Tuesday, August 25, 2015

জাপান সাগরে চলছে রুশ-চীনের যৌথ মহড়া

রাশিয়া এবং চীনের নৌবাহিনী জাপান সাগরে মহড়ার অনুশীলন পর্ব শুরু করেছে। চলতি মাসের ২০ তারিখ থেকে শুরু হয়েছে এ মহড়া। অবশ্য মহড়ার অনুশীলন পর্ব ২৭ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। ২৮ আগস্ট বিদায়ী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে জয়েন্ট সি ২০১৫ সেকেন্ড ড্রিল’ নামের মহড়া শেষ হবে।
রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের নগরী ভ্লাদিভোস্টোকের কাছাকাছি পিটার দ্যা গ্রেট উপসাগরে দেশ দু’টির দ্বিবার্ষিক মহড়া চলছে। মহড়ার অনুশীলন পর্বে উভয় দেশের ২০টি জাহাজ, ২০টি বিমান, ৪০টি সাঁজোয়া যান এবং ৫০০ মেরিন সেনা যোগ দিয়েছে।
মহড়া জাপান সাগরের রুশ এবং নিরপেক্ষ পানিসীমার মধ্যে চলছে। মহড়ায় দু'দেশের সেনাদের একযোগে জল ও স্থলে হামলার অনুশীলন করতে হবে। রুশ ফায়ারিং রেঞ্জ ক্লার্কে উভয় দেশের সেনাদের উভচর যান এবং বিমানযোগে অবতরণের মধ্য দিয়ে অনুশীলন পর্ব শেষ হবে। রাশিয়ার মাটিতে এর আগে এ ধরণের মহড়া আর হয় নি।
এরআগে, মহড়ার সঙ্গে জড়িত একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র চীনা সরকারি সংবাদ সংস্থা শিনহুয়াকে বলেছে, তৃতীয় কোনো দেশকে লক্ষ্য করে এ মহড়া চালানো হচ্ছে না। আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলে সূত্রটি দাবি করেছে। সূত্রটি বলেছে, চীন ও রাশিয়ার বার্ষিক বিনিময় কর্মসূচির আওতায় এ মহড়া হচ্ছে।
জাপান সাগর তীরে চারটি দেশ অবস্থিত। দেশগুলো হলো- জাপান, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং রাশিয়া। চীনের নৌবাহিনী এর আগে কখনোই এ সাগরে কোনো সামরিক মহড়া চালায় নি।

আমরা ওপরে উঠছি, না নিচে নামছি? by সোহরাব হাসান

হাজারো বৈপরীত্য ও স্ববিরোধিতায় আকীর্ণ বাংলাদেশ। একই বাংলাদেশে দুই বিপরীতধর্মী পাচার আমাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক বৈষম্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। এবং এই কাণ্ডটি তখনই ঘটছে, যখন ‘শোষণমুক্ত বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠায় অবিচল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। বিএনপি বা জাতীয় পার্টির আমলে এমনটি হলে আমরা তাদের শোষকশ্রেণির প্রতিভূ ও স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী বলে আচ্ছা করে গাল দিতাম। এখন কী বলব? মাস খানেক আগে সমুদ্রপথে হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিকের পাচার হওয়ার ঘটনা নিয়ে কেবল দেশের ভেতরে নয়, বহির্বিশ্বেও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে প্রথমে অধিকাংশ পাচার হওয়া মানুষ রোহিঙ্গা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা চলছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার কিছুটা নড়েচড়ে বসলেও পাচার হয়ে যাওয়া সবাইকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। অনেকে ফিরে এসেছেন, অনেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। অনেকে হারিয়ে গেছেন চিরতরে।
মালয়েশিয়া থেকে সদ্য ফিরে আসা সিরাজগঞ্জের আল আমিন সরকার নামের একজন যে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন, তা মর্মস্পর্শী। তিনি বলেছেন, ট্রলারে ওঠার পর থেকে থাইল্যান্ডে পৌঁছানো পর্যন্ত দুই মাসে অসুস্থ হওয়ার কারণে সাগরে ফেলে দেওয়া হয় ৭০ জনকে। শুধু পানি খেতে চাওয়ার অপরাধে একজনকে চোখের নিমেষে গলা কেটে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতনের লোভ দেখিয়ে তাঁকে স্থানীয় দুই দালাল নিয়ে গিয়েছিল। টেকনাফ থেকে ৪৭০ জনকে নিয়ে ট্রলার যাত্রা শুরু করলেও কতজন ফিরেছেন, জানা যায়নি।
এই যে দালালদের খপ্পরে পড়ে হাজার হাজার তরুণ বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন; তাঁরা কি জানেন না সেখানে জীবন কতটা অনিশ্চিত ও যন্ত্রণাকাতর? জানেন। কিন্তু তাঁরা নিরুপায়। বিদেশে গিয়ে তাঁরা অমানুষিক পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত অপমান ও লাঞ্ছনা সহ্য করেন। তারপরও তাঁরা দুর্গম মরু কিংবা তরঙ্গসংকুল সমুদ্রপথে পাড়ি জমান। দেশে কর্মসংস্থান নেই। সামাজিক ব্যবসায় নাম লেখাবেন, সেই পুঁজি বা শিক্ষাও নেই।
ইদানীং বাংলাদেশে আরেক ধরনের পাচার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অর্থ বা সম্পদ পাচার। ইংরেজিতে বলে ক্যাপিটাল ফ্লাইট। মানুষ এক দেশ থেকে আরেক দেশে পাচার হয় কাজ না পেয়ে, জীবন ধারণের সংস্থান করতে না পেরে। আর অর্থ পাচার হয় আরও উন্নত, আরও নিশ্চিত, আরও সুখী জীবনের আশায়। সেটি তাঁরাই পারেন, যাঁরা বৈধ-অবৈধ পথে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। কিন্তু সেই সম্পদ কেন তাঁরা দেশে না রেখে বিদেশে রাখছেন? দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে বিনিয়োগ করছেন? একজন ব্যাংকার কাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষককে প্রশ্নটি করেছিলাম। জবাবে তিনি বললেন, পুঁজির পাচার বিশ্বব্যাপী প্রবণতা হলেও সেই সব দেশে গিয়ে তা পুঞ্জীভূত হয়, যেসব দেশে রাজনৈতিক স্থিতি আছে, সামাজিক সহনশীলতা আছে, যেসব দেশে আইনের শাসন সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। আইন যেখানে আওয়ামী লগি–বিএনপি বিচার করে না। এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায়ের ওপর চড়াও হয় না। সেই সব দেশে রাজনৈতিক কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের বারোটা বাজানো হয় না। আর সেই সব দেশ থেকেই পুঁজি পাচার হয়, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা লেগে থাকে, যেখানে বিনিয়োগ করতে নানা রকম আইনি বাধার পাশাপাশি ঘুষ–দুর্নীতি–মাস্তানি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেই সব দেশ থেকে অধিক পুঁজি পাচার হয়, যেখানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভঙ্গুর। এর সব কটি উপসর্গই বাংলাদেশে বিদ্যমান। তদুপরি আছে অবকাঠামোগত সমস্যা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জমির সমস্যা। আছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।
পৃথিবীর দুই শ্রেণির মানুষের প্রকৃত অর্থে কোনো দেশ নেই। প্রথম শ্রেণি হলো অতি ধনবান; তাঁদের জন্য সব দেশের দরজা খোলা। নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করলে একজন ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারী চাইলে পৃথিবীর যেকোনো দেশের পারমানেন্ট রেসিডেন্ট বা নাগরিক হতে পারবেন। হচ্ছেনও অনেকে।
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী অবস্থানে। দুই দলের শীর্ষ নেত্রীর মধ্যে কথাবার্তাও হয় না (২০১৩ সালের অক্টোবরে তাঁদের মধ্যকার শেষ টেলিফোন সংলাপটির কথা স্মরণ করুন)। কিন্তু বিদেশে বিনিয়োগ কিংবা অর্থ পাচারে দুই দলের মধ্যে অদ্ভুত মিল রয়েছে। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা কানাডায় বাড়ি (ম্যানশন) কিনেছেন। আরেক নেতা, যিনি বর্তমানে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী, লন্ডন ও মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগ করেছেন। আওয়ামী লীগের আরও অনেকে তো বিদেশে বিনিয়োগ করছেন।... বিএনপি সরকারের একজন সাবেক মন্ত্রী সিঙ্গাপুরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। তাঁর ছেলে শ্রীলঙ্কায় বেসরকারি বন্দর নির্মাণেও বিনিয়োগ করেছেন। বিএনপি আমলের আরেক মন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন। (ডেইলি স্টার, ২২ জুন ২০১৫)। আর এই যে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, তার সব হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংকে নেই। কেননা, বেশির ভাগ অর্থই যাচ্ছে অবৈধ উপায়ে, হুন্ডির মাধ্যমে।
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিদেশিদের প্রতি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাবেন, আর সরকারের ও দলের কেউ কেউ বিদেশে বিনিয়োগ করবেন, বাড়ি কিনবেন—এটি আত্মপ্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। বিদেশে অর্থ পাচার ও বিনিয়োগকারীর তালিকায় আরও আছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। আছেন সাবেক আমলারা।
আমাদের অর্থনৈতিক নীতির লক্ষ্যই হলো কতিপয়ের হাতে পুঁজি ও সম্পদ পুঞ্জীভূত করা। লাখ লাখ মানুষকে ন্যূনতম মৌলিক অধিকার তথা খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে ধনীকে আরও ধনী করার সুযোগ দেওয়া। ধনবানদের দল বিএনপি-জাতীয় পার্টি তো এই নীতি নেবেই। কিন্তু ‘গরিবের দল’ আওয়ামী লীগও ব্যতিক্রম কিছু করেনি। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া যেসব কল্যাণমুখী কর্মসূচি নিয়েছিলেন, গরিব মানুষের জন্য নিরাপত্তার জাল তৈরি করেছিলেন, তা এখন দলীয় নেতা-কর্মীদের আখের গোছানো কিংবা বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মনে হচ্ছে, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশটির ওপর গরিষ্ঠসংখ্যক দরিদ্র মানুষের কোনো হক নেই।
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে সুইজারল্যান্ডে ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে; ২০১৩ সালে যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা, ২০১২ সালে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা।
গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি জানাচ্ছে, ২০০৩ থেকে ২০১২ সাল—এই ১০ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট পাচার হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পাচার হয়েছে ২০০৬ সালে ২০ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, এরপর ২০০৭ সালে ১৯ হাজার কোটি টাকা, ২০১০ সালে পাচারের পরিমাণ কমে ৫ হাজার ২২৫ কোটি টাকা হলেও ২০১২ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। গত বছর সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে অন্যান্য দেশেও। এই ধারা চলতে থাকলে অর্থ পাচারেও আওয়ামী লীগ বিএপির আমলকে ছাড়িয়ে যাবে।
গ্লোবাল ফিন্যান্স ইন্টেগ্রিটি যে পরিসংখ্যান দিচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, যখন দেশে মোটামুটি রাজনৈতিক স্থিতি থাকে, তখন বিদেশে অর্থ পাচার কমে যায়। আবার যখন অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তখন পাচার হয়ে যাওয়া অর্থের পরিমাণ বাড়ে। একই সঙ্গে কমে যায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনবিষয়ক আঙ্কটাডের বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৫ শতাংশ। আগের বছর ছিল ১৬০ কোটি, চলতি বছর ১৫৩ কোটি ডলার। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী বলেছেন, আঙ্কটাডের এ তথ্য ঠিক নয়। তাঁর দাবি, বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২০০ কোটি ডলার। তাঁর কথা যদি সত্যও ধরে নিই, ১৬ কোটি মানুষের কিংবা বছরে ৩ লাখ কোটি টাকা বাজেটের দেশে ২০০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে কি আত্মপ্রসাদ লাভের সুযোগ আছে? প্রতিবেশী মিয়ানমারে যদি ৮০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়ে থাকে, নেপালে ও পাকিস্তানেও যদি বিনিয়োগ বেড়ে থাকে, বাংলাদেশে কমার কারণ কী? নিশ্চয়ই আমাদের নীতি, পরিকল্পনা ও উদ্যোগে ঘটাতি আছে। বর্তমান বিনিয়োগ বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর লন্ডন, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে যে লাখ লাখ টাকা খরচ করে রোড শো করল, তাতে কী লাভ হলো? বিনিয়োগ বোর্ডের এই অবিমৃশ্যকারী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা কেবল বিরোধী দলই করছে না, ক্ষমতাসীন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফও একহাত নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। পেশাদার, দক্ষ, পরিশ্রমী ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের নিয়ে বিনিয়োগ বোর্ড ঢেলে সাজাতে হবে।
তাইরে-নাইরে করে যাঁরা সাড়ে ছয় বছর পার করেছেন, তাঁরা কবে ঢেলে সাজাবেন? আর এই অব্যবস্থা ও অদক্ষতা কেবল বিনিয়োগ বোর্ডে নয়, ব্যাংক-বিমাসহ প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে। দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে অনেক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও কারখানা মুখ থুবড়ে পড়েছে। কেবল প্রবাসী শ্রমিকদের উচ্চ রেমিট্যান্স কিংবা তৈরি পোশাক রপ্তানির নগদ টাকা কোনো দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিতে পারে না। আমাদের নেতা-নেত্রীরা যতই উন্নয়নের গল্প শোনান না কেন, সত্যিকার উন্নয়ন থেকে আমরা অনেক দূরে আছি।
বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের লুটপাট কিংবা দেশের অর্থ ও সম্পদ বিদেশে পাচার হওয়ার ঘটনায় আমাদের মনে এই প্রশ্নটি বড় করে দেখা দেয় যে দেশের অর্থনীতি কি সত্যি সত্যি এগোচ্ছে? আমরা কি ওপরে উঠছি, না নিচে নামছি? বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে যে সক্ষমতা ও সুশাসন প্রয়োজন, তা কি আমরা অর্জন করতে পেরেছি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

নদীর ওপর মহাসড়ক

স্থাপত্যশিল্পে নতুন তাক লাগিয়েছে চীন। নদীর মাঝ বরাবর ১১ কিলোমিটার লম্বা হাইওয়ে তৈরি করেছে দেশটি। চীনের হুবেই প্রদেশে পাহাড় ও গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া এই হাইওয়েতে নদীপথে বাস ভ্রমণের রোমাঞ্চ পাওয়া যাবে।
এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দর্শনীয় ও বিজ্ঞানভিত্তিক হাইওয়ের তকমা পেয়েছে। গত ৯ আগস্ট এই হাইওয়ের উদ্বোধন করা হয় ডেইলি মেইল

চার ট্রেন হিরোকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ পুরস্কার

ফ্রান্সের একটি ট্রেনে মরক্কোর এক বন্দুকধারীকে ধরাশায়ী করে ‘প্রকৃত হত্যাকাণ্ড’ প্রতিরোধের স্বীকৃতিস্বরূপ তিন আমেরিকান ও এক ব্রিটিশকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘লিজিয়ন দ্য অনার’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ সোমবার এ পুরস্কার দিয়েছেন। ১৮০২ সালে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট এ পুরস্কার চালু করেছিলেন। এলিসি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে আয়োজিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ওলান্দ বলেন, ‘এক সন্ত্রাসী হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রকৃত হত্যাকাণ্ড ঘটাতে তার কাছে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল।
আপনারা যদি নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের পাকড়াও করতে না পারতেন তাহলে সে হত্যাকাণ্ড ঘটাত।’ শুক্রবার ওই ঘটনার ফরাসি গণমাধ্যম এই চার ব্যক্তিকে ‘ট্রেন বীর’ খেতাবে ভূয়সী প্রশংসা করেছে। শুধু ফ্রান্সেই নয়, গোটা বিশ্বেই তারা এখন ‘ট্রেন হিরো’ নামে পরিচিত। মরক্কোর নাগরিক আয়ুব আল খাজ্জানি (২৫) একে৪৭সহ আরও বেশ কিছু অস্ত্রসমেত দ্রুতগতির থেলিস ট্রেনে উঠে হত্যাযজ্ঞ শুরু করার পূর্বমুহূর্তে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন স্পেন্সার স্টোন, আলেক স্কারলাটোস, অ্যান্থনি স্যাডলার এবং ক্রিস নরম্যানসহ আরও দু’জন। অবশিষ্ট দুই ব্যক্তিকেও অনবিলম্বে সম্মাননা প্রদান করা হবে। তারা গুরুতর আহত।

হিন্দু মেয়ের সঙ্গে কথা বলার অপরাধে হেনস্তা

হিন্দু মেয়ের সঙ্গে কথা বলার কারণে এক মুসলমান পুরুষকে অপদস্থ করার ঘটনা ঘটেছে ভারতের মাঙ্গালোরে। জনাকীর্ন বাজারে ওই ব্যক্তিকে বিবস্ত্র করে পোলের সঙ্গে বেধে রাখা হয়। শুধু তাই নয় একঘণ্টা ধরে তাকে মারধোর করা হয়। হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, স্থানীয় কেবল টেলিভিশনগুলো ঘটনাটি সম্প্রচার শুরু করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছায়। গ্রেপ্তার করে ১৪ জনকে। মোট ৩০ জন ব্যক্তি পালাক্রমে তাকে প্রহার করেছে বলে পুলিশ ধারণা করছে। সন্দেহভাজন প্রত্যেকে বজরং দলের কর্মী। হেনস্তার শিকার হওয়া ওই ব্যক্তি মাঙ্গালোরের একটি এক্সেসরিজ স্টোরের ম্যানেজার। আর যে মেয়ের সঙ্গে কথা বলার কারণে তাকে অপদস্থ করা হয়, সে মেয়েটি একই দোকানে সেলসগার্ল হিসেবে কাজ করে। পুলিশে দায়ের করা অভিযোগে মুসলিম ওই ব্যক্তি জানিয়েছে, মেয়েটি তার কাছে ২হাজার রুপি ধার চেয়েছিল। টাকা উঠানোর জন্য তারা এটিএম বুথের দিকে যাচ্ছিল। এমন সময় লাঠিসোটা, ছুরি হাতে একদল লোক তার ওপর চড়াও হয়। মেয়েটি কোন রকম আঘাত ছাড়া পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে তার সহকর্মীর পক্ষে কথা বলতে গিয়ে দুবৃত্তদের থাপ্পড় খেতে হয় তাকে।

গ্রিসের দেউলিয়া হওয়ার পেছনে দায়ভার কার! by সরাফ আহমেদ

ইউরোজোনে নতুন প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন গ্রিক প্রধানমন্ত্রী
গ্রিস গণতন্ত্রের সূতিকাগার বটে, তবে প্রকৃত গণতন্ত্রচর্চাটা বিগত দশকে তাঁরা কমই করেছেন। একজন সাধারণ গেরস্থ যদি তাঁর আয়-ব্যয়ের সীমারেখা বোঝেন বা সীমাহীন ঋণ করে ব্যয় করাটা যে আত্মঘাতী হবে—তা বোঝেন, তবে গ্রিসের মতো আদি গণতন্ত্রের ধারক দেশ তা বুঝতে অক্ষম হলো কেন? বছরের পর বছর ঋণ করে ঘাটতি বাজেট দিয়ে দেশ চালানোর তুমুল নেশাই আজ গ্রিসের মতো দেশকে দেউলিয়া করে ছেড়েছে। ইউরোপের ২৮টি দেশ নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হলেও ২০০২ সাল থেকে ১০টি দেশ নিয়ে ইউরো মুদ্রাব্যবস্থা চালু হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনীতিকে আরও স্বাবলম্বী ও মার্কিন ডলারের বিপরীতে বিশ্বমানের মুদ্রাব্যবস্থাসহ ইউরো মুদ্রাভুক্ত দেশগুলো নিজেদের আমদানি-রপ্তানিকে আরও সহজ ও অর্থবহ করার জন্যই মূলত এই উদ্যোগ। ক্রমান্বয়ে ইউরো মুদ্রা ব্যবহারকারী দেশগুলোর সংখ্যা দাঁড়ায় উনিশে এবং সদস্যভুক্ত দেশগুলোকে ইউরোজোনের অন্তর্ভুক্ত দেশ বলে অভিহিত করা হয়।
এই মুদ্রাব্যবস্থা চালুর প্রথম দিকে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামোতে কী ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে বা ধকল যাবে, তা বোঝা যায়নি। তবে সময় থাকতেই ঘাটতি বাজেট ও রাষ্ট্রীয় ঋণ কমানোর জন্য অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ক্রমান্বয়ে সংশোধিত নীতির মধ্য দিয়ে এগোলে যে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা যাবে, তা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায়।
আজকে গ্রিসের যে দেউলিয়া অবস্থা, সেই একই ধরনের বা কিছুটা লঘু সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল ইউরো জোনভুক্ত দেশ আয়ারল্যান্ড, সাইপ্রাস, ফিনল্যান্ড ও পর্তুগালের মতো ছোট দেশগুলোও। তবে দীর্ঘস্থায়ী সুফলের আশায় সংকটাপন্ন দেশগুলো ঋণ গ্রহণ করে বা তাদের ঘাটতি বাজেট ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এনেছে।
তবে সেই সময় থেকেই সাধারণ জনগণ ও শ্রমিক শ্রেণি থেকে এসব নিয়মনীতি, নানা ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধি ও কৃচ্ছ্রসাধনের বিরুদ্ধে বারবার বাধা এলেও রাজনীতিকেরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে এই সংস্কার ছাড়া দেশ অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে যাবে আর আপাতত সাধারণ মানুষের ওপর ক্রমান্বয়ে চাপ পড়লেও বাজারব্যবস্থায় স্থিতি থাকলে ভবিষ্যতে দেশজ অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনবে।
গ্রিস সেই ২০০২ সাল থেকেই ইউরো মুদ্রাব্যবস্থা প্রচলনের প্রথম ১০টি দেশের একটি হলেও ইউরো জোনভুক্ত তাদের থেকে ভঙ্গুর অর্থনীতির অনেক দেশ ইউরো মুদ্রাব্যবস্থা প্রচলনের প্রাথমিক ঝুঁকি কাটিয়ে উঠেছে; অথচ গ্রিস ১৩ বছর ধরে ঘাটতি বাজেট কমাতে নানা ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে কেবল গড়িমসিই করেছে। সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল তিনটি স্তর, রাজস্ব আদায়ের সংস্কৃতি, পেনশন দেওয়ার ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শী নিয়ম এবং দেউলিয়া হয়ে যাওয়া জাতীয় বিভিন্ন সেবা সংস্থাকে বছরের পর বছর অযৌক্তিকভাবে ভর্তুকি দেওয়ার নীতি থেকে তারা সরে আসতে চায়নি।
বাম ঘরানার অনেক অর্থনীতিবিদ এবং পুঁজিবাদবিরুদ্ধ অনেকেই গ্রিসের অর্থনীতির সংকট আর দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণের প্রকৃত ঘটনা না খুঁজে গ্রিসের বামপন্থী সিরজা দলকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানো বা গ্রিসের গণতন্ত্রে পশ্চিমাদের হামলা বলে অভিহিত করছেন। আদতে গ্রিসও পশ্চিমা বিশ্বের বা ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্য এবং সমস্যাটা পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের আদর্শের লড়াই নয়, সমস্যাটা অন্যত্র।
সাম্যবাদ বা আদর্শের কথা বললে প্রথমেই আসতে হবে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী আলোচিত সিপ্রাসের সমাজতান্ত্রিক ধারার সিরজা দলের ক্ষমতায় আসার কথায়। সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের রাজনৈতিক ধারার কট্টর দক্ষিণপন্থী ইনডিপেনডেন্ট গ্রিস দলের পানোস কামেনসের সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় এসেছেন। ক্ষমতায় আসার আগে দুই ঘরানার দুই রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী কর্মসূচিও ছিল পুরোপুরি ভিন্নধর্মী। আদর্শের স্বার্থে নয়, তাঁরা জোটবদ্ধ হয়েছেন শুধু ক্ষমতার স্বার্থে।
ঋণ নিয়ে ঘাটতি বাজেট, অর্থনৈতিক খাতে চরম বিশৃঙ্খলা ও ধারাবাহিক সংস্কারের পথে না হেঁটে ইউরোজোনভুক্ত অন্য দেশগুলোর জনগণের করের অর্থ ঋণ নিয়ে না ফেরত দেওয়ার সংস্কৃতি কখনোই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
ক্ষমতায় আসার আগে প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের সিরজা দল গ্রিসের অর্থনৈতিক দায়ভার অর্থাৎ দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩২০ বিলিয়ন ইউরো (২৭ লাখ ৮১ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার কিছু বেশি), বেশ ভালো করেই জানতেন। এই অর্থের বেশির ভাগই ইউরোজোনের দেশগুলোর সাধারণ মানুষের রক্ত আর ঘামে অর্জিত করের পয়সা। ২৫ জানুয়ারি ২০১৫ গ্রিসের সর্বশেষ নির্বাচনের প্রাক্কালে অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের সিরজা দল গ্রিসের জনগণের কাছে অনেক প্রতিশ্রুতিমূলক জনপ্রিয় ও বিপ্লবী কথা বলে ৩০০ আসনবিশিষ্ট পার্লামেন্টে ১৪৯টি আসনে জয়ী হলেও তাঁরা নিজেরাও জানতেন যে ক্ষমতায় এলে এই বিশাল ঋণের দায়ভারের সমস্যা সহজেই মেটানোর নয়। তবে তাঁদের প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল গ্রিসের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, কর–ব্যবস্থায় মধ্যবিত্তদের ওপর থেকে চাপ কমিয়ে ধনীদের ওপর কর বৃদ্ধিসহ দেশে অন্য ইউরোপীয়ভুক্ত দেশগুলোতে যে কর সংস্কৃতি চালু রয়েছে, তার প্রচলনসহ নানা জনমুখী উদ্যোগ।
কিন্তু যে দেশটি ঋণের দায়ে গলা পর্যন্ত নিমজ্জিত, যে দেশটির ৬০০ ধনাঢ্য ব্যক্তি কর ফাঁকি দিয়ে তাঁদের সব অর্থ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে জমা রেখেছেন, যে দেশটির বিশাল বাণিজ্য জাহাজ পরিবহন খাতের অর্ধেকেই কোনো কর প্রদান করে না, যে দেশটি পৃথিবীর ১৭৪টি দেশের মধ্যে দুর্নীতির সূচকে ১১০ নম্বরে অবস্থান করছে বা ঘুষ বাণিজ্য ছাড়া যেখানে প্রশাসন চলে না, সেই দেশের সমাজ বা অর্থনীতির খোল নলচে পাল্টিয়ে দেওয়া এতটাই সহজ নয়। প্রবল প্রতিপত্তিসম্পন্ন দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাত রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বা জনগণের স্বার্থে সিরজা দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তাই অচিরেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
গ্রিস সরকারের মোট ঋণ ৩২০ বিলিয়ন ইউরো, তার মধ্যে শুধু জার্মান সরকারের রয়েছে ৯০ বিলিয়ন ইউরো, যা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে ফেরত দেওয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল গ্রিস। জার্মান অর্থমন্ত্রী ভলফগ্যাং সয়েবলে বলেছেন, এই পুরো ঋণ দেওয়া অর্থটি জার্মান করদাতাদের পরিশ্রমের অর্থ, সে ক্ষেত্রে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া গ্রিস সরকারকে আরও ঋণ দিতে হলে আমাদের জনগণের সম্মতির প্রয়োজন হবে। রুগ্ণ অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উঠে আসা বা দাঁড়ানোর চেষ্টায় রত ইউরোজোনের ছোট দেশগুলোর বক্তব্যও প্রায় একই, তারাও বলছে, ট্রয়কা (ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ) প্রেসক্রিপশন মেনে আমাদের জনগণ যদি ধৈর্য আর ত্যাগ স্বীকার করে সুদিনের আশায় নিজ দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারে, গ্রিসের জনগণ তা পারবে না কেন?
গ্রিসের আজকের ঋণগ্রস্ত হয়ে দেউলিয়া হওয়ার পেছনে রয়েছে বিগত তিনটি নির্বাচিত সরকারের দায়ভার, যারা বিগত বছরগুলোতে জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে দেশজ খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চেষ্টা বা ধারাবাহিক সংস্কারের পথে না হেঁটে ঋণ নিয়ে দেশ চালানোর কাজেই সচেষ্ট হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শুরু করে ঋণের অর্থ লুণ্ঠনের যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, তা থেকে দেশটি মুক্ত হতে পারছে না কেন?
সতর্ক করে দেওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর ঘাটতি বাজেট দিয়ে দেশ চালােনার পরিণাম যে কী হতে পারে, তা টের পাচ্ছে গ্রিসের সাধারণ জনগণ। প্রশ্নটা বারবারই আসছে বিগত ১০ বছর থেকেই, ঋণের অর্থ যাচ্ছে কোথায়? এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন থেকে নেওয়া এই ঋণের এক-তৃতীয়াংশের মধ্য ১ ভাগ গেছে ব্যাংকগুলোর কাছে, ১ ভাগ গেছে অভিজাত ধনাঢ্যদের আরাম-আয়েশের খাতে বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি মেটাতে, আর ১ ভাগ অর্থ গেছে গ্রিস থেকে পুঁজি পাচারের ইন্ধন জোগাতে, যা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
ঋণ নিয়ে ঘাটতি বাজেট, অর্থনৈতিক খাতে চরম বিশৃঙ্খলা ও ধারাবাহিক সংস্কারের পথে না হেঁটে ইউরো জোনভুক্ত অন্য দেশগুলোর জনগণের করের অর্থ ঋণ নিয়ে না ফেরত দেওয়ার সংস্কৃতি কখনোই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। তাই গ্রিসের আজকের সমস্যা গ্রিসের গণতন্ত্রের প্রতি কোনো হামলা বা পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের আদর্শের লড়াই নয়। লড়াইটি গ্রিসের রাজনীতিকদের সঙ্গে সে দেশের আপামর সাধারণ বঞ্চিত জনগণের বোঝাপড়ার লড়াই।
সরাফ আহমেদ: প্রথম আলোর হ্যানোভার (জার্মানি) প্রতিনিধি৷
sharaf.ahmed@gmx.net

নেপালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ১৭ পুলিশসহ ২০ জন নিহত

নেপালে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৭ পুলিশসহ তিনজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
সোমবার বিকেলে নেপালের পশ্চিমের কাইলালি জেলায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীরা দেশটির নতুন সংবিধানের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে বিক্ষোভকারীদের দাবি নিহতদের মধ্যে স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধিও রয়েছেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, হাজার হাজার মানুষের মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর স্থানীয়ভাবে তৈরি কুড়াল, বর্শা ও ইট দিয়ে হামলা চালায়। সংঘর্ষের প্রথম দফায় ছয়জন পুলিশ ও দুজন আর্মড পুলিশ নিহত হন।
এরপর বিক্ষোভকারীরা আবার হামলা চালালে পুলিশ গুলি ছুড়ে স্থানীয় থানায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ সময় আরো তিনজন পুলিশ ও তিনজন বিক্ষোভকারী নিহত হন। এরপর জনতা থানায় আগুন দিলে আরো ছয় পুলিশ সদস্য নিহত হন।
এ ছাড়া হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন পুলিশ সদস্য। কাইলালি জেলা পুলিশের উপপ্রধান উদয় বাহাদুর সিং ঠাকুরি জানান, মোট ১৫ পুলিশ ও দু`জন বিশেষ পুলিশ বাহিনীর সদস্যের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আরো অনেক পুলিশ সদস্য নিখোঁজ আছেন।
নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাম দেব গৌতম জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার সেনাবাহিনীর সদস্যদের সেখানে পাঠিয়েছে।

যে দেশে প্রতি ঘণ্টায় খুন

মধ্য আমেরিকার সবচেয়ে ছোট দেশ এল সালভাদরের রাজধানী সান সালভাদরের শহরতলি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের মায়ামি শহরের মতোই। ট্রাফিক, বিপণিবিতান এবং আমেরিকান ফাস্টফুডের চেইনও চোখে পড়ে। গাছগাছালিভরা শহরকে মনে হয় শান্ত কোনো এলাকা। কিন্তু আসলে হয়তো জনপদটি সে রকম নয়। ভালোমতো খেয়াল করলে দেখা যায়, বিদ্যালয়গুলো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঢাকা, নিরাপত্তারক্ষীদের অবিরত টহল। প্রধান প্রধান ব্যবসাকেন্দ্রের প্রবেশমুখে চোখে পড়ে শটগানসহ ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী। মহাসড়কগুলোতেও যখন-তখন গাড়ি তল্লাশি করছে পুলিশ। এত নিরাপত্তাব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগায় মনে। ঘনবসতিপূর্ণ ছোট এই দেশটির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়া যেকোনো স্থানের চেয়ে অনেক বেশি খুনের ঘটনা ঘটে এখানে। এল সালভাদরে সরকার ও অপরাধীদের মধ্যে সংঘটিত ২০১২ সালের অস্ত্রবিরতি চুক্তি ভেঙে গেছে। এ বছর সেখানে ৩ হাজার ৮৩০টির বেশি খুন হয়েছে। পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে তিন শর বেশি সন্ত্রাসী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যও মারা গেছেন অর্ধশতাধিক। চলতি আগস্ট মাসে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় হয়েছে একটি খুন। দেশটির সরকারের সঙ্গে অপরাধীদের ১৯৯২ সালের চুক্তির পর এখনই সবচেয়ে প্রাণঘাতী অবস্থা বিরাজ করছে। বর্তমান অবস্থা যদি অব্যাহত থাকে, তবে এ বছর প্রতি এক লাখে ৯০ জন হত্যার শিকার হবে। আর তা হলে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দেশ হন্ডুরাসকেও ছাড়িয়ে যাবে দেশটি। ধারণা করা হয়, দেশটিতে সন্ত্রাসীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এদের মধ্যে ১০ হাজারের বেশিই কারাগারে।
দেশটির জনসংখ্যার প্রতি ১০ জনে একজন সন্ত্রাসী দলের ওপর নির্ভরশীল। আর বিচার হয় না ৯৫ শতাংশ অপরাধেরই। সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দেওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, সন্ত্রাসীরা প্রধানত দুটি দলে বিভক্ত। একটির নাম মারা সালভাচুরা (এম এস-১৩ নামে পরিচিত)। আরেকটি বারিও-১৮। প্রায়ই দুটি দলের মধ্যে সংঘর্ষ ও প্রতিশোধমূলক হত্যার ঘটনা ঘটে। এই ‘মারা সালভাচুরা’ হলো লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক একটি সন্ত্রাসী দল। ১৯৯২ সালে এল সালভাদরের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত দেশটির অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়িত করা হয়। এই নির্বাসিতরাই গত দুই দশকে দেশটির দুর্বল সরকার কাঠামোতে সন্ত্রাসবাদের আমদানি করে। তবে কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর মাফিয়া চক্রের মতো সংগঠিত নয় এল সালভাদরের সন্ত্রাসী দলগুলো। এমনকি এই দেশটি দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কোকেন পাচার হলেও তাতেও জড়িত নয় এখানকার সন্ত্রাসীরা। তাদের আয়ের মাধ্যম হলো ডাকাতি ও ছিনতাই। আর তাদের সন্ত্রাসের আশঙ্কা থেকে বাদ নেই একজন নাগরিকও। সবচেয়ে হুমকির মুখে দরিদ্র পরিবারগুলো। এই অবস্থা থেকে রাষ্ট্রটিকে একটি স্বাভাবিক জায়গায় আনার জোর চেষ্টা করছে প্রেসিডেন্ট সালভাদর সানচেহ সেরেনের নেতৃত্বাধীন এফএমএলএন সরকার। এর আওতায় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী দিয়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানায় অভিযান চালানো হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলেও পুলিশকে দেওয়া হচ্ছে দায়মুক্তি। আর নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে সেখান থেকেই। কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডগুলো। দেশটির সেন্ট্রো-আমেরিকানো ইউনিভার্সিটির জনমতবিষয়ক সংস্থার পরিচালক জেনিথ আগিলা বললেন, পুলিশই এখন বড় সন্ত্রাসী। অবস্থা থেকে পরিত্রাণে দেশে অস্ত্রবিরতি পুনর্বহালের জন্য কারাগারে বন্দী সন্ত্রাসী নেতারা গত জুন মাসে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছিল। যদিও তরুণ অপরাধীরা এর ঘোর বিরোধী। এমনকি উপ-পুলিশপ্রধান হাওয়ার্ড কট্রোর মতে, অস্ত্রবিরতির নামে নিজেদের সংগঠিত করবে সন্ত্রাসীরা। তবে সংকট উত্তরণে আলোচনাই যে একমাত্র পথ এমন ধারণাও অনেকের। সূত্র: গার্ডিয়ান।

জায়ান্ট পান্ডার যমজ শাবক

জায়ান্ট পান্ডা মেই শিয়াং। গত ১১ আগস্ট তোলা ছবি l ইপিএ
চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন, একটি বাচ্চা জন্মাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জুর বিখ্যাত জায়ান্ট পান্ডা মেই শিয়াং গত শনিবার যমজ সন্তান প্রসব করেছে। এতে সবাই একই সঙ্গে বিস্মিত ও আনন্দিত। খবর এএফপির। প্রথম বাচ্চাটির জন্ম হয় স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে। দ্বিতীয়টি রাত ১০টা ৭ মিনিটে। লোমহীন গোলাপি রঙের শাবক দুটি আকারে বড়সড় ইঁদুরের প্রায় সমান। চিড়িয়াখানাটির পরিচালক ডেনিস কেলি বলেন, মেই শিয়াংয়ের প্রসবে তাঁরা চমৎকৃত হয়েছেন। অত্যন্ত ছোট হওয়ায় বাচ্চা দুটির অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তাঁরা জানেন, মা হিসেবে মেই অত্যন্ত যত্নবান।
বন্দী অবস্থায় জায়ান্ট পান্ডার স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হয়। তাই প্রাণী সংরক্ষণবিদেরা কৃত্রিম উপায়ে গত এপ্রিলে মেই শিয়াংয়ের গর্ভসঞ্চার করেন। এ জন্য চীনের জায়ান্ট পান্ডা হুই হুইয়ের হিমায়িত বীর্য ব্যবহার করা হয়। হুই হুই চীনের সিচুয়ান প্রদেশের জায়ান্ট পান্ডা সংরক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের বাসিন্দা। একই উদ্দেশ্যে মেই শিয়াংয়ের শরীরে স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল জুর আরেক পান্ডা তিয়ান তিয়ানের তাজা বীর্যও প্রয়োগ করা হয়। এখন নবজাতক যমজ বাচ্চার পিতৃপরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। মেই শিয়াং ২০০৫ সালে একটি বাচ্চা প্রসব করে। সেটিকে চীনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মেইয়ের আরেক সন্তানের নাম বাও বাও, থাকে মায়ের সঙ্গেই। ২০১৩ সালে মেইয়ের একটি বাচ্চা জন্মানোর পরপরই মারা যায়। আরেকটি বাচ্চা ২০১২ সালে জন্মের পর মাত্র ছয় দিন বেঁচে ছিল। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড জানায়, বিশ্বজুড়ে বুনো পান্ডার সংখ্যা বর্তমানে দুই হাজারের কম। আবাস নষ্ট হওয়ার কারণেই এরা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই প্রাণীর খাবার বাঁশ। আর কোনো কিছুই এরা সাধারণত খায় না। কয়েকটি দেশে বিশেষ ব্যবস্থায় পান্ডা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নাগা শান্তিচুক্তি কি সফল হবে! by কায়কোবাদ মিলন

নাগাল্যান্ডে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী এনএসসিএন (আইএস) গোষ্ঠীর সাথে সম্প্রতি চুক্তি স্বাক্ষর করল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। ১৯৯৭ সালে ইসাক মুইভা গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের। সেটিই নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাথে ভারত সরকারের প্রথম সমঝোতা। এরপর ১৬ বছর ধরে ৮০ বারেরও বেশি আলোচনার টেবিলে বসেছে কেন্দ্র ও এনএসসিএন। ৩ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনে প্রধানমন্ত্রী মোদির উপস্থিতিতেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আইএস গোষ্ঠী যুদ্ধবিরতির পথে থাকলেও এনএসসিএন (খাপলাং) কিন্তু চুক্তিতে আসতে রাজি হয়নি। গত জুনে মনিপুরে সেনাবাহিনীর গাড়িবহরে ভয়াবহ হামলার পেছনে এরাই ছিল বলে সরকার দাবি করে। সেই প্রেক্ষাপটেই সবচেয়ে বড় নাগা বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সাথে শান্তিচুক্তি করল কেন্দ্র। তবে আইএস গোষ্ঠীর মূল দাবি শান্তিচুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না জানা যায়নি। তাদের দীর্ঘ দিনের দাবি- মনিপুর, আসাম, অরুণাচল প্রদেশ অর্থাৎ গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে নাগা অধ্যুষিত সব এলাকাকে একসাথে জুড়ে বৃহত্তর নাগাভূমি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সরকারি সূত্র বলছে, চুক্তির বিস্তারিত খুঁটিনাটি ও কার্যকর করার উপায় পরে প্রকাশ করা হবে। সে ব্যাপারে মূল ভূমিকা থাকবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অনিত ডোভালের।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মুইভার উদ্দেশে বলেছেন, আমরা শুধু ক্ষত নিরাময় ও সমস্যা নিরসনের চেষ্টাই করব না; আপনাদের গৌরব, সম্মান পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় শরিক হবো। মুইভা বলেছেন, সরকার ও নাগারা ‘সম্পর্কের এক নতুন পর্বে’ পা রাখছে। তবে এখন থেকে বিরাট চ্যালেঞ্জও সামনে আসবে।
প্রসঙ্গত, সার্বভৌম ও স্বাধীন নাগাল্যান্ডের দাবিতে ১৯৮০ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এনএসসিএন গঠন করেন ইসাক সু, থুইলে, মুইভা ও এসএস খাপলাং। ১৯৮৮ সালে আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করেন খাপলাং। অস্ত্রবিরতি স্বাক্ষর হওয়ার পর এনএসসিএন (আইএস) প্রায় দেড় দশক ধরে সহিংস কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকলেও খাপলাং গোষ্ঠী সম্প্রতি ভারতীয় সেনার ওপর হামলা চালায়। পাল্টা ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে খাপলাং গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় ভারতীয় সেনাবাহিনী। এ অভিযানে ভারত ও মিয়ানমারের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। মিয়ানমার সুযোগ পেলে এই অপমানের শোধ যে তুলবে, এ কথা বলাই বাহুল্য।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছয় দশক ধরে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহে তৎপর নাগারা। ১৯৮৮ সালে খাপলাংয়ের নেতৃত্বে এনএসসিএন ভেঙে দুই টুকরো হলেও মূল সংগঠনের রাশ ছিল আইজ্যাক-মুইভা গোষ্ঠীর হাতেই। যুদ্ধবিরতির আগ পর্যন্ত এরা বহু বছর ধরে বিদেশে নাগাল্যান্ডের একটি নির্বাসিত সরকারও চালিয়ে আসছিল। আইজ্যাক সু অসুস্থ থাকায় দিল্লিতে অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি। অনুষ্ঠানে মুইভা প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, নাগারা চিরকাল মোদির স্টেটসম্যান সম্পর্কে মনে রাখবে।
ছয় দশক ধরে নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহিংসতায় আজ এটি ভারতের প্রধানতম গরিব রাজ্য। একই সাথে কেন্দ্রীয় সরকার নানা কালাকানুন প্রবর্তনের মাধ্যমে, সেনাবাহিনীকে প্রভূত ক্ষমতা দিয়ে নির্যাতন চালানোর ফলে অস্থিতিশীলতা যেমন বেড়ে যায় তেমনি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগও সেখানে হয়নি। যদিও ১৯৯৭ সালের যুদ্ধবিরতির পর ২০ লাখ অধিবাসী অধ্যুষিত নাগাল্যান্ডে সহিংসতার মাত্রা কমে। তবে গত জুনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটি অংশ মনিপুরে হামলা চালিয়ে ১৮ ভারতীয় সৈন্যকে হত্যা করলে বিশ্বব্যাপী তা আলোচনার ঝড় তোলে। ওই হত্যাকাণ্ডের রেশ ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনী মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বেশখানিকটা ঢুকে অভিযান চালালে তা-ও বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। অবশ্য একসময় এই খাপলাং গ্রুপকে মদদ দিত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার এখন যাদের সাথে শান্তিচুক্তি করল তাদের ঠেকাতেই খাপলাং গ্রুপকে মদদ দিত সরকার।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, পাকিস্তানের সাথে কারগিল যুদ্ধে এবং ১৯৯৭ সালে কাশ্মিরে অভিযান চালানোর সময় ছাড়া এত বড় বিপর্যয় আর ভারতীয় সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করতে হয়নি। একসাথে এত ভারতীয় সেনাসদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার মাধ্যমে খাপলাং গং ভারত সরকারকে কী বার্তা দিতে চায়, তা-ও বলার অপেক্ষা রাখে না। সীমান্ত পেরিয়ে যেসব নাগা মিয়ানমারে বসবাসরত, তাদের সাথেও খাপলাং গ্রুপের সম্পর্ক মধুর। এ দিকে মনিপুরের সাথেও নাগাল্যান্ডের সম্পর্ক সুখকর নয়। নাগারা মনিপুর ও অরুণাচলকে নিয়ে যে বর্ধিত নাগাল্যান্ড প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী, মনিপুর সরকার স্বভাবতই তার ঘোর বিরোধী। স্বায়ত্তশাসিত নাগা কাউন্সিলে যোগ দেয়াকে মনিপুর পরাজয় বলেই মনে করে। পক্ষান্তরে নাগাল্যান্ডবাসী চায় পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অথবা মনিপুরের ওপর কর্তৃত্ব করতে।
মোদির উপস্থিতিতে যে ঐতিহাসিক চুক্তি হলো তার পক্ষে-বিপক্ষে কোনো প্রতিক্রিয়া নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায় লক্ষ করা যায়নি। চুক্তির প্রেক্ষাপটে খাপলাং কী কর্মসূচি দেবে কিংবা মেনে নেবে কি না, তা-ও নিশ্চিত করে জানা যাচ্ছে না। অভিজ্ঞ মহলের মতে, চুক্তি হয়েছে বটে, কিন্তু এখনো ব্যাপক আলোচনার দাবি রাখে। নাগাল্যান্ডের ২০টি নাগা উপজাতি গ্রুপ ও মনিপুরের নাগাদের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনার পরই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করা যাবে। নাগাল্যান্ডে ব্যাপটিস্ট চার্চ খুবই প্রভাবশালী। যেকোনো সমঝোতার ক্ষেত্রে চার্চের অনুমোদন অপরিহার্য।
ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পরই মোদি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতি ব্যাপক মনোযোগী হয়েছেন। এ অঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়নে তিনি আগ্রহী। নাগাল্যান্ড হয়ে তিনি মিয়ানমারে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার করতে চান। মোদির এ অঞ্চলের ক্ষেত্রে স্লোগান হলো- ‘লুক ইস্ট, অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি। লক্ষ্য হলো- উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের প্রভাব বৃদ্ধি করা। মোদির মাথায় রয়েছে এ অঞ্চলে বিজেপির প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়টিও। এখন বিজেপির পাত্তাই নেই ওইসব এলাকায়। এর ফলে ভাগ্য ভালো হলে বিজেপিরাজ কায়েমের যে স্বপ্ন মোদি লালন করেন, তা এখানে বাস্তবায়নও হয়ে যেতে পারে।
মজার ব্যাপার হলো, প্রধানমন্ত্রী মোদির উপস্থিতিতে তার বাসভবনে নাগাল্যান্ড নিয়ে যে চুক্তি হলো, সে বৈঠকে নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী টি আর জেলিত্র্যাং ও ওই রাজ্যের একমাত্র লোকসভা সদস্য নেইফিউ রিও উপস্থিত ছিলেন না এবং চুক্তির বিশদ কিছু তারা জানেনও না। মোদির ভাগ্য ভালো, ওই দু’জনও চুক্তির প্রশংসা করেছেন। নাগাদের যে অংশের সাথে চুক্তি হলো, সেই গ্রুপের প্রধান নেতা ইশাম চিশি কিডনির চিকিৎসায় দীর্ঘ দিন দিল্লিতে অবস্থান করছেন। হুইলচেয়ারে বসেই তিনি চুক্তিতে সই করেন। নাগাল্যান্ডের বেশির ভাগ নাগরিকই চটজলদি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আর এই চুক্তির সাফল্য নির্ভর করে নাগাল্যান্ডের নাগাদের ওপর যেমন, তেমনি মনিপুরের নাগাদের ওপরও। যদিও নাগাল্যান্ডের অধিবাসীরা এটি বিশ্বাস করতে চান যে, এনএসসিএন (আইএস) চুক্তির মাধ্যমে তাদের প্রতারিত করবে না। উল্লেখ্য, নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রীর অনুরূপ নাগাল্যান্ড বিধানসভা ও সুশীলসমাজও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিটি যাচাই করতে চান।
অভিজ্ঞ মহলের মতে, নাগাল্যান্ডের সাথে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদি চীনকে শক্ত একটি বার্তা দিতে চান। কিন্তু এই বার্তার মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যে নতুন করে কলহ সৃষ্টি হতে পারে তার আশঙ্কাও করছেন অনেকে। ভারতীয় গণমাধ্যমের আশঙ্কা- মনিপুর, অরুণাচল ও আসামের নাগা অধ্যুষিত অঞ্চলের সাথে নাগাল্যান্ডের একীভূতকরণের কোনো উদ্যোগ যদি মোদি গ্রহণের স্বপ্ন দেখে থাকেন, তা হবে বিপদের কারণ। কেননা এতে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা বাড়বে। যদিও চুক্তি স্বাক্ষরকারী এনএসসিএনের (আইএস) ব্যাপক প্রভাব রয়েছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। ফলে শান্তিচুক্তির কারণে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।
অরুণাচল, এ দেশের অংশবিশেষও নাগাল্যান্ডের সাথে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা বিদ্যমান। সেই প্রদেশের অধিবাসী হলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজ্জিড এমপি। তিনি চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কে আশ্বস্ত করে বলেছেন, এর মাধ্যমে প্রতিবেশী কোনো রাজ্যের স্বার্থ ক্ষুণœ হবে না। কেন্দ্র কখনোই প্রতিবেশী রাজ্য আসাম, মনিপুর ও অরুণাচলের অধিবাসীর স্বার্থ ও সেন্টিমেন্টকে আঘাত করবে না। তবে যতভাবেই প্রতিশ্রুতি দেয়া হোক না কেন, এনএসসিএন (আইএস) যতই এই চুক্তিকে অনুমোদন দিক না কেন নাগা এলাকা পুনর্নির্ধারণ হতে হবে আলোচনার টেবিলেই। মিয়ানমারেও বহু নাগার বাস। তাদের বিষয়েও আলোচনা হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্য বলেছেন, দীর্ঘ দিন ধরে নাগা সঙ্কট জিইয়ে রাখার মূলে রয়েছে ভুল বোঝাবুঝি। তবে নাগাদের অতীত ইতিহাসও পারস্পরিক সমঝোতায়। ফলে আলোচনার মাধ্যমে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি হ্রাস করা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, ২০০৯-২০১৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে নাগাল্যান্ডে ১১ জন বিদ্রোহী নিহত হয়েছে। আর বিদ্রোহী বা বিচ্ছিন্নতাবাদীরা প্রতি বছর ওই সময়ে অন্তর্কোন্দলে নিহত হয়েছে সর্বাধিক ৫৫ জন।
নাগাল্যান্ডে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সংখ্যাগুরু। প্রায় ২০ লাখ অধিবাসীর মধ্যে ৯০ ভাগই খ্রিষ্টান। ভারতের অপর দু’টি রাজ্য মেঘালয় ও মিজোরামেও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় সংখ্যাগুরু। নাগাল্যান্ডের গ্রাম ও শহরের উভয় স্থানেই চার্চে প্রার্থনাকারীদের সংখ্যা ব্যাপক ও নিয়মিত। রাজধানী কোহিমা, ডিমাপুর ও মোকোক চাংয়ের আকাশ চার্চের গম্বুজে পরিপূর্ণ। খ্রিষ্টানদের মধ্যে নাগাল্যান্ডে আবার ব্যাপটিস্টদের সংখ্যা বেশি, শতকরা ৭৫ ভাগ। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপিতে ব্যাপটিস্টদের হার বেশি হলেও নাগাল্যান্ডের চেয়ে তা কম, শতকরা ৫৫ ভাগ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে নাগাল্যান্ডে খ্রিষ্ট ধর্মের প্রবর্তন হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীরা সর্বপ্রাণবাদের ধারক ছিল। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা দেখলেন, এখানে ধর্মান্তরের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। তবে ওই অঞ্চলের মধ্যে নাগাল্যান্ডের অধিবাসীরাই খ্রিষ্ট ধর্মকে অতিমাত্রায় পছন্দ করে ফেলে। উল্লেখ্য, নাগাল্যান্ডে হিন্দু ও মুসলমানেরা সংখ্যালঘু। শতকরা হার যথাক্রমে ৭.৭ ও ১.৮।
নাগাল্যান্ডেও রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি গভর্নর সাংবিধানিক প্রধান। মূল ক্ষমতা বিধানসভার ও এর সদস্য সংখ্যা ৬০। মুখ্যমন্ত্রী সরকারের প্রধান। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। নাগাল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট ৩৭টি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসীন।
নাগাদের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। কারো মতে, নাগারা মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত। তবে এরা মঙ্গোলিয়া, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে নাগাল্যান্ডে এসেছে এর কোনো প্রামাণিক দলিল নেই। তবে নাগায় ১২২৮ সালের আগেও পর্বত ও কাছের এলাকায় গ্রামভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা হয়। অনেকের মতে, বার্মিজ শব্দ ‘নাকা’র অপভ্রংশ হলো নাগা। এই মত অধিকাংশের সমর্থন পাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ইংরেজদের আগমনের আগে বার্মিজদের হাতে নাগারা প্রভূত নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ব্রিটিশ এসে নাগা পর্বতমালাসহ দক্ষিণ এশিয়া তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। ১৮৩২ সালে ক্যাপ্টেন জেনকিনস ও পেমবার্টন সর্বপ্রথম নাগাল্যান্ডে আসেন। ১৮৩৯ সাল থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে ইংরেজরা নাগাল্যান্ডে ১০ বার সামরিক অভিযান চালায়। এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ের যুদ্ধে বহু ইংরেজ সৈন্য ও নাগা নিহত হয়। ফলে পরস্পরের মধ্যে বহু চুক্তি ও সন্ধি হয়। উল্লেখ্য, ১৯৪০ সালে ইংরেজরা ব্রিটিশ ভারতের যে মানচিত্র প্রকাশ করে, তাতে নাগাল্যান্ড ও কোহিমাকে আসামের অংশ দেখায়।
১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায় আস্তানা গড়তে চেয়েছিল। মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে ঢোকার মাধ্যমে কোহিমায় আস্তানা গড়ে জাপান ভারতকে পদানত করতে চাইলেও ব্রিটিশ ও পাঞ্জাবিরা তা প্রতিহত করে এবং যুদ্ধে উভয়পক্ষের বহু সৈন্য হতাহত হয়।
নাগাল্যান্ডের সাথে মনিপুর ও আসামের বিরোধও পুরনো। সায়মন কমিশনকে নাগারা যে স্মারকলিপি দেয় তাতে উল্লেখ করা হয়, ওরা কখনো আমাদের পরাজিত করেনি এবং আমাদের শাসনও করেনি। স্মারকলিপিতে এরা আরো বলে, আমাদের আটটি অঞ্চল একটি আরেকটি থেকে পৃথক এবং প্রত্যেকেরই ভাষা পৃথক। ব্রিটিশরাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। ফলে আসাম ও মনিপুরের কোনো ভূমিকা নেই।
১৯৪৬ সালে ভারতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট জওয়াহেরলাল নেহরু স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের অঙ্গীকার করলেও নাগায় স্বাধীন থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করে। ভারত স্বাধীন হলে নাগারা আসামের অন্তর্ভুক্ত হয়। এলাকায় সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকে। বিদ্রোহ দমনে ১৯৫৫ সালে ভারত সরকার নাগাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। পরে নাগাদের সাথে সরকারের অনেক চুক্তি হয়। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর নাগাল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য ঘোষিত হয়। এরপর নির্বাচন হলেও নানা কারণে রাজ্যে অশান্তি বিরাজ করতে থাকে এবং ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নাগাল্যান্ডে সরাসরি রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করেন। ২০১২ সালে নাগাল্যান্ডের বিশিষ্ট রাজনীতিকেরা রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
kaikobadmilan1955@gmail.com

পুরাকীর্তি- খাঞ্জালি মসজিদ by মাসুদ আলম

যশোরের অভয়নগর উপজেলার শুভরাড়া গ্রামের ভৈরব
নদের তীরে খাঞ্জালি মসজিদ l ছবি: প্রথম আলো
কারুকার্য ও নির্মাণশৈলী বিবেচনায় স্থাপত্যশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন খাঞ্জালি মসজিদ। অবস্থান যশোরের অভয়নগর উপজেলার শুভরাড়া গ্রামে ভৈরব নদের তীরে। বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ইসলাম প্রচারক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত মসজিদটি সাড়ে ৫০০ বছরের বেশি পুরোনো।
ইতিহাস গবেষকদের মতে, যশোরের মুড়লী কসবা থেকে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) ১৫ শতকের শেষ ভাগে সৈন্য ও অনুসারীদের নিয়ে ভৈরব নদের তীর ধরে পূর্ব দিকে এগিয়ে যান। এ সময় তিনি বেশ কিছু রাস্তা নির্মাণ, দিঘি খনন ও মসজিদ স্থাপন করেন। এগুলো তাঁর যাত্রাপথের সাক্ষ্য দেয়। খানজাহান আলীর এসব কীর্তি বাগেরহাট-যশোর অঞ্চলে ‘খাঞ্জালি’ নামে পরিচিত।
অভয়নগর উপজেলা সদর নওয়াপাড়া থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে শুভরাড়া গ্রাম। অসংখ্য গাছগাছালি ও বাঁশবাগানে ঠাসা গ্রামটি। সেখানে ভৈরবের তীরে খাঞ্জালি মসজিদের গম্বুজটি দূর থেকেই নজরে পড়ে। সড়ক ও নদীপথে নওয়াপাড়া থেকে শুভরাড়ায় যাওয়া যায়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের যশোহর-খুলনার ইতিহাস গ্রন্থের (১৯১৪ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত) প্রথম খণ্ডের ‘খালিফাতাবাদ’ অধ্যায়ে খাঞ্জালি মসজিদের উল্লেখ রয়েছে। ওই বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত খানজাহান আলী (রহ.) সম্ভবত নড়াইল অঞ্চলে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামনের একটি বিলের অবস্থা দেখে বা অন্য কোনো কারণে সে সংকল্প বাদ দিয়ে তিনি ভৈরবকূল ধরে এগিয়ে যাওয়ার পথ বেছে নেন। এভাবে তিনি শুভরাড়া গ্রামে গিয়ে পৌঁছান।
খ্রিষ্টীয় ১৪৪৫ থেকে ১৪৫৯ সালের মধ্যে কোনো এক সময় খাঞ্জালি মসজিদটি নির্মাণ করা হয় বলে ইতিহাস গবেষকেরা মনে করেন। এতে একটিমাত্র গম্বুজ এবং চার কোণে চারটি মিনার আছে। মসজিদটির ভেতরের মাপ ১৬ ফুট ১০ ইঞ্চি বাই ১৬ ফুট ১০ ইঞ্চি। উচ্চতা ২৫ ফুট। বাইরের মাপ এক মিনারের মধ্যবিন্দু থেকে অন্য মিনারের মধ্যবিন্দু পর্যন্ত ২৮ ফুট ছয় ইঞ্চি। মসজিদটির উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণে তিনটি দরজা অছে। পূর্ব দিকে সদর দরজা এবং এর খিলান ১১ ফুট উঁচু এবং ৪ ফুট ১০ ইঞ্চি প্রস্থের। এই মসজিদ নির্মাণে প্রকাণ্ড ও ক্ষুদ্র—সব রকমের ইটই ব্যবহৃত হয়েছিল। এসব ইটের আকার ১২ ইঞ্চি বাই ১০ ইঞ্চি থেকে ৪ ইঞ্চি বাই ৩ ইঞ্চি পর্যন্ত।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনা কার্যালয় সূত্র জানায়, কারুকাজ ও নির্মাণশৈলী অবিকৃত রেখে সাড়ে ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে পাঁচবার মসজিদটি সংস্কার করা হয়েছে। কিছু সংস্কারকাজ এখনো বাকি রয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ লোকজন বলেন, প্রায় ১০০ বছর আগে খাঞ্জালি মসজিদের ছাদ ভেঙে পড়ে। এরপরও গোলপাতার ছাউনি দিয়ে মসজিদটিতে নিয়মিত নামাজ আদায় করতে থাকেন স্থানীয় লোকজন। পরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আকবার হোসেন বলেন, সংস্কারের সময় মসজিদটির দেয়ালের গাঁথুনিতে একটু সমস্যা হয়েছে। তা ছাড়া দরজা ঠিক করা হয়নি। মসজিদের ভেতরের অনেক ইট ও নকশা ভেঙে গেছে। অনেক কাজ এখনো বাকি। অবশিষ্ট সংস্কারকাজ সম্পন্ন করার জন্য তাঁরা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে আবেদন করেছেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক মো. আমিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইউনেসকো স্বীকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নীতিমালা বা কোড পুরোপুরি অনুসরণ করেই মসজিদটি সংস্কার-সংরক্ষণ করা হয়েছে। মৌলিকত্বের কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। আগে মসজিদ যেমন ছিল, সংস্কারের পর ঠিক তেমন আছে।’

মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশার ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব by আনোয়ার হোসেন

ঢাকায় চলাচলরত প্রায় ১২ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা মেয়াদোত্তীর্ণ। মিটার ব্যবহারের শর্ত অমান্য করে এসব অটোরিকশার চালকেরা যাত্রীদের গলা কাটছেন। চলছেন নিজেদের ইচ্ছায়। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশার ভাড়া সরকারিভাবে আবারও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্যয় বিশ্লেষণে এসব অটোরিকশার দাম গতবারের চেয়ে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা বেশি এবং অন্য কয়েকটি খরচ দেখিয়ে যাত্রী ভাড়া ও মালিকের জমা বাড়ানোর এই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে। আট সদস্যের যে কমিটি এই প্রস্তাব করেছে, তাতে কোনো যাত্রী প্রতিনিধি নেই।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সূত্র বলেছে, নতুন করে প্রথম দুই কিলোমিটারের জন্য ভাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে ৪০ টাকা। বর্তমানে তা ২৫ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ টাকা। বর্তমানে প্রতি কিলোমিটারের সরকার-নির্ধারিত ভাড়া ৭ টাকা ৬৪ পয়সা। এ ছাড়া প্রতি মিনিট ওয়েটিংয়ের (যাত্রাবিরতি, সিগন্যাল ও যানজট) জন্য ৬০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে অটোরিকশার দৈনিক জমা (মালিকের আয়) কাগজে-কলমে ৬০০ টাকা। তবে মালিকেরা দুই পালায় ভাড়া দিয়ে জমা বাবদ আয় করছেন গড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা। নতুন প্রস্তাবে জমা বৃদ্ধি করে ৮০০ টাকা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই ভাড়ার হার নির্ধারণ করেছে বিআরটিএর গঠিত একটি কমিটি। প্রস্তাবটি সম্প্রতি অনুমোদনের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বিআরটিএর সূত্র বলেছে, ভাড়া বৃদ্ধির আগে প্রতিবারই ব্যয় বিশ্লেষণের নামে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করা হয়। এতে মালিক-শ্রমিক নেতাদের দাবিই মুখ্য হয়ে ওঠে। এবারের আট সদস্যবিশিষ্ট ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটির প্রধান বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। কমিটিতে অটোরিকশার মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা আছেন চারজন। বাকি তিন সদস্যের একজন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এবং আরেকজন ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি। কমিটির সদস্যসচিব হচ্ছেন বিআরটিএর পরিচালক (প্রকৌশল)। কিন্তু কমিটিতে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি নেই। অভিযোগ উঠেছে, মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের চাহিদা মেনে ব্যয় বিশ্লেষণে অযৌক্তিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কারণে অটোরিকশার প্রস্তাবিত ভাড়া ও মালিকের দৈনিক জমার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।
২০০২ সাল থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালুর পর এর আগে অন্তত ছয়বার এভাবে ব্যয় বিশ্লেষণ করে মালিকের জমা ও যাত্রী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু মালিক-শ্রমিকেরা কখনোই তা মানেননি।
ভুক্তভোগী ও বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন করে সরকার ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দিলে বর্তমানে নেওয়া বাড়তি ভাড়ার সঙ্গে নতুন করে আরও কিছু যোগ করে যাত্রীদের অতিরিক্ত গলা কাটা শুরু করবেন চালকেরা। মালিকেরাও তাঁদের মনগড়া জমা বাড়াবেন। অতীতেও চালক-মালিকেরা বিআরটিএর সঙ্গে যোগসাজশ করে নিজেরা ভাড়া ও জমার হার ঠিক করে পরে ইচ্ছামতো বাড়িয়েছেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, আগে মিটার ঠিক করে বর্তমান ভাড়া বাস্তবায়ন করতে হবে। এরপর গণশুনানি করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। ওই কমিটিতে অবশ্যই যাত্রীদের প্রতিনিধি রাখতে হবে। তিনি বলেন, কমিটি যে ব্যয় বিশ্লেষণ করেছে, তার অনেক সূচকই ভুল। কারণ, মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো যানবাহনের মূল্য বাড়তে পারে না। এ ছাড়া হুট করে অটোরিকশার ভাড়া বাড়ালে তা অন্য যানবাহনের ভাড়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলবে।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যেই ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন তো চালক-মালিকেরা সরকারি সিদ্ধান্ত মানছেন না। মালিক-শ্রমিক নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জমা ও ভাড়া বৃদ্ধি পেলে তাঁরা মানবেন।
অবশ্য অতীতের প্রতিটি ব্যয় বিশ্লেষণ এবং সেই অনুযায়ী ভাড়া বৃদ্ধির আগে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটিতে মালিক-শ্রমিকদের আধিক্য ও যাত্রী প্রতিনিধি না থাকার বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান বলেন, কমিটি মন্ত্রণালয় করে দেয়। আর মালিক-শ্রমিকদের সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা ঠিক না।
দেখা গেছে, অটোরিকশার চালকেরা এখন নির্ধারিত হারের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। এমনকি চুক্তিতে গেলেও চালকেরা যান তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী গন্তব্যে। উল্টো যাত্রীদের কাছে চালকের আবদার, ‘পুলিশ ধরলে বইলেন মিটারে যাচ্ছি।’
বিশ্লেষণে গোঁজামিল : সর্বশেষ অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধি করা হয় ২০১১ সালে। সে সময় একটি অটোরিকশার স্যালভেজ ভ্যালু বা মেয়াদ শেষে এর মূল্য ধরা হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু এবার অটোরিকশার মূল্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এভাবে অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে অটোরিকশার ভাড়া ও জমা দুটিই বেড়ে যাচ্ছে।
সূত্র বলেছে, অটোরিকশার মূল্যের সঙ্গে সুদ যোগ করা হয়েছে ৪৬ হাজার টাকা। যেখানে মালিকের বিনিয়োগ নেই, সেখানে কীভাবে ব্যাংক ঋণের সুদ যুক্ত হয়, তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। নিবন্ধন, রুট পারমিট, রোড ট্যাক্স ও ইনস্যুরেন্স বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ১৩ হাজার টাকা। কিন্তু পুরোনো অটোরিকশার কীভাবে নিবন্ধন খরচ হয়, তা নিয়ে সমালোচনা আছে বিআরটিএতেই। দুর্ঘটনা ও আপৎকালীন কারণে আকস্মিক খরচ হিসেবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ হাজার টাকা, যা রাজধানী ঢাকার মতো শহরে বেমানান।
এসব অসংগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, বাস্তবতা মেনেই ব্যয় বিশ্লেষণ করতে হয়। আগের ব্যয় বিশ্লেষণ সম্পর্কে তাঁর ধারণা নেই।
পুরোনো অটোরিকশা মেয়াদোত্তীর্ণ: অটোরিকশা নামানোর সময় এর বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ বছর। তা শেষ হওয়ার পর আরও দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়। অর্থাৎ ঢাকায় চলাচলরত প্রায় ১২ হাজার অটোরিকশার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে গত বছরের ডিসেম্বরে।
মালিকদের দাবির মুখে গত বছর অটোরিকশার মেয়াদ তিন বছর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। তবে উচ্চ আদালতে মামলা হলে এই সিদ্ধান্ত আটকে যায়। ফলে এখন যেসব অটোরিকশা চলছে, এর বেশির ভাগই অবৈধ। সাম্প্রতিক সময়ে মিশুকের পরিবর্তে প্রায় ৫০০ অটোরিকশা নামানো হয়েছে।

প্রাথমিকের বই ছাপা নিয়ে জটিলতা বাড়ছে by শরিফুজ্জামান

প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়ের গুণগত মান বজায় রাখতে নিরাপত্তা জামানত ৫ শতাংশ বাড়ানো এবং মান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিল আটকে রাখার শর্ত দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ছাপাখানার মালিকেরা এসব শর্ত ‘অপমানজনক’ উল্লেখ করে প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেওয়ার কথা বলেছেন। এর ফলে এবার সময়মতো পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিদেশি প্রকাশনা সংস্থাকে ঠেকাতে দেশি ছাপাখানার মালিকেরা জোটবদ্ধভাবে প্রাক্কলিত দরের ৩২ শতাংশ কমে কাজ করতে আগ্রহ দেখান। অবিশ্বাস্য কম দামে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত বই দেওয়া সম্ভব নয় বলে প্রকাশনা খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মত দিয়ে আসছেন। বিশ্বব্যাংকও মনে করছে, এত কম দামে ছাপার কাজ দেওয়া হলে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত বই পাবে না। প্রথমে দরপত্র বাতিলের কথা বললেও এখন বিশ্বব্যাংক ছাপাখানার মালিকদের চাপের মধ্যে রাখতে কিছু শর্ত জুড়ে দিতে চাইছে।
বিশ্বব্যাংকের কঠোর শর্ত আরোপ এবং ছাপাখানার মালিকদের তা না মানার ঘোষণায় বিনা মূল্যের প্রাথমিকের পাঠ্যবই ছাপা এবার বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দুই পক্ষের চাপে পড়ে অনেকটা হাত গুটিয়ে বসে আছে।
এ পরিস্থিতি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে সব পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। খুব শিগগির এর সুরাহা হয়ে যাবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের বই ছাপার কাজ করছে এবং দেশের ছাপাখানাগুলো এ দিয়ে উপকৃত হচ্ছে। অনেক মানুষ এই শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছে, উপকৃত হচ্ছে। এ বিষয়টি কারও কারও মনে রাখা দরকার।
এ বছর প্রাথমিকের পাঠ্যবই ছাপার ক্ষেত্রে প্রকাশনাশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই একবাক্যে বলে আসছেন, নির্দিষ্ট শর্ত ও মান অনুযায়ী এত কম দামে বই ছাপা সম্ভব নয়। এ নিয়ে প্রথম আলোয় ৩ আগস্ট প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান, বিশ্বব্যাংক ও ছাপাখানার মালিকদের মধ্যে আলোচনা ও চিঠি চালাচালি শুরু হয়।
গত বছরের ২০ জুলাই এনসিটিবি ছাপাখানার মালিকদের ‘নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড’ দিয়ে কাজ পাওয়ার কথা জানিয়ে দেয়। এবার এখনো সেই চিঠি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এই চিঠি দেওয়ার দিন থেকে বই ছাপা পর্যন্ত সময় লাগে ১৩০ দিন। কিন্তু বছরের প্রথম দিন বই দিতে হলে হাতে সময় আছে ১২৮ দিন। এনসিটিবি বলছে, আজ দূরের কথা—কবে, কীভাবে ছাপাখানার মালিকদের চিঠি দেওয়া যাবে, তা অনিশ্চিত।
পাঠ্যবই বিষয়ে এনসিটিবির একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, পরিস্থিতি এমন অবস্থায় গেছে যে বিশ্বব্যাংকের শর্ত আরোপ করার মধ্যেও যেমন যুক্তি আছে, তেমনি ছাপাখানার মালিকদের বক্তব্যেরও ভিত্তি আছে।
বিশ্বব্যাংকের শর্ত: প্রাথমিকের পাঠ্যবই মাঠে পৌঁছার পর মাঠ থেকে বই সংগ্রহ করে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এর মান যাচাইয়ের পর মুদ্রাকর ও প্রকাশকদের বিল শোধ করতে বলেছে বিশ্বব্যাংক। এ ছাড়া তাদের পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করতে বলেছে।
এনসিটিবি সূত্র জানায়, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী, প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রদত্ত দর অস্বাভাবিক কম হলে নিরাপত্তা জামানত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো যায়। বিশ্বব্যাংক তা ১৫ শতাংশ করতে বলেছে। কিন্তু দরদাতারা বলছেন, তাঁরা দরপত্রের শর্ত দেখে দর দিয়েছেন, সরকারি ক্রয়বিধি বা বিশ্বব্যাংকের শর্ত তাঁদের সামনে ছিল না।
বিশ্বব্যাংক ১৭ আগস্ট এনসিটিবির চেয়ারম্যানকে এসব শর্ত যুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে চিঠি দেয়। ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের টাস্ক টিম লিডার আয়েশা ওয়াওদার ওই চিঠিতে সই করেন। চিঠির সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের মান সুরক্ষায় এবং এ-সংক্রান্ত ঝুঁকি মোকাবিলায় কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স প্রটোকল (কিউএপি) তৈরি করে তা এনসিটিবিকে দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র পাল প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গেছে, তাতে এনসিটিবি চাইলেও এককভাবে কিছু করা সম্ভব নয়। বিষয়টি তাঁরা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক ও মুদ্রাকর—উভয় পক্ষের কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু যেকোনো উপায়ে জাতীয় স্বার্থে ছেলেমেয়েদের হাতে সময়মতো বই পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এই সংকটের সমাধান খুঁজতে হবে।
ছাপাখানার মালিকদের প্রত্যাখ্যান: বিশ্বব্যাংকের শর্ত মুদ্রাকরেরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা বলছেন, দরপত্রের শর্তের বাইরে নতুন কোনো শর্ত তাঁরা মেনে নেবেন না। এনসিটিবি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করে ছাপাখানার মালিক ও তাঁদের সমিতির নেতারা এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির চেয়ারম্যান শহীদ সেরনিয়াবাত প্রথম আলোকে বলেন, শর্ত অনুযায়ী মুদ্রাকরেরা দরপত্র দাখিল করে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছেন। এখন আবার বিশ্বব্যাংকের শর্ত তাঁদের ওপর আরোপ করতে গেলে মামলা-মোকদ্দমা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
এক প্রশ্নের জবাবে শহীদ সেরনিয়াবাত বলেন, শতভাগ বই ছাপতে সক্ষম হলেও বিদেশিদের ডেকে আনার প্রবণতা ঠেকাতে তাঁরা কম দর দিয়েছেন। কিন্তু লোকসান হলেও বা লাভ কম হলেও তাঁরা শর্ত অনুযায়ী বই সরবরাহ করবেন। যদি কোনো ছাপাখানার মালিক বই বুঝিয়ে দিতে না পারেন, তাহলে বোর্ড তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
বিরোধ যেখান থেকে শুরু: প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে এবার ৭৭৩ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৩৫ কোটি বই বিনা মূল্যে ছেপে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরে ২৯২ কোটি টাকা, প্রাক্-প্রাথমিক স্তরে ৩৮ কোটি এবং মাধ্যমিকে ৪৪৩ কোটি টাকা দর প্রাক্কলন করে এনসিটিবি দরপত্র আহ্বান করে। এই তিনটি স্তরেই প্রাক্কলিত দরের চেয়ে কম দর পড়েছে।
গত বছরের দরপত্রমূল্য এবং বাজার দর পর্যালোচনা করে এনসিটিবি শুধু প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার জন্য ৩৩০ কোটি টাকা খরচের বিষয়টি প্রাক্কলন করে। কিন্তু ছাপাখানার মালিকেরা জোটবদ্ধ হয়ে ২২১ কোটি টাকায় এ কাজ নিয়েছেন। ফলে সরকার যে টাকায় কাজ করাতে চায়, মুদ্রাকর ও প্রকাশকেরা তার চেয়ে ১০৯ কোটি টাকা কমে কাজ করে দিতে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
ছাপাখানার মালিকদের যুক্তি হচ্ছে দেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলো এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। তারপরও ভারতসহ কয়েকটি দেশকে ছাপার কাজ দেওয়া হচ্ছে। অথচ ব্যাংকঋণ নিয়ে, ছাপাখানা বসিয়ে, লোকজন নিয়োগ করে তাঁরা সারা বছর পাঠ্যবই ছাপার জন্যই বসে থাকেন।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১১ কোটি বই ছাপার জন্য এনসিটিবি আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করে গত ২৯ এপ্রিল। এতে প্রায় সাড়ে সাত শ প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। কিন্তু ২০টি প্যাকেজে অংশ নেওয়া ২২টি ছাপাখানার সবাই কাজ না পাওয়ার আশঙ্কায় জোট বেঁধে ৩১ দশমিক ৯৪ শতাংশ কম দর দেয়।
এনসিটিবির একাধিক সূত্র জানায়, অস্বাভাবিক কম দরে কাজ নেওয়া ছাপাখানাগুলোকে অনিয়মের আশ্রয় নিতেই হবে। এই দরে ৮০ গ্রাম সাদা কাগজ, উজ্জ্বলতা ও পুরুত্ব এবং মানসম্মত ছাপার সুযোগ থাকবে না।
এর আগে ২০১১ সালে সরকার আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরের রঙিন বই ছাপার সিদ্ধান্ত নেয়। মুদ্রাকর ও প্রকাশকেরা তখন থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন।

নূর হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের আর্জি ভারতে

পশ্চিমবঙ্গের একটি আদালতে সেখানকার সরকার আবেদন জানিয়েছে যে তারা বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ সাতখুন মামলার অন্যতম মূল অভিযুক্ত নূর হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিতে চায়।
তার বিরুদ্ধে যে সব গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেজন্যই নূর হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিয়ে তাকে সেদেশে ফেরত পাঠাতে চায় ভারত।
নূর হোসেন আর তার আরো দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে উত্তর চব্বিশ পরগণার জেলা আদালতে অনুপ্রবেশের মামলা চলছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে।
চার্জশিট পেশ করার পরে তার বিচারও শুরু হয়েছে অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ প্রবীর কুমার মিশ্রের আদালতে।
সেখানেই মামলা তুলে নেয়ার আবেদন জানিয়েছেন উত্তর চব্বিশ পরগণার প্রধান সরকারী কৌঁসুলি শান্তময় বসু।
নূর হোসেন নিজে কোনো উকিল দেননি, কিন্তু তার সঙ্গে ধরা পড়া খান সুমনের হয়ে মামলা লড়ছেন এমন একজন আইনজীবী অনুপ ঘোষ বিবিসিকে জানিয়েছেন, “ভারতীয় দন্ডবিধির ৩২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী সরকার পক্ষ চাইলে এরকম আবেদন করতে পারে"।
অনুপ ঘোষ বলছেন, “সরকারি উকিল তার আবেদনে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশে মি: হোসেনের বিরুদ্ধে অনেকগুলো গুরুতর অভিযোগ আছে – সেজন্যই তার বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিয়ে সেদেশে ফেরত পাঠাতে চায় সরকার। তবে যে আদালতে আজ আবেদন করা হয়েছে, সেই বিচারকের এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই। মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট ২১ সেপ্টেম্বর এই আবেদন শুনে রায় দেবেন"।
নূর হোসেন আর তার দুই সঙ্গী গত বছর ১৪ই জুন কলকাতা বিমানবন্দরের কাছে কৈখালী এলাকায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
তাদের বিরুদ্ধে একটাই অভিযোগ – তারা বসিরহাট এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন কোনও ভিসা ছাড়াই।
তাই বিদেশী আইনের ১৪ নম্বর ধারাতেই অভিযোগ করা হয়েছে তিনজনের বিরুদ্ধে।
নূর হোসেনের সঙ্গেই অনুপ্রবেশের দায়ে ধরা পড়া একজন খান সুমন জামিনে ছাড়া পেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি পরপর তিনটি শুনানিতে গরহাজির থাকায় তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
সূত্র : বিবিসি।