Showing posts with label আল আমিন. Show all posts
Showing posts with label আল আমিন. Show all posts

Sunday, May 4, 2025

এত নতুন দল লক্ষ্য কী? by মো. আল-আমিন

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের হিড়িক পড়েছে। একের পর এক নতুন দলের ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পেতে আবেদন করা হচ্ছে। নতুন এসব দল কারা এবং কী লক্ষ্য নিয়ে গঠন করছেন এ নিয়ে নানা জিজ্ঞাসা আছে জনমনে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত নয় মাসের ব্যবধানে দেশে ২৪টি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হয়েছে। অন্যদিকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য এখন পর্যন্ত ৬৫টি রাজনৈতিক দল আবেদন করেছে। যাদের মধ্যে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই নামসর্বস্ব। এমনো দল রয়েছে, যাদের কোনো কার্যকরী কমিটি নেই। সেইসঙ্গে নেই কোনো কেন্দ্রীয় কার্যালয়। বিশ্লেষকরা বলেছেন, নানারকম আর্থসামাজিক লক্ষ্য এবং সমাজে ব্যক্তিগত প্রভাব বাড়াতে এসব দল গঠন করা হচ্ছে। এ ছাড়া বড় দলের সঙ্গে সমঝোতা করে এমপি ও পদ বাগিয়ে নিতেও অনেকে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করবে।

নিবন্ধনের আবেদন করা রাজনৈতি দলগুলো যা বলছে: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন দিতে চলতি বছরের ১০ই মার্চ গণ-বিজ্ঞপ্তি জারি করে নির্বাচন কমিশন। দলগুলোকে ২০শে এপ্রিলের মধ্যে নিবন্ধনের আবেদন করতে বলা হয়। যদিও পরবর্তীতে বেশ কিছু রাজনৈতিক দলের আবেদনের প্রেক্ষিতে আগামী জুন পর্যন্ত আবেদনের সময় বাড়ায় ইসি। নির্বাচন কমিশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে ৬৫টি রাজনৈতিক দল। এই দলগুলোর একটি বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণময় পার্টি। গত ১৭ই এপ্রিল নিবন্ধনের আবেদন করে দলটি। দলটির চেয়ারম্যান মো. শিপন ভূঁইয়া পেশায় চশমা ব্যবসায়ী। নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, জনগণের খেদমত করতে দল গঠন করেছি। নিবন্ধন পাবো কিনা জানি না। এখন পর্যন্ত দুই জায়গায় অফিস নিতে পেরেছি। ঢাকার প্রধান কার্যালয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্টোর রুমের ঠিকানা প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেছি। এ ছাড়া দলটি কবে গঠন করা হয়েছে-এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিতে পারেননি। এদিকে গত ২০শে এপ্রিল ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে বাংলাদেশ বেকার মুক্তি পরিষদ। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আতিকুর রহমান রাজা মানবজমিনকে বলেন, তার নেতৃত্বাধীন দলটির উদ্দেশ্য ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বেকারমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করা। আমরা এখন পর্যন্ত ৭টি জেলা ও ৮১টি উপজেলায় কমিটি দিয়েছি। ইসি’র বর্ধিত সময়ের মধ্যেই বাকি শর্তগুলো পূরণ করা হবে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে ১৭ই এপ্রিল নিবন্ধনের আবেদন করা বাংলাদেশ মুক্তি ঐক্যদলের সভাপতি মো. নুর ইসলাম শিকদার জানান, তিনি ১৯৯৮ সালে রাজনৈতিক দলটি গঠন করেন। এখন পর্যন্ত নিবন্ধনের জন্য ৩ বার আবেদন করেছেন। কিন্তু তাকে নিবন্ধন দেয়া হয়নি। এবার সকল শর্ত পূরণ করেই আবেদন করা হয়েছে। তিনি আশা করছেন এবার তিনি নিবন্ধন পাবেন। তার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ফরিদপুর বোয়ালমারীর একটি সুপার মার্কেটে। তিনি বলেন, ২৫টি জেলায় এবং ১০০টি উপজেলায় দলের অফিস রয়েছে।

রাজনৈতিক দল নিবন্ধন দেয়ার প্রক্রিয়া কী: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেতে চাইলে তিনটি শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করতে হবে। প্রথমত, স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত কোনো সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে কমপক্ষে একটি আসনে বিজয়; দ্বিতীয়ত, ওই সব নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা যেসব আসনে অংশ নিয়েছেন, সেসব আসনে মোট ভোটের পাঁচ শতাংশ ভোট প্রাপ্তি; তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় অফিস থাকতে হবে। দেশের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ জেলায় জেলা অফিস থাকতে হবে। আর অন্তত ১০০টি উপজেলা বা মেট্রোপলিটন এলাকার থানায় অফিস থাকতে হবে, যার প্রতিটিতে সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ২০০ জন ভোটার থাকবে।

রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্দেশ্য কী: নতুন রাজনৈতি দল গঠনের হিড়িক পড়ার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? এমন প্রশ্নে নির্বাচন বিশ্লেষক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. আব্দুল আলীম মানবজমিনকে বলেন, ২০২৪ সালে নির্বাচনের আগেও ৯০টির উপরে নিবন্ধনের আবেদন পড়েছিল। চব্বিশের আগের নির্বাচনের কালচার ছিল, আপস করে যদি দুই-একটা এমপি পদ নেয়া যায়। কেননা, আমাদের দেশে এমপি হওয়া একটি বড় ব্যবসা। তখন ছিল এমন। তবে ৫ই আগস্টের পরের প্রেক্ষাপট আরেক ধরনের জানিয়ে তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল আছে যারা এতদিন রাজনীতি চর্চা করতে পরেনি। তারা এখন নিবন্ধন চাচ্ছে। পক্ষান্তরে, এখনো অনেক রাজনৈতিক দলই আছেন যারা নিবন্ধন নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে, জোট করে দুই-একটি সিট নিতে চায়। তিনি জানান, বর্তমানে কোনো একটি রাজনৈতিক দল যদি বড় দলের সঙ্গে আঁতাত করে, তখন ছোট দলের প্রতীক ব্যবহার করে নির্বাচনের প্রয়োজন পড়ে না। বড় দলের প্রতীক ব্যবহার করেই তারা নির্বাচন করে। যেহেতু বড় দলের প্রতীক পরিচিত এবং আমাদের দেশের অনেক জনগণই প্রতীক দেখেই এখনো ভোট দেয়। সেহেতু এই সুযোগটা তারা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। এজন্য নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন একটি সুপারিশ করেছি যে, দল অ্যালাইন্স করতে পারবে। কিন্তু ছোট দল যখন বড় দলের সঙ্গে যাবে, তখন ছোট দলকে তাদের নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের মানুষ রাজনীতি করতে পছন্দ করে। এজন্য হয়তো দল গঠনের আগ্রহ বেশি। এছাড়া একটি দলের নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে অনেকে পছন্দ করে। অনেকে বিভিন্ন সুবিধা নিতেও দল গঠন করে থাকে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক দল গঠনে নিরুৎসাহিত করছি না। তবে এত রাজনৈতিক দল করাও খুব স্বাস্থ্যকর কিছু না। কেননা, অনেক দলেরই মানুষের কাছে যাওয়ার ক্যাপাসিটি নাই। তাহলে দল করছেন কেন? আপনারা তো মানুষের কাছে প্রশ্নের সম্মুখীন হবেন। তিনি জানান, যখন কোনো সুযোগ আসে তখন এমন প্রবণতা হয়। ১৯৭৬ সালে যখন নতুন সরকার হলো, সেই সরকার তখন রাজনৈতিক দলের জন্য একটি বিধি করেছিল। তার অধীনে শতাধিক দল নিবন্ধিত হয়েছিল। তবে আল্টিমেটলি কতোটি দল টিকেছে? যখন ক্ষমতার প্রশ্ন আসলো তখন ৩টিরও বেশি দল ছিল না।

mzamin

Thursday, April 10, 2025

বদলে যাচ্ছে নির্বাচনী আচরণবিধি by মো. আল-আমিন

নির্বাচনী আচরণবিধিমালায় সংশোধন আনা হচ্ছে। আচরণবিধিতে প্রথমবারের মতো যুক্ত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার। নির্বাচনী প্রচারণায় থাকছে না পোস্টার। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে প্রতি ৭ দিন অন্তর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দাখিল করতে হবে। জনসভা করতে হলে ৭২ ঘণ্টা আগে নিতে হবে পুলিশের অনুমতি। যুক্ত করা হয়েছে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান। প্রস্তাবিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ এর খসড়ায় এসব বিধান রাখা হয়েছে। ইসি সূত্র জানায়, খসড়া আচরণ বিধিমালার নির্বাচনী প্রচারের অংশে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট বা অন্য কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট ও ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্য প্রচার-প্রচারণা শুরুর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করতে হবে। তবে ডিজিটাল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণাকালে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন করে কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি, কোনো ধরনের তিক্ত বা উস্কানিমূলক বা মানহানিকর কিংবা লিঙ্গ সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি প্রদান, কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারে মানহানিকর প্রচার করলে ডিজিটাল বা সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় শাস্তি হবে। এ ছাড়া ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগেই অনলাইন প্রচারণা থেকে বিরত থাকতে হবে।

খসড়ার নির্বাচনী ব্যয়সীমা সংক্রান্ত বাধা-নিষেধে বলা হয়েছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা দলের মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী বিষয়ক সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি, বিজ্ঞাপন প্রদান, বুস্টিং ও স্পন্সরশিপসহ সকল ডিজিটাল প্রচারণা ব্যয় শিরোনামে সামগ্রিক নির্বাচনী ব্যয়ের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন বরাবর দাখিল করতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে সমস্ত ব্যয়সমূহ প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়সীমার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হবে। সামাজিক প্রচার অভিযানে বিদেশি অর্থায়নে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা কার্যক্রম চালাতে পারবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে প্রতি ৭ দিন অন্তর নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব রিটার্নিং কর্মকর্তা/সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দাখিল করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা-বিধি লঙ্ঘিত হলে ডিজিটাল/সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় শাস্তি প্রযোজ্য হবে।

এদিকে খসড়া আচরণ বিধিমালায় সরকারি সুবিধাভোগী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় নতুন করে উপদেষ্টা ও তাদের সমমর্যাদার ব্যক্তিদের যুক্ত করা হয়েছে। আচরণ বিধিমালার খসড়ায় নির্বাচনের সময়কে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন থেকে তফসিল পর্যন্ত সময়কে নির্বাচন-পূর্ব সময়, তফসিল ঘোষণা থেকে ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের সময়কে নির্বাচনকালীন সময় এবং ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময়কে নির্বাচন-পরবর্তী সময় উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়ায় প্রচারে পোস্টার বাতিল করে ব্যানার শব্দ রাখা হয়েছে। ব্যানারের অর্থ বোঝানো হয়েছে কাপড়ের তৈরি প্রচারপত্র। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত ব্যানার সাদা-কালো রঙের ও আয়তন অনধিক ৩ মিটার বাই ১ মিটার হবে এবং ব্যানারে প্রার্থী তার প্রতীক ও নিজের ছবি ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তির ছবি বা প্রতীক ছাপাতে পারবে না। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত হলে তিনি তার বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি লিফলেট বা হ্যান্ডবিলে ছাপাতে পারবে। প্রচারপত্রে পলিথিনের আবরণ বা প্লাস্টিক ব্যানার লেমিনেটিং ব্যবহার করা যাবে না। জনসভার দিন, সময় ও স্থানের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ন্যূনতম ৭২ ঘণ্টা আগে লিখিত অনুমতি নিতে হবে। জনসভার কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টা আগে স্থান ও সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে জানাতে হবে। রিটার্নিং অফিসারের নিকট মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় ৫ জনের অধিক থাকতে পারবে না। এদিকে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য প্রার্থীর ছবি বা তার পক্ষে ক্যাপ ব্যবহার করা যাবে না।

খসড়ায় বিলবোর্ড ব্যবহার সংক্রান্ত বাধা-নিষেধ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে কোনো প্রকারের স্থায়ী বা অস্থায়ী বিলবোর্ড ভূমি বা অন্য কোনো কাঠামো বা বৃক্ষ ইত্যাদিতে স্থাপন বা ব্যবহার করা যাবে না। ওদিকে মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে শব্দের মান ৬০ ডেসিবেল রাখার এবং বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিধান রাখা হয়েছে খসড়ায়। যেটা আগে ছিল রাত ৮টা পর্যন্ত।

সরকারি সুবিধাভোগীদের নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে পূর্বে সভাপতি বা সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বা মনোনীত হয়ে থাকলে বা তৎকর্তৃক কোনো মনোনয়ন প্রদত্ত হয়ে থাকলে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে তিনি বা তৎকর্তৃক মনোনীত ব্যক্তি উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো সভায় সভাপতিত্ব বা অংশগ্রহণ করবে না অথবা উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে জড়িত হবে না। নির্বাচনী প্রচারণার সময়কাল শুরু হওয়ার আগেই উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে।

খসড়ায় নতুন করে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো উৎস থেকে প্রাপ্ত রেকর্ড কিংবা লিখিত রেকর্ড হতে কমিশনের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট এই বিধিমালার কোনো বিধান লঙ্ঘন করেছে বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করেছে এবং অনুরূপ লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের চেষ্টার জন্য তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হতে পারেন, তাহলে কমিশন বিষয়টি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে। তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির পর কমিশন যদি মনে করেন আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে, সেক্ষেত্রে কমিশন উক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রার্থিতা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর বিধান মোতাবেক বাতিল করতে পারবেন। খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলসমূহ এই আচরণবিধির সকল বিধান মেনে চলবে মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে প্রতীক বরাদ্দের পূর্বে দাখিল করবে।

গত সোমবার এ সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক শেষে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, খসড়াটি প্রায় চূড়ান্ত। এখন নির্বাচন কমিশনে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া নেয়া হবে। ইসি অনুমোদন দিলে ফাইনালি পাবলিশড হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের অধিকাংশ সুপারিশ প্রস্তাবিত আচরণবিধিতে যুক্ত করা হয়েছে। সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলো আছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও গণমাধ্যমে আসা অন্যান্য বিষয়গুলো ইনকরপোরেট করার উদ্যোগ নিয়েছি। একটা চমৎকার আচরণবিধিমালা হবে-এটা প্রত্যাশা। 

mzamin

Monday, January 13, 2025

ইভিএম প্রকল্পে গচ্চা চার হাজার কোটি by মো. আল-আমিন

রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের ব্যাপক আপত্তি সত্ত্বেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম ক্রয় করে তৎকালীন কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। যদিও সেই নির্বাচনে মাত্র ৬টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। ব্যাপক আপত্তির কারণে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিতর্কিত এই যন্ত্রটি ব্যবহার করা হয়নি। এ ছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও যন্ত্রটি ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে স্পষ্ট করেছেন বর্তমান সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন। ফলে বিপুল অর্থব্যয় ছাড়া কোনো কাজেই লাগেনি ‘ভোট চুরির নীরব যন্ত্র’ হিসেবে খ্যাত ইভিএম। এদিকে ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অধিকাংশ যন্ত্র ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে হাতে থাকা কার্যকর মেশিনগুলোকে বুঝে নিয়ে আপাতত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছে নাসির উদ্দিন কমিশন। গতকাল কমিশন সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। সভা শেষে তিনি বলেন, ইভিএমের প্রকল্প জুন মাসে শেষ হয়ে গেলেও কমিশনের পক্ষে এখন পর্যন্ত পুরোপুরিভাবে ইভিএম টেকওভার করা হয়নি। প্রশিক্ষণ অংশটুকু বাকি ছিল, এই সপ্তাহে শেষ হয়েছে। এ অবস্থায় ইভিএম ভবিষ্যতে ব্যবহার করা হবে কিনা-সে ব্যাপারে আমরা জানি না। আমরা জানি সংস্কার কমিশনের মাধ্যমেও কিছু প্রস্তাবনা এটার ব্যাপারে আসতে পারে। আমরা জরুরিভিত্তিতে এটার দায়-দায়িত্ব বুঝে নেবো, রক্ষণাবেক্ষণ করবো।

এর আগে ত্রয়োদশ নির্বাচন যে কেবলই ব্যালট পেপারের মাধ্যমে হবে তাও স্পষ্ট করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। গত শনিবার সিলেটে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন ইভিএমের মাধ্যমে হবে না, এটা পরিষ্কার। আগামী জাতীয় নির্বাচন ইভিএমের মাধ্যমে করার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও। কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্প্রতি জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার করা হবে না।
ইভিএম প্রকল্প যেভাবে নেয়া হয়: ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন দেশের ভোট ব্যবস্থায় ইভিএমের ব্যবহার শুরু করে। সে সময় তারা বুয়েট থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে যন্ত্র তৈরি করে নেয়। ওই কমিশনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশনও ভোট যন্ত্রটি ব্যবহার করে। তবে ২০১৫ সালে রাজশাহী সিটি নির্বাচনে একটি মেশিন অচল হয়ে পড়ায় তা আর ব্যবহার উপযোগী করতে পারেনি রকিব কমিশন। পরবর্তী সময়ে তারা বুয়েটের তৈরি স্বল্প মূল্যের ওই মেশিনগুলো পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত দিয়ে উন্নতমানের ইভিএম তৈরির পরিকল্পনা রেখে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে কেএম নূরুল হুদার কমিশন এসে বুয়েটের তৈরি ইভিএমের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি দামে মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) কাছ থেকে মেশিনপ্রতি ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকায় দেড় লাখের মতো ইভিএম ক্রয় করে। কিন্তু পাঁচ বছর পার না হতেই ৯০ ভাগ ইভিএম অকেজো হয়ে পড়ে।

ইভিএমকেন্দ্রিক লুটপাট থেকে পিছিয়ে থাকতে চায়নি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পদত্যাগ করা কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশনও। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে শুরুতে দেড়শ আসনে ইভিএমে ভোট করার পরিকল্পনা নেয় তারা। সেজন্য নির্বাচন সামনে রেখে অকেজো মেশিন মেরামত, সংরক্ষণ প্রভৃতির জন্য তারা ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব দেয় সরকারের কাছে। তবে ওই সময় চরম অর্থনৈতিক সংকট থাকায় সরকার সেটি নাকচ করে দিতে বাধ্য হয়। তবে বড় প্রকল্প বাতিল হয়ে গেলেও বসে থাকেনি কমিশন। ফলে হাতে থাকা পুরোনো ইভিএমগুলো সচল রাখতে আবারো ১ হাজার ২৫৯ কোটি ৯০ লাখ টাকার চাহিদাপত্র দেয় আউয়াল কমিশন। ইভিএম মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা বরাদ্দ চেয়ে চিঠি চালাচালি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পরও ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে চরম হতাশ হয় সংস্থাটি। আর ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে কোনো আসনেই ইভিএমে ভোট গ্রহণ না করে সব আসনেই ব্যালটে ভোট নেয়া হয়। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা ইভিএমগুলো বর্তমানে ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। 

mzamin

Saturday, November 16, 2024

সংকোচ নিয়ে টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াচ্ছেন তারা by মো. আল-আমিন

নিত্যপণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। শুল্ক কমানোর পরও চাল, তেল, আলু, পিয়াজ ও চিনির দাম আকাশচুম্বী। নাগালের বাইরে সবজির  দামও। এতে করে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে কিছুটা কম টাকায় পণ্য কিনতে নিম্নবিত্তরা তো বটেই, সংকোচ নিয়ে টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াচ্ছেন মধ্যবিত্তরাও। এ ছাড়া লজ্জায় লাইনে দাঁড়াতে না পেরে কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে নিম্নবিত্তদের মাধ্যমে পণ্য কিনছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেল ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

দুপুর ২টা। আগারগাঁও বাংলাদেশ বেতারের বিপরীতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টিসিবি’র ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেলের সামনে দীর্ঘ লাইন। সেখানে কয়েকজন নারীকে দেখা গেল ভদ্রোচিত পোশাকে। এ সময় কথা হয় মুখ ঢেকে টিসিবি’র লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আসমা খাতুনের সঙ্গে। তার স্বামী বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিত্যপণ্যের দাম অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছানোয় বেতন দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন আসমা।

তিনি বলেন, প্রতিটি জিনিসের দাম অনেক বেড়েছে। এমনকি ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজিও কেনা যাচ্ছে না। এক আঁটি লাল শাকের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা। বর্তমানে আমার স্বামীর আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আর পেরে উঠছি না। এজন্য লজ্জা লাগলেও টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।

পারুল খাতুন। বয়স ৬৫ বছর। বৃদ্ধ এই নারীকে টিসিবি’র লাইনে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না ডিলারের সহকারী। কারণ হিসেবে সহকারী জানান, উনি কিছুক্ষণ আগেই একবার পণ্য কিনেছেন। আবারো পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। একজনকে দুইবার করে পণ্য দিতে গেলে অনেকে পণ্য না পেয়ে ফিরে যাবেন। কিছু মানুষ দুইবার করে পণ্য নিয়ে বেশি দামে দোকানে বিক্রি করে দেয় বলেও জানান তিনি।

পারুল খাতুন বলেন, একজন মহিলা লজ্জায় লাইনে দাঁড়াতে পারছিলেন না। আমি লাইনে দাঁড়িয়ে তাকে জিনিস কিনে দিয়েছি। এজন্য উনি আমাকে ২০ টাকা দিয়েছেন। এখন নিজের জন্য পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়াতে গেলে তারা দাঁড়াতে দিচ্ছে না। আমি গরিব মানুষ। কম টাকায় পণ্য কিনতে না পারলে তো না খেয়ে থাকা লাগবে।

টিসিবি’র এই ট্রাকসেলে পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সরকারি এক চাকরিজীবী। তিনি বলেন, ছোট পদে সরকারি চাকরি করি। জিনিসের দাম বাড়ার কারণে বেতনের টাকা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। এজন্য মাঝে মাঝেই টিসিবি থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনি। তিনি বলেন, টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াতে অনেকে সংকোচ বোধ করে। এজন্য বিভিন্ন এলাকার স্থায়ী কিছু দোকানে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করা উচিত। বেসরকারি একটি আইটি ফার্মে কর্মরত আশিকুর রহমান বলেন, লাইনে দাঁড়াতে লজ্জা লাগে। টিসিবি থেকে অনেক কম পরিমাণ পণ্য দেয়া হয়। আরেকটু বেশি পণ্য দেয়া হলে ভালো হতো। বারবার লাইনে দাঁড়ানো লাগতো না।
এদিকে দেশে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। পণ্যের দাম কিছুটা কমাতে বা স্থিতিশীল রাখতে বেশ কয়েকটি পণ্যের উপর শুল্ক ছাড় দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু শুল্ক ছাড়ের সেই সুবিধা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং দাম উল্টো বাড়ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.৬৬ শতাংশে। এতে চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে নিম্ন আয়ের ১ কোটি উপকারভোগী কার্ডধারী পরিবারের মাঝে সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করছে সরকার। পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তার কাছে ঢাকা মহানগরীতে ৫০ ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে ২০টি ট্রাকের মাধ্যমে ৫ কেজি চাল, ২ কেজি মসুর ডাল ও ২ লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি করা হচ্ছে।

mzamin

Tuesday, November 5, 2024

প্রাণিসম্পদের প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্প by মো. আল-আমিন

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষাও করেছে সংস্থাটি। তবে প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কীভাবে পূরণ হবে সেই তথ্য নেই সমীক্ষা প্রতিবেদনে। এ ছাড়া চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্প শেষে পঞ্চম বছর থেকে আরও বরাদ্দ বিনিয়োগ করা হবে, যার মাধ্যমে প্রায় দ্বিগুণ আয়ের কথা প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু কোন খাত থেকে কী পরিমাণ আয় হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। অন্যদিকে দেশে মাংস ও ডিমের উৎপাদন বেশি হয় বলে সমীক্ষায় জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সেক্ষেত্রে প্রকল্পের আওতায় প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া ও কবুতর বিতরণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

সূত্র জানায়, দেশের তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি করা প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৬৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। প্রস্তাবটি নিয়ে সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সূত্র বলছে, প্রকল্প প্রস্তাবের সঙ্গে একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনটি করেছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। স্টাডিটির আয় ও ব্যয় বিশ্লেষণ অধ্যায়ের টেবিলে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে সেটি পূর্ণাঙ্গ নয়। এতে দেখা যায়, প্রকল্প শেষে অর্থাৎ ৪ বছর পর পঞ্চম বছর আরও অতিরিক্ত ৩৭৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হলে প্রকল্প থেকে আয় হবে ৬৩৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। একইভাবে পরবর্তী বছরগুলোতে অতিরিক্ত ৩২৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয় করা হলে প্রতি বছর ৬৭৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আয় হবে। কিন্তু এই আয় প্রকল্পের কোন কোন খাত থেকে কীভাবে হবে তার কোনো হিসাব প্রতিবেদনে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া এই আয়ের জন্য প্রতি বছর অতিরিক্ত যে ৩২৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে তার সংস্থান কীভাবে হবে তারও কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সমীক্ষা প্রতিবেদনে নেই।
কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১১৬ কোটি টাকা এডিপি বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর তথ্যে থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ১২২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া আগামী অর্থবছরেও ঘাটতি থাকবে ৬২৬ কোটি ২১ লাখ টাকা। এমন প্রেক্ষাপটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাজেট সিলিংয়ের মধ্যে থেকে এই প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে করা হবে সে বিষয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্টে কিছু উল্লেখ নেই।
সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পের ৩টি কম্পোনেন্ট প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম কম্পোনেন্টটি হলো- পার্বত্য এলাকার জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ৭২ হাজার ২৭টি পরিবারকে অনুদান হিসাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাণী (গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, ভেড়া ইত্যাদি) বিতরণ করা হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা দারিদ্র্যবিমোচনের মূল ম্যান্ডেট হলো পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ সমবায়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ মডেলের আওতায় এই ধরনের কাজ করে থাকে। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনুদান হিসেবে উপকরণ সহায়তা দিয়ে টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন কতোখানি ফলপ্রসূ তার জন্য ক্ষুদ্রঋণ মডেলের সঙ্গে কোনো তুলনামূলক বিশ্লেষণ সমীক্ষায় উল্লেখ নেই।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, পার্বত্য জেলার প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি করা। কিন্তু সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনে পার্বত্য জেলাগুলোর প্রাণিজ আমিষের চাহিদা বা ঘাটতি এবং সরবরাহের তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। স্টাডি রিপোর্টে সারা দেশের দুধ, মাংস এবং ডিমের চাহিদা, উৎপাদন ও প্রাপ্যতার একটি তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। যেখানে দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় মাংস ও ডিমের উৎপাদন বেশি রয়েছে এবং দুধের উৎপাদনে কিছুটা ঘাটতি আছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য এলাকার প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া, কবুতর ইত্যাদি বিতরণের যৌক্তিকতা প্রতীয়মান হয় না বলে মনে করে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের দ্বিতীয় কম্পোনেন্টটি হলো রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত পিগ ফার্ম আধুনিকীকরণ। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত পিগ ফার্মটি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীন প্রতিষ্ঠান এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা। তাই রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত পিগ ফার্মটি উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে করতে হবে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের তৃতীয় কম্পোনেন্টটি হলো বান্দরবান জেলায় একটি ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলএসটি) স্থাপন করা। এই আইএলএসটি স্থাপনের বিষয়ে প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডিতে প্রস্তাব করা হলেও ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্টের ডিমান্ড অ্যানালাইসিস অংশে বাংলাদেশ লাইভ স্টক ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটদের কোন কোন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ রয়েছে সেটি নেই। এসব ক্ষেত্রে কি পরিমাণ ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েটের চাহিদা রয়েছে, বর্তমানে প্রতি বছর কি পরিমাণ ডিপ্লোমা গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য উল্লেখ নেই। ফলে অসম্পূর্ণ ফিজিবিলিটি স্টাডির ভিত্তিতে প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ডিপিপিতে নানা অসঙ্গতি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা তাদের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কমিশন থেকে বেশ কিছু সুপারিশ দেয়া হয়েছে। ডিপিপি সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হবে।

Saturday, October 26, 2024

অভিজ্ঞতা আছে তবুও বিদেশ ভ্রমণ by মো. আল-আমিন

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করে আসছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই প্রকৌশল সংস্থাটি। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা থাকার পরও পরামর্শক নিয়োগ ও বিদেশে প্রশিক্ষণ খাতে এখনো কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে এলজিইডি’র। সম্প্রতি দেশের ৬টি সিটি করপোরেশন ও ৮১টি পৌরসভার অবকাঠামোর উন্নয়নে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ প্রকল্পের অধীনে এসব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি পার্ক, লাইব্রেরি নির্মাণ ও জলাধার তৈরি করা হবে। এই প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অভাবনীয় ব্যয় প্রস্তাবের কারণে প্রকল্পটির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যয়ের এসব অসঙ্গতির বিষয়ে আপত্তিও জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। যদিও গত ৭ই অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘রিজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ (আরইউটিডিপি) শীর্ষক এই প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নিজেদের দক্ষতা থাকার পরও ঋণের টাকায় দেশি-বিদেশি পরামর্শক এবং বিদেশ ভ্রমণের পেছনে এতবড় অঙ্কের টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা অযৌক্তিক।

পিইসি সভায় অতিরিক্ত ব্যয় ও অপ্রয়োজনীয় খাত নিয়ে প্রশ্ন: উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৯০১ কোটি ২২ লাখ টাকা। যার মধ্যে ৪ হাজার ২৫৯ কোটি ৬০ লাখ দেবে বিশ্বব্যাংক। বাকি ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৬২ লাখ দেবে সরকার। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন। তবে আলোচ্য প্রকল্পের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পিইসি সভার কার্যপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পটিতে পরামর্শক খাতে ৩১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে কার্যপত্রে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সাধারণত পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, ফুটপাথ, ড্রেন নির্মাণ, স্ট্রিট লাইট স্থাপন কার্যক্রমগুলো করে থাকে। সে অভিজ্ঞতার আলোকে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কার্যক্রমগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব। তারপরও এত সংখ্যক বিদেশি ও দেশি পরামর্শক প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নেই। কার্যপত্রে অতি প্রয়োজন ছাড়া পরামর্শক খাতে যথাযথভাবে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এদিকে বিদেশে প্রশিক্ষণ খাতে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়ার বিষয়েও একই অভিমত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। বলছে, প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ করা হবে, সেগুলো এলজিইডি’র নিয়মিত কাজ। এই কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বৈদেশিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। তাই প্রকল্প থেকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বাদ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। অন্যদিকে প্রকল্পটিতে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ বাবদ প্রায় ২০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণ কাদের দেয়া হবে এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা, সেটিও জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ খাতে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যেটিকে অত্যধিক উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলা হয়।
ওদিকে কমিশন সূত্র বলছে, প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৬১৩টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এত সংখ্যক গাড়ি কেনার প্রস্তাবের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের। গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের সুপারিশ ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও এত গাড়ি কেনার যৌক্তিকতা নিয়েও আপত্তি তোলে পরিকল্পনা কমিশন।  প্রকল্পের আওতায় অফিস সরঞ্জাম হিসেবে ৪০০ সেট কম্পিউটার বাবদ ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ৭০টি ল্যাপটপ বাবদ ১ কোটি ৭ লাখ, ১০০ ফটোকপিয়ার বাবদ ২ কোটি এবং ১২টি প্রজেক্টর বাবদ ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া এলজিইডি’র দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ৩৯০ সেট কম্পিউটার বাবদ ৭ কোটি ৪০ লাখ, একটি মাল্টি ফাংশন প্রিন্টার বাবদ ১ লাখ, একটি ফটোকপিয়ার বাবদ লাখ টাকা, ফার্নিচার বাবদ ৮০ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি এবং ফার্নিচার কেনার প্রস্তাবেও আপত্তি ছিল পরিকল্পনা কমিশনের। এত আপত্তি সত্ত্বেও প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রকল্প সম্পর্কে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ডিপিপিতে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী নগরসমূহে স্থানান্তরিত হচ্ছে। দেশের পৌরসভাগুলোতে অবকাঠামো, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনসহ পরিবেশ দূষণের সমস্যা রয়েছে। এ সকল সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন সময় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এমজিএসপি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৪টি সিটি করপোরেশন ও ২৪টি পৌরসভার অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। উক্ত প্রকল্পের ফলো-আপ প্রকল্প হিসেবে রিজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আরইউটিডিপি) প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়। সেক্ষেত্রে একই ধরনের প্রকল্প আগে করা হলেও নতুন করে পরামর্শক ও বিদেশে প্রশিক্ষণ খাত থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশেষজ্ঞরা।  

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত প্রতিটি প্রকল্প খতিয়ে দেখা। কোনোভাবেই টাকা অপচয় করা যাবে না। অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এখনো পরামর্শক ও বিদেশে প্রশিক্ষণ খাতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ খরচ করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পালন করা গোপাল কৃষ্ণ দেবনাথের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তখন তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।

Friday, October 11, 2024

নিত্যপণ্যে নাভিশ্বাস দাম কমবে কবে? by মো. আল-আমিন

চাল, তেল, চিনি, ডিম, আলু, মাংস, সবজিসহ নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছেন স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে স্বস্তি দেয়ার উপায় হিসেবে কয়েকটি পণ্যের শুল্ক ছাড় দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় এক মাস পর গত ৫ই সেপ্টেম্বর প্রথমে আলু ও পিয়াজের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পণ্য দু’টির শুল্ক ছাড় দেয় সরকার। আলু আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে প্রযোজ্য ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। একই সঙ্গে পিয়াজের ওপর প্রযোজ্য ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা হয়। অথচ সেপ্টেম্বরে এসব পণ্যের দাম না কমে উল্টো আরও বেড়ে যায়। ৫ই সেপ্টেম্বরের আগে বাজারে প্রতি কেজি পিয়াজের দাম ছিল ১০৫ থেকে ১২০ টাকা। শুল্ক কমানোর পর পিয়াজের দাম হয় ১১০ থেকে ১২০ টাকা। অন্যদিকে শুল্ক ছাড়ের পর আলুর দামও কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। ফলে সরকার শুল্ক কমালেও তার সুফল ভোক্তার ভাগ্যে না জুটলেও ব্যবসায়ীরা তার সুফল তুলে নিয়েছে।

এদিকে একের পর এক পণ্যের দাম বাড়ায় নাভিশ্বাস অবস্থা সাধারণ ক্রেতার। সম্প্রতি কাঁচা পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় বাজারে মানুষের ভোগান্তি নতুন করে বাড়িয়েছে। বন্যা ও বৃষ্টির অজুহাতে শাক-সবজির দাম বেড়েছে অনেক। এ ছাড়া ডিমের বাজারেও চলছে তুঘলকি কারবার। এখন আমদানি করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানি শুল্ক কমানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

ওদিকে চিনির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার লক্ষ্যে আমদানি পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক অর্ধেক কমিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানায়, অপরিশোধিত ও পরিশোধিত উভয় প্রকার চিনি আমদানির ওপর বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। তাই এবার প্রশ্ন উঠেছে, শুল্ক কমানোর সুফল ভোক্তার ভাগ্যে জুটবে কি-না। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার যদি শুল্ক কমিয়ে এবং দাম নির্ধারণ করেই হাত গুটিয়ে বসে থাকে তাহলে এর সুফল ভোক্তারা এবারো পাবেন না। এজন্য বাজার তদারকি করতে হবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটা না করা গেলে এবারো ব্যবসায়ীরাই সুফল তুলে নেবে।  

এর আগেও শুল্ক কমার সুফল পায়নি ভোক্তারা: চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে চিনি, চাল, তেল ও খেজুরের শুল্ক কমিয়েছিল সরকার। কিন্তু তখন বাজারে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। উল্টো দফায় দফায় এসব পণ্যের দাম বাড়তে দেখা গেছে। শুল্ক কমানোর পর প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৭০ থেকে ১৭৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। আর খোলা চিনির কেজি ১৪০ থেকে ১৪৫ এবং প্যাকেটজাত চিনি ১৪৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। এ ছাড়া সাধারণ মানের খেজুর বিক্রি হচ্ছিল ২৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। অন্যদিকে শুল্ক কমানোর আগে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম একই ছিল। তবে কম ছিল চিনির দাম। শুল্ক কমার আগে প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। আর প্রতি কেজি সাধারণ মানের খেজুরের দাম ছিল ২৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। এদিকে গত বছরের অক্টোবরেও অপরিশোধিত চিনি আমদানিতে শুল্ক ৩ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা করেছিল সরকার। আর পরিশোধিত চিনির শুল্ক ৬ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৩ হাজার টাকা করেছিল। সরকার তখন প্রতি কেজি খোলা চিনির মূল্য নির্ধারণ করে দেয় ১৩০ টাকা, আর প্যাকেটজাত চিনি ১৩৫ টাকা। অথচ শুল্ক কমানোর পর তখন কেজি প্রতি চিনির দাম ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা হয়ে যায়। এর আগে সয়াবিন তেল ও পাম অয়েলেরও শুল্ক কমানো হয়। আগের বছর সয়াবিন ও পাম অয়েল স্থানীয় উৎপাদন পর্যায় এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরোপিত ২০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করেছিল সরকার। এ ছাড়া আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ১৫ থেকে ১০ শতাংশ কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। সব মিলিয়ে ভোজ্য তেলে ৩০ শতাংশ শুল্ক কমানো হয়েছিল। ফলে ভোক্তার মনে আশা জেগেছিল ভোজ্য তেলের দাম লিটারে ৩০ টাকা পর্যন্ত কমবে। কিন্তু ৩০ শতাংশ শুল্ক কমানোর পরও লিটারে সয়াবিন তেলের দাম কমানো হয় মাত্র ৮ টাকা। ফলে শুল্ক কমানোর সুফল কখনোই পাচ্ছেন না ভোক্তারা।

এবার কী বাজারে শুল্ক ছাড়ের প্রভাব পড়বে: এবারো শুল্ক ছাড়ের সুবিধা ভোক্তারা পাবেন না বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সরকার পরিবর্তন হলেও আমলারা তাদের জায়গায় ঠিকই বসে আছেন। তারা আগের সরকারের আমলেও নানাভাবে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিয়েছেন এবং নিজেরাও সুবিধা নিয়েছেন। ভোক্তাদের কথা তারা কখনোই চিন্তা করে না। ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে গত মাসে ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম বেশি করে নির্ধারণ করা হয় বলেও জানান বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, সরকার যদি শুল্ক কমিয়ে এবং দাম নির্ধারণ করেই বসে থাকে তাহলে এর সুফল ভোক্তারা এবারো পাবে না। প্রতিবারের মতো ব্যবসায়ীরাই লাভবান হবে। ২৯টি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হলেও তার প্রভাব বাজারে দেখতে পারছি না। তিনি বলেন, শুল্ক কমার সুফল ভোক্তারা তখনই পাবেন, যখন সরকার মনে করবে তাদের দায়িত্ব শুধু শুল্ক কমানো আর দাম নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। তাদের দায়িত্ব নিয়মিত বাজার তদারকি করা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করা। এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও আগে থেকে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিয়ে আসা আমলারা এখনো রয়ে গেছে। তারাও ব্যবসায়ীদের থেকে অনেক সুবিধা নিয়ে আসছে। সেহেতু আমলারা আগের জায়গা থেকে সরে আসতে পারছে না। বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ট্যারিফ কমিশন ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ করে জিনিসের দাম বাড়িয়ে থাকে। প্রতিযোগিতা কমিশন নামে থাকলেও কাজে নেই। এ ছাড়া ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও ঠিকঠাক কাজ করতে পারছে না। এজন্য আগের মতোই নিয়ন্ত্রণহীন বাজার। 

mzamin

Sunday, October 6, 2024

নিয়ন্ত্রণহীন বাজার নেপথ্যে কী by মো. আল-আমিন

এক মাসের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। ফার্মের মুরগির ডিমের দাম হালিপ্রতি বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত। ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। খোলা পামঅয়েল ও সুপার তেলের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা পর্যন্ত। সাধারণের নাগালের বাইরে রয়েছে পিয়াজ ও রসুনের দাম। শাকসবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এ ছাড়া সরকার থেকে কয়েকটি পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলেও তার চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এভাবে পণ্যের দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে যৌক্তিক কোনো কারণ দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, অসৎ ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের কারসাজির জন্যই মূলত পণ্যমূল্য বাড়ছে। পণ্যের দাম বাড়ার অন্য কোনো কারণ নেই। এটা নিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকে কাজ করতে হবে। ব্যবসায়ীদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভোক্তারা।

তারা বলছেন, সরকার বদলালেও বাজারের দৃশ্যপট বদলায়নি। এখনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কব্জায় রয়েছে বাজার। আমরা পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদাসীনতা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের কষ্ট কমেনি।
গতকাল রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে পামঅয়েল সুপারের দাম লিটারে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রতিলিটার পামঅয়েলের দাম ছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। সেটি এখন বেড়ে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। এ ছাড়া বোতলজাত সয়াবিন তেল সরকার থেকে ১৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও তা বিক্রি হচ্ছে ১৭০ টাকায়। আর খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৪৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলের পাশাপাশি আটার দামও বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরায় প্রতি কেজি খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকায়। খোলা ময়দার দাম ৬০ টাকা। আর দুই কেজির প্যাকেট আটার দাম ১১০ টাকা। আর গত মাসে আটার কেজি ছিল ৩৮ থেকে ৪০ টাকা। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে আটার দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা। যদিও এই সময় বিশ্ববাজারে গমের দাম ছিল নিম্নমুখী। বিশ্বব্যাংকের পিঙ্কশিটের তথ্যমতে, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গমের টনপ্রতি দাম উঠে যায় ৩৮১ ডলারে। পরে তা কমতে থাকে। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজারে টনপ্রতি গমের দাম ছিল ২৯৮ ডলার। আর চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে টনপ্রতি দাম কমে দাঁড়ায় ২৩৭ ডলার। জুলাইয়ে আরও ১৯ ডলার কমে হয় ২১৮। আর আগস্টে বিশ্ববাজারে টনপ্রতি গমের দাম ছিল ২০৫ ডলারের কিছু বেশি। অর্থাৎ গমের দাম ক্রমাগত কমেছে। দেশে আমদানি করা গম আসতে গড়ে দুই মাস সময় লাগে। সে হিসাবে আগস্টে বিশ্ববাজারে হ্রাস পাওয়া দামের প্রভাব অক্টোবরের শুরুতে বাজারে পড়ার কথা। কিন্তু বাজারে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।

এদিকে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে ডিমের বাজারে। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে পণ্যটির দাম। বাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকায়। এক মাস আগে প্রতি ডজন ডিমের দাম ছিল ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। অন্যদিকে বাজারে ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৯০ টাকায়। যদিও সরকার ব্রয়লার মুরগির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ১৭৯ টাকা ৫৯ পয়সা। অন্যদিকে সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ২৯০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে বাজারে চালের দাম ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে বাজারে সব ধরনের সবজির সরবরাহ থাকলেও দাম আগের মতোই চড়া। সবজির বাজার ঘুরে দেখা যায়- শিম, ফুলকপি, পাতাকপি, মুলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটোল, ঝিঙা, করলা, টমেটো, শসা, গাজরসহ সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে। ৫০ টাকার নিচে প্রায় কোনো সবজিই মিলছে না। এ ছাড়া পিয়াজ ১১০ থেকে ১২০ টাকা, দেশি আদা ৫০০ টাকা, দেশি রসুন ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

ডিমের দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে: ডিমের দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে বহুজাতিক কোম্পানি এবং রাজধানীর তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতিকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি এসোসিয়েশন (বিপিএ)। সংগঠনটির সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেছেন, সারা দেশে ডিমের বাজারে অস্থিরতা চলছে। যার প্রেক্ষিতে ডিম-মুরগির দামও নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কোনো প্রান্তিক খামারিকে ডিম-মুরগির দাম নির্ধারণের ওয়ার্কিং গ্রুপ কমিটিতে রাখেনি। তারা শুধু কর্পোরেট গ্রুপদের পরামর্শে দাম নির্ধারণ করেছে। যার ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবার এর জন্য ফিড ও মুরগির বাচ্চার উৎপাদনকারী কোম্পানি, তাদের এসোসিয়েশন এবং তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতিসহ আরও অনেকের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে। তিনি বলেন, ডিম আর মুরগির বাজারে স্বস্তি রাখতে পোল্ট্রি ফিড ও মুরগির বাচ্চার সিন্ডিকেট ভেঙে ডিম-মুরগির উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে শিগগিরই বাজার সহনীয় পর্যায়ে আসবে।

বাজার বিশ্লেষকরা যা বলছেন: নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, অসৎ ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের কারসাজির জন্যই মূলত পণ্যমূল্য বাড়ছে। এ বিষয়ে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, বিশ্ববাজারে বেশকিছু পণ্যের দাম কমেছে। কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রভাব নেই। বরং উল্টো জিনিসের দাম বেড়েছে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কথায় পরিবহন চাঁদাবাজি কমেছে। তাহলে সেই প্রভাব বাজারে নেই কেন? এ ছাড়া ২৯টি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হলেও তার প্রভাবও বাজারে দেখা যাচ্ছে না। আগের কারবার এখনো চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে না। ট্যারিফ কমিশন ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ করে জিনিসের দাম বাড়িয়ে থাকে। প্রতিযোগিতা কমিশন নামে থাকলেও কামে নেই। এ ছাড়া পুলিশ প্রটেকশন না পাওয়ায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও ঠিকঠাক কাজ করতে পারছে না। এজন্য আগের মতোই নিয়ন্ত্রণহীন বাজার। ভোক্তাদের জীবন চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো যা বলছেন: তবে বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর দাবি পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে তারা নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বাজারে বিভিন্ন পণ্যের কেনাবেচায় সুস্থ প্রতিযোগিতা উৎসাহিত করতে ও অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সদস্য মো. হাফিজুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার থেকে আমাদের কার্যক্রম ঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পানির দাম বৃদ্ধির কারণে কিছুদিন আগেই আমরা একটি মামলা করেছি। এর প্রভাব বাজারে দেখা গিয়েছে। ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে আমাদের টিমও বাজারে কাজ করছে। দ্রব্যমূল্যের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসা হবে বলেও জানান তিনি। এদিকে পণ্যের মূল্য বাড়াতে হলে তার যৌক্তিক কারণ অবহিত করার নিয়ম রয়েছে ট্যারিফ কমিশনকে। কোম্পানির পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি সঠিক মনে না হলে কোনো কোম্পানি তার পণ্যের দাম বাড়াতে পারে না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ট্যারিফ কমিশনকে অবহিত না করে বাড়ানো হচ্ছে নানা প্রকার আমদানি পণ্যের দাম। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মইনুল খান মানবজমিনকে বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ে সরকার আমাদের থেকে পরামর্শ নিয়েছেন। কাজ চলছে। দ্রুতই আপনারা এর প্রতিফলন দেখতে পারবেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাজার তদারকি সংস্থা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছি। ব্যবসায়ীরা একেক সময় একেক অজুহাত দেখিয়ে দাম বাড়ায়। এবার জিনিসের দাম বাড়ার কারণ হিসেবে তারা বন্যার অজুহাত দেখিয়েছে। তিনি বলেন, পরিবহন খাতে বেপরোয়া চাঁদাবাজি এখনো বন্ধ হয়নি। তবে কিছুটা কমেছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা জিনিসের সংকট সৃষ্টি করে দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

mzamin


Saturday, October 5, 2024

নির্ধারিত সময়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদে জটিলতা by মো. আল-আমিন

ভোটার তালিকা হালনাগাদ সংক্রান্ত জটিলতায় ২০২৫ সালের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ কর্মসূচি হাতে নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের (ইসি)  অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে কমিশন না থাকায় ভোটার হালনাগাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ইসি সচিব শফিউল আজিম বলেছেন, ২০০৯ সালে ভোটার তালিকা আইন অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ভোটার তালিকা হালনাগাদ শুরু হবে। আমাদের রুটিন আছে ২রা জানুয়ারি থেকে করা। এখন প্রতিদিনের ভোটার হালনাগাদ করছি। কমিশনের অনুমোদন ছাড়া ভোটার হালনাগাদ করা যায় না জানিয়ে তিনি বলেন, এটা কমিশনের কাজ। সুতরাং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত কমিশন নেবে। আমার লিগ্যাল অথরিটি নেই।

বর্তমানে কমিশনহীন ইসিতে আইনে নির্ধারিত রুটিন কাজগুলো করছেন ইসি সচিব শফিউল আজিম। আইন অনুযায়ী, কমিশনের অনুমোদনক্রমে প্রতিবছর দুই জানুয়ারি থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের পর যাচাই-বাছাই, দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তির পর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ২রা মার্চ প্রকাশের বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে জানুয়ারিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে হলে তার আগেই নতুন কমিশন নিয়োগ দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ে কমিশন গঠনের ঘোষণা দেয়। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলমের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশন কার্যক্রম শুরু করেছে। নতুন কমিশন নিয়োগ দিতে এখনো তিন মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। ফলে বিদ্যমান আইনানুযায়ী এই সময়ের মধ্যে নতুন কমিশনের পক্ষে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা কঠিন হয়ে যাবে। ইসি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে অন্তত ৬ থেকে ৮ মাস সময় লাগে। সাধারণত বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, যাদের তথ্য সংগ্রহ করা হয় তাদের ছবি তোলা এবং চোখের আইরিশ ও আঙ্গুলের ছাপ নেয়ার মতো কাজ শেষ করতে পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে এখনই নতুন কমিশন নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু ইসি সংস্কার কমিশন সুপারিশ রিপোর্ট না দেয়া পর্যন্ত পরবর্তী কমিশন গঠন করা যাচ্ছে না। ফলে পিছিয়ে যেতে পারে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। এতে ভোটার আইন সংশোধন ছাড়া ২০২৫ সালের মধ্যে নির্বাচন করতে পারবে না ইসি।

এ বিষয়ে ইসি’র একাধিক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে ২০২৫ সালেই জাতীয় নির্বাচন করার সুযোগ আছে। সেক্ষেত্রে ভোটার তালিকা আইন সংশোধনে অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন রাষ্ট্রপতি। নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়ে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে পারবে। সেটি পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকারের ইচ্ছার উপর।
তবে ভোটার তালিকা হালনাগাদের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের। ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ২১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো অনিবার্য কারণবশত কোনো নির্বাচনী এলাকায় বা, ক্ষেত্রমতো, ভোটার এলাকায় ভোটার তালিকা প্রস্তুতাকার্য সম্পন্ন করা সম্ভব না হইলে কমিশন, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত নির্বাচনী এলাকায় বা, ক্ষেত্রমতো, ভোটার এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থায় ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।’

এদিকে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। ইকুইপমেন্ট ঠিকঠাক আছে কিনা দেখা হচ্ছে। কমিশন থেকে আদেশ পেলেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করবে ইসি সচিবালয়। তবে এখনই কমিশন নিয়োগ না করা গেলে এই কার্যক্রম পিছিয়ে পরের বছরে চলে যেতে পারে। এতে জাতীয় নির্বাচনও পিছিয়ে যেতে পারে। ২০২২ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের কাছে ২০২৫ সালের ১লা জানুয়ারি পর্যন্ত ভোটারদের অ্যাডভান্স ডাটা রয়েছে। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারির পরের ডাটা ইসি’র কাছে নেই। সেক্ষেত্রে ভোটার হালনাগাদ না করে ২০২৫ সালের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হলে ভোটার উপযুক্ত কেউ যদি রিট করে তাহলে ভোট স্থগিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

mzamin

Wednesday, October 2, 2024

দ্বিগুণ খরচে ২৭৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প ফিরিয়ে দিলো পরিকল্পনা কমিশন by মো. আল-আমিন

মা ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিদায়ী সরকারের আমলে ২ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। প্রকল্পটির মাধ্যমে ৮তলাবিশিষ্ট ৬২টি নতুন মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের ঊর্ধ্বমুখী সমপ্রসারণ এবং প্রতিটি হাসপাতালে মেডিক্যাল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ ছিল। এই প্রকল্পে প্রতি বর্গফুট ভবন নির্মাণে ব্যয় প্রস্তাব করা হয় ৬ হাজার ৬৫৪ টাকা। অথচ সরকারেরই বিভিন্ন প্রকল্পে নতুন ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গফুটে ব্যয় পড়ে ২ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকার মতো। অন্যদিকে বেসরকারি ভবন নির্মাণেও প্রতি বর্গফুটে ব্যয় পড়ে ৩ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এজন্য নির্মাণ ব্যয় নিয়ে আপত্তি তুলে প্রকল্পটি ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ সূত্র জানায়, অত্যধিক ব্যয় প্রস্তাবের কারণে ডিপিপি সংস্কার করে পুনরায় পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ৮তলা বিশিষ্ট ৬২টি মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এ নির্মাণকাজে ২ হাজার ১৪২ কোটি ৯২ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৮৪ শতাংশ। প্রকল্পটির ভবন নির্মাণের জন্য প্রতি বর্গফুটে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ হাজার ৬৫৪ টাকা। অথচ বিভিন্ন প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নতুন ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গফুটে ব্যয় হয় ২ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ ভবন নির্মাণে দ্বিগুণ ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পের আওতায় ২৫ হাজার ৫৩৬টি আসবাবপত্র বাবদ ৪৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকার প্রস্তাব রয়েছে। আসবাবপত্রের সংখ্যা ও ব্যয় প্রাক্কলন অত্যধিক মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে। এছাড়া প্রাধিকার ভিত্তিতে আসবাবপত্র নির্ধারণ করা হয়নি। এক্ষেত্রে ১জন বহিঃসদস্যসহ কমপক্ষে ৩ সদস্যের একটি বাজারদর কমিটির মাধ্যমে পুনরায় প্রাধিকার বিবেচনায় আসবাবপত্রের সংখ্যা/পরিমাণ ও ব্যয় প্রাক্কলন করার পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এদিকে প্রকল্পের জন্য ৪ দশমিক ৪০ একর ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ১৮ কোটি ৪৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিপত্র অনুসারে প্রস্তাবিত জমির স্থিরচিত্র ডিপিপিতে রাখার নির্দেশনা থাকলেও তা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে গাজীপুর ও মানিকগঞ্জে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের বিভিন্ন ভবন সংস্কার/পুনঃনির্মাণে অত্যধিক ব্যয় ধরা হয়েছে।

এদিকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে জেলা পর্যায়ে মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এই কার্যক্রম পরিচালনায় যে সমস্যাগুলো সামনে আসে তার মধ্যে কয়েকটি হলো- পুরাতন ভবনগুলো অধিকাংশই ৫০ থেকে ৬০ বছরের পুরনো এবং জরাজীর্ণ। এছাড়া ভবনগুলো সর্বোচ্চ ১০ বা ২০ শয্যাবিশিষ্ট, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ডাক্তারের সংখ্যা কম এবং অন্যান্য সাহায্যকারীর সংখ্যা নিতান্তই অপর্যাপ্ত। জরুরি যন্ত্রপাতি ও প্যাথলজি ল্যাবেরও অভাব রয়েছে। এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জেলা শহরে বিদ্যমান মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রকে ৩০ শয্যা বিশিষ্ট (৫০ শয্যায় উন্নতীকরণযোগ্য) মা ও শিশু হাসপাতালে রূপান্তর প্রকল্প নামক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে স্বল্পমূল্যে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করাই এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় অত্যাধিক বলে মনে করছেন নির্মাণ খাত সংশ্লিষ্টরাও। তারা বলছেন, বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রতি বর্গফুটে ব্যয় হয় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মতো। সেক্ষেত্রে এই প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় অত্যধিক। বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জিনিসের গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে ব্যয়ের পার্থক্য থাকতে পারে। তবে প্রতি বর্গফুট ভবন নির্মাণে ৬ হাজার ৬৫৩ টাকা খরচ হওয়ার কথা না। ঢাকায় ভবন নির্মাণেও এত টাকা খরচ হয় না বলে জানান তিনি।   

এ বিষয়ে আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় অত্যধিক। এছাড়া আসবাবপত্রের সংখ্যা ও ব্যয় প্রাক্কলনও অত্যধিক মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে। এজন্য পরিকল্পনা কমিশন থেকে প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয়েছে। উদ্যোগী মন্ত্রণালয়কে সংস্কার করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) রেহানা পারভীন বলেন, সব প্রকল্পের ভবন নির্মাণ ব্যয় একই হবে তা ঠিক নয়। ভিন্নতা থাকতে পারে। তবে এক্ষেত্রে গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেট শিডিউল অনুসরণ করতে হবে। 

mzamin

Monday, September 30, 2024

নিজেদের জরিপেই ধরা পড়লো বিবিএস by মো. আল-আমিন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুরোর (বিবিএস) বিভিন্ন জরিপ ও শুমারির তথ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলে আসছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। সংস্থাটি থেকে জনসংখ্যা, মূল্যস্ফীতি, জিডিপি’র আকার-প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে অর্থনীতির প্রতিটি খাতেই ভুল ও প্রশ্নবিদ্ধ পরিসংখ্যান তৈরি ও উপস্থাপন করা হয় বলে মনে করেন তারা। এজন্য নিজেদের তথ্য কতোটা গ্রহণযোগ্য এবং স্টেক হোল্ডাররা তাদের তথ্য কীভাবে নিচ্ছেন, তার উপর যৌথভাবে একটি জরিপ চালায় বিবিএস ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। এ জরিপে উঠে এসেছে, বিবিএস’র তথ্য ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশই সংস্থাটির পরিসংখ্যান মানসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না।

জরিপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিবিএস’র মাধ্যমে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানের তথ্যে সন্তুষ্ট ২৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ ব্যবহারকারী। পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় ৫৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ, আর কিছুটা অসন্তুষ্ট ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে বিবিএস’র প্রকাশিত তথ্যে পুরোপুরি অসন্তুষ্ট ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ ব্যবহারকারী। এ ছাড়া ৩৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ ব্যবহারকারী মনে করেন বিবিএস’র তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়।

জরিপের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গুণগত মানের দিক থেকে পণ্যমূল্য এবং শ্রম পরিসংখ্যান নিয়ে সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে ব্যবহারকারী। তথ্য অনুযায়ী, পণ্যমূল্যের পরিসংখ্যানে সন্তুষ্ট মাত্র ২৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, আর পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় ৬০ দশমিক ১০ শতাংশ। অন্যদিকে শ্রম পরিসংখ্যানে সন্তুষ্ট ২৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন ৫৭ দশমিক ১৯ শতাংশ। এই দুই পরিসংখ্যানে ২০২২ সালের তুলনায় ব্যবহারকারীদের সন্তুষ্টি কমেছে। এ ছাড়া আয় ও দরিদ্র পরিসংখ্যানে সন্তুষ্ট ২৯ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন ৫৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর কিছুটা অসন্তুষ্ট ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ ও পুরোপুরি অসন্তুষ্ট ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ ব্যবহারকারী।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিবিএস’র অফিসিয়াল পরিসংখ্যানের সঠিকতা নিয়ে ৬৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ ব্যবহারকারী সন্তুষ্ট। আর ২৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ ব্যবহারকারী অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে ১০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহারকারীর তথ্যে সঠিকতা জানা যায় না। তথ্যের সঠিকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার পরিসংখ্যানে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন ব্যবহারকারীরা।

জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, বিবিএস’র পরিসংখ্যানের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে সন্তুষ্ট ৭৭ দশমিক ০৬ শতাংশ ব্যবহারকারী। অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে ১৭ শতাংশ ব্যবহারকারী। পরিসংখ্যানের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ধারণা নেই ৬ শতাংশ ব্যবহারকারীর।

অন্যদিকে বিবিএস’র পরিসংখ্যানের সময়োপযোগিতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট ব্যবহারকারীরা। জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিবিএস’র পরিসংখ্যানের সময়োপযোগিতা নিয়ে সন্তুষ্ট ৫৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ আর অসন্তুষ্ট ৩৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ ব্যবহারকারী। ৭ শতাংশের বেশি ব্যবহারকারীর এ বিষয়ে ধারণা নেই।

জরিপের ফলে দেখা যায়, বিভিন্ন পরিসংখ্যানগত ডোমেনের মধ্যে শিক্ষার পরিসংখ্যান সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। ৭৩ দশমিক ২১ শতাংশ ব্যবহারকারী এই ডেটার সঙ্গে জড়িত। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তথ্য ব্যবহার হয় জনসংখ্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান (৭২ দশমিক ১০ শতাংশ) এবং আয় এবং দারিদ্র্য পরিসংখ্যান (৬৮ দশমিক ৫২ শতাংশ) তৃতীয় সর্বোচ্চ।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ তথ্য ব্যবহারকারী জনসংখ্যা, জনসংখ্যাগত এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান বেশি ঘন ঘন ব্যবহার করে। তথ্য সংগ্রহের দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে আয় এবং দারিদ্র্য পরিসংখ্যান (৬০ দশমিক ৭৭ শতাংশ) এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় জাতীয় অ্যাকাউন্ট পরিসংখ্যান (৫৪ দশমিক ৯১ শতাংশ)। সবচেয়ে কম ব্যবহার হয় অপরাধ ও বিচার বিভাগীয় পরিসংখ্যান (৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার (১৭ দশমিক ১৮ শতাংশ)।

এসব তথ্য সংগ্রহের সিংহভাগই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নেয় ব্যবহারকারীরা। বিবিএস ওয়েবসাইট বা ডেটা পোর্টালে গিয়ে ৮৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ তথ্য সংগ্রহ করেছে, যেখানে ৪৮ দশমিক ১৬ শতাংশ এটি প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে পেয়েছে। ৪১ দশমিক ২৬ শতাংশ বিনামূল্যে পেয়েছে।

mzamin

Thursday, September 26, 2024

ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প: প্রতি মিনিটের অডিও ভিডিও খরচ ২০ হাজার, আপত্তি পরিকল্পনা কমিশনের by মো. আল আমিন

দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে ‘ই-জুডিশিয়ারি’- নামের একটি প্রকল্প প্রস্তুত করে আইন ও বিচার বিভাগ। দুই হাজার ৬২৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার প্রকল্পটির কিছু খাতে অস্বাভাবিক ব্যয় ধরা হয়। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় কিছু খাত যুক্ত করা হয়। এ সব নিয়ে আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ। সূত্র বলছে, প্রকল্পটিতে প্রতি মিনিট অডিও-ভিডিও বা চিত্রতথ্য নির্মাণের জন্য ২০ হাজার টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। মাত্র ২০ মিনিটের একটি অডিও বা ভিডিও নির্মাণে ব্যয় হবে ৪ লাখ টাকা। এই খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রকল্পের উপদেষ্টার জন্য চার কোটি টাকা ব্যয়ে জিপ গাড়ি কেনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটি বাদ দিতে বলা হলেও পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাবনায় তা বাদ দেয়া হয়নি। অন্যদিকে অফিস স্টেশনারি, অফিস ভাড়া, পরামর্শক সেবা, পেট্রোল, গ্যাস ও জ্বালানি, কম্পিউটার সামগ্রী, কম্পিউটার মেরামত, যানবাহন সংরক্ষণ ও মেরামত ইত্যাদি ব্যয় আরও পর্যালোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ ও বছরভিত্তিক বিভাজন দেখানোর কথা বলা হয়েছিল আইন ও বিচার বিভাগকে। কিন্তু পুনর্গঠিত প্রকল্প প্রস্তাবনায় সেই প্রস্তাবও মানা হয়নি।

এদিকে সেমিনারের ব্যয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী ধরা হয়নি বলেও জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। এছাড়া ইলেকট্রিক আর্চওয়ে, এক্স-রে ব্যাগেজ স্ক্যানার ও নিরাপত্তা অঙ্গে ১০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এসব যন্ত্রপাতির কারিগরি বৈশিষ্ট্য ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়নি। এসব সরঞ্জাম ই-জুডিশিয়ারি কার্যক্রমের সঙ্গে কতটুকু সম্পর্কিত, প্রশ্ন উঠেছে সেটি নিয়েও।
ই-কোর্ট রুমের সম্পূর্ণ বিচারিক কার্যক্রম সিসি ক্যামেরা ও ভিডিও রেকর্ডিং এর আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব নিয়ে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ বলেছে, বিচারিক কার্যক্রমে বাদী-বিবাদীর বক্তব্য, জেরা তাদের ছবির প্রাইভেসি রাখার ক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরা ও অডিও-ভিডিও অন্তরায় হতে পারে। ফলে প্রাইভেসি বিবেচনায় এগুলো রাখা ঠিক হবে কিনা আলোচনা হতে পারে।
প্রকল্পের পরামর্শক সেবা খাতেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। পরামর্শক সেবা, টেকনিক্যাল পরামর্শক সেবা ও আইনি পরামর্শক সেবা নামের তিনটি অঙ্গে যথাক্রমে ১৭ কোটি ৩১ লাখ, ৬ কোটি ৩৩ লাখ ও ৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চতর প্রশিক্ষণ খাতে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ই-জুডিশিয়ারি অনেক বড় একটি প্রকল্প। প্রকল্পটির বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কিছু অঙ্গের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয় নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলেছি। অহেতুক ব্যয়ের কোনো সুযোগ নেই।

অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি অর্থায়নের প্রকল্প অগ্রাধিকার দিচ্ছে জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কিছু কর্মকর্তা বলেন, ই-জুডিশিয়ারি সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নের প্রকল্প। সেক্ষেত্রে প্রকল্পটি এখনই একনেকে অনুমোদন নাও হতে পারে।
আইন ও বিচার বিভাগ বলছে, নাগরিকদের আইনি অধিকার নিশ্চিতকরণে এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থার বিকল্প নেই। কিন্তু সীমিতসংখ্যক বিচারক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী, গতানুগতিক পদ্ধতির বিচার কার্যক্রম ইত্যাদি কারণে যথাসময়ে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন ও রায় প্রদান করা সম্ভব হয় না। এমন অবস্থায় মামলার জট বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিচার কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার জন্য এবং বিচার প্রাপ্তিতে জনগণের প্রবেশাধিকার সহজলভ্য করার জন্য বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করা জরুরি। পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটির উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, বিচার ব্যবস্থার জন্য প্রশাসনিক এবং বিচার কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা, ই-আদালত কক্ষ প্রতিষ্ঠা করা এবং আইসিটি’র জ্ঞান ও দক্ষতা দ্বারা বিচারক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইনজীবীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

এদিকে মাত্র পিইসি সভায় উত্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও ই-জুডিয়িশারি প্রকল্পটি নতুন নয়। ২০১৬ সালের ১২ই জুলাই ওই সময়কার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পটি ৩২৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে দেশের নির্বাচিত কয়েকটি জেলার বাস্তবায়নের জন্য একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়। ওই সভায় উদ্যোগী মন্ত্রণালয় হিসেবে আইন ও বিচার বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে যৌথভাবে উপস্থান করে প্রকল্প এলাকার পরিধি বিস্তৃত করে সারা দেশে বাস্তবায়নের জন্য অন্যান্য সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। পরে আইন ও বিচার বিভাগ বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কারিগরি সহায়তায় ই-জুডিশিয়ারি পাইলট প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রস্তুত করে। ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাস্তবায়নের মেয়াদ রেখে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয় প্রকল্পটি। ২০১৮ সালের ১৪ই নভেম্বর প্রকল্পটি নিয়ে পিইসি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এরপর আর তেমন অগ্রগতি ছিল না প্রকল্প নিয়ে। দীর্ঘ  ৬ বছর পর প্রকল্পটি নিয়ে আবারো তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে জানতে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. গোলাম রব্বানীর সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

mzamin

Monday, September 23, 2024

ফেরত যাচ্ছে শতাধিক প্রকল্প by মো. আল-আমিন

প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শেখ হাসিনা সরকারের নেয়া প্রকল্পগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতি পুনরায় পর্যালোচনা করছে পরিকল্পনা কমিশন। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে আলাদাভাবে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় চূড়ান্ত হওয়া প্রকল্পগুলো আবারো যাচাই করা হচ্ছে। নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রেও গ্রহণ করা হচ্ছে একই নীতি। ফেরত পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের শতাধিক নতুন প্রকল্প। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ নতুন প্রকল্পগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকল্পগুলোর কোনো অংশ পরিবর্তন কিংবা সংযোজন-বিয়োজন লাগলে ডিপিপি সংশোধনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। পুনর্যাচাইয়ে যেসব প্রকল্পে ত্রুটি পাওয়া যাবে না, সেগুলো উপদেষ্টার নজরে আনার নির্দেশনা রয়েছে।

সূত্র আরও বলছে, পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন বিভাগ থেকে শতাধিক প্রকল্প বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ থেকে ৩৫ থেকে ৪০টি প্রকল্প, কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ২০-২২টি প্রকল্প, শিল্প ও শক্তি বিভাগ থেকে ১৫টি প্রকল্প এবং আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ থেকে ১০-১৫ প্রকল্প ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পগুলোর ত্রুটি-বিচ্যুতি পুনরায় পর্যালোচনা করার পর সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে বলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, বিদায়ী সরকারের আমলে চাপে পড়ে ঠিকমতো পর্যালোচনা না করেই অনেক প্রকল্প একনেকে পাঠানো হয়েছে। একনেকে পাঠানো পাস না হওয়া প্রকল্পগুলো আবারো ফেরত পাঠানো হচ্ছে। সেগুলো আবারো যাচাই করা হবে। দুর্বলতা আছে কিনা দেখা হবে। এসব প্রকল্পের সঠিক পর্যালোচনা করলে খরচ অনেক কমে আসবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভৌত অবকাঠামো বিভাগ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ৮টি প্রকল্প ফেরত পাঠানো হয়েছে। এসব প্রকল্প পুনরায় যাচাই-বাছাই করে পাঠাতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন প্রকল্পগুলো আবারো পর্যালোচনা করা হবে। শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্পগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এতদিন কার স্বার্থে এই ধরনের প্রকল্পগুলো নেয়া হয়নি জানি না। গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্পগুলো নেয়া হলে আমাদের বেশি দামে গ্যাস আমদানি করার প্রয়োজন হতো না।

ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) সোলেমান খান বলেন, আগের সরকারের আমলে গ্রহণ করা প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু এবং প্রকল্পের টাকা কোন জায়গা থেকে আসবে, এগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। আসলে বোঝার জন্যেই এটা করা দরকার।

এদিকে গত বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিগত সরকারের সময়ে একনেক সভায় বিপুলসংখ্যক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রকল্পও থাকতো। এখন সেসব যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। দেশীয় অর্থায়নের চেয়ে বিদেশি অর্থায়ন পাওয়া যাবে এমন প্রকল্প গ্রহণে গুরুত্ব দেয়া হবে বলেও জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা। 

mzamin

Saturday, September 14, 2024

তাদের অবিচল লড়াই by মো. আল আমিন

সুজন, টিআইবি, সিপিডি, সিজিএস, মায়ের ডাকসহ নানা সংগঠন গণতন্ত্র, সুশাসন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কেউ কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিল উচ্চকণ্ঠ। এসব করতে গিয়ে তারা হয়েছেন নির্যাতিত। তারপরও হাল ছাড়েননি। চালিয়ে গেছেন লড়াই। বিশেষ করে গত ১৬ বছর তাদের লড়াই ছিল জনতার পক্ষে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে কথা বলে গেছেন-

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন): দেশের সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সুজন। আওয়ামী স্বৈরশাসনামলে হুমকি, হামলা এবং চাপের  মুখেও নাগরিক ইস্যুতে সরব ভূমিকা রেখেছে সংগঠনটি। শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের নানাচিত্র প্রতিনিয়ত তুলে ধরেছে নাগরিকের সামনে। এতে নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়েছে সংগঠনটির। সুজনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হলেন উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন, উন্নয়ন ও সুশাসন নিয়ে তিনি দেশের সুশীল সমাজের অন্যতম সরব কণ্ঠ। নাগরিক ইস্যুতে কথা বলার কারণে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের বিরাগভাজন হয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থা থেকে হুমকি দেয়া, এনজিও ব্যুরো থেকে হয়রানি করা, তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থা সুজন বন্ধ করে দেয়া, সংস্থার অনুদান বন্ধ করে দেয়া এবং ওয়েবসাইট হ্যাক করা, স্বজনদের হয়রানিসহ অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করেই সমাজের প্রয়োজনে কাজ করে গেছেন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বদিউল আলম মজুমদার।

ওদিকে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসন নিয়ে তথ্য প্রকাশ করার ফলে সরকারের রোষানলে পড়তে হয় সংস্থাটির। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত টিআইবি’র প্রতিবেদনকে একপেশে, সরকারবিরোধী, অযৌক্তিক ও গোঁজামিলে ভরা বলে দাবি করে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বলেন, বিএনপি’র ভাষায় কথা বলে টিআইবি। বিএনপি’র ওকালতি করতেই এই রিপোর্ট। এ ছাড়া টিআইবি’র অন্য প্রতিবেদন নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছে সরকার। তবে সরকারের চাপের মধ্যেও নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ করে গেছে সংস্থাটি। সর্বশেষ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে টিআইবি। সেইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সকল দাবি মেনে নেয়ারও আহ্বান জানায় তারা। এদিকে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ডিবিতে আটক ছয় সমন্বয়কসহ অন্যদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার দাবিতে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও মানববন্ধনে অংশ নেন তিনি। তাকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
: ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি গবেষণা ও পলিসি ডায়ালগের মাধ্যমে দেশের নীতিনির্ধারণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। বিগত ১৬ বছর শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে নিরপেক্ষ চরিত্র ধরে রেখেছে বেসরকারি এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নেয়া ভুল পদক্ষেপগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সমালোচনা থেমে ছিল না। এতে সরকারের রোষানলে পড়তে হয় তাদের। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ সিপিডি’র প্রতিবেদনকে নির্জলা মিথ্যাচার বলে আখ্যা দেন। সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকও সিপিডি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনতে জরিপ করে সিপিডি। এ ছাড়া খোদ শেখ হাসিনা সিপিডি’র নাম না করে তাদের প্রতিক্রিয়াকে ‘ভালো না লাগা’ পার্টি বলে আখ্যা দেন। বেসরকারি এই গবেষণা সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো হলেন- বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র জানতে গত ২৮শে আগস্ট একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমানও। এ ছাড়া সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অর্থনীতিবিদ তৌফিকুল ইসলাম এবং গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অর্থনীতি নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে সবসময় সমালোচনা করে এসেছে সংস্থাটির এই গবেষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ২০১৪ সালে গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন কোটা সংস্কার ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এই নেটওয়ার্কটি সবার দৃষ্টি কাড়ে। চব্বিশের জুলাইতে দ্বিতীয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই প্ল্যাটফরমটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৪ই জুলাই একটি সংবাদ সম্মেলনে বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে হাসিনার অবমাননাকর মন্তব্যের পরে আন্দোলনটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পরের দিন, ছাত্রলীগের ও পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মমভাবে হামলা চালায়, ফলে সারা দেশে ছয়জন শিক্ষার্থী নিহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায়, ছাত্রলীগের সদস্যদের ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করা হয়, যার জেরে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেয়। ১৬ই জুলাই রাতের মধ্যে, ছাত্রাবাসগুলো জোরপূর্বক খালি করা হয়েছিল। ১৭ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ঢাবিতে শিক্ষকদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। হত্যাকাণ্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের নিন্দা জানিয়ে শত শত অধ্যাপক এতে যোগ দেন। এই প্রতিবাদ ছাত্র আন্দোলনকে আরও জোরদার ও নিপীড়ন মোকাবিলায় সহায়তা করে। বৈঠকের পর সংগঠনটির অধ্যাপকরা স্থানীয় থানা থেকে আটক ছাত্রদের উদ্ধার করেন এবং চিকিৎসা চলাকালীন শীর্ষ ছাত্র নেতাদের দ্বিতীয়বার আটক করার পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে ২৭শে জুলাই গোয়েন্দা অফিসে যান। ৩১শে জুলাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংগঠনের সদস্যরা একটি সমাবেশে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করার জন্য সাদা পোশাকের পুলিশদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়, যার জেরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২রা আগস্ট দ্রোহযাত্রায় (বিদ্রোহীদের  কুচকাওয়াজ) অংশ নেন ইউটিএন’র  সদস্যরা। যেখানে সিনিয়র সদস্য আনু মুহাম্মদ কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেন এবং হাসিনাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি বিভিন্ন নাগরিক ইস্যুতে সরব ছিল।

মায়ের ডাক হলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের শাসনামলে সরকারি সংস্থা কর্তৃক বলপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের প্ল্যাটফরম। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে প্ল্যাটফরমটি। মায়ের ডাকের অন্যতম সমন্বয়ক হলেন সানজিদা ইসলাম তুলি। যিনি প্ল্যাটফরমটির প্রতিষ্ঠাতা। তার ভাই বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস): বাংলাদেশভিত্তিক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, যা সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বিষয়ে গবেষণা ও মিডিয়া স্টাডি পরিচালনা করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংগঠনটি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সংলাপের আয়োজন করে আলোচনায় আসে সিজিএস। বিশ্বের ৭০টি দেশের গবেষক, শিক্ষক, লেখক, সমরবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। চ্যানেল আই-এর টক শো তৃতীয় মাত্রার জনপ্রিয় সঞ্চালক জিল্লুর রহমান এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সিজিএসের উদ্যোগে বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের নিয়ে মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর অনুষ্ঠান করেন জিল্লুর রহমান। ওই অনুষ্ঠানে আসা জাপানি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত বলেন, আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির কথা আমিও শুনেছি। এতে অনেকটা বেকায়দায় পড়ে যায় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপরই নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় জিল্লুর রহমান ও সিজিএসের কর্মকর্তাদের। তথ্য সংগ্রহের নামে জিল্লুর রহমানের পৈতৃক বাড়িতে যায় পুলিশ। এ ছাড়া জিল্লুর রহমানসহ সিজিএস সাবেক ও বর্তমান তিন কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সেখানে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় বিদেশ থেকে অর্থসহায়তা আসে কিনা, টাকা কীভাবে খরচ হয়। অন্যদিকে জিল্লুর রহমানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ। এ সময় সিজিএসের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়। তারপরও সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বিষয়ে সিজিএসের গবেষণা থেমে থাকেনি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক): মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা প্রদানকারী একটি বেসরকারি সংগঠন। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কর্মকৌশল দিয়ে আসছে। এই কর্মকৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি, সালিশ ও মামলার মাধ্যমে আইনি সহায়তা প্রদান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও মানবাধিকার গবেষণা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার সাহায্যে আইন ও নীতি সংস্কারের প্রয়াস এবং গণমাধ্যম ও নিজস্ব প্রকাশনার মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য প্রদান। বিগত ১৬ বছর আওয়ামী শাসনামলে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, বিচারের অপেক্ষায় কারাবাস, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন, বস্তি উচ্ছেদ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া বিগত সরকারের নেয়া প্রহসনমূলক আইনগুলোর সমালোচনা করেছে তারা। এতে এনজিও ব্যুরো থেকে হয়রানির শিকারও হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বন্ধ করে দেয়া হয় বিদেশি অনুদানের অর্থছাড়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট জেড আই খান পান্না।

ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ (এফবিএস): বাংলাদেশ অধ্যয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাডেমিক, বিশ্লেষক এবং গবেষকদের প্ল্যাটফরম। এই ফোরাম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংক্রান্ত সমসাময়িক বিষয়ের ওপর গবেষণা, মতামত এবং নীতি-নির্ধারণমূলক আলোচনার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে। এফবিএস গঠিত হয় ২০২২ সালে। এরপর থেকেই সুশাসন, অর্থনীতি, দুর্নীতি, মানবাধিকার, নির্বাচন ও সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিনিয়ত ওয়েবিনারের আয়োজন করে আসছে প্ল্যাটফরমটি। ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের ওয়েবিনারের আলোচক হিসেবে নিয়মিত মুখ হলেন-আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ, সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ, সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান, বিশিষ্ট সাংবাদিক মনির হায়দার, টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, উন্নয়ন ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক এবং জার্মান ফেডারেল শিক্ষা ও গবেষণা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প গবেষক জিয়া হাসান, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান। এ ছাড়া দেশ-বিদেশের একাডেমিক, বিশ্লেষক এবং গবেষকরা অংশ নেন প্ল্যাটফরমটির ওয়েবিনারে।   
অধিকার বাংলাদেশভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা। আদিলুর রহমান খান এবং সুশীল সমাজের অন্যান্য সদস্যরা ১৯৯৪ সালের ১০ই অক্টোবর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে হওয়া গুম-খুনের সঠিক তথ্য প্রকাশ করে হয়রানির শিকার হয় প্রতিষ্ঠানটির মানবাধিকার কর্মীরা। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর তার প্রতিক্রিয়ায় ২০১৩ সালের ৫ই মে হেফাজত সারা দেশ থেকে সংগঠনের কর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ঢাকায় জড়ো করে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিল। সরকারের বার বার আহ্বানেও তারা ওই স্থান না ছাড়ায় রাতে সমন্বিতভাবে অভিযান চালিয়ে তাদের সরিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই অভিযানে ৬১ জন নিহত হন বলে পরে অধিকার তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করে। যদিও পুলিশের দাবি, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি। অধিকারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত সংখ্যাটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে গ্রেপ্তার করা হয় অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে। সংগঠনটির পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। তদন্ত শেষে ওই বছরের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে আদিলুর ও এলানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। ২০১৪ সালে তাদের বিচার শুরু হয়। ৯ বছর পর ২০২৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় এই দুইজনকে দুই বছর কারাদণ্ড দেয়। এদিকে মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করার জন্য ২০২২ সালে অধিকারের নিবন্ধন বাতিল করে দেয় সরকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা): বাংলাদেশের অন্যতম একটি বেসরকারি আইনজীবী সংগঠন, যা পরিবেশ সংরক্ষণে আইনি সহায়তার প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে বেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সংস্থাটির হয়ে তিনি পরিবেশের ক্ষতিসাধনকারী নানা চক্র আর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছেন। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সহিংসতায় প্রাণহানির পাশাপাশি মিথ্যা মামলা ও নির্বিচারে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেন তিনি। অংশ নেন বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও মানববন্ধনে। বর্তমানে তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন।

Friday, September 6, 2024

নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগেই কি দায়মুক্তি? by মো. আল-আমিন

আড়াই বছর বাকি থাকতেই কলঙ্কিত নির্বাচনের দায় মাথায় নিয়ে বিদায় নিয়েছে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেয় একদলীয় বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজনকারী এই কমিশন। গতকালই তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন প্রেসিডেন্ট। পদত্যাগের কারণ হিসেবে পরিবর্তিত বিরাজিত অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন সিইসি। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেননি কাজী হাবিবুল আউয়াল। এখন প্রশ্ন উঠেছে পদত্যাগ করেই কী বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজনের দায় এড়াতে পারে এই কমিশন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন না হলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো বলেও অনেকে মনে করেন। একতরফা ওই নির্বাচন আয়োজনে আউয়াল কমিশন সহযোগী হয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর তাদের সহযোগী হিসেবে নির্বাচন কমিশনেরও বিচারের দাবি তুলেছেন অনেকে। এমন অবস্থায় পদত্যাগের পর আউয়াল কমিশনের সদস্যদের সামনে কী অপেক্ষা করছে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে আউয়াল কমিশন। এই কমিশন নিয়ে শুরু থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ছিল। দেশের অন্যতম প্রধান বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ ইসিতে নিবন্ধিত বেশির ভাগ দল তাদের মেনে নেয়নি। ইসির সংলাপের আহ্বানও প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দল ও জোট। এই কমিশনের পরিচালনায় চলতি বছরের ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বর্জন করে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। শুধু আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলগুলো ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।  

জাতীয় নির্বাচনের আগে নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেয়া, বিতর্কিত বিভিন্ন সংস্থাকে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে অনুমোদন দেয়া, আইনে নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করার প্রস্তাব দেয়া, ইভিএম ব্যবহার নিয়ে সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর দেয়া মত পাল্টানোসহ কমিশনের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ছিল। এ ছাড়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনেরও অভিযোগ উঠে এই কমিশনের বিরুদ্ধে।

বিদায়ী বক্তব্যে সিইসি বললেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন একদলীয় হয়েছে: সংবাদ সম্মেলনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিইসি বলেছেন, নির্বাচন মূলত একদলীয় হওয়ার কারণে কারচুপি বা সরকারিভাবে প্রভাবিত করার প্রয়োজনও ছিল না। নির্বাচন দলের ভেতরেই হয়েছে। মধ্যে হয়নি। উইদিন হয়েছে, নট বিটুইন। নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি।

বাংলাদেশের বিগত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস তুলে ধরে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, দেশের প্রথম সাংবিধানিক সাধারণ নির্বাচন ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক ছিল। ১৯৭৯ ও ১৯৮৭ সালের সাধারণ নির্বাচন সামরিক শাসনামলে হয়েছে। ফলাফল নিয়ে বিতর্ক ছিল। ১৯৯১-এর নির্বাচন সম্মত রাজনৈতিক রূপরেখার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছিল। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচন সাংবিধানিক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, সুক্ষ্ম বা স্থূল কারচুপির সীমিত সমালোচনা সত্ত্বেও, সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচন সেনাসমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই নির্বাচনে বিএনপি সংসদে মাত্র ২৭টি এবং আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়েছিল। নির্বাচন বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। নিরাপদ প্রস্থান বিষয়ে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সেনাসমর্থিত অসামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দর কষাকষির বিষয়টি প্রকাশ্য ছিল। সে প্রশ্নে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের অবস্থানও গোপন ছিল না। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন সংবিধানমতে দলীয় সরকারের অধীনে হয়েছে।

হাবিবুল আউয়াল বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ অনেক দলই অংশগ্রহণ করেনি। ফলে সেই নির্বাচনও ২০২৪ সালের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে। আসন পেয়েছিল মাত্র ৬টি। পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৫৮টি। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে বর্তমান কমিশনের অধীনে। ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ২৮টি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও প্রধানতম বিরোধী দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। কমিশন বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য একাধিকবার আহ্বান করা সত্ত্বেও তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার বিষয়টি দলের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।

কিন্তু নির্বাচন স্থগিত বা বাতিল করার মতো সাংবিধানিক এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের ছিল না মন্তব্য করে বিদায়ী সিইসি বলেন, সে কারণে অনেকেই কমিশনকে দোষারোপ করছেন। নির্বাচন কখন, কী কারণে, কতোদিনের জন্য স্থগিত করা যাবে তাও সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। অতীতে কখনোই কোনো কমিশন নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে পদত্যাগ করেননি। সম্প্রতি ভেঙে দেয়া সংসদের ২৯৯টি আসনে নির্বাচন প্রার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হয়েছে। দলের মধ্যে নয়। ২৯৯ আসনে ১৯৬৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

হবিবুল আউয়াল বলেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হওয়ার সকল দোষ বা দায়-দায়িত্ব সকল সময় কেবল নির্বাচন কমিশনের ওপর এককভাবে আরোপ করা হয়ে থাকে। একটি কমিশন না হয় অসৎ বা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। কিন্তু সকল সময় সকল কমিশনই অসৎ বা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে না। কমিশন বিভিন্ন কারণে নির্ভেজাল গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে অক্ষম বা অসমর্থ হতে পারে। বিদ্যমান ব্যবস্থায়, আমাদের বিশ্বাস, কেবল কমিশনের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে অবাধ, নিরপেক্ষ, কালো টাকা ও পেশিশক্তি-বিবর্জিত এবং প্রশাসন-পুলিশের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করা যাবে না। নির্বাচন পদ্ধতিতে দুর্ভেদ্য মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন হবে। রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণে এবং বিশেষত প্রার্থীদের আচরণে পরিবর্তন প্রয়োজন হবে।

দলীয়ভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক না হওয়ার কারণে নির্বাচন বিতর্কিত হয়েছে মন্তব্য করে বিদায়ী সিইসি বলেন, এটি সঠিক ও যৌক্তিক। কিন্তু বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে কোনো নির্বাচন কমিশন সংবিধান উপেক্ষা করে স্বেচ্ছায় নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে পদত্যাগ করেছে এবং সেই কারণে নির্বাচন হয়নি এমন উদাহরণ নেই। সরকার বার বার বলছেন, ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নির্বাচন বারংবার ব্যর্থ হওয়ার প্রকৃত সত্য ও কারণ এই কথাটির মধ্যেই নিহিত।

বিদায়ী পরামর্শে সিইসি বললেন, ভোট তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হলেই ভালো: বর্তমান ও অতীত থেকে আহরিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও উপলব্ধি থেকে ভবিষ্যতের জন্য কিছু প্রস্তাব সরকারের বিবেচনার জন্য রেখে যাওয়া কর্তব্য মনে করছেন সিইসি। তিনি বলেছেন, দেশের প্রতিটি সাধারণ নির্বাচন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলে উদ্দেশ্য অর্জন আরও সুনিশ্চিত হতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর সমরূপতার কারণে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক (দলীয়ভিত্তিক) নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ আদর্শ ক্ষেত্র হতে পারে। সেইসঙ্গে নির্বাচন চার বা আটটি পর্বে, প্রতিটি পর্বের মাঝে ৩/৫ দিনের বিরতি রেখে আয়োজন করা ব্যবস্থাপনার দিক থেকে সহজ ও সহায়ক হতে পারে। আমাদের প্রবর্তিত অনলাইনে নমিনেশন দাখিল অব্যাহত রেখে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার অপটিমাইজ করতে পারলে উত্তম হবে।

এদিকে সংবাদ সম্মেলনের একেবারে শেষ ভাগে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, সবশেষে জানাতে চাই, আমিসহ কমিশনাররা দেশের পরিবর্তিত বিরাজিত অবস্থায় পদত্যাগ করতে মনোস্থির করেছি। আমরা আজ পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপনের নিমিত্তে কমিশনের সচিবের হাতে দেবো। পরে কাজী হাবিবুল আউয়াল পদত্যাগপত্রে সই করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। লিখিত বক্তব্য পাঠ শেষ করেই হাবিবুল আউয়াল ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে নিজ বাসার উদ্দেশ্যে চলে যান।

সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব ও মো. আলমগীর উপস্থিত ছিলেন। তবে ইসি ভবনে থাকলেও সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না নির্বাচন কমিশনার বেগম রাশেদা সুলতানা ও আনিছুর রহমান। পদত্যাগের পর চুপিসারে ইসি ভবন ছেড়ে যাওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে পড়েন এই দুই কমিশনার। দুজনের গাড়িতে জুতা নিক্ষেপ করা হয়।

পদত্যাগেই কী দায়মুক্ত বিদায়ী ইসির?
বিতর্কিত একদলীয় নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করা আউয়াল কমিশন পদত্যাগ করেই দায় এড়াতে পারে না বলে জানিয়েছে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জরুরিভিত্তিতে তাদেরকে দায়বদ্ধ করতে হবে। তারা পার পেয়ে গেলে অন্যরা উৎসাহিত হবে।  এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনের আয়োজন না করলে এতগুলো হতাহত হতো না। ইতিহাস ভিন্ন হতো পারতো। তাই নিঃসন্দেহে এই কমিশনের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। জরুরিভিত্তিতে তাদের দায়বদ্ধ করা দরকার। কেননা, এই কমিশন পার পেয়ে গেলে অন্যরা উৎসাহিত হবে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদও একই কথা জানান। তিনি বলেন, তাদের পদত্যাগ করার অধিকার আছে। কিন্তু পদত্যাগ করলেই তারা দায়মুক্ত হয়ে যাবেন না বলে মনে করেন এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ।

Wednesday, October 23, 2019

কীভাবে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করতেন সম্রাট? by আল-আমিন

তিনি কোনো ভিআইপি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন না। কিন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যবহার করতেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুযোগ সুবিধা। বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করতেন নিয়মিত। বিমানবন্দরের এই ‘ভিআইপি’ হলেন বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। ক্যাসিনোর নেশায় প্রতি মাসে কোটি টাকা নিয়ে সিঙ্গাপুর যেতেন সম্রাট। সেখানকার ম্যারিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে একমাত্র পাইজা চেয়ারম্যান কার্ড পাওয়া বাংলাদেশি সম্রাট সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্টেও ছিলেন ‘ভিআইপি’। সিঙ্গাপুর যাওয়ার সময় সম্রাটের সঙ্গে যারা থাকতেন তারাও প্রবেশ করতেন ভিআইপি লাউঞ্জে। তাদের নিরাপত্তা তল্লাশিরও কোন বালাই ছিল না।
রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট নিজেই এমন তথ্য দিয়েছেন। বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সূত্র সম্রাটের বিদেশ যাওয়ার তথ্য সরবরাহ করেছে। মানবজমিন এর হাতে আসা এ তথ্য অনুযায়ী সম্রাট প্রতি মাসের শেষের দিকে সিঙ্গাপুর যেতেন।
তদন্ত সূত্র জানায়, ভিআইপি লাউঞ্জের কর্মকর্তারারা তাকে লাউঞ্জে আসতে নিষেধ করলে তাদেরই তিনি ধমকাতেন। দেখে নেয়ার হুমকি দিতেন। চাকুরীচ্যুত করার কথা বলতেন। উপরের মহলের সঙ্গে মোবাইল ফোন দিয়ে লাউড স্পিকারে ওই কর্মকর্তার নাম জানাতেন। তার ওই কর্মকাণ্ডে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ত্যক্ত-বিরক্ত হলেও তাদের করার কিছু ছিল না। ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সময় তার দেহ ও ল্যাগেজ তল্লাশী করার কেউ সাহস পেতো না। সম্রাট সর্বশেষ সিঙ্গাপুরে গেছেন  চলতি বছরের ২৬শে আগষ্ট। সেপ্টেম্বর মাসে অভিযান শুরু হলে তিনি গ্রেপ্তার আতঙ্কে সিঙ্গাপুরে যেতে পারেননি। চলতি বছর এ পর্যন্ত ৮ বার সিঙ্গাপুরে গেছেন। আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সবসময় বেসরকারি এয়ারলাইন্স ব্যবহার করতেন।
তাকে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের দুইজন নেতা মদত দিতেন বলে জানা গেছে। তাদের নামও জানতে পেরেছে র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল। বিষয়টি তারা তদন্ত করছেন। গত ১৫ই অক্টোবর অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ মামলায় ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১০ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। ওই মামলার তদন্তভার পড়েছে র‌্যাবের হাতে। গতকাল তার রিমান্ডের সপ্তমদিন অতিবাহিত হয়েছে।
সম্রাটের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের বিষয়টি জানতে চাইলে বিমানবন্দরের আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপারেশন ও মিডিয়া) মো. আলমগীর হোসেন গতকাল মানবজমিনকে জানান, ‘রাষ্ট্রের ভিআইপিরাই মূলত বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করতে পারেন। অন্য কেউ ব্যবহার করার এখতিয়ার নেই। তিনি আরও জানান, শাহাজালাল বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ মূলত ৪ টি। সেগুলো হলো, রজনীগন্ধা, বকুল, দোলনচাপা ও চ্যামেলী। রজনীগন্ধা রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ ভিআইপিরা ব্যবহার করে থাকেন। বকুল ব্যবহার করেন এডিশানাল সেক্রেটারি পদদারি ও সমমর্যাদার ব্যক্তিরা। দোলনচাপা ব্যবহার করেন সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধতন কর্মকর্তারা। চ্যামেলী ব্যবহার করেন একুশে পদক পাওয়া ব্যক্তি, সংবাদপত্রের এডিটর ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিদেশ ভ্রমণরত বেসরকারি কর্মকর্তাগণ। এর বাইরে কারও ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের অনুমতি নেই। কেউ যদি করে থাকে তাহলে সেটি অবৈধ।
গতকাল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সম্রাট সর্বশেষ আগষ্ট মাসের ২৬ তারিখে সকাল সাড়ে ১১ টায় শাহজালাল বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করে রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সিঙ্গাপুরে গেছেন। ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করে গত ২৫শে জুলাই রাত সাড়ে ১০টায়  বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুরে গেছেন। এছাড়াও তিনি সিঙ্গাপুরে গেছেন ২৯শে জুন রাত সাড়ে ১১ টার রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে।
সূত্র জানায়, গত ২৯শে মে ভোর সাড়ে ৪ টার ইউএসবাংলার একটি ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুরে যান। ২৪শে এপ্রিল রাত ১১ টা ৫৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুরে যান। ২৮শে মার্চ সকাল সাড়ে ১১ টায় রিজেন্ট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে, ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাত ১০ টা ৩০ মিনিটে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি সিঙ্গাপুরে যান। এছাড়াও ২৯শে জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১ টায় সিঙ্গাপুরে এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে সিঙ্গাপুর যান সম্রাট। প্রতিবারই তিনি ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করেন। র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল মানবজমিনকে জানান, সম্রাট তার দলবল নিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের চ্যামেলী ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করতেন। তিনি যখন সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো খেলতে যেতেন তখন তাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয়ার জন্য তার সঙ্গে আরও দুইটি গাড়ি যেতো। সেই গাড়িতে অন্তত ১০জন যেতেন। সম্রাটের দাপটে তারা বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের পাত্তা দিতেন না। গত জুন মাসে সম্রাট সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় এক নিরাপত্তা কর্মীকে লাঞ্ছিত করেন। ওই নিরাপত্তা কর্মী তার পরিচয় জানতে চাওয়ার কারণে ওই ঘটনা ঘটে। পরে সেখানে ঊর্ধতন কর্মকর্তারা এসে বিষয়টি সমাধান করেন। সূত্র জানায়, ভিআইপি হলে বিমানবন্দরে লাগেজ তল্লাশীর ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়। অনেক জনের দেহ তল্লাশী করা হয় না। সম্রাট তার লাগেজে করে ডলারসহ অন্যান্য জিনিসপত্র সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন।

Sunday, October 20, 2019

বিদেশের দুই ব্যাংকে সম্রাটের ৮০ কোটি টাকা by আল-আমিন

ক্যাসিনো ডন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট বিদেশের দুই ব্যাংকে অন্তত ৮০ কোটি টাকা জমা রেখেছেন। এছাড়া সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তার রয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট দেশের ব্যাংকে অর্থ রেখেছেন কিনা এর সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সম্রাট এড়িয়ে যাচ্ছেন। দেশের ব্যাংকে অর্থ নেই এমন দাবিও তিনি করছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জার্মানির একটি ব্যাংকে ও সুইজারল্যান্ডের একটি কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে অর্থ জমা রেখেছেন সম্রাট। অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি যে বিপুল অর্র্থ আয় করতেন তার একটি অংশ এসব ব্যাংকে জমা রাখতেন।
এছাড়া সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে তিনি কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ উড়িয়েছেন।
সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে স্যান্ডস’র ক্যাসিনো স্বর্গে একমাত্র বাংলাদেশি পাইজা চেয়ারম্যান ছিলেন সম্রাট। হুন্ডিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অবৈধ আয়ের অর্থ সম্রাট বিদেশে পাচার করতেন। তদন্ত সূত্রের দাবি জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট বিদেশে অর্থ থাকার বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি কিভাবে সেই অর্থ বিদেশে পাচার করতেন। কারা তা দেখভাল করতো এসবও স্বীকার করেছেন। তদন্ত সূত্র জানায়, সুইজারল্যান্ডে ওই টাকার দেখভাল করেন পল্টনের একসময়ের যুবলীগের নেতা সুইজারল্যান্ড প্রবাসী আশরাফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। আশরাফুল পল্টনের ওয়ার্ড কমিশনার মোস্তফা জামানের একসময়ের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। সম্রাটের সঙ্গে মোস্তফার সম্পর্কের সূত্র ধরেই আশরাফুল ওই টাকার দেখভাল করতেন। জিজ্ঞাসাবাদে ব্যাংক এশিয়াসহ দেশের মোট ৫ টি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে সম্রাট জানান। ওই অ্যাকাউন্টগুলো তিনি তার স্ত্রী ও মায়ের নামে খুলেছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে এখন পর্যন্ত ওই ৫ টি অ্যাকাউন্টে তার উল্লেখযোগ্য টাকা নেই বলে তিনি দাবি করেছেন। গোয়েন্দারাও কোন বড় অর্থের সন্ধান পাননি। সব অ্যাকাউন্টগুলোর লেনদেনের নথিগুলো পর্যালোচনা করছেন র‌্যাবের মাঠ পর্যায়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
এর আগে ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার খালেদ মাহমুদ ভূইয়া, আরমান, লোকমান হোসেন ভূইয়াও বিদেশে  কোটি কোটি টাকা পাচারের কথা স্বীকার করেন। সূত্র জানায়, র‌্যাবের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে রিমান্ডে থাকা সম্রাট ও আরমানকে মুখোমুখি করা হয়। এসময় তারা নিজেদের অবৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করেছেন।
গত ১৫ই অক্টোবর অস্ত্র ও মাদকদব্য নিয়ন্ত্রণ মামলায় ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১০ দিন ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহ-সভাপতি আরেক ক্যাসিনো কিং এনামুল হক আরমানকে ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দেন আদালত। পরে মামলার তদন্তভার র‌্যাবে হস্তান্তর হলে তাদের র‌্যাব হেফাজতে নেয়া হয়। তাদের দুইজনকে র‌্যাবের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ওই সেলের কর্মকর্তারা পালাক্রমে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। সম্রাটের জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক এবং র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম গতকাল দুপুরে মানবজমিনকে জানান, সম্রাটকে তার অতীতের সকল বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। তার তথ্যের সূত্র ধরেই তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট স্বাভাবিক রয়েছেন বলে তিনি জানান।
র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, সম্রাটকে র‌্যাব-১ এর হেফাজতে নেয়ার পর গোয়েন্দারা তার আর্থিক বিষয়টি খোঁজ নেয়ার জন্য মাঠে কাজ করা শুরু করেন। বাংলাদেশের ব্যাংক এশিয়াসহ তার ৫ টি ব্যাংকে আক্যাউন্টের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু, এখন পর্যন্ত সেই ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য টাকা লেনদেনের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয় গোয়েন্দাদের। এ বিষয়টি সম্রাটকে জিজ্ঞাসা করেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। তিনি একাধিকবার টাকা রাখার বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও একপর্যায়ে বিদেশের দুইটি ব্যাংকে তার টাকা রয়েছে বলে স্বীকার করেন।
সূত্র জানায়, জার্মানির একটি ব্যাংকে ৩৬ কোটি টাকা রেখেছেন সম্রাট। আর সুইজারল্যান্ডের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রেখেছেন ৪৪ কোটি টাকা। সুইস প্রতিষ্ঠানে রাখা অর্থ দেখভালের দায়িত্বে থাকা আশরাফুলের নামে পল্টন, মতিঝিল ও রমনা এলাকায় তার নামে হত্যাসহ ১২ টি মামলা রয়েছে। পুলিশি হয়রানি ও  মামলার ভয়ে তিনি ২০১২ সালের জুলাই মাসে দেশ ছেড়ে লিবিয়ায় শ্রমিক ভিসায় চলে যান। সেখান থেকে সাগরপথে ইতালি হয়ে সুইজারল্যান্ডে বসবাস করছেন। তিনি ওই দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছেন বলে র‌্যাব নিশ্চিত হয়েছে। র‌্যাবসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর শুদ্ধি অভিযান শুরু হওয়ার পরই পল্টনের কাউন্সিলর মোস্তফা জামান গাঢাকা দিয়েছেন। 
সূত্র জানায়, সম্রাট বিদেশের ব্যাংকে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে হুন্ডি ও ওয়েস্টা ইউনিয়নের আশ্রয় নিয়েছেন। সম্রাটের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বেশী পাঠাতেন আরকে মিশন রোডের গোপীবাগের আকবর হোসেন। তিনি মতিঝিল থানার সেচ্ছাসেবক লীগের নেতা। মতিঝিলের ক্যাসিনো হাটে তার আনাগোনা ছিল। আকবরসহ মতিঝিল পাড়ায় অবৈধ একাধিক হুন্ডি ব্যবসায়ীর চক্র গড়ে উঠেছিল। তাদেরও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে র‌্যাব।
র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের সূত্রে জানায়, সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, ক্যাসিনো টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আরমান ও খালেদের মধ্যে ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুইজনই সম্রাটের আস্থাভাজন হওয়ার কারণে তিনি কোন পক্ষই নেননি।
সূত্র জানায়, প্রত্যেক মাসে একবার করে সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনো খেলতে যেতেন সম্রাট। র‌্যাবকে তিনি জানিয়েছেন এটা তার নেশা ছিল। সিঙ্গাপুর শহরে তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়াও মালেশিয়ার পূত্রাজায়ায় ‘কুইক রোডে’ তার একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। সিঙ্গাপুরে বেশি যাওয়া আসা করায় প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের মালয়েশিয়ার ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দেয়ার চিন্তা করছিলেন সম্রাট।
এদিকে সম্রাট ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন অবৈধ পথে যে অর্থ আয় করতেন তা থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগসহ অনেকে ভাগ পেতেন। সম্রাট কাদের অর্থ দিতেন এ তথ্য তিনি প্রকাশ করছেন। এ পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কিছু নামও বলেছেন। এর মধ্য ঢাকার একজন সংসদ সদস্যকে মাসে চার লাখ টাকা করে দিতেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া নির্ধারিত এ অর্থ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মোটা অংকের অর্থ নিতেন এ সংসদ সদস্য।

Saturday, October 5, 2019

অনলাইন ক্যাসিনো বাণিজ্যেও বিদেশিরা by আল-আমিন

অনলাইন ক্যাসিনো বাণিজ্যে দেশে অবস্থানরত একাধিক বিদেশি নাগরিক জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে র‌্যাব-এর সাইবার ক্রাইম সেল বিভাগ। অনলাইনের যেসব সাইটে ক্যাসিনো খেলা হয় সেগুলোর মূল ডোমেন তারা নিয়ন্ত্রণ করে। কোনো কোন বিদেশি নাগরিক তাদের সাইটের মূল ডোমেন ফিফটি ফিফটি শেয়ারে বাংলাদেশের ক্যাসিনো ডনদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক ব্যবসা করছে। ওই সাইট থেকে যা আয় হয় তার অর্ধেক তারা পেয়ে থাকেন। আর এক একটি গেটওয়েতে জমা হয় কোটি কোটি টাকা। ওই টাকা অবৈধভাবে বিদেশি নাগরিকরা দেশ থেকে পাচার করে নিয়ে যাচ্ছেন।
ইউরোপ, আফ্রিকা ও থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের একাধিক দেশের নাগরিকরা ওই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। তারা ভ্রমণ বা বিজনেস ভিসায় বাংলাদেশে এসে অনলাইনের ক্যাসিনোর কার্যক্রম চালাচ্ছে।
যাদের অধিকাংশের মূল অফিস হচ্ছে বনানী ও গুলশান এলাকায়। কেউ কেউ আবার তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবসার আড়ালে অনলাইন ক্যাসিনো বানিজ্য চালাচ্ছেন। র‌্যাবসহ আইন-শৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থা ওই চক্রকে ধরতে মাঠ কাজ করছেন। ইতিমধ্যে এক ও একাধিক ব্যক্তির নাম পেয়েছে র‌্যাবের গোয়েন্দা সংস্থা। তারা কখন বাংলাদেশে এসেছেন এবং তাদের আসার উদ্দেশ্য কী-ছিল তা ইমিগ্রেশন থেকে র‌্যাবের গোয়েন্দারা তথ্য সংগ্রহ করছেন। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।
যোগাযোগ করা হলে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানান, ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনের আওতায় আনা হবে।
র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ঢাকাসহ সারা দেশে ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান চলছে। খালেদ, লোকমানসহ একাধিক ক্যাসিনো সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যরাও নজরদারিতে আছেন। ওইসব ক্যাসিনো সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা পর র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে তারা শিকার করেন যে, অনলাইনে মোটা অংকের ক্যাসিনো বানিজ্য হয়ে থাকে। কারা ওই অনলাইনে ক্যাসিনো বাণিজ্যে জড়িত তাদের ব্যাপারে প্রযুক্তির সাহাজ্যে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে র‌্যাবের সাইবার ক্রাইম শাখা।
সূত্র জানায়, তথ্য সংগ্রহের একপর্যায়ে তারা অনলাইন ক্যাসিনো সম্রাট সেলিম প্রধানের নাম জানতে পারে। তাকে নজরদারি শুরু করে র‌্যাবের গোয়েন্দারা। তিনি থাই এয়ারওয়েজে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এক পর্যায়ের র‌্যাবের গোয়েন্দারা তাকে বিমান থেকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখা আরও জানায়, অনলাইন ক্যাসিনোতে কিভাবে সেলিম প্রধান যুক্ত হলেন এ ব্যাপারে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি একপর্যায়ে স্বীকার করেন যে, থাইল্যান্ডে উত্তর কোরিও নাগরিক মিস্টার দো নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি সেলিম প্রধানকে অনলাইন ক্যাসিনোর ব্যবসার তত্ত্ব প্রদান করেন। পি-২১ ও পি-২৪ নামে তারা একটি সাইট খোলেন। ওই সাইটের মূল ডোমেনের মালিক ছিলেন উত্তর কোরিত্ত নাগরিক মিস্টার দো। তিনি শুধু মাত্র ওই সাইটের মূল ডোমেনের মালিক হওয়ার কারণে পঞ্চাশ শতাংশ টাকা পেতেন।
তিনি স্বীকার করেন যে, ঢাকায় এমন অনেক বিদেশি নাগরিক এমন ব্যবসায় জড়িত। তারা এক একটি গেটওয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাক বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। তার এই তথ্য পেয়ে মাঠ পর্যায়ে আরও তথ্য সংগ্রহ শুরু করে র‌্যাবের গোয়েন্দারা। গুলশান ও বনানী এলাকায় যেসব স্থানে বিদেশিদের করপোরেট অফিস রয়েছে সেগুলোর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদের ব্যাপারে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে অনলাইন ক্যাসিনো বানিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে একাধিক বিদেশি নাগরিককে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে এজন্য স্থল ও আকাশ পথে ইমিগ্রেশন বিভাগে তাদের নাম দিয়েছেন আইন-শৃংখলা বাহিনী।
সূত্র জানায়, যাদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের উল্লেখ যোগ্য ইউরোপের মাল্টার নাগরিক। যেদেশ ক্যাসিনোর জন্য বিখ্যাত। কিছু রয়েছে থাইল্যান্ড ও আফ্রিকার নাগরিক। কোন কোন বিদেশি নাগরিক এনজিওর কর্মকর্তার নাম করে বাংলাদেশে এসেছেন। আলিশান অফিস নিয়ে গড়ে তুলেন অনলাইন ক্যাসিনোর বিশাল সাম্রাজ্য। তাদের এজেন্ট হিসাবে বাংলাদেশে কাজ করেন শতাধিক অনলাইন ক্যাসিনো সম্রাট।

Wednesday, October 2, 2019

ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ৬৩ জনের অবস্থান অজানা by আল-আমিন

ইন্টারপোলের রেড নোটিশে তালিকাভুক্ত ৬৫ বাংলাদেশি। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন মামলার আসামিদের তালিকা বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছিল পুলিশের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারপোলের সদরদপ্তর ফ্রান্সের লিয়নে। তাদের ছবি, মামলার নথি এবং কেন তাদের ইন্টারপোল নথিভুক্তি করবে তার সমস্ত প্রমাণাদি পাঠানো হয়েছিল সদর দপ্তরে। ওই তালিকায় রয়েছে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের নাম। এছাড়াও রয়েছে শীর্ষ সস্ত্রাসী, গডফাদার ও যুদ্ধাপরাধ মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। তবে এই ৬৫ জনের মধ্যে ২ জন ছাড়া ৬৩ জনের অবস্থান জানে না বাংলাদেশের পুলিশ। যে দু’জন ব্যক্তির অবস্থান জানা গেছে তারা হলো, বঙ্গবন্ধুর খুনি কানাডায় অবস্থানরত নূর চৌধুরী এবং আমেরিকায় অবস্থানরত চৌধুরী এএম রশিদ।
খোঁজ পাওয়া সত্ত্বেও সেদেশের অভিবাসন আইনের ম্যারপ্যাঁচে তাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া থমকে রয়েছে।
বাকিদের অবস্থান জানার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলকে প্রত্যেক সপ্তাহে তাদের অবস্থান জানানোর জন্য বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু, কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। এ তালিকায় একজন নারীও রয়েছে। ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংস্থাটি তাদের ওয়েবসাইটে তাদের নাম ও ছবি দিয়েছে। তাদের বিষয়ে ইন্টারপোলের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সরকার ও পুলিশকে জানানো হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বরের আগে পর্যন্ত ৬২ জনের নাম ছিল। গত ১১ মাসে তিনজনের নাম যুক্ত হয়েছে। তারা হলো, খান সাতাজ মুনাসি, খান পারিসা ও ওয়াসিম।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) শাখার এআইজি মো. মহিউল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ইন্টারপোলে ৬৫ বাংলাদেশির নাম রয়েছে। তার মধ্যে ২ জনের অবস্থান জানা গেছে। তারা দুজনই বঙ্গবন্ধুর খুনি। তিনি আরও জানান, যারা পলাতক রয়েছে তারা বাংলাদেশে বিভিন্ন মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বা অপরাধ করে আইনের মুখোমুখি না হয়ে পালিয়ে গেছেন। তাদের সবার নাম ও সকল অপরাধের প্রমাণাদি নথিসহকারে ইন্টারপোলে পাঠানো হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছি প্রযুক্তির মাধ্যমে। আশা করি ওইসব দুর্বৃত্তের অবস্থান দ্রুত জানা যাবে এবং তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ইন্টারপোলের সদস্য পদ লাভ করে। আন্তর্জাতিক এ সংস্থার রেড নোটিশ কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়। ইন্টারপোল আসামিকে গ্রেপ্তারে কোনো বাহিনী পাঠায় না বা কোনো দেশকে চাপও দিতে পারে না। তারা শুধু এ সংক্রান্ত তথ্য সদস্যভুক্ত ১৯০টি সদস্য দেশ ও সেদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগকে অবগত করে।
সূত্র জানায়, ইন্টারপোলের রেড নোটিশে থাকার পরও বিদেশে পলাতক আসামিদের দেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়া আটকে আছে নানা জটিলতায়। তবে সরকার তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে কয়েকজনকে ফিরিয়ে এনেছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন। যার বিরুদ্ধে আদালতের পক্ষ থেকে ফাঁসির আদেশ হয়েছে। নূর হোসেন এখন কারাগারে রয়েছে।
সূত্র জানায়, যে ৬৩ জনের অবস্থান জানা যাচ্ছে না তার জন্য বাংলাদেশের পুলিশ ইন্টারপোলকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে যাতে দ্রুত তাদের অবস্থান জানা যায়। তাদের অবস্থান জানা গেলে সরকারের পক্ষ থেকে ওই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ফিরিয়ে আনা হবে। যদি সে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তন চুক্তি না থাকে তাহলে তা করা হবে।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশে যাদের নাম রয়েছে তারা হলো, কানাডায় অবস্থানরত নূর চৌধুরী, আমেরিকায় অবস্থানরত চৌধুরী এএম রাশেদ। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর খুনি পলাতক খন্দকার আবদুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, আবদুল মাজেদ ও খান রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন।
এছাড়াও রয়েছে, জঙ্গি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন, যুদ্ধাপরাধ মামলার পলাতক আসামি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, জাতীয় পার্টির নেতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার, জাহিদ হোসেন, গোপালগঞ্জের আশরাফুজ্জামান খান, ফেনীর মইনউদ্দিন চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাসান আলী ও সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন। রয়েছেন আলোচিত ও সমালোচিত হারিছ চৌধুরী। এছাড়াও রয়েছে দেশের টপটেরর  প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, আমিনুর রসুল, হারিস আহমেদ, জাফর আহমেদ, নবী হোসাইন, জিসান, শাহাদাত হোসাইন, মোল্লা মাসুদ, সুব্রত বাইন, কালা জাহাঙ্গীর, খন্দকার তানভীর ইসলাম জয়। রয়েছে, রফিকুল ইসলাম, নবী হোসাইন, তৌফিক আলম, মিন্টু, আতাউর রহমান, নাসির উদ্দিন রতন, চান মিয়া, প্রশান্ত সরদার, সুলতান সাজিদ, হারুন শেখ, মনোতোষ বসাক, আমিনুর রহমান, আহমেদ বাবু,  সৈয়দ মোহাম্মদ হোসাইন, জাহিদ হোসেন খোকন, সুরত আলম, সাজ্জাদ হোসেন খান, হাসেম কিসমত, মো. ইউসুফ, নাঈম খান, মকবুল হোসাইন ও সালাহউদ্দিন মিন্টু, আনজুম ফারজানা, খান মোহাম্মদ শহীদ উদ্দিন, অশোক কুমার দাস, চন্দন কুমার, সুজন শহীদ কামাল, আলী আকবর ভুট্টো, আমান উল্লাহ শফীক, সাজ্জাদ হোসাইন খান, হুসাইন মকবুল, মজনু আহমেদ, দিপু নুরুল, অভি গোলাম ফারুক ও শহীদ সুলতানের নাম।

Saturday, September 21, 2019

মাফিয়া ডন শামীম গ্রেপ্তার by রুদ্র মিজান ও আল আমিন

মাফিয়া ডন। বন্দুক শামীম। সম্রাট। গণপূর্তের যুবরাজ। নানা পরিচয় তার। রাজনীতির আড়ালে ঢাকা পড়েছিল তার পাপের লম্বা খতিয়ান। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ‘যুবলীগ নেতা’, প্রভাবশালী ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম ধরা পড়েছেন অ্যালিট বাহিনী র‌্যাবের হাতে। গুলশানের নিকেতনের কার্যালয় থেকে গতকাল কয়েকঘন্টার অভিযান শেষে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। এসময় গ্রেপ্তার করা হয় তার সাত দেহরক্ষীকেও। এই অস্ত্রধারী দেহরক্ষীরাই সবসময় ঘিরে থাকতো তাকে। তার বাণিজ্যিক কার্যালয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর, নগদ পৌনে দুই কোটি টাকা, অস্ত্র এবং মদ। তার বিপুল সম্পদ আর বিলাসী জীবনের কাহিনী দেখে চমকে ওঠেছেন সবাই। যুবলীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শামীম যুবলীগের কেউ নন। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুবলীগের সমবায় সম্পাদক পরিচয়ই ছিল তার ক্ষমতার উৎস। যদিও একসময় তিনি যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে তার সহ-সভাপতি পদ থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।

শামীমের কার্যালয় থেকে যা কিছু উদ্ধার: গতকাল সকাল ৭ টার দিকে র‌্যাবের একটি দল গুলশানের নিকেতনের ৫ নম্বর রোডের ১১৩ নম্বর বাসা ঘিরে ফেলে। ওই বাসার তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় জিকে শামীম তার পরিবার নিয়ে থাকেন। দুইটি ফ্ল্যাটকে তিনি ডুপ্লেক্স বাসা বানিয়েছিলেন। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সব কিছু গোপন করার চেষ্টা করেন। ওই বাসায় র‌্যাবের সদস্যরা তল্লাশি শেষ করে শামীমের অফিস ১১৪ নম্বর বাড়িতে যান। ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলা ও তৃতীয় তলায় শামীমের বিলাসবহুল অফিস। সেখানে অভিযান চালিয়ে নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের এফডিআর, ১টি রিভলবার, ৪ টি বিদেশি মদের বোতল ও বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই উদ্ধার করা হয়। এসময় শামীমসহ তার ৭ দেহরক্ষীকে আটক করা হয়। র‌্যাব দেহরক্ষীর অস্ত্রগুলো জব্দ করে। আটককৃত দেহরক্ষীরা হলেন, শহিদুল ইসলাম, মুরাদ, দেলোয়ার, জাহেদ, সায়েম, আমিনুল ও কামাল। ভিআইপি এলাকায় র‌্যাবের অভিযানের কারণে ওই এলাকার লোকজন সেখানে ভিড় করে। তাদের ভিড় সামলাতে র‌্যাবের সদস্যদের বেগ পেতে হয়। অভিযান শেষে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সকাল থেকে আমরা শামীমের বাসা ও অফিসে অভিযান শুরু করি। এ সময় শামীম ও তার সাত জন দেহরক্ষীকে আটক করা হয়।

তিনি জানান, অভিযানে শামীমের অফিস থেকে তার একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও দেহরক্ষীদের সাতটি শটগান এবং নগদ এক কোটি আশি লাখ টাকা, মোট ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের (১৪০ কোটি টাকার এফডিআর মায়ের নামে, বাকি ২৫ কোটি টাকার এফডিআর শামীমের নামে) কাগজ ও বিদেশি মদের কয়েকটি বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেসব তদন্ত করছি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে। যেসব টাকাগুলো উদ্ধার হয়েছে সেগুলো বৈধ না অবৈধ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, অবৈধভাবে টাকাগুলো আয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। তদন্ত শেষে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হবে।

এসময় র‌্যাবের ভ্রামমাণ আদালতের মাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম সাংবাদিকদের জানান, শামীমের মায়ের নামে রয়েছে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর। তবে তার মায়ের নামে কোনও প্রতিষ্ঠান নেই। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখবো। শামীমের রাজনৈতিক পরিচয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার কোনও রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিনা তা নির্ধারণ করবে তার দল ও নেতারা। এ দায়িত্ব আমাদের নয়। উদ্ধার হওয়া তার অস্ত্রের লাইসেন্স আছে কী-না প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তার অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেও ওইসব অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিজেকে নির্দোষ প্রমানিত করলে তিনি ছাড়া পাবেন। আটক যুবলীগের নেতা খালেদের তথ্যের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়েছে কী-না প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন উত্তর দেননি। শামীমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো দিদারুল ইসলাম জানান, স্যার বাসায় ঘুমাচ্ছিলেন। র‌্যাবের কর্মকর্তারা তাকে ঘুম থেকে তুলে অফিসে নিয়ে আসে।

শামীমের উত্থান ও বিলাসী জীবন: মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান শামীম ঢাকায় শাহজাহানপুর, বাসাবো এলাকায় বড় হয়েছেন। শিক্ষক পরিবারের এই সন্তান থাকতেন টিনশেডের ঘরে। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন আলাদীনের প্রদীপ পেয়ে যান হাতে। বদলে যায় তার জীবন-যাপন। এখন শত-শত কোটি টাকার মালিক জি কে শামীম। থাকেন বিলাসবহুল বাড়িতে, হাকান দামি গাড়ি। তার সেবায় রয়েছে অর্ধশত কর্মচারী। এরমধ্যে সাত জন রয়েছে তার সিকিউরিটি গার্ড। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার প্রথম পাঁচ বছরেই নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন শামীম। বাসাবো, কমলাপুর, ফকিরাপুল এলাকায় চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নানা অপকর্মে জড়িত তার লোকজন। তবে বাসাবো এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে পা দেন না শামীম। যদিও এখান থেকেই তার উত্থান। এখন ওই এলাকা নিয়ন্ত্রন করে তারই লোকজন। বাসাবো এলাকায় সদ্য নির্মিত শামীমের ৫তলা ভবনে একটি ইউনিট গড়ে তোলা হচ্ছিলো তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের বিনোদনের জন্য।

ওই ইউনিটের ডেকোরেশনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ায় আতঙ্কে তার সঙ্গীরা। গতকাল বাসাবোর ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে নিচ তলায় রয়েছে গ্যারেজ ও পার্লার। রয়েছে সিঁড়ি ও লিফট। বাড়িটি দেখাশোনা করেন জি কে শামীমের এলাকার লোক নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মোহাম্মদ সায়েম। সায়েম জানান, তিন মাস যাবত এখানে আছেন। মাঝে-মধ্যে যুবলীগের স্থানীয় নেতারা ওই বাসায় গিয়ে আড্ডা দেন। বাসাটি নতুন হওয়ায় সিনিয়ররা আসেন না। তারা অন্য বাসায় আড্ডা দেন বলে জানান তিনি। এ বাড়ির তৃতীয় তলায় একটি ইউনিট তাদের জন্য করা হয়েছে বলে জানান সায়েম। বাসাবো এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, বাসাবো এলাকায় দুটি বাসা রয়েছে যেখানে রাত হলেই শামীমের লোকজন নারী ও মদে মত্ত হয়ে থাকতো। শামীমের কথার অবাধ্য হলে প্রকাশ্যে লোকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। বাসায় আটকে রাতভর নির্যাতন করে ছেড়ে দিতো। এমনকি রাজনৈতিক মামলায় আসামি করা হতো তাদের। এজন্য প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলেন না। ফকিরাপুলের একজন ব্যবসায়ী জানান, তার দোকানের সামনে ফুটপাতে দোকান বসিয়েছিলো শামীমের লোকজন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় কমলাপুরে টর্চার সেলে।সেখানে বেদম মারধর করা হয়। এ ঘটনায় মামলার করারও সাহস পাননি এই ব্যবসায়ী।

এলাকাবাসী জানান, শামীমকে সন্ত্রাসী হিসেবেই জানেন এলাকার লোকজন। এই সরকারের আমলে আঙুল ফুলে কালাগাছ হয়েছেন তিনি। বাসাবো, শাহজাহানপুর এলাকাতে সাতটি বাড়ি রয়েছে তার। ওই এলাকায় শামীমের হয়ে নিয়ন্ত্রন করেন দুই জন। শামীমের সময় কাটে কমলাপুর, কাকরাইল ও গুলশানে। গুলশানের নিকেতনের বিলাসবহুল বাড়িতেই বেশি সময় কাটাতেন শামীম। তার অফিস হিসেবে ব্যবহৃত বাড়ির তৃতীয় তলায় রয়েছে শামীমের বসার কক্ষ। বাড়িটি সাজানোর জন্য চায়না থেকে বিভিন্ন ধরণের ল্যাম্প আনেন। প্রায় ৩০ ফুট লম্বা ও ২০ ফুট চওড়া কক্ষটিতে প্রায় রাতেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতেন। কখনও কখনও নামিদামি মডেল, নায়িকারা ভিড় করতেন তার এখানে। এছাড়া দেশের বাইরেই বেশি থাকতেন তিনি। নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে বেশি আসা-যাওয়া করতেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠরা জানান, মালয়েশিয়া ও নেপালে ব্যবসা রয়েছে তার।

তবে সাত আট বছর আগেও শামীমের আড্ডা ছিলো বাসাবো এলাকায়। ওই সময় থেকেই বিভিন্ন ক্লাবে জুয়ার আসরে রাত কাটাতেন তিনি। ঘুমাতেন দিনভর। এমনকি ঢাকার আশপাশে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকায় জুয়ার আয়োজন করতো তার লোকজন। প্রশাসন ম্যানেজ থেকে শুরু করে আর্থিক কাজগুলো করতেন তিনি। জি কে শামীমের আরেকটি সিন্ডিকেট রয়েছে যারা ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করে নিয়মিত। স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মীদের দিয়ে এসব অপকর্ম করতেন শামীম। এমনকি মাদক ব্যবসায়ীরাও মাসোহারা দিতো তাদের। ঠিকাদার হিসেবে তিনি গণপূর্ত ভবনের কাজ বাগিয়ে নেন সহজেই। এই চক্রে রয়েছে প্রভাবশালী বেশ কয়েক যুবলীগ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তা। অন্য ঠিকাদারদের মুখ বন্ধ করতে রয়েছে শামীম বাহিনীর অস্ত্র। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার জানান, অনিয়ম করে কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় কাজ বাগিয়ে নেয় এই চক্রটি। এ নিয়ে কথা বলার সাহস কারও নেই। সন্ত্রাসী ও অস্ত্র সবই তাদের। অস্ত্র ও সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া চলাফেরা করেন না শামীম। গত ১০ বছর যাবত দামি দামি গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। বাসা থেকে বের হলেই নিরাপত্তা বলয়ে থাকেন তিনি। জি কে শামীমের এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি জানান, সন্ধ্যার পর চাঁদাবাজি ও জুয়ার আসরের টাকা বস্তায় ভরে নিয়ে যাওয়া হতো কাকরাইলে। সেখানে তাদের এক নেতার অফিসে ভাগ বাটোয়ারা হতো এসব টাকার। ওই অফিসে ঢাকা দক্ষিণ এলাকার আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা হাজির হতেন।

জি কে শামীমের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সন্মানদী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামে। তার পিতা মৃত মো. আফসার উদ্দিন। তিনি ছিলেন শিক্ষক। তবে কৈশোর থেকেই শামীম থাকতেন ঢাকায়। সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত শামীম গত বিএনপি সরকারের আমলে যুবদলের রাজনীতি করতেন। ক্ষমতার পালা বদলে মিশে যান যুবলীগের সঙ্গে।