Showing posts with label Exclusive Articles. Show all posts
Showing posts with label Exclusive Articles. Show all posts

Saturday, June 20, 2015

হাঁ-বাজেট না-বাজেট by মাহবুব তালুকদার

চাচা বললেন, দেশের অবস্থা নিয়ে তুমি এত কথা বলো। কিন্তু এবারের বাজেট নিয়ে তো তুমি কোন কথাই বললে না।
বললাম, আমি অর্থনীতিবিদ নই যে, বাজেট সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতো মতামত দিতে পারবো। তবে বাজেট সম্পর্কে আমার নিজস্ব কিছু প্রতিক্রিয়া আছে।
কী রকম? চাচা জানতে চাইলেন।
চাচা! এবারের বাজেট হচ্ছে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী বাজেট। মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিজেই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ।
কী কারণে তাকে ব্যতিক্রমী বলছো?
তিনি একজন নমস্য ব্যক্তি। তার হাসিটি বড়ই প্রাণখোলা। ‘রাবিশ’, ‘স্টুপিড’ ইত্যাদি শব্দের সহজাত ব্যবহারের জন্য তিনি আলোচিত। তবে আমার মনে ও মননে তিনি আসন পেতেছেন সৃজনশীল চিন্তাভাবনার কারণে।
কি সেই সৃজনশীলতা?
ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে একবার তিনি বলেছিলেন, একদিন জোড় সংখ্যার গাড়ি এবং একদিন বেজোড় সংখ্যার গাড়ি চালালে সমস্যার সমাধান হবে। আরও একটা প্রস্তাব ছিল তার।
কি প্রস্তাব?
গাড়ি রাস্তায় চলতে হলে চারজনের কম যাত্রী থাকলে হবে না। একজন বা দুজন যাত্রী থাকলে গাড়ি চলবে না। তবে এ প্রস্তাবগুলো কার্যকর করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
কথাগুলো তার পক্ষে গেল, না বিপক্ষে গেল?
পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে আমি ভাবি না। তবে কথাগুলো খুবই মৌলিক চিন্তা বলে আমার মনে হয়েছে। এরকম ব্যতিক্রমী চিন্তার মানুষকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না।
চাচা গম্ভীরমুখে বললেন, মুহিত স্যারের কথা থাক। তার প্রণীত বাজেটকে তুমি ব্যতিক্রমী বলছো কেন?
আমি জানালাম, সেই আদিকাল থেকে দেখে আসছি বাজেট পেশের আগের দিন সরকারি দল ব্যানার-প্ল্যাকার্ড তৈরি করে বাজেটের স্বপক্ষে অভিনন্দন জানিয়ে রাজপথে মিছিল করে। অন্যদিকে বিরোধী দল গণবিরোধী বাজেট পেশের নিন্দা জানিয়ে পাল্টা শোভাযাত্রা করে। এবারের বাজেট পেশের পর তেমন পক্ষে-বিপক্ষে শো-ডাউনের আয়োজন দেখা যায়নি। এ জন্য এটা ব্যতিক্রম।
এটাও আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর হলো না।
তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটা চমক। সেদিক থেকে এটা ব্যতিক্রম। এ ধরনের বাজেট তারাই দিতে পারেন, যারা মনে মনে কবি।
মুহিত স্যার মনে মনে কবি?
অবশ্যই। আমি তাকে মনেপ্রাণে কবি বলিনি। মনে মনে কবি বলেছি।
বাজেটের সঙ্গে কবির সম্পর্ক কি?
চাচা! কেবল কবিদের পক্ষেই কল্পনাবিলাসিতা সম্ভব। সে জন্যই অর্থমন্ত্রীদের কবি হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কল্পনাবিলাসী না হলে তারা দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখাবেন কি করে? তাছাড়া, নিজে স্বপ্ন না দেখলে দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখানো সম্ভব নয়। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এ গুণটি রয়েছে।
তোমার আজকের কথার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি অর্থমন্ত্রীর কথা বাদ দিয়ে বাজেট সম্পর্কে সরাসরি কথা বলো।
ঠিক আছে। আমি তাই-ই বলছি। আমার মতে কোন বাজেট প্রণয়নের আগে পূর্ববর্তী বছরের বাজেটের সাফল্য ও ব্যর্থতার পর্যালোচনা করা উচিত। এডিপি’র বাস্তবায়ন কতখানি সম্ভব হয়েছে, কতখানি হয়নি, কেন হয়নি, তার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল।
হুঁ। এটা একটা কথা হতে পারে।
এই মূল্যায়ন কেবল যে সরকার করবে, তা নয়। বিশেষভাবে বিরোধী দলের উচিত এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করে দেশের মানুষের কাছে বাজেটের সমালোচনার দিকগুলো তুলে ধরা।
শুধু সমালোচনার কথা বলছো কেন? সাফল্যের কথা বলছো না কেন?
বিরোধী দল যদি সরকারের সাফল্যের গীত গাইতে চায়, তাহলে তা তারা করতে পারে। অবশ্য আমাদের দেশের সংসদের বিরোধী দল তো সরকারেরই অংশ।
কেন? আমাদের সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ তো বাজেটের সমালোচনাও করেছেন।
কিছু সমালোচনা না করলে বিরোধী দলের তকমাটা থাকে না, সম্ভবত সে কারণেই করেছেন।
তুমি বাজেটের আলোচনা করতে গিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছো।
বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু করদাতাদের সেই অর্থের কত অংশ দুর্নীতি ও অপচয়ে খরচ হবে, তা বলা হচ্ছে না।
এ কথার অর্থ কি?
দুর্নীতি থেকে রক্ষা পেতে বাজেটে কিছু অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল।
সে তো আছেই। দুদককে সরকার যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে।
আমি দুদকের কথা বলছি না। তাদের দুর্নীতিমুক্তির সার্টিফিকেট জারি নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছি না।
তাহলে?
আমি ন্যায়পালের কথা বলতে চাই। আমাদের সংবিধানে ন্যায়পালের কথা আছে। কিন্তু মন্ত্রী-এমপিসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দুর্নীতির সুরক্ষা দিতে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
আশ্চর্য! মন্ত্রী-এমপি বা প্রভাবশালীদের সমালোচনা করা ছাড়া তোমার কি আর কোন কাজ নেই?
আছে। তবে চোখের সামনে যা দেখা যাচ্ছে, তার চিত্রটি প্রথমে তুলে ধরা উচিত।
ঠিক আছে। বলে যাও।
চাচা! সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ১৬ জন এমপি’র কর্মকাণ্ডে সরকার বিব্রত বলে খবর ছাপা হয়েছে। এরা খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, জমি দখলসহ নানা অপকর্মে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে পত্রিকাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পত্রিকায় তাদের নামও উল্লিখিত আছে। কিন্তু কেউ তা অস্বীকার বা প্রতিবাদ করেছেন বলে জানা যায়নি। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে উপর থেকে সবুজ সংকেত না মিললে কর্তৃপক্ষ নাকি এদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে না।
তুমি বাজেটের আলোচনা করতে গিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছো।
চাচা! বাজেটের আলোচনা তো কেবল কর আদায় আর খাতওয়ারি অর্থ বরাদ্দের বিষয় নয়। যারা রাজস্ব যোগাচ্ছেন, তাদের অর্থ লুটপাট হচ্ছে কিনা, কারা কিভাবে তা লুটপাট করছে, সে বিষয়টিও সারফেসে উঠে আসা দরকার। আমার মতে সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেই লুটপাটের প্রশ্রয় রয়েছে।
তুমি বড় কঠোর কথা বলছো।
হতে পারে। চোখের সামনে যা দেখছি, তাই বলছি। আমি জানালাম, একটা উদাহরণ দিতে চাই। অন্য একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান খবরে বলা হয়েছে: ‘টেন্ডারবাজি রোধে সরকার ই-টেন্ডারের ঘোষণা দিলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সারা দেশের টেন্ডার এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সরকারি দলের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হানাহানি।’ আরও বলা হয়েছে ‘এমপিদের রামরাজত্ব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি দলে অব্যাহত সংঘাত-সংঘর্ষ’ চলছে। ই-টেন্ডার চালু হলে টেন্ডারবাজি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তুমি বাজেট সম্পর্কে কথা বলো।
সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা তো বাজেটেরই অংশ। যে দেশে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেলে কারও টনক নড়ে না। ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না, সেখানে করদাতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে রাজস্ব আদায়ের নৈতিক শক্তি থাকে কিনা, তা বিবেচনাযোগ্য।
তোমার আজ কি হয়েছে বলো তো? কিসব কথাবার্তা বলছো?
চাচা! দেশের আইন যেন কেবল সাধারণ মানুষের জন্য, প্রভাবশালীদের জন্য কোন আইন নেই। দুর্নীতির পেটেই যদি সিংহভাগ কর ঢুকে যায়, তাহলে বাজেটের আকার বাড়ানোর অর্থ দুর্নীতিরও আকার বাড়ানো। ক’দিন আগে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ অর্থাৎ টিআইবি দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী, কেবিনেট মন্ত্রী, উপদেষ্টা, আইনপ্রণেতা, বিচারক, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করে তা নিয়মিতভাবে আপডেট করা হোক। এটা করতে অসুবিধা কি?
এর সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক কি?
আছে। টিআইবি উল্লিখিত মাননীয় ব্যক্তিবর্গ নিয়মিত কর দেন কিনা, কতটা কর দেন, তাদের সম্পদ কি হারে বাড়ে, তা দেশবাসীর জানা প্রয়োজন। কিছুদিন আগে একজন এমপি বলেছেন, ‘ক্ষমতায় থাকলে সম্পদ তো বাড়বেই।’
টিআইবি’র কথা আর বলো না। ওরা সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি আমলেও টিআইবি’র বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ছিল। ঐ সময়ে এ জন্য ডক্টর মোজাফ্‌ফর আহমদকে কম নিগ্রহ পোহাতে হয়নি। তার মানে টিআইবি এখন ঠিক লাইনেই আছে।
তুমি বাজেটের বিষয়ে বলো। বাজেটের ব্যাপারে তোমার কোন সুপারিশ আছে কি?
হ্যাঁ। আমার কমপক্ষে দুটি সুপারিশ আছে।
কী, কী, বলো।
প্রথমটি হলো, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতিমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থাপনা। এটি না করা গেলে ব্যাপক রাজস্ব আদায় করা হবে কোন মুখে? মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টেও বলা হয়েছে: ‘রাজস্ব আদায়ে ন্যূনতম শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ’।
চাচা সরোষে বললেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় নিয়ে কথা বলার তারা কে? যুক্তরাষ্ট্রকে এই অধিকার কে দিয়েছে?
এই অধিকার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। আমি বললাম, যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সাহায্য দিয়ে থাকে, তাদের ব্যাপারে মার্কিনিরা জানতে চায় তাদের ট্যাক্সের টাকা কোথায় কিভাবে খরচ হচ্ছে। যথাযথভাবে তাদের ট্যাক্সের টাকা ব্যয় হচ্ছে কিনা। এ সম্পর্কিত রিপোর্টে রাজস্ব খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ মার্কিন সাহায্য না নিলে তারা এই খবরদারি করতে পারতো না।
চাচা চিন্তিতমুখে বললেন, হুঁ। বুঝলাম। তোমার আরেকটি সুপারিশ কি?
গণতন্ত্রের সংকট নিরসন করা। এটা করা হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া জিডিপির টার্গেট সাত শতাংশ বা যা-কিছুই ধরা হোক না কেন, তাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। আমি জানালাম।

Monday, June 8, 2015

অদ্ভুত এক আইনের শাসন! by কামাল আহমেদ

আমাদের সদা পরিবর্তনশীল এবং নাটকীয়তায় ভরা রাজনৈতিক ডামাডোলের চাপে বাইরের দুনিয়ার অনেক বড় বড় ঘটনা সংবাদপত্রের পাতা এবং টেলিভিশনের পর্দায় প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যায়। বেশি দূরের নয়, ভারত মহাসাগরেরই এ রকম একটি দেশের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার অনেক কিছুর সঙ্গেই আমাদের অদ্ভুত রকমের মিল। আর ওই সাদৃশ্যগুলোর জন্যই ভবিষ্যতের ঝুঁকিগুলোও প্রায় এক। ওই দ্বীপরাষ্ট্রে প্রতিহিংসার নিষ্ঠুর রাজনীতি প্রতিপক্ষকে যেভাবে কোণঠাসা করে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলার চেষ্টায় রত, ঠিক সেভাবেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থীর শেষ ভরসাস্থল আদালতকে তা কীভাবে ধ্বংসের প্রান্তসীমায় নিয়ে গেছে তা অবিশ্বাস্য। এবং বিস্ময়কর হলেও সত্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ওই রাষ্ট্রটির এসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধসে পড়ার প্রক্রিয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জানালেও বাস্তবে তারা নিরুপায় দর্শক মাত্র। প্রায় ৩০ বছর দেশটি একজন স্বৈরশাসকের শাসনে পরিচালিত হলেও তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি খুব একটা খারাপ ছিল না। কিন্তু গণতান্ত্রিক অধিকারের আকাঙ্ক্ষার স্ফুরণে ২০০৮ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় একটি অবাধ নির্বাচন, যার গ্রহণযোগ্যতা দেশটির ভেতরে এবং বাইরে সর্বত্র একেবারে প্রশ্নাতীত ছিল। একেবারে নতুন প্রজন্মের এক নেতার নেতৃত্বে গঠিত সরকার তার গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নিয়ে চার বছর খুব ভালোই দেশ চালায়। কিন্তু পরাস্ত স্বৈরশাসকের অনুসারী ও সহযোগীদের পুনরুজ্জীবন ২০১২ সালে দেশটিতে সৃষ্টি করে চরম অস্থিরতার। ওই অস্থিরতার সূত্রপাত বিচার বিভাগের সংস্কারের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে। সুপ্রিম কোর্ট, পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং সাবেক স্বৈরশাসকের রাজনৈতিক সহযোগীদের যোগসাজশে নির্বাচিত সরকার উৎখাত—সেই সরকারপ্রধানকে বিচারের মুখোমুখি করা, ভবিষ্যতে সব নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার উদ্যোগ—এসবই ছিল ছকবঁাধা প্রতিশোধের রাজনীতি।
ঘটনাক্রম যদি এখানেই থামত, তা-ও হয়তো দেশটিকে আবার গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু এখন স্বৈরশাসকের যেসব উত্তরসূরি পুনর্জন্ম লাভ করেছেন, তঁারা নিজেদের অবস্থান আরও সংহত করতে চান। সুপ্রিম কোর্টে কোনো ধরনের স্বাধীনচেতা বিচারকের অবস্থান যাতে আর না থাকে, তা নিশ্চিত করার মানসে তঁারা আইন সংশোধন করে বিচারকের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতিসহ দুজনকে বাদ দিয়ে আদালত পুনর্গঠনের কাজটি করে ফেলেছেন। দেশটির বিচার বিভাগে এখন যা চলছে, তাকে অনেকেই বেছে বেছে ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা বা ‘সিলেক্টিভ ইউজ অব ক্রিমিনাল জাস্টিস’ বলে অভিহিত করেছেন (সূত্র: ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য, চার্লস ট্যানকের নিবন্ধ-প্যারাডাইজ ইন পেরিল: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২৫ মে ২০১৫)।
পাশাপাশি সেই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিককে এক ফৌজদারি মামলায় তড়িঘড়ি বিচার করে ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। যে মামলায় তাঁকে দণ্ডিত করা হয়েছে, তাঁর বিচার সম্পর্কে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রাদ আল হোসেইন গত ১৩ মার্চ এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন যে বিচারটি একদিকে যেমন ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হয়নি, তেমনি তা দেশটির নিজস্ব সংবিধান ও আইনও অনুসরণ করেনি। ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করার পর মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে ১১ দিনে শুনানি করে তঁাকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড দেওয়া হয়। তঁাকে আপিলের যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তাতেও অবিশ্বাস্য তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট। কেননা, আপিলে সবাই যেখানে ৯০ দিন সময় পান, তঁাকে দেওয়া হয়েছে ১০ দিন (সূত্র: জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতি)। ওই রাজনীতিকের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের আরও কয়েকজনকে একই ধরনের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে এবং সর্বসম্প্রতি অন্য একটি বিরোধী দলের নেতার বিরুদ্ধেও জারি হয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য, চার্লস ট্যানক যে দ্বীপমালার রাষ্ট্রকে স্বর্গ বলে অভিহিত করেছেন, সেই দেশটি আমাদেরই প্রতিবেশী—সার্কের অন্যতম সদস্য মালদ্বীপ। ৩০ বছরের স্বৈরশাসক হলেন মামুন আবদুল গাইয়ুম, প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ এবং বর্তমানের শাসক গাইয়ুম পরিবারের প্রতিনিধি, তাঁর সৎভাই আবদুল্লাহ ইয়ামিন। নাশিদের ক্ষমতাচ্যুতির পর তঁাকে জেলে পোরা এবং তঁার দলের ওপর যে দমনমূলক কার্যক্রম চলেছিল, তার পটভূমিতে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনে প্রাথমিক বাধা পেরিয়ে নাশিদ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। কিন্তু প্রথম দফায় ২০ শতাংশ ভোট বেশি পেলেও তা বাতিল করে যে দ্বিতীয় দফা ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়, তাতে নানা অনিয়মের মধ্যে তিনি হেরে যান এবং বিস্ময়কর বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হন ইয়ামিন।
মালদ্বীপের রাজনীতিতে সংকট যতটা, তার সূত্রপাত যে আদালতকে কেন্দ্র করে, এই নিবন্ধের মূল বিষয় সেই আদালত। মালদ্বীপে বিচারকদের নিয়োগ এবং শৃঙ্খলার বিষয়গুলো পরিচালনা ও তদারকের জন্য গণতান্ত্রিক শাসনামলে একটি আইন প্রণীত হয়, যা জুডিকেচার অ্যাক্ট নামে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট ইয়ামিন নির্বাচিত হওয়ার এক বছর পর গত ১১ ডিসেম্বর দেশটির পার্লামেন্ট (পিপলস মজলিশ) জুডিকেচার অ্যাক্টের একটি সংশোধনী পাস করে। আর ঠিক তার তিন দিন পর ১৪ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সংখ্যা সাতজন থেকে কমিয়ে পঁাচজনে নামানো, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আহমেদ ফয়েজ এবং আরেকজন বিচারপতি মুতাসিম আদনানকে অপসারণের সিদ্ধান্ত ওই পিপলস মজলিশে অনুমোদিত হয়।
বিচার বিভাগের ওপর এই অভাবিত এবং বিরল হস্তক্ষেপের ঘটনায় বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়। বিচারক এবং আইনজীবীদের স্বাধীনতার বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি, স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার, গ্যাব্রিয়েলা ক্নাউল ২২ ডিসেম্বর এক বিবৃতিতে বলেন, যে প্রক্রিয়ায় এই দুজন বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়েছে, তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়নি এবং তাতে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। কোন কারণে তঁাদের অপসারণ করা হয়েছে, তা প্রকাশ না করার বিষয়টি বিশেষভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন যে এই সিদ্ধান্ত দেশটির বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছে এবং সর্বস্তরে ভীতিকর প্রভাব ফেলবে। বিবৃতিতে মিস ক্নাউল বলেন যে মালদ্বীপের সংবিধান অনুযায়ী জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন তখনই কোনো বিচারককে অপসারণের সুপারিশ করতে পারে, যখন তিনি চরম অযোগ্যতা অথবা অসদাচরণের জন্য দোষী সাব্যস্ত হন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী অক্ষমতা অথবা ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হওয়ার বিষয়ে নিরপেক্ষ পর্যালোচনা ছাড়া কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় না বলে উল্লেখ করে তিনি মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের প্রতি ওই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার আহ্বান জানান।
মালদ্বীপের সর্বোচ্চ আদালতের ওপর রাজনীতির এই খড়্গ চেপে বসার পেছনের ইতিহাসটিও বেশ গুরুত্ববহ। ৩০ বছরের স্বৈরশাসনকালে গাইয়ুম পরিবার এবং তঁাদের আশীর্বাদপুষ্টরাই মূলত বিচার বিভাগে প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে মোহাম্মদ নাশিদের উত্থান-পরবর্তী গণতন্ত্রায়ণের কালে তঁাদের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি থেকেই গেছে। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে ফৌজদারি আদালতের একজন প্রভাবশালী বিচারক আবদুল্লা মোহাম্মদকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়ার পর যে হাঙ্গামা শুরু হয়, তাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী যোগ দিয়ে প্রেসিডেন্ট নাশিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এখন সেই বিচারককে জোর করে অপহরণ এবং আটকের আদেশ দেওয়ার অপরাধেই নাশিদের কারাদণ্ড হলো। এই অভিযোগে একবার তিনি অব্যাহতি পাওয়ার পর তঁাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বিচার করে এই সাজা দেওয়া হয় (মালদিভস এক্স লিডার মোহাম্মদ নাশিদ জেইলড ফর থার্টিন ইয়ারস, বিবিসি, ১৩ মার্চ, ২০১৫)।
তবে মালদ্বীপে বিচার বিভাগকে ঘিরে নাটকীয়তার সবচেয়ে করুণ অধ্যায়টি হচ্ছে অপসারিত প্রধান বিচারপতি আহমেদ ফয়েজকে ঘিরেই। বিচারপতি ফয়েজই প্রেসিডেন্ট নাশিদকে উৎখাতের বিষয়টিকে বৈধ বলে রায় দিয়েছিলেন। আবার নির্বাচনের যে দফায় নাশিদ এগিয়ে ছিলেন, সেই নির্বাচনকে বাতিলের কাজটিও তিনিই করেছিলেন। নির্বাচন কমিশনের অন্তত চারজনকে তিনি কথিত আদালতের কর্তৃত্ব উপেক্ষার দায়ে জেলে পাঠিয়েছেন। এমনকি তিনি দেশটির আরেকটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান মানবাধিকার কমিশনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার বিচার শুরু করেছিলেন। কারণ, জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে পেশ করা মানবাধিকার কমিশনের প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের সমালোচনা ছিল। দুর্ভাগ্য, বিচারপতি ফয়েজের যে তিনি অপরাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর তঁার প্রয়োজন ফুরিয়েছে এবং কোনো কারণ না দেখিয়েই তঁাকে অপসারণ করা হয়েছে। তঁার সঙ্গে অন্য যে বিচারপতি অপসারিত হয়েছেন, সেই বিচারপতি মুহতাসিম আদনানকে অবশ্য আদালতের একমাত্র স্বাধীন বিবেক বলে মনে করা হতো (সূত্র: মিউটিনি অব দ্য স্টেট: মালদিভস গেটস অ্যাওয়ে উইথ অ্যানাদার ক্যু দেতাঁ, আইসাথ ভেলেজিনির ব্লগ)। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং বিচার বিভাগ যখন ক্ষমতাসীন নেতা প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের হাতের মুঠোয়, তখন দেশের ভেতরের ভিন্নমত কিংবা বিদেশিদের উদ্বেগ-সমালোচনা এগুলোর কোনো কিছুই কি আর কাজে আসে? এ এক অদ্ভুত আইনের শাসন—নবজীবনপ্রাপ্ত স্বৈরশাসন!
বাড়তি হিসেবে ইয়ামিন সরকার কাকতালীয়ভাবে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির একটি অপ্রত্যাশিত সুবিধাও পেয়ে গেছে। চীন এবং ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের খেলায় ভারত ক্ষমতাসীনদের রুষ্ট করার ঝুঁকি নিতে কোনোভাবেই রাজি নয়, কেননা চীন মালদ্বীপের একটি দ্বীপে তার নৌঘাঁটি বানানোর প্রস্তাব দিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা রয়েছে।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Thursday, June 4, 2015

‘উন্নয়ন’-এর জন্য গণতন্ত্রে ছাড়! by এ কে এম জাকারিয়া

তিন দফা দেশ শাসনের পর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের চতুর্থ দফা শাসনে আমরা জানলাম যে দলটি ‘বেশি’ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। সরকারের দায়িত্ববান একজন মন্ত্রী যখন বলেছেন ‘বেশি গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না’, তখন এটাকে আমরা দলের অবস্থান বলেই ধরে নিতে পারি। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের এই বক্তব্যের পর দল থেকে কোনো ভিন্নমতের কথাও আমরা শুনিনি। কৌতূহল হয়, এটা কি দলটির নতুন অবস্থান, নাকি সব সময়ই এই বিশ্বাস মেনে চলেছে!
১৯৯৬ বা ২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ যখন সরকার চালিয়েছে, তখন অবশ্য দলটির কোনো নেতার কাছ থেকে এ ধরনের কথা শোনা যায়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ও এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার পর সম্ভবত দলটি বুঝতে পেরেছে যে ‘গণতন্ত্র’ নিয়ে মাতামাতি করার অবস্থা তাদের আর নেই। এর বিকল্প কিছু লাগবে। গণতন্ত্রের জায়গা দখল করে নিল ‘উন্নয়ন’। জনগণকে এখন গণতন্ত্র বাদ দিয়ে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাতে হবে। সরকারের নেতাদের ভাষণ-বক্তব্যে জায়গা করে নেয় এই ‘উন্নয়ন’। আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্কেও উঠে আসতে শুরু করে উন্নয়ন না গণতন্ত্র, কোনটি আমাদের জন্য বেশি জরুরি।
এসব নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম, ‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র?’ শিরোনামে (প্রথম আলো, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৪)। আলোচনা বা তর্ক-বিতর্কটি এ রকম যে উন্নয়ন চাইলে গণতন্ত্রে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। অথবা উন্নয়নের বিষয়টি আগে, গণতন্ত্রের কী হবে, তা পরে দেখা যাবে। তুলনামূলক রাজনীতি ও উন্নয়ন পাঠে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা ও তর্ক–বিতর্ক বহু পুরোনো। এর পক্ষে-বিপক্ষে মতের অভাব নেই, বাস্তব ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈপরীত্য। সামাজিক বিজ্ঞানে সম্পদ (উচ্চমাত্রার) ও গণতন্ত্রের (প্রতিষ্ঠিত) মধ্যে সম্পর্কটি স্বীকৃত। তবে গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও নেই, এমন দেশেও উন্নয়ন ও সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র আশা অনুযায়ী উন্নয়ন দিতে পারেনি, এমন উদাহরণও রয়েছে।
‘বেশি গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না’—এই বক্তব্যের ইঙ্গিতটি পরিষ্কার। মানে সরকার ‘বেশি’ গণতন্ত্র দিয়ে ফেলেছিল এবং এখন এর ‘মাত্রা’ কমানো হবে। এবং এর সঙ্গে যে উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরের বক্তব্যে। বলেছেন, ‘মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ যে পথে এগিয়ে গেছেন, বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সে পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।’
মালয়েশিয়ার ‘উন্নয়ন’ নিশ্চয়ই একটি আলোচিত বিষয়, কিন্তু ‘গণতন্ত্র’ বা ‘গণতান্ত্রিক’ দেশের আলোচনায় মালয়েশিয়ার জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি মাহাথিরের ‘পথে এগিয়ে’ যেতে শুরু করেন, তবে গণতন্ত্রকে যে ছাঁটতে হবে, সেটা পরিষ্কার। জনগণকে গণতন্ত্রের অনেক ছাড় মেনে নিতে হবে। আমাদের এখন জানা দরকার, এই ছাড়গুলো কী বা কতটুকু। এর বিনিময়ে কী পাবে বাংলাদেশ, উন্নয়ন? আমাদের আরও জানা দরকার যে উন্নয়ন বলতে আমরা আসলে কী বুঝব। অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন?
‘উন্নয়নের’ স্বার্থে গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে ছাড়টি দিতে হবে, সেটা সম্ভবত নির্বাচন। গত বছরের ৫ জানুয়ারির সংসদ বা এ বছরের সিটি নির্বাচনগুলো যেভাবে হয়েছে, সামনেও মনে হয় সরকার সে ধরনের নির্বাচনের পথেই হাঁটার কথা ভাবছে। সরকার জনগণকে যে ‘উন্নয়ন’ দিতে চাইছে, সেটা পেতে হলে এ ধরনের নির্বাচনকেই মেনে নিতে হবে। আর সরকারি দল যেহেতু ‘বেশি’ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, ফলে নাগরিক বা মানবাধিকার, আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা বা জবাবদিহির মতো বিষয়গুলো স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণকে যে ‘উন্নয়নের’ আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, তার বিনিময়ে গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এ ছাড়গুলো তারা মেনে নিতে রাজি আছে কি না।
গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘উন্নয়নের’ সংজ্ঞা ঠিক করা। যুক্তরাজ্যের স্বাধীন থিংকট্যাংক ওভারসিস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের রাজনীতি ও শাসনবিষয়ক রিসার্চ ফেলো আলিনা রোচা মেনোকাল গণতন্ত্র ও উন্নয়নবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে পাঠ করা প্রবন্ধে বলেছেন, উন্নয়নের এই সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি আমরা অমর্ত্য সেনকে বিবেচনায় নিই, তবে তা বেশ ব্যাপক। তাঁর কাছে উন্নয়নের সংজ্ঞা হচ্ছে ‘মুক্তি’। কারণ তিনি শুধু অর্থনৈতিক সূচককেই উন্নয়নের সংজ্ঞায় যুক্ত করেননি। রাজনৈতিক ও মানবিক মুক্তি, সামাজিক সুযোগ, স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা, সুরক্ষামূলক নিশ্চয়তার বিষয়গুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাহাথির মোহাম্মদের পথে এগোতে থাকলে ‘উন্নয়নের’ গতি কতটুকু বাড়বে, সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু এই ধারার উন্নয়ন চেষ্টায় আর যাই হোক, অমর্ত্য সেনের উন্নয়ন সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশের জনগণের রাজনৈতিক ও মানবিক মুক্তি মিলবে না। স্বচ্ছতার নিশ্চয়তাও পাওয়া যাবে না। উন্নয়নের বড় শত্রু দুর্নীতি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিহীন পরিস্থিতি বরং উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কার্যকর গণতন্ত্র উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে—এই ধারণার পেছনের সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য। এই ব্যবস্থা জবাবদিহি ও ভারসাম্য নিশ্চিত করে, নির্বাচন ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর পর তা কার্যকর করা যায়।
এর বিরুদ্ধ মতও রয়েছে। আগের লেখাটিতে উল্লেখ করেছিলাম, নতুন পাঠকদের জন্য আবার উল্লেখ করছি। ‘গণতন্ত্রে জনগণের যে দাবিদাওয়াকে বিবেচনায় নেওয়া হয়, তা সব সময় উন্নয়ন–সহায়ক নয়। ...গণতন্ত্র অনেক সময় জনপ্রিয় দাবির প্রতি সংবেদনশীল...বা কখনো এমন সুনির্দিষ্ট দাবির প্রতি গণতন্ত্রকে মাথা নোয়াতে হয়, যা আসলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও বড় আকারের প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’ ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: এ কমপ্লেক্স রিলেশনশিপ বইয়ে এই মন্তব্য ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক প্রণব কুমার বর্ধনের।
গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সম্পর্ক নিয়ে এসব তাত্ত্বিক বিতর্ক থাক। আমরা আপাতত শেখ হাসিনার মাহাথিরের পথে চলার সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করি। মালয়েশিয়ার ‘উন্নয়ন’, এর মাথাপিছু আয়—এসব সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা রয়েছে। এবং সেটা বেশ উঁচু বলেই আমাদের দেশের অনেকেরই স্বপ্ন মালয়েশিয়াকে ‘সেকেন্ড হোম’ বানানো। কিন্তু এই স্বপ্নের দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র—এসবেরও তো খোঁজখবর জানা দরকার।
লিম কিট সিয়াং মালয়েশিয়ার বিরোধী ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টির নেতা। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাঁর উপস্থাপিত প্রবন্ধ থেকে সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে। লিম রাজনৈতিক কারণে বেশ কয়েক দফা বিনা বিচারে আটক ছিলেন এবং কোনোটির মেয়াদ ছিল দুই বছরেরও বেশি। এসব আটক কার্যকর করা হয়েছে ‘ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’–এর আওতায়। একবার বিচারে তাঁর শাস্তিও হয়েছে, ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর আওতায়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, মালয়েশিয়া সরকার ও একটি সুইস কোম্পানির গোপন চুক্তির অনিয়ম প্রকাশ করা। মালয়েশিয়া বা মাহাথিরের আমলের শাসনের দশা অন্তত কিছুটা হলেও টের পাওয়া যায় এক লিম কিটের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দিয়ে।
‘ডেমোক্রেসি ইন মালয়েশিয়া, নিদার ফ্রি নর ফেয়ার’ শিরোনামের উপস্থাপনায় লিম অনেক কিছু বলেছেন। মালয়েশিয়ার গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে তাঁর বক্তব্যের কিছু কথা তুলে ধরছি। কথাগুলো সাধারণভাবে এ রকম, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়, কার্যকর গণতন্ত্রে অনেক কিছুর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয়। এর সঙ্গে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সম্পর্ক রয়েছে। সম্পর্ক রয়েছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সভা-সমাবেশ করার স্বাধীনতার। গণতন্ত্রে সংসদীয় নজরদারি বা নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির মতো যথাযথ চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নিশ্চিত করতে হয়। সিভিল সার্ভিসের ভূমিকা হতে হয় স্বাধীন। থাকতে হয় নির্বাচন কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, দুর্নীতি দমন সংস্থা ও স্বাধীন বিচার বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠান। মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন সরকার গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ সব দিকই উপেক্ষা করে চলেছে। নির্বাচনের মাঠ সমতল নয় এবং অগণতান্ত্রিকভাবে সরকারি দল বারিসান নাসিওনালের (বিএন) পক্ষে নানা সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এভাবেই বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা ৫৬ বছর ধরে তাদের শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
আমরা বেশি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি না’ বা ‘মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ যে পথে এগিয়ে গেছেন, বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সে পথে এগিয়ে যাচ্ছেন’—এসব মন্তব্য থেকে তবে আমরা কী সিদ্ধান্তে আসতে পারি? মালয়েশিয়ার এসব লক্ষণ কী এখানে পরিষ্কার হয়ে উঠছে না? উন্নয়নের আশায় কি তবে আমাদের গণতন্ত্রে ছাড় দিতে হবে!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

Tuesday, June 2, 2015

নির্বাচন এখন নির্বাসনে! by সোহরাব হাসান

একটি রাষ্ট্র তখনই গণতান্ত্রিক হয়, যখন তার প্রতিটি অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠান সংবিধান মোতাবেক চলে বা চলতে দেওয়া হয়। আমাদের রাষ্ট্রের চালকেরা এ ব্যাপারে সব সময়ই অনুদার ছিলেন এবং এখনো আছেন। ফলে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও আমরা রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ (নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা) এবং তার অধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সংহত করতে পারিনি। বরং ঔপনিবেশিক আমলে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক কাঠামোটিও এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। গ্রিসের নগর রাষ্ট্রে সব নাগরিককে এক জায়গায় ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, কিন্তু বর্তমান যুগে সেটি তো সম্ভব নয়। এ কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধি বাছাই বা নির্বাচন প্রথা চালু আছে। পৃথিবীতে এমন একটি দেশ দেখানো যাবে না, যেখানে গণতন্ত্র আছে, অথচ নির্বাচন নেই। অথচ আমাদের নেতা–নেত্রীরা সেই নির্বাচনকেই নির্বাসনে পাঠানোর সমস্ত আয়োজন করেছেন।
বাংলাদেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে নির্বাচনমুখী হলেও এখন সেটি আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। আগে এই আতঙ্কটা জাতীয় নির্বাচনেই সীমিত ছিল, এখন তা বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনেও ছড়িয়ে পড়েছে। এফবিসিসিআই নির্বাচন সম্পর্কে গতকাল সহকর্মী শওকত হোসেন লিখেছেন, যার মোদ্দাকথা হলো সরকারের সমর্থন ছাড়া কেউ এই সংগঠনের শীর্ষ পদে জয়ী হবেন, এমনটি ভাবতে পারেন না। বছর দুই আগে অনুষ্ঠিত বিএমএ (বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন) নির্বাচনে সরকার-সমর্থক চিকিৎসকেরা জয়ী হলে বিরোধী পক্ষ ভোট কারচুপির অভিযোগ আনে। অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন নিয়েও। প্রথম আলোয় এ-সংক্রান্ত রিপোর্ট ছাপা হলে সংশ্লিষ্টদের টনক নড়ে।
আমরা সাংবাদিকেরা দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্রায়ণের কথা বললেও নিজেদের যে প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রেসক্লাব, তার গণতন্ত্রায়ণের কথা ভাবি না। এই প্রতিষ্ঠানে বহু সদস্য আছেন, যাঁরা ১৫-২০ বছর আগে সাংবাদিকতা পেশা থেকে বিদায় নিয়েছেন। আবার একটানা ২০-২২ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় থেকেও অনেকে প্রেসক্লাবের সদস্য হতে পারেন না। প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার জন্য কে কত বছর সাংবাদিকতা করেছেন, সেটি বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হলো পরিচালনা কমিটির ‘রহমত’ আছে কি না। বর্তমানে প্রেসক্লাব নির্বাচন নিয়ে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে, তার মূলে রয়েছে কোটারি স্বার্থ। এই কোটারি স্বার্থই প্রখ্যাত কবি ও অধুনালুপ্ত দৈনিক বাংলার সম্পাদক শামসুর রাহমানের সদস্যপদও আটকে দিয়েছিল। মাননীয় হাইকোর্ট বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাচন স্থগিত করেছেন ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার কারণে। আমরা মনে করি, ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে ব্যক্তিবিশেষের সমঝোতা প্রেসক্লাবে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান দেবে না। প্রতিষ্ঠানকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, পেশার জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রেসক্লাবের সদস্যপদ দিতে হবে।
গত ২৮ এপ্রিল তিন সিটি করপোরেশনের (ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম) যে নির্বাচন হয়ে গেল, তাতে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েই জনমনে প্রবল সন্দেহ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন মানে সবার মধ্য থেকে পছন্দসই প্রার্থী বাছাই করার সর্বজনীন প্রক্রিয়া, যা এখানে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার সংস্থার এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে যে সুবাতাস বইতে পারত, তা সরকার, সরকারি দল ও নির্বাচন কমিশন নস্যাৎ করে দিয়েছে। নির্বাচনে নানা অনিয়ম, কারচুপি নিয়ে যারাই সমালোচনা করছে, ক্ষমতাসীনেরা তাদের ওপর খড়্গহস্ত। ভোট কারচুপির কথা এলেই কথায় কথায় তাঁরা জিয়াউর রহমান ও এরশাদের তথাকথিত ‘গণভোটের’ উদাহরণ দেন। এ দেশে আইয়ুব থেকে এরশাদ—সামরিক শাসকের কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এসব জবরদস্তির নির্বাচনে জনরায়ের প্রতিফলন ঘটেনি। সামরিক শাসকেরা জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসেন না। তাঁরা ক্ষমতাকে জায়েজ করতে দুটি কাজ দক্ষতার সঙ্গে করেন। এক. বিরোধী দল থেকে লোক ভাগিয়ে এনে নতুন দল করা, দুই. যেনতেন নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদ গঠন করে নিজেদের অপকর্ম জায়েজ করেন।
ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগও করা হয় যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন বলেই নাকি গণমাধ্যম, টিআইবি ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের পেছনে লেগেছে। বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হলে সবাই চুপ মেরে যেতেন। তাঁদের এই ধারণা ও অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য। গণতন্ত্র পরাজিত হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জয়ী হয়েছেন বলে নয়। গণতন্ত্র পরাজিত হয়েছে নির্বাচনে ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি বলে। আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে থাকার কথা ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে যখন তাঁরা জয়ী হন, তখন দেশের তাবৎ গণমাধ্যম, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক সেই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে সাধুবাদ জানিয়েছিল। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ে গণমাধ্যম কীভাবে দেখেছে, তা-ও ক্ষমতাসীনদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। সমস্যা হলো সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলা অনেকেই পছন্দ করেন না। বিশেষ করে, যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন। বিএনপি আমলে মাগুরা উপনির্বাচন ও ঢাকা-১০ উপনির্বাচন কিংবা আওয়ামী লীগ আমলের টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে গণতন্ত্র সত্যি সত্যি পরাজিত হয়েছিল।
আমাদের প্রশ্ন, যে কাজ ক্ষমতা জবরদখলকারী সামরিক শাসকেরা করেন, সেই কাজ কেন জনগণের মধ্য থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগ করবে? সিটি নির্বাচনে এবার যে পরিমাণ কারচুপি, অনিয়ম ও জবরদস্তি হয়েছে, তার খুব সামান্যই এসেছে গণমাধ্যমে। কিন্তু সেটিও ক্ষমতাসীনেরা সহ্য করতে পারছেন না। তাঁদের দাবি, বিএনপি কারচুপি করলে নাকি গণমাধ্যম মুখে কুলুপ এঁটে থাকে, আর আওয়ামী লীগ আমলে কিছু ঘটলেই হইচই শুরু হয়। তাঁরা এই অভিযোগের পক্ষে একটি প্রমাণও দেখাতে পারবেন না।
অনেক হতাশার মাঝেও মানুষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে একটু আশার আলো দেখতে চেয়েছিল। তারা ভেবেছিল, সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ হলে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সুস্থিরতা আসবে। কিন্তু আসেনি। আওয়ামী লীগ একটি বড় সুযোগ হারাল। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, দেশে এক মুহূর্তের জন্যও অনির্বাচিত সরকার দ্বারা পরিচালিত হতে পারবে না। কিন্তু নির্বাচিত সরকারকে তো প্রমাণ করতে হবে যে তাদের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব। ১৯৯৫–৯৬ সালে বিএনপি সেটি প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল বলেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা এসেছিল। উচ্চ আদালতের রায়ে সেটি বাতিল হয়ে গেছে। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ যখন ব্যর্থ হলো, তখন বিকল্প কী? ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্পর্কে ক্ষমতাসীনেরা দাবি করেন, বিএনপি আসেনি বলেই তারা একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভালো নির্বাচন করতে পারেননি। মানলাম। কিন্তু সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ সত্ত্বেও কেন নগরবাসীরা ভোট দিতে পারলেন না? তিন মাসের পেট্রলবোমা মারা আন্দোলন করে যখন বিএনপি সর্বমহলে নিন্দিত ও ধিক্কৃত, তখনই নির্বাচন কমিশন কৌশল হিসেবে তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। ক্ষমতাসীনেরা সম্ভবত ভেবেছিলেন বিএনপি নির্বাচনে আসবে না। কিন্তু তাদেরও একটি এক্সিট দরকার ছিল এবং নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি কথা প্রায়ই বলেন। বিএনপি ও জামায়াত তিন মাস ধরে পেট্রলবোমা মারা আন্দোলন করার পরও মানুষ কীভাবে তাদের ভোট দেয়? দেয় এ কারণে যে মানুষ মনে করে, বিএনপি আগুনে–বোমা ছুড়ে দেশের যে ক্ষতি করেছে, আওয়ামী লীগ তার চেয়ে কোনো অংশে কম ক্ষতি করেনি। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, দুপুর ১২টা পর্যন্ত নির্বাচন করেই বিএনপি-সমর্থক তিন মেয়র প্রার্থীর ৩৫ শতাংশ ভোট পাওয়া অবাক কাণ্ডই বটে। তাই প্রধানমন্ত্রীকেই উপলব্ধি করতে হবে এত কিছুর পরও কেন মানুষ বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দিচ্ছে। তাহলে কি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এমন কিছু করছেন, যা বিএনপির আগুনে–বোমার চেয়েও ভয়ংকর। প্রতিদিন পত্রিকা খুললে, টিভির সুইচ অন করলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের তাণ্ডব দেখতে পাই। সাংসদের হাতে উপজেলা চেয়ারম্যান, এক কাউন্সিলরের হাতে আরেক কাউন্সিলর খুন হন। ছাত্রলীগ মারছে যুবলীগকে, যুবলীগ মারছে আওয়ামী লীগকে। সাংসদের হাতে নাজেহাল হচ্ছেন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, ওসি। গত ছয় বছরে কোনো ক্যাম্পাসে ছাত্রদল নেই, শিবির দু-একটি ক্যাম্পাসে থাকলেও অনেক আগেই তাদের মাজা ভেঙে গেছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনও এখন নেই। তাহলে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সন্ত্রাস কারা চালাচ্ছে? সেটি বনেদি আওয়ামী লীগারই হোক আর পিপিপি বা প্রেজেন্ট পাওয়ার পার্টির নবাগতই হোক, সরকার দায় এড়াতে পারেন না।
সরকারি দলের নেতারা পেট্রলবোমার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করলেও এ পর্যন্ত সরকার কজনকে ধরেছে? লালবাগে কবজি উড়ে যাওয়া যুবদলের কর্মী কিংবা বোমাসহ আরও দু-একজনের বাইরে কাউকেই তারা ধরতে পারেনি। রাজশাহীতে দুই শিবির কর্মীকে ধরিয়ে দিয়েছে স্থানীয় মানুষ। তাতে পুলিশের তেমন কৃতিত্ব নেই। কিন্তু আমরা যখন দেখি বাসে পেট্রলবোমা মারার জন্য হিন্দু ছেলে নয়ন বছারকে ধরে পুলিশ শিবির কর্মী বানায় কিংবা তার ধর্ম পরিচয় প্রথমে তারা বিশ্বাসই করে না, পরে যখন জানা গেল সে প্রকৃত হিন্দু, তখন তাঁকে ছাত্রদলের কর্মী বানায়, তখন মানুষ কেবল ওই পুলিশের ওপরই বীতশ্রদ্ধ হয় না, আস্থা হারায় তাঁদের পরিচালনাকারী সরকারটির ওপরই। যখন পুলিশ পেট্রলবোমাবাজদের ধরতে না পেরে গয়রহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, কিংবা বিরোধী দলের নেতাদের রিমান্ড দাবি করে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না সরকারের ওপর মানুষ কতটা অনাস্থা প্রকাশ করে। একটি মিথ্যা মামলা ও অবিশ্বস্ত রিমান্ডের জন্য সরকারের কমপক্ষে ৫ শতাংশ করে ভোট কমছে। আর যতই সময় যাবে, ততই তার ভোট আরও কমতে থাকবে।
অনেক বছর আগে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবিচার দেখে নাট্যকার আবদুল্লাহ আল–মামুন লিখেছিলেন সুবচন নির্বাসনে। এখন সম্ভবত লেখার সময় এসেছে নির্বাচন নির্বাসনে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

Friday, May 29, 2015

তরুণীকে নিয়ে চার জনের হাতাহাতি by সৈয়দ আতিক

গারো জাতিগোষ্ঠীর তরুণী গণধর্ষণের পর চার যুবক নিজেদের মধ্যে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। একজন আরেকজনের গলা টিপে ধরে। এক পর্যায়ে একজনের খুলে রাখা প্যান্টও চলন্ত গাড়ি থেকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলা হয়। এ পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল ‘উপভোগে’ বৈষম্য নিয়ে।
গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার চার যুবক এ তথ্য জানিয়েছে। এরা হলেন- আশরাফ খান ওরফে তুষার, জাহিদুল ইসলাম লাভলু, ফিরোজ ও খোকন। তবে এদের দু’জনকে বুধবার গণমাধ্যমের সামনে হাজির করে র‌্যাব। সংস্থাটি জানায়, তুষারকে মঙ্গলবার রাতে পটুয়াখালীর কলাপাড়া এবং অন্য তিনজনকে গুলশান থেকে গ্রেফতার করা হয়। র‌্যাব এ ঘটনায় মাইক্রোবাসটিও জব্দ করেছে। র‌্যাবের সূত্র মতে, মামলার স্বার্থে ফিরোজ ও খোকনের মধ্যে যে কোনো একজনকে সাক্ষী বানানো হতে পারে। সে হিসেবে এ ঘটনায় তিনজন অভিযুক্ত। তরুণীর এ দুর্ঘটনার সুষ্ট বিচার সম্পন্ন করতে র‌্যাব এ আয়োজন করেছে।
এ অপরাধে নেতৃত্ব দেয়া আশরাফ খান ওরফে তুষার দাবি করে, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ওই তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে সে। তরুণীর কাছ থেকে টাকাও ধার নিয়েছিল। সময় স্বল্পতার কারণে দু’জন ধর্ষণ করতে পারেনি। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়েছিল তাদের। তবে তরুণীর দাবি ছিল পাঁচজন তাকে ধর্ষণ করেছে।
তরুণী গণধর্ষণের ঘটনায় বুধবার র‌্যাব সদরদফতর আনুষ্ঠানিক সংবাদ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ চলন্ত মাইক্রোবাসে তরুণীকে শারীরিক নির্যাতনের বিষয়ে নানা তথ্য দেন।
মুফতি মাহমুদ বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে কুড়িল রোড থেকে তরুণীকে গাড়িতে ওঠিয়ে নির্যাতন করা হয়। এ তথ্য জানার পরপরই র‌্যাব তরুণীর তথ্য অনুযায়ী অভিযানে নামে। এ অভিযানের একপর্যায় ঢাকা ও কুয়াকাটায় অভিযান চালিয়ে ধর্ষকদের গ্রেফতার করা হয়। তিনি বলেন, ঘটনার পরই র‌্যাব প্রযুক্তিগত সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে অপরাধীদের গ্রেফতারে সক্ষম হয়।
তুষার জানায়, মাইক্রোবাসটির সামনে বসা ছিল ফিরোজ। আর সে ছিল মাঝের সিটে। সেখান থেকে পেছনে সিটে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের আগে সিটে বসেই সে তার জিন্সপ্যান্ট খুলে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে। তরুণীকে বিবস্ত্রও করে সে। তুষারের দাবি, এ সময় তরুণী বলে, ‘এটা কী করছেন ভাইয়া। আপনি যদি আমার শরীর নেন। তাহলে আমি আমার স্বামীকে কী দিবো।’
র‌্যাব সূত্র জানায়, তখন তুষার রাগত স্বরে বলে, ‘আগে আমি তারপর স্বামী।’ তখন মেয়েটির সঙ্গে তার ধস্তাধস্তিও হয়। একপর্যায় তুষার তাকে হত্যার ভয় দেখায়। সহযোগীদের বলে, ‘এই ছুরি দাও ওর গলায় চালাই’। তুষার জানায়, তরুণীকে গাড়িতে তুলে এমনটি করবে তা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে সে। নিউমার্কেট থেকে ১৬০ টাকায় থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট কিনে গাড়িতে রাখে।
তুষার আরও জানায়, ঘটনার আধাঘণ্টা আগে কুড়িল রোডের একটি দোকান থেকে কোমলপানীয় কিনে নেয়। চলন্ত গাড়িতে তরুণীকে নির্যাতনের সময় উচ্চস্বরে গান ছেড়ে দেয়। এ সময় গাড়ি চালানোর দায়িত্বে ছিল লাভলু। তুষার লাভলীকে বলে, ‘আমি আগে ফুর্তি করি। পরে তুই। এখন তুই একটা কাজ কর ‘আই আম এ ডিসকো ডেন্সার’ গানটা সাউন্ড দিয়ে বাজা। গাড়িতে গান বাজিয়ে উত্তরা ও কুড়িল ফ্লাইওভার তারা দু’বার ঘুরে। এর ফাঁকে তুষার মেয়েটিকে দু’বার ধর্ষণ করে।
তুষার স্বীকার করেছে, পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে সে যৌনউত্তেজক ট্যাবলেট সেবন করে। তার এ জঘন্য খায়েশ নিবৃত হলে পরে লাভলু তরুণীকে ধর্ষণ করে। তখন গাড়ি চালানোর দায়িত্ব নেয় তুষার। লাভলু জানায়, তরুণীর সঙ্গে সে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটানোর সময় ফিরোজ চেয়ে বসে। সে বলে, আর কত সময়। তখন লাভলু ধমক দিয়ে বলে, ‘ব্যাটা ধৈর্য ধর।’ লাভলুর তথ্যমতে, তখন তরুণী বলে, ‘ভাইয়া আপনারা কাজ ভালো করছেন না। আমার কোনো চাকরির দরকার নেই। আমাকে ছেড়ে দেন। বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।’ এ সময় লাভলু তরুণীকে বলে, ‘কথা কম বলবি। একদম গলা টিইপ্পা দিমু...(প্রকাশের অযোগ্য)।’
লাভলু ও তুষারের এ অপকর্ম শেষ হলে খোকন বলে, ‘আমি কি বাদ যামু। তখন ফিরোজ বলে আমি কি করব। তুষার বলে, দু’জনে যা করবা দ্রুত। ওরে জসিমউদ্দিন রোডে নামায় দিতে হবে।’ এরপর তাদের মধ্যে শুরু হয় হৈচৈ। পরে তুষার তরুণীকে নিয়ে উত্তরায় বাসার সামনে নামিয়ে দেয়। তখন তরুণী বলে, ‘আপনারা কাজটা ভালো করেননি। এর উপযুক্ত শাস্তি পেতে হবে।’ তখন দুই যুবক হাসতে থাকে।
তুষার আরও জানায়, সেখান থেকে ফেরার পর তার পরনে তখনও ছোট প্যান্টই ছিল। একপর্যায় খায়েশ মেটাতে না পারা ফিরোজ তার প্যান্ট রাস্তার পাশে চলন্ত গাড়ি থেকে ছুড়ে ফেলে। উভয়ের মাঝে শুরু হয় হাতাহাতি। একপর্যায় তারা কুড়িল এয়ারপোর্ট রোডে এসে নেমে পড়ে। তখন ফিরোজ তুষারকে মারতে যায়। তাকে গাদ্দার ও হারামি বলে আখ্যা দেয়। তুষার জানায়, ছোট প্যান্ট পরে বাসায় যাওয়ার পর তার স্ত্রী বলে এই প্যান্ট কেন? তখন সে নানা কথা বলে স্ত্রীকে বোঝায়।
কে এই তুষার : আশরাফ খান ওরফে তুষার। বয়স ৩৫ বছর। তার পিতার নাম আবদুল মান্নান খান। সে ১৯৮২ সালে বরগুনা জেলার আমতলী থানাধীন চুনাখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। চুনাখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে ৩য় শ্রেণী পাস করে। ১৯৯৯ সালে ঢাকায় এসে ফতুল্লায় ট্রলারে কাজ শুরু করে। এরপর সে ড্রাইভিং শিখে ট্যাক্সি ক্যাব চালায়। ট্যাক্সি ক্যাব চালানোর কিছুদিন পর তার পূর্বপরিচিত ফিরোজের মাধ্যমে গুলশান-১ সিগনেট বাইং হাইসে ড্রাইভার হিসেবে যোগদান করে। গ্রেফতারের আগ পর্যন্ত সে উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিল। চাকরির স্বার্থে সে তার বসদের নিয়ে তরুণীর প্রতিষ্ঠানে কেনাকাটা করতে যায়।
কেনাকাটার সময় তরুণীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সে কোথায় চাকরি করে মেয়েটি তা জানতে চায় এবং সে সিগনেট বায়িং হাউসে চাকরি করে বলে মেয়েটিকে জানায়। সবকিছু জেনে মেয়েটি তার অফিসে রিসিপসনে লোক নিয়োগ হবে কিনা, এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চায়। সে মেয়েটিকে ফাঁদে ফেলানোর জন্য পরিকল্পনা করে। তার অফিসে চাকরি দেয়ার কথা বলে মোবাইল নম্বর আদান-প্রদান করে। পরের দিন ১৭ মে সকাল বেলা তরুণীর সঙ্গে মোবাইলে তার কথা হয়। পরবর্তী সময় সে তার পরিচিত ড্রাইভার লাভলু ও ফিরোজের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে। লাবলু ও ফিরোজ তাকে পরামর্শ দেয়, যে কোনো মূল্যে ওই মেয়ের সঙ্গে সবাই মিলে শারীরিক সম্পর্ক করবে।
পরবর্তী সময় ২০ মে উত্তরার জসিমউদ্দিন রোডে তরুণীর সঙ্গে দেখা করে মেয়েটিকে চাকরি দেয়ার কথা বলে তার বায়োডাটা চায়। ২১ মে ডিউটি শেষে মালিকের মাইক্রোবাস ও তার সহযোগী লাভলুকে নিয়ে রাত আনুমানিক সোয়া ৯টার দিকে ঘটিকায় কুড়িল বিশ্বরোডে আসে। সেখানে তরুণীর সঙ্গে তারা দেখা করে এবং মেয়েটির বায়োডাটা নেয়। সে মেয়েটিকে বাসায় পৌঁছে দেয়ার প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি প্রথমে রাজি না হলে অনেক অনুরোধ করে গাড়িতে তোলে।
তরুণীর সঙ্গে তুষারের আর্থিক লেনদেনও হয়েছে বলে র‌্যাব কর্মকর্তাদের জানায় সে। তুষার জানায়, পরিচয়ের দুদিন পরই সে তার কাছে ১০ হাজার টাকা ধার চায়। পরে আট হাজার টাকা ধারও দেয়।
কে এ লাভলু : জাহিদুল ইসলাম ওরফে লাভলু। বয়স ২৬ বছর। তার পিতার নাম মোবারক আলী হাওলাদার। ১৯৮৮ সালে ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া থানাধীন তালতলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করে। মানিক চেয়ারম্যান বাড়ির মাদ্রাসা থেকে ৮ম শ্রেণী পাস করে। পরে সংসারে অভাব-অনটনের কারণে তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরে নানা স্থানে কাজ করে ঢাকায় সিগনেট এন্টারপ্রাইজ লি. কোম্পানির ড্রাইভার হয়। ফিরোজ তাকে তার কোম্পানির ড্রাইভার হিসেবে চাকরি প্রদানের নিমিত্তে পরিচয় করিয়ে দেয়। উক্ত পরিচয়ের সূত্র ধরে সে গত দেড় বছর পূর্বে ঢাকা এসে ওই বায়িং হাউসের এমডি নাজির করিমের গাড়ি চালানো শুরু করে।
তার অফিসের ড্রাইভার আশরাফ খান তুষার উক্ত কোম্পানির মাইক্রোবাস চালাত এবং ফিরোজ প্রাইভেট কার চালাত। ১৬ মে ড্রাইভার আশরাফ ফিরোজকে বলে একটা মেয়ের মোবাইল নম্বর নিয়ে এসেছি। তাকে গাড়িতে উঠিয়ে ধর্ষণ করা হবে। উক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী ড্রাইভার আশরাফ গাড়ি নিয়ে কুড়িলে কর্মস্থলের সামনে আসে।
র‌্যাব সদরদফতরে বুধবার র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান যুগান্তরকে বলেন, ফিরোজ ও খোকন তাদের অপকর্মের পূর্ণ খায়েশ মেটাতে না পেরে তুষার ও লাভলুর ওপর ক্ষিপ্ত হয়। তাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের একজন কর্মকর্তারা বলেন, উভয়ের মাঝে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তারা জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানায়। অভিযানে দিকনির্দেশনা ও প্রযুক্তিগত গবেষণায় নিয়োজিত থাকা র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ বলেন, সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেফতারের পরপরই র‌্যাবের পক্ষে তরুণীকে এ তথ্য জানানো হয়। পরে তরুণী র‌্যাবের কর্মকর্তাদের কাছে তার পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
চারজনের মধ্যে র‌্যাব দুজনকে ভাটারা থানায় হস্তান্তর করেছে। র‌্যাব বলছে, ঠিক কতজন জড়িত আছে তা তদন্ত শেষে বলা যাবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, বুধবার তরুণীর ডাক্তারি পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

Wednesday, April 8, 2015

‘যেকোনো প্রকারে’ জিতলে হেরে যায় জনগণ by আলী ইমাম মজুমদার

ঢাকার দুটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। এর প্রচার-প্রক্রিয়া আইনানুগভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই শুরু হয়ে গেছে। এমনকি তফসিল ঘোষণার আগেই বিলবোর্ডে ছেয়ে গিয়েছিল মহানগর দুটি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সময় নির্ধারণ করে এগুলো নামিয়ে ফেলার নির্দেশনা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পালিত হয়নি। এ নির্দেশ পালনে অবজ্ঞার জন্যও শাস্তি পেতে হয়নি কাউকে। এমনকি নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও দায়িত্বশীল পদে আসীন কেউ কেউ নিয়ম ভেঙে প্রচারণা চালাচ্ছেন। একজন তো এমনও বলেছেন বলে সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয় যে ‘তিনটি সিটি করপোরেশনে অবশ্যই যেকোনো প্রকারে আমাদের জিততে হবে।’
এ সংবাদটি যথার্থ নয় বলে প্রতিবাদ হয়েছে, তবে অত্যন্ত দুর্বল ভাষায়। কিন্তু প্রতিবেদক তাঁর বক্তব্য যথার্থ বলে দাবি করেছেন। আর খবরটি একাধিক সংবাদপত্রেই এসেছে। এ ধরনের বক্তব্য একজন নয়, আরও কেউ কেউ দিয়েছেন। আর আচরণবিধি? সেটা অনেকটাই কাজির গরুর মতো। কেতাবেই তা আছে। আইনত নির্দলীয় নির্বাচন হলেও দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। অনেক প্রার্থীর বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানারে শোভা পাচ্ছে প্রার্থী ব্যতীত সেই দলের নেতাদের ছবি। এমনকি জাতির জনকের ছবিও। নির্বাচন কমিশন দেখেও না দেখার অবস্থানে আছে। রিটার্নিং কর্মকর্তারাও আছেন এ বিষয়ে অনেকটা গা-ছাড়া অবস্থায়। কমিশন বা তাদের প্রতিনিধিদের এরূপ নির্লিপ্ততার সুযোগ নেবে সবল পক্ষ। সবলতা হতে পারে সরকারি ক্ষমতা, অর্থ কিংবা ক্যাডারদের তাণ্ডব। আর এসব নির্বাচনের ফলাফলকে করবে প্রভাবিত। এমনকি নির্বাচনব্যবস্থাটির প্রতি জনগণের সাম্প্রতিক কালের ক্রমহ্রাসমান আস্থার মনোভাবকে আরও জোরদার করতে পারে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রায় ১৩ বছর পর ঢাকায় সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলমান আন্দোলন ও নৈরাজ্যের মুখে এ ঘোষণাটি সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্তে অনেকটা আলোকরশ্মির মতো বলে দাবি করা চলে। কেননা, সরকারি দলের পাশাপাশি আন্দোলনকারী প্রধান দলটি এই নির্বাচনগুলোতে অংশ নিতে সক্রিয় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, তাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে তাদের সত্যিকার অর্থে নির্বাচনমুখী করতে পারলে সব পক্ষেরই লাভ। বিশেষ করে দেশবাসীর। এই তিনটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তাই যেকোনো মূল্যে এগুলোতে বিজয়ী হতে সরকারদলীয় কারও কারও প্রত্যয় আত্মঘাতী হতে পারে। বরং দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা ও বিরোধী দলের প্রচার-প্রচারণা চালাতে উপযুক্ত সুযোগ দিলে সরকারের মর্যাদা বাড়বে। গণতন্ত্রের ভিত হবে শক্তিশালী। অবশ্য আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আচরণবিধি ভঙ্গ না করার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁর এ বক্তব্য প্রশংসনীয়। আমরা আশা করব, সবাই এটা মেনে চলবেন।
কিন্তু বারবার পোড় খাওয়া এ দেশের জনগণ ভালো কিছু হবে, এমনটি বিশ্বাস করতে শঙ্কিত। বিরোধী দলের গত তিন মাসে লাগাতার হরতাল-অবরোধ, এরই আড়ালে নাশকতা আর নাশকতা দমনের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু, বিরোধী দলকে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে বাধা, সরকারি দলের রণহুংকার আর এই সুযোগে উগ্র মৌলবাদীদের উত্থানের প্রচেষ্টা—এ সবকিছুই জনগণকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। তবু তারা বারবার আশায় বুক বাঁধে। তেমনি ক্ষীণ আশা নিয়ে অপেক্ষায় আছে এই নির্বাচন তিনটির সফল পরিণতি দেখার।
যেকোনো প্রকারে নির্বাচনে জয়লাভের যে বাসনা, তা নতুন বা অভিনব নয়। আমরা তা দেখেছি বারবার। স্থানীয় ও জাতীয় উভয় নির্বাচনে। সম্ভবত এটা অনেকটা পাকিস্তান আমলের উত্তরাধিকার। ১৯৫৮ সালে তখনকার পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর ‘গণভোট’ শব্দটির সঙ্গে আমরা পরিচিত হই। প্রেসিডেন্ট পদ দখলকারী ব্যক্তির প্রতি আস্থার বিপরীতে একটি কালো বাক্স ছিল। সেই কালো বাক্স গণভোটে জিততে পারে না। তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কখনো কোথাও জেতেনি। ১৯৬৫ সালে সেই প্রেসিডেন্ট একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে আরেক মেয়াদের জন্য তাঁর শাসনক্ষমতা ‘নিশ্চিত’ করেন। এ ধরনের গণভোট আর নির্বাচনই ছিল যেকোনো প্রকারে জয়লাভের প্রচেষ্টা। এর সঙ্গে জনগণের তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না, বরং বৈরী ছিল তারা। তবে তিনি জয়ী হয়েছিলেন। সে ধরনের শাসনব্যবস্থায় নানাবিধ বৈষম্যে ক্ষুব্ধ বাঙালি তাদের জাতীয়তার সংজ্ঞা নতুনভাবে খুঁজে নিল। যাত্রা করল নতুন পথ ধরে। সেই পথেই প্রবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় মুক্তিযুদ্ধ। প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। ভেঙে যায় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি। আজও অবশিষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধান সংকট শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা।
আমরা ১৯৭১ সালে স্বাধীন হলাম। স্বাধীনতার প্রধান চেতনা ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ শাসিত হবে। বলাবাহুল্য, সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসবেন জনগণের সমর্থনকে ভিত্তি করে; যেকোনো মূল্যে নয়। দুর্ভাগ্য আমাদের, আবার আমরা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার দুই-দুটি গণভোট দেখলাম। ১৯৮৮-র ভোটারবিহীন নির্বাচনও দেখলাম। তবে গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নির্বাচিত দুটি সরকারের অধীনে ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারি আর ২০১৪-এর জানুয়ারির নির্বাচনও দেখেছি। শেষোক্তটিতে তো অধিকাংশ প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আবার এ ধরনের নির্বাচনে আরেকটি ব্যর্থ চেষ্টা হয়েছিল ২০০৭-এর জানুয়ারিতে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার মাসাধিককালের মধ্যেই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। ২০১৪-এর নির্বাচন নিয়ে সংকট এখনো কাটেনি।
আলোচনা করা যেতে পারে, যেকোনো মূল্য বলতে প্রকৃত অর্থে কী বোঝায়। নির্বাচন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রক্রিয়া। দলগত বা ব্যক্তিগত যেভাবেই হোক, নির্বাচনে জিততে জনসমর্থন লাভ করতে হবে। তা করতে নির্বাচনী বিধিমালার আওতায় ব্যাপক জনসংযোগ একটি নির্দোষ ও অপরিহার্য প্রক্রিয়া। তবে এটা করতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে কালোটাকার লেনদেন হয়। আর তা করে ক্ষমতায় থাক বা না থাক যেকোনো পক্ষ। প্রার্থী ও দলের অতীত কার্যক্রম এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় সহযোগিতা বা অগ্রহণযোগ্য নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আয়ত্তে নিয়ে বা অগ্রাহ্য করে ভোটকেন্দ্র দখল। ভোটার না গেলেও সিল মেরে ভোটের ফলাফল প্রভাবান্বিত করা। মূল প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচন থেকে সরে গেলে সাধারণত ভোটাররা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। ভোটকেন্দ্রে যান না। এ ক্ষেত্রে সংঘাত ছাড়াই ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর তা না হলে সংঘাতে গিয়ে। তবে এ ধরনের জয়ের মূল্য কিন্তু খুব চড়া। ভোটারবিহীন আর কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের তেমন সম্পর্ক থাকে না।
সূচনাতেই উল্লেখ করা হয়েছে, তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের উদ্যোগ উৎসাহজনক। স্থানীয় সরকার নির্বাচন বলে এবং কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের প্রচেষ্টায় তৃণমূল পর্যায়ে ভোটাররা ভোট দিতে উৎসাহী হবেন। এই নির্বাচনগুলো সফল হলে জাতীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আর এগুলো সফল করতে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসমূহ ও প্রার্থীরা সবার সমভাবে সচেতন থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। আম্পায়ারের ভূমিকায় থাকা নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত দৃঢ়তার কোনো ছাপ রেখে অগ্রসর হতে পারেনি। আইন ও বিধি প্রয়োগে তাদের সক্রিয় উদ্যোগ অত্যাবশ্যক। সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে একটি নেতিবাচক চিত্র এসেছে। কমিশনের নামে এর প্রধানই সব দায়িত্ব নিচ্ছেন। এটা অসংগত এবং সংবিধানের বিচ্যুতি। নির্বাচন-প্রক্রিয়াকে জোরদার করতে কমিশনের এ অবস্থান নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
যা-ই হোক, সরকারপ্রধানের সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্যের প্রতিফলন সরকারের কাজেও থাকবে আশা করা যায়। বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা ছোটখাটো বিচ্যুতি উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা সফল নির্বাচনের জন্য অত্যাবশ্যক। সব পক্ষেরই যেকোনো প্রকারে জয়লাভের মানসিকতা বর্জন করতে হবে। কেননা, এরূপ জয়ে হেরে যাবে জনগণ।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

Monday, April 6, 2015

কাজী রকিবউদ্দীনকে ইতিহাস যে কারণে মনে রাখবে by সাজেদুল হক

একবার তার অনুশোচনার খবর চাউর হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন করার কারণে তিনি অনুতপ্ত। পদত্যাগও নাকি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এখন এটা বিশুদ্ধ পানির মতোই পরিষ্কার যে, ওইসবই ছিল গুজব। বরং তিনি ফিরেছেন প্রবল পরাক্রমশালী রূপে। কাউকেই পাত্তা দিচ্ছেন না। বিএনপি অথবা শত নাগরিকদেরই শুধু নয়, এমনকি তিনি আমলে নিচ্ছেন না নির্বাচন কমিশনারদেরও। একটি মীমাংসিত ইস্যুও সামনে নিয়ে এলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। বহু আগেই সুপ্রিম কোর্টে এটা ফয়সালা হয়ে গেছে, নির্বাচন কমিশন বলতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের বুঝায়। সোজা মানে কোন সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য কমিশনাররা সমন্বিতভাবেই নেবেন। তাহলেই কেবল তা কমিশনের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ এসব কোন কিছুরই ধার ধারছেন না। খেয়াল করলে দেখবেন প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলটি যখন দেখা করতে যায় কাজী রকিবউদ্দীন তাদের সঙ্গে একাই বৈঠক করেন। আর প্রতিনিধি দলের বক্তব্যও নাকচ করেন একাই। কমিশনারদের সঙ্গে পরামর্শ করাও অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন তিনি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও আসম হান্নান শাহের নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রতিনিধি দলের বেলাতেও তাই। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কথা বলেছেন একাই এবং নাকচও করেছেন একাই।
এরইমধ্যে খবর বেরিয়েছে শুধু বৈঠকই নয় নির্বাচন কমিশনের প্রায় সব সিদ্ধান্তই এককভাবে নিচ্ছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক একটি সহযোগী দৈনিককে বলেছেন ‘কমিশনের অনেক গুরুত্বপূর্র্ণ বিষয়ে সিইসি একাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। নিবন্ধন বিভাগে হাজার কোটি টাকার কাজ হচ্ছে। এসব কাজ কে করছে, কীভাবে করছে তার কিছুই আমরা জানি না। এ-সংক্রান্ত কোন নথি আজ পর্যন্ত কমিশনারদের দৃষ্টিগোচরে আনা হয়নি।’
এটা শতভাগ নিশ্চিত করেই বলা যায়, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের এভাবে একক সিদ্ধান্ত নেয়া সংবিধান অনুমোদন করে না। এটা সুপ্রিম কোর্টেরও একাধিক রায়ের লঙ্ঘন। তিনি অবশ্য সৌভাগ্যবান। এমন এক সময়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালন করছেন যখন প্রশ্ন তোলাটাই অন্যায়। একটি ‘ঐতিহাসিক’ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নাম অবশ্যই বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা থাকবে। যদিও কলঙ্কিত নির্বাচন বাংলাদেশে একেবারে অভিনব নয়। তবে যা একেবারেই অভিনব তা হচ্ছে, ভোটের আগেই কোন পক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়া। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি জোট অংশ নেয়নি। এর ভুল-শুদ্ধের দায় ওই জোটকেই নিতে হবে। কিন্তু একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে রকিব কমিশন কতটুকু চেষ্টা করেছে সে প্রশ্ন থেকেই যাবে। বর্তমান কমিশন অবশ্য দাবি করতে পারে, অতীতে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে তারা সফলতা দেখিয়েছে। কিন্তু কমিশন সেখানেই সফলতা দেখাতে পেরেছে যেখানে সরকারি দল হস্তক্ষেপ করেনি। আর যেখানে সরকারি দল হস্তক্ষেপ করেছে, সেখানে কমিশন কোন বাধাই তৈরি করতে পারেনি।
তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে অবশ্য কমিশন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের যারপরনাই হতাশ করছে। অনেকেই বলেন, পুলিশ কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ীই নির্বাচন কমিশন ভোটের তারিখ ঘোষণা করেছে। আর এ কয়দিনে কমিশন যেভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি অস্বীকার করেছে তা ভোটের ইতিহাসে একেবারেই অভিনব। এমনকি আফ্রিকার কোন দেশেও এমন ঘটনা ঘটেছে কি-না তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। তবে এটা সবাই নিশ্চিত করেই বলতে পারছেন কাজী রকিবউদ্দীন আহমদকে অবশ্যই ইতিহাস মনে রাখবে।
সাজেদুল হক
৪ঠা এপ্রিল, ২০১৫, ঢাকা।

Sunday, April 5, 2015

স্বাধীন খাদ্যাভাসের অধিকার by কান্তি গাঙ্গুলি

ভারতে বিগত লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি জোট লোকসভার ৫২ শতাংশ আসনে জয় লাভ করেছি, যদিও ভোট পেয়েছিল মাত্র ৩১ শতাংশ। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের মাথারা ভালো করেই জানে ৩১ ভাগ জনসমর্থনের এই মোদি ম্যাজিক অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। সদ্য সমাপ্ত উপনির্বাচনের ফলাফলে সে লক্ষণও ক্রমশ ফুটে উঠছে। তাই ক্ষমতা ধরে রাখতে গেলে বিরোধীদের সমর্থনে থাকা ৬৯ শতাংশ ভোটকে ভাগ করা দরকার। আর বহু ভাষা ও বহু ধর্মের এই দেশকে ভাগ করার শাসকশ্রেণীর ঐতিহাসিকভাবে চিরন্তন কৌশল হচ্ছে, এই কাজে ধর্ম-সম্প্রদায়গত ভাবাবেগকে কাজে লাগাও। মানুষ যত ভাগ হবে বিশ্বায়নের আগ্রাসী নীতিতে কর্পোরেট দুনিয়ার তত সুদিন আসবে এবং নির্বিত্ত গরিব মানুষ ততোধিক অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। একদিকে জলের দরে সরকারী সম্পত্তি বিক্রি হবে, শ্রম আইন মালিকদের অনুকূলে পালটানো হবে, বীমা-ব্যাঙ্ক চলে যাবে বিদেশী পুঁজির হাতে, খেতমজুর কৃষকদের গলায় পা দিয়ে জমি অধিগ্রহণ আইন আসবে; অন্যদিকে মানুষকে ধর্ম জাতপাতের পরিচয়ে বিভক্ত করতে হবে। কর্পোরেট পুঁজি আর তার তাঁবেদারদের এটাই হচ্ছে কৌশল। ইতোমধ্যেই ‘ঘরওয়াপসি’, ‘রামজাদা-হারামজাদা’ দিয়ে শুরু হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর প্রক্রিয়া, সংখ্যালঘুদের ধর্মস্থানে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলছে নির্বিচারে হামলা। পাশাপাশি সুচতুর কৌশলে বিষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে মানুষের শান্তি সম্প্রীতির মনোজগৎকে। যে মনে জন্ম নেয় শ্রেণী চেতনা সেই মনটাকেই ভেঙে দাও, বিষিয়ে দাও—এই হচ্ছে আর এস এস-বি জেপি’র গোলওয়ালকর কথিত ‘হিন্দু জাতি পুনর্গঠিত’ করার ডকট্রিন। চিন্তার জগতের এই সাম্প্রদায়িকীকরণে যুক্ত করা হয়েছে বেশকিছু সংঘ ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীকে। আর এস এস ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিজীবী সুদর্শন রাওকে ভারতীয় ইতিহাস গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয়েছে। বাবা রামদেবসহ ঘনিষ্ঠ ধর্মব্যবসায়ীদের পরামর্শে জাতীয় শিক্ষা নীতিকে ভারতীয়করণ অথবা গৈরিকীকরণের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। আর এই চক্রান্তের সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে গোহত্যা ও গোমাংস নিষিদ্ধকরণ আইন। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে নতুন নির্বাচিত বিজেপি সরকারের প্রথম কাজ হচ্ছে উপরোক্ত আইন চালু করা। মহারাষ্ট্রের পর এবার বিজেপি শাসিত অন্য আর এক রাজ্য হরিয়ানাতেও একইভাবে আরও কঠোর গোহত্যা ও গোমাংস নিষিদ্ধকরণ আইন তৈরির জন্য বিল উত্থাপিত হয়েছে। এই দানবীয় আইনটি ব্যক্তির রুচি অনুযায়ী খাদ্যাভাসের সাংবিধানিক অধিকারকে সরাসরি লঙ্ঘণ করছে। এই আইনের ফলে সংবিধানের ১৯নং ধারা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। অধিকন্তু গোমাংস জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত একটি আন্তর্জাতিক মান্যতাপ্রাপ্ত খাদ্য। মহারাষ্ট্রে এই আইনে বলা হয়েছে, কেউ গরুর মাংস বিক্রয় করলে বা কারোর কাছে গরুর মাংস পাওয়া গেলে তার পাঁচ বছরের জেল এবং জরিমানা হবে। এমনকি রাজ্যের বাইরে থেকে কাঁচা অথবা রান্না করা মাংস আনাও বেআইনী এবং শাস্তিযোগ্য। হরিয়ানায় প্রস্তাবিত বিলে ক্যান বা কৌটায়ভরা গোমাংস নিষিদ্ধ হতে চলেছে। এক্ষেত্রে শাস্তির মেয়াদ দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানা। প্রস্তাবিত আইনটির গালভরা নাম হচ্ছে ‘‘গরু সুরক্ষা, গরু সংরক্ষণ ও উন্নয়ন আইন’’। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বুড়ো, অশক্ত গবাদি পশুগুলোকে নিয়ে উন্মুক্ত গোচারণ ক্ষেত্র তৈরির পরিকল্পনা আমাদের মতো গরিব দেশে কতটা বাস্তব প্রয়োজনের, যেখানে শিশুমৃত্যু, প্রস্রুতিমৃত্যু, প্রান্তিক মানুষদের যক্ষা, কুষ্ঠ — এমনকি সাপের কামড়ে মৃত্যুর পরিসংখ্যান আমাদের মাথা হেঁট করে দেয়। একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, মাংস বিক্রেতারা জীবিকার সঙ্কটে নিমজ্জিত হবেন এবং ক্ষতিগ্রস্থ হবেন সেইসব কৃষকরা যারা বুড়ো অশক্ত গবাদি পশুকে বিক্রয় করে দোন। সিপিআই (এম) পলিট ব্যুরো এই দানবীয় আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। কেরালা বিধানসভায় ইতোমধ্যেই এই সর্বনাশা আইনের বিরুদ্ধে সর্বদলীয় প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এই সর্বনাশা আইন আসলে ধর্মীয় মেরুকরণকেই শক্তিশালী করবে। পূর্বতন বাজপেয়ী সরকারের ছিল মুখ ও মুখোশের কারসাজি, আর বর্তমান মোদি সরকারের ক্ষেত্রে একইসঙ্গে অনেক রূপ। আমরা বিপদটা কতটা অনুধাবন করতে পারছি, সেটাই হচ্ছে আসল কথা। নরেন্দ্র মোদির দ্বিচারিতা আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। একদিকে গান্ধী হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে ‘বীর’, ‘দেশপ্রেমিক’ বানাবার অপকৌশল, অন্যদিকে গান্ধীজীর চশমার ছবিকে সামনে রেখে স্বচ্ছ ভারত অভিযান। একদিকে যেমন কর্পোরেট ক্ষেত্রের জন্য পাঁচ লক্ষ কোটি টাকার শুল্প ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা করা, তেমনি একশোদিনের কাজ সহ বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যয়বরাদ্দ কমিয়ে আনা। অতএব মোদিবাবুর সরকার যেমন সাধারণ মানুষের সুদিন আনতে পারেনি তেমনি এও নিশ্চিত গরুদের সুদিনও আসবে না। আসলে মানুষের খাদ্যাভাস তার রুচি এবং পরিবেশের উপর নির্ভরশীল। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের এই দেশে খ্রিস্টান, মুসলমান, আদিবাসী, উপজাতি, দলিত, অরণ্যচারী, পাহাড়ী জনজাতির মানুষদের খাদ্যাভাসের রকমারি বৈচিত্রে আমরা বিস্মিত হই। সাপ, ব্যাঙ, গরু, মোষ, ছাগল, ভেড়া, কুকুর, বেজি, কচ্ছপ-হরেক কিসিমের পাখি, বনবিড়াল, শুকর; এমনকি পতঙ্গ পর্যন্ত বিভিন্ন অংশের মানুষের খাদ্যাভাসের সঙ্গে জড়িত। আবার দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে উত্তর ভারতের যেমন খাদ্যাভাসে পার্থক্য আছে; তেমনি পূর্ব ভারত, পশ্চিম ভারত, উত্তর-পূর্ব ভারত; আবার এইসব অঞ্চলের ভিতরও স্থানভেদে খাদ্যাভাসের বিবিধ পার্থক্য বর্তমান। কিন্তু শুধুমাত্র গরুর মাংস নিষিদ্ধকরণের ক্ষেত্রে সংঘ পরিবারের হিন্দুত্বের এজেন্ডাই সামনে আসে। ‘হিন্দু’ ধর্ম বলে যদিও হিন্দু ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ, মহাকাব্যে কোথাও স্পষ্ট কিছু উল্লেখ নেই এবং ‘হিন্দু’ শব্দটা পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বহিঃশক্তির মানুষদের দ্বারা ‘সিন্ধু’র অপভ্রংশ হিসাবে উচ্চারিত একটি শব্দ। তদুপরি এই হিন্দু ধর্মও আবার বিভিন্ন ধরনের গুণ-কর্ম-স্বভাব-বিভাগে বিন্যস্ত। তবু ঋকবেদে গোমাংস নিষিদ্ধ নয়; বরং তা একটি বহুল প্রচলিত খাদ্য। আসলে যাযাবর আর্যদের ঋকবেদকালীন সময়ে খাদ্য নিয়ে কোনো বাছবিছারের অবকাশই ছিল না। (অধ্যাপক ডি এন ঝা) বৈদিক যুগে এবং তৎপরবর্তী সময়ে দেখা যাচ্ছে, গোমাংস যথেষ্ঠ পরিমাণে আকাঙ্ক্ষিত খাদ্য বস্তু হিসাবে মান্যতা পেত। শিক্ষক, ছাত্র, পুরোহিত, রাজা, রাজকর্মচারী, নববিবাহিত দম্পতি অতিথি হিসাবে বাড়িতে এলে নধর ষাঁড়, গরুর মাংস দিয়ে আপ্যায়নের রেওয়াজ ছিল এবং এই ‘অতিথি’ শব্দকে বৈদিক ভাষ্যে ‘গোঘ্ন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ গো-হনন করা হয় যার নিমিত্ত। সিকিম এবং নেপালের ব্রাহ্মণরা গোমাংস আহার করতেন কেননা প্রচলিত উৎপাদন ব্যবস্থায় আমিষ আহারের তেমন কিছু বিকল্প ছিল না। তাই ঋকবেদের দশম অধ্যায়ের (৮৫, ১৩-১৪) স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রের গাভী আহারের ইচ্ছা প্রকাশ পাবার মধ্যে অন্যায় কিছু ছিল না। তৈত্তরীয় ব্রাহ্মাণে বিষ্ণু, ইন্দ্র, রুদ্র এবং সূর্যকে পৃথক পৃথকভাবে বিভিন্ন ধরনের ষাঁড় ও গাভী উৎসর্গ করা হয়েছে। সূত্র, কল্পসূত্র, গার্হস্থসূত্রে গোমাংসকে বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে খাদ্য হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অশ্বমেধ এবং গোমেধ যজ্ঞ করা হতো নিশ্চয়ই শুধু বলি এবং নৈবদ্য নিবেদনের জন্য নয়, বরং প্রসাদ পাবার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাও অবশ্যই উল্লেখনীয়। ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ তার ‘ধর্ম ও সমাজ’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন -‘‘প্রাচীন ভারতীয় সমাজে ব্রাহ্মণরা খাদ্য হিসাবে মাংস গ্রহণ করতেন। বৈদিক যুগে ছাগল, ভেড়া, গরু, ষাঁড় ও ঘোড়ার মাংস খাদ্য হিসাবে প্রচলিত ছিল।’’ এতসব আলোচনা করে গোমাংসের ন্যায্যতার প্রমাণ বা অপ্রমাণের সে অর্থে কোনো তাৎপর্য আজকের আধুনিক জীবনে নেই। মানুষ বেদ-উপনিষদ পড়ে জীবন চর্চা করেন তাও না, কিন্তু মানুষের মনে ধর্মবোধের একটা সুপ্ত আশৈশব ধারণা থাকে। আর ধর্ম ব্যবসায়ীরা এই জায়গাটা দখল করে কৌশলে ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতার বিষ ছড়ায়। তাই ধর্মগ্রন্থকে হাতিয়ার করেই এসব প্রশ্নগুলিকে আলোচনা করতে হয়। সংঘ পরিবারের কোনো এক উর্বর মস্তিষ্ক খাদ্যকে সত্ত, রজ ও তম - এই তিন সত্তা বিশিষ্ট হিসাবে বিভক্ত করেছেন এবং গোমাংস তারে মতে অবশ্যই তামসিক খাদ্য। এবং এই তামসের প্রভাবেই নাকি বর্তমান জনজীবনের মূল্যবোধ কলুষিত হচ্ছে। যদিও সারা পৃথিবীতে এখনো পর্যন্ত সব থেকে বেশি সংখ্যক নিরামিষাশি বসবাস করেন ভারতবর্ষেই। এত ব্যাপক সংখ্যায় নিরামিষাশি থাকার পরেও শুধুমাত্র গতকয়েক বছরে নারী নির্যাতনের ঘটনা এবং নৃশংসতায় আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য বিষয়ক নীতি বলছে, সস্তায় পুষ্টিকর খাদ্য হিসাবে গোমাংস অবশ্যই একটি বিকল্প হতে পারে। যদিও যার যেমন রুচি, সংস্কার সেই অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করতে কোনো বাধা থাকা উচিত নয় এবং এই অধিকার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারও বটে। এক্ষেত্রে খাওয়া এবং না খাওয়ার অধিকার দুটোই একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আলোচ্য বক্তব্যে বিষয়বস্তুর সমালোচনা করতে গিয়ে যারা তির্যক মন্তব্য করবেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলা প্রয়োজন যে -হ্যাঁ, খাওয়ার দুটো অধিকারই আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটা আর একটার থেকে ছোট বা বড়ো নয়। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তাই আমাদের সকলকেই সাবধান ও সচেতন হতে হবে। হ্যাঁ, সকলকেই! এই লড়াইয়ে নামার সময় আমাদের নিজেদের সামনেও ধরতে হবে আয়নাটা। এই আয়না হচ্ছে আমাদের জীবন দর্শন, আমাদের মতাদর্শ। চোখ, কান, মন খোলা রেখে দেখতে হবে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা আমাদের সমাজের মর্মমূলে কিভাবে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতার ফল্গু নদী প্রবাহিত হয়ে চলেছে। সম্প্রতি বেশকিছু সময় ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, শারদোৎসবের বিভিন্ন কমিটির কর্মকর্তা হচ্ছেন ইসলাম ধর্মাবলম্বীর মানুষরা। এঁরা নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। আন্তরিকভাবেই তারা অংশগ্রহণ করছেন শারদোৎসবে। একইভাবে হিন্দু সন্তানরাও মুসলমান বন্ধুর বাড়ির উৎসবে-পার্বণে সাগ্রহে অংশগ্রহণ করছেন। কিন্তু হজরত ইব্রাহিম এবং হজরত ইসমাইলের সর্বোত্তম ত্যাগের আদর্শে প্রাণিত কোরবানির উৎসবে আজ যদি ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ উৎকণ্ঠিত হন, ব্যথার্ত হন, অভিমানী হন, তাহলে উৎসবের আনন্দে জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগ হবে না। ছাগল একটা বিকল্প অবশ্যই, তবে দামের নিরিখে তা বেশ চড়া। অধিকন্তু তিন হক আদায়ের পরে গেরস্থের পাতে মাংস থাকবেইবা কতটা! কারণ অধিকাংশ গরিব মুসলমান পরিবারের পক্ষে দুম্বা খাসি বা উট সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, এমনটা নয়। মানুষের ঐক্য বিঘ্নিত হবে। একবার দেশটা ভেঙেছে, লক্ষ লক্ষ মানুষের অশ্রু, রক্তপাত, অভিমান, হাহাকার আর দীর্ঘশ্বাসের রাস্তা মাড়িয়ে আমরা এসেছি। তাই আমরা অবশ্যই চাইব — ‘‘ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি দাও আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’’। আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে যেন কোনভাবেই ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প না ঢোকে। এখানে অবশ্যই একটা কথা উল্লেখ করা দরকার, আর তা হল মুসলমান মাত্রই যেমন গোমাংস আহার করেন না, তেমনি আমাদের পরিচিত অনেক হিন্দু সন্তানও গোমাংস তৃপ্তি করে খান। অর্থাৎ শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় ব্যতিরেকেও ব্যক্তিগত খাদ্যাভাসের একটি সর্বজনীন অধিকার অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যদি হয় জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ তাহলে সেই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য আমাদের আবার নতুন করে মানবতার অন্বেষণ জরুরী। আমাদের সমাজজীবনের ভিত্তিমূলে যে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের রঙিন বর্ণমালা খোদাই করা আছে, তার পুনরাবিষ্কারের প্রয়োজন। মনস্বী অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তী সদর মফস্বলের আখ্যানে বিবৃত করেছে সেরকমই একটি মন ভালো করে দেওয়া শ্যামল কাহিনী। নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে নদীয়া জেলার অখ্যাত একটি গ্রাম চারাতলা সংবাদের শিরোনাম হয়েছিল। গ্রামে ৮০০ ঘর মুসলমান এবং মাত্র এক ঘর হিন্দুর বাস। হিন্দু পরিবারটি জাতিতে কর্মকার। কাস্তে, কাঁচি, বঁটি, দা-কোদাল, গরুর গাড়ির চাকার লোহার বেড় দেওয়া ইত্যাদি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। মুসলমান প্রধান গ্রামে হিন্দু পরিবারটি সম্প্রীতি ও সৌভ্রাত্বের আবহেই বসবাস করতো। উল্লেখ্য, এই যে মুসলমানরা সাধারণত হাপর দিয়ে কামারের কাজ তেমন জানে না। এমতাবস্থায় একদিন কর্মকার পরিবারের কর্তা কিছুদিন রোগভোগের পর নাবালক সন্তান ও স্ত্রীকে রেখে প্রয়াত হন। এইরকম বিপদের দিনে ঐ হিন্দু পরিবারটির পাশে এসে দাঁড়ায়, সাধ্যমতো গ্রামের সকলেই। মুসলমান ধর্মের এই গ্রামীণ মানুষেরা চাঁদা তুলে কর্মকারের মৃতদেহ যথাযথ সম্মান-মর্যাদা সহকারে হরিধ্বনি দিয়ে নবদ্বীপ শ্মশানে নিয়ে গিয়ে দাহ করে। গ্রামের মানুষ চাঁদা তুলে নিয়ম মতো শ্রাদ্ধশান্তি সহ কীর্তনের সমস্ত আয়োজন দাঁড়িয়ে থেকে সংগঠিত করে। লোকায়ত জীবনের মরমী গবেষক সুধীরবাবু তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হরিধ্বনি দেওয়ার সময় কোনো সংকোচ, আড়ষ্টতা হয়নি! উত্তরে একজন প্রায় নিরক্ষর বৃদ্ধ মুসলমান এগিয়ে এসে বলেছিল, ‘‘দেখুনবাবু আমরা ধর্মের দিকটা ভাবিনি... আমরা শুধু আমাদের গাঁয়ের ছেলেটার গঙ্গার কথা ভেবেছি... তাতে আল্লা কোনো গোস্তাকি নেবেন না।’’ আসলে সাধারণ আমজনতার ধর্মবোধ অত্যন্ত সহজ সরল নির্বিরোধী, যেখানে ধর্মান্ধতার কোনো স্থান নেই। কিন্তু কি করে একটি অতি সাধারণ গ্রামীণ জীবনে এইরকম উদার সমন্বয়বাদী ভাবধারা বিকশিত হতে পারে - সুধীরবাবুর দরদী জিজ্ঞাসু মন সে প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিল। ‘‘আসলে এই গ্রামের প্রায় সবাই সাহেবধনী লোকধর্ম সম্প্রদায়ের শিষ্য। আঠারো শতকের শেষে চরণ পাল নামে এক নিম্নবর্গের মানুষ হিন্দু মুসলমানকে একত্র করে এক উদার সমন্বয়বাদী সেকুলার ধর্ম ধারণার পত্তন করেছিলেন। এদের উপাস্য আল্লাও নয়, হরিও নয়। এদের উপাস্য দীনদয়াল। যারা এই ধর্মে দীক্ষিত তারা বাহ্যত হিন্দু-মুসলমান ধর্মের আচরণ পালন করেন, কিন্তু বিশ্বাসে তারা সেকুলারবাদী। ‘দীনদয়ালের ঘরে’ হিন্দু গুরুর যেমন মুসলমান শিষ্য থাকে, তেমনি মুসলমান গুরুর হিন্দু শিষ্যও থাকে।’’ এই লোকধর্মের মানবিক শিক্ষার কথাই বলে গেছেন কবীর লালনসহ লোকায়ত জীবনের বিশিষ্ট দার্শনিকরা। আজ শ্রেণীগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই আমাদের আত্তীকরণ করতে হবে নিম্নবর্গের মানুষের এই সমন্বয়বাদী চেতনাকে। নদীয়ার অখ্যাত গ্রাম চারাতলা। যেখানে কোনো পাঠাগার নেই, সাকুল্যে দুটি সংবাদপত্র আসে। প্রাইমারি স্কুল একটি, তবে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। চাষ আবাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ধুলো কাদার মানুষগুলো চারাতলা গ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব পালন করেছে অনায়াসে, কোনো ভনিতা ছাড়াই। ধর্ম আর অধর্মের মাঝে আজ আমাদের তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই দানবীয় আইনের বিরুদ্ধে, ধর্মসম্প্রদায়গত মেরুকরণের বিরুদ্ধে আমরা আমাদের চেতনাকে কিভাবে অগ্রবর্তী করতে পারবো। নব্বইয়ের দশকে রামজন্মভূমি-বাবরি মসজিদ নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার আগুনে যখন গোটা দেশটাই ঝলসে যাচ্ছিল, তখন সমাজের গভীরে ক্রিয়াশীল ছিল মানবিক সম্পর্কের এইরকম হাজারো আখ্যান। আসলে মানুষের সমাজে মানুষই হচ্ছে কেন্দ্রীয় বিষয়; গরু নয়। এবং গরু জানেও না, গরুকে নিয়ে এবং বিধ তৎপরতা শুরু হয়েছে যাতে করে মানুষের ঐক্য বিঘ্নিত হয়। তাই গরু এখানে উপলক্ষ্য; অন্য আরো বহুবিধ বিষয়কে সামনে এনে মানুষকে ভাগ করার ষড়যন্ত্র চলবে। আমরা সচেতন হব, সাবধান হব। কারণ দেশটা আমাদের, সংবিধানের উৎস হচ্ছে এ দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। আমাদের স্বাধীন রুচি এবং খাদ্যাভাসের অধিকার আমরা কেড়ে নিতে দেব না। আজ যদি আমরা প্রতিবাদে সামিল না হই তাহলে আগামীদিনে বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মচারণ, মত প্রকাশ ইত্যাদি মৌলিক অধিকারও বিপর্যস্ত হবে। কেননা আমরা জানি, ‘নগর পুড়িলে দেবালয় রক্ষা পায় না’। কান্তি গাঙ্গুলি: ভারতীয় গণমাধ্যমকর্মী

Saturday, April 4, 2015

এশিয়ায় গণতন্ত্রের বিচার by ইউরিকো কোইকি

বাংলাদেশ সরকার ও বিচার
এশিয়ার ক্রমবর্ধমান গণতন্ত্রের পরীক্ষার সময় এটা। আক্ষরিক অর্থে এ পরীক্ষা হচ্ছে আদালতে। এ অঞ্চলে ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন অথবা হতে যাচ্ছেন এমন জাতীয় বড় বড় দলের নেতাদের তালিকা ভীষণভাবে বেড়ে যাচ্ছে। তাতে এটা ভাবা যুক্তিসঙ্গত যে, এ দেশগুলোতে আদতে গণতন্ত্রই টিকে থাকবে কিনা!  সম্ভবত সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে হত্যার অভিযোগ। এক বছরেরও কম সময় আগে ক্ষমতা হারিয়েছেন ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে প্রকিসিউশন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তার সরকারের অধীনে কয়লাখনি প্রকল্প বেসরকারি খাতে দেয়া নিয়ে ওই অভিযোগ। থাইল্যান্ডে গণতান্ত্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন ইংলাক শিনাওয়াত্রা। কিন্তু একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। ধান বা চাল সংগ্রহ খাতে ভর্তুকি দেয়ার ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি এ অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বলাৎকারের। ১৯৫৮ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে মালয়েশিয়া। তার পর প্রথমবার ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড মালয়’জ ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)-এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে বিরোধীরা। ঠিক তখনই আনোয়ারের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে তাকে ৫ বছরের জন্য জেল দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৫ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ তিনি। মালয় পার্লামেন্টে পিতার বিরুদ্ধে বিচারের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন করায় আনোয়ার ইব্রাহিমের মেয়েকে আটক করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। মালয় পার্লামেন্টে ডানপন্থি হিসেবে তিনি নির্বাচিত একজন এমপি। অবশ্যই এসব রাজনৈতিক মামলার প্রতিটির অরিজিন বা উৎস ভিন্ন। এসব মামলার প্রতিটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে এর ভিন্নতার মাপকাঠিতে। প্রশ্ন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে। প্রতিটি দেশের ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক স্বার্থে এতে কি প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। মনমোহন সিংকে ভারতের প্রসিকিউটররা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এটা হতে পারে সবথেকে বাজে এবং উদ্বেগ সৃষ্টিকারী মামলা। কারণ, ভারতে রয়েছে দৃঢ় গণতন্ত্র। এর বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ঈর্ষণীয়। মনমোহনের অধিকার নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে তার যে সমর্থক আছেন তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এমন হতে পারে তার বিরুদ্ধে মামলাটি হতে পারে বিরোধী দল কংগ্রেসকে কিছুটা অবদমিত করার রাজনৈতিক খেলার অংশ। বস্তুত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজনৈতিকভাবে এতটাই চতুর যে, তিনি দলীয় সুবিধা অর্জনের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বিরুদ্ধে তদন্তে হস্তক্ষেপও করবেন না। দুঃখজনকভাবে সত্য যে, অন্য মামলাগুলোতে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত হওয়ার কোন বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ মুসলিম গণতান্ত্রিক দেশ বাংলাদেশ। এ দেশটিতে নানা ঐতিহাসিক রেকর্ড আছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে মামলা, তাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হতে পারে। সেটা হতে পারে শুধু তখনই, যদি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে কাজ করার জন্য উদগ্রিব হয়ে থাকেন। বাংলাদেশে দু’নেত্রীর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। তারা কিংবদন্তিতুল্য। দু’জনের প্রত্যেকে  প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দু’জনই আদালতকে ব্যবহার করেছেন প্রতিপক্ষকে ক্ষমতার বাইরে রাখার জন্য, এর ফলে কি ক্ষতি হতে পারে সেটা দৃশ্যতই চিন্তাভাবনা না করে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগের কারণে এরই মধ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। যদি প্রকৃতপক্ষে একটি বিচার কার্যক্রম শুরু হয় তাতে ভয়াবহ জন-অসন্তোষ দেখা দিতে পারে। এতে শেখ হাসিনার শাসনের অধীনে দেশটি যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে তা বিপদগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়বদ্ধ এমন সরকারি প্রসিকিউটররা এ মামলাটি নিয়ে অগ্রসরমাণ। থাইল্যান্ডে শিনাওয়াত্রার বিচার অত্যাসন্ন। মালয়েশিয়ায় আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে বারবার যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তাতে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতায় যথেষ্ট ঘাটতি থাকবে। থাইল্যান্ডে ইংলাক শিনাওয়াত্রা ও তার ভাই থাকসিন সিনাওয়াত্রা- দুজনই সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন থাকসিন শিনাওয়াত্রা। তারা ১৫ বছর থাইল্যান্ডের ক্ষমতায় ছিলেন। তাদের নির্বাচনী ক্ষমতার ইতি ঘটাতে দেশটির জেনারেলরা এবার ইংলাক শিনাওয়াত্রাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন- এটা একেবারে পরিষ্কার। ফলে জেনারেলরা ও ব্যাংককের অভিজাত শ্রেণীর মিত্ররা দৃশ্যত এখন সময়টাকে পাল্টে দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইংলাকের বিরুদ্ধে অত্যাসন্ন যে বিচার সেটা একটা সংকেত। সংকেত দেয়া হবে যে, থাকসিনদের জনপ্রিয়তা থাইল্যান্ডের ‘ম্যানেজড’ গণতন্ত্রের কাছে হারিয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে থাকসিনপন্থি শক্তিগুলো নিষ্ক্রিয়। তবে তাতে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্রকে চিরদিনের জন্য সামরিক বাহিনী দমিয়ে রাখতে পারবে বা অধিকার বঞ্চিত রাখতে পারবে- এমনটা কারও  ভাবা উচিত নয়। দুঃখজনক হলো, মালয়েশিয়াও খুব তাড়াতাড়ি একই রকম সহিংস প্রতিবাদের মুখে পড়তে পারে। এতে তাদের অর্থনীতির অবনমন ঘটবে। এই অর্থনৈতিক পতন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে থাইল্যান্ডকে আঁকড়ে ধরেছে। মালয়েশিয়ার প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার বিচার হওয়া উচিত এমন ধারণাই দিচ্ছে ইউএনএমও। এটা পরিষ্কার যে, এতে বোঝানো হচ্ছে কোন প্রকৃত গণতন্ত্র নেই। যেখানে থাকবে আইনের শাসন। এমন সব প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে তা কোন নিরপেক্ষ আদালত গ্রহণ করতে পারে না। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও দীর্ঘদিনের নেতা লি কুয়ান ইউ এ মাসে মারা গেছেন। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক নেতারা ও এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলো মাঝে মাঝেই তাকে অনুসরণের কথা বলেন, যদিও দেশ দুটি লির দেখানো পথে হাঁটে নি। হ্যাঁ, লি যে ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন তাতে তিনি ৩১ বছর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। ফৌজদারি আদালত নয়, তিনি ব্যবহার করেছিলেন দেওয়ানি আদালত। এই আদালতের মাধ্যমে তিনি তার বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। পৃষ্ঠপোষকতার উপরে ধী শক্তি এটা নিশ্চিত করেছিলেন লি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। সুশাসনের জন্য দ্রুত সংহতকরণের জন্য এই ফর্মুলাই হলো ভিত্তি। এর অধীনে সম্ভ্রান্তদের একচেটিয়া ক্ষমতাকে কঠোর মানদণ্ডে সীমিত করে। কারও প্রতিপক্ষকে ফৌজদারি আদালতে তোলা হলে তাতে দৃশ্যত একই রকম ফল বয়ে আনবে না।
ইউরিকো কোইকি
জাপানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী
ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা
(ইউরিকো কোইকি জাপানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তিনি জাপানের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির জেনারেল কাউন্সিলের চেয়ারওমেন ছিলেন। বর্তমানে তিনি ন্যাশনাল ডায়েট-এর একজন সদস্য)
(অনলাইন প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ)

Friday, April 3, 2015

হুমায়ূন আহমেদ সুপ্রভা, এবং... by সাজেদুল হক

স্বামীর অপেক্ষায় স্ত্রী। বাবার অপেক্ষায় সন্তান। ছেলের অপেক্ষায় মা। প্রয়াত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের অপেক্ষা উপন্যাসে এভাবেই অপেক্ষায় থাকে একটি পরিবার। হঠাৎ একদিন ঘর থেকে বের হয়ে মানুষটি আর ফিরে আসেন না। রাত দিন অপেক্ষা করতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। কখন বুঝি বাসার কলিংবেল বেজে উঠবে, কখন বুঝি ফিরে আসবেন পরিবারের প্রিয় মানুষটি। বাংলাদেশের অনেক পরিবারই এখন এমন অপেক্ষায় রয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ তারা হারিয়ে ফেলছেন তাদের পরিবারের প্রিয় মানুষটিকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের। সৌভাগ্যবান দু-একজন ফিরে আসছেন। কারও লাশ মিলছে। আর কারও খোঁজ মিলছে না। ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান তালুকদার খোকনের কথাই ধরুন না কেন? ফুটফুটে দুটি কন্যা সন্তান তার। পালিয়ে থাকলেও একদিন এদের টানেই ফিরে এসেছিলেন বাড়িতে। আর সে রাতেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। এরপর থেকে দুই কন্যা অপেক্ষায় আছে তাদের বাবার জন্য। তারা খুঁজে বেড়ান তাদের প্রিয় বাবাকে। কিন্তু কোথাও পান না। যদিও বড় কন্যাটির দৃঢ়বিশ্বাস তাদের পিতা একদিন অবশ্যই ফিরে আসবে। শাহ ইসরাত আজমেরী খুঁজে বেড়াচ্ছেন স্বামীকে। খুঁজে তো পাচ্ছেনই না, উল্টো তার সঙ্গে নিষ্ঠুর রসিকতা করছেন কেউ কেউ। হঠাৎ হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। অজ্ঞাত ব্যক্তিরা ফোন করে বলেন, আপনার স্বামীর লাশ ভেসে উঠেছে অমুক জায়গায়।
এই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের জীবনের মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতার বয়ান উঠে এসেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলির এক লেখায়। তিনি লিখেছেন, ‘সরকারের অস্বীকার করাই হচ্ছে বলপূর্বক গুমের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। প্রিয়জন হয়তো বহু বছর ধরে এক অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচে, আশা আর নিরাশার দোলাচলে। মায়েরা চিন্তিত থাকেন, তাদের সন্তান যদি কখনও ফেরেও, তাহলে তাকে চেনা যাবে কিনা। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে যেসব নারী তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বামীর খোঁজে এখনও অপেক্ষায় আছেন তাদের বলা হয় ‘অর্ধ-বিধবা’। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার জানিয়েছে, তারা শোকও প্রকাশ করতে পারেন না ঠিকঠাকভাবে। তারা অস্থির থাকেন এই ভেবে যে, তাদের প্রিয়জন কি এখন নির্যাতন ভোগ করছে, নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, কবরে শায়িত হওয়ার মর্যাদা কি সে পেয়েছে? আজকের বাংলাদেশে, বহু পরিবার এমন প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে রয়েছে।’
কত জনের কথাইবা বলবেন? গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে গুমের শিকার হয়েছেন শতাধিক মানুষ। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে গুমের শিকার হয়েছেন ২১ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক বিবৃতিতেও গুমের প্রায় একই সংখ্যার কথা বলা হয়েছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমেদকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ২১ দিন হতে চললো আজও তার হদিস মিলেনি। তার পরিবার বারবারই বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই তুলে নিয়ে গেছেন তাকে। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীও এমনটাই জানায় সংবাদ মাধ্যমকে। শীর্ষ পর্যায় থেকে নিম্ন পর্যায়ের বিরোধী রাজনীতিবিদ কেউই এখন গুম আতঙ্কের বাইরে নন। এমনকি রংপুর থেকে এক নারীকেও গুম করা হয়েছে।
কেমন আছেন গুম হয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়াদের পরিবারের সদস্যরা। ক’মাস আগে গুম আর বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার এক ব্যক্তির কন্যা বলেছিলেন, আমরা সৌভাগ্যবান। আমরা তো অন্তত আমাদের পিতার লাশ পেয়েছি। কিন্তু গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা তো তাও পাননি।
অপেক্ষা উপন্যাসেরই একটি চরিত্র সুপ্রভা। অভিমান করে যে আত্মহত্যা করে। তাকে নিয়ে হুমায়ূন লিখেছেন, ‘ছোট্ট সুপ্রভা। তোমার প্রসঙ্গ অপেক্ষা উপন্যাসে আর আসবে না। কারণ, তোমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকবে না। মৃত মানুষদের জন্য আমরা অপেক্ষা করি না। আমাদের সমস্ত অপেক্ষা জীবিতদের জন্য। এই চরম সত্যটি না জেনেই তুমি হারিয়ে গেলে।’
হুমায়ূনের বয়ান সত্য হলে জীবিতদের জন্যই আমাদের অপেক্ষা এ সত্য অনিবার্য। কিন্তু যারা জীবিত নয়, আবার মৃতও নয় তাদের জন্য আমরা কি করি? যে সন্তান জানে না তার পিতা বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন, তিনি কি করবেন? যে স্ত্রী জানে না তার স্বামী মৃত না জীবিত, তিনি কি করবেন? যে পিতামাতা জানেন না তাদের সন্তানের খোঁজ, তারা কি করবেন? অর্ধএতিম, অর্ধবিধবা এবং অর্ধ মা-বাবাদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার কেউ নেই বাংলাদেশে।
লিখেছেন: সাজেদুল হক

Monday, March 2, 2015

বেঁচে থাকো বাংলাদেশ, বেঁচে থাকো, প্লিজ by ফরহাদ মজহার

গত ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে সংসদে আওয়ামি লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার কথা শুনছিলাম। ‘যারপরনাই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন’-এর মধ্য দিয়ে তিনি ‘প্রধান মন্ত্রী’, তাঁর ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তিনি তাকে আমলে নিচ্ছেন না। যার কুফল বাংলাদেশকে ভোগ করতে হচ্ছে।
‘যারপরনাই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন (extremely flawed election) আমার ভাষ্য নয়। বিদেশিদের মূল্যায়ন। যুক্তিসঙ্গত কারনেই ‘যারপর নাই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন’-এর মধ্য দিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদও আন্তর্জাতিক মহলে আদৌ বৈধ সংসদ কিনা সে বিষয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে অবৈধ সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, এক শ্রেণির গণমাধ্যমের নির্বিচার ও নির্লজ্জ সমর্থন এবং দেশের ভেতরে শ্রেণি ও শক্তির ভারসাম্যের কারনে। সেই ভারসাম্য চুল পরিমান সরে গেলে সরকারের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব।
সে যাই হোক আওয়ামি লীগ নেত্রীকে গতকাল (৪ ফেব্রুয়ারি) রাতে সংসদে যারপর নাই ক্লান্ত মনে হচ্ছিলো। তিনি রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছেন, তাঁর পিতা সারা জীবন জেল জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক নেতাদের দমনপীড়নের ফল কি দাঁড়ায় এটা তো তাঁর নিজের জীবন থেকেই জানার কথা। ভাবছিলাম কী করে তিনি খালেদা জিয়াকে আইন বহির্ভূত ভাবে অবরুদ্ধ করে রাখতে পারছেন? কিভাবে বাংলাদেশের প্রধান একটি রাজনৈতিক দলের চেয়ার পারসনের বিদ্যুত লাইন তিনি ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় কেটে দেওয়া সম্ভব হোল? মোবাইল, ইন্টারনেট ও ডিশ লাইনও। এই সবের জবাবদিহিতা তাঁকে কি করতে হবে না? চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়।
খালেদা জিয়া নির্বাচন চাইছেন। নির্বাচন দেওয়া না দেওয়া রাজনৈতিক দল গুলোর চাওয়া কিম্বা কারো দয়া প্রদর্শনের ব্যাপার না। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি বৈধ সরকারই জনগণকে শাসন করবার অধিকার রাখে। কিন্তু ভোটারবিহীন একটি তামাশার নির্বাচনের জোরে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, থাকতে পারছেন। তাঁর হিম্মতের প্রশংসা না করে পারি না। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বল প্রদর্শনের ফল কিনা জানি না, তাঁকে আসলেই গতকাল বুধবারে খুবই ক্লান্ত লাগছিলো।
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য তাজুল ইসলামের একটি সম্পূরক প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন তিনি। বিরোধী দলের নেত্রীর প্রতি তাঁর শ্লেষ ও কটাক্ষে জাতীয় সংসদ দ্রুতই তার মর্যাদার ওজন হারাচ্ছিল। হঠাৎ তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জরুরী অবস্থা জারীর কথা তুললেন। একটি সম্পূরক প্রশ্ন তুলতে গিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেছিলেন, বর্তমানে বিভিন্ন টেলিভিশনে টক-শোয় গিয়ে অনেকে উস্কানি দেয়। তাদের উস্কানিতে বেশি বেশি উৎসাহিত হয়ে সন্ত্রাসীরা আরও বেশি পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। কাজেই প্রধানমন্ত্রী এই উস্কানিদাতাদের উস্কানি বন্ধ করতে টক-শো'র বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেবেন কি না। চিফ হুইপের কথা থেকেই বোঝ যায় সংসদে এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সদাই বিষফণা তুলে থাকেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও আনন্দের সঙ্গে শামিল হন। এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে টক-শোয় অংশগ্রহণকারীদের প্রতি তিনি ইঙ্গিত করে বলেন,
“‘যারা টক শো করেন, তাঁদের বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া কে দেবেন? তাঁদের টার্গেট তো আমি। কিছু লোক আছেন, গণতান্ত্রিক পন্থা তাঁদের ভালো লাগে না। অসাংবিধানিক পন্থা এলে তাঁরা ভালো থাকেন, তাঁদের গুরুত্ব বাড়ে। তাই তাঁরা ব্যস্ত থাকেন অসাংবিধানিক পন্থা আনা যায় কি না। ওই স্বপ্ন দেখে লাভ হবে না। আমরা দেশকে আর অসাংবিধানিক পন্থায় ঠেলে দেব না। জনগণ এটা চায় না। কেউ এটা করতে চাইলে জনগণ রুখে দেবে। সংবিধানেও অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলের ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের (সর্বোচ্চ শাস্তি) বিধান রয়েছে”।
তাঁর বক্তব্যে বেশ থতমত খেয়ে বসে আছি। তাহলে কি জরুরী অবস্থা আসছে? তিনি আগাম এসব নিয়ে কথা বলছেন কেন? (দেখুন, ‘জরুরী অবস্থা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি কেউ সৃষ্টি করতে পারে নি’, প্রথম আলো ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
মন্তব্যটি টকশোর অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে শুধু বলেছেন এটা মনে হয় নি। বরং টক শোতে আসুক বা না আসুক সাধারণ ভাবে বাংলাদেশে ‘সুশীলসমাজ’ নামে যারা পরিচিত তাদের সম্পর্কেই মন্তব্যটি করা। অসাংবিধানিক পন্থা এলে সুশীলগণ ভাল থাকেন, তাঁদের গুরুত্ব বাড়ে কথাটা মিথ্যা না। সমাজে ক্ষমতার লোভ শুধু রাজনীবিদদের এটা ভাবা ঠিক না। সুশীলদেরও ক্ষমতা আস্বাদনের সাধ হয়। কিন্তু তারা রাজনীতিবিদদের মতো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেটা আস্বাদন করতে চায় না। সেই ক্ষেত্রে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা ও ঝুঁকি থেকে যায়। সুশীলগণ সেটা ফাও ভোগ করতে চান। সেটা সম্ভব হয় অসাংবিধানিক ভাবে কোন শক্তি ক্ষমতায় এলে। অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতায় আসার অর্থ এমন সব শক্তির ক্ষমতারোহন যারা সংবিধান অনুযায়ী নয়, সংবিধান বহির্ভূত ভাবে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসে তারা সামাজিক ভিত্তি খোঁজে। সুশীলগণ তাদের সেই ভিত্তি দেয়। বাংলাদেশের সংবিধানে তিন মাসের জন্য নির্দলীয় নিরপেক্ষ অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ব্যবস্থা যুক্ত হবার পর, সুশীলদের ক্ষমতার আস্বাদন সাংবিধানিক ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। খুব আরাম হয়েছে তাদের।
সে যাই হোক অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতা দখলের সরল ও সিধা দুটো অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হচ্ছে, সামরিক শাসন বা সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল। রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বীতশ্রদ্ধ মানুষ এই সময় সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রত্যাশা করছে বলে অনেকেই বলাবলি করছে। শেখ হাসিনাও সেটা মনে করছেন কিনা জানি না। কিন্তু তাঁকে খুবই উদ্বিগ্ন মনে হয়েছে। যার কারনে টকশোওয়ালাদের ওপর তাঁর গোস্বা তিনি লুকান নি।
দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে গণ অভ্যূত্থান। গণ অভ্যূত্থান অসাংবিধানিক – অর্থাৎ গণ অভ্যূত্থান সংবিধান মেনে ঘটে না কিম্বা ঘটানো হয় না। জনগণ সংবিধান বগলে নিয়ে উকিল ব্যারিস্টারদের ব্যাখ্যা টিকা ভাষ্য শুনে অভ্যূত্থান করে না। গণ অভ্যূত্থান সবসময়ই অভূতপূর্ব ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে। এই রকম সম্ভাবনা তৈরি হবার পরও ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’র নামে নস্যাৎ করে দিলে তার কুফল হয় ভয়াবহ। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে গণভ্যূত্থানকে নস্যাৎ করে দেবার জন্যই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার হুজুগ তৈরি করা হয়েছিলো। সংবিধানের কোন গণতান্ত্রিক সংস্কার বা রূপান্তর না ঘটিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণার উৎপত্তি ও ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানে সংযুক্তির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সেই সময় জনগণের গণতান্ত্রিক আকাংখা নস্যাত করে দেওয়া। এটা ছিল জনগণের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। যার কুফল হানাহানি, রক্তপাত, লগিবৈঠা ও পেট্রোল বোমা সহ এখন চরম ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে রূপ নিয়েছে।
গণ অভ্যূত্থান অসাংবিধানিক। আলবৎ কিন্তু গণতন্ত্রের সবচেয়ে বিকশিত রূপ। এর কারণ হচ্ছে জনগণের ইচ্ছা ও সংকল্পের চরম মাত্রা ও পরম যৌথবদ্ধতাই গণ অভ্যূত্থানের রূপ পরিগ্রহণ করে। গণতন্ত্রের এর চেয়ে উন্নত অভিপ্রকাশ আর কী হতে পারে? গণ অভ্যূত্থান সব সময়ই রাষ্ট্রকে নতুন ভাবে গড়বার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করে দেয়। সঠিক ভাবে নেতৃত্ব পেলে একটি জনগোষ্ঠি এ ধরণের বৈপ্লবিক মুহূর্ত কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের দিক থেকে কয়েক শ বছরের উল্লম্ফন সম্পন্ন করতে পারে।
দুই
তবে শেখ হাসিনা অসাংবিধানিক পন্থা বলতে গণ অভ্যূত্থান বোঝান নি, তিনি বুঝিয়েছেন বিশুদ্ধ সামরিক অভ্যূত্থান, কিম্বা চাপের মুখে জারি করা ‘জরুরী অবস্থা’। তিনি সরকারে থাকেন বা না থাকেন ক্ষমতা তখন তাঁর হাতে নয়, হস্তান্তরিত হবে সেনাবাহিনীর কাছে। বলা বাহুল্য তিনি কোনভাবেই এটা চাইতে পারেন না। এ বিষয়ে কোন কিছু মুখে আনাও এখন তার রাজনৈতিক পরাজয়। বিপজ্জনকও বটে। তাঁর ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবার লক্ষণ। ক্ষমতার শিথিলতা সমাজে কী ধরণের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে তা অনুমান করা কঠিন। হিংসা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি সমাজকে কতোটুকু উত্তপ্ত করে রেখেছে তার মাত্রা বিপদ সীমা বহু আগেই অতিক্রম করে গিয়েছে সেটা বুঝতে পারা কঠিন নয়। সে কারণেই ভাবছিলাম, কেন তিনি হঠাৎ অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা বদলের কথা বলছেন! কিন্তু অসাংবিধানিক সরকার এলে সুশীলদের লাভ তার এই থিসিসটার একটা ব্যাখ্যা দরকার। অসাংবিধানিক সরকার এলে টকশো ওয়ালারাসহ সুশীলদের লাভের বক্তব্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ধারণার সঙ্গেও জড়িত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ‘সাংবিধানিক’ বলা যাবে না। কিন্তু এ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে যারাই শাসন করবেন তাঁদের অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে। দৃশ্যমান ও বৈধ সম্মতি ছাড়া নাগরিকদের শাসন করবার অধিকার কারুরই নাই। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক শাসন ব্যবস্থা এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে তিন মাস নাগরিকদের অনির্বাচিত ব্যাক্তিদের শাসন মেনে নিতে হবে। কেন? কারণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক চেতনা এতোই পশ্চাতপদ যে শান্তিপূর্ণ ভাবে নিয়ম মেনে তারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে পারে না। প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের সময় এলে হানাহানি, রক্তপাত ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে তারা রাষ্ট্রকে ঠেলে দেয়। এই পরিস্থিতিতে সমাজের শক্তিশালী শ্রেণি ও শক্তি স্থির করেছে এই সময় কোন রাজনৈতিক দল নয়, ক্ষমতায় থাকবে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ কিন্তু বিবাদে জড়িত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য অরাজনৈতিক কিছু ব্যাক্তি যারা সমাজে ‘সুশীল’ নামে পরিচিত। ক্ষমতা হস্তান্তরের এই অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুশীলদের জন্য প্রতি পাঁচ বছর পরপর ক্ষমতাভোগের এক চমৎকার সুব্যবস্থাও বটে। যে সমাজে গণতান্ত্রিক চিন্তা চেতনা অবিকশিত, নাগরিক বোধ ও দায়িত্বজ্ঞানের প্রকট অভাব , সেই সমাজে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রকার অগণতান্ত্রিক চিন্তার আবির্ভাব খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। বাংলাদেশে এই ধরণের একটি ধারণার জন্ম ও তার বাস্তবায়ন সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক চেতনার মাত্রাও নির্দেশ করে।
গণতন্ত্র বিরোধী হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক নয়। এই দিকটি বুঝতে পারা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের যে কোন নীতি, রীতি বা আইন ঘোর অগণতান্ত্রিক অর্থাৎ গণতান্ত্রিক আদর্শের বিরোধী হতে পারে, কিন্তু তার সাংবিধানিক বা আইনসম্মত হতে বাধা নাই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অসাংবিধানিক নয় কারণ এই রীতি বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদে বিধিবদ্ধ ভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে। কিন্তু ধারণাটি অগণতান্ত্রিক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন কোন ব্যবস্থা থাকতে পারে না এবং থাকা উচিত না যেখানে নাগরিকদের তিন মাস অনির্বাচিত ব্যাক্তিদের শাসন মেনে নিতে হয়। শাসনব্যবস্থা হিসাবেও এটা বিপজ্জনক। গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় গঠিত সরকারের ক্ষমতা সীমিত রাখতে হয়েছে। তারা কোন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত দিতে পারে না, এই সরকারের প্রধান কাজ নির্বাচন করা। কয়েকবার এই ব্যবস্থা কাজ করল, কিন্তু ইয়াজুদ্দিন আহমদের সময় দেখা গেল নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত আর সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য গৃহীত সিদ্ধান্তের মধ্যে আর ফারাক করা যাচ্ছে না। তদুপরি ইয়াজ উদ্দীন নিজেকে একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করলেন। জরুরী অবস্থা ঘোষিত হোল। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দুর্নীতিসহ আরও নানান অপরাধের দায়ে গ্রেফতার হলেন। সেই পর্ব নানান উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে শেষ হোল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতির সংকট নতুন ভাবে শুরু হোল। এক তরফা পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পরিণতি আমরা এখন ভোগ করছি।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেই শেখ হাসিনা ক্ষান্ত থাকেন নি। তিনি ইমার্জেন্সি বা জরুরী অবস্থা ঘোষণাও কঠিন করে দিয়েছেন এবং অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতায় আসা অসম্ভব করে তুলেছেন। এমন ভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে সাজিয়েছেন যাতে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে না চাইলে সাংবিধানিক ভাবে তাঁকে অপসারণ যারপরনাই কঠিন হয়। জাতীয় সংসদে সেটাই সকলকে স্মরণ করিয়ে দিলেন। বললেন,
“দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার মতো পরিস্থিতি এখনো কেউ সৃষ্টি করতে পারেনি। কেউ কেউ ফোন করে বলেন, এই হয়ে যাচ্ছে, ইমার্জেন্সি হয়ে যাচ্ছে। ওই স্বপ্ন দেখে লাভ হবে না। ... ‘একসঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ায় ইয়াজউদ্দিন সাহেব ইমার্জেন্সি দিতে পেরেছিলেন। এখন ইমার্জেন্সি দিতে হলে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতির কাছে লিখিত পাঠাতে হবে। তখন রাষ্ট্রপতি ইমার্জেন্সি জারি করতে পারবেন”
এটা পরিষ্কার শেখ হাসিনা সবাইকে জানিয়ে দিলেন, জরুরী অবস্থা জারীর জন্য রাষ্ট্রপতিকে কোন লিখিত সম্মতি তিনি দেবেন না। তাহলে পরিস্থিতি তিনি সামাল দেবেন কিভাবে? আইন শৃংখলা বাহিনীকে দিয়ে তিনি সেটা সামলাবেন। বলছেন,
“ইমার্জেন্সি (জরুরি অবস্থা) লাগবে কেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রয়েছে। এ ধরনের সন্ত্রাস কীভাবে দমন করতে হয় আমরা জানি।...আমরা দেশকে আর অসাংবিধানিক পন্থায় ঠেলে দেব না। জনগণ এটা চায় না। কেউ এটা করতে চাইলে জনগণ রুখে দেবে। সংবিধানেও অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখলের ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের (সর্বোচ্চ শাস্তি) বিধান রয়েছে।’
বোঝা যাচ্ছে সংঘাত ও সহিংসতার হাত থেকে নাগরিকদের নিস্তার সহজে ঘটছে না । কেউ যদি অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা দখল করতে চায় তাদেরকে প্রধানমন্ত্রী সাবধান করে দিলেন। এই ধরণের কাজের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তিনি ভাবছেন ফাঁসির দড়িতে ঝুলবার ভয়ে কেউ অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতা দখল করবার সাহস করবে না।
সেটা হতে পারে। নাও হতে পারে। ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। আইন করে রাজনৈতিক গতিপ্রক্রিয়ার পরিণতি যদি ঠেকানো যেত তাহলে আমরা ব্রিটিশ আইন মেনে চিরকাল ইংরেজের গোলামই থেকে যেতাম। কিম্বা পাকিস্তানের সংবিধানের ভয়ে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য লড়াই-সংগ্রাম করতাম না। আইন ও সংবিধান মান্য করা গর্বিত পাকিস্তানী হয়েই থাকতাম।
আফসোস, ইতিহাস থেকে কেউই শিক্ষা গ্রহণ করে না। বাংলাদেশই সম্ভবত দুনিয়ার একমাত্র দেশ যেখানে আইন জারি করে কিম্বা আদালতে রায় দিয়ে ইতিহাসের ভুলত্রুটি শোধরানো হয়। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে অনেকে মনে করে সংবিধান দিয়ে ক্ষমতার রূপান্তর ঠেকান যায়। যে ক্ষমতা সংবিধানের বাইরে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তৈয়ার হয়, সংবিধান কিভাবে রাজনীতির সেই গতি প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারণ বা নির্ণয় করবে? সংবিধান বা আইন ইতিহাস ও রাজনীতির প্রতিফলন মাত্র, তার নির্ণায়ক নয়। ইতিহাস সংবিধান ও আইনের বাইরে ঘটে, আইন বা সংবিধান সেই ইতিহাসে অংশগ্রহণ করে বটে, কিন্তু ইতিহাসের গতি ও গন্তব্য নির্ধারণ করে দিতে পারে না। মানুষ আইন ও সংবিধানের বাইরে আসতে পারে, কিন্তু সংবিধান মানুষ ছাড়া নিজের ব্যাখ্যা নিজেও দিতে অক্ষম।
বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নির্ধারনের জন্যে এখনই জেগে উঠতে হবে। এখনই সময়। দুনিয়ার কোন রাজা বাদশাহ রাজনীতি ও ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করতে পারে নি। বাংলাদেশেও পারবে না।
বেঁচে থাকো বাংলাদেশ। বেঁচে থাকো, প্লিজ।
সূত্র : আলোকিত বাংলাদেশ