Tuesday, April 28, 2015

মেয়রের হাতে কি আলাদিনের চেরাগ আছে? by মহিউদ্দিন আহমদ

অনেক বছর আগে একটি গান শুনেছিলাম—গণসংগীত। একটি লাইন এখনো মনে পড়ে: ‘জান দিয়ে ইলেকশন পেলাম লাগল দেশে ধুম’। জনগণের মৌলিক চাহিদাগুলোর কথা না বলে ভোটের রাজনীতি নিয়ে মাতামাতিকে বিদ্রূপ করে ষাটের দশকে অনেক বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী এই গানটি গাইতেন। দুদিন পরই হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম ও ঢাকায় সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। চারদিকে হইহই-রইরই। দেশটা ভাসছে নির্বাচনের জোয়ারে।
দেশের আইন অনুযায়ী এই নির্বাচন হবে নির্দলীয় ভিত্তিতে। কিন্তু ঘটা করে যেভাবে দল থেকে মনোনয়ন কিংবা সমর্থন দেওয়া হচ্ছে এবং দলের রাঘববোয়ালেরা যেভাবে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, তাতে নির্বাচনটা আর নির্দলীয় থাকছে না। মসজিদেও শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনী প্রচার। নির্বাচনের আচরণবিধিকে যেভাবে বুড়ো আঙুল দেখানো হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন কমিশন কি নখ-দন্তহীন, না মেরুদণ্ডহীন? নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা অসীম। কিন্তু এই ক্ষমতা বাস্তবে প্রয়োগ করার ইচ্ছা, সাহস ও যোগ্যতা কমিশনের আছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
কয়েকটি বড় রাজনৈতিক দল রীতি পাল্টে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার প্রস্তাব করেছে। শিগগিরই হয়তো আইন করে এটা জায়েজ করা হবে। রাজনৈতিক দলের জন্য এটা খুবই দরকার। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে জেনেছি এবং শিখেছি যে মেয়রের কাজ প্রধানত দুটি। দলের জনসভায় লোক সাপ্লাই দেওয়া এবং দলের ক্যাডারদের ঠিকাদারি পাইয়ে দেওয়া। যে ওয়ার্ডে সরকারদলীয় কাউন্সিলর নেই, সেই ওয়ার্ডে কোনো ‘উন্নয়ন’ হয় না, অথবা উন্নয়নের তাবৎ কাজ তত্ত্বাবধান করেন সরকারি দলের পরাজিত প্রার্থী অথবা তাঁর কোনো কুটুম।
আয়তনের দিক থেকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঢাকা একটি ছোট শহর, কিন্তু জনসংখ্যার দিক দিয়ে অনেক বড়। ঢাকার জনসংখ্যা কত? কেউ বলেন দেড় কোটি, কেউবা বলেন দুই কোটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘ঢাকা স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেট্রোপলিটন এরিয়া’র মধ্যে টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার এবং নারায়ণগঞ্জও আছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার জনসংখ্যা এক কোটির মতো। আমাদের তো সবকিছু বাড়িয়ে বলার অভ্যাস। এই শহরে মানুষ গাদাগাদি করে বাস করে। পানীয় জল, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ-সুবিধা এবং ঘরের মান অনুযায়ী বলা চলে এই শহরের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ প্রকৃত অর্থেই বস্তিবাসী। এ রকম সমস্যা-কণ্টকিত একটি জনপদকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য নিয়ে আসাটা একটা বড় রকমের চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যার সমাধান জয় বাংলা কিংবা জিন্দাবাদ স্লোগানের মধ্যে নেই। সাধারণ মানুষের সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন করতে পারলে নগরবাসী স্বস্তি পাবেন।
এবারের সিটি নির্বাচনে কিছু ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য নজরে পড়ছে। মেয়র প্রার্থীরা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। পেছনে তাঁদের রাজনৈতিক মুরব্বিরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যতই খিস্তিখেউড় করুন না কেন, প্রার্থীরা কথা বলছেন ভদ্রলোকের মতো, ‘জিব ছিঁড়ে ফেলব’ বা ‘মাটির নিচে পুঁতে ফেলব’—এ-জাতীয় কথা মেয়র প্রার্থীদের মুখে এখনো শোনা যায়নি। এটা ভালো লক্ষণ।
মেয়র প্রার্থীরা তাঁদের ইশতেহারে দুনিয়ার যত সুন্দর শব্দ ছেঁকে তুলেছেন, তা নাগরিকদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। ঘুম থেকে উঠে রাস্তায় কোনো আবর্জনা দেখা যাবে না, সবাই গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি পাবেন, যানজট জাদুঘরে চলে যাবে। সবাই নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন, ইত্যাদি। প্রার্থীরা অনেকেই জানেন না, তাঁরা তাঁদের এখতিয়ারের বাইরে কথা বলছেন। নির্বাচিত হয়ে যখন এর কোনোটাই তাঁরা বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, তখন তাঁরা যুক্তি দেখাতে পারবেন, ‘আমাকে সরকার এই ক্ষমতা দেয়নি, তাই আমি আন্তরিকতা সত্ত্বেও অঙ্গীকার পূরণ করতে পারিনি।’ নিজস্ব সীমার মধ্যে থেকে প্রার্থীরা যদি কর্মসূচি দেন, তাহলে তা মনিটর করা সহজ, সম্ভব তাঁদের জবাবদিহির মধ্যে আনা।
মেয়র সাহেবেরা অতীতে শুধু দোকান বানানো আর দোকান বেচাকেনার পেছনেই ছুটেছেন বেশি। কারণ, তাতে ‘নগদ নারায়ণ’ মেলে। ঢাকা শহরে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ চলাচল করে। তাদের অনেককেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে থাকতে হয়। অথচ তাদের প্রয়োজনমতো ‘পাবলিক টয়লেট’ নেই। ‘পাবলিকের’ সুবিধা হয়, এমন কিছু নিয়ে মেয়র সাহেবেরা বেশি ভাবেন না। অথচ নির্বাচনী ইশতেহারে কেউ একজন বলতে পারতেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে আমি ৫০০ পাবলিক টয়লেট বানাব, ৫০০ একর জমি বনায়ন করব’—এই হচ্ছে তার ম্যাপ এবং লোকেশন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট করে সংখ্যা বা পরিমাণ উল্লেখ করে এবং কত দিনের মধ্যে তার কতটুকু বাস্তবায়ন করা হবে, এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। তাঁদের প্রতিশ্রুতিগুলো একেবারেই সাধারণ, বাগাড়ম্বরপূর্ণ এবং বায়বীয়। ‘সবুজ ঢাকা চাই’ কথাটি যথেষ্ট নয়। বলতে হবে নগরকে আবর্জনা ও দুর্গন্ধমুক্ত করার জন্য আমি এই জায়গায় এত টন ক্ষমতাসম্পন্ন বর্জ্য পরিশোধনাগার তৈরি করব তিন কিংবা চার বছরের মাথায়।
নিরাপদ নগরের কথা বলছেন প্রার্থীরা। নাগরিকেরা আতঙ্কিত। কারণ, অনেক কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা। অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও আছে। একজন মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধেও হত্যা মামলা আছে। সব কি মিথ্যা মামলা? আমরা কাদের হাতে জিম্মি হব? মাস্তানদের হাতে?
নগরে সেবাদানকারী অনেক সংস্থা কাজ করে। এদের একটির সঙ্গে আরেকটির সমন্বয় নেই। ঢাকা শহর দুই টুকরা করা হলো। সমন্বয়টা হবে কীভাবে? তাঁদের হাতে কি আলাদিনের চেরাগ আছে?
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে’ তর্কযুদ্ধ করতে থাকুন, সাধারণ নাগরিকেরা অস্বস্তিতে আছেন। কারণ, তাঁদের জন্য সমতল জমি তৈরি করে দিচ্ছেন না কেউ। নগর সরকারের নামে মেয়ররা আরও ক্ষমতা চান। নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত ‘স্পেস’ তৈরি করার কথা কেউ ভাবেন না।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com
যে কারণে সিটি নির্বাচনের প্রার্থী নই by কাসাফাদ্দৌজা নোমান ->বাংলাদেশ প্রতিদিন
আমি আজকাল স্বপ্নও দেখি সিটি নির্বাচন নিয়ে। স্বপ্নেই শেষ পর্যন্ত সিটি নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। হাজারখানেক ভোট হলেই আমার হবে। জেতার জন্য না, মানুষের কাছে পরিচিতি পাওয়ার জন্য নির্বাচন করছি। কিন্তু সকালে গলি থেকে বের হতেই অসাবধানতাবশত ধাক্কা খেলাম একজনের সঙ্গে। সরি বলব কি উল্টা লোকটা আমাকে সরি বলে বললেন, ঠিকই আছে, আপনার দোষ নেই। ফুটপাতগুলো এমন অবস্থা যে ধাক্কা খেতেই হয়। লোকটার চিন্তা ভাবনার প্রশংসা করব এমন সময় থলের বাঘ বেরিয়ে গেল। তিনিও এবার ঢাকার সিটি নির্বাচনে একজন প্রার্থী। ভদ্রলোককে নিয়ে ভাবতে ভাবতে বাসে চড়ে বসলাম। এই ভিড়ের মধ্যে আমড়াওয়ালা। এসব দেখে খুব বিরক্ত হয়ে কপাল কুঁচকানোর আগেই পাশে বসা ভদ্রলোক বললেন, কী করবেন বলুন, একজন দায়িত্বশীল কেউ থাকলে কিন্তু এমন হতো না। বাসে যাত্রীরা উঠবে, আমড়া থাকবে আমড়া গাছে। কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। সবাই ইদানীং ভালো মানুষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রহস্য ফাঁস হয়ে গেল একটু পরেই যখন ভদ্রলোক বলে উঠলেন, জী, মানে আমি আক্কাস আলী, এবার সিটি নির্বাচন করছি আলু মার্কায়। আমি নির্বাচিত হলে এ ঢাকার বাসে আমড়ায়ালা থাকবে না। তিনিও প্রার্থী? অকস্মাৎ মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ায় নীরব হয়ে গেলাম। বাস আমার গন্তব্যে চলে এসেছে। চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে প্রায় পড়তে পড়তে সামলে নিলাম। এক ভদ্রমহিলা এসে বললেন, বাবা তোমার দোষ নেই। বাসগুলো ভীষণ অনিয়ম করে। ভদ্রমহিলাকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য মাত্র মুখ খুলব, খালাম্মা বলতেই তিনি যা বললেন তাতে আমার আরেকবার বাস থেকে লাফিয়ে পড়ে যেতে ইচ্ছা করছে। তিনিও একজন প্রার্থী। তড়িঘড়ি করে উঠে দৌড় দিলাম। বৃষ্টি পড়ছে। চায়ের দোকানে খুব ভিড়। রাস্তায় থকথকে কাদা। সঙ্গে পানিও বেড়ে চলেছে। এক ভদ্রলোক খুব বিরক্ত। একজন যোগ্য প্রার্থীর অভাববোধ করছেন। এগিয়ে গেলাম, আঙ্কেল, আপনি কি এবারের সিটি নির্বাচন প্রার্থী?
: না। তবে আমার দুই ভাই, এক বোন...
: না থাক। আপনার কয় ভাই বোন বলা লাগবে না।
: আমার দুই ভাই, এক বোন, এক চাচা আরেক মামা সিটি নির্বাচন করবে। তাদের জন্য দোয়া করবেন।
কথা বাড়ানোর প্রশ্নই আসে না। দ্রুত স্থান ত্যাগ করলাম ভিজতে ভিজতে। রিকশা ডাকলাম। কিন্তু কোনো রিকশা যাবে না। যারা যেতে চায় তারা আমেরিকা যাওয়ার ভাড়া চায়। শেষে উপায় না পেয়ে একজনের সঙ্গে শেয়ারে রিকশা নিলাম। আমার বয়সী। রিকশা চলছে। ধুপ করে গর্তে একটা চাকা পড়ে গেল। ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন, এ শহরের কিছুই হবে না।
: কেন?
: রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় কীভাবে এত বড় গর্ত থাকে? আপনি ইউরোপ আমেরিকার রাস্তায় যান। দেখবেন সেখানকার রাস্তায় কোনো গর্ত নেই। কারণ সেখানে যোগ্য লোক রয়েছে দেখাশোনার জন্য।
: হ্যাঁ সত্য।
: চিন্তা করবেন না। আমি সাপলুডু মার্কায় ইলেকশন করছি। আপনি?
আমি কে? কোথা থেকে এসেছি? কিছুই মনে পড়ছে না। অনেক চেষ্টা করলাম। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছে। কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু একটা লাইনই মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে- এবার আমি সিটি নির্বাচন করব না।

নতুন অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের রাজনীতি?

বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন অনিশ্চয়তায় বলে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে প্রধান বিরোধী দলের ভোট বর্জনের মধ্য দিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোট গ্রহণ শেষে এখন গণনা চলছে। দুপুরের আগেই প্রথমে চট্টগ্রাম থেকে বিএনপির ভোট বর্জনের কথা আসে। তার কিছুক্ষণ পর রাজধানী ঢাকায় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা নির্বাচন বয়কটের কথা ঘোষণা করেন। সেসময় সেখানে ঢাকা উত্তরের প্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবং দক্ষিণে মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসও উপস্থিত ছিলেন। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনও কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকেও ভোট কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মঞ্জুর আলম ক্ষোভে রাজনীতি থেকেই সরে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, রাজনীতির জন্যে ইস্যু তৈরি করার লক্ষ্যেই বিএনপি পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বয়কট করেছে।
গত বছর ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন বয়কট এবং এ বছর টানা কয়েক মাস ধরে সহিংস আন্দোলনে ক্ষান্ত দিয়ে বিএনপি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়।
অনেকেই মনে করছিলেন যে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হয়তো রাজনৈতিক অচলাবস্থার বরফ গলার একটা সুযোগ তৈরি হলো।
কিন্তু আজ বিরোধীদের ভোট বয়কটের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি যে নতুন একটি অনিশ্চয়তায় পড়লো এনিয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই।

হতাশ নির্বাচন কমিশনের কর্তারাও! by মানসুরা হোসাইন

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সব কর্মকর্তার কক্ষেই ছিল টেলিভিশন। স্বাভাবিকভাবেই গণমাধ্যমে প্রচারিত খবর দেখাসহ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা ছিল তাঁদের। অথচ প্রায় সব কর্মকর্তাই নিজেদের রুমে বসে আজ থেকে শুরু হওয়া বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের প্রথম টেস্টের প্রথম দিনের খেলা দেখেছেন।  এমন অবস্থা কেন?—এ প্রশ্নের জবাবে প্রায় সব কর্মকর্তাই হতাশা প্রকাশ করলেন এ নির্বাচন নিয়ে। নাম প্রকাশ না করে একাধিক কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনার কথা বলেছেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে।
একজন কর্মকর্তা জানালেন, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে হয় সে জন্য তাঁরা অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন। কিন্তু সকাল থেকে গণমাধ্যমসহ পরিচিতজনদের কাছ থেকে তাঁরা কোনো ভালো খবর পাননি। সবখানেই খারাপ খবর। একটাই খবর—নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে না।
এক কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বললেন, কোনো মা যখন দশ মাস গর্ভে সন্তান ধারণ করে সুস্থ বাচ্চা প্রসব করেন, তখন তিনি তাঁর সব কষ্ট ভুলে যান। কিন্তু যখন কোনো মা দেখেন, তাঁর সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের মধ্যে কোনো ত্রুটি আছে, কষ্টটা আরও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে যাঁরা আমরা কাজ করেছি আমাদের মধ্যে সে মায়ের মতো কষ্টটা বেড়ে গেছে। কিন্তু আমাদের কিছু করার নাই।’
আপনারা তো বলেন যে কমিশন স্বাধীন—প্রতিবেদকের এমন কথায় ওই কর্মকর্তা হেসে বলেন, ‘সরকারের চাইতে তো আর স্বাধীন না। কোনো সরকারই চায় না যে কমিশন সরকারের চাইতে স্বাধীন হোক।’
অন্য আর এক কর্মকর্তা বললেন, ‘ছোট বাচ্চারা হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে খেলে, অনেক রান্না করে সারা দিন। কিন্তু দিন শেষে সব ফেলে দিয়ে আসতে হয়। কোনো খাবারই মুখে দেওয়া যায় না। আমরা নির্বাচন কমিশনে যাঁরা কাজ করলাম এত দিন, আমাদের অবস্থাটাও হয়েছে সেরকম।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ প্রধান বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেভাবে বলছেন যে নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে, সেখানে আমাদের কিছুই বলার নেই। আমরা শুধু দেখছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন নির্বাচন কমিশনার বললেন, ‘এই যে এত এত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগ দেওয়া হলো, তাঁরা মাঠে কোনো দায়িত্ব পালন করছে না। এখন মাঠে যে বিশৃঙ্খলা বা মারামারি হচ্ছে, সেটা বিএনপি আর আওয়ামী লীগ এর মধ্যে না। সেটা আওয়ামী লীগই করছে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যেই গন্ডগোলটি হচ্ছে।’
ক্ষোভ আর হতাশা কাজ করছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের প্রায় সবার মধ্যেই। নির্বাচনের প্রসঙ্গে কথা বললেই হাসছেন সবাই। বলছেন, সবইতো দেখছেন কী হলো। এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে কয়টা অভিযোগ এসেছে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন থেকে তা জানানো হয়নি। তবে কমিশনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ১৫ থেকে ১৬টি অভিযোগ কমিশনে জমা পড়েছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ সকালের দিকে ১৫ থেকে ১৬টি কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ঘুরে এসে তিনি জানালেন, সুরিটোলা কেন্দ্রে তিনি যাওয়ার আগে থেকেই উত্তেজনা চলছিল। ব্যালট ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। তবে তিনি চলে আসার পর উত্তেজনার মাত্রাটা আরও বেড়েছে বলে তিনি জানালেন। কোনো কোনো গণমাধ্যমে তাঁর গাড়িতে জুতা নিক্ষেপ ও ভাঙচুর হয়েছে বলে যে খবর প্রচারিত হয়েছে সেটাকে তিনি ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন ঘুরে এই প্রতিবেদকের মনে হয়েছে, এ যেন নির্বাচন নয়, হাসির খোরাক। কমিশন কর্মকর্তারা হাসছেন হতাশা থেকে, হাসাহাসি হচ্ছে কমিশনে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যেও। একেকজন বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে এসে অভিজ্ঞতার কথা বলছেন আর সবাই হাসছেন। কমিশনের অবস্থা দেখে এটা যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু তা বোঝার কোনো উপায়ই নেই।

যেকোন উপায়ে জয় আদৌ জয় নয়- ভোট জালিয়াতির বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিক্যাট আজ বনানী
বিদ্যানিকেতন স্কুল কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। ছবি: ফোকাস বাংলা
ঢাকা নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, যেকোন উপায়ে জয় আদৌ কোন জয় নয়। বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আজ এক টুইট বার্তা তিনি একথা বলেন। এদিকে, অল্পআগে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আজকে বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, এবং সহিংসতার যে সব ঘটনা ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে ব্যাপক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া গেছে এবং বিএনপি সিটি করপোরেশন নির্বাচন বয়কটের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতে আমরা হতাশ।  যে সমস্ত অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরী। আইনের আওতায় থেকে কাজ করার জন্য এবং যে কোনো ধরনের সহিংসতা এড়ানোর জন্য আমরা সকল পক্ষের প্রতি আহবান জানাই।  রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কোনো ধরনের সহিংসতার আশ্রয় গ্রহণের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
ভোট কেন্দ্র পরিদর্শনে রাষ্ট্রদূত
মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট সিটি নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করার বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল। দুপুরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে এ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি। তিনি বলেন, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট না থাকার অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের খতিয়ে দেখা উচিত। অবিলম্বে এসব কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের প্রবেশের ব্যবস্থা করা উচিত। বার্নিকাট ওই কেন্দ্রে ৪০ মিনিট অবস্থান করে পুরুষ ও মহিলা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেন। এসময় ২৫ মিনিটে মাত্র ৪ জন ভোট প্রদান করেন। ওই সময়ে পুরুষ বুথে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্ট ছাড়া অন্য কোন এজেন্ট ছিল না।
অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান গিবসনের
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়মের সকল অভিযোগ দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাই কমিশনার রবার্ট ডব্লিউ গিবসন। এছাড়া নির্বাচন থেকে মাঝ পথে বিএনপির সরে দাঁড়ানোয় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে এতে ঢাকা এবং চট্টগ্রামে আজ রাতে এবং আগামী কয়েকদিন সংহিসতা বা বিঘœ সৃষ্টিকারী কোন ঘটনা ঘটবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এ কূটনীতিক। মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার বৃটিশ হাই কমিশন থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, সকল রাজনৈতিক দলের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আজকের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত। সকল ভোটারের গণতান্ত্রিক অধিবার হিসেবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট প্রদান নিশ্চিত করতে সকল রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃংখলা বাহিনী সমূহের দায়িত্ব। যারা নির্বাচনে জিতবেন তাদের স্ব-স্ব শহরের অধিবাসীদের প্রয়োজন এবং ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের সেবা প্রদানের দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।

যেভাবে নির্বাচন হলো চট্টগ্রামে

নাজিরাবাদ ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যরা সাংবাদিকদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।
নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বিসিএসআই আর ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে যেতে চাইলে দুই নারী ভোটারকে বাধা দেওয়া হয়। ছবিটি বেলা ১১টায় তোলা।
বিএনপির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণার পর নগরের প্রিয়া কমিউনিটি সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ। সেখানে তিনি বলেন, উৎ​সাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ভোট গ্রহণ চলছে। বিএনপি পরাজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই নির্বাচন বর্জন করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
একদল যুবক কেন্দ্রে ঢুকে মেয়র প্রার্থীর ব্যালটে সিল মারা শেষ। এরপর তারা কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যালটে সিল মারে। এ সময় সাংবাদিকেরা এগিয়ে গেলে তাঁদের গালিগালাজ করে বের করে দেয়। ওই যুবকদের গলায় ছিল হাতি প্রতীকের কার্ড। ছবিটি নগরের মুরাদপুর এলাকার সরকারি দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তোলা।
ভোট দিতে এসেছিলেন ৯০ বছর বয়স্কা জরিনা বেগম। ছবিটি হাজী দাউদ আহমেদ সরকারি প্রাথমিক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে তোলা। ছবিটি সকাল ১০টায় তোলা।
নারী ভোটারদের সঙ্গে আসা একজনকে ধাওয়া দিয়ে নিয়ে যায় হাতি প্রতীকের কর্মীরা। ছবিটি বিসিএসআই আর ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে থেকে বেলা ১১টায় তোলা।
কেন্দ্র দখল করে ভোট জালিয়াতির অভিযোগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। নগরের দেওয়ানহাটে এক সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলমের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে মনজুর রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।
মোহাম্মদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকে একদল যুবক কমলা প্রতীকের এজেন্টকে হুমকি ধামকি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় ওই নারী কান্নায় ভেঙে পড়েন। ছ​বিটি বেলা দেড়টায় তোলা।
একদল যুবক কেন্দ্রে ঢুকে হুমকি ধামকি দেওয়ার পর ভয়ে বের হয়ে আসেন এক নারী এজেন্ট। ছ​বিটি বেলা দেড়টায় তোলা।
ভোটকেন্দ্র দখল করলে কিছুক্ষণ মুরাদপুর এলাকার সরকারি দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে। পরে পুলিশ এলে দুপুর সাড়ে ১২টায় পুনরায় ভোট গ্রহণ শুরু হয়।
নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বিসিএসআই আর ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের বাইরে লাঠি হাতে একদল যুবক। তাঁদের বেশির ভাগেরই গলায় ঝোলানো ছিল ‘হাতি’ প্রতীকের ব্যাজ। আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দীনের নির্বাচনী প্রতীক হাতি। ​
সকাল সকাল ভোট দিতে কেন্দ্রে হাজির। ছবিটি উত্তর কাট্টলী জয়তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে সকাল ৯টায় তোলা।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে দক্ষিণ পাহাড়তলীর বিসিএসআইআর ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরুর পাঁচ মিনিট আগে স্কুল মাঠে ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। পরে ১৫-২০ জন যুবক এসে ব্যালট পেপার ছিনতাই করে সেখানে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী ও কাউন্সিলর প্রার্থীর পক্ষে সিল মারে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।  ছবিটি বেলা সাড়ে ১১টায় তোলা।
নগরের বারিক মিঞা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে একদল যুবক জোর করে ভোট দেওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। এ সময় বা​ইরে টহল দেয় বিজিবি।
আগ্রাবাদ তালেবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকে একদল যুবক মেয়র প্রার্থীদের প্রতীক সংবলিত ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে ​সিল মেরে বাক্সে ফেলে। এ সময় সাংবাদিকেরা এসেছে এমন খবর পেয়ে তারা বেরিয়ে আসেন। তাদের একজন এই যুবক। তিনি বেরিয়ে আসার সময় তাঁর পেছনে ছিল দুই পুলিশ। তাঁর গলায় ঝোলানো ছিল হাতি প্রতীকের ব্যাজ।
জাল ভোট ও সংঘর্ষের ছবি ধারণ করতে গিয়ে আগ্রাবাদ তালেবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুর্বৃত্তরা ক্যামেরা ভেঙে দেয়। ছবিটি সকাল সাড়ে ৯টায় তোলা।
নগরের বারিক মিঞা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে একদল যুবক জোর করে ভোট দেওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখেন নির্বাচনী কর্মকর্তারা। ছবিটি সকাল ১০টায় তোলা।
সকাল নয়টায় নগরের মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোট কেন্দ্রে ভোট দেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আ জ ম নাছির উদ্দীন।
বেশ কিছু ব্যালটে হাতি প্রতীকে সিল মেরে এভাবে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। ছবিটি নগরের মুরাদপুর এলাকার সরকারি দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে তোলা।
আগ্রাবাদ তালেবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকে একদল যুবক মেয়র প্রার্থীদের প্রতীক সংবলিত ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে ​সিল মেরে বাক্সে ফেলে যায়। ছবিটি সকাল ৯টায় তোলা।
মোহাম্মদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকে একদল যুবক ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে তাদের প্রার্থীর প্রতীকে সিল মারে। এ সময় পুলিশ তাঁদের বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে এক পুলিশ সদস্যের রাইফেল ভেঙে দেয় তারা।
সকাল ৯টা ৩৮ মিনিটে উত্তর কাট্টলী হাজী দাউদ আহমেদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোহাম্মদ মনজুর আলম। >> ছবি: জুয়েল শীল, সৌরভ দাশ ও হাসান রাজা

কেন্দ্র দখল করে সিল মারার উৎসব by শরিফুল হাসান

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আইডিয়াল
কলেজ কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন একের
পর এক ব্যালটে সিল মেরেছেন। ছবি: শরিফুল হাসান
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার মাসুম আল জাকী। দুপুরে তিনি আইডিয়াল কলেজ কেন্দ্রে গেলেন ভোট দিতে। কিন্তু তাঁকে জানানো হলো, কোনো ব্যালট নেই। ভোট দিতে পারবেন না। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সহায়তা চাইলেন তিনি। কিন্তু প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুরোধের পরেও তাঁকে দেওয়ার মতো কোনো খালি ব্যালট ছিল না।
এই কেন্দ্রের একটি ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন লোকজন একের পর এক ব্যালটে সিল মারছে।
কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, সকাল থেকেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা এখানকার ব্যালট ছিনিয়ে নিয়ে সিল মেরেছেন। দুপুরের পর তাঁরা আর কোনো ব্যালটই খালি রাখেননি। ফলে অনেককেই ভোট না দিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে।
এই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা একজন বৃদ্ধ নারী পোলিং কর্মকর্তা কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকালে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট শুরু হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কিছু ছেলে এল। তারা সব ব্যালট জোর করে নিয়ে গেল। এরপর তারা ইলিশ প্রতীকের পক্ষে সিল মেরে যেতে থাকল। তবে ব্যালটের মুড়ির অংশেও ভোটের সিল থাকতে হয়। সেগুলোতে তারা সিল মারতে পারেনি। পরে তারা আমাদের বাধ্য করে সিল মারতে।’
বিকেল পৌনে চারটার দিকে ওই কেন্দ্রে থাকা মাসুদ রানা নামের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখা গেল ব্যালটে সিল মারতে। ওই দৃশ্য ভিডিও করতে গেলে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর পক্ষের এক নেতা সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর নাম শহিদুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘ভাই কী ছবি তুলছেন দেখি।’ তাঁকে এই প্রতিবেদক বলেন, ‘না ভাই ছবি তো তুলতে পারিনি।’ এ সময় তিনি বলেন, ‘মান-সম্মান ডুবাইয়েন না।’
ওই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, সকালের পর আওয়ামী লীগের লোকজন এই কেন্দ্র দখল করে নেয়। এরপর আর কারো কিছু করার ছিল না। তাঁরা বলেন, তাঁরা রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, র‌্যাবের এক মেজর, পুলিশ-সবার সাহায্য চেয়েছেন। কিন্তু কেউ কোনো সাহায্য করতে পারেনি।
চারটার পরও সিল মারার মহোৎসব by টিপু সুলতান ও জাহাঙ্গীর শাহ
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আজ মঙ্গলবার সকাল আটটায় ভোট নেওয়া শুরু হয়, চলে টানা বিকেল চারটা পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে কেন্দ্র দখল করে সরকার-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিতে দেখা গেছে। কিন্তু বিকেল চারটায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরও ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের একটি কেন্দ্রদখল করে ব্যালটে সিল মারতে দেখা গেছে।
উত্তরার নওয়াব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে বিকেল চারটা ২৫ মিনিট পর্যন্ত বিভিন্ন বুথে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ব্যালটে সিল মারতে দেখা গেছে।
এ সময় ভোটকেন্দ্রের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। প্রথম আলোর ফটো সাংবাদিক ক্যামেরায় এ দৃশ্য ধারণ করতে গেলে তাঁকে জোরপূর্বক বুথ থেকে বের করে দেন সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা।
বিকেল চারটায় ভোট গ্রহণ শেষে কেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বুথে সরকার দলীয় স্থানীয় নেতা-কর্মীরা ব্যালটের বই নিয়ে একের পর এক পাতায় এক নাগাড়ে সিল মেরে তা বাক্সে ভরছিলেন। আরেক গ্রুপ ব্যালট বইয়ের মুড়ির অংশে টিপসই দিচ্ছিল। নেতা গোছের কয়েকজন পাইকারি হারে ব্যালটে সিল মারা ঠিকভাবে হচ্ছে কি না তা তদারকি করছিলেন।
এমনটা চলে বিকেল চারটা ২৫ মিনিট পর্যন্ত। এরপর প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কাছে সিলমারা ব্যালট বাক্সগুলো নেওয়া হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপস্থিত ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তারা কিছু বলতে রাজি হননি।
ভোট শেষ হওয়ার আগে থেকেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান নেন।
উল্লেখ্য, নওয়াব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে নারী-পুরুষের জন্য মোট চারটি ভোট কেন্দ্র। এসব ভোটকেন্দ্রে মোট বুথ সংখ্যা ২৮। দিনভর এ কেন্দ্রে সরকার-দল সমর্থিত প্রার্থীরা ছাড়া আর কোনো প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ছিল না।

মানুষের ঢাকা কী দাবি করে by আনু মুহাম্মদ

বাংলা নতুন বছরের প্রথম দুই দিনের দুটো ঘটনা ঢাকা শহরের ক্ষমতাবানদের চেহারাই প্রকাশ করেছে। প্রথম দিনেই বর্ষবরণের উৎসবে যৌনসন্ত্রাসের ঘটনা হয়তো অন্য আরও বহুবারের মতো আড়ালেই থেকে যেত, যদি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না হতো। প্রশাসন এই সন্ত্রাসীদের রক্ষা করার জন্য প্রথম থেকেই যথারীতি চেষ্টা করে যাচ্ছে, প্রতিবাদের বিস্তারের কারণে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে পারছে না। এ ধরনের লোকজন বাদে সবাই স্বীকার করবেন যে ঢাকা শহর বিশ্বের অন্যতম অনিরাপদ শহর, বিশেষ করে নারী ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য শত্রুভাবাপন্ন। নগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের ওপর, তারাই মানুষের সবচেয়ে বেশি ভয়ের কারণ। যৌনসন্ত্রাসের বিদ্যমান সংস্কৃতির সঙ্গে ক্ষমতারোগ যুক্ত হয়ে এখন ভয়ংকর আকার নিয়েছে। বয়স, পোশাকনির্বিশেষে নারী আক্রমণ ও হয়রানির লক্ষ্যবস্তু। বছরের দ্বিতীয় দিনেই ঘটল অনেক মানুষের অকালমৃত্যুর ঘটনা। ঢাকা শহরে অকালে মানুষ মরছে অহরহ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দুর্ঘটনা, পেট্রলবোমা, ক্রসফায়ার, গুম, ডাকাতি, নির্মাণকাজ করতে গিয়ে, ম্যানহোলে পড়ে, বস্তি বা কারখানার আগুনে। সর্বশেষ ঘটনা ঘটল শহরের অন্যতম জনবহুল খিলগাঁও আবাসিক এলাকায়। ঢাকা শহরের অংশ হিসেবে দখলের বিষ এখানেও। এলাকায় অনেকগুলো খেলার মাঠ ছিল, সেগুলোর প্রায় সবই বিভিন্ন সরকারের আমলে দখল করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করা হয়ে গেছে। পুরো শহরের মতো এখানেও এখন শিশু-কিশোর-তরুণ ছেলেমেয়েদের জন্য খেলার মাঠ নেই, তাদের জন্য আছে ঘর, ছাদ আর ফুটপাত। গরিব হলে রাস্তা, রেললাইন।
এই এলাকার বাড়তি সম্পদ ছিল একটি বড় ঝিল। তারও অনেকখানি দখল হয়ে গেছে, অদৃশ্য হয়ে গেছে বহুতল ভবনের নিচে। বাকি অংশ আছে দখলের প্রক্রিয়ায়। পুরো শহরেই জমি দখলের সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে দ্রুত বস্তি বানিয়ে তাতে গরিব মানুষকে বসানো। তাতে দখলও থাকে নিয়মিত, পয়সা কামাইও হয়। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের জন্য ভাড়ায় কিংবা ভয় দেখিয়ে লোক জোগাড়ের জন্য একসঙ্গে লোক পাওয়াও সুবিধা হয়। তারপর যখন প্রয়োজন হয়, যখন কাগজপত্র তৈরি হয়ে যায়, তখন বস্তি ভেঙে ফেলার আয়োজন হয়। বাধা পেলে বা ক্যাচাল হলে লাগে আগুন। তারপর সেখানে ওঠে বহুতল ভবন। বস্তিবাসী সহায়সম্বল হারিয়ে কিংবা পুড়ে মরে সন্তানকে হারিয়ে আবার নতুন কোনো মরণঘরে চলে যায়।
একইভাবে ঝিল দখলের প্রক্রিয়ায় সরকারি দলের নেতা বানিয়েছিলেন অনেকগুলো ঝুপড়ি ঘর, যার বড় অংশ ছিল ঝিলের ওপর বাঁশ দিয়ে
দাঁড় করানো, যা ক্রমে মাটি দিয়ে ভরাট হচ্ছিল। নিয়মিত এই ঘরগুলো থেকে ওই নেতা প্রতি মাসে অর্থ কামাই করতেন, যার ভাগ নিশ্চয়ই আরও অনেককে দিতে হতো। জেলা প্রশাসন, পুলিশ জানতই না যে এটা অবৈধ! রাজউক কোথায় ছিল, সেটাও প্রশ্ন। নিয়মিত অর্থ উপার্জনের উৎস হলেও এসব ঘর টেকসই করতে বাড়তি কোনো খরচে বরাবরই দখলদারদের অনীহা। যার পরিণতিতেই দুর্বল ক্ষয়ে যাওয়া খুঁটি একদিন ধসে পড়েছে। ইতিমধ্যে ১২ জন শিশু-নারী-পুরুষের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকার মানুষের দাবি, আরও মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ যথারীতি অপরাধীকে এখনো খুঁজে পায়নি!
ঢাকা শহরে কেউ যদি জমি অবৈধ দখল করে, তাহলে তাদের প্রতি পুলিশ বা প্রশাসনের আচরণ বন্ধুসুলভই দেখা যায়। কিন্তু যারা এখানে ভাড়া নিয়ে থাকে, তাদের জীবন অনিশ্চিত ও অিতষ্ঠ করতে তাদের কোনো কমতি থাকে না। এই মানুষদের জীবিকা কী? কোনো কারখানা বা নির্মাণশ্রমিক, গৃহশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, দিনমজুরি অথবা রেললাইনের ধারে কিংবা ফুটপাতে কিছু নিয়ে বসা। এসব রাস্তা বা ফুটপাত আবার বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে, যারা ফুটপাতে বসার বিনিময়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে। এই চাঁদা আদায়কারীরাই এখানকার মালিক, তাদের সঙ্গে প্রশাসন বা পুলিশের বোধগম্য কারণেই ভালো খাতির। কিন্তু বিভিন্ন কারণে মাঝেমধ্যেই এসব মানুষকে উচ্ছেদে কর্মসূচি নেওয়া হয়। তখন সব পুঁজি শুধু হারাতে হয় না, অনেক সময় ক্ষমতার খেলা বুঝতে না পারা মানুষদের হাজতবাসও ঘটে। ছাড়াতে গিয়ে ঋণ করতে হয় স্বজনদের। যাঁরা পারেন না, তাঁদের কতজন উধাও হয়ে যান, তার কোনো হিসাব নেই।
অর্থনীতির ধরনের কারণেই সারা দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের আয়তন বাড়ছে। ঢাকা তার কেন্দ্র। ঢাকার রিকশা, ছোট দোকান, হকার, নির্মাণকাজ সবগুলোই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিত্তহীন শ্রমজীবী নারী-পুরুষের কাজের ক্ষেত্র। ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেশের গড় হারের দ্বিগুণের বেশি। ভোটার সংখ্যা যদিও প্রায় ৪৪ লাখ, কিন্তু মোট জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এর মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগই বস্তিবাসী। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠী সম্পর্কে শহরের বিত্তবান বা মধ্যবিত্তের খুবই অস্বস্তি। অস্বস্তি দূর করতে তাদের উচ্ছেদ অভিযান প্রায়ই চলে। কিন্তু তা স্থায়ী হয় না। কেননা, এদের ছাড়া কারও চলে না, শহর অচল হয়ে যায়। কিন্তু এই সদা পরিশ্রমী মানুষদের জীবন ঘিরে থাকে অবৈধ বসতি, অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ, অবৈধ পানির অনিশ্চয়তা। তাদের অর্থ দিতে হয় সবটাতেই, হারও বেশি। কিন্তু তা বৈধতা পায় না এবং সেই কারণে নিরাপত্তাও পায় না কখনো।
নাগরিক সুবিধা বা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনেক দূরে থাকলেও জমির দামের দিক দিয়ে ঢাকা মহানগর পাল্লা দিচ্ছে লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টোর সঙ্গে। ঢাকার কোনো কোনো অঞ্চলের জমির দাম গত তিন দশকে বিশেষ করে গত এক দশকে যে হারে বেড়েছে, তা ওই সব শহরেও ঘটেনি। এর পেছনে আছে দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় চোরাই টাকার দ্রুত বৃদ্ধি ও কেন্দ্রীভবন। এ ছাড়া প্রবাসী–আয়েরও একটি ভূমিকা আছে। জমির দামের এই বৃদ্ধি জমি দখলের উন্মাদনা বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ। আইনকানুন প্রতিষ্ঠান সবকিছু ভেঙে পড়ে এখানে। রাজনীতিও জিম্মি হয়ে পড়ে।
ক্ষমতা যেমন কেন্দ্রীভূত, নানা প্রশাসনিক দপ্তর এবং শিক্ষা-চিকিৎসাসহ নানা প্রয়োজনীয় সার্ভিসও এই শহরেই কেন্দ্রীভূত। সেই কারণে মহানগরের দিকে সারা দেশের মানুষের প্রবাহ অবিরাম। কিন্তু এই জনপ্রবাহের একাংশকে ধারণ করার জন্যও ঢাকা প্রস্তুত নয়। ঢাকা শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ খুবই দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু পয়োনিষ্কাশন, পানি সরবরাহ, যোগাযোগব্যবস্থার সংগতিপূর্ণ বিকাশ নেই। শহরে সর্বজনের জায়গা ও অধিকারগুলোই বেশি আক্রান্ত বা অবহেলিত। নারীর জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আরও উপেক্ষিত। অথচ ঢাকা মহানগরের শিক্ষা, কারখানাশ্রমিক, দিনমজুর, অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন পেশায় তাঁদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়ছে। পাবলিক টয়লেট, পাবলিক বা সর্বজন পরিবহনের সংকট তাদের প্রতিদিনের জীবন বিষময় করে, দীর্ঘ মেয়াদে শারীরিক–মানসিক ক্ষতির কারণ হয়।
দেশে শিক্ষা ও চিকিৎসা বাণিজ্যিকীকরণের ঢলে এবং দোকানদারি অর্থনীতির বিস্তারে ঢাকার বহিরঙ্গে জাঁকজমক অনেক বেড়েছে। গত দুই দশকে অভূতপূর্ব হারে বেড়েছে বাণিজ্যিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল ও শপিং মল। কিন্তু বাড়েনি সর্বজনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল। ঢাকার মানুষের স্বার্থ বিবেচনা করলে এত শপিং মল তার দরকার নেই, তার দরকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো বৃহৎ অন্তত ১০টি সর্বজনের হাসপাতাল। ঢাকা ভরে গেছে, রাস্তা অচল হয়ে আছে প্রাইভেট কারে, দরকার সর্বজনের পরিবহনব্যবস্থার বিকাশ হয়নি। দরকার সর্বজনের উন্মুক্ত স্থান, খেলার মাঠ। ঢাকায় নির্বোধ পরিকল্পনায় আর অর্থ আত্মসাতের নানা প্রকল্পে সৌন্দর্যবৃদ্ধির কর্মসূচিতে লাগানো হয় প্লাস্টিক গাছ, দরকার সর্বত্র অসংখ্য ফলের গাছ, বটগাছসহ বড় গাছ। দরকার শিশুদের আনন্দ ও নিরাপত্তা।
বুড়িগঙ্গায় যদি নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহিত হতে পারে, যদি এই শহরে পানের জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত হয় (বোতলের পানি নয়), তাহলে ঢাকা শহরের মানুষের অসুখ-বিসুখ বিনা খরচেই অর্ধেক কমে যাবে। বুড়িগঙ্গায় এযাবৎ ‘বহু প্রকল্প’ বাস্তবায়ন হয়েছে, কিন্তু নদী দখল এবং বর্জ্যমুক্ত হয়নি। হিসাবে দেখা যায়, এসব প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। টাকা পানিতে পড়েনি, কিছু লোকের পকেটে গেছে।
ঢাকাকে মানুষের নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে দরকার হবে,
প্রথমত, ঢাকা মহানগরের ভূমি সংস্কার। ঢাকায় বসবাসের জন্য কারও একাধিক জমি বা ফ্ল্যাট থাকার দরকার নেই। কম জমি বেশি মানুষের এই শহর আরও দাবি করে পরিবারপ্রতি বসবাসের জমি বা ফ্ল্যাটের আয়তনের সিলিং বা ঊর্ধ্বসীমা। মাথাপিছু ৫০০ বর্গফুট এবং পরিবারপ্রতি সর্বোচ্চ তিন হাজার বর্গফুট প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। তার পরও যদি এটাকে সিলিং ধরা যায়, তাহলে অনেক বাড়তি জমি ও ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে প্রয়োজনীয় আবাসন পরিকল্পনার জন্য।
দ্বিতীয়ত, বিজিএমইএ ভবনসহ অবৈধভাবে নির্মিত স্থাপনা সরিয়ে জমি জলাশয়, খাল দখলমুক্ত এবং পুনরুদ্ধার করে তাতে সর্বজনের অধিকার নিশ্চিত করা আবশ্যক। যেকোনো জমি ব্যবহারে সর্বজনের হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খেলার মাঠকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাঁচতে হলে বুড়িগঙ্গাসহ সব নদী দখল ও দূষণমুক্ত করতে হবে। ফলের গাছে ঢাকা ভরে দিতে হবে।
তৃতীয়ত, এই শহরে যানজট দূর করার সবচেয়ে যৌক্তিক ও কার্যকর পথ হচ্ছে প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বজন বা পাবলিক পরিবহন সম্প্রসারণ। সপ্তাহে এক দিন গাড়ি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ রাখা দরকার। কোনো পরিবারে একটির বেশি গাড়ি থাকা ঠিক নয়। বাণিজ্যিক এলাকাসহ বেশ কিছু জায়গায় প্রাইভেট গাড়ি চলাচল সব সময়ই নিয়ন্ত্রিত থাকতে হবে।
চতুর্থত, কর্মজীবী ও শিক্ষার্থী নারীর চলাচল ও বাসস্থানব্যবস্থা সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নারীর একা পথচলায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে হবে, সংবেদনশীল নারী পুলিশের সংখ্যা বাড়াতে হবে।
মেয়র নির্বাচন হচ্ছে। আমরা সবাই জানি মেয়রের বা সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা ও এখতিয়ার খুবই সীমিত। তবে এই নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে শুধু এটুকু বলা যায় যে যদি চোরাই টাকা, ছল আর বলে দখলদার কিংবা দখলদারদের প্রার্থী এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়, তাহলে ঢাকা আরও দূষণ ও দখলে বিপর্যস্ত হবে, মানুষের জন্য আরও বৈরী হয়ে উঠবে। ভোটের ফলাফল যা-ই হোক, ঢাকাসহ দেশের প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের জন্য রাজনীতির অনেক পরিবর্তন লাগবে। আমরা কী চাই, তা পরিষ্কার করা ছাড়া এই পরিবর্তন ঘটবে না।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

ব্যালট সংকট: ফিরে গেলেন ভোটাররা

বেলা সাড়ে ১১টা স্পট সিদ্বেশ্বরী গার্সল স্কুল। এই কেন্দ্রের ৮টি বুথেই ব্যালট নেই। ভোটাররা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে বিফল মনোরথে ফিরে যান। একই অবস্থা রাজধানীর সেগুনবাগিচা হাইস্কুল কেন্দ্রে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ব্যাপট জালভোটের কারনে দুপুর ১২টার মধ্যেই অধিকাংশ কেন্দ্রে ব্যালট সংকট দেখা দেয়।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সকালে যুবলীগ,ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ সমর্থক ক্যাডাররা প্রকাশ্যে ব্যালটে সিল বাক্সে ভরে দেয়। বেলা নটার পর ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। অসংখ্য ভোটার ভোট দিতে এসে দেখেন তাদের ভোট দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ ভোটার নম্বর খুঁজে পাননি। ভোট কেন্দ্রের বাইরে স্বেচ্ছাসেবকদের কোন পাত্তা নেই। সকালে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের স্বেচ্ছাসেবক ও পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র  থেকে বের করে দেয়া অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র থেকে। ফলে ভোট দিতে গিয়ে শত শত ভোটারদের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণের ১১ নং ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় যুগান্তরের সাংবাদিক ওয়াবেদ অংশুমানকে লাঞ্চিত করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ ক্যাডাররা। তারা (ছাত্রলীগ-যুবলীগ) তাকে রক্তাক্ত করেই কান্ত হয়নি, তার জামা কাপড়ও ছিঁড়ে ফেলে।
স্কুলের দোতলায় পৌনে বারোয় ২ নং পুরুষ বুথে গিয়ে দেখা গেলো একজন যুবক দরজা আটকে রেখেছে। ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেলো ৪-৫জন যুবক প্রকাশ্যে সিল মারছে। একটু পরে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর ১০-১২জন ভোটার রুমে প্রবেশ করে ব্যালট চাইলে সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার বললেন,ব্যালট শেষ। এসময় একজন বৃদ্ধ মুজিব মিঞা পাশে দাড়ানো এক যুবককে বললেন,মিঞা ভোটটাও দিতে দিলা না।
একই অবস্থা দোতলার ৪নং মহিলা বুথে। মহিলা বুথের ভেতরে প্রকাশ্যে কয়েকজন কিশোর ব্যালট পেপারে সমানতালে একটার পর একটা সিল মারছেন। আরেকজন সেগুলো ছিড়ে বাক্সে ভরছেন। এব্যাপারে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেও তাকে প্ওায়া যায়নি। দোতলায় ১০-১২ জন পৃুলিশ নির্বিকার দাড়িয়েছিলেন।
এছাড়া রাজধানীর সেগুন বাগিচা হাইস্কুল,টিএন্ডটি কলোনী হাইস্কুল এন্ড কলেজ, বধির স্কুল, শান্তিবাগ স্কুল ও বঙ্গবাজার এলাকার ভোট কেন্দ্রে দুপুর ১২ টার মধ্যেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। জালভোট দেয়ার কারনে ব্যালট সংকট থাকায় এসব কেন্দ্রের ভোটারদের ভোট না দিয়েই ফিরে যেতে দেখা গেছে। আবার অনেক ভোটার নম্বর না প্ওায়ায় এসএমএস করে নম্বর সংগ্রহ কর্ওে বুথে গিয়ে ভোট দিতে পারেনি।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের খিলগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের দুটি বুথের ব্যালট পেপার নিয়ে সরকারদলীয় সমর্থকরা। মঙ্গলবার ভোটগ্রহণের আধা ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যালয়টির ৫ ও ৬ নম্বর বুথে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার ও ভোটার তালিকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একাধিক ভোটার অভিযোগ করেন, এখানে পুলিশের একাধিক সদস্য ‍ওই যুবকদের ভেতরে প্রবেশে সহযোগিতা করেছে।
এছাড়া মতিঝিল টিএন্ডটি কলোনী ভোট কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী হারুনের স্ত্রীকে লাঞ্চিত করে নিহত যুবলীগ নেতা মিল্কির ড্রাইভার সাগর।
এছাড়া ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের সিলভারডেল প্রিপারেটরি এ্যান্ড গার্লস হাই স্কুল কেন্দ্র নম্বর ১ ও ২, নিটল স্কলার টিউটোরিয়াল এ্যান্ড হাই স্কুল, ওয়ারী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, ওয়ারী আবদুর রহিম কমিউনিটি সেন্টার কেন্দ্র ১ ও ২, ওয়ারী উচ্চ বিদ্যালয়, ফকির চাঁন সর্দার কমিউনিটি সেন্টার, নারিন্দা সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৯টি কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা গেছে, বেশীরভাগ কেন্দ্রেই ভোটগ্রহণ শেষ পর্যায়ে। প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। সরকারদলীয় সমর্থক ও কর্মীরা ভোটকেন্দ্র দখল করে রেখেছে।

নজিরবিহীন ভোটই হলো

ভোটের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ হলো বাংলাদেশে। শঙ্কা ছিল আগেই। এ নির্বাচন হবে নজিরবিহীন। হলোও তাই। ভোটের উৎসব শেষ হয়ে গেল সকাল ৯টার মধ্যেই। আগের রাত থেকেই ইশারা-ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। ব্যালট পেপারে সিলমারা আরা ছিনতাইয়ের খবর মিলছিলো। যদিও তার সংখ্যা ছিল কম।
তবে মঙ্গলবার সকাল থেকেই দৃশ্যপট খারাপের দিকে যেতে থাকে। প্রথম বাধা আসে গণমাধ্যমের দিকেই। অতীতের সবক’টি নির্বাচনেই কেন্দ্রের ভেতরে যাওয়া সুযোগ ছিল ক্যামেরার। কিন্তু এদিন কেন্দ্রে কেন্দ্রে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে মিডিয়া। বলা হয়, কেন্দ্রের চারশ’ গজের ভেতর ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া যাবে না। পুলিশের বক্তব্য তারা এ কাজ করছেন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশেই। কিন্তু নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজের দাবি, পুলিশকে এ ধরনের কোন নির্দেশনা দেয়া হয়নি। তবে একথা বলেই তিনি নিজের দায়িত্ব সেরেছেন। কোন ব্যবস্থা নেননি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা নির্বাচন কমিশন কেউই এখন বিরোধীদের ছাড়া অন্য কারও কোন অপরাধ খুঁজে পান না। নিকট ভবিষ্যতে তারা সেটা পাবেন বলেও পর্যবেক্ষকরা মনে করেন না।
মঙ্গলবার ভোট শুরুর আধঘণ্টার ভেতরেই প্রায় সব কেন্দ্র থেকেই বিরোধী সমর্থক প্রার্থীদের এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকার সমর্থক নেতাকর্মীদের মধ্যে ভালই সমন্বয় ছিল। কেন্দ্র বিরোধী এজেন্টমুক্ত করার পর বিরোধী ভোটারমুক্তও করা হয়। প্রতিটি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন যুবলীগ-ছাত্রলীগ কর্মীরা। কেন্দ্রের সামনেও জটলা তৈরি করেন তারা। কোন কেন্দ্রের আশপাশেই বিরোধী সমর্থকদের দেখা যায়নি। কোথাও দেখা গেছে প্রকাশ্যে সিল মারতে। কোথাও দেখা গেছে ভোটারদের নির্দেশনা দিতে। অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে কয়েকটি কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। বলা বাহুল্য, এ সংঘর্ষ হয়েছে সরকারি দলের কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যেই।
বেলা ১২টার দিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায় বিএনপি। নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা উত্তরের প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও দক্ষিণের প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে সঙ্গে নিয়ে এ ঘোষণা দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। এমন একটি বহুল  আলোচিত নির্বাচনে ভোট শুরুর চার ঘণ্টার ভেতরেই বিরোধী সমর্থকদের সরে যাওয়ার ঘটনাও অভিনব।
কলঙ্কজনক ভোট বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। তবে সবকিছু এত খোলামেলা হওয়ার ঘটনা সম্ভবত এবারই প্রথম। একদিনের বাদশারা তাদের রায় দিতে পারবেন কি-না তা নিয়ে আগেই শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য, মঙ্গলবার কোন মঙ্গল বয়ে নিয়ে আনেনি। ভোটের উৎসবে মøান হয়েছে গণতন্ত্র। বেশির ভাগ মানুষই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এ নিয়ে বেশি বলাও অবশ্য মুশকিল। কিছু কিছু পত্রিকা বলেছিল, এ নির্বাচন হবে গণতন্ত্রের অগ্নিপরীক্ষা। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই কি বলা যায়, বাংলাদেশে গণতন্ত্র আরও একবার পরাজিত হয়েছে।

‘ভোটবিহীন নির্বাচন’ বর্জনের ঘোষণা বিএনপির

রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ
সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ। তাঁর পাশে
তাবিথ আউয়াল ও আফরোজা আব্বাস। ছবি: প্রথম আলো
ভোটবিহীন নির্বাচনের অভিযোগ এনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি ও দলের সমর্থিত প্রার্থীরা। আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ এ ঘোষণা দেন। এর কিছুক্ষণ আগে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয় বিএনপি ও দলের সমর্থিত প্রার্থীরা।
বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ বলেন, চট্টগ্রামেও নির্বাচন থেকে আমরা সরে এসেছি। এই নির্বাচন কোনো নির্বাচন হয়নি। কী হয়েছে, আপনারা সবাই জানেন। তিনি বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ভোট দখল, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া, ব্যালটবাক্স দখল, ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন। মওদুদ আহমদ বলেন, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের হাতে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই চিরকুট থাকলে তাদের ভোট দিতে যেতে দেওয়া হচ্ছে। না থাকলে ভোট দিতে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। নির্বাচনে পাঁচ শতাংশ ভোটও পড়েনি বলে মন্তব্য করেন মওদুদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদকে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, পরিবার নিয়ে এমাজউদ্দিন আহমেদ ভোট দিতে গিয়েছিলেন। তাঁকে ভোট দিতে দেওয়া হয়। কিন্তু ভোট দেওয়ার পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘আপনি কেন ভোট দিতে এসেছেন? আপনার ভোট দেওয়ার কোনো অধিকার নেই।’ এ সময় এমাজউদ্দিন আহমেদের গাড়িতে কিল-ঘুষি মারা হয়।
মওদুদ আহমদ বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবার প্রমাণ হলো, এ দেশের মানুষের ভোটের অধিকার নেই। সুষ্ঠু তো দূরের কথা, নির্বাচন একেবারে অর্থহীন করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও র‍্যাব মিলে সরকারের ইচ্ছাপূরণ করতে গিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মী, পোলিং এজেন্টদের নির্যাতন করে বের করে দিয়েছে। কোনো ভোটকেন্দ্রেই বিএনপির এজেন্টরা দাঁড়াতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রের অবস্থা তুলে ধরেন মওদুদ। প্রায় সব জায়গায় ভোটারদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন মওকুফ।
সংবাদ সম্মেলনে মওদুদ আহমদের দুই পাশে ঢাকা উত্তরে বিএনপি সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও দক্ষিণে মেয়র পদপ্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
দক্ষিণে মেয়র পদপ্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস বলেন, সকাল থেকে তিনি বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ঘুরেছেন। এসব অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ৯৯ শতাংশ কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে। এসব জায়গায় সরকারদলীয় লোকেরা ব্যালটবাক্স ভরেছে। যারা আসল ভোটার তারা সন্ত্রাসীদের ভয়ে ভোট দিতে যাননি। ভোট ডাকাতি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
উত্তরে মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়াল বলেন, সকাল থেকে তিনি বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ঘুরেছেন। বেশির ভাগ কেন্দ্রের বাইরে কোনো পুলিশ ছিল না। সরকার দলীয় লোকজনই কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে। কারা ঢুকবে আর কারা ঢুকবে না, তা তারাই নিয়ন্ত্রণ করে। তাবিথ বলেন, তেজগাঁওয়ের একটি কেন্দ্রে যেতে তাকে বাধা দেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, মিরপুর ৬ নম্বরের একটি কেন্দ্রে পুলিশের পোশাকে যারা ছিল, তাদের ব্যাজ ছিল না। ব্যাজ কেন নেই, জানতে চাইলে পুলিশের পোশাক পরা ব্যক্তিরা কোনো উত্তর দিতে পারেনি। ওই এলাকার আরেকটি কেন্দ্রে গিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের সামনে একটি ব্যালটবাক্স খোলা দেখতে পান বলেও অভিযোগ করেন তাবিথ। ব্যালটবাক্সটি কেন খোলা, জানতে চাইলে পুলিশ কোনো উত্তর দেয়নি বলে তিনি জানান।
যেভাবে দখল হলো একটি কেন্দ্র by সামছুর রহমান
বেলা ১১টা ৩৫ মিনিট। রাজধানীর মিরপুর শাহ আলী মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্র। ওই কেন্দ্রে ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট আনারকলি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শাহ আলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মইনুদ্দিন। ৩০-৪০ জন যুবক এসে কথা বলেন এই এসআইয়ের সঙ্গে। এসআই বলেন, ‘ম্যাডাম এখনো বের হননি। একটু পরে আসেন।’
এর পরই একটি কেন্দ্র দখল হচ্ছে এই কথা বলে ওই ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে চলে যান তাঁরা। এর পাঁচ মিনিট পর যুবকদের ওই দলটি হইচই করে কেন্দ্রে ঢুকে ১০২ থেকে ১০৫ নম্বর কক্ষে গিয়ে কেন্দ্রের দখল নিয়ে নেয়। তারা সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী কাজী টিপু সুলতানের প্রতীক ‘ঠেলাগাড়ি’-তে সিল মেরে বাক্সে ভরতে থাকে। এ সময় সমকাল পত্রিকার দুজন সাংবাদিক তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে ‘তুই কে? তোলা বের হ’ বলে তাঁদের ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় তারা। এ বিষয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা কামাল উদ্দিনকে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। এ সময় পুলিশ সদস্য ও আনসার সদস্যরা দূরে চেয়ারে বসেছিলেন।
প্রায় ৩০ মিনিট ধরে চলে এ কেন্দ্র দখল। পরে উপস্থিত ভোটারদের হুমকি দেয় তারা। ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেওয়ার সময় সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মোমিনুল ইসলাম বাধা দিলে তারা তাঁর গায়ে সিলের কালি মেখে তাঁকে লাঞ্ছিত করেন।
ওই যুবকের দল বের হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনারকলি ফের এই কেন্দ্রে আসেন। তিনি পরিদর্শন করে চলে যান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার অগোচরে যেসব ঘটনা ঘটবে, সেগুলো আমার এখতিয়ারে নাই।’
ওই যুবকদের সহযোগিতা করার বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই মইনুদ্দিন বলেন, ‘আমি তো তাদের আরও ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলাম। আমরা অন্য কেন্দ্রে যেতেই এ ঘটনা ঘটল।’
ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা চুপ করে থাকেন।
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে উপশহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দরগা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মিরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে।

আওয়ামী সমর্থক প্রার্থীর পক্ষে বান্ডেল ধরে জাল ভোট, গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন সিইসি

সিটি নির্বাচনে অনিয়ম ও অভিযোগের বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ। সকাল থেকে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) সিইসির বক্তব্যের অপেক্ষায় ছিলেন সাংবাদিকরা। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলেই সচিবালয় থেকে বেরিয়ে যান সিইসি। এসময় তার একান্ত সহকারী একেএম মাজহারুল ইসলাম বলেন, স্যার মনে হয় সারপ্রাইজ ভিজিটে যাচ্ছেন। সিইসি’র গাড়ির পিছু নেন সাংবাদিকরা। প্রথমে ঢাকা দক্ষিণের ধানমন্ডি কাকলি হাই স্কুল এন্ড কলেজে যান সিইসি। বিভিন্ন কেন্দ্রে অরাজকতা হচ্ছে, গোলাগুলি হচ্ছে এ প্রসঙ্গে সেখানে সিইসির কাছে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনারা দেখান। এসময় সিইসির গাড়ি বহর থাকা পুলিশ ও সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ধাক্কাধাক্কি হয়। ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান নিজে এনটিভি, বাংলাভিশন, যমুনা ও ইটিভির ক্যামেরা ম্যান ও রিপোর্টারসহ কয়েকজন সাংবাদিককে ধাক্কাতে ধাক্কাতে দ্রুত গাড়িতে উঠিয়ে দেন সিইসিকে। পরে তিনি কেন্দ্র ত্যাগ করেন। এরপর তিনি মোহাম্মদপুরের রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। দুই কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে পুনরায় কমিশনে ফিরে আসেন সিইসি।
সকাল সাড়ে দশটার দিকে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, নির্বাচন খুব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে হচ্ছে। শুধুমাত্র সুরিটোলার একটি কেন্দ্রে ঝামেলা হয়েছে। সেখানে ভোট স্থগিত করা হয়েছে।
এর আগে সকাল থেকে ইসিতে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বেলা সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত ইসি সচিবালয়ে কোন সাংবাদিককে প্রবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, স্যারেরা মিটিংয়ে আছেন। তারা কিছু বলার থাকলে নিজেরাই বলবেন। আপনারা মিডিয়া সেন্টারে বসেন।
আওয়ামী সমর্থক প্রার্থীর পক্ষে বান্ডেল ধরে জাল ভোট
রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটের বান্ডেল নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক কাউন্সিলর প্রার্থীর প্রতীকে সিল মারার ঘটনা ঘটেছে।
এই ঘটনার পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের অপর এক কাউন্সিলর প্রার্থী ভোটগ্রহণ স্থগিত করে পুনঃভোটের আবেদন করেছেন।
ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা শেখ মো. আরিফুল ইসলাম অবৈধভাবে সিল মারার এই ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, “সকাল থেকে ছিলাম। মাঝে একটু ঝামেলা হইছিল। এখন ঠিক হয়ে গেছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি পেয়েছি যে, কিছু ব্যালটে সিল মারা হয়েছে। আমি আমার ঊর্ধ্বতনদের বিষয়টি জানিয়েছি।”
ওই কেন্দ্র থেকে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস।
ভোটকেন্দ্র দখলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ
বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখল ও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের প্রবেশে বাধার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেন ব্লুম বার্নিকাট। আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শনের পর তিনি সাংবাদিকের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বার্নিকাট বলেন, ‘বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট না থাকার অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের খতিয়ে দেখা উচিত। অবিলম্বে এসব কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের প্রবেশের ব্যবস্থা করা উচিত।’
বার্নিকাট ওই কেন্দ্রে ৪০ মিনিট অবস্থান করে পুরুষ ও মহিলা কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ প্রত্যক্ষ করেন। এসময় ২৫ মিনিটে মাত্র ৪ জন ভোট প্রদান করেন। ওই সময়ে পুরুষ বুথে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্ট ছাড়া অন্য কোনো এজেন্ট ছিল না।

ফাস্ট বোলিং আসলে পাগলামি

ফাস্ট বোলারদের ‘পাগল’ হতে হয়। আগ্রাসনই তার অস্ত্র। বক্তা শোয়েব আখতার। ক্রিকইনফোকে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে
এ কথা বলেছেন ‘রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেস’। সাক্ষাৎকারের প্রথম কিস্তি ছাপা হল আজ-
প্রশ্ন : আপনি ফাস্ট বোলার হতে চাইলেন কেন?
শোয়েব : আমি কাউকে না কাউকে অনুসরণ করতে চেয়েছিলাম। ওয়াকার, ইমরান, ওয়াসিম। তাদের চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর কে হতে পারে? এরপর ক্রিকেট হয়ে গেল আমার ভালো লাগা। এরপর আমার পাগলামি। সেই পাগলামির মধ্যে আমি ফাস্ট বোলার হওয়ার উপায় খুঁজে পেলাম। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে আরেক প্রক্রিয়া, সেটি হল সপ্রতিভ হওয়ার। এরপর আরেকটি প্রক্রিয়া। সেখানে আমি সবচেয়ে আনফিট বোলার। আমি উপলব্ধি করি, যত দিন বোলিং করব, গতি কমাব না। যতটা সম্ভব জোরে বল করব। নিজেই উপায় খুঁজে বের করতাম আমার এই অনুরাগ আরও বাড়ানোর জন্য। জোরে বল করার পাগলামি পেয়ে বসেছিল আমাকে। মহল্লায়-গলিতে ওয়াকারের বোলিং অ্যাকশন নকল করে বল করতাম। দেখুন, অনুপ্রেরণা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিভা আপনাকে হিরো বানায়। অনুপ্রেরণা এগিয়ে দেয় সামনের দিকে। এরপর সেটি পাগলামির রূপ নেয়। সেই পাগলামির মাঝে আপনি প্রক্রিয়া খুঁজে পান। আমি পেয়েছিলাম। প্রতিদিন জোরে বল করার উপায়। জোরে বল করার মূল কথা হল, সেটি উপভোগ করা। দর্শকদের গর্জন আমাকে উজ্জীবিত করত। সেটি দুয়োধ্বনি হলেও। বলতে পারেন, এই যে আমি এত জোরে বল করতাম, তার মূলে ছিল দর্শকদের চিৎকার-চেঁচামেচি। নিজেকে শুধাতাম, ‘আজ আমার ভালো লাগছে। আজ আমি ভালো মুডে আছি। খুব জোরে বল করব।’ এসব আর কী? অনুপ্রেরণাই মূল কথা। পাগলামি! পাগলামিটাই আসল!
প্রশ্ন : জোরে বল করা কতটা দুরূহ?
শোয়েব : খেলোয়াড়ি জীবনে প্রতিদিন বাথরুমে যেতাম হামাগুড়ি দিয়ে। ১৮ বছরে এমন একটি দিনও যায়নি, যেদিন হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করিনি।
প্রশ্ন : ফাস্ট বোলার হওয়ার আনন্দটা কিসে?
শোয়েব : আপনি নিজেকে নিজে বিনোদিত করেন বেশিরভাগ সময়। ফাস্ট বোলার হওয়াটা ক্রিকেটে সবচেয়ে ভালো ব্যাপার। আপনি দৌড় শুরু করলেন। দর্শকরা চিৎকার করছে। আপনি উপভোগ করছেন। হৃৎপিণ্ড থেকে অনেক বেশি রক্ত সঞ্চালিত হচ্ছে। অনেক বেশি অক্সিজেন আপনি নিচ্ছেন শরীরে। আমি উপভোগ করেছি। প্রতিপক্ষ যখন শক্তিশালী হয়, গ্যালারি থাকে দর্শকে ভরা, তখন আপনি দ্বিগুণ উজ্জীবিত হন। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলতে নেমে সবচেয়ে বেশি চাঙ্গা থাকতাম আমি। ভীষণ অনুপ্রাণিত হতাম। ফাস্ট বোলিংয়ে মূলমন্ত্র হচ্ছে সেটি উপভোগ করা।
প্রশ্ন : একজন ফাস্ট বোলারের জন্য তাহলে এটাই শেষ কথা?
শোয়েব : ব্যথাহীন দৌড়। অবিরাম বয়ে চলা নদীর মতো ছন্দ। সত্যি বলতে কী, এরকম অনুভূতি জীবনে খুব কমই হয়েছে আমার। আমি শুধু চেয়েছি সারা দিন বোলিং করে যেতে। যখন বেল ছিটকে পড়ত, স্টাম্পে বলের আঘাত করার শব্দ পেতাম, সে যে কী ভালো লাগত। বলে বোঝানো যাবে না। ইয়র্কারে স্টাম্প ছত্রখান হচ্ছে, সেই দৃশ্য দেখতে আমার দারুণ লাগত। ভীষণ আনন্দ পেতাম। আর কোনো কিছুতে কখনোই সেই আনন্দ পাব না। তখন আনন্দটা আসত ভেতর থেকে। নিজেকে মনে হতো, হাওয়ায় ভাসছি। আমি কখনও ব্যাটসম্যানকে আঘাত করতে চাইনি। কখনোই না। কিন্তু কী আর করা! এটা ফাস্ট বোলিংয়ের অংশ। ব্যাটসম্যানকে ভয় পাওয়াতেই হবে। আমি ভয়ের ঘ্রাণ পেতাম। বেশ বুঝতে পারতাম, ব্যাটসম্যান সন্ত্রস্ত। এরপরই স্লোয়ার দিতাম। বাউন্সার ছুড়তাম। আমার যাবতীয় আনন্দ ছিল ব্যাটসম্যানকে আউট করার মধ্যে। যখন সেটা পারতাম না, তখন ব্যাটসম্যানকে আঘাত করে আনন্দ পেতাম।
প্রশ্ন : যখন পারতেন না, কেমন যেত সেসব দিন?
শোয়েব : চূড়ান্ত হতাশার। তবে তা থেকে শিক্ষা নিতাম। সেহওয়াগকে একবার আউট করতে না পারলে, পরেরবার চেষ্টা করতাম। তাকে সাজঘরে ফেরানোর উপায় খুঁজে বের করতাম। বাড়ির পাশে পাহাড়ে পাথর ছুড়ে মারতাম। পাথর ছুড়ে পেশি বানিয়েছিলাম। এরপর পাথরকে বল মনে করে বোলিং করতাম।
প্রশ্ন : আপনি ইট দিয়ে বোলিং করতেন?
শোয়েব : আগেই বলেছি, বাড়ির পাশে পাহাড়ে পাথর ছুড়ে মারতাম।
প্রশ্ন : ২২ গজের দূরত্বে?
শোয়েব : হ্যাঁ, ২৪টা বিভিন্ন আকারের পাথর নিতাম। সেগুলো দিয়ে রাস্তায় বোলিং করতাম। অন্য ছেলেরা ভাবত, আমি পাগল। পুরনো বল নিয়ে অনুশীলন করতাম। এভাবেই রিভার্স সুইং শিখেছি। আপনাকে বাতাসের সঙ্গে খেলতে হবে। এখনকার বোলাররা জানেই না বাতাস যখন বয়, তখন কী করবে তারা।
প্রশ্ন : ম্যাচের আগে কীভাবে নিজেকে তৈরি করতেন?
শোয়েব : বিছানা ছেড়ে গরম পানি দিয়ে গোসল করতাম। এরপর ৩০ মিনিট সাইকেল চালাতাম। পায়ের ব্যায়াম হয়ে যেত। ৩০০ বার প্যাডেলে পা চালাতাম।
প্রশ্ন : তিনশ’বার?
শোয়েব : হ্যাঁ, প্রায় ৩০০ বার। প্রতিদিন। পা বাঁকানো যেত সাইকেল চালানোর সময়। এরপর আবার গরম পানিতে গোসল। ম্যাসাজ। এরপর সোজা মাঠে। তখন আমি চাঙ্গা। তরতাজা।

বাস্তব জীবন এবার টিভি পর্দায়

চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে গিয়েই ওমর সানির সঙ্গে মৌসুমীর পরিচয়। এরপর প্রেম থেকে পরিণয়। সংসারে এলো ফুটফুটে দুটি সন্তান। এর মাঝে অবশ্য কেটে গেছে ২০ বছর। সানি-মৌসুমীর এ বাস্তব জীবন এবার ফুটে উঠবে পর্দায়। দুই তারকার প্রেমময় জীবন নিয়ে ‘ভালোবাসার ২০ বছর’ শিরোনামের একটি টেলিফিল্ম নির্মিত হতে যাচ্ছে। গোলাম রাব্বানীর রচনা ও ইউসুফ চৌধুরীর পরিচালনায় এতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করছেন ওমর সানি ও মৌসুমী।
৬ মে ঢাকার বিভিন্ন লোকেশনে টেলিফিল্মটির শুটিং শুরু হবে। এতে অভিনয় প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, ‘নাটকের রচয়িতার প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ রইল। নিজের চরিত্রে অভিনয় করা সত্যিই আনন্দদায়ক। আশা করছি দর্শকদের জন্য উপভোগ্য একটি কাজ হবে।’ নাট্যকার গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘সেলিব্রেটিদের জীবনে নানা উত্থান-পতন ঘটে থাকে। তবে চিত্রনায়িকা মৌসুমীর জীবন শুধুই উত্থানের। চেষ্টা করেছি খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরার। আশা করছি দর্শকের ভালো লাগবে।’

ব্রিটেনে ভোটের মাঠে হিন্দি গান!

খোদ ব্রিটেনেও ভোটের প্রচারে হিন্দি গান! সেই গান শুনিয়েই ব্রিটেনের ১৬ লাখেরও বেশি ভারতীয় বংশোদ্ভূতকে বশে আনার চেষ্টা করছেন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। শনিবার লন্ডনে একটি সভায় তাকে বলতেও শোনা গেছে ব্রিটেনের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ বা এশীয় প্রধানমন্ত্রী হবেন কনজারভেটিভ পার্টিরই কোনো সদস্য! আগামী ৭ মে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচন। এখন থেকেই কনজারভেটিভ পার্টির বিভিন্ন সভায় বাজছে পণ্ডিত দীনেশের লিখিত, সুরোরোপিত এবং প্রযোজিত ‘নীলা হ্যায় আসমান’ (আকাশের রং নীল)। গানটি গেয়েছেন নবীন কুন্দ্রা এবং রুবাইয়াত জাহান, বাঁশিতে সঙ্গত বকির আব্বাসের। কনজারভেটিভ পার্টির প্রতীক নীল রঙের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখেই লেখা গানটির ধুয়ো, ‘ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে হাত মেলান, তিনিই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবেন।’ বলা হচ্ছে, নির্বাচনী প্রচারে এভাবে গানের ব্যবহার,
ব্রিটেনে এই প্রথম। আর এই প্রচারকৌশলে গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ভোট সংগীত (যাতে গলা মিলিয়েছিলেন তখনও প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি) ‘ম্যায় দেশ নহি ঝুঁকনে দুঙ্গা’র মিলও দেখছেন কেউ কেউ। অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, একদা এই দলেরই প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল মহাত্মা গান্ধীকে বলতেন ‘অর্ধনগ্ন ফকির’। কিন্তু ভোটের দায় সর্বত্রই বড় দায়। যে কারণে সম্প্রতি লন্ডনে গাঁধীমূর্তি উন্মোচন করেছেন ক্যামেরন। গিয়েছেন ব্রিটেনের কয়েকটি হিন্দু মন্দির এবং শিখ গুরুদ্বারে। সংখ্যা এবং প্রভাবের কারণে অন্য জাতিগোষ্ঠীর চেয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটদাতাদের স্বতন্ত্র রাখতে তাদের ‘ব্রিটিশ হিন্দু’ বা ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান’ বলে পরিচয় দিতেও উৎসাহ দিচ্ছেন ক্যামেরন। ব্রিটেনের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর এই ভারত প্রীতির পেছনে সে দেশের ভোট-রাজনীতির পরিবর্তিত বিন্যাসই দেখছেন রাজনীতির কারবারিরা। গত সাধারণ নির্বাচনে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে নির্বাচিত হয়েছিলেন কনজারভেটিভ দলের ১১ জন কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় সদস্য। লেবার পার্টিতে তাদের সংখ্যা ছিল ১৬। এবারের নির্বাচনে ৫৬ জন কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থী দিয়েছে কনজারভেটিভ পার্টি। লেবার পার্টি থেকে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর প্রার্থীর সংখ্যা ৫২। পিটিআই।

পাকিস্তানে মিনি সাইক্লোন

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টির কারণে ৪৪ জন নিহত ও দুই শতাধিক লোক আহত হয়েছে। এছাড়া ধসে পড়েছে বেশ কয়েকটি ভবন। ঝড়টিকে ‘মিনি সাইক্লোন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। সোমবার কর্মকর্তারা এ কথা জানান। রোববার দিনের শেষে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ার ও এর পার্শ্ববর্তী জেলায় প্রবল বর্ষণ ও শক্তিশালী ঝড়ে বহু গাছপালা ও ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে এএফপির এক প্রতিবেদক জানান, এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া প্রবল বর্ষণের ফলে নগরীর কোথাও কোথাও প্রায় তিন ফুট পর্যন্ত পানি জমে গেছে। কর্মকর্তারা জানান, আহতদের মধ্যে প্রায় ১শ’ শিশু রয়েছে। এদিকে ঝড় ও বর্ষণে কৃষকদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাদেশিক তথ্যমন্ত্রী মোস্তাক ঘানি এএফপিকে বলেন, ‘এ দুর্যোগে কমপক্ষে ৪৪ জন নিহত ও ২০২ জন আহত হয়েছে। এছাড়া প্রচণ্ড ঝড় ও প্রবল বর্ষণে বিভিন্ন ফসল ও ফলের বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’ ঘানি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনের চেষ্টা করছে।
ঝড় ও বৃষ্টিতে শত শত গবাদিপশু মারা গেছে বলে আশংকা প্রকাশ করা হচ্ছে। পেশোয়ার এবং এর পার্শ্ববর্তী নওশেরা ও চারসাদ্দা এলাকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঘানি বলেন, এ দুর্যোগে পেশোয়ারে ২৯, চরসাদ্দায় ১০ ও নওশেরায় ৫ জন নিহত হয়েছে। প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সিনিয়র কর্মকর্তা আমির আফাক হতাহতের এ সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের খাদ্য, আশ্রয় ও জরুরি হাসপাতাল সেবা দেয়ার প্রচেষ্টা চলছে। প্রাদেশিক আবহাওয়া বিভাগের পরিচালক মোস্তাক আলী শাহ এ ঝড়কে একটি ‘মিনি সাইক্লোনের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। ঝড়টি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, ঝড়টি দুর্বল হয়ে পড়লেও আগামী তিন থেকে চার ঘণ্টা প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে প্রবল বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ জানমালের ক্ষয়ক্ষতিতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি তিনি শোক ও সমবেদনা জানান এবং প্রাদেশিক সরকার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে উদ্ধার প্রচেষ্টা জোরদারের নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য, পরমাণু শক্তিধর কিন্তু অর্থনীতিতে অনুন্নত পাকিস্তানে গত বছর মৌসুমি বর্ষণে ছাদ ধসে দুশ’রও বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটে।

শুধু এরশাদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড? by সোহরাব হাসান

২৮ এপ্রিল যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে এখন আর কারও সন্দেহ নেই। তবে নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও অবাধ হবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহমুক্ত হওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত ভোটাররা নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কি না? ভোট দিতে পারলেও ফলাফলে জনরায়ের প্রতিফলন ঘটবে কি না?
এই আশঙ্কার কারণ প্রধানত রাজনৈতিক হলেও রাজনৈতিক দলের বাইরেও প্রভাব বিস্তারকারী নানা পক্ষ আছে। আছে অনেক প্রভাবশালী গোষ্ঠী। বিশেষ করে সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও নারী ভোটারদের প্রতি স্থানীয় প্রভাবশালী ও ধর্মীয় আধিপত্যের বিষয়টি উপেক্ষণীয় নয়। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জড়িত একটি সংস্থার প্রধান জানিয়েছেন, সবাই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলেন, কিন্তু জনসংখ্যার অর্ধেক নারী এবং তার বাইরে সংখ্যালঘু, আদিবাসী ও গরিব মানুষের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা কেউ বলেন না। প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তিন সিটিতে সংখ্যালঘু ভোটের হার ১০-১২ শতাংশ হলেও তাদের প্রার্থিতার হার মাত্র দেড় শতাংশ। তিন সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে নারী প্রার্থী শূন্য।
প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক পক্ষ ও প্রার্থীর মতো ভোটারদের জন্যও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা জরুরি। পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নারী লাঞ্ছনার ঘটনাটির সঙ্গে সিটি নির্বাচনের গভীর যোগসূত্র আছে বলে জানালেন এক নারীনেত্রী। তাঁর মতে, নারী ভোটাররা যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে না যান, সে জন্যই পরিকল্পিতভাবে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে হামলা চালানো হয়েছে। তবে কারা এই হামলা চালিয়েছে, গত ১২ দিনেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বের করতে না পারায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও আনন্দমুখর পরিবেশে হবে কি না, সেটি অনেকাংশে নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার ওপর। আবার প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থক রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ভূমিকাও কম নয়। কোনো পক্ষের স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ড পুরো আয়োজনটাই ভন্ডুল করে দিতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। প্রার্থী নির্বাচনী আইন ভঙ্গ করলে তারা যেমন তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পরে, তেমনি প্রয়োজনে নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত করতে পারে। সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে হলে প্রার্থীকে যেমন আইন মেনে চলতে হবে, তেমনি নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাদের মনে রাখা প্রয়োজন, এক অভাবিত রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের প্রতি কেবল দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষই তাকিয়ে নেই, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও এটিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অর্থাৎ এটি নিছক স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন নয়, তার চেয়েও কিছু বেশি। এই নির্বাচনটি সুষ্ঠু হলে তিন সিটি করপোরেশনভুক্ত মানুষ কেবল নিজেদের পছন্দসই প্রতিনিধিই বেছে নিতে পারবেন না, নির্বাচনটি বাংলাদেশের রাজনীতির মোড়ও ঘুরিয়ে দিতে পারে। আর যদি সেটি সম্ভব না হয়, সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে।
তিন সিটি করপোরেশনে নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে পরিবেশ-পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কমিশন ও তাদের পক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তারা দলমত-নির্বিশেষে বেশ কয়েকজন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রথমত, নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে কমিশনের দ্বৈত ও স্ববিরোধী অবস্থান। এ কথা ঠিক যে নির্বাচনের মতো সম্পূর্ণ বেসামরিক বিষয়ে সামরিক বাহিনীকে না টানলেই ভালো হতো। কিন্তু রাজনৈতিক পক্ষগুলোর পারস্পরিক অনাস্থা এবং বেসামরিক প্রশাসনের দলীয় পক্ষপাত এতটাই প্রকট যে গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষ মনে করে, সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। আরেকটি মজার বিষয় হলো ক্ষমতাসীনেরা বরাবর সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে এবং বিরোধী দল পক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকে। বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে অনেক ভেবেচিন্তে নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিল, নির্বাচনের চার দিন আগে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে সেনা মোতায়েন করা হবে। সব নির্বাচনে সেটাই হয়ে থাকে।
কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, কয়েক ঘণ্টা না যেতেই কমিশন সিদ্ধান্তটি পাল্টে জানিয়ে দিল, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নয়, সেনাবাহিনী রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে সেনানিবাসেই অবস্থান করবে এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার চাহিদা অনুযায়ী তারা মাঠে নামবে। তাদের এই প্রস্তাব অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য। ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকায় শত শত ভোটকেন্দ্র আছে। এ অবস্থায় কোনো কেন্দ্রে গোলযোগ হলে সেই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কখন রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানাবেন এবং তিনিই বা কখন সেনানিবাসে অবস্থানরত রিজার্ভ ফোর্সকে তলব করবেন? সেনা তলব করার আগেই তো যা ঘটার ঘটে যাবে।
অন্যদিকে সরকারি দলের কর্মী-সমর্থকেরা তিন দিন ধরে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা চালালেও নির্বাচন কমিশন টুঁ শব্দ করেনি। অন্য কোনো ঘটনায় তিনি ক্ষমতাসীনদের হাতে আক্রান্ত হলে নির্বাচন কমিশনের বলার কিছু ছিল না। কিন্তু তিনি নির্বাচন কমিশন ঘোষিত নির্বাচনে তাঁর সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন। এর দায় কমিশন এড়াতে পারে না।
ঘটনার পাঁচ দিন পর নির্বাচন কমিশন জানায়, গাড়িবহর নিয়ে খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। শুক্রবারে কমিশনাররা কেউ অফিসে না থাকায় একজন কর্মকর্তা তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই কৈফিয়তনামায় সই নিয়ে এসেছেন। খালেদা জিয়া আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে নির্বাচন কমিশন অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু কমিশনের নোটিশ অগ্রাহ্য করে যখন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করে প্রচার অব্যাহত রাখেন, তখন কমিশনকে তৎপর হতে দেখা যায় না। তারা সাবেক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। তাহলে কি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড শুধু এরশাদের জন্য? একজন গণধিক্কৃত স্বৈরাচারের প্রতি কমিশনের এ কেমন বদান্যতা?
তাই কমিশনকে বলব, এখনো সময় আছে। আরেকটি মাগুরা মার্কা নির্বাচন না চাইলে এখনই সজাগ হোন। সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখুন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

ওর জন্য আকাশে একটি চুমু পাঠিয়ে দিন!

নেপালের রাক্ষসী ভূমিকম্প সোফিয়ার কাছ থেকে কেড়ে নিল ড্যানকে। শনিবার হিমালয় পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়া মাউন্ট এভারেস্টে ওঠার সময় ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট তুষার ধসে নিহত হন মার্কিন অভিনেত্রী ও নির্মাতা সোফিয়া বুশের সাবেক প্রেমিক গুগলের কর্মকর্তা ড্যান ফ্রেডিনবার্গ। সাবেক প্রেমিক ও বন্ধুর মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েছেন ‘স্টে অ্যালাইভ’খ্যাত এ তারকা অভিনেত্রী। ইনস্টাগ্রামে আবেগপূর্ণ এক বার্তায় লিখেছেন, ‘আমার বন্ধু ড্যানের জন্য আকাশে একটি চুমু পাঠিয়ে দিন। তাকে কিছু ভালোবাসা উপহার দিন।’ ড্যানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন তার বোন মেগান।
সোফিয়া ও ড্যানের মধ্যে প্রেম শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের মার্চ মাসে। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই তাদের প্রেম ভেঙে যায়। ২০১৪ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে প্রেমের ইতি টানেন তারা। প্রেম ভেঙে গেলেও, তাদের বন্ধুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। গত শনিবার ড্যানের মৃত্যুর খবর জানার পর তীব্র শোক প্রকাশ করে ইনস্টাগ্রামে আবেগপূর্ণ এক বার্তায় সোফিয়া লেখেন, ‘দুঃখ প্রকাশের শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। আমার হৃদয় ভেঙে এত বেশি টুকরো টুকরো হয়ে গেছে যে সেগুলো একত্র করার চেষ্টা করছি। কিন্তু কখনোই ভাঙা টুকরোগুলো খুঁজে পাব বলে মনে হয় না। আজ অসাধারণ একজন বন্ধুকে আমি হারিয়ে ফেলেছি।

শান্তিপূর্ণ সিটি নির্বাচন নিয়ে বিদেশীদের প্রত্যাশা ও শংকা by মাসুদ করিম

তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে যুগপৎ প্রত্যাশা ও শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার পরপরই বিদেশীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের উদ্বেগের বার্তায় নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃংখলা বাহিনীর যথাযথ দায়িত্ব পালনের তাগিদ থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিই ছিল কূটনৈতিক মহলের মূল চাপ। সহিংসতামুক্ত নির্বাচন করার লক্ষ্যে ভূমিকা পালনের জন্য দু’পক্ষের নেতাদের তাগিদ দিয়েছেন। অবশ্য প্রচারের শেষদিকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে আসায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বস্তি প্রকাশও লক্ষণীয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্থানীয় সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট সোমবার টুইটারে লিখেছেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই শক্তিশালী গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় বিষয়। আশা করি, আগামীকালের (আজ) নির্বাচন হবে সেই চেতনার দৃষ্টান্ত’। ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন সোমবার পৃথক এক টুইটার বার্তায় বলেন, ‘আশা করি ঢাকা ও চট্টগ্রামে আগামীকালের (আজ মঙ্গলবার) নির্বাচন সহিংসতা ও ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে যেখানে গণতান্ত্রিক পছন্দ প্রকাশের সুযোগ দেয়া হবে।’ জাতিসংঘ আগের দিনে দেয়া বিবৃতিতে প্রাক-নির্বাচনী সুষ্ঠু পরিবেশকে স্বাগত জানিয়েছে।
ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, বিদেশী শতাধিক পর্যবেক্ষকের পাশাপাশি বিদেশী দূতাবাসগুলো নজর রাখবে নির্বাচনের দিকে। বিদেশী দূতাবাসের প্রতিনিধিরা নিজেদের পর্যবেক্ষক না বলে ‘সিটি নির্বাচন কিভাবে কাজ করে’ সেই সম্পর্কে ‘জ্ঞান আহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেন। ব্রিটিশ হাইকমিশনসহ বিভিন্ন দূতাবাসের এমন প্রতিনিধিরা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনে ভোট কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন।
চট্টগ্রামে মনজুরের নির্বাচনী ক্যাম্প তছনছঃ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী এম মনজুর আলম ও একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর নির্বাচনী ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিয়েছে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা। সোমবার রাত ৮টার দিকে নগরীর ওয়াসা মোড়ে এ হামলায় ৩ বিএনপি কর্মী আহত হয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নগরীর ওয়াসা মোড়ে এএম আলী রোডে মনজুর আলমের ও ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মোহাম্মদ আবুল কাশেমের নির্বাচনী ক্যাম্প ছিল। রাত ৮টার দিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ১০-১২ জন কর্মী অতর্কিতে ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেয়। এ সময় ক্যাম্পে থাকা ৩ বিএনপি কর্মী আহত হন। আহতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। তাদের স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়। এ ঘটনায় ওই এলাকায় রাতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। যোগাযোগ করা হলে খুলশী থানার ওসি সুকান্ত চক্রবর্তী বলেন, এ বিষয়ে কিছুই জানানো সম্ভব নয়।
এর আগে রোববার দুপুরে নগরীর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট এলাকায় গণসংযোগকালে মনজুর আলমের গাড়িতে হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ওই ঘটনায় তার অন্তত ২০ নেতাকর্মী আহত হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য প্রায় অভিন্ন ভাষায় নির্বাচনী প্রচারকালে সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। তার পরপরই উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। উদ্বেগের সুর ছিল জাপানি দূতাবাস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেয়া বিবৃতিতেও। খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার পর প্রায় ১৬টি দেশের কূটনীতিকরা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি নিজের চোখে দেখে আসেন। নির্বাচনী প্রচারকালে এই হামলার বিষয়টি নিয়ে কূটনীতিকদের নিজেদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়। তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘরোয়া বৈঠক করে হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিমত ব্যক্ত করেন।
জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কূটনীতিকদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। উভয়পক্ষের সঙ্গে একত্রে মুখোমুখি বৈঠকও হচ্ছে। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার বিষয়ে কূটনীতিকদের সামনে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দিয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঢাকায় সিটি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে এমন সহিংসতায় ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দার ভাষা ছিল অত্যন্ত কড়া। যুক্তরাষ্ট্র অবাধ, সুষ্ঠু ও অহিংস নির্বাচনের ব্যাপারে যার যা দায়িত্ব তা পালনের তাগিদ দেয়। আইনশৃংখলা বাহিনীর দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, অবাধে নির্বাচনী প্রচার ও সমাবেশ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রার্থীদের রাজনৈতিক সহিংসতার হাত থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতের দায়িত্বও আইনশৃংখলা বাহিনীর। আইন ভঙ্গ করলে তার বিচারের ব্যবস্থা করতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠুভাবে ভোট অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারকালে সহিংসতা উদ্বেগজনক। তিনি সহিংসতা এবং ভয়ভীতিমুক্ত নির্বাচনী প্রচারণার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সব রাজনৈতিক দল, আইনশৃংখলা বাহিনী এবং নির্বাচন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বের ওপর জোর দেন। তিনি আশাবাদী যে নির্বাচনের দিন ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার নির্বিঘেœ প্রয়োগ করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, ভবিষ্যতে সব নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হোক।’
নির্বাচনী প্রচারকালে সহিংসতা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কূটনীতিকদের বৈঠক এবং বিভিন্ন ধরনের তৎপরতার পর সহিংসতা অনেকটাই দূর হয়ে আসে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারের শেষদিকে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা বন্ধ হয়। তারপরও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সতর্ক করে বলেছে, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রামে মেয়র নির্বাচনের প্রাক্কালে কেউ এমন কিছু করবেন না যাতে আবার সহিংসতা হয়। সবাইকে এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকতে হবে।’ ইইউ আশা করে, রাজনৈতিক নেতারা শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবেন।
ইইউ তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ‘ভোটারদের তাদের গণতান্ত্রিক পছন্দ প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। সহিংসতার সমাপ্তি ঘটানো, উত্তেজনা নিরসন এবং বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক পক্ষগুলোকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
ভোটের ঠিক আগে জাতিসংঘের ঢাকায় অবস্থিত আবাসিক সমন্বয়কারী রবার্ট ওয়াটকিনসের বিবৃতিতে সহিংস অবস্থা থেকে উত্তরণে খানিকটা স্বস্তি প্রকাশ পেয়েছে। বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের লগ্নে সার্বিক শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ বজায় থাকাকে স্বাগত জানাই। দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের দিনে ভোটের অধিকার প্রয়োগ করার জন্য ভোটারদের উৎসাহিত করি।’ তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানায়।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বার্ষিকীকে ঘিরে সৃষ্ট টানা তিন মাসের সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতির পর সিটি নির্বাচনকে সংকট উত্তরণের পথ মনে করছেন কূটনীতিকরা। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি। ফলে নির্বাচনের প্রতি মুহূর্ত নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। ভোটের দিনে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শতাধিক পর্যবেক্ষক মোতায়েন থাকবে। এছাড়াও ঢাকায় বিদেশী দূতাবাসের কূটনীতিকরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।