Sunday, May 31, 2020

অপারেশন ব্লু স্টার: যেভাবে স্বর্ণ মন্দিরে ঢুকেছিল ভারতীয় সেনা ট্যাঙ্ক by রেহান ফজল

নবম পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল কুলদীপ বুলবুল বরাড়, উত্তর ভারতের সেনাধ্যক্ষ লে.জে সন্দারজিৎ এবং সেনা প্রধান জেনারেল অরুণ শঙ্কর বৈদ্য।
দিনটা ছিল ৩১ মে, ১৯৮৪। উত্তরপ্রদেশের মীরাটে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল কুলদীপ বুলবুল বরাড় স্ত্রীকে নিয়ে পরের দিন ম্যানিলা ভ্রমণে যাবেন। তারই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
"সন্ধ্যেবেলায় হঠাৎই ফোন এল, যে পরের দিন সকালে চন্ডীগড়ে একটা জরুরি বৈঠকে হাজির হতে হবে আমাকে," বলছিলেন মেজর জেনারেল বরাড়।
"সেদিনই বিকেলে দিল্লি থেকে আমাদের প্লেন ধরার কথা ম্যানিলা যাওয়ার জন্য। ট্র্যাভেলার্স চেক কিনে ফেলেছিলাম। কিন্তু আদেশ পালন করতেই হবে। তাই সড়কপথে দিল্লি গিয়ে সেখান থেকে বিমানে চন্ডীগড় পৌঁছলাম। সোজা হাজির হলাম পশ্চিম কমান্ডের সদর দপ্তরে।"
সেই সময়টায় পাঞ্জাবে বিচ্ছিন্নতাবাদের আগুন জ্বলছিল।
শিখ সম্প্রদায়ের গুরদোয়ারাগুলোতে পাঞ্জাবকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথক খালিস্তান সৃষ্টির পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছিল।
এটাও বলা হচ্ছিল যে প্রয়োজনে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
পাঞ্জাবের পরিস্থিতি এতটাই ঘোরালো হয়ে উঠছিল যে দিল্লির কর্তাদের কপালে তা ভাঁজ ফেলছিল।
সরকারের শীর্ষস্তর থেকে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যে শিখদের সবথেকে পবিত্র তীর্থস্থান স্বর্ণ মন্দিরে সেনাবাহিনীর অভিযান চালানো হবে।
ওই অভিযানের নাম দেয়া হয়েছিল অপারেশন ব্লু স্টার।
তারই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মেজর জেনারেল বরাড়কে।
মিসেস ইন্দিরা গান্ধী।
"আমাকে বলা হয়েছিল যত দ্রুত সম্ভব অমৃতসর পৌঁছতে হবে। সেখানকার পরিস্থিতি খারাপ। স্বর্ণ মন্দির কব্জা করে নিয়েছেন ভিন্দ্রানওয়ালে। পাঞ্জাবের আইন শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। অবস্থা সামলাতে না পারলে পাঞ্জাব হয়তো আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাবে," বলছিলেন মেজর জেনারেল বরাড়।
তার ছুটি বাতিল করে পাঠিয়ে দেওয়া হল অমৃতসরে।
ভিন্দ্রনওয়ালের সঙ্গে কংগ্রেসের যোগ
জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালেকে কংগ্রেসই গোড়ার দিকে উৎসাহ দিয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল যে আকালীদের বিপরীতে এমন একজন শিখ নেতা তৈরি করার প্রয়োজন, যে শিখ সম্প্রদায়ের দাবি দাওয়া নিয়ে সরব হতে পারবে, অন্যদিকে আকালীদের জনসমর্থনও কিছুটা কমানো যাবে।
ভিন্দ্রানওয়ালে নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে উত্তেজক ভাষণ দিতে শুরু করেন।
কিন্তু একটা সময়ে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকেও নিশানা করতে থাকলেন।
পাঞ্জাবে হিংসাত্মক ঘটনা বাড়তে থাকল।
ভিন্দ্রানওয়ালের এক সভায় উপস্থিত প্রবীণ লেখক ও সাংবাদিক খুশওয়ান্ত সিং।
১৯৮২ সালে ভিন্দ্রানওয়ালে চক গুরদোয়ারা ছেড়ে প্রথমে স্বর্ণ মন্দির চত্বরে গুরু নানক নিবাসে আশ্রয় নিলেন, আর তারপরে, কয়েক মাসের মধ্যেই আকাল তখত থেকেই তিনি নিজের মতামত ব্যক্ত করতে শুরু করলেন।
বিবিসি-র অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়ার সংবাদদাতা সতীশ জেকব বেশ কয়েকবার ভিন্দ্রানওয়ালের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
তিনি বলছিলেন, "আমি যখনই ওখানে যেতাম, ভিন্দ্রানওয়ালের দেহরক্ষীরা আমাকে দেখেই বলতে শুরু করতেন, আয়োজী, আয়োজী, বিবিজী আ গয়ে [আসুন আসুন বিবিজী]। তারা কখনই বিবিসি বলত না! সোজা ভেতরে চলে যেতে বলত আমাকে। সন্তজী [ভিন্দ্রানওয়ালেকে সন্ত বা শিখ গুরু বলে মনে করতেন অনেকে]"
"তিনি আমার সঙ্গে বেশ শান্তভাবেই কথা বলতেন। একবার মার্ক টালিকেও নিয়ে গিয়েছিলাম ওর কাছে। ভিন্দ্রানওয়ালে মার্কের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি কোন ধর্মের মানুষ। মার্ক টালি উত্তর দিয়েছিলেন তিনি খ্রিস্টান। উত্তর শুনে ভিন্দ্রানওয়ালে বলেছিলেন, তার মানে আপনি যিসাস ক্রাইস্টকে মেনে চলেন? মার্ক বলেছিলেন, 'হ্যাঁ'। ভিন্দ্রানওয়ালে এটা শুনে বলেন যিসাস ক্রাইস্টের তো দাড়ি ছিল। আপনার দাড়ি নেই কেন?"
"মার্ক উত্তর দিয়েছিলেন, এরকমই পছন্দ আমার। ভিন্দ্রানওয়ালের জবাব ছিল, আপনি বোধহয় জানেন না, দাড়ি ছাড়া আপনাকে মেয়েদের মতো দেখতে লাগে! মার্ক হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন কথাটা," জানাচ্ছিলেন সতীশ জেকব।
ভারত-পাকিস্তান সীমানা
"একবার ভিন্দ্রানওয়ালের সঙ্গে আমার দীর্ঘ কথোপকথোন হচ্ছিল স্বর্ণ মন্দিরের ছাদে। সেখানে কেউ খুব একটা যেত না। চারদিকে অসংখ্য বানর ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি যা যা করছেন, তাতে আপনার বিরুদ্ধে যদি কোনও অ্যাকশন হয় তাহলে কী করবেন?" সেই সাক্ষাৎকারগুলোর কথা মনে করে বলছিলেন মি. জেকব।
তার কথায়, "ছাদ থেকে সামনের দিকে ইশারা করে ভিন্দ্রানওয়ালে বলেছিলেন সামনে চাষের ক্ষেত। সাত-আট কিলোমিটার গেলেই পাকিস্তান। কোনও অ্যাকশন শুরু হলে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সীমানা পেরিয়ে পাকিস্তান চলে যাব, সেখান থেকেই গেরিলা কায়দা সংঘর্ষ চলতে থাকবে। এই কথাগুলো শুনে আমার মনে হচ্ছিল লোকটি আমাকে খুব বিশ্বাস করে নিজের প্ল্যান বলে দিচ্ছে। এমনকি এটাও বলে নি যে এই কথাগুলো যেন আমি না লিখি কোথাও।"
অপারেশন শুরুর আগে নজরদারি
চৌঠা জুন থেকে ভিন্দ্রানওয়ালের লোকেরা কোথায় আছে, সেটা জানার জন্য একজন অফিসারকে সাদা পোশাকে স্বর্ণ মন্দিরের ভেতরে পাঠানো হয়েছিল।
পরের দিন, পাঁচ তারিখ সকালে অপারেশনে অংশ নেবে সেনাবাহিনীর যে সদস্যরা, তাদের সবাইকে মেজর জেনারেল বরাড় নিজে ব্রিফ করেন।
তার কথায়, "পাঁচ তারিখ ভোর সাড়ে চারটে নাগাদ আমি প্রত্যেকটা ব্যাটালিয়নের কাছে গিয়ে সেনা সদস্যদের সঙ্গে প্রায় আধঘন্টা করে কথা বলি। আমি তাদের স্পষ্ট বলেছিলাম, স্বর্ণ মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করার সময়ে এটা মাথায় রাখার দরকার নেই যে তারা কোনও পবিত্র তীর্থে ঢুকছে। এটা মনে রাখতে বলেছিলাম যে আমরা স্বর্ণ মন্দিরে যাচ্ছি ভেতরটা পরিষ্কার করতে। যত কম মৃত্যু হয়, ততই মঙ্গল।"
একটি শিখ জমায়েতে জার্নাইল সিং
"আমি সেনাদের বলেছিলাম, কারও যদি স্বর্ণ মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে আপত্তি থাকে, সেটা নির্দ্বিধায় জানাতে পারে। কমান্ডিং অফিসারদের জানিয়ে দিয়েছিলাম কেউ আপত্তি জানালে তাকে যেন জোর করে ভেতরে না পাঠানো হয় আর তার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও না নেওয়া হয়," জানাচ্ছিলেন মি. বরাড়।
তিনটে ব্যাটালিয়নের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময়ে কেউই আপত্তি জানায় নি।
কিন্তু চার নম্বর ব্যাটালিয়নের এক শিখ অফিসার উঠে দাঁড়াতেই মি. বরাড় বলেছিলেন, "আপনার আবেগ যখন এতটাই বেশি, আপনাকে ভেতরে যেতে হবে না। কিন্তু সেই অফিসার উত্তর দিয়েছিলেন, 'আপনি ভুল বুঝছেন স্যার। আমি ভেতরে ঢুকব তো বটেই, সবার সামনে যেতে চাই আমি। আকাল তখতে সবার আগে ঢুকে ভিন্দ্রানওয়ালেকে গ্রেপ্তার করতে চাই আমি।'
মি. বরাড়ের কথায়, "আমি ওই ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছিলাম যে ওই শিখ অফিসারের প্ল্যাটুনটাই সবার আগে মন্দিরে ঢুকবে। তারা ভেতরে যেতেই মেশিন গান থেকে অজস্র গুলি ছুটে আসতে থাকে। ওই অফিসারের দুই পায়েই গুলি লেগেছিল। কমান্ডিং অফিসার আমাকে জানান যে তাকে কিছুতেই ফিরিয়ে আনা যাচ্ছে না। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই সেই অফিসার আকাল তখতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন! আমি আদেশ দিয়েছিলাম, তাকে জবরদস্তি উঠিয়ে নিয়ে এসে অ্যাম্বুলেন্সে চড়িয়ে দিতে। পরে তার দুটো পাই কেটে বাদ দিতে হয়েছিল। তার সাহসের জন্য অশোক চক্র পেয়েছিলেন ওই শিখ অফিসার," জানাচ্ছিলেন মেজর জেনারেল বরাড়।
বিবিসি সাংবাদিক মার্ক টালি।
অপারেশন শুরু হয়েছিল রাত দশটায়।
অপারেশন ব্লু স্টারের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জেনারেল সুন্দরজী, জেনারেল দয়াল আর জেনারেল বরাড়।
তারা ঠিক করেছিলেন যে গোটা অপারেশনটা রাতের অন্ধকারে চলবে। তাই রাত দশটার সময়ে মন্দিরের সামনের দিক থেকে আক্রমণ করা হয়।
কালো পোশাক পরা প্রথম ব্যাটালিয়নের সৈন্যদের সঙ্গেই প্যারাশুট রেজিমেন্টের কমান্ডোরাও ছিল। ভেতরে গিয়েই খুব দ্রুত আকাল তখতের দিকে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল তাদের।
কিন্তু কমান্ডোরা এগোতেই তাদের ওপরে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়।
মাত্র কয়েকজন কমান্ডোই প্রাণে বেঁচেছিলেন।
তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন লেফটেনান্ট কর্ণেল ইসরার রহিম খাঁ।
দশ নম্বর ব্যাটালিয়নের সদস্যরা সিঁড়ির দুদিকে ভিন্দ্রানওয়ালের সঙ্গীদের মেশিনগানগুলো অকেজো করতে পেরেছিলেন, কিন্তু সরোবরের উল্টোদিক থেকে প্রচন্ড গুলিবর্ষণ শুরু হয়।
সেনাবাহিনী আন্দাজও করতে পারে নি যে তাদের এরকম প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে।
"প্রথম পয়তাল্লিশ মিনিটেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে ওদের পরিকল্পনা, অস্ত্র ভান্ডার নিয়ে তারা বেশ শক্তপোক্ত দূর্গই গড়ে তুলেছে। ওদের এত সহজে বাগে আনা যাবে না! আমরা ঠিক করেছিলাম আকাল তখতের ভেতরে স্টান গ্রেনেড ছুঁড়ব। ওই গ্রেনেডে মানুষ মরে না। গ্রেনেডটা ফাটলে গ্যাস বেরয়, যাতে চোখ দিয়ে জল বেরয়, মাথা ঝিম ঝিম করে। কিন্তু গ্রেনেড ছোঁড়ার কোনও জায়গাই পায় নি সেনারা। প্রত্যেকটা জানলা, দরজায় বালির বস্তা রাখা ছিল। তার মধ্যে দিয়ে গ্রেনেড ছুঁড়লে সেগুলো সেনাবাহিনীর জওয়ানদের দিকেই উড়ে আসছিল," বলছিলেন মি. বরাড়।
মন্দির চত্বরের উত্তর আর পশ্চিম দিক থেকেই যে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গুলি চালাচ্ছিল তা নয়।
ভূগর্ভস্থ নালাতে যে ম্যানহোল থাকে সেগুলোর ঢাকনা খুলে গুলি চালিয়ে আবারও তারা ভেতরেই লুকিয়ে পড়ছিল।
এক প্রাক্তণ সেনা জেনারেল, শাহবেগ সিং ভিন্দ্রানওয়ালের দলকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
তাদের শেখানো হয়েছিল সেনাসদস্যদের হাঁটুর কাছে গুলি করতে। তাদের ধারণা ছিল সেনাবাহিনী গুলি চালাতে চালাতে এগোবে।
সেজন্যই বেশিরভাগ সেনাসদস্যের পায়ে গুলি লেগেছিল।
আর যখন এগোতে পারছিল না সেনাবাহিনী, তখন জেনারেল বরাড় নির্দেশ দেন আর্মড পার্সোনেল ক্যারিয়ার ব্যবহার করতে।
স্বর্ণ মন্দির, আকাল তখত রয়েছে যেখানে।
ওই গাড়ি গুলি নিরোধক। কিন্তু গাড়িটা আকাল তখতের দিকে এগোতেই চীনে তৈরি রকেট লঞ্চার দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয় সেটা।
"আমরা আন্দাজ করতে পারিনি যে ওদের কাছে রকেট লঞ্চার আছে। গাড়িটা এগোতেই রকেট দিয়ে সেটাকে উড়িয়ে দেয় ওরা।"
ওই পরিস্থিতিতে ট্যাঙ্ক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন জেনারেল বরাড়।
"আগে থেকে ট্যাঙ্ক পাঠানোর কথা ভাবাই হয় নি। কিন্তু আকাল তখতের কাছাকাছিও যখন পৌঁছন যাচ্ছে না দেখেই ট্যাঙ্ক আনার কথা ভাবা হয়। আমাদের আশঙ্কা ছিল ভোর হলেই চারদিক থেকে হাজার হাজার লোক চলে এসে সেনাবাহিনীকে ঘিরে ফেলবে। ভোর হয়ে আসছিল, কিন্তু কিছুতেই এগোন যাচ্ছিল না। তখন ঠিক করি যে ট্যাঙ্ক থেকে আকাল তখতের ওপরের তলাগুলোকে লক্ষ্য করে গোলা ছোঁড়া হবে। ইঁট পাথর ওপর থেকে পড়তে থাকলে ভেতরে অবস্থান করা লোকেরা ভয়ে বেরিয়ে আসবে," বলছিলেন জেনারেল বরাড়।
পরে, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জগজিৎ সিং আরোরা যখন স্বর্ণ মন্দির পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন, তখন গোনা হয়েছিল অকাল তখতকে লক্ষ্য করে ভারতীয় সেনাবাহিনী অন্তত চল্লিশটা গোলা নিক্ষেপ করেছিল।
জেনারেল বরাড় বলছিলেন, "হঠাৎই দেখা যায় যে ৩০-৪০ জন বাইরে বেরনোর জন্য দৌড়ে আসছে। ওদিক থেকে গুলি চালানোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হল কিছু একটা ঘটেছে ভেতরে। আমি সেনাসদস্যদের আদেশ দিয়েছিলাম ভেতরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালাতে। তখনই জানা যায় যে জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে আর জেনারেল শাহবেগ সিং নিহত হয়েছেন। তবে পরের দিন গুজব ছড়ায় যে ভিন্দ্রানওয়ালে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানে পালিয়ে গেছে। পাকিস্তান টিভিও ঘোষণা করে যে ভিন্দ্রানওয়ালে তাদের কাছে আছে। ৩০ জুন তারা নাকি ভিন্দ্রানওয়ালেকে টিভিতে দেখাবে।"
মন্দির প্রাঙ্গণে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আত্মসমর্পণ।
"আমার কাছে তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রী এইচ. কে. এল. ভগত আর বিদেশ সচিব রসগোত্রার ফোন এসেছিল। তারা জানতে চান, পাকিস্তান টিভি বলছে যে ভিন্দ্রানওয়ালে বেঁচে আছেন আর আমি কীভাবে বলছি যে তারা নিহত! আমি দুজনকেই বলেছিলাম শব শনাক্ত করা হয়ে গেছে। মৃতদেহ তাদের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের অনুগামীরা শবের পা ছুঁয়ে প্রণামও করেছে। আমি নিশ্চিত যে তারা দুজনেই নিহত। পাকিস্তান যা খুশি বলুক," বিবিসিকে বলছিলেন জেনারেল বরাড়।
এই গোটা অপারেশনে ৮৩ জন ভারতীয় সৈনিক নিহত হয়েছিলেন। ২৪৮ জনের গুলি লেগেছিল।
বিচ্ছিন্নতাবাদী মারা গিয়েছিলেন ৪৯২ জন আর দেড় হাজারেরও বেশি লোক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
অপারেশন ব্লু স্টারের ফলে শুধু ভারতের নয়, সারা বিশ্বের শিখ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছিল।
ভারতীয় সেনাবাহিনী নিশ্চিতভাবেই জয়ী হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছিল ভারত সরকারের।
অবশেষে ইন্দিরা গান্ধীকে নিজের প্রাণ দিয়ে এর মূল্য চোকাতে হয়েছিল।

Thursday, May 28, 2020

১১ বছরেও কি নেপালের প্রজাতন্ত্র সফল হয়েছে? by পিটার গিল

নেপালে ২০০৮ সাল থেকে ২৮ মে পালিত হয় প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে। ওই সময় নির্বাচিত সংবিধান পরিষদ দেশের কয়েক শ’ বছরের প্রাচীন রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একে ফেডারেল, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। গত বছর রাষ্ট্রপতি ও একজন মন্ত্রী মধ্য কাঠমান্ডুতে নারায়নহিতি নামে পরিচিত একটি রাজকীয় প্রাসাদ মাঠে দিনটির স্মরণে নতুন রিপাবলিক মেমোরিয়াল উদ্বোধন করেন। তবে ভিআইপিরা চলে যাওয়ার পর পরিকল্পনা অনুযায়ী জনসাধারণের জন্য এটি খোলা হয়নি। আরো অনেক সরকারি নির্মাণ প্রকল্পের মতো এটির নির্মাণও ২০১২ সাল থেকে বিলম্বিত হচ্ছে।
মেমোরিয়ালের বন্ধ ফটকের সামনে থাকা রাস্তায় ছোট একটি চায়ের দোকান আছে। সকাল বেলা সেখানে অফিসকর্মী আর স্থানীয় যুবকরা জড়ো হয়। দোকানটির মালিক হরি বল্লভ পান্ত কাছের একটি এলাকায় বড় হয়েছেন, তিনি বছরের পর বছর ঘটে চলা ঘটনাগুলো দেখেছেন। রাজতন্ত্রের আমলে তিনি নারায়নহিতি প্যালেসের ভেতরে কার্পেট শ্যাম্পু করার ব্যবসা পরিচালনা করতেন। নতুন রিপাবলিক মেমোরিয়াল বলতে কী বোঝে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বেশ ঝাঁঝাল জবাব দেন।
তিনি নেপালের প্রাক-গণতান্ত্রিক ও গণতন্ত্র-পরবর্তী ক্ষমতায় থাকাদের প্রসঙ্গে বলেন, দেখুন, প্রথমে রানারা জনগণকে শোষণ করত। তারপর এলো রাজতন্ত্র। পরে কংগ্রেস এবং এখন কমিউনিস্টরা। রাজনৈতিক পরিবর্তন নেতাদের কাছে হয়তো কিছু বোঝায়। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ লোকের কাছে কোনো ভিন্নতা নেই।
বর্তমান সময়ে নেপালের রাজনীতি সম্পর্কে হতাশা সাধারণ বিষয়। ২০০৮ সালে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা হওয়ার পর থেকে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাওয়া সত্ত্বেও রাজনীতি নিয়ে আশাবাদী হতে পারছে না জনসাধারণ। ২০০৮ সালে নাগরিক সমাজের নেতা, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো ও সাবেক বিদ্রোহী মাওবাদীরা গণআন্দোলনের মাধ্যমে নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র বীর বিক্রম শাহ দেবকে উৎখাত করেছিল। তাদের লক্ষ্য ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় জোটটি ছিল অস্বস্তিতে। ২০০৫ সাল থেকে স্থগিত হয়ে থাকা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছিল সবাই। যে সব দাবিতে তারা তখন সোচ্চার হয়েছিল, ১১ বছর পরও সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। এবং রিপাবলিক মেমোরিয়াল পর্যন্ত অসম্পূর্ণ হয়ে রয়েছে।
নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিনিধিত্ব
মৌলিক দিক থেকে নতুন প্রজাতন্ত্র সফল হয়েছে। নির্বাচন হয় অনেকটাই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, ভোটারদের উপস্থিতি হয় ভালো। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত পরিষদের দায়িত্ব ছিল নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা। তখন নির্বাচনে ৬০ শতাংশ ভোট পড়ে। কিন্তু তারা নির্ধারিত সময়ে তা করতে পারেনি।
২০১৩ সালে দ্বিতীয় পরিষদ নির্বাচনের সময় ভোট পড়ে ৭৮ শতাংশ। এই পরিষদ ২০১৫ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। এতে সেক্যুলারবাদ ও ফেডারেলবাদকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। তারপর ২০১৭ সালে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি ছিলো ব্যাপক – স্থানীয় নির্বাচনে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভোট পড়ে।
ফেডারেলবাদ ও সেক্যুলারবাদ
বিদ্রোহের সময় মাওবাদীরা ফেডারেল রাষ্ট্র কাঠামোর কথা বলত। তাদের মতে কাঠমান্ডুতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না থেকে যাতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়। তবে কেবল বিকেন্দ্রীকরণই ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য যথেষ্ট নয়। একারণেই ২০১৭ সালের নির্বাচনের পর স্থানীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিরোধ লেগে আছে – কার কাছে কী ক্ষমতা আছে, তা নিয়ে। বিশেষ করে করারোপ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে।
সেক্যুলারবাদ নিয়েও বিরোধ রয়েছে। ২০১৫ সালে হিন্দু ধর্মের ওপর থেকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তারপরও হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মকে কিছুটা সুবিধা দেয়া হয়েছে এই সংবিধানে। গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। জনমত জরিপে দেখা যায়, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজন সেক্যুলারবাদকে তেমনভাবে গ্রহণ করছে না।
নাগরিক আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন
নেপালি ইতিহাসে আগের আমলগুলোতে প্রতিবাদ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। ২০০৮ সাল থেকে মিশ্র অবস্থা দেখা যাচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন রয়েছে, আবার এর ওপর বিধিনিষেধ আরোপের অনেক ঘটনাও দেখা যায়।
২০১৭ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা কমিউনিস্ট জোট এনসিপি পুরনো আইন ব্যবহার করে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। ২০১৮ সালেই ছয় সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এনসিপি সরকার বলছে, অনলাইন অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য কথা বলার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ দরকার। তারা ভুয়া খবরের উদারণ দিচ্ছে।
মাওবাদের ইতিহাস লেখক আদিত্য অধিকারী মনে করেন, বর্তমান সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা নতুন কিছু নয়। নেপালের রাজনৈতিক মহলের মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অভাব থাকায় এমনটা হচ্ছে।
সাপ্তাহিক সংবাদপত্র অন্নপূর্ণা এক্সপ্রেসের সম্পাদক বিশ্বাস বড়াল বলেন, এনসিপি নেতারা উদ্দীপনার জন্য নেপালের প্রতিবেশীর দিকে হয়তো তাকায়। চীনা প্রেসিডেন্ট শি যেভাবে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন, নেপালের প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রাসাদ অলিও হয়তো তেমন কিছু করতে চাচ্ছেন।
বড়াল বলেন, অলি ভারতের নরেন্দ্র মোদির দিকেও তাকাতে পারেন। নবনির্বাচিত মোদিও ক্ষমতা সুসংহত করেছেন, কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার কাছ থেকে ইতিবাচক সমর্থন পেয়েছেন। অলি হয়তো মনে করতে পারেন, যে পন্থায় ক্ষমতায় এসেছেন, সে পন্থাতেই ক্ষমতা সুসংহত করতে হবে।
প্রবৃদ্ধি ও এর অতৃপ্তি
রিপাবলিক মেমোরিয়ালের বাইরে দাঁড়ালে কাঠমান্ডুর স্কাইলাইনে নতুন নতুন বিলাসবহুল হোটেল, আকাশচুম্বি মল, অ্যাপার্টমেন্ট চোখে পড়ে। চায়ের দোকানদার হরি বল্লভ বলেন, ছোট ছোট বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে বড় বড় ভবন করা হচ্ছে। ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, গরিবরা হচ্ছে আরো গরিব।
প্রজাতন্ত্র ঘোষিত হওয়ার পর নেপালে জিডিপি বেড়েছিল ২০১৪ পর্যন্ত। ২০১৫-১৬ সালের ভূমিকম্পের পর পল্লী এলাকায় ধসের সৃষ্টি হয়। তারপর আবার প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে।
তবে স্থানীয় চাকরির সুযোগ বেশ কম। অর্থনীতি প্রবাসীদের আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। শ্রম দফতর ২০০৮ সাল থেকে ৩৫ লাখ ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করেছে। বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায় কাজ করার জন্য।
আরো বড় কথা হলো, বৈষম্য বাড়ছে বলে ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক জানিয়েছে, রাজনীতি, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাতে স্বজনপ্রীতি বাড়ছে। ফলে দুর্নীতির লাগাম টানা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বৈষম্য ও দুর্নীতি বাড়ার ফলে জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এর রেশ ধরে একটি কট্টরপন্থী কমিউনিস্ট দল নতুন বিপ্লবের ডাক দিয়েছে।
লেখক: কাঠমান্ডুভিত্তিক সাংবাদিক

Friday, May 22, 2020

আদর্শ জাতি গঠনে আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা by ইমামুদ্দীন সুলতান

বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মহাগ্রন্থ আল কোরআনকে জীবন বিধানরূপে পাঠিয়েছেন। এ কোরআন পুরো মানবজাতির সমাজ সভ্যতা ও আত্মিক পবিত্রতা এবং পরিশুদ্ধির জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। তাই এ মহাগ্রন্থের প্রতিটি পাতায় ছড়িয়ে আছে ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কার-সংশোধনের পন্থা ও পদ্ধতি এবং পবিত্র ও পরিশুদ্ধ জীবনের বাস্তব রূপরেখা। পরিশুদ্ধ ও পবিত্র সভ্যতার অপরিহার্য দাবি হচ্ছে পরিশুদ্ধ ও সৎ খোদাভীরু মানুষ। কেননা আত্মার পরিশুদ্ধি ছাড়া কোনো মানুষ প্রকৃত কল্যাণ বা সফলতা অর্জন করতে পারে না। তাই পবিত্র কোরআনে ব্যক্তির পবিত্রতা ও আত্মার পরিশুদ্ধির প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে- ‘যে নিজেকে শুদ্ধ করে সে সফলকাম এবং যে নিজেকে কলুষিত করে সে ব্যর্থমনোরথ হয়।’ (সূরা শামস : ৯)।
উল্লিখিত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আত্মশুদ্ধিকে মানবজীবনের সফলতা ও ব্যর্থতার কারণ সাব্যস্ত করেছেন। যার আত্মার পরিশুদ্ধতা আছে সে সফল। আর যার আত্মার পরিশুদ্ধতা নেই সে ব্যর্থ। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জন করে সে সফলকাম। আর সে ব্যক্তি ব্যর্থ যে নিজের নফসকে পাপের পঙ্কে নিমজ্জিত করে দেয়। মোটকথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতার চাবিকাঠি হলো আত্মার পরিশুদ্ধতা ও পবিত্রতা। তাই আল্লাহ তায়ালা রাসুলে করিম (সা.) কে এ মিশন নিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। রাসুল (সা.) পৃথিবীতে আগমনের উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন- ‘তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করবেন তাঁর আয়াত। তাদের পবিত্র করবেন এবং শিক্ষা দেবেন কিতাব এবং হিকমত। এর আগে তারা ছিল পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।’ (সূরা জুমা : ২)। এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রাসুলে করিম (সা.) এর পৃথিবীতে আগমনের চারটি উদ্দেশ্য ও মিশনের কথা উল্লেখ করেন। যার দ্বিতীয়টি হলো, তিনি মানুষকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করবেন।
মানুষকে আল্লাহ তায়ালা দুটি জিনিস দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আত্মা এবং দেহ। এ দুটি জিনিসের সমন্বয়ে যেহেতু প্রতিটি মানুষের সৃষ্টি; তাই এ দুটি জিনিস তথা দেহ এবং আত্মা উভয়টা সুস্থ থাকলেই একজন মানুষকে পরিপূর্ণ সুস্থ বলা হবে। দেহ সুস্থ থাকে দেহের খোরাকের মাধ্যমে আর আত্মা সুস্থ থাকে তার খোরাকের মাধ্যমে। দেহের সৃষ্টি উপাদান থেকে; তাই তার খাদ্যও ব্যবস্থা করেছেনে উপাদান থেকে, যাতে মানবদেহ ঠিক থাকে। আত্মা যেহেতু অবিনশ্বর তার কোনো মৃত্যু নেই, এজন্য আত্মার খোরাকও সেই ধ্বংসহীন বস্তু। তা হলো নেক আমল। উৎপাদনমূলক খাবারের মাধ্যমে যেমন মানবদেহ ঠিক থাকে, সতেজ থাকে, তেমনি আত্মা সতেজ হয় নেক আমলের মাধ্যমে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আজ আমরা দেহের সুস্থতা নিয়ে বেশ সচেতন। দেহের সুস্থতার জন্য আমরা সর্বদা সতেষ্ট থাকি, চেষ্টা অব্যাহত রাখি। সামান্য কিছু হলে চিকিৎসার জন্য দেশ-বিদেশের ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই। কিন্তু আত্মার সুস্থতার জন্য কোনো আধ্যাত্মিক ডাক্তারের কাছে ছুটে যাই না। অথচ দেহের চেয়ে আত্মার গুরুত্ব বেশি। কেননা এ দেহের মূল্যায়ন তো আত্মাকে দিয়েই। আত্মা আছে বলেইে তো আমাকে-আপনাকে মানুষ বলে বা কোনো নাম ধরে সম্মোধন করা হয়। পক্ষান্তরে আত্মা যখন দেহের সঙ্গ ত্যাগ করে, তখন আর নাম ধরে সম্বোধন করা হয় না। সেটাকে লাশ বলা হয়। অতএব এর গুরুত্ব দেওয়া এবং এটাকে সুস্থ রাখা বেশি প্রয়োজন। আত্মা সুস্থ থাকবে গোনাহমুক্ত থাকার মাধ্যমে। আর যার আত্মা শুদ্ধ থাকে তার সবকিছু ভালো হয় আর যার আত্মা পরিশুদ্ধ না হয় তার সবকিছু খারাপ হয়ে যায়। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- ‘জেনে রাখো মানবদেহে এমন একটি গোশতের টুকরা রয়েছে, যা ঠিক হলে পুরো দেহ ঠিক হয়ে যায় এবং তা খারাপ হলে সারা দেহ খারাপ হয়ে যায়। শুনো! তা হচ্ছে ‘কলব’ বা আত্মা।’ (বোখারি : ৫২, মুসলিম : ৩৯৭৩)।
এই হাদিসে রাসুলে করিম (সা.) পুরো দেহের আমলের ইসলাহ ও সংশোধনকে আত্মার সংশোধনের ওপর নির্ভরশীল বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যাকে ইসলামের পরিভাষায় ‘তাজকিয়ায়ে নফস’ বা আত্মশুদ্ধি বলা হয়। যার আত্মা পরিশুদ্ধ থাকবে তার দ্বারা কখনও খারাপ ও অন্যায়মূলক কোনো কাজ সংঘটিত হবে না। আর এ আত্মা শুদ্ধ হয় কিছু গুণাবলি অর্জন এবং কিছু বিষয় বর্জন করার মাধ্যমে। আর তা হলো, প্রথমত শিরক ও কুফরি থেকে বেঁচে থেকে ঈমান ও তাওহিদের নেয়ামত লাভ করা এবং আত্মিক রোগব্যাধি থেকে অন্তরকে পবিত্র রাখা। আত্মিক রোগব্যাধি হলো রিয়া, অহংকার, হিংসা-বিদ্বেষ, অবৈধ যৌনাচার, কুপ্রবৃত্তি, ধনসম্পদ ও সম্মানের মোহ, লোভ-লালসা ইত্যাদি। পক্ষান্তরে আত্মার গুণাবলি হলোÑ ইখলাস, খোদাভীতি, তাওয়াক্কুল, সবর, শোকর, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি, আল্লাহর প্রেম, বদান্যতা, নম্রতা ভদ্রতা, সততা ইত্যাদি।
একটি সৎ ও কল্যাণমূলক সমাজ বা রাষ্ট্র গড়ে তোলা কখনও সম্ভব না, যদি ওই সমাজের মানুষগুলো সৎ ও খোদাভীরু না হয় এবং ওই গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমে তাদের আত্মা পরিশুদ্ধ না থাকে। তাই একটি আদর্শ সমাজ গড়ার জন্য আদর্শ মানুষ তৈরি করা প্রয়োজন। আর আদর্শ মানুষ তৈরি হয় আত্মার সংশোধনের মাধ্যমে। যে সমাজের প্রতিটি জনগণ পরিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী হবে, সে সমাজে কখনও রাষ্ট্রদ্রোহী বা খোদাদ্রোহী কোনো কাজ সংঘটিত হবে না। কারও অধিকার খর্ব হবে না। কোনো অন্যায়- জুলুম-নির্যাতন হবে না। যার স্পষ্ট প্রমাণ রাসুলে করিম (সা.) এর যুগ, যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ। অথচ রাসুলের আগমনের আগে এ যুগটিই ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগকে রাসুলে করিম (সা.) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সোনালি ও আদর্শরূপে গঠন করেছেন একমাত্র ব্যক্তির আত্মার সংশোধনের মাধ্যমে। এটিই হচ্ছে কোরআন প্রদর্শিত পথ ও পন্থা। তাই আজও নব্য জাহেলিয়াতমুক্ত পরিশুদ্ধ ও পবিত্র সমাজ রচনা করতে হলে আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে পবিত্র কোরআনের নির্দেশিত পথেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজেদের আত্মা পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে একটি আদর্শ জাতি ও সমাজ গঠন করার তৌফিক দিন।

বলিরেখা দূর করে ভিটামিন ই অয়েল

ভিটামিন ই ক্যাপসুল
ভিটামিন ই ক্যাপসুল থেকে তেল সংগ্রহ করে ত্বকে লাগাতে পারেন সরাসরি। এটি ত্বকের কালচে দাগ ও বলিরেখা দূর করতে কার্যকর। পাশাপাশি ত্বকে তারুণ্যের দীপ্তি নিয়ে আসে ভিটামিন ই অয়েল।
*অলিভ অয়েলের সঙ্গে ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি ত্বকে ম্যাসাজ করুন চক্রাকারে। সারারাত রেখে পরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন।
*ত্বকের কালচে দাগ ও বলিরেখা দূর করতে ভিটামিন ই অয়েল ম্যাসাজ করুন ত্বকে। আধা ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলুন।
*অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মিশিয়ে ত্বকে লাগান। ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। 
*হাত-পায়ের রুক্ষতা দূর করতে মধু ও লেবুর সঙ্গে ভিটামিন ই অয়েল মিশিয়ে লাগান।
*সহজে নখ ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা থাকলে গরম পানিতে ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মিশিয়ে নখ ভিজিয়ে রাখুন।
*ঠোঁট ফাটলেও ভিটামিন ই কাজে লাগাতে পারেন। মধুর সঙ্গে ভিটামিন ই অয়েল মিশিয়ে ঠোঁটে লাগান। সারারাত রেখে পরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন।
তথ্য: নিউজ এইটিন

বিদ্বেষ উষ্কে দিতে ইন্টারনেটে বিজেপি’র মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা

ভারতে সরকারপন্থীদের মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডায় ভেসে গেছে দেশটির সামাজিক গণমাধ্যম। এই প্রোপাগাণ্ডা যেমন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উষ্কে দিচ্ছে, তেমনি বিরুদ্ধ মতের সাংবাদিক, বিরোধী রাজনীতিক ও ব্যক্তিদের ওপর হামলা বা যৌন নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি করছে। কিন্তু কারা এই প্রোপাগাণ্ডাকারী? কেন তারা এসব করছে, তাদের কাজগুলোই বা কি? আর, কিভাবেই বা সংগঠিত হয়েছে তারা?
দু’বছরের বেশি সময় ধরে এ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে অবশেষে এসব অন্ধকারের জীবদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন সাথি চতুর্বেদি। অনলাইনে যারা প্রোপাগাণ্ডা ছড়ায় তাদেরকে বলা হয় ট্রল। আর লেখিকার মতে ভারতের যেসব ট্রলের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে হবে তারা হলো: ডান-পন্থী ট্রল।
এরা বিপজ্জনক। এরা যৌনকাতর ও স্ত্রীবিদ্বেষী। এরা মোহাচ্ছন্ন। ভারতের সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে এখন ডানপন্থী ট্রলদের উপচে পড়া ভীড়। এদের সারাদিনের কাজ হলো ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো; সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা উষ্কে দেয়া, নারী সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের যৌন হয়রানির এবং বিরোধী রাজনীতিক, সমালোচক ও সরকার বা সরকারি দলের বিরুদ্ধে কথা বলে এমন যে কাউকে হত্যার হুমকি।
তারা যেসব কাজ করছে তা যে দলকে ভালোবেসে করছে তা নয়। দলের আদর্শেও হয়তো তাদের বিশ্বাস নেই। তারা করছে কারণ তাদেরকে তা করতে বলা হয়েছে। তারা এ কাজের জন্য টাকা পাচ্ছে। ট্রলিং হলো তাদের রুটি-রুজির উৎস।
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এরা সবাই ওয়াকিফহাল। তারা জানে এই দেশে ভিন্নমত কোনভাবেই সহ্য করা হয় না। শক্তি প্রয়োগ করে তক্ষুনি তা অবদমন করা হয়। কেন্দ্রের বর্তমান বিজেপি সরকার কোনভাবেই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না বা প্রমাণসহ সমালোচনার জবাব দেয়ার সাধ্যও তাদের নেই।
চোখের পলকে তথ্য জানা ও জানানোর শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে সামাজিক গণমাধ্যম আবির্ভুত হওয়ার পরপরই বিজেপি এর অপার সম্ভাবনাটি বুঝতে পেরেছিলো। একই সঙ্গে তারা এই গণমাধ্যমটি পুঁজি করতে শুরু করে। সাংবাদিক সাথি চতুর্বেদি ঠিক এই কথাটিই বলেছেন তার – আই এম এ ট্রল: ইনসাইড দ্যা সিক্রেট ওয়ার্ল্ড অব দ্যা বিজেপি’র ডিজিটাল আর্মি (আমি এক ট্রল: বিজেপি’র ডিজিটাল আর্মির গোপন জগতের অন্তপুর) বইয়ে।
লেখিকা দেখিয়েছেন আর কোন রাজনৈতিক দল বা তার সদস্যরা অনলাইনে এতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা, কল্যাণধর্মী কাজ বিস্তারের বদলে সামাজিক গণমাধ্যম ব্যবহারের বদলে সরকার তার ট্রল বাহিনী দিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ছড়ানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছে।
অনলাইনে এই দুষ্ট ট্রলিংয়ের শিকার হয়ে চতুর্বেদি এই জগতের গভীরে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উদঘাটন করেন কারা এই শক্তি, তাদের কাজের ধরনটিই বা কেমন।
এই প্রবণতার প্রতিটি ‘হ্যাসট্যাগ’ একেকটি গল্প। রাতারাতি জন্ম নেয়া প্রতিটি সাম্প্রদায়িক ইস্যুর পেছনেই একটি সুসংঘবদ্ধ প্রচারণা রয়েছে। লেখিকার এ কাজে বিজেপি’র এই ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ও দুষ্ট প্রচারণা সম্পর্কে একমাত্র সধবি খোসলা নামে এক সাবেক স্বেচ্ছাসেবক প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হন। বিজেপি’র সোস্যাল মিডিয়া সেল-এ তার কাজের অভিজ্ঞতা বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। খোসলা বলেন কিভাবে এই ভার্চুয়াল জগতের বিদ্বেষ বাস্তব জগতকে ছাপিয়ে যায়, আর সহিংসতা উষ্কে দেয়। সরকার তখন নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে ট্রল লেখিকার কাছে বিজেপি’র সোস্যাল মিডিয়া ইউনিট নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।
চতুর্বেদি ধৈর্য্য নিয়ে ট্রলদের পর্যবেক্ষণ করেন এবং অনলাইনে তাদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। অতি সতর্কতার সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তিনি দেখান কিভাবে বিজেপি এই ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এরা সবাই প্রধানমন্ত্রীর আশির্বাদপুষ্ট।
প্রাঞ্জল ভাষা ও প্রচুর ছবির কারণে যারা সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে পরিচিত নয় তাদের জন্যও বইটি সহজে পাঠযোগ্য।
সাথি চতুর্বেদি
আই এম এ ট্রল: ইনসাইড দ্যা সিক্রেট ওয়ার্ল্ড অব দ্যা বিজেপি’র ডিজিটাল আর্মি
পেপারব্যাক, ১৯২ পৃষ্ঠা
প্রকাশ: জানুয়ারি ২০১৭, প্রকাশক: জগন্নাথদেব বুকস
মূল্য: ২৫০ রুপি

Thursday, May 21, 2020

কোয়েলের ডিমের যত গুণ

মুরগির ডিমের চাইতেও বেশি প্রোটিন থাকে কোয়েলের ডিমে। এই ডিমে প্রোটিন ছাড়া আরও মিলবে ফসফরাস, আয়রন, কার্বোহাইড্রেট, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, জিঙ্ক, ফলেট, ভিটামিন এ, ই, ডি এবং বি-১২। জেনে নিন কোয়েলের ডিম খেলে কী কী উপকার পাবেন।
কোয়েলের ডিম
  • *উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় কোয়েলের ডিমে থাকা পটাশিয়াম।
  • *কোয়েলের ডিমে থাকা প্রোটিনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান শারীরিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
  • *রক্তের দূষিত পদার্থ দূর করে।
  • *কোয়েলের ডিমে ওভোমুকোয়েড প্রোটিন আছে। এটি শরীরের প্রাকৃতিক অ্যান্টি অ্যালার্জিক হিসেবে কাজ করে।
  • *রক্তশূন্যতা দূর করে।
  • *কিডনি ও লিভার ভালো রাখে। কোয়েলের ডিমে থাকা একটি উপাদান ‘লেসিটিন।’ এই উপাদানটি কিডনিতে পাথর হওয়া রোধ করে।
  • *এতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ঠাণ্ডাজাতীয় সমস্যা থেকে পরিত্রাণ দেয়।
  • *এতে থাকা ভিটামিন ও ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখে। 
জেনে নিন
যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি তারা অতিরিক্ত কোয়েলের ডিম খাবেন না। কোনও ধরনের এলার্জি বা শারীরিক সমস্যা হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খাবেন ডিম।
>>>তথ্য: বোল্ডস্কাই

কলকাতার মধ্যরাতের জাদু

কলকাতার আইকনিক স্টুয়ার্ট হগ মার্কেটের আঙিনায় তখন মধ্যরাত। সকালে যে জায়গাটায় হকার আর খদ্দেরদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে তোলপাড় থাকে, সেই স্থানটি মধ্যরাতে হয়ে গেল গণবিছানা। সেখানকার কর্মীসহ স্থানীয়রা কার্ডবোর্ড, কম্বল, সংবাদপত্র – যে যা পেরেছে, তাই বিছিয়ে বিছানা বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
রাস্তার বাতিগুলো উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। প্রাইভেসি বলতে এখানে কিছুই নেই।
এই দৃশ্য দেখার মজাই আলাদা। আর এ কারণেই গভীর রাতে ভারতীয় মহানগরীগুলোর দৃশ্য দেখার আয়োজন বাড়ছে।
এই উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন অ্যান্থনি খাতচুতুরিয়ান। উপনিবেশ আমলের কলকাতার এক নির্মাতার নাতি তিনি। নগরীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হেঁটে হেঁটে দেখানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এসব স্থাপনার আপিল কোনো দিনই ফুরাবার নয়।
আইডিয়াটি কলকাতার লোকজনকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে। খরচও বেশি নয়। মাথাপিছু মাত্র ১৫ ডলার। বেসরকারি অনেক কোম্পানি এখন নৈশ অভিযানে নিয়ে যাচ্ছে পর্যটকদের। এসব কোম্পানির একটি হলো লেট আজ গো। এই ট্যুরে সবচেয়ে বেশি যে লাভটি হয় তা হলো নগরীর ইতিহাসে আরো সহজে প্রবেশ করা যায়।
আগ্রহী অংশগ্রহণকারীরা শেষ রাতের শ্রমিকদের ঠিক বিপরীত দিক দিয়ে চলে এই আগ্রহী পর্যটকেরা। এই সময় রাস্তা থাকে ফাঁকা। ফলে নির্জন রাস্তায় চলার আলাদা মজাও পাওয়া যায়।
এই পর্যটনের একটি বিখ্যাত যাত্রাবিরতি ঘটে আর্ট ডেকো স্টেটসম্যান হাউজে। একসময় এখান থেকেই কিংবদান্তিপ্রতীম সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হতো।এখন ভবনটি আগের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর আছে অল ইন্ডিয়া রেডিওর একসময়ের অফিস ভবনটি। পাশেই আছে সেন্ট জন্স চার্চ। এই চার্চের ঘন্টা কথা বলে পর্যটকদের সাথে। রেডিও অফিস ভবনটির অস্তিত্ব নেই, তবে একটি বটবৃক্ষ এখনো মৃদুমন্দ বাতাস দিয়ে অতীত দিনের স্মৃতি জানিয়ে রাখছে। এই ভবনেই এক বিখ্যাত পিয়ানো বাদকের মৃত্যু ঘটেছিল। এখনো নাকি তিনি তার বাজনা থামাননি। অ্যান্থনি খাতচুতুরিয়ান জানিয়েছেন, তার প্রথম দিকের এক ট্যুরে হঠাৎ করে দুই নারী দৌড় দিয়েছিলেন। তাদের একজন আবার কাঁদছিলেন। দুজনই দাবি করেছেন, তারা পিয়ানো মিউজিক শুনেছেন।
তিনি জানান, মজার ব্যাপার হলো, ওই পিয়ানোবাদক যে এখানে মারা গিয়েছিল, তা কিন্তু তখনো ওই দুই নারী জানতেন না। পরে তারা শুনেছিলেন ঘটনাটি।

রাতের সফরে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশই উপনিবেশ আমলের ভবনগুলোতে ঢু মারতে যান। আর এসব অফিস নিশুতি রাতে থাকে সুনশান। তাদের সফর তালিকায় ব্ল্যাক হোলও থাকে। ব্রিটিশরা বলেছিল, এখানে বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বদ্ধঘরে আটকিয়ে ১৪৩ জন ইংরেজকে দম বন্ধ করে মেরেছিলেন। আজো সফরের সময় এটিও পর্যটকদের মনে দাগ কাটে।
মধ্যরাতের সফরে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই ভুতুরে কাহিনীর ঝাপি মেলে ধরেন। প্রায় সবারই নিজেদেরই ভূত দেখার অভিজ্ঞতা আছে কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে কাহিনী শুনেছে। আবার অনেকে ব্ল্যাক হোলে গিয়েও ভুতুরে কাণ্ডকারখানার সাথে পরিচিত হন।
কলকাতায় অবশ্য রাতের বেলায় নয়, দিনের বেলাতেও ভূতের অস্তিত্ব অনুভব করা যায়। পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে দিনের বেলাতেও থাকে ভীতিকর নীরবতা। এই কলকাতা ১৯১১ সাল পর্যন্ত ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। ওই আমলে করা কলকাতা হাইকোর্ট, রাজভবন, রাইটার্স বিল্ডিং এখনো আগের দিনের কথা সামনে নিয়ে আসছে।
ওই আমলের অনেক ভবন পরিত্যক্ত হয়ে হয়ে এখন বট গাছের আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
খাতচুতুরিয়ান জানান, অনেকেই এসব ভবনে ভূতের দেখা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তারা এসব কাহিনী বেশ জোর দিয়ে বলেও থাকেন।
বাঙালিদের মধ্যে ভূতের গল্প বেশ প্রচলিত। গল্পকাহিনীতে ২৫ ধরনের ভূতের দেখা মেলে। এসব কাহিনী নিয়ে অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে আসছে।
হেরিটেজ ওয়াক কলকাতার মালিক ড. তথাগত নিয়োগি ও তার স্ত্রী চেলসি ম্যাকগিলের মতে, কলকাতার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ভালোবাসা এই নগরীকে অতিপ্রাকৃতি পর্যায়ে এনে দিয়েছে।
এসব কাহিনী শুনতে শুনতেই অনেক সময় সফর শেষ হয়ে যায়। ভোরের আলো তখন ফুটে ওঠে। ভূত থাকুক বা না থাকুক, ভূতুরে এই সফর আপনাকে নিশ্চিতভাবেই আনন্দ দেবে। অজানাকে জানার আনন্দে আপনার মন ভরে ওঠবে।

করলার পুষ্টিগুণ

তিতকুটে করলা খেতে অনেকেই পছন্দ করেন না। তবে জানেন কি সুস্বাস্থ্যের জন্য করলা খাওয়া কতোটা জরুরি? করলায় রয়েছে প্রোটিন, আয়রন, ফাইবার, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, সোডিয়াম, জিঙ্ক, কপারসহ আরও অনেক ভিটামিন ও মিনারেল। জেনে নিন নিয়মিত করলা খাবেন কেন।
  • রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে করলায় থাকা অ্যান্টিডায়াবেটিক উপাদান। প্রতিদিন করলার রস পান করলে রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।
  • মেদ দূর করতে সাহায্য করে করলা।
  • উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমায় করলা। নিয়মিত করলা খেলে রক্তে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টরলের মাত্রা কমে। করলায় রয়েছে প্রচুর মাত্রায় আয়রন এবং ফলিক অ্যাসিড। এই দুটি উপাদান কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর পাশাপাশি শরীরের লবণের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
  • লিভার ভালো রাখে এই সবজি।
  • করলায় থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান ও ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। অ্যালার্জি এবং সংক্রমণের প্রকোপ কমাতেও সাহায্য করে এটি।
  • লিভার, স্তন ও কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমে নিয়মিত করলা খেলে।

যৌথ পরিবারের একাল-সেকাল

যৌথ পরিবার
আত্মকেন্দ্রিক ও নিজেদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ায় ভাঙছে যৌথ পরিবার। বড় পরিবার ভেঙ্গে ছোট পরিবারে রূপ নেওয়ায় শিথিল হচ্ছে সম্পর্কের বন্ধন। সময় বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে মূল্যবোধ। সেই সঙ্গে বদলাচ্ছে সমাজের অনুশাসন। আগে যৌথ পরিবারগুলো যখন এক ছিল তখন সবাই নিজেদের স্বার্থ পরিত্যাগ করে এক থাকার চেষ্টা করে গেছেন বছরের পর বছর। পরিবারের সন্তানরা দাদা-দাদি, চাচা-চাচিদের কাছে বড় হয়েছে। কিন্তু এখন যৌথ পরিবার থেকে বেরিয়ে আসা চাকরিজীবী বাবা-মায়ের সন্তানরা কাজের লোক কিংবা চাইল্ড কেয়ারে বড় হচ্ছে। অনেকেই বৃদ্ধ মা-বাবাকে ওল্ড হোমে রেখে আসছেন। পেশাগত কারণেও যৌথ পরিবার পৃথক হচ্ছে। যৌথ পরিবারে বড় পাতিলে রান্না, একসঙ্গে খাওয়ার মতো অসাধারণ ব্যাপারগুলো এখন শুধুই স্বপ্ন। প্রতিবেদনে বাংলা ট্রিবিউনের রাজশাহী প্রতিনিধি দুলাল আবদুল্লাহ তুলে ধরেছেন ৪৬ বছর একসঙ্গে থাকা একটি যৌথ পরিবারের কথা। চট্টগ্রাম প্রতিবেদক হুমায়ুন মাসুদ লিখেছেন এক সময়ের ঐহিত্যবাহী দোভাষ পরিবারের জৌলুস হারানোর গল্প। আর সিলেট প্রতিনিধি তুহিন আহমেদ বলেছেন ৩৩ সদস্যের এক যৌথ পরিবার ভাগ হয়ে যাওয়ার গল্প।
৪৬ বছর যৌথ পরিবারে রাজশাহীর রথ বাড়ি
স্বাধীনতার পরপরই রাস বিহারী সরকারের মৃত্যু হয়। অনেক জমিজমা ও সম্পদসহ সাত ছেলের জন্য রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানা ভবনের পাশে পাঁচ কাঠা জায়গায় রেখে গেছেন একটি বাড়ি। সেই বাড়িতে ৪৬ বছর ধরে এখনও এক হাঁড়িতে পরিবারের সদস্যদের জন্য রান্না হয়। শুধু তাই নয়, পরিবারের সবার চিন্তা ও মতামতকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। এ কারণে শহরের মধ্যে এই রথ বাড়িতে যৌথ পরিবারটি টিকে রয়েছে। কীভাবে সম্ভব হয়েছে জানতে চাইলে রথ বাড়ি পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান বিমল কুমার সরকার বলেন, ‘বাবা-মা ও বড় ভাই মারা যাওয়ার পরও আমরা সবাই একসঙ্গে থাকার মূলমন্ত্র হচ্ছে- ব্যক্তি শাসনতন্ত্র প্রথাকে এড়িয়ে চলেছি। কেউ বেশি আয় করে। আবার কেউ কম করে। এ নিয়ে কারও মধ্যে কোনও হিংসা-প্রতিহিংসা তৈরি করি না। বাড়ির বৌ’দের সেভাবে গড়ে তুলেছি। কারণ তারা তো অন্য পরিবারের সদস্য। তাদের মধ্যে আমাদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটতে নাও পারে। সেজন্য তাদের আমরা যৌথ পরিবারের ভালো দিকগুলো তুলে ধরে আমাদের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি। যদি আমরা কোনোদিন দেউলিয়া না হই, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাজে প্রভাব না পড়ে তাহলে ভবিষ্যতেও এভাবেই যৌথ পরিবার নিয়ে বসবাস করে যাবো। আমাদের পরিবারে কাজের বুয়াসহ ২৫ জনের রান্না এক সঙ্গে হয়।’ বাড়ির নামকরণ ‘রথ’ রাখা হলো কেন- এমন প্রশ্নে বিমল কুমার সরকার জানান, স্বাধীনতার পর থেকে বিনা খাজনায় আমাদের পরিবার রাজশাহীতে রথমেলা করে থাকে। এজন্য বাড়ির নামটা রাখা হয়েছে রথ বাড়ি।
নগরীর আলুপট্টি এলাকার শফিউল ইসলাম বকুল জানান, দুই ছেলে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে আমাদের পরিবার। দুই বোন বিদেশে থাকে। তাই সংসারটা তেমন বড় নয়। তবে বর্তমানে যৌথ পরিবারের প্রথা আবার ফিরে আসছে। কারণ সবাই এখন ব্যস্ত জীবনযাপন করছে। এতে পরিবারের সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যৌথ পরিবার ভূমিকা রাখতে পারে। স্বামী-স্ত্রী দুইজন চাকরি করেন। আর সন্তানকে কাজের লোকের কাছে রেখে যান। কিন্তু যৌথ পরিবার থাকলে সন্তান দাদি, নানি, চাচির কাছে রেখে যেতে পারতো। আবার দেখা যায়, অনেকের ছেলেমেয়ে বৃদ্ধ মা-বাবাকে ওল্ড হোমে রেখে আসেন। এটা হবে কেন? যৌথ পরিবার থাকলে এটা সম্ভব হতো না। তাই নিজেদের চিন্তা ও মতামতকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে আত্মত্যাগের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে যৌথ পরিবার টিকিয়ে রাখতে হবে। আর বর্তমান যুগে এটা খুব বড় প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগেও অপরাধ প্রবণতা ছিল। কিন্তু বর্তমান সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। বড়দের প্রতি সম্মানবোধ কমে গেছে। তাই এসব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। লোভ-লালসা কমিয়ে ফেলতে হবে। সমাজ ও দেশের উন্নয়নে পরিবার থেকে ভালো শিক্ষা নিয়ে আগামীর জন্য সন্তানদের গড়ে তুলতে হবে।’
গোদাগাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘নিজেদের চিন্তা ও মতামতকে যখন বেশি করে গুরুত্ব দেওয়া হয় তখনই যৌথ পরিবার ভেঙে যায়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর বেড়ে যায়। আবার পেশাগত কারণেও যৌথ পরিবারে ভাঙন তৈরি হয়। এতে একে-অপরের মধ্যে সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, মূল্যবোধ, নৈতিকতার অভাব হয়। বর্তমানে যৌথ পরিবারের অভাবে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
ছয় ভাই ও চার বোনের যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠেছেন সহকারী অধ্যাপক মহিশাল বাড়ী এলাকার মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার চাচারা ছিলেন সাতজন। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন চাচাদের ভয়ে কোন অপরাধমূলক কাজে জড়ানোর সাহস পেতাম না। তারা যদি আমার ভুল ধরে বকা দেন। আর বর্তমানে ছোট ছোট পরিবার হওয়ার কারণে ছেলেমেয়েদের মধ্যে ব্যক্তি স্বাধীনতা বেড়ে গেছে। পরিবারের ছোট সদস্যরাও এতে করে বড়দের সামনে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখায়। এমনকি যৌথ পরিবার প্রায় বিলুপ্তির কারণে চাচাদের কাছ থেকেও এখন পরিবারের সদস্যরা সহযোগিতা পায় না।’
চট্টগ্রামের দোভাষ পরিবারে নেই আগের জৌলুস
এক সময় ফিরিঙ্গি বাজারসহ পুরো চট্টগ্রামে যাদের ছিল আধিপত্য, ঐতিহ্যবাহী সেই দোভাষ পরিবার এখন হারাতে বসছে জৌলুস। খান বাহাদুর আব্দুল হক দোভাষ ছিলেন জমিদার। তার হাত ধরেই নগরীর ফিরিঙ্গি বাজারে গড়ে উঠে ঐতিহ্যবাহী দোভাষ পরিবারের গোড়াপত্তন। পরবর্তীতে এই পরিবারের নিয়ন্ত্রণে আসে তৎকালীন চট্টগ্রাম নগরীর রাজনীতি। তার একমাত্র ছেলে ছিলেন নবী দোভাষ। আব্দুল হক দোভাষের মৃত্যুর দুই বছরের মাথায় মারা যান নবী দোভাষ। এরপরই মূলত ছোট পরিবারে রূপ নেয় দোভাষ পরিবার। বাবার মৃত্যুর পর নবী দোভাষের তিন ছেলে শাহ আলম দোভাষ, জানে আলম দোভাষ ও বদিউল আলম দোভাষ আলাদা হয়ে যান। তখন ঐতিহ্যবাহী দোভাষ পরিবার ঝিমিয়ে পড়ে। অবশ্য পরে আবার জৌলুস ফিরিয়ে আনেন জানে আলম দোভাষ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে রাজনীতি শুরু করেন জানে আলম দোভাষ। তার হাত ধরে জৌলুস ফিরে আসে দোভাষ পরিবারে। সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে রাজনীতি শুরুর পর ধীরে ধীরে বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন হয়ে উঠেন জানে আলম। আর তখন থেকে নগরীর রাজনীতির আঁতুড় ঘরে পরিণত হতে থাকে দোভাষ পরিবার।
জানে আলম দোভাষ মারা যাওয়ার পর দোভাষ পরিবারের সেই জৌলুস আবার কমতে শুরু করে। পরে এই পরিবারের ভাই বোনদের মাঝে সম্পদ ভাগাভাগির কারণে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে তৈরি হয় ছোট পরিবার। জানে আলম দোভাষের বাবা নবী দোভাষের মৃত্যুর পর দোভাষ পরিবার ভেঙ্গে রূপ নেয় চারভাগে। তিন ভাই ও এক বোন আলাদা হয়ে যান। জানে আলম দোভাষ এক ছেলে ও তিন মেয়ে রেখে যান।
পরবর্তীতে জানে আলম দোভাষের পরিবার ভেঙ্গে রূপ নেয় চার পরিবারে। অন্যদিকে তার দুই ভাইয়ের একজন শাহ আলম দোভাষ রেখে যান দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। শাহ আলমের মৃত্যুর পর তার পরিবার ভেঙ্গে রূপ নেয় ৮ পরিবারে। জানে আলমের আরেক ভাই বদিউল আলম দোভাষ এখনও বেঁচে আছেন। তার দুই ছেলে রয়েছে। এক সময়কার দোভাষ পরিবার এখন ১৩ পরিবারে পরিণত হয়েছে।
সবাই যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত
সিলেট নগরের সাদারপাড়ার বাসিন্দা ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম চৌধুরীর পরিবারে ছয় ভাই-বোনসহ সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৩ জন। এছাড়া কৃষিসহ গৃহস্থালি দেখাশোনার জন্য নারী-পুরুষসহ ছিলেন আরও সাতজন। নিজস্ব কৃষি জমিতে ধান চাষ করে তাতেই চলতো পুরো বছর। জমিতে চাষ হতো নানা ফসল। কিন্তু সেই যৌথ পরিবার এখন আর নেই। যৌথ পরিবারে বড় হওয়া নজরুল ইসলামরা প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যার যার মতো করে বাসা তৈরি করে আলাদা হয়ে গেছেন। এখন সবাই যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। একই দেয়ালের ভেতরে সবাই বসবাস করলেও সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া একে-অন্যের সঙ্গে তেমনভাবে দেখা হয় না।
এ বিষয়ে ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আসলে যৌথ পরিবার বড় হতে থাকলে আলাদা হওয়াটা উত্তম। এতে পরিবারের কর্তাদের উপর অনেক চাপ কমার পাশাপাশি ব্যয়ও কমে যায়। দাদা-বাবাদের রেখে যাওয়া যৌথ পরিবারটি এক রাখার নিরন্তর চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু সময়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে যৌথ পরিবারের মধ্যে থাকাটা খুবই আনন্দের যা বলে শেষ করা যায় না। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘যৌথ পরিবারে গৃহবধূরা একসঙ্গে বড় বড় পাতিলে রান্না করতেন। সবাই একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়াটা ছিল অসাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এগুলো আর নেই। এসব বিষয় এখন অনেকটা স্বপ্নের মতো। এককথায় যৌথ পরিবারের মধ্যে আনন্দের মাখামাখি ছিল খুব বেশি।’
ওই পরিবারের গৃহিণী সেলিনা চৌধুরী জানান, যৌথ পরিবারের মধ্যে বসবাস করা যেমনটি আনন্দের তেমনি পরিবার যখন বড় হয়ে যায় তখন এর দায়িত্ব বহন করা এবং পরিচালনা অনেক কষ্টকর হয়ে যায়। এছাড়া যৌথ পরিবারের মধ্যে থাকতে হলে প্রথমেই পরিবারের সদস্যদের একই মন মানসিকতা থাকতে হবে। সবাইকে ছোট-বড় ভুলগুলো ছাড় দেওয়ার উদারতা থাকতে হবে। তবে যৌথ পরিবার বড় হয়ে গেলে আলাদা হওয়াটা অনেক ক্ষেত্রে উত্তম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এসএম শওকত আমিন তৌহিদ বলেন, ‘যৌথ পরিবার ভাঙার পেছনে নগরায়ন একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া সবচেয়ে মারাত্মক কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশি চ্যানেলগুলো যেমন স্টার জলসা, জি বাংলা। এসব কারণেই যৌথ পরিবারগুলোর এক থাকা খুবই কষ্টকর। এসব চ্যানেল শুধু পরিবার ভাঙা দেখায় যৌথ থাকতে দেখায় না। এই চ্যানেলগুলোতে যা কিছু প্রচার করা হয় সবই পরিবারকেন্দ্রিক। এসব চ্যানেল যখন ছিল না তখন আমাদের দেশের পরিবারগুলোর মধ্যে খুবই আন্তরিকতা আর সহমর্মিতা ছিল। আমাদের দাদা-বাবারা যেভাবে যৌথ পরিবার দুঃখ দুর্দশার মধ্যে টেনে নিয়েছেন বছরের পর বছর- এখন আর সেটা নেই। সবাই যার যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। মনে করেন আলাদা হলেই জীবনব্যবস্থা আরও উন্নত হবে। আমি মনে করি এটা সর্ম্পণ ভুল ধারণা।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এখন একই পরিবারের মধ্যে বসবাস করেও কেউ কারও ভালো চায় না। সন্তানদের পড়ালেখাসহ নানা বিষয়ের অজুহাতে এখন যৌথ পরিবার তেমন দেখা যায় না। সবাই মিলেমিশে থাকাটা এখন স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে। এজন্য জাতিসংঘ আন্তর্জাতিকভাবে পরিবার দিবস উদযাপন করে।’ তিনি আরও বলেন, মুল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই বৃদ্ধ মা-বাবাকে সন্তানরা বৃদ্ধাশ্রমে রাখছেন। যদি যৌথ পরিবারগুলো একই ছাদের নিচে থাকতো তাহলে এই সমস্যা প্রকট হতো না। সবাই মিলেমিশে থাকার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে তা আলাদা হয়ে গেলে আর থাকে না। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যৌথ পরিবার এক থাকলে তা কতটুকু শক্তি সঞ্চার করে তা বলে শেষ করা যাবে না।’

পশ্চিম তীরকেও ইসরায়েলের মানচিত্রে ঢোকাতে চান নেতানিয়াহু

লাস্ট আপডেট- ৭ এপ্রিল ২০১৯: ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুননির্বাচিত হলে পশ্চিম তীরের সব ইহুদী বসতিকে ইসরায়েলের অংশ করে নেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার ইসরায়েলে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচনে মিস্টার নেতানিয়াহুকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে দক্ষিণপন্থী দলগুলোর সঙ্গে - যারা চায় পশ্চিম তীরের অংশবিশেষ ইসরায়েল নিজের সীমানার মধ্যে ঢুকিয়ে নিক।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েল যেসব ইহুদী বসতি গড়ে তুলেছে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেগুলো অবৈধ। তবে ইসরায়েল তা মনে করে না।
ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সিরিয়ার কাছ থেকে যে গোলান মালভূমি দখল করে নেয়, সেটিকে নিজের সীমানায় ঢুকিয়ে নিয়েছিল আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে। গতমাসে যুক্তরাষ্ট্র গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের ভূমি বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
পশ্চিম তীরের ইহুদী বসতিগুলোতে প্রায় চার লাখ ইহুদীকে স্থায়ীভাবে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে ইসরায়েল। পূর্ব জেরুসালেমেও একই ভাবে ২০ হাজার ইহুদীর জন্য বসতি গড়ে তোলা হয়েছে।
পশ্চিম তীরে থাকে প্রায় ২৫ লাখ ফিলিস্তিনি। যে ভবিষ্যত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে ফিলিস্তিনিরা, সেটি হওয়ার কথা পশ্চিম তীর এবং গাজা ভূখন্ড নিয়ে। আর তাদের রাজধানী হওয়ার কথা পূর্ব জেরুসালেম।
ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘাত নিরসনে যে কোন শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত একটি ইস্যু হচ্ছে পশ্চিম তীরের এসব বিতর্কিত ইহুদী বসতি।
পশ্চিম তীরে গড়ে তোলা ইহুদী বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ।
ফিলিস্তিনিরা মনে করে, এই ইহুদী বসতিগুলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে অন্যতম বাধা। এগুলো একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারটিকে রীতিমত অসম্ভব করে তুলেছে।

কী বলেছেন নেতানিয়াহু

একটি ইসরায়েলি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে জিজ্ঞেস করা হয় কেন তিনি পশ্চিম তীরের বিরাট ইহুদী বসতির পর্যন্ত ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন না।
জবাবে তিনি বলেন, "আপনি জানতে চাইছেন আমরা পরবর্তী ধাপে যাচ্ছি কীনা। আমার উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, আমরা পরবর্তী ধাপের দিকে যাবো।আমি ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করবো এবং আমি গুচ্ছ বসতি এবং বিচ্ছিন্ন বসতির মধ্যে কোন তফাৎ করি না। "

ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া কী?

একজন সিনিয়র ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা সায়েব এরেকাত বলেছেন, ইহুদী বসতির প্রশ্নে মিস্টার নেতানিয়াহু যে অবস্থান নিয়েছেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
তিনি বলেন, "যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্টের ট্রাম্প প্রশাসন, ইসরায়েলকে যা খুশি তা করার সুযোগ দিয়ে যাবে, ততদিন তারা নির্লজ্জভাবে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করে যাবে। যেভাবে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি জনগণের জাতীয় অধিকার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যাচ্ছে, তার জন্য ইসরায়েলকে বরং উল্টো পুরস্কৃত করা হচ্ছে।"
ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস বলেছেন, "যে ঘোষণা বা যে পদক্ষেপই নেয়া হোক, তাতে সত্য বদলাবে না। এই ইহুদী বসতিগুলো অবৈধ এবং এগুলো অপসারণ করা হবে।"
'বিস্ফোরক মন্তব্য'
বিবিসির আরব বিষয়ক বিশ্লেষক সেবাস্টিয়ান আশার বলছেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইহুদী বসতি সম্পর্কে যা বলেছেন, তা সম্ভাব্য মারাত্মক গণবিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। কারণ বহু বছর ধরে এই ইস্যুতেই শান্তি প্রক্রিয়া বার বার থমকে গেছে।
তিনি বলছেন, মিস্টার নেতানিয়াহু যেসব দলের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করতে চাইছেন, তারা এই কথা শুনে বেশ খুশি হবে। কিন্তু এটি ফিলিস্তিনিদের মারাত্মক বিক্ষুব্ধ করে তুলবে। এটি আন্তর্জাতিকভাবেও নিন্দিত হবে।
সেবাস্টিয়ান আশার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাতে হয়তো বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।

এর পেছনে রাজনীতিটা কী?

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দক্ষিণপন্থী লিকুদ পার্টির সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে নীল এবং সাদা জোটের।
কিন্তু অন্য অনেক ছোট ছোট দক্ষিণপন্থী দল আছে, যাদের সমর্থন হয়তো পরবর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। লিকুদ পার্টির ২৯ জন এমপির মধ্যে মিস্টার নেতানিয়াহু ছাড়া আর সবাই চান, ইহুদী বসতিগুলোর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে।
এতদিন পর্যন্ত মিস্টার নেতানিয়াহু ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম। এখন মনে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য তিনিও তার অবস্থান বদলাচ্ছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন বেপরোয়া করে তুলেছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে

শ্রীলঙ্কার ওয়েরেলেগামা মন্দিরে গৈরিক পোশাকধারী তরুণ প্রহরীদের মন গড়ে দিচ্ছেন এক শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

শান্তভাবে সারি বেঁধে একে একে এগিয়ে চলেছেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। লাইনের একেবারে শেষপ্রান্তে আছে সর্বকনিষ্ঠ সদস্য, সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন তার পরিধেয় বস্ত্র সংযত রাখতে। তার বয়স ৫ বছর। ভিক্ষুরা ক্যান্ডির একটি পল্লীর মঠ থেকে কলম্বোর সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও বিখ্যাত বৌদ্ধ উপাসনালয় গঙ্গারামায়া মঠে এসেছে। সন্ন্যাসীদের সামনে আছেন শ্রদ্ধেয় সূর্যগোদা জিনাসিরি হিমি। তিনি শিক্ষক ও তরুণ ভিক্ষুদের কাছে পিতৃতুল্য ব্যক্তিত্ব। তারা বৌদ্ধ মূর্তির কাছে তাদের প্রার্থনা সম্পূর্ণ করলেন। তবে তরুণ সন্ন্যাসী থেকে শিশুতে পরিণত হতে বেশি সময় লাগল না তাদের।
একজন দৌড়ে জিনাসিরি হিমির জোব্বা টেনে ধরলেন। আরেকজনও অনুসরণ করলেন তাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই ছাত্রদের দল তাকে ঘিরে ফেলল। ছুটির দিনে শিশুরা যা করে, তারাও সেটি করার সুযোগ হারাতে চাইলেন না। সাগর সৈকতে কখন তারা খেলার সুযোগ পাবেন? তারা কি নৌকায় চড়তে পারবেন? মন্দিরের শোভাযাত্রায় অংশ নেয়ার আগে তারা কি হাতিগুলো দেখার সুযোগ পাবেন? জিনাসিরি হিমি প্রশ্নগুলোর জবাব দিলেন, সবকিছুর জবাবে বললেন, হ্যাঁ।
এখানে ৫ বছর বয়সের আরেকজন আছেন। তাকে তার মা-বাবা কয়েক সপ্তাহ আগে মঠের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তিনি এখন ৪০ দিনের বৌদ্ধ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। এটি শেষ হলে তিনি পোশাক পাবেন। চেহারায় রুষ্ট ভাব তার। এক বয়স্ক সন্ন্যাসী হেসে জানালেন, এই শিশুটিও গৈরিক পোশাক পরে কলম্বো আসতে চেয়েছিল।
শ্রীলঙ্কার পার্বত্য রাজধানী ক্যান্ডির ওয়েরেলেগামা গ্রামের একটি মঠ থেকে ১৫টি শিশু এসেছে। তারা ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বার্ষিক হেরাহেরা (ধর্মীয় শোভাযাত্রা) ও পূর্ণ পোয়া দিবস উদযাপন করতে। ওই দিন বৌদ্ধ ছুটির দিন। কলম্বোর সবচেয়ে পুরনো ও জাঁকজমকপূর্ণ মঠ হলো গঙ্গারামায়া। তরুণ সন্ন্যাসীরা শ্রদ্ধায় অবনত। তাদের অনেকে এই প্রথম রাজধানী নগরীতে এসেছে।
জিনাসিরি হিমি বলেন, তার সাথে এখন ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১৫ জন ইন-হাউস প্রশিক্ষণ গ্রহণরত সন্ন্যাসী রয়েছেন। তারা রিরিভেনায় তারই ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়ন করে। ৪৭ বছর বয়স্ক জিনাসিরি হিমি বলেন, তরুণ সন্ন্যাসীদের শিক্ষা ও কল্যাণের জন্য অনেক কিছু করা উচিত।
তিনি বলেন, আমি তাদের মা, বাবা, শিক্ষক ও প্রধান সন্ন্যাসী। আমি ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালনরত থাকি। এই এক দিন আগে একজন গাছে চড়তে গিয়ে পা ভেঙে ফেলেছে। আমার সবসময় মনে থাকে যে তারা শিশু, তাদের পরিচর্যার প্রয়োজন, যত্নের সাথে তাদের পরিচর্যা করা উচিত। অনেক সময় শিশুদের মা-বাবা ও স্বজনেরা মন্দিরে আসেন। শিশুরা তাদের বাড়িতে যায়, তবে তারা তাদের নতুন বাড়ি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকে, এখানকার শিশুরা তাদের নতুন ভাইয়ে পরিণত হয়ে যায়।
জিনাসিরি হিমি বলেন, ১৯৮৮ সালে তিনি নিজে ১৩ বছর বয়সে একটি পল্লী মঠে প্রবেশ করেছিলেন। তখন সিংহলি প্রদেশগুলোতে জেভিপি মাক্সির্স্ট আন্দোলনে আক্রান্ত। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কার্যক্রমে প্রবেশের এক বছরের কম সময়ের মধ্যে একটি সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে মঠের প্রধান নিহত হন। তার মৃত্যুর পর যিনি মঠের দায়িত্ব লাভ করেন, তিনি জিনাসিরি হিমিকে পছন্দ করলেন না। তখন শুরু হলো তার বিভিন্ন মঠে গিয়ে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা চালানো। এই প্রক্রিয়ায় অনেক কষ্টের পর তিনি পেরাডেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজতত্ত্বে ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষা জীবন শেষ করেন।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শৈশবের মঠ (এই মঠটিকে তিনি গৃহ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন) ত্যাগ করে কার্যত গৃহহীন অবস্থায় থাকার স্মৃতি নিয়ে তিনি শিশুদের জন্য একটি মঠ আবাস কাম স্কুল নির্মাণের ইচ্ছাপ্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, এখানে যেসব শিশু আসে, তারা চরম গরিব। তাদের পরিবারগুলো তাদের ব্যয়ভার বহন করতে পারে না। তাদের মা-বাবার যথার্থ আয় নেই, তাছাড়া শিশুদের জন্য ক্ষতিকর অনেক বিষয়ও থাকে। অনেকের মা-বাবাও থাকে না। আবার কারো মা বা বাবা আবার বিয়ে করায় শিশুটিকে তাদের সাথে রাখতেও চায় না। তবে এই মন্দির-স্কুলে এলে তারা যথার্থ শিক্ষা পায়। সাধারণ স্কুলের সিলেবাসের পাশাপাশি তাদেরকে পালি, সংস্কৃত ও বৌদ্ধ ধর্ম শেখানো হয়। তারো অন্যান্য ধর্মীয় দর্শনও শেখে।
তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সাত শতাধিক সন্ন্যাসীকে পড়াশোনা করিয়েছেন। তাদের একটি বড় অংশই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছে। শিক্ষা সমাপ্ত করে অনেকে পুরোহিত্বও ত্যাগ করেছে। তিনি বলেন, থাকা বা না-থাকাটা ইচ্ছার ব্যাপার। শৈশবে এখানে এসে শিক্ষা গ্রহণ করার আগ্রহ থাকায় এসব শিশুকে নিয়ে আমি খুশি।
পাশ্চাত্য ও অন্যান্য দেশের বেশ কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী ইংরেজি শিক্ষা দিয়ে থাকেন শিশু সন্ন্যাসীদের। এছাড়া জিনাসিরি হিমি প্রতিষ্ঠা করেছেন টিম গ্রিন লাইফ ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তরুণ ছাত্র সন্ন্যাসীরা যাতে গ্রাম পর্যায়ের সামাজিক কার্যক্রমে জড়িত হতে পারে, সেজন্যই তিনি এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তরুণ সন্ন্যাসীদের মনে পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার ভালোবাসা সৃষ্টি করা হয়। মন্দির প্রাঙ্গনের একটি বড় অংশ ফলমূল, সব্জি ও ওষুধ গাছ লাগানোর জন্য ছেড়ে রাখা হয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে এই বাগানটি জেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কৃষি উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশে ধর্মের সাথে যখন অস্থিরতা সম্পৃক্ত, তখন জিনাসিরি হিমির বৌদ্ধ স্কুলটি তরুণ সিংহলি শিশুদের অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির লোকজনের জন্য সন্ন্যাসী হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। তার মঠের আশপাশে বেশ কয়েকটি মুসলিম পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের সদস্যরা এসব শিশু সন্ন্যাসীদের দেখাশোনা করেন, তাদের যত্ন নেন।
তরুণ সন্ন্যাসীরা সাধারণত কঠোর সময়সূচি মেনে চলে, প্রার্থনা করে। তবে রোববারগুলোতে তারা অবৌদ্ধসহ অন্য সম্প্রদায়ের সদস্যদের সাথে খেলাধুলা করে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে জিনাসিরি হিমি দেশের অন্যান্য স্থানে ঘুরতে নিয়ে যান শিশুদের। তাদেরকে দেশের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন।
ওয়েরেলগামার পাশের গ্রামের একটি স্কুলের শরত বিজেসিঙ্গে নানাভাবে জিনাসিরি হিমিকে সহায়তা কর থাকেন। তিনি বলেন, শিশুরা খুবই দুষ্টু। তিনি ৫ বছর বয়সের এক শিশু সন্ন্যাসীকে শূন্যে ছুঁড়ে দেন। শিশুটি এই খেলায় খুশিই হয়। হাসিতে ফেটে পড়ে। তবে তার পরপরই তার মনে পড়ে, সে সন্ন্যাসী। সাথে সাথে লজ্জায় জিনাসিরি হিমির পেছনে লুকায়।
অন্যরাও তার সাথে হাসি-তামাশায় মেতে ওঠে। তবে সবকিছুই ম্লান হয়ে যায় ১১ বছর বয়স্ক ক্রিকেটপ্রেমীর নাম ঘোষিত হওয়ার সময়। সন্ন্যাসী হিসেবে ভর্তি হওয়ার সময় তার নাম ছিল ভিন্ন। মন্দিরে তাদের নাম রাখার ব্যবস্থাটি বেশ ভিন্ন। এর সাথে জড়িত থাকে তাদের জন্মস্থানের ঠিকানাও। যেমন মহাসেনপুরা ধাম্মানান্দ। তার নামের প্রথম অংশটি তার গ্রামের নাম। শ্রীলঙ্কার নর্থ সেন্ট্রাল প্রদেশের পুলুনেরুয়ায় গ্রামটি অবস্থিত। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হলো, ব্যাট করার সময় সে কয়টি জানালার কাচ ভেঙেছে, তখন সে হাসি থামাতে পারল না।
মহাসেনপুরা ধাম্মানান্দের বয়স যখন ৩ তখন তাকে মঠে নিয়ে আসেন তার মা-বাবা। স্কুলে তার প্রিয় বিষয় হলো ইংরেজি। তবে সুকণ্ঠ ও বৌদ্ধ প্রার্থনা আবৃতির জন্যও সে বিখ্যাত। এসব কথাবার্তায় একটি সাবলীল পরিবেশ সৃষ্টি হলে শিশুরাও মনখুলে কথা বলতে শুরু করে। তারা একে একে তাদের প্রিয় বিষয় ও বড় হলে কী করতে চায়, সবই বলতে থাকে। বেশির ভাগই জানান, তারা বড় হয়ে হবেন বিখ্যাত সন্ন্যাসী। তবে ১২ বছর বয়স্ক কাতুকেলিয়াওয়ে মেদাননান্দ ঘোষণা করেন, তিনি হতে চান ইঞ্জিনিয়ার। আরেকটি ভিন্ন একটি প্রশ্ন নিয়ে হাত তোলেন। তিনি জানতে চান, নতুন ইংলিশ কোচিং কবে থেকে শুরু হবে।
গ্রামের স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালনকারী বিজেসিঙ্গে জানেন, শ্রীলঙ্কার স্কুলগুলোতে মৌলিক সুবিধাগুলো কত অপ্রতুল। এই প্রেক্ষাপটে তিনি স্বীকার করছেন, মঠ-স্কুলগুলো কতটা ভালো করছে তুলনামূলক। এখানে পড়াশোনাকারী শিশুরা ভালো চাকরি পায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগও পায়। আর সন্ন্যাসীর জীবন অব্যাহত রাখবে কিনা তা তাদের নিজের ব্যাপার হয়ে পড়ে।
জিনাসিরি হিমির এখন তার শিক্ষা মন্দিরটি সম্প্রসারণই বড় কথা। তিনি শ্রীলঙ্কার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা, বিশেষ করে হস্তশিল্প শেখানোর কাজটি শুরু করতে চান। এসব শিল্প দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা থেকে। এগুলো সংরক্ষণ করা খুবই প্রয়োজন।
মনের মুক্তির বৈজ্ঞানিক নীতিমালা প্রতিষ্ঠাকারী গৌতম বুদ্ধের পথ অনুসরণকারী শিশুরা এখন তাদের বাড়ি থেকে দূরে এক বাড়িতে অবস্থান করছে। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে, ভবিষ্যতে তারা কী হতে চায়।

Wednesday, May 20, 2020

যে ৭টি উপায়ে পানি বিশুদ্ধ করা যায়

পানির ওপর নাম জীবন হলেও যদি সেটা দুষিত হয় তাহলে পানিই হতে পারে নানা রোগের কারণ।
ঢাকায় প্রতিদিন যে পরিমাণ পানির চাহিদা থাকে, তার প্রায় পুরোটাই সরবরাহ করে থাকে ওয়াসা।
ভূগর্ভস্থ পানি বা নদী থেকে যে পানি আহরণ করা হয় সেটা দুই দফায় পরিশোধনের মাধ্যমে পুরোপুরি দুষণমুক্ত করা হয় ঠিকই তারপরও ঢাকার বাড়িগুলোয় এই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যায় না।
তার কারণ যে পাইপ লাইনের মাধ্যমে এই পানি মানুষের বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হয় সেখানে লিকেজ বা পুরানো পাইপের কারণে পানি দুষিত হয়ে পড়ে।
এছাড়া বাড়ির ট্যাংকগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করাও পানি দুষিত হয়ে পড়ার আরেকটি কারণ।
ঢাকাসহ সারাদেশের সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে সম্প্রতি এক জরিপ চালায় বিশ্বব্যাংক।
তাদের প্রতিবেদন থেকে জানায় যায়, বাসাবাড়িতে যে পানি সরবরাহ হয় সেখানে এই ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ প্রায় ৮২ শতাংশ।
তবে এই পানিকে চাইলে ৯টি উপায়ে শতভাগ বিশুদ্ধ করা সম্ভব।
১. ফুটিয়ে:
পানি বিশুদ্ধ করার সবচেয়ে পুরানো ও কার্যকর পদ্ধতির একটি হল সেটা ফুটিয়ে নেয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, পানি ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় ৫ থেকে ২৫ মিনিট ধরে ফোটানো হলে এরমধ্যে থাকা জীবাণু, লার্ভাসহ সবই ধ্বংস হয়ে যায়।
তারপর সেই পানি ঠাণ্ডা করে ছাকনি দিয়ে ছেকে পরিষ্কার পাত্রে ঢেকে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন ওয়াটার এইডের পলিসি ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান আবদুল্লাহ আল মুঈদ।
পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পাত্রের পরিবর্তে কাচ অথবা স্টিলের পাত্র ব্যাবহার করার কথাও জানান তিনি।
সেইসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন সেইসব পাত্র বা যে গ্লাসে পানি খাওয়া হচ্ছে সেটি যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে কিনা।
মিস্টার মুইদ জানান সেদ্ধ করা পানি বেশিদিন রেখে দিলে তাতে আবারও জীবাণুর আক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে তিনি ফোটানো পানি দুইদিনের বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দেন।
২. ফিল্টার:
পানি ফোটানোর মাধ্যমেই ক্ষতিকর জীবাণু দূর করা সম্ভব হলেও পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত থাকতে ফিল্টারের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করা যেতে পারে।
তাছাড়া যাদের গ্যাসের সংকট রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ফিল্টারে পানি বিশুদ্ধ করাই সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি।
বাজারে বিভিন্ন ধরণের ফিল্টার পাওয়া যায়। যার মধ্যে অনেকগুলো জীবাণুর পাশাপাশি পানির দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর করতে সক্ষম।
বাজারে মূলত দুই ধরণের ফিল্টার পাওয়া যায়। যার একটি সিরামিক ফিল্টার এবং দ্বিতীয়টি সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত রিভার অসমোসিস ফিল্টার।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ সিরামিক ফিল্টার ব্যবহার করে থাকে।
তবে আবদুল্লাহ আল মুঈদের মতে, এই ফিল্টার থেকে আপনি কতোটুকু বিশুদ্ধ পানি পাবেন সেটা নির্ভর করে ফিল্টারটি নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় কিনা, তার ওপরে।
৩. ক্লোরিন ট্যাবলেট বা ব্লিচিং:
পানির জীবাণু ধ্বংস করতে ক্লোরিন বহুল ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক।
যদি পানি ফোটানো বা ফিল্টার করার ব্যবস্থা না থাকে তাহলে পানি বিশুদ্ধিকরণ ক্লোরিন ট্যাবলেট দিয়ে পানি পরিশোধন করা যেতে পারে।
সাধারণত দুর্গম কোথাও ভ্রমণে গেলে অথবা দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে বা জরুরি কোন অবস্থায় ট্যাবলেটের মাধ্যমে পানি শোধন করা যেতে পারে।
সাধারণত প্রতি তিন লিটার পানিতে একটি ট্যাবলেট বা ১০ লিটার পানিতে ব্লিচিং গুলিয়ে রেখে দিলে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যায়।
এভাবে পরিশোধিত পানিতে কিছুটা গন্ধ থাকলেও সেটা পরিষ্কার স্থানে খোলা রাখলে বা পরিচ্ছন্ন কোন কাঠি দিয়ে নাড়াচাড়া করলে গন্ধটি বাতাসে মিশে যায় বলে জানান আবদুল্লাহ আল মুঈদ।
৪. পটাশ বা ফিটকিরি:
এক কলসি পানিতে সামান্য পরিমাণ ফিটকিরি মিশিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা রেখে দিলে পানির ভেতরে থাকা ময়লাগুলো তলানিতে স্তর হয়ে জমে।
এক্ষেত্রে পাত্রের উপর থেকে শোধিত পানি সংগ্রহ করে তলানির পানি ফেলে দিতে হবে। অথবা পানি ছেকে নিয়ে সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন মিস্টার মুঈদ।
৫. সৌর পদ্ধতি:
যেসব প্রত্যন্ত স্থানে পরিশোধিত পানির অন্য কোনও উপায় নেই সেখানে প্রাথমিক অবস্থায় সৌর পদ্ধতিতে পানি বিশুদ্ধ করা যেতে পারে।
এ পদ্ধতিতে দুষিত পানিকে জীবাণুমুক্ত করতে কয়েকঘণ্টা তীব্র সূর্যের আলো ও তাপে রেখে দিতে হবে।
এতে করে পানির সব ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়ে যায়।
জরুরি অবস্থায় দূষিত পানি জনিত রোগ ঠেকাতে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
৬. আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি:
পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানি জীবাণু মুক্ত করার জন্য অতিবেগুনি বিকিরণ কার্যকরী একটা পদ্ধতি।
এতে করে পানির সব ধরণের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়।
বাজারের বেশ কয়েকটি আধুনিক ফিল্টারে এই আল্ট্রাভায়োলেট পিউরিফিকেশন প্রযুক্তি রয়েছে।
তবে ঘোলা পানিতে বা রাসায়নিক-যুক্ত পানিতে এই পদ্ধতিটি খুব একটা কার্যকর নয়। তাছাড়া এই উপায়টি কিছুটা ব্যয়বহুলও।
৭. আয়োডিন:
এক লিটার পানিতে দুই শতাংশ আয়োডিনের দ্রবণ মিশিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখলেই পানি বিশুদ্ধ হয়ে যায়।
তবে এই কাজটি শুধুমাত্র দক্ষ কারও মাধ্যমে করার পরামর্শ দিয়েছেন মিস্টার মুঈদ। কেননা পানি ও আয়োডিনের মাত্রা ঠিক না থাকলে সেই পানি শরীরের ক্ষতি করতে পারে।

বসনিয়ার মুসলিম ও বলকানের কসাই সমাচার by মু. ওমর ফারুক আকন্দ

ইউরোপ মহাদেশের বলকান অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। অড্রিয়াটিক উপসাগরের তীরে ত্রিভুজ আকৃতির দেশটির আয়তন ৫১ হাজার ১২৯ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা ৩৫ লাখ দুই হাজার ৬৩৬ জন। রাজধানী সারায়েভো।
অতীতে এটি যুগোস্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রের একটি অংশ ছিল। ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। প্রাচীনকালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে বলা হতো ইলিরিকাম। পূর্ব ইউরোপের জাতি সার্বরা সপ্তম শতাব্দীতে ওই অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বসনিয়া হাঙ্গেরির কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় এবং এর পরের ২৬০ বছরের মধ্যে এটি স্বাধীন খ্রিষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৪ শতকে রাজপুত্র শাসিত বসনিয়া দক্ষিণের ডিউক শাসিত হার্জেগোভিনার সাথে মিলে একটি ক্ষণস্থায়ী মধ্যযুগীয় রাজ্য গঠন করেছিল। তারপর ১৫ শতকে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ বসনিয়াকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তারপর উনিশ শতকের শেষ দিকে রাশিয়ার সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যের যুদ্ধের ফলে দেশটি উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অস্টীয়-হাঙ্গেরি রাজ্যের অধীনে চলে যায়। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি যুগোস্লাভিয়ার অংশ ছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষে বসনিয়া স্বাধীনতা লাভ করে।
পরবর্তীতে বলকানে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সম্প্র্রসারণের ফলে ওই অঞ্চলে ভিন্ন সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ধর্মীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠে। আনুমানিক সাড়ে ৪০০ বছর বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসন ছিল। ওই সময় অনেক খ্রিষ্টান স্লাব মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে। বসনিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় ধীরে ধীরে প্রভাবশালী হতে থাকে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের পক্ষে তারা দেশ শাসন করতে থাকে। উসমানীয় সাম্রাজ্যে সঙ্কুচিত হতে থাকলে উনিশ শতকে বলকানের অন্য মুসলিমরা বসনিয়ায় চলে যেতে থাকে। একই সময়ে বসনিয়ায় ইহুদি জনসংখ্যা বাড়তে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে যুগোস্লøাভিয়া থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) স্বীকৃতি চাওয়া হয়। ১৯৯২ সালের মার্চে এক গণভোটে বসনিয়ার ভোটারেরা স্বাধীনতা বেছে নেয়। ১৯৯২ সালের ৫ এপ্রিল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা সংসদ যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এমন সিদ্ধান্ত নিলেও বসনিয়ার সার্বরা এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করে এবং বেলগ্রেডের সহায়তায় পরদিন ৬ এপ্রিল মুসলমানদের জাতিগত নিধন শুরু করে। মুসলমানেরা সভ্য ইউরোপে এমন হবে, তা ভাবতেও পারেনি। তাই তাদের প্রতিরোধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এই নির্মূল অভিযান সভ্য ইউরোপে সাড়ে তিন বছর চলতে থাকে। হাজার হাজার মুসলমান নর-নারী হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় এবং ২০ লাখ মুসলমান দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
সার্বদের তাণ্ডবলীলার সবচেয়ে বড় শিকার সেব্রেনিৎসা শহরের মানুষ। জাতিসঙ্ঘ ওই শহরটিকে নিরাপদ শহর ঘোষণা করার পরও ১৯৯৫ সালে সার্বরা সেখানে আগ্রাসন চালায় এবং জাতিসঙ্ঘের পর্যবেক্ষক সেনাদলের সামনেই তারা আট হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে। বসনিয়ার যুদ্ধে দেশটির এক লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।
৪৪ মাস ধরে সারায়েভো অবরোধের ঘটনা ও হত্যাযজ্ঞ চালানোর অন্যতম নায়ক সাবেক সার্ব সেনাপ্রধান জেনারেল রাদোভান কারাদজিচ। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালত কুখ্যাত এই ‘বলকানের কসাই’কে ২০১৬ সালে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
ওই সময় বিচারক অলফোনস অরিয়ে তার রায়ে বলেন, সেব্রেনিৎসায় বসবাসরত মুসলমানদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অপরাধীরা ওই অপরাধ সংঘটিত করেছিল। ‘বসনিয়ার কসাই’ হিসেবে খ্যাত রাদোভান কারাদজিচের বিরুদ্ধে ১১ অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়ার এই যুদ্ধে কারাদিজিচের নেতৃত্বে তার বাহিনী এসব অপরাধ সংঘটিত করে।
আদালত কারাদজিচকে দেয়া ৪০ বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখেছে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য শহর সেব্রেনিৎসায় গণহত্যা চালানোর দায়ে তাকে দেয়া এই দণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল রেখেছেন যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধাপরাধ তদন্তে গঠিত জাতিসঙ্ঘ ট্রাইব্যুনাল।
দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন রাদোভান কারাদজিচ। কিন্তু বিচারক জোয়েনসেন এই রায় ঘোষণার সময় বলেন, কারাজদিচ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, বসনিয়ার সার্ব সেনাদের কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে অপরাধের তদন্ত করা ও অপরাধীদের শাস্তি দেয়া কারাদজিচের দায়িত্ব ছিল বলে বিচারিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, তাতে ত্রুটি প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন কারাদজিচ।
৭৩ বছর বয়সের কারাদজিচ বসনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৯৫ সালে সেব্রেনিৎসায় গণহত্যায় ভূমিকার জন্য তাকে ‘বলকানের কসাই’ বলা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে এটি সবচেয়ে খারাপ জঘন্য গণহত্যা।
এই রায় বহাল থাকায় অনেকেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এই রায় ন্যায়বিচারের জন্য ঐতিহাসিক বলেছেন অনেকে। যদিও অনেকেই তাকে বাকি জীবন কারাগারেই দেখতে চেয়েছিলেন। তবে তার এই রায় দেশটিতে যে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মসজিদুল আকসা ও গুম্বাদে সাখরা by আফতাব চৌধুরী

বায়তুল মুকাদ্দাসের সব এরিয়া পূর্ণ হয়ে শহরে অলিতে-গলিতে রাস্তাঘাট সম্প্রসারিত হয়। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর পশ্চিম অংশ তারা দখলে নিয়ে নেয়। মসজিদে আকসাসহ বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্বাংশ জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের জুনে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে জর্ডান, মিসর, সিরিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মসজিদুল আকসাসহ পুরো বায়তুল মুকাদ্দাস দখলে নিয়ে সীমান্ত আরও ৪৫ কিলোমিটার জর্ডানের দিকে সরিয়ে আনে। মুসলমানদের কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনার পর বায়তুল মুকাদ্দাস নগরী। কিন্তু বায়তুল মুকাদ্দাসকে মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি ও খ্রিস্টানরা পবিত্র নগরী হিসেবে গণ্য করে থাকে। উঁচু পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত বায়তুল মুকাদ্দাস নগরী। এ নগরীতে একটি সুউচ্চ বরকতময় পাহাড় রয়েছে। যার ওপর মসজিদে আকসা। এ মসজিদে আকসা ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ইসরাইলের জবরদখলে রয়েছে। এ উঁচু পাহাড়ের উপরিভাগে ১ লাখ ৪০ হাজার ৯০০ বর্গমিটার এলাকা নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস হিসেবে স্বীকৃত। এখানকার ঠিক মাঝামাঝি স্থানে গুম্বাদে সাখরা। পাহাড়ের এক পাশে কেবলার দিকে মূল আকসা মসজিদ। এ পাহাড়ের ওপর আরও রয়েছে মসজিদে নিসা, একাধিক মাদ্রাসা ও বোরাকের স্থান।
বিশ্বের বুকে দৃষ্টিনন্দন ইমারতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ইমারতকে গম্বুজে সাখরাও বলা হয়ে থাকে। সাখরা অর্থ পাথর। এ পাথর নিয়ে রয়েছে নানা বরকতময় ইতিহাস। বিশাল পাথরটি শূন্যের ওপর ভাসমান মনে হবে। বিশ্বের বুকে এটি শূন্যে ভাসমান বরকতময় পাথর হিসেবে স্বীকৃত। মানব জাতির পিতা হজরত আদম (আ.) এ পাথরের কাছে নামাজ পড়তেন। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এ পাথরের কাছে এবাদতখানা নির্মাণ করেন। নবী ইয়াকুব (আ.) একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। নবী হজরত ইউশা (আ.) এর ওপর গম্বুজ নির্মাণ করেন। নবী হজরত দাউদ (আ.) এর সংলগ্ন মেহরাব এবং নবী হজরত সুলেমান (আ.) পবিত্র ইবাদতগাহ ‘হাইকলে সুলাইমানি’ নির্মাণ করেছিলেন।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজে গমনের পথে এখানে যাত্রাবিরতি দিলে সব নবী-রাসুলকে নিয়ে এখানে নামাজের ইমামতি করেন। এ পাথরের ওপর বসেন। এখান থেকেই আল্লাহপাকের সান্নিধ্যে রওনা হন। মূলত পাথরটি গুহার ওপর। পাথরটির আয়তন হচ্ছে ৭ মি. ী ৫ মি.। পাথরের নিচে গুহায় প্রবেশ করে ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো নর-নারী নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়।
মসজিদে গম্বুজে সাখরা থেকে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ মিটার দূরত্বে মূল মসজিদে আকসা। একতলা বিশিষ্ট বিশ্বের তৃতীয় বরকতময় মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার, প্রস্থ ৫৫ মিটার। এ আকসা মসজিদের পশ্চিম পাশে বোরাকের স্থান। অর্থাৎ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) পবিত্র মেরাজে গমনকালে পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে যাত্রাবিরতিতে এখানে এসে বোরাক রেখেছিলেন। বায়তুল মোকাদ্দাসে এক আজান দুই একামতে দুটি জামাত হয়। একটি হলো বায়তুল মোকাদ্দাস তথা মূল মসজিদে আকসায়, আরেকটি জামাত হয় গম্বুজে-সাখরায়। কিন্তু জুমার নামাজ ব্যতিক্রম। সব মিলে জুমার নামাজ একটিমাত্র হয়। ইমাম সাহেব থাকেন মূল মসজিদে আকসায়। মসজিদে গম্বুজে সাখরা মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। জুমায় লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি মুসলমানের সমাগম হয়। তখন বায়তুল মুকাদ্দাসের সব এরিয়া পূর্ণ হয়ে শহরে অলিতে-গলিতে রাস্তাঘাট সম্প্রসারিত হয়।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর পশ্চিম অংশ তারা দখলে নিয়ে নেয়। মসজিদে আকসাসহ বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্বাংশ জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের জুনে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে জর্ডান, মিসর, সিরিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মসজিদুল আকসাসহ পুরো বায়তুল মুকাদ্দাস দখলে নিয়ে সীমান্ত আরও ৪৫ কিলোমিটার জর্ডানের দিকে সরিয়ে আনে। ইসরাইলিরা ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের এ যুদ্ধে মিসরের সিনায় উপদ্বীপ, গাজা, গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের পূর্ব বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের যুদ্ধে ইসরাইল মিসরের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। এতে আমেরিকা শক্ত হাতে ইসরাইলের পক্ষ অবলম্বন করে। ফলে মিসর যুদ্ধবিরতিতে আসতে বাধ্য হয়। এর পরবর্তী সময়ে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির মাধ্যমে মিসর থেকে অধিকৃত বিশাল সিনাই উপদ্বীপ ও গাজা ইসরাইল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু জর্ডান ও সিরিয়া থেকে অধিকৃত অঞ্চলগুলো আজও ইসরাইলের জবরদখলে রয়েছে।  জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় এ বায়তুল মুকাদ্দাস নগরী। বায়াতুল মুকাদ্দাস থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে আরেক নগরী হেব্রন। এখানে মসজিদে ইব্রাহিম অবস্থিত। এ মসজিদের নিচ তলায় হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও স্ত্রী হজরত সারা (আ.), পুত্র হজরত ইসহাক (আ.) ও স্ত্রী হজরত রেবকা (আ.) সহ একাধিক নবী-রাসুল ও তাদের পরিবার শায়িত। ঐতিহাসিক এ মসজিদের বহিরাঙ্গনে হজরত ইউসুফ (আ.) শায়িত।
বস্তুত, বায়তুল মোকাদ্দাসসহ ফিলিস্তিন নবী-রাসুলদের কেন্দ্রস্থল। এখানে বহু নবী-রাসুল শায়িত। নবী পাক (সা.) ইসলামের প্রারম্ভে ১৭ থেকে ১৮ মাস বায়তুল মুকাদ্দেসের মসজিদে আকসার দিক হয়ে নামাজ পড়েছিলেন। অতঃপর পবিত্র কাবা মুসলমানদের কেবলা হয়ে যায়। সব নবী-রাসুল হজ করার জন্য পবিত্র মক্কায় আসতেন। কিন্তু তারা দ্বীন প্রচারের জন্য নিজ নিজ স্থানে ফিরে যেতেন। যেহেতু পবিত্র কাবাকেন্দ্রিক জাজিরাতুল আরব মহান আল্লাহ পাকের প্রিয় হাবিব হজরত মোহাম্মদ মোস্তফাও (সা.) খাস এলাকা হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন।
হজরত ইসমাইল (আ.) ও তার মা হজরত হাজেরা (আ.) কে কেন্দ্র করে পবিত্র মক্কা আবাদ হওয়ার সূত্রপাত এবং ইসমাঈল (আ.) এর বংশধর থেকে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর আবির্ভাব। অন্যদিকে, হজরত ইবরাহিম (আ.) এর অপর ছেলে নবী হজরত ইসহাক (আ.) এর রক্তধারায় অসংখ্য নবী-রাসুলের আগমন যারা ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাসসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহপাকের একত্ববাদ প্রচার করে গেছেন। বস্তুত, বায়তুল মুকাদ্দাস বিশ্বের বুকে মুসলমানদের কাছে তৃতীয় পবিত্রতম নগরী। যেহেতু এখানে রয়েছে মসজিদে আকসা ও মসজিদে গম্বুজে সাখরা। বর্তমানে বায়তুল মোকাদ্দাস ইসরাইলের জবরদখলে রয়েছে।

কাঁঠাল চাষ করে সফল হতে চাইলে

কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে কাঁঠাল পাকে। তখন ঘরে ঘরে কাঁঠাল খাওয়ার ধুম পড়ে। ফলে কাঁঠাল চাষ করেও সফল হওয়া যায়। কারণ বাজারে কাঁঠালের চাহিদা কম নয়। তাই আসুন জেনে নেই কাঁঠাল চাষ করার নিয়ম-

জমি নির্বাচন: পানি দাঁড়ায় না এমন উঁচু ও মাঝারি সুনিষ্কাষিত উর্বর জমি কাঁঠালের জন্য উপযোগী।

চারা তৈরি: কাঁঠালের বীজ থেকে কাঁঠালের চারা তৈরি করা হয়। ভালো পাকা কাঁঠাল থেকে পুষ্ট বড় বীজ বের করে ছাই মেখে ২-৩ দিন ছায়ায় শুকিয়ে বীজতলায় বপন করলে ২০-২৫ দিনে চারা গজাবে। এছাড়া গুটি কলম, ডাল কলম, চোখ কলম, চারা কলমের মাধ্যমেও চারা তৈরি করা যায়।

চারা রোপণ: চারা সতর্কতার সাথে তুলে মূল জমিতে রোপণ করতে হয়। সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত চারা বা কলম মধ্য জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য শ্রাবণ মাসে রোপণ করতে হয়। গাছ ও লাইনের দূরত্ব ১২ মিটার করে রাখা দরকার।

সার: রোপণের সময় প্রতি গর্তে গোবর ৩৫ কেজি, টিএসপি সার ২১০ গ্রাম, এমওপি সার ২১০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতি গাছের জন্য সারের পরিমাণ বাড়ানো দরকার।

সেচ: চারা বা কলমের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পরিমিত ও সময়মতো সেচ দেওয়া দরকার।

রোগ-বালাই: এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে কাঁঠালের রোগ হয়। এ রোগের আক্রমণে ফলের গায়ে বাদামি রঙের দাগ হয়। শেষপর্যন্ত আক্রান্ত ফল গাছ থেকে ঝরে পড়ে।

প্রতিরোধ: আক্রান্ত গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল পুড়িয়ে ফেলতে হয়। ছত্রাকনাশক ০.০৫% হারে পানিতে মিশিয়ে গাছে ফুল আসার পর থেকে ১৫ দিন পর পর ৩ বার স্প্রে করা দরকার। ফল ঝরে পড়লে ডাইথেন এম ৪৫ বা রিডোমিল এমজেড ৭৫ প্রতিলিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হয়।

ফল সংগ্রহ: কাঁঠাল পাকতে ১২০-১৫০ দিন সময় লাগে। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে কাঁঠাল সংগ্রহ করা হয়। এসময় বাজারে প্রচুর কাঁঠাল পাওয়া যায়।

সাদাত হোসাইনের ‘‌ছদ্মবেশ’ by ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

‘জীবন কখনো কখনো প্রিয়তম মানুষদের মধ্যেও অদ্ভুত অভিমানের দেয়াল তুলে দেয়। ভালোবেসে কাছে এসে সেই দেয়াল ভাঙা হয় না বলে তা ক্রমশই মহাপ্রাচীর হয়ে উঠতে থাকে। এক সময় হয়ে ওঠে অলঙ্ঘনীয়।’ কংক্রিটের জঙ্গলঘেরা আমাদের যে আটপৌরে জীবন তা নিয়ে এই কথাগুলো পেয়েছি নতুন একটা উপন্যাসে, নাম ‘ছদ্মবেশ’।

উপন্যাসের শুরুতে লেখক সাদাত হোসাইন এমন বর্ণনা দেন—“বাড়ির নাম ‘অপেক্ষা’। অপেক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অধ্যাপক লতিফুর রহমান। তিনি এই বাড়ির মালিক। তার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চশমা ছাড়া তিনি খুব একটা ভালো দেখতে পান না, তারপরও চশমার ফাঁক দিয়েই তিনি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে শেষ মুহূর্তে বাড়ির নামটা আরেকবার দেখে নিলেন। তারপর সন্তুষ্ট গলায় বললেন, ‘এবার ঠিক আছে’।”

এই ঠিক বেঠিকের দোলাচলেই এগিয়ে যায় পুরো উপন্যাস। আমরা যারা কমবেশি আগাথা ক্রিস্টি কিংবা জেমস রলিংসের লেখা পড়ে অভ্যস্থ তাদের কাছে গল্পটি সাদামাটা লাগতে পারে। তবে পুরো উপন্যাস যখন শেষ করেছি তখন এর পরিণত গল্প ও শৈলী অনেক আনন্দ দিয়েছে। সাদাত হোসাইনের কাহিনীর পরিণতি, বিন্যাস, শব্দচয়ন আর রহস্যের জাল বোনার যে দক্ষতা তা নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

বইটি পড়তে পড়তে পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল রাখবেন যে, গল্পটি ঘুরেফিরে আমাদের আটপৌরে জীবনের নানা চিত্রই ফুটো উঠেছে। রহস্য খোঁজা বাদ দিয়ে কেউ কেউ নিজেকেও খুঁজে ফিরতে পারেন।

আবার একটু পড়া যাক—“আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে। খোলা জানালায় সেই চাঁদ দেখে লতিফুর রহমানের মন খারাপ হয়ে গেলো। এতো বড় বাড়ি বানালেন, কিন্তু সেই বাড়ির ছাদে বসে চাঁদ দেখার উপায় নেই।” নিজের বাসার ছাদে উঠে চাঁদ দেখতে পারেন এমন সৌভাগ্য আমাদের ক’জনের হয়, একটু বলবেন?

তারপর একটি পর্যায়ে এসে লেখক বলছেন—“লতিফুর রহমান ঘরের তালা খুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন। নতুন তালা লাগিয়েছিলেন প্রতিটি দরজায়। সেই তালা প্রায় আট-দশ দিন খোলা হয়নি বলে শক্ত হয়ে আটকে আছে। অনেক কসরত করে খুলতে হলো তালাগুলো। কিন্তু ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই বিকট দুর্গন্ধে লতিফুর রহমানের পেট গুলিয়ে উঠলো। পাকস্থলী যেন উল্টে বের হয়ে আসতে চাইছে।”... “তিনি তীব্র আতঙ্ক নিয়ে আরো একবার চোখ মেলে তাকালেন। বাথরুমের মেঝেতে কাঁত হয়ে পড়ে আছে একটা লাশ। লাশটার গলা থেকে মাথাটা প্রায় ছুটে এসে বিভৎসভাবে ঝুলে আছে বুকের ওপর। পচে যাওয়া লাশটার শরীর বেয়ে ভনভন করে উড়ছে মাছি।”

এমন ঘটনা আমরা সচরাচর প্রায় সব রহস্য উপন্যাসে পেয়ে থাকি। তাহলে প্রশ্ন থাকছে অন্য লেখায়ও যা আছে এখানেও তা আছে। সেক্ষেত্রে নতুন উপন্যাস হিসেবে ‘ছদ্মবেশ’ থেকে পাঠক কী পাচ্ছেন?

অধ্যাপক লতিফুর রহমান চেষ্টা করছেন লাশ গুম করতে। সবক্ষেত্রে যা হয় এখানে তেমনটা হয়নি। তিনি হাতে দস্তানা পরে লাশ গুম করছেন অনেক কষ্টে। গন্ধে গা গুলিয়ে আসে। তবুও তিনি গ্রিল কেটে উপর থেকে লাশটাকে নাইলনের দড়ি বেঁধে নামিয়ে দিলেন নিচে। তারপর বৃষ্টি উপেক্ষা করে রেইনকোট পরে গুম করতে যান স্বয়ং।

মানুষ বিপদে পড়লে কিভাবে যন্ত্রতাড়িতের মতো কাজ করে এরপর সেই বর্ণনা। ফেরিওয়ালারা যেভাবে বাঁকে করে মাল টানে বয়সের ভারে ক্লান্ত অধ্যাপক ওইভাবেই কাজ করছেন। বৃষ্টির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে ঘেমে-নেয়ে একাকার। বিপদে পড়লে মানুষের ষষ্ঠইন্দ্রিয় কিভাবে কাজ করে তার বর্ণনা আছে এখানে। বিশেষ করে দারোয়ানকে ঘুমিয়ে পড়তে দিয়ে অধ্যাপক কিভাবে লাশ গুম করেছেন সেই বর্ণনাটা বেশ চমকপ্রদ। তবে সবথেকে অবাক কাণ্ড অধ্যাপক সাহেব শেষপর্যন্ত ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না তার বাসায় তালাবদ্ধ ঘরে কিভাবে ঐ লাশটি এসেছে।

একে একে পরিণতি পেয়েছে অনেকগুলো চরিত্র—রেজা, শরিফুল, চুন্নুসহ আরও অনেকে। কোনো কোনো চরিত্র ঠিকঠাক পরিণতি পেলেও অনেকগুলো চরিত্র গল্পের প্রয়োজনে এসে হারিয়েও গেছে সবার দৃষ্টিসীমার বাইরে।

অধ্যাপকের বাসার সামনে থেকে টু-লেট লেখা প্লেটটি সরানো দেখে হঠাৎ সন্দেহ জাগে রেজার। তার প্রশ্ন এই বাড়ি পুরো তৈরি করার ক্ষমতাও যেখানে অধ্যাপকের নাই সেখানে নতুন ভাড়াটিয়া আনা বন্ধ করলেন কেনো? চুন্নু মিয়া চটে গিয়ে দাবি করে তার ভাগ্নেকে খুন করেছেন গোলাম মাওলা। তারপর তার লাশ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু লেখকের কলমে গোলাম মাওলা হয়ে উঠেছেন অন্যরকম এক চরিত্র। নিচের কয়েকটা লাইন পড়লে অজান্তেই পাঠকের মনে ঠাঁই নিতে শুরু করবেন গোলাম মাওলা:

“গোলাম মাওলা ধীর স্থির মানুষ। কঠিন বিপদেও মেজাজ হারান না। শান্ত গলায়, হাসিমুখে কথা বলেন। এই কারণেই খুব দ্রুত তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি যে রাজনীতির সাথে খুব বেশিদিন যুক্ত, তাও না। বরং তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে ইতালিতে। খুব অল্প বয়সেই শ্রমিক হিসেবে ইতালিতে চলে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন প্রায় বছর কুড়ি পর। এই কুড়ি বছরে তিনি তার ভাগ্য ফিরিয়েছেন। ইতালিতে নিজের একাধিক রেস্টুরেন্ট হয়েছে তার। হয়েছে নানান ধরনের ব্যবসাও। এই ব্যবসা দেখাশোনার জন্য একে একে ছোট তিন ভাইকেও তিনি ইতালি নিয়ে গেছেন। তারা ব্যবসাটা বুঝে উঠতেই বেশ ক’বছর হয় দেশে ফিরে এসেছেন গোলাম মাওলা। এসে ইট-বালির ব্যবসা শুরু করেছেন গ্রামে। যদিও অর্থ তার যথেষ্টই হয়েছে, এখন দরকার সামাজিক সম্মান, পরিচিতি। সেই লক্ষ্যেই রাজনীতিতে নেমেছিলেন তিনি। দুহাতে টাকাও খরচ করেছেন।”

এখন চুন্নু মিয়া সন্দেহের তীর যখন এই গোলাম মাওলার দিকেই তুলেছেন সেখানে পাঠকের আগ্রহ থাকাটা তো স্বাভাবিক। শেষ পর্যন্ত কী হতে যাচ্ছে? তবে কি চুন্নু মিয়া নির্বাচনের ফিল্ড নিজের দিকে নিতে লোক দিয়ে আপন ভাগ্নেকে খুন করিয়েছেন? এটা যদি আমি বলে দেই তাহলে পাঠকের পড়ার জন্য থাকলো কী? বাকিটা জানতে পড়ে দেখতে পারেন সাদাত হোসাইনের রহস্য উপন্যাস ‘ছদ্মবেশ’।

>>>লেখক : শিক্ষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।