Saturday, July 4, 2026

‘গ্রেটার ইসরাইল’ গড়তে এবার সিরিয়ায় নজর

‘গ্রেটার ইসরাইল’ ধারণাকে সামনে রেখে এবার সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে স্থায়ী ইহুদি বসতি স্থাপনের দাবি জোরালো করছে একদল ইসরাইলি সেটলার। হালুতজেই হাবাশান বা ‘পাইওনিয়ার্স অব বাশান’ নামে পরিচিত এই সংগঠনটি গত এক বছরে প্রান্তিক একটি গোষ্ঠী থেকে ইসরাইলের ডানপন্থী রাজনীতির সমর্থনপুষ্ট একটি প্রভাবশালী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে সংগঠনটির কর্মীরা অধিকৃত গোলান মালভূমি ও দক্ষিণ সিরিয়ার মধ্যকার সীমান্তে জড়ো হন। কয়েকজন সীমান্তের বেড়ার সঙ্গে নিজেদের শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলেন, আর অন্তত ১০ জন সীমান্ত অতিক্রম করে হারমন পর্বতের (জাবাল আল-শেখ) পাদদেশে মাজদাল শামসের কাছে সিরিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। পরে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, সীমান্ত অতিক্রমকারী বেসামরিক ব্যক্তিদের ফিরিয়ে এনে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে এই ঘটনাকে সংগঠনটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের অংশ বলেই তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্য, ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতি রেখার ওপারেও ইহুদি বসতি স্থাপনের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

কী এই ‘পাইওনিয়ার্স অব বাশান’
২০২৫ সালের এপ্রিলে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। কয়েক মাস আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ সিরিয়ার কিছু এলাকায় নিজেদের উপস্থিতি জোরদার করে। সেই প্রেক্ষাপটেই সংগঠনটির উত্থান।
‘বাশান’ নামটি নেয়া হয়েছে বাইবেলে উল্লেখিত একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল থেকে, যা জর্ডান নদীর পূর্বে হারমন পর্বত থেকে গিলিয়াদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

‘গ্রেটার ইসরাইল’ মতবাদের অনুসারীদের বিশ্বাস, ইসরাইলের কোনো চূড়ান্ত সীমান্ত নেই। ধর্মীয় জায়নবাদীদের একটি অংশ মনে করে, বাইবেলে প্রতিশ্রুত ভূখণ্ড মিসরের নীল নদ থেকে ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত, উত্তরে তুরস্কের হাতায় এবং দক্ষিণে সৌদি আরবের হেজাজ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই মতাদর্শ অনুযায়ী, দক্ষিণ সিরিয়াকে তারা বিদেশি ভূখণ্ড নয়, বরং পূর্বপুরুষদের ঐতিহাসিক আবাসভূমির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

বিতর্কিত বক্তব্য
ওপেন-সোর্স অনুসন্ধানী সাংবাদিক মুরাদ মোহাম্মদ আল-হামউইর মতে, সংগঠনটির সদস্যরা নতুন হলেও অনভিজ্ঞ নন। তিনি বলেন, এরা অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গোলান মালভূমির অভিজ্ঞ সেটলার। তাদের লক্ষ্য দক্ষিণ সিরিয়ায় স্থায়ী ইহুদি বসতি গড়ে তোলা।
তিনি আরও বলেন, সংগঠনটির কিছু প্রকাশ্য বক্তব্য স্থানীয় জনগণের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের আহ্বানের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এপ্রিল মাসে সংগঠনটির ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়, বাশান অঞ্চল থেকে সব সুন্নি ও শিয়া মুসলিমকে বহিষ্কার করতে হবে। পোস্টে বলা হয়, ইসরাইলি শাসনের অধীনেই কেবল বাশান অঞ্চল সমৃদ্ধ হতে পারে।

কারা দিচ্ছেন নেতৃত্ব?
সংগঠনটির প্রধান মুখ আমোস আজারিয়া। তিনি একজন ইসরাইলি শিক্ষাবিদ, ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী কর্মী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইসরাইলি সীমান্তের বাইরে ইহুদি বসতি স্থাপনের দীর্ঘদিনের সমর্থক।
আজারিয়ার মতে, দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতির পর সেখানে স্থায়ী বেসামরিক ইহুদি বসতি গড়ে তোলা উচিত। তার ভাষায়, এটি যেমন নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন, তেমনি বাইবেলীয় উত্তরাধিকারের অংশ।
তিনি একই সঙ্গে উরি তজাফোন নামে আরেকটি উগ্র ডানপন্থী সংগঠনেরও অন্যতম নেতা। এই সংগঠনটি দক্ষিণ লেবাননে ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে প্রচার চালায়।

সংগঠনের মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারী জোনাথন লেভি দাবি করেন, সিরিয়ার বর্তমান সরকারের অধীনে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে স্থায়ী ইহুদি বসতি স্থাপন।

রাজনৈতিক সমর্থন বাড়ছে
শুরুর দিকে প্রান্তিক সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন সংগঠনটি ইসরাইলের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের প্রকাশ্য সমর্থন পাচ্ছে।

২০২৬ সালের শুরুতে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে “ট্রিবিউট টু দ্য পাইওনিয়ার্স অব সেটেলমেন্ট” শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে হালুতজেই হাবাশান এবং এর প্রতিষ্ঠাতা আমোস আজারিয়াকে বিশেষ সম্মাননা দেয়া হয়।
এই সম্মাননাপত্রে স্বাক্ষর করেন জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির, যিনি দীর্ঘদিন ধরেই সেটলার আন্দোলনের অন্যতম প্রবল সমর্থক।

এ ছাড়া প্রবাসবিষয়ক মন্ত্রী আমিখাই চিকলি প্রকাশ্যে বলেন, এটি আমাদের ভূমি। বাশানে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগমন্ত্রী শ্লোমো কারহির সঙ্গেও আজারিয়ার বৈঠক হয়েছে। সেখানে বাশান অঞ্চলে ইসরায়েলি মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

লিকুদ দলের সংসদ সদস্য এরিয়েল কালনারও এই আন্দোলনের সমর্থনে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তার ভাষায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় বসতি স্থাপনের মাধ্যমে।

একাধিক সীমান্তে সমন্বিত বসতি আন্দোলন
হালুতজেই হাবাশানের সঙ্গে গাজায় পুনরায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে কাজ করা নাহালা এবং দক্ষিণ লেবাননে বসতি স্থাপনের পক্ষে থাকা উরি তজাফোন সংগঠনেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতের পর দখল বা নিয়ন্ত্রণে আসা বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপনের লক্ষ্যে এসব সংগঠনের মধ্যে সমন্বয় ক্রমেই বাড়ছে।

ধারাবাহিক অনুপ্রবেশ
সংগঠনটি ধাপে ধাপে সীমান্ত অতিক্রমের কৌশল অনুসরণ করছে। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো তারা সিরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করে “বাশান ওএসিস” নামে একটি বসতি স্থাপনের চেষ্টা করে। এরপর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরজুড়ে একাধিকবার সীমান্ত ভাঙার চেষ্টা চালানো হয়।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ার ভেতরে “বাশান নেচার রিজার্ভ” নামে একটি নতুন বসতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানও করে তারা।

এপ্রিল মাসে মাজদাল শামসের কাছে সীমান্তের বেড়া ভেঙে কয়েকশ মিটার ভেতরে প্রবেশ করে সংগঠনটির সদস্যরা। ১৭ মে তারা আবারও সীমান্তে বিক্ষোভ করে এবং বসতি স্থাপনের অনুমতি দাবি জানায়।

স্থানীয়দের উদ্বেগ
বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকার দক্ষিণাঞ্চলে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই নিরাপত্তা শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী ও সেটলার সংগঠনগুলো।

মুরাদ আল-হামউই বলেন, এখন পর্যন্ত সংগঠনটির সদস্যরা নিরস্ত্র অবস্থায় সীমান্ত অতিক্রম করছে, যাতে বিষয়টিকে সামরিক নয়, বেসামরিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তারা যখন সিরিয়ার জনবসতিপূর্ণ এলাকার আরও কাছে পৌঁছাবে, তখন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে সংঘর্ষ প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠবে।

২৮ জুন দারা প্রদেশের আবদিন গ্রামে ইসরাইলি বাহিনীর হেলিকপ্টার ও গোলন্দাজ সহায়তায় অভিযানের পর স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেন। তারা পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ফেলে সড়ক অবরোধ করে ইসরাইলি সামরিক যানবাহনের অগ্রগতি ঠেকানোর চেষ্টা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ সিরিয়ায় বসতি স্থাপনের এই আন্দোলন কেবল সীমান্ত রাজনীতির বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতে অঞ্চলটির নিরাপত্তা, জনসংখ্যাগত ভারসাম্য এবং ইসরায়েল-সিরিয়া সম্পর্কের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। 

‘গ্রেটার ইসরাইল’ গড়তে এবার সিরিয়ায় নজর

চা–শিল্প বিকাশের পথে চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় by মামুন রশীদ

চা–শিল্পের সঙ্গে অনেক দিনের সম্পৃক্ততার কারণে প্রায়ই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যদি চা–বাগান খুব লাভজনক না-ই হয়, তাহলে এত এত ব্যবসায়ী কেন চা–বাগানের মালিক হতে আগ্রহী? আর যদি চা বিক্রির বাজার এত বড় হয়, তাহলে এই মূল্যশৃঙ্খলে প্রকৃত লাভের অংশটি কার হাতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশে প্রায় দেড় শ বছরেরও বেশি সময় ধরে চা চাষ হচ্ছে। বর্তমানে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, পঞ্চগড় ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৬৮টি বাণিজ্যিক চা–বাগান প্রায় আড়াই লাখ একরের বেশি জমিতে বিস্তৃত। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নবম বৃহত্তম চা উৎপাদক এবং বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ আসে আমাদের দেশ থেকে।

কিন্তু এত বড় উৎপাদন সত্ত্বেও বাংলাদেশের চা–শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আজও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দেশে উৎপাদিত চায়ের প্রায় পুরোটাই অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহৃত হয়। বছরে প্রায় ৯ থেকে ৯.৫ কোটি কেজি চা দেশেই ভোগ করা হয়। অন্যদিকে বিশেষ মানের ব্লেন্ড তৈরির জন্য কিছু চা আমদানিও করতে হয়। অথচ ২০০২ সালে যেখানে ১ কোটি ৩৬ লাখ কেজির বেশি চা রপ্তানি হয়েছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২২ লাখ কেজিতে। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানিতে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই এ জন্য অপরাপর দেশের তুলনায় আমাদের চায়ের বেশি দামকে দায়ী করেন।

বাংলাদেশের চা–শিল্প মূলত বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের একটি মিশ্র কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইস্পাহানি, জেমস ফিনলে, আবুল খায়ের গ্রুপ, কাজী অ্যান্ড কাজী, ডানকান ব্রাদার্স, ট্রান্সকম, হালদা ভ্যালি ও ওরিয়নের মতো প্রতিষ্ঠান বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে অধিকাংশ সরকারি মালিকানায় রয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত- ন্যাশনাল টি কোম্পানি। বাংলাদেশ চা বোর্ড নিলাম ব্যবস্থা, কারখানার লাইসেন্সিং ও রপ্তানি তদারকির দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু এই কাঠামো এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খুব একটা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।

চা–শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা এর বিপণনকাঠামো। অধিকাংশ চা এখনো চট্টগ্রামের নিলাম ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রি হয়। ফলে উৎপাদকেরা বিদেশি ক্রেতা কিংবা বড় আন্তর্জাতিক বিপণন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পান না। একই সঙ্গে ব্র্যান্ডিং, আধুনিক প্যাকেজিং এবং মূল্য সংযোজনের অভাবে বাংলাদেশের চা এখনো মূলত বাল্ক পণ্য হিসেবেই বিক্রি হয়।

অর্থায়নও একটি বড় বাধা। চা–শিল্পকে এখনো শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে উদ্যোক্তাদের ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। এটিকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। এতে পুনঃ রোপণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ সহজ হবে। সবুজ হলেও চা–শিল্প সবুজ অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ৯০০ কেজি চা উৎপাদিত হয়। অথচ কেনিয়ায় এই হার প্রায় ২ হাজার কেজি এবং মালাউইয়ে আড়াই হাজার কেজিরও বেশি। একইভাবে শ্রীলঙ্কার রপ্তানিকারকেরা প্রতি কেজি চায়ের জন্য যে মূল্য পান, বাংলাদেশের উৎপাদকেরা তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম আয় করেন। অর্থাৎ উৎপাদনের চেয়ে মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রেই আমাদের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। বাগানের অতিরিক্ত জমিতে নতুন করে চাষ, উন্নত মানের ফলের চাষসহ সোলার এনার্জি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শ্রমব্যবস্থা। বহু চা–বাগানে এখনো কয়েক দশক আগের জনবলকাঠামো বহাল রয়েছে। শ্রমিকদের মৌলিক মজুরি সীমিত হলেও অনেকেই উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনার মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় করেন। বাগানগুলোয় আবাসন, রেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা নিয়ে। তাই শ্রমিক কল্যাণ ও উৎপাদনশীলতাকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে।

চা–শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নীতিগত সংস্কারের ওপর। প্রথমত, কৃষি খাতের মতো স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিলাম ব্যবস্থার পাশাপাশি উৎপাদকদের সরাসরি রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে। পাকিস্তান, মিসর, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের চায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জৈব ও বিশেষায়িত চায়ের বাজার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে ব্র্যান্ডভিত্তিক রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। চা–শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করতে হবে।

সুশাসন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্পও নেই। ডিজিটাল পে রোল বা বেতন প্রদান, জিপিএস-নির্ভর সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ব্যবস্থা চা–শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন (ইএসজি) মানদণ্ড অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর-সুবিধা ও সহজ অর্থায়নের আওতায় আনলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে।

বাংলাদেশের চা–শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি এর দীর্ঘ ঐতিহ্য, অনুকূল জলবায়ু এবং ঐতিহ্যবাহী শ্রমশক্তি। দুর্বলতা মূলত নীতিমালা, অর্থায়ন, বাজারব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায়। তাই এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা। স্বল্প সুদে অর্থায়ন, বাজার উদারীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক রপ্তানি কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে চা–শিল্প আবারও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের চা–শিল্পের শিকড় যেমন গভীরে প্রোথিত, তেমনি সঠিক নীতি ও সংস্কারের মাধ্যমে এর সম্ভাবনার ডালপালাও আরও অনেক দূর বিস্তৃত হতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অপরাপর অংশ এ পথে ভাবছে বলে ভালো লাগছে। নীতিমালা গ্রহণ করে সেগুলোর ত্বরিত বাস্তবায়ন হলে আরও ভালো লাগবে।

* মামুন রশীদ, অর্থনীতি বিশ্লেষক

চা বাগানে কাজ করছেন এক শ্রমিক
চা বাগানে কাজ করছেন এক শ্রমিক। ছবি: প্রথম আলো

আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে যুক্তরাষ্ট্রকে অপদস্থ করা মানুষটিকে স্মরণ করছে বিশ্ব

আজ ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে। একই দিনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতাও শুরু হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় খামেনির মৃত্যু এমন এক যুদ্ধের সূচনা করেছিল যেখানে ওয়াশিংটন আশা করেছিল ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে বদলে দেবে। কিন্তু তার পরিবর্তে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র টিকে রইল, এর প্রতিষ্ঠানগুলোও অক্ষুণ্ণ থাকল এবং যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত বা কৌশলগত উদ্দেশ্যগুলো অধরাই থেকে গেল।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস এবং খামেনির জানাজার তারিখ ইচ্ছাকৃতভাবে একই দিনে নির্ধারণ করা হয়েছিল—এমন কোনো সরকারি নিশ্চিত তথ্য নেই। কারণ, ইরানের জানাজার সময়সূচি দেশটির ধর্মীয় ও জাতীয় ক্যালেন্ডার অনুসারে নির্ধারিত হয়। তবুও সময়ের এই মিল রাজনৈতিকভাবে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে।

যুক্তরাষ্ট্র যখন স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে, তখন ইরান ও ইরাকে লাখো মানুষ এমন এক নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে সমবেত হচ্ছেন, যিনি বিশ্বজুড়ে ওয়াশিংটনের বজায় রাখতে চাওয়া মার্কিন আধিপত্যের ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

খামেনি সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আজীবন প্রতিরোধের পরই শহীদ হয়েছিলেন। তিনি পিছু হটে, আপস করে বা রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে মারা যাননি। তিনি যে প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা ভেঙে দেওয়ার জন্য শুরু হওয়া এক যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।

তাকে মারার উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে দুর্বল করা এবং বৃহত্তর প্রতিরোধ শিবিরকে বিভক্ত করা। কিন্তু এর পরিবর্তে, এটি তাদের মধ্যে ঐক্য, সংহতি এবং সংকল্পকে আরও গভীর করেছিল, যারা তাকে সমসাময়িক যুগের অন্যতম প্রধান সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখেছিল।

আল মায়াদিনের প্রতিবেদক হালাল ফরহাত এ প্রসঙ্গে ইতিহাসবিদ জন গ্লাব–এর একটি তত্ত্বও তুলে ধরেছেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, বড় সাম্রাজ্যগুলো সাধারণত বিজয়, সম্প্রসারণ, সমৃদ্ধি, আত্মতুষ্টি, অতিরিক্ত বিস্তার এবং শেষ পর্যন্ত পতনের মতো কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এটিকে ইতিহাসের অপরিবর্তনীয় নিয়ম হিসেবে দেখা উচিত নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ২৫০তম বছরে পদার্পণ করছে সাম্রাজ্যিক পতনের সাথে সম্পর্কিত বেশ কিছু চাপের সম্মুখীন হয়ে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীর অতিরিক্ত বিস্তার, বিপুল সরকারি ঋণ, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার উপর দুর্বল হয়ে আসা নিয়ন্ত্রণ, বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতার পতন, এবং এমন এক রাজনৈতিক শ্রেণি যারা এখনও এমন আচরণ করে চলেছে যেন ১৯৯০-এর দশকের একমেরু যুগ কখনও শেষই হয়নি।

৪ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতার উত্থান, সম্প্রসারণ এবং লেখকের দৃষ্টিতে ইরানকে দুর্বল করতে ব্যর্থ হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিতও বহন করে।

আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে যুক্তরাষ্ট্রকে অপদস্থ করা মানুষটিকে স্মরণ করছে বিশ্ব
ছবি: আল-মায়াদিন।

মার্কিন তরুণ ইহুদিরা যেভাবে জায়নবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছেন by জসিম আল-আজাবি

আমেরিকান ইহুদি সম্প্রদায়ের ভেতরে ঐতিহাসিক এক জাগরণ তৈরি হয়েছে। নিজেদের পরিচয়, আনুগত্য এবং ইহুদিদের নিরাপত্তার অজুহাতে গণবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের পক্ষ নেওয়ার বিরুদ্ধে তুমুল পুনর্বিবেচনার জোয়ার চলছে। গাজা কেবল তাঁদের মতামতকেই বিভক্ত করেনি, বরং ইসরায়েলকে সমর্থন করার ঐতিহ্যগত অধিকারের ব্যাপারে তাঁদের মৌলিক ঐক্যকে চুরমার করে দিয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ আমেরিকান ইহুদি মনে করেন ইসরায়েল গাজায় যুদ্ধাপরাধ করেছে। প্রায় প্রতি দশজনে চারজন, অর্থাৎ ৩৯ শতাংশ আরও এক ধাপ এগিয়ে একে ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

একই বছর ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে এবং ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টারের এক যৌথ জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩১ শতাংশ আমেরিকান ইহুদি ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেন, যেখানে ৫৮ শতাংশ সরাসরি এর বিরোধিতা করেছেন। তরুণ ইহুদিদের (১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী) মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি আবেগীয় টান একেবারেই ভেঙে পড়েছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে যেখানে এই টান ছিল ৬৮ শতাংশ, তরুণদের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশে।

তরুণ আমেরিকান ইহুদিদের অর্ধেকই গাজার ঘটনাকে গণহত্যা বলছেন। এই সংখ্যাগুলো কিন্তু কোনো ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায়ের চিত্র প্রকাশ করে না; বরং তা বিবেকের সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

দলীয় বিভাজনও এখানে স্পষ্ট। ইহুদি রিপাবলিকানদের ৮৫ শতাংশ ইসরায়েলের আচরণকে সমর্থন করলেও, ইহুদি ডেমোক্র্যাটদের মাত্র ৩১ শতাংশ এতে একমত। অর্থাৎ দুই দলের মধ্যে ৫৪ শতাংশের এক বিশাল ব্যবধান রয়েছে। গ্যালাপ-এর ২৫ বছরের ট্র্যাকিং অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের প্রতি মার্কিনদের সহমর্মিতা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ডেমোক্র্যাট ও স্বতন্ত্রদের মধ্যে সমর্থন ধসের কারণেই মূলত এমনটি হয়েছে। এর ফলে আইপ্যাকে দুই দলের যৌথ ঐকমত্য আর টিকে নেই।

জিউস ভয়েস ফর পিসের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা ফিলিস বেনিস বলেন, ‘চাপ এখন এমনভাবে বাড়ছে, যা আমি আগে কখনোই দেখিনি।’

বেনিস একজন আমেরিকান ইহুদি কর্মী এবং ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং প্যালেস্টাইন অ্যান্ড ইসরায়েল’ বইয়ের লেখক। পাঁচ দশক ধরে তিনি এই লড়াইয়ে আছেন। তাঁর এই মূল্যায়ন কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং বাস্তবতা। তাঁর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনটি ‘জিউস ভয়েস ফর পিস’ (জেভিপি)-এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে এই সংগঠনের অগ্রগতি এককথায় অসাধারণ।

১৯৯৬ সালে বার্কলেতে মাত্র কয়েকজন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হওয়া জেভিপির বর্তমান চাঁদা দেওয়া সদস্য সংখ্যা ৩২,০০০-এর বেশি এবং সমর্থক নেটওয়ার্ক সাড়ে ৭ লাখের। গাজা সংকটের আগে তাদের বার্ষিক আয় ছিল ৩-৪ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে আর্থিক দিক থেকে এটি এখন একটি বড় লবিং সংস্থায় পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বাল্টিমোরে অনুষ্ঠিত তাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় সম্মেলনে শত শত কর্মী যোগ দেন। সেখানে রাশিদা তলাইব, নাওমি ক্লেইন এবং লিন্ডা সারসুরের মতো ব্যক্তিত্বরাও উপস্থিত ছিলেন।

সংগঠনটির বার্ষিক প্রতিবেদনে তাদের নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে: ‘আমাদের নামে নয়’ (নট ইন আওয়ার নেম)। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের নামে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

জেভিপির মূল লক্ষ্য হলো আমেরিকান ইহুদি ধর্মের সঙ্গে জায়নবাদের সম্পর্ক চিরতরে ছিন্ন করা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তারা একটি বড় সাংগঠনিক মোড় নেয়। কেবল প্রতিবাদী আন্দোলন হিসেবে না থেকে, নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন, কংগ্রেসে লবিং এবং নিজেদের সদস্য শক্তিকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তারা নির্বাচনী ময়দানে প্রবেশ করে। এক পর্যবেক্ষকের মতে, এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিতে এখন আর ইসরায়েলের বিরোধিতা করা কোনো অযোগ্যতা নয়।

নিউইয়র্ক সিটিতে এই চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল।

নিউইয়র্কের ইহুদি বাসিন্দা করিন গ্রিনব্ল্যাট ২০২৫ সালে সিএনএনে বলেছেন, ‘ইহুদি রাজনীতিতে এখন এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন এটা খুব স্পষ্ট যে এখানে ফিলিস্তিনপন্থী ইহুদি আছেন, ইসরায়েলপন্থী ইহুদি আছেন এবং এমন ইহুদিও আছেন যাঁদের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সম্পর্কই নেই।’

২০২৫ সালের নভেম্বরে জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হন। ৩৪ বছর বয়সী এই গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী উগান্ডান অভিবাসীর সন্তান এবং বিডিএস আন্দোলনের প্রকাশ্য সমর্থক। তিনি বারবার ইসরায়েলের অভিযানকে গণহত্যা বলে আসছেন। প্রগতিশীল ইহুদি সংগঠন জেভিপি অ্যাকশন, বেন্ড দ্য আর্ক এবং জিউস ফর রেশিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক জাস্টিস-এর সক্রিয় সমর্থনে তিনি এই জয় পান। ওয়াশিংটন ঐকমত্যের বাইরে থাকা থিঙ্কট্যাংক এবং গবেষকেরা এই পরিবর্তনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করেছেন।

‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট’-এর তথ্যমতে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের এক-তৃতীয়াংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তা থেকে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, ইসরায়েলের সমর্থনে মার্কিন পরোক্ষ সামরিক অভিযানসহ এই সহায়তার পরিমাণ ২২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

ইনস্টিটিউটের সিদ্ধান্ত খুবই স্পষ্ট: কোনো শর্ত বা লিভারেজ ছাড়াই এই অন্ধ সামরিক সহায়তা যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় সামরিক ও রাজনৈতিক সংকটে টেনে আনছে। এতে আমেরিকার সম্পদ, মর্যাদা ও স্বার্থের বড় ক্ষতি হচ্ছে। স্বয়ং ইহুদি বংশোদ্ভূত মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স প্রথম কোনো দায়িত্বরত সিনেটর হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, ‘এই উপসংহার পৌঁছানো ছাড়া উপায় নেই।’

তবে প্রজন্মের এই পরিবর্তন রুখে দেওয়া অসম্ভব। ‘জিউস ভোটার রিসোর্স সেন্টার’-এর এক জরিপ অনুযায়ী, ৩৫ বছরের কম বয়সী নন-অর্থডক্স ইহুদিদের অর্ধেকই এখন একটি দ্বিজাতিক রাষ্ট্র সমর্থন করেন। এক দশক আগেও মূলধারার ইহুদি সমাজে এই অবস্থান অসম্ভব ছিল।

গত দুই বছরে আমেরিকান ইহুদিদের মধ্যে এক-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থন দ্বিগুণ হয়ে ১৩ থেকে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমান তরুণ ইহুদিরা বড় হয়েছে ইসরায়েলের একের পর এক ডানপন্থী সরকারের আমলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা ধ্বংসস্তূপ থেকে শিশুদের উদ্ধারের দৃশ্য দেখেছে। তাদের দাদা-দাদিদের মতো তারা প্রাতিষ্ঠানিক জায়নবাদী দীক্ষা পায়নি।

জে স্ট্রিটের প্রেসিডেন্ট জেরেমি বেন-অমি বলেন, ‘তরুণ আমেরিকান ইহুদিদের ইসরায়েল থেকে এই দূরে সরে যাওয়ার পেছনে সরাসরি দায়ী বিবি নেতানিয়াহুর নীতি। সেই সঙ্গে আমেরিকান ইহুদি এস্টাবলিশমেন্ট যেভাবে ‘ইসরায়েল যা-ই করুক, তাকেই সমর্থন করতে হবে’ এমন আনুগত্য দাবি করে, তা–ও এর জন্য দায়ী।’

গাজা সংকট ইহুদিদের চেতনা ও পরিচয়ের জায়গায় এক স্থায়ী পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আমেরিকান ইহুদিদের এক নতুন প্রজন্ম এই দৃশ্য দেখেছে, সাক্ষ্যগুলো গ্রহণ করেছে এবং চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা সামাজিক বর্জনের ঝুঁকি নিয়েও উচ্চকণ্ঠে ও প্রকাশ্যে বলেছে—ইসরায়েল তাদের নামে এই কাজ করছে না।

এই অস্বীকৃতি কেবল রাজনৈতিক নয়। ইহুদিদের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী, এটি আসলে একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা। এই প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো বিপ্লব আনবে কি না, তা নির্ভর করছে এই প্রতিবাদ রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে কি না তার ওপর।

* জসিম আল-আজাবি, সাংবাদিক। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত

ফিলিস্তিনের অধিকার প্রশ্নে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন মার্কিন ইহুদিরাও। ২৯ মে ২০২৬ নিউইয়র্ক সিটি।
ফিলিস্তিনের অধিকার প্রশ্নে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন মার্কিন ইহুদিরাও। ২৯ মে ২০২৬ নিউইয়র্ক সিটি। ফাইল ছবি

হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দর আব্বাস শহর ঘুরে বিবিসির প্রতিনিধি কী দেখলেন

বিবিসিঃ গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে জেলেরা জেটিতে তাঁদের শিকার করা মাছ নামাচ্ছেন। এক জেলে গর্বের সঙ্গে তাঁর জালে ধরা পড়া কয়েকটি ছোট হাঙর দেখাচ্ছিলেন। বললেন, হাঙরের স্যান্ডউইচ স্থানীয়ভাবে বেশ জনপ্রিয় একটি খাবার। আরেক জেলেকে দেখা গেল মোটরসাইকেলের দুই পাশে দুটি বড় মাছ ঝুলিয়ে নিয়ে যেতে।

অনেক দিক থেকেই এটিকে মাছ ধরার একটি সাধারণ বন্দর বলে মনে হতে পারে। তবে এ জেটিগুলো আসলে হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত ইরানের বন্দর আব্বাস শহরের অংশ। প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ইরান যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুও হয়ে উঠেছে এটি।

যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা হরমুজ প্রণালির ইরানি অংশে যাওয়ার সুযোগ পেলেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। জবাবে ইরানও ইসরায়েলে এবং মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে আক্রমণ করে। বিশ্বের শক্তিশালী দুটি দেশের বিরুদ্ধে অসম এ যুদ্ধে ইরান নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে সবচেয়ে বড় কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত করে।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর গুলি ছোড়া শুরু করে। এতে কার্যত গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথটি অচল হয়ে পড়ে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাবিকেরা হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়েন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকে। জ্বালানি তেল, গ্যাস ও জ্বালানিভিত্তিক পণ্যের খরচ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত নানা পণ্যের দাম বাড়তে থাকে।

তেহরানের পদক্ষেপের জবাবে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের উপসাগরীয় বন্দরগুলো ব্যবহারকারী যেকোনো জাহাজ লক্ষ্য করে তারা এ পাল্টা ব্যবস্থা নেয়।

পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপে কয়েক মাস ধরে পারস্য উপসাগরে মাছ ধরা অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অনেক জেলেই মাছ ধরতে যাওয়া বন্ধ করে দেন। আবার কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে বের হন। এই জেলেরা ভালো করে জানেন, একটি যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।

তবে এখন পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইরান কয়েক সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালি আংশিক খুলে দেওয়ার পর উত্তেজনা কমেছে। জেলেরাও ধীরে ধীরে মাছ ধরায় ফিরছেন।

মাছ ধরায় ফেরা এসব জেলের একজন আবদুল রহমান। বন্দর আব্বাস ও এর আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রায় যুদ্ধ কী প্রভাব ফেলেছে, তা কাছ থেকে দেখাতে তিনি বিবিসি প্রতিনিধিকে হরমুজ প্রণালির আশপাশে ঘুরে দেখান।

প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে দুটি কনটেইনারবাহী জাহাজ। গত এপ্রিলে সংঘাতের চরম পর্যায়ে আইআরজিসি জাহাজ দুটি জব্দ করেছিল।

সেই সময় আইআরজিসির দাবি ছিল, অনুমতি ছাড়া চলাচল ও নৌ-নির্দেশনা ব্যবস্থায় কারসাজি করার মাধ্যমে জাহাজ দুটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলেছিল।

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পানামার পতাকাবাহী এমএসসি ফ্রান্সেসকা ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এপামিনোনডাস নামের জাহাজ দুটি এখনো ছেড়ে দেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া ইরান উপকূলের অদূরে দেখা গেল নোঙর করা আরও কয়েক ডজন জাহাজ। হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের জন্য এগুলো ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতির অপেক্ষায় আছে।

বন্দর আব্বাস উপকূল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে ‘হরমুজ’ দ্বীপের দিকে এগোতেই আমাদের গাইড আবদুল রহমান সমুদ্রমুখী একটি পুরোনো দুর্গ দেখালেন।

দুর্গের জীর্ণ লাল দেয়ালগুলো মনে করিয়ে দেয়, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লড়াই চলছে। ১৬ শতকের শুরুর দিকে নির্মিত এ দুর্গটি হরমুজে পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের আধিপত্য বজায় রাখার মূল কেন্দ্র ছিল। ১৬২২ সালে পারস্যের শাহ আব্বাস প্রথম পর্তুগিজদের এখান থেকে বিতাড়িত করেন। শাহ আব্বাসের নামানুসারেই বন্দর আব্বাস শহরের নামকরণ হয়েছে।

কৌশলগত দিক থেকে বন্দর আব্বাস এখনো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের কাছাকাছি ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত শহরটিতে দেশটির নৌবাহিনী এবং আইআরজিসির নৌ শাখার প্রধান ঘাঁটি রয়েছে।

সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ নৌপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে শহরটি যেমন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু, তেমনি শক্তিশালী শত্রুদের মোকাবিলায় ইরানের অসম যুদ্ধ কৌশলের প্রধান চাবিকাঠি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার এ সংঘাত আরও তীব্র করার হুমকি দিয়ে আসছেন। ইরান এ প্রণালি খুলে না দিলে ‘তাদের কোনো দেশ থাকবে না’ বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

তবে ট্রাম্পের এ হুমকি এবং যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইরান এখনো এ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য চলমান আলোচনায় তেহরানের কাছে এটি এখনো একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার।

বিবিসির প্রতিনিধিদল যখন বন্দর আব্বাসো পৌঁছায়, তখন সেখানে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল।

পরিবারগুলো নিজ নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন, দোকানপাট আবার খুলেছে এবং রাস্তায় আবারও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে বাজারটিতে সমুদ্রপথে পণ্য আসার পর তা দক্ষিণ ইরানে ছড়িয়ে পড়ত, সেটি আবার ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে।

তবে এই স্বাভাবিকতার মধ্যেও যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। বন্দর আব্বাসের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক পেছনেই খুশনুদি সড়ক। সেখানকার একটি বহুতল আবাসিক ভবন এখন এক ধ্বংসস্তূপ। গত ২৬ মার্চ ইসরায়েলি হামলায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ভবনটির অর্ধেক অংশ কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকলেও বাকি অর্ধেক চূর্ণ-বিচূর্ণ কংক্রিট আর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া রডের স্তূপে পরিণত হয়েছে। যেসব ঘরে একসময় সপরিবার মানুষ বসবাস করত, সেগুলো বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সেই ক্ষতবিক্ষত দেয়ালের ওপর উড়ছে ইরানের জাতীয় পতাকা।

ভবনটিতে কিছু বাণিজ্যিক কার্যালয়ও ছিল। ৪০ বছর বয়সী নারী উদ্যোক্তা ফাতিমা তেমনই একটি কার্যালয়ের মালিক। হামলার সময় তিনি অন্য জায়গায় ছিলেন।

ফাতিমা বলেন, ‘এখানে যে পরিবারগুলো থাকত, তাদের অনেকের সঙ্গেই আমার চেনাজানা ছিল। সেখানে মা ও শিশুরাও ছিল। হামলার সময় তারা সবাই ঘুমাচ্ছিল। কেউ কেউ বেঁচে গেলেও তিনজন নিহত হয়েছেন। তাঁদের একজন ছিলেন সামরিক কর্মকর্তা। তিনি তাঁর পরিবার নিয়ে এখানে থাকতেন। তবে এটি কোনো সামরিক ঘাঁটি ছিল না।’

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলেছে, এ হামলার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন আইআরজিসির নৌবাহিনীর কমান্ডার আলী রেজা তাংসিরি। হামলার চার দিন পর ইরান তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে।

ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভবনটি ধসে পড়লে তিনজন নিহত এবং সাতজন আহত হন। রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর আব্বাস যে প্রদেশের রাজধানী, সেই হরমুজগানে বেসামরিক নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ২৬১ জন নিহত হয়েছেন।

সশস্ত্র সংঘাতের তথ্য সংগ্রহকারী বৈশ্বিক সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুসারে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত বন্দর আব্বাস ও এর আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৯৬টি হামলা চালিয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, হামলাগুলোর এক-তৃতীয়াংশের বেশি চালানো হয়েছে সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে; যার মধ্যে রয়েছে আইআরজিসির স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, নৌবাহিনীর সম্পদ এবং বন্দর আব্বাসের বিমানঘাঁটি। এসবের অনেকগুলোই সাধারণ মানুষের আবাসিক এলাকার একদম কাছাকাছি অবস্থিত। তবে অন্যান্য হামলায় ঠিক কী কী ধ্বংস হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি এসিএলইডি।

যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হন। একই সঙ্গে ধ্বংস হয় ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিও।

তবে এ যুদ্ধের ফলে ইরান দুর্বল হয়ে পড়েছে—এমন দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন বন্দর আব্বাসের মেয়র।

মেয়র মেহেদি নোবানি বলেন, ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কেউই তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ইরানের সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যও হাসিল হয়নি।

মেয়র দাবি করেন, আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি ইরানকে বিভক্ত করার বদলে উল্টো আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, চলতি যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে নিশ্চিতভাবেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে ইরান।

এদিকে স্থানীয় বাজারে বিবিসির প্রতিনিধিদল সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অনেকে মুখ খুলতে রাজি হননি। এর কারণ স্পষ্ট না করলেও কেউ কেউ বলেন, গণমাধ্যমে ইরানকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তার ওপর তাঁদের কোনো ভরসা নেই।

অবশেষে এক তরুণী কথা বলতে রাজি হন। তিনি সম্প্রতি চীন থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরেছেন। তিনি জানান, যুদ্ধের এ কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে থাকতেই দেশে ফিরে এসেছেন। ওই তরুণী বলেন, ‘ইরানের মানুষ এখন একে অপরকে সাহায্য করার জন্য এক জোট হয়েছে।’

বাজারের আঁকাবাঁকা গলির আরও ভেতরের দিকে ৫৫ বছর বয়সী ফাতেমা নামের এক নারী বসে পিচ ফল বিক্রি করছিলেন। বাজারের এ অংশগুলো একেকটি সুনির্দিষ্ট পণ্যের জন্য আলাদা করা। একপাশে উপসাগর থেকে ওই দিন সকালে ধরে আনা তাজা মাছ, অন্যপাশে দক্ষিণ ইরানের খেজুর, আমদানিকৃত ইলেকট্রনিকস সামগ্রী, সুগন্ধি, গৃহস্থালি পণ্য ও ঐতিহ্যবাহী বান্দারি পোশাক বিক্রি হচ্ছে।

ফাতেমা জানান, যুদ্ধের কারণে তাঁর ছেলে চাকরি হারিয়েছেন। এখন তাঁর এ ফলের দোকানের আয়ের ওপর পুরো পরিবারকে নির্ভর করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাইনি। যখন বোমা হামলা হতো, আতঙ্কে কাটাতাম। ট্রাম্প যুদ্ধ চেয়েছিলেন। তিনি আকস্মিকভাবে আমাদের ওপর হামলা করেছেন। আমরা এমনটা কখনো চাইনি।’

কাছেই দাঁড়িয়ে কথা শুনছিলেন ৪০ বছর বয়সী মাসুমেহ। তিনি আলোচনায় যোগ দিয়ে বলেন, ‘প্রতিটি যুদ্ধই সমস্যা তৈরি করে। এটি দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কিন্তু আমাদের এখন ধৈর্য ধরা ছাড়া উপায় নেই।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে এখন আলোচনা চলছে। পরীক্ষা করা হচ্ছে যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে। এটি স্পষ্ট যে এ আলোচনাতেও হরমুজ প্রণালিই মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।

তবে এ জনপদে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধের হিসাবটা একেবারেই ভিন্ন। তাঁদের কাছে যুদ্ধ মানে কর্মসংস্থান হারানো, বিমান হামলার আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটানো। স্বাভাবিকভাবেই চলতি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যেন কার্যকর ও স্থায়ী হয়—সেই আশায় বুক বাঁধছেন তাঁরা।

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের টহল
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের টহল। ছবি: এএফপি

রামমন্দিরে অর্থ লুটের দায় কার ওপর চাপাতে চায় আরএসএস, কিন্তু মোদি কেন চুপ

ভারতের অযোধ্যায় রামমন্দিরের দানপাত্র লুটের ঘটনায় অবশেষে মুখ খুলল হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)। বলল, যারা চুরি করেছে তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবলে গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেন, চুরির ঘটনা ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছে। এটা বরদাশত করা হবে না।

একই সঙ্গে হোসাবলে বলেছেন, এ লুটের ঘটনায় সর্বত্র চরম বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। তার অবসান ঘটাতে হবে।

বিতর্কিতভাবে গড়ে ওঠা রামমন্দির ও তার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ সদস্যদের অধিকাংশই সংঘ ও সংঘের চেতনায় গঠিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) গুরুত্বপূর্ণ নেতা, যাঁরা মন্দির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের তত্ত্বাবধানে অভূতপূর্ব এ চুরির ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই দায় পড়ছে সংঘ নেতৃত্বের ওপর।

এক মাস কেটে গেলেও এ ঘটনা নিয়ে আরএসএসের কেউ মুখ খোলেনি। হোসাবলেই প্রথম। তাঁর বিবৃতির নানা রকম ব্যাখ্যা শুরু হয়েছে। যেভাবে তিনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দানের কথা বলেছেন, তাতে মনে করা হচ্ছে, আরএসএস এ ঘটনার দায় পরোক্ষে ভিএইচপির ওপর চাপিয়ে নিজেদের আড়াল করতে চাইছে।

লুটের ঘটনায় যাঁদের নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে, তাঁরা সবাই সংঘের আদর্শে বড় হয়েছেন। যে তিনজনের বিরুদ্ধে বিরোধী আক্রমণের তির ধাবিত, সেই চম্পত রাই, অনিল মিশ্র ও গোপাল রাও ভিএইচপির নেতা। সংঘ ঘনিষ্ঠদের এই বিচ্যুতি আরএসএস মোটেই ভালোভাবে নেয়নি।

হোসাবলের বিবৃতি থেকে বিষয়টি স্পষ্ট। কারণ, চুরিকাণ্ড সংঘের ভাবমূর্তিকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিরোধীরা প্রচার শুরু করেছে, লুটের একাংশ সংঘের কোষাগারে জমা পড়েছে। এ কারণেই এক শ বছর ধরে আরএসএস নথিভুক্ত হয়নি।

হোসাবলে এই ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ঘটনাকে ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে দেখার আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর আশা, মন্দির পরিচালনার ব্যবস্থাপনায় যেসব ত্রুটি রয়েছে, তা সংশোধন করা হবে। এখন দেখার বিষয়, ৬ জুলাই ট্রাস্টের বৈঠকে চম্পত রাই, অনিল মিশ্র ও গোপাল রাওদের পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া হয় কি না।

তদন্ত শুরুর পর চম্পত ও অনিল পদত্যাগ করেছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা তাঁদের জেরা করলেও কারও বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত এফআইআর দাখিল করা হয়নি। তাঁদের গ্রেপ্তারও করা হয়নি। কেন এই রক্ষাকবচ, বিরোধীরা সেই প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সরগরম।

আরএসএস অবশ্য এই সঙ্গে অন্য এক বার্তাও দিয়ে রেখেছে। লুটের ঘটনা রাজনৈতিকভাবে হিন্দুত্ববাদী সমর্থনে যাতে ঘা না দেয়, সেই কারণে তিনি হিন্দুবিরোধী শক্তিদের সজাগ করে দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হিন্দুবিরোধী ও দেশবিরোধী শক্তি এ দুঃখজনক ঘটনাকে হাতিয়ার করে হিন্দুধর্মকে কলঙ্কিত করতে চাইছে। এ চক্রান্তের বিরুদ্ধে হিন্দুদের একজোট থাকতে হবে। তিনি বলেছেন, হিন্দুদের ধৈর্য ধরতে হবে। সংযম দেখাতে হবে। জোটবদ্ধ থাকতে হবে।

চুরি ধরা পড়ার এতদিন পর আরএসএস মুখ খুললেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো নীরব। অথচ তাঁরই উদ্যোগে কেন্দ্রীয় সরকার মন্দির নির্মাণ ও মন্দির পরিচালনের জন্য দুটি ট্রাস্ট গঠন করেছে। সেই ট্রাস্টে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিদেরও রাখা হয়েছে।

মন্দিরের শিলান্যাস থেকে শুরু করে ‘দেবতার প্রাণপ্রতিষ্ঠা’, প্রতিটি অনুষ্ঠানই হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের উপস্থিতিতে। অথচ এত বড় ঘটনার পরেও প্রধানমন্ত্রী এখনো কেন নীরব, সেই প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলেরা।

কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ ‘এক্স’ হ্যান্ডলে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভগবান রাম ও জনগণের বিশ্বাস নষ্ট হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতে অসুবিধে কোথায়? ভগবানের সম্পদ লুটের ঘটনায় দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। আপনার মনোনীত ব্যক্তিরা সংঘ পরিবারের নেতৃত্বে এই লুট চালিয়েছে। এটা আপনার পাপ। আপনি এর চেয়েও বড় পাপ করছেন এই বিষয়ে নীরব থেকে।’

একই সঙ্গে কংগ্রেস দাবি জানিয়েছে, এই অপরাধের দরুন ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ ভেঙে দেওয়া হোক।

চুরি নিয়ে আরএসএস ও ভিএইচপির মধ্যে সূক্ষ্ম টানাপোড়েন চললেও সংগঠন হিসেবে বিশ্ব হিন্দু পরিষদও (ভিএইচপি) চুরির দায় নিতে নারাজ। ভিএইচপি সভাপতি অলোক কুমার এক সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে চুরির দায় নিতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, চম্পত রাই ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর অপকর্মের দায় ভিএইচপি নিতে পারে না।

তুলনা দিয়ে অলোক বলেন, সরকারি আধিকারিকেরা কোনো ক্লাবের সদস্য হতেই পারেন। তিনি সেই ক্লাবের সম্পদ চুরি করলে সরকারকে কি দায়ী করা যায়? তিনি বলেছেন, ‘কে অপরাধী কে নন, তা তদন্তকারী কর্তারা ঠিক করবেন। আমরা চাই, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কাউকে যেন রেয়াত করা না হয়।’

ভিএইচপি সভাপতির এই মনোভাব থেকে মনে করা হচ্ছে, চম্পত রাই, অনিল মিশ্র বা গোপাল রাওদের থেকে ভিএইচপি দূরত্ব সৃষ্টি করে ফেলেছে। আরএসএসের মতো তারাও চুরির দায় নিতে নারাজ। এর ফলে ৬ জুলাই ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের’ বৈঠকের আগ্রহের কেন্দ্রে চম্পত রাইয়েরা চলে এসেছেন। দেখার এটাই, তাঁদের বাদ দিয়ে ট্রাস্ট পুনর্গঠিত হয় কি না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রামমন্দিরের অর্থ লুট নিয়ে এখনো কোনো কথা বলেননি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রামমন্দিরের অর্থ লুট নিয়ে এখনো কোনো কথা বলেননি। ছবি: এএনআই

তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণে কোন পথে যাবে আমেরিকা by হাসান ফেরদৌস

আড়াই শ বছর আগে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এ দেশের প্রত্যেক মানুষ সম-অধিকারসম্পন্ন হবে। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। কিন্তু তা পূরণের জন্য লড়াই থেকেও আমেরিকার মানুষ পিছিয়ে থাকেনি। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে আব্রাহাম লিঙ্কন, সেখান থেকে আজকের মামদানি, সেই লড়াইয়েরই অব্যাহত ধারা। লিখেছেন হাসান ফেরদৌস

১৭ সেপ্টেম্বর ১৭৮৭। ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমেরিকার শাসনতন্ত্র প্রশ্নে জাতীয় সম্মেলন। ঠিক কী চরিত্র হবে নতুন দেশটির—রাজতন্ত্র ফিরে আসবে, নাকি এক নতুন ধরনের প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠিত হবে?

১১৫ দিনের তর্ক-বিতর্ক শেষে সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। তাঁকে ঘিরে ধরল অপেক্ষমাণ দর্শকেরা। একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডক্টর, কী ঠিক হলো?’

বেন ফ্রাঙ্কলিনের জবাব, ‘প্রজাতন্ত্র, তবে যদি আপনারা একে রক্ষা করতে পারেন।’

৪ জুলাই ২০২৬, আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। ফ্রাঙ্কলিনের সেই সতর্কবার্তা এখন আগের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক অর্থবহ।

এই আড়াই শ বছরে আমেরিকা অনেক চড়াই-উতরাই দিয়ে গেছে। গৃহযুদ্ধ, নাগরিক অধিকারের লড়াই, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ৯/১১, আফগানিস্তান যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ।

কিন্তু কখনোই এই দেশ গণপ্রজাতান্ত্রিক হিসেবে টিকে থাকবে কি না, এমন কোনো সন্দেহ জাগেনি। এখন জাগছে, কারণ ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’

গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প যেভাবে দেশ শাসন করতে চাইছেন, অনেকে তাকে রাজতান্ত্রিক বা ‘ইম্পেরিয়াল’ নামে অভিহিত করেছেন।

ফরাসি সম্রাট ১৪তম লুই বলেছিলেন তিনিই রাষ্ট্র। অর্থাৎ তিনি যা বলবেন, তা–ই আইন। ট্রাম্প ঠিক তা–ই চাইছেন। কোনো আইন, কোনো প্রচলিত নিয়ম নয়, নিজের কাছে যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই আইন, এ তাঁর নিজের কথা।

এমন ঘটতে পারে, সে বিপদ বিষয়ে ১৯৭৩ সালে সাবধান করেছিলেন ঐতিহাসিক আর্থার স্লেসিঞ্জার। তিনি এই ভেবে ভীত ছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ক্রমে এত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন যে তাঁদের সঙ্গে ফরাসি সম্রাটের বড় কোনো ফারাক নেই।

‘ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি’ কথাটা তখন থেকেই শোনা গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহারে অভিযুক্ত প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রসঙ্গেই কথাটা ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু ‘ইম্পেরিয়াল’ প্রেসিডেন্সি সত্যি সত্যি আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে লন্ডভন্ড করে দেবে, এ কথা সম্ভবত কেউ ভাবেনি।

সেই ভয়ের কথাই বলেছেন নিউইয়র্ক টাইমস–এর ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথান সোয়ান। তাঁদের নতুন বই রেজিম চেঞ্জ: ইনসাইড দ্য ইম্পেরিয়াল প্রেসিডেন্সি অব ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাতে কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলা হয়েছে, ট্রাম্প শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নন, তিনি সর্বময় ক্ষমতাধর এক রাজা। তিনি নিজে তা–ই মনে করেন, পৃথিবীও এখন তাঁকে সেভাবেই দেখছে।

আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিনে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সামনে যে প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, একজন সর্বক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট, না দেশের শাসনতন্ত্র—কে এই দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে?

‘পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল নগরী’

প্রেসিডেন্ট রিগ্যান বলেছিলেন, আমেরিকা হচ্ছে পাহাড়শীর্ষে আলোকোজ্জ্বল এক নগরী। ১৯৮৯ সালে তাঁর বিদায়ী ভাষণে তিনি এই আত্মপ্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, ধনজনে ও শৌর্যে সবার সেরা এই দেশ পৃথিবীর মুক্তিপ্রত্যাশী সব মানুষের জন্য একটি ‘খোলা গৃহ’।

আমেরিকা যে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ, এ কথায় কোনো সন্দেহ নেই। তার গণতান্ত্রিক ভিত্তিও সবচেয়ে পুরোনো। মুক্তি ও প্রাচুর্যের আশায় পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ এ দেশে পাড়ি জমিয়েছে। নিজের দেশে কথা বলার অধিকার হারিয়ে এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে অসংখ্য ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ।

কিন্তু সেই আলোকোজ্জ্বল নগরীর সব বাসিন্দা সমান অধিকার ভোগ করে না। ১৭৭৬ সালে নয় যেমন, তেমনি এখনো নয়।

ইংরেজের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে সাড়ম্বরে যে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ জারি করা হয়, তাতে বলা হয়েছিল ঈশ্বরের সৃষ্ট সব মানুষই সমান। অথচ বেন ফ্রাঙ্কলিন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের দেনদরবারের পর যে শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়, তাতে দেশের লাখ লাখ কৃষ্ণকায় মানুষকে বড়জোর তিন-পঞ্চমাংশ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

১৮৬৫ সালে শাসনতন্ত্রের ১৩তম সংশোধনী গ্রহণের মাধ্যমে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হলেও কালো ও বাদামি মানুষেরা দেড় শ বছর পরেও পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক নয়।

আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কালো মানুষেরা এ দেশের সবচেয়ে অনগ্রসর ও দরিদ্র। প্রতি চারজন কালো শিশুর একজন অপুষ্টি ও অনাহারের শিকার। প্রতি চারজন কৃষ্ণকায় পুরুষের একজন তাদের জীবদ্দশায় একবারের জন্য হলেও জেলে গেছে।

কমবেশি একই রকম বৈষম্যের শিকার অশ্বেতকায় অভিবাসীরা। যাদের শ্রম ও মেধায় আমেরিকা বিশ্বে এখন এক নম্বর, তাদের অনেকেই অশ্বেতকায় অভিবাসী। অথচ চলতি মার্কিন প্রশাসনের চোখে কালো অথবা বাদামি এসব অভিবাসী মার্কিন সভ্যতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। যেভাবে পারো এদের খেদাও, চলতি মার্কিন প্রশাসনের এটাই এখন মন্ত্র।

আমেরিকার জনসংখ্যা ক্রমে অশ্বেতকায়-প্রধান হয়ে উঠছে, শ্বেতকায়দের ভীতির সেটাই প্রধান কারণ। বস্তুত, চলতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধরন অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সাল নাগাদ দেশটির জনসংখ্যার বৃহদংশ হবে অশ্বেতকায়।

নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই ভয় এ দেশের শ্বেতকায় প্রভুদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। এর ফলে বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই।

এই উদ্বিগ্ন শ্বেতকায়দের কণ্ঠস্বর হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দল। ২০১৭ সালে ভার্জিনিয়ার শারলটসভিলে জ্বলন্ত মশাল হাতে বর্ণবাদী মিছিলে স্লোগান ছিল, ‘ইউ উইল নট রিপ্লেস আস।’ এই ‘ইউ’ হচ্ছে বহিরাগত অশ্বেতকায়। ‘এদের মধ্যে অনেক ভালো মানুষ রয়েছে,’ এমন সাফাই গেয়েছিলেন ট্রাম্প।

বিভক্ত আমেরিকা

আমেরিকার এই রাজনৈতিক মেরুকরণকে যা আরও তীব্রতর করেছে, তা হলো সম্পদের বৈষম্য। তার ইতিহাসের কোনো পর্যায়েই আমেরিকায় সম্পদ বা অধিকার প্রশ্নে সমতা ছিল না। তবে পরিশ্রম করলে একটা পর্যায় পর্যন্ত ওঠা যায়, এ কথা সত্য ছিল। এখন আর নয়।

আমেরিকা হয়তো এখনো বিশ্বের সেরা দেশ; কিন্তু সেটা কেবল তাদের জন্য যারা ধনী ও ক্ষমতার ভাগীদার। দেশের মাত্র এক শতাংশের হাতে এখন মোট জাতীয় সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ। মাত্র এক ডজন অতিধনীর হাতে রয়েছে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়ে অধিক সম্পদ, যা বিশ্বের সব উন্নয়নশীল দেশের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। এদের হাতে শুধু সব সম্পদ নয়, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতাও।

একদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ, অন্যদিকে সম্পদের পাহাড়সমান বৈষম্যের কারণে অনেক আমেরিকানই নিজের দেশ বিষয়ে হতাশ।

গ্যালপের এক জনমত জরিপ অনুসারে, মাত্র ৩৩ শতাংশ আমেরিকান নিজের দেশ নিয়ে ‘অত্যন্ত গর্বিত’। ‘গর্বিত নয়’ এমন মানুষের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে, বিশেষত যাদের বয়স ৩০-এর নিচে। এই বয়সের ৯০ শতাংশই মনে করে, আমেরিকার চলতি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্দোবস্ত তাদের বিপক্ষে।

আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তাদের ৫৩ শতাংশ মানসিক রোগের শিকার। ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, এ কারণে কোনো দিনই তারা গৃহের মালিক হবে না, এ কথা মনে করে এই বয়সী প্রতি পাঁচজনের একজন।

মামদানির বিদ্রোহ

হতাশ হলেও এ দেশের তরুণ-যুবকেরা হাল ছেড়ে দেয়নি। এই প্রজন্মের সদস্যদের একটা বড় অংশ বলছে, দেশটিকে ফিরে পেতে লড়াইয়ের জন্য তারা প্রস্তুত। আর এই লড়াইটা হবে মূলত রাজনৈতিক।

বিদ্রোহ বা প্রত্যাখ্যান, যা–ই বলি না কেন, তার সবচেয়ে লক্ষণীয় প্রকাশ ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নগরী নিউইয়র্কে। এই শহরের মেয়র বা নগরপিতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন জোহরান মামদানি, যেটা প্রচলিত শ্বেত রাজনীতি ও ক্ষমতার প্রতি এক চপেটাঘাত।

মামদানি শুধু একজন অভিবাসী বা বহিরাগতই নন, তিনি অশ্বেতকায় ও মুসলমান। ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য হলেও নিজেকে তিনি একজন ‘ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট’ হিসেবে পরিচয় দেন।

এই দলেরই উপদল হিসেবে গড়ে উঠেছে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা, যারা বাছাইপর্বের সাম্প্রতিক নির্বাচনে যে অভাবিত সাফল্য দেখিয়েছে, অনেকেই তাকে রাজনৈতিক ভূমিকম্প হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ট্রাম্প মামদানি ও তাঁর অনুসারীদের ‘কমিউনিস্ট’ বলে গাল দিয়েছেন। কিন্তু নামের আগে কোনো লেবেল নিয়ে তাঁরা মোটেই উদ্বিগ্ন নন।

মামদানি বলেছেন, ‘সরকারের কাজ তার নাগরিকদের অধিকার, স্বাচ্ছন্দ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ধনতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বুঝি না, আমরা শুধু সরকারকে ব্যবহার করে সেই কাজটাই করতে চাই।’

অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি

আড়াই শ বছর আগে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এ দেশের প্রত্যেক মানুষ সম-অধিকারসম্পন্ন হবে। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। কিন্তু তা পূরণের জন্য লড়াই থেকেও আমেরিকার মানুষ পিছিয়ে থাকেনি। জর্জ ওয়াশিংটন থেকে আব্রাহাম লিঙ্কন, সেখান থেকে আজকের মামদানি, সেই লড়াইয়েরই অব্যাহত ধারা।

জন্মের ২৫০ বছর পর আমেরিকা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তার সামনে দুটি পথ—একটি শ্বেতনির্ভর, বিভক্ত ও আগ্রাসী। অন্যটি উন্মুক্ত, বহুজাতিক ও জনকল্যাণমুখী।

কোন পথে যাবে সে?

* হাসান ফেরদৌস, সাংবাদিক
- মতামত লেখক নিজস্ব

শিশুদের স্পিচ থেরাপি কখন দরকার হয় by ডা. ফারাহ দোলা

অনেক শিশু সময়মতো বয়স উপযোগী কথা শিখতে ব্যর্থ হয় বা দেরি করে। অথবা অনেক শব্দ শিখলে বা অনুকরণ করতে পারলেও পরিবেশ উপযোগী যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না।

অনেকে আবার অর্থবোধক শব্দ শিখতে পারে না সময়মতো। এই সমস্যাগুলোকে মোটাদাগে স্পিচ ডিলে (বিলম্বিত কথা বলা) বলা হয়ে থাকে।

সুস্থ ও স্বাভাবিক একটি শিশু সাধারণত দুই মাস বয়সেই বিভিন্ন ধ্বনি তৈরি করে কাছের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করে। ৬ থেকে ৮ মাসের দিকে সে বাবলিং করে অর্থাৎ বা বা, দাদ দা—এই ধরনের শব্দ করতে শুরু করে।

১ বছর বয়সের দিকে সে দাদা, মামা বাদেও কমপক্ষে একটি অর্থবোধক শব্দ বলতে শেখে। ১৬ থেকে ২০ মাস বয়সের মাঝে তার শব্দভান্ডার বেড়ে ১০ থেকে ৫০-এর মাঝে আসে।

২ বছরের দিকে দুটি শব্দ জোড়া লাগিয়ে ছোট ছোট বাক্য যেমন আমি খাব, এটা কী, তুমি বস—এসব বলতে পারে। ৩ থেকে ৪টি শব্দ জুড়ে বাক্য বানাতে তার সময় লেগে যায় তিন বছরের মতো।

৪ বছরের দিকে সে একটু জটিল বাক্য বোঝে, ছড়া-কবিতা বলতেও শিখে যায়। এই স্বাভাবিকতার ব্যত্যয় ঘটলে সেটিই স্পিচ ডিলে।

স্পিচ ডিলের বিভিন্ন কারণ

স্পিচ ডিলের কারণ অনেক। একটি শিশুর কথা বলার জন্য সঠিকভাবে কানে শোনা, মস্তিষ্ক দিয়ে অনুধাবন এবং মুখ দিয়ে সঠিকভাবে উচ্চারণ করা প্রয়োজন। এসব প্রক্রিয়ার কোনোটিতে বিচ্যুতি হলেই শিশুর কথা বলা বিলম্বিত হতে পারে।

* শিশু যদি কানে কম শোনে অথবা শ্রবণপ্রতিবন্ধী হয়।

* শিশুর যদি স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যা থাকে, যেমন: সেরিব্রাল পালসি, অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা।

* বিভিন্ন ধরনের সিনড্রেমিক চাইল্ড, বিশেষ করে ডাউন সিনড্রোমের রোগীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।

* বিভিন্ন ধরনের ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিজঅর্ডার যেমন তোতলানো, সিলেকটিভ মিউটিজম ইত্যাদি কারণেও শিশুর স্পিচ ডিলে হতে পারে।

* এ ছাড়া মুখগহ্বরের বিভিন্ন সমস্যা যেমন টাং টাই, তালুকাটা, ঠোঁটকাটা বাচ্চাদেরও কথা বলতে সমস্যা হয় বলে স্পিচ ডিলে হতে পারে।

* শিশুদের অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইসে বুঁদ হয়ে থাকা। এতে একদিকে যেমন পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন ব্যাহত হয়, অন্যদিকে বহু ভাষার সংস্পর্শে এসে বিকাশের সময়টায় দুই ভাষার দ্বন্দ্বে অনেক সময় শিশুদের কথা বলা শিখতে দেরি হয়ে যায়।

* বর্তমান কালের একক পরিবারগুলোয় শিশুদের কথা বলার সঙ্গীর অভাব। সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কম পাওয়াও শিশুর দেরিতে কথা বলার একটি অন্যতম কারণ।

শিশুর স্পিচ ডিলের চিকিৎসার জন্য সবার আগে দরকার সঠিক কারণ নির্ণয়। এ জন্য শিশুবিশেষজ্ঞ অথবা শিশুস্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। এ জন্য শিশুটির ইতিহাস খুব ভালোমতো নিতে হবে।

জন্মের সময় কোনো সমস্যা ছিল কি না, মানসিক বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে কি না, পরিবারে এ ধরনের সমস্যা আর কারও আছে কি না, এসব খুঁজে দেখতে হবে।

এসব ইতিহাস নিয়ে এবং শিশুটিকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন হিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট বা কানে শোনার পরীক্ষা, সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট বা বুদ্ধি পরীক্ষা এবং শিশুটিকে যদি অটিস্টিক মনে হয় সেই অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে।

শিশুর যদি শ্রবণ সমস্যা থাকে তবে স্পিচ থেরাপির আগে কানের চিকিৎসা করাতে হবে। হিয়ারিং এইড অথবা ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টশনের প্রয়োজন হতে পারে। এরপর স্পিচ থেরাপি দিলে শিশুর কথা শিখতে উপকার হয়।

টাং টাই যদি কথা বলায় সমস্যা তৈরি করে তবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জোড়াটা ছাড়িয়ে পরে স্পিচ থেরাপি দিলেই শিশুর কথা বলতে আর সমস্যা হয় না।

সেরিব্রাল পালসি অথবা শিশুর অন্যান্য বিকাশজনিত সমস্যায় স্পিচ থেরাপি দিলে উন্নতি হয়।

শিশু অটিস্টিক হলে বিভিন্ন ধরনের আর্লি ইন্টারভেনশন থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পেশাল স্কুলিংসহ বিভিন্ন ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে শিশুটির চিকিৎসায়।

ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিজঅর্ডার ভাষাজনিত এমন একটি সমস্যা, যেখানে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা, শ্রবণক্ষমতা বয়স অনুযায়ী ঠিক থাকলেও কথা বলায় বয়সের তুলনায় পিছিয়ে থাকে।

এর মধ্যে আছে স্ট্যামারিং বা তোতলানো, স্থানভেদে চুপ থাকা। এই সমস্যা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও থাকতে পারে। এই শিশুদের স্পিচ থেরাপি দিলে উন্নতি হয়।

তাই কথা বলতে দেরি করলে কারণ নির্ণয় করে যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তত দ্রুত শিশুটির উন্নতি আশা করা যায়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-13%2Fqxhf81cf%2Fpexels-photo-4473774.jpg?rect=0%2C0%2C5976%2C3984&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শিশু যদি কানে কম শোনে অথবা শ্রবণপ্রতিবন্ধী হয় তাহলে স্পিচ ডিলের সমস্যা হয়। ছবি: পেক্সেলস

কী আছে নতুন এই কোরীয় সিরিজে

প্রকাশ ২১ নভেম্বর ২০২৫ঃ মুক্তির পরই সাড়া ফেলেছে আরেকটি কে-ড্রামা ‘অ্যাজ ইউ স্টুড বাই’। নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই প্ল্যাটফর্মের সর্বাধিক স্ট্রিমিং হওয়া বিদেশি ভাষার সিরিজের তালিকার ৮ নম্বরে উঠে এসেছে এটি। ইতিমধ্যে ২২টি দেশের শীর্ষ ১০ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে ‘অ্যাজ ইউ স্টুড বাই’। আট পর্বের সিরিজটিতে দুই নারীর প্রতিশোধের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

লি জেওং-রিম পরিচালিত সিরিজের মূল চরিত্র ইউন-সু (জিওন সো-নি) ও হুই-সু (লি ইউ-মি)। হুই-সু তার স্বামী নো জাং-প্যোর (জাং সেউং-জো) নির্যাতনের শিকার। তার বন্ধু ইউন-সুর সঙ্গে মিলে স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করে ইউন-সু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়? সেটা নিয়েই এগিয়ে যায় গল্প।

সিরিজের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত লি ইউ-মি। ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘থ্রিলারের মোড়কে এই সিরিজে আসলে নারীর ক্ষমতায়নকেই তুলে ধরা হয়েছে। এমন শক্তিশালী বিষয় হওয়ার কারণেই আমি এতে যুক্ত হয়েছি। মুক্তির আগে কিছুটা নার্ভাস ছিলাম, তবে মুক্তির পর দর্শকের প্রতিক্রিয়া পেয়ে অভিভূত।’

সিরিজটিতে অভিনয়ের প্রস্তুতি নিয়েও সাক্ষাৎকারে কথা বলেন অভিনেত্রী, ‘সেটে নিজেকে ঠিক রাখার চেষ্টা করতাম। যখন বুঝতাম, মানসিক চাপ বেশি হচ্ছে, বিরতি নিয়ে নিজের মতো সময় কাটাতাম। তবে কেবল মানসিকভাবে নয়, আমাকে এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য শারীরিকভাবেও তৈরি হতে হয়েছে। ওজন ৪১ কেজি থেকে ৩৭-এ নামিয়ে এনেছিলাম। আসলে চরিত্রটি যে ভীষণ শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেটাই দেখাতে চেয়েছেন নির্মাতা; আমিও সেটাই তুলে ধরতে চেয়েছি,’ বলেন তিনি।

সিরিজটির নির্মাতা লি জেওং-রিমও নারী। তিনি বলেন, বেশির ভাগ সিনেমা-সিরিজেই নারী চরিত্র ‘একঘেয়ে’ ও ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’। তিনি চেয়েছেন এমন সব চরিত্র নির্মাণ করতে, যাদের সঙ্গে একাত্মবোধ করবেন দর্শক।
নির্মাতা সরাসরি না বললেও কোরীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, সিরিজটির দ্বিতীয় মৌসুম আসবে।

‘অ্যাজ ইউ স্টুড বাই’-এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স
‘অ্যাজ ইউ স্টুড বাই’-এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স