Friday, June 26, 2015

মানব পাচারের দায় সরকার এড়াতে পারে না

মানব পাচারের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না মন্তব্য করে মানবাধিকার কমিশনের চেয়াম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, ভুক্তভোগীদের আর্থিক, মানসিক, শারীরিক সব ক্ষতির দায় সরকারকেই নিতে হবে। তিনি বলেন, যারা বৈধভাবে অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ গিয়েও মানব পাচারের শিকার তার দায়ও সরকারের। অভিযুক্ত এজেন্সির হাত যতই লম্বা হোক তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি। গতকাল জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত নির্যাতিতদের সমর্থনে ‘অভিবাসন ও বাংলাদেশে মানব পাচার’ শীর্ষক গণশুনানিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ সব কথা বলেন। বিদেশে পাচারের শিকার কয়েকজন ভুক্তভোগীর অংশগ্রহণে সকাল ১১টার দিকে এই গণশুনানির আয়োজন করে মানবাধিকার সংগঠন যশোর রাইটস এবং শিক্ষা স্বাস্থ্য উন্নয়ন কার্যক্রম (শিসউক)।
‘মানব পাচারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স পদক্ষেপ নেয়া হবে’ প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে মিজানুর রহমান তার প্রতি অনুনয় প্রার্থনা করে বলেন, যারা মানব পাচারের শিকার হয়ে নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের কথা শুনে ওইসব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবেন। আমরা সেই সুসময়ের অপেক্ষায় আছি বলেও আশা প্রকাশ করেন মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে যশোর রাইটস ইরাকে মানব পাচারের শিকার ১৮০ জন বাংলাদেশীর একটি এক ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করে। সেখানে পাচারের শিকার মানুষের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। ওই ভিডিও চিত্র প্রসঙ্গে ড. মিজানুর রহমান বলেন, আজ আমরা যা শুনলাম তাতে বোঝা যায়, রেজিস্টার্ড এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশ গিয়েও অনেকে মানব পাচারের চেয়ে নির্মম দাসত্বের শিকার হয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে জড়িতদেরও কোনভাবেই আইনের আওতার বাইরে রাখা যায় না। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, ভিডিও চিত্রে ভুক্তভোগীদের কথায় সরাসরি রাষ্ট্রদূত ও এজেন্সির বিরুদ্ধে যে কথা উঠে এসেছে এগুলো নতুন নয়। আপনারা ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শুনুন। যাদের আপনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন তারা তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে কিনা বা তারা জনবিরোধী কোন কাজে লিপ্ত আছে কিনা আমরা এর জবাব চাই। ভুক্তভোগীদের শুধু ট্রাভেলিং খরচ দিয়েই সরকার দায়ভার এড়াতে পারে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সব ক্ষতিপূরণসহ তাদের পুনর্বাসনেরও সুযোগ সরকারকে নিতে হবে। আমরা দেখতে চাই সরকার সর্বহারা এই মানুষের সহায় হবে। রিক্রুটিং এজেন্সির হাত যতই লম্বা হোক না কেন তা জনগণের হাতের চেয়ে লম্বা নয়। তিনি বলেন, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে জনগণের সরকার বলে প্রমাণ করতে হবে। কমিশন চেয়ারম্যান বলেন, আগামী মাসে সর্বদলীয় সংসদীয় বৈঠক ডাকা হয়েছে।  বৈঠকে আমি মানবপাচারের বিরুদ্ধে বলব। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপতি হয়েছে সেসব বিষয়েও আমি কথা বলব।
১৮০ জনের সঙ্গে ইরাকে পাচার হওয়ার বর্ণনা দিয়ে ইঞ্জনিয়ার সিদ্দিক হোসেন বলেন, দেশটিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল রেজানূর রহমান এই পাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত। রিক্রুটিং এজেন্সি খান টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’র মাধ্যমে জর্ডান যাওয়া মিনারা  বেগম জানান, প্রায় দুই বছর আগে তিনি সে দেশে যান। সেখানে কাজ করেও কোন বেতন পাইনি। বেতন চাইলে বলতো তোর কোন বেতন নেই। তোকে আমরা অনেক টাকা দিয়ে কিনে এনেছি। তারা আমাকে অনেক নির্যাতন করত। রডের পিটুনিতে আমার পায়ের একটা রগ চিকন হয়ে গেছে। পরে দুই বছর থাকার পর আমি একদিন স্বামীর সঙ্গে কথা বলে জানাই, আমি আর থাকতে পারছি না। মিনারা জানান, স্বামীর চিকিৎসা ও সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য তিনি বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু খালি একেবারে খালি হাতে সেখান থেকে ফিরে এসেছি। টাকার অভাবে স্বামীর চিকিৎসাও করাতে পারছি না। আমার মতো আরও কোন মেয়ে যেন এমন পরিণতির শিকার না হয় সে ব্যবস্থা আপনারা নেবেন। তিনি ক্ষতিপূরণেরও দাবি জানান। ইরানে পাচারের শিকার ইসহাক তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, চাকরির জন্য তিনি প্রথমে ওমানে যান। সেখান থেকে তাকে ইরানে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আটকে রেখে সেখানে আমার ওপর তারা নির্যাতন চালায়। পাচারকারীদের আমি অনেক টাকা দিয়েছি। তারপর আমি ইরানি পুলিশের হাতে ধরা দেই। পরে বাংলাদেশী অ্যাম্বাসি আমার কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা নিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়। অথচ ইরান থেকে দেশে আসার জন্য বিমানের ভাড়া মাত্র ২৫ হাজার টাকা। গণশুনানি অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন যশোর রাইটস-এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক, শিসউকের নির্বাহী পরিচালক সাকিউল মিল্লাত, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ডেপুটি এটর্নি জেনারেল মোতাহের  হোসেন সাজু প্রমুখ।

বাংলাদেশকে হটাতে ত্রিদেশীয় সিরিজ!

ভারতের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের পর বাংলাদেশ যখন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলার কাউন্টডাউন শুরু করেছে, তখনই শুরু হয়েছে নানা ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশকে ছিটকে দেয়ার নানা পরিকল্পনা আঁটছে ক্রিকেট বিশ্ব। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগস্টে পাকিস্তান ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নিয়ে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ আয়োজন করার পরিকল্পনা করছে জিম্বাবুয়ে। আলোচিত ত্রিদেশীয় সিরিজ হলে, প্রত্যেক দল প্রত্যেকের সঙ্গে দুটি করে মোট চারটি ম্যাচ খেলবে এবং সেরা দুইটি দল  খেলবে ফাইনাল। পাকিস্তান যদি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চলতি সিরিজ জেতার পর ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে যায়, তাহলে পাকিস্তান বা ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে কেউ জিম্বাবুয়ের সঙ্গে একটি ম্যাচ হারলেই দুই দলের কেউ বাংলাদেশের ওপরে যেতে পারবে না। তবে প্রথম পর্বে পাকিস্তান এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ একে অপরের সঙ্গে একটি করে জিতলে দুই দলই বাংলাদেশের আগে চলে যাবে। এতেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে ছিটকে যাবে বাংলাদেশ।
অথচ আগস্টে আসলে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের দ্বিপক্ষীয় সিরিজ আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল জিম্বাবুয়ের। অবশ্য ওই সিরিজের সূচি চূড়ান্ত ছিলো না। এখন এর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজ যোগ হওয়ায় বিষয়টি বেশ গোলমেলেই হয়ে গেছে। কারণ, ভারতের বিপক্ষে দুটি ম্যাচ জেতায় র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন সাতে। অষ্টম দল হিসেবে শুধু লড়াইয়ের কথা পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের। এফটিপি অনুযায়ী, আগামী মাসে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ রয়েছে পাকিস্তনের। এরপর আগস্টে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। তবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে  কোয়ালিফাইয়ের ‘ডেডলাইন’ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোন ম্যাচ ছিল না। এখন হিসাবটা গোলমেলে করে দিতে পারে আলোচিত এ ত্রিদেশীয় সিরিজ। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির হিসাবের বাইরে থাকা জিম্বাবুয়ে এ ত্রিদেশীয় সিরিজের মূল উদ্যোক্তা। তারাই উদ্যোগী হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘সম্প্রতি আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে। তবে এখনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি।’

মাথার ওপর দণ্ড নিয়ে সাংসদ থাকা যায় না

মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া
দুর্নীতির একটি মামলায় সাজা বহাল থাকায় ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী আর সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশিদ আলম। আজ শুক্রবার বিবিসি বাংলাকে তিনি এ কথা বলেছেন।
মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী থাকতে পারেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত আছে। এ ব্যাপারে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম বিবিসিকে বলেন, একটি দুর্নীতির মামলায় যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে সাজা বহাল রয়েছে, তাই তিনি আর সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না।
২০০৮ সালে জ্ঞাত আয়ের বাইরে অবৈধভাবে ৬ কোটির বেশি টাকার সম্পদ অর্জনের মামলায় ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। ২০১০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ কেবলই আইনি প্রশ্নে ওই রায় বাতিল করেন। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করে। ১৪ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে হাইকোর্টে আপিলের পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নৈতিক স্খলন জনিত অপরাধে কেউ সাজা পেলে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারান।
এদিকে, এই রায়ের দুই পক্ষের আইনজীবীরা দুই রকমের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশিদ আলম বলছেন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী যে আর সংসদ সদস্য থাকতে পারেন না, তা নিয়ে অস্পষ্টতার কোনো অবকাশ নেই। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে তিনি একটি ফৌজদারি আপিল মামলার জামিনপ্রাপ্ত আসামি, যার মাথার ওপর একটি দণ্ড ঝুলছে। কাজেই সেই অবস্থায় আমি মনে করি ওনার সদস্যপদ আর থাকে না সংবিধানের ৬৬ (২) ঘ ধারা অনুযায়ী।’
কিন্তু খুরশিদ আলমের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরীর আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদার। তিনি বলেন, ‘নৈতিকতার প্রশ্ন ভিন্ন। আমি এটিকে আইনের বিচারে দেখতে চাই। আপিল বিভাগ মামলাটিকে বিচার করে আবার পুনর্বিচারের জন্য পাঠিয়েছেন। বিচারিক আদালত তাঁকে যে সাজা দিয়েছিলেন সেই সাজা এখন পুনর্বিচার করা হচ্ছে। সুতরাং এটার চূড়ান্ত মীমাংসা এখনো হয়নি। তাই জনপ্রতিনিধি হিসেবে বা মন্ত্রী হিসেবে তাকে অযোগ্য ঘোষণা করা যাবে না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইতে সরকার দলীয় চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজও বিবিসি বাংলাকে বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংসদ বলতে পারবে না যে তাঁর সংসদ সদস্যপদ নেই। কাজেই আইনি লড়াই শেষ হওয়ার পরই কেবল এর সিদ্ধান্ত দেওয়া যেতে পারে। আ স ম ফিরোজ বলেন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী এখনো সংসদ সদস্য আছেন এবং মন্ত্রিসভাতেও আছেন।

রাজ্জাকের অপহরণের পেছনে রোহিঙ্গা রাজনীতি! by এম সাখাওয়াত হোসেন

আবদুর রাজ্জাক
এটাই প্রথম নয়। প্রায় এক বছরের মাথায় একই সীমান্তে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রায় একই ধরনের ঘটনায় এবার বিজিবির (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) নায়েক রাজ্জাককে বাংলাদেশ সীমানা, মধ্য নাফ নদী থেকে অপহরণ করা হলো। অবশ্য এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয় বলে তথ্য প্রকাশ। ওই গোলাগুলিতে বিজিবি সদস্য বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছেন। এ গোলাগুলি ও অপহরণের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সরকারের তরফ থেকে তেমনভাবে খোলাসা না করলেও পত্রপত্রিকান্তরে, বিজিবি এবং অন্যান্য তথ্য থেকে যা পাওয়া যায়, তাতে মনে হয়, বিজিপির এ অভিযান ছিল সুপরিকল্পিত এবং তেমন প্রস্তুতি নিয়েই বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল।
ওই অপহরণ ও গোলাগুলির পরপরই আমাদের সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর উক্তি ছিল সত্যিই অবাক করার মতো। তিনি অবলীলাক্রমে বক্তব্য দিলেন, ‘এটা একটা ভুল-বোঝাবুঝি ছিল।’ মন্ত্রী মহোদয় সম্ভবত বিষয়টিকে জনসমক্ষে হালকা করতে চেয়েছিলেন, তবে বিষয়টি যে মোটেও হালকা ছিল না, তা বুঝতে বিজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। যৎসামান্য সামরিক জ্ঞান নিয়ে ঘটনার শুরু থেকে উপলব্ধি করেছি যে আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মিয়ানমার ক্রমেই বাংলাদেশের ব্যাপারে অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। গত বছরের মে মাসে বান্দরবান-মিয়ানমার সীমান্তে কোনো উসকানি ছাড়া বিজিবির একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায়, পরে তাঁকে হত্যা করা হয় এবং বহু দেনদরবারের পর তাঁর লাশ ফেরত দেয় বিজিপি কর্তৃপক্ষ। ওই সময়েও আমাদের সরকারকে তেমন সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। এক বছরের মাথায় ফের অপহরণের ঘটনা ঘটার পরপরই যা করার ছিল, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে করতে দেখা যায়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, সমগ্র পরিস্থিতি বিজিবির হাতে ছেড়ে দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত ছিল যে স্বল্প সময়েই কথিত ‘ভুল-বোঝাবুঝির’ অবসান হবে।
কতখানি ভুল-বোঝাবুঝি ছিল, তা এত দিনে মিয়ানমার সরকার বুঝিয়ে দিয়েছে। যেহেতু আমাদের দেশে জবাবদিহি অনুপস্থিত, তাই অতিসংবেদনশীল বিষয়েও চিন্তাভাবনা বা পরামর্শ না করে তাৎক্ষণিক বক্তব্য দেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। সব বিষয়ে সবার ততটা জানার বিষয় না হলেও সলা–পরামর্শ করতে কখনো দেখা যায়নি।
পত্রপত্রিকা মারফত যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে মনে করা যায় যে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতায় বেশ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখন এই তৎপরতা কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মিয়ানমারের সঙ্গে ইদানীং রোহিঙ্গা ইস্যুতে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে, যদিও বর্তমান সরকার রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনও নয়। তথাপি সীমান্তে মিয়ানমার একধরনের উদ্ধত আচরণ করে চলেছে।
মিয়ানমার বাংলাদেশের কথিত কূটনৈতিক আবেদনে সাড়া তো দেয়ইনি, বরং ক্ষতস্থানে নুন ছিটানোর মতো নায়েক রাজ্জাকের যে ধরনের চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করেছে, তা অনেকটা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মতো। এ ধরনের ছবি যেসব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো ওই দেশের সেনাসমর্থিত বলে প্রকাশ।
নায়েক রাজ্জাকের যে ধরনের চিত্র প্রকাশিত হয়ে সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়েছে, তাতে দেশপ্রেমী যেকোনো ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হবেন। ইতিমধ্যেই স্থানীয় জনগণ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছেন। বিজিবিসহ যেকোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমতার প্রতীক। বিজিবি তো অবশ্যই বাংলাদেশের সার্বভৌমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যে কারণে বিজিবির প্রতিটি বর্ডার পোস্ট বা বিওপিতে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়, যা অন্য কোনো বাহিনীর ওই স্তরে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিধি নেই। কাজেই কোনো বিওপির সদস্য ওই প্রতীকের অংশীদার। নায়েক রাজ্জাকের এ ধরনের ছবি প্রকাশ করে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশের আত্মগরিমায় আঘাত করেছে। তিনি ব্যক্তিমাত্র নন, একটি নিয়মিত বািহনীর সদস্য। আমরা জানি না যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে কী মতামত পোষণ করা হয়।
মিয়ানমার যা করেছে, তা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা শুধু মানবিক দিক থেকেই নয়, জাতিসংঘের নীতির লঙ্ঘন করেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন যে তাহলে মিয়ানমার কি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে উপর্যুপরি এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে? অনেকেই মনে করেন, করার সংগত কারণও রয়েছে, যে মিয়ানমার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ভারতের সেনাবাহিনীর অপারেশনের পর যে ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে, সেখান থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে এবং খবরের কাগজ ও ফেসবুকে এ ধরনের ছবি দিয়ে অন্য খাতে দৃষ্টি ফেরাচ্ছে। এ তথ্য কতখানি যৌক্তিক, তা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। তবে আগে যেমন বলেছি, এ ঘটনায় মিয়ানমার সরকারের যে প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।
যাহোক নায়েক রাজ্জাকের অপহরণ আর চিত্র প্রকাশ করা এবং আমাদের সরকারের অসহায়ত্ব যে জাতিকে হতাশ করেছে, তা মাত্র কয়েক দিন আগে সংসদে দাঁড়িয়ে হাজি সেলিম উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে নায়েক রাজ্জাকের হাতে হাতকড়া পরানো মানে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের হাতে হাতকড়া পরানো। তিনি বিজিবির কার্যক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন (প্রথম আলো ২২ জুন, অনলাইন সংস্করণ)। হাজি সেলিম যথার্থই বলেছেন। বিজিবির কার্যক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু যে প্রশ্ন তিনি তোলেননি তা হলো দেশের অন্যতম প্যারামিলিটারি ফোর্স যার প্রধান দায়িত্ব শান্তিকালীন সীমান্তের পাহারা দেওয়া এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে সীমান্তে মোতায়েন থাকা, তাদের সে কাজ থেকে অতি ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রশমনে নিয়োজিত করার বিষয়ে।
বিজিবি নতুন আঙ্গিকে আত্মপ্রকাশ ও পুনর্বিন্যাসের পর এখনো আগের প্রশিক্ষণের পর্যায়ে সম্পূর্ণভাবে ফিরে যেতে পারেনি। প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি অত্যন্ত নবীন সৈনিক। একটি বাহিনী যেকোনো সমস্যার পর পুনর্গঠিত হয়ে পরিপক্ব হতে সময় লাগে। সে সময় অন্য কাজে নিয়োজিত করলে প্রশিক্ষণ ব্যাহত হবেই।
যাহোক, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা কীভাবে একজন বিজিবি সৈনিককে টহলের সময় ধরে নিয়ে যেতে পারল, সে বিষয়ে নিশ্চয়ই সংশ্লিষ্টরা জবাব দেবেন। তবে মিয়ানমার যে এ ধরনের কাজ করতে পারে, তার প্রমাণ আগেও দিয়েছে। সে কারণেই আমাদের সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন ছিল বেশি, বিশেষ করে রোহিঙ্গা মানব পাচার এবং পরবর্তী সময়ে তাদের নিয়ে পূর্ব এশিয়ায় যে সংকট, সেটা এ ঘটনার পেছনের বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে। নৌকার উদ্বাস্তু এবং আরাকান থেকে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ নিয়ে মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। মিয়ানমার এসব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে চাপানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে নায়েক রাজ্জাক অপহৃত হয়েছেন। ২২ জুন বার্মা টাইমস-এ একটি খবর বের হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে অভ্যন্তরীণ সংকটে থাকা মিয়ানমার সরকার নায়েক রাজ্জাকের মুক্তির সঙ্গে সব উদ্ধারকৃত বাদবাকি ৫৫৫ জনকে বাংলাদেশি হিসেবে গ্রহণ করার বিষয়টি জুড়ে দিয়েছে। ওই পত্রিকার ভাষ্যমতে, পর্দার পেছনে এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে দর-কষাকষি চলছে।
খবরটির সত্যতা কয়েক দিন আগেই নিশ্চিত করেছে বিজিবি। বিজিবি এ প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে নাকচ করে বলেছে যে দুটি দুই বিষয়। অবশ্য এ ধরনের অবমাননাকর প্রস্তাবের ওপর সরকারের মন্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি (জুন ২২, ২০১৫-এ লেখা শেষ হওয়া পর্যন্ত)। এ ধরনের প্রস্তাব হতবাক করেছে দেশবাসীকে।
বার্মা টাইমস-এর খবর যা ইতিমধ্যেই নিশ্চিত করা হয়েছে তাতে প্রতীয়মান যে মিয়ানমারের এ ধরনের আচরণ অমানবিক ও ব্ল্যাকমেলিংয়ের পর্যায়ে পড়ে। এর বিরুদ্ধে অবশ্যই সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। একটি সার্বভৌম দেশ অপর সার্বভৌম দেশকে এভাবে ব্ল্যাকমেল করতে পারে না। এ ধরনের অভিপ্রায় সম্পূর্ণভাবে জাতিসংঘের এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিসহ অন্যান্য চুক্তির লঙ্ঘন। এ ধরেনর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এর পাশাপাশি নায়েক রাজ্জাককে উদ্ধার করে আনা সরকারের একান্ত কর্তব্য। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীরা পতাকা বৈঠকে রাজি হয়েছেন এবং আজ বৃহস্পতিবার দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে বৈঠকটি হওয়ার কথা।
নায়েক রাজ্জাককে অপহরণ এবং পরবর্তী সময়ে যে ধরনের আচরণ মিয়ানমার সরকার করছে, তা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে অকল্পনীয়। চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে তারা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ অন্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে মিয়ানমারের এহেন আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে দেখা যায় না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তাদের অমানবিক আচরণ ও প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সোচ্চার হওয়া উচিত।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে ওই সীমান্তে মানব পাচার ও মাদকের চোরাচালানির সঙ্গে সীমান্তপারের বিজিপি (বর্ডার গার্ড পুলিশ মিয়ানমার) যেমন যুক্ত, তেমনি বাংলাদেশের ওই অঞ্চলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও যুক্ত। যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসৎ সদস্য। পত্রিকায় প্রকাশ, একজন সাংসদও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ এ পর্যন্ত এঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। অতএব, আমাদের দায়িত্বও ভুলে গেলে চলবে না। নিজের ঘর সামলাতে না পারলে আমাদের মতো দুর্বল দেশকে সবাই পেয়ে বসবে। মিয়ানমারের এ ঘটনাই তার উদাহরণ।
আমরা দেশের ১৬ কোটি নাগরিক নায়েক রাজ্জাক ও তাঁর পরিবারের পাশে রয়েছি। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাব, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনে মিয়ানমারের এ ধরনের অমানবিক আচরণের বিষয় তুলে ধরতে। অন্যদিকে মিয়ানমার সরকারকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া যে নায়েক রাজ্জাককে অক্ষত অবস্থায় সত্তর ফিরিয়ে দেওয়া ওই দেশের দায়িত্ব। একই সঙ্গে আমাদের সীমান্তে যাতে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে না ঘটে, সরকারকে সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

ময়মুনার দ্বিতীয় বিয়ে by মাহবুব মোর্শেদ

হিট অ্যান্ড হট। এই ছিল ক্যাম্পাসের ময়মুনা। আলাদা লাইফস্টাইল, আলাদা আউটলুক। মাঝে মাঝে ইন্সপায়ারিংও মনে হতো। মিতুর রোলমডেল। বন্ধুত্ব অত গাঢ় না হলেও ময়মুনা আমারও ফেবারিট ছিল। ভালো সঙ্গী ছিলাম। অথচ ক্যাম্পাস ফুরাতে না-ফুরাতে ময়মুনা কীভাবে যেন আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে থাকল। হয়তো চোখের আড়ালে থেকে প্রভাব সঞ্চারের মতো ব্যক্তিত্ব ময়মুনা নয়। হয়তো আমিই হারিয়ে ফেলেছি। আমারই সমস্যা। তবু মাঝে মাঝে ময়মুনার কথা মনে হয়। ওর নামটা ময়মুনা না হয়ে সিলভি বা সিনথিয়াও তো হতে পারত। হলে ভালোই মানাত। আমরা ময়মুনাকে মুনা বলে ডাকতাম। ময়মুনা বলত, খল মি ময়মুনা। আয় লাভ মাই নেইম। আইম প্রাউড অব ইট। জিহ্বা জড়িয়ে ইংলিশ অ্যাকসেন্টে কথা বলত। বাংলাও তেমনই। এ লেভেল, ও লেভেল করা মেয়ে। জিনসের ওপর রেড, ব্লু অথবা ম্যাজেন্টা পরত বেশির ভাগ সময়। আমরা যখন সেমিজ ছাড়তে পারিনি, তখন ময়মুনা ওড়না ছাড়াই ঘুরে বেড়ায়। হলের মেয়েরা বলত, ওর অনেক ড্রেস কিন্তু ওড়না নেই একটাও। স্কিনি জিনস ছিল ওর প্রিয়। এখন ও রকম জিনসকে লেগিংসের অনুকরণে বলে জেনিংস। উইকএন্ডটা ঢাকার বাসায় কাটিয়ে মুনা যখন ক্যাম্পাসে ফিরত, তখন একটা চকলেট কালারের টয়োটা করোলা ওকে নামিয়ে দিত। এমন একটা মেয়ের নাম কী বুঝে যে ওর বাবা ময়মুনা রেখেছিল!
ক্যাম্পাস ছাড়ার পরপর ময়মুনা অস্ট্রেলিয়া চলে গেল। এডিলেডে এমএস করবে বলে। মনে হয় শেষ করেনি। মুনা ছিল অ্যাভারেজ ছাত্রী, স্টুডিয়াস হওয়ার কোনো লক্ষণ ওর মধ্যে কখনোই ছিল না। এরপর বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ নিয়েছিল। ক্যাম্পাসের পর ময়মুনার অতটুকু খবরই এসেছিল কানে। বিয়ে-থা নিয়ে কোনো কথা আমার কান পর্যন্ত আসেনি। এখন জানি, ময়মুনা ম্যানহাটনে থাকে। ইউএসএইডে কাজ করে। মাঝেমধ্যে ময়মুনার আপডেট টাইমলাইনে ভেসে আসে। আপডেট মানে ছবি। আইওএস ডিভাইস থেকে পোস্ট করা পিকস। নানা দেশের এয়ারপোর্টের ওয়েটিং লাউঞ্জে বসে সেলফি তোলে আর আপলোড করে। ছবিগুলো কমন, ওয়েস্টার্ন স্টাইল রপ্ত করা একটা এশিয়ান মেয়ে বড় বড় বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে সেলফি তোলে। দেখে মনে হয়, এটা ওর অবসেশন হয়ে গেছে।
যোগাযোগ বলতে ফেসবুকটুকই। আগে মনে হতো ক্যাম্পাসের বন্ধুদের হারিয়ে ফেলেছি। ময়মুনা, সোমা, মিতু কারও সঙ্গে আর দেখা হবে না। বছর পাঁচেক আগে এক বিকেলে সোমার ছবিটা খুব মনে করার চেষ্টা করছিলাম। কিছুতেই মনে পড়ল না। এত কাছের বন্ধু ছিল সোমা। অ্যালবামেও ওর কোনো ছবি খুঁজে পেলাম না। আগ বাড়িয়ে ভাবতে গিয়ে মনে মনে হাসছিলাম। আমরা তো দেখতে মহিলা হয়ে গেছি। রাস্তায় দেখা হলেও হয়তো সোমাকে চিনতে পারব না।
ময়মুনার ছবিটাও স্মৃতি থেকে মুছে গিয়েছিল। ফেসবুকে হঠাৎ কমন ফ্রেন্ডদের মধ্যে ওকে পেলাম। রিকোয়েস্ট পাঠানোর পর ময়মুনার সে কী উচ্ছ্বাস। বলে, দোস্ত, মোটা হয়ে যাচ্ছিস কেন? ওওর্ক আউট রেগুলার। ওয়াক, ওয়াক, ওয়াক। হুমম, পর্যন্ত বলে আমি থমকে থাকি। ময়মুনা যে কীভাবে এত স্লিম থাকল। সেই একই ফিগার। ফর্টি ক্রস করেছে কেউ ভাবতেই পারবে না। ময়মুনার স্লিম থাকা নিয়ে আমার মধ্যে খুব যে বিস্ময় কাজ করে তা নয়। বরং একটা দূরত্বই ফিল করি। ক্যাম্পাসে আমরা ছিলাম গ্রাম থেকে আসা মেয়ে। গায়ে ধুলার গন্ধ। পায়ে কাদা লেগে থাকা। সার্কেলে ময়মুনাই ছিল ব্যতিক্রম। কমপ্লিট আরবান।
ময়মুনা বুঝত, আমাদের মধ্যে সে-ই একমাত্র আরবান। আমরাও তো আরবানই হতে চাইতাম মনে মনে। গোপনে হোক বা প্রকাশ্যে ময়মুনার হাবভাব খেয়াল করতাম। ও বুঝেও না বোঝার ভান করত। এটাই ওর ভালো। এর বাইরে ময়মুনার এমন কিছু ছিল না যা আমার মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারত। এখন বরং ময়মুনার কথা মনে হলে হাসি পায়। আমি ওর নাম নিয়ে ভাবি। ওর নাম সিলভি বা সিনথিয়া হলেই বেশি মানাত। এই দুইটা নাম কোথা থেকে আমার মাথায় ঢুকেছে জানি না। পরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো স্মার্ট মেয়ের নাম কি সিলভি বা সিনথিয়া ছিল? মনে পড়ে না। ময়মুনার কথা মনে হলে তবু ওই দুইটা নাম মনে আসে। কোনো কো-ইনসিডেন্স আছে কি না জানি না। কাউকে জিজ্ঞেস করাও তো যায় না। ক্লাসমেটদের প্রতি সহজাত জেলাসি সবারই থাকে। সেখান থেকে কি আসে ব্যাপারটা? মিতু শুনলে বলবে, তোমার জেলাসি এখনো যায়নি। কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, ময়মুনাকে অত অ্যাট্রাকটিভ লাগে না আমার কখনোই।
ফেসবুকে ময়মুনা অনেক অ্যাকটিভ। সরকারি চাকরি করি বলে আমাদের প্রায় সবকিছুতেই মানা। স্ট্যাটাস দিতে পারি না। ছবি শেয়ারেও সাবধানী হতে হয়। শুধু লাইক দিই। শেয়ারও করি না তেমন। ময়মুনা হিথরো এয়ারপোর্টে সেলফি তুলেছে, চোখে পড়ল তো লাইক দিলাম। হয়তো ওয়াটার টাউন এয়ারপোর্টের সেলফি চোখেই পড়ল না। ওর টাইমলাইনে গিয়ে স্ট্যাটাস ঘাঁটাঘাঁটি করছি, চেক আউট-চেক ইন খেয়াল করছি এমন এখনো ঘটেনি। আর ঘাঁটলেও ময়মুনার পার্সোনাল লাইফ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু ফেসবুক থেকে জানা সম্ভব কি না জানি না। ইনবক্সে জিজ্ঞেস করা যায়। কিন্তু করা হয়নি কখনো।
অথচ ময়মুনার পার্সোনাল কিছু ব্যাপার এখন আমাকে তাড়া করে ফিরছে। গত মাসের ২৬ তারিখ সকালের ঘটনা। তারিখটা মনে আছে। এমনকি বারটাও। মনে থাকার কারণ ময়মুনা না। ওই দিন একটা জরুরি মিটিং ছিল প্ল্যানিং কমিশনে। অফিসে ফাইল গোছাচ্ছি। আগারগাঁও যেতে হবে। হঠাৎ আননোন নাম্বার থেকে একটা ফোন এল।
স্মৃতি, ইটস মাইমুনা।
আমি একটু উচ্ছ্বাস দেখিয়ে গলা চড়াতে যাব, অমনি ময়মুনা গম্ভীরভাবে বলল, ফ্রেন্ড! অল ইউ ডিড টু মি ইজ রং। ইউ গট ইট রং। শোনো, আমি সেকেন্ড ম্যারেজ করিনি। ইন ফ্যাক্ট আমি এর প্রয়োজনও এই মুহূর্তে অনুভব করছি না। এখন একটা টার্কিশ ছেলের সঙ্গে লিভ ইন করছি। না, কোনো পাকিস্তানিকে বিয়ে করিনি। অ্যানি প্রবলেম?
আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিছু বলতেও পারছিলাম না। ময়মুনা আমাকে ভুলে ফোন দেয়নি, সেটা বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কথাগুলো আমাকেই কেন বলছে, সেটা বুঝতে পারছিলাম না। আমি শুধু একটাই প্রশ্ন করলাম, তোমার বিয়েটা কি ভেঙে গেছে?
ইউ নো নাথিং, না? সবাইকে তো ঠিকই বলে বেড়াচ্ছ।
সেক্রেটারিয়েটের গেটে মাইক্রো অপেক্ষা করছে। বললাম, মুনা আমি একটু ব্যস্ত। তোমাকে পরে কলব্যাক করছি। এটাই তো তোমার নম্বর? একটু ফ্রি হয়েই...।
ময়মুনাকে বললাম বিজি। কিন্তু যে কাজে বিজি থাকার কথা সে কাজে আর মন বসছিল না। রাস্তায় যেতে যেতে ভাবছিলাম, ময়মুনার কী হয়েছে? স্বাভাবিকভাবে ওর একটা সংসার থাকার কথা। হয়তো ছিলও। একটা মেয়ে ছিল। নাকি ছেলে? সংসারটা ভেঙে গিয়েছে? কেন ভেঙে গেল? ডিভোর্স নাকি সেপারেশন? তারপর ময়মুনা কী করল? আর বিয়ে করেনি কেন? লিভ ইন করছে? এখন তো এ দেশেও করে লোকে। ময়মুনাও করতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে আমি কীভাবে এলাম?
ময়মুনার সংসার নিয়ে কমন ফ্রেন্ডদের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছিল বলে মনে পড়ে না। হলে মাথায় থাকত। তবে এটা ঠিক, ফেসবুকের নিউজফিডে ময়মুনার যত ছবি পাই, সবই ওর একার। ব্যাপারটা আগেই মাথায় খেলতে পারত। কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারতাম। করিনি।
ময়মুনার নম্বরটা ঢাকার। হয়তো কোনো পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়েছে। দ্বিতীয় বিয়ের ব্যাপারটা তখনই উঠেছে। ময়মুনা কি তাহলে পাকিস্তানি একজনকে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে? নাকি ও যা বলল সেটাই সত্যি, টার্কিশ একটা ছেলের সঙ্গে লিভ টুগেদার?
ময়মুনাদের ধানমন্ডির বাড়িতে একবার গিয়েছিলাম আমরা। আমি, সোমা, মিতু, সাদেক আর আসিফ। ওর বড় ভাইয়ের মেয়ের বার্থডে ছিল। অতটুকুই পারিবারিক হতে পেরেছিলাম। ময়মুনা শেষ পর্যন্ত কাকে বিয়ে করেছিল জানি না। ক্যাম্পাসের ছেলেদের ও পছন্দ করত না। কারও সঙ্গে প্রেম হয়নি নিশ্চিত। তবে মাঝে মাঝে দু-একজন ঢাকা থেকে আসত। হলের জানালা থেকে আমরা দেখতাম, মুনা কোনো দিন স্পোর্টস কার, কোনো দিন হোন্ডার পেছনে উঠে চলে যাচ্ছে। হলের গেট বন্ধ হওয়ার আগে তারা নামিয়েও দিয়ে যেত। তাদের কাউকে কি শেষ পর্যন্ত বিয়ে করেছিল? সত্যিই জানি না।
ফ্রি হতে হতে বিকেল হয়ে গেল। অফিস আওয়ার শেষ। রিকশায় শেখেরটেক ফিরতে ফিরতে মুনার নম্বরে কল করলাম।
ময়মুনা ধরেই বলল, প্লিজ স্মৃতি, প্লিজ। ডোন্ট পুট ইওর নোজ ইন মাই পার্সোনাল বিজনেস।
তুমি কি আমার কয়েকটা কথা শুনবে?
কী বলবা তুমি? বলো। শুনি।
শোনো, আমি আসলে জানিও না তোমার আগের বিয়েটা ভেঙে গেছে কি না।
আগের বিয়ে মানে কী? আমি প্রতিদিন একটা করে বিয়ে করে বেড়াচ্ছি নাকি। হোয়াট ডু ইউ মিন বাই আগের বিয়ে? তোমরা গ্রামের মেয়েরা বুঝলা চিন্তাভাবনায় সেই রকমই থেকে গেলা। শোনো, তোমাকে একটা কথাই জানানোর ছিল আমার। তুমি আমার পার্সোনাল ব্যাপার নিয়ে কোনো কমেন্ট করবা না।
ফোন কেটে দিল ময়মুনা।
অদ্ভুত একটা সমস্যা। আমি জানি না, এমন একটা বিষয় নিয়ে প্রায় সারা দিন ভাবছি। ময়মুনার অভিযোগটা গায়ে এসে লাগছে। পুরোটা সে বলছে না, আমার কথাও শুনছে না। ক্লাসমেট হিসেবে একটা অধিকারবোধ হয়তো তার আছে। কিন্তু এত দিন পর কথা হচ্ছে। মানুষ তো সাধারণ হাই-হ্যালো করার পর ঝগড়া শুরু করে। একটা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সুযোগ সে নিতে বা দিতে পারত।
বাসায় ফিরে মেয়েকে নাশতা দিয়ে, চা চাপিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসলাম। অনেক নোটিফিকেশন, মেসেজ। ফেসবুকে ময়মুনা ঢাকা এয়ারপোর্টে তোলা সেলফি দিয়েছে তিন দিন আগে। এরপর আর কিছু নেই। প্রথমবারের মতো ময়মুনার অ্যালবামগুলো দেখলাম মন দিয়ে। ওর পার্সোনাল লাইফের কোনো হিন্ট সেখানে নেই। আগে চাইলেও ফেসবুক থেকে কিছু জানতে পারতাম না।
ক্যাম্পাসে মিতু ছিল ময়মুনার সবচেয়ে কাছের। মিতু-ময়মুনা জুটি হয়ে গিয়েছিল। ওর দেখাদেখি মিতুও ক্যাম্পাসে কামিজের সঙ্গে জিনস পরা ধরেছিল। ওরা দুজন হাত ধরাধরি করে চৌরঙ্গী থেকে ট্রান্সপোর্টের দিকে যাচ্ছে—এ রকম একটা দৃশ্য মাঝে মাঝে আমার মনে পড়ে। দুজন দুজনের হাত হাতের ভেতর নিয়েছে। কেন এই দৃশ্যটা মনে পড়ে জানি না। ওরা দুজন বরাবরই কনট্রাস্ট। মিতু এখন পুরোদস্তুর গৃহিণী। ময়মুনাকে আগের মতোই ফলো করে। ঢাকা এয়ারপোর্টের ছবিতেও দেখলাম লাইক দিয়েছে। কমেন্ট একটাই, ওরই—সি ইউ সুন।
মিতুর টাইমলাইনে গিয়ে দেখলাম, এরই মধ্যে ওদের দেখা হয়েছে। বেলিসিমোতে আইসক্রিম খেতে খেতে তোলা আড্ডার সেলফিও পোস্ট করেছে। মিতুর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল, মাস দু-এক আগে। ওর ছোট ভাইকে সার্টিফিকেট সত্যায়িত করতে পাঠিয়েছিল। নম্বরটা আছে। ক্লাসমেট মিতু। হয়তো মিতু জানবে, কেন ময়মুনা আমার ওপর খেপেছে। হয়তো কেন, মিতু নিশ্চিতভাবেই জানবে। ময়মুনার সব আপডেট খেয়াল করে মিতু। ময়মুনার সংসার কবে ভাঙল। সেপারেশন না ডিভোর্স। ছেলেটা বা মেয়েটা এক্স হাজব্যান্ডের সঙ্গে থাকে নাকি ময়মুনার মায়ের কাছে। ময়মুনা কার সঙ্গে নাইট আউট করছে। টার্কিশ না পাকিস্তানি কার সঙ্গে বিয়ে বসছে। কার সঙ্গে লিভ ইন করছে।
হয়তো মিতুই আলাপে আলাপে ঝামেলাটা পাকিয়েছে। ময়মুনার পেট থেকে কথা বের করার জন্য বিয়ের খবরটা বলে টোপ ফেলেছে। পার্সোনাল ব্যাপারে ময়মুনা বেশ অ্যালার্ট। জিজ্ঞেস করেছে, তুমি কীভাবে জানলা। আমার নাম বলে দিয়েছে। অনেক ভেবেও মিতুকে ফোন দেব কি দেব না সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। রাতের রান্না বাকি। সাদেক ফিরেই মন দিল টিভির টকশোতে। মেয়ের ফার্স্ট সেমিস্টার কাল থেকে শুরু। রাতের রান্না শুধু না, সকালের জন্যও কিছু করে রাখতে হবে।
অফিস-বাসা করতে করতে ময়মুনার ব্যাপারটা প্রায় ফিকে হয়ে আসছিল। হঠাৎ পয়লা রমজানের আগের সন্ধ্যায় মিতুর ফোন। ফোনে ক্লাসমেট মিতু নামটা দেখার পর মনে হলো কী ব্যস্ত জীবন। প্রায় মাস গড়াতে চলল। ময়মুনা এত বাজে আচরণ করার পরও মিতা-ময়মুনা কাউকেই আর ফোন দেওয়া হয়নি। ফোনটা একটু গম্ভীর গলাতেই ধরলাম।
বন্ধু, তুমি তো ডিএস হয়েই গেলা। কিন্তু কাকে নিয়ে কী বলে বেড়াও কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। আর বললেও ঠিক খবরটা নিয়ে বলবা না? সরকার তোমাদের এত বড় বড় দায়িত্ব দিয়ে রেখেছে কি এমনি এমনি। এইটুকু রেসপনসিবিলিটি দিয়ে তোমরা দেশ চালাবা?
মিতু ফোন দিলে একাই বলে। আমি শুনছি কি না এটা ওর কাছে ম্যাটার করে না।
আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারলাম, কোন ব্যাপারটা বলো তো?
আরে আমাদের ময়মুনা। শোনো ময়মুনা পাকিস্তানি ছেলেকে বিয়ে করেছে—এটা সত্য নয়। ওর প্রেমিকটা আসলে টার্কিশই। কিন্তু লিভ ইনটা আসলে হেডলাইন না, দোস্ত। আসল খবর হলো, ময়মুনা কনসিভ করেছে। পেটে টার্কিশ বাচ্চা। ভাবতে পারো, আমাদের ক্লাসমেট লিভ ইন করে কনসিভ করে ফেলেছে। তার পেটে টার্কিশ বাচ্চা। সত্যি ময়মুনা আনপ্যারালাল। আমরা তো সেই তুলনায় কিছুই করতে পারলাম না দোস্ত। তবে এটা ঠিক, পার্সোনাল লাইফ নিয়ে বরাবরই খুব রিজার্ভ মেয়েটা। নিজে থেকে বলে না যে কেন, বললেই তো সবাই মিলে সেলিব্রেট করা যায়। টার্কিশ ছেলেদের দেখারই তো ভাগ্য হলো না আমাদের। আর দেখো ময়মুনা, পেটে টার্কিশ বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এয়ারপোর্টে ওর সেলফি দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। তাই তড়িঘড়ি দেখা করলাম। যা ভেবেছিলাম সত্যি। দেখেই বুঝেছি, চার মাস চলছে। সরাসরি তো জিজ্ঞেস করা যায় না। তাই তোমার রেফারেন্স দিলাম। খুব দুঃখ পেল। জানো, ময়মুনা হু হু করে কেঁদে দিল। কাঁদতে কাঁদতে সবই বলে দিল। খুব ভেঙে পড়েছে মেয়েটা। লিভ টুগেদারের বাচ্চা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ওর ফ্যামিলি। অ্যান্টিই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বলো, সেভেনটি আপ মা কোনো দিন মেয়ের এই অবস্থা মেনে নেবে? দেশটা তো এখনো ফ্রান্স বা ইতালি হয়ে যায়নি। অ্যান্টির সঙ্গে দেখা করেই চলে গেছে ময়মুনা। মা-মেয়ের তর্কে কোনো সমাধান হয়নি।
এক ফাঁকে মিতুকে জিজ্ঞেস করলাম, ময়মুনা জিজ্ঞেস করল না একবারও, ওর পার্সোনাল খবর আমি কীভাবে পেলাম?
করেছিল। আমি বলেছি ফেসবুকের যুগে কি কিছু আর গোপন থাকে। কানেকটিভিটির যুগ, ডিজিটাল বাংলাদেশ। এখন তো সবাই কানেকটিভিটিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। নরেন্দ্র মোদি এসেও তো সেই কথাই বললেন। আর সিলভি, সিনথিয়া বদমাশ দুইটা তো তোমার পেছনে লেগেই আছে। এই দুই বোনকে চেনো তো? ময়মুনার এক্স হাজব্যান্ড মামুনকে বিয়ে করেছে সিলভি। সিলভির ছোট বোন সিনথিয়া। বিশ্বসুন্দরী। তোমাদের ওদিকেই তো থাকে। সিলভির জীবনের মোেটা কি জানো? ময়মুনার লাইফটা হেল করে দেওয়া। ময়মুনার স্বামী আর মেয়েকে ভাগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তাতেও শেষ হয়নি। এখনো ওর পেছনে লেগে আছে। ম্যানহাটন পর্যন্ত গোয়েন্দা লাগানো ওর। সিলভিই ময়মুনার মাকে লিভ টুগেদারের বাচ্চার খবর দিয়েছে। খবর ছড়াতে আমাকেও ফোন দেয় রেগুলার। বাচ্চার কথা অবশ্য আমাকে সরাসরি বলেনি। আচ্ছা তুমি সিলভিকে চিনছ তো? ওই যে আমরা একবার ওদের ধানমন্ডির বাসায় গেলাম না? ময়মুনার বড় ভাইয়ের মেয়ের জন্মদিনে। সেখানে ময়মুনার ভাবির দুই বোন ছিল। মনে আছে?
নাহ্। মনে পড়ে না তো।
দেখেছ তুমি। মনে থাকার কথা।
নাহ্। মনে পড়ে না।
আচ্ছা। একটা কথা তো মনে থাকার কথা। ময়মুনার ভাবির নাম। এটা নিয়ে সেদিন অনেক কথা হয়েছিল। মনে আছে?
এবার মনে পড়ল আমার। ময়মুনার ভাবির নাম স্মৃতি। তিন বোন। স্মৃতি, সিলভি, সিনথিয়া। সবার বড় বোনের নাম স্মৃতি। উনিই ময়মুনার ভাবি, বড় ভাইয়ের বউ। কিন্তু আহামরি সুন্দরী কি ছিল সিনথিয়া? সাদেকের সঙ্গে ওই সময়টা খুব সমস্যা যাচ্ছিল আমার। হয়তো সে কারণে ভালো করে কিছু মনে নেই। অন্যমনস্ক ছিলাম। তবে এইটুকু মনে আছে, ময়মুনার বড় ভাবি আর আমার নাম মিলে যাওয়ায় সবাই একটু দুষ্টুমি করছিল।
ঝাপসা হয়ে গেছে।
মিতু বলে চলে, বুঝলা স্মৃতি, ময়মুনার কিছু খবর আমি স্মৃতির কাছেও পাই। তুমি স্মৃতি না। ময়মুনার বড় ভাবি স্মৃতি। খুব দুষ্ট প্রকৃতির মহিলা। তোমার নামেই নাম। তুমি কিছু মনে কোরো না, দোস্ত। একবার হয়েছে কি...।

রাজ্জাকের মুখে নির্যাতনের চিহ্ন

বাংলাদেশে ফিরে আসার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে
কথা বলেন রাজ্জাক। ছ​বি: গিয়াসউদ্দিন, টেকনাফ
অপহৃত হওয়ার ৮ দিন পর অবশেষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ- বিজিবির নায়েক আবদুুর রাজ্জাককে ফেরত দিল মিয়ানমার। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তিনি দেশে ফিরেছেন। কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর দিয়ে বিজিবির একটি দল তাকে নিয়ে দেশে পৌঁছায়। দেশে ফেরার পরও রাজ্জাকের মুখে নির্যাতনের চিহ্ন দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজ্জাকের প্রকাশিত ছবিতে দেখা গিয়েছিল জখমের চিহ্ন। হাতে ছিল তার হাতকড়া। নির্যাতন নিয়ে প্রশ্ন করলে রাজ্জাক কোনও জবাব দেননি। চুপ করে থেকেছেন। বিজিবি প্রধান বলেছেন, রাজ্জাকের নাকে নাসাকা বাহিনীর এক সদস্য কামড় দিয়েছিল। এর আগে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় ধস্তাধস্তি হয়। রাজ্জাক বর্তমানে বিজিবির টেকনাফ ক্যাম্পে রয়েছেন। এর আগে গতকাল সকালে বিজিবি ও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপির সঙ্গে পতাকা বৈঠক হয়। ওই বৈঠক শেষে বিকালে রাজ্জাককে বিজিবির প্রতিনিধি দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। গত ১৭ই জুন ভোরে বিজিবির ছয় সদস্যের একটি দল নায়েক রাজ্জাকের নেতৃত্বে নাফ নদীতে টহল দিচ্ছিল। এ সময় বাংলাদেশের জলসীমায় মাদক চোরাচালান সন্দেহে দুটি নৌকায় তল্লাশি করছিলেন তারা। এরই একপর্যায়ে মিয়ানমারের রইগ্যাদং ক্যাম্পের বিজিপির সদস্যরা একটি ট্রলারে করে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। বিজিপির সদস্যদের ট্রলারটিকে বাংলাদেশের জলসীমা ছেড়ে যেতে বলা হলে তারা নায়েক রাজ্জাককে জোর করে ট্রলারে তুলে নেয়। বিজিবির অন্য সদস্যরা এতে বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। এতে সিপাহী বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন। এই ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন শুরু হয়। কূটনৈতিক ও বিজিবির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও গত ৮ দিন ধরে নানা টালবাহানা করে বিজিবি। একপর্যায়ে মিয়ানমারের জলসীমা থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৫৫ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর শর্ত দিয়ে রাজ্জাককে ফেরত দিতে চায় তারা। অবশেষে বাংলাদেশের জোর তৎপরতার কোনও শর্ত ছাড়াই পতাক বৈঠকের মাধ্যমে রাজ্জাককে ফেরত দিতে রাজি হয় মিয়ানমার।
বিজিবি প্রধানের সংবাদ সম্মেলন: রাজ্জাককে নিজেদের হেফাজতে নেয়ার পর গতকাল বিকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশর সীমান্তের মধ্যে জাদিমোড়া নামক স্থান দিয়ে মিয়ানমার থেকে প্রচুর পরিমাণে ইয়াবা ট্যাবলেট পাচার হয়ে আসে। গত বছরে ওই স্থানে চোরাচালান হয়ে আসা প্রায় ১২ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট বিজিবির সদস্যরা আটক করে। বেশি পরিমাণে ইয়াবা ট্যাবলেট আটক করায় বিজিবির এক হাবিলদার লুৎফর রহমানকে পুরস্কৃত করা হয়। বিষয়টি মিয়ানমারের নাসাকা বাহিনী অবগত ছিল। গত ১৭ই জুন ওই স্থানে বিজিবির নায়েক রাজ্জাক একটি মাছ ধরার নৌকা তল্লাশি করছিলেন। এসময় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর  সদস্যরা সেখানে আসে এবং অতর্কিতভাবে ফায়ার শুরু করে রাজ্জাককে তুলে নিয়ে যায়। তারা ওই স্থানে বিজিবির হাবিলদার লুৎফর রহমানকে খুঁজছিল। বিজিবি প্রধান বলেন, ইয়াবা চোরাচালানের প্রতিরোধ করায় রাজ্জাককে অপহরণ করা হয়েছিল। গতকাল বিকালে রাজধানীর পিলখানায় বিজিবির সদর দপ্তরে মিয়ানমার কর্তৃক রাজ্জাককে ফেরত দেয়ার বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। আজিজ আহমেদ বলেন, আমরা সুস্পষ্টভাবে এখনও বলছি, বিজিবি’র নায়েক রাজ্জাক দেশের অভ্যন্তরে সীমানার মধ্যে থেকে একটি মাছ ধরার নৌকা তল্লাশি করছিল। এসময় মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর অতর্কিত গুলিতে বিজিবির সদস্য বিপ্লব আহত হয়। আর রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। গত ৯ দিন ধরে আমরা তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য বারবার মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছিলাম। কিন্তু, তারা বারবার আমাদেরকে জানায় যে, ঊর্ধ্বতন মহলের অনুমতি পেলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। এরপর দুপক্ষের পতাকা ও সমঝোতা বৈঠকের পর গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টায় তাকে মায়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী তাকে ফেরত দেয়। এসময় তারা ১টি রাইফেল, ২২ রাউন্ড গুলি, ১টি ওয়াকিটকি  ও ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ফেরত দিয়ে দেয়। রাজ্জাক বর্তমানে সুস্থ আছেন। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ার ছবি প্রকাশ পেয়েছে। বিষয়টি রাজ্জাক সেখানে দায়িত্বরত বিজিবির সদস্যদের জানিয়েছেন যে, ঘটনার দিন তিনি মাছ ধরার নৌকা তল্লাশি চালাচ্ছিলেন তখন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী সেখানে গিয়ে নৌকা তল্লাশিতে বাধা দেয়। এতে তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। পরে তারা তাকে নাফনদের ওপারে নিয়ে যায় এবং তাদের মিয়ানমানারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক সদস্য তার নাকে কামড় দেয়ায় তার নাক দিয়ে রক্ত বের হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর থেকে আমরা বিষয়টি শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করেছি। দুই প্রতিবেশী দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেন অটুক থাকে ওই বিষয়টি ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল কূটনীতিকভাবে সমস্যার সমাধানের করার। ঘটনার পর থেকে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্টদূতকে তলব করা হয় এবং এর কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। মিয়ানমারে বাংলাদেশের নিযুক্ত রাষ্টদূতও বিষয়টি ওই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিলেন।
রাজ্জাকের নাক দিয়ে রক্তঝরা ছবি ফেসবুকে আপলোড হওয়ায় দেশের ও বিজিবির মান ক্ষুণ্ন হয়েছে কি না- প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি ওই দেশের ঊর্ধ্বতন মহলকে জানানো হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকেও তদন্ত হচ্ছে, কারা সোশ্যাল মিডিয়ায় হান্ডক্যাপ পরিহিত অবস্থায় তার ছবিটি অ্যাপলোড করেছে। এই ঘটনার সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক না কেন তিনি তার শাস্তি দাবি জানান। দেশের বিভিন্ন দল বিজিবি’র সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিষয়টির ব্যাপারে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ১৯৮০ সালে যে ল্যান্ড বাউন্ডারি চুক্তি হয়েছিল ওই চুক্তি অনুযায়ী বিজিবির সদস্যরা নিয়মনীতি মেনে চলেন। কোন সাংঘর্ষিক নীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না। আমরা সবোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছি। বিজিবির আমাদের সক্ষমতা কেমন গত ২রা জুন বার্মা টাইমস নামে ওই দেশের প্রধান ইংরেজি দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ওই খবর পড়লে বোঝা যাবে যে আমাদের সক্ষমতা কেমন? অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, রাজ্জাকের সন্তান হওয়ার পরেই আমরা ব্যাটালিয়নের পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন সামগ্রী তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। সংবাদ সম্মেলনে এসময় বিজিবি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আমি সুস্থ আছি: অপহৃত হওয়ার আট দিন পর দেশে ফিরে আসা বিজিবির নায়েক আবদুর রাজ্জাক সুস্থ্‌ আছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার পর নায়েক রাজ্জাককে নিয়ে টেকনাফ ৪২ বিজিবির অধিনায়কের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা টেকনাফ স্থলবন্দরের পুলিশ ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে পৌঁছান। সেখান থেকে বিজিবির টেকনাফ সদর দপ্তরে রওনা হওয়ার আগে রাজ্জাক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি সুস্থ আছি।’ এসময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিজিবির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। রাজ্জাক যখন ফিরে আসেন সে সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যে বোট থেকে রাজ্জাককে পায়ে হেঁটেই ঘাটে উঠে আসতে দেখা যায়। বাহিনীর পোশাক পরিহিত রাজ্জাকের নাকে কাটা দাগ ছিল। ধরে নিয়ে যাওয়ার পর বিজিপি তাকে নির্যাতন করেছে কি না জানতে চাইলে তিনি চুপ করে থাকেন। নাকের ক্ষতের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বলেন, ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় কেটে গেছে। কক্সবাজার বিজিবির উপ অধিনায়ক মেজর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, বিকাল সোয়া ৪টার দিকে হস্তান্তরের পরপরই রাজ্জাককে পরীক্ষা করেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে থাকা মেডিক্যাল অফিসার মেজর মো. শাহ আলম। পরে তারা স্পিড বোটে করে দেশের পথে রওনা হন। তিনি সুস্থ আছেন।
পাঁচ ঘণ্টার পতাকা বৈঠক: এক সপ্তাহের অনিশ্চয়তার পর আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনতে গতকাল সকালে মিয়ানমারের মংডুর পথে রওনা হয় বিজিবির সাত সদস্যের প্রতিনিধি দল। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শুরু হয় পতাকা বৈঠক। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন টেকনাফ ৪২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আবুজার আল জাহিদ। মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ২ বর্ডার গার্ড পুলিশের লেফটেন্যান্ট কর্নেল থি হান। পতাকা বৈঠকের বিষয়ে বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে এ ধরনের ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বৈঠক শেষে নায়েক রাজ্জাকের ব্যক্তিগত অস্ত্র (এসএমজি), ম্যাগাজিন ও গোলাবারুদও বিজিপি ফেরত দিয়েছে। বৈঠকে নেতৃত্বদানকারী টেকনাফ ৪২ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. আবুজার আল জাহিদ মিয়ানমার থেকে ফিরে জানান, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও আন্তরিক পরিবেশে উভয় দেশের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অপহৃত নায়েক মো. আবদুুর রাজ্জাককে বিজিপি থেকে ফেরত  নেয়ার আগে মেডিক্যাল অফিসার কর্তৃক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় এবং তিনি সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন। পরে তাকে অধিনায়কের গাড়ি করে টেকনাফ ব্যাটালিয়নে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
৮ দিন পর হস্তান্তর: গত ১৭ই জুন ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে নাফ নদীতে গোলাগুলির পর বিজিবি সদস্য রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যায় বিজিপি। ওই ঘটনায় সিপাহী বিপ্লব নামে আরেক বিজিবি সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার দিন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থেকে এ ঘটনা ঘটেছে। রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমার থেকে সাড়া না পেয়ে পরদিন ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। অপহৃত বিজিবি সদস্যকে দ্রুত ফেরত পাঠাতে বলা হয় তাকে। অপরদিকে বিজিবির পক্ষ থেকে কয়েক দফা পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাড়া না পাওয়ায় বিষয়টি ঝুলে থাকে। টালবাহানা করতে থাকে মিয়ানমার। এরই মধ্যে বিজিপির ফেইসবুক পেজে নায়েক রাজ্জাকের দুটো ছবি প্রকাশ করা হয়, যাতে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাতকড়া হাতে দেখা গিয়েছে। এদিকে রাজ্জাকের স্ত্রীর আসমা বেগম গত রোববার সকালে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। বিষয়টি সংবাদ শিরোনাম হলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে মিয়ানমারের ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন একজন এমপি। একপর্যায়ে শর্তের বিনিময়ে রাজ্জাককে ফেরত দিতে রাজি হয় মিয়ানমার। তারা দাবি করে, মিয়ানমার উপকূলে পাচারকারীদের নৌকা থেকে উদ্ধার ৫৫৫ জনকেও বিজিবি সদস্য রাজ্জাকের সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিতে হবে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে গত মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার ‘অতিরিক্ত করছে’। ওই দিন সন্ধ্যায় বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ বৃহস্পতিবার পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে কোন শর্ত ছাড়াই রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। এর ধারাবাকিতায় ৮ দিন পর গতকাল পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে দেশে ফেরেন নায়েক রাজ্জাক।

বেকায়দায় দুই মন্ত্রী by দীন ইসলাম

বেকায়দায় পড়েছেন সরকারের প্রভাবশালী দুই মন্ত্রী। মহানগর আওয়ামী লীগের আলোচিত এ দুই নেতার মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা করছেন তাদের ঘনিষ্ঠজনরা। দুর্নীতির একটি মামলায় ১৩ বছরের সাজা থাকায় ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কারণ তিনি ২০০৮ সালে জ্ঞাত আয়ের বাইরে অবৈধভাবে ৬ কোটির বেশি টাকার সম্পদ অর্জনের মামলায় ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ২০১০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ শুধুমাত্র আইনি প্রশ্নে ওই রায় বাতিল করেন। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করে। ১৪ই জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে হাইকোর্টে আপিলের পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন। ফলে মায়ার বিরুদ্ধে ঢাকার বিশেষ আদালতে দেয়া ১৩ বছরের সাজা বহাল রয়েছে। গতকাল এ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আদেশের কপি প্রকাশিত হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, এ মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ জুডিশিয়াল মাইন্ড প্রয়োগ করেনি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৪ই জুন থেকে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্য পদ খারিজ হয়ে গেছে। এ ছাড়া গত বছর নারায়ণগঞ্জে চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনায় তার জামাতা র‌্যাবের কর্মকর্তা লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদের জড়িত থাকার ঘটনায় মায়া প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েন। ওই সময় জামাতাকে রক্ষায় মন্ত্রী মায়ার দেন-দরবার সরকারের উচ্চ মহলকে ক্ষুব্ধ করে। এদিকে ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত চার শ’ কোটি টাকার পচা গম আমদানি নিয়ে বেশ সমস্যার মধ্যে রয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। খাদ্যমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের বিবরণ এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেবিলে রয়েছে। সাবেক এক মন্ত্রী খাদ্য মন্ত্রণালয়ের গত দেড় বছরের অপকর্ম প্রধানমন্ত্রীকে রিপোর্ট আকারে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীও পচা গম সম্পর্কে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে স্যাম্পলসহ অভিযোগ পেয়ে খাদ্য সচিব মুশফেকা ইকফাৎকে তিরস্কার করেছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গমের নমুনা সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব গম কেনায় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এত কিছুর পরও গম কেলেঙ্কারির পক্ষে সাফাই গেয়ে চলছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন মতবিনিময় সভায় ব্রাজিলের গম সম্পর্কে বক্তব্য দিচ্ছেন। বলছেন নানা কথা। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কাছে খবর আছে ব্রাজিলের পর ফ্রান্স থেকেও পচা গম কিনছেন অ্যাডভোকেট কামরুল। খাদ্যমন্ত্রীর এসব কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এদিকে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচননে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের কাছে বেশ আলোচিত নাম। এ দুই জনের মধ্যে মন্ত্রী মায়া আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই মেয়র প্রার্থীর সরাসরি বিরোধিতা করেন। এ কারণেও তার ওপর অসন্তুষ্ট খোদ প্রধানমন্ত্রী ও দল। ওই বিরোধিতার সময় খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল তার সঙ্গী হন এমনটা বলছেন কেউ কেউ। দলের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, মায়া-কামরুলের বিরোধিতার কারণেই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগকে মরিয়া হতে হয়েছে। এসব কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ রয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে ওয়ান-ইলেভেনের ভূমিকার কারণে দফায় দফায় পুরস্কার পেয়ে পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। ২০০৯ সালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম এমপি প্রার্থী হিসেবে দলের মনোনয়ন এবং নির্বাচিত হয়েই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দ্বিতীয় মেয়াদে পদোন্নতি পেয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ  মন্ত্রী হন। কিন্তু শুরু থেকেই গম কেনা, নিয়োগ ও বদলিসহ নানা পদক্ষেপে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে শুরু করে। গেল দেড় বছরে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদ থেকে তিন অতিরিক্ত সচিবকে বদলি করিয়েছেন। তার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কারণেই তাদের সরিয়ে দিয়েছেন এমন অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ১২ই জানুয়ারি টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে। ওই দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২৯ মন্ত্রী, ১৭ প্রতিমন্ত্রী এবং ২ উপমন্ত্রী শপথ নেন। পরে আরেক দফা ২৫শে ফেব্রুয়ারি এএইচ মাহমুদ আলী ও নজরুল ইসলাম যথাক্রমে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর মন্ত্রিসভায় আর কোন পরিবর্তন বা অন্তর্ভুক্তি ঘটেনি। তবে হজ, ধর্ম ও সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে মন্ত্রিত্ব হারিয়ে জেলহাজতে তথা প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন আছেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।

শিফার অপহরণ রহস্য সিলেটে তোলপাড় by ওয়েছ খছরু

প্রবাসী বধূ ফারজানা আক্তার শিফার অপহরণ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার অন্ত নেই সিলেটে। সন্তানসহ বধূ অপহরণের ঘটনাকে ‘রহস্যময়’ বলে মনে করছে খালেদের সহকর্মীরা। কারণ, শিফা ও খালেদ বিয়ে করেছে বলে পালিয়ে যাওয়ার আগে খালেদ তাদের জানিয়েছিল। আর এ পথে পা না বাড়ানোর জন্য খালেদকে বারণ করেছিল তারা। কিন্তু শিফার চাপাচাপির কারণেই শেষ মুহূর্তে পালিয়ে যায় খালেদ। এমন তথ্য খালেদের সহকর্মীরা জানায়। কিন্তু ফারজানা আক্তার শিফা আদালতে যে বক্তব্য দিয়েছে তাতে স্পষ্টই উঠে এসেছে- ‘খালেদ তাকে অপহরণ করে গাজীপুরে নিয়ে যায় এবং সেখানে টানা এক সপ্তাহ খালেদ তার সঙ্গে সহবাস করেছে।’ আদালতে শিফা আরও জানিয়েছে, ‘বাসস্ট্যান্ড থেকে রিজার্ভ সিএনজিতে গাজীপুর তার বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে এক সপ্তাহ ছিলাম। জোরপূর্বক সে আমার সঙ্গে সহবাস করেছে। আমার মোবাইল, পাসপোর্ট নিয়ে যায়। ফলে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। সে তাবিজ দেয়। জ্ঞান ফিরে আসার পরই ওই তাবিজ গলায় দেখি। তারপর থেকেই আমি তার প্রতি দুর্বলতা অনুভব করতাম।’ শিফার এ বক্তব্য জানাজানি হওয়ার পর মোগলাবাজার এলাকায় তোলপাড় চলছে। খালেদের সহকর্মী সিএনজিচালক ও তার পরিবারের লোকজন জানিয়েছে, শিফা খালেদের প্রতি যে দুর্বল ছিল সেটি আদালতেই স্বীকার করেছে শিফা। আর এ বিষয়টি তিন মাস থেকে তারা জানতো। আর পালিয়ে যাওয়ার জন্য শিফা আগে থেকেই ব্যাংক থেকে টাকা তুলে রেখেছিল বলে জানায় তারা। এদিকে, গাজীপুর থেকে শিফা উদ্ধার, মেডিক্যালে ভর্তি, ২২ ধারা জবানবন্দির পর সংবাদ সম্মেলন করেছেন শিফার পিতা মো. আবদুল মান্নান। সিলেট জেলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মেয়ের সংসার রক্ষার্থে কুচক্রী মহলের সব ধরনের অপপ্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। মেয়ে ফারজানা আক্তার শিফা ও নাতি শাহী আহমদ শাফিকে টাকার লোভে সিএনজি অটোরিকশাচালক খালেদ ও তার সহযোগীরা অপহরণ করে। পুলিশ তাদের উদ্ধার করে এ ঘটনায় মোগলাবাজার থানায় খালেদসহ অন্যদের আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপহরণ মামলা করা হয়। এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য মামলার আসামি খালেদ ও তার আশ্রয়দাতারা আমার ও আমার মেয়ের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে। তারা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাল্পনিক মিথ্যা সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে, যা সমাজে আমার ও আমার মেয়ের মানসম্মান নষ্ট করার গভীর চক্রান্ত। সংবাদ সম্মেলনে মো. আবদুল মান্নান লিখিত বক্তব্যে বলেন, একটি কুচক্রী মহলের ইন্ধনে একই উপজেলার কন্দিয়ারচর গ্রামের মজুর মিয়া ও তার ছেলে খালেদ এবং তাদের সঙ্গে থাকা দুষ্কৃতকারীদের কারণে তার পরিবারের মানসম্মান হুমকির মুখে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে অনলাইন গণমাধ্যমে তার মেয়েকে জড়িয়ে হীন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে আবদুল মান্নান জানান, ১১ বছর আগে মোগলাবাজার থানার কান্দেবপুর গ্রামের মৃত মকবুল আলীর ছেলে মো. মজির উদ্দিন তালুকদারের সঙ্গে ফারজানা আক্তার শিফার পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ে হয়। মেয়ের জামাই বিদেশ যাওয়ার আগে বিবাদী খালেদ সিএনজিচালক হওয়ায় তাকে সরল বিশ্বাসে বাড়িঘরের বাজার খরচসহ ছেলেকে স্কুলে আনা-নেয়ার জন্য দায়িত্ব যায়। চতুর খালেদ এ সুযোগে আর্থিক লাভবান হওয়ার লোভ করে বসে। গত ৮ই জুন দুপুর ১টায় তার মেয়ে চৌধুরীবাজারে অবস্থিত পূবালী ব্যাংক শাখা থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করে স্বামীর বাড়ি যায়। পরদিন ৯ই জুন সকালে আমার মেয়ে ওই ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ও তার ছেলে শাহীকে নিয়ে শাহীর স্কুলগাড়িতে করে মোগলাবাজারের আল ইকমা কিন্ডারগার্টেনে যায়। পরে নাতির স্কুলছুটির পর শিফা মোগলাবাজারের গ্রিল ওয়ার্কশপ দোকানদার আনোয়ারকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেয়ার জন্য সেখানে যায়। গ্রিল ওয়ার্কশপ বন্ধ থাকায় শিফা টাকাগুলো থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দেয়ার জন্য সিএনজিচালক খালেদকে ফোন দিয়ে আসার জন্য বলে। সিএনজিচালক খালেদসহ অন্যরা সেখানে উপস্থিত হয়ে খালেদ ও তার সাথীরা শিফা ও তার ছেলেকে জোরপূর্বক অপহরণ করে নিয়ে যায়। সিএনজিচালক খালেদ তার ব্যবহৃত মোবাইল থেকে শিফার স্বামী মো. মজির উদ্দিন তালুকদারের কাছে বলে ‘তোর স্ত্রী ও ছেলে আমার কাছে আছে’- এ কথা বলে খালেদ ফোন কেটে দেয়। পরে মো. মজির উদ্দিন আমাকে বিষয়টি জানালে তিনি দ্রুত তার ছেলে জুবেলসহ কয়েকজনকে নিয়ে আল ইকমা কিন্ডারগার্টেনে এসে জানতে পারেন খালেদসহ অন্যরা শিফা ও তার ছেলেকে নিয়ে গেছে। আবদুল মান্নান এ ঘটনায় মোগলাবাজার থানায় খালেদসহ অন্যদের আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করি। অপহরণ ঘটনার ৪ দিন পর মেয়ের ভাসুরের ছেলে নাজিমের কাছে ফোন করে বলে তার কাছে কয়েকজন লোক ফোন করে জানিয়েছে শিফা ও তার ছেলের অবস্থানের তথ্য। আর এ তথ্য পেতে হলে ৫০ হাজার টাকা লাগবে বলে জানায়। পরে তিনি নাজিমকে ৫০ হাজার টাকা দেন। নাজিম টাকা নিয়ে যাওয়ার পর শিফা ও তার ছেলে ঢাকার গাজীপুরের কোনাবাড়িতে অবস্থান করছে বলে জানায়। পরে মোগলাবাজার থানা পুলিশ ১৭ই জুন ঢাকা থেকে শিফা ও তার ছেলে এবং অপহরণকারী খালেদকে সিলেট নিয়ে আসে। এদিকে, খালেদের সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা জানায়, শিফা খালেদকে ভালবাসত সেটি তারা জানতো। খালেদ তাদের সঙ্গে কথা বলেছে। বিয়েও হয়েছে বলে তারা জানতো এবং শিফার চাপাচাপির কারণেই এমনটি হয়েছে বলে দাবি করে তারা।
আদালতে যা বললেন শিফা: শিফা অপহরণের পর তার বাবা বাদী হয়ে এসএমপির মোগলাবাজার থানায় মামলা করেন। যার নং-০৭ (০৬)১৫ইং। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ই জুন এসএমপির মোগলাবাজার থানার পুলিশ অপহৃতাকে উদ্ধার করে গাজীপুর থেকে। উদ্ধারের পর আদালতে শিফাকে হাজির করলে সে ভিকটিম হিসেবে আদালতে জবানবন্দি দেয়। তার জবানবন্দিটি হুবহু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো: আমার স্বামী প্রবাসী। খালেদ একজন সিএনজিচালক। স্বামী দেশে এলে সব সময় খালেদের সিএনজি ব্যবহার করতেন। খালেদকে ভাই ডাকতেন। সেই সুবাদে খালেদ আমাকে ভাবি ডাকত। পারিবারিকভাবে তাদের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে আমিও যাতায়াতের ক্ষেত্রে তার সিএনজি ব্যবহার করতাম। স্বামী বিদেশে থেকে ফোন করে বলেন গ্যারেজের আনোয়ার চাচাকে ১ লাখ টাকা দিতে হবে। আমি বাবার বাড়ি থেকে আসার সময় ০৮.০৬.১৫ইং তারিখ প্রবাসী ব্যাংক থেকে রমজানের খরচাসহ হিসাব করে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করি। পরের দিন শাহী সাবাবরকে স্কুল থেকে নিয়ে সোয়া ১২টায় আনোয়ার চাচার গ্যারেজে গিয়ে তাকে না পেয়ে ফোন করি। ফোনেও পাইনি। ৮ তারিখ রাতেই অতিরিক্ত ৪০ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দিতে বলায় গ্যারেজ থেকে ব্যাংকে চলে যাই। বিদ্যুৎ না থাকায় টাকা জমা দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন আনোয়ার চাচা ফোন করে গ্যারেজে যেতে বললে আমি খালেদকে গাড়ি নিয়ে আসতে বলি। তখন খালেদের গাড়িতে সামনে কয়েকজন বসা ছিল, তাদের আমি চিনি না। আমি পানি খেতে চাইলে পানির বোতল এগিয়ে দেয়। পানি খাওয়ার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরে দেখি আমি এনা বাসে। বাস তখন ভৈরব ব্রিজ পার হচ্ছে। আমি এখানে কেন জিজ্ঞেস করাতে খালেদ জানায়, তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। আমি আমার পূর্বের স্বামীকে তালাক দিয়েছি। আমি অস্বীকার করলে আমার ছবিযুক্ত কাগজ দেখায়। সাড়ে তিন মাস আগে সে লোন নেয়ার জন্য আমার ছবি, আইডি কার্ডের ফটোকপি এবং সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছিল গ্যারান্টার হিসেবে। সেগুলো জাল করে এগুলো দেখায়। বাসের লোকজনকে আমি তার স্ত্রী বলে পরিচয় দেয়। গত ১৭ তারিখ পুলিশ গিয়ে আমাকে উদ্ধার করে। আমার বাবার বাড়ি চলে যেতে চাই।

জরুরি অবস্থার নিপীড়ন জানতেন না ইন্দিরা নাটের গুরু সঞ্জয়

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমলে জারি করা জরুরি অবস্থার বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না ইন্দিরা গান্ধীর। সব নিপীড়ন-নির্যাতনের নাটের গুরু ছিলেন তার ছেলে সঞ্জয় গান্ধী। আর সঞ্জয়ের সব কুকীর্তির সঙ্গী ছিলেন তার স্ত্রী মানেকা গান্ধী। এ ব্যাপারে ইন্দিরা গান্ধীর কোনো দায় নেই। ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত সেক্রেটারি আর কে ধাওয়ান এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন। বর্তমানে ৭০ বছরের অধিক বয়সী ধাওয়ান লিখেছেন,
১৯৭৫ সালের জানুয়ারির শুরুতে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এসএস রায় ইন্দিরা গান্ধীকে জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দেন। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত জরুরি অবস্থা জারি ছিল। ইন্দিরার জারি করা জরুরি অবস্থার সময়টি ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। সে সময় বিরোধী দলগুলোর শত শত নেতাকর্মীকে কারাবন্দি করা হয়। গণমাধ্যমের ওপর আরোপিত হয় কঠোর নিয়ন্ত্রণ। ধাওয়ানের মতে, এসবের খলনায়ক ছিলেন সঞ্জয় গান্ধী। আর মানেকা গান্ধী সবসময় তার সঙ্গী ছিলেন। সেকারণে তিনি দায় এড়াতে পারেন না। সেসময় বিজেপির অনেক নেতাকেই আটক করা হয়েছিল। অথচ সেই মানেকা এখন বিজেপির নেতা হয়ে মোদির মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন।

সিলেটে তাহের-পিংকির প্রেম-অভিসার by ওয়েছ খছরু ও জয়নাল আবেদীন

পিতা লন্ডন প্রবাসী। বাড়ি তদারকির জন্য রাখা  হয়েছিল যুবক তাহেরকে। মাসে-মাসে বেতনও দেয়া হতো তাকে। লন্ডনপ্রবাসী শিহাব মিয়া অগাদ বিশ্বাস করতেন তাকে। কিন্তু সেই বিশ্বাস শেষ মুহূর্তে আর টিকলো না। লন্ডনপ্রবাসী শিহাবের তরুণী মেয়ে পিংকিকে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে তাহের। এক সপ্তাহ আগের ঘটনা এটি। পহেলা রমজানের আগের রাতে। কাউকে না জানিয়ে পিংকি প্রেমিক তাহেরের সঙ্গে ঘর ছাড়ে। লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে এখন ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ওসমানীনগরে। পুরো নাম নাজিয়া আক্তার পিংকি। সিলেটের ওসমানীনগর থানার মোল্লাপাড়া গ্রামে বাড়ি। বয়স ১৮ কিংবা ১৯ বছর। সবেমাত্র যৌবনে পা দিয়েছে। এলাকার স্কুলে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করার পর আর এগোয়নি শিক্ষাজীবন। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, একাধিক প্রেম। বিষয়টি নজরে আসে সবার। জানাজানি হয় এলাকায়। এর ফলে এক সময় পড়ালেখা ইতি ঘটায় শিক্ষাজীবনে। আর তাহের মিয়া। বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পিয়ারগাঁওয়ে। তার পিতার নাম মৃত আবদুল জলিল। এলাকার লোকজন জানান, প্রবাসী শিহাব মিয়া ৫-৬ বছর আগে ‘ভিজিট ভিসা’য় লন্ডনে যান। এরপর তিনি আর দেশে ফিরে আসেননি। এই সময়ে বাড়িতে তার সংসার অনেকটা একা। এই সংসারের দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তাহেরকে। তাহের ছিল তাদের পরিবারের বিশ্বস্ত। এ কারণে তার উপর সংসারের দায়িত্ব ন্যস্ত করার পর সে নিজ বাড়ি জগন্নাথপুরের পিয়ারগাঁও থেকে এসে দেখভাল করতো। বাজার খরচ করে দিতো। বাড়ি যাওয়া- আসার সুবাদে তাহের ও পিংকির মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্ক ধীরে-ধীরে গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে। লুকিয়ে প্রেম করা, অভিসারে যাওয়া এসব বিষয় পরিবারের অন্য সদস্যদের চোখ এড়ায়নি। এভাবে টানা এক বছর তাদের মধ্যে চলে সম্পর্ক। এই এক বছর ধরে তাহের নিয়মিত বসবাস করছে প্রবাসী শিহাবের বাড়িতে। ফলে তারা দুইজন আরও কাছাকাছি চলে আসে। এদিকে, তাদের দুই জনের প্রেমের সম্পর্ক গভীর হলে বাদসাধে পরিবার। পরিবার তাদের সম্পর্কের বিষয়টি মেনে নেয়নি। প্রবাসে থাকা শিহাবও এ ঘটনায় রাগান্বিত হন। পরিবারের সম্মতি না মেলায় অবশেষে পহেলা রমজানের আগের রাতে তাহের ও পিংকি পা বাড়ায় অজানার উদ্দেশ্যে। এদিকে, তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর টনক নড়ে পরিবারের। ইতিমধ্যে তাদের ফিরিয়ে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে। জানা গেছে, পালিয়ে যাওয়ার পর বিয়ে করেছে একে অপরকে। এদিকে পিংকির পালিয়ে যাওয়ার পর দিন থেকে নিজের বাড়ি ছেড়ে পিত্রালয়ে অবস্থান করছেন পিংকির মা ফরিদা বেগম। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ। পারিবারিক সূত্র জানা গেছে, পিংকি পালিয়ে যাওয়ার পর পারিবারিকভাবে অশান্তি নেমে এসেছে। পুরো ঘটনার জন্য দায়ী করা হচ্ছে ফরিদা বেগমকে। এর আগেও এলাকার মানুষ পিংকিকে বন্দি রাখতে বারবার সাবধান করা হয়েছিল। কিন্তু কোনোটিই করেননি মা ফরিদা বেগম। এদিকে, গতকাল বিকালে স্থানীয় উমরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফারুক মিয়া মানবজমিনকে জানিয়েছেন, মোল্লাপাড়া গ্রামের শিহাবের মেয়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও তিনি শুনেছেন। এদিকে, স্থানীয় মেম্বার সোনাফর আলীও একই কথা জানিয়েছেন। তবে, ওসমানীনগর থানার ওসি মোরছালিন জানান, এ বিষয়ে এখনো কোন অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। পারিবারিক সূত্র জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে এতো সহজেই মামলা মোকদ্দমায় যেতে চাচ্ছে না পরিবার। বিষয়টিকে তারা সামাজিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন। ওসমানীনগর থানার রাজনৈতিক নেতারাও সেটিকে ঘরোয়াভাবে সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু গতকাল রাত পর্যন্ত তাদের সেই আহবানে সাড়া দেয়নি তাহের ও পিংকি।

মা ও শিশুর অলৌকিক রক্ষা!

উদ্ধারকর্মীর কোলে শিশু ইয়ুদিয়ের মরিয়েনো। ছবি: এএফপি
উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পর তরুণী মা ও শিশু সন্তানের হদিস নেই। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। না, কোত্থাও নেই। সবাই ধরে নিয়েছিল আর কোনো দিন ফিরবে না তারা। কয়েক দিন পর, গতকাল বুধবার এক জঙ্গলে পাওয়া গেল দুজনকে। বেঁচে আছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এ অলৌকিক ঘটনা ছাড়া কিছুই নয়।
আজ বৃহস্পতিবার এএফপির খবরে জানানো হয়, কলম্বিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় নিবিড় জঙ্গল থেকে মা নেলি মুরিলো (১৮) ও তাঁর এক বছরের কম বয়সী শিশুপুত্র ইয়ুদিয়ের মরিয়েনোকে উদ্ধার করা হয়। গত শনিবার ওই এলাকার আকাশে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। এতে পাইলট নিহত হন। নিখোঁজ হন মা ও শিশু।
উদ্ধারের পর মা নেলি মুরিলো। ছবি: এএফপি
এ ঘটনা সম্পর্কে কলম্বিয়ার বিমান বাহিনীর কমান্ডার কর্নেল হেক্টর কারাসকেল বলেন, ‘এটি একটি অলৌকিক ঘটনা। এলাকাটি বেশ জঙ্গুলে। দুর্ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ।’
কর্নেল হেক্টরের ভাষ্য, ‘মায়ের মানসিক শক্তিই শিশুটিকে বেঁচে থাকার শক্তি জুগিয়েছে।’
এই সামরিক কর্মকর্তা জানান, উদ্ধারের পর মা ও শিশুকে হেলিকপ্টারে করে কাছের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বেঁচে থাকার ঘটনায় বিস্মিত তিনি।
কলম্বিয়ার বিমান বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ওই নারী সামান্য আহত হয়েছেন। শিশুটিকে দেখে মনে হয়েছে তার তেমন কিছু হয়নি।
কলম্বিয়ার জঙ্গলে বিধ্বস্ত উড়োজাহাজ। ছবি: এএফপি

মানব সত্তার সিঁড়িতে ওঠা by হোসনে আরা

আমার প্রিয় লেখক মোতাহার হোসেন চৌধুরী মানুষের জীবনকে একটি দোতলা ঘরের সাথে তুলনা করেছেন। জীব সত্তা সেই ঘরের নিচের তলা। আর মানব সত্তা তথা মনুষ্যত্ব ঘরটির দোতলা। এই জীব সত্তার মানুষগুলোকে লেখক ব্যক্তিগত লোভ লালসাপূর্ণ এমন একটি ঘরের বাসিন্দা বলেছেন, যাদের চাওয়ার কোন শেষ নেই। এরা হিংসা বিদ্বেষ, ক্রোধ, প্রতিহিংসা, পরনিন্দা, পরশ্রিকাতরতা, অহংবোধ, ঝগড়াটে, লোভী, মিথ্যেবাদী- এসব দোষের কালো থাবার এক হায়েনা। এই মানুষ গুলো পশুসম। আমার বিবেকের নিউক্লিয়াস থেকে মনে হচ্ছে এরা পশুর চেয়ে অধম। এক কথায় বড় বড় নাম না জানা সাপ। এদের নিশ্বাসে ভেতরে অক্সিজেন প্রবেশ করলেও সেটি মানুষটির রক্তের সাথে, মগজের সাথে, ধমনীর সাথে, শিরা উপশিরা এবং হৃদপিন্ডের সাথে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও বিষ বাষ্প বের করে। এই শ্রেণীর শুধু প্রাণই আছে। মন মনন বিবেক বলে কিছু নেই। শিক্ষিত-অশিক্ষিত নারী-পুরুষ ধনী-দরিদ্র সব শ্রেণীর মানুষ এই দলের অন্তর্ভূক্ত। এরা মুখে মধু অন্তরে বিষ। আবার কারো কারো অন্তরেও বিষ মুখেও বিষ। আচার ব্যবহার কথা বার্তা কাজে কর্মে চলনে বলনে প্রতিনিয়ত এদের বিষ বাষ্প নির্গত হয়।
এই মানুষদের মনে কোন শান্তি নেই। একটা অস্থিরতা তাদের সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়। অর্থ সাধনাই তাদের জীবন সাধনা। ভ্রান্ত শিক্ষা এবং পারিবারিক প্রশিক্ষণহীনতা এই তলার মানুষগুলোকে এমনই বিশৃঙ্খলা করে দেয় যে, তারা অনেকটা জাতে মাতাল তালে ঠিক। মুক্ত ঘণ নীল আকাশ, নি:সীম নীলিমা, সাগরের অবারিত জলরাশি, সবুজের সমারোহ- মহান স্রষ্টার এতসব নেয়ামত তাদের মনে অনুরণণ তোলে না। লেখক জীব সত্তার মানুষ গুলোকে দোতলায় উঠাবার প্রধান নিয়ামক হিসেবে শিক্ষাকে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু আমার মনটা এটাতে সায় দেয় না। বরঞ্চ শিক্ষার পাশাপাশি যে বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি তা হচ্ছে একটি কঠোর পারিবারিক প্রশিক্ষণ। এই পারিবারিক শিক্ষা তথা প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক নামধারী শিক্ষিত ব্যক্তিরা এখনো জীব সত্তায় বসবাস করছেন। সাধারণ সৌজন্যবোধটুকু তাদের যেন নেই। নির্লোভ-ব্যক্তি মানসের অন্যতম গুণের একটি। এই গুণটি হতে অন্যান্য গুণগুলো উৎসারিত হয়। লোভী মানুষের মাঝেই রয়েছে স্বার্থপরতা, হিংসা, প্রতিহিংসা। অহংকারের ধুম্রজালে তারা অন্যমানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করে না। মহান স্রষ্টা এই বিশ্বভ্রক্ষ্মান্ডটাকে সৃষ্টি করেছেন একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে। পৃথিবী মানুষের জন্য একটি পরীক্ষাগার। এখানে তার অবস্থান অত্যন্ত স্বল্পকালের। এই অস্থায়ী পৃথিবীতে সামান্য স্থায়ীত্বের কথা ভেবে আমাদের চলে কতই না আয়োজন-নিয়োজন। বৈধ অবৈধ যেভাবে পারি আমরা টাকা কামাইয়ের নেশায় মত্ত থাকি। ভুলে যাই মা-বাবা ভাই বোন, গরিব আত্মীয়-স্বজনকে। যদি একবার বিবেক দিয়ে ভাবি আমাদের প্রতিটি কাজের হিসাব আল্লাহ তায়ালা নেবেন, তাহলে মনে হয় আমরা আখিরাতের জন্য কামাইয়ের চিন্তা করতাম। প্রতিটি কাজই ইবাদত সম-যদি তা ধর্মীয় অনুশাসনে থাকে এবং বৈধ হয়। একটু মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করলেই আমরা অনেক ভাল কাজ করতে পারি। অন্যায় অবৈধতা থেকে দূরে থাকতে পারি। ভাল কথা বলা, ভাল কাজ করা, ভাল চিন্তা করা, নারী ও শিশুদের প্রতি অবিচার না করা, পরিশ্রম করা , পরিশ্রমের মূল্য দেয়া, হালাল কামাইয়ের খাবার গ্রহণ করা, ইসলামের বর্জনীয় খাবারগুলো না খাওয়া, সদুপদেশ দেয়া, কারো নামে মিথ্যা তথ্য প্রচার না করা, কাউকে যাঁতাকলে নিষ্পেষিত না করা, নিজের জন্য যেটা পছন্দ করি অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্যেও তা করা, ওজনে কম না দেয়া, কথা দিয়ে কথা রাখা, না রাখতে পারলে আগে থেকেই বলে দেয়া, নিরপেক্ষ বিচার করা, মনের মহানুভবতা সৃষ্টি করা, অহেতুক মানুষকে কষ্ট না দেয়া, ধনী গরিব উঁচু নিচু- সবাইকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয়া- এসব কিছুই ভাল মানুষের গুণাবলী।
ভাল হতে গেলে, টাকা পয়সা  ধন দৌলত লাগে না। মনের ইচ্ছা শক্তিটাই যথেষ্ট। বেশি মাত্রায় কথা বলা উচিত নয়। এতে মুখে ফালতু কথা এসে যেতে পারে। সর্বাগ্রে মিথ্যা পরিত্যাগ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মিথ্যাই সকল পাপের জননী। কথায় কথায় বাহাদূরী আর কসম খাওয়া ঠিক নয়। যে কাজ বা কথাটির জন্য কসম খাওয়া হল সেটি ভঙ্গ হলে কাফফারা দিতে হয়। পরনিন্দুক ব্যক্তি মহাপাপী। বয়সে মুরুব্বীদের সম্মান করতে হবে। পাশাপাশি ছোটদের ¯েœহ দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে পদমর্যাদা তথা বয়ষ্কদের সম্মান দিয়ে কথা বলা উচিত। নিজেকে ফেতনা ফ্যাসাদ থেকে যথাসম্ভব দূরে রাখতে হবে। সামর্থ্য থাকলে কার্পন্য করা ঠিক নয়। নিজের দুটো হাত, মুখ এবং শক্তি দ্বারা অপরকে প্রবঞ্চনা করা ঠিক নয়। ইবলিশ ও কুপ্রবৃত্তি মানুসের চরম শত্রু। নফস বা কুপ্রবৃত্তি দূর করা যদিও কঠিন, তবুও নিজের প্রয়োজনেই তা করতে হবে।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) আমাদের জীবনের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারেন। তিনি ছিলেন, বিশ্বমানবের ত্রাণকর্তা। মানব চরিত্রের যত মহৎ গুণ থাকতে পারে, তার চরিত্রে  সে সমস্ত গুণের সমাবেশ ঘটেছে। দরিদ্র এতিম অবস্থা থেকে রাজ্য শাসকের মযাদায় আসীন হয়েও একটি মুহূর্তের জন্যও তিনি বিশ্বাসচ্যুত হন নি। অতি কিশোর বয়সে তিনি সত্যবাদীতার জন্য আলামীন খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। বর্তামানে একটু অর্থ বিত্তের ছোঁয়া পেলে আমরা ভুলে যাই নিজের অতীত। নিজের হাতে কোন কাজ করতে চাই না। টাকার অহমিকায় কিংবা ক্ষমতার দম্ভে কেনা গোলাম ব্যবহার করি। মনে মনে ভাবি, সূর্যোদয় থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত গোলামটি আমার হাত পা টেপা থেকে শুরু করে খাওয়াটি পর্যন্ত গিলিয়ে দেবে। এখনও অনেক গৃহকর্তা এবং কর্তৃ নূন্যতম ভুলের জন্য দাস-দাসীর শরীরে আগুণের ছ্যাঁকা দেয়। হাতে প্রহার করে, লাঠি পেটা করে। আর তা না হলে মা-বাবা তুলে গালমন্দ করে। ভুলে যায় তারাও মানুষ। হাদীসে এসেছে “মজুরের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।” মহানবী তাঁর বিদায় হজে দাস দাসী সম্পর্কে বলেছেন, তোমরা দাস দাসীদের প্রতি সদয় ব্যবহার কর। তাদেরকে নির্যাতন করবার অধিকার তোমাদের নেই। নিজেরা যা খাও, যে বস্ত্র পরিধান কর, তাদেরকেও অনুরূপ খাদ্য ও বস্ত্র দান করবে। ”
সে সময় প্রাচীণ গ্রীস, রোমান ইহুদী ও খ্রিস্টান জগতে বিশেষ করে আরব সমাজে দাস প্রথা প্রচলিত ছিল। মনিবগণ ছিলেন, গোলামদের জীবন মরণের প্রভু। সেজন্য তাদের প্রতি অমানুষিক অত্যাচার করতে তারা অভ্যস্ত ছিলেন। মানুষ হিসেবে গোলামদের কোন স্বীকৃতি ছিল না। দাসদাসীরা তখন পণ্যের মত বাজারে বেচা কেনা হতো। মহানবী (স:) দাস প্রথার উচ্ছেদ সাধণ করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, “গোলামকে আজাদী দানের চেয়ে, শ্রেষ্ঠতর কাজ আল্লাহর কাজে আর কিছু নেই। ” গোলামীর কথাটি এখানে এ কারণে এসেছে যে, এই এক বিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা আইয়ামে জাহেলিয়া যুগের মত আচরণ করছি। মানুষের উচিত সার্বক্ষণিক মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। মহানবী (স:) বলেছেন, “চোখের পলক ফেলতে পারবো কি পারবো না এর ভেতর দিয়ে মৃত্যু এসে যেতে পারে।” আল্লাহ পাকের পরিচয় খুঁজতে আমাদের অনেক দূরে যেতে হবে না। আমাদের শরীরের গঠনের দিকে তাকালেই যদি চিন্তা করি কোন সত্তা আমাদের চলার জন্য দুটো পা দিয়েছেন দেখবার জন্য দুটো চোখ দিয়েছেন- তাহলেই আল্লাহ পাকের পরিচয় জানা যাবে। যে ব্যক্তি নিজেকে চিনতে পেরেছে সে প্রভুকে চিনতে পেরেছে। সূরা আত-তীনের উদ্বৃতি দিয়ে বলা যায়- (১) আল্লাহ তায়ালা মানুষকে অতি উত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। যথাযথই মানুষের গঠন অতুলনীয়। (২) অতি সুন্দর আকৃতিতে তৈরী করবার পর তিনি মানুষকে দিয়েছেন জ্ঞান। এই জ্ঞানের বলেই সে সমগ্র সৃষ্টির সেরা বিবেচিত হয়েছে। তার চেয়ে অধিক শক্তির অধিকারীকে নিজের অনুগত করেছে। (৩) যখন মানুষ নিজ দেহ ও শক্তিকে অন্যায় ও পাপের কাজে প্রয়োগ করে, তখন সে ধীরে ধীরে অধ:পতনের এমন অতল তলে নিমজ্জিত হয়, যার নীচে আর কোন স্তর নেই। লোভ লালসা, কামনা বাসনা, হিংসাদেশ, ক্রোধ মানুষকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে দেয়। মানুষের এই হিংস্রতা ও বর্বরতার সাথে কোন হিংস্র জন্তুর তুলনা হয় না।
(৪) মহান আল্লাহ অপরাধীকে কঠিন শাস্তি এবং পূণ্যবান ব্যক্তিকে কল্পনাতীত পুরস্কারের ব্যবস্থা করবেন।
প্রকৃতিতে আটদশটা প্রাণী আপন গতিতে বনের লতাপাতা খেয়ে বড় হয়ে উঠে। এই পশূকূল অন্য প্রাণী ধরে খায়। কখনো মানুষকেও গিলে খায়। এরা যেখানে সেখানে অবাধে চলাফেরা করতে পারে। এদের খাওয়া দাওয়ায় হারাম হালালের ব্যবস্থা নেই। এদের দায়িত্ববোধ নেই। মা-বাবাকে দেখা লাগে না, ছোট ভাই বোনকে লালন পালন করতে হয় না। বিবেক খাটিয়ে কিছু করতে হয় না, কাউকে কথা দিয়ে কথা রাখতে হয় না। মানবকূলের কোন স্বচছল পরিবারে যাদের জন্ম সে পরিবারের সদস্যদের লালন পালন করতে, লেখাপড়া করাতে, শিক্ষিত বানাতে পিতা-মাতার অনেক অর্থব্যয়, শ্রম ব্যয় এবং সময় ব্যয় হয়। কিন্তু যদি মানবিক গুণ সম্পন্ন করে সন্তানকে গড়ে তোলা না যায়, তাহলে ঐ পশুর মতই বেড়া ওঠাই হবে, আর জীব সত্তাতেই অবস্থান করতে হবে।
জীবন দোতলা অর্থাৎ মানব সত্তা তথা মনুষ্যত্ব লোকে ওঠা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। লেখক এক পর্যায়ে বলেছেন, “শিক্ষার মূল লক্ষ্য জ্ঞান বিতরণ নয়, মূল্যবোধ সৃষ্টি।” মানব সত্তায় পৌছে, একজন মানুষ বুঝতে পারে অর্থ সাধনার চেয়ে জীবন সাধনা অনেক বড়। আর জীবন সাধণাতেই অন্তরের মুক্তি। প্রকৃত শিক্ষিত লোক যখন, মনুষ্যত্বর স্বাদ পায় তখন সে বোঝে, লোভে পাপ, পাপে মরণ,- নিছক কোন বুলি নয় বাস্তব সত্য। লোভের কারণে মানুষের আত্মিক মৃত্যু ঘটে। অনুভূতির রাজ্যে সে হয়ে পড়ে নি:স্ব রিক্ত। মানব সত্তার মানুষেরা লোভের ফাঁদে পা রাখতে ভয় পায়। আসলে শিক্ষা মানুষের বাইরের ব্যাপার নয়, মনের ব্যাপার। অর্থ কামাই করতে এম এ পাস লোকের প্রয়োজন নেই। যে শিক্ষা মানুষের মোহ মুক্তি ঘটিয়ে, জৈবিক চাহিদা ছাড়িয়ে, মনুষ্যত্বের সাথে পরিচিত করে- সেটাই প্রকৃত শিক্ষা। লেফাফা দুরস্তি আর শিক্ষা এক কথা নয়। সুতরাং আর দেরী না করে আসুন আমরা এই পবিত্র রমজান মাসে মানব সত্তার সিঁড়িতে পা রাখি। কারণ হাতে সময় কম। আমরা অতি দ্রুত মৃত্যু নামক নির্মম সত্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কার ভাগ্যে কখন ডংকা বাজবে, সে তো জানেন মহান সৃষ্টিকর্তা।
লেখক
সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, গ্রামীণ ব্যাংক
জোনাল অফিস, নোয়াখালী।

সু চির নতুন কর্মসূচি কী

৭০ বছরে পা দিলেন অং সান সু চি। জন্মদিনে কেক কাটছেন
তিনি। এ বছর সু চিকে বেশ কিছু নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন
হতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ছবি: এএফপি
মিয়ানমারের রাজনীতির নানা ঘটনায় আলোচ্যসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে এখন নোবেলজয়ী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি। এর আগে গণতন্ত্রের পথে সরব থেকে সু চি আলোচনায় এসেছেন। এখন তাঁকে নিয়ে কানাঘুষা তিনি নীরব বলে। জান্তা ও ভিন্ন গোষ্ঠীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা দলে দলে দেশ ছাড়ছে, অভিবাসী হতে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে পড়ছে নানা দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনায়। কিন্তু এ মানবিক বিষয়ে কোনো সাড়া নেই সু চির। জান্তার নানা কর্মকাণ্ডেও কোনো মন্তব্য নেই তাঁর। কেন তাঁর মৌনতা? সম্প্রতি এএফপির এক প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়, মিয়ানমারের আসন্ন নির্বাচন ও প্রেসিডেন্ট পদে যাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন সু চি। দলে নিজের কোনো উত্তরসূরি তৈরি না করায় সমালোচিত হচ্ছেন তিনি। কী করবেন, কী সিদ্ধান্ত নেবেন—এ নিয়ে ভুগছেন দোনামোনায়।
মিয়ানমারে চলতি বছরে অক্টোবর বা নভেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। গত কয়েক দশকের জান্তার শাসনের পর গণতান্ত্রিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে এ নির্বাচনকে। তবে ওই নির্বাচনে সু চির ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) জয় পেলেও সংবিধান অনুযায়ী সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। দেশটির সংবিধানে বিদেশি স্বামী-স্ত্রী বা সন্তান থাকা ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সু চির স্বামী ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন। দুই ছেলেও তাই।
সু চি গত রোববার রাজধানী ইয়াঙ্গুনে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দুদিনব্যাপী সম্মেলনের শুরুতে দেওয়া ভাষণে বলেন, চলতি বছরের শেষের দিকে ওই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে তাঁর দল এনএলডি অংশ নেবে কি না, এ ব্যাপারে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার ব্যাপারে জান্তার শাসনামলের এই সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করে আসছে এনএলডি। বিশ্লেষক মায়েল রেনড বলেন, সংবিধানের ওই বিতর্কিত ধারাকে উপেক্ষা করেও সু চি শীর্ষ ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু মিয়ানমারের প্রবীণ ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা বিষয়টিকে কীভাবে নেবেন, এটিও গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের জান্তা সরকার নিয়ন্ত্রিত সেনাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন দল যে সু চিকে সহজে মেনে নেবে না, তা বলাই বাহুল্য। সু চিকে আটকাতে সংবিধানের এই ধারা কোনোভাবেই বদলাতে চায় না জান্তার প্রভাব বলয়ে থাকা সরকার। দেশটির সেনাবাহিনী পার্লামেন্টের এক চতুর্থাংশ আসনের দখল নিয়েছে। পার্লামেন্টের সদস্যরা সংবিধানে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনার ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে।
সু চির জনপ্রিয়তায় ভয় পেয়ে বছরের পর বছর তাঁকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল মিয়ানমারের জান্তা সরকার। তবে জান্তার সঙ্গে এখনই কোনো সংঘর্ষে যেতে রাজি নন সু চি। বরং তিনি সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চান। এভাবেই সম্ভবত সু চি সরকারের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে থাকতে চান। তিনি শান্তিপূর্ণ বিরোধী দল হিসেবে এনএলডির অবস্থান ও ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চান। এই মধ্যপন্থী ভূমিকার কারণে সমালোচনার মুখে পড়ছেন সু চি। পোড় খাওয়া সু চির আগের সাহসী ভূমিকার সঙ্গে এই সমঝোতাপূর্ণ মানসিকতাকে অনেকে মেলাতে পারছেন না।
গত শুক্রবার সু চির জন্মদিনে ভিডিও বার্তায় তিনি ‘পরিচ্ছন্ন রাজনীতি’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী এই নেত্রী বলেন, ‘কেবল পরিচ্ছন্ন রাজনীতি নিশ্চিত করতে পারলেই দেশের শান্তিপূর্ণ উন্নয়ন সম্ভব।’ তবে গণতন্ত্রের পক্ষে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে অসামান্য অবদান রাখলেও মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নিপীড়নে পরিষ্কার অবস্থান না নেওয়ায় আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি। সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সু চি বললেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে খুব সাবধানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মিয়ানমারের নিপীড়িত সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানিয়েছেন সু চি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকাকে বলেন, সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে ‘খুব সতর্ক’ থাকতে হবে। সু চির এমন নরম ভূমিকায় অনেকে সমালোচনার ঝড় তুলেছেন।
সু চিকে নিয়ে সমালোচনার আরেকটি কারণ হলো, নিজ দল এনএলডির মধ্যে সু চি যোগ্য কোনো উত্তরসূরি তৈরি করতে পারেননি। অর্থাৎ, প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য এনএলডিতে সু চি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। অবশ্য এনএলডিতে সু চির সমকক্ষ ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন। এর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। সু চির বাবা মিয়ানমারের অবিসংবাদিত স্বাধীনতাকামী নেতা। এ রকম একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির মেয়ে হিসেবে সু চির ভাবমূর্তি একেবারেই অন্যরকম। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মহলেও সু চির যথেষ্ট জনপ্রিয়তা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও সু চির ভক্ত। সু চির মতো এমন ভাবমূর্তি মিয়ানমারের আর কোনো রাজনৈতিক নেতা বা দলের নেই। জীবনীলেখক পিটার পপহ্যামের মতে, সু চির সমকক্ষ আর কেউ নেই। মিয়ানমারের সাধারণ জনগণের মনে সু চির প্রতি যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা, তা আর কারও পক্ষে অর্জন করা সময়সাপেক্ষ ও কঠিন ব্যাপার। মিয়ানমারের রাস্তায় নামলেও এ কথার প্রমাণ মেলে। ইয়াঙ্গুনের গাড়িচালক ওয়াই লিন বলেন, সু চির মতো কেউ নেই।
মিয়ানমারে সু চির এই ভাবমূর্তি গড়ে ওঠার পেছনে তাঁর জীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষাও অনেকটা ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮৮ সালে অসুস্থ মায়ের সেবা করতে যুক্তরাজ্য থেকে মিয়ানমারে আসেন সু চি। এর পরই জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ উত্তাল হয়ে ওঠে। জান্তা প্রভাবিত সরকারের বিরুদ্ধে ওই লড়াইয়ে কমপক্ষে তিন হাজার লোক নিহত হয়। সু চি এরপর গণতন্ত্র আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকেন। এক বছরের মাথায় ১৯৮৯ সালে সু চিকে গৃহবন্দী করা হয়। এর পর বহু বছর গৃহবন্দী থাকেন সু চি। ১৯৯৯ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সু চির স্বামী মিখাইল আরিস। মৃত্যুশয্যায়ও সু চি তাঁর পাশে যেতে পারেননি।
গৃহবন্দী থাকা সত্ত্বেও ১৯৯০ সালে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হন সু চি। তবে তাঁকে কখনো ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হয়নি। সদস্য হিসেবে ২০১২ সালে সু চি পার্লামেন্টে ঢোকেন। সু চি সে সময় থেকেই জান্তা সরকারের সঙ্গে একধরনের মধ্যপন্থী অবস্থানে রয়েছেন।
সব মিলিয়ে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে হিসেব-নিকেশ চলছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বলছে, মিয়ানমারের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

হিমালয়ের পথে চট্টগ্রামের তারুণ্য by আহমেদ মুনির

পাঁচ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতার থার্পুচুলি পর্বতের
চূড়ার দিকে যাত্রা। খারাপ আবহাওয়ার জন্য ৪০০
মিটার নিচ থেকে ফেরত আসতে হয় অভিযাত্রীদের
নেপালের অন্নপূর্ণা হিমবাহের ৪ হাজার ৪০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত থার্পুচুলি পর্বতের বেসক্যাম্প। রাত তখন ১২টা ৪৫ মিনিট। যাত্রা শুরু হয় থার্পুচুলি পর্বতের চূড়ার দিকে। হিমবাহের ৬০ ডিগ্রি খাড়া ঢাল বেয়ে উঠতে হচ্ছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে তারাও নেই। সবার মাথায় হেড ল্যাম্প। হঠাৎ পেছনে চিৎকারের শব্দ। সেই সঙ্গে কোমরে হ্যাচকা টান। নিচে তাকাতেই গা হিম হয়ে আসে। একজন নিচে ঝুলে আছেন। সবাই মিলে তাঁকে টেনে তোলার পর আবার যাত্রা শুরু। পরদিন বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হেঁটে চূড়ার খুব কাছে পৌঁছালে শুরু হয় তুষারধস।
২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকাভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব দ্য কোয়েস্টের আয়োজনে থার্পুচুলি পর্বতে এমন বিপৎসংকুল অভিযানে অংশ নেন দেবাশীষ বল। তুষারধসের কারণে চূড়ার ২০০ মিটার নিচ থেকেই ফিরে আসতে হয় সেবার। অভিযান সফল না হলেও পোক্ত হয়েছে অভিজ্ঞতার ঝুলি। চট্টগ্রামের পর্বত আরোহণ ক্লাবের সদস্য হিসেবেই পেশায় শিক্ষক দেবাশীষ অংশ নিয়েছিলেন অন্নপূর্ণা অভিযানে। চট্টগ্রামে পর্বত আরোহণ ক্লাব? দেবাশীষই জানালেন তার আদ্যোপান্ত। গত বছর বান্দরবানের আলীকদম গুহায় বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। দেখলেন পর্যটকদের ফেলে যাওয়া চিপসের প্যাকেট, পানির বোতলসহ বিচিত্র আবর্জনায় নোংরা হয়ে আছে গুহা। পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ডাক দিয়ে ফেসবুকে ইভেন্ট খোলেন ফিরে এসেই। আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০১৪ সালের ১২ এপ্রিল আট তরুণ জড়ো হন আলীকদেম। গুহার পাশেই ক্যাম্প ফেলেন তাঁরা। ময়লা–আবর্জনা পরিষ্কারের পর আলাপ গড়াতে থাকে অভিযান বিষয়ে। ঠিক হয় চট্টগ্রামে একটা পর্বত আরোহণ অর্থাৎ মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাব গড়ে তুলবেন তাঁরা।
পর্বত আরোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমারসের সদস্যরাl জুয়েল শীল
সে বছরের ৩০ মে তরুণ ভার্টিক্যাল ড্রিমারস নামে চট্টগ্রামে প্রথম মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবের যাত্রা শুরু হয় তাঁদেরই উদ্যোগে। এরপর প্রায় বছর খানেক কেটে গেছে। পর্বত আরোহীদের এই সংগঠনের সদস্যসংখ্যাও ৫০ ছাড়িয়েছে। অভিযাত্রী দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, ব্যাংক কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গত এক বছরে দেশ–বিদেশের পাহাড়ে-পর্বতে ৪২ বার অভিযানে গেছেন সংগঠনের সদস্যরা। এর মধ্যে আছে নেপালের ল্যাংটাংয়ে সুরিয়া পিক, সারগো রি, অন্নপূর্ণা পর্বতমালার থার্পুচুলি পর্বত, কেয়ানজিং রি, বাংলাদেশের সাফা হাফং, জ ত্লাং, দুম লং ও জোগি হাফঙের মতো উঁচু পাহাড়।
২০ জুন পার্বত আরোহী দলের জনা দশেক সদস্যের সঙ্গে আড্ডা হয় প্রথম আলোর চট্টগ্রাম কার্যালয়ে। আলাপের শুরুতেই এভারেস্টের প্রসঙ্গ আসে। কবে এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে পারবে চট্টগ্রামের তরুণেরা? সংগঠনের সদস্যরা বলেন, ‘আমাদের যে প্রস্তুতি তাতে আর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই সম্ভব হবে এটা। তবে এভারেস্টে যেতে মোটা অঙ্কের ফি গুনতে হয়। তাই পৃষ্ঠপোষক না পেলে কাজটা কঠিন হবে।’
বনে বাদাড়ে ট্র্যাকিং, সাইক্লিং, সাঁতার, পর্বত আরোহণের প্রশিক্ষণ, হিমালয়ের বিভিন্ন পর্বতমালায় অভিযান—এসব তো আছেই। পাশাপাশি মানবিক কার্যক্রমেও অংশ নেন ভার্টিক্যাল ড্রিমারসের সদস্যরা। সংগঠনের একজন সদস্য রুপা দত্ত নিজের উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রামের লামা, আলীকদম ও কক্সবাজারে চারটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ ছাড়া বনে জঙ্গলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, শীতার্তদের শীতবস্ত্র বিতরণের কার্যক্রমও করেন তাঁরা।
সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে কেউ তহবিল, কেউ ওয়েবসাইট পরিচালনা, কেউ পরিবেশবিষয়ক দিক আর কেউ বা আইন-কানুনের বিষয় দেখেন। আইন-কানুনের বিষয়টা কি রকম? নেপালের লেংটাং অঞ্চলের ১৬ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতার সুরিয়া পিক জয় করা আরোহী ফারহান জামান ব্যাখ্যা করেন, অভিযানে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি সাধন, খাবারের উচ্ছিষ্ট বা প্যাকেট ফেলা নিষিদ্ধ। আর ফিটনেস না থাকলে বিশেষ অভিযানের জন্য কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় না। এ বিষয়ে সংগঠনের সদস্য তানভিরের আছে মজার অভিজ্ঞতা। পর্বত আরোহণের জন্য তাঁকে দশ কেজি ওজন কমাতে হয়েছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে মাসে এক থেকে দুবার মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনায় র্যাপলিং, জুমারিং ও রক ক্লাইম্বিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। খটমট নামগুলো আসলে পর্বত আরোহণের নানা কৌশল। বুঝিয়ে বললেন পেশায় চিকিৎসক বাবর আলী। খাঁড়া পর্বতে দড়ি ধরে ওঠা-নামা হলো র্যাপলিং আর জুমারিং। আর রক ক্লাইম্বিং হলো খাঁড়া পর্বত বেয়ে ওঠা।
২০১৪ সালের অক্টোবরে নেপালের গোসাইকুন্ডের ৫ হাজার
১৪৫ মিটার উচ্চতায় সূর্য পর্বতের চূড়ায় ভার্টিক্যাল ড্রিমারসের
দুই সদস্য ফারহান জামান ও বাবর আলী l ছবি: সংগৃহীত
কী কী জিনিস প্রয়োজন হয় অভিযানে যেতে হলে? ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফ নেওয়াজ জানান, পাহাড়ি পথের জন্য ভালো গ্রিপের স্যান্ডেল আর পর্বতের জন্য ট্র্যাকিং বুট পরতে হবে। পাশাপাশি সরু লাঠি বা ট্র্যাকিং পোল, ব্যাকপ্যাক, তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ, জিপিএস, পেনি স্টোভ নামের ছোট চুলা, টর্চ, খাওয়ার স্যালাইন, শুকনো খাবার এসব সঙ্গে নিতে হবে। আর পার্বত্য এলাকায় গেলে বর্ষায় ছোট ঝিরি-ঝরনায় নামার ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে। এসব ঝরনায় হঠাৎ করেই স্রোত আছড়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দন্ত বিভাগ থেকে পাস করা সিফাত আরা ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী অবন্তিকা হোসেনও এই দলের সদস্য। দলের অন্য সদস্যরা জানালেন, প্রশিক্ষণে বরাবরই দুর্দান্ত এই দুই নারী। বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের নানা পাহাড়ে ট্র্যাকিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে দুজনেরই। তবে এর মধ্যে থানচির দুর্গম চেমা খাল ধরে ট্র্যাকিং করেছেন অবন্তিকা। একবার তো বড় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছেন অল্পের জন্য। অবন্তিকা নিজেই বললেন সে ঘটনা, ‘বান্দরবানের এক পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠেছি চূড়ায়। অনেক উঁচু পাহাড়। চূড়ায় উঠে হঠাৎই পা পিছলে পড়তে শুরু করলাম। তবে শেষমেশ কিছু দূর গিয়ে পতন ঠেকিয়েছি। সে যাত্রায় ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছি।’
১৬ জুলাই ভার্টিকেল ড্রিমারসের দশ সদস্যের একটি দল আবারও বের হচ্ছেন অভিযানে। এবারের গন্তব্য ভারতের হিমাচল প্রদেশের পর্বতমালা।
এরপর কী? মনে কতদূর যেতে চান চট্টগ্রামের অভিযাত্রীরা? দেবাশীষ বল বললেন, ‘উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু, পৃথিবীর সব পর্বত চূড়াই জয় করতে চাই আমরা।’