Friday, July 11, 2014

এই মাঠ এই জন্মভূমি

আমিতো চলেছি আমার পথেই
এই গতিবেগ আমাকে দিয়েছে চলার সাহস
আকাশের মেঘ ইশারায় বলে
এসো এসো এসো ক্লান্ত পথিক
পথের প্রেরণা ছেড়োনা ছেড়োনা
যেতে হবে দূরে আরো বহু দূরে
পায়ের শব্দে নতুন অব্দে
মাথার ওপর এই যে নীলের আয়োজন দেখ
তার কিছু কথা তোমার খাতায় একটু লেখ
লেখক খোলা বুকে তোমার সম্মুখে নেই কোনো বাধা
তবু জেন তোমার হায়াত আয়ুর বাধা
পার হতে হবে যদি যেতে চাও সীমানা পেরিয়ে
এক পা বাড়িয়ে একটু দাঁড়িয়ে
দাঁড়িয়ে দেখতো তোমার মতন কেউ কি ছিল?
ছিলনা ছিলনা ছিলনা কাব্য কিংবা গদ্যে এতোটুকু মিলও
পদধ্বনির শব্দ মিলিয়ে
দুই পাশের কিছু কাব্য মিলিয়ে
এবার এসোছো খিল খুলবার দরজার কাছে
যদি খিল খোলে কেউ তুমি কি বলবে
দিল খুলে দাও?
তবু দেখ কেউ তোমার বুকের বুতাম খুলছে
মাঝখানে ঐ হৃদয় দুলছে
এবার তোমার পায়ের শব্দে খুলে যাক দ্বার
খুলুক আঁধার আলোর ধাঁধার
এগুতে এগুতে এসেছো কোথায় জান কি তুমি?
হাত দিয়ে দেখো এই মাটি এই জন্মভূমি।

আধুনিক কবিতা হচ্ছে কালোপযোগী নতুন কবিতা by আবুল হোসেন

পূর্ব প্রকাশের পর
প্রশ্ন : আপনার প্রথম বই ‘নববসন্ত’ তো রবীন্দ্রনাথের জীবিতাবস্থায় প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন কি?
আবুল হোসেন : রবীন্দ্রনাথের শরীর ভালো যাচ্ছিল না। আমি ডাকে পাঠাতে চাইনি, চেয়েছিলাম বইটা তাকে হাতে হাতে দেব। রবীন্দ্রনাথের সচিব জানালেন- কবির শরীর ভালো যাচ্ছে না, শরীর ভালো হলে তোমাকে জানাব। কিন্তু সে সুযোগ আমার আর হয়নি, রবীন্দ্রনাথ ১৯৪১ সালে মারা গেলেন।
প্রশ্ন : রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কখন সাক্ষাৎ হয়?
আবুল হোসেন : আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নববসন্ত’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। তার কিছুদিন আগে ফেব্র“য়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। আমি তখন কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ‘রবীন্দ্র পরিষদ’-এর সম্পাদক ছিলাম। সুবোধ সেনগুপ্ত ছিলেন সভাপতি। রবীন্দ্র পরিষদের প্রথম সম্পাদক ছিলেন হুমায়ুন কবীর। আমার যদ্দুর মনে পড়েÑ তখন মৈত্রেয়ী দেবীর বাবা সুরেন দাশগুপ্তই ছিলেন সভাপতি। তিনি রবীন্দ্রনাথের বন্ধু ছিলেন। ঘটনাক্রমে রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেই আমি তার সম্পাদক হলাম। আমি রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখেছিলাম এবং রবীন্দ্রনাথ আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন। তা কলেজের নোটিশ বোর্ডেও টাঙিয়ে দেয়া হয়েছিল।
প্রশ্ন : সাহিত্যাঙ্গনে তখন কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিপুল প্রভাব, তার সঙ্গে কখন পরিচয় হয়?
আবুল হোসেন : কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় কলকাতায়, যতদূর মনে পড়ে ১৯৩৮-৩৯ সালে দিকে । তিনি তখন শ্যামবাজারের একটা গলিতে থাকতেন। ‘বুলবুল’ পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুল্লাহ বাহারের সঙ্গে গিয়েছিলাম নজরুলের সঙ্গে দেখা করতে। উনি গিয়েছিলেন ‘বুলবুল’ পত্রিকার জন্য লেখা আনতে। হাবিবুল্লাহ বাহার ছিলেন আমার প্রথম গ্রন্থ ‘নববসন্ত’-এর প্রকাশক। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। নজরুল তখন খুব ব্যস্ত। নিয়মিত ‘হিজ মাস্টার ভয়েস’-এ গান দিচ্ছেন- গান লিখছেন, তার সুর করছেন; আর শিল্পীদের গান শেখাচ্ছেন। আমরা যেদিন গেলাম-সেদিন বিখ্যাত গায়িকা শৈলদেবীকেও সেখানে বসে থাকতে দেখেছিলাম। নজরুল পান খেতেন খুব-একপাশে পানের বাটা, অন্যপাশে পিকদানি। দুুটোরই ব্যবহার চলছে ক্রমাগত।
প্রশ্ন : আধুনিক কবি হওয়ার জন্য অধ্যয়ন কিংবা আত্মপ্রেরণা-কোনটা বেশি দরকার বলে মনে করেন?
আবুল হোসেন : অধ্যয়ন করে কেউ কবি হতে পারে না। কবি হওয়া বিধাতার দান। কবিরা জন্মান-কবি তৈরি হওয়া যায় না। কোনো কোনো দেশে কবিতা লেখা শেখানো হয়, উপন্যাস লেখার কোর্স চালু আছে। তাতে লেখার প্রক্রিয়া শেখানো যায়, আবেগ জন্মানো যায় না। সৃষ্টিশীল প্রতিভা বা কবি জন্মগ্রহণ করেন- তৈরি হন না।
প্রশ্ন : আপনার সমসাময়িক কবিদের সম্পর্কে কিছু বলুন?
আবুল হোসেন : আমার সমসাময়িক কবিরা হলেন-আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান ও গোলাম কুদ্দুস। গোলাম কুদ্দুস দেশভাগের পরও পশ্চিমবঙ্গে থেকে গেলেন। তার সঙ্গে আমার হৃদ্যতা ছিল বেশি। আমার সমকালে খুবই ভালো কবি হচ্ছেন-ফররুখ আহমদ। ভুল পথে গিয়েই তিনি বেশিদূর অগ্রসর হতে পারলেন না। আমি তাকে বেশ শক্তিশালী কবি মনে করি। আমার সময়ের সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায়েরও যে কোনো লেখা আলাদা করে চেনা যায়।
প্রশ্ন : কবির সামাজিক দায়িত্ব কী?
আবুল হোসেন : কবির আলাদা করে কোনো সামাজিক দায়িত্বের কথা আমি স্বীকার করি না। লেখকের দায়িত্ব তার বিবেকের কাছে, নিজের কাছে। কবিরা তো সমাজেরই লোক, যা তিনি লিখবেন সমাজের মানুষের জন্যই লিখবেন। সমাজের একজন হিসেবে মানুষের কথা, সমাজের কথাই তো লিখছি। যা বলার কবিতাতেই বলছি।
প্রশ্ন : কবিদের রাজনীতি সম্পৃক্ততা থাকা দরকার আছে বলে মনে করেন কি?
আবুল হোসেন : কবিদের রাজনীতি কেন, সবকিছু সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কিন্তু প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশ নেয়া কবির জন্য আত্মঘাতী কাজ। রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে কবিতার বদলে তিনি স্লোগান লিখতে শুরু করবেন। তবে কবিকে অবশ্যই সমাজ ও রাজনীতি সচেতন হতে হবে-সবকিছু জানা থাকতে হবে। সুভাষ কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী ছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাকেও পার্টি ছাড়তে হয়েছে। রাজনীতির মধ্যে গেলে দলীয় নির্দেশে চলতে হয়, নিজের বিবেকের নির্দেশ মতো চলতে পারেন না।
প্রশ্ন : আপনাদের পরবর্তী দশকের বাংলাদেশের কবিতা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
আবুল হোসেন : আবহমান বাংলা কবিতার ধারায় ফররুখ, তালিম হোসেন ভিন্নধারায় গেলেও আমি মূলধারায় থেকেছি। আমাদের পরবর্তী সময়ে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরীরা কিংবা তাদের পরের রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও অন্যরা তিরিশের নতুন কবিতার ধারায় কাব্যচর্চা করে যাচ্ছেন। বাংলা কবিতায় তিরিশের পরে আর কোনো নতুন বাঁকবদল হয়নি। শামসুর রাহমানের ব্যাপ্তি বেশ, আল মাহমুদের কবিতা জসীমউদ্দীনের আধুনিক সংস্করণ। তিনি জসীমউদ্দীন ও জীবনানন্দকে মেলাতে চেয়েছেন। কবিদের দশক ওয়ারি বিভাজনে আমার তেমন সায় নেই। পূর্বসূরিদের চেয়ে আলাদা কিছু করতে পারলে তাকে এমনিতেই চেনা যাবে।
প্রশ্ন : একজন কবি হিসেবে বয়সের শেষপ্রান্তে এসে আপনার প্রধান স্বপ্ন কি?
আবুল হোসেন : আমার সব স্বপ্নই কবিতা নিয়ে। কবিতার বাইরে আশা-আকাক্সক্ষা বিশেষ কিছু নেই। তবে যখনই সময়ের কথা ভাবি-তখন বিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক, প্রকৌশলিক যেসব আবিষ্কার, তার যে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে-তা থেকে মানুষের জীবনযাপনের মান বেড়েছে। এসব সত্ত্বেও আমার মনে হয়েছে-মানুষ যে আগের মানুষের চেয়ে ভালো মানুষ হচ্ছে, তা আমি দেখতে পাইনে। বর্তমান বিশ্বের যে অবস্থা দেখছি, সৎ ও বিবেকবান মানুষের বড় অভাববোধ করছি। আমার বরং মনে হয়েছে-এই সময়টি বিশ্বের জন্য বড় দুঃসময়।
প্রশ্ন : আমরা আলাপের শেষপর্যায়ে এসেছি। তরুণদের উদ্দেশ্যে কোনো উপদেশ দেবেন কি?
আবুল হোসেন : আমি কাউকে কোনো উপদেশ দিই না। তবে একথা বলব-তরুণরাই জাতির ভবিষ্যৎ, তাদের মধ্য থেকে আগামীতে নতুন কিছু সৃষ্টি হবে, নতুন কবিতাও হবে। তবে তাদের অধ্যবসায়, সাধনা ও প্রচেষ্টার ওপরই কবিতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। এ খুব কঠিন কাজ। তবে তরুণরাই তো পথ দেখায়- আমি আশাবাদী।
প্রশ্নকর্তা : এই দীর্ঘ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
আবুল হোসেন : তোমাদেরও ধন্যবাদ।

কবিতা এক অমীমাংসিত শিল্প by আল মাহমুদ

আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় এক অনিবার্য কিংবদন্তির নাম। দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে তিনি যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন, সেখানে এখন গোধূলিসন্ধির নৃত্য; চতুর্দিকে ঘনায়মান তমসার নিদারুণ প্রতিচ্ছায়া। কিন্তু আল মাহমুদ বহু আগেই অকম্পিত কণ্ঠস্বরে ঘোষণা করেছিলেন সেই অমোঘ সত্যবাণী : ‘পরাজিত হয় না কবিরা।’ সুতরাং আল মাহমুদ আছেন প্রায় সর্বব্যাপ্ত হয়ে- বাংলা কবিতায় আজও প্রতিদ্বন্দ্বীহীন অধীশ্বর তিনি। এ জন্য একমাত্র আল মাহমুদই বলতে পারেন; ‘আমি সীমাহীন যেন-বা প্রাচীন বটবৃক্ষের মতো’। ১৯৩৬ সালে ১১ জুলাই বি-বাড়িয়ায় মীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশোনা ও বেড়ে উঠা কুমিল্লা শহর ও চট্টগ্রামে। সাহিত্য জীবন শুরু করেন ঢাকায়। প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লোক-লোকান্তর (১৯৬৩)’। ‘লোক-লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ মাত্র এ দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেন ১৯৭৩ সালে ‘সোনালী কাবিন’ প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে সাহিত্য প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার ও জীবনানন্দ দাশ পুরস্কারসহ নানা সম্মাননায় ভূষিত হলেও পাঠক হৃদয়ে তিনি যে অমরতা লাভ করেছেন তার সঙ্গে কোনো কিছু তুল্য নয়। প্রায় ষাট বছরের কবি জীবনে তিনি অসংখ্য কবিতা লিখেছেন এবং এখনও অনবরত ডিকটেশনে লিখে চলেছেন। তার অধিকাংশ কবিতাই কালোর্ত্তীণ, স্বমহিমায় ভাস্বর। স্বপ্নকামী মানুষের প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আমৃত্যু লিখে যেতে চান। আজ ১১ জুলাই কবির ৮৯তম জন্মদিন উপলক্ষে কবির সঙ্গে বাংলাসাহিত্যের নানা দিকসহ সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে আলাপ করেছেন তরুণ লেখক আবিদ আজম ও কবি ইমরান মাহফুজ। বি.স.
প্রশ্ন : সুধীন দত্ত বলেছেন- শব্দ দিয়েই কবিতা তৈরি হয়। আপনি কি মনে করেন?
আল মাহমুদ : কবিতা এক অমীমাংসিত শিল্প। এর সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত নিরূপণ সম্ভব হয়নি। আমি বলি- কবিতা পরিশ্র“ত চিন্তা যা উৎকৃষ্ট শব্দের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। শুধুমাত্র শব্দ দিয়ে কবিতার অবয়ব তৈরি হয় না।
প্রশ্ন : ‘চোখ’ শিরোমের একটি কবিতায় লিখেছেন- এখন চোখ নিয়েই হল আমার সমস্যা।/ যেন জন্ম থেকেই/ অতিরিক্ত অবলোকন শক্তিকে ধারণ করে আছি...। মূলত চোখ নিয়ে কি সমস্যার কথা বুঝিয়েছেন?
আল মাহমুদ : আমি আসলে অতিরিক্ত দেখি। সাধারণ মানুষ যা দেখতে পায় না আমি তা দেখতে পাই। তুমি পোশাক পরে আছ আমি পোশাক দেখি না, আমি ভিতর দেখি। এটাই একজন কবির দেখা। কবির অবলোকন শক্তি।
প্রশ্ন : আপনার বিখ্যাত কবিতার বই ‘সোনালী কাবিন’। এই নামের কবিতায় বলেছেন- সোনার দিনার নেই, দেন মোহর চেয়ো না হরিণী/ যদি নাও দিতে পারি, কাবিনবিহীন হাত দুটি। কবিরা আসলে সব সময় সাময়িক অর্থের পরোয়া না করে ভালোবাসা দিতে আগ্রহী? কবিদের এই আগ্রহে কি নারীর সব পাওয়া যায়?
আল মাহমুদ : না। কারণ, কাবিন বিহীন এই নয় যে, কোনো মূল্য না দিয়ে প্রেম কেনা যায়। এটা ভালোবাসার বহির্প্রকাশ। নিশ্চয় তার মূল্য দিতে হয়। চাওয়া-পাওয়ায় মিল করে নিতে হয়। বিনা প্রেম সে নাহি মিলে নন্দলালা।
প্রশ্ন : এ সময়ে অনেকে আধুনিক কবিতা লিখতে গিয়ে কবিতার মূল জায়গা থেকে সরে যায়। এতে কি পাঠকের সঙ্গে কবির দূরত্ব তৈরি হয় না?
আল মাহমুদ : কবি যদি আধুনিক কবিতা কি, তা না বোঝেন তা হলে তো কবিতা হল না। কবির কবিতা কমিউনিকেট করতে হবে পাঠকের হৃদয়ের সঙ্গে। তা না হলে কবি ফেইল করল। আমরা তো সারা বছর কবিতা লিখেছি। কই কেউ তো কখনও অভিযোগ করেনি।
প্রশ্ন : আল্লামা রুমি, হাফিজ, জামিসহ এদের অনেক লেখা পড়েছেন, আপনার লেখা পড়ে বোঝা যায়। তাদের নিয়ে কিছু বলা যায়?
আল মাহমুদ : এরা খুবই অসাধারণ কবি ছিলেন। তাদের লেখা আমি ইংরেজিতে পড়েছি। তাদেরও কিছু লেখা আমার মনে ছায়া ফেলেছে। যা কবিতার জন্য খুব কাজ দিয়েছে। আর ভালো কবির কবিতা পড়লে প্রভাব পড়েই স্বাভাবিক। আমাকে তুমি এদের ভাবশিষ্য বলতে পার।
প্রশ্ন : সালমান রুশদি বলেছেন- লেখকদের অধিক স্বাধীনতা থাকা দরকার। আপনি কি তাই মনে করেন?
আল মাহমুদ : লেখকরা তো জন্ম থেকেই স্বাধীন। তারা কাউকে জিজ্ঞাস করে লেখেন না। মনের আনন্দে লিখে যান অবিরত। স্বাধীনতার প্রশ্ন আসবে কেন?
প্রশ্ন : আপনি আপনার একটি বইয়ের উৎসর্গে লিখেছেন, আমাদের কাব্য হিংসা অমর হোক- শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, শহীদ কাদরী। সাহিত্যের ভালোবাসা কি এমনই হয়?
আল মাহমুদ : সত্যিকার অর্থে আমাদের মধ্যে তখন এ বিষয়টাই কাজ করত। আর কাব্য হিংসা বলতে আমরা এক অন্যের লেখার প্রতি চরম ঈর্ষাকাতর হতাম। শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, শহীদ কাদরী তিনজন ভালো বন্ধু ছিলাম। এরা প্রত্যেকে বড়মানের কবিও। আর একজন- পঞ্চাশের সৈয়দ হক ভাই, তারও ভালো কিছু লেখা আছে। আমাদের সময়ের প্রত্যেক লেখকের কিছু না কিছু ভালো কাজ আছে, যেমন ধরো মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ, আমাকে ছন্দ শিখিয়েছিলেন।
প্রশ্ন : আমরা দেখি কবিরা গান লিখলে সেটা বেশ ভালো হয় এবং আলোচনায় আসে। পঞ্চাশের অনেক কবিই গান লিখেছেন। সে ক্ষেত্রে আপনি ভিন্ন। কেন লিখেননি? না আগ্রহ হয়নি?
আল মাহমুদ : হ্যাঁ গান আমি লিখিনি। আমার কেন যেন মনে হয় আমার কবিতার মধ্যে সঙ্গীত আছে। আর আমি মূলত লিরিকধর্মী কবি। আমার কবিতায় গীতিময়তার ফলে গান লিখতে আগ্রহী হইনি। লিখলে হয় তো লিখতে পারতাম। যে শহরে জন্ম আমার, সে শহরকে সঙ্গীতের শহর বলা হতো। সঙ্গীতের সব যন্ত্র এখানে তৈরি হতো। আমি দেখতাম যে সিরিজ কাগজ দিয়ে সেতার, এশরাজ ঘষছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আমি অনেকবার বলেছি যে আমি কবি না হলে সঙ্গীতজ্ঞ হতাম।
প্রশ্ন : কবিরা কখনও কখনও লক্ষ্যহীন চলে বা লেখে। একজন কবির কি কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকা উচিত?
আল মাহমুদ : প্রকৃত কবিরা শুধু লেখে না, তারা পরিশ্রম করে পড়ে, ঘুরে, কবিতার ছন্দ মিল রেখে জায়গায় পৌঁছাতে চায়। একটা কবিতাকে সার্থক করে তুলতে চায়। এটাই কবির লক্ষ্য হওয়া উচিত। কবিদের সম্পর্কে বলা হয়েছে- ওনারা উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। একজন কবিকে লক্ষ্যহীন হলে চলে না। তার কিছু দায়িত্ব আছে, কতর্ব্য আছে।
প্রশ্ন : কবি ফররুখ ও জসীম উদ্দীন আপনার প্রিয় কবি। এরা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকটা আলোচনার বাইরে বা আড়ালে মনে হয়। বিষয়টা কেন, বলতে পারেন?
আল মাহমুদ : আলোচনার বাইরে বা আড়ালে বিষয়টা একদম ঠিক নয়। এই যে তোমার মনে আছে তাহলে আড়াল হল কি করে? তাছাড়া তারা বাংলাভাষার মৌলিক কবি। বাংলা কবিতার কথা বলতে গেলে তাদের নাম উচ্চারণ করতেই হবে। তাদের কবিতায় আছে নতুনত্ব এবং ভাবনার উপাদান। কবিদের তালিকায় এদের নাম লেখা অপরিহার্য।
প্রশ্ন : কাব্যজীবনে আপনাকে বাংলাভাষা ছাড়া অন্য ভাষার সাহিত্য খুব বেশি টাচ করেছে কি?
আল মাহমুদ : সব ভাষার সাহিত্যই টুকটাক পড়েছি। সামান্য যা জেনেছি তা দিয়েই কবিতার সঙ্গে যোগাযোগ করে একটা সম্পর্ক দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। পরে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে ভালো সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। যা আমার লেখায় এসেছে।
প্রশ্ন : মানিক বন্দোপাধ্যায়ের লেখা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। বাংলাসাহিতের আলোচিত উপন্যাসের একটি। আপনার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন এতে একটি খুঁত আছে। সেটি কি?
আল মাহমুদ : প্রথম কথা হচ্ছে, মানবিক শিল্প নির্ভুল হয় না। তবু লেখকের চেষ্টা থাকে পারফেকশনের জন্য। কিন্তু এই উপন্যাসে দেয়া হয়েছে মুসলমানদের ব্যাপরে অন্য ধারণা। উপন্যাসে একটা চরিত্র আছে কুবের মাঝি। নতুন কোনো দ্বীপে দরিদ্র মানুষদের নিয়ে যাচ্ছে সে। সেটা হল ময়নাদ্বীপ। এই যে চিন্তা। এটাই তো অস্বাভাবিক। এখানে ভালো করে পড়ে দেখ বুঝবে।
প্রশ্ন : ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ আপনার এই বইটি নিয়ে একবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে মনজুরে মাওলার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। বিষয়টা কি এবং কেন হয়েছে?
আল মাহমুদ : টেলিভিশনে উনি আমাকে বলল- লোকে বলে আপনার ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ বইটি পঞ্চাশভাগ সত্য আর পঞ্চাশভাগ মিথ্যা। কথাটা শুনে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। বললাম- আমি কবি মানুষ। একটা আত্মোপন্যাস লিখেছি। আপনি নিজেও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। একটা উপন্যাসে পঞ্চাশভাগ সত্য আর পঞ্চাশভাগ মিথ্যা যখন বললেন, তাহলেই আমার বইটি সার্থক। তারপর আর কোনো কথা বলেনি।
প্রশ্ন : আপনার গল্প ‘জলবেশ্যা’ থেকে কলকাতায় ‘টান’ নামে নির্মাণ করা হয়েছে বাংলা সিনেমা। এই বিষয়ে কিছু বলেন?
আল মাহমুদ : অসাধারণ একটি গল্প। তারা গল্পটি প্রছন্দ করে সম্মানী দিয়ে অনুমতি নিয়ে গেল। নির্মিত চলচ্চিত্রটি উদ্বোধন করার কথাও বলে ছিল। কিন্তু আমার বয়স হয়ে গেছে, সে রকম চলাফেরা করতে পারি না। বললাম যে, যেতে পারব না।
প্রশ্ন : ‘ফুরফুরে পাঞ্জাবি পরে সাহিত্য হয় না’ একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন। সহজ করে কথাটা বললে কি বলবেন?
আল মাহমুদ : ‘বিনা প্রেম সে নাহি মিলে নন্দলালা’, ঠিক এমনই। পরিশ্রম আর ভালবাসা ছাড়া কোনো কিছুই অর্জন হয় না। প্রচুর পড়া, ঘুরা, লিখা সবই করতে হবে। অলস হয় বসে থাকলে চলবে না।
প্রশ্ন : বয়স আপনার আশির কোঠায়। এখন শুরু করেছেন ‘এ গল্পের শেষ নেই শুরুও ছিল না’ শিরোনামে মহাকাব্য। শেষ করতে পারবেন কি?
আল মাহমুদ : দোয়া কর ইনশাহআল্লাহ শেষ করব। অনেক আগেই মাহাকব্য লেখার ইচ্ছা থাকলেও হয়ে উঠেনি। এটি শুরু করেছি গত বছর থেকে। দেখি কতটুকু লিখতে পারি। শরীরটা যদি আল্লাহ সুস্থ্য রাখেন।
প্রশ্ন : বর্তমানে আপনি বাংলাভাষার প্রধান কবি। বিষয়টা কেমন উপভোগ করেন?
আল মাহমুদ : ভালোই লাগছে। আমি তো এখনও লিখে চলেছি। জীবনে বহু পরিশ্রম করেছি। সাহিত্যে এসে ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করিনি। সবকিছু অর্জন করেছি কাজের মাধ্যমে। সর্বোপরি সাহিত্যকে ভালোবাসার জন্যই আমার এ অবস্থান। আর কবিতাই আমার বাড়ি-ঘর। তাই সম্পদ নেই, আছে খ্যাতি।

জরুরি তহবিল পাস করতে কংগ্রেসকে ওবামার আহ্বান

বারাক ওবামা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অভিবাসন-সংকট মোকাবিলায় জরুরি তহবিলের জন্য ৩৭০ কোটি ডলারের বিল পাস করতে কংগ্রেসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত বুধবার এই আহ্বান জানানোর সময় তিনি মধ্য আমেরিকার দেশগুলো থেকে সন্তানদের অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার জন্য সীমান্তে না পাঠাতে মা-বাবাদের সতর্ক করে দেন।
খবর এএফপির। টেক্সাসের গভর্নর রিক পেরির সঙ্গে বৈঠকের পর গত বুধবার ডালাসে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সীমান্ত ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন ওবামা। এ সময় তিনি অভিবাসন-সংকট মোকাবিলায় জরুরি তহবিল নিয়ে রাজনীতি না করার জন্য কংগ্রেস নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ওবামা জানান, গত অক্টোবর থেকে অন্তত ৫৭ হাজার শিশু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকেছে। তারা মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশে থেকে এসেছে।

বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে বিভ্রান্ত অর্থনীতিবিদেরা

ভালো দিনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি প্রথম বাজেটে কতটা সুদিনের সম্ভাবনা জাগাতে পারলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর দেশজুড়ে চলল তারই চর্চা। এর প্রতিফলন ঘটল শেয়ারবাজারেও। শেয়ার-সূচক সারাটা দিন পেন্ডুলামের মতো এপাশ-ওপাশ ঘোরাফেরা করল। নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদেরাও বাজেট প্রস্তাব কতটা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়ে বিভ্রান্ত। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম বাজেট সৃষ্টি করল এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার। জেটলির সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল বহুমুখী। সাধারণ মানুষ যাঁরা সমর্থনের ভান্ডার উপুড় করে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছেন, তাঁদের ‘আচ্ছে দিন’ উপহার দেওয়া ছিল তাঁর প্রথম কাজ। সে জন্য জরুরি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা ও মধ্যবিত্তের আর্থিক সুরাহা দেওয়া। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ, প্রবৃদ্ধির সামান্য হারকে ক্রমশ ওপরের দিকে টেনে তুলতে শিল্প মহল ও বাজার অর্থনীতিকে চাঙা করা। সে জন্য অবকাঠামো নির্মাণের দিকে বিশেষ নজরদান ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কর-সংক্রান্ত বিরোধের অবসান জরুরি, যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং বিনিয়োগে উৎসাহ আসে। কৃষি খাতে বিশেষ নজর দেওয়াও ছিল প্রয়োজনীয়। কারণ, এবার অনাবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তৃতীয়ত, কোষাগার ঘাটতি কমানো সব সময়ই একটা বড় সমস্যা। আগের সরকার এ নিয়ে জেরবার হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকে অর্থমন্ত্রী কতটা এগোতে পারেন সে দিকে নজর রেখেছিল দেশ-বিদেশের লগ্নিকারীরা। জেটলি এই প্রতিটি সমস্যার সুরাহা করতে চেয়েছেন তাঁর মতো করে।
প্রত্যক্ষ করে কিছুটা বিন্যাস ঘটিয়ে আয়করে ৫০ হাজার রুপি অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন, ভবিষ্য তহবিলের নিম্নসীমা দুই গুণের বেশি বাড়িয়েছেন এবং প্রত্যেকের পেনশন অন্তত এক হাজার রুপি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রত্যক্ষ কর-কাঠামোয় বিন্যাসের ফলে সরকারের বার্ষিক আয় ২২ হাজার ২০০ কোটি রুপি কম হবে। পরোক্ষ করে শুল্ক-বিন্যাস ঘটিয়ে সাড়ে সাত হাজার কোটি অতিরিক্ত আয় হবে। কিন্তু বিদেশি লগ্নিকারীদের আস্থা অর্জনে কর বিরোধ দূর করে নির্দিষ্ট বিধি প্রণয়নের যে দাবি বড় হয়ে উঠেছিল, তার সরাসরি নিষ্পত্তি না ঘটিয়ে জেটলি একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব রেখেছেন। শিল্প মহল এতে কিছুটা আশাহত হলেও অর্থনতিবিদেরা অর্থমন্ত্রীর পদক্ষেপে ভতুর্কি কমানোর আশা দেখছেন। প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্প-বান্ধব পরিস্থিতি সৃষ্টিতে জেটলি অবকাঠামোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। একাধিক স্থলবন্দর ও ছোট শহরে বিমানবন্দর গড়া, এক শ ‘স্মার্ট শহর’ তৈরির সিদ্ধান্ত ঘোষণা, বিদ্যুৎ সড়ক পরিবহন প্রকল্প, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্বদান, ছয় রাজ্যে এইমস ধাঁচে হাসপাতাল গড়া এবং ক্রমশ সব রাজ্যে একটি করে এমন হাসপাতাল সার্বিক স্বাস্থ্য পরিষেবায় লগ্নি উল্লেখযোগ্য। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি পালনের প্রচেষ্টা রয়েছে। তবে এসব ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও বিমা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২৬ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করা। গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পূর্বতন সরকারের ১০০ দিনের কাজের যে প্রকল্প যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, তা রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জেটলি। তবে এ ক্ষেত্রে সম্পদ সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এই বাজেট মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বাসে পরিণত করবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, রেল বাজেটের মতোই এই বাজেটে নির্দিষ্ট কিছু নেই। অর্থের জোগানই বা কী করে হবে, তার ইঙ্গিত নেই। সোনিয়া গান্ধীর মতে, এই বাজেট নিতান্তই ইউপিএ সরকারের কর্মকাণ্ডগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। রাহুলের মতে, এতে অর্থনীতি বেগবান হবে না। বরং আরও ঢিমে হয়ে যাবে।

বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে বিভ্রান্ত অর্থনীতিবিদেরা

ভালো দিনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি প্রথম বাজেটে কতটা সুদিনের সম্ভাবনা জাগাতে পারলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর দেশজুড়ে চলল তারই চর্চা। এর প্রতিফলন ঘটল শেয়ারবাজারেও। শেয়ার-সূচক সারাটা দিন পেন্ডুলামের মতো এপাশ-ওপাশ ঘোরাফেরা করল। নিরপেক্ষ অর্থনীতিবিদেরাও বাজেট প্রস্তাব কতটা কার্যকর বা বাস্তবায়ন করা যাবে, তা নিয়ে বিভ্রান্ত। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম বাজেট সৃষ্টি করল এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার। জেটলির সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল বহুমুখী। সাধারণ মানুষ যাঁরা সমর্থনের ভান্ডার উপুড় করে বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছেন, তাঁদের ‘আচ্ছে দিন’ উপহার দেওয়া ছিল তাঁর প্রথম কাজ। সে জন্য জরুরি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা ও মধ্যবিত্তের আর্থিক সুরাহা দেওয়া। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ, প্রবৃদ্ধির সামান্য হারকে ক্রমশ ওপরের দিকে টেনে তুলতে শিল্প মহল ও বাজার অর্থনীতিকে চাঙা করা। সে জন্য অবকাঠামো নির্মাণের দিকে বিশেষ নজরদান ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কর-সংক্রান্ত বিরোধের অবসান জরুরি, যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে এবং বিনিয়োগে উৎসাহ আসে। কৃষি খাতে বিশেষ নজর দেওয়াও ছিল প্রয়োজনীয়। কারণ, এবার অনাবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তৃতীয়ত, কোষাগার ঘাটতি কমানো সব সময়ই একটা বড় সমস্যা। আগের সরকার এ নিয়ে জেরবার হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, প্রয়োজনীয় সংস্কারের দিকে অর্থমন্ত্রী কতটা এগোতে পারেন সে দিকে নজর রেখেছিল দেশ-বিদেশের লগ্নিকারীরা। জেটলি এই প্রতিটি সমস্যার সুরাহা করতে চেয়েছেন তাঁর মতো করে। প্রত্যক্ষ করে কিছুটা বিন্যাস ঘটিয়ে আয়করে ৫০ হাজার রুপি অতিরিক্ত ছাড় দিয়েছেন, ভবিষ্য তহবিলের নিম্নসীমা দুই গুণের বেশি বাড়িয়েছেন এবং প্রত্যেকের পেনশন অন্তত এক হাজার রুপি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
প্রত্যক্ষ কর-কাঠামোয় বিন্যাসের ফলে সরকারের বার্ষিক আয় ২২ হাজার ২০০ কোটি রুপি কম হবে। পরোক্ষ করে শুল্ক-বিন্যাস ঘটিয়ে সাড়ে সাত হাজার কোটি অতিরিক্ত আয় হবে। কিন্তু বিদেশি লগ্নিকারীদের আস্থা অর্জনে কর বিরোধ দূর করে নির্দিষ্ট বিধি প্রণয়নের যে দাবি বড় হয়ে উঠেছিল, তার সরাসরি নিষ্পত্তি না ঘটিয়ে জেটলি একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব রেখেছেন। শিল্প মহল এতে কিছুটা আশাহত হলেও অর্থনতিবিদেরা অর্থমন্ত্রীর পদক্ষেপে ভতুর্কি কমানোর আশা দেখছেন। প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্প-বান্ধব পরিস্থিতি সৃষ্টিতে জেটলি অবকাঠামোর দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। একাধিক স্থলবন্দর ও ছোট শহরে বিমানবন্দর গড়া, এক শ ‘স্মার্ট শহর’ তৈরির সিদ্ধান্ত ঘোষণা, বিদ্যুৎ সড়ক পরিবহন প্রকল্প, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্বদান, ছয় রাজ্যে এইমস ধাঁচে হাসপাতাল গড়া এবং ক্রমশ সব রাজ্যে একটি করে এমন হাসপাতাল সার্বিক স্বাস্থ্য পরিষেবায় লগ্নি উল্লেখযোগ্য। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি পালনের প্রচেষ্টা রয়েছে। তবে এসব ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও বিমা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ২৬ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ করা। গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পূর্বতন সরকারের ১০০ দিনের কাজের যে প্রকল্প যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, তা রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জেটলি। তবে এ ক্ষেত্রে সম্পদ সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, এই বাজেট মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বিশ্বাসে পরিণত করবে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বলেন, রেল বাজেটের মতোই এই বাজেটে নির্দিষ্ট কিছু নেই। অর্থের জোগানই বা কী করে হবে, তার ইঙ্গিত নেই। সোনিয়া গান্ধীর মতে, এই বাজেট নিতান্তই ইউপিএ সরকারের কর্মকাণ্ডগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। রাহুলের মতে, এতে অর্থনীতি বেগবান হবে না। বরং আরও ঢিমে হয়ে যাবে।

গাজায় নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করছে ইসরাইল

গাজা হামলায় আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনের মেডিকেল ও মানবাধিকার কর্মীদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তুর্কি বার্তাসংস্থা আনাদোলুর বরাতে বৃহস্পতিবার এ খবর প্রকাশ করেছে ডেইলি সাবাহ। ইসরাইলের হামলায় আক্রান্ত ফিলিস্তিনিদের শরীর পুড়ে যাচ্ছে। আক্রান্তদের শরীরের বিভিন্ন অংশ টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে দিতে হচ্ছে। বুধবার ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল কোদরা বলেন, চলমান গাজা আক্রমণে ইসরাইলি অস্ত্রের আঘাতে আহতদের শরীর পোড়া-কয়লা হয়ে যাচ্ছে। আক্রান্তদের ওপর প্রাথমিক পরীক্ষা চালিয়ে অস্ত্রের প্রকৃতি অত্যন্ত রোমহর্ষক বলে জানা গেছে। তিনি বলন, ইসরাইল এর আগে গাজা আক্রমণে দুবার আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার করেছিল। সেই একই অস্ত্র এখন ব্যবহার করছে। আল কোদরা ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরাইলের নৃশংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। এদিকে মানবাধিকার সংস্থার প্রত্যক্ষদর্শী কর্মীরা অনলাইনে আক্রান্তদের কিছু ছবি প্রকাশ করেছেন। দুর্বলচিত্তদের এসব ছবি দেখতে নিষেধ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি ডাক্তাররা বলছেন, রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় অনেকেই তাদের অঙ্গ হারাতে বসেছেন। এই হামলায় আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেন, গাজা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্য কঠিন সময় পার করছে এখন।
বুধবার রাতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জমিন নেতানিয়াহু, ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি। মুন বলেন, গাজায় নতুন করে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমি অত্যন্ত উৎকণ্ঠিত। সাম্প্রতিককালে এ অঞ্চলটি চরম দুঃসময় মোকাবিলা করছে। তিনি আরও বলেন, গাজা পরিস্থিতি যে কোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। এ সময় ইসরাইলের রকেট হামলার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের হামলা অগ্রহণযোগ্য তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে, গাজা এলাকায় বৃহস্পতিবার ইসরাইলি বিমান হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে চারজন নারী ও চারটি শিশু। গাজায় ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর ব্যাপক অভিযানের তৃতীয় দিনে এসব লোক নিহত হল। হাসপাতাল সূত্র এ কথা জানায়। গাজা উপত্যকা থেকে হামাস জঙ্গিদের রকেট হামলা বন্ধে মঙ্গলবার শুরু করা অপারেশন প্রটেকটিভ এজ নামের ইসরাইলি সামরিক অভিযানে এ নিয়ে নিহত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭০ জনে দাঁড়াল। ইসরাইলের সামরিক বাহিনী জানায়, তারা রাতে হামাসের তিন শতাধিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এদিকে এ অভিযান শুরুর পর থেকে ইসলামি জঙ্গি গ্র“পের সাড়ে ৭০০ অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

নেতা বটে মাসচেরানো!

দশে দশ পেতে পারেন সর্বোচ্চ। হাভিয়ের মাসচেরানো লড়েন এগারো পেতে। কখনও বারোর জন্য। কখনও বা তারও বেশি! লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। কিন্তু মাসচেরানো দলের আধ্যাত্মিক নেতা! নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষটায় এসে গোলকিপার রোমেরোকে বললেন, ‘যাও, নায়ক হয়ে ফিরে এসো!’ তাই করেছেন রোমেরো। ৯০ মিনিটে খেলা গোলশূন্য। কোয়ার্টার ফাইনালে অসম্ভব সুন্দর পারফরম্যান্সের পর এই ম্যাচেও জ্বলজ্বলে তারকা মাসচেরানো।
অতিরিক্ত সময়ের আগে বিশ্রামে দলের নেতা মাসচেরানো। উৎসাহ দেন সবাইকে। এরপর বিরতিতে। তারও পরে পেনাল্টি শুট আউটের আগে সবার নেতা তিনিই। জেফেসিতো বা ছোট নেতা পুরো দলকে নিয়ে গোল হয়ে দাঁড়ান। দলকে দেন প্রেরণা। এরপর সবার গোলকিপার রোমেরোর মুখোমুখি হন। অনেক জোরেই বলেন, ‘আজ গোটা বিশ্ব তোমার দিকে তাকিয়ে। আজ তোমার হিরো হওয়ার দিন। তোমাকে হিরো হতে হবে।’ তারপর হয় ইতিহাস। দলও তার দাবি ফেলেনি। ৪ শটের কোনোটি মিস হয়নি। গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে মাসচেরানোর কথাটা তাতিয়ে দিয়েছিল? রোমেরো দুটি শট ঠেকিয়ে দিয়ে আর্জেন্টিনার জাতীয় বীর। তারই হাত ধরে ২৪ বছর পর আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। মাসচেরানোর পরিচয়, মাঝমাঠের মেধাবী খেলোয়াড়। সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারও একটা পরিচয় তার। এ কারণেই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে আরও বেশি ঝানু। দুটি অলিম্পিক পদক ঝুলেছে তার গলায়। খেলছেন তৃতীয় বিশ্বকাপ। গেল বিশ্বকাপে ছিলেন অধিনায়ক। ম্যারাডোনার যুগে দলের নেতা ছিলেন। পরে সাবেলা আর্মব্যান্ড দিয়েছেন মেসিকে। আর্জেন্টিনার হয়ে এই ৩০ বছর বয়সেই মাসচেরানো খেলে ফেলেছেন ঈর্ষণীয় ১০৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এখনও ফর্মের তুঙ্গে বার্সেলোনা তারকা। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিফাইনালে জান বাজি রেখেই খেলেছেন। একবার বাঁ-প্রান্ত থেকে ডিফেন্স ভেঙে ঢুকে পড়লেন আর্জেন রবেন। শেষ প্রহরী গোলকিপার আছেন। তাকেও হারিয়ে দিতে পারেন এমন জায়গা থেকে শট নিতে যাচ্ছেন। কিন্তু তার সঙ্গে লেগে থাকা মাসচেরানোর স্লাইডিং ট্যাকলে বাঁচালেন দলকে।
নিশ্চিত গোলের সুযোগ মিস ডাচদের। ম্যাচে মাঠের মাঝ থেকে নিচে, কখনও ওপরে কিছুটা রীতিমতো চষে বেড়িয়েছেন। ১২০ মিনিটে ১০৪ বার বল এসেছে পায়ে। ৮৮টি পাস দিয়েছেন। ৮৪ শতাংশ নির্ভুল ছিলেন পাসিংয়ে। ট্যাকল করেছেন ৪ বার। প্রতিবার সফল। ১টি ক্লিয়ারেন্স, ১টি ব্লক। বল দখলের দ্বন্দ্বযুদ্ধে ৮৫ শতাংশ সাফল্য। দখলের লড়াইয়ে লাফিয়ে উঠে উইনালদামের সঙ্গে মাথায় ব্যথা পেলেন। চোখে শর্ষে ফুল দেখেছেন। মাথা ঘুরে পড়েও গেছেন। আবার উঠেছেন মাসচেরানো। লড়েছেন ফাইনালে যেতে। তার এই লড়াকু মানসিকতা প্রশংসনীয় কোচ আলেসান্দ্রো সাবেলার কাছে। তবে রবেনকে যেভাবে ঠেকিয়ে দিয়েছেন গোলকিপারের সামনে ওয়ান টু ওয়ানে, তা নিয়ে উচ্ছ্বসিত সাবেলা, ‘মাসচেরানো একটি প্রতীক, একটি লোগো। আমরা সেমিফাইনাল পার হলাম। আর এই পথে নিজের কাঁধে অনেক ভার তুলে নিয়েছে মাসচেরানো। অসাধারণ খেলোয়াড় সে। অন্যরা তাকে নিতে চাইবে। মাঠ ও মাঠের বাইরে সে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের প্রতীক।’ এক ম্যাচে দু’জনকে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার দেয়া যায় না। নইলে রোমেরোর চেয়ে কোনো অংশে কম দাবিদার ছিলেন না মাসচেরানো!

গডফাদারের মেয়ে তিশা

এবার গডফাদারের মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন নুশরাত ইমরোজ তিশা। ঈদের জন্য নির্মিত একটি নাটকে এমন চরিত্রেই দেখা যাবে তাকে। নাটকে গডফাদারের ভূমিকায় থাকছেন মামুনুর রশীদ। সুমন আনোয়ারের রচনা ও পরিচালনায় নাটকটির নাম ‘তার বাবা গডফাদার’। সম্প্রতি পুরান ঢাকা এবং কালিয়াকৈরের বিভিন্ন লোকেশনে নাটকটির শুটিং হয়েছে। একজন গডফাদারের মেয়ে এবং তার প্রেমিককে নিয়ে এ নাটকের গল্প আবর্তিত হয়েছে। নাটকে তিশার প্রেমিক চরিত্রে অভিনয় করেছেন রওনক হাসান। এ নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে তিশা বলেন, ‘চমৎকার একটি গল্প। চরিত্রে যথেষ্ট ভেরিয়েশন আছে। নাটকটিতে অনেকটা সিনেমাটিক ব্যাপার আছে। যা দেশে দর্শকরা ভিন্ন মাত্রার আনন্দ পাবে বলেই আমার বিশ্বাস।’ নাটকটি এসএ টিভির ঈদ আয়োজনে প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানান।

পুল ডান্সার আবেদনময়ী নাথালিয়া কৌর

রাম গোপাল বার্মার ‘ডিপার্টমেন্ট’ ছবিতে ‘দান দান চিনি’ শীর্ষক আইটেম গানের মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় ভারত-ব্রাজিলিয়ান মডেল নাথালিয়া কৌরের। এরপর বেশ কয়েকটি নতুন ছবিতে কাজ করা হয়েছে তার। মুক্তি প্রতীক্ষিত সেই ছবিগুলোতেও আবেদনময়ী নাথালিয়াকেই আবিষ্কার করা যাবে। তবে এবার নতুন রূপে আসছেন নাথালিয়া। নতুন একটি গানে পারফরম করতে যাচ্ছেন তিনি। এই গানটির চিত্রায়ণ হবে মুম্বইয়ের একটি ফাইভ স্টার হোটেলের সুইমিং পুলে। এখানেই পুল নাম্বারে পারফরম করবেন নাথালিয়া। এই ছবিটির নাম ‘রকি হ্যান্ডসাম’। জন আব্রাহামের প্রযোজনায় ছবিটি পরিচালনা করছেন নিশিকান্ত কামাথ। জন আব্রাহামই এই গানের জন্য নাথালিয়াকে নির্বাচন করেছেন। এই গানটিতে একাধিক সুইমস্যুট পরে ক্যামেরাবন্দি হবেন তিনি। এই সুইমস্যুটগুলোর ডিজাইন করছেন খোদ নাথালিয়া। ব্রাজিলিয়ান ডিজাইনের মতো করেই এগুলো তৈরি হচ্ছে। এদিকে এই গানে জন আব্রহামাকেও পারফরম করতে দেখা যাবে নাথালিয়ার সঙ্গে। ব্যাপক ঘনিষ্ঠ ও চুমোর দৃশ্যে তারা অভিনয় করবেন। নিজের এই আবেদনময়ী পুল ডান্স নিয়ে দারুণ উত্তেজিত ও আনন্দিত নাথালিয়া কৌর।

বিশ্বকাপ শিরোপা চ্যাম্পিয়ন্স -এক কদম বাকি লিওনেল মেসির

নকআউট পর্বের খেলায় বড় তারকাদের দিতে হয় স্নায়ুর আলাদা পরীক্ষাও। তবে লিওনেল মেসি দেখালেন তিনি অন্য ধাতুর গড়া। কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের ডার্ক হর্স বেলজিয়ামের মোকাবিলা করছিল আর্জেন্টিনা। আর পুরো দল ও ভক্তদের প্রত্যাশার বোঝা ঘাড়ে  নিয়ে মাঠে পুরো ম্যাচে মেসি খেলে গেলেন ঠাণ্ডা মাথায়। একই চিত্র দেখা গেলো সেমিফাইনালের গরম লড়াইয়েও। বিশ্বকাপে ২৪ বছর পর সেমিফাইনাল খেলছিল আর্জেন্টিনা। আর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও ডাচ তারকাদের আলাদা নজরে থাকছিলেন প্রতিপক্ষ ফরোয়ার্ড  লিওনেল মেসিই। এতে পরিস্থিতি বুঝে মাঠে নিজের নিয়মিত পজিশন থেকে একটু নিচে নেমে খেলতে দেখা গেল মেসিকে। বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ডকে এদিন ভূমিকা নিতে দেখা যায় দলের রক্ষণেও। আত্মবিশ্বাসী অধিনায়ক লিওনেল মেসি দলে সঞ্জীবনীর সঞ্চার করেন ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। ক্যারিয়ারে ‘সব পাওয়া’ লিওনেল মেসির একমাত্র অপূর্ণতা বিশ্বকাপে। এজন্য পেলে, ম্যারাডোনার মতো গ্রেট ফুটবলারদের কাতারে মেসির নাম নিতে দ্বিধা বোদ্ধাদের। সাদামাটা এক দল নিয়ে ১৯৮৬’র বিশ্বকাপ জেতেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা। আর ব্রাজিল গ্রেট পেলের ঝুলিতে ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০’র বিশ্বকাপ শিরোপা। তবে লিওনেল মেসির সামনে আর মাত্র এক কদম । ১৩ জুলাইয়ের ফাইনালে সুযোগ খোলা রইলো লিওনেল মেসিরও। আর্জেন্টিনা দলের জার্সি গায়ে শিরোপা উদযাপন করেছেন মেসি আগেও। জাবালেতা, রোমেরো, ডি মারিয়া, অ্যাগুয়েরোদের সঙ্গে লিওনেল মেসি জেতেন ২০০৮’র অলিম্পিক ফুটবলের শিরোপা। অধিনায়ক মেসির অসাধারণ নৈপুণ্যে ২০০৫’র আসরে আর্জেন্টিনা জেতে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। সেবার  মেসি নিজে জেতেন সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। বিশ্বকাপে আগের ৭ ম্যাচে মাত্র এক গোল নিয়ে এবারের আসরে খেলতে নামেন লিওনেল মেসি। আসরে নিজেদের সূচনায় ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষ বসনিয়া হার্জেগোভিনার সঙ্গে লড়াইয়ে দলের ২-১ গোলের জয়ে মেসি নিজে পান দুর্দান্ত এক গোল। ইরানের বিপক্ষে গ্রুপের দ্বিতীয় ম্যাচের ইনজুরি সময়ে আর্জেন্টিনার জয়সূচক একমাত্র গোলটি আসে ডি বক্সের বাইরে থেকে মেসির দারুণ এ শট থেকে। গ্রুপের তৃতীয় ম্যাচেও দেখা যায় অপ্রতিরোধ্য মেসিকে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের কঠিন ম্যাচে মেসি করেন জোড়া গোল। দ্বিতীয় রাউন্ডে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নিজে গোল পাননি মেসি। তবে অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া দলের জয়সূচক গোলটি পান মাঝমাঠ থেকে বল পায়ে মেসির ক্ষিপ্র গতির এক দারুণ পাস থেকে । বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও আর্জেন্টিনা দলের বল পায়ে আক্রমণ দানা বাঁধছিল ওই মেসিরই পায়ের জাদুতে।  এতে নিজে গোল না পেলেও আর্জেন্টিনার জয়সূচক একমাত্র গোলটি আসে বল পায়ে মেসির কারুকুরি শেষেই। দৃষ্টিনন্দন ড্রিবলিংয়ে দুই বেলজিক তারকা মারুয়ান ফেলাইনি ও টোবি অল্ডারউইরাল্ডকে পরাস্ত করে ডি মারিয়াকে দারুণ এক পাস ঠেলে দেন মেসি ম্যাচের মাত্র অষ্টম মিনিটে। এতে ডি মারিয়ার পা ঘুরে গঞ্জালো হিগুয়াইনের শট ঠাই নেয় বেলজিয়ামের জালে। আর্জেন্টাইন ফুটবল গ্রেট দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে লিওনেল মেসির তুলনাটা নতুন নয়। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে লড়াইয়ের আগে এ আলোচনা পায় অন্য মাত্রা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে বিশ্বকাপে সর্বশেষ লড়াইটি আর্জেন্টাইনদের জন্য আলাদা তাৎপর্যের । ১৯৮৬’র বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে বেলজিয়ামকে ২-০ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা। পরে ফাইনাল শেষে জিতে নেয় সেবারের বিশ্বকাপ। আর বেলজিয়ামের বিপক্ষে জোড়া গোল পান আর্জেন্টিনা অধিনায়ক দিয়েগো ম্যারাডোনা। পাঁচ গোল নিয়ে ম্যারাডোনা জিতে নেন সেবারের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বলও। এবার কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা-বেলজিয়াম ম্যাচের আগে স্পট লাইট ছিল যথারীতি মেসির দিকে। আর্জেন্টিনার ফুটবল ভক্তরা সাবেক তারকা দিয়েগো ম্যারাডোনোর মতো  ম্যাজিক দেখতে চাচ্ছিলেন লিওনেল মেসির খেলায়ও। আর এবারের বেলজিয়াম ডিফেন্স আলাদা চ্যালেঞ্জ রাখছিল আর্জেন্টিনা ফরোয়ার্ডদের সামনে। আসরে আগের চার ম্যাচে মাত্র দুই গোল হজম করেছিল বেলজিয়াম। আলজেরিয়ার বিপক্ষে এর এক গোল ছিল পেনাল্টিতে। আর লিওনেল মেসির জন্য আলাদা চ্যালেঞ্জটা বেলজিয়াম গোলরক্ষক থিবো কুরতোয়ায়। সর্বশেষ মওসুমে বল পায়ে মেসি পান ৪১ গোল। তবে লা লিগা চ্যাম্পিয়ন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের এ গোলরক্ষকের বিপক্ষে গেল মওসুম ৬ ম্যাচে একবারও গোলের দেখা পাননি বার্সেলোনা তারকা মেসি । কুরতোয়ার বিপক্ষে মেসি গোল পাননি এবারও।  তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যাচের আগাগোড়া ঠাণ্ডা মাথায়  নৈপুণ্য দেখিয়ে মেসি আর্জেন্টিনা দলকে স্বপ্ন পথে এগিয়ে নেন আর এক কদম।  সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডস-আর্জেন্টিনা লড়াইয়ের আগেও ইতিহাসের দিকে চোখ ছিল ফুটবলপ্রেমীদের। নিজ মাটিতে ১৯৭৮’র আসরে ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ শিরোপার স্বাদ নেয় আর্জেন্টাইনরা। আর এবারের সেমিফাইনালের আগে প্রতিশোধের মানসিকতা প্রকাশ করেন ডাচ গোলরক্ষক জেসপার সিলেসেনও। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে  কিছুটা নিরব দেখাচ্ছিল মেসির নৈপুণ্য। এসময় মাঠে একটু নিচের দিকে নেমে খেলছিলেন তিনি। তবে এতেও আর্জেন্টিনা দলে আক্রমণে প্রধান ভূমিকাটা রাখছিলেন আগের টানা চারবারের ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার মেসিই। দ্বিতীয়ার্ধের ৪৫ মিনিট তার সফল পাসের হারটা ছিল ৮৬.৪%। এসময় মেসি সতীর্থদের যোগান দেন নির্ভুল ২২ পাস। সেমিফাইনালেও মাঠে একটু নিচের দিকে নেমে খেলতে দেখা যায় মেসিকে। তবে ঝটিকা আক্রমণে মেসির বাড়নো পাস থেকে গোল আদায়ে ব্যর্থ হন হিগুয়াইন, পালাসিও, ম্যাক্সি রদ্রিগেসরা। আর টাইব্রেকারে প্রথম পেনাল্টি থেকে গোল নিয়ে দলের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখেন অধিনায়ক মেসিই। টাইব্রেকারে সাফল্য শেষে আর্জেন্টিনা শিবিরের আর সবার মতো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তে দেখা যায় লিওনেল মেসিকেও। মাঠে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের গ্যালারির সামনে হেসে-কেঁদে নেচে-গেয়ে আবেগ দেখান এ ফুচবল জাদুকর।  চলতি আসরে আর্জেন্টিনার পাঁচ ম্যাচে দলের সর্বোচ্চ ৪ গোল লিওনেল মেসির।  ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলছে আর্জেন্টিনা। আর মাত্র এক ম্যাচ। মেসি ম্যাজিকে এতে সাফল্য নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপাস্বপ্নে বিভোর আর্জেন্টাইনরা। আর ভক্ত সমর্থকরাতো বটেই, বোদ্ধা বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, আসর শেষে এবারের বিশ্বকাপটা মেসির হাতেই বেশি মানাবে।

মেসির অর্জন
অলিম্পিক ফুটবল শিরোপা: ২০০৮
অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ: ২০০৫
স্প্যানিশ লা লিগা শিরোপা: ৬ বার
ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ: ৩ বার

ঘটন-অঘটনের ফাইনাল by নাইর ইকবাল

সবার চোখ এখন বিশ্বকাপ ফাইনালের দিকে। ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাকর ম্যাচ বলে কথা! এই লড়াইয়ে মাঠের ফুটবলকে ছাপিয়েও মূর্ত হয়ে ওঠে আরও নানা ঘটন-অঘটন। বিশ্বকাপ ফুটবলের ৮৪ বছরের ইতিহাসের ১৯টি ফাইনাল থেকে বেছে নেওয়া এমনই সাতটি ঘটনা জানাচ্ছেন নাইর ইকবাল
বল নিয়ে ফ্যাসাদ
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছিল আর্জেন্টিনা ও স্বাগতিক উরুগুয়ে। ফাইনালে প্রতিবেশী দেশকে হারিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম শিরোপাটি জিতে নিয়েছিল উরুগুয়ে। কিন্তু অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করেই মাঠে গড়িয়েছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম ফাইনালটি। সমস্যা হয়েছিল বল নিয়ে। আর্জেন্টিনা দাবি করেছিল, তাদের বল দিয়ে খেলাটি হোক, উরুগুয়ের দাবিও ছিল নিজেদের বল নিয়ে। মহাফ্যাসাদে পড়ে গিয়েছিলেন বেলজিয়ান রেফারি জন ল্যাংগেনাস। শেষে সমস্যাটা মেটে ওই ল্যাংগেনাসেরই বুদ্ধিমত্তায়। সিদ্ধান্ত হয়, দুই অর্ধে দুই দলের বল দিয়েই অনুষ্ঠিত হবে ইতিহাসের প্রথম ফাইনালটা।
মারাকানাজো
সে এক ‘ভুতুড়ে অধ্যায়’—অন্তত ব্রাজিলের মানুষের জন্য। ১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালটা কোনো দিনও ভুলতে পারবে না ব্রাজিলের মানুষ। ভুলতে পারার কথাও নয়। সেদিন তাদের এমন এক ট্র্যাজিডির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, যা এক করে দিয়েছিল লাতিন আমেরিকার এই দেশটির জাতীয় ইতিহাসও। শিরোপা-নির্ধারণী খেলায় উরুগুয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত দল নিয়েও হেরে যেতে হয়েছিল ব্রাজিলকে। যে ম্যাচ ড্র করলেই চ্যাম্পিয়ন, সে ম্যাচ হেরে শিরোপা হারানোটা তো ট্র্যাজিক ঘটনাই। রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়াম ওই দুঃখের সাক্ষী বলেই ইতিহাসে এর নামকরণ করা হয়েছে মারাকানার দুঃখ। পর্তুগিজে ‘মারাকানাজো’ মানে মারাকানার দুঃখই।
‘মারাকানাজো’র ব্যাপারে বলতে গেলে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত সেবারের বিশ্বকাপের ফরম্যাটটা নিয়ে একটু আলোচনা করা ভালো। ১৩ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত ওই বিশ্বকাপের শিরোপা-নির্ধারণী রাউন্ডে খেলেছিল চারটি দেশ। ব্রাজিল-উরুগুয়ে ছিল ওই চারটি দলের মধ্যে শীর্ষ দুই দল। লিগ-পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত ওই রাউন্ডে একে অন্যের সঙ্গে খেলার পর শেষ ম্যাচটি ছিল ব্রাজিল-উরুগুয়ের মধ্যেই। পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় ব্রাজিলের শিরোপা জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল কেবল একটি পয়েন্ট। অর্থাৎ ড্র করলেই শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যেত তাদের। এমন পরিস্থিতিতে এক গোলে এগিয়ে গিয়েও উরুগুয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে গিয়েছিল ব্রাজিল। ফুটবলপাগল ব্রাজিলীয়দের কাছে এর চেয়ে ট্র্যাজিক ঘটনা আর কী হতে পারে!
বার্নের ‘অলৌকিকতা’
১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে সে সময়কার দুর্দান্ত দল হাঙ্গেরির বিপক্ষে রীতিমতো এক অলৌকিক ঘটনাই ঘটিয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। পুরো বিশ্বকাপে অন্য গ্রহের ফুটবল খেলে অবিসংবাদিত সেরা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল ফেরেঙ্ক পুসকাসের হাঙ্গেরি। গ্রুপপর্বে পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে হারানো হাঙ্গেরি সবাইকে অবাক করে দিয়ে ফাইনালে হেরে যায় ৩-২ গোলে। তাও আবার দুই গোলে এগিয়ে থাকার পর। ফুটবল ইতিহাসে এই ম্যাচে জার্মানির ঘুরে দাঁড়ানোর সঙ্গে ‘অলৌকিক’ ব্যাপারটি খুব ভালো মিলে যায়।
জিওফ হার্স্টের সেই গোল
১৯৬৬-র বিশ্বকাপ ফাইনালে ইংল্যান্ড ৪-২ গোলে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল। ফুটবলের জনক ইংলিশদের ওটাই প্রথম এবং এখন পর্যন্ত শেষবারের মতো বিশ্বকাপ জয়। কিন্তু ইংলিশদের সেই গৌরবকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে এক বিতর্কিত গোল। এতটাই বিতর্কিত যে আজ ৪৮ বছর পরেও ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবের মুহূর্তটির গল্প শোনাতে গেলেই মূল আলোচনার বিষয় হয়ে পড়ে সেটি।
অথচ ওই গোলটি ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের মূল নিয়ামক ছিল না। অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে (১২০ মিনিট) গোল হওয়ার আগে ইংল্যান্ড এগিয়ে ছিল ৩-২ গোলে। শেষ বাঁশি বাজার আগ মুহূর্তে ওই বিতর্কিত গোলটিই কিন্তু এনে দিয়েছিল জিওফ হার্স্টের হ্যাটট্রিক। হার্স্ট বিশ্বকাপের ইতিহাসে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা একমাত্র ফুটবলার।
গোলটির ব্যাপারে মূল বিতর্ক হলো হার্স্টের শটটি গোলরক্ষককে পরাভূত করলেও তা ক্রসবারে লেগে গোললাইনের বাইরে পড়েছিল। অথচ, তাতেই গোলের বাঁশি বাজিয়ে রেফারি জন্ম দিয়েছিলেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মুহূর্তের।
তারদেল্লির ভোঁ-দৌড়
শিরোনামটি দেখলে একটু অবাক হওয়ারই কথা। বিশ্বকাপ ফাইনালে ফুটবল-নৈপুণ্য বাদ দিয়ে একটি দৌড়ের ঘটনা কেন ইতিহাসে স্থান পাবে। কিন্তু ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির মার্কো তারদেল্লির একটি দৌড়ই স্থান পেয়ে গেছে বিশ্বকাপের অন্যতম আইকনিক দৃশ্যে। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে সেদিন তাঁর গোলেই ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ইতালি। দুর্দান্ত ওই গোলটির পর বাঁধভাঙা আবেগে তারদেল্লি চিৎকার করতে করতে শুরু করেছিলেন এক দৌড়। বিশ্বকাপের আর্কাইভ থেকে ছবি দেখানো হবে আর তারদেল্লির দৌড় দেখানো হবে না—এমনটা খুবই বিরল।
লাল কার্ড দেখে ইতিহাসে
পেদ্রো মনজনের নামটি ইতিহাসে খোদাই হয়ে আছে চিরদিনের জন্যই। আর্জেন্টাইন এই ফুটবলারের দুর্ভাগ্য তিনি তাঁর খেলোয়াড়ি যোগ্যতায় নন, নেতিবাচক কারণেই স্থান করে নিয়েছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে। তিনি বিশ্বকাপের ফাইনালে সরাসরি লালকার্ড দেখা প্রথম খেলোয়াড়। আর্জেন্টিনা ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার ওই মাথা গরমের ফাইনালে জার্মান ফুটবলার ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানকে পেছন থেকে ফাউল করার জন্য লাল কার্ড দেখেছিলেন তিনি। এই ম্যাচের মেক্সিকান রেফারি কোডেশাল মেনদেজ মনজনের সঙ্গে আরও একজন আর্জেন্টাইন ফুটবলারকে লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন। গুস্তাভো দেজোত্তির ওই লাল কার্ডটি অবশ্য ছিল ওই ম্যাচে তাঁর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড।
টাইব্রেকারে ভাগ্য-নির্ধারণ
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে শিরোপা-নির্ধারিত হয়েছিল টাইব্রেকারে। ওটাই পেনাল্টি-লটারিতে নির্ধারিত প্রথম শিরোপা। ব্রাজিল-ইতালির মধ্যকার ওই ফাইনালটি নির্ধারিত ৯০ ও অতিরিক্ত ৩০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর ব্রাজিল টাইব্রেকারে ম্যাচটি জিতে নেয় ৩-২ ব্যবধানে। ওই বিশ্বকাপে ইতালির ফাইনালে ওঠার নায়ক রবার্তো ব্যাজ্জিওর পেনাল্টি মিসকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক ট্র্যাজিক ঘটনা হিসেবেই অভিহিত করা যেতে পারে। ব্যাজ্জিও একা নন। তাঁর পাশাপাশি পেনাল্টি মিস করেছিলেন ইতালির অধিনায়ক ফ্রাঙ্কো বারেসি আর ড্যানিয়েল মাসারো। ব্রাজিলের হয়ে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মার্সিও সান্তোস।

মাতামাতিতে বাংলাদেশই চ্যাম্পিয়ন by আনিসুল হক

আগের দিন ব্রাজিল গুঁড়িয়ে গেছে জার্মানির কাছে। বিকেলে খেলবে আর্জেন্টিনা আর হল্যান্ড। বেলো হরিজন্তের মার্কেটে আমি ঘুরছি। বিশাল সুপার মল। রাস্তার ধারের দোকান। সবাই কাজে মগ্ন। বিশ্বকাপ নিয়ে কেউ কথা বলছে না। যেন পৃথিবীতে কোথাও বিশ্বকাপের খেলা হচ্ছেই না। বিকেল পাঁচটায় আর্জেন্টিনা-হল্যান্ড খেলা। পৌনে পাঁচটার দিকে নামলাম হোটেলের লবিতে। টিভি বন্ধ। আমি রিসেপশনে অনুরোধ করে টেলিভিশন চালু করলাম। পুরো খেলা আমি একা দেখলাম। টাইব্রেকারের সময় আরও দু-তিনজন দর্শক পাওয়া গেল। হার বা জিত নিয়ে কেউ কোনো কথা বলছে না।
জার্মানির কাছে প্রলয়ংকরী হার ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এর চেয়েও বড় শঙ্কার ব্যাপার, আর্জেন্টিনা না চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায়। বেলজিয়ামের সঙ্গে আর্জেন্টিনার খেলার দিন ব্রাসিলিয়ার স্টেডিয়ামে দেখেছি, ব্রাজিলিয়ানরা সব লাল জার্সি পরে এসেছে। হল্যান্ড-আর্জেন্টিনা খেলার দিনে বহু ব্রাজিলীয়কে কমলা রঙের জার্সি কিনতে হয়েছে। কোনোই সন্দেহ নেই, ১৩ জুলাইয়ের ফাইনালে ব্রাজিলীয়রা সাদা-কালো-লাল জার্সি পরে গ্যালারিতে হাজির হবে।
রিও ডি জেনিরোতে আমাদের গাইড ছিল ইউরি নামের এক ব্রাজিলিয়ান। তাকে বলেছিলাম, কী হবে যদি আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়? সে মাথা নাড়ছিল, ‘নো ওয়ে, হতেই পারে না।’
ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা কিন্তু প্রতিবেশী। লুৎফর রহমান সরকারের রম্য রচনায় পড়েছিলাম, প্রতিবেশীর সবকিছুই বেশি বেশি, তাদের ঘেঁষাঘেঁষিও বেশি, রেষারেষিও বেশি। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায় শত্রুতার পর্যায়ে চলে গেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক কিংবা মহাকাশ গবেষণায় তারা বহু ক্ষেত্রে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যাচ্ছে বটে, ফুটবলে সেটা দা-কুড়াল সম্পর্কে পর্যবসিত। এরা ১৯৩৯-৪০ থেকেই ফুটবল মাঠের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইকে হাড্ডি ভাঙার লড়াইয়ে পরিণত করেছে। খেলার মাঠে মারামারি হয়েছে, শেষ মুহূর্তে ব্রাজিলের পক্ষে পেনাল্টি দেওয়ায় আর্জেন্টাইনরা মাঠ ছেড়ে চলে গেলে ফাঁকা নেটে গোল দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার খেলা হলে পাকিস্তানিরা কাকে সমর্থন করবে? পাকিস্তানের সঙ্গে ইংল্যান্ডের খেলা হলে ভারতীয়রা কাকে সমর্থন করবে। জার্মানির সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ব্রাজিলীয়রা কোন দল, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এটা কেবল ব্রাজিলীয়দের বেলায় প্রযোজ্য নয়, বাংলাদেশের সমর্থকদের বেলায়ও সমানভাবে খাটবে। ব্রাজিল-জার্মানি খেলার দিন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা জার্মানির বিজয়ে একেবারে ডগমগ ছিল। আর পরাজিত ব্রাজিল-সমর্থকেরা তাদের সাতটি গোল উপহার দেওয়া জার্মানির মুখের দিকেই তাকিয়ে থাকবে, যেন রোববারের ফাইনালে তাদের জার্মানি উদ্ধার করে দেয়।
ফুটবলের সমস্যাটা এখানে। সৌন্দর্যটাও এখানে। ব্রাজিল বাংলাদেশিদের কেউ নয়। তবু তার পরাজয়ে বহু বাংলাদেশি কাঁদে। আর্জেন্টিনা কে আমার? তবু শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকার শেষে যখন মেসি কাঁদছিল, মেসি ছুটছিল, তখন কত বাংলাদেশিই না কেঁদেছে।
জয়ে-পরাজয়ে দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলো কাঁদে। আমরা, বাংলাদেশের মানুষেরাও কাঁদি। সে কারণেই হয়তো আমাদের দেশে এ দুটি দলের সমর্থক এত বেশি। আমরা যে দক্ষিণ আমেরিকার মানুষদের মতোই, বড় বেশি আবেগপ্রবণ।
তার পরেও একটা কথা বলি। বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে আমরা বাংলাদেশে যত মাতামাতি করি, ব্রাজিলে আমি সেই মাতামাতি দেখিনি। বেশির ভাগ ব্রাজিলীয় নিজের দেশের খেলা বাদে অন্য খেলাগুলোর খবর রাখে না। আমাদের মতো সব দেশের খেলোয়াড়দের নামধাম বংশ-ক্লাব পরিচয় এরা মুখস্থ করে বসে নেই। এবং এদের সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় রোজ বিশ্বকাপের খবরই একমাত্র খবর নয়।
আমার কাছে মনে হয়েছে, ব্রাজিলীয়রা নিজেদের আয়-উন্নতি, জীবন-সংগ্রাম নিয়ে ব্যাপৃত, বিশ্বকাপ তাদের কাছে মুখ্য নয়। তাদের যখন জিগ্যেস করি, কে চ্যাম্পিয়ন হবে? তারা বলে, ব্রাজিল। জার্মানির খেলার আগেও একজন মহিলা দোকানি বলেছিলেন, ২-০। এটা তাদের বিশ্বাস যে তাদের দল তাদের জয় এনে দেবে। কীভাবে দেবে, সেটা তাদের মাথাব্যথা নয়। তাহলে কি আমরা বাংলাদেশিরা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছি? আমার ধারণা, ফুটবল নিয়ে মাতামাতিতে বাংলাদেশই চ্যাম্পিয়ন। স্কটিশ ফুটবলার বিল শ্যাংকির একটা উক্তি খুব বিখ্যাত, ‘কেউ কেউ বিশ্বাস করে থাকেন, ফুটবল হলো জীবন-মরণ সমস্যা। আমি এই মনোভাবে হতাশ হই। আসলে ফুটবল জীবন-মরণের চেয়েও কিছু বেশি।’ এটা হয়তো কেবল বাংলাদেশিদের বেলায় সত্য।
এই মুহূর্তে অবশ্য আমার মনে পড়ছে একজন আর্জেন্টাইন বালকের কথা। তার নাম তাফু। ব্রাসিলিয়ার হোটেলে তার সঙ্গে দেখা খাবারের টেবিলে। সঙ্গে তার বাবা। ছেলেটার বয়স বারো-তেরো বছর। ছেলেটা ইংরেজি পারে। বাবা পারে না। কোন ক্লাসে পড়? হাতের আঙুলে ইংরেজি সংখ্যা গুনে সে বলল, সেভেনে। স্কুলে সে ইংরেজি পড়ে। তাকে জিগ্যেস করেছিলাম, কে চ্যাম্পিয়ন হবে, বলো। সে বলল, আর্জেন্টিনা।
আমি বললাম, কিন্তু সেমি ফাইনাল তো কঠিন হবে। হল্যান্ড তো...তারপর ফাইনাল...
তাফু ছেলেটা দেখতে দেবদূতের মতো। আর্জেন্টাইনদের গায়ের রং খুব উজ্জ্বল হয়। অনেকটা নাসপাতির মতো। তার চোখ দুটো উজ্জ্বল, কালো। সে বলল, আমাদের মেসি আছে না? ও ঠিকই জিতিয়ে দেবে।
মেসি বর্তমান পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়। শুধু তাঁর সম্মানেই সোনার কাপটা তাঁর হাতে ওঠা উচিত।
বেলজিয়ামের সঙ্গে খেলার দিনই এক আর্জেন্টাইনের সঙ্গে আমি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জার্সি বদল করেছি। আর আরেকজন আর্জেন্টাইন আমার কাছে বাংলাদেশের পতাকা নেওয়ার জন্য খুবই পীড়াপীড়ি করছিল। তখন আমাদের সঙ্গের তিনটা লাল-সবুজ পতাকার একটা ওকে আমরা দিয়েছি। তখন ও শিশুর মতো হাসছিল। আর ওর পাশের স্বর্ণকেশিনী ওর পিঠে মৃদু চাপড় দিয়ে একটা প্রশ্রয়ের হাসি হেসেছিল।
আমাদের দলের শাফি আর মাহবুব ‘আর্জেন্টিনা’ ‘আর্জেন্টিনা’ বলে এমন চিৎকার করেছিলেন যে আশপাশের সবাই চমকে তাকিয়েছিল। ফুটবল কত দূরবর্তী মানুষকেও আত্মীয় করে তোলে!
ব্রাজিলের কাছ থেকে আমাদের শিখতে হবে পরাজয় সুন্দরভাবে মেনে নেওয়া। আমাদের রাজনীতিতে যদি আমরা পরাজয় মেনে নিতে পারতাম, দেশের অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। জয় ও পরাজয় উভয় পরিস্থিতিকে সুন্দরভাবে উদ্যাপন করার শিক্ষাই তো খেলোয়াড়ি মনোভাব।
এই মুহূর্তে ব্রাজিলীয়রা বড় অস্বস্তিতে আছে। লাখ লাখ আর্জেন্টাইন ঢুকে পড়েছে ব্রাজিলে, তারা সেই গানটা গেয়ে চলেছে—‘ব্রাজিল তোমাদের আঙিনায় এসে যখন আমরা তোমাদের ওপরে বসগিরি করছি, তখন তোমাদের কেমন লাগছে বলো। আমাদের ম্যারাডোনা তোমাদের পেলের চেয়ে বড়... তোমরা এবার দেখবে মেসিকে, আমরা এবার কাপ নিয়ে যাব ঘরে।’ খেলার শেষে মাঠে, ড্রেসিংরুমে মেসিবাহিনী এই গানে গলাও মিলিয়েছে।
সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত ব্রাজিলীয়রা হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে বলত, ‘পেন্টা, পেন্টা, এবার হবে হেক্সা...’
কিন্তু এখন কী করবে? পাঁচ দেখাতে গেলে না ওরা সাত দেখিয়ে দেয়।
আমার আর্জেন্টাইন বন্ধু বিখ্যাত লেখিকা পলা অলইক্সারাক এখন হাসছে। খেলা দেখতে ব্রাজিলে এলে না?
না না। মেসি যদিও আমাকে চান, কিন্তু পোচো ল্যাভেজ্জি আমাকে দেখলে তাঁর মনোযোগ হারিয়ে ফেলবেন। কাজেই আসছি না। সে তার উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত। আর আমি ব্যস্ত ফুটবল নিয়ে। বুঝুন!

এবার ‘ঈশ্বরের দুই হাত’ by উৎপল শুভ্র

বড় খবর! বড় খবর!!

>>২৪ বছর পর বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনা। মেসি, ডেমিচেলিস, রোহো, বিগলিয়া, প্যালাসিওরা এমন বাঁধভাঙা উল্লাসেই তো মাতবেন। পরশু টাইব্রেকারে হল্যান্ডকে হারিয়েই দুই যুগের অপেক্ষার অবসান হয়েছে আর্জেন্টিনার l ছবি: এএফপি
আলেসান্দ্রো সাবেলা হেসেছেন। বিশ্বকাপে অভূতপূর্ব এই ঘটনা গত পরশু রাতে অ্যারেনা করিন্থিয়ানসে সংবাদ সম্মেলনে। অভূতপূর্ব না বলে অবশ্য বিরল বলাই ভালো। সংবাদ সম্মেলনে না হলেও এই বিশ্বকাপে অন্য কোনো সময় কখনো না কখনো নিশ্চয়ই হেসে থাকবেন আর্জেন্টিনার কোচ।
এদিন অবশ্য হাসারই কথা। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফাইনালে! সাবেলার হাসির মতো অভূতপূর্ব না হলেও বিরল তো বটেই। সেই কবে ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপ, এর পর এই প্রথম। মাঝখানে দুই যুগ, পাঁচটি বিশ্বকাপ। সাবেলার হাসিটা অবশ্য ফাইনালে ওঠার আনন্দের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিল না। যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচ নিয়ে বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকে এত কথা, সেমিফাইনালে হারলে সেটিই হতো এই বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। এ সম্পর্কিত একটা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েই সাবেলার ওই হাসি।
মাঠে অবশ্য হাসি-আনন্দের চূড়ান্ত করেছে আর্জেন্টিনা দল। দুই যুগ পর ফাইনালে ওঠার আনন্দে এমনই আত্মহারা হয়ে গেছে যে, ম্যাচ শেষে প্রায় বাধ্যতামূলক সাধারণ সৌজন্যটুকু দেখাতেও ভুলে গেছে। ডাচ খেলোয়াড়েরা মাঠের অন্য প্রান্তে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু আর্জেন্টাইনরা গ্যালারির সমর্থকদের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে মাথার ওপর জার্সি ঘোরাতে এমনই ব্যস্ত হয়ে পড়ল, প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মেলানোর কথা মনেই থাকল না। ব্যাপারটা এমনই দৃষ্টিকটু ছিল যে, ম্যান অব দ্য ম্যাচের সংবাদ সম্মেলনের জন্য বরাদ্দ তিনটি প্রশ্নের মধ্যে একটি হলো এ নিয়েই। সেটি করলেন বাংলাদেশেরই এক তরুণ সাংবাদিক। যা শুনে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলার নায়ক যারপরনাই বিব্রত, ‘আসলে আমরা এত বছর পর ফাইনালে উঠেছি তো, সবাই তাই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে গিয়েছিলাম। নইলে এর আগে সব ম্যাচের পরই তো আমরা প্রতিপক্ষের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেছি।’
দুই যুগ আগে-পরে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠায় বড় একটা মিলও পাওয়া যাচ্ছে এই সার্জিও রোমেরোর কল্যাণেই। ইতালি বিশ্বকাপে জঘন্য নেতিবাচক ফুটবল খেলেও আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠেছিল টাইব্রেকারে এক গোলরক্ষকের বীরত্বে। কোয়ার্টার ফাইনালের পর সেমিফাইনালেও যিনি টাইব্রেকারে জিতিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর নামের প্রথম অংশটাও ‘সার্জিও’-ই। সেই সার্জিও গয়কোচিয়ার বয়স এখন পঞ্চাশ পেরিয়েছে এবং এদিন তিনি টেলিভিশন ধারাভাষ্যকারের ভূমিকায় মিডিয়া ট্রিবিউনে উপস্থিত। রোমেরোর বুক থাপড়ানো উল্লাস দেখতে দেখতে যিনি ফিরে গেছেন নেপলসের ওই রাতে।
অথচ গয়কোচিয়ার ওই বিশ্বকাপে খেলারই কথা ছিল না। গ্রুপপর্বে আর্জেন্টিনার এক নম্বর গোলরক্ষক নেরি পাম্পিডো আহত হওয়ায় সুযোগ মেলে এবং ম্যারাডোনাকেও ছাপিয়ে গয়কোচিয়া হয়ে যান আর্জেন্টিনার ‘জাতীয় বীর’। যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে গয়কোচিয়ার বীরত্বে প্ররোচিত হয়েই ইতালির বিপক্ষে সেমিফাইনালটিকেও কোনোমতে টাইব্রেকারে টেনে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই খেলেছিল আর্জেন্টিনা। পরশু হল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে অবশ্যই তা নয়। তবে দুই দলই যেমন হিসাব কষে সাবধানী খেলা খেলল, সেটি যত না ফুটবল, তার চেয়ে বেশি ‘দাবা’! সেমিফাইনালে কোনো দলই হারতে চাইবে না জানা কথাই। কিন্তু জয়ের জন্য ঝাঁপানোর চেয়ে পরাজয় এড়ানোর চেষ্টাটা এমনই চোখে লাগল যে, মিডিয়া ট্রিবিউনে কে যেন রসিকতা করলেন, ‘আসলে কোনো দলই ফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হতে চাইছে না!’
শেষ পর্যন্ত ফাইনালে ওঠায় জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ সেমিফাইনালটি অবশ্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে লিওনেল মেসির মনে। কিন্তু ‘মেসি-জাদু’তে ম্যাচটিকে দর্শকদের মনে স্মরণীয় করে রাখতে তিনিও ব্যর্থ। খেলার একেবারে শেষ দিকে ম্যাক্সি রদ্রিগেজকে বাড়ানো স্বর্গীয় ওই পাসের মতো দু-একটি মুহূর্ত বাদ দিলে খুঁজেই পাওয়া যায়নি তাঁকে। ডাচদের বিশেষ মনোযোগ ছিল তাঁর প্রতি। তা সেটি কোন ম্যাচে থাকে না? তাই বলে ১২০ মিনিটের খেলায় একবারও বক্সের মধ্যে বলে তাঁর পায়ের ছোঁয়া লাগবে না! শেষ পর্যন্ত সেই ছোঁয়া লাগল টাইব্রেকারে এবং পেনাল্টিতে মেসির গোলটিই ফাইনালের পথে আর্জেন্টিনার প্রথম ধাপ।
না, ভুল বলা হলো। আসলে দ্বিতীয় ধাপ। এর আগেই হল্যান্ডের প্রথম শটটিই যে ঠেকিয়ে দিয়েছেন রোমেরো। পরে স্নাইডারের নেওয়া তৃতীয় শটটিও ঠেকিয়ে টাইব্রেকারের শেষ শট দুটির আর প্রয়োজনই রাখেননি।
অসহায় চোখে তাকিয়ে তা দেখতে হলো টিম ক্রালকে। কোয়ার্টার ফাইনালে হল্যান্ডের জয়ের নায়ক এদিন টাইব্রেকার-নাটকের অসহায় দর্শক। কোস্টারিকার ম্যাচে অতিরিক্ত সময় শেষ হওয়ার ঠিক আগে শুধু টাইব্রেকারের জন্যই ক্রালকে নামিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন লুই ফন গাল। এদিন আগেই তিনটি পরিবর্তন করে ফেলায় তুরুপের তাস আর খেলাই হলো না। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি কি ওখানেই জিতে গেল? সিলেসেন হল্যান্ডের এক নম্বর গোলরক্ষক ঠিক আছে, কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, পেশাদার ক্যারিয়ারেই তাঁর পেনাল্টি ঠেকানোর কোনো ঘটনা নেই।
আর্জেন্টিনা ম্যাচ জেতেনি, জিতেছে টাইব্রেকার—সংবাদ সম্মেলনে লুই ফন গাল এটি মনে করিয়ে দেবেন স্বাভাবিক। আশ্চর্য হলো, ফন গাল নন, তা মনে করিয়ে দিলেন কি না আলেসান্দ্রো সাবেলাই। ‘আমরা হয়তো পরিষ্কার সুযোগ বেশি পেয়েছি, তবে ম্যাচটা ছিল সমানে সমান। সত্যিকার ড্র বলতে যা বোঝায়। অন্য কোনো ফল হলেও আমি এ কথাই বলতাম।’
রেকর্ড বইয়েও ড্র-ই লেখা থাকবে। তবে তা নিয়ে আর্জেন্টাইনদের মাথা ঘামাতে বয়েই গেছে। সাবেলার সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগেই খবর এল, আর্জেন্টিনার রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছে। চলছে উৎসব এবং সেই উৎসবে রোমেরোর নামে জয়ধ্বনি।
আর্জেন্টাইনদের কারণে-অকারণে ঈশ্বরকে টেনে আসার একটা প্রবণতা আছে। ‘ঈশ্বরের হাত’ বলে ম্যারাডোনার মাধ্যমেই এটির শুরু কি না কে জানে! সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডে এই অ্যারেনা করিন্থিয়ানসের একটা পোস্টের মালিকানাও ঈশ্বরকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বল সেখানে লেগে ফিরেছে বলে সেটি ‘ঈশ্বরের পোস্ট’।
আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলে দেওয়া সার্জিও রোমেরোর হাত দুটিও আর শুধুই তাঁর থাকছে না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনার হাতে করা ওই গোলটির নাম হয়ে গেছে—‘লা মানো দে দিওস’। ‘মানো’ মানে হাত। রোমেরোর ক্ষেত্রে সেটি শুধু বহুবচন হয়ে যাচ্ছে—লা মানোস দে দিওস। ঈশ্বরের দুই হাত।
সেমিফাইনালে টাইব্রেকার যদি দুই যুগ আগে-পরের দুই বিশ্বকাপকে মিলিয়ে দিয়ে থাকে, মিল আছে আরেকটি। এবারও ফাইনালে প্রতিপক্ষ সেই জার্মানরা। আর্জেন্টিনা অবশ্য চাইবে, মিলটা যেন ওখানেই শেষ হয়!

দ্বিতীয় সমুদ্র জয় -সম্পদ সংরক্ষণ ও সদ্ব্যবহারের প্রতি নজর দিন

মিয়ানমারের পরে ভারতের সঙ্গেও সমুদ্রসীমান্ত নিয়ে বিবাদের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা ইতিবাচক ঘটনা। প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে বিরোধ না মিটলে সালিসি আদালতের মাধ্যমে মীমাংসার যে আন্তর্জাতিক ও সর্বজনীন রীতি, সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেটাই অনুসরণ করেছে। ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে ইটলসে (ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অব দ্য সি) এবং গত সোমবার ভারতের সঙ্গে হেগের সালিসি আদালতে ঘোষিত রায়ে বঙ্গোপসাগরের ওপর বাংলাদেশ তার ন্যায্য অধিকার ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এটি আমাদের কূটনৈতিক বিজয়।
উল্লেখ্য, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে বঙ্গোপসাগরে আমাদের এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর অধিকার নিশ্চিত হলো।
বাংলাদেশ বরাবর ন্যায্যতার ভিত্তিতে বঙ্গোপসাগরের সীমানা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছিল। ভারত ও মিয়ানমারের দাবি ছিল সমদূরত্বের ভিত্তিতে। আনন্দের বার্তা হলো, উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের দাবির ন্যায্যতা প্রমাণিত হয়েছে। হেগের সালিসি আদালত যে রায় দিয়েছেন, তাতে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এবং ভারত ছয় হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার। এই অর্জন সামান্য নয়।
তবে আদালতে বাংলাদেশি প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে একটি ওজর রয়েই গেল। আইন অনুযায়ী বিবদমান পক্ষ নিজের পছন্দসই একজন বিচারক দিতে পারে। ভারত নিজ দেশের বিচারক দিলেও বাংলাদেশ বিদেশি বিচারকই বেছে নিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে সমুদ্র আইনে আমাদের এমন বিশেষজ্ঞও আছেন, যিনি অন্যান্য দেশের বিরোধ মীমাংসা করে খ্যাতি লাভ করেছেন। আমরা কেন সেই সুযোগটি নিলাম না? অন্যদিকেও আমাদের গাফিলতি রয়েছে। সমুদ্রবিদ্যা বিষয়ে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের স্বার্থ বিষয়ে আমাদের পর্যাপ্ত তথ্য–উপাত্ত গবেষণা নেই, যা ভারতের ভালোভাবেই রয়েছে।
এসব সত্ত্বেও মিয়ানমারের পর ভারতের সঙ্গে সরকার যেভাবে সমুদ্রবিরোধ নিষ্পত্তি করেছে, সে জন্য ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে সরকার এখন তেল–গ্যাসসহ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে যেসব সম্পদ আছে, সেসবের সংরক্ষণ ও সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের দিকে মনোযোগী হবে আশা করি।

প্রিয়মুখ খুঁজে পায়নি শিশুটি by আনোয়ার পারভেজ

গত ছয় দিনেও প্রিয়মুখের খোঁজ পায়নি শিশুটি। বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভাঙা পা নিয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মাতৃহারা শিশুটি। তবে অনেকেই তার দায়িত্ব নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসাও করাতে চান কেউ কেউ।
পরিচয়হীন শিশুটিকে নিয়ে গত বুধবার প্রথম আলোয় ‘প্রিয়মুখ খুঁজছে শিশুটি’ শিরোনামে মর্মস্পর্শী একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর পাঠকের মনে তা ব্যাপক নাড়া দেয়।

৫ জুলাই দুপুরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাঁটাখালী সেতুসংলগ্ন হাওয়াখানা নামক স্থানে একটি দ্রুতগামী ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে উঠে যায়। তখন অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী ও তাঁর কোলে থাকা কন্যাশিশু গুরুতর আহত হয়। পরে ওই নারী মারা যান। আর তাঁর কন্যাশিশুকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে।
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে শিশুটি। পশ্চিমাঞ্চল হাইওয়ের বগুড়ার পুলিশ সুপার ঈসরাইল হাওলাদার জানান, এখন পর্যন্ত শিশুটির কোনো স্বজনের খোঁজ মেলেনি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন দেখে অনেকেই এই প্রতিনিধির কাছে ফোন করে বলেছেন, স্বজনদের খোঁজ পাওয়া না গেলে তাঁরা শিশুটির দায়িত্ব নিতে চান। এঁদের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষকও রয়েছেন। একই প্রস্তাব দেন মুঠোফোন কোম্পানি গ্রামীণফোনের ঊর্ধ্বতন এক নারী কর্মকর্তা, রাজউকের এক কর্মকর্তা, সিলেটের একজন রিয়েল স্টেট ব্যবসায়ী, ঢাকা ও কিশোরগঞ্জের দুই ব্যবসায়ীও।

পরিত্যক্ত আড়াই কোটি মানুষ -সরকার কি আয়নায় মুখ দেখে​ নেবে?

সরকার দরিদ্রদের সুরক্ষা তো দূরের কথা, তাদের প্রতি তেমন নজরই দিচ্ছে না। দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে ২৬ শতাংশ তথা পৌনে চার কোটি মানুষ। এদের ৬৪ শতাংশের জীবনে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দেশের উন্নয়নের কাহিনির এই অন্ধকার দিক​টিতে আলো পড়বে ​কবে?
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র ধরে গত বুধবারের প্রথম আলো এই সুবিধাবঞ্চিত গরিবদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে গরিবদের যুগান্তকারী সেবা দিচ্ছে বলে সরকার দাবি করে। অথচ গত চার বছরে জিডিপির অনুপাতে সামাজিক নিরাপত্তা খরচ কমেছে। ২০১২ সালে খরচের পরিমাণ ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২ দশমিক ১৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ খাতে বরাদ্দ থাকা উচিত কমপক্ষে জিডিপির ৩ শতাংশ।
সমস্যা আছে সরকারের ১০২টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতেও। পরিকল্পনা কমিশনের দাবি অনুযায়ী, এ​র সুবিধাপ্রাপ্তদের ১৮ শতাংশই গরিব নয়। আর বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ বলছেন, ৬০ শতাংশ সুবিধাই অ-গরিবরাই নিয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব সুবিধা দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিতরিত এবং জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দুর্নীতির মাধ্যমে বেহাত হয়ে যায়।
দেশের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্যও বাড়ছে। এটা সামাল দিতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। গরিবদের আয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিতে হবে। গরিবি হটানোর কোনো টোটকা উপায় নেই। অর্থনীতি​, সম্পদ ও অধিকারে জনগণের হিস্যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই বাড়াতে হবে।
পৌনে চার কোটি অতিদরিদ্রের প্রায় আড়াই কোটিই যখন নিঃস্ব, নিঃসহায় ও উপেক্ষিত, তখন সরকারের সাফল্য সবই ম্লান হয়ে যায়। জনগণের বিরাট একটি অংশ কেমন আছে, তা দিয়েই সরকারের সাফল্য বোঝা যায়। সরকার কি আয়নায় নিজেদের মুখ দে​খবে?

১৯১৪ থেকে ২০১৪: অধরা বিশ্বশান্তি by এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রায় দুই সপ্তাহ কাটিয়েছিলাম একসময়ের পূর্ব ইউরোপে। জার্মানির শহর মিউনিখ হয়ে চেক, স্লোভাক প্রজাতন্ত্র, পোল্যাল্ড, হাঙ্গেরি আর অস্ট্রিয়া হয়ে দেশে ফিরেছি। এসব দেশের পুরোটাই স্থলপথে ভ্রমণ করেছি। উদ্দেশ্য যাই থাকুক, দেখার বিষয় ছিল এ কয়টি দেশ তথাকথিত সোশ্যালিস্ট ক্যাম্প থেকে ধনতান্ত্রিক ক্যাম্পে আসার পর কেমন আছে, বিশেষ করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার পর।
অস্ট্রিয়া অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ১০ বছরের মাথায়ই মোটামুটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে উভয় ক্যাম্প থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছিল। এসব দেশের কিছু কিছু সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল যে এই পরিবর্তন তাদের অর্থনৈতিক ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য যথেষ্ট ইতিবাচক। যোগাযোগ সহজতর হওয়ায় এবং ভিসা প্রথা না থাকার কারণে চলাচলের স্বাধীনতা উপভোগ করে আসছে এসব দেশের মানুষ। তবে সব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি একই মাপে হয়েছে, তা বলা যাবে না। এ কয়টি দেশের মধ্যে পোল্যান্ডের অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো। স্মরণযোগ্য যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোল্যান্ডের শহরগুলো যেভাবে ধ্বংস হয়েছিল, সে রকম হয়তো ইউরোপে কমই হয়েছিল। রাজধানী ওয়ারসসহ অন্য শহরগুলো ৮৫ শতাংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ৭০ বছর পর পোল্যান্ডের কোনো শহর দেখে তা বোঝার উপায় নেই।
অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা নাৎসি দখলমুক্ত হয়ে চার শক্তির তত্ত্বাবধানে ছিল ১০ বছর। ভিয়েনায় অবস্থানকালে একটি টিভি চ্যানেলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি থেকে যুদ্ধের সময়কাল ১৯১৪-১৯১৮ পর্যন্ত তথ্যচিত্র প্রতিদিন দেখেছি। জানতে পারলাম ব্রিটেনসহ ইইউ দেশগুলো, বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আগামী জুলাই ২৮ থেকে নভেম্বর ১১, ২০১৮ পর্যন্ত এই চার বছর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু এবং শেষ হওয়ার সময় পর্যন্ত উদ্‌যাপন করার সিদ্ধান্তের পর থেকে এ অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য বিস্তারের শেষ শিকার বলকান অঞ্চল, যার মধ্যে ছিল সার্বিয়াধীন বসনিয়া-হার্জেগোবিনা-সারায়েভো দখল ও বিদ্রোহ; বসনিয়া-হার্জেগোবিনার রাজধানী সারায়েভোর জাতীয়তাবাদী সংগঠন ম্লাডা বসনার ( MLADA BOSNA) ছয়জন আততায়ী, যার মধ্যে একজন গ্যাব্রিয়ালো প্রিন্সেপ গুলি করে হত্যা করেছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরির যুবরাজ আর্চ ডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড ও তাঁর স্ত্রী সোফিকে।
জাতীয়তাবাদী এই দলটিতে মুসলমান সম্প্রদায়ের সদস্য মোহামেদ মেহমেদাবাসিকও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ ঘটনা ২৮ জুন ঘটার এক মাস পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ানরা যুদ্ধ শুরু করে বলকান রাষ্ট্র সার্বিয়ার বিরুদ্ধে। বসনিয়া-হার্জেগোবিনা ছিল সার্বিয়ার অঞ্চল। অপর দিকে তৎকালীন রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষে এবং জার্মানি অস্ট্রো-হাঙ্গেরির পক্ষে যোগ দিলে শুরু হয় মহাযুদ্ধ। ব্রিটেন, ফ্রান্স এ যুদ্ধের বাইরে থাকতে পারেনি। শেষের দিকে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটেন ও ফ্রান্স কেন যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, তা নিয়ে ওই সব দেশে প্রশ্ন উঠছে। ইউরোপ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, আত্মপ্রকাশ শুরু করল পরাশক্তি হিসেবে। অপর দিকে যুদ্ধের জের ধরে ইউরোপে সাম্রাজ্যের পতন, রাশিয়াসহ জন্ম দিল নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার। ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও শীতল যুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে দুটি পরাশক্তির জন্ম হয়েছিল, তার মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনও হয় বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে। বিভক্ত বিশ্ব দৃশ্যত একক বিশ্বে পরিণত হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ এ কারণে টানলাম যে ওই যুদ্ধের এক শ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইউরোপব্যাপী উদ্‌যাপনের যে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে, তা নিয়ে ইইউ তথা ইউরোপে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। অপর দিকে এ যুদ্ধে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে কতখানি গুরুত্ব দেবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বসনিয়া-হার্জেগোবিনার বস্তুতপক্ষে বলকান অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী চেতনা পুনরায় ফিরে আসছে। সারায়েভোতে জুন ২৮, ২০১৪ উদ্‌যাপন করা হলো গ্যাবরিয়ালো প্রিন্সেপের প্রতিমূর্তিতে ফুল দিয়ে জাতীয় বীর আখ্যার মাধ্যমে। অন্যান্য দেশে বিশেষ করে জার্মানি ব্রিটেন ও বেলজিয়ামের বর্তমান প্রজন্মের প্রশ্ন, কেন তাদের দেশ এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল? ওই যুদ্ধ কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ রহিত করতে পেরেছিল? ইউরোপীয়দের মনে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ঠিক যেমন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে তাদের দেশের নতুন মধ্যপ্রাচ্য গড়ার পরিকল্পনা ও প্রয়াস নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির দায়দায়িত্ব নিয়েও।
২.
শীতল যুদ্ধের অবসানের পরপরই একক বিশ্বের প্রধান শক্তিরূপে আভির্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হলো। নিজের অবস্থান ধরে রাখতে আরও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটনে গৃহীত হলো। এরই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের সম্পদ ও প্রভাব রক্ষার্থে নতুন ছক কাটা হলো। এর মধ্য দিয়েই প্রতিপক্ষ তৈরি হলো কথিত ইসলামি উগ্রবাদ। তার পরের ইতিহাস অতি সাম্প্রতিক, সবারই জানা। প্রথমে আফগানিস্তান, পরে ইরাক, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং বর্তমানে নতুন আঙ্গিকে সিরিয়া ও ইরাকের পরিস্থিতি সমগ্র মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নতুন ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
আফগানিস্তানে তালেবান উৎখাতের পরবর্তী পরিস্থিতির শিকার প্রধানত পাকিস্তান হলেও উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে এর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশও শঙ্কামুক্ত নয়। পাকিস্তান প্রতিনিয়ত মোকাবিলায় রয়েছে ওই দেশের তালেবান নিয়ে। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তথা পশ্চিমা দেশের সামরিক বাহিনীর পশ্চাৎ​পদ প্রত্যাহারের পর ওই দেশের অবস্থা আরও অস্থিতিশীল হবে, যদি বর্তমানে আলোচনারত তালেবানদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বোঝাপড়া না হয়।
আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের পর শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরেই নয়, উপমহাদেশেও উত্তেজনা বাড়তে পারে। এ কারণে ভারত-পাকিস্তান বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হবে, তা হবে আফগানিস্তানে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে। তালেবানদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি হলে সে ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান দুর্বল হবে, তা প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে সহায়ক হবে না। অপর দিকে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তানি তালেবানদের সঙ্গে শুধু বল প্রয়োগে সুবিধা করতে পারছে না বলেই আলোচনার তাগিদ অনুভব করছে পাকিস্তান সরকার। সে ক্ষেত্রে আফগানিস্তানে ২০১৪ সালের শেষের দিকে পটপরিবর্তন হলে পাকিস্তানকে অবশ্যই তাদের অংশের তালেবানদের সঙ্গে একধরনের বোঝাপড়ায় আসতে হবে। অন্যথায় পাখতুনস্তানের দাবি নতুন করে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থানের পর আফগানিস্তানে ত্রিশক্তির টানাপোড়েন শুরু হবে। এক পক্ষে চীন-পাকিস্তান, অপর দিকে ভারত। এমনটা হলে উপমহাদেশে উত্তেজনা বাড়বে। আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হাত গুটিয়ে নেওয়াকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রে পরিবর্তিত আগ্রাসী নী​তির কৌশলগত পরাজয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতির কৌশলগত পরাজয়ের জ্বলন্ত উদাহরণ লিবিয়া ও মিসর। তবে নতুন উদ্বেগ ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসআইএস, নতুন নাম ইসলামিক স্টেট নামক সুন্নিগোষ্ঠীর উত্থান। মসুল, তিরকিত, বাজিসহ ইরাকের বিশাল অঞ্চল দখলের পর এই সুন্নিগোষ্ঠী সিরিয়ার কিছু অংশসমেত ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে আবু ওমর আল বাগদাদিকে নেতা নিযুক্তির কথা বলেছে। আইএসআইএস বা ইসলামিক স্টেটের লক্ষ্য শুধু ইরাক নয়; সিরিয়া, তুরস্ক ও জর্ডানের কিছু অংশসহ তৎকালীন লেভেন্টে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা; এদের শক্তির কাছে ইরাকি বাহিনী পরাস্ত। সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে নতুনভাবে নতুন আঙ্গিকে সীমিত আকারে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে হচ্ছে। আইএসআইএস কোনো জঙ্গি সংগঠন নয়, তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশেষজ্ঞরাও স্বীকার করছেন। যদিও এই সুন্নি সংগঠনের যোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে এই সংগঠনের হাতে প্রচুর অর্থ রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। অনেকের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর বহু বিত্তবান এই সংগঠনের অর্থের জোগান দিয়ে থাকেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গবেষণা সংস্থার অনেকেই মনে করেন, সিরিয়ার তেলক্ষেত্র এদের হাতে থাকায় এবং বর্তমানে মসুল-বাজির মতো তেলক্ষেত্রগুলো থেকে তেল চোরাই পথে বিক্রি করে এদের হাতে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অধিক অর্থ রয়েছে। এ অর্থ নতুন জনবল সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবহার করা হচ্ছে যুদ্ধ পরিচালনায়।

ইরাকে আলোচিত সুন্নি সংগঠনের উত্থান এবং ইরাকে এই সফলতা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জিহাদি সুন্নি তরুণদের আকৃষ্ট করছে। কিংস কলেজ অব লন্ডনের প্রফেসর পিটার নিউম্যাম বলেন, সিরিয়ায় যেসব যোদ্ধা পশ্চিমা দেশ থেকে গিয়েছিল, তাদের ৮০ শতাংশ এখন ইরাকে। আইএসআইএসের মুখপাত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপিয়ান ও আরব রাষ্ট্র থেকে যোদ্ধারা এ সংগঠনে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যোগ দিচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সদস্য রয়েছে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো ও ককেশাস অঞ্চল থেকে।
ইরাকে সুন্নি সংগঠনের উত্থান এবং ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে দুজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিককে ইরাকে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে তথ্যে প্রকাশ। এসব প্রচেষ্টা আফগান জিহাদ ও পরবর্তী সময়ের অনুরূপ হলেও পার্থক্যটি অন্যখানে, আর তা হলো ইসলামি খেলাফতের পুনঃপ্রত্যাবর্তনের প্রচেষ্টা। আমাদের দেশেও এমন কিছু সংগঠন রয়েছে, যারা আইএসআইয়ের ভাবধারায় সংগঠিত। কাজেই ইরাকের ঘটনার পরিধি যে উপমহাদেশ ছুঁইবে না, তা হলফ করে বলা যায় না।
ইরাক তথা মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুততম পরিবর্তনের ঘটনা বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আলামত মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে শীতল যুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বের ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা কোথায় ঠেকবে, তা বলা সহজ নয়। এর প্রভাব সারা বিশ্বে পড়তে শুরু করেছে।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমনকি শীতল যুদ্ধের অবসানের পর বিশ্বের মানচিত্র বদলিয়েছে বহুবার। বর্তমান পরিস্থিতি আরও বড় ধরনের সংঘাত সৃষ্টির পথে গড়াচ্ছে। যদিও এবারের রণক্ষেত্র মধ্যপ্রাচ্যে, তবে এর প্রভাব পড়ছে সমগ্র বিশ্বে, বিশেষ করে অস্থির অবস্থায় রয়েছে কথিত মুসলিম বিশ্ব। পরিবর্তনের পথে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র। যেমন পরিবর্তিত হয়েছে অতীতে যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে। একবিংশ শতাব্দীতেও বিশ্ব খুব শান্তিতে থাকবে বলে মনে হয় না। এ অশান্তি ক্ষতিগ্রস্ত করবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে।

এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.): অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

রাশিয়া ও জর্জিয়া- গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের রুপালি শিয়াল by নিনা খ্রুশ্চভা

ক্ষমতায় থাকাকালে এদুয়ার্দ শেভারদনাদজে ‘রুপালি শিয়াল’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই ব্যক্তি ছিলেন একাধারে সোভিয়েত জর্জিয়ার নেতা, ক্রেমলিনের পলিটব্যুরোর সদস্য ও গর্বাচভের সংস্কারপন্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারপর তিনি ছিলেন সোভিয়েত-উত্তর জামানায় জর্জিয়ার পশ্চিমপন্থী প্রেসিডেন্ট। তখন আবার তিনি গর্বাচভের বিরোধী হয়ে ওঠেন। তিনি নিজেকে নায়ক মনে করতেন, যিনি জর্জিয়াকে রাশিয়ার বজ্রকঠিন গেরো থেকে বের করে আনেন। একই সঙ্গে তিনি সে দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক। আহা, একই অঙ্গে কত রূপ।

>>এদুয়ার্দ শেভারদনাদজে, জর্জিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট
জীবনের শেষ দিকে এই শেভারদনাদজে জর্জিয়াতেই অচ্ছুত হয়ে পড়েন, পশ্চিম ও রাশিয়াতেও তাঁর একই হাল হয়। তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের একজন কারিগর হিসেবেই রাশিয়ায় গণ্য করা হতো। ২০০৩ সালে রোজ বিপ্লবে তাঁর একসময়ের রাজনৈতিক অনুগ্রহভাজন মিখেইল সাকাশভিলি তাঁকে উৎখাত করার পর লোকে তাঁকে প্রায় ভুলতেই বসেছিল। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তিকে তাঁর ছলনায় ভুলিয়ে ও নিজের অতীতকে কাজে লাগিয়ে তিনি তাদের কাছ থেকে নানা রকম সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হন।

সাকাশভিলি কঠোর মার্কিনপন্থী মানুষ। তিনি অর্থনৈতিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনেন, পুলিশের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও মাঠে নামেন। যদিও তাঁর বিরুদ্ধেও ঘুষ গ্রহণ ও স্বৈরাচারী আচরণের অভিযোগ আছে। তিনি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে শেভারদনাদজেকে উৎখাত করে ক্ষমতায় আসেন। তারপর তিনি কিছু পুরোনো সোভিয়েত আমলের কৌশল গ্রহণ করেন: প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভয় দেখানো ও তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো এবং বিরোধিতাকারীদের জোরপূর্বক ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া। অর্থাৎ, বিরোধীদের দৌড়ের ওপর রাখা।

 জর্জিয়রা বরাবর একটি প্রশ্নই করে আসছে, শেভারদনাদজে কি সত্যিই উৎখাত হয়েছিলেন? ২০০৩ সালের দিকে তিনি এতটাই অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি আসলে তখন এমন কাউকে খুঁজছিলেন, যার কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি অন্তত নিরাপদে বিদায় নিতে পারেন। মানে নিজের অর্থসম্পদ রক্ষা করতে পারেন। নিশ্চিতভাবেই সাকাশভিলি জর্জিয়ার ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে ওঠেন—তিনি শেভারদনাদজে পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে শেভারদনাদজের ১৫ মিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করেন। কিন্তু সাকাশভিলির সরকার শেভারদনাদজে ও তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যের গায়ে একটি টোকাও দেননি।

বোঝা যায়, শেভারদনাদজের রাজনৈতিক প্রভাব নেহাত কম ছিল না। তিনি সারা জীবনই দ্বৈত নীতি অনুসরণ করেছেন। কখনো কখনো তিনি পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন, সেটা করেছেন নিজের ক্ষমতা বজায় রাখার স্বার্থে। অথবা হত্যার পরিকল্পনা করে শত্রু বধের হুংকার দিয়েছেন, শুধু নিজের জীবন রক্ষার স্বার্থে। ১৯৭০-এর দশকে ক্রেমলিনের প্রতি তাঁর শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য তিনি ব্রেজনেভকে তেল দিতেন।

১৯৯৯ সালে নিউইয়র্কে বার্লিন দেয়াল পতনের দশম বার্ষিকীর উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে আমি নিজ কানে শুনেছি, শেভারদনাদজে বলছেন, বিশ শতকে জর্জিয়ায় দুজন ঐতিহাসিক চরিত্রের জন্ম হয়েছে: একজন লৌহ পর্দা টাঙিয়েছিলেন (জোসেফ স্তালিন), আরেকজন সেটা নামিয়েছেন—মানে তিনি নিজে।

হ্যাঁ, শেভারদনাদজের রাজনৈতিক দক্ষতার সঙ্গে আরেকজন মহান ককেশীয় সোভিয়েত রাজনীতিকের মিল আছে, তিনি হচ্ছেন আর্মেনিয়ার আনাসতাস মিকোইয়ান। এই ব্যক্তি স্তালিনের বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন, স্তালিনের আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। আর পরে খ্রুশ্চভের আস্থাভাজন স্তালিনবিরোধী এবং উপপ্রধানমন্ত্রী। মিকোইয়ান সম্বন্ধে একটি কৌতুক প্রচলিত আছে। তিনি নাকি একদিন বৃষ্টির মধ্যে ক্রেমলিন থেকে বেরোনোর সময় তাঁর এক সহকর্মীর ছাতা ভাগাভাগি করতে অনিচ্ছা জানান। তিনি বলেন,  ‘না, ঠিক আছে, আমি বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে হেঁটে যাব।’

একইভাবে, শেভারদনাদজে ১৯৮০-এর দশকে জর্জিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন সোভিয়েত আমলের বিরোধিতা করে। তার পরেই তিনি গর্বাচভের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। তিনি পশ্চিমা নেতাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। একই সঙ্গে তিনি পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতনও নিজ চোখে দেখেন। তারপর তিনি ১৯৯০ সালে পদত্যাগ করেন। কারণ, রাশিয়া নাকি গর্বাচভের অধীনে আবারও স্বৈরতন্ত্রের খপ্পরে পড়েছে। গণতন্ত্রের অভিভাবক হিসেবে দাঁড়ানোর কারণে তিনি স্বাধীন জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট হন, এমন সময় যখন দেশটি গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিল। তিনি ১১ বছর সে পদে ছিলেন।

শেভারদনাদজে কি কখনো সৎ ছিলেন? তিনি কি একজন গণতন্ত্রী না স্বৈরশাসক? বাস্তবতা হচ্ছে, তিনি উভয়ই ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গর্বাচভের আমলের কমিউনিজম সংস্কারের দিন ঘনিয়ে আসে। বরিস ইয়েলৎসিন ও শেভারদনাদজের মতো মানুষেরা ব্রেজনেভের আমলের কট্টরপন্থীদের চেয়ে আলাদা। এই ব্রেজনেভপন্থীরাই অচেতনভাবে সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা করেন, গণতন্ত্রে উত্তরণের যাত্রাও এর মাধ্যমে শুরু হয়।

আজ প্রতিদিনই ভ্লাদিমির পুতিনের দুর্নীতিগ্রস্ত ও কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের রূপ খোলতাই হচ্ছে, ফলে গণতন্ত্রে উত্তরণ হতে এখনো ঢের বাকি। তারপরও কিছু ভালো খবর আছে। গত বছর বৈধ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে জর্জিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন গিওর্গি মারগভেলাশভিলি। এ বছরের গ্রীষ্মের শুরুতে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এটা পশ্চিমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের লক্ষণ। শেভারদনাদজে তাঁর দশকব্যাপী শাসনের সময় বেশ কিছু ধূর্ত ও সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন, রাজনৈতিক মারপ্যাচে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন—সে কারণেই এত সব সম্ভব হয়েছে।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

নিনা খ্রুশ্চভা: নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো।

টাকা: পাচার ও উদ্ধারের রাজনীতি by কামাল আহমেদ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে সুইজারল্যান্ডে যেসব বাংলাদেশির টাকা গচ্ছিত আছে, তা ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে। সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত বার্ষিক হিসাব বিবরণীতে বিদেশিদের গচ্ছিত আমানতের বিবরণে দেখা যায় যে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ বাংলাদেশি টাকার হিসাবে ২০১৩ সালে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ১৬২ কোটিতে। ২০১২ সালে এই পরিমাণ ছিল এক হাজার ৯০৮ কোটি টাকা (প্রথম আলো, ৩ জুলাই, ২০১৪)। প্রায় একই সময়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, ইউএনডিপির প্রকাশিত আরেকটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বছরে গড়ে ৮০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ছয় হাজার ৪০০ কোটি টাকা) বিদেশে পাচার হচ্ছে।

জাতিসংঘ সমীক্ষায় অবশ্য অর্থ পাচারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে নানা রকম অনিয়ম ও ফাঁকফোকরের কথা বলা হয়েছে। হুন্ডি, সোনা বা অন্যান্য বিলাসসামগ্রীর চোরাকারবারি, মানব পাচার এবং মাদক ব্যবসার মতো বিভিন্ন মাধ্যমে আরও কত হাজার কোটি টাকা পাচার হয়, তার কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া দুষ্কর। তার পরও গত কদিনে রাজনৈতিক বিতর্ক শুধু সুইস ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে দেখে কিছুটা বিস্মিত হতে হয়।

এখন থেকে ঠিক এক বছর আগে বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ (জুলাই ১২ ও ১৪) ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) ফাঁস করা নথিপত্রের ভিত্তিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য এবং তাঁর সাংসদ স্ত্রী, পুত্রসহ আরও অন্তত কুড়িজন ব্যবসায়ীর বিদেশে সম্পদ গচ্ছিত রাখার বিবরণ প্রকাশ করে। তাঁরা সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জসহ করছাড়ের সুবিধা পাওয়া যায়, এমন কিছু দেশ বা দ্বীপরাজ্যে টাকা গচ্ছিত রেখেছেন বলে ওই সব নথিতে উল্লেখ ছিল। বৈধভাবে তাঁদের কারোরই বিদেশে সম্পদ স্থানান্তরের সুযোগ থাকার কথা নয়।

কিন্তু তাঁরা যে ওই সব দ্বীপরাজ্য বা দেশের ব্যাংকে নামে-বেনামে অর্থ গচ্ছিত রেখেছেন, তার বিস্তারিত বিবরণ আইসিআইজের নথিপত্রে তুলে ধরা হয়। বেনামি হিসাবগুলোর মালিকদের বেনামি কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন এবং পরিচালকদের বৃত্তান্তসহ অনেক খুঁটিনাটি তথ্যও তাতে রয়েছে। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন এসব অভিযোগ তদ‌েন্তর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানায় (নিউ এজ, ১ অক্টোবর, ২০১৩)। কিন্তু, সেই তদন্তের আর কোনো অগ্রগতির কথা আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। সুতরাং, এ ধরনের কোনো তদন্ত আদৌ হচ্ছে কি না, কেউ যদি সেই সন্দেহ পোষণ করেন, তা বোধ হয় খুব একটা অযৌক্তিক হবে না। ফাঁস করা নথিগুলো যে বিশেষ কোনো দলকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়া বা কাউকে বেকায়দায় ফেলার উদ্দেশ্যে আইসিআইজে করেছে, এমন উদ্ভট যুক্তি কেউ নিশ্চয়ই দেবেন না। আবার, এসব নথিকে ভিত্তিহীন বলারও কোনো সুযোগ নেই। ২০১৩ সালের এপ্রিলে আইসিআইজে প্রথম তাঁদের অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশ করে। তার পর থেকে গত এক বছরে আইসিআইজের ফাঁস করা নথিগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ইউরোপ ও এশিয়ার নানা দেশ তদন্ত করে অনেকে ক্ষেত্রেই সাফল্য পেয়েছে। অফশোর ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখার তথ্য ফাঁসের পর ফ্রান্সে বাজেটমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ তাঁর মন্ত্রীদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করেছেন।

ইউরোপের কয়েকটি শক্তিশালী অর্থনীতি নিজেদের মধ্যে করদাতাদের বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।কর অবকাশের সুযোগ দেওয়ার জন্য সুইজারল্যান্ডের মতোই খ্যাত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র লুক্সেমবুর্গ তার ব্যাংকিং খাতে গোপনীয়তার নীতির অবসান ঘটানোর কথা ঘোষণা করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া সাবেক স্বৈরশাসক চুন দো হোয়ানের ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। মঙ্গোলিয়ার পার্লামেন্টের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট পদচ্যুত হয়েছেন। প্রতিবেশী ভারতও তাদের তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরুর কথা জানিয়েছে।

সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়া একটু জটিল এবং তাতে সাফল্যের বিষয়টি অনেকটাই অনিশ্চিত। সুইস সরকার এ পর্যন্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের ব্যাংকিং খাতের তথ্য বিনিময়ে রাজি হয়েছে৷ কেননা, তা না হলে সুইস ব্যাংকগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসার পথ বন্ধ হয়ে যেত।ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গেও সুইসদের একই ধরনের সমঝোতা হবে বলে আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু, বাংলাদেশের সঙ্গে এ ধরনের সমঝোতায় সুইসদের তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার দৃষ্টান্তকে কাজে লাগিয়ে নৈতিক অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আবেদন-নিবেদন বা চাপ প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চয়ই আছে। সেটা শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতায় সম্ভব হবে, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই।এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পর্যায়েও উদ্যোগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে এ ধরনের সহযোগিতায় সুইজারল্যান্ড রাজি হওয়ায় নাইজেরিয়া শেষ পর্যন্ত সাবেক সেনাশাসক সানি আবাচার টাকা ফেরত পেয়েছে। এ ছাড়া, তারা ভারত সরকারকে ভারতীয়দের গচ্ছিত সম্পদের বিবরণও হস্তান্তর করেছে, যার ভিত্তিতে গত কংগ্রেস সরকারের আমলেই ভারতীয় কর বিভাগ পাঁচ শতাধিক ভারতীয়র আয়করের বিষয়ে আলাদা করে তদন্ত শুরু করে।

নিজ দেশে করফাঁকি অথবা উঁচুহারে কর এড়ানো ছাড়াও সম্পদ গোপন করার জন্য যেসব দেশ এবং দ্বীপরাজ্য সুখ্যাত, তার মধ্যে অনেকগুলোই ব্রিটিশ রাজ্য অথবা স্বশাসিত অঞ্চল। যেমন কেম্যান, বারমুডা, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, অ্যাঙ্গুইলা, মন্টসেরাট ইত্যাদি। এসব ব্রিটিশ স্বশাসিত অঞ্চল বা দ্বীপরাজ্য গত বছর ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এক সমঝোতায় পৌঁছায় যে এখন থেকে তারা ব্রিটিশ, ফরাসি, জার্মান, ইতালীয় ও স্প্যানিশ নাগরিকদের ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে। এ ছাড়া শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি সেভেনের অর্থমন্ত্রীরা ২০১৩ সালের মে মাসের এক সভায় কর ফাঁকির জন্য অর্থ পাচারের বিষয়টি মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের সিদ্ধান্ত নেন। সেই সভার পর স্বাগতিক অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন জানান, ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলোর জন্য পাওনা কর পরিশোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূ‌র্ণ এবং সেটা শুধু ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ করদাতাদের জন্য নয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও একইভাবে গুরুত্বপূ‌র্ণ (দ্য গার্ডিয়ান, ২২ মে, ২০১৩)। ব্রিটিশ স্বশাসিত অঞ্চল বা দ্বীপরাজ্যগুলো থেকে তথ্য পাওয়ার জন্য এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের সাহায্য পাওয়া তাই অসাধ্য কিছু নয়।

আইসিআইজের ফাঁস করা বিবরণীতে যেসব বাংলাদেশির কথা প্রকাশ পেয়েছে, তাঁদের অধিকাংশেরই সম্পদ র‌ক্ষিত আছে এসব দ্বীপরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে। সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশিদের অবৈধ সম্পদ উদ্ধারের দৃষ্টান্ত (আরাফাত রহমান কোকোর টাকা) যেহেতু ইতিমধ্যেই স্থাপিত হয়েছে, সেহেতু অন্য বাংলাদেশিদের কারও কোনো অর্থ বেআইনিভাবে সেখানে থেকে থাকলে সেগুলোও নিশ্চয় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বিদেশে যাঁরা দ্বিতীয় আবাস গড়েছেন, তাঁদের সম্পদের হিসাব যাচাই করাও সরকারের সাধ্যের বাইরে নয়। অথচ, এসব বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড এবং কেম্যান আইল্যান্ডসে বাংলাদেশিদের অর্থের তথ্য প্রকাশের এক বছর পরও তা উদ্ধারে সরকার বা দুর্নীতি দমন কমিশনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। সেটা কি এ কারণে যে সরকারি ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার বৃহৎ অংশই সরকারের আশীর্বাদপুষ্টরা সেখানে গচ্ছিত রেখেছেন? শেয়ারবাজারের কারসাজিতে লোপাট হওয়া অর্থ, জ্বালানি খাতের ভর্তুকি, টেলিকম খাতের লেনদেনে চুরি—জালিয়াতি এবং বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের সঙ্গে ক্ষমতার যোগসূত্রও কি তার অন্যতম কারণ?

কামাল আহমেদ: প্রথম আলো বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন৷

খাটের ওপর বসে কি কেউ আত্মহত্যা করে?

খাটের ওপর বসে আত্মহত্যা বিরল ঘটনা। প্যাথটিক দৃশ্যটি দেখে এটি আত্মহত্যা ? না পরিকল্পিত খুন! এনিয়ে মানুষের মাঝে যথেষ্ট জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। কুতুবদিয়া ভূমি অফিসের শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের কর্মচারি কৈয়ারবিলের হাজী নজির আহমদ প্রকাশ ডবল হাজী’র পুত্র ফরিদুল আলম’ ঝুলন্ত লাশ। গত ১৮জুন এ ঘটনা ঘটে  নিউজটি Kutubi Hasan এর fb>hasankutubi থেকে নেয়া

পুলিশি হয়রানির অভিযোগ- বড়ঘোপে খুনের শিকার ফরিদুল আলম’র বৃদ্ধা মা নুরুজ্জাহানের সংবাদ সম্মেলন by হাছান কুতুবী

উপজেলার ৮০ বছরের বৃদ্ধ মহিলা নুরুজ্জাহান তার পুত্র ফরিদুল আলম খুনের সাথে জড়িত ঘাতকদের বাঁচাতে বিশাল অঙ্কের মিশন নিয়ে কুতুবদিয়া থানা পুলিশ তাকেসহ তার পরিবারের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন। গতকাল শুক্রবার কুতুবদিয়া প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। এ সময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তার সাথে উপস্থিত ছিলেন। বড়ঘোপের মৃত হাজী নজির আহমদ প্রকাশ ডবল হাজীর স্ত্রী অভিযোগ করেন আমার নিহত পুত্র ফরিদুল আলম’র সাথে তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম ডেজির দাম্পত্য কলহ ছিল। প্রায় সময় তার স্ত্রী ও পুত্র ওয়াহিদুল আলম রিয়াদ আমার পুত্রকে নির্মমভাবে নির্যাতন করত। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮জুন তারা আমার পুত্রকে পরিকল্পিতভাবে খুন করে গলায় রশি বেঁধে তার শয়ন কক্ষের জানালার সাথে ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যার প্ররোচনা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালায়। ওইদিন থানা পুলিশ আমার পুত্রকে উদ্ধারকালে উপস্থিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও গন্যমান্যরা এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত খুন বলে মন্তব্য করেন। এ ঘটনায় তিনি পুত্র খুনের দায়ে তার স্ত্রী রোকেয়া বেগম ডেজি ও তার পুত্র ওয়াহিদুল আলম রিয়াদকে আসামী করে থানায় এজাহার দায়ের করেন। কিন্তু থানা পুলিশ তার এ এজারটি গ্রহন না করে তার অপর নাতী তৌহিদুল আলম’র দায়েরকরা সম্পূর্ণ মিথ্যা এজাহারটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করেন বলে অভিযোগ করেন। যে মামলায় তাকেসহ তার নিরাপরাধ ব্যবসায়ি পুত্র মাহবুবুল আলম, তার স্ত্রী আয়েশা আখতার, আলমগীর, ইসকান্দার মির্জাকে আসামী করা হয়েছে বলে দাবী করেন। অনতিবিলম্বে ওই জঘন্য মিথ্যা মামলাটি বাতিল করে তার এজাহারটি মামলা হিবেবে রেকর্ড করে আসল খুনিদের বিচারের কাটগড়ায় হাজির করার জন্য পুলিশ প্রশাসনের প্রতি জোর দাবী জানান নুরুজ্জাহান।

স্নেহ, সন্তান, পিতা-মাতা by ড. মাহফুজ পারভেজ

অল্প বয়সী একটি সন্তান, ছেলে কিংবা মেয়ে হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছে, ডাক্তারের কাছে আর ফার্মেসিতে ছোটাছুটি করছেন পিতা, মা দারুণ উদ্বেগ নিয়ে বসে আছেন সন্তানের রোগশয্যার পাশে। এমন চিত্র প্রতিদিনের না হলেও প্রতিটি পরিবারেই পরিচিত দৃশ্য। মাঝে মাঝে এমন উদ্বেগাকুল পরিস্থিতি প্রায়-সকল পরিবারেই দেখা যায়। রোগের যন্ত্রণায় সন্তান যখন ছটফট করে, পিতা-মাতার ভেতরেও তখন ছটফটানি কম থাকে না। সন্তান দূরে কোথাও থাকলে, বিদেশে বিদেশের স্কুলে-কলেজে-কর্মক্ষেত্রে, তখন যেন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার তীব্রতা আরও বাড়ে। মানুষের মধ্যে এ বাৎসল্য, আপত্য স্নেহ অতিপ্রাকৃতিক বায়োলোজিক্যাল বিষয়। ইংরেজিতে বলা যায় ইনস্টিংকটিভ। প্রকৃতিই শরীরবৃত্তীয়ভাবে এমনটি মানুষের রক্তে-স্বভাবে-প্রবণতায় ভরে দিয়েছে। বংশের ধারাবাহিকতা, ঐতিহ্যের চেরাগ, নিজের উত্তরাধিকার রক্ষার জন্যই মানুষ এই স্নেহ ও বাৎসল্য অনুসরণ করে। এজন্যই চলতি কথায় বলে স্নেহ নিম্নগামী। পিতা-মাতা সন্তানদের লালন-পালনের জন্য যেমন সদাব্যস্ত, সে সন্তানরা যখন বড় হয়, নিজেরাও সন্তানের বাবা কিংবা মা হয়, তখন তারাও সন্তানদের সুরক্ষা কিংবা সুচিকিৎসা বা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য সব সময় যত্নবান থাকেন। প্রকৃতি ও শরীরবৃত্তীয় এ ব্যাপারটিকে সামনে রেখে পারিবারিক-সামাজিক বাস্তবতায় কিছু প্রশ্ন ওঠে। যেমন, প্রকৃতি ও শরীরচক্র কি উপরের দিকে তাকাতে নিষেধ করেছে? স্নেহ নিম্নগামী বলেই কি সন্তানের জন্য যত ব্যতিব্যস্ততা, নিজের পিতা-মাতার জন্য ততটুকু নয় কেন? নিজের পিতা-মাতার বিপদ-আপদ, অসুখে তাকাবার সময় অনেকেরই নেই কেন? যদিও একজন মানুষের পক্ষে নিজের সন্তান আর নিজের পিতা বা মাতার মধ্যে পার্থক্য বা তারতম্য করা ভয়ানক কঠিন ও অসম্ভব কাজ। তথাপি, স্নেহ বা বাৎসল্য যতটুকু নিচের দিকে সন্তান বা তস্য-সন্তানদের দিকে নামে, ওপরের দিকে পিতা বা মাতার ক্ষেত্রে ততটুকু ওঠে না। সমাজে এমন একচক্ষু বিশিষ্ট মানুষের অভাব তো নেই-ই, বরং সংখ্যায় তারা বাড়ছে। নিজের স্ত্রী-সন্তানের বাইরে বৃহত্তর পরিবার-পরিজন তো দূরের কথা, জন্মদাতা পিতা-মাতার দায়িত্ব পালন, এমন কি, মামুলি খোঁজ-খবর করার প্রয়োজনও বোধ করে না অনেক সাবালক সন্তান। ইদানীং সংবাদপত্রে নানা ঘটনার উল্লেখ দেখে শিউরে উঠতে হয় বেশি বয়সে অনেক পিতা-মাতাকেই অসহায়ভাবে জীবন কাটাতে দেখা যাচ্ছে। এ অসহায়ত্ব আর্থিকভাবে, শারীরিকভাবে, সামাজিক বা পারিবারিকভাবে। শেষ বয়সে যখন বাধ্য হয়েই সাবালক ও প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের তথা নিজের পুত্র বা কন্যার ওপর নির্ভর করতে হয়, তখন যদি আশাহত বা প্রত্যখ্যাত হতে হয়, তাহলে পুরো ব্যাপারটিই মর্মান্তিক আকার ধারণ করে। যে পুত্র বা কন্যাকে মানুষ করার জন্য তাঁরা প্রভূত পরিশ্রম ও যথাসাধ্য চেষ্টা, অর্থ ব্যয় ও পরিশ্রম করেছেন, শেষ জীবনে তাঁরা সেই সন্তানের আশ্রয়ে থাকতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক ও সঙ্গত। কিন্তু এই স্বাভাবিক ও সঙ্গত প্রত্যাশা সব সময় বাস্তবায়িত হয়। বয়স্ক অনেকের জীবনেই প্রতিদানে পাওয়া যায় নিজ সন্তানদের পক্ষ থেকে অভব্য, নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন, অমানবিক ব্যবহার। পিতা-মাতাকে খেতে না দেয়া, বাড়ি থেকে বিতাড়ন, নির্যাতন করা, সম্পত্তি পেতে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে অহরহ। অসহায় মা-বাবা নিষ্ঠুর সন্তানদের বিরুদ্ধে আদালতে পর্যন্ত যেতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত বয়সী-পিতা-মাতা লোক-লজ্জা ও সামাজিক ভয়ে মুখ বুজে সহ্য করছেন নানা রকমের অবজ্ঞা ও অবহেলা। রোগ-শোকের উপশম পাওয়ার বদলে সাধারণ-স্বাভাবিক-সম্মানজনক দৈনন্দিন জীবনও তারা যাপন করতে পারছেন না নিজেরই সন্তানের অধীনে; অথচ সেই অবোধ শিশুকেই তিলে তিলে বড় করেছিলেন এই পিতা-মাতাই। পিতা-মাতার বুকে বড়-হওয়া সন্তান সেই পিতা-মাতাকে সুপ্ত কারাগারের নিত্য যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে শেষ জীবনের পথ পাড়ি দিতে বাধ্য করছে। অথচ সমাজ-সংস্কৃতি-ধর্মে পিতা-মাতার মর্যাদা এবং তাদের প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে সবিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। ইসলামে পিতা-মাতার মর্যাদা অপরিসীম। তারা যেন সন্তানের আচরণে কষ্ট পেয়ে ‘উহ্‌’ শব্দটিও না করেন, এমনই সতর্কতা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, পিতা-মাতা সন্তানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকলে আল্লাহ সোবহানাহুতায়ালাও সন্তুষ্ট থাকবেন। পিতা-মাতাই সন্তানের জন্য জান্নাত বা জাহান্নাম। অর্থাৎ পিতা-মাতার সঙ্গে আচরণ্‌ের মাধ্যমেই একজন সন্তান তার জান্নাত বা জাহান্নাম লাভ করতে পারে। শুধু ইসলাম নয়, অন্যান্য ধর্মেও পিতা-মাতার গুরুত্ব রয়েছে। বৈদিক শ্লোকের ভাষায়, ‘পিতা হি পরমন্তপঃ’। অতএব, জীবনের বাস্তবতা, ব্যস্ততা বা সীমাবদ্ধতার কারণে পিতা-মাতাকে অবজ্ঞা, অবহেলা, নির্যাতনের কোনও সুযোগ নেই। এটা আইনের দিক থেকে, ধর্মের দিক থেকে, নৈতিকতা ও মানবিকতার দিক থেকে জঘন্য অপরাধ। নিজের সন্তানকে স্নেহ ও বাৎসল্য প্রদানের সময় নিজের পিতা-মাতার কাছ থেকে পাওয়া স্নেহ-বাৎসল্যের কথাও কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ রাখা দরকার। নিজের পিতা-মাতাকে অবহেলা ও অন্যায় আচরণের শিকারে পরিণত করলে, শেষ বয়সে নিজেদেরও তেমন বিপদে পড়তে হতে পারে আর জীবনের পরের দুর্ভোগ তো থাকছেই। পবিত্র রমজানের পরেই কৃচ্ছ্র সাধন আর সংযমের পুরস্কার-স্বরূপ আসবে ঈদের অনাবিল আনন্দ। তখন ঈদের সেই মহৎ উৎসবে নিজের সন্তান আর নিজের পিতা-মাতাকেসহ সবাইকে যদি আনন্দে-হাসিতে-খুশিতে উদ্ভাসিত করা যায়, তার চেয়ে স্বর্গীয়-নির্মল আনন্দময় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে! এই অনির্বচনী খুশির সামনে ঈদের বৈষয়িক ও জাগতিক আনন্দ তুচ্ছ। বরং বস্তুগত দিক থেকে কম হলেও ভাবগত, মনোগত ও আত্মিক দিক থেকে উন্নত ও আনন্দময় ঈদের প্রতি সকলের লক্ষ্য থাকা দরকার। যেখানে নিজের পিতা-মাতা, সন্তান, পরিজন, সমাজ, সংসার, সবাইকে নিয়ে আনন্দ উপভোগ করা যাবে, সেখানেই নিহিত থাকবে ঈদের প্রকৃত আনন্দ, প্রাপ্তি ও মর্যাদা। 

‘ছুরির ফলা’য় গাজা: ইসরাইলি হামলায় ৬০ ফিলিস্তিনি নিহত

‘ছুরির ফলা’য় অবস্থান করছে গাজা পরিস্থিতি। এমন মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। ইসরাইল এ পর্যন্ত ফিলিস্তিন-অধ্যুষিত গাজায় ২৩০টিরও বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। প্রায় ৬০০ লক্ষ্যবস্তুতে হামলাসমূহ পরিচালিত হয়। গত মঙ্গলবার থেকে হামাস যোদ্ধাদের ওপর ইসরাইলি বিমান হামলায় এ পর্যন্ত ৬০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের অর্ধেকই ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগরিক। নিহতদের মধ্যে বহু শিশু ও নারী রয়েছে। এদিকে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি কট্টরপন্থীদের বৈরিতার অবসান ঘটানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন বান কি মুন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই অঞ্চলে পূর্ণ মাত্রায় আরেকটি যুদ্ধের ঝুঁকি নেয়া সম্ভব নয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ফিলিস্তিনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস শহরতলির একটি বাড়িতে বিমান হামলায় ৮ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য দিয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেছেন, প্রাণহানির এ ঘটনা ছিল ‘শোকাবহ- এমনটা আমরা চাইনি’। একই শহরতলির একটি ক্যাফেতে বিমান হামলায় ৯ জন নিহত হন। এভাবে গাজায় একের পর এক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে ইসরাইলি যুদ্ধবিমান। বান কি মুন ফিলিস্তিনি হামাস যোদ্ধাগোষ্ঠীকে রকেট হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং একই সঙ্গে ইসরাইলি সরকারকেও সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। আজ রাতের দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে। এর আগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসের ওপর হামলা তীব্রতর করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইসরাইলে রকেট হামলার জন্য হামাস যোদ্ধাদের চরম মূল্য দিতে হবে। এদিকে ফ্রান্স ও জার্মানি ইসরাইলে ফিলিস্তিনি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তারা সব পক্ষকে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

পারিবারিক স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ

সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ, পেশাজীবী পরিষদের নির্বাচন নিজেদের পক্ষে নেয়া ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলোকে হুমকি দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি অনুগত চিকিৎসক, সরকারি কর্মচারী ও আইনজীবীরা। একদলীয় সরকার যন্ত্রের অধীনে তারা একটি রাষ্ট্রের ভেতরের খারাপ দিকগুলো প্রকাশ করতে সাহস দেখান। ভয়াবহভাবে এমন রাজনৈতিক পেশাদারদের আন্তর্জাতিক বার সমিতি, আমেরিকান গ্রাজুয়েট প্রশিক্ষণ হাসপাতাল ও ইউরোপিয়ান সরকারি প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো ও এক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়া কি উচিত হবে। গতকাল অনলাইন এশিয়া টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ইসাম সোহেইলের লেখা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যখন দেশের সিলিকন ভ্যালি দেখিয়ে বিদেশীদের তাতে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান, তখন প্রযুক্তি বিষয়ক মোগলরা বাংলাদেশের অসহিষ্ণু সরকারের কাছে শক্তিশালী একটি বার্তা দিতে পারেন। তারা বলতে পারেন বিনিয়োগের করার জন্য অধিক প্রয়োজন হলো আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত রয়েছে কিনা। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বলা হয়, বার্তা সংস্থা এপির একটি রিপোর্ট পাল্টে দিতে সম্মত না হওয়ায় কোন নেতা তার লোকজনকে একটি পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ইসাম সোহাইল লিখেছেন, যে দেশ আস্তে আস্তে দৃশ্যত পারিবারিক স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন না সচেতন ব্যবসায়ী নারী বা পুরুষ। পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে সরকারের ওপর অর্থপূর্ণ চাপের অভাবে ঢাকায় একদলীয় শাসন পোক্ত হয়েছে। তারা বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি খাতকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছে। ক্ষমতাসীন দলের রয়েছে বহুদলীয় শাসন ব্যবস্থার বিলুপ্তির ইতিহাস। তারা এখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও যেসব পত্রিকা ভিন্নমত প্রকাশ করতে তা বন্ধ করে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয় ভিন্নমত, বহুদল ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের অভাবে ব্যাপক দুর্নীতি ও নিরাপত্তা বাহিনীর অপরাধ, ক্ষমতাসীন দলের অপরাধে জড়িতরা থাকবে। এতে এসব  ঘটনা শুধু বাড়বেই না। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। একবার বিবেচনা করুণ, কত বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী  আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে সুবিধা পেয়ে থাকে। এ বিষয়টি মাথায় নিয়েই বেসরকারি সংগঠন বা এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে চাপ থামাতে হবে।

নারায়ণগঞ্জে সাত খুন- তদন্ত থেকে সিআইডিকে বাদ দেয়ার আবেদন খারিজ

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাত খুনের মামলার তদন্ত থেকে সিআইডিকে বাদ দিতে সরকারের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে আদালত আগের আদেশ সংশোধন করে সিআইডিকে তদন্তের পরিবর্তে অনুসন্ধান করতে বলেছেন। বিচারপতি মো. রেজাউল হক ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুরের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এ আদেশ দেয়। আদালত বলেছেন, ডিবি এ মামলায় নিয়মিত তদন্ত করে চার্জশিট দেবে। তবে সিআইডিসহ অন্যরা অনুসন্ধান করে এ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করবে। ওই প্রতিবেদন দেখে প্রয়োজনে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো, সেখানে যদি অতিরিক্ত কোন তথ্য বা ডকুমেন্ট থাকে তা সাক্ষ্য হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তাকে মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে কিনা। তবে সিআইডিকে বাদ দিতে সরকারের আবেদন খারিজ করে হাইকোর্টের দেয়া আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।  গতকাল বেলা সোয়া এগারোটার দিকে শুনানির শুরুতেই এটর্নি জেনারেল সিআইডিকে তদন্ত কার্যক্রম থেকে বাদ দেয়ার আবেদন উপস্থাপন করতে চান। আদালত এ আবেদনের ওপর শুনানির আগে তাকে চারটি অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে বলেন। এরপর এটর্নি জেনারেল পর্যায়ক্রমে র‌্যাব, পুলিশের আইজি, সিআইডি ও সরকারি তদন্ত কমিটি থেকে পাঠানো অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন। সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মামলায় ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ জন ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এছাড়া, ৩ জন সাক্ষীও জবানবন্দি দিয়েছে। এ জবানবন্দি সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ পর্যন্ত ৩ শ’ ৫০ জনের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়েছে। যে তিনজন র‌্যাব সদস্য ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন তাদের কারা ফটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রাপ্ত সব তথ্য যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। আরো কিছু তথ্য জানার জন্য আরো সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য চার সপ্তাহ সময় দরকার। অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর এটর্নি জেনারেল সিআইডিকে তদন্ত থেকে বাদ দেয়ার আবেদন উপস্থাপন করেন। এসময় তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী একটি মামলায় দু’টি সরকারি সংস্থা তদন্ত করতে পারে না। প্রধান আসামি চিহ্নিত হয়ে গেছে। তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে। তাই সিআইডিকে বাদ দেয়ার আবেদন করেছি। তিনি বলেন, আপনাদের নির্দেশনা মেনে ডিবি সব করছে। এসময় আদালত বলেন, কোন অগ্রগতি প্রতিবেদনেই সিআইডির অসুবিধা হচ্ছে তা বলা হয়নি। ডিবি আর সিআইডির প্রধানতো একই ব্যক্তি। তাই সমস্যা কোথায়। এসময় এটর্নি জেনারেল বলেন, আইনে দু’টি সংস্থা দিয়ে তদন্ত করার সুযোগ নেই। এতে মামলার অসুবিধা হবে। জবাবে আদালত বলেন, আমরা ডিবির তদন্তে বাধা দেইনি। কোন প্রতিবেদন দিতে বলিনি। এটর্নি জেনারেল বলেন, অতিরিক্ত তদন্তের সুযোগ নেই। সিআইডিকে তদন্তের জন্য প্রথম যখন আদালত আদেশ দেন সেই আদেশের বিরুদ্ধে আমরা আপিল বিভাগে গিয়েছিলাম। আপিল বিভাগ হাইকোর্টে আবেদন দিতে বলেন। সে অনুযায়ী আমরা আবেদন দিয়েছি। শুনানির এক পর্যায়ে আদালত এটর্নি জেনারেলের আবেদনের বিষয়ে আইনগত প্রশ্ন তোলেন। আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণকারী আইনজীবী এডভোকেট শামীম সরদার বলেন, আইনগতভাবে সিআইডি তদন্ত করতে পারে। আদালত তদন্ত কার্যক্রমকে আরো কার্যকর করার জন্য যেকোন আদেশ দিতে পারেন। তিনি বলেন, আদালতের আদেশ আইনগত হয়েছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাই বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সিনিয়র আইনজীবীদের অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আদেশ দেয়। গত ২৭শে এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাত জন অপহৃত হন। তিন দিন পর শীতলক্ষ্যায় তাদের লাশ ভেসে ওঠে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনের কাছ থেকে ছয় কোটি টাকা নিয়ে র‌্যাব এ হত্যাকা- ঘটায় বলে অভিযোগ করেন নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম। এ অভিযোগ ওঠার পর র‌্যাব-১১ এর তখনকার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ  হোসেন এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানাকে সশস্র বাহিনী থেকে অবসরে পাঠানো হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে গ্রেপ্তারও করা হয় তাদের। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। অন্যদিকে, নূর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতার পুলিশ। সে এখন ভারতের কারাগারে বন্দি।