Wednesday, November 11, 2015

সংসদ এলাকায় থাকছে না জিয়ার কবর by শরিফুজ্জামান

জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্থপতি লুই কানের নকশায় শেরেবাংলা নগর এলাকায় কবরস্থানের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি—এই যুক্তিতে জিয়াউর রহমানসহ সেখানকার আরও সাতটি কবর সরানোর পক্ষে মত দিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
বাকি সাতটি কবর সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ও আতাউর রহমান খান, সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দীন খানের।
এই আটটি কবর ছাড়া শেরেবাংলা নগরে আছে লুই কানের নকশাবহির্ভূত আরও সাতটি স্থাপনা। এগুলোর মধ্যে বড় স্থাপনা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র (বিআইসিসি), স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন। এর বাইরে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার কবরের চারদিকে থাকা চারটি প্রবেশপথের শুরু বা শেষ প্রান্তে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু, সম্মেলন কেন্দ্র ও মসজিদসহ চারটি স্থাপনা।|সর্বশেষ গত ২৭ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ মারা গেলে তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী সংসদ ভবনের ‘জাতীয় কবরস্থানে’ দাফন করার জন্য জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কাছে অনুমতি চেয়েছিল তাঁর পরিবার। কিন্তু তাতে সম্মতি দেওয়া হয়নি। এর আগে জাতীয় সংসদ ভবন সীমানার পূর্ব প্রান্তে আসাদগেটের উল্টো দিকের পেট্রলপাম্পটি তুলে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় তখনকার মন্ত্রী মির্জা আব্বাসের ভাইকে জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
মূল নকশা অনুযায়ী, সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের পাশাপাশি নতুন সচিবালয়ও শেরেবাংলা নগরে হওয়ার কথা। কিন্তু বিএনপি সরকার সেখানকার ১০ একর জমিতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণ করে, যা পরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নামে নামকরণ করা হয়। এখন সরকার আবার সেখানে সচিবালয় স্থানান্তর করতে চাইলেও লুই কানের মূল নকশা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কবর তো বনানী, আজিমপুর বা মিরপুর কবরস্থানে হওয়ার কথা। কবর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় হবে কেন? তা ছাড়া, লুই কানের নকশার কোথাও শেরেবাংলা নগরে কবরস্থানের জন্য জায়গা নির্ধারিত ছিল না।
গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘রাজনীতিবিদ হিসেবে আমি চট্টগ্রামের জন্য সাধ্যমতো কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমি এখন মন্ত্রী। তাই বলে আমি মারা গেলে আমাকে কি এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে দাফন করতে হবে?’
এক প্রশ্নের জবাবে গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি, সংসদ এলাকা থেকে কবর ছাড়াও নকশাবহির্ভূত সব স্থাপনা সরানো উচিত। জাতীয় প্রয়োজনে মসজিদ-মাদ্রাসাও তো সরানো হয়।’ সে ক্ষেত্রে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন বা বিআইসিসি সরানো হবে কি না, জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন বলেন, মূল নকশা পাওয়ার পর সরকার এগুলো বিবেচনা করে দেখবে।
লুই কানের নকশা এড়িয়ে করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, মসজিদ ও সম্মেলন কেন্দ্র, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনসহ সাতটি স্থাপনা। আছে আরও সাতটি কবর তবে বিএনপির নেতারা মনে করছেন, লুই কানের মূল নকশা আনা বা কবরগুলো সরিয়ে দেওয়ার মূল লক্ষ্য হচ্ছে জিয়াউর রহমানের কবর সরানো। জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কেন সেখানে জিয়ার সমাধি করা হয়েছিল, কে করেছে বা কেন করেছে—এত দিন পর সেই প্রশ্ন অবাস্তব ও অবান্তর। এ দেশের মানুষ জানে, সেখানে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করা একজন জাতীয় নেতার সমাধি আছে। ওটা সরালে গর্হিত কাজ হবে, সংঘাত ও প্রতিহিংসার নতুন বীজ বপন করা হবে।
শেরেবাংলা নগরে নকশাবহির্ভূত স্থাপনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার লুই কানের মূল নকশা হাতে পেতে চায়, যা রয়েছে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার আর্কাইভসে। ওই নকশার একটি অনুলিপি সরকারের কাছে আছে। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, মূল নকশা সংগ্রহের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৪ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।
রাজনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, সংসদ ভবনের সীমানায় জিয়াউর রহমানের দেহাবশেষ আনা হয়েছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ও উদ্দেশ্যে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে তাঁকে হত্যার পর প্রথমে দাফন করা হয়েছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায়। পরে সেখান থেকে তাঁর দেহাবশেষ তুলে এনে ২ জুন চন্দ্রিমা উদ্যানে কবরস্থ করা হয়। ২০০১ সালে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার কবরকে কেন্দ্র করে পাঁচ বিঘা জমিতে সমাধি কমপ্লেক্স গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। ২০০৩ সালে কাজ শুরু হয়, চলে ২০০৭ পর্যন্ত।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রকৌশলী জানান, ক্রিসেন্ট লেকের ওপরের ঝুলন্ত সেতু ও মসজিদ ছাড়া কোনো স্থাপনা সেই অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে না। জিয়ার কবরকেন্দ্রিক প্রায় সমাপ্ত বা অসমাপ্ত কাজগুলো সরকার আর এগিয়ে নিতে চায় না।
সরেজমিনে দেখা যায়, জিয়াউর রহমানের কবরস্থানে যাওয়ার জন্য ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রিসেন্ট লেকের ওপর নির্মাণ করা ঝুলন্ত সেতুটি প্রায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ২০০৪ সালে এটি চালু হয়। ওই সেতু দিয়ে জিয়াউর রহমানের কবর পার হয়ে সোজাসুজি পথের শেষ ভাগে স্থাপন করা হয় ‘সম্মেলন কেন্দ্র’। দেখা যায়, সম্মেলন কেন্দ্রের দোতলায় মসজিদটি শুধু চালু আছে। ভবনকেন্দ্রিক অন্য পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।
গণভবনের দিক থেকে প্রায় ৪০০ ফুট পূর্বে জিয়াউর রহমানের কবরস্থানে প্রবেশের আরেকটি পথের পাশে রয়েছে একটি পরিত্যক্ত ভবন, যেখানে ক্যানটিন, বাথরুম ও খালি কক্ষ আছে।
বিআইসিসির দক্ষিণে রয়েছে আরেকটি ভবন, যেটির সঙ্গে জিয়ার কবরস্থানে যাতায়াতের সংযোগ রয়েছে। ওই ভবনে ক্যানটিন, বাথরুম ও সভাকক্ষ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ভবনটির নির্মাণকাজ মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে আটকে আছে।
এ প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, লুই কানের মূল নকশা পাওয়ার পর এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টাকা না থাকায় অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ হয়নি।
এদিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে সংসদ ভবনের কাছে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এই নির্মাণের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও স্থপতি ইনস্টিটিউট। ২০০৪ সালে হাইকোর্ট নির্মাণ স্থগিতের নির্দেশ দিলেও জোট সরকার কাজ চালিয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভবন দুটির অসমাপ্ত কাজ শেষ হয়। তবে মামলাটি এখনো চলছে। ৪ নভেম্বর এই মামলার শুনানিতেই লুই কানের মূল নকশা তিন মাসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত।
জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের কবর, তার নামও বারবার পাল্টেছে। নব্বই-পরবর্তী সময়ে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, তখন এর নাম বদলে ‘জিয়া উদ্যান’ করেছে। আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে পুরোনো নাম ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’ ফিরিয়ে এনেছে। অন্তত চারবার এই নামবদলের ঘটনা ঘটেছে। আবার ক্রিসেন্ট লেকের ওপর প্রথম বেইলি সেতু করেছিল বিএনপি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তা সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসে স্থায়ী সেতু তৈরি করে। আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেতুটি দিয়ে কিছুদিন যাতায়াত বন্ধ ছিল।
গত বছরের ১৭ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় জিয়াউর রহমানের কবর চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বছরের ৭ জুলাই একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদ ভবনের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি লুই কানের নকশা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কবরগুলো যদি সরানোর দরকার হয়, তাহলে সরকার তা করবে। এরপর এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব তৈরি করে ১৪ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
আরও সাত কবর: পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত আটজন নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের পশ্চিম প্রান্তে পাঁচ বিঘা জমিতে ‘জাতীয় কবরস্থান’ নাম দিয়ে সাতজনকে সমাহিত করা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাতটির মধ্যে দুটি কবরের নামফলক নেই। তত্ত্বাবধায়ক আকবর হোসেন জানালেন, তাঁরা হলেন আবদুস সাত্তার ও শাহ আজিজ। তমিজউদ্দীন খান এবং খান এ সবুরের কবর শুধু পাকা করা হয়েছে। অন্যদের নাম, জন্ম ও মৃত্যুর সময় লেখা আছে সাইনবোর্ডে।
কবরগুলোর নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একজন তত্ত্বাবধায়ক ও কয়েকজন পুলিশ রাখা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রথম আলোকে বলেন, তিন বছর আগেও এই কবরস্থান উন্মুক্ত ছিল। এখন কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না।
সচিবালয় কমপ্লেক্স: ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চন্দ্রিমা উদ্যানের উত্তরে ও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম পাশে যেখানে প্রতিবছর বাণিজ্য মেলা হয়, সেখানেই এখন অবশিষ্ট ৩২ একর জমির ওপরে নতুন সচিবালয় হওয়ার কথা। তবে গত ১৩ অক্টোবর একনেকের সভায় নতুন সচিবালয় কমপ্লেক্স স্থাপনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলা হয়, মূল নকশা অনুযায়ী সবকিছু করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকা।
পাকিস্তান আমলে ১৯৬৪ সালে ১৫ মিলিয়ন ডলারের অনুমিত ব্যয় ধরে লুই কানের নকশা অনুযায়ী সংসদ ভবন কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৮২ সালে।

কে হায় রাজনীতি ছাড়িতে চায়! by এ কে এম জাকারিয়া

অসুস্থতা বা বয়স—বাংলাদেশে রাজনীতির জন্য এসব বাধা নয়। এখানে হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও রাজনীতি চলে। বয়স ৮০ পার হলেও সমস্যা নেই। এখানে রাজনীতিতে অবসর বা অবসরের বয়স বলে কিছু নেই। এখানে রাজনীতি মানে আমৃত্যু রাজনীতি। অতএব রাজনীতি ছাড়ারও কিছু নেই।
অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সমশের মবিন চৌধুরীর রাজনীতি থেকে অবসর এবং দলের সব পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা সেদিক থেকে ব্যতিক্রমই। এমন এক সময়ে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন, যখন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। এই সফরকে যতই ব্যক্তিগত হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা হোক, এর রাজনৈতিক গুরুত্বকে কে অস্বীকার করতে পারবে! সমশের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগও তেমনি একটি বিষয়। পদত্যাগের ঘোষিত কারণ নিশ্চয়ই ‘অসুস্থতা’। কিন্তু এটাই কি সব? তাঁর পদত্যাগ ও এর পরবর্তী নানা প্রতিক্রিয়াতে অবশ্য তেমন মনে হচ্ছে না।
কূটনীতিক থেকে রাজনীতিক হয়ে যাওয়া সমশের মবিন চৌধুরী কয়েক বছর ধরে বিএনপির রাজনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে বিএনপির কথিত ‘বিদেশনির্ভর’ রাজনীতির কারণে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নানা সমঝোতার চেষ্টায় তিনি দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এ বছর জানুয়ারিতে নির্বাচনের এক বছর পূর্তিতে বিএনপির লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় গত ৮ জানুয়ারি তিনি আটক হন। প্রায় সাড়ে চার মাস আটক থাকার পর মে মাসে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। এরপর থেকে তিনি রাজনীতিতে অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।
এভাবে নিষ্ক্রিয় থাকতে থাকতে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া একটি পথ হতে পারত সমশের মবিন চৌধুরীর জন্য। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে কাজটি করেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে লেখা পদত্যাগপত্র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কাছে পাঠিয়ে তা গণমাধ্যমেও জানিয়ে দিয়েছেন। এটা পরিষ্কার যে রাজনীতি থেকে তাঁর ‘অবসর’ ও বিএনপির সব পদ ছাড়ার বিষয়টি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে চেয়েছিলেন। খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খানের মনে তাই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, ‘সমশের ভাইয়ের অবসর ঘোষণার সময়টা সঠিক হয়েছে কি না, এ প্রশ্ন আমার মনে খচখচ করছে। তিনি কি আরও কিছুদিন চুপচাপ ও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারতেন না? অবসর নেওয়ার ঘোষণাটা আরেকটু স্থিতিশীল সময়ে দিলে কী এমন ক্ষতি হতো?’
আর এটা নিছক অসুস্থ হয়ে একজন রাজনীতিকের সরে দাঁড়ানোর ব্যাপার হলে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়াগুলোও এতটা তীব্র ও জোরালো হতো না। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, ‘আপনারা জেনে খুশি হবেন যে বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে, হতাশা ব্যক্ত করে আজ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সমশের মবিন চৌধুরী দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। আমার বিশ্বাস, বিএনপির মধ্যে এখনো যাঁরা বিবেকবান মানুষ আছেন, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, তাঁরা প্রত্যেকেই এই দল থেকে বেরিয়ে আসবেন। খালেদা জিয়া-তারেক রহমানকে বাদ দিয়ে বিএনপিকে ঢেলে সাজাবেন। তাহলেই বিএনপি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবে। সন্ত্রাস ও নাশকতা সৃষ্টিকারী বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমরা তাঁকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানাই।’ সমশের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগপত্রে অবশ্য আমরা ‘বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন’ করার মতো কোনো বিষয় দেখিনি। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ও মন্ত্রী তো সমশের মবিনের উদাহরণ টেনে অন্য নেতাদের দল থেকে কেটে পড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
এ তো রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। এতে বাড়তি অনেক কিছু ও ‘রাজনৈতিক’ কথাবার্তা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জনগণের মনেও এই পদত্যাগ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে তাঁর পদত্যাগের খবরের নিচে পাঠকেরা নানা ধরনের যে মন্তব্য করেছেন, তার কয়েকটি বিবেচনায় নিলে বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এক পাঠক লিখেছেন, ভালো একটি নজির স্থাপন করলেন রাজনীতি থেকে ‘অবসর’ নিয়ে। এ দেশে কেউ রাজনীতি থেকে ‘অবসর’ নেয় না। আরেক পাঠক মন্তব্য করেছেন, রাজনীতি থেকে কেউ ‘অবসর’ নেয়? অন্য দলে যোগ দিলেই তো হতো! আরেকজনের প্রশ্ন, তিনি কি কোনো ভয়ে পদত্যাগ করলেন?
জনমনের এসব প্রশ্ন ও চিন্তাভাবনার জবাব এখনই মিলবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে পরিস্থিতি বিচার-বিবেচনা করতে কিছু পুরোনো ও জানা তথ্য পাঠকদের উদ্দেশ্যে নতুন করে ভাগাভাগি করতে চাই। সমশের মবিন চৌধুরী একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা সেই সময় থেকেই। যুদ্ধে তিনি আহত হয়েছেন। বীর বিক্রম খেতাব পেয়েছেন। কোমরে গুলি লাগার কারণে তিনি আর কখনোই পুরোপুরি সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেননি। সেনাবাহিনী থেকে তাঁর চাকরি স্থানান্তরিত হয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্রসচিব—এসব দায়িত্ব পালন করে চাকরি শেষে ২০০৮ সালে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন।
আগেই বলেছি, দলের পক্ষ থেকে মূলত বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে নানা কারণেই আলোচিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর কথিত টেলিফোন আলাপের একটি অডিও ফাঁস হয়ে পড়ে। সমশের মবিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি বড় সমালোচনা হচ্ছে তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা স্মরণ করতে পারি যে ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে কৃষক লীগের শোকসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিভিন্ন দূতাবাসে পুনর্বাসন করেন। ওই দায়িত্ব পড়ে আজকের সমশের মবিন চৌধুরীর ওপর। তাঁকে বঙ্গবন্ধু জার্মানিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু বেইমান চিরকালই বেইমান। এটা হয়তো অনেকে জানেন না।’ (প্রথম আলো, ৪ আগস্ট ২০১৪)।
এই সমশের মবিন চৌধুরী বিএনপি থেকে পদত্যাগ করলেন এমন এক সময়ে, যখন দল হিসেবে বিএনপি কার্যত স্থবির ও নিষ্ক্রিয়। দলটির চেয়ারপারসনও দেশের বাইরে। ‘অসুস্থতার কারণে’ একজন রাজনীতিকের দল ও রাজনীতি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা নিয়ে তাই নানা প্রশ্ন ও কানাঘুষা। পদত্যাগ করে নিশ্চুপ থাকার কৌশল বা নীতিও নেননি সমশের মবিন চৌধুরী। বারবার উচ্চারিত ‘অসুস্থতা’ শব্দটির আড়ালে ‘রাজনীতি’ বের হয়ে গেছে ঠিকই। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিএনপি এখন জিয়াউর রহমানের নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী চলছে কি না, সে প্রশ্নও তিনি তুলেছেন।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে যতই বলুক না কেন সমশের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ ‘একান্ত ব্যক্তিগত’ ব্যাপার বা অবসরে যাওয়ার বিষয়টি ‘স্বাভাবিক’, কিন্তু দল হিসেবে বিএনপির জন্য এটা একটা ধাক্কা। প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কি শুধুই একটি ধাক্কা নাকি এর সূচনা মাত্র? দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা নিলে এ ধরনের প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কাছে লেখা পদত্যাগপত্রের শুরুতেই তিনি লিখেছেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলাম।’ আর শেষটা করেছেন এভাবে, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার স্বাস্থ্যগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে সামনে রেখে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার প্রয়াস আমার চিরকাল থাকবে।’ ফলে ‘বর্তমান স্বাস্থ্যগত কারণে’ পদত্যাগ করা সমশের মবিন চৌধুরী ভবিষ্যতে আর কখনোই রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন না বা ‘মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে’ সামনে রেখে ‘দেশ ও জাতির কল্যাণে’ কিছু করতে আগ্রহী হবেন না, তা বলা কঠিন।
এই পদত্যাগ নিয়ে এখন যা হচ্ছে তা সবই ধারণা ও জল্পনা-কল্পনা। সামনের দিনগুলোর ঘটনাপ্রবাহে হয়তো অনেক কিছু পরিষ্কার হবে। হয়তো হবেও না। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়!’ আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের রাজনীতি ছাড়াটা কেন জানি এমনই এক হাহাকারের মতো শোনা যায়; কে হায় রাজনীতি ছাড়িতে চায়!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

শূন্য পদ ও যোগ্য প্রার্থী আছেন, নেই প্রাধিকার by আলী ইমাম মজুমদার

৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার বিভিন্ন পর্যায় ঘটনাবহুল। পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও কম হয়নি। সর্বশেষ খবর হয় সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) দুজন সদস্য কর্তৃক অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার। তবে বিষয়টি এখনো প্রমাণের অপেক্ষায়। তাই আলোচনা ভিন্ন প্রসঙ্গে। এ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে ফলাফল চূড়ান্ত করতে পিএসসি সময় নিয়েছে আড়াই বছর। গত ২৯ আগস্ট তারা তা সম্পন্ন করল। এখনো মেডিকেল টেস্ট ও পুলিশি তদন্ত সম্পন্ন হয়নি। তাই সুপারিশ পাওয়া সৌভাগ্যবানদের নিয়োগ পেতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। একটি বাংলা দৈনিকের প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বিজ্ঞাপিত পদ ২ হাজার ৫২-এর স্থলে তারা সুপারিশ করেছে ২ হাজার ১৫৯ জনকে। এমন হতেই পারে। দীর্ঘ সময়ে ক্যাডারে শূন্যপদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরবর্তী পরীক্ষা ও ফলাফল প্রকাশের সময়ও থাকে অনিশ্চিত। তাই নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় নিয়মানুসারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শূন্যপদের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি পিএসসিকে জানিয়ে অতিরিক্তসংখ্যক ক্যাডার নিয়োগের প্রস্তাব করতে পারে। এতে এটাও জানা গেল, ৪০৪টি পদ শূন্য রয়ে গেছে। প্রস্তাবিত সংবাদে পিএসসির বরাত দিয়ে বলা হয়, প্রাধিকার কোটার প্রার্থীদের না পাওয়ায় কিছু পদে সুপারিশ করা যায়নি।
আলোচনার বিষয় ৪০৪টি শূন্যপদ নিয়ে। এর ২৮৮টি সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের। পররাষ্ট্র, নিরীক্ষা ও হিসাব, কর এবং তথ্য ক্যাডারেও পদ শূন্য রয়েছে যথাক্রমে ২, ১, ১ ও ১টি। তেমনভাবে প্রফেশনাল ও টেকনিক্যাল ক্যাডারে শূন্য রয়েছে বেশ কিছু পদ। অথচ চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ প্রার্থীর সংখ্যা ৮ হাজার ৭৬৩। অনুমান করা অসংগত হবে না যে বিশেষ দু-একটি টেকনিক্যাল পদ ব্যতীত অন্য ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়ার মতো যোগ্য প্রার্থী উত্তীর্ণদের মধ্যে রয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাঁদের নেই প্রাধিকার। একসময় প্রাধিকার কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না থাকলে মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা হতো। পরে সিদ্ধান্ত হয়, প্রাধিকার কোটায় উপযুক্ত প্রার্থী না থাকলে সেই পদ শূন্য থাকবে। সিদ্ধান্তটি কমিশনের নয়, সরকারের।
উল্লেখ্য, বর্তমানে কোটাপদ্ধতির নৈতিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ। সেখানে উপযুক্ত প্রার্থী না থাকলে পদ শূন্য রাখার যৌক্তিকতা কি কেউ দিতে পারবেন? শূন্য রাখার এ পরিণতি কী? আলোচিত সংবাদ সূত্রমতে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৩০৬টি প্রতিষ্ঠানে ১৫ হাজার ২৪৬টি শিক্ষকের পদ রয়েছে। এর মধ্যে শূন্যপদের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৯৮। ৩৪তম বিসিএসে ৮৩৫ পদে সুপারিশ করেছে পিএসসি। সবাই নিয়োগ পেলেও শূন্য থাকবে ২ হাজার ৬৬৩টি পদ। এক বিসিএস থেকে পরবর্তীটির ফলাফল প্রকাশ করতে যে সময় লাগে, তাতে এক-দেড় হাজার শিক্ষক অবসরে যান। তাই এ ধরনের নিয়োগনীতির ফলে শিক্ষকশূন্যতা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। আর এ শূন্যতা ঢাকাসহ অন্য মহানগরগুলোয় লক্ষণীয় হবে না। মফস্বলের কলেজগুলোয় কোনো কোনো বিষয়ে শিক্ষকই নেই।
শূন্য পদগুলো ফেলে রেখে মেধাবীদের বঞ্চিত করা হলো। সংশ্লিষ্ট সংস্থা ভুগছে জনবলসংকটে। মূলত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জনগণ। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধিতেও অবদান রাখল সিদ্ধান্তটি এ কোটাব্যবস্থার পক্ষে কী যুক্তি আছে, তাও খোলাসা করে বলা হচ্ছে না। বেসামরিক সব চাকরির (অধস্তন বিচার বিভাগসহ) ৫৫ শতাংশ পদ প্রাধিকার কোটার আওতায়। আমাদের সংবিধানে সবার জন্য চাকরির সমান সুযোগের বিধান রয়েছে। অবশ্য ব্যতিক্রম রয়েছে শুধু পশ্চাৎপদ এলাকা বা জনগোষ্ঠীর জন্য। কিন্তু সমষ্টিগতভাবে যাঁরা সমাজের অন্য সবার মতো, তাঁদের জন্য এ ধরনের সংরক্ষণ চাকরিগুলোয় মেধাবীদের প্রবেশাধিকার কার্যত সীমিত করে ফেলেছে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনায় শাসকদের সহায়তার জন্য একটি দক্ষ প্রথম শ্রেণির সিভিল সার্ভিস দরকার। সেটা তৈরি করতে হলে মেধাকে প্রাধান্য দিয়েই নিয়োগনীতি করতে হয়। ১৯৭৩ সালের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসেস রি-অর্গানাইজেশন কমিটি এবং ১৯৭৭ সালের বেতন ও চাকরি কমিশন এ নীতিকেই সমর্থন করে নিয়োগ পর্যায়ে কোটাপ্রথার বিরোধিতা করেছে। দুটোর মতেই একটি উঁচু মানের সিভিল সার্ভিস দেশের জন্য আবশ্যক। আর কোটাপদ্ধতিতে নিয়োগ সে ধরনের সিভিল সার্ভিস গড়ার প্রচেষ্টাকে ভন্ডুল করে দেবে। পাঁচ বছর কাজ করে ২০০০ সালে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। কমিশনের মতে, কোটাপদ্ধতি সংবিধানস্বীকৃত চাকরিতে সবার সমান অধিকারের চেতনার পরিপন্থী। কেউ কেউ এমনটাও বলে থাকেন, বর্তমান কোটাপদ্ধতিটি বজায় রাখার যৌক্তিক ভিত্তির চেয়ে আবেগের ভূমিকাই বেশি। তা ছাড়া, চাহিদারও অতিরিক্ত কোটা সংরক্ষণের ফলে উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীও জুটছে না কোনো কোনো ক্যাডারে। ফলে, বিভিন্ন দিক দিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন রাষ্ট্রের বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন অঙ্গ। তুলনামূলকভাবে কম মেধাবীদের অব্যাহতভাবে নিয়োগ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে নেতিবাচক দিকটি ক্রমান্বয়ে জোরদার করছে।
এটা সত্যি, উপমহাদেশে সরকারি চাকরিতে নিয়োগকালে কোটাপদ্ধতির প্রয়োগ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সেটা ছিল অনগ্রসর শ্রেণি বা অঞ্চলের জন্য। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে, প্রথমে ভারতীয়দের জন্য সংরক্ষণ করা হয় কোটা। তেমনি মুসলমানরা অনগ্রসর ছিল হিন্দুদের চেয়ে। তারাও একপর্যায়ে এ কোটার সুফলের আওতায় আসে। অবিভক্ত পাকিস্তানে তুলনামূলক অনগ্রসর পূর্ব পাকিস্তানিদের জন্য ছিল কোটাব্যবস্থা। পূর্ব পাকিস্তানেও অনগ্রসর, তফসিলি জাতি ও উপজাতীয়দের জন্য কিছু কোটা ছিল। তবে মেধাবীদের ছিল ব্যাপক প্রাধান্য। মেধাকে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগই ছিল না সে সময়ে। এখনই কোটাব্যবস্থা একেবারে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে, এমনটাও বলা যাবে না। তবে মেধা কোটাকে ব্যাপক প্রাধান্য দিয়ে প্রাধিকার কোটার পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। পিএসসি তার বিভিন্ন সময়কার বার্ষিক প্রতিবেদনে বর্তমানে চালু কোটাব্যবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্যাপক সংস্কারের সুপারিশ করেছে। একটি মেধাভিত্তিক সিভিল সার্ভিসের পক্ষে বরাবর ছিল পিএসসির অবস্থান। সে অবস্থান সময়ান্তরে এখন কিছুটা ম্রিয়মাণ হয়েছে। কিন্তু সরকার এ বিষয়ে অনড়-অচল আছে দীর্ঘকাল। কোনো দলের সরকারই এতে হাত দিতে চায় না। অনস্বীকার্য, এর একটি রাজনৈতিক দিক আছে। তবে সে রাজনৈতিক দিককে বিবেচনায় রেখেও এখানে বড় ধরনের সংস্কার সম্ভব।
এরপর থাকছে শূন্যপদ থাকলেও প্রাধিকার কোটায় উত্তীর্ণ প্রার্থী পাওয়া না গেলে তা শূন্য রাখার সরকারি বিধান। এর কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না। বরং মনে হচ্ছে, ভাগের চিড়া চিবিয়ে ফেলে দেব, তবু খেতে দেব না অন্যকে। কিন্তু বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না, এ ভাগটাই অন্যায্য। যেটুকু অব্যবহৃত থাকে, তা বিনা বাক্যে মেধা কোটায় দিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা পিএসসিরই থাকার কথা। ৩৩তম বিসিএসে সরকারের নির্দেশে তা করা হয়েছেও। আগেও হয়েছে বেশ কিছু সময়ে। এতে তো কোটাব্যবস্থায় হাতও পড়ে না। তাহলে শঙ্কা আর ভয় কিসের। পরের বছর আরও বেশিসংখ্যক পদ খালি হবে এসব ক্যাডারে। তখন প্রাধিকার কোটায় আরও বেশি প্রার্থী পাওয়া যাবে, এমনটা কোন বিশে­ষণ থেকে বিবেচনা করা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।
শূন্যপদগুলো ফেলে রেখে মেধাবীদের বঞ্চিত করা হলো। সংশ্লিষ্ট সংস্থা ভুগছে জনবলসংকটে। মূলত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জনগণ। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধিতেও অবদান রাখল সিদ্ধান্তটি। কোনো কোনো প্রার্থীর কর্মজীবনের মোড় ঘুরে গেল। বয়ঃসীমা উত্তীর্ণ হওয়ায় তাঁরা সরকারি চাকরিতে প্রবেশের উপযুক্ততা হারিয়ে ফেললেন। সরকারি সিদ্ধান্ত মানতে গিয়ে পিএসসি এমনটা করেছে। তবে তথ্যাদি দিয়ে সরকারের নজরে বিষয়টি আনলে ইতিবাচক কিছু ঘটতেও পারত। আড়াই বছর সময় নিয়েও সুবিচার নিশ্চিত করা গেল না ৩৪তম বিসিএসের বেশ কিছু প্রার্থীর প্রতি। চার শতাধিক শূন্য পদের এ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করার কোনো উদ্যোগই পিএসসি নেয়নি। সরকারি সিদ্ধান্তের আলোকে তারা হয়তো বা সঠিক। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত ও পিএসসির কার্যক্রম যান্ত্রিক ও নির্দয়।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

ভবিষ্যৎ নির্মাণে দরকার বাধাহীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চা -সোমনাথ হালদার

পৃথিবী এখন প্রযুক্তি নির্ভর। বর্তমান এবং ভবিষ্যতেও যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি হবে প্রযুক্তি জ্ঞান ও প্রযুক্তি দক্ষতা। নিজেদেরকে বিশ্বে তুলে ধরতে হলে জনশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। আর এ জন্য ভবিষ্যৎ নির্মাণে দরকার বাঁধাহীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোই একমাত্র গন্তব্য। এ লক্ষ্যে চিটাগাং সায়েন্স ফাউন্ডেশন এর উদ্যোগ প্রশংসনীয়। বিশ্ব বিজ্ঞান দিবস-২০১৫ উপলক্ষে চিটাগাং সায়েন্স ফাউন্ডেশন (সিএসএফ) এর আলোচনা সভা, সম্মাননা স্মারক ও কর্মশালার সনদ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ভারতীয় সহকারী হাই কমিশনার সোমনাথ হালদার এ কথাগুলো বলেন।
গতকাল (১০ নভেম্বর মঙ্গলবার) চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন ড. মো. সানাউল্লাহ। চিটাগাং সায়েন্স ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট কল্যাণ চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউএসটিসির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়–য়া, সমাজবিজ্ঞানী ড. মনজুর-উল-আমিন চৌধুরী, অতিরিক্ত জেলা পিপি এড. চন্দন বিশ্বাস, শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী পরিষদ কেন্দ্রিয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এড. তপন কান্তি দাশ, চ্যানেল আই’র ব্যুরো চীফ চৌধুরী ফরিদ, বঙ্গবন্ধু সবুজ স্কুলের প্রেসিডেন্ট নাসরিন সুলতানা, ফোরাম ফর পিপলস ভয়েসের নির্বাহী সদস্য বেলায়েত হোসেন, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন দক্ষিণ জেলার সভাপতি অজিত কুমার দাশ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রফেসর বেলায়েত হোসেন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নীলরতন দাশগুপ্ত, রিমন মুহুরী, অনিন্দ্য দেব, সানি তালুকদার, সমীর পাল প্রমুখ। ইউএসটিসির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ডা. প্রভাত চন্দ্র বড়–য়া বলেন, উচ্চ শিক্ষা বলতে আমরা উন্নত সমাজ-সভ্যতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সৃষ্টির কথা বলি। কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, উন্নত বিশ্বের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় আমরা অনেকটা পিছিয়ে। সমাজবিজ্ঞানী ড. মনজুর-উল- আমিন চৌধুরী বলেন, ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য তাই সর্বাগ্রে দরকার বাধাহীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চা। এখনই সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার। তিনি এই আন্দোলনকে বাংলাদেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। অজিত কুমার দাশ বলেন, এই প্রথম চট্টগ্রামে যে বিজ্ঞান আন্দোলন প্রতিষ্টা লাভ করেছে তা অদুর ভবিষ্যতে পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।
আলোচনা সভা শেষে সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন প্রধান অতিথি সোমনাথ হালদার। এবার বিশ্ব বিজ্ঞান দিবসের সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন সজল কুমার নাথ, ডা. মো. নাছির উদ্দিন, আলমগীর শিপন, মো. আরিফ চৌধুরী, দিদারুল ইসলাম, ডা. আর কে রুবেল, প্রিন্সিপ্যাল ডা. বরুণ কুমার আচার্য্য। উল্লেখ্য যে, বিকাল ৩টার কর্মশালায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। পরে শিক্ষার্থীদের মাঝে সনদপত্র বিতরণ করা হয়।

‘সময় বদলেছে, মানুষ বদলাচ্ছে’ -অং সান সু চি

অং সান সু চি
নিম্নকক্ষে ৩৩০-এ ২৭১, উচ্চকক্ষে ১৬৮-এ ১৩৫ আসন
দৃপ্তকণ্ঠে অং সান সু চি বললেন, সময় বদলেছে। মানুষও বদলাচ্ছে। মিয়ানমারে ঐতিহাসিক নির্বাচনে তার দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) যখন ভূমিধস বিজয়ের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তখন বিবিসিকে দেয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে এসব কথা বললেন সু চি। আরও বললেন, তিনি বিশ্বাস করেন পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন তারা। স্পষ্ট করে বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয় নি। তবে বহুলাংশে অবাধ হয়েছে। গতকালই তার সাক্ষাৎকারটি নেন বিবিসির ফারগাল কিন। সু চি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। বর্তমান সংবিধানের অধীনে সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, যখন একজন সহযোগী ওই পদ ধারণ করবেন তখন তো বড় সিদ্ধান্ত আমাকেই নিতে হবে। কৌতুক করে সু চি ইংরেজিতে বলেন, ‘এ রোজ বাই এনাদার নেম’। এ বাক্যটি বিখ্যাত ইংলিশ লেখক উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের লেখা রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট নাটকে ব্যবহৃত হয়েছে। এতে বোঝানো হয় যে, পদ যা-ই হোক তাতে কিছু এসে যায় না। সাক্ষাৎকারে সু চি বলেন, নির্বাচনের ফল একে একে আসছে। ইউনিয়ন লেজিসলেচারে আমরা সম্ভবত ৭৫ শতাংশের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবো। আমরা যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চাই সেক্ষেত্রে কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হবে। ফারগাল কিন তার কাছে জানতে চান- জেনারেলরা যারা মিয়ানমারে এতো দীর্ঘ সময় কর্তৃত্ব করেছেন, তারা আপনাকে সেটা করতে দেবে- এমনটা বিশ্বাস করেন কি? জবাবে সুচি বলেন, তারা বার বার বলে আসছেন যে, মানুষের পছন্দের প্রতি তারা সম্মান দেখাবেন। নির্বাচনের ফল বাস্তবায়ন করবেন। তার কাছে ফের ফারগাল জানতে চান, আমরা অতীতে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শুনেছি। ২৫ বছর আগের নির্বাচনের বাতিল করা ফলই শুধু নয়। আপনাকে বার বার গৃহবন্দি করা হয়েছে। এবার ব্যতিক্রম হবে এমনটা বিশ্বাস করার পেছনে কারণ কি? সু চির কণ্ঠ জোরালো হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, আমি মনে করি মানুষ এখন রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি সচেতন। শুধু ১৯৯০ সালের তুলনায় নয়, ২০১২ সালে যখন আমরা উপনির্বাচনে প্রচারণা করেছিলাম তখনকার তুলনায়ও মানুষ রাজনীতি নিয়ে এখন অনেক বেশি সচেতন। আশেপাশে কি ঘটছে তা নিয়ে মানুষ অনেক বেশি সতর্ক। তাছাড়া, যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব এসেছে, যা বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। প্রত্যেকে ইন্টারনেটে গিয়ে কি ঘটছে তা অপরকে অবহিত করে। কাজেই যারা অনিয়মে লিপ্ত হতে চান তাদের জন্য পার পেয়ে যাওয়াটা অনেক বেশি কঠিন।
ওদিকে নির্বাচনের ফল প্রকাশে বিলম্ব হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সু চির দল এনএলডি। সু চির মুখপাত্র ইউ উইন হতে বলেছেন, নির্বাচন ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশন নির্বাচনের ফল প্রকাশে অসৎ উপায় অবলম্বন করছে। গতকাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ৮৮টি আসনের ফল ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে এনএলডি পেয়েছে ৭৮টি আসন। সরকার গঠন করতে গেলে তাদেরকে ৪৯৮টি আসনের মধ্যে কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হতে হবে। অর্থাৎ ৪২৯টি আসন পেতে হবে। পার্লামেন্টের ৬৬৪ আসনের মধ্যে এক চতুর্থাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। ওদিকে বিরোধী দল এনএলডির একটি সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়েছে যে, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৩৩০টি আসনে এনএলডি বিজয়ী হয়েছে ২৭১ আসন। উচ্চকক্ষের ১৬৮ আসনে এনএলডি পেয়েছে ১৩৫টি। তবে এ তথ্য দলীয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য বলে অভিহিত করেছে। উল্লেখ্য, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ও প্রেসিডেন্ট আগেভাগেই স্পষ্ট করেছে যে, তারা নির্বাচনের ফল মেনে নেবেন। তবে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী স্বামী ও দু’সন্তান বিদেশী হওয়ায় প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না সু চি। তিনি চ্যানেল নিউজ এশিয়াকে বলেছেন, এনএলডি সরকার গঠন করলে প্রেসিডেন্টের কোন ক্ষমতা থাকবে না। এক্ষেত্রে তিনি সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি ক্ষমতা অর্জন করবেন। ইন্টেলিজেন্স ক্রাইসিস গ্রুপের রিচার্ড হোরসি সতর্ক করেছেন এ বিষয়ে। তিনি বলেন, এতে জেনারেলরা ক্ষুব্ধ হতে পারে। রিচার্ড হোরসি তার এক ব্লগে লিখেছেন, মিয়ানমারের শক্তিধর সেনাবাহিনী ও এর কমান্ডার ইন চিফ সু চির এ উদ্যোগকে প্ররোচনামূলক হিসেবে দেখতে পারেন। তারা মনে করতে পারেন, তারা যে সীমানা বেঁধে দিয়েছিলেন সু চি তা অতিক্রম করছেন। কারণ, সু চি যাতে প্রেসিডেন্ট হতে না পারেন সে জন্যই তারা সংবিধান পরিবর্তন করেছিলেন। সু চি নির্বাচিত হলেও এখনই তার হাতে ক্ষমতা তুলে দিচ্ছে না সেনাবাহিনী। এখন সেনাবাহিনীর ক্ষমতার মেয়াদ আছে প্রায় ৫ মাস। এরপরেই নতুন প্রশাসনের কাছে তারা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। ফলে এসব বিষয় নিয়ে এনএলডির সঙ্গে তারা সমঝোতা করার জন্য প্রচুর সময় পাবে। যদি এ সেনাবাহিনী দেখতে পায় যে, সু চি সংবিধান পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছেন তাহলে দু’পক্ষে সংঘাত লাগতে পারে। ওদিকে এনএলডির সমালোচনার জবাব দিয়েছে দেশটির ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশন। এর প্রধান সাবেক জেনারেল ইউ টিন আয়ি বলেছেন, তারা ফল ঘোষণা নিয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা অবলম্বন করছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, প্রতি তিন ঘণ্টা পর পর তারা ফল ঘোষণা করবেন। কিন্তু এখনও সে অনুযায়ী ফল পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানী ন্যাপিডতে ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশনের সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের এক কর্মকর্তা ইউ মিন্ট নাইংকে সংবাদ সম্মেলনে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কত সময় লাগতে পারে ফল পেতে। জবাবে তিনি বলেছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফল জানানো হবে। তবে তা নির্ভর করে কত তাড়াতাড়ি ভোট গণনা করা যাবে।

মনন ও সৃজনশীলতায় অনন্য তিনি by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী
অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীকে আমি কখনো শিক্ষক হিসেবে পাইনি, যেহেতু তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কিন্তু তাঁকে আমি সব সময় শিক্ষক হিসেবেই জেনেছি। তাঁকে দেখে শিখেছি সাহিত্যের রুচি কীভাবে তৈরি করতে হয়, ভাষার ভেতরের শক্তি আর সংগীতকে কীভাবে আবিষ্কার করতে হয়, আদর্শ ও বিশ্বাসের সঙ্গে কাজকে কীভাবে মেলাতে হয়। শিখেছি বলাটা অবশ্য ঠিক হলো না, যেহেতু তাঁর থেকে শুধু পাঠ নিয়েছি, পাঠ নিতে উৎসাহী হয়েছি, কিন্তু অর্জনের রাস্তায় যেতে পেরেছি সামান্যই।
আমাদের এমএ পরীক্ষার মৌখিক অংশের বহিস্থ পরীক্ষক হয়ে ১৯৭৩ সালে ঢাকা এসেছিলেন অধ্যাপক সিদ্দিকী—সেই প্রথম তাঁকে দেখা, তাঁর কথা শোনা এবং একজন সত্যিকার বিদগ্ধ মানুষকে আবিষ্কার করা। এরপর থেকে যত তাঁকে জেনেছি, তত তাঁর চিন্তাভাবনা ও সক্রিয়তার বহুমাত্রিকতাকে বুঝতে পেরেছি। তাঁর চিন্তায় গভীরতা ছিল, তাঁর বৈদগ্ধ্য তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয়ের সঙ্গে এক আশ্চর্য সখ্য গড়েছিল। কথা বলতেন ভেবেচিন্তে, এবং প্রতিটি কথার পেছনে ওজন থাকত। অথচ মাঝেমধ্যে সহজ-সরল অন্তরঙ্গতা তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিতেন, তাঁর ভেতর একজন মানুষ আছেন, যিনি আনন্দ-হাসিকে উপভোগ করেন।
তাঁকে শুরুতে চিনতাম একজন অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে, পূর্বমেঘ-এর একজন সম্পাদক হিসেবে; তারপর ১৯৭৫-এ তাঁর হৃদয়ে জনপদে বেরোলে তাঁকে চিনলাম একজন শক্তিমান কবি হিসেবে। এরপর তিনি আবির্ভূত হলেন এক সফল অনুবাদকের ভূমিকায়, তাঁর অনূদিত শেক্সপিয়ারের সনেট ঘুরতে লাগল সবার হাতে হাতে। একজন কবি আরেকজন কবির ভাষান্তর ঘটালে স্বভাবতই তাতে শব্দ, শব্দ-প্রতিমা এবং কল্পনার একটা আলাদা মাত্রা পড়ে। এ গ্রন্থেও তা-ই হলো। কিন্তু এরপর যখন তিনি মিল্টনের অ্যারিওপ্যাজিটিকা নিয়ে উপস্থিত হলেন, অবাক হয়ে দেখলাম এই খটমটে, ল্যাটিনের প্রভাবে কঠিন হয়ে যাওয়া ইংরেজি গদ্যের কত কুশলী অনুবাদ তিনি করেছেন।
অধ্যাপক সিদ্দিকীর সঙ্গে স্বল্পদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিল বাংলা একাডেমির ইংরেজি-বাংলা অভিধান প্রকল্পে। ওই প্রকল্পের প্রধান, অর্থাৎ প্রস্তাবিত অভিধানের সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক সিদ্দিকী। মাস দুয়েক ছিলাম ওই প্রকল্পে, কিন্তু পরিশ্রমের ধরন দেখে পিঠটান দিই। ওই দুই মাস তাঁকে দেখেছি, প্রচণ্ড নিষ্ঠা ও একাগ্রতা নিয়ে কাজে নেমেছেন আমাদের দেশে অভিধানবিদ্যায় এক নতুন অধ্যায় সংযোজন করতে। তাঁর অভিনিবেশ ছিল অকল্পনীয়। তিনি ভাষার একেবারে ভেতরে ঢুকে প্রতিটি শব্দের সম্ভাব্য অর্থকে আবিষ্কারের চেষ্টা করতেন। তিনি খুব যোগ্য কয়েকজন সহকর্মী পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বহুভাষাবিদ ড. জাহাঙ্গীর তারেক ছিলেন অন্যতম। একদিন ড. তারেক আমাকে জানালেন, অধ্যাপক সিদ্দিকীর সঙ্গে কাজ করতে করতে তাঁর মনে হয়েছে ড. স্যামুয়েল জনসনের মতো উচ্চতাতেই যেন তাঁর অধিষ্ঠান।
কথাটা বাড়িয়ে বলেননি ড. তারেক। ড. জনসনও বিখ্যাত ছিলেন অভিধানবিদ ও রচয়িতা হিসেবে, তাঁরও পাণ্ডিত্য ছিল গভীর। আমার এখন মনে হয়, দুজনের মধ্যে আরেকটি মিলও ছিল—ড. জনসনের জীবনীকার বসওয়েল বলেছিলেন, ড. জনসন তাঁর জীবনকালেই তাঁর সমসাময়িকদের থেকে সেই প্রশংসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন, যা মেধাবী মানুষ শুধু পরবর্তী প্রজন্মগুলো থেকে পান। অধ্যাপক সিদ্দিকীর প্রশংসা শুনতাম তাঁর বন্ধুদের মুখে, যাঁদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহপাঠী কবি শামসুর রাহমান ও সাংবাদিক এস এম আলী। তাঁদের কাছে অধ্যাপক সিদ্দিকীর কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, তাঁকে তাঁরা পছন্দ করতেন তাঁর চরিত্রের সমুন্নতির জন্য, স্বচ্ছ জীবনদৃষ্টির জন্য এবং অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা এবং শ্রেয়বোধের প্রতি তাঁর সুদৃঢ় অঙ্গীকারের জন্য।
অধ্যাপক সিদ্দিকী শিক্ষাবিদ ছিলেন, শিক্ষা নিয়ে ভাবতেন, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা বিষয়ে ইংরেজিতে একটি বইও লিখেছিলেন। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিপদ নিয়ে বাংলায় লেখা তাঁর বইটি বেরোয় ১৯৮৯ সালে, যখন অনেকের কাছে এগুলো বিপদের গুরুত্ব নিয়ে আসেনি। তাঁর যে দূরদৃষ্টি ছিল, এবং তার আলোকে যে তিনি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজকে পড়তে পারতেন, তা তাঁর লেখালেখিতে, বক্তৃতায়-ভাষণে প্রকাশ পেত। জাতির নানান সংকটের সময় তিনি একজন সচেতকের ভূমিকা পালন করতেন, তাঁর লেখনীর শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ গড়তেন, মানুষের শুভবুদ্ধিকে জাগাতেন।
এক বছর আগে এই দিনে অধ্যাপক সিদ্দিকী আমাদের থেকে বিদায় নেন। ৮৬ বছরের দীর্ঘ জীবন তিনি কাটিয়েছেন জ্ঞান সাধনায়, সাহিত্যচর্চায়, অধ্যাপনায় ও লেখালেখিতে। যত দিন তিনি ছিলেন, তাঁর উপস্থিতি খুবই প্রয়োজনীয় ছিল আমাদের কাছে। তিনি চলে যাওয়ার পর তাঁর অভাবটা তীব্রভাবেই অনুভব করছি আমরা। সৃজনশীলতা ও বুদ্ধির চর্চার একটা সংযোগ তিনি ঘটিয়েছিলেন, দেশজ চিন্তার সঙ্গে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির একটা সম্পর্কও তিনি তৈরি করেছিলেন। তাঁর থেকে অনেক কিছু আমরা পেয়েছি। আমাদের থেকে কতটা তিনি নিতে পেরেছিলেন, তা আমাদের কোনো দিন জানা হবে না, কিন্তু এটুকু বলা যায়, তাঁর জন্য তোলা থাকবে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নজরদারিতে আনা হচ্ছে by কাজী সোহাগ

বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতে এবার ফেসবুক নজরদারি করতে যাচ্ছে সরকার। বিশেষ করে জঙ্গি তৎপরতা, ব্ল্যাকমেইল, হুমকি, চাঁদাবাজি ও অপপ্রচার দমনে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ফেসবুক নিয়ে অসংখ্য অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)কে বিশেষ নির্দেশনা দেয় সরকার। এরই আলোকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রাথমিকভাবে তারা বাংলাদেশে সার্ভার বসাতে রাজি হয়েছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ৫ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে শুধু ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। এ প্রসঙ্গে বিটিআরসির লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং বিভাগের মহাপরিচালক একেএম শহীদুজ্জামান বলেন, সমপ্রতি ফেসবুকের মতো সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে অনেক ধরনের অপকর্ম হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে এরই মধ্যে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে বাংলাদেশে একটি সার্ভার বসাতে। ফেসবুক এতে প্রাথমিকভাবে সম্মতি জানিয়েছে। এটা সম্ভব হলে অনেক অভিযোগের সমাধান হবে। বিটিআরসি জানিয়েছে, বাংলাদেশে ফেসবুকে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৭ শতাংশ এবং ১৮ থেকে ২২ বছর বয়সীদের হার ৪২ শতাংশ। দেশে গত বছর একই সময়ে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি। এর মধ্যে ৮২ লাখ পুরুষ এবং ২২ লাখ নারী ছিল। শুধু ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীর সংখ্যা ছিল ৭৪ লাখ। ফেসবুক নজরদারি প্রসঙ্গে বিটিআরসির সচিব সরওয়ার আলম জানান, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে ‘মিউচুয়াল এগ্রিমেন্ট’ নিয়ে আলোচনা করছে। এই চুক্তির ফলে সমস্যা অনেকাংশে কমার আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রতে রয়েছে, তাই চুক্তি হলে এ বিষয়ে সুবিধা হবে। গত বছর ডিসেম্বরে বিটিআরসির কমিশন বৈঠকে ফেসবুক ও গুগলের অ্যাডমিন প্যানেল স্থাপনে আবেদনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানান, কোন ওয়েবসাইট কিংবা ব্লগে সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটলে কিংবা ক্ষতিকর কোন উপাদান সংযুক্ত করা হলে, তার বিরুদ্ধে সহজেই ব্যবস্থা নেয়া যায়। ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ের মাধ্যমে সহজেই ওই ওয়েবসাইট কিংবা ব্লগের লিংক বন্ধ করা যায়। এ ধরনের প্রায় এক হাজার লিংক বন্ধ করা হয়েছে। তবে ফেসবুক কিংবা গুগল পরিচালিত ইউটিউবের কোন লিংক এককভাবে বন্ধ করা যায় না। এক লিংক বন্ধ করতে গেলে পুরো ডোমেইন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ফেসবুক ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হন। বাংলাদেশের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে ফেসবুক কিংবা গুগলের কোন সমঝোতা স্মারক বা চুক্তি না থাকায় ফেসবুকের কাছে তথ্য চাওয়া হলেও তা তারা দেয় না। গুগলের কাছে কোন ইউটিউব লিংক বন্ধের আবেদন জানানো হলে তারা আমলেই নেয় না। এ কারণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ফেসবুক এবং গুগলের অ্যাডমিন প্যানেল স্থাপনের জন্য আবেদনের সিদ্ধান্ত হয় কমিশনের বৈঠকে। সেই অনুযায়ী আবেদন পাঠানো হয় এবং আবেদনে টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী বিটিআরসি যে রাষ্ট্রীয় স্বাধীন সংস্থা তা উল্লেখ করা হয়। ফেসবুকে বাংলাদেশের তরুণদের আগ্রহ এবং বহুমুখী ব্যবহারে বাংলাদেশে কিভাবে ফেসবুক জনপ্রিয় হচ্ছে তা তুলে ধরা হয়। বিটিআরসি জানিয়েছে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটিতে পৌঁছাবে। গত ৮ই নভেম্বর নেদারল্যান্ডস সফর নিয়ে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিদের যোগাযোগ ও অর্থের উৎস বন্ধ করতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানান। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে কিছু ‘অ্যাপ’ বন্ধ করাসহ ইন্টারনেটের উপর ‘সাময়িক কড়াকড়ি’ আরোপের ইঙ্গিত দেন। সামপ্রতিক কয়েকটি হত্যা ও হামলার ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ডিজিটালাইজেশনের ‘শুভফল’ যেমন আছে, ‘খারাপ ফলও’ আছে। এতো বেশি আমরা সেই থ্রি-জিতে, ফোর-জিতে চলে গেছি...ইন্টারনেট-ভাইবার থেকে শুরু করে নানা ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে এই জঙ্গিরা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে হরতাল-অবরোধের সময়ও ‘ভাইবার’ ও ‘হোয়াটসঅ্যাপ’সহ ইন্টারনেটে যোগাযোগের কয়েকটি মাল্টিমিডিয়া অ্যাপ কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়। তখন পুলিশ বলেছিল, নাশকতাকারীরা মোবাইলফোনে কথা না বলে ইন্টারনেটভিত্তিক এসব অ্যাপ ব্যবহার করায় তাদের ধরতে সমস্যা হচ্ছে। এর মধ্যে ফেসবুকও ছিলো। সংশ্লিষ্টরা জানান, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে সার্ভার বসালে এটা বন্ধ না করেও নজরদারি করা সম্ভব হবে।

জবানবন্দিতে সেই নববধূ যা বলেছেন-

আমার সঙ্গে মোফাজ্জলের প্রেমের কোন সম্পর্ক ছিল না। বড় ভাইয়ের বন্ধু হিসেবে তাকে চিনতাম। সে আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে জোর করে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বরের গাড়ি থেকে ছিনিয়ে নেয়া নববধূ আদালতে জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন। এ ছাড়া তাকে বরের গাড়ি থেকে তুলে নেয়ার পর কোথায় কোথায় রাখা হয়েছে এ ব্যাপারেও বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানা যায়। গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের আদালতে নববধূর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। একই আদালতে সাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন হালিমা খাতুন। তিনি আদালতকে জানান, তার ছেলের দোকান থেকে জিনিসপত্র নিত মোফাজ্জল। সে হিসেবে মোফাজ্জলকে তিনি আগে দেখেছেন। ওই নববধূকে বউ পরিচয় দিয়ে তার বাড়িতে নিয়ে আসে মোফাজ্জল। হালিমা বেগমের বাড়ি থেকে রোববার রাতে নববধূকে উদ্ধার করে র‌্যাব-১১। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত নববধূকে তার বাবা আবদুল লতিফের জিম্মায় দিয়েছেন।
অন্যদিকে একই দিন নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাসিস্ট্রেট আশিক ঈমামের আদালতে ঘটনার মূলহোতা গ্রেপ্তারকৃত মোফাজ্জল ও তার দুই সহযোগী রুবেল ও সুজনের রিমান্ড শুনানি হয়। আদালত নববধূকে ছিনিয়ে নেয়ার মূলহোতা মোফাজ্জলকে ৩ দিন এবং তার দুই সহযোগী রুবেল ও সুজনকে দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড চেয়ে পুলিশ আসামিদের আদালতে হাজির করে। এদিকে আদালতে হাজির করার আগে নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে উদ্ধার হওয়া নববধূর ডাক্তারি পরীক্ষা করিয়েছে পুলিশ।
ওদিকে মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদকের কাছে নববধূর বাবা আবদুল লতিফ জানান, উপজেলার টেকপাড়া এলাকার জয়নাল, ইসমাইল, সোরহাব ও হাতেম আলী এবং নোয়াগাঁও এলাকার তোফাজ্জল মামলা তুলে নিতে তাকে হুমকি দিচ্ছে। না হলে তার বাড়িঘরে আগুন দেবে। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। তা ছাড়া মামলার অপর আসামি জামাল উদ্দিনের ছেলে আলমগীর, ইসমাইল মেম্বারের ছেলে রাকিব, ইব্রাহিমের ছেলে ইয়াছিন, ফারুকের ছেলে ফাহিম ও রাসেল এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।

কচুক্ষেতে দুর্বৃত্তের কোপে মিলিটারি পুলিশ আহত- ছোরাসহ যুবক আটক

রাজধানীর কচুক্ষেত এলাকায় সেনাসদস্যের ওপর
হামলার স্থানটি ঘেরাও করে রাখে নিরাপত্তা কর্মীরা
এক মিলিটারি পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে আহত করেছে এক দুর্বৃত্ত। আহতের নাম সামিদুল ইসলাম। তিনি ১৩ নম্বর মিলিটারি পুলিশের (এমপি) ল্যান্স কর্পোরাল। গতকাল (মঙ্গলবার) সকাল সাড়ে ৯টায় কাফরুল থানাধীন কচুক্ষেতে সেনাবাহিনীর একটি তল্লাশিচৌকিতে এ ঘটনা ঘটে। আহত সেনাসদস্যকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে। তার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা জানা যায়নি।
এ দিকে এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে কাফরুল এলাকার একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে এক যুবককে আটক করা হয়েছে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে একটি ধারালো ছোরা। তবে আটক যুবকের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর সদর দফতরের কাছে সংঘটিত ঘটনার পর ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। এলাকার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। একই সাথে মিলিটারি পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। এটি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাচৌকি।
কাফরুল থানা পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল সকালে মিলিটারি পুলিশ সামিদুলসহ কয়েকজন সেনাসদস্য কচুক্ষেত সেনানিবাসের এ প্রবেশমুখে নিরাপত্তাচৌকিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই এলাকায় রিকশা প্রবেশ নিষিদ্ধ। তারপরও সে সময় একটি রিকশা প্রবেশের চেষ্টা করে। তখন সামিদুল ওই রিকশা আটক করে তার চাকার হাওয়া ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় রিকশায় থাকা এক যুবক ধারালো অস্ত্র বের করে সামিদুলকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। তখন তার সহকর্মীরা হামলাকারী যুবকটিকে ধাওয়া করে। যুবকটি ক্যান্টনমেন্টের নিকটবর্তী আবাসিক এলাকা কাফরুলের দিকে ছুটে যায়। সে ২৩৯/১/খ নম্বর কাফরুলের একটি পাঁচতলা বাড়িতে আশ্রয় নেয়। খবর পেয়ে মিলিটারি পুলিশের আরো সদস্য, কাফরুল থানা পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা এসে বাড়িটি ঘিরে ফেলেন। প্রায় এক ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে বাড়িটি থেকে একজনকে আটক করেন তারা। এ সময় তার কাছ থেকে একটি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, এমপি চেকপোস্টের পাশের রাস্তার পিচের ওপর ছোপ ছোপ রক্ত। পুলিশ ওই এলাকা ঘিরে রেখেছে। সিআইডির ক্রাইমসিন টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করছেন। ঘটনার পর উৎসুক জনতা ওই এলাকায় ভিড় জমাতে থাকে। এ সময় পুলিশ ও মিলিটারি পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়।
এ দিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, রিকশাচালক নিজে, নাকি আরোহী এমপি সদস্যকে কুপিয়েছে এটা নিশ্চিত জানতে পারেননি তারা। পাশেই কচুক্ষেত বাজার হওয়ায় এ এলাকায় বহিরাগতদের যাতায়াত রয়েছে। সালাউদ্দিন নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের জানান, নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তিনি আর্মি চেকপোস্টের দিকে একটি রিকশা যেতে দেখেন। এরপর একজন মিলিটারি পুলিশ ওই রিকশার কাছে গিয়ে চালককে গালমন্দ করতে করতে চাকার হাওয়া ছেড়ে দেন। ঠিক ওই সময় রিকশা থেকে একজন নেমে সেনাসদস্যকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি কোপ ঠেকানোর চেষ্টা করলে তার হাতেও কয়েকটি আঘাত লাগে। তিনি আরো জানান, খুব অল্প সময়ের মধ্যে যুবকটি সেনাসদস্যকে কুপিয়ে দ্রুত দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় অন্যান্য মিলিটারি পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন তাকে ধাওয়া করে।
যুবক কাফরুলের পাঁচতলা একটি বাড়িতে ঢুকে পড়ে। ওই বাড়ির একজন মহিলা ভাড়াটে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, সকালে তার বাসায় ডোরবেলের শব্দ পেয়ে তিনি দরজা খোলেন। এ সময় হাতে রক্তমাখা ছুরি নিয়ে একজন যুবক তাকে ধাক্কা দিয়ে বাসায় ঢুকে পড়েন। তিনি ওই মহিলার কাছে পানি চান। পানি দিলে ওই যুবকটি তার হাতে থাকা ছুরিটি খাবার টেবিলের নিচে রাখেন। পানি খাওয়ার পর বলেন, ‘আমার পেছনে লোক লেগেছে, আমাকে একটু লুকানোর জায়গা দেন’। পরে ওই মহিলার দেবর কৌশলে জায়গা দেয়ার কথা বলে ঘরের বাইরে নিয়ে গেলে মহিলা ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেন। ততক্ষণে এমপি, পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা চার দিক থেকে ওই বাড়িটি ঘিরে ফেলে। তারা হামলাকারী যুবককে নিচে নামার জন্য আহ্বান করতে থাকে। কিন্তু তাতেও না শোনায় গুলি করার হুমকি দিলে ওই যুবক ভবনের ছাদে ওঠার চেষ্টা করে। সে জানিয়ে দেয় তাকে ধরার চেষ্টা করলে সে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়বে। কিন্তু ছাদের দরজা তালা থাকায় ব্যর্থ হয়ে নিচে নামার চেষ্টা করে। ওই সময় পুলিশ তাকে ধরে ফেলে। পুলিশ আরো জানায়, এর আগে হামলাকারী ওই এলাকার বিভিন্ন ভবনে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু গেট বন্ধ থাকায় সেখানে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। হামলাকারীকে প্রাথমিকভাবে ডিজিএফআই সদর দফতরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, নাশকতা সৃষ্টি করতে কেউ যদি পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায় তাহলে সেটা বন্ধ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তারপরও পুলিশ অ্যালার্ট থাকায় সেনাসদস্যের ওপর হামলাকারীকে গ্রেফতার সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, গ্রেফতারকৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ হামলার পেছনে থাকা নির্দেশদাতা ও অর্থদাতা কারা তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ দিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সকাল পৌনে ১০টায় কাফরুল এলাকায় কর্তব্যরত একজন মিলিটারি পুলিশকে এক পথচারী পেছন থেকে ধারালো অস্ত্রের মাধ্যমে আঘাত করে। এতে ওই মিলিটারি পুলিশসদস্য সামান্য আহত হন। কর্তব্যরত অন্য সামরিক সদস্যরা সন্দেহভাজন একজন হামলাকারীকে আটক করেছে। বিস্তারিত জানার জন্য ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে।