Saturday, December 13, 2014

‘গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে’ -খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, স্বাধীনতার পর থেকেই অগণতান্ত্রিক শক্তি তাদের মুখোশ খুলে ফেলে দেশের মানুষের সার্বজনীন গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো একের পর এক অমানবিক কায়দায় দমন করে। আর এই কারণেই সীমাহীন রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব দিনে দিনে দুর্বল করা হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে। ১৪ই ডিসেম্বর ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ উপলক্ষে  শনিবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বাণীতে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ১৪ই ডিসেম্বর একটি বেদনাময় দিন। বাংলাদেশকে মেধা-মননে পঙ্গু করার হীন উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত বিজয়ের ঊষালগ্নে এ দিনে হানাদার বাহিনীর  দোসররা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক বিজ্ঞানীসহ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের নৃশংসভাবে হত্যা করোছিলো। তারা মনে করেছিল জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করলেই এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়বে এবং উন্নয়ন অগ্রগতি রুদ্ধ করে দেয়া যাবে। কিন্তু তাদের সে লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে। খালেদা জিয়া বলেন, অমর বুদ্ধিজীবীরা দেশের বরেণ্য শ্রেষ্ঠ সন্তান, যারা একটি সমৃদ্ধ এবং মাথা উঁচু করা জাতি দেখতে চেয়েছিলেন। তারা ন্যায় বিচারভিত্তিক শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা করেছিলেন।  দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা আন্তর্জাতিক অপশক্তি তাদের সে প্রত্যাশাকে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বিভেদ অনৈক্য এবং সংকীর্ণতার দ্বারা জাতীয় অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে। সুতরাং আমাদের রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশ এবং দেশকে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালনে আন্তরিক হতে হবে। এ ক্ষেত্রে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা আমাদের  প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে যাবেন। তিনি বলেন, আজকের এ শোকাবহ দিনে আমি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই-আসুন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা এক সঙ্গে কাজ করি। আমি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

এভাবে শিক্ষার ভিত শক্ত হয় না by ড.সরদার এম আনিছুর রহমান

শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো অনেকেই দীর্ঘদিন থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও এর ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে কথা বলে আসছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ২৭ নভেম্বর যখন জাফর ইকবালের ‘দোহাই, আমাদের শিশুদের ক্রিমিনাল বানাবেন না’ শিরোনামে লেখাটি পড়ছিলাম, তখন নিজের ভেতরকার কষ্টটা যেন আরও বেড়ে গেল।
জাফর ইকবাল লিখেছেন, এত দুঃখ নিয়ে এর আগে তিনি কখনও কাগজ-কলম নিয়ে বসেননি। এরপর তিনি দেশের বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। তুলে ধরেছেন প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি। এখানে তিনি সবচেয়ে যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বলার চেষ্টা করেছেন সেটি হল, ‘আমাদের শিক্ষানীতিতে পঞ্চম শ্রেণীর শিশুদের জন্য কোনো পাবলিক পরীক্ষার কথা বলা নেই, আমলারা নিজেদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে এটি বের করে জোর করে তা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাবা-মায়েরা আগে আরও বড় হওয়ার পর ছেলেমেয়েদের কোচিং করতে পাঠাতেন। এখন এ শিশুদেরই গোল্ডেন ফাইভ পাওয়ার জন্য কোচিং করতে পাঠাচ্ছেন। তাতেই শেষ হয়ে যায়নি- এখন তাদের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করা হচ্ছে, ছোট ছোট শিশুদের হাতে ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন ধরিয়ে দিয়ে পরীক্ষা দিতে পাঠানো হচ্ছে, সেই ছোট ছোট শিশুদের অন্যায় করতে শেখানো হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও এ নজির নেই, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার দেশের শিশুদের অন্যায় করতে শেখায়। একটা দেশের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার এর চেয়ে পরিপূর্ণ কোনো পদ্ধতি আছে কি?’
আমাদের নীতিনির্ধারকরা যদি মুহম্মদ জাফর ইকবালের এ কথাগুলো একবার হৃদয় দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করতেন, তাহলে হয়তো আমরা সহজেই জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হতাম। কিন্তু যেখানে নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে সবাই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, সেখানে কে শুনবে এসব কথা?
‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’- এ কথা আমরা সবাই স্বীকার করি এবং মুখে উচ্চারণ করি; কিন্তু বাস্তবে যত অবহেলা সব শিক্ষার প্রতি। তা না হলে কি ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীরা জাতির এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মতো করে খেলাঘর সাজাতে পারতেন? বিগত কয়েকটি সরকারের আমলে লক্ষ্য করা গেছে, নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই সেই সরকারের শিক্ষামন্ত্রী নতুন কিছু করে নিজের কৃতিত্ব জাহিরের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় হাত দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং নতুন কিছু করে কৃতিত্ব জাহির করতে গিয়ে জাতির মেরুদণ্ডকে আরও বেশি দুর্বল করা হয়েছে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। বরং অন্যদের চেয়ে তাকে একটু বেশি উৎসাহী বলেই মনে হয়েছে। বিগত মহাজোট সরকারের ৫ বছরের প্রথম দিকে শিক্ষামন্ত্রী জাতিকে নতুন নতুন স্বপ্নের কথা বলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় হাত দেন এবং ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। তিনি এমন সব পদক্ষেপ নেন যে, তা ২-৩ বছরের ব্যবধানেই ম্লান হয়ে যায়। ধীরে ধীরে আমাদের সামনে ফুটে ওঠে এর ত্র“টিপূর্ণ দিকগুলো।
শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত ইচ্ছায় শিশুদের জন্য পিএসসি ও জেএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা চালু করা হল। এর ফলে জাতির মেরুদণ্ডে আঘাত এলো আরও বেশি করে। এখানেই শেষ নয়, যে কোচিং-বাণিজ্য শিক্ষাকে গ্রাস করছিল, তা আরও বেশি চাঙ্গা হয়ে উঠল। শিশুরা শিখল কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে পরীক্ষা দিয়ে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেতে হয়।
কীভাবে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে জীবনকে ধ্বংস করতে হয়।
শিক্ষাকে সাধারণত শিক্ষার্থী বা অভিভাবকরা জীবনে সফল হওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করেন। জীবনব্যাপী শিক্ষা গ্রহণের অভ্যাস ও নেতৃত্বের গুণাবলী তৈরির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিশ্বসমাজের উপযুক্ত, কর্মক্ষম নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যম এটি। এদিক থেকে শিক্ষাকে উৎপাদনশীল একটি শিল্প হিসেবে বিবেচনা করলে বলা যায়, দেশ ও বিশ্বসমাজের উন্নতির জন্য মানুষকে দক্ষ ও আদর্শবান নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কি সেটা করতে পারছে? এর উত্তরে সবাই হয়তো বলবেন, না। কিন্তু কেন পারছে না, সেটা কি আমরা একটু খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছি?
তাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার লেখায় প্রশ্ন তুলেছেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে ছোট ছোট শিশুদের অন্যায় করতে শেখানো হচ্ছে। সারা পৃথিবীর কোথাও এ নজির নেই, যেখানে একটি রাষ্ট্র তার দেশের শিশুদের অন্যায় করতে শেখায়। একটা দেশের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার এর চেয়ে পরিপূর্ণ কোনো পদ্ধতি আছে কি? নাই। সারা পৃথিবীতে কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। শুধু আমাদের দেশেই, কিছু আমরা আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, একটা শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। যে জাতি শৈশবে অন্যায় করতে শিখে বড় হয় সেই জাতি দিয়ে আমরা কী করব?’
তাই তিনি এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার হর্তাকর্তাদের কাছে করজোরে প্রার্থনা করেছেন এ অবস্থা থেকে দেশের শিশুদের মুক্তি দিয়ে জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য।
‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’ কথাটার সারমর্ম হল, কোনো জাতিকে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে প্রথমে তার মেরুদণ্ড শক্ত ও সোজা করতে হয়। আমরা দেখতে পাই, শিক্ষায় যে জাতি যত বেশি উন্নত, সে জাতি সব ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় অগ্রগতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। সেই রোমান সভ্যতা থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বিশ্বেও এ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ইউরোপীয়রা। তাদের উন্নতির কথা আমাদের সবারই জানা।
অন্যদিকে বলা যায়, কোনো জাতিকে অকার্যকর করে রাখতে হলে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্ত ভিত্তির ওপর গড়ে উঠতে না দেয়ার নীতি অনেক আগে থেকেই অবলম্বন করে আসছে সাম্রাজ্যবাদীরা। প্রায় দুইশ’ বছরের ব্রিটিশ গোলামি এবং দুই যুগের পাকিস্তানি গোলামি থেকে আমরা স্বাধীন হয়েছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৩ বছর অতিবাহিত হচ্ছে, কিন্তু আমরা কি মেরুদণ্ড শক্ত করতে পেরেছি?
এজন্য যে মহাপরিকল্পনা ও সুনির্দিষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন, আমরা কি সেটা পেয়েছি? বলা যায়, এর কোনোটিই নেই আমাদের। যখন যে সরকার ক্ষমতাসীন হয়, তারা নিজেদের মতো করে চিন্তা করে এবং শিক্ষায় নিজের দৃষ্টিভঙ্গি টেনে এনে তা বাস্তবায়ন করতে চায়। এতে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। আর এ সুযোগে বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে রাখার চেষ্টা করছে। এটা জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়।
তাই মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গে সুর মিলিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানাতে চাই, দয়া করে জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন। তা না হলে যত ভালো কাজই করুন না কেন, এতে জাতির কোনো লাভ হবে না। জাতির সার্বিক উন্নয়ন করতে হলে মেরুদণ্ডকে প্রথমে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে।
ড. সরদার এম আনিছুর রহমান : শিক্ষা ও সমাজবিষয়ক গবেষক

ফুলবাড়ী, সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর by আনু মুহাম্মদ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের নামে সরকার বারবার যেসব পথ গ্রহণ করছে, সেগুলো দেশের জন্য সর্বনাশা পথ। ফুলবাড়ী, সুন্দরবন, বঙ্গোপসাগর পড়ছে হুমকির মুখে। সুন্দরবন-কৃষিজমি-শহর ধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র; ফুলবাড়ী-বড়পুকুরিয়ার উন্মুক্ত খনির চক্রান্ত অব্যাহত রাখা; বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লক একতরফা অধিকতর সুবিধা দিয়ে বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়ার জন্য পিএসসি ২০১২ সংশোধন ও পরে তাড়াহুড়া করে আকর্ষণীয় প্যাকেজ দেয়ার জন্য পিএসসি ২০১৫ প্রণয়ন; কুইক রেন্টালের নামে ১৪ থেকে ১৭ টাকা কিংবা তারও বেশি দরে বিদ্যুৎ ক্রয়; কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি না করে, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করে রূপপুরে বিদেশী কোম্পানিনির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ ইত্যাদি দেশী-বিদেশী কতিপয় গোষ্ঠীর মুনাফা ও লুটপাটের ব্যবস্থা করছে; কিন্তু দেশের জন্য তৈরি করছে বিভিন্নমুখী বিপদ। আর এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এসব কাজ বিঘ্নহীন করার জন্যই জ্বালানি খাতে সব অপকর্মের দায়মুক্তি আইনের মেয়াদ সম্প্রতি আবারও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে সরকারি চলতি বিভিন্ন পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হল- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জনগণের কর্তৃত্ব হ্রাস, দেশী লুটেরা ও বহুজাতিক কোম্পানির কর্তৃত্ব বৃদ্ধি, নিজেদের গ্যাস বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে বেশি দামে ক্রয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি, যার ফলাফল হল একদিকে সংকট ও অনিশ্চয়তা বহাল থাকা, অন্যদিকে বারবার বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমা সত্ত্বেও তেল ও বিদ্যুতের দাম কমানো হয়নি। কুইক রেন্টালের মেয়াদ এখন ২০২০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার অর্থ হল এই বোঝা আরও বাড়ানো এবং আবারও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি। সরকারের এসব ভুলনীতি ও দুর্নীতির বোঝা জনগণের ওপর ফেলতে গিয়ে বারবার জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং দেশী-বিদেশী কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে এবারও সরকার এ পথেই অগ্রসর হচ্ছে। দেশী-বিদেশী বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে দেশের মানুষ কেন এই বোঝা বহন করবে? কেন সমগ্র অর্থনীতি এই বোঝা বহন করবে?
ফুলবাড়ীতে আবারও অস্থিতিশীলতা কেন?
ফুলবাড়ী-বিরামপুর-পার্বতীপুর এলাকায় বেআইনি অনুপ্রবেশ, দুর্র্নীতি ও সন্ত্রাস বিস্তারের অপচেষ্টার মাধ্যমে বারবার অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে জনপ্রত্যাখ্যাত কোম্পানি এশিয়া এনার্জি (জিসিএম)। সর্বশেষ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সূত্রপাত ২৬ নভেম্বর। ওইদিন গোপনে ফুলবাড়ীতে প্রবেশ করতে গিয়ে জনতার প্রতিরোধের মুখে পড়েন এশিয়া এনার্জির প্রধান গ্যারি লাই। পরে পুলিশ তাকে জনরোষ থেকে রক্ষা করে নিয়ে আসে ঢাকায়। ২০০৬ সালে লাখো মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে সরকারি বাহিনীর মাধ্যমে হামলা-ত্রাস চালিয়ে, গুলি করে মানুষ হত্যা করেও টিকতে পারেনি এই এশিয়া এনার্জি। গণঅভ্যুত্থানের মুখে গভীর রাতে কোম্পানির সব কর্মকর্তা ফুলবাড়ী ছেড়ে পালিয়েছিল তখন। এ কোম্পানি দেশের আবাদি জমি, পানি ও মানুষের সর্বনাশ করে শতকরা মাত্র ৬ ভাগ রয়্যালিটি দিয়ে দেশের কয়লা বিদেশে পাচার করতে চেয়েছিল। ২৬ আগস্ট সেই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে সরকারি বাহিনীর পাইকারি গুলিবর্ষণে শহীদ হন ৩ জন, গুলিবিদ্ধ হন ২০ জন, আহত হন দুই শতাধিক। ৩০ আগস্ট ফুলবাড়ী চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে জনগণের বিজয় সূচিত হয়।
কিন্তু চক্রান্ত থামেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে জরুরি অবস্থার সুযোগে কোম্পানি আবারও এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা চালায়। ফুলবাড়ী আন্দোলনের সংগঠকদের ওপর হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, গ্রেফতার, হুমকি, হয়রানি এবং সেইসঙ্গে সংগঠিত মিথ্যা প্রচারণা কোনোকিছুই জনগণকে হটাতে পারেনি। ২০১২ সালের নভেম্বরে সরকার দশ থানার পুলিশ আনিয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে কোম্পানির প্রবেশের রাস্তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে। জনপ্রতিরোধ সেই চেষ্টাও ব্যর্থ করে দেয়। ২০১৩ সালে বস্ত্র বিতরণের প্রতারণামূলক প্রচার করে গ্যারি লাই গং এলাকায় প্রবেশ করতে চেষ্টা করেছিল, তখনও জনপ্রতিরোধের মুখে পুলিশের আশ্রয়ে পালিয়েছিল। সর্বশেষ ২৬ নভেম্বরেও তাদের জনতাড়া খেয়ে পালাতে হয়েছে। চক্রান্ত আছে, জনপ্রতিরোধও জারি আছে। এই অবিরাম প্রতিরোধের মাধ্যমে ফুলবাড়ীসহ ছয় থানার মানুষ শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, পুরো বাংলাদেশকে অচিন্তনীয় এক ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করছেন।
বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডে বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে এশিয়া এনার্জির (জিসিএম) অপতৎপরতার প্রতিবাদে, এ কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তা গ্যারি লাইসহ সহযোগী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও বিচার এবং এশিয়া এনার্জির বহিষ্কারসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখা ২৬ নভেম্বর থেকে লাগাতার কর্মসূচি পালন করছে। ২৬ ও ২৭ নভেম্বর দিনব্যাপী অবরোধ শেষে বিভিন্ন গ্রাম, ইউনিয়ন ও পৌরসভায় প্রায় প্রতিদিন মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে। ২৭ ডিসেম্বর ফুলবাড়ীতে মহাসমাবেশ আহ্বান করা হয়েছে।
মিথ্যাচার, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও চক্রান্তের ওপর ভর করে দেশে-বিদেশে কোম্পানি ও তার নিযুক্ত প্রচারকদের অপপ্রচার এখনও অব্যাহত আছে। বারবার জনগণের তাড়া খাওয়ার পরও তারা দাবি করে বেড়াচ্ছে জনগণ তাদের সমর্থন করে! আইনি কোনো অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও তারা দাবি করে বেড়াচ্ছে এই খনি তাদের!! পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, সরকারের গোপন পৃষ্ঠপোষকতাতেই তারা এ রকম জালিয়াতির সাহস পাচ্ছে। কোম্পানির পক্ষে মার্কিন দূতাবাস ও ব্রিটিশ হাইকমিশনের তৎপরতাও আমরা জানি। অথচ বহু অপরাধ এ কোম্পানির। সেগুলোর মধ্যে আছে : ১. দেশের পানিসম্পদ, আবাদি জমি ও উত্তরবঙ্গের ধ্বংসযজ্ঞের একটি প্রকল্পকে ঘুষ আর কমিশন দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে প্রচার। ২. কোনো ধরনের অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও ফুলবাড়ী কয়লা খনি দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে লন্ডনে এ কোম্পানির শেয়ার ব্যবসা অব্যাহত রাখা। ৩. সেই মুনাফার টাকায় এ দেশে কতিপয় মন্ত্রী, আমলা, কনসালটেন্ট, বিজ্ঞাপনী সংস্থা ভাড়া করে মিথ্যাচার চালানো। ৪. সমর্থকগোষ্ঠী তৈরির চেষ্টায় এলাকায় দুর্নীতি ও মাদকদ্রব্যের বিস্তার ঘটানো। ৫. সম্পদ লুণ্ঠনের প্রয়োজনে খুন, সন্ত্রাস, জখমের নতুন চক্রান্ত ও অপতৎপরতা। এসব অপরাধে এ কোম্পানির কর্মকর্তাদের গ্রেফতার ও বিচার এবং কোম্পানিকে বহিষ্কারের যে দাবি উত্তরবঙ্গের মানুষ তুলেছে তা অবশ্যই ন্যায্য।
অনেকেরই নিশ্চয়ই মনে আছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার ধ্বংসাত্মক উন্মুক্ত খননের বদলে কয়লা উত্তোলনের নিমিত্তে নতুন প্রযুক্তির জন্য অপেক্ষা করার কথা বলেছেন। সেই বক্তব্যের জন্য তিনি সাধুবাদও পেয়েছেন। কিন্তু ২০০৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ফুলবাড়ীর জনগণের কাছে করা তার অঙ্গীকার অনুসারে এশিয়া এনার্জিকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার, উন্মুক্ত কয়লা খনি ও রফতানি নিষিদ্ধসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন তিনি এখনও করেননি। এর ফলে তার সরকারেরই কোনো কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যকে বিভিন্ন সময়ে উন্মুক্ত খননের পক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য দিতে ও তৎপরতা চালাতে দেখা গেছে। লবিস্টদের চক্রান্তমূলক কর্মকাণ্ডও অব্যাহত আছে। এদের সাহসেই গ্যারি লাই এবং তার সহযোগীরা উসকানি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে সাহস পাচ্ছে।
মহাবিপদের মুখে সুন্দরবন সুন্দরবন নিয়েও সরকারের স্ববিরোধী ভূমিকা দেখা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী একদিকে আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলনে সুন্দরবন বাঁচানোর কথা বলছেন, অন্যদিকে তার সরকার দেশী-বিদেশী মুনাফাখোরদের স্বার্থে সুন্দরবনধ্বংসী নানা তৎপরতায় সক্রিয় থাকছে। সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে গত বছর ঢাকা থেকে সুন্দরবন লংমার্চ ছাড়াও প্রতিবাদী কর্মসূচি অব্যাহত আছে। বিভিন্ন প্রকাশনা, গবেষণার মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞরা কেন এ কেন্দ্র বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী, সুন্দরবন ও মানববিধ্বংসী, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ তথ্য-যুক্তিসহ তুলে ধরেছেন। ভারতীয় কোম্পানি (এনটিপিসি) নিজ দেশের আইন ভঙ্গ করে বাংলাদেশের জন্য সর্বনাশা এ প্রকল্পে চালকশক্তি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। সুন্দরবন রক্ষার পক্ষে বিভিন্ন ব্যক্তি, দল, জাতীয় কমিটি ও বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ ও প্রকৃতিকে যে সুন্দরবন রক্ষা করে, অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে যা প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখে সেই সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে এই প্রকল্প।
সরকার এসব যুক্তির প্রতি কর্ণপাত না করে প্রকল্পের কাজ অব্যাহত রেখেছে, উপরন্তু বাংলাদেশের ওরিয়ন নামে আরেকটি কোম্পানিকে সুন্দরবনের আরও নিকটবর্তী স্থানে আরও একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে সরকারি ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের জমি দখল করে সুন্দরবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আরও বনজমি দখলের তৎপরতা এখন জোরদার। বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএইডের তহবিলে তৈরি হচ্ছে নানা প্রকল্প।
বলাই বাহুল্য, সরকারের এসব ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। ইতিমধ্যে ইউনেস্কো এবং রামসার পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, প্রাণ-বৈচিত্র্যের অসাধারণ আধার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম সুন্দরবন ঘিরে একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন মুনাফামুখী তৎপরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আগ্রাসনের মুখে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের পেট্রোবাংলা মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস আর নরওয়ের স্টেটওয়েলের সমবয়সী হলেও প্রতিষ্ঠার ৪০ বছর পরও এই প্রতিষ্ঠানকে নিজের সক্ষম ভিত্তি দাঁড় করাতে দেয়া হয়নি। অক্ষমতার অজুহাতে, পারি না, পারব না এ আওয়াজের মাধ্যমে লুণ্ঠন ও দুর্নীতির প্রকল্প জায়েজ করা হয়েছে, হচ্ছে। বিশাল সম্ভাবনার বঙ্গোপসাগরের সম্পদ আকর্ষণীয় প্যাকেজে এমনভাবে বিদেশী কোম্পানিকে দেয়া শুরু হয়েছে যে, এই সম্পদ দেশের উন্নয়নে কাজে লাগার পরিবর্তে হয়ে উঠতে যাচ্ছে বিপদ। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও রাশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে বঙ্গোপসাগর ভাগবাটোয়ারা করে দেয়ার আয়োজন চলছে। তার জন্য তাদের চাহিদামতো পিএসসি ২০১৫ প্রণয়নের কাজ চলছে। অথচ এ বঙ্গোপসাগরের সম্পদ বাংলাদেশের শত বছরের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। আগেও পুঁজির অভাবের যুক্তি দিয়ে দেশের সম্পদ বিদেশী কোম্পানির হাতে দেয়া হয়েছে, যার কারণে ১০ থেকে ৩০ গুণ বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। যে পরিমাণ পুঁজি নেই বলে এসব চুক্তি করা হয়েছে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ বিদেশী কোম্পানির পক্ষে প্রতি বছর ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ঋণগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনীতি, বারবার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে এসব ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণেই। বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের পথ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট একটি বাস্তবতা। তার সমাধানে যথাযথ পথ গ্রহণ তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে পথে অগ্রসর হলে এর একটি টেকসই সমাধান হতে পারে, সরকার সে পথে যেতে অনিচ্ছুক। উল্টো ভুল নীতি ও দুর্নীতিযুক্ত নানা প্রকল্প ও চুক্তির জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ছে বারবার, অর্থনীতি বিপদগ্রস্ত হচ্ছে, দেশী-বিদেশী লুটেরাদের আগ্রাসী তৎপরতায় সুন্দরবন, ফুলবাড়ী ও বঙ্গোপসাগরসহ সম্পদ ও দেশ বিপদাপন্ন হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ সংকটেরও টেকসই সমাধান হচ্ছে না। দেশ ও জনস্বার্থ বিবেচনায় যে পথ-নকশা ধরে অগ্রসর হওয়া দরকার তার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হল : তলাহীন ঝুড়ির মতো দুর্নীতি ও অপচয়ের যেসব রেন্টাল-কুইক রেন্টাল চুক্তি দেশের অর্থনীতির বোঝা, সেগুলো বাতিল করে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট চালু, মেরামত ও নবায়ন করা; খনিজসম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ আইন প্রণয়ন করে শতভাগ গ্যাস ও কয়লা বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার; জনবিরোধী পিএসসি প্রক্রিয়া বাতিল করে স্থলভাগে ও সমুদ্রে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে জাতীয় সংস্থাকে প্রয়োজনীয় সুযোগ, ক্ষমতা ও বরাদ্দ প্রদান; বিদ্যুৎকে গণপণ্য হিসেবে বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশীয় মালিকানায় বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন; ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করে দেশের কয়লাসম্পদকে রাহুমুক্ত করা; নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের বিকাশ এবং জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের জন্য বিপর্যস্ত জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধার, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা ইত্যাদি কাজে অগ্রাধিকার প্রদান।
আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

আমলাতন্ত্র উন্নয়নের প্রতিবন্ধক by ড. ইশা মোহাম্মদ

আমলারা আমলাতন্ত্রের পক্ষে লিখবেই। আমলাতন্ত্রকে রাজনীতিকরাও ভয় পায়। কারণ রাজনীতিকদের দুর্বলতা ও দুর্নীতির সব খবরই আমলারা রাখে। কোনো রাজনীতিক আমলাদের বিরুদ্ধে লাগলে তাকে তারা জেল খাটাতেও পারে। বাংলাদেশ হওয়ার পর থেকেই আমলাদের মাতব্বরি বেড়ে গেছে। কারণ রাজনীতিকদের দুর্বলতা। যারা ওই সময়ে আওয়ামী লীগ করত, তারা সবাই উচ্চ মেধার লোক ছিল না। অনেকেই ভালো করে ইংরেজি পড়তে বা লিখতে পারত না। বাংলাও যে খুব একটা ভালো জানত, তাও নয়। প্রথমদিকে দেখা গেছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় যারা চাকরি পেয়েছে, তারা সবদিক থেকেই ছিল দুর্বল। এহেন পরিস্থিতিতে আমলারা সুযোগ নিতেই পারে। তখন থেকেই আমলারা স্বার্থের কারণে একতাবদ্ধ হয়। কিন্তু আমলাতন্ত্র যে কেবল বাংলাদেশেই রয়েছে তা তো নয়। সারা বিশ্বই চলছে আমলাতন্ত্র দ্বারা।
সম্প্রতি একজন যোগ্য আমলা অবসরে গিয়েও আমলাতন্ত্রের পক্ষে লিখেছেন। তিনি ‘শুভকাজ’ না হওয়ার কারণ হিসেবে রাজনীতিকদের মেধা ও যোগ্যতাকে দায়ী করেছেন এবং প্রকারান্তরে আমলাতন্ত্রের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। রাজনীতিকরা যোগ্য হলেই আমলাতন্ত্র বাধ্যগত হবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। আমলাতন্ত্র সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা পরিষ্কার নয়। আমলাতন্ত্রের ইতিহাস যারা জানে, তারা সম্ভবত বিষয়টি বোঝে। অন্যরা যথেষ্ট না বুঝে মনগড়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দেয়। রাষ্ট্র আধুনিক রূপ পাওয়ার আগেই আমলারা রাষ্ট্র দখল করেছে। রাজা ও রাজরক্তই আমলাতন্ত্রের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করেছে। এখনও সেই একই ধারা অব্যাহত আছে। আমলাদের প্রশিক্ষণের সময় শেখানো হয় তারা শাসক, আর রাষ্ট্রের নাগরিকরা প্রজা। তারা শাসক হিসেবে প্রজা শাসন করে। এ কথাই শেখানো হতো আমলাতন্ত্রের প্রাথমিক যুগে। যখন কারও শরীরে রাজরক্ত না থাকলে সে আমলা হতে পারত না। একসময় দেখা গিয়েছিল, সেনাবাহিনীতে চাকরির অভিজ্ঞতা না থাকলে তারা আমলা হতে পারত না। সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকে আমলা না হলেও তাদের অধীনে কামলা হতে পারত। মধ্যবিত্তদের মধ্য থেকে কেরানিকুলের জন্ম হয়েছিল। কেরানিরা কখনোই অফিসার হতে পারত না। এখন যেমন কেরানিরা পদোন্নতি পেতে পেতে অফিসার হয়ে যায়, তেমনটি পৃথিবীর কোথাও দেখা যায়নি। সম্ভবত বাংলাদেশেই প্রথম কেউ পিওন থেকে অফিসার হয়েছে। তার ফলাফল ভালো হয়েছে নাকি খারাপ হয়েছে, সেটি রাষ্ট্রনায়করা ভালো বলতে পারবেন।
যারা রাজরক্ত দেহে ধারণ করে, তারা শাসক হতেই পারে। কিন্তু ধনতন্ত্র শাসক পছন্দ করে না। যে কারণে র‌্যাশনাল বুরোক্রেসি কথাটা এসেছে। আমলারা আইনের ঊর্ধ্বে নয়। একই সঙ্গে দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করেই
তাদের প্রকৃত আমলায় পরিণত হতে হয়। এই প্রথম সামরিক বাহিনীর সদস্য হওয়ার যোগ্যতাকে পরিহার করার সুযোগ তৈরি হল। রোমান আমলাতন্ত্র তার ঐতিহ্য হারাল। রাশিয়ার জারের আমলাতন্ত্রও অযোগ্য
প্রমাণিত হল। আধুনিক জ্ঞান আভিজাত্যকে অতিক্রম করে গেল। কিন্তু আমলারা
কাল্পনিক আভিজাত্যে আক্রান্ত হল। সাধারণ পরিবার থেকে এসেও আমলা হওয়ার পর
দেখা গেল, তারা নিজেরা নিজেদের অভিজাত মনে করছে।
কাল্পনিক আভিজাত্য থেকে নিজেদের কাল্পনিক শাসকও মনে করার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু যেহেতু আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার থাকে, সেহেতু তারা সরকারের সঙ্গে সরাসরি দ্বন্দ্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য একটি ‘গোপন রাষ্ট্র’ তৈরি করে রাষ্ট্রের মধ্যেই। ওই গোপন রাষ্ট্রের অধিশ্বর তারাই। সেখানে সরকারের কোনো মাতব্বরি থাকে না। যে কোনো রাষ্ট্র সম্পর্কেই একথা বলা যায়। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রকৃত ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছাড়া। গণতান্ত্রিক দেশ হলেই জনগণের শাসন বর্তমান আছে- এটি মনে করার কোনো কারণ নেই। ভারত বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সেখানকার আমলাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা বোঝে আমলাতন্ত্র কী জিনিস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই কেবল আমলারা প্রাধান্যে আসতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের শাসক বলতে একটি শ্রেণীকে বোঝায়। শ্রেণীই রাষ্ট্র চালায়। শ্রেণীস্বার্থে রাষ্ট্র একটি যন্ত্র। ধনতন্ত্রে রাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে কী, তা বুঝতে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। মার্কস-এঙ্গেলস কেন রাষ্ট্রকে শ্রেণীর যন্ত্র বলেছেন, তা যুক্তরাষ্ট্রকে দেখলেই বোঝা যায়। তারপরও সেখানে এক বিশেষ জাতীয় আমলাতন্ত্র তৈরি হয়েছে। সামরিক বাহিনী সেখানে একটি ‘গোপন রাষ্ট্র’ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের যে ‘যুদ্ধবাজ’ চেহারা, তা ওই কারণেই। সমাজতন্ত্রেও যে আমলারা সরকারনির্ভর, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। সমাজতন্ত্রে পার্টি রাষ্ট্র চালায়। কিন্তু আমলারা পার্টি ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটা বিশেষ অবস্থান তৈরি করে নিজেদের অস্তিত্ব নিরাপদ করে। পরবর্তী পর্যায়ে প্রবল হয়ে রাষ্ট্র দখল করে। ট্রটস্কি ও স্টালিনের আমলাতন্ত্র নিয়ে ঝগড়া-বিবাদের ইতিহাস মনে হয় সবাই জানে। ট্রটস্কি অভিযোগ করেছিলেন, স্টালিন প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বকে ব্যুরোক্রেট দ্বারা প্রতিস্থাপিত করেছেন। স্টালিনের আমলারা এতই ক্ষমতাধর ছিল যে, তাদের বিরোধিতাকারী কমরেডদের হত্যা করতেও তারা দ্বিধা করত না। ট্রটস্কিও নিহত হয়েছিলেন। স্টালিনের সময়ে অসংখ্য কমরেড খুন হয়েছিলেন। এখন জানা যাচ্ছে, কেবল ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণেই নয়, আমলতন্ত্র পার্টিকেও দখল ও বশে আনার জন্য কমরেডদের খুন করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার জন্য
পার্টির দুর্বলতাই দায়ী। আর পার্টির দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল প্রকৃত কমরেডরা নিহত
হওয়ার কারণেই।
আমলাতন্ত্র অবশ্যই উন্নয়নের প্রতিবন্ধক। উন্নয়ন হলে একপর্যায়ে আমলাদের মাতব্বরি দূর হয়। যে কারণে আমলারা প্রকৃত উন্নয়নের ধারা প্রতিহত করে। অনেকটা সামন্ত যুগের জমিদারদের মতো। প্রজার জীবনযাত্রার মান বেড়ে গেলে, তাদের অবস্থার উন্নতি হলে জমিদার ভেসে যায়। যে কারণে জমিদাররা তাদের জমিদারিতে কাউকেই বাড়তে দিত না। কিন্তু আমলাতন্ত্র ক্ষতিকর বলে আমলাদের তাড়িয়ে দেয়া যাবে না। আমলাদের বিপরীতে আমলা তৈরি করতে হবে। যেমন সমবায় কাজের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা বিপরীত স্রোতের আমলাদের মতো কাজ করে। লেবার অফিসার যেমন লেবারদের স্বার্থ দেখে, মালিকের স্বার্থ দেখে না, তেমনি ধরনের আমলাদের প্রতিপক্ষ গণআমলা তৈরি করা সম্ভব। যারা রাষ্ট্রের পক্ষে থাকবে না। জনগণের পক্ষে থাকবে। এভাবে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী আমলা তৈরি করতে পারলে আমলাতন্ত্রের ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে নেয়া যায়।
সরকারের সঙ্গে যারা কাজ করছে, সেই পণ্ডিতরা চিন্তাভাবনা করে একটি প্রতি-আমলাতন্ত্র তৈরি করতে পারে। এদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের থাকবে না। কমিউনিটির দায়িত্বে তারা তৈরি হবে এবং দায়ী থাকবে কমিউনিটির কাছে। তারা পুরোপুরি সরকারি হওয়া সত্ত্বেও সরকারের প্রতিপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যেখানে আইনের শাসন বলবৎ থাকে, সেখানে এমন ধরনের প্রতি-আমলাতন্ত্র তৈরি করা সম্ভব এবং তা গ্রহণযোগ্যও হবে। যেহেতু তারা গণস্বার্থে দায়িত্ব পালন করবে, সেহেতু কমিউনিটি তাদের ‘বন্ধু’ ভাববে। সাধারণ মানুষ আমলাতন্ত্রের ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায় জানে না। আমলারাই পারে আমলাদের প্রতিপক্ষ হতে, তাদের শায়েস্তা করতে।
আমলাতন্ত্র নিয়ে নতুন করে ভাবনা-চিন্তার সময় এসেছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতেই হবে। আমলাতন্ত্রের পক্ষ-প্রতিপক্ষ তৈরি করতে হবে। রাজনীতিকরা উচ্চ মেধাসম্পন্ন হলে তারা আমলাদের ঠিকই নিয়ন্ত্রণ করতে পারত।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিকদের অবস্থা
দেখে সেটি অসম্ভব বলেই মনে হয়। রাজনীতিকদের চেয়ে আমলাদের মেধা উৎকৃষ্ট। তারাই পারে দেশপ্রেমে সিক্ত হয়ে গণআমলাতন্ত্র তৈরি করতে।
ড. ইশা মোহাম্মদ : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

ভাসানী : যেন তিনি থাকেন by ফরহাদ মজহার

আজ ১২ ডিসেম্বর। গণমাধ্যমগুলোতে খুঁজলাম। দুই-একটি পত্রিকা কানাকুঞ্চিতে ক্ষুদ্রভাবে মনে করিয়ে দিয়েছে। তবুও বলি, শুকরিয়া।
মরিজন বিবি এই তারিখে ১৮৮০ সালে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন। হাজী শরাফত আলী খানের পুত্র। সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রাম ব্রিটিশ আমলে কেমন ছিল, এখন অনুমান করার উপায় নাই। বুঝতে পারি, যাকে আমরা অতি পশ্চাৎপদ গ্রাম হিসেবে ট্যাগ মারতে পছন্দ করি, ধানগড়া সেই রকমই ছিল। শরাফত আলী খান ছেলেকে মক্তবেই পড়িয়েছিলেন। ছেলে মক্তবে কিছুদিন শিক্ষকতাও করেছিলেন। ১৮৯৭ সালে পীর সৈয়দ নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে আসাম চলে যান। তারপরের ইতিহাস উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী লড়াই ও জমিদার-মহাজনদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি যুক্ত। এ লড়াইয়ের নায়ক হচ্ছে এই অঞ্চলের কৃষক। সোজা কথায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মজলুম জনগণ।
মরিজন বিবি আর হাজী শরাফত আলী খান যে ছেলেটির জন্ম দিয়েছিলেন, তিনি আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আজ তার জন্মদিন। আজ ভোরে যখন দেশের বাইরে থাকায় দুই সপ্তাহ বাদে যুগান্তরের লেখা লিখতে বসেছি, মনে হল তিনি পাশে কোথাও বক্তৃতা করছেন। তার ঠাটাফাটানো বজ্র কণ্ঠের খামোশ কানে এসে আছড়ে পড়ছে বারবার।
আবদুল হামিদ খান ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ইংরেজের রাজত্বকে ইংরেজের আইনের অধীনতা মেনে লড়াই করলে পতন ঘটানো যাবে না। এটা বোঝার মতো কাণ্ডজ্ঞান তার ছিল। ক্ষমতা ও আইনের সম্পর্ক কতটা বুঝেছিলেন সেটা বলা যাবে না। কিন্তু গান্ধীর অহিংস আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। মওলানা গান্ধীবাদী ছিলেন না। কিন্তু সন্ত্রাসবাদীও ছিলেন না। যেটা তার বিরুদ্ধে জালিমেরা প্রায়ই বলে থাকে। মওলানা গণআন্দোলনে বিশ্বাস করতেন। গণবিচ্ছিন্ন কোনো সন্ত্রাস বা বিচ্ছিন্ন সামরিক লাইন তিনি অনুমোদন করতেন তার কোনো প্রমাণ তার কথায় বা তৎপরতায় পাওয়া যায় না। কিন্তু গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণশক্তি নির্মাণ ও জালিমের বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে পাল্টা বলপ্রয়োগ সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায় অনিবার্য, এই সত্য অস্বীকার করতেন না। এখানে তিনি অনন্য। জালিম শ্রেণী ক্ষমতা বহাল রাখার জন্য আইন, বিধান ও ব্যবস্থা খাড়া করে। তার বিরুদ্ধে মজলুম লড়বেই। সেটা বিক্ষোভ, হরতাল, ধর্মঘট, ঘেরাও যে কোনো রূপ নিতে পারে। তেমনি রাষ্ট্র বলপ্রয়োগ করে তা দমন করতে চাইলে জনগণের তরফে পাল্টা বলপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। জনগণের ইচ্ছা ও সংকল্পই গণ-আইন বা গণতান্ত্রিক আইনের ভিত্তি, এটা বিভিন্ন সময়ে তার বক্তৃতা ও তৎপরতা পর্যালোচনা করলে অনায়াসেই বোঝা যায়। সাম্রাজ্যবাদীরা তাকে প্রফেট অফ ভায়োলেন্স হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে কুপ্রচার চালিয়েছিল, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেয়ার নামে। সেই কলোনিয়াল অভ্যাস বাংলাদেশে এখনও অনেকে রপ্ত করে রেখেছেন।
আবদুল হামিদ খান ইসলামিক শিক্ষার উদ্দেশে ১৯০৭ সালে দেওবন্দ যান। সেখানে তিনি দুই বছর লেখাপড়া করেন। সেদিক থেকে তিনি একজন দেওবন্দী মওলানা। এই অর্থে যে, দেওবন্দ তার চিন্তা ও চেতনাকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। তার উপনিবেশবাদবিরোধী চিন্তা-চেতনার বড় অংশই দেওবন্দী প্রেরণা থেকে জাত। দেওবন্দে কিছু সময় পড়াশোনার পর তিনি আসামে ফিরে আসেন।
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ময়মনসিংহ সফরে এসেছিলেন। তার বক্তৃতা শুনে আবদুল হামিদ অনুপ্রাণিত হন। ১৯১৯ সালে আবদুল হামিদ কংগ্রেসে যোগদান করেন। খেলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে দশ মাস কারাদণ্ডও ভোগ করেন। ১৯২৩ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন স্বরাজ্য পার্টি গঠন করেন। ভাসানী সেই দল সংগঠিত করার কাজে চিত্তরঞ্জনকে সহায়তা করেন। তবে ১৯২৬ সালে আসামে প্রথম কৃষক প্রজা পার্টি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটানোর মধ্য দিয়ে কৃষক নেতা হিসেবে তার আবির্ভাব ঘটে এবং এই পরিচয়টাই দানা বাঁধতে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২৯ সাল গুরুত্বপূর্ণ। এই বছর আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে প্রথম কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন আবদুল হামিদ খান। এ সম্মেলনের অভূতপূর্ব সাফল্যের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে জমিদার-মহাজনদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী কৃষক আন্দোলনের আবির্ভাব ঘটে। ভাসান চরের ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলনের পর থেকে আবদুল হামিদ খানের নামের শেষে ভাসানী কথাটা যুক্ত হয়ে পড়ে। ভাসানীর মওলানা থেকে শুধু ভাসানী। দেওবন্দের উপনিবেশবাদবিরোধী লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা ভাসানীর মধ্য দিয়ে জমিদার-মহাজনবিরোধী কৃষক আন্দোলনে মূর্ত হয়ে উঠতে শুরু করে। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের কারণে সম্প্রতি দেওবন্দী বিশেষত বাংলাদেশের দেওবন্দী ধারার সম্ভাব্য ভূমিকা রাজনৈতিক-সামাজিক চিন্তার অন্তর্গত হয়ে পড়েছে। যা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। ভাসানীর কৃষক সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকে সেই জায়গা থেকেও বিচার করে দেখা প্রয়োজন। যদিও এখানে স্বল্প পরিসরে সেটা করার সুযোগ আমাদের নেই। ইসলাম, ইসলামের নবী-রাসূল ও অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে অকথা কুকথা বলার যে অসামাজিকতা ও অন্যের বিশ্বাসকে আঘাত করে অপরের মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার যে রীতি, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে সঙ্গত কারণেই ঈমান-আকিদা রক্ষার লড়াই একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহণ করেছে। এটা নতুন বাস্তবতা। বাংলাদেশের দেওবন্দী ধারা বিশেষত কওমি মাদ্রাসা সব সময় রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় অংশগ্রহণ করা থেকে দূরে ছিল। দেওবন্দী আলেম-ওলামারা সব সময়ই তাদের ভাষায় সাচ্চা মুসলমান তৈরির দিকে তাদের মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিলেন। সেকুলার ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে, নিজেদের জনগোষ্ঠীর সেবা করার ও তাদের সঠিক পথ দেখানোর জন্য যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলা। এ কারণে রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও টানাপড়েন থেকে প্রজ্ঞাবান আলেম-ওলামারা নিজেদের দূরে রাখতেই পছন্দ করতেন। একইভাবে আমরা দেখি মওলানা ভাসানী জুলুমের বিরুদ্ধে অকুতোভয় লড়েছেন, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল বা কুক্ষিগত করার দিকে নজর দেননি। এর জন্য তিনি সমালোচিতও বটে। একদিকে হেফাজত আর অন্যদিকে মওলানা ভাসানীর চিন্তা ও লড়াই সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে দেওবন্দের ভূমিকাকে ইতিবাচকভাবে পরিচালিত করতে সক্ষম হবে কি-না সেটা এখনও বলার সময় আসেনি। তবে মওলানা ভাসানী ক্রমে ক্রমে যে বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় প্রেরণাদায়ী চরিত্র হয়ে উঠবেন তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে অ্যান্টি-কলোনিয়াল দেওবন্দী রাজনৈতিক ধারা বাংলাদেশে আদৌ কোনো ভূমিকা পালন করবে কি-না, তা হেফাজতে ইসলামের নেতারা মওলানা ভাসানীকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন তার ওপর বেশ কিছুটা নির্ভর করবে।
আজ এই লেখাটি নিতান্তই ভাসানীকে স্মরণ করার জন্য। আজ সকাল থেকেই তাকে নিয়ে ভাবছি গভীরভাবে। অহিংসা সম্পর্কে তার অবস্থান নিয়ে আগেও লিখেছি। তার হুকুমতে রব্বানিয়া বা প্রতিপালনের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রাষ্ট্রের ধারণা রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ- সে বিষয়েও আগে বলেছি। আজ অন্য একটি বিষয়ে খানিক ধারণা দিয়ে এই লেখা শেষ করব।
মওলানা কমিউনিস্টদের সঙ্গে দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন; নিজের ঈমান-আকিদার সঙ্গে একতিলও আপস না করে। প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে তিনি নিজের চিন্তার মধ্যে এর আত্মীকরণ ঘটিয়েছিলেন। প্রথমত, এটা পরিষ্কার যে, কমিউনিজম মানে নাস্তিক্যবাদ, মওলানা ভাসানী এটা কখনোই গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে জুলুমের অবসান ঘটিয়ে উন্নত ও অগ্রসর সমাজ গঠনের ধারণার সঙ্গে ইসলামের কোনো বিরোধ আছে, তাও তিনি মনে করেননি। ইসলামকে তিনি কমিউনিজম থেকে আলাদা করে দেখেননি। ইসলামকে তিনি উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, জমিদারি-মহাজনি ব্যবস্থা কিংবা সব রকম জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিহাদ হিসেবে দেখেছেন। তার কাছে ঈমান-আকিদা তখনই তার সঠিক ইহলৌকিক কর্তব্য পালন করে, যখন জালিম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একজন মোমিন রুখে দাঁড়ায়। এ দিকগুলো সহজে বোঝা যায়। মওলানা ভাসানীর কাছে ইসলামপন্থী বিশেষত দেওবন্দী আলেম-ওলামাদের বহু শিক্ষণীয় বিষয় আছে। একইভাবে কমিউনিস্টদেরও, যারা এ দেশে বাস্তবসম্মত রাজনীতি করতে চায়। কিন্তু মওলানা যেখানে একশ্রেণীর আলেম-ওলামা ও কমিউনিস্টদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যেতেন, সেটা হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি সম্পর্কে তার অবস্থান। তিনি বলতেন, মওলানাদের অনেকে মুখে বলেন- সবই আল্লাহর, দুনিয়ার সব কিছুর তিনিই মালিক; কিন্তু তারা নিজেদের নফস ছাড়েন না। তারা নিজ নিজ নফসানিয়াতের অধীন। অর্থাৎ দুনিয়ায় তাদের বিষয়-সম্পত্তি আল্লাহর রাহে ছেড়ে দিতে রাজি নন। অন্যদিকে কমিউনিস্টদের মধ্যে তারাই প্রবল, যারা ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎখাত চায়; কিন্তু ব্যক্তির কাছ থেকে সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তারা তাকে রাষ্ট্রের সম্পত্তি বানায়। এতে পার্টি ও রাষ্ট্র উপকৃত হয়- মজলুমের ফের নতুন শোষকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ছাড়া উপায় থাকে না। এ দুই ধারাই মজলুম জনগণের মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
বোঝা যায়, ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণাকে মওলানা ভাসানী আইনি ধারণা অর্থাৎ মালিকানার ধারণা, কিংবা অর্থনৈতিক ধারণা- যেমন, উৎপাদন সম্পর্ক- এই দুই ধারণা থেকেই আলাদা করে বিচারের পক্ষপাতী ছিলেন। এই ধারণাগুলোকে তিনি অস্বীকার করেননি। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা ও বাস্তবতা নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা-পর্যালোচনা হয়েছে বলে মনে করতেন না। এই অভাব থেকেই তিনি নফসানিয়াতের ধারণা ইসলামের জিহাদি ঐতিহ্য থেকে গ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন। অর্থাৎ নিজের নফস থেকে নিজে মুক্ত হতে না পারলে জগতকে আমরা আমাদের সম্পত্তি বা ভোগ্যবস্তু হিসেবেই বিবেচনা করব। এতে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি ইসলাম কায়েমও অসম্ভব। এ যুগের বিপ্লবী কর্তব্য হচ্ছে, নফসানিয়াত থেকে রূহনিয়াতের পর্বে উত্তরণের রাজনীতি আবিষ্কার করা। এই রাজনীতিতে কমিউনিজমকে অস্বীকার করা হয়নি, বরং কমিউনিজমের অসম্পূর্ণতা ও ব্যর্থতা সমাধানের দুঃসাহসী প্রস্তাব নিহিত রয়েছে।
এই গোড়ার তর্ক আমলে না নিলে ভাসানীকে বোঝা কঠিন। তার পালনবাদ বা হুকুমতে রব্বানিয়াকে আমরা এ কারণে বুঝিনি। এই তত্ত্ব দাবি করে যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির একটা জিহাদি পর্যালোচনা হওয়া দরকার। সেটা নিছকই প্রথাগত ধর্মবিশ্বাস থেকে করা কঠিন। কারণ জিহাদ ভাসানীর কাছে অমুসলমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জিহাদ নয়- বরং নিজের নফস কিংবা ভোগবাদী আমিত্বের কাছে বন্দি জীবের বিরুদ্ধে কিংবা আল্লাহর তরফে দুনিয়ায় প্রেরিত আল্লাহর খলিফার জিহাদ। আল্লাহর তরফে তার সৃষ্টিকে রক্ষা ও সব প্রাণের পালন ও বিকাশ যার দ্বীনের অন্তর্গত।
ইসলামকে প্রথাগত ধর্মতত্ত্বের অধীনে রেখে যেভাবে আমরা বিচার করি, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কেন আমিত্ব (নফসানিয়াত) ত্যাগ করে মানুষকে দিব্যপ্রাণ (রুহানিয়াত) হয়ে উঠতে হবে সেটা বোঝা কঠিন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী মুসলমানের ঈমান-আকিদার কর্তব্য হিসেবে কেন এবং কীভাবে মজলুমের পক্ষে দাঁড়াতে হবে তার একটি পথ দেখিয়েছেন। সেখানে তিনি তার সময় ও যুগকেও অতিক্রম করে গিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা দুনিয়ার মজলুমের তিনি এ কারণেই নেতা। আজ তার কথা ভাবতে পেরে মনে হচ্ছে তিনি বুঝি সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। যেন তিনি থাকেন।

স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে আত্মহত্যা

স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে আত্মহত্যা করলেন এক যুবক। নিহত ব্যক্তির নাম রাসেল আহমেদ। ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল দুপুরে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। খবর পেয়ে নিহতের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। সূত্রে জানা গেছে, বেলা দেড়টার দিকে মাগো বলে চিৎকার করেন রাসেল। চিৎকার শুনে তাকে খুঁজতে গিয়ে তার কক্ষের দরজা বন্ধ পান পরিবারের সদস্যরা। এ সময় অনেক ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তাকে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না প্যাঁচানো ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাসেলকে মৃত ঘোষণা করেন। সূত্রমতে, ঘটনার আগে স্ত্রী রোমানা আক্তারের কাছে একটি ফোন নম্বর চেয়েছিলেন রাসেল। রোমানা ওই নম্বর দিতে রাজি হননি। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। তবে ওই নম্বরটি কোন ব্যক্তির তা জানা যায়নি। এই ঘটনার পরই ওই কক্ষে ঢুকেন রাসেল। তবে রাসেল যে আত্মহত্যা করবেন তা পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেননি। কিছু সময় পরে তিনি মা বলে চিৎকার করলে পরিবারের সদস্যরা ছুটে গিয়ে ওই কক্ষের দরজা বন্ধ পান। এ বিষয়ে নিহতের পরিবারের সদস্যরা কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রমনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মজিবর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করেই রাসেল আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার আগে ফোন নম্বরকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। তবে এ বিষয়টি আরও তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। নিহত রাসেল আহমেদ একজন ব্যবসায়ী। তিনি স্ত্রী ও মা, ভাইদের সঙ্গে সিদ্ধেশ্বরীর ৩৮ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। তিনি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জের সাহেবগঞ্জের মুহাম্মদ শামসুজ্জামানের পুত্র। প্রায় দেড় বছর আগে রোমানার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এই দম্পতির কোন সন্তান নেই।

ইতিহাস জানতে বই পড়ার বিকল্প নেই -আরেফিন সিদ্দিক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বই মেলা শুধু ডিসেম্বর মাসে নয়, সারা বছরই আয়োজন করা প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে বই পাড়ার কোন বিকল্প নেই। বই পড়ার মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের না জানা অনেক ঘটনা জানা যায়।  আমি আশা করবো, বই পড়ার মধ্য দিয়েই জাতির সামনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস বের হয়ে আসবে।  কারণ এ ধরনের মেলা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাতির সামনে তুলে ধরে নতুন প্রজন্মকে সামনের দিকে পথ চলতে সহায়তা করবে।  গতকাল পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে জয়তী আয়োজিত মুক্তিযুদ্ধের বইমেলা উদ্বোধন করেন আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার। তিনি বলেন, নানা কৌশলে বিভিন্ন মহল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা করছে। মুক্তিযুদ্ধের বই নিয়ে এ রকম আয়োজন বিভিন্ন সময়ে এটা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধ্বংসের একটি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে আশা করি। এর মধ্য দিয়ে জাতির সামনে বাংলাদেশের ৯ মাসের অজানা কথা নতুন প্রজন্মের কাছে ভেসে উঠবে। কবি সৌমিত্র দেবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আধ্যাপক বদিউর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।  মেলা চলবে আগামী ২০শে ডিসেম্বর প্রর্যন্ত। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৮.৩০ মিটিন পর্যন্ত।

ভারতের কেবিনেট বৈঠকে সীমান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়নি


প্রবল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, বিজয় দিবসের আগেই ভারত সীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের সব কাজ সেরে ফেলবে। কিন্তু পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে এই শীতকালীন সংসদ অধিবেশনে সীমান্ত চুক্তি সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিলটি পেশ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। আগামী ২২শে ডিসেম্বরই এই অধিবেশন শেষ হয়ে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ভারতের কেবিনেটের বৈঠকে সীমান্ত চুক্তি সংক্রান্ত খসড়া বিল নিয়ে আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু সময়াভাবে সেই আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে। আগামী ১৭ই ডিসেম্বর পরবর্তী কেবিনেট কমিটির বৈঠকে বিলটি নিয়ে আলোচনা হবে। আগে জানা গিয়েছিল যে, ভারত সরকার বাংলাদেশের বিজয় দিবসের আগেই সীমান্ত চুক্তি  সংক্রান্ত বিলটি সংসদে অনুমোদন করিয়ে নিয়ে বাংলাদেশকে সুখবর জানাবে। গত সপ্তাহেই  সীমান্ত চুক্তি সংক্রান্ত খসড়া বিলটি নিয়ে পররাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী স্ট্যান্ডিং কমিটির রিপোর্ট সংসদের দুই কক্ষে পেশ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সেই রিপোর্ট ও খসড়া বিলটি কেবিনেট বৈঠকে অনুমোদনের পরেই প্রথমে রাজ্যসভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে এবং পরবর্তী পর্যায়ে পেশ করা হবে লোকসভায়। কিন্তু বৃহস্পতিবারের কেবিনেট বৈঠকে আলোচনা না হওয়ায় গোটা প্রক্রিয়াই পিছিয়ে গেছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে  আশ্বাস দেয়া হয়েছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিলটির  খসড়া সর্বসম্মতিতে অনুমোদন পাওয়ায় এটি পাস  হওয়া সময়ের অপেক্ষা। সব পক্ষকেই আরও একটু ধৈর্য ধরতে হবে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই বিলটি সংসদে পাস করানোর চেষ্টা হচ্ছে। এদিকে অপদখলীয় জমি ও ছিটমহল হস্তান্তরের পরে পুনর্বাসন কিভাবে হবে তা নিয়ে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্ত সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। প্রথম পর্যায়ে বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে অলোচনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব অনিল গোস্বামীর ডাকা এই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্র, স্বরাষ্ট্রসচিব বাসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি জিএমপি রেড্ডি। বৈঠকে ভারতের স্বরাষ্ট্রসচিব অনিল গোস্বামীসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ বিভাগীয় কর্মকর্তারা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর মহাপরিচালক ডিকে পাঠক, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সচিব স্নেহলতা কুমার এবং কেন্দ্রীয় নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীন জমি অধিকর্তা বিভাগের সচিব। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ বিভাগের যুগ্ম সচিব শ্রীপ্রিয়া রঙ্গনাথনসহ কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়লের শীর্ষ কর্মকর্তারাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে ছিটমহলবাসীদের পুনর্বাসনে সম্পূর্ণ আর্থিক দায়ভার নেয়ার জন্য কেন্দ্রের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে এই কাজের জন্য কেন্দ্রের কাছে তিন হাজার কোটি রুপির দাবিও জানানো হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফে এদিন ফের ভারত সরকারকে জানানো হয়েছে, নীতিগত ভাবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ছিটমহল হস্তান্তরে রাজি। সম্প্রতি কোচবিহার জেলার একটি ছিটমহল সংলগ্ন এলাকায় সভা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তিনি সীমান্ত বিলে রাজি। তবে ভারত সরকারকেই পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে, বাসস্থানের ব্যবস্থা, স্কুল ও হাসপাতাল তৈরি এবং এলাকার পরিকাঠামো উন্নয়ন।

‘ড্রোন হামলার চেয়ে সীমিত গণতন্ত্র ভালো’

আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ড্রোন হামলার চেয়ে সীমিত গণতন্ত্র ভাল বলে মন্তব্য করেছেন সাংবাদিক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মৌলবাদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যত খারাপ কাজ করুক আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে সমর্থন দিয়ে যাবো। গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমিতে তার ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সংবর্ধনায় তিনি এসব মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আবদুল গাফফার চৌধুরীর ৮০তম জন্মবার্ষিকী জাতীয় সংবর্ধনা কমিটি। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি তাকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। অনুষ্ঠান চলাকালে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের মোবাইল ফোনে ফোন করে গাফ্‌ফার চৌধুরীকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
এরপর আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, কথা-সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক, জাতীয় কবিতা পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, গণজাগরণ মঞ্চ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ঢাকা কলেজ, আওয়ামী সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় ও ঢাবি শাখা, স্বভূমি লেখক সংঘ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী, পেশাজেবী ঐক্য পরিষদ, মেহেন্দীগঞ্জ সমিতি, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি, কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্তের পরিবার, দৈনিক সমকাল, বাংলা একাডেমি কর্মচারী ইউনিয়ন, অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম, হামদর্দ ফাউন্ডেশন, যুক্তরাজ্য ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষে শফিকুর রহমান চৌধুরী, আবদুল মুকিত চৌধুরী, বিটিভির মহাপরিচালক আসাদ মান্নান। জাতীয় সংবর্ধনা কমিটির পক্ষে মানপত্র পাঠ করেন কবি আসাদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক, সাবেক সচিব এম মোকাম্মেল হক, ভাষা সংগ্রামী প্রতিভা মুৎসুদ্দী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. হারুন অর রশিদ, ড. আনোয়ার হোসেন, সাংবাদিক আবেদ খান, বিবি রায় চৌধুরী, বৃটেনের কনজারভেটিভ পার্টির মনোনয়নপ্রার্থী মিনা রহমান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা নূহ-উল আলম লেলিন, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে গাফ্‌ফার চৌধুরীকে ২১ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করেন এক্সিম ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক নুরুল ফজল বুলবুল।

তেল অপসারণে ১০০ নৌকায় অভিযান

১০০ ভাড়া করা নৌকা দিয়ে শেলা নদী থেকে তেল সংগ্রহ শুরু করেছে বন বিভাগ। গ্রামবাসী এবং জেলেরা তেল সংগ্রহ করে তা রাষ্ট্রীয় কোম্পানি পদ্মা অয়েলের কাছে প্রতি লিটার ৩০ টাকায় বিক্রি করছে। এই পদ্ধতিতে তেল অপসারণের ফলে সুন্দরবন সংলগ্ন খাল ও নদী থেকে তেলের তেজস্ক্রিয়তা কমে আসবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। বন বিভাগের কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কার থেকে নদীর ৮০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে তেল অপসারণের জন্য রাসায়নিক পদার্থ ছিটানোর কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, ডুবে যাওয়া ট্যাংকারের তেল ছড়িয়ে পড়ায় চারদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে। সেখানে রাসায়নিক দ্রব্য ছিটানো হলে আরও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে কিনাÑ সেটা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে। ট্যাংকার ডুবে যাওয়ার চারদিনের মাথায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, সাধারণ মানুষের মাধ্যমে নদী থেকে তেল সংগ্রহের অভিযান অব্যাহত থাকবে। গত মঙ্গলবার ভোরে প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল নিয়ে অন্য একটি জাহাজের ধাক্কায় তলা ফেটে ডুবে যায় ওটি সাউদান স্টার -৭। এ সময় নিখোঁজ হন ট্যাঙ্কারের মাস্টার মোখলেছুর রহমান। এখনও তার খোঁজ মেলেনি।

একাই ৪২ জনকে হত্যা

সাইলসন জোসে গ্রাসাস
ব্রাজিলে ২৬ বছর বয়সী এক যুবক ৪২ জনকে হত্যা করেছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সাইলসন জোসে গ্রাসাস নামে ওই ব্যক্তি গত ১০ বছরে ৩১ জনকে হত্যা করেছেন বলে নিজেই দাবি করেছেন। খবর এএফপি ও বিবিসির। রিও ডি জেনেরিওর শহরতলিতে এক নারীকে ছুরি মেরে হত্যার অভিযোগে গ্রাসাসকে গত বুধবার গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তিনি ওই ঘটনার আগে আরও ৩৭ জন নারী, তিন পুরুষ ও দুই বছর বয়সী একটি মেয়েশিশুকে হত্যা করার কথা বলেন। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা পেদ্রো এনরিক মেদিনা বৃহস্পতিবার বলেন, গ্রাসাসের হাতে খুন হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই নারী। আর তিনি শুধু শ্বেতাঙ্গ নারীদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কালোদের নয়। নিজে কৃষ্ণাঙ্গ গ্রাসাস বলেছেন, শিকারদের কাউকে কাউকে অনুসরণ করতেন তিনি।
কখনো কখনো মাসের পর মাস নিবিড়ভাবে নজরে রাখার পর হত্যা করেছেন। তিনি প্রথম খুনটি করেন ১৭ বছর বয়সে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, গ্রাসাস সম্ভবত একজন মানসিক রোগী। তিনি খুন করে সংবাদমাধ্যমে প্রচার পেতে পছন্দ করেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তাঁর এ কথা ও বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক যাচাই করে দেখছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, গ্রাসাস কারাগার থেকে কখনো ছাড়া পেলে আবারও খুন করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। বলেছেন, তিনি শ্বেতাঙ্গ নারীদের শ্বাসরোধে হত্যা করতেন। আর তিনজন পুরুষকে হত্যার সময় ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করেছেন। ব্রাজিলের আইনে কাউকে সর্বোচ্চ ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া যায়। দেশটিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই।

সারদা কেলেঙ্কারিতে গ্রেপ্তার মদন মিত্র

পুলিশ হেফাজতে মদন মিত্র
সারদা কেলেঙ্কারিতে এবার গ্রেপ্তার হলেন পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনমন্ত্রী মদন মিত্র। গতকাল শুক্রবার তাঁর গ্রেপ্তারের পর বিরোধী দলের পক্ষ থেকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে। কলকাতায় কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (সিবিআই) কর্মকর্তারা মদন মিত্রকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে পাঠান। তিনি হাজির হলে পাঁচ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর মদন মিত্র অসুস্থ বোধ করছেন বলে জানান। তখন সিবিআই দপ্তরে চিকিৎসক দল ডেকে পাঠানো হয়। গতকাল সিবিআই আরও গ্রেপ্তার করেছে সারদার আইনজীবী নরেশ ভালোরিয়াকে।
তথ্য গোপন করার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নান বলেছেন, ‘সারদাকাণ্ড তদন্তে বাধা দিয়েছেন মমতা। এবার গ্রেপ্তার হলেন তাঁরই মন্ত্রিসভার সদস্য মদন মিত্র। মমতাকেও গ্রেপ্তার করা উচিত।’ পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেতা ও মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় এ গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জের আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইকে পরিচালনা করছেন বিজেপির নেতা অমিত শাহ।’

ভারতে বছরে ২ লাখ মুসলিম খ্রিস্টানকে ধর্মান্তরিত করা হবে

বছরে ২ লাখ মুসলিম-খ্রিস্টানকে ধর্মান্তকরণ করবে ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি অঙ্গসংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) শাখা সংগঠন ধর্মজাগরণ সমিতি। এর মধ্যে আসন্ন বড়দিনেই আলিগড়ের আরও ৬ হাজার মুসলিম-খ্রিস্টানকে ধর্মান্তকরণের মাধ্যমে হিন্দু বানানো হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ধর্ম জাগরণ সমিতি। শুক্রবার চাঞ্চল্যকর এ খবর প্রকাশ করেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতিমধ্যেই মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ধর্মান্তকরণের জন্য চাঁদা তুলতে শুরু করেছে ধর্ম জাগরণ সমিতি। আসন্ন বড়দিনে (২৫ ডিসেম্বর) ধর্মান্তকরণ অনুষ্ঠানের খরচ তুলতে প্রচারপত্রও বিলি করা হচ্ছে। ওই দিন ৬ হাজার মুসলিম ও খ্রিস্টানকে ধর্মান্তরিত করা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি আগ্রায় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) বিরুদ্ধে ২০০ মুসলমানকে জোরপূর্বক হিন্দুধর্মে দীক্ষিত করার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে স্থানীয় মুসলমানদের ক্ষোভ বিরাজ করছে। লোকসভাসহ গোটা ভারতেই বর্বরোচিত এ ঘটনার সমালোচনা চলছে।
কিন্তু তাতে আরএসএস কর্ণপাত করছে না। আলিগড়ে প্রস্তাবিত ধর্মান্তকরণ অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণাই তার প্রমাণ।
আরএসএসর শাখা সংগঠন ধর্ম জাগরণ সমিতির পক্ষ থেকে প্রচারপত্রে জানানো হয়েছে, আগামী ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে শহরের মাহেশ্বরী কলেজে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ৫ হাজার মুসলিম ও ১ হাজার খ্রিস্টানকে হিন্দুধর্মে দীক্ষিত করা হবে। গোরখপুরের বিজেপি সংসদ সদস্য যোগী আদিত্যনাথ এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন।
অনুষ্ঠানের খরচ তুলতে চাঁদা চেয়ে ধর্ম জাগরণ সমিতির পশ্চিম ক্ষেত্র (পশ্চিম-উত্তরপ্রদেশ, ব্রজপ্রান্ত, মীরাট ও উত্তরাখণ্ড) শাখার তরফ থেকে জানানো হয়েছে, প্রত্যেক মুসলিমকে ধর্মান্তকরণের খরচ পড়ে ৫ লাখ রুপি এবং প্রত্যেক খ্রিস্টানকে হিন্দুধর্মে দীক্ষিত করার খরচ পড়ে ২ লাখ রুপি। এই কারণে ঘর ওয়াপসি অনুষ্ঠানের জন্য বন্ধুবরদের মুক্তহস্তে দান করার আর্জি জানানো হয়েছে প্রচারপত্রে। শুধু তাই নয়, প্রচারপত্রের ভাষা অনুসারে মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সমস্যা বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে সংগঠনের প্রভাবশালী সদস্য কাশীনাথ বনসাল জানিয়েছেন, যেহেতু মুসলিম ও খ্রিস্টানরা মূর্তিমান সমস্যা, তাই তার সমাধানে বিপুল খরচ করার প্রয়োজন হয়।
তবে প্রস্তাবিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করার কথা যার, সেই যোগী আদিত্যনাথ জানিয়েছেন, প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যম বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করছে। মানুষ স্বেচ্ছায় ধর্মান্তরিত হচ্ছে। যখন হিন্দুদের ভিন্ন ধর্মে দীক্ষিত করা হয়, তা নিয়ে কোনো মহল থেকেই আপত্তি ওঠে না। তবে আদিত্যনাথ যা-ই বলুন বিষয়টি নিয়ে ঝুঁকি নিতে রাজি নয় জেলা প্রশাসন। আলিগড়ের এসএসপিজে রবীন্দ্র গৌড় জানিয়েছেন, মাহেশ্বরী কলেজে প্রস্তাবিত ঘর ওয়াপসি অনুষ্ঠানের অনুমোদন দেয়ার প্রশ্নই আসে না। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে। নিষেধ সত্ত্বেও অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হলে যথাযোগ্য ব্যবস্থা করা হবে। এদিকে বছরের শেষে ধর্মান্তকরণ অনুষ্ঠানের খবরে স্থানীয় মুসলিম এবং খ্রিস্টান সমাজ ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেছেন।

রক্তমাখা স্কুল পোশাক দেখে মালালা কাঁদল

পাকিস্তানের নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কিশোরী মালালা ইউসুফজাই বৃহস্পতিবার একটি প্রদর্শনীতে তালেবান হামলার শিকার হওয়ার দিনের তার রক্তমাখা পোশাক দেখে অঝোরে কেঁদে ফেলে। ২০১৪ সালে শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মাত্র ১৭ বছর বয়সী পাকিস্তানের নারী শিক্ষা কর্মী মালালা এবং ভারতের শিশু অধিকার কর্মী কৈলাস সত্যার্থির উদ্দেশে প্রদর্শনীটি উৎসর্গ করা হয়। তারা যৌথভাবে অসলোতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। মালালা ২০১২ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের সোয়াত ভ্যালিতে তালেবান হামলার শিকার হওয়ার সময় যেসব পোশাক পরে ছিল প্রদর্শনীতে রাখা সেগুলোর সামনে এসে দাঁড়ায়। সে উদ্বোধনটি ঘুরে ঘুরে দেখছিল। শান্ত ও ধীরস্থির কিশোরী তার রক্তমাখা স্কার্ফ, জ্যাকেট ও টাউজার দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। উল্লেখ্য, তালেবানের ওই বর্বর হামলায় সে প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছলেও ইংল্যান্ডে অস্ত্রোপচারের পর বিস্ময়করভাবে সেরে ওঠে। তার এই পোশাকগুলো কাচে ঘেরা একটি স্থানে প্রদর্শন করা হয়। এ সময় সত্যার্থি (৬০) মালালাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু খেয়ে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে বলেন, ‘সে আমার মেয়ের মতো।’ সত্যার্থির বরাত দিয়ে নরওয়ের বার্তা সংস্থা এনটিভি পরিবেশিত খবরে বলা হয়, ‘তুমি অনেক সাহসী, তুমি অনেক সাহসী।’ বুধবার মালালা নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করে। এখন পর্যন্ত যেসব ব্যক্তি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাদের মধ্যে মালালা হচ্ছে সর্বকনিষ্ঠ। উল্লেখ্য, মালালা তালেবান হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে এই প্রথমবারের মতো তার ওই রক্তমাখা পোশাক জনসম্মুখে প্রদর্শন করা হল।

জেরা পদ্ধতি জঘন্য ছিল

জিজ্ঞাসাবাদের সময় বন্দিদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানোর বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান জন ব্রেনান। তবে ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর সন্দেহভাজন বন্দিদের জেরা পদ্ধতি কঠোর ও জঘন্য ছিল বলেও স্বীকার করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার সিআইএর প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ব্রেনান বলেন, ‘কিছু কর্মকর্তা তাদের কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে। কিন্তু সংস্থার অধিকাংশ কর্মকর্তা তাদের কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করেছেন।’
মঙ্গলবার মার্কিন সিনেটের এক প্রতিবেদনে সিআইএর ওই জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতিকে নিষ্ঠুর ও অমানবিক ছিল বলে অভিহিত করা হয়। তবে ব্রেনান বলেন, ‘সিআইএ এক সময় অনেক ভালো কাজ করেছে, তখন কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। আমার মতে, সিআইএর আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য কার্যকরী, যা যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও হাজারো জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে।’ তবে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য অনুমোদিত জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি অব্যাহত রাখা হবে কি না, সে ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে জানান তিনি। বন্দিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের প্রভাব ও ফলাফল অজ্ঞাত বলেও মন্তব্য করেন সিআইএ প্রধান।
২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বন্দিদের ওপর নিষ্ঠুর ওই ধরনের নির্যাতন চালাত সিআইএ। সে সময় জর্জ বুশ দেশটির প্রেসিডেন্ট এবং ব্রেনান সংস্থাটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। জঘন্য ওই কাজের জন্য দুঃখ ও ক্ষমা প্রার্থনা করে ব্রেনান বলেন, ‘তিনি সিআইএর মানবিক দিকটা তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, সিআইএ এজেন্টদের কিছু কর্ম জঘন্য, নিষ্ঠুর ও কঠোর ছিল।
কিন্তু এটা সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিত নির্যাতন ছিল না।’
এদিকে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএর জঘন্য নির্যাতন পদ্ধতি সম্পর্কে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ জানতেন। সিআইএ সদস্যদের এ কাজে উৎসাহ দিতেন তিনি। সিআইএর এ নিষ্ঠুর জেরার পদ্ধতি প্রকাশ হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। বিবিসি।

অতি আবেগে লংঘিত জাতীয় পতাকা বিধি

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর এলেই রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বেসরকারি গাড়িতে উড়তে দেখা যায় জাতীয় পতাকা। অজ্ঞতার কারণেই হোক আর আবেগেই হোক, এভাবে পতাকা উড়ানো এ সংক্রান্ত বিধির সুস্পষ্ট লংঘন। এতে জাতীয় পতাকার মর্যাদা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা যুগান্তরকে বলেন, সরকারের অনুমতি ছাড়া গাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন জাতীয় পতাকা বিধির সুস্পষ্ট লংঘন। বিষয়টির সঙ্গে যেহেতু দেশপ্রেম ও আবেগ জড়িত সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। ব্যাপক জনসচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে এ সংস্কৃতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে রাজধানীসহ দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর রাস্তায় প্রাইভেটকার, ট্রাক, বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে জাতীয় পতাকা উড়তে দেখা যায়। শুধু জাতীয় দিবসেই নয়, ফুটবল ও ক্রিকেট বিশ্বকাপেও দেখা যায় এর ব্যাপকতা। কোনো কোনো বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকার উপরে নিজ নিজ সমর্থিত ভিনদেশী পতাকাও উড়তে দেখা যায়। এসব ক্ষেত্রে পতাকার সরকারি মাপও থাকে উপেক্ষিত। ফলে জাতীয় পতাকা বিধিমালার অবমাননা হয় নিজেদের অজান্তেই। আর জাতীয় পতাকার অবমাননা মানেই দেশের অবমাননা।
বাংলাদেশ পতাকা রুলস, ১৯৭২ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে সরকারি-বেসরকারি ভবনে এবং বাংলাদেশ সরকারের ডিপ্লোম্যাটিক মিশনে ও হাইকমিশনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিনে (ঈদে মিলাদুন্নবি), ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা যাবে। এ ছাড়া ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস এবং জাতীয় শোক দিবসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হবে।
ইচ্ছা করলেই যে কেউ গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করতে পারে না। কোন কোন ভবনে ও কারা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবেন, এ ব্যাপারে পতাকা বিধির ৬ ধারায় বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ও অফিসে সব কর্মদিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। ৬(৩) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে, নৌযানে ও বিমানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবে। এ ছাড়া স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা, মন্ত্রী সমমর্যাদার ব্যক্তি, বিদেশে বাংলাদেশী মিশনের প্রধানের গাড়িতে ও তাদের নৌযানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, উপমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি রাজধানীর বাইরে ভ্রমণকালে গাড়িতে ও নৌযানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে পারবেন।
জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষা প্রসঙ্গে বিধির ৭ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। যদি পাশাপাশি ২টি পতাকা উত্তোলন করা হয়, সে ক্ষেত্রে জাতীয় পতাকা ভবনের ডান দিকে উত্তোলন করতে হবে। জাতীয় পতাকার ওপর অন্য কোনো পতাকা উত্তোলন করা যাবে না।
এ ছাড়া বিধির ৩ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় পতাকার মাপ হবে ১০:৬ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের আয়তাকার ক্ষেত্রের গাঢ় সবুজ রঙের মাঝে লাল বৃত্ত এবং বৃত্তটি দৈর্ঘ্যরে এক-পঞ্চমাংশ ব্যাসার্ধবিশিষ্ট হবে। ভবনে ব্যবহারের তিন ধরনের মাপ হচ্ছে ১র্০:র্৬, র্৫:র্৩ ও ২.র্৫:১.র্৫। তবে অনুমতি সাপেক্ষে ভবনের আয়তন অনুযায়ী এবং দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ঠিক রেখে বড় আয়তনের পতাকা প্রদর্শন করা যাবে।
পতাকা বিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়েছে, কোনো মোটরগাড়িতে পতাকা প্রদর্শিত হলে পতাকার দণ্ড অবশ্যই দৃঢ়ভাবে গাড়ির চেসিস কিংবা রেডিয়েটর ক্যাপের ক্ল্যাম্পের সঙ্গে দৃঢ়াবদ্ধ করতে হবে। বিদেশী পতাকা বা রঙিন পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনকালে বাংলাদেশের পতাকাকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য স্থান সংরক্ষিত থাকবে। আর যেখানে দুটি ভিন্ন পতাকা থাকবে, সেক্ষেত্রে ভবনের ডানপাশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করতে হবে এবং দুইয়ের অধিক পতাকার সঙ্গে উত্তোলনকালে পতাকার সংখ্যা বিজোড় হলে বাংলাদেশের পতাকা ঠিক মাঝখানে থাকবে। তবে জোড়সংখ্যক পতাকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা কেন্দ্র থেকে ডান দিকের প্রথমে উত্তোলন করতে হবে। অন্য কোনো দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলিত হবে এবং সর্বশেষে নামানো হবে।
পতাকা বিধিতে আরও বলা আছে, বাংলাদেশের পতাকার উপর অন্য কোনো পতাকা বা রঙিন পতাকা ওড়ানো যাবে না। মিছিলে ব্যবহার করতে হলে মিছিলের কেন্দ্রে অথবা মিছিলের অগ্রগমন পথের ডান দিকে বহন করতে হবে। অনেকেই জাতীয় পতাকায় নকশা করে ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু জাতীয় পতাকার ওপর কোনো কিছু লেখা বা মুদ্রিত করা যাবে না অথবা কোনো অনুষ্ঠান বা উপলক্ষে কোনো চিহ্ন অংকন করা যাবে না; এমনকি জাতীয় পতাকাকে পোশাক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না এবং গায়ে জড়িয়ে রাখা যাবে না। তবে পূর্ণ সামরিক মর্যাদা বা পূর্ণ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যক্তিকে সমাধিস্থ করা হলে তার শবযাত্রায় জাতীয় পতাকা আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। অনুমতি ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জাতীয় পতাকাকে ট্রেডমার্ক, ডিজাইন বা পেটেন্ট হিসেবে ব্যবহার করাও অপরাধ। কোনো অবস্থায়ই পতাকা নিচে অবস্থিত কোনো বস্তু যেমন মেঝে, পানি ও পণ্যদ্রব্য স্পর্শ করবে না এবং কবরের ওপরে স্থাপন করার সময় পতাকাটি কবরে নামানো যাবে না কিংবা মাটি স্পর্শ করবে না। পতাকা এমনভাবে উত্তোলন, প্রদর্শন বা মজুদ করা যাবে না, যাতে এটি সহজেই ছিঁড়ে যেতে পারে, মাটি লাগতে পারে বা নষ্ট হতে পারে। কোনো দেয়ালে দণ্ডবিহীন পতাকা প্রদর্শিত হলে তা দেয়ালের সমতলে এবং রাস্তায় প্রদর্শিত হলে উলম্বভাবে দেখাতে হবে। গণমিলনায়তন কিংবা সভায় পতাকা প্রদর্শন করা হলে বক্তার পেছনে ও ঊর্ধ্বে স্থাপন করতে হবে।

সারদাকাণ্ডে গ্রেফতার মমতার মন্ত্রী মদন

সারদা আর্থিক কেলেংকারিতে জড়িয়ে দুর্নীতির অভিযোগে সিবিআইর হাতে শুক্রবার গ্রেফতার হলেন পশ্চিমবঙ্গের পরিবহন ও ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্র। তার বিরুদ্ধে সিবিআই বেসরকারি আর্থিক সংস্থা সারদার কাছ থেকে অনৈতিকভাবে হুমকি দিয়ে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সুবিধা নেয়ার পাশাপাশি প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে। গ্রেফতারের পর মন্ত্রীকে ৫ ঘণ্টা ২০ মিনিট জেরা করা হয়েছে। আজ তাকে আলীপুর আদালতে তুলে ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর বিগত ৬৪ বছরে এই প্রথম পশ্চিবঙ্গের কোনো কেবিনেট মন্ত্রীকে দুর্নীতির অভিযোগে সিবিআই গ্রেফতার করল। স্বভাবতই মদনের গ্রেফতারে পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা পূর্ব ভারতে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মদনের পাশাপাশি এদিন গ্রেফতার হয়েছেন সারদাকর্তা সুদীপ্ত সেনের আইনজীবী নরেশ ভালোরিয়া।
এদিকে নিজের সহকর্মী মদন মিত্রকে গ্রেফতার করা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘পুরোটাই বিজেপির রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতা। দেশে স্বৈরতন্ত্র চালাচ্ছে বিজেপি।’ এরপরই দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মমতা বলেছেন, ‘ক্ষমতা থাকলে আমায় গ্রেফতার করো। বাংলাকে আক্রমণ করবেন না। বিজেপি ও সিবিআইয়ের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে গোটা বাংলা গর্জে উঠবে। সাহস থাকলে প্রতিরোধ করো।’ গ্রেফতারের পর অসুস্থ হওয়া মদন মিত্রকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করতে পারে সিবিআই। বিষয়টির উল্লেখ করে মোদিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে মমতা আরও বলেন, ‘পিজিতে আমি মদন মিত্রকে দেখতে যাব। ক্ষমতা থাকলে আটকাও।’
মন্ত্রী গ্রেফতারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি রাহুল সিং বলেছেন, ‘অনেকদিন আগেই মদন মিত্রকে গ্রেফতার করা উচিত ছিল। অসুস্থতার নাম করে কার্যত পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।’ নাম উল্লেখ না করে মমতার প্রতি ইঙ্গিত করে রাহুল বলেছেন, ‘মদনের পর এবার তৃণমূলের অন্য মাথারাও গ্রেফতার হবেন।’ ১৩ দিন আগে কলকাতায় এক জনসভায় বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সিদ্ধার্থনাথ সিং ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সারদাকাণ্ডে পরপর গ্রেফতার হবেন মদন, মুকুল ও মমতা। সিপিএমের পলিট ব্যুরোর সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী নেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী সিবিআই বা কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ না করে সাহস থাকলে সুপ্রিমকোর্টে যান। আমরা জানতে চাই, কেন কোটি টাকা খরচ করে মমতার ছবি কিনেছিলেন সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন?’
সকালেই সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সের সিবিআই দফতরে হাজির হন মদন মিত্র। সারদা তদন্তে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনেক আগেই তাকে হাজির হওয়ার নোটিশ পাঠিয়েছিল সিবিআই। তবে অসুস্থ থাকায় সিবিআইয়ের কাছে বেশ কিছুদিন সময় চেয়ে নেন মদনবাবু।

যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় ছাত্রসহ নিহত ৪ আহত ১১

ট্রাক-ভটভটি সংঘর্ষের পর বাসচাপায় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) ছাত্রসহ চারজন নিহত হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় এবং পরে শিক্ষার্থীদের ওপর পরিবহন শ্রমিকদের হামলায় শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১১ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে যশোর-চৌগাছা সড়কের পোলতাডাঙ্গা নামক স্থানে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কুবারহাট গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে আবু হানিফ (২৩), চৌগাছা আফরা গ্রামের রুহুল আমিনের ছেলে আনিছুর রহমান (২৫), একই গ্রামের হাবিবুরের স্ত্রী খাদিজা বেগম (৪৫) ও চৌগাছার ফুলসারা এলাকায় খাইরুল ইসলাম (৪৮)। প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা যশোর-চৌগাছা সড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করলে মোটর শ্রমিকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। এ সময় শ্রমিকদের হামলায় তিন ছাত্র আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী মোজাহার আলী জানান, বেলা ১১টার দিকে চৌগাছার দিক থেকে একটি যাত্রীবাহী আলমসাধু (ইঞ্জিনচালিত ভটভিিট) যশোরের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় চৌগাছাগামী একটি ট্রাক আলমসাধুকে ধাক্কা দেয়। এতে বিকট শব্দ হয়। এগিয়ে গিয়ে দেখি ৮-১০ জন পড়ে আছে। আলমসাধু দুমড়েমুচড়ে যায়। এ সময় যশোরগামী একটি বাস রাস্তায় ছিটকে পড়া যাত্রীদের ৩-৪ জনকে চাপা দিয়ে চলে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে মৃত্যু হয় খাইরুলের। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রী শারমিন সুলতানা বীথির অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া আহত পরিবেশবিজ্ঞানের ছাত্রী বাসবী ভট্টাচার্য, চৌগাছা উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের জাহাতাপের স্ত্রী খাদিজা বেগম, তার মেয়ে বৃষ্টি খাতুন, একই এলাকার তাহাজ্জেলের স্ত্রী স্বপ্না, তার মেয়ে রত্না, সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি গ্রামের আবু সাইদের ছেলে জাহিদ হাসান, শিবনাথপুরের বিজয় বিশ্বাসের ছেলে বিকাশ বিশ্বাসকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, আবু হানিফ নিহতের খবর শুনে আমরা (সহপাঠীরা) হাসপালের উদ্দেশে রওনা হই। ঘটনাস্থলে চুড়ামনকাটি এলাকার মোটর শ্রমিকরা আমাদের বাধা দেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধ করেন। দুর্ঘটনাকবলিত ট্রাকে আগুন দেন। এ সময় শ্রমিকরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান। এ সময় শ্রমিকদের হামলায় তিন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন- জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মনিরুজ্জামান, নাসির উদ্দিন ও পাভেল আহমেদ। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুপুর ২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। যশোর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইনামুল হক জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে আছে।

গুম খুনে তটস্থ চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থান থেকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো বছরে ৫০৩টি লাশ উদ্ধার করেছে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামে চলতি বছর নভেম্বর পর্যন্ত খুন হয়েছে ২৪৩ জন। অপরদিকে চট্টগ্রামে খাল, বিল, নদী-নালা, রাস্তার পাশে এবং নির্জন স্থানে মিলেছে অজ্ঞাত পরিচয়ের ২৬০ জন নারী-পুরুষের লাশ। এসব লাশ শেষ পর্যন্ত বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
গুম-খুনের ভয়ে আতংকিত চট্টগ্রামের বাসিন্দারা। চলতি বছরের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ছিল বিগত যে কোনো বছরের তুলনায় নাজুক। হয় খুন, নয়তো গুম করে হত্যার পর ফেলে দেয়া লাশ মিলেছে যত্রতত্র। অধিকাংশ লাশের পরিচয় মেলেনি। নিখোঁজের অভিযোগে থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে কয়েকশ’। এর মধ্যে অধিকাংশ নিখোঁজ ও অপহৃতের সন্ধান পাওয়া যায়নি। অজ্ঞাত লাশের অধিকাংশই অপহরণের পর গুম-খুনের শিকার হয়েছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। লাশ শনাক্ত না হওয়ায় চিহ্নিত করা যায়নি অপরাধীদেরও।
২৪৩ খুন : চট্টগ্রামে গত বছরের চেয়ে এ বছর খুনের ঘটনা বেড়েছে। চলতি বছর গত নভেম্বর পর্যন্ত খুন হয়েছে ২৪৩ জন। এরমধ্যে নগরীতে ১১২ জন এবং জেলার ১৪ উপজেলায় ১৩১ জন। ২০১৩ সালে খুন হয় ২২৮ জন। যার মধ্যে ১৪ উপজেলায় ১৩৬ ও নগরীতে ৯২ জন। এ বছরের হিসাবে গত নভেম্বরে নগরীতে ১০ এবং জেলায় ১১ জন খুনের শিকার হয়েছে। অক্টোবরে খুনের সংখ্যা নগরীতে ১১ ও জেলায় ১৫ জন। এ ছাড়া নগরী ও জেলা মিলিয়ে সেপ্টেম্বরে ১৯, আগস্টে ১৬, জুলাইয়ে ৩৩, জুনে ২১, মে-তে ১৯, এপ্রিলে ২১, মার্চে ১৮, ফেব্রুয়ারিতে ২১ এবং জানুয়ারিতে ২৮ জন খুন হয়েছে। এ বছর অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ৩৩টি। বেওয়ারিশ লাশ ২৬০ : চলতি বছর আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম ২৬০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। তার মধ্যে জানুয়ারিতে ২৫, ফেব্র“য়ারিতে ২৯, মার্চে ২৮, এপ্রিলে ২০, মে-তে ৩১, জুনে ২৬, জুলাইয়ে ৩০, আগস্টে ১০, সেপ্টেম্বরে ১৫, অক্টোবরে ২২, নভেম্বরে ১৯ এবং ডিসেম্বরে বুধবার পর্যন্ত ৫টি লাশ দাফন করেছে। ১৪ বছরে ৪ হাজার ১৭৬টি লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। এরমধ্যে ২০১৩ সালে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা ছিলা২৫৯টি। পুলিশের দাবি, শনাক্তকরণে উন্নত প্রযুক্তি না থাকায় অনেক লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে লোকজনের ফিঙ্গার প্রিন্টসহ বায়োডাটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় পুলিশ এখনও সনাতন পদ্ধতিতে বেওয়ারিশ লাশ শনাক্তকরণ পদ্ধতি অবলম্বন করে চলেছে।
পুলিশের পরিসংখ্যানের বাইরে থানায় মামলা না হওয়া কিংবা বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন হয়নি এমন আরও লাশ রয়েছে- যাদের খবর কেউ জানে না।
চাঞ্চল্যকর খুন : নগরীতে চলতি বছর ১১২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। ১৬ মার্চ নগরীর ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংক থেকে দুই বন্ধু এমইএস কলেজছাত্র ও ছাত্রলীগ কর্মী কামরুল হাসান (২০) এবং ফোরকানের (১৯) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এবং ছিনতাইয়ের টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়ে এ খুনের ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ ধারণা করছে। দুই লাশের হাত, পা ও চোখ বাঁধা এবং দুই পায়ের রগ কাটা ছিল। ২৪ মার্চ দিন-দুপুরে খুন হয় মা রেজিয়া খাতুন (৫০) ও মেয়ে সায়মা আকতার (১৭)। আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ১৭ নম্বর সড়কের ১২৯ নম্বর পদ্মা নামের একটি ভবনের চতুর্থ তলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের কুপিয়ে হত্যা করে কথিত প্রেমিক রায়হান ও তার এক সহযোগী। সায়মা আগ্রাবাদ সিডিএ গালর্স স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। নিহতরা সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের স্ত্রী ও মেয়ে। এ ঘটনাটি চট্টগ্রামে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ১৬ সেপ্টেম্বর হালিশহর মোল্লাপাড়ার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় নওগাঁ জেলার বিচারক কাজী আবদুল হাসিব মোহাম্মদ সাঈদের (৪৭) লাশ। বিচারককে খুনের অভিযোগে তার কথিত স্ত্রী সানজিদা আক্তার মিশু, তার মা লাকী আক্তার, ভাই ইমরান আহমেদ এবং বাসার গৃহপরিচারিকা রীমা আক্তারকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তবে বিচারক আÍহত্যা করেছেন মর্মে ৩০ সেপ্টেম্বর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হলে মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য সিআইডির কাছে হস্থান্তর করা হয়। সম্প্রতি আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে বিচারকের লাশ আবারও কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্ত করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে রিপোর্ট প্রকাশিত হবে বলে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক কাজল কান্তি বড়ুয়া জানিয়েছেন। ২১ ফেব্র“য়ারি কোতোয়ালি থানার ফিরিঙ্গিবাজার এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় অজ্ঞাত এক যুবককে। এখন পর্যন্ত নিহত যুবকের পরিচয় মেলেনি। উদ্ঘাটন করা যায়নি হত্যারহস্য। ৬ মার্চ পাহাড়তলী কৈবল্যধামের নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় রাজীব শীল ও তার স্ত্রী সঙ্গীতা শীলের লাশ। রাজীব চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত একটি স্কুলের শিক্ষক। পরিবারের দাবি ওই দম্পতিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ১৩ মার্চ রাতে নগরীর শিল্পকলা একাডেমিসংলগ্ন এমএম আলী রোডে নিজ ফ্ল্যাট থেকে ব্যবসায়ী ওমর ফারুকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
চট্টগ্রামে চলতি বছর অপহরণ এবং নিখোঁজের অভিযোগে থানাগুলোতে অসংখ্য মামলা হয়েছে। গত এক যুগে নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে কয়েক হাজার লোক। বহু নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পরিবার-পরিজন এখনও পায়নি। এমনকি তারা বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে সেটিও অবগত নয়। তারপরেও হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটি একদিন ফিরে আসবে এমন আশায় দিন কাটে স্বজনদের।
কয়েক বছরেও সন্ধান মেলেনি রাউজান বাগোয়ান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু জাফর, সন্ত্রাসী আজিম উদ্দিন মাহমুদ, বোয়ালখালী করলডেঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বাচাসহ অসংখ্য ব্যক্তির। পুলিশ জানায়, অজ্ঞাত লাশগুলোকে বেওয়ারিশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিভিন্ন নদী-খাল, নালা, পাহাড় ও নির্জন স্থানে পাওয়া এসব লাশ উদ্ধার করার পর তিন দিন অপেক্ষা করা হয়। এরপর আঞ্জমান মফিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে এসব লাশ দাফন করা হয়। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেওয়ারিশ লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। অনেক হত্যা রহস্য এ কারণে উদ্ঘাটিত না হওয়ায় নগরীতে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জেলা পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আক্তার যুগান্তরকে জানান, যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার অধিকাংশই পারিবারিক সহিংসতার ফল। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।
সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) বনজ কুমার মজুমদার জানান, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। অপহরণের সঙ্গে জড়িত অনেককে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। আর যেসব অজ্ঞাত লাশ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো অন্য কোনো স্থানে হত্যা করার পর অপরাধীরা এনে ফেলে রেখে যাচ্ছে।

অবশেষে মামলা নিলেন দোহারের ওসি

অবশেষে মামলা নিলেন দোহার থানার ওসি। তবে ঘটনার ১০ দিন পর। তা আবার ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির ধমক খেয়ে। দোহার উপজেলার নয়াবাড়ি ইউনিয়নের আন্তা গ্রামের নাজমা ওরফে মোনালিসা সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন ২ ডিসেম্বর। সন্ত্রাসীরা তার হাত-পা পিটিয়ে ভেঙে দেয়। ঘটনার পর মোনালিসার পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ করার ১০ দিন পার হলেও মামলা নিতে গড়িমসি করেন ওসি মোহাম্মদ মাহমুদুল হক। অবশেষে কেরানীগঞ্জ সার্কের এএসপির শরণাপন্ন হলে তিনি ওসিকে মামলা নিতে বলেন। এএসপির নির্দেশ পেয়ে শুক্রবার ওসি মাহমুদুল হক মামলা নেন। ২ ডিসেম্বর জমিসংক্রান্ত ঘটনা নিয়ে স্থানীয় যুবক ইমনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় মোনালিসার। তর্ক-বিতর্কের একপর্যায়ে ইমন ও তার সহযোগীরা মোনালিসাকে গাছের ডাল দিয়ে পিটিয়ে বাম হাত ও পা গুরুতর জখম করে। এতে তার হাত ও পা ভেঙে যায়। আহত মোনালিসা জানান, হামলার শিকার হয়ে দোহার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হই। ৭ দিন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরলেও হাত-পায়ের ক্ষত নিয়ে কষ্টে দিন যাপন করছি। নয়াবাড়ী ইউনিয়নের একজন জনপ্রতিনিধির মদদে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি।
ভুক্তভোগী মোনালিসা দোহার থানায় মামলা করতে না পেরে শুক্রবার বেলা ১১টায় কেরানীগঞ্জ সার্কেল এএসপি শহীদুল ইসলামের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। তার নির্দেশে অবশেষে মামলা নেন ওসি। এএসপি শহীদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ওসিকে দ্রুত মামলা নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে দোহার থানার ওসি মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন, এ বিষয়ে মামলা হচ্ছে। এতদিন পরে কেন মামলা নেয়া হচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে ওসি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

মানচিত্র পাল্টে যাচ্ছে

পাল্টে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের মানচিত্র। ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় জমিসংক্রান্ত সমস্যা নিরসন এবং দেশের অচিহ্নিত সীমানা চিহ্নিত করায় দু’দেশের সীমান্ত রেখায় কিছুটা পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তনের ফলে ৫২ হাজার ছিটমহলবাসীর ৬৩ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের সমস্যা নিরসনে ভারতের সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে দেশটি সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সংসদের চলতি শীতকালীন অধিবেশনেই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভারত সরকার তাদের সংবিধান সংশোধনীর বিল পাস করতে যাচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, চুক্তির বাস্তবায়ন হলে ভারত তার প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে এক ধাপ এগোবে। এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বরফ গলবে অনেক বেশি, যা অপরাপর অমীমাংসিত ইস্যু নিষ্পত্তিতে সহায়ক হবে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ভারত আমাদের আশ্বস্ত করেছে, তারা শিগগিরই সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করবে। আমরা আশা করি, এই লক্ষ্যে শীতকালীন অধিবেশনেই ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হবে।’ ভারতের পার্লামেন্টে ২৪ নভেম্বর শুরু হওয়া শীতকালীন অধিবেশন ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এর আগে অনুষ্ঠিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিল পাসের পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। তিনি বলেন, সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ভারত ভূমি হারাতে পারে বলে কোনো কোনো মহল থেকে যে আশংকার কথা বলা হচ্ছে, এটা সঠিক নয়। কারণ যে জমি ভারতের দখলে নেই, সেই জমি হারানোর প্রশ্ন আসে কিভাবে। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরকালে বাংলাদেশ-ভারত ১৯৭৪ সালের সীমান্ত চুক্তির একটি অতিরিক্ত প্রটোকল সই হয়। সেখানে ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় ভূমির হস্তান্তর এবং অচিহ্নিত স্থলসীমানা চিহ্নিত করার মাধ্যমে একটি প্যাকেজ সমাধান করা হয়। এই সমাধানের লক্ষ্যে দুই দেশের জরিপ কর্মকর্তারা বিরোধপূর্ণ এলাকায় গিয়ে গুচ্ছ মানচিত্র প্রস্তুত করেন। এই গুচ্ছ মানচিত্র দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষর ও হস্তান্তর হয়েছে। ফলে ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির বলে পরিচিত সীমান্ত চুক্তিতে এমনভাবে ২০১১ সালের নতুন প্রটোকলে যুক্ত করা হয়েছে যে, সীমান্তের কোনো বাসিন্দাকেই সরানো হবে না। যারা যেভাবে বর্তমানে সীমানা দখলে রেখেছেন তা স্থির রেখে নতুন সীমানা রেখা টানা হয়েছে। ফলে দুই দেশের মানচিত্রে খানিকটা বদল হয়েছে বটে। মানচিত্র বদলের কারণেই ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধন করে এই চুক্তি অনুসমর্থন করতে হচ্ছে।
ছিটমহল বিনিময়ের পর ভারতের ছিটে বসবাসকারীদের পুনর্বাসনের সব দায়-দায়িত্ব ভারত সরকার বহন করবে। আগেও এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ছিট বিনিময়ের আগ মূুহূর্তে বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্যই বৃহস্পতিবার দিল্লিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বৈঠক করেন। এতে সিদ্ধান্ত হয় পুনর্বাসনের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের, রাজ্যের নয়। একই সঙ্গে তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকে অবহিত করার বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ভেতরে ভারতীয় ছিটমহল বসবাসকারীদের কেউ যদি ভারতে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন তবে তার পুনর্বাসনে সব দায় কেন্দ্রীয় সরকার বহন করবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নাগরিকত্ব দেয়াসহ সব দায়িত্ব পালন করবে ভারতের সরকার। ছিটমহলবাসীর নাগরিকত্ব দেয়াসহ পুনর্বাসনে রাজ্য সরকারের কোনো সুপারিশ থাকলে কেন্দ্র তাও বিবেচনা করবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং রাজ্য পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ডিজি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে একদা বিরোধিতাকারী বিজেপির এখনকার যুক্তি হল, আসামসহ ভারতে বাংলাদেশীদের ‘অনুপ্রবেশ’ বন্ধে মোক্ষম হাতিয়ার হবে এই চুক্তির বাস্তবায়ন। নিউইয়র্ক ও কাঠমান্ডুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের পর এই বিল পাসে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার বিজেপি। তিস্তার পানিবণ্টন ও সীমান্ত চুক্তির ইস্যুতে ভারত প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়ন না করায় বাংলাদেশ ট্রানজিটের প্রস্তাবিত অবকাঠামো চুক্তি নিয়েও অগ্রসর হচ্ছে না। অনেকেই মনে করেন, ভারতে মোদির বর্তমান সরকার একটি ব্যবসাবান্ধব সরকার হওয়ায় গোটা ভারতে বাণিজ্য বাড়াতে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ট্রানজিট জরুরি। বাংলাদেশের সহায়তা ছাড়া এই কানেকটিভিটি সম্ভব নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মোদি আগে প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়নে মনোযোগী হয়েছেন। এদিকে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের কাছাকাছি সময়ে ১৮ ডিসেম্বর ভারত সফরে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। সফরকালে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হবে। এই চুক্তির বাস্তবায়নকে সীমান্তে হত্যা বন্ধে একটি হাতিয়ার হিসেবে মনে করে।
জানা গেছে, কংগ্রেসদলীয় এমপি শশী থারুরের নেতৃত্বে পার্লামেন্টের এ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি বিলটি পাসের সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। মোদির আসাম সফরের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিজেপির আসাম শাখার এই বিলের ব্যাপারে আপত্তি আর নেই। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রীতিমতো ইউটার্ন নিয়ে কুচবিহার সীমান্তে ঘোষণা দেন যে, তিনি ছিটমহল বিনিময়ের লক্ষ্যে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে। ফলে এই বিল পাসে আপত্তি দেয়ার মতো একমাত্র দল ‘আসাম গণপরিষদ’। কিন্তু বাধা দিয়ে এই বিল আটকে দেয়ার মতো ক্ষমতা তাদের নেই। ফলে বিলটি পাস হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
গত কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সংবিধান সংশোধনের এই বিল ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় উত্থাপন করা হলে বিজেপি, আসাম গণপরিষদ এবং মমতার তৃণমূল কংগ্রেস তার বিরোধিতা করে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের এই বিলের ব্যাপারে তেমন আপত্তি না থাকলেও আসাম ইউনিট এই বিষয়ে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে। ভারতের পার্লামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী সেখানে একবার কোনো বিল উত্থাপন হলে তা থেকে যায়। এই কারণে বিগত আমলে কংগ্রেস যে বিলটি এনেছিল, তা এখন পরিবর্তন ও পরিবর্ধনসহ পাস হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ভারতে সংবিধান সংশোধন করতে হলে পার্লামেন্টে উভয় কক্ষ অর্থাৎ উচ্চকক্ষ রাজ্যসভা এবং নিুকক্ষ লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে তা পাস হতে হবে। লোকসভায় বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় অনায়াসেই এই বিল পাস হয়ে যাবে। রাজ্যসভায় সংবিধান সংশোধনের মতো বিল পাসে পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই বিজেপির। কিন্তু বিলটি যেহেতু গত আমলে কংগ্রেসই উত্থাপন করেছে, ফলে এই বিলে কংগ্রেস সমর্থন দেবে। এ অবস্থায় সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসে তেমন কোনো বাধা নেই। এখন শুধু অপেক্ষা কবে এটি পাস হয়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি সোমবার দিল্লি থেকে টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘আশা করি আগামী ১০ দিনের মধ্যেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধনী বিল পার্লামেন্টে পাস হবে। কার্যপ্রণালী বিধি মোতাবেক এখন পার্লামেন্টের যৌথসভা ডাকা হবে। সেখানে বিলটি নেয়া হলে তার ওপর ভোটাভুটি হবে। এছাড়া এই বিল পাসের ক্ষেত্রে বড় কোনো বাধা নেই।’
সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন যে দুই দেশের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার পূরণ ঘটাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই- এমন কথাই বলেছেন ভারতের অবসরে যাওয়া কূটনীতিক বীণা সিক্রি। তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন। দেখুন, সীমান্তের এই সমস্যাটা বাংলাদেশের স্বাধীনতারও বহু আগের। দীর্ঘদিন ধরেই ঝুলে আছে এই সমস্যা। তারপর ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি হল। প্রটোকল সই হল। এখন সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হলে মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন হবে।’
সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা জানতে চাইলে বীণা সিক্রি বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমান্ত চুক্তি কিভাবে প্রভাব ফেলবে বলতে পারছি না। তবে ভারতে প্রত্যেকেই এই চুক্তি বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের অপেক্ষায় আছেন। সবারই প্রত্যাশা, দীর্ঘদিন ধরে যে চুক্তি ঝুলে আছে তার বাস্তবায়ন সম্পন্ন হোক। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের একেবারে শুরু অর্থাৎ মে মাস থেকেই এই চুক্তি বাস্তবায়নে সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মাথায় ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তির বাস্তবায়নকে সবাই বিজেপির সাফল্য হিসেবে দেখবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই চুক্তির বাস্তবায়ন সবচেয়ে ভালো খবর হয়ে আসবে ছিটমহলবাসীর মধ্যে। সেখানে লোক গণনা হয়ে গেছে।’ বীণা সিক্রি বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আমার সময়ে একবার বন্যা হয়েছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দারা তখন কোনো সহায়তা পায়নি। বাংলাদেশ থেকে সহায়তা করা হয়নি যেহেতু তারা ভারতের নাগরিক। অপরদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গিয়ে ভারতও কোনো সহায়তা করতে পারেনি। ফলে ছিটমহলের বাসিন্দারা অভাবনীয় দুর্ভোগে দিনাতিপাত করেছেন। ছিটমহলের মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনশৃঙ্খলা সব ক্ষেত্রেই বঞ্চিত। তারা যে অন্তহীন সমস্যার মধ্যে থাকেন তার একটা অবসান হবে এটাই শুভ সংবাদ।’ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পর কি নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসতে পারেন এই প্রশ্নে বীণা সিক্রি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুই দফা দেখা হয়েছে। একবার নিউইয়র্কে, আরেকবার কাঠমান্ডুতে, তারা নিশ্চয়ই আলোচনা করেছেন। ফলে অপেক্ষা করুন, দেখুন কী হয়।’
সংবিধান সংশোধনী বিল ভারতের পার্লামেন্টে সহসাই পাস হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ভারতের পার্লামেন্টের চলতি শীতকালীন অধিবেশনেই সীমান্ত চুক্তির বিল পাস করা সম্ভব। তবে যেভাবে প্রক্রিয়াটা অগ্রসর হচ্ছে তাতে শুধু সংবিধান সংশোন বিল পাসই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠ পর্যায়ে এই চুক্তির বাস্তবায়নও প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘ভারতের পার্লামেন্টে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হলে এটা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুবই ইতিবাচক হবে। দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। তবে আমরা একই সঙ্গে আশা করি, তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিসহ অনিষ্পন্ন সব ইস্যুর দ্রুত নিষ্পত্তি করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হবে।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির আরও বলেন, ‘সীমান্ত চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে ছিটমহলে মানুষ যে অমানবিক জীবনযাপন করছে তার একটা অবসান হবে। তাদের মানবেতর জীবনের অবসান করাটা একটা মানবিক দায়িত্ব। এই দায়িত্বই পালন হবে।’
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের লক্ষ্যে স্যার সিরিল রেডক্লিফের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ভারত ও পাকিস্তানের মানচিত্র এঁকেছিলেন। তারপর পূর্ব পাকিস্তানের এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ। এখন সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই মানচিত্র কিছুটা বদলে যাবে। এ কারণে ভারতের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কূটনীতিক বলেছেন, সীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধন প্রয়োজন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ইতিপূর্বে বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তরের সময়েও বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হয়েছিল।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমেনা মহসীন মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘ভারতে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করে এই বিল পাস করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে এই ঐকমত্যের সৃষ্টি হওয়ায় এতদিন ঝুলে থাকা সমস্যা সমাধান সম্ভব হবে। এই বিল পাস হলে এটা ইতিবাচক হবে এ কারণে যে, এর মাধ্যমে সীমান্তে বহু সমস্যা সমাধানের পথ খুলে যাবে। যেমন- সীমান্ত হাট, সীমান্ত এলাকার উন্নয়ন, যার সুফল ভোগ করবে দুই দেশের জনগণ।’
ছিটমহল বিনিময় : ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের পর এখন দেশটির পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সংবিধান সংশোধনী পাস হলেই সীমান্ত সংক্রান্ত তিনটি বিরোধের নিষ্পত্তি হবে। এগুলো হল- ছিটমহল বিনিময়, অপদখলীয় ভূমির হস্তান্তর এবং অচিহ্নিত স্থলসীমানা চিহ্নিতকরণ। ছিটমহল হচ্ছে কোনো দেশের মূল ভৌগোলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্য একটি দেশের মূল ভৌগোলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান ভূখণ্ড বা জনপদ। ছিটমহল থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ওখানে যেতে হলে অন্য দেশটির জমির ওপর দিয়ে যেতে হয়। ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় সম্ভব হবে। এর জন্য ভারতকে ১৭ হাজারের কিছু বেশি একর জমি বাংলাদেশকে দিতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের এখন ১১১টি ছিটমহল রয়েছে। এগুলো বাংলাদেশ পাবে। অপরদিকে ভারত পাবে সাত হাজার একরের একটু বেশি জমি। ২০১১ সালের লোক গণনা মোতাবেক বাংলাদেশে ভারতের ছিটমহলে জনসংখ্যা ৩৮ হাজার এবং ভারতে বাংলাদেশের ছিটমহলে লোকসংখ্যা ১৪ হাজার। কেননা ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের যে ৫১টি ছিটমহল রয়েছে সেগুলো ভারত পাবে। এসব ছিটমহল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল অর্থাৎ পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় এবং সীমানার ওপারে ভারতের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলায় অবস্থিত। কোচরাজারা এবং রংপুরের মহারাজারা মূলত ছিল সামন্ত। তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমনকি ঋণ পরিশোধে মহলের বিনিময় পর্যন্ত ছিল। মোগল আমলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজা ও মহারাজারা মিলিত হতো তিস্তা পারে দাবা ও তাস খেলার উদ্দেশে। খেলায় বাজি ধরা হতো বিভিন্ন মহলকে, যা কাগজের টুকরা দিয়ে চিহ্নিত করা হতো। খেলায় হার-জিতের মধ্য দিয়ে এই কাগজের টুকরা বা ছিট বিনিময় হতো। সঙ্গে সঙ্গে বদলাত সংশ্লিষ্ট মহলের মালিকানা। এভাবে সেই আমলে তৈরি হয়েছিল একের রাজ্যের ভেতরে অন্যের ছিটমহল।
অপদখলীয় ভূমি হস্তান্তর : ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম এবং ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় অনেক স্থানে দুই দেশের বাসিন্দারা সীমান্ত রেখা ছাড়িয়ে গিয়ে ভূমি দখল করে রেখেছে বছরের পর বছর। যাদের দখলে আছে তারা এসব বিরোধপূর্ণ স্থানে কৃষি কাজও করছে। এখন এসব ভূমি বহু বছর ধরে যে দেশ দখল করে রাখছে তাদের কাছে ছেড়ে দিয়ে অপদখলীয় ভূমির হস্তান্তর হবে চুক্তি বাস্তবায়ন হলে। এক্ষেত্রে রেডক্লিফের সীমান্ত রেখারও পরিবর্তন হচ্ছে। যার ফলে নতুন গুচ্ছ মানচিত্র তৈরি করেছেন দুই দেশের জরিপ কর্মকর্তারা। অপদখলীয় ভূমিগুলোও বিনিময় করা হবে, যার ফলে ভারত প্রায় দুই হাজার আটশ’ একর জমি পাবে। আর বাংলাদেশকে দিতে হবে দুই হাজার দুইশ’ ষাট একরের মতো জমি।
অচিহ্নিত স্থলসীমানা চিহ্নিতকরণ : বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চার হাজার কিলোমিটারের বেশি স্থলসীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্তের মধ্যে তিনটি স্থানে সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা এখনও অচিহ্নিত রয়েছে। এই স্থানগুলোতে বিরোধপূর্ণ এলাকা দিয়ে প্রায়ই সীমান্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এখন সীমানায় যে স্থান যার দখলে রয়েছে সেখানেই সীমান্ত রেখা টেনে গুচ্ছ মানচিত্র করা হয়েছে। সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন হলে এই অবশিষ্ট অচিহ্নিত সীমানাও চিহ্নিত হয়ে যাবে।
ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর সিরিল রেডক্লিফ ভারত ও পাকিস্তানের মানচিত্র এঁকেছিলেন। তারপর পূর্ব পাকিস্তানের এলাকাগুলো নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশ। এখন সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই মানচিত্রের কিছুটা বদলে যাবে। এ কারণে ভারতের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কূটনীতিক বলেছেন, সীমান্ত চুক্তির অনুসমর্থনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধানের সংশোধন প্রয়োজন হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ইতিপূর্বে বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তরের সময়েও বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন হয়েছিল।

ঢাবির ৬ হলে ছাত্রলীগের ইয়াবা সিন্ডিকেট by নুর মোহাম্মদ

ছিনতাই, অপহরণ, টেন্ডারবাজির পর এবার ইয়াবা ব্যবসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। চলতি  সপ্তাহে ঢাবি’র মুহসীন হলে ১২৫০ পিস ইয়াবা ধরাপড়ার পর বিষয়টি সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগ এই ব্যবসা করলেও অনেকটা অজানা-অধরা ছিল। সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটে ভাগ-বাটোয়ারা এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের ভাগের অংশ কমে যাওয়ায় এই ঘটনা ফাঁস করে দেয়া হয়েছে। এরপর কেঁচো খুঁড়তে সাপ পেয়েছে ঢাবি কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ। গোয়েন্দা সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র জানায়, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, এফ. রহমান হল, মুহসীন হল, শহীদুল্লাহ হল, মাস্টার দা সূর্যসেন এবং জগন্নাথ হল থেকে রাজধানীর অর্ধেকের বেশি এলাকায় মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ হয়। এই ৬টি হল থেকে ক্যাম্পাস থেকে দ্রুত বের হওয়ার পাশাপাশি হলের ছাত্রলীগের সিন্ডিকেট শক্ত। তাই এই ৬টি হলকে বেছে নেয়া হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছেন, কোন ছাত্র এই অনৈতিক কাজে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে বসে ইয়াবাসহ মাদকের ব্যবসা করে আসছে। এই সিন্ডিকেটের প্রধান নিয়ন্ত্রক মুহসীন হলের ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করে ঢাবি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা। এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছে না কেউ। বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি জানলেও কোন ধরনের অভিযান চালায়নি। এমনকি হল কর্তৃপক্ষ নীরবে নিভৃতে সহ্য করে গেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মাসে মুহসীন হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মাদক ব্যবসার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মতপার্থক্য হয়। সেখানে সভাপতি গ্রুপ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এক নেতার চাহিদা অনুসারে ভাগ দিতে রাজি না হওয়ায় এই কেন্দ্রীয় নেতা অপর গ্রুপকে প্রস্তাব দেয় পুরো ব্যবসা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার। বিষয়টিতে কয়েক দফা দেন-দরবার হলেও কোন সুরাহা হয়নি। এরপর সাধারণ সম্পাদক গ্রুপ সিদ্ধান্ত নেয় এই সিন্ডিকেট ফাঁস করে দেয়ার। এরই অংশ হিসেবে গত রোববার পুলিশকে খবর দেয় সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের সিন্ডিকেট। ওই সময় পুলিশকে সকল ধরনের তথ্যের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনও হয়। এরপর ঘটনাস্থল থেকে ১২৫০ পিস ইয়াবাসহ আটক করে ৭ জন বহিরাগতকে। পরে আটককৃত ৭ জন হল সভাপতির নাম বললেও আজ অবধি কোন ব্যবস্থা নেয়নি ঢাবি ছাত্রলীগ। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন মামলা পর্যন্ত করেনি।
জানা গেছে, পুলিশের সামনেই আটককৃতদের মারধর করে সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের কর্মীরা। এর সঙ্গে সভাপতির লোকজন জড়িত বলে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিতেও চাপ দেয়। এরপর সাধারণ সম্পাদক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে প্রেক্ষাপট পাল্টানোর চেষ্টা করেন। সেই  আবার আটককৃতদের মারধর করে সভাপতির সিন্ডিকেট জড়িত বলতে চাপ দেয়। এরপর পুলিশ তাদেরকে থানায় নিয়ে যায়। হল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুইজন কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রশ্রয় পেয়ে বেপরোয়া হয়ে পড়েছে। কোন কিছুতেই তাদের থামানো যাচ্ছে না। সূত্র আরও বলছে, হল সভাপতির প্রশ্রয়ে দীর্ঘদিন ধরে হলে এই মাদকের ব্যবসা করছে বহিরাগত কিছু ছেলে। প্রতি মাসে এ খাত থেকে হল সভাপতিকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দেয়া হতো। সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা আশরাফ নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীর সঙ্গে মনোমালিন্যর প্রেক্ষিতে তাকে হল থেকে বের করে দেয়া হয়। এরপর সেই এই ইয়াবা ব্যবসার কথা ফাঁস করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে বছর খানেক নাজমুল নামে আরেক ছাত্রলীগ কর্মী এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতো। সে বর্তমানে এই ব্যবসার বাইরে রয়েছে।
জানা গেছে, শুধু মাদক নয়, ঢাবি ছাত্রলীগের অধিকাংশ নেতা সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে বসে জুয়া খেলা, নেশা করা ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত থাকেন। সিন্ডিকেট নতুন করে এই উদ্যানে বসে ইয়াবার বড় চালান রাজধানীর বিভিন্ন অংশে পৌঁছায়। এর আগে চলতি বছর ৯ই মে রাতে কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক অনুপম চন্দ্র, মুহসীন হলের ছাত্র বৃত্তি বিষয়ক সম্পাদক আবদুুল্লাহ আল মামুন ও কর্মী হিমেল মোবাইল ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী ফরহাদকে অপহরণ করে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছে। ঢাবি কর্তৃপক্ষ তাদেরকে ১১ই মে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছেন। জানা গেছে, এই চারজন ছাত্রলীগ নেতা সবাই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাজমুলের ক্যাডার বলে পরিচিত। এদের অর্থের ভাগ নাজমুল পেয়ে থাকেন। সূত্র বলছে, সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানকন্দ্রিক সব ধরনের চাঁদাবাজি, অপহরণ, ব্ল্যাকমেইলিং সহ সকল অপকর্মের সঙ্গে ঢাবি ছাত্রলীগ জড়িত। আর এরা কেন্দ্রীয় ও ঢাবি ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করে এমন গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র বলছে, ঢাবি’র মুহসীন, এসএম, এফ. রহমান, জগন্নাথ, সূর্যসেন ও শহীদুল্লাহ এই ছয়টি হল থেকে রাজধানীর ইয়াবা নিয়ন্ত্রণ হয়। ক্যাম্পাসকে ব্যবসার নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে সিন্ডিকেটগুলো। এর আগে এই হলগুলো থেকে অপহরণ, প্রশ্নফাঁস, ইয়াবা, মাদক বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। মুহসীন হলের সূত্র বলছে, এই হলের সভাপতি মাকসুদুর রহমান মিঠুর বিরুদ্ধে এর আগে একাধিক অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের কাছে করা হলেও বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের আস্থাভাজন হওয়ায় সব ঘটনাই পার পেয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক সম্পাদক মাকসুদ, হল শাখার সাবেক কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. এএম আমজাদ বলেন, ক্যাম্পাসকে সকল ধরনের সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত রাখতে যা করা দরকার সবই করবো। এর সঙ্গে ছাত্রলীগ জড়িত বলে অভিযোগ এসেছে বিষয়টি জানতে চাইলে বলেন, যারাই জড়িত থাকুক কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওমর শরীফ বলেন, ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে কোন ছাত্রলীগ নেতাকর্মী সম্পৃক্ত না। বিশ্ববিদ্যালয় বসে কোন মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট করা হয় না। তারপরও যদি কোন ধরনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় তবে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে।
সূত্র আরও বলছে, এই ৬টি হলে নিয়মিত মাদকের আখড়া বসে। সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা এসএম ও মুহসীন হলে নিয়মিত মাদকের আখড়া বসান। সমপ্রতি পর্নো ছবি তৈরির সরঞ্জামসহ বংশালের একটি হোটেল থেকে আটক করা হয় এ হলের বেশকিছু শিক্ষার্থীকে। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় বেশকিছু নেতাকর্মীর এ ঘটনায় জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।

বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সুন্দরবনে

উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা সর্বত্র। নানা শঙ্কা চারদিকে। তেল দূষণে পরিবেশের ওপর প্রভাব নিয়ে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন। ইতিমধ্যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সুন্দরবনে। সুন্দরবনকে ঘিরে বিরল প্রজাতির ইরাবতী ডলফিন বসবাসের অভয়ারণ্য। দূষণের প্রভাবে ডলফিন বিলুপ্তির শঙ্কাও রয়েছে। ভয়াবহ দূষণে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ারও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওদিকে তেলের আস্তরণে গতকাল রাসায়নিক পদার্থ ছিটানো শুরু করলে বন বিভাগের বাধায় তা স্থগিত করা হয়। তবে খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন কেমিস্ট রাসায়নিকটি পরীক্ষা করছেন। ওদিকে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে ঘটনার ৪ দিন পরও ভেসে থাকা তেলের ক্ষেত্রে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার থেকে ভাসমান তেল সংগ্রহে মাঠে নেমেছে স্থানীয়রা। তারা ফোম, ছালার চট-কলাপাতা দিয়ে তেল সংগ্রহ করছে। পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এ তেল কিনে রাখছে ৩০ টাকা লিটার দরে। গতকাল পর্যন্ত ১০০০ লিটার তেল সংগ্রহ হয়েছে। ভাসমান তেল সংগ্রহে জনগণকে আগ্রহী করতে মাইকিং করা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের করা পৃথক দুটি কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ইতিমধ্যে সরকারের ভেতর-বাইরে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তেল ছড়িয়ে পড়ার পর সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন নিয়ে নৌমন্ত্রণালয় এতখানি উদাসীনতা দেখাবে তা আমি আশা করিনি। স্থানীয় পদ্ধতিতে তেল সংগ্রহকে তিনি তুলনা করেছেন রোগীর মৃত্যুর পর অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার দাবির সঙ্গে। ওদিকে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বিবিসিকে বলেছেন। রোববার বৃটিশ তেল শোধনাগার কোম্পানির লোকজন আসছেন বাংলাদেশে। তারা তেল অপসারণে কাজ করবে।
বালি পরিবহনের কার্গো দিয়ে পরিবহন হচ্ছিল তেল
রাশিদুল ইসলাম, খুলনা থেকে জানান, সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে ফার্নেস অয়েল বোঝাই সাউদার্ন স্টার-৭ ট্যাঙ্কার তেল পরিবহনের উপযোগী ছিল না। এ নৌযানটি মূলত বালি পরিবহন কার্গো ছিল। অধিক মুনাফা লাভের আশায় কার্গোটি রাতারাতি তেলবাহী পরিবহন হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। কার্গোর মালিক ভোলার মেসার্স হারুন অ্যান্ড কোং। নাম আমির হোসেন ফরিদ। তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের শ্যালক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন। তার ট্যাঙ্কারের তেল পরিবহনের যথাযথ কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রীর শ্যালক হওয়ায় দাপট দেখিয়ে কাজ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার চারদিন পরও দুর্ঘটনাস্থলে আসেনি ট্যাঙ্কারের মালিক। তার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও মুখ খুলছে না। এর মধ্যে একটি মহল ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে। শুক্রবার বেলা আড়াইটায় টাগবোটে অবস্থানরত পরিবেশ অধিদফতরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মল্লিক আনোয়ার হোসেন জানান, এই অয়েল স্পিলড ডিসপারসেন্ট কোন দেশ থেকে আমদানি করা, এটি তৈরি ও মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ, এর আমদানি কোড এবং রাসায়নিক নাম ঢাকার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ইতিবাচক সাড়া পেলেই এটি ছিটানো শুরু হবে। টাগবোটের ভেতরেই খুলনা পরিবেশ অধিদফতর থেকে আসা একজন কেমিস্ট রাসায়নিকটি পরীক্ষা করছেন জানিয়ে মল্লিক আনোয়ার আরও জানান, এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল ইতিবাচক হলে এক দিনেই কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। কোন কোন রুটে এই রাসায়নিকটি ছিটানো হবে? তিনি বলেন, যে চ্যানেলে জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে সেই চ্যানেলেই রাসায়নিকটি ছিটানো হবে। তিনি আরও বলেন, ছড়িয়ে পড়া তেল সংগ্রহের জন্য বৃহস্পতিবার থেকেই জেলে ও স্থানীয়রা কাজ করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানির লোকজন ওই সংগৃহীত তেল কিনে নিচ্ছেন।
এদিকে ট্যাঙ্কার ডুবে যাওয়ার ফলে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি জলজ প্রাণীর ব্যাপক প্রাণনাশের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ট্যাঙ্কার ডুবে যাওয়ার পর সমন্বয়হীনতার অভাবে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নৌপরিবহন, মংলাবন্দর কর্তৃপক্ষ, বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও পরিবেশ অধিদফতর যৌথভাবে কোন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারিনি। যে কারণে ঘটনার চারদিন পরও নদীতে তেল ভাসছে। জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যবসায়ী সুলতান মাহমুদ পিন্টু জানান, জ্বালানি তেল নৌপথে পরিবহনের জন্য ট্যাঙ্কার ব্যবহার করার বিধি বিধান রয়েছে। এজন্য ট্যাঙ্কারগুলো শুধুমাত্র তেল পরিবহনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। যাতে ঢেউ বা কোন আঘাত লাগলে এক হ্যাচের তেল অন্য কোন দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে না।
ছোটখাটো আঘাতেও সেই ট্যাঙ্কারের কোন ক্ষতি হয় না। ওটি সাউদান স্টার-৭ গত ৭ই ডিসেম্বর খালিশপুরস্থ পদ্মা ডিপো থেকে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস ওয়েল বোঝাই করে গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ প্লান্টের জন্য যাচ্ছিলেন। যার বাজার মূল্য দুই কোটি ১৫ লাখ টাকা। পদ্মা তেল কোম্পানির ডিপো ম্যানেজার আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ট্যাঙ্কারের পরিবর্তে কার্গোতে ফার্নেল অয়েল সরবরাহ করলেন কেন? জানাতে চাইলে তিনি জানান, সরকার যখন জরুরি বিদ্যুৎ প্লান্ট তৈরি করে তখনই জরুরি ভিত্তিতে ফার্নেস অয়েল পরিবহনের জন্য এই ধরনের কার্গোকে সাময়িক অনুমতি দিয়ে ছিল। সে কারণে তারা ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করেন। পদ্মা তেল কোম্পানির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার ইব্রাহিম হাফিজুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ প্লান্টগুলোর জন্য তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফার্নেস অয়েল সরবরাহ করেন। তিনি জানান, পরিবহন ঠিকাদার তাদের জানিয়েছেন শ্যালা নদীতে কুয়াশার জন্য নৌ-যানটি নোঙর করেছিল এবং পরে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। তিনি জানান, ঠিকাদার নিয়োগ করে বিদ্যুৎ প্লান্টগুলোর কর্তৃপক্ষ। এখানে তাদের কিছু করণীয় নাই। এ ব্যাপারে পরিবহন ঠিকাদার ভোলার মেসার্স হারুন অ্যান্ড কো. এর মালিক আমির হোসেন ফরিদ জানান, কার্গোটি প্রথমে বালি পরিবহন করা হলেও পরে তেল পরিবহন করার জন্য মিনি ট্যাঙ্কারে রূপান্তর করা হয়। এবং আটটি পাম্প বসানো হয়েছে। এটি কত সালে তৈরি তা তিনি বলতে পারেননি। অতিরিক্ত তেল ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি দাবি করেন, কার্গোটির বীমা করা থাকলেও ফার্নেস অয়েল পরিবহনের কোন বীমা ছিল না। সুন্দরবন বিভাগের নির্দেশ থাকলেও কার্গোটি বন বিভাগের জেটিতে নোঙর না করে কেন নদীর মাঝখানে নোঙর করা হলো- এমন প্রশ্ন করলে আমির হোসেন ফরিদ জানান, মাস্টারকে না পাওয়া গেলে এই প্রশ্নের সঠিক জবাব পাওয়া যাবে না। নিজেকে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের শ্যালক কিনা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, তিনি আমার ছোট ভগ্নিপতি। আমার পিতার নাম খোরশেদুর রহমান তালুকদার। গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলার ধনিয়ায়। তিনি বরিশাল শহরের ব্রান্ড কম্পাউন্ড রোডের সাজমী ভবন নামের একটি বাড়িতে বসবাস করেন। অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা নেয়ার কথা জানতে চাওয়া হলে তিনি অভিযোগটি সঠিক নয় বলে সাংবাদিকদের জানান। উল্লেখ্য, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলরত সকল নৌযান নোঙর করলে বন বিভাগের জেটিতে নোঙর  করে থাকার বিধি বিধান রয়েছে। বন্যপ্রাণী  ব্যবস্থপনা ও প্রাকৃতিক সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও মো. জাহিদুল কবির জানান, ট্যাঙ্কার ডুবে যাওয়ার ফলে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি জলজ প্রাণীর ব্যাপক প্রাণ নাশের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বেশ কিছু জলজ প্রাণী রয়েছে যারা সূর্যের আলোক রশ্মির মাধ্যমে যে খাদ্য তৈরি হয় তা গ্রহণ করে। নদীতে তেল ভাসার কারণে সূর্যের রশ্মি প্রবেশ না করতে পারায় বেশ কিছু জলজ প্রাণীর খাদ্য তৈরি হবে না। যার ফলে খাদ্যের অভাবে মাছসহ কিছু জলজ প্রাণী মারা যেতে পারে। যে এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে সেটি ছিল ডলফিনের অভয়ারণ্য কিন্তু দুর্ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় কোন ডলফিন দেখা যাচ্ছে না। আমরা ধারণা করছি, ডলফিন এলাকা ছেড়ে অনত্র চলে গেছে। এছাড়া এই তেল বন্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করলে দু’এক সপ্তাহের মধ্যে রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে। এ ঘটনায় মাটি ও পানির দীর্ঘস্থায়ী কোন ক্ষতির সম্ভাবনা আছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করার জন্য আমরা নমুনা সংগ্রহ করেছি। তবে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনার পরপরই নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিলে এতটা বিপর্যয় ঘটত না। সুন্দরবনের নদী-খালগুলোতে বিপুল পরিমাণ ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়াই দীর্ঘমেয়াদি সঙ্কটে পড়তে পারে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের। চারদিনেও তেল অপসারণ না হওয়ায় নদীর মাছ ও বনের গাছ মরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাঘ ও হরিণসহ সুন্দরবনের সব পশুপাখি সঙ্কটে পড়বে।
এ ব্যাপারে খুলনা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ফরেস্টি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. নবিউল ইসলাম খান বলেন, ফার্নেস অয়েল জোয়ারের সময় সুন্দরবনের ভেতর ঢুকছে এবং গাছপালার গায়ে ও মাটিতে ঢুকে পড়েছে। এতে মাটির নিচে যে শেকড় রয়েছে তা পচে যাবে। তার ধারণা আগামী ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বিষয়টি দৃশ্যমান হতে পারে। এদিকে নৌ-বাহিনীর ‘শহীদ আখতার উদ্দিন’ ও ‘শাহ পরাণ’ জাহাজ দু’টি ডাইভিং এবং স্যালভেজ টিমসহকারে ঘটনাস্থল ও আশেপাশে এলাকায় বাঁশ ও রাবারের ফ্রেম দিয়ে বুম  তৈরি করে আরও ফার্নেস ওয়েল যাতে নদীতে ছড়িয়ে না পড়ে সে লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নৌবাহিনী উক্ত নদী পথে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণে যথাযথ তদারকি করছে।
এদিকে মংলাবন্দরের চেয়ারম্যান কমোডর হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া জানিয়েছেন,  তেল অপসারণে করণীয় নির্ধারণে মংলাবন্দর কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শামসুজ্জোহা খন্দকারের সভাপতিত্বে বন বিভাগ, বিআইডব্লিউটিএ, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও মংলাবন্দর কর্তৃপক্ষের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাতে স্থানীয় জেলেদের সহায়তা নিয়ে আগামী তিন দিনের মধ্যে তেল অপসারণের একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কাণ্ডারী-১০ দুপুরে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট এলাকায় আসলেও তা থেকে তেল শোধনের পাউডার ছিটানো নিয়ে বিড়ম্বনা সৃষ্টি হয়। পাউডারের ক্ষতিকর দিক বিবেচনা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া তা ছিটানোর বিপক্ষে বন বিভাগ অবস্থান নেয়। বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শামসুজ্জোহা খন্দকার সাংবাদিকদের জানান, নদীতে ছড়িয়ে পড়া তেল স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় আগামী তিন দিন ফোমের সাহায্যে সংগ্রহ করা হবে। এ কারণে পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত এই চ্যানেলে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমির হোসাইন চৌধুরী জানান, কাণ্ডারী-১০ এসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাউডার ছিটানোর কথা থাকলেও সকালে জরুরি বৈঠকে পাউডার ছিটানোর ক্ষতিকর দিক বিবেচনা ও ছাড়পত্র পাওয়ার পর তা ছিটানোর জন্য বন বিভাগের পক্ষ থেকে মত দেয়া হয়েছে। ফলে পাউডার ছিটানোর ব্যাপারে আপতত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ছাড়পত্রে অপেক্ষা করতে হচ্ছে বলে তিনি জানান। জয়মনি এলাকার জাহাজ নিরাপত্তা কমিটির সভাপতি মো. রনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন তেলবাহী ট্যাঙ্কার ডুবার পর থেকে সুন্দরবনের নদীগুলোতে বিষাক্ত কালো কালো তেলের কালো থাবা যেন খামচে খাচ্ছে প্রাকৃতিক এ সুন্দরবনকে। তিনি আরও জানান, জয়মনি এলাকার কোল ঘেঁষে খরমা নদী। প্রতিদিনই সেই নদী পার হয়ে এলাকার গবাদি পশু সুন্দরবনে প্রবেশ করে। কিন্তু তিন দিন ধরে ওই খালে কোন গবাদি পশু পার হয় না। বর্তমানে খালে মাছ, সাপ, হাঁস, মরে পড়ে রয়েছে। জয়মনি এলাকার ভ্যানচালক রাজেন (৪৩) বলেন তেলের গন্ধে রাতে ঘুমাতে পারি না। এমন কি নদীতে নেমে কেউ পুকুরে পা ধুতে গেলে ওই পুকুরের পানি নষ্ট হয়ে মাছ মরে যাচ্ছে। চাঁদপাই ফরেস্ট স্টেশনের রেঞ্জার আবুল কালাম আজাদ ঘটনার ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, তেলের বিষক্রিয়ায় ছোট ছোট মাছ আগেই মারা গেছে। এখন বড় মাছ মরার কারণে এটা চোখে পড়ছে।
সুন্দরবনের সম্পদ এখন সঙ্কটে: সুন্দরবনে ৬ হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে বাংলাদেশ অংশে স্থল ভাগের পরিমাণ ৪ হাজার ১৪৩ বর্গ কিলোমিটার। আর ৪৫০টি ছোট-বড় নদী ও খাল নিয়ে জল ভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ বর্গ কিলোমিটার। অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন ছিল বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ। মানুষের কারণে সুন্দরবনের আয়তন আজ এখানে এসে ঠেকেছে। সুন্দরবনে রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, এ উদ্ভিদকূলের ৭৩ ভাগই হচ্ছে সুন্দরী গাছ, ১৬ ভাগ গেওয়া। ১শ৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড। রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রল হরিণসহ ৩২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর, ৩শ’ প্রজাতির পাখি। বিলুপ্ত প্রায় ইরাবতী ডলফিনসহ ৬ প্রজাতির ডলফিন, কুমির, ২১০ প্রজাতির মাছ, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৬ প্রজাতির চিংড়ি, ১ প্রজাতির লবস্টার ও ৪২ প্রজাতির শামুক, ঝিনুক রয়েছে সুন্দরবনে। সুন্দরবনের সম্পদের হিসাব করা কঠিন। সুন্দরবনে দৃশ্যমান সম্পদের পরিমাণ ১৫৮ কোটি ৯ হাজার ৮শ’৭ পয়েন্ট ৮০ বিলিয়ন টাকা। এসব কারণে পর্যটকদের কাছে সুন্দরবন হচ্ছে প্রকৃতির অপর বিস্ময়। সুন্দরবনের এ সম্পদের সবটাই এখন সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক হিসাব মতে, পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের নন্দপাড়া নদী থেকে শ্যালা নদী হয়ে আন্ধারমানিক নদী পর্যন্ত মাছসহ জলজ প্রাণিসহ ডলফিনের অভয়াশ্রম এখন চরম অস্তিত্ব সঙ্কটে। গত মঙ্গলবার এ অয়েল ট্যাঙ্কার ডুবির পর থেকে ডলফিনের এ অভয়াশ্রমে আর ডলফিনের দেখা মিলছে না। এসব এলাকার প্রায় ৫০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে গাছপালার শ্বাসমূলে তেলের আস্তরণ পড়ায় ম্যানগ্রোভ বনের গাছপালা দু’সপ্তাহার মধ্যে মরতে শুরু করবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এমন মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগের মুখোমুখি সুন্দরবন আর কখনো পড়েনি।
তেল সরানোর প্রস্তাব দিয়েছে একটি বৃটিশ প্রতিষ্ঠান
বৃটিশ একটি প্রতিষ্ঠান তেল সরানোর কাজে বাংলাদেশকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এ কথা জানিয়েছেন। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে তিনি বলেন, লন্ডনভিত্তিক একটি দল আমাদের প্রস্তাব দিয়েছে। তারা রোববার ঢাকায় এসে পৌঁছুবে বলে আশা করছি। আমরা তাদের নিয়ে বৈঠক করব। আশা করি, এ বৈঠকে আমরা ভাল একটা ফল পাবো। তারা তেল উত্তোলনের ক্ষেত্রে কি ধরনের সাহায্য করতে পারবে আমাদের সে প্রস্তাব দেবে। আমরা যদি দেখি সেটা উপযোগী আমরা সেই কাজটি করার জন্য তাদের সুযোগ করে দেবো। ওই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বা এ কাজে তাদের অভিজ্ঞতা আছে কিনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন, তিনি এখনও বিস্তারিত জানেন না। মাত্র একটা প্রস্তাব তারা পেয়েছেন। তিনি বলেন, পুরো বিষয়টা রোববারের সভায় আমরা জানতে পারবো। প্রতিষ্ঠানটি নিজেরাই এ প্রস্তাব দিয়েছে এবং তারা এ কাজ করে থাকে জানিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সরকার প্রতিক্রিয়া জানাতে দেরি করেছে এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, মূলত তাদের কাছে খবরই দেরিতে এসেছে। সরকার প্রতিক্রিয়া জানাতে দেরি করেছে এটা সঠিক নয়। বনের ভেতর বাণিজ্যক নৌযান চলাচল বন্ধে ইউএনডিপি যে আহ্বান জানিয়েছে সে প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, এখন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। আর বিকল্প একটি যাত্রাপথ তৈরির কাজ চলছে যা এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন হবে। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পরিবেশ মন্ত্রনালয়ে বিশেষজ্ঞরা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে তেল অপসারণের কাজ আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, রাসায়নিক পদার্থ ছিটানো হলে আরও ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নেবে। প্রধান বন সংরক্ষক ইউনূস আলী বলেছেন, কেমিস্টদের একটি দল ঢাকা থেকে আজ ঘটনাস্থলে যাবেন। ঘটনার চার দিনের মাথায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষজ্ঞ দলকে গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সে দলের একজন সদস্য এবং খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিষয়ক শিক্ষক দিলিপ কুমার দত্ত বলেছেন, ক্ষতি যা হওয়ার হয়েছে। এখন সেটাকে বাদ দিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে। গ্রামবাসী আর জেলেদের উদ্বুদ্ধ করে পুরোনো পদ্ধতিতে নদী থেকে তেল সরানোর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে ছোট ছোট নৌকায় করে স্থানীয়রা বালতি আর হাড়ি পাতিল নিয়ে ফোম দিয়ে তেল তুলছেন। স্থানীয় নিবাসীদের সহায়তায় তেল সরানোর কাজ এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
এপি: হুমকির মুখে জলজ প্রাণিকুল
বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বাংলাদেশের সুন্দরবনে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে যাওয়ার পর দেশটির কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে পরিবেশ বিপর্যয়ের মাত্রা পর্যালোচনা করছে। কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটটিতে তেল ছড়িয়ে পড়ার পর হুমকির মুখে পড়েছে সেখানকার জীববৈচিত্র্য। গতকাল কর্মকর্তারা জানিয়েছে, শেলা নদীতে প্রায় ৭০ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। জলজ প্রাণীদের অভয়ারণ্য সুন্দরবন এখন হুমকির মুখে। শেলা নদীর সঙ্গে কমপক্ষে ২০টি খালের সংযোগ রয়েছে। এছাড়া সংযোগ আছে আরেকটি নদী পশুরের সঙ্গে। প্রভাব পড়েছে এসব নদী নালাতেও। বাংলাদেশ বন বিভাগের প্রধান রক্ষক তপন কুমার দে জানিয়েছেন, বিরল প্রজাতির ইরাবতি ডলফিনসহ অনেক জলজ প্রাণী এখন হুমকির মুখে। তিনি আরও বলেস, জীববৈচিত্র্যে ক্ষতির উচ্চমাত্রায় ঝুঁকি রয়েছে। তবে এখনও ডলফিন বা কুমিরসহ অন্য কোন কোন প্রাণীর মৃত্যুর সংবাদ আসেনি। ডুবে যাওয়া ট্যাংকার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা গিয়াসুদ্দিন জানিয়েছেন, ট্যাংকারটি ডুবে যাওয়ার ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় পর উদ্ধার করা হয়েছে। তপন কুমার দে বলেন, প্রাথমিক প্রভাবের মাত্র নির্ণয় করতে বিভিন্ন দল প্রাণান্ত চেষ্টা করছে। এটা বড় ধরনের বিপর্যয় আর আমরা পুরো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন স্থানে ডলফিনদের বাতাসের জন্য পানি থেকে উপরে উঠতে দেখা গেছে। আর এ বিপর্যয়ের পর কুমিরদের আনাগোনা কমে গেছে। তাদের কি অবস্থা তা বোঝার চেষ্টা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।  
আল-জাজিরা: স্পঞ্জ-বস্তা দিয়ে তেল সংগ্রহ করছে গ্রামবাসী
স্পঞ্জ আর বস্তা দিয়ে তেল সংগ্রহ শুরু করেছে গ্রামবাসী। ব্যাপক পরিমাণ তেল ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবেশবিদরা বিরল প্রাণী ডলফিনের অভয়ারণ্য এ এলাকায় বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার অপর একটি জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষের পর এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে হাজার হাজার লিটার তেল ছড়িয়ে পড়ে ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে। এ সুন্দরবনে বিরল ইরাবতি আর গঙ্গা ডলফিনদের বাস। বাংলাদেশ সরকার তেল অপসারণের সরঞ্জাম সহ একটি জাহাজ ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিক দ্রব্য সুন্দরবনের সংবেদনশীল জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সুন্দরবনের প্রধান বন কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেছেন, করণীয় কোনটা সর্বোত্তম হবে কর্তৃপক্ষ এখনও নিশ্চিত নয়। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেছেন, সুন্দরবনে এটা নজিরবিহীন বিপর্যয় আর এটা কিভাবে মোকাবিলা করতে হবে তা আমরা জানি না। তিনি আরও বলেছেন, আমরা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন কারণ এটা ঘটেছে সংবেদনশীল ও নাজুক ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে। কর্মকর্তারা বলছেন, যা ক্ষতি হবার ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, কেননা তেল দ্বিতীয় আরেকটি নদীতে এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত সুন্দরবনের খালগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
নিউ ইয়র্কভিত্তিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সমাজের বাংলাদেশ প্রধান রুবায়াত মানসুর বলেছেন, বেশির ভাগ তেল ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি জানান, গতকাল সকালে যখন তিনি ডুবে যাওয়া ট্রলারে যান তখন সেখানে মাত্র কয়েক শ’ লিটার তেল অবশিষ্ট ছিল। তিনি আরও বলেছেন, তেল  অপসারণ সরঞ্জামগুলো ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের উপযোগী নয়। এজন্য তিনি গ্রামবাসীদের নদীতে পাতা তাদের জাল দিয়ে তেল সংগ্রহে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন। সুন্দরবনে শ’ শ’ বিপন্ন ডলফিন রয়েছে কয়েকটি গবেষণা এ তথ্য সামনে আসার পর ২০১১ সালে বাংলাদেশ সুন্দরবনকে অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলেছে। এখানে মাছধরা নিষিদ্ধ হলেও ট্যাঙ্কার বা অন্যান্য নৌকা যাতায়াতের অনুমতি রয়েছে।