন হয়নি। আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থাকে নিউক্লিয়াস করে শিক্ষাকেন্দ্রিক উন্নয়ন বাস্তবায়ন হয়নি। এতে করে গুণগত শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি করা যায়নি। প্রথম আলোর ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাহাড়ে প্রাথমিক শিক্ষাতেই ৪০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বিবিএসের ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২ শতাংশের কম শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যেতে পারছে। শিক্ষার এই শোচনীয় অবস্থার কারণে সম্পদশালী দরিদ্ররা দরিদ্র রয়ে গেছেন। তাঁদের ধরে রাখা দারিদ্র্য দূর করার জন্য অনিশ্চিত সময়ের গন্তব্যে উন্নয়ন চলমান।

জাতীয় উন্নয়নে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা বলে একটি কথা আছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারণায় না হলে জাতীয় উন্নয়ন ধারার উন্নয়নে প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর সুযোগের চেয়ে বঞ্চনা তৈরি হয় বেশি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও জাতীয় উন্নয়ন ধারণায় অধিকাংশ উন্নয়নের পরিকল্পনা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এসব উন্নয়নে স্থানীয় মানুষের কোনো অংশগ্রহণ থাকে না। অনগ্রসর স্থানীয় মানুষেরা জানা নেই, শোনা নেই এমন উন্নয়নে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।

ধরা যাক, রুমা থেকে থানচি একটি সড়ক নির্মাণ করা হবে। মোট ৩০ কিলোমিটারের সড়কে মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, খুমি ও খেয়াং জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। কিন্তু তাঁরা কেউ জানেন না সড়কের গতিপথ বা অ্যালাইনমেন্ট সম্পর্কে। নির্মাণ উপকরণ স্থানীয় পাথর, গাছ বা অন্য কিছু হবে—তাঁদের কিছুই জানানো হয়নি। পাহাড়ি এলাকায় সড়ক নির্মাণে পাহাড় কাটতেই হবে। তাহলে পাহাড় কাটার ফলে পানির উৎস বা ঝিরি-ঝরনা কী হবে? এই ঝিরি–ঝরনাগুলো কেন্দ্র করে পাড়া গড়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে যাবে সড়ক। সড়ক হওয়ার পর এই বনাঞ্চল কারা রক্ষা করবে?

এই বনাঞ্চলই পানির উৎস ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করছে। অর্থাৎ সড়ক নির্মাণে আর্থসামাজিক উন্নয়নে কী কী সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি হবে, সেই সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের ন্যূনতমও জানানো হয়নি। এর ফলে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত স্থানীয় লোকজন সড়ক নির্মাণ হওয়ার কারণে সৃষ্ট কোনো সুযোগ আহরণ করতে পারেননি। বনাঞ্চলের গাছ-বাঁশ, ঝিরি–ঝরনার পাথরসহ সব সম্পদ ও সুযোগের সুবিধাভোগী হয়েছেন অন্য এলাকা থেকে আসা মানুষজন। একদিকে স্থানীয় প্রান্তিক মানুষ স্থানীয় সম্পদ হারাচ্ছেন, তাঁদের জনগোষ্ঠীর হিসেবে করা উন্নয়নে আহরণযোগ্য সুযোগ থেকে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে উন্নয়নে সৃষ্ট পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাঁদের। উন্নয়নের শিকারে পরিণত হচ্ছেন তাঁরা। এ জন্য পাহাড়িদের মধ্যে একধরনের উন্নয়ন ফোবিয়া বা ভয় তৈরি হয়েছে। উন্নয়নের কথা বললে কার জন্য উন্নয়ন জানতে চান।

পাহাড়ে সম্পদশালী দরিদ্রদের এটি খুবই সাধারণ চিত্র। সম্পদ ও সুযোগ আছে, সক্ষমতা নেই। আহরণ ও ব্যবহার করতে না পেরে দারিদ্র্য গোছাতে পারছে না। আবার জাতীয় উন্নয়নের ভাবধারার উন্নয়নে স্থানীয় সম্পদ ও সুযোগ হারিয়ে বিশাল একটি অংশ আরও বেশি প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে। দারিদ্র্য কমানো যাচ্ছে না পাহাড়ে। প্রকৃতপক্ষে এই সম্পদশালী দরিদ্রদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণে ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। সমতলের সম্পদহীন দরিদ্রদের উন্নয়নের ভাবনায় পাহাড়ে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হবে না। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে তা অনেকটা প্রমাণিত সত্য। তবে সবার আগে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

* বুদ্ধজ্যোতি চাকমা, প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি

এমন রাত বাড়তে থাকলে একসময় ইসরায়েলিরা প্রশ্ন তুলবে, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

আকাশপথে ইরানের চালানো পাল্টা হামলা থেকে ইসরায়েলিরা কতটা সুরক্ষিত? এই প্রশ্নের উত্তর ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজের সাংবাদিক গিদেওন লেভির কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছে আল-জাজিরা।

গিদেওন লেভি আল-জাজিরাকে বলেন, বেশির ভাগ ইসরায়েলি আকাশপথের হামলা থেকে ‘খুব ভালোভাবে সুরক্ষিত’।

তবে গিদেওন লেভি বলেন, এমন হামলা চলতে থাকলে ইসরায়েলিরা একসময় শুধু ক্লান্ত আর ভীতই হবে না, একসময় যুদ্ধের পর যুদ্ধ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলবে। এভাবে তারা কোথায় যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।

গত শুক্রবার ভোররাতে ইরানে হামলা শুরু করে ইসরায়েল। চলমান ইসরায়েলি হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ২২৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ইরানের অন্তত ২০ জন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন। ইরানও পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের হামলায় এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন।

আকাশপথে চালানো হামলা থেকে ইসরায়েলিদের সুরক্ষার ব্যবস্থা সম্পর্কে সাংবাদিক গিদেওন লেভি বলেন, ইসরায়েলে ‘অ্যালার্ম সিস্টেম’ খুব কার্যকরভাবে কাজ করে। এবার তাঁরা ‘সাইরেন’ বাজার অনেক আগেই ‘অ্যালার্ম’ পাচ্ছেন। ফলে তাঁরা নিজেদের প্রস্তুত করার সময় পাচ্ছেন। যেমন তেল আবিবের বেশির ভাগ এলাকায় অনেক আশ্রয়কেন্দ্র আছে। তা ছাড়া নতুন প্রতিটি ভবনেই নিজস্ব আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ কক্ষ থাকে। এই দিক থেকে দেখলে ইসরায়েলের সাধারণ জনগণ যথেষ্ট সুরক্ষিত।

ইসরায়েলে ‘অ্যালার্ম সিস্টেম’ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আকাশপথে হামলার বিষয়ে লোকজনকে আগাম সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। অন্যদিকে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় আকাশপথে হামলা শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে ‘সাইরেন’ বাজানো হয়।

তবে গিদেওন লেভি উল্লেখ করেন, এই সুরক্ষা সব ইসরায়েলির জন্য সমান নয়। যেমন বেদুইন জনগোষ্ঠী কিংবা ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা এ সুবিধা পান না।

এ প্রসঙ্গে ইসরায়েলের উত্তরের ফিলিস্তিনিপ্রধান শহর তামরার উদাহরণ দেন গিদেওন লেভি। শহরটিতে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে গতকাল রোববার একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় অন্তত চারজন নিহত হন। এখানে কোনো সুরক্ষা আশ্রয়কেন্দ্র নেই। কিন্তু পাশের একটি এক হাজার জনসংখ্যা–অধ্যুষিত ইহুদি গ্রামে একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র আছে বলে জানান গিদেওন লেভি।

সাংবাদিক গিদেওন লেভি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এ রকম রাত যত বাড়বে, ইসরায়েলিরা শুধু ক্লান্ত আর ভীতই হবে না, বরং একসময় আমরা শেষমেশ নিজেরাই প্রশ্ন করতে শুরু করব—এর কি কোনো মূল্য আছে? আমরা কোথায় যাচ্ছি? এক যুদ্ধ থেকে আরেক যুদ্ধে? এক গোলাবর্ষণ থেকে আরেক গোলাবর্ষণে? কারণ, এবারের পরিস্থিতি গাজা বা লেবাননের মতো নয়। এবার বেসামরিক জনগণের খেসারত হতে পারে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। তাই ইসরায়েল কয়েক দিন এটা সহ্য করতে পারবে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে নয়।’

ইসরায়েলের হাইফা শহরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ১৬ জুন ২০২৫
ইসরায়েলের হাইফা শহরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। ১৬ জুন ২০২৫ ছবি: এএফপি