Saturday, July 14, 2018

ডনাল্ড ট্রাম্প এখন বলছেন জোরালো সম্পর্কের কথা

মাত্র একদিনের ব্যবধানে নিজের সুর বদলে ফেললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার যে ব্রেক্সিট পরিকল্পনা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছিলেন, পরের দিন একই বিষয়ে সুর বদলে যুক্তরাজ্যের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। গতকাল বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন দু’দেশের সরকার প্রধান। এতে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করা অপরিহার্য। ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাজ্য যা-ই করুক না কেন, তাতে কোনো সমস্যা নেই। এ সময় তিনি ব্রেক্সিটকে দু’দেশের  সম্পর্ক উন্নয়নের বড় সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। অথচ আগের দিন দ্য সানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র ব্রেক্সিট পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, মে’র ব্রেক্সিট পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনাকে ভণ্ডুল করে দিতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প আরো বলেন, বৈঠকে সন্ত্রাসবিরোধী বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
এর আগে, শুক্রবার সকালে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন ট্রাম্প। তখন ব্রেক্সিট নিয়ে করা মন্তব্যের বিষয়ে ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হলে এড়িয়ে যান তিনি। বৈঠকে তারা উভয় দেশের বন্ধন আরো জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন। পরস্পরকে প্রশংসার বন্যায় ভাসান তারা। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী মে বলেন, ন্যাটো সম্মেলনে খুবই কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন ট্রাম্প। আর ট্রাম্প উভয় দেশের বন্ধন আরো জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী মে’র সঙ্গে আমার খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।’ আগের দিন ব্রেক্সিট নিয়ে করা মন্তব্যের কারণে অনুতপ্ত কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প অনেকটা বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়ান। পরে নিজের সহকারীদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেন। যাতে বুঝা যায়, এমন প্রশ্নে তিনি বেশ বিব্রত।
দ্য সানের সাক্ষাৎকারে যা বলেছিলেন ট্রাম্প: মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের প্রথম যুক্তরাজ্য সফরের শুরুতেই বিস্ফোরক মন্তব্যের ফুলঝুরি ছুটিয়েছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। সফর শুরুর আগে বৃটিশ ট্যাবলয়েড দ্য সানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বৃটেনের নানা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে খোলেমেলা কথা বলেন। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মেকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তার নমনীয় ‘ব্রেক্সিটে’র (ইইউ থেকে বৃটেনের প্রস্থান) ফলে বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা মাটি হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেছেন, ব্রেক্সিট দরকষাকষি নিয়ে তার দেয়া পরামর্শ তেরেসা মে অগ্রাহ্য করেছেন। তার ভাষ্য, ‘যদি বৃটেন প্রস্থানের বিষয়ে ইইউ’র সঙ্গে নমনীয় চুক্তি করে, তাহলে আমরা বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে কার্যত বৃটেনের সঙ্গে আলোচনা করবো না; কারণ সেটা হয়ে যাবে অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনার সমতুল্য। ফলে এ কারণে সম্ভবত চুক্তি মাঠে মারা যাবে। আমি আসলে তেরেসা মেকে বলেছিলামও তার কী করা উচিত, কিন্তু তিনি আমার কথা শোনেননি।’
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ কিছু সূত্র বলেছিল, ব্রেক্সিট নিয়ে নমনীয় চুক্তি হলে যুক্তরাজ্যের অনেক বিষয়েই কিছুটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইইউর। ব্রাসেলসের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা থাকলে বৃটেন-যুক্তরাষ্ট্র আন্তঃআটলান্টিক বাণিজ্য চুক্তি অসম্ভব হয়ে পড়বে।
শুধু ব্রেক্সিট নিয়ে নয়, বৃটেনের আরো নানা বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন ট্রাম্প। কিছুদিন আগে পদত্যাগ করা বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের প্রশংসা করে তিনি বলেন, জনসন অসাধারণ প্রধানমন্ত্রী হবেন। তার বিদায়ে আমি কষ্ট পেয়েছি। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তেরেসা মে ও বরিস জনসন। এখনও জনসনকে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের মধ্যে এই পদের অন্যতম দাবিদার ভাবা হয়।
এছাড়া লন্ডনের লেবার দলীয় মেয়র সাদিক খানের সঙ্গে পূর্বের তিক্ততা আরো নতুনভাবে নিয়ে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার বক্তব্য, সন্ত্রাসবাদের ইস্যুতে লন্ডন মেয়রের পারফরম্যান্স বেশ শোচনীয়।
তার আরেক বিস্ফোরক মন্তব্য ছিল অভিবাসন নিয়ে। তিনি মনে করেন, ‘লাখ লাখ মানুষকে ইউরোপে প্রবেশ করতে দেয়াটা’ উচিত হয়নি। তিনি এর সঙ্গে লন্ডনে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেন। এটি সামাল দিতে সাদিক খানের ব্যর্থতার সমালোচনা করেন। পাশাপাশি, এত অভিবাসী প্রবেশের ফলে ইউরোপের ‘সংস্কৃতি’ হারিয়ে যাচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, ইউরোপে অভিবাসন হতে দেয়াটা লজ্জাকর বিষয়।
এ ছাড়া তার সফরের সময় লন্ডনের আকাশে বিশাল আকারের ট্রাম্প বেলুন ওড়ানো হচ্ছে। ডায়পার পরা শিশু ট্রাম্পের বেলুন ও প্রতিবাদ নিয়ে তিনি বলেন, এসবের ফলে তার মনে হচ্ছে লন্ডনে তিনি স্বাগত নন। ট্রাম্প আরো বলেন, লন্ডন শহর একসময় তার পছন্দের ছিল, কিন্তু এখন সেখানে যাওয়ার তেমন কারণ পান না তিনি।
তবে বৃটিশ রানী ও জনগণ নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন তিনি। তার বিশ্বাস, তিনি যা চান, বৃটিশ জনগণও তা-ই চায়।
এদিকে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করেছেন তেরেসা মে। ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাণিজ্য চুক্তি করতে ট্রাম্পকে রাজি করাতে তার আগের মন্তব্য দৃশ্যত অগ্রাহ্য করছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী।
টুক্সেডো পরিহিত ট্রাম্পকে ঐতিহাসিক বেলেনহেইম প্রাসাদে স্বামী ফিলিপ মে সমেত স্বাগত জানান তেরেসা। ট্রাম্পের পাশে এ সময় ফার্স্টলেডি মেলানিয়া ছিলেন। তবে মোলাকাতের পরপরই তেরেসা মে’র হাত ধরে সামনে আগাতে থাকেন ট্রাম্প। গতবার তেরেসা মে’র হোয়াইট হাউজ সফরেও একই কাণ্ড করেন তিনি।

বন্ধুর মুখে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী প্রবীর ঘোষ হত্যার মূল আসামি পিন্টু দেবনাথ রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছে। তবে সে একেক সময় একেক কথা বলে তদন্তকারী সংস্থাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। কখনো বলছে তার সঙ্গে ভাড়াটিয়া কিলার ছিল আবার কখনো বলছে একাই খুন করেছে। তবে তদন্তকারী সংস্থা বলছে, যতক্ষণ পর্যন্ত  পিন্টু দেবনাথ আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় তার বক্তব্য প্রদান না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোনো কিছুই বিশ্বাস করবো না।
এদিকে তদন্তকারী সংস্থা অনেক সতর্কতার সঙ্গে পিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। কারণ সে বাইপাস রোগী। কিছু সময় পর পর সে ঘামিয়ে যাচ্ছে। এবং অস্থির হয়ে উঠছে।
তদন্ত সংস্থার সূত্রমতে, রিমান্ডে পিন্টু প্রথমে জানায় তিনি খুন করেননি। খুনের জন্য তিনজন কিলারকে ভাড়া করেছিলেন। তাদের সঙ্গে বাপেনও ছিল। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা খুনিদের নাম ও ঠিকানা জানতে চাইলে তা জানাতে পারেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশের জেরার মুখে পিন্টু স্বীকার করেন- প্রবীরকে একাই খুন করেছেন তিনি।
তদন্ত সংস্থার সূত্রমতে, পিন্টু জানিয়েছে ১৮ই জুন রাত ৯টার দিকে প্রবীরকে মোবাইলে ফোন করে আমার বাসায় আনি। এরপর দু’জনে একত্রে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখি। প্রবীর বিস্কিট খেয়ে কোমল স্প্রাইট পান করার সময় পেছন থেকে চাপাতি দিয়ে তাকে আঘাত করি। সে আমাকে ঝাপটে ধরে, কয়েকটা লাথি মারে, ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে আমি চাপাতি দিয়ে আঘাত করতে থাকি। প্রবীর রক্তাক্ত হয়ে টিভির রুমে খাটের উপর লুটিয়ে পড়ে। এরপর বালিশ চাপা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করি। এরপর চাপাতি দিয়ে তার দেহ একে একে ৭ টুকরো করি। ৫ টুকরো লাশ বাজার থেকে আনা সিমেন্টের ৩টি ব্যাগে এবং পা দুটি আরেকটি ব্যাগে ভরি। অন্য একটি ব্যাগে রক্তাক্ত বিছানার চাদর, বালিশ, পরিদেহ কাপড় ও চাপাতি ভরি। বাথরুমে গোসল করে নিজের শরীরের রক্ত ধুয়ে ফেলি। শেষ রাতের দিকে চারদিকের পরিবেশ একেবারে শান্ত হয়ে গেলে বাসার নিচে পরিত্যক্ত সেপটিক ট্যাংকিতে ৩টি ব্যাগ ফেলি। কিন্তু ট্যাংকিতে জায়গা না হওয়াতে পা ভর্তি ব্যাগটি বাড়ির উত্তর পার্শ্বের ময়লার স্তূপের সঙ্গে ড্রেনের মাথায় ফেলে দেই। এবং রাতেই শীতলক্ষ্যা নদীতে গিয়ে ফেলে দেই চাপাতি, বিছানার চাদর আর বালিশ ভর্তি ব্যাগ। অথচ পিন্টু দেবনাথ প্রবীর ঘোষের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুই বছর আগে প্রবীর তাকে ভারতে নিয়ে বাইপাস অপারেশন করিয়ে আনে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পিন্টুর দেয়া তথ্যমতেই শহরের কালিবাজারের একটি হার্ডওয়্যারের দোকান পরিদর্শন করা হয় যেখান থেকে সে চাপাতি কিনেছিল। ওই দোকান মালিক সত্যতা স্বীকার করেছেন। এছাড়া শহরের চারারগোপ এলাকাতে চান্দু এন্ড কোং দোকানের পাশের কামারের দোকানে গিয়ে ওই চাপাতি শান দেয়া হয়। ওই দোকান মালিকও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পিন্টু দেবনাথ পুরো চতুর ও কৌশলী লোক। গ্রেপ্তার হবার পর পুরো ঘটনা নিজের উপর নিতে চাচ্ছে। একটি মানুষকে এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করতে একজন পারে না। পিন্টু বারবার হত্যার জন্য দুটি কারণ উল্লেখ করেন, সেগুলো হলো বন্ধকী স্বর্ণ লেনদেন ও স্বর্ণ ভবনে পিন্টুর নামে ক্রয় করা দোকানে প্রবীরের টাকা দেয়া নিয়ে। পিন্টুর দাবি প্রবীর তাকে দুইবার হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রশ্নের উত্তরে তিনি কোনো সদুত্তর দেননি।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) নূরে আলম জানান, প্রথম দিকে পিন্টু পুলিশকে বিভ্রান্ত করেছেন। তাই এখন যেসব তথ্য দিচ্ছেন, সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় তার বক্তব্য প্রদান না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কোনো কিছুই বিশ্বাস করবো না।
নিহত প্রবীর ঘোষ শহরের কালিরবাজারের ভোলানাথ জুয়েলারির মালিক। পিন্টুও জুয়েলারির মালিক। তারা চার বন্ধু। প্রবীর, পিন্টু, গোপী ও উত্তম। এরমধ্যে প্রবীর ও পিন্টু বেশি ঘনিষ্ঠ। মজার বিষয় হলো প্রবীর ঘোষকে হত্যার পর গত ২১ দিন প্রবীরের সন্ধানে মিছিল, প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধনে সক্রিয় উপস্থিত ছিল পিন্টু। কেউ বুঝতেও পারেনি ঘাতক তাদের সঙ্গেই আছে।
 পিন্টু শহরের ১৫ আমলাপাড়া কেসি নাগ রোডের রাশেদুল ইসলাম ঠান্ডু মিয়ার বাড়ির দুই তলার একটি ফ্লাটে গত ২২ বছর ধরে বসবাস করেন। ৯ই জুলাই রাতে পিন্টুর দেখানো মতে, ওই বাড়ির সেপটিক ট্যাংকি থেকে প্রবীর ঘোষের ৫ টুকরো লাশ এবং ১০ জুলাই রাতে ড্রেন থেকে পা দুটি উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। বর্তমানে সে এবং তার কর্মচারী বাপেন ভৌমিক ৫ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। শুক্রবার তার রিমান্ডের ৪ দিন শেষ হবে।

সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা দিয়েছে যে হাসপাতাল by কাফি কামাল

কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের দুইপাশ তখন আহত-অসুস্থ ও আশ্রয়হীন লাখো রোহিঙ্গা নর-নারীর আর্তনাদে মুখরিত। অসহায় রোহিঙ্গাদের প্রতি সেদিন মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ড্যাব। বালুখালী পানবাজারে তিনদিনের জন্য স্থাপন করেছিল একটি মেডিকেল ক্যাম্প। দিনটি ছিল ১১ই সেপ্টেম্বর ২০১৭। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১০ মাস। তাঁবুর ক্যাম্পটি এখন দোতলা একটি বাড়িতে পরিণত হয়েছে পরিপূর্ণ হাসপাতালে। দশ মাসে হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিয়েছে সাড়ে চার লাখ রোহিঙ্গা ও স্থানীয় গরিব রোগী। আবাসিক ডাক্তার, প্যারামেডিক ও ফার্মাসিস্টদের পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা স্বাস্থ্যসেবা দেন সেখানে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয় প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের প্রোটিন মিক্স। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত শত রোহিঙ্গা ও স্থানীয় লোকজন এখানে চিকিৎসা নেন। একজন মিডওয়াইফ ফলোআপ চেকআপসহ স্বাস্থ্য পরামর্শ দেন গর্ভবতী নারীদের। জন্মনিয়ন্ত্রণে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য যুবতী নারীদের কাউন্সেলিং করেন চিকিৎসক ও মিডওয়াইফ মিলে। ফার্মাসিস্টদের মাধ্যমে বিতরণ করা হয় প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিষ্ঠিত দেশি-বিদেশি হাসপাতাল ও হেলথ সেন্টারগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। অন্য হাসপাতালে যেখানে দৈনিক ৮০-১৫০ জন রোগী চিকিৎসা নেন, সেখানে এ হাসপাতালে দৈনিক রোগীর সংখ্যা ৫০০’র বেশি। সপ্তাহের বাকি ৬ দিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চিকিৎসকরা সেবা দেন। মিডওয়াইফ ও প্যারামেডিকসদের সেবা মেলে ২৪ ঘণ্টা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ড্যাবের সদস্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা টিম করে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাসেবা দেন। কাগজপত্রে হাসপাতালটির নাম- ‘ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প, মেটারনাল, চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টার’। কিন্তু রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় মানুষ এটিকে চেনে- খালেদা জিয়া হাসপাতাল নামে।
হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পেছনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রয়েছেন মূল ভূমিকায়। লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় টেলিভিশনে রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব দেখে সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে একটি রোহিঙ্গা ত্রাণ কমিটি গঠন করেন তিনি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে আহ্বায়ক করে গঠিত রোহিঙ্গা ত্রাণ কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ আলী চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমান, শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ও রুহুল কবির রিজভী। যে কমিটির তত্ত্বাবধানে পরবর্তীতে ড্যাবের অস্থায়ী হেলথ ক্যাম্পটিকেই পরিণত করা হয় হাসপাতালে। পরে ৩০শে অক্টোবর খালেদা জিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে অস্থায়ী হাসপাতালটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। হাসপাতালে নিয়মিত অনুদান দিয়ে আসছেন- মির্জা আব্বাস, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আবদুল আউয়াল মিন্টু, প্রবাসী সংগঠনের চাইল্ড অব অ্যাডাম, নেইবারহুড লাভ অ্যান্ড পিস অর্গানাইজেশন। এছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনসহ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের অনুদান, চিকিৎসক, নানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সমিতি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের আর্থিক সহায়তায় এগিয়ে চলছে হাসপাতালটির কার্যক্রম। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হাসপাতালটির কার্যক্রম চালিয়ে যেতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বিএনপির ত্রাণ কমিটি।
হাসপাতালটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ড্যাব মহাসচিব ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, বিএনপি অস্থায়ী হাসপাতালটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন পেতে নানামুখী বেগ পেতে হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অনুরোধে সৌদি আরব প্রবাসী মোশতাক আহমেদ বালুখালী বাজারে তার বাউন্ডারি ঘেরা দোতলা বাড়িটি হাসপাতালের জন্য ছেড়ে দেন। অনুমতি পাওয়ার পর ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয় হাসপাতালে। গর্ভবতীদের জন্য ডেলিভারি রুম, রোগীদের বিশ্রাম কক্ষ, ফার্মেসি, জরুরি বিভাগ, পুরুষ বহির্বিভাগ, নারী বহির্বিভাগ, ড্রেসিং কর্নার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ও আবাসিক চিকিৎসক এবং নার্সের জন্য থাকার ঘর নির্মাণ করা হয়। ড্রেসিংয়ের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, প্রোটিন মিক্স ও বিস্কুট, পানি এবং অ্যান্টিসেপটিক সাবান সংগ্রহ করা হয়। গর্ভবতী মায়েদের বিতরণের জন্য ২৫ টন প্রোটিন মিক্স কিনে দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ডা. জাহিদ বলেন, প্রথম আড়াই মাস বুলেটবিদ্ধ, কাটা ছেঁড়ায় আহত ও জ্বর-সর্দি আক্রান্ত মিলিয়ে দৈনিক কয়েক হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছেন তাদের ১৮-৩৫ জনের চিকিৎসক টিম। পুরোপুরি স্বেচ্ছাব্রতে তারা এ চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। এখন রোগীর সংখ্যা যেমন কমেছে তেমনি শনাক্ত হচ্ছে নানা ভাইরাল রোগ। ৩রা জুলাই পর্যন্ত এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন সাড়ে চার লাখ রোগী। রোহিঙ্গাদের চাপে স্থানীয় লোকজন চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছিল তাই স্থানীয়দেরও চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছি। হাসপাতালের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রয়োজনের তাগিদে ও স্থানীয়দের চাহিদা মেনে হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছি। রাজনৈতিক দলের উদ্যোগ ও ড্যাবের মতো প্রফেশনাল অর্গানাইজেশনের তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হওয়ায় আমরা প্রচলিত নিয়মে অনুদান চাইতে বা নিতে পারি না। এখন হাসপাতালটি বন্ধ করে দিলে রোগীরা বঞ্চিত হবে। তারপরও যতদিন সম্ভব আমরা হাসপাতালটির কার্যক্রম চালিয়ে নিতে চাই।
হাসপাতালে ল্যাব প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করছেন সঞ্জয় বালা ও নাজিমউদ্দিন। সঞ্জয় বালা জানান, বাইনোকুলার মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে রোগীদের ব্লাড, ইউরিন ও বায়োকেমিস্ট্রি টেস্ট করা হয়। সামপ্রতিক সময়ে প্রতিদিনই ২৫-৩০ জন করে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এছাড়া শনাক্ত হচ্ছে টাইফয়েড, প্যারাটাইফয়েড, ম্যালেরিয়া ও ডিপথেরিয়া রোগী। রোগীদের পলিপ্যাকযুক্ত রিপোর্ট কার্ড দেয়ার পাশাপাশি রোগ শনাক্তকৃতদের তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে হাসপাতালের রেজিস্ট্রারে। হাসপাতালের আবাসিক দুই চিকিৎসক সিফাত ও আসিফ জানান, এখনো প্রতিদিন ৪-৫শ’ রোগী চিকিৎসা নেন। রোগীদের বেশিরভাগই ডায়রিয়া, চর্মরোগ, জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, দাঁতের ব্যথা, ম্যালেরিয়াসহ নানা ভাইরাল রোগে আক্রান্ত। হাসপাতাল থেকেই রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও শ্বাসকষ্টের রোগীদের নেবুলাইজার সুবিধা দেয়া হয়। হাসপাতালে একমাত্র আবাসিক নারী চিকিৎসক ফাতেমা রয়েছেন ৮ মাস ধরে। তিনি জানান, প্রথমদিকে ভাষাগত দূরত্বের কারণে কিছুটা সমস্যা হতো। আমাদের কিশোর অনুবাদ টিমের সদস্যদের সাহায্যে আমরা বুঝে নিতাম। এখন আমরা তাদের ভাষা কিছুটা বুঝি, তারাও আমাদের বুঝাতে পারেন। রোহিঙ্গা নারীদের মধ্যে গর্ভবতীর সংখ্যাই বেশি। তবে রোহিঙ্গা নারীরা আগের তুলনায় অনেক স্বাস্থ্য সচেতন।
হাসপাতালে মিডওয়াইফ লিপি জানান, আমরা গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কার্ডের মাধ্যমে ফলোআপ, টিকাদান, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরামর্শ দেই। নরমাল ডেলিভারিতে সহায়তা করি। গর্ভবতী ও গর্ভপরবর্তী সময়ে ফুড সাপ্লিমেন্ট দিই। রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে রোগীদের নাম, ব্লক ও ক্যাম্পের ঠিকানা এবং রোগের ইতিহাস সবই সংরক্ষণ করি। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা নারীদের জন্মনিয়ন্ত্রণে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য কাউন্সেলিং এবং ক্যাম্পে গিয়ে ক্যাম্পেইন করি। এখন অনেকেই ইনজেক্টেবল মেথড ব্যবহার করছেন। আশার বিষয় হচ্ছে, তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে। হাসপাতালে দুইজন ফার্মাসিস্টের মধ্যে নাজিমউদ্দিন বলেন, আমরা চিকিৎসকদের উল্লিখিত ওষুধগুলো নির্ভুলভাবে রোগীদের বিতরণ করি। প্রতিটি ওষুধের প্যাকেট বা পাতায় মার্কার পেন দিয়ে সেবনের নিয়ম উল্লেখ করে দেই। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে চিকিৎসকদের ভাষাগত সমস্যা নিরসনে এ হাসপাতালে স্বেচ্ছাশ্রম দেন ১৫ কিশোর। তাদেরই একজন নবম শ্রেণির ছাত্র আরিফ হাসান ইলশাম। রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে বন্ধুদের সঙ্গে সে দোভাষীর কাজ শুরু করেছিলেন। হাসপাতালে দেখা গেল ইলশামকে জড়িয়ে ধরছেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন রোহিঙ্গা নারীরা। সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষ জানান, তারা কৃতজ্ঞ এ হাসপাতালের সেবা ও আন্তরিকতায়। কিছু হলেই তাই ছুটে আসেন- তাদেরই দেয়া নামের ‘খালেদা জিয়া হাসপাতালে’।