Sunday, February 28, 2010

বিভাজনের বাইরে এক মূসাভাই by রিয়াজউদ্দিন আহমেদ

আজকের সাংবাদিকতা জগতে এক মহীরুহ আমাদের প্রিয় মূসাভাই। সবার কাছে ও সব মহলে সমান গ্রহণযোগ্য একজন নির্ভীক সাংবাদিক। রাজনৈতিক বিভাজনের এই সমাজে কারও পক্ষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া অতি দুরূহ। এই বিভাজনের সমাজে আপনি হয় আমার সঙ্গে, না হয় আমার বিপক্ষে। এই বিভাজনের সীমারেখা অতিক্রম করতে পেরেছেন এবিএম মূসা।
সাংবাদিকতা জগতের সর্বত্র বিচরণ করেছেন অর্ধশতাব্দীরও অধিক কাল। সাব-এডিটর ও রিপোর্টার, এমনকি ক্রীড়া প্রতিবেদক থেকে সফল নিউজ এডিটর, পরে সম্পাদক, বিদেশি পত্রিকার প্রতিনিধি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনের সংবাদদাতা। এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন কলামিস্ট মূসাভাই।
এই মূসাভাই আগামীকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি ৮০ বছরে পা রাখবেন। এই দীর্ঘ সময়ের অর্ধেকটা আমি নানাভাবে তাঁর খুব কাছে কাছে ছিলাম। এখনো আছি প্রেসক্লাবের আড্ডায়, প্রেস কনফারেন্সে, জনপ্রিয় টিভি টকশোতে আর সামাজিক অনুষ্ঠানে। শুরুটা হয়েছিল ষাটের দশকের শেষ দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে আমি যখন তদানীন্তন পাকিস্তান অবজারভার-এ যোগ দিই। সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম অনুসন্ধানী রিপোর্টিং করার জন্য রিসার্চ সেলে। এক বছর কাজ করার পর অবজারভার পত্রিকার রিপোর্টিং টিমে যোগদানের আদেশ। এই রোমাঞ্চকর অবস্থার মধ্যেও দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কারণ মূসাভাই তখন জাঁদরেল বার্তা সম্পাদক। অফিসে শুধু তাঁর গলার আওয়াজ শুনলেই আমরা যারা নতুন, ভয়ে তাঁর দিকে তাকাতেও পারতাম না। তাই যখন অবজারভার-এর ম্যানেজিং এডিটর মাহবুবুল হক আমাকে রিপোর্টিংয়ে যোগ দিতে বললেন, তখন দ্বিধায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম, তাঁর রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়াতেই পারব কিনা সংশয় রয়েছে, রিপোর্ট লিখব কেমন করে? কিন্তু মাহবুব ভাই মূসাভাইকে ডাকলেন। বললেন, ‘রিয়াজ অর্থনৈতিক বিষয়ে রিপোর্ট করবে। তোমাকে সে ভয় পায়, ওকে কিছু বলো না।’ মূসাভাই চোখ বড় বড় করে কটমট করে তাকালেন। তবে কিছুই বললেন না।
মরহুম শহীদুল হক, এনায়েতউল্লাহ খান (হলিডে), আতাউস সামাদ, আবদুর রহিম টাইপরাইটারের সামনে। ডেস্কে বসে আছেন মূসাভাই, কে জি (মুস্তাফা) ভাই; ভয়ে টাইপরাইটার চলে না। এর মধ্যে মূসাভাই কাছে এলেন, কী রিপোর্ট করতে হবে বললেন, আরও কিছু নির্দেশ দিলেন—কী সাইজের কাগজে টাইপ করতে হবে, কীভাবে রিপোর্ট শুরু করতে হবে—শিক্ষকের মতো এসব বলে চলে গেলেন। কাজ করতে গিয়ে দেখি, সে এক অন্য মূসাভাই, যাঁর ছিল সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞতা আর পাণ্ডিত্য গভীর, প্রখর নিউজ সেন্স, আর সহকর্মীদের জন্য মমত্ববোধ। অনেক ঘটনার মধ্যে একটা ঘটনার উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে তাঁর সাহসের পরিধি। মহাপ্রলয়ের বছর। ১৯৭০ সাল। ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় অঞ্চলে লাখ লাখ লোকের মৃত্যু। মূসাভাই বললেন, ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির হেলিকপ্টারে আমাকে পটুয়াখালী যেতে হবে। পরদিন সকালে পটুয়াখালী হয়ে চর বাইসদিয়ার ওপারে গভীর সমুদ্রে ব্রিটিশ রণতরী এইচএমএস ইনট্রিপিডে গেলাম। ওই যুদ্ধজাহাজেই হেলিকপ্টার অবতরণ করে। ওই জাহাজে হাজার হাজার যানবাহন, রাবার ডিঙি আর সেনা ত্রাণকাজে নিয়োজিত। সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে লিখতে বসলাম। সেনা জনসংযোগ বিভাগ থেকে ফোন। মেজর সালেক সিদ্দিকী (২৫ মার্চ, ’৭১-এ ঢাকায় ছিলেন এবং নয় মাস সব অভিজ্ঞতার ওপর Witness to Surrender বই লেখেন) বললেন রিপোর্টটি কীভাবে লিখতে হবে। কারণ তিনি জানতেন, রিপোর্টে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ত্রাণকাজের সমালোচনা করা হবে। মূসাভাইকে আমি মেজর সালেকের নির্দেশের কথা বললাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফোন তুলে মেজর সালেককে বললেন, ‘নাক গলাবেন না।’ ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর অবশ্য সব বদলে যায়। সালেক সিদ্দিকীদের কথায়ই তখন সব চলত। কিন্তু মূসাভাই তাঁর কথায় চলতেন না। অবশ্য তখনকার অবস্থায় তা প্রতিহত করাও ছিল দুরূহ ব্যাপার। জুন মাসের কোনো এক সময় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি দেশ ত্যাগ করেন। আমিও ঢাকা ছেড়ে চলে যাই।
মূসাভাইয়ের সংবাদ পরিবেশনায় অসংখ্য মুনশিয়ানার আরেকটি উদাহরণ দেব। ষাটের দশকে পাকিস্তান অবজারভার ছিল আইয়ুব শাহীর ত্রাস। সারা পাকিস্তানে এই কাগজের প্রভাব ছিল অনেক। সেই কাগজের নিউজ এডিটর মূসাভাই। তখন শুনতাম, পাকিস্তানে যে কয়জন তুখোড় নিউজ এডিটর ছিলেন, মুসাভাই ছিলেন তাঁদের একজন। দ্রুততার সঙ্গে কপি এডিটিং, চমকপ্রদ হেডিং আর রিপোর্ট এডিটিং ছিল দেখার মতো। একটি হেডিং আমার আজও মনে আছে। একজন লোক ৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটলেন, গন্তব্যে গেলেন। তিনি সেখানে মারা যান। লাশ আনতে একই উড়োজাহাজ দাবি করল কয়েক শ টাকা ভাড়া। মূসাভাই হেডিং দিলেন ‘Costly when dead’ (জীবিতের চেয়ে লাশের মূল্য বেশি)। আবার ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কে কত বড় বাঙালি, তা প্রমাণ করার প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে একজন রিপোর্ট করলেন—খাজা খয়ের উদ্দিন বক্তৃতায় বলেছেন, ‘কোন বোলতা হামি বাঙ্গালি না, হামি ভি বাঙ্গালি আছে।’ মূসাভাই কপিটি এডিট করে খাজা খয়ের উদ্দিনের এ কথাটি বাংলায় ইংরেজির ভেতরে পাঞ্চ করে দিলেন। তাঁর সম্পাদনার এই মুনশিয়ানা, কৌশলী পরিবেশনা সেই সময়ে ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ ধরনের আরও অনেক মজার ঘটনা আছে মূসাভাইকে নিয়ে।
যার রক্তচক্ষুর ভয়ে রিপোর্টার হতে চাইনি, সেই মূসাভাইকে পাই বড়ভাই, সাংবাদিকতার গুরু আর একজন অকৃত্রিম সুহূদ হিসেবে। তাঁর সঙ্গে মেশার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ৮০ বছর বয়সে পা দিয়েও প্রেসক্লাব মাতিয়ে রাখেন। ছোটবড় সবার সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন। তিনবার তিনি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও চারবার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ক্লাব তাঁকে আজীবন সদস্য পদের সম্মাননা দিয়েছে।
মূসাভাই রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ‘সবার মূসাভাই’ হতে পেরেছেন। দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনৈতিক অঙ্গনের সকল দলের সমর্থক ও নেতা-নেত্রীর সমান শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সন্মান এবং সবার কাছে সমান গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন ও পাচ্ছেন। তাই তাঁর অবস্থান এখন মুরব্বির আসনে। আর আমাদের সাংবাদিকদের কাছে তিনি হয়ে আছেন শুধু প্রিয় মূসাভাই, নির্ভীক ও আদর্শবাদী সাংবাদিকতার আদর্শবান অভিভাবক। আশিতে পা-দেওয়া আমাদের মূসাভাই দীর্ঘজীবী হোন।
রিয়াজউদ্দিন আহমেদ: দৈনিক নিউজ টুডে-র সম্পাদক।

আমাদের অতি প্রিয় বেগুনকে দূষিত করবেন না by ফরিদা আখতার

সবজির মধ্যে বেগুন পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুব কমই আছে। যাঁরা রান্না করেন তাঁদের কাছেও বেগুন খুবই প্রিয়। এটা রান্না করতে সহজ, সময় কম লাগে, আবার খেতেও মজা। ইলিশ মাছ দিয়ে রান্না, শুঁটকি কিংবা শুধু আলু দিয়ে ভাজি করা যায়। খিচুড়ি করলে আর কিছু না থাক, চাকা করে কেটে সরিষার তেলে ভেজে বেগুন অত্যন্ত মজা করে খাওয়া যায়। তাছাড়া বিশেষ রকম বেগুন রান্নার জন্য রান্নার বইগুলোতেও অনেক প্রণালী পাওয়া যায়। তার মানে যত সহজই হোক, বেগুনের রকমারি রান্নার নিয়ম রয়েছে। আরও মজার কথা হচ্ছে, চৈত্র মাসে তিতা গিমাশাক একটু বেগুনসহ রান্না করলে খেতে ভালো লাগে। তিতা শাক বাচ্চাদের খাওয়াতে অসুবিধা হলে এভাবে খাওয়ানো দারুণ দাওয়াই। চৈত্র মাসে তিতা খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। বেগুন ছাড়া অনেকেরই তখন চলে না। গিমা বাংলার প্রাচীন খাদ্যব্যবস্থার মধ্যে শীর্ষে। আর বেগুন মাত্রই বাংলার এমন সবজি, যাকে ছাড়া বাঙালির খাদ্যব্যবস্থার কথা ভাবাই যায় না। কিছু অসুখের জন্য খেতে নিষেধ করা হয়। সেটাও আমাদের খাদ্যব্যবস্থার অংশ। খাদ্য এবং পথ্যের ভেদজ্ঞান নিয়েই আমাদের খাদ্য, পুষ্টি ও আয়ুরক্ষা।
অনেকের আবার এলার্জি থাকে। তবে কীটনাশক বা সার ব্যবহারের কারণেই এ এলার্জির আধিক্য অধিক। বেগুন কখনোই বিষাক্ত নয়। উচ্চ ফলনশীল বা ইরি বেগুন এবং বর্তমানে হাইব্রিড বেগুনেই কেবল কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। কোনো দেশীয় জাতের বেগুনে কীটনাশক দিতে হয় না। পোকা লাগলে ছাইয়ের ব্যবহারই যথেষ্ট। বাণিজ্যিক চাষের জন্য উচ্চ ফলনশীল বেগুনে বিষ বা কীটনাশক দিতে হয়। এক বীজ বিক্রেতার কাছে তথ্য নিয়ে জানা গেছে—সুপার সোমনাথ, ড্রাগ স্টোন, চমক ইত্যাদি নামের হাইব্রিড বেগুন বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এরই সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে নানা ধরনের কীটনাশক। এই বেগুন বাজারে আসার আগ পর্যন্ত বিষ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে বেগুনের অনেক স্থানীয় জাত রয়েছে। বলা হয়, বাংলাদেশ বেগুনের অন্যতম প্রধান উত্সস্থল। এলাকাবিশেষে বেগুনের নানা ধরনও পাওয়া যায়। যেমন—পার্বত্য চট্টগ্রামের ফুতা বেগুন, গফরগাঁওয়ের তবলা বা তাল বেগুনসহ অনেক জাতের বেগুন এখনো কৃষকদের হাতে আছে। নয়া কৃষির কৃষকদের সংগ্রহ করা কয়েকটি বেগুনের জাতের নাম উল্লেখ করলেই বোঝা যাবে এসব বেগুন এখনো কৃষকেরা চাষ করছেন। যেমন—লেইট্যা, গোল, আউশা, কাটা, লম্বা, আমনে, পাহাড়ি, ক্ষুদে, তিতা, ঢোপা, বারমাসে, ডিম, বতুলা, বেগুনি, লানি, কালো, বুটকা, কামরাঙ্গা, তাল বা তবলা, সাদা, সংলা, টুপরি, ভোলানাথ, কালগোলা, ঘিকাঞ্চন, কলা, শ্যামলা, হিংলা সইলা, সাদা বীন, সবুজ লম্বা, সবুজ মোটা বেগুন ইত্যাদি। সব বেগুন দিয়ে ভর্তা হয় না, যেমন—কাটা, লম্বা, চিকন, ক্ষুদে, ঝুমকা বেগুন দিয়ে ভর্তা করে লাভ নেই। ভর্তা হয় এমন বেগুন হচ্ছে—গোল, আইসা, আমনে, ঢোপা, তবলা ইত্যাদি। ইলিশ মাছ দিয়ে রান্না করা যায় কাটা, লম্বা ও চিকন বেগুন। ঝুমকা আর ক্ষুদে বেগুনের টক রান্না ভালো হয়। ভাজির জন্য ভালো হচ্ছে গোল বেগুন, সাদা বেগুন, ভোলানাথ (দেখতে খুব সরল বলে)। শুঁটকি মাছ দিয়ে রান্নার জন্য লম্বা বেগুন ভালো। গিমাশাক দিয়ে রান্না করা যায় ঢোপা, গোল আর আউশা বেগুন। তবে একই ধরনের বেগুন বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন নামেও পাওয়া যেতে পারে। কারণ, কৃষক বেগুনের আকার বা রং বা মৌসুম হিসেবে নামকরণ করে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে পেটেন্ট করে না। তারা একই বেগুনের ভিন্ন নাম শুনে হাসি-তামাসা করে, কিন্তু মামলা করে না বা রয়্যালটি দাবি করে না। হাজার বছর ধরে কৃষক এসব বেগুন রক্ষা করে আসছে।
বেগুনের মতো এত সহজ-সরল একটি সবজি নিয়ে লেখার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বেগুন নিয়ে কোনো গবেষণার ফলাফল জানানোর জন্য নয়। আমাদের দেশে এত জাতের বেগুন থাকতে ইরি এবং হাইব্রিড বেগুন এসে আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। বেগুনের বাণিজ্যিক চাষ করে বিষাক্ত করে ফেলেছে। কিন্তু সেই পর্ব শেষ না হতেই এখন জিএম বেগুন প্রবর্তন-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইরি এবং হাইব্রিড বেগুন বাজারে আসার আগে অনেকেই জানতেও পারেনি। বাণিজ্যিক চাষের মাধ্যমে সোজা বাজারে চলে এসেছে। তারই সঙ্গে এসেছে বিষ। ঢাকার বাজারে বাণিজ্যিক চাষ করা যেসব বেগুন আসে সেগুলো বিষে ভরা। স্বাস্থ্যের জন্য এসব বেগুন নিরাপদ নয়। বেগুনের সহজ ভাবটা এর মধ্যে আর থাকে না। অর্থাত্ সহজে সিদ্ধ হয় না, খেতেও মজা লাগে না। অবশ্য বাজারে এখনো সাধারণ কৃষকের উত্পাদন করা দেশীয় জাতের বেগুনগুলোও পাওয়া যায়। বিষের বেগুনে পোকা নেই, কিন্তু বিষ আছে। দেশীয় বেগুনে দু’একটা পোকা থাকলেও ভালো, কারণ এতে বিষ নেই। বুদ্ধিমান ক্রেতারা ঠিকই দেশি জাতের বেগুন কেনেন।
কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, বেগুনকে বিষমুক্ত করার জন্য জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে বিটি-ব্রিনজাল বা বিটি-বেগুন প্রবর্তন করা হবে। ভারতের মহারাষ্ট্র হাইব্রিড সিড কোম্পানি (মাহাইকো) বহুজাতিক কোম্পানি মনসান্তোর কাছ থেকে কীট ব্যবস্থাপনার বিশেষ প্রযুক্তি Bt cry1Ac gene technology-এর লাইসেন্স পেয়ে ভারতে বিটি বেগুনের গবেষণা করেছে। মাহাইকো ভারতের দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ ফিলিপাইন বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র (বারি) এবং এটি বেসরকারি বীজ কোম্পানি ইস্ট-ওয়েস্ট সিড বাংলাদেশের মাধ্যমে প্রবর্তন করার জন্য গবেষণা করছে। অর্থাত্ মনসান্তো-মাহাইকো বিটি বেগুনের প্রবর্তন শুধু ভারতের বাজারকে নিয়ে পরিকল্পনা করেনি, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর বাজারজাত করার চিন্তাভাবনা নিয়েই এগোচ্ছে। এই প্রযুক্তি প্রবর্তনের জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি, Agricultural Biotechnology Support Project II, (ABSPII) প্রকল্পের মাধ্যমে। ফলে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশি সাহায্য পেয়েই এই প্রকল্পের কাজ করছে। জানা গেছে, প্রায় চার বছর ধরে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারি-তে বায়োটেকনোলজি বিভাগের বিজ্ঞানীরা এই বিটি বেগুনের গবেষণা করছেন। এই বেগুন কৃষকপর্যায়ে ছাড়ার আগে আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে বায়োসেফটি আইন পাস হতে হবে। বাংলাদেশে বর্তমানে বায়োসেফটি গাইডলাইন রয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন এই বায়োসেফটি গাইডলাইন অনুসারে দেশে কোনো জিএম শস্য প্রবর্তন করতে হলে দেখতে হবে, এর ফলে স্থানীয় জাত ও প্রাণবৈচিত্র্যের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না। আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে, বিটি বেগুনের গবেষণাকে আগেভাগেই যেভাবে বিজ্ঞানের অগ্রগতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে, তাতে বায়োসেফটি গাইডলাইন অনুসারে বিবেচনা করার জন্য যথেষ্ট মনোযোগ দেওয়া হবে কি না।
আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংগঠন গ্রিন পিস এ বিষয়ে বলেছে, মলিকুলার বায়োলজিতে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে চিকিত্সা-বিজ্ঞানে কিছু অবদান দেখে আমরা বাণিজ্যিক স্বার্থে পুরো প্রাকৃতিক পরিবেশকে তাদের গবেষণাগার বানিয়ে ফেলতে পারি না। প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা এবং পরিবেশের সুরক্ষা খাদ্যের জোগানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এর ওপর কোনো প্রকার হুমকি পুরো মানব জাতিকে বিপদের মুখে ফেলবে।
বিটি বেগুনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া হচ্ছে, ব্যাকটেরিয়া থেকে বিষাক্ত প্রোটিন উদ্ভাবনের জিন ব্যাকটেরিয়া থেকে আলাদা করে জেনেটিক প্রক্রিয়ায় বেগুনের জিনোমের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে বেগুনের মধ্যেই একই ধরনের বিষাক্ত প্রোটিন উত্পাদিত হয়। ফলে বেগুনের মধ্যে সাধারণভাবে আমরা যে পোকা সব সময় দেখি, সেই ব্রিঞ্জাল ফ্রুট অ্যান্ড শুটবরার বা লেদাপোকা বেগুনের গায়ে আক্রমণ করলে বা বেগুনের কোনো অংশ খেলে এগুলোর পুষ্টিনালি ছিদ্র হয়ে মারা যায়। অর্থাত্ বেগুনগাছ নিজেই তখন বিষ হিসেবে কাজ করে। কাজেই এই বেগুন উত্পাদনের সময় বাইরের কোনো বিষ ব্যবহার করতে হয় না। ইরি এবং হাইব্রিডের বিষাক্ত বেগুন চাষ দেখে যাঁরা বিরক্ত এবং আতঙ্কিত তাঁরা নিশ্চয়ই বিটি বেগুনের দিকে ঝুঁকতে পারেন। কিন্তু বিটি বেগুন এতই বিষাক্ত যে পোকা খাওয়ারও উপযোগী নয়, সেই বেগুন কী করে মানুষের খাওয়ার উপযুক্ত হতে পারে, সে প্রশ্ন কি তোলা উচিত নয়? বেগুন ছাড়াও তুলা এবং ভুট্টার ক্ষেত্রে বিটি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোনো ক্ষেত্রেই সফল হতে পারেনি। বরং বিটি তুলা চাষ করে লাখ লাখ কৃষকের সর্বস্বান্ত হয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ভারতে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। বিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষ ব্যবহার না করার কথা বলা মিথ্যা এবং প্রতারণা। আসলে বিষ ব্যবহার বন্ধ নয়, বরং বিষাক্ত বীজ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কোম্পানি বা উদ্ভাবক নিজেই কৃষককে করে দিচ্ছে। খাদ্যশস্য উত্পাদনে বিষ ব্যবহার বন্ধের একটাই উপায় আছে সেটা হচ্ছে, যে বীজ স্থান ও পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সেই পরিবেশে গড়ে ওঠা স্থানীয় বীজের ব্যবহার, মাটির উর্বরতা রক্ষা করা এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ ফসলের উত্পাদন করা। কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে বীজকে বিকৃত করলেই শস্য নিরাপদ হয়ে যায় না।
ভারতে এই বিটি বেগুনের প্রবর্তনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফলে সরকার এই বেগুনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১০। ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে মন্ত্রী জয়রাম রামেশ এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। যদিও মন্ত্রণালয়ে প্রতিষ্ঠিত জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাপ্রোভালস কমিটি (জিইএসি) বিটি বেগুনে ছাড়পত্র প্রায় দিয়ে ফেলেছিল, কিন্তু মন্ত্রী দেখেছেন, ভারতের বিজ্ঞানীদের মধ্যেও এই বিটি বেগুনের নিরাপত্তার প্রশ্নে মতৈক্য নেই এবং কৃষক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে যেসব নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলা হয়েছে উদ্ভাবকেরা তার সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। কৃষক এবং পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদের মুখে মন্ত্রী দেশের বিভিন্ন স্থানে মতবিনিময় করতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝেছেন, এই বেগুন সম্পর্কে বিটি বেগুনের ছাড়পত্র দিয়ে পৃথিবীর মধ্যে প্রথম দেশ হওয়ার গৌরব অর্জনের জন্য তাড়াহুড়োর দরকার নেই। কিন্তু ভারতে বন্ধ হলেও বিটি বেগুনের গবেষণার কাজ যেহেতু একই কোম্পানির উদ্যোগে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে শুরু হয়েছে, বাংলাদেশে এই বেগুনের ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এরই মধ্যে ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ তারিখে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি বিল ২০১০ উত্থাপিত হয়েছে। যদিও বলা হয়েছে, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি-প্রযুক্তির প্রবর্তনের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান কাজ করবে, তথাপি জিএম শস্যের ছাড়পত্র দেওয়ার জন্যও এই প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিলটিতে বিস্তারিত কী আছে তা আমরা জানি না। এ ধরনের জনগুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে জনগণের মধ্যে আলোচনা হওয়া দরকার। কারণ, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আমাদের দেশের কোটি কোটি কৃষকের ভাগ্য, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন।
শুরু করেছিলাম বেগুনের নানা জাতের কথা বলে। বাংলাদেশে বিটি বেগুন আসার অর্থ হচ্ছে, স্থানীয় জাতের বেগুন বিলুপ্ত হওয়ার পথ তৈরি করা। শুধু তাই নয়, মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের কথা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তাহলে আমাদের এই বিতর্কিত এবং পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জিএম বেগুন আনতে হবে কেন? বিদেশি কোম্পানির লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাংলাদেশে প্রাইভেট কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থ দেশের সাধারণ কৃষকের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না—এইটুকু অবশ্যই বোঝা যায়।
ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর আদর্শ ও অনুপম শিক্ষা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

আরবি বর্ষপঞ্জির ১২ রবিউল আউয়াল মানবজাতির ইতিহাসে সর্বগুণে গুণান্বিত ও শ্রেষ্ঠত্বের আলোকোজ্জ্বল প্রতিভা, নবীকুল শিরোমণি হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.){৫৭০-৬৩২ খ্রি.}এ ধরাধামে আগমন করেন এবং এদিনই তিরোধান লাভ করেন। তাই বিশ্ব মুসলিমের কাছে এ মহান দিবসটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও তাত্পর্যময়। আল্লাহ তাআলা এ বিশ্বচরাচরকে তাঁরই প্রিয় ও প্রকৃষ্ট সৃষ্টিসূত্রের আধার নূরে মুহাম্মদী দ্বারা আলোকিত, আলোড়িত এবং আন্দোলিত করেছেন। তিনি সৃষ্টির আদিকাল থেকেই প্রশংসিত মহামানব। তাঁর মাতা প্রদত্ত নাম ‘আহমাদ’ বা সর্বাধিক প্রশংসাকারী, আর দাদা প্রদত্ত নাম ‘মুহাম্মদ’ বা সর্বাধিক প্রশংসিত। পবিত্র কোরআনে ‘মুহাম্মদ’ নামটি চারবার এবং ‘আহমাদ’ নামটি একবার ব্যবহূত হয়েছে। অন্যদিকে নবী করিম (সা.)-এর ২৯টি গুণবাচক নাম ২২৪ বার সম্মানসূচক অভিধায় ব্যবহার হয়েছে। গোটা মানবজাতির জন্য এমনকি সারা দুনিয়ার জন্য রহমত ও আশীর্বাদ হিসেবে তিনি আবির্ভূত হন। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আর নিশ্চয়ই আমি তোমাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত-১০৭)
ইসলামের সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শুভ জন্মোত্সবকে বলা হয় পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। পৃথিবীর বুকে তাঁর শুভাগমন উপলক্ষে মুসলিম উম্মাহর তথা সৃষ্টিকুলের জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ উত্সব। সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সিরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলের মাধ্যমে রবিউল আউয়াল মাসটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপন করে থাকেন। ‘মিলাদুন্নবী’ আরবি দুটি শব্দে গঠিত একটি যুক্ত শব্দ, যার অর্থ নবী করিম (সা.)-এর জন্ম। ‘সিরাতুন্নবী’ শব্দটিও দুটি শব্দের সামষ্টিক রূপ, যার অর্থ দাঁড়ায় রাসুলে করিম (সা.)-এর সামগ্রিক জীবনপ্রবাহ। মিলাদুন্নবী হচ্ছে নবী করিম (সা.)-এর জন্মবিষয়ক আলোচনা যথা— কখন, কোথায়, কীভাবে, কেমন পরিবেশ পরিস্থিতিতে জন্মগ্রহণ করেছেন, আর তাঁর যাপিত জীবনে উদ্ভাসিত জীবনাদর্শগুলো হচ্ছে সিরাতুন্নবীর সারকথা। নৈতিক মূল্যবোধ-বিশ্বাস, কথাবার্তা, চলাফেরা, লেনদেন, বিয়ে-শাদি, আচার-ব্যবহার, ধর্মীয় রীতিনীতি প্রভৃতিসহ মানবজীবনের সার্বিক বিষয়ে তাঁর অনুপম শিক্ষা ও আদর্শ সিরাতুন্নবী শব্দের বিশেষণে ব্যাখ্যা হয়েছে।
বিশ্বমানবতার ভীষণ বিপর্যয়ের এক চরম সংকটময় মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পৃথিবীতে শুভাগমন ঘটে। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এ পবিত্র দিনে অসত্য, অনাচার ও পাপাচারের অবসান ঘটাতে তাঁর জন্মলগ্নে সংঘটিত অলৌকিক ঘটনায় হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত পারস্যের অগ্নিকুণ্ড নিভে যায়, রোম সম্রাটের প্রাসাদে ফাটল ধরে এবং ১২টি শীর্ষচূড়া ধসে পড়ে, কাবাগৃহের প্রতিমাগুলো কেঁপে ওঠে এবং বাহিরা হ্রদের পানি শুকিয়ে যায়। আল্লাহর পেয়ারা হাবিব সারা বিশ্বের জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, অবিচার, ফেতনা-ফাসাদ, অন্যায়ভাবে মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের মূলোত্পাটন ঘটিয়ে সত্য-ন্যায়ের শিক্ষা ও আদর্শ স্থাপন করে জাগতিক শান্তি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা বিধান করেন এবং বিশ্বমানবতার কল্যাণ, মুক্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।’ (সূরা আল-সাবা, আয়াত-২৮)
বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত, অবিসংবাদিত মহাপুরুষ বিশ্বনবী (সা.) অতুলনীয় শিক্ষার এক চিরন্তন আদর্শ। আল্লাহর একত্ববাদ তথা তাওহিদ ও রিসালাতের ক্রমধারায় শুধু জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনাই তাঁর জীবনপথের একমাত্র কর্তব্য ছিল না। তাঁকে প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল মানবগোষ্ঠীকে এ পৃথিবীতে অত্যাচার-দুর্নীতিসহ সব ধরনের জুলুম, নির্যাতন ও অন্যায় থেকে মুক্তিদানে সুখ-শান্তি ও সত্পথে পরিচালন এবং মৃত্যুর পরপারে জাহান্নামের আগুন থেকে পরিত্রাণের মাধ্যমে চিরসুখময় জান্নাতের যোগ্য করে গড়া। এভাবে মহানবী (সা.) দুনিয়াতে ইসলাম ধর্মের মিশন শান্তির মর্মবাণী নিয়ে আসেন। মানবজাতির সুদীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বাধিক সম্মানিত এবং সব নবী-রাসুলের নেতা পরিশেষে আগমন করেন। সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কোনো একটি বিশেষ দল বা সম্প্রদায়ভুক্ত নবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের মানুষের জন্য বিশ্বনবী। তাঁর পরে দুনিয়াতে আর কোনো নবীর আবির্ভাব হবে না। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘অন্য নবীগণ তাঁদের স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, আর আমি বিশ্বের সমগ্র মানবের জন্য প্রেরিত হয়েছি।’ তিনি আরও সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, ‘আমি শেষ নবী, আমার পরে আর কোনো নবী নেই।’
তাওহিদ-রিসালাতে বিশ্বাসের ভিত্তিতে সত্কর্মের একটি সুসমন্বিত ইবাদত ও আখলাকে মানবচরিত্রকে পরিশীলিত করা মহানবী (সা.)-এর ধর্ম-দর্শন, শিক্ষা-আদর্শ আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন হলো সম্পদের সামাজিক মালিকানা সৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহভীরু মানুষের জীবনকে নির্লোভ ও নিরাপদ করা। দারিদ্র্য বিমোচনে তাঁর যাকাত দর্শন পবিত্র কোরআনে উল্লিখিত হতদরিদ্রকে আটটি ভাগে শ্রেণীকরণ করে সমাজের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ৬৩ বছরের সুমহান জীবনচরিতের বর্ণাঢ্য আলেখ্য হলো তাঁর রাষ্ট্র চিন্তা। আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক ঐক্য, মানবিক সাম্যের অঙ্গীকারে মদীনা সনদের ভিত্তিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং জনকল্যাণের জন্য তিনি বিভিন্ন দপ্তর বণ্টন করে বিশিষ্ট সাহাবিদের দায়িত্ব প্রদান করে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন। তাঁর প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থায় ধনী-গরিব, ইতর-ভদ্র সবাই আইনের দৃষ্টিতে সমান ছিল। আল্লাহ তাআলা ফরমান, ‘রাসুল তোমাদের যা দেয় তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাকো।’ (সূরা আল-হাশর, আয়াত-৭)
স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) ২৭টি প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন এবং সাহাবিদের অধিনায়কত্বে ৫৭টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। এসব যুদ্ধে তীর, তরবারি, বল্লম, ঢাল-বর্মের অস্ত্রও ব্যবহূত হয়েছে, কিন্তু এগুলো কখনোই গায়ের জোরে বা মানুষকে ভয় দেখিয়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; বরং যখন ইসলামের শত্রুদের কুটিল চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র ও শক্তির বলে মুসলমানদের দেশান্তর, পরাস্ত ও নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস, তখনই কেবল আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের ময়দানে সত্য ও ন্যায়ের জন্য প্রতিরোধ সংগ্রাম করতে হয়েছে। বিশ্বায়ন তথা আন্তর্জাতিকতায় মহানবী (সা.)-এর পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো বিশ্বভ্রাতৃত্ব, মুসলিম জাতীয় চেতনা, বিশ্বব্যাপী শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রচার এবং সৃষ্টির সেবা ও জনকল্যাণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শাবলি অনুসরণ ও তাঁর শিক্ষা মেনে চলার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ প্রদান করেছেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর রাসুলের মধ্যে সুন্দরতম আদর্শ।’ (সূরা আল-আহযাব, আয়াত-২১)
পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, প্রতিবেশী সবার অকৃত্রিম শিক্ষণীয় আদর্শ ও প্রাণপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি একাধারে সমাজ সংস্কারক, ন্যায় বিচারক, সাহসী যোদ্ধা, দক্ষ প্রশাসক, যোগ্য রাষ্ট্রনায়ক এবং সফল ধর্মপ্রচারক। কেননা কল্যাণকর প্রতিটি কাজে তিনিই সর্বোত্তম আদর্শ। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যার অনুসরণ করলে তোমরা বিভ্রান্ত হবে না, তা হচ্ছে- “আল্লাহর কিতাব” এবং “তাঁর রাসুলের সুন্নাহ” (আমার জীবনাদর্শ)।’ (বুখারি ও মুসলিম)
রবিউল আউয়াল মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আনীত শিক্ষা-দীক্ষা ও তাঁর জনহিতকর আদর্শাবলিকে স্বীয় জীবনে অনুসরণের জন্য প্রয়াসী হওয়া প্রকৃত আশেকে রাসুলের নমুনা। তাই নবী করিম (সা.)-এর সিরাত তথা জীবনচরিত আলোচনা, মিলাদ মাহফিল, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, হাদিস অধ্যয়ন, সালাত-সালাম, দোয়া-দরুদ ও তাঁর সুমহান জীবনের বিভিন্ন শিক্ষণীয় দিকের ওপর গভীর আলোকপাত করে মানব জীবনে তা বাস্তবায়ন করার প্রত্যয়দীপ্ত শপথ নিতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
dr.munimkhan@yahoo.com

বাঘের কবলে মানুষের মৃত্যু, আমাদের দায় by খসরু চৌধুরী

সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণের বড় অন্তরায় সুন্দরবনে বাঘের কবলে মানুষের মৃত্যু। বাংলাদেশ সুন্দরবনে প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ জন বনচারী (সরকারি হিসাবে ২০ থেকে ২২ জন) বনের ভেতর বাঘের আক্রমণে মারা যায়। এ ছাড়া চিকিৎসার অভাবেও বাঘ-আক্রান্ত মানুষ মারা পড়ে গ্রামে ফিরে। ফলে উপদ্রুত এলাকাগুলোর পার্শ্ববর্তী গ্রামাঞ্চলের মানুষ ভয়ঙ্কর বাঘবিরোধী। প্রকৃতপক্ষে কৈখালী থেকে বেদকাশী এলাকার গ্রামাঞ্চলগুলোর এমন বাড়ি খুব কমই আছে যে বাড়ির কেউ না কেউ বাঘের আক্রমণে মারা পড়েনি।
বাঘের আক্রমণে মানুষ মারা যাওয়ার পর গ্রামবাসীর বাঘের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠাটা অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপার। মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হলো বাঘ মানুষ মারে এবং মৃত মানুষের মৃতদেহ খেয়েও ফেলে। এই খেয়ে ফেলাটা মানুষ কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারে না। সুন্দরবন-সংশ্লিষ্ট গ্রামাঞ্চলে বাঘের আক্রমণে যত মানুষ মারা পড়ে তার চেয়ে তিন গুণ বেশি মানুষ মারা যায় সাপের কামড়ে। অথচ মানুষ সাপের ব্যাপারে উদাসীন। প্রসঙ্গত, প্রাক বর্ষা, বর্ষা ও উত্তর বর্ষায় সারা দেশে গড়ে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ সাপের দংশনে মারা যায়।
এবার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে আসছি। সুন্দরবনের লোকালয়গুলোর বিরাট সংখ্যক মানুষ জীবিকার জন্য বনে ঢোকে। ইদানীং, বিশেষ করে এ বছর আইলাবিধ্বস্ত মানুষজন সুন্দরবনে বেশি ঢুকছে। এদের বেশির ভাগই বেপাশী—বন বিভাগের রাজস্ব না দিয়ে, অনুমতি না নিয়েই বনে ঢুকছে নিতান্তই পেটের দায়ে।
বাঘের মানুষ মারার প্রধান কারণ স্বাভাবিক শিকারের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। একটি স্বাভাবিক বাঘের যেটা নিয়ন্ত্রণ এলাকা, সেটাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে নেয় মানুষমারা বাঘ। স্থানিক বাঘের সঙ্গে তার সংঘাত হয় না, কারণ স্বাভাবিক বাঘ যেখানে দিনের বেলা বিশ্রামে কাটায়, মানুষমারা বাঘ সেখানে মানুষের কর্ম এলাকার খোঁজে বের হয় দিনের বেলায়।
আমি দুটি মানুষমারা বাঘের মানুষ মারা শুরু হতে বাঘগুলো মারা যাওয়া পর্যন্ত সময়কালের খোঁজ রেখেছিলাম। এদের মধ্যে চাঁদপাই রেঞ্জের মরা পশরের বাঘটির মানুষ খাওয়ার ক্যারিয়ার ছিল আড়াই বছরের। এটির মানুষ মারার কর্ম এলাকা বিস্তৃত ছিল বাংলাদেশ সুন্দরবনের প্রায় ১৬ ভাগের এক ভাগ এলাকা। এটি শিকারির হাতে মারা পড়ে ২৯ জন মানুষ মারার পর। অন্য বাঘটিও চাঁদপাই এলাকার, এর কর্ম এলাকা ছিল সুন্দরবনের এক-অষ্টমাংশ এলাকা। চার বছরে এক বাওয়ালির কুঠারের আঘাতে বাঘটির মৃত্যু হওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ মেরেছিল ৫৪ জন।
বর্তমান সময়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের কলগাছিয়া এলাকায় গত বছরের মধ্য অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত আটজন মানুষ বাঘের আক্রমণে মারা গেছে। তিনজন কোনো রকমে বেঁচে এসেছে। এ বছর ওই সব এলাকায় গোল ও গরানের ঘের পড়েছে। ওখানে কয়টি বাঘ মানুষ মেরেছে তা ঠিক জানি না। বাঘ ওখানে মানুষ মারা শুরু করেছিল গত বছরের শেষের দিকে। নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে কুয়াশার আবডালে বাঘ প্রধানত গরান গোলের কুপে হানা দিত। কুয়াশা সরে যাওয়ায় এখন অন্যান্য বনচারীর ওপর হামলে পড়ছে।
কোনো এলাকায় একটি বাঘ যখন মানুষখেকো হয়ে পড়ে, তখন বাঘটি যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে আতঙ্ক ছড়ায় এর কয়েক গুণ। উপদ্রুত এলাকার মানুষ নিজের ছায়াকেও ভয় পেতে শুরু করে।
সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চল সম্পূর্ণ সরকারের অধীনে। বন বিভাগ এর দেখভালের দায়িত্বে আছে। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে যখন কোনো মানুষ রাজস্ব দিয়ে, অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করে তখন তার নিরাপত্তার দায় সরকার তথা বন বিভাগের ওপর। দুর্ঘটনা ঘটে গেলে দুর্গত পরিবারটিকে আর্থিক সাহায্য করাও নীতিগতভাবে বন বিভাগের ওপর বর্তায়। অথচ লজ্জাকর এবং দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, এ ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য বন বিভাগের হাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। রাজস্ব দিয়ে বাঘের হাতে মারা পড়া মানুষের সাধারণ দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয় বন কর্মচারীদের সহায়তায়।
লাশ বন অফিসে এনে মৃত্যুর সার্টিফিকেট নিতে হয় বন অফিস থেকে। আমি দেখেছি, সাহায্য করতে না পারা অসহায় বন কর্মীরা অনেক সময় নিজেদের পকেটের সামান্য অর্থ দিয়ে সাহায্য করে দুর্গত পরিবারগুলোকে, যাতে অন্তত দেহাবশিষ্টের কবর দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। বাঘের কবলে মানুষ মারা পড়ার বিষয়টি হেলথ হ্যাজার্ডের অংশ। পৃথিবীর কোনো সভ্য, বন-সংরক্ষণকামী বননীতি এটা হতে পারে না। সরকারকে ব্যাপারটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। এলাকার লোকজন খ্যাপিয়ে বাঘ রক্ষা হবে না। এলাকাবাসীর জন্য অন্তত সান্ত্বনার হাত বাড়ানো দরকার এখনই।
খসরু চৌধুরী: বন বিশেষজ্ঞ।

বইমেলার অন্যপিঠ by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

দেখতে দেখতে আমরা বইমেলার একেবারে শেষে পৌঁছে গেছি। মেলাটি যখন শেষ হয়ে আসে প্রতিবারই আমার একটু মন খারাপ হয়ে যায়, এবারও হচ্ছে। আমি সিলেটে থাকি, ছুটিছাঁটায় ঢাকা যেতে পারি, তার ভেতর থেকে সময় বের করে বইমেলায় যেতে হয়। সব সময়ই সময় নিয়ে একটা টানাটানি থাকে। তাই কোনোবারই তৃপ্তি করে মেলায় ঘোরাঘুরি করতে পারি না, শখের বইগুলো কিনতে পারি না। আমি জানি, মেলার এই কয়েক সপ্তাহই শুধু দেশের সবগুলো বই আমাদের নাগালের ভেতর থাকবে। মেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় দুই-চারজনের কিছু বই ছাড়া সব বই-ই এক বছরের জন্য অদৃশ্য হয়ে যাবে। চেষ্টা করলেও সেগুলো আমরা খুঁজে পাব না। প্রতিবারই ভাবি সামনের বার চুটিয়ে বইমেলা উপভোগ করব, সেই সামনের বার আর আসে না।
তারপরও বইমেলা নিয়ে নানা রকম স্মৃতি আছে। নানা রকম অভিজ্ঞতা আছে। সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা পাঠকদের নিয়ে, আমার লেখালেখি প্রায় সবই বাচ্চাদের নিয়ে। তারা মানুষ হিসেবে আমাদের ছোট হলেও অত্যন্ত কঠিন পাঠক, ফাঁকি দেওয়ার জো নেই। প্রতি মুহূর্তে তাদের নানা অভিযোগ-অনুযোগ শুনতে হয় এবং উত্তর দিতে হয়। বইমেলাটি নতুন লেখকদের জন্যও একটি উত্তেজনাপূর্ণ জায়গা। অনেকবার এমন হয়েছে, একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে গিয়ে নতুন নতুন লেখকদের আধ ডজন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করে ফেলেছি। খারাপ অভিজ্ঞতা যে হয় না তাও নয়, গত বছর মেলায় আমার পাশে বসে থাকা চালবাজ ধরনের একজন বলে ফেলল, ‘আরে! এই দেশটা তো আসলে পাকিস্তান!’ ব্যস আর যায় কোথায়, আশপাশে যারা ছিল তারা গরম হয়ে উঠে একেবারে আক্ষরিক অর্থে সেই চালবাজ ছেলেটিকে ঘাড় ধরে বের করে দিল। এ বছর বটতলায় বসে আছি, সামনে নানা বয়সী ছেলেমেয়ের জটলা, পাশে আমার স্ত্রী বসে আছে, হঠাত্ করে সে চিত্কার করে উঠল, ‘ধরো ওই সাদা শার্টকে!’ সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে সাদা শার্টকে ধরে ফেলল, কী তার অপরাধ? সে ভিড়ের মধ্যে একটা মেয়ের ঘাড়ে চুমু খাবার চেষ্টা করছে! মানুষটি পাবলিকের কিল খেয়ে ভর্তা হয়ে যাওয়ার আগেই তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হলো।
তবে বইমেলার সবচেয়ে মধুর গল্পটি আমি শুনেছি আমাদের পরিবারের বাচ্চা কয়েকটা মেয়ের কাছে। তাদের বাবা-চাচা-মামারা সবাই লেখক, তাই তারা মেলায় ঘোরাঘুরি করতে খুব পছন্দ করে। ছোট ছোট তিনজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাত্ তারা দেখতে পেল, একটা ছোট বাচ্চা একটা বই কেনার বায়না ধরেছে। বাবা-মা নেহাতই নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ, বইটা উল্টিয়ে ভেতরে দাম দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাচ্চাটার হাত ধরে বের হয়ে এলেন। ছোট বাচ্চাটি ঠোঁট উল্টিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
আমাদের ছোট ছোট তিনটি মেয়ে তখন তখনই ঠিক করে ফেলল বাচ্চাটিকে এই বইটি কিনে দিতে হবে, কিন্তু সেটি এমনভাবে করতে হবে যেন বাবা-মা কোনোভাবেই অপ্রস্তুত না হয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে পরিকল্পনা করা হয়ে গেল। একজন ছুটে এল আমার কাছে বই কেনার টাকা নিতে, অন্যজন ছোট বাচ্চা আর তার বাবা-মাকে চোখে চোখে রাখল, অন্যজন রইল মাঝখানে। একজন দ্রুত বইটি কিনে নেয়, তারপর তিনজন মিলে এই পরিবারটির কাছে হাজির হলো, শুরু হলো একটি নাটক।
যে বইটি কিনে এনেছে সে বইটি অন্য দুজনকে দেখিয়ে বলল, ‘এই দ্যাখ, আমি এটা কিনে এনেছি!’
একজন তখন চোখ কপালে তুলে বলল, ‘এই বইটা কিনেছিস? এটা তো আমাদের বাসায় আছে।’ অন্যজন বলল, ‘নেই!’ তখন দুজন মিলে ঝগড়া শুরু করে দিল এবং অনেকেই এই বাচ্চা মেয়েগুলোর দিকে তাকাল, তাদের ভেতর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকা শিশু এবং তার বাবা-মাও আছেন।
তিনজনের ভেতর যে বড় সে তখন মধ্যস্থতা করার ভঙ্গি করে বলল, ‘ঝগড়া করে কী হবে? আয়, মাকে জিজ্ঞেস করি।’ তখনই মোবাইল ফোন বের করে মাকে ফোন করার অভিনয় করে জানা গেল, আসলেই বইটা বাসায় আছে এবং দ্বিতীয় একটা বই কেনা হয়ে গেছে।
যে বইটা কিনেছে তাকে যথেষ্ট গালমন্দ করা হলো এবং এই বাড়তি বইটি নিয়ে কী করা যায় সেটা নিয়ে তিনজনই উচ্চকণ্ঠে ভাবনাচিন্তা শুরু করে এবং তখন তারা আবিষ্কার করে, ছোট একটা শিশু লোভাতুর দৃষ্টিতে বইটির দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়ে তিনজনের একজন তখন শিশুটির বাবাকে বলল, ‘ভুল করে এই বইটা কিনে ফেলেছি। এখন এটা আমাদের বাড়তি হয়ে গেছে। আপনার ছেলে কি এটা নেবে মনে হয়?’
কথা শেষ হওয়ার আগেই শিশুটি ঝাঁপিয়ে বইটা নিয়ে নেয়, তার মুখে এ-গাল ও-গাল জোড়া হাসি। তাই দেখে বাবা-মায়ের মুখে হাসি এবং সবকিছু দেখে আমাদের তিন মেয়ের মুখেও হাসি।
সেই গল্প যখন মনে পড়ে তখন আমার মুখেও হাসি ফুটে ওঠে।

২.
আমার ধারণা ছিল, বইমেলার পুরো ব্যাপারটি বুঝি এ রকম ছোটখাটো আনন্দ-অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝাই। কিন্তু আমি আবিষ্কার করেছি এটি সত্যি নয়। বইমেলার মধ্যে একটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায় রয়েছে এবং সেই অধ্যায়টি হচ্ছে নতুন কিংবা নামীদামি নন সে রকম লেখকদের নিয়ে।
আমি ব্যাপারটি জানতাম না, মাত্র কিছুদিন আগে জেনেছি। আমার বাসায় একজন টেলিভিশন সাংবাদিক এসেছেন, তাঁর নাম বললে সবাই তাঁকে চিনবে, তাই তার নাম বলছি না। তিনি অত্যন্ত চমত্কার একজন লেখক। খুব সুন্দর সুন্দর কয়েকটা গল্পের বই রয়েছে। মেলার আগে এক লেখকের সঙ্গে অন্য লেখকের দেখা হলে লেখালেখি নিয়ে কথা বলার রেওয়াজ, আমরা তাই আমাদের লেখালেখি নিয়ে কথা বললাম এবং কার বই কোন প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে সেটা নিয়ে আলাপ করলাম। আলাপটা কীভাবে কীভাবে জানি লেখকের রয়্যালটির দিকে ঘুরে গেল এবং হঠাত্ করে আমি জানতে পারলাম এই অত্যন্ত ভালো একজন লেখক যার অনেকগুলো বই প্রকাশ হয়েছে তিনি জীবনে একটি কানাকড়িও রয়্যালটি পাননি! তাঁর প্রকাশক কোনোদিন তাঁকে কোনো রয়্যালটি দেননি, আমাকে বেশ কয়েকবার প্রকাশকের নাম জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে হলো। কারণ এই প্রকাশক বাংলাদেশের সবচেয়ে নামীদামি প্রকাশকদের একজন। তারা আমার বইয়েরও প্রকাশক। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রকাশক আমার বই প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার বাসায় এসে রয়্যালটির চেক তুলে দেন, কখনো তার উনিশ-বিশ হয়নি। আমি লেখকের নামটি বলিনি, প্রকাশকের নামও বলছি না, এ মুহূর্তে কাউকে অপ্রস্তুত করতে চাই না। তবে প্রয়োজন হলে ভবিষ্যতে অপ্রস্তুত করব না তার গ্যারান্টি দিচ্ছি না।
আমি তারপর খোঁজখবর নিতে শুরু করেছি এবং আবিষ্কার করেছি বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় দু-চারজন লেখক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দু-চারজন ব্যক্তিত্ব ছড়া প্রকাশকেরা আর কোনো লেখককে কোনো রয়্যালটি দেন না। ব্যাপারটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য ছিল এবং আমি খোঁজখবর করে নিশ্চিত হয়েছি।
বাংলা একাডেমী বইমেলায় ঠিক কত টাকার বই বিক্রি হয় তা সঠিক জানা নেই, সংখ্যাটি ২০ কোটির কাছাকাছি। জনপ্রিয় ধারার লেখকদের বই সব মিলিয়ে হয়তো কয়েক কোটি। বাংলা একাডেমীর খুব প্রয়োজনীয় কিছু বই রয়েছে, সেগুলো কত বিক্রি হয় আমার জানা নেই, যদি কয়েক কোটি ধরে নিই তাহলে অন্তত ১০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয় জনপ্রিয় নন সে রকম লেখকদের। তাদের প্রাপ্য প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকার রয়্যালটি, বাংলাদেশের কয়েক শ লেখক যদি তাঁদের সেই রয়্যালটি পেতেন তাহলে সবাই অনেকগুলো করে টাকা পেতেন। এই লেখকেরা কেউ কখনো সেই টাকার মুখ দেখেননি।
শুধু যে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য টাকার মুখ দেখেননি তা নয়, লেখক হিসেবে তাঁদের বই ছাপা হওয়ার পর বইমেলা চলাকালীন প্রকাশকেরা লেখকদের হাতে তাঁদের প্রাপ্য বইগুলোও তুলে দেন না। তার পেছনে একটা কারণও আছে, একজন লেখকের বই ছাপা হওয়ার পর তাঁর বন্ধু-বান্ধবেরা সবার আগে সেই বইটি কেনেন। লেখকের হাত থেকে উপহার হিসেবে পেয়ে গেলে তাঁরা আর সেই বইটি কিনবেন না—তাই কোনোভাবেই লেখকের হাতে বই তুলে দেওয়া যাবে না। কী নিদারুণ ছোটলোকি ব্যবহার।
আমার ভুল হতে পারে, আমি যেহেতু সাংবাদিক নই তাই সব রকম তথ্য আমার কাছে নাও থাকতে পারে। তাই আগেই ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলছি, আমি যতটুকু জানি এ দেশের প্রকাশকদের ভেতর শুধু ইউপিএল এবং বর্তমানে ‘প্রথমা’ এই দুটি প্রকাশনী লেখকদের সঙ্গে এক ধরনের চুক্তি করেন, অন্যরা কেউ এ রকম ঝামেলায় যান না। চেষ্টা করেও তাঁদের দিয়ে চুক্তি করানো যায় না। তাঁরা যে লেখকদের বই বের করেন তাতেই লেখকদের কৃতার্থ হয়ে থাকার কথা। অন্তত প্রকাশকেরা তাই ভাবেন।

৩.
আমার মনে হয় এই দেশের প্রকাশকদের পুরো ব্যাপারটি নতুন করে ভেবে দেখার সময় হয়েছে। তাঁরা যখন একজন লেখকের বই বের করেন তখন কাগজের বিলটুকু পরিশোধ করেন, ছাপাখানার বিল পরিশোধ করেন, বাইন্ডারের বিলও পরিশোধ করেন। এই বিলগুলো পরিশোধ না করার মতো দুঃসাহস তাঁরা কখনো দেখান না। তাঁদের ধরে নিতে হবে লেখকদের রয়্যালটি ঠিক সে রকম একটি বিল, সেটাও তাঁদের পরিশোধ করতে হবে। লেখকেরা সৃজনশীল মানুষ, সৃষ্টি করার মাঝে তাঁদের এক ধরনের আনন্দ আছে বলে তাঁরা গল্প, কবিতা, উপন্যাস লেখেন, বই হিসেবে সেটা প্রকাশিত হতে দেখে তাঁদের ভালো লাগে। তাঁরা নেহায়তই ভদ্র মানুষ, তাই কখনোই টাকাপয়সা নিয়ে খিটিমিটি করেন না। কিন্তু প্রকাশকদের অবশ্যই তাঁদের রয়্যালটি পরিশোধ করতে হবে। ছাপাখানার মালিক, কাগজ ব্যবসায়ী বা বুক বাইন্ডার থেকে তাঁরা কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নন।
এই বইমেলা থেকেই সেটা শুরু করা যেতে পারে। মেলা শেষে প্রকাশকেরা যখন টাকার বান্ডিল নিয়ে ঘরে ফিরবেন তখন তাঁরা যেন হিসাব করে দেখেন কোন কোন লেখকের বই বিক্রি করে তাঁরা এই টাকার বান্ডিল ঘরে এনেছেন, একটা কাগজে হিসাব করে তাঁদের রয়্যালটি বের করে লেখকদের কাছে যেন পৌঁছে দেন।
টাকার পরিমাণটুকু গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু চমত্কার একটা উপন্যাস লিখে তা থেকে যে রয়্যালটি এসেছে সেটা দিয়ে একজন লেখক যদি তাঁর পরিবারের সবাইকে নিয়ে একদিনও চাইনিজ খেতে যান, সেই আনন্দটুকু অনেক গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষদের সেই সম্মানটুকু দিতেই হবে।

৪.
এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিবছরই বইমেলায় প্রচুর বই ছাপা হয় যেগুলো আসলে ছাপা না হলেই ভালো হতো। অনেক সময় সেগুলো কোনো একটি প্রকাশনীর নামে বের হয়, যদিও আসলে লেখক নিজের পকেটের টাকা দিয়ে সেগুলো বের করেন। গ্রন্থকার হওয়ার এক ধরনের আনন্দ আছে—ছাত্রজীবনে কপোট্রনিক সুখদুঃখ নামে আমার প্রথম বইটি যখন প্রকাশ হয় এবং বাঁধাই হওয়া বইটি হাতে নিয়ে আমি যে উত্তেজনা অনুভব করেছিলাম তার কথা এখনো মনে আছে। কিন্তু যদি কোনো লেখক নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বইটি বের করেন তাহলে তাঁর মাঝে কোনো আনন্দ নেই। যাঁরা লিখতে শুরু করেছেন তাঁদের সবাইকে শুরুতে পত্রপত্রিকায় লিখতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত ভালো পত্রপত্রিকার সাহিত্য পাতায় তাঁদের লেখা ছাপা না হচ্ছে তাঁদের কোনোভাবেই একটা বই ছাপিয়ে ফেলা উচিত নয়। নতুন লেখকেরা অভিযোগ করে থাকেন অপরিচিত লেখকের লেখা পত্রিকার সম্পাদকেরা ছাপতে চান না, এটি পুরোপুরি সত্যি নয়। ভালো লেখার গুরুত্ব দেবেন না এ রকম মানুষ খুব বেশি নেই। এই কথাটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছাত্রজীবনে প্রমাণ করেছিলেন, বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে তিনি ‘অতসী মামী’ নামে একটা গল্প লিখে সেই সময়কার সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত সাহিত্য পত্রিকায় ছাপিয়েছিলেন। সেটি ছিল তাঁর প্রথম লেখা।
আজকাল নতুন লেখকদের আরও একটি ভিন্ন ধরনের সুযোগ হয়েছে, সেটি হচ্ছে ‘ব্লগ’। ইন্টারনেট ব্যবহার করে ব্লগে লেখালেখি করলে মুহূর্তেই অসংখ্য পাঠক সেই লেখালেখির মূল্যায়ন করে ফেলবেন। আমার মনে হয় ব্লগের পাঠকেরা যদি প্রতিবছরই এক-দুজন লেখককে নির্বাচন করে দেন এবং পত্রপত্রিকা তাঁদের কথা একটু প্রচার করে তাহলে নতুন লেখকদের একটু প্রাথমিক সাহায্য হয়।
বইমেলা শেষ হওয়ার পর প্রথম আলো প্রতিবছরই ‘সৃজনশীল’, ‘মননশীল’ বইগুলোর একটা মূল্যায়ন করে। চুল পাকা লেখকদের পাশাপাশি তারা তরুণ লেখকদের লেখালেখিরও একটা মূল্যায়ন করে, দুর্ভাগ্যক্রমে যখন সেটি বের হয় তখন বইগুলো আর কেনা যায় না। জনপ্রিয় দু-চারজনের এবং পাইরেটেড ভারতীয় বই ছাড়া আর কোনো বই সারা বছর কিনতে পাওয়া যায় না। কাজেই বইমেলা চলাকালীন যদি এই বইগুলোর নাম আবার নতুন করে সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া যেত তাহলে এই লেখকদের খুব উপকার হতো। প্রতিবছরই আমি ভাবি, বইমেলার শুরুতে আমার প্রিয় বইগুলোর একটা তালিকা দিয়ে আমি একটা কলাম লিখে ফেলব, আমার রুচিতে যদি কারও বিশ্বাস থাকে তাহলে তাঁরা হয়তো সেই বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখতে পারেন। এখন পর্যন্ত আমি সেটা পারিনি, সামনের বছর অবশ্যই করব। আমি নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করে রাখলাম।
এই দেশের বিবেক হচ্ছেন আমাদের লেখকেরা, তাঁদের আমাদের প্রয়োজনীয় সম্মানটুকু দিতে হবে। প্রতিষ্ঠিত লেখকেরা জীবনের শুরুতে যে ধাক্কাগুলো খেয়েছেন, নতুন প্রজন্মের লেখকদের যেন সে ধাক্কাগুলো খেতে না হয়, সেটি দেখার দায়িত্বও কিন্তু আমাদের রয়েছে।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ধর্মের কল বাতাসে নড়ে -পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সুরাহা দরকার

ধর্মের কল বাতাসে নড়া আর কাকে বলে! যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নৌপরিবহনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে মন্ত্রীর কারণে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিআরটিএ ও বিআরটিসি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দুই সংসদ সদস্য কার্যত পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন। প্রথমত, পাল্টা অভিযোগে নৌমন্ত্রীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের খণ্ডন হয় না। দ্বিতীয়ত, ওই দুই সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ উপেক্ষাও করা যায় না। দুটি অভিযোগের সত্যাসত্য নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্বতন্ত্র তদন্ত প্রয়োজন।
সংসদীয় কমিটির অভিযোগ সত্য হলে, নৌমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর বাধা সৃষ্টির জন্যই বিভিন্ন পরিবহন রুটে সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাস চলতে পারছে না। কেবল তা-ই নয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যকর হতে না পারার জন্যও মন্ত্রীর প্রভাব-প্রতিপত্তিকে তাঁরা দায়ী করেছেন। অন্যদিকে মন্ত্রীর অভিযোগ, ওই সাংসদগণ ভূমিদস্যুতাসহ নানাবিধ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। যাঁরা অভিযোগ করেছেন এবং যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা সবাই সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। এ কারণে অভিযোগটি আমলে নিতেই হয়। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রীও যখন ওই সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন, তখন বলা যায় ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’।
এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) একটি মুমূর্ষু সংস্থা। সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সরকারি তদারকের বেহাল দশায় বলা যায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ তথা বিআরটিএর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। এগুলো যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান দুটি সংস্থা। সুতরাং এর দায় কেন নৌমন্ত্রীর ওপর বর্তানো হচ্ছে তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ভেতর থেকে সংস্থা দুটি এবং সরকারের মন্ত্রীদের ভূমিকা যেহেতু প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সেহেতু মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে সুরাহা করার আলোচনা প্রয়োজন। দায়ী যিনি বা যাঁরাই হোন, প্রতিকারে গাফিলতি মোটেই কাঙ্ক্ষিত নয়। আমরা আশা করব, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এবং নৌমন্ত্রী নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করবেন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গতিশীল ও অনিয়মমুক্ত করায় উদ্যোগী ভূমিকা রাখবেন। আর এটা নিশ্চিত করায় প্রয়োজনে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও দরকার হতে পারে। যা প্রয়োজন তা করাই দায়িত্বশীলতা।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী -মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ হোক চলার পাথেয়

বছর ঘুরে আবার এল পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। মহান আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্ম ও ওফাতের পুণ্য স্মৃতিময় দিন। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বর্তমান সৌদি আরবের মক্কানগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের একই দিনে ইহলোক ত্যাগ করেন। আজকের এই দিন তাই বিশ্বের মুসলমানদের কাছে অতি পুণ্যময়, আশীর্বাদপুষ্ট একটি দিন। বিশ্বের মুসলমানদের ঘরে ঘরে এই দিন উদযাপিত হয় বিশেষ ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে। বাংলাদেশে এই দিন জাতীয় ছুটি পালিত হয়।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মধ্যে পরিপূর্ণ মানুষের যে আদর্শ প্রতিফলিত হয় তা সর্বমানবিক। তাঁকে ডাকা হতো আল-আমিন বা সত্যবাদী বলে। নবুয়তপ্রাপ্তির আগে থেকেই তিনি ন্যায়নিষ্ঠা, সততা ও সত্যবাদিতার জন্য খ্যাতিমান ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে বিশ্বমানবতার মুক্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়েছিলেন। সব মানবীয় সদ্গুণের সম্মিলন ঘটেছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে। তিনি ছিলেন অসাধারণ চিন্তাশীল মানুষ; তাঁর জীবন ছিল বিপুল কর্মময়।
সেই যুগে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল, যখন আরব ভূখণ্ডের ওই অঞ্চলে চরম নৈরাজ্য চলছিল। অশিক্ষা, কুসংস্কার, গোষ্ঠীগত বিবাদ-সংঘাত, নির্মম দাসপ্রথা, নারীর প্রতি চরম বৈষম্যসহ নানা রকম সামাজিক অনাচারে ডুবে ছিল পুরো অঞ্চল। সেই অন্ধকার সময়ে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাব ঘটে আলোর দিশারিরূপে: অন্যায়-অবিচার-অজ্ঞানতার আঁধারে ডুবে থাকা জনগোষ্ঠীকে তিনি দেখান আলোর পথ। সেই আলোর দিশা ইসলাম ধর্মের হাত ধরে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে। সার্বিক অর্থে মানব জাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্যই আবির্ভাব ঘটেছিল এই মহামানবের।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মুসলমানদের রাসুল; কিন্তু অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর মানুষকেও তিনি ভালোবাসতেন সমানভাবে। তিনি যে সত্য ও ন্যায়ের আদর্শ প্রচার করতেন তা ছিল সর্বমানবিক। এবং শুধু কথায় তিনি আদর্শ প্রচার করেননি; ন্যায় ও সত্যের পক্ষে নিজের অবস্থানকে তিনি প্রামাণ্য করে তুলেছেন নিজের জীবনযাপনে সেসব নীতি অনুসরণের মধ্য দিয়ে। সেই অর্থে তিনি ছিলেন সব মানুষের জন্য অনুসরণীয় এক ব্যক্তিত্ব। মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে মানবিক মঙ্গল সাধিত হয়; করুণা ও ভালোবাসা মানব জাতিকে হিংসা ও হানাহানি থেকে মুক্ত রাখতে পারে। হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও করুণার অনন্য দৃষ্টান্তস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। শুধু কথায় নয়, প্রতিটি বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের মনে এই শুভবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন যে মানুষ হলো আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শের আরও একটি বড় দিক হলো শান্তিবাদিতা। শান্তি, মিলন, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে তিনি আবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন গোটা মানব জাতিকে। বাধ্য না হওয়া পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ বা রক্তপাতের পথে অগ্রসর হননি এবং যুদ্ধের ময়দানেও নিষ্ঠুরতা, হিংসা পরিহার করে যুদ্ধের নিয়মে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করেছেন। আজকের দিনে তাঁর শান্তির আদর্শ গোটা বিশ্বের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক; কারণ দিকে দিকে রক্তপাত ও হানাহানি চলছে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি তাঁর অন্যতম বড় রাজনৈতিক শিক্ষা। তাঁর আদর্শ বিশ্ববাসীকে শান্তি, সম্প্রীতিতে অনুপ্রাণিত করুক—পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীতে এই আমাদের কামনা।

ধর্মযুদ্ধের আহ্বান গাদ্দাফির

কূটনৈতিক বিরোধের জের ধরে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ধর্মযুদ্ধের ডাক দিয়েছেন লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। গত বৃহস্পতিবার এক ধর্মীয় জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় এ আহ্বান জানান তিনি। গাদ্দাফির এ আহ্বানকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছেন জাতিসংঘের মহাপরিচালক সের্গেই ওরদঝোনিকিদজে।
সুইজারল্যান্ড এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। সুইজারল্যান্ডের একটি হোটেলে দুজন কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগে গাদ্দাফির ছেলে ও ছেলেবউকে গ্রেপ্তারের জেরে ২০০৮ সাল থেকে লিবিয়ার সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের কূটনৈতিক সংকট শুরু হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় লিবিয়া সুইজারল্যান্ডে তেল সরবরাহ কমিয়ে দেয় এবং সুইস ব্যাংকগুলো থেকে তহবিল সরিয়ে নেয়।

কাবুলে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত ১৬

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে গতকাল শুক্রবার আত্মঘাতী গাড়িবোমা হামলায় অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েকজন বিদেশি ও পুলিশের তিনজন সদস্য রয়েছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এএফপি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেমারাই বাশারি জানান, এ ঘটনায় আরও অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন ইতালি ও একজন ফ্রান্সের নাগরিক। আফগান সেনাবাহিনীর একজন চিকিত্সক জানান, নিহতদের মধ্যে একজন ভারতের নাগরিক।
কাবুলের শের-ই-নই এলাকার পার্ক রেসিডেন্স হোটেলের কাছে জঙ্গিরা একটি গাড়িতে বোমা নিয়ে এ হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের গুলিতে দুজন আত্মঘাতী নিহত হয়েছে। ওই এলাকায় চাকরি সূত্রে অনেক ভারতীয় বসবাস করেন। তালেবানরা এ ঘটনার দায় স্বীকার করেছে।

এবার অন্য গল্প শোনালেন গোধরার ‘প্রত্যক্ষদর্শী’

ইলিয়াস হোসেন মোল্লা। বয়স ৩২ বছর। ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের গুজরাটের গোধরায় ‘সবরমতি এক্সপ্রেস’ ট্রেনে অগ্নিসংযোগে ব্যাপক প্রাণহানির প্রত্যক্ষদর্শী। অন্তত নথিপত্র তাই বলছে। কিন্তু কথিত প্রত্যক্ষদর্শী ইলিয়াস মোল্লা বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি ওই ঘটনার সময় ছিলেন বহু দূরের মুম্বাই শহরে। জোর করে তাঁকে এখন প্রত্যক্ষদর্শী বানানোর অপচেষ্টা চলছে।
২০০২ সালে ‘সবরমতি এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ওই ঘটনায় ঝরে গিয়েছিল ৫৮টি প্রাণ। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন হিন্দুধর্মাবলম্বী। গোধরা কাণ্ডের পর গুজরাটজুড়ে মুসলিমদের ওপর চালানো হয় ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলা। প্রাণ হারান অনেক মুসলিম।
গুজরাট পুলিশ ও সুপ্রিম কোর্ট নিয়োজিত বিশেষ তদন্ত দলের (এসআইটি) কাছে ইলিয়াস মোল্লা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। ওই বিশেষ তদন্ত দলটি সবরমতি এক্সপ্রেস ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী ঘটনাবলি তদন্ত করছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এসআইটিকে সহায়তাকারী পুলিশের একজন সহকারী উপপরিদর্শক গোধরার বি ডিভিশন পুলিশ স্টেশন অভিযোগ করেন, ইলিয়াস মোল্লা সার্কিট হাউস থেকে নিখোঁজ হয়েছেন। তাঁকে ওই সার্কিট হাউসে ‘নিরাপত্তা হেফাজতে’ রাখা হয়েছিল। ওই দিনই আদালতে হলফ করে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল ইলিয়াস মোল্লার।
কিন্তু প্রকৃত গল্প আসলে অন্য রকম। ইলিয়াস মোল্লা বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি আসলে নিখোঁজ হননি। ইলিয়াস মোল্লা এখন দিল্লিতে তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে অবস্থান করছেন এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাত্কার দিয়ে যাচ্ছেন।
ইলিয়াস মোল্লা বলেন, যেদিন গোধরা কাণ্ড ঘটেছিল, সেদিন তিনি সেখানে ছিলেন না। তাই তিনি ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীও নন। ইলিয়াস বলেন, তিনি নিরাপত্তা হেফাজতে ছিলেন না। তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। ইলিয়াস মোল্লার দাবি, নির্দেশিত পথে আদালতে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করার জন্য এসআইটিকে সহায়তাকারী কর্মকর্তা ও পুলিশ তাঁর ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। তিনি বলেন, তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে ইচ্ছুক নন, তাই তিনি পালিয়েছেন। তিনি এখন আদালতের সামনে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে চান।
ইলিয়াস বলেছেন, এসআইটির প্রধান আর কে রাঘবন ও গোধরা সবরমতি মামলা পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেট আর প্যাটেলের কাছে পাঠানো এক ফ্যাক্সবার্তায় নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
ইলিয়াস মোল্লা বলেন, তিনি জিজে-জিইউ-৭৪৪৭ নম্বরের একটি ট্রাকের চালকের সহকারী ছিলেন। গত ২০০২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ট্রাকের চালক ইরফান উদালিয়াসহ তিনি মুম্বাই যান। সেখান থেকেই তাঁরা গোধরা হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে জানতে পারেন।
ইলিয়াসের অভিযোগ, ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর ২০০২ সালের ১৪ জুলাই গোধরা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। হত্যার হুমকি দিয়ে অনেকগুলো স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতিতে তাঁকে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। ওই স্বীকারোক্তির মধ্যে ছিল তিনি সবরমতি এক্সপ্রেসের চেইনে টান দিয়েছিলেন এবং দুজন মুসলিমকে এস-৬ বগিতে আগুন ধরিয়ে দিতে দেখেছেন। ইলিয়াস বলেন, এরপর থেকেই পুলিশের সঙ্গে তাঁর ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছে। প্রথমে ওই খেলা ছিল পুলিশের সঙ্গে। এখন তাঁর সঙ্গে যোগ হয়েছে এসআইটিকে সহায়তাকারী পুলিশ কর্মীরা।

থাকসিনের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছেন থাই সুপ্রিম কোর্ট

থাইল্যান্ডের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার ১৪০ কোটি ডলারের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পক্ষে আদেশ দিয়েছেন থাইল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্ট; যা তাঁর জব্দ করে রাখা সম্পদের অর্ধেকেরও বেশি। গতকাল শুক্রবার আদালত ওই রায় দেন।
আদালতের রায়ে বলা হয়, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা টেলিযোগাযোগ কোম্পানিতে তাঁর অংশীদারি থাকার বিষয়টি গোপন করেছেন। তাঁর ২৩০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করা হবে কি না, এ-সম্পর্কিত রায় দেওয়ার সময় আদালত এ কথা বলেন।
আদালতের রায় থাকসিনের বিপক্ষে গেলে তাঁর সমর্থকেরা সহিংস প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন—এই আশঙ্কায় দেশজুড়ে হাজার হাজার সেনাসদস্য ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম দিনটিকে ‘জাজমেন্ট ডে’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
নয় বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টায় রায় পড়তে শুরু করেন। আদালতে থাকসিনের পরিবারের কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। আইনজীবীরা তাঁর প্রতিনিধিত্ব করেন।
দুইবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। দুর্নীতির দায়ে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কারাদণ্ড এড়াতে থাকসিন এখন স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন।

রিপাবলিকানদের ছাড়াই স্বাস্থ্য বিল পাস করতে যাচ্ছেন ওবামা

বহুল আলোচিত মার্কিন স্বাস্থ্যসেবা আইন প্রণয়ন নিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেননি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। তার পরও প্রেসিডেন্ট ও ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা বলেছেন, রিপাবলিকানদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়াই একতরফা স্বাস্থ্য সংস্কার আইন প্রণয়ন করা হবে। জনগণের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার আর অবকাশ নেই।
স্বাস্থ্যনীতিসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন প্রায় চূড়ান্ত হয়ে উঠেছিল গত ডিসেম্বরে। পরে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ওই বিল পাস হয়। তার পরও বিলটি নিয়ে সমালোচনা ও বিরোধী দল থেকে তীব্র প্রতিবাদ ওঠায় গত বৃহস্পতিবার ‘সমঝোতা’ সভার ডাক দিয়েছিলেন বারাক ওবামা। হোয়াইট হাউসে আইনপ্রণেতাদের সভাটি সঞ্চালন করেন খোদ প্রেসিডেন্ট ওবামা। উভয় দলের নেতৃস্থানীয় আইনপ্রণেতাদের উন্মুক্ত এ বিতর্কটি রেডিও-টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়। টানা সাড়ে সাত ঘণ্টার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বৈঠকটি। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উভয় দলের মতপার্থক্য আলোচনায় তীব্র হয়ে ওঠে। নিজের অবস্থান থেকে কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি হয়নি।
সরকারি ভর্তুকি দিয়ে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা চালু নিয়ে মার্কিন সমাজে বিতর্ক চলছে দীর্ঘদিন ধরে। চরম বিতর্কের মধ্যে কংগ্রেসে স্বাস্থ্যবিমা আইন প্রণয়নের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ নিয়ে জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে; প্রভাব পড়েছে ডেমোক্র্যাটের জনপ্রিয়তায়। এর মধ্যে নিউজার্সি ও ভার্জিনিয়ায় রাজ্য গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের পরাজয় ঘটে। আইন প্রণয়নের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান প্রচারণা তীব্রও হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় আসছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নিজ অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন।
বৈঠকে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা চালু হলে দেশ দেউলিয়া হয়ে পড়বে। জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে। রিপাবলিকান দলের প্রভাবশালী কংগ্রেসম্যান এরিক কেনটর বলেন, ‘আমাদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা খাত সংস্কার নিয়ে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা কমিয়ে আনা দুরূহ। ১০ বছরে স্বাস্থ্যবিমা খাতে সরকারের এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে।’ বেশি ব্যয়ই এ প্রস্তাবটির মূল সমস্যা বলে তিনি উল্লেখ করেন। রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী সিনেটর জন ম্যাককেইন তাঁর বক্তব্যে একে একে প্রেসিডেন্ট ওবামার স্বাস্থ্যনীতির বিভিন্ন অনুষঙ্গের সমালোচনা তুলে ধরেন। তবে বক্তব্যের মাঝপথে তাঁকে থামিয়ে দেন প্রেসিডেন্ট ওবামা।
সভায় প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, ‘শিশুদের মতো পদক্ষেপ নিয়ে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। স্বাস্থ্যবিমার জন্য জনগণের আরও পাঁচ দশক অপেক্ষার অবকাশ নেই।’
স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিসহ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা আভাস দিয়েছেন, রিপাবলিকানদের পাশ কাটিয়েই তাঁরা স্বাস্থ্যবিমা আইন প্রণয়ন করবেন।

ভারত-পাকিস্তান বৈঠক উৎসাহব্যঞ্জক: কৃষ্ণা

ভারত-পাকিস্তান পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠককে ‘উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা। গতকাল শুক্রবার ভারতীয় পার্লামেন্টে তিনি এ কথা বলেন। এর কয়েক ঘণ্টা আগে সফররত পাকিস্তানি পররাষ্ট্রসচিব সালমান বশিরের সঙ্গে বৈঠক করেন কৃষ্ণা।
গত বৃহস্পতিবারের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে ভারত অভিযোগ করেছে, মুম্বাই হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের দুজন সেনা কর্মকর্তা জড়িত। ওই সেনা কর্মকর্তাদের তথ্যসহ একটি দলিল ইসলামাবাদকে সরবরাহ করে তাঁদের হস্তান্তর করার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
গতকাল পার্লামেন্টে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আলোচনা আবার শুরু করা ও দুই দেশের সরকারের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ বৈঠক একটি উত্সাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ। তবে আমরা সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে ইসলামাবাদের কাছ থেকে আরও বেশি কিছু আশা করছি।’
এর আগে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী কৃষ্ণার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে এক ঘণ্টা বৈঠক করেন সালমান বশির। আগের দিনের বৈঠকে উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয়েও তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। এ সময় ভারতে পাকিস্তানের হাইকমিশনার শহীদ মালিক উপস্থিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবারের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকে ভারতীয় পক্ষ জানায়, মেজর ইকবাল ও মেজর সামির আলী নামের পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর দুজন কর্মকর্তাকে মুম্বাই হামলায় জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন জামাত উদ দাওয়াহর প্রধান হাফিজ সাইদকেও তাদের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে নয়াদিল্লি।
সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে জানানো হয়েছে, ভারত সব মিলিয়ে ৩৩ জন সন্ত্রাসীকে হস্তান্তর করার জন্য পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানি জঙ্গিদের পাশাপাশি ১৭ জন ভারতীয় মুজাহিদীনের তথ্যও ইসলামাবাদকে দিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান এসব মুজাহিদীনকে আশ্রয় দিচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব মুম্বাই হামলার ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও হাফিজ সাইদ-বিষয়ক দলিলটিকে ‘গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভারতীয় পক্ষ জানিয়েছে, তারা পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। কিন্তু ইসলামাবাদকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করতে হবে। আর পাকিস্তান সার্বিক আলোচনা আবার শুরু করার ব্যাপারে জোর দিয়েছে।
পাকিস্তানের সংবাদপত্রে প্রতিক্রিয়া: ভারত-পাকিস্তান পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক নিয়ে গতকাল মোটামুটি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রগুলো। বেশির ভাগ পত্রিকার প্রধান সংবাদ ছিল এই বৈঠক নিয়ে। প্রভাবশালী পত্রিকা ডন-এর প্রধান শিরোনাম ছিল, যোগাযোগ বজায় রাখার ব্যাপারে অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি। ডেইলি টাইমস শিরোনাম করেছে, শান্তি-প্রক্রিয়ার বাধা দূর করতে ব্যর্থ পাকিস্তান, ভারত। দ্য নিউজ লিখেছে, দিল্লির দ্বিমুখী বক্তব্য আলোচনাকে পথভ্রষ্ট করেছে। দ্য নেশন-এর শিরোনাম ছিল, অর্থহীন আলোচনা অর্থহীন পথেই শেষ হলো। দ্য পোস্ট বলেছে, সামগ্রিক আলোচনার ব্যাপারে ভারতের ‘না’।

ঢাকার বাইরে

রাজশাহীর খেলা: জিয়া স্মৃতি ক্রিকেটে তালতলা একাদশ (১০৮) ২৪ রানে এমবিসিএ দলকে (৮৪/৯), এশিয়ান দল (১৪৯/৭) ৩০ রানে বায়া ক্রিকেট একাডেমিকে (১১৯/৮) এবং বিশাল একাদশ (১২০) ৩৫ রানে কাজলা ঈদগাহ সংঘকে (৮৫) হারিয়েছে। প্রথম বিভাগ ভলিবল: বন্ধন ক্রীড়াচক্র ২৫-১৯, ২৫-১৫, ২৫-১৮ পয়েন্টে গ্রিন স্টার ক্লাবকে এবং সিটি ক্লাব ২৫-১২, ২৫-১২, ২৫-১০ পয়েন্টে মডার্ন বক্সিং ক্লাবকে হারিয়েছে।—রাজশাহী অফিস
শেরপুরে টি-টোয়েন্টি: শেরপুরে জিএমপিএল টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের উদ্বোধনী ম্যাচে মৈত্রীবাড়ী একাদশ (১২৪) ৩৪ রানে হারিয়েছে অ্যাকটিভ ক্লাবকে (৯০)। জয়ী দলের স্বাধীন ম্যাচ-সেরা।—শেরপুর প্রতিনিধি
বানিয়াচংয়ে ক্রিকেট: সিরাজুল হোসেন খান স্মৃতি ক্রিকেটে কাল ব্রাইট ফিউচার ক্লাব (১৭৩/৯) ৩৯ রানে হারিয়েছে জোড়াসিক স্পোর্টিং ক্লাবকে (১৩৪)। জয়ী দলের সুমন ম্যান অব দ্য ম্যাচ।—বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
দাউদকান্দিতে ফুটবল: দাউদকান্দির গৌরীপুর সুবল-আফতাব উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আশরাফ চৌধুরী স্মৃতি ফুটবলের উদ্বোধনী ম্যাচে ট্রাইব্রেকারে গৌরীপুর স্পোর্টিং ক্লাব ৯-৮ গোলে হারিয়েছে ঢাকার মনসুর স্পোর্টিং ক্লাবকে। খেলায় সেরা খেলোয়াড় জয়ী দলের আলমগীর হোসেন।—দাউদকান্দি (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
নোয়াখালী গোল্ডকাপ ফুটবল: নোয়াখালী জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবলে কাল কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা একাদশ সৌরভ ও কল্লোলের গোলে ২-০ ব্যবধানে হারায় লক্ষ্মীপুর জেলা দলকে। টুর্নামেন্টে খেলছে ২২টি দল।

কমনওয়েলথ শ্যুটিং

দিল্লিতে অনুষ্ঠানরত কমনওয়েলথ শুটিংয়ে কাল মেয়েদের ৫০ মিটার প্রোনের ব্যক্তিগত ইভেন্টে ৫৭৬ স্কোর করে আঠারোতম হয়েছেন সাবরিনা সুলতানা। ৫৭০ স্কোর করে ২০তম তৃপ্তি দত্ত। সোনাজয়ী ওয়েলসের জোহানেলের স্কোর ৫৯২।
৫০ মিটার প্রোনে ছেলেদের দলগত ইভেন্টে ১১৫৯ পয়েন্ট করে অষ্টম বাংলাদেশের আবদুল্লাহ হেল বাকি ও তৌফিক শাহরিয়ার। আবদুল্লাহর স্কোর ৫৮২, তৌফিকের ৫৭৭। ১১৮৬ স্কোর করে সোনা জিতেছে ভারত, রুপাজয়ী ইংল্যান্ড দলের স্কোর ১১৮২।

টেন্ডুলকারের আগেও ক্লার্ক!

ওয়ানডের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটি করেছেন কে? ভাবছেন, এ আবার কেমনতর প্রশ্ন! পাড়ার বুড়ো দাদু থেকে বাড়ির ছোট খুকিটি পর্যন্ত জানে, এই সেদিন গোয়ালিয়রে সেই কীর্তি গড়েছেন শচীন টেন্ডুলকার। ভুল জানেন! টেন্ডুলকার নন, ওয়ানডের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটি করেছেন বেলিন্ডা ক্লার্ক! হ্যাঁ, ঘরোয়া নয়, আন্তর্জাতিক ম্যাচেই ক্লার্কের এই কীর্তি।
বিভ্রান্ত হবেন না। ক্লার্ক আসলে ব্যাটসম্যান নন, ব্যাটসওম্যান। অস্ট্রেলিয়া মহিলা দলের এই সাবেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার ১৯৯৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ডেনমার্কের বিপক্ষে খেলেছিলেন অপরাজিত ২২৯ রানের ইনিংস। এখনো নারী-পুরুষ মিলে ওয়ানডের সর্বোচ্চ ইনিংস সেটাই।
মজার ব্যাপার হলো, ক্লার্কের এই কীর্তি কিন্তু টেন্ডুলকারের বাড়ির উঠোনেই! সে বছর মহিলা বিশ্বকাপের ষষ্ঠ আসর বসেছিল ভারতে। ডেনমার্কের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচটি হয়েছিল মুম্বাইয়ে। ওপেন করতে নেমে ১৫৫ বলে ২২টি চারে এই ইনিংসটি খেলেন অস্ট্রেলিয়ার তখনকার অধিনায়ক। ৫০ ওভারে ৩ উইকেটে ৪১২ রান তোলে অস্ট্রেলিয়া। জবাবে ৪৯ রানে অলআউট হয়ে ডেনমার্ক ম্যাচটা হেরে যায় ৩৬৩ রানে!
প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখা ভালো, পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপ শুরুর আগেই কিন্তু মেয়েদের বিশ্বকাপের শুরু। তার পরও মেয়েদের খেলাটি এখনো পিছিয়ে আছে অনেক। ১৯৯৭ সালের ওই বিশ্বকাপটি যেমন টিভিতে সম্প্রচার করা হয়নি, মাঠেও দর্শক ছিল হাতেগোনা। ওই ম্যাচের দায়িত্ব পালন করা ভারতীয় আম্পায়ার এমআর সিং যেমন আফসোস করেই বললেন, ‘ক্লাব হাউসে বসে থাকা গুটিকয় দর্শক ছাড়া খুব কম মানুষই ওই দুর্দান্ত ইনিংসটা দেখেছে। আমি আজও ভুলতে পারি না সেই ইনিংসটার কথা।’
ক্লার্ক অবসর নিয়েছেন ২০০৫ সালে। ১৫ টেস্টে ৯১৯ আর ১১৮টি ওয়ানডেতে রান করেছেন ৪৮৪৪। টেস্টে দুটি আর ওয়ানডেতে পাঁচটি সেঞ্চুরিও আছে ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ সম্মানে ভূষিত এই ৩৯ বছর বয়সী নারীর।

ম্যারাডোনার কাছে আগে অনুশীলন

তারিখ পর্যন্ত ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু বেঁকে বসেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। কানাডার বিপক্ষে রিভারপ্লেট স্টেডিয়ামে ২৪ মের প্রীতি ম্যাচ খেলায় অনাস্থা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার কোচ।
ইউরোপিয়ান মৌসুম শেষ করে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা একসঙ্গে হবেন এই মে মাসে। সমর্থকেরা যাতে বিশ্বকাপের আগে প্রিয় দলকে শুভেচ্ছা জানাতে পারে, মূলত সেই কারণেই আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশন (এএফএ) আয়োজন করেছিল এই প্রীতি ম্যাচের। কিন্তু ম্যারাডোনা ‘অহেতুক’ তাঁর খেলোয়াড়দের ক্লান্তি বাড়াতে চান না বলেই আপত্তি করে বসেছেন এতে।
ম্যারাডোনার কাছে দলের অনুশীলনটাই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি, আর চান দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় (বিশ্বকাপের ক্যাম্প) যাওয়ার আগে দল নিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট গিয়ে অনুশীলন করবেন। মে মাসের শেষের দিকে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবেন ইউরোপেই। এই পরিকল্পনার কথা এএফএ স্পোর্টিং পরিচালক কার্লোস বিলার্দোকে জানিয়ে ম্যারাডোনা বলেছেন, ‘আমি কানাডার বিপক্ষে খেলতে চাই না। লিগ বা চ্যাম্পিয়নশিপ শেষ হবে অনেক দেরিতে। অনেক অনেক ম্যাচ খেলে আসবে খেলোয়াড়েরা। ওদের আমি চার-পাঁচ দিন বিশ্রাম দিতে চাই। আমরা আসলে প্রস্তুতির দিকে নজর দিতে চাই, ম্যাচ খেলায় নয়।

হকি বিশ্বকাপের শুরুতেই ভারত-পাকিস্তান লড়াই

পাকিস্তান হকি অধিনায়ক জিশান আশরাফের জন্য কালকের দিনটি অন্য রকমও হয়ে যেতে পারে। কাল তাঁর ৩২তম জন্মদিনেই নয়াদিল্লিতে বিশ্বকাপ হকির প্রথম ম্যাচে পাকিস্তান মুখোমুখি হচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের। জিশান বলে দিয়েছেন, ‘এটা আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচ।’
আয়োজকদের দাবি, দিল্লির ১৯,০০০ দর্শক ধারণক্ষম ধ্যানচাঁদ জাতীয় স্টেডিয়ামের সব টিকিটই বিক্রি হয়ে গেছে। তা হতেই পারে! ক্রিকেটই হোক, হকিই হোক—ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উত্তেজনা তো কম নয়।
গত বেইজিং অলিম্পিকে যাওয়ার টিকিটই পায়নি ভারত। এবার স্বাগতিক হওয়ার সুবাদে খেলছে বিশ্বকাপে। জার্মানিতে ২০০৬ সালের সর্বশেষ বিশ্বকাপে ১২ দলের মধ্যে হয়েছিল ১১তম। অষ্টম অলিম্পিক সোনা জিতেছিল সেই ১৯৮০ সালে। সাফল্যের জন্য মুখিয়ে থাকা ভারত ১২ জাতির এই টুর্নামেন্টে খেলবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আশায়। পাকিস্তানও চাইছে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরতে।
‘এ’ গ্রুপে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানি, নেদারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, আর্জেন্টিনা ও কানাডা। ‘বি’ গ্রুপে ভারত, পাকিস্তান ছাড়াও খেলবে অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

কক্সবাজারে বিচ ফুটবল উৎসব

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের সিগাল পয়েন্টে কাল শুরু হয়েছে দেশের প্রথম বিচ ফুটবল টুর্নামেন্ট। ঢাকার দল মোহামেডান, আবাহনী, ব্রাদার্স, ভিক্টোরিয়া, রহমতগঞ্জ এবং কক্সবাজার মাস্টার্স নামে ৬টি দল ‘এ’ ও ‘বি’ দুটি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলছে দু দিনের এই ‘ফাইভ এ সাইড’ টুর্নামেন্টে।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী মাঠের মাপ ১২০ ও ৯০ ফুট। খেলছেন দেশের সাবেক তারকা ফুটবলাররা।
আয়োজক ‘ফুটবলের জন্য আমরা’-এর সভাপতি স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন জানান, দেশের জনপ্রিয় খেলা ফুটবলে জাগরণ ফেরাতেই এই বিচ ফুটবল, যেটির উদ্বোধন করেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু। এই উদ্যোগ নিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন শফিকুল ইসলাম (মানিক)।
প্রথম দিনে মোহামেডান মাস্টার্স ৪-৩ গোলে কক্সবাজার বিচ টিমকে, রহমতগঞ্জ মাস্টার্স ৩-২ গোলে আবাহনী মাস্টার্সকে, ব্রাদার্স মাস্টার্স ৫-৩ গোলে কক্সবাজার মাস্টার্সকে, রহমতগঞ্জ মাস্টার্স ৫-২ গোলে ভিক্টোরিয়া মাস্টার্সকে হারিয়েছে।
মোহামেডান মাস্টার্সের গোলদাতা শফিকুল ইসলাম (২টি), ইমতিয়াজ আহমেদ ও জুয়েল রানা। হ্যাটট্রিক করেছেন কক্সবাজারের আনোয়ার। রহমতগঞ্জ মাস্টার্সের পক্ষে গোল করেন রঞ্জন (২টি) ও ডন। আবাহনী মাস্টার্সের গোলদাতা স্বপন ও আসলাম।

পাকিস্তানের ক্রিকেটে বাজিকরদের হানা

বাজিকরদের সঙ্গে পাকিস্তানের কয়েকজন ক্রিকেটারের সুসময় ছিল একসময়। ক্রনিয়ে-কেলেঙ্কারির পর ক্রিকেট থেকে বাজিকরদের উত্পাত কমেছে। কিন্তু পুরো নির্মূল করা যায়নি। তার প্রমাণ মিলল আবার। খোদ পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান ইজাজ বাট জানিয়েছেন, ম্যাচ পাতানোর সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুজন ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সেই দুজন কারা সেটি প্রকাশ করা হয়নি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ধারণা, এঁদের একজন কামরান আকমল। গত অস্ট্রেলিয়া সফরে ব্যাট হাতে বাজে পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বেশ কয়েকটা ক্যাচ ফেলেছেন কামরান। তাঁর হাতে তিনবার বেঁচে যাওয়া মাইক হাসি প্রায় হারতে বসা টেস্টে জয় এনে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে। বাট জানিয়েছেন, ম্যাচ পাতানোর তথ্যপ্রমাণ পিসিবির হাতে পৌঁছে দিয়েছে আইসিসি।

জ্বলে উঠেছে তারকাপুঞ্জ!

আলো জ্বালানোর জন্য এত তোড়জোড়, অথচ আলো কোথায়? রিয়াল মাদ্রিদকে ঘিরে এই প্রশ্নটা এবার খুব শোনা গেছে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কাকা, করিম বেনজেমা, গঞ্জালো হিগুয়েইন...রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকাপুঞ্জের আলো দেখার আশা মৌসুমের শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের সেই আশা তাঁরা পূরণ করতে পারেননি প্রথম দিকে। এই অপেক্ষাই প্রশ্ন তুলেছে কবে জ্বলে উঠবে রিয়ালের নক্ষত্রপুঞ্জ?
তবে গত রোববার স্প্যানিশ লিগে ভিয়ারিয়াল-রিয়াল ম্যাচটি দেখলেই হয়তো রিয়ালের নক্ষত্রপুঞ্জের আলো দেখা হয়ে গেছে আপনার। আক্রমণাত্মক ফুটবলের পসরাই সাজিয়েছিলেন তাঁরা সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে। রোনালদো, কাকা, হিগুয়েইন—সবাই গোল পেয়েছেন। রীতিমতো গোল করার প্রতিযোগিতা চলেছিল তাঁদের মধ্যে। ৬-২ গোলে উড়ে গেল ভিয়ারিয়াল। রিয়ালের আর্জেন্টাইন তারকা হিগুয়েইন এটিকেই দেখছেন নক্ষত্রপুঞ্জের জ্বলে ওঠার সূচনা হিসেবে। স্প্যানিশ লিগে আজ টেনেরিফের বিপক্ষে ম্যাচ রিয়ালের। এ ম্যাচেও রিয়ালের নক্ষত্ররা ঠিকই জ্বলে উঠবে বলে বিশ্বাস লিগে রিয়ালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিগুয়েইনের (১৪ গোল)।
আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার মনে করছেন, ঠিক সময়ে জ্বলে উঠেছে রিয়াল, ‘আমাদের যেভাবে খেলা উচিত ঠিক সেভাবেই খেলছি।’ এএফপি।
নক্ষত্রপুঞ্জ জ্বলে উঠেছে, রিয়াল ভালো খেলছে, আগামীকালের ম্যাচটাও অবনমন এলাকায় থাকা টেনেরিফের সঙ্গে। তবু একটা ভয় তাড়া করছে রিয়াল মাদ্রিদকে। ম্যাচটি যে টেনেরিফের মাঠে। এ মৌসুমে অন্যের মাঠ যে ‘অপয়া’ হয়ে উঠেছে রিয়ালের কাছে। লিগে এ পর্যন্ত খেলা ২৩ ম্যাচের যে ১২টি খেলেছে নিজেদের মাঠে, জিতেছে সব কটিতেই। অন্যের মাঠে ৩ পরাজয়ের পাশে ড্র করেছে ১টি।
আজ খেলা আছে বার্সেলোনারও। মালাগার বিপক্ষে ম্যাচটি অবশ্য নিজেদের মাঠে খেলবে পেপ গার্দিওলার দল।

নিয়াজের ‘সিক্স সিজন’

হাঙ্গেরিতে প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ফার্স্ট স্যাটারডে’ নামে দাবা উত্সব হয়। শুধুই উত্সব নয়, খেলাও হয়। সেই ধারণা থেকে বাংলাদেশে ‘সিক্স সিজন’ আন্তর্জাতিক দাবা টুর্নামেন্ট শুরু করতে যাচ্ছেন নিয়াজ মোরশেদ। উপমহাদেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে গেছেন অনেকদূর। দু-তিন দিনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানিয়ে দেবেন।
টুর্নামেন্টের নাম ‘সিক্স সিজন’ করার কারণ, বছরে ছয়টি টুর্নামেন্ট হবে। কম-বেশিও হতে পারে। এটা নির্ভর করবে পৃষ্ঠপোষকদের ওপর।
প্রথম টুর্নামেন্টটি (মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার্স) আগামী ৭-১৪ মার্চ কক্সবাজারে হবে। মূলত মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম করার সুযোগ থাকবে এখানে। এরপর ১৫-২২ মার্চ ঢাকায় গ্র্যান্ডমাস্টার্স টুর্নামেন্ট। আমন্ত্রণমূলক দুুটি টুর্নামেন্টেই খেলবেন ১০ জন করে দাবাড়ু।
মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার্সে (ডব্লিউ জিএম) খেলতে দেখা যেতে পারে রাশিয়া, মালয়েশিয়া, ইরান, ভারতের দাবাড়ুদের। বাংলাদেশের দাবাড়ু তো থাকবেনই। গ্র্যান্ডমাস্টার্স টুর্নামেন্টে ভারতের গ্র্যান্ডমাস্টার দিব্যেন্দু বড়ুয়া এবং উজবেকিস্তানের গ্র্যান্ডমাস্টার সাঈদ আলীর আসা মোটামুটি চূড়ান্ত।
কেন এই উদ্যোগ? নিয়াজ বললেন, ‘এমনিতে বছরে এক-দুটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট করে আমাদের ফেডারেশন। এত অল্প টুর্নামেন্ট করে দেশের দাবার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হবে না। আর্থিক কারণে দেশের বাইরে গিয়ে খেলাও কঠিন বাংলাদেশের দাবাড়ুদের। ৫ জন গ্র্যান্ডমাস্টারের পর এখন পাইপলাইন খালি। আমার এই উদ্যোগ দেশের দাবাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে। যাতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলে নর্ম করতে পারে আমাদের দাবাড়ুরা।’
সারা বছরই এমনকি এখন থেকে প্রতিবছর এক-দু মাস পর পরই এই টুর্নামেন্ট করতে চান দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার, ‘ডর্লিউ জিএমের জন্য স্পনসর (প্যারাসুট অ্যাডভান্স) পেয়ে গেছি। পরেরটার জন্যও পেয়ে যাব আশা করি। স্পনসর পেলে এক-দু মাস পরপরই এটা আমি করতে থাকব। পরেরটা হতে পারে এপ্রিলে। খরচ খুব বেশি হবে না। সবার সহযোগিতা পেলে আমার পক্ষে উদ্যোগটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশেই এটা আমি করব।’
কিছুদিন ধরে ভারতে দাবা কোচিং করাচ্ছেন। ভারতের বিশাল দাবারাজ্যে নিয়াজের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আছে, আছে বিশ্বের নানা প্রান্তেও। ‘সাড়া পাচ্ছি অনেক। বেশ উত্সাহবোধ করছি’—নিজের ব্যতিক্রমী উদ্যোগটা নিয়ে কাল বলছিলেন দেশের এই ক্রীড়া তারকা।

নিউজিল্যান্ডেও সেই অস্ট্রেলিয়া

গ্রীষ্মটা কী দারুণই না কাটাল তারা। চলতি মৌসুমে দেশের মাটিতে একটি ম্যাচেও হারেনি অস্ট্রেলিয়া। নিউজিল্যান্ডে গিয়েও সেই দুর্দান্ত অস্ট্রেলিয়া! যথারীতি জয়ের ধারায়। ওয়েলিংটনে কাল প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে স্বাগতিকদের হারাল ৬ উইকেটে। দুই ম্যাচের সিরিজে এগিয়ে গেল ১-০ তে।
শন টেইট, ডার্ক ন্যানেস ও মিচেল জনসনের আগুনে বোলিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই পারেননি ম্যাককালামরা। ২০ ওভারে অলআউট হওয়ার আগে ১১৮ রান তুলতে পারে নিউজিল্যান্ড। এত অল্প রান তাড়া করতে এসেই ঝড় বইয়ে দিয়েছেন দুই ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার ও শেন ওয়াটসন। প্রথম দুই ওভারেই তারা তোলেন ২৮ রান। এরপর ৩৮ রানে পরপর দুই উইকেট হারিয়ে ফেললে রানের গতিটা একটু ধীর হয়ে আসে অস্ট্রেলিয়ার। ৩৯ রানের মাথায় জনসনকে বোল্ড করে নিউজিল্যান্ডের আশার সঞ্চার করেন শেন বন্ড। কিন্তু মাইকেল ক্লার্ককে সঙ্গী করে ২৪ বল হাতে রেখে বাকি কাজটুকু সারেন ডেভিড হাসি। চতুর্থ উইকেটে ৬৭ রানের জুটিতেই কাজ হয়ে যায়। ৩৬ বলে ৫টি চারে ৪৬ রান করেন হাসি। ১৮ রানে অপরাজিত থাকেন ক্লার্ক।
টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ৫৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলে নিউজিল্যান্ড। পঞ্চম উইকেটে হপকিনসকে নিয়ে ফ্রাঙ্কলিন ৫০ রানের জুটি না গড়লে যেন এক শ পেরোনোই দুষ্কর হয়ে যেত তাদের। ৪২ বলে ২টি চার ও ২টি ছক্কায় সাজিয়ে ফ্রাঙ্কলিন করেন সর্বোচ্চ ৪৩ রান। ১৩ বলে ২ চার ও ১ ছক্কায় ২১ রান হপকিনসের। জনসন ৩টি, টেইট, ন্যানেস ও ওয়াটসন নিয়েছেন ২টি করে উইকেট। ম্যাচ-সেরা হয়েছেন মিচেল জনসন। সিরিজের শেষ টি-টোয়েন্টি আজ। ওয়েবসাইট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
নিউজিল্যান্ড: ২০ ওভারে ১১৮ (ফ্রাঙ্কলিন ৪৩, গাপটিল ৩০, হপকিনস ২১; টেইট ২/২১, ন্যানেস ২/২২, ওয়াটসন ২/২৩ জনসন ৩/১৯)।
অস্ট্রেলিয়া: ১৬ ওভারে ১১৯/৪ (হাসি ৪৬, ওয়ার্নার ১৯, ওয়াটসন ১৯, ক্লার্ক ১৮*, হোয়াইট ১১*; বন্ড ২/৩২, ভেট্টোরি ১/১৩, ম্যাককালাম ১/২১)।