Showing posts with label বন্যা. Show all posts
Showing posts with label বন্যা. Show all posts

Monday, October 7, 2024

ভাসছে শেরপুর

টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে শেরপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে সদর ও নকলা উপজেলা। তলিয়ে গেছে উপজেলা দু’টির ৬ ইউনিয়ন। একের পর এক ডুবছে নতুন নতুন গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে হাজার হাজার পরিবার। পানির তোড়ে নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতীসহ বিভিন্ন উপজেলার আমন ধান-সবজি আবাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ভেসে গেছে ২ হাজারেরও বেশি পুকুর ও মৎস্য খামার। এদিকে গত তিন দিনে বন্যার পানিতে ডুবে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ জনে। এর মধ্যে নালিতাবাড়ীতে ২ সহোদর ভাইসহ ৫ জন ও ঝিনাইগাতীতে একজন পানিতে ডুবে এবং নকলায় প্লাবিত এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক কৃষক মারা গেছেন।

জেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা সদরের পানি কিছুটা নেমে গেলেও সদর ও নকলা উপজেলাসহ নিম্নাঞ্চলের অন্তত ২শ’ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমন আবাদ, মাছের ঘের ও সবজি আবাদ। এদিকে পাহাড়ি ঢলের পানিতে ডুবে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও নকলায় বৃদ্ধ-নারীসহ ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলাসহ জেলার অন্তত ৪৭ হাজার হেক্টর আবাদি জমির আমন ধান ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া ১ হাজার হেক্টর জমির সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর মাছের ঘের তলিয়ে গেছে ২ হাজারেরও বেশি।
অন্যদিকে নালিতাবাড়ী উপজেলার ভোগাই ও চেল্লাখালী নদীর বাঁধ ভেঙে ও নদীর পাড় উপচে পানি যাওয়ায় রামচন্দ্রকুড়া, কাকরকান্দি, নন্নী, পোড়াগাঁও, নয়াবিল, বাঘবেড়, কলসপাড়, মরিচপুরান, যোগানিয়া, রাজনগরসহ ১০টি ইউনিয়ন ও পৌর শহরের তিনটি স্থানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
ফসলের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে শেরপুর খামারবাড়ির উপ-পরিচালক ড. সুকল্প দাস বলেন, পাহাড়ি ঢলে ৩ উপজেলার আমন ধান ও সবজি আবাদ নষ্ট হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি কমবেশি নির্ভর করবে পানি নেমে যাওয়ার উপর। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হবে।
জেলার বন্যাকবলিত এলাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছে প্রশাসন। বন্যাকবলিত বেশ কিছু এলাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় রাতভর পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও উদ্ধারকাজ পরিচালনা করেন।
ঝিনাইগাতীর মহারশি নদীর ভেঙে যাওয়া বাঁধ পরিদর্শন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে মেরামতের আশ্বাস দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, মহারশি নদীর বাঁধ উঁচু করার সুযোগ নেই। তবে ভাঙনকবলিত স্থান দ্রুত মেরামত করে দেয়া হবে।
বন্যা পরিস্থিতি ও সরকারি ত্রাণ বিতরণ সম্পর্কে শেরপুরের জেলা প্রশাসক তরফদার মাহমুদুর রহমান  রোববার দুপুরে বলেন, অবিরাম বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। ৩টি উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছে। আমাদের সংগ্রহে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১০ হাজার শুকনো খাবার প্যাকেট পানিবন্দি পরিবারগুলোর মাঝে সরবরাহ করা হয়েছে। আরও ২৫ হাজার প্যাকেট ত্রাণের চাহিদা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরবর্তীতে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
ঝিনাইগাতী (শেরপুর) প্রতিনিধি: ঝিনাইগাতী উপজেলার উজানে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ভাটি এলাকায় বন্যার পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বৃহস্পতিবার রাতে ভারী বর্ষণ ও সীমান্তের ওপার থেকে মহারশি নদী দিয়ে পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নই বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। মহারশি নদীর কুশাইকুড়া, রামেরকুড়া, খৈলকুড়াসহ বিভিন্ন স্থানে মহারশি নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে উপজেলা সদর কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। উপজেলা পরিষদ সহ বিভিন্ন অফিসে কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। হাজার হাজার একর আমন ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। শত শত পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। বন্যাকবলিত এলাকায় হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বহু কাঁচা-পাকা রাস্তাঘাট বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশরাফুল আলম জানান বন্যার্তদের মাঝে ১২শ’ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৫ টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এদিকে গতকাল বিকালে শেরপুর-৩ আসনের বিএনপি’র সাবেক সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন।

ফুলপুর ও তারাকান্দায় পানিবন্দি হাজার হাজার মানুষ
ফুলপুর ও তারাকান্দা প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলায়ও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলার ছনধরা ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে পানিবন্দি অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ। তাদের উদ্ধারে কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। বন্যার পানির কারণে ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলায় ৪ হাজার ২৬০ হেক্টর আমন ধানের ক্ষেত নিমজ্জিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শেরপুরের নালিতাবাড়ী এলাকা থেকে মালিঝি নদী হয়ে ফুলপুরে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে চলা বৃষ্টির কারণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নিচু এলাকায় পানি জমতে শুরু করে। গতকাল শনিবার রাতভর বৃষ্টিতে মানুষ পানিবন্দি হতে শুরু করে।
ফুলপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবিএম আরিফুল ইসলাম জানান, শেরপুরের নালিতাবাড়ী এলাকা থেকে পানি নেমে উপজেলার ছন্দরা ইউনিয়ন পুরোটা প্লাবিত হয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম সকাল থেকে চলছে। স্থানীয় নৌকা ও স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকশ’ মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়া হয়েছে। ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। অন্যান্য ইউনিয়নেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নেও জলাবদ্ধতা রয়েছে। তবে ছনধরায় সবচেয়ে বেশি। রোববার সকালের হিসাবে ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে, তবে এ সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এদিকে তারাকান্দা উপজেলার বানিহালা, কাকনী, তারাকান্দা, ঢাকুয়া ইউনিয়নে জলাবদ্ধতা সবচেয়ে বেশি। তারাকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অরুনিমা কাঞ্চি সুপ্রভা শাওন বলেন, জলাবদ্ধতায় ৬০০ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৫৬০ হেক্টর ধান ও ৪০ হেক্টর শীতকালীন আগাম সবজি। দু-তিন দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে কৃষকের তেমন ক্ষতি হবে না। তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানা বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত মোটামুটি ভালো রয়েছি। বৃষ্টি বাড়লে এখানকার পরিস্থিতিও খারাপের আশঙ্কা রয়েছে।

mzamin

Sunday, September 22, 2024

জাপানে বন্যার ঝুঁকিতে ৪৬ হাজার মানুষকে উদ্ধার শুরু

প্রবল বর্ষণে গুরুতর বন্যার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে জাপানের চার শহরে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই শহরগুলো থেকে ৪৫ হাজার মানুষকে সরানোর কাজ শুরু করেছেন পুলিশ ও দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ক সদস্যরা। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ওয়াজিমা শহর থেকে ১৮ হাজার, সুজু শহর থেকে ১২ হাজার এবং নিগাতা ও ইয়ামাগাতা শহর থেকে ১৬ হাজার- মোট ৪৬ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই লোকজনদের সবাই অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকায় বসবাস করেন। বন্যা শুরু হলে সবার আগে এসব অঞ্চল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। কয়েকদিন ধরে জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি ও ভারী বর্ষণ হচ্ছে। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া সংস্থা জাপান মেটেরোলজিক্যাল এজেন্সি (জেএমএ) ইতিমধ্যে কয়েকটি এলাকায় প্রবল বর্ষণজনিত সতর্কবার্তা জারি করেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল এনএইচকে জানিয়েছে, কয়েকদিনের বর্ষণে দেশটির ১২টি নদীর পানি বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি নদীর তীরবর্তী এলাকায় বন্যা শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। ওয়াজিমা শহরেও ঢোকা শুরু হয়েছে বন্যার পানি। এনএইচকে-তে তার ভিডিও ফুটেজ প্রচার করা হয়েছে। ইশিকাওয়া জেলার তিনটি নদীর পানি উপচে নিগাতা ও ইয়ামাগাতা শহরের বেশ কিছু এলাকা ইতিমধ্যেই প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া কিছু এলাকায় ভূমিধসও হয়েছে। ৮ই আগস্ট ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত করেছিল জাপানে। এতে নিহত হয়েছিলেন ১৬১ জন মানুষ। সেই দুর্যোগের রেশ শেষ না হতেই বন্যা শুরু হলো দেশটিতে।

mzamin

Saturday, August 31, 2024

‘নাতিগারে কেউ কদ্দুরা দুধ দেয়ন আন্নে লইদে না বায়াজি’ by নাজমুল হক শামীম

‘বায়াজি নাতিকে কিছু খাইতে ফারে না, কদ্দুরা দুধের লাই কতোজনের কইলাম কেউ দিলো না। পাগল কই বেকে তারাই দিলো, আন্নে আরে কদ্দুরা দুধ লই দেন না, দোয়া করমু বায়াজি।’ নিজের নাতির জন্য দুধ চেয়ে না পেয়ে এভাবেই আক্ষেপ করে জানাচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব জাহানারা বেগম। ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বারোয়ানী গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা জাহানারা বেগম। পানি ঢোকার পর থেকে গত ১০ দিন ধরে তিনি তার মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ে জামিলা ও চার বছরের এক নাতনিকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এলাহীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে। বলেন, মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে অভাবের সংসার। ছোট যে ঘরটিতে তারা থাকতেন তা পানির নিচে। ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারেননি। যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন সেই স্কুল আঙিনায় বুক সমান পানি। আশপাশের মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যে খাবার দিয়ে যাচ্ছেন তা দিয়ে তাদের কোনোরকম জীবন কাটছে। তিনি বলেন, ত্রাণের গাড়ি দেখলেই ছুটে যাই। নাতিনের দুধের প্রয়োজন। কেউ দুধ দিচ্ছে কিনা খোঁজ নিতে। আজ একটি চিকিৎসক প্রতিষ্ঠান ওষুধের সঙ্গে শিশুদের দুধ দিচ্ছিলো। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি, সবাই পাগল বলে তাড়িয়ে দিয়েছে। আপনি সাংবাদিক আমাকে একটু দুধ নিয়ে দেন।

জাহানারা গ্রামের মতো আশপাশের আরও তিনটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম বিগত ১০ দিনের বেশি সময় ধরে পানিবন্দি। মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসকল গ্রামের বাসিন্দারা। ফেনী সদর উপজেলার শর্শদা ইউনিয়নের দক্ষিণ আবুপুর, উত্তর আবুপুর, কুমিরা, নতুনবাড়ী, পিয়ার আলী মসজিদ, সদর  উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের জগরগাঁও, এলাহীগঞ্জ, ধলিয়া  বারোয়ানী, উত্তর ডোমুরিয়া, দক্ষিণ ডোমুরিয়া, দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের কৈখালী, ছোট কৈখালী, গৌতম খালিতে কোথাও হাঁটু সমান পানি তো কোথাও কোমর সমান পানি। এলাহীগঞ্জ বাজারে কথা হয় আব্দুল মতিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তিনটি ইউনিয়নের সংযোগস্থল এই এলাহীগঞ্জ বাজার। আশপাশের সকল গ্রাম পানিতে ডুবে থাকায় এলাহীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এলাহীগঞ্জ মমতাজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ১৫০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বানভাসি এ মানুষগুলোর চোখে মুখে শুধু হতাশার ছাপ।
ছোট ধলিয়া গ্রামের খামারপাড়ার বৃদ্ধ হারিস মিয়া জানান, ১০ দিন ধরে পানিবন্দি থাকায় পাশের একটি মার্কেটের ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন। পাঁচ ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতিনদের নিয়ে ছাদে ত্রিপল দিয়ে রাত যাপন করছেন। ছেলে হুমায়ুন, পেয়ার আহমেদ, সালেহ আহমেদের বেশ কয়েকটি মাছের খামার ও পোল্ট্রি ফার্ম পানিতে ভেসে গেছে। ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তার পরিবারটি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল কাদের জিলানী ও তার ছোট ভাই মাদ্রাসা পড়ুয়া তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আব্দুর রহমান সৈকত বলেন, ঘরে এখনো হাঁটু সমান পানি। পড়ার সকল বই ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদূর এগুতেই বাজারের একটি দোকানে দেখা গেল জেনারেটর দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় মোবাইলে চার্জ দিচ্ছেন স্থানীয়রা। কথা হয় আব্দুল্লাহ আলিফ নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন ১০ দিনের উপরে এলাকায় কারেন্ট নেই। কারও মোবাইলেই চার্জ নেই। বাজারে যে দোকানটিতে জেনারেটর দিয়ে মোবাইল চার্জ দেয়া হচ্ছে দোকান মালিক প্রতি মোবাইল চার্জ দিতে ৪০ টাকা করে রাখছেন।

এলাহীগঞ্জ বাজারের একটি দোকানে বানভাসি মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ঢাকা থেকে আগত ‘বাংলাদেশ সচেতন নাগরিক সমাজ ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন। ওই সংগঠনের চিকিৎসক সাব্বির আহমেদ জানান, তাদের দলে ৮ জন চিকিৎসক রয়েছেন। চিকিৎসা পত্রের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ও প্রাথমিক চিকিৎসার সকল ওষুধ বিনামূল্যে রোগীদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। দিনব্যাপী তারা ৪ শতাধিক রোগীকে সেবা দিতে পেরেছেন।

নদী থেকে গলিত লাশ উদ্ধার: গতকাল বিকালে ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া এলাকায় নদী থেকে এক ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফেনী জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম মিলন বলেন, ফেনী নদীর লেমুয়া ব্রিজের নিচে এক নারীর মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয় এক নেতা তাকে কল করে বিষয়টি জানায়। পরে তিনি ‘আল মারকাজুল ইসলাম’ নামে লাশ দাফনের সংগঠনকে অবগত করলে তারা তাদের পিকাআপ নিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি ফেনী জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করে। মিলন আরও বলেন, বৃদ্ধ মহিলার বয়স সত্তরোর্ধ্ব। মাথার চুলগুলো সাদা। পরনে লাল রঙের ম্যক্সি ছিল।

বাড়ছে মৃতের সংখ্যা: ফেনীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মৃতদের সংখ্যা। শুক্রবার বিকালে জেলা প্রশাসন থেকে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জেলায় বন্যায় এ পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোসাম্মৎ শাহীনা আক্তার জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিএসবি) বরাতে বলেন, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত বন্যায় ফেনী সদর উপজেলায় ৩ জন, পরশুরাম উপজেলায় ২ জন, ফুলগাজী উপজেলায় ৭ জন, ছাগলনাইয়ায় ৩ জন, দাগনভূঞা উপজেলায় ২ জন ও সোনাগাজী উপজেলায় ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

Friday, August 30, 2024

ত্রাণ কেউ পাচ্ছে কেউ পাচ্ছে না by মারুফ কিবরিয়া ও নাজমুল হক শামীম

উজান থেকে আসা ঢলে ভেসে গেছে ফেনী। ছয়টি উপজেলার কোনোটিই রক্ষা পায়নি। গত কয়েকদিনে উন্নতি হয়েছে পরিস্থিতি। রাস্তাঘাট শুকিয়েছে। প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কার্যক্রমও স্বাভাবিক হয়েছে। তবে বন্যাকবলিত অনেক এলাকার মানুষ এখনও পানিবন্দি। এসব এলাকায় ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন অনেকে। গতকাল সকালে ফেনী সদরের পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বিরলী, রতনপুর, জয় নারায়ণপুর, রামচন্দ্রপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমন্বয়য়ের অভাবেই সর্বত্র ত্রাণ মিলছে না। যদিও জেলা প্রশাসন সমন্বয়হীনতার কোনো অভিযোগ নেই বলেই জানিয়েছে।

ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বিরুলী গ্রামের বাসিন্দা বিবি কুলসুম জানান, নয়দিন ধরে ঘরে পানিবন্দি থাকায় পার্শ্ববর্তী একটি দোতলা ভবনে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন আধা কেজি চিড়া ও আধা কেজি মুড়ি ছাড়া কোনো কিছু পাইনি।
একই কথা বলেছেন গ্রামের নৌকাঘাট এলাকার তোফাজ্জল হোসেন, আনোয়ার হোসেন, লাইলী বেগম, আবুল খায়ের ও বিবি মরিয়ম । কমবেশি সবার ঘরেই এখনো হাঁটু সমান পানি।  আশ্রয় নিয়েছেন বিরলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।

রওশন আরা নামে পঞ্চাশোর্ধ এক নারী বলেন, দুপুরে রান্না করা খাবার একবেলা দিয়ে যায়। আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে বাকি দুই বেলা চিড়া মুড়ি খেয়ে থাকতে হচ্ছে । পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি না থাকায় বুক পরিমাণ পানিতে ডুবে উঁচুস্থানের একটি কল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বিরলী গ্রামের নৌকাঘাট এলাকার পপি আক্তার বলেন,  বন্যার পর থেকে গত আটদিনে ছয়টি মোমবাতিও ৫ লিটারের এক বোতল পানি পেয়েছি। এ ছাড়া এর মধ্যে আর কোনো সামগ্রী পাইনি। ঘরে যা শুকনো খাবার ছিল তা খেয়েছি। খাবার শেষ হওয়ার পর পার্শ্ববর্তী দোকান থেকে মুড়ি বিস্কুট কিনে কয়েকদিন ধরে খেয়েছি। রান্নার চুলা পানিতে ডুবে থাকায় এখনো ভাত রান্না করতে পারেননি বলেও জানান তিনি। একই কথা বলেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া আছিয়া খাতুন। চিড়া মুড়ি খেয়ে কয়দিন থাকা যায় আমাদের কেউ চাল ডাল সহযোগিতা করেনি এখনো। এ গ্রামে চাল ডাল নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনকে আসার জন্য অনুরোধ করেছেন ।

রিকশাচালক শাহ আলম বলেন , ঘরে এখনো হাঁটু পরিমাণ পানি । উঠানে বুক পরিমাণ পানিতে ডুবে আছে উপার্জনের একমাত্র বাহন রিকশাটি । ৮-৯ দিন রিকশা চালাতে না পারায় উপার্জন বন্ধ রয়েছে । ওই বাড়ি পেরিয়ে একটু সামনে এগোতে হাতে বালিশ কাঁথা নিয়ে হাঁটছিলেন বৃদ্ধ আমিনুল ইসলাম । তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে তার বাড়িতে হাঁটু পরিমাণ পানি থাকলেও বর্তমানে মেঝেতে পানি রয়েছে। এ সময় ঠিকমতো খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। এদিকে পার্শ্ববর্তী রতনপুর গ্রামে ঘুরে দেখা যায় গ্রামের গ্রামীণ সড়কগুলোতে এখনো হাঁটু পরিমাণ পানি। পানিবন্দি মানুষগুলো ছোট ডিঙ্গি নৌকা ব্যবহার করে যাতায়াত করছে। গ্রামের বাসিন্দা মো. বেলাল হোসেন বলেন, আটদিন ধরে তারা পানিবন্দি রয়েছেন। বাড়িতে থাকা ফ্রিজ টিভিসহ মূল্যবান আসবাব নষ্ট হয়ে গেছে।

স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক শাহজালাল ভূঁইয়া বলেন, গত বুধবার থেকে টানা নয়দিন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বাজারে কিছু কিছু জায়গায় জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ায় গ্রামবাসী টাকা দিয়ে লাইন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে মোবাইলে চার্জ দিচ্ছেন। বন্যাকবলিত এই পরিস্থিতি পার্শ্ববর্তী বক্তারপুর, জয় নারায়ণপুর, রামচন্দ্রপুর, নুরুল্লাহপুর, রাজাপুর ঘোনাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতেও বিরাজ করছে।

ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের অভাব:
ফেনীতে বন্যা শুরুর পর থেকে সারা দেশ থেকে সরকারি বেসরকারিভাবে ত্রাণ আসা শুরু হয়। কিন্তু জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় না থাকায় অনেক জায়গায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাচ্ছে না।  ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ শাখায় দায়িত্বরত এক স্বেচ্ছাসেবক জানান, গত শুক্রবার থেকে টানা ৫দিন ত্রাণ শাখার দায়িত্বে ছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকে করে আসা ত্রাণগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয় মজুত হলেও সরকারিভাবে বিতরণের সমন্বয়হীনতার কারণে অনেকে ত্রাণ পায়নি। গত বুধবার থেকে প্রতিটি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।

টিম ইজিলাইফ’র স্বেচ্ছাসেবক শহিদুল মিশু বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকায় রান্না করা খাবার পাঠিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সাহায্য করা হচ্ছে। বন্যা পরবর্তী সময় মোকাবিলা করার জন্য চাল,ডাল, তেল বিতরণ করে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি যারা সরকারিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একজন মহিউদ্দিন রনি বলেন, ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার তথ্য পেয়ে আমিসহ আমাদের টিমের বেশ কয়েকজন ফেনীতে যাই কার্যক্রম পরিচালনা করতে। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কয়েক দফা আমাদের বিরোধ হয়। পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর অসুস্থতার খবর পেয়ে আমরা টিমসহ ঢাকায় চলে আসি। আমি আবার যাবো ফেনীতে। তবে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সমস্যা হলে সেটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর দায় দেয়া যাবে না।

অবশ্য মহিউদ্দিন রনি গত কয়েকদিনে ত্রাণ কার্যক্রমে এসে ফেসবুক লাইভে বিতরণ করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে ত্রাণ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও করেন সেই লাইভে। এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মোছা. শাহিনা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, জেলা প্রশাসন ত্রাণ বিতরণে তৎপর রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ত্রাণ ৮৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় হেলিকপ্টার, সড়ক ও নৌপথে আরও সাত হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে ।  বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ,  সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছেন। জেলা প্রশাসনে ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের কোনো অভাব নেই।

‘চিড়া-মুড়ি-বিস্কুট কতক্ষণ চাবান যায়’

আনোয়ারা বেগমের বয়স ৭০ পার হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে বাড়িঘর। রান্নাঘর ও টিউবওয়েলও ডুবে গেছে। চুলায় রান্না হয় না ৮ দিন। মানুষের দেয়া শুকনো মুড়ি-চিড়া-গুড় খেয়ে কোনো রকম দিন পার করছেন তিনি। তার মতো অবস্থা একই বাড়ির ওয়াহেদা বেগম ও শিরিনা বেগমেরও।

গত ৭ দিন ধরে পানিবন্দি তারা। তারা সবাই কুমিল্লার দেবিদ্বারের ফতেহাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ সাইচাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

বৃহস্পতিবার (২৯ আগস্ট) দুপুরে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, ত্রাণের জন্য ঘরের দরজায় বসে অপেক্ষা করছে বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম।

ঘরের ভেতরের কিছু মালামাল চৌকির ওপর বস্তায় রাখা। উঠোনে হাঁটু সমান পানি। পানি স্রোতে টিনের ঘরের এক অংশ হেলে পড়েছে পুকুরের দিকে। যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। রান্না ঘরের চুলায় পানি ভর্তি। টিউবওয়েলের বেশ অর্ধেক ডুবে আছে বন্যার পানিতে।

আনোয়ারা বেগম বলেন, বাইত ৮ দিন ধরে পানি। ঘরে রান্না হয় না, দরজায় বইস্যা রইছি, কেউ যদি বিরিয়ানি দেয় হেললাইগ্যা। মুড়ি-চিড়া-বিস্কিট দেয়, এগুলো কতক্ষণ চাবান যায়, দাঁতেও আর ধরে না। আমরা বুঁড়া মানুষ ভাত খাইতে পারলে জীবনডা বাঁচে।

তিনি আরও বলেন, আমার দুইডা ছেলে আছে, একজন সিএনজি চালায় আর একজন সিএনজির মেকার। তারাও এহন কাজকামে যাইত পারে না। এহন দুশ্চিন্তা পানি কমলে ঘর তো পইরা যাইব। ও বাজান, আমারে এক বান টিনের ব্যবস্থা কইরা দেন না। এক বান টিন অইলে আমার ঘরটা ঠিক করন যাইব।

কালবেলার এই প্রতিবেদকের কাছে অনেকটা আকুতি স্বরেই কথাগুলো বলছিলেন বৃদ্ধা আনোয়ারা বেগম।

ওয়াহেদা বেগম বলেন, ঘরের ধান-চাল-ডাইল সব ভিজ্যা গেছে। কোনো কিছু বাইর করতে পারি নাই। ওহন অসহায় অবস্থায় ঘরে পইড়া আছি। যারা আশ্রয়কেন্দ্রে উঠছে মানুষ তারারে অনেক কিছু দেয়। বাড়ি ঘরের ভেতরে কেউ আসে না। আমি কয়েকবার রাস্তার গিয়ে দাঁড়াই ছিলাম, রাস্তা ডুবে যাওয়ায় এদিকে কোনো ত্রাণের গাড়ি আসতে পারে না। সকালে কিছু লোক চিড়া-মুড়ি-বিস্কিট দিয়া গেছে। এগুলো কোনো রকম চিবাইয়া খাই।

পথে দেখা হয় বৃদ্ধ ওসমান গনির সঙ্গে। তার বাড়িঘরের অবস্থা জানতে চাওয়ায় তিনি কথা বলতে গিয়ে কেঁদেই ফেলেছেন। ‘ঘরে হাঁটু সমান পানি’ বাইরে ঘোরাঘুরি করতাছি’ কেউ কোনো ত্রাণ দিচ্ছে না’ দূর থেকে দেখছি একটা ত্রাণের গাড়ি থামানো। কোমরসমান পানি দিয়ে গাড়ির কাছে আসছি ভাবছি খুঁজলে হয়ত এক প্যাকেট দিবে। আপনি একটু সুপারিশ করে বলেন না আমাকে এক প্যাকেট ত্রাণ দিতে।

ওসমান গনিও অনেকটা আকুতি করে কথাগুলো বলছিলেন। পরে তিনি লুঙ্গির গোছ থেকে ১০০ টাকা বের করে বলছেন- আমার কাছে ১০০ টেহা আছে আরও ১০০ টেহা হলে আমি কিছু কিনে বাড়ি যাইতে পারমু, ঘরের সবাই না খাইয়া আছে।

এ বিষয়ে ফতেহাবাদ ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন রহুল কালবেলাকে বলেন, ফতেহাবাদ ইউনিয়ন দেবিদ্বার উপজেলার একটি বড় ইউনিয়ন। এখানের ১৮টি গ্রামই বন্যার পানিতে প্লাবিত। সবগুলো গ্রামে শুকনো খাবারের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে চাল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রচুর খাবার দেওয়া হচ্ছে। পানিবন্দি যতগুলো ঘর আছে প্রত্যেকটি ঘরেই ত্রাণ পৌঁছানো হবে। রাস্তাঘাট ভাঙা পানি থাকায় যানবাহন সমস্যার কারণে সঠিক সময়ে অনেকটা সমস্যা হচ্ছে।

Sunday, August 25, 2024

মানুষ মানুষের জন্য

ভয়াবহ বন্যায় ভাসছে ১১ জেলা। ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লায় পরিস্থিতি খুবই নাজুক। বানের পানিতে বাড়িঘর ভেসে যাওয়ায় মানুষের বাঁচার আকুতি। খাদ্য ও পানির হাহাকার। এমন অবস্থায় সারা দেশ থেকে ত্রাণ আর উদ্ধারের সহযোগিতা নিয়ে দুর্গত এলাকায় ছুটে যাচ্ছে মানুষ। দেশ জুড়ে চলছে ত্রাণ সংগ্রহের কার্যক্রম। সব শ্রেণি-পেশার মানুষ বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা রাত-দিন একাকার করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন ত্রাণ কার্যক্রমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখান থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দানা বেঁধেছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে গণ ত্রাণ কার্যক্রমের সদরদপ্তর। হাজার হাজার মানুষ ত্রাণ নিয়ে আসছেন। নগদ অর্থ নিয়ে আসছেন কেউ কেউ।

শিশুরা আসছে মাটি বা প্লাস্টিকের ব্যাংকে জমানো টাকা নিয়ে। এতিমখানার শিশুরা তাদের খাবারের টাকা বাঁচিয়ে নিয়ে আসছে টিএসসিতে।  পেশাজীবীরা যার যা সামর্থ্য আছে তা নিয়েই হাজির হচ্ছেন। ত্রাণ সংগ্রহ প্যাকেট করা এবং তা দুর্গত এলাকায় পৌঁছে দিতে নির্ঘুম সময় কাটাচ্ছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। শুধু কি টিএসসি। পুরো রাজধানী জুড়ে ত্রাণ সংগ্রহ করছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। পাড়ায় পাড়ায় করা হয়েছে ত্রাণ সংগ্রহের কমিটি। যে যা পারছেন তা দিয়েই শরিক হচ্ছেন। খাদ্য, টাকা, জামা জমা হচ্ছে ত্রাণের ভাণ্ডারে। দলবদ্ধভাবে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দুর্গত এলাকার মানুষদের জন্য। সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ঝাঁপিয়ে পড়েছে দুর্গত এলাকায়। এ যেন এক অন্য বাংলাদেশ।

টিএসসিতে তিনদিনে জমা পড়লো তিন কোটির বেশি অর্থ
বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে গত তিনদিন এক অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়েছে। বন্যায় বিপর্যস্ত জেলাগুলোর সহায়তায় যেন সেখানে এক হয়েছে পুরো রাজধানীবাসী। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে তারা এগিয়ে এসেছিলেন ক্ষতিগ্রস্তদের সেবায়। দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে ত্রাণ হিসেবে আসা সব সামগ্রী সুশৃঙ্খলভাবে বুঝে নিচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। মধুর কোলাহলে, ঐক্যে, ভ্রাতৃত্বে, মানবিকতায় আর দেশপ্রেমে টিএসসি যেন হয়ে ওঠে নতুন বাংলাদেশের এক খণ্ড চিত্র।

সরজমিন টিএসসি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিনব্যাপী সেখানে ভিড় লেগে আছে ত্রাণ দিতে আসা লোকজনের। কিশোর থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ বয়স্করাও এসেছিলেন মহৎ এই কাজে অংশ নিতে। কেউ ব্যক্তিগত গাড়ি, কেউ ভ্যানে করে, কেউ আবার ছোট ট্রাকে করে ত্রাণ নিয়ে আসছিলেন। ত্রাণ দিতে আসা লোকজনের ভিড় ও গাড়ি টিএসসি এলাকা ছাপিয়ে আশেপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছিল।

টিএসসি’র প্রধান ফটকে বুথ স্থাপন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে থাকা শিক্ষার্থীরা গত তিনদিন ত্রাণ সংগ্রহ করেন। বুথে থাকা শিক্ষার্থীরা দাতার নাম ও পণ্যের বিবরণ লিখে রাখেন খাতায়। পাশাপাশি অনেকে নগদ অর্থ দিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ান। সেই অনুদানের অঙ্কও শিক্ষার্থীরা খাতায় লিখে রাখেন। গত তিন দিনে নগদ অর্থ উঠেছে তিন কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে শুক্রবার কর্মসূচির দ্বিতীয়দিনেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই উদ্যোগে ১ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার ১৯৬ টাকা জমা পড়েছিল।

বৃহস্পতিবার গণত্রাণের এই কর্মসূচি শুরু করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেদিন নগদ অর্থ এসেছিল ২৯ লাখ ৭৬ হাজার ১৭৩ টাকা। আর গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত উঠেছিল সোয়া কোটি  টাকার বেশি নগদ অর্থের পাশাপাশি সর্বসাধারণের দেয়া নানা ত্রাণসামগ্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে টিএসসি’র বিশাল বিশাল সব কক্ষ। টিএসসি’র অভ্যন্তরীণ ক্রীড়াকক্ষ ও ক্যাফেটেরিয়ায় পূর্ণ হয়ে মাঠও ভর্তি হয়ে গিয়েছিল ত্রাণসামগ্রীতে। শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতার স্বতঃস্ফূর্ত পরিশ্রমের পরেও ত্রাণের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল স্বেচ্ছাসেবীদের। ত্রাণ নিয়ে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমে টিএসসি এলাকা গত তিনদিন সকাল-সন্ধ্যা ছিল লোকারণ্য।
ত্রাণ বুথে লিপিবদ্ধ হওয়ার পর সেটি স্বেচ্ছাসেবকদের হাত ঘুরে টিএসসি’র ভেতরে যাচ্ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহায়তায় সেখানে চলে প্যাকেজিং এর বিশাল যজ্ঞ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, প্রায় ৪০০ জন স্বেচ্ছাসেবক এই গণত্রাণ কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করছেন। জমা দেয়া ত্রাণের মধ্যে নগদ অর্থ, শুকনো খাবার ছাড়াও আছে- স্যালাইন, স্যানিটারি প্যাড, জরুরি ওষুধ, মোম, দিয়াশলাই, গুড়, নানারকম পোশাক এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের উদ্যোগে শিক্ষার্থীরা নগদ অর্থ ও শুকনো কাপড় সংগ্রহ করছেন। শিক্ষার্থীদের অনেকগুলো দল ইতিমধ্যে ফেনী ও নোয়াখালীতে উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ বিতরণ করতে  গেছে।  
রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা এসব ত্রাণসামগ্রী প্যাকেজিংয়ের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের সামনে থেকে একের পর এক ট্রাকে করে পাঠানো হচ্ছে বন্যাদুর্গত এলাকায়।

ত্রাণের জন্য অপেক্ষা

দেখা মিলেছে সূর্যের। ধীরে ধীরে নামছে পানি। দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যায় তলিয়ে যাওয়া এলাকা। সন্ধান মিলছে স্বজনের। একদিকে যখন এমন স্বস্তি, অন্যদিকে বাড়ছে দুশ্চিন্তা। ফেনীর ছয় উপজেলার চারটি থেকে পানি নামছে। যে পানি অন্য দুই উপজেলা হয়ে পড়ছে  সাগরে। আতঙ্ক আর দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। অন্যদিকে খাদ্য সংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। সঙ্গে সুপেয় পানি ও শিশু খাদ্যের তীব্র সংকট।

সরকারি ও বেসরকারিভাবে ত্রাণ পৌঁছানো  হলেও চাহিদার তুলনায় সেটি অপ্রতূল। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার মানুষের খাদ্যের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। টানা বর্ষণ ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উজান থেকে নেমে আসা পানিতে গত কয়েকদিনে প্লাবিত ফেনীসহ দেশের ১২ জেলা। পানিবন্দি অর্ধকোটির বেশি মানুষ। মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে। একের পর এক তলিয়ে গেছে বিভিন্ন এলাকা। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, ফসলি ভূমি, সড়ক সবই নিমজ্জিত বন্যার পানিতে। ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ মানুষ। বিদ্যুৎ নেই অধিকাংশ দুর্গত এলাকায়। পানি ও বিদ্যুতের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে অসংখ্য মোবাইল টাওয়ার। যার কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গত এলাকার মানুষ।

গতকাল ফেনীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ৬টি উপজেলার মধ্যে পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরশুরাম ও ফুলগাজীরও বিভিন্ন এলাকা থেকে পানি নেমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন গত পরশু থেকে পানি কমছে ধীরে ধীরে। স্বস্তি ফিরছে নাগরিকদের মধ্যে। তবে খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সুপেয় পানির এখনো অভাব রয়েছে। তাই অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে শিশু খাদ্যেরও অভাব তীব্র। সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এ ছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও রেড ক্রিসেন্টসহ বেসরকারিভাবে অনেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। পরশু রাতে পরশুরামের স্থানীয় বাসিন্দা সাদ বিন কাদের জানিয়েছেন, পানি কমছে ধীরে ধীরে। তবে এলাকায় খাদ্য সংকট রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষ খাদ্যের জন্য অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে শিশু খাদ্যের অভাব প্রকট। অনেক শিশু সুপেয় পানি ও খাদ্যের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ইকরাম হোসাইন নামে পরশুরামের স্থানীয় আরেক বাসিন্দা গতকাল দুপুরে জানান, তিনি শহর থেকে পরশুরামে যেতে চেয়েও পারেননি। রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সবাইকে যেতে দিচ্ছে না। তারা সকলকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।

অন্যদিকে ছাগলনাইয়া ও সদরেও পানি কমতে শুরু করেছে। সেলিনা আক্তার নামে শহরের শান্তিধারা এলাকার এক গৃহিণী বলেন, শহরে পানি কমতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নতির দিকে। আশা করছি এভাবে আর দুই একদিন থাকলে শহরের মানুষের দুরবস্থা দূর হবে। তবে সদরের কিছু কিছু এলাকায় এখনো বানভাসিরা কষ্টে আছে। পানিবন্দি অনেক মানুষ নিজেদের বর্তমান অবস্থানকে সংকাপন্ন হিসেবে বিবেচিত করছেন। এ ছাড়াও এসব এলাকার মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছেন। বিশেষ করে সুপেয় পানির অভাববোধ করছেন বেশি। আতাউর রহমান নামে একজন জানান, তারা খাদ্য সংকটে রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও বাসা-বাড়িগুলোতে পর্যাপ্ত ত্রাণের প্রয়োজন। অন্যদিকে চার উপজেলায় যখন স্বস্তি তখন অন্য দুই উপজেলায় পানি বাড়ছে। ডুবে যাচ্ছে একের পর এক বসতঘর। আতঙ্কে দিন পার করছেন বাসিন্দারা। মূলত এসব এলাকা দিয়েই সাগরে পড়ছে পানি। আলাউদ্দিন নামে একজন জানান, তাদের এলাকায় সব ডুবে গেছে। সেখানে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। আব্দুল্লাহ আল নোমান নামে আরেক বাসিন্দা জানান, উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন ঝুঁকিতে রয়েছেন। সুপেয় পানি ও খাদ্যেরও সংকট এখানে। এ ছাড়া দাগনভূঞা উপজেলায়ও বাড়ছে পানি। পানিবন্দি মানুষের মধ্যে খাদ্যের হাহাকারও দেখা দিয়েছে। প্রত্যন্ত অনেক এলাকায় পৌঁছেনি খাবার। যার কারণে কষ্টে আছেন সেখানকার মানুষ। মোমিন নামে একজন বলেন, তাদের এলাকায় কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। তিনি তার এলাকার জন্য ত্রাণ সহায়তা চেয়েছেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে বাসিন্দাদের গতকালও আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে হয়েছে। উপজেলা শহরের বিভিন্ন মার্কেটের মেঝেতে আশ্রয় নিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়াও দাগনভূঞা বাজারে অসংখ্য মানুষ ট্রাকে ট্রাকে এসে আশ্রয় নিচ্ছেন।

এদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় শুক্রবার রাত ১০টায় কর্ণফুলী জল-বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৬টি স্পিলওয়ের গেট ৬ ইঞ্চি করে খুলে দেয়া হয়েছে। এ জন্য ভাটি অঞ্চলকে দিনব্যাপী সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। দুপুরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ম্যানেজার এটিএম আব্দুজ্জাহের বলেন, কাপ্তাই লেকে ১০৮ ফুট এমএসএল পর্যন্ত পানি উঠলে বিপদসীমার অবস্থা সৃষ্টি হয়। শনিবার ২টা পর্যন্ত পানি ১০৭ দশমিক ৬৩ ফুট পর্যন্ত উঠেছে। সন্ধ্যার মধ্যে পানি ১০৮ ফুটে উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ অবস্থায় ১৬টি গেটের ৬ ইঞ্চি করে ছেড়ে দেয়া হবে। সবাই সাবধানে থাকুন। অন্যদিকে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবর্ষণের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। এ ছাড়া বন্যায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১৯ জন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব কামরুল হাসান বলেন, এখন পর্যন্ত দেশের ১১টি জেলায় ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৫৪৮টি পরিবারের ৪৯ লাখ ৩৮ হাজার ১৫৯ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত বন্যায় ১৮ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে কুমিল্লায় ৪ জন, ফেনীতে ১ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন, নোয়াখালীতে ৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১ জন, লক্ষ্মীপুরে ১ জন এবং কক্সবাজারে ৩ জন মারা গেছেন।

লক্ষ্মীপুরে বন্যার আরও অবনতি হয়েছে। শুক্রবারের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুটের বেশি পানিবৃদ্ধি পেয়েছে। ৫টি উপজেলা, চারটি পৌরসভা ও উপকূলের ৪০টি এলাকায় এখনো পানিবন্দি ৭ লাখ মানুষ। পাশাপাশি শুক্রবার বিকাল থেকে জেলার অনেক এলাকা বিদ্যুৎবিহীন হয়ে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। দেখা দিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগবালাই। এখন পর্যন্ত জেলায় বিভিন্ন আশ্রয়ণ কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ২০ হাজারের বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত আজাদ হোসেন ও হোসেন আহম্মদ  জানান, কয়েকদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে আছি। পানি ওঠার কারণে ঘরে রান্না জুটছে না। খাওয়া-ধাওয়া করা যাচ্ছে না। এখনো কোনো ত্রাণ পাইনি। খুবই কষ্টে দিনাতিপাত করছি। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বলেন, ডাকাতি ও রহমতখালী নদীসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেয়ায় জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দেয়। গত দুইদিনে প্রায় দুইশ’র বেশি বাঁধ কেটে দেয়া হয়েছে। ফলে পানি নামতে শুরু করেছে।

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ডুবেছে কুমিল্লার ১৪ উপজেলা। কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নামা ঢলে জেলার অন্তত ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এসব উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহতা ছুঁয়েছে বুড়িচং উপজেলাকে। গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর পানিতে তলিয়ে যায় বুড়িচং উপজেলা। উপজেলার সবগুলো ইউনিয়ন বানের পানিতে সয়লাব। পানিবন্দি হয়েছেন ২ লাখ মানুষ। ইতিমধ্যে বেশকিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে দুর্যোগের কঠোর ভোগান্তির সর্বোচ্চ শিখরে আছেন এসব এলাকার বানভাসি মানুষ। এসব মানুষদের অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। তবে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত বুড়িচংয়ের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বাকি সব মানুষ আছেন খোলা আকাশের নিচে। ৫০ হাজার পানিবন্দি পরিবারের অপেক্ষা কেবল বন্যা শেষ হয়ে গেলে পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাওয়ার। ইছাপুরা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, আমার জীবনে এত পানি কখনো দেখিনি। আমাদের সবকিছু তলিয়ে গেছে। আজমীর হোসেন নামে খাড়াতাইয়া এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, মুহূর্তের মধ্যে এত পানি কোথা থেকে এলো বুঝি না। যে ক্ষতিটা আমাদের হয়েছে, জানি না কী দিয়ে পোষাবো। শনিবার সকালেও ঝলমলে রোদ দেখা গেছে কুমিল্লার আকাশ জুড়ে। বৃষ্টি না থাকলেও পানি কমছে খুবই কম আকারে। অন্যদিকে গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বুড়িচং উপজেলা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট না থাকায় পরিবারের সদস্যদের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না স্বজনরা। রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে ও ভেঙে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বন্যার প্রভাবে দুইদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কুমিল্লা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে। শনিবার এক বৈঠকের পর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মাহবুব।

নোয়াখালীর মুছাপুর ক্লোজারে ২৩টি স্লুইসগেট খুলে দেয়ায় পানি নামতে শুরু করেছে। জেলায় ২০ লাখ ৩৬ হাজার পানিবন্দি মানুষের মধ্যে ৮২৬টি আশ্রয়ণ কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার মানুষ। গত দুদিনে বন্যাদুর্গত এলাকায় সাপের দংশনে আহত হয়ে ৩৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতকাল শনিবার দুপুরে বেগমগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র মো. শিউর রহমান নাদিম চৌমুহনী পৌর পার্ক দীঘিতে গোসল করতে নেমে সাপের দংশনে মৃত্যুবরণ করে। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরী দল তার মৃতদেহ উদ্ধার করে। শনিবার বিকালের দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মাসুম ইফতেখার।
চট্টগ্রামে গত বৃহস্পতিবার থেকে চলমান বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা  উন্নতি হয়েছে। বৃষ্টি পড়া বন্ধ হওয়ায় কয়েকটি   এলাকায় রাস্তা থেকে নামতে শুরু করেছে পানি। তবে এখনো সড়ক পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অনেক এলাকা। অব্যাহত রয়েছে ত্রাণ তৎপরতা। এদিকে বন্যার পানিতে ডুবে ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে  ৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় বন্যার পানিতে ডুবে রুষা চাকমা (১১) নামে এক শিশু শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। নিহত শিক্ষার্থী কাবুল্যা কার্বারীপাড়া এলাকার পল্টু চাকমার মেয়ে। সে মেরুংয়ের চংড়াছড়ি এসডিপি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। শনিবার দুপুরে উপজেলার ১নং মেরুং ইউনিয়নের ৮ নাম্বার ওর্য়াডের জয়ন্ত কারবারিপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান সরজমিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

Thursday, August 22, 2024

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে ফেনী

মানবজমিনঃ ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে ফেনী জেলা। ফেনীর রামগর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ফেনীর অধিকাংশ বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। এরমধ্যে ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। উপজেলাগুলোর পৌর শহরগুলোও এখন পানির নিচে। এতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দ্রুত স্পিডবোট ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বন্যা দুর্গতদের উদ্ধারের আবেদন জানিয়েছেন বাসিন্দারা। ইতিমধ্যে সহযোগিতার জন্য সেখানে সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ড পৌঁছেছে।

বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে অনেকের মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। এজন্য জেলার বাইরে থাকা বিভিন্ন মানুষ তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এদিকে কিছু মোবাইল টাওয়ার বিকল্প উপায়ে চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু নেটওয়ার্কে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে সোনাগাজী উপজেলার বড় ফেনী নদীর ওপর নির্মিত মুহুরী রেগুলেটরের ৪০টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ফেনী থেকে ফাজিলপুর পর্যন্ত রেললাইন পানিতে ডুবে গেছে। এজন্য চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ফেনীতে রেললাইন ও রেলসেতুর ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এই অবস্থায় ট্রেন চালানো সম্ভব নয়। তাই আপাতত ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।’

পানি উন্নয়নের বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেন, ফেনীর রামগর পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৬ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। পানি বিপৎসীমার ২১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বৃষ্টিতে বন্যাকবলিত ৬ জেলার ৪৩ উপজেলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ২৪৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১ লাখ ৯০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ওই জেলাগুলো হলো-কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও মৌলভীবাজার।

Friday, July 30, 2010

বন্যার মৃদু পদধ্বনি -দুর্যোগ সীমিত হলেও সরকারের প্রস্তুতি রাখতে হবে

বর্ষা আসে, সঙ্গে আসে বন্যা। কিন্তু এবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় আবহাওয়াবিদেরা স্বাভাবিক বন্যার বেশি কিছু হওয়ার আশঙ্কা করছেন না। বাংলাদেশ প্লাবন সমভূমির দেশ হওয়ায় প্রতিবছর ৩০ শতাংশ এলাকায় বছরের মাঝামাঝি বন্যা হওয়ার কথা। তার আলামত ইতিমধ্যে দেখা দিয়েছে। তবে গত এক সপ্তাহের গণমাধ্যমের খবরে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল কিছুটা প্লাবিত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া চর এলাকায় নদীভাঙনে ইতিমধ্যে অজস্র মানুষ ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে।
মৌসুমি বায়ু এবার অনেক দেরিতে হওয়ায় ভারী বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। তবে উজান থেকে আসা পানি পদ্মা, যমুনা ও তিস্তা নদীর কিছু এলাকায় উপচে পড়ছে। এ ছাড়া নদীর গতিপ্রবাহে নানারকম স্থাপনা নির্মাণ এবং প্লাবনভূমি কমে যাওয়ায় বন্যার ভোগান্তি কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি এখনো সহনীয় হলেও আগস্টের শুরুতে অতিবর্ষণ ও উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢলে বন্যার প্রকোপ কিছুটা বাড়তে পারে। ইতিমধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়সহ উত্তরের জেলাগুলোর নদীর পানি বাড়তে শুরু করায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় জীবনযাপন করছে। সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও মুন্সিগঞ্জে নদীভাঙনও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। ফরিদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় বন্যা মোকাবিলা বাঁধের ওপর চাপ বাড়ছে। সার্বিক পরিস্থিতি বলছে, দুর্যোগ বড় না হলেও সরকারের প্রস্তুত থাকাই কর্তব্য। বিশেষ করে জরুরি ত্রাণ, আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও ডায়রিয়া ঠেকানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বন্যাদুর্গত এলাকায় কাজের অভাব ঘটায় গরিব মানুষের বিকল্প আয়ের সংস্থান করতে হবে।
বন্যা একই সঙ্গে অভিশাপ ও আশীর্বাদ। নদীবাহিত পলি জমে জমেই বাংলাদেশের জন্ম। বন্যায় এই পলি সমতলে ছড়িয়ে মাটির উর্বরতাও বাড়ায়। আবার ভুল নদীশাসনে নদীগর্ভ উঁচু হওয়ায় নদী অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, চিরাচরিত পথে বন্যার সঙ্গে বসবাসের প্রস্তুতি নিয়ে রাখাই কার্যকর বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
অন্যদিকে, পানির গমনপথ দখল করে ঘরবাড়ি-স্থাপনা তৈরি হওয়ায় একদিকে বন্যার পলিসমৃদ্ধ পানি যেমন কৃষি জমিতে যেতে পারছে না, আবার কোথাও কোথাও তা জলাবদ্ধতারও জন্ম দিচ্ছে। তাই ওপর থেকে নামা পানি যাতে সহজে খাল-বিল-জলাশয়ে ছড়িয়ে বিনা বাধায় সমুদ্রে নেমে যেতে পারে, তার ব্যবস্থা নিতে হবে।

Tuesday, June 8, 2010

হাটে হাটে কাঁঠাল-বন্যা by আকমল হোসেন

বাতাসে ভাসছে পাকা কাঁঠালের মত্ত ঘ্রাণ। মন চনমন করা কেমন ঘোর লাগানো গন্ধ। হাটের মধ্যে, রাস্তার পাশে কাঁঠালের ওপর কাঁঠাল স্তূপ করে রাখা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই পাহাড়ি এলাকা থেকে বাজারমুখী নামে এই কাঁঠালের ঢল। কাঁধভার, ট্রলি, ঠেলাগাড়ি, রিকশা, বাইসাইকেল আর ট্রাকে করে আসতে থাকে কাঁঠাল। একসময় কাঁঠালে কাঁঠালে ভরে ওঠে হাট। সেই কাঁঠালের ওপর মৌমাছির মতো হুমড়ি খাওয়া মানুষ; চলে দরদামের মিঠেকড়া কথার গুঞ্জন।
এই কাঁঠাল-বন্যা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার, রবিরবাজার; রাজনগরের টেংরাবাজার, মুন্সীবাজার; বড়লেখা সদর; কমলগঞ্জের আদমপুর, শ্রীমঙ্গল সদরসহ পাহাড়ি এলাকার হাটবাজারগুলোতে। হাটগুলো এখন কাঁঠালে কাঁঠালে সয়লাব হয়ে আছে। লোকজন জানিয়েছেন, এই হাটগুলো মূলত কাঁঠালের পাইকারি বাজার। তবে অনেকের মতে, কাঁঠালের বড় হাটটি বসে কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজারে। বিভিন্ন পাহাড়-টিলায় এত দিন যেসব কাঁঠাল গাছে গাছে দানাদার শরীর নিয়ে ঝুলেছিল, বড় হয়েছিল; সেগুলো এখন মানুষের হাত ঘুরে হাটে আসছে। যত দিন কাঁঠালের মৌসুম ফুরিয়ে না গেছে, তত দিন সপ্তাহের শনি ও বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাজারে কাঁঠালের হাট বসবে।
দেখা গেছে, ভোরের আলো স্পষ্ট হওয়ার আগে যেখানে সুনসান নীরবতা, রোদ যখন একটু একটু করে স্পষ্ট হতে থাকে, তখন স্রোতের মতো আসতে থাকে লোকজন; সঙ্গে কাঁঠাল। টুকরিতে করে কাঁধভারে, ট্রলি, বাইসাইকেল, ঠেলাগাড়ি, রিকশা ও ট্রাকে করে দূর-দূরান্ত থেকে কাঁঠাল নিয়ে আসতে থাকেন তাঁরা। মুহূর্তেই মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের প্রায় আধা কিলোমিটার, কোনো কোনো দিন তারও বেশি জায়গার দুই পাশে কাঁঠালের বন্যা। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, বিশ্বনাথ; সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারেরা এসে ভিড় করেন। কাঁঠাল ব্যবসায়ীরা জানালেন, জ্যৈষ্ঠ মাসেই কাঁঠালের জমজমাট এই হাটটি বসে। কুলাউড়া উপজেলার বুধবাসি, টাট্টিউলি, মুরইছড়া, গণকিয়া, ধামুলি, টিকরিয়া, রাঙ্গিছড়া, হিঙ্গাজিয়া, গাজীপুর, লোয়াইউনি, জালালাবাদ, কালিটি, মনছড়া; রাজনগর উপজেলার টেংরা এলাকা থেকে এখানে কাঁঠাল নিয়ে আসেন কাঁঠালচাষি ও ব্যবসায়ীরা।
ইরফান আলী, আবদুল করিমসহ অনেকে জানালেন, আট-দশ মাইল দূর থেকে ট্রাকে করে কাঁঠাল নিয়ে এসেছেন অনেকে। একা এত দূর কাঁঠাল নিয়ে আসতে খরচে পোষায় না। কাঁঠাল আনতে কয়েকজন মিলে ট্রাক ভাড়া করেন। তাঁরা জানান, তাঁদের এলাকায় এমন কোনো বাড়ি নেই যে বাড়িতে ৫০-১০০টি কাঁঠালগাছ নেই। ফসল ভালো হলে প্রতি গাছে ২০০-২৫০টি কাঁঠাল ধরে। এতে করে ৭০-৮০ হাজার টাকা মৌসুমে আয় করতে পারেন অনেকে। কাঁঠালের এই মৌসুমের জন্য এক ধরনের গোপন তাড়না থাকে তাঁদের। গাছ থেকে কাঁঠাল পেড়ে বাজার পর্যন্ত নিয়ে আসতে প্রতিটি কাঁঠালে শ্রমিক ও পরিবহন খরচ পড়ে প্রায় পাঁচ-ছয় টাকা।
তবে এই মৌসুমি ফল কাঁঠাল নিয়ে তৈরি হয়েছে এক নীরব বাণিজ্যিক ব্যবস্থা। বাজারে আসা কাঁঠালচাষি ও পাইকারেরা জানালেন, গাছের সংখ্যা অনুপাতে চৈত্র ও বৈশাখ মাসে আগাম একেকটি বাড়ির গাছের কাঁঠাল বিক্রি হয়ে যায় পাইকারদের কাছে। আবার কোনো কোনো পাইকার আছেন, যাঁরা এক-দুই বছর আগেও কাঁঠালবাগান কিনে নেন। জ্যৈষ্ঠ মাস কাঁঠালের প্রধান মৌসুম হলেও অনেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত কাঁঠাল বিক্রি করতে পারবেন বলে জানালেন। আরজ আলীসহ যাঁরা সাইকেলে করে কাঁঠাল নিয়ে আসেন, তাঁদের অনেকের জীবিকার অন্য রকম সন্ধান। অনেকেই মূলত দিনমজুর। কিন্তু এই সময়টায় দিনমজুরির কাজে যান না। তাঁরা হয় আগাম ক্ষুদ্র পুঁজিতে কাঁঠালের কিছু গাছ কিনে নেন, না-হয় মৌসুমে সরাসরি চাষির কাছ থেকে কাঁঠাল কিনে সাইকেলে বা কাঁধে করে বাজারে নিয়ে আসেন। সেগুলো বিক্রি করে যা মুনাফা হয়, তাতে কখনো কখনো লাভ ভালো হয় আবার কখনো কখনো কোনো রকম দিন চলার ব্যবস্থা হয়। এতেও তাঁরা সন্তুষ্ট থাকেন এটা মনে করে যে দিনমজুরিতে গিয়ে সারা দিনে যা পেতেন, তা না করে আধবেলায় সেই রুজিটা করলেন।
তবে গাছের কাঁঠাল যখন হাটে আসে, তখন তার দামের ওঠানামা আছে। একই রকম কথা বললেন প্রায় সব হাটের কাঁঠাল বিক্রেতারা। সব সময় ভালো দামে কাঁঠাল কেনাবেচা যায় না। কাঁঠালের দামের উঠতি-পড়তি আছে। হাটে যেদিন আমদানি বেশি হয়, সেদিন দাম পড়ে যায়। এতে কারও কারও মুনাফা দূরে থাক, পুঁজিতে হাত পড়ে। তবে মনে মনে আফসোস আছে অনেকের। এত ফল, কাঁঠালের বন্যা হাটে হাটে, তবু এই কাঁঠাল সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই দাম যা-ই পাওয়া যায়, সঙ্গে সঙ্গেই তা বিক্রি করে দিতে হয়। এখানে লাভ-লোকসান নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই। কাঁঠালচাষিরা জানালেন, প্রাকৃতিকভাবেই বাপ-দাদার আমল থেকে পাহাড়ি এলাকায় কাঁঠাল চাষ হচ্ছে। কাঁঠাল চাষের ক্ষেত্রে তাঁদের আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ নেই। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ বা পোকামাকড়ের আক্রমণ হলে তাঁরা অসহায় হয়ে পড়েন।
জেলার কাঁঠালের হাট ঘুরে মনে হয়েছে, ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’—এই প্রবাদটি এখন কাঁঠাল-বন্যার তোড়ে ভেসে গেছে। গাছের কাঁঠাল এখন হাটে হাটে।