Wednesday, July 9, 2025

ইসরায়েলের যুদ্ধ ইরানকে যেভাবে বদলে দিল by হোসেইন হামদিয়েহ

ভঙ্গুর একটি যুদ্ধবিরতি তেহরানের আকাশে পরিচিত হয়ে ওঠা বিস্ফোরণের শব্দ আপাতত বিরতি দিয়েছে। আমার জন্ম হয়েছিল ১৯৮৮ সালে, ইরাক-ইরান যুদ্ধ থামার এক বছর আগে। আমাদের প্রজন্মের কাছে যুদ্ধ ছিল অতীতের বিষয়। এই গ্রীষ্ম আসার আগে তা ছিল অবিশ্বাস্য ও অকল্পনীয় একটা বিষয়।

১২ দিন ধরে, আমরা রাজধানীতে বসবাস করেছি ইসরায়েলের নিরবচ্ছিন্ন হামলার মধ্যে। আমরা যা দেখেছি, তা আমাদের চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে। আমরা দেখেছি, প্রতিবেশীদের মৃতদেহ, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাড়িঘর এবং মানুষের সীমাহীন উদ্বেগ।

‘ইরানি জনগণ’ বলার মধ্যে একধরনের স্বস্তি কাজ করে। এতে মনে হয় যেন আমরা সবাই একটি ঐক্যবদ্ধ গোষ্ঠী। কিন্তু অধিকাংশ সমাজের মতো, ইরানিদের মধ্যেও বিভিন্ন মতপার্থক্যের মানুষ রয়েছেন। এমন অনেক মানুষ ছিলেন, তাঁরা (অন্তত যুদ্ধের সূচনালগ্নে) এটা দেখে খুশি হয়েছিলেন তাঁদের অপছন্দের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) শীর্ষ নেতৃত্বকে একটি বিদেশি শক্তি লক্ষ্যবস্তু করেছে।

আবার ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে এমন অনেক মানুষ ছিলেন, যাঁরা বিদেশি শক্তির আগ্রাসনকে প্রবলভাবে ঘৃণা করেন। কিছু কট্টরপন্থী এই যুদ্ধকে দেখেছিলেন ধর্মযুদ্ধ হিসেবে। তাঁরা মনে করেছিলেন, শেষ পরিণতি না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যেতে হবে। আর কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁরা কী ঘটছে আর না ঘটছে, সে ব্যাপারে ছিলেন পুরোপুরি উদাসীন।

সাধারণ মানুষের হতাহতের ছবি আর ভিডিওতে যতই সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর ভরে উঠছিল এবং হামলা যতই কঠোর ও নির্বিচার হতে লাগল, ততই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ‘ওয়াতান’ বা জন্মভূমির ধারণাকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করলেন। দেশপ্রেম নতুন মাত্রা পেল, বেশির ভাগ মানুষের কণ্ঠে জাতীয় গৌরবের সুর অনুরণিত হলো।

আমার বিচারে ইউরোপের দেশগুলো যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেটা ইরানে ইসরায়েলের নির্বিচার আগ্রাসন চালিয়ে যেতে মূল ভূমিকা রেখেছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে মহাদেশটির নীরব থাকা অন্য দেশগুলো ইসরায়েলি হামলাকে সমর্থন দিয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবাদে সহায়তা—পুরোনো সেই যুক্তি দিয়ে দেশগুলো এই হামলার ন্যায্যতা দিয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আগামী দিনের ইরানের কল্পিত ছবি এঁকেছেন।

কিন্তু আমরা যারা মধ্যপ্রাচ্যে বাস করি, জানি বাস্তবতাটা কী। গাজার ধ্বংসযজ্ঞের ছবি প্রতিদিন আমাদের সামনে আসে। আমরা স্মরণ করতে থাকি লিবিয়ার বিশৃঙ্খলা, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইরাকে দুই দশকের দখলদারত্ব এবং আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থানের কথা। এসব সংঘাতে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, গণতন্ত্রের কোনো বীজও রোপিত হয়নি।

নিশ্চয়ই ইসরায়েলের আগ্রাসনের নগ্ন বাস্তবতা তাদের কাছেও প্রতিধ্বনিত হওয়ার কথা ছিল, যারা সঠিকভাবেই রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণকে নিন্দা করেছিল, যাতে আরেকটি যুদ্ধ আবারও এই অঞ্চলকে ধ্বংস না করে। আর নিঃসন্দেহে এই হামলাগুলো ছিল নিষ্ঠুর, উসকানিহীন ও ইচ্ছাকৃত।

জাতিসংঘ সনদের প্রতি এই অবজ্ঞার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও নিন্দার বন্যা বয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কেউই কথা বলেননি। নীরবতাটাই ছিল সবচেয়ে বড় বধিরতা। এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো ইরানিদের জীবন স্পষ্টতই অন্যদের জীবনের চেয়ে কম মূল্যবান।

আমাদের অনেকের কাছে পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলকে খোলাখুলি সমর্থন দেওয়ার ঘটনার মূল শিক্ষা ছিল এটিই। যুদ্ধ ছিল ইরানের বিরুদ্ধে, কিন্তু তার পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছিল সেই পুরোনো নীলনকশায়, সেটা হলো বর্ণবাদ।

অনেক ইরানি এখন পশ্চিমাদের এই অন্যায্যতার প্রতি ক্ষুব্ধ। এতটাই ক্ষুব্ধ যে তাঁরা এখন চান, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে। অথচ এই ধারণা এত দিন পর্যন্ত কট্টরপন্থী রাজনৈতিক মহলে সীমাবদ্ধ ছিল। এটা এখন সাধারণ মানুষের সমর্থন পাচ্ছে। যেমন একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘উত্তর কোরিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কেউই মনে হয় উদ্বিগ্ন নন।’ তিনি ইঙ্গিত করেছেন, পারমাণবিক অস্ত্রই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একমাত্র নির্ভরযোগ্য বাধা।

যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে ইসরায়েলকে বিশ্বাস করা হবে বোকামি। ইসরায়েল বারবার দায়মুক্তি নিয়েই চুক্তি লঙ্ঘনের রেকর্ড ধরে রেখেছে। এর মানে হলো বিস্ফোরণের শব্দ স্তিমিত হলেও তেহরানের ওপর এখনো ডেমোক্লসের তরবারি ঝুলে রয়েছে। দূর থেকে দেখলে, এক কোটির বেশি মানুষের এই শহর যেন আগের মতোই ব্যস্ত জীবনযাত্রায় ফিরে গেছে। কিন্তু অনিশ্চয়তা এখনো বাতাসে ভাসছে।

যে বিষয় পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে, তা হলো যুদ্ধ শেষ করার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী এখানে নেই।

* হোসেইন হামদিয়েহ, বার্লিনের হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিংস কলেজ লন্ডন থেকে ভূগোল ও নৃতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ইসরায়েলের নগ্ন আগ্রাসনে ইরানিদের মধ্যে দেশপ্রেম নতুন মাত্রা পেয়েছে
ইসরায়েলের নগ্ন আগ্রাসনে ইরানিদের মধ্যে দেশপ্রেম নতুন মাত্রা পেয়েছে। ছবি: এএফপি

ফ্লোরে পড়ে ছিল ‘জালিবি’ অভিনেত্রীর লাশ, মৃত্যু নিয়ে রহস্য

পাকিস্তানি মডেল ও অভিনেত্রী হুমাইরা আসগরকে রহস্যজনকভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে করাচির একটি ভাড়া বাসায়। গতকাল মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে তাঁর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা, হুমাইরার মৃত্যু হয়েছে অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন আগে। এখনো তাঁর সঠিক বয়স জানা যায়নি। তবে পুলিশের ধারণা, তাঁর বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, করাচির ওই ফ্ল্যাটে সাত বছর ধরে একাই থাকতেন হুমাইরা আসগর। সেখানে থেকেই কাজ করতেন। নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করতেন তিনি। তবে প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁর তেমন যোগাযোগ ছিল না।

কিছুদিন ধরে তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। পাশের বাসিন্দারা বিষয়টি টের পান এবং বাড়ির মালিককে জানান। এর আগেও মালিক একাধিকবার তাঁকে ফোন করেছিলেন, তবে কোনো সাড়া মেলেনি। এতে সন্দেহ আরও বাড়ে। পরিস্থিতি আরও গুরুতর হওয়ায় আদালতের অনুমতি নিয়ে পুলিশের একটি দল ও বাড়ির মালিক ফ্ল্যাটটিতে যান। সেখানে কয়েকবার দরজায় কড়া নাড়া ও ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে অবশেষে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন তাঁরা।

পুলিশ কর্মকর্তা ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল (ডিআইজি) সৈয়দ আসাদ রাজা জানান, দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাঁরা ফ্লোরে পড়ে থাকা লাশ দেখতে পান। তিনি বলেন, ‘দেখে মনে হয়েছে, লাশটি বেশ কিছুদিন আগের। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, মৃত্যু হয়েছে ১৫ থেকে ২০ দিন আগে। মৃতদেহে পচন ধরেছে। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য জিন্নাহ পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। মেডিকেল রিপোর্ট আসার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।’

হুমাইরার এই মৃত্যু নিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক ও রহস্য। তাঁরা পুলিশকে জানিয়েছেন, অনেক দিন ধরেই তাঁরা হুমাইরাকে দেখেননি, এমনকি তাঁর বাসায় কাউকে আসতে বা যেতেও দেখেননি। এ নিয়ে ডিআইজি আসাদ রাজা আরও বলেন, ‘আমরা মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। প্রাথমিকভাবে কিছু বলা কঠিন, তবে বিষয়টি রহস্যজনক। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে। এখনো নিশ্চিত নই, এই মৃত্যু স্বাভাবিক, নাকি এর পেছনে কোনো অপরাধ জড়িত।’

হুমাইরা আসগর প্রায় এক যুগ ধরে পাকিস্তানের বিনোদন অঙ্গনে কাজ করছিলেন। তিনি মূলত মডেলিং দিয়েই ক্যারিয়ার শুরু করেন। পরে টেলিভিশন রিয়েলিটি শো তামাশা ঘর-এর মাধ্যমে পরিচিতি পান। অভিনয় করেছেন ২০১৫ সালের আলোচিত ছবি ‘জালিবি’–তেও। সে সময় তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল। তবে সম্প্রতি তিনি কাজ কমিয়ে দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। একাকী জীবনযাপন করতেন, ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব একটা প্রকাশ্যে আসতেন না। হুমাইরার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের বিনোদন অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে তাঁর রহস্যময় মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে কেউ জড়িত কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পর জানা যাবে, মৃত্যুর নেপথ্যে কোনো অপরাধের ছায়া আছে কি না।

মডেল ও অভিনেত্রী হুমাইরা আসগর। ছবি: ইনস্টাগ্রাম
মডেল ও অভিনেত্রী হুমাইরা আসগর। ছবি: ইনস্টাগ্রাম

বিবিসির অনুসন্ধান: হাসিনার নির্দেশ- যেখানেই ওদের পাবে, গুলি করবে

ছাত্রজনতার অভ্যুত্থান দমনে সরাসরি গুলি চালানোর হুকুম দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। ফাঁস হওয়া একটি ফোনালাপ থেকে উঠে এসেছে এই তথ্য। যার সত্যতা যাচাই করেছে বিবিসি আই।

‘এক্স-বাংলাদেশ লিডার অথরাইজড ডেডলি ক্র্যাকডাউন, লিকড অডিও সাজেস্ট’ শিরোনামের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। সেখানে বলা হয়েছে, ওই অডিওতে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। বলেন- যেখানেই ওদের পাবে, গুলি করবে।

হাসিনার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তার বিচার শুরু হয়েছে। সেই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে রেকর্ডটি উপস্থাপন করতে চান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১,৪০০ মানুষ প্রাণ হারান। যদিও ভারতে পালিয়ে থাকা হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, অডিওটি ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের কোনো বেআইনি উদ্দেশ্য’ প্রমাণ করে না।

ওই ফোনালাপে শেখ হাসিনাকে একটি অজ্ঞাত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে শোনা যায়। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ যে, তিনি সরাসরি আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর হুকুম দেন। তিনি এমন আন্দোলনে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন যেখানে তার বিরুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য কোটা বাতিলের দাবিতে ওই আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। যা একপর্যায়ে গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। ফলে হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পতন হয়। ১৯৭১ সালের পর এটিই ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে রক্তাক্ত রাজনৈতিক আন্দোলন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রক্তাক্ত ছিল ৫ আগস্ট। সেদিন হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। সেসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর গণভবন ঘিরে ফেলে জনতা।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের অনুসন্ধানে ঢাকায় পুলিশি সহিংসতার বেশ কিছু অজানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। যার মধ্যে রয়েছে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা। যা আগে জানা যায়নি। ফাঁস হওয়া ফোনকলটি গত বছরের ১৮ জুলাইয়ের। তখন হাসিনা গণভবনে অবস্থান করছিলেন। তার ফোনকলের পরপরই আন্দোলন ভয়াবহতার দিকে রূপ নেয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পুলিশের গুলিতে বিক্ষোভকারীদের নিহত হওয়ার ভিডিও ঘিরে জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। এরপরের কয়েকদিনেই রাজধানীজুড়ে সামরিক অস্ত্র ব্যবহার শুরু হয়। যে বিষয়টি পুলিশের নথিতেও উঠে এসেছে।

এই কলটি রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)। অডিওটি মার্চ মাসে অনলাইনে ফাঁস হয়। যদিও কারা ফাঁস করেছে তা এখনো অজানা। তবে অডিওটি যে হাসিনার তা নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। তারা জানিয়েছে, এটি তার কণ্ঠই। বিবিসিও আলাদাভাবে ইয়ারশট নামের এক অডিও ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে এটি যাচাই করেছে।

ইয়ারশটের বিশ্লেষণে দেখা যায়, অডিওটি এডিট করা হয়নি, কৃত্রিমভাবে তৈরি বা পরিবর্তনও করা হয়নি। অডিওতে বিদ্যুৎ লাইনের ফ্রিকোয়েন্সি (ইএনএফ), ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড, কণ্ঠের ছন্দ, শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ- সব কিছুই প্রমাণ করে এটি অরিজিনাল রেকর্ড। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরামর্শদাতা বৃটিশ মানবাধিকার আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান বলেন, এই রেকর্ডগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো পরিষ্কার ও যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে। আর অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গেও এর মিল আছে।

তবে আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, আমরা নিশ্চিত নই বিবিসির  উল্লিখিত রেকর্ডটি আসল কি না।

শেখ হাসিনার পাশাপাশি সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখন পর্যন্ত মোট ২০৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ জন বর্তমানে আটক রয়েছেন।

বিবিসি আই ৩৬ দিনের বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের হামলার শত শত ভিডিও, ছবি ও নথিপত্র বিশ্লেষণ ও যাচাই করেছে। তদন্তে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার ব্যস্ত এলাকা যাত্রাবাড়ীতে একটি ঘটনায় কমপক্ষে ৫২ জনকে পুলিশ হত্যা করে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে পুলিশি সহিংসতার অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তখনকার প্রাথমিক প্রতিবেদনে ৩০ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়। চোখের দেখা ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ ও ড্রোন ইমেজ বিশ্লেষণ করে বিবিসি আই নিশ্চিত করেছে, সেনাবাহিনীর সদস্যরা যারা শুরুতে বিক্ষোভকারীদের থেকে পুলিশকে আলাদা করে রাখে, তারা স্থান ত্যাগ করার পরপরই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি ছোড়ে। ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে পুলিশ পালিয়ে যাওয়া বিক্ষোভকারীদের পেছনে গুলি চালায়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা গলিপথ ও মহাসড়ক দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পরে পুলিশ সদস্যরা কাছের একটি স্থানে আশ্রয় নেয়।

ঘণ্টা কয়েক পর বিক্ষোভকারীরা পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে যাত্রাবাড়ী থানায় আগুন ধরিয়ে দিলে ৬ জন পুলিশ সদস্যও নিহত হন । বাংলাদেশ পুলিশের এক মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে সংঘটিত সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি বলেন, তৎকালীন পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যের দ্বারা দুঃখজনকভাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ পুলিশ এই ঘটনায় নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে।

এএফপির একটি ছবিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের আগুন ধরানো যাত্রাবাড়ী থানা দেখতে লোকজন ভিড় করছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার গত মাসে শুরু হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যার আদেশ দেওয়া, বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সহিংসতা, উসকানি, ষড়যন্ত্র ও গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ সত্ত্বেও ভারত এখনো শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠায়নি। ব্যারিস্টার টবি ক্যাডম্যান বলেন, হাসিনা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন বলে মনে হয় না।

আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ দলটির কোনো সিনিয়র নেতা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা পরিচালনার দায়ে দায়ী নন। এক মুখপাত্র বলেন, তৎকালীন সিদ্ধান্তগুলো ছিল সঙ্গতিপূর্ণ, সদিচ্ছার ভিত্তিতে নেওয়া এবং প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল। তারা জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও তার সরকারের পদক্ষেপগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর, বাংলাদেশ এখন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলছে। তার সরকার জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এখনো পরিষ্কার নয় যে, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হবে কিনা।

mzamin

আমেরিকাকে হটিয়ে বিশ্ব নেতৃত্বে চলে আসবে চীন by আনা পলাসিও

এখন আর এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে পিছিয়ে আসছে। এই পিছু হটার সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত মূলত স্বেচ্ছায় নেওয়া হয়েছে। আর এতে মূল ভূমিকা রেখেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি।

আমেরিকার এই পিছু হটার ধারা একসময় স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে যদি চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) তাদের লক্ষ্য পূরণ করতে পারে, তাহলে বিশ্বে নতুন নেতৃত্বের ভূমিকায় আসবে চীন।

সম্প্রতি চীন তাদের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে। এতে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ‘সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা ধারণা’ তুলে ধরা হয়েছে। এই নথিতে দেখা যায়, দেশটির নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু প্রতিরক্ষা বা সামরিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিকসহ সব দিক একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

শ্বেতপত্রটিতে দেখা যাচ্ছে, চীন বলেছে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলো রাজনৈতিক নিরাপত্তা। সহজ করে বললে, সিপিসির নেতৃত্বই তাদের নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। এই নেতৃত্বই চীনকে একটি অস্থির বিশ্বে স্থিতিশীলতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

চীনের দাবি, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার জন্য পশ্চিমা শক্তিগুলোই দায়ী। বিশেষ করে নানা দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রই এর জন্য বহুলাংশে দায়ী।

চীনের এই কথা পুরোপুরি অমূলক নয়। কারণ, আমেরিকা নিজে যেভাবে বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে সরে আসছে, তা অনেকটা দ্বিধান্বিত ও বিশৃঙ্খল।

ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে এই বিশৃঙ্খলার শুরু হয়েছিল। এরপর তিনি কয়েক দশক ধরে চলে আসা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতিগুলোকে খারিজ করতে থাকেন। তিনি প্রথম থেকেই খেয়ালখুশিমতো বৈশ্বিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করতে চেয়েছেন। এটিও বিশ্বে অস্থিরতা তৈরির একটি বড় কারণ। ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা চালানো এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।

অবশ্য ট্রাম্পের প্রশাসনের দাবি, এই হামলা ছিল সাহসী একটি কাজ, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক হুমকি শেষ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনা। তাদের দাবি, এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ নয় বরং এটি একবারের একটি পদক্ষেপ।

তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই হামলা ট্রাম্পের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’ বা নৈতিক প্রভাবকে দুর্বল করে দিয়েছে। কারণ, বিশ্বজুড়ে এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে অহংকারী ও দ্বিচারী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই বিষয়গুলো ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। তারা মনে করছে, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য বিশ্বজুড়ে বন্ধুত্ব গড়ার দরকার নেই; বরং শক্তিশালী সামরিক শক্তি, সাইবার নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করা দরকার। এই অর্থনৈতিক রক্ষার মধ্যে রয়েছে চীনের ওপর উচ্চ শুল্ক বসানো, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উন্নত প্রযুক্তি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া।

এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার কূটনীতি কমিয়ে দিয়েছে এবং গরিব দেশগুলোতে সাহায্যও অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। অথচ শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার প্রভাব বিস্তারে এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে চীন। দেশটি এখন নিজেকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়ে নির্ভরযোগ্য একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে। দেশটি এখন বহুপক্ষীয় সহযোগিতার পক্ষের শক্তি, গরিব দেশগুলোর পক্ষে বিনিয়োগকারী ও রক্ষক এবং ন্যায়ের পক্ষের এক শান্তি-প্রত্যাশী দেশ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাচ্ছে।

এশিয়ার ৯টি দেশের সঙ্গে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম ও সহযোগিতাপূর্ণ প্রতিবেশী চুক্তি’ স্বাক্ষর করে চীন এই ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। এ ছাড়া তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মধ্যে আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গেও বিভিন্ন সহযোগিতা রয়েছে।

চীন এখন আরও বড় পরিসরে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ’ (জিএসআই) প্রচার করছে। ২০২২ সালে চালু হওয়া এই উদ্যোগ পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে জটিল ও একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা সমস্যাগুলো নিয়ে এমনভাবে কাজ করা, যাতে সব পক্ষ লাভবান হয়। মানে, সবাই লাভবান হয়, এমন সমাধান খুঁজে বের করা। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ১২০টির বেশি দেশ এই উদ্যোগে সমর্থন জানিয়েছে।

এর পাশাপাশি চীন তাদের ‘সফট পাওয়ার’ বা সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন তারা বিভিন্ন দেশে কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট খুলেছে, আফ্রিকান ইউনিয়নের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপে বসছে, আর বাণিজ্য, ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও সম্পর্ক গড়ে তুলছে।

চলতি বছরের মে মাসে চীন লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য ৯ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণসহায়তা ঘোষণা করেছে। এর বাইরেও চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) নামের বিশাল প্রকল্পের আওতায় আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে।

এই জিএসআই, বিআরআই ও অন্য প্রকল্পগুলো মিলে চীন ‘ভবিষ্যতের জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক সম্প্রদায়’ গড়ার ভিত্তি তৈরি করছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনও সব সময় নৈতিক উচ্চতার দাবি তুললেও বাস্তবে তা মেলে না। চীনের বক্তব্য হলো, চীন হচ্ছে এমন এক ন্যায়পরায়ণ, স্থিতিশীল ও আধিপত্যবিমুখ শক্তি, যা বিশ্বের জন্য, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু চীনের এই ন্যায়ের ও বহুপক্ষীয়তার কথামালাকে তার দেশের ভেতরের দমনমূলক নীতি ও আঞ্চলিক আগ্রাসী অবস্থান মিথ্যে করে দেয়। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিকীকরণ চীনের উচ্চ নৈতিকতার দাবিকে ম্লান করে দেয়।

চীন বলছে, তারা কেবল নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে তারা একের পর এক সীমান্ত দাবি আরও জোরালোভাবে উত্থাপন করছে। তাইওয়ানের বেলায় সিপিসি বলেছে, তাইওয়ানকে চীনের সঙ্গে একীভূত করতে তারা শক্তি প্রয়োগ না করার কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না এবং এর জন্য তারা প্রয়োজনে ‘যেকোনো ব্যবস্থা’ নিতে প্রস্তুত।

এই ধরনের হুমকি কার্যকর করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার চেয়েও অনেক বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। যুক্তরাষ্ট্র অন্তত দাবি করেছিল, তারা একটি আশঙ্কাজনক হুমকি প্রতিহত করার জন্যই ইরানে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু তাইওয়ান তো চীন বা তার আশপাশের কারও জন্যই কোনো হুমকি নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—এই দুই দেশের বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ধরন একেবারেই আলাদা। যুক্তরাষ্ট্র আগে (ট্রাম্পের আমলের আগে পর্যন্ত) বলত, তারা একটি নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হুমকি দমন করে, মাঝেমধ্যে সামরিক হস্তক্ষেপও করে।

কিন্তু ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র সেই নীতি থেকে সরে এসে বিশ্বকে নিজের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এতে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি বিকল্প আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

- সত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
- অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* আনা পলাসিও, স্পেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা করছেন।

সি চিন পিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
সি চিন পিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের পক্ষে গাজায় জেতা যে কারণে অসম্ভব by জসিম আল আজ্জায়ি

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন আর শুধু অস্ত্রের যুদ্ধ নয়, এটি এখন ছবি বা দৃশ্যের যুদ্ধও। গাজার ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল, অনাহারে কাতরাতে থাকা শিশু, গণকবর ও ধ্বংসস্তূপে সন্তানকে খুঁজতে থাকা বাবার ছবির মতো করুণ চিত্র—সবকিছু এখন মুঠোফোনে ধরা পড়ছে। প্রতিটি ছবিই ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি ধ্বংসাত্মক শক্তিতে মানুষের মনে আঘাত হানছে। এসব তাজা ও জলজ্যান্ত অডিও-ভিডিও ও স্থির ছবির প্রভাব প্রেস কনফারেন্স বা সরকারি ভাষণের চেয়ে অনেক বেশি। এই প্রথমবারের মতো ইসরায়েল এ দৃশ্যগুলো মুছে ফেলতে পারছে না। আগের মতো তারা প্রোপাগান্ডার স্রোতে সেগুলোকে ঢেকে ফেলতেও পারছে না।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যখন গাজায় ত্রাণ বিতরণের জায়গায় মানুষ হত্যা করছিল, সেই দৃশ্য দেখে ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ-এর লেখক গিডিয়ন লেভি ২৯ জুন লিখেছিলেন, ‘ইসরায়েল কি গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে? …গাজা থেকে যেসব সাক্ষ্য আর ছবি উঠে আসছে, তা দেখে খুব বেশি প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না।’ এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস–এর দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলপন্থী হিসেবে পরিচিত কলাম লেখক টমাস ফ্রিডম্যানও এখন ইসরায়েলের কথাবার্তায় আর আস্থা রাখছেন না। গত ৯ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে তিনি একটি নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘এই ইসরায়েলি সরকার আমাদের মিত্র নয়।’ তিনি যোগ করেন, তারা এমন আচরণ করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের জন্য হুমকি।

একসময় ইসরায়েলের গল্প বা ভাষ্যগুলোকে পশ্চিমা মিডিয়ার সম্পাদকীয় নীতিমালা আর ইতিহাসগত অপরাধবোধ রক্ষা করত। কিন্তু স্মার্টফোনের কারণে এখন সেই রক্ষাকবচ ভেঙে গেছে। এখন আমরা আর ইসরায়েলের ব্যাখ্যা শুনে বাস্তবতা বুঝতে চেষ্টা করি না। কারণ, গাজার মানুষই তাদের বাস্তব অবস্থা আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে।

যেসব অ্যাপে (যেমন টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, এক্স) গাজার ধ্বংস, কাঁদতে থাকা শিশু বা ত্রাণের লাইনে মানুষকে গুলি করার ভিডিও ছড়াচ্ছে—সেসব অ্যাপ কিন্তু কোনো ঘটনার পেছনের ইতিহাস বা ব্যাখ্যা দেয় না। অ্যাপগুলো শুধু দেখে কোন ছবি বা ভিডিও সবচেয়ে বেশি মানুষ দেখছে আর সেটাকেই বেশি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আগের প্রজন্মের লোকেরা হয়তো এসব ছবি দেখে চোখ ফিরিয়ে নেন, কিন্তু নতুন প্রজন্ম চোখ আটকে রাখে। প্রতিটি ছবি, প্রতিটি সাইরেনের শব্দ, প্রতিটি ধ্বংসের দৃশ্য তাদের মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ বিচলিত, ক্ষুব্ধ। এ ক্ষোভ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। এখন আর ইসরায়েল শুধু তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে না, তাকে ক্যামেরার লেন্সের সঙ্গেও যুদ্ধ চালাতে হচ্ছে।

এ ছবির যুদ্ধ বা ‘ভিজ্যুয়াল ওয়ার’-এর মানসিক ধাক্কা ইসরায়েলি সমাজের ভেতরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে। বহু বছর ধরে ইসরায়েলিরা নিজেদের বিশ্ববাসীর সামনে ‘নির্যাতিত’ বা ‘আঘাতপ্রাপ্ত’ জাতি হিসেবে দেখিয়ে এসেছে। এর মাধ্যমে তারা বিশ্ববাসীর সহানুভূতি কুড়িয়েছে। কিন্তু এখন প্রতিদিনের ভিডিওতে যখন ইসরায়েলিদের নির্বিচার বোমাবর্ষণ, গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত পাড়া-মহল্লা আর হাড্ডিসার শিশুদের আর্তনাদ দেখা যাচ্ছে, তখন অনেক ইসরায়েলিই গভীর নৈতিক সংকটে পড়ে যাচ্ছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, বিশ্ব আর আগের মতো তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। এখন ইসরায়েলের মধ্যপন্থী বা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা অনেক মানুষও অস্বস্তি বোধ করছেন। কারণ, গাজার বাস্তব অবস্থাসংবলিত (যেমন ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি, ক্ষুধার্ত শিশুদের মুখ, রক্তমাখা রাস্তা) ছবি ইসরায়েলের ‘নৈতিক উচ্চতা’কে ভেঙে দিচ্ছে। প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি সমাজে কথাবার্তার মধ্যে ঢুকে পড়েছে এক নতুন ভয়, ‘বিশ্ব এখন আমাদের কীভাবে দেখছে?’

আন্তর্জাতিকভাবেও এসব ছবি ইসরায়েলের কূটনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে ফেলেছে। যে পুরোনো মিত্ররাষ্ট্রগুলো একসময় চোখ বন্ধ করে ইসরায়েলকে সমর্থন দিত, তারাও এখন চাপের মুখে পড়ছে।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার পার্লামেন্ট সদস্যরা এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন, ইসরায়েলকে অস্ত্র পাঠানো কি উচিত? এ যুদ্ধের সময় তাদের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি কি রাখা উচিত? এখন যুদ্ধক্ষেত্র শুধু গাজায় সীমাবদ্ধ নেই। তা ছড়িয়ে পড়েছে পার্লামেন্টে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, শহরের কাউন্সিল দপ্তরে, এমনকি গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় কক্ষে। এটা এমন এক যুদ্ধ, যেখানে শুধু শক্তি দিয়ে জেতা যাবে না।

জসিম আল আজ্জায়ি, ইরাকি সাংবাদিক ও টিভি উপস্থাপক
- আল–জাজিরা ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ইসরায়েলি বোমা হামলায় বিধ্বস্ত স্থাপনার সামনে সন্তান কোলে ফিলিস্তিনি বাবা
ইসরায়েলি বোমা হামলায় বিধ্বস্ত স্থাপনার সামনে সন্তান কোলে ফিলিস্তিনি বাবা। ছবি: রয়টার্স

গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়ানোর পুরোনো খেলায় ট্রাম্প–নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বৈঠক করেছেন। সেখানে তাঁরা আবারও গাজা উপত্যকা থেকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক অন্যত্র পাঠানোর বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরই বিতর্কিত এই পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

গতকাল সোমবার রাতে হোয়াইট হাউসের ব্লু রুমে নৈশভোজের সময় গাজা পরিকল্পনা নিয়ে দুজনের আলোচনা হয়। তাঁরা এমন সময়ে এসব বিতর্কিত ও পুরোনো খেলায় মেতেছেন, যখন কাতারে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। ওই আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলের উগ্রবাদী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে কিছু দেশের সঙ্গে কাজ করছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের ‘ভবিষ্যৎ ভালো হয়’। তাঁর ইঙ্গিত ছিল, গাজার মানুষ চাইলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে চলে যেতে পারে।

ইহুদিবাদী এই নেতা বলেন, যদি কেউ থাকতে চায়, থাকতে পারে। তবে যদি কেউ চলে যেতে চায়, তার সুযোগ থাকা উচিত। গাজা যেন কোনো কারাগার না হয়, বরং খোলা জায়গা হয়। মানুষ যেন নিজের পছন্দ বেছে নিতে পারে, সেই সুযোগ থাকা উচিত।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি এমন সব দেশ খুঁজে বের করতে, যারা আগে থেকেই বলে আসছে—তারা চায় ফিলিস্তিনিদের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে। আমার মনে হয়, কয়েকটি দেশ পাওয়া যাচ্ছে।’

ট্রাম্প বলেছেন, ‘চারপাশের দেশগুলো থেকে দারুণ সহযোগিতা’ পাওয়া গেছে। আর তাতে ‘ভালো কিছু হবে’।

বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে ওই অঞ্চলকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভেরা’ (মধ্যপ্রাচ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত উপকূলীয় এলাকা) বানানো যেতে পারে। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

‘জাতিগত নিধনের পথ’


আল–জাজিরার জর্ডানের আম্মানের সাংবাদিক হামদাহ সালহুত বলেন, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কথা বলে আসছে। এটাকে তারা ‘স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ’ বলে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি একধরনের জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা।

সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক অ্যালন পিনকাস বলেন, কে কী বলল, সেটা দিয়ে বোঝা যাচ্ছে না যে সত্যিই কোনো বাস্তব পরিকল্পনা আছে। প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট অনেক সময় মুখে অনেক কথা বলেন। পরে তা কেবল মতামত হয়ে থাকে, বাস্তব পরিকল্পনা নয়।

অ্যালন বলেন, ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে ট্রাম্প বলেছিলেন, গাজায় ‘ফিলিস্তিনি রিভেরা’ হবে। কিন্তু ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের সেখান থেকে তাড়ানো হবে।

অ্যালন আরও বলেন, ‘মার্কিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপ এ বিষয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা করলেও সেটা বাস্তবে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং এটা গাজা নিয়ে ভবিষ্যতের কোনো শান্তিচুক্তিকে অনিশ্চিত করে তুলবে।’

ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর বৈঠকের মধ্যেই কাতারে ইসরায়েল ও হামাস টানা দ্বিতীয় দিনের মতো পরোক্ষ আলোচনা করেছে। সেখানে আলোচনায় আছে—৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হামাসের কাছে থাকা বন্দীদের পর্যায়ক্রমে মুক্তি, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং পুরো যুদ্ধ শেষ করার উপায়।

তবে কথা হচ্ছে, এই যুদ্ধবিরতির পরে কি যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হবে? হামাস বলছে, তারা গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা সম্পূর্ণ সরানোর শর্তে সব বন্দীর মুক্তি দিতে প্রস্তুত।

কিন্তু নেতানিয়াহু বলছেন, হামাস আত্মসমর্পণ করলে এবং গাজা ছেড়ে গেলে কেবল যুদ্ধ শেষ হবে। ইসরায়েলের এই শর্ত হামাস মানতে রাজি নয়।

নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফরের আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, এই সপ্তাহেই হয়তো যুদ্ধবিরতি চুক্তি হতে পারে। তবে নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি পূর্ণ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র মানেন না এবং ইসরায়েল গাজার ওপর সব সময় নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।

গতকাল সোমবার কাতারের বৈঠকে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। তবে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ কাতারে আলোচনায় যোগ দেবেন বলে জানানো হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, ‘আলোচনা সময় নেবে। আমি এখনই কোনো সময়সীমা দিতে পারছি না।’

নোবেল পুরস্কারের লোভ

এই আলোচনার কিছুদিন আগেই ট্রাম্প ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলার নির্দেশ দেন। এরপর ইসরায়েল-ইরানের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাত অবসানে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়।

গতকাল ওয়াশিংটনে বৈঠককালে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে একটি চিঠি দেন, যা দিয়ে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ট্রাম্প বিষয়টি শুনে খুশি হয়ে তাঁকে ধন্যবাদ জানান।

আল–জাজিরার ওয়াশিংটন সংবাদদাতা ফিল ল্যাভেল বলেন, সবকিছুই অনেকটা লোক দেখানো। নেতানিয়াহু নিজ দেশে এই বৈঠককে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চান। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখাতে আগ্রহী।

এর আগেও ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তিনি নোবেল পুরস্কার পেতে আগ্রহী। ভারত-পাকিস্তান ও কঙ্গো-রুয়ান্ডার মধ্যে সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তিগুলোকে নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানি কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় আগ্রহ দেখিয়েছেন। আমরা আলোচনার তারিখ ঠিক করেছি। তারা আলোচনা চায়। তারা বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে।’

ট্রাম্পের উপদেষ্টা উইটকফ বলেন, আলোচনা সম্ভবত এক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হতে পারে।

এর আগে গতকাল সোমবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক টাকার কার্লসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তেহরান বিশ্বাস করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সব দ্বন্দ্বের সমাধান সম্ভব।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু একই দিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং দূত উইটকফের সঙ্গেও বৈঠক করেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে বৈঠক হয়। এ সময় দুদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ৭ জুলাই সোমবার, ওয়াশিংটন
হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে বৈঠক হয়। এ সময় দুদেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ৭ জুলাই সোমবার, ওয়াশিংটন। ছবি: রয়টার্স

অগ্নিঝরা জুলাই: মাকে খুঁজছে সেই শিশুটি by ফাহিমা আক্তার সুমি

শিশুটির মায়ের আদরমাখা স্পর্শ তাকে আর ছুঁয়ে যায় না। ছোট কোমল হাতে মাকে স্পর্শ করতে পারে না। টলোমলো চোখে খুঁজে ফিরে মায়ের মুখটি। আধো আধো বুলিতে মা মা করে ডাকতে শিখেছে। কিন্তু কোথাও মিলে না ছোট্ট সুহাইবা’র সেই মা ডাকের সাড়া। জন্মের পঁচাত্তর দিন পর হারাতে হয় মাকে। ২০২৪-এর ২০শে জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় গুলিতে মারা যান বিশ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ নতুন মহল্লায় ভাড়া বাসায় তার একমাত্র শিশু সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পর ঘুম পাড়িয়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়েছিলেন। এ সময় ভবনটির ৬তলার বারান্দার গ্রিল ছিদ্র হয়ে তার মাথায় এসে একটি বুলেট বিদ্ধ হয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢলে পড়েন মেঝেতে।

শহীদ সুমাইয়ার মা আসমা বেগম মানবজমিনকে বলেন, সন্তান ছাড়া একজন মা কেমন থাকতে পারে? এই কষ্ট কাউকে বুঝানো যায় না। একটা মাছুম শিশু বাচ্চা রেখে গেছে। যখন মারা যায় তখন আড়াই মাস বয়স ছিল এখন এক বছরের বেশি বয়স। মাঝে মাঝে ভাঙা ভাঙা গলায় মা মা বলে ডাকে। আমরা এই হত্যার ন্যায়বিচার চাই। এই রকম যেন কোনো মায়ের ও সন্তানের বুক আর খালি না হয়। কোনো সন্তান যেন এতিম না হয়। শহীদদের জীবন যেন বৃথা না যায়। এই গণহত্যার এখন বিচার হলে পরবর্তীতে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা এই ধরনের কাজ করতে সাহস পাবে না। তারা একবারের জন্য হলেও জনগণের কথা ভাববে। মানুষের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করবে। তিনি বলেন, সবাই খোঁজখবর রাখছে, আর্থিক কিছু সহযোগিতা ছাড়া তেমন কিছু দেখছি না। আমরা চাই সরকারের পক্ষ থেকে এই অবুঝ শিশুর দায়িত্বটা যেন নেয়া হয়। ওর মা-তো কোনো অপরাধ করেনি, এই শিশুটিকে রেখে তার জীবন দিতে হয়েছে। মাত্র ২০ বছর বয়সে আমার মেয়েটা জীবন দিলো। আমি মা হয়ে আমার সন্তানের রক্তে ভিজে যাওয়া শরীর দেখেছি।

তিনি আরও বলেন, এই শিশুটির তো ভবিষ্যৎ আছে। ওর বাবাও খোঁজখবর রাখে না। আমি কখনো আমার মেয়েকে ভুলতে পারবো না। পুতুলের মতো শিশুটাকে রেখে সে চলে গেল। এই কষ্ট আমি একবছর ধরে আঁকড়ে ধরে আছি। নাতনিটা যখন আধো আধো বুলিতে মা মা করে তখন আমার মনে হয় বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। যখন বুঝতে শিখবে তখন তাকে আমি কী বলে এই মা শব্দটার মানে বুঝাবো। কী বলে তাকে সান্ত্বনা  দেবো। এটা ভেবে ভেবে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি।

আসমা বেগম বলেন, সে তো অবুঝ, মায়ের অভাব বুঝতে পারলেও মুখ ফুটে বলতে পারছে না কাউকে। ওইদিন নতুন মহল্লার আশপাশের সবাই গুলি ও হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে পায়। অনেকে তখন বারান্দা, ছাদ এবং জানালায় ছুটে যায় দেখার জন্য। আমার মেয়েও তার বাচ্চাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে বাসার উত্তরদিকের বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। এসময় গ্রিল ভেদ করে বুলেটটি এসে সুমাইয়ার মাথায় লাগে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, আমি হারিয়েছি আমার বুকের সন্তানকে। আমার নাতনি হারিয়েছে তার মাকে। মায়ের কষ্টটা ওর কি কখনো পূরণ হবে। আমার মেয়েটা খুব শান্ত ছিল নিজের কষ্ট সবসময় লুকিয়ে রাখতো। সুমাইয়ার বাচ্চা হওয়ার পর এত খুশি ছিল যেটা বলার বাইরে। সব সময় মেয়েকে নিয়ে হাসিখুশিতে কেটে যেতো। মেয়েটিও ওর মাকে মাত্র চিনতে শিখেছিল। মেয়ের জন্য বেশি লাল জামা পছন্দ করতো সুমাইয়া। আমাকে এমন কিছু বলে যেতেও পারেনি আমার মেয়েটা। আমার মেয়েটা বলে যেতে পারেনি যে, মা আমি চলে যাচ্ছি- আমার মেয়েটিকে দেখে রেখো। গুলি লাগার পরেই নিচের দিকে ঢলে পড়ে যায়।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ২০শে জুলাই সন্ধ্যায় ঘটনাটি ঘটে। ওইদিন পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ ছিল। চারদিকে গোলাগুলি হচ্ছে। একটার পর একটা হেলিকপ্টার ঘুরছিল। এটা দেখার জন্য সবাই উৎসুক ছিল। 

mzamin

১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগে মানুষের তৈরি ‘চর্বির কারখানার’ সন্ধান

এক-দুই হাজার নয়, ১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগের কথা। তখন পৃথিবীতে বাস করত আমাদেরই পূর্বপুরুষ—প্রস্তর যুগের মানুষেরা। সেই সময় জার্মানিতে একটি লেকের ধারে তাদের বসবাসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। সেখানে পশুর হাড় থেকে চর্বি সংগ্রহ করত তারা। এ জন্য ছিল বিশাল প্রক্রিয়াকরণব্যবস্থা। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘ফ্যাট ফ্যাক্টরি’ বা ‘চর্বির কারখানা’।

এ নিয়ে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্স’-এ গত বুধবার এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, জার্মানির হ্যালে শহরের দক্ষিণে নিউমার্ক-নর্ড এলাকায় কয়েক বছর ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করে এই ‘কারখানার’ সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানে মিলেছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার হাড়ের টুকরা এবং ১৬ হাজার পাথরের সরঞ্জাম। চর্বি সংগ্রহের কাজে আগুন ব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে।

গবেষকদের বিশ্বাস, সোয়া লাখ বছর আগের ওই মানুষেরা ছিল বিলুপ্ত নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির। জার্মানির ওই লেকের ধারে তারা পাথরের হাতুড়ি দিয়ে পশুর বড় হাড় চূর্ণ করত। তারপর সেগুলো ফোটানো হতো পানিতে। একপর্যায়ে হাড় থেকে আলাদা হয়ে চর্বি পানির ওপর ভেসে উঠলে, তা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করত তারা। এ থেকে বোঝা যায়, পুষ্টির বিষয়ে বেশ সচেতন ছিল নিয়ান্ডারথালরা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের সুষম খাবারে সামান্য পরিমাণ চর্বির আবশ্যকতা রয়েছে। এই চর্বি নিয়ান্ডারথালদের জন্য আরও বেশি জরুরি ছিল। কারণ, পশুপাখি শিকার করতে তাদের অনেক শক্তি খরচ করতে হতো। তারা মূলত পশুপাখি থেকে পাওয়া খাবার খেয়েই বেঁচে থাকত। ফলে মাংস ও ফ্যাটি অ্যাসিডের ঘাটতি হলে নিয়ান্ডারথালদের অপুষ্টিতে ভোগার বড় ঝুঁকি ছিল।

ইউরোশিয়া অঞ্চলে বসবাসকারী নিয়ান্ডারথালরা ৪০ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায়। জার্মানির নিউমার্ক-নর্ড এলাকায় ৩০০ বছরের বেশি সময় তাদের বসবাস ছিল। নেদারল্যান্ডসের লেইডেন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উইল রোয়েব্রোকস বলেন, নিয়ান্ডারথালরা বোকা ছিল বলে একটি ধারণা রয়েছে। তবে তাদের বিষয়ে নতুন যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা অন্য কিছু প্রমাণ করছে।

ক্রোয়েশিয়ার একটি মিউজিয়ামে নিয়ান্ডারথাল পরিবারের প্রতিকৃতি
ক্রোয়েশিয়ার একটি মিউজিয়ামে নিয়ান্ডারথাল পরিবারের প্রতিকৃতি। ফাইল ছবি: রয়টার্স