Thursday, October 10, 2013

জনপ্রিয়তা বেড়েছে আ. লীগেরও, কমেছে জাপা ও জামায়াতের- জনসমর্থনে বিএনপি এগিয়ে

দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতি মানুষের সমর্থন আগের চেয়ে বেড়েছে। তবে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের চেয়ে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির জনপ্রিয়তা বেড়েছে বেশি।

সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনই কাম্য

পূজা আর ঈদের ছুটির পর থেকে ১০ দিনের মাথায় সংশোধিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের সময় শুরু হবে। ৯০ দিন, ২৫ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারি। ২৫ অক্টোবরের আগেই পরিষ্কার হবে দুই বিবদমান রাজনৈতিক জোটের চূড়ান্ত অবস্থান। বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে ২৫ অক্টোবরের পর থেকে। তবে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচনী সময়সূচি ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত জনমনে নির্বাচনকালীন ব্যবস্থাপনা অপরিষ্কার থাকবে। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন একবার নির্বাচনী সময়সূচি ঘোষণা করলে সেখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব হবে না। মনে হচ্ছে, দেশের বেশির ভাগ মানুষও মনে করেন যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুধু ১৪-দলীয় জোটই একতফা নির্বাচনে প্রস্তুত। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একাধিকবার বলেছেন যে অন্যান্য দল অংশগ্রহণ না করলে তিনি ও তাঁর দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ‘জাতীয় বেইমান’ হতে চাইবে না। এই ঘোষণার পরও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এরশাদের কথার ওপরে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। তবে এ কথা ঠিক যে জাতীয় পার্টির ভেতরে তত্ত্বাবধায়ক অথবা নির্দলীয় সরকারের সপক্ষেই বেশির ভাগ নেতার অবস্থান। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিও যদি ১৪ দলের একলা চলো নীতির সঙ্গে যোগ না দেয়, তাহলে সে নির্বাচনকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সংজ্ঞায় ফেলা যাবে না।
গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অবশ্যই বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হয়। বিশেষ করে সংসদে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল যদি অংশগ্রহণ না করে, সেই নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হবে না। এমন নয় যে সরকারি দল এমন সরল পাঠ বোঝে না। কিন্তু খুব বিচলিত নয়। নির্বাচন হবেই এবং সেই নির্বাচন যে সরকারি দলের ছকে হবে, সেটাই এখন প্রধান বিরোধী দলের মাথাব্যথা। এ অবস্থায় বিরোধী দল ও জোট এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার প্রত্যয় খুব পরিষ্কারভাবে দেশবাসীকে জানিয়েছে। সর্বশেষ সিলেটের জনসভায় ১৮-দলীয় জোট ও বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচন প্রতিহত করতে কেন্দ্রে কেন্দ্রে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপির নেত্রীর এই হুঁশিয়ারিকে হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই। এমনটাই যদি হয়, তবে নির্বাচনের ভবিষ্যৎ কী হবে, তার ফলাফল এবং ভোটার উপস্থিতি কী হবে—এ সবই অনুমেয়। এমন নির্বাচন দেশের ও গণতন্ত্রের জন্য যে মঙ্গলজনক হবে না, অন্তত ইতিহাস তা-ই বলে।
বিভিন্ন জরিপ, আলোচনা, সেমিনার এমনকি বহুল আলোচিত টক শোগুলোতে প্রশ্নকর্তারা যে ধরনের প্রশ্ন করেন, তাতে প্রতীয়মান হয় যে সংখ্যাতত্ত্বের দিকে না গেলেও এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন যে অন্তত আগামী নির্বাচন নির্দলীয় অথবা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকারব্যবস্থার তত্ত্বাবধানে না হলে তা শান্তিপূর্ণ হবে না। এমনকি সরকারি জোটের অনেক নেতা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন যে সংসদ রেখে নির্বাচন ভালো ব্যবস্থা নয়। তথাপি শাসক জোট সংবিধানের আওতায় বিদ্যমান পদ্ধতিতেই নির্বাচনের জন্য সব প্রস্তুতি শেষ করতে যাচ্ছে। পত্রিকার খবরে প্রকাশ, সরকারি দল আগামী নির্বাচনে বিরোধী গোষ্ঠীর অবর্তমানে মাঠকর্মীদের ৫১ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করতে বলেছে। এই সংবাদ যদি সত্য হয়, তাহলে বলতেই হবে যে বাস্তবতার নিরিখে তেমনটি হওয়ার নয়। এ অবস্থায় সরকারি দল ভোটার উপস্থিতিকে বাড়িয়ে দেখালে তা হবে গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী দলের কাছ থেকে সেটি আশা করা যায় না। এ-ও সত্য, নির্বাচনে বিএনপি ও সমর্থক দল অংশগ্রহণ না করলে ৫০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি হবে না। এই সরল অঙ্ক কষতে বড় ধরনের পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন হয় না। মহাজোটের মধ্যে সংসদে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে আওয়ামী লীগ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় পার্টির।
এর মধ্যে জাতীয় পার্টি নিজের পরিচয়ে নবম জাতীয় সংসদে নির্বাচন করেছে। বাকিরা আওয়ামী লীগের প্রতীক ‘নৌকা’ নিয়ে জয়ী হয়েছেন। তবে নিজস্ব প্রতীকেও জাসদের ২৫ জন এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির তিনজন নির্বাচন করেছিলেন। আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে জাসদের তিনজন এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির দুজন সদস্য নির্বাচিত হন। এ দুই দলের মধ্যে জাসদ সমষ্টিগত প্রদত্ত ভোটের শূন্য দশমিক ৭৪ এবং ওয়ার্কার্স পার্টি শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অপর দিকে আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ৪৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। কাজেই ১৪-দলীয় জোটের এই তিনটি দল, যারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে, তাদের মোট ভোটের প্রাপ্ত শতাংশ ছিল ৪৯ দশমিক ২৫। অবশ্য জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ ভোট। ১৪-দলীয় জোটের বাদ বাকি পার্টির কোনোটি শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটও পায়নি। কাজেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী জোটবিবর্জিত এবং ঘোষিত বাধার মুখে ৫১ শতাংশ ভোটারের ভোট প্রদান বাস্তবিক পক্ষে কতখানি সম্ভব হবে, তা ভেবে দেখার বিষয়। স্মরণযোগ্য যে দশম জাতীয় সংসদে নিবন্ধিত দল হতে যাচ্ছে ৩৮টি আর বিএনএফ নামক সংগঠনটি যদি নিবন্ধিত হয়, তবে আরেকটি বাড়বে।
সে ক্ষেত্রে নতুন দুটি দল কতখানি ভোট টানতে পারবে, তা সহজেই অনুমেয়। মাত্র কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত হয় বরগুনা-২ আসনের উপনির্বাচন। ওই নির্বাচনে দুজন প্রার্থী প্রতিযোগিতা করেন। যার মধ্যে একজন ছিলেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের, অপরজন ছিলেন ইসলামী আন্দোলন পার্টির প্রার্থী। মোট প্রদত্ত ভোট ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ, যার মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম সরওয়ার হিরু পেয়েছিলেন ৫৭ হাজার ৯৯৩ এবং আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছিলেন ৬৫ হাজার ৮১২ ভোট। ওই নির্বাচনের পর ইসলামী আন্দোলনের নেতারা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁদের অভিযোগ, তিনটি ইউনিয়নে ভোট প্রদানে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ভোট গ্রহণের দুই দিন পর বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকেরা পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের ওপর হামলা করে ব্যাপক ভাঙচুর করেন বলে পত্রপত্রিকায় সংবাদ পরিবেশিত হয়। যদিও বিজয়ী প্রার্থী এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেন, তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবরের সত্যতা পাওয়া যায়। এর পরই ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতা চরমোনাইয়ের পীর বলেন যে বর্তমান ব্যবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে তাঁরা ভবিষ্যতে নির্বাচন করবেন না। উল্লেখ্য, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১৬৬ জন প্রার্থী দিয়েছিল এবং প্রদত্ত মোট ভোটের ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।
কাজেই ১৪ দল এককভাবে নির্বাচন করলে ভোটের পরিসংখ্যান কেমন হবে, তা অনুমান করা কঠিন নয়। ওপরের আলোচনা এবং নিরিখে প্রতীয়মান হয় যে শাসক জোট তাদের ঘোষিত উপায়ে আগামী সংসদ নির্বাচন বর্তমান সংবিধানের আওতায় নির্বাচন করে এবং জাতীয় পার্টিসহ বিরোধী দল অংশগ্রহণ না করলে সে নির্বাচনে ভোটার সমাগম করানো দুরূহ কাজ হবে। তদুপরি বিরোধী জোটের ঘোষিত বিরোধিতার মুখে নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের থাকবে, তা নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। স্মরণযোগ্য যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, বজায় রাখা এবং ভোটারদের নিরাপত্তার বিধান করা নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তাবে। ওই সময় নির্বাচন কমিশনই মুখ্য, সরকারের ভূমিকা শুধু সহযোগিতার হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত থাকবে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন কী ধরনের পরিকল্পনা নেয় তা এ মাসেই হয়তো জানা যাবে, অবশ্য নির্বাচন কমিশন যদি কোনো পরিকল্পনা করে থাকে। তারা এখনো বিরোধী দলের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। সে কারণেও বিরোধী দল বিবর্জিত নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে নির্বাচন কমিশনকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। যত দূর জানা যায়, নির্বাচন কমিশনও সংবিধানের আওতায় সংসদ রেখে নির্বাচন করাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখনো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সর্বশেষ সংশোধনীতে এ ধরনের নির্বাচনে কমিশনকে কতখানি শক্তিশালী করতে হবে তার বিধান রাখা হয়নি। এমনকি বিগত কমিশনের সুপারিশ করা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্তি হতে বাদ পড়েছে।
এ অবস্থায় শুধু আচরণবিধি দ্বারা কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করবে—এমন কথা খোদ কমিশনাররাও বিশ্বাস করেন কি না সন্দেহ আছে। নির্বাচন কমিশন নতুন আচরণবিধি যত দেশের বিধি দেখে তৈরি করুক না কেন, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একজন সংসদ সদস্য যেভাবে পাঁচ বছরে সর্ববিষয়ে শেষ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন, সেখানে পদে বহাল থেকে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলে অন্যদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হয়ে পড়বে বৈকি। স্মরণ করা যায় ক্ষমতাসীন দলের একজন ক্ষমতাধর নেতার সরকারি কর্মকর্তাদের প্রদেয় হুমকির বিষয়টি। নির্বাচন কমিশন কি এ ধরনের পরিস্থিতিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে পারবে? চলমান সরকারি উদ্যোগে নির্বাচনী প্রচারণা কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে সাহায্য করছে? নতুন বিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয় খাটো করে দেখার সুযোগ নেই, তবে তার প্রয়োগ কতখানি করা যাবে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। নির্বাচন কমিশন প্রতিবারই নিশ্চিত করতে চাইছে যে তারা সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে সক্ষম হবে। প্রশ্ন থাকে যে যদি ওই ধরনের পরিবেশ তৈরি করতে না পারে তাহলে কী হবে? নির্বাচন কমিশন ওই পরিস্থিতিতে সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন স্থগিত করতে পারবে? এসব প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই রয়েছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির উপাদান। উপসংহারে বলতে চাই যে আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী দল একতরফা নির্বাচন করে কতখানি লাভবান হবে, তা নিশ্চয়ই বাস্তবতার নিরিখে ভেবে দেখা প্রয়োজন। তাই একতরফা নয়, সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই কাম্য। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে নির্বাচনই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়, নির্বাচন গণতন্ত্রের ভিত মাত্র। ভিত নড়বড় হলে গণতন্ত্র ভেঙে পড়তে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের দায়িত্বও অপরিসীম।
এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

শুকুইয্যা কডে?

প্রতিপক্ষকে অশ্লীল বাক্যবাণে বিদ্ধ করা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মজ্জাগত অভ্যাস। প্রতিপক্ষ তো বটেই, নিজের দলেও যাঁরা তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করেন না, তাঁদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে কখনো দ্বিতীয়বার চিন্তা করেননি তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা বিপক্ষ দলের নেতা-কর্মীরাই যে শুধু তাঁর এই স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত অশ্লীল বাক্যবাণের শিকার হয়েছেন তা কিন্তু নয়, খোদ তাঁর দলের প্রধান খালেদা জিয়া বা দলের অন্য সিনিয়র নেতারাও রেহাই পাননি এই আক্রমণ থেকে। অনেকের ধারণা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দীক্ষা যেমন তিনি পেয়েছিলেন তাঁর বাবা প্রয়াত রাজনীতিক ফজলুল কাদের চৌধুরীর কাছ থেকে, তেমনি দম্ভ, ঔদ্ধত্য এবং প্রতিপক্ষের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাষাটাও শিখেছিলেন তাঁর কাছ থেকেই। ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দেয়। ১৯৬২ সালে দৈনিক ইত্তেফাক-এ সেকেন্ড লিড হিসেবে ছাপা হয়েছিল ‘শুকুইয্যা কডে?’ নামের কৌতূহলোদ্দীপক একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনটি চট্টগ্রাম থেকে পাঠিয়েছিলেন ইত্তেফাক-এর তৎকালীন তরুণ সাংবাদিক (বর্তমানে কানাডাপ্রবাসী) মঈনুল আলম। প্রতিবেদনটি, বিশেষ করে এর শিরোনাম তখন পাঠকমহলে এতটাই সাড়া জাগিয়েছিল যে মুখে মুখে তো বটেই, অনেকের লেখায়ও এর উদ্ধৃতি পাওয়া যায়। প্রয়াত সাংবাদিক কে জি মুস্তাফা দৈনিক ইত্তেফাক-এ শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, ‘তাঁর কতিপয় সংবাদ শিরোনাম অমরত্ব লাভ করেছে। যেমন, “শুক্কুইয্যা কডে?” অথবা “চিনিল কেমনে?”
ধরনের হেডলাইনে জনমনে প্রতিক্রিয়া হয়েছে অসাধারণ।’ এই শিরোনাম ও প্রতিবেদনটির পশ্চাৎপট উল্লেখ করা বোধ করি এখানে প্রাসঙ্গিক। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন এ অঞ্চলের খ্যাতিমান রাজনীতিক ফজলুল কাদের চৌধুরী। অথচ এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘দারোয়ানের (আইয়ুব খান) কাজ পাহারা দেওয়া, আমি দারোয়ানের মন্ত্রী হই কী করে?’ এই দৃঢ়তা দেখে তাঁকে সংবর্ধনাও দিয়েছিল তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। মন্ত্রী হওয়ার খবরে তাই ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল এ অঞ্চলের গণতন্ত্রকামী মানুষ। মন্ত্রী হয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী যখন প্রথম চট্টগ্রামে এলেন, সকালে রেলস্টেশনে তাঁর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পণ্ড হয়েছিল ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে। ওই দিন বিকেলে লালদীঘির ময়দানে আবার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে পরিস্থিতি হয়েছিল আরও ভয়াবহ। প্রবল প্রতিবাদধ্বনির মধ্যেও ফজলুল কাদের বক্তৃতা দিতে শুরু করলে মঞ্চের দিকে জুতা-স্যান্ডেল নিক্ষেপ শুরু হয়। মঈনুল আলম তাঁর কলমের সৈনিক গ্রন্থে এর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। উড়ে আসা জুতা মন্ত্রীর আশপাশের লোকজনের গায়ে এসে পড়তে লাগল।
তিনি রাগে অন্ধ হয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গর্জন শুরু করেছিলেন, ‘আয়ুব খাঁ আঁরে মন্ত্রী ন গরিব ত কারে গরিব? আঁরে ত দেইখতে ফাটানর বাইচ্চার মতো লাগে। আর বেওগ্গুন বাঙালি নেতা ত দেইখতে ম্যালেরিয়া রোগীর মতো...।’ (আইয়ুব খাঁ আমাকে মন্ত্রী করবে না তো কাকে মন্ত্রী করবে? আমাকে তো দেখতে পাঠানের বাচ্চার মতো লাগে, অন্য বাঙালি নেতারা তো সব দেখতে ম্যালেরিয়া রোগীর মতো।) তিনি একপর্যায়ে সমাবেশের উদ্দেশে গালিগালাজ শুরু করেছিলেন, ‘শুয়রের পোয়া অল...শুয়রের বাইচ্চার দাত উডিলে ফইল্যা বাপর ফোঁদৎ টেরাই গরে। তোরা বাফল্লয় বেয়াদবি গইত্য আইচ্ছস দে না?’(‘শুয়োরের বাচ্চারা...শুয়োরের বাচ্চার দাঁত উঠলে প্রথমে বাপের পাছায় কামড় দেয়। তোরা বাপের সঙ্গে বেয়াদবি করতে এসেছিস?’) এ সময় বিক্ষোভ প্রচণ্ড আকার ধারণ করে, অবস্থা বেগতিক দেখে ফজলুল কাদেরের সমর্থকেরা সমাবেশ ছেড়ে পালাতে শুরু করে। তিনি তখন মাইকের সামনে গিয়ে হাঁক দিলেন, ‘শুক্কুইয্যা কডে গেলি? ইনদি ছাআচো না...।’ (‘শুক্কুইয্যা কোথায় গেলি? এদিকে দেখ না।’) কিন্তু কোথায় তখন শুকুইয্যা?
পুলিশের লোকজন এসে কোনোক্রমে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিলেন মন্ত্রীকে। ফজলুল কাদেরের রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আত্মম্ভরিতা, সাধারণ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এবং ‘শুকুইয্যানির্ভরতা’ (মাস্তান) তাঁকে জনবিচ্ছিন্ন করেছিল। অথচ ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান যখন নির্বাচন ঘোষণা করেন, তখন মুসলিম লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং সেই সূত্রে পাকিস্তানের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। বলেছি, সাকা চৌধুরী রাজনীতিতে এসে সব দিক থেকেই অনুসরণ করেছেন তাঁর বাবাকে। তিনি বেশ কবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ওপর এতটুকু আস্থা বা শ্রদ্ধার মনোভাব থাকলে, একজন জনপ্রিয় নেতার যে মাস্তান বাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজন হয় না—এ কথা কখনো উপলব্ধি করেননি। নব্বইয়ের দশকে এনডিপি নামের একটি দল গঠন করেন সালাউদ্দিন, সেই দল থেকে সাংসদও নির্বাচিত হন। এ সময় তাঁর মদদেই গড়ে ওঠে বিরাট এক সন্ত্রাসী বাহিনী।
তখন রাউজান, রাঙ্গুনিয়া এলাকায় তাঁর অনুগত ফজল হক, বিধান বড়ুয়া, জানে আলম, আবু তাহের, রমজান প্রমুখ সন্ত্রাসীর হাতে খুন, রাহাজানি, ডাকাতি, অপহরণসহ হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা সংঘটিত হয়নি। একদিকে ব্যঙ্গভরে ভোটারদের ছাগলের সঙ্গে তুলনা করে তাঁদের মুখের সামনে কাঁঠালপাতা ধরে দিলেই চলে বলে মন্তব্য করেছেন, অন্যদিকে তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন সন্ত্রাসী। পরে জাতীয় পার্টি হয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েও একই রকম কার্যক্রম চালাতে থাকেন তিনি। প্রতিপক্ষ তো বটেই, তাঁর দলেরই নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, মোরশেদ খান প্রমুখের বিরুদ্ধেও বিষোদ্গার করেছেন নানা সময়। সাদেক হোসেন খোকার মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘আগে কুকুর লেজ নাড়াত, এখন লেজ কুকুরকে নাড়ায়’। ১৯৯১ সালে আলমগীর নামের এক ছাত্রলীগ কর্মীর হত্যাকাণ্ডে যেমন প্রধান আসামি ছিলেন তিনি, তেমনি নিজ দলেই আবদুল্লাহ আল নোমানের সমর্থক হিসেবে পরিচিত নিটোলের হত্যাকাণ্ডের জন্যও অভিযোগের আঙুল উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জ এলাকায় ফজলুল কাদের চৌধুরীর গুড হিলের বাসভবনে পাকিস্তানি সেনারা আশ্রয় নিয়েছিল এবং এই বাড়িতে বহু মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। প্রফেসর সালেহউদ্দিন, সাংবাদিক নিজামউদ্দিন,
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ম. সলিমুল্লাহর মতো অনেকেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরেছেন ওই বাড়িতে ধরে নিয়ে গিয়ে তাঁদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি। অনেকেই অভিযোগ করেন, সেই নির্যাতনের নির্দেশদাতা হিসেবে ফজলুল কাদেরের সঙ্গে তাঁর ছেলে সালাউদ্দিনও ছিলেন। সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, কুণ্ডেশ্বরী বিদ্যালয় ও ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা। পাকিস্তানি সেনারা ব্রাশফায়ার করে যাওয়ার পর সালাউদ্দিন আবার নিজের রিভলবার থেকে গুলি করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে উল্লেখ করেছেন সাক্ষীরা। সালাউদ্দিনের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ২৯ মার্চ থেকেই দেশে ছিলেন না তিনি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কাজী নুরুল আবছার পত্রিকান্তরে জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে তিনিসহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রহমতগঞ্জ এলাকায় হামলা করেছিলেন সালাউদ্দিনের ওপর, এতে তিনি (সালাউদ্দিন) আহত হয়েছিলেন, মারা গিয়েছিলেন তাঁর ড্রাইভার। এর পরই দেশ ছেড়েছিলেন তিনি। মানবতাবিরোধী অপরাধে সালাউদ্দিনের ফাঁসির দণ্ড ঘোষণার পর চট্টগ্রামে বিএনপি এক দিন মুখরক্ষার হরতাল ডেকেছে বটে, কিন্তু এই কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি।
অন্যান্য হরতাল চলাকালে বিএনপির নাসিমন ভবন কার্যালয় ও এর আশপাশের এলাকা থাকে মুখর। কিন্তু গত ২ অক্টোবর হরতালের দিনে জনশূন্য ও তালাবদ্ধ দলীয় কার্যালয়ের ছবি ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। এমনকি রায়ের পর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশের দিন ঢাকায় অবস্থান করেও এতে যোগ দেননি চট্টগ্রামের কোনো নেতা। আবদুল্লাহ আল নোমান, সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম, গোলাম আকবর খোন্দকার দেখিয়েছেন অসুস্থতার অজুহাত, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ব্যস্ত ছিলেন পেশাগত কাজে। ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবেও খ্যাতি ছিল তাঁর। কিন্তু বাবার মতোই দাম্ভিক চরিত্রের এই মানুষটি একদিকে বাক্যবাণে ঘায়েল করতে চেয়েছেন দলের ভেতর-বাইরের প্রতিপক্ষকে, অন্যদিকে বাবার মতোই ‘শুকুইয্যানির্ভর’ বাহুবলের রাজনীতি করে বজায় রাখতে চেয়েছেন নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি। দুঃসময়ে তাই দলের ভেতরও পেলেন না পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো কাউকে।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

বার্ধক্যে বিষাদ

চিকিৎসাশাস্ত্রের উন্নতির পথ ধরে বাড়ছে মানুষের আয়ুষ্কাল। সারা বিশ্বেই বাড়ছে প্রবীণদের সংখ্যা। ফলে প্রবীণদের স্বাস্থ্যগত দিকটিও আলাদাভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। গুরুত্ব পাচ্ছে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও। সেদিকে লক্ষ রেখেই এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল ভাবনা ‘বয়োবৃদ্ধদের মানসিক স্বাস্থ্য’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আজ ১০ অক্টোবর বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এটা মোটেও অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে বার্ধক্যেও মানুষ বিষাদগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু নানা কারণে বিষয়টি আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। ফলে ভুক্তভোগীর দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। যাঁদের বয়স ৬০ বা তার ওপরে, তাঁরাই প্রধানত বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার শিকার হন। বিশেষ করে শারীরিক সমস্যা যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হূদেরাগ, বাত-জাতীয় বিভিন্ন রকমের ব্যথা, স্ট্রোক, ডিমেনসিয়া বা স্মৃতিবৈকল্য ইত্যাদি। আবার এঁদের প্রায় ১৫ শতাংশ এসব শারীরিক সমস্যার সঙ্গে ডিপ্রেশন বা বিষাদ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। বয়সকালে অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় না এবং প্রবীণেরাও অনেক সময় এসব উপসর্গের কথা আত্মীয়স্বজনকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন না।
এ কারণে এই রোগের চিকিৎসাও পিছিয়ে যায় বা অবহেলিত হয়। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, বয়স্কদের শতকরা প্রায় ১৫ জন নানা ধরনের বিষণ্নতায় ভোগেন। আর শতকরা চারজন গুরুতর বা জটিল রকমের বিষণ্নতার শিকার। আমাদের দেশে বিষণ্নতায় ভোগে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। বয়োবৃদ্ধদের মধ্যে এই হার প্রায় তিন গুণ। ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে মন-মেজাজ ভালো না থাকা, কোনো বিষয়ে আগ্রহ-উদ্যোগ কমে যাওয়া এবং একধরনের অবসাদ চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে সব সময়। এ ছাড়া মনোযোগের অভাব, মনের ভেতর একধরনের অস্থিরতা, আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া, নিজেকে সব কাজের জন্য অযোগ্য মনে করা, অকারণে বা সামান্য কারণে কান্না, নিজেকে অপরাধী মনে করা, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চরম হতাশা ইত্যাদি। এ ছাড়া ক্ষুধা, ঘুম ও যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া। আত্মহত্যার চিন্তা বা পরিকল্পনাও একটি বড় উপসর্গ। বয়স্কদের বিষণ্নতার কারণগুলো নানা রকমের: সামাজিক, মানসিক ও জৈবিক। সামাজিক কারণগুলোর মধ্যে আছে সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, একাকিত্ব, শোক, দারিদ্র্য, শারীরিক অক্ষমতা ইত্যাদি। মানসিক কারণগুলোর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব,
অন্যের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার অক্ষমতা, শারীরিক অসুস্থতা। জৈবিক কারণগুলোর মধ্যে স্নায়ুকোষের ক্ষয় ও স্নায়ুকোষে জৈব রাসায়নিক পদার্থের অভাব, বংশগত ঝুঁকি ইত্যাদি। বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক অসুখ পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বিষণ্নতার কারণ হতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে রজঃনিবৃত্তি ও ক্যানসার এবং মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত কিছু সমস্যা সরাসরি বিষণ্নতার কারণ হতে পারে। আবার বৃদ্ধ বয়সে নানা রকম শারীরিক অসুস্থতার জন্য প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের ওষুধ খেতে হয়, যা সব সময় সুফল বয়ে আনে না; বরং একসঙ্গে কয়েক রকম ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়ও বিষণ্নতা বেড়ে যেতে পারে। গত তিন দশকে মনোরোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বিষণ্নতা রোগের চিকিৎসাও এখন অনেক সহজলভ্য ও ফলদায়ক। তবে বার্ধক্যে বিষণ্নতার সুচিকিৎসার জন্য শুধু ওষুধই নয়, তার সঙ্গে সাইকোথেরাপিও অত্যন্ত জরুরি। বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে যেকোনো ওষুধ প্রয়োগের সময় কতগুলো বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়। যেমন ওষুধের কার্যকারিতা, সহনীয়তা, নিরাপত্তা বা নির্বিঘ্নতা ও একাধিক ওষুধের সম্ভাব্য মিথস্ক্রিয়া। বয়সকালে দেহের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো যেমন যকৃত, বৃক্ক, হূৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক ইত্যাদির কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে সেবন করা ওষুধের বিপাক ও শরীর থেকে নিষ্ক্রমণ ও ধীরগতিতে হয় কিংবা অনেক সময় স্বাভাবিক থাকে না। ফলে সেবন করা ওষুধের বিপাক ঠিকমতো হয় না, যা অনেক সময় গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়া হিসেবে দেখা দেয়। সুতরাং ওষুধ প্রয়োগের সময় স্বল্পতম কার্যকরী মাত্রায় ওষুধ শুরু করাই বাঞ্ছনীয়।
বর্তমানে বিষণ্নতা রোধকারী বা অ্যান্টিডিপ্রেশেন্ট ওষুধের মধ্যে ট্রাইসাইক্লিক অ্যান্টিডিপ্রেশেন্ট-জাতীয় ওষুধ অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সহজলভ্য। কিন্তু এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার কারণে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও কার্যকরী এসএসআরআই-জাতীয় অ্যান্টিডিপ্রেশেন্ট বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। ওষুধের সঙ্গে সঙ্গে মনোসামাজিক চিকিৎসা, বিশেষ করে মানসিক সমর্থন, রোগ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা প্রদান এবং রোগের পরিণতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান অত্যন্ত ফলদায়ক। কননিটিভ থেরাপি ও কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি বিষণ্নতা রোগের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী মনোরোগ চিকিৎসা। যেসব ক্ষেত্রে এক বা দেড় মাস ওষুধ সেবনের পরও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় না, সেসব ক্ষেত্রে ওষুধের সঙ্গে বৈদ্যুতিক চিকিৎসা বা ইসিটি ভালো কাজ করে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও বার্ধক্যে মানুষকে অনেক কিছু হারাতে হয়। স্বামী স্ত্রীকে হারান, স্ত্রী স্বামীকে। সব বয়সী আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের মৃত্যুসংবাদ কানে আসে। সন্তানেরা দূরে চলে যায়। শূন্য গৃহে একাকিত্ব যেন আরও নিষ্ঠুর হয়ে গ্রাস করতে থাকে। এসবের পরও যা সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় বা বিষাদগ্রস্ত করে তোলে তা হচ্ছে সংসারে ক্রমেই মূল্যহীন হয়ে পড়া, সংসারে নিজের দায়িত্ব-কর্তব্য থেকে সরে গিয়ে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া ইত্যাদি বিষয়। তাই বার্ধক্যে বিষাদ ঠেকিয়ে রাখতে প্রয়োজন প্রবীণদের আত্মমর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।
অধ্যাপক মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী: পরিচালক ও অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।

থ্রিজি প্রযুক্তি : সর্বোত্তম সেবা চাই by রাজীন অভী মুস্তাফিজ

এ মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ও গণমাধ্যমে বহুল একটি আলোচনার বিষয় থ্রিজি। দেশে থ্রিজি প্রযুক্তি এসেছে- এ নিয়ে চারপাশে একটা চাপা উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। থ্রিজি হচ্ছে থার্ড জেনারেশন বা তৃতীয় প্রজন্মের মোবাইল টেলিযোগাযোগের একটি প্রযুক্তি, যা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের দীর্ঘ ১৫ বছরের গবেষণালব্ধ একটি বিশেষ প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে মোবাইল ইন্টারনেট সেবার এক অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটেছে। এনটিটি ডোকোমো নামের একটি জাপানি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান সর্বপ্রথম এ প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছিল, যেটির প্রথম বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয় জাপানে ১ অক্টোবর ২০০১ সালে। ধীরে ধীরে থ্রিজি প্রযুক্তি অন্যান্য দেশেও বিস্তৃতি লাভ করে। বাংলাদেশে এ প্রযুক্তি সেবা পৌঁছতে প্রায় এক যুগ সময় পেরিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত আমরা বিশ্বের আধুনিক এই মোবাইল ইন্টারনেট প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারলাম। যদিও এখন বলা হচ্ছে, ফোর জি বা চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তিও অল্প কিছুদিনের ভেতরেই হাতের নাগালে চলে আসবে।
দ্বিতীয় প্রজন্ম থেকে তৃতীয় প্রজন্ম (টুজি থেকে থ্রিজি) প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু চালিকাশক্তি কাজ করেছে। প্রথমত, মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ধীরগতির ইন্টারনেট নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল, তাদের দাবি ছিল আরও বেশি গতির ইন্টারনেট, যার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে কাজ সম্পন্ন করা যায়। দ্বিতীয়ত, বিশ্বের বড় মোবাইল কোম্পানিগুলো এমন একটি প্রযুক্তির সন্ধানে ছিল, যা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে তুলনামূলক ব্যবসায়িক সুবিধা দেবে, যেখানে অবকাঠামোগত বিনিয়োগের মাত্রা বেশি হওয়ার কারণে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকতে না পেরে অস্তিত্ব হারাবে। উল্লেখ্য, থ্রিজি প্রযুক্তিতে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বেশ বড় অংকের একটি বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়, যেহেতু থ্রিজি প্রযুক্তি একটি বিশেষ তরঙ্গ (ফ্রিকোয়েন্সি) ব্যবহার করে থাকে এবং এই তরঙ্গ ব্যবহারের জন্য সরকারের কাছ থেকে নতুন করে লাইসেন্স নিতে হয় মোটা অংকের ফির বিনিময়ে। তৃতীয়ত, বিশ্বের জনবহুল দুটি দেশ চীন ও ভারতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির কারণে মোবাইল ইন্টারনেটের প্রসারের অপার সম্ভাবনা।
থ্রিজি প্রযুক্তি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কাজ করেছে এর মাধ্যমে ব্যবহৃত ইন্টারনেটের গতি। যেখানে টুজি প্রযুক্তি মূলত ভয়েস কল, টেক্সট মেসেজ, এমএমএস এবং কম গতির ইন্টারনেট সেবা প্রদান করতে সক্ষম, সেখানে থ্রিজি প্রযুক্তি ভয়েস কল, টেক্সট মেসেজ, এমএমএসের পাশাপাশি ভিডিও কল, মোবাইল টিভি সম্প্রচার, দ্রুত ডেটা আদান-প্রদান করতে পারে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে। যদিও এই দুই প্রযুক্তির তুলনা করলে ভয়েস কলে তেমন একটা তারতম্য ঘটে না, কিন্তু ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে কোনো আদান-প্রদানের (ডাউনলোড বা আপলোড) ক্ষেত্রে বিশেষ ইতিবাচক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তবে নতুন এ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য থ্রিজি সহায়ক মোবাইল সেটের প্রয়োজন হয়।
বিটিআরসির তথ্যানুযায়ী জুন ২০১৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটি ৫৬ লাখের কিছু বেশি। এর ভেতর সিংহভাগই মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, যার সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখের মতো। যেহেতু দেশের ছয়টির ভেতর পাঁচটি মোবাইল ফোন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এখন থ্রিজি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তাই আশা করা যায় নিজেদের বাণিজ্যিক সুবিধা লাভের জন্য হলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত সব জায়গায় তাদের থ্রিজি নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করবে এবং উল্লিখিত মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা অল্প কিছুদিনের ভেতরেই এ সেবার আওতায় আসবে। তবে এখনই সব ব্যবহারকারী থ্রিজি ব্যবহারকারীতে রূপান্তরিত হতে পারবে না মূলত দুটি কারণে। প্রথমটি হচ্ছে, একসঙ্গেই সব জায়গায় থ্রিজি সেবা চালু হচ্ছে না- বিভাগীয় শহরগুলো থেকে ধীরে ধীরে অন্যান্য অঞ্চলে এর বিস্তৃতি ঘটবে এবং যা কিছুটা সময়সাপেক্ষ। দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, থ্রিজি সেবা পেতে হলে মোবাইল হ্যান্ডসেটটিতে অবশ্যই থ্রিজি ব্যবহারের সুবিধা থাকতে হবে। সাধারণত সব স্মার্টফোনেই থ্রিজি সেবা পাওয়ার সুবিধা থাকে। তবে আশার কথা হচ্ছে, এ মুহূর্তে বাজারে স্বল্পমূল্যের অত্যাধুনিক স্মার্টফোন পাওয়া যাচ্ছে, যা এই প্রতিবন্ধকতা খুব সহজেই দূর করবে। এবার থ্রিজি প্রযুক্তি নিয়ে কিছু আশার কথা বলি। আমাদের দেশের মোবাইল ফোন প্রতিষ্ঠানগুলো দেশজুড়েই তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে অনেক আগে। যেসব এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি এমন অনেক জায়গায়ই অনেক প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক থাকার কারণে মোবাইল ফোন গণযোগাযোগে একটি ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। আর সেসব এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ বিকল্প বিদ্যুৎ হিসেবে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে সহায়তা করছে। এসব স্বল্পোন্নত এলাকায় দ্রুতগতির এই থ্রিজি সেবা সহজ করে দিতে পারে স্বাস্থ্য যোগাযোগ, কৃষি যোগাযোগ কিংবা শিক্ষার অগ্রযাত্রাসমূহ। এ কারণে আশা করা যাচ্ছে, প্রত্যন্ত এসব অঞ্চলে থ্রিজি সেবা বিবেচিত হতে পারে যোগাযোগ খাতের এক যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে। গণমাধ্যম, বিশেষত বাংলাদেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জন্য মোবাইল টেলিভিশন সম্প্রচার এক অভিনব সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ এই মোবাইল টেলিভিশনের কল্যাণে এখন প্রায় দেশজুড়েই এসব স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখতে পাওয়া যাবে। তাই বাংলাদেশ টেলিভিশনের টেরিস্ট্রিয়াল সুবিধার সঙ্গে লড়াই করার জন্য কিছুটা ইতিবাচক দিক এখান থেকে খুঁজে নিতে পারে বাংলাদেশী স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের এ যুগে এদেশের উপযোগী করে বিভিন্ন স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন সৃষ্টি করতে পারে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বনির্ভরতা।
এবার বলি কিছু আশংকার কথা। থ্রিজি সেবার সাফল্যের অনেকটাই নির্ভর করছে এটির ব্যবহার মূল্যের ওপর। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। ধরা যাক, যে কোনো গ্রাহক আরেকজন গ্রাহকের সঙ্গে ভিডিও কল করবে অর্থাৎ একই সঙ্গে কথাও বলবে এবং দেখতেও পাবে। এখন এই ভিডিও কলটি গ্রাহকের জন্য দ্বিমুখী তথ্য আদান-প্রদানের খরচ (আপলোড ও ডাউনলোড) বহন করবে অর্থাৎ তার ছবি আপলোড হয়ে অপর গ্রাহকের কাছে যাবে, আর অপর গ্রাহকের ছবি ডাউনলোড হয়ে তার কাছে আসবে। কিংবা মোবাইল টিভি দেখার জন্য ব্যয় হবে বেশ খানিকটা ইন্টারনেট ডেটা। ইন্টারনেট সেবার এই ব্যয়ভার যদি সহনীয় মাত্রায় কমিয়ে আনা না যায়, তাহলে হয়তো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ থ্রিজির অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। অন্যদিকে দেশে যে পরিমাণ গতি গ্রাহকদের দেয়া হবে, সেই পরিমাণ গতি যদি থ্রিজি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান তাদের দিক থেকে নিশ্চিত করতে না পারে তাহলে ডেটা প্রেরণের সময় একটি শুভঙ্করের ফাঁকি সৃষ্টি হবে। উল্লেখ করা যেতে পারে, উপমহাদেশের দেশগুলোর ভেতর এখনও বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি।
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক সর্বপ্রথম বাংলাদেশে থ্রিজি সেবা চালু করলেও তা সেভাবে জনপ্রিয় করতে পারেনি। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে প্রাথমিকভাবে ব্যবহারের উচ্চমূল্য, দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহকদের সঠিক তথ্যের মাধ্যমে আগ্রহী করে তুলতে না পারাই প্রধান হিসেবে বিবেচিত হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আশা করি, বাংলাদেশের মোবাইল ফোন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিজ্ঞাপনে শুধু থ্রিজি প্রযুক্তি বাংলাদেশে এসেছে এভাবে গ্রাহকদের আগ্রহী করার পরিবর্তে বরং এই থ্রিজি সেবার ব্যবহারিক দিকগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে, প্রয়োজনে ডেটা গ্রহণ ও প্রেরণের একটা স্বচ্ছ ধারণা দিয়ে ব্যবহার ব্যয়ের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বায়নের এই যুগে সব গ্রাহকই ‘ভ্যালু ফর মানি’ অর্থাৎ যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবে ততটুকু সেবা পাওয়ার পরও আরেকটু কিছু বেশি চায়। সেক্ষেত্রে নতুন এ প্রযুক্তি সম্পর্কে গ্রাহকদের অবহিত করাটাই হওয়া উচিত সর্বপ্রথম কাজ। থ্রিজি প্রযুক্তি কী এবং এর মাধ্যমে একজন গ্রাহক কীভাবে উপকৃত হবে সেটাই যদি সে স্বচ্ছভাবে না জানে, তাহলে সেই প্রযুক্তির প্রতি উদাসীন থাকাটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমার প্রায়ই মনে হয়, মানুষই শুধু প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে না, প্রযুক্তিও আমাদের ব্যবহার করে। তাই নতুন এই থ্রিজি প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষকে সঠিকভাবে অবহিত করতে পারলে উন্নয়নশীল এ দেশের যোগাযোগ খাতে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
রাজীন অভী মুস্তাফিজ : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষক

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কি গণতান্ত্রিক? by ড. কাজী আবদুস সামাদ

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) গত ২৮ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে দেশবাসীকে জানিয়েছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সক্ষমতা নেই। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান তো দূরের কথা, একটি স্বাভাবিক নির্বাচন অনুষ্ঠানেরও যোগ্যতা নেই। কয়েকটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আর কিছু সংসদ সদস্য পদে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানই নির্বাচন কমিশনের যোগ্যতার মাপকাঠি নয়। ৩০০ আসনে দেশব্যাপী জাতীয় সংসদ নির্বাচন একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় এবং এটি একটি জাতীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এটিকে সামাল দেয়া ও ত্র“টিমুক্তভাবে সব ব্যবস্থাপনা করা অত সহজ কোনো কাজ নয়। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়নি এবং করা হয়নি দল নিরপেক্ষ। প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে শুরু করে অন্য কমিশনারদের যোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তোলা হয়েছে নানা মহল থেকে। দেশের অভ্যন্তরে অভিজ্ঞ মহলও একই ধারণা পোষণ করে আসছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, সরকারি দল আওয়ামী লীগ কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কোনো সমালোচনা না করে বরং দৃঢ়তার সঙ্গে বলছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় শতভাগ সক্ষম। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরাই তো বর্তমানে সিইসি এবং কমিশনার। তাই তারা বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী অবশ্যই পক্ষপাতদুষ্ট। একে তো নিরপেক্ষতার অভাব, অন্যদিকে আবার যোগ্যতারও অভাব। এই দুই সমস্যার কারণে স্বভাবতই নির্বাচন কমিশনার নিয়ে জনমনে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে তার সুরাহা হবে কিভাবে? সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন একেকটা একেক দিনে হয়েছে, তার ব্যবস্থাপনা আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা কখনও এক হতে পারে না। তাই দুই ধরনের নির্বাচনকে এক করে দেখছেন যারা, অবশ্যই তারা এক পেশে চিন্তা করছেন।
২৯ সেপ্টেম্বর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মত প্রকাশ করেছে, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কখনোই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে না এবং এই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না এবং কোনো গ্রহণযোগ্যতাও পাবে না। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হলে জাতীয় সংসদ যথাসময়ে ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষও এরই মধ্যে নিরপেক্ষ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়কের অধীনেই নির্বাচন চায়। বিদেশী দাতা সংস্থাগুলো, জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও অন্য দেশগুলো এরই মধ্যে সব দলের অংশগ্রহণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক পরিবেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ওপর পুনঃপুন জোর দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু সরকারি দল এসব বক্তব্যকে কোনোরূপ গুরুত্ব না দিয়ে একতরফা নির্বাচনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সরকারের ভাব দেখে মনে হয়, সরকার যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ কি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নিয়েছিল? কেএম হাসান সাহেবের কি যোগ্যতার কোনো ঘাটতি ছিল? একের পর এক কতবার তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পরিবর্তিত হয়েছিল? একে পছন্দ হয় না, ওকে পছন্দ হয় না, এভাবে কতদিন লেগেছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পর্যন্ত গড়াতে? অর্থাৎ আওয়ামী লীগ মনে করে, তারা যা চায় তা আদায় করে নিতে পারবে, আর বিরোধী দল যা চায় তা আদায়যোগ্য নয়। তাই সরকারের আজ্ঞাবহ, অযোগ্য নির্বাচন কমিশন দিয়েই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। এখানে বিএনপির কোনো জোরালো বক্তব্যও কোনো গুরুত্ব পাচ্ছে না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য কী করেনি? ১৭৩ দিন হরতালসহ ধ্বংস করেছিল দেশের অর্থনীতি আর কত মানুষ যে হত্যা করা হয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই।
বিশ্ববাসীর দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে। সবাই একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন দেখতে চায়। এদেশের রাজনৈতিক অবস্থা এমনই যে, একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্ত হল একটি শক্তিশালী নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং একটি নিরপেক্ষ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। এ দুটি শর্ত পূরণ হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের আর তেমন কোনো বাধা নেই। বিরোধী দল সব সময়ই এ দুটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিক ধারায় গঠন করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। সরকারি দল অন্যদিকে বলছে, জাতীয় সংসদ বহাল রেখে প্রধানমন্ত্রী তার পদে আসীন অবস্থাতেই নাকি সুন্দর, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে বলে এসেছেন, দেশে সুন্দর, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তিনি জাতিসংঘকে বাংলাদেশে পর্যবেক্ষক দল পাঠাতে আগাম অনুরোধ জানিয়ে এসেছেন। যেখানে গোটা বিশ্ব তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়া অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে আস্থাশীল হতে পারছে না, সেখানে সরকারি দল ও মহাজোট এ ব্যাপারে কিভাবে আস্থাশীল হচ্ছে, তা কেউ বুঝতে পারছে না। দেশের ৯০ ভাগ মানুষ যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন চায়, সেটা কি সরকারি দলের কাছে কোনো গুরুত্ব পাচ্ছে না? সরকারি দল এ পরিস্থিতিতে কিভাবে আশা করে যে, একদলীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে যেনতেন করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করবে? জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকা? সেও কি এ যুগে সম্ভব?
আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত কয়েক দিনে যে ভাষায় কথা বলেছেন তা গণতন্ত্র থেকে যোজন যোজন দূরে। তিনি বলেছেন, সরকারি কর্তাব্যক্তিরা সরকারের কথামতো কাজ না করলে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হবে। অর্থাৎ সরকারের অভিপ্রায় মোতাবেক তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকার মতো করে সাজানো নির্বাচনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে, অন্যথায় গুরু শাস্তি হিসেবে বাড়িতে ফেরত যেতে হবে। কোনো সভ্য সমাজে কিংবা দেশে মানুষ এ ভাষায় কথা বলেছে? এটা কি গণতন্ত্রের ভাষা? বরং যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিশেষ বিশেষ লোকদের ক্ষমতায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, তারা দেশদ্রোহী। এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মোহাম্মদ নাসিম আরও বলেছেন, কেয়ামত হয়ে গেলেও আওয়ামী লীগ দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। কথা হচ্ছে, দলীয় সরকার এখন এত জনপ্রিয় একটি মতবাদ হল কেন? কোনো মানুষ যদি এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে ভাবে জগতের সব প্রাণীরই আত্মহত্যা করা সমীচীন। এটিই মুক্তির একমাত্র সোপান, একমাত্র পথ। বিকল্প বলে কিছু নেই। সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপিদের কথা শুনে সেই আত্মহত্যারই কথা মনে হয়। এর থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারছেন না এবং বিকল্পও দেখছেন না। আসলে সরকারি দলের কাছে ক্ষমতাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, দেশের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার কোনো মূল্য নেই। সংঘাত, সংকটময় পরিস্থিতি যে কারও কাম্য নয়, এটা বিবেচনায় নিচ্ছে না সরকারি দল। জার্মানির চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল তৃতীয়বারের মতো চ্যান্সেলর নির্বাচিত হলেন সপ্তাহখানেক আগে। অর্থাৎ ৮ বছর সফল রাজনীতির বখশিশ হিসেবে ওই দেশের জনগণ তাকে আরও ৪ বছরের জন্য এই পদে আসীন রেখেছেন। তার আগে তার অগ্রজ রাজনীতিক ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি হেলমুট কোহল পরপর সর্বোচ্চ ৪ টার্ম (মোট ১৬ বছর) চ্যান্সেলর পদে আসীন ছিলেন। জার্মানি এমনই একটি দেশ। কই সেখানে নির্বাচনের আগে বিরোধী দল তো কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে তা নিয়ে কোনো কথা বলেনি। নির্বাচনের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে, জনগণ যাকে খুশি তাকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করেছেন। এটাকেই বলে গণতন্ত্র। জোর করে কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। আর এটাও ঠিক যে, শুধু নির্বাচনী কৌশলই নির্বাচনে জেতা কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র নিয়ামক নয়। জনকল্যাণমুখী রাজনীতিই হতে পারে এক্ষেত্রে সহায়ক একটি নিয়ামক। সরকার যতই চেষ্টা করুক না কেন, তাদের সাজানো নাটক মঞ্চায়ন করার আগেই মঞ্চ ভেঙে পড়বে। বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, সরকারের মন্ত্রী, এমপিদেরই বাড়ি যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। নির্বাচনকে ঘিরে জনগণের উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের কোনো শেষ নেই। শুধু যে এদেশের জনগণই উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে তাই নয়, বিশ্বব্যাপী বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সরকারি দল সংশ্লিষ্ট দেশী-বিদেশী সব সংস্থা/এজেন্সিকে প্রত্যাখ্যান করছে কেন? সবাইকে প্রত্যাখ্যান করে একেবারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় জোর করে টিকে থেকে কি ফায়দা হাসিল করা যাবে? নাকি গণতান্ত্রিক ভাবধারায় উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনমতের ওপর আস্থা স্থাপন করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত? আমাদের নেতানেত্রীরা গণতন্ত্র বলতে কী বোঝেন? বিশ্ব সভ্যতা, বিশ্বের ইতিহাস কি তাদের জানা নেই? তারা কি এমনি এমনি নেতানেত্রী হয়েছেন? দেশের স্বাধীনতা লাভের পর মাত্র সাড়ে ৩ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আসতে ২১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগ কি সেই ইতিহাস ভুলে গেছে? আওয়ামী লীগ একটি ঘোরের মধ্যে পড়ে গেছে? অশুভ ঘোর থেকে দলটি যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসবে এবং যত তাড়াতাড়ি জনমতকে আস্থায় নিয়ে একটি সর্বজনীন, দেশী-বিদেশী সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করবে, দেশের জন্য ততই মঙ্গল হবে।
ড. কাজী আবদুস সামাদ : অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সম্প্রীতির বন্ধনে উদ্ভাসিত হোক স্বদেশ by নির্মল চক্রবর্তী

দেশের কোথাও না কোথাও প্রায়ই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের দেব-দেবীর প্রতিমা ভাংচুর করা হয়। এগুলোর তেমন আর্থিক মূল্য নেই। কারণ এ প্রতিকৃতিগুলো তৈরির ক্ষেত্রে তেমন মূল্যবান কোনো ধাতব পদার্থ ব্যবহার করা হয় না। আর এসব তেমন দর্শনীয় নয় যে তা বিশেষভাবে আকর্ষণীয় কোনো বস্তু। নয় অনিন্দ্যসুন্দর শোপিস যা লুফে নেয়ার মতো কোনো কিছু। প্রশ্ন হল, তাহলে কেন ওগুলো ভাঙা হয় যখন-তখন? হ্যাঁ, লাভ তো একটা আছেই; সেটা হল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া। একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের মনে কষ্ট দেয়া, তাদের অসম্মান করা। পরোক্ষভাবে অপমান-অপদস্থ করা। যাতে করে তারা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে এ দেশ থেকে চলে যায়। আর সেই সুযোগে তাদের জায়গা-জমি, ভিটেমাটি জোর-জবরদস্তি করে কিংবা অপেক্ষাকৃত কম দামে কিনে রাখা যায়। মূলত হিন্দু সম্প্রদায়কে দমিয়ে রাখার অভিপ্রায়েই তাদের বিগ্রহগুলো ভেঙে ফেলা হয়।
প্রতিমা ভাঙার আরও কিছু বিচ্ছিন্ন কারণ রয়েছে। যেমন- হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু টাউট প্রকৃতির মানুষও এর সঙ্গে জড়িত। তারা নিজেদের মধ্যে দলাদলি, কোন্দল, শরিকানা বিবাদ কিংবা নিতান্তই হিংসার বশবর্তী হয়ে স্বধর্মীয় মানুষের বিপক্ষে অবস্থান নেন। প্রতিদ্বন্দ্বীকে হেয়প্রতিপন্ন কিংবা নিছক নাজেহাল করার উদ্দেশ্যে কখনও কখনও নিজেরাই তাদের ধর্মীয় বিগ্রহের প্রতিকৃতিগুলো ভেঙে চুপচাপ বসে থাকেন। যাতে করে এর দায় মুসলিম সম্প্রদায়ের কারও ঘাড়ে পড়ে, আর তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীকে করা হয় নাজেহাল। আবার কখনও এমনও দেখা যায়, নিজের মন্দিরের বিগ্রহ নিজেই ভেঙে পাড়া-প্রতিবেশীর নামে মামলা করা হয়েছে। সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে তাদের নাম, যারা তাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক শত্র“। তবে এগুলো একবারেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এগুলোর সঙ্গে দেশে চলমান সামগ্রিক মূর্তি ভাঙার কোনো বিশেষ সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না।
মূর্তি ভাঙা, প্রতিমা ভাংচুর, বিগ্রহ চুরি এবং মন্দিরে আগুন দেয়া, মন্দিরের থালাবাটি কিংবা দানের টাকা লুট করার মতো মানসিকতাসম্পন্ন শ্রেণী আলাদা। এরা নিজেদের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুভূতির দিক থেকে একেবারে আঠারো আনা। অর্থাৎ পান থেকে চুন খসলেই উগ্রমূর্তি ধারণ করে। শুধু তাই নয়, ছোটখাটো বিষয়েও মীমাংসায় না গিয়ে রীতিমতো জিহাদ ঘোষণা করে বসে। প্রয়োজনে বিশেষ কোনো দিন-তারিখ ঠিক করে সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যে কোনো অজুহাতেই ভাংচুর, লুটতরাজ কিংবা অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, তারা যে কোনো সংঘাতকে ধর্মের নামে জিইয়ে রাখতে চায়। এরা শুধু নিজেদের ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রদায় ছাড়া আর কোনো ধর্ম কিংবা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষকে মূলত স্বীকৃতি দেন না। তাদের প্রতি কোনো ধরনের সম্মানজনক মনোভাব পোষণ করা তো দূরে থাক, বরং সব সময় অসম্মানজনক পথটিই খুঁজে থাকে।
মন্দিরে হামলা হলে, প্রতিমা ভাংচুর হলে ‘সন্ত্রাসী’ নামটি ব্যবহৃত হয়। প্রশ্ন হল, সমসময় দুর্বৃত্ত কিংবা সন্ত্রাসীরাই কি মূর্তি ভাঙে? সন্ত্রাস, দুর্বৃত্তায়ন আর বেছে বেছে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে মানসিকভাবে আহত করা এক ব্যাপার নয়। কারণ চিহ্নিত সন্ত্রাসী কিংবা দুর্বৃত্ত বলতে এ পর্যন্ত দেশী-বিদেশী এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের কেউ মূর্তি ভেঙেছে কিংবা মন্দিরে হামলা করেছে বলে শোনা যায়নি। তাই বলা যায়, যারা এগুলো করে, তাদের সব সময় সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত কিংবা জঙ্গি আখ্যায়িত করে প্রকৃত অপরাধ ও অপরাধীর দিক থেকে দৃষ্টিকে আড়াল করার অপচেষ্টা কোনোক্রমেই বাঞ্ছনীয় নয়।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমরা কেন বলতে পরি না, হিন্দুর জায়গায় হিন্দু থাকুক, মুসলমান থাকুন মুসলমানের জায়গায়, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান থাকুক তাদের নিজস্ব ধর্মীয় সামাজিক কৃষ্টির জায়গায়। ধর্মীয় আদর্শগতভাবে থাকুক না যে যার মতো করে। কী দরকার অযথা হয়রানি-বিরক্ত করে, উপাসনালয়ে ভাংচুর-হামলা করে তাদের মানসিকভাবে কষ্ট দেয়ার? অন্য ধর্মাবলম্বীরা দেশ থেকে বিতাড়িত হলেই কি নিজেদের শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে? পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, কোনো বিতাড়ন, কোনো হামলা-ভাংচুর কখনও শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ হতে পারে না। মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, কারও মনে তুমি দিও না আঘাত, সে আঘাত লাগে কাবার ঘরে। অথবা পাবিনারে তুই, পাবিনা খোদারে, ব্যথা দিয়ে তারি মানুষের মনে। তাই ভাঙাভাঙির এ অপসংস্কৃতি থেকে আমাদের বের হয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন এ অপসংস্কৃতির ধারক-বাহক-পৃষ্ঠপোষক তথা লালন-পালনকারীদের অপরাধ আড়াল করার মতো হীন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা। তা না হলে ওপরে ওপরে যতই সম্প্রীতির বার্নিশ করা হোক- বিদ্বেষের ঘুণ পোকা ভেতরে ভেতরে কেটেই যাবে। জ্বালিয়ে যাবে ক্রমাগত অশান্তির আগুন। প্রতিমা ভাংচুর, হামলা অব্যাহত থাকবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে। ভেতরে ক্যান্সার রেখে ওপরে মলম পট্টিতে নিরাময় হবে না। মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন, প্রয়োজন চিন্তা-চেতনার উদারতা।
হিন্দু বাঙালি সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। দেখা যায় প্রতিটি মন্দিরে পুলিশের প্রহরা, প্রশাসনের উপস্থিতি, স্থানীয় প্রতিনিধিদের ঘনঘন নজরদারি। এসব দেখে সত্যিই খুব দুঃখ হয়। মাটির প্রতিমা, তাও প্রায় অধিকাংশ অনুদান, চাঁদা ও অনেকের সহায়তায় গড়া, তাও মাত্র কয়েক দিনের জন্য। এর জন্য এত উৎকণ্ঠা? নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার এতই আশংকা যে পাহারার জন্য পুলিশের প্রয়োজন হয়। শহরের কথা না হয় বাদই দেয়া গেল, কারণ সেখানে নানা অচেনা-অজানা মানুষের আনাগোনা। কিন্তু গ্রামে তো সবাই সবাইকে চেনে জানে, একত্রে পাশাপাশি বসবাস করা মানুষ তারা। সেখানে কে মূর্তি বা প্রতিমা ভাঙবে? কারা ভাঙবে? তাদের কি চেনা যাবে না, ধরা যাবে না? আর কেন ভাঙবে,তার কারণ উদ্ঘাটন করা কি এতই কঠিন! আসলে আন্তরিকতার অভাবেই এমনটি ঘটে। ধর্ম নিয়ে, ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। ঠিক নয় সুপরিকল্পিতভাবে কারও সংস্কৃতিতে আঘাত করাও। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দেব-দেবীর প্রতিকৃতি তথা উপাসনার উপকরণাদি ভাংচুর করাসহ উপাসনালয়ে আগুন দেয়াটা নিঃসন্দেহে গর্হিত অপরাধ। এটি যে কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই নিন্দনীয় ও অমানবিক। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যতই দিন যাচ্ছে, বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কারণ প্রতিবারই দেখা যায়, নির্বাচনের ফলাফল যে দলের বিপক্ষে যায়, তারাই চড়াও হন সংখ্যালঘুদের ওপর।
আজন্ম লালিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে এ প্রেতের নৃত্য থামবে কবে? থামবে কবে এ প্রতিমা ভাংচুরের অপসংস্কৃতি? বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় তথা মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা প্রহরামুক্ত হবে কবে? নিশ্চিন্তে নিরাপত্তায় একান্তে একমনে পরমেশ্বরের আরাধনায় আর কি কোনো দিনই বসা যাবে না? এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খায় সময়ের আবর্তে। তারপরও আশা, ভরসা- সব ঠিক হয়ে যাবে। একদিন আবার ফিরে আসবে সম্প্রীতির সেই ঐতিহ্য, হারিয়ে যাওয়া বন্ধন। আমরা সবাই একসঙ্গে সম্মিলিতভাবে অংশ নেব দেশ ও জাতির যে কোনো উন্নয়নে। যে কোনো ব্যর্থতার গ্লানি, যে কোনো সাফল্যের আনন্দ সমানভাবে ভাগ করে নেব। এগিয়ে চলব জাতীয় জীবনের সমৃদ্ধির পথে।
নির্মল চক্রবর্তী : উত্তরবঙ্গ সংবাদের বাংলাদেশ প্রতিনিধি

নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে না

যুগান্তর : বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানের সূচকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান অনেক পেছনে। এ অবস্থার উন্নয়নে কী করণীয়?
এমাজউদ্দীন আহমদ : বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি সঠিক মানে উন্নীত করা না যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নত মানের শিক্ষা যদি অব্যাহত না রাখা যায়, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত। কারণ এতে জাতীয় সম্পদের অপচয় হয়। বাংলাদেশের যে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে তার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। এটি গর্ব করার মতো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ বছরের আন্তর্জাতিক সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাত হাজারেরও নিচে নেমে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং প্রশাসক হিসেবে আন্তর্জাতিক সূচকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অবস্থানে অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমে গেছে এমনটা আমার মনে হয় না। তবে অন্যান্য দেশের মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে না। এটি দুঃখজনক। দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সন্তোষজনক। কাজেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান আরও উন্নত হওয়া উচিত। অন্যান্য দেশের মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো দ্রুত অগ্রসর হওয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগে শিক্ষার কাক্সিক্ষত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের কারণে কোনো প্রার্থী যাতে বাড়তি সুবিধা না পায় সেজন্য কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। কম যোগ্যতা সম্পন্ন কোনো প্রার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার নিয়োগ পেলে এতে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময়ের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কাজেই জাতীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে সক্ষম যোগ্য, দক্ষ ও প্রতিশ্র“তিশীল ব্যক্তিদের নিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
যুগান্তর : দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হলে আন্দোলনের প্রথম শিকার হয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। আন্দোলন শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাদের মনে রাখা দরকার, রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান রাজনৈতিক ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে হওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করার জন্য এসব আনুষঙ্গিক দিকেও সংশ্লিষ্ট সবার বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।
যুগান্তর : বাংলাদেশের অনেক গবেষক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার?
এমাজউদ্দীন আহমদ : আমাদের দেশের অনেক তরুণ শিক্ষার্থী গবেষক বিশ্বের নামিদামি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে গবেষণা করছেন। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপের নামিদামি প্রায় পাঁচশ’ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষকতা ও গবেষণা করছেন। এসব শিক্ষক ও গবেষককে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে তারা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবেন। এসব শিক্ষক-গবেষক বিদেশে যে সুযোগ-সুবিধা পান, তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে একই রকম সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে তাদের অবদানে আমাদের দেশ সমৃদ্ধ হবে। আমি কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় বিভিন্ন দেশের যেসব শিক্ষার্থীকে সেখানে পেয়েছিলাম, পরে জেনেছি ওইসব শিক্ষার্থীর অধিকাংশ তাদের নিজ নিজ দেশ যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জাপানে ফিরে গেছেন। তাদের অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে তারা নিজের দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। সরকার আমাদের কৃতী ব্যক্তিদের মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবে এটাই আমার প্রত্যাশা।
যুগান্তর : সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি কমছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি শূন্য পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য কী করণীয়?
এমাজউদ্দীন আহমদ : ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে আমি খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারছি না। কারণ এখনও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বাণিজ্য, আবাসনের ক্ষেত্রে বাণিজ্য- এসব অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো রকম দুর্নীতি থাকার কথা নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা তুমুল প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে এটাই তো নিয়ম। শিক্ষাঙ্গনে টেন্ডার বাণিজ্যের কথা আমরা প্রায়ই শুনি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন অনলাইনে টেন্ডার আহ্বান করে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো যায়। ২০ বছর আগেও আমাদের দেশের শিক্ষাঙ্গনের সার্বিক পরিবেশ বর্তমানের পরিবেশ থেকে অনেক উন্নত ছিল। অন্যান্য দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির কোনো সুযোগই নেই। তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে তারা বেড়ে উঠছে। বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে দুর্নীতি শব্দটি ঘৃণার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
যুগান্তর : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ : আমাদের দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়নি। দশ বা বারো বছর একটি বিশ্ববিদ্যালয় সুষ্ঠুভাবে গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট সময় নয়। তবে দে আর ইউনিভার্সিটিস ইন দ্য মেকিং। দেশের কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি সন্তোষজনক। বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান পরীক্ষার জন্য এক্রেডিটেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছি। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিভাগ ভালো করছে অথবা কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভালোভাবে চলছে তা নির্ণয়ের জন্য এক্রেডিটেশন কাউন্সিল গঠন করা দরকার। এখনও তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশে ১৫ থেকে ২০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বচ্ছন্দে প্রথম শ্রেণীর বিশ্ববিদ্যালয় বলে মনে করা যেতে পারে। কিন্তু পনের-বিশটি বিশ্ববিদ্যালয়েরও কিছু অসম্পূর্ণতা আছে। খেলার মাঠ, বড় অডিটোরিয়াম- এসব অসম্পূর্ণতা পূরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে খাসজমি প্রদান করে সহযোগিতা করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ই বেসরকারি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতপক্ষে পরিচিতি পায় শিক্ষার মান ও গবেষণার মান কেমন তার ওপর। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কৃতিত্বের ওপরও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম অনেকটাই নির্ভর করে। সম্প্রতি আরও কয়েকটি প্রাইভেট ভার্সিটি অনুমোদন পেয়েছে। এতগুলো প্রাইভেট ভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত না হলেও চলত। রাজধানীতে বর্তমানে ৪৩টি প্রাইভেট ভার্সিটি রয়েছে। অথচ ঢাকা মহানগরী টোকিওর মতো বড় শহর নয়, কিংবা লন্ডন বা নিউইয়র্কের মতো বড় শহর নয়। তাই রাজধানীতে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়ার আগে কর্তৃপক্ষের এসব বিষয়ও বিবেচনা করা উচিত। যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য সরকারের পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবকরা বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকেন। একইসঙ্গে সমাজটাই যে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে থাকে। কোথাও কোনো বিচ্যুতি ঘটলে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দিনও যাতে অপচয় না হয় সেদিকে আমরা তীক্ষ্ণ নজর রাখি। এখানে কোনো শিক্ষার্থীকে ফল প্রকাশের জন্য তিন-চার মাস অপেক্ষায় থাকতে হয় না; হয়তো তিন-চার দিন অপেক্ষা করতে হয়। সরকার প্রাইভেট ভার্সিটিকে খাসজমি প্রদানের ক্ষেত্রে উদারতার পরিচয় দিলে অনেক প্রাইভেট ভার্সিটির শিক্ষার মানে আমূল পরিবর্তন আসবে।
যুগান্তর : দাবি আদায়ের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখার বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : শিক্ষক কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অবরুদ্ধ থাকার বিষয়টি একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। উপাচার্য পদটি আরও অতি মর্যাদাপূর্ণ একটি পদ। কাজেই অবরুদ্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির আগেই একজন উপাচার্যের অন্যত্র সরে যাওয়া উচিত। উপাচার্যের পদটি ক্ষমতা প্রদর্শনের পদ নয়। এটি অত্যন্ত সম্মানের পদ। তাই এসব বিবেচনায় রেখেই উপাচার্যকে প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হয়। এ রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে উপাচার্যের পদত্যাগ করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদটি সীমাহীন দায়িত্বের পদ এবং অত্যন্ত সম্মানজনক পদ। নিজের মর্যাদা যাতে অক্ষুণœ থাকে, একজন উপাচার্যকে সেদিকে সব সময় তীক্ষè নজর রাখতে হবে।
যুগান্তর : শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের গতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ : শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। শ্রীলংকা, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এসব দেশে শিক্ষা খাতে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, আমাদেরও শিক্ষা খাতে সেসব দেশের মতো বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে জিডিপির ২.২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয় অথচ শ্রীলংকায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয় জিডিপির ৩.৫০ শতাংশ। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ালে তা আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীকে মানব সম্পদে পরিণত হতে সহায়তা করবে। ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় আমাদের দেশের অর্থনীতি এখন ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকদের প্রেরিত অর্থ আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। এ স্বল্প শিক্ষিত তরুণদের দক্ষ কর্মী হিসেবে বিদেশে প্রেরণ করা গেলে তাদের প্রেরিত অর্থে আমাদের অর্থনীতি দ্রুত সমৃদ্ধ হতে পারে। এজন্য শিক্ষানীতিতে গৃহীত এ বিষয়ক পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সারাদেশে অনেক প্রাইমারি স্কুলেই খেলার মাঠ নেই, অনেক হাইস্কুলে লাইব্রেরি নেই, মফস্বলের অনেক সরকারি কলেজে অনেক বিষয়ে শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেন না; শিক্ষকের সংখ্যাও অপ্রতুল। এসব কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরও কোনো কোনো শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শুদ্ধভাবে বলতে ও লিখতে পারে না। ব্রিটেনে প্রাথমিক স্তরেই শিক্ষার্থীদের ভাষা শিক্ষার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।
আমাদের শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকারকে প্রচুর অর্থ বরাদ্দের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। মেধাবী তরুণ-তরুণীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য আকর্ষণীয় বেতনের ব্যবস্থা করতে হবে।
যুগান্তর : ডাকসু, চাকসু, রাকসু- এসব নির্বাচন হচ্ছে না বহু বছর ধরে। এতে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায় কী ধরনের প্রভাব পড়ছে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : ডাকসু, চাকসু, রাকসু- এসব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। সরকারি ও বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাত গুটিয়ে না নিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে এসব নির্বাচন হবে না। ডাকসু, চাকসু, রাকসুর নির্বাচনে প্রার্থী কে হবে তা ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধী দলই ঠিক করে দেয়। এখন ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের মধ্যে অসহিষ্ণুতা এতই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে যে, এ মুহূর্তে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়া হলে নানা জটিলতা দেখা দেবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত করা গেলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক জটিলতা থাকবে না।
যুগান্তর : জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার ও বিরোধী দলগুলোর কী করণীয়?
এমাজউদ্দীন আহমদ : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলগুলোকে আলোচনার মাধ্যমে তাদের পারস্পরিক অবিশ্বাস কমাতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধী জোটের মধ্যকার অনাস্থা ও অবিশ্বাসের জায়গাটা হিমালয়ের মতো উঁচু। এ অবস্থায় নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ নির্দলীয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সংসদ না ভেঙে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় ব্রিটেন ও ভারতের পার্লামেন্টকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া হয়েছিল। ‘হাউস অব কমন্স’ না ভেঙে ব্রিটেনে কখনোই নির্বাচন হয়নি। ভারতেও লোকসভা অক্ষুণ্ন রেখে নির্বাচন হয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট এবং বিরোধী জোটের মধ্যে যে অসহনীয় অবিশ্বাস এবং তীব্র অনাস্থা বিদ্যমান- এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে- সব দলের জন্য একসঙ্গে নির্বাচনের সুযোগ তৈরি করতে হলে নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া অনুষ্ঠিত নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
যুগান্তর : সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় যাতে নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করে তার ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সামরিক বাহিনী কতটা সম্পৃক্ত থাকবে- এ বিষয়েও নির্বাচন কমিশনকে আগে থেকে বিস্তারিত পরিকল্পনা করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নির্বাচন কমিশন কী কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে সবার আস্থা অর্জন করতে হবে।
যুগান্তর : নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে কী করণীয়?
এমাজউদ্দীন আহমদ : নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বহু কারণ রয়েছে, যা স্বল্প পরিসরে আলোচনার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। সংক্ষেপে শুধু বলব- সাধারণ মানুষের সামনে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের বড়ই সংকট। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। দায়বদ্ধতা সৃষ্টির জন্য সামগ্রিকভাবে সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পরও অনেকের নৈতিক মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনা আদর্শস্থানীয় হয় ওঠেনি।
যুগান্তর : আন্তঃগ্রহের অভিযানে উন্নয়নশীল দেশের জনগণের অংশগ্রহণ একেবারেই সীমিত পর্যায়ে থাকবে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণায় কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
এমাজউদ্দীন আহমদ : বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যেই ব্যতিক্রমী অনেক গবেষণা চলছে। আন্তঃগ্রহের অভিযানের প্রেক্ষাপটে সেসব গবেষণা আরও জোরদার করতে হবে। এতে জ্ঞানের দিগন্ত আরও বিস্তৃত হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো দক্ষ মানবসম্পদ দিয়ে এসব অভিযানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে। —

মালালার আত্মজীবনী প্রকাশ

মঙ্গলবার লন্ডন থেকে প্রকাশিত হল মালালা ইসুফজাইয়ের আত্মজীবনী। ‘আই অ্যাম মালালা : দ্য গার্ল হু স্টুড আপ ফর এডুকেশন অ্যান্ড ওয়াজ শট বাই দ্য তালেবান’ নামের আত্মজীবনীটির সহ-লেখক ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস্টিনা ল্যাম্ব। এতে মালালা ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর পাকিস্তানের সোয়াতে তার ওপর তালেবানের হামলার মুহূর্তটির বর্ণনা দেয়। সে বলছে, বান্ধবীদের সঙ্গে যাওয়ার পথে স্কুলবাসে দু’জন বন্দুকধারী ওঠে। এদের একজন আমার মাথা বরাবর একের পর এক ৩টি গুলি চালায়। হাসপাতালে যখন আমাকে নেয়া হল তখন আমার চুল ও বান্ধবী মনিবার কোল রক্তে ভেসে যায়। মালালার মাথায় এ সময়ে লম্বা চুল ছিল। বইটিতে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সোয়াত উপত্যকায় ২০০০ সালের মাঝামাঝি তালেবানের বর্বর শাসনামলে মালালার জীবনযাপনের চিত্র উঠে আসে। এছাড়া এতে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে মালালার সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছার কথাও তুলে ধরা হয়।
বর্তমানে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় নগরী বার্মিংহামে বসবাসরত মালালা নিজেকে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে সেদেশের জন্য কাতরতার কথাও তুলে ধরে। মালালা পাকিস্তানে ফেলে আসা বন্ধুদের সঙ্গে স্কাইপিতে দীর্ঘসময় ধরে কথা বলে, তাদের সঙ্গে সময় কাটায়। এছাড়া হামলার কয়েক মাস আগ থেকে সে যে তালেবানের কাছ থেকে হুমকি পাচ্ছিল সে কথাও রয়েছে তার আত্মজীবনীতে। সে বলছে, রাতে সবাই না ঘুমুনো পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করতাম। পরে প্রতিটি দরজা ও জানালা পরীক্ষা করে ঘুমুতে যেতাম। তবে হুমকিতে আমি ভয় পাইনি। কারণ আমার মনে হতো, একদিনতো সবাইকেই মরতে হবে। ‘আমি যা করতে চাই তাই করা উচিত’ বলে আমার মনে হয়েছে।