Saturday, August 29, 2015

সিংড়ায় ৫ পরিবার ১৬ দিন ধরে একঘরে: শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ব্যহত

একঘরে হয়ে থাকা লোকজন
নাটোরের সিংড়া উপজেলার জয়নগর গ্রামের আইয়ূব আলীসহ পাঁচ কৃষক পরিবারকে ১৬ দিন ধরে একঘরে করে রেখেছে স্থানীয় মাতব্বরেরা। এতে ওই ভুক্তভোগী পরিবারের তিন মেয়ে শিক্ষার্থীর লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এদিকে কতিপয় বখাটের হুংকারে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ৩ মেয়ে শিক্ষার্থীসহ ৫ নিরীহ কৃষক পরিবার। অবিলম্বে প্রসাশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হস্তক্ষেপ দাবি জানিয়েছেন ভূক্তভোগীরা। এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ দিন ধরে উপজেলার জয়নগর গ্রামের আইয়ুব আলী দিং ৫ ভাইয়ের সাথে ছোট ভাই শরিফুল ইসলাম ভুলুর জমি-জমা নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। গত ১১ আগষ্ট বিরোধ নিরসনের জন্য গ্রামপ্রধান খবির উদ্দিন সরদারের বাড়ির পাশে একটি শালিসী বৈঠকও বসে। কিন্তু জনৈক ব্যক্তি আব্দুল হান্নানসহ কয়েকজন গ্রাম্য মাতব্বরের কিছু উৎভট, অবাস্তব কথায় শালিসী বৈঠক দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পরে বিকেলেই জনৈক যুবক আব্দুল হান্নান ও আব্দুর রহমান, আব্দুস সাত্তার, আনছার আলীসহ কতিপয় মাতব্বরের নির্দেশে ওই ৫ কৃষক পরিবারের জন্য সরকারি রাস্তায় চলাচল ও শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বাড়ি বাড়ি জানিয়ে দেন জনৈক আশরাফ আলী। গত বুধবার সরোজমিনে গিয়ে এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি খবির উদ্দিন সরদার ও এলাকাবাসী শফিউল আলম, সিহাব উদ্দিন, হুসেন আলীসহ অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, ওই পরিবারের সদস্যদের সরকারি রাস্তায় চলাচল ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি অকপটে সবাই স্বীকার করেন। তবে ওই পরিবারের সদস্যদের কিছু দোষও রয়েছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেন। আর সেখানে জড়ো হওয়ার অনেকে বলেন, তাদের বাড়িতে যাওয়া ও কথা বলা নিষেধ। কারণ তাদের সমাজ থেকে একঘরে করা হয়েছে। এসময় ছালেহা বেওয়া (৬০) বলেন, 'আজ ১৬ দিন ধরে সিদ্ধ ভাত ও বাড়ির শাক কচু খেয়ে রয়েছি। গ্রাম্য কতিপয় মাতবরকে উৎকোচ না দেয়ায় আমার পরিবারকে একঘরে করি দিছে। ছেলেরে হাসপাতালে দেখতি যেতে দেয় নাই। ছেলেদের জুম্মার নামাজও পড়ির দেয় না।'
এই শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে
এবিষয়ে ভূক্তভোগী পরিবারে দশম শ্রেণী পড়ুয়া শিক্ষার্থী আলো খাতুন, নবম শ্রেণীর বিজলী খাতুন ও শিশু শিক্ষার্থী সোমা খাতুনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদেরকে সরকারি রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কথা না শুনলে চরম ক্ষতি হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জনৈক আশরাফ আলী। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় কেজি স্কুলের শিক্ষিকা মৌসুমী খাতুন জানান, তার স্কুলের শিক্ষার্থী সোমা খাতুন তিনটি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেনি। আর দু’সপ্তাহ ধরে সে স্কুলেও আসে না। স্কুলে না আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি গ্রামীণ বিষয়ে কিছু বলবেন বলে মন্তব্য করেন। এ বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুল হান্নান একঘরে করে রাখার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, শালিসে তাকেই পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে। আর আশরাফ আলীর মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মিনহাজ উদ্দিন জানান, জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি ও সিংড়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস ওই শালিসী বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বিরোধ মীমাংসা না হওয়ায় বৈঠক ত্যাগের পর ওই গ্রামের এ ধরনের কোনো ঘটনা তাদেরকে কেউ জানায়নি। সিংড়া থানার ওসি নাসির উদ্দিন জানান, একঘরে করে রাখার বিষয়টি তার জানা নেই। তবে আইয়ুবসহ ওই পাঁচ পরিবারের বিরুদ্ধে সিংড়া থানায় একটি মামলা রয়েছে। বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছে। বিষয়টি জেনে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।

নাটোরে আ’লীগ-বিএনপি গুলিবিনিময় : ২ যুবলীগ নেতা গুলিবিদ্ধ

গুলিবিদ্ধ দুই যুবলীগ নেতা
নাটোরে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও বিএনপিকর্মীদের মধ্যে শনিবার বিকেলে সংঘর্ষ ও গুলিবিনিময়ের ঘটনায় যুবলীগ নেতা রাজিব ও নাজমুল গুলিবিদ্ধসহ উভয় দলের ছয় নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ঘটনার পর এলাকার বিক্ষুদ্ধ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা নাটোর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা ফয়সাল আলম আবুল ও যুবদল কর্মী রিংকুর বাড়িঘরে হামলা করে ভাঙচুর শেষে হলুদের গোডাউনে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে বেশ কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছে জেলা আওয়ামী লীগ।
স্থানীয়রা জানায়, শনিবার বিকেলে শহরের স্টেশনবাজার একতার মোড়ে সদর থানা যুবলীগের শোকসভা আয়োজন করা হয়। প্রধান অতিথি সদরের এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল সভায় পৌঁছার পর বিকেল ৬টার দিকে তেবাড়িয়া এলাকার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে সমাবেশে রওনা হয়। এ সময় মিছিলকারীরা রিংকু নামে স্থানীয় এক ছাত্রদলকর্মীকে দেখতে পেয়ে ধাওয়া করে মারপিট করে। খবর পেয়ে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে এগিয়ে এলে উভয় দলের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বেশ কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যায়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ যুবলীগ নেতা রাজিবকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং নাজমুলকে নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রাজিবের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছে। রাজিব একই এলাকার হুগোল বাড়িয়া মহল্লার আমিন হোসেনের ছেলে এবং নাজমুল শহরতলীর তেবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নাদের হোসেনের ছেলে। এলাকায় বিপুল পরিমান পুলিশ মোতায়ানে করা হয়েছে।
নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল এমপি মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তার ব্যক্তিগত সহকারী এস এম আকরামুল ইসলাম এ ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করে বলেছেন, স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা তাদের শোক মিছিলের উপর গুলিবর্ষণ করেছে। আওয়ামী লীগের কেউ কোনো গুলি করে নাই। রিংকুর উপর হামলার ঘটনাও সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেন।
নাটোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক বলেছেন, তিনি ব্যবসায়িক কাজে রাজশাহী আছেন। এ বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।
নাটোরের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার মুখার্জী ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুন্সি শাহাবুদ্দিন বলেছেন, তারা এখনো এ ঘটনার মধ্যেই আছেন এই মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্ঠা করছেন।

দূতাবাসের বাইরে বেরোলেই খুন হবেন অ্যাসাঞ্জে!

দূতাবাসের বাইরে বেরোলেই খুন হতে পারেন। শনিবার এমনটাই জানেলেন উইকিলিক্স প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জে। তাকে আমেরিকার ড্রোন খুন করতে পারে বলে নিজের বক্তব্যে বলেছেন জুলিয়ান।
তার কোথায়, “দূতাবাসের বারান্দায়ও যাওয়ার উপায় নেই আমার। আমি বেরোলেই সিআইএ-র ড্রোন আমায় খুন করবে।” একইসঙ্গে বিভিন্ন সূত্র থেকে তিনি যে তথ্য পেয়েছেন তাতে, তাকে বোমা হামলায়ও খতম করার চক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জুলিয়ান। কোনো দিনই আর মুক্ত নাগরিক তিনি হতে পারবেন না বলেও দুঃখ প্রকাশ করেছেন উইকিলিক্স প্রতিষ্ঠাতা।
২০১২ সাল থেকে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রয়েছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জে। ১৯৫১ সালের ইকুয়েডর শরণার্থী সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবের বলেই লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় পেয়েছেন জুলিয়ান। তার সংস্থার এক সুইডিশ কর্মীকে ধর্ষণ করারও অভিযোগ রয়েছে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে।

জাসদের সমালোচনা না করার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর

জাসদের সমালোচনায় প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত। তিনি জাসদের সমালোচনা না করারও পরামর্শ দিয়েছেন নেতাদের। আজ দৈনিক সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই খবর দেয়া হয়েছে। শাহেদ চৌধুরী লিখিত ওই প্রদিবেদনে বলা হয়, “আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার জাসদের সমালোচনায় বিরক্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জাসদের সমালোচনা না করারও পরামর্শ দিয়েছেন নেতাদের। সম্প্রতি জাতির জনকের শাহাদাতবার্ষিকী জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরি করার জন্য জাসদকে সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি। এরপর একই অভিযোগ করেছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এমপি। তারই ধারাবাহিকতায় গত কয়েকদিন নানাভাবে এ প্রসঙ্গে উভয় পক্ষে বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য চলছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে কয়েক দফায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় জাসদের সমালোচনা না করার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এই ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমপিসহ দলের সংশ্লিষ্ট নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এ সব আলোচনায় দলের বর্তমান এবং গত কমিটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের কয়েকজন সমকালের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতীতের সব কিছুকেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখছেন। সংশ্লিষ্ট সবাইকে ক্ষমাও করেছেন। তবে তিনি কিছুই ভোলেননি। মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি তার সহকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।” প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, “আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ সরকার এবং ১৪ দলের অন্যতম শরিক রাজনৈতিক দল। এ কারণে জাসদকে জড়িয়ে কোনো মন্তব্য না করাই সমীচীন। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিতর্কিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অনেকে ওয়ান ইলেভেনের সময়ে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তাদের নিয়েই রাজনীতি ও সরকার পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী।” এদিকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য জাসদকে জড়িয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার বক্তব্যের পর এ নিয়ে ১৪ দলের সমন্বয়ক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে কথা বলেছেন জাসদের সাধারণ সম্পাদক শরীফ নূরুল আম্বিয়া। তাকে আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম জানিয়েছেন, জাসদকে জড়িয়ে কয়েকজন নেতার বক্তব্য আওয়ামী লীগের বক্তব্য নয়। এতে ১৪ দলীয় ঐক্যে কোনো ক্ষতি হবে না। জাসদ সাধারণ সম্পাদক বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চান।

মাদকাসক্ত ছেলেমেয়ে ৫০ লাখ: ডিআইজি

দেশের ১৩ থেকে ৩২ বছর বয়সী প্রায় ৫০ লাখ ছেলেমেয়ে মাদকাসক্ত বলে জানিয়েছেন পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ইকবাল বাহার। আধুনিক বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এটা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন তিনি। শনিবার সকালে সিরাজগঞ্জ কোর্ট চত্বরে মাদক ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠানে এই তথ্য জানান ডিআইজি। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে এই মাদক নির্মূল সম্ভব নয় উল্লেখ করে ডিআইজি বলেন, এটা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে শুধু সীমান্ত এলাকার মাদকপাচার বন্ধ হলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন, পুলিশের পাশাপাশি সুধীমহল ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। সচেতন হতে হবে সবাইকে। মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীদের শনাক্ত করতে শিগগিরই রাজশাহী বিভাগের সব জেলাকে ওয়েবসাইটের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডিআইজি ইকবাল বাহার। এ সময় পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হওয়া চার হাজার ৬৬৫ বোতল ফেনসিডিল ও ১৭৯ কেজি ৫০০ গ্রাম গাঁজা রোলার দিয়ে ভেঙে ও পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।   মাদকদ্রব্য ধ্বংস কার্যক্রমে জেলা প্রশাসক বিল্লাল হোসেন, পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুপ্রিয়া রহমানসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মিসরে আল-জাজিরার তিন সাংবাদিকের কারাদণ্ড

আল-জাজিরার তিন সাংবাদিক মোহাম্মদ ফাহমি (বামে),
পিটার গ্রিস্টে ও বাহের মোহাম্মদ। ছবি: এএফপি
মিসরে আল-জাজিরার তিন সাংবাদিককে তিন বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। ‘মিথ্যা খবর’ প্রচারের মামলায় নতুন করে বিচারে তাঁদের এই সাজা দেওয়া হয়। আজ শনিবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
দণ্ড পাওয়া সাংবাদিকেরা হলেন- অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক পিটার গ্রিস্টে, মিসরীয় বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক মোহাম্মদ ফাহমি ও মিসরীয় বাহের মোহাম্মদ।
রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন ফাহমি ও বাহের। চলতি বছরের শুরুর দিকে পিটার অস্ট্রেলিয়া চলে যাওয়ায় পুনর্বিচার হয়েছে তাঁর অনুপস্থিতিতে।
আল-জাজিরার এই তিন সাংবাদিককে ২০১৩ সালে গ্রেপ্তার করে মিসরের কর্তৃপক্ষ। তাঁদের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা খবর’ প্রচার এবং নিষিদ্ধঘোষিত ইসলামপন্থী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। তবে তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন।
গত বছর এই তিন সাংবাদিককে সাত থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেন কায়রোর একটি আদালত। ওই শাস্তির বিরুদ্ধে কায়রোর সর্বোচ্চ আপিল আদালতে তাঁরা আবেদন করেন। শুনানির পর আদালত তাঁদের আবেদন গ্রহণ করেন এবং দণ্ড বাতিল করে মামলাটি নতুন করে বিচার করার নির্দেশ দেন।

এই বেলা নে ঘর ছেয়ে by সৈয়দ আবুল মকসুদ

শিয়ালদা থেকে ট্রেনে বোলপুর গিয়ে নামলাম। শান্তিনিকেতনে যাব কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে। ওই ট্রেনেরই এক যাত্রীকে কয়েকজন যুবক-যুবতী স্টেশনে ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক। তিনি অন্য ট্রেনে কোথাও যাবেন। তিনি তাঁর পরিচিত ওই যাত্রীকে বললেন, খুব যে দাঁত কেলাচ্ছ হে? পুষ্পস্তবক হাতে যাত্রী বললেন, কাজটা হয়ে গেছে। ভদ্রলোক বললেন, খুব ভালো, খুব ভালো। তাঁর ট্রেন এসে গিয়েছিল। ঘণ্টা বেজে উঠেছে। তিনি হনহন করে হেঁটে যেতে যেতে বললেন, এই বেলা নে ঘর ছেয়ে।
মানুষের জীবনে সুযোগ সব সময় আসে না। দাঁও মারার লগ্ন আছে। সেই শুভক্ষণটি ধরতে হয়। নিজের ঘরের ফুটো চালটি ছেয়ে নেওয়ার সুযোগ সব সময় পাওয়া যায় না। বোলপুর স্টেশনের ওই যাত্রী সিপিএমের এক বিধায়ক বা মন্ত্রীকে ধরে একটি লাভজনক কাজ বাগিয়ে নিয়ে এসেছিলেন কলকাতা থেকে। তাই তাঁকে শুনিয়ে বোলপুরী ভদ্রলোক স্বগতোক্তির মতো বলছিলেন, এই বেলা নে ঘর ছেয়ে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তখন মুখ্যমন্ত্রী।
আমাদের বাংলার মাটিতেও কোনো কোনো বঙ্গবাসীর জীবনে এসেছে নিজেদের ঘর ছেয়ে নেওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ—মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই লগ্নের তাঁরা সদ্ব্যবহার করছেন সর্বোচ্চ দক্ষতায়। কয়েক দিন যাবৎ একটি খবরে কী যে ভালো লাগছে! গর্বে বুকের ছাতি উঁচু হয়ে গেছে দেড় হাত। দেশীয় ব্যাংকগুলোর সিন্দুক আর ধারণ করতে পারছে না। আমাদেরই ভাইবোনদের টাকা জমা হচ্ছে সুইস ব্যাংকে। আমাদের জন্য এ যে কত বড় গৌরবের কথা, তা কোনো কলামে লিখে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
ধারণা করি, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে আগে যে ভল্ট ছিল, তাতে আর কুলাচ্ছে না। আরও বড় ভল্ট দরকার। প্রত্যেক ব্যাংকে একটি করে ভল্ট দরকার শুধু বাংলাদেশিদের টাকা রাখার জন্য। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের সর্বশেষ খতিয়ান থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালে বাঙালি ভাইয়েরা/বোনেরা বস্তায় ভরে সেখানে নিয়ে জমা করেছেন ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা (৫০ কোটি ৬০ লাখ সুইস ফ্রাঁ)। তাঁরা ২০১২ অব্দে জমা করেছিলেন ১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা এবং ২০১৩-তে ৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা।
সুইস ব্যাংকে টাকা জমা করায় কোনো পরশ্রীকাতর বাঙালি অথবা মিডিয়ার লোকদের অন্তর্দাহ হওয়ার কোনো কারণই থাকত না, যদি ওই টাকা ভ্রাতা-ভগ্নিরা বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরিবাকরি করে কামাই করতেন। বঙ্গমাতার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা এবং তারই দানাপানি খেয়ে এখানে বসেই জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাত যেকোনো উপায়ে রোজগার করে টাকাগুলো তাঁরা অতি সংগোপনে জুরিখ বা জেনেভায় পাঠিয়ে দিলেন। আমাদের মতো একজন বাঙালির জন্য বেদনাদায়ক যা তা হলো, যাঁদের নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারতাম, তা পারছি না। কারণ, তাঁদের নাম জানি না। জানলে আজ পাড়ার চা–দোকানে, ড্রয়িংরুমে চায়ের পেয়ালা হাতে, অফিসের কাজকাম ফেলে টেবিলে টেবিলে, বাস টার্মিনালে, রেলস্টেশনে, লঞ্চঘাটে, এমনকি নিষিদ্ধপল্লিতে পর্যন্ত তাঁদের নাম ধরে আলোচনা হতো। তাঁরা হতে পারতেন সেলিব্রিটি। কিন্তু সে সুযোগ তাঁরা দেননি। তাঁরা তাঁদের নামধাম প্রকাশ করার ঘোর বিরোধী। বাংলা ভাষার কোনো কোনো কবি-সাহিত্যিকের মতো তাঁরা খুবই প্রচারবিমুখ। তবে আমাদের আবদার, তাঁদের নামগুলো প্রকাশ করা হোক।
ওয়াশিংটনের গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি (জিএফআই) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০০৩ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলার মাটি থেকে অবৈধ পুঁজি বিদেশে পাচার হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা (১৩ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। শুধু ২০০৬ সালেই ২০ হাজার ৮০২ কোটি বঙ্গীয় টাকা বিদেশে উড়ে গেছে। মধ্যম আয়ের দেশ হলে এত টাকা বিদেশে পাচার সম্ভব হতো না। কেউ স্বীকৃতি দিক বা না দিক, বাংলাদেশ বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দশকেই উচ্চ আয়ের দেশে প্রমোশন পেয়েছে। বাংলার মাটি টাকা কামাই করার জন্য যদি সবচেয়ে চমৎকার জায়গা হয়ে থাকে, টাকা পাচারের জন্য তা সর্বোচ্চ স্বর্গ।
টাকা যাঁরা পাচার করছেন, তাঁদেরও শক্ত যুক্তি রয়েছে। সাংবাদিকদের ভাষায় বলতে গেলে ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ অনেকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশটা ভালো না, শান্তি-শৃঙ্খলা নেই, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কোন সময় গাড়িতে ঢিল মারে তার ঠিক নেই। আর সাড়ে তিনজন মন্ত্রী ও নেতার ভাষ্যমতে সিরিয়া ও তিউনিসিয়ার মতো এখানে জঙ্গি গিজগিজ করছে। সুতরাং এখানে বালবাচ্চা নিয়ে থাকা সম্ভব নয়। ছেলেমেয়েদের আগেই বিদেশে পাঠানো হয়েছে। ভবিষ্যতে ওরা বউ-বাচ্চা নিয়ে কী খাবে, সে জন্য কিঞ্চিৎ অর্থ সুইস ব্যাংকে হোক বা অন্য কোনো দেশের ব্যাংকে জমা রাখা জরুরি। আরে ভাই, পিঁপড়াও তো বর্ষাকালের জন্য সঞ্চয় করে রাখে কোনো শুকনা জায়গায়!
তাঁদের এই যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। শুধু বলার থাকে এইটুকু যে, এই খারাপ দেশটাতে আছেন বলেই তো টাকাগুলো কামাই করলেন। সুইজারল্যান্ডে থেকে যদি টাকাগুলো কামাই করে সেখানকার ব্যাংকে রাখতেন, আমরা খুবই প্রীত হতাম। তা ছাড়া যে অবৈধ উপায়েই টাকা রোজগার করুন না কেন, তা নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা নিষ্প্রয়োজন, তবে টাকাগুলো বৈধভাবে পাঠালেন না কেন? যাদের সব কাজেই অসাধুতা ও গোপনীয়তা, তাদের তো ঘৃণা ছাড়া আর কিছু প্রাপ্য নয়।
সর্দি-কাশি হলে বাঙালি চায়ের সঙ্গে চ্যাবনপ্রাশ সেবন করেন। কিন্তু ভোজ্যতেলের সঙ্গে কোকেন—এ কথা আমরা চৌদ্দ পুরুষে শুনিনি। স্বর্ণ ও কোকেন চোরাচালানের রুট আজ বাংলাদেশ। কতকাল থেকে কোকেন প্রভৃতি মাদকদ্রব্য বাংলাদেশ হয়ে চোরাচালান হচ্ছে, তা বিধাতা বলতে পারবেন, গোয়েন্দারা নন। সেদিন ধরা পড়ল বলিভিয়া থেকে আমদানি করা ১০৭ ড্রাম সূর্যমুখী ভোজ্যতেল। তেলটা সূর্যমুখী না চন্দ্রমুখী নাকি তিসির তেল, সেটা বড় কথা নয়। তেলের ড্রামে কোকেন। বলিভিয়া থেকে বাংলাদেশে আগে কখনো সূর্যমুখী ভোজ্যতেল আমদানি হয়নি। এলসি বা ঋণপত্র ছাড়াই এসেছে এ তেল। অন্য কোনো পণ্যের সঙ্গে এসেছে এবং তা পুনরায় ইউরোপের বা অন্য কোনো দেশে রপ্তানি করা হতো। এ কাজ হামেশাই হয়ে থাকে এবং সংশ্লিষ্ট সবার পূর্ণ সহযোগিতায়। বৈধভাবে যাঁরা টাকা উপার্জন করেন, তাঁদের তো আমরা স্যালুট দিই। যে দেশে মাদক ব্যবসা জমজমাট এবং সে কারবারের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা জড়িত, সে দেশের টাকার গন্তব্য সুইজারল্যান্ড না হয়েই পারে না।
ডিলান টোমাসের একটি কবিতা কলকাতার এক কবি তর্জমা করেছেন। তাঁর শুরু এ রকম: ‘এই যে রুটিকে ছিঁড়ি একদা এ শস্য ছিল মাঠে/ এই মদ বিদেশি লতায় ফলের শরীরে জড়ানো ছিল একদিন।’ খাবারের টেবিলে গমের রুটি চিবোতে গিয়ে পঙ্ক্তিগুলো মনে পড়ল। গম থেকেই রুটি হয়। সে গম বাংলাদেশের মাঠেরও হতে পারে, ব্রাজিলের খেতেরও হতে পারে। বাংলাদেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পৃথিবীর একটি খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ—এ বাণী প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় ঘোষিত হয়।
মাঠের গম রুটি হয়ে পেটে গিয়ে পচবেই। এবং তা বিশেষ পথ দিয়ে বেরিয়ে সুয়ারেজ লাইনে গিয়ে পড়বেই। তবে এবার ফুটবল কিংবদন্তি পেলের দেশ থেকেই এসেছে পচা গম। কেউ বলবেন, ও গমের পুষ্টিগুণ বেশি। কারণ, ওতে কার্বোহাইড্রেড যেমন আছে, তেমনি আছে প্রাণিজ প্রোটিন। ভোক্তাদের একসঙ্গে দুটি উপাদান পাওয়া ভাগ্যের কথা। যেসব গরিব মানুষ শুধু কাঁচা মরিচ-পেঁয়াজ দিয়ে রুটি খায়, মাংস-ডিম চোখে দেখে না, তাদের জন্য নিম্নমানের গম বড়ই উপকারী। ডাবল পুষ্টি। নিম্নমানের গমের সঙ্গে পেলের দেশের ব্রাজিলীয় পোকাও বাংলার মাটিতে এসে থাকতে পারে বিনা পাসপোর্ট-ভিসায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু আমদানিকারকের পকেট ভরছে টাকায় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের বাড়তেই পারে সুইস ব্যাংকে জমার পরিমাণ। তবে বাংলাদেশ সহ-অবস্থানের জন্য বিশ্বখ্যাত। এখানে পচা গমও থাকবে, গমের আমদানিকারকও থাকবেন এবং মন্ত্রিত্বও থাকবে।
আজ যে যেভাবে পারছে ছেয়ে নিচ্ছে তার ঘরের চাল। জমাচ্ছে টাকা সুইস ব্যাংকে। ‘সেকেন্ড হোমে’র বাসিন্দা যে কত বঙ্গবাসী, তাদের নামধাম আমরা জানি না। যদিও একাত্তরে অনেকের বাড়িতেই মরচে পড়া দুই বান্ডিল টিনের দোচালা ছিল, আজ প্রাসাদ। কারও কারও বাড়ি বাকিংহাম প্যালেস বা সম্রাট আকিহিতোর প্রাসাদকে হার মানায়। তবু তাদের আর একটি বাড়ি দরকার। সে বাড়ি মালয়েশিয়ায় হতে পারে, কানাডায় হতে পারে অথবা অন্য কোনো দ্বীপরাষ্ট্রে। বাংলাদেশে গোলমাল দেখা দিলেই সেকেন্ড হোমে গিয়ে উঠবেন। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ইতিমধ্যেই কারও কারও থার্ড হোম বা ফোর্থ হোমের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে।
এত বৈষম্য, এত অনাচার, এত অপরাধ বঙ্গমাতা সইবে না। ১ ভাগ ভাগ্যবান মানুষের বাড়াবাড়ি ৯৯ ভাগ মানুষ হাসিমুখে দেখবে না। বিশেষ করে সচেতন যুবসমাজ বসে বসে আঙুল চুষবে, তা আশা করা ঠিক নয়। ভয়টা ওখানেই যে তাদের কেউ বিন লাদেনের আত্মার সঙ্গে কথা বলার জন্য প্লানচেটে বসবে, কেউ আইএস খলিফা আল বোগদাদির আলখাল্লার নিচে আশ্রয় নেবে, কেউ চেয়ারম্যান মাওয়ের লাল বই থেকে দীক্ষা নেবে। তখন আমাদের কারোরই পালানোর পথ থাকবে না। প্রত্যেকের প্রয়োজন হবে একটি করে সেকেন্ড হোমের।
এটা কুচপরোয়া না করার দেশ। এখানে বলিভিয়া থেকে কোকেনসমেত ভোজ্যতেল আসুক, ব্রাজিল থেকে পচা গম আসুক, ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লোপাট হোক—নজরদারির কেউ নেই। ফ্রি স্টাইল। সবাই স্বাধীন। শামসুর রাহমান এখন বেঁচে থাকলে ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি হয় পুনর্বার লিখতেন অথবা ‘পুনশ্চ’ দিয়ে লিখতেন:
স্বাধীনতা তুমি
সুইস ব্যাংকে জমানো টাকা,
স্বাধীনতা তুমি
সেকেন্ড হোমে সুখী সংসার,
স্বাধীনতা তুমি
৫৫ হাজার কোটি খেলাপিঋণ,
স্বাধীনতা তুমি
পচা গমের মদির গন্ধ
স্বাধীনতা তুমি
বিএমডব্লিউ জাগুয়ার লেক্সাস,
স্বাধীনতা তুমি
মধ্যসাগরে ভাসমান শব,
স্বাধীনতা তুমি
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপে আর্তনাদ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

দুর্নীতির অভিযোগে গিলানির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ইউসুফ রাজা গিলানি
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিসহ পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) শীর্ষস্থানীয় দুই নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির কেন্দ্রীয় দুর্নীতিবিরোধী আদালত অজামিনযোগ্য এই পরোয়ানা জারি করেন। খবর ডন অনলাইনের। গিলানি বাদে পিপিপির অন্য নেতা হলেন মাখদুম আমিন ফাহিম। সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফাহিম পিপিপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুজনকে গ্রেপ্তার করে আগামী শুনানিরদিন আদালতে হাজির করতে পুলিশকে নির্দেশও দিয়েছেন আদালত। বাণিজ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (টিডিএপি) কোটি কোটি রুপি কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে ১২টি নতুন মামলাসহ এই দুই নেতার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফআইএ)। গিলানি ও ফাহিম ছাড়াও টিডিএপির সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসব মামলায় অর্থ কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন দুর্নীতির যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তাঁরা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে কোটি কোটি রুপি বাণিজ্য ভর্তুকি অনুমোদন করেছেন। এর আগে গত বুধবার করাচিতে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অসিম হোসাইনকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়। তিনি পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

চুক্তির আগে সশস্ত্র দলগুলোকে ভাবার আহ্বান সু চির

অং সান সু চি
মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চি দেশটির জাতিগত সশস্ত্র দলগুলোকে সরকারের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করার আগে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যুদ্ধবিরতির চুক্তি নিয়ে এই প্রথমবারের মতো মুখ খুললেন সু চি। খবর এপির। মিয়ানমার সরকার দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দেশটিতে সক্রিয় ১৫টি সশস্ত্র দলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। আগামী ৮ নভেম্বর মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচন। এর আগেই এই যুদ্ধবিরতির চুক্তি শেষ করতে চান প্রেসিডেন্ট থান শোয়ে। তবে নির্বাচনের আগে এই চুক্তি কতটুকু যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সু চি।
গত শনিবার সু চির সঙ্গে বৈঠক করেন কারেন বিদ্রোহীদের সংগঠন কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের নেতা মেজর ঠু ঠু লে। কয়েক দশক ধরে অধিকতর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে লড়াই করছে কারেনরা। তারা এখন যুদ্ধবিরতি চায়। সু চির সঙ্গে ওই বৈঠকের আলোচ্য নিয়ে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতা উইন থেইন বলেন, ‘নভেম্বরের নির্বাচনের আগে চুক্তি করতে সতর্ক বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন সু চি। কারণ, তিনি মনে করেন এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি যৌক্তিক হতে হবে।’

আমরা সুস্থ আছি তো? by মশিউল আলম

হাসপাতালে সুখী আক্তার ও তাঁর মা
‘সুখীর ডান চোখ একেবারে উপড়ে ফেলা হয়েছে। সুখীকে যাঁরা হাসপাতালে ভর্তি করাতে এসেছিলেন, তাঁরা তুলে ফেলা চোখটি সঙ্গে করে এনেছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, চিকিৎসকেরা যদি চোখটি আবার লাগাতে পারেন। আসলে তা করা সম্ভব নয়।’
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক জালাল আহমেদের এই কথাগুলো বড্ড ক্লিনিক্যাল—নির্লিপ্ত, নিরাবেগ। আর যাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করতে গিয়ে তিনি কথাগুলো বলেছেন, সেই ২৪ বছর বয়সী গৃহবধূ সুখী আক্তারের বক্তব্যেও কোনো আবেগ টের পাওয়া যায় না। তিনি প্রথম আলোর প্রতিবেদকের কাছে ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন এভাবে: ‘টাকা দেওনের লাইগ্যা আগে থেইকাই মারধর করত। রোজার দিন। আমার মেয়েরে দোকানে পাঠাইয়্যা দেয়। প্রথমে আমার হাত বান্ধে। প্রথম ভাবি, আজকেও মারব। কিন্তু ওর দুই ভাই আর এক বইনও যখন আমারে ধরে তখন বুঝি, অন্য কিছু করব।’
সেই অন্য কিছু হলো একটা ইলেকট্রিক টেস্টার দিয়ে সুখী আক্তারের চোখ আমূল উপড়ে ফেলা।
সুখীর নামটা এক নির্মম পরিহাস: তাঁর একটা চোখ উপড়ে ফেলেছেন তাঁরই স্বামী রবিউল ইসলাম। আর রবিউলকে সহযোগিতা করেছেন তাঁর দুই ভাই ও এক বোন। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি যায় সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। সুখী আক্তারেরও নিশ্চয়ই সেই স্বপ্ন ছিল।
সুখীর উপড়ে ফেলা চোখটা জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এক দর্শনীয় বস্তুর মর্যাদা পেয়েছে। সেখানকার চিকিৎসকেরা চোখটি বোতলে ভরে রেখেছেন। সেখানকার আনসার কমান্ডার আবুল কাশেম প্রথম আলোর প্রতিবেদককে বলেছেন, তিনি ও অন্য অনেকে সেই চোখ দেখেছেন। ‘অনেকে মোবাইলে ছবিও তুলছে।’—আবুল কাশেমের এই কথা সত্য হলে অচিরেই ফেসবুক কিংবা ইউটিউবে সুখীর ওপড়ানো চোখটির ছবি দর্শনীয় হয়ে ওঠা অসম্ভব নয়।
টাকার দাবিতে প্রায়ই প্রহারকারী স্বামীর হাতে সুখী আক্তারের চোখ ওপড়ানোর ঘটনাটি ঘটেছে ঈদুল ফিতরের আনন্দোৎসবের ঠিক আগের দিন, শুক্রবার দুপুরে। আগ্রহী পাঠক এ বিষয়ে বিস্তারিত খবর পাবেন ২১ জুলাই মঙ্গলবারের প্রথম আলোর প্রথম পাতায়। তাঁর ওপড়ানো চোখের জায়গায় একটা প্লাস্টিকের চোখ বসানো হয়েছে—এই খবর পাবেন পরদিনের প্রথম আলোয়।
দুই. তিন সন্তানের মা, ৩৫ বছরের গৃহবধূ রাবেয়া বশরি চেয়েছিলেন ঈদের দিনটি স্বামীসহ পরিবারের সবাই মিলে আনন্দে কাটাবেন। কিন্তু তাঁর স্বামী কবির মিয়া যাবেন জুয়া খেলতে। স্বামী জুয়ায় আসক্ত—রাবেয়া এটা জানেন। কিন্তু অন্তত ঈদের দিনটিতে স্বামী জুয়ার আসরে যাবেন না, এটুকুই চেয়েছিলেন রাবেয়া। তাই বাধা দিয়েছিলেন স্বামীকে। ফল ভালো হলো না: কবির মিয়া শোয়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে পেটালেন রাবেয়াকে। রাবেয়া আধমরা হলে কবির পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে; কিছুক্ষণ পরে ফিরে এলেন; ভীতসন্ত্রস্ত, কান্নারত ছেলেমেয়েদের বললেন তিনি তাদের মায়ের জন্য ওষুধ এনেছেন।
কিন্তু ওষুধ নয়, আধমরা স্ত্রীর মুখে বিষ ঢেলে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন কবির মিয়া। ১৫ বছরের একটি মেয়ে, সাত ও পাঁচ বছর বয়সী দুটি ছেলে রেখে মরে গেলেন রাবেয়া বশরি, ঈদুল ফিতরের দিন। মৌলভীবাজারের জুড়ীর কুলাউড়া পৌরসভার উছলাপাড়া এলাকায় ঘটেছে এই ঘটনা।
তিন. টাঙ্গাইলের গোপালপুরের নবগ্রাম দক্ষিণপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আল্পনা আক্তার (৩৫) ও সোনা মিয়ার (৪৫) বিয়ে হয়েছে ১৮-২০ বছর আগে। দুই ছেলেমেয়ে, অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়েছেন মেয়েকে। ছেলেটি ছোট। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজ করেন ঢাকায়, পৃথক দুটি গার্মেন্টস কারখানায়। ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন দুজনেই।
ঈদের পরদিন স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে গোসল করতে গেছেন গ্রামের পাশের ঝিনাই নদীতে। কিন্তু নদী থেকে সোনা মিয়া উঠে আসেন একা। কল্পনাকে তিনি নদী থেকে জীবিত উঠতে দেননি।
নদী থেকে কল্পনার লাশ উদ্ধার করেন গ্রামবাসী।
পুলিশ সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি পুলিশকে বলেছেন, কল্পনাকে তিনি নদীতে ডুবিয়ে মেরেছেন। কারণ, কল্পনার অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। প্রথম আলোর প্রতিবেদক খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, সোনা মিয়া ও কল্পনা আক্তারের মধ্যে দাম্পত্য কলহ চলছিল অনেক দিন ধরে।
সেই ‘কলহ’ এমনই যে, অবশেষে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নদীতে গোসল করতে নেমে স্বামী আবির্ভূত হলেন যমের ভূমিকায়।
চার. সমাজবিজ্ঞানী, নারী অধিকার সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর এই তিনটি ঘটনার বিবরণে ‘পারিবারিক সহিংসতা’ শব্দবন্ধটি ব্যবহৃত হবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তি ও সংস্থাগুলো বলবে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা’র কথা। সুখী আক্তারের ঘটনার পেছনে স্পষ্টতই যৌতুক নামের ‘সামাজিক অভিশাপ’ দেখতে পাওয়া যাবে। আর সোনা মিয়া ও আল্পনা আক্তারের ‘দাম্পত্য কলহ’ থেকে সোনা মিয়ার মধ্যে জন্ম নেওয়া ও ঘনিয়ে ওঠা ঈর্ষার কথা তো সোনা মিয়ার স্বীকারোক্তিতেই স্পষ্ট।
বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার পেছনে যৌতুক, দাম্পত্য কলহ, ঈর্ষা, প্রেম-বিয়ের প্রত্যাখ্যান—এসব কারণ বাস্তবসম্মতভাবেই চিহ্নিত করা গেছে। এসব প্রবণতা দমন বা প্রশমনের জন্য আইনের প্রয়োগের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। আইন প্রয়োগ ও শাস্তি নিশ্চিত করাই প্রথম কর্তব্য বটে। তবে দুটো কর্তব্যেরই প্রয়োজন দেখা দেয় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে, তার আগে নয়। সুখী আক্তারের একটি চোখ উপড়ে ফেলার আগে তাঁর স্বামী রবিউলকে, রাবেয়া বশরিকে পিটিয়ে আধমরা করে মুখে বিষ ঢেলে দিয়ে মেরে ফেলার আগে তাঁর জুয়াড়ি স্বামী কবির মিয়াকে, কিংবা আল্পনা আক্তারকে নদীর পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলার আগে তাঁর স্বামী সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার প্রশ্ন ছিল না। আবার, এই তিন অপরাধীর বিচার ও শাস্তি হলেই সুখী আক্তার তাঁর একটি চোখ এবং রাবেয়া বশরি ও আল্পনা আক্তার তাঁদের প্রাণ ফিরে পাবেন না।
আমরা তাহলে কী করব?
রাষ্ট্রকে তার কাজ করতে হবে: আইনের সুষ্ঠু ও দক্ষ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ওই তিন পাষণ্ডকে শাস্তি দেওয়ার দৃষ্টান্ত গড়তে হবে। যেন কেউ মনে করতে না পারে এই দেশে এ ধরনের নৃশংস অপরাধ করে অবলীলায় পার পাওয়া যায়। সমাজ-মনোবিজ্ঞানী ও অন্য বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলছেন, বিচারহীনতার পরিবেশ নিষ্ঠুরতা বাড়ার প্রধান কারণ। এটা গুরুত্বপূর্ণ কথা, কিন্তু শেষ কথা নয়। শেষ কথাটা একটা গভীর প্রশ্ন: সুখী আক্তার, রাবেয়া বশরি ও আল্পনা আক্তারের সঙ্গে তাঁদের স্বামীরা যে আচরণ করেছেন তার স্বরূপ কী? নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা, পৈশাচিকতা—এ ধরনের আরও যত শব্দ বাংলা ভাষায় আছে, তার কোনোটাই যথেষ্ট বলে মনে হয় না।
শুধু এই তিনটি ঘটনা নয়, এ রকম কিংবা এর থেকেও অনেক বেশি বিভীষিকাপূর্ণ অনেক ঘটনা এই দেশে ঘটে চলেছে। এবং তা শুধু নারীর ক্ষেত্রে নয়; নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ-পেশা-বয়সনির্বিশেষে ঘটে চলেছে ভয়ংকর নানা অপরাধ। আমাদের সংবেদনশীলতাও হয়তো খানিক ভোঁতা হয়েছে, যদিও দর্শকসুলভ আহাজারির মাত্রা কমেনি। সুখী আক্তারের চোখ ওপড়ানোর ঘটনাটি আরও প্রচারিত হলে সিলেটের শিশু সামিউল হত্যাকাণ্ডের মতো দেশজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঝড় উঠতে পারে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে শুরু হতে পারে আবেগ প্রকাশের প্রতিযোগিতা। ঠিক আছে, তা হোক; দর্শকসুলভ আবেগেরও মূল্য আছে, দরকারও আছে। কারণ তাতে সামাজিক চাপ সৃষ্টি হয়, সেই চাপ অনুভব করে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। তারা সক্রিয় হয়, তার ফলে অপরাধীদের পার পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠে।
কিন্তু এসব কিছুই ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরের ব্যাপার। তার আগের নয়।
আগে দেখা দরকার, মানুষ হিসেবে আমরা ঠিক আছি কি না, সুস্থ আছি কি না, মানবিক আছি কি না। এই জিজ্ঞাসা আমাদের সবার জন্য প্রযোজ্য, শুধু সুখী আক্তার, রাবেয়া বশরি ও আল্পনা আক্তারের স্বামীদের জন্য নয়। কারণ, তাঁরা ভিন্ন কোনো গ্রহ থেকে আসেননি।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

যুক্তরাষ্ট্রে ২৩৮ দিনে ২৪৭ বন্দুক হামলা

ম্যাস শুটিং বা ব্যাপক বন্দুক হামলা মার্কিন মুলুকে একটি অতিপরিচিত বুলি হয়ে উঠেছে এই চলতি বছরে। কেননা মাত্র ২৩৮ দিনে ২৪৭টি ম্যাস শুটিং হয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতার নামধারী এ ভূখণ্ডে। বৃহস্পতিবার এ খবর প্রকাশ করেছে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। ২৬ আগস্ট ভার্জিনিয়ায় দুই সাংবাদিক হামলার মাধ্যমে ২৪৭তম ম্যাস শুটিং ক্রিমিনাল রেকর্ড খাতায় স্থান পেয়েছে। বিশ্বজনতার নিরাপত্তায় কানফাটা বুলি আওড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাই বিপদসংকুল করে তুলেছে নিজের আবাসভূমি। ব্যক্তিগত বন্দুক হামলার ওপর করা এক জরিপে প্রথম স্থানও লাভ করেছে তারা। পৃথিবীজুড়ে ১৯৬৬-২০১২ সালের মধ্যে ম্যাস শুটিংয়ের ৩১ শতাংশই ঘটেছে এদেশে। অর্থাৎ মোট ২৯১টি হামলার ৯০টিই সংঘটিত হয়েছে আধুনিকতা ও সভ্যতার তেজে ফেঁপে ওঠা আমেরিকায়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিদ্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ল্যাংকফোর্ডের চালানো গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। আমেরিকায় ম্যাস শুটিং বলতে বোঝায় কোনো ব্যক্তির বন্দুক হামলায় ওই ব্যক্তিসহ অন্তত চারজন আহত হওয়া।
গানসআরকুল সাবরেডিট নামের বন্দুক হামলা চিহ্নিতকারী প্রতিষ্ঠানের দেয়া এ সংজ্ঞা যদিও এফবিআই ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন তবুও এটাই সর্বাধিক গৃহীত। অনলাইনভিত্তিক সংবাদ সংস্থা লাইভ সায়েন্স এক খবরে উল্লেখ করেছে আমেরিকায় সার্বিক অপরাধের হার হ্রাস পেলেও ব্যক্তিগত বন্দুকধারীদের হামলার ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে হুহু করে। আর এটাই বড় দুঃশ্চিন্তা ও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের। ৩৫ কোটি মানুষের দেশটিতে ৩০ কোটি আধুনিক অটোমেটেড আগ্নেয়াস্ত্রের প্রাইভেট লাইসেন্স রয়েছে। দেশটির সহজ অস্ত্র নিয়ন আইন এ পরিস্থিতির জন্য দিয়েছে। বন্দুকবাজদের দৌরাÍত্ম্য এ জন্যই বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে ল্যাংকফোর্ড মনে করছেন। এছাড়া, আমেরিকানরা স্বাভাবিকভাবেই উচ্চাভিলাষী। সামান্য ব্যর্থতায় বিগড়ে যায় তাদের মস্তক। হলিউড অ্যাকশন সিনেমাগুলো এক কাল্পনিক জগতে বাস করতে শেখাচ্ছে তাদের। শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী চেতনা অপরিপক্ক কিশোরদের পরিচালিত করে বন্দুক হামলায়। এসব কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ফ্যাক্স পাঠিয়ে ঘাতকের আত্মহত্যা : যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় দুই সাংবাদিকের হত্যাকারী ভেস্টার ফ্ল্যানাগান পুলিশের ধাওয়ায় পালিয়ে যাওয়ার সময় আত্মহত্যা করেছেন। বুধবার এ হত্যাকাণ্ডের পরপরই তিনি এবিসি নিউজে একটি ফ্যাক্সও পাঠান। তাতে নিজেকে ভয়ংকর ‘হিউম্যান পাউডার কেজ’ বলে দাবি করেন তিনি। অর্থাৎ নিজেকে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা বোমার সঙ্গে তুলনা করেন ফ্ল্যানাগার। কংগ্রেসকে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করতে হবে
হোয়াইট হাউস
যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় সর্বশেষ দুই সাংবাদিক নিহত হওয়ার পর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন পাসে কংগ্রেসকে চাপ প্রয়োগ করেছে হোয়াইট হাউস। বুধবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জোশ আর্নেস্ট এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমেরিকার ছোট-বড় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বন্দুক সহিংসতার সর্বশেষ উদাহরণ এটি। এটি মোকাবেলায় কংগ্রেসকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রসর জাতি। কিন্তু অস্ত্র নিরাপত্তা আইনের সাধারণ জ্ঞানটুকু আমাদের নেই।’ এদিকে ভার্জিনিয়ায় লাইভ সম্প্রচারের সময় দুই সাংবাদিককে গুলি করে হত্যার খবরের প্রতিক্রিয়ায় নিজের হৃদয় ভেঙে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন, সারা যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্র সম্পর্কিত যত ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটছে, ছোট-বড় প্রত্যেকটি ঘটনাই সন্ত্রাসবাদের অন্তর্ভুক্ত। এবিসি টেলিভিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় ওবামা বলেন, এ ধরনের ঘটনা আমি যতবারই শুনি এবং দেখি, প্রতিবারই আমার হৃদয় ভেঙে যায়।

পুলিশের গুণ্ডামি তদন্তের নির্দেশ

ভারতের গুজরাটে কোটার দাবিতে প্যাটেল সম্প্রদায়ের আন্দোলন রুখতে পুলিশের অতিসক্রিয়তাই আন্দোলনকারীদের ক্ষিপ্ত করেছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের সহিংস হওয়ার পেছনে পুলিশের ‘গুণ্ডামি’ই দায়ী। প্যাটেলদের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ আগেই করা হয়েছিল। এবার আহমেদাবাদের শাহীবাগের একটি বহুতলের পার্কিং লটের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল পুলিশ অকারণেই দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির কাচ ভাঙছে! এই রকমই একটি ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিক, আইনজীবী বিরাট পোপটাল আহমেদাবাদ হাইকোর্টে পুলিশের বিরুদ্ধে হাঙ্গামা বাধানো এবং সম্পত্তি নষ্টের একটি অভিযোগ দায়ের করেন। আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করেন, নোটিশ পাঠিয়েছেন আহমেদাবাদের পুলিশ কমিশনারকে। হাঙ্গামা এবং ভাংচুরের ঘটনায় কোন পুলিশ কর্মীরা জড়িত, আসল ঘটনাই বা কী, সব বিশদে তদন্ত করতে পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দু’সপ্তাহের মধ্যে আহমেদাবাদ পুলিশকে রিপোর্ট জমা দিতে হবে। মামলার ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি পরদিওয়ালা এ নির্দেশ দেয়ার সময় বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, যদি পুলিশই এ কাজ করে, তবে দাঙ্গাবাজ আর রক্ষকের মধে পার্থক কোথায়! প্যাটেলদের আন্দোলনের নেতা হারদিক প্যাটেল বলেছেন, ‘আমরা শন্তিপূর্ণ আন্দোলন করছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের ওপর এমনভাবে পেটানো শুরু করেছে যেন আমরা সন্ত্রাসী। পুলিশ নারীদেরও নির্বিচারে পিটিয়েছে।’ এদিকে, বৃহস্পতিবার সারাদিন শান্তই ছিল গুজরাট। বুধবার রাত থেকে নতুন করে কোনো গণ্ডগোলের খবর না এলেও, আহত এক পুলিশ কর্মীর মৃত্যুর খবর মিলেছে।
এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১-তে। রাজ্যের কিছু জায়গায় কারফিউ উঠেছে, কোথাও এখনও বহাল। বন্ধ বেশকিছু স্কুল-কলেজ। গুজব ছড়ানোর ভয়ে এদিনও নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। মোট ৫৩ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী এবং ১১ কলাম সেনা মোতায়েন করেছে গুজরাট প্রশাসন। তবে চিন্তা বাড়িয়ে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা করেছেন হারদিক প্যাটেল। রাজ্যের বিভিন্ন গ্রামে থাকা কৃষক এবং গোয়ালাদের কাছে তিনি আবেদন করেছেন পুলিশি জুলুমের প্রতিবাদে শহরে দুধ ও শাক-সবজি না পাঠাতে। পাশাপাশি হারদিকের দাবি, সেসব বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে, তাদের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গুজরাট পরিস্থিতির জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদিকেই এদিন দায়ী করেছেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেছেন, মোদি সরকারের ক্রোধের রাজনীতি গুজরাট অস্থিরতার জন্য দায়ী। মোদির রাজনীতি তার বা তার দলের স্বার্থ মেটাতে পারে, দেশের সাধারণ মানুষের নয়। মোদি চতুর্দিকে প্যাকেজের কথা বলে বেড়াচ্ছেন, আসলে ওসব নিছক প্যাকেজিং! তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গুজরাটে। মঙ্গলবার প্যাটেল সম্প্রদায়ের কয়েক লাখ সদস্য চাকরিতে কোটার দাবিতে গুজরাটের রাজ্যের প্রধান শহর আহমেদাবাদে জড়ো হয়। সেখানে হারদিক প্যাটেল অনশনে বসেন। রাতে তাকে অনশন মঞ্চ থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ওপর চলে পুলিশের নির্বিচার লাঠিপেটা। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। চলে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ। পরে পুলিশ তাকে ছেড়ে দিলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি।

রাজনৈতিক দল ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চা by আল মাসুদ হাসানউজ্জামান

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহানের Political Parties in Bangladesh: Challenges of Democratization একটি সময়োপযোগী প্রকাশনা। রাজনৈতিক দলের ওপর গবেষণা এ জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে এ দেশে রাজনৈতিক দল বিষয়ে স্বল্পসংখ্যক গবেষণাকর্মই সম্পাদিত হয়েছে এবং গভীরতর সূক্ষ্ম, অনুসন্ধানমূলক গবেষণার অভাব রয়ে গেছে। এই গবেষণা ও বইটি এ অভাব পূরণের সুচারু প্রয়াস। এ জন্য রওনক জাহানকে অভিনন্দন।
ছয়টি অধ্যায়ে বিন্যাসকৃত আলোচ্য বইটির ভূমিকায় লেখক রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক উন্নয়ন তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করে দ্বিতীয় অধ্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বিভিন্ন শাসনামলের তিনটি পর্বে দলীয় ব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ণয় করেছেন। এভাবে বর্ণিত হয়েছে ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত এক দলের প্রাধান্য থেকে একদলীয় ব্যবস্থা, ১৯৭৫-৯০ সময়ে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সামরিক শাসনামলে দল গঠন এবং ১৯৯১ থেকে বর্তমান পর্যন্ত দ্বিদলীয় প্রাধান্যে দ্বন্দ্বমূলক রাজনৈতিক পরিসর। এরপর আলোচনায় এসেছে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বৈশিষ্ট্য, অভ্যন্তরীণ দলীয় গণতন্ত্রচর্চা, স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় রাজনীতি এবং বিভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে গণতন্ত্রচর্চার মাত্রা যাচাইকরণ। উপসংহারে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায় প্রাপ্ত ফল ও সুপারিশমালা।
গণতন্ত্রচর্চার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের অপরিহার্য ভূমিকা আর অত্যাবশ্যকতা সর্বজনবিদিত; দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা এবং দলীয় কর্মকাণ্ড নাগরিক জীবনকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চালিকাশক্তি হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল হাতিয়ার।
রাজনৈতিক দলের সম্প্রসারিত ভূমিকার কারণে ডেমোক্রেসিকে ‘পার্টিক্রেসি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। ১৯৬০–এর দশকের শেষার্ধে লুই আর্মস্ট্রং পার্টিক্রেসি শব্দটি ব্যবহার করেন। ‘পার্টিক্রেসি’ বস্তুত রাজনৈতিক দলের অতি ভূমিকা ও ব্যাপকতর প্রভাবেরই পরিচায়ক। নেতিবাচক অর্থে দেখতে গেলে যেখানে জনগণ নীরব ভূমিকাধারী বা দর্শকের ভূমিকায় আর রাজনৈতিক দল প্রতিনিধিত্ব ও শাসনের ক্ষেত্রে তার একচেটিয়াত্ব বিস্তার করে চলেছে।
রাজনৈতিক দল ও বিষয়টি পশ্চিমা উদ্ভূত। পশ্চিমা উদারনৈতিক গণতন্ত্রে দল গঠনের ক্ষেত্র ও উদ্ভবের প্রেক্ষাপট আর বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের রাজনৈতিক দলের ইতিহাস, গঠন ও বিকাশ ভিন্ন। এ জন্য এসব দেশের দল-গবেষণার ক্ষেত্রে পশ্চিমা ধারণার পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। ইউরোপীয় ধ্রুপদি পার্টি মোড, মরিস ডুভারজারের মাস-বেস-পার্টি বা কার্শহেইমারের ক্যাচ-অল পার্টি গঠন আমাদের মতন কাঠামোতে অবিকলভাবে খাপ খাওয়ানো সম্ভব নয়। আমাদের দেশের ক্রান্তিকালীন পর্যায়ে যে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ, সমস্যার সংকট প্রত্যক্ষ করা হচ্ছে, সেই প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় এনে অনুসন্ধান আবশ্যক হয়। এ জন্য রাজনৈতিক দলের সমাজতত্ত্ব প্রয়োগ করে গবেষণা সম্পাদন গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক দলের তাত্ত্বিক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সমরূপতা রয়েছে। যেমন: রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ, স্বার্থ জ্ঞাপন, স্বার্থ সংরক্ষণ আর রাজনৈতিক যোগাযোগ যাকে পলিটিক্যাল ইনপুট কাজ বলা হয়। বস্তুত, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নির্মাণের জন্য আবশ্যক কর্ম সম্পাদন নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকৃতি আর দলীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর। এ ক্ষেত্রে দলের প্রাতিষ্ঠানিকায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় এবং সক্রিয় দল-ব্যবস্থার সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ইতিবাচক পারস্পরিক সম্পর্ক পরিমাপ করা হয়।
আসলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দল, নির্বাচকমণ্ডলীর সঙ্গে দল, সরকার আর বিরোধী দলে রাজনৈতিক দলের যে ভূমিকা, তা পালনে রাজনৈতিক দলের সংগঠন থেকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যার সফল পরিণতি হচ্ছে রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।
এ ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও পরীক্ষণের বিষয়গুলো হচ্ছে সমাজের গভীরে রাজনৈতিক দল ও দলীয় ব্যবস্থার শিকড় কতখানি প্রোথিত হয়েছে, তার নির্ণয় এবং দলের আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাত্রা, দলীয় নেতৃত্ব, কাঠামো, দলীয় স্বাতন্ত্র্য, সংহতি, স্বকীয়তা, সাংগঠনিক দৃঢ়তা, দল ও জনগণ, দল ও সুশীল সমাজ সম্পর্ক এবং গঠনতন্ত্র মোতাবেক কর্ম সম্পাদনের পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ।
এ দেশে সংসদীয় কাঠামো চালু থাকলেও এর সুষ্ঠু কার্যকারিতা না থাকায় সরকারের কর্তৃত্ববাদী মনোভাব এবং বিরোধী দলের বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতাসহ নেতিবাচক ভূমিকা অব্যাহত রয়ে গেছে। এভাবে জন-ইস্যুর চেয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্বার্থ উদ্ধারে অব্যাহত-লাগাতার হরতাল হয় এবং এসব জনবিচ্ছিন্ন নেতিবাচক কর্মসূচি ক্রমান্বয়ে সহিংস ও নৈরাজ্যময় হয়ে যায়। জনজীবন ও তার নিরাপত্তা চরম হুমকিতে পড়ে। ক্রমাগত সহিংসতা, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি কখনো সুষ্ঠু দলীয় ব্যবস্থা নির্দেশ করে না।
রওনক জাহানের গবেষণায় লক্ষণীয় হয়েছে যে নব্বই-পরবর্তী থেকে এ দেশে দ্বিদলীয় প্রভাবাধীনে এবং জোটবদ্ধভাবে রাজনীতি চর্চিত হচ্ছে। তবে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চার সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং রাজনীতি দুর্বৃত্তদের করায়ত্ত হয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় অর্জিত প্রক্রিয়ার বদলে আরোপিত প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ‘এক-এগারো’-পরবর্তী সময়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে শীর্ষ নেতৃত্বের কর্তৃত্ব অধিকতর সুসংহত ও সুদৃঢ় হয়েছে। দলে অরাজনৈতিক উপাদানের অনুপ্রবেশ ও প্রভাব বিস্তার ঘটেছে, যা নির্বাচনী মনোনয়নে দৃশ্যমান হয়েছে। রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রাধান্য অব্যাহত রয়েছে এবং রাজনীতির বাণিজ্যকরণ ঘটছে। সেই সঙ্গে আছে অস্বচ্ছ রাজনৈতিক অর্থায়ন।
বর্ণিত পার্টিক্রেসির নেতিবাচক প্রবণতার প্রেক্ষাপটে দলীয় জবাবদিহি বা দায়িত্বশীলতার প্রসঙ্গটি আসে। সাম্প্রতিক কালে উন্নয়নশীল বিশ্বে দলীয় জবাবদিহির জন্য রাজনৈতিক দলকে আইনি কাঠামোয় আনা এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল ও কর্মকাণ্ডকে আইনি প্রক্রিয়ায় এনে দায়িত্বশীলতা আনয়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য গণপ্রতিনিধিত্বশীল আদেশ তথা আরপিওতে সংস্কারসাধন এক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এতে রয়েছে নির্বাচনে ইচ্ছুক রাজনৈতিক দলের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, গণতন্ত্রসম্মত গঠনতন্ত্র রচনা, অর্থায়ন ও নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে দল ও সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আবশ্যিক তথ্য প্রকাশ, দলীয় আয়-ব্যয়ের তথ্য উন্মুক্তকরণ ইত্যাদি। তবে অদ্যাবধি গণপ্রতিনিধিত্বশীল আদেশের যথাযথ অনুসরণ ও সুষ্ঠু প্রয়োগ দৃশ্যমান হয়নি।
রওনক জাহানের বইটিতে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র অনুসারে দলীয় কাঠামোর বিন্যাস, নেতৃত্ব নির্বাচন, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, নির্বাচনে দল ও প্রার্থীর অর্থায়ন, নির্বাচনী মনোনয়নদান, দলে নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব, বাৎসরিক আয়-ব্যয়, হিসাব দাখিল ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রচলিত আরপিও বিধিবিধান ও প্রকৃত চর্চার ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য এবং অসংগতি যথাযথ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তত্ত্ব ও তথ্যের মাধ্যমে সুচারুরূপে উদ্ঘাটন করা হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রাইমারি উৎস থেকে তথ্য পাওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে, যা অবশ্য লেখক বইয়ের মুখবন্ধে উল্লেখ করেছেন। গবেষণার জন্য চারটি রাজনৈতিক দল: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ে রাজনীতিতে বামপন্থী দলগুলোর সরব অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপটে একটি বামপন্থী দলকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করলে গবেষণা আরও প্রতিনিধিত্বমূলক হতে পারত বলে মন্তব্য করা যায়।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে রাজনৈতিক দল-ব্যবস্থায় অন্তর্দলীয় ও আন্তদলীয় সম্পর্ক গণতন্ত্রায়ণ ও রাজনীতিচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। যখন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মূল নিয়ামক হয়ে ওঠে, তখন এ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিংসাত্মক ও সহিংস হয়ে যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেখানে নির্বাচনী গণতন্ত্রসহ রাষ্ট্রের মৌল বিষয়ে ঐকমত্যহীনতা রয়েছে, সেখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সহিংস ও অসাংবিধানিক পন্থাই অনুসৃত হয়ে থাকে, যা আমরা আন্তদলীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করেছি। আলোচ্য বইটিতে অন্তর্দলীয় বিষয়াদি বিভিন্ন ডাইমেনশন থেকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে আন্তদলীয় সম্পর্কের উপাদানগুলো গণতন্ত্রায়ণের সমস্যার অন্যতম প্রভাবক কিনা তার পরীক্ষণ বইটিতে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
যা হোক, আলোচ্য বইটিতে গত তেতাল্লিশ বছরে বাংলাদেশে দলীয় ব্যবস্থার বিকাশ এবং রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্রায়ণের চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। যদিও এ দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলো দলীয় নেতৃত্বেই হয়, তথাপি দলীয় কাঠামোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ও প্রাতিষ্ঠানিকায়নে একধরনের অবক্ষয় বিরাজমান। প্রধান দলগুলোর মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল হওয়ায় সুবিধা প্রদানের বিনিময়ে নিজ নিজ সমর্থনের ভিত্তি সম্প্রসারণ তাদের মতাদর্শ ও নীতির সঙ্গে আপসকামিতা প্রকাশ করে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মক্কেলধর্মী সম্পর্ক, দুর্নীতি ও সহিংসতার প্রসার ঘটায়। ফলে রাজনৈতিক দলের ঐতিহ্যিক কর্মকাণ্ড পালন ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। গণতন্ত্রায়ণে উত্তরণের জন্য লেখক রাজনৈতিক দলগুলোকে অগণতান্ত্রিক আচরণ পরিহার, নিজ পক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ ও সম্পদের ব্যবহার বন্ধকরণ, জাতীয় সংসদ বয়কটের সংস্কৃতির অবসান, অন্তঃ ও আন্তদলীয় দ্বন্দ্ব নিরসনে সহিংসতা পরিত্যাগ, দলীয় সংগঠনকে সরকার থেকে পৃথক্করণ, ব্যবসায়িক স্বার্থের পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ সামাজিক গোষ্ঠীসহ নারী ও প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য বিস্তারিত কার্যক্রম গ্রহণ এবং দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রচর্চার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক গতি–প্রকৃতির সুষ্ঠু ব্যাখ্যার জন্য দল ও দলীয় ব্যবস্থার ওপর সার্বিক ও গভীরতর গবেষণা ও ফলোআপ পঠন–পাঠনের সুষ্ঠু পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পাদন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে রওনক জাহানের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য, সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের পরামর্শ বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। অধ্যাপক জাহানের রচিত প্রতিটি প্রবন্ধ, গবেষণাকর্ম ও বই এ দেশের সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জন্য একাডেমিক সম্পদ হিসেবে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আলোচ্য বইটি আরেকটি মূল্যবান সংযোজন।
পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অব ডেমোক্রেটাইজেশন। লেখক: রওনক জাহান, প্রথমা প্রকাশন ২০১৪।
আল মাসুদ হাসানউজ্জামান: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

অবিলম্বে দিগন্ত টিভি খুলে দেয়ার দাবি বিশিষ্টজনদের

জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন ‘দিগন্ত টিভি’ খুলে দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলেছেন, সাময়িক বন্ধের কথা বলে সরকার বছরের পর বছর দিগন্ত টিভি সম্প্রচার করার সুযোগ দিচ্ছেনা। এভাবে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে দিগন্ত টিভির ৭ম বর্ষপূর্তিতে সম্প্রচার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে আয়োজিত এক সংহতি সম্মেলনে বক্তারা এ কথা বলেন। দিগন্ত টেলিভিশনের নির্বাহী পরিচালক মাহবুবুল আলম গোরার সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সুপ্রীমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, নয়া দিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, সমাজ চিন্তক ও কবি ফরহাদ মজহার, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, বিএফইউজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম আব্দুল্লাহ, মহাসচিব এম এ আজীজ, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন বাদশা, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি কবি আব্দুল হাই শিকদার, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, বিএফইউজে সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, দিগন্ত টিভির উপ নির্বাহী পরিচালক মজিবুর রহমান মঞ্জু, প্রধান বার্তা সম্পাদক জিয়াউল কবির সুমন, ডিইউজে যুগ্ম-সম্পাদক শাহিন হাসনাত প্রমূখ।
নির্বাচনকে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি উল্লেখ করে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ বলেন, দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র দাঁড় করাতে হলে নির্বাচনের বিকল্প কিছু নেই। নির্বাচন এমনভাবে হতে হবে যাতে করে সাধারণ জনগণই এ নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। আমরা আন্তর্জাতিক শক্তির দাবা খেলায় পড়ে গেছি উল্লেখ করে বিচারপতি রউফ বলেন, সব জায়গায় শৃঙ্খলাবোধের অভাব। গণতন্ত্র ফিরে না আসলে মারামারি কাটাকাটি কোনভাবেই শেষ হবে না।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথা বলে লাভ হবে না। আইডিয়া দিতে হবে, কারণ আইডিয়া ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না। বর্তমান সময়ে আইডিয়ার অভাবে দেশে গণতন্ত্র নেই। সে কারণে আইনের শাসনও নেই।
তিনি বলেন, বিএনপি আওয়ামী লীগ যে দলের কথাই বলেন তারা যে যখন ক্ষমতায় আসে তারা সঠিকভাবে গণতন্ত্রের দায়িত্ব পালন করে না। সাংবাদিক বলেন, আইনজীবী বলেন সব কিছুকেই তারা দুভাগে বিভক্ত করে দিয়েছে। তিনি অবিলম্বে দিগন্ত টিভি খুলে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, আমার দাবিতে যদি দিগন্ত টেলিভিশন খুলে দিত তাহলে সারাদিন এই দাবিটাই করতাম।
স্লো-পয়জনিংয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে অভিযোগ করে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দেশের সব স্তরের মানুষকে সব ধরনের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে স্বৈরাচার ফ্যাসিষ্ট জালিম সরকারকে গণবিস্ফোরণের মাধ্যমে পতন ঘটিয়ে দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র ফিরিয়ে নিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান যে সরকার রয়েছে এ সরকার দিগন্ত টিভি বা দৈনিক আমার দেশ খুলে দিবে এটা ভাবা উচিত নয়।
সরকারের বিরদ্ধে শুধু সভা-সেমিনার করলে চলবে না মন্তব্য করেন সুপ্রীম কোর্টের এ সিনিয়র আইনজীবী বলেন, দিগন্ত টিভি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে চায়। তাই বর্তমান সরকার দিগন্ত টেলিভিশনকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করতে দেবে না বলেই তাদের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারের সাথে ভালো আচারণ করে লাভ হবে না।
তিনি বলেন, আমরাও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের। প্রতিহিংসামূলক নয়। দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলীর মুক্তি দাবি করেন তিনি।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ভোটারবিহীন বর্তমান সরকার অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় টিকে আছে, তাই তাদের কাছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আশা করা বোকামি। সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদের মত আরও অনেক নেতাকে শিগগিরই জেল হাজতে নেয়া হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আলমগীর মহিউদ্দীন বলেন, দিগন্ত টেলিভিশন মানুষ ও সমাজের কথা বলতো। কিন্তু তদের কন্ঠরোধ করে দেয়া হয়েছে। এভাবে বন্ধ রেখে সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলতে পারে না। তিনি অবিলম্বে দিগন্ত টিভি খুলে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, গণতন্ত্রে সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ থাকা উচিত, তাহলে সরকারই লাভবান হবে।
শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করে দিয়েছে উল্লেখ করে ফরহাদ মজহার বলেন, ব্রিটিশরা ২০০ বছর ক্ষমতায় থেকে দেশকে যতটা না পিছিয়ে দিয়েছিল বর্তমান সরকার তার চেয়ে বেশি পিছিয়ে দিয়েছে। তাদের ক্ষমা নাই। তিনি বলেন, আমাদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। এ রকম অন্ধকারে অনেক জাতিই পড়েছে আবার শেষ পর্যন্ত তাদেরই বিজয় হয়েছে।
দিগন্তসহ সকল বন্ধ মিডিয়া খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, মানুষ সত্য কথা জানতে চায়। দিগন্ত টিভি সেই কথাটিই বলতো। কিন্তু তাদেরকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সাময়িক বন্ধের কথা বলে বছরের পর বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা অন্যায়। কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটা কাম্য হতে পারে না।
সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, সত্য এবং সুন্দরের পক্ষে কথা বলতে গেলে নির্যাতন আসবেই। দিগন্ত টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিনি দিগন্ত টেলিভিশন খুলে দেয়ার দিকে না তাকিয়ে থেকে বিকল্প কিছু ভাবার পরামর্শ দেন।

গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে দেশ শাসন করা যায় না : খালেদা জিয়া

গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করা যাবেনা বলে সরকারের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সেইসাথে হিংসা বিদ্বেষের পথ ছেড়ে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য পূর্বের মত একসাথে কাজ করতে সরকারকে আহ্বান জানান তিনি। দলের নির্বাহী কমিটির সহ-পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক ও জয়পুরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি মোজাহার আলী প্রধানকে জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ফের তাকে আটক করায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সরকারের এই ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানান বিএনপি চেয়ারপারসন।
আজ শুক্রবার এক বিবৃতিতে খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান বিনা ভোটের সরকার তাদের অনৈতিক ক্ষমতাকে সংহত করতে সারাদেশে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর যে অত্যাচারের স্টীমরোলার চালাচ্ছে-তা বর্ণনাতীত। সরকার দেশের আইন কানুন ও বিচারিক রায়কে পর্যন্ত অশ্রদ্ধা করছে। উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনেক রাজনৈতিক বন্দীকে সময়মত মুক্তি না দিয়ে নানা টালবাহানায় তাদের আটকে রাখছে এবং এরপরও কেউ জামিন নিয়ে মুক্তিলাভ করলেও কারাফটক থেকে নিত্য-নতুন সাজানো মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে পুনরায় আটক করে তাদের জেলে পুরছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এধরনের তৎপরতা দেশের আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা এ ধরনের বেআইনী কর্মকাণ্ড থেকে সরকারকে সরে আসার আহবান জানাচ্ছি। সরকারের এধরনের আচরণ মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার হরণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা যখন সাংবিধানিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো পালনের উদ্যোগ নিচ্ছি এবং আমাদের দলকে তৃণমূল পর্যায় থেকে পুনর্গঠনের মত সাংগঠনিক কর্মসূচি নিয়ে এগুচ্ছি তখন সরকার দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দকে নিত্য-নতুন মিথ্যা মামলায় আটক করছে, পুরনো মিথ্যা মামলায় চার্জ গঠন করে চার্জশিট প্রদান করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিরোধী দলকে কোনোভাবেই সাংগঠনিক কাজ করতে না দেয়া।
আমরা এই বিনা ভোটের সরকারকে বলতে চাই- তারা এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মূলত: একধরণের একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে হাঁটছে। সারা পৃথিবীতে যখন কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটছে, একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের বিলোপ ঘটছে-তখন শেখ হাসিনার সরকার বিরোধী দলকে নির্মূল করার দিবাস্বপ্নে বিভোর।
বিএনপি নেত্রী বলেন, আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই- গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করা যাবেনা। আশা করি সরকারের বোধোদয় ঘটবে।
তিনি আরো বলেন, সরকার বিরোধী নেতা-কর্মীদের জেলে পুরে, নিত্য-নতুন মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী দলের সাংগঠনিক কর্মকান্ডকে বাধাগ্রস্ত করে নিজেদেরকে অগণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করছে মাত্র। সরকার যে ভয়াবহ ইমেজ সঙ্কটে নিপতিত-তাতে সরকারের ফ্যাসিবাদী আচরণ তাদেরকে ক্রমেই আরো জনবিচ্ছিন্ন করে তুলছে। সরকার এ সত্যটি যত দ্রুত অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন এবং সে অনুযায়ী একটি দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন সকল দলের অংশগ্রহণে এবং তা অবশ্যই সবার দাবি অনুযায়ী একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে-তাতেই তাদের মঙ্গল।
খালেদা জিয়া বলেন, আমি আবারো উল্লেখ করতে চাই-হিংসা বিদ্বেষের পথ ছেড়ে আসুন একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আমরা পূর্বের মত একসাথে কাজ করি। জনগণের রায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা-আস্থা আছে। আপনাদের ভয় কিসে? আমি আশঙ্কা করছি- হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি দেশের মৃতপ্রায় গণতন্ত্রকে কফিনে পুরে ফেলবে একদিন। সরকার যেন সেই কাজটি করতেই বেশি তৎপর হয়ে উঠেছে।
খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আমরা এজন্য দেশ স্বাধীন করিনি, কারন এখন যে নীতিতে সরকার দেশ চালাচ্ছে-তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বেইমানী ছাড়া কিছু নয়।

জাসদকে নিয়ে যা বললেন আন্দালিব রহমান পার্থ

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ নিয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে চলছে বিভিন্ন আলোচনা সমালোচনা। সরকার দলীয় নেতা থেকে শুরু করে এ বিষয়ে কথা বলছেন রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষক ও বুদ্ধিজীবীরা। এবার জাসদকে নিয়ে কথা বললেন সময়ের জনপ্রিয় তরুণ রাজনীতিবিদ জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। শুক্রবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে তার ভেরিফাইড পেজে 'জাসদের crocodile tears...' শিরোনামে এক স্ট্যাটাস দিয়েছেন পার্থ। সেটি পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো-
জাসদের crocodile tears ...
জাসদ নিয়ে বিতর্কটা ভালোই উপভোগ করছি। নতুন প্রজন্মের জাসদকে নিয়ে এতো কিছু জানার সুযোগ ছিল না। গত বিশ বছর জাসদকে নিয়ে ততো লেখালেখিও হতো না। আর জাসদ নেতাদের জনগণের সাথে সম্পর্কও ছিল না বললেই চলে। তবে এখন পরিষ্কার। সব খোলাসা ...
কত রঙ এই রাজনীতির, কত রূপ, কত কৌশল। আসলে রাজনীতিতে সবই সম্ভব। আর একটু পতাকার ভাগ পেলে তো একবারে সবই সম্ভব।
কি ভয়াবহ না ছিল জাসদের কর্মকাণ্ড সেই ৭২ থেকে ৭৫। সরকারদলীয় সংসদ সদস্যকে হত্যা, ব্যাংক লুট, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে আগুন, খুন, গুম সবই করেছে। আর এখন কিনা সারাক্ষণ জঙ্গি জঙ্গি করে।
সেই নির্মম ১৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট তৈরির অভিযোগে গণবাহিনীর সশস্ত্র বিপ্লবের সেকেন্ড ইন কমান্ড ইনু ও তার জাসদকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুব উল আলম হানিফ ও ক্যাপ্টেন অব. এবিএম তাজুল ইসলাম সিরিজ আক্রমণে অস্থির করে তুলেছেন। সেই হত্যাকাণ্ডের পর ১৬ এবং ১৭ই আগস্ট এই জাসদ কাউকে সেই হত্যার প্রতিবাদে একটা মিছিলও করতে দেয়নি।
কয়েকদিন আগে টকশোতে শুনলাম মইনুদ্দিন খান বাদল সাহেব বলছেন, যে টুঙ্গিপাড়া যেয়ে নাকি উনি কেঁদে ফেলেছেন। আর জাসদ নাকি এখন অতীতের সব ভুলের কাফফারা দিচ্ছে। ইংরেজিতে একে বলে ‘crocodile tears ‘। আর রাজনীতিতে কাফফারা, দুঃখিত অথবা ক্ষমার কোনো সুযোগ নেই।ইতিহাস কখনো কাউকে ক্ষমা করেনি ।