Sunday, June 22, 2025

জন্মদিনে স্মরণ- ইরানি সিনেমার কবি আব্বাস কিয়ারোস্তামি by মুমিত আল রশিদ

আব্বাস কিয়ারোস্তামি—আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ নামগুলোর একটি। একাধারে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক, কবি, চিত্রনাট্যকার, চিত্রগ্রাহক ও আলোকচিত্রী। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন শুভ্র তুষারের বুনো সৌন্দর্যের আলবোরর্জ পর্বতমালার পাদদেশে গ্রীষ্মের প্রথম দিনে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। দার্শনিক কবি ওমর খৈয়াম পরবর্তী পাশ্চাত্যে সবচাইতে বেশি জনপ্রিয়—কিয়ারোস্তামি।

২০১৬ খ্রিস্টাব্দে রাজধানী তেহরানে ৩৫তম আন্তর্জাতিক ফজর চলচ্চিত্র উৎসবে কিয়ারোস্তামির ৭৫তম জন্মজয়ন্তীকে কেন্দ্র করে উৎসব থিম হিসেবে ‘বন্ধুর বসত এখানে’ (খনে দুস্ত ইনজাস্ত) চিত্তাকর্ষক বাক্যটি ব্যবহার করে। আয়োজক কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল কিয়ারোস্তামির ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত?’ (Where Is the Friend’s House? ১৯৮৭ খ্রি.) চলচ্চিত্রটির বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা অনুধাবন ও অনুরণন।

ইরানি চলচ্চিত্রের মহান কবি আশির দশকের শেষভাগে নির্মাণ করেন বিশ্ববিখ্যাত অমর চলচ্চিত্র খনে দুস্ত কোজাস্ত। এর মাধ্যমে শুধু নিজেরই নন, বিশ্ব দরবারে ইরানি চলচ্চিত্রেরও কদর বাড়িয়ে দেন বহুগুণ। সিনেমাটি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দারুণ সাড়া ফেলে। বিশ্বের তরুণ পরিচালকদের মধ্যে তুমুল আশা-আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। ইরানের সিনেমার পথচলাও শুরু হয় নতুনভাবে।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি আবারও তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন ক্লোজ আপ বা নামায়ে নাজদিক (১৯৯০ খ্রি.) ও মাশক্বে শাব (Homework, ১৯৮৯ খ্রি.) সিনেমা দিয়ে। এ দুটো চলচ্চিত্র প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের আঙিনায়ও তাঁর অনন্য দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। চলচ্চিত্র দুটোর বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে আমরা দেখব, এতে ফারসি সাহিত্যের অনন্য বৈশিষ্ট্যের একটি দিক ‘রেভায়াত পারদাজি’র সফল প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। রেভায়াত পারদাজি বলতে বোঝায়—গল্পের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ছকে কথা বলা, লেখা, গান, সিনেমা, টেলিভিশনের কোনো কাজ, কম্পিউটার গেম, আলোকচিত্র, থিয়েটার বা কোনো সিকোয়েন্সে সংঘটিত গল্প অথবা অনাগত ভবিষ্যতের কাল্পনিক কোনো গল্প যা এখনো সংঘটিত হয়নি—এ রকম কিছু। আব্বাস কিয়ারোস্তামি উপর্যুক্ত দুটি চলচ্চিত্রের মধ্যে রেভায়াত পারদাজির অত্যন্ত সফল চিত্রায়ণ করেছেন। তাঁর ক্লোজ আপ চলচ্চিত্র বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে—বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও সিনেমা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপরিহার্য একটি বিষয় হিসেবেও স্থান করে নিয়েছে।

এই চলচ্চিত্র ফ্রান্সের বিখ্যাত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার, লেখক ও কবি ক্রিস মার্কার ও স্পেনের চলচ্চিত্রকার লুইস বুনুয়েল এবং অন্যান্য প্রসিদ্ধ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকারের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের মতো দর্শকের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—নিগূঢ় সত্য কী? বা বস্তুনিষ্ঠ বিষয় কী? অবশ্য সব বাস্তবতা, যুক্তি-দলিল, আধুনিকতার বিবেচনা আমাদের শেষ পর্যন্ত এই ফলাফলে পৌঁছতে সাহায্য করে যে, বিষয়বস্তু হচ্ছে বিশ্বাস। বিশ্বাসের কোন দিকটি ভয়ংকর? বিশ্বাস কি প্রশান্তি দেয়? কোনো মুক্তি বা উপহারের বার্তা দেয়?

অন্যদিকে আব্বাস কিয়ারোস্তামি তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতায় প্রায় কাছাকাছি গল্পে নির্মাণ করেন মাশক্বে শাব। ‘আভভালি হা’ ও ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত’ চলচ্চিত্র দুটি নির্মাণের মাধ্যমে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন দিগন্তের সূচনা করেন কিয়ারোস্তামি। বিশেষ করে, খনে দুস্ত কোজাস্ত নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে প্রচুর প্রশংসা ও পুরস্কার অর্জন করেন। গ্রামের সহজ-সরল শিশুদের চিন্তার সুপ্ত বিকাশমান ধারা, একে-অপরের প্রতি ভালোবাসা, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, কষ্টসহিষ্ণু জীবনধারা, নির্লোভ জীবনের সবুজ শ্যামল প্রকৃতি দেশকাল ভেদ করে চলচ্চিত্রটির প্রতি দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে। উল্লেখ্য, এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের নজির যদিও পূর্বে ছিল না, কিন্তু ‘ইয়েক ইত্তেফাক্বে ছদেহ’ (A Simple Event, ১৯৭৪ খ্রি.) চলচ্চিত্রে ছোট্ট শিশুটির কাস্পিয়ান সাগর-তীরবর্তী এলাকা থেকে মাছের থলে কাঁধে নিয়ে দৌড়ানোর দৃশ্য দেখে, স্কুলের কাজ দেখে, মায়ের প্রতি কর্তব্যবোধ দেখে অনেকেই হয়তো আব্বাস কিয়ারোস্তামির হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস?-এর নায়ক আহমাদের সহপাঠী বন্ধু নেয়ামতযাদেহর কর্তব্যবোধের কারণে বারবার পাহাড়ের একপাশের গ্রাম থেকে অন্যপাশের গ্রামে দৌড়ে ছুটে যাওয়ার কথা স্মরণ করতে পারেন। শুধু কি তাই? ছোট্ট মনের আকুতি-মিনতির এই পার্থিব অর্থকে অনেক বিজ্ঞ চলচ্চিত্র সমালোচক ইহজাগতিক তৃষ্ণা থেকে পরমাত্মার যাত্রার কথাই ইঙ্গিত করেছেন।

হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের নামটি ইরানের কবি সোহরাব সেপেহরির (জন্ম ১৯২৮ খ্রি.- মৃত্যু ১৯৮০ খ্রি.) বিখ্যাত কবিতা ‘খনে দুস্ত কোজাস্ত?’ থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণের পর লেখক বেহরুজ তাজুর দাবি করেন যে, সিনেমার গল্পটি তাঁর ছোট গল্প ‘চেরা খানম মোআল্লেম গেরিয়ে কার্দ?’ (নারী শিক্ষক কেন কান্না করেছেন?) থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কিয়ারোস্তামি প্রদর্শনীর সময় সিনেমার গল্পটি বেহরুজের গল্প থেকে নেওয়া হয়নি বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।

সিনেমার পটভূমি, লোকেশন, কলাকুশলী নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আব্বাস কিয়ারোস্তামিকে যিনি সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়েছেন, সেই কিউমারছ পুর আহমাদি চমকপ্রদ কিছু তথ্য দিয়েছেন। কিউমারছ পুর আহমাদি পরবর্তীকালে সিনেমা ও টেলিভিশন মাধ্যমে ইরানিদের মাঝে মাজিদ নামের নস্টালজিক চরিত্রের রূপায়ণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি হয়্যার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস চলচ্চিত্রের বিহাইন্ড দ্য সিনের বাস্তবচিত্র অঙ্কন করেছিলেন, যা খনে দুস্ত কোজাস্ত নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়। এই সময়ে কিয়ারোস্তামি জেন্দেগি ভা দিগার হিচ (Life, and Nothing More, ১৯৯২ খ্রি.) ও জিরে দেরাখ্‌তনে জেইতুন (Through the Olive Trees, ১৯৯৪ খ্রি.) নামে আরও দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। দুটি চলচ্চিত্রই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে সকলের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগানো হয়্যার ইজ মাই ফ্রেন্ড’স হোম চলচ্চিত্রের পর এই দুইটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় গিলান প্রদেশে।

সত্তরের দশকের আগে ইরানের শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র যেভাবে যাত্রা শুরু করেছিল, বিপ্লবের পরও তা অব্যাহত ছিল। এ সময় অসাধারণ সব চলচ্চিত্রকারের আগমন ঘটে। শিশু ও কিশোরদের জন্য অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এ ক্ষেত্রে যিনি বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন, তিনি হচ্ছেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁর আরেকটি বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘তামে গিলাছ’ (‘Taste of Cherry’, ১৯৯৭ খ্রি.)। চলচ্চিত্রটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া অন্য সিনেমাগুলোর মধ্যে ‘জিরে দেরাখ্তনে জেইতুন’ (‘Through the Olive Trees’, ১৯৯৪ খ্রি.), ‘মেছলে ইয়েক আ’শেক্ব’ (‘Like Someone in Love’, ২০১২ খ্রি.) উল্লেখযোগ্য।

আব্বাস কিয়ারোস্তামি তত দিনে ইরান ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত একজন চলচ্চিত্রকার। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো বিশ্বব্যাপী প্রশংসার জোয়ারে ভাসছিল। এই সময়ে নির্মাণ তিনি করেন ‘বদ ম রা খহাদ বোর্দ’ (‘The Wind Will Carry Us’, ১৯৯৯ খ্রি.), ‘তামে গিলাছ’ (‘Taste of Cherry’, ১৯৯৭ খ্রি.), ‘এবিছি আফ্রিকা’ (ABC Africa, ২০০১ খ্রি.) ও ‘দাহ’ (‘Ten’, ২০০২ খ্রি.)। ‘টেস্ট অব চেরি’ এর মধ্যে সবচেয়ে দেদীপ্যমান সিনেমা, যেটির মাধ্যমে কিয়ারোস্তামি আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচিত হন। আব্বাস কিয়ারোস্তামি ফ্রান্স-ইতালিতে নির্মিত ‘কপি বরাবর আছলি’ (‘Certified Copy’, ২০১০ খ্রি.) নিয়ে ২০১০ সালে কান উৎসবে অংশগ্রহণ করেন এবং চলচ্চিত্রটির নায়িকা জুলিয়েত বিনোশ সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার লাভ করেন। এ সিনেমার মাধ্যমে একটি যুগের অবসান হয়।

আব্বাস কিয়ারোস্তামিও বিশ্বখ্যাত গায়ক জিম মরিসন, ঔপন্যাসিক অস্কার ওয়াইল্ড, ভিক্টর হুগো, দার্শনিক রুশোর মতো— প্যারিসকে অন্তিম যাত্রার জন্য বেছে নেন। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই প্যারিসেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোয় ইরানি চলচ্চিত্রের বিস্তৃত এক বেলাভূমির সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত সারা বিশ্বের দর্শক, সমালোচক, চলচ্চিত্রপ্রেমীরা অবগাহন করছেন। ৮৫তম জন্মদিনে তেহরানের অদূরে লাভাসানের ছোট্ট মফস্বল শহরে ঘুমিয়ে থাকা এ মহান শিল্পীর প্রতি একরাশ মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলায় তেজস্ক্রিয়তা বাড়েনি: আইএইএ

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বলেছে, ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর পরও ‘আশপাশের এলাকায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বৃদ্ধির’ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। খবর বিবিসির।

জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আজ রোববার এক বিবৃতিতে এ কথা জানায়। এতে আরও বলা হয়, ‘ইরানের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইএইএ তার পরবর্তী মূল্যায়ন জানাবে।’

গতকাল শনিবার রাতে ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান—তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এ হামলা চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পরে ইরানও তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার বিষয় নিশ্চিত করে। তেহরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা ‘অ্যাটমিক এনার্জি অর্গানাইজেশন অব ইরান’ (এইওআই) বলেছে, এ হামলা আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) লঙ্ঘন।

যদিও ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ একজন কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলেছে, যে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কথা যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আদতে সেখানে তেজস্ক্রিয়তা সৃষ্টি করার মতো কোনো পদার্থ নেই।

ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় ১২টি ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের যে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় গতকাল শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বোমারু বিমানগুলো হামলা চালিয়েছে, তার একটি ফোরদো। সেখানে ছয়টি বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান উড়ে গিয়ে মোট ১২টি ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে ৩০ ‘টিএলএএম’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করা হয়েছে ইরানের নাতাঞ্জ আর ইস্পাহান পারমাণবিক স্থাপনায়। সেই সঙ্গে একটি বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান নাতাঞ্জে উড়ে গিয়ে দুটি বাংকার বাস্টার বোমা ফেলেছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

গতকাল রাতে ইরানের ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান—তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ইরানে হামলা চালানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পরে ইরানও তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার বিষয় নিশ্চিত করে। তেহরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা ‘অ্যাটমিক এনার্জি অর্গানাইজেশন অব ইরান’ (এইওআই) বলেছে, এ হামলা আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) লঙ্ঘন।

যদিও ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ এক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলেছে, যে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কথা যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আদতে সেখানে তেজস্ক্রিয়তা সৃষ্টি করার মতো কোনো পদার্থ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের বোমা বহনে সক্ষম। এ বোমা ‘বাংকার বাস্টার’ নামে পরিচিত। বি–২ বিমান থেকে এ বোমা ফেলে ইরানের ফর্দো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানো হতে পারে বলে আগে থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

ইসরায়েল ১৩ জুন ইরানে হামলা চালায়। এরপর পাল্টা হামলা চালায় ইরান। তখন থেকে দুই দেশের মধ্যে একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। এর মধ্যে গতকাল চলমান সংঘাতে ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে জড়িয়ে পড়ল তার ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।

সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রয়েছে  : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে।

শনিবার দিবাগত রাতে ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান—তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর প্রকাশ্যে প্রথম প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আব্বাস আরাগচি জানান, ‘ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ চালিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন ও এনপিটির গুরুতর লঙ্ঘন করেছে।’

আব্বাস আরাগচি আরও জানান, নিজেদের সার্বভৌমত্ব, স্বার্থ ও জনগণকে রক্ষা করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রয়েছে ইরানের। 

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) লোগোসংবলিত একটি পতাকা অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে উড়ছে
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) লোগোসংবলিত একটি পতাকা অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে উড়ছে। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে জড়ালেনই ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল শনিবার ঘোষণা দেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফর্দো ভূগর্ভস্থ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র। এই হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়াল।

ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় রাত আটটার একটু আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমরা ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় সফলভাবে হামলা সম্পন্ন করেছি, যার মধ্যে রয়েছে ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইস্পাহান। সব উড়োজাহাজ এখন ইরানের আকাশসীমার বাইরে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও লিখেছেন, প্রধান লক্ষ্যবস্তু ফর্দোয় সর্বোচ্চ পরিমাণ বোমাই ফেলা হয়েছে। সব উড়োজাহাজ নিরাপদে ফিরছে। মহান মার্কিন যোদ্ধাদের অভিনন্দন। বিশ্বের আর কোনো সামরিক বাহিনী এটি করতে সক্ষম হতো না। এখন শান্তির সময়।

হোয়াইট হাউস গত বৃহস্পতিবার রাতে বলেছিল, ট্রাম্প দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরানে হামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ কথা বলার দুই দিন পরই ইরানে হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার ব্যাপারে জানতেন। পরে ট্রাম্প নিজেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য জানান এক কর্মকর্তা।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে হামলা নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন।

তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয় স্পষ্ট নয় যে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কতগুলো বোমা ফেলেছে। কিংবা এই বোমা হামলার কারণে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্ত হওয়া উচিত হবে কি না, তা নিয়ে ট্রাম্প দ্বিধায় ছিলেন। তব শেষ পর্যন্ত তিনি ইরানে হামলা চালালেন।

তবে ট্রাম্প এখনো বলছেন, কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব। কিন্তু ইরান এতে আগ্রহ দেখাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ইরানে হামলার কথা ভাবছেন, তখনই তিনি তাঁর রিপাবলিকান পার্টির সমালোচক-সমর্থকদের চাপের মুখে পড়েন। বিষয়টি দলটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে স্পষ্ট করে তোলে।

হোয়াইট হাউসের ভেতরে-বাইরের কিছু উপদেষ্টা ট্রাম্পকে বোমা হামলা থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা ইসরায়েলকে মার্কিন সহায়তা শুধু গোয়েন্দা সাহায্যের মধ্যেই সীমিত রাখতে বলেছিলেন।

অন্যরা যাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন ট্রাম্প এই হামলা চালানোর ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তাঁরা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেন হামলার সম্ভাব্য পরিণতি পুরোপুরিভাবে বুঝতে পারেন। আর প্রাথমিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা যেন সীমিত রাখা হয়।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স কয়েক মাস ধরে ইরানে সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধের বিপদের বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন।

ট্রাম্প নিজেও সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়েছিলেন, ইরানের সরকার পতনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার কোনো আগ্রহ তাঁর নেই।
ট্রাম্প বহুবার বলেছেন, তিনি বিদেশে মার্কিন সেনা পাঠাতে চান না।

ইরানে ইসরায়েলি বোমা হামলা শুরুর পর ট্রাম্প তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যেতে বলছিলেন।

তবে এ ব্যাপারে ইরানি কর্মকর্তাদের ধীর প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন।

তখন ট্রাম্পের দল অভিযোগ করে, তারা বুঝতে পারছে না, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা ইরানি কর্মকর্তারা আদৌ দেশটির সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে কথা বলছেন কি না।

আর এখন ট্রাম্পের দল ইরানের পাল্টা হামলা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
৯ জুন এক ফোনকলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেছিলেন, তিনি ইরানে হামলার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

যে ট্রাম্প মাসের পর মাস ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির পক্ষে কাজ করছিলেন, সেই তিনি অনিচ্ছায় হলেও ইসরায়েলকে গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে রাজি হন। কিন্তু ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা শুরু করে, তখনো স্পষ্ট ছিল না ট্রাম্প পুরোপুরি সেই মিশনকে সমর্থন করবেন কি না।

১৩ জুন ইসরায়েল হামলা শুরু করলে ট্রাম্প প্রশাসনের তরফ থেকে প্রথম বিবৃতি দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখা হয়। ইসরায়েলের পাশে থাকার কোনো উল্লেখও বিবৃতিতে ছিল না। বিষয়টি ছিল অস্বাভাবিক ঘটনা।

পরে যখন দেখা গেল, ইসরায়েলের প্রথম রাতের হামলা সফল, তখন ট্রাম্প সেই অভিযান নিয়ে নিজের কৃতিত্ব দাবি করতে শুরু করেন। সাংবাদিকদের তিনি ইঙ্গিত দেন, এই মিশনে তাঁর ভূমিকা লোকের ধারণার চেয়েও বেশি।

সেই সপ্তাহান্তে যখন ট্রাম্প কানাডায় জি-৭ সম্মেলনে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন, সম্ভবত তাঁকে ‘সবচেয়ে বড়টি’ ফেলতে হবে।

ট্রাম্প এ কথা বলে ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের বাংকার–বিধ্বংসী বোমাকে বোঝাচ্ছিলেন, যেগুলো কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই আছে।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর ইরাক যুদ্ধের সমালোচনা করে আংশিকভাবে নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছিলেন ট্রাম্প।

তবে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদের যে ঘটনা নিয়ে সবচেয়ে গর্ব করেন, তা হলো ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা। এই ঘটনা তাঁর অনড় হস্তক্ষেপবিরোধী সমর্থকদের অনেককে দূরে ঠেলে দেয়। তবে ট্রাম্প বারবার বলে আসছিলেন, এটি প্রয়োজনীয় ছিল। এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেই করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান
যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

পুতিন কেন ইরানকে রক্ষা করছেন না? by হান্না নোট্টে

ইরান একের পর এক আঘাত সহ্য করছে। কিন্তু তার সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র রাশিয়া তেমন কিছুই করছে না।

অল্প কিছুদিন আগেও মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা দুনিয়ার সবচেয়ে অপছন্দের শক্তি ইরানকে সমর্থন করা রাশিয়ার জন্য লাভজনক ছিল। ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ভ্লাদিমির পুতিন পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাতকেই তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি বানিয়েছেন। সেই পটভূমিতে ইরান ও এর অংশীদারদের দিকে ঝুঁকে রাশিয়ার লাভ হয়েছিল।

তখন ইরান রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন সরবরাহ করেছিল। এই ড্রোন তখন ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। তারপর ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণ হলো। এর জবাবে ইসরায়েল গাজার ওপর নির্মম আক্রমণ শুরু করল। সেই সময় ফিলিস্তিনপন্থী ও পশ্চিমবিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া বিশ্বজনমতকে নিজেদের দিকে টানতে পেরেছিল।

কিন্তু এই কৌশল খুব দ্রুতই রাশিয়ার জন্য কাঁটা হয়ে দাঁড়াল। প্রথমে ইসরায়েল হামাস ও হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করল। এরপর ২০২৪ সালের এপ্রিল ও অক্টোবর মাসে ইরান সরাসরি ইসরায়েলকে আক্রমণ করল। কিন্তু ইরানের হামলায় খুব সামান্য ক্ষতি হলো।

এতে বোঝা গেল, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা তেমন শক্তিশালী নয়। ইসরায়েল পাল্টা হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করে দিল। এমনকি ইরানের রাশিয়ানির্মিত এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। হঠাৎ করেই ইরানকে দুর্বল মনে হতে লাগল। তখন রাশিয়ার সামনে দুটি পথ ছিল। তারা চাইলেই ইরানকে শক্তি জোগাতে পারত। আর তা না হলে মধ্যপ্রাচ্যের জটিলতা থেকে নিজেদের দূরে থাকতে পারত।

রাশিয়া যে তার মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের পক্ষে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না, তা স্পষ্ট হয়ে যায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে যখন সিরিয়ার বিদ্রোহীরা বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। আসাদ ছিলেন রাশিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্র। ইরান ও রাশিয়া তখনো ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা স্যাটেলাইট উন্নয়নের মতো কিছু ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করছিল। এমনকি তারা ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তিও করে। কিন্তু রাশিয়া ইরানকে দরকারি সাহায্য দেয়নি। যেমন উন্নত যুদ্ধবিমান বা শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। যেগুলো থাকলে ইরান ইসরায়েলের আক্রমণ ঠেকাতে পারত। অন্তত ভালোভাবে প্রতিরোধ করতে পারত।

আসলে রাশিয়া ইরানকে কতটা সমর্থন করবে, তা আগেই ঠিক করে রেখেছিল। পুতিনের পশ্চিমবিরোধী মনোভাব ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র করেছে। কিন্তু পুতিনের আরও কিছু স্বার্থ আছে। যেমন ইসরায়েলের সঙ্গে পুরোনো এবং জটিল সম্পর্ক। আবার তেলের দামের ক্ষেত্রে ওপেকের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন। তাই ইরানকে সামরিক সহায়তা দিতে গিয়ে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্কের সীমারেখা পেরিয়ে যেতে চায়নি রাশিয়া। তা ছাড়া রাশিয়া ইরানের জন্য নিজেকে সামরিক জটিলতায় ফেলতে রাজি নয়। বিশেষ করে যখন সে ইউক্রেন যুদ্ধেই পুরোপুরি ব্যস্ত।

রাশিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে একসময় পরমাণু অস্ত্র বিস্তার ঠেকানোর কাজ করেছে। ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে দিতে সে কখনো চায়নি। এই নিয়ে আমেরিকার হুঁশিয়ারিগুলো রাশিয়া গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তারা চায়নি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাক। রাশিয়া এটাও চায় না যে, ইরান পারমাণবিক শক্তি হয়ে গিয়ে এমন এক মর্যাদা পাক, যা মস্কোর প্রভাবকে কমিয়ে দেবে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রাশিয়ার কিছু লাভও হতে পারে। এই লড়াই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করার প্রচেষ্টা নষ্ট করে দেবে। এতে আমেরিকাকে দুর্বল মনে হবে। ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার আমেরিকান ব্যর্থতা স্পষ্ট হবে। যদি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে তেলের দাম চড়া থাকবে। এতে রাশিয়ার অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা কমবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং দুনিয়ার দৃষ্টি ইউক্রেন থেকে সরে যাবে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। এতে ইরান রাশিয়াকে আর অস্ত্র পাঠাতে পারবে না। কিন্তু রাশিয়া এরই মধ্যে ইরানের নকশায় ড্রোন তৈরি করতে শিখে গেছে।

তবু ইরানকে অপমানিত হতে দেখে রাশিয়ার নেতারা খুশি হবেন না। ইসরায়েল ইতিমধ্যেই ইরানের আকাশে মুক্তভাবে অভিযান চালানোর দাবি করছে। রাশিয়া হয়তো উদ্বিগ্ন যে ইরানে দীর্ঘ যুদ্ধ হলে দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। যেমন আর্মেনিয়া, আজারবাইজান বা জর্জিয়ায়। এ অঞ্চলে রাশিয়ার স্বার্থ আছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া সেদিকে তেমন মনোযোগ দিতে পারছে না। রাশিয়া চায় না, অস্থিরতা গিয়ে ইরানে সরকার পতনের পথে ঠেলে দিক।

ইরান যদি কোণঠাসা হয়ে যায়, তাহলে হয়তো খেপে গিয়ে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি ছেড়ে চলে আসবে বা সরাসরি বোমা তৈরির দিকে ছুটবে। তখন মস্কোর তেহরানকে নিয়ন্ত্রণের সীমা স্পষ্ট হয়ে যাবে। রাশিয়া চায় না ইরান পরমাণু শক্তিধর দেশ হোক। তারা এটাও চায় না যে, আমেরিকা সামরিক হামলা চালিয়ে ইরানকে আরও দুর্বল করে দিক।

গত শনিবার পুতিন ট্রাম্পকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছেন। বাইডেন শপথ নেওয়ার পর থেকেই মস্কো ওয়াশিংটনের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আংশিকভাবে এটি ইউক্রেন যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি বিলম্বিত করার কৌশল। এখন এই ইরান ইস্যু রাশিয়ার জন্য বিরল একটি সুযোগ। এই ইস্যুতে বড় শক্তি হিসেবে কূটনীতিতে ফিরে আসতে চায় পুতিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাশিয়া আসলে কী নিয়ে কূটনৈতিক খেলা খেলতে চায়?

রাশিয়া ইরানের জন্য বীরের মতো ছুটে আসেনি। তবু এই দুই দেশ মিত্র। পশ্চিমবিরোধী এজেন্ডায় তারা ঐক্যবদ্ধ। রাশিয়ার কাছে ইরানকে দেওয়ার মতো তেমন কিছু নেই। রাশিয়া এখন খুবই সতর্ক। এ মুহূর্তে ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম দিলে সেগুলো ইসরায়েল ধ্বংস করে দেবে। আর পুতিন হেরে যাওয়া দলের পক্ষে প্রকাশ্যে দাঁড়াতে পছন্দ করেন না।

রাশিয়া ভবিষ্যতে হয়তো একটা বাস্তবসম্মত ভূমিকা রাখতে পারবে। যেমন তারা প্রস্তাব দিয়েছিল যে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে গিয়ে সিভিল চুল্লির জ্বালানিতে রূপান্তর করবে। কিন্তু রাশিয়ার এই প্রযুক্তিগত প্রস্তাব মূল রাজনৈতিক বিরোধ মেটাতে পারবে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে কোনো রকম পারমাণবিক কার্যক্রম থাকতে দেবে না। আর সেটাকে ইরান আত্মসমর্পণ মনে করে।

কৌশলগতভাবে একঘরে এবং দুর্বল ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আগের চেয়ে আরও বেশি অবিশ্বাসী। তাই তারা অন্তত ভারসাম্যের ছলে হলেও রাশিয়াকে প্রক্রিয়ায় যুক্ত রাখতে চায়। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল, ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ বা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তে রাশিয়ার প্রভাব খুবই সীমিত।

রাশিয়া তার সীমান্ত থেকে দূরের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে খুব বেশি আগ্রহী নয়। সেই শক্তিও তার বেশি আছে বলে মনে হয় না। ইউক্রেন যুদ্ধে সে এখন পুরোপুরি ব্যস্ত। মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমবিরোধী মিত্র থাকলে রাশিয়ার লাভ। তাই বলে কেউ আশা করবেন না যে রাশিয়া ছুটে গিয়ে ইরানকে রক্ষা করবে।

* হান্না নোট্টে, জেমস মার্টিন সেন্টার ফর নন-প্রলিফারেশন স্টাডিজের একজন পরিচালক
- দ্য আটলান্টিক থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

২০১৫ সালে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সঙ্গে আলাপচারিতায় পুতিন
২০১৫ সালে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সঙ্গে আলাপচারিতায় পুতিন। ছবি : রয়টার্স

ইরানে ইসরায়েলের আক্রমণ, বিস্ফোরণের মুখে গোটা মধ্যপ্রাচ্য by হেশাম গাফার

ইরানে ইসরায়েলের আক্রমণের সিদ্ধান্তটি মধ্যপ্রাচ্যে গভীর উত্তেজনা বৃদ্ধির সূচনাবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এ আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন এবং আরও অস্থির অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

‘রাইজিং লায়ন’ নামে পরিচালিত ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত বাস্তবে রূপ পেল। ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইরান পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এ জবাব ইরানের জন্য শুধু প্রত্যাশিতই ছিল না, বরং দেশটির প্রতিরোধ সক্ষমতা ও জাতীয় মর্যাদার জন্য রাজনৈতিকভাবে অপরিহার্য ছিল।

এ পরিস্থিতি এমন এক সহিংস সংঘাতের চক্র তৈরির হুমকি তৈরি করছে, যা দুই দেশকেই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মধ্যে আটকে ফেলবে।

ইসরায়েল তাদের হামলার যুক্তি হিসেবে বলছে যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের জন্য এটি একটি প্রতিরোধমূলক অভিযান। কিন্তু বিশ্লেষকদের এ ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ আছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা ইসরায়েলের পক্ষে আদৌ সম্ভব কি না। এর কারণ হলো, ইরান ফর্দোর মতো পারমাণবিক স্থাপনা তৈরি করেছে, যেটা মাটির অনেক গভীরে অবস্থিত। এ ধরনের স্থাপনায় আঘাত করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা ‘ব্যাংকার–বিধ্বংসী’ প্রযুক্তি প্রয়োজন।

ইসরায়েলের এ আক্রমণ ইরানের পারমাণবিক উচ্চাশাকে থামানোর বদলে উল্টো পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি (এনপিটি) থেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে আনতে পারে। উত্তর কোরিয়ার পথ অনুসরণ করে ইরানও খোলাখুলিভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগিয়ে যেতে পারে।

ইরান এরই মধ্যে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় উন্নীত করেছে। নতুন সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা প্রতিষ্ঠারও ঘোষণা দিয়েছে। ফলে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির পথে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে।

এ ছাড়া ইসরায়েলের আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পরমাণু আলোচনা ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইসরায়েলে হামলা শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই পরমাণু আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল।

ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানে ইসরায়েলি হামলায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করলেও তেহরান ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করে যে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত। ফলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের দোসর হিসেবে গণ্য করতে পারে। ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জটিল করে তুলতে পারে। আবার ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সম্পদের ওপর হামলা চালায়, তাহলে এ যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীও সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে।

নতুন জোট

উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ, যারা অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়, তারা ইরানে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব দেশের সরকারগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তারা উত্তেজনা প্রশমন ও কূটনৈতিক পথে সমাধানের পক্ষে কথা বলেছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে প্রধান ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। এটি ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে নতুন কিন্তু ভঙ্গুর একটি জোটের জন্ম দিতে পারে। সেটা হলে আরব দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন জটিলতা তৈরি হবে। কেননা এসব দেশের জনমত প্রবলভাবে ইসরায়েলি আগ্রাসনবিরোধী।

ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের আপাতলক্ষ্য হচ্ছে, ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক নেতৃত্বকে ধ্বংস করে দেওয়া। যদিও ইসরায়েলের আক্রমণের মুখে তেহরান এখনো দৃঢ়তা দেখাতে পারছে, কিন্তু চলমান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ইরানের আরও বিশৃঙ্খলা বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে ইসরায়েলও নানা সংকটে জর্জরিত। গাজায় ৬০০ দিনের বেশি সময় ধরে তারা যুদ্ধ করছে। এতে করে তাদের সামরিক খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজন গভীর হচ্ছে। আর সরকারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত রাজননৈতিক স্বার্থে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার অভিযোগ উঠেছে। এর ফলাফল হলো, ইসরায়েলে হতাশা বাড়ছে। জিম্মি মুক্তি নিয়ে অচলাবস্থা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলের অবস্থান ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ছোটখাটো সংঘর্ষে থেমে না থেকে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক চিত্র বদলে ফেলা, ‘প্রতিরোধের জোটকে’ দুর্বল করা এবং ইসরায়েলি আধিপত্যকে সুদৃঢ় করা। হামাস ও হিজবুল্লাহ দুর্বল হলেও এসব গোষ্ঠী এখনো সক্রিয় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল।

এ যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাতও অনেক বড়। জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। হরমুজ প্রণালির মতো জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথে ব্যাঘাত সৃষ্টি হওয়ার যে আশঙ্কা আছে, তাতে করে গোটা বিশ্বের বাণিজ্য ঝুঁকিতে পড়বে।

ইসরায়েলের ইরান আক্রমণ ও গাজায় গণহত্যা—পুরো আরব বিশ্বে ব্যাপক জনরোষের জন্ম দিয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পক্ষে জনসমর্থন (এমনকি যেসব দেশ আব্রাহাম আকর্ডে স্বাক্ষর করেছে) ব্যাপকভাবে কমে গেছে। উল্লেখ্য যে ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিমা শক্তির ওপর আরব জনসাধারণের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

গত কয়েক মাসে আরব দেশগুলোয় যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা হয়তো অঞ্চলটির কর্তৃত্ববাদী শাসকদের উৎখাত করতে পারবে না। কিন্তু এ আন্দোলন আরব দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে। জনগণকে শান্ত রাখতে হলে আরব দেশগুলোকে তাদের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে।

ইরান তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করতে পাল্টা নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে সাইবার আক্রমণ, পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটিতে হামলা অথবা সামুদ্রিক বাণিজ্যে ব্যাঘাত সৃষ্টি। এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার বৃত্ত একপর্যায়ে রাশিয়া ও চীনের মতো বড় শক্তিগুলোকেও এ সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে।

তেহরানকে একঘরে করার বা ভেঙে ফেলার যেকোনো প্রচেষ্টা বুমেরাং হতে পারে। ইরান যদি বিভিন্ন জাতিগত বিভাজনের ভিত্তিতে (কুর্দি, আরব, বেলুচ, আজারবাইজানি ইত্যাদি) খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়, তাহলে সেখান পরিস্থিতি গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়া অথবা সালেহ-পরবর্তী ইয়েমেনের মতো হতে পারে। অরাজক পরিস্থিতিতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো সেখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতি সেখানে আল-কায়েদার মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর বিস্তার ঘটাতে পারে।

গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার ঘটনায় এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ফুঁসছে।

ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে আরও নাজুক করে তুলেছে। কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ায় এসব রাষ্ট্রে যে শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে, তাতে করে অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধকে ইসরায়েল পারমাণবিক হুমকি প্রশমনের যুদ্ধ বললেও এর অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হলো, ইসরায়েলের আধিপত্যের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাকাঠামো নতুনভাবে সাজানো। জনরোষ, আরব রাষ্ট্রগুলোর দুর্বল হওয়া ও চরমপন্থীদের উত্থানের বিনিময়ে সেটা ঘটছে।

এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য আবারও সামরিকীকরণের পথে হাঁটছে। কূটনীতির ওপর আস্থা ভেঙে পড়ছে, বিভাজন বাড়ছে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। এর ধাক্কায় উন্নয়ন পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়ছে, জোটগুলো ভেঙে যাচ্ছে এবং বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

* হেশাম গাফার, গবেষক ও ইসলামি চিন্তাধারা, আন্দোলন এবং সংঘর্ষ সমাধান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ইরানের রাজধানী তেহরানে ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামে হাজার হাজার মানুষ। তাঁরা ইরানের জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। তেহরান, ২০ জুন ২০২৫
ইরানের রাজধানী তেহরানে ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভে নামে হাজার হাজার মানুষ। তাঁরা ইরানের জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। তেহরান, ২০ জুন ২০২৫ ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগ দিলে যে ৩টি বড় ঘটনা ঘটতে পারে by সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া

ইসরায়েল-ইরান (সঙ্গে আমেরিকাও) যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়াচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে কিছু অন্তঃসারশূন্য হুমকি দিয়েছেন, কিন্তু যুদ্ধে সরাসরি আমেরিকার হস্তক্ষেপ করার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেননি।

ইউরোপীয়রা আরেকটি বড় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে চায়। কারণ, ইতিমধ্যে ইরাক-সিরিয়া যুদ্ধের পরিণতিতে লাখ লাখ শরণার্থীর স্রোত পুরো ইউরোপীয় কল্যাণরাষ্ট্রের বন্দোবস্তকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। ইরানের ৯ কোটি  মানুষের স্রোত ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে। এমন সব কারণে ইউরোপীয়রা যুদ্ধ বন্ধে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। তবে তা কাজ করবে কি না, তা নির্ভর করবে ইসরায়েল ও আমেরিকার ডিপস্টেটের ওপর।

এখন পর্যন্ত যুদ্ধ পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে এটি ওয়ার অব এট্রিশন; অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যুদ্ধটি যদি সত্যি সত্যি একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয়, সে ক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে?

সম্ভাবনা আছে তিনটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটার।

প্রথমত, ইসরায়েলের কোনো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জেতার সম্ভাবনা শূন্যের কাছাকাছি। তারা সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে (স্যামসন অপশন) ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা চালাতে পারে। তবে তা তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঠেকাতে পারবে বলে মনে হয় না।

দ্বিতীয়ত, প্রলম্বিত যুদ্ধে ইরান কার্যত একটি অকার্যকর রাষ্ট্র হয়ে পড়বে। এর সব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু ‘মাটির নিচের ইরান’ প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।

তৃতীয়ত, আমেরিকান সাম্রাজ্যের পতন হবে এবং আমেরিকা একটি দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। আমেরিকান জায়নবাদের যবনিকাপাত হবে ও তার নতুন আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটবে। প্রতিটি ঘটনার পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী। এসব বিষয়ের কয়েকটি আঙ্গিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই লেখায়।

------- ১.

ইসরায়েল একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জেতার সম্ভাবনা একেবারেই শূন্যের কোঠায়। এর অনেকগুলো রাজনৈতিক ও সামরিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে দুটি কারণ উল্লেখযোগ্য।

প্রথমত, ইসরায়েলের কোনো কৌশলগত গভীরতা (স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ) নেই। ইরানের তা আছে। অর্থাৎ একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে ইসরায়েলের প্রায় সব অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে এটি একটি মিনি গাজায় পরিণত হবে। ইসরায়েল বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। মনে রাখতে হবে যে ইসরায়েলের বেশির ভাগ নাগরিকের একাধিক পশ্চিমা নাগরিকত্ব রয়েছে। প্রায় সাত লাখ ইসরায়েলির আমেরিকার নাগরিকত্ব রয়েছে। আমাদের পরিচিত কিছু অধ্যাপকও আছেন এই তালিকায়। তাঁরা ইতিমধ্যে ইসরায়েল ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটা অনুমান করা ভুল হবে না যে এই দ্বৈত পশ্চিমা নাগরিকেরা বিধ্বস্ত ইসরায়েল ছেড়ে স্থায়ীভাবে পশ্চিমে পাড়ি দেবেন এবং আর ফিরবেন না।

অন্যদিকে ইরান ইসরায়েলের ৮০ গুণ বড়। এর কৌশলগত স্থাপনাগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে। তারা বছরের পর বছর সংঘাত চালিয়ে যেতে পারবে। এ ছাড়া অনেক ইরানি পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তুরস্কসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিলেও বেশির ভাগ ইরানির যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, সুতরাং তারা দেশেই থাকবে। অনেকেই ইরানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে মিলে প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইসলামি বিপ্লবের পর, আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর ইরান প্রায় ৪০ বছর ধরে এ ধরনের যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুতি নিয়েছে। তারা জানে যে আকাশযুদ্ধে তারা দুর্বল। যার কারণে এই চার দশকে ইরান মাটির নিচে আরেকটি ইরান তৈরি করেছে। সেখানে কেবল কয়েক ডজন ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি’ই নয়; বরং আন্ডারগ্রাউন্ড নেভাল বেইজ, এয়ার বেজ—সবই তারা তৈরি করেছে।

ধারণা করা যায় যে ইরান দেশের সামরিক সক্ষমতার ৮০ শতাংশ মাটির নিচে নিয়ে গেছে। আর সেগুলো প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। আপনি এগুলো জিপিএস দিয়ে ট্র্যাক করতে পারবেন না এবং জানবেনও না যে এগুলো আছে। এগুলো ধ্বংস করার একমাত্র উপায় স্থল অভিযান। কিন্তু ইরানকে বলা হয় আগ্রাসনকারীদের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক। ইরান কার্যত একটি দুর্গ সমতুল্য। এটি প্রায় তিন দিকে সুবিশাল পর্বতমালা দিয়ে ঘেরা, এক পাশে কৃষ্ণসাগর।

--------- ২.

ইরানে বড় ধরনের স্থল অভিযান পরিচালনার সামর্থ্য আছে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু এমনকি যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালেও এটি ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলের পাল্লায় পড়ে ইরানের ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনায় বাংকার ব্লাস্টার বোমা অথবা অন্য কোনো উপায়ে আক্রমণ করে ও ইরান যদি জবাবে আশপাশের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা করে হতাহতসহ জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে এবং তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান পরিচালনা করে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়ে বড় ফাঁদ হয়ে আবির্ভূত হতে পারে। সেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনার প্রাণ হারানোর ঝুঁকি থাকবে। কিন্তু চূড়ান্ত অর্জন হবে নেহাতই শূন্য। কেন?

বলা হয় যে শক্তিশালী আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে টিকে থাকলে আপনি জিতে যাবেন; অর্থাৎ শক্তিশালী আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে আপনাকে ‘জিততে’ হবে না, কেবল ‘টিকে থাকলেই’ হবে। যে কারণে ২০০৬ সালের লেবানন যুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ‘টিকে যাওয়া’ হিজবুল্লাহকে বিজয়ী গণ্য করা হয়। সুতরাং একটা জোরদার সম্ভাবনা হচ্ছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান প্রতিরোধ করে যাবে এবং ‘টিকে যাবে’।

যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর যুদ্ধ চালিয়ে ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো রণে ক্ষান্ত দেবে ইরাক যুদ্ধের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে। মনে রাখতে হবে, ইরাক যুদ্ধে আমেরিকা প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছে; অর্থাৎ একটা প্রলম্বিত ইরান যুদ্ধে আমেরিকা ৮-১০ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে হতে পারে। এই পরিমাণ আমেরিকার বর্তমান জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আর সেটি করলে আমেরিকান অর্থনীতি কার্যত দেউলিয়া হয়ে যাবে। আমেরিকা তার বৈশ্বিক সামরিক আধিপত্য হারাবে।

---------- ৩.

আমেরিকার পরাজয় কেবল আমেরিকান সাম্রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এটি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আরেকটি ওয়াইমার রিপাবলিক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে সাধারণ আমেরিকানরা ইসরায়েলের এই যুদ্ধে আমেরিকাকে জড়ানো ও রাষ্ট্রকে দেউলিয়া করার ‘অপরাধে’ জায়নবাদীদের দায়ী করবে এবং তাদের ওপর প্রচণ্ড আক্রোশ নিয়ে হামলে পড়বে।

এটি প্রথম ‘ওয়াইমার রিপাবলিক’–এর পুনর্মঞ্চায়ন হবে মাত্র। মনে রাখতে হবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানিতে জাতীয়তাবাদী জার্মানরা জায়নবাদীদের ওপর ব্যাপক আক্রোশে হামলে পড়েছিল। তাদের অভিযোগ ছিল যে জায়নবাদী গোষ্ঠীগুলো তৎকালীন জার্মানির বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বিনোদনজগতের ওপর প্রায় নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। অভিযোগ ছিল যে যুদ্ধে তারা যথেষ্ট দেশপ্রেমী ছিল না ও শত্রুর সঙ্গে ‘কোলাবোরেট’ করেছিল। জায়নবাদীদের এই ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগকে পুঁজি করে জার্মানরা ব্যাপক ইহুদিবিদ্বেষ তৈরি করে। যার পরিণতি আমরা দেখি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের ওপর জার্মানদের চূড়ান্ত আক্রোশ। বর্ণিত এই পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান আমেরিকার মিল পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

---------- ৪.


দুশ্চিন্তার কারণ আছে যে আমেরিকাতেও ওয়াইমার রিপাবলিকের পুনর্মঞ্চায়নের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। আমেরিকায় প্রগতিশীলদের একটা বড় অংশ আগে থেকেই জায়নবাদী লবির অতি ইসরায়েলপ্রীতি এবং আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরন্তর যুদ্ধে জড়ানোর কারণে ক্ষিপ্ত। তবে রক্ষণশীলরা বরাবরই জায়নবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু এবার নতুন একটি ঘটনা ঘটছে। সেটি হলো, আমেরিকার রক্ষণশীলদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ইরান যুদ্ধের ডামাডোল ঘিরে (কিংবা তারও আগে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে) জায়নবাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে। টাকার কার্লসন, স্টিভ ব্যানন, ক্যান্ডেস ওয়েন্সসহ নামীদামি রক্ষণশীল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও প্রচারণাকারীরা কেবল সক্রিয়ভাবে ইরান যুদ্ধের বিরোধিতাই করছে না, তারা ইসরায়েল ও জায়নবাদের বিরুদ্ধে কার্যত তথ্যযুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আমেরিকার রাজনীতিতে এর প্রভাব হবে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।

---------- ৫.

অনুমান করা যায় যে আমেরিকা যদি ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়, আমেরিকার প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল উভয় অংশ মিলে সারা আমেরিকায় জায়নবাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা উৎপাদন করবে।

জাতীয়তাবাদী জোয়ার তৈরির চেষ্টা হবে। ঠিক যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয়ের পর জার্মান জাতীয়তাবাদীরা জায়নবাদীদের দায়ী করে করেছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জায়নবাদীদের প্রতি জাতীয়তাবাদী আমেরিকানদের এই সম্ভাব্য আক্রোশে অনেক নিরীহ ইহুদিও লক্ষ্যবস্তু হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমনকি মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীও আক্রোশের লক্ষ্যবস্তু হবে।

হাজার হাজার বছরের লিখিত মানব–ইতিহাস পাঠ করলে মনে হতে পারে যে মানুষ যতই উৎকর্ষ অর্জন করুক, তারা যেন রাগ-ক্রোধ, তথা আমাদের ষড়্‌রিপুর দ্বারা সীমাবদ্ধ। শান্তিকালীন সময়ে মানুষ শক্তি অর্জন করতে চায়। আবার শক্তিশালী হলে দুর্বলের ওপর শোষণ করতে চায়। এই শোষণের জবাবে দুর্বল নিজে শক্তি অর্জনের চেষ্টা করে, অর্জন করেও। তারপর দুর্বল সবলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যার ফলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই শান্তি ও সংঘাতের চক্রটি মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে সামষ্টিক বা গোষ্ঠীজীবনের একটি নিরন্তর চক্র। অলঙ্ঘনীয়। তবু এতক্ষণ ধরে বলা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে এই অনুমান বাস্তব না হওয়াই মঙ্গলজনক হবে।

[মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যেকোনো অনুমান কঠিন। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি অনেক বেশি জটিল। এখানে আন্তরাষ্ট্রীয় একরৈখিক কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন। ফলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কে কী বলছেন এবং সেটি কতটুকু নির্ভরযোগ্য, তা নির্ভর করবে লেখকের এই অঞ্চল সম্পর্কে গভীর জানাশোনা ও নিজস্ব প্রজ্ঞার সমন্বয়ের ওপর। প্রায় দুই দশকের কাছাকাছি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির একাগ্র পাঠ, কিছু গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এটি লেখা হয়েছে। যাঁরা এই লেখা পড়বেন, তাঁরা যেন এসব পূর্বানুমান আক্ষরিকভাবে গ্রহণ না করেন। বর্তমানে যা ঘটছে, সে রকম পরিস্থিতি নিকট অতীতেও ছিল। সেসবের সঙ্গে তুলনা ও বিশ্লেষণ করে বর্তমানের পরিণতি আনুমানের একটি প্রয়াস এই লেখা।]

* সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া, উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব রিজওনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসন

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে কাজ করছেন ইসরায়েলি উদ্ধারকর্মী। গতকাল শুক্রবার, ইসরায়েলের বন্দরনগরী হাইফায়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনে কাজ করছেন ইসরায়েলি উদ্ধারকর্মী। গতকাল শুক্রবার, ইসরায়েলের বন্দরনগরী হাইফায়। ছবি: রয়টার্স

নেতানিয়াহু আজীবন ক্ষমতায় থাকতে ইরান যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন: বিল ক্লিনটন

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন বলেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অনেক দিন ধরেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চাচ্ছেন, যাতে তিনি আজীবন ক্ষমতায় থাকতে পারেন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘নেতানিয়াহু অনেক আগে থেকেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাচ্ছিলেন। কারণ, এর মাধ্যমে তিনি চিরকাল ক্ষমতায় থাকতে পারবেন। আমার মনে হয়, গত ২০ বছরের বেশির ভাগ সময়ই তিনি ক্ষমতায় আছেন।

বিল ক্লিনটন ‘দ্য ডেইলি শো’ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।

সাবেক এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন, তিনি যেন ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত ‘নিরসনে’ ভূমিকা রাখেন এবং দুই দেশের ‘নাগরিকদের লাগাতার হত্যাকাণ্ড বন্ধ’ করেন।

ক্লিনটন বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমাদের উচিত, এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি প্রশমিত করা। আমি আশা করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তা করবেন।’

ডেমোক্র্যাটদলীয় সাবেক প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তিনি মনে করেন না, নেতানিয়াহু বা ট্রাম্প পুরো অঞ্চলে কোনো বিপর্যয়কর যুদ্ধ শুরু করতে চান।

ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি সংযমের পক্ষে মত দেন।

বিল ক্লিনটন বলেন, ‘আমাদের মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুদের বোঝাতে হবে, আমরা তাদের পাশে আছি। আমরা তাদের সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করব।’

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘কিন্তু ঘোষণা না দিয়ে এমন যুদ্ধ শুরু করা, যেখানে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন এমন সাধারণ মানুষ হন প্রধান ভুক্তভোগী—এটা কোনো ভালো সমাধান নয়। সাধারণ মানুষ শুধু শান্তিতে বাঁচতে চান।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে সরাসরি অংশ নেয়নি। তবে তারা ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সহায়তা দিয়েছে এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

কঠোর অবস্থানে ইরান, থেমে নেই ইসরাইলও: ইরানের ৩ পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

যুদ্ধ অব্যাহত। কঠোর অবস্থানে ইরান। ইউরোপে সমঝোতা প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধে যদি যুক্তরাষ্ট্র জড়িত হয় তাহলে পরিণতি হবে খুবই ভয়াবহ। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো চায় ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যতে নামিয়ে আনুক। কিন্তু তাতেও রাজি নয় ইরান। তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কমিয়ে আনতে চায়। তাই বলে শূন্য নয়। ফলে ইরানকে এতদিন যতটা দুর্বল ভাবা হয়েছিল, সে ততটা নয়। পরিষ্কারভাবে তার কঠোরতার কথা জানান দিয়েছে বিশ্ববাসীর সামনে। ওদিকে শিশু হত্যার কারণে জাতিসংঘের কালো তালিকায় নাম উঠেছে ইসরাইলের। এমন অবস্থায় উভয়পক্ষই হামলা-পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ইরান প্রশ্নে নিজের জাতীয় গোয়েন্দা বিষয়ক মহাপরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডের সঙ্গে মতের অমিল দেখা দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। গত মে মাসে কংগ্রেসের শুনানিতে তুলসি বলেছিলেন, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির অধীনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। কিন্তু ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে বা করেছে এমন অভিযোগ তুলে  দেশটিতে সামরিক আগ্রাসন চালায় ইসরাইল। এতে ট্রাম্পের সম্মতি আছে। তুলসি গ্যাবার্ডের বক্তব্যের সঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থান বিপরীতমুখী হওয়ায় কয়েকদিন ধরেই মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার পাচ্ছে বিষয়টি। এর প্রেক্ষিতে তুলসি গ্যাবার্ডকে ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প।

তুলসিও তার মন্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে মুখরক্ষার চেষ্টা করছেন। এখন তিনি ইউটার্ন করে বলছেন, তিনি বিশ্বাস করেন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়ায় ইসরাইল সবচেয়ে বড় বাধা বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান। ইস্তান্বুলে তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠকে এ কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ইরানে ইসরাইলের হামলাকে ‘সমঝোতায় স্যাবোটাজ’ বলে আখ্যায়িত করেন এরদোগান। ইস্তান্বু্বুলে কূটনৈতিক এক সম্মেলনে এরদোগান ইসরাইলি কর্মকাণ্ডকে ডাকাতির সঙ্গে তুলনা করেন। বলেন, তারা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সমঝোতা প্রক্রিয়াকে প্রকৃতপক্ষে হেয় করার চেষ্টা করছে নেতানিয়াহুর সরকার। এর আগের দিন শুক্রবার জেনেভায় ইউরোপিয়ান নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন আরাঘচি। সেখান থেকে শনিবার ইস্তান্বুলে অব্যাহত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন তিনি। সেখানে যোগ দেন আরব ও মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিরা। তাদের সঙ্গে উদ্ভূত সংকট নিয়ে কথা বলেন তারা। ওদিকে ইসরাইল অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানে। পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরানও। এবারো ইসরাইলের আকাশসীমা ভেদ করে ইরানের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরাইলে। ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) দাবি করেছে তারা ইরানের আরও দু’জন কমান্ডারকে হত্যা করেছে। ওদিকে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করে ইউরোপ। কিন্তু শুক্রবার ইরান সাফ জানিয়ে দেয়, ইসরাইল যদি হামলা অব্যাহত রাখে তাহলে তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যত নিয়ে কোনোই আলোচনা করবে না।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এমন অবস্থান নিলেও তিনি শুক্রবার বিলম্বে পৌঁছান জেনেভায়। সেখানে কূটনীতিকে একটা সুযোগ দেয়ার জন্য ইউরোপিয়ান নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তবে ইরানে ইসরাইলি হামলা বন্ধের যে দাবি জানানো হয়েছে তা ট্রাম্প বন্ধ করতে বলবেন বলে মনে হয় না। তিনি বলেছেন, (ইসরাইলকে) এমন অনুরোধ করা আমার জন্য খুবই কঠিন বিষয় হবে। তিনি আরও বলেন, ইউরোপের সঙ্গে কথা বলতে চায় না ইরান। তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়। এ বিষয়ে ইউরোপ  কোনো সাহায্য করতে পারবে না। ট্রাম্প আরও জানান, তিনি ইরানে স্থলবাহিনী ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করবেন না। তবে অনেক নিরাশার মধ্যে আশার বাণী শুনিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। তিনি বলেছেন,  ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না। ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে এ নিয়ে তার ফোনে কথা হয়েছে। তাতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইউরোপিয়ানদের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। এক্সে দেয়া এক পোস্টে ম্যাক্রন লিখেছেন- আমি দাবি করেছি ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না। এই প্রক্রিয়া যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে এটা নিশ্চিত হবে তাদেরকে। ম্যাক্রন বিশ্বাস করেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার এবং আরও বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। এটা অর্জন করার জন্য তিনি বলেন, ফ্রান্সের নেতৃত্বে এবং তার ইউরোপিয়ান অংশীদারদের নেতৃত্বে সমঝোতা দ্রুত এগিয়ে নিতে চায় ইরান। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ১৩ই জুন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৪৩০ ইরানিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। অন্যদিকে ইসরাইলের সেনাবাহিনী দাবি করেছে তারা ইরানের দু’জন কমান্ডারকে হত্যা করেছে। তারা হলেন হামাসের সমন্বয়ক সাঈদ ইজাদি এবং কুদস ফোর্স কমান্ডার বেনহ্যাম শাহরিয়ারি। তারা আরও বলেছে, শনিবার সকালে এক ঘণ্টা ইসরাইলে প্রবেশ করে ইরানের ৮টি ড্রোন। ইসরাইল বলেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের দেশে নিহত হয়েছে ২৫ জন। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে হার্ট অ্যাটাকে। আহত হয়েছে ২৫১৭ জন।

ইসরাইলের কেন্দ্রস্থলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, হোলোনে অগ্নিকাণ্ড
একদিকে ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। ঠিক সেই সময়ে দুই দেশই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। গতকাল ভোরে ইসরাইলের কেন্দ্রস্থলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এর ফলে হোলোন শহরে অগ্নিকাণ্ড হয়। একই সময় ইসরাইলও ইরানের ইসফাহান অঞ্চলে হামলা চালিয়েছে। সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র অবস্থিত। তাতেই হামলা করা হয়েছে বলে দাবি ইসরাইলি সেনাদের। তারা ইরানের আরও একজন কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন আল-জাজিরা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ইসরাইলের সেনাপ্রধান এয়াল জামির। তিনি বলেছেন, দেশটিকে এখন ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী অভিযান চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ডকে প্রকাশ্যে ভর্ৎসনা করেছেন। গ্যাবার্ড বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে- এমন কোনো প্রমাণ নেই। ট্রাম্প এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। ওদিকে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) সতর্ক করে বলেছে, ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইলি হামলার পর তেজস্ক্রিয় ও রাসায়নিক দূষণের আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই স্থাপনার বাইরের এলাকায় তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা বাড়েনি। ওদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে এটি তত বিপজ্জনক হয়ে ওঠবে। ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ যুদ্ধ এই অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। তিনি আরও বলেন, আমরা এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়তে চাই যা উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এই যুদ্ধ আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে- শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতই নয়, গোটা অঞ্চলকে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোহরে খারাজমি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জানেন যে- ইরানের হাজারো প্রকারের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ইরানের মিত্ররা এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে ‘প্রচুর আগুন’ আনতে পারে। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প নিজেই দোদুল্যমান অবস্থায় আছেন, সরাসরি যুদ্ধে নামবেন কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন। তিনি আরও বলেন, এমনকি ১০ জনের মধ্যে ৮ জন মার্কিন নাগরিক চায় কূটনৈতিক সমাধান। তারা চায় না যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। আমার মনে হয়, যদি পশ্চিমা বিশ্ব, চীন, রাশিয়া এবং আরব রাষ্ট্রগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করে, তাহলে এখনো কূটনৈতিক সমাধান পাওয়া সম্ভব।

একাট্টা চীন ও রাশিয়া: ট্রাম্পকে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা যখন সরাসরি যুদ্ধে পরিণত হওয়ার পথে, তখন বিশ্বরাজনীতিতে একটি ভিন্ন দৃশ্যপট তৈরি করছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৃহস্পতিবার এক ফোনালাপে দুই নেতা এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করেছেন যেন তারা এই সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে উঠে আসতে চান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন ইসরাইলের সঙ্গে একত্রে ইরানে হামলা চালানোর কথা ভাবছেন, তখন এই ক্রমবর্ধমান সংঘাতকে ‘নির্বোধ আগ্রাসন’ হিসেবে তুলে ধরছে বেইজিং ও মস্কো। এ খবর দিয়ে বিশ্লেষণধর্মী একটি প্রতিবেদন সিএনএনে লিখেছেন নেকটার জান। তিনি আরও লিখেছেন ক্রেমলিন জানায়, ফোনালাপে পুতিন ও শি ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণও এক ধরনের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, যা নিয়ে চীন বরাবরই নীরব থেকেছে। চীনের পাঠানো বিবৃতিতে অবশ্য শি জিনপিং একটু নরম ভাষায় কথা বলেন। তিনি বিশেষ করে ইসরাইলকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান এবং বলেন, বড় শক্তিগুলোকে উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করতে হবে, উস্কানিতে নয়। এটা মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে একটি পরোক্ষ সতর্কবার্তা। চীনের সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ লিউ ঝোংমিন বলেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যে নীতিগত অনিশ্চয়তা ও লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে, তা এই সংকটের মূল কারণ। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব এখন প্রশ্নবিদ্ধ। তারা নিজের মিত্রদের আস্থাও হারাচ্ছে এবং শত্রুদের ভীত করার ক্ষমতাও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে।

চীন ও রাশিয়া এখন নিজেদের ‘শান্তির বার্তাবাহক’ হিসেবে তুলে ধরছে। চীন কেবল যুদ্ধবিরতির আহ্বানই জানাচ্ছে না, বরং তারা চার দফা প্রস্তাব দিয়েছে। তা হলো- যুদ্ধ বন্ধ ও বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা, পারমাণবিক ইস্যুতে সংলাপ, আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইতিমধ্যেই ইরান, ইসরাইল, মিশর ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিক ফোনালাপ করেছেন।

চীন এর আগেও গাজা যুদ্ধের শুরুতে শান্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই অঞ্চলে বাস্তব রাজনৈতিক বা সামরিক প্রভাব নেই। তাই তারা যতই শান্তির দূত হওয়ার চেষ্টা করুক, বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারা কঠিন। তবে চীন-ইরান সম্পর্ক ক্রমাগত গভীর হচ্ছে। চীন ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা এবং উভয় দেশ যৌথ সামরিক মহড়া পর্যন্ত করেছে। ইরান এখন চীনের নেতৃত্বাধীন ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সদস্য। এ ছাড়া চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র- বিশেষত, গোয়েদার বন্দর ও হরমুজ প্রণালীর কাছে অবস্থানের কারণে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব নেতৃত্ব নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন বেইজিং ও মস্কোর এই কৌশল তাদের জন্য কূটনৈতিকভাবে এক প্রতীকী জয় এনে দিতে পারে- বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের চোখে।

ইরানের ৩ পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের  ফরর্দোসহ ৩টি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এগুলো হলো ফরদো, নাতাঞ্জ ও ইস্ফাহান। তিনি একে ‘অত্যন্ত সফল’ অভিযান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেন, ফরর্দো স্থাপনাটিতে ‘পূর্ণ ক্ষমতার’ বোমা বর্ষণ করা হয়েছে। তবে ইরান জানিয়েছে হামলার আগেই ওইসব স্থাপনা থেকে তারা পারমাণবিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১০টায় (বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায়) ট্রাম্প একটি টেলিভিশন ভাষণে হামলার বিস্তারিত তুলে ধরবেন। ওদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও ফরর্দো স্থাপনাটিতে ‘শত্রু পক্ষের আক্রমণ’ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ফরর্দো হলো ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপন পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র, যেটি প্রায় ৮০ মিটার ভূগর্ভে অবস্থিত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন এবং এর জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা ও বিশেষ ধরনের বিমান প্রয়োজন। এর আগে মার্কিন সামরিক সূত্র জানায়, গুয়াম দ্বীপে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। এই বিমানই একমাত্র এমন বোমা বহনে সক্ষম, যা ফরর্দোর মতো শক্ত ঘাঁটিকে ধ্বংস করতে পারে। হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও কৌশল নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তার আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। হোয়াইট হাউস সূত্র বলছে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা রুখতেই এই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে কোনো পাল্টা হামলার ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব নেতারা ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। 

mzamin