Showing posts with label গোলাম মর্তুজা. Show all posts
Showing posts with label গোলাম মর্তুজা. Show all posts

Wednesday, October 23, 2019

ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করব? by গোলাম মোর্তোজা

রাজনীতি বা সমাজকে যেভাবে দেখি সেভাবে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি। ক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রশ্ন করতে পছন্দ করি। বিশ্বাস করি, একজন ক্ষুদ্র সংবাদকর্মী হিসেবে এটাই দায়িত্ব। আমার বিশ্লেষণের সঙ্গে সবাই একমত হবেন, তা মনে করি না। প্রশ্ন করলেই উত্তর পাওয়া যাবে, তেমন ধারণা নিয়েও বসে থাকি না। আমাদের বিশ্লেষণ বা প্রশ্ন ক্ষমতাসীনরা বিবেচনায় নিবেন বা নেন, বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। এতে তারা বিরক্ত হন, ক্ষুব্ধতারও প্রকাশ ঘটান। তবুও নিজের কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করি।
গত প্রায় ২৫ বছর এভাবেই কাজ করছি, কথা বলছি, লিখছি। ক্ষমতায় যেই থাকুক, আমার কলমের ভাষা একই রকম থেকেছে। তা গোপনীয় কিছু নয়, সবই দৃশ্যমান। প্রিন্ট মিডিয়াতে হাতে খড়ি। পরবর্তীতে নানা আঙ্গিকে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে জড়ালেও এখন পর্যন্ত  সনাতন গণমাধ্যমই আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজের জায়গা।
যে কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলনামূলক অনেক দেরিতে নাম লেখানো। যে মাধ্যমে রাতারাতি মানুষ তারকা বনে যায়, সে মাধ্যমে ভরসা করতে একটু সময় নিয়েছি। কিন্তু এক পর্যায়ে শুধু যোগাযোগের সহজতম মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ব্যবহার করতে শুরু করি ২০১৩’র মাঝামাঝি সময় থেকে। অল্পদিনেই ফলোয়ারের সংখ্যা যখন লাখ খানেক ছাড়িয়ে গেল, বুঝলাম সনাতন মিডিয়ায় কাজের কারণে এতোদিনে যে পাঠক শ্রেণী তৈরি হয়েছে, তাদের মতামত জানার দ্বিপাক্ষিক প্লাটফরমটা দুই পক্ষের জন্যই উপযোগী। আস্তে আস্তে একটা অভ্যস্ততায় পরিণত হলো ফেসবুক। 
অথচ আমার এই ফেসবুক ব্যবহার কখনোই খুব স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক ছিলো না। ব্যবহার শুরুর পর থেকেই নানাবিধ সমস্যায় পড়ছিলাম। রিপোর্ট করে আইডি ডিজেবল করে দেয়ার ঘটনা ধারাবাহিকভাবে চলছিল। গত প্রায় ৫ মাস যাবৎ আমার ফেসবুক ব্যবহার একেবারেই বন্ধ।
এর আগে ২০১৮ সালে আইডি টানা প্রায় দুই মাস বন্ধ ছিল। প্রথমে আইডি হ্যাকড করা হয়েছে, তারপর ফেসবুক ডিজেবল করে দিয়েছে। পরিচিতজন, শুভানুধ্যায়ীরা এগিয়ে এসেছেন। তাদের সহায়তায় ফেসবুকের হেড কোয়ার্টারের এক বড় কর্তার সঙ্গে যোগাযোগ হলো। আনঅফিসিয়ালি জানলাম যা লিখি তা যাদের পছন্দ নয়, তাদের চাওয়ায় আইডি ব্লক করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ফেসবুক নির্দিষ্ট করে কোনো কারণ দেখাতে পারেনি, যার প্রেক্ষিতে তারা আইডি ব্লক করে দিয়েছিল। আইডি আবার খুলে দিল। ছোটখাটো ঝামেলার মধ্য দিয়ে চলছিল। গত মে মাসের ২০ তারিখে আইডি আবার ডিজেবল করে দিল ফেসবুক। এবারও ডিজেবল করার ক্ষেত্রে কোনো কারণ দেখায়নি। শুধু ইমেল দিয়ে জানিয়েছে, আইডি যে আমারই- ফেক নয়, তা প্রমাণ করতে হবে।
পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, সাংবাদিকতার অফিসিয়াল পরিচয়পত্রসহ ফেসবুককে চার থেকে পাঁচ বার ইমেল করে প্রমাণ দিলাম। ফেসবুক একবারও জবাব দিল না। এরপর ইউরোপের একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আমার হয়ে ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ফেসবুক তাদের জানায়, এই আইডিটি আর খুলে দেয়া সম্ভব নয়। সম্ভবত: ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আমার আইডি ডিলিট করে দিয়েছে। ফেসবুক আমাকে কোনো কারণ জানায়নি। ফেসবুককে বারবার চ্যালেঞ্জ করে লিখেছি, নিয়মবহির্ভূত একটি শব্দও কখনো পোস্ট করিনি। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ইতিপূর্বে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন ব্যক্তির আইডি ও পেজ ডিলিট করে দিয়েছিল, গুজব ও অসত্য প্রপাগান্ডা চালানোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে। যাদের আইডি ও পেজ ডিলিট করে দিয়েছিল, তারা ফেসবুককে চ্যালেঞ্জ করা তো দূরে থাকুক প্রকাশ্যে বলতেও পারেনি যে, তাদের আইডি ডিলিট করে দিয়েছে। কারণ তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শতভাগ সত্য ছিল, তথ্য-প্রমাণ ছিল। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সত্য বা অর্ধসত্য বা অসত্য কোনো তথ্য-প্রমাণ ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। কারণ আমি অসত্য বা প্রপাগান্ডামূলক কর্মকাণ্ড কখনো ফেসবুকে পোস্ট করিনি।
বর্তমান পৃথিবীতে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফেসবুক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। ফেসবুক আইডি না থাকায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছিলাম। এমন অবস্থায় কয়েকদিন আগে একজন শুভাকাক্ষীর বুদ্ধি ও পরামর্শে ফেসবুকে একটি পেজ খুলেছি। নতুন একটি আইডিও খুলতে হয়েছিল পেজে প্রবেশের জন্যে। নতুন আইডিতে কোনো লেখা পোস্ট করিনি। আইডিটি সবার দেখার জন্যে উন্মুক্ত ছিল না। শুধু পেজে চার পাঁচটি লেখা পোস্ট করেছি। হঠাৎ করে দেখলাম ফেসবুক আমার নতুন আইডিও ডিজেবল করে দিয়েছে। কোনো কিছুই লিখলাম না! তবুও আইডি ডিজেবল? ক্লান্ত লাগছে। ফেসবুককে আর কিছু লিখিনি।
এখন প্রশ্ন হলো, আমি কেন ফেসবুক ব্যবহার করতে পারব না? কেন আমি মতপ্রকাশ করতে পারব না? এর জন্যে কাকে দায়ী করব?
‘সরকার কারও ফেসবুক আইডি বন্ধ করতে পারে না’- জোর প্রচারণা বা প্রপাগান্ডা চলছে। আবার সরকারের মন্ত্রীরা বারবার বলেছেন, ‘ফেসবুক এখন আমাদের কথা শুনতে শুরু করেছে।’
গত ২৯শে জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছিলেন, ‘চলতি বছরের শেষ দিকে এসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউব নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে বাংলাদেশ৷’ (ডয়চে ভেলে, ১৮ই অক্টোবর ২০১৯)।
সেই নিয়ন্ত্রণ কি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে?
সরকার আইডি বন্ধ করিয়েছে, এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমার কাছে নেই। সুতরাং সরকারকে দায়ী করতে পারছি না। ‘ফেসবুক সরকারের কথা শুনছে’- কী কথা শুনছে? কারও আইডি বন্ধ বা ডিলিট করে দিতে বললে, ফেসবুক কি সে ‘কথা শুনছে’? জানিনা, মন্ত্রীর ওই বক্তব্য ছাড়া কোনো প্রমাণ হাতে নেই।
আমার লেখা অন্য যে কারও কাছে গুরুত্বহীন হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সাল থেকে ২০১৯ সালের মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত ফেসবুকে যা লিখেছি, সবকিছু ডিলিট করে দিয়েছে ফেসবুক। কোনো কারণ জানায়নি। লেখা ও বহু ছবি সংগ্রহে নেই। ছিল শুধু ফেসবুকে।
এখন করণীয় কী? আমি কি আইনের আশ্রয় নিতে পারি? ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারি? পারলে কোথায় করতে পারি, দেশে না বিদেশে? দেশে বা বিদেশে আইন ব্যবসার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত আছেন, তাদের কেউ কি বুদ্ধি বা পরামর্শ দিতে পারেন? করতে পারেন সক্রিয় কোনো সহায়তা?
কয়েকদিন আগে নিউইয়র্কে কথা হচ্ছিল একজন সংবাদকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টের সঙ্গে। তার আইডি বারবার ব্লক করে দেয়ায় তিনি ফেসবুকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তারপর অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফেসবুক তার আইডি খুলে দেয়। যার কথা বলছি, তিনি একজন বাংলাদেশি আমেরিকান। তার ক্ষেত্রে ফেসবুক যা করেছে, আমার ক্ষেত্রেও কি তা করবে? আমার নামের আগে তো ‘আমেরিকান’ শব্দটি নেই। আমি তো বাংলাদেশের অতি সাধারণ একজন সংবাদকর্মী। আমার গায়ের রঙ কালো, আমি বাংলাদেশের নাগরিক, এ কারণেই কি ফেসবুক কর্তৃপক্ষ এসব নির্দয়-অগ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারছে?
মুক্তচিন্তা-বাক স্বাধীনতা-মতপ্রকাশ, কত কথাই না বলে ফেসবুক! অথচ আমার মতপ্রকাশে বাধা  তৈরি করছে। যারা মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়, ফেসবুক তাদের সহায়তা করছে?
একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কি কোনো অধিকার আছে এ ধরণের বৈষম্যমূলক আচরণ করার?

Friday, February 22, 2019

সরকারের ‘ঘুমে’ বাড়ছে কান্না by গোলাম মর্তুজা

দুটো বাঁকা হয়ে যাওয়া চাকা আর একটা কাঠামো দেখে বোঝা যায় এটা একটা পুড়ে যাওয়া রিকশা। তার ওপরে ভেজা সুতি কাপড় দিয়ে পুড়ে যাওয়া মানুষের দেহাবশেষ ঢেকে রেখেছেন স্থানীয়রা। একজন জানালেন, রিকশাটিতে এক দম্পতি ও একটি শিশু ছিল। তিনজনই রিকশার সঙ্গে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছেন।
চুড়িহাট্টার পুড়ে যাওয়া বাড়িটির সামনে ও পাশের সড়কটিতে এক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ নিমতলীর কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০১০ সালের ৩ জুনের বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় রাসায়নিকের আগুনে জ্বলে উঠেছিল নিমতলী, যাতে প্রাণ হারান ১২৪ জন। মুহূর্তেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চারদিকে পড়ে ছিল লাশগুলো। ঘিঞ্জি অলিগলির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাসায়নিক ব্যবসা বা শিল্প কারখানা কতটা বিপজ্জনক, আট বছর আগে তা দেখেছে মানুষ। কিন্তু শিক্ষা হয়নি। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে শেষ পর্যন্ত কাজটি আর হয়নি।
সেই নিমতলীর পুনরাবৃত্তি যেন চুড়িহাট্টায়। রাস্তা জুড়ে ১৫/২০টি পুড়ে যাওয়া রিকশার কাঠামো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দুটি পিকআপ ভ্যান, দুটি প্রাইভেট কার, কয়েকটি মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার কাঠামোও দেখা যায়। কোথাও কোথাও ধোঁয়া উঠছে। এগুলোর মধ্যেই মানব দেহের অবশিষ্টাংশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। স্থানীয়রা আগেই কয়েকটি দেহাবশেষ দেখে মসজিদ থেকে সুতি কাপড় ভিজিয়ে এনে ঢেকে দিয়েছেন।
এত মৃত্যু সবাইকে নির্বাক করে দিয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও বেঁচে থাকতে পেরে সৃষ্টিকর্তাকে বারে বারে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন বেঁচে যাওয়া মানুষেরা। রাত তখন শেষের পথে। তখন বিকট দুম দুম শব্দ করে বিস্ফোরণ ঘটছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানালেন, সুগন্ধির ক্যানিস্টারগুলো সশব্দে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বাজছে পুলিশ আর ফায়ার কর্মীদের বাঁশি। ফায়ার ইঞ্জিনগুলোর ঘরঘর শব্দ চলছেই। সেসব ইঞ্জিনের পোড়া ডিজেল আর সদ্য পুড়ে যাওয়া জনপদের ধোঁয়ায় একাকার পুরো এলাকা।
চকবাজারের এই এলাকাটি মূলত প্রসাধনী ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামাল বেচা কেনার কেন্দ্র। এই এলাকায় প্রচুর নকল প্রসাধনী বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। সারা দেশ থেকেই ব্যবসায়ীরা এখানে পাইকারি দরে প্রসাধনী কিনতে আসেন।
চুড়িহাট্টা মসজিদের উল্টোদিকের বাড়িটির ভূগর্ভস্থ তলাসহ একতলা ও দোতলায় গড়ে তোলা হয়েছিল সুগন্ধির বিশাল মজুদ। ওই বাড়ির সামনে এসে মিলেছে চারটি সরু গলি। রাত সাড়ে ১০টার দিকে আগুন লাগার সময় ওই গলির মোড়টি ছিল মানুষ, গাড়ি, মোটরসাইকেল আর রিকশা দিয়ে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। যানজটের কারণে থমকে ছিল সব। সুগন্ধির ক্যান ভর্তি বাড়ি থেকে আগুনটা রাস্তায় ছড়িয়েছে নাকি রাস্তার কোনো গাড়িতে লাগা আগুন ওই বাড়িকে গ্রাস করেছে তা নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, একটি প্রাইভেট কারের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। কিন্তু ঘটনাস্থলে দু’টি গাড়ির একটির সিলিন্ডার অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। আরেকটি গাড়ি হাইব্রিড (টয়োটা অ্যাকুয়া), যেটাতে কোনো সিলিন্ডার ছিল না।
চুড়িহাট্টা মসজিদ লাগোয়া গলিতে প্লাস্টিকের গুটির দোকানদার রেজাউল করিম তখন দুই কর্মচারীকে নিয়ে দিনের বেচা-কেনার হিসাব মেলাচ্ছিলেন। হঠাৎই বিকট বিস্ফোরণের শব্দে তাকিয়ে দেখেন থমকে থাকা রাস্তায় একটি গাড়িতে আগুন লেগে তা কয়েক ফুট শূন্যে উঠে গেছে। মুহূর্তেই আগুনের ঢেউ যেন গোটা রাস্তাটিকে গ্রাস করে। দুই কর্মচারীকে নিয়ে দৌড়ে বের হয়ে যান, দোকানের ঝাঁপ ফেলারও চিন্তা করেননি।
আবার ওই পথ ধরে তখন মোটরসাইকেলে যাওয়া ফারুক হোসেন বলেন, চার গলির ওই মোড়ের দুটি বড় রেস্তোরাঁ। সেগুলোর চুলার গরমে জায়গাটা এমনিতেই একটু গরম হয়ে থাকে। রাতে যাওয়ার সময় তিনি ওখানে রেস্তোরাঁর খাবারের গন্ধ ছাড়াও সুগন্ধির গন্ধ পান। ৫০ গজ এগোতেই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ পান। পরে ঘুরে ওই বাড়িটি থেকে আগুন জ্বলতে দেখেন।
স্থানীয়রা বলছেন, আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যেই তা ঢেউয়ের মতো করে চারপাশের রাস্তায় থাকা মানুষ ও যানবাহনগুলোকে গ্রাস করেছে। আশপাশে অনেক ভাসমান ফল বিক্রেতা, পান-সিগারেট বিক্রেতাও ছিলেন। আগুনে এই লোকগুলোর অনেকেই রাস্তার ওপরেই জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন।
আগুন লাগার পরে পুড়ে যাওয়া এসব যানবাহনের কাঠামোগুলো রাস্তার ওপরই ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে ছিল। কোনো কোনোটির তলায় মানুষের দেহাবশেষ।
এখানে এমন কোনো বাড়ি নেই যার নিচতলায় দোকান বা কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়নি। দোকানগুলোর মধ্যে প্রসাধনী ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্লাস্টিকের গুটির (চিপস) দোকান। স্থানীয়রা বলছেন, যে কয়টা বাড়িতে আগুন লেগেছে তার মধ্যে দু’টির নিচে গুটির দোকান ছিল। এগুলো দ্রুত জ্বলে আগুন বাড়িয়েছে।
এত ব্যস্ত ব্যবসায়িক এলাকা হলেও এখানে ঢোকার সড়কগুলো একেবারেই সরু। কোনো সড়কেই দু’টি গাড়ি পাশ কাটানোর জায়গা নেই। ফায়ার সার্ভিসের বড় পানিবাহী গাড়ি এখানে ঢুকতে না পারায় প্রচণ্ড সমস্যায় পড়তে হয়েছে। পাম্প দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের পুরোনো কারাগারের পুকুর থেকে পানি আনা হয়। যার কারণে পানির গতি ছিল কম। আর মানুষের পায়ের চাপে পাইপগুলো মাঝে মাঝেই পানিশূন্য হয়ে পড়ছিল। ফায়ার সার্ভিসের লোকদের মাইক নিয়ে বারবারই বলতে হচ্ছিল ‘পাইপগুলো পাড়াবেন না।’ এ ছাড়া চুড়িহাট্টা মসজিদ এবং আশপাশের কয়েকটি বাড়ির রিজার্ভ ট্যাংক থেকেও পানি সংগ্রহ করে ফায়ার সার্ভিস।
চুড়িহাট্টা মসজিদের অজু খানায় বসে কাঁদছিলেন আাবদুল আজিজ ও তাঁর মেয়ে। আজিজ জানান, তাঁর ১৮ বছরের ছেলে ইয়াসিন রনি এখানে ছিলেন। আগুন লাগার পর থেকে ইয়াসিনের ফোন বন্ধ, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
মো. রায়হান খুঁজছেন তাঁর বোন সোনিয়া, দুলাভাই মিঠু ও দুই বছরের ভাগনে শাহীদকে। আগুন লাগার সময় ওই পরিবারটি এই রাস্তা দিয়ে রিকশায় করে যাচ্ছিলেন।
ভাই আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ছবি মোবাইলে বের করে কান্নায় ভেঙে পড়েন মাইনুল হোসেন। পুরে যাওয়া বাড়িটির উল্টো দিকে হায়দার মেডিকো বলে একটি ওষুধের দোকান চালাতেন আনোয়ার। ঘটনার সময় সেখানে আনোয়ারের তিন বন্ধু নাসির, হীরা ও আরেক আনোয়ার ছিলেন। এদের কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
রাত ৩টার পর থেকে ঘটনাস্থলে পাওয়া মৃতদেহগুলো একের পর এক ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি মো. ইউসুফসহ কয়েকজন লাশ উদ্ধারের কাজ করছিলেন। হাত দু’টো দেখিয়ে ইউসুফ বলেন, ‘দেখছেন লাশ তুলতে তুলতে কেমন হয়ে গেছে।’
সকাল আটটা নাগাদ ঢাকা মেডিকেলে জমা হয়ে গেছে ৬৫টি লাশ। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাসপাতাল চত্বরে জমা হয়েছেন হাজারো মানুষ। কিন্তু অঙ্গার হয়ে যাওয়া এ লাশ তাঁরা চিনবেন কী করে? লাশ দেখে অসহায় মানুষগুলো কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ারও কেউ নেই।

Saturday, January 19, 2019

এবার চাকরি নিয়েই টানাটানি by গোলাম মর্তুজা ও অরূপ রায়

  • • শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মজুরিকাঠামো সমন্বয়।
  • • আন্দোলনরত শ্রমিকেরা চাকরি নিয়ে টানাটানিতে।
  • • ছাঁটাই ও মামলার প্রতিবাদে শ্রমিকেরা মাঠে নামবেন।
শ্রমিকদের এক সপ্তাহের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মজুরিকাঠামো সমন্বয় করা হয়েছে। অনেক শ্রমিক এখন কাজেও ফিরেছেন। কিন্তু আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সাভার-আশুলিয়া এলাকার শ্রমিকেরা চাকরি নিয়ে টানাটানিতে পড়েছেন। তাঁরা গ্রেপ্তার-আতঙ্কে রয়েছেন।
এর মধ্যেই বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ চুরি, ভাঙচুর, মারধর, কারখানার ক্ষতি করা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিককে আসামি করে মামলা করেছে। পুলিশ ২০ জন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছে। সব মিলিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে শঙ্কা, অস্বস্তি ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, মামলায় নাম উল্লেখ করা হয়—এমন শ্রমিকদের প্রায় সবাই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শ্রমিক রয়েছেন। ছাঁটাই ও মামলার প্রতিবাদে তাঁরা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আক্তার।
জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকার, মালিক ও শ্রমিকদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, কোনো নিরীহ শ্রমিককে হয়রানি করা যাবে না। শুধু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই বিশৃঙ্খলায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নেওয়া যাবে। সেই নির্দেশনা মেনেই কয়েকটি কারখানা মামলা করেছে। কোনো নিরীহ শ্রমিককে হয়রানি করা হচ্ছে না। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিষয়ে কোনো শ্রমিক কিংবা শ্রমিকনেতা আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। বিষয়টি আমার জানা নেই।’
ইতিমধ্যে আশুলিয়া থানায় আটটি এবং সাভার থানায় দুটি মামলা হয়েছে। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিজাউল হক গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় তাঁর থানায় দায়ের হওয়া আটটি মামলায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও কয়েকটি মামলা প্রক্রিয়াধীন, রাতে এগুলো হতে পারে। আর সাভার থানার পুলিশ জানিয়েছে, এই থানার দুটি মামলায় তারা আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গতকাল জামগড়া এলাকায় কথা হয় খুশি বেগমসহ কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে। তাঁদের পরিচিত কয়েকজন পুরুষ সহকর্মী মামলার আসামি হয়েছেন। তাঁরা কারখানায় আসছেন না। তাঁরা মামলার বিষয়ে তদবির করার জন্য এখন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মো. ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, চাকরিচ্যুত হয়ে তাঁদের কাছে বিপুল শ্রমিক আসছেন। এফএনএফ অ্যাপারেলস, আল গাউসিয়া গার্মেন্টস, নিট এশিয়া, ডনলিয়ন ১ ও ২, হলিউড গার্মেন্টস, এফজিএস ডেনিম, কেআরএফ গার্মেন্টস থেকে চাকরিচ্যুত শ্রমিকেরা যোগাযোগ করছেন। তাঁরা মামলারও ভয় পাচ্ছেন। আরেকটা ভয় হচ্ছে, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের নাম ‘অনলাইনে’ দিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ তাঁদের নামগুলো পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর একটা বিশেষ সার্ভারে কালো তালিকাভুক্ত হয়ে থাকে। এরপর ওই সব শ্রমিককে আর কোনো কারখানাই কাজে নেবে না।
বিপ্লবী গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শ্রমিক ফোরামের আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম বলেন, সাভারের উলাইল এলাকার কয়েকটি কারখানায় তাঁদের বেশ কিছু সদস্য মামলার আসামি হয়েছেন, চাকরিও হারিয়েছেন। ওই সব শ্রমিকের জন্য সংগঠনের নেতারা এখন আদালতে দৌড়াচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, চাকরিচ্যুত শ্রমিকেরা অন্য কারখানায় কাজ খোঁজা শুরু করেছেন। তবে অতীতে দেখা গেছে, এভাবে চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের একটা অংশকে পেশা বদলাতে হয়েছে।
মামলায় এলাকাছাড়া
স্থানীয় বাড়ির মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মামলার পর গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেক শ্রমিক এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
আশুলিয়া থানা সূত্রে জানা গেছে, ৮ জানুয়ারি চারাবাগ নিটিং অ্যান্ড ডাইং নামের একটি কারখানার নিরাপত্তা কর্মকর্তা আবদুস সালাম ৫৫ জনের নাম উল্লেখ করে ৩৫৫ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে কারখানায় ভাঙচুরসহ পাঁচ লাখ টাকার তৈরি পোশাক চুরির অভিযোগে মামলা করেন।
আশুলিয়ার বাড়ইপাড়া এলাকার মাহমদ ফ্যাশনসের ২৯ জন শ্রমিকের নাম উল্লেখ করে ৫৪ জনের বিরুদ্ধে ৯ জানুয়ারি মামলা হয়। মামলায় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের মারধর, তৈরি পোশাক চুরিসহ হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। একই দিন কাঠগড়া এলাকার অরবিট অ্যাপারেলসের ৫০ জন অজ্ঞাতনামা শ্রমিকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে মামলা হয়।
১০ জানুয়ারি কাঠগড়া এলাকার এ আর জিন্স প্রোডিউসার নামের একটি পোশাক কারখানার ৬১ জন শ্রমিকের নাম উল্লেখ করে ৩১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলায় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের মারধর, ভাঙচুর ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ আনা হয়। একই দিন নরসিংহপুরের নিট এশিয়া নামের একটি পোশাক কারখানার ৫০ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা হয়।
সাভার থানায় ১৩ জানুয়ারি ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরও ১৬৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে জে কে গ্রুপ। মামলায় মারধর, চুরি ও ক্ষতি করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এর আগে ৮ জানুয়ারি শিল্প পুলিশ অজ্ঞাতনামা দেড় হাজার শ্রমিকের বিরুদ্ধে সাভার থানায় মামলা করেছে।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, যাঁরা অপরাধ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেই মামলা হচ্ছে। কোনো নিরীহ শ্রমিক যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে খেয়াল রাখা হচ্ছে।
গতকাল কাঠগড়া এলাকার এ আর জিন্স প্রোডিউসারের সামনে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার সামনে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ১৭২ জন শ্রমিকের তালিকা টাঙানো। এখানকার কয়েকজন শ্রমিক বলেন, সাভার ও আশুলিয়ার অন্য সব কারখানার শ্রমিকদের মতো মজুরিকাঠামোর পরিবর্তনের দাবিতে তাঁরাও কাজ না করে কারখানা থেকে বের হয়েছিলেন। তাঁরা কারখানা ভাঙচুর, সড়ক অবরোধ বা কাউকে মারধর করেননি। এরপরও তাঁদের গণহারে বরখাস্ত করা হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অর্ধেকের নামেই মামলা হয়েছে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করেছে।
জানতে চাইলে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিরীহ শ্রমিকেরা যেন ছাঁটাই এবং হয়রানির শিকার না হন, বিষয়টি গত মঙ্গলবারের বৈঠকে আমরা বারবার বলেছি। নিরীহ শ্রমিকদের ছাঁটাই ও গ্রেপ্তার করা হলে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে কষ্ট থেকে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মামলা, ছাঁটাই ও পুলিশের ভয় দেখিয়ে শ্রমিকদের হয়তো সাময়িকভাবে দমানো যায়। তবে ভবিষ্যতের জন্য এসব ভালো না। তা ছাড়া এককভাবে শ্রমিকদের দোষ দিয়ে লাভ হবে না। সরকারের কাছে অনুরোধ, মালিকদের কোথায় গাফিলতি আছে, সেটিও খুঁজে বের করা দরকার। কারণ পোশাকশিল্প বড় হলেও খাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পরিপক্ব হয়ে ওঠেননি।’

Tuesday, July 10, 2018

‘হাতুড়ির নিচে জীবন’ by গোলাম মোর্তোজা

কবি বা কবিতা নিয়ে কথা বলার সময় নয় এটা। আবার কবির কবিতাই তো সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ। এরশাদের সামরিক নিপীড়নের কালে কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন ‘হাতুড়ির নিচে জীবন’। মাত্র তিন শব্দের বাক্য দিয়ে কবি যা বুঝিয়েছেন, লক্ষ শব্দ লিখেও তা বোঝানো কঠিন। সবচেয়ে বড় কথা কবিতার প্রাসঙ্গিকতা। যখনই লেখা হোক, বহু বছর বা যুগ পরেও তা প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বারবার।
চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গেও পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে ‘হাতুড়ির নিচে জীবন’।
কোটা সংস্কার বিষয়ে বহুদিন ধরে কিছু তর্ক চলছে।
কিছু প্রশ্ন সামনে আনা হচ্ছে। আজকের লেখায় সেই সব সাধারণ কিছু প্রসঙ্গ- প্রশ্ন বিষয়ে দু’একটি কথা দিয়ে শুরু করি।
১. ‘কোটা বাতিল করা যাবে না। আমি কোটার পক্ষে। কোটা থাকতে হবে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্যে কোটা থাকতে হবে’- একথা বলে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমালোচনা করছেন কেউ কেউ।
প্রথমত, সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে। কোটা সংস্কারের দাবিকে যৌক্তিক মনে করার অধিকার যেমন আছে, অযৌক্তিক মনে করারও অধিকার আছে।
দ্বিতীয়ত, কোটা থাকবে না, বাতিল করতে হবে- এ কথা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরতরা কখনো বলেননি। যৌক্তিক শতাংশে কোটা থাকার কথাই তারা সব সময় বলে এসেছেন। কোটা বাতিলের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী কোটা থাকার কথাও তিনি বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সংসদে এবং সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য যদি কার্যকর হয়, তবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা, নারী কোটা, জেলা কোটা থাকবে না।
সুতরাং যারা বলছেন ‘কোটা থাকতে হবে, বাতিল করা যাবে না’- তাদের দাবি করতে হবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। আন্দোলনকারীদের অবস্থান আর আপনাদের অবস্থানে কোনো পার্থক্য নেই, নেই সমালোচনারও কিছু।
২. ‘ যারা আন্দোলন করছেন, তারাই শুধু মেধাবী? যারা কোটায় চাকরি পাচ্ছেন, তারা কি মেধাবী নয়? তারাও তো বিসিএসে প্রিলিমিনারি, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই চাকরি পাচ্ছেন। সুতরাং তারাও মেধাবী।’
প্রথমত, বিতর্কটা কে মেধাবী, কে মেধাবী নয়- তা নিয়ে নয়। যিনি কোটায় চাকরি পাচ্ছেন তিনি মেধাবী নন, সে কথাও কেউ বলছেন না। মেধার ভিত্তিতে চাকরি আর মেধাবী, এই দুটি বিষয় সচেতন বা অসচেতনভাবে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যারা উত্তীর্ণ হবেন, তাদের ভেতর থেকে মেধার ভিত্তিতে চাকরি নিশ্চিত করা হোক। একথা সত্যি যে, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন সবাই (কোটা সুবিধা প্রাপ্তরাও)। পাশাপাশি আরও বড় সত্যি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একজন হয়তো ৩০০তম হয়ে চাকরি পাচ্ছেন না। আর কোটা প্রাপ্তজন হয়তো ৭০০তম হয়ে চাকরি পাচ্ছেন। শুধু বিসিএস পরীক্ষায় ৫৬ শতাংশ চাকরি হচ্ছে এই প্রক্রিয়ায়। এখানেই ‘মেধার ভিত্তিতে’ প্রসঙ্গ আসছে। কোটা প্রাপ্তজন মেধাবী নন, সেটা বলা হচ্ছে না। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ৩০০তম জন অবশ্যই ৭০০তম জনের তুলনায় মেধাবী এবং চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে তারই অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। যেহেতু সেটা ঘটছে না, সেহেতু দাবি তোলা হয়েছে ৫৬ শতাংশ নয়, কোটা ১০ বা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হোক। এতে বৈষম্য কমে আসবে। আরও একটি তথ্য সবার জানা থাকা দরকার, ৫৬ শতাংশ কোটা শুধু বিসিএসের ক্ষেত্রে। অন্যান্য ক্ষেত্রে কোটা অনেক বেশি। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নন ক্যাডার চাকরিতে কোটা ৬১ শতাংশ। ৭০ শতাংশ কোটা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে। রেলওয়েতে কোটা ৮২ শতাংশ। ৯৬ শতাংশ কোটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে।
৩. ‘কোটা সংস্কারের দাবিতে যারা আন্দোলন করছেন তারা বিএনপি-জামায়াত। তারা সরকারবিরোধী। তারা শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায়।’- এই অভিযোগ ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ নেতা এবং মন্ত্রীদের।
প্রথমত, গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা গত তিন মাস অনুসন্ধান করে কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দের কারও বিএনপি বা জামায়াত সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায়নি। সুতরাং আন্দোলনকারীরা সবাই বিএনপি বা জামায়াত এই বক্তব্যের কোনো ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, যে কোনো দাবি সরকারের কাছেই করতে হয়। সরকারের কাছে দাবি তোলা মানে সরকার বিরোধিতা নয়।
তৃতীয়ত, সরকারের বা সরকারের কাজের বিরোধিতা করার অধিকার দেশের সব নাগরিকের আছে। একইভাবে সমর্থন করার অধিকারও আছে। সরকারের কাজের বিরোধিতা করা মানে দেশের বিরোধিতা করা নয়, সরকার পতনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকাও নয়। সরকার আর দেশ বা রাষ্ট্র সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
চতুর্থত, অস্থিতিশীল যে পরিবেশ তৈরি করা হলো, তার দায় কার? কোটা সংস্কারের দাবি প্রধানমন্ত্রী মেনে নেওয়ার তিন মাস পরও প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। কবে হবে সে বিষয়েও কোনো ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেছেন, প্রজ্ঞাপন জারির কোনো অগ্রগতি নেই।
আন্দোলনকারীরা একটি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অবস্থান জানান দিতে চেয়েছিলেন। তারা রাস্তায় নেমে আসেননি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট ডাকেননি, গাড়ি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করেননি। মনে রাখা দরকার, গাড়ি বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা ছাড়া অন্যগুলো করার অধিকার তাদের আছে। সংবাদ সম্মেলনকারীদের উপর আক্রমণ করার অধিকার ছাত্রলীগের নেই। যে অধিকার নেই, সেই অধিকার প্রয়োগ করে ছাত্রলীগ নুরুলদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে। এখানে ‘মারামারি’ হয়নি। শুধু ‘মারা’ হয়েছে। ছাত্রলীগ কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আহত করেছে। লোহার হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পায়ের হাড় ভেঙে দিয়েছে। ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন করেছে, শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছে। একজন শিক্ষার্থী এখনও নিখোঁজ।
আন্দোলনকারীরা পরিস্থিতি ‘অস্থিতিশীল’ করেছে তার পক্ষে একটিও তথ্য বা প্রমাণ নেই। ছাত্রলীগ পিটিয়ে-নিপীড়ন করে পরিস্থিতি ‘অস্থিতিশীল’ করেছে, তার পক্ষে ভিডিও চিত্রসহ যাবতীয় প্রমাণ আছে।
প্রথমত, যে কোনো দাবি বা আন্দোলনের সঠিক প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা না করলে, বিরোধী দল সুযোগ নিতে চাইবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। এই সুযোগ নিতে চাওয়ার দায় আন্দোলনকারীদের নয়। এই দায় সরকারের। যদি বিরোধী দল কোনো সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, সেটা নিয়েছে সরকারের ভুল দমননীতির কারণে।
৪. শিক্ষার্থীদের জীবন চলে গেল হাতুড়ির নিচে, দেখার কেউ থাকল না। ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মামুন লোহার হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে কোটা আন্দোলনের নেতা তরিকুলের জীবন বিপন্ন করে দিয়েছে। ভিডিও চিত্রে মামুনের দানবীয়তা ধারণ করা আছে, এক্সরে রিপোর্টে আছে তরিকুলের টুকরো হয়ে যাওয়া পায়ের ছবি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার মেরুদণ্ড।
‘হাতুড়ির নিচে জীবন’র কিছু খণ্ড চিত্র-
ক. তরিকুলকে রাজশাহী সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা হয়নি। তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ করেছেন তরিকুলের ভাই-বোন- বন্ধুরা।
খ. নুরুলকে ঢাকা মেডিকেলের বারান্দায় ফেলে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা করা হয়নি। আনোয়ার খান মেডিকেলে আনা হয়েছে। পুলিশের ভয়ে মাঝরাতে হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। নুরুল নিজেই গণমাধ্যমকে সেকথা বলেছেন।
গাজীপুরের কোনো একটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। দরিদ্র বাবা জমি বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ছেলের চিকিৎসার জন্যে ঢাকায় এসেছেন।
গ. সবাই গাজীপুর থেকে চিকিৎসার জন্যে ঢাকায় আসেন। নুরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। কোনো অপরাধ ছাড়া তাকে পিটিয়ে আহত করেছে ছাত্রলীগ। তার চিকিৎসার দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা সরকার নিলো না। ঢাকা মেডিকেল বা বেসরকারি মেডিকেলে করতেও দিল না। তাকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে গাজীপুরে।
ঘ. ছাত্রীদের লাঞ্ছিত করা হয়েছে। শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের হুমকি দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
ঙ. কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা ফারুককে শহীদ মিনারে লাথি- ঘুষি- পিটিয়ে অজ্ঞান করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে গেছে ছাত্রলীগ। ভিডিও চিত্রে তা দেখা গেছে। একদিন পর জানা গেল ডিবি তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তুলে নিলো ছাত্রলীগ, পাওয়া গেল ডিবির কাছে!
চ. ‘আপনি কুলাঙ্গার ছেলের জন্ম দিয়েছেন। আপনার ছেলেকে গুম করে ফেলা হবে’- রাশেদের বাবাকে ফোন করে একথা বলেছেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেছেন রাশেদের বাবা। সোহাগ বলেছেন, রাশেদের বাবা অসত্য বলছেন।
জ. সাপ মারার মতো একজনকে দশ বারোজন মিলে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে ক্ষত-বিক্ষত এবং লোহার হাতুড়ি দিয়ে রড সোজা করার মতো আঘাত করে পায়ের হাড়-কোমর ভেঙে দেওয়া নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বা প্রশাসন একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। সহস্রাধিক শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ১৪ জন তরিকুলদের নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছেন। ভিসি এই ১৪ জনকে বলেছেন ‘সরকারবিরোধী’। তিনি বলেছেন, সরকারি সুযোগ সুবিধা নিয়ে শিক্ষকরা সরকারের বিরোধিতা করছেন।
শিক্ষকরা যে মুক্তচিন্তা, মুক্ত কথা বলার অধিকার রাখেন, ৭৩’র অধ্যাদেশ তাদের সেই অধিকার দিয়েছে, ভিসি মহোদয় তা ভুলে গেছেন।
ঝ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর নিপীড়ন বা ছাত্রলীগের হামলা বিষয়ে প্রথম তিন দিনে কিছু জানেনইনি। ভিসি বলেছেন, গ্রেপ্তার ছাত্রদের দায় বিশ্ববিদ্যালয় নেবে না। ‘শিক্ষক সমিতির কাজ শিক্ষকদের স্বার্থ দেখা’- বলেছেন শিক্ষক নেতা। বলেননি যে, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ দেখা বা তারা নিপীড়িত হলে তাদের দেখা শিক্ষকদের দায়িত্ব নয়। এমন বাক্য না বলেও তা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। দুই হাজারের অধিক শিক্ষকের মধ্যে নিপীড়নের প্রতিবাদ করছেন অল্প কয়েকজন শিক্ষক। উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের পক্ষে শিক্ষক- আইনজীবী- সমাজকর্মীরা প্রতিবাদ করছেন। পুলিশ তাদেরও অপমান- অসম্মান করছেন।
৫. বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে কর্মক্ষম মানুষের সাংখ্য প্রায় ১১ কোটি। এর মধ্যে কাজ নেই প্রায় সাড়ে ৪ কোটি কর্মক্ষম মানুষের। অর্থনীতির অবস্থা ভালো, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’-এই চিত্রের মাঝেও সাড়ে ৪ কোটি মানুষ বেকার।
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, এই একটি পরিসংখ্যান তার প্রমাণ বহন করছে। যারা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করছেন, তারা এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীরই অংশ। আন্দোলনকারীদের উপর হামলা যারা করছে, তারাও এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অংশ। মূল সমস্যা কাজের নিশ্চয়তার অভাব। বিনিয়োগ বা কর্মক্ষেত্র বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ না দিয়ে, কোটা বৈষম্য দূর না করে, হাতুড়ি পেটা করে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দমন করা যাবে বলে মনে হয় না। আরও বড় হানাহানির আশঙ্কা তৈরির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সূত্রঃ ডেইলি স্টার

Thursday, June 29, 2017

‘পুলিশ হয়্যা গুন্ডাক ধরিম’ by গোলাম মোর্তুজা

দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া নয়ন। ছবি: গোলাম মোর্তুজা
নয়নের সামনের দাঁতগুলো ভেঙেছে পড়ে গিয়ে। তাতে তার শৈশবের উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি। দ্বিতীয় শ্রেণিপড়ুয়া নয়নের সঙ্গে দেখা হলো ঠাকুরগাঁও শহর থেকে ১০ মিনিট দূরত্বে দেওগাঁও গ্রামে। বিকেলে চতুর্থ শ্রেণিপড়ুয়া মামাতো ভাই নিমাইকে সঙ্গে নিয়ে গরু আনতে যাচ্ছিল সে।
নয়নের হাসিটাই ওর সঙ্গে কথা বলার আগ্রহটা বাড়িয়ে দিল। জিজ্ঞেস করলাম বড় হয়ে সে কী হতে চায়। উত্তর এল, ‘পুলিশ’। কেন রে, এত কিছু রেখে কেন পুলিশ হতে ইচ্ছে হলো। উত্তর এল, ‘পুলিশ হয়্যা গুন্ডাক ধরিম।’ জানতে চাইলাম নয়নের বাবা কী করে। নিমাই জানাল, তার বাবা ইটের ভাটায় কাজ করে। আর মা ঘরের কাজ করে।
মনে মনে শঙ্কা হয়, এই নয়ন-নিমাইয়ের মনের ইচ্ছে কি আদৌ পূরণ হবে! ভাবছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অধ্যাপক আতিউর রহমানের কথা। দারিদ্র্যকে জয় করে পড়াশোনা শেষ করতে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে।
শুধু অধ্যাপক আতিউরই নন, তাঁর সমবয়সী যাঁরা এখন দেশের প্রশাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা বা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সফল, তাঁদের বেশির ভাগেরই অতীতটা সংগ্রামের। আর তাঁদের বেশির ভাগই এসেছেন গ্রাম থেকে। হাল চাষ করে কাদা মাখা পায়ে স্কুলে যাওয়া, কিংবা স্কুল থেকে ফেরার পরে ধান-পাট নিয়ে হাটে যাওয়ার গল্প শোনা যায় অধ্যাপক আতিউরদের প্রজন্মের বেশির ভাগের মুখ থেকে।
কিন্তু এখন যখন ঢাকা শহরে একেকটি বাচ্চার স্কুলে যাতায়াতের জন্যই মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্তদের মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করে গাড়ি পালতে হচ্ছে, আছে কোচিং আর টিউটরের খরচ। এই আমলে নয়ন আর নিমাইরা কি এই শহুরে সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারবে। হয়তো তাদের জীবনও তাদের বাবা-কাকাদের মতোই ইটের ভাটায় কাটবে।
নিমাইয়ের হাতে খুটসহ গরুর রশি। সন্ধ্যার আগেই গরু নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। অবশ্য তখনো সূর্য লাল হয়নি। মানে দুজনের হাতে খেলাধুলা করার আরও কিছু সময় আছে। আলাপ করার ইচ্ছে মোটেই নেই নয়নের। তরতর করে গাছে উঠে যাচ্ছে। এদিকে নিমাই গরুর রশি গাছের ডালে বেঁধে চমৎকার দোলনা বানিয়ে বসেছে। বললাম পড়ে গেলে মজাটা টের পাবে। কিন্তু নিমাই আত্মবিশ্বাসী।

Friday, January 1, 2016

সিরিয়ায় নিহত সাইফুল দেশে এসেছিলেন ২০১৪ সালে, বাবা ও ভাই কারাগারে by গোলাম মর্তুজা

সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আইএসবিরোধী সামরিক জোটের বিমান হামলায় নিহত সাইফুল হক ওরফে সুজনের বাংলাদেশের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যে অভিবাসন আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তিনি ২০১৪ সালে দেশে ফেরেন। ওই বছর ঈদুল ফিতরের পর আবার দেশত্যাগ করেন। দেড় বছর পর তাঁর মৃত্যুসংবাদ পাওয়া গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার মোহাম্মদপুরে সাইফুলের বাসায় গিয়ে এসব তথ্য জানা যায়। সাইফুলের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার পাকুরদিয়ায়। তাঁর বাবা আবুল হাসনাত দন্ত চিকিৎসক। সাইফুল বড় হয়েছেন বাবার কর্মস্থল খুলনায়।
সাইফুলের বাবা ও এসএসসি পরীক্ষার্থী এক ভাইকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গত ৮ ডিসেম্বর আটক করেছে। জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলাও দিয়েছে পুলিশ।
গতকাল ঢাকার বাসায় গিয়ে সাইফুলের মা ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ভাইকে পাওয়া গেছে। তাঁরা জানান, সাইফুল সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন ২০১৪ সালের ঈদুল ফিতরের আগে। তখন তাঁরা খুলনায় থাকতেন। ঈদের কয়েক দিন পর লন্ডনের উদ্দেশে সাইফুল অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, এক বাচ্চা ও বড় ভাইয়ের পাঁচ বছরের বাচ্চাকে নিয়ে দেশত্যাগ করেন। এখন পরিবার ধারণা করছে, সাইফুল তখন লন্ডন না গিয়ে সিরিয়া চলে যান।
সাইফুলরা চার ভাই। বড় ভাই থাকেন স্পেনে। তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাঁর শিশুপুত্রকে লালনপালন করেছেন সাইফুলের স্ত্রী। তৃতীয় ভাই এসএসসি পরীক্ষার্থী। ছোট ভাই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।
ছোট ভাই প্রথম আলোকে বলে, ২০১৪ সালের রোজার ঈদে সাইফুল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দেশে আসেন। সবাই মিলে খুলনার সোনাডাঙার বাসায় ঈদ করেন। ঈদের পরে সাইফুল সবার কাছ থেকে দোয়া নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দেন। তখন সাইফুলের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। এরপর প্রায় দুই মাস পরিবারের সঙ্গে তাঁদের আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। দুই মাস পর হঠাৎ একদিন ফোন করে সাইফুল পরিবারকে জানান, সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর অসুস্থতা ও সন্তান জন্মদান নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। তবে তিনি কোন দেশে আছেন, সেটা বলেননি। এরপর সাইফুলের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়। মাস খানেক আগে পরিবার জানতে পারে যে সাইফুল সিরিয়ায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিতে সিরিয়া গেছেন। আর, চলতি সপ্তাহে তাঁরা খবর পান যে সাইফুল বিমান হামলায় মারা গেছেন।
সিরিয়া ও ইরাকে বিমান হামলায় নিহত আইএসের ১০ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতার একটি তালিকা গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশি সাইফুল হকের নামও রয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর খবরে বলা হয়, ১০ ডিসেম্বর আইএসের কথিত রাজধানী সিরিয়ার রাকা প্রদেশের কাছে বিমান হামলায় সাইফুল মারা যান। তিনি আইএসের হয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের পরিকল্পনাকারী, হ্যাকিং কর্মকাণ্ড, নজরদারি প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও অস্ত্র উন্নয়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
তবে ঢাকা মহানগরের পুলিশের জনসংযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার গতকাল প্রথম আলোকে বলেছেন, সিরিয়ায় বিমান হামলায় নিহত সাইফুলের বাংলাদেশের পরিচয় সম্পর্কে তাঁদের কাছে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
ঢাকায় সাইফুলের বাসা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাইফুলের স্ত্রী দুই শিশুপুত্র ও ভাইয়ের পাঁচ বছরের ছেলে সাইফুলের সঙ্গেই ছিল। এর মধ্যে দেশ ছাড়ার পর ছোট ছেলের জন্ম হয়েছে। এর আগে ২০০৩ সালে সাইফুল লেখাপড়ার জন্য লন্ডনে যান। কম্পিউটার প্রকৌশলী সাইফুল পরে কার্ডিফে চলে যান।
গতকাল যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র টেলিগ্রাফ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর সাইফুল গ্লোমরগ্যান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি আইব্যাক নামে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ব্যবসায় খুবই ভালো করেন। টেলিগ্রাফ তাঁকে স্থানীয় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে একটি পিলার হিসেবে অভিহিত করেছে। তিনি সবাইকে সাহায্য করতেন। সাইফুলের প্রতিবেশীরা টেলিগ্রাফকে জানিয়েছে, তিনি খুব দামি হাই পারফরম্যান্স কার চালাতেন। তাঁর একটি কালো বিএমডব্লিউ গাড়িও ছিল।
টেলিগ্রাফ-এর খবরে আরও বলা হয়, যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্বের আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর ২০১৪ সালের জুলাই মাসে সাইফুল বাংলাদেশে ফিরে যান। তখন তিনি তাঁর বন্ধু ও সহকর্মীদের বলেছেন যে তিনি দেশে ফিরে যেতে চান। দেশে তাঁদের পাটের ব্যবসা রয়েছে। তখন বাংলাদেশে যাওয়ার আগে তিনি তুরস্কে গিয়েছিলেন বলেও শোনা যায়।
তবে সাইফুলের ছোট ভাই প্রথম আলোকে জানায়, বাবা আবুল হাসনাত (৬৭) দন্ত চিকিৎসক। তিনি চিকিৎসা পেশা ছেড়ে গিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে একটি বায়োফুয়েলের (জৈব জ্বালানি) কারখানা তৈরি করছেন। তবে সাইফুল দেশে থাকা অবস্থায় কোথায় পড়াশোনা করেছেন সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি তাঁর ছোট ভাই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তিনি যুক্তরাজ্যেই পড়েছেন।
সাইফুলের যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বের আবেদন ফরমে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০০৩ সালে শিক্ষা ভিসায় যুক্তরাজ্যে যান। এরপর ২০১২ সাল থেকে তিনি একজন অভিবাসী উদ্যোক্তা হিসেবে সেখানে অবস্থান করছিলেন।

Friday, December 25, 2015

গ্রেনেডের উপকরণ আসছে দেশের বাইরে থেকে by গোলাম মর্তুজা

নিষ্ক্রিয় করার পরে একটি গ্রেনেডের
খোল দেখাচ্ছেন এক কর্মকর্তা। ছবি: প্রথম আলো
পাইপ কেটে ঘরে বসেই জঙ্গিরা তৈরি করছিল হাতে তৈরি গ্রেনেড। মোটা দাগে গ্রেনেডের মূল পাঁচটি অংশ বা উপকরণ। এর তিনটিই এ দেশে পাওয়া যায় না। দেশের বাইরে থেকে এসব উপাদান জঙ্গিরা সংগ্রহ করছে বলে পুলিশের বোমা বিশেষজ্ঞরা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর-১ এর এ ব্লকের নয় নম্বর সড়কের একটি ছয়তলা বাড়িতে দীর্ঘ ১৪ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ছয়জনসহ মোট সাতজনকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ওই বাড়ি থেকে ১৬টি হাতে তৈরি গ্রেনেড ও দুটি ককটেল উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়। বাড়িটি থেকে প্রচুর হাতে তৈরি গ্রেনেডের উপকরণ উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, পানির ধাতব (জিআই) পাইপের খোল কেটে মূলত গ্রেনেডের খোল বা বডি তৈরি করছিল। এর ভেতরে বিস্ফোরক ঢুকিয়ে আনুষঙ্গিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ভরে তৈরি হচ্ছিল গ্রেনেড। ওই বাড়িতে যে পরিমাণ গ্রেনেড তৈরির সরঞ্জাম মজুত করা হয়েছে তা দিয়ে অন্তত দুশোটি গ্রেনেড তৈরি সম্ভব।
কয়েকজন উর্ধ্বতন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, মোটা দাগে গ্রেনেডের পাঁচটি অংশ। এগুলো হলো খোল, বিস্ফোরক, সার্কিট, প্রেশার রিলিজ সুইচ ও পিন। স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত পাইপ কেটে খোল তৈরি হয়। কয়েক ধরনের বিস্ফোরকও খোলা বাজারেও পাওয়া যায়। তবে এদের ব্যবহৃত বিস্ফোরকগুলো দেশের বাইরেও থেকে আনা বলে মনে হচ্ছে। তবে ব্যবহৃত সার্কিট ও প্রেশার রিলিজ সুইচগুলোও এ দেশে পাওয়া যায় না। সুইচ খোলার পিন এখন জঙ্গিরা নিজেরাই বানাচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানান। পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলোর পিন স্থানীয়ভাবেই ঝালাই করে তৈরি করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলেন, এর আগে একই রকম গ্রেনেড উদ্ধারের পরে জঙ্গিরা জানিয়েছিল নিজেদের জঙ্গি নেটওয়ার্কে পাশের একটি দেশ থেকে তারা এসব সার্কিট ও প্রেশার রিলিজ সুইচ সংগ্রহ করছেন। আগে বিভিন্ন সময় উদ্ধার করা গ্রেনেডেও একই ধরনের সার্কিট ও প্রেশার রিলিজ সুইচ ব্যবহার করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, গতকাল মিরপুর থেকে উদ্ধার করা প্রতিটি গ্রেনেডে একটি করে নম্বর বসানো ছিল। এসব গ্রেনেড দিয়ে জঙ্গিরা রাজধানী ও এর আশপাশে গির্জায় ও মাজারে হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করলে সবকিছু জানা যাবে।
এই ঘটনায় আজ রাজধানীর শাহ আলী থানায় ৫ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নম্বর ৩৬।

Monday, December 21, 2015

জঙ্গিদের দায় স্বীকার তবু ফাঁসানো হলো নিরীহ ১৩ জনকে by গোলাম মর্তুজা ও আনোয়ার পারভেজ

১৩ বছর আগে জয়পুরহাটে এক পীরের খানকায় পাঁচজনকে খুন করা হয়েছিল। এর তিন বছর পর জেএমবির আমির শায়খ আবদুর রহমান টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদে অন্য অনেক ঘটনার সঙ্গে এই পাঁচ খুনেও জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তারপরও এ মামলায় জঙ্গিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় ছয় নেতা-কর্মী, সাত শ্রমজীবীসহ ১৩ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে এই পাঁচ খুনকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে পুলিশ। তখন এলাকার বেশ কিছু মানুষকে পুলিশ আটক করে এবং দুজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে এই ১৩ জনকে ফাঁসায়। পরবর্তী সময়ে জেএমবির প্রধান এর দায় স্বীকার করলেও পুলিশ আগের তদন্তকে সঠিক প্রমাণ করতে জঙ্গিদের সঙ্গে এসব ব্যক্তিকেও আসামি করে।
সিআইডি ২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর ২১ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। এরপর সাত বছর পার হলেও এখনো সাক্ষ্য গ্রহণ হয়নি। দীর্ঘদিন কারাভোগ করে এই ১৩ জন জামিনে মুক্ত হলেও এখনো মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে।
এঁদের একজন দরজিশ্রমিক নূর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় এক যুগ ধরে আদালতে হাজিরা দিচ্ছি। মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছি। ভিটেমাটি বিক্রি করতে হয়েছে। বিচারের কোনো লক্ষণ দেখছি না।’ আরেক আসামি সোলেমান আলী বলেন, বছরের পর বছর ধরে মামলার খরচ জোগাতে গিয়ে তিনি প্রায় নিঃস্ব।
২০০৩ সালের ২০ জানুয়ারি গভীর রাতে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার বেগুনগ্রামে আস্তানায়ে চিশতিয়া নামে এক পীরের আস্তানায় পাঁচজনকে জবাই করে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন মাজারের খাদেম নূরউদ্দিন, ভক্ত আফাজ উদ্দিন, দুলাল এবং বাবুর্চি সফিউদ্দিন ও মতিউর রহমান। এ ঘটনায় কালাই থানায় হত্যা মামলা হয়।
জয়পুরহাট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্তের নামে প্রথমে কালাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এমদাদুল হকের বড় ভাই শাহজালালসহ ২৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর পুলিশ ২০০৩ সালের ৯ মার্চ শাহজালালের কাছ থেকে একটি জবানবন্দি আদায় করে। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া ওই জবানবন্দিতে শাহজালাল এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে তাঁর ভাই এমদাদুল হকসহ স্থানীয় পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতার নাম বলেন। অন্যরা হলেন পৌর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সোলায়মান আলী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম, পৌর আওয়ামী লীগের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শমসের আলী ও বেলাল হোসেন।
এরপর ২০০৩ সালের ১০ মার্চ মামলাটি সিআইডিতে যায়। তিন বছর পর ২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সিআইডি ভটভটিচালক হযরত আলীকে গ্রেপ্তার করে। পাঁচ দিন রিমান্ডে থাকার পর তিনিও ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি জবানবন্দি দেন। তাতে আওয়ামী লীগের ওই পাঁচ নেতা-কর্মীর পাশাপাশি কালাই পৌর বিএনপির সহসভাপতি আনিসুর রহমান, দরজিশ্রমিক নূর মোহাম্মদ, স্থানীয় গ্রামের বাসিন্দা মফছের আলী, মনতাজ ওরফে মমতাজ ও সিরাজউদ্দীনের নাম উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, এসব ব্যক্তি খানকায় ঢুকে পাঁচজনকে হত্যা করে সিন্দুকের টাকা লুট করে নিয়ে যান।
এর কিছুদিন পর সিলেটে গ্রেপ্তার হন জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান। তিনি ঢাকায় টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, ওই খানকায় ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ হয় এমন অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জেএমবির সদস্য ওই হত্যাকাণ্ড চালায়। ২০০৬ সালের ২৫ মার্চ টিএফআই সেল থেকে এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানানো হয়।
২০০৮ সালের ১৮ নভেম্বর এ মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির দিনাজপুর ক্যাম্পের পরিদর্শক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) জালাল আহম্মেদ ২১ জনকে আসামি করে আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দেন। তাতে জেএমবির জঙ্গি আছে আটজন। তাঁরা হলেন তরিকুল ওরফে ভাগনে শহীদ, এনামুল হক, আবু হাসান সরকার, রশিদুল, সালাউদ্দীন, তরিকুল ইসলাম ওরফে হাবিল, শফিউল্লা ওরফে তারেক ও রমজান আলী। অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় জেএমবির তিন শীর্ষস্থানীয় নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলাভাই ও আবদুল আউয়ালকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ‘অভিযুক্ত নহে’ বলে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে জেএমবির আরও ছয় সদস্যকে। তাঁদের মধ্যে একজন হারুন অর রশীদ ওরফে মামুন ২০০৬ সালে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হন। তিনি পুলিশ রিমান্ডে ও টিএফআই সেলে দেওয়া জবানবন্দিতে কালাইয়ে পাঁচ খুনে অন্য জঙ্গিদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। তারপরও তাঁকে এ মামলায় আসামি করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগপত্র দাখিলকারী সিআইডির পরিদর্শক জালালউদ্দীন দাবি করেন, ‘এ রকম হওয়ার কথা নয়।’
নিরীহ ১৩ জনকে আসামি করার কারণ জানতে চাইলে জালালউদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর আগে কয়েকজন কর্মকর্তা মামলাটির তদন্ত করেন। তখন স্থানীয় কয়েকজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সে অনুযায়ী, ওই ১৩ জনকে আসামি করতে হয়েছে। জালালউদ্দীন বলেন, তিনি তদন্তকালে তিনি টিএফআই সেলে জেএমবির নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের নথি হাতে পান, যার পরিপ্রেক্ষিতে জঙ্গিদের আসামি করেন।
আওয়ামী লীগের নেতা এমদাদুল হক বলেন, ‘ঢাকায় শীর্ষ জঙ্গিরা এই মামলায় স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর ভাবছিলাম, বোধ হয় খালাস পাব। আমি খুব অসুস্থ। টাকার অভাবে ভালোভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। কিন্তু মামলার হাজিরা দিতে হচ্ছে। খরচ করতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে জয়পুরহাটের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নৃপেন্দ্রনাথ মণ্ডল বলেন, এ মামলায় জঙ্গিদের পাশাপাশি কিছু স্থানীয় রাজনীতিক ও শ্রমজীবী মানুষকে জড়ানোর বিষয়টি তিনি জানেন। এখন কে দোষী, কে নির্দোষ তা আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। এখানে আবেগের কোনো স্থান নাই।

Sunday, November 29, 2015

রক্তাক্ত হামলায় গ্রামবাসী জানল শিয়া-সুন্নি ভেদ! by গোলাম মর্তুজা

বগুড়ার শিবগঞ্জের চাককানু গ্রামের শিয়া মসজিদের সামনে
গতকাল সতর্ক অবস্থায় পুলিশ। এই মসজিদেই গত
বৃহস্পতিবার অস্ত্রধারীদের হামলায় মুয়াজ্জিন নিহত ও
ইমামসহ অপর তিনজন গুরুতর আহত হন l ছবি: এএফপি
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর, চককানুসহ আশপাশের ছয়টি গ্রামে দেড় শ ঘর শিয়া মুসলমানের বাস। এদের কেউই বংশানুক্রমিকভাবে শিয়া নয়, গত তিন দশকে শিয়া মতবাদ গ্রহণ করেছে। এক পরিবারেরই এক ভাই শিয়া আর অন্যরা সুন্নি মতবাদে বিশ্বাসী। গ্রামগুলোর অনেক তরুণ জানেনই না শিয়া-সুন্নির তফাতটা কী। জানেন কেবল একদল হাত বেঁধে, আরেক দল হাত ছেড়ে নামাজ আদায় করে।
এই দুই মতবাদের মানুষের মধ্যে কখনো কোনো বিরোধ হয়নি। মানুষের প্রাণ নিয়ে কারা এই শান্ত গ্রামগুলোতে শিয়া-সুন্নি বিরোধের বীজ বপন করতে চায়, তা-ই এখন বড় জিজ্ঞাসা এখানকার মানুষের।
বগুড়ার মোকামতলা-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপরে ২০-২২টি দোকান নিয়ে হরিপুর বাজার বাসস্ট্যান্ড। মহাসড়কের উত্তর পাশে হরিপুর আর দক্ষিণ পাশে চককানু গ্রাম। চককানু গ্রামের শিয়া মসজিদেই গত বৃহস্পতিবার মাগরিবের নামাজের পর পর অস্ত্রধারীরা হামলা করে। এতে মসজিদের মুয়াজ্জিন মোয়াজ্জেম হোসেন নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও তিনজন।
মূলত সবজি চাষ ও এর ব্যবসা করে দুই গ্রামের মানুষই মোটামুটি সচ্ছল। মহাসড়ক থেকে নেমে দক্ষিণে মেঠোপথ ধরে গেলে রাস্তার দুই পাশে কয়েকটি বাড়ি। হাতে গুনে চারটি বাড়ি পার হয়ে ডানে দুই বাড়ির মাঝে আড়াই থেকে তিন ফুট প্রস্থের সরু একটি গলি। এলাকাটা না চিনলে ওই গলির অস্তিত্ব বোঝাও দায়। গলি ধরে সামনে গেলে হলুদ রঙের লোহার গ্রিলের দরজা। এরপর এক চিলতে আঙিনা পার হলে মসজিদে ঢোকার দরজা। বাঁয়ে অজুখানা ও বাথরুম এবং নির্মাণাধীন সীমানা দেয়াল।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বন্দুকধারীরা ঢুকে গ্রিলের দরজাটি ভেতর থেকে বন্ধ করে মসজিদের সামনে আঙিনায় দাঁড়িয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছিল।
এই শিয়া মসজিদটির বিষয়ে স্থানীয় শিয়া সম্প্রদায় ও মসজিদের আশপাশের গ্রামের লোক ছাড়া অন্যরা জানতেনই না। শিয়া মসজিদটি যে চককানু গ্রামে অবস্থিত সেই আটমূল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার মান্নান প্রথম আলোকে বললেন, এই ইউনিয়নে যে শিয়াদের জন্য পৃথক একটি মসজিদ আছে সেটিই তিনি এর আগে জানতেন না। আর শিয়া-সুন্নি বিরোধের তো প্রশ্নই ওঠে না।
শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষের সংগঠন ইমামিয়া জনকল্যাণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবু জাফর মণ্ডল বলেন, ১৯৮০ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধের পরে আয়াতুল্লাহ খোমেনির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ঢাকায় ইরান দূতাবাসে যোগাযোগ করেন। দূতাবাসের সহায়তায় তিনি ১৯৮৪ সালে হরিপুর গ্রামে ইমামিয়া স্টাডি সেন্টার নামে একটি পাঠাগার চালু করেন। নিজে শিয়া মতবাদ গ্রহণ করেন। তাঁর দেখাদেখি ৩১ বছরে ছয় গ্রামে দেড় শ পরিবার শিয়া মতবাদ গ্রহণ করে। লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পরে পাঠাগারের কাজের পরিধি বেড়ে যায়। ইমামবাড়া স্থাপন করা হয়। এরপরে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধন করে সংগঠনটির নাম দেওয়া হয় ইমামিয়া জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মানুষের দান করা ৬ শতক জমি, চাঁদা ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ২০০৯ সালে শিয়া মসজিদটি স্থাপিত হয়। এখনো এর কাজ শেষ হয়নি।
আবু জাফর বলেন, ওই মসজিদে শিয়া ছাড়াও প্রায়ই সুন্নি মতাবলম্বীরাও নামাজ পড়তে আসেন। শিয়ারা হাত ছেড়ে দিয়ে নামাজ পড়লেও সুন্নিরা হাত বেঁধেই তাঁদের সঙ্গে নামাজ পড়েন।
মসজিদের পাশের বাড়ি রেহানা বেগমের। দরজায় দাঁড়িয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যখন তিনি মালয়েশিয়াপ্রবাসী ছেলের কথা ভাবছিলেন তখনই হঠাৎ পর পর অনেকগুলো শব্দ শুনেন। ঘরে ছুটে যান রেহানা। তখনই মসজিদ থেকে চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ আসতে থাকে ‘মইরা গেনু বারে, মইরা গেনু’ (মেরে গেলোরে বাবা, মেরে গেল)। দরজায় শিকলটি আটকে মসজিদের দিকে দৌড়ে গিয়ে দেখেন ভেতরে রক্তারক্তি কাণ্ড। তাঁর মতো আশপাশের বাড়ির অনেকে সাহায্য করতে ছুটে আসেন।
রেহানার বাসা থেকে বের হয়ে কয়েক পা এগোতেই দেখা যায় মসজিদের সামনে সকালের রোদ গায়ে লাগিয়ে জটলা করে আছে কিছু মানুষ। কাছে গিয়ে দেখা গেল, চায়ের দোকানে বসে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোর একটি স্থানীয় দৈনিকে শিয়া মসজিদে হামলার খবরটি জোরে জোরে পড়ছে। তাকে ঘিরে আরও ১০-১১ জন শিশু-তরুণ, একজন বৃদ্ধ ও কয়েকজন নারী মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। কথা বললে এঁদের কেউই শিয়া-সুন্নির তফাতের বিষয়টি বোঝেন না বলে জানালেন। বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিটি বললেন, ‘ওরা (শিয়ারা) হাত ছাইড়ে দিয়ে নামাজ পড়ে, শবে বরাত মানে না—এগুলাই আর কী।’
হামলার পরে গতকাল শিয়াদের ওই মসজিদে জুমার নামাজ হয়নি। র্যা ব-পুলিশ মসজিদের ভেতরটা অপরাধস্থল হিসেবে সংরক্ষণ করছে। শিয়ারা ইমামবাড়ায় জড়ো হয়ে নামাজ পড়েন। সুন্নিরা পড়েন পাশেরই আরেকটি মসজিদে।
নামাজের পরে উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরা হরিপুর বাজারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন নিহত মোয়াজ্জেম হোসেনের লাশের জন্য। বেলা তিনটার দিকে সাদা অ্যাম্বুলেন্সে নীল পলিথিন মুড়িয়ে মোয়াজ্জেম হোসেনের লাশ আসে। অ্যাম্বুলেন্সটি বাজারে না থেমে মোয়াজ্জেমের বাড়ির দিকে যেতে থাকে। পেছনে দৌড়াতে থাকে মানুষ। মেঠোপথ দিয়ে হেঁটেও মোয়াজ্জেমের বাড়ির দিকে যেতে থাকে শত শত মানুষ। সদ্য কেটে ফেলা একটি ধানখেতে গাড়িটি থামানো হয়। গাড়িটি ঘিরে ধরে দল বেঁধে কান্নাকাটি করতে থাকে গ্রামের মানুষ। গাড়ি থেকে লাশ বের করে খাটিয়ায় রাখামাত্র মানুষ দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মোয়াজ্জেমের মুখ দেখে কান্নার রোল পড়ে যায়, কেউ কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ে যায়। এদের বেশির ভাগ সুন্নি। এমনকি নিহত মোয়াজ্জেমের সহোদর হাবিবর রহমানও সুন্নি।
লাশ আসার আগে সকালে হরিপুরের দক্ষিণপাড়ায় মোয়াজ্জেমের আধা পাকা বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় আঙিনায় কয়েক শ লোক। মোয়াজ্জেমের শোকাহত স্ত্রী কমেলা বেগমের (৫৫) সঙ্গে আহাজারি করছিলেন আরও কয়েকজন নারী। যাঁদের বেশির ভাগই তাঁদের প্রতিবেশী, গ্রামের লোক।
মোয়াজ্জেমের ছেলে ইটভাটার শ্রমিক শাহাজুল ইসলাম বলেন, ‘বসতবাড়িসহ বিঘা খানেক জমিই সম্বল। বাবা টুকটাক সাংসারিক কাজ করতেন। মসজিদে আজান দিলেও কোনো পারিশ্রমিক নিতেন না।’ শাহাজুল বলেন, তাঁর বাবা কয়েক বছর আগে শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করলেও তাঁর চাচারা সুন্নি।
হরিপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ সুলতান বলেন, ‘এখানে একই পরিবারের শিয়া-সুন্নি দুই-ই রয়েছে। আমি সুন্নি, আমার ভাই হাবিল মিয়া শিয়া। তাই এখানে কে শিয়া কে সুন্নি তা বাছবিচার করাই নিরর্থক।’

Friday, November 6, 2015

পুলিশের রাইফেলে গুলি ছিল না by গোলাম মর্তুজা ও অরূপ রায়

আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় কর্তব্যরত পাঁচ পুলিশ সদস্যের কারও রাইফেলেই গুলি ছিল না। তাই হামলার শিকার হওয়ার পরে তাঁরা কোনো পাল্টা প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। তিনজন পুলিশ সদস্য তো শালবনের দিকে দৌড়ে পালিয়েই গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার আশুলিয়া ও ঢাকা জেলা পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
গত বুধবার সকালে রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় পুলিশের একটি তল্লাশিচৌকিতে হামলা চালায় দুই ব্যক্তি। তাদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কনস্টেবল মুকুল হোসেন নিহত এবং কনস্টেবল নূরে আলম সিদ্দিকী গুরুতর আহত হন। নূরে আলমকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে আগের হামলাগুলোর মতো বুধবারের পুলিশের ওপর হামলার দায়ও আইএস স্বীকার করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে।
ওই হামলা ও হত্যার ঘটনায় আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আজাহারুল ইসলাম বাদী হয়ে বুধবার রাতে একটি মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা দুজনসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ধরতে পারেনি পুলিশ। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) দীপক চন্দ্র সাহাকে। এর বাইরেও পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি সফিকুর রহমানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সাহায্য করতে একটি বিশেষ দল গঠন করেছে পুলিশ। আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহসিনুল কাদির বলেন, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও গাজীপুরের সাত কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। তাঁরা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সহায়তা করবেন। ওই দলের দায়িত্বে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবুল খায়ের।
ঢাকা জেলা ও আশুলিয়া থানার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেখানে কর্তব্যরত পাঁচ পুলিশ সদস্যের কাছে চায়নিজ রাইফেল থাকলেও তাঁরা সেগুলোর ব্যবহার করেননি। পরে পালিয়ে যাওয়া তিন সদস্য কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তাঁদের কারও রাইফেলেই গুলি ছিল না। কর্মকর্তারা জানান, রাইফেল ও গুলি পুলিশ সদস্যদের কাছে আলাদাভাবে ছিল। ওসব রাইফেলে গুলি ভরা খুব ঝক্কির নয়, তবে কিছু সময় লাগে। গুলি ভরা না থাকায় তাঁরা গুলি চালাতে পারেননি। তবে প্রতিরোধ না করে তিনজন কেন পালিয়ে গেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার ওসি মোহসিনুল কাদির বলেন, অস্ত্র থাকলেও তাঁদের অস্ত্রে¿গুলি ভরা ছিল না। এটা নিশ্চিত। তবে কী জন্য তাঁরা পালিয়ে গেলেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল বিবিসিকে বলেন, ওই তল্লাশিচৌকিতে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বয়সে নবীন ছিলেন।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাড়ইপাড়ার তল্লাশিচৌকিতে কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। সেখানকার পাঁচটি খাবার হোটেল এবং একটি দোকান বন্ধ রয়েছে। লোকজনের উপস্থিতি ছিল কম। ঘটনাস্থলের উল্টো দিকে নন্দন পার্কের সামনে বিআরটিসির বাস ডিপোতে তিনটি বাস আর কয়েকজন পরিবহনশ্রমিক ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি।
গতকালও ঘটনাস্থলে পাওয়া যায় বাসচালক কনক দাসকে। তিনি বলেন, প্রকাশ্যে সশস্ত্র পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বুধবার হামলার সময় তিনি ঘটনাস্থলের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হামলার পরে দুই হামলাকারীকে তিনি ছাই রঙের একটি মোটরসাইকেলে করে চন্দ্রার দিকে চলে যেতে দেখেন। ঘটনা সম্পর্কে জানতে পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর আবার ছেড়ে দিয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দীপক চন্দ্র সাহা বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
গতকালের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কনকের বরাত দিয়ে ঘটনার বিবরণ ছাপার পর থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাঁর মুঠোফোনে কল করে তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে চাচ্ছে। এসব নিয়ে তিনি আতঙ্কে রয়েছেন। একই এলাকার মিলন রহমান বলেন, ‘যেখানে পুলিশই নিরাপদ নয়, সেখানে আমাদের নিরাপত্তা দেবে কে?’
তবে এই হত্যা-হামলাও পুলিশের মধ্যে সতর্কতা আনতে পারেনি। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের সিঅ্যান্ডবি এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে একজন সশস্ত্র এএসআইসহ চার কনস্টেবলকে গা ছাড়াভাবে বসে থাকতে দেখা যায়। ওই চৌকির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার এসআই কামরুজ্জামান তখন চৌকিতে ছিলেন না। এএসআই মুন্নু শেখ, কনস্টেবল জয়ন্ত মণ্ডল, গোপাল সাহা ও উজ্জ্বল খান সিঅ্যান্ডবির সাখাওয়াত শেখের দোকানে বসে গল্প করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আলাপে যোগ দিলে এএসআই মন্নু শেখ বলেন, ‘আমরাও আতঙ্কের মধ্যে আছি। সতর্কও আছি। তবে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।’ জয়ন্ত মণ্ডল বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করছি ভাই।’
মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তল্লাশিচৌকিতে না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই কামরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি কিছু সময় আগে খাওয়ার জন্য তিনি থানায় যান।
সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নূরে আলমের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। ঢাকা রেঞ্জের পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান গতকাল সন্ধ্যায় হাসপাতালে গিয়ে তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, সাময়িকভাবে বাড়ইপাড়ার তল্লাশিচৌকি বন্ধ রাখা হলেও দুপুরের পর তা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশকে আগের চেয়ে বেশি সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। দুষ্কৃতকারীরা আর যাতে হামলার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ হতাহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। গতকাল রাজধানীর গাবতলী-আশুলিয়া সড়কের একটি চৌকিতে পুলিশ সদস্যরা। (ইনসেটে) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পুলিশি তল্লাশি l ছবি: প্রথম আলো

Saturday, October 24, 2015

মধ্যরাতে হোসনি দালানে বোমা হামলায় নিহত ১, আহত শতাধিক by নজরুল ইসলাম ও গোলাম মর্তুজা

পুরান ঢাকার হোসনি দালান এলাকায় গতকাল
গভীর রাতে বোমা হামলায় আহত ব্যক্তিদের
চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
রাত তিনটার সময় ছবিটি তুলেছেন সাজিদ হোসেন
রাজধানীর পুরান ঢাকার হোসনি দালান এলাকায় গভীর রাতে বোমা হামলায় এক কিশোর নিহত হয়েছে। আহত হয়েছেন ১০০ জনের বেশি। এদের মধ্যে ৫৭ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, ১৭ জন মিটফোর্ড হাসপাতালে ও ১৬ জন মগবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতরা জানান, গতকাল শুক্রবার দিবগত রাত পৌনে দুইটার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তার জন্য পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকে নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা এ সময় ওই এলাকায় মোতায়েন ছিলেন। নিহত কিশোরের নাম সাজ্জাদ হোসেন। হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানান।
পবিত্র আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলে অংশ নিতে পুরান ঢাকার হোসনি দালানে আসেন নগরীর বিভিন্ন এলাকার মানুষ। এদের অধিকাংশই শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। হজরত মুহাম্মদ (সা.) দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইনের (রা.) শহীদ হওয়ার দিনকে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা ত্যাগ ও শোকের প্রতীক হিসেবে পালন করে থাকে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত রাত দেড়টা থেকে হোসনি দালানের মূল ফটকে একটি তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি চলছিল। মিছিলটি পল্টনে যাওয়ার কথা ছিল। মিছিলে যোগ দিতে এসেছিলেন তরুণ, বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা। এর মধ্যেই রাত পৌনে দুইটার দিকে মুহুর্মহু বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। কারও কারও মতে পরপর ১০-১৫টি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কেউবা দৌড় দিতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পায়ের তলায় পড়েছেন। কান্না-চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। আশপাশের বাসিন্দারা যে যেভাবে পারেন মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ভ্যান, লেগুনায় করে আহতদের ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও আশপাশের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনার পরে হোসনি দালান এলাকায় অনেককে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
রাতে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা চেয়ার, স্যান্ডেল, তাজিয়া মিছিলের সজ্জার সরঞ্জামাদি। বিভিন্ন স্থানে ছিল ছোপ ছোপ রক্ত। ঘটনাস্থলে কালো স্কচটেপ মোড়ানো একাধিক অবিস্ফোরিত বোমা পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
হোসনি দালান এলাকায় পড়ে থাকা অবিস্ফোরিত
একটি বোমা। রাত পৌনে তিনটার সময় তোলা
রনি নামের এক যুবক জানান, ঘটনার সময় তিনি দুলদুল ঘোড়ার কাছে ছিলেন। সবাই মোনাজাত করছিলেন। হঠাৎ আগুনের হলকার মতো কিছু ছুটে আসতে দেখেন। এরপর শুরু হয় হুড়োহুড়ি। তিনি ৮/১০টি আওয়াজ শুনেছেন বলে জানান।
আমলিগোলার বাসিন্দা আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মিছিলটি হোসনি দালান থেকে শুরু হয়ে পল্টন ঘুরে আবার হোসনি দালানে এসে হওয়ার কথা ছিল। এ জন্য মিছিলের আগে মোনাজাত করছিলেন সবাই। মোনাজাতের সময়ই বোমা হামলা হয়। রাবেয়া আক্তার নামের এক নারী বলেন, বোমায় তার হাত ও পা ঝলছে গেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেখা যায়, কেউ কোঁকাচ্ছেন, কেউ ব্যথায় কাঁদছেন। কেউ চিৎকার করে ফোনে বলছেন, ‘ভাইরে পাইতাছি না’। কারও গলা থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা। কারও মাথায়, কারও বা পায়ে ব্যান্ডেজ।। কারও সারা শরীরেই রক্তাক্ত জখম। কেউ চিৎকার করছেন ‘ডাক্তার কই’ বলে। কেউ আবার অন্য হাসপাতালে রোগী নিতে যানবাহনের জন্য ছোটাছুটি করছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে ৫৭ জন চিকিৎসাধীন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, রাতে কোনো ধরনের মিছিল না করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছিল। কিন্তু তা কেউ শোনেনি।

Monday, October 5, 2015

জাপানি নাগরিক কুনিওকে আপন করে নিয়েছিল মুন্সিপাড়া by গোলাম মর্তুজা

কুনিও হোশির লাশের ময়নাতদন্তের সময়
উপস্থিত ছিলেন জাপানি প্রতিনিধিদলের
সদস্যরা। গতকাল দুপুরে রংপুর মেডিকেল
কলেজের মর্গ থেকে তোলা ছবি -হাসান রাজা
রংপুর শহরের উপকণ্ঠে নিভৃত গ্রাম কাচু আলুটারি। রাস্তার দুপাশে দীর্ঘ পথজুড়ে শুধু ধানখেত আর পুকুর। এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই কখনো গুলির শব্দ শোনেনি। শনিবার সকালে পরপর তিনটি গুলির শব্দে তারা হকচকিত। যে গুলিতে নিহত হয়েছেন জাপানের নাগরিক ৬৬ বছরের কুনিও হোশি।
গ্রামবাসী বলছেন, তাঁরা মোটরসাইকেল আরোহী খুনিদের দেখে সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশকে জানিয়েছিলেন। পুলিশ বলছে, তারা খবর পেয়ে খুনিদের ধরার চেষ্টা করেও পারেনি।
গতকাল রোববার কাচারিবাজার এলাকায় মুন্সিপাড়ার কয়েকজন তরুণের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, পাড়ার লোকদের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন কুনিও হোশি। প্রতি সন্ধ্যায় পাড়ায় হাঁটাহাঁটি করতেন। প্রতিদিনই পাড়ার দোকান থেকে অন্তত দুই হালি কলা কিনতেন। পাড়ার শিশুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন, চকলেট কিনে দিতেন। ভাঙা ভাঙা বাংলায় শিশুদের নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতেন। শুনে মজা পেত শিশুরা। তাদেরও দু-একটি জাপানি শব্দ শেখানোর চেষ্টা করতেন কুনিও।
স্থানীয় কয়েকজন তরুণ বলেন, কুনিওকে তাঁরা পাড়ার লোকই মনে করতেন। তিন-চার বছর ধরে তিনি বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন। দুই থেকে চার মাস থেকে চলে যেতেন। আবার কয়েক মাস পরে ফিরে আসতেন। সাদামাটা জামা-কাপড় পরে চলাফেরা করতেন। পাড়ার তরুণদের সঙ্গে কুনিও নামাজ পড়তে যেতেন। গত কোরবানি ঈদে সবার সঙ্গে মুন্সিপাড়া কবরস্থান ঈদগা মাঠে ঈদের নামাজে অংশ নিয়েছেন। স্থানীয় কেরামতিয়া মসজিদে শুক্রবার জুমার নামাজও পড়তে যেতেন।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, কুনিও যে বাড়িতে থাকতেন, তার মালিক এ কে এম জাকারিয়া দীর্ঘদিন জাপানে ছিলেন। তাঁর ভাই এখনো জাপানপ্রবাসী। তিন বছর আগে জাকারিয়া তাঁর সঙ্গে কুনিওর পরিচয় করিয়ে দেন। বলেন, কুনিও পোলট্রি খাবার নিয়ে গবেষণা করছেন। ওই ব্যবসায়ী বলেন, কুনিওর সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। পরে তিনি কুনিও ও জাকারিয়ার কাছ থেকে জেনেছেন, কুনিও এমন ধরনের পশুখাদ্য নিয়ে গবেষণা করছেন, যেগুলো দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যেই অনেক বেড়ে উঠবে। এসব ঘাসের বীজ নিয়ে গবেষণা জাপানে অনেক ব্যয়সাধ্য। তাই তিনি বাংলাদেশে এই গবেষণা করতে এসেছেন বলেই সবাই জানে। তাঁরা বেশ কিছুদিন ধরে খামার করার উপযোগী জমি খুঁজছিলেন। পরে জাকারিয়া তাঁর আত্মীয় হুলমায়ূন কবির ওরফে হীরার নামে আলুটারি গ্রামের তিন ভাইয়ের কাছ থেকে বছরে ৮২ হাজার টাকায় দুই একর আট শতক জমি বর্গা নিয়ে দেন। সেই জমিতেই কয়েক মাস আগে ঘাসের চাষ করেন কুনিও।
কুনিওর ঘাসের খামার: রংপুর শহর থেকে একটু বাইরে রংপুর-হারাগাছ স্থানীয় সড়ক ধরে প্রায় দুই কিলোমিটার গেলে কাচু আলুটারি গ্রাম। পাকা সড়ক থেকে মেঠো পথ ধরে এক কিলোমিটারের মতো গেলেই কুনিও হোশির ঘাসের খেত। খেতের ঘাস তিন-চার ফুট লম্বা।
রংপুরের আলুটারি গ্রামের এখানকার
রাস্তাতেই খুন হন জাপানি নাগরিক
কুনিও হোশি। তদন্তের জন্য পুলিশ হলুদ
ফিতা দিয়ে ঘিরে রেখেছে জায়গাটি।
রাস্তা বন্ধ থাকায় পথচলতি এক গ্রামবাসী
সাইকেল নিয়ে ধানখেতের মধ্য
দিয়ে যাচ্ছেন l ছবি: প্রথম আলো
প্রায় প্রতিদিনই খামারে আসতেন কুনিও। আলুটারি গ্রামের আবদুল জব্বার বলেন, খামারে এসে ঘাস কত লম্ব হয়েছে তা মাপতেন, কখনো নিজেই নিড়ানি দিতেন। তাঁর দাবি, কুনিও তাঁকে বলেছেন, রংপুরের মাটিতে তাঁর প্রত্যাশামতো খুব দ্রুত বাড়ছে ঘাস। জাপানে এত দিনে এই ঘাস দেড় থেকে দুই ফুট লম্বা হতো। এখানে তা তিন ফুট ছাড়িয়ে গেছে।
হত্যাকাল: রংপুর শহরের মুন্সিপাড়া থেকে খামারে যেতেন মুন্নাফ আলীর রিকশায়। অন্যদিনের মতোই শনিবার সকালে মুন্নাফের রিকশায় তিনি খামারের দিকে রওনা দেন। রিকশাটি পাকা সড়ক ফেলে মাটির রাস্তায় ঢুকে ১০০ গজ এগোতেই সামনের দিক থেকে দুই ব্যক্তি এসে কুনিওকে ধাক্কা মেরে রিকশা থেকে ফেলে দিয়ে গুলি করে। স্থানীয় গ্রাম পুলিশ আনোয়ার হোসেন বলেন, তিনি স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে শুনেছেন, কুনিওর রিকশাটি ওই এলাকায় আসার আগে লাল রঙের একটি ডিসকভার মোটরসাইকেলে তিনজন এসে কাঁচা রাস্তার মাথায় পাকা সড়কে থামে। এর নম্বরপ্লেটে শুধু ‘প্রেস’ লেখা ছিল। দুজন সেই মোটরসাইকেল থেকে নেমে হেঁটে মেঠোপথ ধরে কিছুটা এগিয়ে যায়। তারা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। কুনিওর রিকশাটি ওপাশ থেকে খোকা মিয়ার বাড়ির সামনে আসার পর ওই দুজন অস্ত্র বের করে এগিয়ে যায়। একজন কুনিওকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়, আরেকজন তাঁকে গুলি করে।
আলুটারি মোড়ের দোকানদার মো. মোস্তফা বলেন, তিনিসহ বাজারের ব্যবসায়ীরা গুলির শব্দ শুনেছেন। যেহেতু তাঁদের বেশির ভাগই এর আগে কখনো গুলির শব্দই শোনেননি, তাই তাঁরা বিষয়টি বুঝতেই পারেননি। সে সময় সেখান দিয়ে ঢাকা থেকে হারাগাছগামী একটি বাস যাচ্ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, বাসের চাকা ফেটে গেছে।
সারাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম বলেন, বাসটি যাওয়ার কারণে গুলির শব্দে অনেকে বিভ্রান্ত হয়েছে। পরে চিৎকার শুনে আলুটারি মোড়ের দোকানগুলোতে থাকা লোকজন ভেবেছিলেন, হয়তো খোকার বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। স্থানীয় তিন যুবক আমিনুর, মোস্তফা ও শহীদার দৌড়ে এসে দেখেন কুনিও পড়ে রয়েছেন। তাঁরা কুনিওকে ধরে পাকা রাস্তায় নিয়ে যান। সেদিক দিয়ে যাওয়ার সময় স্বাধীন নামে এক অটোচালকের গাড়িতে কুনিওকে নিয়ে উঠে বসেন তিনজন। রংপুর শহরের সাতমাথায় গিয়ে কুনিওকে নিয়ে একটি পিকআপ ভ্যানে ওঠেন।
চেয়ারম্যান বলেন, প্রত্যক্ষদর্শী তিনজন তাঁকে বলেছেন যে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে কিছুক্ষণ কথা বলতে পেরেছিলেন কুনিও। তবে তাঁর কথা তাঁরা বুঝতে পারেননি। শুধু এটুকু বোঝা গেছে, তিনি সাতমাথায় যেতে বলছেন। সাতমাথায় যাওয়ার আগেই কুনিও নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
আশরাফুল বলেন, সকাল সোয়া ১০টার দিকে তিনি প্রথমে কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ফোনে বিষয়টি জানান। এরপর তিনি জেলা প্রশাসকসহ অন্য কর্মকর্তাদের ফোন করেন।
কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, চেয়ারম্যানের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষে বিষয়টি জানানো হয়। দ্রুতগতিতে চারদিকে ছড়িয়ে থাকা পুলিশকে সতর্ক করা হয়। কিন্তু দুর্বৃত্তদের ধরা যায়নি। ওসি বলেন, রংপুর থেকে হারাগাছগামী ওই রাস্তাটিতে অনেকগুলো শাখা রাস্তা এসে সংযুক্ত হয়েছে। এ কারণে অনেকগুলো পথে পুলিশ অবস্থান নিয়েও তাদের ধরতে পারেনি।

Sunday, July 26, 2015

পাচারকারীদের থেকে মেয়েকে উদ্ধার করেও চাপে পরিবার by গোলাম মর্তুজা ও আহাদ হায়দার

পাত্র দেখানোর নাম করে সদ্য এসএসসি উত্তীর্ণ একটি মেয়েকে বাগেরহাটের কচুয়া থেকে ভারতে পাচার করেছিল তারই এক আত্মীয়। স্বজনেরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আড়াই মাস পরে মেয়েটিকে ভারতের উত্তরাখন্ড থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। কিন্তু এরপর থেকেই পাচারকারীরা সমানে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটি ও তার পরিবারকে।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের প্রশ্রয়ে আসামিরা!
সাতজনের বিরুদ্ধে মেয়েটির বাবা মানব পাচারের মামলা করেছিলেন। তাদের ধরতেও কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না পুলিশ। উল্টো মামলা তুলে নিতে চাপ দিয়ে যাচ্ছে আসামিরা। ভুক্তভোগী মেয়েটির পরিবার এ নিয়ে কচুয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছে।
পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা আসামিদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তার কারণেই আড়াই মাসেও আসামিদের ধরতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি পুলিশ। পুলিশ বলছে, বাগেরহাটের আওয়ামী লীগের এক নেতার পক্ষের দুই ব্যক্তি ওই মেয়েটির বাড়িতে এসেছিল বলে তদন্তে জানা গেছে। তবে আসামি ধরা বা না-ধরার বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই।
মামলার বিবরণ ও মেয়েটির স্বজনদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট জেলা শহরে নিয়ে পাত্র দেখানোর নাম করে মেয়েটিকে বাড়ি থেকে মোটরসাইকেলে করে নিয়ে যায় তারই চাচাতো বোনের স্বামী আল আমিন ফকির। এরপর থেকেই মেয়েটি নিখোঁজ। এ ঘটনায় ৮ মার্চ কচুয়া থানায় একটি ‘নিখোঁজে’র জিডি করে মেয়েটির পরিবার। বাড়ি থেকে যাওয়ার এক মাস পর ১ এপ্রিল মেয়েটি তার মাকে ভারতের একটি নম্বর থেকে ফোন করে জানায়, সে বেঁচে আছে, ভালো আছে। ওই মুঠোফোনের সূত্র ধরেই তার সন্ধানে নামেন মামা রিয়াজ উদ্দীন। স্বজনেরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, মেয়েটিকে ভারতে পাচার করা হয়েছে। এরপর মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে আল আমিন ফকিরসহ সাতজনকে আসামি করে কচুয়া থানায় মানব পাচার আইনে একটি মামলা করেন। মামলার অন্য আসামিরা হলো নাজমা বেগম, মেহেদি হাসান, পারুল বেগম, আল আমিনের স্ত্রী দুলালি বেগম এবং তার দুই ভাই আকু ফকির ও জুমা ফকির।
উদ্ধারপর্ব: মেয়েটির মামা রিয়াজ উদ্দীন বলেন, তিনি দুই দফা ভারতে গিয়ে সেখানে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও মানবাধিকার সংগঠন স্টপের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত উত্তরাখন্ড রাজ্যের নেপাল সীমান্তবর্তী জেলা রুদ্রপুর থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করেছেন। তিনি বলেন, ১ এপ্রিল প্রথম যেই নম্বরটি থেকে মেয়েটি ফোন করেছিল সেই নম্বরে বাংলাদেশ থেকে যখন বলা হয় তখন সীমা পরিচয় দিয়ে এক নারী বলেছিলেন, তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নন্দীগ্রামে অবস্থান করছেন। সীমা পরিচয় দেওয়া ওই নারী দাবি করেন, মেয়েটিকে তিনি বাসের ভেতর পেয়েছেন। মেয়েটির অভিভাবক ভারতে গেলে তিনি তাকে অভিভাবকের হাতে তুলে দেবেন। কিন্তু রিয়াজ উদ্দীন ভারতে গিয়ে ওই নম্বরটি বন্ধ পান। এরপর বাংলাদেশ হাইকমিশনের সহযোগিতায় পুলিশের শরণাপন্ন হন রিয়াজ। পুলিশ মুঠোফোন নম্বরটি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ করে দেখে ঝাড়খন্ড থেকে সিমকার্ডটি কেনা, সেটি দিল্লিতে ব্যবহৃত হচ্ছিল। নম্বর বন্ধ থাকায় পুলিশ কিছু করতে পারেনি।
রিয়াজ উদ্দীন বলেন, বাগেরহাটে ফিরে তিনি একপর্যায়ে প্রধান আসামি আল আমিন ফকিরের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে দিল্লির একটি ঠিকানা পান। এর মধ্যেই ৪ মে মেয়েটি ফোন করে জানায় যে, সে পাচারকারীদের খপ্পর থেকে পালিয়ে দিল্লির গ্রিন পার্ক এলাকায় প্রিয়া নামে এক নারীর তত্ত্বাবধানে রয়েছে। পরদিনই রিয়াজ রওনা দিয়ে ৬ মে কলকাতা পৌঁছান। সেখান থেকে প্রিয়া নামে ওই নারীকে ফোন করলে তিনি বলেন, তিনি এখন বেঙ্গালুরুতে রয়েছেন। তিনি মেয়েটির স্বজনদের দুই মাস পরে গিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে আসার জন্য বলে ফোন কেটে দেন।
রিয়াজ বলেন, তবুও ১১ মে দিল্লি যান তিনি। সেখানে গিয়ে প্রিয়ার ওই নম্বরটি বন্ধ পান। পরে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে স্টপ নামের একটি এনজিওর সাহায্য চাওয়া হয়। এর মধ্যেই পাচার হওয়া মেয়েটির বিষয়ে জানতে ভারতের একটি নম্বর থেকে গ্রামের বাড়িতে যোগাযোগ করেন এক নারী। পরে সেই নম্বরটি সংগ্রহ করে দিল্লি থেকে ফোন করেন রিয়াজ। জানতে পারেন, নিতু রায় ও অমিত নামে দুই যুবকের তত্ত্বাবধানে রয়েছে মেয়েটি। মূলত প্রিয়া নামের ওই নারীও পাচারকারী চক্রের সদস্য ছিলেন। তাঁর বাড়ির গৃহকর্মী ছিল অমিত। অমিতের কাছে সাহায্য চাইলে অমিত মেয়েটিকে নিয়ে উত্তরাখন্ডের রুদ্রপুরে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে ১৩ মে মেয়েটিকে পুলিশ ও এনজিও স্টপের সহায়তায় উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়ার পরে মেয়েটি জানায়, তাকে বিক্রি করে দিয়েছিল আল আমিন। এরপর কয়েক হাত বদল হয়ে দিল্লি যায়। তাকে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার জন্য নানা রকম নির্যাতনও করা হয়। এর মধ্যে মেয়েটি মার্কেটে কাপড় কিনতে যাওয়ার কথা বলে পাচারকারীদের কবল থেকে পালাতে সক্ষম হয়। কিন্তু গিয়ে পড়ে আরেক পাচারকারী প্রিয়ার খপ্পরে। ২৪ মে মেয়েটি বাগেরহাটে মা-বাবার কাছে ফেরে।
হুমকি ও চাপ: মেয়েটি ফেরার পর থেকে গত দেড় মাসে পাঁচবার তাদের বাড়িতে মোটরসাইকেল আরোহী যুবকেরা গিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে এসেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গা থেকে মামলা তুলে নেওয়ার চাপও দেওয়া হচ্ছে। পরিবারটি রয়েছে চরম আতঙ্কে।
গত বুধবার মঘিয়া গ্রামে গিয়ে ওই মেয়েটির বাবার নাম বলে তাদের বাড়িতে যাওয়ার পথ জানতে চাইলে লোকজন কেউই সাহায্য করেনি। উল্টো বিভিন্নজন নানা রকম প্রশ্ন শুরু করে। পরে মেয়েটির বাড়ি খুঁজে পাওয়ার পর তার ভাই জানান, হুমকিদাতা সন্দেহে গ্রামবাসী এ রকম আচরণ করেছিলেন। মেয়েটির পরিবার কৃষক, বেড়ার ওপরে টিন দিয়ে তাদের বাড়ি। পরিবারের সদস্যরা জানান, এখন পর্যন্ত পাঁচবার মোটরসাইকেলে তাদের বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে গেছে অচেনা যুবকেরা। এর মধ্যে একই লোকেরা এসেছে তিনবার। তারা নিজেদের বাগেরহাট সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিনা হাসিবুল হাসান ওরফে শিপন মিনার লোক বলে পরিচয়ও দিয়েছে। আর বিভিন্ন মাধ্যম থেকে মামলা তুলে নিয়ে ‘মীমাংসা’ করার চাপও আসছে। অব্যাহত হুমকি ও চাপের মুখে ২৩ জুন মেয়েটির ভাই কচুয়া থানায় একটি জিডি করেন।
পরিবারের কয়েকজন সদস্য জানান, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা আসামিদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন। এ কারণে তাদের ধরছে না পুলিশ।
কচুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ শমসের আলী বলেন, আসামিদের না ধরার বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই। প্রধান আসামি আল আমিনসহ দুজন এখন ভারতে পালিয়ে রয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। বাকিদের ধরার জন্য তিনিসহ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা একাধিকবার বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছেন। এর মধ্যে ২২ জুন রাতে ২ নম্বর আসামি আল আমিন ফকিরের স্ত্রীকে (পাচার হওয়া মেয়েটির চাচাতো বোন) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, কারা হুমকি দিতে এসেছিল সেটা জানাতে পারেনি বাদীপক্ষ। তবে পুলিশ তদন্ত করে দেখেছে, বাগেরহাটের সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিনা হাসিবুল হাসানের দুজন লোক ওই মেয়েটির বাড়িতে গিয়েছিল। পুলিশ জেনেছে, বাদীপক্ষেরই কোনো আত্মীয় শিপন মিনার কাছে গিয়ে বলেছেন যে মামলাটি ভুয়া। তারপরে শিপন মিনা ঘটনাটি খতিয়ে দেখার জন্য দুজনকে মঘিয়া গ্রামে পাঠান। তারা বাদী ও আশপাশের বিভিন্নজনের কাছে ঘটনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। এ বিষয়ে পরে পুলিশ শিপন মিনার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।
যোগাযোগ করা হলে মিনা হাসিবুল হাসান লোক পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো তাদের চিনিই না। আমি কেন লোক পাঠাব। আমার লোক ৩৫ জন। তাঁরা কোথাও যান না। আর যদি এ রকম লোক গিয়ে থাকে তাহলে পুলিশকে বলেন পুলিশ আটকায় রাখুক।’

Wednesday, April 29, 2015

বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ভোটকেন্দ্র হাজি সেলিম, গোলাগুলি–সংঘর্ষ by গোলাম মর্তুজা

বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্র থেকে হাজি সেলিমকে
সরিয়ে নিচ্ছেন তাঁর লোকজন। তিনি কেন্দ্রে ঢোকার
পর আ.লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর
মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয় l ছবি: সুমন ইউসুফ
পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটের (৩৭ নম্বর ওয়ার্ড) বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজনের সংঘর্ষে একজন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার ভোট চলাকালে স্থানীয় সাংসদ হাজি সেলিম সেই কেন্দ্রে ঢুকলে এই সংঘর্ষ বাধে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী আবদুর রহমান মিয়াজী (ঘুড়ি মার্কা) ও মো. শাহাবুদ্দীনের (ঠেলাগাড়ি মার্কা) লোকজনের মধ্যে সকাল থেকেই উত্তেজনা চলছিল। এই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরে পোগোজ স্কুল কেন্দ্রে সকালে ভোট গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। সুরিটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়েও এই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্র নিয়ে সোমবার রাত থেকেই উত্তেজনা চলছিল। ঘুড়ি মার্কার প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে সাংসদ হাজি সেলিম সোমবার রাতে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্রে এলে সেখানে হইচই হয়। সাংসদ কেন্দ্রে না ঢুকেই ফিরে যান।
এরপর গতকাল বেলা পৌনে দুইটার দিকে দুই পক্ষের উত্তেজনার মধ্যেই হাজি সেলিম লোকজন নিয়ে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্রে ঢোকেন। এ সময়ই কেন্দ্রে বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যায়। এরপরই বিদ্রোহী প্রার্থী শাহাবুদ্দীনের লোকজন কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে অভিযোগ করেন, হাজি সেলিম তাঁদের বের করে দিয়ে ঘুড়ি মার্কার পক্ষে জাল ভোট দেওয়াচ্ছেন। শাহাবুদ্দীনের কর্মী নার্গিস আক্তার, মেরি ও সাজু বেগম অভিযোগ করেন, হাজি সেলিম তাঁদের মারধর করেছেন।
কেন্দ্রসংলগ্ন রাস্তায় দুই পক্ষের প্রার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় আগ্নেয়াস্ত্র কোমরে গুঁজে একদল তরুণকে দৌড়াতে দেখা যায়। এদের কয়েকজন গুলিও ছোড়ে। এদের গোলাগুলির সময় লিটন নামের এক ব্যবসায়ী গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
পরে পুলিশ এসে ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশেরও একটি মাইক্রোবাস ভাঙচুর করে বিবদমান কর্মীরা।
এদিকে এ সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ছবি তুলতে গেলে একটি অনলাইন গণমাধ্যমের ফটো সাংবাদিককে এক পুলিশ কর্মকর্তা অস্ত্র উঁচিয়ে বলেন, ‘ছবি তুললে গুলি করব।’
বেলা দুইটার দিকে হাজি সেলিম কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। এর পরও উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চলতে থাকে। কেন্দ্রে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আড়াইটার পরে কেন্দ্রে ভোট দিতে আসার জন্য প্রার্থীদের লোকজন ডাকাডাকি শুরু করেন। তবে এরপর কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে।
কেন্দ্রে ঢুকে মারধর ও জাল ভোটের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাজি সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কিছু দেখিনি। আমি জানি না।’

Saturday, April 25, 2015

তিন কন্যার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প by গোলাম মর্তুজা

ইয়ানূর, রেহানা আর লতিফা। তিন পরিবারের তিনটি মেয়ে। তিনজনের মধ্যে মিল হচ্ছে রানা প্লাজা ধস এঁদের জীবন অনেকখানি বদলে দিয়েছে। পঙ্গু বানিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে স্বজনকে। স্বজনের নির্মমতাও দেখতে হয়েছে এঁদের কাউকে। তবে এই তিন কন্যা জীবনকে জীবনের হাতে ছেড়ে দেননি। ঘুরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধে নেমেছেন। পড়াশোনা ছেড়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ইয়ানূর পোশাক কারখানায় কাজ নিয়েছিলেন। মা আনোয়ারা বেগম আর তিনি একই সঙ্গে রানা প্লাজায় কাজ করতেন। ভবনধসের ১৪ দিন পরে আনোয়ারার গলিত লাশ পাওয়া যায় সাভারের অধর চন্দ্র বিদ্যালয়ের মাঠে। কোমরে, পায়ে, মাথায় আঘাত নিয়ে ইয়ানূর তখন হাসপাতালে। ইয়ানূর এখনো ভালোভাবে হাঁটতে পারেন না। বাঁ পা টেনেহিঁচড়ে আর শরীরটাকে বাঁকিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে ইয়ানূরকে হাঁটতে হয়। মায়ের মৃত্যু, নিজের শারীরিক সীমাবদ্ধতা ইয়ানূরকে বদলে দিয়েছে অনেকখানি। তবে হাল ছাড়েননি তিনি। এখন ইয়ানূর আবারও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছেন।
ইয়ানূর
ইয়ানূরের বাবা ঝালমুড়িবিক্রেতা ইউনুস আলী মুন্সীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। ইউনুস আলী বলেন, ভবনধসের ১৪ দিন পরে তিনি স্ত্রীর গলিত লাশ পান। তখন ইয়ানূর হাসপাতালে। তাঁর ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে ইয়ানূরই বড়। ছোটগুলোকেও দেখার কেউ নেই। একটা ঝড় গেছে সবার জীবনের ওপর দিয়ে। তবে এখন পর্যন্ত ইয়ানূরের মায়ের জন্য ছয় লাখ টাকা ও ইয়ানূরের জন্য আড়াই লাখ টাকা পেয়েছেন। ইয়ানূরকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সিআরপি। সম্প্রতি বিয়েও করেছেন ইউনুস। বললেন, ‘ছোট বাচ্চাদের দেখাশোনার কেউ নাই, সেই জন্য আবার সংসার করলাম।’
পা হারিয়েও থেমে নেই রেহানা: রানা প্লাজায় দুই পা হারানো শ্রমিক রেহানা আক্তারেরও দেখা মিলল এই গণকবাড়ির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। রানা প্লাজা ধসের পরে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল ও সিআরপিতে দীর্ঘ চিকিৎসা নিতে হয়েছে রেহানাকে। চিকিৎসা নিতে এসে জীবনসঙ্গীও খুঁজে পেয়েছেন রেহানা। তাঁর স্বামী মো. খোকন সিআরপির কর্মী। এই দম্পতি এখন সিআরপির গণকবাড়ি কেন্দ্রে কর্মীদের জন্য নির্ধারিত আবাসস্থলে থাকেন।
মার্চ মাসের দুপুরবেলা যখন রেহানার সঙ্গে দেখা হলো তখন তিনি সিআরপির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সেলাইয়ের (দরজি কাজ) প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন। বললেন অপেক্ষা করতে। প্রশিক্ষণ শেষে নিজেই হুইলচেয়ার চালিয়ে বাসায় এলেন। বাসায় তাঁর স্বামী খোকন মিয়া ছিলেন। খোকনের চোখের চিকিৎসা চলছে, সম্প্রতি অস্ত্রোপচার হয়েছে। ঘরে আগে থেকেই ভাত রান্না করা ছিল। রেহানা ঘর থেকে ডিম ও আনুষঙ্গিক জিনিস নিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ভেজে আনলেন। স্বামী-স্ত্রী মিলে দুপুরের আহার সেরে স্বামীর চোখে ড্রপ দিয়ে দিলেন তিনি। এরপর আলাপ করতে বসলেন।
রেহানা

পাবনার মেয়ে রেহানা জানান, হাঁটুর ওপর থেকে পা কাটা পড়ার পরে তাঁর মা বিয়ে নিয়ে খুব চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু সিআরপিতে কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজন কেন্দ্রে গিয়ে পরিচয় হয় খোকন মিয়ার সঙ্গে। খোকন রোগীদের কৃত্রিম অঙ্গ পরিয়ে দেন। সেখান থেকে জানাশোনা, মন দেওয়া-নেওয়া। এরপর দুই পরিবারের উপস্থিতিতে সিআরপিতেই বিয়ে হয়। কয়েক মাস আগে সিআরপির সাভার কেন্দ্র থেকে গণকবাড়ি কেন্দ্রে বদলি হয়ে আসেন খোকন মিয়া। এখন এখানেই রয়েছেন এই দম্পতি। এখনো অনেক শারীরিক জটিলতা রয়েছে রেহানার। পায়ে আরও একটি অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা রয়েছে। তবু রেহানা জানালেন, এখন নিজের কাজগুলো নিজেই করার চেষ্টা করেন। তিনি জানান, এ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পেয়েছেন। সেই টাকা ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে রেখেছেন। স্বামী এখানে চাকরি করছেন। এই দিয়ে বেশ ভালোই চলছে দুজনের সংসার।
লতিফা
ছোট্ট লতিফা এখন সংসারী: রানা প্লাজা ধসের পরে অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আরিফা আর লতিফা নামে দুই বোনের সঙ্গে। আরিফার বয়স তখন ১০ আর লতিফার ১৪-১৫। তাঁরা তাঁদের মা রীনা বেগমকে খুঁজছিলেন। ধসের ১৬তম দিনে আরিফাই মায়ের লাশ শনাক্ত করে। এরপর দুই বোন গ্রামের বাড়িতে চলে যান। মায়ের মৃত্যুর পরে পরিবারটি দুই লাখ টাকা পেয়েছিল। কিন্তু এক বছর পরেই তাঁদের বাবা লুৎফর রহমান আবার বিয়ে করে নতুন সংসার করেন। আর দুই বোন যেন অথই জলে পড়েন। এরপর ছোট বোনকে নিয়ে লতিফা আবারও সাভারের পুরোনো বাড়িতে চলে আসেন। তত দিনে তাঁদের ভাড়া ঘরে অন্য লোক উঠে গেছে। পাশের বাড়িতে ঠাঁই হয় দুই বোনের। এই বাড়ির সাইফুল ইসলামের স্ত্রী রাশিদা এক বছরের শিশু রেখে রানা প্লাজায় মারা গেছেন। সাইফুলের বোন মাজেদাও রানা প্লাজায় গুরুতর আহত হন। চলতি বছর প্রতিবেশীরা সাইফুলের সঙ্গে লতিফার বিয়ে দেন। বিয়ের পরে একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই সংস্থার আবাসিক স্কুলে বোন আরিফাকে ভর্তি করিয়েছেন লতিফা ও তাঁর স্বামী সাইফুল।

Friday, April 24, 2015

ডাকাতির সময় ব্যাংকের সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল by গোলাম মতুর্জা ও অরূপ রায়

আশুলিয়ার বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া শাখায় ডাকাতির সময় ব্যাংকটির সবগুলো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) বন্ধ ছিল। ডাকাতির সময়ের কোনো দৃশ্য ক্যামেরায় পাওয়া যায়নি। বিষয়টিকে ‘রহস্যজনক’ মনে করছে পুলিশ।
ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, ক্যামেরাগুলো পরিকল্পনা করে আগে থেকে নষ্ট রাখা হয়েছিল, নাকি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জানতে চাইলে কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু সাদেক মো. সোহেল বলেন, ‘ক্যামেরায় ফুটেজ না পাওয়ার কথা পুলিশ আমাকে বলেছে। আসলে যারা এগুলো স্থাপন করেছিল, তাদেরই দায়িত্ব ছিল রক্ষণাবেক্ষণ করা। কিন্তু কী হয়েছে জানি না। এখন অন্য শাখায় যাতে এ ব্যবস্থা সচল থাকে, সেটা নিশ্চিত করছি।’
মঙ্গলবার ডাকাতির ঘটনায় ব্যাংকের ভেতরে ব্যবস্থাপকসহ তিনজন, ডাকাতদের ধরতে গিয়ে চারজন এবং গণপিটুনিতে একজন ডাকাত-মোট আটজন নিহত হন। এ ঘটনায় কমার্স ব্যাংকের দ্বিতীয় কর্মকর্তা ফরিদুল হাসান বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। এতে গ্রেপ্তারকৃত বোরহান উদ্দীন মৃধা ও সাইফুলের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৮-১০ জনকে আসামি করা হয়। আর গণপিটুনিতে ডাকাত নিহতের ঘটনায় অজ্ঞাত সংখ্যক গ্রামবাসীকে আসামি করে মামলা করেছেন আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক মো. জাকারিয়া। ডাকাতির ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে কাঠগড়া বাজারের ব্যবসায়ীরা গতকাল দোকান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানান। বাজারে তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল ও আশপাশের মানুষ বক্তব্য, এ ঘটনা প্রতিরোধে বা অপরাধীদের ধরতে পুলিশ কিছুই করেনি। ডাকাতদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে চারজন নিরীহ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। কাঠগড়া বাজার মসজিদের খতিব তৈয়ব আলী বলেন, তিনিসহ চটপটি বিক্রেতা ও আরও তিন-চারজন ব্যাংকের সিঁড়ির সামনে মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় ব্যাংকের ভেতর থেকে একজন চিৎকার করতে করতে দৌড়ে এসে বলেন, ‘ডাকাত পড়েছে, বাঁচান’। তখন চার-পাঁচজন সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ব্যাংকের দিকে যাওয়া শুরু করেন। এ সময় ওপর থেকে গুলির শব্দ আসে। এ সময় তিনি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেন, ‘ব্যাংকে ডাকাত আইছে, ডাকাত আইছে’। এরপর অনেক লোক ব্যাংকের সামনে জড়ো হয়ে যায়। তখন ব্যাংকের ভেতর থেকে কয়েকজন ভবনের ভেতরের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যায়। অপর দুজন গুলি করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। একটি গুলি মসজিদের কাচে লাগে। ডাকাতেরা তখন দুটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে মসজিদের পাশে দাঁড়ানো কয়েকজন আহত হন। ডাকাতেরা গুলি ছুড়তে ছুড়তে বাজারের ভেতর দিয়ে সড়কের দিকে চলে যায়।
এরপর বাজারের লোকজন ডাকাতদের ধাওয়া দিতে থাকে, তারাও সমানে গুলি-বোমা ছুড়তে থাকে, ছুরি চালাতে থাকে। গতকালও বাজারের বিভিন্ন অংশে রক্তের দাগ দেখা গেছে।
ডাকাতদের ধরতে নিজের গাড়ি নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন রনি দেওয়ান। তিনি বলেন, তিনি কাঠগড়ার বাসার সামনে নিজের গাড়িতে বসে ছিলেন। মাইকে ডাকাত, ডাকাত চিৎকার শুনে চাচাতো ভাই ইমরান আহমেদ ও নয়ন দেওয়ানকে নিয়ে বাজারের দিকে আসেন। এ সময় সবাই চিৎকার করছিল ‘ওই যে ডাকাত গেল’। তাঁরা দেখেন একটি বাজাজ ডিসকোভার মোটরসাইকেলে (ঢাকা মেট্রো হ ৪১-৬৬৭৬) দ্রুতগতিতে তিনজন পালিয়ে যাচ্ছে। তিনি গাড়ি নিয়ে ওই মোটরসাইকেলের পিছু ধাওয়া করেন। তিনজন বসা, তবুও মোটরসাইকেলের গতি ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার ওপরে। তিনিও গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেন। এ অবস্থাতেই প্রায় দেড় কিলোমিটার ধাওয়া করে গাড়ির বাম্পার দিয়ে ধাক্কা দিলে মোটরসাইকেলটি ছিটকে পড়ে। তিনি গাড়ি থামাতে না থামতেই ডাকাতেরা একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় মোটরসাইকেল আরোহী দুজন দৌড়ে পালাতে থাকেন। রনির গাড়িতে থাকা দুজন তাদের ধরতে ছুট দেন। রনি বের হয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে পড়ে যাওয়া একজনকে ধরে ফেলেন। তাদের ব্যাগে বেশ কিছু টাকাও পাওয়া যায়।
ক্যামেরা অচল: ঢাকা জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, তাদের ধারণা ছিল, ব্যাংকের সিসি ক্যামেরা থেকে অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে। কিন্তু কাল ভিডিও ব্যবস্থাটি পরীক্ষা করে দেখেন, এতে কোনো ফুটেজ নেই। ওই কর্মকর্তা বলেন, কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া শাখায় মোট আটটি সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। ক্যামেরাগুলো এমনভাবে লাগানো, যাতে ব্যাংকের ভেতরের সব দৃশ্য দেখা যায়। একটি ক্যামেরা একটি মনিটর ও রেকর্ড করার যন্ত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা।
জেলা পুলিশ সুপার বলেন, কমার্স ব্যাংকের সিসি ক্যামেরা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সার্ভিস-১ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এগুলোর সরবরাহ করেছে। একজন কর্মকর্তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তিনি জানিয়েছেন, রেকর্ড করা যন্ত্রটি অচল ছিল।