Tuesday, June 30, 2026

হরমুজের নিয়ন্ত্রণ কার?

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একত্রে ইরানে হামলা চালালে যে যুদ্ধের সূচনা হয় তার প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি আটকে দেয়। এতে শতশত সামুদ্রিক জাহাজ ও হাজারো নাবিক এই প্রণালিতে আটকা পরে। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর পদক্ষেপের পরও হরমুজে কার্যকর অবরোধ বজায় রাখে ইরান। এতে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয় মার্কিন পরাশক্তি। আলোচনার টেবিলে ইরানকে সুবিধাজনক অবস্থান এনে দেয় তার হরমুজ প্রণালি অবরোধ করার এই সক্ষমতা। অচলাবস্থা ভাঙ্গতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান শান্তিচুক্তির সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলে হরমুজ প্রণালিতে স্বস্তি ফেরে। তবে এই স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ চলমান।

শুধু স্নায়ুযুদ্ধই নয় একই সঙ্গে সামরিক সংঘাতের ঘটনাও ঘটেছে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর। এতে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি আবারো স্থবির হয়ে পরার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও উভয় পক্ষ উত্তেজনা বাড়াবে না বলে জানিয়েছে তবে যেকোন সময় ফের সংঘাত শুরু হতে পারে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে এখন বিশ্বে চলছে টান উত্তেজনা। এই পরিস্থিতিতে ‘স্ট্রেইট অব হরমুজ’ বা হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রথম বৈঠক হয়েছে। ওমানের মাস্কাটে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশ প্রণালিটি পরিচালনার বিষয়ে একটি সাধারণ সমঝোতায় বা যৌথ বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি। এ খবর দিয়েছে এএফপি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে কাজেম ঘারিবাবাদি জানান, ওমান একটি উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে এই প্রণালির ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হতে সমর্থন জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা মনে করে যে, প্রণালিতে প্রদত্ত বিভিন্ন সেবার বিপরীতে ফি বা শুল্ক আদায় করা উচিত। এই লজিস্টিকস ও শিপিং রুট নির্ধারণের জন্য আগামী সাত থেকে আট দিনের মধ্যে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে। হরমুজ প্রণালির এই নতুন সেবা শুল্ক নিয়ে আমেরিকার সাথে ইরানের তীব্র মতবিরোধ চলছে; ওয়াশিংটন যেকোনো ধরনের শুল্ক আরোপের ঘোর বিরোধী। এর আগে ওমান জানিয়েছিল যে, তারা কোনো পারাপার ফি বা প্যাসেজ ফি নেবে না এবং জাতিসংঘের সমন্বয়ে একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক করিডোর তৈরি করবে। যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান তাদের নিজস্ব উপকূলবর্তী রুট ব্যবহারের জন্য জাহাজে হামলা চালিয়ে চাপ সৃষ্টি করে আসছিল।

এদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন সোমবার ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালিকে মাইনমুক্ত করতে এবং নিরাপদ সামুদ্রিক চলাচল নিশ্চিত করতে ফ্রান্স ও ওমান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের ফ্রান্স সফরের পর ম্যাক্রন সামাজিক মাধ্যম এক্সে এই ঘোষণা দেন। তবে ফ্রান্সের এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে তেহরান। কাজেম ঘারিবাবাদি এক্সে দেয়া এক পোস্টে স্পষ্ট জানান, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী ইরান এককভাবেই হরমুজ প্রণালি মাইনমুক্ত করার কাজ সম্পন্ন করবে। চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ৮০টি মাইন অপসারণের দায়িত্ব সম্পূর্ণ ইরানের। ঘারিবাবাদি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান মাইন অপসারণের এই প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো দেশকে অংশ নিতে দেবে না। একই সাথে তিনি হরমুজ প্রণালির সংবেদনশীল ও জটিল পরিস্থিতিকে ফ্রান্সের এমন উসকানিমূলক পদক্ষেপ দিয়ে আরও জটিল না করার জন্য কঠোর বার্তা দিয়েছেন। বিশ্বের পরাশক্তিরা চাইছে এই জলপথে নিজেদের প্রভাব থাকুক। অপরদিকে ইরান চাইছে এর কর্তৃত্ব শুধুই তাদের হাতে থাকবে। এতে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে তা সহসাই মিটবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে না। বিশ্ব অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোর যত দ্রুত সম্ভব উন্মুক্ত করণে সকল পক্ষকে একটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ আশু প্রয়োজন।

হরমুজের নিয়ন্ত্রণ কার?

রামমন্দিরে অর্থ আত্মসাতে কোনো মুসলিম জড়িত থাকলে যোগী সরকার এতক্ষণে এনকাউন্টারে হত্যা করত: ওয়াইসি

রামমন্দির নির্মাণের জন্য ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি রুপি অনুদানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় এবার উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী উগ্র হিন্দুত্ববাদী যোগী আদিত্যনাথের সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি।

গতকাল সোমবার উত্তর প্রদেশের পশ্চিমের বিজনৌর জেলায় এক জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে হায়দরাবাদের এই আইনপ্রণেতা ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘রামমন্দির ট্রাস্টে যদি কোনো মুসলিম থাকতেন, তাহলে এতক্ষণে সরকার তাঁকে এনকাউন্টারে হত্যা করত এবং তাঁর বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিত।’

অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে ‘বিলম্ব’ হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ওয়াইসি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, বহুল আলোচিত এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পুলিশ এমনকি হেফাজতে নেওয়ার আবেদনও করছে না।

এ নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে ওয়াইসি বলেন, ‘ট্রাস্টে একজন মুসলিমকে রাখলেই হতো। তারপর তাঁকে এনকাউন্টারে হত্যা করে এবং তাঁর বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে মামলাটি শেষ করে দেওয়া যেত। কিন্তু এখন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’

এ সময় উপস্থিত জনতা জোরালো করতালির মাধ্যমে ওয়াইসির এ বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।

অযোধ্যায় বিতর্কিত ভূমিতে রামমন্দির নির্মাণের পক্ষে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় আসার পর ২০২০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়। এই ট্রাস্ট মন্দির নির্মাণকাজ দেখভালের দায়িত্ব পায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রামমন্দির তৈরির কাজ উদ্বোধন করেন। মন্দির নির্মাণের জন্য ভক্তরা কোটি কোটি রুপি আর্থিক অনুদান ও গয়না দান করেন।

মোদির মন্দির নির্মাণকাজ উদ্বোধনের আড়াই বছর পর এখন সেই অনুদানের কোটি কোটি রুপি নয়–ছয় ও আত্মসাতের অভিযোগে ভারতজুড়ে তোলপাড় চলছে।

অনুদানের অর্থ চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর রামমন্দির ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই পদত্যাগ করেছেন।

ওয়াইসি এ নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ সুরে বলেন, ‘চম্পত তো দিব্যি সুখে আছেন।’

কয়েক দিন আগেও ওয়াইসি উত্তর প্রদেশ সরকারকে একই প্রশ্ন করেছিলেন। সেবার তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘এ মামলার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি গুলি চালানো হবে বা তাদের বাড়ির ওপর কি বুলডোজার চালানো হবে—যেমনটি রাজ্যটিতে মুসলিমদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে।’

রামমন্দিরের অনুদানের অর্থ চুরির ঘটনা ভারতজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং তা বড় ধরনের রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলগুলো যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলেছে।

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবের জনসমক্ষে তোলা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে যে বিষয়টি শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠনের মাধ্যমে তদন্তে রূপ নেয়। এরপর কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির বাসভবনে তল্লাশি চালানো হয়, অপ্রদর্শিত নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয় এবং মন্দিরের কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে, অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এই বিতর্ক রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে এবং মন্দিরের ব্যবস্থাপনা কমিটিতে ব্যাপক সংস্কারের দাবিও জোরদার করেছে।

চম্পত রাইয়ের পদত্যাগের পর ট্রাস্টি অনিল মিশ্রও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

গত ২৫ জুন ট্রাস্টের সদস্য কৃষ্ণ মোহনের অভিযোগের ভিত্তিতে এ ঘটনায় প্রথম এফআইআর দায়ের করা হয়। এফআইআরে আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁরা হলেন—অবিনাশ শুক্লা, অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, মনীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রামাশঙ্কর মিশ্র, সুভাষ শ্রীবাস্তব ও রাম শঙ্কর যাদব (টিন্নু নামেও পরিচিত)।

তাঁদের সবাই রামমন্দিরের অনুদান গণনার কাজে যুক্ত কর্মী। তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া এফআইআরএ আরও কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নামও এতে নেই।

২৬ জুন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ বলেন, জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করে এমন যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ করবে।

অনুদানের ঠিক কী পরিমাণ অর্থ চুরি গেছে তার সঠিক পরিমাণ এখনো জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, মন্দিরের হিসাব থেকে প্রায় ৭ বা সাড়ে ৭ কোটি রুপি নগদ অর্থের হিসাব মিলছে না। এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রায় ৮০ লাখ রুপি উদ্ধার করেছে পুলিশ।

আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ও যোগী আদিত্যনাথ
আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ও যোগী আদিত্যনাথ। ছবি: এএফপি ও এএনআই

‘কালো’ ও ‘মোটা’ বলে কটাক্ষ, সমালোচকদের জবাব মিস ইউনিভার্স পাকিস্তানের

প্রকাশ ১৯ নভেম্বর ২০২৫ঃ থাইল্যান্ডে বসেছে মিস ইউনিভার্সের ৭৪তম আসর। ১২২টি দেশের সুন্দরীরা অংশ নিয়েছেন এতে। এ আসরে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করছেন রোমা রিয়াজ। প্রতিযোগিতায় যেখানে নিজ দেশ থেকে সমর্থন পাওয়ার কথা, সেখানে কটাক্ষের শিকার হতে হচ্ছে তাঁকে। গায়ের রং, উচ্চতা ও কিছুটা ভারী শারীরিক গড়নের কারণে কয়েক দিন ধরেই তাঁর শুনতে হচ্ছে, ‘পাকিস্তানে কি সুন্দরী নারীর আকাল পড়ল!’ এর মতো মন্তব্য। এই ঘৃণাত্মক মন্তব্যের বিরুদ্ধে এবার সরাসরি মুখ খুললেন এই সুন্দরী। ইনস্টাগ্রামে একটি রিল ভিডিও পোস্ট করে তাঁকে নিয়ে করা বর্ণবাদী ও বডিশেমিং মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন তিনি।

ভিডিওতে রোমা রিয়াজ বলেন, ‘ফরসা হওয়াই সৌন্দর্যের মাপকাঠি—এই “বিষাক্ত বিশ্বাস” থেকেই এমন সমালোচনার জন্ম। তাঁর মতে, বর্ণবাদী মানসিকতার কারণেই আমরা ফরসা হওয়ার পেছনে ছুটি এবং নিজেদের শিকড় ভুলে যাই।’ রোমা আরও বলেন, ‘আমার সবটুকু জুড়ে আমি একজন পাকিস্তানি। আমার এই গায়ের রং তাদেরই পরিচয় বহন করে, যারা আমাদের ঘর আর দেশটাকে গড়ে তুলেছেন।’
রোমা আরও বলেন, তিনি শুধু পাকিস্তানকেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সেই নতুন প্রজন্মের নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যাঁরা সমাজের ঠিক করে দেওয়া সৌন্দর্যের সংকীর্ণ সংজ্ঞায় আটকে থাকতে চান না।

ভিডিওতে কথা বলার সময় রোমা প্রশ্ন তোলেন, কেন মানুষ নিজেদের দেশের নারীদের ছোট করতে এত তৎপর? তিনি বলেন, তিনি সারা বিশ্বকে বলে বেড়াচ্ছেন যে পাকিস্তানের মানুষ কতটা সুন্দর, অথচ সেই মানুষেরাই তাঁকে নিয়ে নেতিবাচক কথা ছড়াচ্ছেন। সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সবারই নিজস্ব মতামতের অধিকার আছে, কিন্তু যদি ভালো কিছু বলার না থাকে, তবে পাকিস্তানের সম্মানের স্বার্থে দয়া করে চুপ থাকুন।’
তরুণীদের উদ্দেশে রোমা রিয়াজ বলেন, ‘যেসব মেয়েকে ‘‘বেশি কালো, অন্যদের চেয়ে আলাদা’’ বলে ট্যাগ দেওয়া হয়েছে, তাঁরাও অন্য সবার মতোই পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন।’

সম্প্রতি একটি ইভেন্টে শাড়ি পরা নিয়েও সমালোচনার শিকার হন রোমা। এর জবাবে তিনি বলেন, ‘শাড়ি, সালোয়ার–কামিজের মতোই পাকিস্তানি।’ তিনি স্পষ্ট করে দেন, পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক ইতিহাস মুছে ফেলা বা নতুন করে লেখার কোনো সুযোগ নেই।
এর আগে দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসবের জবাব দিয়ে রোমা বলেন, ‘আমার গায়ের রং পাকিস্তানের মাটির প্রতীক। আমি এমন এক সময়ের প্রতিনিধিত্ব করি, যখন সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণাগুলো ক্লিশে হয়ে পড়েছে। আমি কালো, আমি বডি পজিটিভিটির অ্যাম্বাসেডর, আমার উচ্চতা খুব বেশি নয়, আর আমি সুন্দর। এতটা সুন্দর যে আমি আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করি।’

তথ্যসূত্র: গালফ নিউজ

রোমা রিয়াজ
রোমা রিয়াজ। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

জেন-জিদের হতাশা এবং উত্তরণের সিনেমায় বর্ষণ

প্রকাশ ১৯ নভেম্বর ২০২৫ঃ নাটক-সিনেমায় অভিনয়ের জন্যই পরিচিত রাজীব সালেহীন। সর্বশেষ ‘দাগি’ সিনেমায় অভিনয় করে আলোচনায় আসেন এই তিনি। পাশাপাশি বানিয়েছেন নাটক ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। এবার পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণে আসছেন।

‘রবি ইন ঢাকা’ নামের সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন ইমতিয়াজ বর্ষণ। চলতি মাসের শেষে শুটিং শুরু হবে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে খবরটি নিশ্চিত করে রাজীব সালেহীন বলেন, ‘জেন–জিদের হতাশা এবং তা থেকে উত্তরণ নিয়ে আমার এই ছবি।’

ছবির প্রধান চরিত্রের অভিনয়শিল্পী ইমতিয়াজ বর্ষণ বলেন, ‘সমকালীন জীবনের হতাশা, মানসিক চাপ এবং নানা সংকটের পরও মানুষ কী করে টিকে থাকার শক্তি খুঁজে পায়, ছবিটি সে বাস্তবতাকেই তুলে ধরবে। বেঁচে থাকার জন্য সুন্দর কিছু খুঁজে বের করার মানুষের এই নিরলস প্রচেষ্টা ছবির মূল বার্তা হিসেবে যেভাবে উঠে এসেছে, তা আমার কাছে সত্যিই দারুণ লেগেছে।’

‘রবি ইন ঢাকা’য় আরও অভিনয় করবেন রিচি সোলায়মান, আজাদ আবুল কালাম, আরমান পারভেজ মুরাদ প্রমুখ। রাজীব ২০০৫ সালে ডকু ফিকশন ‘ঠিক বাড়ি নয় বাড়ির মতোন’ দিয়ে তাঁর নির্মাণজীবন শুরু করেন। তানভীর মোকাম্মেলের ‘জীবনঢুলী’ তাঁর অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র।

ইমতিয়াজ বর্ষণ
ইমতিয়াজ বর্ষণ। ছবি: প্রথম আলো

ট্রাম্প-পুতিন-খামেনি-সি-মোদি–নেতানিয়াহু-এরদোয়ান, কার বিদ্যার দৌড় কত দূর

কারও শৈশব কেটেছে রেলস্টেশনে, কাউকে রুটি বিক্রি করতে হয়েছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কাউকে বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়েছে পাহাড়ের গুহায়, কারও ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে উঠেছে সামরিক একাডেমির কঠোর শৃঙ্খলায়। আজ তাঁরাই বিশ্বের প্রতাপশালী রাষ্ট্রনায়ক। তবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর এই পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, জীবনের পাঠশালা থেকেই তাঁরা পেয়েছেন বিশ্বশাসনের রসদ।

বইয়ের পাতার পাঠ আর বাস্তবের রুক্ষ লড়াই—এই দুইয়ের মিশেলে কীভাবে তাঁরা আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন, ছয় বিশ্বনেতার সেই সংগ্রামী শিক্ষাজীবন ও অজানা জয়গাথা নিয়েই এ বিশেষ আয়োজন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিক্ষাজীবন এককথায় বৈচিত্র্যময়। জন্ম তাঁর ব্যবসায়ী পরিবারে, ১৯৪৬ সালে নিউইয়র্কের কুইন্সে।

শৈশবে বেশ উদ্ধত স্বভাবের ছিলেন ট্রাম্প। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ‘মিলার সেন্টার’-এর জীবনীসংক্রান্ত তথ্য জানাচ্ছে, তাঁকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ‘নিউইয়র্ক মিলিটারি একাডেমি’তে পাঠিয়ে দেন বাবা–মা, যা তাঁর পরবর্তী জীবনে শৃঙ্খলার ভিত্তি গড়ে দেয়।

উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি প্রথমে ফোর্ডহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করলেও পরে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার বিখ্যাত ‘হোয়ার্টন স্কুল অব ফিন্যান্স অ্যান্ড কমার্স’-এ স্থানান্তরিত হন। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাফেজখানার তথ্য অনুযায়ী, সেখান থেকে ১৯৬৮ সালে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের উত্তাল সময়ে চারবার শিক্ষাবিরতি এবং একবার পায়ের হাড়ের সমস্যার মেডিক্যাল সনদ দেখিয়ে বাধ্যতামূলক সামরিক চাকরিতে যাওয়া এড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। ২০১৬ সালে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ট্রাম্পের এই ড্রাফট এড়ানোর বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে, যা নিয়ে পরে রাজনৈতিক মহলে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে।

ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবনের একটি অনুপ্রেরণামূলক দিক হলো, তাঁর নেশামুক্ত জীবন। ট্রাম্প বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে (যেমন ২০১৭ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে কথা বলার সময়) জানিয়েছেন, তাঁর বড় ভাই ফ্রেড ট্রাম্প জুনিয়র অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে ১৯৮১ সালে অকালে প্রাণ হারান। ভাইয়ের সেই করুণ পরিণতি দেখে ট্রাম্প জীবনে কখনোই মদপান, ধূমপান কিংবা মাদক গ্রহণ না করার কঠোর শপথ নেন এবং তা আজ ৮০ বছর বয়সেও মেনে চলেন।

পড়াশোনা শেষে বাবার আবাসন ব্যবসায় যোগ দিয়ে তিনি সেটিকে ‘ট্রাম্প অর্গানাইজেশন’-এ রূপান্তর করেন। এ সময় তিনি ম্যানহাটানের আকাশচুম্বী অট্টালিকা থেকে শুরু করে আটলান্টিক সিটির ক্যাসিনো ব্যবসায় নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। তবে ব্যবসায়িক জীবনের বাইরে তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পান এনবিসির রিয়ালিটি শো ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’-এর সঞ্চালক হিসেবে, যেখানে তুমুল জনপ্রিয়তা পায় তাঁর ‘ইউ আর ফায়ার্ড’ সংলাপটি।

২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ট্রাম্প। এরপর ২০২০ সালে পরাজয়ের তিক্ততা থাকলেও ২০২৪ সালে কামব্যাক করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দ্বিতীয় ব্যক্তি (প্রথম জন গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড) হিসেবে বিরতি দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

ইতিবাচকের পাশাপাশি নেতিবাচক রেকর্ডও রয়েছে তাঁর। মার্কিন কংগ্রেসের রেকর্ড অনুযায়ী, ট্রাম্পই আমেরিকার একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রতিনিধি পরিষদে দুবার অভিশংসিত হয়েও দুবারই সিনেটে খালাস পেয়েছেন।

ভ্লাদিমির পুতিন

রাশিয়ার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ভ্লাদিমির পুতিনের শৈশব ও শিক্ষাজীবন পেরিয়েছে এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে। ১৯৫২ সালে তৎকালীন লেলিনগ্রাদে (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) জন্ম তাঁর। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে তিনটি পরিবারের সঙ্গে একটি সাধারণ ‘কমিউনাল’ অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর বেড়ে ওঠা বলে সিএনএন-এর ‘ফাস্ট ফ্যাক্টস’-এ উল্লেখ করা হয়েছে।

পুতিন শৈশবে মোটেও শান্ত ছিলেন না, ছিলেন জেদি প্রকৃতির। পুতিন একবার অ্যাপার্টমেন্টের সিঁড়িতে একটি ইঁদুরকে কোণঠাসা করতে গিয়ে জীবনের বড় এক শিক্ষা পান। ইঁদুরটি একসময় পালানোর জায়গা না পেয়ে পুতিনকেই পাল্টা আক্রমণ করে বসে।

পুতিন তাঁর আত্মজীবনী ‘ফার্স্ট পারসন’–এ সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন এভাবে, ‘কাউকে কখনো এমনভাবে কোণঠাসা করো না যে তার পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, তখন সে মরণকামড় দেবেই।’

সিএএনের তথ্য বলছে, বিশৃঙ্খল জীবন থেকে নিজেকে ফেরাতে জুডোর শরণ নেন পুতিন। এরপর তিনি পড়াশোনায় গভীরভাবে মনোযোগী হন।

পুতিনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় লেলিনগ্রাদ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে, যেখান থেকে তিনি ১৯৭৫ সালে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেন। আয়ারল্যান্ডের রুশ দূতাবাসের নথিপত্র অনুযায়ী, পরবর্তী জীবনে তিনি অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রিও লাভ করেন।

পড়াশোনা শেষ করেই তিনি তৎকালীন সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পূর্ব জার্মানিতে গোয়েন্দা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পুতিনের রাজনৈতিক উত্থান অত্যন্ত নাটকীয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর তিনি তাঁর আইনের শিক্ষক আনাতোলি সোবচাকের অধীনে সেন্ট পিটার্সবার্গের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সিএনএনের টাইমলাইন অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন তাঁকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন এবং ওই বছরেরই ৩১ ডিসেম্বর ইয়েলৎসিনের আকস্মিক পদত্যাগের পর তিনি রাশিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হন।

ব্যক্তিগত জীবনে পুতিন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ। সিএনএনের তথ্যমতে, তিনি জুডোতে ব্ল্যাক বেল্টধারী এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করেন। ট্রাম্পের মতো তিনিও মদপান থেকে দূরে থাকাকেই প্রাধান্য দেন। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় সিদ্ধহস্ত এই নেতার দুই মেয়ে মারিয়া ও কাতেরিনাও জনসমক্ষে খুব একটা আসেন না।

মোজতবা খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনিকে তাঁর বাবার উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে দীর্ঘ ও নিবিড় শিক্ষাজীবনের এক বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ইরানের জটিল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোতে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে তিনি কয়েক দশক ধরে নিভৃতে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন।

১৯৬৯ সালে ইরানের পবিত্র শহর মাশহাদে জন্ম নেওয়া মোজতবার বেড়ে ওঠা ছিল ইসলামি বিপ্লবের ডামাডোলের মধ্যে। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, তিনি পড়াশোনা করেন তেহরানের অভিজাত ‘আলাভি’ হাইস্কুলে। ১৯৮৭ সালে রেভোল্যুশনারি গার্ডসে (আইআরজিসি) যোগ দিয়ে ইরান-ইরাক যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাঁর এই নিবিড় সম্পর্ক ক্ষমতারোহণের পথে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোজতবা খামেনি তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছেন ইরানের পবিত্র শহর কোমের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন সেমিনারিতে। সেখানে তিনি প্রখ্যাত আলেমদের তত্ত্বাবধানে ইসলামি আইন (ফিকহ) এবং দর্শনের ওপর গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ইরানের ক্ষমতাকাঠামোয় সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই উচ্চপদস্থ ধর্মীয় আলেম হতে হয়। মোজতবা দীর্ঘ সময় ধরে পর্দার আড়ালে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাঁর ধর্মীয় পদমর্যাদায় এক নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে।

২০২২ সালের শেষের দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁকে প্রথমবারের মতো ‘আয়াতুল্লাহ’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। এর আগে তিনি ‘হুজাতুল ইসলাম’ পদবিতে পরিচিত ছিলেন, যা মূলত মাঝারি স্তরের ধর্মীয় আলেমদের বোঝায়।

আয়াতুল্লাহ উপাধিটি পাওয়ার অর্থ হলো তিনি এখন ইসলামি আইনশাস্ত্রে স্বাধীনভাবে মতামত বা ‘ইজতিহাদ’ করার সক্ষমতা রাখেন। বর্তমানে তিনি কোম সেমিনারিতে ‘বাহথ আল-খারিজ’ বা উচ্চতর ফিকহ শাস্ত্রের পাঠদান করছেন। এই স্তরের শিক্ষকতা শুধু শীর্ষস্থানীয় আলেমরাই করতে পারেন।

মোজতবার প্রভাব শুধু ধর্মীয় বা সামরিক খাতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০৫ সালে মাহমুদ আহমাদিনেজাদের অভাবনীয় জয়ের পেছনে তাঁর নেপথ্য ভূমিকা নিয়ে সংস্কারপন্থীরা ব্যাপক সমালোচনা করেছিলেন। এ ছাড়া রক্ষণশীল রাজনীতিক গোলাম-আলী হাদ্দাদ আদেলের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংহত করেছে।

মোজতবার এই পাণ্ডিত্য ও শিক্ষকতা তাঁকে বাবার উত্তরসূরি হওয়ার পথে তাত্ত্বিকভাবে এবং আইনত বৈধতা দিয়েছে। ফলে ধর্মীয় উচ্চশিক্ষার এই পথ ধরে তিনি ইরানের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করছেন।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্ম ১৯৪৯ সালে তেল আবিবে হলেও তাঁর বৌদ্ধিক বিকাশের বড় অংশটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে। তাঁর বাবা বেন-জিয়ন নেতানিয়াহু ছিলেন একজন ঐতিহাসিক ও ‘এনসাইক্লোপিডিয়া জুডাইকা’র সম্পাদক। হিব্রু ইউনিভার্সিটিতে বাবার শিক্ষকতা নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হলে ১৯৬২ সালে নেতানিয়াহু সপরিবার আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় চলে যান। সেখানেই কিশোরের পড়াশোনা সম্পন্ন হয় তাঁর। বাবার পাণ্ডিত্য আর বাড়িতে গবেষণার পরিবেশ নেতানিয়াহুকে শৈশব থেকেই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও কৌতূহলী করে গড়ে তোলে।

উচ্চশিক্ষার জন্য নেতানিয়াহু ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিকে (এমআইটি) বেছে নেন। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গতিশীল। ১৯৭২ সালে তিনি স্থাপত্যবিদ্যায় (আর্কিটেকচার) পড়াশোনা শুরু করেন। এমআইটির আর্কাইভ রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাঁর কোর্সগুলো শেষ করতেন। ১৯৭৫ সালে তিনি স্থাপত্যে স্নাতক (বিএস) ডিগ্রি অর্জন করেন।

তবে স্থাপত্যেই তিনি থেমে থাকেননি। এমআইটির বিখ্যাত ‘স্লোন স্কুল অব ম্যানেজমেন্ট’ থেকে মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৭৬ সালের জুনে তিনি ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর (এমএস) ডিগ্রি লাভ করেন। স্থাপত্যের নান্দনিক নকশা আর ব্যবস্থাপনার কঠিন গাণিতিক হিসাব—এই দুইয়ের সংমিশ্রণ তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে কৌশল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এমআইটিতে পড়ার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর প্রবল আগ্রহ ছিল রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমআইটি—উভয় প্রতিষ্ঠানেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে গভীর পড়াশোনা করেছেন। এই বহুমুখী জ্ঞানের কারণে তিনি পশ্চিমা বিশ্বের কাছে কেবল একজন রাজনীতিক নন, তুখোড় তার্কিক ও কৌশলী কূটনীতিবিদ হিসেবেও পরিচিতি পান। তাঁর ইংরেজি উচ্চারণে মার্কিন ধাঁচ এবং আন্তর্জাতিক আইন ও অর্থনীতির ওপর প্রখর দখল মূলত এই হার্ভার্ড-এমআইটি দিনগুলোরই ফসল।

নেতানিয়াহুর শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো বইয়ের পাতার সঙ্গে বারুদের গন্ধের সহাবস্থান। ১৯৬৭ সালে হাইস্কুল শেষ করেই তিনি ইসরায়েলে ফিরে গিয়ে এলিট স্পেশাল ফোর্স ‘সায়েরেত মাতকাল’-এ যোগ দেন। সেখানে পাঁচ বছর সামরিক জীবন কাটিয়ে ১৯৭২ সালে যখন এমআইটিতে পড়াশোনা শুরু করেন, তার এক বছর পরেই বেজে ওঠে ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধের দামামা।

একজন প্রতিশ্রুতিশীল শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি পড়াশোনা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে পুনরায় রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যুদ্ধ শেষ করে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে এসে তিনি দ্বিগুণ উদ্যমে তাঁর ডিগ্রিগুলো শেষ করেন। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে দেশের প্রয়োজনে বন্দুক হাতে তুলে নেওয়ার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ইসরায়েলি নাগরিকদের কাছে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

পড়াশোনা শেষে তিনি আমেরিকার বিখ্যাত ‘বোস্টন কনসালটিং গ্রুপ’-এ (বিসিজি) ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। সেখানে তাঁর সহকর্মী ছিলেন বর্তমানে মার্কিন রাজনীতির পরিচিত মুখ মিট রমনি। এমআইটি ও হার্ভার্ডের এই উচ্চতর শিক্ষা এবং বিসিজির করপোরেট অভিজ্ঞতা নেতানিয়াহুকে বিশ্বমঞ্চে স্থান করে নিতে সহায়তা করেছে।

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বাবা ছিলেন কোস্টগার্ডের একজন সাধারণ কর্মচারী। তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবন কেটেছে চরম দারিদ্র্য ও কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে। কাসিমপাশার মতো একটি রুক্ষ এলাকায় বড় হওয়া এরদোয়ানকে পড়াশোনার খরচ চালাতে শৈশবে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় লেবুর শরবত ও ‘সিমিত’ (একধরনের রুটি) বিক্রি করতে হতো। এই সংগ্রামী জীবনই মূলত তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক দর্শনে ‘সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি’ হওয়ার ভিত্তি গড়ে দেয়।

এরদোয়ানের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ইস্তাম্বুল ইমাম হাতিপ স্কুলে। এটি ছিল একটি ধর্মীয় বৃত্তিমূলক উচ্চবিদ্যালয়। ১৯৬৩ সালে কাসিমপাশা পিয়ালে প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করার পর তিনি এই স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে এখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

ইমাম হাতিপ স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি পবিত্র কোরআনের পাঠ, ইসলামি দর্শন এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তাঁর বাগ্মিতা বা চমৎকার ভাষণ দেওয়ার ক্ষমতার হাতেখড়ি হয়েছিল এই স্কুলেই। সেখানে তিনি এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চমৎকার বক্তৃতার জন্য সবার নজর কেড়েছিলেন।

সেই সময় তুরস্কে ইমাম হাতিপ স্কুলের মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক আইনি বাধা ছিল। এই বাধা অতিক্রম করতে এরদোয়ান কঠোর পরিশ্রম করেন এবং আইয়ুপ হাইস্কুল থেকে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে একটি সাধারণ হাইস্কুল ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এই জেদই প্রমাণ করে যে তিনি লক্ষ্য অর্জনে কতটা সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য এরদোয়ান ইস্তাম্বুলের আকসারায় স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড কমার্শিয়াল সায়েন্সে ভর্তি হন। এটি বর্তমানে মারমারা বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। তিনি ১৯৮১ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও জনপ্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তাধারা এবং তুরস্কের বর্তমান ‘এরদোয়ানমিকস’ বা অর্থনৈতিক কৌশলের তাত্ত্বিক ভিত্তি মূলত এই মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতেই তৈরি হয়েছিল।

এরদোয়ানের ছাত্রজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ফুটবল। তিনি কিশোর বয়স থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া পর্যন্ত স্থানীয় ক্লাব ‘কাসিমপাশা এরোকস্পোর’ এবং পরে ‘কামিয়ালতি স্পোর’-এ দাপটের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। এমনকি তুরস্কের নামী ক্লাব ফেনারবাচে তাঁকে দলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু বাবার অনিচ্ছার কারণে তিনি পেশাদার ফুটবলার হতে পারেননি। তবে মাঠের সেই নেতৃত্ব এবং দলগত সংহতির শিক্ষা তিনি পরবর্তীকালে রাজনীতিতে প্রয়োগ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই এরদোয়ান ন্যাশনাল টার্কিশ স্টুডেন্ট ইউনিয়নে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এককথায়, তাঁর শিক্ষাজীবন কেবল ডিগ্রি অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইমাম হাতিপ স্কুলের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক জ্ঞান—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তিনি আজকের তুরস্কের একচ্ছত্র নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

সি চিন পিং

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের জন্ম ১৯৫৩ সালে বেইজিংয়ে এক প্রভাবশালী পরিবারে। তাঁর বাবা সি ঝংশুন ছিলেন চীনের বিপ্লবী নেতা ও তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী। বেইজিংয়ের অভিজাত পরিবেশে বড় হওয়া সি চিন পিংয়ের শৈশব ছিল নিরাপদ ও রাজকীয়। কিন্তু ১৯৬২ সালে তাঁর বাবার রাজনৈতিক পতন ঘটলে ভাগ্যের চাকা উল্টে যায়। সি চিন পিংয়ের বয়স যখন মাত্র ৯ বছর, তখন তাঁর বাবাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং তাঁর পরিবার পড়ে চরম লাঞ্ছনায়।

মাও সে–তুংয়ের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’-এর সময় ১৯৬৯ সালে ১৫ বছর বয়সী সি চিন পিংকে বেইজিং থেকে সুদূর উত্তর-পশ্চিমের শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহে গ্রামে পাঠানো হয়। সেখানে দীর্ঘ সাত বছর তিনি একটি পাহাড়ি গুহায় বাস করেন।

শিক্ষাজীবনের সেই সময়টি তাঁর জন্য ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সারা দিন কায়িক পরিশ্রম, সার বহন এবং চাষাবাদের কাজ করতে হতো তাঁকে। গুহার ভেতরে মাটির ওপর ঘুমাতেন তিনি, যেখানে পোকা-মাকড়ের উপদ্রব ছিল নিত্যসঙ্গী। সি চিন পিং পরবর্তীকালে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই সাত বছরের গুহাজীবনই তাঁকে ‘সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ বুঝতে শিখিয়েছে’ এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের প্রকৃত ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অস্থিরতা কাটিয়ে ১৯৭৫ সালে সি চিন পিং বেইজিংয়ের ঐতিহ্যবাহী এবং চীনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। তখন তিনি ‘শ্রমিক-কৃষক-সৈনিক’ কোটায় রসায়ন প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন।

এবস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রকৌশলবিদ্যার এই পাঠ তাঁকে যেকোনো সমস্যাকে গাণিতিক ও প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা দেয়, যা পরবর্তীকালে চীনের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে।

রাজনীতিতে প্রবেশ করার পরও সি চিন পিং তাঁর পড়াশোনা থামিয়ে দেননি। ১৯৯৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি আবার সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত হন। এবার তাঁর বিষয় ছিল ‘মার্ক্সীয় তত্ত্ব এবং আদর্শিক-রাজনৈতিক শিক্ষা’।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি এই গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করেন এবং আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর এই তাত্ত্বিক জ্ঞানই আজকের ‘সি চিন পিং থট’ বা তাঁর বিশেষ রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূল উৎস। এটি বর্তমানে চীনের সংবিধানেও অন্তর্ভুক্ত।

একদিকে শৈশবের আভিজাত্য, অন্যদিকে কৈশোরের চরম কষ্টের শিক্ষা সি চিন পিংকে অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও কঠোর নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে বলে মনে করা হয়। তিনি মদ্যপান বা বিলাসিতার চেয়ে শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবনকেই প্রাধান্য দেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে বাবার প্রতি সম্মান এবং কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অবিচল আস্থা।

নরেন্দ্র মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শৈশব আক্ষরিক অর্থেই এক কঠিন জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ১৯৫০ সালে গুজরাটের এক অতি সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। মোদির বাবা ভাদনগর রেলস্টেশনে একটি ছোট চায়ের দোকান চালাতেন। শৈশবে স্কুলে যাওয়ার আগে এবং পরে নরেন্দ্র মোদি তাঁর বাবাকে চা বিক্রিতে সাহায্য করতেন। পিএম ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, অভাবের সংসারে বড় হলেও নরেন্দ্র মোদি কখনোই প্রতিকূলতার কাছে হার মানেননি। তাঁর এই শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তীকালে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়েছে।

মোদির শিক্ষাজীবন ছিল জ্ঞানতৃষ্ণা এবং সমাজসেবার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। ভাদনগরের একটি স্থানীয় স্কুলে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। স্কুলের লাইব্রেরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বই পড়া ছিল তাঁর প্রিয় শখ। তাঁর শিক্ষকেরা জানান, নরেন্দ্র মোদি একজন তুখোড় বিতার্কিক ছিলেন। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীকালে তিনি গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তবে তাঁর শিক্ষা কেবল ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি রাজনীতির বিভিন্ন তাত্ত্বিক দিক শিখেছিলেন মাঠে থেকে।

মোদির জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় ও অনুপ্রেরণামূলক দিক হলো তাঁর গৃহত্যাগ। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি একাই ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। আধ্যাত্মিকতার খোঁজে তিনি হিমালয়ের বিভিন্ন আশ্রমে সময় কাটান, যা তাঁর চরিত্রে কঠোর শৃঙ্খলা ও বৈরাগ্যের বীজ বুনে দেয়। সি চিন পিং যেমন গুহায় থেকে মানুষের কষ্ট বুঝেছিলেন, মোদিও তেমনি হিমালয়ের জনশূন্য পরিবেশে থেকে নিজের আত্মিক শক্তিকে সংহত করেছিলেন।

দুই বছর পর ফিরে এসে তিনি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে নরেন্দ্র মোদি কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নেশামুক্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা পুতিনের মতো তিনিও মদ্যপান, ধূমপান বা কোনো প্রকার মাদক গ্রহণ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তিনি একজন নিরামিষাশী এবং প্রতিদিন নিয়ম করে যোগব্যায়াম করেন। এই কঠোর নিয়মানুবর্তিতাই তাঁকে দিনে প্রায় ১৮ ঘণ্টা কাজ করার শক্তি জোগায়। তাঁর বাগ্মিতা এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রাজনৈতিক উত্থানের ক্ষেত্রে মোদি এক অভাবনীয় নজির গড়েছেন। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর টানা ১৩ বছর তিনি সেই পদে ছিলেন। নানা বিতর্কের পরও ২০১৪ সালে তিনি প্রথমবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তারপর টানা দুবার জিতে এক যুগ ধরে ক্ষমতায়।

তথ্যসূত্র: প্রতিবেদনটি তৈরিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভ এবং সংশ্লিষ্ট নেতাদের দাপ্তরিক জীবনী থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প: ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার ‘মিলার সেন্টার’, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া আর্কাইভ এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিশেষ প্রতিবেদন।

ভ্লাদিমির পুতিন: পুতিনের আত্মজীবনী ‘ফার্স্ট পারসন’, সিএনএন ফাস্ট ফ্যাক্টস এবং আয়ারল্যান্ডের রুশ দূতাবাসের দাপ্তরিক নথি।

মোজতবা খামেনি: বিবিসি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু: ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি আর্কাইভ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের রেকর্ড।

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান: মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক রেকর্ড এবং এরদোয়ানের দাপ্তরিক জীবনবৃত্তান্ত।

সি চিন পিং: সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভ এবং এবস্কোর গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য।

নরেন্দ্র মোদি: পিএম ইন্ডিয়ার দাপ্তরিক ওয়েবসাইট এবং গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য রেকর্ড।

ক্ষমতার শীর্ষে আসীন সাত বিশ্বনেতা (বাঁ থেকে) ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, মোজতবা খামেনি, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সি চিন পিং ও নরেন্দ্র মোদি
ক্ষমতার শীর্ষে আসীন সাত বিশ্বনেতা (বাঁ থেকে) ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, মোজতবা খামেনি, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সি চিন পিং ও নরেন্দ্র মোদি। কোলাজ

Monday, June 29, 2026

বাবরি মসজিদ ভেঙে মোদির গড়া রাম মন্দিরে দুর্নীতির মহা কেলেঙ্কারি

উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বর্তমানে যে রাম মন্দির দাঁড়িয়ে আছে, সেই স্থানেই একসময় ছিল ষোড়শ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। ১৯৯২ সালে হিন্দু উগ্রপন্থীদের হাতে মসজিদটি ভেঙে ফেলার ঘটনা গোটা ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্ম দেয়। সেই দাঙ্গায় প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম।

পরবর্তীতে ওই স্থানকে কেন্দ্র করেই বিজেপি-সমর্থিত হিন্দুত্ববাদী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়। আড়াই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন রাম মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন। বহু হিন্দুর বিশ্বাস, এ স্থানই ভগবান রামের জন্মভূমি।

তবে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ইতিহাসের পর ভক্তদের কাছে ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠা এই মন্দির এখন বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায়। গত এক মাস ধরে অভিযোগ উঠেছে, ভক্তদের দেওয়া বিপুল পরিমাণ অনুদান ও মূল্যবান উপহার আত্মসাৎ করা হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মন্দির পরিচালনাকারী ট্রাস্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।

ভক্ত ব্রজেশ কুমার আল জাজিরাকে বলেন, তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তার ভাষায়, যারা ধর্মের নামে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন, তারাই সেই বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছেন।

অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে।

রাম মন্দির উদ্বোধনের পর থেকেই ভারতের অন্যতম ব্যস্ত ধর্মীয় তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। মন্দিরটি পরিচালনা করে স্বাধীন সংস্থা ‘শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্ট’। যদিও ট্রাস্টটি সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে নয়, এর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বিজেপির আদর্শিক সংগঠন আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা যায়।

চলতি মাসে ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মহিপাল সিং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। তবে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলেও আল জাজিরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।

এদিকে বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টির নেতা ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেন, মন্দিরের অনুদানের কোটি কোটি রুপি গায়েব হয়ে গেছে। বিরোধীদের চাপের মুখে উত্তর প্রদেশ সরকার তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি ইতোমধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দিলেও সেটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

এরই মধ্যে পুলিশ ফৌজদারি মামলা দায়ের করে অন্তত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অনুদানের নগদ অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গণনার দায়িত্বে থাকা কয়েকজনও রয়েছেন।

শুধু তাই নয়, আরও অনেক ভক্ত দাবি করেছেন, তারা ট্রাস্টের কাছে জমা দেওয়া রুপার ইট, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মূল্যবান উপহারের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না।

ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শুক্রবার ট্রাস্টের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রায়সহ কয়েকজন প্রভাবশালী ট্রাস্টি পদত্যাগ করেন। রাম মন্দির আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হওয়ায় চম্পত রায়ের পদত্যাগ ঘটনাটিকে আরও অভিযোগগুলো আরো শক্তিশালী করে তুলেছে।

তবে পদত্যাগের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। হাজারো ভক্তের পাশাপাশি বিজেপির একাংশের সমর্থকরাও নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন এবং অনুদানের অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রীর সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছেন।

সূত্র: আল জাজিরা

বাবরি মসজিদ ভেঙে মোদির গড়া রাম মন্দিরে দুর্নীতির মহা কেলেঙ্কারি

ট্রাম্প প্রশাসনে ফাটল?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করার পর দেশটির অভ্যন্তরে, বিশেষ করে ইসরাইলপন্থী রাজনীতিক ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। তবে ট্রাম্পের পক্ষে চুক্তিটির সাফাই দিতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি একাধিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং একটি সফল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য খুব শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেয়া ভ্যান্স ইসরাইলের প্রকাশ্য বিরোধিতার জবাবে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন।
তিনি বলেন, আপনারা ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি সমস্যার সমাধান শুধু মানুষ হত্যা করে করা সম্ভব নয়। ইসরাইলের সামরিক কৌশলের সমালোচনা করে ভ্যান্সের এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রুবিওর ভিন্ন অবস্থান
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে ইসরাইলের সমালোচনা না করে বরং ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছেন। গত সপ্তাহে তিনি মধ্যপ্রাচ্য সফর করে উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করেন, যারা যুদ্ধ চলাকালে ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল।
২৫ জুন বাহরাইনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথ (হরমুজ প্রণালি) কোনো একক রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়। এর কয়েক দিন পরই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটে। ১৭ জুন এমওইউ স্বাক্ষরের পর এটিই ছিল প্রথম সামরিক উত্তেজনা।

বর্তমানে উভয় পক্ষ হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা কমাতে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট জ্বালানির প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত সপ্তাহে ভ্যান্স ও রুবিওর দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করায় ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে নীতিগত বিভক্তির জল্পনা শুরু হয়। তবে হোয়াইট হাউস জোরালোভাবে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
হোয়াইট হাউসে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভ্যান্স বলেন, বৈরুতে ইসরাইলের বেসামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান শান্তি প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর আগে ইসরাইলের সমালোচনা করে বলেছিলেন, কাউকে খুঁজছেন বলে প্রতিবার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। কারণ ওই ভবনে অনেক মানুষ থাকে, তারা সবাই হিজবুল্লাহর সদস্য নয়।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে দেশটিতে ইসরাইলি হামলায় চার হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ১২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ভ্যান্স আরও বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্পই এই মুহূর্তে বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রনেতা, যিনি ইসরাইলের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমি যদি ইসরাইলি সরকারের সদস্য হতাম, তাহলে আমার সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করতাম না।
অন্যদিকে রুবিও লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে হিজবুল্লাহর হামলার বৈধ জবাব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভ্যান্সের মন্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান।

উপসাগরীয় দেশগুলো নিয়ে ভিন্ন সুর
ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য ভ্যান্স সুইজারল্যান্ড সফর করেন এবং আলোচনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। তিনি এমনও ইঙ্গিত দেন যে ভবিষ্যতে আরব দেশগুলো ইরানের পুনর্গঠন তহবিলে অবদান রাখতে পারে।
অন্যদিকে রুবিও সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফর করে মিত্র দেশগুলোকে আশ্বস্ত করেন যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে।
২৩ জুন তিনি বলেন, ইরানের পুনর্গঠনে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নের প্রশ্ন এখনো অনেক দূরের বিষয়। তিনি বলেন, আমরা অবশ্যই একটি চুক্তি চাই। তবে যে কোনো মূল্যে চুক্তি করতে চাই না।

ইরানকে নিয়ে অবস্থানের পার্থক্য
ভ্যান্স ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, দুই দেশ একসঙ্গে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করতে পারে।
তিনি অতীতের সেই মার্কিন অবস্থান থেকেও কিছুটা সরে আসেন, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।
ভ্যান্স বলেন, ইসরাইল হোক বা ইরান- কোনো দেশকেই আত্মরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না

অন্যদিকে রুবিও স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনো ধরনের টোল বা ফি আদায় করতে দেয়া হবে না।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, এখানে একটিই শিবির রয়েছে- প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শিবির। পুরো প্রশাসনই প্রেসিডেন্টের সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে একমত যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগটও বলেন, রুবিও ও ভ্যান্সের মধ্যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিভক্তির দাবি ‘পুরোনো ও ভিত্তিহীন’। রুবিও নিজেও এ ধরনের জল্পনা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমরা সবাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বেই কাজ করছি। পুরো প্রশাসন একই অবস্থানে রয়েছে।

ভ্যান্স ও রুবিও ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ভিন্নধর্মী অবস্থান রয়েছে।
ক্ষমতায় আসার আগে ভ্যান্স বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধকে প্রাণহানি ও অর্থের অপচয় হিসেবে সমালোচনা করতেন। অন্যদিকে রুবিও সিনেটে থাকাকালে ইরান, রাশিয়া ও কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় “হক” বা কঠোরপন্থী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি পান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত এই দুই নেতা রিপাবলিকান পার্টির দুটি ভিন্ন ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। একদিকে রয়েছেন বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ সমর্থনকারী নব্য রক্ষণশীলরা (নিওকনজারভেটিভ), অন্যদিকে রয়েছেন সেই রিপাবলিকানরা, যারা মনে করেন সাম্প্রতিক অনেক বিদেশি যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয় ছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনে ফাটল?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বে কি ফাটল ধরেছে, কী ভাবছেন ইসরায়েলিরা

একসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে প্রায় অটুট বলেই মনে করা হতো। তবে গত কয়েক সপ্তাহে সেই সম্পর্ক নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিক মহল ও গণমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৎপরতা এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য সমালোচনা ইসরায়েলে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

অনেক ইসরায়েলি এখন প্রশ্ন তুলছেন, ট্রাম্পকে কি এখনো হোয়াইট হাউসে তাঁদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলা যায়?

এর মধ্যে গত মঙ্গলবার নিউইয়র্ক নগরের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারির ফলাফল সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া তিন ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডেমোক্র্যাট–দলীয় কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন। তাঁরা ইসরায়েলের সমর্থক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেন।

এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের কেউ এখনই চীন বা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার কথা বলছেন না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা দ্রুতই ইসরায়েলের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তেল আবিবের বর্তমান ডেপুটি মেয়র আসাফ জামির বলেন, ‘আমি চরম উদ্বিগ্ন।’ তিনি বলেন, বিজয়ী তিন প্রার্থীই নির্বাচনী প্রচারে ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনাকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অথচ জেরুজালেমের পর নিউইয়র্ক বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি–অধ্যুষিত শহর।

বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, ইসরায়েল হয়তো আর বেশি দিন ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থন পাবে না। বছরে শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা, জাতিসংঘে ইসরায়েলবিরোধী প্রস্তাবে মার্কিন ভেটো কিংবা ইসরায়েলি দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য কর-সুবিধা—সবকিছুই ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল সি কার্টজার বলেন, ‘সামনে একটা বড় খাদ আছে। আর আমরা সেই খাদের কিনারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

মঙ্গলবার নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট–দলীয় প্রাইমারিতে কয়েকজন ইসরায়েলপন্থী প্রার্থীও জয় পেয়েছেন। তবে জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া ব্র্যাড ল্যান্ডার ও ক্লেয়ার ভালদেজের মতো প্রার্থীদের জয় ইসরায়েলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই প্রার্থীরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে বিজয়ী আরেক প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন এবং ক্লেয়ার ভালদেজের মতো দেশটিকে বর্ণবাদী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

আসাফ জামির দাবি করেন, ‘ঘুম থেকে উঠেই শুনছি, আমাদের গণহত্যাকারী ও বর্ণবাদী বলা হচ্ছে।’ তিনি আরও দাবি করেন, ‘আমি একজন বামপন্থী, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বিশ্বাসী এবং শান্তিপ্রিয় ইসরায়েলি। কিন্তু আমি অন্ধ নই। আমি জানি, ইসরায়েলের পরিস্থিতি কী। আমাদের যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, আমরা তেমন নই। অথচ দিন দিন আরও বেশি মার্কিন নাগরিক এসব বিশ্বাস করছেন এবং সেই ভিত্তিতে ভোট দিচ্ছেন। এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলছে।’

(আসাফের এই দাবি আসলেই কি সত্য? গাজায় যেভাবে ইসরায়েল ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, বাড়িঘর, হাসপাতাল–স্কুল গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, হাজার হাজার শিশু আর বেসামরিক মানুষকে নিশানা বানিয়ে হত্যা করছে, সেটাকে তিনি সঠিক মনে করেন? গাজায় খাদ্যসংকট তৈরি করে যেভাবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের অনাহার আর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, সেটাই কি সঠিক? নেতানিয়াহু সরকার আর উগ্র ইহুদিরা শিশুদের হামাস সদস্য বলে তাদের হত্যাকে যেভাবে সমর্থন করেন, আসাফও কি সেটাকেই সঠিক মনে করেন? কোন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল আছে বলে আসাফ দাবি করেন?)

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

দুই বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে এবং গাজা উপত্যকার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মনেও।

গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের এক জরিপে দেখা যায়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মার্কিন নাগরিকেরা ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করছেন।

এ ছাড়া গত এপ্রিলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ২০২২ সালে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ।

নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইসরায়েল পলিসি ফোরামের বিশ্লেষক মাইকেল কোপলো বলেন, ‘আমি ইসরায়েলি হলে কংগ্রেসের কট্টর বামপন্থী তিন-চারজন সদস্যকে নিয়ে এতটা চিন্তিত হতাম না।’

মাইকেল কোপলো বলেন, এই নতুন আইনপ্রণেতাদের জয় ডেমোক্রেটিক দলের ভেতরে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাবের একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

এই বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘ইসরায়েলের বিরোধিতা এখন আর কোনো গুরুত্বহীন বিষয় নয়। এটি এখন নির্বাচনী প্রচার এবং মানুষের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।’

ডেমোক্র্যাটদের প্রধান আপত্তি হলো, মানবাধিকার ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এখন বড় ধরনের নৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা ইসরায়েলি জনমত জরিপকারী ডাহলিয়া শিন্ডলিন বলেন, ‘দশকের পর দশক এই বিশেষ সম্পর্ককে চিরস্থায়ী বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল।’

গাজা যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে ডাহলিয়া শিন্ডলিন বলেন, ‘অনেক ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান এখন বুঝতে পেরেছেন, বিশেষ সম্পর্ক ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ ইসরায়েল গাজায় হাজার হাজার শিশুকে হত্যা না করছে। এই নির্মমতার কারণেই মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।’

অন্যদিকে রিপাবলিকান সমালোচকদের প্রধান আপত্তি হলো, ইসরায়েল নিজের যুদ্ধগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে আনছে। তাঁদের প্রশ্ন, দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ কি এখনো এক জায়গায় আছে?

২০০০-এর দশকের শুরুতে নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অ্যালন পিনকাস। তিনি বলেন, ‘৪০ বছর ধরে ইসরায়েল নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক কৌশলগত সম্পদ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এখন একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে—ইসরায়েল কি সত্যিই একটি সম্পদ, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের বোঝায় পরিণত হচ্ছে?’

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে যদি মার্কিন জনগণকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হয়, তাহলে এই প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।

তবে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মূল সমর্থনে এখনো বড় ধরনের ফাটল ধরেনি।

বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের কাছে শতকোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রি ও জরুরি সামরিক সহায়তা দ্রুত করার ব্যবস্থা করেছে। হামাসের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের ওপর চাপ কমিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ দমনে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে সম্পর্কের আরও অবনতি হলে ইসরায়েলের অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।

ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের, বিশেষ করে লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করছে, যা অনেক ইসরায়েলির কাছেই অকল্পনীয় ছিল।

এ ছাড়া ইসরায়েল এখন আর প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শতকোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পাওয়ার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও এ বছর ইঙ্গিত দিয়েছেন, ধীরে ধীরে মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানো উচিত।

বিশ্লেষক মাইকেল কোপলো বলেন, ‘ইসরায়েল সব সময় ধরে নিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এ ধরনের পদক্ষেপ নেবে না। কিন্তু এখন সেই সম্ভাবনাই তীব্র হয়ে উঠছে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল সি কার্টজার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘে ইসরায়েলের পক্ষে মার্কিন ভেটো প্রায় নিশ্চিত। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

কার্টজারের ভাষায়, ‘এখন এমন একজন খামখেয়ালি প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আছেন, যিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়; বরং কোন সিদ্ধান্তে তাঁর নিজের লাভ হবে, সেটি বিবেচনা করেই পদক্ষেপ নেন।’

দুই দেশের এই টানাপোড়েন এখন ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এ সপ্তাহে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে এবং এটি ঠিক করা হবে অত্যন্ত কঠিন কাজ।

বেনেট সতর্ক করে বলেন, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ইসরায়েল একটি বোঝায় পরিণত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য এক চরম বিপর্যয়।’

তবে ইসরায়েলিদের জন্য আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া খুব বেশি কিছু করার নেই।

তেল আবিবের ডেপুটি মেয়র আসাফ জামির বলেন, সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসলে মনস্তাত্ত্বিক। তিনি বলেন, ‘আমি সামরিক সহায়তা হারানোর ভয় পাচ্ছি না। সেটা ছাড়াও আমরা বেঁচে থাকতে পারব। আমি আসলে ভয় পাচ্ছি বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ভরসাটুকু হারানোর—যে অনুভূতিটা আমাদের এত দিন সাহস দিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের পেছনে কেউ একজন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।’

গত মঙ্গলবার নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার
গত মঙ্গলবার নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন মেয়র জোহরান মামদানির সমর্থন পাওয়া ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থী ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার। ছবি: রয়টার্স

মায়ের পরিচয় নিয়ে কেন মুখ খোলেন না কিম জং উন

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের জীবনের অনেকটাই রহস্যে ঘেরা। এর মধ্যে অন্যতম তার মাকে নিয়ে তৈরি গোপনীয়তা। গত ১৫ বছর ধরে তিনি শাসন করছেন। কিন্তু একবারও প্রকাশ্যে মায়ের নাম মুখে নেননি। কিমের শাসনের বৈধতা মূলত ‘মাউন্ট পেকতু’ বংশ পরিচয়ের ওপর টিকে আছে। এটি কোরিয়ান জাতির এক পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতার বংশধারা। উত্তর কোরিয়া বংশের এই পবিত্রতা নিয়ে খুব গর্ব করে। তাই কিমের মায়ের আসল পরিচয় সেখানে কেবল একটি গোপন বিষয় নয়, বরং বর্তমান সরকারের জন্য বড় হুমকি।

পৌরাণিক জন্মস্থান

চীন ও উত্তর কোরিয়া সীমান্তে পেকতু পর্বত অবস্থিত। সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী, এখান থেকেই কোরিয়ার ইতিহাস শুরু হয়। বলা হয়, এটি কোরিয়ার প্রথম রাজ্যের পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা দানগুনের জন্মস্থান। বহু বছর পর উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং জাপানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় এই পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তার ছেলে কিম জং ইলও এই পবিত্র পাহাড়ে জন্মেছেন বলে দাবি করা হয়।

যদিও আসল তথ্য অনুযায়ী তার জন্ম হয়েছিল রাশিয়ায়। গত কয়েক দশক ধরে কিম রাজবংশের শাসন টিকিয়ে রাখতে এই পর্বতের গল্প ব্যবহার করা হচ্ছে।

উত্তর কোরিয়ার নির্বাসিত কূটনীতিক রিয়ু হিয়ুন উন তার বই ‘কিম জং উন’স সিক্রেট ভল্ট’–এ লিখেছেন, ‘কিম জং উনের বয়স যখন বিশের কোঠায়, তখনই তিনি উত্তরসূরি নির্বাচিত হন। তখনো তার উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন ছিল না। তিনি শুধু পেকতু বংশধারার সদস্য হওয়ার কারণেই সে মর্যাদা পেয়েছিলেন।’

তবে কিম জং উনের মায়ের দিকের পারিবারিক বংশপরিচয়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে।

সাবেক উত্তর কোরিয়ান কূটনীতিক রিউ হিউন-উ একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘কিম জং

কিম জং–উনের মা কো ইয়ং–হুই মাউন্ট পেকতু থেকে শত শত মাইল দূরে জাপানের ওসাকা শহরে জন্মেছিলেন বলে মনে করা হয়।

জীবনীকারদের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, কো ইয়ং–হুই ১৯৫২ সালে ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা–বাবা এসেছিলেন জেজু দ্বীপ থেকে। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ উপকূলের কাছের একটি দ্বীপ।

জাপানে বসবাসকারী তাদের পরিবারটি ছিল ‘জাইনিচি কোরিয়ান’। ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সালের ঔপনিবেশিক শাসনামলে কোরিয়া থেকে জাপানে চলে যাওয়া বা সেখানে বসতি গড়া কোরীয় বংশোদ্ভূত মানুষদের একটি অংশকে জাইনিচি কোরিয়ান বলা হয়ে থাকে।

কো ইয়ং হুইয়ের বয়স যখন প্রায় ১০ বছর, তখন তার পরিবার জাপান ছেড়ে উত্তর কোরিয়ায় যায়। ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যাওয়া আনুমানিক ৯৩ হাজার কোরীয় অভিবাসীর মধ্যে তার পরিবারও ছিল। একটি পুনর্বাসন কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এ পরিবারগুলো উত্তর কোরিয়ায় গিয়েছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় তাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা, শিক্ষা, চাকরিসহ একটি সুখী ও সচ্ছল জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

প্রথম দিকে উত্তর কোরিয়ায় আসা এসব অভিবাসীকে অনেকেই ঈর্ষার চোখে দেখত। কারণ, তারা জাপান থেকে নগদ অর্থ, উন্নত মানের পোশাক ও বিভিন্ন গৃহস্থালিসামগ্রী নিয়ে এসেছিল। তবে উত্তর কোরিয়ায় এসব অভিবাসীকে ‘জ্যেপো’ নামে ডাকা হতো, যা একটি অবমাননাকর শব্দ। এই শব্দ এমন মানুষদের বোঝাতে ব্যবহার করা হতো, যাদের বিদেশি ও বিপজ্জনক মতাদর্শের প্রভাবে প্রভাবিত বলে মনে করা হতো।

উত্তর কোরিয়ার সমাজব্যবস্থা বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত। অনেক বিশ্লেষক এই ব্যবস্থাকে বর্ণপ্রথার সঙ্গে তুলনা করেন। দেশটিতে বিদ্যমান কঠোর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতিটি ‘সংবুন’ নামে পরিচিত। সেখানে জ্যেপোদের স্থান ছিল ‘দোদুল্যমান শ্রেণি’-তে, অর্থাৎ শাসকগোষ্ঠীর অনুগত মূল শ্রেণি ও শত্রু শ্রেণির মাঝামাঝি অবস্থানে। এ কারণে জ্যেপোদের কড়া রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে রাখা হতো। পাশাপাশি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা মর্যাদাপূর্ণ চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা প্রায়ই বৈষম্যের শিকার হতো।

কো ইয়ং–হুইয়ের এই ইতিহাস কিম পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রচারিত ‘পেকতু বংশধারা’র গল্পের সঙ্গে একেবারেই সাংঘর্ষিক।

নর্দার্ন রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক কিম হিয়ুং সু বলেন, ‘শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পেকতু বংশধারার যোগসূত্রকে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই দেশের নেতা একজন “জ্যেপো”র সন্তান হতে পারেন-এমন ধারণাই অনেকের কাছে অকল্পনীয়।’

‘সিন্ডারেলার মতো’ জীবন

কো ইয়ং–হুইকে অন্য অনেক জাইনিচি কোরিয়ানের মতো একই পরিণতির শিকার হতে হয়নি। কারণ, তার প্রেম এবং তা কিম জং ইলের মতো ব্যক্তির সঙ্গে। কিম জং–ইল তখন ছিলেন শাসনক্ষমতার উত্তরসূরি।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, কো হুইয়ের সঙ্গে পরিচয়ের আগেই কিম জং ইল বিয়ে করেছিলেন। তার সেই স্ত্রী কিম ইয়ং সুক ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার মেয়ে। সেই বিয়ে হয়েছিল কিম জং ইলের বাবা তৎকালীন শাসক কিম ইল সাংয়ের পছন্দে।

কিম জং ইলের আরো দুজন প্রেমিকা ছিলেন বলেও জানা যায়।

কো ইয়ং হুই উত্তর কোরিয়ার অভিজাত সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্য ছিলেন। তার সৌন্দর্য ও নাচের দক্ষতায় মোহিত হয়েছিলেন কিম জং ইল। জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি ২০২৫ সালে কো ইয়ং–হুইকে নিয়ে লেখা একটি বইয়ে এ কথাগুলো লিখেছেন।

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, কিম জং ইল গভীরভাবে কো ইয়ং হুইয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। তাদের তিনটি সন্তানও হয়।

উত্তর কোরিয়ায় বিয়ে ছাড়া জন্ম নেওয়া সন্তানদের সামাজিকভাবে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাই কিম জং ইলের আনুষ্ঠানিক স্ত্রী ইয়ং সুক পিয়ংইয়ংয়ে বসবাস করলেও কো ইয়ং হুই ও তার সন্তানদের রাজধানী থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার দূরের উপকূলীয় শহর ওনসানে রাখা হয়েছিল।

কিম জং ইলের সঙ্গে সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না পেলেও কো হুই এমন এক জীবন যাপন করেছিলেন, যাকে সাংবাদিক ইয়োজি গোমি তুলনা করেছেন ‘সিন্ডারেলার মতো জীবন’–এর সঙ্গে।

বিভিন্ন সূত্রের মতে, কো ইয়ং হুই ছিলেন কিম জং ইলের সবচেয়ে প্রিয় প্রেমিকা।

তবে একটি বাস্তবতা কখনো বদলায়নি। নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিয়ু হিউন উ লিখেছেন, কো ইয়ং হুইকে কখনোই পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি দেননি কিম ইল সাং। তাকে কখনো প্রকাশ্যে কো ইয়ং হুইয়ের সন্তানদের সঙ্গেও দেখা যায়নি।

সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক চং সঙ-চাংয়ের মতে, কিম ইল সাং যদি হুইকে স্বীকৃতি দিতেন, তাহলে তার নাতি-নাতনিদের সঙ্গে কিম ইল সাংয়ের ছবি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হতো।

কিম ইল সাংয়ের মৃত্যুর পর কিম জং ইল উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা হন। তখন কো ইয়ং হুই অঘোষিত ফার্স্ট লেডির ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। তিনি কিম জং ইলের সঙ্গে সামরিক পরিদর্শনে যেতেন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন।

কিম জং ইলের সাবেক ব্যক্তিগত রাঁধুনি কেনজি ফুজিমোতোর বর্ণনা অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেও ইল প্রায়ই হুইয়ের মতামত চাইতেন।

২০১১ সালে নির্মিত একটি সরকারি প্রামাণ্যচিত্রে কিম জং ইলের সঙ্গে বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে যেতে দেখা যায় কো ইয়ং হুইকে। তবে সেখানে তাঁর নাম বা সামাজিক শ্রেণিগত পরিচয় সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

প্রামাণ্যচিত্রটি সাধারণ মানুষের জন্য প্রকাশ করা হয়নি। গবেষক চং সঙ চাংয়ের মতে, ২০১২ সালের জুন মাসে এটি শুধু জ্যেষ্ঠ দলীয় কর্মকর্তাদের দেখানো হয়েছিল। পরে সেটি ফাঁস হয়ে যায় এবং চোরাই পথে আনা ইউএসবি ড্রাইভের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ে।

চং সঙ চাং বলেন, ‘এটি ছড়িয়ে পড়ার পর কো ইয়ং হুইকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। ফলে সরকার দ্রুত প্রামাণ্যচিত্রটি প্রত্যাহার করে নেয়।’

চং সঙ চাংয়ের মতে, কো ইয়ং হুইয়ের পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি প্রকাশ্যে এলে শাসকগোষ্ঠীর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে-এমন আশঙ্কায় প্রামাণ্যচিত্রটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

ক্ষমতার উত্তরাধিকার

২০০৪ সালে কো ইয়ং হুই স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্যারিসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর খবর কোনো গুরুত্বই পায়নি।

তবে প্রেমিকার দ্বিতীয় ছেলে এবং কিম জং ইলের সবচেয়ে ছোট ছেলে কিম জং উন কীভাবে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হয়ে গেলেন?

কিম জং ইলের ঘোষিত স্ত্রী কিম ইয়ং সুকের দুটি সন্তান ছিল। কিন্তু দুজনই মেয়ে হওয়ায় উত্তরসূরি হিসেবে তাদের কথা বিবেচনা করা হয়নি।

কো ইয়ং হুই ছাড়াও কিম জং ইলের আরো দু’জন প্রেমিকা ছিলেন। তারা হলেন সং হে রিম ও কিম ওক। ইলের সঙ্গে কিম ওকের কোনো সন্তান ছিল না।

একসময় মনে করা হতো, সং হে-রিমের গর্ভে জন্ম নেওয়া কিম জং ইলের বড় ছেলে কিম জং নাম উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তবে বহু বছর বিদেশে পড়াশোনা করা কিম জং নাম শুরু থেকেই শাসকগোষ্ঠীর অপছন্দের ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। তিনি এক দশকের বেশি সময় বিদেশে পড়াশোনা করেছেন এবং ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সাবলীল ছিলেন।

সাংবাদিক ইয়োজি গোমি বছরের পর বছর ধরে কিম জং নামের সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তিনি বলেন, কিম জং নাম উত্তর কোরিয়ার বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যবস্থার সমালোচনা করতেন এবং সংস্কারের পক্ষে মত দিতেন। এ কারণেই তিনি ক্ষমতাকেন্দ্রের সমর্থন হারান। এ ছাড়া ঘন ঘন ক্যাসিনোতে যাওয়া এবং বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপনের কারণে তার সম্পর্কে একজন আনন্দপ্রিয় ও ভোগবিলাসী ব্যক্তির ভাবমূর্তিও তৈরি হয়েছিল।

ম্যাকাউতে কয়েক বছর ধরে নির্বাসিত জীবনযাপনের পর ২০১৭ সালে কিম জং নামকে মালয়েশিয়ায় হত্যা করা হয়। বিমানবন্দরে তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল।

নির্বাসিত কূটনীতিক রিয়ু হিউন উ বলেন, কিম জং উনের বড় ভাই কিম জং চুলও উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন। তবে গুরুতর আফিম-আসক্তির কারণে তাকে উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

ধারণা করা হয়, কো ইয়ং হুই নিজেই তার দ্বিতীয় ছেলে কিম জং উনকে ক্ষমতার উত্তরসূরি করার জন্য সক্রিয় হয়েছিলেন।

সাংবাদিক অ্যানা ফিফিল্ড তার ‘দ্য গ্রেট সাকসেসর: দ্য সিক্রেট রাইজ অ্যান্ড রুল অব কিম জং উন’ বইয়ে লিখেছেন, কো ইয়ং হুই তার বোনের পরামর্শে এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার বোন তাকে বলেছিলেন, ‘তোমার ছেলেকেই পরবর্তী নেতা হতে হবে, নইলে আমাদের পুরো পরিবার ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতা কিম জং উনকে খুব দ্রুতই তার বাবা কিম জং ইলের প্রিয়পাত্র করে তুলেছিল।

কিম জং উন কিছু সময়ের জন্য সুইজারল্যান্ডে পড়াশোনা করেছেন। তবে বলা হয়, বিদেশে থাকলেও তাকে তার সৎভাই কিম জং নামের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও বিচ্ছিন্ন পরিবেশে রাখা হয়েছিল।

২০১১ সালে কিম জং ইল যখন মারা যান, তখন মাত্র ২৭ বছর বয়সি কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন।

এরপর কিম জং উন বোন কিম ইয়ো জংকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা দেন। তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রভাবশালী প্রচার বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে ধারণা করা হয়।

তবে কিম জং উনের পারিবারিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন আজও তার পিছু ছাড়েনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই উনের জন্মদিনকে এখনো জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। কারণ, তার জন্ম ও শৈশব নিয়ে বেশি আলোচনা শুরু হলে তার মায়ের পরিচয় এবং কেন তিনি পিয়ংইয়ংয়ের বাইরে বড় হয়েছেন-এসব স্পর্শকাতর প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে। অথচ উনের দাদা কিম ইল সাং ও বাবা কিম জং ইলের জন্মদিন উত্তর কোরিয়ায় জাতীয়ভাবে উদ্‌যাপন করা হয়।

কিম জং উনের পারিবারিক পরিচয় ঘিরে যে গোপনীয়তা রয়েছে, সেটিই সম্ভবত তাকে দ্রুত তার স্ত্রী রি সল জুকে জনসমক্ষে পরিচয় করিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রি সল জু পিয়ংইয়ংয়ের একটি উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এসেছেন বলে মনে করা হয়। তিনি একটি স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক দলের গায়িকা ছিলেন। এ ছাড়া তরুণ বয়সে রি সল জুকে চীনে ধ্রুপদি সংগীত শেখার জন্য পাঠানো হয়েছিল, যা উত্তর কোরিয়ার সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা সংবুনে ভালো পারিবারিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।

জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি বলেন, ‘মায়ের পারিবারিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে কিম জং উন যে বৈধতাজনিত সংকোচ ও ক্ষোভ অনুভব করতেন, সেটিই তাকে শুরুতেই স্ত্রী রি সল জু এবং মেয়ে জু আয়েকে সামনে আনার জন্য শক্তিশালী প্রেরণা জুগিয়েছিল।’

এখন প্রশ্ন হলো, যদি কোনো দিন কিম জং উনের মায়ের প্রকৃত বংশপরিচয় ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে চলে আসে, তাহলে কী হতে পারে?

নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিয়ু হিউন উর মতে, ‘যদি জানা যায় যে তার (কিম উন) মা জাপানে বসবাসকারী কোরীয় বংশোদ্ভূত পরিবারের সদস্য ছিলেন, তাহলে তা শুধু কিমের শাসনের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে না; বরং উত্তর কোরিয়ায় বংশানুক্রমিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পুরো ব্যবস্থাকেই নাড়িয়ে দেবে। উত্তর কোরীয় সমাজে এর প্রভাব হবে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের মতো।’

সূত্র: বিবিসি

মায়ের পরিচয় নিয়ে কেন মুখ খোলেন না কিম জং উন
কিম জং উন, মা কো ইয়ং হুই ও বাবা কিম জং ইল। ছবি: বিবিসি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রস্তাবিত চুক্তি প্রত্যাখ্যান করল লেবানন

লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার ও হিজবুল্লাহর মিত্র নাবিহ বেরি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও লেবাননকে নিয়ে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় কাঠামো চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, এই চুক্তিতে লেবাননের অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি, তাই এটি বর্তমান রূপে কার্যকর হবে না।

সোমবার (২৯ জুন) ভোরে নিজের দল আমাল মুভমেন্টের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বেরি বলেন, এই চুক্তি পাস হবে না এবং বর্তমান রূপে বাস্তবায়নও হবে না।

তিনি আরও বলেন, এটি লেবাননের অধিকার সংরক্ষণের চুক্তি নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া শর্তের একটি চুক্তি। এতে লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে তাদের দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে সরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। যতদিন না ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সরে যাবে এবং হামলা বন্ধ না করবে ততদিন এই চুক্তির কোনো অর্থ নেই।

লেবাননের সাধারণ জনগণও এই চুক্তি পক্ষে নন। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা আল জাজিরা জানিয়েছে, লেবানন-ইসরায়েল-মার্কিন কাঠামো চুক্তির অন্যতম কঠোর সমালোচক হলেন তারাই, যারা দেশটিতে ইসরায়েলের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

তাদের অনেকেই বলছেন, এই চুক্তিটি অসম্পূর্ণ, কারণ এতে লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে তাদের দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে সরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়েহর বাসিন্দা আলী যায়তুন আলজাজিরাকে বলেন, এই চুক্তিটি মেনে নেওয়া তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।

যায়তুন বলেন, আমার পরিবার, আমার গ্রাম, দক্ষিণাঞ্চল এবং দাহিয়েহ যা কিছু সহ্য করেছে তার পর সেই একই রাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তি মেনে নেওয়া আমার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন, যারা আমাদের জনপদগুলোকে ধ্বংস করে দিতে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। 

লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি। ছবি : সংগৃহীত
লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি। ছবি : সংগৃহীত

সলিলের গানের ভেতরেই ছিল মিছিলের স্লোগান

প্রকাশ ১৯ নভেম্বর ২০২৫ঃ ‘গণসংগীত মানুষের রক্তে আগুন জ্বেলে দিয়েছে, উজ্জীবিত করেছে, মুক্তির পথ দেখিয়েছে’—আজ শহীদ মিনারে এই উচ্চারণে আবারও ফিরে এলেন সলিল চৌধুরী। বুধবার, সন্ধ্যায় উদীচীর আয়োজনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হলো কিংবদন্তি গণসংগীতকার সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন ‘সতত সলিল’।

আলোচনা, গান, কবিতা ও নৃত্যে সজ্জিত এই আয়োজন ছিল একাধারে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও চেতনার পুনর্জাগরণ। সভাপতিত্ব করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুল আলম। আলোচনায় অংশ নেন লেখক–গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সায়েম রানা এবং উদীচী কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সহসাধারণ সম্পাদক ইকবালুল হক খান।

সলিল চৌধুরী সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আলোচকেরা বলেন, জাতির যে ঐতিহাসিক ধারাক্রম রয়েছে, সেই ধারার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একজন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন সলিল চৌধুরী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলার মানুষের প্রতিটি লড়াই–সংগ্রামে গণসংগীত মানুষের রক্তে আগুন জ্বেলেছে, মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, মানুষকে তার মুক্তির পথ দেখিয়েছে। সলিল চৌধুরী ছিলেন সেই গণসংগীতের একজন কিংবদন্তি কারিগর। তাঁর হাত ধরে গণসংগীত পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। তিনি কবিতাকে, মিছিলের স্লোগানকে যেমন গানে রূপান্তর করেছেন, তেমনি তাঁর রচিত সংগীত হয়ে উঠেছে মিছিলের স্লোগান। বক্তারা আরও বলেন, ‘গণমানুষের মুক্তির বাণী নিয়ে যে গান, তা আমাদের যুগে যুগে রাষ্ট্রব্যবস্থায় শাসকশ্রেণি থেকে শুরু করে অনেকেরই পছন্দের নয়। তাই হয়তো আমাদের সমাজে গণসংগীত যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু তারপরও মানবমুক্তির প্রতিটি লড়াইয়ে, প্রতিটি সংগ্রামে গণসংগীত আমাদের শক্তি জোগায়, সাহস জোগায়। বাংলা আধুনিক গানের অবিস্মরণীয় সুরস্রষ্টা ও গণসংগীতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তি সলিল চৌধুরীর তৈরি করা গণসংগীত সর্বকালের জন্য প্রাসঙ্গিক।’

আলোচনা শেষে আয়োজন মাতিয়ে তোলে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বৃন্দগান পরিবেশন করে উদীচী সংগীত বিভাগ ও ‘কোরাস’। একক গান করেন তানভীর আলম সজীব এবং মনসুর আহমেদ। বৃন্দনৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দন; একক নৃত্যে অংশ নেন আদৃতা আনোয়ার প্রকৃতি। আবৃত্তিতে অংশ নেয় উদীচী আবৃত্তি বিভাগ; একক আবৃত্তি করেন শাহেদ নেওয়াজ।

১৯২৫ সালের ১৯ নভেম্বর, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গাজীপুর গ্রামে জন্ম গণসংগীতের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব সলিল চৌধুরীর। পশ্চিমা শাস্ত্রীয় সুর থেকে অসমিয়া লোকগান—বহুমাত্রিক সঙ্গীতভুবনে বেড়ে ওঠা সলিল মাত্র ২২ বছর বয়সে রচনা করেন অমর গান ‘গাঁয়ের বধূ’।

আইপিটিএতে সক্রিয় কাজের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের শিল্পী। তাঁর ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘দো বিঘা জমিন’-এর সংগীত পরিচালনা করেন তিনিই, যা আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। বাংলা, হিন্দি, মালয়ালামসহ বিভিন্ন ভাষার ১৫০টির বেশি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন তিনি। কবিতা, স্লোগান ও লোকসুরের সঙ্গে পাশ্চাত্য অর্কেস্ট্রেশনের অপূর্ব সংমিশ্রণে তাঁর সৃষ্টি আজও আন্দোলনের গান, মানবমুক্তির গান। আজ সলিলের শতবর্ষে শহীদ মিনারের ওপর আজ যেন ভেসে উঠেছিল তাঁর গান-মানুষের সাহস, সংগ্রাম আর মানবমুক্তির চিরন্তন সুর।

আলোচনা, গান, কবিতা ও নৃত্যে সজ্জিত এই আয়োজন ছিল একাধারে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও চেতনার পুনর্জাগরণ
আলোচনা, গান, কবিতা ও নৃত্যে সজ্জিত এই আয়োজন ছিল একাধারে স্মরণ, শ্রদ্ধা ও চেতনার পুনর্জাগরণ। উদীচী

নাম না বলেও ভালোবাসা যায়, শিখিয়েছেন সঞ্জীব by সৌমেন্দ্র গোস্বামী

লেখাপড়ায় অসাধারণ ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক—দুটি পরীক্ষাতেই মেধাতালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হন; কিন্তু ভালো লাগল না বলে থিতু হলেন না। বিভাগ পরিবর্তন করে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে গেলেন। কর্মজীবনে সাংবাদিকতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। ভালোবেসে ফলিয়েছিলেন সোনার ফসল। তাঁর হাতে ‘ফিচার’ ভাষা পেয়েছে।

সঞ্জীব চৌধুরীর জন্ম ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর হবিগঞ্জের মাকালকান্দি গ্রামে। বাবা-মায়ের সপ্তম সন্তান তিনি। কর্মমুখর জীবনে অনেক পরিচয়ে অভিষিক্ত করেছেন নিজেকে। লিখেছেন কবিতা, গল্প, নাটকসহ নানা কিছু। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর পৃথিবীর বাতাসে শেষবার নিশ্বাস ছেড়েছেন তিনি। ৪৩ বছর বয়সের ছোট্ট জীবনে বাংলা গানে তৈরি করে গেছেন নতুন ধারা। গান দিয়ে জিতে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়। ১৮ বছর পরও তাঁর গানের রং ফিকে হয়নি। একইভাবে ভালোবেসে তাঁর গান আঁকড়ে রেখেছেন শ্রোতারা। ভক্ত, অনুরাগীরা আজও তাঁকে শ্রদ্ধা নিয়ে স্মরণ করছেন। আজ সারা দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে কথা হয়েছে, ছবি শেয়ার করেছেন অনেকে।

‘আমি তোমাকেই বলে দেব/ কী যে একা দীর্ঘ রাত, আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে/ আমি তোমাকেই বলে দেব/ সেই ভুলে ভরা গল্প, কড়া নেড়ে গেছি ভুল দরজায়/ ছুঁয়ে কান্নার রং, ছুঁয়ে জোছনার ছায়া’। কথাগুলো উচ্চারিত হতেই কেমন যেন ভালো লাগা অনুরণিত হয়। বাপ্পা মজুমদারের সুরে গানটিতে জীবনের চূড়ান্ত সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন সঞ্জীব। তাই তো গানের পরের চরণে তিনি যখন গেয়ে ওঠেন, ‘আমি কাউকে বলিনি সে নাম/ কেউ জানে না, না জানে আড়াল/ জানে কান্নার রং, জানে জোছনার ছায়া’,  তখন মন কেমন করে ওঠে।
ভালোবাসা, প্রেম, বিরহ, প্রতিবাদ, দ্রোহ—প্রতিটি বিষয়কেই নিজস্ব ভাষায় গানে তুলে ধরেছেন সঞ্জীব। যা কেবল তাঁর নিজের ভাষা বা নিজের গান হয়েই থেকে যায়নি, ক্রমেই শ্রোতাদের ভাষা ও অভিব্যক্তি হয়ে উঠেছে। শোষকের বিরুদ্ধে গানে গানে সব সময় সোচ্চার ছিলেন তিনি। কঠিন সময়েও তাঁর গান থামেনি, প্রতিবাদ জারি রেখেছেন।
সঞ্জীব সংগীতচর্চা শুরু করেছিলেন শঙ্খচিল নামের একটি সংগীত দলে যুক্ত হয়ে। ফোক গানের প্রতি তাঁর বিশেষ ভালো লাগা ছিল। তাঁর কণ্ঠে ফোক জমেছেও বেশ। বাউল শাহ আবদুল করিমের লেখা ‘গাড়ি চলে না চলে না/ চলে না রে, গাড়ি চলে না’ গানটি তাঁর কণ্ঠে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সংগীতশিল্পী বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গে জনপ্রিয় ব্যান্ড দলছুট গঠন করেন সঞ্জীব। দুজনের প্রয়াসে দলছুট শ্রোতাদের মন জিতে নেয়। দলছুটের প্রথম অ্যালবাম ‘আহ’। ১৯৯৭ সালে এটি প্রকাশিত হয়। এরপর ‘হৃদয়পুর’, ‘স্বপ্নবাজি’, ‘আকাশচুরি’, ‘জোছনা বিহার’, ‘টুকরো কথা’, ‘আয় আমন্ত্রণ’ নামে আরও কয়েকটি অ্যালবাম বেরিয়েছে দলছুট থেকে।

কবি কামরুজ্জামান কামুর লেখা সঞ্জীব চৌধুরীর গাওয়া ‘আগুনের কথা বন্ধুকে বলি,’ ‘তোমার ভাঁজ খোলো, আনন্দ দেখাও’, ‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ’ গানগুলোও তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে।
নিজের লেখা কবিতাতেও সুর দিয়েছেন সঞ্জীব। কবিতা থেকে বানিয়েছেন গান। ছোটগল্পও লিখেছেন কিছু। তাঁর ‘রাশ প্রিন্ট’ আশির দশকে বাংলা একাডেমি কর্তৃক সেরা গল্পগ্রন্থ হিসেবে নির্বাচিত হয়। নাটকের স্ক্রিপ্ট লেখার কাজেও দক্ষ ছিলেন সঞ্জীব। ‘সুখের লাগিয়া’ নাটকের মাধ্যমে অভিনয়েও নাম লিখিয়েছিলেন এই শিল্পী।

গল্পকার, নাট্যকার, সাংবাদিক—নানা পরিচয়ের মধ্যে শিল্পী হিসেবেই সমধিক পরিচিত সঞ্জীব চৌধুরী। গান দিয়েই আসন করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। ‘আমি ফিরে পেতে চাই/ সেই বৃষ্টিভেজা সুর/ আমি ফিরে পেতে চাই /সাত সুখের সুমুদ্দুর’।

গানের এই আহ্বান কেবল সঞ্জীবের একার নয়, প্রত্যেকে এভাবে বলতে চাই। প্রেমিকমাত্রই বলতে চাই, ‘আমি রাগ করে চলে যাব ফিরেও আসব না/ আমি কষ্ট চেপে চলে যাব খুঁজেও পাবে না/ মেয়ে আমাকে ফেরাও/ আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল চাঁদ’। গানে সহজভাবে বলতে পারা, সবার কথা বলতে পারাই কি তাঁর গানের প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহ বাড়িয়েছে? কনসার্ট থেকে ঘরোয়া আয়োজন—সর্বত্র নতুন প্রজন্মের অনেকেই তাঁর গান গেয়ে থাকেন।

সঞ্জীব চৌধুরী
সঞ্জীব চৌধুরী (২৫ ডিসেম্বর ১৯৬৪—১৯ নভেম্বর ২০০৭) ছবি: সংগৃহীত

Sunday, June 28, 2026

এ বছরই দেশে ফিরব: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। এ সময় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি এ বছরই দেশে ফিরব।’ তার ভাষায়, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি ‘শক্তি’। তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার ওপর আঘাত।

প্রশ্ন: আপনি একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং আপনার সমর্থকেরাও আশাবাদী যে, আপনি শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরবেন। এমনকি দলের কয়েকজন নেতা বলেছেন, আপনি এ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

শেখ হাসিনা: আমার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোন বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য।

আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা ন্যায়বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অতীতেও এ ধরনের চেষ্টা হয়েছে। তখনও তারা ব্যর্থ হয়েছে, এবারও ব্যর্থ হবে।

আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র ভেদ করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। বাংলাদেশের জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি এবং দেশের নজিরবিহীন উন্নয়নে কাজ করেছি।

আমার জীবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং দেশের উন্নয়ন। তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই। সব বাধা ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব।

প্রশ্ন: অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ আবার জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে। এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি বর্তমানে আওয়ামী লীগের রয়েছে?

শেখ হাসিনা
: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোন কাগুজে সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগ বহুবার হামলার শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অন্য কারও ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আওয়ামী লীগ নিজের পথ তৈরি করে। জনগণের সমর্থন সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই শক্তি নিয়েই সরকারে থেকে আমরা মানুষের উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছি।

বাংলাদেশবিরোধী শক্তি জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। কিন্তু সব চেষ্টা করেও তারা মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকারের পর এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনে মানুষ বাস্তবতা নিজের চোখে দেখছে। দেশে গণতন্ত্র নেই, আইনের শাসন নেই, নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হচ্ছে। উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন।

মানুষ তুলনা করতে জানে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা থাকে।

সাংগঠনিক শক্তির প্রশ্নে বলতে চাই, বাংলাদেশের রাজনীতির অলিগলি আওয়ামী লীগ হাতের তালুর মতো চেনে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই এই দল বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জনগণের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার সক্ষমতা আওয়ামী লীগের রক্তে মিশে আছে।

আগুনে যেমন সোনা আরও খাঁটি হয়, তেমনি শাসকের নিপীড়ন ও নির্যাতন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করছে।

দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আমার বার্তা খুবই সহজ। ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান। প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আপস করবেন না।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়। এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ মানুষের সঙ্গে ছিল, আছে এবং থাকবে। জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে এবং দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজারো মামলা হয়েছে বলে খবর রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক পুনরুত্থান কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না। এটি জনগণের ওপর নির্ভর করে।

অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে একটি সাজানো নির্বাচন থেকে দূরে রেখেছে। দলের কার্যালয় বন্ধ করেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে দমন করেছে। কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। সে কারণেই আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। শুধু নেতা-কর্মীরাই নয়, সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন। মায়েরা তাদের সন্তানদের সাহস জোগাচ্ছেন। এগুলোই আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণের লক্ষণ।

বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে, তারা আওয়ামী লীগের শক্তিকে ভয় পায়। সে কারণেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এটি তাদের দুর্বলতার প্রমাণ।

আওয়ামী লীগকে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা যাবে না। যে দল জনগণের জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে থামানো যায় না। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ কখনো শাসকের রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি। বরং সেই রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করেই বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে।

বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের ওপর অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু যারা এখন ক্ষমতা দখল করে আছে, তারা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও বন্ধ রাখে, তাহলে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ, বেদনা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের মতো একটি মডেলের দিকে এগিয়ে গেছে। এই পরিবর্তন বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?

শেখ হাসিনা: আমি কখনোই কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণের স্বার্থে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই পরিষ্কার ছিল, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ তবে সেই সম্পর্ক অবশ্যই রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে সামরিক শাসন, বৈষম্য, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা এবং গণতন্ত্র অস্বীকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলাম, তার ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করা মানেই বাংলাদেশের মৌলিক পরিচয়ের ওপর আঘাত হানা।

৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা চালানো হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হয়েছে। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। সুফি দরগা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করে উগ্রবাদ বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এক কথায়, বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা একটি স্থিতিশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং উন্নয়নশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় পৌঁছেছিল ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলারে। ২৯ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছিল ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল।

আমরা দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিশুমৃত্যুর হার চার গুণ কমেছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আট গুণ বেড়েছিল এবং শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছিল। সাক্ষরতার হার বেড়ে হয়েছিল ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৩ দশমিক ৪৪ শতাংশে। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা ১৪ হাজার ৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছি।

আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসন করেছি। প্রায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ১১৫ জনকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ বাড়ির মালিকানা দিয়েছি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পেলে বাঙালি জাতি নিজ শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা ধ্বংস করা হয়েছে। দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে একমাত্র আওয়ামী লীগই দেশকে মুক্ত করতে পারে। জনগণ তা বুঝতে পেরেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই বিজয়ী হবে। ইউনূস এবং বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এটি খুব ভালোভাবে জানে। এ কারণেই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে ধ্বংস করেছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রশ্ন: এমন একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আপনার জন্য ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আপনার পর্দার আড়ালে আলোচনা হয়েছে। এসব দাবির কোনো সত্যতা আছে কি?

শেখ হাসিনা: জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা প্রায়ই ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের প্রচারণা চালায়। এ বিষয়ে আমার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার এসব কোনো গোপন দরকষাকষির বিষয় নয়। এগুলো দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।

আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। একইভাবে ন্যায়বিচারও কোনো দান বা করুণা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। রাজনৈতিক নির্দেশনায় পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা সাক্ষ্য কিংবা বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কখনো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না।

আমি সবসময় রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে। তবে সেই সমাধান হতে হবে প্রকাশ্য, নীতিনিষ্ঠ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে নয়। আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া বা অনুগ্রহ চায় না। আওয়ামী লীগ সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার, জনগণের সমর্থন এবং মানুষের শক্তির ভিত্তিতেই রাজনীতি করবে।

প্রশ্ন: সম্প্রতি মন্দির ও হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা, পাশাপাশি কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর বিক্ষোভ ও হুমকির খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শেখ হাসিনা: বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গভীরভাবে উদ্বেগজনক। দুঃখজনক হলেও এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে যখনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দুর্বল হয়েছে, যখনই সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করেছে, তখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন নেমে এসেছে। তাদের বাড়িঘর, উপাসনালয়, ব্যবসা, জীবন ও মর্যাদা সবই হুমকির মুখে পড়েছে।

৫ আগস্টের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া সম্প্রদায় এবং সুফি সংশ্লিষ্ট কেউই নিরাপদ নন। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিমা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাড়িঘরে লুটপাট হয়েছে। চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বাধা অব্যাহত রয়েছে।

সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এখনও একটি মিথ্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে, সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নয়, তারা বাংলাদেশের সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। সেই বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও উগ্রবাদের জিম্মি হতে দেওয়া যায় না।

যারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়, মন্দির ভাঙচুর করে কিংবা ধর্মের নামে মানুষকে হুমকি দেয়, তারা শুধু একটি সম্প্রদায়ের শত্রু নয়। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু। যখন কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ে থাকে, তখন রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। আজ অনেক সংখ্যালঘু পরিবার সেই ভয়ের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছে। নিরাপত্তার দাবিতে তাদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মন্দির ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যারা শান্তিপূর্ণভাবে সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা বা হয়রানি করা চলবে না বরং তাদের কথা শুনতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমঅধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ব্যক্তিগতভাবে এই সময়টা আপনি কীভাবে কাটাচ্ছেন? আপনার মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হচ্ছে, নাকি নির্বাসিত জীবন বেশ সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে?

শেখ হাসিনা: দীর্ঘ সময় ধরেই আমার জীবনে ব্যক্তিগত বলে আলাদা কিছু নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। ১৯৭৫ সালে আমি সবকিছু হারিয়েছি। তারপরও আমাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। পরে দেশে ফিরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াই করেছি। আজ আবার বাংলাদেশ একটি কঠিন সময় পার করছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি সেখানে থাকতে পারছি না এটাই আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।

আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে বাংলাদেশে। যে মাটিতে আমার বাবা শায়িত, যে দেশের মাটির সঙ্গে আমার পরিবারের রক্ত মিশে আছে, যে দেশের মানুষের জন্য আমি সারাজীবন কাজ করেছি। নিজের দেশের মানুষের থেকে দূরে থাকা, নিজের মাটির গন্ধ থেকে দূরে থাকা, এবং প্রতিদিন আমার নেতা-কর্মীদের কষ্টের খবর শোনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

আজ আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে অনেক বড় বিষয় হলো বাংলাদেশের মানুষের অধিকার। দূর থেকেও আমি প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। আমাদের নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর নিই। নির্যাতিত পরিবারের গল্প শুনি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমার সংগ্রাম থেমে নেই।

আমার শক্তি বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং জাতির পিতার আদর্শ। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে আমি প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছি । আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। জনগণের শক্তিতে আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। আমি সেই সংগ্রামের সঙ্গেই আছি এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকব।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

রামমন্দিরে দুর্নীতি ঘিরে ভারতে তোলপাড়: আটজন গ্রেপ্তার, ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার

মুঘল স্থাপনা বাবরি মসজিদ ভেঙে গড়া হিন্দুত্ববাদীদের সাধের রামমন্দিরে এবার চুরির ঘটনা ঘটেছে। অযোধ্যার এই মন্দিরে অনুদানের টাকা তছরুপেরও অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

এ ঘটনায় উত্তর প্রদেশ সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) ইতোমধ্যে বড়সড় গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে নগদ ও মূল্যবান সামগ্রী গোনার দায়িত্বে থাকা আটজনকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৭৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। মিলেছে কিছু বিদেশি মুদ্রাও। আগামীকাল ২৯ জুন পর্যন্ত তাদের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে অনুদান পরিচালনার ক্ষেত্রে নিয়মের চরম লঙ্ঘন ধরা পড়েছে। অনুদান গোনার সময় কর্মীদের তল্লাশি করা হয়নি। সেখানে কোনো নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন ছিল না। সিসিটিভি ফুটেজ ১৮০ দিনের বদলে মাত্র ৪৫ দিন সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অনুদান বাক্সের চাবি ছিল রামশঙ্কর যাদব ওরফে তিন্নু যাদবের কাছে। তিনি ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের প্রাক্তন গাড়িচালক। এটি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত।

সূত্র জানায়, কর্মীদের পকেটবিহীন পোশাক পরার নিয়ম ছিল। কিন্তু তা মানা হয়নি। এসআইএস এজেন্সির কোনো নিরাপত্তারক্ষী ছিল না। এমনকি কোনো আচমকা তল্লাশিও চালানো হতো না। সিট জানিয়েছে, অনুদান গোনার দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত সুভাষ শ্রীবাস্তবকে নিয়ম ভেঙে নিয়োগ করা হয়েছিল। ট্রাস্টের অন্যতম শীর্ষ এক কর্মকর্তার সুপারিশে তার চাকরি হয়।

গত ৭ জুন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব প্রথম এই দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তার আগে প্রাক্তন এসপি বিধায়ক পবন পাণ্ডে বড়সড় দাবি করেছিলেন। তার মতে, সাড়ে সাত থেকে ২৭ কোটি টাকা তছরুপ হয়েছে। প্রথমে শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এই অভিযোগ উড়িয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, অভ্যন্তরীণ অডিটে সন্দেহজনক কিছু মেলেনি। তবে ১৩-১৪ জুন উত্তরপ্রদেশ সরকার তিন সদস্যের সিট গঠন করে। এরপর ২৫ জুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতার একাধিক ধারায় এফআইআর দায়ের হয়। অনুকল্প মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, অবিনাশ শুক্লা, তিন্নু যাদব, মনীশ যাদবসহ আটজনের নাম রয়েছে এই এফআইআরে। এরপর গত শুক্রবার নৈতিক দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন চম্পত রাই এবং ট্রাস্টি অনিল মিশ্র।

গতকাল শনিবার মহারাষ্ট্রের ইয়াভাৎমাল-ওয়াশিম কেন্দ্রে একটি জনসভায় বিজেপির তীব্র সমালোচনা করেন শিবসেনা (উদ্ধব) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে। তিনি বলেন, বিজেপি হিন্দুদের আবেগের সঙ্গে খেলছে। তারা হিন্দুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। মন্দির লুট করার এই হিন্দুত্বকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ‘বিজেপি-মুক্ত রাম’ গড়ার ডাক দিয়েছেন। এজন্য প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেবে তার দল। দলবদল করা সংসদ সদস্য সঞ্জয় দেশমুখের সমালোচনা করে উদ্ধব ভোটারদের কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, তার কথাতেই মানুষ ওই ‘কাকতাড়ুয়া’কে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু সে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।

তিনি একনাথ শিন্ডের গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে ফের ‘৫০ খোকা’ বা ৫০ কোটি টাকার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি প্রশ্ন করেন, আগে বিধায়কদের দাম ৫০ কোটি হলে এখন সাংসদদের দাম কত? অন্যদিকে, দলের নেতা সঞ্জয় রাউত অভিযোগ করেছেন, রাম জন্মভূমি ট্রাস্টে অনুদান দিলেও তারা কোনো রসিদ পাননি।

কংগ্রেসও এই ইস্যুতে বিজেপি, আরএসএস এবং কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এই ঘটনাকে ‘লজ্জাজনক’ ও ‘দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, সাধারণ মানুষ, গরিব নারী এবং শিশুদের জমানো টাকা এভাবে চুরি যাওয়াটা গোটা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এর পেছনে বড় চক্রান্তকারীদের হাত থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

কংগ্রেস নেতা পবন খেরা প্রশ্ন তুলেছেন, আরএসএস এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নজরদারিতে থাকা এই প্রকল্পে কীভাবে এমন দুর্নীতি হলো। তার অভিযোগ, ট্রাস্ট তৈরি হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ নৃপেন্দ্র মিশ্র ও চম্পত রাইদের নিয়ে। মহীপাল সিং নামের যে ব্যক্তি প্রথম চুরির কথা জানিয়েছিলেন, তাকে উল্টে সরিয়ে দেওয়া হয়। খেরা বলেন, ধর্মকে হাতিয়ার করে চুরি চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যারা চুরি করেছে, তারাই আসলে হিন্দু ধর্মের অবমাননা করেছে।

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং এ ঘটনায় চম্পত রাই এবং অনিল মিশ্রকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহীপাল সিং এবং দীননাথ বর্মার মতো সাক্ষীদের বয়ান রেকর্ড করা উচিত।

তার অভিযোগ, প্রায় সাড়ে ১২ কোটি পরিবারের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হলেও তার কোনো হিসাব নেই। বিজেপি, আরএসএস ও ভিএইচপি সনাতন ধর্মের ঐতিহ্য ধ্বংস করছে। এই সংগঠনগুলো মঠ ও মন্দির দখলের চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈ এফআইআর দায়ের করতে দেরি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, আসল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে। জ্যোতির্মঠের শঙ্করাচার্যও জানিয়েছেন, এফআইআরে মূল অভিযুক্তদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। তিনি বিজেপির হিন্দুত্বকে ‘নকল’ বলে কটাক্ষ করেছেন।

তবে বিরোধীদের এই আক্রমণের কড়া জবাব দিয়েছে বিজেপি। উত্তরপ্রদেশের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টিকে নিশানা করেছেন। তিনি অখিলেশ যাদবের দলকে ‘লাঠিয়াল গ্যাং’ বলে কটাক্ষ করেন। তার দাবি, এই দলগুলো বরাবরই রাম মন্দিরের বিরোধী। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তারা মিথ্যা ও বিষ ছড়াচ্ছে।

তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, সিট তদন্তের পর এফআইআর হয়েছে এবং গ্রেপ্তার শুরু হয়েছে। দোষীদের কাউকেই রেয়াত করা হবে না।

সরকারি সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। সিট তাদের প্রাথমিক রিপোর্টে কড়া সুপারিশ করেছে। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরকার জানিয়েছে।

রামমন্দিরে দুর্নীতি ঘিরে ভারতে তোলপাড়
মুঘল স্থাপনা বাবরি মসজিদ ভেঙে গড়া হিন্দুত্ববাদীদের সাধের রামমন্দির। ছবি: সংগৃহীত

গুহামানবদের চুম্বন, এবং...

মানবসভ্যতার বহু পুরোনো এক রহস্যে আলো ফেলেছে নতুন এক গবেষণা। তাতে বলা হয়েছে, মানুষ ও নিয়ান্ডারথালরা শুধু মিলনই করত না, তারা একে অপরকে চুম্বনও করত। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ফ্লোরিডা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকরা জানিয়েছেন, প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে মানুষের চুম্বনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন ডেইলি মেইল বলছে, নিয়ান্ডারথাল হলো মানুষের ঘনিষ্ঠ পূর্বপুরুষ। তারা প্রায় ৪ লাখ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ায় বসবাস করত।

আগের গবেষণায় জানা গিয়েছিল, আধুনিক মানুষের জিনে আজও নিয়ান্ডারথালের ডিএনএ পাওয়া যায়। অর্থাৎ দুই প্রজাতির মধ্যে যৌনসম্পর্ক ঘটেছিল। তবে চুম্বনও সেই মিলনের অংশ ছিল কি না, তা এতদিন অজানাই ছিল। গবেষণার সহ-লেখক ফ্লোরিডা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ক্যাথরিন ট্যালবট বলেন, চুম্বন আমাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার মনে হলেও, মানব সভ্যতার মাত্র ৪৬ শতাংশ সংস্কৃতিতে এটি নথিবদ্ধ। সমাজভেদে এর অর্থ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এটি কি আদিম আচরণ, নাকি সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন- এটাই ছিল বড় প্রশ্ন। গরিলা, শিম্পাঞ্জি, বনোবো থেকে শুরু করে সাদা ভাল্লুক, নেকড়ে এমনকি অ্যালবাট্রস- অনেক প্রাণি চুম্বনের মতো আচরণ করে। কেউ মুখে মুখ দেয়, কেউ নাক ছোঁয়ায়, কেউ মাথা ঠেকায়- যা সামাজিক বা প্রজনন আচরণের অংশ। তবে বিবর্তনগতভাবে চুম্বন হলো এক ‘রহস্যময় আচরণ’। কারণ এতে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। অথচ প্রজননে সরাসরি কোনও সুবিধা দেয় বলে মনে হয় না। গবেষকরা আধুনিক প্রাইমেটদের আচরণ নিয়ে সংগ্রহ করা বিপুল তথ্য ব্যবহার করেন- যেমন শিম্পাঞ্জি, বনোবো, ওরাংওটাং কি ধরনের চুম্বন-সদৃশ আচরণ করে। তারা চুম্বনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে- ‘আক্রমণাত্মক নয়, মুখে-মুখে স্পর্শ, যার মধ্যে খাবার আদান-প্রদান হয় না।’ এরপর জটিল পরিসংখ্যানভিত্তিক বাইসিয়ান মডেলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে বিবর্তনের বিভিন্ন শাখায় চুম্বনের সম্ভাব্য উৎস নির্ণয় করা হয়। মডেলটি এক কোটি বার চালানো হয়, যাতে ফলাফল অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য হয়। ফলাফলে দেখা যায়, চুম্বনের উৎপত্তি দুই কোটি ১৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৬৯ লাখ বছর আগের এক পূর্বপুরুষে। এই পূর্বপুরুষ থেকে সৃষ্টি চারটি গ্রেট এপ। তারা হলো ওরাংওটাং, গরিলা, প্যান (শিম্পাঞ্জি ও বনোবো) এবং হোমো (যার একমাত্র জীবিত সদস্য আধুনিক মানুষ)।

গবেষকদের মতে, নিয়ান্ডারথালরাও জীবদ্দশায় চুম্বনের আচরণ করত। এটি সমর্থন করছে আগের প্রমাণ- মানুষ ও নিয়ান্ডারথালের মুখের জীবাণু  আদান-প্রদান হয়েছিল, যা লালার মাধ্যমে ছাড়া সম্ভব নয়। গবেষণা বলছে- মানুষ ও নিয়ান্ডারথালের শারীরিক সান্নিধ্য শুধু মিলনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং চুম্বন, আদর, ঘনিষ্ঠ স্পর্শ- সবই ঘটত। যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন- প্রাগৈতিহাসিক যুগে মিলন সবসময়ই হয়তো ‘সম্মতিতে’ হয়নি। প্রফেসর পল পেটিট ডেইলি মেইলকে বলেন, আমরা ধরে নিই মিলন ছিল সম্মতিপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হল- সে যুগে অনেক সময়ই হয়তো কারও কোনও বিকল্প ছিল না। যদি সম্মতিপূর্ণ হয়ে থাকে- তবে অবশ্যই চুম্বন ও আলিঙ্গন ছিল মিলনের অংশ।
চুম্বন প্রায় সব বড় এপ প্রজাতির মধ্যেই আজও দেখা যায়। অর্থাৎ এটি টিকে আছে লক্ষ লক্ষ বছর। তবে কেন এটি বিবর্তনে বজায় রইল। তার কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। একটি ধারণা হলো- চুম্বনের মূল ছিল পরস্পরের গায় থেকে উকুন-টিক পড়া সরানো। পরবর্তীকালে এটি যৌন উত্তেজনা ও অন্তরঙ্গতার অংশ হয়ে ওঠে।
https://mzamin.com/uploads/news/main/190205_Abul-6.webp

গাজায় তাঁবুতে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত শিশুদের হত্যা

গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুতে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় আরো এক ফিলিস্তিনি শিশুসহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। গাজার কিছু অংশকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করে ‘যুদ্ধবিরতি’ চললেও ইসরাইল এই হামলা অব্যাহত রেখেছে।

চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, শনিবার দুটি অস্থায়ী তাঁবুতে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় দুই ভাই-বোন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন ১৫ বছর বয়সি ইসলাম মুসা এবং তার ৩০ বছর বয়সি ভাই আবদুল্লাহ মুসা।

গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকার ওই হামলার স্থান থেকে সাতজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের নাসের হাসপাতাল ও রেড ক্রস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসপাতালের আঙিনায় সাদা কাফনে জড়ানো ভাই-বোনের লাশের পাশে আত্মীয়-স্বজনদের কাঁদতে দেখা গেছে।

এর আগে দক্ষিণ গাজায় ইসরাইলি বোমাবর্ষণে আহত হওয়া ১০ বছর বয়সি আরো এক ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেছে।

নাসের হাসপাতালের একটি সূত্র আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছে, দিনকয়েক আগে আল-মাওয়াসিতে ইসরাইলি হামলায় আহত হওয়া ওয়ালিদ ইউসুফ আবু জাজার নামের ওই শিশুটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

আল-শিফা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পশ্চিম গাজা শহরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেওয়া আরেকটি তাঁবুতেও আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অ্যাম্বুলেন্স সেবা জানিয়েছে, আহতদের বেশিরভাগই নারী এবং তাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

গাজা শহর থেকে আল জাজিরার তারেক আবু আজুম জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধবিরতি’ সত্ত্বেও ইসরাইল তাদের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গত বছর যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর থেকেই সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা ইসরাইলি নীতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তিনি আরো জানান, ‘গত কয়েক ঘণ্টায় আমরা খবর পেয়েছি যে ইসরাইলি ড্রোনগুলো আল-মাওয়াসি এলাকার অস্থায়ী তাঁবুতে আঘাত হেনেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী এই এলাকাটিকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জন্য নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।’

আজুম বলেন, ‘আমরা ড্রোন হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির সাক্ষী হচ্ছি এবং এখনও মাথার ওপরে ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।’

শিশুদের লক্ষ্য করে ইসরাইলের পরিকল্পিত হামলা

জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে গাজায় শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি নথিভুক্ত করার পর ইসরাইলের ফিলিস্তিনি শিশু হত্যার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু।

শিশুদের অধিকারকর্মী রাচেল আকুরসো (মিস রাচেল নামে পরিচিত) এই প্রতিবেদনের একজন সহ-লেখকের সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড থামাতে বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে।

শুক্রবার তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি আমাদের নিজেদের সন্তানদের মতো শিশুরাই একটি গণহত্যার মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তবুও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কোনো জবাবদিহিতা নেই।’

প্রতিবেদনের সহ-লেখক এবং জাতিসংঘের কমিশনার ক্রিস সিডোটি এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে ‘একেবারে হৃদয়বিদারক’ বলে অভিহিত করেছেন।

সিডোটি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রগুলোর পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমাদের সাড়ে তিন বছর আগেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, তবে শুরু করার জন্য এখনও খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৪৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৭ জন আহত হয়েছেন।

মন্ত্রণালয় আরো জানায়, গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি বাহিনী ১ হাজার ৩১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ৩ হাজার ৩০৯ জনকে আহত করেছে।

সূত্র: আল-জজিরা

গাজায় তাঁবুতে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত শিশুদের হত্যা
ছবি: এএফপি

হরমুজ ঘিরে ফের মুখোমুখি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, সংকটে যুদ্ধবিরতি

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে আবারো সংঘর্ষে জাড়িয়ে পড়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। শনিবার সকালে হরমুজের একটি জাহাজে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল আঘাত হানলে আবারো সংঘর্ষের সূত্রাপাতা ঘটে দেশ দুটির মধ্যে। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর উপকূলবর্তী সিরিক জেলার তাহরুই গ্রামের কাছে কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এদিকে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপের একটি গ্রামে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।

এ পর্যন্ত ইরানের রাজনৈতিক বা সামরিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সিরিক এবং কেশম দ্বীপ। কেশম দ্বীপে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, টেলিযোগাযোগ টাওয়ার এবং নজরদারি কেন্দ্র রয়েছে।

এ ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। যুক্তরাজ্যের সমুদ্র নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও জানায়, হামলায় জাহাজটির নিয়ন্ত্রণকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নাবিকেরা সবাই নিরাপদে আছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পর এটি দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের ঘটনা। ফলে সমঝোতাটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি চুক্তি আবারও লঙ্ঘন করায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার সাইটে হামলা চালিয়েছে। মনে হচ্ছে, তারা কখনোই শিক্ষা নেবে না।”

তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এমন সময় আসতে পারে, যখন আমাদের আর সংযত থাকার সুযোগ থাকবে না। তখন আমরা সামরিকভাবে অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করা কাজটি সম্পূর্ণ করতে বাধ্য হব।

অন্যদিকে, কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ বাহরাইনে কথিত ইরানি ড্রোন হামলাকে দেশটির সার্বভৌমত্বের ‘অবৈধ লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে তিনি দেশটির জনগণের প্রতি কানাডার সংহতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

অনিতা আনন্দ বলেন, বাহরাইনের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এই কথিত ইরানি ড্রোন হামলা অবৈধ লঙ্ঘনের শামিল।

তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টেকসই সমাধানের আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে কানাডা।

হামলা চালিয়ে গেলে ইরানও কঠোর অবস্থান নেবে

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানও আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন নিজেই যে সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে, এখন সেটির শর্ত মানতে আগ্রহী নয়।

আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আহমাদিয়ান বলেন, সমঝোতা স্মারকের পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার ইরানের রয়েছে। তেহরান ওই ধারার ভিত্তিতেই যেসব জাহাজ ইরানের সঙ্গে সমন্বয় না করে চলাচল করছে বলে দাবি করছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘চুক্তিটি ইরানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র সেই সমঝোতার বাইরে ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর করতে চাইছে।’

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি না ইরান থেমে যাবে। বরং যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তেজনা আরও বাড়ায়, তাহলে ইরানও পাল্টা উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে।

ইরানে হামলা ‘যুদ্ধক্ষমতা আইনের লঙ্ঘন: মার্কিন কংগ্রেসম্যানের

মার্কিন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রো খান্না ইরানে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন হামলার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এটি কংগ্রেসে পাস হওয়া ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন’ বা যুদ্ধক্ষমতা-সংক্রান্ত প্রস্তাবের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে খান্না বলেন, আমরা যে ওয়ার পাওয়ারস রেজুলেশন পাস করেছি, এই হামলাগুলো তার প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পকে এখনই এই যুদ্ধ থামাতে হবে। অন্যথায় তাকে বাধ্য করতে আমরা আদালতের শরণাপন্ন হব।

গত মঙ্গলবার মার্কিন সিনেট একটি প্রস্তাব পাস করে, যাতে বলা হয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হয় ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে, নয়তো পরবর্তী কোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে। এর আগে জুন মাসেই একই ধরনের প্রস্তাব প্রতিনিধি পরিষদেও পাস হয়েছিল।

তেলের দাম বাড়লেই অবস্থান নরম করবেন ট্রাম্প: সাবেক মার্কিন নৌ কর্মকর্তা

মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে হামলার কারণে তেলের দাম বেড়ে গেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপে সংযম দেখাতে বাধ্য হতে পারে।

আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উলম্যান বলেন, “আমার ধারণা, তেলের দাম দ্রুত বাড়বে। কারণ সবাই ধরে নেবে লেবানন ও ইরানের সঙ্গে হওয়া চুক্তিগুলো কার্যকর হবে না।”

তিনি বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ ট্রাম্পকে আবারও আলোচনার পথে ফিরতে বাধ্য করতে পারে, যাতে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়।

উলম্যান আরও সতর্ক করে বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের পাল্টাপাল্টি হামলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

তার ভাষায়, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তবে আমার ধারণা, তেলের দাম যদি প্রত্যাশামতো বেড়ে যায়, তাহলে সেটিই উভয় পক্ষকে কিছুটা সংযত করতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন।

হরমুজে জাহাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হচ্ছে ইরান
ফাইল ছবি