Showing posts with label জেল থেকে জেলে. Show all posts
Showing posts with label জেল থেকে জেলে. Show all posts

Tuesday, September 13, 2011

১- সাত নম্বর সেলের দুই নম্বর কুঠুরি থেকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা

আজ জুলাইর প্রথম প্রভাত। ইংরেজি সন ২০১০। বাংলা তারিখ ১৭ আষাঢ় ১৪১৬। জীবন আর মৃত্যুর একেবারে সীমান্তে দাঁড়িয়ে তিরিশটি দিন পার করার পর প্রথমবারের মতো কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করছে। না, কোনো প্রাণঘাতী অসুস্থতায় আক্রান্ত হইনি। তবে, আমাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে কি-না, এ নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায় যে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন, সেটি এই একটি মাস প্রতিটি মুহূর্তে মর্মে মর্মে অনুভব করেছি। মনের ভেতরে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি সবিনয়ে সাঙ্গ করে রেখেছিলাম।

যে অসহায় মা এবং স্ত্রীকে ঘরে রেখে গ্রেফতার হয়েছি, তাদের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না এমন আশঙ্কায় হৃদয় ভেঙে-চুরে গেলেও অনেক চেষ্টায় বাইরে থেকে অবিচল থেকেছি। অবশ্য তাদের সঙ্গে মুক্তজীবনে কতদিন পর আবার দেখা হবে, সেটিও মহান আল্লাহতায়ালাই জানেন। আমাকে গ্রেফতার এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনে ক্ষমতাসীনদের বিদেশি মুরব্বি রাষ্ট্রগুলোর শতভাগ সমর্থন থাকলেও একেবারেই শেষ করে দেয়া নিয়ে সম্ভবত তাদের মধ্যে মতদ্বৈধ রয়েছে। সে কারণেই আমাকে হত্যার কাজটা শুরু করেও সমাপ্তি টানা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, আল্লাহ এখনও তাঁর এই অকিঞ্চিত্কর বান্দাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নেয়ার সময় নির্ধারণ করেননি।
লেখার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। গত তিরিশ দিনে কলম একেবারেই স্পর্শ করিনি, তা নয়। ডাইরি লেখার অভ্যাস আমার কস্মিনকালে না থাকলেও গ্রেফতারের পর থেকেই সময়-সুযোগমত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ভবিষ্যতের রসদ হিসেবে টুকরো টুকরো কাগজে টুকে রাখতে ভুল হয়নি। রিমান্ড চলাকালে লেখা সম্ভব ছিল না। তবে, সেই বিভীষিকাময় স্থানগুলো থেকে কারাগারে ফেরামাত্র কোনোরকম বিশ্রাম না নিয়ে আগে লেখার টেবিলে কাজে বসে গেছি। কাজেই আজও লিখতে বসে পুঁজির অভাব হচ্ছে না। কিন্তু, সমস্যা অন্যত্র। আমি যে লিখতে জানি না, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? প্রকৃতি যেমন আপন প্রয়োজনে শূন্যকে পূর্ণ করে, তেমন করেই তো এক-এগারোপরবর্তী এক বিশেষ সময়ের প্রয়োজন মেটাতেই আমি কলাম-লেখক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলাম। তাগিদটা এসেছিল ভেতর থেকে। কিন্তু নাজিমউদ্দীন রোডের বন্দিশালার সাত নম্বর সেলে বসে কী লিখি? বন্দি জীবনের স্মৃতিচারণ আর পত্রিকার কলাম লেখার মধ্যে যোজন যোজন ফারাক। ব্যক্তিগতভাবে আত্মজীবনীমূলক লেখায় আমার কোনো উত্সাহ নেই। বাগাড়ম্বর করে নিজেকে মহত্ দেখানো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আত্মজীবনী তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একজন ব্যক্তির মহান খণ্ডিত ও অনেকাংশে কাল্পনিক চিত্র হয়ে ওঠে। এর মধ্যেও ব্যতিক্রম হয়তো আছে। আমি কোনোক্রমেই সেই ব্যতিক্রমীদের মধ্যে পড়ি না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম যথাসম্ভব
নিরাসক্তভাবে ঘটনা বর্ণনা করে যাব। এর মধ্যে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের যে ছবি অবধারিতভাবে ফুটে উঠবে, তার ন্যায্যতা-অন্যায্যতার মূল্যায়ন করার দায়িত্ব আমার নয়। জীবিত থাকি আর না থাকি, যদি কোনোদিন এ লেখাটি পাঠকের কাছে পৌঁছায়, তাহলে সে কাজটি তারাই করবেন। এক মাস ধরে অনেক ভেবে যখন লেখকের ভূমিকাটি উপলব্ধিতে এসেছে, তারপরই কেবল লিখতে বসেছি। রিমান্ডের ফাঁকে ফাঁকে এই এক মাস বহিরাঙ্গে প্রশান্ত কিন্তু ভেতরে সর্বক্ষণ ছটফট করেছি। হাতে বন্ধ্যা কলম নিয়ে সাত নম্বর সেলের দুই নম্বর কুঠুরির লোহার মোটা মোটা শিকগুলোর ফাঁক দিয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এখন আমি নির্ভার। এবার শুরু হোক আমার কথকতা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে আমাকে জেলে পুরবেনই, সেটা আমার জানাই ছিল। ২০০৯-এর ডিসেম্বরের ১৪ তারিখে তার পুত্র এবং জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের আনুষ্ঠানিক, সরকারি কাগজপত্র আমার দেশ-এর সাংবাদিক এম আবদুল্লাহ হাতে পাওয়ার পর পুরো একটি দিন সেই সংবাদ ছাপানোর ঝুঁকি বিবেচনা করেছি। জীবনের পড়ন্ত বেলায় পেশা বদল করে সম্পাদক হয়েছি। হয়তো সেজন্যই যে সংবাদ বস্তুনিষ্ঠ, যার সমর্থনে কাগজপত্র রয়েছে, সেই সংবাদ চেপে রেখে নিজে বিপদমুক্ত থাকতে মন সায় দেয়নি। ঘটনার অবধারিত ধারাবাহিকতায় এই বছরের জানুয়ারি মাসে খোদ প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রশাসনের তাবত্ অংশে আনুষ্ঠানিক চিঠি যা সরকারি পরিভাষায় ডিও নামে অভিহিত, পাঠানো হয়। দেশের একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এমন চিঠি দিতে পারে কি-না, সেই তাত্ত্বিক অথবা আইনি প্রশ্ন ফ্যাসিবাদকবলিত বাংলাদেশে উত্থাপন করা অর্থহীন। এই রাষ্ট্রে সরকার-পরম্পরায় ক্রসফায়ার পর্ব পেরিয়ে ষাট-সত্তর দশকের চিলি, আর্জেন্টিনার মতো আমরা এখন গুম-খুনের জমানায় প্রবেশ করেছি। জেলের এই তিরিশ দিনেই এ-জাতীয় অসংখ্য লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের কাহিনী জেনেছি, যেগুলো প্রসঙ্গক্রমে ক্রমান্বয়ে বর্ণনা করব। তার আগে আপন অভিজ্ঞতার গল্প। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ডিও’র ব্যাপারে জেনে যাওয়ার পরই স্ত্রীকে বলেছিলাম, আমাকে হারানোর মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে। মাকে বিশেষভাবে না বললেও ঘনায়মান বিপদের ভয়াবহতা সম্পর্কে তিনি একেবারে অন্ধকারে ছিলেন না। তবে গ্রেফতারের রাতের পূর্বপর্যন্ত সরাসরি কখনও আলাপ করিনি, মা আর ছেলের মধ্যে এক ধরনের লুকোচুরি খেলা আর কি! জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর পেতাম প্রধানমন্ত্রী নাকি আমার গ্রেফতারে দেরির জন্য ভয়ানক ক্ষুব্ধ। ঘনঘন বিদেশযাত্রার আগে এবং প্রত্যাবর্তনের পরে এ বিষয়ে মনিটর করা তার রুটিনে পরিণত হয়েছিল। বশংবদ দুদক নির্দেশমত ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কিছুতেই আর ধৈর্য রাখতে পারছিলেন না। ঘটনার অন্ত টানতে তাই শেষপর্যন্ত এগিয়ে আসে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা—এনএসআই। ৩১ মে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় পরবর্তী দশ দিনের মধ্যে আমাকে গ্রেফতার এবং ‘আমার দেশ’ বন্ধ করা হবে। একজন সাংবাদিক জুনের এক তারিখ সকাল এগারোটার দিকে ফোনে আমাকে এই সংবাদ দেন। আমি তখন আর্টিজান সিরামিকের উত্তরা অফিসে নিজ কক্ষে বসে কাজ করছিলাম। আগেরদিন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সভাটির স্থান নিয়ে খানিকটা বিতর্ক রয়েছে। দু’টি সম্ভাব্য স্থানের কথা আমাকে জানানো হয়। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কিংবা এনএসআই কার্যালয়ের মধ্যে যে কোনো একস্থানে চূড়ান্ত মিটিংটি অনুষ্ঠিত হয়। আমার স্ত্রী এবং আর্টিজান সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজার অফিসে আগমনের জন্য প্রতীক্ষারত অবস্থাতেই আমার অপর সহকর্মী সাংবাদিক খবর দিলেন, সকাল ৯টায় হাসমত আলীকে সাদা পোশাকধারী ব্যক্তিরা বাসা থেকে উঠিয়ে এনএসআই কার্যালয়ে নিয়ে গেছে। সংস্থাটির প্রভাবশালী এক পরিচালককে পুরো অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। চাকা যে অতি দ্রুত ঘুরতে শুরু করেছে, সেটি বুঝতে অসুবিধা হলো না। স্ত্রী অফিসে এলে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রেস ক্লাবের উদ্দেশে রওনা করলাম। বিদায়ের সময় আবেগতাড়িত হওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না; বরং ঘটনার আকস্মিকতায় দু’জনাই হতবিহ্বল। এ দিনটি আসবে জানতাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি! ঘর থেকে বার হয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রীর মাথায় হাত দিয়ে শেষবারের মতো দোয়া করাও হয়ে ওঠেনি। মনে হয়েছিল, গ্রেফতারের জন্য সরকার আরও কয়েকটা দিন সময় নিতেও পারে। উত্তরা থেকে প্রেস ক্লাব যাত্রাপথেই সর্বশেষ পরিস্থিতির ওপর বেসরকারি সংবাদ সংস্থা শীর্ষ নিউজকে টেলিফোনে সাক্ষাত্কার দিলাম। হাসমত আলীর নিরাপত্তা নিয়ে তখন আমার গভীর উত্কণ্ঠা। প্রেস ক্লাবে পৌঁছে সরাসরি গেলাম সভাপতি শওকত মাহমুদের কক্ষে। সেখান থেকেই আবারও অন্য বেসরকারি সংবাদ সংস্থা বিডি নিউজকেও সাক্ষাত্কার দিলাম। ততক্ষণে দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। শওকত মাহমুদের সৌজন্যে আহারপর্ব সাঙ্গ করলাম। সহকর্মী আবদাল, গনি এবং সাংবাদিক রওনাক আর শওকত মাহমুদ খাওয়ার সময় সঙ্গ দিয়েছিলেন স্মরণে আছে। বিকাল তিনটায় প্রেস ক্লাব থেকে আমার দেশ-এর উদ্দেশে যাত্রার আগেই সেখানে বিকাল পাঁচটার সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনও সমাপ্ত হয়েছে। গণতন্ত্রের লেবাসধারী সরকারের চরম স্বৈরাচারী আচরণের ইতিহাস জাতির জেনে রাখা দরকার।
আমার দেশ কার্যালয়ে আমার কক্ষে পৌঁছানোর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই টেলিফোন অপারেটর জানালো হাসমত আলী টেলিফোনে অপেক্ষমাণ। স্বস্তি এবং কৌতূহল নিয়ে ফোন ধরতেই ওপারে ভদ্রলোকের আতঙ্কমিশ্রিত গলার আওয়াজ পেলাম। তার বক্তব্যের সারাংশ হলো, সকাল ন’টায় সাদা পোশাকধারী লোকজন তাকে বাসা থেকে উঠিয়ে এনে এনএসআই কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে তার সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে, সেই বর্ণনা পরিষ্কারভাবে না দিয়ে তিনি ভয়ার্ত কণ্ঠে শুধু বললেন, ওখানে মানুষ যায়! এই একটিমাত্র বাক্যে হয়তো তার বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা বোঝানোর চেষ্টা করলেন। হাসমত আলীর জবানিতেই জানলাম, বন্দিত্বের একপর্যায়ে তার কাছ থেকে দু’টি কাগজে জোর করে সই নেয়া হয়েছে। পরে এই দুই কাগজেরই একটি গেছে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে এবং অপরটি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হাসমত আলী সরকারের নীলনকশার অংশীদার হতে সম্মত হওয়ার পরই দুপুর দুটোর দিকে এনএসআই অফিস থেকে ছাড়া পেয়ে স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছেন। শেখ হাসিনার ইচ্ছানুযায়ী তার পুলিশ যে ওইদিনই আমাকে গ্রেফতার করবে, এ নিয়ে আমার আর কোনো সংশয় থাকল না। ততক্ষণে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আমার দেশ-এর খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। শীর্ষ নিউজ ডট কম তাদের ওয়েবসাইটে ঘণ্টায় ঘণ্টায় সর্বশেষ পরিস্থিতির খবর দিচ্ছে। ফ্যাসিবাদী সরকার যে সর্বদা নির্জলা মিথ্যার ওপরই নির্ভর করে, তার প্রমাণ পেতেও দেরি হলো না। ‘অপারেশন আমার দেশ’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত এনএসআই পরিচালক স্বগৃহ থেকে হাসমত আলীকে অপহরণ করার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের কাছে বেমালুম অস্বীকার করলেন।
এদিকে উদ্বিগ্ন শুভানুধ্যায়ীরা ততক্ষণে ফোন করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ আমার দেশ কার্যালয়ে এসেও পড়েছেন। সংবাদ সম্মেলন শুরু করার আগেই স্ত্রীকে ফোন করে সাড়ে তিন বছর ধরে আমার সঙ্গে জেলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ কাপড়-চোপড়ের ব্যাগটিকে পাঠাতে বলে একপ্রস্থ বিদায় নিলাম। ফোনের ওপারে কণ্ঠ রুদ্ধ হওয়ার আভাস পেলাম। তিনজন মাত্র মানুষের দীর্ঘ পঁচিশ বছরের সংসার থেকে একজনের ঝরে যাওয়ার আশঙ্কাপূর্ব মানসিক প্রস্তুতি সত্ত্বেও তাকে ব্যাকুল করে তুলছিল। সারাদিনের তুমুল উত্তেজনার ফলে সেই মুহূর্তে আবেগশূন্য থাকতে পারলেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাত নম্বর সেলে বসে পাঠকদের গল্প বলার সময় কেবলই চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে বারবার চশমার কাচ মুছেও পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি কই? নিতান্তই মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই আমি কর্মজীবনে নানামুখী সাফল্য পেলেও সমস্তটা জীবন ধরে আমার ছোট সংসারের মানুষগুলোকে বড় অবহেলা করার আক্ষেপ জীবনের পড়ন্ত বেলায় অসহনীয় বোধ হচ্ছে। তারাশঙ্করের মতো বলতে ইচ্ছে করছে, ‘ভালবেসে মিটিল না সাধ, জীবন এত ছোট কেনে?’
বিকেল পাঁচটার সংবাদ সম্মেলনে আমার দেশ নিয়ে প্রশাসনের বেআইনি কার্যকলাপের বিবরণী সপ্রমাণ তুলে ধরলাম। প্রাসঙ্গিক সব কাগজপত্রের অনুলিপি তুলে দিলাম সংবাদমাধ্যমের উপস্থিত সহকর্মীদের হাতে। উপস্থিত সাংবাদিকরা সহজেই বুঝতে পারলেন তথ্য মন্ত্রণালয় আমাকে প্রকাশক হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিলেও ঢাকা জেলা প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে অসত্ উদ্দেশ্যে সামান্য দাফতরিক একটি রুটিন কাজ মাসের পর মাস ফেলে রেখেছেন। এই গর্হিত অপরাধের জন্য জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে এখন আমাকে জেলে নেয়ার প্রস্তুতি চলছে। বলে রাখা দরকার, সংবাদ সম্মেলন চলাকালীনই আমার দেশ কার্যালয় যে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার মালিকানাধীন ইমারতে অবস্থিত, তার নিচতলায় সাদা পোশাকে অসংখ্য পুলিশ অবস্থান নিতে শুরু করেছে। তখন পর্যন্ত ঢাকার জেলা প্রশাসক পত্রিকার ডিক্লারেশনও বাতিল করেননি কিংবা শিল্পাঞ্চল থানায় আমার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়নি। অথচ সর্বশেষ ব্যবস্থায় শত শত পুলিশ আসতে শুরু করেছে। সংবাদ সম্মেলন শেষ করে অফিস কক্ষে ফিরে এলাম। আমার দেশ পত্রিকা অফিস ততক্ষণে অন্যান্য সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদকর্মীতে ভরে গেছে। নিজের ঘরে ফিরেই শুনলাম, আমার গাড়িসহ এগারোতলা ইমারতের নিচতলা পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। শুরু হলো দীর্ঘ অবরোধ। বাংলাদেশে সম্পাদক গ্রেফতারের পরম্পরা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মরহুম পিতা শেখ মুজিবুর রহমান চালু করেছিলেন। কবি আল মাহমুদ, এনায়েতুল্লাহ খান, আবদুস সালাম, ইরফানুল বারী প্রমুখ গ্রেফতার হয়েছিলেন স্বাধীনতা-পরবর্তী সাড়ে তিন বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে। পরবর্তী সময়ে স্বৈরশাসক এরশাদ গ্রেফতার করেছিলেন আতাউস সামাদকে এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে তোয়াব খান ও বোরহান আহমেদও গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু প্লাটুনের পর প্লাটুন দাঙ্গা পুলিশ পাঠিয়ে একটি পত্রিকা অফিসকে এমন করে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেনি কোনো সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৌশলগত মিত্র এবং পূর্বসূরি জেনারেল মইনের প্রচ্ছন্ন সামরিক সরকারের পাইক-বরকন্দাজদের বুটের আঘাত অবশ্য অনেক পত্রিকা অফিসকেই এক-এগারোপরবর্তী সময়ে সইতে হয়েছে। আজ যারা আমার দেশ বলাত্কারের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করছেন, তাদের অনেককেই চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহাজোটের আন্দোলনের ফসল সরকারের দুর্নীতি দমন অভিযানের অংশ হিসেবে। এদের দুর্বল স্মৃতিশক্তি দেখে করুণা হয়। যা-ই হোক, কী ঘটতে চলেছে সেই চিন্তা বাদ দিয়ে আমরা প্রতি সন্ধ্যার মতো পত্রিকার মেকআপের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। রাত আটটার দিকে নিচ থেকে সংবাদ পেলাম, গাড়ির পর গাড়ি দাঙ্গা পুলিশ এসে চত্বর ভরে ফেলেছে। অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে লাগল। অবরোধকারী পুলিশ সাংবাদিকদেরও আর এগারোতলায় উঠতে দিচ্ছিল না। এদিকে টেলিভিশন চ্যানেলে তখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় লাইভ অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে। আমরা সবাই মিলে কাজে লেগে গেলাম যাতে যত দ্রুত সম্ভব সেলোফেন ছাপাখানায় পাঠানো সম্ভব হয়। ধারণা করছিলাম, যে কোনো সময় সেখানেও পুলিশ পৌঁছে যাবে। রাত দশটার মধ্যেই প্রথম সংস্করণের সেলোফেন পাঠিয়েও দেয়া গেল। সোয়া দশটায় খবর পেলাম ছাপার কাজ শুরু হয়েছে। আনন্দিত হয়ে ভাবলাম, অন্তত পরদিনের সংবাদপত্র পাঠকদের হাতে দিতে পারব। পৌনে এগারোটায় প্রেস মহাব্যবস্থাপক আহমদ হোসেন মানিক ফোন করে জানালেন, কয়েকশ’ পুলিশ প্রেস ঘিরে ফেলেছে। প্রায় একই সময় প্রধান কার্যালয়ের নিচতলা থেকে খবর এলো দাঙ্গা পুলিশ সিঁড়ি বেয়ে এগারোতলার উদ্দেশে উঠতে শুরু করেছে। কম্পিউটার বিভাগকে তাত্ক্ষণিক নির্দেশ দিলাম সংবাদপত্রের সফট কপি ওয়েবে তুলে দেয়ার জন্য, যাতে বিশ্ববাসী তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারের চরম ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। এর মধ্যেই অগ্রজপ্রতিম ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে আসন্ন গ্রেফতারের সংবাদ দিয়ে আইনি লড়াইয়ে তার সহযোগিতা চাইলাম। তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তার সাধ্যমত চেষ্টা চালানোর দৃঢ় সঙ্কল্পের আশ্বাসটুকুই কেবল দিতে পারলেন। বাংলাদেশের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন এই আইনজীবীকে দীর্ঘদিন ধরে চেনার সুযোগ হয়েছে। এদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে তার সহানুভূতি সেক্যুলারদের প্রতিই অধিকতর মনে হয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সামরিক সংযোগের বিষয়টি তিনি কখনোই সর্বান্তঃকরণে অনুমোদন করেননি। অবশ্য জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের অসাধারণ সত্ ব্যক্তিচরিত্রের প্রতি তিনি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করেন। তার তুলনামূলক পছন্দের দলের এই অগণতান্ত্রিক এবং সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারবিরোধী আচরণ তাকে প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত করেছে বলেই মনে হলো। এক-এগারোর অপশাসনের দুই বছরে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কৌশল নিয়ে দু’জনা দিনের পর দিন আলাপ-আলোচনা করেছি। তার পুরানা পল্টনের চেম্বারে বসে থাকার সময় আজকের ক্ষমতাবানদের আত্মীয়-স্বজনের কত অশ্রুজলের সাক্ষী আমি নিজে।

২- দরজার ওপারে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র আর এপারে সাংবাদিকদের ক্যামেরা

দাঙ্গা পুলিশের এগারোতলার দিকে ধেয়ে আসা এবং আমার আসন্ন গ্রেফতার নিয়ে আমি কোনো উদ্বেগ অনুভব করছিলাম না। কিন্তু আমার দেশ যে পরদিন পাঠকের কাছে পৌঁছানো গেল না, এ কারণে উপস্থিত সবাই বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। আমার দেশ নিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের এই সম্পূর্ণ আইনবিরোধী কার্যকলাপ যে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বিচার বিভাগেও শেষ পর্যন্ত টেকানো যাবে না, আমার মনে এই দৃঢ়বিশ্বাস সত্ত্বেও এতগুলো সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কায় বড় বিষণ্ন বোধ করতে লাগলাম।
এর মধ্যে পত্রিকার সকল সহকর্মী তাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের কথা আমাকে জানাতে এলেন। তারা নিজেদের মধ্যে দুটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথমটি, আমার সঙ্গে গণগ্রেফতার বরণ করবেন এবং দ্বিতীয়টি, কোনো পরিস্থিতিতেই ফজরের নামাজের আগে আমাকে গ্রেফতার হতে দেবেন না। বিদেশি প্রভুদের অন্ধ সমর্থনে যে বেপরোয়া সরকার ক্রমেই গুম-খুনে সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠছে, তাদের হাতে রাতের অন্ধকারে আমাকে কোনো অবস্থাতেই সমর্পণ করা হবে না। সহকর্মীদের এমন ভালোবাসার প্রকাশে চোখ শুকনো রাখব এমন সাধ্য কই? এদিকে এগারোতলায় তখন খাদ্য ও পানির সঙ্কট চলছে। নিচতলায় পুলিশের অবরোধের মধ্য দিয়ে কারও পক্ষে হেঁটেও উপরে ওঠা সম্ভব নয়। সরকার আমাদের ভাতে এবং পানিতে মারার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে। রাত ১২টার মধ্যে এগারোতলার প্রবেশদ্বারের বাইরেটা সাদা পোশাকধারী এবং দাঙ্গা পুলিশে ভরে গেছে। দরজার ওপারে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র আর এপারে সাংবাদিকদের হাতে হাতে ক্যামেরা। এ এক অসম লড়াই।
সন্ধ্যা থেকে আমার অফিসে উপস্থিত ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি এবং অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সজলকে অনুরোধ করলাম ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার জন্যে, যাতে সাংবাদিকরা কেউ হতাহত না হয়ে আমার গ্রেফতারপর্ব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা যায়। তারা প্রশ্ন করে জানলেন পুলিশের কাছে আদালতের কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা নেই। ঢাকার জেলা প্রশাসক উপরের নির্দেশে রাত ১০টা পর্যন্ত তার কার্যালয় ‘বিশেষ প্রয়োজনে’ খোলা রেখে আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিলের যে আদেশনামায় স্বাক্ষর করেছেন, তার কোনো অনুলিপি পর্যন্ত নেই। আছে কেবল তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় হাসমত আলীর দায়ের করা কথিত এজাহার। আগেই উল্লেখ করেছি, দুপুর দুটো পর্যন্ত এনএসআই কার্যালয়ে হাসমত আলীকে আটকে রেখে দুটি কাগজে সই নেয়া হয়েছিল। তারই একটি গেছে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায়। কোনো থানায় এজাহার দায়ের করতে হলে অভিযোগকারীকে সেখানে উপস্থিত হয়ে জিডি অথবা এফআইআর রুজু করা আইনত বাধ্যতামূলক। হাসমত আলী তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় সারাদিনের মধ্যে উপস্থিত হয়েছিলেন এমন দাবি আমাকে গ্রেফতার করতে আসা পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে কেউ করেননি। এদেশে আদালত থেকে জারি করা হাজার হাজার গ্রেফতারি পরোয়ানা মাসের পর মাস কোর্টে এবং থানায় পড়ে থাকে। বিশেষ তদবির ছাড়া সেগুলো বাস্তবায়নে পুলিশের কোনো আগ্রহ থাকে না। অথচ আমার ক্ষেত্রে একটি বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপন করামাত্র শত শত পুলিশ কোনোরকম তদন্ত ছাড়াই জামিনযোগ্য ধারার মামলায় কোর্টের নির্দেশের তোয়াক্কা না করেই গ্রেফতারের জন্যে ছুটে এসেছে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা পুরো অপারেশন মনিটর করছে। হয়তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। সর্বক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন তত্পর হলে দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো সমস্যাই হতো না।
প্রবীণ সাংবাদিক আতাউস সামাদকে ফোন করলাম। তিনিই যে আমাকে এই পত্রিকাটি রক্ষার জন্যে অনেকটা জোর করে মিডিয়া জগতে নিয়ে এসেছিলেন, সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমার অবর্তমানে পত্রিকা দেখা-শোনার দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ জানালাম। তার এবং তার স্ত্রীর গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও আমার অনুরোধ সামাদ ভাই ফেললেন না। কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত হলাম।
রাত ১টার দিকে বাসা থেকে ফোন এলো। মা এবং স্ত্রীর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিলাম। পুরনো ঢাকা থেকে শেফালী নামের আমার এক খালা সেদিন বেড়াতে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গেণ্ডারিয়ায় আমরা একসঙ্গে থাকতাম। তিনিও অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে আমাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে বিদায় জানালেন। আমার মা সমস্তটা জীবন শিক্ষকতা করে একমাত্র সন্তানকে মানুষ করেছেন। তিনি জানেন বিনা অপরাধে জালিম সরকারের পুলিশ তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে। সেই নৈতিক শক্তিতেই বোধহয় সেই দুঃখিনী মা নিষ্কম্প গলায় আমাকে মাথা উঁচু করে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্যে সাহস জোগালেন। শাশুড়ি এবং খালা-শাশুড়ির সামনে টেলিফোনে কথা বলার সময় আমার স্ত্রীর যথাসাধ্য আবেগ চেপে রাখার চেষ্টা বুকফাটা কান্নার চেয়েও করুণ শোনাল। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বিবাহিত জীবনে তাকে তেমন একটা সময় দিইনি। নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থেকেছি। আর আজ চলেছি অজানার উদ্দেশে। কবে আবার দেখা হবে, আদৌ দেখা হবে কি-না জানা নেই। আমার ঘরভর্তি সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী। বিদায়ের মুহূর্তে নিজের আবেগ নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করব এমন পরিবেশ নেই। মাকে দেখার ভার স্ত্রীর কাঁধে অর্পণ করে মনে মনে ভাবলাম—ওর দায়িত্ব দেব সেই মানুষ কই? আমাদের সন্তান নেই, ওর কোনো ভাই নেই। পিতা থাকলেও অনেক বয়স হয়েছে। কন্যাকে দেখার জন্যে তার আর কত সময় অবশিষ্ট রয়েছে, সেটা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। এবার সহকর্মীদের ডেকে আমাকে বিদায় দেয়ার অনুরোধ জানালাম। কিন্তু তারা কোনো কথা শুনতে প্রস্তুত নয়। আমার পরম সুহৃদ, অগ্রজপ্রতিম কবি ফরহাদ মজহার সেই সন্ধ্যা থেকে একটা চেয়ারে চুপচাপ বসে আছেন। বিএনপির চেয়ারপার্সনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল সোহেল, ব্যক্তিগত সচিব শিমুল বিশ্বাস, শাম্মী আখতার এমপি এবং আরও পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দীর্ঘক্ষণ ধরে আমাকে সঙ্গ দিচ্ছেন। সবারই অভিন্ন বক্তব্য, এই রাতের আঁধারে আমার গ্রেফতার হওয়া নিরাপদ নয়। ক্রসফায়ার এবং গুম-খুন যে রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য আচরণ, সেখানে ফজরের নামাজের আগে আমার কোনো অবস্থাতেই যাওয়া চলবে না। সহকর্মী সাংবাদিকরা আমাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সম্পাদকের দরজা আগলে ঘরের বাইরে সারিবদ্ধভাবে শুয়ে পড়ল। ওদিকে মূল প্রবেশদ্বারের বাইরে পুলিশের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। রাত ৩টায় বিবিসি থেকে ফোন পেয়ে বেশ অবাক হলাম। বেশ কিছুদিন ধরে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির সংবাদ এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান প্রচারে ক্ষমতাসীনদের প্রতি পক্ষপাত সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারে প্রিন্ট মিডিয়ায় যে বিজ্ঞাপন দেয়, সেখানেও আমার দেশ পত্রিকার জন্যে বরাদ্দ প্রায় থাকে না বললেই চলে। কিন্তু ফোনের ওপারের মহিলার কণ্ঠস্বর এবং প্রশ্ন করার ধরন আজ যথেষ্ট সহানুভূতিশীল মনে হলো। ফ্যাসিবাদ ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আমার দেশ পত্রিকার নৈতিক অবস্থান তুলে ধরলাম। আমাদের অবরুদ্ধ অবস্থার যথাসম্ভব বর্ণনা দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার লড়াইয়ে বিবিসিসহ মুক্তবিশ্বের সকল গণমাধ্যম এবং মানবাধিকারে বিশ্বাসী মানুষের সমর্থনের আহ্বান জানালাম। সেই সাক্ষাত্কার বিবিসি থেকে প্রচারিত হয়েছিল কি-না আমার জানা নেই। সাক্ষাত্কারপর্ব শেষ না হতেই শেষবারের জন্যে স্ত্রীর ফোন পেলাম। আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুলিশের হেফাজতে চলে যাব জানাতেই পারভীন স্তব্ধ হয়ে গেল। থানায়, আদালতে কিংবা কারাগারে মা এবং সে যেন কোনোদিন আমাকে দেখতে না যায়, মিনতিভরে সেই অনুরোধ করলাম। ফ্যাসিবাদী সরকারের সব অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করার মতো মনোবল আমার রয়েছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আমার প্রিয়জনের অপমান সইতে পারব না। দেড় বছরের শাসনামলে প্রমাণিত হয়েছে ন্যূনতম শালীনতা, সৌজন্যবোধও এদের মধ্যে নেই। বারবার করে পারভীনকে বললাম, তোমাদের কষ্ট হবে জানি, তবু আমার এই শেষ অনুরোধটুকু রক্ষা কোরো।
নিরস্ত্র মানুষের সব বাধা শেষরাত সাড়ে ৩টার মধ্যেই ভেঙে গেল। ঘরের বাইরে চেয়ার ছুড়ে ফেলা, সাংবাদিকদের লাঠিপেটা এবং অগ্রসরমাণ বুটের আওয়াজ পেলাম। কয়েকজন বোধহয় দরজা আগলে রাখার শেষ চেষ্টা করেছিল। দাঙ্গা পুলিশের সবল ধাক্কায় সবাই ছিটকে পড়ল ঘরের ভেতরে। ডজন দুয়েক পুলিশের চাপে আমার সামনের টেবিলটা প্রায় গায়ের ওপর উঠে এলো। ফরহাদ ভাই সামান্য আহত হলে বললাম, আর নয়। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। চারদিক থেকে পুলিশের আগ্রাসী হাত এগিয়ে এলো আমার দিকে। সহকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ তখনও ফজরের নামাজ পর্যন্ত সময় চাইছে। অনুরোধ রক্ষা হবে না বুঝতে পেরে আমি কেবল শেষবারের জন্যে অজু করতে চাইলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সংলগ্ন বাথরুম থেকে অজু করে এসে বললাম, আমি তৈরি। চারদিকে অশ্রুর বন্যা। অগুনতি পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে এগিয়ে গেলাম লিফটের দিকে। মুখে হাসি ধরে রেখেছি। নইলে সহকর্মীরা আরও ভেঙে পড়বে। লিফট বন্ধ হলো। চালকের দিকে তাকিয়ে দেখি তার চোখেও পানি। লিফট নিচতলায় নামলো। সেখানেও অত রাতে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষ অপেক্ষা করে আছে। এমপি পাপিয়া, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলনেত্রী শিরিন এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের সোহেলকে বোধহয় চিনতে পারলাম। তখনও স্লোগান চলছে। গাড়িবারান্দার সামনেই একটি সাদা, দরজা খোলা, মাইক্রোবাস আমার জন্যে অপেক্ষমাণ। কাছে এগোতেই ভেতর থেকে একজন হাত বাড়িয়ে সজোরে ভেতরে টেনে নিল। আমাকে মাঝখানে ঠেলে দিয়ে আরও একজন মাইক্রোবাসে উঠল। চালকের পাশেও দেখলাম অপর এক কর্মকর্তা। মুহূর্তের মধ্যে মাইক্রোবাস ছুটে চলল শেরাটন হোটেলের দিকে। কোথায় যাচ্ছি জানা নেই। কেউ কোনো কথা বলছে না। জিজ্ঞাসা করাও অর্থহীন। বাংলামোটরের মোড়ে ইউটার্ন নেয়ার পর ওয়্যারলেসে কথা শুরু হলো। আবারও সোনারগাঁও হোটেল পেরিয়ে এবার উত্তরে ছুটতে লাগলাম। ছুটন্ত গাড়ির ভেতর থেকে মনে হলো বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার ইমারতের নিচতলায় তখনও বেশ লোকজন। আমাকে কি দেখতে পেয়েছে তারা? ভাবছিলাম, থানায় নিচ্ছে নাকি দেশবাসী কালই ক্রসফায়ারের মিছিলে আরও একজন বেড়ে যাওয়ার একঘেয়ে গল্প শুনবে? মিনিট দশেকের মধ্যেই জাহাঙ্গীর গেট দিয়ে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ করলাম। সঙ্গের পুলিশ কর্মকর্তারা ওয়্যারলেস অথবা মোবাইল ফোনে নির্দেশ দেয়া-নেয়া ছাড়া আমার সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় করেনি। ভোর ৪টার দিকে একবার ভুলের পর চালক গাড়ি নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় প্রবেশ করল। জায়গাটি অপরিচিত। আগে কখনও এখানে আসার কারণ ঘটেনি। মাইক্রোবাস থেকে নামলাম। কেউ কোনো কথা বলছে না। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেই এগিয়ে গেলাম ডিউটি অফিসারের ঘরের দিকে। চেয়ার টেনে বসেও পড়লাম। ডিউটি অফিসার এবং শিল্পাঞ্চল থানা থেকে আগত আমার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) আবদুল আহাদ প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় নিল পারস্পরিক কাগজপত্র লেখা এবং সই-সাবুদ সমাপ্ত করতে। ফজরের আজান শুনতেই পাশে মেঝেতে নামাজ পড়ার জন্যে দাঁড়িয়ে গেলাম। একজন কনস্টেবল দয়াপরবশ হয়ে একটি জায়নামাজ নিয়ে এলো। নামাজ শেষ হলে আইও আহাদ দুই-একটি অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করল। আমার গ্রেফতারে বিলম্ব নিয়ে বেশ অনুযোগও শুনলাম। কর্মকর্তাটির কথা বলার ভঙ্গি যথেষ্ট তির্যক। অভদ্র হয়তো বলা যাবে না তবে ব্যঙ্গ ঝরে পড়ছিল প্রতিটি বাক্যে। সাড়ে ৫টার মধ্যেই আমাকে হাজতে নিয়ে যাওয়া হলো। জীবনে প্রথমবারের মতো থানার হাজতে পা রাখলাম।
হাজতটি বেশ বড়। এক কোণে আধা-মানুষ সমান উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা প্রাতঃকৃত্যের জায়গা। পাশে ধূলি-ধূসরিত কালো রঙের ময়লা কম্বল পড়ে আছে। ওই কম্বল পেতে বসার চেয়ে নোংরা মেঝেতে বসা অনেক ভালো। যতক্ষণ শরীরে কুলায় পায়চারি করে সময় কাটানোই মনস্থ করলাম। আমার দিকে একবার তাকিয়ে ডিউটি অফিসার চলে গেল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ফিরে এলো একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে করে। তার হাতে একটা চেয়ার। গারদের তালা খুলে চেয়ারটা দিয়ে বলল—স্যার, এখানে বসে সময় কাটান। প্রত্যুত্তরে ধন্যবাদ জানালাম। বসার আয়োজন তো হলো। কিন্তু মশা এবং ভ্যাপসা গরমের যুগপত্ আক্রমণে সময় কাটানো কঠিন। ডিউটি অফিসার খানিক বাদে একটা মশার কয়েল এনে গারদের লোহার দরজার ওপারে জ্বালিয়ে আমাকে বলল—স্যার, দরজার কাছে এসে বসেন, গরম এবং মশা দুটোই কম লাগবে। আমাদের গারদের ভেতরে কয়েল দেয়ার নিয়ম নেই। পুলিশ কর্মকর্তাটির সৌজন্যে যথেষ্ট কৃতজ্ঞ বোধ করলাম। আমাকে পাহারা দেয়ার জন্যে একজন সেন্ট্রি গারদের বাইরে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। ছেলেটির সঙ্গে টুকটাক গল্প করতে করতে ৮টা বাজল। কৌতূহলবশত থানার অন্যান্য সেন্ট্রিও উঁকি দিয়ে আমাকে দেখে গেল। এর মধ্যেই ক্যান্টিন থেকে নাস্তা এলো। দুটো ছোট পরোটা, ডিমভাজি এবং লেবু দেয়া এককাপ রঙ চা। আগের রাত থেকে প্রায় কিছুই খাওয়া হয়নি। ডিমভাজি দিয়ে একটা পরোটা এবং চা খেলাম। চায়ের স্বাদটা চমত্কার লাগল।
সময় আর কাটতে চায় না। ভ্যাপসা গরমে সেদ্ধ হচ্ছি। গেঞ্জি-শার্ট ঘামে ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। দেয়ালঘেরা প্রাতঃকৃত্যের জায়গায় গোসল হয়তো করা যেত; কিন্তু সঙ্গে দ্বিতীয় কোনো কাপড় নেই। ঘামের গন্ধে নিজের কাছেই অস্বস্তি লাগছে। এর মধ্যেই দুপুরে ভাত খাওয়ার প্রস্তাব এলো। এ অবস্থায় খাওয়ার রুচি হলো না। আরও এককাপ লেবু চা চেয়ে খেলাম। বসে বসে ভাবছিলাম আইন অনুযায়ী তো আমাকে আজই কোর্টে হাজির করার কথা। জামিন না পাই, আপনজনরা অন্তত জানবে আমি এখনও বেঁচে আছি। পরক্ষণেই মনে হলো, এক-এগারোর সরকার অনেক রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ আদালতে সোপর্দ না করেই অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখেছিল। অসহায় আত্মীয়স্বজন তখনকার ক্ষমতাবানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছে প্রিয়জনের হদিসের জন্যে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা সেই অবৈধ সরকারেরই ফসল। চোখ বুজে একমনে আল্লাহর কাছে সবরের প্রার্থনা করে যাচ্ছিলাম। বিকাল সাড়ে ৩টায় গারদের তালা খোলা হলো। শুনলাম আমাকে আদালতে নেয়ার জন্যে প্রিজন ভ্যান এসেছে। প্রধানমন্ত্রীপুত্র জয় সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের অপরাধে দায়ের করা মানহানি মামলার হাজিরা দিতে গ্রেফতার হওয়ার দু’সপ্তাহ আগে সিএমএম আদালতে গিয়েছিলাম। সেদিন সহকর্মী সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান সঙ্গে ছিল। আদালতে প্রিজন ভ্যানে আসামিদের গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে বড় কষ্ট লেগেছিল। এক আসামির স্ত্রীকে দেখেছিলাম কোলের ছেলেটিকে উঁচু করে ধরে আছে যাতে প্রিজন ভ্যানের মধ্যে থাকা পিতা তার সন্তানকে একটু স্পষ্ট করে একনজর দেখতে পায়। দৃশ্যটি বিশ্ববিখ্যাত ‘স্পার্টাকাস’ ছবির মতো লেগেছিল, যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী, ক্রুশবিদ্ধ স্পার্টাকাসের সামনে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রী সদ্যোজাত পুত্রকে দু’হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে ছিল। যতবার ছবিটি দেখেছি, অবধারিতভাবে ওই দৃশ্যে চোখে পানি এসেছে। আমি নোমানকে ভাঙাচোরা প্রিজন ভ্যানে আসামিদের অসুবিধা নিয়ে একটা প্রতিবেদন লিখতে বলেছিলাম। তখন কি জানতাম এত শিগগির আমাকেই প্রিজন ভ্যানে উঠতে হবে? ভেতরে ঢুকে দেখি বসার কোনো সুযোগ নেই। লোহার বেঞ্চের কাঠামো থাকলেও প্লাইউডের সবগুলো তক্তা ভাঙা। ভ্যানটির উচ্চতাও বেশ কম মনে হলো। ফলে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পুরনো ঢাকার সিএমএম কোর্ট পর্যন্ত দীর্ঘ পথ ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে থেকে পা এবং ঘাড় দুটোই ব্যথা করে ফেললাম। ভিআইপি সড়ক দিয়ে আমার দেশ পার হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল আমার সহকর্মীরা কি অফিসে আছে, নাকি ফ্যাসিবাদের পুলিশ সবাইকে বার করে দিয়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে? আরও একটি চিন্তা সমস্ত পথ মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। আমাকে যে মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে, সেটি জামিনযোগ্য। অতএব চরম পক্ষপাতদুষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকেও এই মামলায় অন্তত জামিন দিতেই হবে। কিন্তু শত শত দাঙ্গা পুলিশ দিয়ে এত কাণ্ড করে প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই, মাত্র একরাতের জন্যে আমাকে গ্রেফতার করেননি। জামিন পাওয়া যাবে না এমন মামলা গত চব্বিশ ঘণ্টায় সম্ভবত দায়ের করা হয়েও গেছে। মামলার অভিযোগটি কী হবে, অনেক ভেবেও তার কোনো কূলকিনারা করতে পারছিলাম না। বাংলাদেশের পুলিশ বানোয়াট মামলা তৈরিতে কতটা সিদ্ধহস্ত, সেটা ঠাহর পেতে আর মাত্র একঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। জনসন রোড থেকে সিএমএম কোর্টের দিকে প্রিজন ভ্যান বাঁক নিতেই অসংখ্য লোকের গগনবিদারী স্লোগানের আওয়াজ শুনতে পেলাম।

৩- ভোরের আজানের ধ্বনি আমাকে সেই ভরসাই দিয়ে গেল

পুলিশ হেফাজতে আমার নির্যাতন এখন অবশ্যম্ভাবী। প্রথম চেষ্টায় রিমান্ডে নিতে প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকার ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় বার যে তারা ব্যর্থ হবে না, সে ব্যাপারে আমি এর মধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছি। কতখানি নির্যাতন সইতে পারব, সেটাই একমাত্র বিবেচ্য.....

আমাকে বহনকারী প্রিজন ভ্যান অসংখ্য মানুষের ভিড় ঠেলে এগোতে চেষ্টা করছে। ভেতর থেকেই শুনতে পাচ্ছি অনেকের কণ্ঠে ‘মাহমুদ ভাই’ ডাক এবং পুলিশের মুহুর্মুহু হুইসেলের আওয়াজ। সিএমএম আদালতের সামনের রাস্তায় অপেক্ষমাণ আইনজীবী, সাংবাদিক, প্রকৌশলী এবং সাধারণ জনগণের প্রতিবাদের মুখে আমাকে কোর্টে নেয়া সম্ভব হলো না। অবস্থা বেগতিক হয়ে ওঠায় শেষ পর্যন্ত শত শত পুলিশের প্রহরায় প্রিজন ভ্যান ঢুকে গেল কোর্ট গারদ চত্বরে। প্রায় আধঘণ্টা ধরে জ্যৈষ্ঠের প্রচণ্ড গরমে ভ্যানের মধ্যেই সেদ্ধ হচ্ছি। আশপাশের বিল্ডিং-এ ক্যামেরা হাতে সাংবাদিকরা ততক্ষণে অবস্থান নিয়েছেন। আইও আহাদ ভ্যানের তালা খুলে একজন কনস্টেবলসহ প্রবেশ করল। দু’জনার হাতে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং হেলমেট। যুগপত্ বিরক্ত এবং বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাতেই পুলিশের গত্বাঁধা বুলি আউড়ে জানাল, আমার নিরাপত্তার জন্যই নাকি এই চরম অবমাননাকর আয়োজন। যেন আমি ভয়ঙ্কর কোনো সন্ত্রাসী। হয় আমাকে মেরে ফেলা কিংবা ছিনিয়ে নেয়ার জন্যে প্রিজন ভ্যান থেকে বাইরে পা দিলেই অস্ত্র হাতে হাজার হাজার সন্ত্রাসী ঝাঁপিয়ে পড়বে! এক-এগারোর সময়ে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানকে এই আদালতেই হেলমেট, জ্যাকেট পরিয়ে আনার দৃশ্য মনে পড়ে গেল। জেএমবি এবং হুজির লোকজনকেও একইভাবে আদালতে হাজির করা হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকেই। বুঝতে অসুবিধে হলো না, মিডিয়া-সার্কাসের মাধ্যমে চরিত্রহননের চেনা কৌশল আমার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হতে যাচ্ছে। আমাকে পুরোপুরি চিনতে বর্তমান প্রশাসনের তখনও বাকি ছিল।
আমি বেঁকে বসলাম। আমার সাফ কথা, হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানোর আগে প্রিজন ভ্যানের ভেতরেই আমাকে গুলি করে মেরে ফেলতে হবে। আইও আবদুল আহাদ আমাকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলেন। তার কাছ থেকে শুনলাম, আমার নাকি অনেক শত্রু, জ্যাকেট আর হেলমেট কেবল আমার অমূল্য প্রাণ রক্ষার জন্যই ‘সদাশয় সরকার’ বিশেষভাবে ব্যবস্থা করেছে। আমি অটল রইলাম। দল বেঁধে আসা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নানারকম হুমকিতেও কাজ হলো না। আমার অনমনীয়তার কাছে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের লেবাসধারী মহাজোট সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হলো। তখনও বাইরে পুলিশের সঙ্গে আইনজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবীসহ প্রতিবাদী জনতার ধাক্কাধাক্কি চলছে। আরও ঘণ্টাখানিক অপেক্ষার পর অনেক কসরত করে প্রিজন ভ্যান কোর্টের একেবারে দোরগোড়ায় নেয়া হলো। চারদিকে স্লোগান এবং শত শত পুলিশের বেষ্টনীর মধ্যে হেলমেট, জ্যাকেট ছাড়াই মাটিতে পা দিলাম। এর মধ্যেই অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার দুটো ওকালতনামায় আমার সই নিয়ে গেছেন। তখনই প্রথম বুঝেছি, সরকার নতুন একটি মামলা অন্তত দায়ের করেছে। তবে কী প্রকৃতির মামলা, সেটি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগে টের পাইনি। অসংখ্য পুলিশ এবং জনতার ভিড় ঠেলে দুর্বল শরীরে সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হলেও পিঠ সোজা রেখেই আদালতে পৌঁছে সোজা কাঠগড়ায় উঠলাম। সানাউল্লাহ মিঞা, মাসুদ তালুকদার, খোরশেদ আলমসহ অনেক আইনজীবী আমার জন্যে দাঁড়ালেন। সরকারও তার পিপিবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছে। এজলাসে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। যুক্তি-তর্ক শুরু হলো। হাসমত আলীর দায়ের করা জামিনযোগ্য, বানোয়াট মামলায় সহজেই জামিন পেয়ে গেলাম। তারপর শুরু হলো দ্বিতীয় মামলা। এই মামলায় বাদী তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। পূর্বরাতে আমার দেশ কার্যালয় থেকে আমাকে গ্রেফতারের সময় পুলিশকে নাকি আমারই নির্দেশে কর্তব্য-কর্মে বাধা দেয়া হয়েছে। কেবল মামলা দায়ের নয়, পুলিশ সাত দিনের রিমান্ডও প্রার্থনা করল। এবার সত্যিই ধাক্কা খেলাম। মইন ও তার মার্কিন এবং ভারতীয় প্রভুর বিরুদ্ধে কলম ধরার দিন থেকেই জেলখানায় আসার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। কিন্তু বিনিয়োগ বোর্ডের সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় দৈনিকের একজন সম্পাদককে কোনো সরকার নির্যাতন করার অভিপ্রায়ে বানোয়াট মামলায় রিমান্ডে নিতে পারে—এমন চিন্তা কখনও মাথায় আসেনি। মনে পড়লো, পত্রিকার দায়িত্ব নেয়ার প্রথম দিনেই আমার দেশ-এর সাংবাদিকদের মানবাধিকার প্রশ্নে আমার অনমনীয় অবস্থানের কথা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। সেই থেকে ক্রসফায়ার, রিমান্ডে নির্যাতন, গুম-খুন ইত্যাদির বিরুদ্ধে আমরা জনমত গঠনের অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে গেছি। গণতান্ত্রিক সরকার পদ্ধতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র নির্যাতনের হাতিয়ারে পরিণত হবে, এটা মানতে পারিনি কোনোদিন। আজ আমিই রিমান্ডের শিকার হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। উপস্থিত সবাইকে কিছুটা অবাক করেই তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট সরকারপক্ষের রিমান্ডের আবেদন খারিজ করে তিন দিনের মধ্যে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের রায় শোনানো মাত্র প্রসিকিউশনের এক আইনজীবীকে উচ্চস্বরে ম্যাজিস্ট্রেটকে রাজাকার বলে গাল দিতে শুনলাম। উভয়পক্ষের যুক্তি-তর্কের পুরোটা সময় ধরে একই ব্যক্তি আমাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের খিস্তি-খেউড় ও অঙ্গভঙ্গি করে যাচ্ছিল। অনেক গালাগালের মধ্যে টাউট শব্দটা বেশ পরিষ্কার শুনতে পেয়েছিলাম। দ্বিতীয় মামলায় জামিন অবশ্য হলো না। এক-এগারোর অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরার দিন থেকে জেলে যাওয়ার যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম, আজ সেটাই ঘটতে চলেছে। থানার হাজত ইতোমধ্যে দেখা হয়েছে, এবার প্রকৃত জেল দেখতে চলেছি। রিমান্ড আটকাতে পেরে আমার পক্ষের আইনজীবী ও আদালতে উপস্থিত পেশাজীবী নেতারা এক ধরনের স্বস্তিসহ আমাকে বিদায় জানালেন। তাদের অভিব্যক্তিতে মনে হলো, স্বল্প সময়ের জন্য আমি যেন কোথাও বেড়াতে চলেছি। এদিকে আমার মন তখন বলছে, এক দীর্ঘ এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এই যাত্রা। রিমান্ড চাওয়ার মাধ্যমে সরকারের হীন চক্রান্ত প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে আমার নির্যাতন এখন অবশ্যম্ভাবী। প্রথম চেষ্টায় রিমান্ডে নিতে প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকার বিফল হলেও দ্বিতীয়বার যে তারা ব্যর্থ হবে না, সে ব্যাপারে আমি এর মধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছি। কতখানি নির্যাতন সইতে পারব, সেটাই একমাত্র বিবেচ্য। হাসিমুখেই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। আজ অন্তত গত রাতের মতো গন্তব্য নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তায় ভুগছি না। প্রকৌশল বিদ্যা অধ্যয়নকালে পুরনো ঢাকা থেকে বহুদিন নাজিমউদ্দীন রোডের জেলখানার উঁচু প্রাচীরের পাশ দিয়ে রিকশা করে বুয়েটে গেছি। সেই উঁচু প্রাচীরের ভেতরের পৃথিবীর বাসিন্দা হব আজ থেকে। ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে তার প্রয়োজনীয় ভিসা দিয়েছেন।
জুন মাসের ২ তারিখ সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আমাকে বহনকারী প্রিজন ভ্যানটি থামল কারাগারের প্রধান ফটকের গা ঘেঁষে। ব্যাগ হাতে নেমে বিশাল প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। পেছনে পড়ে রইল আমার ৫৭ বছরের মুক্ত জীবন। ভেতরে আলো-আঁধারি। পার হয়ে আসা দীর্ঘ সময়ের চিহ্ন কারা অফিসের চারদিকে। কোন দিকে যাব বুঝতে না পেরে থমকে দাঁড়ালাম। একজন কারারক্ষী ইশারা করল ডান দিকের গলিপথের দিকে। বেশ খানিকটা অস্বস্তি নিয়েই সেখানে একজন জেল কর্মকর্তার সামনে দাঁড়াতেই মনে হলো, তিনি আমার পরিচয় জানেন। সামনের চেয়ারে বসতে বলে সেই ডেপুটি জেলার নিজের কাজে মন দিলেন। আধঘণ্টাখানিক পর মাথা তুলে জানালেন, আমার ডিভিশন প্রাপ্তির কোনো আদেশ নাকি তারা পাননি। কিছুটা উদ্বেগের সঙ্গেই মনে করিয়ে দিলেন পরের দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় রোববারের আগে আদালতের সেই আদেশ জেল কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। অর্থাত্ অন্তত তিন দিন আমাকে আম-কয়েদিদের সঙ্গে কাটাতে হবে। জেল কোড অনুযায়ী সচিব পর্যায় পর্যন্ত সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা এবং জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকের ক্ষেত্রে ডিভিশন পাওয়ার জন্যে আদালতের নির্দেশের প্রয়োজন পড়ে না। এটা প্রটোকল অনুযায়ী তাদের প্রাপ্যের মধ্যেই পড়ে। জেল কোডের প্রশ্ন তুলতেই ভদ্রলোক অসহায়ত্ব প্রকাশ করে জানালেন, কোর্টের আদেশ ছাড়া আমাকে ডিভিশন দেয়া হলে তার বিপদে পড়ার সমূহ আশঙ্কা। চাকরি তো যাবেই, তার সঙ্গে উপরি হিসেবে আনুষঙ্গিক বিপদ। তাকে আশ্বস্ত করে জানালাম, সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে থাকতে আমার কোনো অসুবিধা হবে না। এবার একটু বিব্রত হয়েই তিনি জানতে চাইলেন, আমি শুকনো খাবার, বোতলের পানি ইত্যাদি সঙ্গে এনেছি কিনা। নেতিবাচক জবাব শুনে খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললেন, মুশকিলে ফেললেন; এত রাতে খাবেন কী? এক রাত উপোস করতে কিংবা পিপাসার্ত থাকতে আপত্তি নেই শুনে আমার মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে তার বোধহয় কিছুটা সন্দেহ হলো। খানিকটা চুপ থেকে আড়ষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি যদি আমাকে এক প্যাকেট বিস্কুট এবং এক বোতল পানি দেন, আমি গ্রহণ করব কিনা। কোনো কথা না বলে কৃতজ্ঞচিত্তে কেবল ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাতে পেরেছিলাম। আমাদের আলাপচারিতার মাঝখানেই হৃষ্টপুষ্ট ও অতিশয় উদ্ধত এক কারারক্ষী উপস্থিত হয়ে প্রচণ্ড রুক্ষভাবে সঙ্গের ব্যাগে কী আছে জানতে চাইলে বৃথা বাক্যব্যয় না করে ব্যাগটি তার দিকে এগিয়ে দিলাম। ব্যাগের সব বস্তু মাটিতে নিক্ষেপ করা হলো। আপত্তিকর কিছু না পেয়ে লোকটির বিরক্তির পারদ কয়েকগুণ চড়ে গেল। এরপর আমার পরিধেয় বস্ত্র এবং আবৃত শরীর তার মনোযোগের বস্তুতে পরিণত হলো। অন্তর্বাসের ভেতরে লুকিয়ে মোবাইল ফোন এনেছি কিনা, জিজ্ঞাসা করেই অশালীনভাবে আমার ওপর-নিচ পরীক্ষা করা হলো। আল্লাহর কাছে তখন শুধু সবর করার শক্তি চাচ্ছি। ব্যাগের দ্রব্যাদি অবহেলায় মাটিতে ফেলে রেখেই কারারক্ষী চলে গেলে নিজেই সবকিছু কুড়িয়ে আবার ব্যাগে ভরলাম। জেল কর্মকর্তাটি লজ্জিত মুখে কেবল বলতে পারলেন, আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে আজ হয়তো এখানে একটা চরম অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যেত। আমি যথাসম্ভব নির্বিকারভাবে বললাম, যতদূর জানি ডিভিশনপ্রাপ্ত আসামির শরীর স্পর্শ করতে পারেন কেবল জেলার নিজে। একজন কারারক্ষী আপনার সামনে এই আচরণের স্পর্ধা কেমন করে পেল? এই প্রসঙ্গে আর কথা না বাড়িয়ে ভদ্রলোক অপর একজন রক্ষীকে ডেকে আমাকে আমদানিতে নিয়ে যেতে বললেন। ব্যাগ হাতে যন্ত্রচালিতের মতো উঠে দাঁড়ালাম। দ্বিতীয় একটি বিশাল দরজা পেরিয়ে এবার কারাগারের মূল অংশে প্রবেশ করলাম। রাত তখন ৯টার কাছাকাছি। দু’দিনের ধকল এবং খানিক আগের অপমানে জেলের চারপাশ দেখার উত্সাহ তখন শূন্যে। কোনো কথা না বলে রোবটের মতো সঙ্গের রক্ষীটিকে অনুসরণ করে আমদানিতে পৌঁছানোর আগেই মুষলধারে বৃষ্টি নামল। মনে করলাম সৃষ্টিকর্তা বোধহয় সব গ্লানি ধুয়ে দেয়ার জন্যই তার রহমতের দ্বার আমার জন্য খুলে দিলেন। আল্লাহ্র কাছে শোকর জানিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলাম। আমদানিতে পৌঁছে দেখলাম, বেশ দীর্ঘ টানা একটি একতলা বিল্ডিং। সেখানকার প্রথম ঘরটি সুবেদারদের অফিস কক্ষ। বড় জেলগুলোয় দু’জন সুবেদার সচরাচর দায়িত্বে থাকেন। সুবেদার ফয়েজ এবং সুবেদার ফজলু দু’জনই উপস্থিত ছিলেন। জেলের প্রধান অফিসে যে ব্যবহার জেলে প্রবেশের পর পেয়ে এসেছি, তার তুলনায় এখানকার ব্যবহার যথেষ্ট ভদ্রজনোচিত। রাতে আমাকে যে অনাহারে থাকতে হবে, সেই সংবাদ দেখলাম এরই মধ্যে আমদানিতে পৌঁছে গেছে। সুবেদার ফয়েজ একটি ত্রিকোণাকৃতির বড় পাউরুটি দেখিয়ে জানালেন, সেটিই জেলখানার বেকারিতে তৈরি বিখ্যাত পেজগি রুটি। সেই রুটি এবং জেলেরই কোনো এক ভাণ্ডার থেকে জোগাড় করা দুই বোতল পানি দিয়ে রাতের আহারের ব্যবস্থা হলো। বৃষ্টি একটু ধরে এলে বিশাল দুই ছাতা সঙ্গে সুবেদার ফয়েজ আমাকে নিয়ে এগোলেন ঢাকা জেলে আমার বাসস্থানের দিকে। তখনও জানি না জেল কর্তৃপক্ষ আমার জন্য কী ধরনের জায়গা বরাদ্দ দিয়েছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে কাদাপানি পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই শুনলাম, আমরা সাত নম্বর সেলে যাচ্ছি। এর আগে শুনেছিলাম আমার মতো হাজতিদের ডিভিশন না দেয়া হলে হাসপাতালে রাখা হয়। আমি সম্ভবত জেল কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় সেই পর্যায়ভুক্তও নই। সুবেদার ফয়েজ জানালেন, সাত নম্বর সেলের দুই নম্বর কুঠুরি হবে আমার আবাসস্থল। সেখানে তিনজন আসামি ছিল যাদের এক ঘণ্টার নোটিশে পাশের তিন এবং চার নম্বর কুঠুরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে আমাকে জায়গা করে দেয়ার জন্য। তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আজ রাতের মতো আগের স্থলেই থাকবে। সুবেদার ফয়েজ আমাকে আপাতত মানিয়ে নেয়ার অনুরোধ জানালে নিঃশব্দে হাসা ছাড়া আর জবাব খুঁজে পাইনি।
সেলে পৌঁছে তালা খোলা হলে অপর্যাপ্ত আলোর মধ্যেই ভেতরে ঢুকে হাতের ব্যাগটি রাখলাম। সুবেদারকে আগেই গোসলের ব্যবস্থার অনুরোধ করেছিলাম। সেলের বারান্দার ঠিক নিচেই ড্রামে পানি তোলা ছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল সেরে রাতের মতো নিজের সেলে ঢুকলাম। বাইরে থেকে প্রহরী তালা লাগিয়ে দিল। অর্থাত্ জেলের পরিভাষায় আমার লক-আপ সম্পন্ন হলো। পেজগি রুটির একাংশ ছিঁড়ে রাতের আহারের পাট সাঙ্গ করলাম। অন্য আসামির ব্যবহার করা মাটিতে বালিশ ছাড়া কম্বলের বিছানায় পরিশ্রান্ত শরীর এলিয়ে দিতেই অনুভব করলাম, জেলজীবন সত্যিই শুরু হলো। স্ত্রীকে কতদিন রসিকতা করে বলেছি, অনেক কিছু দেখা হলেও জেলখানাটা এখনও দেখা হয়নি। প্রতিবারই রাগতকণ্ঠে পারভীন (স্ত্রীর ডাক নাম) বলতো, বাজে কথা বলো না তো, আল্লাহ কখন কোন কথা কবুল করেন, কে জানে! শুয়ে তো পড়লাম, কিন্তু নিদ্রাদেবী অধরা। সেই শৈশব থেকে ফেলে আসা জীবনের কত কথা মনে হতে লাগল। কোথায় যেন পড়েছিলাম, স্মৃতি সততই দুঃখের। দুঃখ তো দুঃখই। কিন্তু সুখের কথা মনে হলেও যে চোখ ভিজে আসে, সেই নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম অন্ধকার সেলের নোংরা মেঝেতে শুয়ে। কখন ঘুমিয়েছি জানি না। তবে ঘুম ভাঙল আজানের সুমধুর আওয়াজে। বিগত প্রায় কুড়ি বছর ধরে গুলশানে থাকি। সেখানে কষ্ট করে, কান পেতে আজানের শব্দ শুনতে হয়।
পুরনো ঢাকার চিত্র একেবারে আলাদা। চকবাজারের চারপাশের মসজিদগুলো থেকে আজানের সুরেলা ধ্বনি ভেসে আসছে। হঠাত্ মনে হলো যেন শৈশবে ফিরে গেছি। গেণ্ডারিয়ায় ধূপখোলা মাঠের পাশে থাকতাম। ওখানকার এক মসজিদের মুয়াজ্জিনের অসাধারণ সুরেলা কণ্ঠ ছিল। মাঝে মাঝে আমার নানা ভোরবেলায় ঘুম ভাঙিয়ে দিতেন সেই আজান শোনার জন্য। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রথম রাত কাটানোর পর মনে হলো, আমি যে এখনও আল্লাহর রহমতবঞ্চিত হইনি, ভোরের আজানের ধ্বনি আমাকে সেই ভরসাই দিয়ে গেল।

৪- টুকরো কাগজগুলো পাশের সেলের বাবুকে দিয়ে বললাম যদি আর না ফিরি এগুলো আমার স্ত্রীর হাতে পৌঁছে দিও

সিএমএম আদালত থেকে সরাসরি রিমান্ডে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিলাম।
গ্রেফতার হওয়া থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ঘটনাবলী সংক্ষিপ্ত আকারে টুকরো কাগজে লিখে রেখেছিলাম। কোর্টে যাওয়ার আগে পাশের সেলের বাবুর হাতে সেই টুকরো কাগজগুলো দিয়ে অনুরোধ করলাম, যদি আর না ফিরি তাহলে কাগজগুলো যেন আমার স্ত্রীর হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে .....

ফজরের নামাজ শেষ করে সেলের চারদিকে ভালো করে তাকালাম। রাতে যখন এই ঘরে ব্যাগ হাতে ঢুকেছিলাম, তখন কোনো কিছু লক্ষ্য করার মতো শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ছিল না। দৈর্ঘ্যে ১২/১৩ ফুট এবং প্রস্থে টেনেটুনে ৮ ফুটের সেল। থানার হাজতের মতোই কোণে প্রাতঃকৃত্যের স্থান। মেঝেতে দুটো কম্বলের বিছানা পাতা রয়েছে। মাথার কাছে প্লাস্টিকের শেলেফ কয়েকটি বই এবং অন্যান্য টুকিটাকি দ্রব্যাদি রক্ষিত আছে। এগুলো আমি এখানে আসার আগ পর্যন্ত অবস্থানকারী আসামিদের সম্পত্তি। সেলের দেয়ালে পেরেক পুঁতে ব্যাগ ঝোলানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছাদে ফ্যান ঝুলছে এবং দুই সেলের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বাল্ব থেকেই উভয় সেলের বাসিন্দাদের যত্সামান্য বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা। এর মধ্যেই ৬টা বাজার ঘণ্টাধ্বনি শুনলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকালের শিফেটর কারারক্ষী এসে গারদের তালা খুলে দিল। লক-আপ খোলামাত্র দৌড় লাগালাম বাইরের গণটয়লেটে। রাতে কষ্ট হলেও সেলের মধ্যে ওই কাজটি করার রুচি হয়নি। বাইরের টয়লেটের অবস্থাও দেখলাম ভীতিকর। দুর্গন্ধের ধাক্কায় প্রথম চেষ্টায় পিছিয়ে এসে চৌবাচ্চা থেকে বালতিতে পানি নিয়ে আগে ভাসমান ময়লা পরিষ্কার করতে হলো। প্রাতঃকৃত্য শেষে সেই চৌবাচ্চার পাশে দাঁড়িয়েই গোসলও সারলাম। সকালে গোসল করা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এখানেও তার ব্যতিক্রম করলাম না। তবে ঈষদুষ্ণ পানি ব্যবহার করার বিলাসিতা ছাড়তে হলো। এর মধ্যে প্রতিবেশীরাও যার যার সেল থেকে দিনের মতো মুক্তি পেয়েছে। চারদিক থেকে আসা উত্সুক দৃষ্টিতে দ্রুত অভ্যস্ত হতে লাগলাম।
সকাল সাড়ে ৭টা নাগাদ আগের রাতের মতো পেজগি রুটি আর পানি দিয়ে সবে সকালের নাস্তার আয়োজন করছি আর তিন নম্বর কক্ষের একজন প্রতিবেশী এসে হাজির। ছেলেটির নাম বাবু, অস্ত্র মামলার আসামি। সরল-সাধারণ মানুষের সোজাসুজি প্রস্তাব। যতদিন ডিভিশন ওয়ার্ডে স্থানান্তরিত না হচ্ছি, ওদের সঙ্গে তিনবেলা খেতে হবে এবং কোনো টাকা-পয়সা দেয়া চলবে না। জেলের কয়েদিদের মধ্যে যারা সামর্থ্যবান তারা কেবল সরকারি খাওয়ার ওপর নির্ভর করে জীবন ধারণ করে না। জেলে ক্যান্টিন রয়েছে যেখান থেকে তুলনামূলক উন্নত খাদ্য কিনে ক্ষুধা নিবারণ করছে অন্তত এক-চতুর্থাংশ বন্দি। বাকিদের যেহেতু কিনে খাওয়ার মতো অর্থ সংস্থান নেই, কাজেই অতীব নিম্নমানের সরকারি ডায়েটই একমাত্র ভরসা। সকালবেলার সরকারি বরাদ্দ হচ্ছে দু’খানা আধপোড়া ধুলোমাখা রুটি এবং খানিকটা আখের গুড়। আমি যতই বলি পেজগি রুটিতেই চলে যাবে, কিন্তু বাবু নাছোরবান্দা। শেষ পর্যন্ত এই আন্তরিকতার কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হলো। জেল ক্যান্টিন যাকে জেল পরিভাষায় পিসি বলা হয়, সেখান থেকে নাস্তা এলো ঘণ্টাখানেক পর। পরোটা, ভাজি এবং ডিমভাজা দিয়ে সকালের খাওয়াটা একেবারে মন্দ হলো না। বাবুর ঘরে চায়ের আয়োজনও রয়েছে। তবে ব্যাপারটা যে বেআইনি, সেটা পরে জেনেছিলাম। এর মধ্যে সারা জেলে আমার আগমনী বার্তা রটে গেছে। বিভিন্ন সেল থেকে বন্দিরা আসছে আমার সঙ্গে পরিচিত হতে। সাত নম্বর সেলে ছোটখাটো ভিড় জমে যেতেই কারারক্ষীরা উদ্বিগ্ন হয়ে আগত অতিথিদের জেলকোড ভঙ্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। জেলের ভেতরে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া এক সেল থেকে অন্য সেলে যাতায়াত নিষিদ্ধ থাকলেও কারারক্ষীদের সন্তুষ্ট করতে পারলে তারা সচরাচর চোখ বুজেই থাকে। কিন্তু, সঙ্গত কারণেই আমার ব্যাপারটা অনেক বেশি স্পর্শকাতর। আগত কয়েদিদের সঙ্গে আলাপচারিতার ফাঁকে প্রশাসনের লোক এলো আমার ছবি তুলতে। নতুন আসামির বুকে নম্বর সেঁটে ছবি তোলা বাধ্যতামূলক। ‘একে ধরিয়ে দিন’ মার্কা ছবি আর কী! ছবি তোলার জন্য আমাকে জেল হাসপাতাল প্রাঙ্গণে যেতে হলো। জায়গাটি সাত নম্বর সেলের কাছেই। সেখানেও আমাকে ঘিরে ছোটখাটো ভিড় জমে গেল। ছবি তুলিয়ে ফিরে আসতে না আসতেই জেল অফিস থেকে পেয়াদা এসে হাজির। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী জেলগেটে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তেজগাঁও থানা থেকে আইও এসে গেছে। সেখানে গিয়ে দেখলাম, পেটানো শারীরিক গঠনের খর্বাকৃতির এক ব্যক্তি অপেক্ষমাণ। নাম জিজ্ঞেস করায় জানাল ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম। প্রথম দর্শনেই লোকটিকে অপছন্দ হলো। মিনিট পনেরোর বেশি জিজ্ঞাসাবাদ জমল না। আমাকে গ্রেফতারের সময় আমার দেশ কার্যালয়ে সাংবাদিক এবং শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে কারা উপস্থিত ছিল সেটাই প্রধানত তার জিজ্ঞাস্য। এসব ব্যক্তিকে পত্রিকা অফিসে আসার জন্য আমি ফোন করেছিলাম কি-না তাও জানতে চাইল। নেতিবাচক জবাব দিয়ে আমি পাল্টা জানতে চাইলাম, আদালতের কোনো পরোয়ানা ছাড়া কোন অধিকারে সেদিন এতজন পুলিশ আমার অফিসে হাজির হয়েছিল। আমার দেশ বন্ধ করার আইনগত ব্যাখ্যাও দাবি করলাম। ইন্সপেক্টর রেজার পক্ষে আমার একটি প্রশ্নের জবাব দেয়াও সম্ভব হলো না। সে স্বভাবতই বিরক্তবোধ করতে লাগল। আমি জোর দিয়ে বললাম, আমার প্রতিটি প্রশ্ন তার প্রতিবেদনে বিশদভাবে উল্লেখ করতে হবে। কেবল একতরফা জবাব লিখে কাজ সারলে চলবে না। বিব্রত হওয়াতে তার জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটার গতি বেড়ে গেল। সওয়াল-জবাব চলাকালেই আইও আকস্মিকভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, এখানে জিজ্ঞাসাবাদের কোনো পরিবেশ নেই। আর কোনো প্রশ্ন আছে কি-না, আমার এই প্রশ্নের জবাবে সে দু’দিকে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল, জিজ্ঞাসাবাদ সমাপ্ত হয়েছে। আমিও কালক্ষেপণ না করে সাত নম্বর সেলের ফিরতি পথ ধরলাম।
জেলের তৃতীয় দিন ব্যারিস্টার নাসিমউদ্দিন অসীম এবং সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো। বন্দি হওয়ার পর প্রথমবারের মতো পরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ব্যগ্র হয়ে জেলগেটে গেলাম। মা ও পারভীনের কুশল জানতে চাইলে ওরা বলল, সবাই ভালো আছেন। আমার স্ত্রী যে বাস্তবে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে সেটা সেদিন আমাকে আর কেউ জানায়নি। জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে ডিভিশন দেয়নি জেনে অসীম বিস্মিত হয়ে বলল, ওখান থেকে সরাসরি প্রেস ক্লাবে গিয়ে তারা সংবাদ সম্মেলন করে জাতিকে সরকারের স্বৈরাচারী আচরণের কথা জানাবেন। আমার পার্শ্ববর্তী সেলের বাসিন্দারা আমাকে চাঁদা তুলে দু’দিন ধরে তিনবেলা খাওয়াচ্ছে শুনে নোমানের বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে গেল। অলিউল্লাহ নোমানের কাছ থেকে জানলাম, জেলে আসার দিনই আমার নামে দশ হাজার টাকা পিসিতে জমা দেয়া হয়েছে। পিসি শব্দটি ইংরেজি Personal Cash (ব্যক্তিগত তহবিল)-এর ক্ষুদ্র প্রতিশব্দ। এখানে জমাকৃত টাকা দিয়ে জেল ক্যান্টিন থেকে কয়েদিরা পছন্দমত খাবার কিনে খেতে পারে। প্রায় তিনদিন পার হয়ে গেলেও টাকা জমার খবরটি জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। সরকার কতখানি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছে, এরপর আর না বোঝার কারণ রইল না। হাইকোর্টে রিট করে যত শিগগির সম্ভব পত্রিকা পুনঃপ্রকাশের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করে অসীমের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। সেদিনই বিকাল ৫টার দিকে সুবেদার ফজলু এসে সংবাদ দিল, জেল কর্তৃপক্ষ আমার ডিভিশনপ্রাপ্তি মঞ্জুর করেছে। আমি চাইলে তখনই সঙ্গে আনা ব্যাগ নিয়ে ডিভিশন ওয়ার্ড চম্পাকলি, যেটি ২৬ নম্বর সেল হিসেবেও পরিচিত, সেখানে যেতে পারি। প্রশাসনের এই হঠাত্ বদান্যতার কারণ যে অসীম এবং নোমানের জেলগেটে আগমন, সেটি বুঝতে আমার কোনো সমস্যা হলো না। কেন যেন মনে হলো আল্লাহ্ আমার পরীক্ষা চাইছেন। কোরআন-হাদিস অধ্যয়ন করে আমি জানি, আল্লাহ্র কাছে পরীক্ষা দেয়া বান্দার সাধ্যাতীত। তারপরও যে সরকার জেল কোডকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একজন নাগরিককে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনটি দিন হেনস্তা করেছে, খাদ্য ও পানীয় থেকে বঞ্চিত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়েছে—তাদের ডিভিশন গ্রহণ করতে মন চাইল না। সাধারণ কয়েদিদের মতো কষ্টকর কারাজীবনে অভ্যস্ত হয়েই নৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদী প্রশাসনকে পরাজিত করার তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম। উপস্থিত বন্দি, কারারক্ষী, নির্বিশেষে সবাইকে অবাক করে আমি ডিভিশন প্রত্যাখ্যান করলাম। সারা জেলে হৈচৈ পড়ে গেল। ডিভিশনপ্রাপ্তির জন্য এখানে কত আকাঙ্ক্ষা, কত হা-হুতাশ। এমন অবাক করা কাণ্ড কারা প্রশাসন জন্মে দেখেনি। স্বয়ং জেলার ছুটে এসে তিনদিন ডিভিশন না দেয়ার সপক্ষে নানারকম দুর্বল যুক্তি দিতে লাগল। আমি অনড় রইলাম। এরপর প্রচ্ছন্ন হুমকি। বলা হলো, সরকারের বদান্যতার অসম্মান করলে আমাকে আর আইনজীবীদের সঙ্গে জেলগেটে সাক্ষাত্ করতে দেয়া হবে না। আমি ওকালতনামাতেও সই করতে পারব না। কাজেই আমার মামলা লড়াও সম্ভব হবে না। জেলার মোখলেসুর রহমান আমার মতো চিজের পাল্লায় আগে কখনও পড়েননি। কঠিনভাবে তাকে বলে দিলাম, যে হুমকি তিনি দিচ্ছেন তার একটিও করার ক্ষমতা তার নেই। তর্কাতর্কির মধ্যেই শেষ পর্যন্ত একটা রফা হলো। আমি ডিভিশন ওয়ার্ডে যাব না। তার পরিবর্তে আমার সাত নম্বর সেলের সেই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠেই একটি চৌকি ও চেয়ার-টেবিল দেয়া হবে। ভূমি শয্যা থেকে চৌকিতে উত্তরণ ঘটল গ্রেফতারের তিনদিন পর।
আরও দু’দিন কাটল। এর মধ্যে সরকার তিনটি নতুন মামলা দায়ের করেছে। সাতাশটি মামলার বোঝা ঘাড়ে নিয়ে জুনের ২ তারিখ ভোর রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানা হাজতে প্রবেশ করেছিলাম। ৭ তারিখের মধ্যে মামলার সংখ্যা দাঁড়াল একত্রিশে। কোতোয়ালি থানা পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা দেয়ার মামলা দায়ের করা হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে সিএমএম আদালতে আমাকে আনার দিনে আদালত এলাকায় জনগণের প্রতিবাদের অপরাধে। সেদিন আদালত চত্বরে যখন প্রচণ্ড বিক্ষোভ চলছিল, আমি তখন শত শত পুলিশ পরিবেষ্টিত অবস্থায় প্রিজন ভ্যানে আটকাবস্থায় ছিলাম। বিক্ষোভের খবরও আমার জানা ছিল না। অথচ আমিই নাকি এই মামলার এক নম্বর আসামি। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী আমার উস্কানিতেই হাজারের ওপর আইনজীবী, সাংবাদিক, পেশাজীবী, সাধারণ নাগরিক সেখানে জমায়েত হয়েছিল। অভিযোগ সত্য হলে সাধারণ জ্ঞান বলে, আমাকে পাহারারত পুলিশও সমভাবে অপরাধী। তাদের সংশ্রব ও সহযোগিতা ছাড়া বন্দি অবস্থায় আমার পক্ষে লোক জমায়েত এবং তাদের উস্কানি দেয়া অসম্ভব। বাংলাদেশের কথিত স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার প্রতি প্রশাসনের এই উপহাসে আমি চমত্কৃত হলেও বিচারকরা নির্বিকার। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় মামলা তুলনামূলকভাবে অনেক গুরুতর। উত্তরা থানায় ইসলামী জঙ্গিত্বের অভিযোগে এবং বিমানবন্দর থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের হয়েছে। সবক’টি মামলাতেই সেই অতিচেনা শোন অ্যারেস্ট (Shown Arrest)| শেখ হাসিনার এবারের শাসনকালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্ন মতাবলম্বীদের শায়েস্তা করার জন্য শোন অ্যারেস্ট নামক আইনের যথেচ্ছ অপব্যবহার চলছে। যে কোনো নাগরিককে একটি বানোয়াট মামলায় গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে এন্তার মামলা দায়েরের মাধ্যমে শোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে বিনা বিচারে সুদীর্ঘকাল আটক রাখার নয়া পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে দেশে পুরনো কালো আইন নামে পরিচিত বিশেষ ক্ষমতা আইনের আর প্রয়োজন হচ্ছে না। গত দুই বছরে নাগরিকের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সপক্ষে আমার দেশ জোরালো অবস্থান নিয়ে ক্রসফায়ার, গুম-খুন, শোন অ্যারেস্ট, রিমান্ডের নামে ভয়াবহ নির্যাতন এবং পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু সম্পর্কিত সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দূরের এবং কাছের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আজ্ঞাবহ সরকার মানবাধিকারের পক্ষে আমার দেশ-এর নৈতিক অবস্থানকে সহ্য করতে পারেনি। জনগণ তাদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠলে যে কোনো স্বৈরাচারী সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবী। আমার সম্পাদনায় আমার দেশ স্বাধীনতার কথা বলেছে, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য জনমত তৈরির যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। এই ‘অপরাধের’ জন্য হয়তো আমাকে চরম মূল্যই দিতে হবে। খবর পেলাম, নতুন তিনটি মামলাসহ তেজগাঁও থানার পুরনো মামলাতেও সরকার নতুন করে রিমান্ড প্রার্থনা করেছে। ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম কেন বলেছিল জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের পরিবেশ নেই, তাও এবার বুঝতে পারলাম। সব মামলারই রিমান্ড শুনানির জন্য সিএমএম আদালত ৭ জুন দিন ধার্য করেছে। দেখতে দেখতে সাত তারিখ এসে গেল। আজ আদালতে যেতে হবে। এর মধ্যে অ্যাডভোকেট মুন্সী কবির জেলগেটে এসে জানিয়ে গেছে, সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী এবং ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মতো দেশবরেণ্য আইনজীবী অনেকটা প্রথাবিরুদ্ধভাবে নিম্ন আদালতে আমার পক্ষে মামলা লড়তে আসবেন। এ আমার জন্য এক বিরাট সম্মান হলেও কাজের কাজ যে কিছুই হবে না সে বিষয়ে কোনোরকম সন্দেহ পোষণ করছিলাম না। নিম্ন আদালতে রিমান্ডের আবেদন মঞ্জুর কোন প্রক্রিয়ায় হয়ে থাকে সেটা সবারই জানা। সাত তারিখে সিএমএম আদালত থেকে সরাসরি রিমান্ডে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিলাম। আমার মনে ক্রমেই দৃঢ়বিশ্বাস জন্মে যাচ্ছিল, প্রধানমন্ত্রী আমার প্রাণহীন দেহটাকেই কেবল মা এবং স্ত্রীর কাছে ফেরত পাঠাতে চান। গ্রেফতার হওয়া থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ঘটনাবলী সংক্ষিপ্ত আকারে টুকরো কাগজে লিখে রেখেছিলাম। কোর্টে যাওয়ার আগে পাশের সেলের বাবুর হাতে সেই টুকরো কাগজগুলো দিয়ে অনুরোধ করলাম, যদি আর না ফিরি তাহলে কাগজগুলো যেন আমার স্ত্রীর হাতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করে। লেখার মধ্যে আমার জীবনের শেষ ক’দিনের স্মৃতিটা অন্তত তার বাকি জীবনের বাঁচার অবলম্বন হতে পারে। সন্ত্রাসের অভিযোগে আটক ছেলেটি আমার দু’হাত ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। বাবু সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমরা দু’জনই বাইরে থাকলে এই ছেলেই হয়তো দলের নেতা-নেত্রীর নির্দেশে আমার গাড়িতে বোমা হামলা চালাবে। অথচ জেলের ভেতরে মাত্র ক’দিনেই কত আপন হয়ে উঠেছে। এজন্যই মানুষ আশরাফুল মখলুকাত, সৃষ্টির সেরা জীব।
সকাল ১০টায় জেল থেকে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো কোর্ট গারদে। বাহন সেই প্রিজন ভ্যান। এর আগে কোর্ট গারদ চত্বর পর্যন্ত এসেছিলাম। সেদিন আমাকে প্রিজন ভ্যানের ভেতরেই ঘণ্টাখানেক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। আজ সরাসরি গারদে। নোংরা, দুর্গন্ধময় গারদে আমাকে ঢুকিয়েই তালা মেরে দেয়া হলো। ঢাকা সিএমএম আদালতে সেই গারদখানার দু’পাশে চারটি হাজত রয়েছে। আমাকে রাখা হলো পূর্বদিকের শেষ সেলটায়। বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। বসতে হলে কফ, পানি এবং অন্যান্য মনুষ্য বর্জ্যময় মেঝেই একমাত্র স্থান। ওরকম জায়গায় বসতে তখন পর্যন্ত অভ্যস্ত হতে পারিনি। শুরু করলাম পায়চারি। প্রথমে ধীরে, তারপর দ্রুত এবং সবশেষে অতি দ্রুত। অনেকটা ঘোরলাগা মানুষের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটেই চলেছি। চুল, কপাল বেয়ে অবিরত ধারায় ঘাম ঝরছে। দুপুর ২টার দিকে এক দঙ্গল পুলিশ এসে হাজতের দরজা খুলল। ততক্ষণে আমার ঘামে ভেজা, রুক্ষ, পরিশ্রান্ত চেহারা ভীতিকর রূপ নিয়েছে। জানানো হলো, মহামান্য ম্যাজিস্ট্রেট এজলাসে উঠেছেন। আমার মামলার শুনানির সময় হয়েছে। হাজত থেকে সামনের চত্বরে নেমে দেখি অসংখ্য পুলিশ চত্বর ভরে ফেলেছে। তাদের মধ্য থেকে কয়েকজন কর্মকর্তা হাত ধরতে এলে রূঢ় কণ্ঠে আমাকে স্পর্শ না করতে নির্দেশ দিলাম। তারা থমকে পিছিয়ে গেল। শুরু হলো আদালত পানে সম্মিলিত পদযাত্রা।

৫- এমন বেইনসাফিতে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার কথা

কড়া পুলিশ পাহারায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ালাম। খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, আবদুর রাজ্জাক, সানাউল্লাহ মিঞাসহ আমার পক্ষে প্রায় একশ’ আইনজীবী। সরকারপক্ষেও তাবত্ পিপিসহ আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের ছড়াছড়ি। পেশাজীবী আন্দোলনে আমার সহযোগীরাও আদালতে সহমর্মিতা জানাতে এসেছেন।

কালো শ্মশ্রুমণ্ডিত, কপালে নিয়মিত নামাজ পড়ার গাঢ় চিহ্নযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটকে দেখলে যে কেউ তাকে কট্টর মৌলবাদীর তালিকায় ফেলে দেবেন। আমার পক্ষভুক্ত ঢাকা বারের একজন আইনজীবী অবশ্য অনুচ্চ কণ্ঠে আমাকে চেহারা দেখে বিভ্রান্ত না হতে পরামর্শ দিলেন। আদালতপাড়ায় নাকি এই ম্যাজিস্ট্রেট নির্ভেজাল সরকারপন্থী হিসেবে সবিশেষ পরিচিত। সরকারপক্ষ তাদের বক্তব্য শুরু করলেন। তেজগাঁও থানার যে মামলায় আমাকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, সেই মামলাতেই সরকার নতুন করে সাত দিনের রিমান্ড প্রার্থনা করল। সরকারপক্ষের উকিল তেজগাঁও থানার আইও রেজাউল করিমের ঢাকা জেলগেটে তিন দিন আগে করা মন্তব্যেরই প্রতিধ্বনি করে বললেন, আমাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন এবং জেলগেটে সেই বিশেষ পদ্ধতির জিজ্ঞাসাবাদের (পড়ুন নির্যাতন) পরিবেশ নেই। পিপি আরও অভিযোগ করলেন, জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমি যেহেতু প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে অসৌজন্যমূলক ভাষা প্রয়োগ করেছি, কাজেই আমার শক্তির উত্স খুঁজে বের করার জন্যও থানা হেফাজতে রিমান্ড আবশ্যক। সরকারপক্ষের বক্তব্য শেষ হলে একে একে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, এ জে মোহাম্মদ আলী এবং সানাউল্লাহ মিঞা উঠে দাঁড়িয়ে রিমান্ড আবেদনের বিরোধিতা করলেন। ঢাকা বারের সভাপতি সানাউল্লাহ মিঞার বক্তব্য প্রদানের সময় সরকারপক্ষ বার বার বাধা সৃষ্টি করায় আদালতের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট বিচারকসুলভ আত্মসংযম হারালেন এবং অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিঞার বক্তব্যের মাঝেই সবাইকে চমকে একেবারে হুঙ্কার দিয়ে সজোরে টেবিল চাপড়ে উঠলেন। এই অসৌজন্যমূলক আচরণে কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো কোর্ট স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। এই অপমান কেবল ঢাকা বারের সভাপতির একার নয়, আজ ঘটনাক্রমে সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনও নিম্ন আদালতে উপস্থিত। বেঞ্চের এই অপ্রত্যাশিত আচরণ ঢাকা বারে আগে কোনোদিন পরিলক্ষিত হয়নি। বিস্ময় কাটিয়ে শতাধিক আইনজীবী ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। আদালতের অনভিপ্রেত ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে বিচারকার্য অব্যাহত রাখা সম্ভবপর হলো না। হট্টগোলের খবর ততক্ষণে সিএমএম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। সিএমএম এ কে এনামুল হক তার এজলাস থেকে ছুটে এসে ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান তালুকদারের পাশে চেয়ার টেনে বসলেন। তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বিচারক বিব্রতবোধ করে শুনানি অসমাপ্ত রেখেই এজলাস ত্যাগ করলেন।
আমার পরবর্তী গন্তব্য ম্যাজিস্ট্রেট হাবিবুর রহমান ভূঁইয়ার আদালত। এখানে বাদী কোতোয়ালি থানা। পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় আমার বিরুদ্ধে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দেয়ার যে অবিশ্বাস্য ধরনের বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছে, তারই রিমান্ড শুনানির জন্য সদলবলে সেই আদালতে যাওয়া হলো। আমি নিশ্চিত ছিলাম, অন্তত এই মামলাটি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কেবল খারিজই করবেন না, আদালতের সময় নষ্ট করার জন্য সরকারপক্ষকে তিরস্কারও করবেন। ভুলে গিয়েছিলাম এটা বাংলাদেশ এবং মইন-ফখরুদ্দীন তাদের শাসনামলে দেশবাসীকে ‘স্বাধীন বিচারব্যবস্থা’ উপহার দিয়ে গেছেন। আমরা তো বটেই, এমনকি সরকারি পিপিকে পর্যন্ত হতবাক করে ম্যাজিস্ট্রেট একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন। শুনানির প্রহসন সমাপ্ত করে আমাকে কোর্ট গারদে ফিরিয়ে আনা হলো। সারাদিনের অনাহারে, পরিশ্রমে, পানিশূন্যতায় তখন শরীরে আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। যে নোংরা মেঝেতে বসার রুচি না হওয়ায় সকাল থেকে তিন ঘণ্টা অবিরত পায়চারি করে কাটিয়েছি, সেখানেই বসে পড়লাম। ৫টা বাজলো। পুলিশ এসে জানাল, যে মামলায় ঘণ্টা দুয়েক আগে আদালত বিব্রতবোধ করেছিল, সেই মামলায় নতুন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে পুনঃশুনানি হবে। অতএব আবার শ’খানেক পুলিশ নিয়ে আদালত অভিমুখে মার্চ করলাম। সেখানে পৌঁছে আমি হতবাক। আমার পক্ষের কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত নেই। ঘর ভর্তি করে রেখেছে সরকারি পিপি এবং আওয়ামীপন্থী উকিলের বহর। কী ঘটছে, তার কিছুই বুঝতে পারলাম না। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উঠে জানালেন, আমার পক্ষের সিনিয়র আইনজীবীদের উচ্চ আদালতে মামলা থাকায় তারা সময় প্রার্থনা করেছিলেন এবং তাদের সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আদালতের সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আমার পক্ষের আইনজীবীরা সদলবলে শুনানি বর্জন করেছেন। এখন আমি চাইলে নিজেই যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করতে পারি। নইলে নিরুপায় হয়ে আদালতকে একতরফা শুনেই রায় দিতে হবে। সরকারপক্ষের আইনজীবীরা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেই নানা রকম অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে মন্তব্য করছিলেন, আমি এতই মন্দ প্রকৃতির যে আমার মামলা লড়ার জন্যে কোনো আইনজীবী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্য থেকেই একজন রসিকতা করে প্রস্তাব করলেন, তিনি আমাকে আদালতে প্রতিনিধিত্ব করতে করুণাবশত সম্মত আছেন। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে বললাম, এ অন্যায়, এর নাম বিচার হতে পারে না। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হবে। দেশে ন্যায়বিচার ব্যাহত হবে। অন্তত পরদিন পর্যন্ত শুনানি মুলতবি রাখার আবেদন করলাম। ম্যাজিস্ট্রেট তার অপারগতা জানিয়ে সরকারপক্ষকে তাদের যুক্তি-তর্ক পেশের নির্দেশ দিলেন। আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। সরকারি উকিলের পর উকিল হাত-পা নেড়ে কী বলে যাচ্ছিলেন, তার এক বর্ণ কানে ঢোকেনি। তাদের বাগ্মিতা কখন শেষ হয়েছে, তাও বলতে পারব না। চমক ভাঙল ম্যাজিস্ট্রেটের কথায়। স্মিত হাসিতে মুখ ভরিয়ে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, আমার কিছু বলার আছে কি-না। ইচ্ছা হলে আমি সরকারপক্ষের অভিযোগ খণ্ডন করে বক্তব্য দিতে পারি। তিনি আরও মন্তব্য করলেন, আমিও তো লেখাপড়া জানি; সুতরাং আইনজীবী না থাকলেও চলবে। হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আমি কেবল বললাম, আইনজীবী নিয়োগ আমার সাংবিধানিক অধিকার এবং আমার আইনজীবীদের অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য চলতে পারে না। বিচারের নামে এই একতরফা শুনানি ভবিষ্যতের জন্য অতি মন্দ নজির হয়ে থাকবে। কে শোনে কার কথা! ম্যাজিস্ট্রেট তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে এজলাস ত্যাগ করলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, রিমান্ডের সিদ্ধান্ত নেয়াই ছিল, আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ঘোষণা করা হলো মাত্র। সিএমএম আদালতের নিচে নেমে দেখি, পিপি গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমের কাছে বীরদর্পে তাদের বিজয়বার্তা বয়ান করছে। গ্রেফতার হওয়ার পর সাত দিনে পদে পদে বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। কিন্তু আজকের মতো হতাশ ও বিমর্ষ আর কখনও বোধ করিনি। পাঠক ভাববেন না রিমান্ডের কারণে আমার এই হতাশা। আমি শুধু ভাবছিলাম বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে। আমার যদি এমন হাল হয়ে থাকে, তাহলে এদেশের দরিদ্র, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত মানুষগুলো বেঁচে আছে কেমন করে? এমন বেইনসাফিতে তো আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠার কথা। কোর্ট গারদে অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যা ৬টা পেরিয়ে গেল। শেষতক কোর্ট পুলিশ এসে গারদের তালা খুলে দিলে জিজ্ঞেস করলাম, কোন থানা থেকে রিমান্ড শুরু হচ্ছে। জবাব শুনে খানিকটা অবাকই হলাম। আমার আয়ু একদিন বাড়ানো হয়েছে। অর্থাত্ আজ রাতের মতো জেলখানায় ফেরত যাচ্ছি। কাল আরও দু’টি মামলায় রিমান্ড শুনানি রয়েছে। সেগুলো শেষ করে তারপর থানায় নিয়ে ধোলাই শুরু হবে। সাত নম্বর সেলে ফিরে দেখি, আমার প্রতিবেশীরা মন খারাপ করে বসে আছে। রেডিও মারফত রিমান্ডের খবর তারা আগেই পেয়েছে। বাবুর কাছে যে কাগজের টুকরোগুলো পারভীনকে পৌঁছে দেয়ার জন্য গচ্ছিত রেখে গিয়েছিলাম, সেগুলো আর ফেরত নিলাম না। চৌবাচ্চার ধারে দাঁড়িয়ে গোসল করেই সেলে ঢুকে শুয়ে পড়লাম। সারাদিন কিছু খাইনি, তারপরও ক্ষিদে নেই। বাবু এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এলো। ওটুকুই রাতের আহার। সারারাত না ঘুমিয়ে ৫৭ বছরের দীর্ঘ জীবনের ডেবিট-ক্রেডিট মেলানোর চেষ্টা করলাম।
প্রায় নির্ঘুম রাতের সব চিন্তা প্রধানত আমার প্রিয়জনদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তাদের প্রতি কৃত সমুদয় অবিচারের স্মৃতি আরও একবার জীবন্ত হয়ে ধিক্কারে ধিক্কারে আমাকে নিজের কাছেই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে তুলল। ক্ষমা চাওয়ারও তো আর সুযোগ রইল না। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে স্বজন হয়ে ওঠা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ৮ জুন সকালে বিদায় নিলাম। রিমান্ডের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর সর্বাঙ্গের ক্ষতচিহ্নে বহন করছে, এমন দু’জন কয়েদি সকাল থেকে চুপচাপ আমার সেলে এসে বসে রইল। তাদের দু’চোখে সারাক্ষণ অশ্রু টলমল করছিল। সেদিন কোর্ট থেকে আমাকে যে সরাসরি রিমান্ডে নেয়া হবে, সে সম্পর্কে নিঃসন্দেহই ছিলাম। তবে কোথা থেকে জানি না, এক রাতের মধ্যে যথেষ্ট মানসিক শক্তি অর্জন করে ফেলেছিলাম।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রিমান্ডে আমাকে শেষ করে দেয়ার ব্যাপারে কেন জানি না একরকম নিশ্চিত হয়েই কোর্টের উদ্দেশে প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। কিন্তু অবাক কাণ্ড, এক প্রকার গর্ববোধ মৃত্যুভয়কে বার বার অতিক্রম করে যাচ্ছিল। এই সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্রের কুিসত চেহারা আমাকে হত্যার মধ্য দিয়ে জাতির সামনে উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা আমার ৫৭ বছরের অকিঞ্চিত্কর জীবনকে নিজের কাছেই এক ভিন্ন মর্যাদায় অভিষিক্ত করে তুলছিল। মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমিই সর্বপ্রথম লেখা এবং বক্তব্যের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের সিলমোহর তাদের কপালে সেঁটে দিয়েছিলাম। ২০০৮-এর সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী দেড় বছরে অবশ্য ফরহাদ মজহার, বদরুদ্দীন উমর প্রমুখও এই বিশেষণটি একাধিকবার ব্যবহার করেছেন। অন্যান্য দিনের মতোই দুপুর ২টার পর আমাকে কাঠগড়ায় তোলা হলো। জনাকীর্ণ আদালতে ইসলামী জঙ্গিত্বের মামলায় আমার সপক্ষে আমি নিজেই বক্তব্য দিলাম। বললাম, হিযবুত তাহিররের সঙ্গে আমাকে জড়ানোর অপচেষ্টা কেবল নির্জলা মিথ্যাই নয়, এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ফ্যাসিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী সব কণ্ঠ নানা কৌশলে রোধ করা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত সত্যের বিজয়ই সাধিত হয়। আমার ক্ষেত্রেও ইনশাআল্লাহ এর অন্যথা হবে না। মিনিট পাঁচেক বক্তব্য না দিতেই পিপি বাহিনী এবং আওয়ামী আইনজীবী গোষ্ঠী সমস্বরে চিত্কার করে আমার কথা বলায় বাধা দিতে লাগল। শেষ যে কথাটি বলতে পেরেছিলাম তা হলো, আমাকে হত্যা করা যাবে; কিন্তু জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রামে আমার ঈমানের শক্তিকে দুর্বল করা যাবে না। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আমি কথা না বলে সপক্ষের আইনজীবীদের শুনানি করতে দিতে সম্মত হলাম। সানাউল্লাহ মিঞা, মাসুদ তালুকদারসহ আরও কয়েকজনের যুক্তি-তর্ক পেশ শেষে মামলার রায় শুনে এই বৈরী পরিবেশে, এত হতাশার মধ্যেও হেসে ফেললাম। উভয় মামলায় চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন তরুণ সেই ম্যাজিস্ট্রেট। রসিকতা করে ঢাকা বারের সভাপতি সানাউল্লাহ মিঞাকে বললাম, আমার আর আপনার মধ্যে আজ থেকে পেশাগত কোনো পার্থক্য নেই। আমি শুনানি করলে চার দিন রিমান্ড, আপনি করলেও তা-ই। আমি কেবল ভাবছিলাম, যারা অতিশয় গম্ভীর চেহারা নিয়ে তরুণ বয়সেই নিম্ন আদালতে বিচারকের চেয়ারে বসেন, তাদের কি এই জীবন ভালো লাগে? আমি তো জানতাম তারুণ্য সততা ও বিদ্রোহের প্রতীক।
চার পৃথক মামলায় সর্বমোট বারো দিনের রিমান্ডের বোঝা মাথায় নিয়ে কোর্ট গারদে ফিরে এলাম। সামনে অনিশ্চিত সময়। লড়াইয়ের ময়দানে আমি একা, নিঃসঙ্গ। মা আর স্ত্রীর চেহারা সামনে ভেসে উঠল। ছাব্বিশ বছরের সংসার জীবনের কত টুকরো স্মৃতি আনন্দ-বেদনার কাব্য হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে মনের গহিনে। আর কি তাদের সঙ্গে দেখা হবে জীবনে, নাকি এই শেষ! বাবার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় আমার দুঃখিনী মা আমাকে নিয়ে দীর্ঘ নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেছেন। স্কুলে থাকতে বিয়ে হয়েছিল। একমাত্র পুত্রকে বুকে নিয়ে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত থেকেছেন। ছেলেকে বুয়েটে পড়িয়েছেন। মনে পড়ছিল, আমার কলেজ শিক্ষয়িত্রী মা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় সেই দাউদকান্দির কর্মস্থল থেকে সে সময় দুষ্প্রাপ্য এক টিন কেরোসিন বাসে এবং রিকশায় করে ঢাকা শহরে বয়ে নিয়ে এসেছেন। রাজধানীতে তখন কেরোসিন দুষ্প্রাপ্য। রান্না করে ছেলের মুখে ভাত তুলে দেয়ার জন্যে একজন মহিলাকে অত দূর থেকে কেরোসিনের টিন ঘাড়ে করে আনতে হয়েছে। সেই একই নারী জীবন সায়াহ্নে এসে দেখছেন—তার পুত্র রাষ্ট্রের একমাত্র হর্তাকর্তা, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আক্রোশের লক্ষ্য হয়ে বিনা অপরাধে রিমান্ডে নির্যাতনের মুখোমুখি। অপরদিকে সর্বংসহা, নিঃসঙ্গ স্ত্রী জায়নামাজকে আশ্রয় করে দিন-রাতের অধিকাংশ সময় সেখানেই অশ্রুজলে ভাসছে। সদ্য তরুণী মেয়েটি বিত্তহীন স্বামীর হাত ধরে বিত্তবান পিতার বিপুল বিত্ত-বৈভব ছেড়ে সংসার সমুদ্রে কিস্তি ভাসিয়েছিল প্রায় আড়াই দশক আগে। আজ রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম শিকারে পরিণত সেই স্বামীকে আর কোনোদিন ফিরে না পাওয়ার আশঙ্কায় তার হৃদয়ভাঙা হাহাকারের তীব্রতা পাশে উপস্থিত না থেকেও যেন স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পারছি। শোকাতুর দুই প্রবীণা ও মধ্যবয়সিনী নারীকে আমি চোখ বুজলেই দেখতে পাচ্ছিলাম। পুলিশের বুটের আওয়াজ আর গারদের তালা খোলার শব্দে চোখ খুললাম। কোনো কথা না বলে এগিয়ে গেলাম প্রিজন ভ্যানের দিকে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা পাশ থেকে বললেন, প্রথম দিনের রিমান্ড কোতোয়ালি থানায়। আমার কাছে এই তথ্য একেবারেই অর্থহীন, অপ্রয়োজনীয়। জবাইয়ের পূর্বরাতে শিকারকে কোথায়, কেমন রাখল তা জেনে কী লাভ? ভ্যানের ভেতরে ঢুকতেই পেছনের দরজা সশব্দে বন্ধ করে তালা দিয়ে দু’জন অস্ত্রধারী পুলিশ অবস্থান নিল পাদানির সামনের একচিলতে জায়গায়। প্রিজন ভ্যানের ইঞ্জিন শব্দ করে জানান দিল, আসামির যাত্রা এবার রিমান্ড জীবনের অভিমুখে।

৬- রিমান্ডের বিভীষিকা

টয়লেটের জন্যে তো একচিলতে আধখোলা জায়গা। হাজতে আসামির সংখ্যা ততক্ষণে অন্তত পনেরোজন। কাজেই টয়লেটে যাওয়ার চেষ্টা বাদ দিয়ে যার যার কাপড়েই কাজ সারা হতে লাগল। এরপর বসে থাকা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নেয়াও নরকযন্ত্রণার সমতুল্য।...

কোতোয়ালি থানায় যখন পৌঁছলাম, সূর্য তখনও পুরোপুরি অস্ত যায়নি। সিএমএম আদালত থেকে স্বল্প দূরত্বের থানায় যাওয়ার পথে রিমান্ডের আসন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে চিন্তার পরিবর্তে পথ-ঘাট ঠাহর করতেই অধিকতর মনোযোগী ছিলাম। বাল্যকাল কেটেছে পুরনো ঢাকার গেণ্ডারিয়ায়। সে সময় নানার সঙ্গে প্রায়ই সদরঘাটের আড়ত থেকে ফল এবং পাটুয়াটুলির এক বোম্বাই মিষ্টান্নের দোকান থেকে অতীব সুস্বাদু মিষ্টি কিনতে আসতাম। প্রিজন ভ্যানের ভেতর থেকে মনে হলো, যেন বাল্যের সেই চেনা জায়গাগুলোই অতিক্রম করছি। কাছাকাছি মায়া নামে এক সিনেমা হলও ছিল। আমার নানা সিনেমা দেখা অপছন্দ করলেও নানীর শখ ছিল ষোলআনাই। অতি শৈশবে নানা ছাড়া পরিবারের আর সবাই একসঙ্গে মায়া হলে যে সিনেমা দেখতে এসেছিলাম, সেই স্মৃতিও এতদিন পর মনে এলো। ছবিটার নায়ক ছিলেন সম্ভবত দিলীপ কুমার। নস্টালজিয়ায় ডুব দিয়ে বেশিক্ষণ থাকা গেল না।
প্রিজন ভ্যান ততক্ষণে গন্তব্যে পৌঁছে থেমে গেছে। ভ্যানের তালা খোলা হলো। এক তরুণ পুলিশ কর্মকর্তা এগিয়ে এসে বললেন, তিনিই কোতোয়ালি থানার দায়ের করা মামলার আইও। যথেষ্ট সম্ভ্রমের সঙ্গে নিয়ে গেলেন থানার সেকেন্ড অফিসারের কক্ষে। চা এবং বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়িত হলাম। এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি চাইলে সেই অনুরোধও রক্ষিত হলো। একে একে সেকেন্ড অফিসার এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেই কক্ষে এসে যথেষ্ট সৌজন্যের সঙ্গে পরিচয়পর্ব সাঙ্গ করলেন। দু’জনারই দেশের বাড়ি কাকতালীয়ভাবে গোপালগঞ্জে। নাম যথাক্রমে আতাউর এবং সালাহ্উদ্দিন। রাতে কী খেতে চাই, তাও সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করা হলো। সকাল থেকে পেটে তেমন কিছু না পড়লেও আমি চা ছাড়া আর কিছু খেতে চাইলাম না। আমাকে ভরসা দিয়ে জানানো হলো, সেকেন্ড অফিসারের কক্ষেই রাতযাপন এবং পরদিন রিমান্ডের আনুষ্ঠানিকতা অন্তে যথাসময়ে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পুনরায় হাজির করানো হবে। মামলা যে লজ্জাকরভাবে বানোয়াট, সেটা যেহেতু উভয় পক্ষেরই জানা ছিল, কাজেই জিজ্ঞাসাবাদ নামক বিষয়টি এই প্রাথমিক আলোচনায় কোনো স্থানই পেল না।
ঘণ্টাখানিকের মধ্যেই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন দেখতে পেলাম। শুনলাম থানা কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট সদ্দিচ্ছা (?) সত্ত্বেও আমাকে সেকেন্ড অফিসারের কক্ষে আর রাখা যাচ্ছে না। উপরের নির্দেশে হাজতে তখনই স্থানান্তর করতে হবে। আমিও তথাস্তু বলে আইও’র পেছন পেছন কোতোয়ালি থানার হাজতে প্রবেশ করলাম। ক্যান্টনমেন্ট থানা এবং কোর্ট গারদে দেখা হাজতের তুলনায় সেলটি বেশ ছোট। তাতে অবশ্য আমার কিছু যায় আসে না। হাজতে ঢুকে দেখলাম, আমি তখন পর্যন্ত সেখানে একমাত্র আসামি। কাজেই ভাবলাম, একজন মানুষের জন্য এটিও প্রকাণ্ড সেল। এশার নামাজ হাজতে পড়লাম, মাগরিবের নামাজ আগেই সেকেন্ড অফিসারের অফিস ঘরে পড়ে নিয়েছিলাম। থানা প্রশাসনের প্রকৃত চরিত্র তখনও চেনা হয়ে ওঠেনি।
রাত আটটার পর থেকে পরিস্থিতি আরও পাল্টাতে শুরু করলো। হাজতে তিনজন নতুন আসামি ঢোকানো হলো। তাদের মধ্যে একজন ডাণ্ডাবেড়ি পরিহিত। সম্মানজনক দূরত্ব বজায় রেখেই তিনজন বসলো। খানিকটা ভড়কে গেলেও ভাবলাম, এদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে গল্প-গুজব করলেই বরং রাতটা ভালো কাটবে। ডাণ্ডাবেড়ি পরা ছেলেটিকেই নেতা মনে হলো। কথা প্রসঙ্গে জানলাম, তাকে ডাকাতি মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার করে একবার রিমান্ড পর্ব সাঙ্গ করা হয়েছে। এবার দ্বিতীয় দফা রিমান্ড। সপ্তাহখানেক আগের রিমান্ডের চিহ্ন ফোলা হাঁটু এবং দুই হাতের কনুইয়ে দৃশ্যমান। পরে অবশ্য থানার লোকজনই জানিয়েছিল সে নাকি রাজধানীর একজন দুর্ধর্ষ, পেশাদার খুনি। ক’দিন আগে পুরনো ঢাকায় এক পুলিশ কর্মকর্তা হত্যায় তাকেই সন্দেহ করা হচ্ছে। ওরকম রোগা-পটকা, তিরিশের ঘরে পা না দেয়া যুবককে দুর্ধর্ষ খুনি হিসেবে কল্পনা করা কঠিন। অবশ্য গুলি চালানোর জন্যে তো আর গামা পাহলোয়ান হওয়ার দরকার নেই।
সারা রাত ধরে এই ছেলেটি আমাকে ওই নারকীয় পরিবেশে যথাসম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য দেয়ার চেষ্টা করেছে। তবে সেই বর্ণনায় পরে আসছি। রাত দশটায় পুনরায় গারদের তালা খোলা হলো। এবার যে পাঁচজন আসামি টলতে টলতে ঢুকলো তাদের পরনে শতছিন্ন, নোংরা, দুর্গন্ধময় পোশাক। শরীরে হাড় ছাড়া আর কিছু নেই। অসংলগ্ন আচরণ করতে করতে প্রায় আমার ঘাড়ের ওপর বসে পড়লো তারা। গাঁজা, সিগারেট এবং অপরিচ্ছন্ন শরীরের দুর্গন্ধে নিমেষে হাজতের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। কথিত খুনি ছেলেটি দেখলাম এদের চেনে। ডাণ্ডাবেড়ি পরা অবস্থাতেই উঠে এসে ঠেলে, ধাক্কিয়ে আমার কাছ থেকে যতটা দূরে সম্ভব দলটিকে সরিয়ে দিল। তারপর হাসতে হাসতে জানালো, এরা সবাই হেরোইনসেবী। সদরঘাট, ইসলামপুর এলাকার দোকানের বারান্দা এদের নিবাস। ওদের পুলিশ কেন ধরে এনেছে, জিজ্ঞাসা করতেই সমস্বরে যা বললো তার মর্মার্থ উদ্ধার করা কঠিন। যতটুকু বুঝলাম, তাতে আমার সন্দেহ জন্মালো—আমাকে মানসিকভাবে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবেই এই মাদকাসক্তদের হাজতে আগমন। কাল সকালে হয় থানা থেকেই ছেড়ে দেবে অথবা তিন ধারায় চালান দিয়ে আদালতে কয়েকশ’ টাকা জরিমানা করা হবে। টাকাটা তাত্ক্ষণিকভাবে দিতে পারলে সিএমএম কোর্ট থেকেই মুক্তি, নইলে সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের জেলবাস। এর মধ্যেই রাতের আহার চলে এলো। একই থালার মধ্যে ভাত, ডাল এবং সবজি জাতীয় একটা কিছু। নেশাখোরদের ভাত খাওয়ার দৃশ্য দেখে অভিজ্ঞতার ঝুলি সমৃদ্ধ হলো। ডাল মেশানো ভাত মুখে, শরীরে, মেঝেতে সর্বত্র। কেউ কেউ খাচ্ছে এবং ঝিমুচ্ছে। চিবুতে ভুলে গেছে। একজন দেখলাম, খাওয়া অসমাপ্ত রেখে এঁটো হাতেই হাজতের টয়লেট ঘুরে এসে নির্বিকারভাবে আবার ভাতের থালায় হাত ডুবালো। নারকীয় দৃশ্য। আমার ভেতর থেকে সবকিছু উঠে আসতে চাচ্ছে। নেহাত উঠে আসার মতো পেটে কিছু ছিল না। ডাণ্ডাবেড়ির জন্যে বাসা থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে উন্নত খাদ্য এলো। ছেলেটি আমাকে অনুরোধ করলো তার খাওয়ায় ভাগ বসাতে। তার মা নাকি রান্না করে পাঠিয়েছে। খাব কী! আমি তখন প্রাণপণ চেষ্টায় বমি আটকাচ্ছি। পরবর্তী ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে দুই দফায় আরও পাঁচজনকে ঠেসে দেয়া হলো একই হাজতে।
কোনোক্রমে এক কোণে বসে আছি। এর মধ্যে মাদকাসক্তদের পেটে ভাত পড়ার প্রতিক্রিয়া শুরু হলো। টয়লেটের জন্যে তো একচিলতে আধখোলা জায়গা। হাজতে আসামির সংখ্যা ততক্ষণে অন্তত পনেরোজন। কাজেই টয়লেটে যাওয়ার চেষ্টা বাদ দিয়ে যার যার কাপড়েই কাজ সারা হতে লাগল। এরপর বসে থাকা তো দূরের কথা, দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস নেয়াও নরকযন্ত্রণার সমতুল্য। ডাণ্ডাবেড়ি আমার প্রাণান্তকর অবস্থা লক্ষ্য করছিল। হঠাত্ তার বোঁচকার মধ্য থেকে ভোজবাজির মতো আগরবাতির বাক্স এবং ম্যাচ বার হলো। ছেলেটি একটা আগরবাতি জ্বালিয়ে আমার একেবারে কাছে নিয়ে এলে কৃতজ্ঞতামাখা কেবল একটা হাসি প্রতিদান দিতে পেরেছিলাম। হাতের ঘড়িতে দেখলাম, রাত প্রায় দুটো। খানিক পর আইও এসে বলল, এবার আমার জিজ্ঞাসাবাদ হবে। আমার কাছে তখন ওই নরককুণ্ড থেকে বার হওয়াই জীবন ফিরে পাওয়ার শামিল। জিজ্ঞাসাবাদের নামে আমাকে শারীরিক নির্যাতন করা হবে কি-না, সেটা নিয়ে আর ভাবছি না। গন্তব্য সেই সেকেন্ড অফিসারের কক্ষ। আমার অসুবিধার জন্যে বারবার ক্ষমাপ্রার্থনা করে ভদ্রলোক চা খাওয়াতে চাইলেন। আমি ভাবলেশহীনভাবে চায়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শুরু করতে বললাম। আইও এবং সেকেন্ড অফিসার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়ে জানালো, তাদের কোনো জিজ্ঞাস্য নেই। আধঘণ্টাখানেক নির্বাক বসে থাকার পর আইও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে। এখন আবার হাজতে ফিরতে হবে। সেখানে ফিরে দেখি, আরও জনা দুই আসামি এসেছে, যারা সম্ভবত খানিক আগেই প্রচুর মদ্যপান করেছে। কারণ গাঁজা ও বিষ্ঠার গন্ধ ছাপিয়ে মদের গন্ধে হাজত ভরে গেছে। সেই সঙ্গে আমার বসার জায়গাটাও বেদখল। কী আর করা! কোনোরকমে ঠেলেঠুলে গারদের একেবারে দরজা ঘেঁষে একটুখানি দাঁড়ানোর স্থান মিললো। শিকের ফাঁক দিয়ে নাকটাকে বাইরে নিয়ে অক্সিজেন নেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলাম। সদ্য মৃতব্যক্তির শোকাতুর বাড়িতেও রাত পোহায়। কোতোয়ালি থানার হাজতের রাতও প্রকৃতির নিয়মে একসময় শেষ হলো। ঘড়ি দেখতে আর ইচ্ছে করছিল না। ধারণা করছি, সকাল আটটার মতো হবে। সেলের ওই জমাটবাঁধা দুর্গন্ধের মধ্যে আবার নাস্তার পাট শুরু হলো। সবাই নির্বিকারভাবে খেয়ে যাচ্ছে। একমাত্র ব্যতিক্রম আমি। সকালের সেন্ট্রি ইতস্তত করে একবার খাওয়ার কথা ওঠানোয় চশমার ভেতর দিয়ে চোখ তুলে তার দিকে তাকাতেই পিছিয়ে গেল। সকাল ন’টায় দু’জন করে আসামিকে হাজত থেকে বের করে উল্টোদিকের ঘরে নিয়ে শুরু হলো পেটানো। হাজতে বসেই লাঠির আওয়াজ আর বাবাগো, মাগো চিত্কার শুনতে থাকলাম। এক এক দলের বরাদ্দ পনেরো মিনিট। হাত-পায়ের কবজিতে রক্তের চিহ্ন নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরতে লাগল তারা। ফিরে এসে কান্নার ফাঁকে ফাঁকে পুলিশের বাবা-মাকে উদ্দেশ করে অশ্রাব্য গালাগাল। ঘণ্টা দুয়েক এই সার্কাস চললো।
আমি গারদের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। একসময় দূরে ডিউটি অফিসারের অফিসকক্ষে মনে হলো যেন আমার সহকর্মী সাংবাদিক নাছিরকে দেখলাম। নাছির আমাদের পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার। হয়তো আমি বেঁচে আছি কি-না, খবর নিতে এসেছে। দূর থেকে হলেও ওকে দেখে স্বজনকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি হলো। এর মধ্যেই আসামিদের নেয়ার জন্যে প্রথম দফা প্রিজন ভ্যান এসেছে। আসামিদের গারদ থেকে বের করে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে কোমরে দড়ি এবং হাতকড়া পরানো হচ্ছে। বুঝতে পারছিলাম না. আমাকেও ওই লাইনে দাঁড়াতে হবে কি-না। থানা প্রশাসন নির্বিকার, কিছুই জানাচ্ছে না। আমার আইও সেই যে রাতে ‘জিজ্ঞাসাবাদের’ পর গায়েব হয়েছে, তারপর থেকে দেখা নেই। হাজতের সামনে দিয়ে যাতায়াতরত অন্যান্য কর্মকর্তা এবং কনস্টেবলদের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, তারা আমারও কোমরে দড়ি পরানোর চূড়ান্ত নির্দেশের জন্যই অপেক্ষমাণ। কোর্টহাজত থেকে আগত এক নিম্নপদস্থ কর্মকর্তা আড়চোখে আমার দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেল। শেষ পর্যন্ত দুপুর একটার দিকে হারানো আইও এসে সংবাদ দিল আমাকে নেয়ার জন্যে প্রিজন ভ্যান এসেছে। ভ্যানে উঠতে যাচ্ছি, সেকেন্ড অফিসারসহ থানার অন্যান্য কর্মকর্তা আমার সামনে প্রায় হাতজোড় করে অন্তত এক গ্লাস পানি মুখে দেয়ার অনুরোধ করল। আত্মসংযম যথাসম্ভব বজায় রেখে গম্ভীরভাবে তাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিলাম। আমার মানসিক অবস্থা টের পেয়ে ওদেরই একজন অনুচ্চকণ্ঠে বলল, আমার ওপর ভয়ঙ্কর নির্যাতনের নির্দেশ ছিল। কোতোয়ালি থানা নাকি তাতে সম্মত হয়নি। মনে আছে, সে বলেছিল বারো দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই তার কথার সত্যতার প্রমাণ আমি পেয়ে যাব। সেই প্রমাণ পেতে আমাকে বারো ঘণ্টার অধিক সময় অপেক্ষা করতে হয়নি।
কোতোয়ালি থানা থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে না তুলে আমাকে সরাসরি কোর্ট গারদে নেয়া হলে হতাশ হলাম। আমি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে একরাতের রিমান্ডের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে চাচ্ছিলাম, যাতে জাতি এই ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বরূপ চিনতে পারে। কেবলই মনে হচ্ছিল, মহান আল্লাহ্র রহমত এবং দেশপ্রেমিক, বিবেকবান জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদ ছাড়া এই মৃত্যুগুহা থেকে আমি আর ফিরতে পারব না। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কোর্ট গারদে বসিয়ে রেখে আমাকে জানানো হলো, কোর্টে না তুলেই সরাসরি দ্বিতীয় রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে। প্রিজন ভ্যানের কাছে পৌঁছেই দেখি, ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম দাঁড়িয়ে আছে। সে শ্বাপদের মতো দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। চারদিকে দাঙ্গা পুলিশের মধ্যেই আমি আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার দাবি করলাম। কোনো কথা না বলে রূঢ় ভঙ্গিতে ইন্সপেক্টর রেজা প্রিজন ভ্যানে উঠতে ইশারা করল। বুঝলাম সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। প্রিজন ভ্যান স্টার্ট দেয়ার মুহূর্তে শুনতে পেলাম, কে যেন উচ্চস্বরে ডাকছে, মাহমুদ ভাই আপনি কোথায়? সর্বশক্তি জড়ো করে চিত্কার করে উঠলাম, আমি ভ্যানের ভেতরে। উঁচু লোহার গ্রিলের ফাঁকের মধ্য দিয়ে অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদারকে দেখতে পেয়ে ভরসা হলো, আমার অন্তিম বক্তব্য দেশবাসী তাহলে জানতে পারবে। ততক্ষণে মাসুদ ভাই আইও রেজার সঙ্গে বিষম তর্ক জুড়ে দিয়েছেন। তিনি আদালত থেকে আমার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি নিয়ে এসেছেন, অথচ আইও দেখা করতে দেবে না। পারলে মাসুদ তালুকদারকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে প্রিজন ভ্যান চালিয়ে দেয়। তর্কাতর্কি চলাকালেই আরেকজন জুনিয়র আইনজীবী আদালতের লিখিত নির্দেশনামা নিয়ে এলে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও রেজাউল করিম ভ্যানের তালা খুলে আমাকে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিল। অ্যাডভোকেট মাসুদকে সঙ্গে করে কোর্ট গারদে ফিরে গেলাম। আগের চব্বিশ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের নামে আমার সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে, তার বিশদ বর্ণনা দিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত সংবাদমাধ্যমকে জানানোর অনুরোধ করলাম। ততক্ষণে অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিঞাও আমাদের আলোচনায় যোগ দিয়েছেন। তারা পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করলেন। আমি তাদের আগাম বলে গেলাম পরবর্তী রিমান্ডে আমার প্রাণসংশয় রয়েছে। এক ধরনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তখন আমার মধ্যে কাজ করছিল। আইও’র অবয়বে একজন হত্যাকারীকে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার কিছু হলে বাড়ির লোকজনদের দেখার অনুরোধ করে দুই আইনজীবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পুনর্বার প্রিজন ভ্যানে উঠলাম। দু’জনই বিষণ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ইন্সপেক্টর রেজা আগে থেকেই প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছিল তার শিকারকে যথাস্থানে পৌঁছে দেয়ার জন্যে।
পুরনো ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে ভিআইপি রোড ধরে কারওয়ান বাজারে আমার দেশ কার্যালয় অতিক্রম করার সময় ভাবছিলাম, আর কি কোনোদিন সম্পাদকের অফিসে ফিরতে পারব? আমাদের পত্রিকা অফিসের একেবারে কাছেই তেজগাঁও থানা। ভ্যান থানা অতিক্রম করে এগিয়ে গেলে বুঝলাম, আমরা অন্য কোনো স্থানে চলেছি। এদিন ভ্যানের ভেতরে আমার সঙ্গে একজন অতিরিক্ত কনস্টেবল পাহারার জন্যে দেয়া হয়েছিল। একবার ভাবলাম, কোথায় যাচ্ছি ওকেই জিজ্ঞেস করি। পরক্ষণেই মনে হলো, দরিদ্র বেচারার চাকরি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়ে কী লাভ? গ্রেফতারের রাতের মতো জাহাঙ্গীর গেট পেরিয়ে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রিজন ভ্যান প্রবেশ করতেই নিশ্চিত হলাম, আমাকে ক্যান্টনমেন্ট থানাতেই নেয়া হচ্ছে। স্বজনদের এই সংবাদটি জানানোর জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠলেও আমি অসহায়, পিঞ্জরাবদ্ধ। এরই নাম বাংলাদেশে আইনের শাসন? যে থানা মামলা দায়ের করে, রিমান্ডে সেই থানাতেই জিজ্ঞাসাবাদ করা আইনত বাধ্যতামূলক হলেও আমাকে অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। গৃহে কোনো পুরুষ মানুষ নেই যে, ছোটাছুটি করে আমার সঠিক অবস্থান খুঁজে বার করবে। অসহায় শাশুড়ি ও পুত্রবধূ কাদের দ্বারে দ্বারে একটুখানি খবরের আশায় ছুটে বেড়িয়ে অপমানিত হবে, কে জানে? এই গণতন্ত্রের জন্যে তাহলে ১৯৭১ সালে আমরা রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধ করেছি, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছি! আকাশ-পাতাল ভাবনার মধ্যেই ক্যান্টনমেন্ট থানা চলে এলো।
আজকের ড্রাইভার রাস্তা চেনে। প্রথম রাতের মতো ভুল করে অন্য জায়গায় নিয়ে গাড়ি থামায়নি। পরিচিত থানায় প্রিজন ভ্যান থেকে নেমে সময়ক্ষেপণ না করে সোজা ডিউটি অফিসারের সামনে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। আমার পেছন পেছন আইও রেজা ঘরে ঢুকে, আরেকটি চেয়ার নিয়ে আমার পাশে বসেই ডিউটি অফিসারকে নানারকম নির্দেশ দিতে লাগল। বাসা থেকে একটা ছোট ব্যাগে আমার জন্য টুকিটাকি কিছু জিনিস পাঠানো হয়েছিল। এক সেট পরিষ্কার প্যান্ট-শার্ট, একটা লুঙ্গি, টুথ ব্রাশ, পেস্ট, সাবান, কিছু শুকনো খাবার ইত্যাদি। সেই ব্যাগটি ডিউটি অফিসারের হাতে দেয়ার পর অনুচ্চকণ্ঠে দু’জনার মধ্যে কিছু বাক্যবিনিময় হলো। আমার শোনার কোনো উত্সাহ ছিল না। তবে আমার দিকে ডিউটি অফিসারের চকিত, রহস্যময় চাহনি দেখে খানিকটা সচকিত হয়ে উঠলাম। কোতোয়ালি থানার অচেনা, তরুণ পুলিশ কর্মকর্তার আজ দুপুরের ভয়ঙ্কর নির্যাতনের আগাম সতর্কবার্তার কথা মনে পড়লো। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে পূর্বপরিচিত হাজতখানায় ঢুকলাম। বাসা থেকে পাঠানো ব্রাশ, পেস্ট এবং সাবান সঙ্গে নিতে দেয়া হলো না। বলা হলো, প্রয়োজন অনুযায়ী ডিউটি অফিসারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে ব্যবহার শেষে প্রতিবার ফেরত দিতে হবে। আমি যে ফ্যাসিবাদী প্রশাসনের একেবারে হাতের মুঠোয়, সেটাই অবমাননাকরভাবে বুঝিয়ে দেয়া আর কি! নোংরা টয়লেটের ওপর দাঁড়িয়ে বদনায় পানি ভরে গোসল করলাম। আগের রাতে হেরোইনসেবীদের সঙ্গে একই সেলে গাদাগাদি করে কাটিয়ে নিজেকে বড় ক্লেদাক্ত বোধ হচ্ছিল। ব্যবহার শেষে টুথ ব্রাশ, পেস্ট এবং সাবান ফেরত গেল ডিউটি অফিসারের কাছে। কাল সকালে আবার চাইতে হবে। রাত ন’টার দিকে থানা কর্তৃপক্ষ পরোটা, ডিমভাজি এবং লেবু দেয়া রং চা সরবরাহ করলে সামান্য ডিমভাজি দিয়ে অর্ধেক পরোটা এবং পুরো কাপ চা পেটে চালান করে রাতের আহার সাঙ্গ করলাম। প্রায় আটচল্লিশ ঘণ্টা উপোসের পর এই আহার। তারপর হাজতের নোংরা মেঝেতেই শুয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবতে লাগলাম।

৭- তিন আততায়ী বাংলাদেশের, না ভিনদেশের তাও কেউ জানে না

বিভীষিকার সেই কালো রাত
হঠাত্ করেই দু’দিক থেকে দু’জন আমার দু’হাত ধরে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে দিল। অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে বলল, ‘নিয়ে চল ব্যাটাকে জায়গা মতো। দেখি কত বড় বীর পুরুষ’। চোখ বাঁধা, তাই কোনদিকে ঠেলছে ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। জ্ঞান হারানোর আগে ক্রসফায়ারে নিয়ে যাচ্ছে এরকম কিছু একটা বোধহয় ভেবেছিলাম। ...

গত দু’রাত না ঘুমিয়েই কেটেছে। তার ওপর কোতোয়ালিতে সারা রাত ঠায় দাঁড়ানো। ক্যান্টনমেন্ট থানার নোংরা মেঝেতে শুয়ে ঘুমের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে এলেও ঘুমের দেখা নেই। মাঝে মাঝে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছি। পরক্ষণেই চমকে তন্দ্রা ছুটে যাচ্ছে। রাত বোধহয় তখন দেড়টা থেকে দুটোর মাঝামাঝি। গারদের তালা খোলার আওয়াজে চোখ মেলে তাকালাম। বাতি নেই, হয়তো বিদ্যুত্ চলে গেছে; তবে প্রকৃতির আলো আছে। সেই আলো-আঁধারিতে দেখলাম গারদের সামনে বেশ কয়েকটি ছায়া। একজনের হাতে বাক্সসদৃশ কিছু দেখতে পেলাম। পরে অবশ্য জেনেছিলাম, এই আগন্তুকরাই আমার সেলের তালা খোলার আগে থানার বাতি নিভিয়ে দিয়েছিল।
গারদের দরজা খুলে গেল। খর্বাকৃতি একটা অবয়ব আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমি ততক্ষণে উঠে বসেছি। লোকটি দ্রুত পায়ে এসেই আমার শার্টের কলার ধরে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে দিল। তাকে চিনে ফেললাম। আমার মামলার আইও ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্য একজন পেছন থেকে দ্রুত আমার চোখ বেঁধে ফেলেছে। রেজাউল করিম শার্টের বোতাম খুলে শরীর থেকে শার্টটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় ঘোর কেটে মাথা পরিষ্কার কাজ করছে। এরা আততায়ী, দেশের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারকের নির্দেশে আমাকে শেষ করে দিতে এসেছে। একবার ভাবলাম, চিত্কার করি। পরক্ষণেই মনে হলো, আমার সেই চিত্কার এই কাপুরুষদের আনন্দের খোরাকই কেবল জোগাবে। স্যাডিস্ট মহাপ্রভুর সামনে বসে রসিয়ে রসিয়ে আমার অন্তিম চিত্কারের গল্প বলে তার মনোরঞ্জন করবে। শুধু একবার মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করলাম। এর মধ্যে আমাকে একটা জ্যাকেট পরানো হয়েছে, সম্ভবত দু’হাত আটকে ফেলার জন্য। যন্ত্রের মতো কাজ চলছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। আমার কানের কাছে মধ্যরাতের আগন্তুকদের দ্রুত তালে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। আমাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো সেলের কোণের দিকে, সেখানে কেবলই দেয়াল, বাইরে থেকে দেখা যাবে না ভেতরে কী ঘটছে। নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আমাকে ঠেলে বসিয়ে দেয়া হলো। সামনে আমার দুই পা প্রসারিত, কাঁধের ওপর শক্ত দুটো হাত, পেছন থেকে পিঠ একজন তার হাঁটু দিয়ে চেপে রেখেছে। পরের ঘটনায় আবারও অবাক হলাম। কেউ দ্রুত আমার কোমরের বেল্ট খুলতে শুরু করেছে। প্যান্ট খুলে ফেলা হলো। কী করতে যাচ্ছে এরা? এত ঝামেলার প্রয়োজন কী? মাথার পাশে পিস্তলের নল ঠেকিয়ে একবার গুলি করলেই তো যথেষ্ট। এক-এগারোর নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় শুনেছি বর্তমান ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারও নাকি লোকজনকে ধরে এনে হরেকরকম নির্যাতনের মধ্যে শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে ইলেকট্রিক শক দেয়। আমাকেও কি তেমন কিছু করতে যাচ্ছে? নইলে প্যান্ট খুলছে কেন? সঙ্গে আনা বাক্সের মধ্যে অত্যাচারের কোন ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে তাও জানা নেই। প্যান্ট খুললেও অন্তর্বাস অবশ্য যথাস্থানেই রইল। হঠাত্ করেই দু’দিক থেকে দু’জন আমার দু’হাত ধরে এক ঝটকায় দাঁড় করিয়ে দিল। অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে বলল, ‘নিয়ে চল ব্যাটাকে জায়গামত। দেখি কত বড় বীরপুরুষ।’ চোখ বাঁধা, তাই কোনদিকে ঠেলছে ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। জ্ঞান হারানোর আগে ক্রসফায়ারে নিয়ে যাচ্ছে এরকম কিছু একটা বোধহয় ভেবেছিলাম। দু’দিনেরও অধিক সময় ধরে অনাহারক্লিষ্ট, নির্ঘুম, দুর্বল শরীর আর সইতে পারল না। দুই আততায়ীর শক্ত মুঠোর মধ্য দিয়েই আমার উভয় হাত পিছলে বার হয়ে এলো।
আমি শূন্যে ভাসতে লাগলাম। কোনো কষ্ট নেই, যাতনা নেই, কেবল অনাবিল প্রশান্তি। তারপর সব অন্ধকার। জ্ঞান যখন ফিরল—আমি থানার ডিউটি অফিসারের মেঝেতে শুয়ে আছি, সর্বাঙ্গ ভেজা। সম্ভবত জ্ঞান ফেরানোর জন্য পানি ঢালা হয়েছে। পাশ ফিরতে গিয়ে কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভব করলাম। তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে দেখলাম প্যান্ট যথাস্থানে আছে। তবে বেল্ট উল্টো করে বাঁধা। আততায়ীরা আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় প্যান্ট পরানোর সময় বেল্ট উল্টো হয়ে গেছে। আমার অস্ফুট, বেদনার্ত আওয়াজ শুনে ডিউটি অফিসার ছুটে এসে বলল, স্যার আপনি ভালো আছেন, কোনো চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাকে পাহারা দিচ্ছি। আমার তখন টয়লেটে যাওয়া দরকার, অথচ উঠতে পারছি না। দু’জন সেন্ট্রির কাঁধে ভর দিয়ে টয়লেটে গেলাম। সেখান থেকে ফিরে ডিউটি অফিসারকে অনুরোধ করলাম আমাকে হাজতে ফেরত পাঠাতে। ফজরের আজান শুনে তখনও জীবিত থাকার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অতি কষ্টে বসে ইশারায় নামাজ পড়লাম।
সকাল সাতটা না বাজতেই ক্যান্টনমেন্ট থানার কর্মকর্তা, কনস্টেবল দল বেঁধে এসে আমাকে সহানুভূতি জানিয়ে গেলেন। রাতের হত্যা প্রচেষ্টার ঘটনা পুরো থানায় জানাজানি হয়ে গেছে। ওদের কাছ থেকেই টুকরো টুকরো যে খবর পেলাম, সেগুলো জোড়া দিয়ে গতরাতে কী ঘটেছিল সেই চিত্রটি দিনভর সাজালাম। সেটাই আমার মতো করে বিবৃত করছি। রাত একটার পর একটি সিভিল গাড়িতে পাঁচজনের একটি দল ক্যান্টনমেন্ট থানায় প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা ছিল, যার একজনকে আমি চিনতে পেরেছি। অন্য কর্মকর্তার নাম জিজ্ঞাসা করে জবাব পেলাম না। সবাই এড়িয়ে গেল। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বাকি তিনজনকে থানার কেউ চিনতে পারেনি। কনস্টেবল, কর্মকর্তারা একবাক্যে বলল, ওই তিনজন পুলিশ বাহিনীর কেউ নয়। তাহলে তারা কারা? তিন আততায়ী বাংলাদেশের, না ভিনদেশের তাও কেউ জানে না। দলটি এসেই কর্তব্যরত এএসআই’র কাছ থেকে আমার সেলের চাবি নিয়ে থানার বাতি নিভিয়ে দেয়। সেলে ঢোকার সময় থানার কাউকে কাছে-পিঠে থাকতে দেয়নি। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলে এরা খানিকটা আতঙ্কিত হয়ে থানার লোকজনদের ডেকে নিয়ে আসে। তারা বাতি জ্বালিয়ে দেখতে পায়, আমি সেলের কোণে অর্ধ উলঙ্গ নিথর পড়ে আছি। কর্তব্যরত কর্মকর্তা এবং সিপাহীরা মিলে আমাকে কাঁধে করে সেল থেকে ডিউটি অফিসারের কক্ষে নিয়ে ফ্যানের নিচে মেঝেতে শুইয়ে দেয়। তারপর চোখে-মুখে পানির ছিটা, পায়ের তালুতে সর্ষের তেল ঘষা, মাথায় পানি দেয়া ইত্যাদি অন্তে প্রায় দুই ঘণ্টা পর আমার জ্ঞান ফেরে। এই সময়ের মধ্যে আততায়ী বাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থানা ত্যাগ করে। সর্বপ্রথমে তিন অচেনা ব্যক্তি এবং সর্বশেষ আইও রেজাউল করিম থানা ছেড়ে যায়। এমনই কিছু একটা ঘটার আশঙ্কা আগে থেকে থাকলেও একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সরকারের এই বিশেষ খুনে বাহিনী কাজটা অসমাপ্ত রেখে গেল কেন? তাহলে কি আজ রাতে অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে ফিরে আসবে? যে কোনো উপায়ে আত্মীয়-স্বজনদের কাউকে এই হত্যা প্রচেষ্টার সংবাদ দ্রুত জানানো দরকার। নইলে রিমান্ডের বাকি দুই দিনের মধ্যেই কোনো এক ঝোপ-জঙ্গলে আমার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়ে থাকার সমূহ আশঙ্কা। পুরো থানায় পরিচিত কেউ নেই। আমার অসহায় অবস্থায় প্রশাসনের কাউকে বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না। জানি না কী বুঝে সিদ্ধান্ত নিলাম অনাহারে থাকব। মনে হলো, আততায়ীর বুলেটে অথবা নির্যাতনে প্রাণত্যাগ করার চাইতে অতিরিক্ত দৌর্বল্যে হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়াই উত্তম। আজন্ম আমার রক্তচাপ বেশ কমের দিকে। সুতরাং রক্তচাপ আরও খানিকটা কমলেই হয়তো সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন সহজতর এবং দ্রুততর হবে। থানার প্রতিটি কর্মকর্তা সারাদিন ধরে অনুরোধ করেও আমাকে কিছু খেতে সম্মত করাতে পারল না।
বিকেলের শিফটে দায়িত্বরত ডিউটি অফিসার গারদের তালা খুলে আমাকে তার কক্ষে ফ্যানের নিচে বসে কিছুটা সময় অন্তত আরাম করার অনুরোধ করল। এই দু’দিনে মশার কামড়ে আমার সমস্ত শরীর ফুলে গেছে; ঘামে ভিজতে ভিজতে সর্বাঙ্গ চটচটে, দুর্গন্ধময়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছেলেটির সঙ্গে গেলাম। সেখানে গিয়ে মনে হলো, না আসাটাই ঠিক ছিল। আইও রেজা ডিউটি অফিসারের কক্ষে আগে থেকেই অপেক্ষমাণ। তাকে সেখানে দেখে গত রাতের কথা মনে করে অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করলাম। লোকটি খেজুরের একটি বাক্স আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে খেতে অনুরোধ করল। খেজুর আমি বেশ পছন্দ করেই খাই। বাক্সটি দেখেই বুঝলাম, এটা আমারই বাসা থেকে এসেছে। দাঁতে দাঁত চেপে ভেতর থেকে প্রবল হয়ে উঠে আসা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ক্রোধ সংবরণ করলাম। কোনো কথা না বলে সম্ভাব্য হত্যাকারীর হাত থেকেই একটা খেজুর নিয়ে মুখে দিতেই বমনেচ্ছা প্রবল হয়ে উঠল। লোকটি আমার চেহারার রং পরিবর্তন লক্ষ্য করে তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা পানি আনতে নির্দেশ দিল। একজন সেন্ট্রি ছুটে গিয়ে এক গ্লাস ফ্রিজে ঠাণ্ডা করা পানি নিয়ে এলে পুরোটাই খেলাম। ওখানে বসে থাকা আমার অসহ্য বোধ হতে লাগল। সেই মানসিক নির্যাতনের তীব্রতা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কাউকে বোঝানো কঠিন। ডিউটি অফিসার এবং ইন্সপেক্টর রেজার বাধা উপেক্ষা করে গারদে ফিরে এলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মন শক্ত করে রাতের আসন্ন আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। আমার সেলে যাদের ডিউটি ছিল সেসব সিপাহী তো বটেই, থানার অন্য সেন্ট্রিরাও কিছুক্ষণ পরপর আমাকে ভরসা দিয়ে যাচ্ছিল। তারা দৃঢ়কণ্ঠে বলছিল, আজ রাতে আপনার ওপর যে কোনো আঘাত আমরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করব। তাতে লড়াই বাধলেও পিছিয়ে যাব না। ওদের কথা শুনে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, আমি তাহলে নিঃসঙ্গ নই। সত্যের পক্ষে সিনা টান করে দাঁড়ানোর মতো সৈনিক এখনও এই দেশে আছে। মন প্রশান্ত হয়ে গেল। জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম একদিন ইনশাআল্লাহ, শুরু হবে। সেই মহান সংগ্রামে আমার মতো তুচ্ছাতিতুচ্ছ ব্যক্তির আগাম মৃত্যু যত্সামান্য ত্যাগ স্বীকার মাত্র। মহান মুক্তিযুদ্ধে যে লাখ লাখ তরুণ আত্মদান করেছেন, তাদের ক’জনকেই বা আমরা চিনি। কিন্তু, এই আত্মত্যাগের ফলেই পাকিস্তানি স্বৈরশাসন থেকে আমরা মুক্তিলাভ করেছি। সাম্রাজ্যবাদের দোসর, বাংলাদেশী ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠী চার দশক পর দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দিতে উদ্যত হয়েছে। সেই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আজ অকাতরে প্রাণ দেয়ার সময় এসেছে। অতএব, আল্লাহ ভরসা।
রাত বারোটার ঘণ্টা বেজেছে বেশ খানিক আগে। একাধিক বুটের শব্দ শুনলাম। গারদের সামনে আইও রেজাউল করিম, পাশে ক্যান্টনমেন্ট থানার ডিউটি অফিসার আহসান হাবিব। থানার বাতি জ্বালানোই রয়েছে। বলা হলো, আমার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হচ্ছে। আইও একটি কালো কাপড় বের করে রূঢ়ভাবে জানাল, আমার চোখ বাঁধা হবে। এর হেতু জিজ্ঞাসা করতেই শুনলাম, এটাই নাকি আইন। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু না হতেই আরও একজনের বুটের আওয়াজ শুনতে পেলাম। সেই আওয়াজ সেলে ঢুকে আমার চারপাশে পায়চারি করছে। তৃতীয় ব্যক্তির পরিচয় আমার কাছে গোপন রাখা হলো। আধ ঘণ্টাখানেক ধরে জিজ্ঞাসাবাদের তামাসা চলছে। ঘুরে-ফিরে একই প্রশ্ন। গ্রেফতারের রাতে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকদের মধ্যে কারা কারা আমার দেশ কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের আমি ডেকে এনেছিলাম কি-না? হঠাত্ একজন সেন্ট্রি ছুটে এসে খবর দিল, অ্যাডভোকেট মাসুদ তালুকদার আমার খোঁজে থানায় এসেছেন। উত্তেজনা চাপতে না পেরে উচ্চকণ্ঠেই বলে উঠলাম, তিনি আমার আইনজীবী। জিজ্ঞাসাবাদ থেমে গেল। মিনিট পাঁচেক পর চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হলো। তারপর সব চুপচাপ। খানিক বাদে এক সেন্ট্রি এসে চুপি চুপি বলে গেল, আমার স্ত্রীও নাকি এসেছে। আমি অস্থির হয়ে উঠলাম। কোনো ভদ্র পরিবারের মহিলাদের আসার স্থান থানা নয়। তার ওপর রাত তখন প্রায় দুটো। অপর একজন খবর দিল, মাসুদ তালুকদার ছাড়াও অন্যান্য ব্যারিস্টার এবং জাতীয়তাবাদী দলের সংসদ সদস্যরাও আমার খোঁজে এসেছেন। মনে হলো, আল্লাহ তাঁর রহমতের ভাণ্ডার আমার জন্য উজাড় করে দিয়েছেন। তিনিই আমার একমাত্র নিরাপত্তাদাতা। ভোর চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে আছি। জিজ্ঞাসাবাদের খবর নেই। শেষ পর্যন্ত আহসান হাবিব এসে জানালেন, আমি এবার ঘুমাতে পারি। আজ রাতের মতো জিজ্ঞাসাবাদে ইতি। আর খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতেই ফজরের নামাজের ওয়াক্ত হলো। নামাজ শেষ করে ঘুমিয়ে যখন জেগে উঠলাম, তখন সকাল প্রায় আটটা। সারাদিন আর কেউ এলো না। পাহারারত সেন্ট্রির সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করে আর খানিক পরপর রঙ চা খেয়ে সময় কাটালাম। সন্ধ্যা সাতটায় আরেক দফা জিজ্ঞাসাবাদের কথা জানানো হলো। তবে জিজ্ঞাসাবাদ সেলে হবে না। ভিন্ন স্থানে যেতে হবে। ডিউটি অফিসারের কক্ষে পৌঁছে যথারীতি রেজাউল করিমকে দেখতে পেলাম। তার ইচ্ছেতেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার চমত্কার অফিসে যাওয়া হলো। তৃতীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদে যোগ দিল। তরুণটি ইন্সপেক্টর রেজাউল করিমের জুনিয়র। আবারও সেই একঘেয়ে প্রশ্ন। আজ কিন্তু আমার চোখ বাঁধা হলো না। পূর্বরাতে আমাকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ পুলিশের আইনই হচ্ছে চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করা। আজকে এই আইন ভঙ্গ করায় ইন্সপেক্টর রেজার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কি-না, নির্দোষভাবে জানতে চাইলে সে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। এসব ক্ষেত্রে আমারও চোখ নামানোর অভ্যাস নেই। রেজাউল করিমের চোখের ভাষায় আমি যেন পড়ছিলাম, তেল তাহলে এখনও পুরোটা যায়নি। জুনিয়রের সামনে আমার বেমক্কা প্রশ্নে দৃশ্যত অপমানিত আইও জিজ্ঞাসাবাদে সমাপ্তি টেনে আমাকে হাজতে নিয়ে যেতে বলল। আমিও কোনো সেন্ট্রির জন্য অপেক্ষা না করে ওসি’র ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা হাজতে চলে গেলাম। এই তিন দিনে থানার পথ-ঘাট মোটামুটি চেনা হয়ে গেছে। তেজগাঁও থানার দায়ের করা মামলার রিমান্ডের সর্বশেষ রাতে উল্লেখযোগ্য আর কিছু ঘটলো না। তবে সেন্ট্রির মাধ্যমে খবর পেলাম সংসদ সদস্য পাপিয়া, রুনু, আইনজীবী মুন্সি কবির আমার কুশল জানতে থানায় এসেছিলেন। এদের ঋণ শোধ করা আমার সাধ্যাতীত।
বারই জুন দুপুর একটায় প্রিজন ভ্যান আমাকে আদালতে নেয়ার জন্যে এলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভ্যানে উঠলাম। যাওয়ার সময় অবশ্য ধারণা করছিলাম, আদালতের আনুষ্ঠানিকতা শেষে এখানেই বোধহয় ফিরে আসছি। আরও দুই মামলার রিমান্ড সমাপ্ত হতে তখনও আট দিন বাকি রয়েছে। তাছাড়া এই মামলাতেই সরকার পুনরায় রিমান্ডও চাইতে পারে। ঘণ্টাখানেকের পথ পাড়ি দিয়ে সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। ম্যাজিস্ট্রেট একজন তরুণী। অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিঞাকে আগেই বলে রেখেছিলাম, নির্যাতনের ঘটনা আমি নিজমুখে বর্ণনা করতে চাই। তিনি কথামত শুনানির শুরুতেই আদালতের অনুমতি নিয়ে রাখলেন। সরকারপক্ষ যথাসম্ভব বাধা দিলেও ফল হলো না। ম্যাজিস্ট্রেট সম্ভবত আমার বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে করুণাবশত কাঠগড়ায় বসার জন্য একটা চেয়ার দেয়ারও নির্দেশ দিলেন। ক্যান্টনমেন্ট থানায় রাতের তৃতীয় প্রহরের সেই লোমহর্ষক ঘটনা যতটা সম্ভব নিরাসক্তভাবে বর্ণনা করলাম। ম্যাজিস্ট্রেট প্রায় কন্যাসম হওয়ায় পরনের কাপড় খোলার বর্ণনা দেয়ার সময় বিব্রত বোধ করছিলাম। ম্যাজিস্ট্রেটকে সে কথাটা আমি বললামও। আমি বলে যাচ্ছি। আদালতে পিনপতন নিস্তব্ধতা, কারও চোখে পানি। আওয়ামী লীগ যে চরিত্রগতভাবে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দল, সে বিষয়টি এদেশের জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন জনগণ মোটামুটি জানে। এমনকি আওয়ামী লীগাররাও জানে। তবে তারা বিষয়টি লজ্জাস্কর বিবেচনা না করে বরং একপ্রকার অহঙ্কার বোধ করে। সেই ফ্যাসিবাদী দলটি মার্কিন-ভারতের অন্ধ সমর্থনে এবার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশকে ‘আইয়ামে জাহেলিয়াতে’ পরিণত করেছে। আমার বক্তব্য শেষ হতেই সরকারি আইনজীবী তারস্বরে চিত্কার করে বলতে লাগলেন, এগুলো সব বানানো। আমি নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগ করছি। যে রাষ্ট্রে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দৈনন্দিন বিষয়ে পরিণত হয়েছে, সেখানে আমার ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় শুরু হবে এমন অলীক স্বপ্ন দেখার মতো নির্বোধ আমি নই। তবে আশা করেছিলাম, এই ঘটনা সংবাদকর্মীদের বিবেক অন্তত জাগ্রত করবে। নির্যাতন ও মানবাধিকার প্রশ্নে সব সংবাদকর্মী রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একটি নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করবেন। আমার সেই আশাটি অবশ্য পূরণ হয়নি। তবে সাধারণ জনগণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন, সেই সত্য আমাকে আশান্বিত করছে। ব্যক্তিগত মান-অপমানকে উপেক্ষা করে আদালতে নির্যাতনের কাহিনী বিশদভাবে বর্ণনার উদ্দেশ্যই ছিল এদেশের লড়াকু জনগণকে আরও সচেতন করে তোলা। তেজগাঁও থানার মামলায় সরকারপক্ষ নতুন করে আর রিমান্ড চাইল না। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে পরবর্তী রিমান্ডে যাত্রার আগে স্বল্প সময় বিরতির জন্যে আমাকে কোর্ট গারদে পাঠানো হলো। সেখানে আদালতের অনুমতি নিয়ে আমার আইনজীবীরা দেখা করতে এলেন। পারভীন খিচুড়ি রান্না করে পাঠিয়েছে। গারদের নোংরা পরিবেশে খাওয়ার রুচি না হলেও জায়া ও জননীর খানিকটা মানসিক শান্তির জন্যে জোর করে হলেও কয়েক চামচ খিচুড়ি গলাধঃকরণ করলাম। সেদিনই প্রথম শুনলাম, রিমান্ডে আমার ওপর অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় পারভীন শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। রক্তচাপ ২০০ এবং ১৩৫। যে কোনো সময় হার্ট অ্যাটাক অথবা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা রয়েছে। পঁচিশ বছরের সংসারজীবনে ওকে অনেক প্রতিকূল অবস্থা সামলাতে দেখেছি। এমনভাবে ভেঙে পড়েনি কখনও। আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা তাকে সব সময় শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে। এক-এগারোর পর মইনের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডকে কলমের অস্ত্রে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সময় থেকেই আমার গ্রেফতারের আশঙ্কা নিয়ে আমাদের মধ্যে বহুবার কথা হয়েছে। জেলে যাওয়ার সার্বক্ষণিক প্রস্তুতিস্বরূপ একটি ব্যাগের মধ্যে আমার প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য টুকিটাকি জিনিসপত্র পারভীন নিজ হাতে গুছিয়ে রেখেছে সেই ২০০৭ সাল থেকেই। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়ায় দেশে-বিদেশে আওয়ামী পেটোয়া বাহিনীর আক্রমণ এবং সরকারের একটার পর একটা মামলা দায়েরেও সে কখনও বিচলিত হয়নি। স্ত্রী হিসেবে স্বাভাবিকভাবে উদ্বিগ্ন হলেও সাহস হারায়নি একদিনের জন্যেও। আজ তারই অসুস্থতার সংবাদে বড় বিষণ্ন হয়ে পড়লাম। সানাউল্লাহ ভাই, মাসুদ ভাই এবং অন্যান্য আইনজীবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তৃতীয় দফা রিমান্ডের মুখোমুখি হতে অপেক্ষমাণ প্রিজন ভ্যানে প্রবেশ করলাম। তখন চোখ আমার শুষ্ক; কিন্তু হৃদয়ে অবিরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

৮- মরতেই যদি হয়, তাহলে অন্তত আততায়ীর চেহারা দেখে চিরতরে চোখ বন্ধ করতে চাই

গন্তব্য মিন্টো রোডের ডিবি অফিস
ক্যান্টনমেন্ট থানার বিশেষ রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পর থেকে রাতে ঘুমানো ছেড়ে দিয়েছি। এদের হাতে মরতেই যদি হয়, তাহলে অন্তত আততায়ীর চেহারা দেখে চিরতরে চোখ বন্ধ করতে চাই। নয় দিনের রিমান্ডে সাত কেজি ওজন কমে গেছে। দুই হাতের চামড়া টানলেই সাপের খোলস ছাড়ানোর মতো করে উঠে যাচ্ছে। তবু জেলে এসে রিমান্ডের ডাকের অপেক্ষা করতে লাগলাম ...

প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় জানলাম, আমরা ক্যান্টনমেন্ট থানায় যাচ্ছি না। এবারের গন্তব্য মিন্টো রোডের ডিবি অফিস। শেখ হাসিনার আগের পাঁচ বছরের শাসনকালে সেখানেই রুবেল নামে সিদ্ধেশ্বরী এলাকার এক নিরপরাধ কলেজছাত্রকে স্থানীয় মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীর মিথ্যা অভিযোগের প্রেক্ষিতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। পুলিশেরই সোর্স জালালকে খুন করে তার মৃতদেহ ডিবি অফিসের ছাদের পানির ট্যাংকের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছিল। জালাল হত্যার বিচার নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক টালবাহানা করার অভিযোগে তত্কালীন পিপি অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছিল হাইকোর্ট। প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের প্রেক্ষিতে বিচারপতি এস কে সিনহা এক সুয়ো মোটো (ঝঁড় সড়ঃড়) রায়ে এই অব্যাহতি প্রদান করেছিলেন। কর্তব্যকাজে গাফিলতির জন্যে অব্যাহতিপ্রাপ্ত সেই পিপি অবশ্য ভাগ্যগুণে আজ বাংলাদেশের আইন প্রতিমন্ত্রী। ক্যান্টনমেন্ট থানায় আমার ওপর যে হত্যা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, তারই হয়তো চূড়ান্ত রূপ দেয়া হবে ডিবি’র চারদিনের রিমান্ডে। সিএমএম আদালত থেকে মিন্টো রোডের দূরত্ব বেশি নয়। সাত-পাঁচ ভাবনার মাঝখানেই প্রিজন ভ্যান ডিবি অফিসের গেট দিয়ে প্রবেশ করল। কবজি উল্টে দেখি সন্ধ্যা ছ’টা পার হয়েছে।
জীবনে প্রথমবারের মতো ডিবি অফিসে এসে দেখলাম, যথেষ্ট পুরনো এক দ্বিতল ভবন। আমাকে নিচতলার এক হাজতে নিয়ে যাওয়া হলো। হাজতের সামনেটা অফিস। তিন-চারটে চেয়ার-টেবিল পাতা রয়েছে। সেখানে সবাই কাজ করছেন। পাশে একটা লম্বা বেঞ্চও রয়েছে। সম্ভবত আসামিদের খোঁজে আগত আত্মীয়-স্বজনরা সেখান বসে অপেক্ষা করেন। আমার সঙ্গে কাঁধে ঝোলানো যায় এমন একটা ছোট সাদা ব্যাগ। ব্যাগটি ডিউটি অফিসার গ্রহণ করলেন। স্যান্ডেল খুলে খালি পায়ে আমাকে হাজতে প্রবেশ করতে হলো। এর উদ্দেশ্য হাজতের মেঝে অপরিষ্কার হওয়া থেকে রক্ষা করা হতে পারে। তবে আমার কাছে মনে হলো, ব্যাপারটি প্রচ্ছন্ন অপমানের মাধ্যমে মানসিকভাবে দুর্বল করার কৌশল। এখানে সৌভাগ্যবশত আমাকে অন্তত টুথ ব্রাশ, পেস্ট এবং সাবান সঙ্গে রাখার অনুমতি দেয়া হলো। হাজতটি আকারে ছোট হলেও একজন আসামির জন্যে যথেষ্ট। ক্যান্টনমেন্ট থানা হাজতের মতোই সেলের এক কোণে ধূলি ধূসরিত কম্বলের স্তূপ পড়ে আছে। আমি মাটিতে বসে পড়ে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে তীব্র সোঁদা গন্ধযুক্ত দুটো অতিরিক্ত কম্বল আমাকে দিয়ে বলা হলো, একটি বিছানা এবং অপরটি বালিশরূপে ব্যবহার করতে হবে। নির্দেশমত মেঝেতে কম্বল বিছিয়ে তার ওপর বসলাম। ঘরের কোণের ময়লা কম্বলের স্তূপ যথাস্থানে অব্যবহৃত পড়ে রইলো। টয়লেটে যাওয়ার জন্যে উঠলাম। সেলের লাগোয়া টয়লেট। আব্রু রক্ষার ব্যবস্থা ক্যান্টনমেন্ট থানার তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও টয়লেটের ভেতরের অবস্থা ভয়াবহ। মেঝে এবং প্যান সম্ভবত নির্মাণের পর থেকে কোনোদিন পরিষ্কার করা হয়নি। ময়লা জমে জমে ঘোর কৃষ্ণবর্ণ।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গণ-টয়লেটের মতোই প্যানের ওপর ময়লা ভাসছে। টয়লেটের ভেতরে কোনো আলোর ব্যবস্থা না থাকায় এবং মেঝে ভয়াবহ রকম পিচ্ছিল হওয়ায় যে কোনো সময় পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙার আশঙ্কা প্রবল। এক কোণে পানির কল এবং টয়লেটের তাবত্ কর্ম সম্পাদনের জন্যে একটিমাত্র বদনা। কলে পানি আছে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। যে কাজে ঢুকেছিলাম, সেটি সম্পন্ন না করেই বার হয়ে এসে ডিউটি অফিসারকে প্যানের ময়লা যাতে পানি ঢাললে যায় অন্তত সেই ব্যবস্থাটুকু করবার অনুরোধ করলাম। জবাব পেলাম, পরেরদিন ঝাড়ুদার না আসা পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হবে না। একটি রাত ওই পরিবেশেই আমাকে মানিয়ে নিতে হবে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই বিবেচনা করে সোঁদা কম্বলের আশ্রয়ে ফিরে গেলাম। জুনের প্রচণ্ড গরমে দরদর করে ঘামছি। খানিক বাদে আমার সেলের বাইরে মিউজিয়ামে যাওয়ার উপযুক্ত একটা পেডেস্টাল ফ্যান কোথা থেকে আনা হলো। অনেক কসরত্ করে সেটা আমার দিকে তাক করে চালিয়ে দেয়া হলে গারদের ফাঁক দিয়ে কিছুটা বাতাস সেলের ভেতরে প্রবাহিত হলে কৃতজ্ঞবোধ করলাম। ক্যান্টনমেন্ট থানায় তিনদিনে আমার শরীর থেকে যে পরিমাণ ঘাম ঝরেছে, তাতে কিডনির বারোটা বেজে যাওয়ার কথা। মশাও মনে হলো ক্যান্টনমেন্টের তুলনায় অনেক কম। ওখানে তিনদিনের অবস্থানে মশার কামড় এবং ঘামাচিতে আমার সর্বাঙ্গ ছেয়ে গেছে।
ঘণ্টাদুয়েক পর ডিবি’র কয়েকজন কর্মকর্তা এসে জানালেন, ওই রাতে আমার কোনো জিজ্ঞাসাবাদ হবে না। আমি বিশ্রাম নিতে পারি। কর্মকর্তাদের মধ্যে একজনকে চিনতে পারলাম। গ্রেফতারের রাতে শত শত পুলিশের মধ্যে তিনিও ছিলেন। তাকে বিশেষভাবে মনে রাখার কারণটি হলো, গ্রেফতারের মুহূর্তে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, আমার হাত ধরেন স্যার, আপনার নিরাপত্তা আমি দেব। আমি জবাব দিয়েছিলাম, আপনি মনুষ্যমাত্র, আমি নিরাপত্তার জন্যে আল্লাহ ছাড়া আর কারও ওপর নির্ভর করি না। যাই হোক, তরুণটির নাম জানলাম। তিনি এডিসি নজরুল। রাতের আহারের প্রসঙ্গ উঠলে এক কাপ চা খেতে চাইলাম। বাসা থেকে পাঠানো ঝোলা ব্যাগের ভেতর থেকে এক প্যাকেট বিস্কুট বার করলাম। সেই বিস্কুটের প্যাকেটটি সঙ্গে রাখার অনুমতি চাইলে আবেদন মঞ্জুর হলো। ক্যান্টনমেন্ট থানায় বিশেষ রাতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পর থেকে রাতে ঘুমানো ছেড়ে দিয়েছি। এদের হাতে মরতেই যদি হয়, তাহলে অন্তত আততায়ীর চেহারা দেখে তারপর চিরতরে চোখ বন্ধ করতে চাই। ডিবি’র সেলের চতুর্দিকে নানান কিসিমের ক্যামেরা লাগানো রয়েছে। ডিউটি অফিসারদের সঙ্গে বাক্যালাপ বিপজ্জনক। বিপদটা আসামির নয়, সেটি পুলিশ কর্মকর্তার। ওপরআলাদের কোনো রকম সন্দেহ হলেই নিদেনপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি। গুরুতর কিছু ঘটলে চাকরিটাও যাবে। নিম্নস্তরের পুলিশ কর্মকর্তারা আমাদের সিস্টেমে সবচেয়ে অসহায় শ্রেণী। দ্বিতীয় কম্বলটা ভাঁজ করে মাথার নিচে দিয়ে ফজরের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। ঘুম তাড়ানোর জন্যে কম্বলের গন্ধই যথেষ্ট। রাত তিনটায় কম্বলশয্যা ত্যাগ করলাম।
সেলের বাইরে রাতের প্রহরীরা সবাই ঘুমাচ্ছে। কেউ চেয়ারে বসে, আর অন্যরা বেঞ্চে শুয়ে। নোংরা টয়লেটের অন্ধকারে অনেকক্ষণ ধরে গোসল করলাম। গুলশানে বাস করেও সেখানকার এলিট শ্রেণীর বিলাসিতায় অভ্যস্ত না হওয়ার সুফল পাচ্ছি গ্রেফতারের রাত থেকেই। জীবনের প্রায় শেষপ্রান্তে উপনীত হলেও গেণ্ডারিয়ার মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর আমাকে কখনও ত্যাগ করে যায়নি। গোসল সেরে বেরিয়ে গারদের বাইরের সেই ফ্যানের সামনে জোড়াসনে বসলাম। মাথায় চুল কম থাকাও যে সুবিধাজনক, সেটা প্রমাণ হলো স্বল্প সময়ের মধ্যে চুল শুকিয়ে যাওয়ায়। সঙ্গে গামছা বা তোয়ালে নেই তাই শরীর মোছাও সম্ভব হয়নি। গায়ের পানি গায়েই শুকালো। বাড়ির কথা ভাবছিলাম। আগের দিনেই জেনেছি, মা এখন পর্যন্ত শক্ত থাকতে পারলেও পারভীন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। রিমান্ডে আমার জীবন ধারণের অবস্থাটা জানলে দু’জনই অসুস্থ হবেন। চৈত্র মাসের কাঠফাটা গরমেও ঈষত্ গরম পানিতে গোসল করা আমার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। ঠাণ্ডা পানিতে সাইনাসের প্রকোপ বেড়ে যায়। ডিবি অফিসে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতে তো হচ্ছেই, ভেজা শরীর শুকাচ্ছি ফ্যানের বাতাসে। ফজরের আজান এবং আমার সেলের পাশের বিশাল কড়ই গাছে আশ্রয় নেয়া অসংখ্য পাখির কিচিরমিচির সুবেহ্ সাদেকের আগমনী জানান দিল। নামাজে আল্লাহর কাছে ভিক্ষা জানালাম, আমার বন্দি জীবনে এক মুহূর্তের জন্যেও যেন জালিম সরকারের মুখাপেক্ষী হতে না হয়। জালিমের করুণা প্রত্যাশী হওয়ার পরিবর্তে আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন সর্বসময় আকাঙ্ক্ষিত। ফজরের নামাজ অন্তে এক ঘণ্টা বোধহয় ঘুমাতে পেরেছিলাম। এর মধ্যেই নতুন শিফটের লোকজন এসে তাদের দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছে। চেয়ার টানার শব্দ, তাদের কথোপকথন ঘুম ভাঙিয়ে দিল। রুটি, ডিমভাজি এবং রঙ চা’র বরাদ্দ দিয়ে নাস্তাপর্ব শেষ করে অন্তহীন অপেক্ষা শুরু হলো। দুপুরে কম্বলের ওপর বসে আছি। হঠাত্ দেখলাম সামনের করিডোর দিয়ে ফকরুল আলম কাঞ্চন দ্রুত হেঁটে গেল। যাওয়ার সময় মনে হলো, যেন সে আমাকে লক্ষ্য করেছে। কাঞ্চন আমাদের সংবাদপত্রের ক্রাইম বিভাগের প্রধান। মনের ভার এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল। বাইরের পৃথিবী আমার অবস্থানটা এবার জানবে।
রাত এগারোটায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে আইও নুরুল আমিন নিতে এলেন। তার সঙ্গে দোতলায় ডিসি ডিবি (উত্তর) মাহবুবুর রহমানের কক্ষে গেলাম। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন এডিসি নজরুল। প্রাথমিক সৌজন্য প্রদর্শন শেষ হলে জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শুরু হলো। আমি অভিযোগ জানতে চাইলাম। হিযবুত তাহরিরকে জড়িয়ে আমার বিরুদ্ধে ইসলামী জঙ্গিত্বের হাস্যকর অভিযোগ উত্থাপন করলেন ডিবি’র ইন্সপেক্টর নুরুল আমিন। আমার অপরাধ তিনটি। প্রথমত. হিযবুত তাহরিরের কোনো এক লিফলেটের ভাষার সঙ্গে আমার দেশ-এ প্রকাশিত সংবাদের মিল রয়েছে। দ্বিতীয়ত. আমার দেশ কার্যালয় বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল সংস্থার যে বাণিজ্যিক ভবনের ১১ তলায় অবস্থিত, সেই ভবনেরই কোনো এক তলায় হিযবুত তাহরিরের এক কথিত নেতার অফিস রয়েছে। সেই নেতা নাকি আমার সঙ্গে তাদের সংগঠনের প্রচারের উদ্দেশ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। এবং তৃতীয়ত, আমার দেশ প্রেসে হিযবুত তাহরিরের লিফলেট ছাপা হওয়ার সন্দেহ করছে পুলিশ। জবাবে আমি বললাম, আমার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অথবা আমার কোনো লেখা নিয়ে হিযবুত তাহরির লিফলেট তৈরি করেছে এমন কোনো সংবাদ আমার জানা নেই। আর যদি আমাদের অজ্ঞাতসারে তেমন কিছু করেও থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে আমার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ উত্থাপনের কোনো সুযোগই নেই। আমার লেখা উদ্ধৃত করে ইচ্ছে করলে সরকারও লিফলেট ছাপাতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ভবনে হিযবুত তাহরিরের লোকজন অফিস খুললে তার দায়িত্ব ভবন মালিকের, আমার নয়। তাছাড়া যে ব্যক্তির কথা বলা হচ্ছে, তেমন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কস্মিনকালেও আমার কোনোরকম যোগাযোগ হয়নি। এমন কোনো ব্যক্তিকে আমি চিনি না। আর সর্বশেষ, সংবাদপত্রের প্রেসের যন্ত্রপাতি দিয়ে লিফলেট ছাপানো যায় না। তার জন্য ভিন্ন প্রেস লাগে। আমি এটাও বললাম, আমার বিরুদ্ধে ইসলামী সন্ত্রাসের মামলা দিয়ে আপনারা সন্ত্রাসের মতো গুরুতর ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক বিষয়কে খেলো করে ফেলছেন। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে এই খেলা থেকে তাদের নিবৃত্ত হতেও পরামর্শ দিলাম। হিযবুত তাহরির নিয়ে আলোচনা এখানেই সমাপ্ত হলো।
এরপর এলো আসল প্রসঙ্গ। এডিসি নজরুল জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কেন আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদী বলি এবং আমার দেশ সরকারের এত তীব্র সমালোচনা কেন করে? এই প্রশ্নের সঙ্গেই আমার গ্রেফতারের প্রকৃত কারণ প্রকাশ হয়ে গেল। আরও ঘণ্টাখানেক এই বিষয় নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা শেষে ডিসি মাহবুবুর রহমান উঠে দাঁড়িয়ে জানান দিলেন, আজ রাতের মতো জিজ্ঞাসাবাদের পালা শেষ। সেলে যখন ফিরলাম, দেখলাম একটা বেজে গেছে। পূর্বরাতের মতোই শেষ রাতে গোসল, নামাজ শেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। সারাদিন একইভাবে কেটে গেল। সকালের নাস্তাটা কোনোক্রমে গলাধঃকরণ করলেও, ওরকম পরিবেশে ভাত খাওয়ার রুচি হয় না। অতএব খাদ্য বলতে খানিক পরপর চা এবং একটা করে বিস্কুট। রাত এগারোটায় পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে নুরুল আমিন আবারও সেল থেকে নিয়ে গেলেন। আজ অতিরিক্ত কয়েকটি কথা বললাম।
আমি সংবাদপত্রে লেখালেখি করি কেবল এই কারণেই আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী দলে পরিণত হয়ে যাচ্ছে না। জনমত এত সহজে প্রভাবিত হয় না। তাছাড়া আমি এমন কিছু শক্তিশালী লেখকও নই। বাস্তবতা হলো, দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে সাধারণ কর্মী পর্যন্ত প্রতিটি ব্যক্তির অসহিষ্ণু এবং চরম অগণতান্ত্রিক আচরণই জনগণকে বাধ্য করছে তাদেরকে এই বিশেষণে অভিহিত করতে। ১৯৭৫ সালে চারটি ছাড়া দেশের সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া, শত শত পুলিশ পাঠিয়ে আমার দেশ বেআইনিভাবে বন্ধ ঘোষণা করে তালা ঝুলিয়ে দেয়া, আমাকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নির্যাতন, হত্যা প্রচেষ্টা—এসবই ফ্যাসিবাদী আচরণের মধ্যে পড়ে। ক্যান্টনমেন্ট থানার ঘটনার কথা শুনে উপস্থিত তিন ডিবি কর্মকর্তাই নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। বেশ কিছুক্ষণ আমি একাই কথা বলে গেলাম। এটাও বললাম, আমার দেশকে কেন্দ্র করে সরকারের ন্যক্কারজনক আচরণ তাদের কপালে যে কলঙ্ক তিলক এঁকে দিয়েছে, সেটি আর মোছা যাবে না। দীর্ঘ তিন যুগ পর আজও যেমন করে আমরা ১৯৭৫ সালের ১৫ জুনকে সংবাদপত্রের কালো দিবস হিসেবে ঘৃণা সহকারে পালন করে থাকি, একইভাবে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম আমার দেশ বন্ধ করার অপচেষ্টার জন্যে আওয়ামী লীগকে ধিক্কার দিয়ে যাবে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে এটাও বললাম, আমাকে হয়তো দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখা যাবে; কিন্তু আমার দেশ বন্ধ করে রাখা সাম্রাজ্যবাদীদের সমর্থনধন্য প্রবল প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেও সম্ভব হবে না। আমার বক্তব্যের ওপর কোনো মন্তব্য না করে ডিসি মাহবুবুর রহমান বারবার বলার চেষ্টা করছিলেন, তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে জনমন থেকে ভুলিয়ে দিতেই আমার দেশ পত্রিকা সজীব ওয়াজেদ জয় সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি ছাপিয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের পক্ষে সব কাগজপত্র আমাদের সাংবাদিকের কাছে রয়েছে এবং সুস্থ সাংবাদিকতার সব নীতিমালা মেনেই যে সংবাদটি ছাপানো হয়েছে, এ বিষয়টি জোরের সঙ্গে উল্লেখ করলাম। তাকে জানালাম, তারেক জিয়ার দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে ওই সংবাদ প্রকাশের বিষয়টি কোনোক্রমেই সম্পর্কিত নয়। এ রাতেও প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হতে দেড়টা বেজে গেল। ছাড়া পেয়ে সেলে এসে সটান শুয়ে পড়লাম। পরের রাতে জিজ্ঞাসাবাদ আরও সংক্ষিপ্ত হলো। আমার বিরুদ্ধে সরকারের নতুন মামলা দায়েরের খবর পেলাম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশের প্রেক্ষিতে দুদক মামলা করেছে। এই আইনবহির্ভূত কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রমাণ করলো তারা স্বাধীন তো নয়ই; বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক্সটেনশন মাত্র। এই প্রত্যাশিত মামলা দায়েরে কোনোরকম উদ্বেগ বোধ না করে সংবাদটি জানানোর জন্য মাহবুবুর রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে মধ্যরাতে সেলে ফিরলাম।
১৬ জুন, দুপুর একটা। সেলে চুপচাপ বসে আছি। আইও হন্তদন্ত হয়ে এসে তৈরি হতে বললেন। তখনই আদালতে যেতে হবে। ইসলামী জঙ্গিত্বের মামলার রিমান্ড শেষ হয়েছে। আদালতে উপস্থিত হতেই আইনজীবী, সাংবাদিক আমাকে দেখে আঁেক উঠলেন। সমস্বরে বলে উঠলেন, মাহমুদ ভাই এ কী চেহারা হয়েছে আপনার! রিমান্ডের নয়দিনে আয়না দেখার সুযোগ হয়নি, তাই শুভানুধ্যায়ীদের এতখানি উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠার হেতু ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ভাবলাম, নয়দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হয়তো আমাকে ভয়ঙ্কর লাগছে। গাত্রবর্ণ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ হওয়ায় সুদর্শন হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রিমান্ডের ধাক্কায় আজ চেহারার দিকে সম্ভবত তাকানোই যাচ্ছে না। হাসিমুখেই বললাম, আয়না তো দেখিনি, কেমন করে বলবো কী চেহারা হয়েছে। যে তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটটি আমাকে একটানা আটদিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছিলেন, তারই এজলাসে আমাকে তোলা হলো। ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে একবারের জন্যেও তাকাতে আমার ইচ্ছে হলো না। সরকার এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বিতর্কের পুরোটা সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দরজা দিয়ে সোজা বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। রিমান্ডের যে চারদিন তখনও বাকি রয়েছে, সেটি পুরো করতে পরবর্তী অজানা গন্তব্যে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে আমি দৃষ্টিপাত না করলেও তিনি সম্ভবত মাত্র ক’দিনে আমার শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করে থাকবেন। মামলার সব পক্ষকে অবাক করে আমাকে রিমান্ডে প্রেরণের পরিবর্তে জেলহাজতে পাঠিয়ে যথাযথ চিকিত্সার নির্দেশ দিয়ে বসলেন তরুণ সেই ম্যাজিস্ট্রেট। ভাবলাম সুপ্ত বিবেক হয়তো জেগে উঠেছে। আমার পক্ষের সবাই বেজায় খুশি। আমি কিন্তু কোনো আনন্দ অনুভব করছিলাম না। নয়দিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতায় আমি শারীরিক ও মানসিক উভয় যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করতে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমার কাছে রিমান্ড সমাপ্ত না করে জেলহাজতে ফিরে যাওয়াটা উটকো ঝামেলার মতো বোধ হলো। ভাবছিলাম, সবটা একবারে সাঙ্গ করে জেলে ফিরলেই তো ভালো ছিল।
সন্ধ্যা পার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাত নম্বর সেলে ফেরার আগেই লক-আপ হয়ে গেছে। আমার প্রতিবেশীরা যার যার সেলে বন্দি। জেলে আসার প্রথম রাতের মতো ড্রামের তোলা পানিতে গোসল করে আমিও ভেতরে ঢুকে গেলাম। ডিভিশন সেল থেকে পাঠানো খাবার দিয়ে রাতের আহার শেষ করেই ঘুমিয়ে পড়লাম। দীর্ঘ নয় রাত পর এই ঘুম। নির্যাতন কিংবা হত্যার আশঙ্কা নেই এমন পরিবেশে ফিরে আসতে পেরে ঘুমটা লম্বাই হলো। সকালে উঠে নাস্তার পাট শেষ না হতেই জেল হাসপাতালের ডাক্তার এসে হাজির। আমার দিকে একনজর তাকিয়েই হাসপাতালে গিয়ে অন্তত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতে অনুরোধ করলেন। কথা না বাড়িয়ে ডাক্তারের সঙ্গে গেলাম। প্রথমেই ওজন পরীক্ষা। নয় দিনের রিমান্ডে ওজনের দশ শতাংশ অর্থাত্ সাত কেজি কমে গেছে। অথচ ডায়াবেটিস পাওয়া গেল না। তবে দুই হাতের চামড়া টানলেই সাপের খোলস ছাড়ানোর মতো করে উঠে যাচ্ছে। অবাক কাণ্ড, আমি একটুও দুর্বল বোধ করছি না। সমস্যার মধ্যে কোমরে এবং ঘাড়ে স্পনিডলাইটিসের পুরনো ব্যথাটা বেশ বেড়েছে। তারপরও আমি রিমান্ডে যাওয়ার জন্যে উদগ্রীব। জালিমকে মোকাবিলা করার মানসিক শক্তি আমার শারীরিক অক্ষমতাকে অতিক্রম করে গেছে। ডাক্তারদের বললাম, সুপারের মাধ্যমে ডিবি অফিসে আমার সুস্থতার সংবাদ জানিয়ে দিতে। তারা কিছুতেই সম্মত না হয়ে পিজি থেকে ডাক্তার ডাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। একদিন পর পিজির ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বেশকিছু বেদনানাশক এবং বলবর্ধক ওষুধ পাঠালে আমি সেগুলো ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িতে নিক্ষেপ করলাম। নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো জেলে বসে রিমান্ডের ডাকের অপেক্ষা করতে লাগলাম।