Monday, March 7, 2011

শৃঙ্খলিত দুদক রেখে কী লাভ?

দিনবদলের সনদের অঙ্গীকারের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। দিনবদলের সনদে ২৩টি অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে পাঁচটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা’ গ্রহণ, দ্বিতীয়—‘দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ এবং বিশ্বমন্দার মোকাবিলায় সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা’র পরই অঙ্গীকার করা হয়: ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। ক্ষমতাধরদের বার্ষিক সম্পদের বিবরণ দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনুপার্জিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, কালো টাকা ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ ও নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে...সরকারি কর্মকাণ্ডের ব্যাপকভাবে কম্পিউটারায়ন করে দুর্নীতির পথ বন্ধ করা হবে।’ এসব অঙ্গীকারের ওপর আস্থা রেখেই এ দেশের ভোটাররা মহাজোটকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাবিজয় উপহার দিয়েছিলেন।
নির্বাচন-পরবর্তীকালেও প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং দুদককে স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর করার প্রত্যয় বারবার ব্যক্ত করেছেন। এমনকি গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংসদে প্রশ্নোত্তরকালে তিনি দুদকের স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি সংসদে উত্থাপিত ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০১১’, যা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে, নাগরিক হিসেবে আমাদের চরমভাবে হতাশ করেছে। বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, বিলে অন্তর্ভুক্ত সংশোধনীর সঙ্গে দিনবদলের সনদের অঙ্গীকারগুলোর এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যয়ের কোনো মিল আমরা খুঁজে পাই না।
সংসদে উত্থাপিত বিলে ২০০৪ সালের আইন সংশোধনের ‘উদ্দেশ্য ও কারণ’ শিরোনামে বলা হয়: ‘দুর্নীতি প্রতিরোধকল্পে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও শক্তিশালী, জবাবদিহিসম্পন্ন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়িয়া তুলিবার নিমিত্ত দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর অধিকতর সংশোধনের লক্ষ্যে এই বিল উত্থাপন করা হইল। প্রস্তাবিত সংশোধনের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাইবে বলিয়া আশা করা যায়।’
এটি সুস্পষ্ট যে একটি ‘স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা’ সংশোধনীর উদ্দেশ্য নয়; বরং ‘কমিশনের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা ও গ্রহণযোগ্যতা’ বাড়ানোই সংশোধনের উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই খসড়া বিলটি সংসদে পাস হলে, দুদক আর স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিরাজ করবে না।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস, যা আমাদের সংবিধানেও (অনুচ্ছেদ ৭) স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ তাঁদের ভোটের মাধ্যমে একদল প্রতিনিধি নির্বাচন করেন তাঁদের স্বার্থে ও কল্যাণে কাজ করার লক্ষ্যে। নির্বাচনের মাধ্যমে সাংসদেরা সীমিত—‘আইনপ্রণয়নের’ জন্য (অনুচ্ছেদ ৬৫)—ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হন। সংসদীয় পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একাংশ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হয়ে, নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন। অন্যরা সাংসদ হিসেবে, মোটা দাগে বলতে গেলে, আইন প্রণয়ন ও সরকারের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করেন। এ কাজগুলো সুচারুরূপে সম্পাদনের জন্য সংসদকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, পাহারাদারকে (দুদককে) যদি যাকে পাহারা দেওয়ার কথা, তার (নির্বাহী বিভাগের) অনুমতি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়, তাহলে পাহারাদারের পক্ষে কোনোভাবেই সে কার্যক্রম স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও ফলপ্রসূভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কারণ, একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে কারও অনুমতি নিয়ে কাজ করতে হয় না। প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা আরও ক্ষুণ্ন হবে, যদি প্রস্তাবিত বিলের সুপারিশ অনুযায়ী সরকার দুদকের সচিবের নিয়োগ প্রদান করে। আর দুদকের স্বাধীনতা খর্ব করা হলে এটি কোনোভাবেই কার্যকারিতা অর্জন করতে পারবে না।
দুর্ভাগ্যবশত, ২০০৪ সালের আইনের ৩২ ধারার সঙ্গে ৩২ক ধারা সংযোজিত করে সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাবিত বিলে দুদকের স্বাধীনতা খর্ব করার একটি অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রস্তাবিত ৩২ক ধারায় বলা হয়েছে, ‘ধারা ৩২-এর বিধান সাপেক্ষে, এই আইনের অধীন জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৭-এর বিধান আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করিতে হইবে।’ অর্থাৎ বিচারক ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে সরকারের (অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগের) পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে। বিদ্যমান আইনের ৩২ ধারা সংশোধনের মাধ্যমে এ ধরনের অনুমোদনপত্র মামলা দায়েরের সময় আদালতে হাজির করতে হবে।
২০০৪ সালের আইনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার আগে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’র ওপর দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল। অ্যান্টি-করাপশন আইন ১৯৫৭-এ, যার অধীনে ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করার আগে সরকারের পূর্বানুমতি গ্রহণের এমনই একটি বিধান ছিল, যা ওই প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে ফেলেছিল। আমাদের আশঙ্কা, এই বিধানটির পুনঃপ্রবর্তনের ফলে দুদকের ভাগ্যেও তা-ই ঘটবে।
বিচারক ও সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের ‘ইনডেমনিটি’ বা সুরক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্নও জড়িত। আমাদের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান।’ তাই অন্যান্য নাগরিককে বাদ দিয়ে শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য এমন বিধান হবে সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন, ফলে অসাংবিধানিক।
সরকারি কর্মচারীদের এ ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হলে প্রশাসনে দলবাজি আরও প্রকট হবে। সরকারি কর্মকর্তারা—বিশেষ করে, যাঁরা অযোগ্য, অদক্ষ ও অসৎ—সংগত কারণেই সরকারি দলের অনুগত হয়ে পড়বেন। এর ফলে প্রশাসনে মেধাশূন্যতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
প্রসঙ্গত, গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে (৪ নভেম্বর ১৯৭২) প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: ‘সরকারী কর্মচারীরা একটি আলাদা জাতি নয়। ...আইনের চক্ষে সাড়ে সাত কোটি মানুষের যে অধিকার, সরকারী কর্মচারীদেরও সেই অধিকার।’ প্রস্তাবিত বিলের মুখবন্ধে দুদককে স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কাম্য। কারণ, কোনো প্রতিষ্ঠানই দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয় এবং গ্রহণযোগ্যতা না থাকলে সে প্রতিষ্ঠান কার্যকর হবে না। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—কী ধরনের স্বচ্ছতা? কী প্রক্রিয়ায় দায়বদ্ধতা? কার কাছে দায়বদ্ধতা? কার কাছে গ্রহণযোগ্যতা? দুদকের কার্যক্রমে অবশ্যই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হবে, তবে সে গ্রহণযোগ্যতা হতে হবে নাগরিকদের কাছে, কোনোভাবেই প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে নয়। কারণ, প্রশাসনের দুর্নীতি দমন করাই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম দায়িত্ব।
দুদকের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিধান ২০০৪ সালের আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আইনের ২৯ ধারা অনুযায়ী, দুদক বার্ষিকভাবে তার কার্যক্রমের একটি প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করবে এবং রাষ্ট্রপতি তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের ব্যবস্থা করবেন। এর মাধ্যমে দুদকের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার সুযোগ ঘটবে। এ ছাড়া দুদকের অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য অন্য বিধানের কথাও ভাবা যেতে পারে। যেমন, দুদকের সব কার্যক্রমের বিবরণী (তদন্ত ও মামলা-সংক্রান্ত আইনানুগভাবে গোপনীয় তথ্য ছাড়া) নিয়মিতভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা যেতে পারে। প্রসঙ্গত, বর্তমান বিলটি মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত হওয়ার পর এতে কী আছে, সে সম্পর্কে কাউকেই জানানো হয়নি, এমনকি দুদকের চেয়ারম্যানকেও না। এটি কোন ধরনের স্বচ্ছতা?
দুদকের দায়বদ্ধতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। দুদকের কমিশনাররা কোনো ধরনের অসদাচরণে লিপ্ত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান অবশ্যই থাকতে হবে। সে ধরনের বিধান ২০০৪ সালের আইনে রয়েছে। আইনের ১০ ধারায় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মতো সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে দুদকের কমিশনারদের অপসারণের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতির দায়ে দুদকের কমিশনার ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ২০০৪ সালের আইনে কোনোরূপ বিধিনিষেধ নেই। বস্তুত দুদক ইতিমধ্যেই তাদের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে।
প্রস্তাবিত বিলে আরও কয়েকটি সংশোধনী আনা হয়েছে, যা দুদককে অকার্যকর করবে। এতে দুদকের সাক্ষীদের সমন জারির, সাক্ষীদের পরোয়ানা জারির এবং শপথের মাধ্যমে তাঁদের সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষমতা রহিত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বিলটি পাস হলে দুদকের শুধু সাক্ষীদের প্রতি নোটিশ জারি করার ক্ষমতা থাকবে। এ ছাড়া দুদকের ক্ষমতা তদন্তের পরিবর্তে অনুসন্ধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। উপরন্তু, বিদ্যমান আইনের ২৩ ধারা সংশোধনীর মাধ্যমে কোনো অভিযোগের তদন্তকালে সরকার বা সরকারের অধীন কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা দুদককে সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবে না, এ ধরনের সংশোধনী পাস হলে দুর্নীতির মামলায় দুদকের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত হবে।
প্রস্তাবিত বিলে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে দুদকের কমিশন ও তার কর্মকর্তাদের দুই থেকে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়ের বিধান রাখা হয়েছে। মিথ্যা মামলার মানদণ্ড কী? যেকোনো মামলায় হারলেই কি ধরে নেওয়া যায়, মামলাটি মিথ্যা ছিল? সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, অনেক চিহ্নিত দুর্নীতিবাজও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। দুর্বল তদন্ত, সরকার ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার অসহযোগিতা, সাক্ষীর বৈরী মনোভাব, রাষ্ট্রের আইনজীবীদের বিতর্কিত ভূমিকা, আদালতের ভুল ব্যাখ্যার কারণে শাস্তিপ্রাপ্ত অনেক ব্যক্তি সম্প্রতি দুর্নীতির দায় থেকে মুক্ত হয়েছেন। তাই বলে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা কি মিথ্যা বলা যাবে? এ ধরনের বিধান আইনে পরিণত হলে, দুদকের কমিশনার ও কর্মকর্তারা ভবিষ্যতে দুর্নীতির মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে প্রবলভাবে নিরুৎসাহিত হবেন। এ ছাড়া দুদকের মামলার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধান করা হলে, অন্য সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রে তা নয় কেন? উপরন্তু, সরকার ও অন্যান্য সরকারি সংস্থা সহায়তা করতে যদি বাধ্য না হয় এবং সাক্ষীদের যদি সাক্ষ্য দিতে পরোয়ানা জারি না করা যায় এবং তাঁদের শপথ গ্রহণপূর্বক সাক্ষ্য দিতে না হয়, তাহলে দুর্নীতির মামলায় দুদক হারবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
কিছুদিন আগে দুদকের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, দুদককে একটি নখ ও দন্তহীন বাঘে পরিণত করার পাঁয়তারা চলছে। আমরা মনে করি যে প্রস্তাবিত বিলটি পাস হলে দুদক, রূপক অর্থে, শুধু নখ ও দন্তহীনই হবে না, প্রতিষ্ঠানটির হাতে-পায়েও শৃঙ্খল পরিয়ে দেওয়া হবে। ফলে এটি একটি পরাধীন, আজ্ঞাবহ ও অর্থহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। তাই এটি বিলুপ্ত করলেও কিছু আসবে-যাবে না। আশা করি, নাগরিকেরা এ ব্যাপারে সোচ্চার হবে এবং সাংসদেরা বিলটি পাস করার আগে আমাদের উৎকণ্ঠার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবেন।
প্রসঙ্গত, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুদকের কমিশনারদের শূন্যপদে সরকারি দলের প্রতি অনুগত দুজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। আশা করি, সরকার তা থেকে বিরত থাকবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

আড়িয়ল ও আনুষঙ্গিক by দ্বিজেন শর্মা

‘মানুষ বিশ্বজগতের জাল বোনেনি, সে এই জালের একটি সুতোমাত্র, এই জাল ছিন্ন করলে সে নিজেই বিপন্ন হবে।’ এটি উদ্ধৃত হলো ১৮৫৬ সালে নিউইয়র্কের গভর্নরকে সিয়াটল নামের জনৈক রেড-ইন্ডিয়ানের লেখা একটি চিঠি থেকে।
কয়েকটা গাছ কাটলে, নরভুক বাঘ ও ফসলভুক পাখি মারলে কী এমন ক্ষতি মানুষের? কী এমন অমূল্য ধন আছে আড়িয়ল বিলে, সেখানে বিমানবন্দর বানালে দেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে? এ-ই তো চলছে অনাদিকাল থেকে এবং এভাবেই তো গড়ে উঠেছে সভ্যতা, মানুষের নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবন। যাঁরা প্রায়ই এ ধরনের কথা বলেন, তাঁরা ওই চিঠিটি পড়তে পারেন। চিঠিটিতে আছে প্রকৃতিপুত্র আদিবাসী মানুষের বিশ্ববীক্ষা, প্রকৃতির সঙ্গে সহযোগ-নির্ভর জীবনযাত্রার যৌক্তিকতা ও যন্ত্রসভ্যতার অবশ্যম্ভাবী বিনষ্টির পূর্বাভাস। সেই রেড ইন্ডিয়ান পত্রলেখকের কথা কেউ শোনেনি। মার্কিন শ্বেতাঙ্গরা আদিবাসীদের উৎখাত করেছে বন ও বন্য জন্তুর মতো, যা আজও চলছে প্রায় সর্বত্র, আমাদের দেশেও। লক্ষণীয়, মর্গান ও মার্ক্স-এঙ্গেলস ওই আদিবাসীদের জীবনপ্রণালি থেকেই নিজ নিজ তত্ত্বগ্রন্থনায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং আজকের ইকো-সমাজতন্ত্রী ও ‘ডিপ ইকোলজি’র প্রবক্তারা ওই আদলেই ভবিষ্যৎ সভ্যতার কাঠামো নির্মাণের স্বপ্ন দেখছেন।
যন্ত্রসভ্যতার জয়যাত্রা অব্যাহত আছে, চলছে শ্রমজীবী মানুষ ও প্রকৃতির অবাধ শোষণ, আর এটাই উন্নয়নের মৌল মডেল। বিকল্প আরেকটি মডেলও কিছুকাল টিকে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে, সেখানে মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণ বন্ধ হলেও নিবৃত্ত হয়নি ভোগবাদ ও প্রকৃতির যদৃচ্ছা দোহন। গান্ধীরও একটি কৃষিভিত্তিক পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন মডেল ছিল, কিন্তু তাঁর স্বদেশ ভারত তা গ্রহণ করেনি। শুমেকারের ‘ক্ষুদ্রই সুন্দর’ কোথাও আমল পায়নি, কেননা ‘বৃহৎ অপরিহার্য’। আফ্রিকান গান্ধী জুলিয়াস নায়বেরি শুমেকারের ‘প্ররোচনায়’ তানজানিয়ায় উন্নয়নের আফ্রিকীয় মডেল চালু করে মার্কিন বিরোধিতায় ক্ষমতা হারান। এককালের সমাজতন্ত্রী চীন আজ ভোগবাদের উর্বর অকুস্থল ও প্রকট প্রকৃতিবিমুখ। বঙ্গবন্ধুর ‘বাকশাল’ এখন স্মৃতিমাত্র।
কৃষিসভ্যতার পতনের পর উন্নয়ন সর্বত্রই শিল্পনির্ভর। শিল্পবিপ্লবের সূচনা ইংল্যান্ডে। শিল্পোন্নয়নের সেই আদিপর্বে কলকারখানার জ্বালানি ও কাঁচামাল জোগান দিয়ে বন-বনানী উজাড় হতে থাকলে এবং বর্জ্যদূষণে শহরাঞ্চল বাসযোগ্যতা হারালে তাদের নজর পড়ে উপনিবেশগুলোর দিকে এবং সেগুলোই হয়ে ওঠে মুশকিল-আসান। আজ উপনিবেশ নেই, কিন্তু উন্নত বিশ্ব কৌশলটি অব্যাহত রেখেছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, উজাড় হচ্ছে ক্রান্তীয় বৃষ্টিবন, দূষিত হচ্ছে নদী ও জলাশয়, বিলীন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, আর তাতে মদদ জোগাচ্ছে আক্রান্ত দেশের বশংবদ রাজনীতিক ও আমলারা।
বর্তমান বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনেকটা ইংল্যান্ডের শিল্পায়ন শুরুর সেই যুগের মতো। আমাদের দেশটিও ছোট, নেই কিন্তু কোনো উপনিবেশ। সে কারণে শিল্পের প্রসার ও পরিবেশ সুরক্ষার যথাযোগ্য মেলবন্ধন ঘটানো কঠিন। এই সঙ্গে আছে অত্যধিক জনঘনত্ব। ইতিমধ্যে অনেক নদী দূষিত, বনাঞ্চলের আয়তন সর্বনিম্ন, চলছে পাহাড় কাটা, নদী দখল, জলাভূমি ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। সরকার নিষ্ক্রিয় নেই, প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের চেষ্টা আছে—কাগজে এসব খবর আমরা পড়ি ও আশান্বিত হই। কিন্তু আড়িয়ল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ আমাদের ধন্দে ফেলে, কেননা আমরা রামসার কনভেনশনের স্বাক্ষরদাতা, জলাভূমি সংরক্ষণে দায়বদ্ধ। বিমানবন্দর নির্মাণ-প্রকল্প স্থানান্তরিত হয়েছে জনমতের চাপে, বাস্তুসংস্থানকে মান্য করে নয়। বিরোধী দলের বক্তব্যও তথৈবচ। তাহলে কি ধরে নেব যে আমাদের রাজনীতিকেরা দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশকে যথাসম্ভব সুরক্ষা প্রদানে আন্তরিক নন? এমনটি হলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী পশ্চিমের কাছ থেকে প্রাপ্য খেসারত আদায় আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠবে।
আজকাল সাসটেইনেবল বা পরিপোষক উন্নয়নের ব্যাপক প্রচার চলছে, যাতে আছে বাস্তুসংস্থান সুরক্ষা, পরিবেশদূষক বর্জ্য নিঃসরণ হ্রাস, অরগানিক কৃষি, প্রকৃতিবান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ইত্যাদি। কিন্তু পুঁজিতান্ত্রিক আবহে এটির বাস্তবায়ন সুকঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা পশ্চিমা করপোরেট সংস্থাগুলো, সেই সব দেশের রাজনীতিকেরা যাদের ক্রীড়নক। প্রয়োজনীয় সময়ের দৈর্ঘ্যও একটি প্রতিকূল ফ্যাক্টর। সময় আমাদের নেই। আগামী ৫০ বছর হলো শেষ সীমা। ইতিমধ্যে দূষণমুক্ত জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সাহায্যে সাবেকি উৎপাদন-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে বর্তমান সভ্যতা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
আগামী ৫০ বছরের সময়কালে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কেমন হবে? জনসংখ্যা ৩০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে, নদীনালা, হাওর-বাঁওড় ভরাট হতে থাকবে, বনজঙ্গল বিলীন হবে, জীববৈচিত্র্যের নির্বিশেষ বিনাশ ঘটবে, মাথাপিছু খেতজমির পরিমাণ শূন্যাঙ্কে পৌঁছাবে, সারা দেশ গৃহময় হয়ে উঠবে এবং জনারণ্যে অদ্ভুত এক নিঃসঙ্গতা নামবে। দেশের মানুষ তখন কতটা সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকবে, রাজনীতিকদের কাছে এটাই আমাদের জিজ্ঞাস্য।
>>>দ্বিজেন শর্মা: লেখক, নিসর্গবিদ।

রাজধানীতে যাত্রী হয়রানি

ঝোপ বুঝে কোপ, এই যেন চালু রীতি। ওপর থেকে তলা পর্যন্ত সবাই এই কৌশলই অবলম্বন করেন। সিএনজিচালকেরা ভাড়া নিয়ে যা করছেন, তা ওই ঝোপ বুঝে কোপ মারারই কৌশল। সরকার ভাড়া বাড়িয়েছে, মালিক-চালক-বিআরটিএর মধ্যে চুক্তিও হয়েছে। কাজে দিয়েছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত। এখন আদালত আর ভ্রাম্যমাণ নয়, তাই সিএনজির ভ্রাম্যমাণ চালকেরা আবার আগের নিয়মে ফিরেছেন। যেমন খুশি ভাড়া নিচ্ছেন, মর্জিমাফিক গন্তব্যে যাচ্ছেন বা যাচ্ছেন না—এই অনিয়মই এখন নিয়ম। কিন্তু তাতে ভোগান্তির একশেষ হচ্ছেন যাত্রীরা। ঢাকা মহানগরের চলাচল যে কঠিন ছিল, সেই কঠিনই আছে।
সিএনজিচালকদের অভিযোগ ছিল, খরচ অনুযায়ী ভাড়া কম। অভিযোগ ছিল, মালিকেরা বেশি জমা নেন। দুটি অভিযোগেরই সুরাহা করার চেষ্টা হয়েছিল ওই চুক্তিতে। এখন কোনো মালিক যদি বেশি জমা রাখেন, তাহলে তাঁর রুট পারমিট বাতিল হওয়ার কথা, চালক যদি বেশি ভাড়া দাবি করেন, তো তাঁরও লাইসেন্স বাতিল হওয়ার কথা। প্রশ্ন হলো, বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? ভ্রাম্যমাণ আদালত চললে সবাই চাপে থাকে। আদালত না চললে যার যা খুশি তা-ই করেন।
গত বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোয় যাত্রীদের এই ভোগান্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। এমন নয় যে যাত্রীরাও কখনো বাড়াবাড়ি করেন না, এমন নয় যে ট্রাফিক ও পুলিশের কাছে সিএনজিচালকেরা কখনো হয়রানি হন না। কিন্তু সবাইকে অগ্রাহ্য করে, চুক্তির বরখেলাপ করে রাস্তার রাজা হওয়া যাবে না, এই পরিস্থিতি সিএনজিচালকদের বুঝতে হবে। সাধারণ মানুষকে জ্বালিয়ে তাঁরাও তাঁদের পেশাগত সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন না।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও পুলিশকে এ ব্যাপারে তৎপর হতে হবে। ৯ মার্চ এ বিষয়ে যোগাযোগমন্ত্রী সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক-চালক ও পুলিশকে নিয়ে বৈঠকে বসবেন। সেখানেই এর সমাধান হওয়া দরকার। চালকদের ক্ষোভ ও হতাশার প্রতিকারের দিকেও নজর দেওয়া উচিত। পরিবহন আইন সব পক্ষকে মেনে চলতে হবে। প্রয়োজনে সিএনজিচালকদের অনিয়মের তাৎক্ষণিক প্রতিকারের ক্ষমতা ট্রাফিক পুলিশকে দিতে হবে এবং তারা আত্মসেবায় মগ্ন না থেকে যাত্রীসেবার প্রতি যত্নবান হবেন, সেটাই প্রত্যাশিত।

গোধরা হত্যাকাণ্ড এখনো এক রহস্য by কুলদীপ নায়ার |

গোধরা ট্রেন জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনার রায় দিয়েছেন বিশেষ আদালত। ৩১ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং বেকসুর খালাস পেয়েছেন ৬৩ জন। এই নিরীহ ৬৩ জনকে নয় বছর ধরে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে মাওলানা উমরজিকে এই হত্যাযজ্ঞের ‘হোতা’ হিসেবে ত্রাণশিবির থেকে আটক করা হয়েছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। সম্ভবত একজন নেতা হিসেবে তাঁর বিচার গোড়া থেকেই ভুল ছিল। যখন তাঁর সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণই পাওয়া যায়নি, তখন বলা যায় তাঁকে ফাঁসানো হয়েছিল বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে।
আমি বরং ষড়যন্ত্রের অভিযোগটি নিয়ে বেশি চিন্তিত। বলা হচ্ছে, ষড়যন্ত্র ‘প্রমাণিত’ হয়েছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারা নিযুক্ত বিশেষ তদন্তকারী দলের (এসআইটি) প্রধানও বলেছেন, ‘আদালতের রায় পেশাদারি জায়গা থেকেও সন্তোষজনক।’ সম্ভবত, তিনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ষড়যন্ত্রের ওপর জোর দেবে, কারণ তাহলে গুজরাটের দাঙ্গা তাদের দিক থেকে জায়েজ হয়।
দাঙ্গাকে প্রতিশোধ হিসেবে চিহ্নিত করে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে বলেছিলেন ‘সমান ও বিপরীত’ আচরণের কথা, সেটাই এতে জোরদার হলো। ভবিষ্যতে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের বেলায় এ ঘটনা প্রভাব ফেলবে।
গোধরা ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যে যাঁরা সেখানে ছুটে গিয়েছিলেন, আমি তাঁদের একজন। আমি সেখানে গিয়েছিলাম, যেখানে তখনো সেই অগ্নিদগ্ধ ট্রেনের কামরাটি দাঁড়িয়ে ছিল। জায়গাটি থেকে কিছুটা দূরে মুসলমানদের বসতি। জায়গাটি আবার এত কাছে নয় যে ট্রেনটি স্টেশন ছাড়ার পর লোকজনের পক্ষে সেখানে দৌড়ে যাওয়া সম্ভব।
ষড়যন্ত্রতত্ত্ব অনুসারে, চলন্ত ট্রেনে লাফিয়ে উঠে তীর্থযাত্রীদের কামরায় ঢুকে আগুন দেওয়ার জন্য মুসলমানরা রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এই ন্যক্কারজনক কাজের একটা উদ্দেশ্য তো তাদের থাকতে হবে। কিন্তু সেখানকার মুসলমানরা যত ‘খারাপই’ হোক, হিন্দু বা গুজরাটিদের সঙ্গে তাদের কোনো নতুন বা পুরোনো শত্রুতা কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিছুই ছিল না।
সে সময় দেশেও এমন কিছু ঘটেনি, যাতে কোথাও না কোথাও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং অন্য কোথাও সেই উত্তেজনার প্রকাশ ঘটবে। গোধরার সেই মুসলমানপল্লির লোকেরা ট্রেনের কামরাভর্তি তীর্থযাত্রীদের পুড়িয়ে মেরেছে এমন কল্পনা কেবল শয়তানি মনেরই ফসল হতে পারে, আইনি যুক্তিতে নয়।
যে মামলার ৬৩ জন আসামিই নিরীহ প্রমাণিত হয়, ধরে নিতে হবে সেই মামলার তদন্তে গুরুতর গলদ ছিল। পুলিশ যে রদ্দিমার্কা কাজকর্ম করেছে, তা প্রমাণিত হয় প্রায় ৯৯ ভাগ অন্ধ এক সরকারি কর্মচারীকে আসামি করায়, যিনি আবার ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে ছিলেন।
গোধরা হত্যাকাণ্ডের দুই বছরের মাথায় একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় যে ট্রেনের কামরায় আগুন লাগাটা ছিল একটা দুর্ঘটনা। সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারক ইউ সি ব্যানার্জি একটি প্রতিবেদনে লিখেছেন: ‘বাইরের কোনো উপাদান ছাড়াই সেখানে আগুন লেগেছিল।’ কিন্তু মোদি সরকারের নিযুক্ত বিচারপতি নানাবতী কমিশন এই উপসংহারে পৌঁছে যে আগুন দুর্ঘটনাজনিত কারণে লাগেনি। ট্রেনের সেই কামরাটি জ্বালিয়ে দিতে পেট্রল ব্যবহার করা হয়েছিল।
দুটি বিচারিক পর্যবেক্ষণ পরস্পরকে কাটাকাটি করে দেয়। এসব কিছুর পরে মনে হচ্ছে, সঠিক বিবরণ হাত পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মোদি নিজেই গোধরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, কারণ তিনি চাইছিলেন তাঁর রাজ্যের মুসলমানদের ‘শায়েস্তা’ করতে। হয়তো এর একটা সুরাহা করায় কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (সিবিআই) ওপর নির্ভর করা যেত, কিন্তু সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বিভাগ হওয়ায় তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। সাধারণভাবে ভাবা হয় যে সিবিআই সর্বদা ক্ষমতাসীন দলের দ্বারা প্রভাবিত থাকে।
গোধরা ঘটনার তুলনায় গুজরাটের দাঙ্গা বিষয়ে এসআইটির তদন্ত অনেক সফল। তাদের তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না করায় আমি বিস্মিত। গত মে মাস থেকে এটা নিয়ে আদালত গড়িমসি করছেন। এটা প্রকাশের জন্য বর্তমান সময়ই হলো সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। গোধরা বিষয়ে বিশেষ আদালতের রায় যত না প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, তার থেকে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এসআইটির প্রতিবেদন দেখিয়েছে, গুজরাটের অপরাধ বিচারের ব্যবস্থাকে কীভাবে মোদি সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, দাঙ্গার চরম মুহূর্তে মোদি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘আক্রমণাত্মক’ ও ‘দায়িত্বহীন’ মন্তব্য করেছেন। সেখানে আরও বলা হয়, ‘গুজরাট সরকার দাঙ্গার শিকারদের সুবিচার দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’
মোদি সরকারের সব থেকে খারাপ কাজ হলো, দাঙ্গার সময় পুলিশের ওয়্যারলেস কথাবার্তার সব রেকর্ড নষ্ট করে ফেলা। তাহলেও একজন সাহসী পুলিশ কর্মকর্তা তদন্ত দলের কাছে হারিয়ে যাওয়া সেসব নথিপত্র সরবরাহ করেন। বিনিময়ে গুজরাট সরকার তাঁর বিরুদ্ধে বিধিভঙ্গের অভিযোগ আনে। দেখে খুবই হতাশ লাগল যে এ ব্যাপারে পুলিশের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে রা করা হয়নি।
আমি আশা করি, একটি মিথ্যা এনকাউন্টারের বিরুদ্ধে রিট পিটিশনের আবেদনের জবাবে সুপ্রিম কোর্ট নতুন করে তদন্তের যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আমি দ্রুতই তার বাস্তবায়ন চাই। বিচারপতি নানাবতীর নেতৃত্বে কমিটি গঠনের পক্ষপাতী ছিলাম না আমি। তাঁকে নিযুক্ত করা হয়েছে নয় বছর হলো, অথচ এখন পর্যন্ত তিনি প্রাথমিক প্রতিবেদনও দিতে পারেননি। বিজেপি বলেছিল, চার মাসের মধ্যে সব জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। কিন্তু সেই ঘটনার পর ১১ বছর অতিবাহিত হলেও মোদি বা বিজেপির কোনো বিবেকদংশন নেই। উল্টো গোধরা বিচারের রায় তাদের আরও বাহাদুরি করার ব্যাপারে উৎসাহী করে তুলল।
গালফ নিউজ থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

ব্র্যাডলি ম্যানিংকে ‘অদ্বিতীয় নায়ক’ বললেন অ্যাসাঞ্জ

উইকিলিকসের কাছে গোপন নথি সরবরাহ করার সন্দেহে গ্রেপ্তার মার্কিন সেনা ব্র্যাডলি ম্যানিংকে ‘অদ্বিতীয় নায়ক’ আখ্যা দিয়েছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের আইটিভি নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ম্যানিংকে এই আখ্যা দেন।
সাক্ষাৎকারে অ্যাসাঞ্জ বলেন, ম্যানিংকে বিনা বিচারে আগামী ১০ মাস নির্জন কারাগারে থাকতে হবে, যা অন্যায়।
অ্যাসাঞ্জ বলেন, অভিযোগ সত্যি বা মিথ্যা যা-ই হোক না কেন, ম্যানিং এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক বন্দী। অভিযোগগুলো সত্যি হলে তিনি হবেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক।
অ্যাসাঞ্জ বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকিয়ে দেখুন, সামান্য কিছু তথ্য ফাঁস করেছি; তাতেই টালমাটাল অবস্থা।’
ম্যানিংয়ের আইনজীবী ডেভিড কুম্বস অভিযোগ করেন, তাঁর মক্কেলকে কারাকক্ষে সাত ঘণ্টা নগ্ন রাখা হয়েছে।
ম্যানিংয়ের সমর্থকেরা দাবি করেন, তাঁকে ভার্জিনিয়াভিত্তিক নৌবাহিনীর একটি ঘাঁটিতে ‘একটি গর্তের ভেতর’ রাখা হয়েছে। পেন্টাগন অবশ্য এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র জীবিত ব্রিটিশ সেনার জন্মদিন পালিত

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একমাত্র জীবিত ব্রিটিশ সেনা ক্লদ কুলেস গতকাল শুক্রবার তাঁর ১১০তম জন্মদিন পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি অন্ধ ও বধির, তবে মানসিকভাবে পুরোপুরি চাঙা।
ক্লদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যুক্তরাজ্য থেকে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে চলে আসেন। বর্তমানে তিনি সেখানকার একটি বৃদ্ধনিবাসে বাস করছেন।
ক্লদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বয়স ভাঁড়িয়ে সেনাবাহিনীতে ভর্তির চেষ্টা করেন। কিন্তু বয়স কম থাকায় সেনাবাহিনীতে ভর্তি হতে ব্যর্থ হন। পরে ১৯১৬ সালে তিনি নৌবাহিনীতে যোগ দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর।

মনোনয়নের দৌড় শুরু তৃণমূলে

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে নির্বাচনী তৎপরতা শুরু হয়েছে। চলছে প্রার্থী নির্বাচনের প্রক্রিয়া। ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসে এই তোড়জোড় যেন বেশি।
এবার মমতার দলের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে নামার ব্যাপারে শুরুতে যাঁদের নাম শোনা গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট অভিনেতা রঞ্জিত মলিক, নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী, ব্রাত্য বসু, শাঁওলী মিত্র, সংগীতশিল্পী নচিকেতা, অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সুনন্দ সান্যাল, সাবেক আইএএস আমলা দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবেক সিবিআই কর্মকর্তা উপেন বিশ্বাস, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা রচপাল সিং, বিশিষ্ট চিকিৎসক সুদীপ্ত রায়, অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার। তবে শাঁওলী মিত্র, ব্রাত্য বসু ও অভিরূপ সরকার জানিয়েছেন, তাঁরা প্রার্থী হচ্ছেন না। তাঁরা বাইরে থেকে সহযোগিতা করবেন ও পরামর্শ দেবেন।
মমতা আগেই ঘোষণা করেছেন, যোগ্য ব্যক্তিকেই তিনি মনোনয়ন দেবেন। তদবিরে কাজ হবে না। ১৮ এপ্রিল থেকে ছয় দফায় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। ১০ মে তা শেষ হবে। ১৩ মে ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
এদিকে প্রার্থিতা নিয়ে বাম ফ্রন্টের শরিকদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ থাকলেও তা প্রকাশ পায়নি। বাম দল বিধানসভার ২৯৪ আসনেই প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছে। এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ওই তালিকা প্রকাশ করবে তারা।
তবে কংগ্রেস-তৃণমূল জোটের আসন ভাগাভাগি নিয়ে এখনো সমঝোতা হয়নি। এ নিয়ে দুই দলের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। কংগ্রেস বলেছে, তারা এক-তৃতীয়াংশ আসন চাইছে। সে ক্ষেত্রে তাদের ৯৪টি আসন দিলেই চলবে, কিন্তু তৃণমূল এতে রাজি হচ্ছে না। তারা কংগ্রেসকে ৪২টি আসন দিতে চাইছে। এই নিয়ে এখনো দুই দলের মধ্যে দর-কষাকষি চলছে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে বাম ফ্রন্ট পেয়েছিল ২৩৫টি আসন, কংগ্রেস পেয়েছিল ২১টি আর তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৩০টি আসন।

ভারতে আদভানিসহ ২১ জনকে সুপ্রিম কোর্টের নোটিশ

ভারতের বাবরি মসজিদ ধ্বংস মামলায় বিজেপির নেতা এল কে আদভানি, শিবসেনাপ্রধান বাল ঠাকরেসহ ২১ জনকে নোটিশ পাঠিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। গতকাল শুক্রবার তাঁদের এ নোটিশ পাঠানো হয়। সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) দায়ের করা একটি লিভ পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের এ নোটিশ দেন।
এর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মামলা থেকে ওই নেতাদের অব্যাহতি দিতে গত বছরের ২০ মে আহমেদাবাদ হাইকোর্টের লক্ষ্নৌ বেঞ্চ ওই নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ওই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে রায়ের নয় মাস পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে লিভ পিটিশন দায়ের করে সিবিআই। কিন্তু বিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে আপিলটি করার কথা। সিবিআই অবশ্য বিলম্বের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে পিটিশনটি আমলে নিতে একটি দরখাস্ত করেছিল সুপ্রিম কোর্টে।
দরখাস্তে সিবিআই জানায়, মামলাটি থেকে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ওই নেতাদের অব্যাহতি দিয়ে উচ্চ আদালতের রায় মেনে নেওয়া হলে তা ন্যায়বিচারের বড় ধরনের লঙ্ঘন হবে। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত গতকাল আদভানিসহ ওই ২১ নেতাকে নোটিশ দেন।

আমাজনে বিতর্কিত প্রকল্পের অনুমোদন দিলেন আদালত

আমাজনের অরণ্যে বিতর্কিত একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন ব্রাজিলের উচ্চ আদালত। আগের সপ্তাহেই নিম্ন আদালত পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে ওই প্রকল্পের কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন।
গত বৃহস্পতিবার ব্রাজিলের উচ্চ আদালত ওই প্রকল্পের জন্য মন্টি বেলো বাঁধ নির্মাণের অনুমতি দিয়ে বলেন, বাঁধ নির্মাণের জন্য সব শর্ত মানার প্রয়োজন নেই। তাই বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু করা যেতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বাঁধ নির্মিত হলে বন্যপ্রাণীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে। আশপাশের হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে।

লিবিয়ায় পশ্চিমা আগ্রাসন চায় না আরব বিশ্ব

লিবিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটে সরাসরি ভূমিকা রাখতে তোড়জোড় শুরু করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র এর মধ্যে রণতরী পাঠিয়েছে লিবিয়ার দিকে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, লিবিয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের এ ধরনের ভূমিকা চান না আরব বিশ্বের নেতারা। তাঁরা চান না লিবিয়া আরেকটি ইরাক হোক।
তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ায় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে গাদ্দাফিবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধে। অল্প সময়েই তা এটি সশস্ত্র বিক্ষোভে রূপ নেয়। এ অবস্থায় পশ্চিমা বিশ্ব লিবিয়ার আকাশ নো-ফ্লাইজোন হিসেবে ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিদ্রোহীদের ওপর গাদ্দাফি যাতে বিমান হামলা চালাতে না পারেন, তাই তারা উদ্যোগটি নিতে চাচ্ছে বলে প্রচার চালাচ্ছে। কারণ, নো-ফ্লাইজোন ঘোষণা করা হলে লিবিয়ার আকাশে উড্ডয়নকারী যেকোনো বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করার এখতিয়ার পেয়ে যাবে পশ্চিমারা।
এদিকে পশ্চিমাদের কাছ থেকে প্রস্তাবটি আসার পর গত বুধবার আরব লিগ জানিয়েছে, তারা এতে সমর্থন দেবে কি না, বিবেচনা করে দেখবে।
ব্রুকিংস দোহা সেন্টারের উপপরিচালক ইব্রাহিম বলেন, লিবিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালানোর প্রশ্নটি আরবদের জন্য খুবই স্পর্শকাতর। কারণ ইরাকেও এ রকম আগ্রাসন চালিয়ে দেশটি যে অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, লিবিয়ার ক্ষেত্রে সে পরিস্থিতি তাঁরা মেনে নেবেন না। যে লক্ষ্যের কথা বলে ২০০৩ সালে পশ্চিমা বিশ্ব ইরাকে আগ্রাসন চালিয়েছিল, এর কিছুই তারা অর্জন করতে পারেনি। বরং গৃহযুদ্ধের দিকে দেশটিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আরব-বিশ্লেষক ও সাংবাদিক জামিল মৌর বলেন, লিবিয়ার গাদ্দাফিবিরোধীরাও পশ্চিমাদের অযোগ্যতায় শঙ্কিত। তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ইরাক, আফগানিস্তানে ব্যর্থ হয়েছে। এসব দেশে নিরপরাধ অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এখনো দেশ দুটিতে শান্তি ফিরে আসেনি। লিবিয়ায়ও ওই পশ্চিমারা তাদের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

প্রতিরক্ষা-ব্যয় বাড়াচ্ছে চীন আসছে বিমানবাহী জাহাজ

চীন তার সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে। শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্টিলথ যুদ্ধবিমানের পর চীনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এবার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিমানবাহী জাহাজ। এ বছর চীনের প্রতিরক্ষা খাতে শতকরা ১২ দশমিক ৭ ভাগ বাজেট বাড়ানো হবে। এতে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় দাঁড়াবে ৯১ দশমিক ৫০০ কোটি ডলার। গতকাল শুক্রবার সে দেশের সরকারের এক মুখপাত্র এ তথ্য জানান।
ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এপিসি) বার্ষিক সম্মেলনের এক দিন আগে চীন তার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির এ ঘোষণা দিল। চীনের পার্লামেন্টের মুখপাত্র লিও ঝাওজিং গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রতিরক্ষা খাতের বাজেট বৃদ্ধি-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে (এপিসি) জমা দেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার এনপিসির বার্ষিক সম্মেলন। এ সম্মেলনে কমিউনিস্ট পার্টির পাঁচ বছরের পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করা হবে।
তবে সামরিক খাতে চীনের এই ব্যয় বৃদ্ধি আশপাশের দেশগুলোতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে। চীনের সামরিক শক্তি ক্রমাগত বৃদ্ধির এ উদ্যোগে জাপান ও তাইওয়ান উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তাদের দাবি, বেইজিংয়ের এ ধরনের শক্তি বৃদ্ধি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। ওয়াশিংটনও তাই মনে করে। তবে চীন বলে আসছে, তাদের এ উদ্যোগ অন্য কোনো দেশের জন্য হুমকি হতে পারে না।
মুখপাত্র লিও ঝাওজিং বলেছেন, চীন বরাবরই সামরিক খাত আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করার পক্ষপাতী। প্রতিরক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর ব্যাপারে মনোযোগ দিয়ে আসছে বেইজিং। তবে এবার দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় আরেক দফা বাড়ানো হলেও এ খাতে তা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় যথেষ্ট কম। চীন গত জানুয়ারিতে জে-২০ স্টিলথ যুদ্ধবিমানের পরীক্ষামূলক মহড়া দেয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস বেইজিং সফরকালে সামরিক শক্তির প্রদর্শন করা হয়।
চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও সে দেশের নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়ে আসছেন। তাঁদের রণতরীগুলো আরও আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, চীন চলতি বছরেই প্রথমবারের মতো বিমানবাহী জাহাজ উদ্বোধন করবে।
চীনের জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বিমানবাহী জাহাজগুলো ঝুঁকির মুখে পড়বে।
চীনের দ্বিতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর ভান্ডারে ১০০ থেকে ৪০০টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে। সামরিক শক্তিধর চীনকে তাই ভয়ের চোখে দেখে তাইওয়ান ও জাপান।

উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে কাটল আরেকটি সপ্তাহ

দেশের পুঁজিবাজার উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আরেকটি সপ্তাহ পার করল। সপ্তাহের পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দুই দিন চাঙা থাকলেও তিন দিন দরপতনের ঘটনা ঘটে। দরপতনকালে একদিন বিনিয়োগকারীরা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে রাস্তায় নেমে এলেও শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি সমাধান হয়। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে গত সপ্তাহটি অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবেই কেটেছে।
ডিএসই সূত্রে জানা যায়, রবি, সোম ও বুধবার ডিএসইতে শেয়ারে দাম পড়ে যায়। আর মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার বাজার চাঙা থাকে। সব মিলিয়ে গত সপ্তাহে ডিএসই সাধারণ সূচক ৩৭২ পয়েন্ট কমে। সপ্তাহের শুরুতে রোববার সূচক ছিল ৫৮০০ পয়েন্ট যা সপ্তাহ শেষে বৃহস্পতিবার ৬.৪২ শতাংশ কমে ৫৪২৮ পয়েন্টে দাঁড়ায়।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্যসূচক গত সপ্তাহে ১০০৬ পয়েন্ট কমে যায়। সপ্তাহের শুরুতে স্টক এক্সচেঞ্জটিতে সূচক ছিল ১৬৩৩০ পয়েন্ট, সপ্তাহ শেষে ১৫৩২৪ পয়েন্টে দাঁড়ায়। সিএসইতেও সপ্তাহের পাঁচ দিনের মধ্যে তিন দিন দরপতন হয়।
গত সপ্তাহে ডিএসইতে ২৬০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৩০টির, কমেছে ২২৮টি প্রতিষ্ঠানের। গত সপ্তাহে আর্থিক লেনদেন গড়ে প্রতিদিন ২৪.৬৬ শতাংশ কমে ৫০৩ কোটি টাকা করে হয়েছে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৬৬৮ কোটি টাকা। সাপ্তাহিক মোট লেনদেনের পরিমাণ ২৫১৭ কোটি টাকা।
একই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন ৫.১০ শতাংশ কমে দুই লাখ ৫০ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা সপ্তাহের শুরুতে ছিল দুই লাখ ৬৪ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।
গত সপ্তাহে লেনদেনে শীর্ষে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো—বেক্সিমকো, বেক্সটেক্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, বে লিজিং অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, প্রাইম ফিন্যান্স, গ্রামীণফোন, তিতাস গ্যাস, সাউথইস্ট ব্যাংক, লঙ্কাবাংলা ফিন্যান্স ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল।
সমাপনী মূল্যের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে দাম বাড়ায় শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এশিয়া ইনস্যুরেন্স, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় মিউচুয়াল ফান্ড, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ, ব্র্যাক ব্যাংকের ২৫% সাব কনভারটিবল বন্ড, সামিট পাওয়ার, বেক্সটেক্স, বাটা সু ও মেট্রো স্পিনিং।
সমাপনী মূল্যের ভিত্তিতে দাম কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো—ইস্টার্ন ব্যাংক, আইএলএফএসএল, প্রাইম ইনস্যুরেন্স, ঢাকা ব্যাংক, এইচআর টেক্সটাইল, চিটাগং ভেজিটেবল, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, জুট স্পিনার্স, সায়হাম টেক্সটাইল ও বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রডস।

ট্রেডমার্ক লঙ্ঘন মামলায় ফোর্ড ও ফেরারির মধ্যে মীমাংসা

ট্রেডমার্ক লঙ্ঘন নিয়ে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফেরারির বিরুদ্ধে ফোর্ড মোটরের দায়ের করা মামলার মীমাংসা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, মীমাংসা হয়েছে এ শর্তে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েটের আদালত থেকে ফোর্ড মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়। তবে মীমাংসার শর্তগুলো পরিষ্কার নয় বলে জানা গেছে।
মার্কিন গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ড মোটর ট্রেডমার্ক লঙ্ঘনের অভিযোগে ইতালির প্রতিষ্ঠান ফেরারির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। ওই মামলায় তারা অভিযোগ করেছিল যে জনপ্রিয় ফর্মুলা ওয়ান রেসিং গাড়ির ক্ষেত্রে ‘এফ-১৫০’ নামটি ব্যবহার করে ফেরারি ট্রেডমার্ক শর্ত ভঙ্গ করেছে।
ফেরারির বিরুদ্ধে দায়ের করা ওই মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, এ গাড়িতে ফেরারি যে লোগো ব্যবহার করছে, তা দেখতে তাদের এফ-১৫০ গাড়ির লোগের মতোই।
মামলা দায়েরের এক দিন পর ফেরারির পক্ষ থেকে বলা হয়, ফর্মুলা ওয়ান গাড়ির জন্য তারা তাদের কোম্পানির পূর্ণ নাম ব্যবহার করবে। তবে ফোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নতুন নামেও ‘এফ’ এবং ‘১৫০’ আছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রযোজকেরা মুক্তি দিচ্ছেন স্বল্প বাজেটের ছবি

বিশ্বকাপ ক্রিকেট ও ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের প্রভাব পড়েছে বলিউডে। ভারতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জ্বরে বলিউডের বড় তারকারা পরবর্তী ৯০ দিনের জন্য বড় বাজেটের ছবির কাজ বন্ধ রেখেছেন। আর প্রযোজক ও পরিবেশকেরা ঝুঁকেছেন ছোট বাজেটের ছবি মুক্তির দিকে।
বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ভায়াকম ১৮-এর তনু ওয়েডস মনু নামের ছবিটি মুক্তি দেয়। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ছবিটি ১০ কোটি রুপি আয় করে, যদিও ওই দিন ছিল ভারত-ইংল্যান্ডের ম্যাচ। ছবিটি তৈরিতে ১৭ কোটি রুপি খরচ হয়। এরই মধ্যে ছবিটি ১৮ কোটি রুপির বেশি আয় করেছে বলে জানা যায়।
ভায়াকম ১৮ মোশন পিকচারসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিইও) বিক্রম মালহোত্রা ছবিটি আরও ভালো চলবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তনু ওয়েডস মনু ছবির প্রোডাকশন হাউস ছবিটি বিদেশে প্রচারের জন্য জি টিভির কাছে বিক্রি করেছে। এর মাধ্যমে বিদেশ থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিক্রম মালহোত্রা বলেন, ‘আমরা দেশের জন্য ছবিটির ৮০০ কপি ও বিদেশের জন্য ৮০টি কপি তৈরি করেছি।’
এদিকে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ক্রিকেটের এই আয়োজনের জন্য বলিউডের ২৫০ কোটি রুপি মূল্যমানের কয়েকটি ছবির মুক্তি আটকে আছে।
ইরোস ইন্টারন্যাশনাল গত বছর গোলমাল ৩, দাবাং, হাউসফুল, এনথিরানসহ বেশ কিছু বড় বাজেটের ছবি মুক্তি দিয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানই আগামী ২৯ এপ্রিল চলো দিল্লি নামে স্বল্প বাজেটের অর্থাত্ মাত্র পাঁচ কোটি রুপির নতুন ছবি মুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন লারা দত্ত ও বিনয় পাঠক। ইরোস বিশ্বকাপ শেষে মুক্তির জন্য বড় বাজেটের জিন্দিগি না মিলেগি দোবারা, রা ওয়ান, এজেন্ট বিনোদ, দেশি বয়েজ, মৌসম ও রকস্টার ছবি রেখে দিয়েছে।
তার পরও ওয়ার্ল্ড কাপ ও আইপিএলের মধ্যবর্তী সময়ে অভিষেক বচ্চন ও কঙ্গনা রানাউত অভিনীত গেম ছবিটি আগামী ৮ এপ্রিল মুক্তির ঘোষণা দিয়েছে ইরোস।
এ ছাড়া আইপিএল অনুষ্ঠিত হওয়ার পর জুনে বড় বাজেটের বেশ কিছু ছবি মুক্তি পাওয়ার ব্যাপারে আশা করা হচ্ছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে বিক্রম ভাটের স্বল্প বাজেটের ত্রিমাত্রিক হরর ছবি হন্টেড, সাগর বালারির ভেজা ফ্রাই টু ও তিগমানসু ধুলিয়ার সাগরিদ ছবি মুক্তিরও সম্ভাবনা রয়েছে।

মেসিকে ছুঁলেন রোনালদো

টানা চার ম্যাচে গোল না পাওয়ার দুঃখ এক ম্যাচেই ভুললেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। পরশু মালাগার বিপক্ষে করেছেন হ্যাটট্রিক। রিয়াল মাদ্রিদও জিতেছে ৭-০ গোলে। মৌসুমে এটাই রিয়ালের বড় জয়। এই হ্যাটট্রিক রোনালদোকে বসাল লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা লিওনেল মেসির পাশে। দুজনেরই গোল সমান ২৭টি করে। আর এই জয়ে রিয়াল বার্সেলোনার সঙ্গে পয়েন্টের ব্যবধান ৭-এ নামিয়ে আনল। ২৬ ম্যাচে বার্সেলোনার পয়েন্ট ৭১, রিয়ালের ৬৪। একটি দুঃসংবাদও আছে। খেলা শেষের ১০ মিনিট আগেই চোট নিয়ে মাঠ ছাড়া রোনালদো খেলতে পারবেন না আগামী ১০-১৫ দিন

সবকিছু হঠাৎই সাদা-কালো

শেরেবাংলা স্টেডিয়ামমুখো নাতিপ্রশস্ত সড়কটির নাম হয়ে গেছে বিশ্বকাপ সরণি। রাস্তার চারপাশে লাল-সবুজের সজ্জা। ব্যানার-ফেস্টুনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার রং। কাল মধ্যদুপুরের উষ্ণতায় এই লাল রংকে মনে হচ্ছিল বড় বেশি গাঢ়। সবুজকে মনে হচ্ছিল সর্বগ্রাসী সবুজ। এর মধ্যে বাঙালির সমস্ত চেতনার রং গিয়েছিল মিশে। লকলক করছিল জয়ের ক্ষুধা।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম বিশ্বকাপের প্রথম বলটি মাঠে গড়ানোর আগে থেকেই উৎসবপুর। কিন্তু কালকের দুপুরটা বিকেলের কোলে ঢলে পড়ার আগেই সেখানকার নাম হয়ে গেল হতাশাপুর, বেদনাপুর, লজ্জাপুর কিংবা অপমানপুর। বাংলাদেশ জিততে চেয়েছিল। ক্যালিপসো সুর থামিয়ে দিয়ে প্রবল হয়ে উঠতে চেয়েছিল এই দেশের বিজয়ের গান। কিন্তু স্টেডিয়ামটি স্তব্ধ হয়ে গেল। করুণতম কোনো রাগিণী বাজল। ম্যাচটি আরেকটি বিজয়ের বার্তা দিতে গিয়ে চরম লজ্জায় ডুবল। বাংলাদেশ তার ২৪১তম ওয়ানডেতে সর্বনিম্ন রান করে পেল সবচেয়ে বাজে পরাজয়। ১৮.৫ ওভারে মাত্র ৫৮ রানে অলআউট বাংলাদেশ হারল ৯ উইকেটে। কমপক্ষে ৭ ঘণ্টা আয়ু পাওয়ার কথা যে ম্যাচের, সেটি শেষ হলো ২ ঘণ্টা ১৪ মিনিটে। কোথায় রং, কোথায় সুর! চারদিকে শুধু সাদা-কালো।
ম্যাচ আসলে শেষ হয়ে গিয়েছিল কেমার রোচের বলে আশরাফুল যখন উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে এলেন। স্কোর কার্ডটা তখন ৮ উইকেটে ৫৬ হয়ে বেদনার পদাবলি। আর শেষ ব্যাটসম্যান রুবেল হোসেন সুলিমান বেনের বাঁহাতি স্পিনে বোল্ড হওয়ার পর কার্যত কফিনবন্দী বাংলাদেশের ম্যাচ। গ্যালারি থেকে চার, ছয়ের প্ল্যাকার্ডগুলো উড়ে উড়ে এল ক্ষোভের পাথর হয়ে। সীমানা দড়ির কাছ ঘেঁষে থাকা হলুদ পোশাকের ‘হিমু মার্কা’ ঢুলিরা আত্মরক্ষার জন্য দৌড়ে সরে এলেন। কাগজের প্ল্যাকার্ডকেই এত ভয়! বাঁচোয়া যে, পানি কিংবা কোমল পানীয়র বোতল ঢুকতে পারেনি। ক্ষোভের প্রকাশটা স্টেডিয়ামে ততটা তীব্র ছিল না। দর্শকমনে প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রতিবর্তী ক্রিয়াই তো কাজ করতে পারেনি। এমন হার যে তাদের চোখেও একটা বিভ্রম।
প্রতিক্রিয়া হলো বাইরে। মুখে লাল-সবুজ আঁকা তরুণ-তরুণীরা হতাশায় মুহ্যমান। দক্ষিণের প্রবেশ দুয়ারে উত্তেজিত মিছিল, তাতে জ্বালাময়ী স্লোগান উঠতে থাকল বাংলাদেশের অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে, ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে। জুতা-স্যান্ডেল ছড়ানো-ছিটানো। এসব কি স্লোগানের অনুষঙ্গ হয়ে হাতে উঠেছিল? ১০ নম্বর গোল চত্বর পেরিয়ে এসে রাস্তায় দেখা গেল অনেক কাচের টুকরো। বাসের ভাঙা গ্লাস। সমর্থকের হতাশার ঢিলের শিকার কাচগুলো? তবে সাকিবরা যেমন বলেন, সেই কথারও প্রমাণ পাওয়া গেল। কিশোর ভাইপোকে নিয়ে খেলা দেখতে এসেছিলেন সেগুনবাগিচার তুহিন। ছয় হাজার টাকা দামের দুটি ভিআইপি টিকিট ২৫ হাজার টাকায় কিনে। হতাশা ছাপিয়ে তাঁর কণ্ঠে বাজল সাকিবদের জন্য প্রবল সমর্থনের সুর, ‘খুব হতাশ। একটা বাজে দিন গেল আমাদের। খুবই বাজে। তবু আমি বাংলাদেশ দলের পেছনে আছি। এই দলটাই আমাদের জেতায়, এরাই আবার আমাদের জেতাবে। দেখবেন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আমরা জিতব।’
চার বছরের ফুটফুটে মেয়ে সুমনা তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, বাংলাদেশ কি হেরে গেছে?’ বিমর্ষ বাবা জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, মা, বাংলাদেশ পচা খেলে হেরে গেছে।’ কিন্তু অবুঝ মেয়েটিকে তিনি উত্তর দিতে পারতেন, ‘২ ঘণ্টা ১৪ মিনিটে কী ভয়ানক লড়াই হলো মা যে, শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা...।’
অভিশপ্ত একটি বিকেলে সাকিবদের ‘লড়াই’টা বড় দুঃখের। বেদনায় ছেয়ে গেছে সমর্থকদের অন্তর। ক্ষোভের আগুন জ্বলেছে। কষ্টের নীল স্রোত বয়ে গেছে। তার মাঝেও বাংলাদেশ দলের পেছনে সমর্থনের মিছিল। কী বলবেন একে? আনন্দ-বেদনার কাব্য, ক্রিকেটপ্রেমের মায়াবী বিভ্রম!

কিউইদের কাছে উড়ে গেল জিম্বাবুয়ে

অলক্ষ্যে একটা মৃদু ভূমিকম্প হয়েছিল কাল। পৃথিবীর কোনো রিখটার স্কেলে মাপা যায়নি সেই ভূমিকম্পের মাত্রা। টের পেয়েছিল কেবল দুটো দল। মিরপুরে বাংলাদেশ, আহমেদাবাদে জিম্বাবুয়ে!
পার্থক্যও আছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ নামের সেই ভূমিকম্পের আঘাতে বাংলাদেশের ইনিংসে ভেঙে পড়েছে তাসের ঘরের মতো। আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলার পরও লড়াই করে স্কোরটাকে একটা ভদ্রস্থ চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছে জিম্বাবুয়ে। ষষ্ঠ, অষ্টম আর নবম—এই তিন উইকেট জুটিতে ১০৮ রান আসায় অলআউট হওয়ার আগে ১৬২ পর্যন্ত গিয়েছিল জিম্বাবুয়ে।
পরিণতি অবশ্য একই। নিউজিল্যান্ডের কাছে ১০ উইকেটেই হারতে হয়েছে। মার্টিন গাপটিলের ৮৬ আর ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ৭৬ নির্বিঘ্নে নিউজিল্যান্ডকে পৌঁছে দিয়েছে জয়ের বন্দরে।
শুরু থেকেই নড়বড়ে ছিল টস জিতে ব্যাট করতে নামা জিম্বাবুয়ে। প্রথম দুটো পাওয়ার প্লের ১৫ ওভারেই তারা হারায় ৫ উইকেট। শুরুটা হয়েছিল রানের খাতা খোলার আগে চার্লস কভেন্ট্রির বিদায়ে। এর মধ্যে ড্যানিয়েল ভেট্টোরির করা ১৫তম ওভারের প্রথম আর তৃতীয় বলে এলটন চিগুম্বুরা আর রেজিস চাকাভা বিদায় নিলে ৫০ রানের আগেই ৫ উইকেটের পতন।
প্রথম প্রতিরোধ ষষ্ঠ উইকেটে। ব্রেন্ডন টেলর আর গ্রেগ ল্যাম্ব মিলে যোগ করেন ৪০ রান। স্টাইরিস এলবিডব্লুর ফাঁদে ফেলেন টেলরকে। খানিক পরে ভেট্টোরির দুর্দান্ত রানআউটের শিকার ল্যাম্ব। জিম্বাবুয়ে ৮৯/৭। এরপর শুরু হয় সাবেক অধিনায়ক প্রসপার উতসেয়ার প্রতিরোধ। ক্রেমারের সঙ্গে ৩৩ আর প্রাইসের সঙ্গে যোগ করেন ৩৫ রান। প্রাইস-উতসেয়া দুজনকেই তুলে নিয়ে জিম্বাবুয়েকে ১৬২ রানে আটকে ফেলেন টিম সাউদি।
বছর তিনেক আগে একবার বাংলাদেশের বিপক্ষে ৬ ওভারেই ম্যাচ শেষ করে ফেলেছিলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম। কাল লক্ষ্যটা অবশ্য একটু বড় ছিল। তা ছাড়া গত ম্যাচে শোকসন্তপ্ত নিউজিল্যান্ড হেরেও গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছে। ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত দেশের মানুষের জন্য একটা জয় এনে দিতে চেয়েছিলেন ভেট্টোরি। সেই চাওয়া অবশেষে পূর্ণ হলো ভেট্টোরিদের।

পন্টিংদের পরীক্ষার নাম মালিঙ্গা

আমার বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়া-শ্রীলঙ্কা ম্যাচটি খু-উ-ব রোমাঞ্চকর হবে। এ ম্যাচটিই হয়তো ঠিক করে দেবে ‘এ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হবে কোন দল। পাকিস্তানের বিপক্ষে জিতলে শ্রীলঙ্কাই থাকত ভালো অবস্থায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শ্রীলঙ্কা ব্যাটিং-পথ হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের চেয়ে খারাপ খেলেই হেরেছে।
শ্রীলঙ্কা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কোন পরিকল্পনা নিয়ে নামে, তা দেখার জন্য মুখিয়ে আছি। আমার কাছে মনে হয়, শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং লাইনআপ ওপরের দিকে ভারী হয়ে গেছে। অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের সবাই টপ-অর্ডারে। এতে হয়তো দলের সেরা ব্যাটসম্যানরা বেশি বল খেলার সুযোগ পাচ্ছে। তবে দ্রুত দু-তিনটি উইকেট পড়ে গেলে কিন্তু এই রণকৌশল বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গত ম্যাচে এটাই হয়েছে। দ্রুত উইকেট পড়ে যাওয়ার পর চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি মিডল-অর্ডার।
অস্ট্রেলিয়াও এই ম্যাচে কয়েকটি হিসাব মাথায় রেখে নামবে। লাসিথ মালিঙ্গা এখন আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। চোটের কারণে মাঝেমধ্যে খেলতে পারে না, তবে শতভাগ ফর্মে থাকলে ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের জন্য সে আতঙ্ক। মাইক হাসি না থাকায় অস্ট্রেলিয়ার টপ-অর্ডারের সবাই ডানহাতি। মালিঙ্গাকে সামলাতে ওদের দক্ষতার চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে হবে। একটা ব্যাপারে বিস্মিত হয়েছি, কেউ আম্পায়ারদের তাদের টুপি খুলতে অনুরোধ করেনি। কারণ সাদা বলে খেলা হলে আম্পায়াররা সাদা টুপি পরে থাকলে সমস্যাই হয়।
আমার দুশ্চিন্তা শুধু মালিঙ্গার ফিটনেস নিয়ে। সব সময়ই ওর বিকল্প কাউকে প্রস্তুত রাখা দরকার। টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে ও যদি বাইরে চলে যায় এবং কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই বিকল্প হিসেবে একজনকে নামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তো সেটা ভয়ংকর ব্যাপার হবে।
বোলিংটা এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো স্কোরই জয়ের জন্য নিরাপদ মনে হচ্ছে না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টাই ম্যাচের পর ভারত তাদের বোলিং নিয়ে আবার ভাববে বলেই মনে হয়। যারা ভেবেছিল ভারতের দুর্দান্ত ব্যাটিং পুষিয়ে দেবে বোলিংয়ের দুর্বলতা, তাদের নড়েচড়ে বসতে হবে। এমন ব্যাটিং-স্বর্গ কন্ডিশনে রান বাঁচানোটা সোনার মতোই মূল্যবান। আমার কাছে মনে হচ্ছে, শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ বা চারজনের জায়গায় পাঁচজনের বোলিং আক্রমণই হতে পারে ভারতের সমস্যার সমাধান।
ইংল্যান্ডের অঘটনের পর আয়ারল্যান্ডকে ভারত হালকাভাবে নেবে না। আবার দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের আগে ব্যাটিং-বোলিং সমন্বয়টা পরীক্ষা করে নেওয়ারও এটাই সুযোগ।

স্যামিও অবাক

এই বাংলাদেশ যেন অচেনা তাঁর কাছেও। কাল ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ড্যারেন স্যামি খোলাখুলিই বললেন, এভাবে তাঁর দল জিতবে, সেই আশা তিনিও করেননি, ‘আমরা জিতেছি ঠিক আছে। কিন্তু এত সহজে জিতব, সেটা আশাই করিনি। তবে আজ আমরা দেখিয়ে দিয়েছে, সবাই পুরো একটা দল হয়ে খেললে আমাদের পক্ষে সবকিছুই করা সম্ভব।’
কিন্তু কী রহস্য এই সাফল্যের? বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের নির্বুদ্ধিতা? আত্মহননের প্রবৃত্তি? নাকি সেটা করতে বাধ্য করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররাই? সহজ-সরল স্যামি অবশ্য বেশি ঘোরপ্যাঁচে গেলেন না, ‘আমরা আসল কাজগুলো ঠিকঠাক করতে চেয়েছি। ঠিক জায়গায় বল ফেলেছি। আমাদের একটা পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনা কাজে দিয়েছে।’
তাঁর অধিনায়কত্বেরও প্রশংসা করছেন অনেকেই। স্যামি নিজেও আজ বল হাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ধ্বংসযজ্ঞে। গেইলের উপস্থিতির পরও এই দলে ধীরে ধীরে যেন নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। স্যামি মানলেন, ‘নিজের ওপর আমার আস্থা আছে। অধিনায়ক হিসেবে আপনি সব সময়ই ভালো খেলতে চাইবেন। আমি কঠোর পরিশ্রম করেছি বলেই এই ফল পেয়েছি। এখন আমাকে ধারাবাহিক হতে হবে।’
পর পর দুই ম্যাচে দুটি দাপুটে জয় কি তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও ফেবারিট করে তুলল? র্যাঙ্কিংয়ের নয় নম্বরে থাকা দলটির অধিনায়ক অবশ্য বাস্তববাদী, ‘দেখুন, সবকিছু একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। কোচ আর আমি মিলে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা জানি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের গৌরবময় একটা ইতিহাস আছে। আমরা তাই ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে হাঁটছি। এই মুহূর্তে আসলে আমরা অনেক দূরে তাকাচ্ছি না। আগেও বলেছি, আমরা একটা একটা ম্যাচ ধরে এগোতে চাই। এখন আমাদের লক্ষ্য তাই আয়ারল্যান্ড।’
সর্বশেষ এই বাংলাদেশের কাছে লজ্জায় ডুবেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। খর্বশক্তির ওই দলটি টেস্ট-ওয়ানডেতে হয়েছিল হোয়াইটওয়াশ। স্যামি নিজেও খেলেছেন ওই দলে। কাল কি তবে প্রতিশোধ নিলেন? স্যামির উত্তর, ‘সুইট রিভেঞ্জ!’

‘আমরা সত্যিই দুঃখিত’

গতকাল শুক্রবার দিনটিকে অনেকেই এদেশের ক্রিকেটের কৃষ্ণতম দিন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশ মাত্র ৫৮ রানে অল আউট হয়ে যাওয়ায় হতাশায় নুইয়ে পড়েছিল গোটা দেশ ও জাতি। ক্রিকেটামোদীদের হতাশা, লজ্জা, ক্ষোভ-যাই বলা হোক না কেন, দিনের শেষে সবকিছু ছাপিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছিল একটি অপ্রত্যাশিত লজ্জার খবর। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল যখন স্টেডিয়াম থেকে হোটেলে ফিরছিল, ঠিক সেই সময়ই একদল উচ্ছৃঙ্খল দর্শক তাদের টিম বাসে ইট ছুঁড়ে জন্ম দিয়েছিল, জাতীয় দলের ৫৮ রানে অল আউট হয়ে যাওয়ার থেকেও বড় লজ্জার ঘটনা। মুহূর্তে এই ঘটনা শিরোনাম হয়ে যায়, সারা বিশ্বের প্রধান সব গণমাধ্যমেই। সত্যিকারের ক্রিকেট প্রিয় মানুষ শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল একদল কাণ্ডজ্ঞানহীন দর্শকের বিবেকহীন হঠকারিতায়।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ক্রিস গেইল তাঁদের বাস আক্রান্ত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এই লজ্জাজনক ঘটনার বার্তা টুইটারে তুলে দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘জঘন্য ব্যাপার..বাংলাদেশ আমাদের বাসে পাথর ছুড়ছে!!! কাচ ভেঙে গেছে!!! এটা যা-তা ব্যাপার-বিশ্বাস করতে পারছিনা-এরপর কি...বুলেট!!!’ ক্রিস গেইল লিখলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের বাসে পাথর ছুড়ছে।’ কি ভয়ানক !! মাত্র কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল মানুষের মুহূর্তের হঠকারিতা আমাদের গোটা দেশের মুখে কালিমা লেপে দিল। গেইল বলে কিনা, বাংলাদেশ পাথর ছুড়ছে!!!
ব্যাপারটি একেবারেই মেনে নিতে পারলেন না, ঢাকায় বসবাসকারী কয়েক যুবক। তাঁরা এটাকে ‘মায়ের কয়েকজন কুসন্তানের অপরাধ’ হিসেবেই দেখলেন। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকে তাঁরা গঠন করলেন একটি গ্রুপ, যার নাম, ‘লেটস সে সরি টু আওয়ার গেস্ট’। সেই ফেসবুকের দল নিয়ে এই যুবকেরা আজ শনিবার সকালে এমন মহত্ একটি কাজ করেছেন, যাতে আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের সম্মান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল তথা বিশ্বকাপের কারণে এদেশে আসা বিদেশি অতিথিরা জেনেছেন, কাল সন্ধ্যার সেই দুঃখজনক ঘটনাটি ছিল আসলেই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।
আজ শনিবার খুব ভোরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল যখন ঢাকা ছাড়ছিল তার অনেক আগেই ‘লেটস সে সরি টু আওয়ার গেস্ট’ দলের সদস্যরা জড়ো হয়েছিলেন হোটেল শেরাটনের মূল ফটকে। তাঁরা হাতে ফুল ও দুঃখ প্রকাশ করে লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে জানাতে চেয়েছিলেন, ‘তোমরা আবার ভেবে বসো না যে তোমাদের বাসে গোটা বাংলাদেশ পাথর ছুঁড়েছে। যারা এই ঘৃণ্য কাজটি করেছে তাঁরা এই সমাজের খুবই নগন্য বিচ্ছিন্ন একটা অংশ।’
স্বাভাবিক নিরাপত্তা জনিত কারণেই এই দলের সদস্যরা সরাসরি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি ও অন্যান্য খেলোয়াড়দের হাতে সরাসরি ফুল তুলে দিতে পারেননি। কিন্তু তাঁরা ক্যারিবীয় দলের নিরাপত্তার তত্ত্বাবধান করা আইসিসির অন্যান্য কর্মকর্তাদের কাছে তাঁদের সেই ফুল ও শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। ড্যারেন স্যামি তাঁদের কাছে আসতে না পারলেও দূর থেকে হাত নেড়ে তিনি জানিয়েছেন, ‘তোমাদের শুভেচ্ছা আমরা গ্রহণ করছি।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের কাছে গোটা জাতির পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা এই দলের অন্যতম সদস্য ইফতেখার আল মাসুম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের কাছে গোটা জাতির পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করতে পেরে আমরা সত্যিই অনেকটা নির্ভার বোধ করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ কমপক্ষে তাঁরা তো দেশে ফেরার সময় জেনে গেল যে এই ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষ দুঃখিত, এটাই বা কম কি?’
মোটেও কম কিছু নয়। সত্যি বলতে কি, ইফতেখাররা আমাদের সকলকেই ভয়ঙ্কর একটি লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। তাঁদের সবাইকে অভিনন্দনের জানানোর পাশাপাশি, আর কোনোদিন এদেশের মাটিতে অতিথিরা যেন খারাপ অভিজ্ঞতার শিকার না হন, সে কামনাই থাকল।

রেফারেল পদ্ধতির সমর্থনে আফ্রিদি

ক্রিকেটে প্রযুক্তিভিত্তিক রেফারেল পদ্ধতির ব্যবহার শুরুর হওয়ার পর থেকেই চলছে নানামুখি বিতর্ক। বিশ্বকাপেও প্রথমবারের মতো এই পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সেই বিতর্কটা উঠেছে বেশ জোরেসোরেই। কয়েকদিন আগে ইংল্যান্ড-ভারতের শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটিতে ইয়ান বেলের আউট না দেওয়া নিয়ে রেফারেল পদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করেছিলেন ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। তার রেশ এখনও শেষ হয় নি।
তবে পাকিস্তান অধিনায়ক শহিদ আফ্রিদি বলেছেন ভিন্ন কথা। কানাডার বিপক্ষে রেফারেল পদ্ধতির ফায়দা নিয়ে দুইটি আউট পাওয়ার পর আফ্রিদি এখন এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেছেন, ‘আমার মতে রেফারেল পদ্ধতিটা খুবই ভালো। একটা সিদ্ধান্ত পুরো খেলারই চেহারা পালটে দিতে পারে। সুতরাং আমার মতে এটা অবশ্যই থাকা উচিত।’ শুধু থাকাই না, আফ্রিদি রেফারেল পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগটা আরো বাড়িয়ে দিতে চান। ‘প্রতি ম্যাচে দু’বারের জায়গায় রেফারেল পদ্ধতি ব্যবহূত হওয়া উচিত চারবার। দু’বারের সুযোগটা কমই মনে হচ্ছে। বড় ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে এটা আরো কার্যকরী হতে পারে’, বলেছেন আফ্রিদি।
এখন, অপেক্ষা রেফারেল পদ্ধতির পক্ষে আফ্রিদির সাফাই, এই বিতর্কে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করে কিনা।

‘অনেক আম্পায়ারই মুরালির অ্যাকশন নিয়ে সন্দেহপ্রবণ’

আজ থেকে পনেরো বছর আগে ১৯৯৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার মেলবোর্ন টেস্টটি আলোচনা ও বিতর্কের ঝড় তুলেছিল বিশ্বময়। সেই টেস্টে অস্ট্রেলীয় আম্পায়ার ড্যারেল হেয়ার শ্রীলঙ্কান ‘স্পিন যাদুকর’ মুত্তিয়া মুরালিধরনকে সাতবার ‘নো’ ডেকেছিলেন কেবলমাত্র তাঁর বোলিং অ্যাকশনের কারণে। হেয়ারের ভাষ্যমতে, মুত্তিয়া মুরালিধরন সেই ম্যাচে এমন কিছু অ্যাকশনে বল করছিলেন, যার স্বীকৃতি ক্রিকেটের কোনো আইনে নেই। সেই ঘটনাটি ক্রিকেট বিশ্বকে আক্ষরিত অর্থেই দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছিল। অনেকেতো হেয়ারকে একজন বর্ণবাদী আম্পায়ার হিসেবেই অভিহিত করে ফেলেছিলেন।
সেই ড্যারেল হেয়ার এরপরেও অনেকবার বিতর্কিত হয়েছেন। আইসিসিতো ১৯৯৫ সালের পর আর কোনোদিনই শ্রীলঙ্কার কোনো ম্যাচে হেয়ারকে আম্পায়ারিংয়ের দায়িত্ব দেয়নি। ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে দল নিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তত্কালীন পাকিস্তানি অধিনায়ক ইনজামাম-উল-হক। সেই বিতর্কের রেশ ধরে আইসিসি তাঁকে কিছুদিনের জন্য আম্পায়ারিং থেকেও দূরে সরিয়ে রেখেছিল। ২০০৮ সালে হেয়ার আম্পয়ারিং থেকে সরে দাঁড়ান। ততদিনে তাঁর ভাণ্ডারে জমা হয়েছে ৭৮টি টেস্ট ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা।
আজ ২০১১ সালে দাঁড়িয়েও মুত্তিয়া মুরালিধরন সম্পর্কে তাঁর দর্শনের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেটের মালিক এই অফস্পিনার যে বোলিংটা সবসময় আইন মেনে করেন না, তা এখনো মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন তিনি। শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়ার হেরাল্ড সান পত্রিকায় আজ শনিবার লেখা এক কলামে তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানের অনেক আম্পায়ারই ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে বলেছেন যে মুরালির অ্যাকশন নিয়ে তাঁদের মধ্যেও সন্দেহ রয়েছে।
অন্য আম্পায়ারদের মুরালির অ্যাকশন নিয়ে সন্দেহের কথা বলে তিনি লিখেছেন, ‘অন্যরা আসল ব্যাপারটি বিশ্বাস করলেও এটা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ কিছু করার সাহস তাঁদের নেই।’ তাঁদের ব্যাপারটি অনেকটা ‘আম্পায়ারিং করছি, নাম কামাচ্ছি, টাকা কামাচ্ছি, আমার কি ঠেকা’ টাইপের।
তবে, নিজের মনোভাব কখনোই বর্তমান আম্পায়ারদের মতো ছিল না বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন,‘আমি সেই পথে হাঁটিনি বলেইতো আমি বিতর্কিত আম্পায়ার।’ নিজের পেশা নিয়ে মনের গহিনে গুমড়ে ওঠা ক্ষোভটা যেন প্রকাশ করেই দিলেন ড্যারেল হেয়ার।
মুরালিধরনের অ্যাকশন নিয়ে অনেকবার বিতর্ক উঠলেও বারবারই তিনি আইসিসির কাছ থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। মুরালির সম্পর্কে আইসিসির বক্তব্য হচ্ছে, ‘সে যখন বোলিং করে, তখন তাঁর অ্যাকশন নিয়ে একটি চোখের ধাঁধাঁ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক, কারণ জন্মগত কারণেই তাঁর বাহু বেঁকে থাকে। অথচ ডেলিভারির সময় বোলারের বাহু অবশ্যই সোজা হতে হবে।’ আইসিসি এটাকে মুরালির জন্মগত শারিরীক ত্রুটি হিসেবে অভিহিত করে, চাকিংয়ের অভিযোগ থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছে অনেক আগেই। ব্যাপারটি আইসিসি কখনোই সঠিক করেনি বলে ধারণা হেয়ারের।
মুরালিধরন সবসময়ই অবৈধ অ্যাকশনে বল করে। শুধু তাই নয়, এবারের বিশ্বকাপেও সে একইভাবে বল করে যাচ্ছে বলেই নিজের কলামে মন্তব্য করেছেন হেয়ার। তিনি বলেছেন, ‘পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটিতেও দেখলাম মুরালি যেসব বলগুলোতে বেশি টার্ন পায়, সেই বলগুলো সে সন্দেহজনক অ্যাকশনে করে থাকে। ব্যাপারটি নিয়ে আইসিসির অবশ্যই ভেবে দেখা উচিত।’
তিনি তাঁর কলামে দুঃখ করেই লিখেছেন, একজন আম্পায়ারের দায়িত্ব ক্রিকেটের আইন-কানুনকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। আম্পায়ারের দায়িত্ব, ক্রিকেটের মাঠে সব দলের জন্যই সমান সুযোগ সৃষ্টি করা।