Saturday, December 21, 2013

হানাহানির রাজনীতির বিরুদ্ধেও শক্তিশালী বার্তা- বিশ্বজিৎ হত্যার বিচারের রায়

বিশ্বজিৎ দাসের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষের নিরাপত্তা বোধের অসহায়ত্বই প্রকট হয়ে উঠেছিল। অবশেষে বিশ্বজিতের হত্যাকারীদের বিচারের রায় ঘোষিত হওয়ায় হত্যার বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয় ঘোষিত হয়েছে।
রায়ে আদালত যথার্থই বলেছেন, ‘এটা (হত্যা) মানবতা ও নৈতিকতার কোনো স্তরেই পড়ে না। নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি ও অহেতুক রক্তপাত সমর্থনযোগ্য নয়।’ বাংলাদেশে জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে হানাহানির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একে বার্তা হিসেবেও পাঠ করা যায়।
হত্যা মামালার রায় শুনতে আদালতে বিশ্বজিতের সহোদর । ছবি-শাহীন কাওসার, মানবজমিন।
এই রায়ের মাধ্যমে আসামিরা শাস্তি পেয়েছেন, বিশ্বজিতের পরিবার ও ন্যায়প্রত্যাশী দেশবাসী সান্ত্বনা পেয়েছে। বিশ্বজিতের মা গ্রেপ্তার না হওয়া আসামিদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানিয়েছেন। আসামিপক্ষ নিশ্চিতভাবে উচ্চ আদালতে আপিল করবে। ইতিমধ্যে আদালত প্রাঙ্গণেই আসামিদের কেউ কেউ ‘কিছু হইব না’ বলে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছেন। তবে কি এখনো তাঁরা কারও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া পাচ্ছেন? পাশাপাশি এ কথাও আসবে, বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ডের সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা কেন ছাড় পাবে?
আপিল নিষ্পত্তির পর আসবে রায় কার্যকর করার প্রশ্ন। তার আগে অন্তত এটুকু বলা যায়, এই রায় রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধেও শক্ত হুঁশিয়ারি। এর আলোকে নারায়ণগঞ্জের কিশোর ত্বকীসহ সব হত্যাকাণ্ডের আশু বিচারও প্রত্যাশিত। বিচারাধীন এবং বিচারের প্রক্রিয়া থেকে দায়মুক্তি পাওয়া নৃশংস খুনিদেরও অনুরূপভাবে দণ্ডিত হওয়া দরকার। নইলে চুনোপুঁটিদের শাস্তি হয়, রাঘববোয়ালেরা রেহাই পান; এমন ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে।
একটি খুনের মামলায় আটজনের ফাঁসি ও ১৩ জনের যাবজ্জীবন দণ্ড আলোড়ন সৃষ্টিকারী দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে সরকার-সমর্থিত ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় বিচার হওয়া ইতিবাচক ঘটনা। তবে অন্য সব হত্যা মামলার তদন্ত ও বিচারের বেলায়ও সরকার একই রকম সহায়ক থাকে, তবেই বলা যাবে সরকার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জীবনের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
আদালত তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, বিশ্বজিতের খুনিরা খুনি হয়ে জন্মাননি। এই সমাজ ও রাজনীতি তাঁদের তৈরি করেছে। তাঁরা সহিংস রাজনীতিরও হাতিয়ার। হাতিয়ারের বিচার হলেও, তাঁদের ব্যবহারকারী হাতের বিচার না হওয়া পর্যন্ত হত্যার রাজনীতি বন্ধের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করি।

জামায়াতের কাছে বিএনপির আত্মসমর্পণ?

কাদের মোল্লার ফাঁসির পর রাস্তায়
গাড়ি পোড়ায় জামায়াত-শিবির
জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি হয় গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টা এক মিনিটে। কিন্তু আগের দিন থেকেই জামায়াত-শিবির তাণ্ডব চালাতে থাকে। পরদিন শুক্রবার বিরোধী জোট বা দলের কর্মসূচি ছিল না। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রলয় ঘটে যায়। গণমাধ্যম সাক্ষ্য দিচ্ছে: ‘গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের তাণ্ডবে কমপক্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগের দুই নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালী, পিরোজপুর ও যশোরে সহিংসতায় তিনজন মারা গেছেন। এ ছাড়া গতকাল রাতে খুলনা মহানগরের নিরালা পুলিশ ফাঁড়িতে শিবিরের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক আখ ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। ‘রাজধানীর মতিঝিলে এজিবি কলোনি ও মালিবাগ চৌধুরীপাড়া এলাকায় গতকাল শুক্রবার ব্যাপক তাণ্ডব চালিয়েছেন জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। আকস্মিক হামলা চালিয়ে তাঁরা প্রাইভেট কার, বাস, কাভার্ড ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ ১৫টি যানবাহন ও ২০টি ফুটপাতের দোকান পুড়িয়ে দিয়েছেন। (ইত্তেফাক, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩) ‘কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াত-শিবিরের লোকজন তাঁর (সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নুর আলম) বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি কোনোমতে প্রাণ বাঁচান।’ (প্রথম আলো, ১৮ ডিসেম্বর) তবে নির্দলীয় সরকারের দাবির সঙ্গে এসব ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি এক নয়।
বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। আর জামায়াতে ইসলামী ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলে। জামায়াতি হুকুমত কায়েম হলে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির অস্তিত্ব থাকে না। আবার বিএনপি যে উদার গণতন্ত্রের কথা বলে, সেটি চালু হলে মৌলবাদী জামায়াতের ঠাঁই হওয়ার কথা নয়। ধর্মতন্ত্র ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলে না। কিন্তু বাংলাদেশের নিয়তি হলো, ২০১৩ সাল বিএনপি ও জামায়াতকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিএনপির নেতাদের দাবি, তাঁরা আন্দোলন করছেন নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির যে আন্দোলন করছে, তার প্রতি তাঁদের সমর্থন নেই। কিন্তু বাস্তবে একে অপরের পরিপূরক হয়ে গেছে। দুটি রাজনৈতিক দল তখনই অভিন্ন রণকৌশল নেয়, যখন তাদের উদ্দেশ্য এক হয়। কিন্তু এ মুহূর্তে বিএনপি ও জামায়াতের উদ্দেশ্য এক নয়। জামায়াতের উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধাপরাধের বিচারে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত নেতাদের রক্ষা করা। এ জন্য তারা দেশব্যাপী সহিংসতা চালাচ্ছে, গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ মারছে, রেলের ফিশপ্লেট তুলে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে। এসব ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান কী?
তারা কি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে, নাকি বিপক্ষে? নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির সামনে দুটি পথ খোলা ছিল—সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যতটা সম্ভব দাবি আদায় করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অথবা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করা। বিএনপি প্রথমটি গ্রহণ করেনি এই ভীতি থেকে যে, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে সরকার ফল উল্টে দেবে। দলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে নমনীয় হলেও ‘শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়’ নীতিতে অবিচল থাকেন খালেদা জিয়া। ফলে বিএনপির সামনে দ্বিতীয় পথ খোলা থাকে। অর্থাৎ আন্দোলনের মাধ্যমে নির্দলীয় সরকারের দাবি প্রতিষ্ঠা করা। যেমনটি আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে করেছিল। সে সময় আওয়ামী লীগ সব দল থেকে বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছিল। এবার বিএনপি পারেনি জামায়াতের কারণে। ডা. বি চৌধুরী, অলি আহমদ, কাদের সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব প্রমুখ নির্দলীয় সরকারের দাবির প্রতি শতভাগ একমত থাকলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে যাননি জামায়াতের কারণে। বিএনপির নেতৃত্ব পুরোনো সুহূদদের চেয়ে জামায়াতের প্রতিই বেশি ভরসা রাখে। কেননা সরকারকে মোকাবিলা করার মতো তাদের কর্মী-ক্যাডার নেই, কিন্তু জামায়াতের আছে। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশকে কেন্দ্র করে প্রথম জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা রাজধানীতে বড় ধরনের ভাঙচুর ও সহিংসতা ঘটায়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকলেও ‘প্রবাসী নেতৃত্ব’ সবই জানতেন। গত ফেব্রুয়ারিতে কাদের মোল্লার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হয়। এরপর জামায়াত-শিবির আন্দোলনের নামে বিভিন্ন স্থানে নাশকতা, সরকারি স্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর চোরাগোপ্তা হামলা চালায়। সাঈদীর রায়ের পর সেই হিংসা ও নাশকতা ব্যাপক আকার নেয়।
চাঁদে সাঈদীর ছবি দেখার গুজব তুলে সারা দেশে তারা তাণ্ডব চালায়। এরপর বিএনপির নির্দলীয় সরকারের আন্দোলন এবং জামায়াত-শিবিরের যুদ্ধাপরাধের বিচারবিরোধী তৎপরতা কখনো সমান্তরাল, কখনো একে অপরের পরিপূরক হিসেবে চলতে থাকে। জামায়াত-শিবির ভালো করেই জানে, পেছনে বিএনপি না থাকলে মাঠে টিকে থাকা সম্ভব নয়। আবার বিএনপির নেতৃত্বও মনে করেন, জামায়াত-শিবিরের সমর্থন ছাড়া রাজপথ দখলে রাখা যাবে না। এই অবস্থায় নির্বাচনী রাজনীতি পেছনে ফেলে যুদ্ধাপরাধের বিচারবিরোধী রাজনীতি সামনে চলে আসে। বিএনপির নেতৃত্বও ‘কম পরিশ্রমে বেশি ফসল’ ঘরে তোলার কৌশল নেন; যা এখন বুমেরাং হয়ে পড়েছে। বিএনপির রাজনৈতিক সমর্থনের জোরে জামায়াত-শিবির চোরাগোপ্তা হামলা ও সন্ত্রাসী তৎপরতার মাধ্যমে সরকারি প্রশাসন, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সন্ত্রস্ত করে রাখে। গত এক মাসের আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ১৮ দলের নামে কর্মসূচি দেয় বিএনপি, পালন করে মূলত জামায়াত-শিবির। ঢাকাসহ সারা দেশে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরাই মিছিল-সমাবেশ-বৃক্ষনিধন ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এমনকি নোয়াখালী, বগুড়া, রাজশাহীর মতো স্থানে যেখানে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী, সেখানেও মিছিল-সমাবেশ হয় জামায়াতের নেতৃত্বে।
কাদের মোল্লার ফাঁসির আগে ও পরে সারা দেশে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ ও মানুষ হত্যার মাধ্যমে আন্দোলনকে পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ তো বটেই, দলটির উদারপন্থী নেতারা জামায়াত-শিবিরের কাছে এই আত্মসমর্পণ মেনে নিতে পারেননি। প্রকাশ্য ফোরামে না হলেও ব্যক্তিগত আলাপে তাঁরা ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। কাদের মোল্লার ফাঁসির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত বলেও মনে করেন বিএনপির এই অংশের নেতারা। তাঁদের কথা হলো, আমরা এমন একজন ব্যক্তির জন্য কেন বদনাম নেব, যাঁকে পাকিস্তান তাদের আদর্শিক নেতা বলে দাবি করে। বিএনপিতে এখনো অনেক নেতা-কর্মী আছেন, যাঁরা নির্দলীয় রাজপথে জামায়াতের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়াকে মানতে পারছেন না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, নির্দলীয় সরকারের আন্দোলনে জনগণের সমর্থন পেতে হলে জামায়াতের সঙ্গে বর্তমানে যে গাঁটছড়া রয়েছে, সেটির অবসান হওয়া প্রয়োজন। উচ্চ আদালতের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। তাই, বিএনপির ঘাড়ে বন্দুক রেখে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য আন্দোলনের নামে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে তারা। এর দায় কেন বিএনপি নেবে? হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে সরকারবিরোধী অনেকেই খুশি হবেন। তবে এটিও সত্য যে, এতে বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ না করার জন্য সরকারের প্রতি যেমন আহ্বান জানানো হয়েছে, তেমনি আন্দোলনকারীদের প্রতিও সহিংসতা পরিহার করতে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এশিয়াবিষয়ক পরিচালক অ্যাডামস বলেছেন, ‘জামায়াতের সমর্থকেরা পুলিশ ফাঁড়ি,
সরকারি ভবন, সরকারি দলের সমর্থক এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধী দলগুলোর হয়তো বিক্ষোভ করার সংগত কারণ আছে। কিন্তু তাদের সমর্থকেরা যে ধরনের ভয়ংকর সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছে, এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না।’ প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৬ নভেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ দিনে নিহত হয়েছেন ১০৫ জন। এর মধ্যে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ১৮ দলের হরতাল-অবরোধে মারা গেছেন ৭৫ জন এবং কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা নিয়ে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩০ জন। টানা অবরোধ ও হরতালের মধ্যে কাদের মোল্লার ফাঁসির খবর প্রচারিত হওয়ার পর (যদিও ওই দিন ফাঁসি হয়নি) মঙ্গলবার রাত থেকে ঢাকার বাইরে তাণ্ডব শুরু করে জামায়াত-শিবির। বিচারপতির বাড়ি, সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, রেললাইন, আওয়ামী লীগের কার্যালয়, নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর—কোনো কিছুই তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি। বিএনপির নেতৃত্ব কি জামায়াত-শিবিরের এই হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞও নির্দলীয় সরকারের আন্দোলনের অংশ বলে মনে করেন? যদি না করেন, তাহলে এখনই তাদের পরিষ্কার করে বলতে হবে। পরিষ্কার করতে হবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রস্তাব সম্পর্কেও তাদের অবস্থান। পথ হারাবে না বাংলাদেশ দেশের দুঃসময়ে রাজনীতিকেরাই যে পথ দেখাতে পারেন, তার ইঙ্গিত পাওয়া গেল গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতাদের কণ্ঠে।
সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাবে দুই দলের নেতারা বৃহস্পতিবার একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা শান্তির লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করবেন এবং উপজেলায় কাউকে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা করতে দেবেন না। তাঁরা তাঁদের নিজ নিজ কর্মসূচি পালন করবেন, কেউ বাধা দেবেন না। তাঁরা বলেন, উপজেলার রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বহুকাল ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেও সম্প্রতি মহলবিশেষের উসকানিতে তা ব্যাহত হয়। তাঁরাও এটিও স্বীকার করেন যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; স্বার্থান্বেষী মহল এই বিরোধ তৈরি করে রেখেছে এবং সবাইকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। তবে এই শান্তি সমাবেশে সাদুল্যাপুরের আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন নেতারা উপস্থিত থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর কাউকে ডাকা হয়নি। উল্লেখ্য, ১৩ ডিসেম্বর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার খানের ওপর জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা হামলা চালালে তিনি গুরুতর আহত হন। এর কয়েক দিন পর আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা বিএনপির নেতা মইনুল হাসান সাদিকের বাড়িতে আগুন দেন। এ রকম আগুনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্যই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা শান্তি বৈঠক করেছেন। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে এ রকম একটি শান্তি বৈঠক কি হতে পারে না?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

জিতবে আওয়ামী লীগ, হারবে দেশ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টাকে ‘পর্যায়ক্রমিক অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করেছেন একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক। প্রধান বিরোধী দল ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করতে যাচ্ছে। কাজেই শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত। এখানে বৈধতার প্রশ্নটি অন্য। ভোট নিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত শতাধিক লোক নিহত হয়েছে। ১২ ডিসেম্বর ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর করার পর সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের রক্তাক্ত পরাজয়ের সময় যুদ্ধাপরাধের দায়ে তিনি একটি ত্রুটিপূর্ণ ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত হন। যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। কিন্তু আরও রক্ত না ঝরিয়ে সংঘাতপূর্ণ জন্ম বাংলাদেশ মেনে নেবে বলে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা বিলীন হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার অজনপ্রিয় সরকার দেশের বেশির ভাগ অংশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)
রাজপথে তার রাজনীতি পরিচালনা করছে। একের পর এক হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি দিয়ে তারা পরিবহনব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। তাদের দোসর জামায়াত নিছক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়ছে। তাদের গুন্ডা-মাস্তান, যারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শাস্তি দিতে গিয়ে রগ কাটে বলে কুখ্যাতি রয়েছে, তারা এখন সরাসরি হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। গুলি ছুড়ে এর পাল্টা জবাব দিচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। ১৬ ডিসেম্বর তারা জামায়াতের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত ভারতের সীমান্তসংলগ্ন সাতক্ষীরা জেলায় পাঁচজন জামায়াত-সমর্থককে হত্যা করে। উত্তরাঞ্চলে জামায়াতের তরুণ কর্মীরা হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও দোকানপাট পুড়িয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা রাজধানী ঢাকার আশপাশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, দণ্ডিত সব জামায়াত নেতার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর হওয়া দেখতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতার বিষয়ে আস্থা রয়েছে সামান্যই। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা শেখ হাসিনাকে এসব দণ্ডাদেশ কার্যকর না করতে বলেছিলেন। কিন্তু আপস করা তাঁর রীতি নয়। পাঁচ বছর আগে শেখ হাসিনা বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেন।
২০১১ সালে একটি অনুচ্ছেদ বাতিল করে সংবিধান সংশোধন করা হয়। নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার এই অনুচ্ছেদ সংবিধানভুক্ত হয় ১৯৯৬ সালে। দুটি বড় দলের পারস্পরিক অবিশ্বাসের দীর্ঘ জের ধরে এর বিলুপ্তি ঘটে। এই সংশোধনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা যে স্বেচ্ছায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হতে চেয়েছেন, তা নয়। তবে ওই সংশোধনীর পরিণামে হয়তো এটাই হতে যাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের পক্ষ-বিপক্ষের বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখছেন। এখানে সবচেয়ে বড় বেকায়দার বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচন হবে সুস্পষ্ট একটা প্রহসন। ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৫৪ জন নির্বাচিত হবেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বিএনপি ও তাদের মিত্র ১৭টি ছোট দল নির্বাচন বর্জন করছে। এই বর্জনে তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি যোগ দেওয়ায় দলের নেতা সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে হাসপাতালে আটক রাখা হয়েছে এবং তাঁকে নির্বাসনে পাঠানো হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। পরবর্তী বড় দল জামায়াত ধর্মকে পুঁজি করে প্রকাশ্যে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, এই কারণ দেখিয়ে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে আওয়ামী লীগ অন্তত জয়ী হচ্ছে। ৫ জানুয়ারি যা-ই ঘটুক না কেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার শপথ নেওয়ার মতো যথেষ্ট সাংসদ সংসদে থাকবেন। দেশে-বিদেশে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। নির্বাচনের দিক পরিবর্তনে বিদেশি শক্তি হিসেবে বাংলাদেশকে কেবল প্রভাবিত করতে পারে প্রতিবেশী দেশ ভারত। কিন্তু হস্তক্ষেপ করছে না তারা। ভারত যদি ‘ফল নির্ধারণপূর্বক আয়োজিত নির্বাচনের’
(রাষ্ট্রপতি এরশাদ আশির দশকে এ ধরনের নির্বাচনের প্রচলন করেন) প্রতি পরোক্ষ সমর্থনও দেয়, তবে তা দেশটির জন্য অদূরদর্শিতা বলে গণ্য হবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব ফেঁপে উঠেছে। সংঘাতময় পরিস্থিতি যত খারাপ হচ্ছে, ভারতের মিত্র আওয়ামী লীগকে ইসলামবিরোধী হিসেবে দেখানোর আশঙ্কাও তত বাড়ছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতা কুক্ষিগত করাকে সমর্থন করলে তা ভারতের জন্য উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। তা হবে ‘আরও উগ্র ও দুর্বল ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ’। এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীও আগ বাড়াতে রাজি নয়। গতবার খালেদা জিয়া যখন নির্বাচনের ফল ছিনতাইয়ের ফন্দি করছিলেন, তখন একটি অনির্বাচিত ‘টেকনোক্রেটিক’ প্রশাসন ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে দুই বছর দেশ শাসন করেছিল। এই অভ্যুত্থানের প্রতি বিদেশি ক্ষমতাধর দেশগুলোর মৌন সমর্থন থাকলেও এবার তা করবে না। এতে সংঘাতময় পরিস্থিতি মাসের পর মাস ধরে চলতে পারে। কাজেই যথাযথ নির্বাচন হতে হবে। আওয়ামী লীগের কিছু রাজনীতিকও তা স্বীকার করেন। জনমত জরিপ বলছে, মাত্র ৩০ শতাংশ বাংলাদেশি চায়, জেনারেলরা ক্ষমতায় আসুন। তা করে তাঁরা যদি সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজনও করেন, তবু মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ‘যুদ্ধংদেহী বেগমদ্বয়ের’ রাজনীতি থেকে দূরে রাখার পক্ষে। তবে দেশ তাঁরা যত খারাপভাবেই চালান না কেন, মনে হচ্ছে তাঁদের ছাড়া চলবে না।
সূত্র: দি ইকোনমিস্ট, ২০ ডিসেম্বর ২০১৩

জনগণের ইচ্ছাতেই সুপার মেজরিটি?

সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনসভার নির্বাচনে কোনো দল বা জোটের দুই-তৃতীয়াংশ আসন লাভের ঘটনার পর সেসব দেশের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে গত চার দশকে দক্ষিণ এশিয়ার চারটি দেশেই। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ৩৫টি নির্বাচনের ভেতরে যে ১১টিতে বিজয়ী দল বা জোট দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি আসন পেয়েছে, সেখানে নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং তাঁদের আচরণে অগণতান্ত্রিক প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। এর একমাত্র ব্যতিক্রম ভারতে ১৯৮৪ সালে রাজীব গান্ধীর শাসনামলে; শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সেই পদে আসীন হয়েছেন। কিন্তু এই নির্বাচনগুলোর ফলাফল যেহেতু জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন, সেহেতু সুপার মেজরিটিও জনগণের রায়—এই দাবি কেউ কেউ করতে পারেন। কিন্তু এই নির্বাচনগুলোর ফলাফল খতিয়ে দেখলে যে ছবি উঠে আসে, তা এই যুক্তির বিরুদ্ধেই বরং প্রমাণ তৈরি করে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় গত চার দশকে কোনো সুষ্ঠু, অবাধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে কোনো দল ভোটারদের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট পায়নি। আমরা অবশ্যই এই বিবেচনা থেকে বাংলাদেশের ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাদ রেখেছি। কেননা, এই দুই ক্ষেত্রেই ভোটারদের সামনে কার্যকর কোনো বিকল্প ছিল না। ফলে এই সময়ে সংশ্লিষ্ট বিজয়ী দল যে ৬৬ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে, তাতে নির্বাচনে অসদুপায় ব্যবহারের প্রমাণ মেলে, তাদের প্রতি ভোটারদের সমর্থন নয়। বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনকে ব্যতিক্রম বলা যেতে পারে।
তবে এই নির্বাচনেও ভোট জালিয়াতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে। তবু তাকেই আমরা ব্যতিক্রম বলতে পারি, যেখানে ক্ষমতাসীনেরা ১৯৭৩ সালে ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, আসনের দিক থেকে ৯৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল ৪৬ দশমিক ৬২ শতাংশ (আসনের ৭০ দশমিক ৬৭ শতাংশ); ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের পাওয়া ভোট ৫৭ শতাংশ। ভারতে ১৯৭১ সালে কংগ্রেস পায় ৪৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ ভোট (আসনের ৬৭ দশমিক ৯৫); ১৯৮৪ সালে কংগ্রেসের বাক্সে পড়ে ৫০ শতাংশের কম ভোট—৪৯ দশমিক ০১ শতাংশ; পায় আসনের ৭৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। পাকিস্তান পিপলস পার্টি ১৯৭৭ সালে পেয়েছিল ৬০ দশমিক ১ শতাংশ ভোট—কিন্তু আসন পেয়েছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। পাকিস্তান মুসলিম লীগ যখন দুই-তৃতীয়াংশের জোরে দেশ শাসন করেছে, সেই ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে তার পাওয়া ভোটের হার ছিল ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ। শ্রীলঙ্কায় ইউএনপি মাত্র ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটের জোরে ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ আসনের অধিকারী হয়েছিল ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে। এসব তথ্য নিঃসন্দেহে ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’-ব্যবস্থার ভেতরে লুকানো একটা গভীর দুর্বলতার দিকে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে। এই ব্যবস্থায় একটি দল সুপার মেজরিটির দাবি করতে পারে এবং সেভাবে দেশ শাসন করতে পারে, যখন দেশের ভোটাররা তাঁদের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এমন কোনো ম্যান্ডেট দেয়নি। শুধু তা-ই নয়, এসব উদাহরণ থেকে আমরা আরও একটি উপসংহারে পৌঁছতে পারি। ক্রিস অ্যাডক গুয়াতেমালা, কলম্বিয়া ও আলজেরিয়াবিষয়ক আলোচনায় যে কথাগুলো বলেছেন, তা এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তিনি বলেছেন, ‘কার্যকর নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকার অর্থ এই নয় যে তা নিজে নিজেই প্রকৃত গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা দেয় বা কর্তৃত্ববাদী (বা অথরিটারিয়ান) আচরণ বা কাঠামোর সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়।’ গত চার দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের এ তথ্যও জানাচ্ছে যে চারটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশিবার দুই-তৃতীয়াংশের শাসনের ঘটনা ঘটেছে; সেটা যেমন সেনাশাসকদের বৈধতা প্রদানের জন্য, তাঁদের হাতে নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তেমনি তা ঘটেছে বেসামরিক শাসকদের হাতেও। আর কোনো দেশে এত ঘন ঘন এ ধরনের অবস্থার উদ্ভব হয়নি। শুধু তা-ই নয়, সংসদে এ ধরনের উপর্যুপরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ক্ষমতার প্রয়োগ দেশে সেনাশাসনের পথ সুগম করেছে, যার পরিণতি দেশটির জন্য ভালো হয়নি। ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্ক হলো, ১৯ মাসের জরুরি অবস্থা এবং তার আওতায় যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে আসন্ন দশম সংসদ নির্বাচনে যখন একটি দলের ও তার শরিকদের সব আসনে বিজয়ী হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং ‘নির্বাচনী’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তা হতে চলেছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ার গত চার দশকের ইতিহাস স্মরণ করা জরুরি। বাংলাদেশে গত দুই সংসদে ক্ষমতাসীনেরা সুপার মেজরিটির কারণে যে অবস্থার তৈরি হয়েছে, তার পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে দেশের মানুষকে, এখনো তারা তার পরিণাম ভোগ করছে। দুর্নীতি, অস্থিতিশীল রাজনীতি, আইনের শাসনের অভাব ও ক্ষমতাসীনদের আচরণ দেশের ভবিষ্যৎকে বিভিন্নভাবে বিপন্ন করেছে। অন্যান্য দেশে যেমন এই ধরনের শাসনের ফলে সৃষ্ট সমস্যাদি পরবর্তী সময়ে মোকাবিলা করা গেছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার সুযোগ পর্যন্ত সৃষ্টি হয়নি। সে কারণেই এ আলোচনা যেমন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ দেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা বিবেচনার ক্ষেত্রে। একে এড়ানোর কোনো উপায় নেই।

এটা কি লোকসভা নির্বাচনের পূর্বাভাস? by শরীফ হাসান

নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে গত ৪ ডিসেম্বর শেষ হয় ভারতের দিল্লি, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, মিজোরাম ও মধ্যপ্রদেশের বিধানসভার নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৪ সালের এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠেয় লোকসভার নির্বাচনের আগে এসব রাজ্যের নির্বাচন ছিল সেমিফাইনাল পর্ব। যার চারটিতে হেরেছে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান দল কংগ্রেস। দীর্ঘ ১৫ বছর পর দিল্লি হাতছাড়া হয়েছে কংগ্রেসের। তবে দিল্লিতে এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। বেশি আসন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পেলেও সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা পায়নি। এর কারণ, চমক দেখিয়েছে আনকোরা দল আম আদমি পার্টি (এএপি)। এখন তারা বলছে, সরকার গঠন করবে না এবং সরকার গঠনে কাউকে সমর্থনও দেবে না। এ অবস্থায় দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন অবধারিত হয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকার গঠিত না হলে লেফটেন্যান্ট গভর্নর নাজিব জং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সুপারিশ করেন। আর আগামী মে মাসে লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গে আবার দিল্লি বিধানসভার ভোট হবে। যা হোক, দিল্লি এখন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনায় থাকলেও ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা কংগ্রেসের ভরাডুবি। দিল্লি ও রাজস্থানের বিধানসভা ছিল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে। এ দুটিতে চরমভাবে হেরেছে তারা। অন্যদিকে ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশে আগে থেকেই ক্ষমতায় থাকা বিজেপি বিজয়ী হয়েছে। মিজোরামে জিতেছে কংগ্রেস। তবে জাতীয় রাজনীতিতে রাজ্য হিসেবে মিজোরামের প্রভাব তেমন নেই।
কংগ্রেসের এই ভরাডুবির কারণ অনুসন্ধানে নেমেছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। সামনে আসছে দুর্নীতি, সম্পদের অসামঞ্জস্যতা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, দলীয় কোন্দল ও নারীর নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা ইস্যু। তবে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্নীতি। এ ছাড়া বড় উদাহরণ তো দিল্লিতে ‘জায়ান্ট কিলার’ এএপি’র উত্থান। গান্ধীবাদী আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকেই এ পার্টির উত্থান। এতদিন দিল্লিতে বিজেপি আর কংগ্রেসের মধ্যে মুখোমুখি লড়াই হয়ে এসেছে। ভোটাররা এই দুটি দলের বাইরে অন্য কারও দিকে কখনও সমর্থন দেয়নি। কিন্তু এবার ফল ও পরিস্থিতি দুটিই সম্পূর্ণ ভিন্ন। একেবারে আনকোরা দল এএপিকে জনতা ভোট দিয়েছে। এখন স্পষ্ট হয়েছে, গত বছর দিল্লিতে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে কেন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ সংহতি জানিয়েছিল। ভারতীয়রা আসলে দুর্নীতিকে আর প্রশ্রয় দিতে চাইছে না। আর এ অবস্থার সুযোগ ভালোভাবেই নিয়েছেন হাজারের ভাবশিষ্য অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
বস্তুত কেজরিওয়ালের উত্থান ও কংগ্রেস-বিজেপির হোঁচট খাওয়া ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন হাওয়ার স্পষ্ট আভাস ছাড়া আর কিছু নয়। বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোটা দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারের কারণে কফিনে ঢুকতে বসেছিল। বলা হচ্ছে, কেজরিওয়াল কফিনে পেরেক ঠোকা ঠেকিয়েছেন। আম আদমি পার্টির উত্থান থেকে ভারতের বাকি দলগুলো যদি শিক্ষা নেয়, তবে কফিন থেকে বেরোতে পারে ভারতীয় গণতন্ত্র। কিন্তু ব্যর্থ হলে সব বরবাদ হবে।
প্রকৌশলী থেকে কর কর্মকর্তা বনে যাওয়া অরবিন্দ কেজরিওয়াল চাকরি ছেড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছিলেন অনেক আগেই। তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নের দাবিতে লড়েছেন তিনি ও তার সাথীরা। সফল হয়েছেন। পরে আন্না হাজারের সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে নামলেন। কিন্তু জনগণের সঙ্গে থাকতে থাকতে অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তার বন্ধুরা বুঝতে পারেন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে জয় প্রায় অসম্ভব।
আন্না গররাজি হলেও রাজনৈতিক মঞ্চ দাঁড় করান কেজরিওয়াল। ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বরে আম আদমি পার্টি গঠন করেন। শুরু করেন আন্দোলন-সংগ্রাম। একসময় আম আদমি পার্টির আন্দোলন-বিক্ষোভেই মূর্ত হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ-আক্ষেপ। ফলে বাড়তে থাকে জনসমর্থন।
কেজরিওয়াল প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগ দেয়ায় সবচেয়ে খুশি হয়েছিল কংগ্রেস, বিজেপি ও অন্য দলগুলো। তারা ভেবেছিল, আপদ বিদায় হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদান বা কোনো আদর্শের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ না থাকা এসব দলের রাজনীতিকরা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি, আম আদমি এভাবে তাদের নাকে ঝামা ঘসে দেবে।
অনেক বিশ্লেষকের অভিমত, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা (ইউপিএ) টানা দুই মেয়াদে ভারতের শাসনক্ষমতায় রয়েছে। এ সময় সরকারের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ভালোই বিপাকে পড়ে কংগ্রেস। এর মধ্যে রয়েছে কমনওয়েলথ গেমস, থ্রিজির লাইসেন্স বরাদ্দ ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে কয়লার খনি বরাদ্দে দুর্নীতি। এর সঙ্গে ছিল সুশাসনের অভাব। এসব বিষয় সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেস। বিধানসভা নির্বাচনে হয়তো তারই ফল পেয়েছে দলটি।
কংগ্রেসের এই নাজুক পরিস্থিতিতে দেশটির ১১ সংসদ সদস্যের ঘুষ গ্রহণের দৃশ্য ফাঁস হয়েছে। এ সংসদ সদস্যদের ঘুষ চাওয়া এবং ঘুষ গ্রহণের দৃশ্য ধারণ করে তা ফাঁস করে দিয়েছে দেশটির সংবাদভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল কোবরা পোস্ট। যদিও এর মধ্যে কংগ্রেসের এমপি ছাড়াও বিজেপি, এআইএডিএমকে, সংযুক্ত জনতা দল ও বহুজন সমাজ পার্টির নেতাও রয়েছেন। এ ঘটনা কংগ্রেসসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে। এদিকে হঠাৎ করেই কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যসভায় দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল বিল পেশ করেছে। হট্টগোলের মধ্যে এ বিল পেশ হলেও সমাজবাদী পার্টি ও বিজেপির আপত্তির কারণে শেষ পর্যন্ত তা অনুমোদন পায়। এমনকি নিুকক্ষ লোকসভাতেও বিলটি পাস হয়। মহারাষ্ট্রে নিজের গ্রামে আন্না হাজারে নতুন করে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশনে বসায় কংগ্রেস তড়িঘড়ি লোকপাল বিল পেশে আগ্রহী হয়েছে।
অনেকেই বলছেন, গত দুই বছরে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তি বিশেষ করে কংগ্রেসের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। চার রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের পর তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে কংগ্রেস। সে কারণেই তড়িঘড়ি করে এ বিল পার্লামেন্টে উত্থাপন করেছে কংগ্রেস। তবে এখন দেখার বিষয় হল আগামী পাঁচ মাসে দুর্নীতি দমনে কতটুকু সফল হতে পারে তারা। কতটুকু ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে পারে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য।
দিল্লির মতোই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনও কংগ্রেস আর বিজেপির দ্বিমুখী ডুয়েল হবে না। নরেন্দ্র মোদি নাকি রাহুল গান্ধী- লোকসভা নির্বাচন শুধু এ প্রশ্নের ফয়সালা করার জন্যই অনুষ্ঠিত হবে না। বরং অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে তৃতীয় শক্তিগুলো, বিভিন্ন আঞ্চলিক দল। কংগ্রেসবিরোধী হাওয়া নিঃসন্দেহে বইছে, কিন্তু সেটা শুধু বিজেপির পালেই লাগবে না। বরং নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে ফের উগ্র হিন্দুত্ববাদের জমানায় ফেরত গিয়

দশম সংসদ নির্বাচনের একটি ব্যঙ্গাত্মক ব্যবচ্ছেদ by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক আচারের মধ্যে নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একমাত্র নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বৈধভাবে সরকার পরিবর্তিত হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বেছে নেয় তাদের পছন্দনীয় সরকার। নিজেদের চাহিদার সঙ্গে প্রতিযোগী দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার মিলিয়ে ভোটাররা পছন্দনীয় দলকে ভোট দিয়ে সরকার গঠনে সহায়তা করেন। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের দেশগুলোতে একইভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না। পাশ্চাত্যের তুলনায় প্রাচ্যের দেশগুলোতে ভোটাররা নির্বাচনে অধিকতর নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হন। তারা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যদিয়ে উৎসবীয় আমেজে নির্বাচনে অংশ নেন। নির্বাচনে প্রতিযোগিতা হয় প্রতিন্দ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে। তবে নির্বাচিত সরকারের চরিত্রে কখনও কখনও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা দেখা দিলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় ছন্দপতন ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দল অগণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করে যে কোনো উপায়ে নির্বাচন জেতার পরিকল্পনা করে। এর ফলে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বিঘিœত হয় নির্বাচনী পরিবেশ। অনেক দেশে এ কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থার সুযোগে অরাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এলে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা পিছিয়ে যায়। বাংলাদেশে ২০০৬-০৭ সালে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে মতভেদজনিত দ্বন্দ্ব-সংঘাতে অরাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এসে দুই বছর দেশ পরিচালনা করেছিল। ওই তিক্ত অভিজ্ঞতার সাত বছর পর আবারও একই কারণে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। আবারও আশংকা দেখা দিয়েছে প্রার্থীহীন একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে দেশকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতায় নিয়ে যাওয়ার। একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্যদিয়ে সরকার গঠিত না হলে এ দেশে আবারও স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র পিছিয়ে যাবে। এ প্রবন্ধে সংক্ষেপে একদলীয় নির্বাচনের ভালোমন্দ উপস্থাপন করা হবে।
এক. বিরোধীদলীয় জোটসহ আরও কিছু দলের প্রবল বিরোধিতার মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারবে কিনা সে সম্পর্কে নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশবাসী সন্দেহ এবং চরম টেনশনের মধ্যে রয়েছেন। এ কারণে এখন ওষুধ কোম্পানিগুলো উত্তেজনা প্রশমন এবং উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের উৎপাদন বাড়িয়ে দিতে পারে। এখন থেকে নির্বাচন এবং নির্বাচন পরবর্তী অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশে এ রকম ওষুধের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এ রকম ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর এ ধরনের ওষুধের বিক্রয় বৃদ্ধির মধ্যদিয়ে ভালো ব্যবসা হবে।
দুই. প্রহসনের এ নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশন যে ৬০০ কোটি টাকা পেয়েছে তার অর্ধেকেরও বেশি সাশ্রয় হবে। কারণ, ১৫৪ আসনে নির্বাচন না হওয়ায় ওইসব আসনে একদিকে যেমন নির্বাচনী মালামাল পাঠাতে হবে না, তেমনি নিয়োগ দিতে হবে না নির্বাচনী কর্মকর্তা। আবার, ৩০০ আসনে নির্বাচন করতে যতসংখ্যক আইনশৃংখলা বাহিনী ও সেনা সদস্য নিয়োগ করতে হতো এখন তার অর্ধেকেরও কম নিয়োগ করতে হওয়ায় এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় কমবে। তবে নির্বাচনী মালামাল প্রেরণ এবং ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা রক্ষায় বাড়তি ব্যয় বৃদ্ধি ঘটবে।
তিন. সংঘর্ষপূর্ণ এ নির্বাচন ঘিরে এরই মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর ব্যবসা জমে উঠেছে। আহত-নিহতের সংখ্যাবৃদ্ধি ও বার্ন ইউনিটে প্রচুর রোগী সমাগমের মধ্যদিয়ে হাসপাতালগুলো চুটিয়ে ব্যবসা করছে। আগামীতে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়া, নিবাচনী মালামাল প্রেরণ ইত্যাদির কারণে আরও অবরোধ ও অসহযোগকেন্দ্রিক সংঘর্ষ হলে যেসব আসনে নিবাচন হবে ওই নির্বাচনী এলাকার কাছের হাসপাতালগুলোর ভালো ব্যবসা হবে। কারণ, সরকারি দল একতরফাভাবে নির্বাচন করতে গেলে নির্বাচন বয়কটকারী ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা ওই নির্বাচন প্রতিহত করতে নামলে হাসপাতালে রোগীর সমাগম বাড়বে।
চার. এ নির্বাচনকে ঘিরে বিভাগীয় ও জেলা সদরের প্রেস ব্যবসায়ীদের মন খারাপ। পাঁচ বছর পর এরা নির্বাচনী মৌসুমে প্রার্থীদের নির্বাচনী পোস্টার, লিফলেট ইত্যাদি ছেপে যে পরিমাণ উপার্জন করেন, এবার সে উপার্জন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। কারণ, অর্ধেক আসনে তো নির্বাচনই হবে না। পাঁচ জেলার (শরীয়তপুর, চাঁদপুর, জয়পুরহাট, রাজবাড়ী, মাদারীপুর) প্রেস ব্যবসায়ীদের ভীষণ মন খারাপ। কারণ, ওই জেলাগুলোর সব আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্ব^ন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় কোনো নির্বাচনী ব্যবসা হবে না। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতরা কোনো শোডাউন বা বিজয় মিছিল করলে সেগুলোকে কেন্দ্র করে সংঘাত হলে জেলার হাসপাতালগুলোর কিছু ব্যবসা হতে পারে।
পাঁচ. এ নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদকে ঘিরে যে নাটক রচিত হয়েছে, তাতে জাতীয় পার্টি সমর্থনকারী তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অসুস্থ হলে ভুল করে অ্যাম্বুলেন্স না ডেকে র‌্যাবকে ফোন করতে পারেন। এ বিভ্রান্তি থেকে জনগণকে বাঁচাতে যদি সরকার কিছু না করে, তাহলে বেসরকারি এনজিওদের জনগণকে এ মর্মে উদ্বুদ্ধ করতে হবে যে, অসুস্থ হলে তাদের র‌্যাবের পরিবর্তে হাসপাতালে ফোন করতে হবে এবং বেশি অসুস্থ হলে র‌্যাবের গাড়ির পরিবর্তে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে না গেলে অসুস্থ অবস্থায় তারা বিপদে পড়তে পারেন। এরশাদ সাহেব র‌্যাবের গাড়িতে কেন হাসপাতালে গেলেন সে সম্পর্কেও সরকারকে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে হবে।
ছয়. পাঁচ বছর পর একবার সংসদ নির্বাচন এলে গরিব-দুঃখী ও মেহনতি মানুষের কদর বৃদ্ধি পায়। বস্তিবাসী গরিবজন এ উপলক্ষে ভোটপ্রার্থীদের কাছ থেকে গোপনে কিছু উপার্জনও করতে পারেন। কিন্তু এবার সে আশায় গুড়ে বালি পড়েছে। এমনিতেই অর্ধেকের বেশি আসনে নির্বাচন হচ্ছে না, বাকি যে আসনগুলোতে নির্বাচন হবে সেখানে প্রতিযোগিতা না হওয়ায় ভোটপ্রার্থীরা এবার গরিব ভোটারদের দ্বারস্থ হবেন না। ফলে এবার নির্বাচনকেন্দ্রিক শাড়ি, লুঙ্গি, চাদর বা নগদ অর্থ সহায়তা পাওয়া যাবে না মনে করে গরিব-দুঃখী মানুষের খুবই মন খারাপ।
সাত. এ নির্বাচনে প্রিসাইডিং বা পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকে সংশ্লিষ্টরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন। নির্বাচন কেন্দ্রে হামলা হয় কিনা ভেবে এখন থেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকে দোয়াদরুদ পড়তে শুরু করেছেন। যে ১৫৪ আসনে নির্বাচন হবে না, ওইসব কেন্দ্রে যাদের ডিউটি করতে হতো তারা হাফ ছেড়ে বেঁচেছেন। একইভাবে বাকি কেন্দ্রগুলোতে যাদের নির্বাচনী ডিউটি রয়েছে তারা রয়েছেন চরম টেনশনে। অনেকে এখনই ভাবছেন, যেহেতু একদলীয় নির্বাচনে সন্ত্রাস ও বোমাবাজি হলে ভোটার উপস্থিতি খুবই কম হবে, সে ক্ষেত্রে সরকারদলীয় প্রার্থীরা নির্বাচনটিকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে বেশি ভোট কাস্ট দেখাতে চেষ্টা করবেন; আর ওই প্রচেষ্টায় বাধা দিলে সন্ত্রাসের কবলে পড়তে হতে পারে।
আট. এ রকম একদলীয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে কোনো দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষক আসবেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। তবে যদি সরকারি অনুরোধে কোনো স্বদেশী বা বিদেশী পর্যবেক্ষক এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসেন, তাহলে নির্বাচন কমিশন ওই পর্যবেক্ষকদের ভালোভাবে ওরিয়েন্টেশন দেয়ার পর তাদের শারীরিক নিরাপত্তার জন্য লাইভ জ্যাকেট ও হেলমেট সরবরাহের কথা ভাবতে পারে। তাছাড়া ওরিয়েন্টেশনের সময় তাদের বাংলাদেশী সংস্কৃতি, নির্বাচনী নিয়মকানুনসহ প্রাথমিক আÍরক্ষা, ককটেল ও পেট্টলবোমা আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার কলাকৌশল রপ্ত করার প্রশিক্ষণ দিলে ভালো হবে।
নয়. অর্ধেকের বেশি আসনে (১৫৪) নির্বাচন না হওয়ায় বাকি যে ১৪৬ আসনে নির্বাচন হবে সেখানে কমিশন আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক আইন-শৃংখলা বাহিনী ও সেনা সদস্য মোতায়েন করতে পারবে। যদি নির্বাচন বয়কটকারী দলগুলো এ নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে এ বিষয়টি মাথায় রেখে তাদেরও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন করে প্রতিরোধের অংক করে লোকবল বৃদ্ধি করতে হবে। তবে এহেন প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন টানটান উত্তেজনাপূর্ণ নির্বাচনে সাধারণ ভোটাররা নির্বাচন কেন্দ্রে যান কিনা সেটাই দেখার বিষয়।
দশ. নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণার পর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে কমিশনের অমনোযোগ, সরকারি দলের সাজানো প্রশাসনে রদবদল না করা, একজন দলীয় প্রধানকে বাড়ি থেকে র‌্যাবের তুলে নেয়ার পরও ইসির নীরব থাকা এবং মনোনয়নপত্র জমাদান, প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দ প্রক্রিয়াগুলোতে সরকারদলীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যানের প্রভাব বিস্তার ইত্যাদি নিয়ে কমিশনের অনিয়মতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করলে অনুধাবন করা যায় দশম সংসদ নির্বাচন যদি হয়, তাহলে নির্বাচনটি কেমন হবে। এ রকম একটি একদলীয় ও ভোটারবিহীন নির্বাচন করার পর নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি যে কতটা ভূলুণ্ঠিত হবে তা অনুমান করা যায়।
এগার. সরকার এখন পর্যন্ত এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি যে এ নির্বাচনের পর তারা সংসদে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় ব্যবস্থাধীনে সংসদ নির্বাচনের বিধান সংবলিত বিল পাস করে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে অতি দ্রুত আরেকটি নির্বাচন করবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, একটি যাচ্ছেতাই মার্কা নির্বাচনের মাধ্যমে একবার ক্ষমতায় যেতে পারলে সরকার শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পাকাপোক্তভাবে ক্ষমতায় থাকতে চাইবে। সে কারণে বিরোধী দল আপ্রাণ চেষ্টা করবে এ নির্বাচন প্রতিহত করার। তবে যদি প্রতিহত করতে না পারে, তাহলে বিরোধী দল নির্বাচন পরবর্তী অবস্থায় সরকারকে একদিনও স্বস্তিতে থাকতে না দিয়ে প্রথমদিন থেকেই কঠোর সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে নিয়োজিত হবে।
বারো. আলোচ্য নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পড়বে সে অংক বের করতে গভীর গবেষণার প্রয়োজন পড়বে না। কতসংখ্যক ভোটার ভোট কেন্দ্রে যাবেন তার ওপর এ পারসেন্টেজ নির্ভর করবে না; বরং বিষয়টি নির্ভর করবে সরকারি দল কত শতাংশ ভোট কাস্ট দেখাতে চান তার ওপর। কারণ, ‘আমরা আর মামুরা’ মিলে করা এ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্রে যেহেতু বিরোধীদলীয় কোনো এজেন্ট থাকবেন না, ফলাফল পূর্বনির্ধারিত হওয়ায় পর্যবেক্ষণের তেমন কিছু নেই মনে করে হয়তো থাকবেন না পর্যবেক্ষকরাও। এ সুবর্ণ সুযোগে সাজানো প্রশাসনে সরকারি ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটাতে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কাজেই ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে না গেলেও সরকার চাইলে এ নির্বাচনে ৫ থেকে শুরু করে ৮৫ শতাংশ, বা আরও বেশি ভোট কাস্ট দেখাতে পারবেন।
তের. নির্বাচন হওয়ার আগেই লক্ষণ দেখে বিশেষজ্ঞরা এ নির্বাচনকে যেসব বিশেষণে বিশেষিত করছেন তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে নির্বাচনটি হলে যুগপৎ দেশে এবং বিদেশে তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। বিএনপি নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান এ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের ‘গণদুশমন’ ও ‘জাতীয় বেঈমান’ বলে অভিহিত করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এ নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে তুলনা করেছেন ‘সমঝোতার ভিত্তিতে টেন্ডার ভাগাভাগির মতো’ বলে; আরেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী ‘হাস্যকর বিষয়’ বলে এ নির্বাচনকে আখ্যায়িত করেছেন। প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক যখন এ নির্বাচনকে ‘নির্বাচনের নামে তামাশা’ বলেছেন, তখন অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন ‘হাস্যকর ও অরুচিকর’। জাপার কাজী জাফর আহমেদ এ নির্বাচনকে ‘নজিরবিহীন তামাশা’ বললেও বিকল্প ধারার মাহী বি চৌধুরীর ‘শতাব্দীর সেরা কৌতুক’ এবং মানবজমিন পত্রিকার ‘জাতীয় রসিকতা’ বিশেষণদ্বয় আলোচ্য নির্বাচনের বিশেষণ হিসেবে খুবই যথাযথ।
উপরের বিশেষণগুলো বিশ্লেষণের পর দশম সংসদ নির্বাচনের হিসাব-নিকাশ করে বলা যায়, এ রকম একটি নির্বাচন সরকার সাজানো প্রশাসনের সহায়তায় কোনো রকমে করতে পারলেও দেশে শান্তি আসবে না। নির্বাচনটি নিরুত্তাপ, নিষ্ক্রিয়, সহিংস, অগণতান্ত্রিক, দুর্নীতিযুক্ত একটি নিকৃষ্ট নির্বাচনের উদাহরণ হিসেবে গণ্য হবে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যতদিন একটি মুক্ত, গ্রহণযোগ্য, দুর্নীতিমুক্ত ও অবাধ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে না।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নির্বাচনী কূটনীতিতে শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন by মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর

রাজনীতির বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের এনারকিক স্ট্রাকচার, বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং জাতীয়তাবাদী ও স্বার্থান্বেষী চরিত্রের অপরিহার্য ফল হচ্ছে এক রাষ্ট্রের ওপর অপর রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজ স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা। প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে স্বার্থ আদায়ের চেষ্টার কৌশলগুলো গত তিন দশকে বিশেষ করে স্নায়ুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত এসে গড়িয়েছে, যাকে আমরা এখন বলছি নির্বাচনী কূটনীতি। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের জাতীয় নির্বাচনে পছন্দের সরকারকে ক্ষমতায় আনতে নির্বাচনের আগে স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্য রাষ্ট্রগুলোর নানাধর্মী কূটনৈতিক তৎপরতাই নির্বাচনী কূটনীতি। রাজনীতির বিশ্বায়নের ফলে এক দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অস্থিরতার প্রভাব অন্য দেশেও আমরা প্রত্যক্ষ করছি। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতায় রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, সহযোগিতার মনোভাব ও প্রয়োজনীয়তা, প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা, পছন্দের সরকার আনার সুপ্ত বাসনা ইত্যাদি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ নির্বাচনী কূটনীতির অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন, চুক্তি, সনদ, প্রটোকল ইত্যাদির ফলে বিশ্বব্যবস্থার যে রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তাতে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্বার্থপরতা, সহযোগিতা, দ্বন্দ্ব সবই রয়েছে কিন্তু এর প্রক্রিয়ায় একটা শালীনতা ও ভদ্রতার প্রথা গড়ে উঠেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যাকে আমরা বলি কূটনৈতিক শিষ্টাচার। কূটনীতিতে যে কোনো কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বক্তব্য ও কাজ চরমভাবে নিন্দিত হয় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। কূটনীতির অনেক সুনির্দিষ্ট রীতিনীতি রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনভেনশনে অনুমোদন করেছে। কূটনীতির প্রথা ও নিয়মনীতি গড়ে উঠেছে এক রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেক রাষ্ট্রের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। রাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যক্তির নয় কিংবা রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো দলের নয়, শুধুই রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক।
বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা আমরা লক্ষ্য করেছি। শক্তিধর রাষ্ট্র, প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্রসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিনিয়ত বিবৃতি দিচ্ছে ও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। সম্প্রতি পাঁচদিনের সফরে ঢাকা এসেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছিল, বাংলাদেশে কোনো একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তা আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য হবে না- এ বার্তাটিই নিয়ে এসেছিলেন তারানকো এবং আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি সংকট নিরসনে তিনটি ইস্যুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় জাতিসংঘ। একই সঙ্গে সহিংসতামুক্ত শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘ সব দলকে নিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে আগ্রহী। গত ২৫ নভেম্বর দুই নেত্রীকে লেখা চিঠিতে একই মনোভাব জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব। ঢাকার জার্মান রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের ছেড়ে দিয়ে সংকট সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা চলমান রাজনৈতিক সংকটে উদ্বেগ প্রকাশ করে দুই নেত্রীকে দ্রুত সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বলেছেন, তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেননি। পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেবল সেই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে, যে নির্বাচন হবে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। সম্প্রতি কানাডা বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক সংকটজনিত সহিংসতায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানি কানাডার উদ্বেগের প্রধান কারণ। ঢাকায় নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইতিবাচক রাজনৈতিক সংলাপের জন্য রাজনীতিকদের গ্রেফতার কিংবা হরতাল সহায়ক নয়। আগামী নির্বাচন স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ করার ব্যাপারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দলগুলোর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর সুযোগ এখনও রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশে অব্যাহত সহিংসতা এবং নিরপরাধ লোকজনের হতাহতের ঘটনায় কানাডা অসন্তুষ্ট। এছাড়াও দীর্ঘদিন থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
গত ১৬ নভেম্বর শনিবার মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা এসেছিলেন। তিনি সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার পর বলেছিলেন, নির্বাচনী সরকার নিয়ে দু’দল ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারলে তার সমাধানে দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে। সম্প্রতি তিনি আরও একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচনে কে বিজয়ী হল তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো মাথাব্যথা নেই। বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এ নির্বাচনকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য সব রাজনৈতিক দলের সমঝোতাপূর্ণ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। কমনওয়েলথের একটি প্রতিনিধি দলও সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। সাক্ষাৎ শেষে কমনওয়েলথের গণতন্ত্র ও রাজনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা মার্টিন ক্যাস্ত্রি সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর ব্যাপারে তারা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং গত ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং কয়েকজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলাপ করেন বলে জানা যায়। খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার আশাবাদ ব্যক্ত করেন কিন্তু নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা বলেননি বলে জানান খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা শমশের মবিন চৌধুরী। জেনারেল এরশাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এরশাদকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার অনুরোধ করেন এবং এরশাদ নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি তার এ রাষ্ট্রীয় সফরের সর্বশেষ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্তব্যটি করেন। তিনি বলেন, ভারত সর্বোচ্চসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন দেখতে চায়। তিনি প্রকারান্তরে এর দ্বারা বুঝিয়েছেন, কোনো বৃহৎ দল, জোট বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী নির্বাচনে অংশ না নিলেও যদি কোনো একতরফা নির্বাচন হয় তাহলে ভারত তাকে স্বাগত জানাবে।
উল্লিখিত বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যে কূটনৈতিক তৎপরতা আমরা লক্ষ্য করছি, সেগুলো বিশ্লেষণ করলে কূটনৈতিক শিষ্টাচার-অশিষ্টাচার উভয়ই আমাদের চোখে ধরা পড়ে। স্বার্থগত কারণে প্রতিটি রাষ্ট্রের পছন্দের ব্যাপার থাকবে এটি স্বাভাবিক, তবে কূটনীতির ভাষায় ও প্রক্রিয়ায় যেন সেটির প্রকাশ না ঘটে সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইইউ, কানাডা, জাতিসংঘ সবাই সর্বোচ্চ সতর্কতার পরিচয় দিচ্ছে। তারা উদ্বেগ জানিয়েছে বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রকে নিয়ে। জনগণ ও রাষ্ট্র তাদের কাছে মুখ্য। তারা সবাই সবার অংশগ্রহণমূলক একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ওপর জোর দিচ্ছে- যে বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারি দল, বিরোধী দল, সুশীল সমাজ ও জনসাধারণ একমত। সংকট সৃষ্টি হয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার ও তার কাঠামো নিয়ে। সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণের কাক্সিক্ষত। এই গণআকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থা অবস্থান নেয়নি। শ্রদ্ধা দেখাচ্ছে সবাই। কিন্তু ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীসহ পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারকদের বিবৃতিগুলো দীর্ঘদিন থেকে লক্ষ্য করলে আমরা দেখি, তারা ‘সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন’ শব্দগুলো ব্যবহার করছেন না। সুজাতা সিং ব্যবহার করেছেন ‘সর্বোচ্চ সংখ্যক দল’। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনার পংকজ শরণ ‘সব দলের অংশগ্রহণ’ শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলে আসছেন রাজনৈতিক সংকটের শুরু থেকেই। সুজাতা সিং একে নতুন মাত্রা দিলেন। একে নগ্ন কূটনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। উপরন্তু সুজাতা সিং নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা বলেননি বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে, কিন্তু এরশাদকে ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বর্জন না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। সবাই উদ্বেগ জানাচ্ছেন বাংলাদেশকে নিয়ে, কিন্তু ভারত উদ্বেগ প্রকাশ করছে শুধুই ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে। এ ধরনের নগ্ন স্বার্থপরতা কূটনীতির ইতিহাসে বিরল। একটি দেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির পরিবর্তে একটি দলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির এ কূটনীতি চূড়ান্ত বিচারে গণতন্ত্রবিরোধী । কারণ দেশ ও সরকার স্থায়ী, কিন্তু কোনো দল স্থায়ী নয়। আর তাই এ গণতন্ত্রবিরোধিতা কোনো কূটনীতি হতে পারে না- এটি নগ্নতা। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্য কোনো ভালো ফল বয়ে আনবে না, আনতে পারে না।
ভৌগোলিক ও স্বার্থগত কারণেই ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উভয়ের স্বার্থেই সহযোগিতা, সৌহার্দ ও সম্প্রীতি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন উভয়ের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনও। সম্প্রীতির সম্পর্ক তৈরি এবং তা ধরে রাখতে আরও প্রয়োজন কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলা। একই সঙ্গে উভয়ের আÍমর্যাদাবোধের অনুভূতি ও আন্তঃসহযোগিতা বৃদ্ধির চেষ্টাই উভয়ের উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এ ধরনের নগ্ন নির্বাচনী কূটনীতি এবং জনগণকে বাদ দিয়ে একটি দলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির শিষ্টাচার বহির্ভূত কূটনৈতিক তৎপরতা একদিকে যেমন কূটনীতির ইতিহাসকে কলঙ্কিত করছে, তেমনি উভয় দেশের সুস্থ স্বাভাবিক সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।
মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর : সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনটি খারাপ দৃষ্টান্তই তৈরি করবে by তারেক শামসুর রেহমান

আবারও লাগাতার ৮৩ ঘণ্টার অবরোধ আর ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ সংসদ সদস্যের খবর যখন সংবাদপত্রগুলো আমাদের দিচ্ছে, ঠিক তখন মনে পড়ে গেল ২০০৮ সালের একটা লেখার কথা। লেখক ছিলেন ই জে সি দুরু এবং ও ও জর্জ। প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘দ্য প্যারাডক্স অব ডেমোক্রেটাইজেশন ডার্জ’। বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘মৃত গণতন্ত্রের স্মরণগীত’। অন্ত্যেষ্টিকালে যে শোকস্তবক উচ্চারণ করা হয়, তাকে ইংরেজিতে বলে ‘উরৎমব’। এটা পশ্চিমা সমাজের ঐতিহ্য হলেও আমরাও কিন্তু তা অনুসরণ করি। একজন মানুষ মারা গেলে জানাজায় তার সম্পর্কে কিছু ভালো ভালো কথা বলা হয় এবং তার বিগত জীবনের ভুল-ত্র“টির জন্য ক্ষমা চাওয়া হয়। এটা আমাদের মুসলমান সমাজেরও ঐতিহ্য। আফ্রিকার ওই দুই লেখক উল্লিখিত প্রবন্ধে আফ্রিকার গণতন্ত্রের কথা বলতে গিয়ে ওই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। যারা আফ্রিকার রাজনীতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন, বিশেষ করে ২০০৮ সালের দিকে জিম্বাবুয়ে কিংবা কেনিয়ার ঘটনাবলী সম্পর্কে যাদের কিছুটা ধারণা আছে, তারা জানেন আফ্রিকায় গণতন্ত্র চর্চা কীভাবে তখন বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তাই ওই দুই লেখক অনেকটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে গণতন্ত্রের ‘মৃত্যু’ হয়েছে মনে করে তার জন্য শোকবাণী উচ্চারণ করেছিলেন!
বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ে কিংবা কেনিয়া নয়। আমাদের গণতন্ত্র চর্চার আলাদা একটা ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু লাগাতার অবরোধ আর একতরফা নির্বাচন এই গণতন্ত্রকে এখন একটি প্রশ্নের মাঝে ফেলে দিল। একটা বাজে দৃষ্টান্ত আরেকটা বাজে দৃষ্টান্তকে টেনে আনবে ভবিষ্যতে। ইতিমধ্যে একটা বাজে দৃষ্টান্ত আমরা তৈরি করেছি তারানকোকে মধ্যস্থতা করার সুযোগ দিয়ে। বিষয়টি একান্তভাবেই আমাদের। এখানে নির্বাচন ব্যবস্থা কীভাবে হবে, সংসদ কীভাবে চলবে- এ বিষয়গুলো একান্তভাবেই আমাদের। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়েছে ‘তৃতীয় পক্ষ’ অর্থাৎ বিদেশীরা। জাতিসংঘের দূত যখন বাংলাদেশে আসেন তখন আমরা বলেছি, এটা অশনি সংকেত! এভাবে আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জাতিসংঘের মতো সংস্থা আসতে পারে না। এটা জাতিসংঘের কাজও নয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনীতিকরা এ সুযোগটি করে দিয়েছেন। দাতাগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছিল ‘সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের কথা। কিন্তু সেটা হল না। এখন একটা নির্বাচন হচ্ছে। ইতিমধ্যে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন! নির্বাচন হচ্ছে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই নেই, সেটা কেমন নির্বাচন? এটা তো সংবিধানে বর্ণিত ১১নং অনুচ্ছেদের বরখেলাপের শামিল। ১১নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ এখন জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হল কোথায়? আরও একটা কথা। কোথাও কোথাও এখন দু’জন সংসদ সদস্যের (যেমন পিরোজপুর-২) অবস্থান হয়েছে। নবম জাতীয় সংসদ ভেঙে না দেয়ায় সেখানে এখনও একজন এমপি ‘আইনগতভাবে’ বহাল রয়েছেন। কিন্তু ওই আসনে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ আরেকজন এমপি এসে গেছেন, যিনি নবম জাতীয় সংসদে বিজয়ী হয়ে এমপি হননি। বাংলাদেশে আমরা এখন এ কোন গণতন্ত্র দেখছি! জাতীয় পার্টি একটি বড় দল। সংসদের তৃতীয় বৃহত্তম দল। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান তার দলের প্রার্থীদের নাম প্রত্যাহার করে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিলেও কোথাও কোথাও জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়ে গেছেন। অর্থাৎ সেসব আসনে নির্বাচন হচ্ছে! খোদ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানও ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হয়ে আছেন! তার প্রত্যাহারের চিঠি গ্রহণ করা হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তার দলের ৬ জন সদস্য থাকলেও (একজন উপদেষ্টাসহ) তিনি তাদের পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন। মন্ত্রীরা পদত্যাগপত্র পাঠালেও তা এখন অবধি গ্রহণ করা হয়নি! আমরা এ কোন গণতন্ত্র প্রত্যক্ষ করছি এ দেশে!
যখন এ নিবন্ধ তৈরি করেছি, তখন একের পর এক খারাপ খবর আসছে। সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসউইম্যান গ্রেস মেংয়ের একটি বক্তব্য। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি না বদলালে মার্কিন কংগ্রেসে ফের বাংলাদেশ নিয়ে শুনানি হবে। গেল নভেম্বরে একবার শুনানিতে কংগ্রেস সদস্যরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর কংগ্রেসের ফরেন রিলেশন কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডওয়ার্ড রয়েস ও কংগ্রেসনাল বাংলাদেশ ককাসের চেয়ারম্যান জোসেফ ক্রাউলি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতাকে চিঠি দিয়ে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জাতিসংঘের মহাসচিবের প্রতিনিধি তারানকোর বাংলাদেশে পাঁচ দিনের সফরও কার্যত ‘ব্যর্থ’ হয়েছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার খবর অনুযায়ী কেরি প্রধানমন্ত্রীকে সরে গিয়ে নির্বাচন আয়োজন করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। যদিও সংবাদটির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিজয় দিবসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা সাভারে স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেননি। প্রতিটি ঘটনা কতগুলো মেসেজ আমাদের পৌঁছে দিচ্ছে : ক. বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দাতারা অসন্তুষ্ট; খ. তারা নিশ্চিত নির্বাচনটা প্রধান বিরোধী দলকে বাইরে রেখেই একতরফাভাবে হচ্ছে; গ. ‘একটি সিদ্ধান্তে’ আসতে পারে(?) মার্কিন কংগ্রেস। প্রতিটি ঘটনা আমাদের জন্য কোনো ভালো খবর নয়। স্পষ্টতই বিদেশীদের কাছে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।
শুধু বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি যে নষ্ট হচ্ছে তা নয়। বরং অর্থনীতির ‘বারোটা’ বেজে গেছে। তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংস্থা বিজিএমইএ’র হিসাব মতে, হরতাল ও অবরোধজনিত কারণে প্রতিদিনের ক্ষতির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে গত দেড় মাসে ক্ষতি হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। একটা দেশের জন্য এই বিপুল ‘ক্ষতি’ কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এর রেশ আগামীতে কোথায় গিয়ে পৌঁছবে, ভাবতেই আঁতকে উঠতে হয়! আর একটা জিনিস আমরা অনেকেই চিন্তা করছি না যে, অবরোধ যদি এভাবে চলতেই থাকে, তাহলে দেশের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির সৃষ্টি হবে। অর্থনীতি সচল না হলে ভ্যাট আদায় হবে না। আর ভ্যাট আদায় না হলে রাষ্ট্রের আয় কমে যাবে। সেক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে একটা সমস্যা সৃষ্টি হবে। সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে নোট ছাপিয়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে বলতে পারে, তাতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। যেখানে আমাদের প্রবৃদ্ধি গেল বছর ছিল ৬ দশমিক ২ ভাগ, সেখানে তা কমে ৫ দশমিক ২ ভাগে নেমে আসবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এনবিআর আমাদের জানাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। যুগান্তর আমাদের জানাচ্ছে (১৭ ডিসেম্বর), বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দেশের সঙ্গে এখন দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশগুলো এখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে শুরু করেছে। একটি উদ্বেগজনক সংবাদও দিয়েছেন প্রতিবেদক। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে শংকিত আমদানিকারক দেশগুলো। তাদের এ শংকার কথা জানিয়ে এরই মধ্যে ৩৫টি দেশের বায়ার্স প্রতিষ্ঠান প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তারা ব্যবসার পরিবেশ না পেলে ভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার কথা জানিয়েছেন। বেশ ক’টি বিদেশী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি কতটুকু গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন আমি জানি না, কিন্তু পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হওয়ার একটা আশংকা রয়েছে। বিশেষ করে আগামী ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এ পরিস্থিতি চলতে থাকবে বলে আমার ধারণা। কেননা নির্বাচন বাতিল করার আর কোনো সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
৫ জানুয়ারির আগে আর দুপক্ষের মধ্যে কোনো সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। সংলাপ কার্যত এখন ব্যর্থ। আমরা বারবার বলছি, আমাদের রাজনীতিকদের ‘মাইন্ড সেটআপে’ যদি পরিবর্তন আনা না যায়, তাহলে এ ধরনের ‘সংলাপ’ হবে লোক দেখানো। ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর স্যার নিনিয়ানের ব্যর্থ চেষ্টার পর আরেক ডিসেম্বরে তারানকোর উদ্যোগও কার্যত ব্যর্থ হল! এতে আগামীতে আর কেউ আসবেন না আমাদের নিজস্ব সমস্যার সমাধানকল্পে। এখন বিএনপিকে বাদ রেখেই দশম জাতীয় সংসদ ‘নির্বাচন’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সংসদ কতদিন টিকবে, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু বাংলাদেশ যে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের জন্য আদৌ উপযুক্ত নয়, সে প্রশ্ন উঠবে বিভিন্ন মহলে। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- প্রথম সংসদ (১৯৭৩) ৩০ মাস, দ্বিতীয় সংসদ (১৯৭৯) ৩৫ মাস, তৃতীয় সংসদ (১৯৮৬) ১৭ মাস, চতুর্থ সংসদ (১৯৮৮) ৩১ মাস, পঞ্চম সংসদ (১৯৯১) ৫৬ মাস, ষষ্ঠ সংসদ (১৯৯৬) ১৩ দিন, সপ্তম সংসদ (১৯৯৬) ৬০ মাস, অষ্টম সংসদ (২০০১) ৬০ মাস, নবম সংসদ (২০০৮) ধারণা করছি ৬০ মাস টিকে ছিল। রাজনীতির স্ট্র্যাটেজিস্টরা ‘রাজনীতির অংক’ কষতেই পারেন। লাভ-ক্ষতির হিসাবও কষতে পারেন কেউ কেউ। তাতে পরিস্থিতি বদলে যাবে না। নির্বাচন হবেই। এ ক্ষেত্রে আমরা কেউ স্বীকৃতি দিই আর না দিই, দশম জাতীয় সংসদে আমরা একটা ‘বিরোধী দল’ও পাব!
পঞ্চম দফা অবরোধ আন্দোলন অনেক ‘বিষয়’ সামনে নিয়ে এলো। এক. নির্বাচন কমিশনকে ‘স্বাধীন’ করেও ‘সব দলের অংশগ্রহণ’ কমিশন নিশ্চিত করতে পারে না। প্রশাসনের প্রভাবের বাইরে গিয়ে ইসি কাজ করতে পারে না। সুতরাং ‘স্বাধীন’ ও ‘নিরপেক্ষ’ নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করার জন্য যথেষ্ট নয়। সিইসি সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচিত হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত তার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলেন। অতীতের অনেক ব্যর্থ কমিশনের মতো ‘রকিব কমিশন’ও ব্যর্থতার খাতায় নাম লেখাল! দুই. এবার আমাদের একটি ‘নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো’ গড়ে তুলতে হবে। এটা এখন সময়ের দাবি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে সরকার একটি কমিশন গঠন করে বুদ্ধিজীবীদের মতামতও নিতে পারে। তিন. সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলের নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে আনীত সব মামলা প্রত্যাহার করে নিতে পারে। এতে একটা আস্থার সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পথ প্রশস্ত হতে পার। চার. পাড়ায় পাড়ায় প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলার যে আহ্বান সরকারি নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, তা প্রত্যাহার করতে হবে। এতে উত্তেজনা, সংঘাত বাড়বে বৈ কমবে না।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাই সব কথা নয়। গণতন্ত্র সহনশীলতা ও আস্থার কথা বলে। দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য, সহনশীলতা ও আস্থার সম্পর্ক এ মুহূর্তে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগটা তাই বাঞ্ছনীয়।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

দেবযানীকে জাতিসংঘ স্থায়ী মিশনে বদলি

নিউইয়র্কে হেনস্তার শিকার ভারতীয় নারী কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়কে জাতিসংঘের ভারতীয় স্থায়ী মিশনে বদলি করেছে ভারত সরকার। এখন তিনি পূর্ণ কূটনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। ভারতে মার্কিন দূতাবাসের বাইরে নিরাপত্তা বেষ্টনী সরিয়ে দেয়া হলেও নয়াদিল্লিতে মার্কিন কূটনীতিকদের সব সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে দিয়েছে ভারত সরকার। স্থগিত করা হয়েছে মার্কিন দূতাবাসের আমদানি ছাড়পত্র। বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশীদ এক পার্লামেন্ট বক্তৃতায় বলেন, দেবযানী খোবরাগাড়কে ফিরিয়ে আনা আমার কর্তব্য। আমাদের তার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং আমি যে কোন মূল্যে তা করব। খুরশীদ আরও বলেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই খোবরাগাড়ের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা কাক্সিক্ষত নয়। এ আটকের পেছনে যুক্তি দেখিয়ে ওয়াশিংটন জানায়, দেবযানী খোবরাগাড় তার কাজের মহিলাকে ন্যূনতম বেতন দেননি এবং ভিসা আবেদনের সময় মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। এ ঘটনার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র মারি হর্ফ বলেন, নিয়ম মেনেই এই কূটনীতিককে তল্লাশি করা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি মাথায় রেখেই তাকে তল্লাশি করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। মারি হর্ফ বলেন, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি হবে না। আর এই আটকের বিষয়টি স্পর্শকাতর।
পরিচালকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ : ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানি খোবরাগাড়কে আমেরিকায় গ্রেফতার এবং হয়রানির প্রতিবাদে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। এই ঘটনার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, খুবই নিন্দাজনক ঘটনা এটি। দেবযানীকাণ্ডে প্রতিবাদে সরব হন রাজ্যসভার সদস্যরাও। পরিবার ও রাজনীতিবিদদের দাবি, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে দেবযানীকে জাতিসংঘে পাঠাচ্ছে ভারত। দেশটির স্থায়ী সদস্য হিসেবে পাঠানো হচ্ছে দেবযানীকে। ফলে সব কূটনৈতিক সহায়তা পাবেন তিনি। ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ে ষড়যন্ত্রের শিকার বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ। দেবযানীর পরিচারিকা সঙ্গীতা রিচার্ডের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন কূটনীতিকের বাবা উত্তম খোবরাগাড়ে। নির্ধারিত মজুরির চেয়ে কম মজুরি দেয়া আসলে কোনো ইস্যুই না বলে মনে করছেন তিনি। একই আশংকা কূটনৈতিক মহলেরও। ২০১২ সালের নভেম্বর থেকে দেবযানী খোবরাগাড়ের পরিচারিকার কাজ শুরু করেন সঙ্গীতা। ছুটির দিনে দেবযানীর বাড়ির বাইরে কাজ করতে চান তিনি। কিন্তু সঙ্গীতার ভিসায় সে বন্দোবস্ত না থাকায় বাদ সাধেন দেবযানী। এই গণ্ডগোল থেকেই একদিন মুদি দোকান থেকে আর ফেরেননি পরিচারিকা। সমস্যার সূত্রপাত এখানেই। তথ্যসূত্র : জিনিউজ, টাইমস অব ইন্ডিয়া।

জীবন বাঁচানো নায়কেরা by আলম পলাশ

গত ২৭ নভেম্বর, বুধবার। ভোর চারটা ৫০ মিনিট। জমজমাট চাঁদপুর স্টেশন। তার আগের দিন থেকে শুরু হওয়া অবরোধের ছোঁয়া সেখানে নেই বললেই চলে। ঠিক আর ১০ মিনিট পরে স্টেশন ত্যাগ করবে মেঘনা এক্সপ্রেস। গন্তব্য চট্টগ্রাম।
স্টেশনে প্রিয়জনকে বিদায় দিতে অনেকেই এসেছেন। ব্যাগ গুছিয়ে নির্দিষ্ট আসনে বসছেন যাত্রীরা। ব্যস্ত কুলি, হকার ও ট্রেনের কর্মচারীরা। এরই মধ্যে ট্রেনের হুইসেল পড়ে গেছে। তখন ভোর পাঁচটা। বিশালাকার অজগরের মতো হেলেদুলে চাঁদপুর স্টেশন ছাড়ল মেঘনা এক্সপ্রেস। স্টেশনের বাইরে কুয়াশা মোড়ানো ভোর। তবে সবচেয়ে ভয় জাগানো ব্যাপার হলো জায়গায় জায়গায় রেললাইন উপড়ে ফেলার খবর। ততক্ষণে অবশ্য বাংলাদেশ রেলওয়ের আগাম সতর্কতামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ‘অবরোধের সময় দেখে-শুনে ধীরগতিতে (নিয়ন্ত্রিত গতি) ট্রেন চালাতে হবে।’

সেভাবেই ট্রেন চালাচ্ছেন চালক জয়নাল আবেদিন ও সহকারী চালক আজম খান। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পরবর্তী স্টেশনে পৌঁছারও তাড়া আছে। ট্রেন ছাড়ার পর এরই মধ্যে তিনটি স্টেশনে থেমেছে। যথারীতি যাত্রী উঠেছেন-নেমেছেন। ততক্ষণে ভোরের কুয়াশাও কাটতে শুরু করেছে। গাছগাছালির ফাঁক গলে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। ট্রেনের ভেতরে অনেকেই সকালের নাশতা সারছেন। পণ্য বিকোতে ব্যস্ত হকারেরা। টিকিট দেখতে ব্যস্ত টিটি। ব্যস্ত সামনের স্টেশনে নামার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরাও। ৩ নম্বর স্টেশন হাজীগঞ্জ ছাড়ার পরপরই সবে গতি বাড়াতে যাবেন চালক, তখন তাঁর দৃষ্টি আটকে যায় সামনে। বিন্দুর মতো লাল কিছু একটা লাইন ধরে এগিয়ে আসছে ট্রেনের দিকে! পাশে বসে থাকা আজম খানকে ভালো করে খেয়াল করতে বলেন জয়নাল আবেদিন। আজমও তীক্ষ দৃষ্টিতে নজর রাখেন। সাদা কুয়াশার ভেতর লাল বিন্দুটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আরও একটু এগিয়ে এলে নিশ্চিত হন ‘ওই কিছু একটা’ আদতে একটা লাল নিশান। একটা বাঁশের আগায় লাল রঙের কাপড় বেঁধে ট্রেনের দিকে দৌড়ে আসছেন একজন বয়স্ক মানুষ। লাল মানেই দুর্ঘটনার সংকেত—ভালো করেই জানেন দুই চালক। কমিয়ে দেন ট্রেনের গতি। লাল নিশান হাতে বয়স্ক মানুষ আর ট্রেনের মধ্যে তখন দূরত্ব কমে এসেছে। লাফ দিয়ে নামেন আজম। বয়স্ক মানুষটির কাছে গিয়ে জানতে চান, ঘটনা কী? শীতের সকালে বয়স্ক মানুষ, অর্থাৎ তাজুল ইসলামের কপালে ঘাম। হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন, ‘সামনে রেললাইন অনেকখানি কাটা!’

ওরা তো আমার মতন কোনো মায়ের পুত!
ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস কৃষক তাজুল ইসলামের। সেদিনও উঠেছেন। নামাজ পড়েছেন। তারপর বাইরে বেরিয়েছেন। তাজুল ইসলামের বাড়ির পাশ দিয়ে চলে গেছে চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রেললাইন। প্রতিদিনই ভোরবেলা রেললাইনে গিয়ে কিছু সময় কাটান। ২৭ নভেম্বরও বের হয়েছিলেন। কিন্তু রেললাইনে বসতে গিয়ে তাঁর চোখ আটকে যায়। তাজ্জব ব্যাপার! কাল সন্ধ্যায়ও দেখেছেন রেললাইন ঠিক আছে। রাতের মধ্যে কী এমন হলো যে সেখান থেকে প্রায় ৬০ ফুট লম্বা   লোহার পাত হাওয়া! পাতগুলো পড়ে আছে খানিক দূরে। এখন উপায়! ঠিক একই সময়ে সেখানে হাজির হন শিবপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন। রেললাইনের পাশে বাড়ি হওয়ায় তাঁরা ভালো করেই জানেন, কখন কোন ট্রেন আসে-যায়। মেঘনা এক্সপ্রেস আসার সময় হয়ে এল প্রায়। কিছু একটা করতেই হবে—এই চিন্তা থেকেই দৌড়ে আবার বাড়িতে যান তাজুল। হাতে নেন উঠানের বাঁশে টাঙিয়ে রাখা স্ত্রীর লাল পেটিকোট। বাড়ি থেকে বের হতে গিয়ে হাতে নেন টেঁটা (বাঁশের তৈরি মাছ শিকারের বিশেষ অস্ত্র)। সেটার আগায় লাল পেটিকোটটি বেঁধে দ্রুত রেললাইনের ওপর চলে আসেন। দৌড়াতে থাকেন উয়ারুক স্টেশনের দিকে। অন্যদিকে আনোয়ার হোসেন ছুটতে থাকেন মেহের স্টেশনের দিকে। সেখানে পেয়ে যান এক রেলমিস্ত্রিকে। তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগ করেন স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে। সতর্ক  করে দেন সম্ভাব্য বিপদের ব্যাপারে। স্টেশন মাস্টারও দ্রুত খবরটা পৌঁছে দেন  ট্রেনের গার্ডকে।

ওদিকে তাজুল ইসলাম দৌড়াচ্ছেন। একসময় তাঁর কানে আসে ট্রেনের হুইসেল। বাড়িয়ে দেন দৌড়ানোর গতি। ক্রমেই তাঁর সামনে স্পষ্ট হতে থাকে ট্রেন। চালক লাল নিশান দেখতে পেয়েছেন—এটা বুঝতে পারেন। ট্রেনের গতিও কমছে ধীরে ধীরে। খুব কাছাকাছি এসে থেমে যায় মেঘনা এক্সপ্রেস। এগিয়ে আসেন ট্রেনের গার্ড। নেমে আসেন চালকদ্বয়। জয়নাল আবেদিন বুঝতে পারেন, একটা বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেল মেঘনা এক্সপ্রেস।

কথার ফাঁকে তাজুল ইসলামকে আমরা বলি, ‘আপনি তো সত্যিই অনেক বড় দায়িত্ব পালন করেছেন!’ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যাত্রীরা তো আমার মতন কোনো মায়ের পুত (ছেলে)! হেগোর জীবন বাঁচানো আমার দায়িত্ব মনে করছি।’

আর আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য, ‘চোখের সামনে এত বড় অ্যাকসিডেন হইব ভাইবা গা শিউরায় উঠতেছিল। কিছু না ভাইবাই দৌড় দিছি, মনে মনে ভাবতেছিলাম মানুষগুলারে বাঁচাইতে হইব।’

সাহসী প্রাণ

চাঁদুপরের শাহরাস্তি থানার পশ্চিম উপলতা গ্রামের তাজুল ইসলাম পেশায় কৃষক। তবে চাষ করার মতো নিজের কোনো জমি নেই। অন্যের জমিতে কাজ করেন। স্ত্রী, চার ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে পশ্চিম উপলতা গ্রামে রেললাইন ঘেঁষে বসবাস তাঁর। সন্তানদের মধ্যে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বিয়ে করিয়েছেন দুই ছেলেকে। বাকি দুই ছেলের মধ্যে একজন রাজমিস্ত্রি, অপরজন মুদির দোকানে কাজ করেন। সব মিলিয়ে টানাটানির সংসার। আনোয়ার হোসেনেরও একই অবস্থা। পেশায় করাতকলের শ্রমিক।

সেই ‘টেনে চলা সংসারে’ ট্রেন থামিয়ে দেওয়ার ঘটনা অনেকটা সুখের বার্তা বয়ে এনেছে। স্থানীয় সাংসদ, রেলমন্ত্রী, পুলিশ সুপার ও জেলা
প্রশাসক তাঁকে পুরস্কৃত করেছেন। সব মিলিয়ে তিনি পেয়েছেন প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার টাকার পুরস্কার। জানতে চাই, ‘এই টাকা দিয়ে কী করবেন?’ তাজুল ইসলাম খানিকটা চিন্তায় ডুব দেন, ‘ভাবছি দুইটা গাভি কিনব। গাভির দুধ বিক্রি করেই সংসার চলবে। অন্যের জমিতে আর কাজ করতে হবে না।’

‘আপনি তো একটা প্রশংসাপত্র পেয়েছেন।’—মনে করিয়ে দিতেই ঘর থেকে বের করে আনেন বাঁধাই করা প্রশংসাপত্র। চাঁদপুর পুলিশ সুপার মো. আমির জাফরের স্বাক্ষর করা প্রশংসাপত্রে শেষ দিকে লেখা, ‘তাজুল ইসলাম...দায়িত্বশীল, সুনাগরিকসুলভ ও সাহসী ভূমিকার মাধ্যমে একটি  যাত্রীবাহী ট্রেনকে দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করেন। তাঁর ভূমিকায় আমরা গর্বিত।’

সরল গরল- ইসি এখন ‘বিবেকহীন অনুপ্রবেশকারী’ by মিজানুর রহমান খান

ভোট গ্রহণের আগেই ক্ষমতাসীন দল ১৫১টির বেশি আসনে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় নির্বাচনের ধারণা ইতিমধ্যে সমাহিত হয়েছে।

সফলদের স্বপ্নগাথা- যেতে হবে বহুদূর by জোয়ান বায়েজ

সবাই এক হলেই অন্য রকম কিছু করা সম্ভব। এখন বিভিন্ন দেশে দুর্নীতি আর কুশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আন্দোলন চলছে। সবাই মিলে এক হয়েছে বলেই এমনটি করা সম্ভব হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের আন্দোলন বিস্তৃত হচ্ছে। এ ধরনের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি অনেক প্রভাবশালী ও জটিল প্রকৃতির। কোনো ধরনের জাতীয় নেতা ছাড়া এ ধরনের কাজ নিঃসন্দেহে অসাধ্য সাধনই বটে।

বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে শিল্পীরা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই অংশ নেন। এ ক্ষেত্রে শিল্পীদের দায়বদ্ধতাও বেশি। শিল্পকলা ও আন্দোলনের মাঝে যোগসূত্র অবশ্যই আছে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি, সাধারণ মানুষের সঙ্গে শিল্পীদের সংযোগই এই বৈচিত্র্যপূর্ণ যোগসূত্রের কারণ। জেলের কয়েদি থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রের যোদ্ধার সঙ্গে আমি শিল্পী হিসেবে কথা বলতে পারি। সে আমার কথা শুনতে পারে। যা অন্যান্য সাধারণ মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এমন কাজ করতে পেরে আমি সত্যিই সৌভাগ্যবান। প্রকৃতি আমাকে সত্যিকারের সৌভাগ্য উপহার দিয়েছে। আমার কণ্ঠের গানই আমার সব। আমার এই প্রকৃতিপ্রদত্ত কণ্ঠ দিয়ে আমি যা ইচ্ছে বলতে পারি। আমি আমার কণ্ঠের গানকে এমনভাবে ব্যবহার করেছি, যা দিয়ে আমি জীবনের প্রকৃত স্বাদ উপভোগ করেছি। আমার জীবনকে পরিপূর্ণ করেছে আমার কণ্ঠ, আমার গান।

এই তো কিছুদিন আগে এ বছর বর্ণবাদবিরোধী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নন্দিত মার্কিন নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের ওয়াশিংটন পদযাত্রা ও ঐতিহাসিক ভাষণ ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’-এর অর্ধশত বর্ষপূর্তি উদ্যাপন করা হলো। এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বব্যাপী নাগরিক আন্দোলনের লক্ষ্য কিছুটা হলেও অর্জিত হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি সেই আন্দোলনের লক্ষ্য নাগরিকদের অধিকার এখনো সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য অনেক দূর যেতে হবে। খুব সাধারণ অর্থে, এই পৃথিবীর মতো নিষ্ঠুর জায়গা আর একটিও নেই। এখানে অধিকাংশ মানুষই কেউ কারও কথা মনে রাখে না, কেউ অন্যের জন্য কিছু চিন্তা করে না। দিনকে দিন বিশ্বব্যাপী মানুষে মানুষে বিভেদ বেড়েই চলছে। এই বৈষম্য নিঃসন্দেহে বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয়।

আমাদের নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের সংগ্রামকে অনেক দূর নিয়ে যেতে হবে। থেমে পড়লে হবে না। তবে এটা নিঃসন্দেহে অনেক কঠিন একটি কাজ। কারণ, অধিকার আদায়ের জন্য অনেক দিন ধরে বেশি কিছু করা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন চালানো অনেক বড় কাজ। তবে যেকোনো আন্দোলন সফলতার ক্ষেত্রে আমার নিজের মূলমন্ত্র হলো—ক্ষুদ্র জয় আর বড় পরাজয় মেনে চলা। আপনি যদি বড় সব পরাজয়কে মেনে নিতে পারেন, তাহলে ক্ষুদ্র জয়েই খুঁজে পাবেন পরিপূর্ণ তৃপ্তি।

 সেই ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই বিভক্ত ছিল। এখানকার নাগরিকদের ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক তর্ক ছিল। আমরা যারা যুদ্ধের বিপক্ষে ছিলাম, তারা আমাদের আসল কাজ সম্পর্কে জানতাম। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা যায় তার জন্য নতুন কোনো উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম। কারণ আমি অনেক ছোটবেলা থেকে নিজেকে অহিংস আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করি। যখন আমার বয়স ১৫, তখন আমি পথে নামি। এ জন্যই বোধ হয় আমি অন্যদের মতো ছিলাম না। সেই সব সাধারণ মানুষ, যারা যুদ্ধের বিপক্ষে ছিল, তাদের অধিকাংশেরই যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো ধারণা ছিল না। তারা যুদ্ধ চাইত না, কিন্তু যুদ্ধ বন্ধে কী করতে হবে, সেটা তারা জানত না। তাই তো শেষ পর্যন্ত তারা নিজ নিজ কাজে ফিরে যায়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এটা ঘটেনি। আমি ছোটবেলা থেকে নানা ধরনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তাই তো যুদ্ধ শেষেও আমার যুদ্ধ শেষ হয়নি।

সূত্র: রেডিও ফ্রি ইউরোপ রেডিও লিবার্টিকে দেওয়া জোয়ান বায়েজের ২০১৩ সালের এক সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লিখেছেন জাহিদ হোসাইন খান