Showing posts with label ফরহাদ মজহার. Show all posts
Showing posts with label ফরহাদ মজহার. Show all posts

Friday, July 4, 2025

প্রতিবিপ্লবী রাজনীতি ও গণমাধ্যম by ফরহাদ মজহার

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কামাল আহমেদের লেখা ও পর্যবেক্ষণ আমাদের সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর করে তোলায় মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমের স্বায়ত্তশাসন যথেষ্ট নয়। ব্যক্তি খাতে গণমাধ্যমে কালোটাকার দৌরাত্ম্য, প্রভাবক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং নৈতিক মানের অনুপস্থিতির মতো বিষয়গুলোতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ প্রয়োজন।’

তাঁর (কামাল আহমেদ) সঙ্গে আমরা একমত। তবে তিনি লিবারেল ইকোনমিক পলিসি নামে পরিচিত ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগ’কে যে ইতিবাচক চোখে দেখেন এবং নির্বিচার গ্রহণ করেন, আমি সেভাবে দেখি না, গ্রহণও করি না।

মুক্তবাজার অর্থনীতি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না। ইউরোপে বাজারব্যবস্থা বিকাশের সঙ্গে গণতন্ত্রের আবির্ভাব ও বিকাশের সম্বন্ধ আছে বটে, কিন্তু একালের কাছাখোলা মুক্তবাজার অর্থনীতি গণতন্ত্রের সহায়ক নয়; বরং গণতন্ত্রের, বিশেষত গণমাধ্যমের ঘাতক। পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যায়।

----------- ২.

কামাল আহমেদ ‘জুলাই সনদে কী থাকছে, কী থাকা উচিত’ (২৬ জুন ২০২৫) নিবন্ধটিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘জুলাই ঘোষণা’ দিতে বাধা দেওয়া নিয়ে কিছু বলেননি। জনগণকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার দলিল হিসেবে ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণার সিদ্ধান্তে কোনো রাজনৈতিক বা আইনি সমস্যা দেখেননি।

৫ আগস্টে গণ–অভ্যুত্থান হয়েছে, কিন্তু ৮ আগস্টে বিদ্যমান সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থা বহাল রাখার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিবিপ্লবী রাজনীতির বৃত্তে প্রবেশ করে। কামাল আহমেদ ৮ আগস্টের সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব এবং পরবর্তী সময়ে জনগণকে সজ্ঞানে বাদ দেওয়ার প্রতিবিপ্লবী রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকেও ৫ আগস্ট থেকে আলাদা করতে পারেননি।

অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা সরকার লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণির সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করছে লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণির রাজনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করার জন্য। এটাও তাঁর কাছে সমস্যা মনে হচ্ছে না।

---------- ৩.

রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের জনগণের প্রতিনিধি গণ্য করা এবং তাঁদের সঙ্গেই আপসরফা করা আদতে পুরোনো ব্যবস্থাকেই পুনর্বাসিত করা। অধ্যাপক ইউনূস এই ভুল করছেন।

লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণির প্রতিনিধিদের সঙ্গেই আপসরফার প্রক্রিয়া গণ-অভ্যুত্থানের মর্মের বিরোধী এবং তিনি সেটা করছেন জনগণকে বাদ দিয়ে। এটাই প্রহসনের জায়গা। কারণ, এই লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণি যদি জনগণের প্রতিনিধি হতো, তাহলে তাদের নেতৃত্বেই গণ–অভ্যুত্থান হতো।

৮ আগস্টের সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের পর তথাকথিত সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন আদতে প্রতিবিপ্লবকেই বৈধতা ও ন্যায্যতা দেওয়ার প্রক্রিয়া।

‘জুলাই সনদ’ বানানোর প্রক্রিয়া জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের স্পিরিট বা মর্মের বিরোধী এবং সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবকে বৈধতা দেওয়ার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।

তথাকথিত জুলাই সনদ লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বন্দোবস্তের দলিলের অধিক কিছু নয়, অধিক কিছু হয়ে ওঠা অসম্ভব।

----------- ৪.

ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে প্রধান উপদেষ্টা ‘জুলাই ঘোষণা’ দিতে দেননি। ৬ জুন ২০২৫ তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই মাসেই একটি ‘জুলাই সনদ’ প্রস্তুত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করার কথা বলেছেন।

তিনি বলেছেন, তথাকথিত ‘জুলাই সনদে’ একটা জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সংস্কার কমিশন যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে, সেগুলোর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলগুলো যে কটিতে একমত, তার তালিকা থাকবে। সেই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে রাজনৈতিক দলগুলো নাকি জাতির কাছে সেগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করবে।

ব্যস। এতগুলো মানুষ শহীদ হলো আর এতগুলো মানুষ পঙ্গুত্বের জীবন বরণ করে নিল কেন? লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণি নিজেদের
মধ্যে কোথায় কোন বিষয়ে একমত হলো, সেই সনদের জন্য?

যে রাজনৈতিক দলগুলো শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যত কিছুই করতে পারেনি, তারা এখন আমাদের ‘জাতীয় সনদ’ উপহার দেবে!

জুলাই সনদ সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবকে বৈধতা ও ন্যায্যতা দেওয়ার দলিল; গণ–অভ্যুত্থানের ঘোষণাকে নস্যাৎ করার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা।

‘জুলাই সনদ’ প্রকৃতপক্ষে ৫ আগস্টের মৌলিক গঠনতান্ত্রিক মুহূর্তকে (কনস্টিটুয়েন্ট মোমেন্ট) অস্বীকার করার কৌশল, যেখানে জনগণ বিদ্যমান রাষ্ট্রশক্তির বাইরে নতুন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

জুলাই ঘোষণার অধিকার কেড়ে নেওয়া মানে জনগণের অভিপ্রায় ও আকাঙ্ক্ষাকে ‘অদৃশ্য’ করে ফেলা।

------------ ৫.

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, তথাকথিত ‘সংস্কার কমিশন’, ‘জুলাই সনদ’ প্রভৃতি মূলত লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণির রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং বিদেশি স্বার্থান্বেষী শক্তির মধ্যকার নতুন বোঝাপড়ার প্রক্রিয়া ও দলিল।

এতে স্পষ্টতই জনগণের অভিপ্রায়ের কথা নেই, আছে ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ’ করে রাস্তায় নামা জনগণকে বাদ দিয়ে ‘ঐকমত্যের নামে’ সংলাপভিত্তিক রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনর্বিন্যাসের সমঝোতা।

কামাল আহমেদের লেখায় সংস্কারপন্থী বিবেচনা, যেমন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, জনপ্রশাসন ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে ‘গণতন্ত্রের কার্যকারিতা’ স্থাপনের দাবি করা হয়েছে।

কিন্তু এগুলো এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কারচেষ্টা, যার মৌলিক ভিত্তি হলো জনগণ থেকে কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়ে শাসকশ্রেণির মধ্যে
ভাগ করে দেওয়া। জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা এখানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত; বরং এই সংস্কার বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার একটা কারিগরি বা কৌশল।

কামাল আহমেদের লেখার সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হলো ‘সবার ঐকমত্যে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ’—এই ভাষ্য। বাস্তবে এই ‘ঐকমত্য’ কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে? কে ঠিক করছে, কোন সুপারিশ গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়?

জনগণের পক্ষ থেকে কোনো গণপরিষদ, গণশুনানি বা প্রতিনিয়ত সংলাপ তো দেখা যাচ্ছে না। জনগণকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য স্থাপনের মধ্য দিয়ে যে ‘সনদ’ তৈরি হয়, তা কোনোভাবেই জনগণের সার্বভৌমত্ব কায়েম করতে পারে না।

----------- ৬.

কামাল আহমেদের লেখাটিতে গণমাধ্যম সংস্কারের ঘাটতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে যে উদ্বেগ জানানো হয়েছে, সেটা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার অভ্যন্তরে বসে এবং সেই ব্যবস্থাকে অক্ষত রেখে কিছু ‘নৈতিক সংশোধন’ কামনা করা।

কামাল আহেমদের চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে একপ্রকারের ‘সরকারি বা করপোরেট স্বাধীনতা’ দেওয়ার চিন্তা ফুটে উঠেছে, যেখানে জনগণের তথ্য নিরীক্ষণের অধিকার ও জনগণের ভাষ্য নির্মাণের অধিকার মোটেও স্বীকৃত নয়।

কামাল আহমেদ শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, নিরাপত্তা, অধিকার ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেটা শূন্য বুলি ছাড়া কিছু হয়ে ওঠে না। কারণ, সাংবাদিক হিসেবে তিনি জানেন, এই তথাকথিত সনদ বা কমিশনের মধ্যে শ্রমিকদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। এই অবস্থান শ্রমিকশ্রেণিকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সরিয়ে রেখে তাদের আবার ‘সক্ষম শাসকদের দয়া’র অধীন করার চেষ্টা মাত্র।

------------ ৭.

‘সংস্কার’ কথাটির বিপজ্জনক ব্যবহার সংস্কারপন্থীরা বুঝলেও অনেকে বুঝতে পারেন না। ‘সংস্কার’ শব্দটি ব্যবহৃত হচ্ছে এমনভাবে, যেন শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার দু–এক জায়গায় স্বল্প সংশোধন মানেই গণতন্ত্র। এতেই বুঝি জনগণের অধিকার আদায় হয়ে যাবে।

আসলে ‘সংস্কার’ কথাটি জনগণের অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ কিংবা নতুন গঠনতান্ত্রিক শক্তির দাবিয়ে রাখা বা নির্মূল করার ভাষিক অস্ত্র। জনগণের সার্বভৌম অধিকার হলো নিজেদের নিজেরা রাজনৈতিকভাবে গঠন করার ক্ষমতা, নিজেদের গঠনতন্ত্র, রাষ্ট্রকাঠামো এবং বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের যোগ্য স্থান নির্ধারণের অধিকার—সেটা লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণির প্রতিনিধিদের রাজনৈতিক দলের ‘ঐকমত্যে’ বন্দী হতে পারে না।

------------ ৮.

কামাল আহমেদের লেখা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শেষমেশ লেখাটি সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবকে কৌশলে রক্ষা করার একটি দুর্বল ভাষ্য হয়ে রইল, তার অধিক কিছু হয়ে উঠতে পারল না।

গণমাধ্যম শুধু জনগণের সামষ্টিক অভিপ্রায়ের কাছে জবাবদিহি করে, কিন্তু কোনো করপোরেট স্বার্থ, রাষ্ট্র, আমলাতন্ত্র বা পুলিশি ব্যবস্থার কাছে নয়। গণসার্বভৌমত্বের আলোকে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিয়ে কীভাবে আমরা ভাবব এবং গণমাধ্যমে চর্চা করব, তার কোনো নীতি বা দিশা কামাল আহমেদ দিতে পারলেন না। জনগণের অভ্যুত্থান গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের মধ্য দিয়ে নিজেদের নতুনভাবে গঠন এবং একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য এটা আমাদের প্রয়োজন।

------------- ৯.

জুলাই ঘোষণা হলো জনগণের নতুন গাঠনিক ক্ষমতার ঘোষণা; লুটেরা ও মাফিয়াশ্রেণির সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য জনগণ অকাতরে শহীদ হয়নি।

গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের অভিপ্রায় এবং জনগণের সামষ্টিক গাঠনিক ক্ষমতা ও গঠনের কর্তব্য ইত্যাদি সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে পুরোনো শাসকেরাই নতুন মুখোশ পরে পুরোনো ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাই বহাল রাখছে।

একে বলা যায় প্রতিবিপ্লবকে (লিগ্যালাইজড কাউন্টার রেভল্যুশন) বৈধতা ও ন্যায্যতা দেওয়ার কৌশল। ফলে সংস্কারের নামে পুরোনো শাসকশ্রেণি ও শাসনকেই চিরস্থায়ী করার আয়োজন চলছে।

কিন্তু জনগণ কি তা মেনে নেবে?

* ফরহাদ মজহার,  কবি, লেখক ও চিন্তক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

প্রতিবিপ্লবী রাজনীতি ও গণমাধ্যম

Tuesday, May 13, 2025

গণসার্বভৌমত্ব ও গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ কেন জরুরি by ফরহাদ মজহার

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’ শিরোনামে একটি খসড়া আইন নিয়ে আলোচনা শুরু করছে। আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। কারণ, ফ্যাসিস্ট শক্তি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল নাগরিকদের ‘গুম’ (এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স) করার বিরুদ্ধে লড়াই। মানবিক অধিকার লঙ্ঘনের ক্রূর অভিজ্ঞতাই মূলত জনগণকে গণ-অভ্যুত্থানের শামিল হতে এবং অকাতরে প্রাণ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বিভিন্ন দাবি আদায়ে এখনো তাদের বিক্ষোভ ও রাজপথে আন্দোলন করতে হচ্ছে।

কিন্তু ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও গণদাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও আইনি মর্ম বুঝতে হবে। এই ক্ষেত্রে গণ-আন্দোলনের মারাত্মক ঘাটতি আছে। যার ফলে জনগণের তরফ থেকে কী ধরনের ঘোষণা বা দাবি আমাদের একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের দিকে নিয়ে যেতে পারে, তার রণনীতি ও রণকৌশল সম্পর্কে ছাত্র-তরুণেরা এখনো অতিশয় অস্পষ্ট। ছাত্র-তরুণদের আত্মত্যাগ সে কারণে ইতিবাচক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। পড়াশোনা, বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে তাঁদের আগ্রহ দুঃখজনকভাবে কম। তাই আমরা এখনো পরিষ্কার বুঝতে পারছি না যে আমাদের লড়াই বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

এই বিষয়গুলো আমাদের ভালোভাবে বুঝতে হবে। জনগণকে দমন-পীড়ন করা, আইনবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ের মর্ম না বুঝলে আমরা আমাদের বাস্তবসম্মত কর্তব্যগুলো সঠিকভাবে ধরতে পারব না। ইউরোপে ১৬৪৮ সালে স্বাক্ষর করা ওয়েস্টফিলীয় চুক্তির জেরে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র নিজে সার্বভৌম। মানুষ সেখানে সার্বভৌম নয়। আমরা এখনো পুরোনো সেই ওয়েস্টফিলীয় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিপরীতে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা বা গণ-সার্বভৌমত্বের (পপুলার সভরেন্টি) ধারণা সম্পর্কে কিছুই প্রায় জানি না।

জনগণকে দমন-পীড়ন, আইনবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াই চলছে। এই লড়াইয়ের প্রধান মর্ম হচ্ছে তথাকথিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে জনগণের সার্বভৌম সামষ্টিক কর্তাসত্তার প্রতিষ্ঠা, যা একই সঙ্গে গণতন্ত্রেরও মর্ম; অর্থাৎ গণতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে তথাকথিত ‘রাষ্ট্র’ নয়; বরং জনগণই রাষ্ট্রের সব নীতি প্রণয়ন, প্রশাসনিক পরিচালনাসহ সব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী।

জনগণের ক্ষমতার বিপরীতে রয়েছে রাষ্ট্রের নামে সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাষ্ট্রের নামেই গড়ে ওঠা নানা পরজীবী প্রতিষ্ঠান, লুটেরা ও মাফিয়া শ্রেণির করপোরেট ক্ষমতা, নানা কিসিমের গণবিরোধী রাজনৈতিক দল ইত্যাদি। অথচ ক্ষমতাকে হতে হবে জনগণের ক্ষমতা। যার দ্বারা ব্যক্তির অধিকার ও ব্যক্তির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং সেই অধিকার ও মর্যাদা সামষ্টিক গণরাজনৈতিক শক্তির বলে টিকিয়ে রাখাই গণতন্ত্রের কাজ। এ ছাড়া গণতন্ত্র কায়েম অসম্ভব।

সেই ক্ষেত্রে নাগরিকদের ‘গুম’ করা চরম গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের অতি কুৎসিত ও দৃশ্যমান উপদংশ। যে কারণে মানবাধিকার রক্ষার বিবিধ আন্তর্জাতিক আইন থাকা সত্ত্বেও জাতিসংঘ আলাদা করে গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ ঘোষণা করেছে। তথাকথিত রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিপরীতে জনগণের সামষ্টিক গণতান্ত্রিক অভিপ্রায়ের মর্ম বুঝতে হবে। আর এর জন্য সারা দুনিয়ার নিপীড়িত মজলুম জনগণের লড়াইয়ের ফসল হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স (আইসিপিপিইডি) সনদটি আমাদের পাঠ ও পর্যালোচনা করা অত্যন্ত জরুরি। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য জাতিসংঘ কর্তৃক ২০০৬ সালে সনদটিও গৃহীত হয় ২০১০ সালে সনদটি বলবৎ হয়। এটা বিশ্বব্যাপী গণসার্বভৌমত্ব কায়েমের লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট সনদটি স্বাক্ষর করেছে।

আন্তর্জাতিক সনদ হিসেবে আইসিপিপিইডি এর সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এর ইতিবাচক তাৎপর্য এবং সীমাবদ্ধতা বুঝতে হলে গণসার্বভৌমত্বের (পপুলার সভরেনটি) আলোকে সনদটি পর্যালোচনা করতে হবে। তা ছাড়া এর মর্ম বুঝতে এবং বাংলাদেশে তা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আমরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কতটা প্রস্তুত? কীভাবে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে আইসিপিপিইডিকে আমরা কাজে লাগাব, সেটা বোঝার জন্য গণসার্বভৌমত্বের আলোকে এই আন্তর্জাতিক সনদের একটি পর্যালোচনা এখানে পেশ করছি।

আমরা প্রশ্ন করতে পারি, আইসিপিপিইডি সনদটি কি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার ধারণাকে কেন্দ্র করে গঠিত, নাকি এটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক মানবাধিকারের সুরক্ষার একটি চুক্তিমাত্র?

আইসিপিপিইডির মৌলিক নীতিমালা পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমরা তা অনুধাবনের চেষ্টা করতে পারি।

১. এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সের সংজ্ঞা (আর্টিকেল ২): ‘ ...বাই এজেন্টস অব দ্য স্টেট অর বাই পারসন্স অ্যাক্টিং উইথ দ্য অথরাইজেশন, সাপোর্ট অর অ্যাকুয়েসেন্স অব দ্য স্টেট...’; অর্থাৎ এই সনদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকে গুমের অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে। এটি জনগণের নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে রক্ষার চেষ্টা করে।

২. অস্বীকার ও তথ্য গোপনের বিরুদ্ধে অধিকার (আর্টিকেল ১৮, ২০): আন্তর্জাতিক সনদে পরিবারের সদস্যদের ডিটেইনির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এটি একটি নাগরিক-কেন্দ্রিক (পিপল-সেন্টার্ড) দৃষ্টিভঙ্গি।

৩. প্রতিরোধের সাংগঠনিক কাঠামো (আর্টিকেল ২৩): আন্তর্জাতিক সনদে রাষ্ট্রকে এমন আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে, যা গুমের পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধ করবে।

৪. ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (আর্টিকেল ১৫-১৬): গুমের মতো অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে, বহুরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও বিচারব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।

গণসার্বভৌমত্বের আলোকে যদি আন্তর্জাতিক সনদের ধারাগুলো আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যায়, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আইসিপিপিইডি গণসার্বভৌমত্বের ধারণাকে ধারণ করে।

ক. আইসিপিপিইডি রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারণ করে। এর দ্বারা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত প্রচলিত ধারণার বিপরীতে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে সামনে আনে। সনদটি মূলত রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত রাখার একটি ব্যবস্থা, যেন রাষ্ট্র জনগণের ওপরে নয়; বরং জনগণের অধীনে জনগণের পক্ষের ক্ষমতা হিসেবে  ভূমিকা রাখতে পারে।

খ. জনগণের জানার ও প্রতিবাদের অধিকার আইসিপিপিইডিতে স্বীকৃত। পরিবার, নাগরিক সমাজ ও আইনি প্রতিনিধিদের অধিকার ও তথ্যপ্রাপ্তি সনদে নিশ্চিত করা হয়েছে, যা গণনিয়ন্ত্রণমূলক চিন্তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

গ. সনদটি আন্তর্জাতিক স্তরে জনগণের পক্ষ থেকে ন্যায়সংগত দাবি উত্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। সনদ অনুযায়ী ভুক্তভোগীরা জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ বা অপর আন্তর্জাতিক ফোরামে অভিযোগ জানাতে পারেন। এটি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের একটি রূপ। যার চর্চার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় গণসার্বভৌমত্বের ধরন কী হতে পারে, তা আমরা স্পষ্ট করে তুলতে পারি। কিন্তু আইসিপিপিইডির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যা গণসার্বভৌমত্বকে সীমিত করে। এই সীমাবদ্ধতাগুলোর দিকে তাকানো যাক।

ক. এখনো রাষ্ট্রই প্রধান কর্তা, জনগণ নয়। যদিও সনদটি রাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতার অধীনস্থ করে; তবু আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ ও প্রতিকারব্যবস্থায় জনগণের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা অংশগ্রহণের কথা বলা হয়নি; অর্থাৎ সনদটি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ নয়; বরং রাষ্ট্রের ওপর ‘নৈতিক নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী।

খ. প্রচলিত ওয়েস্টফিলিয়ান সার্বভৌম রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই ন্যায়ের সন্ধান করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার পথটি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। এতে জনগণের প্রতিরোধ বা গণ-আন্দোলনের ক্ষমতা স্বীকৃত নয়।

গ. আন্তর্জাতিক সনদে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুমের পরিপ্রেক্ষিত উপেক্ষিত। গুমকে প্রায়ই ‘আইনি’ এবং ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখা হয়েছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত, যেমন গণ-আন্দোলন দমন, জাতিগোষ্ঠী নিধন, শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃত্ব বজায় রাখার প্রকল্প অনুপস্থিত।

সংক্ষেপে বলা যায়, আইসিপিপিইডি আংশিকভাবে গণসার্বভৌমত্ব ধারণাকে ধারণ করে, বিশেষত যেখানে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে জনগণের তথ্য, সুরক্ষা ও বিচার চাওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি আছে। তবে এটি মূলত একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক মানবাধিকার প্রতিরক্ষাকাঠামো। এই কাঠামো গণতন্ত্র বা জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে (কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার) কেন্দ্র করে কাজ করে না। এটি বরং রাষ্ট্রীয় শাসনকে নৈতিকভাবে পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টামাত্র।

অতএব গণসার্বভৌমত্বের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য আইসিপিপিইডির পাশাপাশি যা প্রয়োজন তা হলো:

১. জনগণের নেতৃত্বে সত্য নির্ণয় ও ইনসাফ কায়েম কমিশন

২. জনগণের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার ফোরাম (ট্রানজিশনাল জাস্টিস ফোরাম)

৩. আইন প্রণয়নে সরাসরি গণ-অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের বাইরে থেকেও গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচারের ক্ষমতা নির্মাণ।

ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে অবিলম্বে ‘গুম প্রতিরোধ ও গণসুরক্ষার ঘোষণা’ হাজির করা জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫’-এর খসড়া গণসার্বভৌমত্বের আলোকেই আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে।

* ফরহাদ মজহার কবি ও চিন্তক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

নাগরিকদের ‘গুম’ করা চরম গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের অতি কুৎসিত ও দৃশ্যমান উপদংশ
নাগরিকদের ‘গুম’ করা চরম গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের অতি কুৎসিত ও দৃশ্যমান উপদংশ। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, March 16, 2025

বিএনপি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি : ফরহাদ মজহার

বিএনপির ‘দ্রুত নির্বাচন’ দাবির সমালোচনা করে বিশিষ্ট দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তক ফরহাদ মজহার বলেছেন, দলটির অনেক নেতা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। তারা নিশ্চিতভাবে বঙ্গোপসাগরে ডুববে। তবে খালেদা জিয়ার আপসহীন মনোভাবের প্রশংসা করে বলেন, তার অবস্থান অভ্যুত্থানকারীদের শক্তি জুগিয়েছে, তাই বিজয়ের পরপরই তাকে মুক্ত করা হয়েছে।

শনিবার (১৫ মার্চ) যশোর শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ আয়োজিত আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে ফরহাদ মজহার এসব কথা বলেন।

এসময় তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত সরকারকে ‘নির্বাচিত সরকার’ হিসেবে গণ্য করা উচিত। তার মতে, শুধু ভোটের মাধ্যমেই সরকার নির্বাচিত হয় এই ধারণা ভুল। গণঅভ্যুত্থানই প্রকৃত গণতন্ত্রের প্রতিফলন এবং জনগণের অভিপ্রায়েই এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, চব্বিশ সালে ছাত্র-জনতা-সৈনিকদের গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল। কিন্তু ‘ফ্যাসিবাদী সংবিধান’ বহাল থাকায় প্রতিবিপ্লবও সংঘটিত হয়েছে। সংবিধান না থাকলেও ফরমান দিয়ে দেশ চালানো সম্ভব। তবে অভ্যুত্থানকারীরা একের পর এক ভুল করে চলেছে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল চুপ্পুর কাছে শপথ নেওয়া। এখন তারা মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল গঠনের চেষ্টা করছে, যা আরও একটি ভুল।

মধ্যপন্থাকে ‘সুবিধাবাদ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, তরুণদের দল হতে হবে সব ধরনের ফ্যাসিবাদবিরোধী। কেবল বাঙালি জাতিবাদের বিরোধিতা করলেই চলবে না, ধর্মীয় ফ্যাসিবাদসহ সব রূপের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।

ভারত ক্রমাগত উসকানি দিচ্ছে বলে সতর্ক করে ফরহাদ মজহার বলেন, ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতি আসছে। নিজেদের মধ্যে সংঘাত ও ক্ষমতার লড়াই বন্ধ না করলে পরাজিত ফ্যাসিবাদীরা দিল্লির সহায়তায় ফিরে আসতে পারে। ইতোমধ্যে আছিয়া ধর্ষণ ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তারা ইউনূস সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের বিশাল অংশগ্রহণের প্রশংসা করে বলেন, তারা আজ কোথায়? কেন আমরা তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি? কেন তারা রাজনীতির সামনের কাতারে আসতে পারছে না? মুহাম্মদ (স.) -এর সময় নারীরা মসজিদে যেত, যুদ্ধ করত। তাহলে আজ কেন তাদের ঘরে বন্দি রাখতে চাই?

বিদ্যমান সংবিধানকে ‘বাংলাদেশের নয়’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সত্তরের নির্বাচন হয়েছিল পাকিস্তানের নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য। স্বাধীনতার পর যে সংবিধান রচিত হয়েছে, তার জন্য জনগণের ম্যান্ডেট ছিল না। এটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিপরীত।

সভায় আরও বক্তব্য দেন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট বেনজীন খান, এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ, মোহাম্মদ রোমেল প্রমুখ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যশোরের আহ্বায়ক রাশেদ খান সভাটি পরিচালনা করেন।

এর আগে, শুক্রবার বিকেলে ফরহাদ মজহার ‘প্রাচ্যসংঘ’ -এর সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ফকিরদের আস্তানায় হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ভারত এ সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করবে যে বাংলাদেশে ধর্মীয় ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, যা দেশকে নতুন সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। 
যশোরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন ফরহাদ মজহার। ছবি : কালবেলা
যশোরে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন ফরহাদ মজহার। ছবি : কালবেলা

Sunday, January 5, 2025

‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব হয়ে গেছে, গৃহযুদ্ধের দিকে দেশ’ -ফরহাদ মজহার

২০২৪ সালের বিদায়লগ্নে গণঅভ্যুত্থান, রাজনীতি, সংবিধান, রাষ্ট্র ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার৷

ডয়চে ভেলে: ২০২৪ তো আমাদের জীবনে একটি ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। এখন রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন দেখছেন?

ফরহাদ মজহার: রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে সেটা আমরা চূড়ান্ত রূপে দেখতে পারবো কিনা সেটা নির্ভর করে জনগণের যে সার্বভৌম ক্ষমতা, সেটা আমরা ক্ষমতার দ্বারা রুপান্তর করতে পেরেছি কিনা। একটা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। সেই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণ ক্ষমতায় যেতে পারেনি- যেটা হওয়া উচিত ছিল। যদি জনগণ ক্ষমতায় যেতে পারতো, তাহলে বাংলাদেশকে আমরা নতুনভাবে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে পারতাম। গণআন্দোলন থেকে গণশক্তি। গণশক্তি থেকে গাঠনিক ক্ষমতা। এই রূপান্তরটুকু আমরা করতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। এজন্য আমি এটাকে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব বলছি। আইনের কথা বলে জনগণের অভিপ্রায়কে নস্যাৎ করে দেয়া হয়েছে। পুরনো সংবিধানের অধীনে, ফ্যাসিস্ট সংবিধানের অধীনে আমরা নিয়ে গিয়েছি পুরো গণঅভ্যুত্থানকে। উচিৎ ছিল এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারা বলবেন,  ‘‘আমাদের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হলো বাংলাদেশের জণগণকে একটি নতুন সংবিধান উপহার দেয়া। সেটা হয়নি। ফলে গণঅভ্যুত্থানটা একটা সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লবের মধ্য দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। তবে লড়াইটা চলবে। এই লড়াইটা কীভাবে শেষ হয়, কে কীভাবে ভূমিকা রাখে সেটা দিয়েই আগামীর বাংলাদেশ, রাজনীতি ঠিক হবে। ফলে সামনে বেশ কিছু সময় আমাদের অস্থিরতার মধ্যে কাটবে। যে গণঅভ্যুত্থানটা সফল হলো না। সেটাকে সফল করাই এখন আমাদের বড় কাজ।

বিপদের দিকটা হলো সরকার ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দলের কাছে নতজানু হয়ে গেছে, পরাজিত হয়ে গেছে। তারা ইতিমধ্যে কোনো সংস্কার ছাড়া নির্বাচন কমিশনকে বসিয়ে দিয়েছে এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার কি তাহলে চার সাড়ে চার মাসে সংস্কার প্রক্রিয়া স্পষ্ট করতে পেরেছে?

অবশ্যই পেরেছে। সবগুলো নস্যাৎ করে দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। আমরা সম্পূর্ণ বিজয় করতে পারিনি। ড. ইউনূসকে পূর্ণ ক্ষমতা না দিয়ে আমরা একটা উপদেষ্টা সরকার বানিয়েছি। তাকে দোষ দিয়ে তো লাভ নাই। এটার জন্য সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক দলগুলো দায়ী। রাজনৈতিক দলগুলো গণঅভ্যুত্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। সংস্কার ছাড়া নির্বাচনের কথা বলা মানেই আওয়ামী লীগ ১৫ বছর ধরে লুপপাট করেছে, এবার আমরা লুটপাট করবো। নতুন গঠনতন্ত্র (সংবিধান) প্রণয়ন মানে আমরা তাকে রাজনৈতিক দল বলবো কিনা এটাও সিদ্ধান্ত নেয়া।

এই সরকার কি সেই ম্যান্ডেট পেয়েছে?

অবশ্যই পেয়েছে, রক্ত দিয়ে পেয়েছে। আপনি যে প্রশ্নটি করলেন সেটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এটার জন্য কি লোক শহিদ হয়নি? একটা প্রশ্নের জবাব দেন, আমরা কি দেশ স্বাধীন করার ম্যান্ডেট পেয়েছি? তাহলে আমরা একাত্তরে স্বাধীন হলাম কী করে?  মুক্তিযুদ্ধ করেন নাই? লোক মরে নাই?

রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, এটা তো নির্বাচিত সরকার নয়- সম্মতির সরকার...

আমি তো বললাম, রাজনৈতিক দলগুলো বদমাশ। আপনারা  কীভাবে এত বিভ্রান্ত! আপনারা তো এখনো বুঝতে পারছেন না যে, তারা(অন্তর্বর্তী সরকার) জনগণের রক্ত দিয়ে নির্বাচিত। বর্তমান সরকার রক্তের বিনিময়ে জনগণের অভিপ্রায়ে দায়িত্ব নিয়েছে। আর কী, আর কীভাবে নির্বাচিত হবে? ভোট কী? ভোট তো ফ্যাসিস্ট সংবিধানের। জনগণ তো সংবিধান ফেলে দিয়েছে। সংবিধান অনুসারে হয়েছে নাকি?

তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো এই সরকারকে কত সময় দেবে?

এটা তো রাজনৈতিক দলগুলো ঠিক করবে। রাজনৈতিক দলগুলো তো গণঅভ্যুত্থান করে নাই, জনগণ করেছে। ছাত্ররা তো মাঠে আছে। তারা তো মাঠ ছাড়ে নাই। কাজেই আগামীতে এটা দেখবো তারা করতে পারে কী।

আইন-শৃঙ্খলা আর দ্রব্যমূল্য- এগুলো সাধারণ মানুষের কনসার্ন। এগুলো এই সময়ের মধ্যে ঠিক করা যেতো?

খুবই সম্ভব ছিল। কিন্তু আপনি তো কোনো ক্ষমতাই দেননি। এই উপদেষ্টা সরকারকে রাজনৈতিক দল তো কোনো ক্ষমতাই দেয় নাই। তাহলে কী করে তারা সিন্ডিকেট ভাঙবে? সিন্ডিকেট ভাঙতে তো পাওয়ার লাগবে। তাদের তো কোনো পাওয়ারই নাই। সে তো সংবিধান দ্বারা বদ্ধ। রাজনৈতিক দলগুলো তো সমস্ত জায়গাগুলো, পদগুলো দখল করে ফেলেছে। আওয়ামী লীগের সিন্ডিকেটগুলোর জায়গায় তাদের সিন্ডিকেট বসিয়েছে। আপনারা তো এখন কাকে নির্বাচিত বলে, কাবে বলে না- এই প্রশ্ন তুলে সমস্যা তৈরি করছেন।

তাহলে তো সংবিধানই নতুন করে লেখার কথা।

কথা নয়, সংবিধান নতুন করে লেখা হবে। লিখতে হবে।

সেই প্রক্রিয়াই তো এখানো দেখছি না।

এটা তো তারা করবে না, জণগণ করবে। জনগণ যদি দেখে, পূর্ণ বিজয়ে যায়নি, তাহলে অবশ্য জনগণ সংগঠিত হবে। ছাত্ররা সংগঠিত হচ্ছে। ফলে আগামী দিনে আরেকটা লড়াই হবে। আপনি এড়াতে পারবেন না।

ছাত্ররাও তো নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করবে। তারাও তো রাজনৈতিক দলের দিকেই যাচ্ছে।

তাতে অসুবিধা কী? তারা তো নতুন গঠনতন্ত্রের (সংবিধান) দাবি তুলেছে। এটা একটা পলিটিক্স। পলিটিক্সটা দুইটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। জনগণ নতুন গঠনতন্ত্র চায়। নতুনভাবে বাংলাদেশ গড়তে চায়। আর রাজনৈতিক দলগুলো চায় না, তারা জনগণকে ক্ষমতায় আসতে দেবে না। তারা আগের লুটেরা, মাফিয়া গ্রুপের ক্ষমতা বজায় রাখবে। এটার মীমাংসা তো রাজনৈতিকভাবে হবে। আর তো কোনো পথ নাই।

সেটি কি এভাবেই হবে, না গণভোটের মাধ্যমে হবে?

-কেন গণভোট হবে? গণভোট করে কি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে? এটা হলো পলিটিক্যাল অর্গ্যানাইজেশন। জনগণ যদি ক্ষতায় থাকে, তারা জিতবে আর জনগণ যদি না পারে তো জিতবে না। তবে আগামী দিনে চোখের সামনে একটা গৃহযুদ্ধ দেখতে পাচ্ছি। এবং এটার জন্য সাংবাদিকরাও দায়ী। গণমাধ্যম দায়ী। কারণ, বাংলাদেশে যে মূল প্রশ্নগুলো, তা আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। আপনারা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশ্ন আমাদের করছেন। জনগণ তো বলেই দিয়েছে তারা কী চায়। জনগণের কথা তো আপনারা বলছেন না।

রাজনৈতিক দলগুলো তো বলছে তারা এই আন্দোলনে এই গণঅভ্যুত্থানে ব্যাপক অংশগ্রহণ করেছে।

তারা অংশগ্রহণ করেনি। জনগণ অংশগ্রহণ করেছে। দল এবং জনগণ এক কথা না। জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কারা রাজনৈতিক দল, কারা রাজনৈতিক দল না। নতুন সংবিধান কি সেটা বলবে না?

তাহলে এরা(অন্তর্বর্তী সরকার) সংবিধানের অধীনে শপথ নিলো কীভাবে?

ভেরি গুড। আমি তো প্রথম থেকেই বলছি তারা ভুল করেছে। এটাকে কারেক্ট করেন আপনারা। সাংবাদিকরা সঠিক কথাটা বলেন।

অন্তর্বর্তী সরকার একদিকে সংবিধানের কথা বলছে। আবার...। এখানেই তো সংকট রয়ে গেছে। সেটা স্পষ্ট না করে...

না না, স্পষ্ট তো হয়েছে। আমরা তো বলেছি। আপনারা খেয়াল করেননি। সেজন্যই তো লড়াই চলছে। প্রোক্লেইম করা হয়নি যে, আমরা গণঅভ্যুত্থান করেছি, আমাদের কথায় দেশ চলবে যতক্ষণ না পর্যন্ত নতুন শাসনতন্ত্র হয়। যারা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, তারা এখানে রাজনীতি এবং আইনের সম্পর্ক -এটা বোঝে না। এইজন্য এখানে সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব হয়ে গেছে। এরজন্য প্রধানত দায়ী গণমাধ্যম। ছাত্ররা পরিস্কারই  এটা বলেছে যে, ছাত্রদের পক্ষে গণমাধ্যম কোনো ভূমিকা রাখেনি।

গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গণহত্যার বিচার তো হতেই হবে। সেই প্রক্রিয়াটি কি সঠিকভাবে হচ্ছে?

গণহত্যার বিচার যে কমিটি হয়েছে, যে আইনে হচ্ছে, সেটা তো ফ্যাসিস্ট সরকারের আইনে হচ্ছে। ওই আইনে জামায়াত নেতাদের ঝুলানো হয়েছে, যেটা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ওটাকে বলা হয়, জুডিশিয়াল মার্ডার। আপনি যদি সেই একই আইনে বিচার করেন, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে এটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জনগণকে যদি ক্ষমতা দিতেন, তাহলে জনগণ সংক্ষিপ্ত আদালতে বিচার করে রায় দিয়ে দিতো।

তাহলে সংবিধান নতুন করে না লিখে আপনার মতে কিছুই করা ঠিক হচ্ছে না। তারা অনেকগুলো সংস্কার কশিন করেছে। তাহলে তারা কিসের সংস্কার করছে?

ভালো প্রশ্ন। ঢাল নাই, তলোয়ার নাই, নিধিরাম সর্দার। তাহলে সংস্কার কীভাবে করবে তারা। আর আমি তো সংস্কারের কথা বলি নাই। আমি তো গঠন করার কথা বলেছি। আপনি ঘরই বানাননি, সংস্কার কী করবেন?

যারা দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের যদি ক্ষমতার লোভই না থাকে, তাহলে তারা দেখছেন যে কিছুই হচ্ছে না, তারপরও তারা কেন চালাচ্ছেন?

তারা তাহলে কী করবেন? আপনার পরামর্শ কী?

তারা জাতির কাছে বলবেন, বলুক তারা কীভাবে সঠিক জায়গায় যেতে পারবেন, এটা করা দরকার, নয়তো আমরা গেলাম।

হ্যাঁ, আপনার সাথে আমি একমত। রাইট জায়গায় যেতে হলে কী করতে হবে আপনারাও আমার সঙ্গে বলেন। অবিলম্বে তাদের পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হোক। সংবিধান বাতিল করা হোক। চুপ্পুকে সরিয়ে দেয়া হোক। ছাত্ররা তো এই দাবি করেছে। আপনারা তো সেগুলো প্রচার করছেন না। সে প্রক্রিয়া তো এরা পারবে না। সেটা তো আমি আপনি করবো।

সেজন্যই কি আপনি গৃহযুদ্ধের কথা বলছেন?

নিশ্চয়ই। সেদিকেই তো যাচ্ছে।

সেই গৃহযুদ্ধে পক্ষ হবে কারা?

জনগণ বনাম বিদেশী শক্তি এবং তাদের দালালরা।

এখন যে প্রক্রিয়া চলছে সেটা চলতে থাকলে আপনি কি আবার ফ্যাসিবাদের ক্ষমতায়নের আশঙ্কা দেখেন নাকি?

ফ্যাসিবাদ তো, আপনিও ফ্যাসিবাদী। গণমাধ্যম যেভাবে প্রশ্ন তোলে সেটা ফ্যাসিজমের আরেকটি প্রকাশ মাত্র৷

গণমাধ্যমের ব্যাপারে সরকার ইমিডিয়েটলি কি করতে পারে ফ্যাসিবাদী আচরণ বন্ধ করতে?

কিছুই করতে পারে না। এটা যেহেতু জনগণ। গণমাধ্যমকে জনগণ হতে হবে আগে। এটা সরকার কিছু করতে পারবে না। ছাত্রদের দাবি-দাওয়া তো গণমাধ্যমে প্রাধান্য পাচ্ছে না। রাজনৈতিক দল কী বলে, মির্জা সাহেব কী বলে, জামায়াত কী বলে এগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে।

এই ধরনের গণমাধ্যম আবার কোনো কোনো স্টুডেন্ট বা সমন্বয়ক দখল করে কী লাভ করতে চান?

ওরা কোথায় দখল করছে, একটা বলেন না?

সময় টিভিতে শেয়ার চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে আবার জোর করে চাকরিচ্যুত করানো হয়েছে।

তারা তো ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বের মধ্যে আসছে না। আপনি কি মনে করেন না যে, যেসব গণমাধ্যম ফ্যাসিস্ট ভূমিকা পালন করেছিল, সেগুলোর চলে যাওয়া উচিদ?

সেটা কি সিঙ্গেলভাবে হবে, না একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হবে?

না, একমত, একমত। আমি সিঙ্গেলভাবে বলছি না। এটাই তো গৃহযুদ্ধের আলামত। এটা তো পলিটিক্যাল রিজলভের মধ্য দিয়ে হবে। সেটা হলে কী হতো, রিকনসিলিয়েশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন। রাজনৈতিক দলগুলো তো কোনো নৈতিক আলোচনায় যাচ্ছে না। দেশটাকে আমরা কীভাবে গঠন করবো? অনেক জায়গায়ই তো এখনো ফ্যাসিবাদ আছে।

ড. ইউনূস নিজে কি ফ্যাসিবাদের বাইরে?

ওনাকে তো আমরা নির্বাচিত করেছি। ব্যক্তি তো ঠিক করবে না।

আমরা ঠিক করি আর যা-ই করি, উনি কি ফ্যাসিবাদের বাইরে যেতে পেরেছেন?

ইয়েস এবং নো দুইটাই। আমরা যারা গণঅভ্যুত্থান করেছি, আমরা যদি তাকে আমাদের গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধি মনে করি, তাহলে ডেফিনিটলি তিনি ফ্যাসিবাদের বাইরে। আর যদি মনে করি, উনি সংবিধানের ভিতরে ঢুকে গেছেন, তাহলে সে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হলে আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেল। দোষটা তো তার নয়, দোষটা তো আমাদের।

আমরা যারা সাধারণ, অমরা যারা ‘স্থূল' চিন্তা করি, দ্রব্যমূল্যের কথা বলি, সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলি। সংখ্যালঘু নির্যাতন তো হয়েছে, সেটা সংখ্যায় কম বা বেশি হোক। আবার  বান্দরবানে ত্রিপুরা আদিবাসী গ্রামে আগুন দেয়া হয়েছে। এগুলো তো সরকারকে দেখতে হবে...

আপনার সঙ্গে আমি একমত। একটা হলো রাষ্ট্র এবং আরেকটা সরকার। রাষ্ট্র যদি আমরা গঠন করতে না পারি, তাহলে তো সরকার গঠিত হয়নি। সরকারের তো ক্ষমতা নাই। একথা আপনি বলতে পারবেন যদি একটি রাষ্ট্র বানিয়ে সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতাবান করে আপনি বসান।

(সূত্র -ডয়চে ভেলে)

mzamin


Thursday, December 12, 2024

ক্ষমতায় টিকে থাকতে গণহত্যা, গুম, ক্রসফায়ারসহ সবকিছুই করেছে আওয়ামী লীগ

যে শিশুর বয়স দুই বছর ছিল, তখন তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন হয়তো তার মনেও নেই, তার বাবা দেখতে কেমন ছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তার এখনো জানা নেই যে তার বাবা কোথায়, তার বাবা কি আদৌও বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের অনেকের পেট কেটে ফেলা হয়েছে, নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়েছে, বস্তা দিয়ে বেঁধে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারে জীবন গেছে কত মানুষের!

আজ বুধবার ‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুমের ঘটনা ও এর পরিণতি নিয়ে এ কথাগুলো উঠে এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে ‘সপ্রাণ’ আয়োজিত এই আলোচনা সভায় গণহত্যা ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুবিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান বক্তারা।

সভায় কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার নিজে গুম হওয়ার সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এটা একটা অবিশ্বাস্য রকমের ট্রমা। গুম হওয়া ব্যক্তিদের এই ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। তাঁদের পরিবারগুলো সেই কষ্ট দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়ায়। যাঁরা গুম হয়েছেন, তাঁরা যেন সুবিচার পান, সেই দাবি জানান তিনি।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন মানবাধিকারকর্মী মো. নূর খান লিটন। আলোচনায় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক দল বলা যাবে না। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এরা এমন কিছু নেই, যা করেনি। গণহত্যা, গুম, ক্রসফায়ারসহ ভিন্নমত দমনে সবকিছুই করেছে দলটি।

নূর খান লিটন বলেন, তাঁদের (গুমের শিকার ব্যক্তি) আয়নাঘরে এমন ভয়ংকর বন্দী হিসেবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটাতে হয়েছে, যেখানে পাঁচ–ছয় ফুট একটা জায়গায় সাপের মতো প্যাঁচ দিয়ে একটা মানুষকে থাকতে হয়। তিনি বলেন, গুমের শিকার অনেক ব্যক্তির পেট কেটে ফেলা হয়েছে, নাড়িভুঁড়ি বের করা হয়েছে, বস্তা দিয়ে বেঁধে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে, রাতের অন্ধকারে ক্রসফায়ারে তাঁদের জীবন দিতে হয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম বলেন, ‘আমরা যখন গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলি, গুমের শিকার যাঁরা পরবর্তীকালে ফিরে এসেছেন, তাঁদের সঙ্গে যখন কথা বলি, তাঁরা যে কী ভয়ংকর ট্রমার মধ্য দিয়ে যান, তাঁদের কথাগুলো শুনে আমরা বুঝতে পারি।’ তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এই ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে গত ১৫ বছর পুরো দেশ চুপ ছিল। যে পরিবারের মানুষেরা এখনো গুমের শিকার ব্যক্তিদের পাননি, সেই সব পরিবারই বা ভবিষ্যতে কীভাবে জীবন পার করবে?

নৃবিজ্ঞান ও গুমবিষয়ক গবেষক ইয়াসমিন আরা বলেন, যে শিশুর বয়স দুই বছর ছিল, তখন তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন হয়তো তার মনেও নেই, তার বাবা দেখতে কেমন ছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তর তার এখনো জানা নেই যে তার বাবা কোথায়, তার বাবা কি আদৌও বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন।

সভায় জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ফাইয়াজ হত্যার বিচার দাবি করেন।

‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা। আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে
‘গণহত্যা, গুম ও ভয়ের সংস্কৃতি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা। আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী অডিটরিয়ামে। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

Friday, November 1, 2024

আল্লাহর নামে কতল হয়ে যাব : ফরহাদ মজহার

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার বলেছেন, আমাকে কতল করলে যদি ইসলাম কায়েম হয় তবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহর নামে কতল হয়ে যাব। আমাকে ভয় দেখাবেন না।

শুক্রবার (০১ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড পিস স্টাডিজ আয়োজিত ‘দুর্নীতি ও রাষ্ট্রপতি বা সংস্কার’ শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।

ফরহাদ মজহার বলেন, অনেকে বলেন বাংলাদেশে ইসলাম কায়েম করতে হলে ফরহাদ মজহারকে নাকি কতল (হত্যা) করতে হবে। আমি কিন্তু বিষয়টা জেনে গেছি। আমাকে যেখানে বলবেন আমি যাব, আমাকে কতল করে ফেলবেন। আমাকে কতল করলে যদি ইসলাম কায়েম হয় তবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহর নামে কতল হয়ে যাব। আমাকে ভয় দেখাবেন না। কিন্তু ফ্যাসিজমকে ইসলাম বলে প্রচার করবেন না। আপনারা কোথা থেকে আসেন, সেটা আমরা জানি। আপনাদের কারা পাঠায়, সেটাও আমরা জানি।

তিনি বলেন, আমরা গণতন্ত্রের কথা বলি তবে জনগণকে উপেক্ষা করে। আমরা গণঅভ্যুত্থানের পরেও জনগণকে উপেক্ষা করি, এটা অদ্ভুত ব্যাপার। এতগুলো মানুষ শহীদ হয়ে গেল, এতগুলো মানুষ পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে, তারপরেও কিন্তু আমরা জনগণকে উপেক্ষা করেছি। আপনি ধরে নিচ্ছেন তথাগত রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রতিনিধি। এটা ঠিক নয়।

তিনি আরও বলেন, সংবিধান শব্দটা সঠিক নয়। এটা ঔপনিবেশিক শক্তি ব্যবহার করে। তারা যাদেরকে শাসন করবে, তাদের শাসন করার জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়। এটাকেই বলা হয় সংবিধান। কনস্টিটিউশনের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে গঠন। কনস্টিটিউশনের লিগ্যাল এবং পলিটিক্যাল অর্থ হচ্ছে যুগপৎ। আপনারা কনস্টিটিউশন শব্দটা বাদ দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এটার ব্যবহার ইংরেজ আমল থেকে শুরু হয়েছে। আমি একটা আইন দেব, সে আইনের দ্বারা আমি শাসন করব। আপনি শাসিত এবং আমি শাসক। গণতন্ত্রে শাসিত এবং শাসক বলে কোনো পার্থক্য থাকতে পারে না। গণতন্ত্রে জনগণ নিজের শাসক। আইন এবং রাজনীতির সম্পর্ক আমরা বুঝি না বলে এবার গণঅভ্যুত্থানটা ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হওয়াটা জরুরি ছিল। যাতে আমরা টের পাই আমাদের অজ্ঞতা, আমাদের বেহুঁশ অবস্থা, এটা আমাদেরকে ভুল দিকে নিয়ে যাবে। আমরা বারবার সংস্কার সংস্কার বলছি। আপনি তো বাড়িই গঠন করেন নাই, সংস্কার কীভাবে করবেন?

ফরহাদ মজদার বলেন, ১৯৭২ সালে আপনি যাদের পাকিস্তানের গঠনতন্ত্র বানানোর জন্য ভোট দিয়েছেন, তারাই ফিরে এসে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করল। তারা শাসন করতে যেটা চেয়েছে সেটাই করেছে। তারা সমাজতন্ত্র ঢুকিয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতা ঢুকিয়েছে। ওদের যে মতাদর্শ যেটাকে আমরা ফ্যাসিজম বলি। এটা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এতটা বছর শাসন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ বুঝানোর চেষ্টা করেছে, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধারণ করেছি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল সাম্য মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার।

তিনি বলেন, আপনি একটা গণঅভ্যুত্থান করেছেন। কোনো অভ্যুত্থানে কখনো শপথ করা লাগে না। আপনি যদি শহীদ মিনার বা রাজু ভাস্কর্যের সামনে শপথ গ্রহণ করতেন তাহলে যারা শহীদ হয়েছে, যারা পঙ্গু হয়েছে, তাদের যথার্থ মর্যাদা আপনিই দিতে পারতেন। যখনই আপনি বঙ্গভবনে ঢুকেছেন তখনই শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। তারই কিন্তু কুফল প্রত্যেকটা দিন আপনারা দেখছেন। এর কুফল আপনারা আগামী দিনেও দেখতে পারবেন। এটা বারবার বিভিন্নভাবে আসবে।

তিনি আরও বলেন, আপনারা সরকারের দুই একটা সংস্কার নিয়ে কথা বলছেন। এটা কিন্তু এখনকার আলোচনার বিষয় না। সরকারে আজকে একজন আছে আগামীকাল আরেকজন থাকবে। মূল বিষয়টা হচ্ছে রাষ্ট্র গঠন করা। আপনার এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে হবে, যেখানে রাষ্ট্রের মধ্যে আমরা প্রত্যেকেই এই রাষ্ট্রের অন্তর্গত। আমাদের অভিপ্রায়টা সার্বজনীন থাকতে হবে। আমরা এমন একটা রাষ্ট্র চাই যেটা আমাদের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করবে। আমার জীবন ও ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মর্যাদা হরণ করতে পারবে না। একটা গঠনতন্ত্র তৈরি করা খুব কঠিন কাজ না।

লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার। ছবি : সংগৃহীত
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার। ছবি : সংগৃহীত



Saturday, September 21, 2024

এই সরকারকে বিদ্যমান আইনে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই: ফরহাদ মজহার

ছাত্র-জনতার গণ–অভুত্থ্যানে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিদ্যমান আইনে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই পুরোনো সংবিধান ফেলে দিয়ে নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ নগরের ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনের এক্সপেরিমেন্টাল হলে ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পথ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহার এসব কথা বলেন।

পাঠ-চিন্তার আয়োজনে আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন হাসান জাফরুল বিপুল। রাকিবুল রাকিবের সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্য দেন সারোয়ার তুষার। আলোচনা শেষে প্রশ্ন–উত্তর পর্বের সঞ্চালনা করেন আফসার বিপুল।

উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক, পরিবেশবাদী সংগঠক ও কবি আরিফ বুলবুল, সংগঠক ও চিত্রনির্মাতা মো. রোমেল, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিবাদী শক্তি, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবারের ছাত্র-জনতার গণ–অভু্যত্থান হয়েছে। যারা পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চায়, তারা কিন্তু খুব ভালো সুযোগ নিয়ে নিয়েছে। তারা কী করল, পুরোনো ব্যবস্থার অধীনে এই যাঁদেরকে আমরা উপদেষ্টা বলছি। তাঁরা শপথ নিলেন পুরোনো ব্যবস্থার প্রেসিডেন্টের কাছে। তাঁরাা শপথ নিয়ে বললেন আমরা এই সংবিধান রক্ষা করব। আমরা কি এই সংবিধান রক্ষা করব। তাঁরা ফ্যাসিবাদ–ব্যবস্থা রক্ষা করবেন বলে শপথ নিয়েছেন। এখন তাঁদেরকে সরানো যাবে না। হয়তো এখানে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।’

বিদ্যমান আইনের মধ্যে এই সরকারকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এই সরকার কীভাবে নিজেদের বৈধ প্রমাণ করবেন, আমি জানি না। তাঁরা যতটুকু করবেন, জোর করে করবেন, যতটুকু তাঁদের হাতে ক্ষমতা আছে, ততটুকু তাঁরা করবেন। কিন্তু লিগ্যালি ওইটা কখনো বৈধ হবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের যে নতুন রাষ্ট্র গঠন করার আকাঙ্ক্ষা এই যে গণ–অভুত্থ্যানের মধ্য দিয়ে ঘটেছে, এটার ধারেকাছে আমরা যেতে পারিনি। গণ–অভুত্থ্যান হলে আপনি কেন গণ–আদেশে চলতে পারেন না প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাই পুরোনো সংবিধান ফেলে দিয়ে নতুন করে সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে।’

শেখ মুজিবকে হত্যার পরে ইনডেমনিটি আইন করা হলেও সেটি বাতিল করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময় সংবিধান ফেলে দিয়ে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হলে এটা করা সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, পুরোনো সংবিধান রেখে দেওয়া হলে আজকে থেকে ২০ বছর পরও যদি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে, তাহলে গণ–অভুত্থ্যানের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের সবার বিচার হবে।

শেখ হাসিনা চট করে ঢুকে পড়ার মুঠোফোন ফাঁস হওয়ার সারা দেশে মাজারে হামলা শুরু হয়ে গেছে উল্লেখ করে ফরহাদ মজহার বলেন, মাজার, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও পাহাড়িদের আমাদের রক্ষা করতে হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে, আলোচনা করে এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে।’

সিগারেটের নিকোটিনের ক্ষতির চেয়ে গাঁজা খাওয়ায় ক্ষতি কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাজারে গাঁজা ও গানবাজনা বন্ধ করতে হলে, আগে বড় হোটেলগুলোতে মদ, বিয়ার খাওয়া ও গানবাজনা বন্ধ করতে হবে।

সূচনা বক্তব্যে সারোয়ার তুষার বলেন, ‘ছাত্র-জনতার গণ–অভুত্থ্যান আন্দোলন নস্যাৎ করতে দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। তাই আমাদের রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।’

‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পথ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।  গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনে
‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পথ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার। গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

Wednesday, September 18, 2024

আমার বই পড়ে তরুণরা গণঅভ্যুত্থানের দিক-নির্দেশনা পেয়েছে: ফরহাদ মজহার

নিজের লেখা ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’ বই পড়ে ৫ আগস্টের মতো ঘটনার জন্য তরুণরা দিক-নির্দেশনা পেয়েছে বলে দাবি করেছেন বিশিষ্ট কবি, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার।

বুধবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘দ্য ভয়েস অব টাইমস’ আয়োজিত ‘গণঅভ্যুথ্যান-২৪: জনআকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন দাবি করেন।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) ছাত্র রেদোয়ানুর রহমানের একটি বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ফরহাদ মজহার ওই দাবি করেন। রেদোয়ানুর রহমান কবি ও লেখক আহমেদ ছফার একটি লাইন উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছিল তখন বুদ্ধিজীবীরা তা জানতো না।

বুদ্ধিজীবীরা সমাজ বদলায়নি, বদলেছে তরুণরা—এমন একটি বক্তব্য টেনে এনে ফরহাদ মজহার বলেন, বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না—একজন তরুণ বলেছেন। একটা কথা মনে রাখতে হবে, বুদ্ধিজীবিতা ছাড়া কোনো বড় ঘটনা বা বাংলাদেশকে গঠন করতে পারব না।

ওই তরুণকে উদ্দেশ্য করে ফরহাদ মজহার বলেন, তিনি আর একটা কথা বলেছেন, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান হচ্ছে, এটা জানতো না। এটা ভুল কথা। ২০২৩ সালে আমাদের একটা বই বের হয়েছিল। আমাদের যৌথ প্রযোজনা। বইটির নাম ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন’। ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট এটা প্রকাশ পায়। বাংলাদেশের তরুণদের বড় একটা অংশ সেই বই দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। সেই বই তারা পড়েছে। সেই বই থেকে তারা দিক-নির্দেশনা পেয়েছে।

রাষ্ট্রচিন্তা প্রকাশনী থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত ‘গণঅভ্যুত্থান ও গঠন: বাংলাদেশের গণরাজনৈতিক ধারার বিকাশ প্রসঙ্গে’ বইটি নিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, এই গ্রন্থটির পেছনে আমার নিজের ক্ষতবিক্ষত হৃদপিণ্ডের অনেক টুকরা জড়িত। বইটি যখন স্নেহভাজন সারোয়ার তুষার হাতে তুলে দিলেন; ভেবেছি, একাত্তরের শহীদদের প্রতি কিছু দায় কি শোধ করা গেল? আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি যে, বাহাত্তরে আমরা নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠন করতে পারিনি, সেই কাজ আমাদের অবশ্যই সম্পূর্ণ করতে হবে, সেটা স্মরণ করিয়ে দেবার জন্য এই গ্রন্থ।

ফরহাদ মজহার বলেন, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট বইটি বের হয়েছে। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। তাই তরুণরা যেভাবে বলছেন, সেটা ঠিক না। বারুদ জমা ছিল কিন্তু ম্যাচের কাঠি জ্বালানোর লোক ছিল না। তরুণরা ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়েছেন। ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে তরুণরা যেহেতু বুদ্ধিজীবিতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন নাই, তাই তারা বিজয়ের ফসল তুলে দিয়েছেন ওই চুপ্পুর (রাষ্ট্রপতি) হাতে। এটা বুঝতে হবে। তরুণরা কাজটা শুরু করেছেন, জনগণ সাড়া দিয়েছে। আজ এই বিজয়টা চলে গেল তাদের হাতে, যারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন।

তিনি বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনো সম্পর্ক নাই। গণতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের একটা ধরন। বাড়িটা হলো রাষ্ট্র আর বাড়িটা কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটা হচ্ছে নির্বাচন। বাড়ির ঠিক নাই, সেখানে কী নির্বাচন করবেন? এইজন্য বারবার বলা হচ্ছে গঠনের কথা।

ফরহাদ মজহার বলেন, এই সরকারকে এই বিষয়গুলো ঠিক করতে হবে। না হলে মারাত্মক ভুল হবে। তরুণদের বুদ্ধিজীবীদের নেতিবাচক হিসেবে মনে করলে হবে না। এটার চর্চা না থাকলে সেই রাষ্ট্রে হাজার হাতুড়ি পিটিয়ে গণতন্ত্র আনতে পারবেন না।

উপদেষ্টাদের নিয়ে গঠিত সরকার প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, জনগণের অভিপ্রায় হচ্ছে গণতন্ত্র। জনগণের অভিপ্রায় বিসর্জন দিয়ে এখন একটা উপদেষ্টা সরকার বানানো হয়েছে। তার ভাষায় এটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। প্রশাসনের সকল স্তরে জনগণের অংশগ্রহণ করতে হবে। কিন্তু এই সরকারের সেটা হচ্ছে না। তারা কিন্তু কাউকে বলে নাই। জনগণের পক্ষে কনক সারোয়ার, পিনাকী কথা বলেছে। কিন্তু এই সরকার কি তাদের কিছু বলেছে? যাদের আন্দোলন ও প্রোপাগান্ডার ফলে হয়েছে।

সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রসঙ্গে এই বুদ্ধিজীবী বলেন, এটা খুব ভালো লক্ষণ নয়। আমরা চেয়েছিলাম পুলিশ সংস্কার করা। তা হয়নি। পুলিশ না এলে তাদের পলাতক ঘোষণা করা হোক। আগে পুলিশ মাসে লাখ টাকা কামাতো। তারা তো এই দুই চার টাকার জন্য ফিরে আসবে না। আগে থেকেই এটা ভাবা উচিত না। তরুণরা ভেবেছিল বিল্পব ডিনার পার্টি, এটা ডিনার পার্টি না।

বিচার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার বলেন, তারা (বিচার বিভাগ) ইকোনমিক ইস্যুতে, প্রসাশনিক এবং আইনের ক্ষেত্রে তারা স্বাধীন। এরশাদ সাহেব আদালতকে একবার ডিসেন্ট্রালাইজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটা আদতে হয়নি, যেটা নিয়ে আমরা আজ পর্যন্ত কাজ করতে পারিনি। আদালতকে জনগণের কাছে থামতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কথাটা বলা সহজ। এক-এগারোর সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার কথা বলে নির্বাহী শাসন ব্যবস্থা নিয়ে এসেছিল। মানবিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা আমরা মুখে বলি, কিন্তু কার্যত এর ব্যবস্থা আমরা করতে পারি না। আমরা কারো কথা শুনি না, অন্যের কথায় নাচানাচি করি। এটা কি আমাদের স্বভাব নাকি জ্ঞানের অভাব? এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অনেক সচেতন হতে হবে এবং সহনশীলভাবে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

ছাত্ররা একটি নাগরিক কমিটি করেছে কিন্তু প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল সেটাকে সন্দেহের চোখে দেখছে উল্লেখ করে ফরহাদ মাজহার বলেন, কারণ তারা বলছে তোমরা নাগরিক কমিটি করো কিন্তু এই সরকারের ক্ষমতা নিয়ে আরেকটি কিংস পার্টি হয়ো না। এখন যেটা দরকার সেটি হলো বিপুল বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন।  চিন্তার পরিবর্তন এবং সেই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করা। যে ভিত্তিটা কারো পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব হবে না এবং সেই ভিত্তি তৈরি হলে কোনো দেশের পক্ষে নতুন বাংলাদেশ তৈরি হতে কোনো বাধা থাকবে না।

ভয়েস অব টাইমস-এর সম্পাদক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অংশ নেন সাংবাদিক ওলীউল্লাহ নোমান, জামায়াতে ইসলামীর পল্টন থানার আমির শাহীন আহমেদ খান, লেখক ও গবেষক সারোয়ার তুষার, সাংবাদিকনেতা শহীদুল ইসলাম। 

আমার বই পড়ে তরুণরা গণঅভ্যুত্থানের দিক-নির্দেশনা পেয়েছে: ফরহাদ মজহার

Sunday, September 15, 2024

বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গড়তে সংবিধান সংস্কার করতে হবে -ফরহাদ মজহার

গণতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের বিশেষ ধর্ম। এটা রাষ্ট্রের বিশেষ রূপ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার কর্মকাণ্ড সুষ্ঠুভাবে নির্ধারণ করলেই একটি রাষ্ট্র সুচারুভাবে গঠন করা হয়। ১৯৭২ সালের যে সংবিধান তা ছিল পাকিস্তান আমলের, সেই সংবিধান প্রণেতারা সেই সময়ের আলোকে সংবিধান রচনা করেছিলেন। বর্তমানে যে সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্র চলছে তা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৈরি সংবিধান। বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্র গড়তে হলে প্রথমে সংবিধান সংস্কার করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন  সমাজচিন্তক ও গবেষক ফরহাদ মজহার। নতুন বাংলাদেশ বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি একথা বলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৃতীয় তলায় আকরাম খাঁ হলে প্রফেসর কে আলী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় ফরহাদ মজহার আরও বলেন, রাষ্ট্রের প্রত্যেকটা সেক্টরে সংস্কার করতে হবে। জনগণকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সুতরাং দেশের গণতন্ত্র বজায় রাখতে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে জনগণের অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে সবাইকে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। সেমিনারে লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. নুরুল ইসলাম। প্রবন্ধে বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে চরম গণ-অসন্তোষে ৫ই আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতনের ফলে জনমানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপায়ণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ছাত্র জনতার বিপ্লব একটি শোষণহীন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা এখন। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই তরুণ ও যুবা। তাদের প্রত্যাশা নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের ১২ দফা রূপরেখা-২০২৪ পেশ করা হয়। ১২ দফার প্রস্তাবে রয়েছে, রাষ্ট্রের ৩টি প্রধান অঙ্গ নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, যাতে একে অপরের উপর ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের প্রয়োগ থেকে বিরত থাকে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা এবং বিচারপতি নিয়োগে আলাদা কমিশন বা আইন প্রণয়ন করা। কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য করবে না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। অধ্যাপক ড. শেখ আকরাম আলীর সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তৃতা করেন- সাবেক সচিব ও এনবিআর এর চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ, রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) আবুল কালাম, অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সাবেক ডীন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সলজার রহমান ও ফরিদ উদ্দিন প্রমুখ।
mzamin

Wednesday, September 11, 2024

যখন রাষ্ট্র গঠনের সময়, তখন ‘মব’ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে: ফরহাদ মজহার

‘মব জাস্টিস’-এর (উচ্ছৃঙ্খল বা উত্তেজিত জনতার হাতে বিচার) সমালোচনা করে কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার বলেছেন, যখন রাষ্ট্র গঠন করার সময়, তখন ‘মব’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতা) গিয়ে মাজার ভাঙে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। কোনো কিছু গুছিয়ে করতে পারে না।

আজ শনিবার ‘অভ্যুত্থান–পরবর্তী কেমন বাংলাদেশ চাই?’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় ফরহাদ মজহার কথাগুলো বলেন। ঢাকা কলেজ মিলনায়তনে ওই আলোচনার আয়োজন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকা কলেজ।

কলেজ মিলনায়তনভর্তি শ্রোতাদের উদ্দেশে ফরহাদ মজহার প্রশ্ন রাখেন, গণ–অভ্যুত্থানের বিজয় কি হয়েছে, না হয়নি? অনেকে তখন ‘না’ আবার অনেকে ‘হ্যাঁ’ বলে জবাব দেন। পরে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘না, আমরা জয়ী হইনি। আমরা ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ হওয়ার কারণটা কী? কারণ, আমরা এখনো মব। কোনো একটা ঘটনা ঘটলে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ি, আবেগের দ্বারা। আবেগের দ্বারা কখনো কোনো বড় কাজ করা যায় না।’

মাজার ভাঙার সমালোচনা করে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘মাজার সম্পর্কে আপনি সমালোচনা করতে পারেন, আপনি ফতোয়া দিতে পারেন, নিন্দা করতে পারেন...। কিন্তু আপনাকে তো ফতোয়া বাস্তবায়িত করার অধিকার ইসলাম দেয়নি।’

ফরহাদ মজহার বলেন, গণ–অভ্যুত্থানের অর্থ হলো পুরোনো ব্যবস্থাকে উৎখাত করে নতুন ব্যবস্থার পত্তন। রাষ্ট্র, রাজনীতি, আইন না বোঝার কারণে শত্রুপক্ষ সংবিধান ও আইনের নামে প্রতিবিপ্লব ঘটিয়েছে। বর্তমান সংবিধানে ফ্যাসিস্ট শক্তি নিজেকে হাজির রেখেছে। গণ–অভ্যুত্থানের পর সে সংবিধানের ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রপতির কাছে উপদেষ্টারা শপথ নিয়েছেন এই সংবিধান রক্ষা করার।

ফরহাদ মজহার বলেন, আয়নাঘর, গুম-খুনে জড়িত ব্যক্তিরা পালিয়ে গেছে। বিপ্লব কোনো ডিনার পার্টি নয়। এখন উল্লাস করার সময় নেই।

ব্যক্তিকে সরানো হলে ব্যবস্থা আপনা–আপনি বদলে যায় না—এমন মন্তব্য করে ফরহাদ মজহার বলেন, বিজয়কে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই ‘আমাদের প্রেসিডেন্ট’ নিয়োগ করতে হবে। তিনি জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি হিসেবে হাজির হবেন। তাঁর প্রধান কাজ হবে জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা।

নতুন যে সংবিধান হবে, সেখানে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে প্রধান তিনটি বিষয় থাকা জরুরি বলে মনে করেন ফরহাদ মজহার। সেগুলো হলো রাষ্ট্রের কোনো অধিকার থাকবে না ব্যক্তির স্বাধীনতা ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার, রাষ্ট্রের ওপর থাকবে জনগণ। ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষা করা হবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য–সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও ঐতিহ্য ধ্বংস করতে পারবে না।

ফরহাদ মজহার বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম কাজ জনগণের অভিপ্রায় শোনা। তারা কি শুনছে, তাহলে গণতন্ত্র কোথায়—এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘কথা শোনা তো দূরের কথা, তারা তাদের পছন্দের লোক বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে দিচ্ছে। আপত্তি নেই, ভালো লোক থাকতে পারে, খারাপ লোক থাকতে পারে। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে, কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই লোকগুলো বসছে, সে ব্যাপারে স্বচ্ছতা নেই।’

এ মুহূর্তে নির্বাচন দাবির সমালোচনা করে ফরহাদ মজহার বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্র বলতে বুঝি নির্বাচন দাও, নির্বাচন দাও। যেন আমি আগামী ১৫ বছর লুটপাট করতে পারি।’

একই সঙ্গে যাঁরা বিএনপির বিরোধিতা করছেন, তাঁদেরও সমালোচনা করেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, বিএনপি ভুল করতে পারে। তার সমালোচনা করা যায়। বিএনপির কি কোনো অবদান নেই আন্দোলনে—এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া যদি ফ্যাসিস্ট শক্তির সাজানো নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান না করতেন, তাহলে এই গণ–অভ্যুত্থান ঘটত না।

আমান আযমীর জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবিরও সমালোচনা করে ফরহাদ মজহার বলেন, জাতীয় সংগীত এখন সমস্যা নয়। রবীন্দ্রনাথ একটি ইতিহাসের অংশ। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ঐতিহ্যের অংশ। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া যাবে না। ঐতিহ্য ভুলে গেলে সমাজ ফ্যাসিস্ট হয়ে থাকে।

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘কেমন বাংলাদেশ চাই, এটা নির্ভর করবে আপনি কেমন...। যেমন প্রজা, তেমন কিন্তু রাজা। ভাববেন না যে শেখ হাসিনা একমাত্র দায়ী, আপনারাও কিন্তু সমানভাবে দায়ী।’

অন্যদের মধ্যে আন্দোলনে নিহত সাব্বির হোসেনের বাবা মহিউদ্দীন, কবি আবদুল হাই শিকদার, ইসলামিক স্কলার মূসা আল হাফিজ, মানবাধিকারকর্মী সাইয়েদ আবদুল্লাহ প্রমুখ বক্তব্য দেন। মুঈনুল ইসলাম ও নাহিয়ান রেহমান অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।

‘অভ্যুত্থান–পরবর্তী কেমন বাংলাদেন চাই?’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার। আজ বুধবার ঢাকা কলেজ মিলনায়তনে

Saturday, August 24, 2024

দেশকে ইউরোপ বানাতে ৫ বছরের বেশি লাগবে না : ফরহাদ মজহার

বাংলাদেশকে ইউরোপের সমান বানাতে পাঁচ বছরের বেশি সময় লাগবে না বলে মন্তব্য করেছেন কবি, লেখক ও গবেষক ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, অবশ্য তার জন্য প্রয়োজন আমাদের মানব সম্পদসহ সব সম্পদকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো।

শনিবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে প্রজন্ম একাডেমির উদ্যোগে ‘আওয়ামী দুর্বৃত্তায়ন ও লুটপাটে বিধ্বস্ত অর্থব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকারের করণীয়’- শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফরহাদ মজহার এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের উচ্ছ্বাসকে কাজে লাগাতে হবে। আওয়ামী সরকার এতদিন আমাদের তরুণ প্রজন্মের উচ্ছ্বাসকে দাবিয়ে রেখেছিল। সেটা এতদিন পর মাটি ফুড়ে বেরিয়ে এসেছে। এই প্রজন্ম আজ দেশের যে কোনো স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলেই আমাদের দেশ একটি সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। পার্শ্ববর্তী দেশের চাপ আছে। আমাদের মৌলিক প্রাপ্তিগুলো যদি তাদের কাছ থেকে সহজ প্রক্রিয়ায় না পাই সেক্ষেত্রে আমাদের দাবিগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের দেশে অনেক রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে চক্রান্তকারীরা কিছুই করতে পারবে না। দেশে দীর্ঘসময় ধরে লুটপাট হয়েছে, দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রে বিপর্যয়কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকেও আমরা অল্পসময়ের মধ্যে মুক্তি পেতে পারি যদি আমাদের তরুণ ছাত্রসমাজ সোচ্চার থাকে। তিনি দুঃসময়ে প্রফেসর ইউনূসের পাশে থাকার জন্য প্রজন্ম একাডেমির সদস্যদের ধন্যবাদ জানান এবং তাদের বর্তমান সরকারে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।

প্রধান বক্তার বক্তব্যে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন। আমাদের তরুণ প্রজন্ম যে দুঃসাহসী ভূমিকা রেখে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। একে এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক শক্তিকে ধরে রাখতে হবে এবং গণতান্ত্রিক শক্তির বিকশিত হওয়ার প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। মনে রাখতে হবে ফ্যাসিস্ট শক্তি বনাম জনগণ। এখানে জনগণের জয় হয়েছে। আগামীদিনে দেশ পরিচালনায় জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ৭ দফা বাস্তবায়ন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও দৈনিক খোলা বাজার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক জহিরুল ইসলাম কলিম বলেন, বানভাসী মানুষের পাশে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক রাষ্ট্রদ্রোহীতা আইন পাস করে তাদের সব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। আওয়ামী লুটেরাদের সব অর্থ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা রাখতে হবে। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার থাকতে হবে। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের দমনপীড়নে তরুণ সমাজ পিষ্ট ছিল। এখন কাজ করার অবারিত সুযোগ এসেছে। প্রজন্ম একাডেমি থেকে দাবি তোলা হয় যাতে বর্তমান সরকারে তাদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়।

প্রজন্ম একাডেমির সভাপতি লেখক ও গবেষক কালাম ফয়েজীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মোজাম্মেল হোসেন শাহীনের পরিচালনায় এতে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন ও সাধারণ সম্পাদক এস এম মিজানুর রহমান, প্রজন্ম একাডেমির অর্থ সম্পাদক আবু হায়দার, জাতীয় মানবাধিকার সমিতির চেয়ারম্যান মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম হোসেন, যুবনেতা হারুন অর রশীদ, প্রজন্ম একাডেমির সদস্য মো. নবী হোসেন, শারমিন রিনা, খলিল মৃধা প্রমুখ।

Thursday, June 20, 2019

মুরসির মৃত্যু নিয়ে যা বললেন ফরহাদ মজহার

মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম ও একমাত্র প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুরসি মৃত্যুবরণ করেছেন। ৬৭ বছর বয়সী সাবেক এই প্রেসিডেন্ট সোমবার দেশটির আদালতে শুনানি চলাকালে এজলাসেই মৃত্যুবরণ করেন। মিসরের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রথম বৈধ প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি।
তার মৃত্যুতে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ শোক জ্ঞাপন করেছেন। বাংলাদেশের অন্যতম চিন্তক ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক ফরহাদ মজহার মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ওয়ালে একটি পোস্ট দিয়েছেন। পাঠকদের সুবিধার্থে নিম্নে সেই পোস্ট হুবহু তোলে ধরা হলো।
“শেষ পর্যন্ত মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মরসি এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা ইন্তেকাল করলেন। নির্জন কারাবাসে তাঁকে অমানবিক ভাবে মানসিক নির্যাতন ও অত্যাচার করা হয়েছে। কারাগারে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিক্স, কিডনি ও লিভারের অসুখের চিকিৎসা তিনি পান নি। না পেয়ে আদালতে শুনানির সময় অসুস্থ হয়ে আদালতেই ইন্তেকাল করেছেন। ধন্য আদালত! ধন্য বিচার ব্যবস্থা! আজ ভোরে এই খবরটি, বিশেষত মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, মনকে ভয়ানক বিষণ্ণ ও বিষাক্ত করল।
তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। আরব বসন্তের পরে ২০১২ সালে তিনিই হচ্ছেন মিশরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এরপর ২০১৩ সালের জুলাইয়ে পালটা গণ আন্দোলন এবং তার সুযোগে আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসির নেতৃত্বে সামরিক অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁকে ক্ষমতাচ্যূত করা হয়।
আদালতে তাঁকে কাঁচের খাচায় রাখা হোত। তাঁর ইন্তেকাল মিশরের আদালত ও শাসন ব্যবস্থার জন্য কলংক হয়ে রইল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিধিবিধান অনুযায়ী এটা মরসির স্বাভাবিক মৃত্যু নয়। বরং সরকারি বা পুলিশী হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা। তিনি বিচার পেলেন না। যেভাবে অত্যাচার করে তাঁকে মারা হয়েছে তার চেয়ে সম্ভবত তাঁকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা অনেক সদয় কাজ হোত।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এই হত্যাকাণ্ডকে বলেছে ‘ভয়াবহ’, কিন্তু ‘একদম এটাই ঘটবে তা আগেই বোঝা গিয়েছিল’। তাদের দাবি, মিশরের কতৃপক্ষকেই মরসির মৃত্যুর দায় বহন করতে হবে। বলাবাহুল্য মিশরে প্রতিক্রিয়া হিশাবে ক্ষোভ-বিক্ষোভ হবে। মিশরের রাজনীতি দেশের ভেতরে এবং বাইরে সরকারি হেফাজতে মরসির হত্যায় কতোটা আলোড়িত হবে পরবর্তী ঘটনাঘটনে সেটা বোঝা যাবে। আমাদের নজর রাখতে হবে।
মিশরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। বিশেষত ইসলামপন্থি রাজনীতির সীমাবদ্ধতা বোঝার জন্য মোহাম্মদ মরসির নেতৃত্বাধীন ব্রাদারহুডের রাজনীতির পর্যালোচনা বাংলাদেশে আমাদের খুবই দরকার। এ নিয়ে ২০১৩ সালেই আমি একটি লেখা লিখেছিলাম। সেখানে লিখেছি:
“মিশরের অভিজ্ঞতা থেকে এই সংশয়ও আরও প্রবল হবে যে ইসলামপন্থি রাজনীতি এখনও পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ঐতিহাসিক ফলাফল ও রাষ্ট্র গঠনের মর্ম ও কাঠামোর অসম্পূর্ণতা ও স্ববিরোধিতার কোন সমাধান দেবার যোগ্য হয়ে ওঠে নি। পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা ও রূপের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে অস্বীকার করে সেটা সম্ভব নয়। বরং তাকে অতিক্রম করে যাবার সংকল্পের মধ্যেই একালের ইসলামপন্থি রাজনীতিসহ যে কোন ইতিহাস-সচেতন রাজনীতির সম্ভাব্য বিশ্ব-ঐতিহাসিক ভূমিকা নিহিত রয়েছে। এখন অবধি দেখা যাচ্ছে প্রচলিত ইসলামি রাজনীতি অন্য সম্প্রদায়ের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে নিয়ে শুধু মুসলমানদের জন্য বড়জোর শরিয়া আইন ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র কায়েম করতে পারে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের এই কালে পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের অসম্পূর্ণ ও স্ববিরোধী রাষ্ট্রের ধরণে ও মর্মে বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটানোর দার্শনিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা এই রাজনীতি এখনও অর্জন করে নি। এই ক্ষেত্রে আদৌ কোন সমাধান দিতে পারে কিনা তার ওপর নির্ভর করবে ইসলামি রাজনীতির ভবিষ্যৎ। যেমন, পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের পর্যালোচনা ও তাকে অতিক্রম করে যাবার পথ অনুসন্ধানের জন্য ইসলামের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের ধারণার বিকাশ, ব্যবহার ও প্রয়োগ । সে কাজ হচ্ছে না, তা নয়। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের তাগিদেই এই ধারণাগুলোর বিকাশ ঘটবে। আর ঠিক এই ধারণার বিকাশ ঘটানোর জন্য যেমন, ঠিক তেমনি জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াইকে আরও তীব্র ও অপ্রতিরোধ্য করে তোলার জন্যই ‘গণতন্ত্র’ দরকার। গণতন্ত্রই রাজনীতির শেষ মঞ্জিল নয়। তবে মিশরে দেখা যাচ্ছে ব্রাদারহুড মিশরের জনগণের জন্য যে গঠনতন্ত্র বা সংবিধান উপহার দিয়েছে ব্রাদারহুড সমর্থক ছাড়া মিশরের জনগণ তা গ্রহণ করে নি। অথচ তাদের ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার এটাই ছিল সর্বোচ্চ রূপ”।
মিশরে একটা পর্বের অবসান হোল। কিন্তু ইসলামপন্থি রাজনীতি এই তিক্ত ও করুণ অভিজ্ঞতা থেকে আদৌ কিছু শিখবে কিনা সেটা আগামিতেই বোঝা যাবে।”
ফরহাদ মজহারের পোস্ট

Thursday, July 13, 2017

আমার সঙ্গে যা হয়েছে তা প্রকাশ করতে আমি ভীত নই -গার্ডিয়ানকে ফরহাদ মজহার

অবশেষে মুখ খুলেছেন কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহার। তার ‘অপহরণ’ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বৃটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে। বলেছেন, কিভাবে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। ফরহাদ মজহার বলেছেন, এখনও তিনি প্রচণ্ড রকম মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত। সুস্থ হতে তার অনেকটা সময় লাগবে। তার ভাষায়, তবে আমার সঙ্গে যা হয়েছে তা প্রকাশ করতে আমি মোটেও ভীত নই। জোরপূর্বক নিখোঁজের পর যেসব মানুষ জীবিত ফিরে আসেন তারা পরে রহস্যজনক কারণে নীরবতা অবলম্বন করেন। যখন আমি কাজে ফিরবো তখন এ ইস্যুতে কাজ শুরু করবো। জোর করে এমন গুমের সংস্কৃতি আমাদেরকে বন্ধ করতে হবে।
বুধবার হাসপাতালের বিছানা থেকে ফরহাদ মজহার এ সাক্ষাৎকার দেন। সাক্ষাৎকারটি নেন গার্ডিয়ানের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক করেসপন্ডেন্ট মাইকেল সাফি। গার্ডিয়ান ফরহাদ মজহারের পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের একজন সমালোচক হিসেবে। গার্ডিয়ান লিখেছে, অপহরণের পর ঢাকায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে দেয়া এটিই তার প্রথম সাক্ষাৎকার। তিনি এর আগে দেশের বা বিদেশি কোনো মিডিয়াকে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, অপহরণকারীরা খুব কর্কশ ভাষা ব্যবহার করেছে। আমার মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়েছিল। আমার চোখ বেঁধে ফেলেছিল। তারপর তাদের হাঁটু দিয়ে আমাকে মিনিবাসের ফ্লোরের ওপর চেপে ধরে রেখেছিল।
বুধবার ফরহাদ মজহার বলেছেন, গত সপ্তাহে সকাল প্রায় ৫টার দিকে তার বাসার কাছের রাস্তা থেকে তাকে অপহরণ করা হয়। তারা কারা তা তিনি নিশ্চিত নন। তার ভাষায়, ওইদিন সকালে আমার চোখে সমস্যা দেখা দেয়। তাই আমি ওষুধ কেনার জন্য বাসা থেকে বের হই। অকস্মাৎ তিনজন মানুষ আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। তারা আমাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে একটি সাদা মিনিবাসে তুলে নেয়। তিনি বলেন, এ সময় তিনি পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করতে সক্ষম হন এবং স্ত্রীকে ফোন করেন। ফরহাদ মজহার বলেন, (আমার স্ত্রীকে দেয়া) ওই ফোনকলটি ছিল একটি শর্ট কল। আমি তাকে শুধু বলতে পেরেছি, তারা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। তারা আমাকে হত্যা করবে। বিষয়টি অপহরণকারীরা টের পাওয়ার আগে আমি আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি সামান্য সময়।
তিনি বলেছেন, অপহরণকারীরা তার চোখ বেঁধে ফেলে এবং তার মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেয়। তিনি যদি তার স্ত্রীকে আবার ফোন করেন, তিনি কোথায় আছেন পুলিশ তা ট্র্যাক করতে পারবে এটা মনে করে তিনি তাদের মুক্তিপণ দেয়ার প্রস্তাব করেন। ‘এরপরই তারা আমাকে ফোনটি দিয়ে দেয়। এ নিয়ে আমি কয়েক বার আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলি’।
‘বাসটি কয়েক ঘণ্টা চলতে থাকে। এ সময়ে তারা আমাকে নানাভাবে নির্যাতন করে। মাঝে মাঝেই আমার প্রতি আজেবাজে ভাষা ছুড়ে দিতে থাকে। তারা আমাকে থাপ্পড় দেয়। প্রায় ১০ বা ১২ ঘণ্টা পরে তারা আমাকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে। এ সময় তারা আমার চোখের বাঁধন খুলে দেয়। একটি নির্জন স্থানে নামিয়ে দেয় আমাকে। তখন কিছুটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। এরপর তারা আমাকে একটি বাসের টিকিট ধরিয়ে দেয়। আমাকে বলে ওই বাসে করে খুলনা থেকে ঢাকায় ফিরে যেতে। তখন আমি কিছুটা পথ হেঁটে আসি। খুলনায় একটি মার্কেটে পৌঁছি। রাত ৯টা ১৫ মিনিটে বাসটিতে ওঠার আগে সেখান থেকে কিছু খাবার কিনি। আমাকে যখন জিম্মি রাখা হয়েছিল তখন আমি আমার স্ত্রীকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছি। মাইক্রোবাসটি ঢাকা ছাড়ার পর আমার এসব মোবাইল কলের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ আমার অবস্থান নির্ণয় করতে পারতো। এভাবেই আমাকে পরে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আমি বিস্মিত, মাইক্রোবাসটি খুলনায় পৌঁছানোর আগে কেন পুলিশ মাইক্রোবাসটি ইন্টারসেপ্ট করতে পারলো না।
ফরহাদ মজহার আরো বলেছেন, তাকে অপহরণের জন্য প্রকৃতপক্ষে কারা দায়ী সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। তার ভাষায়, আমার অপহরণকারীরা ছিল সাদা পোশাকে (প্লেন ক্লোথ)। তারা কারা ছিল বা কোন গ্রুপের ছিল তা আমি জানি না। ফরহাদ মজহার বলেছেন, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কণ্ঠ রোধ করা যাবে না। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে সোচ্চার থাকবেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন নেতাকর্মী ও বিরোধী দলীয় নেতাদের অপহরণের যে ধারা চলছে তারই সর্বশেষ শিকার তিনি।
ফরহাদ মজহারের নিখোঁজের খবর যখন রহস্যময় হয়ে ওঠে তখন পুলিশ ঘোষণা করে, তিনি ঢাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর খুলনার কাছে একটি বাস থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি গত এক সপ্তাহ পুলিশি প্রহরায় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঢাকাভিত্তিক মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা অধিকার-এর হিসাব মতে, গত তিন বছরে বাংলাদেশে গুম হয়েছেন প্রায় ২২৩ জন মানুষ। তার মধ্যে ১৮ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাকিদের ভাগ্যে কি ঘটেছে সে বিষয়ে কেউ মুখ খোলেনি। ৩১ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এদের পরিবারসহ অন্য গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো ২০১৪ সালের জুলাই থেকে নীরবতা বজায় রাখছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও অধিকার-এর সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো এ নিয়ে কথা বলতে শঙ্কিত। কারণ, তাদের ভয় পরিবারের অন্য সদস্যরাও একই পরিণতি ভোগ করতে পারেন।
ঢাকার পুলিশ ফরহাদ মজহারের মামলাটি তদন্ত করছে। তবে কর্মকর্তারা স্থানীয় মিডিয়াকে বলেছেন, ফরহাদ মহজারের দেয়া তথ্য নিয়ে তারা সন্দিহান। একজন কর্মকর্তা বুধবার ডেইলি স্টারকে বলেছেন, তিনি যে মাইক্রোবাসে করে খুলনা গিয়েছিলেন এমন কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি।
গত সপ্তাহে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তাতে অভিযোগ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার গোপনে আটক করে রেখেছে কয়েকশ’ মানুষকে। এর বেশির ভাগই মানবাধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, যারা ক্ষমতাসীন সরকারের বিরোধিতা করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেছেন, অল্প কিছু মামলার তদন্ত করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের লোকজন অবৈধ এসব আটকের জন্য দায়ী এমন অভিযোগ আমলে নেয় না পুলিশ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেছেন, তারা যাদেরকে আটক করেন তা বৈধভাবে, আইন অনুযায়ী। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রচারণা চালাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি এএফপিকে বলেছেন, তারা বাংলাদেশে একটি নেতিবাচক প্রচারণা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, বাস্তবতার সঙ্গে যার কোনো মিল নেই।

Thursday, July 6, 2017

ফরহাদ মজহারের কী অপরাধ by মাসুদ মজুমদার

ফরহাদ মজহার এখনো বিপর্যস্ত, অসুস্থ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছেন। অজানা আতঙ্ক এখনো তাকে তাড়া করছে। তার দেয়া জবানবন্দী আদালতের হাতে। তিনি শঙ্কামুক্ত হয়ে আবার কলম ধরবেন। জাতিকে নির্দেশনা দেবেন, তার প্রতিবাদী কণ্ঠ আবার দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করবে- এটা আমাদের প্রত্যাশা। তার মামলা ডিবিতে গেছে, তারা তদন্ত করবে না ডিপ ফ্রিজে রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে, তাও ভবিষ্যৎ বলবে। অনেকেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাবাসি দিচ্ছেন। পুলিশকে স্বল্পসময়ের মধ্যে উদ্ধারের জন্য বাহবা দিচ্ছেন। আমরা সব প্রশ্নের জবাব না পেলে সাবাসি দিতে পারি না। কারা অপহরণের হোতা? অপহরণে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসটি কোথায়? অপহরণকারীরা যশোর-খুলনার দিকে যাচ্ছিল কেন? মোবাইল ট্রাকিংয়ের পরও উদ্ধারে এত বিলম্ব হলো কী জন্য? ঢাকা থেকে খুলনা দীর্ঘ পথে মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের পরেও চেকপোস্ট বসিয়ে মাইক্রোবাসটি আটকের চেষ্টা কেন করা হলো না? খুলনার রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত যাওয়া ও খাওয়ার বিলের টাকা দিলো কে? তাদের পরিচয় কী? হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দেয়ার নাটুকেপনা কারা করল? তাকে ঢাকা পাঠানোর পুরো বিষয়টি রহস্যাবৃত রাখা হচ্ছে কেন? কারা টিকিট ধরিয়ে দিলো, তাও রহস্যময়।
সাধারণত তিন-চারজন যাত্রী নিয়ে কোনো পরিবহন ঢাকায় আসে না। তা ছাড়া এখন ঈদ মওসুম। র‌্যাব-পুলিশ যদি উদ্ধারকারী হয়, তারা অপহরণকারী শনাক্ত করেনি- এটা কিভাবে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী তাকে জাতিকে ব্যাখ্যা দিয়ে জানাতে হবে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেয়ার শঙ্কা জাগল কেন। এতসব প্রশ্নের বাইরেও বাস্তবে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে গাড়ির নিচে বসিয়ে রাখা হয়। অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
আমরা ভুলে যাইনি বিএনপি সরকারের আমলে তিনিও একবার গ্রেফতার হয়েছিলেন। সেটা ছিল আনসার বিদ্রোহের ব্যাপারে। তিনি মন্তব্য করেছিলেন- এরা কৃষকের সন্তান তাই বঞ্চিত হয়েছেন। বিদ্রোহ উসকানি দেয়ার কোনো অভিযোগ ছিল না। বর্তমান সরকারি মহলে তার ওপর বিরক্তি কারো অজানা নেই। আমরা যদ্দুর জানি, ফরহাদ মজহার একজন বামপন্থী তাত্ত্বিক। তার সব তত্ত্বের ভক্ত সবাই হবেন- এমনটি কেউ আশা করে না। তবে মোটা দাগে তিনি একজন চিন্তাবিদ- তার সব চিন্তা জাতিকে ঘিরে। দেশকে নিয়ে। সেখানে তিনি সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক এবং যুক্তিবাদী মানুষ। দেশের মানুষ ও দেশ নিয়ে তার ভাবনার ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। হেফাজত ইস্যুতে তার অবস্থান স্পষ্ট। ঢাকায় লাখ লাখ লোকের উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছিলেন এরাই বাংলাদেশ। এটা কোনো উসকানি ছিল না, ছিল আবেগাপ্লুত মানুষের অনুভূতি। এর সাথে দ্বিমত করার অধিকার সবার আছে। ফরহাদ মজহারেরও চিন্তার স্বাধীনতা আছে। চিন্তার স্বাধীনতা যারা মেনে নিতে পারে না তারাই ফ্যাসিস্ট।
ফরহাদ মজহারের ব্যাগ ও পোশাক সবার চেনা, তার চলন-বলন এবং চেহারা-সুরতও কারো অচেনা নয়। তাই তার ব্যাগতত্ত্বের কোনো উত্তর এখনো মিলছে না। উত্তর পাচ্ছি না অপহরণকারীদের অসংলগ্ন আচরণের। তাকে যেভাবে ঢাকায় পাঠানো হলো তারও হিসাব মিলাতে পারছি না। অপহরণকারীদের উদ্দেশ্য যাই হোক, তারা ফরহাদ মজহারের বন্ধু, সুহৃদ কিংবা শুভাকাক্সক্ষী নন। তাদের চেহারা অচেনা। তারা কারা অনুমান করতে পারেননি ফরহাদ মজহার নিজেও।
ফরহাদ মজহার বাড়াবাড়ি করার মতো মানুষ নন। চিন্তাগত ফারাক অন্য জিনিসি- সেটা চিহ্নিত হওয়া উচিত। তাহলে কারা তাকে জব্দ করতে এতটা নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেছে? সব প্রশ্নের জবাব না মিললে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাহবা দেবো কিভাবে। তবে ফরহাদ মজহার ইস্যুতে তার সহমর্মী মানস কোনোভাবেই অশ্রদ্ধা করা যায় না। তাকে ওপারে ঠেলে দেয়ার শঙ্কা আমরা গুরুত্বের সাথে নেয়ার পক্ষে।
এখন ঘুরেফিরে প্রশ্ন একটাই- গুম ও অপহরণের যে দীর্ঘ তালিকা, বিচারবহির্ভূত হত্যার যে ফর্দ তার শেষ কবে হবে! কেই বা থামাবে এ অনাচার। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের উপসংহার না টানলে জাতিকে খাদের কিনারা থেকে উদ্ধার করবে কে? ভারত-ইসরাইলের নয়া কৌশল পড়শিদের জন্য আরো বিপজ্জনক হবে না- সেই নিশ্চয়তা কার কাছে পাবো? কারণ ইসরাইলি বর্ণবাদী ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্রটি কারো বন্ধু হলে তার আর শত্রুর প্রয়োজন হয় না। ১৯৪৮ সাল থেকে আরবজাহান ও বিশ্ববাসী সেই ইসরাইলি গোয়েন্দা মোসাদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ভীতিকর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। এখন অভিজ্ঞতার ডালি কি আমাদের সীমান্তের ওপারে! অনেক পেছনে যাওয়ার গরজ নেই। প্রয়োজনও নেই। শফিক রেহমান প্রথিতযশা সাংবাদিক, উপস্থাপক ও রাজনৈতিক গদ্যের ভিন্ন ধারার লেখক। কিভাবে তাকে গুটিয়ে যেতে বাধ্য করা হলো- তা তো কারো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। মাহমুদুর রহমান নিয়ে অল্প কথা বলাই ভালো। তিনি যখন সাদাকে সাদা বলা শুরু করলেন। লেখা শুরু করলেন নিজের মতো করে। হুল ফুটিয়ে দিলেন নীতিনির্ধারকদের শরীরে। তিনি হয়ে উঠলেন অসহ্য মানুষ। তারপরের ঘটনা সবার স্মৃতিতে তাজা।
আরো কম করে জনাদশেক মানুষের নাম বলা যাবে, যারা সাদাকে সাদা বলতে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে এখন ‘অপাঙ্ক্তেয়’। তাদের টকশোতে ডেকে কর্তৃপক্ষ ঝুঁকির পাল্লা আরো ভারী করে তুলতে চান না। তাদের লেখা ছাপিয়ে কোপানলে পড়তে নারাজ। অবশিষ্ট রইলেন কবি, গবেষক ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার। কলাম লিখেন নিজস্ব ভাব ও ভাষায়। ইনসাফের কথা বলেন। মানবিকতার কথা বলেন। মানবাধিকারের কথা বলেন। বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে সরব থাকেন। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কথা বলেন। পরাশক্তির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ উচ্চারণে কথা বলেন। ভারতবিরোধিতার নামে সস্তা রাজনীতি করতে নিরুৎসাহিত করেন। নেতা-নেত্রীদের দেশের জনগণকে মর্যাদা দিয়ে পরিকল্পনা নিতে বলেন। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতিকে সতর্ক করেন। দেশপ্রেমের প্রেরণা জোগান। যা বলেন অনেক বেশি ঋজু ভাষায় বলেন। যারা বোঝেন না তারা চুপ থাকেন। যারা বোঝেন তারা অসহ্য বিবেচনা করেন। যাদের কাছে ফরহাদ মজহারের লেখা-চিন্তা অসহ্য, তারাই তাকে অপহরণ করেছেন। হয়তো হজম করতে পারেননি কিংবা চালে ভুল করেছেন। এমনও হতে পারে- একটা বড় খেলার মাঠ তৈরি করতে ফরহাদ মজহার বলির পাঁঠা হতে হতে বেঁচে গেলেন। এটাকেই বলা হয়- রাখে আল্লাহ মারে কে? এখন যারা ফরহাদ মজহারকে শুইয়ে পেটাতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য সলিমুল্লাহ খানের দাওয়াই যথেষ্ট। আরো খুঁচিয়ে যারা ক্ষত দগদগে করে সেখানে নুন ছিটাতে চান, তাদের জন্য বার্তা একটাই, যারা মৃত্যুকে জয় করার মতো সাহস সঞ্চয় করেন তারা কখনো হেরে যান না। হেরে যায় ভীরু কাপুরুষ এবং সময়ের কুসন্তানেরা।
স্মৃতি প্রতারণা না করলে অনেকেরই স্মরণে পড়ার কথা, এবিএম মুসা টকশোতে বলেছিলেন, এক সময় বর্তমান সরকারের মুখপাত্ররা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় জনগণ বলবে- ‘ধর ধর ওই চোর যায়।’ তারপর মুসা ভাইকে কে বা কারা সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তিনি আমৃত্যু টকশো এড়াতেন!
আসাফউদ্দৌলা সত্য কথা সাহসের সাথে বলতেন, হঠাৎ একদিন টকশো থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে টার্গেট করে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিলো। তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন, কিন্তু আর টকশোতে কথা বলতে রাজি হলেন না। কলাম লেখাও বন্ধ করে দিয়ে কুরআন চর্চায় মনোযোগ দিলেন। সাদাকে সাদা বলে সত্য উচ্চারণের একটা ভাবমর্যাদা সৃষ্টি করেছিলেন আসিফ নজরুল। তাকে এড়ানোর বিষয়টি কারো দৃষ্টি এড়াল না। ডক্টর তুহিন মালিক সাহসী উচ্চারণে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন- এক সময় দেখা গেল, তিনি আর ডাক পান না। শেষ পর্যন্ত দেশের বাইরে থাকা ভালো ভাবলেন। নূরুল কবির দেশপ্রেমিক বাম ধারার সাহসী সাংবাদিক। অনুগত দাসানুদাসের মতো কথা বলেন না। বামপন্থী এই সাংবাদিক কথা বলতেন সাহসের সাথে এবং ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে। এক সময় দেখা গেল তার গাড়ি অনুসরণ করে জানান দেয়া হলো ‘খামোশ’। বিরোধীদলীয় রাজনীতির তুখোড় মানুষের দিকে তাকান- মামলার স্তূপ ঠেলে তারা সামনে পথ চলতে পারেন না। সামনে পাঁচ কদম এগোলে হেঁচকা টানে পনেরো কদম পিছিয়ে দেন।
মির্জা ফখরুলরা প্রায় শ’খানেক মামলার ঘানি টানছেন। খালেদা জিয়ার হাজিরার ধরন দেখুন না। গণতন্ত্রের এই ধরনের ভীতিকর বাতাবরণে কখনো বসন্ত আসে না, আসে দুর্যোগ। জানি না, রাজনীতিবিদেরা দুর্যোগ আঁচ করতে পারছেন কি না।
masud2151@gmail.com

Friday, February 26, 2016

মাহফুজ আনামের উপলব্ধি, অতঃপর by ফরহাদ মজহার

এক এগারোর সময় পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে নিজের ভূমিকার ভুলের কথা মাহফুজ আনাম একটি টেলিভিশান টকশোতে স্বীকার করেছেন। তাঁর এই উপলব্ধিকে আন্তরিক মনে না করার কোন যুক্তি নাই। সরকারপক্ষের টেলিভিশান চ্যানেলটি তাঁকে কথার ফাঁদে ফেলবার জন্যই তাঁদের অনুষ্ঠানে নিয়েছিল কি না সেটাও আমরা ভাবতে পারি। কিন্তু যে উপলব্ধির জায়গা থেকে মাহফুজ আনাম সম্প্রতি ভুল স্বীকার করেছেন তাকে স্বাগত জানাবার জন্যই এই লেখাটি।
মাহফুজ আনামের উপলব্ধি ও স্বীকারোক্তি হচ্ছে এজেন্সির চাপের কাছে একটি পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে তাঁর নতি স্বীকার করা ঠিক হয়নি- এ কথা একটি টেলিভিশান চ্যানেলে কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন। তবে তিনি যে শুধু শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে এজেন্সির দেয়া তথ্য ছেপেছেন তা নয়, খালেদা জিয়া ও বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন রিপোর্ট করেছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির বিরুদ্ধে তাঁর লেখালিখির কথা তিনি চেপে গিয়েছেন। এখনো উল্লেখ করেন নি। এটা অন্যায় এবং হিপোক্র্যাসি।
তারপরও আমি তাঁর এই উপলব্ধিকে স্বাগত জানাই। ফলে তাঁর এই উপলব্ধির সুযোগ নিয়ে তাঁকে অযথা হয়রানি ও তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলারও তীব্র নিন্দা জানাই।
মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানকে হয়রানি আমি একটা অশনি সংকেত হিসাবে দেখি। শেখ মুজিবর রহমান দলীয় পত্রিকা ছাড়া বাকশালী আমলে সব পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা যেভাবে একদলীয় শাসন চালাচ্ছেন তাতে তিনি এখনো দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকবেন কি না তা নিশ্চিত হতে পারছেন না। অতএব তিনি মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানকে তাঁদের এক এগারোর ভূমিকার জন্য এখন কাটছাঁট করে দেবেন। আওয়ামী লীগের দলীয় স্বার্থের অধীনস্থ না থাকলে কোনো গণমাধ্যমই শেখ হাসিনা রাখবেন না। এই পরিস্থিতি বাকশালের চেয়েও ভয়াবহ হবে। যারা নাগরিক ও মানবিক অধিকারে বিশ্বাস করেন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তাঁদের উচিত এই হয়রানির প্রতিবাদ জানানো। দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এই সরকারের অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সব মামলার জামিন হবার পরেও নতুন মামলা দেখিয়ে তাঁকে এখনো কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানের উচিত ছিল মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ও মানবিক অধিকারের পক্ষে সুদৃঢ় ভাবে দাঁড়ানো। তাঁরা নাম কা ওয়াস্তে বিবৃতি দিয়েছিলেন। কিন্তু কোন নীতিগত দৃঢ়তা তাঁদের মধ্যে আমরা দেখি নি। কিন্তু সে কারণে তাঁকে যখন ক্ষমতাসীনরা হয়রানি করছে আমরা চুপ করে থাকতে পারি না।
এক এগারোর সময় ডেইলি স্টার পত্রিকার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ও প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সেনা সমর্থিত সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে তাঁরা বদল ঘটাতে পেরেছিলেন। এটা তাঁদের শক্তির পরিচয় ছিল, সন্দেহ নাই। এর আগে থেকেই সিপিডিসহ এনজিওদের একাংশকে নিয়ে তাঁরা সৎ মানুষের খোঁজে জাতীয় রাজনীতি প্রবর্তনের প্রয়াস চালিয়েছিলেন। তখনই সুশীলসমাজ নামক সমাজের এই অংশের রাজনৈতিক অজ্ঞতা কিম্বা হিপোক্রাসি ধরা পড়তে শুরু করে। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যা নিছক সৎ মানুষের অভাব নয়। বাংলাদেশে রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে ওঠার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। তারই ফল বাকশালী দুঃশাসন, সেনাশাসকদের কুকীর্তি এবং রাজনীতির দুর্বৃত্তপনা ও দুর্নীতি। এগুলো বাইরের দিক। গোড়ায় রয়েছে আর্থসামাজিক সম্পর্ক ও ব্যবস্থা এবং পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তিক দেশ হিসাবে বাংলাদেশের জনগণের লড়াই-সংগ্রাম জয়-পরাজয়ের ইতিহাস।
তদুপরি ক্ষমতা, শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রকাঠামো ইত্যাদি সম্পর্কে সমাজের চিন্তাভাবনা অতিশয় দুর্বল। দলবাজি করা বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে অতি নিম্নপর্যায়ের দালালী ছাড়া কোন স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক বা সাংবাদিকতার চর্চার দেখা পাওয়া কঠিন। ইত্যাদি নানা কারণে বাংলাদেশের ইতিহাসের মন্দ চরিত্রের দিকটা স্রেফ রাজনীতি বা রাজনৈতিক দলের দোষ হতে পারে না। বরং সেই ক্ষেত্রে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ যাদের আমরা ‘সুশীল’ বলে অভিহিত করি তাঁদের দায়িত্বটাই সমধিক। অথচ তাঁরা নিজেদের সবসময়ই সমাজ ও রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে ভেবেছেন এবং এখনও ভাবেন, যার ফলে বাংলাদেশের সকল মন্দের জন্য রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলকেই শুধু দোষারোপ করেন। এটা একটা বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের ভূমিকা বিচার করে দেখবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ও প্রতিভা সুশীলদের মধ্যে দেখা যায় না। এদের চিন্তার দৌড় কতটা সংকীর্ণ সেটা আমরা বুঝতে শুরু করি যখন তারা এক এগারোর আগে দোর্দণ্ড প্রতাপে সৎ মানুষ খোঁজ করতে শুরু করেছিলেন এবং রাজনীতির দুর্নীতিবাজ ও দুর্বৃত্তদের বিপরীতে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনদের আবিষ্কার করেছিলেন।
মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানের দুটো দৈনিক পত্রিকা পড়লে আমরা বুঝতে পারি ইতিহাস ক্ষমতা ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর চিন্তাভাবনা কতটা অপরিপক্ব ও সংকীর্ণ। যদি তাঁরা আসলেই উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার প্রবর্তন চাইতেন এবং কিভাবে বাংলাদেশে তা কায়েম করা সম্ভব সে সম্পর্কে আন্তরিক ভাবে ভাবতেন তাহলে বাংলাদেশে আর যাই হোক একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সরকার কায়েম হোত না। সেই ক্ষেত্রে তাঁদের নিজেদের চিন্তার সমস্যা কোথায় সেটা আগে তাঁরা নিজেরা পর্যালোচনা করতেন, কিম্বা নিদেন পক্ষে পর্যালোচনা করবার হিম্মত প্রদর্শন করতেন।
মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান দুটো ফর্মুলা নিয়ে কাজ করেছেন। এক. কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, সৎ মানুষদের রাজনীতিতে বসিয়ে দিলেই বাংলাদেশের সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গণতন্ত্র, সাম্য, ইনসাফ ইত্যাদি মৌলিক রাজনৈতিক ধারণার বিকাশ ঘটানোরও কোন দরকার নাই। এদেশে বহুজাতিক কোম্পানি বা করপোরেট স্বার্থ কায়েম করা গেলেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এটা করতে গিয়ে তারা বাংলাদেশের শিল্পপতি বা ব্যবসায়ীদের পক্ষে দাঁড়ান নি। বরং উল্টাটা করেছেন। দাঁড়িয়েছেন বিদেশী বহুজাতিক কম্পানির স্বার্থে। এমনকি সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যবস্থা রক্ষার ন্যূনতম দরদ আমরা তাঁদের মধ্যে দেখি না। ডেইলি স্টার তাদের প্রথম পাতায় মনসান্টোর বিটিবেগুন ও সিনজেন্টার গোল্ডেন রাইসের পক্ষে দাঁড়ায়। এই অবস্থান বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকের সর্বনাশ ঘটায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ ও পরিবেশের সুরক্ষার দিক থেকে এই দু’টি পত্রিকার ভূমিকা এ কারণে নেতিবাচক। এই সমালোচনা আমরা করে যাবো। কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা তাঁদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পত্রিকা দু’টিকে হয়রানি করবে আমরা তা হতে দিতে পারি না।
তাঁদের দ্বিতীয় ফর্মুলা হচ্ছে পাশ্চাত্যের ওয়ার অন টেররের সঙ্গী হয়ে দেশে ও আন্তর্জাতিক ভাবে ক্ষমতাবান হওয়া। এদেশে তাদের মতাদর্শিক বা রাজনৈতিক দুষমন হিসাবে তারা তাই জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়ারের মতো ইসলামকেই শত্রু গণ্য করেন। যে কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁরা বিএনপি ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিরোধী ছিলেন। বিএনপি ও ইসলামপন্থীদের অবশ্যই সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু সেকুলারিজমের দোহাই দিয়ে তাঁরা সমর্থন করেছেন জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিস্টদের। এই দুই সস্তা ফর্মুলা চর্চা করতে গিয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে শেষাবধি বাংলাদেশে তাঁরা যে বদল ঘটালেন তার কুফলই তাঁরা এখন ভোগ করছেন। বিএনপি ও বিরোধীদলীয় জোটকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে মাইনাস করবার কাজেও তাঁরা শেখ হাসিনার হাতকেই শক্ত করেছিলেন।
এই সব চিন্তা ও কর্মকাণ্ডের গলদকে সুনির্দিষ্ট ভাবে চিহ্নিত না করে একজন সৎ মানুষকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিলেই বাংলাদেশের রাজনীতির সমস্যা মিটে যাবে এর চেয়ে আজগুবি, অবাস্তব ও অদূরদর্শী চিন্তা আর কিছুই হতে পারে না। বাংলাদেশে ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন যেকোনো নাগরিকই তাদের সুশীল রাজনীতির এই ফাঁপা দিকটা বুঝতে পেরেছিল। সে ক্ষেত্রে সংস্কার নাকি খোলনলচে বদলে দিয়ে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে হবে সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ তর্কের বিষয় হতে পারত। ধরে নিচ্ছি সেই তর্কে তাঁরা নিয়মতান্ত্রিক, উদার ও অহিংস রাজনীতির পক্ষে থাকতেন। কারণ ক্ষমতা, রাষ্ট্রকাঠামো কিংবা সামাজিক সম্পর্কের বৈপ্লবিক রূপান্তরের রাজনীতির পক্ষের মানুষ তাঁরা নন। এতে কোন দোষ নাই। কিন্তু পরাশক্তির স্বার্থের সাথে গাঁটছড়া বাঁধা এবং তাঁদের ‘গুড গভর্নেসের’ রাজনীতির ফেরিওয়ালা বা নির্বিচার এজেন্ট হওয়া শুধু দোষের না বরং মারাত্মক অপরাধ। এক এগারোর সময় কোন সুনির্দিষ্ট অবস্থান না নিয়ে বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য কী ধরনের রাজনৈতিক পথ নেয়া যেতে পারে তা নিয়ে ফলপ্রসূ তর্কের পরিবেশ তাঁরা তৈরি করতে পারতেন। তার সমূহ সুযোগ ও সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই দুই পত্রিকার সম্পাদক সেসময় তার চর্চা করেননি। এখনো করেন না। বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার আদালতে এরা তাঁদের ভূমিকার কারণেই অপরাধী হিসাবেই থেকে যাবেন। এটাই ইতিহাস।
ফলে তাদের ‘সৎ মানুষের সন্ধান’ এবং ‘বদলে যাও বদলে দাও’ জাতীয় স্লোগান ও বিল বোর্ড সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। সেই সময় কূটনীতিক মহলের ‘ট্যুস ডে গ্রুপ’, বিভিন্ন কূটনীতিবিদদের হাঁকডাক, ক্ষমতাসীন বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করবার প্রতিটি প্রচেষ্টাই সাধারণ মানুষ বঙ্গীয় সুশীলদের বগলে নিয়ে পরাশক্তির ষড়যন্ত্র হিসাবে দেখেছে। তাঁদের অনুমান মিথ্যা হয় নি। দেখা গেল সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে মাহফুজ আনাম দাবি করলেন তাঁদের লেখালিখির কারণেই মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার ক্ষমতায় এসেছে।
সৎ মানুষ হিসাবে তারা ডক্টর ইউনূসকে খুঁজে পেয়েছিলেন। ডক্টর ইউনূস প্রকাশ্যে না এসে পেছনে থেকে সমর্থন যুগিয়েছিলেন। এতে তাঁর মান আজও কিছুটা রক্ষিত আছে। কিন্তু এরাই তাঁকে জরুরী অবস্থার অধীনে থেকে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পরামর্শ দিয়েছিল। তিনি ভুল পথে পা বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু একসময় সেই পথে আর এগোলেন না। বললেন, যাঁরা তাঁকে নামিয়েছিল তাঁরা তাঁকে নামিয়ে পিছু হটে গিয়েছে। সেটা রাজনৈতিক দল না করবার বাহানা হিসাবে হয়তো বলেছেন। এভাবে একটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোন পরিবর্তন আনা যায় না, এই উপলব্ধি ডক্টর ইউনূসের আছে কি না জানি না। কিন্তু জরুরী অবস্থার অধীনে রাজনৈতিক দল না করে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারতেন। কিন্তু একটা সময়ে তিনি প্রকাশ্যে দলীয় রাজনীতিতে আগ্রহী নন সেটা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার ইউনূস-বিদ্বেষ উৎকট সন্দেহ নাই সময়ে তা মিথ্যা বেহুদা অভিযোগ হলেও ডক্টর ইউনূসের বিরুদ্ধে মুজিব কন্যার গোস্বা করবার সঙ্গত কারণ অবশ্যই আছে। যেখানে প্রধান প্রধান জাতীয় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ সেখানে ডক্টর ইউনূস তাদের স্থান পূরণ করতে রাজনৈতিক দল করতে নেমেছিলেন। এর ফলে তাঁর গায়ে যে ময়লা লেগে গিয়েছে সেটা টের পেয়ে তিনি রাজনীতি থেকে দ্রুত সরে এলেও এখনও তা ধুয়ে ফেলা যাচ্ছে না। তাঁকে যারা রাজনীতিতে নামিয়েছিল তাঁদের দলে মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমানও আছেন। ডক্টর ইউনূস ছিলেন তাঁদের ‘সৎ মানুষ’ মার্কা রাজনৈতিক ক্যান্ডিডেট। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির টানাপড়েনের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডক্টর ইউনূসের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ভুল রাজনৈতিক চিন্তা ও ভুল পদক্ষেপ তা নষ্ট করে দিয়ে গেছে। গণমাধ্যম সরকার গঠনে ও সরকার পতনে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। তেমনি রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্রগঠনেও গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আগামি দিনেও বাংলাদেশকে শক্ত হাতে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের বিচক্ষণ ভূমিকার প্রয়োজন হবে। এর কোন বিকল্প নাই। মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান অতীতে ভুল করেছেন বলে আগামিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন না বা রাখতে পারবেন না এটা আমি মনে করি না। এক এগারোতে কেন তাঁরা উদার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আস্থা রাখেন নি তার ব্যাখ্যা তাঁরাই শুধু জানেন। নিয়ম কিংবা সাংবিধানিক বিধিবিধান না মেনে সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চড়ে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মী ও ব্যবসায়ীদের কেন তাঁরা শায়েস্তা করতে নেমেছিলেন তার একটা ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই তাঁদের আছে। এ ব্যাপারে তাঁদের উপলব্ধিও নিশ্চয়ই আছে।
গণমাধ্যমের ভুলত্রুটি কিম্বা অন্যের লেখালিখির পর্যালোচনা আমরা করতেই পারি। যখনই তা করি তার উদ্দেশ্য বাংলাদেশে সামগ্রিক ভাবে চিন্তা বিকশিত করবার সুযোগগুলো –বিশেষত রাজনৈতিক পরিসর, রাজনৈতিকতা, ক্ষমতা, রাষ্ট্র ইত্যাদি সম্পর্কে সমাজের চিন্তাচেতনা যথাসম্ভব পরিচ্ছন্ন করে তোলা। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা স্রেফ ক্ষমতার জোরে আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার বিরোধীদের নিগৃহীত করবে এটা মেনে নেওয়া হবে চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আত্মঘাতী। আমি অতএব আহ্বান জানাবো যাঁরা ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর রাজনীতির বিরোধিতা করেন তাঁরাও নীতিগত জায়গা থেকে রাষ্ট্র যখন যাকে তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হবেন। এই অতি প্রাথমিক নীতিগত জায়গা বিনষ্ট হলে গণতন্ত্র দূরে থাকুক বাংলাদেশে কোন ভাবেই আমরা কোন প্রকার ‘রাজনৈতিক পরিসর’ নির্মাণ করতে পারবো না। আমি জানি মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান ভাবেন নি ক্ষমতাসীনরা যখন মাহমুদুর রহমানকে অন্যায় ভাবে শাস্তি দিচ্ছে, দীর্ঘ দিন কারাগারে বিচার ছাড়া আটকে রেখেছে... সেই প্রকার দুর্দশার শিকার তাঁরা হবেন না। মাহমুদুর রহমানের নাগরিক ও মানবিক অধিকারের পক্ষে পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তাদের যে দৃঢ় নীতিগত অবস্থান জারি রাখা জরুরি ছিল, সেই অবস্থান তাঁরা নেন নি। আজ তাঁরা নিজেরাই ক্ষমতাসীনদের রোষের শিকার হয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ হচ্ছে গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। এর সহজ অর্থ হচ্ছে সমাজে সমষ্টির স্বার্থ নিয়ে কথা বলবার পরিসর তৈরি করা। সমাজের অনেকের সঙ্গেই আমাদের চিন্তা, মত, সিদ্ধান্ত, ভাবনা ইত্যাদির বিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু আমরা সকলেই যদি সমাজের অন্তর্গত হয়ে থাকি তাহলে যাঁদের মতের সঙ্গে আমাদের মতের বিরোধ চরম তাঁদের কথা শোনার ও কথা বলার পরিসর নির্মাণের গুরুত্বকে যেন আমরা উপেক্ষা না করি। পরস্পরের মধ্যে কথা বলার মধ্য দিয়েই সমষ্টির ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষা রূপ লাভ করে। যদি আমরা মনে করি মতাদর্শিক ভাবে বিরোধীদের কথা বলার সুযোগ বন্ধ করে দিলেই সেই মতাদর্শ মরে যাবে তাহলে বুঝতে হবে আমরা গভীর কুয়াশার সাম্রাজ্যে বসবাস করছি। চিন্তাকে চিন্তা দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে আর তা করতে হলে সমাজে কথা বলার পরিসর শক্তিশালী করতে হবে। হবেই। এর কোনো বিকল্প নাই। আর এটা সফল ভাবে গণমাধ্যমই করে ও করতে পারে। কেন এক-এগারোর সময় মাহফুজ আনাম ও মতিউর রহমান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি নির্মূল করবার জন্য মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনকে ক্ষমতায় আনলেন সে সম্পর্কে আমার নিজের ব্যাখ্যা আছে। দুই একটি লেখায় আমি তা উল্লেখও করেছি। সেটা হোল বাংলাদেশে লিবারেলিজম বা উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো উদার রাজনীতিতে আস্থাশীল নয়। এটা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চিন্তা চেতনা বিকাশের ক্ষেত্রে বড় সড় বিপদের জায়গা। তারা উদার রাজনৈতিক চিন্তার পক্ষের শক্তি নয়। এক এগারোর সময় দেখা গেলো তারা নিয়মতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক চিন্তা-চেতনারও বিরোধী। দ্বিতীয়ত দুটো পত্রিকাই রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ এবং সমাজে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জারি রাখার গুরুত্বকে খাটো করে দেখে। সুশীলদের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে তারা রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করে, কিম্বা নিজেরা রাজনৈতিক দলের বিকল্প হতে চায়। এই উচ্চাশা ভয়ঙ্কর। এই দুটো পত্রিকার রাজনৈতিক চেতনার অভাব পত্রিকা দুটিকে এক এগারোর সময় আওয়ামী লীগের ভাষায় অসাংবিধানিক পথে রাজনৈতিক দল বিলোপ... বিশেষত শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে নির্মূল করবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গিয়েছিল। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার রাজনীতি বাংলাদেশকে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনায় পর্যবসিত করেছে- এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু তার সমাধান তাদের নির্মূল করা নয়। বরং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে আরো সচল ও সজীব করে তোলা। দলবাজি নয়, বরং রাজনীতির সজীব প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই নতুন রাজনীতির পথ বের করে আনা। সেটা সম্ভব। অবশ্যই সম্ভব, যদি সুশীলদের বিরাজনীতিকরণের চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে আমরা সাধারণ মানুষকে আস্থায় নিতে পারি। তাঁদের আবেগ, ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা, সংকল্প, ইত্যাদির প্রতি মনোযোগী থেকে তাকে প্রকাশের ও তর্কবিতর্কের সুযোগ তৈরি করি। সামষ্টিক ইচ্ছা ও অভিপ্রায় নির্মাণের প্রক্রিয়া জারি রাখি। ইত্যাদি। দৈনিক প্রথম আলোর জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে পত্রিকাটির গ্রহণযোগ্যতা আছে। কিন্তু এই শক্তিকে ইতিবাচক ভাবে কাজে না খাটিয়ে দৈনিক প্রথম আলো একদিকে তাদের পত্রিকার অভ্যন্তরে সক্রিয় আওয়ামী ও দিল্লি প্রেমিকদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। খেয়ে না খেয়ে খালেদা জিয়া ও তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের বিরোধিতা করা তার খাসিলত হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে তাঁরা যুক্ত থেকেছে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার পরিবারকে রাজনীতি থেকে নির্মূল করবার তৎপরতায়। যার ফল কারো জন্যই শুভ হয়নি এটা খোদ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের কাজটাই গোড়ায় মেরে ফেলার শামিল।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ, বিএনপির রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিকাশ ও গতিশীল উন্নয়নের পথে বাধা। নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার দিক থেকে দেখলেও এদের সমালোচনা বা বিরোধিতা মোটেও অযৌক্তিক নয়। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা ও দুর্নীতির জায়গা থেকে দেখলে এই দুটি দলের রূপান্তর কিম্বা এদের হাত থেকে নিষ্কৃতি ছাড়া বাংলাদেশের গতিশীল বিকাশ সম্ভব নয়। এসব নিয়ে তর্ক বা আপত্তি করবার কিছু নাই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে। সেটা নিশ্চয়ই এই ধরনের দলের বিপরীতে সেনা সমর্থিত সরকার কায়েম করা নয়। এদের বিপরীতে জয়ী হতে হলে বাংলাদেশকে বেশ দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জারি রেখে তার ভেতরেই রাজনৈতিক সচেতনতা নির্মাণের পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। একেই আমি রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ বলে থাকি। গণমাধ্যম এই ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো সে কাজে নিবিষ্ট না থেকে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনকে দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে চেয়েছে। এই দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার রুষ্ট হবার এটাই প্রধান কারন। যদিও শেখ হাসিনা নিজেও দাবি করেছেন এক এগারো সরকার তাঁদেরই আন্দোলনের ফল। এবং এক এগারোর সরকারের সকল অপকর্ম তাঁরা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এরপর থেকে মাহফুজ আনামকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দোষে অভিযুক্ত করবার যুক্তি থাকে না। কিম্বা থাকলেও খাটো হয়ে যায়। শেখ হাসিনা যদি মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনকে ক্ষমা করে দিতে পারেন তো মাহফুজ মতিউরকে ক্ষমা করতে পারছেন না কেন?
এর একটা প্রহসনমূলক দিক আছে। মাঝে মধ্যে ইতিবাচক অর্থে উদার বা লিবারেল চিন্তাভাবনার নমুনা দেখালেও ডেইলি-স্টার প্রথম আলো শেষাবধি দুটো অঘটন ঘটায়। একটি হচ্ছে দলবাজ ভূমিকা পালন করার কাজে নিজেদের নামিয়ে আনা। সেটা তারা করে সেকুলারিজম বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে তাদের অনুমানের জন্য। এই অনুমান হচ্ছে বাংলাদেশে সেকুলারিজম রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতে হবে। দাঁড়াতে হবে ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে, এদের নির্মূলের কাজে। বাংলাদেশের সেকুলারদের জন্মগত অসুখের কারণে তাঁরা মনে করে ইসলামের সঙ্গে কিম্বা ইসলামপন্থীদের সঙ্গে গণতন্ত্র ও ‘ধর্ম নিরপেক্ষতার’ প্রশ্নে কোনো নেগোশিয়েশান্স, চিন্তার পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠনের কোন সুযোগ নাই। ইসলামপন্থীদের সাথে কোন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণ, বোঝাপড়া তৈরি করার কোনো সুযোগ তৈরি করতে এরা চায় না। বরং তাঁদের কাজ হচ্ছে খেয়ে-না-খেয়ে ইসলাম সংশ্লিষ্ট যেকোনো কিছুর বিরোধিতা করা। এটাই প্রহসনের জায়গা। দুটো পত্রিকাই মূলত বিএনপির রাজনীতির বিরোধিতা করে। কিন্তু তাতেও দুই সম্পাদক শেখ হাসিনার মন জয় করতে পারেননি। পারেননি কারণ তাঁরা খোদ শেখ হাসিনাকেই নির্মূল করে বোঝাতে চেয়েছেন শেখ হাসিনার ইসলাম নির্মূলের কাজটা তাঁরা আরো ভালো পারবেন।
ইদানীং প্রথম আলোতে দেখছি ইসলাম সম্পর্কে ভুল চিন্তা সামাল দেবার জন্য তাঁদের সম্পাদকীয় পাতায় ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বয়ান দেওয়া। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে লেখালিখি দেখে আমি খুশি হয়েছি। কিন্তু দেখলাম এটা নিছকই ধর্ম প্রচার মাত্র। ইসলামের আদৌ কোনো আদর্শগত ও রাজনৈতিক চিন্তা প্রথম আলোর উদার রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না তার বিচার নয়। সম্ভবত তারা ইসলামপন্থীদের সহানুভূতি চাইছে। তবে সেটা করতে গিয়ে ইসলাম সম্পর্কে পর্যালোচনামূলক লেখালিখি না করে ধর্ম শিক্ষা বা ধর্মপ্রচারকের ভূমিকায় নামাটা হচ্ছে প্রথম আলোর সবচেয়ে হাস্যকর ভূমিকা। এই সব জায়গাতেই প্রথম আলোর চূড়ান্ত হিপোক্রাসি ধরা পড়ে। সত্য এই যে ‘ইসলাম’ একাট্টা কিছু নয়। ইসলাম নানান কিসিমের নানান মতাদর্শের নানান রাজনীতির। প্রশ্ন হচ্ছে উদার ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য ইসলাম প্রণোদিত কী ধরনের চিন্তা ডেইলি স্টার বা প্রথম আলোর দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ? তাকে তারা কিভাবে হাজির করে সেটাই মুখ্য বিষয়। ইসলাম প্রচার তাদের কাজ না। ধর্মের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সমাজে ইতিবাচক কথাবার্তা ও ডায়ালগের শর্ত তৈরি করা এখনও বড় একটি কাজ। যে কাজ রাজনৈতিক পরিসর গড়ে ওঠার শর্ত নিশ্চিত করে। ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের সমালোচনা অব্যাহত থাকবে। উভয়েই করপোরেট স্বার্থের পাহারাদার। সেটা ভিন্ন একটি বিতর্ক। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে গণমাধ্যমের সঙ্গে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সম্পর্ক বিচার না করে বিচ্ছিন্ন ভাবে শুধু দুটো পত্রিকার কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার চরিত্র আলোচনা সঙ্গত হবে না। বরং এখন মাহফুজ আনামকে যেভাবে ক্ষমতাসীনরা শায়েস্তা করতে চাইছে তার বিরোধিতা কর্তব্য।
শেষ করবার আগে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ‘দৈনিক আমার দেশ’ বন্ধ করে দেবার পর তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ৩ জুন ২০১০ তারিখে মাহফুজ আনাম যে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন পাঠকদের তা মনে করিয়ে দিচ্ছি।
'As a newspaper upholding journalistic professionalism and freedom, we have, however, found it difficult at times to appreciate the brand of journalism that the Amar Desh was pursuing. Still it is our firm conviction that a dissenting voice, however venomous and thinly founded, must be allowed space because it is an integral part of a functioning democracy, a touchstone of free press and an axiom that the people will be the ultimate judge of all opinions. No matter how opaque or squinted or biased a report and a view-point maybe for or against somebodz it must get a free play not only to enrich environment of free press but also strengthen the institutions of democracy'.
‘যে সাংবাদিকতার পেশা ও স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাসী সেই দিক থেকে দৈনিক আমার দেশ-এর সাংবাদিকতা আমাদের পক্ষে সবসময় প্রশংসা করা কঠিন, তবুও এটা আমাদের বিশ্বাস যে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তা যতোই বিষোদ্গারী হোক ও হালকা ভিত্তির ওপর দাঁড়াক- তাকেও অবশ্যই জায়গা করে দিতে হবে। কারণ তা গণতন্ত্র সক্রিয় রাখার জন্য জরুরি, স্বাধীন সংবাদপত্র আছে কি না তা বিচারের কষ্টিপাথরও এটা আর জনগণই শেষ বিচারক এই নৈতিক মানদণ্ড কার্যকর কি না তার প্রমাণও এটাই। অস্পষ্ট, একচোখা অথবা পক্ষপাতদুষ্ট হোক বা না হোক সাংবাদিকতাকে স্বাধীন ভাবে কাজ করতে দিতে হবে, যেন শুধু মুক্ত সংবাদপত্রের পরিবেশ বিরাজ করা নয়, একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণতন্ত্রকেও তা শক্তিশালী করে’।
বলা হচ্ছে দৈনিক আমার দেশ এবং মাহমুদুর রহমানের সাংবাদিকতা অস্পষ্ট, অপরিচ্ছন্ন, একচোখা, পক্ষপাতদুষ্ট ইত্যাদি। বিরোধী মতাদর্শ হিসাবে দৈনিক আমার দেশও ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো সম্পর্কে একই কথা বলতে পারে। ভিন্ন মতাদর্শের বিরোধিতা ডেইলি স্টার করতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ডেইলি স্টার কি আদৌ গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সংহত করবার কাজ করে? বা করেছে? যে দাবি তারা করছে তা মোটেও সত্য নয়। যদি এটা সত্য হোত তাহলে গোয়েন্দাদের দেয়া প্রতিবেদন ছাপাতে ডেইলি স্টার অস্বীকার করত। কই, মাহমুদুর রহমান তো ছাপেন নি। এক এগারোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন মাহমুদুর রহমান। তাহলে সাংবাদিকতায় অস্পষ্ট, পক্ষপাতদুষ্ট ও একচক্ষু কারা? দৈনিক আমার দেশ নয়, বরং ডেইলি স্টার। ডেইলি স্টার এখানে যা লিখেছে তা তাদের হিপোক্র্যাসির একটা নজির, মাত্র। তার সঙ্গে আমি একমত নই, কিন্তু এখানে যে নীতিগত প্রশ্ন তোলা হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসর গড়ে তোলার জন্য তার মূল্য আছে। মাহমুদুর রহমানের সমালোচনার আগে ডেইলি স্টারকে ভাবতে হবে তাদের ইসলামবিদ্বেষের বিষ মোটেও কম ভয়ঙ্কর ও বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য কম ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এর বিচার জনগণকেই করতে দেওয়া উচিত। ডেইলি স্টার যা বলছে তা তারা নিজেরা মানে না জানি, তবু এই নীতির আমি দৃঢ় সমর্থক। এই কারণেও মাহফুজ আনামকে সমর্থন করা নাগরিক হিসাবে আমার নৈতিক কর্তব্য মনে করি। এটাই সকলের স্পিরিট হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে উদার বা সত্যকারের লিবারেল চিন্তাচেতনার ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু ডেইলি স্টার ও দৈনিক প্রথম আলোর রাজনীতি যতোটা এই রাজনীতিকে সততার সঙ্গে বহন করতে পেরেছে তাদের সাফল্যও সেই মাত্রাতেই ঘটেছে। কিন্তু যখনই তারা উদার রাজনীতি পরিহার করে অনুদার রাজনৈতিক নীতি ও কৌশল অবলম্বন করেছে তখনি তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে।
এই উপলব্ধিটুকু শুধু সবার ঘটুক, আমরা যেন এগিয়ে যেতে পারি।
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। ১৩ ফাল্গুন ১৪২২। শ্যামলী।

Tuesday, January 26, 2016

প্রধান বিচারপতির বক্তব্য ও বিতর্ক by ফরহাদ মজহার

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দুর্দশা নতুন কোনো খবর নয়, তবে সম্প্রতি বিচারকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব যেভাবে প্রকাশ হয়েছে তাতে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার সঙ্কট আরো তীব্র হতে পারে। কিছু দিন আগে অবসর নেয়া সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী যেভাবে প্রধান বিচারপতিকে ঘায়েল করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন পৃথিবীর আর কোথাও এই প্রকার আচরণের কোনো নজির আছে কি না আমার জানা নেই। সাবেক এই বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক নামে পরিচিত। ব্যক্তিগত ও সঙ্কীর্ণ পেশাগত দ্বন্দ্বকে তিনি প্রকাশ্য করে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে যেখানে নামিয়ে এনেছেন তাকে অবিশ্বাস্যই বলতে হবে। বিষয়টি স্রেফ বিস্ময়ের বিষয় হলে অসুবিধা ছিল না। কিন্তু সাবেক এই বিচারপতির আচরণ, উচ্চারণ এবং প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তার ভূমিকা স্র্রেফ বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা সজ্ঞানে বিনষ্ট করার শামিল। তার মন্তব্য ‘আদালত অবমাননা’র পর্যায়ে পড়ে। প্রধান বিচারপতিকে ঘায়েল করতে গিয়ে তিনি নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করবার মহৎ কাজে লিপ্ত হয়েছেন। বিচারব্যবস্থার বিপর্যয় এতে আরো ত্বরান্বিত হওয়ার ও ভেঙে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এই বিষয়টিকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।
কিছু দিন আগে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলেছিলেন, ‘বিচার বিভাগের ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছে নির্বাহী বিভাগ’। বিচার বিভাগের দিক থেকে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ গুরুতর। মনে রাখা দরকার মাহমুদুর রহমান উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত চেম্বার জজ স্থগিত করে দিত বলে একই সারকথা বলেছিলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধি। দেখা গেছে, হাইকোর্ট যখন কোনো মামলায় রায় দেন, অ্যাটর্নি জেনারেল তার স্থগিতাদেশ চেয়ে চেম্বার জজের কাছে আবেদন করেন। আদালতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধি অর্থাৎ অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদন অনুযায়ী চেম্বার জজ স্থগিতাদেশ মঞ্জুর করেন। নিয়মিত এই ঘটনা চলতে থাকলে সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাবেক বিচারপতি টি এইচ খান দৈনিক আমার দেশকে বলেছিলেন, হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে দেয়াই যেন চেম্বার জজ আদালতের মূল কাজ। আর ঠিক এই কথাকেই দৈনিক আমার দেশ বলেছিল, ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’। অথচ এই কথা বলার জন্য আদালত মাহমুদুর রহমানকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন।
মাহমুদুর রহমান তার বক্তব্যের জন্য আদালতের কাছে ক্ষমা চাননি। চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা ছাড়াও সত্য প্রকাশের দৃঢ়তার জন্য মাহমুদুর রহমান সাংবাদিকতার ইতিহাসে বিশাল উদাহরণ হয়ে থাকবেন। কিন্তু এখন প্রধান বিচারপতি সারমর্মের ভাষায় একই কথাই বলছেন: নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাইছে। নির্বাহী বিভাগ কেড়ে নেয়ার কাজটি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের মাধ্যমে চেম্বার জজের মাধ্যমে সম্পন্ন করছিল দৈনিক আমার দেশের এই অভিযোগ তাহলে মিথ্যা নয়। মাহমুদুর রহমানকে শাস্তি দেয়ার বেঞ্চে এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীসহ বিচারপতি এস কে সিনহাও ছিলেন। ইতিহাস এক প্রহসন বটে!
সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি সিনহা আবার বলেছেন, অবসর গ্রহণের পর বিচারপতিদের রায় লেখা আইন ও সংবিধানপরিপন্থী। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি একুশতম। গত ১৭ জানুয়ারি বিচারপতি হিসেবে তার এক বছর পূর্ণ হলো। প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে তিনি একটি ‘বাণী’ দিয়েছেন। সেখানেই তিনি এই বোমাটি ফাটালেন।
এই কথার পর পরই তার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের সাঙ্গপাঙ্গরা আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে। ফলে তিনি ঠিক কী বলেছেন সেটা আমাদের জানা দরকার। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বলছেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট এর বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের সংরক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ গ্রহণ করেন। কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না। আদালতের নথি সরকারি দলিল। একজন বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার হারান, আশা করি বিচারকগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এমন বেআইনি কাজ থেকে বিরত থাকবেন।’ (দেখুন সুপ্রিম কোর্ট ওয়েবসাইট)।
সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বিচারপতি হিসেবে অবসর নেয়ার আগে থেকেই প্রধান বিচারপতিকে পর্যুদস্ত ও অপদস্থ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন যে, অবসরের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক মাত্র। যেভাবে তিনি আদালতকেও পর্যুদস্ত ও অপদস্থ করে চলেছেন তা ঘোরতর আদালত অবমাননা। মাহমুদুর রহমান ছয় মাস অন্যায়ভাবে শাস্তি ভোগ করে আসবেন আর শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না, বিচার বিভাগ এই দ্বৈত নীতি গ্রহণ করতে পারে না। টেলিভিশনেও এই সাবেক বিচারপতি বিতর্কিত বক্তব্য রেখেছেন। বিতর্কিত বক্তব্য রাখা অসুবিধা নয়; টেলিভিশনে অনেকেই অনেক স্টুপিড মন্তব্য করে থাকেন। শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও করতে পারেন, সেটা তার মতপ্রকাশের অধিকার। কিন্তু যে বক্তব্য প্রধান বিচারপতিকে জনসমক্ষে অপদস্থ করে ও জনগণকে বিচারব্যবস্থার প্রতি সামগ্রিকভাবে তুমুল অবিশ্বাসী করে তোলে সেটা অবশ্যই আদালত অবমাননা। মাহমুদুর রহমান ও বাংলাদেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা এক রকম আর সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর জন্য তো সেটা ভিন্ন হতে পারে না।
দুই
জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের দিক থেকে তাকালে ক্ষমতাসীনদের বরকন্দাজ বিভিন্ন রঙ ও পোশাকের সুবিধাবাদী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অন্তর্দ্বন্দ্ব বিচারব্যবস্থার জন্য অবমাননাকর হলেও এসব কিছুতে শেষমেশ বাংলাদেশের জনগণের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। বিচার ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে যেসব সমালোচনা এত দিন করা হয়েছে তার ক্ষত ও দুর্গন্ধই আসলে এখন ছড়াতে শুরু করেছে। যতই তা প্রকাশ্য হতে থাকবে ততই জনগণ বুঝতে পারবে বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কারের সুযোগ নেই বললেই চলে। এ দিক থেকে এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি এস কে সিনহার দ্বন্দ্ব আমাদের জন্য বিচারব্যবস্থা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিষয়টা শুধু আদালত অবমাননা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক এবং সামগ্রিকভাবে বিচারব্যবস্থার ক্ষয়ের বিচারের প্রশ্ন নয়। দু-একজন বিচারকের নীতিনৈতিকতার প্রশ্নও বটে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে একটি প্রশ্ন করি। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। কিন্তু সেই দেশের সুপ্রিম কোর্টে কেউ যদি তার বিদেশী নাগরিকত্ব লুকিয়ে রেখে অতিশয় প্রভাবশালী বিচারক হয়ে বসেন তাহলে তার কী শাস্তি হওয়া উচিত? কোনো দেশ কি তা বরদাশত করবে? কোনো দেশ কি তার সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিদেশী বিচারক মেনে নেবে? অবশ্যই না।
এখন ধরা যাক, কোনো একজন বিচারক সম্পর্কে এই ধরনের অভিযোগ উঠল। সুবিচারের খাতিরে আমরা ধরে নিচ্ছি এই অভিযোগ মিথ্যাও হতে পারে। তাহলে এই ক্ষেত্রে সরকার, বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা কী হতে পারে? অবশ্যই এই অভিযোগের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা। সত্যতাসাপেক্ষে তাকে দ্রুত অপসারণ করা। যদি কেউ সত্য গোপন রেখে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হয়ে থাকেন তার শাস্তির ব্যবস্থা করা।
কিন্তু বাংলাদেশ বিচিত্র দেশ। সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক সম্পর্কে এসব গুরুতর অভিযোগ উঠার পরও তার কোনো তদন্ত হয়নি। দৈনিক পত্রিকা আমার দেশে এ সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। বিলাতে তার বাড়ি ও দুর্নীতি সম্পর্কে কিছু তথ্য তারা প্রকাশ করেছিল। রাজনৈতিক বিরোধ ও বিদ্বেষ ছাড়াও এসব কারণে দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। তাকে আদালত অবমাননার দায়ে যে বেঞ্চ শাস্তি দিয়েছিল সেখানে সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও ছিলেন।
বাংলাদেশে ‘আদালত অবমাননা’ সংক্রান্ত কোনো আইন নেই। সে দিক থেকে ঔপনিবেশিক আইনের ভিত্তিতে আদালত অবমাননার বিচার চলতে পারে না। ঔপনিবেশিক আইন চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে না, বরং তা দমন করার কাজেই ব্যবহার করা হতো। সেই আইন দিয়ে একটি স্বাধীন দেশে চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশসংক্রান্ত মামলার সিদ্ধান্ত কিভাবে বিচারকেরা নিচ্ছেন? তাহলে তর্ক করা যায় ঔপনিবেশিক আইনের অধীনে স্বাধীন দেশের নাগরিকদের যে বিচার বিচারকেরা করেছেন তা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চেতনার বিরোধী। ঔপনিবেশিক আইনের অধীনে যেসব রায় হয়েছে তা অবৈধ। অভিযুক্তকে ‘পরাধীন’ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, স্বাধীন দেশের চিন্তা ও বিবেকসম্পন্ন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। লিগ্যাল সাবজেক্ট হিসেবে নাগরিকদের যে স্তরে বিচারকেরা পর্যবসিত করেছেন তারা কি তা করতে পারেন?
এ ছাড়াও আরেকটি গুরুতর আইনি বা সাংবিধানিক তর্ক মাহমুদুর রহমানসংক্রান্ত আদালত অবমাননার রায়ে উঠেছে। অপরাধের শাস্তি কী হবে তা নির্ধারণ বিচারকের এখতিয়ার নয়। আইনের অনুপস্থিতিতে যদি শাস্তি সুনির্দিষ্ট না থাকে তাহলে বিচারপ্রক্রিয়া বিচারকদের বৈচারিক স্বেচ্ছাচারে পর্যবসিত হতে পারে না। এ ছাড়া অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কোন অপরাধে কতটা শাস্তি হবে সেটা নির্ণয়ের অধিকারও বাংলাদেশের সংবিধান বিচারকদের দেয়নি। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে আনা অভিযোগে যে রায় দেয়া হয়েছিল তা বিচারকদের ব্যক্তিগত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ কি না তা তর্ক আকারে যেমন রয়ে গিয়েছে তেমনি মাহমুদুর রহমানের রায়ে বিচার বিভাগ সংবিধানে দেয়া ক্ষমতার বাইরে কাজ করেছেন কি না সেটাও অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ তর্ক আকারে রয়ে গিয়েছে। আমরা তা উপেক্ষা করতে পারি না। ইনসাফ নিশ্চিত করা না হলে তুষের আগুনের মতো তা থেকে যাবে। এজলাসে বসে রায় দিলেই তার জের শেষ হয় না। আইন কিংবা বিচার সমাজ ও রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। একজন নাগরিককে শাস্তি দিতে গিয়ে ন্যায়বিচার বিঘিœত হলে তা দ্বিগুণ শক্তি হয়ে বেইনসাফির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রায়ের জেরও বাংলাদেশে কাটেনি। আদালত অবমাননার প্রসঙ্গ যেহেতু নাগরিকদের মানবিক অধিকারের প্রশ্নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত তাই এই রায়টি বারবারই ইতিহাসের কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়াবে এবং আবার ইনসাফ নিশ্চিত করার জন্য ফরিয়াদ জানাতে থাকবে।
ঠিক। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার ওপরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী শাস্তি অসাংবিধানিক। আদালত অবমাননার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার বিচারকদের আছে। অবশ্যই। কিন্তু অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি নির্ণয়ের অধিকার তাদের নেই। কিসের ভিত্তিতে মাহমুদুর রহমানের ছয় মাসের কারাদণ্ড হলো? অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা নির্ণয়ের অধিকার এখতিয়ার একান্তই জাতীয় সংসদ বা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নী বিভাগের। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ তো কোনো আইনই প্রণয়ন করেনি। কিন্তু বিচারকেরা প্রায়ই নিজেদের জাতীয় সংসদের ঊর্ধ্বে ভাবতে পছন্দ করেন। সংবিধানে ‘ইনহেরেন্ট পাওয়ার’ নামক একটি ধারণা আছে বলে অনেকে মনে করেন। এই ইনহেরেন্ট পাওয়ার খোদায়ী ক্ষমতার সমতুল্য। বিচারক যা খুশি তাই শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু ইনহেরেন্ট পাওয়ারের অর্থ এমন নয় যে, কোনো আইন না থাকলে আদালত নিজেই নিজের ক্ষমতাবলে যা খুশি আইন তৈরি করতে পারে। সওয়াল জবাবের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান ও আইনের ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা উচ্চ আদালতের। কোর্ট অব রেকর্ড হিসেবে যা থেকে যায়। আইনের ব্যাখ্যা হিসেবে আদালতের এখতিয়ারের মধ্যে ‘আইন’ হয়ে হাজির থাকে। যাকে কেইস ল, প্রিসিডেন্স ইত্যাদি নানান নামে অভিহিত করা হয়। বিভিন্ন আইনের মধ্যে সমন্বয় বা বিরোধ থাকলে এবং তা আদালতে মীমাংসার সুযোগ থাকলে বৈচারিক ক্ষমতাবলে তা মীমাংসার ক্ষমতাকেও অনেকে আদালতের ইনহেরেন্ট পাওয়ার বলে মানেন। এত দূরই বড়জোর। ইনহেরেন্ট পাওয়ার নিয়ে অন্যত্র ভিন্নভাবে আমরা বিস্তৃত আলোচনা করতে পারি।
কিন্তু আদালত অবমাননার অজুহাতে কোনো আইন না থাকা অবস্থায় কাউকে ছয় মাসের শাস্তি দেয়ার ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে। অথচ ইনহেরেন্ট পাওয়ারের অজুহাত দিয়ে বিচারক সেই শাস্তি দিতে পারেন না। এটা তার এখতিয়ারের জায়গা নয়। যেহেতু বাংলাদেশে বৈচারিক যুক্তিবিদ্যা (jurisprudence), দর্শন কিংবা রাষ্ট্রনীতি নিয়ে শক্তিশালী সামাজিক-রাজনৈতিক বিতর্ক নেই, বহু গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় অস্পষ্ট ও অপরিচ্ছন্ন রয়ে গিয়েছে। কিছু বিচারক তার সুযোগ গ্রহণ করতে পারছেন। মাহমুদুর রহমানকে শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি কিভাবে ব্যক্তিগত ক্রোধ বিচারপ্রক্রিয়াকে ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত করে। কিছু বিচারক তাকে ‘চান্স এডিটর’ মন্তব্য করেছিলেন এবং আদালত অবমাননার জন্য দীর্ঘ দিন কারাগারে পচতে পাঠিয়েছিলেন। বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ বা তথাকথিত সিভিল সোসাইটি নামক কিছু যে নেই সেটা তখন থেকেই আরো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কারণ এই অন্যায়ের প্রতিবাদ যেভাবে হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়নি। মাহমুদুর রহমান ‘ইসলামপন্থী’ এই অভিযোগে সংবিধান, আইন ও বিচারব্যবস্থার এই সব নানাবিধ ঘাটতি উপেক্ষা করা হয়েছে। তাকে শাস্তি দেয়ার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের আনন্দ আমরা তখন প্রত্যক্ষ করেছি। যে তলোয়ার অন্যের মাথা কাটে, একদিন তার কোপ আমার ঘাড়েও পড়তে পারে এই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের প্রকট অভাব দেখে অবাক হয়েছি। কিন্তু এটাই বাংলাদেশ। আজ দেখছি, যেসব বিচারক মাহমুদুর রহমানকে শাস্তি দিয়ে পুলকিত হয়েছিলেন আজ তারাই পরস্পরের সাতে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। প্রহসন বটে!
আদালত অবমাননা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশেষত যারা সাংবাদিক ও লেখালিখির সাথে জড়িত তাদের জন্য সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের দিক থেকে চিন্তা ও মতপ্রকাশের সীমা ও সম্ভাবনা পরিষ্কার করা সংসদ ও বিচার বিভাগ উভয়েরই কর্তব্য। আদালত অবমাননা মামলায় মাহমুদুর রহমানের শাস্তি বাংলাদেশের আইন ও বিচার বিভাগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। প্রসঙ্গটি আবার সে কারণেই এখন তুলেছি। সেই মামলার বেঞ্চে বর্তমান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাও হাজির ছিলেন। তিনিও এই দায়ের বাইরে নন। এখন বিচারকদের সংবিধান বিরোধী কাজের কথা যদি তিনি তুলেই থাকেন তাহলে তিনিও বা দায় এড়াবেন কিভাবে? এই প্রশ্নটুকু প্রধান বিচারপতির বিবেকের কাছে পেশ রাখছি। এর বেশি কথা বাড়াতে চাই না। কারণ তিনি যদি আন্তরিক উপলব্ধি থেকে এখনকার কথাগুলো উচ্চারণ করে থাকেন তাহলে তাকে শক্তভাবে সমর্থন করা আমি আমার নাগরিক কর্তব্য বলে মনে করি।
তিন
অবসর গ্রহণ করার পর পরই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ সাধারণ নাগরিক হয়ে যান এবং তারা আর শপথের অধীন থাকেন না। তাই অবসর গ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার তারা হারান। সে কারণে অবসরে যাওয়ার পর রায় লেখাকে প্রধান বিচারপতি অসাংবিধানিক বলেছেন। তার এই সঠিক অবস্থানের যারা সমালোচনা করছেন তাদের যুক্তি একটাই। বিচারক যখন রায় দিয়েছিলেন তখন তিনি শপথের অধীনে ছিলেন। অতএব এরপর অবসরে গিয়ে রায় লিখলে তা অসাংবিধানিক হবে না। কিন্তু প্রধান বিচারপতি তো তা নিয়ে তর্ক করছেন না। শপথের অধীনে দেয়া সংক্ষিপ্ত রায়কে তিনি অসাংবিধানিক বলছেন না। তিনি বলছেন, আদালতের নথি সরকারি দলিল, অবসরে যাওয়া বিচারক নিজের বাড়িতে রাখেন কোন অধিকারে? এগুলো পাবলিক ডকুমেন্ট। কিংবা তার পর্যালোচনা করতে পারছেনই বা কিভাবে? এবং শপথের বাইরে থেকে রায়ও বা লিখছেন কোন সাংবিধানিক বা আইনি অধিকারে? বিশেষত এমন সময় যখন রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দলিল সংরক্ষণের শপথ থেকে তিনি মুক্ত। এই ব্যাপারে তার আর কোনো দায় থাকে না। যারা অন্য দেশের উদাহরণ দিচ্ছেন তারা সুনির্দিষ্টভাবে কোন দেশে কোথায় বিচারপতিরা অবসরে যাবার পরে কিভাবে রায় লিখেছেন তার কোনো উদাহরণ দেননি। বাংলাদেশে এর আগের বিভিন্ন বিচারপতি ও এই কাজ করেছেন বলা হচ্ছে। আগের বিচারপতিরা অসাংবিধানিক কাজ করেছেন বলে তা স্র্রেফ বিচারপতিদের স্বেচ্ছাচার হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বক্তব্য এতে এক তিলও বাতিল হয় না। আগের বিচারপতিরা ভুল করলে আমাদের সেই ভুল করে যেতে হবে তার কোনো যুক্তি নেই। কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না। তো তিনি যখন রায় দিয়েছিলেন তখন তিনি শপথের অধীন ছিলেন তাই অবসরে অসম্পূর্ণ রায় লিখবেন এই যুক্তি যারা দিচ্ছেন তাদের যুক্তি কাণ্ডজ্ঞানপ্রসূত মনে হচ্ছে না।
ধরুন তর্কের খাতিরে মানা গেল যে তারা অবসরে গেলে রায় লিখতে পারবেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বিচারপতিদের স্বাক্ষর করা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। বাড়িতে বসে অবসরে লেখা রায়ে যখন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক স্বাক্ষর করেছিলেন তখন কি তিনি শপথের অধীন? নাকি অধীন নন? স্বাক্ষরের তারিখ তিনি কী দেবেন? শপথ থেকে অবমুক্ত হওয়ার পরের তারিখ নাকি যখন তিনি শপথের অধীনে ছিলেন সেই তারিখ? যদি শেষেরটা করেন সেটা হবে শুধু অসাংবিধানিক নয়, একইভাবে দুই নম্বরি কাজ। কিভাবে একজন সাধারণ নাগরিক রায়ে স্বাক্ষর দিচ্ছেন? আর তা রাষ্ট্রের কাছে বলবৎযোগ্য বলে গৃহীত হচ্ছে? কাণ্ডজ্ঞানেই বোঝা যায় প্রধান বিচারপতি সঠিক বলেছেন।
এতে কি বৈচারিক বা আইনি জটিলতা তৈরি হবে? অবশ্যই হবে। কিন্তু সেটা ভিন্ন তর্ক। আর সেই তর্ক ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। কী ধরনের জটিলতা তৈরি হবে কিংবা ইতোমধ্যে হয়েছে সেই তর্কে আমি এখন এখানে যাচ্ছি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত রায় এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশ হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়। এই রায়টি লিখেছিলেন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। অবসরে যাওয়া বিচারপতির রায় লেখা নিয়ে সেই সময় দৈনিক আমার দেশ প্রশ্ন তোলে। তখন দৈনিক আমার দেশের সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান সিনিয়র আইনজীবী বিচারপতি টি এইচ খানের বরাতে জানিয়েছিলেন, এটা অবৈধ কাজ। বিচারপতিরা দায়িত্ব গ্রহণের আগে শপথ নেন। এই শপথ নেয়া হয় সংবিধানের আলোকে। যত দিন দায়িত্বে থাকেন তত দিন শপথের আওতায় তাদের কাজ করতে হয়। অবসরে চলে যাওয়ার পর তারা শপথের আওতামুক্ত। তখন তিনি সাধারণ নাগরিক। সুতরাং শপথের আওতামুক্ত কোনো ব্যক্তি রায় লিখতে পারেন না। কারণ তিনি আর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকেন না।
তবে সাংবিধানিক বা আইনি জটিলতা তৈরি হবে বলে ক্ষমতাসীনদের বরকন্দাজরা যেসব কূটতর্ক করছে আসলে তার কোনো ভিত্তি নেই। কারণ একটি নির্বাচিত সংসদ অনায়াসেই দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতির ভিত্তিতে বিতর্কিত বিষয় সমাধান করতে পারে। কিন্তু তারা জানে বর্তমান সংসদ অনির্বাচিত। এর নৈতিক বা আইনি ভিত্তি নেই। যে রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতাসীনেরা ক্ষমতায় এসেছে সেটাই প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে প্রশ্নবোধক ও অসাংবিধানিক হয়ে পড়েছে। এদের তেলেবেগুনে গোস্বা হওয়ার কারণ এটাই। তারা বিতর্কিত সংসদে এর সমাধান দিলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
প্রধান বিচারপতি এখন যা বলছেন তা আসলে নতুন কিছু নয়। তার বলাটাই নতুন। জানি না তিনি তার বিবেকের তাগিদ থেকে কথাগুলো বলছেন কি না। যদি বলে থাকেন তাহলে তার উচিত বিচার বিভাগীয় উদ্যোগে মাহমুদুর রহমানের জামিন কেন হচ্ছে না তার খোঁজ নেয়া। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হোক অসুবিধা নেই। কিন্তু কোনো বিচারপতির ব্যক্তিগত ক্রোধের কারণে যদি নাগরিকদের ওপর অন্যায় করা হয় তাহলে তা প্রশমনের দায় প্রধান বিচারপতিরও বটে।
প্রধান বিচারপতির উদ্যোগ নেয়ার মধ্য দিয়েই আমরা বুঝব তিনি আইন বা সাংবিধানিক বৈধতা বা অবৈধতার তর্ক ছাড়াও নীতি ও ইনসাফের প্রশ্নে আন্তরিক। সমাজ ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য যা জরুরি।
২২ জানুয়ারি, ২০১৬। ৯ মাঘ, ১৪২২। আরশিনগর।