Thursday, November 7, 2013

কোটি পৃথিবীর মহাবিশ্ব!

আমাদের আকাশ গঙ্গা ছায়াপথে (মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি) সূর্যের মতো প্রতি পাঁচটি নক্ষত্রের মধ্যে একটির পৃথিবীর মতো একটি গ্রহ আছে। পৃষ্ঠে পানি থাকার মতো উপযুক্ত অবস্থানে থাকায় এসব গ্রহে প্রাণ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা এক গবেষণার ফলাফলে এ সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। পানি হচ্ছে প্রাণের প্রধান শর্ত। পানির কারণেই পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি হয়েছে ও বিকাশের মাধ্যমে প্রাণ প্রাচুর্য তৈরি হয়েছে। পানি না থাকলে প্রতিবেশী মঙ্গল ও শুক্রের মতোই প্রাণহীণ ঊষর গ্রহ হয়ে থাকতো পৃথিবী। যুক্তরাষ্ট্রের মহাশূন্য গবেষণা সংস্থা নাসা’র কেপলার মহাশূন্য টেলিস্কোপের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে রোমাঞ্চকর অনেকগুলো বিষয় জানা গেছে। তিন বছরের মধ্যে সংগ্রহ করা তথ্যগুলো বলছে, আকাশ গঙ্গা ছায়াপথে পৃথিবীর মতো এক হাজার কোটি বাসযোগ্য গ্রহ আছে। এসব বাসযোগ্য গ্রহের মধ্যে লোহিত বামন নক্ষত্রের গ্রহজগতে থাকা বাসযোগ্য গ্রহগুলো ধরা হয়নি। সেগুলো ধরলে বাসযোগ্য গ্রহের সংখ্যা আরো অনেক বেশি হয়।
কারণ আকাশ গঙ্গা ছায়াপথে এ ধরনের নক্ষত্রের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। প্রত্যেকটি নক্ষত্রের গ্রহজগতের সদস্যরা ব্যতিক্রম না হয়ে সৌরজগেতের গ্রহগুলোর মতোই একই ধারাবাহিকতা মেনে চলে বলে জানিয়েছেন তথ্য বিশ্লেষণকারী গবেষক দলের নেতা এরিক পেটিগুরা। এই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী নক্ষত্রের আকার অনুযায়ী আনুপাতিকভাবে পৃথিবীর মতো দূরত্বে থাকা গ্রহগুলোর পৃষ্ঠে পানি থাকার সম্ভাবনা আছে। পেটিগুরা এরকম ১০টি গ্রহ খুঁজে পেয়েছেন যেগুলো পৃষ্ঠে পানি থাকার মতো সঠিক দূরত্বে থেকে নিজ নিজ কেন্দ্রীয় নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণ করছে। এই দশটি গ্রহে প্রাণের উৎপত্তি ও বিকাশের মতো প্রয়োজনীয় পরিবেশ আছে বলে জোরালো ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ছাত্র পেটিগুরা ও তার সহকর্মীরা আরো বের করেছেন, আকাশ গঙ্গা ছায়াপথে সূর্যের মতো ৫ হাজার কোটি নক্ষত্র আছে।

নির্বাচনী জনমত জরিপ নিষিদ্ধের দাবি কংগ্রেসের

ভারতে প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। এ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। অপরদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিজেপি অভিযোগ করেছে, একের পর এক দুর্নীতিতে জড়ানোর মতো ঘটনা থেকে শুরু করে নানা জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের সমর্থন হারিয়েছে কংগ্রেস। তাই প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছে তারা। তবে বিজেপির এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে কংগ্রেস।
২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে সব রকম প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে একটি চিঠি দিয়েছে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস। এই চিঠিকে ঘিরেই যাবতীয় বিতর্কের শুরু হয়। সোমবার এই চিঠির কথা জানাজানি হলে চরম উত্তেজনা দেখা দেয় রাজনৈতিকমহলে। প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা মাত্রই ভুল, এ কথা মানে না কংগ্রেস। কিন্তু প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষাকে নিজেদের উদ্দেশে ব্যবহারের আশংকা থেকেই যায়। রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা অরুণ জেটলি এ বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা ভুল প্রমাণিত হতেই পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষাকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবি জানিয়ে পক্ষান্তরে মানুষের কথা বলার অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে কংগ্রেস। বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী তথা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে ব্লগে লিখেছেন, যে সরকার প্রাক-নির্বাচনী সমীক্ষা নিষিদ্ধ করার মধ্যদিয়ে জনমতকে অস্বীকার করতে চায়, সেই সরকারকে ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়া উচিত। ইন্ডিয়া টুডে।

হরতালে শিক্ষার্থীদের সমস্যা বিবেচনায় রাখতে হবে by নজরুল ইসলাম

যুগান্তর : রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে শিক্ষার্থীরা নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হয়। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি হ্রাসে রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে করণীয় কী?
প্রফেসর নজরুল ইসলাম : আমাদের দেশে এটা একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি হয়ে গেছে যে, বিভিন্ন সমস্যার কারণে রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিরোধী দলে যারা থাকেন, তারা তাদের কর্মসূচি হিসেবে হরতালকে বেছে নেন। হরতাল যদি করতেই হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের যাতে সমস্যা না হয়, সেটা বিবেচনায় রেখেই করতে হবে। অর্থাৎ বড় যেসব পরীক্ষা হয়, সেগুলোর নির্ধারিত তারিখ আগেই জানা থাকে। সেই তারিখগুলো যেন হরতালের মধ্যে না পড়ে তা বিবেচনায় রাখতে হবে। হরতালের মতো কর্মসূচি আহ্বান না করলেই সবচেয়ে ভালো হয়। হরতাল যদি হয়ই সেটা যেন কোনো অবস্থাতেই সহিংস ঘটনায় পরিণত না হয়। এতে কিশোর-তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ তো অবশ্যই পড়ে এবং অন্যদের ওপরও এর নানারকম প্রভাব পড়ে। সে জন্য হরতাল পরিহার করার চিন্তা করা উচিত। হরতাল পরিহার করতে না পারলে পরীক্ষার সময়গুলো বাদ দিয়ে যেন হরতাল হয়, সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে।
যুগান্তর : বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার মান কতটা বেড়েছে বলে আপনি মনে করেন?
নজরুল ইসলাম : দেশে পাবলিক পরীক্ষায় বিশেষত বিভিন্ন পর্যায়ের স্কুল সমাপনী পরীক্ষায় অথবা কলেজ পরীক্ষায় পাসের হার বেড়েছে। আমাদের দেশে একটা ঐতিহ্য বা ধারা ছিল- অস্বাভাবিক উঁচু হারে পরীক্ষায় পাস- এটা ছিল না। গত কয়েক বছরে এসব পরীক্ষায় পাসের হার অনেক বেড়েছে। স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় পাসের হার বাড়তেই পারে। কিন্তু সেটা যেন অতি উচ্চ হারে না হয় এবং অস্বাভাবিক না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। পরীক্ষা একটা মান যাচাইয়ের কাজ। সেই মান যদি সঠিকভাবে যাচাই করতে না পারা যায়, তাহলে তো পাস দেখিয়ে খুব একটা লাভ নেই। সুতরাং এ ব্যাপারে আমাদের আরেকটু সচেতন হতে হবে- পাসের হার যেন মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।
যুগান্তর : শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশে বর্তমানে প্রচলিত সৃজনশীল পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি?
নজরুল ইসলাম : স্কুল শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বা চিন্তা শক্তির বিকাশে বিদ্যমান সৃজনশীল পদ্ধতি অতীতের রচনামূলক পদ্ধতির তুলনায় কিছুটা কার্যকর বলা যেতে পারে। তবে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা হতে পারে। বর্তমানে প্রচলিত সৃজনশীল পদ্ধতি চলতে দেয়া উচিত। বিদ্যমান সৃজনশীল পদ্ধতি যেন আরও গ্রহণযোগ্যতা পায় সে জন্য গবেষণা হওয়া উচিত।
যুগান্তর : দীর্ঘ সময় পর কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার প্রক্রিয়া চালু হলে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ঠিকমতো চলছে কিনা তা পর্যবেক্ষণে মনিটরিং কমিটির কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার, যাতে নিয়ম অমান্য করার অল্প সময়ের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যায়?
নজরুল ইসলাম : ১৯৯০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিপুলভাবে প্রসার লাভ করেছে। এখন তো প্রায় ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংখ্যার বিবেচনায় এটি একটি বৈপ্লবিক অগ্রগতি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর যে সংখ্যা- এটিও একটি বিশাল অর্জন। এ ক্ষেত্রে এবং সর্বক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার মান যেন ক্ষুণ্ন না হয় এবং শিক্ষার মান যেন প্রতিষ্ঠিত হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এবং শিক্ষার্থী বৃদ্ধির পাশাপাশি যখন শিক্ষার মান অর্জিত না হয় বা মান প্রতিষ্ঠিত না হয় তখন আমরা খুবই শংকিত হই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে দ্রুত হারে বেড়েছে, সেটার সঙ্গে তাল রেখে সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না এবং মনিটরিং যদি না হয় তাহলে মান সংরক্ষণ বা মান অর্জন সম্ভব হবে না। কতগুলো নিয়মনীতির আওতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হওয়ার কথা। সেই নিয়মনীতি-শৃংখলা যদি ভঙ্গ করা হয় সেক্ষেত্রে শাস্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তও সরকার নিতে পারে- এরকম সিদ্ধান্ত নেয়াও হয়েছে দু-এক ক্ষেত্রে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম মনিটরিং ব্যবস্থা এবং নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ- এটি আরও সুদৃঢ় হওয়া উচিত- সরকারের পক্ষ থেকে এবং ইউজিসির পক্ষ থেকে। কারণ মনিটরিং যদি ঠিকমতো না হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানের ব্যাপারে অত্যন্ত উদাসীন। তবে এখানে বলা সঙ্গত হবে, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার মান নিয়ে যথেষ্ট সতর্ক ও যতœবান থাকে। সেটা একটা ভালো লক্ষণ। কিন্তু আমরা শংকিত হই যখন দেখি অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মান নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নয়। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে হয়, দুর্নিবারভাবে মানকে উপেক্ষা করে এবং তা শুধুই বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। এটাও মনে হচ্ছে যে, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণভাবে মুনাফা সৃষ্টির লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। সেটা হওয়া উচিত নয় এবং হতে দেয়া উচিত নয়।
যুগান্তর : রাজধানীর পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখার ক্ষেত্রে ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলো অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু নদীগুলোই দূষণের শিকার। নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য করণীয় কী?
নজরুল ইসলাম : আমরা জানি, ঢাকা একটি ভাগ্যবান শহর। কারণ এর চারপাশে নদী আছে। দক্ষিণে তো বুড়িগঙ্গা যথেষ্ট চওড়া নদী ছিল। বুড়িগঙ্গার প্রশস্ততা কিছুটা কমেছে, কিন্তু এর নাব্য অনেক কমে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এর পানিতে অতিমাত্রায় দূষণ পাওয়া যাচ্ছে। বুড়িগঙ্গাকে এই অর্থে নদী বলা যায়- এর মধ্য দিয়ে নৌযান চলাচল করে। কিন্তু এর পানি এতই দূষিত যে, নদীর যে অন্যান্য ব্যবহার আছে সেগুলো আর এখানে হয় না। ঢাকা ওয়াসা বুড়িগঙ্গা থেকে কিছু পানি সংগ্রহ করে। এত দূষিত পানি সংগ্রহ না করাই ভালো। এ নদীর পানি দূষণের কারণে এর আশপাশের জনগণের (যারা এর পানি কোনো না কোনোভাবে ব্যবহার করে) জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। যারা দূষিত জেনেও বুড়িগঙ্গার পানি ব্যবহার করে, তাদের নানারকম ঝুঁকি থেকে যায়।
বুড়িগঙ্গার দূষণের অন্যতম কারণ ট্যানারির বর্জ্য। এসব বর্জ্যরে কারণে বুড়িগঙ্গার পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়। এ ছাড়া বস্তি এবং অন্যান্য আবাসিক এলাকার নানারকম বর্জ্যরে মাধ্যমে বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হয়। ঢাকা ওয়াসার অপরিশোধিত তরল বর্জ্যও বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখতে হবে। এগুলোকে প্রবহমান রাখতে হবে, এদের নাব্য বাড়াতে হবে, যাতে নদীগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখার জন্য বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনসহ অন্যান্য নাগরিক সংগঠন ও ব্যক্তি পর্যায়ের সব কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হবে।
যুগান্তর : যানজটের কারণে রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী হতে পারে?
নজরুল ইসলাম : যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকার জনগণের দুর্ভোগ কী করে বেড়ে যায়, এটি আমরা সবাই জানি। এ সমস্যা নিয়ে বহুদিন ধরে আলোচনা চলছে। এ সমস্যার সমাধানে নানারকম পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়। রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা ও যানজট নিয়ে সবচেয়ে বড়, ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাটির নাম হল এসটিপি বা স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান। এটি ছিল বৃহত্তর ঢাকার কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষ হয় ২০০৬ সালে। কিন্তু তখন তা অনুমোদন পায়নি বা তৎকালীন সরকার এটি অনুমোদনের ব্যবস্থা করেনি। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এটির অনুমোদন দিলেও এর বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। তাদের সময়ও ছিল না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর উল্লিখিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা পুনঃঅনুমোদন দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসটিপিতে উল্লিখিত কিছু বিষয়কে আরও অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া উচিত ছিল। এর মধ্যে গণপরিবহন ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা যায়। গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির অংশ হিসেবে কমিউটার ট্রেন সার্ভিস চালু হয়েছে। এ ট্রেন সার্ভিস আংশিক চালু হলেও তা কার্যকরভাবে সফল হয়নি। বৃত্তাকার নৌপথ সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। এসটিপির আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা হল বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি- যার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে এয়ারপোর্ট থেকে গাজীপুর পর্যন্ত। এ প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। গণপরিবহনবিষয়ক আরেকটি বড় প্রকল্প হল মেট্রোরেল। এটি হতে পারে আন্ডারগ্রাউন্ড রেল বা ওভারগ্রাউন্ড রেল অর্থাৎ পাতাল দিয়ে হতে পারে; মাথার ওপর দিয়েও হতে পারে। এটি বিভিন্ন দেশের শহরে আছে। ঢাকায় ইতিমধ্যে এক কোটি মানুষ বসবাস করছে, বৃহত্তর ঢাকা দেড় কোটিরও বেশি মানুষের শহরাঞ্চল। এরকম একটি শহরে মেট্রোরেল, কমিউটার ট্রেন সার্ভিস, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট- অর্থাৎ ব্যাপক রকমের গণপরিবহন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে যানজট বা পরিবহন সমস্যার সমাধান হতে পারে না। এর পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন ব্যবস্থাপনার (ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজমেন্ট) দিকেও জোর দিতে হবে। ফুটপাতগুলোকে চলাচলের উপযোগী রাখতে হবে। ফুটপাতের কোনো অংশ যাতে বেদখলে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনুষ্যচালিত রিকশা ও সাইকেল ধরনের যানবাহনের জন্য আলাদা লেন থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের এ শহরে প্রায় ছয়-সাত লাখ রিকশা আছে। তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে পরিবহন পরিকল্পনা করতে হবে। বর্তমানে ব্যক্তিগত গাড়িকে যে অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে, তা কমিয়ে গণপরিবহন ও মনুষ্যচালিত পরিবহনকে অগ্রাধিকার প্রদান করা উচিত। সার্বিকভাবে পরিবহন ব্যবস্থাপনাটি কার্যকর করা উচিত।
যুগান্তর : অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট জটিলতা দূরীকরণে কী করতে হবে?
নজরুল ইসলাম : নগরায়ণ অবশ্যই হতে হবে পরিকল্পিতভাবে। রাজধানীর ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সার্বিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে- এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু রাজউকের সেই ক্ষমতাও বোধহয় নেই। তাদের জনবলও নেই। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে রাজউকের আর্থিক কোনো সংকট আছে বলে মনে হয় না। কারণ রাজউক যেভাবে জমি ও হাউজিংয়ের ব্যবসা করছে সেখানে তাদের অর্থ সমাগম খুব ভালো। কিন্তু যা হচ্ছে না তা হল, সঠিক ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। রাজউক যেহেতু পরিকল্পনা করতে পারে না, তাই তারা অন্যকে দিয়ে পরিকল্পনা করায়। রাজউক অন্যকে দিয়ে যে পরিকল্পনাটা করায় তা সঠিক হতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, রাজধানীর সঠিক উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা করতে হবে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সব ধরনের পরিকল্পনাই করতে হবে। পরিকল্পনার বিকল্প কিছুই হতে পারে না। অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ বন্ধ করতে হবে।
যুগান্তর : সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার ফলে নাগরিক দুর্ভোগ বেড়ে যায়। এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কেন?
নজরুল ইসলাম : রাজধানীর অধিবাসীদের সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসে। সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের জন্য একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের সংস্থা থাকা উচিত। সেটি আমাদের নেই। আমি বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব দিয়েছি সব সেবাদানকারী সংস্থার সমন্বয়ে করতে পারবে- এ রকম একটি ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা নতুন করে তৈরি করতে হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন উচ্চ মেধাসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি নির্বাচিত হয়ে আসবেন- হয়তো এমপিদের মধ্য থেকে একজন অথবা একজন সিনিয়র মন্ত্রী। তিনি একজন উপ-প্রধানমন্ত্রী পদাধিকারী হতে পারেন। অবশ্য এ রকম ব্যবস্থা আমাদের সংবিধানে নেই। সে ক্ষেত্রে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে রাজধানীর সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া উচিত। একই সঙ্গে ওই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ক্ষমতা ও সুযোগ দিতে হবে। ম্যানিলা, ব্যাংকক, টরেন্টো- এসব শহরের আদলে মেট্রো গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা চালু করা যায়। যেহেতু আমাদের দেশের সমস্যাটা প্রকট আকার ধারণ করেছে, সে জন্য অন্য দেশে না থাকলেও আমাদের দেশের উপযোগী নতুন সংস্থা চালু করতে হবে। এ সংস্থা সরাসরি কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে না। বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে নির্দেশ দিয়ে কাজটির সমন্বয় সাধন করবে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্ব যাতে বেশি থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
যুগান্তর : প্লট-ফ্ল্যাট নিয়ে রাজউক যেভাবে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে, এতে রাজউকের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ার আশংকা আছে কি?
নজরুল ইসলাম : রাজউকের ম্যান্ডেটের মধ্যে রয়েছে রাজধানীর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন অনুমোদন ও তদারকি করা। শুরু থেকেই অবশ্য রাজউক (বা তৎকালীন ডিআইটি) নাগরিকদের আবাসনের জন্য প্লট প্রস্তুতকরণ, প্লট বরাদ্দকরণ, মৌলিক সেবা সংযোগ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। এ কার্যক্রমের অধীনে তারা গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারা উন্নয়ন করেছে। বর্তমানে পূর্বাচল, ঝিলমিল ইত্যাদি মডেল টাউনশিপ উন্নয়ন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজউকের পাশাপাশি বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন ও আবাসন সংস্থাগুলোও একই ধরনের কাজ করছে। সে বিবেচনায় প্লট ও ফ্ল্যাট সরবরাহে রাজউকের দায়িত্ব অনেকটা হ্রাস পেতে পারে। তবে একেবারে বন্ধ করা সমীচীন হবে না। এ ক্ষেত্রে রাজউকের বিশ্বাসযোগ্যতা এখনও বেসরকারি কোম্পানির তুলনায় বেশি। অবশ্যই রাজউকের মূল কাজ হওয়া উচিত নগর পরিকল্পনায় মনোযোগী হওয়া এবং সে জন্য তার দক্ষতা ও জনবল বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়ত, রাজউকের দায়িত্ব হচ্ছে বেসরকারি পর্যায়ে নগর উন্নয়ন, আবাসন উন্নয়ন ইত্যাদি যথাযথভাবে তদারক করা এবং উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়ন করা।
যুগান্তর : বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকা যাতে ওপরের দিকে থাকে তার জন্য সামগ্রিকভাবে কী করণীয়?
নজরুল ইসলাম : বাসযোগ্য শহরের আন্তর্জাতিক তালিকায় ঢাকার অবস্থান সর্বনিুে। তালিকার নিচের অবস্থানের উন্নতি করতে হলে অন্যান্য (বাকি ১৩৯) নগরীর তুলনায় উন্নয়ন প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিযোগিতায় সব ক’টি সূচকেই উন্নয়ন আবশ্যক। তবে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সুশাসন ও দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর। সামগ্রিক নগর উন্নয়ন পরিকল্পনার মান বাড়াতে হবে, পরিকল্পনা সংস্থা ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে। নগর উন্নয়নের জন্য অর্থ-সম্পদও বাড়াতে হবে। সর্বোপরি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি হ্রাস ছাড়া অবস্থার উন্নয়ন হবে না। ঢাকার জন্য একটি শক্তিশালী সমন্বয়কারী সংস্থা গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এই সংস্থা যেমন হবে সব সম্পৃক্ত মহলের প্রতিনিধিত্বমূলক, তেমনি এর নেতৃত্বে থাকবেন একজন দক্ষ ও ধীমান নেতা। আগেই উল্লেখ করেছি, এরকম ব্যক্তির পদমর্যাদাও উচ্চতম পর্যায়ের হতে হবে।
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
নজরুল ইসলাম : ধন্যবাদ।

আদালতের রায় উপেক্ষা করে ভিসিবিরোধী আন্দোলন! by ফরিদ আহমদ রবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একাংশের চলমান আন্দোলনের প্রথমদিকে একজন অভিভাবক হিসেবে আমার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। যুগান্তরের পাতায় তা স্থান পেয়েছিল। এরপর অনেক বিদগ্ধজন বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় লিখেছেন। আনুপূর্বিক বিশ্লেষণ পেয়েছি। পত্রিকায় অনেক সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। সব বক্তব্য একজন সচেতন পাঠক পড়ে থাকলে অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। বর্তমানে দেশের রাজনীতির সঙ্গে খুব মিলে যায় আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের রাজনীতি। দু’ক্ষেত্রেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন। সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা কোনো যৌক্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাইছেন না। শুরু থেকে তাদের একটিই উদ্দেশ্য ছিল, আর তা হচ্ছে একটি নির্বাচিত সরকারের পদত্যাগ। বিরোধী রাজনীতির নিয়ন্ত্রকরা এখন একের পর এক হরতালের খড়গ চাপিয়ে দিচ্ছেন দেশবাসীর ঘাড়ে। বোমাবাজি হচ্ছে, আগুন জ্বলছে, মানুষ আহত-নিহত হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার ঘরে তালা ঝুলছে। এ ‘গণতান্ত্রিক’ দেশে জনগণকে সবকিছু মাথা পেতে নিতে হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী শিক্ষকরাও একজন নির্বাচিত ভিসির পেছনে লেগে আছেন শুরু থেকেই। শুরুতে ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের অপরাধ চিহ্নিত হয়েছে। তা হচ্ছে, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক রাজনীতিক শিক্ষকের ভিসি হওয়ার আকাক্সক্ষাকে নস্যাৎ করে দিয়ে তিনি ভিসি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক ধারণাকে তোয়াক্কা না করে সংকীর্ণ স্থানিক ধারণা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে তারা গ্রহণ করতে পারেননি। এরপর অধ্যাপক আনোয়ার নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে মহামান্য চ্যান্সেলর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হলে তার অবস্থান শক্ত হয়ে যায়। আন্দোলনকারীরা তখন কৌশল পাল্টান। নানা ইস্যু তুলে তাকে উত্ত্যক্ত করতে থাকেন, যাতে বিরক্ত হয়ে ভিসি মহোদয় পদত্যাগ করেন। কিন্তু এ মুক্তিযোদ্ধা ভিসির মনোবল শক্ত থাকায় তিনি অনেক কষ্ট স্বীকার করেছেন, কিন্তু অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। আন্দোলনকারীরা ১২ থেকে ১৮ দফা অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। কিন্তু তার মধ্যে ভিসিকে পদত্যাগ করানোর মতো একটিও উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে নানা পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত বলপ্রয়োগের চেষ্টাও করেন আন্দোলনকারী শিক্ষকরা। নিজেদের লাভক্ষতির আন্দোলনে জিম্মি করে ফেলেন শিক্ষার্থীদেরও। ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে সেশনজটের মুখে ফেলে দেন। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিপন্ন করে তোলেন শিক্ষক নামধারী কিছুসংখ্যক রাজনীতি করা শিক্ষক। একপর্যায় অত্যন্ত অমার্জিতভাবে ভিসি মহোদয়কে প্রায় চারদিন অবরুদ্ধ করে রাখেন তার অফিস কক্ষে। এ পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও একজন ছাত্র শিক্ষার পরিবেশ রক্ষার জন্য হাইকোর্টে রিট করেন। মহামান্য আদালত রায় দেন রিটকারীদের পক্ষে। সব ধরনের অবরোধ অবস্থা তুলে দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ নির্বিঘœ করার নির্দেশ দেয়া হয়। এ নির্দেশ কার্যকর করার জন্য আদেশ দেয়া হয় পুলিশের আইজিপি, শিক্ষা সচিব, সাভার অঞ্চলের পুলিশ প্রশাসন, ভিসি মহোদয় প্রমুখের ওপর। এবার দেশবাসী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। অবরুদ্ধ অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন মুক্ত হন। ভিসি মহোদয় সরকারের কাছে দাবি জানান সবকিছু তদন্ত করে দেখার। তদন্তে তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে তার জন্য সব শাস্তি মেনে নেয়ার অঙ্গীকারও করেন। এমন উদাহরণ এদেশে আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে কি-না আমার জানা নেই।
বিস্ময়কর হচ্ছে, আদালতের আদেশের একটি বায়বীয় কার্যকারিতা কয়েকদিন কার্যকর থাকে। তারপর আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা ভর করে। তারা আদালতকে অবজ্ঞা করতে শুরু করেন। তারা অবরুদ্ধ করেন প্রশাসন ভবন। ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করেন। আটকে দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন কার্যক্রম। সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে, আদালত অবমাননাকে যেন উৎসাহ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাও। ভিসি বারবার তাগাদা দেয়ার পরও তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হচ্ছে না। দু-একটি সংবাদপত্রের রিপোর্টের ভিত্তিতে জানা যায়, তদন্তে নাকি ভিসিকে দোষী সাব্যস্ত করার কোনো উপাদান নেই। আন্দোলনকারীদের রক্ষার জন্য এ নীরবতা! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক শিক্ষক বন্ধুর অনুমান, আন্দোলনকারী শিক্ষকদের কারও সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাশীল কারও সখ্য আছে। তাই পাথর চাপা দেয়া হয়েছে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট। পত্রিকা সূত্রে জানতে পারি, এর মধ্যে শিক্ষাবিষয়ক সংসদীয় কমিটি ভিসি এবং আন্দোলনকারী শিক্ষক নেতাদের ডেকেছিলেন মিটমাট করার জন্য। কিন্তু এতে গৃহীত সিদ্ধান্তে আন্দোলনকারীরাই লাভবান হয়েছেন। অনেকটা জোর খাটিয়েই অনেক অন্যায় আবদার মেনে নিতে অনুরোধ করা হয়েছে ভিসিকে। আন্দোলনকারীদের কাছেও অনুরোধ রাখা হয়েছে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। শোনা যায়, সরকার তার শেষ অবস্থায় বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে বলে নতুন ঝামেলা ঘাড়ে নিতে চাইছে না। ফলে একজন নির্বাচিত ভিসিকেই অন্যায় অনুরোধ মেনে নিতে হচ্ছে। তাই নিজের ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে ছাড় দিয়ে ভিসি ঘোষণা দিয়েছেন, সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত ভিসির হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে তিনি অচিরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবেন। তবে আমাদের মনে হয়, এমন প্রক্রিয়ায় গিয়ে সংসদীয় কমিটি ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ায় না থেকে একটি বাজে উদাহরণ তৈরি করল। এর নেতিবাচক ব্যবহার শুরু হবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে।
জানা যায়, ভিসি তার কথা রক্ষা করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু করেছেন। তবে কথা রাখেননি আন্দোলনকারীরা। তারা ভিসিকে সময় দিতে চান না। বলপূর্বক পদত্যাগ করিয়েই ছাড়বেন। শিক্ষক রাজনীতির আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক গ্র“পের এক দারুণ মিলনের রসায়নে চাপ বৃদ্ধি চলছে ক্রমাগত। আমাদের ধারণা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়টি বিশেষ ব্যতিক্রম। সেখানে দুটি শিক্ষক গ্র“প ছাড়া আন্দোলনে অন্য কেউ নেই। কোনো ধারার ছাত্ররা এ আন্দোলনে নিজেদের যুক্ত করেনি, বরঞ্চ শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার জন্য মিছিল করেছে। ব্যানার টানিয়েছে। লিফলেট বিতরণ করেছে। শিক্ষক মঞ্চ নামে বাকি শিক্ষকরা এ অযৌক্তিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবুও আন্দোলনকারীরা নির্দ্বিধায় শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার মতো অনাচার করে যাচ্ছেন। আর তা সম্ভব হচ্ছে সম্ভবত অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের একাকীত্বে। কারণ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি দলীয় শিক্ষক রাজনীতির বলয় তৈরি করতে চাননি। সেই অর্থে তার কোনো শিক্ষক গ্র“প নেই। যারা এ আন্দোলন সমর্থন করছেন না, তারা নৈতিকভাবে নিজেদের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, কিন্তু যৌক্তিক কারণে ভিসিকে রক্ষায় সংঘবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন না। সম্ভবত এ সুযোগটিই গ্রহণ করছেন আন্দোলনকারীরা।
এরই মধ্যে আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবার সর্বাত্মক আন্দোলনে নেমেছেন আন্দোলনকারীরা। ক্লাস, পরীক্ষা, প্রশাসনিক কার্যক্রম সবকিছু অচল করে দেয়া হয়েছে। ভিসির ওপর চূড়ান্ত চাপ প্রয়োগের জন্য গভীর রাতে তার বাসভবনে ঢুকে ঘুমন্ত ভিসিকে ডেকে নামানো হয়েছে। নানাভাবে অসদাচরণ করা হয়েছে। সেই মুহূর্তে পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়া হয়েছে। ভিসিকে এবার নিজ বাসভবনে পরিবার-পরিজনসহ অবরুদ্ধ করে সেখানেই অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষাগুরুরা।
এসব দেখেশুনে ও পত্রিকায় পড়ে আমরা ভীষণভাবে হতাশ ও আতংকিত। অভিভাবক হিসেবে আমরা ঘোর অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। এমন অনাচারের দায় আমরা শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারী শিক্ষকদেরই দিতে চাই না, এ দায় নিতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব অংশকেই। প্রশ্ন থাকে, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ না করে কি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংকট ঘোলাটে করায় ভূমিকা রাখছে না? সংসদীয় কমিটির অসম ফয়সালাও শেষ পর্যন্ত মান্য না করে যে অপরাধ করলেন আন্দোলনকারীরা, তার জন্য কোনো প্রতিক্রিয়া কি দেখিয়েছে সংসদীয় কমিটি? আর আদালতের রায় অব্যাহতভাবে অমান্য করে যাওয়ার পর রায় কার্যকর করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষা সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক কোনো ভূমিকা না রাখায় তারা কি আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হবেন না?
আমি আমার শিক্ষক বন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলাম, রায় থাকার পরও আন্দোলনকারীরা আদালত অবমাননা করে যাচ্ছেন কীভাবে? তিনি বললেন, এসব রায়ে শিক্ষকরা ভীত নন। তাদের বিশ্বাস, শেষ সময়ে এসবে মনোযোগ দেবে না সরকারপক্ষ। আর শিক্ষকদের ঘাঁটাতে আদালতের রায় কার্যকর করতেও এগিয়ে আসবে না সংশ্লিষ্ট পক্ষ। এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে আইনের শাসনের প্রতি কারও আস্থা থাকবে কি? আর এভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর যদি জোড়াতালি দিয়ে সংকট এড়াতে চায়, তবে তা ভয়ংকরভাবে চেপে বসবে ঘাড়ে। এরপর স্বাভাবিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। নষ্ট রাজনীতির কাছে এমন আত্মসমর্পণ শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে স্থায়ী সংকটের মধ্যে ফেলে দেবে, যা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা মনে করি, মহামান্য আদালতের নিজ দায়িত্বে বিষয়টি নজরে আনা প্রয়োজন। কারণ আদালতের রায় এভাবে অকার্যকর হতে থাকলে আদালতের মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ফরিদ আহমদ রবি : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা

বিএনপি কি জামায়াতের সঙ্গে একীভূত হচ্ছে? by নুরুল ইসলাম বিএসসি

আমি এক ছাত্রদল কর্মীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। আক্ষেপ করে ছাত্রটি বলল, ছাত্রদলে এখন তাদের আওয়াজ নিচু হয়ে গেছে। ছাত্রশিবির যা বলে তাই হয়। এই ছাত্রদলের কর্মীর ভয়, আগামীতে ছাত্রদলকে ছাত্রশিবির গ্রাস করে ফেলবে, যা তার কাছে মোটেও কাম্য নয়। ফলে ছাত্রদলের কর্মীরা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে বিএনপি বা জামায়াতের প্রার্থীকে ভোট দেবে না। বিএনপিকে এখন ভোট দেয়ার অর্থই হবে জামায়াতকে ভোট দেয়া। ধানের শীষ যদি জিতে যায়, মূলত জামায়াতিরাই জিতবে এবং এ দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে সংখ্যালঘুসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। বর্তমান পর্যায়ে অনেকে লক্ষ্য করে থাকবেন, যেখানে বেগম জিয়ার সভা হয়, আগের কাতারগুলো শিবির কর্মীরা দখল করে রাখে। এমনও দেখা গেছে, ছাত্রদলের ছেলেদের তাড়িয়ে দিয়ে ওই জায়গাটাই শিবির দখলে রেখেছে। দখল বললে ভুল হবে, তারা ওখান থেকে বেগম জিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে যুদ্ধাপরাধী ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষে স্লোগান দেয়। ছবি ও প্লাকার্ড বহন করে এদের মুক্তি দাবি করে। বিচারকার্য সম্পন্ন হয়েছে, শাস্তি ঘোষিত হয়েছে, এমন ব্যক্তিদেরও মুক্তি দাবি করছে। এতে পরিষ্কার বোঝা যায়, এ দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা নেই। অথচ বেগম জিয়া একবারের জন্যও এ কাজগুলো থেকে বিরত থাকতে এদের নিষেধ করেননি। তিনি দেশনেত্রী হিসেবে নিজেকে দাবি করেন। আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া কি একজন নেত্রীর কাজ নয়?
আগামীতে দেশে কী হবে, তা ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত থাক। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে বেগম জিয়া জামায়াতের হাতের পুতুল। এই জামায়াতিদের জন্যই বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারলেন না। সংলাপ সংলাপ বলে যারা এতদিন টিভির পর্দা ফাটিয়েছেন, এখন তারা কী বলবেন? কই, টকশোর নায়করা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে আবারও ৬০ ঘণ্টা হরতালের বিষয়ে তো কিছুই বলছেন না! সংলাপের আগেই যদি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়, তাহলে সংলাপের প্রয়োজন কী? আমাদের নবীজিও যেখানে সংকট সৃষ্টি হয়েছে ওখানে সংলাপ করেছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠায় ছাড় দিয়ে হলেও চুক্তি করে গেছেন। মদিনা সনদ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যারা এখন ইসলাম রক্ষায় মাঠে নেমেছেন, তারা কি মদিনা সনদ পড়েছেন? আসলে এরা কিছুই মানে না। এদের একমাত্র উদ্দেশ্য যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানো এবং যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগারদের শায়েস্তা করা।
এরা ইসলাম রক্ষা করার কথা বলে। কই, এ সরকারের আমলে ইসলামের বিপক্ষে একটি আইনও কি পাস হয়েছে? তবু মানুষদের ধোঁকা দিয়ে সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে প্রচার করে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। কাবা শরিফের গিলাফ পরিবর্তনের ছবিকে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রতিবাদ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। কত বড় মিথ্যুক হলে এমন কাজ করতে পারে! কোনো ভিন্নধর্মী মানুষও এ কাজ করতে পারে না। অথচ এরা নিজেদের মুসলমান দাবি করে, আবার ইসলাম রক্ষার নামে ককটেল মারে। কোন কিতাবে লেখা আছে ককটেল বানানোর ফর্মুলা? কোন ইসলামিক আইনে লেখা আছে গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার? নিরীহ মানুষ যারা হত্যা করতে পারে, এদের হাতে সাধারণ মানুষ নিরাপদ কিনা?
মিথ্যা বলারও একটা আর্ট আছে। মাওলানা শফী সাহেব মহিলাদের তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে অবস্থা বিপরীত দেখে এখন বলছেন, তিনি গোলাপ ফুল বলেছেন। এসব মিথ্যাবাদীর হাতে ইসলাম কতখানি নিরাপদ- এ প্রশ্ন উত্থাপন করলে বেশি বলা হবে কি?
মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সাময়িক টিকে থাকা যায়। দীর্ঘমেয়াদি কর্মকাণ্ডে সত্যকেই আঁকড়ে থাকতে হয়। মিথ্যা বেশিদূর এগুতে পারে না। যারা ঈমানদার বলে দাবি করছেন, তাদের কাছে মিনতি- মিথ্যা ছাড়–ন, যা সত্য তাকেই প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ দিন। খামাকা দেশের সম্পদ, মানুষের জানমাল নিয়ে খেলা করা থেকে বিরত থাকুন। হরতাল দিয়ে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করা যাবে, একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারকে কখনও ফেলে দেয়া যাবে না। গণতন্ত্র ভেস্তে যাক, এটা কারও কাম্য হতে পারে না।
নুরুল ইসলাম বিএসসি : সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক

ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর by ড. মাহবুব উল্লাহ্

আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক মানুষ এই দিনটি পালন করে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে। ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সিপাহি-জনতার বিপ্লবী অভ্যুত্থানের সূচনা হয়। সিপাহি-জনতার এই অভ্যুত্থান ছিল আধিপত্যবাদের করালগ্রাস থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার এক তেজোদীপ্ত জাগরণ। জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপরিচয় নির্ধারণে এ অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের নিগড় থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকার মাটিতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ কমান্ড গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল এমএজি ওসমানী। বাংলাদেশের জনগণ এবং সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যাশা করেছিল, আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে একদিকে যেমন থাকবেন ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল অরোরা, অন্যদিকে তারই পাশে অবস্থান করবেন জেনারেল এমএজি ওসমানী। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যে কোনো কারণেই হোক বা কোনো ষড়যন্ত্রের ফলেই হোক, জেনারেল ওসমানী আত্মসমর্পণ স্থল থেকে বহু দূরে অবস্থান করেছিলেন। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ বাংলাদেশীদের অহংবোধ মারাত্মকভাবে আহত হয়। মানুষ ভাবতে শুরু করল, আমরা কি সত্যই একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতি?
বাংলাদেশের অতুলনীয় সাহসের অধিকারী মুক্তিযোদ্ধারা ৯ মাস ধরে খণ্ড খণ্ড লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছিল। এ লড়াই আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকলে পাকিস্তানি বাহিনীকে বাংলাদেশের সূর্যসন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হতো। কিন্তু বাংলাদেশের মিত্র ভারতের ছিল ভিন্ন চিন্তা। তারা চাইল এ যুদ্ধের ত্বরিত সমাধান। তারা ভেবেছিল, যুদ্ধ-জয়ের একক গৌরব যদি মুক্তিযোদ্ধারা অর্জন করে, তাহলে বাংলাদেশকে ঘিরে তাদের রণনীতিগত আকাক্সক্ষার সাফল্য আসবে না। বাংলাদেশ হয়ে উঠবে একটি আÍগর্ভে বলীয়ান দৃঢ়চেতা জাতি। এদের কাছ থেকে কোনো অন্যায় সুবিধা আদায় করা সম্ভব হবে না।
পৃথিবীর ইতিহাস বলে, যুদ্ধের ময়দানে মিত্র শক্তিরা নিছক নিঃস্বার্থভাবে মানবিকতা বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহায্যের হাত বাড়ায় না। যে কোনো ধরনের সহযোগিতা ও সমর্থনের ক্ষেত্রে- হোক তা রাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক অথবা হতে পারে সামরিক- সাহায্য লাভের জন্য মূল্য দিতে হয়। এমনি ধরনের মূল্য দিয়েছিল নাৎসি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো। তারা যেভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য পেয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা জনগণ প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য অন্তরে অন্তরে গুমরে মরছিল।
৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ সামরিক বাহিনীতে একটি অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলেন। তিনি ব্রিগেডিয়ার পদ থেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। একই সময় সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সাধারণ সৈনিকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। সাধারণ সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে বন্দি করা এবং খালেদ মোশারফের অভ্যুত্থানকে সহজভাবে মেনে নেয়নি। তারা ভাবল, বাংলাদেশের ওপর আধিপত্যবাদের কব্জা আরও দৃঢ় হল। এ অবস্থা সৈনিকরা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ৬ নভেম্বরের মধ্যরাতের পর কামানের গোলাবর্ষণ করে সর্বাত্মক বিদ্রোহের সূচনা ঘটাল। তারা জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করল। খালেদ মোশারফ এবং তার সহযোগীরা পালাতে গিয়ে বিদ্রোহী সৈনিকদের হাতে ধরা পড়ে নিহত হলেন। এভাবে খালেদ মোশারফের মতো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশের প্রতি বেঈমানি করার কালিমা নিয়ে দুঃখজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এরকম মৃত্যুও কাম্য ছিল না। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনা অনেক সময় আমাদের স্বাভাবিক যুক্তি-বুদ্ধিকে হার মানায়।
অভ্যুত্থানকারী সৈনিকরা ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান নিয়ে ঢাকার রাজপথে বেরিয়ে পড়ল। তাদের কণ্ঠে স্লোগান ছিল- ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহি-জনতা ভাই-ভাই’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। জনগণ ফুলের মালা দিয়ে হর্ষধ্বনি তুলে বিপ্লবী সৈনিকদের অভিনন্দন জানাল। অনেকে ট্যাংকের ওপরে চড়ে বসল। এভাবে রচিত হল সৈনিক ও জনতার মধ্যে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয়ে এক অচ্ছেদ্য বন্ধন। একটি দেশের সামরিক বাহিনী যতই প্রশিক্ষিত হোক, তাদের অস্ত্র সম্ভার যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা না থাকলে তারা কখনোই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জয়ী হতে পারে না। ৭ নভেম্বরের শিক্ষা হল, সামরিক বাহিনী ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সৌভ্রাতৃত্বই বাংলাদেশকে যে কোনো আগ্রাসী শক্তির ভ্রুকুটি থেকে রক্ষা করতে পারে।
৩ থেকে ৭ নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানী ঢাকার মানুষদের অনুভূতি ও অভিব্যক্তি অনুভব করার সুযোগ আমার হয়েছিল। মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এক অজানা শংকা তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তারা ভাবছিল, আবার কি গোলামি জিঞ্জির পরতে হবে? ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান এ দেশের মানুষকে নবতর জীবন চেতনায় প্রাণিত করল। জাতি তার পরিচয় ও ঠিকানা পুনরুদ্ধার করল। দুর্ভাগ্যের বিষয়, বর্তমান সরকারের আমলে দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে না। এ দিবসের তাৎপর্য মুছে ফেলার প্রয়াস বাংলাদেশকে সবল করবে না।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

হরতালের নৃশংসতা থেকে রক্ষা করুন

অগ্নিদগ্ধ কিশোর মনিরের পাশে বাবার আহাজারি
মঙ্গলবার দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রথম পাতায় প্রকাশিত ১৪ বছরের কিশোর মনিরের ছবির প্রতি আমরা যথাযথ শ্রদ্ধা এবং বিনয়ের সঙ্গে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। অনুগ্রহ করে মনিরের ও আট বছরের শিশু সুমির কাহিনি পড়ুন। এই অস্বাভাবিক, বিশেষ আবেদনের জন্য আমরা আদালতের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। কিন্তু আইন, সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের রক্ষক উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া আমাদের আর কোথাও যাওয়ার নেই। কারণ, উচ্চ আদালতই আমাদের সর্বোচ্চ আস্থাভাজন ও শ্রদ্ধেয় রাষ্ট্রীয় অঙ্গ; অসহায় নাগরিকদের শেষ আশ্রয়। ১৯৯৯ সালের মে মাসে মাননীয় হাইকোর্ট হরতালকে একটি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন, তবে একই সঙ্গে বলেন, জবরদস্তিমূলকভাবে হরতাল চাপিয়ে দেওয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ২০০৭ সালে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই রায়ের প্রথম অংশ বহাল রাখেন, কিন্তু দ্বিতীয় অংশটি খারিজ করে দেন। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এ রায়ের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এটিকে হরতালের প্রাক্কালে ও হরতাল চলাকালে যা ইচ্ছে তাই করার অবাধ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। তারই ফল কিশোর মনির ও শিশু সুমিসহ গত কয়েক দিনে কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু, অগ্নিদগ্ধ হওয়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারানো।
গত কয়েক বছরের হিসাব নিলে হরতালে মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা হাজার পেরিয়ে যাবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনির ও সুমির বিষয়ে দায়ী করেছেন সরকারকে। তাঁর যুক্তি যেমন সরল তেমনই বিবেকবর্জিত: বিএনপি ও তার শরিকেরা একটা দাবি তুলেছে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে দাবি পূরণ করা হচ্ছে ততক্ষণ মনির ও সুমিদের পুড়িয়ে মারার স্বাধীনতা তাদের আছে। দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন দূরে থাক, কোনো নিয়মশৃঙ্খলা, শব্দপ্রয়োগে সতর্কতা বা তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের নিরস্ত করারও কোনো বালাই নেই! কোনো অনুশোচনা নেই, সহানুভূতিসূচক একটি শব্দও নেই; কচি প্রাণগুলোর জন্য উদ্বেগের লেশমাত্র নেই! তিনি একবাক্যে বলে দিলেন, ‘সরকার দায়ী’! আমরা মির্জা ফখরুলকে শুধু একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে চাই, যাদের জ্বালানো আগুনে মনির ও সুমি দগ্ধ হয়েছে, তাদের প্রতি আপনি কী বার্তা পাঠালেন? যে নৃশংস কাজ তারা করেছে, সেটার পুনরাবৃত্তি করার সবুজ সংকেতই তারা পেল না? এই ধারার রাজনীতিই কি আপনারা চান? এই রাজনীতির মধ্যে কি আপনারা দেশ পরিচালনা করতে পারবেন, যদি ক্ষমতায় আসেন? এখন বিএনপি ক্রুদ্ধভাবে বলবে, ডেইলি স্টার ও এই লেখক এমন ভাব করছে, যেন এর আগে কেউ হরতালে মারা যায়নি বা অগ্নিদগ্ধ হয়নি! আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকার সময় তাদের দ্বারা সংঘটিত এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার উদাহরণ তারা হাজির করবে। সত্য কথা যে তারা সে রকম অজস্র উদাহরণ খুঁজে পাবে। এভাবে এক পক্ষের অন্যায়-অপরাধের দৃষ্টান্ত দিয়ে অপর পক্ষ একই অন্যায়-অপরাধের সাফাই গেয়ে চলবে, এক হত্যাকাণ্ডের জায়গা নেবে আরেক হত্যাকাণ্ড। বদলাবে শুধু তাদের পরিচয়। এই দোষারোপের খেলা চলতেই থাকবে এবং প্রায় একইভাবে আমরাও আমাদের শাসক বেছে নিতে এই দল বা ওই দলকে ‘ভোট’ দেওয়ার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে নিজেদের ধ্বংস করে চলব।
আমরা নিশ্চিত, আমাদের বিচারকেরা যখন হরতালকে ‘সাংবিধানিক অধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন এ ধরনের হরতালের কথা তাঁরা ভাবেননি। আবেদন, তাঁরা যেন এ বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন। বিচারকেরা প্রশ্ন তুলতে পারেন, হরতাল ডাকার ‘সাংবিধানিক অধিকার’ ভোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীলতা কী? যেকোনো সভ্য সমাজে প্রতিটি অধিকারের সঙ্গে থাকে সমমাত্রার দায়িত্বশীলতা। তাহলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ‘সাংবিধানিক অধিকার’ ভোগের পাশাপাশি তাদের দায়িত্বশীলতা কী? ‘সরকার দায়ী’—শুধু এইটুকু বলা? আমাদের বিচার বিভাগ হরতালকে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করলেও প্রতিবেশী ভারতের বিচার বিভাগ এ বিষয়ে নাটকীয় রকমের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। প্রথমে কেরালার হাইকোর্টে ১৯৯৭ সালে এক মাইলফলক রায়ে ঘোষণা করা হয় জবরদস্তিমূলক বন্ধ্ (আমাদের হরতালের সমতুল্য) অবৈধ। হাইকোর্টের এ রায় ১৯৯৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখেন। এ ছাড়া, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ২০০২ সালে ঘোষণা করেন, জনসাধারণের কাজকর্ম জবরদস্তিমূলকভাবে বন্ধ করে দেওয়া বেআইনি। ২০০৩ সালে বোম্বে শহরে বন্ধ্ (হরতাল) ডাকার দায়ে বোম্বে হাইকোর্ট ২০০৪ সালের জুলাইতে শিবসেনা ও বিজেপিকে ২০ লাখ রুপি করে অর্থদণ্ড প্রদান করেন। একই বছরের নভেম্বরে কলকাতা হাইকোর্ট তৃণমূল কংগ্রেসের ডাকা বাংলা বন্ধেক অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা প্রত্যাহার করে সেই ঘোষণা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করার নির্দেশ দেন। ২০০৬ সালে কেরালা হাইকোর্ট কোনো রাজনৈতিক দল বন্ধ্ ডাকলে তার নিবন্ধন বাতিল করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেন। ২০০৭ সালের জুনে দিল্লিতে ডাকা বনেধ নগরের ক্ষতি হয়েছিল সাত শ কোটি রুপি, সুপ্রিম কোর্ট সেটি আমলে নিয়েছিলেন। কেরালার হাইকোর্ট যে মামলায় মাইলফলক রায়টি দিয়েছিলেন, সেটির আরজি পেশকারী ছিলেন দুজন সাধারণ নাগরিক ও রাজ্যের বিভিন্ন চেম্বার্স অব কমার্সের সদস্যরা।
যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে বন্ধ্ ডাকার ফলে যেহেতু ভারতীয় সংবিধানের ১৯ ও ২০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়, তাই তা ‘অসাংবিধানিক’ হিসেবে ঘোষিত হওয়া উচিত। কেরালা হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, কোনো সমিতি, সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের হরতাল ডাকা এবং তা পালন করা বেআইনি ও অসাংবিধানিক। আদালত এই মত ব্যক্ত করেন যে, যেসব সংগঠন এ ধরনের হরতাল ডাকবে, তারা ব্যক্তিমালিকানাধীন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য সরকার, জনগণ ও সাধারণ নাগরিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে দায়বদ্ধ থাকবে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে সুপ্রিম কোর্ট তা বহাল রাখেন। আমরা ভারতীয় এসব রায়ের কথা উল্লেখ করছি এ কারণে যে দক্ষিণ এশিয়ায় এক দেশের উচ্চ আদালতের রায় থেকে অন্য দেশের দৃষ্টান্ত গ্রহণের রীতি বেশ প্রচলিত। আমাদের বিচার বিভাগেরও এই ধারায় চিন্তাভাবনা করার সময় এসেছে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যখন জনগণকে উদ্ধারে আসছেন না, তখন বিচার বিভাগ কেন এগিয়ে আসবেন না? ২৩ বছর ধরে আমরা গণতান্ত্রিকভাবে সরকার নির্বাচিত করে আসছি, প্রতিটি সংসদ সম্পূর্ণভাবে নির্বাচিত। অথচ প্রতিটি সংসদের মেয়াদকালে বিরোধী দলগুলো সংসদে তাদের বৈধ ও অধিকারসম্মত স্থান গ্রহণ না করে ইচ্ছাকৃতভাবে সংসদ বর্জন করে এসেছে, একের পর এক হরতাল চাপিয়ে দিয়ে নাগরিকদের অধিকার খর্ব করেছে, জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। আজ সাধারণ মানুষের জীবন-মরণ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের মর্জির বিষয়, হরতাল সফল করতে গিয়ে হত্যা-জখম, মানুষের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস কাজ যারা অবলীলায় করতে পারে। আমরা শুনতে পাই, রাজনৈতিক দলগুলো এখন হরতালের সময় সহিংস কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার সন্ত্রাসী-মাস্তানদের ভাড়া করছে। কে কতটি প্রাইভেট কার, বাস,
সিএনজিচালিত অটোরিকশা ইত্যাদি ভাঙচুর করতে বা পোড়াতে পারল, তা হিসাব করে তাদের টাকা দেওয়া হয়। কিছু টাকা আগেই দেওয়া হয়, বাকিটা দেওয়া হয় কাজের ‘প্রমাণ’ হাজির করার পর (সাধারণত মোবাইল ফোনে ছবি তুলে)। হরতাল প্রতিরোধ করার নামে ক্ষমতাসীন দলেরও সহিংসতার নিজস্ব পরিকল্পনা থাকে। হরতাল চলাকালে সহিংসতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হরতালের আগের দিনের সহিংসতা। হরতাল-পূর্ববর্তী সহিংসতায় এ বছর নিহত হয়েছেন ১৭ জন, আহত ৬৮১ জন। ১১৮টি যানবাহন পোড়ানো হয়েছে, ভাঙচুর করা হয়েছে ২০৬ (সূত্র: ডেইলি স্টার-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন)। এসব ঘটেছে হরতালের আগের সন্ধ্যায়; হরতাল চলাকালে বা অন্য কোনো ঘটনার অনুষঙ্গ হিসেবে নয়। হরতাল চলাকালীন আর হরতাল-পূর্ববর্তী সহিংসতার মধ্যে তফাত কী? হরতালের ব্যাপারে পূর্বঘোষিত সময়সীমা থাকে। এ মুহূর্তে চলমান হরতাল সম্পর্কে ঘোষণা করা হয়েছে যে এটি সোমবার সকাল ছয়টায় শুরু হবে, শেষ হবে বুধবার সন্ধ্যা ছয়টায়। কিন্তু হরতাল শুরুর আগের দিনই, বিশেষ করে রোববার সন্ধ্যা থেকেই সহিংসতা শুরু হয়ে গেল। এর যুক্তি কী? আইনের শাসন দ্বারা পরিচালিত একটি দেশে, যার সংবিধানে সুস্পষ্ট ভাষায় সুনির্দিষ্টভাবে নাগরিকদের অধিকার ও দায়দায়িত্বের কথা বলা আছে, সেখানে আমাদের কেন এই ধরনের সহিংসতার শিকার হতে হবে? এসব বিষয় এবং প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন আদালতের দেওয়া রায়গুলোর আলোকে উচ্চ আদালতে আমাদের আবেদন:
১. রাজনৈতিক দলগুলোর হরতাল আহ্বানের ‘সাংবিধানিক অধিকার’ ভোগের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ও বাধ্যবাধকতার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হোক;
২. হরতালের আগের দিন যেহেতু ঘোষিত হরতালের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে পড়ে না, সেহেতু হরতাল-পূর্ববর্তী সময়ে হরতাল আহ্বানকারী রাজনৈতিক দলের ‘সাংবিধানিক অধিকার’ ভোগের কোনো প্রশ্ন নেই। এ সময়ের নাগরিক অধিকারগুলো বিবেচনায় নেওয়া হোক।
৩. হরতাল আহ্বানকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে হরতাল-পূর্ববর্তী সময়ে কোনো সহিংসতা ঘটবে না। এটা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে সহিংসতার দায়দায়িত্ব দলগুলোর নেতাদেরই নিতে হবে। হরতাল কেবল ততক্ষণ পর্যন্তই গণতন্ত্রের অংশ, যতক্ষণ জনসাধারণ তাতে স্বেচ্ছায় অংশ নেয়। জোর করে হরতাল চাপিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা হয়ে যায় স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ। এই দুই পরিস্থিতিকে একইভাবে বিচার করা যায় না। হরতাল এখন শুধু জবরদস্তিমূলকই নয়, বরং তা চাপিয়ে দেওয়া হয় অত্যন্ত ভয়ংকর ও নৃশংসভাবে, যা আমরা দেখলাম কিশোর মনির ও শিশু সুমির ক্ষেত্রে। আমাদের অধিকারগুলো যখন নৃশংস ও জঘন্যভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, তখনো কি আমাদের উদ্ধার করতে সংবিধান ও আমাদের সব মানবিক, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের রক্ষক উচ্চ আদালত এগিয়ে আসবেন না।

২২ বছরে নিহত ২৫১৯

রাজনৈতিক সহিংসতায় ২২ বছরে দুই হাজার ৫১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন দানবীয় রূপ নিয়েছে। এর মুখ্য দায় নাগরিক সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর চাপালে চলবে না। এর মুখ্য দায় শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বকেই নিতে হবে। কিন্তু পরিহাস হচ্ছে, তাঁরা একে অন্যের ওপর দায় স্থানান্তর করেই পার পেতে চাইছেন। এটা আর চলতে পারে না। ভুক্তভোগীদের পরিবারগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এর বিরুদ্ধে দুর্বার সামাজিক প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ গড়ে তুলতে হবে। দেশে ক্ষতিপূরণ (টর্ট) আইনের কার্যকারিতা সৃষ্টি ও তার প্রসার ঘটাতে হবে। রাজনীতিতে আকস্মিক উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেনি। এর মূলে রয়েছে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রহীনতা। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রকৃত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করার বাস্তবতা সমাজ থেকে লোপ পেতে চলেছে। সহিংসতার বিষবৃক্ষ সমাজ থেকে উপড়াতে হলে সর্বাগ্রে দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ব্যাপকভিত্তিক চর্চা দরকার। এ জন্য প্রয়োজন বৈরী ও বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতির পরিবর্তন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিস্তৃতি ঘটেছিল সামরিক শাসনামলে। ১৯৯০ সালে গণতন্ত্রে উত্তরণের পর আমরা আশা করেছিলাম, রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল ও সক্রিয় করে তোলার পাশাপাশি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা জোরদার হবে। কিন্তু সেটা করা হয়নি। এর কুফল নানাবিধ উপায়ে সমাজে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
শাসকগোষ্ঠী জাতির সামনে বৈষয়িক উন্নতির যে চিত্র তুলে ধরে আসছে, তার আড়ালে বহু মানুষের লাশ চাপা আছে। দল ও শাসনব্যবস্থায় যেকোনো মূল্যে ব্যক্তিকে ধরে রাখার সর্বনাশা চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে এই লাশের মিছিল চলতেই থাকবে। নির্বাচনী বছরগুলো ক্রমেই রক্তগঙ্গার বছর হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ গঠনের বছরে মাত্র ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটলেও ২০০১ সালে তা ৫০০ জনে উন্নীত হয়েছে। এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৩০৪ জন মারা গেছে। মানুষ শঙ্কিত, এবার কী হবে? স্বজনহারাদের পরিবারগুলো বলছে, ক্ষমতার রাজনীতির কারণে এসব হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। অথচ ক্ষমতার রাজনীতির প্রতিভূরা এ নিয়ে আলোচনায় বিমুখ থাকেন। ২২ বছরে আড়াই হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি নিয়ে সংসদে একটিবারও আলোচনা হয়নি। সাম্প্রতিক হরতালে যারা প্রাণ হারিয়েছে, তাদের বিষয়ে দুই প্রধান দলের মধ্যে প্রথাগত দায় স্থানান্তরের খেলা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হরতালজনিত সহিংসতায় প্রাণহানির দায়ে এমন ভাষায় মামলা দায়ের করার হুমকি দিচ্ছেন, যাতে মনে হতে পারে, তিনি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে কেবলই রাজনৈতিক কারণে করুণা ভিক্ষা দিচ্ছেন; যেন এটা তাদের অধিকার নয়। এই রাষ্ট্র এবং তার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সঙ্গে এভাবেই পরিহাস করে চলেছে। এই ‘ক্ষমতার রাজনীতি’ আমরা চাই না। সহিংস ক্ষমতার রাজনীতির অবসান হোক। আর এ জন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও নেতৃত্বে অবশ্যই গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে।

এবং হরতালের ক্ষয়ক্ষতি

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কারণে হরতাল আহ্বানের নজির খুব কম হলেও এর পুরো চাপটা বহন করতে হয় অর্থনীতিকেই। হরতালে বিপুলসংখ্যক মানুষের হতাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোৎপাদন যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি অর্থনীতির চাকাও হয়ে পড়ে স্থবির। গবেষকদের মতে, এক দিনের হরতালে ক্ষতির পরিমাণ অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে পোশাক খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার ওপরে। যে বছর নির্বাচন থাকে, সে বছর বেশি হরতালও থাকে, এতে সে বছরটিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে যায়। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৬ সালে। গত চার বছর দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের বেশি থাকলেও এবার ৬-এর নিচে নামারই আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি। সিপিডির হিসাবে, হরতালে ১ শতাংশ পুঁজি নষ্ট হলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এফবিসিসিআইয়ের দাবি, এক দিনের হরতালে দেশের জিডিপির দশমিক ১২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর যে ক্ষতি হয়েছে,
তা বাংলাদেশের জিডিপির ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের সমান। এই আর্থিক ক্ষতির বাইরে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার বিষয়টি যোগ করলে হরতালে ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। একদিকে হরতাল দেশের জনগোষ্ঠীকে করে তোলে কর্মবিমুখ ও অলস, অন্যদিকে ধ্বংস করে মানবিক মূল্যবোধ। হরতালের কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিই শুধু বিনষ্ট হচ্ছে না, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকেরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলো, গত দুই দশকে গণতান্ত্রিক শাসনামলে যত হরতাল হয়েছে, তার এক-দশমাংশও হয়নি সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। আরও হতাশার কারণ হলো, পালা করে দেশ শাসনকারী দুটি প্রধান দলই ক্ষমতায় থাকতে হরতালের বিরুদ্ধে বুলন্দ আওয়াজ তুললেও বিরোধী দলে গিয়ে ফের হরতালকেই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করে। বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হরতালের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। হরতালে জনজীবন ও অর্থনীতি বিপন্ন হলেও সরকারের পতন হয় না। তাই, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য দেশের অর্থনীতিকে জিম্মি করবেন না। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করুন।