Showing posts with label বিএনপি. Show all posts
Showing posts with label বিএনপি. Show all posts

Friday, October 2, 2026

পিন্টুর বোন, নিউটনের স্ত্রী থেকে এমপি: মিষ্টির রাজনৈতিক উত্থান-পতনের গল্প

স্বামী সাইদুর রহমান ওরফে নিউটন খুন হওয়ার পর তারই নির্বাচনি ওয়ার্ডে উপনির্বাচনে দাঁড়িয়ে জয়ী হয়েছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ ওরফে মিষ্টি। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কমিশনার হিসেবে স্থানীয় সরকারে যাত্রা শুরু হয় তার। এর আগে কলেজে ছাত্রদলের রাজনীতি ও ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। পরে ঢাকা মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।

চলতি বছরের মে মাসে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে সংসদে প্রবেশ করেন মিষ্টি। তবে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় তার নাম আলোচনায় আসার পর গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছে সংসদ সচিবালয়।

মিষ্টির স্বামী নিউটন ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা ও ঢাকার ওয়ার্ড কমিশনার। তার বড় ভাই নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুও ছাত্রদলের সভাপতি থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। বিএনপির রাজনীতিতে পরিচিত এই দুই নেতার সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের পাশাপাশি মিষ্টির নিজের রাজনৈতিক পথচলায় রয়েছে স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ, দলীয় দায়িত্ব পালন এবং মামলা মোকাবিলার ইতিহাস।

সম্প্রতি মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় মিষ্টির নাম সামনে এসেছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গা বরাদ্দ চেয়ে দুই দশক আগে তার স্বাক্ষরে করা আবেদন এবং হামলায় অভিযুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এসব অভিযোগের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

ছাত্রদল থেকে ওয়ার্ডের নির্বাচনে

মিষ্টির জন্ম ১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি। শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক, পেশায় ব্যবসায়ী। বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে পড়ার সময় ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। পরে ওই কলেজের ছাত্র সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদক বা এজিএস নির্বাচিত হন। বড় ভাই পিন্টুও তখন ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

কলেজের রাজনীতি থেকে মিষ্টি পরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসেন। ২০০২ সালে স্বামী নিউটন খুন হওয়ার পর অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন তিনি। সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডে নয়, সাধারণ ওয়ার্ডের ভোটারদের সরাসরি ভোটে কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন মিষ্টি।

পরবর্তী সময়েও সাধারণ ওয়ার্ডের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনের আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি তৃতীয়বারের মতো সাধারণ কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন। স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সে সময় এলাকার কয়েকটি সমস্যা সমাধানের দাবিও করেছিলেন।

কাউন্সিলর হিসেবে নিজের কাজের বিবরণ দিতে গিয়ে মিষ্টি বলেছিলেন, এলাকায় গ্যাসলাইনের সমস্যার সমাধান করেছেন। অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে শিশুদের জন্য খেলার মাঠের ব্যবস্থা করেছেন। তার দায়িত্ব পালনের সময়ে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কমেছিল বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।

গৃহকর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির কার্যক্রমেও যুক্ত ছিলেন মিষ্টি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আয়োজিত একটি শোভাযাত্রায় তিনি নেতৃত্ব দেন। এতে স্কুলশিক্ষার্থী, গৃহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। ওই সময় তার নির্দেশনায় ওয়ার্ডের বিভিন্ন বাড়িতে কর্মরত গৃহকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ এবং তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

মহানগর বিএনপিতেও দায়িত্ব

স্থানীয় নির্বাচনের পাশাপাশি মহানগর বিএনপিতেও দায়িত্ব পান মিষ্টি। ২০১৮ সালে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। ওই বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন।

সে সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ২০টি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোকে ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা বলে দাবি করেছিলেন তিনি।

সদ্য বিলুপ্ত ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটিতে মিষ্টি ছিলেন যুগ্ম আহ্বায়ক। চলতি বছরের এপ্রিলে বিএনপি তাকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেয়। সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ থেকে নির্বাচিত হয়ে ৩ মে শপথ নেন তিনি। এটিই ছিল তার প্রথম সংসদীয় মেয়াদ।

স্বামী নিউটন যেভাবে খুন হন

মিষ্টির স্বামী নিউটনের রাজনৈতিক জীবনও শুরু হয়েছিল ছাত্রদল দিয়ে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, তেজগাঁও কলেজে পড়ার সময় তিনি সংগঠনটিতে যুক্ত হন। ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ের দায়িত্ব পেরিয়ে মহানগরে আসেন। পরে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হন।

২০০২ সালে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হন নিউটন। কিন্তু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাননি। কমিশনার হিসেবে শপথ নেওয়ার তিন দিন পর, ওই বছরের ১০ মে ধানমন্ডিতে গুলিতে নিহত হন তিনি।

দলীয় পদ ও নির্বাচনি সাফল্যের পাশাপাশি নিউটনের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগও ছিল। সে সময় তার বিরুদ্ধে ৩৬টি ফৌজদারি মামলার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, আগের আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক কারণে এসব মামলা করেছিল।

হত্যাকাণ্ডের দিন ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ধানমন্ডিতে এসেছিলেন নিউটন। অর্কিড প্লাজার একটি সেলুন থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় তাকে গুলি করা হয়। হামলায় তার গাড়িচালকও গুলিবিদ্ধ হন। নিউটনের মা রাবেয়া বেগম সেদিনই ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা করেন।

মামলাটিতে ২০০৬ সালের ২৪ মে বিচারিক আদালত ১০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে ২০১১ সালে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন এবং যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তিনজনকে খালাস দেন। কালা জাহাঙ্গীরসহ বাকি সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়। অন্য তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে।

নিউটন নিহত হওয়ার পর তার ওয়ার্ডের উপনির্বাচনে অংশ নেন মিষ্টি। ওই নির্বাচনে জয় দিয়ে তার স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালনের শুরু। এরপর দলীয় রাজনীতি ও স্থানীয় নির্বাচনে সক্রিয় থাকেন তিনি।

ছাত্রদলের সভাপতি থেকে সংসদে পিন্টু

মিষ্টির বড় ভাই নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ছিলেন পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক বিএনপির পরিচিত নেতা। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তিনি সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি দুই পদেই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সভাপতি ছিলেন।

ছাত্রদলের সভাপতি থাকা অবস্থায় ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন ঢাকা-৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন পিন্টু। পরে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব থেকে জাতীয় সংসদ ও মূল দলের দায়িত্বে আসেন তিনি।

২০০১ সালে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকার গঠন করার আড়াই মাসের মধ্যেই গ্রেপ্তার হন পিন্টু। ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল, একটি দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নিলামের দরপত্রের কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

২৯ দিনের মাথায় তিনি জামিনে মুক্তি পান। পরে মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বলে প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন বিএনপি সরকার। ২০০৫ সালে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়।

পিন্টু পিলখানা হত্যা মামলায় দণ্ডিত হন। ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় করা ওই মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন তিনি।

কারাবন্দি অবস্থায় ২০১৫ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের উদ্যোগ নেন পিন্টু। তবে দণ্ডিত হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। ফলে ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি তিনি।

২০১৫ সালের ৩ মে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হওয়ার পর পিন্টুকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা জানানো হয়।

তার মৃত্যুর পর পরিবার ও বিএনপি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তোলে। চিকিৎসক রইস উদ্দিনও হাসপাতালে নিতে বিলম্ব এবং আগের দিন কারাগারে গিয়ে পিন্টুকে দেখতে না পারার অভিযোগ করেন। তবে কারা কর্তৃপক্ষ ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

স্বামী ও ভাইয়ের মৃত্যুর পরও মিষ্টি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মহানগর সংগঠনে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হন।

রাড্ডার ঘটনায় পুরোনো আবেদন সামনে

গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। এরপর স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জায়গা বরাদ্দ চেয়ে সমিতির পক্ষ থেকে অতীতে করা আবেদনের তথ্য সামনে আসে।

২০০৬ সালে ওই সমিতির সভাপতি হিসেবে জায়গা বরাদ্দের আবেদনে মিষ্টির স্বাক্ষর ছিল। তখন তিনি শাহ আলী থানা এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার ছিলেন। অনুসন্ধানে হামলার আয়োজনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসে। মিষ্টি অবশ্য সমিতির সঙ্গে বর্তমানে কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, সমিতির সঙ্গে এখন তার সম্পর্ক নেই। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার সঙ্গেও তিনি জড়িত নন।

হামলার ঘটনায় রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার মামলা করেছেন। মামলায় হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা এবং জায়গা দখলের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনে একাধিক সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

গত বুধবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই দিনে মহানগর উত্তর যুবদল ও মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। বিএনপির তিনজন, ছাত্রদলের পাঁচজন, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুজন ও শ্রমিক দলের চারজনকে বহিষ্কার করা হয়। তবে মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির কারণ দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়নি। যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্তির ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পাঁচ মাসেই শেষ সংসদীয় মেয়াদ

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার মিষ্টি জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দেন। সংসদ সচিবালয়ের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ফেরদৌসী আহমেদ ১ অক্টোবর পদত্যাগ করায় সংবিধানের ৬৭ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩২৩ নম্বর আসন, অর্থাৎ সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ একই তারিখে শূন্য হয়েছে।

চলতি বছরের ৩ মে শপথ নেওয়া মিষ্টির প্রথম সংসদীয় মেয়াদ শেষ হলো প্রায় পাঁচ মাসের মাথায়। ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার, মহানগর বিএনপির দায়িত্ব এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদ- দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পর রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনাকে ঘিরে তার সংসদ সদস্য পদে ইতি ঘটল।

ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। গ্রাফিক্স: কালবেলা
ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। গ্রাফিক্স: কালবেলা

Thursday, August 6, 2026

হাসিনাকে ভারত এই সুযোগ কেন দিল, প্রশ্ন বিএনপির

বিবিসি বাংলাঃ বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের অনেকে।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল—এটি আমাদের প্রশ্ন।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। সেই প্রসঙ্গে টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হলো।’

‘বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই সুযোগ দিলে’—এই প্রশ্নও রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পাঁচই আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সরকারি দল বিএনপির নেতৃত্বের মাঝেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন।

বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাইবেন কি না, নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সেই প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন তিনি।

ওই সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একপক্ষকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে; একপক্ষ দায়মুক্তি পেলে অন্যপক্ষেরও সে অধিকার আছে।

দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাদের কোনো অনুশোচনা না থাকায় বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনা নেই।’

‘বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে থেকে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ,’ মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

দুই বছর আগে শেখ হাসিনার শাসনের পতন হলে সে সময় গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান এনে ওই অধ্যাদেশ যুক্ত করা হয়েছিল।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে পাস করে। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থেকে যায়।

নয়া দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাদের দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।


সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির ব্যাপারে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা তো (আওয়ামী লীগ) আদালতে যায়নি। আদালত থেকেই যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।’

একইসাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, ‘জনগণও বিচার করবে। জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের দীর্ঘ শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানষকে দমন-পীড়ণ চালিয়েছে; গুম, খুন করেছে। ফলে তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই এবং তাদের ব্যাপারে জনগণও বিচার করবে।’

এদিকে, ভারতের নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে পারেন, এমন খবর যখন আলোচনায় আসে, তখনই বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দিল্লিতে শেখ হাসিনা যাতে রাজনৈতিক কার্যক্রম না চালায়, সেজন্য ভারত সরকারের সহযোগিতা চান।

একই দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারত সরকারকে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এছাড়া এরপর মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশনা তুলে ধরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য বিবরণীতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করতে অনুরোধ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছিলেন।

যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনটি বেসরকারিভাবে আয়োজন করা হচ্ছে। এরসাথে ভারত সরকারের সম্পর্ক নেই। এবং সেখানে যে বক্তব্য আসবে, তা ভারত সরকার সমর্থন করে না।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরও নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে এবং তাতে শেখ হাসিনা সরাসরি বক্তব্য ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্যই দেওয়া হোক না কেন, তাদের সমর্থন ছাড়া নয়া দিল্লিতে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।

আর সেকারণে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্য থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে।

হাসিনাকে ভারত এই সুযোগ কেন দিল, প্রশ্ন বিএনপির
সালাহউদ্দিন আহমদ

‘বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই’

অনলাইন একিক্টভিস্ট সাদিকুর রহমান খান বলেছেন,বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই।

বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘তারেক রহমানের ডাকে সরকার পড়লে হাসিনা সরকার পড়ার কথা ছিল ২৮ অক্টোবর। তারেক রহমানের ডাকে ১০ লাখ লোক ঢাকা আসলো। পুলিশ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে ১০ মিনিটে ১০ লাখ পালাইয়া গেল। নেতা নাকি কর্মীরা আগে পালাইসিল, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আরও বড় প্রশ্ন, ১০ লাখ লোক কেমনে ১০ মিনিটে পালাইয়া যায়? এরা এসেছিল ক্ষমতার জন্য।

একজন মানুষও তারেক রহমানের ডাকে মরতে রাজি হয় নাই। একজনও না। নেতাও না। কর্মীও না। জুলাই আগস্টে মির্জা ফখরুলকে বারবার বলতে হইছে এই আন্দোলন আমাদের আন্দোলন না। আমরা এর সাথে জড়িত না। কারণ জুলাই বিএনপির আন্দোলন হইলে কোটি কোটি মানুষ এই আন্দোলনে আসতই না।

১৭ বছরে এক দফা কি কম দিসে?

একটা মানুষ পাত্তা দিসে?

দেয় নাই।

মানুষ যাইয়া শুনলো নাহিদ ইসলাম নামের অপরিচিত, অরাজনৈতিক একটা ছেলের কথা। ৩ আগস্ট নাহিদ ইসলামের এক দফাতেই সরকারের নৈতিক পতন হয়ে যায়। হাসিনা পরিবারের সবাই পালাতে শুরু করে ৩ তারিখ থেকেই। আর ৪ আগস্ট আসিফ মাহমুদ ঢাকা দখলের ডাক দেন। ৫ আগস্ট মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢাকার রাজপথ দখলে নেয়। শহীদ হয় দুইশরও বেশি মানুষ। বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনদিন পালাইতে হয় নাই। কারণ হাসিনা জানত, পুলিশের বাঁশি শুনলেই এরা পালাবে। ১৭ বছর তো তাই পালাইসে।

জুলাইয়ে কারা রাজপথে ছিল, সেটা ডকুমেন্টারিতে দেখানোর কিছু নাই। মানুষ দেখেছে জুলাইয়ে কে লন্ডনে ছিল, কে শিলং এ ছিল আর কে ঢাকায় ছিল। এই জেনারেশনের সাথে তামাশা করে লাভ নাই। জুলাইয়ের নেতা কারা, জুলাইয়ের ইমাম কে, বাংলাদেশের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় যাইয়া ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করেন, যান, ১০ সেকেন্ডে এই দেশের বাচ্চারা সাক্ষ্য দেবে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত আর আখতারদের নাম।

জুলাইয়ের ইতিহাসে এই প্রজন্মের অন্তরে লেখা আছে। দুই পয়সার ডকুমেন্টারি দিয়ে সেই লেখা মুছতে পারবেন না। আপনাদের কর্মীরা হইলো ১০ মিনিটে সব রাইখা পালাইয়া যাওয়া বিড়ালের দল,

আর নাহিদের ডাকে যারা আসছিল, তাদের ব্যাপারে হাসিনার শুনতে হয়েছিল, একটা গুলি করি। একটা মরে, ঐ একটাই যায় স্যার। বাকিডি যায় না।

গুলি করে যেই জেনারেশনের সাথে হাসিনা পারে নাই, মিথ্যা ইতিহাস আর মিথ্যা ডকুমেন্টারি দিয়ে সেই জেনারেশনকে মুছে ফেলতে চাওয়ার দু:সাহস কেমনে হয় আপনাদের?’

‘বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই’

Wednesday, July 15, 2026

ফার্মের মুরগিরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী -সোনারগাঁয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি

এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, আমরা এমন একজন শিক্ষামন্ত্রী পেয়েছি যিনি স্ট্যান্ডবাজি ও টেন্ডারবাজিতে ওস্তাদ। শিক্ষামন্ত্রী সব জায়গায় গিয়ে বলেন, নকল আর হবে না। ২০২৬ সালের শির্ক্ষাথীরা কিন্তু আপনাদের দেখিয়ে দিচ্ছে এ স্ট্যান্ডবাজি এদেশে আর চলবে না। হাটুঁ সমান পানিতে, বুক সমান পানিতে ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের আপনি ডুবিয়ে ডুবিয়ে পরীক্ষা দিতে বাধ্য করেছেন।

একটি পরীক্ষায় আপনি দুইটা সৃজনশীল ভুল দিয়ে রেখেছেন। পরীক্ষার্থী যখন পরীক্ষা কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নে উত্তর মেলাতে চেষ্টা করে সে যখন উত্তর মেলাতে পারে না, তখন তাদের কী ধরনের মানসিক অবস্থা হয়, বুঝতে পারেন?

এ ঘটনায় আপনি একবারও দুঃখ প্রকাশের প্রয়োজন মনে করলেন না। বরং এ শিক্ষার্থীদের আপনি বললেন মাদকাসক্ত। শিক্ষামন্ত্রী আপনি আজ যাদের ফার্মের মুরগী বলছেন। এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী হতে পেরেছেন। এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই শিলং থেকে এসে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হয়েছেন।

এ ফার্মের মুরগীরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আজ লন্ডন থেকে এসে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সোনারগাঁ উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ পথযাত্রা নারায়ণগঞ্জ জেলা এনসিপি আয়োজিত এক পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, শিক্ষামন্ত্রীকে বলব শিক্ষার্থীরা গিনিপিগ নয়। তাদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট বন্ধ করুন। কিছুদিন পর পর আপনাদের ইচ্ছা হয় আর সেটাই শিক্ষার্থীদের উপর চাপিয়ে দেন। আপনাদের সন্তানরা দেশে পড়াশুনা করে না। তাদের বিদেশে রেখে পড়াশুনা করান।

পরের সন্তানকে রাস্তায় নিয়ে রাজনীতি করবেন, এক্সপিরিমেন্ট করবেন- এ বাংলায় আর এসব হতে দেওয়া হবে না। ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে সংবেদনশীল আচরণ করার অনুরোধ করছি, তা না হলে তারা রাস্তায় নামলে আপনাদের অস্থিত্ব থাকবে না। আপনাদের পাটাতন যে কত দুর্বল তা শিক্ষার্থীদের অর্ধবেলার আন্দোলনেই বুঝা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এখানে বাপ হচ্ছে এমপি আর তার ছেলে করে চাঁদাবাজি। থানায় গিয়ে দিতে হয় মুচলেকা। আমরা সারা দেশে দেখি গ্যাসের হাহাকার আর সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অবৈধ সংযোগ নিয়ে কোটি কোটি টাকা সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

চুনা কারখানাগুলো কোটি টাকার অবৈধ গ্যাস পোড়াচ্ছে। সোনারগাঁয়ের নদী ও খালগুলো রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দখল করে ফেলেছে। চব্বিশ পরবর্তী এ বাংলাদেশ আমরা চাইনি। ব্যবসায়ীরা, হকাররা ও রিকশাচালকরা হাহাকারের মধ্যে রয়েছে। দুইশত টাকা ইনকাম করলে পঞ্চাশ টাকা ছাত্রদল যুবদলকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। স্থানীয় এমপিদেরকেও চাঁদা দিতে হয়। এ চাঁদাবাজি বাংলাদেশ আর চলবে না।

আপনারা এভাবে চাঁদাবাজি করে বেশি দিন আর খেতে পারবেন না। আবার যদি জুলাই হয় পালানোর জায়গা পাবেন না। হাসিনার জন্য ইন্ডিয়া ছিল। আপনারা বলেন আপনারা বাংলাদেশপন্থি। আপনাদের কিন্তু ভারতে জায়গা হবে না। পাকিস্তানেও জায়গা হবে না। আমাদেরকে এদেশেই থাকতে হবে, সুতরাং মানুষের আকাঙ্খার বাইরে গেলে জনগণ রাস্তায় বিচার করবে।

তিনি বলেন, আমরা হাসিনা ব্যবস্থার পরির্বতন চেয়েছি কেবল হাসিনার পরিবর্তন চাইনি। বর্তমান সরকার জন আকাঙ্খার বিপক্ষে গিয়ে, গণভোটের বিপক্ষে গিয়ে এমন অবস্থান নিয়েছেন যা সরাসরি আমাদের আকাঙ্খার পরিপন্থি।

তিনি চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, বন্যা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রতিমন্ত্রী হজ্ব করতে চলে গেছেন। একই সময় দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ বন্যায় কষ্ট পাচ্ছে আর প্রধানমন্ত্রী বরিশাল সফর করছেন।

চট্টগ্রাম থেকে এ বছর নব্বই হাজার কোটি টাকার বেশি জাতীয় রাজস্ব জমা দেওয়া হয়েছে। পরিতাপের বিষয় এ সংকটকালে বন্যার জন্য চট্টগ্রামে জনপ্রতি ত্রিশটারও কম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেছেন, সংবিধান সংশোধন কমিটি নাকি সংবিধানে নাই। যদি এটি সংবিধানে না থেকে থাকে তাহলে ২০২৬ সালের সংসদ নির্বাচনও কোনো সংবিধানে নেই। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। আপনার থাকার কথা ছিল শিলংয়ে, প্রধানমন্ত্রীর থাকার কথা ছিল লন্ডনে, আপনার নেতাকর্মীর থাকার কথা ছিল ধানক্ষেতে, আপনার নেতাকর্মীর ঢাকা শহরে চালানোর কথা ছিল রিকশা।

এ সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, ছাত্রজনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আপনাদের পায়ের তলায় কিন্তু মাটি নেই।

পরে হাসনাত আব্দুল্লাহ জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র সহ-সভাপতি তুৃহিন মাহমুদকে আসন্ন সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এনসিপির প্রার্থী ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠানে জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র সহ-সভাপতি তুৃহিন মাহমুদের সভাপতিত্বে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন ও জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তরিকুল ইসলামসহ উপজেলা এনসিপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ফার্মের মুরগিরা রাস্তায় নেমেছিল বলেই আপনি আজ শিক্ষামন্ত্রী
ছবি: আমার দেশ

Saturday, June 20, 2026

সমাবেশে লোক ভাড়া করে বেশি মাথা দেখানো কী ফল দেয় by সালেহ উদ্দিন আহমদ

রাজধানীতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়ে গেল। এখনো হচ্ছে। বড় বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনের ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন ‘সদ্যোজাত’ দল—সবাই, এই আন্দোলন মাসে সভা করেছে।

সরকারও পিছিয়ে নেই, তারাও জুলাই সনদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভা করেছে সংসদ ভবনের সামনে। এই মাসটাতে প্রতিটি সভাই জাতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ—বিভিন্ন অঙ্গীকার ও তথ্যে ভরপুর।

যাঁরা সভাগুলোয় যোগ দিয়েছেন বা যাঁরা অন্যভাবে সভাগুলোর প্রতি নজর রেখেছেন, তাঁদের জন্য এতসব গুরুগম্ভীর তথ্য সম্ভবত মনে রাখা খুব সহজ নয়। তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, সবার জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই সনদ নিয়ে নেতারা যা যা বলেছেন, সেগুলো মোটাদাগে সবাই স্মরণ করবেন।

তবে একটা জিনিস সবাই মনে রাখবেন। সেটা হলো ‘হেড কাউন্ট’। কোন দলের সভায় কত লোক হলো, কাদের সভায় রাস্তা কতটুকু উপচে উঠেছিল এবং যানবাহন কতক্ষণ বন্ধ ছিল—এই জিনিসগুলো আলোচনায় এসেছে।

আমাদের রাজনীতিবিদদের দরকার হেড কাউন্ট বা মাথার হিসাব। কারা সভায় কত মাথা আনতে পারলেন, তা দিয়ে জনপ্রিয়তা মাপা হয়ে থাকে। সমাবেশে যত বেশি হেড কাউন্ট, টিভি সংবাদ ও পত্রিকায় জনসভার ছবিও তত ভালো দেখাবে।

তবে জনসভার হেড কাউন্ট দল বিচারে বা জনপ্রিয়তার দৌড়ে যে খুব প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের প্রতিটি জনসভায় উপচে পড়া ‘মাথা’ থাকত। কিন্তু জনতার স্বতঃস্ফূর্ত হেড কাউন্টের কাছে তারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।

জনসভায় হেড কাউন্ট জিনিসটা আমাদের রাজনীতিতে অনেক দিন ধরে চলে আসছে। একাত্তরের আগে দেখেছি, রাজনৈতিক দলগুলো বাস পাঠিয়ে ডেমরা, তেজগাঁও থেকে শ্রমিকদের নিয়ে আসত। প্রয়োজন হলে কাঁটাবন বস্তি থেকেও লোক আসত। তাতেই ভরে যেত পল্টন ময়দান। ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবের সভা ভরাতে বাস-ট্রেনের প্রয়োজন হয়নি, মানুষ নিজেদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছিল।

মাওলানা ভাসানী যখন পল্টনে সভা করতেন, তখন অন্য দলের লোকজনও ওখানে যেত। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সব সময়ে তুঙ্গে ছিল। তাঁর সভায় ডান দিকে টুপি মাথায় তাঁর ভক্ত ও মুরিদেরা থাকতেন, বাম দিকে লাল ঝান্ডা হাতে বা লাল পট্টি কপালে বেঁধে তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীরা বসতেন। দক্ষিণপন্থী-বামপন্থী কোনো হাঙ্গামা হতো না। সবাই মন দিয়ে তাঁর সাম্যের বাণী শুনতেন। মাওলানা ভাসানী হেড কাউন্ট নিয়ে কখনো খুব মাথা ঘামাতেন না, যা ভাবতেন তাই বলতেন, আর যা বলতেন তা-ই করতেন।

এখন সময় পাল্টে গেছে। সবকিছু এখন ফাইভ স্টারভিত্তিক। দলের কাজকর্ম সব এখন ফাইভ স্টার ভবনে। রাজনৈতিক দলের ইফতার হবে ফাইভ স্টার হোটেলে। নেতাদের গাড়িবহর হবে ১০০টি গাড়িতে। দলের জনসভায় লোক আনানো হবে রেলগাড়িতে।

জনসভার জন্যও কোনো সীমারেখা নেই। মাঠ-ময়দান, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল চত্বর সবই বৈধ। রাজনৈতিক দলগুলোর অঢেল টাকা। তার কিছুটা সভা-সমিতিতে হেড কাউন্ট বাড়াতে খরচ হবে, সেটাই স্বাভাবিক।

১৯ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহাসমাবেশ উপলক্ষে বাইরে থেকে সমর্থকদের ঢাকায় আনার জন্য চার জোড়া বিশেষ ট্রেন ভাড়া করা হয়েছিল। ইসলামী আন্দোলনও গাড়ি ও লঞ্চ ভাড়া করে বাইরে থেকে লোক এনে ইদানীং ঢাকায় সভা করেছে। আমির আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার গাড়ি রিজার্ভ করা হয়েছে।’

আগে ছাত্ররা সভা করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। বটতলায় সমাবেশ করাটাই ছিল তাদের গর্ব। একুশে যেত শহীদ মিনারে। এখন ছাত্রদের দলগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে পাল্লা দিচ্ছে। বাস-ট্রেন ভাড়া করে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘ছাত্র’ আনছে তাদের ‘ছাত্রসভায়’ যোগ দিতে।

জনসমর্থন দেখাতে রাজধানীতে ৩ জুলাই ছাত্রদল ও এনসিপির পৃথক সমাবেশ হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে, জনসভায় হেড কাউন্ট বাড়াতে ছাত্রদল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ২০ বগির বিশেষ ট্রেন ভাড়া করেছে।

প্রথম আলোর খবরে প্রকাশ, ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ অনুষ্ঠানে সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতা আনতে আট জোড়া ট্রেন ভাড়া করেছে সরকার। এসব ট্রেনে করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছাত্র-জনতাকে ৫ আগস্ট ঢাকায় নিয়ে আসার কর্মসূচি নেওয়া হয়। আট জোড়া ট্রেনের জন্য প্রায় ৩০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও দেশের সব টিভি চ্যানেলে এই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে, তবু বাইরের থেকে লোক আনতে হয়েছে। কারণ, সরকারের প্রয়োজন হেড কাউন্ট।

রাজনীতির আরেকটা হেড কাউন্টের বর্ণনা আশা করি এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কিছু রাজনৈতিক দলের সভায় এই হেড কাউন্ট সবার চোখে পড়বে—স্টেজের ব্যানারে একটা ফ্যামিলি ট্রি-এর ছবি। বিএনপির ব্যানারে হেড কাউন্ট থাকে তিন—জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। আওয়ামী লীগের ব্যানারে হেড কাউন্ট দুই—শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা; তৃতীয়জন তারা এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি।

এক শ বছর পরে, এই দল দুটির ব্যানারে ফ্যামিলি ট্রি আরও বড় হবে, হেড কাউন্টও স্বভাবত আরও অনেক বাড়বে!

যুক্তরাষ্ট্রে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কে, তা বলতে পারবেন কি না, সন্দেহ আছে। কারণ, ওদের ব্যানারে কোনো ফ্যামিলি ট্রি নেই।

একক হেড কাউন্টের বিষয়টাও এখন বলা যেতে পারে। শেখ হাসিনার সময় টিভি স্ক্রিনের ওপরের বাঁ দিকের কোনায় শেখ মুজিবের একটা মাথার ছবি প্রায়ই দেখা যেত বছরের প্রায় দশটা মাস। স্বাধীনতা দিবস, ৭ মার্চ, মৃত্যুদিবস, জন্মদিবস, বিজয় দিবস, পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগমন দিবস ইত্যাদি সব দিবসে মাসব্যাপী অনুষ্ঠান থাকত। এই একক হেড কাউন্টটা শেখ মুজিবের মর্যাদা বাড়াতে কোনো সাহায্য করেনি।

এখন ইন্টারনেট-যুগে আমাদের শহরে গ্রামে প্রায় প্রতিটি জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ আছে। আমাদের জাতীয় দলের একজন বড় নেতা লন্ডনে বসে প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশে তাঁর সমর্থক ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি কথা বলছেন। ঢাকার জনসভায়ও তিনি ভার্চ্যুয়ালি যোগ দিয়েছেন।

সুতরাং সশরীর হাজির হয়ে দলের হেড কাউন্ট বাড়াতে হবে, এই যুগে এ ধারণাটা অচল। হেড কাউন্ট বাড়াতে সভাস্থল থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। যার যত সংযোগ এবং প্রতি সংযোগের স্ক্রিনে যত লোক দেখছেন, তার তত হেড কাউন্ট।

রাজনৈতিক দলগুলো ভাড়া করা গাড়িতে বাইরের থেকে লোকজন নিয়ে এসে আরও বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারেন। যদি কোনো অর্বাচীন প্রশ্ন করে বসেন—বাইরের থাকে আনা লোকগুলোও কি ভাড়াটে? আড়াই কোটি লোকের শহরে হেড কাউন্ট দেখাতে, তাদের শহরের বাইরের থেকে লোক আনতে হবে কেন?

আজকাল আমাদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতারা প্রায় সবাই পুরোমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছেন। নেতাদের আগের দিনের মতো ঢাকার বাইরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সভা-সমিতি করতে দেখা যায় না। সেটাও একটা কারণ হতে পারে ঢাকার সভার হেড কাউন্ট বাড়ানোর। নেতারা যাবেন কেন জনগণের কাছে, জনগণকেই আসতে হবে তাঁদের কাছে! জনগণ হলো রাজনৈতিক দলের হেড কাউন্ট।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ
রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ। প্রতীকী ছবি

Wednesday, June 10, 2026

প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাস্তা বানাতে ‘ইটভাড়া’ নিয়েছিল এলজিইডি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সফরের সময় একটি আধা কিলোমিটার কাঁচা রাস্তায় ইট-বালু ফেলে রাতারাতি নির্মাণ করেছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এ রাস্তা দিয়েই প্রধানমন্ত্রী তাঁর পৈতৃক ভিটায় পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সেই সড়কের ইট তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন বৃষ্টিতে এ সড়কে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এলাকার বাসিন্দারা। যার কারণে এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি পর্যন্ত ৫০০ মিটার এ কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য গত অর্থবছর এলজিইডি থেকে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কার্যাদেশ পাওয়ার পরও ঠিকাদার সঠিক সময়ে কাজ শুরু করেননি। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী সফরের সময় এ কাঁচা সড়কে অস্থায়ীভাবে ইট বিছানো হয়। আনুষঙ্গিক কিছু কাজসহ এতে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে সড়কের ৫০০ মিটার অংশে বিছানো ইট পুরোটায় তুলে নেওয়া হয়েছে।

নিয়মনীতি মেনেই অস্থায়ীভাবে সড়কে ইট বিছানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এলজিইডির বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান। তিনি বলেন, ওই সড়ক পাকা করতে ৮৪ লাখ টাকা আগেই বরাদ্দ হয়েছে। এ কারণে সেখানে অস্থায়ীভাবে বিছানো ইট ঠিকাদারকে তুলে নিতে বলা হয়েছে। কারণ, অস্থায়ীভাবে সোলিং করার জন্য ইট ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ইট কিনতে গেলে ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে।

এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বাগবাড়ি-সোনাহাটা সড়ক থেকে জিয়াবাড়ি পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি কার্পেটিং করার জন্য গত অর্থবছরে এলজিইডি থেকে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্র আহ্বানের পর গত বছরের আগস্ট মাসে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী, এ বছরের আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত সড়ক পাকাকরণের কাজ শুরুই করেনি।

এর মধ্যে গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে আসেন। এদিন তিনি বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন, চৌকিরদহ খাল খননকাজের উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ি পরিদর্শন করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে ৫০০ মিটার এই কাঁচা রাস্তায় রাতারাতি ইট বিছানোর তোড়জোড় শুরু করে এলজিইডি। শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমানকে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে ইট বিছানোর কাজ শেষ হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে আতিকুর রহমান তাঁর শ্রমিক দিয়ে রাস্তা থেকে ইট তুলে নেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

মিনহাজুল ইসলাম নামে স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনে কাঁচা সড়কে ইট বসায় এলাকাবাসী খুশি হয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছিল। এখন সড়কের ইট তুলে নেওয়ায় এ রাস্তা দিয়ে চলাচল দায় হয়ে পড়েছে। চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে এলজিইডি থেকে ওই কাঁচা সড়কে অস্থায়ীভাবে ইট সোলিং করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী, ভাটা থেকে ইট নিয়ে গিয়ে শ্রমিক দিয়ে সড়কে ইট বিছিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সড়কের ইট তুলে ভাটায় নিয়ে এসেছেন। এলজিইডি থেকে শুধু পরিবহন ও শ্রমিক খরচ দেওয়া হয়েছে। তবে সেই কাজের জন্য ঠিক কত টাকা দেওয়া হয়েছিল, সেটা এই মুহূর্তে মনে নেই।

গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, ৫০০ মিটার কাঁচা রাস্তা ৮৪ লাখ টাকায় পাকাকরণের জন্য ইতিমধ্যে ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। বর্তমানে সড়কের পাশে প্যালাসাইডিংয়ের কাজ চলছে। সড়কের সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে সাইট বুঝে দিতে বিলম্ব হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ওই কাঁচা সড়কটি ইট বিছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আরও ১৫০ মিটার রাস্তা ও আনুষঙ্গিক কাজসহ খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৫০ মিটার রাস্তা নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য গাবতলী উপজেলা পরিষদ থেকে ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা এখনো ঠিকাদারকে দেওয়া হয়নি।

সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক বলেন, একটি কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য দরপত্রপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে নতুন করে আর কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। শুধু রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথির সফরকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ব্যয় রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে কাঁচা সড়কে ইট বিছিয়ে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর সড়ক থেকে ইট তুলে নেওয়ায় চরম ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ কাজে সরকারি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হোক, সেটার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে নির্মাণ করা সড়ক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ইট। সম্প্রতি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে নির্মাণ করা সড়ক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ইট। সম্প্রতি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে। ছবি: সংগৃহীত

Thursday, February 26, 2026

‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’, এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে নেই by শিশির মোড়ল

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের একটি বক্তব্য অনেকের নজর কেড়েছে। অনেকে মনে করছেন, মন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্র কিছুটা ফুটে উঠেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এতে চিকিৎসকদের কিছুটা হেয় করা হয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিন পর গত শুক্রবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার হাফিজপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানুষকে যাতে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে না হয়, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে। সহজলভ্য ও সর্বজনীন করার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’ তবে ‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’—এই পরিস্থিতি দেশে নেই।

চিকিৎসাসেবা পাওয়া বা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন চিকিৎসক। সেবার জন্য নার্সসহ আরও অন্য ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীও প্রয়োজন। কিন্তু ১০ হাজার মানুষের জন্য দেশে চিকিৎসক আছে সাতজন। নার্স আরও কম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। বছরের পর বছর স্থায়ী জনবলসংকটের মধ্যে আছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জনবল কম রেখে মানসম্পন্ন সেবা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে চিকিৎসকসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব দূর করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রুমানা হক বহু বছর ধরে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বর্তমান মানবসম্পদ তথ্যপদ্ধতিকে হালনাগাদ ও শক্তিশালী করা এবং একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী, চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মীর শূন্যপদ পূরণ করা। মনে রাখতে হবে, গ্রামীণ সেবাকে পদোন্নতির মানদণ্ডে যুক্ত করলে প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসক ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করি।’

পরিস্থিতি কী

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের (এমবিবিএস পাস) সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার। এর মধ্যে কত চিকিৎসক মারা গেছেন, কত চিকিৎসক বিদেশ আছেন, কত চিকিৎসক পেশা চর্চা করেন না—এই তথ্য বিএমডিসির কাছে নেই।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩০ হাজারের মতো চিকিৎসক কর্মরত আছেন।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন দলিলে বাংলাদেশের অনুমিত জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরা হচ্ছে। সেই হিসাবে দেশে ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক ৭ দশমিক ২ জন। ভারতে ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক ৯ দশমিক ৯ জন, নেপালে ১০ দশমিক ৯ জন, শ্রীলঙ্কায় ১১ দশমিক ৪ জন, পাকিস্তানে ১২ দশমিক ৮ জন এবং মালদ্বীপে ২৩ জন। বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে শুধু আফগানিস্তান (৩ দশমিক ২) ও ভুটান (৫ দশমিক ৫)। একইভাবে দেখা যায়, দেশে নার্সের সংখ্যাও প্রয়োজনের চেয়ে কম।

বাস্তবে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া শুধু একা চিকিৎসকের কাজ নয়। স্বাস্থ্যসেবায় বড় ভূমিকা রাখেন নার্স, মিডওয়াইফ, টোকনোলজিস্টসহ আরও অনেকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রধান বা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। মানসম্পন্ন সেবার জন্য চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর দক্ষতার মিশ্রণের প্রয়োজন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত ১: ৩: ৫ হওয়া বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ একজন চিকিৎসক থাকলে নার্স থাকবেন তিনজন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন পাঁচজন।

২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ কোটি মানুষের জন্য সরকারি খাতে চিকিৎসক প্রয়োজন ১ লাখ সাড়ে ৩ হাজার। সেই হিসাবে নার্স দরকার ৩ লাখ সাড়ে ১০ হাজার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দরকার ৫ লাখ সাড়ে ১৭ হাজার। ওই প্রতিবেদন আরও বলছে, দেশে প্রয়োজনের চেয়ে ১৭ শতাংশ চিকিৎসক কম আছে। অন্যদিকে নার্স ৮২ শতাংশ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ৫৬ শতাংশ কম। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩২ শতাংশ পদ শূন্য।

চিকিৎসক অনুপস্থিতির ১৮ কারণ

দক্ষিণের জেলা খুলনার সুন্দরবন–সংলগ্ন দাকোপ উপজেলায় সরকারি চিকিৎসকের পদ আছে ৪০টি। রোববার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে চিকিৎসক আছেন ১২ জন। অর্থাৎ ২৮টি পদে চিকিৎসক নেই বা ৭০ শতাংশ পদ শূন্য। এ রকম উদাহরণ আরও আছে।

নানা কারণে চিকিৎসকেরা কর্মক্ষেত্রে থাকেন না, থাকতে চান না বা থাকতে পারেন না। ২০২৪ সালের মার্চে স্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট–এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখা গেছে, ১৮ কারণে চিকিৎসকেরা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন। এর মধ্যে আছে:

অবকাঠামোগত দুর্বলতা: রোগী দেখার কক্ষগুলো ছোট, এক কক্ষে একাধিক চিকিৎসককে বসতে হয়, রোগী দেখার সময় গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়স্বজনের ভিড় অনেক বেশি থাকে। হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ প্রয়োজনমতো থাকে না। ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি থাকে। পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না। চিকিৎসকদের সহায়তাদানকারী সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা দেখা যায়। হাসপাতালগুলোতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘটতি থাকায় চিকিৎসকদের নোংরা পরিবেশে কাজ করতে হয়।

প্রভাবশালীদের চাপ, সহিংসতা: হাসপাতালে সরকারি চিকিৎসকেরা সব সময় স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চিকিৎসকদের কাজে বাধা দেন, নানা অনৈতিক চাপ দেন। এসব চাপের কারণে কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অনেক সময় রোগীর আত্মীয়রা চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অনেক সময় শারীরিক সহিংসতার মুখে পড়েন চিকিৎসকেরা।

আবাসন ও পারিপার্শ্বিক সমস্যা: উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের আবাসন সমস্যা বেশি। কর্ম এলাকায় তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভালো সুযোগ নেই। তাঁরা যে এলাকায় কাজ করেন, সেই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ।

নীতি–সম্পর্কিত: সরকারি নীতিই অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পেশাগত উন্নয়নের বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা চার ধরনের সমস্যার কথা গবেষকদের বলেছেন—চাকরির সুযোগ–সুবিধায় ক্যাডারদের মধ্যে অন্যায্যতা রয়েছে, অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানো যায় না, বদলির ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা যায় এবং উচ্চশিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগের ঘাটতি আছে।

গবেষকদের একজন ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের সমস্যাগুলো পুরোনো, পরিচিত ও বহুল আলোচিত। প্রয়োজন আন্তরিকতার সঙ্গে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা।’

‘অটোমেশন’ একটি সমাধান

চিকিৎসকেরা নিজের পছন্দের এলাকায় থাকতে বা পেশা চর্চা করতে চান। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বদলি ও পদায়নে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে চিকিৎসকেরা নিজেদের পছন্দের বেশ কিছু বিকল্প স্থানের নাম উল্লেখ করতে পারেন। এর সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য দক্ষতা মেলালে চিকিৎসকদের পদোন্নতি হবে নিরপেক্ষভাবে।

এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসকের পদায়ন হয়েছে। এই পদায়নে এখনো কোনো অনিয়ম বা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। একই পদ্ধতিতে ৪৪তম বিসিএসের ২১৭ জন চিকিৎসকের পদায়ন হবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

গত রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বহাল থাকলে বা সর্বস্তরে চালু হলে নিয়োগ ও বদলিতে স্বচ্ছতা আসবে, অর্থ লেনদেন বন্ধ হবে।

জনবলসংকট সমাধানে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কমিশন প্রতিবেদনের সুপারিশ নতুন সরকারের আমলে নেওয়া উচিত।

বিএনপি কী করবে, মন্ত্রীর ব্যাখ্যা

নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, চিকিৎসকেরা অসমভাবে বণ্টিত। হাসপাতালে চিকিৎসকদের চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। তাঁদের মধ্যে উৎসাহের ঘাটতি আছে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ‘দেশজুড়ে সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে প্রায় এক লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একটি সভা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমানসহ আরও একাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানিয়েছে, সভায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচিত হয়।

চিকিৎসকেরা মানুষের পেছনে ঘুরবে, এমন বক্তব্যের কিছু সমালোচনা হতে দেখা গেছে। ওই প্রসঙ্গে গত রোববার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজ কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে রোগী কোনো চিকিৎসককে পাননি, এমন অভিযোগ শোনা যায়। আমরা এই ধরনের অভিযোগের অবসান ঘটাতে চাই। আমরা কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে চাই। চিকিৎসকের উপস্থিতি রোগীর সেবা নিশ্চিত করবে। চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণে রোগীর চিকিৎসা হয়নি, এমন অভিযোগ আর শোনা যাবে না।’

‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’, 
এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে নেই

Saturday, February 21, 2026

শুরুটা আরও সুন্দর হতে পারত by টিপু সুলতান

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়নি; জন্ম দিয়েছিল এক নতুন প্রত্যাশার। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশ পেল একটি শান্তিপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। গতকাল মঙ্গলবার ছিল নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথ। সব মিলিয়ে দিনটি হওয়ার কথা ছিল নতুন রাজনৈতিক সূচনার প্রতীক, গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের এক বড় আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপন।

কিন্তু শুরুতেই দেখা দিল অনাকাঙ্ক্ষিত টানাপোড়েন।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে তৈরি হলো প্রথম জটিলতা। বিএনপি আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে এ ধরনের শপথের উল্লেখ নেই। শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতেই তারা জানিয়ে দেয়, তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে না। তাদের যুক্তি—সংবিধানে যেহেতু এর ভিত্তি নেই।

বিএনপির এই অবস্থান রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। সকালে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জানায়, বিএনপি যদি সংস্কার পরিষদের শপথ না নেয়, তবে তারা সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের শপথ না–ও নিতে পারে। এতে দিনের প্রথম ভাগে সাময়িক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুটি শপথই নেন। তবে দল দুটির কেউ বিকেলে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি, যা অনেকের কাছে রাজনৈতিক দূরত্বের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে সংবিধানের ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে জনরায় এসেছে। সেই রায় কার্যকর করার জন্যই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা। আদেশ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের একই অনুষ্ঠানে পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বিধান ছিল এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারিত। সূচনালগ্নেই এই প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়ার কারণে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বেড়ে গেছে।

১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, এটা কেবল সরকার পরিবর্তন বা নতুন সরকার গঠন নয়; এটা ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশার নির্বাচন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তঝরা পটভূমিতে দেশের তরুণেরা নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখার আশা জুগিয়েছিল—সংলাপ, সমঝোতা ও সহযোগিতার সংস্কৃতি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ী ভাষণে বলা হয়েছিল, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন অভিযাত্রার সূচনা।

নির্বাচনের পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা রাখতে চায়। বিএনপি জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির কথা বলছে জোরেশোরে।

কিন্তু শপথের দিনেই যে দৃশ্য দেখা গেল, তা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে অনেকটাই বেমানান।

গণতন্ত্রে মতভেদ অস্বাভাবিক নয়; বরং সেটিই তার প্রাণশক্তি। তবে সূচনালগ্নে প্রতীকী ঐক্যের গুরুত্বও কম নয়। নতুন সরকারের প্রথম দিনটি যদি আরও দৃশ্যমান ঐক্যের বার্তা দিতে পারত, তবে সেটা হতো গণ-অভ্যুত্থানের আত্মত্যাগের প্রতি গভীরতর শ্রদ্ধা।

এখন দেখার বিষয়, এই প্রাথমিক টানাপোড়েন বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়, নাকি সংলাপের মধ্য দিয়ে পথ খুঁজে নেয় নতুন বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে বলা যায়, এত ত্যাগের পর যে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা গড়ে উঠেছে, তার আনুষ্ঠানিক শুরুটা আরও সুন্দর হতে পারত।

* টিপু সুলতান: সাংবাদিক

বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে শপথবাক্য পাঠ করেন
বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথগ্রহণ কক্ষে শপথবাক্য পাঠ করেন। ছবি: বাসস থেকে নেওয়া

Friday, February 20, 2026

বিএনপির শপথ না নেওয়া গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করা by শরীফ ভূঁইয়া

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপির প্রতিনিধিদের শপথ না নেওয়ার ফলে দলটির ও দেশের জন্য নতুন সূচনা যথার্থ হলো না। এই শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি দুভাবে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করল। প্রথমত, গণভোটে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি নাগরিক ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। গণভোটে অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে এটিও ছিল যে জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর প্রতি তাদের সম্মতি জ্ঞাপন করছে কি না? যেহেতু ‘হ্যাঁ’ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে, সেহেতু সংবিধান সংস্কার আদেশ জনগণের সম্মতিপ্রাপ্ত হয়েছে। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং এর কার্যাবলি সংবিধান সংস্কার আদেশের উল্লেখযোগ্য বিষয়। এমনকি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয়টিও এই আদেশে অন্তর্ভুক্ত আছে। পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের ফরমও এই আদেশে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যেহেতু আদেশটি গণভোটে জনগণের সম্মতি লাভ করেছে, তাই এসব বিষয়ও জনগণের সম্মতিপ্রাপ্ত। কাজেই বিএনপির সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়াটা গণভোটে জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করা।

দ্বিতীয়ত, যে কারণে দৃঢ়ভাবে বলা যায় যে বিএনপি জনরায়কে উপেক্ষা করছে, তা হলো নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুস্পষ্টভাবে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন ১২ তারিখে দয়া করে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দেবেন। বিএনপির অন্যান্য প্রতিশ্রুতি যেমন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড ইত্যাদির মতো গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থানও দলটির একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। তাই এই প্রশ্ন উত্থাপন করা যায় যে বিএনপি যদি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান না নিয়ে ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিত, তাহলে নির্বাচনে তারা যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা করতে পারত কি না? ‘না’-এর পক্ষে অবস্থান নিলে এমনও হতে পারত যে বিএনপি নির্বাচনে খারাপ ফল করত। কিন্তু এই শপথ না নেওয়ার ফলে কার্যত গণভোটের রায় ‘না’ হলে যে অবস্থা দাঁড়াত, জাতি এখন সেই অবস্থার মুখোমুখি। কাজেই বিএনপি দুভাবে অর্থাৎ গণভোটের ফলাফলকে উপেক্ষা করে এবং তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে জনরায়কে উপেক্ষা করেছে।

এর ফলে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের যে প্রক্রিয়া চিন্তা করা হয়েছিল, তা একটা প্রাথমিক বাধার সম্মুখীন হলো। এই প্রক্রিয়ায় প্রথম ধাপ ছিল সংবিধান সংস্কার আদেশ জারি, দ্বিতীয় ধাপ ছিল গণভোট এবং তৃতীয় ধাপ ছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ। প্রথম দুটি ধাপ অনুসরণ করা গেলেও তৃতীয় ধাপে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনপ্রক্রিয়া বাধার সম্মুখীন হলো। তবে এখনো আশা করি বিএনপির প্রতিনিধিরা শপথ নেবেন। এতে বিএনপির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো আশঙ্কাও নেই। যেহেতু সংস্কার পরিষদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে।

আর যদি সংস্কার পরিষদ গঠন করা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে ১৪২ অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়া অনুসরণ করার দুর্বলতা হলো, এই অনুচ্ছেদের অধীনে সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা সীমিত এবং এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক বিষয় পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন অতীতে আদালত কর্তৃক অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে। যেমন, হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ-সংক্রান্ত সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা-সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী। বলা বাহুল্য, আদালত কর্তৃক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করার ফলেই দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। এ কারণে জুলাই সনদে বর্ণিত ব্যাপক ও মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত প্রক্রিয়া টেকসই না-ও হতে পারে। বিএনপির পক্ষে এখনো শপথ নেওয়া সম্ভব এবং সে ক্ষেত্রে পুরো বিষয়ের একটি সুন্দর সমাধান হতে পারে।

* ড. শরীফ ভূঁইয়া, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ছিলেন এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আইনবিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন।

শরীফ ভূঁইয়া
শরীফ ভূঁইয়া। ফাইল ছবি

Wednesday, February 18, 2026

নতুন বাংলাদেশ, ইসলামাবাদের উচিত গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা

দ্য নেশনের সম্পাদকীয়ঃ মঙ্গলবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নেতা তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক গতিপথে এটি একটি নির্ধারক পরিবর্তনের সূচনা। পাকিস্তানের অনলাইন দ্য নেশনের সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে।

তারেক রহমান এমন একটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি, যা ঐতিহাসিকভাবে হাসিনা পরিবারের বিরোধী অবস্থানে থেকেছে। তার ব্যাপক নির্বাচনী জয় অতীত রাজনীতির প্রতি স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান এবং বাংলাদেশের একটি অংশের মধ্যে এমন মনোভাবের প্রতিফলন, যেখানে সমালোচকদের চোখে অতিমাত্রায় ভারতঘেঁষা নীতির পরিবর্তে পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্য আনার আকাঙ্ক্ষা দেখা যাচ্ছে। তবে এ ধরনের রূপান্তর সবসময়ই নিজস্ব জটিলতা বহন করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বদানকারী বহুল প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কার্যত আবারও উত্তরাধিকারের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারায় ফিরে গেল, যার সঙ্গে পরিচিত কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও ফিরে এসেছে। বিপ্লবী মুহূর্তগুলো সাধারণত দ্রুত ও মৌলিক সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি করে, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলগুলো ধীর প্রক্রিয়া ও আপসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নতুন বিএনপি সরকার কীভাবে তাদের উত্থানকে সম্ভব করে তোলা সেই বিপ্লবী প্রেরণাকে স্থিতিশীল শাসনের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য করবে- এটাই তাদের মেয়াদের নির্ধারক প্রশ্ন হয়ে উঠবে।

এই নির্বাচন রাজনৈতিক প্রভাবও পুনর্বণ্টন করেছে। জামায়াতে ইসলামী শেখ হাসিনার আমলে প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল। তারা নতুন প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব পেয়েছে। পাশাপাশি, যে ছাত্রগোষ্ঠীগুলোর আন্দোলনে এই রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে, তারাও এখন বিরোধী আসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছিল এবং বাইরের চাপ হিসেবে বিবেচিত বিষয়গুলো প্রতিরোধ করেছিল। বিএনপি সরকার- একদিকে ইসলামপন্থী ও ছাত্রভিত্তিক সক্রিয় বিরোধী শক্তি নিয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শাসনের একটি সুসংহত নীতি ধরে রাখতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের মন্ত্রীদের উপস্থিতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত। ঢাকা শেষ পর্যন্ত যে রাজনৈতিক পথই অনুসরণ করুক না কেন, ইসলামাবাদের উচিত ঐতিহাসিকভাবে সংযুক্ত এই প্রতিবেশীর সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা, যাতে দক্ষিণ এশিয়ায় আরও স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলা যায়।

নতুন বাংলাদেশ, ইসলামাবাদের উচিত গঠনমূলক সম্পৃক্ততা বজায় রাখা

নির্বাচনে জামায়াতের উত্থান ও বিএনপির চ্যালেঞ্জ by ইফতেখারুজ্জামান

শত অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে বহুল প্রত্যাশিত ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। ভোটের হারও মোটামুটি ভালো ছিল। তবে ভোট দিলেও আসলে কতটা বাস্তব পরিবর্তন বা লাভ পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে অনেকের মনে সন্দেহ রয়ে গেছে। এই আস্থার ঘাটতির কারণেই হয়তো ভোটের হার আরও বেশি হয়নি। তবে মোটের ওপর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।

কর্তৃত্বপরায়ণ ক্লিপ্টোক্রেসি বা তস্করতন্ত্রের পরাজয়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। এতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারায়। ফলে দেশে-বিদেশে অনেকেই এ নির্বাচন কতটুকু অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো, সে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধ ও ষড়যন্ত্রমূলক ঘোষণার অবস্থানে আওয়ামী লীগ অবিচল থেকেছে। তারা নির্বাচনকেও অবৈধ ও প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। এ লক্ষ্যে তারা নির্বাচনকালে সক্রিয় ছিল। অতএব নির্বাচন ও নির্বাচনী পরিবেশে আওয়ামী লীগের নেতিবাচক ও সক্রিয় ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন প্রতিহত করার অবস্থান সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা নির্বাচনে ভোটার হিসেবে অংশ নিয়েছেন। এমনকি কারাগারে থাকা দলটির উচ্চপর্যায়ের নেতারাও ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দলটির সমর্থকদের একাংশ ভোট বর্জন করে থাকতে পারেন, কিন্তু সেটি তো সাধারণ ভোটারদের ক্ষেত্রেও কমবেশি প্রযোজ্য।

মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভোট টানার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের অনেকেই, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত জোট এবং জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়েছে। এতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাও সাড়া দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী কোনো কোনো দলে যোগদান করেছেন ও প্রচারণাসহ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন।

ফলে আওয়ামী লীগ একদিকে দল হিসেবে নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে; অন‍্যদিকে অনানুষ্ঠানিকভাবে দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা ভোট দেওয়াসহ তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করেছেন। তাই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি—এমন অবস্থানের পক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বাস্তবতার নিরিখে সব ভোটার সম-অধিকারের ভিত্তিতে ভোট দিতে পেরেছেন, এমনও বলা যাবে না। বাস্তবতা হলো, সব ভোটার সমানভাবে ভোট দিতে পারেননি। এখানে ধনসম্পদ ও পেশিশক্তির প্রভাব বড় ভূমিকা রেখেছে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী পরিবেশে ধর্মান্ধতা, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠদের চাপও ছিল। এই কারণে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক ভোটারদের জন্য পরিবেশ বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠেছে। অনেক সময় এটা কঠিন বা ভয়ংকরও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারপরও, এবার নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং জনগণের রায়ে নতুন সংসদ ও সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। সংসদে বিএনপি জোটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এই ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নেতিবাচক প্রভাব কত বড় হতে পারে—এ অভিজ্ঞতা আছে জনগণের এবং বর্তমান সব রাজনৈতিক দলেরও।

এই শিক্ষা মাথায় রেখে আশা করা যায় যে নতুন সংসদ ও সরকার দায়িত্বশীলভাবে কাজ করবে এবং ‘এবার আমাদের পালা’ মনোভাব পরিহার করবে। এটি দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।

বিএনপির বড় বিজয়ের ঝুঁকির দিক থাকলেও, এবার দেশের ভোটাররা এমন একটি পরিস্থিতি ঠেকাতে পেরেছেন, যা আরও ভয়ংকর হতে পারত। এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে ধর্মান্ধ বা ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে আগ্রাসীভাবে কোনো শক্তির বিস্তারের চেষ্টা সীমিত হয়েছে, অন্তত সাময়িকভাবে।

ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার রোধ করাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম চাওয়া। সেই বিবেচনায় এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের এক-চতুর্থাংশের বেশি আসন পাওয়া হতাশাজনক। কিন্তু এটাই বাস্তবতা। একে শুধু জুলাই আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখলে হবে না। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো ধর্মীয় প্রভাব বাড়ানোর জন্য একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকায় এই ধরনের শক্তি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এর ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের পর থেকে দেশের দুই বড় রাজনৈতিক দল একে অপরের ওপর ‘উইনার টেকস অল’ বা ‘বিজয়ীরা সব নিয়ে যাবে’ মানসিকতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালাচ্ছে। এই প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে ধর্মভিত্তিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা বা নিয়ম ছিল না। এবারের নির্বাচনের কিছু ঘটনার মধ্যেও এর নমুনা দেখা গেছে।

এ শক্তি শুধু কর্তৃত্ববাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের অংশ ছিল না; বরং কর্তৃত্ববাদ পতনের পরে অতি ক্ষমতাপ্রবণ অবস্থায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। নারী কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে বা মাজার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর এই ধর্মীয় চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর আক্রমণাত্মক কর্মকাণ্ডের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের
নীরব ও আত্মসমর্পণমূলক আচরণ এ শক্তিকে আরও ক্ষমতাবান করেছে।

অন্যদিকে ইসলামের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান নেতিবাচক মনোভাব এবং পার্শ্ববর্তী দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের ইসলামবিরোধী প্রচারণার কারণে একধরনের হুমকির অনুভূতি তৈরি হয়। এসব ঘটনা বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিকাশের পথ আরও প্রশস্ত করেছে।

তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কৌশলভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জামায়াত সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, প্রশাসন, সিভিল-মিলিটারি আমলাতন্ত্র, ব্যাংক, আর্থিক খাতসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ইকোসিস্টেমে নিজেদের ভিত্তি শক্তিশালী করতে পেরেছে। দেশের মূলধারার রাজনীতি ধারাবাহিকভাবে দেশের জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ‘বিকল্প’ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছে।

অতএব টেকসই ভিত্তির ওপর বিকশিত জামায়াতের এ নির্বাচনী উত্থান সাময়িক কোনো বিষয় নয়। একই সঙ্গে তাদের এ অভূতপূর্ব অর্জন পরবর্তী সময়ে আরও কত বিকশিত হবে, তা নির্ভর করবে বড় জয় নিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে তার ওপর।

বিএনপি ‘রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা’, এবারের নির্বাচনের ইশতেহার এবং জুলাই সনদে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তার ভিত্তিতে তারা নতুন সরকারে এসে কীভাবে দায়িত্ব পালন করবে, কতটা সফল হবে এবং তার সুবিধা জনগণ কখন, কতটা ও কীভাবে পাবে—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার এসব ক্ষেত্রে সফল হতে না পারলে তা জামায়াতকে আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দেবে।

বিশেষ করে রক্তের বিনিময়ে অর্জিত রাষ্ট্র সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে। এই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকলেও বিএনপি সেগুলোতে ‘সরকারের হাত-পা বাঁধা যাবে না’ বলে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এই প্রস্তাবগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা যৌক্তিক আর বাস্তবে এগুলো কতটা বিপর্যয় বা বুমেরাং হিসেবে কাজ করতে পারে, তা দলকে নতুন করে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে।

অর্থাৎ বিএনপিকে ভাবতে হবে, এগুলো সরকারের কার্যক্রমে কী প্রভাব ফেলতে পারে এবং কীভাবে এগুলো জনগণ বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। সর্বোপরি রাজনৈতিক, জনপ্রতিনিধিত্ব ও সরকারি অবস্থানকে ক্ষমতার অপব্যবহারের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করার যে চর্চা দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে, তা থেকে মুক্তির জন্য আত্মশুদ্ধির পথ অবলম্বন করা ছাড়া বিকল্প নেই।

মনে রাখতে হবে, যেসব কারণে এবার জনগণের রায় জামায়াতকে আরও বেশি পথ যেতে দিল না, সেসব কারণ শনাক্ত করা এবং কীভাবে নিজেদের জনগণের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করা যায়, তার বিশ্লেষণে দলটি হয়তো অবিলম্বেই ‘ড্রয়িং বোর্ডে’ ফিরে যাবে। এই বিশ্লেষণের জন্য তারা হয়তো নতুন পরিকল্পনা বা কৌশল সাজাতে মনোযোগী হবে।

* ইফতেখারুজ্জামান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

মোটের ওপর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে।
মোটের ওপর নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। ছবি : প্রথম আলো

বিএনপির ‘দুর্গ’ খুলনা-২ আসনে ‘হেভিওয়েট’ মঞ্জুর পরাজয়ের নেপথ্যে by উত্তম মণ্ডল

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে এবার ব্যতিক্রমী ফল হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে ধারাবাহিক সাফল্যের পর এবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির প্রার্থী। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো খুলনা নগরের কোনো আসনে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে খুলনা-২ ও খুলনা-৬ আসনে জয় পায় জামায়াত। খুলনা-৬ আসনে জয় নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা থাকলেও খুলনা-২ আসনের ফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সংগঠক ও মাঠের নেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল, যিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। ভোটের আগে অনেক বিশ্লেষণেই মঞ্জুর জয়ের সম্ভাবনা দেখা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

ইতিহাস বলছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে এ আসনে দীর্ঘদিন ধরেই শক্ত অবস্থানে ছিল বিএনপির। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এখানে জয় পান সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। ২০০১ সালে জয় পান বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালে জোটের ভরাডুবির মধ্যেও এ আসনে জয় পান নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ১৯৯৬ সালের পর জামায়াত এ আসনে কখনো প্রার্থী দেয়নি। সেবার জামায়াতের আনসার উদ্দীন ৮ হাজার ৪২৬ ভোট পান।

বিএনপির অন্তত ২০ জন স্থানীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট কম পড়া, দলীয় সমন্বয়ের ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, এ আসনে তুলনামূলক কম ভোট পড়েছে, যা বিএনপির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ভোটের সমন্বয়ও এখানে হয়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াত মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ঘরে ঘরে যোগাযোগ, নারী ভোটারদের কেন্দ্রে আনা এবং দলীয় কোন্দল না থাকা—এসব বিষয় তাঁদের পক্ষে কাজ করেছে।

নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে জড়িত জামায়াতের একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আসনটি আমাদের কাছে নিশ্চিত ছিল না। তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আমাদের মাথায় ছিল। আমরা নির্বাচনের জন্য প্রচুর কাজ করেছি, ঘরে ঘরে গিয়েছি।’

অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মতে, দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন, কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ে দুর্বল প্রচারণা পরাজয়ের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে ভোটারদের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে না পারা এবং নারী ভোটারদের সক্রিয়ভাবে কেন্দ্রে আনতে না পারা বড় দুর্বলতা ছিল।

নগরের বাগমারা এলাকার বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী বলেন, ‘আমাদের দেওয়া ভোটার স্লিপ সবার বাসায় পৌঁছেনি। বিএনপির নির্বাচনী প্রচার বাজার ও মূল সড়কে সীমাবদ্ধ ছিল। জামায়াত নারী কর্মীদের ব্যাপক কাজে লাগিয়েছে, আমরা সেভাবে পারিনি।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সঙ্গে বর্তমান নেতা-কর্মীদের দূরত্ব বাড়তে থাকে। মহানগর বিএনপির থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকেও বাদ দেওয়া হয় মঞ্জু অনুসারীদের। দলীয় পদ হারানোর পরও রাজনীতি থেকে সরে যাননি তিনি। বিভিন্ন ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন। এবারের নির্বাচনে মঞ্জুকে প্রার্থী ঘোষণা করা হলে নগর বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের অনেক নেতা এবং অনুসারীরা তা মেনে নিতে পারেননি।

এমনকি প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পরও দুই পক্ষ আলাদা কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে। মঞ্জুর প্রার্থিতা বাতিলের দাবিও জানান বর্তমান কমিটির নেতারা। একপর্যায়ে প্রকাশ্য বিরোধ মিটিয়ে দুই পক্ষের নেতারাই মঞ্জুর পক্ষে মাঠে নামেন। তবে ভেতরের পুরোনো কোন্দল ভেতরেই রয়ে গিয়েছিল।

ভোটের দুই দিন আগে খুলনা নগরে বিএনপির বর্তমান কমিটির এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ধানের শীষে ভোট চাচ্ছি। তবে প্রার্থী ও তাঁর নিজের লোকদের কাছে সেভাবে মূল্যায়ন পাচ্ছি না। তিনি প্রার্থীকেন্দ্রিক রাজনীতি সাজিয়েছেন। ভেতরের ক্ষত আসলে পুরোটা উপশম হয়নি।’

খুলনা নগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখনো বুঝে উঠতে পারছি না এবার কেন হারলাম, হিসাব মিলছে না। আরও বিশ্লেষণ করার দরকার আছে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণায় খুলনা–২ আসনে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সম্প্রতি নগরের সোনাডাঙ্গা এলাকায়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণায় খুলনা–২ আসনে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সম্প্রতি নগরের সোনাডাঙ্গা এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

Tuesday, February 17, 2026

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান যৌক্তিক -রিদওয়ানুল হকের অভিমত

গণভোট, জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে যে বিতর্ক এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান, সেটি কেবল একটি আইনি বা কারিগরি বিতর্ক নয়। এটি আমাদের সাংবিধানিক সংস্কৃতি, প্রক্রিয়াগত শুদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক আস্থার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। সাম্প্রতিক গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থন পাওয়া একটি সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নপদ্ধতি নিয়ে যে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক জটিলতার বীজ বপন করতে পারে।

প্রথমে একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সংসদীয় নির্বাচন হয়েছে সংবিধানের অধীনে। যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তা বর্তমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই বৈধতা পেয়েছে। অন্যদিকে গণভোটে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো ছিল বহুমাত্রিক। কিছু বিষয়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করে বাস্তবায়ন করা তুলনামূলক সহজ।

কিন্তু যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি, সেগুলো গণভোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় একটি নতুন প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। গণভোটে মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু সেই মতামত সংসদ কীভাবে বাস্তবায়ন করবে, তার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো স্পষ্ট নয়।

সংসদ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের ভূমিকা আলাদা। সংসদের কাজ আইন প্রণয়ন করা। সংবিধান সংশোধনও সংসদের মাধ্যমেই হয়। যদি বর্তমান সংসদকে হঠাৎ করে একটি সংস্কার পরিষদে রূপান্তর করা হয়, তবে তার আইনি ভিত্তি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। সংবিধান সংশোধন ছাড়া এমন কোনো কাঠামো কার্যকর করা হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

উদাহরণ হিসেবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব ধরা যেতে পারে। যদি সংবিধান সংশোধন করে বলা হয় যে ভবিষ্যৎ নির্বাচন থেকে দ্বিকক্ষব্যবস্থা কার্যকর হবে, তবে সেটি বৈধ প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান সংসদ গঠনের দিন থেকেই সেটি কার্যকর ঘোষণা করা হলে তা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক ঐকমত্য। একটি বড় দল ইতিমধ্যে জানিয়েছে যে সংস্কার পরিষদ গঠনের পদ্ধতিতে তাদের সরাসরি সম্মতি ছিল না। অন্যদিকে কিছু দল হুবহু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে। এই বিভাজন সংসদের ভেতরেই একটি ভিন্নমত তৈরি করছে। গণতন্ত্রে মতভেদ অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা না থাকলে সেই মতভেদ অবিশ্বাসে রূপ নিতে পারে।

গণভোটের প্রশ্নেও একই কথা প্রযোজ্য। সাধারণত সংসদে আলোচনার পর কোনো বড় পরিবর্তনের জন্য গণভোট হয়। এবার প্রক্রিয়াটি উল্টো হয়েছে। প্রথমে আলোচনা, তারপর গণভোট, এরপর সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন। গণভোটে সমর্থন পাওয়া মানেই প্রতিটি প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যাবে, এমন নয়। বিশেষ করে যখন প্রস্তাবগুলো বহুবিধ এবং জটিল। সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

আরও একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা জরুরি। কোনো এক প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মকে সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে রাখতে পারে না। সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই যুক্তি থেকেই বিএনপির নোট অব ডিসেন্টকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। একই সঙ্গে অন্য দলগুলোর দাবিও অগ্রাহ্য করা যায় না। সমাধান একটাই, সংসদে আলোচনা করা।

ভবিষ্যতে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সংস্কার প্রশ্নে মতভেদ থাকলে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সম্পর্ক টানাপোড়েনে পড়তে পারে। কিন্তু ইতিবাচক দিকও আছে। প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও সংলাপের উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক। গণতন্ত্রে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে ধারাবাহিক চর্চার মাধ্যমে। তর্ক, আপস, সমঝোতা ও স্বচ্ছতা এই সংস্কৃতির ভিত্তি।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো সংসদকে কার্যকরভাবে কাজ শুরু করতে দেওয়া। অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, সহিংসতা রোধ এবং জনজীবনের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। সংবিধান সংস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া, কিন্তু সেটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প নয়। বরং স্থিতিশীলতার ভিত মজবুত হলেই সংস্কার টেকসই হয়।

* রিদওয়ানুল হক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

রিদওয়ানুল হক
রিদওয়ানুল হক। ছবি: প্রথম আলো

আগে নৌকার জন্য ভোট চাওয়ার ব্যাখ্যা দিলেন রবি চৌধুরী

প্রকাশ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ‘আমাকে দালাল বানাবেন না, আমি দালাল না’—গতকাল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির হয়ে ঢাকা-১৭ আসনে ভোট চাইতে গিয়ে গণমাধ্যমের সামনে কথাটি বলেন সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী। এ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য ভোট চাইতে পুলিশ প্লাজা থেকে গুলশান গার্ডেন ও এর আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ করেন সমর্থক শিল্পীদের একটি অংশ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী রিনা খান, সংগীতশিল্পী মনির খান, চিত্রনায়িকা সামসুন নাহার সিমলা, অভিনেতা শাহেদ শরীফ খান প্রমুখ। বিএনপিপন্থী শিল্পীরা প্রচারে গিয়ে সাধারণ পথচারী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজনের কাছে দোয়া ও ভোট চান।

বিএনপির চেয়ারম্যানকে জয়যুক্ত করার জন্যও অনুরোধ করেন তাঁরা। প্রচারের একপর্যায়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শিল্পীরা। ভোট নিয়ে দলটির প্রতিশ্রুতিও তুলে ধরেন মনির খান ও রিনা খানরা। এরপর সাংবাদিকদের উদ্দেশে অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী বলেন, ‘এখন ফেসবুক তো গরম হয়ে গেছে। সম্প্রতি আমি ও মনির খান ঠাকুরগাঁও জেলায় বিএনপির জন্য ভোট চাইতে গিয়েছিলাম। সেখানে অনেকেই প্রশ্ন তোলে আমাকে নিয়ে যে আমি নৌকার জন্য ভোট চেয়েছিলাম।’

এরপর রবি বলেন, ‘আমাকে দালাল বানাবেন না, আমি দালাল না। আমি কি কাজ করি, আমার এলাকায় গিয়ে দেখেন। গায়িকা মমতাজ আমাকে দাওয়াত দিয়েছিল। সে আমার সহশিল্পী। তার অনুরোধে তার মার্কার জন্য আমি ভোট চেয়েছি। এখানে আমি কারও দালালি করিনি। আমি গান গাইতে গিয়েছি। যেখানে টাকা দেবে, সেখানেই গান গাইব, সেটা যেই হোক।’

এ বিষয়ে প্রথম আলো আজ মঙ্গলবার দুপুরে কথা বলে রবি চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ২০০৩ সালে খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী ছিলাম। মিয়ানমারে তখন আমি আর শাকিলা জাফর “কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে” গানটি গেয়েছি। তারেক রহমান সাহেবও সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবেও চিনি। জানাশোনাও ভালো। মানুষের সঙ্গে মিশলে মানুষ সম্পর্কে জানা যায়। মেশার পর জেনেছি, তিনি ভদ্রলোক। আমি কিন্তু একটা সময় জাসাসের অনেক অনুষ্ঠানও করেছি। দলীয়ভাবে যদিও আমি কোনো পদপদবি নিইনি। তবে ওরা চেয়েছিল আমাকে বিএনপিতে রাখতে। গাজী মাজহারুল আনোয়ার ভাই ও হেলাল খানও আমাকে বারবার চেয়েছিলেন। বলেছি, দল করব না কিন্তু আপনাদের সমর্থনে আছি। আমি কিন্তু আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে ছিলাম না। নৌকার জন্য যে ভোট চেয়েছি, তা মমতাজ আমার সহকর্মী—সে অনুরোধ করেছে, সেখানে গিয়ে আমি তাঁর ভোট চেয়েছি। এখানে যদি মনির খানও বলে—আমি তার জন্যও ভোট চাইতে যাব। আমার অঙ্গনের অন্য কোনো সহকর্মী এক্স, ওয়াই জেড—যে–ই বলুক, তার জন্যও নামব। এখন চাই, জাতীয়তাবাদী দল ধানের শীষ বিজয়ী হোক।’

বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় রবি চৌধুরী, সঙ্গে মনির খানও
বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় রবি চৌধুরী, সঙ্গে মনির খানও। ছবি : শিল্পীর ফেসবুক থেকে

মানুষ রাজনীতি করে কেন, সুবিধা নেওয়ার জন্য তো? এমপি হওয়ার জন্য, মন্ত্রী হওয়ার জন্য—কিন্তু আমার এ ধরনের কোনো লোভ নেই—উল্লেখ করে রবি চৌধুরী বলেন, ‘কোনো সুবিধা নেওয়ার জন্য ধানের শীষের প্রচারণা করছি না। আগের সরকারের আমলেও করিনি, এই সরকারের আমলেও না। শুধু দেশ বাঁচানোর জন্য ধানের শীষের জন্য প্রচারে নেমেছি।’

আগে নৌকার জন্য ভোট চেয়েছেন—এমন প্রসঙ্গ উঠতেই রবি চৌধুরী বললেন, ‘আগেই বলেছি, মমতাজ আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, এটা একান্তই তার অনুরোধে। আওয়ামী লীগের কোনো মিছিল–মিটিংয়ে গেছি কি না, সেটা কেউ আমাকে দেখাক। আমার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে নানান কথা লেখা হচ্ছে! তাদের বলতে চাই, একজন শিল্পী হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন শিল্পী হিসেবে আমাকে দাওয়াত দেন, যাওয়াটা আমারও দায়িত্ব। শিল্পী হিসেবে অন্যদের যেমন দাওয়াত দিয়েছেন, আমাকেও তাই। ওই দাওয়াতের কিছু ছবি এখন মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেব এবং তারেক রহমান সাহেবের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ভিউ পাওয়ার জন্য একটা গ্রুপ খবর ছড়াচ্ছে। এসব করছে ভিউ ব্যবসায়ীরা। স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শিল্পী হিসেবে আমার দেশে যিনি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, তিনি যখন আমাকে সম্মান দিয়ে ডাকবেন—আমি অবশ্যই যাব। এই যাওয়াটা আমার দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও সম্মান দেখানো।’

টাকার জন্য শিল্পীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করে থাকেন। মমতাজের নির্বাচনী প্রচারণার অনুষ্ঠানেও টাকা পেয়েছেন বলে গান করেছেন রবি চৌধুরী—এমনটাই জানালেন। আর সেই অনুষ্ঠানে মমতাজের জন্য সবার কাছে ভোট চেয়েছেন তিনি।

রবি চৌধুরী বলেন, ‘মমতাজের অনুষ্ঠানে আমাকে টাকার বিনিময়ে নিয়ে গেছে। আমি সেখানে গান গেয়েছি। যারাই আমাকে টাকা দেবে, তাদের সঙ্গে যদি অন্যান্য শর্ত মেলে, তাহলে অবশ্যই গান গাইব। তা ছাড়া মমতাজ তো আমাদের বন্ধু, এটা তো অস্বীকার করতে পারব না। সে আমাদের খুব কাছের, আপনজন। আমরা সবাই তো তার বাসায় আড্ডা দিতাম। মনির খান, ওমর সানি, অপু বিশ্বাস থেকে শুরু করে অনেকে মমতাজের বাসায় দিনের পর দিন আড্ডা দিয়েছি। কারণ, আমরা শিল্পী পরিবার। এই পরিবারের কেউ যদি আওয়ামী লীগ করে, তাঁকে তো আমি ফেলে দিতে পারব না, অস্বীকার করতে পারব না। সে–ও এই দেশের নাগরিক, শিল্পী পরিবার—শিল্পী রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু সরকারে যেই–ই থাকুক—শিল্পীর শিল্পকর্মটাই সরকারের বিবেচনায় রাখা উচিত।’

মমতাজের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় রবি চৌধুরী
মমতাজের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় রবি চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

Monday, February 16, 2026

২৮ আসনে জয়-পরাজয়ে যেভাবে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা by আসিফ হাওলাদার

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে ২১টি আসনে জিতেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন সাতটি আসনে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ে প্রভাব রেখেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা।

যেসব আসনে বিদ্রোহীদের কাছে বিএনপি বা দলটির সমর্থিত প্রার্থীরা হেরেছেন, সেগুলো হলো ময়মনসিংহ-১, দিনাজপুর-৫, কুমিল্লা-৭, কিশোরগঞ্জ-৫, টাঙ্গাইল-৩, চাঁদপুর-৪ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২।

বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ। ময়মনসিংহ-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৯২৬ ভোট। তাঁর চেয়ে ৬ হাজার ৩৩৯ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ সালমান ওমর।

বিদ্রোহীতে ধরাশায়ী বিএনপির জোটসঙ্গীরা

ঢাকা-১২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট পেয়ে তিনি দ্বিতীয় হয়েছেন। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল আলম (নীরব) পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। দুজনের সম্মিলিত ভোট ৬০ হাজার ৮৩২ ভোট।

বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে ভোট ‘ভাগ’ হয়ে যাওয়ায় এই আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন। তিনি পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জোটসঙ্গী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী জুনায়েদ আল হাবিব। ৩৭ হাজার ৫৬৮ ভোটের ব্যবধানে তাঁকে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রুমিন ফারহানা।

সিলেট-৫ আসনে বিএনপির সমর্থনে নির্বাচন করেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক। তিনি পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। এই আসনে জয়ী হয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান। দেয়ালঘড়ি প্রতীক নিয়ে তিনি পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ পেয়েছেন ৫৬ হাজার ৩৬৯ ভোট।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীকে সমর্থন দিয়েছিল বিএনপি। তিনি হেরেছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিনের কাছে। কাসেমী পেয়েছেন ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। জয়ী হওয়া আব্দুল্লাহ আল আমিন পেয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট।

এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁরা হলেন মো. শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। শাহ আলম ৩৯ হাজার ৫৮৯ ভোট আর গিয়াস পেয়েছেন ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট। অর্থাৎ ভোট ‘ভাগ’ না হলে কাসেমীর জয় নিশ্চিত ছিল।

ধানের শীষ পেতে দলত্যাগ, তবু হার

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিবের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কুমিল্লা-৭ আসনে নির্বাচন করেছেন রেদোয়ান আহমেদ। তাঁকে ৪৩ হাজার ১৮১ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম (শাওন)।

ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী হন। ভোটে তিনি তৃতীয় হয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত ভোট ৪৫ হাজার ৪৬৩। তাঁকে ৭২ হাজার ৬৭৯ ভোটে পরাজিত করেছেন জামায়াতের প্রার্থী আতাউর রহমান। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মনিরুল ইসলাম ৭৮ হাজার ৪৫৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন।

ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার জন্য গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন মো. রাশেদ খান। ঝিনাইদহ-৪ আসনে নির্বাচন করে তিনি ৫৬ হাজার ২২৪ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। এই আসনে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালিব। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৯৯ ভোট। এখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. সাইফুল ইসলাম ফিরোজ পেয়েছেন ৭৭ হাজার ১০৪ ভোট।

বিএনপিতে বিদ্রোহী থাকায় যেসব আসনে সুবিধা পেল জামায়াত

বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় যে ২১টি আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের প্রার্থীরা সুবিধা পেয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৬ আসন অন্যতম।

বাঁশখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রামের এই আসনে ১০ হাজার ৬২ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মোহাম্মদ লেয়াকত আলী ৫৫ হাজার ৪৯২ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

পাবনা-৪ আসনটির কথাও আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। এই আসনে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭৫ ভোট পেয়ে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী আবু তালেব মণ্ডল। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৭৪ ভোট। দুজনের ভোটের পার্থক্য ৩ হাজার ৭০১।

এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী জাকারিয়া পিন্টু পেয়েছেন ২৭ হাজার ৯৭০ ভোট। অর্থাৎ বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ায় অল্প ব্যবধানে হারতে হয়েছে হাবিবকে।

বাগেরহাট-১ আসনে ৩ হাজার ২০৪ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থী কপিল কৃষ্ণ মণ্ডলকে পরাজিত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মশিউর রহমান খান। এই আসনে বিএনপির দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মো. শেখ মাছুদ রানা পেয়েছেন ৬ হাজার ৪৬৭ ভোট এবং এম এ এইচ সেলিম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। দুজনের মোট ভোট ১১ হাজার ৭৫০। অর্থাৎ এই দুই নেতা বিদ্রোহী না হলে বিএনপি প্রার্থী কপিলের সুবিধা হতে পারত।

একই রকম বা কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে যশোর-৫, মাদারীপুর-১, ঢাকা-১৪, সাতক্ষীরা-৩, পাবনা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, বাগেরহাট-২ এবং বাগেরহাট-৪ সংসদীয় আসনে।

ময়মনসিংহ-৬ সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল। এখানে জিতেছেন জামায়াতের প্রার্থী কামরুল হাসান। তিনি পেয়েছেন ৭৭ হাজার ৩২৫ ভোট। এই আসনে জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. জসিম উদ্দিন পেয়েছেন ৫১ হাজার ৯৭০ ভোট।

এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আখতারুল আলম পেয়েছেন ৪৯ হাজার ৪৭৬ ভোট পান। আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আখতার সুলতানা পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৩৩১ ভোট।

ঢাকা-১২ আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান
ঢাকা-১২ আসনে জয়ী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

নাহিদ ইসলামের বাসায় তারেক রহমান

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সাক্ষাতে নাহিদ তারেক রহমানকে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, রাজনৈতিক মতভিন্নতা সত্ত্বেও সবাই যাতে একসঙ্গে থাকতে পারেন, সংলাপের মধ্য দিয়ে যাতে যেকোনো সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো যায়। বিএনপির পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার দুই দিন পর আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদের বাসায় যান তারেক রহমান। তাঁর সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও ছিলেন।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাহিদের বাসার ড্রয়িং রুমে তারেক রহমান ও নাহিদ ইসলামের সাক্ষাৎ হয়। এ সময় এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত আখতার হোসেন এবং দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম নাহিদের সঙ্গে ছিলেন। প্রথমেই তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান নাহিদ। এরপর শহীদ আনাসের ফ্রেমে বাঁধা সেই মর্মস্পর্শী চিঠি তারেক রহমানকে উপহার দেন তিনি। এনসিপির দলীয় প্রতীক শাপলা কলির একটি স্টিলের তৈরি প্রতিকৃতিও বিএনপির চেয়ারম্যানকে উপহার দেন নাহিদ ইসলাম। পরে দুজন বসে আলোচনা শুরু করেন।

আলোচনা শেষে রাত সোয়া নয়টার দিকে নাহিদের বাসা থেকে বের হয়ে যান তারেক রহমান। বাইরে সাংবাদিকেরা থাকলেও তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তারেক রহমান চলে যাওয়ার পর নাহিদের বাসার নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘জনাব তারেক রহমান ও জনাব নাহিদ ইসলাম আজকে সৌজন্য সাক্ষাতে একত্রে বসেছেন। নির্বাচনে কয়েকটি আসনের ফলাফল নিয়ে এনসিপির প্রশ্ন থাকলেও তারেক রহমান যে রাজনৈতিক সৌজন্যবোধের জায়গা থেকে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন, এই রাজনৈতিক সৌজন্যতা এবং তাঁর জয়ী হয়ে আসাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। নিজেদের মধ্যে মতভিন্নতা সত্ত্বেও আমরা কীভাবে একত্রে দেশের জন্য কাজ করতে পারি, সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। সংস্কারের প্রশ্নকে কীভাবে সুরাহা করা যায় এবং বিচারের প্রশ্ন নিয়েও আমরা কথা বলেছি।’

তারেক রহমান ও নাহিদ ইসলাম এবং বিএনপি ও এনসিপির এই নির্বাচন–পরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটা পরিবর্তনের আভাস দেয় উল্লেখ করে আখতার বলেন, ‘আমরা মনেপ্রাণে চাই, আমাদের রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য আলাদা হবে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে সব দল একসঙ্গে থাকব। সে ধরনের পরিবেশ অটুট থাকবে, এই প্রত্যাশা আমরা রাখছি।’

কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে কীভাবে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ‘পলিসি ডায়ালগের’ (নীতি–সংলাপ) মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেসব বিষয়েও তারেক রহমানের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান এনসিপির সদস্যসচিব। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন–পরবর্তী যেসব সহিংসতা বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে, সেসব নিয়েও আমরা তারেক রহমানকে জানিয়েছি। তাঁদের দলের পক্ষ থেকে সে বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’

জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, অভ্যুত্থানে জীবন দেওয়া ও অঙ্গহানি হওয়া বীর শহীদ ও গাজীদের পরিবারের যথোপযুক্ত পুনর্বাসন নিয়েও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আখতার। তিনি বলেন, নির্বাচন–পরবর্তী এই সৌজন্য সাক্ষাৎ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।

পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আখতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পক্ষে, ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে থাকা যেকোনো রাজনৈতিক দল, যারা বাংলাদেশকে নতুন করে গড়তে চায়—এমন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, পলিসির (নীতির) ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যাতে একত্রে বসতে পারি, সংলাপের মধ্য দিয়ে যাতে আমরা সমাধানে পৌঁছাতে পারি, সে ব্যাপারে নাহিদ ইসলাম আহ্বান জানিয়েছেন। সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে বিএনপির নেতারাও জোরারোপ করেছেন। আমরা আশাবাদী, আজকের এই সাক্ষাৎ বা সংলাপের মধ্য দিয়েই আমরা দেশের সংকটকে সমাধানের দিকে নিতে পারব।’

বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগদানের কোনো আহ্বান এনসিপি পেয়েছে কি না, জানতে চাইলে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘এটা নির্বাচন–পরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ। রাজনৈতিক যেসব বিষয়বস্তু থাকে, সে রকম কোনো বিষয়ে আমাদের আলোচনা হয়নি। নির্বাচনে জয়ী দল ও বিরোধী দল হিসেবে যাঁরা ফাংশন করবেন, তাঁদের মধ্যকার একটা সম্পর্কের সূচনা হিসেবে আজকের এই সাক্ষাৎ। অন্যান্য রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনা হয়নি। সে বিষয়গুলো সামনের দিনে আমাদের মধ্যে আরও আলোচনা হবে। তখন এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানানো যাবে।’

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে বাসায় স্বাগত জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে বাসায় স্বাগত জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেলের সৌজন্যে

নিরঙ্কুশ জয়ের পর বাংলাদেশের নতুন নেতা কি পরিবর্তন আনতে পারবেন

বিবিসির বিশেষ প্রতিবেদনঃ মাত্র দুই বছর আগে শেখ হাসিনা যখন তাঁর পক্ষে কারচুপি করার অভিযোগে অভিযুক্ত এক নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, তখন ভাবা কঠিন ছিল যে দীর্ঘ ১৫ বছরের ক্ষমতার ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এভাবে হঠাৎ ভেঙে পড়বে। কিংবা কার্যত বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া একটি বিরোধী দল এমনভাবে বিশাল ব্যবধানে ফিরে আসবে।

তবে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের চক্রে এটি হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার আরও একটি হাতবদলমাত্র। কয়েক দশক ধরে এ দুই দলই পর্যায়ক্রমে দেশ শাসন করে আসছে।

ব্যতিক্রম শুধু এটিই যে এবারই প্রথম বিএনপির নতুন নেতা তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও প্রথমবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।

গত বছরের শেষ দিকে অসুস্থতায় তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া মারা যান। বিএনপির প্রয়াত এই চেয়ারপারসন চার দশক ধরে দলের প্রধান ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা দলের হাল ধরেছিলেন।

মায়ের শাসনামলে স্বজনপ্রীতির সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ যেমন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে, তেমন তিনি দুর্নীতির অভিযোগেরও মুখোমুখি হয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে লন্ডনে ১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন তিনি।

৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান তাঁর মায়ের কারাবাস ও অসুস্থকালীন মাঝেমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া বিএনপির ‘ডি-ফ্যাক্টো’ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি মূলত একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে বিবেচিত নন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাভীন মুর্শিদ বলেন, ‘তাঁর (তারেক রহমান) পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকাটা তাঁর জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, মানুষ পরিবর্তনের সুযোগ দিতে চায়। ভাবতে চায়, নতুন ও ভালো কিছু করা প্রকৃতপক্ষেই সম্ভব। তাই অনেক আশা রয়েছে।’

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, ‘গত এক দশকে যেসব গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে, সেগুলো আমাদের আগে ঠিক করতে হবে।’

বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরে তা ভাঙার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যেখানে ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।

তবে এবার ২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’ অংশ নেওয়া তরুণ প্রজন্ম, যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, তারা আর এমন ধারার (পুরোনো) রাজনীতি মেনে নিতে রাজি নয় বলে মনে হচ্ছে।

অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী তাজিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা আর লড়াই করতে চাই না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগই আমাদের চূড়ান্ত বিজয় ছিল না। আমাদের দেশ যখন কোনো দুর্নীতি ছাড়া চলবে ও অর্থনীতি ভালো হবে, সেটাই হবে আমাদের মূল বিজয়।’

তাজিনের ২১ বছর বয়সী স্বজন তাহমিনা তাসনিম বলেন, ‘আমরা প্রথমেই মানুষের মধ্যে ঐক্য চাই। আমাদের একটি স্থিতিশীল দেশ ও অর্থনীতি পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছি এবং জানি কীভাবে লড়াই করতে হয়। তাই, যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়, আমরা আবার রাস্তায় নামার অধিকার রাখি।’

হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামল সংঘাতের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে।

নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। এ ছাড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, খাদ্যদ্রব্যের দাম কমানো এবং বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও হবে বিশাল চ্যালেঞ্জ।

সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা মনে করেন, সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতার অভাব সব দলের ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দুবার নিষিদ্ধ হওয়া ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর জন্য এবারই প্রথম উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন জয়ের অভিজ্ঞতা হলো।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ও জামায়াতে ইসলামীর জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের প্রথম নির্বাচনেই ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে।

লুৎফা বলেন, ‘আমরা সংসদে এমন সব নেতাদের দেখতে যাচ্ছি, যাঁরা আগে কখনো সংসদে যাননি। এনসিপির তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছে। অন্যরা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হলেও তাঁদের দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাই এটি একটি কঠিন কাজ হতে যাচ্ছে।’

জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী। সেখানে ইসলামি আইনের কোনো উল্লেখ ছিল না। কিন্তু দলটির ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, ‘জামায়াত রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজ করে, কারণ রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’ আর এটিই সব সময় প্রশ্ন তুলেছে যে দলটি ক্ষমতায় এলে প্রকৃতপক্ষে কী করবে।

নাভীন মুর্শিদ বলেন, এই নির্বাচনে জামায়াতের ফলাফল আশ্চর্যজনক কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘জামায়াত একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। কয়েক দশক ধরে তারা তৃণমূল পর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করেছে। আমি মনে করি, সেটি স্বীকার করতে হবে। তবে দলটির সমস্যাযুক্ত দিক হলো তারা মূলত “গণতন্ত্রবিরোধী, নারীবিদ্বেষী ও পিতৃতান্ত্রিক”।’

লুৎফা বলেন, সব রাজনৈতিক দলই বাংলাদেশের নারীদের হতাশ করেছে। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি ছিল নারী। তিনি বলেন, ‘আমরা যেসব নারী জুলাই অভ্যুত্থানের অংশ ছিলাম, সব রাজনৈতিক দল আমাদের সেই সম্মিলিত ভূমিকাকে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বা নির্বাচনী রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন সংসদ সদস্যদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তাঁরা সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নিয়ে আসতে পারেন।’

বাংলাদেশের ৩৫০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত। বাকি ৫০টি সংরক্ষিত আসন দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে মনোনীত নারীদের জন্য বরাদ্দ।

যদিও হাসিনার অধীন গত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় এ নির্বাচন ছিল একদম ভিন্ন, যেখানে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হয়েছে এবং ভোটের আগে ফলাফল জানা ছিল না। কিন্তু তাঁর দলকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এর গ্রহণযোগ্যতার ওপর একটি ছায়া ফেলেছে।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে তাঁরা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সমর্থন করবেন কি না, তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা চৌধুরী বলেন, ‘এটি আমাদের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়।’

এই নেতা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফিরতে সময় লাগবে। কারণ, তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যখন আপনি আপনার নিজের দেশের মানুষকে হত্যা, নৃশংসতা ও নিপীড়ন করার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, তখন ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান কোথায় হবে, তা জনগণই ঠিক করবে।’

ভারত থেকে শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবারের এ নির্বাচনকে ‘প্রতারণা ও প্রহসনের’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং আবার নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন, যেখানে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে।

বর্তমানে হাসিনার দলের বিরুদ্ধে জনরোষ তুঙ্গে। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনায় আওয়ামী লীগকে চিরতরে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়াটা হবে অপরিপক্বতা।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

এক গ্রাম থেকেই সংসদ সদস্য হলেন তিনজন by গাজী ফিরোজ

গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের তিনটি আসন থেকে পৃথকভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরা। এই তিনজনই চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামটির নাম গহিরা। এক গ্রাম থেকে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এলাকার লোকজনের মধ্যে খুশির আমেজ বিরাজ করছে।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে নির্বাচিত হন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। সাঈদ আল নোমান নির্বাচিত হয়েছেন নগরের চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, খুলশী, পাহাড়তলী) আসন থেকে। তিনজনই বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

গিয়াস উদ্দিন কাদের ও হুম্মাম সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বড় ভাই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।

গিয়াস উদ্দিন কাদের ও হুম্মাম গহিরা গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা। তাঁদের বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে সাঈদ আল নোমানের বাড়ি। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে।

বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দাদের একজন নুর উদ্দিন চৌধুরী। তিনি গহিরা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের মধ্যে গহিরা একমাত্র গ্রাম যেখান থেকে এবারের নির্বাচনে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে এলাকার লোকজনের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নিজ সংসদীয় এলাকা ছাড়াও নিজেদের গ্রামের উন্নয়নে অবদান রাখবেন, বাসিন্দাদের সেটিই প্রত্যাশা।’

বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর আবদুল্লাহ আল হারুন, বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান গহিরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান পার্লামেন্টের স্পিকার ও পাকিস্তানের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাড়িও এই গ্রামে। তিনি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী চৌধুরী মহিবুল হাসান, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু এবং রাউজান আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বাড়িও এই গহিরা গ্রামে।

রাউজান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার পাশাপাশি নির্বাচিত আরও দুজন সংসদ সদস্যের বাড়িও এই এলাকায়। তাঁরাও এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। গ্রামের জন্য এটি খুবই সুসংবাদ।’

প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের ও আবদুল্লাহ আল নোমানের কবর গহিরা গ্রামে। এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে তাঁদের ছেলে হুম্মাম কাদের ও সাঈদ আল নোমানের। তাঁরা দুজনই নিজ সংসদীয় আসনের পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

গহিরা গ্রাম থেকে এবারের নির্বাচনে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে এলাকার জন্য গর্বের বিষয় বলে মন্তব্য করেন গহিরা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রায়হান মাহমুদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের শিক্ষা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাশাপাশি বাকি দুজনও অবদান রাখতে পারেন। এতে এলাকার লোকজন উপকৃত হবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-14%2Fbvs984wu%2FUntitled-6-1f.png?rect=0%2C0%2C918%2C612&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান। ফাইল ছবি

Saturday, February 14, 2026

পঞ্চগড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খোলা বিএনপি নেতা বললেন, সেটি গুদামঘর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন পঞ্চগড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের তালা খোলা–সংক্রান্ত ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাত ১১টার দিকে জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আবু দাউদ প্রধান দাবি করেন, ঘটনাস্থলটি চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছিল না। বরং তিনি সেটিকে একটি গুদামঘর হিসেবেই জানতেন। তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করা এবং সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

আবু দাউদ প্রধান বলেন, তিনি পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যান। গতকাল সকালে গ্রামের বাড়ি থেকে শহরে আসার পথে চাকলাহাট বাজারে লোকজনের জটলা দেখে সেখানে যান। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন, জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী একটি গুদামঘরের তালার চাবি দিচ্ছিলেন না। পরে তিনি ওই কর্মীকে চাবি দিতে বললে তালা খুলে দেওয়া হয় এবং চাবিটি বাজার বণিক সমিতির সভাপতির কাছে জমা রাখা হয়।

স্থানীয় বিএনপির এই নেতার ভাষ্য, ‘এ সময় আমি ঘরটি গুদামঘর বলেই জানতাম। সেখানে কোনো চেয়ার, টেবিল বা কোনো রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ছিল না। ঘটনার সময় আমি লোকজনকে সামলাতে গিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে কে কী বক্তব্য দিয়েছেন—তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। পরে শুনেছি সেখানকার ভিডিও আওয়ামী লীগ অফিস খুলে দেওয়া হয়েছে বলে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’

এর আগে গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান বুলেট। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আবু দাউদ প্রধান, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক ইউপি সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আনিসুজ্জামান স্বপনসহ আরও অনেকে। আওয়ামী লীগ কার্যালয় খুলে দেওয়ায় আবু দাউদ প্রধানকে ধন্যবাদ জানাতে দেখা যায়।

সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাতে পঞ্চগড় জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায়
সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাতে পঞ্চগড় জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো