Wednesday, November 16, 2016

গিলানির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা ইউসুফ রাজা গিলানির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে দেশটির একটি আদালত। পিপিপির অপর নেতা মাখদুম আমিন ফাহিমের বিরুদ্ধেও জারি করা হয়েছে পরোয়ানা। বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের একটি দুর্নীতি দমন আদালত এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফআইএ) আদালতে ইউসুফ গিলানি ও মাখদুম আমিন ফাহিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ১২টি মামলার চার্জশিট দাখিল করলে এ পরোয়ানা জারি করা হয়। বাণিজ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (টিডিএপি) স্ক্যান্ডালে কোটি রুপির দুর্নীতির অভিযোগে এ দুই নেতার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়। এর আগে আদালত এসব মামলায় গিলানি ও ফাহিমকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিলে তা উপেক্ষিত হয়। বৃহস্পতিবার এফআইএ চার্জশিট দাখিল করলে শুনানি শেষে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।
সেই সঙ্গে ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অভিযুক্তদের আটক করে আদালতে হাজির করারও নির্দেশ দেয়া হয়। ২০০৮ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানের ১৬তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বপালন শুরু করেন ইউসুফ রাজা গিলানি। ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল দেশটির সর্বোচ্চ আদালত তাকে অযোগ্য ঘোষণা করে বহিষ্কারাদেশ দিলে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এদিকে, বুধবার করাচিতে এক সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অসিম হোসাইনকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। তিনি পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। শান্তিপূর্ণ ও সন্ত্রাসমুক্ত করাচি নিশ্চিত করতে সম্প্রতি দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ ‘সন্ত্রাসবাদ, মাফিয়া, সহিংসতা ও দুর্নীতির মধ্যে বিদ্যমান দুষ্টু চক্রকে’ ভেঙে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এর একদিন পরই অসিমকে আটক করা হয়।

মিত্রদের ওবামার আশ্বাস

সংবাদ সম্মেলনে বারাক ওবামা
সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে ইউরোপীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় করা বিতর্কিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করবেন না। কঠোর বাস্তবতার মুখে তিনি সেই অবস্থান থেকে পিছু হটবেন। তবে ওবামা স্বীকার করেছেন, নিজের উত্তরসূরিকে নিয়ে তিনি ‘উদ্বিগ্ন’। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শেষ বিদেশ সফরের আগে গত সোমবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ওবামা। সেখানেই তিনি ট্রাম্পকে নিয়ে ইউরোপসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদ্বেগ দূর করার চেষ্টা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত জয়ের পর ইউরোপীয় নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্যই মূলত এর কারণ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে এটিই ছিল বারাক ওবামার প্রথম সংবাদ সম্মেলন। এরপর শেষ বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে গ্রিসে যাত্রা করেন ওবামা। সংবাদ সম্মেলনে ওবামা বলেন, নির্বাচনের প্রচারণায় হাততালি পাওয়া বাগাড়ম্বর করা যতটা সহজ, লাখ লাখ অভিবাসীকে দেশছাড়া করা, ন্যাটো ও জাপানের সঙ্গে সামরিক চুক্তি বাতিল করা, ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি উড়িয়ে দেওয়া অথবা পরিবেশ রক্ষাসংক্রান্ত চুক্তি বাতিল করা তত সহজ নয়। তিনি বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) যে অভিজ্ঞতা কিংবা ধারণা নিয়েই প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে আসেন না কেন, এই পদ তাঁকে জাগিয়ে দেবে।’ ওবামা বলেন, ট্রাম্প যতটা না ভাববাদী, তার চেয়ে বেশি বাস্তববাদী। বাস্তবতার একধরনের চাপ রয়েছে, যা অনেক কিছু ঠিক করে দেয়। জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ট্রাম্প শ্রদ্ধা দেখাবেন বলেও মিত্রদের আশ্বস্ত করেছেন ওবামা। নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্পকে মাঝেমধ্যেই মেজাজ গরম করতে দেখা গেছে। ট্রাম্পের স্বভাবের এ বৈশিষ্ট্য নিয়েও কথা বলেন ওবামা। বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় অবশ্যই মেজাজকে একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। না হলে তা ক্ষতিকর হবে। মার্কিন নির্বাচনের এবারের অতিতিক্ত প্রচারণায় বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে ওবামা বলেন, ‘আমি তাঁকে (ট্রাম্পকে) বলেছি এবং জনসমক্ষেও বলেছি, ঐক্যের একটা বার্তা দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রচারণার সময় সংখ্যালঘু, নারী ও অন্য যারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়েছেন তাঁদের কাছে এই বার্তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।’ ওবামা আরও বলেন, গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করার পর তিনি নিশ্চিত যে, তাঁর উত্তরসূরি সব মার্কিনেরই প্রেসিডেন্ট হতে চান। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প খুব ‘আন্তরিক’।
ট্রাম্প আরও আশ্বস্ত করেছেন, কৌশলগত সম্পর্ক অব্যাহত রাখার ব্যাপারেও তাঁর আগ্রহ রয়েছে। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার ওবামা গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে পৌঁছেছেন। এই সফরে পেরু ও জার্মানিতেও যাবেন তিনি। ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপ: এদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত সোমবার ওই ফোনালাপে ওয়াশিংটন-মস্কো সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ব্যাপারে একমত হন এই দুই নেতা। ক্রেমলিন বলছে, দুই নেতা ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পুতিন। ফোনালাপে ট্রাম্প বলেন, তিনি রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক চান। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের শুরু থেকেই পুতিনের প্রশংসা করে আসছেন ট্রাম্প। বলেছেন, তাঁর দৃষ্টিতে ওবামার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য নেতা পুতিন। মার্কিন নির্বাচনের সময় রুশ ক্ষমতাসীনদের মদদে প্রচারণাকাজের ওপর হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ওঠে। এমন প্রেক্ষাপটে পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ‘সৌহার্দ্য’ যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

মিশেল ওবামাকে নিয়ে বর্ণবাদী মন্তব্যে ঝড়

মিশেল ওবামা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য পোস্ট করায় যুক্তরাষ্ট্রে দুজন কর্মকর্তাকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। তাঁদের বর্ণবাদী মন্তব্যের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। ওই দুই কর্মকর্তা হচ্ছেন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার একটি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও একজন মেয়র। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ক্লে কাউন্টি ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের পরিচালক পামেলা র্যামজে টেইলর এক পোস্টে মন্তব্য করেন, ‘অবশেষে হোয়াইট হাউসে একজন সুন্দরী,
মর্যাদাবান ও রুচিশীল ফার্স্ট লেডিকে দেখতে পাব। এটা দারুণ আনন্দের। সেখানে হিল পরা এক বানরকে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’ ক্লে এলাকার মেয়র বেভারলি ওয়ালিং ওই পোস্টে মন্তব্য করেন, ‘আমাদের দিনটাকে আনন্দময় করে দিলেন।’ তাঁদের এই পোস্ট ও মন্তব্য প্রথমে নজরে পড়ে ডব্লিউএসএসজেড-টিভির। তারা এ নিয়ে প্রতিবেদন করে। পরে অবশ্য পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে তা ছড়িয়ে পড়ে এবং ফেসবুকে কয়েক শ বার শেয়ার হয়। এ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এপি ক্লে কাউন্টি ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনে ফোনে যোগাযোগ করলে তারা কোনো জবাব দেয়নি। আর মেয়রকে খুদে বার্তা দেওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

ঘুষ নেওয়ার সন্দেহে গ্রেপ্তার রুশ অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রী

আলেক্সেই উলুকালভ
রাশিয়ার অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী আলেক্সেই উলুকালভকে ঘুষ গ্রহণের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি রসনেফটের একটি অধিগ্রহণ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য মন্ত্রী ২০ লাখ ডলার ঘুষ নিয়েছেন সন্দেহে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সংশ্লিষ্ট তদন্তকারীরা গতকাল মঙ্গলবার এ কথা জানিয়েছেন। ৬০ বছর বয়সী মন্ত্রী আলেক্সেই উলুকালভ দুর্নীতির সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া পুতিন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা। এ ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। রাশিয়ায় ১৯৯১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পর থেকে এটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হওয়ার প্রথম ঘটনা। ২০০০ সালে ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু পুতিনের আমলে তাঁর মিত্ররা ফুলেফেঁপে উঠছেন বলেই অভিযোগ রয়েছে। সরকারি দুর্নীতি দমন সংস্থা ‘রুশ তদন্ত কমিটি’ (এসকে) বলেছে, গোয়েন্দা বাহিনী এফএসবি এক অভিযানে আলেক্সেই উলুকালভকে গ্রেপ্তার করেছে। এসকে এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, গত মাসে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি বাশনেফটের বড় অংশ রসনেফটের অধিগ্রহণ অনুমোদন করার জন্য অর্থমন্ত্রী গত সোমবার ওই অর্থ নেন। কিন্তু ওই ঘুষের অর্থ তাঁকে কে দিয়েছেন, তা বিবৃতিতে বলা হয়নি। ওই চুক্তির মূল্য ৫২০ কোটি ডলার। তদন্ত কমিটি বলছে, ঘুষ গ্রহণের ঘটনা তদন্তের অংশ হিসেবে উলুকালভকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার জন্য তাঁর ৮ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। তাঁকে শিগগিরই অভিযুক্ত করা হবে বলেও তদন্ত কমিটি জানিয়েছে। কমিটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘রসনেফটের প্রতিনিধিদের ভয় দেখিয়ে ঘুষ আদায় করা হয়েছে।...তিনি ঘুষ নিয়েছেন, তা হাতেনাতে ধরা পড়েছে।’
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি সূত্র জানায়, উলুকালভ ও তাঁর সহযোগীর কথাবার্তার রেকর্ড থেকে তদন্তকারীরা অপরাধের ‘গুরুতর প্রমাণ’ পাওয়ার পর ‘স্টিং অপারেশনের’ অংশ হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। অর্থমন্ত্রীর গ্রেপ্তারের বিষয়ে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইন্টারফ্যাক্স বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘এই গুরুতর অভিযোগের পক্ষে জোরালো প্রমাণ দরকার, যা কেবল আদালতই নির্ধারণ করতে পারেন।’ অবশ্য তিনি এ-ও বলেন, যে অভিযানে অর্থমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হলো, সেই অভিযানের শুরু থেকেই সবকিছু জানতেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। উল্লেখ্য, আলেক্সেই উলুকালভ ২০১৩ সাল থেকে রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। পুতিনের আমলের সবচেয়ে দীর্ঘায়িত অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে টেনে তোলা ছিল তাঁর দায়িত্ব। ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কোর পদক্ষেপের প্ররিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা অবরোধ আরোপ ও তেলের দাম পড়ে যাওয়ার কারণে ২০১৪ সালের শেষ দিক থেকে ওই তীব্র অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয় রাশিয়ায়। উলুকালভের আগে গত সেপ্টেম্বরে আরেক ঘুষের মামলায় গ্রেপ্তার হন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্রধান। তাঁর মস্কোর ফ্ল্যাট থেকে নগদ ১২ কোটি ডলারের বেশি পাওয়া গিয়েছিল। জুলাই মাসে অপরাধী চক্রের নেতার কাছ থেকে মামলা বাতিলের বিনিময়ে বড় অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে তদন্ত কমিটির কয়েকজন কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। এর আগে ২০১২ সালে একটি বড় দুর্নীতির কেলেঙ্কারির জেরে তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনাতোলি সারদিউকভকে বরখাস্ত করা হয়।

মুরসির মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছেন মিসরের সর্বোচ্চ আদালত

মোহাম্মদ মুরসি
মিসরের সর্বোচ্চ আদালত দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের একটি রায় বাতিল করেছেন। ২০১১ সালে একটি কারাগার থেকে অনেক কয়েদির গণহারে পালানোর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১৫ সালে তাঁকে এ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সর্বোচ্চ আদালত ওই রায় বাতিল করে আবার বিচারের আদেশ দিয়েছেন। সর্বোচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় গতকাল মঙ্গলবার বাতিল করায় এখন আর মুরসির ফাঁসি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্য কয়েকটি মামলায় তাঁকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করার অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড, 
কাতারের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করার অভিযোগে ৪০ বছরের কারাদণ্ড এবং ফিলিস্তিনের ইসলামি গোষ্ঠী হামাসের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ২০১৩ সালে অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রেসিডেন্ট হন সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। তাঁর নির্দেশে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত মুরসিকে বন্দী করা হয়। তিন বছর ধরেই কারাগারে বন্দী মোহাম্মদ মুরসি। তাঁর বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগের বিচার চলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, সিসি সরকারের চালানো এসব বিচারিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং এতে হাজারো মিসরীয়র মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

জুমার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (ডিএ) দেশটির প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছে। জোহানেসবার্গের শহরতলি রোজব্যাংকের থানায় এ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে গতকাল মঙ্গলবার জানিয়েছে রাজনৈতিক দলটি। ডিএ-র অভিযোগে বলা হয়েছে,
ধনাঢ্য গুপ্ত পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে প্রেসিডেন্ট জুমা বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব রাখার সুযোগ দিয়েছিলেন। ডিএ জোট গুপ্ত পরিবার এবং জুমার ছেলেসহ কয়েকজন ব্যক্তির ব্যাপারে তদন্ত করতে বলেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার দুর্নীতিবিরোধী ন্যায়পাল সম্প্রতি বলেন, প্রেসিডেন্ট জুমা গুপ্ত পরিবারকে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ দিয়ে থাকতে পারেন বলে তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
ব্লুমবার্গ

বাংলাদেশের কাছে ৯২১ কোটি রুপির আবদার পাকিস্তানের

বাংলাদেশে তাদের ‘অনাদায়ি ফেলে যাওয়া সম্পদ’ ফেরতের দাবি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান সরকার। দেশটি এর আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করেছে ৯২১ কোটি রুপি।
পাকিস্তানের
ইংরেজি দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে
আজ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান দেশটির সব বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠিতে তাদের বাংলাদেশের কাছে থেকে পাওনা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের কাছে থেকেও অনাদায়ি সম্পদ ফেরত চায় পাকিস্তান। ভারতের কাছে দেশটি ৬০০ কোটি রুপি পাবে বলে নির্ধারণ করেছে। পাকিস্তানের দাবি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জমি, ভবন, আসবাবপত্র, অফিসের ব্যবহার্য নানা দ্রব্য, যানবাহন, সরকারি বন্ড, ঋণ, বিনিয়োগ করা অর্থের পরিমাণ এখন আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ৯২১ কোটি পাকিস্তানি রুপি। চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত এসব সম্পদের মূল্য নির্ধারণ করেছে তারা।

ট্রাম্পই আমেরিকার অবতার নন by মিজানুর রহমান খান

মার্কিন সংবিধানে লেখা আছে, প্রেসিডেন্টের হাতে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। বাংলাদেশের সংবিধানে এই ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর। একজন ব্যক্তির হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু মার্কিন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক। কারণ, ক্ষমতার প্রয়োগ ও অনুশীলনে পদে পদে যেভাবে ভারসাম্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা চলে না। বাংলাদেশে তা সংবিধানগত ও বাস্তব উভয় অর্থে অনুপস্থিত।
রাষ্ট্রের কোনো একটি অঙ্গকে অসীম ক্ষমতা দেয়নি মার্কিন সংবিধান। বরং প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতা হলো কংগ্রেসের কাছে। সংসদে নীতি তৈরি হবে। বাজেটের পরিমাণ নির্দিষ্ট হবে। তারাই জনগণের কণ্ঠস্বর, ঐতিহাসিক সাধারণ ধারা হলো হোয়াইট হাউস কংগ্রেসকে নয়, কংগ্রেসই হোয়াইট হাউসকে চালিত করেছে। ৭ নভেম্বর দ্য গার্ডিয়ানে টম ম্যাকার্থি ঠিকই লিখেছেন, ‘সিনেট, কংগ্রেসসহ সবটাই ট্রাম্পের দলের কিন্তু তাই বলে ট্রাম্পের জন্য তা খেয়াল–খুশিমতো হবে না।’ কংগ্রেসের স্পিকার পল রায়ান যদিও ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানাতে প্রথম কাতারে ছিলেন কিন্তু তিনি ট্রাম্পের সমালোচকদের অন্যতম, এমনকি তাঁর সঙ্গে প্রচারণায় যেতে রাজি ছিলেন না। দেখার বিষয়, স্পিকার পদে তাঁর পুনর্নির্বাচনে ট্রাম্প কী ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যম অবচেতনে ট্রাম্পের জয়-পরাজয়ের মধ্যেই নিরঙ্কুশভাবে যে আশা-নিরাশা দেখছে, সেটা মার্কিনীয় নয়, তাদের দুর্বলতা। তারা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে যা দেখে, সেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকেও দেখছে। ট্রাম্পের সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়ী হওয়া মাইক পেন্স শ্রদ্ধাভাজন নেতা হিসেবে পরিচিত।
ট্রাম্পের মুসলিম বহিষ্কারের ঘোষণাকে পেন্স বলেছেন ‘আক্রমণাত্মক ও অসাংবিধানিক’। ইরাকে নিহত এক মুসলিম মার্কিন সেনার পরিবারের সঙ্গে ট্রাম্প দ্বন্দ্বে জড়ালে পেন্স বিবৃতি দেন: ‘প্রত্যেক মার্কিন ওই পরিবারকে হৃদয়ে ধারণ করবে।’ বাংলাদেশকে শিখতে হবে যে কী করে কোনো স্পর্শকাতর নীতিগত প্রশ্নে দলের অভ্যন্তরে ভিন্নমত প্রকাশ করা যায়, কিন্তু তাকে কেউ ষড়যন্ত্র দূরে থাক, অস্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখে না। নির্বাচনী প্রচারকালে ট্রাম্প যখন ভ্লাদিমির পুতিনের সিরীয় নীতির প্রশংসা করেছেন, তখন পেন্স ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে আসাদের নিন্দা করে রাশিয়াকে আক্রমণ করেছেন। সুতরাং, অভ্যন্তরীণভাবে পেন্সকে একটা রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা যেতে পারে। মন্ত্রিসভাও তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের মতো ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ হবে না। জাতির ‘কল্যাণ সাধনের’ জন্য ট্রাম্প যা–ই করার চেষ্টা করুক না কেন, তা যদি গণতন্ত্রের সঙ্গে না যায়, তা যে তিনি করতে পারবেন না, সেটা ট্রাম্পের অতি বড় সমর্থকেরাও জানেন। তবে সত্য যে, ক্ষমতার পৃথক্করণ কিছু ক্ষেত্রে কাগুজে বিষয়। যেমন কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও ওবামা লাখ লাখ বৈধ কাগজপত্রবিহীন অভিবাসীকে তিন বছরের জন্য থাকতে দিয়েছেন। ট্রাম্প এখন বললেন, ৩০ লাখকে যেতে হবে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ওবামা গাদ্দাফির বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেছেন। ওবামা এখন স্বীকার করছেন যে ওটা ছিল তাঁর নিকৃষ্টতম ভুল। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ওবামা স্বীকার করেছিলেন যে রাষ্ট্রের ওপর হামলা অত্যাসন্ন না হলে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ওবামা সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে সৈন্য প্রেরণ করেছেন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই। এর আগে মার্কিন ফৌজদারি আইনে নিষিদ্ধ থাকলেও বুশ প্রশাসন রিমান্ডে নির্যাতন করেছে ও বিনা পরোয়ানায় নাগরিকদের ফোনে আড়ি পেতেছে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিম ফিনারের মতে, ‘সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্টরা কংগ্রেসকে অগ্রাহ্য করে “ইউনিটারি-এক্সিকিউটিভ” (বাংলাদেশি মডেল স্মরণযোগ্য) তত্ত্ব প্রয়োগ করছেন। এই তত্ত্বের উৎস হলো প্রাচীনকালের রাজার ক্ষমতা।’ আশঙ্কা হচ্ছে,
ট্রাম্প সেই ‘সাহসী’ রাজা হওয়ার প্রবণতা দেখাবেন কি দেখাবেন না। ট্রাম্প কী কী বলেছিলেন, তার চেয়ে তিনি কী কী করে দেখাবেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে হচ্ছে, গর্তে পড়লে তা থেকে উঠে দাঁড়ানোর মূল রক্ষাকবচ বাক্স্বাধীনতা, মার্কিন সংবিধান বা তাদের সরকার–ব্যবস্থা নয়। বাক্স্বাধীনতা আছে বলেই ট্রাম্পের পক্ষে একজন সাদ্দাম বা গাদ্দাফি ধরনের লৌহমানব হওয়া সম্ভব নয়। এমনকি মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ বা সিঙ্গাপুরের লি কুয়েনের মতো উন্নয়ন প্রদানকারী একজন কর্তৃত্ববাদী নায়ক হওয়াও কঠিন। যদিও মূলধারার মার্কিন গণমাধ্যমের ভবিষ্যদ্বাণী পরাস্ত হয়েছে। কিন্তু তাদের স্বাধীনতার শক্তি ট্রাম্প অগ্রাহ্য করে চলতে পারবেন না। ট্রাম্প জানবেন যে তিনি আমেরিকার টেকনিক্যাল প্রেসিডেন্ট। তবে মার্কিন সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার এতটা কঠোর ও স্পষ্ট পৃথক্করণ থাকার পরও একজন ট্রাম্পের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ওপর কিছু বিষয় নিশ্চয় নির্ভর করবে। মনে হয় চেনা ট্রাম্পের হঠাৎ অচেনা হয়ে যাওয়াটায় গণমাধ্যমের চাপের ছাপ পরিষ্কার। এর আগে গণমাধ্যমকে শায়েস্তা করার হুমকি ট্রাম্প দিয়েছিলেন। পাঁচ মাস আগেই বলেছেন, তিনি মানহানির আইন ‘শিথিল’ করবেন, যাতে মিডিয়াকে ধরা সহজ হয়। তাঁর সমালোচক ও বিক্ষোভকারীদের প্রতি রূঢ় হওয়ার মনোভাবও তিনি লুকিয়ে রাখেননি। তবে নিজেকে রক্ষায় কালাকানুন আরোপ করা, মানহানিকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে সমালোচকদের স্তব্ধ করতে গিয়ে তিনি নিজের হাত পোড়াবেন কি না, দেখার বিষয়। নির্বাচনের পর গোটা আমেরিকা প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ চলমান রয়েছে। শয়ে শয়ে স্কুলছাত্রও রাজপথে এসেছে।
কিন্তু ট্রাম্প তাঁর প্রথম নির্বোচনোত্তর ভাষণের মতোই উদার থাকবেন, সেটা আমরা দেখতে চাইব। আগামী ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরদিন ১০ লাখ নারীর রাজধানীতে বিক্ষোভ দেখানোর পরিকল্পনার খবর দিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে ইংল্যান্ডের ও মার্কিন নারীরা ভোটাধিকার পেয়েছিলেন। ইংল্যান্ড ৩৭ বছর আগেই মার্গারেট থ্যাচারকে প্রধানমন্ত্রী করতে পারল। বার্নি স্যান্ডার্স বা অন্য কোনো পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলে ট্রাম্প এ ধরনের অভাবনীয় উগ্র নির্বাচনী কৌশল নিতেন কি না সন্দেহ। নারী সম্পর্কে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের আবির্ভাব-পূর্ব আরব সমাজের অন্ধকার যুগকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কেউ অবশ্য অবাক না হয়ে বলেন, এটা আমেরিকার পুঁজিবাদের অনুষঙ্গ। তবু গত ৯ অক্টোবর বোমার মতো ফাটল ট্রাম্পের অশালীন টেপ। ওই রাতেই দুজন মার্কিন অধ্যাপকের সঙ্গে ই-মেইল বার্তা চালাচালি করি। নারী অধ্যাপক অ্যালিস ইগলি বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, তাঁর প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনার মৃত্যু হলো। নারী সম্পর্কে তাঁর মনোভাব পঞ্চাশের দশকের, কিন্তু জবরদস্তি যৌনতা আমেরিকার ইতিহাসে কখনো গ্রহণযোগ্য ছিল না।’ দুজন অধ্যাপকই ঘোরতরভাবে ট্রাম্পবিরোধী। অথচ তাঁরা ট্রাম্পের ওই মানহানিকর উক্তিকে শাস্তিযোগ্য বলে মানতে চাননি। এটা তাঁর বাক্স্বাধীনতার অংশ। নারীর প্রতি তাঁর উক্তিগুলো কি অভিশংসনযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়ে? আমার প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক অ্যালিসের মন্তব্য ছিল: প্রেসিডেন্ট পদে থেকে যদি তিনি জবরদস্তি যৌনকর্মে (ধর্ষণে) লিপ্ত হতেন, তাহলে তা ইমপিচেবল অফেন্স হতো। শুধু মন্তব্য শাস্তিযোগ্য নয়। তিনি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ‘অফেনসিভ স্পিচ’-বিষয়ক রায়ের প্রতি আমার নজর কাড়লেন। এসব রায়ের সারকথা হলো, কোনো মন্তব্যের কারণে বিপদের সৃষ্টির আশঙ্কা হতে হবে বাস্তব, অত্যাসন্ন। ‘ইমিডিয়েট ডেঞ্জার’ থাকতে হবে। ওই সব রায়ের সারকথা হলো, মানহানি বা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কোনো উসকানি ধরনের কোনো মন্তব্য শাস্তিযোগ্য নয়, যদি না তা ল অ্যান্ড অর্ডারকে তাৎক্ষণিকভাবে বিপন্ন বা সংকটাপন্ন করে তোলে। শুধু কল্পনাশক্তির ওপর নির্ভর করে কোনো অপরাধ সংঘিটত হয় না। অ্যালিস বললেন, ‘আমরা তাঁর সমালোচনা করছি। কিন্তু কেউ এ জন্য তাঁর শাস্তির দাবি করিনি।’ একই মত দিলেন অধ্যাপক ড্যান পি ম্যাক অ্যাডামস। অ্যাডামস অবশ্য বললেন, ইমপিচেবল অফেন্স কী, সেটা কংগ্রেসই ঠিক করে থাকে। কংগ্রেস অভিশংসনের নালিশ আনে। বিচার করে সিনেট। কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণে দরকার ২১৮ আসন, রিপাবলিকানদের আছে ২৩৮টি। ডেমোক্র্যাটরা ১৯৩। সিনেটে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র। ৫১ জন রিপাবলিকান। আর ডেমোক্র্যাটরা ৪৮ জন। ট্রাম্প মনোনীত বিচারপতিরা হয়তো উতরে যাবেন সুপ্রিম কোর্টে। তাই সবই তো ট্রাম্পের! প্রেসিডেন্টের পদসহ কংগ্রেস ও সিনেট একটি দলের দখলে যে যেতে পারে, সেটা মার্কিন সংবিধান প্রণেতারা কল্পনা করেছিলেন। সেটা ভেবে তাঁরা রক্ষাকবচ তৈরি করেছিলেন। নিউজউইক–এ একজন কট্টর রিপাবলিকান সমর্থক, যিনি লিখেছেন, ক্ষমতার ভারসাম্যই ট্রাম্পকে রুখে দেবে। অহেতুক আতঙ্ক ছড়ানোর কোনো মানে নেই।
এই ভদ্রলোক ট্রাম্প বা হিলারি কাউকে ভোট দেননি বলে জানিয়েছেন। অবশ্য আমি বিশ্বাস করি, মার্কিন নির্বাচন ও শাসনব্যবস্থায় বিরাট পরিবর্তন আনা দরকার। ট্রাম্প অন্তত তৃতীয় বিশ্বের স্বৈরশাসক হতে পারবেন না। কারণ, মার্কিন সাংবিধানিক ব্যবস্থা এমন করেই সাজানো, যাতে কোনো ব্যক্তিরই রাজার হালে দেশ চালানোর সুযোগ নেই। আমরা মনে রাখব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমাদের দল নিরোধকের মতো কোনো ৭০ অনুচ্ছেদ নেই। ট্রাম্পের দলের লোকেরা ইস্যুভিত্তিক বিদ্রোহ করবেন, কিন্তু তা বিশৃঙ্খলা বলে গণ্য হবে না। ভিন্নমতের জন্য ট্রাম্প তাঁদের কারাগারে নিক্ষেপ করবেন কি না, সেটা দেখার বিষয়। তবে মার্কিন ব্যবস্থা কাউকেই নিরঙ্কুশ অবতার হতে দেয় না। জন ম্যাককেইন একজন প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প-ম্যাককেইনের বাদানুবাদে মনে হচ্ছিল, তাঁরা দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। ম্যাককেইন এর আগে রিপাবলিকান মনোনীত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন, ট্রাম্পের জয়ী হওয়ার পর তিনি দুই ছত্রে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ট্রাম্পকে যাঁরা ভেতর থেকে আটকাবেন, সিনেটে আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান ম্যাককেইন হবেন তাঁদের অন্যতম। ইলিনয়ের নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই দুই জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক মনস্তত্ত্ব বিভাগের। আমাকে লেখা ই-মেইলে অধ্যাপক অ্যাডামস জানিয়েছেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে এটা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয় যে মি. ট্রাম্প নিজেকে শুধরে চলতে পারবেন। অধ্যাপক অ্যাডামসের সতর্ক মন্তব্য আমরা মনে রাখব: ‘আমি সন্দেহ করি যে মি. ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট হন, তাহলে ইমপিচমেন্ট প্রসিডিংস পথের ধারে কোথাও তাঁর জন্য ওত পেতে থাকতে পারে। তিনি এতটাই বিস্ফোরক ও দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত একজন মানুষ যে তাঁর পক্ষে কংগ্রেস, এমনকি নিজের দলের সাংসদদের সঙ্গে বিরাট কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

অব্যাহত মমতা–ঝড়

মমতা ব্যানার্জি
পশ্চিমবঙ্গজুড়ে মমতা-ঝড় বয়েই চলেছে। এই ঝড়ের প্রধান ঝাপটা এখন পড়ছে কংগ্রেসের ওপর। কংগ্রেসের সাজানো বাগান তছনছ করে দিচ্ছে এই ঝড়। বাদ যায়নি বাম দলও। তবে তাদের দিকে এই ঝড়ের ঝাপটা কিছুটা কম লেগেছে। গত ২৭ মে দ্বিতীয় দফায় পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় আসেন মমতা। হন মুখ্যমন্ত্রী। ক্ষমতায় আসার পর মমতার দুই সেনাপতি রাজ্য-মন্ত্রী বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী আর সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে কংগ্রেসের শেষ ঠিকানাটুকু মুছে দেওয়ার জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামেন। কজন মন্ত্রীও ঘোষণা দেন এই রাজ্যপাট থেকে মুছে দিতে হবে বিরোধী দলের অস্তিত্ব। প্রথম টার্গেট করে মুর্শিদাবাদ জেলাকে। মুর্শিদাবাদ এই রাজ্যে কংগ্রেসের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। এখানের নেতাও দোর্দণ্ড প্রতাপের।
অধীর চৌধুরী। অধীর চৌধুরী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতিও। সাংসদ। ছিলেন কংগ্রেস আমলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যখন মমতা-ঝড়ে তছনছ হচ্ছিল বিরোধীরা, তখনো মুর্শিদাবাদকে নোয়াতে পারেননি মমতা। মুর্শিদাবাদ কংগ্রেসের ঘাঁটি হিসেবেই অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। এ বছরের এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠিত ফের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে ২১১টি জিতলেও অস্তিত্ব মুছে দিতে পারেনি কংগ্রেসের। কংগ্রেসই পৌঁছেছিল দ্বিতীয় স্থানে। পেয়েছিল ৪৪টি আসন। আর তৃতীয় স্থান পায় বাম দলেরা। তাদের ভাগ্যে জোটে ৩২টি আসন। ফলে বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতার আসনটি পায় কংগ্রেস। নেতা হন কংগ্রেসের আবদুল মান্নান। মমতার এই বিপুল বিজয়ের পর সংবিৎ ফিরে পান মমতা নিজেই। আর তো এই রাজ্যে কংগ্রেসের অস্তিত্ব রাখা যাবে না? কংগ্রেসকে করতে হবে সাইনবোর্ডের দল। ডাক পড়ে দুই নেতা শুভেন্দু অধিকারী আর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। অভিষেক মমতার ভাইয়ের ছেলে। মাঠে নেমে পড়েন দুজন। যেকোনো মূল্যে মুছে দিতে হবে এই রাজ্যের কংগ্রেসের অস্তিত্বকে। সেই সঙ্গে বাম দলেরও। ব্যস, যেই কথা সেই কাজ। মমতার এই দুই বিশ্বস্ত সৈনিক শুরু করেন মুর্শিদাবাদ থেকে কংগ্রেসকে মুছে দেওয়ার কাজ। কংগ্রেসের নেতা আবদুল মান্নান বলেছেন, অর্থ আর পুলিশি ভয় দিয়ে একে একে দখল করা হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার পৌরসভাগুলো। সুস্থ গণতন্ত্রে এটা চলতে পারে না। কংগ্রেস–শাসিত সাতটি পৌরসভারই দখল নেয় তারা। ভাবা যায়, যুগ যুগ ধরে যে কংগ্রেস মুর্শিদাবাদের মাটির সঙ্গে মিশে ছিল, তা শুভেন্দু আর অভিষেকের কেরামতিতে বদলে যায়! মমতা দখল করেন শুধু সাতটি পৌরসভা নয়, মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদও।
নতুন করে পতাকা ওঠে তৃণমূলের। বলা বাহুল্য, ২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিজয়ী হলেও মুর্শিদাবাদের দখল নিতে পারেনি। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস মুর্শিদাবাদের ২২টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৪টি জিতে তাদের দলীয় অবস্থানকে অক্ষত রেখেছিল। তৃণমূল পেয়েছিল ৪টি আর বাম দলও পেয়েছিল ৪টি আসন। শুধু মুর্শিদাবাদই নয়, আরও বেশ কয়েকটি পৌরসভা এবং গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতির দখল নিয়েছেন তাঁরা। সব থেকে ব্যতিক্রম ঘটেছে দার্জিলিংয়ে। দার্জিলিং গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার দখলে রয়েছে। নেতা হলেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার প্রধান বিমল গুরুং। মমতা প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসে দার্জিলিংয়ে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্যের আন্দোলনকে স্তব্ধ করে সেখানে বিমল গুরুংয়ের নেতৃত্বে গড়েছিলেন জিটিএ বা গোর্খা টেরিটরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। সেই জিটিএতেও ভাগ বসিয়েছেন মমতা। জিটিএর দ্বিতীয় ক্ষমতাধর নেতাকে নিজের দলে টেনে নিতে সমর্থ হয়েছেন মমতা। এমনকি গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরির বোনকেও নিজের দলে নিতে পেরেছেন তিনি। তাই দার্জিলিংয়ে তৃণমূলের পতাকা তুলতে সমর্থ হয়েছেন মমতা। আর শিলিগুড়ি? শিলিগুড়ি পৌর করপোরেশনই পশ্চিমবঙ্গের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে, যেখানে ক্ষমতায় রয়েছে বাম দল। মেয়র বাম নেতা ও সাবেক রাজ্যমন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য। শিলিগুড়ি করপোরেশনও দখল নেওয়ার জন্য মমতা মাঠে নেমেছেন। এখানের সৈনিক করেছেন তৃণমূল নেতা ও সাবেক মেয়র গৌতম দেবকে। গৌতম দেবও মমতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শিলিগুড়ির বাম দুর্গকে ভেঙে তছনছ করার জন্য মাঠে নেমেছেন। তাই বলতে হয়, সত্যিই মমতার বৃহস্পতি তুঙ্গে। আর সিঙ্গুর, তার তো কথাই নেই। দীর্ঘ ১০ বছর লড়ে জমি ফেরত পাওয়ার আন্দোলনে জয়ী হয়ে মমতা এখন সিঙ্গুরের টাটার স্থায়ী স্থাপনা ডিনামাইট দিয়ে ভেঙেচুরে সেই জমি কৃষিজমির রূপ দিয়ে জমির মালিকদের ফেরত দেওয়া শুরু করেছেন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। মমতা জয়ী হয়েছেন জমি অধিগ্রহণ মামলায়। এই সিঙ্গুরেই টাটা গোষ্ঠীকে সাবেক বামফ্রন্ট সরকার ২০০৬ সালে টাটার ন্যানো গাড়ির কারখানা গড়ার জন্য ৯৯৭ একর জমি দিয়েছিল কৃষকদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করে।
এতে সায় ছিল না একাংশ জমিদাতার। তাঁদের নিয়েই মমতা আন্দোলনে নেমে দেখিয়ে দেন মমতা যা বলেন, তা-ই করেন। মমতা কথা দিয়েছিলেন সিঙ্গুরের জমি ফেরত দেবেন জমিদাতাদের। এবার দিয়েছেন। কিন্তু সবকিছুর পর একটি কথা থেকে যায়। মমতা এবং তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা যেভাবে বিরোধী দলকে ভাঙার খেলায় মেতেছেন, রাজ্যপাট থেকে বিরোধী দলের অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার লড়াইয়ে ব্রতী হয়েছেন, তা কি সত্যি সুস্থ গণতন্ত্রের পক্ষে ইতিবাচক? যদিও মমতা ইতিমধ্যে কংগ্রেস ও বাম দলের অন্তত পাঁচজন বিধায়ককে তাঁদের দলে টেনে নিতে সমর্থ হয়েছেন। এ নিয়ে মমতার বিধানসভায় সদস্যসংখ্যা বেড়ে ২১৬ হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মমতার লক্ষ্য এবার বিধানসভার ২৯৪টি আসনই দখল করা। বিধানসভাকে বিরোধীশূন্য করা। এটা কি পারবেন মমতা তাঁর শক্তি এবং ক্ষমতা দিয়ে? কারণ, বাম দলও ৩৪ বছর শাসন করে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি। বাম বিরোধী জনজোয়ারে ২০১১ সালে হারিয়ে গিয়েছিল তারা। মমতার ভাগ্যে ভবিষ্যতে সেই ফলাফলই কি অপেক্ষা করছে? কারণ, রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে নেই। ঘটেও যেতে পারে এমন ঘটনা। কারণ, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বিরোধী দলের চেয়ে মাত্র ৩০ লাখ বেশি ভোটে জিতেছিলেন। তবে আসন পেয়েছিলেন বেশি। তাই ফের এই রাজ্যে মমতাবিরোধী ঝড় উঠলে এবং মমতার সাজানো বাগান তছনছ হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে সেই ঝড়কে সামাল দিতে মাঠে তৈরি রয়েছে মমতার বাহিনী।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।