Thursday, January 30, 2025

‘বাপু, নমস্কার’ বলেই মহাত্মা গান্ধীকে তিনটি গুলি করেন খুনি by সাইফুল সামিন

শান্তি, মুক্তি ও মানবতার প্রতীক তিনি। আমৃত্যু এই নীতিতে অটল থেকেছেন। অহিংস পথে ব্রিটিশবিরোধী বিরামহীন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। কারাভোগ করেছেন। জীবনভর তাঁর এমন সংগ্রাম তাঁকে করে তোলে অনন্য। তাঁর নামযশ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।

খুবই সাদামাটা, অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনীতিক, আধ্যাত্মিক এই মানুষটির নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। তিনি ‘মহাত্মা গান্ধী’ নামেই বহুল পরিচিত। এই নামের অর্থ ‘মহান আত্মা’। সম্মান করে অনেকে তাঁকে ‘বাপু’ (বাবা) বলেও ডাকতেন।

ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক মহাত্মা গান্ধী। তবে ভারতের স্বাধীনতার ছয় মাসের কম সময়ের ব্যবধানে নৃশংস গুপ্তহত্যার শিকার হন এই শান্তিকামী নেতা।

ধর্মীয় পরিবারে জন্ম

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর জন্ম ১৮৬৯ সালের ২ অক্টোবর, ব্রিটিশশাসিত ভারতের পোরবন্দরের একটি অভিজাত হিন্দু পরিবারে। তাঁর জন্মস্থান এলাকাটি এখনকার ভারতের গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত।

বাবা করমচাঁদ উত্তমচাঁদ গান্ধী। তিনি ছিলেন পোরবন্দরের রাজদেওয়ান (মুখ্যমন্ত্রী)। মা পুতলিবাই গান্ধী। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। ছেলের মধ্যে তিনি ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার সঞ্চার ঘটিয়েছিলেন। নিরামিষ ভোজন, ধর্মীয় সহনশীলতা, সহজ-সাধারণ জীবনযাপন, অহিংসার ওপর জোর দিয়েছিলেন তিনি।

মহাত্মা গান্ধী ১৩ বছর বয়সে মা–বাবার পছন্দে ১৪ বছর বয়সী কস্তুরবা মাখাঞ্জিকে বিয়ে করেন। ১৮ বছর বয়সে ১৮৮৮ সালে আইনশাস্ত্র পড়তে মহাত্মা গান্ধী লন্ডন যান। ১৮৯১ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করেন।

লন্ডনে পড়া শেষে মহাত্মা গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন। আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রথম মামলাতেই তিনি হেরে যান। তিনি অপমানিত হন। একপর্যায়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি ভারতীয় ফার্মে কাজের প্রস্তাব পান তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকায় সংগ্রাম

১৮৯৩ সালে মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে ভারত ছাড়েন। পরবর্তী ২১ বছর তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকাতেই কাটে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি সাধারণভাবে প্রচলিত বৈষম্যের শিকার হন মহাত্মা গান্ধী। এই আচরণে তিনি হতবাক হন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় অভিবাসীদের অধিকার আদায়ে মহাত্মা গান্ধী সোচ্চার হন। ভারতীয়দের অধিকার আদায়ে ১৮৯৪ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠা করেন নাটাল ভারতীয় কংগ্রেস। দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধীর হাত ধরে বিকশিত হয় অহিংস আন্দোলন ‘সত্যাগ্রহ’।

অহিংস আন্দোলন করতে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় মহাত্মা গান্ধী একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালেই তাঁর পরিচিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানকালে ১৯০৬ সালে ব্রহ্মচর্য গ্রহণ করেন মহাত্মা গান্ধী। এর পর থেকে তিনি ব্রহ্মচর্য পালনে আরও কঠোর হতে শুরু করেন।

ভারতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ

১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে ভারতে ফিরে আসেন মহাত্মা গান্ধী। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের আগে তিনি তিনটি আঞ্চলিক সত্যাগ্রহ—চম্পারণ (১৯১৭), খেদা ও আহমেদাবাদ (১৯১৮) পরিচালনা করেন। কৃষক-শ্রমিকদের সমস্যা-অধিকার নিয়ে করা পৃথক এই সত্যাগ্রহের মাধ্যমে তিনি ভারতজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীদের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল। এর মধ্যে ১৯১৯ সালের গোড়ার দিকে দমনমূলক রাওলাট আইন পাস করে ব্রিটিশ সরকার। এই আইন ব্রিটিশ সরকারকে বিনা কারণে যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়।

মহাত্মা গান্ধী এই আইনকে ‘কালো আইন’ বলে অভিহিত করেন। তিনি এই আইনের বিরুদ্ধে অহিংস সত্যাগ্রহের ডাক দেন। এই আইনের বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলন তাঁকে ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামের মূলধারায় নিয়ে আসে। ভারতীয় রাজনীতিতে মহাত্মা গান্ধী যুগের সূচনা হয়।

অসহযোগ আন্দোলন

রাওলাট আইন ও স্থানীয় দুই জনপ্রিয় রাজনীতিককে (সাইফুদ্দিন কিচলু ও সত্যপল) গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসর শহরের জালিয়ানওয়ালাবাগে অনেক মানুষ জড়ো হন। সেদিন পাঞ্জাবের অন্যতম বৃহৎ উৎসব বৈশাখীর দিন ছিল।

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে বিক্ষোভরত নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি চালানো হয়। গুলিতে কয়েক শ মানুষ নিহত হন। আহত হন হাজারো মানুষ। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইটহুড’ উপাধি পরিত্যাগ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় মুসলমানরা খেলাফত আন্দোলন (১৯১৯-২৪) শুরু করেন। অন্যদিকে রাওলাট আইন থেকে শুরু করে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২)।

১৯২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে খেলাফত আন্দোলনের প্রতি মহাত্মা গান্ধী সমর্থন দেন। বিনিময়ে খেলাফত আন্দোলনের নেতারা মহাত্মা গান্ধীর অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

এভাবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট গড়ে ওঠে। ব্যাপক সহিংসতাসহ বেশ কিছু বড় ঘটনার জেরে ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মহাত্মা গান্ধী তাঁর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।

রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ১৯২২ সালের ১০ মার্চ মহাত্মা গান্ধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অস্ত্রোপচার–সংক্রান্ত স্বাস্থ্যগত কারণে ১৯২৪ সালে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

আইন অমান্য আন্দোলন

ভারতের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন ও তা চূড়ান্তকরণে ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার সাইমন কমিশন গঠন করে। ব্রিটিশ সংসদীয় এই কমিশনকে পুরোপুরি ‘শ্বেতাঙ্গ কমিশন’ অভিহিত করে তা বর্জন করেন ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতারা।

পাল্টা হিসেবে ১৯২৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা মতিলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারতের জন্য একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়। ব্রিটিশ সরকারকে ‘নেহরু রিপোর্ট’ পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করতে চাপ দেয় কংগ্রেস।

ব্রিটিশ সরকার ১৯২৯ সালে ঘোষণা দেয়, শিগগিরই ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহরুর মতো কংগ্রেসের তরুণ নেতারা দাবি করেন, তাঁদের সংগ্রামের লক্ষ্য ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা।

এমন প্রেক্ষাপটে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় কংগ্রেস। মহাত্মা গান্ধীকে এই আন্দোলন পরিচালনার নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। তিনি অহিংস পন্থায় এই আন্দোলন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৩০ সালে তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় আইন অমান্য আন্দোলন। শিগগির এই আন্দোলন গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরুসহ অন্যান্য নেতাকে কারারুদ্ধ করা হয়। মহাত্মা গান্ধীসহ কংগ্রেসের নেতাদের ১৯৩১ সালের জানুয়ারিতে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯৩১ সালের মার্চ মাসে মহাত্মা গান্ধী ও ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড আরউইনের মধ্যে চুক্তি (গান্ধী-আরউইন চুক্তি) হয়। গান্ধী আইন অমান্য আন্দোলনে বিরতি দেন।

ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে আলোচনা করতে কংগ্রেসের একক প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বরে লন্ডনের গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন মহাত্মা গান্ধী। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হয়।

সরকারের দমননীতির জেরে ১৯৩২ সালের জানুয়ারিতে আবার আইন অমান্য আন্দোলন শুরুর সিদ্ধান্ত নেন মহাত্মা গান্ধী। ১৯৩৪ সালের এপ্রিলে এই আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৪০ সালের মার্চে লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর দ্বিজাতিতত্ত্বের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। জিন্নাহর ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগের অধিবেশনে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রসমূহ (স্টেটস) গঠনের রূপরেখার একটি প্রস্তাব (লাহোর প্রস্তাব) উত্থাপন করেন। পরে প্রবল উৎসাহে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

ভারত ছাড় আন্দোলন

ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের দাবিতে ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে ভারত ছাড় আন্দোলনের প্রস্তাব পাস হয়। এরপরই অহিংস পথে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।

তবে শেষ পর্যন্ত আন্দোলন আর অহিংস থাকেনি। আন্দোলন একপর্যায়ে পরিণত হয় বিদ্রোহে। ভারত ছাড় আন্দোলনকে ভাইসরয় লর্ড লিনলিথগোর ১৮৫৭ সালের ভারতীয় মহাবিদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করেন।

ভারত ছাড় আন্দোলন স্বাধীনতার দাবিকে মৌলিক দাবিতে পরিণত করে। এই আন্দোলনের পর মহাত্মা গান্ধীসহ ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামীদের আর পেছনে ফেরার কোনো পথ ছিল না।

ভারতের স্বাধীনতা

১৯৪৫ সাল নাগাদ ব্রিটিশরা বুঝে যায়, ভারত ছাড়তে হবে। ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ভারতত্যাগের বিষয়ে একটা ঘোষণা দেন। তিনি ১৯৪৮ সালের জুন মাস নাগাদ ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগ করার অভিপ্রায়ের কথা জানান। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের ১৫ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রণীত হয় ভারতের স্বাধীনতা আইন।

১৯৪৭ সালের ২ জুন রাতে কংগ্রেস, মুসলিম লীগসহ ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন। তিনি ১৯৪৭ সালের ৩ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং ভারত বিভাজনের ঘোষণা দেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সরকারের কাছে এবং ১৫ আগস্ট ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।

দেশ বিভাজনের পর আরও সহিংসতা, আরও দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে অনশন করে কলকাতাকে দাঙ্গার আগুন থেকে রক্ষা করেন মহাত্মা গান্ধী। পরে তিনি কলকাতা থেকে দিল্লিতে ছুটে যান। মুসলমানদের নিরাপত্তা, অধিকারসহ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার দাবিতে তিনি অনশন শুরু করেন। ১৯৪৮ সালের ১৩ থেকে ১৮ জানুয়ারি দিল্লিতে এটা ছিল তাঁর জীবনের শেষ অনশন।

অহিংসার পূজারি সহিংসতার শিকার

মহাত্মা গান্ধী দিল্লির বিড়লা হাউসে অবস্থান করছিলেন। তাঁর অনশনভঙ্গের দুই দিন পর বিড়লা হাউসে একটি বোমা হামলা হয়। তবে এই হামলায় তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি।

বিড়লা হাউসে সকাল ও সন্ধ্যায় প্রার্থনাসভা করতেন মহাত্মা গান্ধী। সভায় সব ধর্মের কথা বলা হতো। সভায় প্রতিদিন অংশ নিতেন কয়েক শ মানুষ।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি বিকেল ৫টার কিছু পর দুই আত্মীয় আভা ও মানুর কাঁধে হাত রেখে প্রার্থনাসভায় যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এগোতে থাকেন মহাত্মা গান্ধী। হঠাৎ তাঁর সামনে এসে দাঁড়ান নাথুরাম গডসে নামের এক ব্যক্তি।

নাথুরাম তাঁর হাতজোড় করে মহাত্মা গান্ধীকে বলেন, ‘বাপু, নমস্কার।’ তখন নাথুরামকে সরে যেতে বলেন মানু। মানুকে ধাক্কা দেন নাথুরাম। এরপরই তিনি মহাত্মা গান্ধীর দিকে পিস্তল তাক করে চোখের নিমেষে পরপর তিনটি গুলি চালান। মহাত্মা গান্ধী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। দ্রুত তাঁকে বিড়লা হাউসে তাঁর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

মহাত্মা গান্ধীর মরদেহ বিড়লা হাউসে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পরে সেখানে পৌঁছান তাঁর ছোট ছেলে দেবদাস গান্ধী। তিনি মহাত্মা গান্ধীর শরীর থেকে কাপড়টি সরিয়ে দেন। সবার উদ্দেশে বলেন, ‘অহিংসার পূজারির সঙ্গে হওয়া হিংসার ঘটনা দুনিয়া দেখুক।’

নাথুরামের ফাঁসি

নাথুরাম কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল হিন্দু মহাসভার সদস্য ছিলেন। হিন্দু মহাসভায় যোগ দেওয়ার আগে তিনি আরেক কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্য ছিলেন।

মহাত্মা গান্ধীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন নাথুরাম। তাঁর অভিযোগ ছিল, দেশভাগের জন্য মহাত্মা গান্ধীই দায়ী। মুসলিম সম্প্রদায় ও পাকিস্তানের প্রতি মহাত্মা গান্ধীর মনোভাব ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ ও নমনীয়।

মহাত্মা গান্ধী হত্যা মামলার বিচার চলাকালে আদালতে নাথুরাম বলেছিলেন, ‘গান্ধীজি দেশের জন্য যা করেছেন, এর জন্য আমি তাঁকে সম্মান করি। গুলি চালানোর আগে তাই আমি মাথা নিচু করে তাঁকে প্রণামও করেছিলাম। কিন্তু সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে ভাগ করার অধিকার কারও নেই, তিনি যত বড়ই মহাত্মা হোন না কেন। আর এর বিচার করবে—এমন কোনো আইন-আদালত নেই। সে জন্যই আমি গান্ধীকে গুলি করেছিলাম।’

মহাত্মা গান্ধী হত্যা মামলায় নাথুরাম ও তাঁর সহযোগী নারায়ণ আপ্তের ফাঁসির আদেশ হয়। নাথুরামের ভাই গোপাল গডসেসহ ছয়জনকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ১৯৪৯ সালের ১৫ নভেম্বর নাথুরাম ও নারায়ণের ফাঁসি কার্যকর হয়।

২০০৭ সালের ১৫ জুন জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ২ অক্টোবরকে (মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন) ‘আন্তর্জাতিক অহিংসা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

তথ্যসূত্র: বাংলাপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, বিবিসি, এমকেগান্ধী ডট ওআরজি।

ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক মহাত্মা গান্ধী
ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম অগ্রনায়ক মহাত্মা গান্ধী। ছবি: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

৩৫ বছর পর যে কলেজে প্রকাশ্যে এল শিবির by ফাহিম আল সামাদ

ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষে প্রাণ হারান তিন ছাত্র। এরপর কলেজটির রাজনীতির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রলীগ। প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও কলেজটিতে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করেছে ছাত্রশিবির। পালন করা হচ্ছে নানা কর্মসূচি।

কলেজটির নাম চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ। চট্টগ্রাম নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থিত এই কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৪৭ সালে। তখন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘চট্টগ্রাম কলেজ অব কমার্স’। গত সোমবার কলেজটিতে শেষ হয়েছে শিবিরের আয়োজন করা দুই দিনের প্রকাশনা উৎসব।

১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে সরব দেখা গেছে এই কলেজের শিক্ষার্থীদের। কলেজটির ছাত্র সংসদে নেতৃত্ব দিয়েছেন—এমন অনেকেই দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েরও। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে কলেজটিতে সব ছাত্রসংগঠনের অংশগ্রহণে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়ার রীতি ছিল। তবে সেই দৃশ্যপট পাল্টে যায় নব্বইয়ের দশকে।

কলেজটির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন—এমন নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৮ ও ১৯৮৯ সালের দিকে কলেজে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয় ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে। এতে প্রাণ হারান তিন ছাত্র। এরপর কলেজটি পুরোপুরি ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। একসময় প্রকাশ্যে রাজনীতি করা ছাত্রশিবিরের কার্যক্রমও কলেজে বন্ধ হয়ে পড়ে।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কলেজের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আবারও পাল্টে গেছে। কলেজটিতে আবারও প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। গত বছরের নভেম্বরে প্রথম প্রকাশ্যে আসে সংগঠনের কলেজ শাখার কমিটিও। গত রোববার থেকে গত সোমবার পর্যন্ত এই কলেজে আয়োজন করা হয় ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা উৎসব। আয়োজক ইসলামী ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম নগর দক্ষিণ শাখা।

গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, কলেজের ফটকের উল্টো দিকে সড়কের পাশে বসানো হয়েছে তিনটি স্টল। পাশে ‘রিডিং কর্নার’। বইয়ের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের ছবিযুক্ত ক্যালেন্ডারও প্রদর্শন করা হচ্ছে এসব স্টলে। এ ছাড়া পাশে একটি বুথে ছাত্রশিবিরের সমর্থক ফরম পূরণের সুযোগ রাখা হয়েছে। জানতে চাইলে মহানগর দক্ষিণ শাখার সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শিবির নিয়ে মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছিল। এই বিভ্রান্তি দূর করতেই সংগঠনের প্রকাশনা নিয়ে উৎসবের আয়োজন।

ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা জানান, কলেজটিতে দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে শিবিরের রাজনীতি না থাকলেও সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ ছিল না। সাংগঠনিক থানা হিসেবে প্রতিবছর কমিটিও করা হয়।

শিক্ষার্থীদের সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্টের আগে কমার্স কলেজের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। এরপর সেখানে গত সেপ্টেম্বর মাসের দিকে আহ্বায়ক কমিটি দেয় ছাত্রদল। গত ২৩ নভেম্বর কলেজের উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় নবীনবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিবির। সেখানে প্রথম প্রকাশ্যে আসেন কমার্স কলেজ শাখা শিবিরের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম। এরপর গত ডিসেম্বর মাসে বিজয় শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয়। এ বছর কমার্স কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের সাদনান ফাহিম।

কমার্স কলেজ শাখা শিবিরের সভাপতি সাদনান ফাহিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে তাঁদের জন্য কাজ করতে চাই। ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে যে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের, আমরা সেটি দূর করতে চাই। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলেজে শিবিরের কার্যক্রম চলছে।’

কলেজ ছাত্রলীগের নেতাদের অধিকাংশই বর্তমানে আত্মগোপনে। তাই তাঁদের কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রাম নগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক সহাবস্থানে থাকতে চাই। আমরা চাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়। পাশাপাশি শিবিরকেও গুপ্ত রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতি করার আহ্বান জানাই’

---প্রথম আলো

সরানো হচ্ছে মোনালিসাকে, রাখা হবে বিশেষভাবে নির্মিত কক্ষে

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী আসেন ফ্রান্সের ল্যুভর জাদুঘরে। এ জাদুঘরটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি মোনালিসা ছবিটি। পৃথিবীর সব থেকে চর্চিত শিল্পকর্মটির সামনে যখন পৌঁছবেন, তখন বুলেটপ্রুফ কাচের আড়ালে থাকা ‘ছোট্ট’ ছবিটিতে রহস্যময়ীর অবিস্মরণীয় হাসি ও কাব্যিক সত্তা আপনাকে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করে দেবেই।

ল্যুভর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, মোনালিসাকে তার বর্তমান স্থান থেকে সরিয়ে একটি পৃথক বিশেষভাবে নির্মিত কক্ষে রাখা হবে। এই ঘোষণা দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো।

বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জাদুঘর সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মোনালিসাকে এবার সরানো হবে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর সমাগমের কারণে জাদুঘরের অন্য শিল্পকর্মের প্রতি মনোযোগ দেয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ বলে জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত ভিড়ের ফলে জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং শিল্পকর্ম সংরক্ষণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

ল্যুভর কর্তৃপক্ষের মতে, এই স্থানান্তরের ফলে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা উন্নত হবে, পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পকর্মও তাদের প্রাপ্য গুরুত্ব পাবে। ২০৩১ সালের মধ্যে এ সংস্কার কাজ শেষ হবে বলে ঘোষণা দেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। পরবর্তীতে এ ছবিটি দেখতে হলে দর্শনার্থীদের আলাদা করে টিকিট কেটেই এ চিত্রকর্ম দেখতে হবে। আগামী জানুয়ারি থেকে প্রবেশমূল্যের পরিবর্তন আনা হবে। এখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের দর্শনার্থীদের বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের পর্যটকদেরও ল্যুভর জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হবে।

ল্যুভর পরিচালক লরেন্স দে কার সতর্ক করে বলেছে, জাদুঘরটিতে ভিড় আগে থেকে অনেক বেশি বেড়ে গেছে এবং এ কারণে অবকাঠামোগত সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন জাদুঘরে আসা ৩০ হাজার দর্শনার্থীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশই লিওনার্দো দা ভিঞ্চির এই চিত্রকর্ম দেখতে আসেন। তবে এটি যেন ধৈর্যের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন ভিড় সামলাতে দর্শনার্থীদের সাল দে জেতা হলের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সেখানে দর্শকরা গড়ে মাত্র ৫০ সেকেন্ডের জন্য তারা ছবিটি পর্যবেক্ষণ ও ছবি তোলার সুযোগ পান।

ম্যাডাম দে কার্স তার চিঠিতে লিখেছেন, জনসাধারণ কোনোভাবেই শিল্পীর কাজকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে না, যা আমাদের পুরো জনসেবামূলক মিশনকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, মোনালিসা শুধু একটি চিত্রকর্ম নয়, এটি ল্যুভর প্রতীক এবং একে আলাদা কক্ষে সরানো এই জাদুঘরের ঐতিহ্যের পরিপন্থী।

শিল্পবিশ্বের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ শিল্পের গভীর ঐতিহ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে আধুনিকীকরণের নামে একটি কৃত্রিম অভিজ্ঞতা তৈরি করার চেষ্টা করছে। সূত্র: বিবিসি

mzamin

কেন এই দাবির মিছিল?

দফায় দফায় নতুন দাবি নিয়ে সরকারের কাছে হাজির হচ্ছে বিভিন্ন পক্ষ। সেসব দাবি তাৎক্ষণিক মেনে নিতে দেয়া হচ্ছে চাপ। অন্যথায় বন্ধ করে দেয়া  হচ্ছে সেবা। অবরোধ করা হচ্ছে সড়ক। তালা দেয়া হচ্ছে সরকারি স্থাপনায়। সব মিলিয়ে দাবি-দাওয়া পার্টির কাছে জিম্মি সরকার ও সাধারণ মানুষ। সাড়ে ১৫ বছরের বৈষম্য নিমিষেই দূর করতে মরিয়া এসব পক্ষ। দাবি নিয়ে হাজির হওয়া এসব পক্ষের কাছে সরকারও অনেকটা নিরুপায়। মেনে নিতে হচ্ছে অযৌক্তিক সব দাবিও। না মানলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে জনগণকে। নৈতিকতার প্রশ্নও কোথাও কোথাও নস্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে দাবি-দাওয়া পার্টির কাছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে দেশে যেনো দাবি-দাওয়া আদায়ের দরবার বসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নরমে-গরমে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই সরকারের কাজ। স্বৈরাচারী না হয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হয়। নতুবা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মানুষ অনুভব করতে পারে না। প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে শক্ত ভূমিকা নিতে হয়। আবার কখনো সহানুভূতিশীল হতে হয়। এক্ষেত্রে একটা ভারসাম্য থাকতে হবে। আবার জনগণকেও তার রাষ্ট্রের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ইচ্ছা হলেই রাষ্ট্রের কাছে অযৌক্তিক দাবি চাপিয়ে দেয়া যাবে না। পশ্চিমা ধাঁচে বাংলাদেশ পরিচালনা করা যাবে এই চিন্তাও অমূলক। অনেকে বলছেন, বছরের পর বছর নিজেদের দাবি নিয়ে কথা না বলা মানুষদের এখন হঠাৎ সরব হওয়ার পেছনে কোনো পক্ষের ইন্ধন এবং আর্থিক বিনিয়োগ থাকতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে কর্মপন্থা ঠিক করতে হবে।

জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি মানুষের যে বিশাল প্রত্যাশা ছিল দাবি-দাওয়ার আন্দোলনের কারণে তা অনেকটা ম্লান হয়ে আসছে। দাবি পার্টি একের পর এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে চলেছে। এতে সরকার স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাতে পারছে না।

এ পর্যন্ত শতাধিক দাবি-দাওয়ার আন্দোলন মোকাবিলা করতে হয়েছে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সক্রিয় হয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। যারা বিগত সাড়ে ১৫ বছর নিজেদের বঞ্চিত বলে দাবি করছেন। সচিবালয় থেকে মাঠ প্রশাসন সব জায়গায় নানা দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠী। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বাদ যাচ্ছে না। সময়ে সময়ে নতুন নতুন দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কল-কারখানাগুলোতেও চলছে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার আন্দোলন। শিক্ষক-চিকিৎসক-শ্রমিক শ্রেণি সবাই দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে রয়েছে। শিক্ষার্থীরাও সময়ে অসময়ে যৌক্তিক-অযৌক্তিক দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকারকে এইচএসসি পরীক্ষার সব বিষয়ে পরীক্ষা না নিয়ে ফলাফল দিতে হয়েছে। সচিবালয়ে সময়ে সময়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু থেকেই সরকারকে জিম্মি করে রেখেছিল। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে চলছে দাবি- দাওয়ার আন্দোলন।

অনেকে দাবি-দাওয়া নিয়ে নেমে আসছেন রাস্তায়। বিশেষ করে শাহবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিছুদিন পরপর অবরোধ করছেন এসব গোষ্ঠী। যাদের মধ্যে চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী রয়েছেন। এর পাশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি, বারডেম, ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান থাকায় বিষয়টি আরও উদ্বেগের। প্রতিনিয়ত এ পথে রোগী ও স্বজনদের পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। সর্বশেষ এবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকরা শাহবাগে অবস্থান নেয়। যেখান থেকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অভিমুখে রওয়ানা হলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। এ ছাড়াও সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা গত কয়েকদিন রাজধানীর বেশ কয়েকটি সড়কে আন্দোলন করছেন। এদের মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি অন্যতম। ওদিকে গুচ্ছ পরীক্ষার দাবিতে একদল শিক্ষার্থী তালা দিয়েছে ইউজিসিতে।

মঙ্গলবার থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের রানিং স্টাফরা মূল বেতনের সঙ্গে রানিং অ্যালাউন্স যোগ করে পেনশন এবং আনুতোষিক সুবিধা দেয়ার দাবিতে কর্মবিরতিতে গিয়েছে। রাত ১২টার পর শিডিউলে থাকা ট্রেনগুলোতে উঠেননি রানিং স্টাফরা। ফলে প্রারম্ভিক স্টেশন থেকে কোনো ট্রেন ছেড়ে যায়নি। রানিং স্টাফের মধ্যে রয়েছেন ট্রেনচালক, গার্ড ও টিকিট চেকার পদধারীরা। এতে ভোগান্তিতে পড়েন রেলের যাত্রীরা। নিরুপায় হয়ে সরকার বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বিআরটিসি বাসের ব্যবস্থা রাখে। সর্বশেষ কয়েক মাসে বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে আরও সক্রিয় ছিল ইন্টার্ন চিকিৎসক, প্রাথমিক শিক্ষক, ম্যাটস শিক্ষার্থী, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক, গার্মেন্টস শ্রমিক, ব্যাটারিচালিত রিকশা শ্রমিক, বন্দর শ্রমিক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি, ইএফটি, বিডিআর পরিবারসহ আরও অনেকে। এ ছাড়াও দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে সরকারকে আনসার ও সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন আন্দোলন মোকাবিলা করতে হয়েছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কিন্তু ধৈর্য অনেক কম। কয়েকটা মাসে আমরা পাগল হয়ে গেছি। সরকার অনেক ভুল করছে ঠিক আছে কিন্তু তাকে তো সময় দিতে হবে। প্রতিদিন দাবি-দাওয়া নিয়ে নেমে পড়ছে। এতদিন কোথায় ছিলেন। তখন তো একটা কথা বলারও সাহস পাননি। এখন যেহেতু একটি সুযোগ তৈরি হচ্ছে তখন সবাই রাস্তায় নেমে পড়ছেন। এতে লাভ কার। এ দেশের সমাজের, রাষ্ট্রের কোনো লাভ হবে। অনেক ত্রুটি আছে। একটা জঞ্জালের মধ্যে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। যখন খবর নিয়েছি তখন অবাক হয়ে গেছি। এত দুর্নীতি অনিয়ম।   

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. জিন্নাত আরা নাজনীন মানবজমিনকে বলেন, ৫ই আগস্টের পর মানুষের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা বেড়ে গেছে। সরকারকে স্টেবল হতে না দিয়ে সবাই নিজ নিজ দাবি আদায়ে ব্যস্ত। সময়ে অসময়ে মাঠে নেমে আসছে। একজনের দাবি আদায় হলে আরেকজন মাঠে নেমে যাচ্ছে। এ মেন্টালিটি খারাপ। যেটি আমাদের এখানকার মানুষ বুঝছে না। এক্ষেত্রে সরকার শক্ত হলে সমালোচনা হবে, আবার নরম হলে রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সরকারকে একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। যেন নিজে আবার স্বৈরাচারী না হয়ে উঠে। এ ছাড়াও মানুষকে সচেতন করার উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতারা ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রচারণা চালাতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, কোয়ের্সিভ পাওয়ার (দমনমূলক শক্তি) না থাকলে একটি স্টেটের মূল্য থাকে না। স্টেটের বিভিন্ন ফাংশান থাকে। সেখানে সোসাইটি (সমাজ) হচ্ছে মাদার (মা) আর স্টেট (রাষ্ট্র) হচ্ছে ফাদার (পিতা)। প্রফেসর ইউনূসের বড় ভুল তিনি শুরু থেকে এ দেশটি পশ্চিমা স্টাইলে পরিচালনার নীতি নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশের সব মানুষ তো পশ্চিমা ক্যারেক্টারের না। রাষ্ট্রের যে শক্তি আছে সেদিকে তিনি যাননি। স্টেটের পাওয়ার না থাকলে মানুষের আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে না। ১/১১ সময় সেনাবাহিনীকে ম্যাজেস্ট্রিসি পাওয়ার দেয়া হয়েছিল। তারা সেভাবে কাজ করায় তখন এ রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কিন্তু এবার সেটি দেয়া হয়েছে দেরিতে। আবার তারাও আগের মতো কাজ করছে না। তাই বিভিন্ন গোষ্ঠী এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। আর পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের লোকজন এখানে ইন্ধন যোগাচ্ছে। সুযোগ নিচ্ছে। এসব আন্দোলনের পেছনে একটি সংঘবদ্ধ শক্তি কাজ করছে যেন ইউনূস সরকার ব্যর্থ হয়। ড. ইউনূসকে মনে রাখতে হবে এনজিও’র মতো করে সরকার চালানো যায় না। স্টেটের রোল হতে হবে শাসন ও মমতা দুটোর সমন্বয়ে। তাহলে স্টেট সফল হবে।

mzamin

নির্যাতনে চার দাঁত হারানো গৃহকর্মী কল্পনা এবার হাসিমুখে বাড়ি ফিরবে

১৩ বছর বয়সী কল্পনার মুখে ঝকঝকে দাঁত, আর মুখে হাসি লেগেই আছে। লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় সে। এখন আর ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কল্পনার হাসিমুখের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে।

অথচ আজ থেকে ৩ মাস ১১ দিন আগে কল্পনার চেহারা দেখে যে কেউ আঁতকে উঠতেন। কল্পনার সামনের চারটি দাঁত ভাঙা ছিল। হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল ছ্যাঁকার ক্ষত। কোনো কোনো ক্ষত ছিল দগদগে। বুক, পিঠসহ সারা শরীরে মারের চিহ্ন। রক্তশূন্যতার পাশাপাশি মানসিক ট্রমা তো ছিলই।

কল্পনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের অধীনে চিকিৎসাধীন। এই চিকিৎসক জানান, দুই–এক দিনের মধ্যেই কল্পনা হাসিমুখে বাড়িতে ফিরবে। কল্পনার শরীরে অনেকগুলো অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কৃত্রিমভাবে চারটি দাঁত লাগানো হয়েছে। দাঁতগুলো স্থায়ীভাবে লাগানোর প্রক্রিয়া চলছে। নিচের ঠোঁটেও ছোট একটি অস্ত্রোপচার লাগবে। সব মিলিয়ে তাকে ফলোআপে রাখা হবে।

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় সাড়ে চার বছর গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত কল্পনা। সেখানেই সে চরম নির্যাতনের শিকার হতে থাকে।

বেসরকারি চ্যানেল ৭১ টেলিভিশনের সাংবাদিক ইশতিয়াক ইমন একটি ভিডিও ফুটেজের সূত্র ধরে কল্পনার বিষয়টি জানতে পারেন। পরে তাঁর মাধ্যমে ভাটারা থানার পুলিশের সহায়তায় ১৯ অক্টোবর রাতে বসুন্ধরার ওই বাসা থেকে কল্পনাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর কল্পনা প্রথম আলোকে জানিয়েছিল, দীর্ঘদিন ধরে তাকে মারধর করার পাশাপাশি দিনে এক বেলা খাবার দেওয়া হতো। চুল সোজা করার যন্ত্র দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া, লম্বা বেত দিয়ে মারধর করা এবং বন্দী করে রাখা হয়েছিল। মা ফোন করলেও ফোনের সামনে বাড়ির মালিক দিনাত জাহান থাকতেন বলে কল্পনা মাকেও নির্যাতনের কথা বলতে পারত না।

কল্পনারা পাঁচ বোন ও এক ভাই। কল্পনার বাবা শরিফ মিয়া সিলেটের হবিগঞ্জে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। তবে মেয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী আফিয়া বেগম তিন মাসের বেশি সময় ধরে হাসপাতালেই ছিলেন।

মেয়েকে মারধরের অভিযোগে আফিয়া বেগম বাদী হয়ে বাড়ির মালিক দিনাত জাহানের বিরুদ্ধে ভাটারা থানায় মামলা করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) অনুযায়ী মামলা করেন। দিনাত জাহান ও তাঁর এক ভাই বর্তমানে কারাগারে আছেন।

আজ বুধবার মুঠোফোনে কল্পনার মা আফিয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাইয়াডারে কামে দিয়া সব্বনাশ হইছে। মাইয়ারে আর কামে দিমু না। বাড়িত নিয়া ইস্কুলে ভর্তি করামু।’

পরে মায়ের মুঠোফোনেই কল্পনার সঙ্গে কথা হয়। শুরুতেই কেমন আছো, জানতে চাইলে কল্পনা জানায়, সে ভালো আছে। নিজে থেকেই প্রতিবেদককে ‘আপনি কেমন আছেন’ তা–ও জানতে চায়।

টুকটুকে লাল লিপস্টিক দেওয়া কল্পনার হাসিমুখের ছবিটি খুব সুন্দর হয়েছে বললে সে হাসতে থাকে। জানায়, লিপস্টিকটি বড় বোন রত্না কিনে দিয়েছেন। বাড়িতে ফিরে স্কুলে ভর্তি হবে এবং পড়াশোনা শেষ করে চিকিৎসক হবে বলেও জানিয়ে দিল সে। সে নির্যাতনকারী দিনাত জাহানের ফাঁসি চায়।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল কল্পনাকে দেখতে গিয়েছিল। এ ছাড়া সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ কল্পনাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে তাঁর সুচিকিৎসার পাশাপাশি অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছিলেন।

ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটির মা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলার আসামি হিসেবে দিনাত জাহান এবং সহযোগী অপরাধী হিসেবে তাঁর এক ভাই বর্তমানে কারাগারে আছেন। মেয়েটির মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়ার পর মামলার নিষ্পত্তি করা হবে।

কল্পনার চিকিৎসক বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন আজ সন্ধ্যায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কল্পনা হাসিমুখে বাড়িতে ফিরছে, এটা ভাবতেই ভালো লাগছে।’ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পরে উপদেষ্টার সঙ্গে সরাসরি দেখা করে কল্পনার সার্বিক অবস্থার কথা জানানো হয়েছে। উপদেষ্টা তাঁর মন্ত্রণালয়কে কল্পনার পড়াশোনাসহ পুনর্বাসনের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

হাসপাতালে ভর্তির পর ক্ষত জায়গার সংক্রমণ এড়াতে কল্পনার শরীর ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছিল। মানুষের ভিড় থেকে দূরে রাখতে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও (আইসিইউ) রাখতে হয়েছিল তাকে। তার শরীরের অনেকগুলো অস্ত্রোপচারের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় চামড়া লাগাতে হয়েছে। হাসপাতালের দন্ত বিভাগ, মানসিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে কল্পনার চিকিৎসা চলে। সরকারি খরচে তার চিকিৎসা হয়েছে।

মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন জানান, কল্পনার শরীরে এখন শুধু অস্ত্রোপচারের দাগ আছে। আগে যে ট্রমা ছিল, তা এখন নেই বললেই চলে। কল্পনাও টেলিফোনে প্রথম আলোকে বলে, সে এখন আর মানুষ দেখে ভয় পায় না।

গত ২০ অক্টোবর প্রথম আলো অনলাইনে ‘নির্যাতনে গৃহকর্মী শিশুটির চারটি দাঁত ভেঙেছে, শরীরে মারধর ও ছ্যাঁকার ক্ষত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

নির্যাতনে গৃহকর্মী শিশুটির চারটি দাঁত ভেঙেছে, শরীরে মারধর ও ছ্যাঁকার ক্ষত by মানসুরা হোসাইন

১৩ বছর বয়সী কল্পনার সামনের চারটি দাঁত ভাঙা। হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ্যাঁকার ক্ষত। কোনো কোনো ক্ষত শুকিয়ে টান ধরেছে। কোনো কোনো ক্ষত এখনো দগদগে। বুক, পিঠসহ সারা শরীরে মারের চিহ্ন। একদিকে মারধর, অন্যদিকে রক্তশূন্যতা। শারীরিক সমস্যার সঙ্গে মানসিক ট্রমা তো আছেই।

কল্পনা রাজধানীতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এক বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত। সাড়ে চার বছর ধরে সে এই বাসায় কাজ করত। বর্তমানে কল্পনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।

আজ রোববার কল্পনার শারীরিক ও মানসিক ট্রমার কথা এভাবেই বর্ণনা করলেন বার্ন ইউনিটের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন। শনিবার থেকে এই চিকিৎসকের অধীনেই ভর্তি আছে কল্পনা।

নাসির উদ্দীন জানালেন, মেয়েটির সারা শরীরে ক্ষত। তাই সংক্রমণ এড়াতে ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছে। শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো হলে মঙ্গলবার প্রাথমিকভাবে একটি অস্ত্রোপচার করার সম্ভাবনা আছে। এরপর আরও অস্ত্রোপচার লাগবে। মানুষের ভিড় থেকে দূরে রাখতে এবং চিকিৎসকের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের দন্ত বিভাগ, মানসিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেয়েটির চিকিৎসা করতে হবে।

বেসরকারি চ্যানেল ৭১ টেলিভিশন একটি ভিডিও ফুটেজ থেকে কল্পনার বিষয়টি জানতে পারে। পরে চ্যানেলটির সাংবাদিক ইশতিয়াক ইমনের মাধ্যমে ভাটারা থানার পুলিশের সহায়তায় গতকাল শনিবার রাতে বসুন্ধরার ওই বাসা থেকে কল্পনাকে উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় বাসার মালিক তরুণী দিনাত জাহানকে।

৭১ টেলিভিশনের প্রতিবেদনে কল্পনা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাকে মারধর করার পাশাপাশি দিনে এক বেলা খাবার দেওয়া হতো। চুল সোজা করার যন্ত্র দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো তাকে। লম্বা বেত দিয়ে মারধর করা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়া এবং বন্দী করে রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছে কল্পনা।

কল্পনারা পাঁচ বোন ও এক ভাই। আজ মুঠোফোনে কথা হয় কল্পনার মা আফিয়া বেগমের সঙ্গে। তাঁর স্বামী শরিফ মিয়া কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। তাঁরা থাকেন সিলেটের হবিগঞ্জে। মেয়েকে মারধরের অভিযোগে আফিয়া আজ বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০) এর অধীনে ভাটারা থানায় দিনাত জাহানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

আফিয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে মেয়েকে ওই বাসায় কাজে দিয়েছিলেন। দিনাত জাহানের মা–বাবার সঙ্গে কথা বলেই মেয়েকে কাজে দেন। এক মাস আগে দিনাত জাহানকে ফোন দিলে তিনি বসুন্ধরা না, গুলশানে থাকেন (একা) বলে জানান। বাসায় গিয়ে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে দিনাত জাহান বাসায় যাওয়া যাবে না এবং মেয়ে ভালো আছে বলেও জানান। মেয়েও ভয়ে টেলিফোনে নির্যাতনের কথা বলতে পারেনি।

এই মা বললেন, ‘এক মাস আগেই মনে হয় দাঁত ভাইঙ্গা দিছিল। তাই মাইয়্যা কথাও কইতে পারতেছিল না। এখন দেখি মাইয়্যারে সারা শরীরে ছ্যাঁকাও দিছে। আমার কলিজাডা ফাইট্যা যাইতেছে। এইটা কোনো কারবার হইছে? আমি উপযুক্ত বিচার চাই।’

কল্পনার বোনের স্বামী হৃদয় ইসলাম গাজীপুরের চন্দ্রায় অটোরিকশা চালান। হাসপাতালে কল্পনাকে দেখতে এসেছেন। বললেন, ‘কল্পনার অবস্থা তো খুবই গুরুতর। চারটি দাঁত নাই। ওরে দেইখ্যা নিজেদেরই কষ্ট লাগতেছে।’

ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটির মা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আসামিকে রিমান্ডে চাওয়া হয়েছে।

এদিকে কল্পনার সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে আজ দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল। এ ঘটনার ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কমিশনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস দেন চেয়ারম্যান। তিনি জানান, মানবাধিকার কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত অভিযোগ গ্রহণ করেছে এবং সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, শিশুটির চিকিৎসায় হাসপাতালের পক্ষ থেকে সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শিশুটির সারা শরীরে ক্ষত। তাই সংক্রমণ এড়াতে ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছে
শিশুটির সারা শরীরে ক্ষত। তাই সংক্রমণ এড়াতে ব্যান্ডেজ করে রাখা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

নির্যাতনে চারটি দাঁত ভেঙে গেছে শিশুটির
নির্যাতনে চারটি দাঁত ভেঙে গেছে শিশুটির। ছবি: সংগৃহীত