Wednesday, April 15, 2015

সময় খুব অল্প: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকদের
সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ছবি: ফোকাস বাংলা
বর্তমান সরকারের হাতে চলতি মেয়াদে মাত্র ৩ বছর ৯ মাস সময় আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সময় খুব অল্প। কিন্তু আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। ২০১৯ সালে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে সব উন্নয়ন কর্মসূচি একটি বিশেষ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বুধবার গণভবনে বাংলা নববর্ষ-১৪২২ উপলক্ষে সম্পাদক, কলামিস্ট, লেখক ও টেলিভিশন টকশোতে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। খবর বাসসের।
প্রধানমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমে তাঁর সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গঠনমূলক সমালোচনা ও মতামত প্রত্যাশা করেন। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ঢালাও সমালোচনা কেবল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে সহায়তা করে এবং বর্তমান সরকার পদে পদে এই শক্তির মোকাবিলা করছে। তিনি বলেন, ‘সমালোচনা আমাদের সংশোধনে সহায়তা করবে। কিন্তু আমার প্রত্যাশা যে আপনারা এমন কিছু করবেন না, যা স্বাধীনতাবিরোধীদের হাত শক্তিশালী করবে। এই বিরোধী শক্তি এ দেশের স্বাধীনতাই চায়নি।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার জনগণের সেবা করতে ক্ষমতায় এসেছে; নিজের ভাগ্য গড়তে নয়। বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, যুদ্ধাপরাধীর বিচারসহ যেসব কাজ আমরা শুরু করা হয়েছে তা অবশ্যই শেষ করতে হবে। দুটি রায় কার্যকর হয়েছে। সব বাধা পেরিয়ে অন্যগুলোও সম্পন্ন করার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি।
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার অন্যদের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। স্বাগত বক্তৃতা দেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী।
সততাই তাঁর সরকারের মূল শক্তি-এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল পদ্মা সেতু ইস্যুতে আমাদের ভাবমূর্তি ম্লান করতে চেয়েছিল। আমরা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছি এবং নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন স্থগিত করেছিল। তারা ভেবেছিল যে ওদের অর্থ ছাড়া এ সেতু নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর আশা, পদ্মা সেতু হবে অসাধারণ এক স্থাপনা, এর জন্য বাংলাদেশের মানুষ গর্ববোধ করবে।

আমরা স্পষ্ট বলে দিয়েছি, অস্ত্র পকেটে রাখার জন্য নয় -শেখ হাসিনা

যারা ক্রসফায়ারের সমালোচনা করেন তাদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি করে। পুলিশের গুলিতে অপরাধীরাই মারা যায়। আমরা স্পষ্ট বলে দিয়েছি, অস্ত্র পকেটে রাখার জন্য নয়। আজ দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বিজয়ী জাতি। কারও দয়া বা মুখাপেক্ষী না হয়ে বাঙ্গালি জাতিকে মাথা উচু করে চলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর না করার জন্য অনেক উচু জায়গা থেকে তার কাছে টেলিফোন এসেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে। অপরাধীদের জন্য তাদের মায়াকান্না। মানবাধিকার নিয়ে তারা খুব সোচ্চার। আর যারা আপনজন হারালো তাদের ব্যাথা কেউ বোঝে না। একমাত্র তারাই বোঝে আপনজন হারানোর কি যন্ত্রণা, যারা আপনজন হারিয়েছে। তিনি  বলেন, যে মুহুর্তে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ শুরু করেছি সেই মুহুর্তে এ ধরণের অপপ্রচার আসবে জানতাম। ফাঁসি কি হয় না? ঈদের দিন সাদ্দামকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। সাদ্দাম, লাদেন, গাদ্দাফী এরা কার সৃষ্টি? এদেরকে মেরে ফেলা হলে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের বিচারে প্রশ্ন কেন? অপরাধ অপরাধই, সে যেই হোক। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্রসফায়ার কি? অপরাধী পুলিশের গুলিতে মারা যাচ্ছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি, অস্ত্র পকেটে রাখার জন্য নয়। তিনি বলেন, যারা ক্ষতির শিকার হলো তাদের নিয়ে চিন্তা নেই আর যারা অপরাধ করলো তাকে নিয়ে তাদের নিয়ে এত মাথাব্যাথা কেন? আমাদের দেশে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই তা অপরাধ হয়ে যায়। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, যিনি নিজে হরতাল-অবরোধ ডাকেন তিনি নিজেই নিজেকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করেন। মানুষকে পুড়িয়ে মারার মতো জঘন্য কাজ আর হতে পারে না।

ইন্টারপোলের ‘রেড অ্যালার্ট’ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয় by তবারুকুল ইসলাম

পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করার বিষয়টি কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। আসামিকে গ্রেপ্তারে সংস্থাটি কোনো বাহিনী পাঠায় না বা কোনো দেশকে চাপও দিতে পারে না। প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে ফ্রান্সে অবস্থিত ইন্টারপোলের সদর দপ্তর থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নামে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারির বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ইন্টারপোল জানায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য কারও কাছে তারা ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে না।
ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত ব্যক্তি (ওয়ান্টেড পারসন) হিসেবে তারেক রহমানের নাম-পরিচয় ও বিবরণ রয়েছে। তবে সেখানে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারির তারিখ উল্লেখ নেই।
ইন্টারপোলের নোটিশে মামলার কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। এ ঘটনায় ২২ জন নিহত হন। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কয়েক শ লোক আহত হন। ২০০৮ সালের ১১ জুন এ মামলায় ২২ জনকে আসামি করে সিআইডি প্রথম অভিযোগপত্র দেয়। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এ মামলার অধিকতর তদন্ত করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। মোট ৫২ আসামির মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৯ জন পলাতক আছেন। আসামিদের তালিকায় আরও আছেন জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নান।
প্রথম আলোর প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের গণসংযোগ বিভাগ ই-মেইলের মাধ্যমে জবাব দেয়। সংস্থাটি জানায়, ‘রেড অ্যালার্ট’ আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। এর মাধ্যমে সংস্থাটির ১৯০টি সদস্য দেশকে জানানো হয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করতে কোনো সদস্য রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ইন্টারপোল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান নিশ্চিত করতে সদস্য দেশগুলোর পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করে। যাতে এক দেশের সরকার অপর দেশের সরকারের কাছে অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণে ব্যবস্থা নিতে পারে।
ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট জারির ফলে যুক্তরাজ্য থেকে কোনো আসামির প্রত্যর্পণ ঘটেছে-এমন নজির পাওয়া যায়নি। আবার যুক্তরাজ্য সরকার চাইলেই কাউকে প্রত্যর্পণ করতে পারে না। আসামি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও না। কারণ সংশ্লিষ্ট আসামির আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে প্রত্যর্পণের বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
দেশটির আসামি প্রত্যর্পণ আইন (এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট ২০০৩) অনুযায়ী, আসামি ফেরত আনতে দূতাবাস বা সরকারের বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বা সাজাপ্রাপ্ত হলে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এবং যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির উপযুক্ত তথ্যসহ আদালতের নির্দেশের বিস্তারিত জমা দিতে হয়। একই সঙ্গে এটা নিশ্চিত করতে হয় প্রত্যর্পণের পর ওই ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে না। তাঁকে আনীত অভিযোগ ব্যতীত অন্য মামলায় সাজা দেওয়া হবে না এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সর্বোচ্চ সুযোগ থাকবে। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবেদন আমলে নিয়ে একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করবেন। একইসঙ্গে আবেদনটি আদালতের বিবেচনার জন্য পাঠাবেন। এ পর্যায়ে ইস্যুকৃত সার্টিফিকেট বলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় একটি প্রাথমিক শুনানির পর আদালত পূর্ণাঙ্গ শুনানির (প্রত্যর্পণ-বিষয়ক শুনানি) দিন ধার্য করেন। দায়ের করা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ‘এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট ২০০৩’ এবং ‘ইউরোপীয় হিউম্যান রাইটস অ্যাক্ট ১৯৯৮’ বিবেচনায় নিয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দেন। এ সিদ্ধান্ত আসামির বিপক্ষে গেলে তিনি উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ পান। এ বিচার প্রক্রিয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।

নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির শিকার একাধিক নারী

বাংলা নববর্ষের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন কয়েকজন নারী। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফটকে এ ঘটনা ঘটে।
নিপীড়নকারীদের ঠেকাতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি লিটন নন্দীর হাত ভেঙেছে। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে এই ঘটনা জানানো হলেও তাঁরা যথাসময়ে ব্যবস্থা নেননি।
ঘটনার প্রতিবাদে আজ বুধবার ক্যাম্পাসে মিছিল-সমাবেশ করেছে ছাত্র ইউনিয়ন ও প্রগতিশীল ছাত্রজোট। তারা অভিযোগ করেছে, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার কারণেই যেকোনো উৎসবের দিন এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তারা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা দেখে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্র ইউনিয়ন নেতা লিটন নন্দী প্রথম আলোকে বলেন, বাংলা নতুন বছর উপলক্ষে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষের প্রচণ্ড ভিড় ছিল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে শাহবাগ থেকে টিএসসি আসার পথে তাঁরা কয়েকজন দেখেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে ৩০-৩৫ জনের একদল যুবক বেশ কয়েকজন নারীকে যৌন হয়রানি করছে। তারা কারও কারও শাড়ি ধরে টান দিচ্ছিল। কয়েকজনকে তারা বিবস্ত্রও করে ফেলে। এ সময় সেখানে বাধা দিতে গেলে ওই যুবকদের ধাক্কায় তিনি পড়ে যান এবং তাঁর হাত ভেঙে যায়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিটন নন্দী বলেন, ‘এ দৃশ্য বর্ণনা করা যায় না। আমি আমার পাঞ্জাবি খুলে এক নারীকে দিয়েছিলাম। আরেকটি মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। ওই যুবকেরা ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে এই ঘটনা ঘটাচ্ছিল। আমরা পুলিশ ও প্রক্টরকে ঘটনা জানালেও তারা কেউ যথাসময়ে আসেনি। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা পরে প্রক্টরের কার্যালয়ে গিয়ে দেখেন, তিনি কম্পিউটারে গেমস খেলছেন।’
ছাত্র ইউনিয়নের সহ-সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী গেটে যখন এই ঘটনা ঘটছিল, তখন সেখানে মাত্র দুজন পুলিশ ছিল। টিএসসির ডাচ-বাংলা বুথের দিকে বেশ কয়েকজন পুলিশ ছিল। আমরা তাদের এগিয়ে আসতে বললে তারা তখন রাজি হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে আমরা দুজনকে ধরিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ পরে তাদের ছেড়ে দিয়েছে বলে জানতে পারি।’
গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিজ্ঞান লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় যেখানে খুন হন, তার পাশেই সোহরাওয়ার্দী গেটে এ ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ছাত্র অভিযোগ করেছেন, সোহরাওয়ার্দী গেট এবং এর ভেতরে প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায়ও প্রথম বর্ষের কিছু ছাত্র নিয়মিতই নারীদের লাঞ্ছিত করে। এসব ব্যাপারে প্রশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরও এসব প্রতিরোধে এগিয়ে আসা উচিত।
ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা বলেন, ঘটনাস্থলে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা ছিল বলে পুলিশ দাবি করেছে। কাজেই সেগুলো দেখে যেন দ্রুত দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলী বলেন, ‘ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা আমাকে খবর দেওয়ার পরপরই আমি পুলিশকে সোহরাওয়ার্দী গেট বন্ধ করতে এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। পরে পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে বলে আমি জেনেছি। আমরা পুলিশকে বলেছি সিসি টিভির ফুটেজ দেখে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে।’
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) বিভাগের জাহাঙ্গীর আলম সরকার প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ এ ব্যাপারে বিধিমতো ব্যবস্থা নেবে।
ক্যাম্পাসে মিছিল, সংবাদ সম্মেলন: যৌন নিপীড়নের এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আজ ক্যাম্পাসে মিছিল-সমাবেশ করেছে ছাত্র ইউনিয়ন ও প্রগতিশীল ছাত্র জোট। পরে দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জি এম জিলানী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও মিলন চত্বরে পুলিশের অবস্থানের কাছাকাছি জায়গায় এই ঘটনা ঘটে; যেখানে পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও সিসি ক্যামেরা ছিল। তারপরেও পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি।’
জি এম জিলানী বলেন, বর্ষবরণের দিন মানুষজন যেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে সে কারণে তাঁরা প্রক্টরের সঙ্গে দেখা করে ক্যাম্পাসে পয়লা বৈশাখের দিন সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ এবং ফুটপাতে দোকান বসতে না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু দুপুরের পর থেকেই অবাধে গাড়ি চলতে ও ফুটপাতে দোকানপাট বসতে দেওয়া হয়। এর ফলে ক্যাম্পাসের পরিবেশ জনসাধারণের চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। ভবিষ্যতে যেকোনো উৎসবের দিনে এমন পরিস্থিতি এড়াতে আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

তিন আঁচড়েই তার ছবি বিক্রি ১০ লাখ রুপিতে, ছবি বিক্রির অঙ্ক নিয়ে বিব্রত মমতা

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গর্ব করে বলতে পারেন, তিনটে আঁচড় দেব, ১০ লাখ রুপিতে বিক্রি হবে (ছবি)। কলকাতা পুরসভার নির্বাচনী প্রচারে তার ছবি বিক্রি নিয়ে ঘন ঘন বলতে হচ্ছে। কখনও ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে, কখনো আত্মরক্ষার তাগিদে। তিনি নিজেই বলেছেন, তার বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। প্রায় ৫৪ টি বই লিখে তিনি বছরে রয়্যালটি পান বেশ কয়েক লক্ষ রুপি। আর ছবি এঁকে তিনি কত পান তা নিয়েই  শুরু হয়েছে যত গোলমাল। অনেকদিন ধরেই তার ছবি বিক্রি নিয়ে নানা অঙ্ক শোনা গিয়েছে। সারদা কর্তা থেকে শিল্পপতিদের মোটা অঙ্কে মমতার ছবি কেনা নিয়ে সমালোচনার ঝড়ও উঠেছে বারে বারে। কিন্তু এতদিন মমতা সে সবে পাত্তা না দিলেও এবার তিনি মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন তার ছবি বিক্রির নানা অঙ্ক প্রচারিত হওয়ার ফলে। একসময় শোনা গিয়েছিল দু কোটি রুপিতেও নাকি তার ছবি বিক্রি হযেছে। তবে এটা যে অপপ্রচার সেটা জানিয়ে কলকাতায় সম্প্রতি এক জনসভায় মমতা নিজেই বলেন যে, তার ছবি বিক্রি হযেছে ১০ লক্ষ রুপিতে। এই ভাবেই আয় হয়েছে ২ কোটি রুপি। তবে মমতা নিজেকে কখনোই পেশাদার শিল্পী বলে মনে করেন না। তিনি শিল্প র্চ্চার কোন পাঠও নেন নি। তবে শিল্প শুভাপ্রসন্ন তাকে ছবি আঁকার কিছু টিপস দিয়েছেন। আর তিনিই সার্টিফিকেট দিয়েছেন যে মমতা একজন বড় দরের শিল্পী। তার পর থেকে মমতা কত যে ছবি ্ঁকেছেন তার সঠিক হিসেবে মমতা নিজেও জানেন না। অনেককেই বিলিয়েও দিয়েছে তার আঁকা ছবি। তবে তার ছবি বিক্রি থেকে সাড়ে ছয় কোটি রুপি আয়ের কথা দলের আয়ব্যায়ের হিসেবে দেখানোতেই গোল বেঁধেছে। বিক্রির অঙ্কের ধাঁধায় পড়ে মমতা কখনো বলছেন দু কোটি রুপি আয় হয়েছে তার ছবি বিক্রি থেকে। আর ৪৮ ঘন্টার মধ্যে মত পাল্টে বলেছেন, তার ৩০০ ছবি বিক্রি হয়েছে নয় কোটি রুপিতে। ৬০০ ছবি বিলিয়েও দিযেছেন বলে জনসভায় জানিয়েছেন। তবে ছবি বিক্রির তিন রকম হিসেব নিয়েই রাজণীতি গরম হয়ে উঠেছে। বিরোধীরা আক্রমন শানাচ্ছেন তার সততা নিয়ে। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গেও সভাপতি তো বিষয়টি নিয়ে আদালতে যাবার কথাও সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছেন। তৃণমূল নেত্রীর আঁকা ছবির দাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএম-সহ বিরোধী দলগুলির নেতারা। পুরভোটের মুখে সে কথা মাথায় রেখেই এ দিন মমতা বলেছেন, ওরা বাজার জানে না। এক একটা ছবি ১৫ কোটি রুপিতে বিক্রি হতে পারে! তার পরেই বিরোধী এবং সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, আমার ছবি হাজার, কোটি রুপিতে বিক্রি করব! তোমার কী? তোমার পিতা, পিতামহ, তোমার বউয়ের কী? তবে বিরোধীদের বক্তব্য, নিজের আঁকা ছবি বিক্রির টাকা নিয়ে আজ এক রকম, কাল এক রকম কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী প্রমাণ করছেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে চাপে আছেন। বিশেষ করে পুরভোটের আগে নাগরিক সমাজের সামনে এই প্রসঙ্গটি দলের সমস্যা বাড়াতে পারে। সেই বিড়ম্বনা এড়াতেই তৃণমূল নেত্রীকে মুখ খুলতে হচ্ছে। সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী অবশ্য এক আঁচড় দিয়ে তোলাবাজি হিসেবে অভিহিত করেছেন। আর কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নান বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর ছবি বিক্রি থেকে আয়ের অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে! শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, চিট ফান্ড থেকে তৃণমূল কয়েক হাজার কোটি টাকা পেয়েছে এবং তার পুরোটাই মুখ্যমন্ত্রী নিজের ছবি বিক্রির আয় বলে চালাচ্ছেন। বিজেপি বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্যও বলেন, তৃণমূল নেত্রীর ছবির দামের ওঠা-পড়া ভারতীয় শেয়ার বাজারের হর্ষদ মেটার যুগকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছে।

স্বাভাবিক রাজনীতি ফিরে আসার প্রত্যাশা by গোলাম মোহাম্মদ কাদের

সবার অংশগ্রহণে ২৮ এপ্রিল তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন কি ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, নাকি ফের সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে? এসব প্রশ্নের উত্তরে নিজ নিজ দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির তিনজন শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক। প্রথম আলোয় পর্যায়ক্রমে তাঁদের লেখা প্রকাশিত হবে। আজ ছাপা হলো জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মোহাম্মদ কাদেরের নিবন্ধ
দেশে এখন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের হাওয়া বইছে। ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রার্থী যাচাই-বাছাই শেষ, প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল তাদের সমর্থিত একক প্রার্থী মনোনয়নের মাধ্যমে এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীও।
সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন এবং আইনগতভাবে নির্দলীয় হওয়ার কথা। তবে রাজনীতিতে দলীয়করণের সুনামিতে পড়ে অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো এ নির্বাচনও অনানুষ্ঠানিকভাবে দলীয় ব্যানারেই হচ্ছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই দলীয় সমর্থনপুষ্ট একজন করে প্রার্থী মনোনীত করেছে। সেই দলের অন্য প্রত্যাশীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো হয়েছে। অস্বীকৃতি জানালে সেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। দল-সমর্থিত প্রার্থীরা আইনগত কারণে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করতে পারলেও দলীয় নেতাদের ছবি নির্বাচনী প্রচার ফেস্টুনে ব্যবহার করছেন।
উন্নত বিশ্বের এ ধরনের প্রতিষ্ঠানসমূহের তুলনায় আমাদের স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর দায়িত্ব কম ও কর্তৃত্ব দুর্বল। তথাপি আমাদের মতো জনবহুল ও সীমিত সুযোগের দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রচুর আগ্রহ সৃষ্টি করে, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়া বাঞ্ছনীয় কি না, সে বিষয়ে বিতর্কও অধুনা শোনা যাচ্ছে। এই নির্বাচন নির্দলীয় করার পক্ষে প্রধান যুক্তি, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হবেন। তাঁদের মাধ্যমে ও সরাসরি সম্পৃক্ততায় জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড গৃহীত ও বাস্তবায়িত হবে। এ ধরনের কার্য সম্পাদনে সার্বিক জনস্বার্থে প্রাধান্য দেওয়া হবে, এ প্রত্যাশা থাকে। এ লক্ষ্যে কারও বা কোনো কিছুর প্রতি অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করা সর্বোত্তম পন্থা হিসেবে স্বীকৃত। সুশাসন নিশ্চিত করার স্বার্থে সরকার ও সরকারি দলের মধ্যে আড়াল বা পৃথক্করণের আবশ্যকতা এ কারণেই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়।
সরকারি দলের ব্যক্তিদের সরকারের মন্ত্রী হিসেবে কার্যনির্বাহী কর্মকাণ্ডে নিয়োগ দেওয়া হলে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাঁদের নিরপেক্ষতা ও নির্দলীয়ভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করে শপথ নিতে হয়। এ বিধান আমাদের সংবিধানে আছে। যদিও বাস্তবে এর প্রতিফলন চোখে পড়ে না। বরং সরকারি দলের বা দলীয় ব্যক্তিদের স্বার্থে কাজ করার জন্য নির্বাহী বিভাগকে প্রত্যক্ষভাবে উৎসাহিত করার রেওয়াজ দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা শুধু সংবিধানবিরোধী নয়, সুশাসন ও আইনের শাসনের পরিপন্থী এবং সে কারণে জনস্বার্থবিরোধী। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হলে, বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি দৃষ্টে বলা যায়, নির্বাচিত ব্যক্তিরা শপথ ভঙ্গকারী মন্ত্রীদের মতো গণস্বার্থের স্থলে দলীয় ব্যক্তিদের স্বার্থে অনুরাগ ও বিরাগের বশবর্তী হয়ে দলীয়ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত নেবেন বা নিতে তাঁদের বাধ্য করা হবে।
সমাজের প্রতিটি স্তরে দলীয়করণের কালো মেঘ বাংলাদেশের মানুষের মুক্ত মন ও স্বাধীন চিন্তার নীলাকাশকে ক্রমেই গ্রাস করছে। আশঙ্কা হয়, এভাবে চলতে থাকলে বৃহৎ রাজনৈতিক দলসমূহ ক্ষমতার দাপটে একদিন মানুষের সব ধরনের বিচার-বিবেচনা ও বিবেকপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তদীয় নেতাদের খামখেয়ালিপনার বৃত্তে আটকে ফেলবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন, ঢাকা ব্যতীত অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মতো মোটামুটি সময়মতো মেয়াদান্তে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচিত মেয়র দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। যেমন চট্টগ্রামের সর্বশেষ মেয়র ছিলেন মনজুর আলম। তিনি ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। ইতিপূর্বে, ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের শাসনকালে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরী বিপুল ভোটে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছিলেন।
সমস্যা দেখা গেছে ঢাকা সিটি করপোরেশন নিয়ে। এখানে নির্বাচন সময়মতো হয়নি এবং অনির্বাচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন সিটি করপোরেশনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ মেয়র ছিলেন বিএনপির নেতা সাদেক হোসেন খোকা। তিনি ২৫ এপ্রিল, ২০০২ সালে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ওই নির্বাচন হয় বিএনপি যখন ক্ষমতায়। তাঁর মেয়াদ শেষে ২০০৭ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা। সে সময় নানা জটিলতার কারণ দেখিয়ে নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। আইনগত কারণে নতুন মেয়র নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব হস্তান্তর সম্ভব না হওয়ায় তাঁর মেয়াদ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটÿ ক্ষমতায় আসে। যথাশিগগির সম্ভব ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এটাই তখন মানুষের প্রত্যাশা ছিল। বাস্তবে তা হলো না। নানা ধরনের জটিলতার কারণে নির্বাচন বিলম্বিত হচ্ছে বলা হলো। জনগণ কারণটিকে সরকার সৃষ্ট অজুহাত হিসেবে চিহ্নিত করে। আসল কারণ, নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর ভরাডুবির আশঙ্কা। এভাবে তৎকালীন মেয়রের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হতে থাকল।
বিষয়টি সাধারণভাবে জনগণের সমালোচনার মুখে পড়ে। একপর্যায়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ওই মেয়রকে নির্বাচন ছাড়া অন্যভাবে সরানোর সুযোগ সৃষ্টির জন্য ২৯ নভেম্বর, ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন আইনে সংশোধনী আনে। সেই মোতাবেক অনির্বাচিত সরকার মনোনীত ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব অর্পণের বিধান করা হয়। অবশেষে ঢাকা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র ক্ষমতা গ্রহণের সাড়ে নয় বছর ও মেয়াদ শেষের প্রায় সাড়ে চার বছর পর ২৯ নভেম্বর, ২০১১ তারিখ দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
একই সংশোধনীতে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ নামে দুটি সিটি করপোরেশনে ভাগ করা হয়। এ বিষয়টিও বিভিন্ন মহলে অপ্রয়োজনীয় বলে গণ্য হয়। সে সময়কার পরিস্থিতিতে আওয়ামী-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয় লাভ সহজতর হবে মনে করেই করা হয়েছে বলে অনেকেই মত প্রকাশ করেন। তখন থেকেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য দিন-তারিখ নিয়ে আকার-ইঙ্গিতে আভাস দেখা যেতে থাকে। কিন্তু ২৯ নভেম্বর, ২০১১ থেকে আজ অবধি এই দীর্ঘ সময় আমলাদের মাধ্যমেই ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পরিচালিত হয়ে আসছে।
২০১৫ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী সহিংসতা ও অরাজকতা সৃষ্টি হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে গত মার্চ মাসের শেষ পর্যায়ে ওই সিটি করপোরেশনসমূহের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। হঠাৎ করে এমন একটি সময়ে নির্বাচন ঘোষণার কারণ কী হতে পারে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে কি না—এ বিষয়গুলো এখন জনমনে আলোড়ন সৃষ্টি করছে, আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন আঙ্গিকে।
কারও কারও মতে, উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ঠান্ডা করার উদ্দেশ্যে কৌশল হিসেবে সরকার এ চাল দিয়েছে। তাঁদের মতে, বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের জন্য এটি একটি ফাঁদ। তারা নির্বাচনে অংশ নিলে আন্দোলনের ইস্যুসমূহ চাপা পড়ে যাবে এবং দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে নির্বাচন ঘোষণার কিছুদিন আগে থেকে এমনিতেই আন্দোলনের তীব্রতা হ্রাস পেতে শুরু করেছিল নানা কারণে।
স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী জয়লাভ করতে পারবেন না—এ আশঙ্কা থেকে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন বারবার বিলম্বিত করা হয়েছে, নির্বাচনী আইন সংস্কার করা হয়েছে, এমনকি ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে—এই অভিযোগসমূহকে গ্রহণযোগ্য মনে করলে, যেকোনোভাবেই হোক নির্বাচনে (বিশেষ করে ঢাকা সিটি করপোরেশনসমূহের) জয়লাভ করতে হবে, আওয়ামী লীগ এ নীতিতে বিশ্বাসী বলা যায়। সেই পেরিপ্রেক্ষিতে কিছু মানুষের বক্তব্য, চরম আন্দোলনের মধ্যে বিএনপি ও ২০-দলীয় জোট নির্বাচন বয়কট করবে এবং আওয়ামী লীগ ফাঁকা মাঠে গোল দিতে পারবে—এ ধারণা থেকেই নির্বাচনের ঘোষণা। সেই বিবেচনায় বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগকে বিপাকে ফেলেছে। তাদের ধারণা, এখন অনুগত নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সহায়তায় যেনতেন প্রকারে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।
এ ধরনের চিন্তাধারা যদি সত্যি প্রমাণিত হয়, তা হবে দুঃখজনক। এতে করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি ও সহিংসতার পুনরাবৃত্তি দেশবাসীর জন্য বয়ে আনতে পারে দুর্ভোগ। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও পরাজিত হবে গণতন্ত্র। এতে করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করা হবে। অবশ্য অনেকেই মনে করছেন, বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের জন্য ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের পথ থেকে বেরিয়ে আসার সম্মানজনক বহির্গমনের একটি রাস্তা হতে পারে এ নির্বাচন। সে উদ্দেশ্য নিয়েই সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্দোলনরত দলসমূহ স্বাভাবিক রাজনীতির ধারায় ফিরে আসার সুযোগ পাবে। দেশে শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা স্থাপনের পথ উন্মুক্ত হবে।
উদ্দেশ্য যদি এই হয়, তা নিঃসন্দেহে দেশবাসীর জন্য সুখবর। তবে, সে ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব হবে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করে বিরোধী মহলে আস্থা সৃষ্টি করা। পরে সুবিধাজনক সময়ে সমঝোতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক সমস্যা ও বিরোধ মীমাংসার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই হবে বাঞ্ছনীয়।
গোলাম মোহাম্মদ কাদের: সাবেক মন্ত্রী, প্রেসিডিয়াম সদস্য জাতীয় পার্টি।

সিটি নির্বাচন কি একটা ধূম্রজাল? by মশিউল আলম

বিএনপিপন্থী শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ মনে করেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের পথ খুলে যাবে; স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংবাদমাধ্যমের লেখালেখি খেয়াল করলে এখন এ রকম একটা আশাবাদের দেখা পাওয়া যায়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসায় ফিরে যাওয়া, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ হওয়া এবং তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে আশাবাদী মানুষেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। তাঁরা এমন আশা করছেন যে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ফিরে আসবে।
কিন্তু এই আশাবাদের পক্ষে কোনো সায় পাচ্ছেন না নিউ ইস্কাটনের মুদি দোকানদার জসিম মিয়া। তিনি মনে করেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটা নিতান্তই সাময়িক উদ্দীপনার বিষয়। নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই উত্তেজনা মিলিয়ে যাবে এবং জাতীয় রাজনীতির গভীর সংকট যথারীতি ফিরে আসবে।
জসিম মিয়ার সঙ্গে আলাপ করে তাঁর যে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির আভাস পেয়েছি, সে প্রসঙ্গে একটু পরে ফিরে আসছি। তার আগে আরও তিনজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপের কিছু বিষয় তুলে ধরা যাক।
রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের পেছনে হাতিরঝিলের পাড়ে চৈত্রের খররোদে পুড়তে পুড়তে, ঘামতে ঘামতে আখের রস বিক্রি করছিলেন মাদারীপুরের যুবক মোহাম্মদ দুলাল মিয়া, যিনি প্রতিদিন পাঁচ টাকা দিয়ে একটি দৈনিক পত্রিকা কিনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, দেশের অবস্থা এখন তাঁর কাছে কেমন বলে মনে হচ্ছে। একগাল হেসে তিনি বললেন, ‘ভালোই তো দেখা যায়। পেট্রলবোমা থামছে। অবরোধ-টবরোধ আর নাই, খালেদা জিয়া পারে নাই, ব্যর্থ হইছে।’
‘কেন এ কথা বলছেন? খালেদা জিয়া কীভাবে ব্যর্থ হলেন?’ আমার এই প্রশ্নের উত্তরে দুলাল মিয়া বললেন, ‘উনার আন্দোলন ব্যর্থ হইছে। উনি মানুষ মারছে, সেই জন্য পাবলিক উনারে সাপোর্ট দেয় নাই। মানুষ মাইরা আর কত দিন আন্দোলন চালাইব? তাই এখন থামছে, না থাইমা উপায় ছিল না।’
আমি জানতে চাইলাম, খালেদা জিয়া কী উপায়ে আন্দোলন করলে সফল হতেন? দুলাল মিয়া বললেন, ‘জনগণরে সঙ্গে নিয়া আন্দোলন করতে হয়, মানুষ মাইরা আন্দোলন হয় না। মানুষ মারলে জনগণ সাপোর্ট দেয় না। খালেদা জিয়া যদি হাজার হাজার মানুষ নিয়া রাস্তায় নামতে পারত, তাইলে দেশের মানুষ দেখতে পাইত ওনার পিছে কত লোক আছে। কিন্তু উনি সেটা করতে পারে নাই। টোকাই ভাড়া কইরা পেট্রলবোমা দিয়া মানুষ মারছে। তাই উনি ব্যর্থ হইছে। ব্যর্থ হইয়া আস্তে কইরা বাসায় ফিরা গেছে গিয়া।’
আমি বললাম, ‘সরকার তো তাঁকে ও তাঁর দলের লোকজনকে রাস্তায় নামতে দেয়নি। তাহলে তাঁদের আর কী করার ছিল?’
দুলাল মিয়ার উত্তর: ‘লাখ লাখ লোক নিয়া যদি খালেদা জিয়া রাস্তায় নামত, তাইলে সরকারের বাপেরও ক্ষমতা ছিল না বাধা দেয়। উনি আসলে পারে নাই, পুরাই ব্যর্থ হইছে, এখন আপস কইরা আদালত থিকা জামিন নিয়া বাসায় ফিরা গেছে গিয়া।’
কিন্তু নড়াইল থেকে আসা সবজিবিক্রেতা শফিকুর রহমান মুরাদ মনে করেন না খালেদা জিয়া ব্যর্থ হয়েছেন। মুরাদের বিচারে তিনি
তাঁর অবস্থানে অটলই আছেন; ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড় দিছে, তাই দেশে শান্তি ফিরে আসছে,’ বললেন মুরাদ, যিনি একজন গ্র্যাজুয়েট এবং নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন ও টিভি দেখেন। নিউ ইস্কাটনে নূর মসজিদের এক কোণে রাস্তার পাশে তাঁর সবজির দোকান। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনার কী ধারণা, প্রধানমন্ত্রী কেন এত দিন পরে হঠাৎ খালেদা জিয়াকে “ছাড়” দিলেন?’
‘কারণ, প্রধানমন্ত্রীর শুভবুদ্ধির উদয় হইছে,’ বললেন মুরাদ, ‘উনি বুঝতে পারছেন, এইভাবে আর চলতে পারে না। উনি পুলিশ বাহিনীকে বিএনপির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে যেভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করছেন, সেটা এরশাদের আমলেও আমরা দেখি নাই। প্রধানমন্ত্রী এখন বুঝতে পারছেন, বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, এত বাড়াবাড়ি তো ভালো না। দেশের সব মানুষ মনে মনে বিরুদ্ধে চলে গেলে শুধু স্বৈরাচারী পন্থায় তো বেশি দিন চালানো যাবে না। আর একটা কথা হলো, তাঁর ওপর বিদেশিদের চাপ আছে। সব দিক মিলায়া তাঁকে ছাড় দিতে হইছে।’
‘এই ছাড় দেওয়াটা কি ভালো হয়েছে?’ আমার এই প্রশ্নের উত্তরে মুরাদ বললেন, ‘অবশ্যই, হানড্রেড পারসেন্ট ভালো হইছে। এখন দেশের ভালো হবে। শান্তি ফিরে আসবে। এই যে সিটি নির্বাচন হইতে যাইতাছে, এর ফলে আরও ভালো হবে, মানুষের মধ্যে একটা স্বাভাবিক শান্তিশৃঙ্খলা ফিরে আসবে। তবে হ্যাঁ, এখানে একটা কথা আছে, সিটি নির্বাচন কিন্তু সুষ্ঠু হইতে হবে, নিরপেক্ষ হইতে হবে। কারচুপি হইলে বা বিএনপির প্রার্থীদের জোর করে হারানো হলে কিন্তু আবার অশান্তি শুরু হয়ে যাবে।’
আর অশান্তি চান না ৫২ বছর বয়সী মোহাম্মদ কাল্লু মিয়া। কারণ, দেশজুড়ে গত তিন মাসের অশান্তিতে তাঁর অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে, প্রায়-অচল হতে বসেছে জীবন-জীবিকা। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শান্তি-অশান্তির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল তাঁর জীবিকা। তিনি বাস করেন বাংলামোটরের উত্তর পাশের এক ঘিঞ্জি গলির ভেতরে। লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি, কিন্তু কাজ চালানোর মতো ভাষা শিখে নিয়েছেন প্রায় ডজন খানেক। প্রতিদিন সকালে তিনি এসে দাঁড়ান সোনারগাঁও হোটেলের গেটে। হোটেল থেকে পর্যটকেরা যখন বেরিয়ে আসেন, তখন তিনি নিজেকে একজন ‘ইন্টারপ্রেটার’ হিসেবে উপস্থাপন করেন, জানতে চান তাঁর সাহায্য তাঁদের দরকার কি না। তিনি তাঁদের নিয়ে যেতে পারেন কোনো বিপণিকেন্দ্রে, জাদুঘর, লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল বা অন্য কোনো দর্শনীয় ঐতিহাসিক স্থানে। পর্যটকদের কেউ কেউ তাঁকে সঙ্গে নেন। দিন শেষে তাঁকে ৫০০ বা এক হাজার টাকা দেন। কোনো কোনো হৃদয়বান দেন আরও বেশি। কিন্তু প্রতিদিন তিনি এই কাজ পান না। আমার সঙ্গে দেখা হলেই মলিন মুখে বলেন, ‘স্যার, হোটেলে গেস্ট কম, আমার রুজিরোজগার প্রায় বন্ধ হইয়া গেছে। দেশের অবস্থা কি ভালো হইব না?’
সেদিন জসিম মিয়ার মুদি দোকানের সামনে কাল্লু মিয়ার সঙ্গে দেখা। উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন, ‘স্যার, দেশের অবস্থা তো ভালো, খালেদা জিয়া বাসায় ফিরা গেছে। এখন দেশে শান্তি হইব। বেশি বেশি বিদেশি গেস্ট আইব।’
তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে জসিম মিয়া বললেন, ‘দ্যাশের অবস্থা ভালো এইডা তোরে কে কইছে, কাল্লু? তুই রাজনীতি কিছু বোজছ?’
কাল্লু মিয়া ভ্যাবাচেকা খেয়ে যান, খানিক অপমানও বোধ করেন সম্ভবত। তিনি জসিম মিয়াকে বলেন, ‘ক্যান? পেট্রলবোমা বন্ধ হয় নাই? সিটির ইলেকশান হইতেছে না? অখন কুনোখানে মারামারি হইতাছে? ’
জসিম মিয়া কাল্লুকে পাত্তা না দিয়ে আমার দিকে চেয়ে বলেন, ‘শান্তি দেখতাছেন, এইটা সিটি ইলেকশান বইল্যা। কিন্তু সিটি ইলেকশান দিয়া আসল সমস্যারে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হইতাছে। কিন্তু লাভ নাই। সামনে আরও খারাপ দিন আইতাছে।’
আমি জসিম মিয়ার কাছে তাঁর এই আশঙ্কার ব্যাখ্যা চাইলাম। তিনি বললেন, ‘প্রথম খারাপ কথা হইল, সিটি ইলেকশানে আওয়ামী লীগ সবগুলা মেয়র পদে জিতবার চায়। হেগো মন্ত্রী কইয়া দিছে, যেকোনো প্রকারে হোক জিততেই হইব। হেরা জোর কইরা ব্যাকটি জিত্যা নিলে বিএনপি কি বইয়া থাকব? গন্ডগোল শুরু হইব না? সিটি ইলেকশানের পরেই দেইখেন, কী শুরু হইয়া যায়।’
আমি বললাম, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কারচুপি করা বা জবরদস্তি খাটানো সম্ভব হবে না। এই সরকারের অধীনেই এর আগে পাঁচটা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রতিটাতেই বিএনপির প্রার্থীরা জিতেছেন। জসিম মিয়া বললেন, ‘ভালো কথা, এইবারও যদি ঠিকঠাক মতন ইলেকশান হয়, বিএনপির অন্তত দুইজন প্রার্থী মেয়র হইব। আচ্ছা হইল, সিটি ইলেকশানের ব্যাপার শ্যাষ হইল, কিন্তু তার পরে কী? দ্যাশ কি এইভাবেই চলব? সরকার যে কইয়া দিছে, উনিশ সালের আগে সংসদ নির্বাচন নাই, তো এই কয় বছর বিএনপি কী করব? বইয়া বইয়া হুক্কা খাইব? জে না, হেরা আবার আন্দোলন শুরু করব, এইবার আরও জোরেশোরে! আর সরকারও বইয়া থাকব না। তার মানে দুই পক্ষে মিল্যা যা শুরু করব, দ্যাশের এক্করে বারোটা বাইজ্জ্যা যাইব।’
যাঁরা দুই বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষের সাময়িক নমনীয়তা দেখে স্থিতিশীল ও শান্তিময় রাজনৈতিক ভবিষ্যতের আশায় বুক বাঁধছেন, তাঁদের মনে হতে পারে জসিম মিয়া অতিরিক্ত হতাশাবাদী লোক। কিন্তু তাঁর শঙ্কাটা সত্যিই বিবেচনার যোগ্য। সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনা আর সপ্তাহ তিনেকের মধ্যেই মিলিয়ে যাবে। পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন কখন, কী পদ্ধতিতে হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ না মেটা পর্যন্ত প্রকৃত রাজনৈতিক সংকট থেকেই যাবে।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

একটি স্বীকারোক্তি এবং রাষ্ট্রের দায় by কাবেরী গায়েন

বিজ্ঞানলেখক অভিজিৎ রায় হত্যার এক মাস পার না হতেই নির্মমভাবে খুন হলেন ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান। গত ৩০ মার্চ ওয়াশিকুর রহমান তাঁর বেগুনবাড়ীর বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হলে বাসার সামনেই তাঁকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা  করা হয়। এর আগে একই কায়দায় হত্যা করা হয় ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার, মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী; চাপাতির কোপে বিক্ষত হয়েছেন লেখক হুমায়ুন আজাদ, ব্লগার আসিফ মহীউদ্দিন, আঘাতের চেষ্টা হয়েছিল কবি শামসুর রাহমানের ওপর। এসব হত্যাকাণ্ড ও হত্যাচেষ্টার বিচার হয়নি।
তবে অতীতের ঘটনাগুলোর সঙ্গে এবার একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যে তিনজন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের মধ্যে দুজনকে এলাকার মানুষ—যাঁদের দুজন তৃতীয় লিঙ্গের—হাতেনাতে ধরে ফেলেছেন রক্তমাখা চাপাতিসহ ঘটনাস্থল থেকে। এরা দুজন হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্র জিকরুল্লাহ ও মিরপুরের দারুল উলুম মাদ্রাসার ছাত্র আরিফুল ইসলাম। অপরজনের নাম জানা গেছে আবু তাহের, যে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলামের স্বীকারোক্তি ছাপা হয়েছে সব গণমাধ্যমে। তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ীই ‘বড় ভাই’ ‘নির্দেশনা দানকারী হুজুরের’ বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে। এই স্বীকারোক্তি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যেমন চিহ্নিত করতে সাহায্য করছে, একই সঙ্গে কতগুলো বাস্তব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রকে।
এক. স্বীকারোক্তি
‘ব্লগ কী বুঝি না, তার লেখাও আমরা দেখিনি, হুজুরের পরামর্শ, সে ইসলামবিরোধী। তাকে হত্যা করা ইমানি দায়িত্ব। আর সেই ইমানি দায়িত্ব পালন করতে ওয়াশিকুরকে হত্যা করেছি।’ (বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ৩০ মার্চ ২০১৫)—এমনই সহজ স্বীকারোক্তি জিকরুল্লাহ ও আরিফুল ইসলামের। তারা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণের কারণ হিসেবে ‘সওয়াব হবে’, ‘বেহেশত নিশ্চিত’ বলে জানিয়েছে (কালের কণ্ঠ, ৩১ মার্চ ২০১৫)। এমনকি ‘গুলির চেয়ে চাপাতির কোপে মারলে সওয়াব বেশি’ বলেও জানিয়েছে।
দুই. নির্দেশনা দানকারী হুজুর
কে এই হুজুর, যে নির্দেশ দিয়েছে বলেই সুদূর চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে চলে এসেছে জিকরুল্লাহ? আরিফুল ও জিকরুল্লাহর জবানবন্দি অনুযায়ী, ‘বড় ভাই’, ‘নির্দেশনা দানকারী’, ‘হুজুর’ বা মাসউলকে (মাসউল কোনো ব্যক্তি নয়, তত্ত্বাবধায়ক) তারা শুধু নামে চেনে, হত্যাকাণ্ডের আগে ঢাকায় কয়েকবার তার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং ‘প্রটেক্ট’ নামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ রাখত। মাসউল তাদের দুজনকে চিনিয়েছে ওয়াশিকুরের বাসা, দিয়েছে হত্যাকাণ্ডের ট্রেনিং ও ওয়াশিকুরের ছবি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, যা এ পর্যন্ত গণমাধ্যমে এসেছে সে অনুযায়ী, মাসউলকে নিষিদ্ধঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অন্যতম নেতা রেদোয়ানুল আজাদ রানা বলে ধারণা করা হচ্ছে (নয়া দিগন্ত, ২ এপ্রিল ২০১৫) এবং এরা সবাই এই টিমের স্লিপার সেল-এর সদস্য। জিকরুল্লাহ ও আরিফুল কেউই পরস্পরকে চিনত না, চিনত না পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়া তাহেরকে, এমনকি ‘নির্দেশনা দানকারী’ মাসউলকেও। অর্থাৎ, স্তরবিন্যস্ত এই নেটওয়ার্কে জিকরুল্লাহ ও আরিফুল অন্ধভাবে নির্দেশ পালনকারী মাত্র (যুগান্তর, ৫ এপ্রিল ২০১৫)। এর আগেও তারা জেএমবি-সংশ্লিষ্টতার কারণে ধরা পড়েছে।
কথিত মাসউলের খোঁজ পাওয়াটা জরুরি। তাহলে হয়তো জানা যাবে সেই-ই মূল হোতা, নাকি সেও আসলে পালন করেছে অন্য কারও নির্দেশ। সে নিজেই কি জানে ব্লগ কী, নাকি সেও শুনেছে অন্য কারও কাছে। কী তার রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয়? এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি এ জন্যও যে হয়তো দেখা যাবে, যারা ওয়াশিকুরের বিষয়ে খবর দিয়েছে, তারা আমাদের সঙ্গেই ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে সংযুক্ত।
তিন. রাষ্ট্রের দায়
আমাদের দেশে মাদ্রাসা শিক্ষায় প্রায় এক কোটির মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। কিছু ঝাঁ-চকচকে ইংরেজি মাধ্যম মাদ্রাসা বাদ দিলে এসব মাদ্রাসা দরিদ্র ছেলেমেয়েদের জন্যই বানানো। তাদের সিলেবাস মূলত বিশ্বাসনির্ভর। বিশ্বাস ও মান্যতা যেমন অধীত সিলেবাসে, তেমনি ‘হুজুর’দের প্রতিও। এই মান্যতার স্বরূপটি আমরা দেখেছি ৫ মে ২০১৩ সালে। হুজুরের নির্দেশমতো যেমন তারা এসেছিল শাপলা চত্বরে, তেমনি হুজুরের নির্দেশ অনুযায়ী বেরিয়েও গিয়েছিল।
এই মান্যতার কারণ আছে। খাওয়া-পরা-শিক্ষা-সামাজিক মর্যাদা যতটুকুই তারা পায়, সে তো এই মাদ্রাসার কারণেই, রাষ্ট্র তাদের দায়িত্ব নেয়নি। রয়েছে পরকালে বেহেশত লাভের নিশ্চয়তামূলক সরল পাঠ। সমস্যার জায়গা হলো, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নানা জঙ্গি নেটওয়ার্কের অর্থে রাজনৈতিক ইসলাম কায়েমের জন্য কোনো কোনো মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর এই সরল বিশ্বাসকে এমনভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হয় যে তাদের পক্ষে ধর্মের জন্য জীবন দেওয়া ও ধর্মের ‘বিরোধিতাকারী’দের জীবন নেওয়া দুই-ই অশেষ পুণ্যের কাজ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন বলেছে জিকরুল্লাহ ও আরিফুল যে তারা তাদের ‘ইমানি দায়িত্ব’ পালন করেছে এবং তাদের ‘সওয়াব’ ও ‘বেহেশত’ লাভ হবে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শিক্ষা-কাঠামোর কোনো অংশেই এমন প্রশ্নহীন বিশ্বাস তৈরির ব্যবস্থা এত বিপুল আয়তনে চালু রাখার ব্যাপারটি নিয়ে ভাবার সময় বোধ হয় হয়েছে রাষ্ট্রের। অথচ বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, তিরাশির শিক্ষা আন্দোলন, এমনকি ১৯৯০ সালে তিন জোটের রূপরেখায় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১০ দফা দাবিতেও বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার দাবি ছিল।
রাষ্ট্র জানে যে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে কীভাবে নারী নেতৃত্ব, ব্লগার ও গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ ছোট–বড় নানা দল গজিয়েছে, যারা ফেসবুকে তালিকা দিয়ে দিচ্ছে খুন করার, খুন করার পরে তারা ফেসবুকে তাদের জয়োল্লাস প্রকাশ করছে। হত্যা করার জন্য ৮৪ জন লেখক ও ব্লগারের তালিকা থেকে ইতিমধ্যে আটজনকে খুন করতে এসব উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী সক্ষম হয়েছে।
এসব হত্যাকাণ্ডের বিপরীতে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা-পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে বলতেই হয়। কারণ, এখন পর্যন্ত কাউকে তারা দোষী সাব্যস্ত করতে পারেনি। অভিজিৎ হত্যার সময় কাছেই থাকা পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার সুস্পষ্ট অভিযোগ করেছেন তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদ।
এমন সব ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হচ্ছে, এই জঙ্গিগোষ্ঠীর ট্রেনিংয়ের বিপরীতে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থার প্রশিক্ষণ অপর্যাপ্ত প্রমাণিত, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েও ভাবা দরকার।
ভয়াবহ আরেকটি বিষয় দেখি, কোনো খুনের পরে খুনির পক্ষে সাফাই গাওয়ার মানুষ দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। এসব খুন ও খুনের সাফাইয়ের বিপরীতে ধর্মীয় নেতারা কি এগিয়ে আসবেন না? তাঁরা কি বলবেন না, এসব হত্যাকাণ্ড পবিত্র ইসলাম ধর্ম সমর্থন করে  না, যারা এসব করছে তারা খুনি? প্রতিরোধ কি করবেন না মানবতাবাদী সব মানুষ যে ‘লেখার প্রতিবাদ হোক লেখনী দিয়ে, চাপাতি কোনো পথ হতে পারে না’।
যে কাউকে হত্যা করে তার নামের সঙ্গে ব্লগার শব্দটি জুড়ে দিতে পারলেই তাকে হত্যা করা জায়েজ হয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, সেটি ভয়াবহ। আর এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলেছেন ওয়াশিকুর রহমানের বোন আফসারী সুলতানা বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে, ‘মানুষের মনে তো কত কথাই আসে...সে যদি খারাপ কিছু লেখেও, তার বিচার বিধাতা করবেন। আল্লাহ আছেন। পৃথিবীতে ওরা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কে?’ ধর্ম, যুক্তি ও মানবতা যাই-ই বলি, এর ওপরে কথা চলে না। তিনি তাঁর ভাইয়ের খুনিদের ফাঁসির দাবি করেছেন যেন ‘তারা ভবিষ্যতে এমন করতে না পারে’। আমার ধারণা, এই দাবি এ দেশের শান্তিকামী সব মানুষের।
হাতেনাতে ধরে ফেলায় খুনিদের নেটওয়ার্ক বের করা এখন সরকারি সদিচ্ছার ব্যাপার। সরকার হুকুম দানকারী, হত্যাকাণ্ড পরিচালনাকারী, ব্লগ ঘেঁটে ব্লগারদের পরিচিতিকারী, খুনিদের সমন্বয়কারী, অর্থাৎ নেটওয়ার্কের সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের খুঁজে বের করে প্রাপ্য শাস্তির ব্যবস্থা করবে, সেই আশা করি। অনুরোধ করি তৃতীয় লিঙ্গের যে দুজন মানুষ এই খুনিদের ধরেছেন, তাঁদেরসহ প্রান্তিক এই কমিউনিটির নিরাপত্তার দিকটি খেয়াল রাখার।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটি যে বহু ধর্মের, বহু জাতিসত্তার, বহু মতের মানুষের—সেই বিষয়টি শিশুশিক্ষার ভেতরেই যেন প্রোথিত করা যায়, চেষ্টাটি সেখানেও থাকা চাই। রাষ্ট্রের দায়টিও সেখানেই। নয়তো হেরে যাবে বাংলাদেশ।
ড. কাবেরী গায়েন: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আয়কর না ব্যয়কর by এম ফাওজুল কবির খান

সম্প্রতি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থীদের হলফনামায় বর্ণিত আয় ও সম্পদের দৈন্যের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে (প্রথম আলো, ১ এপ্রিল)। প্রার্থীদের দৃশ্যমান বিলাসী জীবন এবং তাঁদের আয় ও সম্পদের অসংগতি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এসব ‘দরিদ্র’ প্রার্থীই আবার আসন্ন নির্বাচনে অজ্ঞাত উৎস থেকে প্রাপ্ত কোটি কোটি টাকা খরচ করবেন এবং নির্বাচনের পর তাঁদের বিনিয়োগ মুনাফাসহ উঠিয়ে আনতে তৎপর হবেন। এসব বিষয় আমাদের প্রত্যক্ষ কর-ব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
আয়কর সম্পর্কে নাগরিকমাত্রই জানেন। কিন্তু ব্যয়কর (expenditure tax) কী? এটা আয়করের অনুরূপ, কেবল করের ভিত্তি হচ্ছে ব্যয়, আয় নয়। আয়করব্যবস্থার ন্যায় এতে অব্যাহতি ও বিয়োজনের ব্যবস্থা থাকবে। ব্যয়ের ভিত্তিতে করের হার নির্ধারিত হবে। যাঁরা বেশি ব্যয় করবেন, তাঁরা বেশি হারে কর প্রদান করবেন। উৎসে ব্যয়কর আদায়েরও ব্যবস্থা থাকবে। মূল পার্থক্যটা হচ্ছে, কর নির্ধারণের ভিত্তি হবে আয়ের পরিবর্তে ব্যয়।
অনেকে ভেবে থাকেন যে ব্যয়করের ক্ষেত্রে যাবতীয় খরচের তালিকা রাখতে হবে। ফলে আয়করব্যবস্থা থেকে এটা আরও জটিল হবে। এটা ঠিক নয়। ব্যয়করের হিসাবের ক্ষেত্রে কর বৎসরে ব্যয়ের জন্য প্রাপ্ত তাবৎ অর্থ (নিয়মিত এবং অনিয়মিত আয় ও সম্পদ ইত্যাদি) থেকে সঞ্চয় বাদ দিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বা ব্যয়করের ভিত্তি নির্ধারণ করা হবে।
প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি আয় নাকি ব্যয় হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক শতাব্দীর বেশি পুরোনো। জন স্টুয়ার্ট মিল করের ভিত্তি থেকে সঞ্চয়কে বাদ দিতে বলেছেন। যেহেতু আয় ও সঞ্চয়ের পার্থক্যই ব্যয়, প্রকারান্তরে তিনি ব্যয়করের কথা বলেছেন। তিনি একে আদর্শ করব্যবস্থা বলেছেন। কেননা, এ ধরনের ব্যয়করব্যবস্থায় সঞ্চয় ও বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে।
বিগত চল্লিশের দশকে, আরভিং ফিশার প্রচলিত আয়করব্যবস্থার বিপক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন যে এটা সঞ্চয়ের ওপর দুবার কর আরোপ করে—একবার আয়ের অংশ হিসেবে, আরেকবার সঞ্চয় থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর কর আরোপ করে। ফলে তাঁর মতে, আয়কর কেবল অন্যায্যই নয়, এটা সঞ্চয় ও উদ্যোগের বিপরীতে ভোগ ও অবসর উৎসাহিত করে থাকে।
নিকোলাস কেল্ডর ১৯৫৫ সালে যুক্তি দেখান যে ব্যয়কর প্রদান ক্ষমতার উন্নততর নির্দেশক। কেননা, ‘ব্যয়ক্ষমতা’ সম্পদ, নিয়মিত ও অনিয়মিত আয়সহ সার্বিক আর্থিক সংগতির ওপর নির্ভরশীল। যেমন কেউ নিজ বাড়িতে থাকলে তিনি ভাড়ার সমপরিমাণ ব্যয় করেছেন বলে ধরা হবে। এ ছাড়া, এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের প্রয়োজনের বিভিন্নতার কারণেও ‘ব্যয়ক্ষমতা’ ভিন্ন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে কেল্ডর আয়করকে ‘কর প্রদান ক্ষমতার’ ত্রুটিপূর্ণ নির্দেশক বলে বর্ণনা করেছেন।
ব্যয়করের বিপক্ষেও যুক্তি আছে। যেমন, সঞ্চয়কে করের আওতামুক্ত রাখলে ধনীরাই লাভবান হবেন। কেননা, তাঁদের সঞ্চয় তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে ধনবৈষম্য আরও বাড়বে। ব্যয়করের বিষয়ে আরেকটি আপত্তি হলো, এটা কৃপণকে উৎসাহিত এবং ব্যয়কে নিরুৎসাহিত করবে। পাল্টা যুক্তি হলো, ব্যয়করের ক্ষেত্রেও আয়করের ন্যায় প্রয়োজন অনুযায়ী আনুক্রমিক করারোপের (progressive taxation) ব্যবস্থা করা যায়, যাতে করে ধনীরা অধিকতর কর প্রদান করবেন। ব্যয়করের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তিটি হলো, সমাজ থেকে ব্যক্তি যা গ্রহণ করে, তা-ই হবে করের ভিত্তি, অর্থাৎ ব্যয়। যা সমাজের জন্য রেখে দেয়, অর্থাৎ আয় বা সঞ্চয় নয়। কেননা, যা ব্যয় করা হয়, তা সমাজের অন্য কারও ব্যবহারের জন্য আর অবশিষ্ট থাকে না।
প্রত্যক্ষ করব্যবস্থা হিসেবে কোন ব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ন্যায়সংগত, এ ধরনের নৈতিক বিষয় ছাড়াও ব্যয়করের সপক্ষে ও বিপক্ষে বিবিধ অর্থনৈতিক বিবেচনা রয়েছে। ব্যয়কর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক—এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদেরা যেমন একমত, তেমনি ব্যয়কর যে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় আয়করের তুলনায় কম কার্যকর, এটাও তাঁরা স্বীকার করেন। কর্মস্পৃহা, বিনিয়োগ এবং ঝুঁকি গ্রহণের ন্যায় অর্থনৈতিক বিষয়ে আয়কর না ব্যয়কর কোনটি বেশি কার্যকর, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। এ ছাড়া প্রশ্ন থেকে যায় যে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর আদায়ের জন্য অথবা কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ভারসাম্য অর্জনের জন্য আয়কর ও ব্যয়কর কোনটির হার বেশি হবে।
যদিও অর্থনীতিবিদেরা ব্যয়করের বিবিধ সুবিধা এবং আয়করের বিকল্প হিসেবে এর তাত্ত্বিক মর্যাদা স্বীকার করেন, তাঁরা এর প্রশাসনিক বাস্তবায়ন এবং এর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সম্বন্ধে সন্দিহান। ভারত ও বর্তমান শ্রীলঙ্কায় ব্যয়কর প্রবর্তন করা হয়েছিল। এবং এটা কেবল স্বল্পসংখ্যক ধনী ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। ১৯৯৬ সালে দুই দেশেই এটা তুলে নেওয়া হয়। আমাদের আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ১৯(৩) ধারায় অব্যাখ্যাত খরচকে আয় হিসেবে গ্রহণ করে এর ওপর কর ধার্যের বিধান আছে, যা ব্যয়করের ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
সার্বিকভাবে, ব্যয়করের উপকারিতা কিংবা এর সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিলেও অদূর ভবিষ্যতে আয়করব্যবস্থা বাতিল করে এর পরিবর্তে ব্যয়করব্যবস্থা প্রবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে বিদ্যমান আয়করব্যবস্থায় ব্যয়কর উল্লেখযোগ্য সংযোজন হতে পারে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের ন্যায় ব্যক্তিবর্গ, যাঁদের ব্যয় তাঁদের প্রদর্শিত আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়, তাঁদের ক্ষেত্রে এটা প্রয়োগ করা যেতে পারে।
আমাদের করব্যবস্থা, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ করব্যবস্থার অন্যায্যতা নির্বাচনী হলফনামায় প্রদত্ত আয় ও সম্পদের বিবরণ থেকেই স্পষ্ট। যাঁরা করব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখাবেন বা এর অপব্যবহার করবেন, তাঁরাই জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রতি সুবিচার করবেন—এটা আশা করা যায় না। আমাদের প্রত্যক্ষ করব্যবস্থার সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মার্কিন উপনিবেশগুলোর একটি স্লোগান ছিল, ‘প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোনো করারোপ নয়’। কথাটাকে খানিকটা ঘুরিয়ে বলা যায়, ‘যথাযথ কর প্রদান ব্যতীত কোনো প্রতিনিধিত্ব নয়’। যাঁরা জনপ্রতিনিধি হবেন, তাঁদের যথাযথ কর প্রদানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
এম ফাওজুল কবির খান: সাবেক সচিব ও অর্থনীতির অধ্যাপক

ওপারে মা, এপারে ছেলে, মাঝখানে কাঁটাতার by শহীদুল ইসলাম

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে পঞ্চগড়ের অমরখানা সীমান্তে
আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের মাঝে পাঁচ কিলোমিটার
এলাকাজুড়ে বসে দুদেশের মানুষের মিলনমেলা। সকাল
সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলে এ মিলনমেলা।
এ সময় স্বজনেরা একে অন্যের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
খোঁজখবর নেন। ছবিটি আজ তোলা। ছবি: শহীদুল ইসলাম
কুশল বিনিময়ে ব্যস্ত দুদেশের স্বজনেরা। ছবি: শহীদুল ইসলাম
ওপারের (ভারত) স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন তাঁরা
ওপারে (ভারতে) মা সিতুমণি, এপারে (বাংলাদেশে) ছেলে বিশ্বনাথ। দুজনের মাঝে বাধা কেবল একটি কাঁটাতারের বেড়া। দূরত্ব দুই-তিন হাতের বেশি নয়। দুপাশে দুজন দাঁড়িয়ে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছেন। দুজনেরই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বনাথের মা চোখে দেখতে পান না, তবে কথা বলতে পারেন। তাই দূর থেকে ছেলের সঙ্গে কথা বললেন তিনি।
বিশ্বনাথের বাড়ি পঞ্চগড় সদর উপজেলার কাজীপাড়ায়। বয়স ৭৫ পার হয়েছে। উপজেলার অমরখানা সীমান্তে ৭৪৩ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের কাছে আজ মঙ্গলবার সকালে এসেছেন তাঁর মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। মায়ের বয়স ১০০ পার হয়েছে। থাকেন ভারতের দার্জিলিং জেলার আফছা গ্রামে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে আজ সকালে তিনিও অমরখানা সীমান্তে এসেছেন ছেলের সঙ্গে দেখা করতে। বিশ্বনাথ বললেন, ‘ওপারে যেতে পারি না, তাই প্রতি নববর্ষে মায়ের সঙ্গে দেখা হয়।’ এবারও এসেছেন তিনি। মায়ের আশীর্বাদও নিয়েছেন।
কেবল বিশ্বনাথ নয়, দুদেশের কয়েক হাজার মানুষ নববর্ষ উপলক্ষে হাজির হন সীমান্তে। অমরখানা সীমান্তে ৭৪৩,৭৪৪ ও ৭৪৫ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমানা পিলারের মাঝে পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসে দুদেশের মানুষের মিলনমেলা। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলে এ মিলনমেলা।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির তানজিনা দেখা করতে এসেছেন তাঁর বোন পঞ্চগড়ের তাসলিমা বেগমের সঙ্গে। এ সময় দুবোনের চোখেই জল দেখা যায়। দুজন দুজনের বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজ খবর নেন।
সীমান্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উভয় দেশের মানুষ যাঁরা অর্থাভাবে পাসপোর্ট বা ভিসা করতে পারেন না, তাঁরা এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন। বাংলা নববর্ষে তাঁরা স্বজনদের সঙ্গে দেখা করেন। এদিন ভোর থেকে দুই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন এসে জড়ো হন। স্বজনদের মিলন আর দুই দেশের অগণিত মানুষের উপস্থিতিতে এখানে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়।
এলাকাবাসী জানান, আজ সকাল থেকে কাঁটাতারের বেড়ার এপারে কয়েক হাজার বাংলাদেশি, ওপারে কয়েক হাজার ভারতীয় বাঙালি জড়ো হন। তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছেন, কুশলাদি বিনিময় করছেন। কেউ কেউ কাঁটাতারের ওপর দিয়ে বিস্কুট, চানাচুর, ইলিশ মাছ, উপহারসামগ্রী আর সিগারেটের প্যাকেট ছুড়ে দেন একে অপরকে। কেউবা আত্মীয়স্বজনকে দেওয়ার জন্য কোমল পানীয়র বোতল ছুড়ে মারেন। স্বজন ও পরিচিতদের দেখে অনেকে আবেগে কেঁদে ফেলেন। এ কান্না বিরহের নয়, মিলনের।
স্থানীয় মানুষ আরও জানান, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির পর তাঁদের অনেক আত্মীয়স্বজন ভারতীয় অংশে পড়ে যান। ফলে অনেকেরই যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে তাঁরা উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অলিখিত সম্মতিতে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষে সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে দেখাসাক্ষাৎ করার সুযোগ পান।
পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল হক জানান, উভয় দেশের মানুষের অনুরোধে এবং বিএসএফের সঙ্গে আলোচনা করে কাঁটাতারের বেড়ার পাশে জিরো লাইনে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও দুদেশের মানুষের জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কামারুজ্জামানের ফাঁসি by মাসুদ মজুমদার

একসময় লাল পতাকা, লাল ব্যানার, লাল কোর্তা-টুপি ভালো লাগত। বিপ্লবের স্মারক মনে করে সম্মানও করতাম, সেটা ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের সময়টিতে মাওবাদে দীক্ষা নেয়ার ফসল। মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময় বঙ্গবন্ধুকে লাল সালাম দেয়ার জন্য লাল বাহিনীর লাল পোশাক পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত হয়েছিলাম। ডেমরা শিল্পাঞ্চল থেকে ট্রাক ভর্তি হয়ে আমরা প্রায় পাঁচ ট্রাক শ্রমিক-ছাত্র অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলাম। ছাত্র হয়ে শ্রমিক সেজেছিলাম বন্ধুদের চাপে। তা ছাড়া আমার বড় ভাই ছিলেন লতিফ বাওয়ানি জুট মিলের লেবার অফিসার। শ্রমিক নেতারা তার নেকনজরে থাকার জন্য চার পাশে ঘুর ঘুর করত। শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হওয়ার সুবাদে আমাকে ঢাকা ছাড়তে হলো। যেদিন ঢাকা ছাড়ি সেদিন ছিল একুশের প্রথম প্রহর। ওই রাতে বঙ্গবন্ধুর সোনার ছেলেরা শহীদ মিনারে কিছু মহিলা ও ছাত্রীর ওপর বিনা কারণে চড়াও হয়েছিল। সেই ঘটনা ছিল লজ্জার, যুগপৎ বিস্ময়ের। সেই ঘটনার দায় কাউকে নিতে হয়নি, কারো বিচারও হয়নি। পাকিস্তানি বর্বর সৈন্যরা শহীদ মিনার ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। সোনার ছেলেরা আমাদের শহীদ মিনারে কালিমা লেপন করেছিল। যে একুশ মাথা নত না করার কথা শেখায়- সেখানে লজ্জায় আমাদের মাথা হেট হয়ে গিয়েছিল।
লাল পতাকা-ব্যানার দিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম- বিপ্লবী মন্ত্রে দীক্ষার কথা বুঝাতে। বিপ্লব ধ্বংস নয় সৃষ্টির প্রসব বেদনা, ক্ষমতার উৎস বন্দুকের নল। এসব বিপ্লবী কথাবার্তা শুনতে ও বলতে  রোমাঞ্চকর মনে হতো। দস্যু বাহরাম, বনহুর, কিরিটি রায় ও রবিনহুডের মতো হওয়ার বাসনা জাগত। তারা শ্রেণিবিভক্ত সমাজের সৃষ্ট পুঁজিবাদীদের অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন করে গরিবদের মাঝে বিলাত। এই কথিত মহৎ কর্মটির প্রতি তাবৎ বামপন্থীর সায় ছিল। খুন, হত্যা আর ফাঁসির কথা শুনলে বিচলিত হতাম না। আজ হই। নিজের জানার পরিসর হয়তো বেড়েছে, তার ওপর শফিক রেহমানের দেশে দেশে ফাঁসির ওপর লেখাটা পড়ে ছাপতে গিয়ে নিজেও প্রভাবিত হয়েছি। নিশ্চিত আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফোরামগুলো শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড রদের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা সঠিক। এ যুগে শাসকেরা যে পন্থী হন, তারা শতভাগ নীতিনিষ্ঠ নন, হোক রাজা-বাদশাহ। এখন ইসলামের নামে মৃত্যুদণ্ডকেও মেনে নিতে চাই না। কারণ, ইসলাম বিচার প্রক্রিয়ায় সততা ও সাক্ষী সাবুদের ব্যাপারে সতর্কতার যে পরাকাষ্ঠা দেখাতে বলেছে- এ যুগে সেটা অনুপস্থিত। তাই বিচার হয় না, যা হয় তা জুলুম বা অবিচার।
একজন বিখ্যাত জার্মান পণ্ডিত বলেছেন, বিপ্লবী সেজে রোমাঞ্চকর অনুভূতি লালন করা তারুণ্যের স্বভাব, চল্লিশের পর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পাল্টে যাওয়াও মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। আমার বেলায় বয়সের ফ্রেমে এটা তত্ত্বীয়ভাবে ফলেনি, কিন্তু চিন্তার রূপান্তর ঘটেছে-  এটা অনস্বীকার্য। আজকাল লাল কিছুর প্রতি মোহ জাগে না। বিপ্লব বিপ্লব ভাবও জাগে না। বরং হত্যা, খুন, গুম, অপহরণ ও ফাঁসিকে বড়ই নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং বর্বোরোচিত কাজ মনে হয়। শাস্তি হিসেবে ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড মন এখন মানতে নারাজ। এটা হয়েছে কয়েকটি কারণে- প্রথমত, মানুষ সৃষ্টির সেরা, জন্ম-মৃত্যুর মালিক সৃষ্টিকর্তা। শাস্তিটা নানাভাবে হতে পারে। কিন্তু গর্দান কেটে, রশিতে ঝুলিয়ে কিংবা বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মানুষকে মারতে হবে কেন। তাছাড়া প্রচলিত কোর্ট-কাচারি, আইন, বিচার প্রক্রিয়া, সাক্ষী-সাবুদ কোনোটাই নিশ্চয়তামূলক হয় না। মানুষের জানার, আকল ও বিবেকের একটা সীমাবদ্ধতা থাকে। সেটা ডিঙ্গানো যায় না বলেই বিচার নিয়ে নানা নীতিকথা মানুষই বানিয়েছে। মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। শাস্তিটা ভোগ করার সময় পেল কই। যার মৃত্যুদণ্ড হয় সেই মুহূর্তে তার জীবনলীলা সাঙ্গ হয়ে যায়। তার আগে রায় থেকে দণ্ড কার্যকর পর্যন্ত তার মানসিক যন্ত্রণা হয়তো অন্যদের বোধগম্যের বাইরে। যতটুকু অনুমান করি মৃত্যুভীতি মানুষকে অস্বাভাবিক করে দেয়। অধিক শোকে পাথরও বানায়। নিজেকে নিয়তি বা সৃষ্টিকর্তার হাতে সোপর্দ করে দিয়ে আরো সাহসী হয়ে সান্ত্বনা নেয়ার মতো মানুষও ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এর বেশি আর কী! এজন্যই ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও অনেক আদর্শিক চৈতন্যবিদৌত মানুষ সাহসী হয়ে ওঠেন। বলতে পারেন প্রাণ ও ক্ষমার মালিক আল্লাহ। নাস্তিকও আস্তিক হয়ে যায়। অনেকেই আদর্শের দীক্ষা অনুযায়ী আরো সাহসী হয়ে অনুসারীদের জন্য প্রেরণা হয়ে ওঠেন। শিকাগোর হে মার্কেটের ঘটনায় মে দিবস পেলাম ১০টি মেহনতি মানুষের প্রাণ ও অগাস্টাস স্পাইসের মৃত্যুদণ্ডের বিনিময়ে। অগাস্টাস ফাঁসির মঞ্চেও নতজানু হননি। নাথুরাম  গডসে গান্ধীকে হত্যা করেও মাথা তুলে নিজের ইচ্ছার সততা প্রকাশ করেছেন। তিতুমীর, প্রফুল্ল চাকি, ক্ষুদিরাম তাদের উদাহরণ তো  আমাদেরই ইতিহাস।
মুনির-খুকুর ঘটনার পর মুনিরের ফাঁসি আমার ভাবান্তর ঘটায়। রিমাকে তার স্বজেনরা আগেই হারায়। রিমাকে হত্যার জন্য মুনিরের পরকীয়াই দায়ী। মুনিরের ফাঁসি রিমাকে ফিরিয়ে দেয়নি। তাহলে দৃষ্টান্ত কোনো ফল বহন করল না, একজন অপরাধী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পেল, অন্যরা সতর্ক হলো- এতটুকুতে আমার সান্ত্বনা হয় না।
যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার ইস্যুটির একটি সমাপ্তি ঘটুক- এটা ছিল সব সাধু মনের চাওয়া। কিন্তু স্বচ্ছতা ছাড় দিয়ে সেটা হোক তা কখনো চাইনি। আইন-ট্রাইব্যুনাল, বিচার প্রক্রিয়া  না হলো আন্তর্জাতিক মানের, না হলো দেশজ। আইনের ছাত্র হওয়ার সুবাদে ভালো করে জানি প্রচলিত আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ইনসাফ পালাতে পারে। রায় নির্ধারণ করে বিচার চালালে সেটা কী হয় সবার জানা। তাতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিচার হয়, প্রতিহিংসা ও ঘৃণার জয় হয়, মানবিক দাবির পরাজয় ঘটে। বিজয়ীর অন্যায় আবদার রক্ষা পায়- হাজার অপরাধী মাফ পাওয়ার বিনিময়ে  একজন নিরপরাধী পার পাওয়ার সুযোগ থাকে না। সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে তিন দশক পর একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানুষ নিরপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডের পর এই ভুল সংশোধনের সুযোগ হতো কিভাবে। অ্যান্থনি রে হিল্টন ৫৮ বছর জীবনের অর্ধেকটা কাটিয়েছে ফাঁসির সেলে।  ২৮ বছর পর প্রমাণিত হলো তিনি নিরপরাধ, কথিত অভিযোগ সত্য নয়। তিনি মুক্তি পেয়ে অঝোরে কাঁদলেন- বললেন, স্রষ্টার কাছে বিচারকদের জবাব দিতে হবে। আবদুল কাদের মোল্লা বা কামারুজ্জামানের ফরিয়াদ কে শুনবে?
আমাদের আদালত কসাই ও বিহারি কাদের মোল্লার বিচার করে তড়িঘড়ি ফাঁসি দিয়ে দিলো। যেদিন প্রমাণ হবে দুই মোল্লা এক নন, তখন আদালতের জবাব হবে কী! দেল্লা রাজাকারের সাথে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মিল নেই- এ দাবি বলিষ্ঠ। আদালত বেনিফিট সব ডাউটের সুযোগ নিয়ে বা অন্য কারণ দেখিয়ে তাকে যাবজ্জীবন দিয়েছে। প্রমাণ সাপেক্ষে ভবিষ্যতে তার রায় সংশোধনের সুযোগ রইল।
শাহবাগ মঞ্চের মাধ্যমে দৃশ্য-অদৃশ্য চাপ আদালত বিবেচনায় না নিলে বিচার চলমান প্রক্রিয়ায় আইন সংশোধনের খারাপ নজির সৃষ্টি হতো না। যে সুযোগ আসামি বা অভিযুক্ত পায় সেটা আদালত এবং অভিযোগকারীদের হাতে তুলে দেয়া হতো না। আন্তর্জাতিক মহলের সব বক্তব্য বিবেচনায় নিয়েও একটি স্বচ্ছ বিচারের ধারায় ইস্যুটির নিষ্পত্তি হতে পারত। জামায়াত-শিবির আদালতের প্রসিকিউশনে সাহায্য করে আবার হরতালের পথে যাওয়ার সুযোগ পেত না। এত বিতর্ক বিচারকে তাড়া করত না। বিসা বালী হত্যা নিয়ে সুখরঞ্জন বালীর অপহরণ নানা প্রশ্নের উদ্রেগ করত না। একটি বিচার চলছে কিন্তু দেশে বিদেশে কাউকে সন্তুষ্ট করছে না। তার পরও সরকারের অনড় অবস্থানই কি কামারুজ্জামানকে নজিরবিহীন দৃঢ়তা দেখিয়ে শহীদ হওয়ার বাসনা জাগিয়ে দেয়নি, নয়তো কামারুজ্জামান এতটা নৈতিক বল-ভরসা পান কিভাবে।
সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে বিচারকে আন্তর্জাতিক মানে তুলে ধরলে বর্বর পাকিস্তানি গণহত্যাকারীদের জামাই আদরে ছেড়ে দিয়েও তাদের রাজনৈতিক সহযোগীদের একটি গ্রহণযোগ্য বিচার হতে পারত। সেটাই হতো দৃষ্টান্ত। বিচারের নামে এই খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দগদগে ক্ষত সৃষ্টির প্রয়োজন হতো না। এখন এই মন্দ নজিরটি এই জনপদের আকাশে বাতাসে যুগ যুগ ধরে প্রতিহিংসার রাজনীতিকে অনুপ্রাণিত করবে।
নরখাদক ও ঘাতক ইয়াহিয়া বাহিনীর সব গরল ক’জন বাংলাদেশী হজম করে নিয়ে আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুসোচনায় দগ্ধ করে যাবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও আমরা ছোট হয়ে গেলাম। অথচ সরকার নিজের মর্জি ও জেদকে সাহস ও দৃঢ়তা হিসেবে দেখাতে মরিয়া। কামারুজ্জামানের ফাঁসি নিয়ে সরকার নানাভাবে হেয়ালি প্রদর্শন করল। টানটান উত্তেজনা ও হিমশীতল এক নিষ্ঠুরতার আবহ সৃষ্টি করে হয়তো অভিযুক্ত এবং তার স্বজন ও প্রিয়জনদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করল। জনমনে সরকারের রাজনৈতিক মর্জির উৎকট প্রকাশ ঘটল। এর অর্জনটা কি খুব একটা সুখকর হলো? না, হয়নি। কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুরভিসন্ধি ও প্রতিহিংসার কালো ছায়া জনগণ প্রত্যক্ষ করল। এর মাধ্যমে জাতি কোনো সুখবর পেল না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শনৈ শনৈ বার্তাও জনগণ গ্রহণ করল না। ঘুরেফিরে সাধারণের প্রশ্ন একটাই- জামায়াত আওয়ামী লীগের সাথে বোঝাপড়ায় একই পক্ষপুটে আপসের রাজনীতি করলে এতসব ডুগডুগি বাজত কি? শাহবাগে মজমা বসিয়ে নজিরবিহীন এক অপরাজনীতি নাটক মঞ্চস্থ করার সুযোগ কি কেউ কোনো দিন নিতে পারত?
শাহবাগ মঞ্চ তৈরির পর কম করে দশবার দেখতে গিয়েছি। মনে হয়নি এর ভেতর প্রাণ আছে, জাতির বৃহত্তম অংশের সায় আছে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার লাশ নিয়ে ইংরেজ ও মীরজাফরের বশংবদরা মুর্শিদাবাদে উল্লাস করেছে। সেই লাশ হাতির পিঠে তুলে কিছু মানুষ উল্লাস করেছে বলে ইতিহাস পাল্টে যায়নি। জন নোভাকের বর্ণনায় তার সংখ্যা অর্ধশত। লাখো মানুষ নীরবে কাঁদল। একইভাবে কাইভ যখন মুর্শিদাবাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে বর্জায় করে ভাগীরথী দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন নদীর দু’পাশে যত মানুষ তামাশা দেখেছে তারা একটি করে ঢিল ছুড়লে সেদিনই ইংরেজ আধিপত্যের পরিসমাপ্তি ঘটত। তাই কোনো মঞ্চ কাদের সেটা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, সময়মতো ইতিহাস সেটা চিনিয়ে দেয়।

করপোরেট ছোঁয়ায় অন্য বৈশাখ by একরামুল হুদা

নববর্ষের উৎ​সবে যুক্ত হয়েছে দেশি বিদেশি
কর্পোরেট হাউস। ছবি:জিয়া ইষলাম
‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’-এই গানটির মাধ্যমেই স্বাগত জানানো হয় বাঙালির প্রাণের উৎসব পয়লা বৈশাখকে। আবহমানকাল ধরে নানা উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা বছরের প্রথম এ দিনটি পালিত হয় আমাদের দেশে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই দিনটিকে আনন্দের অন্যরকম উপলক্ষ করে তুলেছে বলে বর্তমানে এটি পরিণত হয়েছে সর্বজনীন উৎসবে।
নতুন বছরের উৎসবের মধ্যে ফুটে উঠে গ্রাম বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগের বিষয়টি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে উৎসবের আয়োজনেও। ঢাকায় রমনার বটমূলের বর্ষবরণ ও চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা, সোনারগাঁওয়ের বউমেলা ও ঘোড়া মেলা, পার্বত্য জেলায় আদিবাসীদের বর্ষবরণসহ সব জেলা, উপজেলা ও গ্রামে নিজেদের মতো করে, নিজেদের অর্থায়নে এ উৎসবটি পালিত হয়ে আসছিল। তবে কয়েক বছর ধরে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানগুলোতে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত হচ্ছে দেশি বিদেশি বিভিন্ন করপোরেট হাউসগুলো।
পয়লা বৈশাখের উৎসবে করপোরেট হাউসগুলোর এই যুক্ত হওয়াকে ইতিবাচকই বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। তিনি বলেন, এটা ভালো। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এভাবে করপোরেট হাউসগুলো যুক্ত হবেই। এমনটা যদি হয় তাহলে উৎসবটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। তিনি বলেন, এর ফলে উৎসবে পরিবর্তন আসতে পারে ঠিক, যদি ইতিবাচক পরিবর্তন হয় সেটা কোনো সমস্যা না।
১৯৮৯ সাল থেকে পয়লা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে পয়লা বৈশাখের সকালে এ শোভাযাত্রাটি বের হয়। চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের নিজেদের বানানো বিভিন্ন রং-বেরংয়ের মুখোশ, ফেস্টুন ও বিভিন্ন প্রতিকৃতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ করে এ শোভাযাত্রা। তবে কারও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই প্রতিবছর এ কাজটি করে চারুকলা অনুষদ। চারুকলা অনুষদের ডিন নিসার হোসেন বলেন, আমরা কারও পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করি না।
পয়লা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানটি হয় রাজধানী ঢাকায়। রমনা বটমূলে বৈশাখের প্রথম প্রত্যুষে সুরের মূর্ছনা ও কবিতার মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো হয় নতুন বছরকে। ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে আসছে। বেশ কয়েক বছর ধরে এ অনুষ্ঠানটিকে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে মুঠোফোন কোম্পানি গ্রামীণফোন। তবে এ বছর পৃষ্ঠপোষকতা করছে না গ্রামীণ ফোন। বরং এ বছর মুঠোফোন কোম্পানিটি বিভিন্ন জেলার বর্ষবরণের অনুষ্ঠানগুলোকেই পৃষ্ঠপোষকতা করছে।
ঢাকাকেন্দ্রিক যে পয়লা বৈশাখ পালন করা হয় সেটাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এটা করা হচ্ছে বলে জানালেন গ্রামীণ ফোনের বহির্যোগাযোগ বিভাগের প্রধান সাইয়েদ তালাত কামাল। তিনি বলেন, যে জিনিসটি অনেক বছর ধরে চলে আসছে আমরা সেটাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য কাজ করছি।
একটা সময় রাজধানীতে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল রমনা বটতলায় ছায়ানটের বর্ষবরণ এবং চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। এরপর ধীরে ধীরে যুক্ত হলো দেশের বড় বড় ব্যান্ড দলগুলোর অংশগ্রহণে কনসার্ট। বিভিন্ন দেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় সাধারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কলাবাগান মাঠ ও রবীন্দ্রসরোবর সহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় এ কনসার্টগুলো অনুষ্ঠিত হয়। এ ধরনের কনসার্ট আয়োজনকে ভালোই বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শামসুর রহমান। তাঁর মতে, কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন হচ্ছে ঠিক, তবে তরুণ প্রজন্মও বিনোদন পাচ্ছে এর মাধ্যমে।
সবকিছুরই ভালো খারাপ এ দুটি দিক থাকে। পয়লা বৈশাখের উৎসবের সঙ্গে করপোরেট হাউসগুলোর যুক্ত হওয়াকে খারাপ চোখে দেখেন অনেকেই। অনেকেই বলে থাকেন এর ফলে উৎসবের ঐতিহ্যগত দিকটি হারিয়ে যাবে। তবে ইতিবাচক দিকটাই বেশি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক খায়রুল আনাম শাকিল বলেন, যারা সাহায্য করেন তাঁরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই করেন ঠিক, কিন্তু সবটাই যদি বাণিজ্যিক হয় তাহলে সে সহায়তা নেওয়া উচিত নয়। ঐতিহ্য যদি আমাদের মতো করে চর্চা করতে পারি এবং এমন চর্চা করতে কেউ যদি সাহায্য করে তাহলে সেটাকে সাধুবাদ জানাই।

সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দায়িত্ব শেষ

বরগুনা শহরের কাঁচাবাজারসংলগ্ন খাকদোন নদের ওপর থাকা
লাকুরতলা সেতুটির বেশ কয়েকটি খুঁটি ছয় মাস আগে ভেঙে ও
বেঁকে গেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এর ওপর দিয়ে ঝুঁকি
নিয়ে চলাচল করছে। ছবিটি সম্প্রতি তোলা l প্রথম আলো
বরগুনার খাকদোন নদের ওপর লাকুরতলা সেতুটির কয়েকটি খুঁটি ভেঙে ও বেঁকে যাওয়ায় সেতুটির মাঝ বরাবর দেবে গেছে। স্থানীয় সরকারপ্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সেতুর দুই পাশে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে। এর পরও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ও হালকা যানবাহন সেতু দিয়ে পারাপার হচ্ছে।
বরগুনা শহরের কাঁচাবাজার ও উত্তর পাড়ে পরিচর্যা ইউনিয়নের লাকুরতলা গ্রাম অবস্থিত। গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, লাকুরতলা সেতুটি লোহার খুঁটি দিয়ে তৈরি। এর পাটাতন সিমেন্টের। সেতুটির লোহার খুঁটি ও অ্যাঙ্গেলগুলোর বেশির ভাগ বেঁকে গেছে, কয়েকটি ভেঙেও গেছে। এতে সেতুটি মাঝ বরাবর দেবে যায়। দুই পাশে সেতু ব্যবহার না করার নির্দেশসংবলিত সাইনবোর্ড থাকলেও কেউ তা মানছে না। মানুষের পাশাপাশি ভ্যান, সাইকেলসহ নানা হালকা যানবাহনও চলাচল করছে। এলাকার লোকজনের আশঙ্কা, যেকোনো সময় সেতুটি ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সাতজন এলাকাবাসী জানান, এই সেতুটি জেলা শহরের সঙ্গে গৌরীচন্না, ফুলঝুঁরি ও বদরখালীর ইউনিয়নের মানুষের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম। পাশের বামনা ও বেতাগী উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ এ সেতু প্রতিদিন ব্যবহার করে। খাজুরতলা গ্রামের বাসিন্দা ও বরগুনা কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমিনুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ সেতু দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পারাপার হয়। এর মধ্যে চার থেকে পাঁচ হাজার আছে বিদ্যালয় ও কলেজগামী শিক্ষার্থী।
লাকুরতলা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, ছয় মাস আগে এই সেতুর অবস্থা নড়বড়ে হয়ে যায়। এখন কোনো হালকা যানবাহন চলাচল করলে সেতুটি দুলে ওঠে। গুরুত্বপূর্ণ এই সেতুটির নাজুক অবস্থা চললেও এর সংস্কারে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষ শুধু সাইনবোর্ড দিয়েই তাঁদের দায়িত্ব শেষ করেছে।
এলজিইডি বরগুনা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ৭৩ দশমিক ১৭ মিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুটি ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় ৩০ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ২০১২ সালের শেষ দিকে প্রায় আট লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি সংস্কার করা হয়। কিন্তু মাস যেতে না যেতে এটি পুনরায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
গৌরীচন্না ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম বলেন, জেলা শহরের সঙ্গে খাকদোন নদের উত্তর পাড়ের প্রায় তিন লাখ মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই সেতু। সেতুটি সংস্কারের জন্য বারবার আবেদন করা হলেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
এলজিইডির বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সেতুটির বিষয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ পায়রা-বিষখালী নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে খাকদোন নদ খনন করে চায়। এটা করতে হলে সেতুটি উঁচু করতে হবে। কিন্তু দুই পাশে সেতুর সংযোগসড়ক নির্মাণ করার জায়গা নেই। এলজিইডির একটি বিশেষজ্ঞ দল জায়গাটি পরিদর্শনে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

বদলে যাচ্ছে বর্ষবরণ উৎসব? by মাহবুবুল হক ভূঁইয়া

বাবার কোলে বাঁশি নিয়ে নববর্ষের আনন্দে
মেতেছে শিশুটি। ছবি: জাহিদুল করিম
অভিনব এমন সাজ দৃষ্টি কেড়েছে অনেকের
বাঙালির বর্ষবরণ উৎসব কি ধরন বদলাচ্ছে? বৈশাখের আচার-অনুষ্ঠান, হালখাতা, বৈশাখী মেলা, খাবার বাঙালির বর্ষবরণ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ। সময়ের বিবর্তনে এসব অনুষঙ্গে পরিবর্তন খুব কম নয়। আবার নববর্ষ উদ্‌যাপনে অনেক ঐতিহ্য যেমন হারিয়ে যাচ্ছে, যোগও হয়েছে অনেক কিছু।
বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আচার-অনুষ্ঠান, খাবার আর পোশাক পরিচ্ছদে। এ পরিবর্তন শুধুমাত্র শহরাঞ্চলেই নয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে।
সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা সাফিয়া রহমানের শৈশব কেটেছে গ্রামে। ‘৭০ এর দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। সন্তানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে এ সময়টাকেও কাছে থেকেই দেখেছেন।
গ্রাম-শহর মিলিয়ে তিন প্রজন্মের বর্ষবরণ দেখে তাঁর উপলব্ধি, বৈশাখ উদ্‌যাপনে পরিবর্তন এসেছে, অনেক কিছু যোগও হয়েছে, হারিয়েছেও অনেক কিছু। তবে সবচেয়ে বড় কথা, এ উদ্‌যাপনে কোথায় যেন নাড়ির টানটা নেই।
খাবার আর পোশাকের বৈশাখ
নববর্ষ উদ্‌যাপনে খাবার ও পোশাক অন্যতম বিষয়। এক-দুই দশক আগে পর্যন্তও সন্দেশ, গুড়, পিঠা-পুলি, খই, দই ইত্যাদি নববর্ষের প্রধান খাবার ছিল। তবে এ প্রজন্মের কাছে পান্তা-ইলিশটাই যেন বৈশাখের প্রধান খাবার হয়ে উঠেছে। তবে পান্তা-ইলিশের জন্য কাড়াকাড়িটা শহরাঞ্চলেই বেশি চোখে পড়ে।
বর্ষবরণের পোশাক হিসেবে ধুতি পাঞ্জাবির কথা বলেন অনেকে। তবে এখন বৈশাখের পোশাক হিসেবে সাদা-লাল রঙের পাঞ্জাবি, শাড়ি এবং সালোয়ার কামিজের ব্যবহারই বেশি। পোশাকের বাণিজ্যিক প্রসারও চোখে পড়ার মতো। বৈশাখের পোশাকের ব্যবসাই এখন শত কোটি টাকার।
কলেবর কমেছে হালখাতা উৎসবের
আগে বছরের প্রথম দিনে হিসেবের নতুন খাতা খোলার প্রথাটা অনেকটা উৎসবের মতোই পালিত হতো। বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল শহরগুলোতে। হালখাতার আয়োজনে ব্যবসায়ীরা বেশ কিছুদিন আগেই গ্রাহক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের চিঠি দিয়ে দোকানে আমন্ত্রণ জানাতেন। এর পেছনে পুরোনো বছরের বকেয়া আদায়ের ব্যাপারটিও কাজ করত। তবে এর চেয়েও বড় যে বিষয়টি কাজ করে, সেটি হলো সামাজিকতা ও সৌজন্য বিনিময়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হালখাতার আয়োজনের মাত্রা কমেছে। ঢাকার কারওয়ান বাজার, মৌলভীবাজার, ইসলামপুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন শুধুমাত্র পুরোনো ঢাকার কিছু প্রতিষ্ঠানেই হালখাতার আয়োজন করা হয়।
এ প্রসঙ্গে রমেশ চন্দ্র বিশ্বাস নামে মৌলভীবাজারের একজন ব্যবসায়ী বলেন, ছোটবেলা থেকে বাবা-জ্যাঠাদের হালখাতার আয়োজন করতে দেখে এসেছি। ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখনো আমাদের অনেকেই হালখাতার আয়োজন করে। গ্রাহকেরা সেভাবে আসেন না, টাকাপয়সাও তেমন একটা আদায় হয় না। কিন্তু এটা করে তাঁর শান্তি লাগে বলে জানান তিনি।
বৈশাখের উৎসব
বৈশাখের খাবার, পোশাক, আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে বৈশাখের উৎসবেও। বৈশাখী মেলা, মেলায় কেনাকাটা বৈশাখের অন্যতম উৎসব ছিল। কিন্তু এখন আর আগের মতো করে মেলা হয় না।
রাজধানীর বর্ষবরণের অন্যতম রমনার বটমূলে ছায়ানটের গান আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারকলার আয়োজনে মঙ্গল শোভাযাত্রা। তবে বর্ষবরণের উৎসব এখন আর এ দুটি জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি স্থানে পয়লা বৈশাখের দিন ঢাউস মঞ্চে কনসার্টের আয়োজন করা হয় এখন। দিনব্যাপী এ আয়োজনে ব্যান্ড সংগীতই বেশি হয়। তবে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের অংশ নয়; এমন দাবি করে অনেকেই এ ধরনের আয়োজনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তবে তরুণ প্রজন্মের বেশিরভাগই একে সাদরে গ্রহণ করেছে।
বৈশাখ উদ্‌যাপনের বদলে যাওয়া নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, বাংলা মাসের সঙ্গে মিলিয়ে কিংবা কৃষককেন্দ্রিক বৈশাখের যে উদ্‌যাপন ছিল, সেটি এখন আর নেই। বর্ষবরণের উৎসব স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়েছে, সেখানে বিচ্ছিন্নতা চলে এসেছে। এ ছাড়া বৈশাখী মেলা বর্ষবরণের অন্যতম উৎসব ছিল। কিন্তু সেই মেলা এখন আর হয় না।
তিনি আরও বলেন, বৈশাখকে ঘিরে কেনাকাটার যে বিষয়টি ছিল, সেটি মানুষ আনন্দের জন্য করত। কিন্তু এখন সেখানে কৃত্রিমতা ঢুকে পড়েছে। পুঁজিবাদ এর জন্য দায়ী বলে তিনি মনে করেন।