Wednesday, June 18, 2025
ইরানে ইসরায়েলের হামলায় ফিরে আসছে অপারেশন ব্যাবিলনের স্মৃতি by আসজাদুল কিবরিয়া
মিলটা সামান্য হলেও কাকতালীয় না পরিকল্পিত, তা বলা কঠিন। তবে এটা অনুমান করা যায়, সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনশাম বেগিনের নির্দেশে ৪৪ বছর আগে প্রায় কাছাকাছি দিন-তারিখে চালানো অভিযানের সাফল্য ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে কিছুটা অনুপ্রাণিত করেছে।
সেটা ছিল ১৯৮১ সালের ৭ জুন, রোববার। চিন্তা করেই বেছে নেওয়া হয়েছিল দিনটা। দুপুরের পরপরই কয়েকটি ইসরায়েলি সিএইচ-৫৩ হেলিকপ্টারে চেপে বসেন দেশটির বিমান পাইলট উদ্ধারকারী দলের কয়েকজন সদস্য।
বেলা তিনটার দিকে জর্ডান সীমান্তের পশ্চিম দিকে ১০০ ফুট ওপরে হেলিকপ্টারগুলো শূন্যে ভাসতে থাকে। তখনো এর আরোহীরা জানেন না যে ঠিক কী হতে যাচ্ছে। তবে একটা নির্দেশ স্পষ্ট, খানিক পরেই যে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো উড়ে যাবে, সেগুলোর কোনোটি বিধ্বস্ত হলে বা অন্য কোনো কারণে পাইলট ভূপতিত হলে তাঁকে উদ্ধার করার জন্য অন্য যেকোনো দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করতে হবে।
ঠিক বিকেল চারটার দিকে সিনাই মরুভূমির (১৯৭৯ সালে মিসরের সঙ্গে শান্তিচুক্তি হলেও তখনো ইসরায়েল পুরো সিনাই উপত্যকার দখল ত্যাগ করেনি) এৎজায়ন বিমানঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি আটটি এ-১৬ যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন শুরু করল।
প্রতিটিই দুটি করে এমকে ৮৪ বোমা, দুটি করে এআইএম-৯এল সাইডউইনডার মিসাইল, একটি করে ৩০০ গ্যালন ফুয়েল ট্যাংক এবং ডানার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ৩৭০ গ্যালন করে দুটি বাড়তি ফুয়েল ট্যাংক বহন করছিল। বিমানগুলোর গন্তব্য ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আল-তুয়াতিয়াহ। আর এ যুদ্ধবিমানগুলোকে পথ দেখানো ও পাহারা দেওয়ার জন্য আরও কয়েকটি এফ-১৫ বিমান যোগ দেয়।
----- ২.
ইসরায়েলের সীমান্ত পেরিয়ে জর্ডানের আকাশসীমা প্রবেশকালে আকাবা উপসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এটা চোখে পড়ে বাদশাহ হোসেনের। তিনি তখন তাঁর ইয়টে অবকাশ যাপন করছিলেন। একজন অভিজ্ঞ যুদ্ধবৈমানিক হিসেবে হোসেন মুহূর্তেই আঁচ করে ফেলেন, কী হতে যাচ্ছে। তিনি দ্রুত ইরাকে একটি সতর্কতামূলক বার্তা পাঠান। তবে অজ্ঞাত কারণে তা আর পৌঁছায়নি।
উত্তর দিকে জর্ডানের ও দক্ষিণ দিকে সৌদি আরবের রাডার ফাঁকি দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানগুলো মরুভূমির সমতল থেকে মাত্র ১৫০ ফুট ওপর দিয়ে ও এলোমেলোভাবে দ্রুত এগোতে থাকে। জর্ডান ও ইরাকের জঙ্গি বিমান তাদের বাধা দেবে, এটা ধরে নিয়েই অগ্রসর হচ্ছিল ইসরায়েলি বিমানগুলো। কিন্তু বিনা বাধায় তারা ইরাকের আকাশসীমায় প্রবেশ করে।
দজলা (ইউফ্রেতিস) নদী অতিক্রম করার পর ইরাকি জঙ্গি বিমানের বাধা আসবে বলে যে ধারণা করা হয়েছিল, সেটাও ভুল প্রমাণিত হলো। ফোরাত (তাইগ্রিস) নদী অতিক্রমের সময় ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানগুলোর দৃষ্টিসীমায় চলে এল আল-তুয়াতিয়াহতে নির্মাণাধীন ওসিরাক পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্রের গোলাকার গম্বুজ। এখানেই ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ফরাসি সহায়তায় পারমাণবিক বোমা তৈরির কাজ চালাচ্ছিলেন।
এফ-১৫ বিমানগুলো ততক্ষণে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উঠে গেছে। মূল কাজটা করবে এফ-১৬ বিমানগুলো, যেখান থেকে তখন ছাড়া হলো শিখা ও তুষ। উদ্দেশ্য মিসাইল ও রাডারকে বিভ্রান্ত করে ফাঁকি দেওয়া। লক্ষ্যবস্তুর চার মাইল দূরে থাকতে এফ-১৬ জঙ্গি বিমানগুলো পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতায় খাড়া উঠে গেল। আর তারপরই দ্রুতগতিতে ধেয়ে এল ওসিরাকের রিঅ্যাক্টরের দিকে। একের পর এক মোট ১৪টি বোমা বর্ষিত হলো গোলাকার গম্বুজের ওপর। আর দুটি বোমা পরল লক্ষ্যবস্তুর বাইরে। মাত্র ৮০ সেকেন্ডে কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে গেল সাদ্দাম হোসেনের পারমাণবিক বোমা তৈরির সব প্রয়াস।
এদিকে ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানের হামলায় ভ্যাবাচেকা খেয়ে দ্রুত ছুটে এলেন ওসিরাকের চারপাশে মোতায়েন করা বিমানবিধ্বংসী কামানের চালকেরা। তাঁরা তখন ক্যাফেটেরিয়ায় খাচ্ছিলেন। কামান থেকে যখন গোলা ছোড়া হলো, তখন ইসরায়েলি জঙ্গি বিমানগুলো দ্রুত সরে যাচ্ছে। রাডার–ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় তা চালু না করে এলোমেলোভাবে ছোড়া গোলা কোনো ক্ষতিই করতে পারেনি এসব বিমানের। কোনো রকম বাধাবিঘ্ন ছাড়া আবার সৌদি আরব ও জর্ডানের আকাশসীমা অতিক্রম করে নিরাপদে নিজেদের ঘাঁটিতে ফিরে এল বিমানগুলো। মোট ৩ ঘণ্টা ১০ মিনিট আকাশে উড্ডয়ন করতে হয়েছিল তাদের।
------ ৩.
এই বিমান হামলায় একজন ফরাসি কারিগর নিহত হন। খ্রিষ্টান হওয়ার কারণে ফরাসি ও ইতালির বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও কারিগরেরা রোববার সাপ্তাহিক ছুটি পালন করবে বিবেচনায় বেগিন এদিন হামলার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, যেন তাঁদের কোনো ক্ষতি না হয়। তবে ইরাকের প্রচলিত সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবারেই তাঁদের ছুটি পালন করতেন, যা ইসরায়েলিদের জানা ছিল না। অবশ্য যখন হামলা হয়, তার আগে প্রায় সবাই কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করেছিলেন।
ক্ষিপ্ত-রাগান্বিত সাদ্দাম হোসেন আকাশ প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত কমান্ডার ও তাঁর অধীনস্থ মেজর পদের ওপরের সব কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আরও ২৩ জন কর্মকর্তা ও পাইলটকে কারাগারে পাঠানো হয়।
ইরাকে হামলার ঘটনাটি পরদিন প্রকাশিত হলে বিশ্বজুড়ে বেশ হইচই পড়ে যায়। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়তে একে ‘অমার্জনীয় ও অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন আগ্রাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ইসরায়েলে এফ-১৬ সরবরাহ বন্ধ করে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডাহেইম একে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেন। নিরাপত্তা পরিষদ কঠোর ভাষায় এ হামলার নিন্দা জানায়।
------- ৪.
ওই হামলার ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বেগিন রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পান। জুন মাসেই ছিল ইসরায়েলের নির্বাচন, যেখানে তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন লেবার পার্টির নেতা শিমন পেরেজ। নির্বাচনে লিকুদ পার্টির বেগিন জয়লাভ করেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী এজার ওয়াইজম্যান এ রকম কোনো অভিযানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে বেগিন সমর্থন পান তাঁর মন্ত্রিসভার কৃষিমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন (যিনি পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন), পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইজ্যাক শামির, সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাফায়েল এইটান এবং বিমানবাহিনীর প্রধান ডেভিড আইভরি। ওয়াইজম্যান পদত্যাগ করলে বেগিন নিজে কিছুদিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করে শ্যারনের হাতে এর ভার ছেড়ে দেন।
মূলত ১৯৭৮ সাল থেকেই ওসিরাকে হামলা চালানোর পরিকল্পনা শুরু করেন বেগিন। ১৯৮০ সালের অক্টোবরে গোপনে মন্ত্রিসভায় এ হামলা পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। তার আগে জুলাই মাস থেকে জনপরিসরে ইরাকের পারমাণবিক বোমা তৈরির বিষয়টি আলোচনায় আনা হয়। এটাও বলা হতে থাকে যে ইসরায়েল প্রয়োজনে এই হুমকি মোকাবিলায় হামলা চালাবে। শেষ পর্যন্ত তা–ই হয়েছে; ‘অপারেশন অপেরা’ সাংকেতিক নাম ব্যবহার করে এই অভিযান সম্পন্ন করা হয়, যা ‘অপারেশন ব্যাবিলন’ নামেও পরিচিত।
-------- ৫.
৪৪ বছর পর বেগিনের মতোই কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ১৩ জুন ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। ২০০টি জঙ্গি বিমান দুই দফা হামলা করে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কারখানাগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং নাতানজ ও ফরদৌতে পারমাণবিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে।
এ ছাড়া ইরানের হামলায় দেশটির সেনাপ্রধান ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রধানসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার নিহত হন। ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ছয়জন পরমাণুবিজ্ঞানীও নিহত হয়েছেন। এরপর অবশ্য ইরান পাল্টা আঘাত হেনেছে ইসরায়েলে ড্রোন ও মিসাইল ছুড়ে। পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে, যাতে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি।
কয়েক বছর ধরে এ হামলা চালানোর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন সময় হামলা করার হুমকি তো দেওয়া হয়। এবার ইসরায়েল তা বাস্তবে রূপ দিল।
------- ৬.
অপারেশন ব্যাবিলনের ২৬ বছর পর ২০০৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল একই রকম হামলা চালিয়ে সিরিয়ার আণবিক কর্মসূচি স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়। তবে সিরিয়ার সরকার কখনোই স্বীকার করেনি যে কোনো ধরনের পারমাণবিক কর্মসূচি তারা নিয়েছিল। তবে ইসরায়েলি হামলায় সামরিক স্থাপনার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছিল। ইসরায়েল ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সিরিয়ায় এই হামলার কথা স্বীকার করে তা বিস্তারিত প্রকাশ করে।
আবার ইরাকের ওসিরাকে ইসরায়েলি হামলার বছরখানেক আগে ইরান ছোটখাটো হামলা চালিয়ে কিছু ক্ষতিসাধন করেছিল। বড়সড় হামলা চালালে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে, আশঙ্কায় ওসিরাক রিঅ্যাক্টরে আঘাত করেনি ইরানি জঙ্গি বিমান। কাজটা পরে সম্পন্ন করে ইসরায়েল। আর ১৯৯১ সালে অপারেশন ‘ডেজার্ট স্ট্রর্ম’–এর সময় মার্কিন বাহিনী ওসিরাকে হামলা চালিয়ে ওখানে যা অবশিষ্ট ছিল, তা গুঁড়িয়ে দেয়।
ইসরায়েলের ইরাক অভিযানে সবচেয়ে বেশি উদ্দীপ্ত হয়েছিল ভারত। পাকিস্তানের কাহুতায় অবস্থিত পারমাণবিক স্থাপনায় একই কায়দায় আঘাত হানার চিন্তা শুরু হয়। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার গড়ে তোলার প্রয়াসে ভারতের চেয়ে ইসরায়েলই বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারকে লেখা চিঠিতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাঁর উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, পাকিস্তান ও লিবিয়া মিলে আণবিক অস্ত্র বানাচ্ছে।
অপারেশন ব্যাবিলনের সাফল্য ইসরায়েলকে প্রবল আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। সে ভারতকে পাকিস্তানে হামলার জন্য সব রকম সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। সেই সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। ভারত-ইসরায়েল যৌথভাবে এ হামলা করবে বলে ঠিক হয়। গুজরাটের জামনগর বিমানঘাঁটিকে প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হয় অভিযানের জন্য জঙ্গি বিমান ওড়াতে। আর উদমাহপুর ঘাঁটিকে নির্ধারণ করা হয় জ্বালানি পুনর্ভরণের জন্য।
১৯৮৪ সালের মার্চ মাসে ইন্দিরা এ বিষয়ে সম্মতি দেন; তার আগে অবশ্য বাতাসে কথা ছড়িয়ে পড়ে যে পাকিস্তানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করতে যাচ্ছে ভারত। সে সময় অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পাকিস্তানের একজন পরমাণুবিজ্ঞানী ভারতের আণবিক শক্তি কমিশনের প্রধান রাজা রামান্নাকে এই বলে সতর্ক করেন যে ভারত কাহুতায় হামলা করলে পাকিস্তান ট্রমবেতে ভারতীয় পারমাণবিক কেন্দ্রে পাল্টা আঘাত হানবে। তারপরও ভারত সরকার তাদের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে থাকে। হঠাৎ হামলা চালিয়ে যথাসম্ভব ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ধ্বংস করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। সে কারণে ইসরায়েলের সহযোগিতায় গোপনে প্রস্তুতি চলতে থাকে।
কিন্তু এ ধরনের খবরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ভারতকে সতর্ক করেন হামলা–পরবর্তী পরিণতির জন্য। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ গোপনে পাকিস্তানকে ভারতের পরিকল্পনা সম্পর্কে আভাস দেয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের এবিসি টেলিভিশনে প্রচারিত এক খবরে কাহুতায় ভারতীয় হামলার পরিকল্পনার কথা ফাঁস করা হয়। পরিস্থিতি গুরুতর আঁচ করতে পেরে পাকিস্তান কাহুতার আশপাশে সামরিক প্রতিরক্ষা জোরদার করে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া এফ-১৬ দিয়ে ভারতে পাল্টা হামলা চালাবে বলে জানান দেয়।
এমতাবস্থায় ইন্দিরা গান্ধী কাহুতা অভিযানের সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেন। এর কিছুদিন পর তিনি দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। ভারতীয়দের কেউ কেউ বিশেষত বিজেপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা মনে করেন, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা মারাত্মক ভুল করেছেন। তাঁরা এটাও মনে করেন যে মোদির উচিত হবে ইসরায়েলি সহযোগিতায় পাকিস্তানের আণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো। ইসরায়েল গত শুক্রবার থেকে ইরানে হামলা চালানো শুরু করার পর তাঁদের মধ্যে এ দাবি ও উত্তেজনা জোরদার হয়েছে।
লক্ষণীয় হলো, ১৯৮৮ সালে ভারত ও পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় এক চুক্তিতে উপনীত হয়; যার মূলকথা হলো, এক দেশ অন্য দেশের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করবে না। এই চুক্তির অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত প্রতিবছর ১ জানুয়ারি ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লি নিজ নিজ দেশের পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করে আসছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত–পাকিস্তানের এ রকম ‘সমঝোতা’ কত দিন বহাল থাকবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়েছে।
(তথ্যসূত্র: এয়ারফোর্স ম্যাগাজিন, এপ্রিল ২০১২; দ্য ওয়ারফেয়ার হিস্ট্রি নেটওয়ার্ক, দ্য ইকোনমিক টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়া)
* আসজাদুল কিবরিয়া, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ভবনে উদ্ধারকাজ করছেন ইরানি রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা। ছবি: এএফপি |
Thursday, April 10, 2025
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা: অপরাধের শত বছর, অন্যায়ের ৮০, পাপের ৬৯ by আসজাদুল কিবরিয়া
‘মহামান্য (ব্রিটিশ) সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য জাতীয় আবাসভূমি গড়ে তোলার বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে আর এই লক্ষ্য অর্জনে তার সর্বোত্তম প্রয়াস প্রয়োগ করা হবে এবং এটাও পরিষ্কার যে এমন কিছু করা হবে না, যা ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের নাগরিকদের ধর্মীয় অধিকার কিংবা অন্য কোনো দেশে ইহুদিদের বিরাজমান অধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষুণ্ন করতে পারে।’
আজ থেকে শতবর্ষ আগে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার বালফোর ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর এই ছোট্ট পত্রটি লিখেছিলেন জায়নবাদী নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে। এটি কালক্রমে বালফোর ঘোষণাপত্র নামে পরিচিতি পায়। এর মধ্য দিয়ে তিনি জায়নবাদ নামক উগ্র ইহুদিবাদ বা ইহুদি জাতীয়তাবাদকে স্বীকৃতি দেন, যা এক মহা বিপর্যয়ের দ্বার খুলে দেয়।
বালফোর অবশ্য জেনে-বুঝেই কাজটি করেছিলেন। আর বছরটি ছিল ১৮৯৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করা বিশ্ব জায়নবাদী সংস্থার (ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন) ২০তম বছর।
জায়নবাদীরা বাইবেলকে আশ্রয় করে সুনিপুণভাবে এক কল্পকাহিনি সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার দীর্ঘমেয়াদি এক প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছিল। বালফোরও জানতেন, যুগের পর যুগ ধরে নিজ ভূখণ্ডে বসবাসকারীদের বিতাড়িত করে ধর্মগ্রন্থভিত্তিক কল্প-কাহিনি আশ্রিত এক মিথ প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করা অপরাধ। বালফোর অপরাধটি করেছিলেন। এ জন্য তাঁর ও তাঁর সহযোগীদের কোনো পরিতাপ ছিল না।
বালফোর ঘোষণার তাৎপর্য বেড়ে যায় এ জন্য যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে অটোমান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ব্রিটিশদের অধীনে চলে যায়। ১৯২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশরাজ ম্যানডেটরি প্যালেস্টাইনের শাসনভার গ্রহণ করে, যা চলে ১৯৪৮ সালের মে মাস পর্যন্ত। এটি ছিল জর্ডান নদীর পশ্চিম দিকের ভূখণ্ডে, যেখানে আজকের ইসরায়েল অবস্থিত।
ব্রিটিশরা ফিলিস্তিনের শাসনভার গ্রহণ করার পর থেকেই সেখানকার ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি আরব অধিবাসীর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ ও দমননীতি শুরু করে। দীর্ঘ মেয়াদে ইহুদিদের জন্য ঈশ্বর ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’ (প্রমিজড ল্যান্ড) তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে ইহুদি সেটেলারদের বিভিন্নভাবে অগ্রাধিকার সুবিধা দিতে থাকে।
দলে দলে ইহুদিরা ইউরোপ ও অন্য আরব দেশ থেকে ফিলিস্তিনে পাড়ি জমাতে শুরু করে। ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ মদদেই অভিবাসী ইহুদিদের নিয়ে ১৯২১ সালেই গঠন করা হয় হাগানাহ নামের আধা সামরিক বাহিনী। এরপর আরও দুটি জায়নবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ইরগুন ও স্টার্ন গ্যাং গড়ে ওঠে পরে।
ফিলিস্তিনিরা সন্ত্রাসবাদী বলে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্ব দশকের পর দশক ধরে প্রচারণা চালিয়ে তাদের ওপর ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও হত্যাযজ্ঞকে বৈধতা দিচ্ছে, অথচ ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে হাগানাহ, ইরগুন ও স্টার্ন গ্যাং একীভূত হয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়।
বালফোর ঘোষণার ২০ বছর পর বা আজ থেকে ৮০ বছর আগে ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকারের নিয়োগকৃত পিল কমিশন ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে একটি ছোট ইহুদি রাষ্ট্র গঠন করে সেখানকার আরবদের পূর্বে ট্রান্স জর্ডান ও পশ্চিমে মিসরসংলগ্ন বৃহত্তর অংশে স্থানান্তরের এবং জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ছিটমহল হিসেবে রাখার প্রস্তাব দেয়। আরবেরা এটি প্রত্যাখ্যান করলেও জায়নবাদী নেতারা এতে সমর্থন দেন। কেননা পিল কমিশন অন্যায়ভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
১৯৩৯-৪৫ কালপর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল আর জার্মানিতে হিটলারের চরম ইহুদিবিদ্বেষ জায়নবাদীদের জন্য বিরাট সুযোগ এনে দেয়। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইউরোপে কমবেশি ৬০ লাখ ইহুদিকে নিধন করা হয়, যা ইতিহাসে হলোকাস্ট হিসেবে স্বীকৃত। যুদ্ধ শেষে এই হলোকাস্টই ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি স্থাপনের সবচেয়ে বড় যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
পশ্চিমা বিশ্ব বেমালুম এটা ভুলে যায় যে ইহুদি গণহত্যার দায় ইউরোপের, অথচ ক্ষতিপূরণের জন্য মূল্য গুনতে হচ্ছে আরবদের, বিশেষত ফিলিস্তিনিদের। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর সদ্য গঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে দুই ভাগ করার প্রস্তাব অনুমোদনের মধ্য দিয়ে কফিনের শেষ পেরেকটি বুঝি পুঁতে দেওয়া হয়।
এদিকে জায়নবাদীরা নিজ ভূখণ্ড থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার ছক কেটে ফেলে। প্ল্যান দালেত বা প্ল্যান ডি নামে এই পরিকল্পনার নেতৃত্বে ছিলেন ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ান। পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী বেন গুরিয়ান ১৯০৬ সালে অটোমান ফিলিস্তিনে অভিবাসী হয়ে আসেন এবং কট্টর জায়নবাদী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।
প্ল্যান ডি ছিল হত্যা-ধর্ষণ-লুটতরাজ-সন্ত্রাসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি আরবদের নিজ ভূমি থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মহাপরিকল্পনা। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলে ইসরায়েলি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো তা বাস্তবায়নে পুরোদমে নেমে যায়। তখন পর্যন্ত ব্রিটিশদের শাসনাধীনে থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশ বাহিনীকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়, যাতে নিরস্ত্র ও অপ্রস্তুত আরবেরা সুরক্ষা না পায়।
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যানডেট বা শাসন শেষ হলে বেন গুরিয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে একে স্বীকৃতি দেন। আর আল নাকবা বা মহাবিপর্যয় নেমে আসে ফিলিস্তিনিদের ওপর। নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিঃস্ব অবস্থায় রাতারাতি লাখ লাখ ফিলিস্তিনি প্রাণ রক্ষায় ছুটে পালাতে থাকে। তাই ১৫ মে আল নাকবা (বিপর্যয়) দিবস বিবেচিত হয়।
যদিও নাকবা আসলে আগে থেকেই শুরু হয়। মূলত মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত সাত লাখ ফিলিস্তিনি আশপাশের আরব দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুসারে তাদের নিজ ভূমে ফেরার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি, যদিও এর মধ্যে কয়েক প্রজন্ম চলে গেছে। বরং যারা রয়ে গিয়েছিল, তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ইসরায়েলি দখলদারি ও সন্ত্রাসের মধ্যে জীবনযাপন করছে।
আরব দেশগুলো অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীনভাবে ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। তবে ইউরোপ থেকে পাওয়া আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ইসরায়েলি বাহিনীকে তারা কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে পারেনি। জর্ডানের সেনাবাহিনী সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও বেন গুরিয়ানের সঙ্গে বাদশাহ আবদুল্লাহর গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে তারা এক প্রকার নিষ্ক্রিয় ছিল। সিরীয়, মিসরীয় ও লেবাননের বাহিনীগুলোর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল না। একমাত্র ইরাকি বাহিনী কিছুটা প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিল। আর এরপরের ইতিহাস তো সবারই জানা।
১৯৬৭ সালে ইসরায়েলি দখলদারি আরও পোক্ত হয় গোলান উপত্যকা, পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে কর্তৃত্ব স্থাপনের মধ্য দিয়ে। আর তা সম্ভব হয় সে বছর আরবদের আরেক দফা পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। জায়নবাদী ভাষ্যে অবশ্য এই অধিগ্রহণ হলো ‘জুদিয়া, সামারিয়া ও গোলান উপত্যকার মুক্তি।’
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জায়নবাদীরা যে পাপের সূচনা ঘটিয়েছে, তা একাধারে অপরাধ ও দখলদারির মধ্য দিয়ে দশকের পর দশক ধরে বিস্তৃত হয়ে আসছে। এ জন্য ৬৯ বছর ধরে জায়নবাদীরা প্রকৃত ইতিহাসের বিকৃতি শুধু ঘটায়নি, বরং বাছাই করা সত্য ও সযত্নে তৈরি মিথ্যার সুদক্ষ মিশেলে নিজেদের অপকর্মের বৈধতার জন্য বিভ্রান্তিকর ভাষ্য তৈরি করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে।
আশার কথা হলো, খোদ ইসরায়েলের ভেতর থেকেই এর প্রতিবাদ ও পাল্টা ভাষ্য উঠে আসছে, প্রকৃত ইতিহাস ও তার নির্মোহ বিশ্লেষণ করছেন ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ও গবেষকেরাই। এই দলে আছেন বেনি মরিস, শলমো স্যান্ড, ইলান পেপে, অভি শ্লিম, ইয়ায়েল লোটান, ইউরি আভনেরিসহ অনেকেই। জায়নবাদীদের তীব্র সমালোচনা ও অশালীন আক্রমণ তাঁদের নিবৃত্ত করতে পারেনি, ইসরায়েল রাষ্ট্রের দমননীতি তাঁদের টলাতে পারেনি। বরং তাঁরা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন।
বিশ্ব মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে ও পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন নিয়ে বৈশ্বিক নিয়মনীতি অবজ্ঞা করে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে উদ্বাস্তু বানিয়ে এবং নিজ ভূমে তাদের অবরুদ্ধ করে ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞা পূরণ না করেও (সুনির্দিষ্ট ভূ-সীমা) ইসরায়েল প্রচণ্ড প্রতাপের সঙ্গে টিকে আছে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে চরম উৎকর্ষ ইসরায়েলের বিকশিত হওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। সামরিক শক্তিতে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রসহ বিশাল অত্যাধুনিক অস্ত্রভান্ডার গড়ে তুলেছে। তবে এত কিছুর পরও জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েল শান্তিতে নেই।
নিঃশর্তে নিজ ভূমে ফিলিস্তিনিদের ফিরতে না দিলে, দখলদারির অবসান ঘটিয়ে ফিলিস্তিনিদের জমি-পানি-সম্পদ ফিরিয়ে না দিলে এবং জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণের জন্য ক্ষমা না চাইলে আর যা-ই হোক, শান্তি আসবে না। অবসান হবে না ফিলিস্তিনি নাকবার।
* আসজাদুল কিবরিয়া লেখক ও সাংবাদিক asjadulk@gmail.com

Tuesday, April 8, 2025
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে যেভাবে গড়ে উঠল ইসরায়েল রাষ্ট্র by আসজাদুল কিবরিয়া
‘প্রতিশ্রুত ভূমি।’ ‘মনোনীত সম্প্রদায়।’ ‘ভূমিহীন মানুষের জন্য মনুষ্যহীন ভূমি।’ পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত অত্যন্ত শক্তিশালী তিনটি বয়ান, যেগুলোর ওপর ভিত্তি করে ইহুদিদের জন্য ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে জোরপূর্বক আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্র স্থাপনকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ হিব্রু বাইবেল বা তানাখ অনুসারে নবী আব্রাহামকে ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তাঁর বংশধরদের জন্য একটি ভূখণ্ড নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যা বংশপরম্পরায় তাদের পুণ্যভূমি হিসেবেই থাকবে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে আজ যেখানে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল, সেটি হলো সেই ভূমি, যদিও বাইবেলের আরেক বিবরণ অনুসারে এটি মিসর থেকে ইউফ্রেতিস নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত। আবার যাদের জন্য ঈশ্বর এই ভূমির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তারা হলো ইহুদি সম্প্রদায়, যারা এই বাইবেল অনুসারেই, মহাপ্রভুর মনোনীত সম্প্রদায় বা জাতি (চুজেন পিপল)। ঈশ্বরের সঙ্গে ইহুদিদের রয়েছে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক, একমাত্র তাদের সৌভাগ্য হয়েছে ঈশ্বরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার। সে কারণেই তারা জগতের শ্রেষ্ঠতম জাতি, যারা সব অ-ইহুদিকে নিম্ন জাতের বলে মনে করে।
যেহেতু ইহুদি শুধু একটি ধর্মাদর্শই নয়, একই সঙ্গে একটি সম্প্রদায় বা জাতি, তাই অন্য ধর্মাবলম্বীদের চেয়ে ব্যতিক্রম। ইহুদিরা একই সঙ্গে ধর্ম, নৃতত্ত্ব ও সংস্কৃতি দ্বারা একসূত্রে গাঁথা। যদিও ইহুদিদের মতো খ্রিষ্টান ও মুসলমানরাও একেশ্বরবাদী ইব্রাহিমীয় ধর্মাদর্শের অনুসারী। অর্থাৎ বিশ্বের এই তিনটি প্রধান ধর্মের আদি পিতা একজনই—আব্রাহাম {বা পবিত্র কোরআন মতে হজরত ইব্রাহিম (আ.)}।
ইহুদিরা হিব্রু সম্প্রদায় হিসেবেও পরিচিত, যেহেতু তাদের ভাষাও হিব্রু। ঈশ্বরের পছন্দের জাতি বা সম্প্রদায়ের মানুষেরা ঈশ্বরের প্রতিশ্রুত ভূমিতেই বসবাস করবে। তারা সেটা করেও আসছিল মুসা (আ.) তাদের মিসর থেকে সিনাই উপত্যকা হয়ে কেনানে ফিরিয়ে আনার পর থেকে (খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১৪০০ সাল)। তবে দুই হাজার বছরের বেশি আগে (৭০ খ্রিষ্টাব্দে) রোমানরা জেরুজালেমে ইহুদিদের দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংস করে তাদের জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেয়।
হিব্রুরা স্বভূমি থেকে উৎখাত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে। নির্বাসিত হয়েও তাদের মন পড়ে থাকে সেই প্রাচীন ভূমিতে, যেখানে রয়েছে জেরুজালেম ও ইহুদিদের দ্বিতীয় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, আছে প্রাচীন জুদিয়া ও সামারিয়া, আছে জায়ন পাহাড়। তারা অবশ্য এটাও বিশ্বাস করত যে একসময় এই প্রতিশ্রুত ভূমিতে তারা বা তাদের উত্তরসূরিরা ফিরে আসবে। সুতরাং আজকে যে ইহুদিরা ইসরায়েলে বসবাস করছে, তারা দুই হাজার বছর আগে এই ভূমি থেকে বিতাড়িত হিব্রু সম্প্রদায়েরই বংশধর।
স্বভূমি থেকে উৎখাত ও দুই হাজার বছর পর স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে এই ভূমিতে ফিরে আসার মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়ে তাহলে কারা ছিল এই ভূমিতে? নাকি এই ভূমি ছিল মানববসতিহীন? এর উত্তর দেওয়া হয়েছে এভাবে: যারা পরবর্তী সময়ে থেকেছে, তারা আসলে সেই ভূমির মানুষ নয়, এমনকি কোনো মানবসম্প্রদায়ও নয়! আর তাই সেই ভূমি হলো মনুষ্যহীন ভূমি। এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করতেই বলা হলো, ফিলিস্তিনি বলে কিছু নেই, ফিলিস্তিনি জনগণ বা সম্প্রদায় বলে কিছু নেই। বরং সেই মনুষ্যহীন ভূমির প্রকৃত দাবিদার হলো হিব্রু সম্প্রদায়ের মানুষেরা। সুতরাং তারা যখন আবার এসে এখানে বসবাস শুরু করেছে, তখনই এই ভূমি সঠিক মালিকের কাছে ফিরে গেছে। তার আগপর্যন্ত যারা থেকেছে এবং তা হাজার বছরের বেশি সময় ধরে বংশপরম্পরায় তারা, মানে ফিলিস্তিনিরা, বিশেষত মুসলমানরা উৎখাতযোগ্য এবং যথাযথভাবেই তা করা হয়েছে, এখনো হচ্ছে।
ইহুদিদের চূড়ান্ত দখলদারত্ব সূচনার মাধ্যমে আজ থেকে ৭৫ বছর (এখন ৭৭ বছর প্রায়) আগে ফিলিস্তিনিদের ওপর অনিঃশেষ এক বিপর্যয় নেমে আসে। সেটা ১৯৪৮ সালের ১৪ মে। ফিলিস্তিনের ভূমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পরপরই সাত লাখের বেশি ফিলিস্তিনিকে নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত ও রাষ্ট্রহীন হওয়ার বিপর্যয় শুরু হয়। আরবিতে বিপর্যয়কে বলা হয় ‘নাকবা’। ফিলিস্তিনিরা প্রতিবছর তাই ১৫ মে তারিখটিকে ‘আল-নাকবা’ দিবস হিসেবে পালন করে। আর এ বছরই প্রথম জাতিসংঘে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি জনগণের অবিসংবাদিত অধিকার আদায়বিষয়ক জাতিসংঘ কমিটি (ইউএনসিআইআরপিপি) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে দিনব্যাপী নানা আয়োজনে নাকবা দিবস পালনের জন্য ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর সাধারণ পরিষদ অনুমোদন দেয়।
অবশ্য ফিলিস্তিনিরা ৭৫ বছর ধরে এই নাকবা দিবস পালন করছে না। বরং ১৯৯৮ সালে ইসরায়েল যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘটা করে উদ্যাপনের প্রস্তুতি নেয়, তখন ফিলিস্তিনিদের কিংবদন্তি নেতা ও ফিলিস্তিনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরাও তাঁদের নাকবার ৫০ বছর পূর্তি পালন করবেন। তিনি ইসরায়েলের স্বাধীনতা দিবসের পরের দিনটিকে নাকবা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন।
প্রথমবার নাকবা দিবস পালনের আগের দিন সন্ধ্যায় ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন যে ফিলিস্তিনিদের ট্র্যাজেডির জন্য ইসরায়েল দায়ী নয়; বরং দায়ী তাদের নেতৃত্ব। তবে ফিলিস্তিনিদের জন্য কী পরিহাস যে সিকি শতাব্দী পরে নাকবা দিবস পালনের সময় সেই নেতানিয়াহুই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী, যাকে ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎস বিভিন্ন সময় বর্ণবাদী ও জাতিবিদ্বেষী হিসেবে অভিহিত করেছে।
ফিলিস্তিনের নাকবা মানে ইসরায়েলের স্বাধীনতা। আর ইসরায়েলিরা প্রতিবছর হিব্রু অষ্টম মাস আইয়ারের পাঁচ তারিখে দিবসটি উদ্যাপন করে, যাকে হিব্রুতে বলে ইয়োম হা-য়াতযামুত। হিজরির মতো অনেকটা চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় প্রতিবছর গ্রেগরীয় বা আন্তর্জাতিক বর্ষপঞ্জির ১৪ মে তারিখের সঙ্গে কখনো মিল আর কখনো আগে-পরে গিয়ে অমিল হয়।
জায়নবাদ থেকে ইসরায়েল রাষ্ট্র
অস্ট্রিয়ার ইহুদি সাংবাদিক, নাট্যকার ও রাজনীতিক থিওডর হারজেলের উদ্যোগে ১৮৯৭ সালের আগস্ট মাসে সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেল নগরে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্ব জায়নবাদী সম্মেলন (ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট কংগ্রেস)। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে শুধু ইহুদিদের জন্য একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা গৃহীত হয়। প্রসঙ্গত, ১৮৯৫ সালে অস্ট্রীয় লেখক নাথান বারনবুম ‘জায়নইজম’ বা জায়নবাদ শব্দটি প্রবর্তন করেন।
মোটাদাগে এই মতবাদ হলো ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার এবং সেই ভূমির ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার জাতীয় আন্দোলন। যেহেতু ইহুদি হওয়ার কারণেই বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে অন্য জাতিগোষ্ঠী, সম্প্রদায় ও ধর্মের মানুষ দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা, সেহেতু একটি পর্যায়ে তারা উপলব্ধি করে যে একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি তথা দেশ না হলে তাদের ওপর এই নির্যাতন বন্ধ হবে না। জায়নবাদী আন্দোলন এ থেকেই উৎসারিত। আর জায়নবাদীরা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ভূমিতেই ইহুদিদের নিজস্ব দেশ গঠনের কোনো বিকল্প নেই বলে দাবি তোলে। শুরু হয় নানামুখী তৎপরতা।
-----১৯৪৮
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় বেন গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে তেল আবিবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে একে স্বীকৃতি দেন। এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর অনিঃশেষ এক বিপর্যয় নেমে আসে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিপর্যস্ত-বিধ্বস্ত ওসমানীয় সাম্রাজ্যকে নিজেদের মধ্যে বাঁটোয়ারা করে নিতে ১৯২০ সালে ইতালির সান রেমো শহরে গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী এবং জাপান, বেলজিয়াম ও গ্রিস সরকারের প্রতিনিধিরা একত্র হন। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে সিরিয়া ফরাসি ম্যান্ডেটে আর ফিলিস্তিন ও মেসোপটেমিয়া বা ইরাক ব্রিটেনের ম্যান্ডেটে শাসিত হবে। ১৯২২ সালে লিগ অব নেশনসের মাধ্যমে এই ম্যান্ডেট অনুমোদন করা হয়। এদিকে ১৯২৩ সালে তুরস্কে আনুষ্ঠানিকভাবে ওসমানীয় খেলাফত বা সালতানাত অবলুপ্ত হয়ে যায় কামাল আতার্তুকের হাত দিয়ে।
ফিলিস্তিনকে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটে নেওয়ার পেছনে ছিল এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড আর্থার বেলফোর জায়নবাদী নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে ৬৭ শব্দের এক পত্রে জানান, ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি গড়ে তোলার জন্য যা করা প্রয়োজন, তার সবই করবে। এটি ‘বেলফোর ঘোষণা’ হিসেবে পরিচিত, যাকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম বড় নিয়ামক হিসেবে দেখা হয়।
সান রেমো সম্মেলনে বেলফোর ঘোষণা কার্যকর করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হলো ব্রিটিশ সরকারকে। সেটাকে অন্য মিত্রশক্তিগুলো সমর্থন দিল। এর পর থেকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইউরোপ থেকে ইহুদিরা দলে দলে পাড়ি জমাতে থাকে। তারা সেখানে জমিজমাও কিনতে থাকে। প্রথম দিকে ফিলিস্তিনিরা এটায় গুরুত্ব দেয়নি। তা ছাড়া তখনো সেখানে মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি ও খ্রিষ্টানদেরও বসবাস ছিল।
এই তিন ধর্মের মানুষ হাজার বছরের বেশি সময় ধরেই এই ভূমিতে বসবাস করে আসছিল। এই ইহুদিরা ছিল বেশির ভাগই প্রাচ্যের ইহুদি, যারা মিজরাহি হিসেবে পরিচিত। আর ইউরোপ থেকে আসতে থাকে আশকেনাজি ইহুদিরা, যারা আবার ইহুদিদের মধ্যে নিজেদের সবচেয়ে উচ্চবর্ণের বলে দাবি করে থাকে। ১৮৮২ ও ১৯০৪ সালে রাশিয়া ও ইউরোপ থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইহুদির অভিবাসন ঘটে ওসমানীয় ফিলিস্তিনে। অভিবাসী ইহুদিরা স্থানীয় আরবদের জমিজমা কিনতে থাকে। আরবরা বেশির ভাগই ছিল মুসলমান।
ইউরোপীয় ইহুদিদের স্রোত বাড়তে থাকায় একপর্যায়ে স্থানীয় ফিলিস্তিনি-আরবদের সঙ্গে তাদের বৈরিতা-সংঘাত দেখা দেয়। ১৯৩৩ সালে ফিলিস্তিনিরা বড় আকারে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুরু করলে ব্রিটিশ সরকার কঠোরভাবে তা দমন করে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনে স্বতন্ত্র ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের নানামুখী পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ড চলতেই থাকে।
তারই অংশ হিসেবে ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ সরকার নিযুক্ত পিল কমিশন ফিলিস্তিনকে দুই ভাগ করে ৭৫ শতাংশ আরব ও বাকিটা ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের সুপারিশ করে। তবে তিন ধর্মের পবিত্র স্থান জেরুজালেমকে জাফাসহ ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ও আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাখার কথাও বলা হয়। আরব ও ইহুদি—দুই পক্ষই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
কিন্তু ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ছয় বছরব্যাপী এই যুদ্ধ চলাকালে জার্মান নেতা হিটলারের নেতৃত্বে ইউরোপে ইহুদি নিধনযজ্ঞ (হলোকাস্ট) সারা দুনিয়ায় বিভীষিকা তৈরি করে। কমবেশি ৬০ লাখ ইহুদি নাৎসি বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। প্রাণ বাঁচাতে সে সময় অনেক ইহুদি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাতে থাকে, অনেকে আসে ফিলিস্তিনে, যদিও ব্রিটিশ সরকার ইহুদি অভিবাসন সীমিত করে দিয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে জায়নবাদী সম্মেলনে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা গৃহীত হয়।
১৯৪৫ সালে জার্মানি-জাপান অক্ষশক্তির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। ইউরোপ ইহুদি নিধনের বিভীষিকার তরতাজা স্মৃতি সারা বিশ্বের সমবেদনা কেড়ে নেয়। ফলে ইহুদিদের রাষ্ট্র স্থাপনের কাজ অনেকটা সহজ হয়ে ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ব্রিটিশ ম্যান্ডেটে শাসিত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ৫৬ শতাংশ ইহুদি ও ৪৩ শতাংশ ফিলিস্তিনি আরবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় ৩৩-১৩ ভোটে (চীনসহ ১০ দেশ ভোটদানে বিরত ও থাইল্যান্ড অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিল)। এতে জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নগরের মর্যাদা দেওয়া হয়। ইহুদিরা এটা মেনে নিলেও আরবরা এতে আপত্তি জানায়। আরব লিগ নেতৃত্ব প্রশ্ন তোলেন, হলোকাস্টের অপরাধের শাস্তি কেন আরবদের পেতে হবে?
এদিকে জায়নবাদীরা ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার ছক কেটে ফেলে। প্ল্যান দালেত বা প্ল্যান ডি নামে এই পরিকল্পনার নেতৃত্বে ছিলেন ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ন। প্ল্যান ডি ছিল হত্যা-ধর্ষণ-লুটতরাজ-সন্ত্রাসের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি আরবদের নিজ ভূমি থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার মহাপরিকল্পনা। ১৯৪৮ সালের ১০ মার্চ এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলে হাগানাহ, স্টার্ন গ্যাংসহ ইসরায়েলি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলো তা বাস্তবায়নে পুরোদমে নেমে যায়। স্থানীয় আরবরা ইহুদিদের হামলা ও হত্যার শিকার হতে থাকে। ফলে নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিঃস্ব অবস্থায় লাখ লাখ ফিলিস্তিনি প্রাণ রক্ষায় ছুটে পালাতে থাকে। মূলত মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত সাত লাখ ফিলিস্তিনি আশপাশের আরব দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। কিছু কিছু স্থানে ইহুদিরাও আক্রান্ত হয় ও মারা পড়ে।
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট বা শাসন শেষ হলে বেন গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান সঙ্গে সঙ্গে একে স্বীকৃতি দেন। আনুষ্ঠানিকভাবে আল-নাকবা বা মহাবিপর্যয় নেমে আসে ফিলিস্তিনিদের ওপর।
আরব দেশগুলোর ব্যর্থতা
ফিলিস্তিনিদের এই মহাবিপর্যয় সৃষ্টির জন্য আরব দেশগুলোর দুর্বলতা ও ব্যর্থতাও কোনো অংশে কম দায়ী নয়। অথচ আরব ও মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত ফিলিস্তিনের ইতিহাসে আরব দেশগুলোর অবস্থান নির্মোহভাবে তুলে ধরা হয়নি। ১৯৪৮ সালের ১৫ মে আরব লিগের সদস্য মিসর, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও ইরাকের সেনাবাহিনী ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এবং সদ্য ঘোষিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। প্রথম দিকে আরবরা কিছুটা সুবিধা করতে পারলেও দ্রুতই তারা পিছু হটতে থাকে। সামরিক শক্তির দিক থেকে আরব দেশগুলো ছিল দুর্বল, যদিও সংখ্যায় প্রথম দিকে তারা ছিল বেশি। তবে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়া ও রক্ষার প্রত্যয়ে প্রবলভাবে উদ্দীপ্ত ইহুদি যোদ্ধাদের সামনে তারা ছিল দিগ্ভ্রান্ত ও লক্ষ্যহীন। তদুপরি নিজেদের মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না। ফলে ১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে আরব দেশগুলো যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
------১৯৪৭
১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর ব্রিটিশ ম্যান্ডেটে শাসিত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ৫৬ শতাংশ ইহুদি ও ৪৩ শতাংশ ফিলিস্তিনি আরবদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়।
জর্ডানের বাদশাহ প্রথম আবদুল্লাহ আগ্রহী ছিলেন ফিলিস্তিনের ভূমিকে সংযুক্ত করে নিয়ে বৃহত্তর হাশেমীয় সিরিয়া গঠনের। সিরিয়াবাসী ইসরায়েলের চেয়ে জর্ডান নিয়ে বেশি ভীত থাকায় তাদের সেনারা ফিলিস্তিনে হাজির হয়েছিল মূলত পশ্চিম তীর জর্ডানের দখলে যাওয়া থেকে রুখতে। মিসরও হাশেমীয় জর্ডানের পরিকল্পনা ঠেকাতে চেয়েছিল। ফলে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন হয়ে ওঠে এসব আরব দেশের উচ্চাভিলাষ ও ভীতির এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা ও ভবিষ্যতের চিন্তা আসলে পেছনে পড়ে যায়।
১৯৪৭ সালেই জায়নবাদী নেতা গোল্ডা মেয়ার (ইসরায়েলের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী ও এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী) গোপনে ট্রান্সজর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এতে বাদশাহ পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীর পাওয়ার বিনিময়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র স্থাপনের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকতে সম্মত হন। প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে জর্ডান তাই পশ্চিম তীর দখলে নিতে সক্ষম হয়। ওদিকে মিসর দখল করে নেয় গাজা উপত্যকা। তবে দুই দশকের মধ্যেই ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে গাজা ও পশ্চিম তীর যথাক্রমে মিসর ও জর্ডানের হাতছাড়া হয়ে যায়।
ইসরায়েলের এগিয়ে যাওয়া
গত ৭৫ বছরে চারটি আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রতিটিতে আরবরা পরাজিত হয়েছে আর ফিলিস্তিনিরা নিজ ভূমে ক্রমে কোণঠাসা হয়েছে। তবে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল সাড়ে সাত দশক ধরে বিকশিত হয়ে চলেছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি, যার আছে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার, আছে বিশ্বের দুর্ধর্ষতম গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ।
উচ্চ প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনে নেতৃস্থানীয় দেশটির প্রতি ১০ হাজারে ১৩৫ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। এটি পরিণত হয়েছে ‘স্টার্টআপ নেশনে’। নিপুণভাবে পানি ছিটানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে সেই ’৫০-এর দশকে। ঊষর মরুর বুকে ব্যাপক সবুজায়ন ঘটিয়েছে। অধিবাসীদের গড় আয়ু বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। ইসরায়েলের অর্জন আধুনিক বিশ্বের এক বিরাট বিস্ময় বললেও অত্যুক্তি হয় না, যার পেছনে পশ্চিমা বিশ্বের অকুণ্ঠ সমর্থনও ভূমিকা রেখেছে।
একই সঙ্গে এই সমর্থনের জোরে, বিশেষত যুগের পর যুগ যুক্তরাষ্ট্রের একচোখা মদদে ফিলিস্তিনিদের ভূমি-পানি-গাছপালা-ঘরবাড়ি—সবই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। ফিলিস্তিনিদের একাংশ জর্ডান সীমান্তঘেঁষা পশ্চিম তীরে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত, আরেকাংশ মিসরের সিনাই সীমান্তঘেঁষা গাজায় ইসরায়েল আরোপিত অবরোধের মধ্যে জীবন যাপন করছে। ফিলিস্তিনিরা নিয়মিতই ইসরায়েলি হামলা-নির্যাতন-হত্যা-দখলদারির শিকার হচ্ছে। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বও একাধারে দ্বিধাবিভক্ত, দিশাহীন ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়েছেন। আরব দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থবহ ও কার্যকর সহযোগিতা অতীতেও মেলেনি, আজও মিলছে না। ফিলিস্তিনিরা টিকে আছে নিজস্ব প্রতিরোধ-সংগ্রাম আর কিছু সীমিত বৈশ্বিক সহায়তায়। শেষ হচ্ছে না তাদের নাকবার।
[তথ্যসূত্র: ১. ইসরায়েল অ্যান্ড প্যালেস্টাইন: দ্য কমপ্লিট স্টোরি—ইয়ান ক্যারল (২০১৮ কিন্ডল ই-বুক সংস্করণ ২. দৈনিক হারেৎসের বিভিন্ন সংখ্যা।]
* আসজাদুল কিবরিয়া: লেখক ও সাংবাদিক
asjadulk@gmail.com
![]() |
| ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা জেরুজালেম কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটা নির্ধারণ। ছবি: এএফপি |
Monday, February 17, 2025
গাজায় শেষ পর্যন্ত জেনোসাইডই ঘটেছে by আসজাদুল কিবরিয়া
গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধাভিযানে ১৫ মাসে ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন; লাখ লাখ ফিলিস্তিনি আহত, পঙ্গু ও অক্ষম হয়ে গেছেন; সেখানকার ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও রাস্তাঘাট ধুলায় মিশে গেছে; সেখানকার মাটি ও পানি বিষাক্ত হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে গাজাকে অবাসযোগ্য করে তোলা হয়েছে।
এই পুরো কর্মকাণ্ডকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে অভিহিত করা যায় কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে এখন তর্ক চলছে। বলা দরকার যে ইংরেজি ‘জেনোসাইড’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘গণহত্যা’ প্রচলিত হয়ে গেলেও তাতে জেনোসাইডের ব্যাপ্তি ও তাৎপর্য প্রতিফলিত হয় না। ‘ম্যাস কিলিং’ বা ‘ম্যাস মার্ডার’কেও বাংলায় ‘গণহত্যা’ বলা হয়। অনেকে তাই জেনোসাইডকে বাংলায় ‘পরিকল্পিত গণহত্যা’ বলার পক্ষে। আবার অনেকে ‘জাতিগত নিধন’ বা ‘জাতিগত নির্মূলাভিযান’ বলতে চান, যদিও তা ‘এথনিক ক্লিনজিং’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।
● ‘জেনোসাইড’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘গণহত্যা’ প্রচলিত হয়ে গেলেও তাতে জেনোসাইডের ব্যাপ্তি ও তাৎপর্য প্রতিফলিত হয় না।
● একটি মানবিক ও জাতি-সমষ্টির সত্তা হিসেবে গাজার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। আর জেনোসাইড ঠিক এ রকমই হয়।
২.
ইসরায়েলের রিভিশনিস্ট বা সংশোধনবাদী ইতিহাসবিদ হিসেবে খ্যাত বেন্নি মরিসের ভাষ্যটা আগে জানা যাক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ইসরায়েল গাজায় কোনো জেনোসাইড চালাচ্ছে না। হেগে (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি) প্রসিকিউটর এবং ওমের বারটভ থেকে শুরু করে সব জ্ঞানী অধ্যাপক জেনোসাইড নিয়ে যা বলছেন, তা ভুল। (ইসরায়েল) সরকারের জেনোসাইড-বিষয়ক কোনো নীতি নেই, ইসরায়েলি নেতৃত্ব জেনোসাইড ঘটানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য পরিকল্পিত কোনো উদ্দেশ্য নেই এবং সরকার বা সেনাপ্রধানদের কাছ থেকে সেনাবাহিনীর কাছে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ–এর ইংরেজি সংস্করণে গত ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত এই নিবন্ধে মরিস অবশ্য এটা স্বীকার করেন, গাজায় যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে বিষয়টি হয়তো জেনোসাইডের পথে যাচ্ছে।
এর কিছুদিন আগে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর হারেৎজ–এ (হিব্রু সংস্করণ) আরেক খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ শ্লোমো স্যান্ড লিখেছেন, গাজায় ইসরায়েল ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছে, যুদ্ধাপরাধ করেছে। তারপরও এ সবকিছু মিলিয়ে জেনোসাইড সংঘটিত হয়নি। এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে স্যান্ড গাজা যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন ফ্রান্সের আলজেরিয়া যুদ্ধ (১৯৫৪-১৯৬২) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনাম যুদ্ধে (১৯৬৫-১৯৭৩) লিপ্ত থাকার ঘটনাকে। স্যান্ডের ভাষ্যে, এ দুটি যুদ্ধে ফরাসি ও মার্কিন বাহিনী বেসামরিক জনগণের ওপর যে নৃশংসতা-বর্বরতা চালিয়েছে, তা গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংসতার চেয়ে ভয়াবহ ছিল। তারপরও তাদের সেই হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইড হিসেবে অভিহিত করা হয়নি।
তবে জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক ড্যানিয়েল ব্লাটম্যান ও অ্যামোস গোল্ডবার্গ স্যান্ডের যুক্তিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। তাঁরা বলেন, আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক দখলদারির কালে (১৮৩০-১৮৭৫) ৫ থেকে ১০ লাখ আলজেরীয় ক্ষুধা ও রোগাক্রান্ত হয়ে বা পরিকল্পিতভাবে প্রাণ হারিয়েছিল। বেন কিরানানের ব্লাড অ্যান্ড সয়েল: আ ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি অব জেনোসাইড অ্যান্ড এক্সট্রামিনেশন ফ্রম স্পার্টা টু দারফুর (২০০৭) বই থেকে উদ্ধৃতি টেনে তাঁরা বলেন যে ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনকালে ফরাসিরা যা করেছে, তা জেনোসাইডের সমতুল্য।
৩০ জানুয়ারি হারেৎজ–এর ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত এক দীর্ঘ নিবন্ধে ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ বিশ্ব ইতিহাসে জেনোসাইডের বিভিন্ন উদাহরণ ও পটভূমি নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তাঁরা এতে লিখেছেন যে লিও কুপার তাঁর জেনোসাইড: ইটস পলিটিক্যাল ইউজ ইন দ্য টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি (১৯৮২) বইয়ে বলেছেন, আলজেরিয়ার যুদ্ধের সময় ফরাসিরা যে নৃশংসতা ঘটিয়েছিল, তা হয়তো পরিকল্পিত গণহত্যার কাছাকাছি নিধনযজ্ঞ (জেনোসাইডাল ম্যাসাকার), তবে পূর্ণাঙ্গ জেনোসাইডের যাবতীয় মানদণ্ড পূরণ করে না।
ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিষয়ে স্যান্ডের অভিমতের সঙ্গে প্রবলভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। তাঁরা এ ক্ষেত্রে রাসেল ট্রাইবু৵নালের বিষয়টি তুলে ধরেন। ১৯৬৬ সালে ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধ অনুসন্ধান ও পর্যালোচনার জন্য যে গণ-ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন, ফরাসি দার্শনিক জ্যঁ পল সাত্রে৴ তার প্রধান ছিলেন। অন্যদের মধ্যে ফরাসি লেখক সিমোন দ্য বোঁভেয়া ইতালির রাজনীতিবিদ লেলিও বাসো এবং যুগোস্লাভিয়ার মানবাধিকারকর্মী ভ্লাদিমির দেদিজা এতে যুক্ত ছিলেন।
এই গণ-ট্রাইব্যুনাল বিচার-বিশ্লেষণ শেষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী যা করেছে, তা জেনোসাইড অপরাধের প্রতিরোধ ও শাস্তিবিষয়ক ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘ কনভেনশনের আলোকে জেনোসাইড। নির্বিচার বোমাবর্ষণ, বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, নিষিদ্ধ অস্ত্রের ব্যবহার, যুদ্ধবন্দীদের নিপীড়ন ও নির্যাতন এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা ও স্মারক ধ্বংস করায় মার্কিন সেনাবাহিনী জেনোসাইডের অপরাধে অপরাধী হয়েছে।
৩.
কয়েক শ বা কয়েক হাজার মানুষের ওপর নির্বিচার চালানো হত্যাযজ্ঞকে আইনিভাবে জেনোসাইডের অন্তর্ভুক্ত করতে গেলে এহেন হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হয়, যা বেশ কঠিন কাজ। জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশন অনুসারে এ রকম হত্যাযজ্ঞ দ্বারা আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে (যা কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র হতে পারে) ‘পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য’ থাকতে হবে।
ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ বলেন, ‘উদ্দেশ্য’ (ইনটেন্ট) নির্ধারণের বিষয়টি কনভেনশনে যুক্ত করার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের যৌথ স্বার্থ। ঠান্ডা যুদ্ধ চলাকালে দুই পরাশক্তিই কিছুটা শঙ্কিত হয়েছিল এই ভেবে যে এই কনভেনশনের আলোকে তাদেরও কখনো–বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে—অতীতে সংঘটিত বা ভবিষ্যতে ঘটানো হতে পারে এমন সহিংসতার জন্য।
জেনোসাইড সংঘটিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। এ কারণেই ১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে বসনিয়ার সার্বদের দ্বারা বসনিয়ার মুসলমানদের স্রেব্রেনিৎসা জেনোসাইড এর একটি উদাহরণ। এ-সংক্রান্ত রায়ে বলা হয় যে জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত অংশটিকে স্বতন্ত্র ও সুচিহ্নিত হতে হবে এবং তাদের নির্মূল করা হলে গোটা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
সাবেক যুগোস্লাভিয়ার যুদ্ধবিষয়ক দুটি রায়ে আইসিজে বলেছে যে ‘ধ্বংস করার উদ্দেশ্য’ প্রমাণের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও আচরণকে এমন হতে হবে, যেগুলো অন্য কোনোভাবে যৌক্তিক ব্যাখ্যা করা যায় না। মানে এসব কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা ‘ধ্বংস করার উদ্দেশ্য’হলেই হবে না, এসবের অন্য আর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই, তা-ও দেখাতে হবে।
৪.
গাজার ক্ষেত্রে কি ‘ধ্বংস করার উদ্দেশ্য’ প্রমাণ করা সম্ভব? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগের চিন্তার বিষয়টি বাদ দিলেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টসহ ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ এবং ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা একাধিক বিবৃতিতে তাঁরা যে জেনোসাইড ঘটাতে ইচ্ছুক, সে রকম আভাস দিয়েছেন।
‘গাজায় নিরীহ কেউ নেই’, ‘আমরা এবার দ্বিতীয় নাকবা ঘটাব’ এবং আরও অনেক বক্তব্য এসেছে, যা সবই সংরক্ষিত আছে। এসব বক্তব্য-বিবৃতি গাজায় ইসরায়েলের জেনোসাইড ঘটানোর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা জেনোসাইড-গবেষক ও বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম স্ক্যাবাসের শরণ নিয়েছেন।
স্ক্যাবাসের যুক্তি হলো, হামলাকারী ও হত্যাকারীরা যদি জেনোসাইডমূলক বিবৃতি, নির্দেশ ও বক্তব্য দেন, তাহলে ‘ধ্বংস করার উদ্দেশ্য’ তথা জেনোসাইড ঘটানোর উদ্দেশ্য প্রমাণ করা সহজ। সে কারণেই আইসিজেতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা অভিযোগ অত্যন্ত জোরালো বলে মনে করেন স্ক্যাবাস। কারণ, ইসরায়েলি সিদ্ধান্তপ্রণেতাদের জেনোসাইডমূলক অগণিত বক্তব্য যেমন আছে, তেমনি আছে তাঁদের কর্মকাণ্ডের ধরনও। গাজাবাসীকে পদ্ধতিগতভাবে অনাহারে রাখা, গাজার বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া, উত্তরাঞ্চলে জাতিগত নিধন ঘটানো এবং ‘নিরাপদ’ হিসেবে চিহ্নিত স্থানগুলোয় হামলা চালানো এসব কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত।
আবার ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ বলেন যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জেনোসাইড সংঘটনকারীরা তাঁদের কর্মকাণ্ডকে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করে থাকেন। গাজার জেনোসাইডকে বেশির ভাগ ইসরায়েলি হামাসের ভয়াবহ আক্রমণের প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ হিসেবেই বিবেচনা করেন।
গাজায় ইসরায়েল যা করেছে, তার সঙ্গে হিটলারের ইহুদি নিধনযজ্ঞের অনেক মিল পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করেছেন ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ইয়ান কেরশ তাঁর ফেটফুল চয়েসেস: টেন ডিসিশনস দ্যাট চেঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড, ১৯৪০-১৯৪১ বইয়ে দেখিয়েছেন যে নিধনযজ্ঞ পরিচালনার জন্য খোদ হিটলারের কাছ থেকে সরাসরি কোনো নির্দেশ জারি করা হয়নি, তবে নানা রকম বার্তা ও কথা–চালাচালির জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে, যা সহিংসতা বাড়াতে এবং হত্যাযজ্ঞের বিস্তার ঘটাতে ভূমিকা রেখেছে।
গাজায় জেনোসাইড ঘটানোর বিষয়টি আলোচনা করতে গিয়ে ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা ও বিতাড়নের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলছেন, ২০১৬ সাল থেকে সাড়ে আট লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ সব বা বেশির ভাগ রোহিঙ্গাকে সশরীর নিধন করা হয়নি; বরং এক ক্ষুদ্রাংশকে হত্যা করা হয়েছে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র পুরো ঘটনাকে রোহিঙ্গা জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। হলোকাস্টের বাইরে এটা হলো যুক্তরাষ্ট্র-স্বীকৃত অষ্টম জেনোসাইড। এ জন্য মিয়ানমারকে আইসিজের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে গাম্বিয়া আরও কয়েকটি দেশের সমর্থনে।
ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, সমষ্টিগতভাবে কোনো জনগোষ্ঠীর নিজ অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকার সামর্থ্যকে ধ্বংস করে দেয়, এমন যেকোনো পদক্ষেপই হলো জেনোসাইড, এ জন্য ওই জনগোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ নিধন জরুরি নয়। তাঁরা এ-ও বলেছেন যে গাজায় প্রায় ৪৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, ১ লাখের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে কতজন চাপা পড়েছেন, তার সঠিক তথ্য কখনোই জানা যাবে না। আর আক্রান্ত মানুষের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক।
জাতিসংঘের হিসাবে গাজার ৯০ শতাংশ মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং মানবেতর জীবন যাপন করছেন, যা মৃত্যুহার বাড়িয়েছে। গাজায় শিশুহত্যা, ক্ষুধা, স্বাস্থ্য পরিষেবাসহ অবকাঠামো ধ্বংস করা, বেশির ভাগ ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া, জাবালিয়া ও রাফাহর মতো শহর ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া, উত্তর দিকের উপত্যকায় জাতিগত নিধন, গাজার সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেশির ভাগ মসজিদ ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেওয়া, সরকারি অবকাঠামোসহ স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন ও পানি সরবরাহের অবকাঠামোর বিনাশ সাধন এবং অগণিত গণকবর—এ সবকিছুই জেনোসাইডের পরিষ্কার একটি ছবি তুলে ধরে বলে মন্তব্য করেছেন ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ। তাঁদের মতে, একটি মানবিক ও জাতি-সমষ্টির সত্তা হিসেবে গাজার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। আর জেনোসাইড ঠিক এ রকমই হয়।
গাজায় জেনোসাইড ঘটানো হয়েছে উল্লেখ করে ইসরায়েলের এই দুই ইতিহাসবিদ অনেকটা আত্মসমালোচনার মতো করে বলেন, ‘আমাদের ইসরায়েলিদের উচিত হবে নিজ আয়নায় নিজেদের দেখা, যেখানে আমরা এমন একটা সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাব, যে সমাজ নিজের নাগরিকদের হামাসের খুনে আক্রমণ থেকে রক্ষা করেনি এবং অপহৃত হওয়া নিজের পুত্র ও কন্যাদের অবহেলা করেছে। পাশাপাশি গাজায় এসব কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। এই জেনোসাইড ইহুদিদের ইতিহাসে এখন থেকে চিরকাল একটি কালো দাগ হয়ে থাকবে। আমাদের এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে এবং আমরা যে ভয়াবহতা সঞ্চারিত করেছি, তার গভীরতা বুঝতে হবে।’
ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গের নিবন্ধটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন অশউইৎজ বন্দিশিবির মু্ক্তির ৮০ বছর উদ্যাপিত হচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে পোল্যান্ডের অশউইৎজে স্থাপিত কুখ্যাত বন্দিশিবিরটি ১৯৪৫ সালের ২৭ জানুয়ারি সোভিয়েত লালফৌজ মুক্ত করেছিল। এখানে লাখ লাখ ইহুদিকে ধরে এনে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে হত্যা করেছিল নাৎসিরা। সেই ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে ব্লাটম্যান ও গোল্ডবার্গ তাঁদের লেখার উপসংহার টেনেছেন এভাবে; ‘গাজায় যা হচ্ছে, তা হলোকাস্ট নয়। এখানে কোনো অশউইৎজ নেই, নেই কোনো ত্রেবলিঙ্কা। তবে এটা সেই একই ধরনের অপরাধ—জেনোসাইডের অপরাধ’।
● আসজাদুল কিবরিয়া লেখক ও সাংবাদিক
![]() |
| বিধ্বস্ত গাজায় ঘরে ফেরার চেষ্টা সাধারণ মানুষের। গাজা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলীয় জাবালিয়া এলাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ছবি: এএফপি |
Sunday, July 19, 2015
উপ-আঞ্চলিক জোট ও বাণিজ্য করিডর by আসজাদুল কিবরিয়া
মোটাদাগে একই অঞ্চলের কয়েকটি ছোট দেশ তাদের প্রতিবেশী বড় একটি দেশের এক বা একাধিক প্রদেশকে নিয়ে গঠিত জোটকে উপ-আঞ্চলিক জোট বলা যায়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হয় বৃহত্তর মেকং উপ-অঞ্চল। কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং চীনের ইউনান ও গুয়াংজি প্রদেশদ্বয়কে নিয়ে এই গঠিত। গুয়াংজি বাদে অন্যগুলো সবই মেকং নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। ১৯৯২ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বৃহত্তর মেকং উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবর্তন করে।
দক্ষিণ এশিয়ায়ও এ ধরনের একটি উপ-আঞ্চলিক জোট গঠনের জন্য এডিবির চেষ্টা বেশ পুরোনো। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটি সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিয়নাল কো-অপারেশন (সাসেক) নামে একটি জোট গঠনের ঘোষণা দেয়, যার সদস্য হয় বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। কিন্তু এটি আসলে উপ-আঞ্চলিক জোট হতে পারেনি, বরং ‘পাকিস্তান বাদে সার্ক’ এমন একটি জোটের ধারণাই জোরালো হয়েছে। তা ছাড়া এখানে দুটি দেশ হলো দ্বীপরাষ্ট্র, যাদের সঙ্গে স্থল ও রেলপথে যোগাযোগের সুযোগ নেই। সর্বোপরি বিশাল রাষ্ট্র ভারতের নির্দিষ্ট কোনো প্রদেশ নয়, বরং পুরো দেশটিই এর সদস্য বিবেচিত হয়েছে। ফলে এই উদ্যোগে তেমন অগ্রগতি হয়নি।
অবশ্য বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব সাত রাজ্য ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে একটি উপ-আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রয়াস অনেক পুরোনো। এর উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্নভাবে পশ্চাৎপদ তিনটি দেশ ও ভারতীয় প্রদেশগুলোর পরস্পরের মধ্যে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করা। বিবিআইএনের মোটরযান চুক্তি সেই সম্পৃক্ততার পথে একটি বড় ধাপ বলে বিবেচিত হতে পারে। এই চুক্তির আওতায় চার দেশের যানবাহন একে অন্যের দেশে যাতায়াত করতে পারবে। অবশ্যই তা অবাধে নয়, নিয়ন্ত্রিতভাবে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিতভাবে বা সীমিত পরিসরেই তা হওয়া উচিত। এরপর প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুসারে এই নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা যাবে। চার দেশের মধ্যে যান চলাচলের সুযোগ পর্যায়ক্রমে মানুষ ও পণ্য পরিবহন সহজ করবে এবং দেশগুলোর পরম্পরের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াবে।
সন্দেহ নেই ভারত সরকারের সক্রিয় উদ্যোগেই বিবিআইএন গতি পেয়েছে। ২০১৩ সালে ভারতের কংগ্রেস সরকার এই উপ-আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হওয়ায় এবং পরের বছরগুলোয় সম্পর্ক অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক উন্নত হওয়ায় ভারতের জন্য এই উদ্যোগ কার্যকর করা সহজ হয়। বরাবরই ভারত তার যেকোনো উদ্যোগে নেপাল ও ভুটানকে অনেক সহজেই সঙ্গে পেয়েছে। কিন্তু সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকায় বাংলাদেশকে পাশে পাওয়া সহজ হয়নি। আবার বাংলাদেশও বিভিন্ন কারণে বিশেষত ভারতের অতিমাত্রায় নিজ স্বার্থকেন্দ্রিক আচরণ ও ছাড় দিতে অনীহ মনোভাবের জন্য উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগে উৎসাহ পায়নি। তার বদলে সার্কের আঞ্চলিক জোটকেই তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক মনে করেছে। অন্যদিকে ভারত বেশির ভাগ সময়ই সার্কের বিষয়ে উদাসীন ও সন্দিহান থেকেছে। প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে চিরশত্রুতার কালো ছায়া সার্কের সম্ভাবনা ও অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছে।
তবে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারতের বৈদেশিক নীতি একই সঙ্গে প্রতিবেশীদের প্রতি অধিক বন্ধুবৎসল হয়ে ওঠে। সার্কের তথা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা বাড়াতেও আগ্রহ প্রকাশ পায়। তবে গত বছর নভেম্বরে কাঠমান্ডুতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে দক্ষিণ এশীয় মোটরযান, রেল ও বিদ্যুৎ সংযোগ-বিষয়ক তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরে পাকিস্তান বাগড়া দিলে তা প্রকারান্তরে ভারতের জন্য আশীর্বাদ হয় ওঠে। ভারত দ্রুত বিবিআইএন নিয়ে অগ্রসর হয়। অথচ সার্কের আওতায় চুক্তিগুলো হলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানও অভিন্ন সড়ক ও রেল যোগাযোগের আওতায় আসতে পারত।
বিবিআইএন জোটের মাধ্যমে নেপাল ও ভুটান এখন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে সহজে। ভারতের কলকাতা বন্দর ব্যবহারও আগের চেয়ে সহজ হবে। বাংলাদেশ অবশ্য বরাবরই নেপাল ও ভুটানকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার করতে দিতে চেয়েছে। কিন্তু ভারত তার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়নি বলে সেটি সম্ভব হয়নি। অথচ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতি-বিধি অনুসারে ভূ-আবদ্ধ কোনো দেশকে (নেপাল বা ভুটান) দ্বিতীয় দেশ (ভারত) তৃতীয় দেশে (বাংলাদেশে) যাওয়ার জন্য ট্রানজিট সুবিধা দিতে বাধ্য। ভারত কখনোই তা অনুসরণ করেনি, যদিও গত কয়েক বছরে অনেক কিছুতে দেশটি নমনীয় হয়ে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছে।
মজার বিষয় হলো ২০১১ সালেই বাংলাদেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট প্রদানের জন্য নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানকে প্রধান করে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ট্রানজিট-বিষয়ক একটি মূল দল গঠন করা হয়। এই দল একটি সর্বাত্মক প্রতিবেদন তৈরি করে, যেখানে ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্টের বিভিন্ন কৌশলগত, কারিগরি ও ভূরাজনৈতিক দিক বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ রাখা হয়। সে বিবেচনায় বাংলাদেশই আসলে বিবিআইএনের পথিকৃৎ। কিন্তু সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নীতিনির্ধারক ভারতকে একতরফাভাবে ও অবাধে ট্রানজিট সুবিধা দিতে সচেষ্ট থাকায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি হিমাগারে চলে যায়।
বিবিআইনের আন্ত-আঞ্চলিক বাণিজ্য বা দেশগুলোর পরস্পরের মধ্যে বাণিজ্য ২০১৪ সালে ২ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা এক দশক আগে ছিল মাত্র ৫৭৮ কোটি ডলার। সার্ক বাণিজ্যের ৪৯ শতাংশই বিবিআইএনে সম্পন্ন হয়। ২০১৩ সার্ক আন্ত-আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার। একই সময়ে বিবিআইএনের এ বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ১৯৩ কোটি ডলার। মোটরযান চুক্তি বিবিআইএনের বিদ্যমান বাণিজ্য করিডরগুলোর উন্নয়ন ও সংস্করণের একটি সুযোগও তৈরি করেছে। আর এসব বাণিজ্য পথ বা করিডরগুলো উন্নত না হলে পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়বে না, কমবে না ব্যবসার ব্যয়।
বিবিআইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় বাণিজ্য করিডর হলো কাঠমান্ডু-কাকরভিটা/ পানিটাঙ্কি-ফুলবাড়ী/বাংলাবান্ধা-হাটিকুমরুল-ঢাকা। ১ হাজার ৪৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একই ত্রিদেশীয় সড়কপথে নেপালের অংশ ৬০০ কিলোমিটার, ভারতের ৫৪ কিলোমিটার আর বাংলাদেশের ৪৯৮ কিলোমিটার। এটি প্রধানত বাংলাদেশ ও নেপালের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। ভারতও কখনো কখনো এটি ব্যবহার করে। যদি ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সড়কপথকে বিবেচনায় নেওয়া হয় তাহলে এর মোট দূরত্ব দাঁড়াবে ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার। আর যদি বাংলাবান্ধা থেকে মংলা পর্যন্ত চলে আসে তাহলে মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১ হাজার ৩২৯ কিলোমিটার। সার্ক রিজিয়নাল মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট স্টাডি (এসআরএমটিএস) এই পথটিকে ‘সার্ক হাইওয়ে করিডর-৪’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কিন্তু অবকাঠামোজনিত ঘাটতি এই বাণিজ্য করিডরে তো বটেই, অন্য করিডরগুলোয় বাণিজ্য সম্পন্নকরণকে কঠিন করে রেখেছে। ভারতের জয়পুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাটস ইন্টারন্যাশনাল চলতি বছর তাদের প্রকাশিত এক সমীক্ষায় এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। তাতে এই বাণিজ্য করিডর সম্পর্কে বলা হয়েছে, নেপালের দিকে কাকরভিটা শুল্ক স্টেশনে শুধু রাসায়নিক পরীক্ষাগার ছাড়া আর প্রায় সবই ভালোভাবে আছে। বাংলাদেশের দিকে বাংলাবান্ধায় সড়কের অবস্থা ভালো থাকলেও পণ্যবাহী ট্রাক রাখার জায়গার অভাব আছে, প্রয়োজনীয় পণ্যগুদাম নেই। ভারতের দিকে নেপালসংলগ্ন স্যানিটারি অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। নেই পণ্যগুদাম ও ভালো পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। এখানকার শুল্ক স্টেশনে স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা নেই। পানিটাঙ্কি ও কাকরভিটা সংযোগ স্থাপনকারী সেতুটা সংকীর্ণ।
এই একটি উদাহরণ থেকেই বোঝা যায় যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর কতটা অপ্রতুলতা আছে এই সিবিআই জোটের দেশগুলোয়। অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া প্রত্যাশিত উপ-আঞ্চলিক বা আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা যেমন হবে না, তেমনি হবে না কাঙ্ক্ষিত বাণিজ্য। তাই বাণিজ্য করিডরগুলোর উন্নয়ন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ করতে হবে চার দেশকেই। তবে প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে ভারতেরই উচিত বেশি বিনিয়োগ করা। আর উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডরগুলোর কয়েকটি ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যাতায়াত ও যোগাযোগ সহজতর ও সাশ্রয়ী করবে। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক পরিবহন করিডরে যান চলাচল শুরু করেছে। পরিবহন করিডরকে বাণিজ্য করিডর ও তারপর অর্থনৈতিক করিডরে রূপান্তর ঘটানোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে বড় বিনিয়োগে ভারতের পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই।
আসজাদুল কিবরিয়া: সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com
Friday, October 31, 2014
শ্রদ্ধাঞ্জলি- অনন্য মাওলা বখশ চাচা by আসজাদুল কিবরিয়া
মাওলা বখশ চাচার খুব কাছাকাছি প্রথম আসি ১৯৮৭ সালে। তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা ফখরুদ্দীন আহমদ তখন পররাষ্ট্রসচিব। সম্ভবত ওই সময় সরকারের একটা সিদ্ধান্ত ছিল যে সচিব ও জ্যেষ্ঠ আমলারা নিজ নিজ গ্রাম ও এলাকা পরিদর্শনে যাবেন। তারই অংশ হিসেবে ফখরু চাচা তাঁর আরও কয়েক ভাইকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের আদি নিবাসে যাওয়ার আয়োজন করেন। তিন দিনের সেই সফরে মাওলা বখশ চাচার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। আরও ছিলেন আমার আব্বার দুই বড় ভাই ফজলে রাব্বি (জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক) এবং বজলে রাব্বি (সাবেক ব্যাংকার) ও তাঁর দুই ছেলে। সম্ভবত সেটাই মাওলা বখশ চাচার নিজ গ্রামে শেষবারের মতো যাওয়া। ফখরুদ্দীন আহমদ আবার বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন ১৯৯১ সালে। তিনি ইন্তেকাল করেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। তাঁদের আরেক ভাই মহিউদ্দীন আহমদ বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী। বাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে।
আদি নিবাসের কথা যখন এল, তখন সালাহ্উদ্দীন আহমদের পূর্বপুরুষের পরিচয়সূত্রটা স্পষ্টভাবে বলা দরকার। নিজে সারা জীবন নির্মোহভাবে কাটিয়েছেন বলেই বোধ হয় এ বিষয়ে তেমন কথা বলেননি। হয়তো ভেবেছিলেন, ব্যক্তির পারিবারিক বংশ-পরিচয়ের চেয়ে সমাজ–জাতির বৃহত্তর পরিচয়টা বেশি তাৎপর্যবাহী। এই ঔদার্যের ফলে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের শুভানুধ্যায়ী, গুণগ্রাহী থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই জানেন না যে তাঁর পিতামহ মৌলভি আহমদ অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমান গ্র্যাজুয়েটদের একজন। আহমদের পিতা মুন্সি ফইজুদ্দীন এখন থেকে দেড় শ বছরের বেশি সময় আগে আজকের গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রাম থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন কলকাতায়। উপলব্ধি করেছিলেন, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত না হলে পিছিয়েই থাকতে হবে। সে কারণেই পুত্র আহমদকে কলকাতায় পড়ালেখা করিয়েছিলেন।
কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ ও এমএ পাস করে মৌলভি আহমদ হয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। অবশ্য তার আগে কিছুকাল শিক্ষকতা ও স্কুল পরিদর্শকের কাজ করেছিলেন। মেদিনীপুর, ফেনী ও ময়মনসিংহে কর্মজীবন কেটেছে। ফেনীতে এসডিও অবস্থায় একটি স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। আর ময়মনসিংহে সম্ভবত এসডিও অথবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থাকা অবস্থায় অকালমৃত্যু হয় মৌলভি আহমদের। সেটা ১৯১৩ সালে। তাঁর তখন এক কন্যা ও তিন পুত্র। জ্যেষ্ঠ পুত্র আবু আহমেদ ফয়জুল মহীই হলেন সালাহ্উদ্দীন আহমদের বাবা। অন্যদিকে তাঁর মাতামহ বিহারের মতিহারি নিবাসী কাজী আজিজুল হক ছিলেন ফিঙ্গারপ্রিন্টের অন্যতম আবিষ্কারক, যা কিনা শত বছর ধরে অস্বীকৃত ছিল। ঘটনাচক্রে পিতামহ মৌলভি আহমদের মৃত্যুর ১০১ বছর পর এ বছরের ১৯ অক্টোবর তাঁরই জ্যেষ্ঠ পৌত্র সালাহ্উদ্দীন আহমদ চিরবিদায় নিলেন। তিনি জন্মেছিলেন ১৯২২ সালে ফরিদপুরে। তাঁর বাবা-চাচারা তখন ফরিদপুর শহরে বসবাস করতেন। তবে বাঁশবাড়িয়া গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। পরবর্তীকালে চাচার ভাইবোনেরা অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমান।
স্পষ্ট মনে আছে, প্রথম যেদিন বনানীতে মাওলা বখশ চাচার বাসায় গিয়ে সারা দিন তাঁর সঙ্গে কাটালাম, সেদিন তিনি আমার হাতে তাঁর বাঙালির সাধনা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বইটি তুলে দেন। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য এটি আসলেই একটি অসাধারণ গ্রন্থ। ১২টি প্রবন্ধ-নিবন্ধের সংকলন এই বইতে সালাহ্উদ্দীন আহমদ তত্ত্ব-তথ্য ও যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতার একটি চূড়ান্ত রূপ। তার মৃত্যুর পর বাসায় বইটি খুলে দেখলাম তাঁর স্বাক্ষরটি ১৯৯৪ সালের আগস্ট মাসের। অর্থাৎ আজ থেকে ২০ বছর আগে আমি মাওলা বখশ চাচার সান্নিধ্যে আসতে শুরু করি। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেদিন দুপুরে চাচা-চাচির সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করি। চাচি হামিদা খানমের কথাও একটু বলা দরকার। কলকাতার বেথুন কলেজের প্রথম দিককার মুসলমান ছাত্রীদের একজন তিনি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃত্তি নিয়ে ব্রিটিশ আমলেই বিলেত গিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার্থে। প্রখর ব্যক্তিত্ববোধসম্পন্ন চাচিও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে গেছেন। সর্বশেষ ছিলেন ঢাকার গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অধ্যক্ষ। চাচার আগেই চাচি বিদায় নিয়েছেন। সেটা ২০১২ সালে। তাঁর বড় ভাই মরহুম আবদুল আহাদ হলেন বিখ্যাত সুরকার ও রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ।
মাওলা বখশ চাচার সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল মাঝখানে কয়েক বছর। তবে পারিবারিক বিভিন্ন আয়োজনে যেখানেই আমাকে দেখতেন, সস্নেহে কাছে টেনে নিতেন, হাসিমুখে কথা বলতেন নানা বিষয়ে। পড়তে বলতেন বিভিন্ন বইপত্র। আর তাঁর বাসায় গেলে আলাপচারিতায় সব সময়ই বলতেন মুক্তমনে চিন্তা করতে। তিনি প্রবলভাবে বিশ্বাস করতেন ধর্মনিরপেক্ষতায়। শুধু মুখের কথায় নয়, জীবনজুড়ে তিনি ও চাচি এই বিশ্বাসের লালন ও চর্চা করেছেন। ধর্মপরিচয়ের চেয়ে মানুষের পরিচয় তাঁদের কাছে সব সময়ই অগ্রাধিকার পেয়েছে। আর তাই ধর্মানুরাগ বা ধর্মের অনুশাসন যাঁরা অনুসরণ করতেন, কোনো রকম বিরাগের বাইরে থেকে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রাখতেন। আর স্পষ্টতই ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রচণ্ডভাবে অপছন্দ করতেন।
বস্তুত, মাওলা বখশ চাচা আমাদের শিখিয়েছিলেন ও বুঝিয়েছিলেন যে বাঙালির ইতিহাসে ইসলামের যে প্রভাব, তার মধ্যে সমন্বয়বাদী ধারাটিই মানবমুখী ধারা। অর্থাৎ মুসলমান ধর্মাবলম্বী হয়েও মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিলে জীবন যাপন করা, সহিষ্ণুতা ও উদারতার চর্চা করার মাধ্যমেই শত শত বছর ধরে এই ভূখণ্ডে বাঙালি মুসলমানের আলোকিত মানসলোক গড়ে উঠেছে। এর বিপরীতে রক্ষণশীল গোঁড়াপন্থী ধারায় বিশ্বাসী মুসলমানরা বরাবরই গোটা সম্প্রদায়কে পেছনে টেনে রেখেছে, কূপমণ্ডূকতায় নিমজ্জিত হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িকতার শিকলে বেঁধে রাখতে চেয়েছে। মাওলা বখশ চাচা এ বিষয়েও সব সময় আমাদের সতর্ক করেছেন। ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠতায় সচেষ্ট থেকেছেন সব সময়। জগন্নাথ কলেজ থেকে অধ্যাপনা শুরু করে পরবর্তী সময়ে ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের মূল পরিকল্পক তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার ক্যাসেটবন্দী করে তা পরবর্তী সময়ে লিখিত রূপ দেওয়ার একটি কাজে তিনি আমাকেও সম্পৃক্ত করেছিলেন। আমি কয়েকটি ক্যাসেটের শ্রুতিলিখন করেছিলাম।
মাওলা বখশ চাচার সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাৎ এ বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর। ওই তারিখে সন্ধ্যার পর আমরা বেশ কয়েকজন তাঁর বাসায় জড়ো হয়েছিলাম। অনেক খানাদানার আয়োজন ছিল। চাচার দীর্ঘদিনের সহকারী অমল ও শিল্পী যাবতীয় রান্নাবান্না ও আপ্যায়নের সবকিছু করত। অমলের ছেলে আশীষ চাচার আত্মজীবনীর শ্রুতিলিখন করেছে। চাচার শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের সময় এরা তিনজনই পাশে ছিল। এই তিনজন চাচার পরম আত্মীয় বললে অত্যুক্তি হবে না। বিশেষত, অমলকে চেনে না, চাচার এমন কোনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, গুণগ্রাহী বা ছাত্রছাত্রী নেই বললেই চলে।
ওই দিন চাচা বারবার করে সবার খাওয়া ঠিকমতো হয়েছে কি না, তার খোঁজ নিচ্ছেলেন। চলে আসার আগে আমার সহধর্মিণীর মাথায় হাত রেখে দোয়া করে দেন। আমাদের বৃহত্তর পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য যেন এভাবেই সবাইকে আশ্বস্ত করতেন, ভরসা দিতেন। সেই হাতটি চিরদিনের মতো হারিয়ে গেল।
আসজাদুল কিবরিয়া: সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com
Saturday, May 17, 2014
পাপের ৬৬ বছর! by আসজাদুল কিবরিয়া
Thursday, April 3, 2014
বিনিয়োগে ভারতের পিছিয়ে থাকা by আসজাদুল কিবরিয়া
Monday, October 14, 2013
বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছে হজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড by আসজাদুল কিবরিয়া
Monday, June 24, 2013
বাংলাদেশিদের ১৯০৮ কোটি টাকা গচ্ছিত সুইস ব্যাংকে by আসজাদুল কিবরিয়া
Friday, November 9, 2012
কর্মসংস্থানের তাগিদ দিয়ে শুরু সামাজিক ব্যবসা সম্মেলন by আসজাদুল কিবরিয়া
Thursday, November 8, 2012
সামাজিক ব্যবসা সম্মেলন শুরু হচ্ছে আজ by আসজাদুল কিবরিয়া
Saturday, June 23, 2012
বিশ্ব অর্থনীতি-জি-২০ সম্মেলনে ধাক্কা খেল আমেরিকা by আসজাদুল কিবরিয়া
Tuesday, June 12, 2012
রাজস্ব আয়-আয়কর প্রদানে বৈষম্য হ্রাস জরুরি by আসজাদুল কিবরিয়া
Sunday, May 27, 2012
পরিসংখ্যান ব্যুরো-দোষ না দিয়ে ঘাটতি মেটান by আসজাদুল কিবরিয়া
Saturday, May 26, 2012
অ র্থ র স by আসজাদুল কিবরিয়া
Friday, May 18, 2012
অর্থনীতি-কর দিতেই যত অনীহা by আসজাদুল কিবরিয়া
Thursday, May 10, 2012
অর্থনীতি-এশিয়াজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ ও বাংলাদেশ by আসজাদুল কিবরিয়া
Tuesday, May 1, 2012
বিশ্ব বাণিজ্য-বাজারসুবিধা ও আমেরিকার দ্বৈতনীতি by আসজাদুল কিবরিয়া
Saturday, April 28, 2012
শেয়ারবাজার-স্ফীতি ও ধসের মধ্যে ফাটকা খেলা by আসজাদুল কিবরিয়া
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2002)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...



