Thursday, September 17, 2009

মৃত্যু পরাজিত হবে, জয়ী হবে শিবলী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আঠারোতম ব্যাচের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মোহাম্মদ শিবলী আমাদের কারও বন্ধু, কারও স্নেহভাজন ছোট ভাই, কারও ছাত্র। পরিবেশ অধিদপ্তরের চাকরিগত কারণে স্ত্রী ও এক বছর বয়সী একমাত্র সন্তানটিকে ঢাকায় রেখে বেশির ভাগ সময় সিলেটেই অবস্থান করত। ১০ সেপ্টেম্বর কর্মস্থল থেকে ঢাকায় ফেরার পথে হবিগঞ্জের কাছে একটি বাসের সঙ্গে শিবলীকে বহনকারী গাড়িটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। তার পর থেকে আজ অবধি জ্ঞান ফেরেনি ওর।
মৃত্যু পরাজিত হবে, জয়ী হবে শিবলী—এখনও এ আশা আছে আমাদের। শিবলী ডিপ কোমায় আছে গত বৃহস্পতিবার থেকে। চিকিত্সকেরা বলেছেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ যেহেতু বন্ধ হয়েছে, নলের মাধ্যমে খাবার যখন দেওয়া গেছে, তখন সব আশা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। স্কয়ার হাসপাতালে কাচঘেরা নির্জন কক্ষে প্রাণচঞ্চল শিবলী লাইফ সাপোর্ট নিয়ে শুয়ে আছে, এই দৃশ্য মানা যায় না, ভাবাও কঠিন; তার পরও আশা নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আর তো কোনো বিকল্প নেই।
আমরা যারা শিবলীকে অনেক দিন থেকে চিনি, কাছ থেকে যারা দেখেছি ওকে, তারা জানি কী প্রচণ্ড প্রাণশক্তির অধিকারী এই মানুষটি! হাজার ব্যস্ততার মধ্যেও মুখে ওর হাসি থাকত সারাক্ষণই—যখন ছাত্র ছিল তখনো, পরিণত বয়সেও। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে যে যখনই সিলেটে গেছে, ঘুরতেই হোক আর পেশাগত কারণেই হোক, শিবলী তাকে সময় দেয়নি বা তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেনি, এমনটি ঘটেনি কখনো। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ কাজটি করত শিবলী। বন্ধুদের পেলে মেতে উঠত আড্ডায়। নিজ উদ্যোগে খুঁজে বের করত পুরোনো বন্ধুদের। এতটা বন্ধুবত্সল, বন্ধুপাগল ছেলে আমাদের বন্ধুদের মধ্যেও বিরল। আজ সেই বন্ধুরা ভিড় করছে হাসপাতালের বারান্দায়। শিবলী কথা বলছে না। শিবলী অচেতন হয়ে শুয়ে আছে।
সব সময় শিবলী ভেবেছে আমাদের নিয়ে। আজ শিবলী ভাবনাহীন। যেন আর কিছু ভাবার দায় নেই ওর। শিবলীর স্ত্রী কামরুন্নেছা সেলিনার মুখ স্থির। স্কয়ারে ভর্তি করানোর সময় ভালো ট্রিটমেন্টের কথাটাই মাথায় ছিল, খরচের কথা তো মাথায় ছিল না সেলিনার। দিনে ৪২ থেকে ৪৫ হাজার টাকা, ভাবা যায়! আমাদের অনেকের মতো শিবলীর পরিবারের পক্ষেও এই ব্যয় নির্বাহ করা শুধু কঠিন নয়, অসম্ভবও। ঠিক এমন একটি সময়ে আমরা কি চুপ করে বসে থাকব? আমরা কি একবার চেষ্টা করে দেখব না—কিছু করা যায় কি না? আমরা যারা শিবলীর বন্ধু কিংবা আমাদের বন্ধু যারা—সবাই মিলে একটু উদ্যোগী হলে তো অন্তত চিকিত্সাটা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো যায়।
এমনই এক দুর্ভাগা দেশের মানুষ আমরা, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে স্বাভাবিক ঘটনার মতো। আমরা কি চাই আমাদের বন্ধু শিবলী বিনা চিকিত্সায় মারা যাক?
ব্যস্ত সময়ে দূর-দূরান্তে থাকা অনেক বন্ধুর পক্ষেই হয়তো হাসপাতালে এসে শিবলীকে দেখে যাওয়া সম্ভব হবে না। তা এই মুহূর্তে অতটা জরুরিও নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা। আমরা জানি, শিবলীর সংকটাপন্ন অবস্থার কথা জানামাত্র দেশ-বিদেশে থাকা আমাদের বন্ধুরা ওর দ্রুত আরোগ্য কামনায় অস্থির হয়ে উঠবে। সহযোগিতার হাত যে বাড়াবে তাতে কোনো সংশয় নেই।
অর্থ পাঠানোর সুবিধার জন্য শিবলীর স্ত্রী কামরুন্নেছা সেলিনার দুটো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে দেওয়া হলো: ১৩০ ১০১ ৪৫৭১৪, সুইফট কোড: dbbl bddh, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড, জয়পাড়া শাখা, দোহার, ঢাকা এবং ২৮৯৬/৫, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, ধানমন্ডি, সাতমসজিদ রোড শাখা।
শিবলী ও সেলিনার একমাত্র সন্তান বাবাই। যেদিন মেয়েটার বয়স এক বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ঠিক তার আগের দিনই ঘটল এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বাবাই সারা দিন পথ চেয়ে ছিল বাবা আসবে বলে; আসেনি। আজ শুধু এইটুকু চাওয়া—মৃত্যু পরাজিত হোক, আবার শিবলীর কোলে উঠে হাসুক বাবাই; আবারও পূর্ণ উদ্যমে ও ঝাঁপিয়ে পড়ুক ওর কাজ নিয়ে।
লেখকেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।

ক্ষমতাসীন দলের অক্ষমতা by আব্দুল কাইয়ুম

ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাদের টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির প্রতিটি ঘটনা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তারা বোধ হয় ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নিতে চায় না। সবাই জানে, ক্ষমতাসীনেরা লুটপাট করলে কী করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়। বিগত বিএনপি সরকারের আমলে লুটপাটে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে। এ রকম কথা প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিভিন্ন সময় বলেছেন। মানুষের সেই আস্থার প্রতি মর্যাদা না দিলে অবস্থা যে কী হবে তা বোঝার ক্ষমতা অন্তত এসব ছাত্রনেতার থাকা উচিত।
মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে ৩১ আগস্ট ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতা-কর্মীদের টেন্ডারবাজির ব্যাপারে তাঁর মনোবেদনার কথা বলে তাদের আদর্শ মেনে রাজনীতি করার পরামর্শ দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কথায় কান দেওয়ার মতো সময়, ধৈর্য ও মনোবৃত্তি হয়তো তাদের নেই। না হলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলছে কীভাবে? প্রধানমন্ত্রী ভালো ভালো কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু শুনবে কে?
কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী সচিবদের নির্ভয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পরে কোনো সমস্যা হলে দায়িত্ব তিনি নিজে নেবেন, সচিবেরা থাকবেন দায়মুক্ত। এখন সময় এসেছে বলার যে, কোথাও ছিনতাই, চাঁদাবাজি বা টেন্ডারবাজিতে সরকারদলীয় লোকজন জড়িত থাকলে থানা-পুলিশ যেন নির্ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়; এ জন্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে হয়রানির শিকার হতে হবে না। সাধারণত ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ভয় পায়। কারণ, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কিছু করতে গেলে তাঁদের কোনো দুর্গম অঞ্চলে বদলি করে দেওয়া হয়। স্থানীয় সাংসদ বা দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাঁদের নানাভাবে হয়রানি করেন। তাই গা বাঁচিয়ে চলতেই তাঁরা অভ্যস্ত।
এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য পুলিশকে নির্ভয়ে কাজের পরিবেশ দিতে হবে। শুধু কথায় নয়, বাস্তবেও দেখাতে হবে। পত্রপত্রিকায় তো প্রায় প্রতিদিনই দলীয় লোকজনের টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজির খবর নামধামসহ বেরোচ্ছে। সুতরাং পুলিশের কাজের পথ প্রশস্ত করে দিচ্ছে পত্রিকা। তার ভিত্তিতে তদন্ত করে যদি সুস্পষ্ট অভিযোগে কোনো দলীয় নেতা-কর্মীর ব্যাপারে পুলিশ উপযুক্ত ধারায় মামলা করে, তাহলে অন্তত টেন্ডারবাজির জন্য তাকে কারাগারে ঢোকানো সম্ভব। একবার কারারুদ্ধ হলে মামলার জটিল প্রক্রিয়ায় জামিন পেতে মাস ছয়েক লাগবে। এ রকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে দলীয় লোকজনের উপদ্রব অনেকাংশে কমে যাবে বলে আশা করা যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, নিজ দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দিতে প্রধানমন্ত্রী কতটা প্রস্তুত। দল এমন একটা যন্ত্র যা ক্ষমতায় গেলে দানবীয় রূপ ধারণ করে। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের সে দশাই হয়। এ অবস্থায় বিভিন্ন মহল বঙ্গবন্ধুকে কঠোর হওয়ার জন্য বলতে থাকল। তিনি কঠোর হলেন। ১৯৭৪ সালে সরকার চোরাচালান ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার দৃঢ় পদক্ষেপ নিল। সেনা নিয়োগ করা হলো। দেখা গেল, বেশ কিছু স্থানে দলীয় লোকজন টপাটপ ধরা পড়ছে। তখন দল থেকে অভিযোগ আসতে থাকল যে আওয়ামী লীগকে হেয় করার জন্য মিথ্যা অভিযোগে দলীয় নেতা-কর্মীদের ধরপাকড় ও হয়রানি করা হচ্ছে। বাধার মুখে একসময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু সে সময় দৃঢ়তার সঙ্গে নীতিগত অবস্থান ধরে রাখা হলে সেটা এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হতে পারত। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী কোনো দল যে নিজেদের লোকজনের অন্যায়-দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অভিযান চালাতে পারে, সে রকম অদ্বিতীয় উদাহরণ স্থাপন করা সম্ভব হতো। আর সে পথে রচিত হতে পারত অন্য রকম ইতিহাস।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিষ্কার বলেছেন, ‘আমি যখন পত্রিকায় পড়ি ছাত্রলীগের ছেলেরা চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি করে, তখন আমার কষ্ট লাগে।’ (প্রথম আলো, ১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯) কিন্তু এরপর তিনি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আর নিচ্ছেন না। বরং ছাত্রলীগের ছেলেরা পত্রিকায় যেন খবর না বেরোয় সে ব্যবস্থা করতে তত্পর হয়ে উঠেছে। চুয়াডাঙ্গা, যশোর, গলাচিপাসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মীরা তাদের নানা অপকীর্তির খবর পত্রিকায় প্রকাশের কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিকদের ওপর হামলা করছে, পরিবার-পরিজনকে হয়রানি করছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী নীরব। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও চুপ। দল ও সরকারের ওপর মহলের নির্লিপ্ত মনোভাবের কারণে সাংবাদিকদের এভাবে হয়রানি করা সম্ভব হচ্ছে।
অবশ্য সরকারি দলের নেতারা সম্প্রতি দু-একটি ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। রাজধানীর কল্যাণপুর খালের ওপর ছাত্রলীগ তাদের ওয়ার্ড কার্যালয় বানালে খবরটি পত্রিকায় আসে। এরপর সম্প্রতি স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে ছাত্রলীগের নেতারা সেটি ভেঙে ফেলে। খালটি আপাতত দখলমুক্ত হয়। পটুয়াখালীতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির বিষয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভায় আওয়ামী লীগের দুই নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এসব ঘটনা কালো মেঘের রুপালি পাড়ের মতো ক্ষণস্থায়ী কি না তা দেখার বিষয়।
বিপুল ভোটে নির্বাচিত একটি দল ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র সাড়ে আট মাসের মাথায় যে এমন বিতর্কিত অবস্থানে চলে যেতে পারে, এটা সত্যিই দুঃখজনক। সব সময় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের চারপাশে একশ্রেণীর চাটুকার ভিড় জমায়। তারা নেতৃত্বকে নানা কথা বলে ভুল বোঝায় এবং ক্ষমতাকেন্দ্রের চারপাশে দুর্ভেদ্য বলয় সৃষ্টি করে মূল নেতৃত্বকে পারিপার্শ্বিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই চাটুকারদের নানা দুরভিসন্ধি থাকে। মুখে সাধু, কাজে চক্রান্তকারী। এটা আগেও দেখা গেছে। আওয়ামী লীগের বিগত সরকারের সময় যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর চারপাশ ঘিরে ছিলেন, যাঁদের কথায় প্রধানমন্ত্রী বেশি গুরুত্ব দিতেন, তাঁদের বেশির ভাগই আজ আর প্রধানমন্ত্রীর পাশে নেই। দেখা গেছে, ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাঁদের বেশির ভাগ সেই যে দেশ ছেড়েছেন, সাত বছরে তাঁদের মুখ আর দেখা যায়নি। সে সময় আওয়ামী লীগের ভরাডুবির জন্য তাঁদের দুর্নীতি ও লুটপাটের নানা অভিযোগ অনেকাংশে দায়ী ছিল। অনেক দেরিতে প্রধানমন্ত্রী সেটা বুঝেছেন। আজ তাঁদের অনেকে ক্ষমতাবলয়ের বাইরে।
প্রধানমন্ত্রী কি অতীতের এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করছেন? তাঁর চারপাশে কারা ভিড় জমাচ্ছে, সে সম্পর্কে সতর্ক হওয়ার এখনই সময়। একবার কপট সমর্থকদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়লে অনেক ক্ষমতাধর নেতাও নিজের অজান্তেই ক্ষমতাবঞ্চিত হয়ে পড়েন। এভাবেই ক্ষমতাসীনরা অক্ষমতার চোরাবালিতে আটকে যান। আওয়ামী লীগ আজ যেন সে পথেই চলছে। সাম্প্রতিক অতীতে আমরা বিএনপিকেও একই দশায় পড়তে দেখেছি। বিএনপির সরকারের আমলে ২০০৫-০৬ সালে দলের সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে ঘরোয়া আলোচনায় হাওয়া ভবনের নেতিবাচক ভূমিকার সমালোচনা করতে শুনেছি। কিন্তু তাঁরা কখনো সেসব কথা তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলতে পারতেন না। তাঁরা শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের কাছে অনুযোগ করার সুযোগই পেতেন না। তাঁদের উচ্চমহলে ঘেঁষতে দেওয়া হতো না, সেখানেও সেই চাটুকারদের প্রভাববলয়। এর পরিণাম যে শুভ হয়নি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিগত বিএনপির সরকারের শেষ দিকে দুর্নীতি ও লুটপাটে মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। ২০০৬ সালের জুন মাসে আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির একজন নেতা আমাকে বলেন, মানুষ এত উত্তেজিত যে সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে লোকজন হাওয়া ভবনের প্রতিটি ইট খুলে নেবে। তাঁর কথায় মনে পড়ল ১৯৮৭ সালের কথা। তখন এরশাদ ক্ষমতায়। সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন চলছে। ২২ জুলাই থেকে শুরু হয় বিরোধী জোট ও দলের ৫৪ ঘণ্টার হরতাল। তখন ৭২ ঘণ্টার হরতালও হতো। সে রকম এক উত্তাল হরতালের দিনে বিক্ষুব্ধ জনতা জাতীয় পার্টি ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর অফিস মতিঝিলের আল্লাহওয়ালা ভবনে অভিযান চালায়। তারা চারতলা ভবনের সব আসবাবপত্র রাস্তায় ফেলে আগুন দেয়। পরে ভবনটি জ্বালিয়ে দেয়। পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। অফিসের ভেতরে যে কয়জন কর্মী ছিল, তারা প্রাণভয়ে এদিক-ওদিক পালিয়ে বাঁচে। হাওয়া ভবনেরও সেই দশা হবে, এটাই ছিল ওই আওয়ামী লীগ নেতার ধারণা। এরপর সে বছর অক্টোবরে হাওয়া ভবন আক্রান্ত না হলেও যা হয়েছে তা কোনো অংশে কম নয়। বিএনপিরই নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে বিএনপিকে তছনছ করে দেয়। আওয়ামী লীগের অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধেও চলে নানা অভিযান।
সাম্প্রতিক অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের সব সময় স্মরণ করা উচিত। ক্ষমতাসীন দলের অক্ষমতা যেন সেই কঠিন দিনগুলোয় ফিরে যেতে বাধ্য না করে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।

মামলা দিয়ে কণ্ঠরোধ করা যায় না -আবার গলাচিপা

গলাচিপা বাংলাদেশের আর দশটি উপজেলার মতো একটি উপজেলা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক অঘটনের পরিপ্রেক্ষিতে গলাচিপার নাম এখন সারা দেশের মানুষের মুখে মুখে। মামলা দিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানির পর গলাচিপা আবার আলোচনায় এসেছে এক ‘শ্যালক’-এর কল্যাণে। পটুয়াখালী-৩ আসনের সাংসদ গোলাম মাওলার শ্যালক মকবুল খান এলাকায় ‘স্বরাজ’ কায়েম করেছেন। মকবুল খান ও তাঁর সহযোগীরা সরকারি গাছ কাটতে গেলে বাধা দেওয়ায় উপজেলার ডাকুয়া ইউপি চেয়ারম্যান নেছারউদ্দিন গাজীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের অভিযোগে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার শাস্তি যদি হয় মামলা, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে!
সাংসদের আশকারা না পেলে তাঁর শ্যালকের পক্ষে কোনোভাবেই অন্যায় করে বেড়ানো সম্ভব নয়। এর দায় মাননীয় সাংসদ কিছুতেই এড়াতে পারেন না। এ ধরনের ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে বড় ধরনের নেতিবাচক ভূমিকা রাখবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিছুদিন আগে গলাচিপায় স্থানীয় সাংবাদিকদের হয়রানি করতে একাধিক কল্পিত মামলা দেওয়ার ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের হুমকি-ধমকি এখনো অব্যাহত রয়েছে। কিছু সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিও নিজেদের আখের গোছানোর স্বার্থে এসব অপতত্পরতার সঙ্গী হয়েছেন।
সরকার মুখে বলবে তথ্য অধিকার ও সুশাসনের কথা, আর কর্মীরা লুটপাট ও নির্যাতনে ব্যস্ত থাকবে, তা চলতে পারে না। সরকারের এই দ্বৈতনীতি সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখছে না। সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার বলছেন দিনবদলের কথা; কিন্তু মাঠপর্যায়ে যা হচ্ছে তা কোনো অর্থেই ‘দিনবদল’ নয়, ‘হাতবদল’। গলাচিপার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের কর্তব্য।

সংসদীয় কমিটিতে তলব বিতর্ক

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাহী বিভাগকে আইনসভার মাধ্যমে জবাবদিহি করার একটি অন্যতম মাধ্যম হলো সংসদীয় কমিটি-ব্যবস্থা। সংসদীয় কমিটি আইনসভায় উত্থাপিত আইনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে এবং তাদের সুপারিশ পেশ করে। যেহেতু আইনসভা একটি বড় ফোরাম, তাই এর কাজকে সংক্ষিপ্ত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি-ব্যবস্থার এমন ভূমিকার জন্য কমিটিকে ‘মিনি পার্লামেন্ট’ বা ছোট আকারের সংসদ বলা হয়। সংসদীয় কমিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও অনিয়মসংক্রান্ত তদন্ত করা। এ তদন্তের জন্য যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কমিটিতে তলব করতে পারে। এ ধরনের বিধান গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে বিদ্যমান।
যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নীতি বর্তমান আছে। সেখানে কোনো মন্ত্রী সিনেটের সদস্য না হলে তিনি সিনেটের অধিবেশনে যোগদান করতে পারেন না। এ অবস্থায় নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভার মধ্যকার সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে সংসদীয় কমিটিগুলো। কমিটির বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী উপস্থিত থাকেন। সেখানে যেকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এমনকি মন্ত্রীকেও তলব করার ক্ষমতা কমিটিকে দেওয়া হয়েছে। তাই শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগের কাজের সমন্বয়সাধনে কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, ব্রিটেন-ভারতসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশেও সংসদীয় কমিটি নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সংবিধানেও সংসদীয় কমিটি-ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়।
কিন্তু আমরা সব সময় দেখে এসেছি, নির্বাহী বিভাগের ব্যাপক ক্ষমতার কারণে সংসদীয় কমিটি যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে না। তা ছাড়া তাদের বিশেষ কোনো ক্ষমতাও দেওয়া হয়নি। বর্তমান সংসদে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন কমিটি এ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুজন উপদেষ্টা, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যানসহ কমিশনের কয়েকজন কর্মকর্তা, সাবেক স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও চিফ হুইপ এবং ঢাকার মেয়রকে কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হওয়ার জন্য তলব করেছে। কিন্তু বেশির ভাগই কমিটির সামনে উপস্থিত হননি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকেই তলব করা ব্যক্তির সংসদীয় কমিটিতে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতাসংক্রান্ত্র বিধান করার কথা বলেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইন প্রণয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে কমিটিকে যেন পুলিশি ও বিচারিক ক্ষমতা না দেওয়া হয়। সামান্য কিছু নীতিগত মতানৈক্য থাকলেও এ ব্যাপারে সবাই একমত যে সংবিধানে বর্ণিত বিধানটি কার্যকর করার জন্য একটি আইন প্রণয়ন করা অবশ্যই প্রয়োজন। এ ধরনের একটি আইন প্রণয়ন করা হলে শক্তিশালী কমিটি-ব্যবস্থা প্রবর্তনে তা হবে একটি মাইলফলক, যা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিতকে শক্তিশালী করবে।
খাদেমুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বিনিয়োগে হতাশ ব্যবসায়ীরা

২ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় শিশির ভট্টাচার্যের একটি কার্টুন ছাপা হয়। কার্টুন দেখানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা নিয়ে নতজানু অবস্থায় বসে আছে। আর সেই টাকা ছাগলে খাচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে আছে। ওই কার্টুনটি আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রতীকী রূপ।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবায়ক সরকারের দুই বছরে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলাকালে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং বিনিয়োগ থেকে দূরে থাকেন।
আশা ছিল, বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিনিয়োগে প্রতিকূলতা দূর করে অনকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে। কিন্তু টেন্ডারবাজি, দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, সর্বোপরি বিদ্যুত্ ও গ্যাস-সংকট বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর (যেগুলো নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে) অন্যতম ছিল ‘প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে সরকারি চাকরি দেওয়ার।’ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ মন্দা ও বিদ্যমান কলকারখানা বন্ধ হওয়ায় ফলে বা হলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মসংস্থানের কী হবে, তা সরকার ভেবে দেখেছে কি? তাই বর্তমান সরকারের কাছে অনুরোধ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো মাথায় রেখে যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুত্ ও গ্যাস-সংকট নিরসন করুন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করুন, যাতে এ দেশের লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মনে রাখতে হবে, প্রত্যেকটি সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ভর করে দেশের অর্থনীতির ওপর। অর্থনীতিকে যারা চাঙা করে রাখেন, সেই বিনিয়োগকারীদের যদি বিনিয়োগের পরিবেশ দিতে সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। সন্দেহাতীতভাবে কথাটি সত্য।
নূরুল ইসলাম, তেজগাঁও, ঢাকা।

রোজার কাজা-কাফ্ফারা ও ফিদ্ইয়া by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

রমজান মাসে যাঁরা পীড়িত, অতিবৃদ্ধ, যাঁদের অত্যধিক দৈহিক দুর্বলতার কারণে সিয়াম পালন করা খুব কষ্টদায়ক হয়ে যায়, যাঁরা সফরে থাকার কারণে মাহে রমজানে সিয়াম পালন করতে পারেন না, তাঁদের জন্য রোজার কাজা, কাফ্ফারা, ফিদ্ইয়া ইত্যাদি বদলা ব্যবস্থা স্থির করে ইসলামি শরিয়তে সুনির্দিষ্ট বিধিব্যবস্থা রয়েছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ পীড়িত হলে বা সফরে থাকলে অন্য সময় সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে। এ (সিয়াম) যাদের অতিশয় কষ্ট দেয়, তাদের কর্তব্য হচ্ছে এর পরিবর্তে ফিদ্ইয়া বা একজন মিসকিনকে অন্নদান করা। যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্ কাজ করে, তবে সেটা তার পক্ষে অধিকতর কল্যাণকর। তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে, তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। আর কেউ পীড়িত থাকলে অথবা সফরে থাকলে অন্য সময় এই সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য যেটা সহজ সেটাই চান এবং যা তোমাদের জন্য ক্লেশকর তা চান না এ জন্য যে, তোমরা সংখ্যা পূরণ করবে।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৮৪-১৮৫)
যেসব কারণে রমজান মাসে রোজা ভঙ্গ করা যায়, তবে পরে কাজা করে নিতে হয়, তা হচ্ছে; ১. মুসাফির অবস্থায়, ২. রোগবৃদ্ধির বেশি আশঙ্কা থাকলে, ৩. গর্ভের সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে, ৪. এমন তৃষ্ণা বা ক্ষুধা হয়, যাতে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকতে পারে, ৫. শক্তিহীন বৃদ্ধ হলে, ৬. কোনো রোজাদারকে সাপে দংশন করলে, ৭. মেয়েদের হায়েজ-নেফাসের সময় রোজা ভঙ্গ করা যায়। আর যেসব কারণ রোজার কাজা ও কাফ্ফারা দুটোই ওয়াজিব হয় তা হলো—জেনেশুনে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করলে রোজা ভেঙে যাবে। এমতাবস্থায় কাজা ও কাফ্ফারা দুটোই ওয়াজিব হয়।
মনে রাখা দরকার, শরিয়তে কঠোর নিষেধ থাকা সত্ত্বেও বিনা কারণে রোজা ভঙ্গ করলে তাঁর ওপর অবশ্যই কাজা-কাফ্ফারা উভয়ই আদায় করা ওয়াজিব। যে কটি রোজা ভঙ্গ হবে, সে কটি রোজা আদায় করতে হবে। কাজা রোজা একটির পরিবর্তে একটি। অর্থাত্ রোজার কাজা হিসেবে শুধু একটি রোজাই যথেষ্ট। কাফ্ফারা আদায় করার তিনটি বিধান রয়েছে—১. একেকটি রোজা ভঙ্গের জন্য একাধারে ৬০টি রোজা রাখতে হবে। কাফ্ফারা ধারাহিকভাবে ৬০টি রোজাই রাখতে হবে, মাঝে কোনো একটি রোজা ভঙ্গ হলে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। ২. যদি কারও জন্য ৬০টি রোজা পালন সম্ভব না হয়, তাহলে সে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা খানা দেবে। অপরদিকে কেউ অসুস্থতাজনিত কারণে রোজা রাখার ক্ষমতা না থাকলে ৬০ জন ফকির, মিসকিন, গরিব বা অসহায়কে প্রতিদিন দুই বেলা করে পেটভরে খানা খাওয়াতে হবে। ৩. গোলাম বা দাসিকে আজাদ বা স্বাধীন করে দিতে হবে।
মাহে রমজানে নেক আমলের ফজিলত যেমন বেশি, তেমনি এ মাসে গুনাহ করলে এর শাস্তিও বেশি। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত রোজা না রাখলে যে কঠিন শাস্তির হুকুম এসেছে, সেই ব্যক্তি ইহকালে তা না পেলেও পরকালে তার শাস্তি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো শরিয়ত অনুমোদিত ওজর ছাড়া মাহে রমজানের একটি রোজাও ছেড়ে দেয়, সে নয় লাখ বছর জাহান্নামের দাউদাউ করে প্রজ্বলিত আগুনে জ্বলতে থাকবে।’
বিনা কারণে যে ব্যক্তি মাহে রমজানের মাত্র একটি রোজা না রাখে এবং পরে যদি ওই রোজার পরিবর্তে সারা বছরও রোজা রাখে, তবু সে ততটুকু সওয়াব পাবে না, যতটুকু মাহে রমজানে ওই একটি রোজার কারণে পেত। এ সম্পর্কে ফিকহিবদদের মতে, দুই মাস একাধারে রোজা রাখলে স্বেচ্ছায় ভাঙা একটি রোজার কাফ্ফারা আদায় হয়, আর এই কাফ্ফারার বিনিময়ে একটি রোজার ফরজের দায়িত্বটাই কেবল আদায় হয়। আর যারা নানা অজুহাতে ও স্বেচ্ছায় পুরো মাহে রমজানের রোজা রাখে না, তাদের শাস্তি কত যে ভয়াবহ হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই এ বিষয়ে প্রত্যেক মুসলমানের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এ সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাহে রমজানের এক দিনে রোজা কোনো (শরিয়ত অনুমোদিত) ওজর বা অসুস্থতা ব্যতীত ভঙ্গ করবে, সারা জীবনের রোজায়ও এর ক্ষতি পূরণ হবে না, যদি সে সারা জীবনও রোজা রাখে।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদ)
ইসলামের অনুসারী দাবি করেও যেসব ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা রাখে না, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোরতর বিধান এসেছে। ইসলামি আইনশাস্ত্র ‘হিদায়া’য় বিভিন্ন ফিকহ্ গ্রন্থের উদ্ধৃতিসহ উল্লেখ আছে যে, ‘যারা মাহে রমজানে কোনো রকম শরিয়ত অনুমোদনসাপেক্ষ ওজর (অর্থাত্ শরিয়ত যাদের সাময়িকভাবে রোজা না রাখার অনুমতি দেয়) ছাড়া প্রকাশ্যভাবে পানাহার করে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া উচিত। অনুরূপভাবে, যারা তাদের এ কাজে সহায়তা করে, তাদেরও একই দণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।’
রোজার ফিদ্ইয়া: রোজা রাখা দুঃসাধ্য হলে একটা রোজার পরিবর্তে একজন দরিদ্রকে অন্নদান করা অবশ্যকর্তব্য। শরিয়ত মোতাবেক রোজা রাখায় সামর্থ্যহীন হলে প্রতিটি রোজার জন্য একটি করে ‘সাদাকাতুল ফিতর’-এর সমপরিমাণ গম বা এর মূল্য গরিবদের দান করাই হলো রোজার ‘ফিদ্ইয়া’ তথা বিনিময় বা মুক্তিপণ। অতিশয় বৃদ্ধ বা গুরুতর রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, যাঁর সুস্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, অথবা রোজা রাখলে জীবনহানির আশঙ্কা থাকে, তিনি রোজার বদলে ফিদ্ইয়া আদায় করবেন। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি যদি সুস্থ হয়ে রোজা রাখার মতো শক্তি ও সাহস পান, তাহলে তাঁকে আগের রোজার কাজা আদায় করতে হবে। তখন আগে আদায়কৃত ফিদ্ইয়া গণ্য হবে সাদকা হিসেবে।
অসুস্থ ব্যক্তি ফিদ্ইয়া বা মুক্তিপণ আদায় না করে মারা গেলে তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে ফিদ্ইয়া আদায় করা কর্তব্য; যদি মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে যান। অন্যথায় আদায় করা মুস্তাহাব। উল্লেখ্য, প্রত্যেক রোজার ফিদ্ইয়া হলো একটি সাদাকাতুল ফিতর, অর্থাত্ এক কেজি ৬৫০ গ্রাম আটা বা এর সমমূল্য দরিদ্র, এতিম বা মিসকিনকে দান করা, অথবা একজন ফকির বা গরিবকে দুই বেলা পেটপুরে খাওয়ানো। অনেক জায়গায় দেখা যায়, গরিব লোক কোনো ধনীর বদলি রোজা পালন করে দিচ্ছে। খেয়াল রাখতে হবে, কোনো অবস্থাতেই একজনের রোজা অন্যজন বদলি হিসেবে পালন করতে পারবে না। কেউ কারও রোজা বদলি হিসেবে রাখলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তা শুদ্ধ হবে না। রোজার ফিদ্ইয়া গুনাহ্মাফির মাধ্যমে মানুষকে নিষ্কলুষ ও নির্ভেজাল করে। রোজাকে আল্লাহ তাআলা মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বান্দার জন্য নির্ধারণ করেছেন। রোজার কাজা, কাফ্ফারা ও ফিদ্ইয়ার মাধ্যমে আল্লাহ পাক বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে সওয়াবের আশায় যে ব্যক্তি রমজানের মাসে রোজা রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার বিগত দিনের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (বুখারি)
একজন মুমিন রোজাদার যদি পরচর্চা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অসাধুতা, দুর্নীতিপরায়ণতা, আত্মকলহ, বিবাদ-বিসংবাদ ইত্যাদি শরিয়তগর্হিত ও অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিহার করে আত্মসংযমী হয় এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়, সহিহ শুদ্ধভাবে রোজা পালন এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দোয়া-ইস্তেগফার—এসব ইবাদতের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করেন, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি পরম করুণাময় আল্লাহর একজন খাঁটি আবেদ বা প্রিয় মকবুল বান্দা হিসেবে গণ্য হবেন। অতএব আমরা যেন সঠিকভাবে রোজার হক আদায়ের মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবনের পরিপূর্ণ সংশোধন এবং কলুষতা ও পাপ-পঙ্কিলতা থেকে নিষ্কৃতি লাভের নিমিত্তে তওবা-ইস্তেগফার করে অশেষ রহমত, বরকত, নিয়ামত, ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে খাঁটি বান্দা হতে পারি, আল্লাহ পাক আমাদের সেই তাওফিক দান করুন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান,। সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়

আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ‘ক্রসফায়ার’-এই কৌশল সরকারের অক্ষমতাকেই তুলে ধরছে

র্যাব ও পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইদানীং ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি বাদ দেওয়া হচ্ছে। সে কারণেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়তো বলছেন যে দেশে ‘ক্রসফায়ার’ বলে কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভিন্ন নামে এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পথকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সরকারের দেওয়া অঙ্গীকার—কোনো কিছুই এখন আর বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে ৬০টি এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ও সায় ছাড়া এটি ঘটছে, এমন ভাবার কারণ নেই। সরকার কেন এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা স্পষ্ট। ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ছাড়া সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। ২০০৪ সালের মার্চ মাসে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ক্রসফায়ারের নামে দেশে যখন এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়, তখন প্রথম দিকে সাধারণ জনগণ এ ধরনের ঘটনায় বেশ কিছু চিহ্নিত সন্ত্রাসী নিহত হওয়ায় স্বস্তি বোধ করেছিল। ২০০৫ সালে প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব আইরিন খান বলেছিলেন, কোনো সমাজে যখন বিচার ছাড়াই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হত্যাকাণ্ড ঘটায় এবং জনগণ তাতে খুশি হয়, তখন বুঝতে হবে যে সেই সমাজে অপরাধকর্ম সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে এবং সরকারের সেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই।
২০০৪ সালে জোট সরকার অপরাধ ও অপরাধী নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে ক্রসফায়ারের যে পথ বেছে নিয়েছিল, ২০০৯ সালে এসে এখন দেখা যাচ্ছে মহাজোট সরকারও সেই একই পথ বেছে নিয়েছে। অর্থাত্ বর্তমান সরকারও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়েছে। আর বিচারবহির্ভূত এ হত্যাকাণ্ড করে যদি সত্যিই অপরাধ ও অপরাধী নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তবে ২০০৪ সালে শুরু হওয়া ক্রসফায়ার এখনো অব্যাহত রাখার প্রয়োজন পড়ত না। এরও আগে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর নামে অপরাধী ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত কিছু লোককে হত্যা করা হয়েছিল। বিনা বিচারে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশ অপরাধীদের দমন করতে পারেনি। ক্ষমতার বাইরে থাকতে ক্রসফায়ারের ব্যাপক সমালোচনা করে এবং ক্রসফায়ার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে বর্তমান সরকার আবার অপরাধ দমনের সেই অকার্যকর ও ভুল পথ বেছে নিয়েছে।
বোঝা যায়, সরকারের কোনো দূরদৃষ্টি নেই। সরকারকে এটা বুঝতে হবে যে ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কখনো অপরাধ দমনের কার্যকর ও বাস্তবসন্মত পথ হতে পারে না। আইনের শাসন কার্যকর আছে— এমন একটি সমাজে অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত না করা গেলে নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকারও নিশ্চিত করা যায় না। সরকার যদি ক্রসফায়ারকে অপরাধ দমনের সহজ পথ মনে করে এই ধারা অব্যাহত রাখে, তবে দেশের ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পুরো বিচারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। দেশে আইনের শাসন কায়েম রাখতে হলে এবং আন্তর্জাতিকভাবে একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসন কায়েম আছে এমন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হলে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টার—যে নামেই হোক, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের কোনো বিকল্প নেই।

মাননীয় ছিনতাইকারীগণ সমীপে আকুল আবেদন -গদ্যকার্টুন by আনিসুল হক

আমার ভক্তিপূর্ণ সালাম ও অভিনন্দন গ্রহণ করুন। খবরের কাগজে পড়িলাম, না পড়িলেও জানিতাম, আপনারা কুশলে আছেন। শুধু কুশলে আছেন তাহা বলিলে কম বলা হয়, আপনাদের এখন পোয়াবারো চলিতেছে। ঢাকা শহরে আপনাদের দৌরাত্ম্য বাড়িয়াছে, কাগজে লিখিয়াছে। খবরের কাগজওয়ালাদের কী ধৃষ্টতা। তাহারা দৌরাত্ম্য শব্দটি ব্যবহার করিল! দৌরাত্ম্য বাড়ে তাহাদের যাহারা দুরাত্মা। আপনারা তো মহাত্মা। আপনাদের বাড়িবে মাহাত্ম্য। খবরের কাগজওয়ালারা ভুল লিখিয়াছে। তাহাদের লেখা উচিত ছিল, ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টির মাহাত্ম্য বাড়িয়াছে।
কেন আপনারা মহাত্মা। কারণ আপনারা বাঁচিয়া রাখিয়াছেন, তাই আমরা এখনো কেহ কেহ বাঁচিয়া আছি। বাঁচিয়া তো নাও রাখিতে পারিতেন! আপনাদের উদ্যত ছুরিকা (ভোঁতা, মরিচাপূর্ণ) আমাদের যেকোনো কাহারও পাঁজর, বক্ষ, উদর এফোঁড় ওফোঁড় করিয়া দিতে পারে যেকোনো সময়, যখন তখন। আপনাদের দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র নির্গত অগ্নিতপ্ত বুলেট যেকোনো করোটি চূর্ণ করিতে পারে, যেকোনো বক্ষ বিদীর্ণ করিতে পারে যত্রতত্র, দিবারাত্র চব্বিশ ঘণ্টার যেকোনো সময়। আপনাদের বিষাক্ত মলম যেকোনো ব্যক্তির চক্ষু অন্ধ করিয়া দিতে পারে চিরকালের জন্যে। আপনাদের বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য যেকোনো কাউকে চেতনাহীন করিয়া পাঠাইয়া দিতে পারে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিস্থলে। ১৮ দিনে মাত্র ৩৭ জনকে আপনারা হাসপাতালে পাঠাইয়াছেন, পাতালে কতজনকে পাঠাইয়াছেন কে জানে, কিন্তু পুরো এক কোটি মানুষের শহরে মাত্র ৩৭ জনকে হাসপাতালে প্রেরণ যে আপনাদের দায়িত্বশীলতা ও মহানুভবতার প্রমাণ, তাহা আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি।
এই শহরটা তো পুরাপুরি আপনাদেরই পদতলগত। এমনও হইয়াছে, একই রাস্তায় দাঁড়াইয়া আপনারা সিরিজ ছিনতাই করিয়াছেন, একটার পর একটা, এক হালি, এক ডজন, এক কুড়ি, যতটা ইচ্ছা। এমনও হইয়াছে, একই ব্যক্তি রাস্তার এক মোড়ে তাহার সর্বস্ব হারাইয়া পরের মোড়ে গিয়া পৌঁছিবা মাত্র আপনাদেরই আরেক দলের হাতে পড়িয়াছে, তাহার পরনের কাপড় ছাড়া দিবার মতো কিছু নাই, আপনারা তাহাও কাড়িয়া লইয়াছেন, তিনি অতঃপর আরও একদল ছিনতাইকারীর কবলে পড়িয়াছেন। দিবার মতো যাহার কিছু নাই, তাহাকে সামনে পাইয়াও যে আপনারা তাহাকে বাঁচাইয়া রাখিয়াছেন, সে আপনাদের মহানুভবতা ছাড়া আর কী! আপনারা চলন্ত বাস হইতে ধাক্কা মারিয়া ছিনতাইয়ের শিকারকে প্রাণে মারিয়াছেন, তেমন ঘটনা তো আরও পাঁচ হাজার ঘটিতে পারিত, তাহা তো ঘটে নাই। বাসও আপনাদের, দিনের বেলায় পুরা বাস দখল করিয়া আপনারা ছিনতাই করিতে পারেন। ট্যাক্সিও আপনাদের, ট্যাক্সিওয়ালা যাত্রী লইয়া আপনাদের আস্তানায় আসিয়াই দাঁড়ায়, আপনারা আয়েশের সঙ্গে তাহাতে উঠিয়া যাত্রীকে ঠাসিয়া ধরেন। আপনারা চলন্ত বাস, ট্রেন, ট্যাক্সি, গাড়ি, রিকশা, স্কুটারের যাত্রীর কানের দুল, গলার চেইন, হাতের ব্যাগ ছোঁ মারিয়া টানিয়া লন, যাত্রীর কান ছিঁড়িয়া যায়, কিন্তু কী মহত্ আপনারা যে মাথাটা আপনারা ছিঁড়িয়া লন না। ধাবন্ত মোটরসাইকেলযোগে আপনারা পথচারী বা রিকশাযাত্রীর ব্যাগ এক থাবায় উড়াইয়া লইয়া যান, যাত্রী যান হইতে পড়িয়া যায়, কি যায় না, তাহা আপনাদের দেখিবার অবকাশ নাই, তবে সকল যাত্রী যে মারাত্মক আহত বা একেবারে নিহত হয় না, তাহা আপনাদের পেশাদারি দক্ষতারই সামান্য প্রকাশ মাত্র। সবচেয়ে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ আপনারা দিয়া থাকেন ব্যাংক হইতে টাকা তুলিয়া যাহারা বাহির হয়, তাহাদের ওপর পরিচালিত অভিযানের ব্যাপারে। গুলি ছুড়িতে হয়। আপনারা দুই-চারিজনকেই মারেন। কিন্তু ব্যাপক গোলাবর্ষণ কিংবা বোমাবাজিতে গণহত্যা করিয়াছেন, এমন কখনো শোনা যায় না।
সবচেয়ে বড় কথা, আপনারা ধরা পড়েন না। ধরা পড়িলেও আপনাদের কী শাস্তি হয়, জনগণ জানিতে পারে না। শুধু অবিবেচক জনতা মাঝেমধ্যে আপনাদিগকে গণপিটুনি দিয়া থাকে। স্বীকার করি, গণপিটুনি জিনিসটা মোটেও মুখরোচক নয়, ইহাতে আপনাদের কোনো কোনো ইয়ারদোস্ত কোনো কুক্ষণে প্রাণও হারাইয়া থাকিতে পারে। এই উচ্ছৃঙ্খল জনতার এইরূপ বেয়াদবিতে আমরা যাহার পর নাই কুণ্ঠিত ও শরমিন্দা। আপনারা এই অবিমৃষ্যকারীদের গোস্তাকিটুকুন হিসাবে লইবেন না, এই আমাদের আশা।
আপনারাই আমাদের শহরের একমাত্র কায়েমি শক্তি। আপনারাই আছেন, আর কেহ নাই। পুলিশ আছে, তা তো থাকিবেই। ফুল থাকিলে পাতা থাকিবেই। আপনারা হইলেন এই ঢাকা নামক কাননের ফুল আর পুলিশ পাতা মাত্র। পাতা যেমন জানে ফুল আছে, ফুলও তেমনি জানে পাতা আছে। দুইটা মিলিয়াই বাগানের শোভা।
আপনাদের নিকট আমাদের করজোড়ে নিবেদন, প্রতিটা পেশারই একটা পেশাগত নীতিরীতি আছে। সকলেই ইহা মানিয়া চলে। আপনাদেরও একটা ‘কোড অব কনডাক্ট’ বা আচরণবিধি আপনারা স্থির করুন। আপনারা ইহা মানিয়া চলুন। আমরাও, দেশের নাগরিকেরা ইহাতে সহযোগিতা করিব।
আপনারা যখন ছিনতাই করিবেন, তখন কেবল ছিনতাইটুকুই করিবেন, দয়া করিয়া খুনজখম করিবেন না। আপনাদের ছুরি, তরবারি, চাপাতিগুলি দয়া করিয়া ধার দিয়া আনিবেন। ইহাতে যেন মরিচা না থাকে। আর নিতান্ত পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়া না গেলে দয়া করিয়া অস্ত্র পরিচালনা করিবেন না। যে পথচারী বা যাত্রী স্বেচ্ছায় সর্বস্ব আপনাদের হাতে তুলিয়া দিবে, তাহাকে আপনারা দয়া করিয়া আঘাত করিবেন না। যাহা চান, তাহা পাইবার পরেও কেন আপনারা আঘাত করেন? ইহা পেশাগত নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। যখন আপনারা কাহাকেও টার্গেট করেন, তাহার ওপর চড়াও হন, তখন এই দেশের নাগরিক হিসাবে সেই ব্যক্তি ও আপনারা একটা নির্মল স্পষ্ট চুক্তির অধীনে আসেন। তাহা হইল, সে তাহার সঙ্গে যাহা কিছু আছে, তাহা আপনাদের হাতে তুলিয়া দিবে, কোনো রকমের আপত্তি করিবে না, পলায়নের চেষ্টা করিবে না, পুলিশ বা পথচারীদের ডাকাডাকি করিবে না, পরে আপনাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করিবে না। দেশের বেশির ভাগ নাগরিক তাহাদের অংশে এই চুক্তি রক্ষা করে। তাহার বিনিময়ে সে এই আশ্বাসটুকু প্রত্যাশা করে যে আপনারাও তাহার শরীরে আঘাত করিবেন না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে আপনারা সেই চুক্তি রক্ষা করেন না। তাত্ক্ষণিক উত্তেজনাবশত আপনারা আঘাত করিয়া বসেন। স্বীকার করিতে বাধ্য যে আমাদের দিক হইতেও কখনো কখনো চুক্তিভঙ্গের ঘটনা ঘটে। অনেকেই তাহার সবকিছু তুলিয়া দিতে দ্বিধা করে। তবে জানিবেন, তাহা আপনাদের প্রাপ্য প্রদানের অনীহা নয়, ঘটনাচক্রের তাত্ক্ষণিকতায় তাহারাও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়ে। ফলে কী করিতে হইবে তাহা তাহারা বুঝিয়া উঠিতে পারে না। এইরূপ ক্ষেত্রে আপনাদিগকেও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হইবে।
দ্বিতীয় আকুল আবেদনটি হইল, দয়া করিয়া চোখে অতি বিষাক্ত মলম দিবেন না। আপনারা সরকার ও বিএসটিআই অনুমোদিত চোখে-সাময়িক-অন্ধকার মলম ব্যবহার করিবেন। সরকার বাহাদুরের নিকট আরজ, এই মলম আপনারা খোলাবাজারে ছাড়ুন এবং ছিনতাইকারীরা যাহাতে কেবল এই মলমটিই আক্রান্তের চোখে ব্যবহার করে, তাহা নিশ্চিত করুন। এনজিওগুলিও এই প্রকল্প হাতে লইতে পারে। ‘নিরাপদ ছিনতাই মলম’ ছিনতাইকারীদের দোরগোড়ায় পৌঁছাইয়া দিতে পারে।
আমাদের তিন নম্বর আরজ হইল, অজ্ঞান করিবার জন্যেও দয়া করিয়া ধুতুরার বিষজাতীয় প্রাণঘাতী চেতনানাশক ব্যবহার করিবেন না। আক্রান্ত ব্যক্তি মিনিট বিশেক অজ্ঞান থাকিয়া আবার নিরাপদে উঠিয়া দাঁড়াইবে, এই রূপ নিরাপদ চেতনানাশক আপনারা ব্যবহার করিবেন। স্থানীয় থানায় এই রূপ চেতনানাশকের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করিবার জোর দাবি আমরা সরকার বাহাদুরের নিকট পেশ করি।
শ্রদ্ধেয় ছিনতাইকারীগণ, ঢাকা শহরে একজন ব্যক্তিও নাই, যিনি জীবনে একবারও আপনাদের কবলে পড়েন নাই। আপনারা এই শহরে আছেন আলো আর হাওয়ার মতো, রিকশা আর যানজটের মতো, মশা আর ময়লার মতো, ফিরিওয়ালা ও পুলিশের মতো। আপনাদিগকে উচ্ছেদের কথা আমাদের সরকার কল্পনাও করিতে পারিবেন না, কারণ তাহাতে একটি মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কাজেই আপনারা থাকুন।
আমরাও থাকি। ধরুন ঢাকা শহরের সব লোক আপনাদের কবলে পড়িয়া মরিয়া গেল, তখন আপনারা কাহাদের ধরিবেন, কাহাকে ছিনতাই করিবেন?
একটি জাতি কী রূপ তাহা বোঝা যায়, সে-জাতির ছিনতাইকারীরা তাহাদের শিকারের সঙ্গে কী রূপ আচরণ করিয়া থাকে তাহা দেখিয়া। দেশ ও জাতির সম্মানের স্বার্থে আপনারা মানুষ মারা বন্ধ করুন। আর বিশেষ করিয়া বিদেশিদের ছিনতাই করা বর্জন করুন। কারণ তাহা এই দেশে অনভিপ্রেত বিদেশি হস্তক্ষেপ ডাকিয়া আনিতে পারে। যাহা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা পর্যন্ত করিতে পারে।
অতএব আসুন, আপনাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে আপনারা সচেতন ও দায়িত্বপূর্ণ হোন। আর আমরা নাগরিক কর্তব্য হিসাবে সকল ছিনতাইকারীকে পরিপূর্ণ সহযোগিতার হাত বাড়াইয়া দিই।
পরস্পরের সহযোগিতাই আমাদের অগ্রযাত্রা ও পরিপূর্ণ বিকাশের পূর্বশর্ত।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

বাঙালির স্বাধীনতা—বাঙালির অপহরণ স্পৃহা -সহজিয়া কড়চা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বড় বড় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিয়ে গেছেন। সেগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা রাত জেগে মুখস্থ করে। ঠিকমতো মুখস্থ করতে না পারলে চিরকুটে লিখে নিয়ে যায় পরীক্ষার হলে। নিজের দলীয় সরকার না হলে আন্ডারওয়্যারের ভেতরে লুকিয়ে নিতে হয়। ওটা দেখে পরীক্ষার খাতায় টুকতে হয় সাবধানে। পরীক্ষায় ভালো ফল পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের মতো অরাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সাধারণ বুদ্ধিতে যা বুঝি তা হলো—একটি রাষ্ট্র শুধু একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নয়, তার জনগণ ও সরকার-প্রশাসন প্রভৃতি। তবে রাষ্ট্রে জনগণই আসল, সরকার পরে।
পত্রপত্রিকায় যাঁরা প্রতিবেদন, নিবন্ধ ও উপসম্পাদকীয় বা সম্পাদকীয়ের ডানদিকের পাতায় রচনা লেখেন তাঁরা সরকারের কড়া সমালোচনা করতে পারলে বিশেষ আনন্দ পান। সরকারকে ধোলাই দিতে না পারলে মন ভরে না। কিন্তু রাষ্ট্রের আসল যে জনগণ, যারা সংখ্যায় অনেক, তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারণ সরকারপ্রধানকে হাতের নাগালে পাওয়া যায়, বিরোধী দলের প্রধান নেতাকে হাত বাড়ালেই ধরা যায়, কিন্তু জনগণের প্রধানকে? সব জনগণকে এক সঙ্গে ধরে কীভাবে? সুতরাং জনগণের ভালো-মন্দ, দোষ-ত্রুটি আড়ালে থেকে যায়—তা আড়ালে থাকে অল্পকাল নয়—শতাব্দীর পর শতাব্দী। তারপর কোনো মহান সংস্কারক এসে তা সংশোধনের চেষ্টা করেন। তবে বিশেষ বিশেষ জনগোষ্ঠী সহজে সংশোধনযোগ্য নয়।
সীমাহীন ত্যাগ ও কঠোর সাধনার পর কোনো জাতির জীবনে স্বাধীনতা আসে। যেমন উপমহাদেশের মানুষের জীবনে এসেছিল ১৪-১৫ আগস্ট ১৯৪৭। তার আগে এ দেশের মানুষের নিজস্ব রাষ্ট্র ছিল না ১৯০ বছর—তারা ছিল নিজ বাসভূমে পরবাসী। তখন দেশটির মালিকানা ছিল মহামহিম ব্রিটিশ সম্রাটের। এ দেশের মানুষ ছিল তাঁর সাবজেক্ট—অর্থাত্ প্রজা বা দাস। বাঙালিসহ উপমহাদেশের মানুষ রাষ্ট্রের অধিকারী হলো বা মালিকানা পেল ১৫ আগস্ট থেকে। অমন আনন্দের দিন, অমন স্মরণীয় দিবস, কোনো জাতির জীবনে শত শত নয়, হাজার বছরেও আসে না।
বাঙালি সেই দিনটি কীভাবে উদ্যাপন করেছিল। সেই ১৫ আগস্ট। ১৯৪৭ সাল। আজ খুব কম মানুষই জানে সেদিন বাঙালি কী করেছিল। বাঙালি সেদিন দিয়েছিল তার প্রকৃত পরিচয়। এত মায়ের, এত ভাই ও বোনের, এত বাবার অশ্রু বিসর্জনের পর, কত প্রাণের বিনিময়ে জাতি পাচ্ছে মুক্তির স্বাদ। সেই আনন্দের মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী কলকাতায় গভর্নর হাউস জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ভোর থেকে সূর্যান্ত পর্যন্ত সেখানে ছিল সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত।
সদ্য গঠিত প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী—মহাত্মা গান্ধীর বেহাই মহাশয়। তবে স্যুটকেস গোছগাছ করতে দেরি হওয়ায় ব্রিটিশ গর্ভনর স্যার ফ্রেডারিক বারোজ ও মাদাম বারোজ-ও তাঁদের শয়নকক্ষে কোনোরকমে ম্লানমুখে বসে ছিলেন।
একেবারে সকাল সকালই কংগ্রেস ও মহাসভার একদল কর্মী-সমর্থক বীরদর্পে ঢুকে গেল ওই প্রাসাদে। এ ঘর-ও ঘর তছনছ করে তারা গিয়ে ঢোকে গভর্নরের শয়নকক্ষে। জনাদশেক লাফ দিয়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল পায়ে উঠে পড়ে খাটের ওপর। উঠেই আনন্দে লাফাতে থাকে। লাফানো পর্যন্ত ভালোই ছিল। একজন বেডকভার আরেকজন বিছানার মূল্যবান চাদরটি টান দিয়ে তুলে কাঁধে ফেলে হন্ হন্ করে চলে গেল। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে গভর্নরের পত্নী থর থর করে কাঁপছিলেন। দু-একটি কলকাত্তিয়া গালও তাঁর কানে গেছে, তবে তিনি ভাষার মর্মার্থ ও মাধুর্য বুঝতে পারেননি। বহু দিন পর সেই দিনের শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন।
চাদর, বেডকভার, বালিশ নিয়ে গেলে ভালোই ছিল, নতুন গভর্নর রাজাগোপালাচারী অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন বলে বালিশ ছাড়াই না হয় প্রথম দিন ঘুমাতেন। কিন্তু রাতের খাবার খাবেন কিসে? তিনি তো গান্ধীজি নন যে একটি বাটিই যথেষ্ট। প্লেট, চামচ, পেয়ালা থেকে শুরু করে গভর্নরের বিবির লিপস্টিক, পাউডার কেন, বিউটি বক্স—সবই হাতে হাতে চলে যায়।
হোটেলে গিয়ে সন্ধ্যার পর গভর্নর যখন ভালো করে তাঁর পত্নীর দিকে তাকালেন, তাঁর চোখে পানি আসার জো! কান্না চেপে বলেছিলেন, ‘হানী, তোমার একি দশা! চুল উষ্কোখুষ্কো, ঠোঁট খোসা ছাড়ানো লিচুর মতো পাংশু।’ মাদাম বলেন, ‘আমার চিরুনিও নিয়ে গেছে।’ গভর্নর হাফ ছেড়ে বললেন, ‘চিরুনি নিয়ে গেছে যাক, তোমাকে যে আমার কাছ থেকে নিয়ে যায়নি এই আমার সাতজনমের ভাগ্যি।’
১৫ আগস্ট গান্ধীজি ছিলেন ঢাকার নবাব খাজা হাবিবুল্লাহর পরিত্যক্ত বাড়ি বেলেঘাটায় ‘হায়দারি মঞ্জিলে’। ১৯০ বছর পর স্বাধীনতাপ্রাপ্তরা গভর্নর হাউসের হেঁসেলের খুন্তি পর্যন্ত খুশিতে হাতে করে বাড়ি নিয়ে গেছে—এ কথা তাঁর কানে যায়। অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী, নতুন মুখ্যমন্ত্রী ডা. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, পুলিশের আইজিসহ পশ্চিমবঙ্গের শীর্ষ কর্মকর্তারা গান্ধীজিকে ঘটনার বিবরণ দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকেন। গান্ধীজি গভর্নর হাউসের ঘটনা শুনে এতটাই মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হন যা তিনি তাঁর ৫৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে আর কোনোদিন হননি। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ হলে গান্ধীজি ভাবতেন তাঁর বেহাই রাজাজিকে নিয়ে—তিনিও নতুন রাজ্যপাল হিসেবে ওই প্রাসাদে গিয়ে উঠলেন আর সেখানকার সবকিছু লুটপাট হয়ে গেল! সেদিন তিনি তাঁর অপরাহ্নিক প্রার্থনা করেছিলেন বাঙালির ভবিষ্যত্ নিয়ে।
বাংলা বিভাগ ও গান্ধীজির ওপর কাজ করতে গিয়ে আমি পশ্চিমবঙ্গের বহু মানুষের সাক্ষাত্কার নিই, বিশেষ করে যারা ১৯৪৬-৪৭ সালে সক্রিয় ছিলেন। কয়েক মাস আগে রক্তগঙ্গা বয়ে গেলেও স্বাধীনতা লাভের সপ্তাহখানেক আগে কলকাতার ও শহরতলির মিষ্টির দোকান এবং রেস্তোরাঁর মালিকেরা দাতা কর্ণ সেজে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ১৫ আগস্ট তাঁরা ক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো পয়সা নেবেন না। স্বাধীনতার সুখের চেয়ে বিনা পয়সায় খাওয়াটা বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের জন্য বেশি আনন্দের। বলতে গেলে ওটাই পরম সুখ। বিনা পয়সায় মিষ্টিমুখ করার মওকা হাতছাড়া করবে এমন বেকুব কোনো বাঙালি হতেই পারে না।
এখনকার মতো সেদিন দুধের লিটার ৫০ টাকা আর চিনি ৭০ টাকা কেজি ছিল না। দুধ ছিল পঁচিশ পয়সা সের (লিটার) আর চিনির মণ ৩৫ টাকা, অর্থাত্ এখনকার এক লিটার দুধের দামে ১৯৪৭ সালে ২০০ লিটার দুধ কেনা যেত এবং এক কেজি চিনির দামে পাওয়া যেত দুই মণ চিনি। ১৪ তারিখ সারা রাত জেগে প্রতিদিনের চাহিদার চেয়ে পাঁচ-দশ গুণ বেশি মিষ্টি তৈরি করা হয়েছিল বিভিন্ন ময়রার দোকানে।
২০০০ সালে আমি কলকাতার চৌরঙ্গী, শ্যামবাজার, হ্যারিসন রোড প্রভৃতি এলাকার ১০-১২ জন বৃদ্ধ ঘোষের সঙ্গে কথা বলি। সেই প্রথম স্বাধীনতা দিবসের কথা জিজ্ঞেস করায় ঘোষ মশায়দের কেউ কেউ স্মৃতিকাতর হয়ে যান। তবে কারও কারও চোখ জ্বলে ওঠে ক্ষোভে। একটি দাঁতও না থাকায় দাঁত-কট্মট করতে পারলেন না—শুধু মুখের মাংসপেশিগুলো নড়তে লাগল। প্রায় প্রত্যেকেই বলেছেন, বেলা ১০-১১টার মধ্যেই তাদের দোকানের মিষ্টি শেষ হয়ে যায়। তা হতেই পারে। কিন্তু সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তরা দোকানের পিরিচ চা-কাপ ও চামচগুলো পর্যন্ত পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে যায়। ১৬ আগস্ট দোকানি ও রেস্তোরাঁর মালিকেরা নতুন কাপ- পিরিচ-চামচ কিনে দোকান খোলেন।
এ তো গেল বাঙালির পুরোনো স্বাধীনতার গল্প। আমার সেটা স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে নতুন স্বাধীনতার দিনগুলোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তো রয়েছে। ২৬ ডিসেম্বরের কথাটি বেশ মনে আছে। সকালবেলা, বেইলি রোডের চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের ঘনিষ্ঠ একজন একটি গাড়িতে এসে দাঁড়ালেন। প্রায় জেনারেলের মতো পোশাক পরা। নয় মাস তিনি সাধারণ পোশাকেই ছিলেন। বললেন, গাড়িতে উঠুন। সোজা মগবাজার পাঁচ রাস্তা দিয়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকা।
কোহিনূর কেমিক্যালে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বললেন। তারপর নাবিস্কো। এভাবে ১০-১২টা পরিত্যক্ত শিল্প-কারখানায় গেলেন। এবং শেষটায় এক পরিত্যক্ত জমিতে দাঁড়িয়ে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, নাহ্, শ্লারা সব আগেই দখল কইরা ফ্যালাইছে।
স্টেডিয়ামের বিহারিদের দোকানগুলো বেদখল হয়ে যায় ১৬ ডিসেম্বরের তিন-চার দিনের মধ্যে। আমার বন্ধুবান্ধবদের কেউ কেউ তালা ভেঙে দোকানে ঢুকে বসে যায়। মোহাম্মদ-মিরপুর ও ঢাকার অন্যান্য এলাকার অবাঙালিদের বাড়িগুলোর ‘আগে গেলে আগে পাবেন’ নীতিতে রাতারাতি মালিকানা বদলে যায়।
বাঙালির জীবনে একেকবার স্বাধীনতা এসেছে আর একদল মানুষের দিন বদলে গেছে। সাতচল্লিশে এক গোত্রের ভাগ্য বদল ঘটে, একাত্তরে আরেক গোত্রের। একই সঙ্গে ভাগ্যবিপর্যয় ঘটে কোটি কোটি মানুষের। কলকাতায় যখন দোকানের চামচ-পিরিচ হাওয়া হয় তখন পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান তো বসে থাকতে পারে না। তারা পিরিচ-চামচে সন্তুষ্ট নয়। আম-জাম-জামরুল-নারকেল-সুপারির বাগান, উঠানের কোণে জবা ও কাঠটগর গাছ এবং পুকুরসমেত বিত্তবান হিন্দুদের ২০-৩০ বিঘার বাড়ি জমির দিকে চোখ পড়ে। মুসলিম লীগের লুঙ্গি পরা মোড়ল বাজারের মধ্যে সজোরে পানের পিক ফেলে বলে, কী দত্ত মশায়, ও-পারে যাইবেন কবে? বাড়ি বেচলে আমারে দিয়েন। যা পারি দিমুনে।
দত্ত মশায় ভাত খাওয়া ছেড়ে দেন। গিন্নি বলেন, দানাপানি ছাইড়া দিলা নাকি? দত্ত বাবু বলেন, ঘর বাড়ি সুদ্ধা ৩২ বিঘা আঠার হাজারে দিয়া দিলাম। বড় ট্রাংকটা বাইর করো। কাপড়চোপ গুছাও। গোয়ালন্দ থিকা ট্রেন। সোজা শিয়ালদাহ।
আমরা—বাঙালিরা—অবলীলায় অপরের সম্পদ অপহরণে অভ্যস্ত। আমরা হিন্দুদের সম্পদ লুট করেছি, আমরা বিহারিদের বাড়িঘর-কলকারখানা জবরদখল করেছি। তিল তিল করে সঞ্চয় করা টাকায় তৈরি কারও শখের বাড়িটিতে গিয়ে ঢুকে পড়েছি। ও-বাড়ির গৃহকর্ত্রীর ছল্ ছল্ চোখ একবারও আমাদের চোখে ভাসেনি।
জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার দুই-তিন দিন পর দৈনিক বাংলা বিচিত্রার সাংবাদিকসহ আমরা কয়েকজন মিরপুর যাই। আমাদের আশা ছিল, দু-চার দিনের মধ্যে তাঁকে দুর্বৃত্তরা মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। মিরপুর গোলচক্করের কাছে আমার এক পূর্বপরিচিতের সঙ্গে দেখা। বললাম, এখানে কী করেন। তিনি বললে, মিরপুরেই থাকি। বললাম, এত দূরে বাসা নিলেন? তিনি বললেন, বাসা না, নিজের বাড়ি। স্বাধীনতার অব্যবহিত আগেও তিনি ছিলেন লালবাগের দিকে এক মেসে। স্বাধীনতার চল্লিশ দিন না যেতেই তিনি হলেন এক তৈরি বাড়ির মালিক। সাহস করে বীরোচিতভাবে দখল নিলেই হলো।
কিন্তু বিহারিদের বাড়ি-দোকানপাট দখল করেছে কয়জন? লাখ লাখ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা পায়নি কিছুই—সামান্য কয়েক টাকার ভাতা পর্যন্ত নয়। প্রতিদিন আমি দেখি টাঙ্গাইলের গোপালপুরের আজিজুর রহমানকে। ধানমন্ডি আজিজ অ্যাপার্টমেন্টের সিকিউরিটি গার্ড। সাড়ে তিন বা চার হাজার টাকা মাইনে। প্রায় ২৪ ঘণ্টা ডিউটি। তিনি ছিলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীতে। সিদ্দিকী সাহেব ও তাঁর অগ্রজ বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী তাঁকে খুব ভালো চেনেন। আজিজুর রহমান ট্রেনিং নেন ভারতের তুরায়। আমাদের বন্ধু খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক ট্রেনিং নেন তুরার ৬ নম্বর উয়িংয়ে, আজিজ মিয়া ট্রেনিং নেন ৭ নম্বর উয়িংয়ে। জুন-জুলাই মাসে ড. রাজ্জাক ও তিনি একই নৌকায় গোপালপুর ফেরেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আজিজ মিয়ার ভাড়াটি টাঙ্গাইলের ডিসির দয়ায় আজও পাননি। আজিজ মিয়ার মতো মানুষও বাংলাদেশে অগণিত।
একটি সুশাসিত, সুশৃঙ্খল ও সার্থক রাষ্ট্র গড়ে ওঠে জনগণ ও সরকারের যৌথ চেষ্টায়। একটি রাষ্ট্রে জনগণই ৯০ ভাগ, সরকার মাত্র ১০ শতাংশ। সরকারের ভুলে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় ১০ ভাগ, জনগণের অকর্মণ্যতা ও অপকর্মের ক্ষতি অপরিমেয়। একেকটি নৃতাত্ত্বিক বা শঙ্কর জনগোষ্ঠীর একেকটি মৌল চরিত্র থাকে। বাঙালির মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টি গুণ্ডামিপ্রবণতা প্রবল; তার অপহরণস্পৃহা অপ্রতিরোধ্য। অন্যের জিনিস দেখলে তার মাথা ঠিক থাকে না। কিছু ভাঙার কথা শুনলে তার—‘মুখ হাসে তার চোখ হাসে তার টগবগিয়ে খুন হাসে।’ ধ্বংস-সুখের উল্লাসে সে মেতে ওঠে।
গত পাঁচ হাজার বছরে কৃষকেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে নাই, তাঁতিরা করে নাই, জেলেরা করে নাই, কামার ও কুমারেরা করে নাই। প্রতিদিন মারামারি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে। কৃষক ও তাঁতি কোনো দিন মন্ত্রী-উপদেষ্টা হবে না। এখন যারা পরস্পরের মাথা ফাটাচ্ছে তাদেরই কেউ ১৫-২০ বছর পর সাংসদ, সচিব, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রদূত হবে।
একটি ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই, তা হলো যদি কোনো ‘নেতা’ আজ যমুনা সেতু গুঁড়িয়ে দেওয়ার ডাক দেন—এক কোটি লোক একদিনের মধ্যে ওখানে জড়ো হবে। কোমর পড়ে যাওয়া বুড়োও ওখানে গিয়ে হাজির হবে। কেউ যাবে শুধু ইট ও লোহাগুলো বাড়ি নিয়ে যেতে। পুরো সেতু ভাঙতে সাতদিনের বেশি লাগবে না।
মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেই ৩৭ বছর বয়স্ক অনেক বক্তাকে আজকাল মঞ্চে পদাঘাত করতে দেখি। যুদ্ধ করে স্বাধীনতা শুধু আমরা পাইনি। ভিয়েতনামিরা ৩০ বছর যুদ্ধ করেছে সাম্রাজ্যবাদী জাপান, ফ্রান্স ও আমেরিকার বিরুদ্ধে। ৩০ লাখ তিন হাজার মানুষের জীবনের বিনিময়ে ১৯৭৫-এ যেদিন ভিয়েতনাম স্বাধীন হয় সেদিন রয়টারের পাঠানো একটি খবর আমি যত্নে রেখে দিই। সায়গন বা হোচি মিন নগরের রাস্তায় আমেরিকানদের ব্যবহূত বিলাস সামগ্রী স্তূপীকৃত করে রাখা হয়। কোনো ভিয়েতনামি তা ছুঁয়েও দেখেনি। অবশ্য পরে আমেরিকানদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে ভিয়েতনাম। তারা বাস্তববাদী। এবং দেশপ্রেম তাদের আমাদের চেয়ে একচুল হলেও বেশি। তবে কথা ও বক্তৃতায় তারা আমাদের সঙ্গে পারবে না।
স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য কত প্রাণ গেল। কিন্তু বাঙালির ভেতর থেকে অপহরণস্পৃহা ও গুণ্ডামির প্রবণতা গেল না। দখল মানে বুক ফুলিয়ে অপহরণ করা। ৩০টি বেলি বা গাঁদাফুলের গাছ নয়, সমুদ্রসৈকতের ৩০ হাজার ঝাউগাছ অলৌকিভাবে উধাও হয়ে গেছে। গাছ তো নিয়ে গেছেই গেছে, এখন গাছের মুথা তুলতে কামলা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথম আলোর গাছ নিধন ছবির শিরোনামে বলা হয়েছে: একসময়ের ঘন বন এখন বিরানভূমি।
একদিন বাংলাদেশই বিরান হয়ে যাবে। যারা বিরান করবে তাদের ছেলেমেয়েরা থাকবে আমেরিকায়। ওখানে রাস্তার গাড়ি মুছলেও ডলার কামাই করা যায়। ঝাউগাছ নয়, খাস জমিগুলোও দখল হয়ে গেছে। অর্পিত সম্পত্তি নামে এক সোনার খনি আছে, তা দখল হচ্ছে। সরকারি রাস্তার ইটগুলো চলে যাচ্ছে সরকারি দলের নেতা-কর্মীর বাড়িতে। নদীর তীরগুলোর পানি নামারও অবসর পাচ্ছে না, সেখানে উঠছে দালালকোঠা। নদীর বালু চুরি হচ্ছে দিনদুপুরে। কার সাধ্য বাধা দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমিতে যার খুশি তুলছে ঘর। টেন্ডারের বাক্সগুলো জাদুর বাক্সের মতো হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। নিজে টেন্ডার পাবে না তাই টেন্ডার বাক্সে দরপত্রে পানি ঢেলে দিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। সড়কের গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে হাজারও মানুষের সামনে। বনভূমি তো বনবিভাগের কর্তাদের পৈর্তৃক সম্পত্তি। আদিবাসীদের জমি দখলে কোনো ঝুঁকি নেই। পার্বত্য এলাকার বিস্তীর্ণ বনবাদাড় দেখে বাঙালি মন্ত্রী, উপদেষ্টা, আমলা ও বড়-মাঝারি-ছোট নেতার মাথা ঠিক থাকতেই পারে না।
দখল-বাণিজ্য ও দিনবদল নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। অল্প জায়গায় আট মাসের অত কথা বলার সুযোগ আমাকে সম্পাদক দেবেন না। তাই পুরোনো দিনের কিছু ঐতিহাসিক দখল-অপহরণের গল্প বলে দুধের কাজ মাঠায় মিটিয়ে দিলাম।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

গ্রাসের থাবা থেকে কি কিছুই রেহাই পাবে না -সাত দিনে ৩০ হাজার ঝাউগাছ উজাড়

টেকনাফ সমুদ্রসৈকতে একসময়ের ঘন বনের এক ভয়ানক দুর্দশা দেখা গেছে সোমবারের প্রথম আলোতে। ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ঝাউগাছের বন উজাড় করে ফেলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো বিপর্যয়ে যে বন প্রাকৃতিক দেয়াল হয়ে উপকূলের অধিবাসীদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করার কথা, আজ তা শুধুই বিরানভূমি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের তথ্যানুসারে, এক সপ্তাহে অন্তত ৩০ হাজার ঝাউগাছ নিধন করা হয়েছে। বন বিভাগের কিছু কর্মীর যোগসাজশে কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি গাছ কেটেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রকাশ্যে এত বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়ানো বন উজাড় হলো অথচ বন বিভাগ এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিল না। গাছ নিধনে সহায়তা করার বিনিময়ে বনকর্মীরা আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন—এমন অভিযোগ আছে। রক্ষক নিজেই যখন ভক্ষক বা ভক্ষকের সহযোগী হয়ে ওঠে তখন জনগণের ভরসার আর কী জায়গা অবশিষ্ট থাকে?
পাশাপাশি চলছে জমি দখলের উত্সব। অথচ এসব বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো পরস্পরকে দায়ী করছে। গাছ কাটা হবে, জমি দখল হবে আর প্রশাসন তা ঠেকাতে পারবে না—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশে সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থাকার পরও প্রতিরোধহীনভাবে এমন বন চুরি চলতে থাকে কী করে? গ্রাসের থাবা থেকে কি কিছুই রেহাই পাবে না?
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের স্বার্থে সরকারকে বনের ক্ষতি বন্ধ করতে হবে, বন ব্যবস্থাপনা উন্নত ও গতিশীল করতে হবে। পরিবেশ ও উপকূলের অধিবাসীদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় অবিলম্বে এই ধ্বংসাত্মক কাজে অংশগ্রহণকারী ও মদদদাতাদের খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখীন করা প্রয়োজন।

ব্যবসায়ীদের ওপর সব ভার ছেড়ে দেওয়া যাবে না -শিয়ালের কাছে মুরগি জমা!

এক শ্রেণীর অসত্ ব্যবসায়ীর বেপরোয়া তত্পরতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে গেছে। বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করে তারা দফায় দফায় পেঁয়াজ, মসুরের ডাল, ছোলা, ডিম, কাঁচামরিচ এবং সর্বশেষ চিনির দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই স্ব-উদ্যোগে বাজার তদারকির দায়িত্ব নিলে অবস্থা আরও খারাপ হয়। এ পর্যন্ত ব্যবসায়ী নেতারা পাঁচবার ঢাকঢোল পিটিয়ে বাজার তদারকিতে গেছেন এবং প্রতিবারই পরিদর্শন শেষে পাইকারি ও খুচরা বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। অবশেষে তদারকিতে ইস্তফা দিয়ে তাঁরা প্রমাণ করলেন যে ব্যবসায়ী দিয়ে ব্যবসায়ীদের মুনাফাবাজি বন্ধ করা যায় না।
শিয়ালের কাছে মুরগি জমা রাখা আর ব্যবসায়ীদের হাতে বাজারের সব দায়িত্ব তুলে দেওয়া একই কথা। বাজার-অর্থনীতিতে সরকারের হাতেও কিছু উপায় থাকে, যা ব্যবহার করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। শুধু ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর না করে সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত পরিমাণ চিনি, পেঁয়াজ, মসুরের ডাল আমদানি করে তা বাজারে ছাড়ার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান এসব বিষয়ে উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ক্রেতাসাধারণকে। গতকাল সোমবার রাজধানীর ২০ এলাকায় ৪২ টাকা দরে চিনি বিক্রির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে ব্যবস্থা আরও আগে করা হলে মানুষকে ৭০ টাকায় চিনি কিনতে হতো না।
ডাল, চিনি, ডিমসহ অন্যান্য জিনিসের দাম এত বেশি হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না; এটা ব্যবসায়ীদের কারসাজি। সরকারের উচিত এখনই দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। শনিবার সাড়ে ২৭ হাজার টন চিনির চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। চলতি মাসেই এক লাখ সাড়ে চার হাজার টন অপরিশোধিত চিনি আসবে। সামনের মাসে আসছে আরও এক লাখ ১৫ হাজার টন। এসব খবরই তো চিনির বাজার ঠান্ডা করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু বাজারে চিনির সরবরাহ কম—এ রকম গুজব ছড়িয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের দুই ডিলারের কারসাজিতে এক দিনের ব্যবধানে চিনির দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকার তাহলে কী করছে? গুজব রটনাকারী ও অভিযুক্ত ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন?
মূল্যবৃদ্ধিতে চাঁদাবাজির অবদানও কম নয়। এক ট্রাক পণ্য বেনাপোল থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে আসতে ২২টি স্থানে পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়, এমন অভিযোগের সচিত্র প্রতিবেদন একটি টিভি চ্যানেলে শনিবার রাত ১০টার সংবাদে প্রচার করা হয়েছে। ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজির অভিযোগ কয়েক দিন আগে খাদ্যমন্ত্রী নিজেই করেছেন। কিন্তু এসব ব্যাপারে কোনো তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার খবর আজও পাওয়া যায়নি। সরকারের এ ধরনের নিষ্ক্রিয়তা মূল্যবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে।
ঢালাও অভিযান নয়, যারা কারসাজি করে দাম বাড়ায়, তাদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি খোলাবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা দরকার। বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এ রকম উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিন লাদেন বললেন ওবামা ক্ষমতাহীন

আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেন বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একজন ‘ক্ষমতাহীন’ ব্যক্তি, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি যুদ্ধ বন্ধ করতে অক্ষম। একটি ইসলামি ওয়েবসাইটে প্রচারিত এক অডিও বার্তায় তিনি এ কথা বলেন। ১১ মিনিটের অডিও বার্তাটির শিরোনাম ছিল ‘আমেরিকার জনগণের প্রতি একটি বিবৃতি’।
অডিও বার্তায় ওসামা বিন লাদেন বলেন, ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ বন্ধের ক্ষমতা নেই প্রেসিডেন্ট ওবামার। তিনি বলেন, যুক্তিবাদী জনগণ জানে যে, ওবামা একজন ক্ষমতাহীন ব্যক্তি। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি যুদ্ধ বন্ধে সক্ষম নন। খবর বিবিসি ও এএফপির।
যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার অষ্টম বার্ষিকীর মাত্র দুই দিন পর আল-কায়েদা প্রধানের এই অডিও বার্তাটি প্রচারিত হলো।
আল-কায়েদা কেন ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে হামলার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছিল, অডিও বার্তায় সেই বিষয়টি বর্ণনা করেন আল-কায়েদা প্রধান। বিন লাদেন বলেন, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ওই হামলায় ইন্ধন জুগিয়েছে।
মার্কিন জনগণের উদ্দেশে বিন লাদেন বলেন, ‘সময় এসেছে ভয় ও নব্য-রক্ষণশীলদের আদর্শিক সন্ত্রাসবাদ এবং ইসরায়েলি লবি থেকে নিজেদের মুক্ত করার। আপনাদের সঙ্গে আমাদের বিরোধের কারণ হচ্ছে ইসরায়েলের প্রতি আপনাদের সমর্থন। যারা ফিলিস্তিনে আমাদের ভূমি দখল করে রেখেছে।’
কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও আল-কায়েদার মধ্যকার বিরোধের অবসান হতে পারে, সে বিষয়েও নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন বিন লাদেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি যুদ্ধ বন্ধ করেন, তাহলে খুবই ভালো। তা না হলে প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো উপায় নেই। আপনারা যদি নিরাপত্তাকে বেছে নেন এবং যুদ্ধ বন্ধ করেন, তাহলে আমরাও তার ইতিবাচক সাড়া দিতে প্রস্তুত।’
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটসসহ বুশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্বপদে বহাল রাখার কারণেই পররাষ্ট্রনীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি।
ওবামার উদ্দেশে বিন লাদেন বলেন, ‘আপনি যদি আপনার অবস্থান সম্পর্কে ভালোভাবে চিন্তা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন প্রেসার গ্রুপগুলোর হাতে জিম্মি হয়ে আছে হোয়াইট হাউস। হোয়াইট হাউসের বর্তমান প্রশাসন শুধু সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির কৌশলই অনুসরণ করছে।’
উল্লেখ্য, ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তান ও পাকিস্তান সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে রয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। তবে কয়েক দিন আগে বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি বলেছিলেন, আল-কায়েদা প্রধান বেঁচে নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ জরুরি বলে যে দাবি করা হয়, সেটিও নাকচ করে দিয়েছেন বিন লাদেন। এর আগে সর্বশেষ প্রচারিত বার্তায় তিনি বলেছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মুসলিম বিশ্বের অন্তরে ‘প্রতিশোধ ও ঘৃণার’ বীজ বপন করেছেন। অডিও বার্তাটিতে বিন লাদেনের একটি স্থিরচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষায় মার্কিন সহায়তা ব্যবহার করা হয়েছে: মোশাররফ

পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ বলেছেন, তিনি ক্ষমতায়থাকাকালে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের জন্য পাকিস্তানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
সাবেক এই জেনারেল স্বীকার করেছেন, সামরিক সাহায্য ব্যবহারের নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন তিনি। তবে নিজের কর্মকাণ্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে পারভেজ মোশাররফ বলেন, পাকিস্তানের সর্বোচ্চ স্বার্থে কাজ করেছেন তিনি। পাকিস্তানের স্বার্থের ব্যাপারে কোনো আপস করতে চাননি তিনি।
সম্প্রতি একটি সংবাদ চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, এই সত্য উন্মোচন করার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষুব্ধ হলেও তিনি সেটাকে পরোয়া করেন না।
জেনারেল মোশাররফ বলেন, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে জঘন্যসন্ত্রাসী হামলার পর তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সমর্থন না দিতেন, তাহলে তাঁর দেশে পরমাণু সম্পদ দখল করার জন্য মার্কিন সেনারা হয়তো পাকিস্তানে প্রবেশ করত। এমন সম্ভাবনাও ছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত হয়তো যৌথভাবে পাকিস্তানে হামলা চালাত।

ইহুদি বসতি স্থাপন বন্ধ করতে হোসনি মোবারকের আহ্বান

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে সব ধরনের ইহুদি বসতি স্থাপন বন্ধ করার জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক। গত রোববার মিসরের কায়রোতে দুই নেতার এক বৈঠকে মোবারক এ আহ্বান জানান। খবর এএফপির।
মোবারকের মুখপাত্র সুলেইমান আওয়াদ বলেন, প্রেসিডেন্ট সব ধরনের বসতি স্থাপন প্রক্রিয়া এবং জেরুজালেমে ইহুদি ধর্ম বিস্তার প্রচেষ্টা বন্ধের জন্য নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে দেন, ওই প্রচেষ্টা বন্ধ না করলে শান্তি প্রচেষ্টা বিঘ্নিত হতে পারে। তিনি জেরুজালেম ইস্যু নিয়ে আরব ও মুসলিম বিশ্বের আবেগের ওপর জোর দেন।
ইহুদি বসতি স্থাপন বন্ধ ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনা শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জর্জ মিশেল ইসরায়েল সফরের পরই নেতা নেতানিয়াহু মিসর সফর করলেন।
আওয়াদ বলেন, শান্তি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে মোবারক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণের জন্য আলোচনা শুরুর আহ্বান জানান। এতে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সব বিষয়ে একটি চুক্তি হতে পারে।
এর আগে জেরুজালেমে মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠক শেষে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আশা করি আমরা মতপার্থক্য কমাতে সফল হব।’
নেতানিয়াহু এর আগে ক্ষমতা গ্রহণ করেই গত ১১ মে মিসরের শারম আল শেখে মোবারকের সঙ্গে বৈঠক করেন।

পশ্চিম তীরে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত, পাইলট নিহত

ইসরায়েলের একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে এর পাইলট নিহত হয়েছেন। গত রোববার পশ্চিম তীরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ওই পাইলটের নাম আসসাফ র্যামন (২১)। সেনা কর্তৃপক্ষ এ তথ্য দিয়েছে। নিহত ওই তরুণ পাইলটের বাবা ইলান র্যামন। ইলান ছিলেন দেশটির একমাত্র নভোচারী। তিনিও ২০০৩ সালে মহাকাশযান কলাম্বিয়া দুর্ঘটনায় নিহত হন।
সেনা কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, যুদ্ধবিমানটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ মহড়া দিচ্ছিল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, বিমানটি হেবরন শহরের দক্ষিণাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় নিচু দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। তারপর হঠাত্ই তা বিধ্বস্ত হয়।
আসসাফ র্যামন এ বছরের গোড়ার দিকে ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর পাইলট কোর্সে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

অস্ত্র কেনার জন্য ভেনেজুয়েলাকে বিপুলঅঙ্কের ঋণ দেবে রাশিয়া

অস্ত্র কেনার জন্য ভেনেজুয়েলাকে ২২০ কোটি ডলার ঋণ দেবে রাশিয়া। গতকাল সোমবার সাপ্তাহিক টেলিভিশন ভাষণে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ এ কথা জানান। রাশিয়া থেকে বিমানবিধ্বংসী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ১০০টি ট্যাংক কেনার জন্য এ অর্থ ব্যয় করা হবে। ভাষণে শাভেজ বলেন, ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতেই এসব অস্ত্র কেনা হচ্ছে।
‘আলো প্রেসিদেন্তে’ অনুষ্ঠানে শাভেজ বলেন, সম্প্রতি কলম্বিয়া তার দেশের সাতটি সামরিক ঘাঁটি মার্কিন সেনাদের ব্যবহার করার অনুমতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। এতে তার দেশের প্রতি নিরাপত্তা হুমকি বেড়েছে। সে কারণেই তার সরকার অস্ত্র কেনার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি জানান, রাশিয়ার সরকার ২২০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করেছে। গত সপ্তাহে শাভেজের রাশিয়া সফরের সময় দুই পক্ষের মধ্যে এ চুক্তি হয়।
মার্কিন হুমকির প্রতি ইঙ্গিত করে শাভেজ বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুদ রয়েছে আমাদের। ওই সম্পদের ওপর নজর রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির (যুক্তরাষ্ট্র)। এই রকেট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আকাশপথে তাদের বোমা হামলা থেকে আমাদের রক্ষা করবে।’ দেশের তেল ও গ্যাসসম্পদ রক্ষার জন্য সামরিক নিরাপত্তা দরকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়ার মধ্যে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের অস্ত্র ক্রয়ের চুক্তি সই হয়েছে। এ ছাড়া গত নভেম্বরে ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় যৌথ সামরিক মহড়াও চালিয়েছে দুই দেশ।

আবার বিয়ের সাধ

তাঁর বয়স ১০৭ বছর। তিনি এরই মধ্যে ২২ বার বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন। সম্প্রতি আরও একবার বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তিনি। মালয়েশীয় ওই নারীর নাম উক কুন্দর। বর্তমান স্বামী মুহাম্মদের (৩৭) সঙ্গে তাঁর বয়সের ব্যবধান ৭০ বছর।
আবার বিয়ে করার পরিকল্পনার কারণ জানাতে গিয়ে স্বামীকে হারানোর ভয়ের কথা বললেন উক। স্থানীয় পত্রিকা স্টারকে তাঁর ভয়ের কথা জানাতে গিয়ে উক বলেন, মাদকসেবী বর্তমান স্বামী মুহাম্মদ কম বয়সী নারীর সঙ্গে থাকতে চান। আর এ কারণেই তাঁর এ ভয়। বর্তমানে কুয়ালালামপুরের নিরাময় কেন্দ্রে চিকিত্সাধীন মুহাম্মদ সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাঁকে চিরজীবনের জন্য ছেড়ে যাবেন উক। চার বছর আগে মুহাম্মদকে বিয়ে করে পত্রিকার পাতার শিরোনাম হয়েছিলেন উক কুন্দর।
উক বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি আমার বয়স হয়েছে। এখন আর আমি তরুণী নই যে, একজন পুরুষকে আকর্ষণ করতে পারব। আমার আবার বিয়ে করতে চাওয়ার কারণ একাকিত্ব ও নিরাপত্তাহীনতা দূর করা। আর কোনো কারণ নেই।’ তিনি জানালেন, আগামী সপ্তাহে ঈদ। এ সময় স্বামী পাশে না থাকায় একাকিত্ব বোধ করছেন তিনি। এর আগে উক কুন্দরকে বিয়ে করার পর মুহাম্মদ বলেছিলেন, স্রষ্টার ইচ্ছায় তাঁরা পরস্পরের প্রেমে পড়েন। মুহাম্মদ উকের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।

শেরপুর জেলায় শ্রেষ্ঠ পাঁচ করদাতা নির্বাচিত

শেরপুর জেলার পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ীকে বিগত ২০০৮-০৯ অর্থবছরের জন্য শ্রেষ্ঠ করদাতা নির্বাচন করা হয়েছে।
এই করদাতারা হলেন মেসার্স আকরাম কনস্ট্রাকশনের মালিক মো. আকরাম হোসেন, নয়ানী বাজার মহল্লার বাসিন্দা বিপ্লব সরকার, মধ্যশেরী মহল্লার বাসিন্দা সৈয়দ আরিফুল ইসলাম উজ্জ্বল, শেরপুরের চালকলের মালিক জয়নাল আবেদীন ও নূরনবী মোল্লা।
মো. আকরাম হোসেন পর পর দুবার সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবে সম্মাননা পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
শেরপুর জেলা আয়কর বিভাগের সহকারী কর কমিশনার মো. আবদুল আওয়াল গতকাল প্রথম আলোকে জানান, মঙ্গলবার (আজ) ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁদের সম্মাননা পুরস্কার দেওয়া হবে।

দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ ওয়েবসাইট চালু হয়েছে

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সম্প্রতি www.mamB2B.com নামে একটি ওয়েবসাইটের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই ওয়েবসাইট মূলত একটি বিজনেস টু বিজনেস ডিরেক্টরি।
এতে দেশের সব রপ্তানিকারক কোম্পানি তাদের পণ্যের নাম, বিস্তারিত বিবরণ, পণ্যের ছবি ও নিজস্ব ওয়েবসাইট সংযোজন করতে পারবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আমদানিকারকেরা যাতে খুব সহজে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের বিস্তারিত তথ্য পান, সে জন্য অনলাইনে গুগল, ইয়াহু! ফেইসবুকসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ও সংবাদমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।
mamB2B.com-এ লগ ইন করে আমদানিকারকদের সঙ্গে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা লাইভ চ্যাটের মাধ্যমে যোগাযোগ করার সুযোগ পাবেন। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে এই সুবিধা গ্রহণ করা যাবে। এই ওয়েবসাইটে ক্রেতারা তাঁদের পণ্যের প্রয়োজনীয়তা বা চাহিদার তালিকা পোস্ট করার সুযোগ পাবেন। ফলে রপ্তানিকারকেরা খুব সহজে পণ্যের অর্ডার গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি রপ্তানিকারকেরাও তাঁদের পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করতে পারবেন।
এ ওয়েবসাইটটি চালু করেছে mamsIT.com নামের একটি IT প্রতিষ্ঠান।

৪টি হ্যান্ডসেটসহ নতুন প্যাকেজ ছেড়েছে ওয়ারিদ

গ্রাহকদের ভিন্ন ভিন্ন চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে ওয়ারিদ গতকাল সোমবার থেকে নকিয়া, স্যামসাং এবং এইচটিসি ব্র্যান্ডের আকর্ষণীয় হ্যান্ডসেটসহ চারটি নতুন বান্ডেল প্যাকেজ চালু করেছে।
নতুন এই অফারে গ্রাহকেরা এক হাজার ৭৯৯ টাকায় সংযোগসহ নকিয়া ১২০৮ হ্যান্ডসেট, এক হাজার ৮৯৯ টাকায় স্যামসাং সি১৪০ হ্যান্ডসেট, দুই হাজার ৯৯ টাকায় স্যামসাং সি১৬০ হ্যান্ডসেট এবং ২৯ হাজার ৯৯৯ টাকায় এইচটিসির হ্যান্ডসেট ও সংযোগ ক্রয় করতে পারবেন।
এইচটিসি টাচ ক্রুইজ প্যাকেজ ছাড়া বাকি তিনটিই প্রিপেইড প্যাকেজ এবং প্যাকেজগুলোতে যথাক্রমে ২৯৯ টাকা, ৩৯৯ টাকা এবং ৪৯৯ টাকার টকটাইম থাকবে, যার মেয়াদ হবে যথাক্রমে তিন মাস, নয় মাস এবং ১২ মাস। এই প্রিলোডেড টকটাইম যেকোনো অপারেটরে ভয়েস কল ও নন-ভয়েস কার্যক্রমে ব্যবহার করা যাবে।
গ্রাহকেরা যদি এইচটিসি টাচ ক্রুইজ সেটের সঙ্গে প্রিপেইড সংযোগ নিতে চান সে ক্ষেত্রে তাঁদের ৫০০ টাকা রিচার্জ করতে হবে। আর পোস্টপেইড সংযোগ নিলে কোনো রিচার্জ করতে হবে না।
দেশজুড়ে ওয়ারিদের গ্রাহকসেবা কেন্দ্রগুলোয় সব হ্যান্ডসেটের প্যাকেজ এবং ফ্রাঞ্চাইজগুলোতে স্যামসাং সি১৪০ হ্যান্ডসেট ও স্যামসাং সি১৬০ হ্যান্ডসেটের প্যাকেজ পাওয়া যাবে।
আবুধাবি গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওয়ারিদ ২০০৭ সালের ১০ মে এ দেশে বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করেছে। ওয়ারিদকে এ দেশে একটি গ্রাহককেন্দ্রিক টেলিফোন কোম্পানিতে পরিণত করার উদ্দেশে নতুন লোগো এবং নতুন ব্র্যান্ড প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোম্পানিটি গত ৫ আগস্ট পুনর্যাত্রা শুরু করেছে।

নিয়ন্ত্রণবিধি সহজ করা ছাড়া এসএমইর উন্নয়ন হবে না

বিশ্বমন্দার প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে দেশে প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগের (এসএমই) উন্নয়ন ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে তাই এসএমই খাতের জন্য সরকারের নিয়ন্ত্রণবিধি সহজ করার তাগিদ দেন উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা।
রাজধানীর পান্থপথে এসএমই ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট ফান্ডের (বিআইসিএফ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে এসএমই খাত উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণবিধির প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে গতকাল সোমবার বক্তারা এসব কথা বলেন। তাঁরা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার জন্য সরকারি বিধিবিধান সংস্কার করারও সুপারিশ করেন।
বৈঠকে ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আফতাব-উল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য দেন ফাউন্ডেশনের উপমহাব্যবস্থাপক আহমেদ আলী শাহ।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিদ্দিক-ই-রব্বানী, আইএফসির ঊর্ধ্বতন কর্মসূচি ব্যবস্থাপক সৈয়দ আকতার মাহমুদ, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক সালমা চৌধুরী জহির, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আফতাব-উল ইসলাম বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত হলো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশ এসএমই খাতের উন্নয়ন করেই অর্থনীতিকে উন্নয়ন করেছে।
আফতাব-উল ইসলাম আরও বলেন, এসএমই খাতের উন্নয়ন হলে প্রচুর কর্মসংস্থান হবে। সুতরাং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেই এসএমই খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা প্রয়োজন।
অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্বমন্দায় দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশকে মন্দার হাত থেকে বাঁচাতে হলে প্রচুর কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আর এ জন্য এসএমই খাতের উন্নয়ন করতে হবে।
মমতাজ উদ্দিন বলেন, দেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য বাধাগুলো হচ্ছে সহজে ট্রেড লাইসেন্স না পাওয়া, আয়কর ও ভ্যাট নিবন্ধনে জটিলতা এবং ঋণ পেতে হয়রানি। তিনি এসএমই খাতের উন্নয়নে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ সুদহারে ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করেন।
সৈয়দ আকতার মাহমুদ বলেন, প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে এগিয়ে যেতে হলে সরকারি নিয়ন্ত্রণবিধির সংস্কার করতে হবে। বিদ্যুত্সহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক সময় লাগে। কিন্তু কেবল বিধিবিধান সংস্কার করে হয়রানি কমানো হলে দ্রুত উন্নয়ন করা সম্ভব হয়।
বেসরকারি খাতের উন্নয়নের স্বার্থে বেটার বিজনেস ফোরাম (বিবিএফ) ও রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশনকে (আরসিসি) কার্যকর করার সুপারিশ করেন সৈয়দ আকতার।
গোলাম মোয়াজ্জেম ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের সমস্যা সমাধানে এসএমই ফাউন্ডেশনকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
সিদ্দিক-ই-রব্বানী বলেন, ‘দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন না করে কেবল বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে এসএমই খাতের উন্নয়ন সম্ভব হবে না। তা ছাড়া এ খাতের উন্নয়নে সরকারকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা নয়, সহায়কের ভূমিকা রাখতে হবে।’
তিনি এসএমই খাতের সব ধরনের কর ও ট্রেড লাইসেন্স নিবন্ধনের আওতার বাইরে রাখার প্রস্তাব করেন।

অর্থনৈতিক সংকটের এক বছর

এক বছর আগে ২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ১৫৮ বছর বয়সী বিনিয়োগ ব্যাংক লেম্যান ব্রাদার্সকে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। ৬০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ নিয়ে লেম্যানের পতন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বৃহত্তম দেউলিয়াপনার ঘটনা।
আর লেম্যান ব্রাদার্সের পতনের মধ্য দিয়ে গোটা ওয়ালস্ট্রিটে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ধস নামে। স্পষ্টতর হয়ে ওঠে আর্থিক সংকটের বিষয়টি। বন্ধকি ঋণের বিপর্যয় থেকে সৃষ্ট এই সংকট রূপ নেয় বিশ্বমন্দায়। যুক্তরাষ্ট্র মন্দাকবলিত হয়ে পড়ে যা বিস্তৃত হয় ইউরোপ ও এশিয়ায়। এই সংকটের ধাক্কায় বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর কী দশা হয়েছে, তাই তুলে ধরা হয়েছে এএফপি গ্রাফিক্সে।
সংকট কাটাতে আমেরিকার সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢালতে আরম্ভ করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে, যা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। এক বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অবশ্য এই উদ্ধার কর্মসূচির পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। বলতে চেয়েছেন, এর মাধ্যমে দ্বিতীয় মহামন্দা রোধ করা গেছে। ওয়ালস্ট্রিটের ফেডারেল হলে তাঁর যে ভাষণ দেওয়ার কথা (এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তা হয়নি), তাতে এসব বিষয় থাকছে।

সেরেনার শাস্তি

সম্ভাব্য সর্বোচ্চ শাস্তিটাই হলো সেরেনা উইলিয়ামসের। কিম ক্লাইস্টার্সের বিপক্ষে ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের দায়ে ১০ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছে মেয়েদের টেনিসের দুই নম্বর তারকাকে। কোর্টে অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের সর্বোচ্চ শাস্তি এটাই। এ ছাড়া র্যাকেট ছুড়ে মারায় আরও বাড়তি ৫০০ ডলার গুনতে হবে সেরেনাকে। অঙ্কটা অবশ্য সেরেনার কাছে খুবই নগণ্য, এই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠেই প্রাইজমানি জিতেছেন সাড়ে তিন লাখ ডলার।
প্রথম সেট হারার পর দ্বিতীয় সেটে ৫-৬ অবস্থায় যখন সেরেনা ১৫-৩০-এ পিছিয়ে, এমন সময় প্রথম সার্ভিসটি মিস করেন সেরেনা। দ্বিতীয় সার্ভিসের সময় লাইন্সউওম্যান ফুট-ফল্ট কল করেন। ক্ষিপ্ত সেরেনা এ সময় লাইন্সউওম্যানকে গালাগালি শুরু করেন। সেরেনাকে এক পয়েন্ট জরিমানা করলে ক্লাইস্টার্স ম্যাচ জিতে যান। টুর্নামেন্ট অফিশিয়ালরা ভিডিও দেখে এবং সেরেনা ও ম্যাচ আম্পায়ারের সাক্ষাত্কার নিয়ে এই শাস্তি ঘোষণা করেন।
শনিবারের ঘটনার এক দিন পর গতকাল রাতেই বড় বোন ভেনাসকে সঙ্গে নিয়ে দ্বৈতের ফাইনালে আবার আর্থার অ্যাশ স্টেডিয়ামে নামার কথা ছিল সেরেনার।

দুই পর্বে বাংলাদেশের ইংল্যান্ড সফর

মাঝখানে এশিয়া কাপ পড়ে যাওয়ায় ২০১০ সালে বাংলাদেশ দলের ইংল্যান্ড সফর হবে দুই ভাগে। প্রথম ভাগে হবে দুটি টেস্ট, পরের অংশে তিনটি ওয়ানডে। কাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) মুলতবি সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
ইংল্যান্ড সফরে দুই টেস্টের সিরিজের আগে দুটি তিন দিনের ম্যাচ ও একটি চার দিনের ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ দল। এর পর এশিয়া কাপ খেলে বাংলাদেশ দল আবার ইংল্যান্ডে যাবে। সফরের এ অংশে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের আগে আছে দুটি এক দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ। এশিয়া কাপের জন্য ইংল্যান্ড সফরের মাঝে ছেদ পড়লেও এখনো চূড়ান্ত নয় এশিয়া কাপ কোথায় হবে। তবে বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস কাল জানিয়েছেন, সেটি হতে পারে বাংলাদেশেও, ‘বাংলাদেশে এশিয়া কাপ আয়োজনের একটা প্রস্তাব আছে। কিন্তু ২০১১ বিশ্বকাপের জন্য সে সময় আমাদের স্টেডিয়ামগুলোয় সংস্কারকাজ চলবে। তখন এখানকার পরিবেশ কেমন থাকবে, সেটা বিবেচনা করে আমাদের চিন্তাভাবনা করতে হবে। তা ছাড়া ওই সময়ে বাংলাদেশের আবহাওয়া ক্রিকেট উপযোগী থাকবে কি না, সেটাও বিষয়।’
সভায় জাতীয় দলের সহকারী কোচ হিসেবে খালেদ মাহমুদকেই রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং জিম্বাবুয়ে সফরে মাহমুদ সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করলেও মূলত তিনি ছিলেন একাডেমির দায়িত্বে। ২০১০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত দলের সঙ্গে থাকবেন বোলিং কোচ চম্পকা রামানায়েকে। একই বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত চুক্তি বেড়েছে কম্পিউটার অ্যানালিস্ট নাসির আহমেদ এবং বয়সভিত্তিক পর্যায়ের দুই নির্বাচক এহসানুল হক ও সাজ্জাদ আহমেদের। গতকালের সভায় চুক্তি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়নি কেবল জাতীয় দলের ফিল্ডিং কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনেরই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আসন্ন হোম সিরিজের পর তাঁর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন জালাল ইউনুস, ‘ক্রিকেট অপারেশন্স বিভাগ থেকেই বলা হয়েছে, জিম্বাবুয়ে সিরিজের পর তাঁর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হবে। সেজন্যই আজ (কাল) এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’ সভায় জিম্বাবুয়ে ও ইংল্যান্ড সফরের জন্য অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক করা হয়েছে মাহমুদুল হাসানকে, সহ-অধিনায়ক অমিত মজুমদার।
বিদেশ সফরে দলনেতা হিসেবে জাতীয় দলের সঙ্গে একজন করে বোর্ড পরিচালক পাঠানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জালাল ইউনুস। তবে আট সদস্যের টিম ম্যানেজমেন্টের পুরো কাঠামো এখনো চূড়ান্ত নয়। জাতীয় দলের টিম স্পনসর হিসেবে গ্রামীণফোনের মেয়াদ আগামী ৩১ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মাঝে জিম্বাবুয়ে সফর পড়ে যাওয়ায় সেটা বাড়ানো হয়েছে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত।
সিনা ইবনে জামালীর জন্য বিসিবি সভাপতি হিসেবে পরিচালনা পরিষদের দশম সভাটাকেই ধরে নেওয়া হচ্ছে শেষ সভা। নতুন বোর্ড সভাপতির নাম ঘোষণা করার কথা এ সপ্তাহেই। তবে জালাল ইউনুস জানিয়েছেন, সভায় এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি, ‘সরকারের কাছ থেকে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। যতক্ষণ না সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত আসে, তিনিই (সিনা ইবনে জামালী) আমাদের বোর্ড সভাপতি।

ভারতকে ট্রফি দেখাচ্ছেন টেন্ডুলকার

২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করা দলের উইকেট-প্রতি সবচেয়ে কম রান হয়েছে এই প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে। দিনের বেলা আর ফ্লাড লাইটে উইকেটের চরিত্র কেমন পাল্টে যায় সেটা তো দেখেছেন আগের ম্যাচেই। ‘অবশ্যই আমরা ব্যাট করব’ টস জিতে হাসিমুখে মহেন্দ্র সিং ধোনির বলা এই কথায় তাই অবাক হলেন না কেউ। ধোনির হাসি আরও চওড়া হলো নিজেদের ইনিংস শেষে। সৌজন্য আরও একবার শচীন টেন্ডুলকার।
লিটল মাস্টারের পুরোনো দিনকে মনে করিয়ে দেওয়া এক সেঞ্চুরি আর অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের হাফ সেঞ্চুরিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩১৯ রান করেছে ভারত। বিশাল লক্ষ্যের পেছনে শুরুটা দারুণ করলেও স্পিনাররা ম্যাচে ফিরিয়েছেন ভারতকে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১৮ ওভারে ১৩২ রান তুলতেই ইনিংসের অর্ধেক হারিয়ে ফেলেছে শ্রীলঙ্কা। অধিনায়ক সাঙ্গাকারার (১৯) সঙ্গে উইকেটে ছিলেন থিলান কান্দাম্বি (১)।
আগের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে পর্যদুস্ত হওয়ার পর কাল ভারতের ইনিংসের সূচনা করেছিলেন টেন্ডুলকার ও রাহুল দ্রাবিড়। ১৭.২ ওভারে ৯৫ রান তুলে ভারতকে দারুণ এক ভিত গড়ে দেয় এই জুটি। দ্রাবিড়কে শর্ট কাভারে দিলশানের ক্যাচ বানিয়ে সনাত্ জয়াসুরিয়া জুটিটা ভাঙলেও ভারতকে এগিয়ে নেওয়ার কাজটা করেন বর্তমান ও সাবেক অধিনায়ক। ৭৮ ম্যাচ আর ৫ বছরের অপেক্ষার পর ১৯৯৪ সালে প্রেমাদাসায় নিজের ওয়ানডে সেঞ্চুরি-খরা কাটিয়েছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। কাল পেলেন চতুর্থ সেঞ্চুরি। ১৩৮ রানের এই ইনিংসের পথে কাল এ মাঠে নিজের ১০০০ রানও পার করে ফেলেছেন। তবে এসব কোনোটার জন্যই নয়, টেন্ডুলকারের কালকের ইনিংসটা মনে থাকবে নব্বইয়ের দশককে মনে করিয়ে দেওয়া ব্যাটিংয়ের কারণে। দুর্দান্ত সব কাভার ড্রাইভ-স্কয়ার ড্রাইভ, ফ্লিক, অফ স্টাম্পের বল কবজির মোচড়ে মিড উইকেট বাউন্ডারিতে পাঠানো...কী খেলেননি তিনি? ফ্রি হিট পেয়ে ৪৭ বলে হাফ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেছেন যে শটটি খেলে, কাল সেটি ছিল তাঁর বাতাসে ভাসিয়ে প্রথম কোনো শট।
দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরিতে বল খেলেছেন আরও দুটি কম। মেন্ডিসের বলে কাভারের ওপর দিয়ে সীমানা ছাড়া করার পরের দুই বলে রিভার্স সুইপ করে দুটি চার। পরের বলে আবারও একই শট খেলতে গিয়ে এলবিডব্লু। ৪৪তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করে যখন ফিরছেন, পুরো প্রেমাদাসা তখন দাঁড়িয়ে। শচীনের সঙ্গে ধোনির নিয়ন্ত্রিত আর যুবরাজের আগ্রাসী দুটি ৫৬ রানের ইনিংসে ভারত পৌঁছে যায় ৩১৯ রানের নিরাপদ দূরত্বে।
প্রেমাদাসায় সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ২৭১, শ্রীলঙ্কার সবগুলো ভেন্যু হিসাব করলে সেটা আর মাত্র ১৮ বেশি। এ রিপোর্ট লেখার সময় বিশ্বের প্রথম ডিজিটাল কাপটা ধোনির হাতে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ছিল।

পেরেছেন ফেদেরার

যমজ কন্যার বাবা হওয়ার পর প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম জিততে পেরেছেন রজার ফেদেরার? কিংবা ১৯৬৯ সালে রড লেভারের পর প্রথম এক বছরে টানা তিনটি গ্র্যান্ড স্লাম? টানা ষষ্ঠ ইউএস ওপেন জিতে ছুঁয়েছেন আমেরিকার বিল টিলডেনকে? নাকি অল ইংল্যান্ড ক্লাবের মতো ফ্লাশিং মিডোতেও মুখ থুবড়ে পড়েছে টানা ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্ন?
এই লেখা যখন পড়ছেন, তখন সবগুলো প্রশ্নের উত্তরই জেনে যাওয়ার কথা। গত কিছুদিনের ধারাবাহিকতার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে নিউইয়র্কের আকাশ যদি কান্নাকাটিতে একটু ক্ষান্তি দেয়, তাহলে বাংলাদেশ সময় ভোররাতেই এবারের ইউএস ওপেনের পুরুষ এককের শিরোপার ফয়সালা হয়ে গেছে। ফেদেরার আর এত সব কীর্তির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন হুয়ান মার্টিন দেল পোত্রো। গত পরশু সেমিফাইনালে রাফায়েল নাদালকে হারিয়ে যিনি জন্ম দিয়েছেন বড় এক আপসেটের।
একসঙ্গে এতগুলো কীর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ফেদেরার ছিলেন রোমাঞ্চিত, ‘বাবা হওয়ার পর প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম জয়টা হবে অসাধারণ। টানা তিনটি স্লাম জয়টাও হবে বিশেষ কিছু। আমি দারুণ বোধ করছি, আশা করি আমি পারব।’ এটুকু বলার পরই হয়তো ২৮ বছর বয়সী সুইসের মনে পড়ে গিয়েছিল টানা ছয়টি শিরোপা জয়ের সম্ভাবনার কথা, ‘এটা হবে অদ্ভুত। উইম্বলডনে অনেক কাছে গিয়েও আমি পারিনি, আশা করছি এবার সবকিছুই ভালোভাবে হবে।’ প্রতিপক্ষ দেল পোত্রোর বিপক্ষে মুখোমুখি ছয় লড়াইয়ের প্রতিটিতেই জিতেছেন, তবে তার পরও সতর্ক ফেদেরার, ‘আমি নিশ্চিত, দেল পোত্রো আমাকে সহজে ছাড় দেবে না। রাফার (নাদাল) বিপক্ষে সে দারুণ খেলেছে। প্রতি মাসেই সে উন্নতি করছে। টেনিস কোর্টে তার কী করা উচিত, সেটা সে এখন আরও ভালো জানে।’
ফেদেরারকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে সেমিফাইনালের পারফরম্যান্স। নোভাক জোকোভিচকে টানা দ্বিতীয়বার সেমিফাইনাল থেকে ফিরিয়েছেন ৭-৬ (৭/৩), ৭-৫, ৭-৫ গেমে হারিয়ে। দর্শকদের মাতিয়েছেন ‘ফেড এক্সপ্রেস’ তাঁর উইনিং শটটি দিয়ে। নেটের দিকে পেছন ফিরে দুই পায়ের মাঝ দিয়ে দুর্দান্ত এক ফোরহ্যান্ড, হতভম্ব জোকোভিচের তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করা ছিল না। ফেদেরার নিজেও এটিকে বলেছেন ক্যারিয়ারের সেরা শট, ‘প্র্যাকটিসে আমি এটা প্রচুর অনুশীলন করি, কিন্তু কখনোই ঠিকমতো পারি না। আর এখানে গ্র্যান্ড স্লাম সেমিফাইনালে ম্যাচ পয়েন্টের সময়...এ কারণেই আমার মনে হয় এটা আমার ক্যারিয়ারের সেরা শট।’
ফেদেরারের ফাইনালে ওঠায় কোনো বিস্ময় নেই। বিস্ময় বললে বলতে হয় রাফায়েল নাদালকে ৬-২, ৬-২, ৬-২ গেমে উড়িয়ে দিয়ে দেল পোত্রোর ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্লামের ফাইনালে ওঠা। এই সাফল্যে আকাশে উড়ছেন ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা এই আর্জেন্টাইন, ‘এটা আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত। রাফা গ্রেট খেলোয়াড়। সে পাঁচ-ছয় ঘণ্টাও দৌড়াতে পারে। কিন্তু আমার সেরাটা দিয়েছি এবং আমি ফাইনালে! আর গ্র্যান্ড স্লাম ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে পরাজয়ের জন্য টানা খেলার ক্লান্তি এবং হাঁটুর চোটকে দায়ী করেছেন রাফায়েল নাদাল।

টেনিস-মায়ের রূপকথা

শেষ পয়েন্টটা জয়ের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন কোর্টে, চোখে বাঁধভাঙা জল। লুকানোর কোনো চেষ্টাও করছেন না। এ যে আনন্দাশ্রু! অপ্রত্যাশিত, কল্পনারও অতীত কিছু পাওয়ার আনন্দ। মাস দেড়েক আগেও স্বামী-সন্তান আর সংসার সামলাতেই যার দিন-রাত একাকার হয়ে যেত, সেই কিম ক্লাইস্টার্সের হাতে এখন ইউএস ওপেন ট্রফি। ফ্লাশিং মিডোয় চমক দেখানো দুই ফাইনালিস্টের লড়াইয়ে ক্যারেলিন ওজনিয়াকিকে ৭-৫, ৬-৩ গেমে হারিয়ে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্লাম জিতলেন এক কন্যার জননী এই বেলজিয়ান।
২০০৭ সালের মে মাসে একের পর এক চোট-আঘাত আর পেশাদার টেনিসের ব্যস্ত জীবনে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে বিদায় জানিয়েছিলেন কোর্টকে। এর পর তিনি শুধুই গৃহিণী। ২৭ মাস ঘরকন্নার পর হঠাত্ই কোর্টের দিনগুলোর কথা মনে পড়ছিল। মনের খোরাক মেটাতেই তাই ফিরলেন আগস্টের শুরুতে। ইউএস ওপেন খেলতে পেরেছেন আয়োজকেরা ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ দিয়েছিলেন বলেই। এর পর এক একটি ধাপ পেরিয়েছেন আর এগিয়ে গেছেন ইতিহাসের দিকে। মার্গারেট কোর্ট আর ইভোন গুলাগংয়ের পর মাত্র তৃতীয় ‘মা’ হিসেবে গ্র্যান্ড স্লাম জিতেছেন—ইতিহাসের অংশ হতে শুধু এটুকুই যথেষ্ট। কীর্তিটা আরও মহিমান্বিত হয়ে যাচ্ছে পুরুষ-মহিলা মিলিয়েই একমাত্র ওয়াইল্ড কার্ডধারী হিসেবে ইউএস ওপেন জিতেছেন বলে। এমন একটা কীর্তি গড়ে এই বেলজিয়ান শুধু টেনিস বিশ্বকেই নয়, চমকে দিয়েছেন নিজেকেও, ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না এটা সত্যিই ঘটেছে। ফিরেই দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্লাম জয়টাকে এখনো স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। এখানে আমি শুধু আগামী বছরের জন্য প্রস্তুতি নিতে চেয়েছিলাম।’
ক্লাইস্টার্সের আনন্দটা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল দর্শক গ্যালারিতে স্বামী সাবেক বাস্কেটবল তারকা ব্রায়ান লিঞ্চ ও ১৮ মাস বয়সী কন্যা জাডার উপস্থিতি, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা বিশ্বজয়। বোঝাতে পারব না আমি কত খুশি! আমার স্বামী, মেয়ে আর পুরো দলের সঙ্গে আনন্দটা ভাগ করে নিতে পারছি।’
ইউএস ওপেন জেতা ক্লাইস্টার্সের কাছে এটা একরকম শিরোপা ধরে রাখাও। দিনারা সাফিনার মতো কোনো গ্র্যান্ড স্লাম না জিতেই র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ওঠার পর টীকা-টিপ্পনী কম শুনতে হয়নি তাঁকেও। ২০০৫ সালে এখানে শিরোপা জিতেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন সমালোচকদের মুখ। পরের বছর খেলেননি ইনজুরির জন্য, এর পর তো চলে গেলেন অবসরে। তাঁকে সুযোগ দেওয়ার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ দেওয়ার পর জানিয়েছেন নিজের সংসারে ফিরে যাওয়ার জন্য আর তর সইছে না তাঁর, ‘এই টুর্নামেন্ট দিয়ে আমি মূল স্রোতে ফিরতে চেয়েছিলাম, ওয়াইল্ড কার্ড দেওয়ার জন্য তাই ইউএস টেনিস ফেডারেশনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এখন বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য আমি উন্মুখ হয়ে আছি।’
ক্লাইস্টার্সের মতো হারানোর কিছু ছিল না ওজনিয়াকিরও, ছিল পাওয়ার। প্রথম ডেনিস হিসেবে গ্র্যান্ড স্লাম ফাইনালে উঠেই গড়েছেন ইতিহাস। চ্যাম্পিয়ন হলে ইতিহাসে জায়গাটা পাকাপোক্ত হয়ে যেত, তবে যা পেয়েছেন তাতেও কম খুশি নন এই ১৯ বছর বয়সী। হারার পরও মুখে সেই পরিচিত হাসি, ‘ব্লন্ড কন্যা’ মেনে নিয়েছেন প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্বও, ‘কিম অসাধারণ খেলেছে। সে দেখিয়েছে সে কতটা ভালো খেলোয়াড়। জিতলে অবশ্যই দারুণ হতো, তবে সে আমার চেয়ে ভালো খেলেই জিতেছে।’ ।