Monday, April 13, 2015

যুক্তরাষ্ট্রে হিলারি হাওয়া?

গত কয়েক মাস ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল- যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্ত্রী সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন কি দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন? জবাব এখন স্পষ্ট। মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার দীর্ঘ ও কষ্টকর পথ বেয়ে প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হিলারি ক্লিনটন। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যাওয়ার আগে নিজ দলের চূড়ান্ত টিকিট পেতে নামতে হবে অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে। রাজনৈতিক বিরোধীদের মোকাবিলা, অভিযোগ-সমালোচনা খণ্ডন, পাল্টা ইস্যু তৈরি, গল্প-ক্ষুধার্ত মিডিয়াকে সামলানো, সাংবাদিক সৈনিকদের তীর্যক তীর এড়িয়ে যাওয়া, জনগণের মন কাড়া- এ সব যোগ্যতার সুসংহত বহিঃপ্রকাশই তাকে সফলতা এনে দিতে পারে।
হিলারির ক্লিনটনের জন্য সুবিধা এই যে, আগে দুইবার প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে প্রথমবার স্বামী বিল ক্লিনটনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ২০০৮ সালে নিজেই বারাক ওবামার বিরুদ্ধে ডেমোক্রেট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বি^তায় নেমেছিলেন তিনি। সেবার হেরে গেলেও এবার ডেমোক্রেট দলের টিকিটপ্রাপ্তি খুব সহজ বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
বারাক ওবামার মতো স্বপ্ন দেখানো ও প্রজন্মের প্রতিনিধি এবার তার প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছেন না। কিংবা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জন এডওয়ার্ডসের মতো যুদ্ধ-পরীক্ষিত দক্ষ খেলোয়াড় ও বিল রিচার্ডসনের মতো হিস্পানিক গভর্নর প্রতিদ্বন্দ্বি^ হিসেবে মাঠে থাকছেন না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ডেমোক্রেট দলের প্রার্থিতা পেতে বেগ পেতে না হলেও প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ কতটা সহজ হবে? উত্তরটা বেশ কঠিন। রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারিয়ে হোয়াইট হাউসের দখল নেয়ার পথ অত্যন্ত দুরূহ। ইতিমধ্যে রিপাবলিকানের প্রতি জনমতের সাড়া পাওয়া গেছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে। কংগ্রেসে ডেমোক্রেটের প্রভাবই নেই। এর মধ্যে বেনগাজির মার্কিন দূতাবাসে হামলা নিয়ে হিলারির বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের তদন্ত করছে কংগ্রেস কমিটি। রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যক্তিগত ই-মেইল ব্যবহারের বিতর্ক রয়েছে। তবে এবার অনেকটাই পরিণত হিলারি। আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। বারাক ওবামার প্রচারণা কমিটির অনেককে উপদেষ্টা বানিয়েছেন। দেশ-বিদেশের নারী অধিকার ইস্যু, অর্থনৈতিক অসমতা দূরীকরণের মতো কর্মসূচি হাতে নিয়ে ভোটারদের মন জয় করতে চান তিনি।
জানা গেছে, হাস্যরস, নম্রতা আর নীতিদক্ষতা- এই তিন নীতিতে এগোতে চান হিলারি। এতেই স্বপ্ন দেখেন সাফল্যের সিঁড়িতে হাঁটার।
ওবামা-হিলারির সম্পর্ক পুনর্নির্ণয় : ওবামার কাছে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী প্রতিযোগিতায় হেরেছিলেন হিলারি। তারপর ওবামার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে কাজ করেছেন। পরবর্তীকালে সমালোচনাও করেছেন ওবামার নীতির। তবে এবারের নির্বাচনে হিলারিকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন ওবামা। ইতিমধ্যে তিনি বলেছেন, হিলারি একজন উৎকৃষ্ট ও নিখুঁত প্রার্থী হবেন। তার নির্বাচনী তহবিল গঠনেও সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন ওবামা।

ঢাকাকে যেমন দেখেছিলেন গুন্টার গ্রাস by কাজল ঘোষ

সাহিত্যে নোবেলজয়ী জার্মান লেখক গুন্টার গ্রাস আর নেই।
আজ সোমবার ৮৭ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন। তাঁর
প্রকাশকদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এ কথা জানিয়েছে।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্টাইডল টুইটারে বলেছে, এই নোবেলজয়ী জার্মানির
উত্তরাঞ্চলের শহর লুইবেকের এক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
গ্রাস। পুরো নাম গুন্টার ভিলহেম গ্রাস। বিশ্বব্যাপী গুন্টার গ্রাস নামে সমধিক পরিচিত। ‘টিনড্রাম’ উপন্যাসের জন্য ১৯৯৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। জন্মেছেন পোল্যান্ডের বাল্টিকে। জন্মসূত্রে জার্মানি এই লেখক লিখেছেন দশটি উপন্যাস, বেশ ক’টি নাটক ও কয়খানা ভ্রমণকাহিনী। খ্যাতনামা এই মানুষটির ঢাকা ড্রাম রয়েছে। ঢাকা নিয়ে রয়েছে অগাধ ভালবাসা। নোবেল পুরস্কার অর্জনের প্রায় এক যুগ আগেই তিনি ঢাকায় বেড়াতে এসেছেন। শুধু ঢাকা নয় গিয়েছেন সোনারগাঁ, টাঙ্গাইল। সময়টা ১৯৮৬ সাল। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে গুন্টার গ্রাস ঢাকায় অবস্থান করেছিলেন টানা সাতদিন। ডিসেম্বরের ২ তারিখ থেকে ৯ তারিখ। সঙ্গী করেছিলেন স্ত্রী উটে গ্রাসকে। মানবতাবাদী এই লেখক ঢাকায় এসে বেড়াতে গিয়েছিলেন বুড়িগঙ্গা, শাঁখারীবাজার, লালবাগের কেল্লা, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মৌলভীবাজার। অংশ নিয়েছেন বেশ কিছু ঘরোয়া অনুষ্ঠানাদিতেও। সাতদিনের এই বর্ণাঢ্য ভ্রমণে সঙ্গী করেছিলেন কখনও কবি বেলাল চৌধুরী, কখনও শিল্পী এসএম সুলতান। ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দি করেছিলেন আলোকচিত্র সাংবাদিক নাসির আলী মামুন।
গুন্টার গ্রাস জার্মানি ফিরে লিখেছেন ঢাকা ভ্রমণের নানা বৃত্তান্ত। তিনি লিখেছেন, ‘বিমানবন্দরের একদল লেখক আমাদেরকে ফুলসহ বরণ করে নেয়। চীনা-খাবার নেয়ার পর আমরা মশারি ছাড়াই নিদ্রা যাই আর ল্যাংটা বোধ করি। পরদিন সকালে একটি রংচঙে রিকশায় চড়ে আমরা পুরাতন শহরে যাই। ভাড়া ঠিক করতে কিছুটা সময় লাগে। জনৈক লেখক বেলাল চৌধুরী আমাদের গাইড। মুসলমানদের এ নগরীতে পুরুষরাই সড়কে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। কেবল একটি অংশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা বাস করে। দাউদের মতো বেলালও হইচই ছাড়াই আমাদেরকে কারখানায় ঢোকায়, পরিবারগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তক্তার ছাউনি দিয়ে পরিসর বাড়ানো একটি ঘিঞ্জি বাড়িতে এক যুবক আলমারির মতো সিন্দুক খুলে দেখালো গোপন গৃহবেদী: যেখানে আছে টুকিটাকি সামগ্রীর মতো দুর্গা, গণেশ আর লক্ষ্মীর মূর্তি; আর আছে মশারি সমেত একটি পুতুলের খাট যেখানে ঘুমানোর সময় দেব-দেবীদের শুইয়ে রাখা হয়। নতুন হত্যাযজ্ঞের আশঙ্কা হাসিমুখে নাকচ করে দিল  যুবকÑএর অবশ্য সামান্য গুরুত্ব আছে। পরিবারে আছে অনেকগুলো শিশু।
কারখানাগুলোতে লোহার পাত দিয়ে ঝিনুক কেটে চুড়ি বানানো হয়। বাম পা দিয়ে কাষ্ঠখ-ের উপরে রাখা ঝিনুক চেপে ধরা হয় আর পায়ের আঙুলের পাশে করাত স্থাপন করে দুহাত দিয়ে চালানো হয়। করাতের পাতটি ধাতুর তৈরি হলেও উৎপাদন পদ্ধতিটি প্রস্তরযুগীয়। এরপর আমরা মোগল আমলে নির্মিত লালবাগ কেল্লার অবশিষ্ট দেখতে যাই। একটি ক্ষুদ্রাকৃতির জাদুঘর, তবু সংস্কৃতির পূজারি ইংরেজরা কিভাবে জাদুঘরগুলোকে সমৃদ্ধ করেছিল তারই নিদর্শন। এর সঙ্গে বৃহত্তর জার্মানির ফিল্ড মার্শাল গোয়েরিংয়ের বিদেশী শিল্প সম্পদের প্রতি অনুরাগের তুলনা চলে। সেদিন বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর পরিকল্পিত বিনাশের ওপর একটি আলোচনা। বস্তুত বাঙালি জাতীয়তাবাদ জাতীয় সীমানা মানে না। বাংলাদেশের ভেতরে সামরিক সরকার এই বিনাশ অভিযানের সমালোচনা করতে দেয় না। কিন্তু মধ্যবিত্তশ্রেণী দ্বারা নির্বাচিত বিরোধী দলও উপজাতীদের ভাগ্যের ব্যাপারে সামান্যই উদ্বিগ্ন। কলকাতার মতো এখানেও বেঁচে থাকার প্রাত্যহিক সংগ্রাম পরিবারের বাইরে সহানুভূতি শুষে নেয়।
পরদিন এক সাহিত্যপ্রেমিক শিল্পপতির বাসায় রাতের খাবারের দাওয়াত। এতে অন্য লেখকরাও উপস্থিত ছিলেন। তবে বেলাল সঙ্গত কারণেই দাওয়াতটি কবুল করেনি। শিল্পপতির স্ত্রী হারমোনিয়াম সহযোগে ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে দুটো রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করে। আহারের সময় আলাপচারিতায় এমন সব প্রশ্ন ছোড়া হলো যেগুলোর কদাচিৎই উত্তর দেয়ার সুযোগ থাকে। টেবিলের চারদিকে রাজনৈতিক রসালাপ উপভোগের পর আমরা মূল প্রসঙ্গে এলাম। যদিও বাংলা চিরতরে বিভক্ত হয়ে গেছে একমাত্র যে কারণে তা জার্মানির সঙ্গে তুলনীয়-তবুও সুভাষচন্দ্র বসুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এখনও নিঃসন্দেহে অবিভাজ্য।
পরদিন গেলাম কুমোরদের পাড়ায়। প্লাস্টিকের তৈরি তৈজস দ্রুত বাজার দখল করায় এরা এখন বেকার হতে বসেছে। বিকালে বেলাল আমাদের জেনেভা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। একটি সুবিস্তৃত ও ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি যেখানে বিশ হাজার মুসলিম বিহারি বাস করে।

গুন্টার গ্রাসের বিদায়

নারায়ণগঞ্জে সোনারগাঁওয়ের পানাম নগর ঘুরে দেখেছিলেন
সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস। ছবি: নাসির আলী মামুন
ঢাকার রাস্তায় রিকশা ভ্রমণে সাহিত্যে নোবেলজয়ী জার্মান
সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস। ছবি: নাসির আলী মামুন
সাহিত্যে নোবেলজয়ী জার্মান লেখক গুন্টার গ্রাস আর নেই। আজ সোমবার ৮৭ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন। তাঁর প্রকাশকদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি ও বিবিসি অনলাইন এ খবর জানায়।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্টাইডল টুইটারে বলেছে, এই নোবেলজয়ী জার্মানির উত্তরাঞ্চলের শহর লুইবেকের এক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রথম উপন্যাস ‘দ্য টিন ড্রাম’ দিয়েই পাঠকের মন জয় করেছিলেন গুন্টার গ্রাস। এ ছাড়া তাঁর খ্যাতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘ক্যাট অ্যান্ড মাউস’ ও ‘ডগ ইয়ার্স’ উপন্যাসের নামও। তিনটি বইয়েই তিনি তুলে আনেন তাঁর নিজের শহর ডানজিশে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর উত্থান ও নির্মমতার কথা। ডানজিশ শহরটি এখন অবশ্য পোলান্ডে পড়েছে, নাম গদানস্ক।
গুন্টার গ্রাস ১৯৯৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। এ ছাড়া অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। স্টাইলিশ গোঁফ আর তামাকের পাইপ এই ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার ও ভাস্করের ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে গিয়েছিল।
গুন্টার গ্রাস ছিলেন রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব। তাঁর লেখায় এই বিষয়টির উপস্থিতি ছিল অনেক শক্তিশালী। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এর তীব্র সমালোচক ছিলেন এই সাহিত্যিক। তিনি মনে করতেন, বুশ এই যুদ্ধের নামে ধর্মকে ব্যবহার করছেন। ইসরায়েলেরও কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। এক কবিতায় তিনি বলেছেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় হুমকি। ইসরায়েলের সমালোচনা করে ২০১২ সালে তিনি ‘হোয়াট মাস্ট বি সেইড’ নামের একটি গদ্য-কবিতা লেখেন। ইসরায়েল তখন তাঁর বিরুদ্ধে অ্যান্টি-সেমিটিজমের (ইহুদিবাদ-বিদ্বেষী) অভিযোগ এনে তাঁকে দেশটিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিশোর গুন্টার গ্রাসকে হিটলারের নাৎসি বাহিনীতে যোগ দিতে হয়েছিল। আর এ কারণেই ইসরায়েল তাঁকে পছন্দ করত না। ইসরায়েল মনে করে, তিনি হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হয়ে কাজ করেছেন বলেই ইহুদি-বিদ্বেষী মনোভাব পোষণ করেন। মুদি দোকানদার বাবা-মায়ের ঘরে ১৯২৭ সালের ১৬ অক্টোবর গুন্টার গ্রাসের জন্ম। তিনি পড়াশোনা করেছেন ভাস্কর্য ও গ্রাফিকস নিয়ে। তবে তিনি ছিলেন শখের ভিজুয়্যাল শিল্পী। তাঁর লেখা আর শিল্পে বারবার এসেছে জার্মানির অতীত ইতিহাস।
গুন্টার গ্রাসের লেখা প্রথম তিনটি বই ডানজিশ ট্রিলজি হিসেবে পরিচিত। এই বইগুলোতে উঠে এসেছে তাঁর শৈশব ও অতীত দিনের কথা। তাঁর প্রথম উপন্যাস দ্য টিন ড্রাম অনুসরণে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছিল। ২০০২ সালে গুন্টার গ্রাসের লেখা ‘ক্র্যাবওয়াক’ উপন্যাসেও উঠে এসেছে বর্তমানের ওপর অতীতের প্রভাবের কথা।
১৯৬৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে গুন্টার গ্রাস নিজেকে মানবতাবাদী হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোনো বিশ্বাসকে চূড়ান্ত সত্য বলে ধরে নিয়ে তা প্রতিষ্ঠার নামে অন্যের ওপর আক্রমণাত্মক মনোভাবের বিরোধী তিনি।
একটি অনুষ্ঠানের সূচি থেকে লেখক সালমান রুশদির রচনা পাঠ বাদ দেওয়ায় ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে জার্মানির জনপ্রিয় লেখক গুন্টার গ্রাস ১৯৮৯ সালে বার্লিন একাডেমি অব আর্টস থেকে পদত্যাগ করেন। ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসের জন্য ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি তখন সালমান রুশদিকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। দুই জার্মানির একত্রীকরণের বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন গুন্টার গ্রাস।
‘পিলিং দ্য ওনিয়ন’ নামে ২০০৬ সালে একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন এই নোবেলজয়ী। সেখানে তিনি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা গোপন রাখার ব্যাখ্যা দেন। তাঁর ভাষায়, ‘যুদ্ধের পর আমি আমার কৈশোরের লজ্জাটুকু আড়াল রাখতে চেয়েছিলাম।’

বৈসাবি উৎসবের মধ্যে পরীক্ষা! by ইলিরা দেওয়ান

পাহাড়ে বৈসাবি উৎসব সন্নিকটে। ছোট-বড় সবার মাঝে এখন উৎসবের আমেজ। আমরা যাঁরা জীবিকার তাগিদে দুমুঠো খেয়ে বাঁচার জন্য পাহাড়ের বাইরে চাকরি করি, তাঁরাও প্রিয়জনের সঙ্গে সারা বছরের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য এ সময় পাহাড়ের দিকে ছুটে যাই।
এ দেশের প্রকৃতির রূপই এমন যে চৈত্র ও বৈশাখ মাসে প্রচণ্ড দাবদাহে পুড়তে থাকে দেশ। তবে এ বছর প্রকৃতি দাবদাহের রূঢ়তায় নয়, কালবৈশাখীর তাণ্ডবে সারা দেশে ইতিমধ্যে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অসংখ্য গ্রাম তছনছ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্রতা অর্থাৎ দাবদাহ কিংবা কালবৈশাখীর কালো মেঘ পাহাড়ের বৈসাবির আমেজে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। পাড়ায়-মহল্লায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কোলাহল, ঐতিহ্যবাহী খেলায় ছেলে-বুড়ো সবার উছলে পড়া ‘রেং’ (আনন্দে চিৎকার করা)।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, পাহাড়ের সবচেয়ে বড় এ উৎসবের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষার সময়সূচি রাখা হয়। ফলে কোমলমতি শিশুরা পরীক্ষার জন্য মানসিক চাপে থেকে উৎসবের আমেজটা উপভোগ করতে পারে না। ছোট্ট সোমা চাকমা খাগড়াছড়ির একটি স্কুলের প্রাথমিক গ্রেডের শিক্ষার্থী। বৈসাবির পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সে অকপটে জানাল, সে সময় পরীক্ষা থাকবে, তাই বৈসাবির জন্য আলাদাভাবে কোনো পরিকল্পনা সে করেনি।
সোমা চাকমার জায়গায় আমরা কি কুমিল্লা বা রাজশাহীর শিশু কোনো সোমা বেগমের ঈদের সময়ে পরীক্ষার কথা ভাবতে পারি? বৈসাবির দিনে নতুন জামা গায়ে দিয়ে এ শিশুরা যে আনন্দটুকু পাবে, সে আনন্দ সারা বছর নতুন জামা গায়ে দিলেও তা পাবে না। কেবল এক দিনের ছুটি ঘোষণা দিয়ে পরীক্ষার মতো জগদ্দল বোঝা মাথায় চাপিয়ে দিয়ে পাহাড়ের শিশুদের অধিকারকেই মূলত কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, তিন পার্বত্য জেলায় প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’র জন্য সেখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকা সমন্বয় করে থাকে পার্বত্য জেলা পরিষদ। কিন্তু জাতীয়ভাবে পরীক্ষাসহ অন্যান্য কারিকুলাম প্রস্তুত করে মূলত ন্যাশনাল কারিকুলাম টেক্সট বুক বোর্ড (এনসিটিবি)।
সম্প্রতি এনসিটিবি সারা দেশ থেকে ৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নির্বাচন করেছে ‘ট্রাই আউট কার্যক্রম পরিচালনা’ শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণের জন্য। এ কর্মসূচির লক্ষ্য হলো পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষক সংস্করণ। পাঠ্যপুস্তক কিংবা শিক্ষকদের মানোন্নয়নের জন্য এ ধরনের হাজারো কর্মসূচি শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে থাকবেই, সে বিষয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রশিক্ষণের সময়সূচি নিয়ে (১২-১৩ এপ্রিল)। এ দুদিন পাহাড়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ উৎসব পালিত হয়ে থাকে।
জানা যায়, সারা দেশের ৩০টি সৌভাগ্যবান স্কুলের মধ্যে তিন পার্বত্য জেলা থেকে নয়টি স্কুলের শিক্ষকেরা এ প্রশিক্ষণের আওতাভুক্ত হয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশ আদিবাসী। এনসিটিবি সারা দেশের স্কুলের কারিকুলাম নির্ধারণ করে থাকে। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থার একটি দায়িত্বশীল দপ্তর হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষকদের বেলায় এনসিটিবির এত বড় বৈষম্য কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু সংস্কৃতি, বহু ভাষীর দেশ। বৃহত্তর বাঙালি গোষ্ঠী (মুসলমান ও হিন্দু) ছাড়াও এ দেশের আরও অন্যান্য যেসব জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়াদি সম্পর্কে আমাদের আরও সচেতন হওয়া উচিত।
কেননা, আদিবাসী শিক্ষকেরা যে মুহূর্তে বৈসাবি উৎসবের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখনই এ নোটিশ তাঁদের নিঃসন্দেহে হতাশ করেছে। আর এমন বড় উৎসবে পরিবারের প্রধান ব্যক্তির অনুপস্থিতির অর্থ সারা বছরের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া।
যথাক্রমে নার্সারি ও প্রথম শ্রেণির ছাত্রী রূপকথা ও তুলি। বৈসাবির প্রস্তুতি হিসেবে কয়েক দিন ধরে পরিদের মতো গোলাপি রঙের ফোলা জামা, লাল রঙের স্কার্ট, গোলাপি রঙের ক্লিপ, গোলাপি নেইল পলিশ ইত্যাদির বায়না চলছিল। কিন্তু তাদের স্কুলশিক্ষক মায়ের হঠাৎ ঢাকায় প্রশিক্ষণের নোটিশে তাদের সেই আনন্দ বিষাদে ভরে গেছে। কারণ তারা এখনো বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর বয়সে পৌঁছায়নি। তাই তাদের বৈসাবির সব আনন্দ মায়ের দুই হাত ধরে পাশের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। এ বছর তারা সেই সীমাবদ্ধ আনন্দ থেকেও বঞ্চিত হবে।
আমরা কেবল শিশু অধিকার, শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন এসব নিয়ে সভা সেমিনারের কক্ষ গরম করে ফেলি। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এসব কোমলমতি শিশুদের কথা কেন আমরা বারবার ভুলে যাই। শিক্ষানীতিতে জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারা বিকশিত করে প্রজন্ম পরম্পরায় সঞ্চালনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
আমরা কি এ প্রজন্মকে সেই পরিবেশ সঠিকভাবে দিতে পারছি?
ইলিরা দেওয়ান: হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক

প্রার্থীদের অযথা হয়রানি না করার নির্দেশ

সিটি নির্বাচনের প্রার্থীদের কোন ধরনের হয়রানি না করে প্রচারণায় সমান সুযোগ দেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেছেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের ব্যবস্থা করেছে কমিশন। এক্ষেত্রে কাউকে কোন ধরনের ছাড় দেয়া হবে না। গতকাল সকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ঢাকা উত্তরের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দিয়ে সিইসি বলেন, জনগণ যেন শান্তিপূর্ণভাবে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন সেরকম পরিবেশ সৃষ্টি করুন। কেউ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন। প্রার্থীরা যেন সুন্দরভাবে তাদের প্রচারণা চালাতে পারেন সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন। ভোটকেন্দ্র সুরক্ষিত রাখুন। কোন বেআইনি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন না ঘটতে পারে তা নিশ্চিত করুন। প্রার্থীদের উদ্দেশে কাজী রকিবউদ্দীন বলেন, আজ এই ঐত্যিহবাহী নগরীর দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র পরমত সহিষ্ণুতা ভোটারদের রায় খোলা মনে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে শান্তিপূর্ণভাবে, নিয়মতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন করার ঐতিহ্য গড়ে তুলি। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন করতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীগণ যেন নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করি। ইতিপূর্বে ৬টি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছি। সেখানে একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে রায় মেনে নিয়েছেন। প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আশা করি আপনারা এবারের নির্বাচনে আরও ভাল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এ ঐতিহ্যকে এগিয়ে নেবেন। নির্বাচনে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য আমরা পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। প্রচারণার শুরু থেকেই অধিক সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আরও আদালতের ব্যবস্থা করা হবে যাতে করে আচরণবিধি লঙ্ঘন করা না হয়। নির্বাচনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার ব্যবস্থা আছে। আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ আছে। আপনারা আইন ভঙ্গ করবেন না, নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিপদগ্রস্ত করবেন না। বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনুন। নিশ্চয় আপনারা সুবিচার পাবেন। সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে তিনি বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১৯শে এপ্রিল বৈঠকের পর সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। আমরা সর্বোচ্চ শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবো যেন প্রতিটি ভোটার নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন।
নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, এবার নির্বাচনে অনেক বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচনের প্রতি সম্পৃক্ত সকল কর্মকর্তার প্রতি নির্দেশ- আপনাদের দায়িত্ব এ রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব আইন অনুযায়ী নিয়মনীতি মেনে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে নির্ভয়ে পালন করে দেশের প্রতি দেশবাসীর প্রতি আপনাদের ঋণ পরিশোধ করুন। নির্বাচনে কোন প্রকার কারচুপি ও প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই উল্লেখ করে সিইসি বলেন, আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে অবাধ সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশন সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোন রকম ছাড় দেয়া হবে না। নির্বাচনের জন্য যে ভোটার তালিকা করা হয়েছে এতে ভূয়া ভোট দেয়ার সুযোগ নেই। এ নির্বাচনে অস্বচ্ছতার কোন সুযোগ নাই। এখানে সকলে উপস্থিত থাকবেন। পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক ও এজেন্টরা থাকবেন। গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, মিডিয়ার কাছে অনুরোধ সকল প্রার্থীর এলাকা যেন মিডিয়াতে প্রকাশ পায়। জনসংযোগে সবাই যেন সুযোগ পান। এ সময় বিটিভিকেও সকল প্রার্থীর প্রচারণায় সহায়তা করার অনুরোধ জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। সভায় অন্য নির্বাচন কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

‘আমার রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ নেই’ -প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ by আশরাফুল ইসলাম

প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, হাওরে আমার জন্ম। পাশাপাশি এ কিশোরগঞ্জে আমি বড় হয়েছি। এখানেই আমার রাজনীতির শুরু। ১৯৬১ সালে মেট্রিক পাস করে গুরুদয়াল কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু করি। দলমত নির্বিশেষে সবার সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক। ২০১৩ সালের ১৩ই মার্চ পর্যন্ত রাজনৈতিক বক্তৃতা করার সুযোগ ছিল। কিন্তু এখন আর রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ নেই। চারদিনের সফরে কিশোরগঞ্জে এসে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ শনিবার সন্ধ্যার পর সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে সাংবাদিক, জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন সংগঠন ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথকভাবে বেশ কয়েকটি মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। এসব মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রেসিডেন্ট আক্ষেপ করে বলেন, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার আগে সবার সঙ্গে সবসময় অবাধে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে, কথা হয়েছে। জেলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা হয়েছে। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ নেই। এই কারণে এলাকার লোকজনকে দেখতে আমি এসেছি। যদিও এসএসএফের কারণে লোকজন আমার কাছে যেতে পারে না। তারপরও এসব হাঙ্গামা পার হয়ে যারা আমার কাছে আসতে পেরেছেন, তাদের সঙ্গে মনের দু-একটি কথা বলে হালকা হয়েছি। এতে অনেক ভাল লাগছে। আমি এলাকার লোকজনকে না দেখে থাকতে পারি না।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত বক্তারা, প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের কাছে জেলা সদরের রাস্তাঘাট, একটি সেতুসহ শহরের যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান। জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, আমার কোন ক্ষমতা নেই। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার ব্রিজ নির্মাণ করেই এখান থেকে ঢাকা যেতাম। তবে আমি কিশোরগঞ্জবাসীর দাবি-দাওয়াগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা করি প্রেসিডেন্টের অনুরোধ তারা রক্ষা করবেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় কিশোরগঞ্জকে প্রস্তাবিত ময়মনসিংহ বিভাগে না রেখে ঢাকার সঙ্গে রাখার দাবি জানালে প্রেসিডেন্ট বলেন, কিশোরগঞ্জের একজন মানুষ হিসেবে ঢাকা বিভাগে আমিও থাকতে চাই। তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হলে আমি কিশোরগঞ্জবাসীর অনুভূতির কথা তুলে ধরবো।
এ সময় অন্যদের মধ্যে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের এমপি মো. আফজাল হোসেন, কিশোরগঞ্জ-২ আসনের এমপি অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিন, সংরক্ষিত আসনের এমপি দিলারা বেগম আসমা, জেলা প্রশাসক এস এম আলম, পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন খান, জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মো. জিল্লুর রহমান, পৌর মেয়র মাজহারুল ইসলাম ভূঁইয়া, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমএ আফজল, জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোস্তফা কামাল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সফরের শেষ দিনে গতকাল দুপুরে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ কিশোরগঞ্জে শতকোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে নরসুন্দা নদী পুনর্বাসনের মাধ্যমে শহর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ৫টি দৃষ্টিনন্দন সেতুর কয়েকটি ঘুরে দেখেন। পরে বিকালে হেলিকপ্টারযোগে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করেন। এর আগে সফরের প্রথম দিন গত বৃহস্পতিবার নিজের সংসদীয় এলাকার ইটনা উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিদর্শন, দ্বিতীয় দিন শুক্রবার নিজ উপজেলা মিঠামইনের যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিদর্শন ছাড়াও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং তৃতীয় দিন শনিবার বিকালে করিমগঞ্জের জাফরাবাদে তার নামে প্রতিষ্ঠিত আবদুল হামিদ মেডিক্যাল কলেজ পরিদর্শন ও মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চিকিৎসকদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছান।

মাদকাশক্ত পিতার কামড়ে শিশু নিহত

৩৭ দিন বয়সের শিশু সন্তান লুৎফুর রহমান হৃদয়কে নেশাগ্রস্থ পিতা কামড়িয়ে হত্যা করেছে। ঘটনা ঘটেছে রোববার গভীর রাতে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সাবিয়া গ্রামে। হত্যকারী  মশিউর রহমান রিপন (৩৭) কে মৌলভীবাজার মডেল থানার পুলিশ গ্রেফতার করেছে। মৌলভীবাজার মডেল থানার ডিউটি অফিসার  জানান,এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি। নিহত শিশুর পোস্টমর্টেম এর জন্য ২৫০ শয্যার হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।হাসপাতালের বারান্দায় নিহত শিশুর পাশে ছিলেন সন্তান হারা মা লুবনা (২২)। শোকে পাথর লুবনা ও তার এক বোন জানালেন বিয়ের পর থেকে রিপন অপছন্দ শুরু করে। যৌতুক দাবী করে। সম্প্রতি আরেক বিয়ে করতে চাইলে তা নিয়ে বিরোধ শুরু হয় লুবনার সাথে। রিপনের এক প্রতিবেশি ছাতির আলী বলেন মূলত গরীব লুবনার পরিবার। রিপনের পরিবার ধনী । রিপন নতুন করে বিয়ে করতে চাইলে এর মধ্যে শিশু সন্তানকে অন্তরায় ভাবতে শুরু করে। লুবনার ভাই মাহমদ আলী (৪০) জানিয়েছেন ঘটনা ঘটে রাত আড়াই থেকে তিনটার মধ্যে। পরে তার বোন লুবনা থানায় এসে সন্তান হত্যার কথা জানায়। পুলিশ গিয়ে রিপনকে আটক করে এবং শিশুকে উদ্ধার কওে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে  ভোর ৫ টায় পাঠানোর পর কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে।

নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পরামর্শ সুজনের

সব প্রার্থীদের সমান সুযোগ দেয়া, আচরণবিধি ভঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া, গুরুতর অপরাধে প্রার্থীতা বাতিল, নির্বাচনে টাকার অবাধ ব্যবহার ও পেশী শক্তির দৌরাত্ম্য বন্ধের  পরামর্শ দিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। এছাড়া নির্বাচনের কয়েকদিন আগে থেকে সেনা মোতায়েন করারও পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। একইসাথে প্রার্থীদের কারো বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা থাকলে তা প্রত্যাহার এবং জামিনযোগ্য মামলা থাকলে জামিন দেয়ারও পরামর্শ দিয়েছে তারা।
আজ সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণমূলক অনুষ্ঠানে  নির্বাচন কমিশনকে এসব পরামর্শ দেয় সুজন।
তথ্য বিশ্লেষণে সুজন বলেছে, ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে ১৬ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে সাতজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতকোত্তর, অপর সাতজন স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং অবশিষ্ট দু’জন স্বশিক্ষিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণে প্রতিদ্বন্দ্বী ২০ জনের মধ্যে পাঁচজন স্নাতকোত্তর, চারজন স্নাতক, পাঁচজন স্বশিক্ষিত এবং একজন অষ্টম শ্রেণী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরে ১৬ জন প্রার্থীর মধ্যে নয়জন ব্যবসায়ী, তিনজন চাকরিজীবী। বাকী চারজনের একজন সার্বক্ষণনিক রাজনৈতিক কর্মী, একজন সমাজকর্মী, একজন লেখক ও গবেষক এবং আরেকজন কবি  ও সাহিত্যিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা উত্তরে ব্যবসায়ী ৬৭.২ শতাংশ। দক্ষিণে ২০ জনের মধ্যে ১৪ জন ব্যবসায়ী, একজন কোনো পেশার কথা উল্লেখ করেনননি।
মামলার বিষয়ে সুজন জানিয়েছে, ঢাকা উত্তরে ১৬ জন প্রার্থীর মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে মামলা ছিল এবং এখনো আছে। আরেকজনের বিরুদ্ধে অতীতে একটা ছিল, এখন নেই। বাকী ১৪ জনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই।
ঢাকা দক্ষিণে ২০ জনের মধ্যে ৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা আছে। সাতজনের বিরুদ্ধে অতীতে ছিল। তিনজনের বিরুদ্ধে অতীতেও ছিল বর্তমানেও আছে। বাকিদের কথা উল্লেখ নেই।
তথ্য বিশ্লেষণে মূল বক্তব্য প্রদান করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। উপস্থিত ছিলেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, সদস্য হামিদা হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

গুলিতে দুই শিবিরকর্মী নিহত

শহীদুল ইসলাম ও আনিসুর রহমান
সিরাজগঞ্জে গুলিতে আহত এক শিবিরকর্মী চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে মারা গেছে। রোববার মধ্যরাত সাড়ে ১২টার সময় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করার পর সে মারা যায়। এদিকে, রাজশাহীতে শহিদুল ইসলাম (২৬) নামে এক শিবির কর্মীর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার করেছে নগরীর শাহ মখদুম থানা পুলিশ। সোমবার সকাল ৭টার দিকে নগরীর বড়বনগ্রাম সংলগ্ন কৃষ্টগঞ্জ এলাকা থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়।
সিরাজগঞ্জে নিহত আানিসুর রহমান আনিস (১৮) উল্লাপাড়া উপজেলার গয়হাট্টা-পারকোলা উত্তরপাড়া গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে ও জেলা সদরের নবদ্বীপপুল সংলগ্ন ধানবান্ধি মহল্লার ভাইভাই মেসে থেকে মওলানা ভাসানী ডিগ্রী কলেজে একাদশ শ্রেনীতে পড়তো।
হাসপাতালের জরুরী বিভাগের চিকিৎসক ফয়সাল আহম্মেদ ও অর্থোপেডিক বিভাগের মেডিকেল অফিসার নুরুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আনিস মারা গেছে।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুল ইসলাম জানান, কামারুজ্জামানের ফাঁসির পর জামায়াত-শিবিরের ডাকা সোমবার হরতাল সফল করার লক্ষ্যে রোববার সন্ধায় কতিপয় শিবির কর্মী আনিসের নেতৃত্বে রোববার সন্ধায় বৃষ্টির মধ্যে সদর থানার ওপর দু’টি ককটেল হামলা চালায়। এ সময় পুলিশও ধাওয়া করে আনিছকে আটক করে। পরে তার দেয়া তথ্য অনুয়ায়ী শহরের নবদ্বীপ পুল সংলগ্ন ভাই-ভাই ও আশেপাশের দু’টি মেস থেকে ৫ জনকে আটকসহ ৩টি তাজা ককটেল উদ্ধার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী শহর রক্ষা বাঁধের পাশে একডালা ও গয়লায় অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করা হয়।
রাত সোয়া বারটার দিকে আনিসকে সাথে নিয়ে অভিযান পরিচালনার সময় শিবিরকর্মীরা শহর রক্ষা বাঁধ এলাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এ সময় সহকর্মীদের ছোড়া গুলি আনিছের ডান পায়ে বিদ্ধ হয়। আনিছকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোরে সে মারা যায়।
তবে জেলা জামায়াতের আমির শাহিনুর আলম দাবি করেছেন, আনিস পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
রাজশাহীতে শিবির কর্মীর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার
রাজশাহীতে শহিদুল ইসলাম (২৬) নামে এক শিবির কর্মীর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ উদ্ধার করেছে নগরীর শাহ মখদুম থানা পুলিশ। সোমবার সকাল ৭টার দিকে নগরীর বড়বনগ্রাম সংলগ্ন কৃষ্টগঞ্জ এলাকা থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয়।
পরে মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
নিহত শিবির কর্মী শহিদুল ইসলাম শাহ মখদুম থানার ভাড়ালিপাড়া এলাকার জালাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি নগরীর নওদাপাড়াস্থ ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন।
নগরীর শাহশখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান নয়া দিগন্তকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, গত রোববার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের রাজশাহী মহানগর সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ জোবায়ের ও সাংগঠনিক সম্পাদক ইসমাঈল হোসেন দাবি করেন, শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে নগরীর নওদাপাড়াস্থ ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শিবির কর্মী শহিদুল ইসলামকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরদিন রোববার তাকে আদালতে হাজির না করায় এবং পুলিশ তাকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করায় বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা।
তবে রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও মহানগর গোয়েন্দা শাখার সহকারী কমিশনার (এসি) ইফতে খায়ের আলম অভিযোগ অস্বীকার করে রোববার জানিয়েছিলেন, শহিদুল ইসলাম নামে কোনো শিবির কর্মীকে আটক করা হয়নি।

একটি গরুবিষয়ক রচনা by আনিসুল হক

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বিএসএফের জওয়ানদের বলেছেন, বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধ করতে হবে। তাঁর কাছে খবর আছে, ভারতের সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ানোয় বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। গরু পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ করা হলে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম আরও ৭০ শতাংশ বেড়ে যাবে। তখন ওখানকার মানুষ গরু খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর (২ এপ্রিল ২০১৫)। কাজেই এটাকে বেখবর বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। বাংলাদেশের পত্রিকা ডেইলি স্টার এই উক্তিটাকে দিনের উদ্ধৃতি হিসেবে ছেপেছেও।
আমি মিলান কুন্ডেরা নামের এক কথাসাহিত্যিকের ভক্ত। তিনি বলেছেন, সবকিছুরই হালকা দিক আছে, এমনকি সেক্স এবং মৃত্যুরও একটা রসিকতার দিক রয়েছে। কাজেই প্রথমে এই উক্তির হালকা দিকটা নিয়ে কিছু কথাবার্তা বলে নেওয়া ভালো। গরুর মাংসই হোক আর ইলিশ মাছই হোক, দামের কারণে খাদ্যাভ্যাস বদলানোর পাত্র যে বাংলাদেশিরা নয়, সেটা রাজনাথ সিংকে মনে করিয়ে দেওয়াটা কর্তব্য বলে মনে করি। বাংলাদেশে যে ইলিশ মাছ আর ১৫ দিন পরে ৩০০ টাকায় পাওয়া যাবে, তা এখন বাজারে তিন হাজার টাকায় বিকোচ্ছে। দাম বেড়েছে ১০ গুণ। তাতেও বাংলাদেশি ও বাঙালিরা ইলিশ মাছ কেনা বা খাওয়া ছাড়েনি। দিব্যি বাজারে ইলিশ মাছ কেনা হচ্ছে, একটা ইলিশের দাম তো হাঁকা হয়েছে ১৬ হাজার টাকা! মাননীয় রাজনাথকে কি কেউ বলবেন, বাঙালিকে দামের ভয় দেখাবেন না! ৭০ শতাংশ কেন, দাম ১ হাজার শতাংশ বাড়লেও ওরা কোনো কিছু কেনা বা খাওয়া থেকে বিরত থাকে না।
দ্বিতীয় কথাটা অবশ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াই বলে দিয়েছে। বাংলাদেশকে গরুর মাংস খাওয়ানো বন্ধ করার দাম ভারতকে দিতে হবে বছরে ৩১ হাজার কোটি টাকা (ইকোনমিক টাইমস, ৩ এপ্রিল ২০১৫)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে প্রতিবছর ১ কোটি ২৫ লাখ গরু উৎপাদিত হয়, ২৫ লাখ পাচার হয় বাংলাদেশে, কিন্তু বাকিটা কই যায়? টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, ওই মন্ত্রীকে কেউ কি বলেনি, গরুর মাংসের বেশির ভাগটাই চলে যায় উপসাগরীয় দেশসমূহে? আর যে ৩১ হাজার কোটি রুপি ভারত আয় করে বাংলাদেশে আসা গরু থেকে, সেটা ভারতে পুষ্টিহীনতার শিকার শিশুদের রক্ষার রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ব্যয়ের চার গুণ।
আরেকটা কথাও বলে নেওয়া দরকার। বাংলাদেশ অলৌকিক সব উন্নতির নজির দেখিয়ে পৃথিবীকে নানা দিক থেকে অবাক করছে। ‘বাংলাদেশ মিরাকল’ নামে সেসব প্রচলিত ও প্রশংসিত। এত চাহিদা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ইলিশ উৎপাদন বেড়েছে। মাছ উৎপাদনে তো রীতিমতো রুপালি বিপ্লব ঘটে গেছে। জ্যান্ত পাঙাশ মাছ লাফাচ্ছে, খাওয়ার লোক নেই। ডিম, দুধ, কলা থেকে শুরু করে বাউকুল—সর্বত্র বিপ্লব ঘটে গেছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীর চার নম্বরে। বাংলাদেশের সৃজনশীল ও পরিশ্রমী মানুষ যদি একবার বোঝে গরু উৎপাদনটা লাভজনক, তাহলে আগামী চার বছরের মধ্যে বাংলাদেশে গরু-বিপ্লব সম্পন্ন হয়ে যাবে। আমরা সেই বিপ্লবকে ‘শিং বিপ্লব’ নাম দিতে পারি। দেখবেন, আমাদের ঘরে ঘরে, উঠোনে, মাঠে-ঘাটে, খামারে গরু আর গরু, কত জাতের গরুই না চাষ করা হবে। তার ফলটা আমরা জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ হতে দেখব, ৩১ হাজার কোটি টাকা বাঁচবে নগদে, তারপর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় রপ্তানি করব গরুর মাংস। শুধু কি মাংস, আমাদের খেতে-খামারে রাসায়নিক সার দরকার হবে না—গোবর বড় উৎকৃষ্ট সার—কৃষিতে উৎপাদন বাড়বে, পরিবেশ বাঁচবে, সার খাত থেকে বেঁচে যাবে বৈদেশিক মুদ্রা। আমাদের চামড়া উৎপাদন আর রপ্তানি বাড়বে, চামড়াশিল্পে উন্নতি ঘটবে। আমরা সস্তায় জুতা পরব আর গরুর লেজের রোম দিয়ে বুরুশ বানিয়ে সেই জুতা পালিশ করব!
তবে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই উক্তিতে সাম্প্রদায়িকতার ভাবটা ঠিক প্রচ্ছন্নও নেই, একটু বেশি প্রকটভাবে প্রকাশিত হয়ে গেছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে কী হবে, ভারতসহ পৃথিবীর সম্প্রীতিকামী মানুষ এই বিষয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং আছেন। ভারত যদি গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার রাষ্ট্রীয় নীতি থেকে বিচ্যুত হয়, সেটা ভারতের জন্য সুসংবাদ নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও দুঃসংবাদ। একটা সমীক্ষায় দেখা গেল, ২০২০-এর দশকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মুসলমানের দেশ হবে ভারত। ভারতকে অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতে হবে, তা ভারতের শান্তি ও উন্নতির জন্য দরকার। তা দরকার পৃথিবীর অন্য অংশগুলোর শান্তি ও উন্নতির জন্যও। ১৯৪৭-এর আগস্টে জওহরলাল নেহরু তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই, সে যে-ধর্মেরই হই না কেন, ভারতের সমান সন্তান, সবার অধিকার, সুযোগ আর দায়িত্ব সমান। আমরা সাম্প্রদায়িকতা কিংবা সংকীর্ণ মানসিকতা উৎসাহিত করতে পারি না, কোনো জাতিই বড় হতে পারে না, যার মানুষ চিন্তায় কিংবা কাজে সংকীর্ণ।’ ওই আগস্টেই পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘তোমরা মুক্ত। তোমরা মুক্তভাবে মন্দিরে যেতে পারো, তোমরা মসজিদে যেতে পারো বা অন্য যেকোনো প্রার্থনাগৃহে যেতে পারো।’ ‘তোমরা যেকোনো ধর্ম, গোত্র বা বর্ণের হতে পারো, তার সঙ্গে রাষ্ট্রের কাজকর্মের কোনো সংস্রব নেই।’ যেকোনো সুবিবেচক রাষ্ট্রনায়ক এই রকমটাই কেবল বলতে পারেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭২ সালে বলেছিলেন, বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এর একটা মানে আছে। মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। কিন্তু ধর্ম নিয়ে কেউ ব্যবসা করতে পারবে না। সেই আদর্শবাদিতা থেকে ভারত বাস্তবে অনেক জায়গায় বিচ্যুত হয়েছে, বাংলাদেশ হয়েছে, পাকিস্তান বিচ্যুত হয়েছে ব্যাপকভাবে, তার দাম দেশগুলোকে দিতে হয়েছে, দিতে হচ্ছে এবং হবে। তবু ভারত তার গণতন্ত্রকে রক্ষা করেই এসেছে। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের গৌরব ভারতের প্রাপ্য, কিন্তু রাজনাথ সিংয়ের বক্তব্য সেই ঐতিহ্য ও আদর্শবাদিতার সঙ্গে মানানসই নয়।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর দিল্লি প্রতিনিধি। বড় ভালো লেখেন। আমি তাঁর ভক্ত, তাঁর সাংবাদিকসুলভ লেখার জন্য আর তাঁর অপরূপ গদ্যভঙ্গির জন্য। সৌম্যদা কিছুদিন আগে আমাকে পাঠিয়েছিলেন ছোট ছোট ডায়েরির মতো লেখার নমুনা। সেখান থেকে একটা হুবহু উদ্ধৃত করি, ভালো লেখার উদাহরণ হিসেবে আমরা যারা সাংবাদিকতার ছাত্র, তারা তা পড়তে পারি:
‘মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যান ফিলিপ হিউজ বাউন্সারের মোকাবিলা ঠিকঠাক করতে না পেরে যেদিন মারা গেলেন, সেদিনই হর্ষবর্ধনের সঙ্গে আমার কথোপকথনটা আবার মনে পড়ে গেল। এবং কী আ­শ্চর্য, ওই দিনেই বিজেপি শ্রীনগরে তাদের কাশ্মীর নির্বাচনের ইশতেহার প্রকাশ করল, যাতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি ও সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ নিয়ে একটা শব্দও স্থান পায়নি!
‘হর্ষবর্ধন বিজেপির প্রথম সারির নেতা হলেও তিনি দিল্লির একজন নামকরা ডাক্তার। সৎ ও ভালো মানুষ বলে তাঁর সুনাম আছে। গুন্ডা-বদমাশদের নিয়ে রাজনীতি করেন না বলে অন্য দলের নেতারাও তাঁকে পছন্দ করেন। ভদ্রলোককে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী করা হবে ঠিক করে বিজেপি রাজ্যের গত ভোটটা লড়েছিল। কিন্তু বিজেপির তরি তীরে ভিড়তে ভিড়তেও ভিড়ল না। কংগ্রেসের সাহায্য নিয়ে সরকার গড়ল আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ৪৯ দিনের মাথায় তার পদত্যাগ। হঠকারিতার একশেষ। এসব গল্প এখন সবার জানা।
‘হর্ষবর্ধন অতঃপর লোকসভায় জিতে কেন্দ্রে মন্ত্রী হলেন এবং বিধানসভার পদ ছেড়ে দিলেন। দিল্লিতে রাষ্ট্রপতির শাসন চলছে। বিজেপি ঠিক করল, দিল্লিতে টু হুইলার চালানোর যে নীতি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন শীলা দীক্ষিত চালু করেছিলেন, তাতে সামান্য পরিবর্তন আনবে। আগের নীতিতে মহিলা আরোহীদের হেলমেট পরা জরুরি ছিল না। নতুন নীতিতে তা বাধ্যতামূলক করা হলো। শুরু হলো হইচই। শিখ সম্প্রদায়ের আপত্তি মেনে শিখ মহিলাদের হেলমেট পরায় ছাড় দিল সরকার। অর্থাৎ, শিখ পুরুষদের হেলমেট পরতে হয় না। শিখ মহিলারাও পেছনে বসলে তাঁদের ছাড়।
‘সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে পার্লামেন্ট হাউসে ওই সময় একদিন হর্ষবর্ধনের মুখোমুখি। তারপর তাঁর সঙ্গে আমার এই ধরনের কথাবার্তা হয়।
“আপনারাও তাহলে সবার জন্য প্রযোজ্য টু হুইলার নীতি চালু করতে পারলেন না! নীতিটা ধর্মভিত্তিক হলো। শিখদের বাদ দিলেন!”
“কী করা যাবে বলুন। শিখদের এমন চাপ। পাগড়ির ওপর হেলমেট পরা যায় না। ওদের ধর্মের ব্যাপার। তাই...।”
“তাই ওদের ছাড়। কিন্তু শিখ ক্রিকেটাররা তো দিব্যি হেলমেট পরে ব্যাট করতে নামে। সিলিতে হেলমেট পরে ফিল্ডিং দেয়। তখন ধর্মে আটকায় না? কিংবা খনিতে যখন শিখ শ্রমিক নামে, ফ্রন্ট লাইনে যখন শিখ জওয়ানদের যুদ্ধ করতে হয়, অথবা শিখ কনস্ট্রাকশন লেবাররা যখন সাইটে কাজ করে, তখনো তো নিরাপত্তার জন্যই হেলমেট মাস্ট? ধর্মের যুক্তি তখন পাত্তা পায় না কেন?”
‘হর্ষবর্ধন কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমি বললাম, “আইনটা হওয়া উচিত টু হুইলার স্পেসিফিক। যারাই স্কুটার বা বাইক চালাবে ও চড়বে, তাদের সব্বাইকেই তাদেরই নিরাপত্তার জন্য হেলমেট পরতে হবে। কারও ধর্মে আঘাত করলে সে চালাবে না। এটাই সহজ শর্ত। শিখ পুরুষ-নারীদের ছাড় আর অন্যদের জন্য বজ্র আঁটুনি, এটা স্যার বাজে আইন। এটাই অন্য অর্থে ভোটব্যাংক রাজনীতি।”
‘হর্ষবর্ধন আমতা-আমতা করে বলেছিলেন, “আপনার যুক্তি অকাট্য সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদেরও অনেক কিছু ভাবতে হয়।” কথাটা বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার আগে ওকে বলেছিলাম, “যারা সারা দেশের জন্য অভিন্ন স্কুটার বা বাইক আইন করতে পারে না, তারা করবে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি? কস্মিনকালেও হবে না। বাজি ধরবেন?”’
রাজনীতি জিনিসটা কঠিন, রাষ্ট্র ব্যাপারটা আরও কঠিন। তবু মনে হয়, ভারতকে, পাকিস্তানকে তাদের প্রতিষ্ঠাতা-পুরুষদের ১৯৪৭-এর আগস্ট বক্তৃতাগুলোই বারবার পড়তে হবে, সেই দিকেই যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

‘ধার করা’ প্রার্থী দিয়ে সিটি নির্বাচন! by সোহরাব হাসান

মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর তিন সিটিতে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত হলো। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীকও বরাদ্দ করে দিয়েছে। এই নির্বাচনী যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধাদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততা নিয়ে আমরা কোনো প্রশ্ন করতে চাই না। সেটি ভোটাররা বিচার-বিশ্লেষণ করে ২৮ এপ্রিল রায় দেবেন। তবে অধিকাংশ মেয়র পদপ্রার্থী নিজ নিজ দলে নবাগত, কেউ বা ‘ধার করা’। দলে যোগ্য প্রার্থী না থাকলেই ধার করতে হয়। ছোটখাটো দলে প্রার্থী সমস্যাটি না হয় মানা যায়। কিন্তু ৬৫ বছরের পুরোনো আওয়ামী লীগ এবং ৩৭ বছর বয়সী বিএনপিকে যদি ধার করা প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করতে হয়, সেটি তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই পরিচয়। দুই দলেই ডজন ডজন নেতা আছেন। কিন্তু নির্বাচন এলেই তাঁরা গুটিয়ে যান। কিংবা নির্বাচনে যাঁরা অতি উৎসাহ দেখান, তাঁদের ওপর শীর্ষ নেতৃত্ব আস্থা রাখতে পারেন না।
স্থানীয় সরকার সংস্থার (আমাদের সংবিধান কেন্দ্রিকতার দোহাই দিয়ে স্থানীয় সরকার কথাটি লিখতে সাহস পায়নি, লিখেছে স্থানীয় শাসন) নির্বাচন রাজনৈতিক পরিচয়ে হওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক আছে। একটি পক্ষ মনে করে, রাজনৈতিক পরিচয়েই হওয়া উচিত। নাচতে নেমে ঘোমটা দেওয়া কেন? আরেক পক্ষ মনে করে, এই নির্বাচনটি অরাজনৈতিক পরিচয়ে হলে দলের বাইরের ‘ভালো মানুষেরাও’ জয়ী হতে পারেন। কিন্তু সত্য যে নির্বাচনী রাজনীতিতে দলের বাইরের ‘ভালো মানুষেরাও’ শেষ পর্যন্ত বাইরে থাকতে পারেন না। সবাইকে দলীয় বৃত্তে নাম লেখাতে হয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো বাইরের ভালো মানুষকে দলে টানতে যতটা আগ্রহী, দলের ভেতরে ভালো মানুষ তৈরি করতে ততটাই নিষ্ক্রিয়।
এই আলোচনায় যাওয়ার আগে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মনোভাবটা জেনে নিই। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন রাজনৈতিক পরিচয়ে হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন। এর আগে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও অনুরূপ মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদও মনে করেন, এই নির্বাচনও রাজনৈতিক পরিচয়ে হওয়া উচিত। বিরোধী দল বিএনপি এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেনি। ২০১৩ সালে পাঁচ সিটি করপোরেশন এবং ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন তারা দলীয় ও জোটগতভাবেই করেছে। দেশব্যাপী ৯২ দিন নিষ্ফল অবরোধ পালন করার পর এবারও তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এখন কথা হলো যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে করার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে, নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব দলের ভেতরে যোগ্য প্রার্থী তৈরি করার চেষ্টা করছেন না। মোহাম্মদ হানিফের মৃত্যুর পর ঢাকা সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী দেওয়ার মতো নেতা তৈরি করতে পারেনি। এমনকি ২০১২ সালে যখন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল, তখনো দলটি প্রার্থী-সংকটে ছিল। শীর্ষ নেতৃত্ব দক্ষিণে সাবের হোসেন চৌধুরীর কথা ভাবলেও তিনি সংসদ সদস্য পদে ইস্তফা দিয়ে বিভক্ত ঢাকার একাংশের মেয়র হতে রাজি হননি। উত্তরে যাঁদের নাম শোনা গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে বর্তমান মেয়র পদপ্রার্থী আনিসুল হক ছিলেন না। আওয়ামী লীগের যেসব নেতার নাম ছিল, তাঁদের প্রতি শীর্ষ নেতৃত্ব ভরসা রাখতে পারেনি বলেই প্রার্থী ধার করতে হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের অভিপ্রায় অনুযায়ী স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচনটি যদি রাজনৈতিকভাবে হতো, তাহলে দলের সদস্য না হয়ে কেউ দলীয় প্রার্থী হতে পারতেন না। ২০০৮ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী কোনো দলের পক্ষে কেউ প্রার্থী হলে তাঁকে ওই দলে কমপক্ষে তিন বছর আগে যোগ দিতে হতো।
আওয়ামী লীগ দক্ষিণে যাঁকে সমর্থন দিয়েছে, সেই সাঈদ খোকন দলে নবাগত না হলেও তাঁর এক-এগারো পরবর্তী ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সেনা-সমর্থিত সরকারের আমলে তিনি কিংস পার্টি নামে পরিচিত ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রেটিক পার্টিতে (পিডিপি) যোগ দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। মন্ত্রিসভার অন্তত তিনজন সদস্য সাঈদ খোকনের বদলে হাজি সেলিমকে প্রার্থী করার পক্ষপাতী ছিলেন বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। সে ক্ষেত্রে একসঙ্গে দুপুরের আহার ও জুমার নামাজ সেই তাঁর মনোবেদনা কাটাতে পারবে কি না, সে বিষয়ে সংশয়মুক্ত হওয়া যাচ্ছে না।
ওদিকে বিএনপির অবস্থা আওয়ামী লীগের চেয়ে কিঞ্চিৎ ভালো বলার উপায় নেই। বিএনপির সিটি কমিটিতে খোকা-আব্বাসের বিরোধ পুরোনো। সেই বিরোধ কতটা তীব্র নগরবাসীর সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্বও টের পেয়েছে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের পর। এখনো মানুষ বিএনপির নগর কমিটি বলতে সাদেক হোসেন খোকাকেই বোঝে। অসুস্থতার কারণে তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। রাজনৈতিক মহলে যে কথাটি চাউর আছে তা হলো, খোকার ইঙ্গিত ছাড়া মির্জা আব্বাসের জয়ী হওয়া যেমন কঠিন, তেমনি হাজি সেলিমের সমর্থন ছাড়া সাঈদ খোকনের জিতে আসাও অসম্ভব। মোহাম্মদ হানিফের পর আওয়ামী লীগ যেমন ঢাকা মহানগরে কোনো নেতা তৈরি করেনি, বিএনপিও সাদেক হোসেন খোকার বিকল্প ভাবেনি। এ কারণে দুই সিটিতেই নির্বাচনের আগে তাদের প্রার্থী ‘ধার’ করতে হয়।
ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপি যাঁকে সমর্থন দিয়েছে, সেই তাবিথ আউয়ালও একজন ধারের প্রার্থী। তিনি কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাঁর বাবা আবদুল আউয়াল মিন্টু বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হলেও ব্যবসায়ী নেতা হিসেবেই পরিচিত। তিনিও আনিসুল হকের মতো এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ছিলেন। মিন্টু এখন যেমন বিএনপির নেত্রীকে উপদেশ দেন, শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে তখন তাঁকেও উপদেশ দিতেন। আওয়ামী লীগ থেকে তাঁর বিএনপিতে হিজরতের কারণও মেয়র পদ। আওয়ামী লীগ জানিয়ে দিয়েছিল, মোহাম্মদ হানিফ থাকতে আর কাউকে মেয়র পদে সমর্থন দেওয়া হবে না। মিন্টু বর্তমান সরকারের আমলে জেলও খেটেছেন। কিন্তু এক ছেলের হাতে বাবার এবং আরেক ছেলে তাঁর নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া নিয়ে বিএনপি মহলে নানা গুঞ্জন রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ‘সামান্য ভুলে’ আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায় এবং ছেলে তাবিথ আউয়ালই দলের সমর্থন পান। বিকল্পধারার মাহী বি. চৌধুরীও সমর্থনের প্রতিযোগিতায় ছিলেন। কিন্তু ২০০২ সালে বাবা বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর যে ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, সেটি নবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
চট্টগ্রামের দৃশ্যপট ভিন্ন। সেখানে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম বিএনপির নেতা ছিলেন না। তিনি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুগত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে মনজুর আলমই মেয়রের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু এক-এগারোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মহিউদ্দিন গ্রেপ্তার হলে মনজুরকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র করা হয়। ২০১০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। সে ক্ষেত্রে তিনি এবারের না হলেও আগেরবারের ধারের প্রার্থী। বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা চেয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান কিংবা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী মেয়র পদে দাঁড়ান। কিন্তু তাঁরা কেউ রাজি হননি। মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেনকে ঠেকাতেই মনজুর আলমকে বেছে নেওয়া হয়। যদিও গত পাঁচ বছরে তাঁর সাফল্যের পরিমাণ প্রায় শূন্য। আওয়ামী লীগের সমর্থক প্রার্থী আ জ ম নাছির বহুদিন দলীয় নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত ছিলেন। বছর দুই আগে মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হলেও সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছিল। তাঁদের দুজনের নামে ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপ আছে, যাঁরা অন্তর্দলীয় কোন্দলে প্রতিপক্ষের কর্মীকে খুন করতেও দ্বিধা করে না।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাসিন্দা এমন একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জানিয়েছেন, এবার মহিউদ্দিনকে আওয়ামী লীগ সমর্থন দিলে তিনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি ভোটও পেতেন না। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম নায়ক বিনোদবিহারী চৌধুরীর সঙ্গেও তিনি বিরোধে জড়িয়েছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মতে, চট্টগ্রামে এখনো মহিউদ্দিনের বিকল্প নেই। মেয়র পদে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। দুই ‘প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে’ বাদ দিয়ে দলীয় নেতৃত্ব অপেক্ষাকৃত তরুণ আ জ ম নাছিরকে বেছে নেয়।
দুই প্রধান দলের জেলা ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যাঁরা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন, ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা প্রায় সবাই ষাট ও সত্তর দশকের। কিন্তু এরপর আর নতুন নেতা তৈরি হয়নি। কোনো দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রচর্চা নেই। আড়াই দশক ধরে দুই দল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখেছে। অথচ আজকের জাতীয় পর্যায়ের নেতা–নেত্রীদের বেশির ভাগই এসেছেন ছাত্রসংসদ নির্বাচন করে। দুর্ভাগ্য, যে সুযোগটি তাঁরা পেয়েছেন, নতুন প্রজন্মের জন্য সেই সুযোগটি করে দিতে চান না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক দল—কোথাও গণতন্ত্রচর্চা না থাকলে নেতা তৈরি হবেন কীভাবে? সে কারণেই যত বড় দলই হোক না কেন নির্বাচন এলেই প্রার্থী ‘ধার’ করতে হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

ইসরায়েল দুঃস্বপ্নের কাল ডেকে আনছে by অ্যান মেরি স্লটার

অ্যান মেরি স্লটার
যুক্তরাষ্ট্রে বছরের পর বছর ধরে মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালনাজনিত মৃত্যুর হার কমানোর জন্য ব্যাপক চেষ্টার ফলে সেখানে ইদানীং এক মন্ত্র শোনা যায়, ‘বন্ধুরা বন্ধুদের মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাতে দিতে পারে না’। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর বিশ্বজুড়ে দেশটির বন্ধুদের উচিত সে রকম একটি স্লোগান দেওয়া: ‘বন্ধুরা বন্ধুদের অন্ধভাবে শাসন করতে দিতে পারে না’।
ইসরায়েলের অন্ধত্ব স্ব-আরোপিত। ফিলিস্তিনের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব ইসরায়েল নিজের মতো করে সমাধান করতে পারে না, ফলে সে এমনভাবে আচরণ করছে যে মনে হয় এই দ্বন্দ্বের কোনো অস্তিত্বই নেই। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে যে বক্তৃতা দেন, তাতে ইরান যে ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে, সে কথা থাকলেও ফিলিস্তিনের জনগণ সম্পর্কে একটি কথাও সেখানে ছিল না। দেশে প্রচারণা চালানোর সময় যে ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠেছে, তাদের সম্পর্কে কথা বললেও অন্য ফিলিস্তিনিরা শান্তির যে সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি।
ইসরায়েলি ভোটাররা সম্ভাবনার রাজনীতির জায়গায় ভয়ের রাজনীতিই বেছে নিয়েছেন। ডানপন্থী ও মধ্যবামপন্থীদের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার ব্যাপারটা বন্দুক ও মাখনের এবং নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার মতো ব্যাপার। জায়নবাদী ইউনিয়ন হচ্ছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির প্রধান প্রতিপক্ষ। তারা গৃহায়ণ, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্যের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। ইরান, ইসলামিক স্টেট ও হামাস যে ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে, নেতানিয়াহু সে কথা বলেছেন। নির্বাচনের দিন এই ভয়ের কারবারে তিনি বর্ণবাদী মাত্রা যোগ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘আরব ভোটাররা পশুর পালের মতো ভোট দিতে আসছে।’ নির্বাচনী প্রচারণার সময় নেতানিয়াহু দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিবাদ মেটানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর সরকারের আমলে এমন কিছু হবে না। ইসরায়েলের অনলাইন সংবাদমাধ্যমের একজন সাক্ষাৎকারগ্রাহক তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি কি এমন কথা বলছেন যে আপনি প্রধানমন্ত্রী হলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হবে না?’ উত্তরে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ঠিক।’
আর জয়লাভ নিশ্চিত হওয়ার পর নেতানিয়াহু তৎক্ষণাৎ এই বিবৃতি প্রত্যাহার করে নেন। তিনি দাবি করেন যে শুধু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এটা হওয়া সম্ভব নয়, এ কথাই তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর দাবি, যত দিন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ হামাসের সঙ্গে সখ্য বজায় রাখছে বা যত দিন খালি হওয়া ভূখণ্ডে ‘জঙ্গি ইসলামের উত্থান’ হচ্ছে, তত দিন এটা হওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। কিন্তু ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় শেষ। ফিলিস্তিনিরা বহুদিন ধরে যা অনুমান করে আসছিল, সেটা তারা পরিষ্কারভাবে শুনেছে: শান্তি সমঝোতায় আসার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সরকারের কোনো ইচ্ছাই নেই। তারা বসতি স্থাপন করতেই থাকবে, আর নিরাপত্তা দেয়ালের পেছনে উবু হয়ে বসে থাকবে। এটা বিয়োগান্ত ব্যাপার। কারণ, এতে উভয় পক্ষই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার এক চক্করের মধ্যে পড়ে যাবে, আর তাতে দ্বিজাতিভিত্তিক সমাধানের ব্যাপারটি অসম্ভব হয়ে পড়বে। যে সমাধানে দুই পক্ষকেই কিছু পাওয়ার জন্য কিছু ছাড় দিতে হবে, যেখানে ব্যাপারটা এমন যে উভয় পক্ষই আরও বেশি বেশি চায়।
ইসরায়েল এখন তিনটি পরিস্থিতির মুখে পড়েছে, সব কটিই খারাপ। একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে কট্টর সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের রাজনৈতিকীকরণ। আজকের মার্কিন তরুণেরা তো আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি নিধনযজ্ঞ দেখেনি, ফলে আগের প্রজন্ম যেভাবে সাধারণভাবেই ইসরায়েলকে সমর্থন করত, তারা আর সেভাবে তা করে না। ইসরায়েল নিজেকে যেভাবে দেখে, তারা ইসরায়েলকে সেভাবে দেখে না: ইসরায়েল হুমকির মুখে আছে। তাদের কাছে ব্যাপারটি এমন যে একটি ভিন দেশের সরকার রিপাবলিকানদের সঙ্গে খোলাখুলিভাবে সখ্য গড়ে তুলেছে। তারা একসময় প্রশ্ন করতে শুরু করবে, কেন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ায়, যেখানে তার ঘনিষ্ঠতম ইউরোপীয় মিত্ররা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে?
কংগ্রেসে বক্তৃতা দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু অনেক সমর্থন পেলেও ৬০ জনের বেশি ডেমোক্র্যাট সদস্য সেই বক্তৃতা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ইউরোপীয় ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মার্কিনদের সমর্থন হারানো ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য ভালো নয়।
ফিলিস্তিনিরা এখন আরও সংকল্প ও জোশের সঙ্গে একপক্ষীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রসর হবে। তারা সফল হলে ইসরায়েলের সামনে এমন এক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটবে, যার সীমানার সঙ্গে তারা একমত নয়। আর চলমান দ্বন্দ্ব দুই দেশের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে রূপ নেবে, আন্তর্জাতিক আইনের পরিসরের মধ্যে।
ব্যর্থ হলে ফিলিস্তিনিরা আবারও সহিংসতার পথে হাঁটবে, তৃতীয় ইন্তিফাদা। তবে প্রথম দুটির তুলনায় এই তৃতীয় ইন্তিফাদার আন্তর্জাতিক সমর্থন অনেক বেশি হবে। সে ক্ষেত্রে সম্প্রতি গাজা যুদ্ধে ইসরায়েল যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল, সে রকম কিছু করা ছাড়া ইসরায়েলের আর কিছু করার থাকবে না। যে যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মৃত শিশুর ছবি, ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ও কলেজের ছবিতে ভরে গিয়েছিল। এমনকি ইসরায়েলি সেনারা পাথর নিক্ষেপরত ফিলিস্তিনি বালকদের দিকে তেড়ে যাচ্ছে, তেমন ছবিও আমরা সে সময় দেখেছি। ইসরায়েল ও তার বন্ধুরা নিশ্চয়ই আবারও সেই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে চাইবে না।
নেতানিয়াহু ভাবেন, তিনি দেয়াল বানাবেন আর সব সমস্যা চিরতরে মিটে যাবে। কিন্তু ল্যাংস্টন হিউজের কবিতার বিখ্যাত কয়েকটি কথা মাথায় রাখা দরকার, যেটা মার্কিন নাগরিক আন্দোলনের ধ্রুবকে পরিণত হয়েছিল:
‘তামাদি স্বপ্নের কী দশা হয়?
এটা কি শুকিয়ে যায়, সূর্যের আলোয় যেমন
কিশমিশ শুকিয়ে যায়, নাকি
ক্ষতের মতো পচে যায়—
তার পর সে কি দৌড়ায়?
নাকি ভারী বস্তুর মতো বেঁকে যায়
অথবা, বিস্ফোরিত হয়?
ইসরায়েলের আগের সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে, ফিলিস্তিনিদের রাগ-ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটলে তারা সেটা বাগে আনতে পারে। কিন্তু যতবারই তারা সেটা করেছে, ইসরায়েলের নৈতিক বল ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। ইসরায়েল এক বিশেষ ও রোমাঞ্চকর দেশ। সেখানে অনেক মেধাবী, পরিশ্রমী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ মানুষ আছে। কিন্তু দেশটির বর্তমান নেতারা ফিলিস্তিনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে এক দুঃস্বপ্নের কাল ডেকে আনছেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
অ্যান মেরি স্লটার: মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক পলিসি প্ল্যানিং ডিরেক্টর।

ওয়াই-ফাইয়ের পার্সওয়ার্ড হারালে কী করবেন?

অনেকেই বাড়িতে বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ব্যবহার করার জন্য অথবা কাজের প্রয়োজনে ওয়াইফাই ব্যবহার করেন৷কিন্তু মাঝে মাঝে ওয়াই-ফাই ব্যবহারকারীকে নানান সমস্যার সন্মুখীন হতে হয়৷ সেই সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড হারিয়ে ফেলা বা ভুলে যাওয়া৷ জেনে নিন সেই পার্সওয়ার্ড কিভাবে পুনরুদ্ধার করতে হয়৷
রাউটারের পার্সওয়ার্ড হারিয়ে গেলে করণীয় :
১৷  প্রথমে ব্রাউজারটি ওপেন করতে হবে৷
২৷ ব্রাউজার ওপেন করার পরই যেতে হবে রউটারের লোকাল অ্যাড্রেস অপশনে৷
৩৷ সেখানে গিয়ে দিতে হবে ব্যবহারকারীর ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড দিতে হবে৷
৪৷ পরে ইন্টারনেট অপশনে ক্লিক করুন, সেখান থেকে চলে যান ওয়ারলেস অপশনে৷
৫৷ এরপরই একটি বক্স দেখতে পাবেন৷ সেখানেই পাবেন আপনার রাউটারের পাসওয়ার্ডটি৷
সূত্র : ইন্টারনেট

ভারতে মুসলিম, খৃস্টানদের জোর করে নির্বীজীকরণ করা উচিত: হিন্দু মহাসভা

মুসলিম ও খৃস্টানদের জোর করেই নির্বীজীকরণ করিয়ে দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করলেন উগ্রবাদী হিন্দু মহাসভার অন্যতম শীর্ষ নেত্রী সাধ্বী দেবা ঠাকুর। শনিবার এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জানান, মুসলিম ও খৃস্টানদের বাধ্যতামূলক ভাবে নির্বীজীকরণ অস্ত্রোপচার করিয়ে দেওয়া উচিত। তাতে তাদের সম্প্রদায়ের সম্প্রসারণের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে, না হলে যে হারে মুসলিম-খৃস্টান সম্প্রদায়ভুক্তদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে হিন্দুদের অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়তে পারে। সাধ্বী বলেন, “মুসলিম ও খৃস্টানদের  সংখ্যা দিনদিন বেড়েই চলেছে। একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রকে জরুরি অবস্থা জারি করতে হবে। সেখানে সব মুসলিম ও খৃস্টানদের জোর করে নির্বীজীকরণ করাতে হবে, যাতে তারা সংখ্যা বৃদ্ধি না করতে পারে।” সারা ভারত হিন্দু মহাসভার সহ-সভানেত্রী একইসঙ্গে হিন্দুদের উদ্দেশে অধিক সন্তান জন্ম দেওয়ার আহ্বানও করেন। সাধ্বী বলেন, “হিন্দুদের উচিত অধিক সন্তানের জন্ম দিয়ে সম্প্রদায়ের সংখ্যা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া, যাতে সারা বিশ্বে এর প্রভাব পড়ে। এখানেই শেষ নয়। সাধ্বী এর পাশাপাশি আরও একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেন।” তিনি জানান, “হিন্দু দেব-দেবীদের মূর্তি মসজিদ ও গির্জায় বসাতে হবে।” পাশাপাশি, নাথুরাম গডসেকে ‘দেশপ্রেমী’ বলে উল্লেখ করে হরিয়ানায় তার মূর্তি বসানোর জোর সওয়াল করেন তিনি।- ওয়েবসাইট

‘নির্বাচন রাজনৈতিক বন্ধ্যত্ব ঘুচাবে’ -অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে দেশে যে রাজনৈতিক বন্ধ্যত্ব চলেছে তার অবসান হবে। মানবজমিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ফররুখ মাহমুদ
রাজনৈতিক সহিংসতায় শিক্ষাখাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার কোন অধিকার রাজনীতিবিদদের নেই। এমন রাজনীতি করা যাবে না যে রাজনীতি দেশের শিক্ষা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে দেয় না। দেশের সামগ্রিক অবস্থার জন্য রাজনীতিবিদদের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাবকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। হরতাল দেয়ার অধিকার বিএনপির রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এটা তাদের রাজনৈতিক অধিকার। কিন্তু এই হরতালের নামে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে ফেলে দেয়া, জনগণের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কাম্য নয়। মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। আর ভালো থাকার পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব। আসন্ন ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, জনগণ স্বেচ্ছায় ভোট দিতে যাবে- এমন ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচন যাতে স্বচ্ছ হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। নির্বাচন পরবর্তী ফলাফল নিয়ে প্রার্থীদের সহিংস আন্দোলনের দিকে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সব পক্ষকে ফলাফল মেনে নিতে হবে। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এই শিক্ষাবিদ রাজনীতিবিদদের সুস্থ ধারার রাজনীতি করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আন্দোলন করতে হলে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

মায়ার পাখিরা মরে গেল! by ফারুক ওয়াসিফ

কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে ভেঙে গেছে গাছের ডাল,
মারা পড়েছে শালিক, কাকসহ বেশ কিছু পাখি।
ছবি: সোয়েল রানা, প্রথম আলো, বগুড়া
এই দেশে পাখি নামের পোশাকের জন্য মেয়েরা আত্মহত্যা করে; কিন্তু লাখো পাখির মৃত্যুতে শোক জাগে কি? কালবৈশাখী এসেছে আবার চলেও গেছে। সঙ্গে নিয়ে গেছে ত্রিশের অধিক মানুষের প্রাণ। হাজার হাজার পাখিও তাদের সঙ্গে সহমরণ নিয়েছিল সেই রাতে। কুষ্টিয়ার এক গ্রামেই পাওয়া গেছে ২৫ হাজার পাখির লাশ। চুয়াডাঙ্গার গ্রামের বন-জঙ্গলের মাটিতে স্তূপের মতো পড়ে ছিল মৃত পাখিরা। লেবানিজ কবি কাহলিল জিবরান বলেন, ‘বিদায়ের সময়ই মানুষ বুঝতে পারে তার প্রকৃত ভালোবাসা।’ এত পাখির মৃত্যু দেখে মনে কি জাগে না এই কথা যে ওরা আমাদের কে ছিল?
পাখি হলো প্রকৃতির শিশু। আমাদের শিশুদের দেখলে মনে যেমন মায়া উথলে ওঠে, মানুষের শিশুরা যেমন নিষ্পাপ সারল্যের অনুভূতি জাগায়, অনেকেরই প্রায় সেরকমই অনুভূতি হয় পাখিদের দেখে। মানুষ কাছে গেলে নাকি প্রকৃত সারস উড়ে যায়, কিন্তু প্রকৃত সরল-শুদ্ধ মানুষের কাছে উড়ে আসে পাখি—লোকমুখে শোনা যায় সেই গল্প। একসময় মানুষ ও পশুপাখি অনেক কাছাকাছি ছিল। এখনো গেরস্থ কৃষকের সংসারে পশুপাখি ও শিশুরা একসঙ্গে খেলা করে। শিশুদের সঙ্গে পাখিদের এই সম্পর্ক, পাখির প্রতি শিশুদের যে উচ্ছল আদর, তা জানায় যে শিশুরা আমাদের পাখি আর পাখিরা প্রকৃতির শিশু! ওরা আমাদের এমন কিছু দেয়, যা আমরা শৈশবে রেখে এসেছি। বড় হওয়া মানে সারল্য হারাতে থাকা, মানে পাখি-স্বভাব ভুলতে বসা, জীবন-জগতের প্রতি মুগ্ধতা হারানো।
প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের অংশ আমরা। অদৃশ্য বন্ধনে পৃথিবীর সব প্রাণ এক সুতায় গাঁথা। প্রকৃতিতে কোনো প্রাণের বড় রকমের ক্ষতি হলে তার প্রভাব অন্য সব প্রাণীর ওপরও পড়ে। একসঙ্গে এত পাখির মৃত্যুতে তাই আমরা এমন কিছু হারালাম, যা আমাদের প্রয়োজন ছিল। ফুলবাড়ীর এক কৃষক কয়লাখনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে বুঝিয়েছিলেন, ‘শুধুই কি মানুষ? এই যে আঠারো হাজার মখলুকাত, পশু-পাখি-পোকা-মাকড়-সাপ-ব্যাঙ—এরা কই যাবে খনি হইলে? ’
পাখির ডাকে যাদের ঘুম ভাঙে, রোদেলা উঠানে যে শালিকের নাচানাচি দেখে, বরইগাছে চড়ুইদের দুষ্টুমিতে যার মন ভরে, ভরদুপুরে যে ঘুঘুর ডাক শোনে, সন্ধ্যায় যে টিয়া পাখির দলের উড়ে যেতে দেখে; তার মনে কি পাখোয়ালি সুখ জাগে না? মনে হয় না জীবন সুন্দর? শরীরের যেমন পুষ্টি প্রয়োজন, মনের মহল্লায় পাখির ছায়া তো তেমনই এক পুষ্টি, তাই না?
এ কারণেই হয়তো কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার মানুষেরা দুঃখ পেয়েছে। এসব মানুষের অনেকেরই পাখির মতো সংসার‍। সম্পত্তি নেই, নেই কোনো সঞ্চয়, দিন এনে দিন খেতে হয় পাখিদের মতো করেই। পাখিরা যেমন লতাপাতা-খড়কুটোয় ঘর বানায়, এদের অনেককেও তেমনি প্রকৃতির দান দিয়ে ঘর বানিয়ে থাকতে হয়। গাছের ওপর পাখির মামুলি বাসা আর মাটির ওপর বেড়ার ঘর সে রাতে একসঙ্গেই তছনছ হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাই সামাজিকও বটে। সমাজে যারা গরিব ও বঞ্চিত, যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে তারাই বেশি অরক্ষিত। এবারের কালবৈশাখীতে নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই বিত্তহীন। পাখিরা যেমন প্রকৃতির মধ্যে দুর্বলতম প্রাণের অংশ; সমাজের মধ্যে এসব মানুষও তেমনি। পাখির জন্য শোকে তাই সেসব বঞ্চিত মানুষের প্রতি বেদনাও মিশে থাকে। থাকা উচিত।
পাখি মুক্তি ও শান্তির প্রতীক। আমাদের দেশটা সুখে নেই, মানুষ কতটা মুক্ত তাও সত্য করে বলতে গেলে সাহস লাগে। এ রকম সময়ে হাজার হাজার পাখির মৃত্যু মুক্তি ও শান্তির বিপন্নতারও প্রতীক। লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ের বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানোর বলা ছোট্ট একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করি। গল্পটা অনুবাদ করে দিচ্ছি:
উরুগুয়ের রাজনৈতিক বন্দীদের অনুমতি ছাড়া কথা বলা, শিস দেওয়া, হাসা, তাড়াতাড়ি হাঁটা অথবা একে অন্যকে শুভেচ্ছা জানানো বারণ। এমনকি প্রসূতি নারী, প্রেমিক জুটি, প্রজাপতি, তারা ও পাখি আঁকা কিংবা সেসবের ছবি উপহার পাওয়াও ছিল নিষিদ্ধ। এক রোববার, ‘আদর্শবাদী হওয়ার’ দায়ে বন্দী ও নির্যাতিত স্কুলশিক্ষক দিদাসকো পেরেজের কাছে তাঁর পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মাইলা দেখা করতে এল। ও বাবার জন্য পাখির ছবি এঁকে এনেছিল। জেলের দরজাতেই রক্ষীরা সেসব ধ্বংস করে।
পরের রোববার মেয়েটি আবারও আসে। এবার মাইলা এনেছে তার আঁকা গাছের ছবি। তো গাছ যেহেতু নিষিদ্ধ না, সেহেতু ছবিগুলো কারাগারে ঢুকতে পারল। দিদাসকো মেয়ের আঁকার খুবই তারিফ করে জানতে চাইল, ‘তোমার গাছের পাতার ভেতর থেকে উঁকিঝুঁকি দেওয়া ছোট ছোট রঙিন গোল্লাগুলো কী, মা? এগুলো কি কমলালেবু? কী ফল এগুলো?’ মেয়ে তার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলে ‘হিশশশশ! ’ তারপর বাপের কানে ফিসফিস করে বলে: বোকা তুমি! দেখছ না এগুলো হলো চোখ? ওগুলো তোমার কাছে লুকিয়ে পাঠানো আমার পাখিদের চোখ।’ (Eduardo Galeano, Memory of Fire III, The Century of the Wind, 1988)
ছোটবেলায় আমারও একটি পাখির ছানা মরে গিয়েছিল ঝড়ে। ভাইবোনেরা মিলে তাকে কবর দিয়ে ফুল ছিটাতে ছিটাতে কেঁদেছিলাম। সেই ছোট পাখিটা আমাকে বলে গেছে, ‘মানুষ শুধু রক্ত-মাংস দিয়েই তৈরি নয়, মানুষ মায়া দিয়েও তৈরি।’
ঝড়ে, নদীতে ডুবে, বাস উল্টে আর আগুন ও গুলিতে যে মানুষগুলো মরে গেল, তাদের ভেতরেও মায়া ছিল!
এত এত মৃত্যুতে আমাদের পৃথিবীতে মায়া কমে গেল আরও! মানুষ নিপাখি হয়ে গেল বড়!

চাল নিয়ে প্রতারণা : চিকন চাল মিনিকেট নয় by আলাউদ্দীন আজাদ

মিনিকেট ধানের চালের ভাত দেখলে জ্বিহবায় পানি আসে। রসনা তৃপ্তির জন্য তাই ব্যকুল হয়ে ওঠে মানুষ। অথচ দেশে ’মিনিকেট’ নামে কোন ধানের জাত না থাকলেও এই নামে প্রতারণার রমরমা বানিজ্য চলছে দীর্ঘকাল ধরে।
এক শ্রেনীর চালকল মালিক মোটা চাল ছেঁটে সরু করে ’মিনিকেট’ বলে বাজারজাত করে বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটে নিলেও কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই!
কৃষিবিদ আব্দুল মজিদ জানান, ঝিনাইদহসহ এ অঞ্চলের জেলাগুলোতে বাংলাদেশ ধান গবেষনা ইনিষ্টিটিউট উদ্ভাবিত জাত গুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার ভারতীয় জাতের ধান চাষ হয়। কিন্তু মিনিকেট নামে কোন ধানের জাত বাংলাদেশ কিংবা পার্শ্ববতী দেশ ভারতেও নেই। মিনিকেট নামে চাল বাজারে মানুষের মাঝে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
মিনিকেট নামের উৎপত্তি নিয়ে আরেক কৃষিবিদ খোন্দকার সিরাজুল করিম চমৎকার তথ্য দেন। তিনি জানান, ১৯৯৫ সালের দিকে প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ ভারতের কৃষকদের মাঝে সেদেশের ধান গবেষনা ইনস্টিটিউট নতুন জাতের চিকন ‘শতাব্দী’ ধানের বীজ বিতরণ করে। তিনি আরো জানান, মাঠ পর্যায়ে চাষের জন্য কৃষকদেরকে এ ধান বীজের সঙ্গে আরো কিছু কৃষি উপকরণসহ একটি ‘মিনিপ্যাকেট’ প্রদান করে ভারতীয় সরকার। মিনিপ্যাকেটে করে দেওয়ায় ভারতীয় কৃষকদের কাছে এ ধান শেষমেষ ‘মিনিকেট’ বলে পরিচিতি লাভ করে। কৃষকরা মিনিপ্যাকেট শব্দটির মধ্য থেকে ‘প্যা’ অক্ষরটি বাদ দিয়ে মিনিকেট বলে পরিচয় দিতে শুরু করে। কৃষি বিভাগ সুত্রে জানা গেছে বোরো মৌসুমে চাষ যোগ্য এ ধানের বীজ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের কৃষকদের হাতে পৌছে যায়। দেশে ঝিনাইদহ জেলার সীমান্তবর্তী মহেশপুর উপজেলার চাষিরা এনে সর্ব প্রথম এ ধানের চাষ শুরু করেন। আমাদের দেশে আগে নাজির শাইল, পাজাম ও বালাম ধানের চাষ হতো। এ সকল দেশি সরু ধানের চালের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বরিশালে বালামের সুনাম ছিল সারা ভারত উপমহাদেশ ব্যাপি। কালের বিবর্তনে সকল সরু জাতের ধান চাষ উঠে যায়। সরু চালের সন্ধান করতে থাকে ক্রেতারা। এসময় বাজারে কথিত মিনিকেটের আর্বিভাব ঘটে। ক্রেতারা লুফে নেয় এ সরু জাতের চাল। সুযোগ বুঝে এক শ্রেনীর মিল মালিক মাজারি সরু বি আর- ২৮, বিআর- ২৯ ও বি আর-৩৯ জাতের ধান ছেঁটে ’মিনিকেট’ বলে বাজার জাত করতে শুরু করে। বর্তমানে সারা দেশে চিকন চাল বলতে এখন ’মিনিকেট’ ই বোঝায়, যার দামও চড়া।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে একমাত্র পশ্চিমের জেলা যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা জেলাতে কথিত ‘মিনিকেট’ ধানের চাষ হয়। গত রোবো মৌসুমে যশোর জেলায় ৩০ হাজার হেক্টরে, ঝিনাইদহ জেলায় ১৮ হাজার হেক্টরে, চুয়াডাঙ্গা জেলায় ৩ হাজার হেক্টরে ও মাগুরা জেলায় ১ হাজার হেক্টর কথিত এ মিনিকেট ধানের চাষ হয়। সর্বমোট এ অঞ্চলে ৫৫ হাজার হাজার হেক্টরে মিনিকেট চাষ হয়েছিল। হেক্টর প্রতি গড় ফলন ছিল ৩ দশমিক ৬২ মেট্রিক টন। ঝিনাইদহের ডাকবাংলা বাজারের চালকল ব্যাবসায়ীরা জানান, পশ্চিমের সীমান্তবর্তী যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা ও মাগুরা জেলা ছাড়া অন্য কোন জেলায় ’মিনিকেট’ ধান উৎপাদন হয় না। তাদের ভাষ্যমতে গত বোরো মৌসুমে ধান উঠার পর প্রতিমণ (৪০ কেজি) ’মিনিকেট” ধানের দাম ছিল সাড়ে সাতশ’ থেকে ৮শ’ টাকা। আর সে সময় প্রতি কেজি ’মিনিকেট’ চাল পাইকিারি ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা দরে বিক্রি হয়।
এক শ্রেনীর অসাধু চালকল মালিক বিআর-২৯ ও বিআর-৩৯ জাতের চাল ফিনিশিং করে মিনিকেট বলে বাজার জাত করছে বলে অভিযোগ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়ার খাজানগর, পাবনা, নওগাঁ প্রভৃতি স্থানের চাল কল থেকে সারা দেশে কথিত ‘মিনিকেট’ চালের সরবরাহ করা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এই লাখ লাখ মন ’মিনিকেট’ চালের যোগান কোথা থেকে আসছে। কারণ গত বছর যে ধান উৎপাদন হয়েছে তাতে এক লাখ ৩২ হাজার মেট্রিকটন চাল হওয়ার কথা। ফলে ‘মিনিকেট’ নিয়ে প্রতারণার রমরমা বানিজ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে চাল ব্যবসায়ীদের মাঝে। ঝিনাইদহ মেছুয়া বাজারের আড়তদাররা জানান, অটো রাইচ মিল মালিকরা কথিত ‘মিনিকেট’ বলে যে চাল সরবরাহ করছে তারা তাই মিনিকেট বলে বাজারে বিক্রি করছেন। তারা স্বীকার করেন ‘মিনিকেট’ নামে বাংলাদেশ সরকার অনুমোদিত কোন জাতের ধান নেই। বিআর ২৮, কল্যানী, রতœা, বেড়ে রতœা, স্বর্ণা, গুটি স্বর্ণা, লাল স্বর্ণা আইঅর-৫০, জাম্বু ও কাজল লতা জাতের ধান ছেটে মিনিকেট বলে বাস্তায় ভরে বিক্রি করা হচ্ছে। বাজারে এ চালের ব্যাপক চাহিদার জন্য এ ‘মিনিকেট’ প্রতারনার ব্যবসা চলছে বলেও তিনি মনে করেন। কৃষি বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা আহম্মেদ হোসেন জানান, পাঁচ বছর আগে সুপার ফাষ্ট নামে বোরো মৌসুমে চাষের জন্য ভারতের ধান গবেষনা ইনস্টিটিউট একটি সরু জাতের ধান অবমুক্ত করে। এ ধানের চাল এক শ্রেনীর মিল মালিক সুপার মিনিকেট বলে এখন বাজারে বিক্রি করছে। এ চাল কথিত মিনিকেটের চেয়ে আরো বেশি চিকন। তিনি আরো জানান, দেশ ব্যাপী মিনিকেট চালের নামে যে প্রতারণা চলছে তা কেবল ক্রেতাদের মাঝে সচেতনা বৃদ্ধি হলেই নিরসন সম্ভব হবে। বিষয়টি নিয়ে কৃষিবিদ ড. মোঃ শমসের আলী জানান মিনিকেট নামে কোন জাতের ধান বাংলাদেশে নেই। এটা প্রতারণার সামিল। তিনি জানান এই প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে হলে সচেতনতার পাশাপাশি আমাদের সৎ হতে হবে। চাল ব্যবসায়ীরা আসল পরিচয়ে চাল বিক্রি করলে ক্রেতারা প্রতারিত হবেন না। তিনি বলেন আমাদের চাল বাজারগুলো ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রনে। ফলে তারা ইচ্ছা মতো চালের নাম দিয়ে বাজারে বিক্রি করছেন।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতি ১৭,০০০ কোটি টাকা

রাজনৈতিক অস্থিরতায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৭,১৫০ কোটি টাকা বা ২.২ বিলিয়ন ডলার। ফলে এ অর্থবছর দেশের প্রবৃদ্ধি ৫.৬ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সেবা খাতের ক্ষতি ৬৮ শতাংশ, ২৫ শতাংশ শিল্প খাতে এবং কৃষি খাতের ৭ শতাংশ। গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ে বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে এ পূবার্ভাস দিয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, আর্থিক ক্ষতির এ পরিমাণ মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) এক শতাংশ। তিনি বলেন, যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকত তাহলে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৬.৪ থেকে ৬.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতো। যেহেতু এক শতাংশ ক্ষতি হয়ে গেছে, সেহেতু আমাদের হিসাবে ৫.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।
জাহিদ হোসেন বলেন, গত ৫ই জানুয়ারি সারা দেশে অবরোধ শুরু হয়; পরে মাঝে মাঝে হরতাল। টানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে অবরোধ-হরতাল। তবে শেষ দিকে এসে এর ধার কমে গিয়েছিল। সে কারণে আমরা ৬০ দিনের উৎপাদনের ক্ষতির হিসাব করে এ তথ্য দিয়েছি। এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলেন, এ ৬০ দিনে উৎপাদনশীল খাতে দৈনিক যে ক্ষতি হয়েছে তার ভিত্তিতে হিসাব করা হয়েছে। ২০১৩ সালে যে অস্থিরতা-সংঘাত হয়েছিল তার হিসাবও একইভাবে করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৬.১২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। আর বিশ্বব্যাংক ৫.৮ শতাংশ পবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত শক্তি আছে। সেই শক্তি দিয়ে নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যে তারা অর্থনীতিতে অবদান রেখে চলেন। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যে বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা হয়েছে তার পরের বছরই ভাল প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৩ সালের প্রথম দিকের সহিংসতার পর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৬.১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সেটাই প্রমাণ করে। একই কারণে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি না হলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে ৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গতানুগতিক উন্নয়ন যেমন অবকাঠামো খাতে সংস্কার, অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ’র (পিপিপি) উন্নয়ন করতে হবে।
গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জিডিপির আকার ছিল চলতি মূল্যে ১৩ লাখ ৫০,৯২০ কোটি টাকা। এ থেকে চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছে সরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সুখবর। শুধু তেল নয়; সার, খাদ্যপণের দামও কম। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সব কিছুই বাংলাদেশের অনুকূলে। বাজেটে সরকারের ভর্তুকি খাতে খরচ অনেক কম হবে।
জাহিদ হোসেন বলেন, তেলের দাম কমায় অতীতের পুঞ্জীভূত ক্ষতি থেকে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশের জ্বালানি তেল বিপণন ও সরবরাহকারী সংস্থা বিপিসি। গত বছরের অক্টোবর থেকে লাভ করছে সংস্থটি। কেবল পেট্রল-অকটেনে নয়, ডিজেল-কেরোসিনেও লাভ করছে বিপিসি। বাংলাদেশের অর্থনীতির চালচিত্র বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, গড় মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ থেকে ৬.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত দুই ধরনের মূল্যস্ফীতিই সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাব ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট) ১০৯ কোটি ডলারের ঘাটতি (ঋণাত্মক) রয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ১৮০ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত ছিল। এ ছাড়া বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৬৪০ কোটি ডলারে উঠেছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইউহানেস জাট, প্র্যাকটিস ম্যানেজার শুভব চৌধুরী ও যোগাযোগ কর্মকর্তা মেহেরীন এ মাহবুব।

পারমাণবিক প্রকল্পের নিরাপত্তা by ডিইএস ব্রাউন ও ইগর এস ইভানভ

চার বছর আগে জাপানের উপকূল বিধ্বংসী সুনামির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৫০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস হয়। সেই তোড়ে ফুকুশিমা ডাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুরক্ষা দেয়াল ভেঙে পানি ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফলে এর জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং শীতলীকরণ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে।
সেই ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল পারমাণবিক প্রকল্পে দুর্ঘটনার পর এটাই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক পারমাণবিক দুর্ঘটনা। তদন্তকারীরা খুঁজে বের করেন, এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ছিল আত্মতুষ্টি। যারা এর দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের ধারণা ছিল প্রকল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল খুবই শক্তিশালী। আর সেখানে কোনো কার্যকর স্বাধীন নজরদারিও ছিল না।
জাপানের এই বিপর্যয়ের পর সারা দুনিয়াতেই নিরাপদ পারমাণবিক বিদ্যুতের জগতে নানা সংস্কার শুরু হয়। কিন্তু পারমাণবিক নিরাপত্তার ব্যাপারটি আসলেই মনে হয়, সবার মধ্যে আত্মসন্তুষ্টি ভর করেছে। বিয়োগান্ত ঘটনা এসে নাড়া না দেওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব, ব্যাপারটা যেন এমন না হয়। আজ সারা দুনিয়ার বিভিন্ন পারমাণবিক প্রকল্পে অতি সমৃদ্ধ দেড় মিলিয়ন কেজি ইউরেনিয়াম ও প্লুটোনিয়াম বিশ্বের ২৫টি দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। সেগুলোর কিছু অংশের নিরাপত্তা খুবই নাজুক। কিন্তু লাখ লাখ মানুষকে হত্যা ও মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিসাধন করতে ছোট এক ব্যাগ চিনির সমপরিমাণ পারমাণবিক উপাদানই যথেষ্ট, অস্ত্র বানানোর জন্য এটুকু উপাদানই যথেষ্ট।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পারমাণবিক নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য অনেক কিছুই করা হয়েছে, কিন্তু সব দেশের সরকারের উচিত, বিধ্বংসী পারমাণবিক কর্মসূচির হাত থেকে তার জনগণকে রক্ষা করার জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া। ফুকুশিমা সংকট থেকে যে শিক্ষা আমরা পেয়েছি, সেটা এই লক্ষ্যে সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করতে পারে।
যারা শুরু করছে, তাদের উচিত হবে পারমাণবিক নিরাপত্তার ব্যাপারটি সার্বক্ষণিক উন্নতির ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করা। আর নতুন নতুন হুমকি ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য তাল মিলিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে। যে ব্যবস্থা আজ থেকে ২০ বছর আগে নিরাপদ ভাবা হতো, সেটা হয়তো এখন আর নিরাপদ নয়। সেটা এখন সাইবার হামলার মুখে ভেঙে পড়তে পারে। সাইবার হামলা পারমাণবিক উপাদানগুলো নজরে রাখার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
অরাষ্ট্রীয় কিন্তু সুসংগঠিত সংগঠন যেমন ইসলামিক স্টেট নতুন নতুন কৌশল, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা ব্যবহার করে পারমাণবিক উপাদান চুরি করতে পারে। ফলে সরকারকে বিকাশমান প্রযুক্তি ও হুমকি ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে সেই ব্যবস্থা এসব সম্ভাব্য চোরের হুমকির চেয়েও শক্তিশালী থাকে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে নিরাপদ সংস্কৃতির মতো নিরাপত্তা সংস্কৃতি পারমাণবিক প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত কমান্ডের প্রধান কমান্ডার জেনারেল ইউজেন হাবিজার, যাঁকে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ‘নিরাপত্তা জার (রাজা)’ বলা হতো, বলেছিলেন, ‘ভালো নিরাপত্তার ২০ শতাংশ হচ্ছে যন্ত্রপাতি, আর ৮০ শতাংশ মানুষি সক্ষমতা।’
সরকার ও শিল্পকে একত্র হয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পারমাণবিক প্রকল্পের সব কর্মীকে, অর্থাৎ প্রহরী থেকে বিজ্ঞানী পর্যন্ত, মনে করতে হবে যে নিরাপত্তা তাদের কাজের প্রয়োজনীয় অংশ। তৃতীয়ত, সরকারকে নিয়মিত পারমাণবিক প্রকল্পের নিরাপত্তা পর্যালোচনা করতে হবে। শুধু পারমাণবিক প্রকল্পের পরিচালকদের বললে হবে না যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা ‘যথেষ্ট ভালো’। বস্তুত কার্যকর নজরদারি আত্মসন্তুষ্টি দূর করতে পারে।
ফুকুশিমা কাণ্ড অন্যান্য পারমাণবিক প্রকল্পের পরিচালকদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, নিয়মিত চাপ পরীক্ষা করতে হবে। পারমাণবিক কেন্দ্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে, এমন আকস্মিক সম্ভাবনা মোকাবিলাও করতে শিখিয়েছে এই ঘটনা। পরিচালকদের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবস্থার হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা নিরূপণ করতে হবে। কেন্দ্রের জ্ঞানী চোরেরা যাতে চুরি করতে না পারে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
শেষমেশ, বিশ্বনেতাদের পারমাণবিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। চেরনোবিল ও ফুকুশিমার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, এক দেশের পারমাণবিক প্রকল্পে নিরাপত্তার ঘাটতি অন্য দেশে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। পারমাণবিক নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়েও একই কথা প্রযোজ্য।
সন্ত্রাসীরা যেন এসব মারাত্মক উপাদানের নাগাল না পায় সেটা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের অভিন্ন রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত নান-লুগার কো-অপারেটিভ থ্রেট রিডাকশন কর্মসূচি থেকে অন্যদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। যেসব দেশের পারমাণবিক শক্তি আছে, তাদের উচিত নিরাপত্তা জোরদার করা, সাধারণ পারমাণবিক নিরাপত্তা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও মান পর্যবেক্ষণের সম্ভাবনা খুঁজে বের করা।
নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের কো-চেয়ারম্যান আমাদের বন্ধু ও সহকর্মী স্যাম নান প্রায়ই সতর্ক করে বলেন, আমরা সহযোগিতা ও বিপর্যয়ের মধ্যকার প্রতিযোগিতায় পড়ে গেছি। ফুকুশিমার শিক্ষা নিয়ে পারমাণবিক সন্ত্রাস মোকাবিলায় আমাদের আরও সমৃদ্ধ হতে হবে। এই প্রতিযোগিতায় আমাদের পিছিয়ে পড়লে চলবে না।
ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
ডিইএস ব্রাউন: সাবেক ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
ইগর এস ইভানভ: রাশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বাঙালি আপ্যায়নে

ছানা-সবজির নিরামিষ
ছানা-সবজির নিরামিষ
উপকরণ: ছানা ২ টেবিল-চামচ। পেঁয়াজকুচি, আলু, গাজর, ফুলকপি, মটরশুঁটি, মিষ্টি কুমড়া সব মিলিয়ে ২ কাপ, সরিষা বাটা ১ চা-চামচ, আদা ও রসুনবাটা আধা চা-চামচ করে, জিরাবাটা আধা চা-চামচ, ধনেগুঁড়া আধা চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, সয়াবিন তেল ২ টেবিল-চামচ, কাঁচা মরিচ ফালি করে কাটা ২টি, ধনেপাতা কুচি প্রয়োজনমতো, পাঁচফোড়ন আধা চা-চামচ, ঘি সামান্য।
প্রণালি: হাঁড়িতে তেল গরম করে পেঁয়াজ ভেজে নিন। বাকি সব মসলা দিয়ে একটু পানি দিয়ে কষিয়ে নিন। এবার গুঁড়া মসলা দিয়ে ভেজে নিন। ছানা দিয়ে সামান্য পানিসহ মসলার সঙ্গে কষিয়ে নিন। সবজি দিয়ে লবণ দিন। সবজি সেদ্ধ হওয়ার জন্য একটু পানি দিতে পারেন। ঢাকনা ছাড়া রাঁধলে সবজির রং সুন্দর থাকবে। সেদ্ধ হয়ে গেলে হাঁড়ি নামিয়ে নিন। অন্য হাঁড়িতে ঘি গরম করে পাঁচফোড়ন ও কাঁচা মরিচ ভেজে সবজিতে বাগাড় দিন। ওপরে ধনেপাতা ছিটিয়ে পরিবেশন করুন। 
উপকরণ: টাকি মাছ ৫-৬ টি, ব্রকলি (শুধু ফুল) আধা কাপ, হলুদ গুঁড়া সামান্য, শুকনা মরিচ ৪টি, পেঁয়াজ কুচি আধা কাপ, রসুন কুচি ১ কোয়া, লবণ পরিমাণমতো, ধনেপাতা কুচি ২ টেবিল চামচ, কাচামরিচ কুচি ১ চা-চামচ, সরিষার তেল পরিমাণমতো।
প্রণালি: মাছে হলুদ-মরিচ গুঁড়া মেখে রাখুন ২০ মিনিট। ব্রকলির ফুলগুলো ভাপিয়ে নিন। কড়াইয়ে তেল গরম করে মাছ ভেজে নিন। কাঁটা বেছে মাছ আলাদা করে রাখুন। মাছভাজার তেলে শুকনা মরিচ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ কুচি ও রসুন কুচি নরম করে ভেজে নিন। মচমচে করবেন না। এবার সব উপকরণ হাতে কচলে মেখে নিন।
.
বাহারি ডাল-চাটনি
উপকরণ: মসুর ডাল ২ টেবিল চামচ, মুগ ডাল ২ টেবিল চামচ টেলে নেওয়া, মাষকলাই ডাল খোসাসহ ৮ টেবিল চামচ, বুটের ডাল ২ টেবিল চামচ, কাঁচা আম ২ টুকরা, লবণ স্বাদমতো, শুকনা মরিচ টেলে নেওয়া ৩টি, কাঁচা মরিচ ৪টি, রসুনকুচি ১ চা-চামচ, আদাবাটা আধা চা-চামচ, জিরা টেলে গুঁড়া করা আধা চা-চামচ, হলুদ গুঁড়া আধা চা-চামচ, ধনেপাতা এক মুঠো, সরিষার তেল ২ টেবিল চামচ।
প্রণালি: সব রকম ডাল ধুয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। বুটের ডাল আগের দিন রাতে ভিজিয়ে রাখুন। ডালগুলো একসঙ্গে লবণ, হলুদ, জিরা ও কাঁচা মরিচ দিয়ে সেদ্ধ করে নিন। কাঁচা আমের ফালি দিয়ে কিছুক্ষণ জ্বাল দিন। কড়াইয়ে সরিষার তেল গরম করে শুকনা মরিচ ফোড়ন দিন। এবার রসুন কুচি ও আদাবাটা ভেজে ডাল বাগাড় দিয়ে নিন। ডাল ঠান্ডা হলে এক মুঠ ধনেপাতা কুচি দিয়ে ব্লেন্ডারে পেস্ট করে নিন। বেশি আঠালো যেন না হয়। বাটিতে সাজিয়ে পরিবেশন করুন। 
পনির সবজির কাটলেট
উপকরণ: পনির বা ছানা ১ কাপ, আলু মাঝারি ১টা, গাজরকুচি ১টা, ফুলকপি কুচি ১টা, মটরশুঁটি দানা ১ কাপ, পেঁয়াজ বেরেস্তা ২ টেবিল-চামচ, কাঁচা মরিচ ২টা, লবণ স্বাদমতো, ভাজা জিরার গুঁড়া আধা চা-চামচ, টালা শুকনা মরিচের গুঁড়া আধা চা-চামচ, পুদিনাপাতা কুচি ১ মুঠ, ডিম ২টি, তেল ভাজার জন্য।
প্রণালি: আলু সেদ্ধ করে ছিলে চটকে নিন। বাকি সবজিগুলো সেদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে নিন। পনির বা ছানা, পুদিনাপাতা কুচি, ১ চা-চামচ বেরেস্তা ও লবণ একসঙ্গে কচলে নিন। আলু সবজি ও তেল ছাড়া বাকি সব মসলা একসঙ্গে মেখে নিন। এর ভেতরের পনির মিশ্রণের পুর ভরে কাটলেটের আকার করে নিন। এগুলো ২ ঘণ্টা ফ্রিজে রেখে দিন। ভাজার আগে বাটিতে সামান্য লবণ দিয়ে ডিম ফেটিয়ে নিন। কাটলেটগুলো ডিমের মিশ্রণে গড়িয়ে অল্প তেলে ভেজে নিন। পুর দিতে না চাইলে পনিরের মিশ্রণ সবজির সঙ্গে মেখে একবারে কাটলেট বানাতে পারেন।
সরিষা-মাংস ভুনা
সরিষা-মাংস ভুনাউপকরণ: গরু বা খাসির চর্বি ও হাড়ছাড়া মাংস আধা কেজি, পেঁয়াজবাটা ২ টেবিল-চামচ, রসুনবাটা ১ চা-চামচ, আদাবাটা ১ চা-চামচ, জিরাবাটা ১ চা-চামচ, হলুদগুঁড়া আধা চা-চামচ, মরিচগুঁড়া ১ টেবিল-চামচ, সরিষাবাটা ১ টেবিল-চামচ, লবণ ১ চা-চামচ বা পরিমাণমতো, সরিষার তেল আধা কাপ, সয়াবিন তেল ৪ টেবিল-চামচ, পেঁয়াজ বেরেস্তা বাটা ১ টেবিল-চামচ, গরমমসলার গুঁড়া আধা চা-চামচ, ভাজা জিরার গুঁড়া আধা চা-চামচ, পাকা পেঁপে কোরানো ২ টেবিল-চামচ, পানি ১ কাপ।

প্রণালি: সরিষার তেল, পেঁয়াজবাটা, ভাজা জিরার গুঁড়া ও গরমমসলার গুঁড়া ছাড়া সবকিছুসহ মাংস মাখিয়ে ২ ঘণ্টা রেখে দিন। এবার হাঁড়িতে সরিষার তেল গরম করে পেঁয়াজবাটা দিয়ে ভেজে নিন ১ মিনিট। এবার মাখানো মাংস দিয়ে ঢেকে দিন এবং চুলার আঁচ একদম কমিয়ে দিন। এভাবেই রান্না হবে সেদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত। মাঝে মাঝে নাড়ুন। মাংস থেকে বের হওয়া পানি শুকিয়ে গেলে ১ কাপ পানি দিন। আবারও অল্প আঁচে রান্না করতে থাকুন। মাংস সেদ্ধ হয়ে গেলে গরমমসলা ও ভাজা জিরার গুঁড়া ছড়িয়ে দিন এবং ২০ মিনিট দমে রাখুন তাওয়ার ওপরে। গরম গরম পরিবেশন করুন।

কড়াই ইলিশ
কড়াই ইলিশ
উপকরণ: মাঝারি বা বড় ইলিশ মাছ ১টি, টমেটো ২টি, ক্যাপসিকাম ১টি, পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, রসুনবাটা ১ টেবিল চামচ, আদাবাটা ১ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়া আধা চা-চামচ, মরিচ গুঁড়া ২ চা-চামচ, ধনে ও জিরা গুঁড়া ১ চা-চামচ করে, এলাচ ও লবঙ্গ তিনটি করে, তেজপাতা ১টি, গোলমরিচের গুঁড়া আধা চা-চামচ, সয়াবিন তেল ৫ টেবিল চামচ, কালোজিরা আধা চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি এক চিমটি, কাঁচা মরিচ কুচি ২-৩টি, পানি ২ কাপ।

প্রণালি: মাছ টুকরা করে কেটে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। টমেটো ও ক্যাপসিকাম কুচি করে নিন। শুকনা কড়াইয়ে ক্যাপসিকাম কুচি টেলে নিন। কড়াইয়ে ৪ টেবিল চামচ তেল দিয়ে পেঁয়াজ কুচি ভেজে নিন। এতে এলাচ-লবঙ্গ-তেজপাতা দিন। কালোজিরা বাদে একে একে বাকি মসলাগুলোও দিয়ে কষিয়ে নিন। টমেটো ও ক্যাপসিকাম কুচি দিয়ে একটু নাড়ুন। এবার এই মিশ্রণ ব্লেন্ডারে মিহি পেস্ট করে নিন। অন্য কড়াইয়ে বাকি তেল গরম করে কালোজিরা ফোড়ন দিন। এতে মসলার পেস্ট দিয়ে দিন। একটু কষিয়ে ২ কাপ পানি দিন। ঝোল ফুটলে মাছ বিছিয়ে দিয়ে লবণ ছিটিয়ে দিন। এক ঘণ্টা তাওয়ার ওপর দমে রেখে দিন। ঝোল মাখা মাখ হলে নামিয়ে একটু চিনি ছিটিয়ে দিন। গরম গরম পরিবেশন করুন। ডিম বেগুনি
উপকরণ: গোল বেগুন ১টি গোল চাক করে কাটা, ডিম ১টি, লবণ ২ চা-চামচ, তেল ভাজার জন্য, যেকোনো আচারের তেল ৪ টেবিল-চামচ, পেঁয়াজকুচি ছোট ১টি, কাঁচা মরিচ কুচি ১টি, ধনেপাতাকুচি ১ টেবিল-চামচ, হলুদগুঁড়া আধা চা-চামচ, মরিচগুঁড়া আধা চা-চামচ।
প্রণালি: ৩ কাপ পানিতে দেড় চা-চামচ লবণ মিশিয়ে বেগুনের চাকগুলো ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এতে করে বেগুনের কষ বেরিয়ে যাবে। এবার পানি ঝরিয়ে বেগুনের চাকে চিকন ছুরি দিয়ে আড়াআড়ি দাগ কেটে দিন। তাহলে মসলা ভালোমতো ভেতরে ঢুকবে। এবার বাকি লবণ, হলুদ ও মরিচের গুঁড়া দিয়ে বেগুন মাখিয়ে রাখুন ২০ মিনিট। আরেকটি বাটিতে এক চিমটি লবণ, পেঁয়াজ, মরিচ, ধনেপাতাকুচিসহ ডিম ফেটিয়ে রাখুন। এবার কড়াইতে একটু করে সাদা তেল ও আচারের তেল মিশিয়ে দিয়ে গরম করে ১টি করে বেগুনের চাক দিন। আড়াআড়ি করে কাটা পাশটি আগে তেলে ছাড়বেন। উল্টে দিয়ে অপর পাশে ছোট চামচে করে ৩ চামচ ডিমের মিশ্রণ দিয়ে ঢেকে দিন। চুলার আঁচ মাঝারি থাকবে। এক পাশ সোনালি হয়ে এলে উল্টে দিয়ে আবারও ঢেকে দিন ৩/৪ মিনিট। নামিয়ে নিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন। 
জিরা ভাত
জিরা ভাতউপকরণ: বাসমতী চাল দেড় কাপ, পানি ৫ কাপ, এলাচি-লবঙ্গ ২টি করে, দারুচিনি ১ ইঞ্চি ১টি, তেজপাতা ১টি, লবণ ১ চা-চামচ, সয়াবিন তেল ২ টেবিল-চামচ, ঘি দেড় টেবিল-চামচ, জিরা ২ চা-চামচ, ধনেপাতাকুচি এক মুঠ।
প্রণালি: চাল ধুয়ে আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে পানি ঝরিয়ে নিন। পাতিলে ৫ কাপ দিয়ে গরমমসলাগুলো ছেড়ে দিন এবং জ্বালে বসিয়ে দিন। পানি গরম হয়ে গেলে চাল ও লবণ দিয়ে অল্প আঁচে ভাত রান্না করুন এবং ভাত হয়ে গেলে নামিয়ে নিন। এবার আরেকটি কড়াইয়ে তেল ও ঘি গরম করে জিরার ফোড়ন দিন। ২ মিনিট মাঝারি আঁচে ভাজুন, যেন ভেতরে কাঁচা না থাকে। এবার আলতো করে এই জিরার ফোড়নটি ভাতে ঢেলে মিশিয়ে দিন। ধনেপাতা ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

পনির চাটনি শাশলিকউপকরণ: পনির কিউব করে কাটা প্রয়োজনমতো, কাঁচা আম ১ ফালি, কাঁচা মরিচ ১টি, ধনেপাতা এক মুঠ, পুদিনাপাতা ১ মুঠ, সয়াবিন তেল ১ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, পানমসলা সাজানোর জন্য (ঐচ্ছিক) ও টুথপিক প্রয়োজনমতো।
প্রণালি: ননস্টিক প্যানে অল্প তেল ব্রাশ করে পনির কিউবগুলো সবদিকে সেঁকে নিন। খেয়াল রাখুন যাতে গলে না যায়। এবার বাকি উপকরণ মিশিয়ে ব্লেন্ড করে চাটনি বানিয়ে নিন। পনির ঠান্ডা হলে একটি করে কিউব টুথপিকে গেঁথে তা চাটনিতে গড়িয়ে পানমসলায় গড়িয়ে নিন। সব কটি বানানো হলে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।
.
চিংড়ি-আলুর শাশলিক
উপকরণ: মাঝারি চিংড়ি খোসা ও মাথা ছাড়া ২০টি, আলু কিউব করে কাটা ৪০ টুকরা, লবণ পরিমাণমতো, চিলি সস ২ টেবিল চামচ, লেবুর রস ১ চা-চামচ, আদাবাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচা মরিচ বাটা ১ চা-চামচ, সয়াবিন তেল ১ টেবিল চামচ, আলু-সবজি ভাজার জন্য সয়াবিন তেল আধা কাপ, টুথপিক প্রয়োজনমতো।
প্রণালি: আলুর কিউবগুলো পাঁচ মিনিট ফুটন্ত গরম পানিতে সেদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে নিন। প্রয়োজনমতো লবণ দিয়ে তেলে সোনালি করে ভেজে নিন। কাচ বা স্টিলের বাটিতে বাকি মসলাগুলো চিংড়ির সঙ্গে মেখে ৩০ মিনিট রাখুন। এবার কড়াইয়ে ১ কাপ পানি দিয়ে মাঝ বরাবর চিংড়ির বাটি বসিয়ে ঢেকে দিন। ১৫ মিনিট ভাপে রান্না করুন। কড়াইয়ের পানি যেন বাটিতে না ঢোকে। চিংড়ি নামিয়ে টুথপিকে একটি করে গেঁথে নিন। চিংড়ির পর আলুর কিউব, তারপর চিংড়ি, আবার আলুর কিউব এভাবে সাজিয়ে নিন। ওপরে সামান্য ধনেপাতা কুচি ছিটিয়ে পরিবেশন করতে পারেন।
কোয়েলের ডিম ভুনা
উপকরণ: কোয়েল পাখির ডিম ৪ হালি, পেঁয়াজকুচি আধা কাপ, পেঁয়াজবাটা ৩ টেবিল-চামচ, রসুনবাটা আধা চা-চামচ, আদা অমসৃণ করে বাটা আধা চা-চামচ, জিরাবাটা আধা চা-চামচ, ধনেগুঁড়া আধা চা-চামচ, তেজপাতা ১টি, এলাচি ২টি, সরিষা বাটা ১ চা-চামচ (সরিষা বাটার সময় লবণ ও ১টি কাঁচা মরিচসহ বাটলে তিতকুটে ভাব থাকলেও চলে যায়), লবণ পরিমাণমতো, কাঁচা মরিচ ৩টি, সয়াবিন তেল ২ টেবিল-চামচ, সরিষার তেল ২ টেবিল-চামচ।
প্রণালি: ডিমগুলো সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে নিন। কড়াইতে দুই রকমের তেল গরম করে তেজপাতা ও এলাচি দিন। ১ মিনিট পর পেঁয়াজকুচি দিয়ে সোনালি করে ভেজে নিন। এবার একে একে বাটা মসলাগুলো দিয়ে আধা কাপ পানিসহ কষিয়ে নিন। গুঁড়া মসলাগুলো দিয়ে ভাজুন। মসলা কষানো হয়ে গেলে ২ কাপ পানি ও লবণ দিয়ে ঢেকে দিন। ঝোলের পানি ফুটে উঠলে সেদ্ধ ডিমগুলো দিয়ে ঢেকে ১০ মিনিট মাঝারি আঁচে রান্না করুন। এবার কাঁচা মরিচ ফালি করে কেটে দিন এবং আরও ২ মিনিট ঢেকে রান্না করুন। নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
রংধনু শরবত
রংধনু শরবতউপকরণ: যেকোনো স্বচ্ছ কোমল পানীয় প্রয়োজনমতো, লেবু ১টি, পানি ১ গ্লাস, চিনি ৪ টেবিল-চামচ, ফুড কালার ৩-৪ রকম, সাদা বরফ ১ কাপ।
প্রণালি: এক গ্লাস পানিতে চিনি ও লেবুর রস মিশিয়ে শরবত বানিয়ে নিন। বরফের ছাঁচে শরবত ঢেলে দিয়ে একেক ছাঁচে একেক রং মেশান। কটন বাডে সামান্য রং নিয়ে সেটা গুলিয়ে দিন। এবার বরফ জমতে দিন। আপনি পেয়ে যাবেন ভিন্ন ভিন্ন রঙের বরফ। রঙিন বরফ জমে গেলে আলাদাভাবে হালকা গুঁড়া করে নিন। সাদা বরফও গুঁড়া করে নিন। এবার বড় গ্লাসে যেকোনো এক রকম রঙিন বরফ ঢেলে দিন। এর ওপর কিছু সাদা বরফকুচি বিছান। তার ওপর আরেক রঙের বরফ দিন। আবার সাদা বরফ দিন, তার ওপর আরেক স্তর রঙিন বরফ। এভাবে ইচ্ছেমতো স্তর করে সাজান। এই গ্লাস ডিপ ফ্রিজে রেখে দিন এক ঘণ্টা। গ্লাস বের করে অল্প করে কোমল পানীয় ঢালুন। দেখবেন রংধনুর মতো নানা রং দেখা যাচ্ছে। এবার পরিবেশন করুন।
ডাবের শরবত
ডাবের শরবতউপকরণ: ডাবের পানি ১ লিটার, শাঁস জুলিয়ান করে কাটা ২ কাপ, চিনি ৬ টেবিল চামচ, পানি ১ কাপ, পেস্তা বাদাম আধা কাপ, বরফকুচি পরিমাণমতো।
প্রণালি: চিনি ও পানি একসঙ্গে জ্বাল দিয়ে পাতলা শিরা বানিয়ে নিন। ডাবের পানির সঙ্গে শিরা ভালো করে গুলিয়ে নিন। পেস্তা বাদাম গরম পানিতে ভিজিয়ে নরম করে ছিলে নিন। গ্লাসে ডাবের পানির মিশ্রণ ঢেলে শাঁস আর বাদাম দিয়ে অন্তত দুই ঘণ্টা ফ্রিজে রাখুন। বরফ কুচিসহ ঠান্ডা পরিবেশন করুন।

সাগু-জেলো পুডিং
সাগু-জেলো পুডিংউপকরণ: নিচের স্তরের জন্য: দুধ ১ লিটার, সাগু এক মুঠ, চিনি স্বাদমতো, তেজপাতা-এলাচি-দারুচিনি ১টি করে, লবণ ১ চিমটি।
ওপরের স্তরের জন্য: দুধ আধা লিটার, চিনি ৫ টেবিল-চামচ, আগার আগার পাউডার ১ টেবিল-চামচ, পানি ৫ টেবিল-চামচ, যেকোনো ফুড কালার ৩-৪ ফোঁটা।
প্রণালি: দুধে এলাচি-দারুচিনি-তেজপাতা দিয়ে জ্বাল দিন। ঘন হয়ে অর্ধেক হয়ে এলে সাগু দিয়ে দিন। সেদ্ধ হয়ে এলে চিনি ও এক চিমটি লবণ দিন। এবার চুলা থেকে নামিয়ে পরিবেশন গ্লাসের মাঝ বরাবর ঢালুন এবং ঠান্ডা হওয়ার জন্য রেখে দিন। এরপর ফ্রিজে অন্তত দুই ঘণ্টা রাখুন। ফিরনির ওপর সর জমতে হবে। এবার ওপরের স্তর তৈরির জন্য আগার আগার পাউডার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এবার দুধে চিনি মিশিয়ে ফুড কালার দিন। এতে আগার আগার মিশ্রণটি ঢেলে দিন। চুলায় দিয়ে ঘন ঘন নাড়ুন। বলক এলে নামান। এবার সাগু ফিরনির ওপর একটু করে ঢেলে দিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। ফ্রিজে রেখে দিন। পরিবেশনের আগে বের করুন।