Thursday, November 21, 2013

রাজনৈতিক সংকট ও বাস্তবতা by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

নির্বাচনে জয় শতভাগ নিশ্চিত করতে চাইছে আওয়ামী লীগ। এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা বিএনপি। এজন্য বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার কৌশলে হাঁটছে সরকার। সেক্ষেত্রে বলা যায়, সাময়িকভাবে হলেও চলমান রাজনীতিতে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে সরকার। বিরোধী দলের কৌশলে বেনিফিশিয়ারি হচ্ছে তারা। সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনা অপরিহার্য বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। হরতাল বাংলাদেশে একসময় প্রতিবাদের একটি শক্তিশালী মাধ্যম ছিল। কিন্তু অতি ব্যবহারের কারণে হরতালের কার্যকারিতা এখন তেমন নেই। দাবি আদায়ের মাধ্যম হিসেবে হরতালকে এখন সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্মসূচি মনে করা সমীচীন হবে না। তাই হরতাল না দিয়ে বিকল্প কর্মসূচির চিন্তা করতে হবে। দাবি আদায়ে কোনো নির্দিষ্ট স্থান ঘেরাও, অবরোধ ও সমাবেশ হরতালের চেয়ে বেশি কার্যকর ও উত্তেজনা সৃষ্টিতে সহায়ক হবে বলে মনে হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বসে নেই পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তি। তারা তাদের ফায়দা হাসিল করতে অত্যন্ত তৎপর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ভারত। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তারা একটু বেশিই মাথা ঘামাচ্ছে বলে মনে হয়। বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের মনোভাব হওয়া উচিত উদার। কোনো একক দলের পক্ষে অবস্থান নিলে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও উদারতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সভা হচ্ছে দিল্লিতে। বাংলাদেশের রাজনীতি কেমন হবে, কারা ক্ষমতায় আসবে- ভারতের এসব নিয়ে মাথা ঘামানোকে দেশের মানুষ ভালোভাবে দেখছে না। সুতরাং ভারতের উচিত বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করা এবং সব দলের অংশগ্রহণে একটি পক্ষপাতহীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে এ দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে মনেপ্রাণে কাজ করা। তাতে ভারতের লাভই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হলে ভারতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি। কারণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটা বড় অংশ ব্যয় হয় ভারত থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানির পেছনে। কাজেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে, এখানে অশান্তি বিরাজমান থাকলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত।
আন্তরিকভাবে চাইলে কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি- ইতিহাসে এমন নজির নেই। প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই সংকটের সমাধান হতে পারে, কারণ তার হাতেই সমাধানের চাবিকাঠি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মানুষের কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেন না; তিনি দেশে শান্তি চান। তার কথা খুব ভালো লেগেছে। আমরা চাই, আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয়, কোনো প্রাণ ঝরে না যায়।
রাজনৈতিক কারণে এরই মধ্যে কয়েকশ’ মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে এবং এ হত্যার মিছিল দিন দিন বাড়ছে। যারা নিহত হয়েছে, তারা প্রত্যেকে পরিবারের সম্পদ ছিল; এ সম্পদ হারিয়ে পরিবারগুলো মহাসংকটে পড়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার সময় মানুষ একবার জীবন দিয়েছে। এটি বাতিলের কারণে এখন আবার জীবন দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ যদি বিরোধী দলে যায়, হয়তো দেখা যাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য মানুষকে আবার জীবন দিতে হচ্ছে!
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দেশকে নিয়ে চলছে বিপজ্জনক খেলা। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হয়েও হচ্ছে না। পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তির তৎপরতা দেখে প্রতীয়মান হয়, কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করার চেষ্টায় আছে। এমনটি হলে রাজনীতির ভাগ্যে বিপর্যয় ঘটার সমূহ আশংকা আছে। আর রাজনীতিতে বিপর্যয় ঘটলে বিপর্যয় ঘটবে রাজনীতিকদের জীবনে; বিপর্যয় ঘটবে দেশেও। কাজেই রাজনীতিকদের সতর্ক হতে হবে, দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংকট সমাধানে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশ বাঁচলে তবেই রাজনীতি। দেশই যদি বিপর্যয়ে পড়ে তাহলে রাজনীতিকরা কী নিয়ে রাজনীতি করবেন?
কাজেই সময় থাকতে পরস্পরের ভেদাভেদ ভুলে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে সবাইকে মনোনিবেশ করতে হবে, যাতে সংঘাতের পথ এড়ানো সম্ভব হয়। সুস্থ রাজনীতির ধারা দেশে ফিরে আসে। গণতন্ত্র মেনে রাজনীতি করলে রাজনীতি কোনোভাবেই সহিংসতার পথে ধাবিত হয় না। রাজনীতিতে পরাজয়কে সহজভাবে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে এবং বিজয়কে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
দেশে একটি রাজনৈতিক সংকট চলছে। এর সঙ্গে দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য জড়িত। রাজনীতিকদের দ্রুত সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে হবে এবং সেটি দেশের ক্ষতি না করে। দেশের ক্ষতি হয় ও মানুষের কষ্ট হয়- এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। দেশের ক্ষতি না করে সংকটের সমাধান করলে রাজনীতিকদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কাণ্ডারী হুঁশিয়ার! by মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

বর্তমান অবস্থায় দেশের মানুষ কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছেন। ব্যাংকিং ব্যবসাসহ পুঁজিবাজারে আস্থার ভাব ফিরে আসার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। সরকারি দল সর্বদলীয় সরকার গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছে এবং তাতে ২/১টি দল সাড়া দিয়ে মন্ত্রিপরিষদে যোগদান করেছে। এ অবস্থায় বিরোধী দল এগিয়ে এলে দেশের মানুষ এ যাত্রায় বেঁচে যায়। তবে এজন্য সরকারি দলকে আরও উদার মনোভাব গ্রহণ করতে হবে। বিএনপি সর্বদলীয় সরকারে যোগদান করলে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে- বিএনপির মনে এমন আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। আর এ দায়িত্ব সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে। এ মুহূর্তে সরকারকে তাই বলব, অতীতে যা হওয়ার হয়েছে, বর্তমানের কথা ভেবে বিএনপিকে আস্থায় আনতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে কোন দল সরকার গঠন করবে তা জনগণের ওপরই ছেড়ে দিতে হবে। অর্থাৎ জনগণ যাতে তাদের ইচ্ছেমতো বা পছন্দমতো যাকে খুশি ভোট দিতে পারেন সে পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। নির্বাচনী ময়দান সমতল হয়েছে বা হচ্ছে- বিএনপি এমনটি মনে করলে এবং তাদের চাহিদামতো ২/১টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পেলে নিশ্চয়ই তারা নির্বাচনে আসবেন। মনে রাখতে হবে, বর্তমান বিশ্বে নির্বাচন ছাড়া বিকল্প কিছু ভাবা বোকামি। এক্ষেত্রে আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের অবস্থাই ঘর পোড়া গরুর মতো। তাই কোনো দলের কোনো হঠকারিতাই যেন নির্বাচন বানচাল না করে বা অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে সেদিকে সংশ্লিষ্ট সবার সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। কারণ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা যেমন দেশে অনিবার্য বিপর্যয় ডেকে আনবে, তেমনি একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনও ভবিষ্যতের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে থাকবে। মনে রাখতে হবে, এরই মধ্যে দেশের মানুষ যথেষ্ট শাস্তি ভোগ করেছেন। আগুনে পোড়া মানুষেরা দগদগে ঘা নিয়ে হাসপাতালে দিনরাত মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করে মৃত্যুবরণ করেছেন। রাস্তাঘাটে গাড়ি পুড়িয়ে আকাশে বাতাসে আগুন ছড়িয়ে দেশের মানুষের ভাগ্যাকাশে কালোমেঘ সৃষ্টি করা হয়েছে। এমন ভীতিকর পরিবেশের মাধ্যমে দেশের মানুষকে যাতে আর এক মুহূর্তও কাটাতে না হয়, আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয়কেই সে ব্যবস্থা করতে হবে। ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতায় শিশু, কিশোর, নারীসহ আর একটি মানুষও যেন আগুনে পুড়ে না মরে সে নিশ্চয়তাও দিতে হবে। ভেবে দেখতে হবে, আগুনে পুড়িয়ে শিশু-নারীসহ মানুষ হত্যা করে ক্ষমতায় গেলে মসনদে আরোহণের পর পুড়ে মরা ওইসব মানুষের আত্মার কাছে কী জবাব দেয়া হবে? ওপার থেকে আগুনে পোড়া নিহত ব্যক্তিরাই বা ক্ষমতার মসনদে বসা প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীদের কী নামে ডাকবেন? এসব বিষয় মাথায় নিয়ে যদি বিএনপি-আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড তথা দলীয় প্রধানরা একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতেন তাহলেও দেশের মানুষ বেঁচে যেতেন। দুটি বড় দলের প্রধানের উদ্দেশে তাই বলব, আপনারা দুই দলের কাণ্ডারীই বারবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, দলীয় ব্যক্তিদের আনুকূল্য প্রদানের মাধ্যমে আপনারা অনেককে এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টাসহ রাজাগজা বানিয়েছেন, ব্যবসায়িক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে অনেককে ধনকুবের বানিয়েছেন, যাদের অনেকেই অনেক কুকর্ম করেছেন এবং অনেকেই এখন আপনাদের সঙ্গে নেই। আবার ওইসব ব্যক্তির অনেকেই আপনাদের সুখ, দুঃখ, বেদনা, বিপদের সঙ্গী থাকেননি। সুযোগ বুঝে তারা কেটে পড়েছেন। বাস্তবতা এমনটিই! সে দৃষ্টিকোণ থেকেও বলতে চাই, ক্ষমতা দখলের জন্য দয়া করে লড়াই-ফ্যাসাদের পথ থেকে সরে আসুন। কারণ আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আপনাদের চারপাশে এখনও উপরোক্ত শ্রেণীর কায়েমি স্বার্থবাদীরা ভিড় করে আছেন। তারা আপনাদের ঘাড়ে চেপে, আপনাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে আবারও হীন স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছেন। দেশের এই সন্ধিক্ষণে ওই শ্রেণীর মানুষের কুমন্ত্রণাও যে দেশকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সে কথাও বলা বাহুল্য! ক্ষমতা দখল করে তা বিলিবণ্টন করার মধ্যে হয়তো এক ধরনের আনন্দ আছে, কিন্তু সে ক্ষমতার অপব্যবহারে যে পাপ, যে কলংক অর্জিত হয় তারও দায়ভার আছে। তাই ক্ষমতা লাভের জন্য যে কোনো বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা ত্যাগ করাই শ্রেয়; ক্ষমতার দ্বন্দ্বে বারবার হানাহানির পথে না যাওয়াই ভালো। আপনাদের দু’দলের দু’জন কাণ্ডারীর কাছে তাই আবেদন, আশা করি আপনারা ভালো পথটিই বেছে নেবেন। দেশ ও জাতি এ মুহূর্তে আপনাদের দু’জনের মুখের দিকেই চেয়ে আছেন, আশা করি তাদের হতাশ করবেন না। আপনারা দুই নেত্রী কায়েমি স্বার্থবাদীদের হাতিয়ার হবেন না, তাদের দ্বারা পরিচালিত হবেন না, দেশ ও জাতি আপনাদের কাছে সে প্রত্যাশাই করে। দেশ ও জাতির বর্তমান অবস্থায় আরও একটি কথা বলব, তা হল ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’!
মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট

মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই by তারেক শামসুর রেহমান

নিশা দেশাই বাংলাদেশে এসেছিলেন। আবার চলেও গেছেন। নিশা দেশাই ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সম্প্রতি রবার্ট ব্লেকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে নিশা দেশাইয়ের সফরকে কোনো কোনো মহল থেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হলেও এ সফর বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন নীতিতে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে না। বাংলাদেশে আসা তার রুটিন ওয়ার্ক। দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে তিনি কাজ করবেন। পররাষ্ট্র সচিবকে, এমনকি প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দেবেন। তাই তার বাংলাদেশে আসাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে কোনো কোনো মহল তার এ সফরকে ভিন্নভাবে নিলেও নিতে পারে। মোদ্দা কথা, তার এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আসার সম্ভাবনাও কম।
যারা দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে মার্কিনি নীতি সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তারা জানেন বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন যে নীতি, তা পরিচালিত হয় ভারতকেন্দ্রিক মার্কিন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে। মনে রাখতে হবে, দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে ভারতের অগ্রাধিকার বেশি। বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা কখনও ভারতকে পাশ কাটিয়ে কিছু করবেন না। কিছুদিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজিনার নয়াদিল্লি সফরের পর দেশের কোনো কোনো পত্রপত্রিকায় এমন একটি ধারণা দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কিংবা সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের ব্যাপারে মার্কিন ও ভারতীয় অবস্থান পরস্পরবিরোধী। অর্থাৎ দুটি দেশের অবস্থান ভিন্ন ভিন্ন! অনেকে এমন অভিমতও পোষণ করেছেন যে, দু’দেশের অবস্থান সাংঘর্ষিক! এ ধারণা ভুল। পরে মজিনার একটি বক্তব্যে সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মনোভাবকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের ব্যাপারে আলাদাভাবে কোনো নীতি প্রণয়ন করেনি এবং আগামীতে করার সম্ভাবনাও ক্ষীণ। ভারতের মনোভাবের সঙ্গে সমন্বয় করেই বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন নীতি প্রণীত হয়েছে এবং কোনো অবস্থাতেই তা ভারতীয় স্বার্থকে ক্ষুণœ করে নয়। মনে রাখতে হবে, এ অঞ্চলের রাজনীতিতে যে পরিবর্তন আসছে, তাতে ভারত একটি ফ্যাক্টর। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের গুরুত্বকে অস্বীকার করতে পারবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্ব দেয়। কিন্তু তা কোনো অবস্থাতেই ভারতীয় স্বার্থকে আঘাত বা উপেক্ষা করে নয়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কোঅপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট (টিকফা) চুক্তিতে রাজি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে এ সিদ্ধান্তকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবে নেবে। কিন্তু তাতে করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশী পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার (জিএসপি) দেবে, এটা আমার মনে হয় না।
মূল বিষয় হচ্ছে, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার রাজনীতিতে পরিবর্তন আসছে। ভারত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবহরের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। আগামী বছরের শুরুতে একটি নৌ-মহড়া হবে ভারত মহাসাগরে। যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছে ভারত ওই মহড়ায় অংশ নিক। মালদ্বীপের সঙ্গেও একটি ‘সোফা’ চুক্তি করতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটো ২০১০ সালে তার লিসবন সম্মেলনে ন্যাটোর সম্প্রসারিত ভূমিকা সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক কনসেপ্ট সম্পর্কে যারা ধারণা রাখেন তারা জানেন, এই ধারণাপত্রের মূল বিষয়টি হচ্ছে ন্যাটোর সম্প্রসারিত ভূমিকা। ন্যাটোর কর্মকাণ্ড এখন আর শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা দক্ষিণ এশিয়ায় সম্প্রসারিত হয়েছে। অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা, যুক্তরাষ্ট্র তার নৌবাহিনীর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকাণ্ড ভারত মহাসাগর এলাকায় সম্প্রসারিত করেছে। আগামীতে মার্কিন ষষ্ঠ ফ্লিটের বেশ ক’টি জাহাজ দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্রসীমায় মোতায়েন করা হবে। যে কারণে বাংলাদেশে সম্ভাব্য মার্কিন ভূমিকা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকে গেল। অনেকেরই জানার কথা, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এরই মধ্যে একটি অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ তথাকথিত ‘অংশীদারিত্ব সংলাপ’ চুক্তির আওতায় দৃশ্যত বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদ দমন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ, শ্রমমান, পণ্যের শুল্ক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করলেও মূল বিষয় একটিই- যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত নীতির ব্যাপারে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করা। ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় যৌথ কর্মসূচি গ্রহণে’র আড়ালে এ অঞ্চলে মার্কিন সেনা মোতায়েনের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না! বলা ভালো, প্রতিবছর একবার ‘অংশীদারিত্ব সংলাপ চুক্তি’র আওতায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র মিলিত হবে। প্রথম সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল গেল বছরের ১৯-২০ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে। আর এবার দ্বিতীয় সংলাপ হল ঢাকায় গত ২৬ মে। সংলাপ শেষে একটি ব্রিফিং করা হয় বটে, কিন্তু ভেতরের অনেক কথাই জানানো হয় না। বাংলাদেশ এর আগে ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তাই গুজবের ডালপালা বেড়েছে এবং আগামীতে তা আরও ছড়াবে।
গেল বছরের ১৮ জুন ইউরোপের দেশ ক্রোয়েশিয়ায় ন্যাটোর একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ন্যাটোর ২৫টি সদস্য দেশের বাইরেও মোট ৫৫টি দেশ অংশ নিয়েছিল। ওই সম্মেলনকে তারা বলছে স্ট্র্যাটেজিক মিলিটারি পার্টনারশিপ কনফারেন্স। যারা সরাসরি ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র নয়, তারাও এ সম্মেলনে অংশ নিয়েছিল। ন্যাটোর সঙ্গে কাজ করতে পারে এমন দেশগুলোকে ন্যাটোর নীতিনির্ধারকরা মোট চার ভাগে ভাগ করেছে, যারা ন্যাটোর সদস্য নয়, তবে ন্যাটোর সহযোগী। যেমন ইউরোপের ১২টি দেশকে নিয়ে গঠিত হয়েছে দ্য পার্টনারশিপ ফর পিস। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলভুক্ত আলজেরিয়া, তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত হয়েছে মেডিটেরিয়ান ডায়ালগ মেমবার্স। সৌদি আরব কিংবা ওমানের মতো দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত হয়েছে ইসতান্বুল কোঅপারেশন ইনিশিয়েটিভ। অস্ট্রেলিয়া কিংবা জাপানের মতো দেশগুলোকেও ন্যাটো ‘পার্টনার্স অ্যাক্রস দ্য গ্লোবে’র ব্যানারে একত্রিত করেছে। আফগানিস্তান ও পাকিস্তানও এ ব্যানারে রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে ন্যাটোর কোনো কর্মকাণ্ড নেই। এখন এল সালভাদর ও কলম্বিয়ার মতো দেশও ন্যাটোর সঙ্গে জড়িত হতে যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হল, ইউরোপে ন্যাটোর কমান্ডার এডমিরাল স্টাভরিডিস সম্প্রতি বলেছেন, তারা ভারত ও ব্রাজিলের মতো দেশকে নিয়ে ভাবছেন এবং আশা করছেন এ দেশ দুটি ‘পার্টনার্স অ্যাক্রস দ্য গ্লোবে’র ব্যানারে আগামীতে ন্যাটোর কর্মকাণ্ডে শরিক হবে। ২০১০ সালে ন্যাটো লিসবন সম্মেলনে ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক কনসেপ্ট গ্রহণ করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ক্রোয়েশিয়ায় সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এর মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয়ে গেল, একুশ শতকে ন্যাটো নতুন এক কৌশলগত ধারণা নিয়ে উপস্থিত হচ্ছে।
ন্যাটোর এ ভূমিকা অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বিশ্বকে কর্তৃত্ব করার প্রবণতা নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে প্রভাব বলয়কে কেন্দ্র করে জন্ম হয়েছিল স্নায়ুযুদ্ধের। আর ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে সেই স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটেছিল। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ওয়ারশ সামরিক জোট ভেঙে দেয়া হলেও ন্যাটো জোট ভেঙে দেয়া হয়নি বরং এর সম্প্রসারণ ঘটেছে। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন ন্যাটো ও ওয়ারশ জোটের মধ্যে সামরিক প্রতিযোগিতা এমন এক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল যে ইউরোপে একাধিকবার ‘পারমাণবিক যুদ্ধে’র আশংকা দেখা দিয়েছিল। সেই যুদ্ধ হয়নি বটে, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর পুরোটা সময় এ দুই শক্তির মাঝে প্রতিযোগিতা বজায় ছিল। দুই পরাশক্তিই ইউরোপে পারমাণবিক বোমা বহনযোগ্য অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র মোতায়েন করেছিল। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরই এ স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। এর প্রধান কারণ ছিল একটি- রাশিয়া এখন আর ইউরোপের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি নয়। দুটি আদর্শের (সমাজতন্ত্র বনাম পুঁজিবাদ) মাঝে যে দ্বন্দ্ব ছিল, সেই দ্বন্দ্বেরও অবসান ঘটে, যখন রাশিয়া আদর্শ হিসেবে মুক্তবাজার ও পুঁজিবাদকে গ্রহণ করে। উপরন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার অনেক আগেই ১৯৮৮ সালে গরবাচেভ ওয়ারশ সামরিক জোট ভেঙে দিয়েছিলেন। যে কারণে ইউরোপে রাশিয়ার উত্থান যুক্তরাষ্ট্র তথা ইউরোপের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি নয়। আর তাই নতুন করে এ অঞ্চলে স্নায়ুযুদ্ধের জন্মের আশংকাও ক্ষীণ। এখন ভারত মহাসাগর হচ্ছে সম্ভাব্য ক্ষেত্র, যেখানে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম হতে যাচ্ছে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে চীন। চীনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভয় ও শংকা’ এখন অনেক বেশি। প্রথমত, তত্ত্বগতভাবে চীন এখন আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। কিন্তু একটি অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন এখন বিশ্বকে কর্তৃত্ব করছে। চীন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হওয়ায় তা এখন মার্কিন স্বার্থকে আঘাত করছে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে নিজের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সচল রাখছে। এটা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অনেকেরই অপছন্দের। গত ৮ জুন নয়া চীনা প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। এ সফরে ওবামার সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক হয়েছে। কিন্তু তারপরও বেশকিছু ইস্যুতে বিরোধ রয়েছে। তৃতীয়ত, দক্ষিণ এশিয়া তথা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের প্রভাব বাড়ছে। এটা মার্কিনিদের চিন্তার কারণ। বিশেষ করে ভারত মহাসাগর ও আফগানিস্তানের ব্যাপারে তাদের আশংকার কারণ রয়েছে যথেষ্ট। ২০১৪ সালে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন সৈন্য ও সেই সঙ্গে সব বিদেশী সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিচ্ছে না। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। এ কারণেই তথাকথিত ‘অংশীদারিত্ব চুক্তি’ করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি ন্যাটোকে ব্যবহার করে এ অঞ্চলে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। আর ন্যাটোর স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম এক ধরনের কর্মসূচি যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চায়। তাই যুক্তিসঙ্গত কারণেই ভারতকে প্রয়োজন রয়েছে ওবামা প্রশাসনের। ভুলে গেলে চলবে না জাতিসংঘের সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলনে (২০১৩) যোগ দেয়া যে ক’জন সরকারপ্রধানকে ওবামা হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তার মাঝে অন্যতম ছিল ভারত। গত ২৭ সেপ্টেম্বর মনমোহন সিং হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। ভুলে গেলে চলবে না, যুক্তরাষ্ট্রকে তার স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে হলে তার ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। ভারত উঠতি শক্তি। সামাজিক তো বটেই, অর্থনৈতিক শক্তিও বটে। মার্কিন স্বার্থ বিঘ্নিত হবে যদি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র সেটা কখনোই চাইবে না।
বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কখনও একক কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশের ব্যাপারে মার্কিন নীতি ভারতীয় মনোভাব দ্বারা প্রভাবান্বিত। বাংলাদেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে। দাতা দেশগুলোর উদ্যোগ কিংবা জাতিসংঘের মহাসচিবের ফোনের পরও সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। সরকার এককভাবে হাঁটছে। আর বিএনপি যাচ্ছে হার্ডলাইনে। সংলাপ প্রত্যাশিত হলেও সংলাপের কোনো সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না। সংলাপ নিয়ে পরস্পরবিরোধী মন্তব্যও লক্ষ্য করা যায়। তাই স্পষ্টতই মজিনার নয়াদিল্লি সফর নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছিল। নয়াদিল্লি সফর শেষ করে মজিনা ওয়াশিংটনে গিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনে যে তিনি বাংলাদেশের সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন, তা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। প্রশ্ন হচ্ছে, এক্ষেত্রে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের অবস্থান এক ও অভিন্ন কি-না? অর্থাৎ বাংলাদেশের নির্বাচনকে ঘিরে এ দু’দেশের মনোভাব এক কি-না? এখানে কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অবস্থান স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র চায় সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। এর আগে বাংলাদেশ সফর করে গিয়েছিলেন মার্কিন কংগ্রেসের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সম্পর্কিত পররাষ্ট্রবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান স্টিভ শ্যাবট। তিনিও বলেছিলেন ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে’র কথা। ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি দেখা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সঙ্গে। তার ওই সফরের পরপরই ঢাকা সফরে এলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক নবনিযুক্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি কি ভারতীয় নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক? ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা কি চান ‘সব দলের অংশগ্রহণে’ বাংলাদেশে একটি নির্বাচন হোক? আমার মনে হয়, ভারতও এটা চায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ভারতের স্বার্থেই মঙ্গল। নিশা দেশাই দেখা করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সঙ্গে। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশী নেতাদের মনোভাব জানলেন। এক্ষেত্রে মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। যুক্তরাষ্ট্র চায় ‘সব দলের অংশগ্রহণে’ একটি নির্বাচন। নিশা দেশাইয়ের সফরের পর এতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে না।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এবারের নির্বাচন হোক ভিন্ন ইশতেহারে by ড. শরীফ মজুমদার

ঠিক এই লেখাটি কিনা জানি না, তবে এ ধরনের একটি লেখার চিন্তা করেছিলাম ২০০৭ সাল থেকে। ২০০৭ সালে কানাডায় অধ্যয়নকালীন তাদের নির্বাচনমুখী গণতান্ত্রিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে টিভি চ্যানেলগুলোতে যে ডিবেট হতো, সেগুলো খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করার সুযোগ হয়েছিল। পরে পিএইচডি করতে ইংল্যান্ডের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া এবং ইউরোপিয়ান গণতান্ত্রিক ইশতেহার সম্পর্কে জানার ও দেখার সুযোগ হয়েছিল। ডেভিড ক্যামেরন যে নির্বাচনটিতে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন, সে নির্বাচনটি নিজের চোখে দেখার এবং নির্বাচনকালীন সেদেশে অবস্থান করার সুযোগটি নেহাত তুচ্ছ নয়। যা হোক, যে কথাটি প্রথমেই উল্লেখ করব তা হল নটিংহাম বা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বা শিক্ষকদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো আলাপচারিতা বা কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যায়নি। নির্বাচন যেন একটি স্বাভাবিক ঘটনা, যা তাদের কর্মস্থলের দৈনন্দিন দায়িত্বশীলতার ঊর্ধ্বে কিছু নয়। হয়তো সে কারণেই অক্সফোর্ড শব্দ ভাণ্ডারে ‘শিক্ষক নেতা’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। আবার উল্টোভাবেও হয়তো বা সত্য- এ শব্দটি তাদের কালচারে নেই বলে শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্বের ভূমিকায় আসীন হওয়ার কোনো প্রবণতা নেই। আমাদের দেশে সেই কালচার আজও জন্মানি; হয়তো সে কারণেই আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বললে হয় অক্সফোর্ডকে অবমূল্যায়ন করা হয় অথবা যিনি তা বলছেন, তার অক্সফোর্ড সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই বলেই ধরে নেয়া হয়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন এবং আগামী নির্বাচনে যে দলটি তাদের ইশতেহারে বলবে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই নির্বাচন করবেন এবং দলমত নির্বিশেষে তারা নির্বাচিত উপাচার্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবেন, তাদেরই আমরা গণতান্ত্রিক বলে ধরে নেব। রাষ্ট্র উপাচার্য নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে একটি কাঠামো প্রদান করতে পারে, যেখানে সরকারের মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীলতার চেয়েও একাডেমিক সদস্যদের কাছে প্রহণযোগ্যতা সম্ভাব্য নির্বাচিতের মানদণ্ড হিসেবে প্রাধান্য পাবে। উন্নত দেশগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নির্বাচনের পদ্ধতি সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্যক ধারণা থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ একমাত্র তাতে করেই কিছু গবেষণার জায়গা তৈরি হবে বা ভঙ্গুর গবেষণার কাঠামোগুলো মজবুত করা সম্ভব হবে। গবেষণা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অর্থ হয় না।
রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপের কারণে আজ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইমেজ প্রায় ধ্বংসের মুখে। আদালত যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে মাদ্রাসার ছাত্র ভর্তির আদেশ দিতে পারেন, তাহলে একজন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া ছাত্র বা ছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না দিলে আদালত কীভাবে চুপ করে থাকতে পারেন? ছাত্র ভর্তির আদেশ যদি স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ না হয়, তাহলে একটি সর্বোচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্রের অধিকার নিশ্চিত করতে চাওয়াটা কীভাবে স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপের শামিল হবে? স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নিয়োগ পাওয়া দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ শিক্ষকরা শিক্ষকতায় দ্বিতীয় শ্রেণীর মনমানসিকতার ধারাবাহিকতা রেখে যাওয়ার জন্য সব নিয়ম-নীতির ঊর্ধ্বে উঠে যে দলীয়করণে ব্যস্ত, মুক্তিযোদ্ধা সনদ কি তাদের সে অধিকার দেয়? জাতির ভবিষ্যৎ নষ্ট করার জন্যই কি জাতি তাদের প্রতি অনুকম্পা দেখিয়েছিল? অনেক পশ্চিমা দেশে একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার আবেদনের ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা আছে। জাতি এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে এ বিষয়গুলো নিয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা চায়।
ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই সময়ের আলোকে নতুন করে ভাবতে হবে। ছাত্রদের এহেন রাজনীতি চর্চার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনো দেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন এসে যায়, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আমরা ইচ্ছে করলেই একটি বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি চালু রাখতে পারি কিনা বা রাখতে চাওয়া উচিত কিনা? ছাত্র রাজনীতির বর্তমান রূপটা ভারত থেকে আমদানি করা, এটা বিলাতি বাবুদের শেখানো কোনো কৌশল নয়। কিন্তু যাদের কাছ থেকে আমদানি করেছি তাদের দিকে তাকালে দেখব, তারা আর এ সংস্কৃতি ধারণ করে না। হয়তো এটিই তাদের শিক্ষার বর্তমান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এখনই ছাত্র রাজনীতির ইতি টানতে না পারলেও সুশীল সমাজ আশা করবে, এ ব্যাপারে তারা জাতিকে একটি ভবিষ্যৎ সময়সীমা জানিয়ে দেবে এবং সে সময়ের মধ্যে যে কোনো মূল্যে সব রাজনৈতিক দল তাদের ছাত্র সম্পৃক্ত কার্যক্রমের ইতি টানবে। রাজনীতি সচল রাখার জন্য দলগুলো ছাত্র নেতাদের পরিবর্তে বিভিন্ন পেশায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রেখেছেন- এ ধরনের নাগরিকদের বেছে নিতে পারে। এতে রাজনীতিতে যেমন অধিকতর ভদ্রতার সঞ্চালন হবে, তেমনি বিভিন্ন পেশায় একটি প্রচ্ছন্ন সুস্থ প্রতিযোগিতারও সঞ্চালন হবে। জনগণ আশা করবে, এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলো অবশ্যই ছাত্র রাজনীতির ইতি টানার ব্যাপারে সময়োপযোগী অঙ্গীকার করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো নিয়ে গণতান্ত্রিক ইশতেহারের কথা চিন্তা করার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব কাঠামো নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিশ্র“তি এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিফলিত হওয়া একান্তই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে রাজনীতিকে পরিবারতন্ত্রের মধ্যে বেঁধে রেখে ত্যাগী রাজনীতিকদের প্রতি অবজ্ঞা দেখানোর ধৃষ্টতা একটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের কোনো দলীয়প্রধান চিন্তাও করতে পারেন না। ব্রিটেনে অবস্থান করায় সে সময়কার লেবার দলের নতুন নেতা নির্বাচনটা মিডিয়ায় দেখার সুযোগ হয়েছিল। তাতে মনে হয়েছে, আমরা বোধহয় গণতন্ত্র নামের বৃক্ষটির গোড়া কর্তন করে অগ্রভাগে পানি সঞ্চালন নিয়ে ব্যস্ত। সুশীল সমাজ আশা করবে, দুই নেত্রী তাদের জীবদ্দশায় পরিবারতন্ত্রের বাইরে গিয়ে সত্যিকারের গণতন্ত্রের বীজ বপন করে যাবেন। যাতে তাদের অবর্তমানে জনগণ তাদের রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করে, তাদের পরিবারের আদর্শকে নয়। দলীয়প্রধান নির্বাচনটি একটি জাতীয় নির্বাচনের মতোই স্বচ্ছ হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এটি একটি প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের মূলভিত্তি। ৪০ বছর চর্চার পর গণতন্ত্রের এ ভিত্তির প্রতি সবার আন্তরিক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। হয়তো এখানেই নিহিত রয়েছে বহুবিধ জাতীয় সমস্যার সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাধান।
মুখে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বললাম, আর নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে দুর্নীতিবাজ লোকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলাম- এ ধরনের দ্বিমুখী নীতি থেকে দলীয়প্রধানদের বেরিয়ে আসতে হবে। ২০১৩ সালের বাংলাদেশের জনগণ দলীয় দুর্নীতিবাজদের এভাবে পুরস্কৃত করা রাজনৈতিক দলকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করবে- সেটাই হোক এবারের নির্বাচনে জনগণের ইশতেহার। শুধু তাই নয়, সরকারে থাকাকালীন দুর্নীতি করে যারা অবৈধ অর্থ বানিয়েছে, যাদের দুর্নীতির কারণে দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প ভস্তে গেছে, তাদের সম্পর্কে দলীয়প্রধানের অবস্থান পরিষ্কার না করলে সে দলকেও জনগণ আগামী নির্বাচনে প্রত্যাখ্যান করবে- সেটাই হোক এবারের নির্বাচনের প্রতিপাদ্য। জনগণের একটি বড় অংশ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্ধ নয় এবং জনগণের সেই অংশটিই এবারের নির্বাচনের ফলাফল তৈরি করবে। বিশ্বের সব প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশে এই ভাসমান ভোটাররাই সরকার নির্বাচন করে এবং এই ভাসমান ভোটারদের পছন্দ অনুযায়ীই রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করতে হয়। প্রতিটি নির্বাচনেই এই ভাসমান ভোটারদের পছন্দ-অপছন্দের কথা বিবেচনায় রেখে বহু পুরনো মূল্যবোধের বাইরে এসে রাজনৈতিক দলগুলোকে সময়োপযোগী নির্বাচনী ইশতেহারের কথা ভাবতে হয়। মনোনয়ন প্রার্থীদের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ এবং সেই ঋণ কতটা পরিশোধ করা হয়েছে, কী কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা দেশের কাজে আদৌ ব্যবহার করা হয়েছে কি-না, নাকি দেশের বাইরে পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে বাড়ি-গাড়ি কেনার কাজে ব্যবহার হয়েছে, সে ব্যাপারগুলো এবার জনগণ তথা ভাসমান ভোটাররা খুব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে এবং সে ধরনের ব্যক্তিবিশেষের হাতে মনোনয়নের টিকিট তুলে দিলে সেই টিকিটধারীদের ‘না’ বলতে এবারের ভাসমান শিক্ষিত তরুণ সমাজ একটুও দ্বিধা করবে না।
রাজনৈতিক দলের নেতারা ক্ষমতায় খাকাকালীন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কী পরিমাণ অর্থ নিয়েছেন, সে অর্থ কোন খাতে ব্যবহার করেছেন তার একটি হিসাব প্রতি প্রার্থীকেই জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। ব্রিটেনের মতো দেশে এ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ করায় বহু এমপির সদস্যপদ হারানোর মতো ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। আমাদের দেশে এখনও সে ধরনের কোনো ঘটনা না ঘটাটা শুধু অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতার অভাবের কথাই মনে করিয়ে দেয়। জাতি এবারের নির্বাচনে ও নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর স্পষ্ট প্রতিশ্র“তি শুনতে চায়।
ড. শরীফ মজুমদার : সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে by মুহাম্মদ রুহুল আমীন

আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ তাদের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর হঠকারী, অদূরদর্শী ও আত্মকেন্দ্রিক নীতির কারণে দেশে শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ঔপনিবেশিক ও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শাসনের করাল গ্রাস থেকে দেশমাতৃকার মুক্তি-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা রেখে যে দলটি আপামর মানুষের মনে অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর জনপ্রিয়তার অবিস্মরণীয় রেকর্ড তৈরি করেছে, সেই আওয়ামী লীগ সাম্প্রতিককালে নানা কারণে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী দলটির হ্রতগৌরব পুনরুদ্ধারে বর্তমান বিস্ফোরণোন্মুখ রাজনৈতিক অবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। স্বাধীন সার্বভৌম সোনার বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়ে যে নতুন দেশটির মানচিত্র ছিনিয়ে এনেছিল, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিএনপি গণতন্ত্রায়ন ও উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে সেই দেশটিকে গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় এ দুটি বৃহৎ দলের নেতারা বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার মৌলিক রাজনৈতিক আদর্শ, চেতনা ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য বিস্মৃত হয়ে কেবল আত্মকেন্দ্রিক ও দলকেন্দ্রিক লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিতে শুরু করেন। ফলে জাতীয় মুক্তি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে তাদের অবদান দিন দিন অপসৃত হতে শুরু করে, যা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
নজিরবিহীন ম্যান্ডেট নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠন করে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহাজোট সরকারের ব্যাপক সাফল্য অর্জিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়নে বর্তমান সরকারের সেই সাফল্যগাথা স্থান পায়। দুর্ভাগ্যবশত বিভিন্ন মন্ত্রী, সরকারদলীয় এমপি, সরকারের মদদপুষ্ট আমলা ও নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শী, একপেশে ও ব্যক্তি-পারিবারিক-গোষ্ঠী স্বার্থের কাছে বলি হয় বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকারগুলো। প্রথম দিকে পত্রপত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সেমিনার-সিম্পেজিয়ামের মাধ্যমে সরকারের সেই ভ্রান্ত নীতি ও কার্যকলাপগুলোর একাডেমিক মূল্যায়ন শুরু করা হয়। সুশীল সমাজের এ প্রয়াসের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতাসীনদের গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সঠিকপথে দেশ পরিচালনার জন্য সরকারকে সহযোগিতা করা। কিন্তু বেদনাদায়ক বিষয় হল, এক পর্যায়ে রেডিও, টিভি ও পত্রপত্রিকার বিরুদ্ধে সরকারের শীর্ষ দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিষোদগার করতে থাকেন। আত্মসমালোচনার পরিবর্তে আত্মপক্ষ সমর্থনের এ ভ্রান্ত নীতি সরকারকে আত্মসংশোধনের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে বেশ অন্ধ করে তোলে। দিন দিন সরকারের গঠনমূলক সমালোচনায় বিভিন্ন মহল সোচ্চার হয়ে ওঠে, যা দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরাম পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। কোনো এক বিদগ্ধ ব্যক্তি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের ভ্রান্ত নীতির সমালোচনায় দেশের সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, রেডিও, টিভি, পত্রপত্রিকা, বিদেশী সংস্থা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে বেশি সোচ্চার। এমন নিখাদ মূল্যায়ন সরকারের জন্য আশীর্বাদ হতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, আমাদের সরকার কখনও সমালোচনা থেকে শিক্ষা নেয় না, বরং সমালোচনাকে বৈরিতা হিসেবে বিবেচনা করার ভুল পথে হাঁটতে থাকে। মহাজোট সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতি ও কর্মপরিকল্পনা ভণ্ডুল হলেও সরকার তা থেকে শিক্ষা নেয়নি। উদাহরণস্বরূপ, দুর্নীতির অভিযোগে প্রতিশ্র“ত পদ্মা সেতু নির্মিত হতে না পারলেও সরকার বিষয়টি নিয়ে তেমন মাথা ঘামিয়েছে বলে মনে হয়নি। এছাড়া শেয়ারবাজার কেলেংকারি, ব্যাংক জালিয়াতি, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারি লোকজনের সংশ্লিষ্টতা হ্রাস করে শুদ্ধি কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে জনপ্রিয়তার মানদণ্ড ধরে রাখতে সরকার কোনো কার্যকর নীতি গ্রহণ করেনি।
এতসব ভ্রান্ত নীতির পরও নানামুখী সাফল্যের কারণে সরকার জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারত, যদি নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে সক্ষম হতো। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ একাট্টা। একটি সংবাদপত্রের জরিপে শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ নির্দলীয়-নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে মত দিয়েছে। মজার বিষয় হল, নির্দলীয় সরকারের পক্ষে একসময় যারা সোচ্চার ছিলেন, তাদের অনেকে আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্বে রয়েছেন এবং অনেকে পুরনো নেতৃত্বের আসনে ছিলেন। অর্থাৎ নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল। সেই গণদাবি, যা জাতীয় দাবির সুরেই নিনাদিত, কখনও কি তা সরকারের কাছে বিবেচ্য হয়েছে?
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেত্রীর ফোনালাপের পর আমরা আশ্বস্ত হয়েছিলাম ও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সহিংস ঘটনাগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করলে আমাদের বলতেই হবে, জনগণের জানমালের প্রতি রাজনীতিকদের মমতা-ভালোবাসার ঘাটতি প্রচুর। কেবল দুটি দলের একগুঁয়েমির জন্য, হরতালের পর হরতালের জন্য এবং ভ্রান্ত নীতির কারণে আজ জাতীয় নিরাপত্তা, ব্যক্তি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা মুখ থুবড়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে আমরা সর্বাত্মক জাতীয় সংকটের গহীনে ডুবে যাচ্ছি- এ দূরদৃষ্টি রাজনীতিকদের লোপ পাওয়ার কথা নয়।
হরতালের অজুহাত দেখিয়ে বিরোধীদলীয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ-আমন্ত্রণ অবজ্ঞা করে ভুলই করেছেন। আবার হরতাল শেষে বিরোধীদলীয় নেত্রীর সংলাপ প্রস্তাবনায় সাড়া না দিয়ে প্রধানমন্ত্রীও নির্ভুল ভূমিকা রাখতে পারেননি। ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই আহূত দু’দলের মহাসচিব পর্যায়ের আলোচনার উদ্যোগ বিএনপি সমর্থন করলেও আওয়ামী লীগের অনিচ্ছার কারণেই ব্যর্থ হয়েছে। সবশেষে গঠিত সর্বদলীয় সরকারের কাঠামোটি বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এটি মূলত মহাজোটের মোড়কেই আচ্ছাদিত। যদি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে হয়, তাহলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত দলগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সেই সরকারে প্রতিনিধিত্ব করার পরিবেশ, সুযোগ ও ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। এজন্য দরকার সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের একটি কার্যকর সংলাপ। রাজনীতিতে আইনের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু নৈতিকতা, সামাজিক শিষ্টতা ও আচার-আচরণও অনেক সময় আইনের ঊর্ধ্বে স্থান পায়। কোনো একটি ইস্যু আইনি প্রক্রিয়ায় শুদ্ধ হলেও সামাজিক ও নৈতিক প্রক্রিয়ায় তা অসমর্থিতও হতে পারে।
সার্বিক বিবেচনা সামনে রেখে অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং আমাদের সংবিধানের ধারা সমুন্নত রেখেই কেবল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সমাধান করা দরকার। এই একটি জায়গায় এসে থমকে গেছে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের শেষ সুযোগ। আমরা এখনও আশা করব, জনপ্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ তার জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার করতে এবং তা ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
মুহাম্মদ রুহুল আমীন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জানোয়ারের সঙ্গেও কেউ এমন করে না

ব্রিটিশ নাগরিক শাকের আমির বিগত এগারো বছর ধরে গুয়ানতানামো বে কারাগারে বন্দি আছেন। যুক্তরাজ্য সরকারের চাপের কারণে শাকের আমিরকে মুক্তি দেয়ার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি আমিরের রেকর্ড করা একটি গোপনবার্তা প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল সিবিএসতে প্রচারিত হয়। এরপর থেকেই আবারও গুয়ানতানামো বে কারাগার ও এর ভেতরে থাকা বন্দিদের নিয়ে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। টেলিভিশনটির ৬০ মিনিটের একটি অনুষ্ঠানে শাকের আমির বলেন, ‘দয়া করে পৃথিবীকে সত্যিটা জানতে দিন। আমরা আর পারছি না। আমরা ক্লান্ত। হয় আপনারা আমাদের শান্তিতে মরতে দিন, নয়তো বিশ্ববাসীকে এই গুয়ানতানামো নরকের সত্যিটা জানান। বিশ্ববাসীকে শুনতে দিন এখানে কি ঘটছে। এখানে আধামিটার রাস্তাও চেইন ছাড়া হাঁটা অসম্ভব। একে কি মানুষ বলে?
জানোয়ারের সঙ্গেও কেউ এমন করে না।’ ২০০২ সালে কোনো ধরনের মামলা বা অপরাধ ছাড়াই আমিরকে গ্রেফতার করে গুয়ানতানামো বে’র কারাগারে পাঠানো হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে আমিরের বিষয়টি নিয়ে অনেকবার আলাপ করার চেষ্টা করলেও কোনো সফলতা আসেনি। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালের একজন মুখপাত্র সোমবার রাতে জানায়, ‘মার্কিন সরকার মি. আমিরের ব্যাপারটি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে পরিষ্কারভাবেই জানাতে চাই যে, আমরা আমিরকে মুক্ত অবস্থায় অতিসত্বর যুক্তরাজ্যে দেখতে চাই। প্রধানমন্ত্রী আমিরের ব্যাপারটি নিয়ে জি-৮ সম্মেলনের সময়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে কথা বলেছেন।’ মুখপাত্র আরও জানায়, ‘প্রধানমন্ত্রী পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট ওবামাকে মি. আমিরের মুক্তি বিষয়ে একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের সহকারী প্রধানমন্ত্রী নিজে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে মি. আমির বিষয়ে কথা বলতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন। আমরা আশাবাদী যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার যুক্তরাজ্যের অনুরোধের গুরুত্ব বুঝতে পারবে এবং মি. আমিরকে মুক্তি দেবে। কারণ মি. আমিরের মুক্তির বিষয়টি পুরো যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে।’ শাকের আমির একজন ব্রিটিশ নাগরিক। স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে তিনি দক্ষিণ লন্ডনে থাকতেন। যুক্তরাষ্ট্র তাকে বরাবরই তার জন্মভূমি সৌদি আরবে পাঠানোর হুমকি দিয়ে আসছিল। কিভাবে আমিরকে আফগানিস্তানের বাগরাম কারাগারে অত্যাচার করা হতো তা আমিরের ভাষ্যে উঠে আসে।

ম্যান্ডেলার বর্ণাঢ্য জীবনের আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু

দক্ষিণ আফ্রিকার রাজধানী জোহানেসবার্গে চালু হল নেলসন ম্যান্ডেলা সেন্টার। আর এর মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র ও বর্ণাঢ্য জীবনের আলোকচিত্রের প্রদর্শনী শুরু হল। সোমবার দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা নেলসন ম্যান্ডেলা সেন্টারের উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, জোহানেসবার্গের উপকণ্ঠে হাগটনে অবস্থিত নেলসন ম্যান্ডেলা সেন্টার ম্যান্ডেলার বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। বিপুলসংখ্যক দর্শক সেন্টার পরিদর্শনে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সেন্টারে ম্যান্ডেলার শৈশবকাল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন স্মৃতিমূলক জিনিসপত্রাদি রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে শান্তিতে নোবেল জয়ী ম্যান্ডেলার বিভিন্ন আলোকচিত্র,
স্মারক ও ম্যান্ডেলার পছন্দের হাতের তৈরি বিভিন্ন বস্তু। দর্শনার্থীরা আরও দেখতে পাবেন শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গদের বিভেদ অবসানের নায়ক আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) সাবেক প্রধানের জেলে থাকার সময় পরিবার ও দলের নেতাদের লেখা চিঠি। গত সেপ্টেম্বরে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর সবশেষ তার অবস্থা জানা যায় এ সপ্তাহের শুরুতে। জানা যায়, তিনি কথা বলতে পারছেন না। আকার-ইঙ্গিতে যোগাযোগ করছেন। জ্যাকব জুমা নেলসন ম্যান্ডেলাকে তার বাড়িতে দেখতে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, সাবেক প্রেসিডেন্টের অবস্থা আগের মতোই রয়েছে। বিবিসি।