Tuesday, December 29, 2015

বাংলাদেশে ছয় হামলার পেছনে আইএস -আনন্দবাজার পত্রিকা

ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ছয়টি হামলার পেছনে আইএস জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। ঘাড়ে নিশ্বাস এবার, আইএস এখানে অপারেশনে নামছে- শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বার ইসলামিক স্টেটের হামলার লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ? আর শুধুই ‘নিশ্বাস’ ফেলা নয়। সম্ভবত, এই বাংলায়, আমাদের ঘাড়েই এসে পড়েছে আইএস।
নিছক ‘জিহাদি’র পক্ষে প্রচার বা লোক-নিয়োগের ছক নয়। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রের খবর, পুরোদস্তুর ‘অপারেশন’ চালানোর ফন্দি এঁটেছে আইএস জঙ্গিরা। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ঝাড়খন্ডে।
তা বোমা বিস্ফোরণ হতে পারে। হতে পারে জনবহুল এলাকায় ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি-বর্ষণের ঘটনা। বা আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা। যা কলকাতা, গুয়াহাটি, রাঁচির মতো ভারতের পুর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজধানী শহরগুলোকে কাঁপিয়ে দিতে পারে। আর শুধুই বিক্ষিপ্ত দু’-একটা বিস্ফোরণ বা আত্মঘাতী জঙ্গি হামলার ঘটনাই নয়, পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ঝাডখ-ে পাকাপাকি ভাবে নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তুলতে চাইছে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিরা। আর তার জন্য কোনও স্থানীয়, আঞ্চলিক বা জাতীয় স্তরের সন্ত্রাসবাদী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে ইতিমধ্যেই কাঁধে কাঁধ মেলাতে শুরু করে দিয়েছে আইএস। সিরিয়ার এই সন্ত্রাসবাদী সংগঠনটি ইতিমধ্যেই হাতে হাত মিলিয়েছে বাংলাদেশের ‘জামাত-উল-মুজাহিদিন’ (জেএমবি) ও জম্মু-কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান মূজাহিদিন’-এর সঙ্গে। তবে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, সংগঠন ও অভিযান চালানোর নিরিখে, পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ঝাডখ-ে সক্রিয় আইএস জঙ্গিরা বাংলাদেশের ‘জামাত-উল-মুজাহিদিন’ (জেএমবি)-এরই বেশি ঘনিষ্ঠ।
কী ভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন গোয়েন্দারা?
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা জানাচ্ছেন, ‘বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের ঘটনাতেই প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ‘জামাত-উল-মুজাহিদিন’ (জেএমবি) কী ভাবে, দ্রুত হারে কতটা ঘাঁটি গেড়ে ফেলেছে ভারতের মাটিতে। গত সাত বছরে জেএমবি হাজার হাজার ভারতীয় মুসলিমকে তাদের সংগঠনে ভিড়িয়েছে। অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছে। অসম ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিকে নিয়ে ‘বৃহত্তর মুসলিম বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার জন্য গত কয়েক বছর ধরেই জোর প্রচার শুরু করে দিয়েছে জেএমবি। খাগড়াগড়ের ঘটনায় জড়িতদের সামান্য কয়েক জনেরই নাগাল পেয়েছে পুলিশ, এনআইএ। বডসড় চাঁইরা এখনও ধরা পড়েনি। গত ৩১ অগস্ট ১২টি রাজ্যের পুলিশের ডিজি ও স্বরাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে পেশ হওয়া এক রিপোর্টে জানানো হয়েছিল, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু জায়গায় গত কয়েক মাস হল একেবারে মাঠে নেমে পড়েচে আইএস জঙ্গিরা। তাদের সমর্থনে জোর দেওয়াল লিখন চলছে ওই দু’টি জেলার বেশ কয়েকটি এলাকায়। আর সেই সব দেওয়াল লিখন মুছে ফেলাও হচ্ছে না। তার মানে, ওই সব এলাকায় কিছুটা হলেও, জনসমর্থন আদায় করে নিতে পেরেছে আইএস। আর এমন সব এলাকায় সেটা হয়েছে, যেখানে না আছে সাইবার ক্যাফে, না আছে ঘরে ঘরে কম্পিউটার-ল্যাপটপ। ফলে, ওই সব এলাকার মানুষ যে সোশ্যাল মিডিয়ায় আইএসের প্রচারে ‘মোহিত’ হয়েছেন, তা নয়।’’
ওই গোয়েন্দা অফিসারের প্রশ্ন, তা হলে ওই সব এলাকার সাধারণ মানুষকে কারা আইএসের মন্ত্রে দীক্ষিত করছেন?’
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে, বাংলাদেশের জেএমবি-র খুব শক্ত ঘাঁটি রয়েছে নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের ওই সব এলাকায়। জেএমবি-ই ওই এলাকাগুলোতে আইএসের ভিত গড়ে দিচ্ছে। রাজ্যে বড়সড় হামলার ভিত গড়ে তুলছে একটু একটু করে। পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ঝাডখন্ডে আইএসের ‘বীজ বপনে’র জন্য কি বাংলাদেশের মাটি থেকে ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ কাজকর্ম চালাচ্ছে জেএমবি ও আইএস জঙ্গিরা?
এনআইএ-র এক গোয়েন্দা কর্তা জানাচ্ছেন, ‘‘এ বছর ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের দিনাজপুর, ঢাকা, রংপুর ও রাজশাহিতে যে ছ’টি জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছে, পরে তার প্রত্যেকটিরই দায় স্বীকার করেছে আইএস। তখনই আমাদের সন্দেহ হয়, বাংলাদেশে আইএসের ‘ওয়ার্কিং সেন্টার’ না থাকলে এটা কী ভাবে সম্ভব হচ্ছে? তদন্তে নেমে আমরা জানতে পারি, প্রত্যেকটি ঘটনার পিছনেই রয়েছে আইএস। আর তাদের অস্ত্র ও লোকবল দিয়ে সাহায্য করেছে জেএমবি। মজার ঘটনা হল, ওই জঙ্গি হামলার ঘটনাগুলো যে সব এলাকায় ঘটেছে, সেই সবক’টি এলাকাই জেএমবি-র অত্যন্ত শক্ত ঘাঁটি। ‘বাংলা ভাই’-সহ দুই জেএমবি নেতার ফাঁসি ও সংগঠনের বহু নেতা গ্রেফতার হওয়ার পর জেএমবি এখন আইএসের ‘ছদ্মবেশে’ বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তাদের ‘অপারেশন’গুলো চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী ‘অপারেশনে’র প্রস্তুতি নিচ্ছে। জঙ্গিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
জেএমবি ও আইএসের ভাবসাবের আর কী কী প্রমাণ মিলেছে?
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দার জানিয়েছেন, এক, বাংলাদেশ ও খাগড়াগগে আত্মঘাতী জঙ্গিদের দেহে যে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বা সুইসাইড ভেস্ট পাওয়া গিয়েছে, তা একমাত্র্ আইএস জঙ্গিরাই ব্যবহার করে। দুই, জঙ্গিদের ব্যবহার করা জেলি জাতীয় এক ধরনের বিস্ফোরক। যা বাংলাদেশে কখনও তৈরি হয় না। আর যা আইএস জঙ্গিদের হাতে হাতে ঘোরে। তিন, জঙ্গিদের কাছ থেকে যে আমেরিকায় বানানো ‘এম-১১’ স্নাইপার রাইফেল মিলেছে, তা আইএস জঙ্গি ছাডা ভাবাই যায় না। চার, জঙ্গিদের ইউনিফর্ম। আর পাঁচ, তাদের লিফলেট। যেখানে জেএমবি প্রকাশ্যে আইএসের কাজকর্ম ও মতাদর্শকে সমর্থন করেছে।

খালেদার বক্তব্য বিকৃত ব্যাখ্যা করা হচ্ছে: বিএনপি

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে করা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে বিকৃত ব্যাখ্যা করে ক্ষমতাসীন মহল অপরাজনীতিতে মেতে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, গত ২১শে ডিসেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত আলোচনা সভায়  বিএনপি চেয়ারপারসনের বক্তব্যের একটি অংশের বিকৃত ব্যাখ্যা করে ক্ষমতাসীন মহল যে অপপ্রচার ও বিভিন্ন মতলবী কার্যক্রম শুরু করেছে আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি। ওই ভাষণে খালেদা জিয়া স্বাধীনতাযুদ্ধে মহান শহীদদের সংখ্যা নিয়ে যে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক রয়েছে রেফারেন্স হিসাবে সে কথার উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম প্রতিষ্ঠিত বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে বিশ্বাসী এদেশের সর্ববৃহৎ একটি রাজনৈতিক দল। রণাঙ্গনের অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা এই দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেগম খালেদা জিয়া নিজেও তার শিশু সন্তানদের নিয়ে দুঃসহ বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা ও সম্মান দেয়ার ব্যাপারটি তাই এই দলের কারও কাছ থেকে শিখতে হবে না। জিয়াউর রহমান প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করার উদ্দেশে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার উদ্দেশে তিনিই মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। বেগম খালেদা জিয়াই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহের সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করেন। তার নির্দেশে তৎকালীন ঢাকা সিটি মেয়র বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা ঢাকা মহানগরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোর নামকরণ করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নামে। মুক্তিযুদ্ধের মহান শহীদদের তালিকা ও পরিচিতি আজ পর্যন্ত সংরক্ষিত না থাকায় স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বিভিন্ন শক্তি ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে নানা ধরনের তথ্য ও বিতর্ক উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন গ্রন্থে শহীদদের বিভিন্ন রকম সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। দেশনেত্রী সে কথাই তুলে ধরেছেন তার বক্তব্যে। এর মাধ্যমে তিনি মহান শহীদদের পরিচিতি ও প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণের প্রয়োজনীয়তার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন, যাতে তাদেরকে উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা যায়। এই কথা বলার মাধ্যমে শহীদদের প্রতি কোন ধরনের অসম্মান প্রদর্শনের প্রশ্নই আসে না। মির্জা আলমগীর বলেন, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করেনি বরং ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সাজিয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করেছে এবং যারা প্রকৃত শহীদদের তালিকা ও পরিচিতি সংরক্ষণের মাধ্যমে তাদের সম্মানিত করতে চায় না, তারাই বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে বিকৃত ব্যাখ্যা করে অপরাজনীতিতে মেতে উঠেছে। আমরা তাদের এই হীন অপপ্রচার ও তৎপরতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই। আমরা বিশ্বাস করি এই ধরনের হীন অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।

বগুড়ায় বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী হিমু শ্যোন অ্যারেষ্ট, ভোট ডাকাতির জন্যই গ্রেফতার : স্ত্রীর অভিযোগ

জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি ও বগুড়া পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী এবং বর্তমান কাউন্সিলর শাহ মোঃ মেহেদী হাসান হিমুকে (৪০) কারাফটকে শ্যোন অ্যারেষ্ট দেখিয়েছে পুলিশ। নির্বাচনের আগের দিন সরকারের এমন আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তার মুক্তি দাবি করেছে বিএনপি ও তার পরিবার।
মঙ্গলবার বিকেলে হিমুর সহধর্মীনি জিনাত পারভীন স্নিগ্ধা বগুড়া প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, হিমু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বার বার শোন অ্যারেষ্ট হচ্ছেন। তিনি তিনবার জামিন লাভ করলেও কারাগারের গেটে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার করা হয়। সর্বশেষ তিনি সোমবার কোর্টে জামিন লাভ করেন । জামিনের আদেশ কারাগারে পৌছার আগেই তাকে শ্যোন অ্যারেষ্ট দেখানো হয়। এ জন্য তিনি প্রতিদ্বন্দি আ’লীগ প্রার্থী টিপু সুলতানকে (উটপাখি) দায়ী করেন।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, আটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে আ’লীগ প্রার্থী ভোট কেটে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তিনি রিটার্নিং অফিসার ও আইন শৃংখলাবাহিনীর দৃষ্টি কামনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে হিমুর ছেলে মুনতাসির হাসান কাভি , মেয়ে মেহজাবিন হাসান বৈশাখী, স্ব্চ্ছোসেবক দল নেতা খান জাহাঙ্গীর, রাব্বি রাশেদ রিজভী মিঠু, মাহবুব হাসান লেমন, আতিক, সাইমুম, মোহাম্মাদ আলী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে হিমুকে গ্রেফতার নিন্দা জানিয়ে বিবুতি দিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন চাঁন, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর শাহে আলম।

নাইজেরিয়ায় বোকো হারামের হামলায় ৮০ জন নিহত

নাইজেরিয়া চরমপন্থি সংগঠন বোকো হারামের হামলায় কমপক্ষে ৮০ জন নিহত হয়েছে। সোমবার উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ার শহর মাউদুগুরিতে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
সরকারি সংবাদ প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, ১০টি আত্মঘাতী বোমা ও পুনঃপুনঃ রকেট হামলায় শহরে সরকারি সেনারা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলায় কমপক্ষে ৩০ জন নিহত হয়েছে। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
দাওয়ারি গ্রামের প্রধান বুলামা ইসা জানান, জঙ্গিরা গ্রামের বাইরে তিনটি ট্রাকের পেছন থেকে নির্বিচারে গুলি ছুঁড়ছিল। সেনারাও তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালায়। স্থানীয় লোকজন বিভিন্ন স্থানে পালানোর চেষ্টা করছিল। এ সময় এক নারী ছুটে এসে ‘বোকো হারাম, বোকো হারাম’ বলে চিৎকার শুরু করে দেয়। গ্রামের লোকজন তার কাছাকাছি জড়ো হলে সে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। একই সময় জঙ্গিরা রকেট থেকে একটি গ্রেনেড ছুড়ে মারে। এতে খড়ের চালা দিয়ে তৈরি ঘরগুলিতে আগুন ধরে যায়। আরেকজন নারী এ সময় আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। বোমা হামলায় ইসার ১০ সন্তানসহ আরো অনেকে নিহত হয়েছে বলে দুই প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সেনা জানিয়েছে, মাউদুগুরির চারটি আবাসিক এলাকায় রকেট চালিত গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। সেনারা পাল্টা হামলা চালালে অনেক বেসামরিক নাগরিক বন্দুকযুদ্ধের মাঝখানে পড়ে যায়।
মাউদুগুরি স্পেশালিস্ট হাসপাতালের এক সেবিকা ও এক প্রহরী জানিয়েছে, সারারাত হাসপাতালে কমপক্ষে ২০টি মৃতদেহ এসেছে। ৫০ জনেরও বেশি গুরুতর আহতকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। এদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
সূত্র: এপি

হবিগঞ্জে গউছের প্রধান নির্বাচনী এজেন্টসহ তিন বিএনপি নেতা আটক

বৃটিশ অর্থসাহায্য বৃটেনেই ব্যয় করা উচিৎ। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নয়। এসব বলেছেন বৃটেনের বিরোধী লেবার দলের এমপি সিমন ড্যানচুক। তার মতে, এ অর্থ বৃটেনে ব্যয় হলে বিভিন্ন স্থানে চলমান বন্যা প্রতিরোধে আরও বেশি কিছু করা যেত। ড্যানচুকের নিজের নির্বাচনী এলাকা রোচডালেতেও বন্যা ব্যাপক আঘাত হেনেছে। বিবিসি রেডিও ম্যানচেস্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা কেন বাংলাদেশে অর্থ ব্যয় করছি, যখন বৃটেনে ওই অর্থ ব্যায়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? আমাদের যা করা উচিৎ তা হলো, আমাদের এখানের সমস্যা আগে সমাধান করা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর এত নজর দেওয়া নয়। এটাই হতে হবে আমাদের অগ্রাধিকার। তিনি এমন সময় এ মন্তব্য করলেন, যখন ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জায়গায় বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এর আগে ৭ই ডিসেম্বর বৃটেনের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের বেশ কয়েকজন এমপি একই আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাদের মতে, যুক্তরাজ্যে আসন্ন বন্যা প্রতিরোধেই বিদেশী সাহায্যের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করা উচিৎ। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্থ দেশসমূহের জন্য বৃটেনের বরাদ্দকৃত অর্থও দেশটির বন্যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে ব্যয় করা উচিৎ বলে এমপিদের মত। তবে দেশটির মন্ত্রীরা তাতে সায় না দিয়ে, বন্যাক্রান্ত বাড়ি ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানকে কাউন্সিল কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

আমার গুরু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে যাঁর প্রতিভার ব্যাপ্তি, বাংলাদেশের মানুষের কাছে যিনি শিল্পবোধ, শিল্পচেতনা ও শিল্পের সৌন্দর্যকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, বিশ্বের সংস্কৃতির সঙ্গে যিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন, তিনি আমার গুরু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। আজ তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। জয়নুল আবেদিনের সৃজনশীলতা ও শিল্পদর্শন তাঁকে মহান করেছে। তাঁর শিল্পের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে জীবদ্দশাতেই দেশ-বিদেশে শিল্পবোদ্ধা, শিল্পসমালোচক ও শিল্পচেতনাসমৃদ্ধ সব মানুষের কাছে তিনি সমাদৃত হয়েছেন। শৈল্পিক গুণে গুণান্বিত একজন মানবতাবাদী, হৃদয়বান, দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে এ দেশের মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অসীম দরদ। চারুশিল্পের শিক্ষক হিসেবে এ দেশে শিল্পরুচি বিনির্মাণে তিনি ছিলেন অগ্রণী। আমার পরম সৌভাগ্য, চিরকাল সুন্দরের স্বপ্ন দেখা এই মানুষটির সরাসরি ছাত্র ছিলাম আমি। শিল্পের আঙিনায় বিশাল এই মানুষটির সাহচর্য পেয়েছিলাম। শান্তিনগরে তাঁর বাসার কাছাকাছি আমাদের আবাস থাকায় তাঁর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে ওঠার সুযোগ হয়। তাঁর বাসায় প্রায়ই দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ও বরেণ্য ব্যক্তিদের আগমন ঘটত। তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম আমার মনে পড়ছে, তাঁরা হলেন কবি গোলাম মোস্তফা, গায়ক আব্বাসউদ্দীন আহমদ, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, অর্থনীতিবিদ ড. এম এন হুদা, কবি জসীমউদ্দীন, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, অধ্যাপক মনসুরউদ্দিন,
গায়ক মমতাজউদ্দিন, কলিম শরাফী, আবদুল লতিফ, আবদুল গণি হাজারী, সিকান্দার আবু জাফর, শহীদুল্লা কায়সার, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ। এ ছাড়া তখনকার বিশিষ্ট শিল্পী তাঁর সহকর্মী আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মীর মোস্তফা আলী, মুস্তাফা মনোয়ারসহ আরও কেউ কেউ আড্ডা দিতে আসতেন তাঁর বাসায়। ভারতবর্ষের বিখ্যাত শিল্পসমালোচক মুলকরাজ আনন্দও এসেছিলেন তাঁর বাসায়। তাঁর ছাত্র ও পরবর্তী সময়ে সহকর্মী বিশিষ্ট শিল্পী আমিনুল ইসলাম, ইমদাদ হোসেন, কাইয়ুম চৌধুরী, হামিদুর রাহমান, আবদুর রাজ্জাক, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তীরা আসতেন তাঁদের আঁকা কাজ দেখাতে, ভুলত্রুটি সংশোধন করতে এবং শৈল্পিক জ্ঞান অর্জনের জন্য। পরে এই শিল্পীরাই দেশে-বিদেশে তাঁদের শিল্পকর্ম দিয়ে সুপরিচিত হয়েছেন। এই গুণী মানুষদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। এই সুযোগে তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। আবেদিন স্যারের বাসায় বিদগ্ধজনের এই আড্ডায় আমার অংশগ্রহণের সুযোগ হতো। আড্ডার কনিষ্ঠজন ও প্রতিবেশী হিসেবে মাঝেমধ্যে ভাবির অনুরোধে ভেতরবাড়ি থেকে চা-নাশতা সরবরাহের দায়িত্বও বর্তাত আমার ওপর। এতে আমি প্রফুল্লবোধ করতাম। এই আড্ডার আলোচনার অনেক কিছুই বুঝতাম না, তারপরও মনের অজান্তেই কী এক ভালো লাগার বোধ ওই আসরে আমাকে টেনে নিয়ে যেত। এর সুবাদে ভাবি বেগম জাহানারা আবেদিন এবং তাঁদের তিন পুত্র—সাইফুল আবেদিন টুটুল, খায়রুল আবেদিন টুকুন ও ময়নুল আবেদিন মিতুর সঙ্গে আমার যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়, আজও তা অটুট ও অম্লান রয়েছে। এলাকার ছেলেরা যাতে খেলাধুলা করতে পারে, সেদিকেও তাঁর বিশেষ দৃষ্টি ছিল। শান্তিনগর ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। এই এলাকার ছেলে পরে রাজনীতিক মোজাফফর হোসেন পল্টু ছিলেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। আবেদিন স্যার পাকিস্তানে গেলে ক্রিকেট ব্যাট-বলসহ অন্যান্য খেলার সামগ্রী নিয়ে আসতেন। সে সময়ের নামজাদা ক্রিকেটার রিয়াজউদ্দিন মানুকে আবেদিন স্যার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক করেছিলেন। তিনিও আসতেন স্যারের বাসায়। আউটডোরে ছবি আঁকতে আবেদিন স্যারের সঙ্গী হয়েছি অনেকবার। স্যারের মেজ ছেলে টুকুনও মাঝেমধ্যে যেত আমাদের সঙ্গে। স্যারের প্রিয় বিষয় ছিল প্রকৃতি, বিশেষ করে নদী ও নৌকা। তাঁর আঁকার জন্য কাগজ বিছিয়ে দিতাম, রং বের করে প্যালেটে ঢেলে দিতাম। ইনডিগো নীল ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় রং। আকাশ ও নদীর জল আঁকতে তিনি এই রংটি ব্যবহার করতেন।
একদিনের কথা বলি। আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন নৌকার ছবি আঁকতে। অবাক হয়েছিলাম। জয়নুল আবেদিনকে নৌকার ছবি আঁকতে নতুন করে নৌকা দেখতে হবে! পরে বুঝলাম, তিনি নৌকা দেখার জন্য যাননি। তিনি নৌকায় চড়ে নৌকার দোলা অনুভব করতে গিয়েছিলেন। স্যারের কাছে গিয়ে বলি, স্যার, নৌকার ছবি আঁকতে এসে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন; ছবি আঁকা হলো না। স্যারের জবাব, ‘নৌকা তো কতই দেখছি মিয়া, কিন্তু নৌকায় চড়লে কেমন লাগে, হেইডা অনুভব না কইরা, নৌকার দোলা না খাইয়া, বাবা, নৌকারে বুঝবা কেমনে! নইলে নৌকার ছবি তো মিয়া ডাঙায় উইঠা আইব!’ সেই দিনই বুঝেছিলাম জয়নুল আবেদিনের ছবি কেন এত জীবন্ত হয়। তাঁর চোখ কোনো কিছুকে বাইরে থেকে দেখত না। সবকিছুকে তিনি এ দেশের প্রকৃতি ও মাটি থেকে সংগ্রহ করতেন। মহিলা সমিতি মঞ্চে থিয়েটারের নাটক দেখাতে একবার স্যারকে সপরিবারে নিয়ে এসেছিলাম ১৯৭৪ সালে। প্রয়াত বন্ধু আবদুল্লাহ আল-মামুনের চারদিকে যুদ্ধ প্রদর্শন হচ্ছিল সেবার। নাটক শেষে জয়নুল আবেদিন আমাদের নাটকের প্রশংসা করেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘মিয়া, নাটকে অভিনয় চালাইয়া যাইবা, এটাও শিল্প।’ আমি সেই থেকে নাটকে আরও বেশি সম্পৃক্ত হলাম। হাসপাতালে শুয়েও নিজের জীবনের উপমা খুঁজে পেয়েছিলেন কোকিলের ডাকে। আবেদিন স্যার পিজি হাসপাতালে অসুস্থ থাকা অবস্থায় একদিন আচমকা কোকিলের ডাক শোনা গিয়েছিল। আমি ছিলাম পাশেই। হঠাৎ স্যার ভাঙা কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অহন কোকিল ডাকে ক্যান রে!’ আমি উত্তর খোঁজার আগেই বললেন, ‘ক্যান ডাকে জানস? কোকিল ডাকে দুইবার। বসন্তকালে ডিম পাড়নের আগে। আরেকবার কুনহানে ডিম পাড়ছিল, হেই বাড়ি খুঁজবার সময়। হেই সময় কোকিলের ডাক বেসুরো হইয়া যায়। কোকিল অহন বাড়ি খুঁজতাছে। হের তো নিজের বাড়ি নাই, অন্যের বাড়িতে ডিম পাড়ে। আমারও বাড়ি নাই অহন, আমিও কোকিলের মতো বাড়ি খুঁজতাছি।’ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁকেও যেতে হবে অন্য কোনো বাড়িতে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একজন মহাপুরুষ হয়েও আমার কাছে তিনি ছিলেন বড় কাছাকাছির মানুষ। খুব আপনজন—যেমন আমি আমার আনন্দ-বেদনায় আমার মা–বাবাকে খুঁজে বেড়াই, তেমনি খুঁজে বেড়াই আমার শিল্পগুরু জয়নুল আবেদিনকে।
কেরামত মওলা: নাট্য অভিনেতা।

মোদির ‘দ্বিতীয় স্ত্রী’ স্মৃতি ইরানি!

ভারতের মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী স্মৃতি ইরানিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় স্ত্রী বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন কংগ্রেসের দুই নেতা। স্মৃতি ইরানির শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। আসামের গৌহাটির নলবাড়ীতে রোববার এক জনসভায় কংগ্রেস নেতা নীলামণি সেন ডেকার মন্তব্যের এক দিন পরই আরেক কংগ্রেস নেতা একই ধরনের মন্তব্য করলেন। মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রীকে এ ধরনের সমালোচনা করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন কংগ্রেস নেতারা। পরে ক্ষমা চেয়েছেন নীলামণি। সোমবার ফার্স্টপোস্ট জানায়, আসামের নির্বাচন উপলক্ষে আজ সেখানে যাওয়ার কথা রয়েছে স্মৃতি ইরানির। এর আগের দিন আসামের নলবাড়ীতে কংগ্রেসের এক জনসভায় বিধায়ক নীলামণি সেন ডেকা বলেন, ‘সেই মহিলা, সেই নেতা যাকে নরেন্দ্র মোদির দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে অভিহিত করা হয়, সেই স্মৃতি ইরানি নলবাড়ী আসছেন।’
একই দিন কংগ্রেসের সংসদীয় নেতা রূপজ্যোতি কুর্মিও মোদিকে নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ভারতের মহিলা দূর থেকে নমস্কার করে মোদিকে। কিন্তু বিদেশ গেলেই সব বদলে যায়। বিদেশী মহিলাদের আলিঙ্গন করতে ভালোবাসেন মোদি। কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে পড়ে রাজনৈতিক পরিবেশ। তাদের ওই মন্তব্য টিভিতে সম্প্রচার হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিজেপি। রাজ্য বিজেপির সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, ‘হারের ভয়ে এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে গিয়ে আক্রমণের রাস্তায় হাঁটছে কংগ্রেস। এ ধরনের মন্তব্য কংগ্রেসের নিু রুচির পরিচয়। একজন প্রবীণ বিধায়কের মুখে এমন কথা আসামের সংস্কৃতির পরিপন্থী।’ এ ঘটনায় নীলামণির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার ঘোষণা দিয়েছে বিজেপি। বিপাকে পড়ে ক্ষমা চেয়েছেন নীলামণি। তিনি বলেন, ‘আমি যা বলেছি নিছকই মজা করে বলেছি। ওই মন্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইছি। এর সঙ্গে দলের কোনো যোগাযোগ নেই।’ আসামে সামনেই নির্বাচন। তার জন্য চলতি ডিসেম্বর ও জানুয়ারির মধ্যে রাজ্যের পাঁচটি জায়গায় কেন্দ্রের পাঁচ মন্ত্রীকে দিয়ে সভা করানোর কর্মসূচি নিয়েছে বিজেপি। রোববার সুষমা স্বরাজ বরাকে সভা করার পর এবার নলবাড়ী যাচ্ছেন স্মৃতি ইরানি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১৯ জানুয়ারি আসামে যাওয়ার কথা।

বন্ধ হোক ‘পিষে মারার সংস্কৃতি’

অন্যের মুখে শোনা বলে আপনি এর সত্যতা নিয়ে সন্দিহান হতে পারতেন, একে কম গুরুত্ব দিতে পারতেন, উত্তেজনার মুখে ‘কথার কথা’ বলেও আপনি খানিকটা হয়তো ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে পারতেন; যদিও কথাটা কেবল কথা থাকেনি, বলতে না-বলতেই কাজে রূপান্তরিত হয়েছে। সর্বসমক্ষে নিহত হয়েছেন একজন, দিবালোকে। আসলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনা কয়েক দিন আগের। ঢাকার উত্তরায় জসীমউদ্দীন রোডের মোড়ে একজন বাসচালকের সঙ্গে একজন অটোরিকশাচালকের বাদানুবাদ হয়, তারপরে বাসচালক আবদুল মজিদ (২৫) বাসটি তুলে দেন অটোরিকশাচালক মো. ফারুকের (৪০) ওপর। বাসের চাকায় পিষ্ট ফারুকের দেহ বাসটি টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছে অন্তত আধা কিলোমিটার। বাদানুবাদ যাঁরা শুনেছেন, তাঁরা বলেছেন, আবদুল মজিদ হুমকি দিয়েছিলেন, ‘তুই সর। নাইলে পিষ্যা ফালামু তোরে।’ প্রত্যক্ষদর্শী অনন্ত কুমার সিংহ প্রথম আলোর সাংবাদিককে এই কথাগুলো জানিয়েছিলেন। পুলিশের হাতে আটক চালক আবদুল মজিদ স্বীকার করেছেন যে তিনি জেনে-বুঝেই কাজিট করেছেন। উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ কর্মকর্তা মো. আলী হোসেন খান জানাচ্ছেন যে তাঁর কাছেও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আবদুল মজিদ বলেছেন যে ‘ওই সিএনজিচালক আমার সঙ্গে তর্ক করছিল। তাই তাকে পিষে দিয়েছি।’ (মানবজমিন, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৫)। কী ভয়াবহ! কিন্তু একই সঙ্গে লক্ষণীয়,
আবদুল মজিদ এই নিয়ে চিন্তিত নন, কেননা তিনি এভাবেই ভাবেন। কখনো কখনো একটি-দুটি ঘটনা সমাজের ভেতরের অদৃশ্য প্রবণতাকে তুলে ধরে। কিন্তু যখন একই ধরনের ঘটনা উপর্যুপরিভাবে ঘটে, তখন একে আমরা অদৃশ্য প্রবণতা না বলে সমাজের ছবি বলেই গণ্য করব। কয়েক মাস ধরে আমরা যেসব নৃশংস ঘটনা দেখতে পাচ্ছি, সেগুলো আপাতদৃষ্টে রাজনৈতিক নয় বলে আমরা সাধারণত এই নিয়ে খুব বেশি বিচলিত হই না। কিন্তু আমাদের কি প্রশ্ন করা উচিত নয় যে কী কারণে সমাজের ভেতরে সহিংসতার এই মানসিকতা বিস্তার লাভ করে এবং করেছে? কীভাবে এ ধরনের অমানবিকতা সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে আর কত দিন আমরা নিজেদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় মত্ত থাকব? আবদুল মজিদ তাঁর চেয়ে ছোট এবং দুর্বল বলে যাঁকে দেখেছেন, সেই মোহাম্মদ ফারুককে পিষে দিয়েছেন। এটি মর্মান্তিক ঘটনা। কিন্তু আমার কাছে এ ঘটনাকে খুব বিস্ময়কর মনে হয় না এই অর্থে যে বাংলাদেশের সমকালীন সমাজে পিষে দেওয়ার মানসিকতা সর্বব্যাপ্ত, সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। আকারে ও শক্তিতে যাঁরা নিজেদের বড় মনে করেন, তাঁরা তুলনামূলকভাবে ছোটদের ওপর চড়াও হন। তাঁর যদি অর্থ, বিত্ত, প্রভাব, ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য থাকে, তবে তো সোনায় সোহাগা। রাষ্ট্র যদি তাঁর পক্ষে দাঁড়ায়, তবে তো কথাই নেই। ‘পিষে মারা’র একটি প্রকাশ হচ্ছে পিটিয়ে মারা।
এ মাসের গোড়ার দিকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ডাকাত সন্দেহে আটজনকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা নিশ্চয় আমাদের মনে আছে; যদিও অনেকেই হয়তো মনে করতে পারবেন না যে এই বছরের ২৫ জানুয়ারি নরসিংদী সদরে ডাকাত সন্দেহে বা অভিযোগ তুলে সাতজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ বছরের মাঝামাঝি পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো যেসব তথ্য দিয়েছিল, সেই হিসাবে সাড়ে ছয় বছরে কথিত ‘গণপিটুনি’তে ৯০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংবাদপত্র যাকে ‘গণপিটুনি’ বলে বর্ণনা করে, তা আসলে বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি রূপ। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৮ জন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থেকে ব্যক্তিগত শত্রুতা—সবই এসব ঘটনার পেছনের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু পিটিয়ে মারার ঘটনা একা ঘটে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাতে যোগ দেন অনেকে। আবদুল মজিদ যাঁকে ‘পিষে মারা’ বলছেন, আক্ষরিকভাবে তা–ই দেখতে পাই এই পিটিয়ে মারার মধ্যে, কিন্তু তাতে অংশ নেন অনেকে। যদি বলি, আসলে পিষে মারতে চাওয়ার মানসিকতা কেবল আবদুল মজিদের নয়, তা হলে কি অতিরঞ্জন হবে? সমাজে যাঁদের শক্তি আছে, তাঁরা প্রতিপক্ষকে ‘পিষে মারতে’ চান। সেই লক্ষ্যে তাঁরা তাঁদের শক্তিকে ব্যবহার করতে মোটেই কুণ্ঠিত হন না। সমাজে যাঁরা সংখ্যালঘু বলে পরিচিত—ধর্মবিশ্বাসে, জাতীয় পরিচয়ে,
রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে—তাঁরা প্রতিদিন বুঝতে পারেন যে এই পিষে মারার চেষ্টা কত প্রবল। সমাজে ও রাজনীতিতে ক্ষমতাবানেরা অন্যদের কথা শুনতে চান না, তাঁদের সঙ্গে ‘তর্ক’ করলে তাঁরা যাঁরা তর্ক করেন, তাঁদের যেভাবে পারেন ‘পিষে মারতে’ উদ্যোগী হন। এই পিষে মারা সব সময় শারীরিক হতে হবে তা নয়। পিষে মারার ভিন্ন পথও আছে। খানিকটা ‘পিটিয়ে মারার’ মতো ঘটনা। এমন মনে করার কারণ নেই যে পিটিয়ে মারায় অংশগ্রহণকারী সবাই সম্যকভাবে অবহিত কেন তাঁরা পিটিয়ে মারছেন। যাঁরা অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা কোনো না কোনো কারণে, কোনো না কোনোভাবে এ ঘটনায় যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের উজ্জীবিত করে ‘গোষ্ঠী’ বা ‘মব’ (Mob)-এ পরিণত করা হয়েছে। এই একই অবস্থা আপনার কথা বলার ব্যাপারে, চিন্তার ব্যাপারেও হতে পারে। ব্লগার বলে পরিচিত পাঁচজন লেখক এবং একজন প্রকাশক যে খুন হলেন, তা আসলে শারীরিকভাবে ‘পিষে’ ফেলাই। কিন্তু তার বাইরেও ক্রমাগতভাবে শক্তি প্রয়োগের উদাহরণ আছে। আপনার তর্ক করার অধিকার যখন অগ্রাহ্য হচ্ছে, সেটা আইনের মোড়কেই হোক কিংবা আইনের বাইরেই হোক, সেটা আসলে আপনার কণ্ঠকে বা প্রকারান্তরে আপনাকে ‘পিষে’ ফেলা।
যখন আপনার ওপরে গোষ্ঠীগতভাবে মৌখিক আক্রমণ হচ্ছে, তখন একে পিষে ফেলার চেষ্টা বলেই অনুমান করা যায়; আপনার কথা আগামভাবে বন্ধ করার মানসিকতা কেন ভিন্ন বলে জানব? এই প্রচেষ্টাগুলো যখন একটি ভাবাদর্শের ছায়ায় পরিচালিত হয়, তখন তা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কেননা ভাবাদর্শ তাঁকে বৈধতা দেয়। সেই সময় চিন্তার স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়। এ কাজে রাষ্ট্র যখন অগ্রণী, তখন তা কেবল উদ্বেগের জায়গায় থাকে না। বাসচালক আবদুল মজিদ নিরীহ অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফারুককে পিষে ফেলেছেন; বাসযাত্রীরা তাঁকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। আমরা আশা করি, আবদুল মজিদের বিচার হবে, তাঁর যথাযথ শাস্তি হবে। এও আশা করি, ফারুকের অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা হবে। কিন্তু সমাজে যে এই প্রবণতা বাড়ছেই, তার কী হবে? সমাজে যে দুর্বলকে পিষে ফেলার অব্যাহত চেষ্টা, ভিন্নমতকে পিষে ফেলার নিরন্তর চেষ্টা—সেটা নিয়ে আমরা সরব হব কবে? আমাদের ভেতরে যে অন্যকে পিষে ফেলার মানসিকতা, তা থেকে মুক্তির পথ কি আমরা অনুসন্ধান করছি?
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

ভারতে অনলাইনে গোবর বিক্রি!

ভারতে গরু, গো-মাংস ও গো-বর্জ্য নিয়ে কাণ্ড-কীর্তির শেষ নেই। গরু জবাই, গো-মাংস নিষিদ্ধ হলেও গো-মূত্রের বেলায় কদরের ঘাটতি নেই। রোগ তাড়াতে ঢক ঢক করে গিলেছে গো-মূত্র। আবার জীবাণুমুক্ত করতেও ব্যবহৃত হয়েছে গো-মূত্র। এমনকি ‘গো-মূত্রের’ নানা প্রসাধনীও দেদারসে বিক্রি হয় ভারতের কয়েকটি রাজ্যে। এই তো কয়েকদিন আগে ভারতের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, ‘গো-মূত্রে সারবে ক্যানসার’! এখানেই শেষ নয়, দেশটির কট্টরপন্থী দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ‘গো-সম্মানে’ আরেক ধাপ এগিয়ে। তাদের দাবি, পরমাণু বোমার তেজস্ক্রিয়তা নষ্ট করে দিতে পারে গোবর!
‘গো-মূত্রের’ পর এবার ‘গো-মলে’র মহিমায় মজেছেন ভারতের শহরাঞ্চলের ইন্টারনেট গ্রাহকরা। ভারতের অনলাইন বাজার ছেয়ে গেছে গোবর দিয়ে তৈরি এক পণ্যে। যা ভারতে ঘুঁটে নামে পরিচিত। এটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ঘুঁটে তৈরি হয় গোবর, মাটি ও পানি মিশিয়ে। সাধারণত গ্রামাঞ্চলের নারীরা বাড়িতেই তৈরি করেন এ জ্বালানি। নিজেরাই এটা বিক্রি করেন। অনলাইনে ঘুঁটে বিক্রি এটাই প্রথম। অ্যামাজন ও ইবেসহ বেশকিছু অনলাইন বাজার গ্রামের এই জ্বালানিটি বড় শহর ও নগরগুলোতে বাজারজাত ও সরবরাহ করছে। অনলাইনে যা ‘গোবর কেক’ নামে বিক্রি হচ্ছে। ২২ পিস গো-কেকের মূল্য ২৭৪ রুপি। এ ছাড়া বিভিন্ন দামের ছোট-বড় আকৃতির গো-কেক পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে। কিছু বিক্রেতা জানিয়েছেন, বড় ফরমায়েশের জন্য মূল্যছাড় দিচ্ছেন তারা। অনেক ক্রেতা উপহার দেয়ার মতো প্যাকেট করে ফরমায়েশ করা ঘুঁটে সরবরাহ পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ডন ও এনডিটিভি।

ইসি : ‘চোখ নেই, শিং নেই, নখ নেই...’ by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ইলেকশন কমিশন হচ্ছে একটি নিরপেক্ষ সংস্থা, এটি নির্বাচনী কাজের জন্য নিয়োজিত। এর দায়িত্ব হচ্ছে; ১. নির্বাচনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, ২. নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা, ৩. নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ করা ও ৪. নির্বাচন ব্যবস্থা তদারকি করা। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে নানা নামে, নানাভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। ইলেকশন কমিশন নামে প্রতিষ্ঠানটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোতে বেশ কার্যকর। ভারত, কলম্বিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় ইলেকশন কমিশন পরিপূর্ণ ক্ষমতা এবং দায়িত্বের সাথেই পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে উত্তরাধিকার সূত্রে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ইলেকশন কমিশন সাংবিধানিকভাবে বেশ শক্তপোক্ত। বলা হয়ে থাকে, যেসব সংবিধানে ইলেকশন কমিশনকে নির্বাচনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রভূত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে সম্ভবত বাংলাদেশ সংবিধান সবার শীর্ষে অবস্থান করে। বাংলাদেশ সংবিধানের সপ্তম ভাগে ১১৮ অনুচ্ছেদ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদ পর্যন্তÑ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব, কর্তব্য এবং ক্ষমতায়ন ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ১১৮ এর ৪ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হইবেন’। ১৯৭২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতার প্রয়োগ নির্ভর করেছে কমিশন নেতৃত্বের ওপর। শাসক দল বশংবদ নেতৃত্ব পছন্দ করলেও কেউ কেউ কুশলতা, অভিজ্ঞতা, সাহস ও সততা দ্বারা যেকোনো বৈরিতাকে অতিক্রম করতে পেরেছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয়, তখন তারা তাদের মনোনীত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবউদ্দীনকে নির্বাচনী ফলাফল বাতিল করার জন্য চাপ দেয়। কথা না শুনলে তাকে আওয়ামী লীগ ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করে। ওই সময়ে গোপালগঞ্জ এবং আত্মীয়তা সূত্রে আমলা এম এ সাঈদকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মনোনীত করে আওয়ামী লীগ। ব্যক্তিত্ববান এম এ সাঈদ তখন মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি নিরপেক্ষ নই, কিন্তু নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব’। আওয়ামী লীগ তাকেও তিরস্কার করেছিল। এটা দুর্ভাগ্যজনক, রাজনৈতিক সরকারগুলো নির্বাচন কমিশনকে দলীয় স্বার্থ দ্বারা সংগঠিত করতে চায়। এমন সব ব্যক্তিকে নির্বাচনী দায়িত্ব দেয়া উচিত, যাদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আছে। ষোল কোটি মানুষের এই দেশ নিশ্চয়ই এমন দেউলিয়া হয়ে যায়নি যে, মর্যাদাবান মানুষের আকাল পড়েছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবারে নির্বাচন কমিশনকে মনোনীত না করে তাদের অনুসৃত প্রতারণা কৌশল অনুযায়ী একটি ‘সার্চ কমিটি’ গঠন করে। এই সার্চ কমিটি গঠন করা হয় আওয়ামী বিশ্বস্ত এলিটদের দিয়ে। তারা অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে একান্ত বিশ্বস্ত তাঁবেদারদের মনোনীত করে। শুরু থেকে এ পর্যন্ত তারা বিশ্বস্ততার উৎকৃষ্ট নমুনা উপহার দিয়েছে! বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতায়ন করার ক্ষেত্রে কিছু কার্য ব্যবস্থা নেয়া হলেও এই কমিশন সেই ক্ষমতা প্রয়োগে অপারগতা প্রদর্শন করে। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কথিত নিয়ম রক্ষার নির্বাচনে তারা যে নৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয় দিয়েছে সেটা সবারই জানার কথা। এরপর বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাদের কারসাজির চেহারা গোটা জাতি অবলোকন করেছে। এখন ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য পৌর নির্বাচনে তারা খেল দেখাতে যাচ্ছেন। এই প্রথমবারের মতো যখন দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তখন তারা সময়ের সঙ্কীর্ণতা সত্ত্বেও তড়িঘড়ি করে সরকারি আনজামে সায় দেয়। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনী সময়সূচি কয়েক দিন পিছিয়ে দিতে বললেও তারা স্পষ্ট না বলে দেয়। ক্ষমতাসীনদের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য তারা নির্ধারিত নির্বাচন কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে দলমুখী সরকারি কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়। ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রচারণায় খুন, জখম, গুম, সঙ্ঘাত হানাহানির ঘটনা ঘটলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সেনাবাহিনী মোতায়নের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১১ সালের ১২ থেকে ১৮ জানুয়ারি দেশের আড়াই শ’-এর মতো পৌরসভায় নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিল কমিশন। এখন নির্বাচনব্যবস্থায় কারচুপি এবং কারসাজি রেকর্ড করায় সর্বশেষ ভরসা হচ্ছে গণমাধ্যম। এবার যাতে গণমাধ্যম নির্বাচন কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকতে না পারে সে জন্য এক বাহিনী প্রধান পরামর্শ দিয়েছিল। ইলেকশন কমিশন সে নির্দেশ পালনে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে। পাঁচ দফা নিদের্শনায় বলা হয়েছে: ১. প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া কোনো সাংবাদিক ভোটকক্ষে প্রবেশ করতে পারবেন না। ২. সাংবাদিকেরা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কর্তব্য পালনে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। ৩. কোনো ধরনের নির্বাচনী উপকরণ স্পর্শ বা অপসারণ করতে পারবেন না। ৪. কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কর্মকাণ্ড চালাতে পারবেন না। ৫. সংবিধান ও নির্বাচনী বিধিবিধান মেনে চলতে হবে। স্পষ্ট করে ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভোট দেয়ার গোপন কক্ষে তারা কোনোমতে প্রবেশ করতে পারবেন না। সাধারণভাবেই বোঝা যায়, নির্বাচনী কারচুপির কোনো প্রমাণ তারা রাখতে দেবে না। ইতঃপূর্বের নির্বাচনগুলোর ভিডিও এবং তথ্য প্রমাণ সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে বিব্রত করেছিল।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যদি বিরোধী প্রার্থীরা সব আসনেও জয়লাভ করে তাহলে সরকার পতন হবে না। (অবশ্য নিরেট দল নিরপেক্ষ নির্বাচন হতো তাহলে অমন ফলাফল হতেও পারত) যদি এমন হয় তখন ইতঃপূর্বের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনগুলোর ফলাফল অসত্য বলে প্রমাণিত হবে। দ্বিতীয়ত, সরকার একদলীয় ব্যবস্থা কায়েমের যে পরিকল্পনা নিয়েছে তা এ ধরনের একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং প্রথম থেকেই তারা সব ধরনের আইন-কানুন, নিয়ম-রীতি, ভব্যতা-সভ্যতা অগ্রাহ্য করে একরকম কাপড় ছেড়ে নেমেছে। ক. অনবরত মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলেছেন। খ. নির্বাচনের আগেই হামলা-মামলা দিয়ে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে বিরোধীদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়া অসম্ভব করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ বিএনপির দুর্গ ফেনী এবং নোয়াখালীতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গ. জোরপূর্বক মনোনয়ন প্রত্যাহারের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া গেছে। ঘ. বিএনপি এবং বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারণায় আওয়ামী লীগ বারবার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব:) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান এবং সাবেক চিফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুক আওয়ামী হামলার শিকার হয়েছেন। ঙ. বিরোধী দলের প্রার্থী ও সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। চ. বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী গডফাদাররা স্ব-স্ব বেষ্টনী তৈরি করেছে। উদাহরণ হিসেবে লক্ষ্মীপুর এলাকায় প্রকাশিত ‘তাহের আতঙ্ক’ এর উল্লেখ করা যায়। ছ. নির্বাচনী প্রচারণায় হত্যাকাণ্ড ঘটছে। মাটিরাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির কৃষক দলের স্থানীয় সহসভাপতি নজরুল ইসলামকে হত্য করা হয়েছে। জ. আওয়ামী লীগের নেতারা মহিলাদের ওপরও হামলা করছে। কুষ্টিয়ার খোকশায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী ও এক কাউন্সিলর প্রার্থীর নারী সমর্থকদের ওপর হামলা করেছে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর সমর্থকেরা। ঝ. সরকারের গৃহপালিত বিরোধী দলের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ স্পষ্ট কারচুপির ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘সকাল ৯টার মধ্যেই ইলেকশন শেষ হয়ে যাবে’। ঞ. সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন আওয়ামী মহাজোটের ছোট শরিককেরা।
অবস্থাদৃষ্টে সহজেই মন্তব্য করা যায়, এই নির্বাচনও আগেকার নির্বাচনের মতো প্রহসনে পরিণত হবে। ইলেকশন কমিশন নির্বাচনের জন্য যে রাজনৈতিক সমঝোতার পরিবেশ প্রয়োজন তা নিশ্চিত করেনি। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এখন যখন সেনা মোতায়েনের আহ্বান আসছে, তখন তারা সরকারি ভাষ্যেই কথা বলছে। নির্বাচনকালীন ইলেকশন কমিশন আইনগতভাবে সব ব্যবস্থাই নিতে পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার তারা নিজেদের দায় অপরের মাথায় তুলে দিতে চায়। তারা স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা নির্দেশ করেই তাদের দায়িত্ব পালন করতে চায়। যে দায়িত্ব তাদের প্রতি সাংবিধানিকভাবে আরোপিত সে দায়িত্ব পালনে তারা সরকার প্রধানের দোহাই দিয়ে দায় এড়াতে পারে না। ইলেকশন কমিশন অযোগ্যতা, অকর্মণ্যতা, অদক্ষতা, অনভিজ্ঞতা ইত্যাদি অনেক ‘অ’-এ বিভূষিত হচ্ছে। তাদের ক্ষমতা আছে প্রয়োগ নেই, তাদের দায়িত্ব আছে সমাপনে আগ্রহ নেই। তাদের চোখ আছে কিন্তু তারা দেখেন না। তারা কয়েক জন ব্যক্তি আছেন বটে কিন্তু তাদের ব্যক্তিত্বের স্ফুরণ নেই। এ কঠিন দায়িত্ব পালনের জন্য যে ঝুঁকি নেয়া দরকার সেটা সম্পূর্ণভাবেই তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। হয়তো দলীয় অন্ধত্ব এবং সুবিধাবাদ তাদের পেয়ে বসেছে। সে জন্য তারা শুধু দুধ-ভাত খেতে চায়। আর ‘ডাণ্ডা মেরে’ সব ঠাণ্ডা করতে চায়। তাদের তুলনা করতে গিয়ে ছোট সময়ের ছড়া ‘বাবু রাম সাপুড়ে’ মনে পড়ছে। সেই যে পঙ্তিমালা.. ‘বাবু রাম সাপুড়ে/ কোথা যাস বাপুরে../ যে সাপের চোখ নেই / শিং নেই, নখ নেই / ছোটে নাকি হাঁটে না / করে নাকো ফোঁস ফাঁস/ মারে নাকো ঢুঁশ ঢাঁশ / নেই কোনো উৎপাত খায় শুধু দুধ ভাত.../ তেড়ে মেরে ডাণ্ডা করে দেই ঠাণ্ডা’।
Mal55ju@yahoo.com

বাংলাদেশে নতুন মাত্রায় জঙ্গি তৎপরতা: বিবিসি

চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকায় একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি একটি এমকে-১১ স্নাইপার রাইফেল, প্রায় ২০০ রাউন্ড গুলি এবং বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে। সেনাবাহিনীর পোশাকও পাওয়া গেছে ওই বাড়িতে। গোয়েন্দা পুলিশ ধারণা করছে, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্যরা এই বাড়িটিকে তাদের আস্তানা বানিয়েছিল। অভিযানের সময় অবশ্য বাড়িতে কেউ ছিল না। বাংলাদেশে জঙ্গিদের কাছ থেকে স্নাইপার রাইফেল উদ্ধারের ঘটনা বিরল। সেই সাথে সেনা পোশাক পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। ওই বাড়ি থেকে স্নাইপার রাইফেল ও সেনা পোশাক ছাড়াও রিমোট ডিটোনেটর, বেশ কিছু বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রামের গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, এটি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির একটি আস্তানা। চট্টগ্রামে গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বাবুল আক্তার বলছেন, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে তিনজনকে আটক করার পর তাদের তথ্যের ভিত্তিতে ওই বাড়িটির সন্ধান পেয়েছেন তারা।   সেখানে সেনাবাহিনীর পোশাকের সাথে মেজর পদবীর ব্যাজও পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, “মেজরের ব্যজ পাওয়া গেছে ইউনিফর্মের সাথে। তারা যে কোন ভাবেই হোক এটা সংগ্রহ করেছে।” বাংলাদেশে স্নাইপার রাইফেল উদ্ধারের বিষয়টি বেশ বিরল বলে উল্লেখ করে মি আক্তার বলেছেন, “অস্ত্রটির গায়ে লেখা আছে এমকে ডাবল ওয়ান। এধরণের স্নাইপার রাইফেল পাওয়ার খবর আমি আগে কখনো দেখিনি।” ইন্টারনেটে এই স্নাইপার রাইফেলটি নিয়ে একটু গবেষণা করে দেখা গেলো তার সাথে চট্টগ্রামের পাওয়া অস্ত্রটির ছবির কোনো মিল নেই। সেনিয়ে মি আক্তার জানান, এটি পুরনো ধরনের এমকে ইলেভেন। সেনিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে তিনি আলাপও করেছেন। গত ছ’মাস ধরে এই বাড়িটিকে একজন ভাড়া নিয়েছিলো বলে জানা গেছে। তবে অভিযানের সময় বাড়িতে কেউ উপস্থিত ছিলো না। মি আক্তার জানিয়েছেন, যাদের আটক করা হয়েছে তাদের সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ। “এদের একজনের বাড়ি মহেশখালী, একজনের ফেনি আর একজনের বাড়ি কুড়িগ্রামে। এদের বয়স চব্বিশ পঁচিশের মতো। এরা সবাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে।” পুলিশ বলছে, আটক ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এর আগে গত বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে একটি কথিত জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ সক্রিয় ১৬ টি গ্রেনেড, বিপুল পরিমাণ বোমা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও সুইসাইড ভেস্ট উদ্ধার করে। সেখানে এগুলো বানানোর একজন প্রশিক্ষকও ছিলো বলে জানানো হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশ মিরপুরের ওই বাড়িটিকে 'বোমা তৈরির কারখানা' বলে জানায়। এই অভিযানের মাত্র চারদিনের মাথায় হলো নতুন এই অভিযান। নিরাপত্তা বিশ্লেষক আব্দুর রব খান বলেছেন, সেনা পোশাক উদ্ধার আর তা ব্যবহারের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য কি সেটি বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, “ঢাকার কাফরুলে আর্মড পুলিশ ব্যটালিয়ন যেখানে পাহারা দিচ্ছিলো সেখানে আক্রমণ হয়েছে। আর চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর সুরক্ষিত এলাকায় দুটি মসজিদে হামলা হয়েছে। সেখানেই উদ্বেগের বিষয়। কারণ সেনাবাহিনীর পোশাককে ক্যামোফ্লাজ হিসেবে ব্যবহার করে যদি তারা ক্যান্টনমেন্ট বা সেনাবাহিনীর উপর হামলা চালায় তা অত্যন্ত ভয়ের ব্যাপার হবে।” “এর আগে সেনাবাহিনীর পোশাকের ব্যাপারটি দেখিনি। এখন হয়ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরীক্ষা করে দেখবেন এগুলো আসল না নকল। কিন্তু যেটাই হোক তাদের কি ইচ্ছা ছিলো সেটা সেটাই উদ্বেগের বিষয়।” মি খান বলছেন, সবমিলিয়ে জঙ্গিদের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নতুন মাত্রার মুখোমুখি হচ্ছে।- বিবিসি

মোদির পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত by গৌতম দাস

ব্যাপারটাকে মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করা যায় যে, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ তৎক্ষণাৎ সেই কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, সেই ব্যথা যা তাকে তাড়িত করছে তা উপশমের জন্য। ভারত-পাকিস্তান এ দুই রাষ্ট্রের কেচ্ছা-কাহিনীর শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় সেটা ঝগড়া-বিবাদের, চরম ও গরমের। তবুও ভারত-পাকিস্তান এখন এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছে; কোনো এক ব্যথা তাদের এমন তাড়িত করছে যে, তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে, পুরনো কিছু বিবাদ প্রসঙ্গে মারমুখী হওয়ার বদলে তা লঘু করতে দিল্লি তৎপর হওয়া খুবই জরুরি মনে করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাবুল সফর থেকে দিল্লি ফেরার পথে আচমকা পাকিস্তানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অন্তত তার মুখে বলা উদ্দেশ্য হলো, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন ছিল। ফলে মোদি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য পথে শরিফের লাহোরের বাসায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিল্লি ফিরে গেলেন। অনেকে বলেন, মোদি চমক দিতে ভালোবাসেন, তাই তিনি এক চমক নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু এমন কী সেখানে ঘটেছে, যা এ দুই শীর্ষ নেতাকে এমন বেচাইন করছে? সেটা আজকের প্রসঙ্গ!
বাইরের চমকের দিকগুলো তুলে ধরেছি প্রসঙ্গে প্রাথমিক প্রবেশ করার জন্য, কিন্তু বাস্তবে কূটনীতি বা দুই রাষ্ট্র-স্বার্থের ঠোকাঠুকি খুবই জটিল বিষয়। ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ ধরনের ফালতু, মিথ্যা ও অবাস্তব শব্দগুলোকে বাদ দিয়ে সরিয়ে রাখলে যেকোনো দু’টি রাষ্ট্র মানেই দু’টি আলাদা আলাদা সঙ্ঘাতময় স্বার্থ এবং মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে যেকোনো দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক মানেই স্বার্থসঙ্ঘাত। কারণ, বাস্তবতায় স্বার্থসঙ্ঘাত আছে বলেই তো তারা দুই আলাদা রাষ্ট্র, নইলে তো একই রাষ্ট্র হিসেবে তাদের থাকতে দেখতাম। কিন্তু তবুও এই সঙ্ঘাতের সম্পর্কের ভেতরেই আবার কোনো কোনো ইস্যুতে সাময়িক এক সাধারণ অবস্থান খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। উভয় পক্ষই এর সুযোগ নিতে চাইলে, একসাথে দরকার অনুভব করলে এমন পরিস্থিতির উদয় হয়; ফলে সাধারণ অবস্থান খোঁজা খুবই দরকার হয়ে পড়ে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাত্র এমন এক জটিল বিষয়।
কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদির চমক সৃষ্টি করার ঝোঁক সব সময় দেখা যায়; মোদির এই ঝোঁক যেন বলতে চায় এ জটিল জিনিসটিকে সামলাতেই শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, গুড ইম্প্রেশন তৈরির চেষ্টা কাজে আসে। যেটাকে আমরা ব্যক্তিগত ইমোশন শেয়ার বা ভাবের সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি বলি, মোদি বলতে চান এগুলো জটিল কূটনীতিকে তরল করতে বিরাট ভূমিকা রাখে। কথা সত্যি, জটিল স্বার্থসঙ্ঘাতের ইস্যুকে নরম করতে, অন্তত ডায়ালগ শুরু করার দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাবুঝি ভালো থাকলে তা একটা ইতিবাচক ভূমিকা অবশ্যই রাখে।
মোদি আসলে গিয়েছিলেন পুতিনের রাশিয়া সফরে। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ পাকিস্তানে থেমেছিলেন। দুই দিনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফরে গত বুধবার তিনি রাশিয়া পৌঁছেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, সেই ’৫০-এর দশক থেকেই রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের ভারী অস্ত্র, যুদ্ধ টেকনোলজির সরবরাহকারী। মাঝে ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আমেরিকান অস্ত্র; বিশেষত পারমাণবিক টেকনোলজিসহ ভারী অস্ত্র কেনা, একসাথে যৌথ উদ্যোগে এর উৎপাদন ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সম্পর্কের দুয়ার খুললেও এখনো অস্ত্রবিষয়ক সম্পর্ক ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে সব ধরনের অঙ্ক বা ফিগারের দিক থেকে এখনো রাশিয়া সবার চেয়ে আগে এবং একমাত্র।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ যৌথভাবে লাইট কার্গো হেলিকপ্টার উৎপাদন, যৌথভাবে ট্যাংক তৈরি, যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন, পারমাণবিক ক্ষমতায় চলা অ্যাটাক সাবমেরিন লিজ বা ভাড়া নেয়া এবং শত্রুর ছোড়া মিসাইল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাশিয়ান মিসাইল শিল্ড কেনা ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি শেষ করে দিল্লি ফেরার পথে কয়েক ঘণ্টার জন্য মোদির আফগানিস্তানের কাবুল যাওয়ার কথা। অনেকেই জানেন, আফগানিস্তান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথেও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আফগানিস্তানের আছে। এ দিকটা জানতে আগ্রহীরা ছাড়া এর বাইরের অনেকেরই জানা নেই। আফগানিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে এর ফায়দা যেন শুধু পাকিস্তান না তোলে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাড়তি সুবিধা না হয়, ভারতের ভাষায় তা যেন ভারসাম্যহীন না হয়, এর বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের এমন সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা। এসব রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক সূত্রে ভারত ৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে খরচ করে আফগানিস্তানের জন্য এক নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি করে দিয়েছে। ওই ভবন উদ্বোধন করতেই মোদির সংক্ষিপ্ত কাবুল সফর। এই সফরের খবর নিরাপত্তার কারণে খুব সীমিত বা লো-প্রোফাইল রাখাতে অনেকেই জানতেন না মোদি আসবেন। আর কাবুলে কর্মসূচির শেষে ওই দিনই বিকেলে তার দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
কিন্তু চমক ঘটল কাবুল কর্মসূচি সমাপ্তিতে। মোদি এ ধরনের চমকের খবর সবার আগে নিজেই টুইট করে ঘোষণা বা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। ফেরার পথে তিনি টুইট করলেন যে, ভারতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে দেখা করতে লাহোর যাচ্ছেন। শুক্রবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিন, তাই তিনি শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন আর একই সাথে শরিফের নাতির বিয়ে, ফলে শরিফের লাহোরের বাসায় তিনি যাবেন।
এতক্ষণ চমকের দিক থেকে ধারাবর্ণনা করলেও আসলে মোদির পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে তাগিদবোধ অনেক আগে থেকেই। সুনির্দিষ্ট করে বললে, আইএসের প্যারিস হামলা বা আক্রমণের পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে শরিফের সাথে দেখা হওয়াকে পরিকল্পিতভাবে মোদি নতুন করে মিলিত হয়ে কথা বলার কাজে লাগিয়েছিলেন।
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের আপত্তি ও মতবিরোধের শেষ নেই। এবং প্রায় প্রতিটি ইস্যু আজন্ম। ফলে সেদিকে না গিয়ে একালের বিরোধের মূল ইস্যু নিয়ে কথা তুললে বলতে হয়, ভারত মনে করে, ভারতে আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা ইতোমধ্যেই ঘটেছে, অ্যাকশন প্রস্তুতি চলছে ধরনের। এ বিষয়টি মোদিকে পাকিস্তানের সাথে দ্রুত ডায়লগ শুরু করতে নগদ তাগিদ হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ ২০০১ সাল আলকায়েদা উত্থানের পর থেকে ভারতে এরা সরাসরি হাজির ও তৎপর না হলেও কাশ্মির-কেন্দ্রিক সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক তৎপরতাগুলোকেই ভারত আলকায়েদার ‘টেররিজম’ বলে চালিয়ে এসেছে। এখন এই প্রথম ভারতকে আলকায়েদা বা একালের আইএস বিষয়ে মানে প্রকৃত ও ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বা আমেরিকার ভাষায় যা ‘টেররিজম’ তা মোকাবেলার জন্য মোদি ভারতকে উপযুক্ত করে সাজাতে তৎপর হয়েছে। সম্ভবত মোদি সরকারের ইচ্ছা ও অনুভব হলো, এত দিন ধরে টেররিজম বলে চালিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন আর আইএসের ‘টেররিজম’Ñ এ দুইয়ের সাথে একসাথে লড়তে গেলে ভারতের সক্ষমতা ও রিসোর্সে টান পড়তে পারে, উপযুক্তভাবে কাজে নাও লাগানো যেতে পারে। এর বদলে প্রথমটার বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বা পাকিস্তানের মাধ্যমে কোনো রফা করতে পারলে কমপক্ষে একে তুলনামূলক কম ভয়ঙ্কর হিসেবে হাজির রাখতে পারলেও তা সরকার ও রাষ্ট্রের সুবিধা হয়, এটাই মোদির জন্য হয়তো স্বাভাবিক ও সঠিক অনুমান। কিন্তু গোল বেধেছে তাহলে কাশ্মির ইস্যুকে সুরাহা করতে ভারতের পছন্দমতো করে হলেও ভারতকে কোনো একটা ফর্মুলা প্রস্তাব করতে হবে। সেটা ভারত চায় না বলে মনে করার কারণ আছে। ফলে ভারতের ইচ্ছা কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে আইএসের টেররিজম মোকাবেলার ইস্যুতে পাকিস্তানকে কতটা পাশে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাল্টা বলতে চায়, কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে শুধু টেররিজম নিয়ে ডায়লগ সে চায় না। এটাই ছিল ভারত-পাকিস্তানের এ কালের মতবিরোধের মূল বিষয়। তাহলে সার বিতর্ক হলো, ‘টেররিজম বিষয়ে আলাপ হবে’ না ‘কাশ্মির ইস্যুসহ সব টেররিজম নিয়ে আলাপ হবে’।
দীর্ঘ দিন এভাবে নন-ডায়লগ হয়ে পড়ে থাকার পর মোদি এবার পাকিস্তানের সাথে মতবিরোধের স্থবিরতা কাটাতে উদগ্রীব হয়েছেন। এ বিষয়ে, গত ২৫ ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, মোদি বুঝেছেন, ‘তিনি যে পাকিস্তানের সাথে ডায়লগে যুক্ত হচ্ছেন, এটা দেখানো তার দরকার, কারণ তিনি আমেরিকা ও সৌদিদের চাপে আছেন।’ টাইমস এ কথাগুলো লিখছে এক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিকের বরাতে। মালিক অবশ্য আরেক কথা বলেছেন যে, পাকিস্তানের আগের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্প্রতি বদল করে সেখানে সেনাপ্রধানের পছন্দের লোক আনা হয়েছে। কিন্তু মোদি এটাকে তার জন্য সুবিধা হিসেবে দেখেছেন, কারণ তিনি সরাসরি পাকিস্তান সেনাদের সাথে কাজ করতে চান। অনেকে খোঁচা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাদের হাতে। নওয়াজের আগের সরকারের কালে সেনাদের সাথে অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না; যেটা জেনারেল মোশাররফের বিমান আকাশে আটকে রাখা আর পাল্টা ক্যু-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই এবারো এমন কোনো জটিলতা যেন না সৃষ্টি হয়, সেজন্য নওয়াজের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার সময়ের ইনফরমাল ডিল হলো, কেবল সামরিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেনাদের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাবে, বাকি অন্য সব বিষয়ে নওয়াজ। এ বিষয়টিকে অনেকে খোঁচা দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। তবে মোদি জানেন, পাকিস্তান থেকে তিনি যা চান তা পেতে গেলে তার জন্য সরাসরি সেনাদের সাথে ডিল করা ভালো, কারণ তারাই তা দিতে পারে।
এসব পটভূমি মাথায় রেখে মোদি প্যারিস জলবায়ু মিটিংয়ে নওয়াজ শরিফের সাথে সমঝোতা করেন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেররিজম ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে ডায়লগ করবে। আর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একই সাথে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ চলবে। সেই রফা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে টেররিজম ইস্যুতে ডায়লগ হয়। আর এর দুই দিন পর ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সুষমা স্বরাজের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ হয়।
বলা যায়, মোদি ভারতে আইএস তৎপরতা ছড়ানোর সম্ভাবনা ও তা মোকাবেলাকে মাথায় রেখে, এটাকে সব বিবেচনার মূল কেন্দ্রে রাখার কারণে তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করতে সিরিয়াস হয়েছিলেন। যদিও ভারতে কাশ্মির ইস্যুতে কিন্তু পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যেসব সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে, এগুলো ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা হাজির হওয়ার আগে থেকেই আছে বা ছিল।
ফলে এরা আর আলকায়েদা ফেনোমেনা এক নয়। কিন্তু তবুও ভারত কল্পিত জঙ্গিবাদ ও টেররিজম, নিজের ভূমিতে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কথার প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য, কল্পিত টেররিজমের সরবরাহকারীর অজুহাতে বাংলাদেশকে কব্জার মধ্যে রাখা, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওপরে বাণিজ্য সুবিধা আদায় করা আর ট্রানজিট করিডোর আদায় করে নেয়ার কাজে ব্যবহার করে গেছে। সম্প্রতি আইএস ভারত ও বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে থাকতে পারে, এটা তারা স্বীকার করছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যের সাথে তার রাষ্ট্রের ভাষ্যের এ প্রথম অমিল দেখা গেছে। এমনকি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অমিল-গরমিলকে স্বীকার করে নিয়ে গত সপ্তাহে বলেছেন, তারা ভারতের পাওয়া তথ্যের সাথে নিজের বোঝাবুঝি ও অমিলের কারণ খুঁজছে। তাহলে এ কথা মনে করার কারণ আছে যে, মোদির পাকিস্তান সফর কোনো চমক বা কারিশমা দেখানো নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টে ভারতের ইংরেজি একটি দৈনিকের ডব্লিউআইআরই-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদ্বারজনের এক মন্তব্য তুলে এনেছে। মোদি সম্পর্কে ভারাদ্বারজন বলছেন, ‘একভাবে দেখলে চমকের পাকিস্তান গমন করে মোদি আসলে সবার কাছে এক বার্তা দিয়ে ফেলেছেন, যা থেকে তিনি আর সরে আসতে পারবেন না। তিনি আসলে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি এখন আর সহজে এখান থেকে সরে যেতে পারবেন না।’
বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই যে যখন যেভাবে সুবিধা মনে করেছে পাকিস্তান ইস্যুকে অ্যান্টি-পাকিস্তানি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ, এক উগ্র বর্ণবাদ প্রচার করেছে ভোটের বাক্স ভরার দিকের নজর থেকে। ফলে তাদের যার যার সরকারের পাকিস্তান নীতিতে আর ওইকালে যেকোনো নির্বাচনে পাকিস্তানবিরোধী ঝড় তুলে ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতির মধ্যে কখনো মিল-সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। স্থানীয় নির্বাচনে জেতার বিষয়টিকে মুখ্য বিবেচ্য রাখার কারণে সরকারের নীতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। এসব সমস্যার কথা খেয়াল করে ভারাদ্বারজন ওই মন্তব্য করেছেন।
কম-বেশি প্রায় এই একই সমস্যা আমাদের দেশেও হয়ে আছে। সরকারের সক্ষমতা ও মনোযোগ এরই মধ্যে (নকলভাবে) জঙ্গি বলে সাংবিধানিক রাজনীতির জামায়াত-বিএনপি দমনের কাজে সরকার ব্যবহার করে চলেছে। আবার সাম্প্রতিককালে আসল ‘টেররিজম’ আইএস বা জেএমবি দমনের কাজেও এটা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সক্ষমতায় তারা দুইভাবে ভাগ হয়ে আছে। এভাবে কত দিন চলতে পারবে, সক্ষম থাকবে কি না জানি না। তবে কেবল জেএমবি দমনের কাজে মনোযোগী থাকার জন্য সক্ষমতা কেবল সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে আপাতত সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিরোধীদের সাথে কোনো ডায়লগ, আঁতাত, বোঝাবুঝি কোনো কিছুর আলামত দেখা যাচ্ছে না, যাতে সরকার সব রিসোর্স সক্ষমতা একমুখী করতে পারে।
goutamdas1958@hotmail.com

বন্ধ হোক ‘পিষে মারার নৃশংস সংস্কৃতি’ by আলী রীয়াজ

অন্যের মুখে শোনা বলে আপনি এর সত্যতা নিয়ে সন্দিহান হতে পারতেন, একে কম গুরুত্ব দিতে পারতেন, উত্তেজনার মুখে ‘কথার কথা’ বলেও আপনি খানিকটা হয়তো ভিন্নভাবে বিবেচনা করতে পারতেন; যদিও কথাটা কেবল কথা থাকেনি, বলতে না-বলতেই কাজে রূপান্তরিত হয়েছে। সর্বসমক্ষে নিহত হয়েছেন একজন, দিবালোকে। আসলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনা কয়েক দিন আগের। ঢাকার উত্তরায় জসীমউদ্দীন রোডের মোড়ে একজন বাসচালকের সঙ্গে একজন অটোরিকশাচালকের বাদানুবাদ হয়, তারপরে বাসচালক আবদুল মজিদ (২৫) বাসটি তুলে দেন অটোরিকশাচালক মো. ফারুকের (৪০) ওপর। বাসের চাকায় পিষ্ট ফারুকের দেহ বাসটি টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছে অন্তত আধা কিলোমিটার। বাদানুবাদ যাঁরা শুনেছেন, তাঁরা বলেছেন, আবদুল মজিদ হুমকি দিয়েছিলেন, ‘তুই সর। নাইলে পিষ্যা ফালামু তোরে।’ প্রত্যক্ষদর্শী অনন্ত কুমার সিংহ প্রথম আলোর সাংবাদিককে এই কথাগুলো জানিয়েছিলেন। পুলিশের হাতে আটক চালক আবদুল মজিদ স্বীকার করেছেন যে তিনি জেনে-বুঝেই কাজিট করেছেন। উত্তরা পশ্চিম থানার পুলিশ কর্মকর্তা মো. আলী হোসেন খান জানাচ্ছেন যে তাঁর কাছেও নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আবদুল মজিদ বলেছেন যে ‘ওই সিএনজিচালক আমার সঙ্গে তর্ক করছিল। তাই তাকে পিষে দিয়েছি।’ (মানবজমিন, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৫)।
কী ভয়াবহ! কিন্তু একই সঙ্গে লক্ষণীয়, আবদুল মজিদ এই নিয়ে চিন্তিত নন, কেননা তিনি এভাবেই ভাবেন।
কখনো কখনো একটি-দুটি ঘটনা সমাজের ভেতরের অদৃশ্য প্রবণতাকে তুলে ধরে। কিন্তু যখন একই ধরনের ঘটনা উপর্যুপরিভাবে ঘটে, তখন একে আমরা অদৃশ্য প্রবণতা না বলে সমাজের ছবি বলেই গণ্য করব। কয়েক মাস ধরে আমরা যেসব নৃশংস ঘটনা দেখতে পাচ্ছি, সেগুলো আপাতদৃষ্টে রাজনৈতিক নয় বলে আমরা সাধারণত এই নিয়ে খুব বেশি বিচলিত হই না। কিন্তু আমাদের কি প্রশ্ন করা উচিত নয় যে কী কারণে সমাজের ভেতরে সহিংসতার এই মানসিকতা বিস্তার লাভ করে এবং করেছে? কীভাবে এ ধরনের অমানবিকতা সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে আর কত দিন আমরা নিজেদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায় মত্ত থাকব?
আবদুল মজিদ তাঁর চেয়ে ছোট এবং দুর্বল বলে যাঁকে দেখেছেন, সেই মোহাম্মদ ফারুককে পিষে দিয়েছেন। এটি মর্মান্তিক ঘটনা। কিন্তু আমার কাছে এ ঘটনাকে খুব বিস্ময়কর মনে হয় না এই অর্থে যে বাংলাদেশের সমকালীন সমাজে পিষে দেওয়ার মানসিকতা সর্বব্যাপ্ত, সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। আকারে ও শক্তিতে যাঁরা নিজেদের বড় মনে করেন, তাঁরা তুলনামূলকভাবে ছোটদের ওপর চড়াও হন। তাঁর যদি অর্থ, বিত্ত, প্রভাব, ক্ষমতাসীনদের আনুকূল্য থাকে, তবে তো সোনায় সোহাগা। রাষ্ট্র যদি তাঁর পক্ষে দাঁড়ায়, তবে তো কথাই নেই।
সমাজে যে দুর্বলকে পিষে ফেলার অব্যাহত চেষ্টা, ভিন্নমতকে পিষে ফেলার নিরন্তর চেষ্টা, সেটা নিয়ে আমরা সরব হব কবে?
‘পিষে মারা’র একটি প্রকাশ হচ্ছে পিটিয়ে মারা। এ মাসের গোড়ার দিকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ডাকাত সন্দেহে আটজনকে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনা নিশ্চয় আমাদের মনে আছে; যদিও অনেকেই হয়তো মনে করতে পারবেন না যে এই বছরের ২৫ জানুয়ারি নরসিংদী সদরে ডাকাত সন্দেহে বা অভিযোগ তুলে সাতজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ বছরের মাঝামাঝি পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো যেসব তথ্য দিয়েছিল, সেই হিসাবে সাড়ে ছয় বছরে কথিত ‘গণপিটুনি’তে ৯০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংবাদপত্র যাকে ‘গণপিটুনি’ বলে বর্ণনা করে, তা আসলে বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি রূপ। এ বছরের প্রথম ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৮ জন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থেকে ব্যক্তিগত শত্রুতা—সবই এসব ঘটনার পেছনের কারণ হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু পিটিয়ে মারার ঘটনা একা ঘটে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাতে যোগ দেন অনেকে। আবদুল মজিদ যাঁকে ‘পিষে মারা’ বলছেন, আক্ষরিকভাবে তা–ই দেখতে পাই এই পিটিয়ে মারার মধ্যে, কিন্তু তাতে অংশ নেন অনেকে। যদি বলি, আসলে পিষে মারতে চাওয়ার মানসিকতা কেবল আবদুল মজিদের নয়, তা হলে কি অতিরঞ্জন হবে?
সমাজে যাঁদের শক্তি আছে, তাঁরা প্রতিপক্ষকে ‘পিষে মারতে’ চান। সেই লক্ষ্যে তাঁরা তাঁদের শক্তিকে ব্যবহার করতে মোটেই কুণ্ঠিত হন না। সমাজে যাঁরা সংখ্যালঘু বলে পরিচিত—ধর্মবিশ্বাসে, জাতীয় পরিচয়ে, রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে—তাঁরা প্রতিদিন বুঝতে পারেন যে এই পিষে মারার চেষ্টা কত প্রবল। সমাজে ও রাজনীতিতে ক্ষমতাবানেরা অন্যদের কথা শুনতে চান না, তাঁদের সঙ্গে ‘তর্ক’ করলে তাঁরা যাঁরা তর্ক করেন, তাঁদের যেভাবে পারেন ‘পিষে মারতে’ উদ্যোগী হন। এই পিষে মারা সব সময় শারীরিক হতে হবে তা নয়। পিষে মারার ভিন্ন পথও আছে। খানিকটা ‘পিটিয়ে মারার’ মতো ঘটনা। এমন মনে করার কারণ নেই যে পিটিয়ে মারায় অংশগ্রহণকারী সবাই সম্যকভাবে অবহিত কেন তাঁরা পিটিয়ে মারছেন। যাঁরা অংশ নিচ্ছেন, তাঁরা কোনো না কোনো কারণে, কোনো না কোনোভাবে এ ঘটনায় যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের উজ্জীবিত করে ‘গোষ্ঠী’ বা ‘মব’ (Mob)-এ পরিণত করা হয়েছে। এই একই অবস্থা আপনার কথা বলার ব্যাপারে, চিন্তার ব্যাপারেও হতে পারে। ব্লগার বলে পরিচিত পাঁচজন লেখক এবং একজন প্রকাশক যে খুন হলেন, তা আসলে শারীরিকভাবে ‘পিষে’ ফেলাই। কিন্তু তার বাইরেও ক্রমাগতভাবে শক্তি প্রয়োগের উদাহরণ আছে। আপনার তর্ক করার অধিকার যখন অগ্রাহ্য হচ্ছে, সেটা আইনের মোড়কেই হোক কিংবা আইনের বাইরেই হোক, সেটা আসলে আপনার কণ্ঠকে বা প্রকারান্তরে আপনাকে ‘পিষে’ ফেলা। যখন আপনার ওপরে গোষ্ঠীগতভাবে মৌখিক আক্রমণ হচ্ছে, তখন একে পিষে ফেলার চেষ্টা বলেই অনুমান করা যায়; আপনার কথা আগামভাবে বন্ধ করার মানসিকতা কেন ভিন্ন বলে জানব? এই প্রচেষ্টাগুলো যখন একটি ভাবাদর্শের ছায়ায় পরিচালিত হয়, তখন তা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কেননা ভাবাদর্শ তাঁকে বৈধতা দেয়। সেই সময় চিন্তার স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হয়। এ কাজে রাষ্ট্র যখন অগ্রণী, তখন তা কেবল উদ্বেগের জায়গায় থাকে না।
বাসচালক আবদুল মজিদ নিরীহ অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফারুককে পিষে ফেলেছেন; বাসযাত্রীরা তাঁকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। আমরা আশা করি, আবদুল মজিদের বিচার হবে, তাঁর যথাযথ শাস্তি হবে। এও আশা করি, ফারুকের অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা হবে। কিন্তু সমাজে যে এই প্রবণতা বাড়ছেই, তার কী হবে? সমাজে যে দুর্বলকে পিষে ফেলার অব্যাহত চেষ্টা, ভিন্নমতকে পিষে ফেলার নিরন্তর চেষ্টা—সেটা নিয়ে আমরা সরব হব কবে? আমাদের ভেতরে যে অন্যকে পিষে ফেলার মানসিকতা, তা থেকে মুক্তির পথ কি আমরা অনুসন্ধান করছি?
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

২০১৫: জনমনে আতঙ্ক উদ্বেগ আর জঙ্গিবাদের নতুন উত্থানের বছর by আমীর খসরু

বছরটি শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতার মধ্য দিয়ে। এর আগের বছরের ৫ই জানুয়ারি ভোটারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে ওই সহিংসতা শুরু হয়। আর বছরটি শেষ হচ্ছে প্রথমবারের মতো দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠান পৌর নির্বাচনকে ঘিরে উত্থাপিত নানা অনিয়ম, আচরণবিধি লঙ্ঘন এবং ছোট-বড় নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে। বছরটি জুড়ে ছিল আগে থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণে সৃষ্ট নানা বিপদ। আর ওই ভারসাম্যহীনতার কারণে রাজনৈতিক শূন্যতা গাঢ় হয়ে বড় সংকটের দৃশ্যমান উপস্থিতি লক্ষ্য করা
 যায়। ওই কারণে বছরটিতে জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের নতুন উত্থান ঘটে। আগের চেয়ে শক্তিমান হিসেবে আবির্ভূত হয় তারা এবং নতুন মাত্রায়। পুরো বছরটি জুড়ে রাজনৈতিক শূন্যতার যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে তা আগামীতে কমবে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, ক্রমবর্ধমান গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি ও কর্তৃত্ববাদিতার কারণে।
গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার বিপদটিই বিস্তারিত হয়েছে সর্বত্র- তা শাসনে হোক, রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় কিংবা মানুষের বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতার ক্ষেত্রেই হোক। এ কারণে গেল বছরটিতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতার উপরে যেমন বড় মাত্রার বাধা এসেছে, তেমনি বিরোধী দল, মত, পক্ষ ও পথ বিনাশী কার্যক্রমের অবাধ কার্যক্রম ছিল ব্যাপকমাত্রায় লক্ষ্যণীয়। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, এ সমস্ত বিষয়াদি শাসকদের মনোজগতে এবং মনের গহীন ভেতর বাসা বেঁধেছে গাঢ়তর হয়ে। জঙ্গিবাদ দমনের নামে যেখানে প্রয়োজন ছিল জাতীয় ঐক্যের, তা বাদ দিয়ে এক এবং এককের প্রচেষ্টাটিই যেন মুখ্য হয়ে উঠেছে। হাত পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপরেও। ২২ দিন বন্ধ ছিল ফেসবুক। ভাইবারসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমও এ থেকে বাদ পড়েনি।
২০১৪-এর ৫ই জানুয়ারিতে বিতর্কিত এবং নজিরবিহীন নির্বাচনের মধ্যদিয়ে পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থা যে মানুষের নাগালের অনেক দূরে যেতে থাকে- তা আর থামানো হয়নি। যার প্রতিফলন দেখা গেছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে।
গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি সৃষ্টির কারণে যেসব বাধা-বিঘ্নসমূহ তৈরি করা হয় তা থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার কারণেই নতুন করে উত্থান ঘটেছে জঙ্গিবাদের। এ কথা অনেকদিন ধরে বার বার বলা হচ্ছিল, গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির কারণে ভারসাম্যহীন পরিস্থিতিতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয় তা থেকেই জন্ম নেয় জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ-চরমপন্থার। ২০১৫-তে চারজন ব্লগার ও একজন প্রকাশককে হত্যা, প্রকাশক-ব্লগারদের হত্যার উদ্দেশে হামলার ঘটনা ঘটে। রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র-বহির্ভূত দুই শক্তিই স্বাধীন মতামত প্রকাশের উপরে বাধার সৃষ্টি করে। এছাড়া দু’জন বিদেশী নাগরিককে হত্যা করা হয়। একজন বিদেশী নাগরিকের উপর হামলাসহ শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় মিছিলে হামলায় দু’জন নিহত হওয়া, আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদ ও হিন্দু মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলা এবং হুমকির ঘটনা ঘটে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের যাজকদের উপরে। এসব ঘটনা বাংলাদেশে একেবারেই নতুন। বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস, আল-কায়েদা ভারতীয় শাখা, আনসার আল-ইসলামের উপস্থিতির কথা ইতিপূর্বে এদেশে আর শোনা যায়নি। কিন্তু সরকার বরাবরের মতোই এসব ক্ষেত্রেও উল্টো পথ বেছে নিয়েছে। সবকিছুকে না বলা এবং অস্বীকারের সংস্কৃতি আরও জোরদার হয়েছে এ বছরটিতে। আইএস-এর উপস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন- ‘আইএস’-এর উপস্থিতি আছে এমনটা বললে তারা ‘হামলে’ পড়তে পারে’। এ কথার মধ্যদিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কথাটিই বললেন। পরে অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, এ পর্যন্ত যতো সব জঙ্গি ঘটনা ঘটেছে তা সবই আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। এ কথাগুলোর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হচ্ছে তাও প্রথমবার শোনা গেল।
একদিকে, জঙ্গিবাদের নতুন উত্থান অন্যদিকে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সামগ্রিকভাবে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যদিয়েই কেটেছে বছরটি। আপাত: শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে বলে বলা হলেও পুরো সমাজের অন্তর্গত অবস্থাটি ছিল ভিন্ন। ভেতরে রক্তক্ষরণ রেখে বাইরে দৃশ্যমান শান্তির অবস্থাই ছিল সর্বত্র।
এতে জন্ম নিয়েছে নানা সংকট। রাজনৈতিক সংকট থেকে অর্থনীতি, বাদ যায়নি সাধারণ মানুষও। এ বছরটিতে দলে দলে মানুষ দেশান্তরী হতে গিয়ে মৃত্যুর মুখে পড়েছেন সাগরে, থাইল্যান্ডের গহীন জঙ্গলে, মালয়েশিয়ার বিরানভূমিতে। এটি অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার নমুনা। আর এই অস্থিতিশীলতার কারণে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আরও কমেছে। বেড়েছে জনদুর্ভোগ। সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সামাজিক বৈষম্য। আবার উল্টো পথে অর্থনৈতিক খাতের নৈরাজ্যও বজায় ছিল। ব্যাংক থেকে টাকা লোপাট কিংবা দুর্নীতির দায়ে অভিযোগ উঠলেও তা অচিরেই হাওয়ায় মিলিয়ে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে ক্ষমতা আর বিত্তশালীদের পক্ষ নিয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলেও এই দুর্ভাগা দেশে তা কমেনি।
বাংলাদেশের মতো শেকড়ে প্রোথিত গণতন্ত্রপ্রিয় ও মনোভাবাপন্ন জনমানুষের দেশে প্রথমবার শুনতে হয়েছে ‘অল্প-স্বল্প গণতন্ত্র এবং বেশি উন্নয়নে’র স্লোগান। কিন্তু গণতন্ত্রবিহীন উন্নয়ন যে আমাদের মতো দেশে সম্ভব নয়- সে কথাটিও শাসকরা ভুলিয়ে দিতে চেয়েছেন। এটাও কর্তৃত্ববাদিতার কারণে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার উদাহরণ দেয়া হয়েছে বার বার। কিন্তু সে কথাটি বলা হয়নি যে, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় গণতন্ত্রের অভাব থাকলেও ওই সব দেশে প্রশাসনে দলীয়করণ নেই, দলের নেতা-কর্মীরা রাজত্ব করে না, দুর্নীতি আর অনিয়ম হলে কঠিন শাস্তি। এটাও বলা হয়নি যে, সেখানে আইনের শাসন আছে, আইনকে শাসন করা হয় না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সেখানে নেই।
এতো সবের মধ্যে ন্যায্যতাবিহীন, বৈষম্যপূর্ণ বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ড মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার প্রচারণায় সাধারণ মানুষকে শুনতে হয়েছে জয়গান আর জয়ধ্বনি।
২০১৫-র সামগ্রিক পরিস্থিতিটি ছিল এমন যে, নানাবিধ সন্ত্রাস সমাজকে গ্রাস করেছে। এই সন্ত্রাসের হাত থেকে নারীরাও রেহাই পাননি। বেড়ে গেছে যৌন সন্ত্রাস। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে এতো বড় যৌন সন্ত্রাসের ঘটনা বেমালুম চেপে যাওয়ার ইতিহাস আর নেই। এখানে বলতেই হবে, সন্ত্রাসীদের যেহেতু দলীয় পরিচয় আছে তাই কখনোই তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না। আগেও হয়নি। এটা টেন্ডারবাজি থেকে হল দখল, শিক্ষকদের মারধর আর যৌন সন্ত্রাস যাই হোক না কেন।
দলীয়করণ প্রশাসনসহ সর্বত্র বিস্তৃত হয়েছে। সার্বিকভাবে ক্ষমতাশ্রয়ী, ক্ষমতাবান ও শক্তিমান একটি শ্রেণির উত্থান ঘটেছে বছরটিতে। সামগ্রিকভাবে কর্তৃত্বপরায়ণতার সৃষ্টির পথে বেড়েছে গুম, অপহরণ, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কথিত গণপিটুনিসহ নির্যাতন-নিপীড়নের নানা পন্থা। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশে-বিদেশে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা চরমে উঠলেও না বলার সংস্কৃতিটি ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বছর জুড়েই জারি ছিল।
২০১৫-তে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতেও কোনো স্থিরতা ছিল না। এরও কারণ গণতন্ত্রহীনতার কারণে বহির্বিশ্বে যে বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে তার দাওয়াই খোজার কারণে। পশ্চিমি দুনিয়ার সাথে সম্পর্ক তেমন ভালো যায়নি। ভারতের সাথে সম্পর্কের মাত্রাটি ছিল ভিন্ন। পশ্চিমি দুনিয়ার বিকল্প হিসেবে চীন-রাশিয়াকে দিয়ে স্থান দখলের চেষ্টা করা হয়।
সব মিলিয়ে ২০১৫ ছিল বাংলাদেশের জন্য গণতন্ত্রহীনতা আরও প্রকট হওয়ার কারণে সৃষ্ট নানাবিধ অনিবার্য সমস্যা ও সংকটের বছর। আর এ কারণে আইনের শাসনের অভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতির উত্থানের সাথে সাথে জনমনে জন্ম নিয়েছে অধিকতর হতাশা, উদ্বেগ, আতঙ্ক আর শঙ্কা। মানুষ আতঙ্কিত, উদ্বিগ্ন তার বর্তমান নিয়ে এবং ভবিষ্যৎ চিন্তা করে।
এ কথাটি মনে রাখতে হবে, একটি বছরের হিসাব-নিকাশ শুধু ওই বছরটির ঘটনাবলীর নিরিখেই বিচার-বিশ্লেষণ করা যায় না। বছরটিকে বিচার করতে হলে, এর হিসাব-নিকাশ মিলাতে হলে অতীতকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক অতীত। গণতন্ত্রবিহীনতার কারণে যে রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, সে প্রক্রিয়াটি এ বছরই শুরু হয়েছে তা নয়, এটি অনেকদিনের সংকটের অনিবার্য পরিণতি। বিদ্যমান পরিস্থিতি জারি থাকলে আগামী বছরটিতেও কোনো সুসংবাদ থাকবে কিনা তা বলা এখনই সম্ভব নয়। তবে আগামী বছরটি সবার জন্য শুভ হোক, প্রতিটি সকাল হোক প্রত্যাশিত আনন্দের। আমীন।

আমার গুরু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন by কেরামত মওলা

দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে যাঁর প্রতিভার ব্যাপ্তি, বাংলাদেশের মানুষের কাছে যিনি শিল্পবোধ, শিল্পচেতনা ও শিল্পের সৌন্দর্যকে ছড়িয়ে দিয়েছেন, বিশ্বের সংস্কৃতির সঙ্গে যিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন, তিনি আমার গুরু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। আজ তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
জয়নুল আবেদিনের সৃজনশীলতা ও শিল্পদর্শন তাঁকে মহান করেছে। তাঁর শিল্পের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে জীবদ্দশাতেই দেশ-বিদেশে শিল্পবোদ্ধা, শিল্পসমালোচক ও শিল্পচেতনাসমৃদ্ধ সব মানুষের কাছে তিনি সমাদৃত হয়েছেন।
শৈল্পিক গুণে গুণান্বিত একজন মানবতাবাদী, হৃদয়বান, দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে এ দেশের মানুষের প্রতি ছিল তাঁর অসীম দরদ। চারুশিল্পের শিক্ষক হিসেবে এ দেশে শিল্পরুচি বিনির্মাণে তিনি ছিলেন অগ্রণী। আমার পরম সৌভাগ্য, চিরকাল সুন্দরের স্বপ্ন দেখা এই মানুষটির সরাসরি ছাত্র ছিলাম আমি। শিল্পের আঙিনায় বিশাল এই মানুষটির সাহচর্য পেয়েছিলাম। শান্তিনগরে তাঁর বাসার কাছাকাছি আমাদের আবাস থাকায় তাঁর সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে ওঠার সুযোগ হয়।
তাঁর বাসায় প্রায়ই দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ও বরেণ্য ব্যক্তিদের আগমন ঘটত। তাঁদের মধ্যে যাঁদের নাম আমার মনে পড়ছে, তাঁরা হলেন কবি গোলাম মোস্তফা, গায়ক আব্বাসউদ্দীন আহমদ, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, অর্থনীতিবিদ ড. এম এন হুদা, কবি জসীমউদ্দীন, কথাশিল্পী শওকত ওসমান, অধ্যাপক মনসুরউদ্দিন, গায়ক মমতাজউদ্দিন, কলিম শরাফী, আবদুল লতিফ, আবদুল গণি হাজারী, সিকান্দার আবু জাফর, শহীদুল্লা কায়সার, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ।
এ ছাড়া তখনকার বিশিষ্ট শিল্পী তাঁর সহকর্মী আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মীর মোস্তফা আলী, মুস্তাফা মনোয়ারসহ আরও কেউ কেউ আড্ডা দিতে আসতেন তাঁর বাসায়। ভারতবর্ষের বিখ্যাত শিল্পসমালোচক মুলকরাজ আনন্দও এসেছিলেন তাঁর বাসায়। তাঁর ছাত্র ও পরবর্তী সময়ে সহকর্মী বিশিষ্ট শিল্পী আমিনুল ইসলাম, ইমদাদ হোসেন, কাইয়ুম চৌধুরী, হামিদুর রাহমান, আবদুর রাজ্জাক, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তীরা আসতেন তাঁদের আঁকা কাজ দেখাতে, ভুলত্রুটি সংশোধন করতে এবং শৈল্পিক জ্ঞান অর্জনের জন্য। পরে এই শিল্পীরাই দেশে-বিদেশে তাঁদের শিল্পকর্ম দিয়ে সুপরিচিত হয়েছেন। এই গুণী মানুষদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। এই সুযোগে তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।
আবেদিন স্যারের বাসায় বিদগ্ধজনের এই আড্ডায় আমার অংশগ্রহণের সুযোগ হতো। আড্ডার কনিষ্ঠজন ও প্রতিবেশী হিসেবে মাঝেমধ্যে ভাবির অনুরোধে ভেতরবাড়ি থেকে চা-নাশতা সরবরাহের দায়িত্বও বর্তাত আমার ওপর। এতে আমি প্রফুল্লবোধ করতাম। এই আড্ডার আলোচনার অনেক কিছুই বুঝতাম না, তারপরও মনের অজান্তেই কী এক ভালো লাগার বোধ ওই আসরে আমাকে টেনে নিয়ে যেত। এর সুবাদে ভাবি বেগম জাহানারা আবেদিন এবং তাঁদের তিন পুত্র—সাইফুল আবেদিন টুটুল, খায়রুল আবেদিন টুকুন ও ময়নুল আবেদিন মিতুর সঙ্গে আমার যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়, আজও তা অটুট ও অম্লান রয়েছে।
এলাকার ছেলেরা যাতে খেলাধুলা করতে পারে, সেদিকেও তাঁর বিশেষ দৃষ্টি ছিল। শান্তিনগর ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি। এই এলাকার ছেলে পরে রাজনীতিক মোজাফফর হোসেন পল্টু ছিলেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। আবেদিন স্যার পাকিস্তানে গেলে ক্রিকেট ব্যাট-বলসহ অন্যান্য খেলার সামগ্রী নিয়ে আসতেন। সে সময়ের নামজাদা ক্রিকেটার রিয়াজউদ্দিন মানুকে আবেদিন স্যার ক্রিকেট দলের অধিনায়ক করেছিলেন। তিনিও আসতেন স্যারের বাসায়।
আউটডোরে ছবি আঁকতে আবেদিন স্যারের সঙ্গী হয়েছি অনেকবার। স্যারের মেজ ছেলে টুকুনও মাঝেমধ্যে যেত আমাদের সঙ্গে। স্যারের প্রিয় বিষয় ছিল প্রকৃতি, বিশেষ করে নদী ও নৌকা। তাঁর আঁকার জন্য কাগজ বিছিয়ে দিতাম, রং বের করে প্যালেটে ঢেলে দিতাম। ইনডিগো নীল ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় রং। আকাশ ও নদীর জল আঁকতে তিনি এই রংটি ব্যবহার করতেন।
একদিনের কথা বলি। আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন নৌকার ছবি আঁকতে। অবাক হয়েছিলাম। জয়নুল আবেদিনকে নৌকার ছবি আঁকতে নতুন করে নৌকা দেখতে হবে! পরে বুঝলাম, তিনি নৌকা দেখার জন্য যাননি। তিনি নৌকায় চড়ে নৌকার দোলা অনুভব করতে গিয়েছিলেন।
স্যারের কাছে গিয়ে বলি, স্যার, নৌকার ছবি আঁকতে এসে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন; ছবি আঁকা হলো না।
স্যারের জবাব, ‘নৌকা তো কতই দেখছি মিয়া, কিন্তু নৌকায় চড়লে কেমন লাগে, হেইডা অনুভব না কইরা, নৌকার দোলা না খাইয়া, বাবা, নৌকারে বুঝবা কেমনে! নইলে নৌকার ছবি তো মিয়া ডাঙায় উইঠা আইব!’
সেই দিনই বুঝেছিলাম জয়নুল আবেদিনের ছবি কেন এত জীবন্ত হয়। তাঁর চোখ কোনো কিছুকে বাইরে থেকে দেখত না। সবকিছুকে তিনি এ দেশের প্রকৃতি ও মাটি থেকে সংগ্রহ করতেন।
মহিলা সমিতি মঞ্চে থিয়েটারের নাটক দেখাতে একবার স্যারকে সপরিবারে নিয়ে এসেছিলাম ১৯৭৪ সালে। প্রয়াত বন্ধু আবদুল্লাহ আল-মামুনের চারদিকে যুদ্ধ প্রদর্শন হচ্ছিল সেবার। নাটক শেষে জয়নুল আবেদিন আমাদের নাটকের প্রশংসা করেছিলেন। আমাকে বলেছিলেন, ‘মিয়া, নাটকে অভিনয় চালাইয়া যাইবা, এটাও শিল্প।’ আমি সেই থেকে নাটকে আরও বেশি সম্পৃক্ত হলাম।
হাসপাতালে শুয়েও নিজের জীবনের উপমা খুঁজে পেয়েছিলেন কোকিলের ডাকে। আবেদিন স্যার পিজি হাসপাতালে অসুস্থ থাকা অবস্থায় একদিন আচমকা কোকিলের ডাক শোনা গিয়েছিল। আমি ছিলাম পাশেই। হঠাৎ স্যার ভাঙা কণ্ঠে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অহন কোকিল ডাকে ক্যান রে!’ আমি উত্তর খোঁজার আগেই বললেন, ‘ক্যান ডাকে জানস? কোকিল ডাকে দুইবার। বসন্তকালে ডিম পাড়নের আগে। আরেকবার কুনহানে ডিম পাড়ছিল, হেই বাড়ি খুঁজবার সময়। হেই সময় কোকিলের ডাক বেসুরো হইয়া যায়। কোকিল অহন বাড়ি খুঁজতাছে। হের তো নিজের বাড়ি নাই, অন্যের বাড়িতে ডিম পাড়ে। আমারও বাড়ি নাই অহন, আমিও কোকিলের মতো বাড়ি খুঁজতাছি।’ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁকেও যেতে হবে অন্য কোনো বাড়িতে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একজন মহাপুরুষ হয়েও আমার কাছে তিনি ছিলেন বড় কাছাকাছির মানুষ। খুব আপনজন—যেমন আমি আমার আনন্দ-বেদনায় আমার মা–বাবাকে খুঁজে বেড়াই, তেমনি খুঁজে বেড়াই আমার শিল্পগুরু জয়নুল আবেদিনকে।
কেরামত মওলা: নাট্য অভিনেতা।

ডেইলি টাইমসের সম্পাদকীয়- কূটনীতিক নিয়ে বিতর্ক

পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ফের আগুন নিয়ে খেলছে পাকিস্তান। এতে পুরনো ক্ষত নতুন করে জেগে উঠতে পারে। এ অবস্থায় পাকিস্তানের উচিত পররাষ্ট্রনীতির পর্যালোচনা করা। বাংলাদেশ সরকারকে আস্থায় নেয়া ও এক হয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা। গতকাল পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত ডেইলি টাইমসের এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলা হয়েছে। এখানে ওই সম্পাদকীয়টির বাংলা রূপান্তর তুলে ধরা হলো: সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশন থেকে একজন কূটনীতিককে প্রত্যাহার করে নিয়েছে পাকিস্তান। এতে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকদের একজন ফারিনা আরশাদকে পাকিস্তান প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নে জড়িত থাকার অভিযোগে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র কর্মী ইদ্রিস শেখের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগ উঠেছে ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনে সেকেন্ড সেক্রেটারি ফারিনের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে পুরোপুরি তদন্ত শেষে বাংলাদেশ সরকার এ সপ্তাহের শুরুর দিকে পাকিস্তান সরকারকে আহ্বান জানায় এই কূটনীতিককে প্রত্যাহার করে নিতে। তবে এক্ষেত্রে পাকিস্তান নেতিবাচক ভূমিকায় ছিল। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ অব্যাহতভাবে ফারিনকে হয়রানি করছিল। পাকিস্তান বলেছে, তার বিরুদ্ধে অব্যাহত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ প্রচার করেছে মিডিয়া। এতে তাকে তথাকথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত দেখানো হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাখ্যান করার অবস্থান নেয়ার মধ্যে সমস্যার সমাধান নেই। বছরের পর বছর বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে এরই মধ্যে পাকিস্তান বেশ মতপার্থক্য সৃষ্টি করেছে। এ ইস্যুর স্পর্শকাতরতা সম্পর্কে অনুধাবন করা উচিত পাকিস্তানের। ক্ষমা প্রার্থনার পরিবর্তে বাংলাদেশ সরকার ও মিডিয়া মিথ্যা এমনটা প্রমাণ করতেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। প্রক্সি যুদ্ধে জড়িত হওয়ার মাধ্যমে এরই মধ্যে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এমন ভুলের বিষয়ে নীরব থেকে আমরা আরও সমস্যাকে আগ বাড়িয়ে টেনে আনতে পারি না।
ইসলামপন্থি জঙ্গিদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাকিস্তানি কূটনীতিকের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম নয়। এই বছরের শুরুতে, বাংলাদেশে জঙ্গি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পাকিস্তান হাইকমিশনের একজন অ্যাটাচে মোহাম্মদ মাহজার খানকে প্রত্যাহার করে আনে পাকিস্তান। এটা দুঃখজনক যে, অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে পাকিস্তান। এতে প্রমাণ হয় যে, ফের আগুন নিয়ে খেলছে পাকিস্তান। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে এভাবে প্রক্সি যুদ্ধ করার সক্ষমতা আমাদের আর নেই। এরই মধ্যে আমরা দেখেছি আফগানিস্তানের তালেবানের সঙ্গে সম্পর্কের ফল। এতে তারা শুধু পাকিস্তানের জন্যই সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে শুধু তা-ই নয়, একই সঙ্গে পুরো বিশ্বের জন্যও তারা হুমকি হয়ে উঠেছে। পররাষ্ট্রনীতি পর্যালোচনা করা ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে কাজ করার জন্য এটা পাকিস্তানের জন্য উপযুক্ত সময়। পাকিস্তান সৃষ্টিতে পূর্ব বাংলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এরপর আলাদা হয়ে যাওয়া একটি হৃদয়বিদারক বিষয়। সর্বশেষ কূটনীতিক ইস্যুতে বিতর্ক শুধুই পুরনো ক্ষতকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে। পাকিস্তানের উচিত এমন কূটনৈতিক এডভেঞ্চার এড়িয়ে চলা। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা উচিত ও যে কাউকে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী অর্থায়নে জড়িত পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে আস্থায় নিতে হবে পাকিস্তান সরকারকে এবং এ অঞ্চলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে হাতে হাত রাখতে হবে।

ভোট ছিনতাই রুখে দেয়ার আহ্বান খালেদা জিয়ার, সেনা মোতায়েনের দাবি

আসন্ন পৌর নির্বাচনে ভোট ছিনতাই রুখে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন- পৌর নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সেনা মোতায়েন করতে হবে। আজ সোমবার বিকেলে গুলশানে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।
খালেদা জিয়া বলেন, যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপকৌশলে সরিয়ে দিয়েছে, তাদের ভোট চাওয়ার কোনো অধিকার নেই। তিনি বলেন, জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তি যে কোনো স্বৈরশাসকের অসৎ উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
তিনি বলেন, আমরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী যুদ্ধে অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শাসক দল নির্বাচনের ওপর অশুভ প্রভাব বিস্তারে যে পরিকল্পনা করেছে তা শান্তিপূর্ণ পন্থায় ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। খালেদা জিয়া পৌর নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান। এছাড়া ভোটারদের যেকোনো মূল্যে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার আহ্বানও জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে ২০ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
খালেদার পুরো বক্তব্য @মানবজমিন
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আসসালামু আলাইকুম।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে আমি প্রথমেই স্বাধীনতা যুদ্ধের অমর শহীদদের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জানাচ্ছি অভিবাদন।
অনেক দিন পর আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে কিছু কথা বলার জন্য আজকের এই আয়োজন। চিকিৎসার জন্য দুই মাস আমি দেশের বাইরে ছিলাম। বর্তমানে আপনাদের ও দেশবাসীর দোয়ায় আল্লাহ্র রহমতে অনেকটাই সুস্থ  আছি। আপনারা জানেন, লন্ডনে আমার পরিবারের সদস্যদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ পেয়েছি। এটি আমার জন্য ছিল একদিকে পরম আনন্দের, অন্যদিকে গভীর বেদনার। আমার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো আমার কাছ থেকে অনেক দূরে বিদেশে অবস্থানকালে আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছে। আমি দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ, তারা কোকোর শেষযাত্রায় বিপুলভাবে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন। তার জানাযায় লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল। এর মাধ্যমে দেশবাসী জানিয়ে দিয়েছে যে, শত অপপ্রচার সত্ত্বেও তারা আমাদেরকে ভুল বোঝেনি। এই নীরব ভালোবাসা সক্রিয় সমর্থনে পরিণত হলে কোনো নিষ্ঠুর ফ্যাসিবাদীর পক্ষেই ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল যে, আমি আদৌ দেশে ফিরবো না। আমি বরাবরই বলেছি যে, দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। বাংলাদেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। যতদিন বাইরে ছিলাম প্রতি মুহূর্তেই ভাবনায় ছিলো দেশ। মনে পড়তো নির্যাতিত ও অধিকার-বঞ্চিত দেশবাসীর কথা। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি, কখন দেশে ফিরব।
উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ,
আমি বিদেশে অবস্থানকালে দেশে উদ্বেগজনক কিছু ঘটনা ঘটেছে এবং এখনও বিক্ষিপ্তভাবে ঘটে চলেছে। বিদেশীরা আক্রান্ত হচ্ছে। ভিন্নমতের মানুষের ওপর সশস্ত্র চোরাগোপ্তা হামলা চলছে। ধর্মীয় সমাবেশ, মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয় আক্রান্ত হচ্ছে। নিরাপত্তা বেষ্টনির ভেতরেও ঘটছে বোমা হামলার মতো সন্ত্রাসী ঘটনা। এ সবের পেছনে কারা জড়িত তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে পরস্পর-বিরোধী নানামুখী বক্তব্য আসছে। দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল মেয়াদের শাসনকালে দেশে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা করে জঙ্গীবাদের উত্থান হয়েছিলো। কিন্তু তারা সেই জঙ্গীদের দমন না করে বিরোধীদলের উপর  দোষ চাপিয়ে নির্যাতন চালাবার পথ বেছে নিয়েছিলো। আমরা পরবর্তীকালে সেই জঙ্গীবাদকে সাফল্যের সঙ্গে দমন করতে পেরেছিলাম। বাংলাদেশে বিলুপ্তপ্রায় জঙ্গীবাদীরা এখন আবারো নতুন শক্তিতে সংগঠিত হয়েছে কি-না এবং তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে কি-না, তা নিয়ে সবখানে সংশয় ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। এটা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরণের বিপদকে সম্মিলিতভাবে এবং জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে। চার দিকের অশুভ আলামত ও বিপজ্জনক সব হামলার ঘটনার ব্যাপারে আমি সকলকে সতর্ক ও সজাগ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। দেশে  যাতে  কোনোভাবেই নৈরাজ্যকর নিরাপত্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে দিকে আমি সকলকে নজর রাখতে বলবো।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আগামী পরশু ৩০ ডিসেম্বর দেশে ২শ’৩৪টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এখন  নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই নির্বাচনটি খুবই তড়িঘড়ি করে ঘোষণা করা হয়েছে।  রেওয়াজ থাকা সত্বেও সময় স্বল্পতার অজুহাতে ইলেকশন কমিশন এ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন বোধ করেনি। অথচ এবারের মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দলীয় ভিত্তিতে। জাতীয় নির্বাচনের দলীয় প্রতীক এই স্থানীয় নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া খুবই প্রয়োজন ছিলো বলে আমরা মনে করি। দেশবাসী দেখেছেন, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন বছরের পর বছর ধরে অনুষ্ঠিত না হলেও সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। শাসক দলের সুবিধাজনক সময়ের জন্য তারা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছে। আমাদের দলের পক্ষ থেকে আমরা পৌর নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় মাত্র ১০ দিন পিছিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু খোঁড়া যুক্তি তুলে নির্বাচন কমিশন তা মানেনি।
নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির ব্যাপারেও কমিশন অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। এরমধেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, আসন্ন পৌর নির্বাচনকেও প্রহসনে পরিণত করার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। বিরোধীদলের  অফিস ও প্রার্থীর ওপর হামলা, সমর্থকদের হত্যা, প্রচারণায় বাধা দেওয়া, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, গ্রেফতার ও হুমকি চরম আকার ধারণ করেছে। বিরোধীদল সমর্থক ভোটার ও সম্ভাব্য এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতি দেখানো হচ্ছে। সন্ত্রাসী ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্যকে এই অপকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে, সশস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। ভোটকেন্দ্র দখলের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।  শাসক দলের মন্ত্রী-এমপিরা নির্বাচনী আচরণবিধি  বেপরোয়াভাবে লংঘণ করে চলছেন। এর কিছু কিছু খবর সংবাদ-মাধ্যমে প্রচারিত হলেও মামুলি কারণ দর্শানো নোটিশ এবং তারপর লোক দেখানো দুঃখ প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন দায় সারছে। ইতিমধ্যে ক্ষমতাসীনদের আচরণবিধি লংঘণ রোধে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মাধ্যমে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নিজেদের অসহায়ত্ব ও অক্ষমতাই প্রকাশ করেছে।
চাপ ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে অনেক জায়গায় বিরোধীদলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়া হয়নি এবং প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ৭ জন মেয়র ও ১শ’৩২ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে।   বর্তমান অদ্ভুত সরকারের তথাকথিত বিরোধীদলের এক নেতা, যিনি আবার প্রধানমন্ত্রীরও দূত, তিনি বলেছেন যে, ভোটের দিন সকাল নয়টার মধ্যেই ভোট শেষ হয়ে যাবে। এক মন্ত্রীও বলেছেন যে, ভোট হওয়ার আগেই নাকি বিএনপি’র পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেছে।
এসব কথা থেকেই সকলের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, পৌর নির্বাচনকে কী ধরণের প্রহসনে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে সরকার এগুচ্ছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে আমরা সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করেছি। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এ দাবি নাকচ করে বলা হয়েছে যে, সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো পরিস্থিতি না-কি সৃষ্টি হয়নি। আমরা জানি না, আর কত ভয়াবহ অবস্থা হলে নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করবেন। আমরা জানি না, নির্বাচনী দায়িত্বে জাতীয় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের এতো অনীহার কারণ কি? সকলেই এ বাস্তবতা স্বীকার করবেন যে, আমাদের প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবের কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেনা। ফলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে নির্বাচনী দায়িত্বে সেনা মোতায়েন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অতীতেও সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিভিন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই আমরা আবারও পৌর নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানাচ্ছি। নিজ উদ্যোগেই এই কাজটি করার সাংবিধানিক ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। তারা যদি একটি স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তাহলেই আসন্ন পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হতে পারে। আর তা হলেই বর্তমান নির্বাচন কমিশন তাদের হারানো ভাবমূর্তি ফিরে পেতে পারে।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
এবারেই প্রথম মেয়র নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে এবং দলীয় প্রতীক ব্যবহার করে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনটি পরিপূর্ণভাবে দলীয় ভিত্তিতে হচ্ছে না। কাউন্সিলর প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক ব্যবহার করতে পারছেন না। একটা জগাখিচুড়ি ব্যবস্থায় নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, এর পেছনে সরকারের ঘোর দুরভিসন্ধি রয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। কারণ জাতীয় দাবি ছিল নির্বাচনটি হতে হবে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।  এর আগে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটি সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করা হয়। সৃষ্টি হয় নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট।
সেই সংকটের মধ্যেই প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জিত এবং ভোটারবিহীন সেই তথাকথিত নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বিদায়ী সংসদ বহাল রেখেই। স্বাভাবিকভাবেই সেই তথাকথিত নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ ৫ শতাংশের বেশি ছিল না। ১শ’৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একক প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়; যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১শ’৫১টি আসনের বেশি।  কলংকিত সেই নির্বাচনের পর গঠিত সংসদের তথাকথিত বিরোধী দলটিও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব নিয়ে সরকারেরও অংশ হয়ে আছে। এই অদ্ভুত ব্যবস্থা কোনোক্রমেই গণতন্ত্র নয়। এই নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ফলে ক্ষমতাসীন সরকারের নৈতিক বৈধতার সংকট রয়ে গেছে। এই সংকট কাটাতে প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় ব্যবস্থার অধীনে সবার অংশগ্রহণমূলক নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
দলীয় ভিত্তিতে পৌর মেয়র নির্বাচন করার ব্যবস্থা সরকার করেছে  সেই সংকট থেকে উত্তরণের দূরাশা নিয়ে। তারা এই নির্বাচনে সকল রকম অনিয়মের মাধ্যমে ফলাফল পাল্টে দিয়ে দেশবাসী এবং পৃথিবীকে দেখাতে চায় যে, তাদেরও জনপ্রিয়তা আছে। সেই অসৎ উদ্দেশ্যেই আসন্ন পৌর নির্বাচনে প্রশাসন ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে তারা নির্বাচনী ফলাফল ছিনতাই করতে চায়।  আপনারা দেখেছেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তারা ন্যক্কারজনকভাবে প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্তদেরকে সরকার-সমর্থক প্রার্থীদের পক্ষে প্রকাশ্যে ব্যবহার করেছে। নির্বাচনকে তারা আবারো হুন্ডা-ডান্ডা-গুন্ডার নির্বাচনে পরিণত করেছে। এবার পৌর নির্বাচনেও তার পুনরাবৃত্তির পাঁয়তারা চলছে। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বান, আপনারা সবাই মিলে দলে দলে ব্যাপক সংখ্যায় ভোট কেন্দ্রে হাজির হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে নিজেদের ভোটের মর্যাদা রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। যারা আপনাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, যারা আপনাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপকৌশলে সরিয়ে দিয়েছে, তাদের ভোট চাইবার কোনো অধিকার নেই। জনতার ঐক্যবদ্ধ শক্তি যে-কোনো স্বৈরশাসকের অসৎ উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেবার জন্য যথেষ্ট। আমরাও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী যুদ্ধে অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শাসক দল নির্বাচনের উপর অশুভ প্রভাব বিস্তারের যে পরিকল্পনা করেছে তা শান্তিপূর্ণ পন্থায় ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ান।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
বিএনপি স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচনেই অংশগ্রহণ করে আসছে। ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল। এসব নির্বাচনকে দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখিয়ে শাসক দল বলেছে যে, তারা নির্বাচনে কারচুপি করে না। মনে রাখা দরকার, এই নির্বাচনগুলো হয়েছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার আগে। সেই সময় সরকার দেখাতে চেয়েছিল যে, তাদের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো বিরোধীদল যেন ৫ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল দেখে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হয়। কিন্তু তাদের সেই ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়েছে। ৫টি সিটি করপোরেশনে জনগণের নির্বাচিত ৫জন মেয়রকেই সরকার বরখাস্ত করে দিয়েছে। সেই সঙ্গে অনেক নির্বাচিত বিরোধীদলীয় পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। এতে তাদের গণতন্ত্র-বিরোধী চরিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন সংসদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আপনারা শাসক দলের সন্ত্রাস, দখলদারী ও ন্যক্কারজনক কারচুপির চিত্র অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এবং পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে তুলে ধরেছেন। আপনাদের সততা ও বস্তুনিষ্ঠতার কারণে দেশবাসী এবং বিশ্ববাসী জানতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কখনো কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না।  আমি জানি, এবার সাংবাদিকরা যাতে নির্বাচন চলাকালে তাদের পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে না পারেন তার জন্য নানা ধরণের অপচেষ্টা চলছে।  ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে।  সাংবাদিকদের অনুমতিপত্র দেওয়ার ব্যাপারেও সরকারি দলের নেতাদের গোপনে মতামত নেয়া হচ্ছে। এই সরকার বিকল্প মিডিয়ার উপরেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ফেসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক মিডিয়া ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের উপরও খবরদারি করছে। এই নির্বাচনে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আমরা একটি বিজ্ঞাপনচিত্র প্রচার করতে চেয়েছিলাম। সরকারের পরোক্ষ চাপের কারণে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো সে বিজ্ঞাপনটি প্রচারেও রাজি হয়নি। এসব ঘটনায় সরকারে অগণতান্ত্রিক আচরণ আরো ন্যক্কারজনকভাবে ফুটে উঠেছে। এতো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা বিশ্বাস করি, এবারের পৌর নির্বাচনে আপনারা আগের মতোই সাহসের সঙ্গে সত্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে সচেষ্ট থাকবেন।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আপনারাই সংবাদ দিচ্ছেন, প্রায় প্রতিদিনই সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ঢালাওভাবে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য বিরোধীদল ও ভিন্নমতকে ধ্বংস করে কার্যত বাকশালের মতো একদলীয় শাসন পাকাপোক্ত করা।  বর্তমান সরকারের নিষ্ঠুর দমননীতির ফলে আমাদের বহু নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। অনেকে গুম হয়েছেন। তাদের স্বজনেরা, মায়েরা ও বোনেরা গুম হয়ে যাওয়া সন্তান ও ভাইদের ছবি বুকে ধারণ করে আহাজারি করছেন। আমরা বিশ্বাস করি, বীরের এই রক্ত¯্রােত, মায়ের এই অশ্রুধারা কখনো বৃথা যাবে না। আপনারা জানেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির ফলে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়েছে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পেয়ে কৃষিকাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের নামে চলেছে লুঠপাঠের মহোৎসব। ব্যাংকিংখাত অচল হয়ে পড়ছে সীমাহীন দুর্নীতিতে। শেয়ার বাজারে অবাধ লুণ্ঠণে নিঃস্ব হয়েছে অসংখ্য পরিবার। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই। বর্তমান অর্থনৈতিক নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি ও লুঠপাঠ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ অবনতি ঘটবে।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত  বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা ও স্বাধীনতার প্রত্যাশাই অপূর্ণ থেকে যাবে। বিজয়ের এই মাসে আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে, তার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বাংলাদেশের জনগণের কাঙ্খিত মুক্তি অর্জন সম্ভব। এই বিশ্বাস থেকে আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বারবার লড়াই-সংগ্রামের পথে অর্জন করেছি গণতন্ত্র। দুর্ভাগ্য জাতির, শহীদের রক্তে অর্জিত সেই গণতন্ত্র বারবার লুণ্ঠিত হয়েছে। আজ আবার আমাদেরকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক কঠিন সংগ্রামে নিয়োজিত হতে হয়েছে।  সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসাবেই আমরা আসন্ন পৌর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছি।
আপনাদের মাধ্যমে আমরা দেশবাসীকে অনুরোধ জানাই, আসন্ন পৌর মেয়র নির্বাচনে আমাদের মনোনীত প্রার্থীদেরকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন। আপনাদের অধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রামে ভূমিকা রাখবেন।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আমি আপনাদেরকে এবং আপনাদের মাধ্যমে প্রিয় দেশবাসীকে আসন্ন ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
আজকের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হবার জন্য আপনাদের সকলকে জানাই অশেষ ধন্যবাদ।
আল্লাহ হাফেজ, বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ।