Monday, September 9, 2019

তদন্ত কর্মকর্তার কারিশমা: চার্জশিটে মৃত চেয়ারম্যানও জীবিত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদ্যাকুট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রউফ (৭৩) মরেও বেঁচে আছেন। তাকে জীবন্ত করে রাখার এই কারিশমা দেখিয়েছেন পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ইন্সপেক্টর হারুন অর রশিদ। দেশের বাইরে থাকা লোকও হয়েছে সাক্ষী। আবার সাক্ষী দেননি এমন ২৪ জনকে সাক্ষী বানিয়েছেন তিনি। টাকা না দেয়ায় একটি হত্যা মামলায় নিরপরাধ লোকজনকে ফাঁসিয়েছেন এই তদন্তকারী কর্মকর্তা এমন অভিযোগ করেছেন ওই মামলার একজন আসামি নবীনগরের বিদ্যাকুট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান ভূঁইয়া। সেখানকার শিবপুর ইউনিয়নের বাঘাউড়া গ্রামে ২০১৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি রাতে আল আমিন (২২) খুনের ঘটনা ঘটে। শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ এনে পরদিন তার পিতা কসবার খাড়েরা ইউনিয়নের সোনারগাঁও গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বাদী হয়ে ১০ জনকে এজাহারনামীয় এবং ২-৩ জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে নবীনগর থানায় হত্যা মামলা করেন। এই মামলায় পার্শ্ববর্তী সেমন্তঘর গ্রামের আবদুল হান্নান ভূঁইয়া, তার ছেলে পলাশ (ইফতেখার মাহমুদ)সহ ৫ জনকেও আসামি করা হয়। হত্যা মামলাটির সর্বশেষ তদন্ত করে পিবিআই। এর আগে প্রথমে সিআইডি এবং এরপর গোয়েন্দা পুলিশ মামলাটির তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এই দুটি সংস্থার তদন্তেই প্রকাশ পায় আবদুল হান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে আল আমিনের ভগ্নিপতি জাকির হোসেনের জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধ রয়েছে। আবদুল হান্নানকে শায়েস্তা করতে নিজের শ্যালককে হত্যা করে জাকির হোসেন। এরপর আবদুল হান্নান এবং তার ছেলেসহ ১০ জনকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। দুটি সংস্থার অভিযোগপত্রে বলা হয় ঘটনার  আগের দিন ২০১৫ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি নিহতের স্ত্রী ইতির নানির বাড়িতে দাওয়াত খেতে যায় আল আমিনের ভগ্নিপতি জাকির ও তার সহযোগী শাওন, বিল্লাল ও মোবারক। খাওয়ার পর জাকির ইতিকে ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত দুটি শিঙ্গাড়া খেতে দিয়ে আল আমিনকে নিয়ে পাশের বাড়িতে নাছির ফকিরের মাহফিলে চলে যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে তাকে হত্যা করে। এরপর লাশ গ্রামের একজনের বাড়িতে ফাঁস দিয়ে ঝুলিয়ে রাখে। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সাক্ষীদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির প্রেক্ষিতে সিআইডি এবং গোয়েন্দা পুলিশ জাকির হোসেন (৩৮), তার সহযোগী বিল্লাল (৩৭), শাওন ওরফে রানা (৪২), মোবারক মিয়া (৩৬) এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগপত্র দেয়। অন্যদিকে পিবিআই এ ৪ জনকে নির্দোষ বলে তাদের অভিযোগপত্রে উল্লেখ করে। এ বছরের ৯ই এপ্রিল আদালতে এই চার্জশিট দেন পিবিআই ইন্সপেক্টর হারুন অর রশিদ।
এই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরে গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন আবদুল হান্নান ভূঁইয়া। পিবিআই’র দেয়া অভিযোগপত্রকে অদ্ভুত বলে আখ্যায়িত করে তিনি জানান- পিবিআই’র তদন্তকারী কর্মকর্তা মোট ৩৯ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে বিদ্যাকুট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুর রউফ (৭৩) অন্যতম। ২০১৮ সালের ২রা নভেম্বর আবদুর রউফ ইন্তেকাল করলেও সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি নেয়ার তারিখ দেখানো হয়েছে ২০১৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি। অর্থাৎ তার মৃত্যুর ২ মাস ২৯ দিন পর তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। মেরাকুটা গ্রামের অজন্ত কুমার ভদ্র (৬৬) এর সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখও দেখানো হয়েছে ২০১৯ সালের ৩১শে জানুয়ারি। কিন্তু তিনি বৈধ পাসপোর্টে ২০১৯ সালের ৯ই জানুয়ারি ভারত যান। সেখান থেকে দেশে ফেরেন ৮ই ফেব্রুয়ারি। আরো ২৪ জন সাক্ষী আদালতে এফিডেভিট জমা দিয়েছেন এই বলে যে তারা পিবিআই’র ওই কর্মকর্তার কাছে কোনো রকম সাক্ষীই দেননি। তাদের কয়েকজন হচ্ছেন শিবপুর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান শাহিন সরকার, সাবেক ইউপি সদস্য মকবুল হোসেন, বিদ্যাকুটের বর্তমান ইউপি সদস্য শফিকুল আলম, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. মোস্তফা, সাবেক ইউপি সদস্য তৌহিদুল ইসলাম, ডাক্তার নাছির উদ্দিন, সাবেক ইউপি সদস্য আলহাজ রফিকুল ইসলাম, আলহাজ কিতাব আলী, আলহাজ রেজেক মিয়া। তাছাড়া সিআইডি’র তদন্তে ঘটনায় জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে নাম এসেছিল এমন ৬ জন কানু মিয়া, রহিজ মিয়া, সুদন মিয়া, দারু মিয়া, মজনু মিয়া ও মন্নান মিয়াকে পিবিআই কর্মকর্তা সাক্ষী হিসেবে দেখিয়েছেন। এই ৬ জনের মধ্যে ৪ জনই সিআইডি এবং গোয়েন্দা পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রের ৪ আসামির আত্মীয়স্বজন। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয় ২০ লাখ টাকা ঘুষ না দেয়ার কারণেই পিবিআই কর্মকর্তা মনগড়া এই অভিযোগপত্র দিয়েছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ইন্সপেক্টর হারুন অর রশিদ প্রথমে আবদুল হান্নান ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করার পর তার বড় ছেলের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেন। যার সাক্ষী শহরতলীর বিয়াল্লিশ্বর এলাকার আরভী হোটেলের মালিক আরিফ মিয়া। এরপর তদন্তে প্রকাশিত আসামি বিল্লাল মিয়াকে গ্রেপ্তার করার কথা বলে এ বছরের ২০শে ফেব্রুয়ারি আরো ১০ হাজার টাকা নেন। এরপর ২১শে মার্চ পিবিআই কর্মকর্তা হারুন তাকে ফোন করে শহরের কাউতলীস্থ হোটেল বায়েজীদে যেতে বলেন। সেখানে যাওয়ার পর তিনি তাকে বলেন-‘পূর্বের মতো সিএস (চার্জশিট) দিতে ২০ লাখ টাকা লাগবে। এই টাকা ডিআইজিসহ সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণকে দিতে হবে। টাকা না দিলে পূর্বের মতো সিএস দিতে পারবো না। কারণ বাদীপক্ষে জোর তদবীর আছে।’ সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ খানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং ন্যায় বিচার প্রার্থনা করেন আবদুল হান্নান ভূঁইয়া। তার বিরুদ্ধে পুলিশ মহাপরিদর্শকসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রধানের কাছে ইতিপূর্বে লিখিত অভিযোগ দেয়ার কথাও জানান তিনি। বর্তমানে জামালপুরে কর্মরত অভিযুক্ত পিবিআইয়ের কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, নথিপত্র আমার হাতে নেই। না দেখে বলতে পারবো না। টাকা দাবি করার বিষয়ে বলেন, অভিযোগপত্র দিলে কতজন কত কিছুই বলে। মৃত ও দেশের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের স্বাক্ষর রয়েছে।

চীনের মধ্যস্থতায় নিউ ইয়র্কে বসছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার by মিজানুর রহমান

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জট খুলতে চীনের মধ্যস্থতায় ফের বৈঠকে বসছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের সাইড লাইনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ত্রি-দেশীয়  এ বৈঠক হওয়ার সূচি নির্ধারিত হয়েছে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র বলছে, দিনক্ষণের বিবেচনায় বৈঠকটিকে টেন্টেটিভ প্রোগ্রাম বা টিবিসি হিসাবে সূচিতে রাখা হলেও এটি যে নিউইয়র্কে হচ্ছে তা মোটামুটি নিশ্চিত। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচির প্রতিনিধি হিসাবে মিয়ানমারের মন্ত্রী চাউ থিন মোয়ে জাতিসংঘে যাচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত। আর যার মধ্যস্থতায় বৈঠকটি হওয়ার প্রস্তাব সেই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েং ই-ও নিউইয়র্কে যাচ্ছেন। ৩ জনের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার প্রেক্ষিতে বৈঠকটি নিউইয়র্কে হওয়ার পক্ষেই আয়োজক চীন। ঢাকার তরফে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার প্রস্তাবের আগেই বলা হয়েছে, প্রত্যাবাসন জট খূলতে বাংলাদেশ যে কোন স্থানে বৈঠকে বসতে রাজী। ঢাকাস্থ চীনের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোলাসা করেই বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশ রোহিঙ্গা বোঝা লাঘব করতে চায়। তাদের ফেরত পাঠাতে ঢাকা প্রস্তুত। প্রয়োজন মিয়ানমারের প্রতিশ্রতির বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ। তারা তাদের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের আস্থা অর্জনে যেনো দ্রুত পদেক্ষেপ নেয় এটাই বাংলাদেশের একমাত্র চাওয়া। আর এ নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা, সংলাপ বা বোঝাপড়ায় বাংলাদেশ সর্বদা তৈরি আছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, মানবিক কারণে বাংলাদেশ ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যে সংকটে পড়েছে এটি এবার বিশ্ববাসীকে জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের শতাধিক সরকারি প্রতিনিধি জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন। ওই দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বেশ ক’জন মন্ত্রী এবং  পররাষ্ট্রসচিব ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রয়েছেন। তারা বিশ্বসভার মূল অধিবেশন এবং সাইড লাইনে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। সব খানেই প্রাধান্য পাবে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি। সরকার প্রধানের সফরসঙ্গী হিসাবে প্রায় দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নিউইয়র্কে যাচ্ছেন। নিজ খরচে যাওয়া শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের ট্র্যাক টু ডিপ্লোমেসির সূযোগ রয়েছে। তারা যেখানে যে আয়োজনেই অংশ নেন না কেন, সবখানেই বাংলাদেশ বিশেষত রোহিঙ্গা সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরবেন এবং এ থেকে ভুক্তভোগী হিসাবে বাংলাদেশের পরিত্রান চাইবেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি এরইমধ্যে অনেকটা এগিয়েছে ঢাকা। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কো-অর্ডিনেশন মিটিং হয়েছে। সেখানে সরকার প্রধানের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সূত্র মতে, সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ দেয়া ছাড়াও সাইড লাইনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। তা হলো- ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাতিসংঘ মহাসচিব এন্তোনিও গুতেঁরার সঙ্গে বৈঠক। সাইড লাইনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের প্রস্তাব রয়েছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত অন্য সব বৈঠকও হবে, তবে চূড়ান্তভাবে দিনক্ষণ নির্ধারিত হতে অর্থাৎ উভয়ের সুবিধাজনক সময় এবং হাই লেভেল মিটিং রুমগুলোর বুকিং হওয়াসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

গত ৫ বছরে দুর্ঘটনায় ২৬ জঙ্গিবিমানসহ ৩৭ এয়ারক্রাফট হারিয়েছে ভারত by তানভীর আযম

ভারতীয় বিমানবাহিনীতে জঙ্গিবিমান বহরে শূন্যতা উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকলে সেটা কেবল কিনতে না পারা ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে বিলম্বের জন্যই নয়। ভারত নিয়মিতভাবেই বিমান খোয়াচ্ছে এবং গত ৫ বছরে প্রায় এক স্কোয়ড্রন বিমান দুর্ঘটনায় ধ্বংস হয়েছে।

পার্লামেন্টে দেয়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, গত ৫ বছরে ২৬টি জঙ্গিবিমান ধ্বংস হয়েছে, এতে ১২ জন পাইলট ও সাতজন ক্রু নিহত হয়েছে।

কেবল ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসেই ভারতীয় বিমান বাহিনী দুর্ঘটনায় ছয়টি বিমান খুইয়েছে। জানুয়ারিতে একটি জাগুয়ার বিধ্বস্ত হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে দুটি (একটি হক এমকে ১৩২ ও একটি মিগ ২৭ ইউপিজি) বিধ্বস্ত হয়েছে। মার্চ মাসে ভারতীয় বিমান বাহিনী আরো দুটি বিমান হারায়। এর মধ্যে একটি মিগ ২১ বাইসন ও একটি মিগ ২৭ ইউপিজি। জুনে একটি এএন-৩২ বিধ্বস্ত হয়।

আগস্টে একটি সুখোই-৩০ বিধ্বস্ত হয় আসামে প্রশিক্ষণকালে। এসবের মধ্যে এপ্রিলে কাশ্মীরের বাদগামে বিধ্বস্ত হওযা এমআই-১৭ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বালাকোট বিমানহামলার পর ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার মধ্যে বিমানটি নিজেদের গুলিতে ঘায়েল হয়েছিল। ওই ঘটনায় ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়।

এসব ঘটনা নিয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি জানায়, এমআই-১৭ হেলিকপ্টারটি ভুলবশত ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে। এই ঘটনার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয় ঘাঁটির প্রধান অপারেটিং অফিসারসহ ভারতীয় বিমানবাহিনীর ৫ কর্মকর্তা।

ভারতীয় বিমান বাহিনীর গত ৫ বছরের দুর্ঘটনার রেকর্ডে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ ও ২০১৮-১৯ সময়কালে সাতজন যোদ্ধা ও ২০১৬-১৭ সময়কালে আরো ছয় যোদ্ধা নিহত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ২০১৫-১৬ ও ২০১৭-১৮ ছিল সেরা সময়। ২০১৫-১৬-এ চারটি বিমান বিধ্বস্ত হয়, আর ২০১৭-১৮-এ হয় দুটি।

২০১৯ পর্যন্ত এসব ঘটনায় এক ডজনের বেশি পাইলট নিহত হয়েছে। তবে মোট নিহতের সংখ্যা অনেক বেশি। এসব ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে ৪৬, এদের মধ্যে এয়ারক্রু ৭ এবং অন্যান্য কর্মী ২৭।

গত ৫ বছরে হেলিকপ্টার, প্রশিক্ষণ ও পরিবহন বিমান দুর্ঘটনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলে মোট বিধ্বস্ত এয়ারক্রাফটের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭। দুর্ঘটনায় ছয়টি হেলিকপ্টার, নয়টি প্রশিক্ষণ বিমান, তিনটি পরিবহন বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।

শতবর্ষী আয়েশার ভাগ্যে জুটেনি ভাতার কার্ড

সহায় সম্বলহীন শতবর্ষী বৃদ্ধ আয়েশা খাতুন। নিজস্ব জমি নেই, ভিটে নেই। নেই কোনো আয়ের উৎস্য। নেই বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাহায্য সহযোগিতায় কোনোদিন একবেলা ভাত জোটে তো অন্যবেলা নেই। প্রতিবন্ধী দুই ছেলে আর স্বামী পরিত্যক্তা এক মেয়েকে নিয়ে বয়সে ন্যুব্জ আয়েশা খাতুন থাকেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের বানিপাট্টা গ্রামে ভাইপুত্র চান মিয়ার বাড়িতে। এত কষ্টের পরেও একটি ভিজিডি বা বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড না পাওয়ায় তার বড় মেয়ে জাহানারা আক্ষেপ করে বলেন, “আর কত বয়স হলে বয়স্ক ভাতার কার্ড পাবেন আমার মা”।
কষ্টে ভরা আয়েশার জীবনের গল্প। জানা যায়, ১৯৪২ সালে ১২ বছর বয়সে আয়েশার বিয়ে হয় একই উপজেলার পার্শ্ববর্তী ডিক্রিরচর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান খুরশিদ উদ্দিনের সঙ্গে। বিয়ের পর আয়েশার ঘরে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। মেয়ে জাহানারা ও হেনা সুস্থ থাকলেও ছেলে মমিন ও আমিন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। ১৯৬০ সালে স্বামী খুরশিদ এক দুর্ঘটনায় মারা যান। ১৯৬২ সালে দেবর সুরুজ মিয়ার পরামর্শে উন্নত জীবন গড়ার আশায় স্বামীর রেখে যাওয়া সহায় সম্বলটুকু বিক্রি করে ডিক্রিরচর গ্রাম থেকে ছেলে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে দেবরের সঙ্গে রংপুরে পাড়ি জমান। সেখানে গিয়ে রংপুরে জাহানারা ও হেনার বিয়ে হয়। বছর দুয়েক পর ছোট মেয়ে হেনা দুরারোগ্য রোগে মারা যায় এবং জাহানারা খাতুনকে স্বামী ছেড়ে চলে যান। জাহানারা ফিরে আসেন মায়ের কাছে। রংপুরেও আয়েশার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সহায় সম্বলহীন হয়ে ১৯৬৮ সালে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে নিয়ে ফের চলে আসেন পৈতৃক ভিটা বানিপাট্টা গ্রামে। সেখানে বর্তমান আশ্রয়দাতা ভাইপুত্র চান মিয়ার ভিটায় একচালা টিনের একটি ভাঙ্গাচুড়া জীর্ণ ঘরে বাস করেন। সে ঘরেই আয়েশা বর্তমানে বড় মেয়ে জাহানারাকে নিয়ে বাস করছেন। দুই ছেলে প্রতিবন্ধী হওয়ায় বাহাদিয়া গ্রামে ফুফুর বাড়িতে থাকেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আয়েশা স্পষ্ট ভাষায় কোনো কথা বলতে পারেন না।
মেয়ে জাহানারা খাতুন জানান, মাকে নিয়ে জাহানারা খুবই কষ্টে আছেন। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী দুই ভাই ফুফুর বাড়িতে থেকে খাবারের বিনিময়ে কাজ করে। তাই ফুফুর বাড়িতে তারা থাকেন। নির্দিষ্ট আয় না থাকায় আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাহায্য সহযোগিতায় কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের। শতবর্ষী মায়েরও কোনো বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার কার্ড নেই। জাহানারারও কোনো বিধবা ভাতার কার্ড নেই। একটি ভাতার কার্ডের জন্য মেম্বার ও চেয়ারম্যানের পিছনে অনেক ঘুরেছেন জাহানারা। দেই দিচ্ছি করে এখনো কোনো কার্ডের ব্যবস্থা করে দেননি বলে জানান। সুখিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য উজ্জ্বল মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। সুখিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আঃ হামিদ টিটুর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বৃদ্ধ আয়েশা ও মেয়ে জাহানারার কাছে বিধবা বা বয়স্ক ভাতার কার্ড করার জন্য কয়েকবার গিয়েছি। তাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র চেয়েছি। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র না দেয়ায় আমি তাদের ভাতার কার্ড করে দিতে পারছি না।

বালিশের পর ৩৭ লাখ টাকার পর্দা নিয়ে আলোচনা, সরকারি কেনা-কাটায় দুর্নীতি হয় কীভাবে? by মুন্নী আক্তার

বাংলাদেশের একটি হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের একটি পর্দা ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে কেনার খবরের বিষয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
গত ২০শে অগাস্ট এ বিষয়টি ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত।
এদিকে দুর্নীতির এমন অভিযোগ ওঠার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারি কেনাকাটার বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।
এর আগে পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের গ্রিন সিটিতে বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয় ৬ হাজার টাকা। পরে তা গড়ায় আদালতে। এই বিষয়টি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য উঠেছিল।
কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটায় এ ধরনের অভিযোগ বারবার আসছে কেন?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, 'পাবলিক মানি' বা সরকারি অর্থ নিয়ে এ ধরণের দুর্নীতি আসলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়।
কারণ এ অর্থ উন্নয়ন কিংবা জনগণের কাজে ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও দুর্নীতির কারণে তা ব্যক্তি পর্যায়ে কুক্ষিগত করা হয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, "এর ফলে পর্যাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় না হওয়ার কারণে হয় সেই উন্নয়ন কাজটি বাধাগ্রস্ত হয়, না হলে নিম্নমানের কাজ করা হয় অথবা যে কাজে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার কথা ছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় হয়"।
এ ধরণের দুর্নীতি থাকলে তার দায়ভার আসলে জনগণের উপরে গিয়েই পড়ে।
প্রথমত কর হিসেবে জনগণ অর্থ দিয়ে দেয় বলে তাদের কাছে সেই নগদ অর্থ থাকে না। ফলে সে এই অর্থ নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারে না।
আর দ্বিতীয়টি হলো, করের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার হলে মানুষ যে সুযোগ-সুবিধা পেতো তা থেকেও বঞ্চিত হয় তারা।
এই একই কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয় না বলেও মন্তব্য করেন এই অর্থনীতিবিদ।

সরকারি কেনা-কাটায় দুর্নীতি কিভাবে হয়?

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে বিভিন্ন ধরণের যন্ত্রপাতি ও পণ্যদ্রব্য কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি করাটা সহজ বলে প্রায়ই এ খাতে দুর্নীতির অভিযোগ আসে।
তবে এখাতে দুর্নীতি ধরাটাও সহজ বিধায় এ খাতের দুর্নীতির খবর সামনে আসলেও অন্যান্য খাতের খবর বাকি থেকে যায় বলে মন্তব্য করেছেন সরকারি সাবেক আমলারা।
এ বিষয়ে সাবেক মহা হিসাব নিরীক্ষক এবং দুর্নীতি বিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, "বহু ধরণের কাজের গ্রাউন্ড আছে যার দ্বারা কেনাকাটার সময় দুর্নীতি হয়ে থাকে। এটা নতুন নয়।"
"বরং বহুদিন ধরে চলে আসছে এবং সময়ের সাথে এটি বেড়েই চলেছে।"
কেনাকাটার ক্ষেত্রে দুর্নীতির এ খবর সরকার জানে বলেও মনে করেন তিনি।
আর এ কারণেই এ খাতে দুর্নীতি বন্ধে সরকার পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং ই-টেন্ডারিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু এ ধরণের ব্যবস্থা নিয়েও কোন লাভ হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন হাফিজ উদ্দিন খান।
তিনি বলেন, "শত রকমের উপায় আছে কেনাকাটার ক্ষেত্রে দুর্নীতি করার। টেন্ডারিং প্রসেসের মধ্যে কাউকে টেন্ডার পাইয়ে দিতে চাইলে তাকে সব থেকে কম খরচের দেখানো, আগে থেকেই টেন্ডারের তথ্য ফাঁস করে দেয়া, দামের রেট বা হার বলে দেয়া, এগুলো তো আছেই।"
"এছাড়া টেন্ডারের বৈশিষ্ট্য বা শর্ত এমনভাবে সাজানো হয় যাতে নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিই ওই সুযোগটি পায়। এধরণের আরো অনেক রকমের পদ্ধতি রয়েছে।"
মি. খান বলেন, এ ধরণের দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব নয় যদি না কেনাকাটা প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ব্যক্তিরা সৎ হয়।
দুর্নীতির কারণেই রাস্তা মেরামত করলেও তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, সেতু নির্মাণ করলেও তা ভেঙ্গে যায়। কারণ যাদের এ সব বিষয়ে নজরদারি করার কথা তাদের কেউই এগুলো দেখে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
উদাহরণ হিসেবে মি. খান বলেন, সরকার সব সড়ক ও মহাসড়কে সেতুগুলো নিয়ে একটি তথ্য ভাণ্ডার করার ঘোষণা দিয়েছে।
"তবে প্রকৌশলীরা এটা করার সময় পাচ্ছে না। কারণ তারা আসলে এটি করার বিষয়ে আগ্রহী নন। কারণ এখানে দুর্নীতির সুযোগ কম।"

দুর্নীতি কেন বন্ধ করা যায় না?

দুর্নীতি বিষয়ে বহু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক রিপোর্ট করেছে টিআইবি এবং তার প্রকাশও করা হয়েছে বলে জানান মি. খান। এসব প্রতিবেদন প্রাথমিকভাবে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো স্বীকার করে নিলেও পরে তা অস্বীকার করে বলে জানান তিনি।
টিআইবির ট্রাস্টি মি. খান বলেন, "প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত সব কর্মকর্তা টপ-টু-বোটম সবাই দুর্নীতির সাথে জড়িত। যার কারণে এ খাতে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব হয় না।"
তিনি বলেন, "যেহেতু দুর্নীতি করলে পার পাওয়া যায় আর এই ধরণের নিরাপত্তা নিয়ে অর্থাৎ দুর্নীতি করার পর ধরা পরা ও শাস্তির ভয় ব্যতিরেকে দুর্নীতি করা সম্ভব হচ্ছে বলেই দুর্নীতি হচ্ছে এবং তা বন্ধ হচ্ছে না। কারণ সবাই মিলে যোগসাজশে এই দুর্নীত করে।"

৫টি পদক্ষেপের সুপারিশ

মি. খান বলেন, দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে প্রথমত এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন করতে হবে। তাদের মধ্যে দুর্নীতি বিরোধী মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত দুর্নীতির অভিযোগ বিশেষ বিচারিক আদালতে করারও পরামর্শ দেন তিনি। তার অভিযোগ, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতাও এক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে বিচার থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে।
তিনি বলেন, "আমাদের দেশে বেশিরভাগ সময়েই দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তার সাজা কার্যকরের উদাহরণ চোখে পড়ে না।" দুর্নীতি বন্ধে কঠোর সাজা কার্যকর করা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।
তৃতীয়ত, সংসদের একটি দায়িত্ব আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে 'ওয়াচ ডগ' হিসেবে ভূমিকা পালন করা। যা জাতীয় সংসদ করে না।
চতুর্থত, সাংবিধানিক কমিটির মধ্যে অন্যতম পাবলিক আকাউন্টস কমিটি। এই কমিটি থেকে যে প্রতিবেদন দেয়া হয় এবং সুপারিশ দেয়া হয় তা মন্ত্রণালয়গুলো ঠিকমতো পালন করে না।
পঞ্চমত, মহাহিসাব নিরীক্ষকের দপ্তরে অনেক ঘাটতি আছে, তাকে সেগুলো খেয়াল রাখতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

দুর্নীতি আগের চেয়ে কমেছে-দুদক

দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বলেন, দুর্নীতিকারীরা দুর্নীতি করতে ভয় পায় না বলেই আসলে দুর্নীতি ঠেকানো সম্ভব হয় না।
মি. বখত বলেন, "আইন যারা মানে, যারা ভয় পায় তারা পরবর্তীতে কোন অপরাধ করবে না। কিন্তু যারা মনে করে যে তারা আইনের শাসনের ঊর্ধ্বে তারা আইন ভয় করে না, তারা অপরাধ করে, আবার ধরা পড়ে।"
তবে দুর্নীতিকে ঠেকানো যাচ্ছে না এমনটা বিশ্বাস করতে চান না তিনি। তার দাবি, "আগের চেয়ে দেশে দুর্নীতির পরিমাণ কমেছে।"
তিনি বলেন, "কোন একটি দেশে কি একদিনেই দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে? পর্যায়ক্রমে হয়তো হবে।"
"যেসব অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর তদন্ত করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে হয়তো কমছে। তুলনা করলে দেখা যাবে যে, আগে যে দুর্নীতি ছিলো তা এখন কমবে।"

আসামে ‘রাষ্ট্রহীন’দের হাতেই নির্মিত হচ্ছে তাদের আটক কেন্দ্র!

রাষ্ট্রহীনদের আটক কেন্দ্র
আসামে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’দের জন্য নির্মাণাধীন একটি আটক কেন্দ্রের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের একটা বড় অংশই বাদ পড়েছেন এনআরসি তালিকা থেকে। এই শ্রমিকেরা জানেন, নিজেদের জন্যই তারা আটক কেন্দ্র বানাচ্ছেন। তবুও তাদের উপায় নেই। জীবিকার স্বার্থে এই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স-এর এক অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে।
৩১ আগস্ট (শনিবার) স্থানীয় সময় সকাল দশটায় অনলাইনে ও এনআরসি সেবাকেন্দ্রে প্রকাশিত হয় আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা (এনআরসি)। সে সময় এক বিবৃতিতে এনআরসি কর্তৃপক্ষ জানায়, চূড়ান্ত তালিকায় মোট আবেদনকারীদের মধ্যে ৩ কোটি ৩০ লাখের মধ্যে নাগরিক হিসেবে স্থান পেয়েছেন ৩ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪ জন। তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন রাজ্যের প্রায় ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষ। বাদ পড়া বাসিন্দারা ১২০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ পাবেন। তবে এই আপিলে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারলে তারা সেখানকার অবৈধ অভিবাসী বলে বিবেচিত হবেন। তখন তাদের প্রাথমিক জায়গা হবে আটককেন্দ্রে।  এ নিয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যেই এ ডিটেনশন ক্যাম্প বা আটক কেন্দ্রগুলো বানানো হচ্ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, আসামের গোয়ালপাড়া শহরের কাছে নদী তীরবর্তী দুর্গম এক এলাকায় ভারতে প্রথমবারের মতো গণআটক কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে। ঘন জঙ্গল কেটে প্রায় সাতটি ফুটবল মাঠের সমান জমি প্রস্তুত করে 'অবৈধ অধিবাসীদের' জন্য  ভবনগুলো নির্মিত হচ্ছে। আটক কেন্দ্র নির্মাণের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মধ্যে রয়েছেন এনআরসি থেকে বাদ পড়া অনেকেই। তারা বলছেন,  অর্থের জন্য বাধ্য হয়েই তারা এ ক্যাম্প বানাতে শ্রম দিচ্ছেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, আসামের এ ডিটেনশন ক্যাম্পের আশপাশে স্কুল, হাসপাতাল, বিনোদনের স্থান, নিরাপত্তারক্ষীদের বাসভবনের পাশাপাশি উঁচু সীমানা দেয়াল এবং ওয়াচ টাওয়ার থাকবে।   ক্যাম্পগুলো নির্মাণের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে এবং ক্যাম্পগুলোর লেআউট পর্যবেক্ষণ করে এসব তথ্য জানতে সক্ষম হয়েছে রয়টার্স। ক্যাম্প নির্মাণে জড়িত শ্রমিকদের অনেকেই জানান, আসামে অবৈধ অধিবাসী চিহ্নিত করতে গত সপ্তাহে যে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তাদের নাম নেই। তারা জানেন, ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে শেষ পর্যন্ত তাদেরও স্থান হতে পারে। তবুও কাজ না করে উপায় নেই তাদের।
শ্রমিকদের একজন শেফালি হাজং। নির্মাণস্থলের কাছাকাছি একটি গ্রাম তার আবাস। হাড্ডি-চর্মসার এ আদিবাসী নারীরও নাম ওঠেনি চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জিতে। আরও প্রায় ২০ লাখ মানুষের মতোই তাকে এখন জন্মসনদ কিংবা জমির মালিকানা সনদের মত নাগরিকত্বের প্রমাণ স্বরূপ কাগজপত্র দাখিল করতে হবে; ব্যর্থ হলে নিজের হাতে বানানো ক্যাম্পগুলোর মতো কোনও একটি ক্যাম্পে বন্দি হতে পারেন তিনি।
ভারত সরকারের দাবি, আসামে প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ থেকে আসা লাখ লাখ অবৈধ অধিবাসী বসবাস করছে। তবে ঢাকার দাবি অনুযায়ী, ভারতে কোনও বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী নেই। ভারত কাউকে অবৈধ অধিবাসী ঘোষণা করলে তাকে বাংলাদেশে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ঢাকা। এমন পরিস্থিতির কারণে চিন্তিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন আদিবাসী হাজং গোত্রের শেফালি। "কিন্তু আমার তো পেট চালাতে হবে," কংক্রিট মিক্সচারে পাথর ঢালতে ঢালতে স্থানীয় অহমীয়া উচ্চারণে বলেন এ নারী। অন্যান্য শ্রমিকদের মতো তিনিও ক্যাম্প বানানোর কাজে প্রতিদিন প্রায় চার ডলারের কাছাকাছি আয় করেন; তুলনামূলক দরিদ্র এলাকা হওয়ায় এ আয়কেই যথেষ্ট মনে করছেন অধিকাংশ শ্রমিক।
সঠিক জন্ম তারিখ না জানা শেফালির ধারণা তার বয়স ২৬ এর কাছাকাছি। গত সপ্তাহে প্রকাশিত নাগরিকপঞ্জিতে কেন নাম নেই তাও বলতে পারছেন না তিনি। "আমাদের কোনো জন্মসনদ নেই," বলেছেন শেফালির মা মালতি হাজং। তিনি নিজেও ক্যাম্পটির নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন।
শেফালী হাজং

মুসলিমদের বাদ দিতেই এনআরসি, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, পশ্চিমবঙ্গে ‘না’, দিল্লিতে বাংলাভাষী মানেই বাংলাদেশী

নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি’কে রাজনৈতিক প্রতিশোধ আখ্যায়িত করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তিনি কখনোই তার রাজ্যে বিজেপিকে এনআরসি করতে দেবেন না। এনআরসির উদ্দেশ্য মুসলিমদের বাদ দেয়া। দিল্লিতে বাংলা ভাষায় কথা বললেই তাকে বাংলাদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীরা রাজ্যের সম্পদ গ্রাস করছে বলে বিজেপির অভিযোগ। তারা এনআরসি করার মধ্য দিয়ে এমন নামে আখ্যায়িত করে ওইসব ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের’ উৎখাত করতে চায়। রাজ্য বিধানসভায় এভাবেই এনআরসি ও বিজেপির বিরুদ্ধে শুক্রবার ক্ষোভ ঝাড়েন মমতা। বিধানসভায় তিনি আরো জানান, এই ইস্যুতে একই অবস্থানে আছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমার। ১৮৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে এনআরসি নিয়ে বিধানসভায় মমতা বলেন, আমি নিতিশ কুমারের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাকে বলেছেন, তার রাজ্যেও এনআরসি করতে দেবেন না তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বিজেপি এটাকে (এনআরসি) হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে, বাঙালি ও অবাঙালি, বাঙালি ও রাজবংশীদের মধ্যে ফাটল ধরাতে। মমতার ভাষায়, বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি প্রণয়নের কাজ শুরু করতে চায়। তারা চায় জনগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করতে। কিন্তু আমরা কখনোই বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি করতে দেবো না। তিনি আরো বলেন, কেন্দ্রীয় ‘অ্যাডভাইজরি’ দিয়ে পরিচালিত হয় গণতন্ত্রের সব ভিত্তি। এনআরসির তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে বহু প্রকৃত ভারতীয় নাগরিককে। আসাম চুক্তির অংশ হিসেবে আসামে এনআরসির নির্দেশনা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট- এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করেন মমতা। তিনি বলেন, আসামে যা প্রযোজ্য তা পুরো দেশে প্রয়োগ করা যায় না।

আসামে বিজেপির সাম্প্রতিক উত্থানের দিকে খোঁচা দিয়ে মমতা বলেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল এনআরসি তালিকা করে মুসলিমদেরকে বাদ দেয়া। এ জন্যই তারা এনআরসির প্রথম তালিকা থেকে ৪১ লাখ মানুষকে বাদ দিয়েছিল। পরে তারা দেখতে পেয়েছে, তাদের এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে না। তাই পরে এই সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে ১৯ লাখে। আসামে যাদেরকে এভাবে বাদ দেয়া হয়েছে তাদের বেশির ভাগই বাংলাভাষী। এ ছাড়া সেখানে বসবাসকারী প্রায় এক লাখ গোরখাকে বাদ রাখা হয়েছে। এরপরই মমতা দার্জিলিংয়ের বিধায়কের প্রতি প্রশ্ন্ ছুড়ে মারেন। তিনি প্রশ্ন করেন, আমাদের দার্জিলিংয়ের এমএলএ কোথায়? আপনারা ভোট দিয়েছিলেন বিজেপিকে। এখন দেখুন আপনাদের জন্য কি করেছে বিজেপি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার সদস্যদের বলেন, এমনকি শরণার্থী কার্ড দেয়া হয়েছিল যাদেরকে তাদের বিষয়টিও আমলে নেয়নি এনআরসি কর্তৃপক্ষ। এসব কার্ড দেয়া হয়েছিল দেশভাগের সময়। ওই সময় যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আসামে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন তাদেরকে দেয়া হয়েছিল এই কার্ড। এ সময় তিনি ‘হ্যান্ডবুক অব ইন্ডিয়ান সিটিজেনশিপ’ উদ্ধৃত করে বলেন, সনাক্তকরণে আর কত প্রমাণ প্রয়োজন এনআরসি কর্তৃপক্ষের। তার ভাষায়, জনগণের হাতে আছে রেশন কার্ড। আছে ভোটার কার্ড। আধার কার্ড। প্যান কার্ড। ব্যাংক একাউন্ট। ড্রাইভিং লাইসেন্স। তাদের (কর্তৃপক্ষের) আর কত  (প্রমাণ) প্রয়োজন? এখন বউবাজার ঘটনার কথাই ধরুন। সেখানকার মানুষগুলো কোনো প্রমাণপত্র সংগ্রহ করার মতো সুযোগ পাননি। তার আগেই তাদেরকে জীবন বাঁচাতে সেখান থেকে সরে যেতে হয়েছে। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে পুলিশের এফআইআরের স্বীকৃতি দিতে হবে। কারণ, এসব মানুষ কোনো ডকুমেন্ট বানাতে পারেন না। একই সঙ্গে অভাবনীয় পরিস্থিতির কারণে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এসেছিলেন যেসব মানুষ তাদের কথা আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না।

এসব বাদ দিয়ে অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান মমতা। তিনি বলেন, অর্থনীতি লেজেগোবরে অবস্থা। রাজনীতিরও তাই। এই অস্বস্তিকর অবস্থা আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দিল্লিতে বাংলাভাষায় যেসব মানুষ কথা বলছেন তাদেরকে চিহ্নিত করা হচ্ছে বাংলাদেশী হিসেবে। যদিও সর্বোপরি তারা বাংলাভাষী।

সংসদে শোক প্রস্তাবের আলোচনা: এরশাদকে নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অনেক কিছু বলার থাকলেও গণতন্ত্রের স্বার্থে অনেক কিছু হজম করে এগিয়ে যাচ্ছি। দেশের উচ্চ আদালত মার্শাল ল’ দিয়ে জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের ক্ষমতা দখলকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। এই রায়ের পর এ দু’জনকে (জিয়া ও এরশাদ) আর রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা যায় না। তবে জেনারেল এরশাদ সাহেব অমায়িক ছিলেন, মানুষের প্রতি তার দরদ ছিল।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে রোববার সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন প্রয়াত বিরোধী দলের নেতা এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, দোষে গুণে মানুষ। আমাদেরও অনেক কিছুই বলার আছে। কারণ আমরাই সব চেয়ে বেশি ভূক্তভোগী। তারপরও দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, জনগণের উন্নয়নের স্বার্থে অনেক কিছু হজম করে যাচ্ছি। তিনি প্রয়াত বিরোধী দলের নেতা এইচ এম এরশাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের নেতা যিনি ছিলেন, সেই জেনারেল এরশাদ এক সময় যখন পাকিস্তান থেকে ফিরে আসেন, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তাঁকে সেনাবাহিনীতে যোগদান করান। একসময় তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান হন। তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেই নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী ছিলেন বিচারপতি সাত্তার। তাকে কিন্তু সেনাপ্রধান হিসেবে সাত্তারকে প্রার্থী করেছিলেন জেনারেল এরশাদ। একটি বিদেশী পত্রিকায় তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন বিচারপতি সাত্তার সাহেব তার প্রার্থী! সেখানেই আমরা আপত্তি তুলেছিলাম। বিচারপতি সাত্তার সাহেবকে বলেছিলাম, এ ধরণের প্রার্থী হওয়া উচিত না। বরং নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে হতে দেন, গণতান্ত্রিক ধারা যেন বজায় থাকে। কিন্তু তারা তা করেনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরফলে ফলাফল এটাই হয়েছিল যে তখন বেগম খালেদা জিয়া কিন্তু রাজনীতিতে আসেনি। কিন্ত পরবর্তিতে রাজনীতিতে না আসলেও হঠাৎ করে বিচারপতি ছাত্তার সাহেবের বিরুদ্ধে একটা স্টেটমেন্ট দেন। বিচারপতি ছাত্তার সাহেব ছিল তখন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তখন খালেদা জিয়া তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে বিদায় দেয়ার জন্য স্টেটমেন্ট দেয়। তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে এরশাদ সাহেব যে ক্ষমতা দখল করেছিল, সেই ক্ষমতা দখলের সুযোগটা কিন্তু খালেদা জিয়াই করে দিয়েছিলেন। করে দিয়েছিল হয়তো একারনেই যে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়াকে শুধু দুটি বাড়িই নয়, নগদ ১০ লাখ টাকাসহ অনেক সুযোগ সুবিধা জেনারেল এরশাদ দিয়েছিলেন। যে কারণে জিয়া হত্যার ব্যাপারে যে মামলা হয়েছিল চট্টগ্রামে, সে মামলা কিন্তু বিএনপি কখনো চালায়নি। তিনি বলেন, বহুবছর পরে ১৯৯৪ সালের দিকে এক সময়ে বা বহু বছরপর এসে জেনারেল এরশাদকে তাঁর স্বামী হত্যার জন্য দায়ী করেছেন খালেদা জিয়া। এরপূর্বে কখনো দায়ী করেননি। এগুলো ইতিহাসের একটা অংশ যে, ক্ষমতাটাকে তুলে দেয়া বা সুযোগ করে দেয়া। তবে এর বিরুদ্ধে আমরাই প্রতিবাদ করেছি। কারন আমরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল প্রতিবাদ করেছিলাম এই জন্যই যে, আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ এক সামরিক শাসকের ক্ষমতা থেকে আরেক সামরিক শাসকের ক্ষমতা আসুক, এটা কখনো আমাদের জন্য কাম্য ছিল না। সংসদ নেতা বলেন, অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আমাকে চলতে হয়েছে। আমি দেশে ফিরে আসার পরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের আমাদের বাড়িতে জেনারেল জিয়াকে আমাকে ঢুকতেই দেয়নি। এটাও বাস্তবতা। তিনি বলেন, প্রথমে মার্শাল ল জারি করে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করে। এরপর নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করে নেয়। এই ক্ষমতা দখল প্রথমে জিয়াউর রহমান করে। জাতির পিতাকে হত্যার পর ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। এরপর জেনারেল এরশাদও নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ আদালত জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের এই ক্ষমতা দখলটাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। উচ্চ আদালত অবৈধ যখন ঘোষণা করেছে, তখন আর এই দুইজনের কেউ আর সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিন্তু থাকে না। তাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লে¬খ করাও হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী বৈধ নয়, বরং সেটা করা যায় না। কারণ একটা রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের ধারাটা অব্যাহত রাখার সুযোগ হয়েছে। জেনারেল এরশাদ সাহেব অমায়িক ছিলেন এবং মানুষের প্রতি তাঁর দরদ ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা সাভার স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসে। জেনারেল জিয়া কিন্তু নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিলেও কখনো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি। যেটা করেছেন জেনারেল এরশাদ সাহেব। তিনি আসার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অসমাপ্ত কাজ বা সাভার স্মৃতিসৌধের অসমাপ্ত কাজ বা মুজিব নগরের স্মৃতিসৌধ সেগুলো তৈরি করেছেনে- এতে কোন সন্দেহ নাই। তিনি বলেন, কেউ যদি ভাল কাজ করে নিশ্চয়ই আমরা তা বলব। তাছাড়া আর একটি কাজ এরশাদ সাহেব করেছিলেন। নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে যখন জেনারেল এরশাদের সঙ্গে সংলাপ করি আমাদের ১৪ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে জিয়ার আমলে জারিকৃত মৃত্যুর পরোয়ানা প্রত্যাহারের জন্য এবং তাদের মুক্তি দেয়ার জন্য। তাছাড়া অনেকেই তখন গ্রেপ্তার হয়ে বন্দী ছিলেন। এরশাদ সাহেব সকলকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই মুক্তি দেয়ার মধ্য থেকে তিনি এক একটা পরিবারকে রক্ষা করেছিলেন। অতীতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় (এরশাদের শাসনামল) অনেকবার আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়, কারাবরণ করি। আমাদের একেক সময় গ্রেপ্তার কখনো সাব জেলে রাখা হয়, আবার কখনো গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদীঘির ময়দানে আমাদের সভা করতে বাধা দেয়া হয়। সরাসরি গুলি ছোঁড়া হয়, সেখানে প্রায় ৩০ জনের মতো মানুষ মারা যায়। এগুলো কিন্তু এরশাদের শাসনামলেই হয়েছিল। সংসদ নেতা বলেন, আমরা সব সময় গণতন্ত্র চেয়েছি, যেন গণতন্ত্র অব্যহত থাক। যে কারণে অনেক প্রতিকুল অবস্থায়ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম ১৯৮৬ সালে, যদি সেই নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে হতো, তাহলো হয়তো তাকে (এরশাদ) এই ধরনের বিতর্কিত হতে হতো না। একটি গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হতো। যদিও নির্বাচনের পর কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। কারণ জেনারেল জিয়ার আমলে প্রতি রাতে কারফিউ ছিল। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালের নির্বাচন যেটা হয় সেটাও বলতে গেলে কোন দল অংশগ্রহণ করেনি। এরপর আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন করেছিলেন খালেদা জিয়া, তখনও কিন্তু কোন দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই। আন্দোলনের মুখে খালেদা জিয়া মাত্র দেড়মাসের মধ্যে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। সেটাও জনগণের রুদ্ররোষে। অর্থাৎ জনসমর্থন না থাকলে নির্বাচন নিয়ে যে যত বিতর্কিত হোক, যে কথাই বলুক না কেন, যদি জনসমর্থন না থাকে তবে সে নির্বাচেন যদি সত্যিকার ভোট দিয়ে না থাকে তাহলে সেই নির্বাচনে কেউ টিকে থাকতে পারে না। তার প্রমান খালেদা জিয়ার ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও জনগণ ভোট দিয়েছে বলেই বিএনপির আন্দোলনের ডাকে দেশের জনগণ সাড়া দেয়নি। যদি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিত, তবে তারা আন্দোলন করে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারতো। তাই অনেক চরাই উৎরাই পার হয়েই আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। দেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে।

পদত্যাগ করলেন কনজারভেটিভ হুইপ ও মন্ত্রী অ্যাম্বার রাড

শনিবার রাতে মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বৃটিশ কর্ম ও পেনশন বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাম্বার রাড। একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের হুইপ পদও ত্যাগ করেছেন। অ্যাম্বার রাড বলেছেন- অনুগত, উদারমনা এমপিদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি এর সঙ্গে একমত হতে পারেন না। তার এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকারের সামনে যেন এক ভয়ঙ্কর বিপদের বিস্ফোরণ হয়েছে।
অ্যাম্বার রাড প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সমালোচনা করে কড়া এক পদত্যাগপত্র লিখেছেন। এর আগে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে পার্লামেন্টে একটি বিল সমর্থন করায় কনজারভেটিভ পার্টির ২১ জন এমপিকে বরখাস্ত করেছেন জনসন। তার এ পদক্ষেপকে শিষ্টাচার ও গণতন্ত্রের প্রতি আঘাত, রাজনৈতিক ধ্বংসসাধন বলে অভিযুক্ত করেছেন অ্যাম্বার রাড। তিনি জনসনকে বলেছেন, চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট আলোচনায় উঠবে- এমন একটি বিশ্বাস নিয়ে তিনি তার মন্ত্রিপরিষদে যোগ দিয়েছিলেন। তার ভাষায়, আমি আর বিশ্বাস করতে পারছি না যে, চুক্তি করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করা সরকারের মূল উদ্দেশ্য।
অ্যাম্বার রাড দেখতে পেয়েছেন চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট সম্পাদনে সরকার প্রচুর পরিমাণে শক্তি খরচে প্রস্তুত। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় সমপরিমাণ তীব্রতা দেখাচ্ছে না সরকার। অ্যাম্বার রাড বলেছেন, আমি যে নিশ্চয়তা চেয়েছিলাম দুঃখজনক হলো প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে সে বিষয়ে আপডেট দেয়া হচ্ছে না।
বিদ্রোহী এমপিদের ভেতর থেকে হুইপ প্রত্যাহারে প্রধানমন্ত্রী জনসন যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সে বিষয়ে অ্যাম্বার রাড বলেছেন, আমার সহকর্মীদের দল থেকে বহিষ্কারের এই অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত দলের বিস্তৃত মানসিকতা ও কনজারভেটিভ এমপিদের প্রতি যে উদারতা তার প্রতি আঘাত। রাজনৈতিক এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে আমি সমর্থন করতে পারি না।
গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন বরিস জনসনের নিজের ভাই জো জনসন। তারপরই এমন সিদ্ধান্ত নিলেন অ্যাম্বার রাড। এতে মন্ত্রিপরিষদে আরো যারা চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের বিরোধিতা করছেন তাদের ওপর তীব্র এক চাপ সৃষ্টি হবে। এমন মন্ত্রীর মধ্যে রয়েছেন নিকি মরগান।
লেবার দলের চেয়ারম্যান ইয়ান ল্যাভেরি বলেছেন, রেকর্ড সময় কর্তৃত্বের বাইরে চলে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। ব্রেক্সিট নিয়ে তিনি যে পরিকল্পনা নিয়েছেন তা এক লজ্জায় পরিণত হয়েছে। বরিস জনসনের ওপর কারো আস্থা নেই। তার মন্ত্রিপরিষদের আস্থা নেই। তার এমপিদের আস্থা নেই। এমন কি তার নিজের ভাইয়েরই আস্থা নেই।
অ্যাম্বার রাডের পদত্যাগ করা নিয়ে টুইট করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেই বৃটেনকে রাখার পক্ষে থাকা সাবেক আইনমন্ত্রী ও লর্ড চ্যান্সেলর ডেভিড গাউকে। তিনি অ্যাম্বার রাডের সিদ্ধান্ত নিয়ে টুইটে বলেছেন, আমি নিশ্চিত এমন সিদ্ধান্ত নেয়াটা অতো সহজ নয়। এটি একটি সাহসী ও নীতির বিষয়। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
বহিষ্কার হওয়া সাবেক এমপিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছেন, ডমিনিক কামিনংস ডাউনিং স্ট্রিটের মেশিন থেকে চাকা খুলে আসছে। লজ্জাজনক সমঝোতা প্রকাশ পেয়েছে। তার (জনসন) কোনো বিকল্প পরিকল্পনা নেই। তিনি একক হাতে কনজারভেটিভ পার্টিকে একটি কট্টর ডানপন্থি দলে পরিণত করার চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে উদার ব্যক্তিদের স্বাগত জানানো হচ্ছে না। নতুন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ঝঞ্ঝাময় একটি সপ্তাহ অতিক্রম করেছেন। তার মধ্যেই অ্যাম্বার রাডের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত হলো। ওই এক সপ্তাহে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট বন্ধের পক্ষে আন্তঃদলীয় এমপিদের একটি গ্রুপ পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন এবং তারা চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট ঠেকানোর জন্য একটি বিল পাস করাতে সক্ষম হয়েছেন। এক্ষেত্রে বরিস জনসন বলেছেন তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে বৃটেনকে বের করে আনতে সর্বশেষ ৩১শে অক্টোবরের সময়সীমা বর্ধিত করবেন না।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তিনি এমনটা করলে একটি আইনগত ও সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হবে। এর ফলে আন্তঃদলীয় এমপিদের ওই গ্রুপটির আনা প্রস্তাব অনুসরণে তিনি ব্যর্থ হলে তাকে পদত্যাগও করতে বাধ্য হতে হবে।
শীর্ষ স্থানীয় কিউসি’দের কাছ থেকে ফাঁস হওয়া আইনি পরামর্শ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে ব্রেক্সিট বিষয়ক ছায়ামন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের কাছে। তাতে বলা হয়েছে, ৩১শে অক্টোবরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী যদি চুক্তি ছাড়াই ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে বৃটেনকে বের করে আনার ক্ষেত্রে অটল থাকেন, তিনি যদি ওই সব এমপি’র প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে থেকেই যান তাহলে তাকে আদালত অবমাননাকারী হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে। এ সংক্রান্ত নতুন আইনে এ সপ্তাহের শুরুর দিকে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তার সম্মতি দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ম্যাট্রিক্স চেম্বারস-এর আইনজীবীদের দেয়া আইনি পরামর্শে বলা হয়েছে, যদি প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান তাহলে আমরা এক অসম্পূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে থাকবো। তখন আইনি অবস্থান হবে পরিষ্কার। তাহলো, প্রধানমন্ত্রী আদালত অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন। তার বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
শনিবার পার্লামেন্টের কাছে ব্রেক্সিটপন্থি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ব্রেক্সিট বিরোধীদের বিক্ষোভের সময় সহিংস সংঘর্ষ হয়েছে। এদিন ডাউনিং স্ট্রিট থেকে বলা হয়েছে, জনসন তার অবস্থানে অটল আছেন।
জনসন ও তার উপদেষ্টারা এই সপ্তাহান্তে আরো আইনগত সম্ভাব্যতা উদ্ভাবনের চেষ্টা করবেন। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশে ‘পারমাণবিক বিস্ফোরণের’ মতো অপশন এবং তখন কনজারভেটিভ এমপিদের নির্দেশ দেয়া হতে পারে এতে ভোট দেয়ার জন্য, যাতে একটি নির্বাচনের নির্দেশ আসে। এমন কোনো প্রস্তাব পাস হতে হলে এমপিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। কিন্তু এমন প্রস্তাব স্পিকার জন বারকাউ অনুমোদন করবেন বলে মনে হয় না।
পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানিয়ে টুইটারে অ্যাম্বার রাড বলেছেন, আমি মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছি এবং কনজারভেটিভ পার্টির হুইপ পদ সমর্পণ করেছি। চমৎকার, অনুগত ও উদার কনজারভেটিভদের বহিষ্কার করা হবে এমন অবস্থানের পক্ষে আমি থাকতে পারি না। আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এবং আমার এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছি। এক জাতির মূল্যবোধ আমাকে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে। আমি সেই নীতিতে অবিচল থাকবো।
নমনীয় ব্রেক্সিট পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর গত এপ্রিলে দল থেকে পদত্যাগ করেন নিক বোলস। তিনি টুইটারে বলেছেন, প্রতিটি মানুষের একটি সীমা আছে, যা তিনি অতিক্রম করতে পারেন না। অ্যাম্বার রাড তার সীমা পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন। দ্বিতীয় একটি পরিকল্পনার আগে অথবা তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেয়ার আগে, যে দলের হাল ধরে আছেন জনসন, তার আর কতটা ক্ষতি করবেন তিনি? কোন অবস্থানে গেলে ম্যাট হ্যানকক এবং নিকি মরগান আকস্মিকভাবে দেখতে পাবেন যে, তাদের মেরুদণ্ড নেই। স্টারমার টুইটে বলেছেন, জনসন সরকার ভেঙে পড়েছে।

এক তরুণের স্বপ্ন ও এক বিদেশি বন্ধু by হামিদ মোহাম্মদ

দ্য ক্যাফে আইটি স্কুলের ল্যাব
সব মানুষের স্বপ্ন থাকে বড় হওয়ার। এই স্বপ্নপূরণের জন্য প্রয়োজন সুযোগ এবং সঙ্গে ইচ্ছা। যাদের জীবনে স্বপ্ন দেখা বা কোনো ইচ্ছারও সুযোগ নেই, তাদের বেলায় কী বলা চাই। এ রকম অবাক করা এক তরুণের গল্প বলার সুযোগ আমার হয়েছে। আমার সুযোগ হওয়া এ জন্য বললাম, আমরা অভ্যস্ত যেভাবে সেটা এতই ব্যতিক্রম, যা চমকে দেওয়ার মতো। আমি চমকে গেছি, বিশ্বমাত্রিকতায় জায়গা করে নেওয়ার অদম্য এক তরুণের স্বপ্নবাজির কথা শুনে। এই স্বপ্নবাজ তরুণের নাম মো. কবির উদ্দিন। সিলেটের খাদিমনগরের দলইপাড়ার সন্তান।
কিন্তু প্রচলিত চিন্তাধারার ব্যতিক্রম কবির উদ্দিন। তিনি কোনো স্বপ্নই দেখেননি। সেই স্বপ্ন না দেখা কবির উদ্দিন এখন উচ্চতায় ছাড়িয়ে গেছেন তাঁর বেড়ে ওঠার হতদরিদ্র ছ্যামছ্যামে বৃষ্টিভেজা, শীতে হাড়কাঁপানো মাটি ছোঁয়া অন্ধকার স্থানটি। অনেক দূরে বিজ্ঞানের আলো ঝলমল স্থানে তাঁর অবস্থান। তিনি ঘুরে বেড়ান, বক্তব্য দেন বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে, আইটি সেমিনারে, উপস্থাপন করেন সফটওয়্যারের নানা উদ্ভাবনী।
নিতান্ত দারিদ্র্যে ডুবে হাবুডুবু খাওয়া, কোনো রকম বেঁচে থাকার লড়াই করা জীবন ছিল তাঁর। নয় ভাইবোনের সংসার। বাবা কৃষক, অষ্টম শ্রেণি পাসÑনাম মো. মোখসেদ আলী। মা পঞ্চম শ্রেণি পাস আমীরুন নেসা। নিজের বাড়ি নেই। বাড়িভাড়া না দিতে পারায় আশ্রয় পান খাদিমনগর এফআইভিডিভির পাশে একটি মুরগির ফার্মের টিনের একচালায়। এফআইভিডিভির জমিতে চাষবাস করে দিন গুজরান চলে। চাষবাসে চলে না। তাই বাড়তি রোজগারের আশায় মোখসেদ আলী সন্তানদের খাদিমনগর প্রধান সড়কে চা-বিস্কুটের দোকান পেতে দেন। মোটের ওপর এই হলো কবির উদ্দিনদের পরিবারের বৃত্তান্ত।
এই বিদ্যুৎ-তরুণ কবির উদ্দিন তাঁর পরিবারের কষ্টের দিনগুলোর কথা এভাবেই বলছিলেন। পরিচয় বা তাঁর সম্পর্কে জানা হয়েছিল সাংবাদিক নজরুল ইসলাম বাসনের মাধ্যমে। পত্রিকা অফিসে তিনি এসেছিলেন ২০১৭ সালে একবার। তখন তাঁর কাহিনি আংশিক জেনেছিলাম। তিনি ম্যানচেস্টার ও নরউইচে বিভিন্ন সেমিনারে ব্যস্ত। ফোনেই তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলাম। শুনতে থাকলাম তাঁর গল্প। জন্ম ১৯৯৩ সালে।
কবির উদ্দিন বলছিলেন তাঁর জীবনের মোড় নেওয়ার কাল ২০০৪ সালের কথা। তখন তাঁর বয়স ১১ বছর। রমজান মাস। বাবা মোখসেদ আলী ইফতার করতে এফআইডিভির ক্যানটিনে গেছেন, সেখানে জমি চাষাবাদ ও সামান্য চাকরি করার সুবাদে। কবির উদ্দিনও বাবার সঙ্গে গেলেন ক্যানটিনে। উদ্দেশ্য টিভি দেখা রেসলিং, অ্যাডভেঞ্চার।
ক্যানটিনে ছিলেন একজন ব্রিটিশ শিক্ষক। তিনি টিচার ট্রেইনার হিসেবে কাজ করেন। নাম লুক ডয়েল। অ্যাডভেঞ্চার দেখার প্রতি অন্য দশ বালকের মতো তার আকর্ষণ দেখে কথা বলতে চাইলেন। কিন্তু কবির ইংরেজি বলতে বা উত্তর দিতে পারছিলেন না।
কবির উদ্দিনের অল্প লেখাপড়া। দলইপাড়া হজরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রহ.) মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা। তারপর এফআইডিভি বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে অল্প দিন পর্যন্ত পড়া। দু-একটা ইংরেজি শব্দ-অনেকটা আকারে-ইঙ্গিতে বোঝানো। লুক ডয়েল পাশের রুমে রাখা ল্যাপটপ কম্পিউটারটি এনে তাকে টাইপ করে প্রশ্ন করলেন, যা বাংলায় দাঁড়ায় ‘এটা কি তুমি চালাতে পারো?’ কবির উদ্দিন কাঁচুমাচু করে বলল, না। লুক ডয়েল বললেন, ‘আমি তোমাকে শেখাব।’ লুক বুঝতে পারলেন, ছেলেটি শিখতে চায়-কম্পিউটারসহ আরও অনেক কিছু। চিক চিক করা তার চোখের ভাষায় সেই উত্তর ঝিলমিল করছে।
ওয়াশিংটনে মাইক্রোসফট হেডকোয়ার্টারে মো. কবির উদ্দিন ও লুক ডয়েল
লুক ডয়েল লন্ডনের কেন্টের একটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। গিয়েছিলেন চ্যারিটি সংস্থার হয়ে সিলেটের এফআইভিডিভিতে শিক্ষকতায়-টিচার ট্রেইনার হিসেবে। তিনি যেন খুঁজে পেলেন এখানে জীবনের সন্ধান, পেলেন এক বিদ্যুৎ-বালককে। তাঁর হাত ধরেই শুরু হলো কবির উদ্দিনের সামনে চলা। যা স্বপ্নেও কল্পনা করেননি তিনি। লুক ডয়েল তাঁকে অবাক করে দিয়েই দায়িত্ব নিলেন তার পড়ালেখার ব্যয়ভার বহনের। ভর্তি করে দিলেন ইংলিশ মিডিয়ামে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে।
কিন্তু ২০০৭ সালে আসে এক কঠিন সময়। ওই সময় বাংলাদেশে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায়। এ সরকার লুক ডয়েলকে ভিসা দেয় মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য। বাংলাদেশে লুক ডয়েল থাকতে না পেরে চলে যান চীন। পরে যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতায়। কিন্তু কবির উদ্দিনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি।
২০১০ সালে লুক ডয়েল আবার যান বাংলাদেশে। তবে এবার সিলেটে নয়Ñঢাকায় যান একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতে। তখন কবিরকেও নিয়ে এলেন ঢাকায়। এ সময় বনানীর দ্য নিউ স্কুল অব ঢাকা থেকে ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল সম্পন্ন করেন কবির উদ্দিন। একই সময়ে লুক ডয়েল ঢাকার বাড্ডায় প্রতিষ্ঠা করলেন ‘দ্য ক্যাফে’ নামে একটি আইটি স্কুল। শুরু হলো অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের বিনা বেতনে বেসিক কম্পিউটার শিক্ষা থেকে প্রোগ্রামিং শিক্ষাদান পর্যন্ত। সেখানে কবিরও প্রোগ্রামিংসহ সফটওয়্যার প্রশিক্ষণ শিখে অল্প দিনেই শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণদান শুরু করেন।
একই সময়ে ঢাকায় একটি সংস্থা পরিচালিত লেফ নামে একটি আইটি স্কুল ছিল। লেফ মানে ‘লাভ, এডুকেশন ও ফুড’। তারা অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের সামাজিক বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা, শিক্ষাদান ও খাবারের ব্যবস্থা করত। পরিচয় হলো তাদের সঙ্গে। লুক ডয়েলের ভালো লাগল প্রজেক্টটি। জড়িয়ে গেলেন তাদের সঙ্গে। সংস্থাটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কম্পিউটার ও প্রোগ্রামিং শিক্ষাদানের উদ্যোগ নিলেন। তাদের ১০টি কম্পিউটারও চ্যারিটির মাধ্যমে সংগ্রহ করে দেন। যাতে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃতভাবে দাঁড়াতে পারে।
কিছুদিন পর, ২০১৬ সালে লুক ডয়েল আবার গেলেন সিলেটে। সেখানে খাদিমনগরে ১৫ হাজার টাকায় একটি ভাড়া বাড়ি নিয়ে কবির উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করলেন আইটি স্কুল নাম দ্য ক্যাফে। ক্যাফের অর্থ কম্পিউটার আর ফ্রি ফর এভরি ওয়ান। অল্প দিনেই ৩০টি কম্পিউটারের ব্যবস্থা হলো বিভিন্ন চ্যারিটি সংস্থার বদান্যতায় ও নানা অনুদানে।
বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ২৫০ শিক্ষার্থী রয়েছেন। ৩০ জনের ব্যাচ, এক ঘণ্টা করে স্টাডি ক্লাস। শিক্ষার্থীদের বয়স ৬ থেকে ২৫ বছর। প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্কুলের ক্লাসের পর আসেন, সপ্তাহে দুই দিন। এ ছাড়া যাঁরা নানা কারণে লেখাপড়ার সুযোগবঞ্চিত হয়ে পড়েছেন, কিছু করছেন না- তাঁদেরও যত্ন ও গুরুত্বের সঙ্গে শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা হয়।
ক্যাফেতে প্রোগ্রামিং ও গ্রাফিক ছাড়াও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে নানা খেলনা তৈরি ও তা সঞ্চালনা শিশুদের শেখানো হয়। শেখানো হয় বিজ্ঞানমনস্কতা। কবির উদ্দিন প্রোগ্রামিং শিক্ষা থেকে ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরির এই প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক।
কবির উদ্দিনের যে কথাটি আমাকে বিস্মিত করে বেশি তা হলোÑলুক ডয়েল তাঁর স্বপ্নঘেরা এই প্রতিষ্ঠানটির ব্যয়ভার নির্বাহ করতে যুক্তরাজ্যসহ নানা দেশের চ্যারিটি সংস্থা থেকে ফান্ড জোগাড় করেন নিয়মিত। মূলত লুক ডয়েলই মানুষ তৈরির এক অদ্বিতীয় স্বপ্নযান, যাঁর উচ্চতা আকাশছোঁয়া। যে লোকটির স্বনিষ্ঠ প্রণোদনায় সহিংস পৃথিবীতে মানব তৈরির এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে সিলেটের খাদিমনগরে।
জানলাম এই প্রতিষ্ঠান থেকে বেসিক কম্পিউটার শিক্ষাসহ প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক ডিজাইন ও অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট শিখছে শিক্ষার্থীরা। এতে প্রায় ৬৫ ভাগ রয়েছে মেয়ে শিক্ষার্থী। শিক্ষা সমাপ্তির পর নিজ নিজ ক্ষেত্রে এবং স্বউদ্যোগে স্বাধীনভাবে ঘরে বসেই সফটওয়্যার ও গ্রাফিক ডিজাইন তৈরি করে হাজার হাজার টাকা উপার্জন করছেন অনেকেই। স্বাবলম্বী হচ্ছে শত শত তরুণ-তরুণী ও পরিবার।
মো. কবির উদ্দিন
উপার্জন বিষয়ে কবির উদ্দিন উদাহরণ হিসেবে বললেন, তাঁর ছোট ভাই ফয়েজ উদ্দিন, বয়স ১৪। সে দুই ঘণ্টায় রোজগার করে প্রায় ১৫ হাজার টাকা। তাঁর ভাই কিশোর বয়সেই যে টাকা রোজগার করছে সে জায়গায় তাদের বাবা এক মাসেও কখনো সেই টাকা চাষবাস করে উপার্জন করতে পারেননি।
আর কবির উদ্দিন ও তাঁর ভাই ফয়েজ উদ্দিন কিশোর বয়সেও সফটওয়্যার প্রোগ্রামিংয়ে লন্ডনের রেভেনাসবোর্ন কলেজে এসেছেন ২০১৭ সালে, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। এই মেলায় প্রদর্শিত সফটওয়্যারটি ছিল কোনো শিশু জলে পড়লে কীভাবে তাঁর মা-বাবা জানবেন এবং তৎক্ষণাৎ তাঁকে উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। ঘড়ির মতো একটি ডিভাইস থাকবে শিশুটির কবজিতে আরেকটি ডিভাইস থাকবে মা-বাবার কাছে। কোনো নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই ডিভাইসটি সতর্ক বার্তা দেবে। এটা তাঁদের নিজস্ব উদ্ভাবনী। এই সফটওয়্যারটির প্রদর্শনীতে সহ-প্রোগ্রামার ছিলেন বর্তমানে কবির উদ্দিনের সহধর্মিণী ও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক রোকশানা আকতারও।
কবির উদ্দিন এবার ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যে এসেছেন বেশ কয়েকটি এক্সপো মেলা ও সেমিনারে অংশ নিতে। এর মধ্যে অংশ নিয়েছেন ম্যানচেস্টারে ৪ মে থেকে ৫ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্লে এক্সপোতে। ডানস্টবলের ওয়াদার ফিল্ড একাডেমিতে প্রোগ্রামিং শিক্ষার সফটওয়্যার প্রদর্শন caffebd.org ওয়েবসাইটে গেলেই বিস্তারিত জানা যাবে। এ ছাড়া ২৬ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নরউইচ গেম ফেস্টিভ্যালে যোগ দেন কবির।
এর আগে কবির উদ্দিন আটবার (২০১০ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত) যুক্তরাজ্যে এসেছেন। সব সফরই বিভিন্ন এক্সপোতে যোগদান ও চ্যারিটির নানা কাজে। এর ব্যয়ভার কখনো বহন করেছেন লুক নিজে, কখনো চ্যারিটি সংস্থার সৌজন্যে। যুক্তরাষ্ট্রেও কবির উদ্দিন গিয়েছেন, ওয়াশিংটনে মাইক্রোসফট হেডকোয়ার্টারে ২০১৭ সালে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে, সঙ্গে ছিলেন লুক ডয়েলও।
বিভিন্ন দেশ ও নানা এক্সপো মেলায় যোগদান করে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে এবং যে সাহস তৈরি হয়েছেÑতাতে কবির উদ্দিন এখন স্বপ্ন দেখছেন।
কথার শেষ পর্যায়ে তাঁর স্বপ্নের কথা জানালেন। তিনি একটি আইটি ইনস্টিটিউট করতে উদ্যোগ নিয়েছেন। এ জন্য ৮ শতক ভূমি সিলেটে ক্রয় করেছেন। এর অর্থ দিয়েছে কয়েকটি চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান। বহুতল ভবন নির্মাণ করবেন সেখানে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এত টাকা পাবে কই? উত্তরে কবির হেসে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বললেন, চ্যারিটি সংস্থাসমূহের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করব। যে প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে আমাদের সহায়তা করছেÑতারা তো আছেই। তবে ফান্ড রাইজিংয়ে আগামী অক্টোবরে তিনি ইংল্যান্ডের বরমাউথে অনুষ্ঠিতব্য ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নেবেন। তাঁর আশা, বড় একটা ফান্ড সংগ্রহ হবে তখন।
সবকিছু শুনে মনে হলো-কবিরকে স্বপ্ন দেখানোর মানুষ লুক ডয়েল একজন নিরহংকার শিক্ষানুরাগী শিক্ষক শুধু নয়, মানব তৈরির এক অসামান্য দূত এই লোকটি। কবির উদ্দিন তাঁর অবদান সম্পর্কে বারবার বলছিলেন নানা উচ্চতায়। জীবনকে ঘুরিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করার দীপ্তি ছিল কবিরের প্রতিটি কথায়।
লুক ডয়েলের হাতে গড়া সিলেটের আইটি প্রতিষ্ঠান দ্য ক্যাফেতে আছেন ছয়জন শিক্ষক। এঁদের বেতন মাসে ৬ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। কোনো চ্যারিটি সংস্থা থেকে যদি এই অর্থ সংগ্রহ সম্ভব না হয়Ñলুক যুক্তরাজ্যে তাঁর শিক্ষকতার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তা সংকুলান করেন। এতে তাঁর বাবা-মায়েরও উৎসাহ কম নয়।
কবির উদ্দিন তাদের প্রকল্পের নানা উদ্যোগের কথা বলতে গিয়ে বললেন, আমরা সিলেট অঞ্চলের প্রত্যন্ত কোনো গ্রাম এলাকার যেকোনো স্কুলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে চাই। যেমন এমন কোনো স্কুল রয়েছে, যাদের কম্পিউটারসহ সব ব্যবস্থাদি আছে, কিন্তু প্রশিক্ষক নেই। সেসব স্কুলে আমরা আমাদের দক্ষ প্রশিক্ষক দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে প্রস্তুত আছি। তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সম্মানী দেবেন, যা আমাদের প্রতিষ্ঠান ক্যাফের ব্যয় বহন করার কাজে ব্যবহৃত হবে। আবার যাদের সামর্থ্য আছেÑকিন্তু কম্পিউটার ও ল্যাবের ব্যবস্থা নেই, তাদের আমাদের এক্সপার্টাইজ দিয়ে ল্যাব স্থাপনসহ অল্প টাকার বিনিময়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তুতিও আমাদের আছে। তবে সবকিছুই দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়ার মাধ্যমে কার্যকর বা বাস্তবায়ন করা হবে।
কবিরের এসব সাহসী কথা শুনে বললাম-অনেক বড় ভাবনা তোমার। এগুলো বাস্তবায়নে তো শুধু সাহস নয়, অর্থেরও দরকার। কবির জানালেন, দেশে-বিদেশে অনেক বিত্তবান আছেন,-যাঁরা সামাজিক নানা কাজে আর্থিক সহায়তা করে থাকেন। তাঁদের কাছে আমাদের বার্তা, আসুন, সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানদের পাশে দাঁড়াই, তাদের কচি কচি হাতকে সৃষ্টিশীল করে তুলি। আমরাও প্রস্তুত রয়েছি আপনাদের সহযোগী-বন্ধু হিসেবে। এ ক্ষুদ্র সেতুবন্ধনই হতে পারে জাতির জন্য এক অভাবনীয় ঘটনা,-যা বিশ্বদরবারে আমাদের বাংলাদেশের উচ্চতা আকাশসমান হতে পারে।
কিন্তু কবিরের কথাগুলোর ভেতরে আমি বারবার দেখতে পাই লুক ডয়েলকে, বাংলাদেশে স্বপ্ন চাষ করা এই বিদেশি বন্ধুটিকে। কথা শেষ করতে গিয়ে শেষ হলো না। কবির কথায় কথায় বললেন, সুযোগ পেলে লুক ডয়েলকে নিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে আপনাদের অফিসে আসতে পারি।
২৩ মে সকালে কবিরের ফোন। বিকেল সাড়ে চারটায় এসে হাজির লুক ডয়েল ও কবির উদ্দিন। এই সুযোগে আমার লেখাটির ছোটখাটো তথ্য সংশোধন করার পর আমরা কিছু চমৎকার স্নিগ্ধ সময় পার করি। উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী। গোটা কয়েক ছবিও তোলা হলো। অন্যত্র যাওয়ার তাড়া থাকায় অল্প সময় পরই বিদায় দিলাম লুক ডয়েল ও কবিরকে।
লুক ডয়েলকে শত শ্রদ্ধা। শত অভিনন্দন স্বপ্ন না দেখা তরুণ কবির উদ্দিনকে স্বপ্ন দেখানোর জন্য। অভিবাদন শত ঝরে পড়া শিশু-কিশোর-কিশোরীকে প্রেরণা জোগানোর জন্য। শুভেচ্ছা জানাই পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার কর্মে স্বপ্নচারী কবির উদ্দিনকেও।
কবিরের এই স্বপ্নের পথযাত্রা নিয়ে আগ্রহীরা যোগাযোগ করতে পারেন <caffebd@gmail.com> ই–মেইলে। এ ছাড়া <caffebd.org> ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন।
দ্য ক্যাফে আইটি স্কুলের ল্যাবে শিক্ষার্থীরা

চীনের বিআরআইএ লাভবান হবে বাংলাদেশ, তবে...

সঠিক পদক্ষেপ নিলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড কার্যক্রমের সুফল পেতে পারে বাংলাদেশ। তবে, প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশ যেন চীনা ঋণের ফাঁদে না পড়ে, সে বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। প্রকল্প বাছাই ও বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ, ঋণের শর্ত- এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন রয়েছে। রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড: তুলনামূলক অবস্থান থেকে বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সিপিডির চেয়ারম্যান  অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপত্বিতে বক্তব্য রাখেন শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক, সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, চীনে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান, চীনের ইউনান অ্যাকাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের অধ্যাপক চেং মিন, ভারতের রির্সাচ অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিসের মহাপরিচালক ড. শচীন চতুর্বেদী, সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ মঞ্জুর ইলাহী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। সেমিনারে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও নেপালের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
সেমিনারে বহুল আলোচিত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে’ বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে বক্তারা জানান, ২০১৩ সালে এই উদ্যোগের সূচনা করে চীন। এটি ৭২টি দেশকে সংযুক্ত করবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে চীনের এক্সিম ও ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশের অবকাঠামো প্রকল্পে ১৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এই প্রকল্পে চীন-বাংলাদেশ এক হয়ে কাজ করলে লাভবান হবে দুই দেশই। তবে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। ভুল পদক্ষেপে ফল হতে পারে নেতিবাচক। তাই বাংলাদেশকে সতর্ক পদক্ষেপের পরামর্শ অর্থনীতিবিদদের।
শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, বিআরআই উচ্চপর্যায়ের সহযোগিতার একটি প্লাটফর্ম। এটি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্লাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে লাভবান হবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, কোনো দেশ একা উন্নয়ন করতে পারে না। যেহেতু আমাদের দেশের অর্থনীতিতে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান তাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাংলাদেশ-চীন দুই দেশ যৌথভাবে পথচলার মধ্যদিয়ে ব্যাপক লাভবান হতে পারে। বিআরআই নিয়ে যখন চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা হবে, তখন উইন-উইন পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, চীন দেশের অবকাঠামো, জ্বালানি খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা লাগবে। বিআরআই এই সুযোগ নেয়ার ফোরাম হতে পারে।
সিপিডি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, চীন বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের নেতৃত্বে আছে। এর সঙ্গে অন্য দেশের সমন্বয় করে চলতে হবে। এটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির নতুন ব্যবস্থা। এটা যেন উপনিবেশবাদের মতো না হয়, এটা যেন অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হয়। এতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার সুযোগ আরো বাড়বে। তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বিআরআই প্রকল্পে যুক্ত হতে হলে চীনের অর্থনীতিটা বুঝে দর কষাকষি করতে হবে। কেননা যখন আমরা দর কষাকষি করব, তখন জাতীয় স্বার্থ সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। আর সে জন্য গবেষণা প্রয়োজন। চীনের অর্থনীতিতে ভবিষ্যতে কী হচ্ছে, তাদের থিং ট্যাঙ্ক কী ভাবছে, সেজন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এরসঙ্গে পার্টনারশিপে যুক্ত করতে হবে। কেননা বিআরআই নিয়ে চীনে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোডের অবকাঠামো নির্মাণে কোন দেশ কি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করবে তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি বলে মনে করেন সিপিডি’র চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, বিআরআই বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগ আরো বাড়বে। বিআরআইয়ের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা দরকার। তিনি বলেন, বিআরআইয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যদেশের সঙ্গে যেন দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক নষ্ট না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। প্রকল্পে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ যেন সমানভাবে উপকৃত হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিচার বিবেচনা ছাড়া প্রকল্প নিলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। একইসঙ্গে প্রকল্প হতে হবে বাংলাদেশের সক্ষমতা বিবেচনায়।
পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক বলেন, বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যে ইন্দো-প্যাসিফিক, ইউরো-এশিয়া ও বিআরআই উদ্যোগ আছে। আমরা সব উদ্যোগের সঙ্গে যাব। কোনো ক্ষতিকর কিছুর সঙ্গে থাকব না। যখন আমরা এসব নিয়ে দর কষাকষি করব, তখন জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেব।
সংলাপে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মঞ্জুর এলাহী বলেন, আমরা বাজার চাই, এটা সত্য। কিন্তু সবকিছু যাচাই বাছাই করে নেয়া উচিত।
মূল প্রবন্ধে ড. ফাহিমদা বলেন, বিআরআই-এর মাধ্যমে আমাদের যে প্রস্তাবগুলো দেয়া আছে আমরা তা নেব। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের শর্তগুলোর দিকে। দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে টেন্ডার থেকে শুরু করে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে, বিআরআই যে ঋণ দিচ্ছে সেই ঋণে সুদের হার যাতে কম হয়। আমরা কেন ৩ শতাংশ দেব? ঋণ যেন এক শতাংশের নিচে হয়। আমরা যাতে ঋণের ফাঁদে না পড়ি। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হতে হবে রাজনীতির বাইরে গিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা।

লজ্জার মুখোমুখি বাংলাদেশ by ইশতিয়াক পারভেজ

চট্টগ্রাম টেস্টের তৃতীয় দিন থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভক্তরা বৃষ্টির প্রার্থনা করছিল। স্থানীয় অনেক সমর্থকই বার বার চাইছিলেন যেন বৃষ্টিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ দুই দিন ভেসে যায়। বৃষ্টি এসেও ছিল, ম্যাচও বন্ধ হয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু বাংলাদেশ এখন লজ্জার হারের দ্বারপ্রান্তে। রাত থেকেই বৃষ্টির কারণে গতকাল ম্যাচ শুরু হতে বিলম্ব হয়। অবশেষে শুরু হলেও খেলা হয় ৭৮ ওভার। ব্যাট করতে নেমে আফগানদের  শেষ দুই ব্যাটসম্যান ফেরেন দ্রুত। ততক্ষণে অবশ্য বাংলাদেশের সামনে ৩৯৮ রানের কঠিন লক্ষ্য দাঁড় করে ফেলে রশিদ খানের দল। জবাব দিতে নেমে আরো একবার ব্যাটিং ব্যর্থতার চূড়ান্ত রূপ দেখিয়ে মাত্র ৪৪.২ ওভারে ১৩৬ রানে ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। জিততে হলে আরো ২৬২ রান প্রয়োজন, হাতে আছে মাত্র ৪ উইকেট। শেষ বিকালে বৃষ্টি না এলে হয়তো গতকাল চতুর্থ দিনেই হার নিশ্চিত হয়ে যেতো সাকিবদের। ক্রিজে অপরাজিত আছেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান ও সৌম্য সরকার। দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে ফলাফলের আগেই হার মেনে নিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সাকিব বলেন, ‘এখনো ২৭০ রানের মতো প্রয়োজন, হ্যাঁ ক্রিকেটে অসম্ভব বলে কিছু নেই। এজন্য আমাকে ও সৌম্যকে দুটি সেঞ্চুরি করতে হবে। অন্তত একজনের ১৫০ আরেক জনের ১২০ রান করতে হবে। অসম্ভব নয়! আরেকটা আছে, বৃষ্টি উপরে, ওটাও আমাদের বাঁচাতে পারে। বেশ কয়েকটা পথ আছে। এখন বাকিটা দেখা যাক।’
বাংলাদেশের বিপক্ষে নিজেদের ইতিহাসের তৃতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছে আফগানিস্তান। কিন্তু  সেই নবীন দলের বিপক্ষে দাঁড়াতেই পারেনি টাইগাররা। মুশফিকুর রহীম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের আফগান স্পিনের বিপক্ষে কাঁপতে দেখা গেছে। প্রথম ইনিংসে ২০৫ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে দেড়শ ছোঁয়ার আগেই নেই ৬ উইকেট। এদিনও ব্যর্থ দলের ব্যাটিং লাইনআপ। কেন আফগানদের বিপক্ষে এমন অসহায় আত্মসমর্পণ? এ নিয়ে সাকিব বলেন, ‘টেকনিক্যালি সমস্যাও বলতে পারে, আবার প্রয়োগের ক্ষেত্রে। যেহেতু রিস্ট স্পিনার খেলি না। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মানিয়ে নেয়ার বিষয় থাকে। যদিও আমরা পরিকল্পনা করেছি, আমাদের যারা নেটে বোলার আছে এরকম, ওদের এনে আমরা অনুশীলন করেছি। যতক্ষণ না আপনি ম্যাচ খেলছেন বা সাকসেসফুল হচ্ছেন, কাজে আসবে না। আমি বলবো না কারও অ্যাপ্রোচে সমস্যা ছিল। আমি বলব এক্সিকিউশনে অনেক প্রবলেম। আর বড় মন নিয়ে খেলার একটা সমস্যা। লিটনের কথাই ধরেন যখন টি-টেয়েন্টিতে খেলে তখন রিভার্স সুইপ কেন, যত শটই খেলে ওর লাগে। কিন্তু টেস্ট ম্যাচে ও এটা করতে পারেনি। কোচও এই কথাই বলেছে যে আমরা যেন মন খুলে খেলি। আমার কাছে মনে হয়েছে আমরা অনেক ভয় নিয়ে খেলি, অনেক প্রেশার নিয়ে খেলি। এত বেশি প্রেশার নিয়ে ফেলি নিজেদের ওপরে পারফরম করা আমাদের জন্য কষ্টকর হয়।’
গতকাল আফগানদের চারশ ছোঁয়া লক্ষ্য তাড়া করতে ঝুঁকি নিতে হতো। সে কারণেই ওপেনিংয়ে সাদমানের সঙ্গে লিটনকে নামানো হয়েছিল। প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ সাদমান ৪১ রান করে অনেকটা সময় একাই লড়াই করেন। লিটন মাত্র ৯ রান করেন। এরপর মুমিনুলের পরিবর্তে মোসাদ্দেককে নামানো হয়। কিন্তু এদিন তিনিও ব্যর্থ। এ নিয়ে সাকিব বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে ফার্স্ট ইনিংসে আমরা যতজন ব্যাটিং করেছি সবচেয়ে বেশি কমফোর্টেবল ওকে মনে হয়েছে, স্পিন বোলিংয়ের বিপক্ষে। আমরা যেহেতু স্পিন বেশি ফেস করছিলাম, কাল রাত থেকেই প্ল্যান করা হচ্ছিল যে ও ওপরের দিকে ব্যাট করলে, ফার্স্ট ইনিংসে যেভাবে ব্যাট করেছে ওভাবে করতে পারলে, বড় ইনিংস খেলারও অভিজ্ঞতা আছে কারণ ফার্স্ট ক্লাসে বোধ হয় চারটা কি পাঁচটা ডাবল সেঞ্চুরি করেছে সে। আমাদের চারশ চেজ করতে হলে এরকম কিছু প্লেয়ার দরকার হতো যাদের বড় ইনিংস খেলার অভ্যাস আছে বা খেলে অভ্যস্ত। সেকারণেই ওকে খেলানো।’
তবে যতই পরিকল্পনা করুক না কেন সবই বিফলে গিয়েছে বাংলাদেশ দলের। একেবারে উইকেট নিয়ে চিন্তা থেকে শুরু করে একাদশ সাজানো পর্যন্ত। যে কারণে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বলেছেন সব পরিকল্পনাই ভুল ছিল। এ বিষয়ে সাকিব বলেন, ‘পরিকল্পনা ঠিকমতো যদি বাস্তবায়ন হতো তাহলে এরকম হতো না। যেহেতু পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয়নি, তাই এরকম হয়েছে। তখন এটাই বলা স্বাভাবিক যে পরিকল্পনায় ভুল ছিল।’ শুধু তাই নয় দিন শেষে সংবাদ সম্মেলসে এসে অকপটে জানিয়ে দেন কতটা চাপে আছেন তিনি। তবে তারচেয়ে বেশি চাপে দলের ক্রিকেটাররা। সে কারণে অধিনায়কের মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রশ্নের। সাকিব বলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই, যে ধরনের ম্যাচ আমরা আশা করছিলাম তার পুরো বিপরীত। স্বাভবিকভাবে চাপ তো থাকবেই। টিম মেটদের ওপর থেকে চাপ কমানোর একটা ওয়ে (সাংবাদ সম্মেলনে আসা), এটা বলতে পারেন। কিন্তু মাঠের চাপ থাকবেই, যতদিন ক্রিকেট খেলবো ততদিনই থাকবে। এটা মেনে নিতে হবে। এটা নিয়ে বেশি একটা চিন্তা করার কিছু নেই।’

ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়ার আলোচনার নেপথ্যে

শুরু থেকেই বিতর্ক পিছু ছাড়ছিল না ছাত্রলীগের নতুন কমিটির। পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পরপরই আন্দোলনে নামেন একাংশ। কমিটিতে বিতর্কিতদের স্থান দেয়া হয়েছে এমন দাবিতে টানা বিক্ষোভ-কর্মসূচি পালন করেন তারা। পরে অবশ্য বিতর্কিতদের কমিটি থেকে বাদ দেয়ার ঘোষণা আসে। তবে এ সিদ্ধান্ত আদৌ কার্যকর হয়নি। আগের বিতর্কের যবনিকা হতে না হতেই পুরো কমিটি বিলুপ্তির খবর আসে গণমাধ্যমে। নতুন কমিটির নেতাদের বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে শনিবার আলোচনা হয় আওয়ামী লীগের  স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এ বোর্ডের প্রধান। বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্রের খবর, আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি ওই কমিটি ভেঙে দেয়ার বিষয়েও আলোচনা করেন। কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এমন খবরও আসে গণমাধ্যমে। যদিও গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ওই বৈঠকে ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা হলেও কমিটি ভেঙে দেয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে কেন কমিটি ভেঙে দেয়ার আলোচনা এমন প্রশ্ন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মুখে মুখে। তারা বলছেন, বর্তমান কমিটির নেতাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড খোদ দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা অবহিত। যে প্রত্যাশা নিয়ে তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তা তারা পূরণ করতে পারেননি। বরং ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয়ে তারা বেশি আগ্রহী। সর্বশেষ ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের সিলেট সফর নিয়ে নয়া বিতর্ক দেখা দেয়। সফর শেষে ঢাকা ফেরার পথে তাকে বিদায় জানাতে স্থানীয় নেতাকর্মীরা নজিরবিহীনভাবে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টারমাকে প্রবেশ করেন। তাদের কেউ কেউ বিমানের সিঁড়ি পর্যন্ত চলে যান। এ খবর গণমাধ্যমে আসার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও অনেকে ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, দলের সর্বোচ্চ নেতাদের জন্য এভাবে নিয়ম ভেঙে কোন সংবর্ধনা দেয়া হয় না। ছাত্রলীগ সভাপতি হিসেবে তিনি এ সংবর্ধনা কিভাবে নিলেন? এমন নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে নেতাদের বিরুদ্ধে।
ওদিকে শনিবারের বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে ছাত্রলীগের প্রসঙ্গ তোলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেই। গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য সূত্রে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। বিশেষ করে তারা দুপুরের আগে ঘুম থেকে ওঠে না। এ সময় মনোনয়ন বোর্ডের অন্যান্য সদস্যও আলোচনায় অংশ নেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা, অন্য একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির এমন পরিস্থিতিতে পড়ার ঘটনা উঠে আসে আলোচনায়। এছাড়া নেতাকর্মীদের সঙ্গে নেতাদের যোগাযোগ না থাকা এবং বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ও নেতারা তুলে ধরেন। আলোচনার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী কমিটি ভেঙে দেয়ার কথা বলেন। ছাত্রলীগ নিয়ে নেতাদের এমন আলোচনার সময় সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গণভবনেই অবস্থান করছিলেন বলে একটি সূত্রের দাবি। তাদের নিয়ে এমন নেতিবাচক আলোচনা হওয়ায় সিনিয়র নেতাদের পরামর্শে তারা গণভবন ত্যাগ করেন।
কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি-কাদের: ওদিকে ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার কোন সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, কথা প্রসঙ্গে হয়তো কথা আসে। এটা নিয়ে সিদ্ধান্ত আকারে কোনো কথা হয়নি। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে সেটার ফোরাম ওটা (বৈঠক) ছিল না। ওখানে ইনসাইডে আমরা অনেক কথাই বলতে পারি, অনেক আলোচনাই করতে পারি। গতকাল সচিবালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারকে সৌজন্য সাক্ষাৎ দেয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের বলেন, শনিবার আমাদের যে মিটিং ছিল, এটা পার্লামেন্টারি বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভা। রংপুরের বাই ইলেকশন, ২টি ইউনিয়ন পরিষদ, তিনটি পৌরসভা, সাতটি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হচ্ছে অক্টোবরে মাসে। এজন্যই আমরা বসেছিলাম। মনোনয়নে বোর্ডের মিটিংয়ে ছাত্রলীগের কমিটি ভেঙে দেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে কোনো কোনো প্রসঙ্গে ক্ষোভের প্রকাশও হতে পারে বা কারও কারও রিঅ্যাকশনও আসতে পারে। কিন্তু অ্যাজ এ জেনারেল সেক্রেটারি অব দ্য পার্টি আমার এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা এ মুহূর্তে ঠিক হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না এটা ইমপ্লিমেন্টশন প্রসেসে যায়। এখানে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে পারে, প্রতিক্রিয়া হতে পারে কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত আকারে কিছু হয়নি। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ কিনা এমন প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের বলেন, কিছু কিছু ব্যাপারে তো থাকতেই পারে। যেমন- আমাদের ইলেকশনে যারা বিদ্রোহী ছিল, আমাদের মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে, নেতাদের মধ্যে- এসব ব্যাপারে তো ক্ষোভ প্রকাশ হয়। কাজেই ছাত্রলীগেরও বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত কিছু কিছু ব্যাপার আছে, সেগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কনসার্ন থাকতেই পারেন, এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে কোনো স্পেসিফিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে আমি জানি না, কারণ ওই ফোরামে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার বিষয় আসেনি।
তিনি বলেন, আমার মনে হয় এ ধরনের কিছু হলে আপনারা তো দেখবেনই। এ ধরনের কিছু হতে গেলে তো এটা পাবলিক স্টেটমেন্ট। ডিসিশনটা জানা যাবে, এটা তো ওপেন সিক্রেট হয়ে যাবে, তখন সিক্রেট থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী মিটিংয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে একথা বলেছেন কিনা জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, যতক্ষণ এটা সিদ্ধান্ত আকারে না আসছে ততক্ষণ পর্যন্ত এর সত্যতা আমি স্বীকার করব না। ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যেগুলো সন্তোষ প্রকাশ করার মতো সেগুলোতে সন্তোষ প্রকাশ করি, আর যেগুলো লোকে পছন্দ করে না সেগুলো আমিও পছন্দ করব না। এটা খুবই স্বাভাবিক এবং সে ব্যাপারে আমি তাদেরকে সতর্ক হতে বলি, সাবধান হতে বলি, তাদেরকে সুনামের ধারায় ফিরে আসতে বলি। তাদেরকে ভালো খবরের শিরোনাম হতে বলি- এটা আমি অহরহ বলে যাচ্ছি।
উল্লেখ্য, গত ১৩ই মে সম্মেলনের এক বছরের মাথায় ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্য পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকেই কমিটি নিয়ে নানা সমালোচনা চলছিল। এর আগে ২০১৮ সালের ১২ ও ১৩ই মে সম্মেলনে কমিটি করতে ব্যর্থ হয় ছাত্রলীগ। পরে একই বছরের ৩১শে জুলাই সম্মেলনের দুই মাস পর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম আওয়ামী লীগ সভাপতি চূড়ান্ত করার পর তা ঘোষণা করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

বেসরকারি হাসপাতাল: চিকিৎসা সেবা নিয়ে একজন ভুক্তভোগী - 'শিশুটি মারা যাওয়ার পর চিকিৎসক পা ধরে মাফ চাইতে আসছিলো' by শাহনাজ পারভীন

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অনেক অভিযোগ
শাহান তৌফিক পৃথিবীর বুকে বেঁচে ছিল এক মাস ১৯ দিন। নির্ধারিত সময়ের ৮ সপ্তাহ আগে জন্ম।
জন্মের পর রাখা হয়েছিল ইনকিউবেটরে। এরপর সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছিল শিশুটি।
কিন্তু হঠাৎ জানা গেলো ইনকিউবেটরে থাকা প্রিম্যাচিওর শিশুদের চোখে সমস্যা হতে পারে, এমনকি অন্ধত্বের ঝুঁকিও রয়েছে।
তখন তার চোখে লেজার দিয়ে একধরনের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিলো। তৃতীয় দফায় সেই চিকিৎসা নিতে গিয়েই চিকিৎসকের ভুলে মারা গেল শিশুটি।
তার বাবা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম বলছিলেন, "ওকে যখন লেজার করতে যায় ও বমি করে ফেলে। এক হাতে ওকে চেপে ধরে রাখে আর আরেক হাতে লেজার করে।"
"ও চিৎকার করছিলো আর বমি করছিলো। ওই বমি শ্বাসনালীতে আটকে যায়। বমি করা অবস্থায় তাকে লেজার করছিলো। চিন্তা করুন কী কষ্ট পেয়ে আমার বাচ্চাটা মারা গেছে।"
তিনি বলছিলেন, "সেখানে চিকিৎসকদের কোন ধরনের প্রস্তুতি ছিল না। কোন বাচ্চাকে লেজার করতে চাইলে পিডিয়াট্রিক চিকিৎসকের উপস্থিতি লাগে।"
"সাকশান মেশিন থাকতে হয়, ইনকিউবেটর থাকতে হয়। ওকে যখন থার্ড টাইম ফলো আপে লেজার করছিলো তখন সাপোর্টিং কিছু ছিল না।"
অন্য আরেকটি ঘটনার কথা বিবিসিকে বলছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম যিনি তার ছোট শিশুকে হারিয়েছেন।
তিনি বলছিলেন, অবহেলার জন্য দায়ী চিকিৎসক তার সহকর্মীদের নিয়ে শিশুটির জানাজার দিন তার গ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিলেন মামলা ঠেকাতে।
তিনি তার ভুলের কথা স্বীকারও করেছিলেন। পরবর্তীতে ডাক্তারি রিপোর্টেও বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে।
মোহাম্মদ তৌফিকুল ইসলাম কোন ক্ষতিপূরণও নিতে চাননি।
মি. ইসলাম বলছিলেন, "হাসপাতালে ওকে মৃত ঘোষণা করার পর আমি আমার স্ত্রী, ভাইবোনসহ যখন বসে কান্নাকাটি করছিলাম তখন সে (চিকিৎসক) আমার পা ধরে মাফ চাইতে আসছিলো।"
"সে আমাকে বলেছিল আমি সরি। তখন আমি তাকে বলেছিলাম সরি ফর হোয়াট?"

অবহেলা, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ

বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো সম্পর্কে বাংলাদেশে রোগীদের অভিযোগের সীমা নেই।
বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী মোহাম্মদ হোসেন খান মাস দুয়েক আগে একটি অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। নাভিতে ইনফেকশন হয়েছিলো।
হাসপাতালে ইনকিউবেটরে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে এক সদ্যজাত শিশুকে।
খুব ব্যথা নিয়ে যখন চিকিৎসার জন্য ছুটোছুটি করছেন তখন তাকে তিনজন চিকিৎসক তিন ধরনের খরচের কথা বলেছেন। কিছুটা ভয় থেকেই এদের মধ্যে সবচাইতে নামি চিকিৎসককেই বেছে নিয়েছিলেন মোহাম্মদ হোসেন।
তিনি বলছেন, "তিনজনের মধ্যে ধানমন্ডির যে ক্লিনিকে গেলাম ওরা পঞ্চাশ হাজার টাকা চাইলো। অন্য একটা ক্লিনিকে এর অর্ধেক চেয়েছিল।"
"আমি ধানমন্ডিতেই গিয়েছিলাম কারণ ওরা বলল তাদের সার্জন এ ক্যাটাগরির। অপারেশনের ২০ দিন পর আমার ওই যায়গায় আবার পেইন শুরু হয়।"
"পরে দুইবার ডাক্তারের কাছে যাবার পরে ডাক্তার দেখেন যে আমার ওখানে একটা সুতা রয়ে গেছে। যেখানে আমার ১৫ দিনের মধ্যে সুস্থ হওয়ার কথা সেখানে দেড় মাস সময় লেগেছে। এই কারণে আমার ব্যক্তিগত ও প্রফেশনাল জীবনে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। "
তারমানে বেশি টাকাও দিলেন কিন্তু ভোগান্তিও বেশি হল।

জরুরী চিকিৎসায় অনীহা

সরকারি তথ্যমতে বাংলাদেশে রেজিস্টার্ড বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি। আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা দশ হাজার ছয়শোর মতো।
এসব প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসা, অবহেলা, সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা ছাড়াও প্রচুর অর্থ নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা বা অবহেলার অভিযোগের যথাযথ প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই বাংলাদেশে।
বিভিন্ন সেবার জন্য নির্ধারিত ও সমন্বিত কোন মূল্য তালিকা নেই। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে ইমার্জেন্সি বলে সাইনবোর্ড টাঙানো থাকলেও সেখানে আসলে জরুরী চিকিৎসা মেলে না।
রোগীদের জরুরী সেবা দিতে অস্বীকৃতির কারণে রোগীর মৃত্যুর উদাহরণ বাংলাদেশে প্রচুর রয়েছে, বিশেষ করে দুর্ঘটনা, নির্যাতন ও আত্মহত্যার ঘটনার ক্ষেত্রে। বিষয়টি নিয়ে ক্যাম্পেইন করছেন বাংলাদেশ সোসাইটি ফর ইমারজেন্সি মেডিসিন নামে একটি সংস্থার মহাসচিব ডা. রাঘীব মানজুর।
তিনি বলছেন, "আমার মনে হয় ইমার্জেন্সি বিভাগ রাখার ব্যাপারে তাদের মধ্যে একটা ভীতি কাজ করে। ভীতিটা এই যে তাদের দক্ষতার অভাব।"
"যেহেতু বাংলাদেশে ইমার্জেন্সি চিকিৎসা নিয়ে পোষ্ট গ্রাজুয়েশন নাই তাই এটা নিয়ে চর্চা হচ্ছে না। বিভিন্ন হাসপাতালে ইমার্জেন্সিগুলোতে যাদের থাকার কথা সেখানে ভ্যাকান্সি আছে।"
তিনি বলছিলেন, দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত কেউ বা অন্য কিছু ক্ষেত্রে রোগী ভর্তি না করে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেয়ার প্রবণতার পেছনে কারণ হল আরেক ধরনের ভয়।
তার মতে, "ইমার্জেন্সিতে একটা ট্রমার পেশেন্ট নিলে সেনিয়ে পরে যখন কোন মামলা হবে তখন মামলায় সাক্ষী দেবার জন্য বারবার কোর্টে দৌড়াতে হবে কিনা সেটা তাদের মধ্যে কাজ করে।"

মুনাফা বনাম সেবা

তবে আরেকটি বিষয় তিনি উল্লেখ করলেন। তা হল মুনাফা।
তার মতে, "ইমার্জেন্সি চিকিৎসা কোন লাভজনক জায়গা না। এখানে হয়ত প্রফিট হয় না। এটা সম্ভবত আরেকটা কারণ।"
সরকারি হিসেবে বাংলাদেশে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ বছরে বেসরকারি খাত থেকে স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে থাকেন। সেবার বদলে মুনাফার দিকেই যেন তাদের নজর বেশি।
অল্প খরচে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া গেলেও তার সংখ্যা অনেক কম। তাই যেতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতাল।
দরিদ্রদের জন্য সরকারি হাসপাতালই প্রধান ভরসা
তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকস ওনার্স এসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. মইনুল আহসান বলেন, " সবাই টাকা আর্ন করতে চায়। তারা এটাকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালে একেকরকম চার্জ।"
"বড় বড় নামকরা হাসপাতাল বাদ দিলেও অন্যান্যগুলোতেও চার্জ অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা ডাক্তার হয়েছি মানুষের সেবা করা জন্য। কোন সন্দেহ নেই, সেটি খুবই কঠিন কাজ।"
তবে তিনি বলছেন, আশপাশের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডাক্তারদের ফি এখনো অনেক কম। সেক্ষেত্রে তিনি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করেছেন।
বাংলাদেশ বেসরকারি হাসপাতালগুলো এখনো চলছে ১৯৮২ সালে করা একটি অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী। সেই আইনে নির্দিষ্ট মূল্য তালিকা বা জরুরী বিভাগ করার বিষয়টি বাধ্যতামূলক নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলছেন, নতুন আইনসহ বেশ কিছু পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলছেন, "এসব ক্ষেত্রে আগের মতো অব্যবস্থা আর সহ্য করা হবে না। আমরা পরিদর্শন ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করছি, একটা স্ট্যান্ডার্ড প্রাইসিং ঠিক করবো যাতে করে তার থেকে বেশি কেউ না নেন।"
তিনি হাসপাতালগুলোর নিজেদের মধ্যেও পরিদর্শন ও তদারকি বাড়ানোর কথা বলছেন। এছাড়া চিকিৎসা প্রদানকারী ও সেবাগ্রহীতার জন্য একটি সুরক্ষা আইনের খসড়া তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বেশিরভাগ বেসরকারি হাসপাতাল জরুরী চিকিৎসা দিতে অনীহা দেখায়।

অমিতাভ ঘোষের বই ‘গান আইল্যান্ড’: ভেনিসে বাঙালি বণিক by বৈষ্ণ রায়

জ্ঞানপীঠ চলতি বছর অমিতাভ ঘোষকে আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা গল্পকথক হিসেবে সম্মানিত করেছে। তিনি দারুণ কিছু সৃষ্টি করেছেন, প্রতিটিই তার ভাষাগত দক্ষতা, তার ঐতিহাসিক গবেষণার গভীরতা ও তার উপন্যাসক চরিত্রের বিপুল বিস্তারের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে।
তার বইগুলো কিছু গল্প ও কিছু চরিত্রের অনুসন্ধানই নয়, বরং একটি যুগ, একটি ধারা, একটি একক সত্তার পরিস্ফূটন। দি গ্লাস প্যালেসের (২০০০) মতো বইগুলো মোটেই ফিকশন নয়, বরং সেইসাথে চমৎকার ইতিহাসও।
তারপর দি গ্রেট ডেরেঞ্জমেন্ট (২০১৬) প্রকাশিত হয়েছে। এটি নন-ফিকশন গ্রন্থ। এতে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ও এর প্রতি আমাদের চোখ বুঝে থাকার বিষয়টিই তুলে ধরেছেন। তার সৃষ্টিশীল সফরের একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবেই আমরা একে চিহ্নিত করতে পারি। তার গ্রন্থে প্রকৃতি, বন্যা, ঝড় বারবার আসে, সম্ভবত তার অবচেতন মনের তাড়নায়। শিল্প ও উপন্যাসে জলবায়ু পরিবর্তনকে অগ্রাহ্য করা হয় কেন, তিনি সে দিকেও প্রশ্ন সৃষ্টি করেছেন এই বইটির মাধ্যমে।
এই অগ্রাহ্য অবস্থা সংশোধন করতেই ‘গান আইল্যান্ড’ তার দারুণ সব চরিত্র নিয়ে সুন্দরবন থেকে ভেনিস যাত্রা করে, অতীত ও বর্তমানকে সামনে নিয়ে আসে, বিশ্ব যে নজিরবিহীন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আমরা যে সমাপ্তির দিকে যাত্রাকে বুঝতে পারছি না, সে দিকে নজর দিয়েছেন।
স্থির দর্শন
বর্ণনাকারী দীন ব্রুকলিনভিত্তিক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের ব্যবসায়ী। তিনি কলকাতা সফর করেন বন্দুকি সওদাগরের (দি গান মার্চেন্ট) একটি আশ্চর্য কাহিনী শুনে। তার লক্ষ্য সুন্দরবন যাওয়া। সেখানে এক প্রাচীন ইটের আখড়ায় এখনো বন্দুকি সওদাগরের সাথে সর্পদেবী মনসার দ্বন্দ্বযুদ্ধের কিংবদন্তির ছাপ রয়েছে। তরুণ টিপুকে চন্দ্র গোখড়ার দংশনের কাহিনী এতে প্রকাশিত হয়েছে। টিপু বেঁচে যান তিনিই প্রাচীন বিশ্বের সাথে আধুনিক দুনিয়ার, পাশ্চাত্যের সাথে প্রাচ্যকে, মানুষকে অমানবীয় সত্ত্বার সাথে সংযোগ সাধন করিয়ে দেন।
বর্তমানে যে পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, সেটাকে সম্ভবত সংশোধন করা যাবে না। ঘোষও সচেতনভাবে তা জানেন। এ ধরনের অনিবার্যতার মুখে ঘোষ দৃশ্যত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কুইকজোটের তাগিদে নিজেকে বায়ুকলে নিক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেন। গান আইল্যান্ডের উপজীব্য আসলে সবকিছুই। এখানে জাদু, কল্পকথা, ইতিহাস, বিজ্ঞান, প্রাণিবিদ্যা, পরিবেশবিদ্যা সবকিছুই আছে। এটা জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক, তবে আকস্মিকভাবে এটি অভিবাসন আর মানবপাচারের বিষয়ও।
ফিকশন ঈর্ষাকাতর প্রণয়পাত্রীর মতো, লেখকের বিশ্বস্ততা দাবি করে। যখনই সে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গন্ধ পায়, এখানে তা হলো ‘কারণ’, তখনই সে ওঠে চলে যায়। একটি পরিবেশবাদী উপন্যাস লেখার প্রতি তিনি নিজেকে এতই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করেছিলেন যে ঘোষ তার প্রণয়পাত্রীর অপছন্দের শিকার হয়ে পড়েন। প্রতিটি বাঁকেই তার থিমই প্রাধান্য পায়, তার গল্পকাহিনীকেও তা ছাপিয়ে যায়। চরিত্রগুলো যদি কেবল তথ্য প্রদানের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তবে সেগুলো আর ফুটে ওঠে না। বর্ণনাকারী দীন নিস্তেজ হয়ে পড়েন। একবার তিনি একেবারে নির্ভুলভাবে বলেন, তাকে যেভাবে তার ইতালিয়ান বন্ধু চিন্তা করে, যেভাবে দেখে, তিনি তা জানেন না। প্রিয়া দি হাঙ্গরি টাইড থেকে এই বইটি ফেরত দেন, কিন্তু বইটি তেমন আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পারে না।
ছকবাঁধা পথ
জীবন ও ঘটনাপ্রবাহ অনিবার্য পথে আগায় না। তবে তারা সামনে বাড়তে থাকে, একটি জায়গার দিকে যেতে থাকে। সন্ধ্যায় হাঁটাহাঁটির সময় চিন্তা ও দীন শিপওয়ার্মের সাক্ষাত পান। সাগরের পানির উষ্ণতা বাড়ার কারণেই এই প্রাণিটির ব্যাপকতা বাড়ছে। প্রাণিটি এখন ভেনিসের কাঠের পাইলিং খেয়ে ফেলছে। বিচে হাঁটার সময় মৃত একটি হলুদ বুকের সামুদ্রিক সাপের উপস্থিতি অস্বাভাবিক ঠেকে। কেউ হয়তো ভাবতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি উপন্যাসে এমনটি ঘটা অনিবার্য। ভালো যুক্তি, কিন্তু এগুলো হাজির হয় আগেভাগে তৈরী রাখা ব্যবস্থা হিসেবে। রচনাকারী শেষ কী কী সামনে নিয়ে আসবেন, সবই যেন আগেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন।
দি গ্রেট ডেরেঞ্জমেন্টে ঘোষ মনে করেছিলেন, টর্নেডো হবে যথার্থ বিষয়। আবার বাস্তবতার বদলে আরব্য রজনীর মতো প্রাক-আধুনিক বর্ণনাগুলো বসাবেন কিনা তাও ভেবেছেন।
গান আইল্যান্ডে ঘোষকে উভয় সঙ্কটের সাথে লড়তে হয়েছে। জাদু লড়াই করছে বাস্তব দুনিয়ার সাথে এবং বাস্তবতাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে। তিনি পরাবস্তবতার দিকে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নিজেকে তা থেকে বিরতই রেখেছেন।
তবে তিনি তার গল্পকে রহস্যময় সুন্দরবনের কাদা আর সবুজ পানিতে নিয়ে গেছেন। টিপু আর রাফির মিলন স্বাভাবিক ও গতিশীল। প্রাচীন কিংবদন্তিকে রহস্যজনক আধুনিক প্রকাশে অপার্থিব কিছুর সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেয়। ঘোষ পারতেন মনসা দেবীকেই তার পথ দেখানোর সুযোগ করে দিতে।
আমরা বর্তমানে সুনামি, টর্নোডো, গলতে থাকা বরফ, মৃত পাখির মতো আমাদের বোধশক্তির বাইরে থাকা অনেক কিছুর মুখোমুখি হওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছি। আর শিল্পকলা যেভাবে যুদ্ধ বা সন্ত্রাসের মোকাবিলা করেছে, সেভাবেই সাড়া দেয়ার পথ খুঁজে নিতে হবে। এই সফরে ঘোষ পরীক্ষামূলক প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তবে তার আসলে প্রয়োজন তার কৃতিত্বকে উদ্ভাসিত করার জন্য ঘষামাজা করা।

ঢাকায় সক্রিয় ৫০ কিশোর গ্যাং by শুভ্র দেব

ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে ঢাকায় কিশোর গ্যাং। প্রতিটি এলাকা ভিত্তিক গড়ে উঠছে আলাদা আলাদা কিশোর গ্যাং। কোনো কোনো এলাকায় একাধিক গ্রুপ গড়ে উঠেছে। এসব গ্যাং ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তারে মারামারি, খুনখারাবি, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন, ইভটিজিং সবই করছে। নিজেদের অবস্থান জানান দিতে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা স্ট্যাটাস দেয়। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমুতে তারা একে অপরের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে। বিপক্ষ গ্রুপকে প্রতিহত করার জন্য প্রকাশ্য হুমকি-ধমকি দেয়া তাদের নিত্যদিনের কাজ। বুধবার কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারে মহসিন নামের ১৪ বছরের এক কিশোরের প্রাণহানি ঘটেছে।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে শতাধিক কিশোর গ্যাং গড়ে উঠলেও সক্রিয় আছে ৫০টি। এসব গ্যাংয়ে অন্তত কয়েক হাজার কিশোর জড়িত। এদের মধ্যে অনেকেই স্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেনি। অথচ তারা ভয়ঙ্কর সব অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানে গত এক মাসে অন্তত অর্ধশতাধিক কিশোরকে আটক করে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশেরে উত্তর বিভাগে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং। ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে রয়েছে, পাওয়ার বয়েজ, ডিসকো বয়েজ, বিগ বস, নাইন স্টার ও নাইন এমএম বয়েজ, এনএনএস, এফএইচবি, জিইউ, ক্যাকরা, ডিএইচবি, ব্ল্যাক রোজ, রনো, কেনাইন, ফিফটিন গ্যাং, ডিসকো বয়েজ, পোটলা বাবু, সুজন ফাইটার, আলতাফ জিরো, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, তুফান, থ্রি গোল গ্যাং। কিশোর গ্যাং দ্বন্দ্বে উত্তরা এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা অতিষ্ঠ হয়ে গেছেন। ডিএমপির উত্তর বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার মো. কামরুজ্জামান সরদার বলেন, সাইবার ক্রাইম থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অফিসাররা সাইবার প্রেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংদের গতিবিধি নজরদারি করে। কোন কোন মোড়ে তারা আড্ডা দেয়, কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়াচ্ছে কিনা। এছাড়া এলাকাভিত্তিক সন্দেহভাজন কিশোরদের ডেকে এনে কাউন্সিল করে ছেড়ে দেয়। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের ডেকে এনে তাদের জিম্মায় দেই। আর যদি কোনো অপরাধের সঙ্গে কাউকে সম্পৃক্ত পাওয়া যায়। তবে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হয়।

এছাড়া তেজগাঁওয়ে মাঈনুদ্দিন গ্রুপ, মিরপুর-১১তে বিহারি রাসেল গ্যাং, মিরপুর ১২ তে বিচ্চু বাহিনী, পিচ্চি বাবু ও সাইফুলের গ্যাং, সি ব্লকে সাব্বির গ্যাং, ডি ব্লকে বাবু রাজন গ্যাং, চ ব্লকে রিপন গ্যাং,ধ ব্লকে মোবারক গ্যাং। কাফরুলের ইব্রাহিমপুরে নয়ন গ্যাং, তুরাগে তালাচাবি গ্যাং, ধানমণ্ডিতে রয়েছে, নাইন এম এম, একে ৪৭ ও ফাইভ স্টার গ্রুপ, রায়ের বাজারে স্টার বন্ড গ্রুপও মোল্লা রাব্বি গ্রুপ, মোহাম্মদপুরে গ্রুপ টোয়েন্টিফাইভ, লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল-চিনে ল, কোপায়ইয়া দে গ্রুপ, দক্ষিণখানে শাহীন-রিপন গ্যাং, উত্তরখানের বড়বাগে নাজিম উদ্দিন গ্যাং, আটি পাড়ার শান্ত গ্যাং, মেহেদী গ্যাং, খ্রিস্টান পাড়ার সোলেমান গ্যাং, ট্র্যান্সমিটার মোড়ের রাসেল ও উজ্বল গ্যাং, হাজারীবাগে বাংলা ও গেণ্ডারিয়ায় লাভলেট, বংশালে জুম্মন গ্যাং, মুগদায় চান-জাদু, ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভাণ্ডারি গ্যাং, চকবাজারে টিকটক গ্যাং, পোঁটলা সিফাত গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।

র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, ২৪ আগস্ট রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে স্টার বন্ড গ্রুপের ১৭ সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব। পরে তাদেরকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। এক্‌ দিন পুরাণ ঢাকার বংশালে জুম্মন গ্রুপের প্রধান জুম্মনসহ ৫ জন কিশোরকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ২৫ আগস্ট মুগদার মাণ্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চান-জাদু গ্রুপে, ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভাণ্ডারি গ্রুপের ২৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১০ আগস্ট মিরপুর -১ নম্বর থেকে কিশোর গ্যাংয়ের ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ৭ আগস্ট রাতে কাওরান বাজার, ফার্মগেট, কলেজগেট, শিশুমেলা, শ্যামলী ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-২। তাদের মধ্যে ১১ জনকে রায়েরবাজারে ছিনতাই করার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২৮ জুলাই মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে লাড়া দে ও লেভেল হাই গ্রুপের ২ সদস্যকে আটক করে র‌্যাব। ১৫ জুলাই রাতে তুরাগের বাউনিয়া থেকে নিউ নাইন স্টারের ১১ সদস্যকে আটক করে র‌্যাব-১।

র‌্যাব-২ কোম্পানি কমান্ডার ও পুলিশ সুপার মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বেশ কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে। তারা এলাকায় ছিনতাই, চুরিসহ নানা অপরাধ করে বেড়ায়। রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবি স্মৃতি সৌধ এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের কারণে দর্শনার্থীরা আসতে পারে না। তারা দর্শনার্থীদের সঙ্গে অপ্রীতিকর আচরণ করে। মারামারি করা তাদের নিয়মিত কাজ। আমরা ইতিমধ্যে অনেক কিশোরকে আটক করেছি। বাকি যারা আছে তাদের নজরদারিতে রেখেছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, গ্যাং কালচারের সঙ্গে বাঙ্গালীদের কোনো সম্পর্ক নাই। এটি একটি ইউরোপীয় কালচার। কিন্তু প্রযুক্তির কারণে সেটা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। টেলিভিশনের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে কিশোর কিশোরীরা। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কোন ধরণের প্রোগ্রাম দেখাতে পারবে এসব ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। তিনি বলেন, কয়েক দশক আগেও যেমন মা-বাবা তাদের সন্তানদের সঙ্গ দিতেন, সময় ও পরিস্থিতির কারণে এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। কেউ কেউ তার সন্তানদের ডে-কেয়ার অথবা গৃহপরিচারিকার কাছে রেখে কাজে যাচ্ছেন। যার কারণে সন্তানের সুস্থ সামাজিকরণ হচ্ছে না। সঠিকভাবে সামাজিক আদব কায়দা, শিষ্টাচার শিখছে না। এর বাইরে আমাদের সমাজে পারিবারিক ভাঙ্গন, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এসব কারণে শিশুদের ওপর একটা মনস্তাত্তিক প্রভাব পড়ে। তারা এক সময় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। সঙ্গ খোঁজতে গিয়ে অনেক সময় খারাপ সঙ্গীর সঙ্গে মিশে যায়। এছাড়া শিক্ষার্থীরা স্কুল কলেজ থেকে যে নৈতিকতার শিক্ষা পেত এখন সেটা পাচ্ছে না। কারণ বেশিরভাগ স্কুল কলেজ এখন বানিজ্যিক দিক দিয়ে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। গ্যাং কালচারের থেকে সরিয়ে আনার জন্য কিশোর উন্নয়ণ ও বেড়ে উঠার প্রক্রিয়াগুলোতে সরকারের বিনোয়োগ বাড়াতে হবে। এবং অভিভাবকদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি। সর্বোপরি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরে এসব বিষয়ে নজরদারি থাকতে হবে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম মানবজমিনকে বলেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসাবে কিশোর গ্যাং দমনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। যারা এ ধরনের অপরাধে জড়িত প্রতিটা এলাকা ভিত্তিক তালিকা করেছি। তালিকা ধরে ধরে আমাদের প্রতিটা ব্যাটালিয়ন কাজ করছে। তাদের ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা অনেক কিশোর অপরাধীদের আটক করেছি। যাদের বয়স কম তাদের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠিয়েছি। আর যারা ১৮ বছরের ওপরে তাদের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তির আওতায় নিয়ে এসেছি। আশা করছি তাদের তৎপরতা কমে যাবে। কারণ একদিকে আমাদের সাঁড়াশি অভিযান চলছে এছাড়া স্কুল-কলেজের কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের বার্তা দিচ্ছি। যেন তাদের সন্তানদের বেলায় সতর্ক থাকে। তারা কি করছে কোথায় যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল রাখার জন্য।