Saturday, July 31, 2021

সকালে ঘুম থেকে উঠে কাচা ছোলা খাওয়ার উপকারিতা জেনে নিন?

কাঁচা ছোলার গুণ সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যপোযগী ছোলায় আমিষ প্রায় ১৮ গ্রাম, কার্বোহাইড্রেট প্রায় ৬৫ গ্রাম, ফ্যাট মাত্র ৫ গ্রাম, ২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ‘এ’ প্রায় ১৯২ মাইক্রোগ্রাম এবং প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি-১ ও বি-২ আছে। এছাড়াও ছোলায় বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন, খনিজ লবণ, ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাস রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে আরও অনেক উপকার। জেনে নিন....
* ছোলায় শর্করার গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের পরিমাণ কম থাকায় শরীরে প্রবেশ করার পর অস্থির ভাব দূর হয়।
* ছোলাতে দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় উভয় ধরনের খাদ্য আঁশ আছে। এই খাদ্য আঁশ হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
* ছোলা খাদ্যনালীতে ক্ষতিকর জীবাণু দূর করে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা কমায়। * ছোলার শর্করা গ্লুকোজ হয়ে দ্রুত রক্তে যায় না। তাই ডায়াবেটিকস রোগীর জন্য ছোলা খুবই উপকারী খাবার।
* ছোলার ফ্যাটের বেশিরভাগই পলি আনস্যাচুয়েটেড। এই ফ্যাট শরীরের জন্য মোটেই ক্ষতিকর নয়, বরং রক্তের চর্বি কমায়।
* কাঁচা ছোলা ভিজিয়ে কাঁচা আদার সঙ্গে খেলে শরীরে আমিষ ও অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা পূরণ হয়। আমিষ মানুষকে শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান বানায় এবং অ্যান্টিবায়োটিক যে কোনো অসুখের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
* ছোলা খাওয়ার পর বেশ অল্প সময়েই হজম হয়। ছোলার আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
* ছোলায় বেশ ভাল পরিমাণ ফলিক এসিড থাকায় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
* ছোলায় থাকা প্রচুর পরিমাণে ক্যালরি দীর্ঘক্ষণ ধরে শরীরে শক্তির যোগান দেয়।

Thursday, July 29, 2021

যেভাবে আখ্যান থেকে আখ্যানে বয়ে গেছে ভালোবাসার নদী চেনাব by হারুন খালিদ

সোহনি এবং মাহিওয়ালের প্রেম কাহিনীতে মাটির ঘড়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাঞ্জাবি এই ফোক গল্পের শেষে সোহনি মাহিওয়ালের সাথে দেখা করার জন্য চেনাব নদী পার হয়। মাহিওয়াল নদীর ওপারে তার জন্য অপেক্ষা করছি। সোহনির ঘড়া তার হাতের মধ্যে গলতে শুরু করে। প্রতিদিনই প্রিয়তমের সাথে দেখা করার জন্য এই ঘড়া নিয়ে নদী পার হতো সে। কিন্তু শেষ দিন সে জানতো না যে, তার ননদ তার অজান্তেই প্রতিদিনের ঘড়া বদলে সেখানে কাঁচা মাটির একটা ঘড়া রেখে দিয়েছিল।
জনপ্রিয় সুফি কবিতায় এই ঘড়া, সোহনি এবং মাহিওয়াল – প্রত্যেকেরই প্রতীকী অর্থ আছে। মাহিওয়াল এখানে পরম ভালবাসার পাত্র বা আধ্যাত্মিক লক্ষ্য, সোহনি হলো আত্মত্যাগী ধর্মভীরু যে সকল প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে এবং চেনাব এ ক্ষেত্রে গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম। কিন্তু ধর্মভীরুর প্রচেষ্টা এখানে এককভাবে পূরণ হয় না। অনেক কাহিনী রয়েছে যেখানে বিভিন্ন ধর্মভীরু পরম সত্য জানার চেষ্টা করতে গিয়ে গাইডের অভাবে উন্মাদ হয়ে গেছে। তাই প্রত্যেক অনুসন্ধিৎসুরই একজন শিক্ষক, পৃষ্ঠপোষক, মুরশিদ প্রয়োজন। শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক গুরুর সংস্পর্শে থেকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। পাঞ্জাবি সুফি কবিতায় এই ঘড়ার ভূমিকা সেটাই। এটার সাহায্য নিয়েই সোহনি প্রতিদিন সন্ধ্যায় মাহিওয়ালের সাথে দেখা করতো।
চেনাব নদী পার হয়ে নৌকা থেকে নামছেন পাকিস্তানের গ্রামবাসী, ছবি: এএফপি
সোহনি যখন স্রোতের মধ্যে পড়ে, তার ঘড়া ক্রমেই পিছলে যেতে থাকে। নতুন একটি প্রতীকের জন্ম হয় এখানে। অনেক গুরু ভক্তদের এই কঠিন সফরে উদ্বুদ্ধ করতে পারলেও এমন হতে পারে যে সে নিজেই প্রশিক্ষিত নয়। সে ক্ষেত্রে ভক্ত ও গুরু উভয়েই এই কঠিন পথে নিজেদের হারিয়ে ফেলতে পারে।
নদীর পাশে
যে নদী সোহনিকে গিলে ফেলেছিল, সেখানেই জন্ম নিয়েছিল সাহিবান। সোহনির মতো সেও চিল হিয়ার। নদীর অল্প দূরেই খেইওয়া গ্রাম। এর পাশেই কৃষিক্ষেতে একটা ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে যেখানে বাল্যকালে একসাথে লেখাপড়া করেছিল মির্জা আর সাহিবান। তাদের বাল্যকালের প্রেম যখন বড় হচ্ছিল, সাহিবানের বাবা-মা তখন ভিন্ন চিন্তা করেছিলেন। চাচাতো ভাইয়ের সাথে সাহিবানের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তারা।
পালানোর সিদ্ধান্ত নেয় তারা। মির্জা ঘর ছাড়ার আগে তার মা তাকে সতর্ক করে বলে যে সাহিবান সিয়ার গোত্রের মেয়ে এবং এই গোত্রের মেয়েরা হয় খারাপ। মির্জা অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্র নয়। রাঞ্ঝার যেটা ছিল না, সেই তীর-ধনুক ছিল তার। ছিল বলবান ঘোড়া। কিন্তু মির্জা আর সাহিবানের পরিণতিও ছিল ট্রাজিক। সাহিবানের ভাইয়েরা তাদের হত্যা করে, যারা নিজেদের ‘সম্মান’ রক্ষা করছিল।
চেনাব নদীর কাছে ঐতিহাসিক ঝাং শহরের প্রান্তে মাহি হিরের মাজার, ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
চেনাব নদী থেকে বেশি দূরে নয় ঐতিহাসিক ঝাং শহর। শহরের প্রান্তে মাহি হিরের মাজারে প্রতিদিন ভিড় করে শত শত পূণ্যার্থী। মাজারের মাঝখানে হির আর রাঞ্ঝাকে একই কবরে কবরস্থ করা হয়েছে। চূড়ান্ত এই মিলন সুফি কবিতার ঐতিহ্যিক প্রতীক হয়ে আছে।
প্রতীক হিসেবে নদী
হির এভাবেই আদর্শ ভক্তের প্রতীক হয়ে আছেন। আর তার প্রেম কাহিনী পরবর্তী প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য পথ দেখিয়েছে। সোহনি এবং সাহিবানের মধ্যেও একজন হির ছিল। অন্যদিকে মাহিওয়াল আর মির্জার মধ্যে রাঞ্ঝার ছায়া খুঁজে পান অনেকে। এই গল্পগুলোকে যখন একত্রে দেখা হয়, আরেকটি প্রতীকের আবির্ভাব হয় সেখানে – একটা নদীর প্রতীক – চেনাব নদী – যেটা সমস্ত আখ্যানকে এক সূতায় গেঁথেছে। এক আখ্যান থেকে আরেক আখ্যানে ছড়িয়ে গেছে যেটা। এই সব প্রেমের আখ্যানের সাক্ষি হিসেবে ভালোবাসার নদী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে চেনাব।
হারুন খালিদ চারটি বইয়ের লেখক। তার সাম্প্রতিক বই – ‘ইমাজিনিং লাহোর: দ্য সিটি দ্যাট ইজ, দ্য সিটি দ্যাট ওয়াজ’। পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউজ এই বইটি প্রকাশ করেছে।

বলিরেখা দূর করে ক্যাস্টর অয়েল

আঠালো ক্যাস্টর অয়েল কেবল চুলের যত্নেই অনন্য নয়, এটি ত্বকের সুস্থতার জন্যও কার্যকর। ব্রণ ও বলিরেখা দূর করার পাশাপাশি ত্বক উজ্জ্বল করে এই তেল। আবার চুল পড়া বন্ধ করে নতুন চুল গজাতেও এর জুড়ি মেলা ভার।
ব্রণ দূর করতে
ক্যাস্টর অয়েলে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের স্বাভাবিক ময়েশ্চারাইজ লেভেল নিয়ন্ত্রণে রেখে দূর করে ব্রণ। রাতে ঘুমানোর আগে ব্রণের উপর ক্যাস্টর অয়েল লাগিয়ে রাখুন। পরদিন সকালে ত্বক পরিষ্কার করে ফেলুন।
ঝলমলে চুলের জন্য
চুলের রুক্ষভাব দূর করে ঝলমলে ও উজ্জ্বল করে ক্যাস্টর অয়েল। ক্যাস্টর অয়েলের সঙ্গে নারকেল তেল ও অলিভ অয়েল মিশিয়ে চুলে ম্যাসাজ করুন। ১ ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলুন ভেষজ শ্যাম্পু দিয়ে। 
চুল পড়া রোধ করতে
মেথি গুঁড়া করে ক্যাস্টর অয়েল মিশিয়ে চুলের গোড়ায় লাগান। কিছুক্ষণ পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। বন্ধ হবে চুল পড়া।
বলিরেখা দূর করতে
চোখের আশেপাশের ত্বকে বলিরেখা পড়ে গেলে রাতে ঘুমানোর আগে ক্যাস্টর অয়েল লাগান ঘষে ঘষে। পরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন।
শুষ্ক ত্বকের যত্নে
শুষ্ক ও প্রাণহীন ত্বকের যত্নে সপ্তাহে একদিন ক্যাস্টর অয়েল লাগান।
>>>তথ্য: এনডিটিভি

Saturday, July 24, 2021

শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম্: দক্ষিণ এশিয়ায় ‘জাতি-রাষ্ট্র’-এর সংকট

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ আয়তনে খুব ছোটই বলা যায়। কিন্তু এইরূপ ছোট বড় সকল দেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা বর্তমানে আঞ্চলিক পরিস্থিতির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। গত কয়েক দশকে আমরা বিশ্বায়নের ব্যাপকতা দেখেছি। গত এক দশক ধরে দেখছি  বাংলাদেশে আঞ্চলিক পরিস্থিতির লক্ষ্যণীয় প্রভাব। দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশই এইরূপ প্রভাব অগ্রাহ্য করে এককভাবে এগোতে পারবে না আর। পাশাপাশি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ধুঁকছে পারস্পরিক বিবাদ ও এথনো পলিটিকস্-এর অন্ত:কলহেও। ফলে বর্মা থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত জনপদগুলো রক্তপাতপূর্ণ এক পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে, যদিও খুব ধীর লয়ে। সেই ‘পরিবর্তন’ও অনিশ্চয়তায় ভরা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই আসন্ন উত্থান-পতনের অনিবার্যতায় কাজ করছে তার বিবিধ জাতীয়তাবাদের বৈরিতা। আলতাফ পারভেজের ‘শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম্ : দক্ষিণ এশিয়ায় জাতিরাষ্ট্রের সংকট’ সেই জাতীয়তাবাদী টানাপোড়েনের একটি বড় কেস স্টাডি। এখানে মূলত শ্রীলঙ্কার তামিল জাতীয়তাবাদের পূর্বাপর আলোচিত হলেও তা ঘটেছে দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে জাতীয়তাবাদী দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক পটভূমিতে। লেখক ‘এথনো-পলিটিক্স’ বলে একটি নতুন ধারণা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মূল সংকটটি বুঝবার ওপর জোর দিচ্ছেন। ‘মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী’ শীর্ষক সাড়া জাগানো গ্রন্থের পর এবার এই লেখক অনুসন্ধানী আলো ফেলেছেন নৃতাত্ত্বিক রাজনীতির উপর।
আমরা জানি, উপনিবেশিক শক্তি প্রায় ৭০ বছর আগে ভারত, পাকিস্তান, বর্মা, শ্রীলঙ্কাকে একই সময় ‘স্বাধীনতা’ দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সেক্যুলার ‘জাতি-রাষ্ট্র’ গঠনের সুপারিশ ও চ্যালেঞ্জও দিয়ে গিয়েছিল। সেই চ্যালেঞ্জের পরিণতি এই হয়েছে যে, আরকান, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাব, আসাম, কাশ্মীর, বালুচিস্থান, মধেস, জাফনাসহ অনেক জনপদ আজও জ্বলছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ‘জাতি-রাষ্ট্র’ – এর মডেল কিভাবে এবং কেন ব্যর্থ হলো এবং তার সম্ভাব্য পরিণতি কি তারই গভীর অনুসন্ধান এই গ্রন্থ। লেখক কেবল যে, সিংহলি ও তামিলদের সংঘাতের ঐতিহাসিক পূর্বাপর নিয়ে তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছেন তাই নয়, একই সঙ্গে ২৬ বছর স্থায়ী ঐ সংঘাতে ভারতের প্রায় তিন দশক পুরানো সর্বগ্রাসী হস্তক্ষেপেরও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে অনুসন্ধানের উপসংহার হলো, এথনো পলিটিক্সে বহির্দেশীয় হস্তক্ষেপ সেই সংকটকে আরও জটিল ও বিপথগামী করে। লেখক এই বার্তা হাজির করেছেন পাকিস্তান, বর্মা, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ সকলের জন্য।
জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগকে ব্যবহার করে শুরু হলেও এথনো-পলিটিক্স কীভাবে অস্ত্র ব্যবসা, সামরিক আমলাতন্ত্র, ন্যায়বিচারহীন মানবিক বিপর্যয় এবং ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের পুষ্টি সাধন করে চলে তারও বিস্তর তথ্য দিচ্ছে এই গ্রন্থ। তামিল ইলম্- এর সংগ্রামে ভারতের ভূমিকা ছাড়াও  শ্রীলঙ্কাকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের উদীয়মান বিবাদের পর্যালোচনাও রয়েছে অনুসন্ধানে। আগামীতে দক্ষিণ এশিয়া নৃতাত্ত্বিক ঘৃণাকে উপজীব্য করে কীভাবে ভূ-রাজনীতির উত্তপ্ত কড়াই হতে চলেছে তার ইশারা-ইঙ্গিত গ্রন্থটির বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে। রয়েছে জাতীয়তাবাদী ঘৃণা-বিদ্বেষ থেকে নিষ্কৃতির মৃদু পথনির্দেশও। তবে লেখক বলেছেন, জাতি-রাষ্ট্র’র টানাপোড়েন থেকে দক্ষিণ এশিয়ার আপাত মুক্তি নেই এবং ঐরূপ রাষ্ট্র কায়েম সম্ভবও নয়। অর্থাৎ পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র ধারণার মৃত্যু ঘটেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ থেকে বের হয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে একক পলিটিক্যাল কমিউনিটি হওয়ার তাগিদ রয়েছে লেখকের ভাবনায়। তবে মূল আলোচনায় লেখক নৈর্ব্যক্তিক।
৩৩৫ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে সাতটি অধ্যায়জুড়ে মূলত ৪-৫টি বিষয় আলোচিত হয়েছে। এগুলো হলো শ্রীলঙ্কায় সিংহলি বনাম তামিল বিবাদের ঐতিহাসিক আর্থ-সামাজিক বিবরণ, তামিল জাতীয়তাবাদের উত্থানের ভূ-রাজনৈতিক পটভূমি হিসেবে বিশেষভাবে তামিল নাড়ু, দিল্লি ও অন্যান্য দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা এবং সিংহলি শাসক এলিটদের কাছ থেকে ‘হোমল্যান্ড’ আদায়ে এলটিটিই ও প্রভাকরণের ভূমিকা। যদিও এলটিটিই’র সঙ্গে শ্রীলঙ্কার শাসকদের যুদ্ধ চলেছে ২৬ বছর, তবে এই গ্রন্থের শুরু আরও পূর্বে এবং শেষও হয়েছে অতিসাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় শ্রীলঙ্কাচর্চা প্রায় নেই বললেই চলে। তাই এ গ্রন্থকে বলা যায় বাংলা ভাষায় শ্রীলঙ্কা বিষয়ক প্রথম গবেষণা গ্রন্থ। কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো লেখক শুরুতে দেখিয়েছেন, কীভাবে শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে বাংলাদেশ বার বার আলোচিত এবং দেশটির ইতিহাসে বাংলাদেশ কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই গ্রন্থ বাংলা ভাষায় দক্ষিণ এশিয়ায় এথনো-পলিটিক্স-এর আলোচনার পরিসর বাড়াবে। বাংলাদেশেও যে আলোচনা জরুরি।
এটা এইরূপ সিরিজের প্রথম গ্রন্থ হিসেবে দাবি করা হয়েছে প্রকাশকের তরফ থেকে।
শ্রীলঙ্কার তামিল ইলম্: দক্ষিণ এশিয়ায় ‘জাতি-রাষ্ট্র’-এর সংকট আলতাফ পারভেজ
ঐতিহ্য, ২০১৭ পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৩৫ মূল্য : ৭২০ টাকা
>>সেলিম সারোয়ার

হৃদপিন্ডের ক্ষতিগ্রস্ত পেশী সারিয়ে তুলবে যে প্যাচ

হার্ট প্যাচ - যা লক্ষ লক্ষ জীবন্ত দেহকোষ দিয়ে তৈরি
ছেঁড়া কাপড় জোড়া দিতে যেমন তালি দেয়া হয় - ঠিক তেমনি হার্ট এ্যাটাকের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হৃদপিন্ডের পেশীগুলোকে সারিয়ে তুলতে স্টেম সেল ব্যবহার করে একটি 'পট্টি' তৈরি করেছেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা ।
বিজ্ঞানীরা একে বলছেন হার্ট প্যাচ - যা লক্ষ লক্ষ জীবন্ত দেহকোষ দিয়ে তৈরি ।
এই প্যাচ প্রায় তিন সেন্টিমিটার বা এক ইঞ্চি দীর্ঘ এবং এটি রোগীর নিজ দেহের কোষ থেকেই ল্যাবরেটরিতে তৈরি হবে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা ম্যানচেস্টারে এক সম্মেলনে তাদের এই গবেষণার ফল তুলে ধরেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন এটিকে একটি তালি বা পট্টির মতো করে ক্ষতিগ্রস্ত হৃদপিন্ডের ওপর সেলাই করে দেয়া হবে এবং তা ধীরে ধীরে সুস্থ পেশীতে পরিণত হয়ে হৃদপিন্ডের সাথে মিশে যাবে।
তারা বলছেন তারা খরগোশের দেহে এ পদ্ধতি পরীক্ষা করে দেখেছেন যে এটি নিরাপদ।
দু বছরের মধ্যেই মানবদেহের ওপর এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হবে।
মানুষের দেহের কোন একটি ধমনী যখন সরু হয়ে যায় - তখন হৃদপিন্ডের পেশীতে রক্তের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, তার ফলে পেশীগুলোতে অক্সিজেন আর পুষ্টিকর উপাদানের অভাব ঘটে। এর ফলে হৃদপিন্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শেষ পর্যন্ত দেখা দেয় হৃদরোগ।
এই প্যাচ প্রাণীর দেহে পরীক্ষা করে সাফল্য পাওয়া গেছে, বলছেন বিজ্ঞানীরা

Thursday, July 22, 2021

ইসরাইলের অজানা কথা by ড. ইলিয়াস আকলেহ

একটি প্রতিষ্ঠিত ও খুব পরিচিত তথ্য হলো, ইসরাইল হচ্ছে গণহত্যাকারী, সন্ত্রাসবাদী, জনগোষ্ঠী নির্মূলকারী এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র। তাদের ওল্ড টেস্টামেন্টে এক অভিজাততন্ত্রী ‘দেবতা’র কথা আছে, যে গণহত্যার হোতা ও রক্তপিপাসু। এই অপশক্তির ধর্মটাই বর্ণবাদী, শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও প্রতিশোধপরায়ণ। আজকের আইএস সন্ত্রাসীদের মতো- ইহুদিদের স্টার্ন, ইরগুন, পালমাক, হেগানা প্রভৃতি সন্ত্রাসবাদী গ্যাং ১৯৪৬ থেকে ফিলিস্তিনিদের খাদ্যবিপণি, থানা, হোটেলসহ বেসামরিক বহু টার্গেটে বোমা মেরেছে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে অসংখ্য গণহত্যা, গ্রামের জনবসতির ওপর হামলা, নারী ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন, কোথাও কোথাও ঠাণ্ডা মাথায় সব অধিবাসীর হত্যাযজ্ঞ, গ্রামের পর গ্রাম ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া, প্রভৃতি অপরাধ এরা ঘটিয়েছে।

ফিলিস্তিনি জনগণের চার শতাধিক গ্রাম পুরোপুরি কিংবা বেশির ভাগই ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এগুলোর বাসিন্দাদের ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। এসব কিছুর উদ্দেশ্য, স্বদেশ থেকে বিতাড়নের জন্য তাদের মনে ভীতির সঞ্চার করা। ১৯৪৮ সালে অন্তত আট লাখ ফিলিস্তিনি নর-নারীকে নিজস্ব আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করায় তারা পরিণত হলো উদ্বাস্তুতে।

স্বঘোষিত ‘সভ্য’ বিশ্বশক্তিরা তাদের নতুন হাতিয়ার হিসেবে জাতিসঙ্ঘ সৃষ্টি করেছিল। তারা কিন্তু ফিলিস্তিনিদের বাঁচাতে কোনো জোট গঠন করেনি। ওরাই বর্তমানে আইএসকে মোকাবেলার জন্য জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। বরঞ্চ জবরদখল করা ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরাইল রাষ্ট্র বানিয়ে দিয়ে জাতিসঙ্ঘ ইহুদিবাদী সন্ত্রাসী চক্রগুলোকে করেছে পুরস্কৃত।

১৯৪৮-এ যা দখল করে নিয়েছিল, তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না লোভী সম্প্রসারণবাদী ইসরাইলি ইহুদি নেতারা। তাই তারা আরো চেয়েছেন। তারা এখানে-ওখানে আরব গ্রামগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তারা ফিলিস্তিনের বাদবাকি অংশও দখল করে নিলেন; সেই সাথে আংশিকভাবে লেবানন, সিরিয়া, মিসরও। এ জন্য আরো যুদ্ধাপরাধ ঘটানো হয়েছিল। ফিলিস্তিনে আর গোলান মালভূমিতে জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা হলো, বহু সিরীয় গ্রাম পর্যবসিত হয় ধ্বংসস্তূপে; ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে এক হাজার মিসরীয় বন্দীকে। ৬৭ সালের লড়াইয়ে ইসরাইল বেআইনি ঘোষিত, নাপাম বোমার ব্যাপক প্রয়োগ ঘটিয়েছে আরবদের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।

কথিত সভ্য জগৎ ইসরাইলকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখতে কিছুই করেনি। তারা কেবল অর্থহীন বিবৃতি প্রদান আর দন্তবিহীন জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব গ্রহণে ব্যস্ত ছিল। এ প্রস্তাবে ইসরাইলি দখলদারিকে বেআইনি বলে ‘সবিনয়ে’ ইসরাইলকে অনুরোধ করা হয় দখলকৃত স্থান থেকে সরে যাওয়ার জন্য।

ইসরাইলের নেতারা বিরত হননি। তারা জাতিসঙ্ঘের যাবতীয় প্রস্তাব লঙ্ঘন করে মিসর, জর্দান ও লেবাননে হামলা চালিয়েছেন। লেবাননের রাজধানী বৈরুতকে প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হলো। সেখানে সাবরা ও শাতিলার মতো হত্যাযজ্ঞের অনেক নজির ইসরাইল স্থাপন করেছে। এমনকি, জাতিসঙ্ঘ পর্যবেক্ষণ চৌকিতে বোমা ফেলতেও দ্বিধা করেনি ইসরাইল। যাতে গুচ্ছ বোমাসহ বিভিন্ন প্রকার অবৈধ অস্ত্রবলে ইসরাইলি হামলার প্রমাণ রাখা না যায়, সে জন্যই এ হামলা করা হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ ইসরাইলের গণহত্যাসহ এসব ব্যাপারে কিছুই করেনি, অর্থহীন তদন্ত রিপোর্ট লেখা ছাড়া।

ফিলিস্তিনিদের সাথে সম্পাদিত সব শান্তিচুক্তি নগ্নভাবে লঙ্ঘনপূর্বক ইসরাইল তার অত্যাচার-নির্যাতন বাড়িয়ে দেয়, যাতে ওদের উৎখাত করে ইহুদিবাদী দখলদারদের বসতি গড়ার সুযোগ করে দেয়া যায়। এ জন্য ফিলিস্তিনিদের কারাবন্দী করা হয়; তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়; বহু ফিলিস্তিনি শিশুকে মধ্যরাতে ইসরাইলের সন্ত্রাসী সেনারা অপহরণ করে জেলে আটকে রাখে; ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস বা দখল করা হয়েছে; উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দেয়া হয়েছে সেসব বাড়িঘর; ফিলিস্তিনিদের জমি বাজেয়াপ্ত করে তাতে বেআইনি ইহুদি বসতি স্থাপন করা হচ্ছে; শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায় এবং ট্যাংক দিয়ে অবরোধ করা হচ্ছে ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত শহরগুলো।

ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা পরিকল্পিতভাবে নিয়মিত হামলা করে থাকে ফিলিস্তিনি জনপদে। তারা তখন শস্য পুড়িয়ে দেয়; পানির কূপে মিশিয়ে দেয় বিষ; গাছপালা কেটে ফেলে; ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করে; সম্পদ করে ধ্বংস। এ ধরনের আরো অনেক সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ইহুদিরা করে থাকে। উগ্রবাদী ইহুদিরা নিয়মিতই হামলা চালিয়ে অপবিত্র করছে ইসলামের পবিত্র স্থানগুলো। দৃশ্যত সৈন্যদের পাহারাধীন, আল আকসা মসজিদে তাদের হামলা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

ইসরাইল এ যাবৎকালের বৃহত্তম বন্দিশিবির তৈরি করেছে গাজায়। এই এলাকা ও এর বাসিন্দারা ইসরাইলের নব-উদ্ভাবিত রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্রের পরীক্ষা নিরীক্ষার জীবন্ত টার্গেটে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন রোগব্যাধি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে ঘন ঘন ইসরাইল তার সুয়ারেজ লাইনের আবর্জনা গাজার শহরগুলোতে ছড়িয়ে দেয়। ইসরাইলি সেনারা কয়েক দফায় গাজায় নির্বিচার হামলা করেছে। এ সময়ে সাধারণ লোকজনকে হত্যা এবং বসতবাটি ধ্বংস করা হয়। ইসরাইলের হামলা ও ধ্বংসের টার্গেট ছিল গাজার অফিস আদালত, বাড়িঘর, স্কুল, হাসপাতাল, গির্জা ও মসজিদ, সব ধরনের যানবাহন এবং মাছ ধরার নৌকা।

গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নির্বিচারে বারবার সাদা ফসফরাস বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করেছে। হিউম্যান রাইটস অর্গানাইজেশন এটাকে বলেছে ‘অগ্নিবৃষ্টি’। জাতিসঙ্ঘের ত্রাণসংস্থা (UNRWA) পরিচালিত স্কুলগুলোতে বোমা ফেলতেও দ্বিধা করেনি ইসরাইল। অথচ আশ্রয়কেন্দ্ররূপে ব্যবহৃত এসব স্কুলে যাতে হামলা করা না হয়; এ জন্য এগুলোর জিপিএস অবস্থান আগেই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। ফিলিস্তিনি জনগণ যাতে খাদ্যাভাবে দুর্ভোগের শিকার হয়; সেজন্য জাতিসঙ্ঘের দেয়া খাদ্যের মজুদের ওপর হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করা হয়েছে।

গাজার ফিলিস্তিনিদের বিশ্বসম্প্রদায় ও আরব নেতারা পরিত্যাগ করেছে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ব্যাধি আর ইসরাইলি গুলির মুখে এভাবে ঠেলে দেয়ায় গাজাবাসী নিজেরাই ১৯৪৮ সালের জাতিসঙ্ঘ প্রস্তাব নম্বর ১৯৪ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে জোর দেয়া হয়েছে ইসরাইলের দখল করা এলাকায় অবস্থিত আসল বাড়িঘরে ফিলিস্তিনি শরণার্থীরা ফিরে যাওয়ার বৈধ অধিকারের বিষয়ে। গাজার মানুষ প্রতি শুক্রবার ‘প্রত্যাবর্তনের মহান অভিযাত্রা’ দ্বারা ইসরাইলের আরোপিত প্রতিবন্ধক পর্যন্ত অগ্রসর হচ্ছে।

এই প্রতিবন্ধক দিয়ে গাজার ক্ষুদ্র এলাকায় তাদের বন্দী করে রাখা হয়েছে। এই অভিযাত্রার সূচনা গত বছর ৩০ মার্চ। এবার এ কর্মসূচির ৭০তম দিবস অতিবাহিত হয়েছে। অভিযাত্রীরা নিরস্ত্র হওয়া সত্ত্বেও ইসরাইল মারাত্মক বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে। ইহুদি চোরাগোপ্তা হামলাবাজরা বিষাক্ত গ্যাস এবং রাবার বুলেট ও সত্যিকার গুলি ব্যবহার করেছে। এ পর্যন্ত শিশু, নারী, চিকিৎসাকর্মী ও সাংবাদিকসমেত ৩১০ জন ফিলিস্তিনিকে এখানে হত্যা করা হয়েছে। আহতের সংখ্যা হাজার হাজার। বিস্ফোরক বুলেটের আঘাতে আহত অনেকের অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে।

ইসরাইলের সন্ত্রাসী হুমকি অধিকৃত ফিলিস্তিন ও আরব দেশগুলো ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে বিস্তৃত। এটা ভালোভাবেই জানা যে, ইসরাইলের আছে পরমাণু বোমা। এর প্রযুক্তি ও উপকরণ ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে চুরি করে আনা হয়েছিল। অনেক দেশের রাজধানীতে এ বোমার হামলা করার হুমকি দিয়েছে ইসরাইল। তার পরও, দেশটি পরমাণু অস্ত্র বর্জন করবে না; পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের চুক্তিতে সই দেবে না এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থাকে (IAEA) ইসরাইলি পরমাণু স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করতে দেবে না। বরং ইসরাইল তার পরমাণু সমরাস্ত্র বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া একমাত্র ইসরাইলই পরমাণু বোমা ব্যবহার করেছে। ইসরাইল এ বোমার প্রয়োগ ঘটিয়েছে তার নিকটতম মিত্র খোদ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ’৯/১১’-র ভুয়া হামলায়। ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ যুদ্ধের যৌক্তিকতার আড়ালে আরব বিশ্বকে যেন টার্গেট করা যায়, এ জন্যই ওই হামলার অবতারণা। সিরিয়ার উপরেও ইসরাইল পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করেছে। ইয়েমেনে ইসরাইল দু’টি নিউট্রন বোমা ফেলার কথা জানা গেছে।

মোসাদ এজেন্টদের ঘটানো হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ইসরাইলের সন্ত্রাসী হামলা পৌঁছে গেছে দুনিয়ার দেশে দেশে। তা ছাড়া ‘ভুয়া পতাকা’ হামলা চালানো হয় যাতে ভীত হয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের ইহুদিরা ‘নিরাপদ’ ইসরাইলে চলে যায়। উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে কেনেডিদের হত্যা, আরব ও ফিলিস্তিনি অ্যাক্টিভিস্টদের খুন করা, মিসর, ইরাক ও ইরানের পরমাণুবিজ্ঞানীদের হত্যাকাণ্ড, প্রভৃতি অল্প কয়েকটি দৃষ্টান্ত মাত্র। ভুয়া হামলা চালানো হয় ইহুদিদের উপাসনালয়, বিদ্যালয় ও গোরস্তানে। সেইসাথে ‘ইসলামপন্থী’দের নামে হামলা চলে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন টার্গেটে।

ইসরাইল হচ্ছে এমন দেশ, যে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসে লিপ্ত। তবুও আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো তাকে রক্ষা ও সমর্থন করছে। অথচ এ দেশগুলো ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও শান্তির বুলি আওড়ায়। লেবানন, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানকে ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা, বিধ্বংসী অস্ত্র রাখা এবং নিষিদ্ধ ও রাসায়নিক অস্ত্র’ ব্যবহারের জন্য অভিযুক্ত করে এসব দেশ যে আচরণ করে থাকে, তা দেখা যায় না ইসরাইলের বেলায়। সে ক্ষেত্রে নেই অর্থনৈতিক অবরোধ; তীব্র নিন্দা অথবা সামরিক হামলা।

এর বিপরীতে, আমরা দেখে আসছি- জাতিসঙ্ঘে ইসরাইলকে বাঁচাতে একের পর আরেক মার্কিন প্রশাসন ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। ইসরাইলকে সাহায্য করার জন্য প্রত্যেক অর্থবছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়। এর বাইরে, বিনামূল্যে সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে তাদের সহায়তা করা তো আছেই। ইসরাইল নাকি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘একমাত্র গণতান্ত্রিক মিত্র।’ আমেরিকার মানুষের আবাসন সঙ্কট বাড়ছে ক্রমশ; অথচ সে দেশের সরকার দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে বেআইনি ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের জন্য ভর্তুকি দিচ্ছে। আমেরিকার ছাত্রছাত্রীরা আজীবন টানছে শিক্ষার্থী ঋণের বোঝা। অথচ মার্কিন প্রশাসন কিন্ডারগার্টেন থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত, ইসরাইলি নাগরিকদের বিনা খরচে শিক্ষালাভের জন্য ভর্তুকি ঢালছে। চিকিৎসাবীমার অভাবে অনেক আমেরিকান নাগরিক মারা যায় এবং কষ্ট পায়। অথচ প্রত্যেক ইসরাইলি যাতে সারা জীবন বিনাব্যয়ে চিকিৎসা সুবিধা পেতে পারে, এ জন্য আমেরিকা ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইল হচ্ছে একটি সুরক্ষিত সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। ইসরাইল যে অপরাধই করুক, পাশ্চাত্যজগৎ তাকে সমর্থন দিয়ে যাওয়ার কারণ কী?

এটা বোঝার জন্য ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। সাম্রাজ্যবাদের যুগের কথা- ১৯০৫ সাল। তখন ছিল অটোম্যান সাম্রাজ্য। খুবই শক্তিশালী এ সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল উপসাগরীয় এলাকা থেকে আটলান্টিক অবধি গোটা আরবজগতে। ১৯০৫ সালেই ইরান ও আরব উপদ্বীপে জ্বালানি তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হেনরি ক্যাম্পবেল-ব্যানারম্যান একটি সম্মেলন ডাকেন, যার পরিচিতি ছিল ‘ঔপনিবেশিক সম্মেলন’ হিসেবেও। কিভাবে অটোম্যান সাম্রাজ্যকে দুর্বল বা ধ্বংস করা যায় এবং পাশ্চাত্যের খ্রিষ্টীয় উপনিবেশবাদী সভ্যতাকে শক্তিশালী করে তোলা যেতে পারে, তার আর্থ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করাই ছিল সম্মেলনটির উদ্দেশ্য। ব্রিটিশ, ফরাসি, ডাচ, বেলজিয়াম, স্পেন ও ইটালি সাম্রাজ্যের কর্মকর্তারা এবং খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ, কৃষিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদেরা এতে অংশ নেন। দু’বছর চলে এ সম্মেলন।

তারা এ উপসংহারে উপনীত হন যে, ‘ভূমধ্যসাগর হলো তিনটি প্রধান মহাদেশের সংযোজনকারী। তাই এ সাগর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মাঝে প্রাকৃতিক সেতুবন্ধন। এর পূর্ব ও দক্ষিণ তীর ‘আরব’ নামের একটি জাতির করতলগত। আরবদের রয়েছে অভিন্ন ভাষা ও ইতিহাস এবং বিশেষত একক ধর্ম। ভূকৌশলগত অবস্থান, প্রধান প্রধান বাণিজ্য পথ, তেলসহ বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রচুর জনশক্তির সমভিব্যহারে আরবরা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধিক শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হতে পারে।’ এটা যাতে না হতে পারে, সে লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছিল ওই সম্মেলন থেকে।

এ অঞ্চলের জন্য সর্বাধিক বিপর্যয়কর বিষয় হলো, আরব জগতের মধ্যখানে একটি বৈরী ‘বাফার স্টেট’ তৈরি করা। বিশেষ করে ফিলিস্তিনে এটা প্রতিষ্ঠা করে মধ্যপ্রাচ্যের আরবদের তাদের উত্তর আফ্রিকান ভাইদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়েছে। এভাবে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরবর্তী অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যেই ফিলিস্তিনে ইসরাইলের জন্ম দেয়ার জন্য সমর্থন করা হয়েছে ইহুদিবাদকে।

সে সময়ের শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও বিচ্ছিন্নতাকামী ধর্ম হিসেবে ইহুদিদের পরিচিতি, তাদের সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা; অ-ইহুদি সবার প্রতি ওদের ঘৃণা; প্রভৃতি কারণে ইহুদিবিরোধী মনোভাব ইউরোপে ছিল প্রবল। ইউরোপের বহু দেশ থেকে তাদের বের করে দেয়া হয় লাথি মেরে। ‘ইহুদিবাদ’ হলো একটি রাজনৈতিক মতবাদ যার লক্ষ্য হচ্ছে শুধু ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। ইউরোপের ইহুদি ইস্যুর ‘নিরসন’ই ইহুদিবাদের জন্মের কারণ। ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরে এবং আরব জগতের হৃৎপিণ্ডতুল্য, ফিলিস্তিনে বৈরী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার জন্য ইহুদিবাদকে মদদ দিয়ে ‘এক ঢিলে দুটি পাখি’ মারতে চাওয়া হয়েছে।

প্রথমত ইসরাইল হবে আরব বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে একটি বৈরী ‘বাফার স্টেট’। পাশ্চাত্যের সামরিক শিল্পকে জিইয়ে রাখা হবে আরব প্রতিবেশীদের সাথে ইসরাইল কর্তৃক নিরন্তর যুদ্ধের পরিস্থিতি বজায় রাখার মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত ইউরোপ তার ইহুদি সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে ইহুদিরা ইউরোপ থেকে ইসরাইলে চলে গেলে।

১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বালফোর ইহুদিদের জন্য ইসরাইল রাষ্ট্র কায়েমের ঘোষণা দিয়েছিলেন। অথচ তিনি নিজেই মনে করতেন, ‘ইহুদিরা বৈরী ও শত্রুভাবাপন্ন জনগোষ্ঠী।’ তৎকালীন অন্যান্য ব্রিটিশ রাজনীতিকের মতো বালফোরও ব্রিটিশ এলিয়েন্স অ্যাক্ট নামের আইনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। আইনটি করা হয়েছিল ব্রিটেনে রুশ ইহুদিদের অভিবাসন বন্ধ করার জন্য। বালফোর ইহুদিবাদকে সমর্থন দেন এ কারণে যে, এর দ্বারা পাশ্চাত্য সমাজ সংখ্যালঘু ইহুদিদের কবল থেকে নিস্তার পাবে, যারা সে সমাজকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল।

[কাউন্টারকারেন্টস ডট ওআরজি, ২০ আগস্ট ২০১৯ সংখ্যার সৌজন্যে।
>>>লেখক : ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব-আমেরিকান। ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র সময়ে ইহুদিরা হাইফাতে তার পারিবারিক সম্পত্তি দখল করে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইহুদিবাদীরা ফিলিস্তিনের বাকিটাও দখল করে নিলে তার পরিবারকে পশ্চিম তীর থেকে বিতাড়িত করা হয়।]

>>>ভাষান্তর- মীযানুল করীম

শওকত আলীর দক্ষিণায়নের দিন by আহমেদ মাওলা

সময় বিমূর্ত, প্রবহমান। বিমূর্ত সময়ের বস্ত্তগত চেহারা প্রতিবিম্বিত হয় কেবল ব্যক্তিমানুষের ভেতর দিয়েই। ব্যক্তির ওপর দিয়েই সময় বয়ে যায়। অনুকূল বা প্রতিকূল সবরকম পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করে ব্যক্তিমানুষ জীবনযাপন করে। সময়ে, চাপে বা তাপে ব্যক্তিমানুষের ক্ষয়, বিকাশ বা বিনাশ ঘটে। সময়ের প্রবহমানতায় ব্যক্তির বিশ্বাস, মূল্যবোধ, চিমত্মা-চেতনারও রূপান্তর হয়। ব্যক্তির বদলে যাওয়া এই স্বরূপের মধ্যে আমরা সময়ের বস্ত্তগত চেহারার বিচিত্র মুখশ্রী অবলোকন করতে পারি। ষাটের দশকে, বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত মানসের আর্থ-সামাজিক, রাজনীতির স্বপ্নময় আকাঙক্ষা ও আশাভঙ্গের বেদনা, যাতনা নিয়ে রচিত হয়েছে শওকত আলীর সুবৃহৎ উপন্যাসত্রয়ী বা ট্রিলজি – দক্ষিণায়নের দিন (১৯৮৫), কুলায় কালস্রোত (১৯৮৬) এবং পূর্বরাত্রি পূর্বদিন (১৯৮৬)। শওকত আলীর শিল্পসত্তার মৌলিক প্রবণতা হচ্ছে ইতিহাস ও সময়নিষ্ঠতা। সময়ের প্রবহমান অভিঘাতে ব্যক্তিমানুষ কীভাবে পর্যুদসত্ম হয়, সমাজ ও রাজনীতির দ্বন্দ্বময় সংঘাতে অসিত্মত্ব-সংকটে পড়ে তার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে শওকত আলীর উপন্যাসত্রয়ী বা ট্রিলজিতে। A trilogy is a series of three connected literary works, may it be fiction, drama or any other branch of creative arts। অর্থাৎ ট্রিলজি (trilogy) বলতে এমন একটি সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মকে বোঝায়, যার মধ্যে আখ্যানগত পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। হতে পারে তা উপন্যাস (fiction), নাটক (drama) বা অন্য সাহিত্যাঙ্গিক। ট্রিলজি বলতে তাই তিন খ– রচিত ধারাবাহিক কাহিনির বিশেষ ধরনের উপন্যাস বোঝায়। ইংরেজি এবং রুশ সাহিত্যে ট্রিলজির প্রচুর উদাহরণ রয়েছে। বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৯৪-১৯৫০) পথের পাঁচালী (১৯২৯), অপরাজিত (১৯৩১), কাজল; গোপাল হালদারের (১৯০২-৯৩) একদা (১৯৩৯), অন্যদিন (১৯৫০), আর একদিন (১৯৫১); আশাপূর্ণা দেবীর (১৯০৯-৯৫) প্রথম প্রতিশ্রম্নতি (১৯৬৪), সুবর্ণলতা (১৯৬৬), বকুল কথা (১৯৭৩) ইত্যাদি সার্থক ট্রিলজি রচনার উদাহরণ রয়েছে। ট্রিলজি রচনার একটা বিশেষ সুবিধা হচ্ছে, সময়ের বিসত্মৃত প্রেক্ষাপটকে ব্যক্তিমানুষের চরিত্রের ভেতর দিয়ে প্রতিমূর্তি দান করা যায়। সমাজ-সচেতন কথাশিল্পী শওকত আলী তাঁর ট্রিলজি দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত, পূর্বরাত্রি পূর্বদিন উপন্যাসেও কাহিনি-বর্ণনায়, চরিত্র-সৃষ্টিতে রাজনৈতিক জীবনজিজ্ঞাসাকে সচেতনভাবে শৈল্পিক পরিচর্যা দিয়েছেন। সময় যেন এ-উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র। কু-লায়িত সময়ের অস্থির দ্বন্দ্বময় চালচিত্র বিনির্মাণে শওকত আলী যথেষ্ট যত্নশীল ও স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো আত্মবিচ্ছিন্ন, আত্মীয়বিচ্ছিন্ন, সমাজের নির্ধারিত ছাঁচে খাপ-না-খাওয়া, বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ক্ষয়িত, পর্যুদসত্ম, তবু তারা জীবনজিজ্ঞাসায় অসিত্মত্ববান, চলিষ্ণু।

ক. রাখী, এবার কী করবে?

এই এক নিদারুণ প্রশ্ন। কেবলই ঘুরেফিরে আসছে। আববা, বুবু, হাসান ভাই এরাও দু-একবার প্রশ্নটা তুলেছেন, কিন্তু ঐ প্রশ্ন পর্যন্ত – প্রসঙ্গটা আর বেশিদূর
এগোয়নি। কেমন করে এগোবে, উত্তরটা কারো জানা থাকলে তো। রাখী এবার নিজেকে শুধায়, রাখী কী করবি তুই এবার?

(দ. দি., পৃ ২৯)

খ. বন্ধ ঘরে চাপা আর্তনাদের মতো ওর গলা শোনা যেত, বিশ্বাস কাকে বলে? কেন বিশ্বাস করবো আমি, বলতে পারো? প্রতারণাকে সত্য বলে চালাবে শুধু বিশ্বাসের জোরে?

(কু. কা., পৃ ১৭৮)

এই ক্রমজিজ্ঞাসা ও জীবনার্থ সন্ধানের মূলে রয়েছে সময়ের অন্তর্গূঢ় ক্রিয়াশীলতা। ফলে, সময় এই উপন্যাসে মৌল নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। সময়ের স্বভাব ফুটে উঠেছে বিভিন্ন চরিত্রের প্রতিবিম্বনে।

শওকত আলীর শিল্পমানসের অপূর্ব সৃষ্টি প্রদোষে প্রাকৃতজন (১৯৮৪), দক্ষিণায়নের দিন (অখ-, ১৯৮৫-৮৬), ওয়ারিশ (১৯৮৯), উত্তরের খেপ (১৯৯১), দলিল (২০০০), নাঢ়াই (২০০৩) ইত্যাদি উপন্যাসে সময় ও ইতিহাসনিষ্ঠতার পরিচয় পাওয়া যায়।

শওকত আলীর জন্ম ১৯৩৬ সালে। অবিভক্ত বাংলার পশ্চিম দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জে। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি সপরিবারে চলে আসেন বাংলাদেশের দিনাজপুরে। তাঁর কৈশোর কেটেছে নিদারুণ দাঙ্গা ও উন্মূল যাতনায়। তিনি দেখেছেন, ভূমি থেকে বিতাড়িত মানুষের যন্ত্রণা এবং দেশভাগের মূলে রয়েছে রাজনীতি। দক্ষিণায়নের দিন উপন্যাসে সময়তাড়িত চরিত্রগুলোর জীবন তাই রাজনীতি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের মানসে যে ক্রমমুক্তির প্রত্যাশা, সেই চেতনাই তাঁকে রাজনীতি-সচেতন করে তোলে। বিশেষত, ষাটের দশকে বামপন্থী রাজনীতির যে স্বপ্নময় আকাঙক্ষা তরুণদের জাগ্রত করেছিল, তা বুর্জোয়া রাজনীতির কাছে অচিরেই মার খায়। তাছাড়া বামপন্থী রাজনীতি ধারার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও দ্বিধাবিভক্তিতে অজস্র মেধাবী তরুণের জীবনে নেমে আসে ব্যর্থতা, হতাশা এবং মৃত্যু। দক্ষিণায়নের দিন উপন্যাসে রাখীর ভাই মনি এবং সেজানের মৃত্যু সে দ্বন্দ্ব-দীর্ণ রাজনীতিরই ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত উদাহরণ। সেজানের অভিব্যক্তিতে তা উঠে আসে এভাবে :

ক. বইপড়া তত্ত্ব দিয়ে রাজনীতি হলে অধ্যাপকরা বড় রাজনীতিবিদ হতেন। তোমাদের কাছে এখন ব্রডবেস্ড্ ইউনিটির কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বুর্জোয়া পার্টিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করে কাজ করার জন্য – তাতেই নাকি বিপস্নব হবে। এসব কথা ভাঁওতাবাজি ছাড়া কিছু নয়। কেননা বলা হচ্ছে যে, সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী বুর্জোয়াদের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় ধনতন্ত্রের বিকাশ হলে, দেশে শিল্পায়ন হবে এবং তখনই সম্ভব সুস্থ সবল শ্রমিকশ্রেণি গড়ে ওঠা এবং তাদের নেতৃত্বে হবে সমাজতান্ত্রিক বিপস্নব।

(দ. দি., পৃ ৯৫)

ছেলেবেলা থেকে রাজনীতির প্রতি সচেতন মনি। অনার্স ফাইনাল দেওয়ার আগেই চলে যায় আন্ডারগ্রাউন্ডে। হুলিয়া বাতিল হলে বের হয় এক বছর পর। পরের বার পরীক্ষার আগেই ধরা পড়ে গেল। জেলে কাটল দেড় বছর – মনি তারপর বেরিয়ে এসে হঠাৎ রাজনীতি ছেড়ে দেয়। ওই সময় কেমন যেন নিঃসঙ্গ আর একাকী হয়ে পড়েছিল মনি। বামপন্থী রাজনীতির অমত্মঃদ্বন্দ্বে জর্জরিত অসুস্থ মনি সারারাত ঘুমাত না। ওই সময় চোখ বন্ধ করে মনি প্রলাপের মতো বাবাকে প্রশ্ন করে – ‘আববা, বিশ্বাস কেমন করে জন্মায়? কেন আমি বিশ্বাস করতে পারি না?’

(দ. দি., পৃ ৩১)

এই অবিশ্বাস বা বিশ্বাস ভেঙে চূর্ণ হয়ে যাওয়া হতাশাই মনিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। আবেগপ্রবণ মনি জীবন এবং রাজনীতির মধ্যে সংগতি বিধান করতে না পেরে মৃত্যুকেই বরণ করে নেয়। সময়ের অভিঘাত ব্যক্তিকে এভাবে অজগরের মতো গিলে খায়। শওকত আলী রাজনীতি-আক্রান্ত মানুষের ক্ষয় এবং আত্মবিনাশকে এভাবে
শিল্প-অভীপ্সায় তুলে ধরেন।

উপন্যাসের শিরোনাম দক্ষিণায়নের দিন কথাটির মধ্যে ব্যাপক অর্থ-ব্যঞ্জনা রয়েছে। রাজনীতিতে বামধারার রাজনীতি দক্ষিণপন্থী হিসেবে পরিচিত। ষাটের দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন একটি স্রোত-আবর্ত তৈরি হয়েছিল যে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত ছাত্র-যুবকরা সমাজতান্ত্রিক বিপস্নবের স্বপ্নময় আকাঙক্ষা নিয়ে প্রবলভাবে মার্কসীয় সাম্যবাদী আদর্শের প্রতি ঝুঁকে পড়েছিল। দক্ষিণায়নের দিন শব্দটির মধ্যে রাজনীতির সেই ‘দক্ষিণায়নের’ তাৎপর্যসহ ইঙ্গিত রয়েছে। আভিধানিক অর্থে বিষুবরেখা থেকে সূর্যের দক্ষিণগতি (২১ জুন থেকে ২২ ডিসেম্বর) অর্থাৎ সূর্যের দক্ষিণ দিকে গমনকালকে বোঝায়।ট্রিলজির প্রথম খ- দক্ষিণায়নের দিনের ঘটনাকাল ওই সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

ঋতুবৈচিত্র্যের দিক থেকে দেখলে এই সময়টা ঝঞ্ঝামুখর, বর্ষাভাসা জোয়ারের পানিতে থইথই অবস্থা। প্রকৃতির বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। দক্ষিণায়নের দিন নামকরণের মধ্যে প্রকৃতির সেই ক্রামিত্মকালের প্রতীকী তাৎপর্য অভিব্যঞ্জিত হয়েছে। এছাড়া উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রোকেয়া আহমেদ রাখীর ব্যক্তিগত জীবনের রিক্ততা, রাজনীতির ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ষাটের দশক, রাষ্ট্রীয় স্বৈরশাসন, আন্দোলন-সংগ্রামে উত্তাল বাংলার সে-সময়কার মধ্যবিত্ত মানসের সামগ্রিক জীবনের রূপান্বিত রূপক ফুটে উঠেছে দক্ষিণায়নের দিন নামকরণের মধ্যে। যেমন –

আকাশে ইতসত্মত মেঘ ছিল। দুপুরবেলা হঠাৎ মেঘের ডাক   শোনা গেল। রাখী হাঁটছিল, হঠাৎ দেখে, সামনে টুকরো কাগজ, ধুলো, খড়কুটো সব যেন কেউ শূন্যে উড়িয়ে দিয়েছে।

উপন্যাস শুরুর কয়েকটি বাক্যে ‘আকাশে মেঘ’, ‘হঠাৎ মেঘের ডাক’, ‘খড়কুটো, কাগজ, শূন্যে উড়া’ এসবের মধ্যে রাখীর ব্যক্তিগত জীবন এবং ষাটের দশকের ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ রাজনীতির সমূহ পরিস্থিতির আভাস পাওয়া যায়।

উপন্যাসের কাহিনি : দক্ষিণায়নের দিন

দক্ষিণায়নের দিন উপন্যাসের মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে রোকেয়া আহমেদ রাখীকে কেন্দ্র করে। তাকে ঘিরেই অন্য চরিত্রগুলোর বিকাশ এবং বিলয় ঘটেছে। তার পিতা সরকারি চাকরিজীবী রাশেদ আহমেদ, বোন বিলকিস আহমেদ, বড়ভাই বাম রাজনৈতিক কর্মী মনি। পার্শ্বচরিত্র হিসেবে এসেছে মনির বন্ধু বাম রাজনৈতিক কর্মী সেজান আহমদ, বিলকিস আহমেদ বুলুর স্বামী হাসান, ট্রাভেল এজেন্সির মালিক মাজহার, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরবর্তী সময়ে রাখীর স্বামী জামান, রাখীর বান্ধবী ডাক্তার সুমিতা, পারভীন, জাহানারা, দেবতোষ প্রমুখ চরিত্র উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে উলেস্নখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

ট্রিলজির প্রথম আখ্যানের ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, রাখীর পিতা রাশেদ আহমেদের পারিবারিক জীবন। ষাটের দশকে, তৎকালীন সমাজবাসত্মবতায় একজন পিতা যে-মূল্যবোধকে ধারণ করে সুস্থ-সুন্দর জীবন আকাঙক্ষা করে, রাশেদ আহমেদ তার মূর্তপ্রতীক। ইতিবাচক মূল্যবোধকে ধারণা করে তিনি সময়ের যোগ্য প্রতিনিধি।

ক. সেই উনিশ শো পঁয়ত্রিশের রাশেদ আহমেদ, উনিশ বছরের তরুণ রাশেদ, সায়ীদাবাদ থেকে ফিরছিলেন বুকের ভেতর কষ্টের ভার নিয়ে। কাউকে বলার উপায় ছিল না। কোনো প্রতিকারের আশা ছিল না। প্রাচীন আভিজাত্য আর কঠিন শাসনের দেয়াল ভেদ করে বুকের কথা মুখ ফুটে বলবার ক্ষমতা কারুর ছিল না। হ্যাঁ, সেই উনিশ শো পঁয়তিরিশেও। বুদ্ধদেব বসুর ‘রজনী হলো উতলা’ লিখে ফেলেছেন, নজরুল যখন প্রেমের বন্দনা গান করছেন – তখনো বাঙালি মুসলমান ঝিমুচ্ছে।

ঢাকার নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবন যাপন করতে এসেও তিনি প্রাচীন মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হননি। হায়দার, মীজানের ছেলেরা ঠিকাদারি করে গাড়ি-বাড়ি করে ফেলেছে। মীজান, হায়দার ছেলেদের সাফল্যের কথা গর্বের সঙ্গে বলে। রাশেদ সাহেব তার মনিকে সে-জায়গায় দেখতে চান না।

মনিকে একদিন দেখেছিলেন তোপখানার রাসত্মায় – বোধহয় ৬২-এর সেপ্টেম্বরে। মিছিলের সামনে, মুষ্ঠিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে ছুঁড়ে শেস্নাগান দিচ্ছিল। শুকনো চুল বাতাসে উড়ছে,  ঘাড়ের কাছে শার্টে রক্তের দাগ – বোধহয় আহত কাউকে  রাসত্মা থেকে সরিয়েছিল কাউকে। রাশেদ সাহেব দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন।… মনির ওই রোদজ্বলা ধারালো মুখ। ওই মুখ তিনি ভুলতে পারবেন না। ওইরকম মুখ না হয়ে মনির মুখ হবে পালিশ করা, বিগলিত হাসিতে মাখামাখি, দুচোখে লোভের চটচটে আঠালো দৃষ্টি ল্যাপ্টানো – নাহ্ অসম্ভব।

সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক রূপান্তর ছিল রাশেদ সাহেবের কাম্য। কিন্তু জীবনের পর্বে পর্বে ঘটনা-দুর্ঘটনায় নিজের অজামেত্মই রাশেদ সাহেব যেন ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন। কলোনিশাসিত তৎকালীন পূর্ববাংলার মধ্যবিত্তের বিকাশ ছিল সিত্মমিত। ক্ষমতাকেন্দ্রিক, আপসকামী, পাকিসত্মানপন্থী, একটি শ্রেণি শর্টকাট পথে বড়লোক হওয়ার নেশায় ঠিকাদারি, উমেদারি, টোটক ব্যবসায় উন্মত্ত। বড় মেয়ের স্বামী হাসান যখন চাকরি ছেড়ে ব্যবসার কথা বলে, তখন রাশেদ সাহেব বলেন –

আসলে একটা ঠিকাদারী সোসাইটি গড়ে উঠেছে এদেশে। ব্যবসা, ইন্ডাস্ট্রি, চাকরি সর্বত্র ঐ ঠিকাদারী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। শর্টকাট পথে বড় হবার পাগলামিতে পেয়ে বসেছে সবাইকে। চাকরি ছেড়ে দেওয়াটাকে যদি তুমি নিজের ক্যারিয়ারের জন্য ভালো মনে করো, তাহলে নিশ্চয় তুমি চাকরি ছেড়ে দেবে। তবে আমার কথা হলো, যা করবে, ভেবে-চিমেত্ম করবে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে রাশেদ সাহেবের আশঙ্কা, সংশয়, হতাশার মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্তের উপায়হীন অসহায়ত্বের চেহারা ফুটে উঠেছে। পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলায় অভ্যসত্ম নন রাশেদ সাহেব। যদিও তিনি সমাজের সদর্থক রূপান্তর প্রত্যাশা করেন, তবু তার সংসারের ওপর বয়ে যাওয়া ঝড়ের অভিঘাতে রাশেদ সাহেব পর্যুদসত্ম। বড় ছেলে মনি রাজনীতি করতে গিয়ে নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে অন্যদের মেলাতে না পেরে অন্তর্দ্বন্দ্বে রক্তাক্ত হয়ে মারা যায়। বুলু তার স্বামী হাসানের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে সন্দেহ, অবিশ্বাসের অন্তর্দ্বন্দ্বে পাগল হয়ে যায়। ছোট মেয়ে রাখীর বিয়ে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জামানের সঙ্গে। খুব অনাড়ম্বরভাবেই রাখীর বিয়ে সম্পন্ন হয়। রাখী স্বামীর ঘরে যাত্রার মধ্য দিয়ে ট্রিলজি উপন্যাস দক্ষিণায়নের দিন প্রথম আখ্যানের কাহিনি শেষ হয়। রাশেদ সাহেবের পারিবারিক কাহিনি একসময় বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের তাবৎ পরিস্থিতি নিয়ে সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়। সেখানে রাশেদ সাহেবের ছোট সমত্মান রোকেয়া আহমেদ রাখী হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় চরিত্র। রাখীর ব্যক্তিগত জীবন এবং সমাজ-পরিস্থিতির প্রবাহিত স্রোত অভিন্ন। আখ্যানটি শুরু হয়েছিল এভাবে –

আকাশে ইতসত্মত মেঘ ছিল। দুপুরবেলা হঠাৎ মেঘের ডাক শোনা গেল। রাখী হাঁটছিল… রাখীকে সামনের দিকেই পা চালাতে হল।

শেষ হয়েছে এভাবে –

না, ঠাট্টা নয় পারভীন, হাসানের গলার স্বর হঠাৎ কেমন বদলে যায়।

…আমার কেমন ভয় হয়, দ্যাখো  রাখী শেষ পর্যন্ত পসত্মাবে।

…শিউলি পাতায় শিশির ঝরার শব্দ হচ্ছে। রাখী, অস্ফুট ডাকল বুলুর মনের ভেতরে, রাখী শোন, তুই সুখী হোস, ভুল করিস না তুই।

এই ‘মেঘ’, মেঘের ‘ডাক’ দক্ষিণায়নের দিনের মেঘের ডাক। রাখীর পথচলা শুরু হয়েছিল এই মেঘডাকা দিনের ভেতর দিয়ে। শেষ হয় ‘শিশির ঝরার শব্দে’ এবং হাসানের আশঙ্কা ‘রাখী শেষ পর্যন্ত পসত্মাবে’র মধ্যে। রাখীর জীবন এবং প্রকৃতি সমান্তরালভাবে সংকেতায়িত হয়েছে। দক্ষিণায়নের দিন আখ্যানে উলিস্নখিত ঘটনাসমূহ মোট বিশটি পরিচ্ছদে বর্ণিত হয়েছে।

কুলায় কালস্রোত দ্বিতীয় পর্বের আখ্যানের শিরোনাম। ‘কুলায়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নীড়, পাখির বাসা, বাসস্থান। ‘কালস্রোত’ মানে বৈরী হাওয়া, কূলভাঙা স্রোত। আখ্যানভাগের ঘটনাংশের সঙ্গে কুলায় কালস্রোত নামকরণের সার্থকতা রয়েছে। কারণ, এ-পর্বে রাখী বিয়ের মাধ্যমে জামানের সঙ্গে যে-নীড়
বেঁধেছিল, তা অচিরেই ভেঙে যায়। জামানের স্বার্থপরতা, দেহসর্বস্ব ভোগলিপ্সা, এমনকি ক্যারিয়ারের জন্য সমত্মান নষ্ট করতেও যে দ্বিধা করে না, এমন বুর্জোয়া মানসিকতায় রাখীর দাম্পত্য জীবনে ফাটল দেখা দেয়। জামানের সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবন সুখের হয় না। জামানের অহেতুক সন্দেহবোধ রাখীকে আরো ক্ষতবিক্ষত করে। স্বপ্নময় আকাঙক্ষা নিয়ে নীড় বাঁধা রাখী নিজেকে গুটিয়ে নেয়। জামানের উপলব্ধিতেও তা স্পষ্ট হয় –

এক সময় তার মনে হয়েছে – রাখীকে সে পুরোপুরি পায়নি – কখনো রাখী নিজেকে দেয় না। নিজেকে সে আড়াল করে রাখে। শরীর ভেসে যায় ঠিকই, আবেগ উচ্ছ্বসিত হয় ঠিকই, কিন্তু সে তো রাখী নয় – রাখীর শরীর শুধু।

জামানের দেহসর্বস্ব সম্ভোগ, সমত্মানে অনীহা, নীতিহীন উন্নতির আকাঙক্ষা রাখীর চেতনালোকে এক অদৃশ্য ফাটল তৈরি করেছিল। ‘বুলু লক্ষ করে, রাখী আগের মতোই ধীর-শান্ত। বিয়ে হয়ে যাবার পর যে পরিবর্তন আসে মেয়েদের, রাখীর মধ্যে সে পরিবর্তন আসেনি? তার চিমত্মা হয়।’ হৃদয়বৃত্তির চেয়ে শারীরিক কামনা যেখানে প্রাধান্য পায়, সেটাই হয়ে ওঠে রাখীর যন্ত্রণার মূল উৎস।

রাতে বিছানায় স্বামীর সঙ্গে শোবার চরম মুহূর্তটিতে মনের

কোনো গর্ত থেকে যেন লাফিয়ে ওঠে ঘেন্নার সাপ।

শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান, আত্মমর্যাদাশীল রাখীর ব্যক্তিগত ভূগোল চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। রাখীর চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া মনোলোকের সঙ্গে ষাটের দশকে সমাজতান্ত্রিক বিপস্নবের সম্ভাবনায় স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার একটি প্রতীকী মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অমত্মঃবাসত্মবতা ও বহিঃবাসত্মবতার এই কৌশলী কাহিনি বিন্যাস কুলায় কালস্রোত উপন্যাসটিকে নতুন অর্থ-ব্যঞ্জনা দান করেছে।

রাখীর জীবনভাবনা নারীর সহজাত চিমত্মার বিপরীত নয়। ধারণা ছিল, ‘মেয়েরা বড় হয়, লেখাপড়া শেখে, তাদের প্রেম হয়, শেষে ছেলেপুলে নিয়ে সংসার পাতে। জীবনের মোটামুটি চেহারা এই।  এ-রকমেরই একটা স্রোতের মতো জীবন বয়ে যায়। সবার জীবন এমনই।’ বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে তার উপলব্ধি হয় ভিন্ন। একদিন পুরনো পিলের কৌটো ফেলে দিতে গিয়ে জামান দেখে কৌটোর তলায় তিন-চারটা পিল রয়ে গেছে। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকায় জামান। রাখী শান্ত স্বরে বলে, ‘ওসবের আর দরকার হবে না।’ জামানের চেহারা তখন ভয়ানক ক্ষুব্ধ। সে বলে –

স্কলারশিপের ব্যবস্থা প্রায় হয়ে এসেছে, কোথায় বিদেশে গিয়ে ডিগ্রি আনব, মাঝখান থেকে এই ফ্যাসাদ বেধে গেল।

রাখী তখনো আহত হয়নি। বরং জামানের দুঃখে কিছুটা বিচলিত হয়েছে। বান্ধবী সুমিতার কাছে গিয়ে অ্যাবরশনের কথা বলতেই, সুমি চোখ কপালে তুলে বলে – ‘তুই কি পাগল হয়েছিস? এখন বাচ্চা না হলে আর কখন হবে।’ শেষ পর্যন্ত রাখী বাচ্চা নষ্ট করার চিমত্মা বাদ দিয়েছে। জামানকে জানিয়ে দেয়, বাচ্চাটা তার হওয়া দরকার; কিন্তু জামান তা কোনোক্রমেই মেনে নিতে পারে না। দুর্ঘটনায় সিঁড়ি থেকে পড়ে রাখীর বাচ্চা নষ্ট হয়ে যায়। নিজের উন্নতির পথে যে-স্বামী গর্ভজাত সমত্মানকে বাধা মনে করে, তার সঙ্গে কেবল ধর্মের ভিত্তিতে শারীরিক বন্ধন টিকিয়ে রাখা হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়। সমত্মান নষ্টের পর, হাসপাতালের বেডে যখন জামানকে ডাকার কথা বলে, তখন রাখী বলে ওঠে, ‘জামান, কোন জামান?’ রাখীর এই প্রত্যাখ্যানে ধর্মের আরোপিত বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। প্রেম, বিশ্বাস, শরীর, ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে বেরিয়ে আসতে হয় রাখীকে। সমান্তরালভাবে দেখা যায়, ধর্মের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র পাকিসত্মানের একাংশ পূর্ববাংলার জনজীবন ছিল দুঃসহ। শোষণ, নির্যাতন আর জবরদসিত্ম চলছিল সর্বত্র। ধর্মের সেই বন্ধনকে অস্বীকার করে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া বাঙালি জাতিসত্তা টিকিয়ে রাখা ছিল কঠিন। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতীকী চরিত্র হয়ে উঠেছে রাখী।

রাখীর জীবনকুলায় বয়ে যাওয়া স্রোতই কুলায় কালস্রোত নামকরণকে সার্থকতা দিয়েছে। জামানের ঘর ছেড়ে রাখী বাবার গৃহে প্রত্যাবর্তন করে, আর ফিরে যায়নি। পিতার গৃহে রাখীর রাতগুলো দীর্ঘ হয়ে ওঠে। ঘুম হয় না, স্মৃতি কেবলই দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে আজকাল। বাবা, বুবু, মনিভাইয়ের কথা মনে পড়ে।

স্বামী জামানের কথাও মনে পড়ে, শেষে পড়ে নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া সমত্মানের কথা। নিঃসঙ্গ রাতে রাখী পাগলের মতো কাঁদে। আত্মযন্ত্রণায় দগ্ধ হয় রাখী। বুকের ভেতর মুচড়ে ওঠে, কান্না পায়। মনি ভাই যেমন শেষ সময় বলত –

জীবন কাকে বলে আববা? এই কি জীবন?

এরকমই কি ঘটে থাকে সবার জীবনে?

নব্য ব্যবসায়ী, মুনাফালোভী স্বামীকে ঘরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় ঘরের মেয়ে বিলকিস আহমেদ বুলু ঘর থেকে বের হয়। ব্যবসায়ী স্বামীর স্বার্থে বিভিন্নজনের কাছে নিজেকে বিলিয়ে অবশেষে মাদকাসক্ত হয়ে স্বামীকেও হারায়। স্বামী হাসানের সঙ্গে মামাত বোন পারভীনের সম্পর্ক জেনে বুলু হাসানকে জিজ্ঞাসা করেছিল – ‘আচ্ছা, পারভীন কি বেশি আরাম দেয় তোমাকে, বলো না গো!’ সমত্মান নেই, হওয়ার সম্ভাবনাও নেই, আবার স্বামীকেও ধরে রাখতে পারছে না, এরকম একটি ব্যর্থতা, হতাশা, অসিত্মত্ব-সংকটে পড়ে বুলু মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। বুলুর ঠিকানা হয় পাবনা মানসিক হাসপাতালে এবং উপন্যাসের শেষে তার মর্মামিত্মক মৃত্যু হয়। জামানের ঘরে নার্গিসকে আবিষ্কার করার পর রাখী বলেছিল – ‘কেন এত অস্থির হচ্ছ, বলো তো? নার্গিসের সঙ্গে শুয়েছ বলে আমি রাগ করিনি, বিশ্বাস করো।’ উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত রুচির মেয়ে রাখী – জামান, হাসানদের এসব লাম্পট্য, স্খলন, পতন দেখে মোটেই বিচলিত হয় না। কারণ বুর্জোয়া, পুঁজিবাদী, লোলুপ-লুম্পেন চরিত্রের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে উন্মত্ত ভোগসর্বস্বতা। রাখী সেই বুর্জোয়া সমাজের ভোগের সামগ্রী হতে চায়নি। তাই সমসত্ম অচলায়তন ভেঙে, ধর্মের শৃঙ্খল চূর্ণ করে বেরিয়ে আসে। রাজনীতিতে ছয় দফা আন্দোলন তখন তুঙ্গে। পূর্ব পাকিসত্মানকে বিচ্ছিন্ন করে ‘বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার অভিযোগ তুলে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। আইয়ুব খান, মোনয়েম খানের এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে। হায়দার, হাসান, মাজহার প্রমুখ বুর্জোয়া শ্রেণির লোকের মনে তখন ভয়, আতঙ্ক।

পিতৃগৃহের একাকিত্ব, চরম নৈঃসঙ্গ্যে নিক্ষিপ্ত রাখীকে উদ্ধার করে বান্ধবী এবং ডাক্তার সুমিতা। একটা চাকরির দরখাসত্ম সামনে ধরে বলে, ‘নে সই কর একটা।’ একেবারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারসুদ্ধ। ঢাকা শহর ছেড়ে চলে যাবে এবার রাখী। তার শৈশব-কৈশোরের শহর, ক্ষতবিক্ষত হওয়া শহর, বিলাসী এই শহর ছেড়ে সে চলে যাবে। বিদায় নিল সে সবার কাছ থেকে। তবু বারবার মনে হচ্ছে, কার কাছ থেকে যেন তার বিদায় নেওয়া হয়নি। সুমিতা বলল, ‘করেছিস কী মুখপুড়ি, তোর বরকে জানাবি না?’ রাখী জামানের সঙ্গে দেখা করতে যায়; কিন্তু জামানের সঙ্গে তার দেখা হয় না। জামান তখন করাচি কি লাহোরে কনফারেন্সে। ঠাকুরগাঁওয়ে রাখী কলেজে চাকরি নিয়ে ট্রেনে যাত্রা করার মধ্য দিয়ে ট্রিলজির দ্বিতীয় পর্ব কুলায় কালস্রোতের কাহিনির সমাপ্তি ঘটে। রাখীকে ট্রেনে তুলে দিতে স্টেশনে এসে সুমিতা বলেছিল, ‘ফিরে আসতে চেষ্টা করিস।’ উত্তরে রাখী বলেছিল, ‘ফিরে আসব কোথায়?’ সুমিতা বলেছিল, ‘নিজের জায়গায়।’ ঠাকুরগাঁও মফস্বল শহরের কলেজে স্বল্পকালীন চাকরির তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখী ঢাকায় ফিরে এসেছিল সেজানকে সঙ্গে নিয়ে। সেই জীবনকুলার স্রোতে ভাসা ভিন্ন এক রাখী।

ত্রয়ী উপন্যাসের তৃতীয় অর্থাৎ শেষ আখ্যানের নাম পূর্বরাত্রি পূর্বদিন। শৈশব, কৈশোরের শহর, বাবা, বড় বোন বুলু, ভাই মনি, তার ব্যর্থ সংসার, সবকিছু থেকে বিদায় নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে এসে রাখী ঘুরে দাঁড়ায়।

কলেজের কাজে নিজেকে সহজে জড়িয়ে নেয় রাখী। প্রিন্সিপাল করিম সাহেব নিজের বাড়ির লাগোয়া একটা ছোট বাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। বিধবা এক মহিলা পাওয়া গেল রান্নাবান্নার জন্য। থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে সে প্রায় নিশ্চিন্ত। লাইব্রেরির দায়িত্ব, অফিসের কাজ, ছাত্রীদের খেলাধুলা, পিকনিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান – সবকিছুতে রাখী স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করে যায়। কিন্তু মফস্বলের নানা সংকীর্ণতা, স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা, কলেজের গভর্নিংবডির সভাপতি এসডিও নিজামউদ্দিনের লাম্পট্য ও অনৈতিক প্রসত্মাবে রাজি না হওয়ায় রাখী জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এ-সময় বাম রাজনৈতিক কর্মী সেজান রাখীর পাশে দাঁড়ায়। সেজান ওই অঞ্চলে হাসান নামে পরিচিত। হাসানরূপী সেজান, যে মনে করে –

এদেশে সত্যিকার অর্থে প্রলেতারিয়েত যদি কেউ থাকে তো সে হলো এদেশের কিষান – ওদের সংগঠিত যদি করা না যায়, ওরা যদি নেতৃত্বে এগিয়ে না আসে, তাহলে কোনো বিপস্নবী আন্দোলনই সফল হবে না।

বাম রাজনীতির অন্তদ্বর্নদ্ব ও বিভাজনের ফলে বুর্জোয়াদের সঙ্গে হাত মেলানোর পরিবর্তে আত্মত্যাগী যুবক সেজান গ্রামে গিয়ে। কৃষকদের সংগঠিত করার প্রয়াস চালায়। তাই রাজধানীকেন্দ্রিক বুর্জোয়াপন্থী রাজনীতিকে পরিত্যাগ করে চলে যায় ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামের অভ্যন্তরে। কিষান-মজুরদের সংগঠিত করে, তাদের অধিকার আদায়ের স্বপ্ন গর্জে ওঠে সেজানের কণ্ঠে।

রাখীর প্রতি সুতীব্র আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও রাখীর কাছে নিজেকে ধরা দেয়নি। সেজানের কাছে আত্মসুখের চেয়ে পরার্থে জীবন উৎসর্গ অনেক বড়। তাই ব্যক্তিক প্রেমের কাছে পরাজিত হয়ে আর দশজনের মতো সংসারী হওয়ার কথা সে ভাবতে পারে না। ত্যাগ, দেশপ্রেম, আদর্শ ছাড়া অন্য কিছু সেজান ভাবতে পারেনি। নিজের ভবিষ্যতের কথা চিমত্মা না করে, দেশ-জনগণের কথা ভেবে নিরলসভাবে কাজ করে গেছে। গ্রামে ঘুরে ঘুরে জটিল অসুখে আক্রান্ত হয়েছে। অসুস্থতাও তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

শারীরিকভাবে অসুস্থ, বাম রাজনীতির বিপস্নবী চরিত্র সেজানকে সেবা-ভালোবাসার মধ্য দিয়ে রাখীর জীবনের গতিপথ বদলে যায়।  ঠাকুরগাঁওয়ের কলেজের চাকরি ছেড়ে সেজানকে নিয়ে ঢাকায় এসে সুমিতার বাসায় ওঠে রাখী। নিজের সঙ্গে নিজেই বোঝাপড়া করে। নতুন এক সিদ্ধামেত্ম পৌঁছায় সে। কোনো দ্বিধা নেই, সংকোচ নেই, ভয় নেই। সেজানের কাছে আত্মনিবেদন করার আগে রাখী বলে –

দ্যাখো, তুমি আমার দিকে দ্যাখো। আমার দাঁড়াবার কোনো জায়গা নেই, আমার ভাই অহেতুক মরে গিয়েছে, আমার বোন পাগল হয়ে মরার দিন গুনছে, আববার মুখের দিকে তাকানো যায় না, আমার সমত্মান এসেও এলো না। দ্যাখো, তুমি আমাকে ভালো করে দ্যাখো।

সেজান রাখীকে বলছে, রাখী আমি জানি। আমি সব জানি। …আমার মনকে পায়ের তলায় মাড়িয়েছে সবাই, আমার শরীরকে কলঙ্কিত করেছে, আমার নামে অপবাদ দিয়েছে। বলো, আমি এই জীবন নিয়ে কী করব?

বাইরে বৃষ্টি আরো তুমুল হয়। সেজান রাখীকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়। চুমু খায় কপালে, চোখে, মুখে, বুকের মাঝখানে। তারপর ওই সময় ওই উত্তাল মুহূর্তগুলোতে রাখীর মনের মতো শরীরও সকল দল মেলে দেয়। ফুলের মতো ফুটে রাখী সেজানের দুই হাতের মধ্যে।

সেজানের সমত্মান গর্ভে ধারণ করে রাখীর নারীত্ব পূর্ণতা পায়। প্রকাশ্যে, সগৌরবে রাখী নিজের মাতৃত্বকে ঘোষণা দেয়। রাখীর শূন্য সত্তা পূর্ণ হয়ে ওঠে। জামানের সঙ্গে তার দৈহিক মিলন ছিল – বিয়ে সামাজিক শর্তাধীন। সেই মিলনের মধ্যে কেবল দৈহিক লীলাখেলা, হৃদয়বৃত্তির কোনো বিষয় ছিল না তাতে। কারণ নারী-পুরুষের জৈবিক মিলনের পরিণত ফল সমত্মান, জামান সমত্মান নিতে অনাগ্রহী ছিল; কিন্তু দৈহিক সুখভোগে ছিল ক্লামিত্মহীন। এমনকি নিজের ক্যারিয়ারের জন্য সমত্মানকে বাধা মনে করেছে। জামান, হাসান, মাজহারদের সমাজ মনুষ্যত্বহীন, বুর্জোয়া স্বার্থান্ধ, ভোগসর্বস্ব। ওই সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে রাখী, সেজানের প্রেমে, শর্তহীন, স্বার্থহীন ভিন্ন এক মানবিক বোধে উজ্জীবিত হয়। বান্ধবী সুমিতা রাখীর গর্ভের সমত্মানের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুললে, রাখী তাই বলে –

সুমি, আমাকে তুই ওসব কি বোঝাস বল? আমার ছেলের  পরিচয় কি হবে জানিস না তুই। কী মনে করিস, আমি কিছু  লুকোব? নিজের রক্তের কাছে কিছু লুকোনো যায়? বিশ্বাসের কাছে কি ছলনা চলে? দেখিস, আমি যেমন এখন লুকোই না, তখনো লুকোব না। তোদের সংসারের নিয়মকানুন কী হল না  হল, তাতে আমার ভারী বয়ে গেল।

সেজানকে ভালোবাসা, স্বেচ্ছায় দৈহিক মিলন এবং সমত্মান ধারণের মধ্য দিয়ে প্রথাগত সমাজ ও ভোগবাদী বিমানবিক মানসিকতাকে চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে রাখী। ১৯৬৯ সালে, ঠিক এ-সময়ে, পাকিসত্মান নামক কৃত্রিম রাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাঙালির চলমান আন্দোলন চূড়ান্ত বিস্ফোরণের মুখে। বাঙালির স্বাধিকার চেতনার মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। সেজান নিহত হয়। সমাজতান্ত্রিক বিপস্নবের প্রতীক চরিত্র সেজানের সমত্মান তখন রাখীর গর্ভে। সেই অনাগত সমত্মান আগামী বিপস্নবের মিছিলে শামিল হবে, এই দৃঢ়প্রত্যয় ধ্বনিত হয় রাখীর পেটের সমত্মানকে নিয়ে উচ্চারিত সংলাপে –

দ্যাখ, এখানে আমি হেঁটে ছিলাম –

তুইও হাঁটিস এখান দিয়ে, এখানে দাঁড়িয়ে আমি মিছিল দেখেছিলাম – তুইও দেখিস এখানে দাঁড়িয়ে, সেজানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল এখানে, এই গাছতলায় – এখানে তুইও দাঁড়াস, আর এই যে রাসত্মাটা, এই রাসত্মায় সেজান মিছিল নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল – তুইও এই রাসত্মা দিয়ে মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাস্, হ্যাঁ রে, পারবি তো?

অনাগত সমত্মানকে সামনে রেখে রাখীর এই আত্মকথন, স্বপ্ন ও কল্পনার মধ্যে ঔপন্যাসিকের জীবনার্থ সন্ধানের চেতনা-বীজ পুষ্পিত হয়েছে। ত্রয়ী উপন্যাসের শেষ পর্ব পূর্বরাত্রি পূর্বদিনের আখ্যান মোট চোদ্দটি পরিচ্ছদে বর্ণিত হলেও কাহিনির এই পরিসমাপ্তি ব্যাপ্ত সময় এবং বৃহত্তর জীবনের কলস্বরকে ধারণ করেছে।

জীবনের কোনো অর্থ নেই। ঔপন্যাসিক সেই নিরর্থক জীবনকে অর্থময় করে তোলেন। নিরর্থক জীবনকে বস্ত্তময় স্থাপত্য দান করেন। শওকত আলী সেই মহান কথাশিল্পী, যিনি একান্তভাবে ইতিহাস ও সময়নিষ্ঠ। ব্যক্তি-মানুষের যাপিত জীবন এবং সময়কে তিনি নতুন এক শিল্পমাত্রায় ব্যবহার করেছেন তাঁর দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত, পূর্বরাত্রি পূর্বদিন ত্রয়ী উপন্যাসে। এখানে ব্যক্তিসত্তা ও সমাজসত্তা প্রায় সমান্তরাল। রাশেদ সাহেব, মনি, বুলু, রাখী এবং হাসান, জামান, সেজান, মাজহার প্রমুখ চরিত্রের অন্তর্কথা যেমন উন্মোচিত হয়েছে, তেমনি সময় ও সমাজসত্তার মর্মমূলে প্রবাহিত চেতনা-বীজ দৃষ্টিকোণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রধানত বর্ণনাত্মক ভঙ্গি ব্যবহৃত হলেও কোথাও কোথাও বিশেস্নষণাত্মক পরিচর্যাও লক্ষ করা যায়। চরিত্র চিত্রণ, বাসত্মবোচিত সংলাপ ও পরিবর্তনমান সময়ের প্রেক্ষাপট নির্মাণের দক্ষতার কারণে কাহিনি সুনির্দিষ্ট পথে অগ্রসর হয়ে পরিণতি লাভ করেছে। ট্রিলজির তিনটি পর্বে পৃথক শিরোনাম থাকলেও বিষয় ও শিল্প-অন্বেষার দিক থেকে তা অভিন্ন। ষাটের দশকের সমাজ ও রাজনীতির সংকটদীর্ণ প্রেক্ষাপট শওকত আলীর হাতে রূপায়িত হয়েছে অসীম আকাঙক্ষার চিত্রকল্পে।

Tuesday, July 20, 2021

জয়নুলের প্রিয়তমা by সুমন রহমান

মেঘ উড়ে যায়।
আকাশ ওড়ে না।
আকাশের দিকে।
উড়েছে নতুন সিঁড়ি।

জয়নুলের সাফল্যের যত নতুন সিঁড়ি, নেপথ্যে জয়নুলের প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারা আহমেদ। শিল্পচার্যের সমগ্র জীবনের সুখ দুঃখের সারথী। ভরসার স্থল, শিল্পচার্যকে ছায়ার মতো আগলে রেখেছিলেন সারাটা জীবন। প্রতিমার মত সুন্দর এই মহিয়সীর রয়েছে অন্যরকম একটা স্ট্রং পারসোনালিটি। তাই জয়নুলের শিল্পাচার্য হয়ে ওঠার পেছনে জাহানারা আহমেদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অসম্ভব মেধাবি। স্কুল জীবনে ফার্স্ট গার্ল ছিলেন। অংক শাস্ত্রে তুখোড় ছিলেন বলে বোধকরি জীবনের অংকেও সাফল্য পেয়েছিলেন।
তিন পুত্রের জননী জাহানারা। সন্তানদের পড়াশুনার ব্যাপারে ছিলেন সচেতন। তাই প্রতিটি ছেলেই পড়াশুনায় অসাধারণ সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিলেন। জয়নুল সন্তানদের ভীষণ ভালো বাসতেন। প্রচ- স্নেহকাতর ছিলেন সন্তানদের ব্যাপারে। জাহানারা আহমেদ যদি কখনও ছেলেদের বকাঝকা করতেন শিল্পচার্য ভীষণ রাগ করতেন। এমনও হয়েছে রাগ করে দু’তিন দিন বাসাতেই ফেরেননি। আর্ট কলেজে থেকে গেছেন। শেষে জাহানারা মান ভাঙ্গিয়ে সঙ্গে নিয়ে বাসায় ফিরতেন। অসাধারণ এক রসায়ন ছিলো জয়নুল জাহানারা সম্পর্কে। দু’জন দু’জনকে বেশ বুঝতে পারতেন। এতো বড় সংসারের বড় বউ। অনেক দায়িত্ব। সবার সঙ্গে মানিয়ে চলা। বিশেষ করে জয়নুলের দিকে খেয়াল রাখা। শিল্পাচার্য তখন প্রচ- ব্যস্ত। ছবি আঁকা, আর্ট কলেজ, পানাম নগরীতে লোক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার স্বপ্ন, নানামুখি ব্যস্ততা। তাই সাংসারিক কোন ঝামেলা যাতে শিল্পাচার্যের কাছে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায় সেদিকে জাহানারা খুবই সজাগ থাকতেন। আর জয়নুলও বেশ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন জাহানারার প্রতি। বেতনের টাকা। ছবি বিক্রির টাকা সব তুলে দিতেন জাহানারার হাতে। শেষে কলেজে যাওয়ার রিকশা ভাড়া চেয়ে নিতেন বউয়ের কাছ থেকে। জয়নুল সিগারেট খেতেন খুব। পান খেতেন। আর খেতেন চা। প্রচুর সিগারেট খেতেন বলে জাহানারা এক সঙ্গে দুই তিন কার্টন সিগারেট কিনে রাখতেন। জয়নুল বেড়াতে পছন্দ করতেন। স্ত্রী সন্তানদের নিয়েই বেড়াতেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বেড়িয়েছেন তিনি সস্ত্রীক। একবার শিল্পাচার্য পাকিস্তান গিয়েছেন। ফেরার সময় সবার জন্য কেনাকাটা করে এনেছেন। প্রিয় জাহানারার জন্য এনেছেন শাড়ি। শাড়ি দেখেতো ক্ষেপে আগুন। বললেন এটা কি এনেছো? এটা কোন শাড়ি হলো। আর রং? বিচ্ছিরি। তোমারতো দেখছি রঙের কোন আইডিয়াই নেই। এমন মজার খুনশুটি ছিলো দুজনার। তবে জয়নুলের ছবি আঁকার ব্যাপারে জাহানারা ছিলেন অসম্ভব যতœবান। তাঁর রং তুলি গুছিয়ে রাখা, জয়নুলের লোকজ সব কালেকশন সযতেœ রাখা এমনকি সংসারের কোন সঙ্কটের কথাও জানাতেন না। পাছে শিল্পাচার্যের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। কৈ মাছ জয়নুলের ভীষণ পছন্দ ছিলো আর পছন্দ শুঁটকি। কৈ মাছ রান্না হলে সবার জন্য একটি বরাদ্দ থাকলেও জাহানারা জয়নুলের জন্য তুলে রাখতেন তিনটি। এখানেও কি এক পরম মমতার গন্ধ মেলেনা?
ফিরে দেখা
জাহানারা আহমেদ। জন্ম ১৯৩১। ৪০/২ আব্দুল হাদি লেনের বাসিন্দা তৈয়ব উদ্দিন আহমেদের কন্যা ১৯৪৬ সালের ৮ই অক্টোবর পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে। জাহানারা আহমেদের জ্যেষ্ঠ বোন রহিমা খাতুনের বিয়ে হয়েছিলো জয়নুল আবেদিনের সতীর্থ শফিকুল আমীনের ভাই নূরুল আমিনের সঙ্গে। এভাবে একটি যোগাযোগ সৃষ্টি হয়েছিলো এবং সে অনুযায়ী জয়নুল আবেদিন  ১৯৪৬ সালের প্রথমার্ধ্বে জাহানারা আহমেদকে গোপনে তাঁর স্কুলে দেখে যান। এ বিয়ের আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী ছিলেন সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দিন। অক্টোবরের শুরুতে জয়নুল ময়মনসিংহ এসেছেন শুনে আবু জাফর শামসুদ্দিন কন্যাপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাকে আনতে ময়মনসিংহ যান। কিন্তু জয়নুল তখন ধানিখোলায় বোনের বাড়িতে থাকায় আবু জাফর শামসুদ্দিন ফিরে আসছিলেন, কিন্তু পথে কালিরবাজার রেল স্টেশনে জয়নুলের দেখা পেয়ে সেখান থেকেই তাঁকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান। জয়নুল ওই স্টেশন থেকেই ভাইয়ের খবর পাঠালে জাহিদুর রহিম ঢাকায় আসেন। আবু জাফরের পোশাক পরেই জয়নুল ১৯৪৬ সালের ৭ই অক্টোবর আব্দুল হাদি লেনের বাসায় আনুষ্ঠানিকভাবে জাহানারা আহমেদকে দেখতে যান। সঙ্গে আবু জাফর শামসুদ্দিন ও জাহিদুর রহিম ছিলেন। কনে দেখার পর দিনই আক্দ ও রেজিস্ট্রি সম্পাদিত হয়। অতঃপর ১৯৪৬ সালের ২৬শে ডিসেম্বর জাহানারা আবেদিনকে শ্বশুরগৃহে নিয়ে যাওয়া উপলক্ষে ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে ময়মনসিংহ থেকে জয়নুলের আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত ছিলেন। পরদিন ২৭শে ডিসেম্বর নববধূকে নিয়ে বরযাত্রীরা ট্রেনযোগে ময়মনসিংহ প্রত্যাবর্তন করেন। এভাবেই ময়মনসিংহের আকুয়া মাদ্রাসা কোয়ার্টারের শ্বশুরগৃহে নববধূর প্রবেশ ঘটে। বিয়ের সময় জাহানারা আহমেদ ছিলেন ইডেন স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী। ঢাকায় ফিরে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ শেষে জাহানারা আবেদিন জানুয়ারির শেষদিকে শ্বশুরগৃহ হয়ে জয়নুলের সঙ্গে কলকাতা চলে যান। ১৯৪৬ সালের ২৭শে ডিসেম্বর শুক্রবার। যেদিন জাহানারা আবেদিন নববধূ হিসেবে প্রথম শ্বশুরগৃহে যান। সেদিন কলকাতায় জয়নুলের গুণগ্রাহীরা এই নববধূকে অভিনন্দিত করে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। কলকাতায় মোহাম্মদী প্রেস থেকে মুদ্রিত এই পুস্তিকার শিরোনাম: জাহানারা জয়নুলকে। ‘আগের কথা’ নামে এর ভূমিকা লেখেন কবি আহসান হাবীব, মোহাম্মদ নাসির আলী, সৈয়দ সাদেকুর রহমান এবং আরও কয়েকজন। এরাই ছিলেন এই পুস্তিকার উদ্যোক্তা প্রকাশক। সম্পূর্ণ লাল-কালিতে ছাপা এ পুস্তিকায় নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আঠারো জনের কবিতা এবং দুজনের গদ্য স্থান পায়। কবিতা লেখেন সুফিয়া কামাল, বেনজীর আহমদ, কাজী আফসার উদ্দিন আহমেদ, আব্দুল কাদির, শওকত ওসমান, মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত, এবনে গোলাম নবী, কাদের নওয়াজ, মঈনুদ্দিন, আব্দুল মওদুদ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সৈয়দ আলী আহসান, গোলাম কুদ্দুস, অবন্তী সান্যাল, মতিউল ইসলাম, মোতাহার হোসেন, ইবনে বতুতা ও ফররুখ আহমদ। গদ্য লেখেন মুজীবুর রহমান খাঁ ও শেফাউল মূলক, ছদ্মনামের একজন। আরবী-ফার্সি উর্দু মিশ্রিত ভাষায় দ্বিতীয় গদ্যটি কৌতুকপূর্ণ ঢংয়ে লেখা। জয়নুল আবেদিন তৎকালীন কলকাতার কবি সাহিত্যিক ও শিল্পী মহলে কতটা আদরণীয় ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তা এ পুস্তিকা থেকে অনুধাবন করা যায়।
ওই পুস্তিকা থেকে নবদম্পতির উদ্দেশে গদ্য-পদ্যে রচিত জয়নুল আবেদিনের শুভানুধ্যায়ী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কিছু আশীর্বচনের অংশবিশেষ নিচে উদ্ধৃত করলে আবেদিন সে সময়ে কতটা সম্মান ও স্নেহের পাত্র ছিলেন, তা উপলব্ধি করা সহজ হবে। জয়নুলের শিক্ষক শিল্পী মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত (১৮৯৮-১৯৬৮) লেখেন : ‘তুমি নূতন জীবনে প্রবেশ করিতে যাইতেছ, তোমার শিল্পসৃষ্টির মতই তাহা আনন্দপূর্ণ এবং কণ্টকহীন হউক; তোমার শিল্পের মধ্যে যে মানবপ্রেম নিহিত আছে, তাহা তোমার ব্যক্তিগত জীবনে প্রতিফলিত হউক।’ (পৃ.পাঁচ)। কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন (১৯০১-৮১)-এর রচনা : ‘নব-বাঙলার বন্ধুরা শোন হিন্দু-মুসলেমীন,/ শিল্পী চোলেছে দোসর খুঁজিতে-জয়নাল আবেদিন ।/...প্রাণ পেলো যাঁর বদৌলতে,-দি-ই মোবারক বাদ,/ লভুক আজিকে নোতুন করিয়া নবজীবনের স্বাদ।’ (পৃ. সাত)। কবি বেনজীর আহমেদ (১৯০৩-৮৩) লেখেন : ‘সোনার ফসল-আশা জেগেছে মনের কোণে-কোণে/ তামাটে আকাশ ছেয়ে নেমেছে কাজল মেঘ-মায়াÑ/ কঠোর মাটির বুকে খেয়ালী আবার স্বপ্ন বোনে,/ প্রেমের মধুর রসে সে স্বপ্ন লভুক রূপ-কায়া।’ কবি আবদুল কাদির (১৯০৬-৮৪) রচিত সনেটের শেষ চরণ: ‘সেই রেখাময়ী কিগোর ধরা দেয় বাহু-আলিঙ্গনে,/বাসর-প্রাঙ্গণে তোলে ব্যাকুলিয়া হাসির বিদ্যুতে?/প্রথম আষাঢ়ে কাঁদে পাঠাইয়া মর্ত্তো মেঘদূতে,/চিত্তের তমসা-তলে ফিরে পুনঃ স্বপ্নে সংগোপনে?/এবার জাগিয়া র’বে তা’রি নূপুর নিক্বণে; বসন্ত-সঙ্গীত বাজে তাই তব জীবন-তন্তুতে॥’ কবি কাদের নেওয়াজের (১৯০৯৬-৮৩) জিজ্ঞাসা: ‘অনেক ছবি ত’ এঁকেছ শিল্পী।/ আজিকে কাহার ছবি,/আঁকিতেছ হৃদে, মানবী কিম্বা/দেবী সে, শুধায় কবি।’ সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মুজীবুর রহমান খাঁ (১৯১০-৮৪) বলেন: ‘কিন্তু সেই চির-পুরাতন ও চির-নূতন প্রশ্নÑযা ছিল শিল্পীর তুলিকায় এতদিন, আজ এল নেমে তেমনই জিজ্ঞাসা নিয়ে তার জীবনের পাতায়। আশা করি, তার প্রতিভা-দীপ্ত তুলির আঁকা ছবিটির মত জীবনের পাতায়ও এই মিলন-মধুর প্রশ্নের জওয়াব তার সুন্দর হবে, বিচিত্র হবে, হবে নিপুণ ও অনিন্দনীয়Ñ।’ কবি সুফিয়া কামালের (১৯১১-৯৯) কবিতা: ‘যে-দিগন্ত শূন্য ছিল সেথা হল আঁকা? একটি তারকা,/ঈষৎ কম্পিত, ভীরু হৃদ-স্পনন্দন সম/স্নিগ্ধ মনোরম।/সে আলোর অনির্বাণ শিখাহীন জ্যোতি/পূর্ণ পরিণতি/লভিবে সম্মুখে এলে চন্দ্রহীন রাতি,/সেই-ই হবে সাথী।/সে দীপ্তি শাশ্বত অচঞ্চলÑ/জীবনের পথের সম্বল॥’ কবি ও সঙ্গীতশিল্পী জ্যোতিরিন্দ্র নাথ মৈত্র (১৯১১-৭৭) লিখেছেন: ‘শিল্পীর প্রাণাবেগ মূর্ত্ত হল পূর্ণ প্রতিমায়।/তিলে তিলে গড়ে তুলো দ্বৈত সুরে গাঁথা/জীবনের সুর-সৌধ। তোমার বিধাতা/জানি আমি একমাত্র তুমি।/কারণ তুমি যে শিল্পী দীপ্ত জীবনের।/পূর্ণ হও, প্রীত হও, শুদ্ধ মহিমায়॥’ শিল্পীর উদ্দেশে কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের (১৯১৭-৯৮) কয়েকটি পঙ্ক্তি: ‘নীড় আর আকাশের ডাক/মাঝখানে থাকে যত ফাঁকÑ/শিল্পী, পূর্ণ করে দাও তুমি,/তারি সুরে জেগে উঠে চিত্ত-বন-ভূমি।’ কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-৭৪) রচিত সনেটের শেষ ছয় পঙক্তি; ‘তুমি এলে সে আঁধারে তারপর দ্যুতি নিয়ে একা,/যে নীল ছিল না শূন্যে মায়াঞ্জনে এল সেই নীল,/তিমির শেখর ঊর্ধ্বে আলোকের দীপ্ত ত্যোজির্লেখা/নিমিষে মুছিয়া নিল আঁধারের উদ্দাম ফেনিল/সংখ্যাহীন ঘূর্ণাবর্ত, সংশয়ের ঘন-কৃষ্ণ রেখা,/স্বপ্নহীন নভাঙ্গন হ’ল মোর স্বপ্নময় নীল॥’ কবি ও গদ্যকার সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২-২০০২) লেখেন: ‘অঞ্জন দাও নয়নে এবার জাগো বিচিত্রালোকে/তোমাদের প্রাণ প্রদীপ্ত হোক্ নব মাধুর্যে আজ॥’
১৯৪৬ সালের নভেম্বর ডিসেম্বরে ইউনেসকোর উদ্যোগে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় একটি আন্তর্জাতিক আধুনিক চিত্রকলা প্রদর্শনী (এক্সপোজিশন ইন্টারন্যাশনাল দি আর্ট মডার্ন, মুসেক দি আর্ট মডার্ন (ইউনেসকো, প্যারিস)। এ প্রদর্শনীতে ভারত থেকে যাঁদের ছবি স্থান পায় তাঁরা হলেন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেইজ, অমৃতা শেরগিল, শৈলজ মুখার্জি, জ্যোতিরিন্দ্র রায়, সুনীল মুখার্জি, সুশীল সরকার, অমূল্য সেন, ওয়াই কে শুক্লা, সতীশ সিনহা, জয়নুল আবেদিন, সফিউদ্দীন আহমেদ, বঙ্কিমচন্দ্র ব্যানার্জি, মুক্তিপদ ব্যানার্জি, নগেন ভট্টাচার্য ও ফণীভূষণ।
১৯৪৭ সালের শেষ জানুয়ারিতে জয়নুল আবেদিন তাঁর নববধূ জাহানারা আবেদিনকে সঙ্গে নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনে করে কলকাতায় যান। আগেই নতুন বাসা ভাড়া করা ছিল, কিন্তু পৌঁছাতে রাত হয়ে যাওয়ায় নবদম্পতি কলকাতায় তাঁদের প্রথম রাত কাটান ১৪ নম্বর সার্কাস রো-র পুরোনো বাসায়। পরদিন তাঁরা ৩৬ নম্বর তারক দত্ত রোডের নতুন বাসায় গিয়ে ওঠেন। বাসাটি ভাড়া করা হয়েছিল জাহানারা আবেদিনের বড় পরিবারের (রহিমা খাতুন ও নুরুল আমীনের পরিবার) সঙ্গে একত্রে। ভাড়া ছিল ৮০ টাকা। দুই পরিবার সমানভাবে মেটাবে বলে স্থির হয়েছিল। জয়নুলের তখন মাসিক বেতন ছিল ২০০ টাকার কম। এছাড়া ইত্তেহাদ পত্রিকায় প্রতি সপ্তাহে নিয়মিতভাবে ড্রয়িং ও ইলাস্ট্রেশন করে মাসে ১০০ টাকা পেতেন। জাহানারা আবেদিন গার্হস্থ্যকর্মে ছিলেন অনভ্যস্ত ও অপটু। জয়নুলের বিবাহপূর্ব জীবনের পরিচারক সফি রান্নার ব্যাপারে প্রথমাবস্থায় সাহায্য করে। আবার জয়নুলও কিছুদিন রান্না করেন। মার্চের দিকে একবার জাহানারা আবেদিন তাঁর মায়ের সঙ্গে ঢাকা ঘুরে যান। এবং ১৯৪৭-এর জুলাই মাসে বোন রহিমা খাতুনের পরিবারের সঙ্গে চূড়ান্তভাবে ঢাকা চলে আসেন। জয়নুল জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে কলকাতা ছাড়লেও ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকা আসেন আগস্টে। কলকাতায় এই কয়েক মাসের অবস্থানকালে জয়নুল, দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতার নিরাপত্তাহীন পরিবেশের কারণে নববধূকে নিয়ে বেশি বেড়াতে পারেননি। এই নবদম্পতি ডেন্টিস্ট আর আহমেদ ও শিল্পী আনোয়ারুল হকের বাসায় নিমন্ত্রিত হয়েছেন। কিছু আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়িয়েছেন। তা ছাড়া গেছেন শিল্প প্রদর্শনীতে, যেখানে জয়নুলের ছবিও ছিল; সেখানে শিল্পী অতুল বসু ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে, একাডেমি অব ফাইন আর্টের লেডি রানু মুখার্জির সঙ্গে দেখা হয়েছে। জ্যোতির্ময় রায় পরিচালিত উদয়ের পথে শীর্ষক চলচ্চিত্রের প্রেস শোতে গেছেন। জ্যোতির্ময় রায়ের স্ত্রী বিনতা রায় ছিলেন ওই ছবির নায়িকা, নায়ক ছিলেন রাধামোহন সেন। ওই শোতে দেখা হয় যামিনী রায়ের সঙ্গে। যামিনী রায় জাহানারা আবেদিনকে দেখে জয়নুলকে বলেন: ‘কোথা থেকে এই পটের ছবি নিয়ে এলে?’ অতুল বসু ও যামিনী রায় দুজনই জাহানারা আবেদিনকে বলেছিলেন, ‘জয়নুলকে তোমার দেখে রাখতে হবে, যাতে ওর ছবি আঁকায় বিঘœ না ঘটে।’ ওই কয়েক মাসে জাহানারা আবেদিনের মনে হয়েছে: জয়নুল বোধ হয় কোনো শৃঙ্খলে আটকে পড়েছেন, সে জন্য ছটফট করছেন। বিকেলে বা ছুটির দিনগুলোতে জয়নুল তাঁর স্ত্রীর একটু খোঁজ নিয়ে আবার বেরিয়ে যেতেন। বেরিয়ে গিয়ে কিছু একটা কিনে ফিরে এসে আবার বেরিয়ে পড়তেন। এ সময় কলকাতা আর্ট স্কুলের শিক্ষক বলাইচন্দ্র দাস প্রতিদিন স্কুল ছুটির আগে বাগান থেকে একটি করে ফুল তুলে এনে জয়নুল আবেদিনের হাতে দিতেন। জয়নুল আবেদিন তাঁর শিক্ষকের এই আশীর্বাদপুষ্ট স্নেহের দানটি অতি যত্নে স্ত্রীর উদ্দেশে বাসায় নিয়ে যেতেন।
বিষাদ পর্ব
সুখ দুঃখের দোলাচলে জয়নুল দম্পতির দিনগুলো যখন মধুর আর রঙিন। তখন বিধাতা কেন জানিনা হঠাৎ এর মধ্যে বিষাদের রেখা টানলেন। ১৯৭৫ সালের মধ্য পর্যায় থেকে জয়নুলের শরীর খারাপ হচ্ছিল। মাঝে মধ্যে জ্বর, কাশি হতো। সেপ্টেম্বর অক্টোবর থেকে তিনি প্রায়শঃ অসুস্থবোধ করতে থাকেন। শরীর বেশ খারাপ হয়ে যায়। হাসপাতালে তার নানা রকম পরীক্ষা করা হয়। এক্স-রেতে ধরা পড়লো ফুসফুসে টিউমার। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ক্যান্সারের সন্দেহ করলেন এবং বিদেশে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ই জানুয়ারি জয়নুল আবেদিন  চিকিৎসার জন্য লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। সঙ্গে প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারা। লন্ডনের হ্যামার স্মিথ হাসপাতালে তাকে দেখানো হয়। সেখানে ডা. মরিসন জয়নুলের চিকিৎসা করেন। ব্রঙ্কোসকপি করে ডাক্তাররা নিশ্চিত হন যে, টিউমারটা ম্যালিগন্যান্ট এবং অপারেশনের সুযোগ নেই। ফলে ডাক্তার কেমোথেরাপির কোর্স শুরু করেন। লন্ডনে থাকতেই কেমোথেরাপির দুটো কোর্স সম্পন্ন করা হয়। প্রায় দুই মাস চিকিৎসার পর জয়নুল লন্ডন ত্যাগ করেন। লন্ডনে ডা. মরিসনকে শিল্পচার্য বলেছিলেন, ‘ডাক্তার আমার একটা ব্যবস্থা করো যাতে দু’ বছর বাঁচতে পারি। সোনারগাঁওয়ের লোক শিল্প জাদুঘর ও কারুপল্লী নির্মাণের প্রকল্পটি তিনি শেষ করে যেতে চেয়েছিলেন। যেটি জয়নুলের মতো জাহানাররাও স্বপ্ন ছিলো।
ঢাকায় ফিরে পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) চিকিৎসা চলেছে শিল্পাচার্যের। ৭ই মে বিটিভির লোকজন ক্যামেরাসহ জয়নুলের বাসায় গিয়ে তাকে না পেয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। হাসপাতালে ওরা তাঁর ছবি তুলেছিলো। ওদের অনুরোধেই শিল্পচার্য ‘দুই মুখ’ শীর্ষক জীবনের শেষ ছবিটি এঁকেছিলেন ওইদিন হাসপাতালে বসেই।
এরপর জয়নুলের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। জাহানারা যেন আর কোন আশার আলো দেখতে পান না। চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে।
১৯৭৬ সালের ২৭শে মে সন্ধ্যার দিকে ড. কুদরত-এ খুদা জয়নুলকে দেখতে হাসপাতালে যান। জাহানারা আবেদীনের ভাষায়-‘আবেদিন  অতিশয় মমতার সঙ্গে ওঁর হাত ধরলেন। মনে হলো ঘুমিয়ে গেলেন। ঘুম দেখে রাতে আর তাঁকে জাগালাম না। আমরাও ঘুমিয়ে গেলাম। ২৮শে মে সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ওঁর বিছানা ভিজে গেছে। সব পরিস্কার করে দিলাম। আমি তখনও কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। আমি ওর জন্য নাশতা তৈরি করলাম। আবেদিন  ঘুমে আছে দেখে আমরা নাশতা খেয়ে নিলাম। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে ডাক্তার এলেন। এসেই অক্সিজেনের ব্যবস্থা করলেন। এরপর সকাল সোয়া এগারোটা। জয়নুলের প্রিয়তমা জাহানার জীবনের ছন্দ হারিয়ে গেল। সকল দরজা বন্ধ হয়ে গেল যেনো। বাংলাদেশের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের পতন। শিল্পাচার্য চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
‘...আমি চলিলাম/যেথা নাই নাম,/যেখানে পেয়েছে লয়/সকল বিশেষ পরিচয়, নাই আর আছে? এক হয়ে যেথা মিশিয়াছে/যেখানে অখ- দিন/আলোহীন অন্ধকারহীন,/আমার আমির ধারা মিলে যেথা যাবে ক্রমে ক্রমে/পরিপূর্ণ চৈতন্যের সাগর সঙ্গমে।’
জয়নুলের প্রিয়তমা জাহানারা। দিন যায়। বছর গড়িয়ে যুগ। কোন কিছুতেই যেন আর তার মন লাগে না। আবেদিন  ছাড়া এই ধরা ধামে সবকিছুই যেন অর্থহীন মনে হয়। চারিদিকে এতো আলো, এতো রং এতো আয়োজন কোন কিছুতেই যেন তিনি আর তাল মেলাতে পারেন না। সর্বত্র আবেদিনের ছায়া লেগে আছে। তিনি ভুলতে পারেন না। তিরতিরে জলের মতো শান্ত আর নীরব আনন্দের মতো জেগে থাকে প্রাণে। জয়নুলের চরণ ধ্বনি কি শুনতে পান জাহানারা? কোন সুদূর থেকে ভেসে আসে সেই ধ্বনি! জাহানারার বুকের ভেতর ইন্দ্র ধনুর মতো আবেশ ছড়ায়। জীবনের এইসব সঙ্গীত থেমে গেলে একদিন মহাকাল এসে হাত ধরে নিয়ে যাবে ঠিক। জাহানারা প্রহর গুনছেন কাক্সিক্ষত সেই শান্তিধামের। কত দূরে আর? আমার ভাবনাও কি সেই দিকেই ধাইছে? ...এ অসম্ভব। নয়! 
>>>বিশেষ কৃতজ্ঞতা: ময়নুল আবেদিন ও কোহিনূর আবেদিন। এবং সৈয়দ আজিজুল হক রচিত জয়নুল আবেদিন: সৃষ্টিশীল জীবন সমগ্র

Thursday, July 15, 2021

নিসে না গেলেই মিস! by জনি হক

প্রোমেনেড দে অ্যাংলেইস সৈকত
সাদা বালির সৈকত, সাগরমুখো চলাফেরার জায়গা, প্রাচীন স্থাপত্য ও সুস্বাদু খাবারের রেস্তোরাঁ— সব মিলিয়ে ফ্রান্সের নিস বেড়ানোর দারুণ গন্তব্য। সমুদ্রের জলে কাইটসার্ফিং, দর্শনীয় জাদুঘরগুলো ঘুরে ইতিহাস দেখা অথবা সৈকতে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে সব ধরনের ভ্রমণপ্রেমীর জন্য এই ফরাসি শহর অতুলনীয়। রোমাঞ্চপ্রিয়, শিল্পপ্রেমী ও নবদম্পতিদের অন্যতম আকর্ষণ নিস। মনোরম শহরটির আনাচে-কানাচে অনেক ল্যান্ডমার্কের পাশাপাশি চোখে পড়বে অদেখা-অজানা সৌন্দর্য।
সাগরের সৈকতে
*লম্বা সবুজ পাম গাছে ঘেরা নিসে বিকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ঘুরে বেড়ালে দারুণ লাগে। ফিরোজা-নীল জলের সিনেমাস্কোপিক দৃশ্যের পাশে সমুদ্র উপকূলে হাঁটা সব বয়সীদের জন্য উপভোগ্য। স্কেটবোর্ডার, সাইক্লিস্ট, জগারস ও সৈকতপ্রেমীদের জন্য নিস বেশ আরামদায়ক।
ক্যাথেড্রাল সেন্ট রেপারেট
ক্যাথেড্রাল সেন্ট রেপারেট
শতবর্ষী গির্জা
*নিসের শতবর্ষী গির্জাগুলো এককথায় দর্শনীয়। খ্রিস্টানদের এসব ধর্মীয় স্থান দারুণভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। এতে শতাব্দীর প্রাচীন ইউরোপীয় স্থাপত্য ও নিপুণ নকশার নজির পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিতি ক্যাথেড্রাল সেন্ট রেপারেট ও ক্যাথেড্রাল সেন্ট নিকোলাস।
নিসের বাজার ক্যুর্স স্যালেইয়া
নিসের বাজার ক্যুর্স স্যালেইয়া
নিত্যপণ্যের বাজার
*পুরনো এলাকা বিজু নিসে আছে নিত্যপণ্যের বাজার ক্যুঁর্স স্যালেইয়া। এতে ভোজনরসিক ক্রেতারা পাবেন ক্যাফে, বার, রেস্তোরাঁ। পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয়রা বিভিন্ন স্টল থেকে ফল, শাকসবজি, রুটি, অলিভ অয়েলসহ দৈনন্দিনে খাবারের প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনে। প্রতি সোমবার এই বাজারে বিক্রি হয় প্রাচীন জিনিসপত্র। এছাড়া রোজ বিভিন্ন সুবাসিত ফুলের বিকিকিনি চলে।
ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়াম অব নেইভ আর্ট আনাতল ইয়াকোভস্কি
ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়াম অব নেইভ আর্ট আনাতল ইয়াকোভস্কি
জাদুঘর-গ্যালারি
নিসসহ ফ্রান্সের গৌরবময় অতীতের মুগ্ধকর নিদর্শন দেখা যায় বহু জাদুঘর ও গ্যালারিতে। শিল্পপ্রেমীরা পথে পথে ঘুরে এসব সাংস্কৃতিক স্থান ও মনোরম শহর উপভোগ করে মুগ্ধ হয়। নিসের বিখ্যাত কিছু জাদুঘর ও গ্যালারির মধ্যে রয়েছে ম্যাটিস মিউজিয়াম, মার্ক চাগাল মিউজিয়াম, মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট অ্যান্ড কন্টেমপরারি আর্ট ও ইন্টারন্যাশনাল মিউজিয়াম অব নেইভ আর্ট আনাতল ইয়াকোভস্কি। এর মধ্যে উল্লিখিত শেষ জাদুঘরটির প্রতিষ্ঠাতা ফরাসি শিল্প সমালোচক আনাতল ইয়াকোভস্কি।
ফ্রিপ অ্যান্ড দ্য সিটি
ফ্রিপ অ্যান্ড দ্য সিটি
ফ্যাশন-শপিং
নিসের সাজানো-গোছানো রাস্তায় বুটিকসসহ অনেক দোকানপাট। প্রাচীনকালের কাপড় থেকে শুরু করে হালের ট্রেন্ডসহ সব ধরনের ফ্যাশন পণ্য পাওয়া যায় এগুলোতে। কেতাদুরস্ত মনোভাব থাকলে মাই কাট কনসেপ্ট, ফ্রিপ’এন দ্য সিটি ও ইউনিক হতে পারে জুতসই।
অপেরা দো নিস
অপেরা দো নিস
গান-বাজনা
ফ্রান্সের এই শহরে অপেরা, ব্যালে ও ক্ল্যাসিকাল কনসার্টের জন্য রয়েছে অপেরা দো নিস। ১৮৮৫ সালে চালু হয় এটি। ভিনদেশের সংস্কৃতির প্রতি কৌতূহলীদের জন্য বিশাল ভেন্যুটি উপযুক্ত। এতে প্রতি বছর সাতটি অপেরা ও ১৫টি কনসার্ট হয়ে থাকে। এসব অভিজাত সংগীতানুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক দর্শক দেখা যায়।
অবজারভাতোয়ার দো নিস
অবজারভাতোয়ার দো নিস
বিজ্ঞান জাদুঘর
মন্ট গ্রোস পাহাড়ে অবস্থিত বিজ্ঞান জাদুঘর ‘অবজারভাতোয়ার দো নিস’। এতে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে আকর্ষণীয় ঝলকের পাশাপাশি শহরটির উঁচু ভবন ও চোখধাঁধানো স্তম্ভগুলো দেখা যায় অনায়াসে। এটি স্থাপত্যের রত্ন বলা চলে। পর্যবেক্ষণাগারের বহির্ভাগে আছে একটি গম্বুজ। ইতিহাসপ্রেমী ও বিজ্ঞানে আগ্রহীদের জন্য এটি অন্যতম আকর্ষণ।
কেভ দো লা ট্যুর
কেভ দো লা ট্যুর
রাত বাইরে কাটানো
নিসে রাতের সৌন্দর্য উপভোগের ইচ্ছে হয় অনেকের। শহরটিতে কম দামে বেড়াতে চাইলে কেভ দো লা ট্যুর আর বিলাসবহুল আবহের জন্য লা ভিলা আছে। এগুলোতে মিলবে ওয়াইন ও আনন্দসহ মন প্রফুল্ল রাখার আরামদায়ক পরিবেশ।
নিসের খাবার
নিসের খাবার
বৈচিত্র্যময় খাবার
নিসে রাস্তার ধারের ক্যাফে থেকে শুরু করে বিলাসবহুল হোটেলে রেস্তোরাঁয় সামুদ্রিক খাবার, ফরাসি, ইতালিয়ানসহ বৈচিত্র্যময় খাবার পাওয়া যায় হাত বাড়ালেই। শুধু পকেটের ওজন বুঝে অর্ডার দিলেই চলবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের সারাবছর এখানে দেখা যায়।

লেবু গাছের কলম করবেন যেভাবে

লেবু গাছের গুটি কলম পদ্ধতি খুব সহজ। এর জন্য অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয় না। এ কলম খুব সহজভাবে করতে পারেন। অন্যান্য ফলের গাছ থেকে লেবু গাছের গুটি কলম পদ্ধতির সফলতা তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়। তাই এখনই জেনে নিন লেবু গাছের কলম করার পদ্ধতি সম্পর্কে-

কলমের সময়: গুটি কলম করার উপযুক্ত সময় বৈশাখ-আষাঢ় মাষের মধ্যে। ইংরেজি জুন-আগস্ট মাসের মধ্যে।
গাছ ও শাখা নির্বাচন: কলম করার জন্য দেড়-দুই বছর বয়সী গাছের ডাল নির্বাচন করতে হবে। বা এর বেশি বয়সী গাছের পেন্সিলের মতো মোটা ডালের মধ্যেও গুটি কলম করা যায়। মাতৃ গাছ থেকে পেন্সিলের মতো মোটা ডালকে বেছে নিতে হবে। পেন্সিলের মতো ডালটির মধ্যে একটি গিঁটের নিচে কলমটি করতে হবে।
যা প্রয়োজন: বাকল তোলার জন্য ধারালো ছুরি, মাটির পেস্ট মোড়ানোর জন্য পলিথিন, পলিথিন দিয়ে ঢাকা মোড়কটি বাঁধার জন্য সুতলি এবং মাটির পেস্ট ইত্যাদি।
মাটির পেস্ট: গুটি কলম করার জন্য প্রথমেই মাটির পেস্ট তৈরি করতে হবে। জৈবসার মিশ্রিত ৩ ভাগ এঁটেল মাটি ও ১ ভাগ পঁচা গোবর বা পাতা পঁচা একত্রে পানি দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করতে হবে। পেস্টটিতে প্রয়োজনমতো পানি দিতে হবে। মাটিতে পানি দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে একটু শক্ত অথচ হাত দিয়ে টিপলে নরম হবে, এরকম তৈরি করতে হবে।

কলম করার পদ্ধতি
• প্রথমে মাতৃ গাছ থেকে একটি পেন্সিলের মতো মোটা ডাল বেছে নিতে হবে।
• মাতৃ গাছের নির্বাচিত ডালের আগা থেকে ৪০-৫০ সেমি লম্বা একটি গিঁটের নিচে কলমটি করতে হবে।
• ডালের মধ্যে একটি গিঁটের নিচে ৩-৪ সেমি মাপে ডালের ছাল গোল করে ধারালো ছুরি দিয়ে কাটতে হবে।
• সাবধানে কেবল ডালটির বাকল উঠিয়ে ফেলতে হবে। ডালটির শক্ত কাঠটিতে আঘাত লাগানো যাবে না।
• বাকল ওঠানোর পর কাঠটিতে লেগে থাকা সবুজ রঙের আবরণটি ছুরি দিয়ে চেঁছে কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে।
• মাটির পেস্টটি ডালের মধ্যে কাটা অংশটির মধ্যদিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দিতে হবে।
• যেন বাকল তোলা পুরো জায়গায় ঠিকমত মাটির পেস্টটি বসে।
• ঢেকে দেওয়ার পর ২০ সেমি লম্বা পলিথিন দিয়ে মাটির বলটি ঢেকে দিয়ে দু’দিকে উপরে এবং নিচে সুতলি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে।
• কলম করা ডাল অর্থাৎ গুটির মধ্যে শিকড় আসতে সময় লাগে প্রায় ২.৫-৩ মাস।
• লেবু গাছে ২-২.৫ মাসের মধ্যেই শিকড় বেরিয়ে যায়। প্রথমে সাদা রঙের শিকড় দেখা যাবে।
• শিকড় যখন খয়েরি বা তামাটে হবে, তখন গুটিসহ ডালটি গাছ থেকে কেটে নিতে হবে।
• গুটির পলিথিন সরিয়ে ডালটি ছায়া জায়গায় পলিথিন ব্যাগ অথবা টবে ৪-৫ সপ্তাহ রাখতে হবে।
• পলিথিন ব্যাগের মধ্যে কলম করা ডালটি লাগানোর কিছুদিন পরই পলিথিন ব্যাগের ভেতরে শিকড় দেখা যাবে।
• বাইরে থেকেই শিকড়গুলো দেখতে পাবেন। যদি পলিথিনটি পরিষ্কার হয়। এবং নিয়মিত সেচ দিতে হবে।
• কলম করা ডালটি ৪-৫ সপ্তাহ রাখার পরে লাগানোর উপযুক্ত হয়ে যাবে।

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে গ্যাং রেপ ও হত্যা by রুদ্র মিজান

কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে দুই যুবক। ১২ বছর বয়সী কিশোরী বলেছিল ঘটনাটি সবাইকে জানিয়ে দেবে। তারপরই তাকে হত্যা করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে বাসার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা
হয়। পরিকল্পায় সফল হতে চলেছিলো দুই খুনি। কিশোরী সুমাইয়া খাতুন আত্মহত্যা করেছে বলেই জানতো সবাই। এ বিষয়ে গত বছরের ৩১শে অক্টোবর গাজীপুরের কাশিমপুর থানায় অপমৃত্যু মামলাও হয়। কিন্তু আসল ঘটনা বের হয়ে আসে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। এতে উল্লেখ করা হয় শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে তাকে।
পাওয়া গেছে ধর্ষণের আলামতও। চলতি বছরের ৩রা জুলাই একই ঘটনায় এবার হত্যা মামলা হয় কাশিমপুর থানায়। দীর্ঘ তদন্তের পর কাশিমপুরের বারেন্ডা এলাকার বহুল আলোচিত কিশোরী সুমাইয়া খাতুন হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার করা হয়েছে এ ঘটনায় জড়িত দুই যুবককে। গ্রেপ্তারের পর গত ১২ ও ১৩ই জুলাই আদালতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে দুই আসামি।
কাশিমপুরের বারেন্ডা এলাকায় সুমাইয়াদের বাসার পাশেই ভাড়া থাকতো রনি মিয়া। রনির বাসায় টাকার বিনিময়ে খাওয়া-দাওয়া করতো মিলন, হাসান ও সাঈদ। তারা প্রত্যেকই শ্রমিক এবং ওই এলাকায় পাশাপাশি থাকতো। রনির বন্ধু মিলনের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল সুমাইয়ার। সুমাইয়ার প্রতি আকৃষ্ট ছিল রনি ও সাঈদ। নানাভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় রনি। একইভাবে ব্যর্থ হয় সাঈদও। এরমধ্যে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নেয়ার চিন্তা করেন সুমাইয়ার মা। গত বছরের নভেম্বরে বাসার মালিককে জানিয়ে দেয়া হয় এই মাস পরেই অন্যত্র চলে যাবেন তারা। সুমাইয়া চলে যাবে, তা জানার পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে রনি ও সাঈদ। দুইজন এক হয়ে শলাপরামর্শ করে। পরিকল্পনা করে তাকে রেপ করবে। পরিকল্পনা অনুসারেই ৩১শে অক্টোবর সকালে যখন সুমাইয়ার মাসহ অন্যরা কর্মস্থলে তখনই ঘটে ঘটনা। সুমাইয়ার সঙ্গে বসে কথা বলছিলো রনি ও সাঈদ। এরমধ্যেই হঠাৎ করে সুমাইয়াকে জাপটে ধরে। তার জামা খোলার চেষ্টা করে। সুমাইয়া বাধা দেয়। চিৎকার করতে চেষ্টা করে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বিছানায় শুইয়ে মুখে বালিশ চেপে ধরে রনি। বাধা হয় তার দুই হাত, পা ধরে রাখে সাঈদ। রনি ধর্ষণ করে সুমাইয়াকে। মোবাইল ফোনে সেই ভিডিওচিত্র ধারণ করে সাঈদ। রনির পর সুমাইয়াকে ধর্ষণ করে সাঈদ। সুমাইয়া তখন বলেছিলো, ধর্ষণের ঘটনা সবাইকে জানিয়ে দেবে। মাকে নিয়ে থানায় যাবে। তারপরই আরও হিংস্র হয়ে ওঠে রনি ও সাঈদ। পরিকিল্পতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সুমাইয়াকে। তারপর নাটক সাজায় আত্মহত্যার। ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় তার লাশ।
সুমাইয়ার বাবা-মা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না তার মেয়ে কেন আত্মহত্যা করবে। বারবার এ বিষয়ে অভিযোগ করলেও আমলে নেয়নি কেউ। পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ জানা ও ধর্ষণের আলামত পাওয়া যাওয়ার পরই হত্যা মামলা রেকর্ড করে পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১২ই জুলাই ভোরে টঙ্গী পশ্চিম থানার গাজীপুরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাঈদ ইসলামকে। সাঈদ ইসলাম (১৯) নিলফামারী জেলার ডোমার থানার চিলাহাটী মাস্টারপাড়ার মৃত নবীর উদ্দিনের পুত্র। সাঈদকে গ্রেপ্তারের পরদিন ১৩ই জুলাই রাত দেড়টায় গাইবান্ধা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় রনিকে। রনি মিয়া (২১) লালমনিরহাটের তিস্তা চৌরাটারী গ্রামের শফিকুল ইসলামের পুত্র। নিহত সুমাইয়া যশোরের বাঘাপাড়া থানা এলাকার বাউলিয়া গ্রামের সোহেল রানা ও রুনা বেগমের সন্তান।
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান বলেন, শুরু থেকেই এই ঘটনায় পিবিআই গাজীপুর জেলায় ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে থানায় হত্যা মামলা রুজু হওয়ার পর স্ব-উদ্যোগে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানান তিনি।

৬৩ বছর পর বাংলা রেডিও সার্ভিস বন্ধ করছে ভয়েস অব আমেরিকা

ভয়েস অব আমেরিকা গত মঙ্গলবার ঘোষণা করেছে ৬৩ বছর ধরে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় সম্প্রচার করে আসা বাংলা রেডিও সার্ভিস বন্ধ হতে যাচ্ছে। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলায় এফএম এবং শর্টওয়েভ রেডিও সম্প্রচারের আনুষ্ঠানিকতা ৬৩ বছর পর আসছে ১৭ই জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে।
একই সঙ্গে, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের টেলিভিশন এবং সোশ্যাল
মিডিয়া কন্টেন্টের পরিধি যথেষ্ট বাড়ানো হবে। কারণ এই প্ল্যাটফরমগুলো ভিওএ বাংলার (এক কোটি ষাট লাখ) সাপ্তাহিক শ্রোতাদের দ্বারা বেশি ব্যবহৃত হয়।
ভিওএ প্রোগ্রামিংয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জন লিপম্যান বলেন, “ভিওএ বাংলা ১৯৫৮ সালের জানুয়ারিতে যখন চালু হয়েছিল, বাংলাদেশ তখন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ হিসেবে পরিচিত ছিল এবং অঞ্চলটি সামরিক আইনের অধীনে ছিল যেখানে কোনো টেলিভিশন বা বেসরকারি রেডিও ছিল না।”
তিনি বলেন, ‘তখন সীমান্তের বাইরে থেকে ভিওএ-র শর্টওয়েভ রেডিওতে সম্প্রচারিত স্বাধীন সংবাদ এবং তথ্যের ওপর নির্ভর করতো বাংলাভাষী জনগণ।’
যদিও শর্টওয়েভ রেডিও শ্রোতা এখন এক শতাংশেরও কম, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিওএ বাংলার শ্রোতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। টুইটার অ্যাকাউন্টে সম্পৃক্ততা আগের বছরের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ইনস্টাগ্রামে ভিডিও দেখা ২৭৪ শতাংশ বেড়েছে।
লিপম্যান উল্লেখ করেন, ‘কয়েক ডজন দেশীয় টেলিভিশন এবং রেডিও স্টেশন বাংলাভাষী শ্রোতা ধরতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, এর পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমের সংখ্যাও বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘সংবাদের জন্য বাংলাদেশে টিভি এবং অনলাইন অ্যাক্সেসের চাহিদা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভিওএ বাংলা বিভাগের অনুষ্ঠান সেসব প্ল্যাটফরমে পরিবেশন করা দরকার যেখানে তার শ্রোতারা ইতিমধ্যেই সক্রিয়।
ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শতরূপা বড়ুয়া এ মাসেই বলেছিলেন, ‘রেডিও যখন প্রাথমিক সংবাদমাধ্যম ছিল সে সময় থেকেই ভিওএ বাংলা তার শ্রোতাদের কাছে বিশ্ব সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। এটি ছিল আমাদের গড়ে তোলার মাধ্যমে, সবার মুখে মুখে ছিল এর নাম। শর্টওয়েভ এবং মিডিয়ামওয়েভ রেডিওর চেয়ে এখন যেসব মিডিয়ায় আমাদের উপস্থিতি আরও বেশি জনপ্রিয় সেসব জায়গায় আমাদের সেই খ্যাতিকে ভিত্তি করে এগিয়ে যাবো।’
শতরূপা বলেন, “বাংলাদেশে আমাদের এমন ইতিহাসের কারণে, ভিওএ-তে কাজ করা আমাদের অনেকের জন্য ‘ড্রিম জব’।

আসন্ন পরিবর্তনগুলোর পরও তা অব্যাহত থাকবে।”
সম্প্রচারের শেষ দিনগুলোতে ভিওএ বাংলা রেডিও সার্ভিস তাদের সূচনালগ্ন অর্থাৎ ১৯৫৮ সালের পর থেকে এ দেশে ঘটে যাওয়া নানা পরিবর্তন সম্প্রচার করবে।

Wednesday, July 14, 2021

নিত্য প্রয়োজনে ফিটকিরির ১০ ব্যবহার by ফাতেমা সানজিদা

ফিটকিরি একটি রাসায়নিক যৌগ। এর ইংরেজি নাম এলাম। এর নানাবিধ ব্যবহার রয়েছে আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনে। সহজলভ্য এই ফিটকিরির ব্যবহার দেখে নিন।
১.সেভিং -এ ব্যবহার :
ফিটকিরি ত্বকের যত্নে আ্যাসটিনজেন্ট হিসেবে কাজ করে। সেভিং এর সময় ছোটখাট কাটাঁ ছেড়াঁ খুব স্বাভাবিক। দ্রুত রক্ত বন্ধ করতে একটা ফিটকিরির টুকরা আক্রাণ্ত স্হানে ৫ মিনিট ঘষুন। এরপর ১০ মিনিট অপেক্ষা করে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এছাড়াও আফটার সেভ লোশনের বদলে ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়।
২.মুখের ঘা এ উপশম :
অনেক সময় মুখের চারপাশে ঘা হয়। এই ঘা এর উপশমও ফিটকিরি করতে পারে। মুখের ঘা -তে ফিটকিরি ব্যবহারের নিয়ম – ১ চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ ও ১ গ্লাস পানি নিন। পানি একটা পাত্রে চুলায় দিন। ফুটে উঠলে ফিটকিরির গুড়াঁ    মিশিয়ে নিন ও চুলা বন্ধ করে নিন। পানি কুসুম গরম অবস্হায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এবার এটা দিয়ে কুলকুচি করে নিন। দিনে ২-৩ বার করুন, আরাম পাবেন।
৩.ব্রণ দূর করতে :
প্রাকৃতিক উপায়ে ব্রণ দূর করতে ফিটকিরি অত্যন্ত কার্যকর। মাত্র ৩ উপাদানেই তৈরি করুন ব্রণের জন্য ফেসপ্যাক। ১ চা চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ, ২ চা চামচ মুলতানি মাটি, ২ চা চামচ গোলাপজল একসাথে মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। ব্রণে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।ভালো ফল পেতে সপ্তাহে ১ বার ব্যবহার করুন। ২ মাস নিয়মিত ব্যবহারে লক্ষণীয় উন্নতি দেখা যাবে।
৪.ডিওডেরেন্ট হিসেবে :
ফিটকিরি বা ফিটকিরির গুঁড়া শরীরের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। এটাকে প্রাকৃতিক ডিওডেরেন্ট বলা যায়। ফিটকিরির টুকরা ভিজিয়ে আন্ডারআর্ম বা বগলে ঘষুন, ২ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে ফেলুন। অথবা গোলাপজলের সাথে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে বগলে লাগান। ৫-১০ মিনিট পরে ধুয়ে ফেলুন। এটা দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারি ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে। তবে প্রতিদিন ব্যবহার না করে সপ্তাহে ২ দিন ব্যবহার করুন।
৫.পানি বিশুদ্ধকরনে :
ফিটকিরির ব্যবহার পানি বিশুদ্ধকরনে খুব জনপ্রিয়। প্রতি ১ লিটার পানিতে ১ গ্রাম ফিটকিরি বা ফিটকিরির গুঁড়া ব্যবহার করুন। ময়লা বা কাঁদাযুক্ত পানিতে ফিটকিরি মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দিন। এরপরে দেখবেন কাঁদা সব নিছে জমা হয়েছে, এখন উপরে ভয়াল পানিতা আস্তে করে ছেঁকে নিন।
৬.ক্রিয়াবিদের পায়ের যত্নে :
ফিটকিরিতে আছে অ্যান্টিমাইক্রোবাইয়াল উপাদান। এটা ক্রিয়াবিদের পায়ে ফাঙ্গাসকে মেরে ফেলে। একারনে ক্রিয়াবিদের পায়ের যত্নে ফিটকিরি ব্যবহার করা যায়। গোলাপজলের সাথে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে পা ও পায়ের পাতাতে লাগিয়ে রাখুন। শুকালে কুসুম গরম পানিতে ধুয়ে ফেলুন। অন্যভাবে, হালকা গরম পানিতে ফিটকিরির গুঁড়া মিশিয়ে পা কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে পা ধুয়ে, মুছে নিন।
৭.পা ফাটা উপশমে :
ফিটকিরি খুব দক্ষতার সঙ্গে পা ফাটা আরোগ্য করতে পারে। পায়ের মরা চামড়া তুলে পা কে নরম ও মসৃণ করে তোলে। পায়ের ফাটা ভালো করতে একটা প্যাক তৈরি করুন। একটা বাটিতে ২ চা চামচ ফিটকিরি গুঁড়া , ১ চা চামচ নারিকেল তেল ও ১ চা চামচ মধু মিশিয়ে নিন। পা ভালো করে ধুয়ে, শুকিয়ে নিন। এরপর প্যাক লাগিয়ে ৫ মিনিট ম্যাসাজ করুন। তারপর ১০-১৫ রেখে কুসুম গরম পানিতে ধুয়ে নিন। ভালো ফল পেতে সপ্তাহে ২-৩ বার ব্যবহার করুন।
৮. উকুন ধ্বংসে :
চুলে উকুন হয়েছে? চিন্তা নেই, ফিটকিরিই দূর করে দিবে উকুন। ১/২ লিটার পানিতে ৪ গ্রাম ফিটকিরি মিশিয়ে নিন। এবার মাথার তালুতে লাগান। ৩০ মিনিট পরে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ১ /২ দিন ব্যবহার করুন।
৯. ডার্ক সার্কেল দূর করতে :
চোখের নিচের কালো দাগ বা ডার্ক সার্কেল দূর করতে ১ চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ ও ২ চামচ মধু মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এখন চোখের নিচে লাগিয়ে ৪/৫ মিনিট পরে ধুয়ে মুখ ফেলুন। তবে খুব সাবধান চোখের ভিতরে যেন না যায়, তা হলে চোখ জ্বালা করবে।
১০. বলিরেখা দূর করতে :
ফিটকিরি ত্বককে টানটান করতে সাহায্য করে। ১চামচ ফিটকিরির গুড়াঁ ও ২ চামচ গেলাপজল বা পানি মিশিয়ে মুখে লাগান ( চোখ বাদে)।  কিছুক্ষণ পরে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ফিটকিরির গুড়াঁ না থাকলে, একটা ফিটকিরির টুকরা ভেজা মুখে ঘষুন। কিছু সময় পরে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ত্বকের বলি রেখা দূর করে, আপনাকে করে তুলবে সতেজ ও লাবন্যময়ী।