Showing posts with label কাফি কামাল. Show all posts
Showing posts with label কাফি কামাল. Show all posts

Sunday, June 9, 2019

ফ্রন্টের পরিধি বাড়ানোর ইঙ্গিত আস্থা সংকটে নেতারা by কাফি কামাল

ফ্রন্টের পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তারই অংশ হিসেবে প্রথমেই তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন ফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ নিরসনের। আগামীকাল ফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের একটি বৈঠক ডেকেছেন তিনি। সেখানে সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিজেদের কৌশল পর্যালোচনা এবং আগামীদিনের করণীয় নিয়ে  আলোচনা করবেন। বৈঠকে গৃহিত কৌশলের ভিত্তিতে ফ্রন্টের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। ঐক্যফ্রন্টের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এমন তথ্য জানিয়েছেন। তবে দেশের রাজনৈতিক মহলসহ নিজ দলের নেতাকর্মীদের কাছে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, কৌশল ও কর্মপন্থা নিয়ে।  আস্থার সংকটে পড়েছেন নেতারা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের প্রতি সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব- এমন ভাবনা থেকেই নির্বাচনের আগে গড়ে তোলা হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।
রাজনীতিতে নানামুখী দ্বন্দ্ব-সন্দেহের মধ্যদিয়ে ঐক্যফ্রন্ট পথচলা শুরু করেছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে বিএনপি ও ২০ দলের আপত্তিকারী নেতারাও মেনে নিয়েছিল বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে। কিন্তু যে প্রত্যাশা নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলা হয়েছিল, তার ন্যূনতম অর্জন প্লাটফর্মটির মাধ্যমে আসেনি। একাদশ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা ও পরবর্তী স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস্যুতে প্রশ্ন উঠেছে ফ্রন্টের কৌশল ও কর্মপন্থা নিয়ে। একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানীতেও এই প্রশ্ন তুলেছিলেন ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থীরা। বিশেষ করে দীর্ঘদিনেও খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ তৈরি করতে না পারা এবং রাজনীতির নিস্তরঙ্গ পরিস্থিতির কারণে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অসন্তোষ ও হতাশা। নির্বাচনের পর কয়েকটি কর্মসূচি দিলেও তা পালন হয়েছে খুবই সংক্ষিপ্ত পরিসরে। সারাদেশে সংঘটিত নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ৩০শে এপ্রিল শাহবাগে ‘গণজমায়েত’ কর্মসূচি পালনের ঘোষনা দিয়েছিল। কিন্তু ২৯শে এপ্রিল সন্ধ্যায় পূর্বঘোষিত ‘শাহবাগে গণজমায়েত’ কর্মসূচি অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়। তারপর থেকেই নীরব জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। দীর্ঘদিনেও ২০দলের শরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করতে পারেনি ঐক্যফ্রন্ট। উল্টো ভাঙন ধরেছে ২০দলে। ফ্রন্টের শরিকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে অসন্তোষ। এমন পরিস্থিতিতে, ফ্রন্টের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ ও নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের ইঙ্গিত রয়ে যাচ্ছে প্রশ্নের মোড়কে।
দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঈদ পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন। বৃহস্পতিবার বেইলি রোডে নিজের বাসায় আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট মোটেও ভাঙনের পথে না। ঐক্যফ্রন্টের ঐক্য অটুট আছে। নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করাই পরিকল্পনা। আগামী ১২ই জুন আমরা সবাই মিলে বসছি। আমরা কৌশল ঠিক করে মাঠে নেমে ঐক্যকে আরও সুসংহত করব।’ সমমনা দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন জোরদার করার কথা জানিয়ে ড. কামাল বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য জনগণের ঐক্য গড়ে তোলা। সমমনা দলগুলো সঙ্গে নেয়ার কাজটা অব্যাহত আছে। তা আরও জোরদার করা হবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই ধরনের একটা স্বৈরতান্ত্রিক অবস্থা থেকে মুক্ত হতে হলে জনগণের ঐক্য প্রয়োজন এবং সচেতন রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য অপরিহার্য। জোটের পরিধি আরও বাড়িয়ে এই বছরই আন্দোলন জোরদার করা হবে।’
রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, কি বলছে বাস্তবতা? বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট বিদ্যমান থাকার পরও আলাদা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন প্রশ্নে আপত্তি ছিল অনেকের। জোটের মধ্যে গুরুত্বহীন করে তোলার অভিযোগ করেছিল ২০ দলীয় জোটের কয়েকটি শরিকদল। কিন্তু বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে তখন এ নিয়ে বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঐক্য ধরে রেখেছিল তারা। নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানের পর ফের সংসদে যোগ দেয়ায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলে যেমন ভাঙন ধরে, তেমনি অসন্তোষ তৈরি হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে। দুই দশকের সম্পর্ক ভেঙে জোট ছাড়ে ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থের দল বিজেপি। শপথগ্রহণ প্রশ্নে ২০দল ও ফ্রন্টের সঙ্গে আলোচনা না করায় তারা ক্ষুব্ধ বিএনপির ওপর। কেবল তাই নয়, এই সিদ্ধান্তের মধ্যদিয়ে ফ্রন্টের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিজয়ী সাত এমপির শপথ গ্রহণের ব্যাখ্যা চেয়ে জোট ছাড়ার এক মাসের আলটিমেটাম দেয় ফ্রন্টের শরিক দল কৃষক-শ্রমিক-জনতালীগ। অসন্তোষ প্রকাশ করে মাহমুদুর রহমান মান্নার দল নাগরিক ঐক্যের নেতারা। সবচেয়ে বড় কথা দলের শীর্ষ নেতারা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গড়লেও তার প্রতি আস্থা তৈরি হয়নি বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের। জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে আরও প্রকট হয়েছে সে আস্থার সংকট। সবচেয়ে বড় কথা সবখানে বিরাজ করছে সমন্বয়হীনতা। 
জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে সাত এমপির শপথ গ্রহণের ব্যাখ্যা চেয়ে ৯ই মে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ছাড়ার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন কৃষক-শ্রমিক-জনতালীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। সে আলটিমেটামের ডেটলাইন ছিল গতকাল ৮ই জুন। ডেটলাইন শেষে দুইদিন সময় নিয়েছেন কাদের সিদ্দিকী। গতকাল তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা জনগণের আশা-আকাঙক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত জন এমপির শপথ নেয়ার সঠিক ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলাম। এরই মধ্যে ড. কামাল হোসেন আমাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আগামী ১০ই জুন আ স ম আবদুর রবের বাসায় ফ্রন্টের সবাইকে তিনি ডেকেছেন। ওই বৈঠক থেকে কী ব্যাখ্যা আসে- সেটা আমরা দেখব। তারপর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবো।’
জাতীয় স্বার্থে ড. কামাল হোসেনকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছে বিএনপি। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই প্রশ্ন উঠেছে তিনি এই বৃহত্তর বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দিতে কতটুকু প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পেরেছেন। নির্বাচনের পর বিএনপির নেতারা নানা আলোচনা সভায় এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তারা কথা বলেছেন রয়েসয়ে। ফ্রন্টের শরিক দল কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী তার আলটিমেটাম ঘোষণার দিন বলেছিলেন, ‘৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা যায়নি। বিশেষ করে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার পর কারও সঙ্গে আলোচনা না করেই ফ্রন্টের সাত জন বিজয়ী প্রার্থী শপথ নিয়েছেন। ঐক্যফ্রন্ট পরিচালনায় কেন এই দুর্বলতা? সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত কেন নেয়া যাচ্ছে না?’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনে সরকারের কৌশলের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট কুলিয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো বর্জনের সিদ্ধান্তটি ছিল অপরিনামদর্শী। মূলত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যৌথসিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপি। ফ্রন্টের নির্বাচিত এমপিরা সংসদে যাবেন না সিদ্ধান্ত নেয়ার ভেতর দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটি এসেছিল। সে নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে শত শত নেতাকে বহিষ্কার করেছে বিএনপি। কিন্তু গণফোরামের দুই এমপির শপথের মধ্যদিয়ে তৈরি হওয়া পথে বিএনপির এমপিরা শপথ নেয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটি হয়ে পড়ে অর্থহীন।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যখন পরিধি বাড়ানোর চিন্তা করছে তখন নতুন চিন্তা করছে ২০দল। জোটের কয়েকজন নেতা বলেন, ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ২০ দলের শরিকদের সম্পর্ক মজবুত হয়নি। তারা এখনও জোটের রাজনীতি করছেন বিএনপির কারণে। ২০ দলের দুইজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, জোটের আগামী বৈঠকে বিএনপির প্রতি ২০ দলকে সক্রিয় করতে রাজী আছে কিনা- এমন একটি প্রশ্ন তারা তুলবেন। তারা জানান, জোটের শরিক দলগুলো বিএনপিকে ছেড়ে যেতে চায় না কিন্তু ফ্রন্টের ব্যাপারে তাদের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বর্তমান সরকারের কাছে দাবি আদায়ে কোন ধরনের আন্দোলনে যেতে পারবে কিংবা অন্য কোন কৌশল কার্যকর করতে পারবেন সেটা তারা কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। ফলে নতুন করে কোন রাজনৈতিক দল ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ফ্রন্টের ওপর আস্থা রেখে যোগ দিতে আগ্রহী হবেও তার মনে করছেন না।

Tuesday, May 21, 2019

সংসদ যেন একদলীয় করে তোলা না হয় by কাফি কামাল

সংসদে কথা বলার পর্যাপ্ত সময় প্রত্যাশা করে সংরক্ষিত নারী আসনে  বিএনপি মনোনীত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেন, সংসদ যেন একদলীয় করে তোলা না হয়। সংখ্যার বিচার না করে যেন নায্য কথা বলার জন্য বিরোধী এমপিদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া হয়। জীবনে প্রথমবারের মতো সংসদে যাওয়ার অনুভূতিটি তার কাছে একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনার। বিরোধী দলগুলোর রাজনীতি করার গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার যখন পুলিশী অনুমতির জালেবন্দি তখন সংসদে কথাবলার যে পথটি রয়েছে সেটা ব্যবহারের মধ্যেই তিনি খুঁজে পান সংসদে যাওয়ার যৌক্তিকতা। সংসদে গিয়ে তিনি দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার আইনীপ্রক্রিয়ায় মুক্তির বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরবেন। গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত আলাপে তিনি সংসদ নিয়ে তার প্রত্যাশা ও প্রাইয়োরিটির কথা তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত একমাত্র নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির সহ আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। রোববার রাতে তাঁর মনোনয়নের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর গতকাল দুপুরে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। মনোনয়নপত্রে তার প্রস্তাবক হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এমপি উকিল আবদুস সাত্তার এবং সমর্থনকারী হয়েছেন বগুড়া- আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপি দলীয় এমপি মোশাররফ হোসেন।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, জীবনে প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছি। আমার প্রত্যাশা থাকবে সেখানে ন্যায্য কথা বলার সুযোগ পাবো। সেখানে যেন আমাদের ৬জন হিসেবে দেখা না হয়। সংসদের বাকি সদস্যরাও যেন আমাদের নায্য কথাগুলো শুনেন। যদি আমাদের কথাগুলো যৌক্তিক হয়, দেশের ও দেশের মানুষের জন্য কল্যানকর হয় তবে তা যেন গ্রহণ করা হয়। আশা করি, সংসদে আমাদের পর্যাপ্ত সময় দেয়া হবে। সংসদকে একদলীয় সংসদে পরিণত করা হবে না।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনে দলের মনোনয়ন পাওয়ায় সংসদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এটা আমার জন্য একই সঙ্গে আনন্দের ও বেদনার। আনন্দের এই জন্য যে, জীবনে প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছি। সংসদে দাঁড়িয়ে দল, দেশ ও জাতির জন্য কথা বলতে পারবো। অন্যদিকে বেদনার এই জন্য যে, এমন একটি সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছি যেটা দেশের মানুষসহ সারা দুনিয়ার কাছে গণধিকৃত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। সে নির্বাচনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দল বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন করতে দেয়া হয়নি। যে সংসদে আমাদের নেত্রী খালেদা জিয়া নেই। অথচ তিনি তার জীবনে কোন নির্বাচনে হারেননি। যে নির্বাচনে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জেতার কথা ছিল কিন্তু বিজয় পেয়েছেন মাত্র ৬জন। যা ভোটের রাজনীতিতে হাস্যকর।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, প্রশ্ন আসতে পারে- আমি কেন এই সংসদে যাচ্ছি। আমি যাচ্ছি এই কারণে যে, আমাদের রাজনীতি করার গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সমস্ত অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। অনুমতির নামে আমাদের কোথাও কোন সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয় না। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি এখন অনুমতি জটিলতার কারণে সমাবেশও করতে পারে না। তিনি বলেন, দেশের মানুষের পক্ষে, জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য সংসদে যাচ্ছি। তরুণ এই আইনজীবী বলেন, আপনারা খেয়াল করেছেন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যই নয়- দেশের সুশীল সমাজের বক্তব্য, কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মতো অরাজনৈতিক মুভমেন্টগুলোও সরকার নিষ্ঠুরতার সঙ্গে দমন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদে আমাদের কথা বলার একটুখানি সুযোগ আছে, সেটাকে আমরা কাজে লাগাতে যাচ্ছি। রুমিন বলেন, সংসদে আমরা কথা বলতে চাই। কিন্তু সরকার আমাদের কথা শুনবে কিনা সেটা সরকারের ওপর নির্ভর করে।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, সংসদে কথা বলার যেটুকু সুযোগ পাবো তাতে আমি আমার বক্তব্যে ও কাজে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবো। আমার প্রথম অগ্রাধিকার হচ্ছে, আমাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনীপথে জামিনে কারামুক্তির দাবিটি জোরদার করে তোলা। কারণ তিনি আইনগতভাবে জামিন পাওয়ার যোগ্য এবং আইনগত বিষয়ে তার হকের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরবো। দ্বিতীয়ত, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার সুযোগ পাওয়ার পক্ষে কথা বলবো। এছাড়া আমাদের দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাভোগ করছে দিনের পর দিন। এইসব মিথ্যা মামলা নিয়ে কথা বলবো। গণতন্ত্র বিরোধী ৫৭ ধারা নিয়ে কথা বলবো। বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলব। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলব। বিশেষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেয়ার বিরুদ্ধে কথা বলব।
বিএনপির সহ আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি মেগাপ্রজেক্টের দুর্নীতি নিয়ে, বালিশ কেনা ও ভবনে বালিশ তোলার মজুরি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ মূলধারার গণমাধ্যমে রীতিমতো ট্রল হচ্ছে। আসলে এটাই বর্তমানের বাংলাদেশ। সরকার মেগাপ্রজেক্ট নিয়ে দেশের মানুষকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখছে। কিন্তু এক একটি প্রজেক্টের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে ১০-১৫বার। আর প্রতিটি প্রকল্পে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব। সংসদ তো রেসকোর্স ময়দান নয়, কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়- সেখানে তথ্য-উপাত্তসহ সুনির্দিষ্টভাবে দুর্নীতির ক্ষেত্র ও চিত্রগুলো তুলে ধরবো।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, সংসদে আমার কাজ কি হবে? আমি বা আমরা কয়েকজন তো আর সরকারকে হঠাতে পারবো না। আমাদের কাজ হবে জনসচেতনতা তৈরি করা। যেখানেই সরকারের দুর্নীতি দেখব, যেখানেই অনিয়ম দেখব- সেখানেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেব। কোন আইনপ্রণয়ন করা হলে তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগনকে অবহিত করবো। সর্বোপরি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করব।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, আমি জনপ্রতিনিধিত্ব করার যে সুযোগ পাচ্ছি তার জন্য প্রথমেই আমি পরম করুনাময় আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ প্রকাশ করছি। আমাকে এমন একটি সুযোগ করে দেয়ার জন্য আমাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বিশেষ করে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি- যারা এই সংসদে গিয়ে আমি ভূমিকা রাখতে পারবো এমন বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আমার নাম বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা করেছেন, গণমাধ্যমে রিপোর্ট করেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়েছেন। আমি তাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

Tuesday, April 16, 2019

প্যারোলে আগ্রহী নন খালেদা by কাফি কামাল

প্যারোলে মুক্তির আগ্রহ নেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। আইনি প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক পথে জামিনে মুক্তি চান তিনি। তার শারীরিক অবস্থা  অত্যন্ত নাজুক হলেও মনোবল অটুট রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। খালেদা জিয়াকে গত ১লা এপ্রিল কারাগার থেকে স্থানান্তর করা হয় হাসপাতালে। তবে উন্নত চিকিৎসার স্বার্থে প্যারোলে বা শর্তসাপেক্ষ মুক্তিতে ন্যূনতম সায় নেই তার।
কিছুদিন আগে একবার প্যারোলে মুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তার কড়া ধমক খেয়েছেন কয়েকজন আইনজীবী।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, সেদিন তিনি পরিষ্কার বলে দিয়েছেন- ‘কেউ তেমন উদ্যোগ নিলে তিনি তার কোন কিছুই বিবেচনায় নেবেন না, আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে দেবেন।’ এরপর থেমে যায় সে আলোচনা। কিন্তু খালেদা জিয়ার শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কিছুদিন ধরে তার পরিবারের কতিপয় সদস্য এ ব্যাপারে আগ্রহ পোষণ করেন।
কিন্তু খালেদা জিয়া যে এ ব্যাপারে রাজি নন তা আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে বাংলা নববর্ষের দিন। হাসপাতালে সাক্ষাত করতে যাওয়া দলের নীতিনির্ধারক ফোরামের তিন সদস্যের কাছে প্যারোলের ব্যাপারে অনাগ্রহের বিষয়টি জানিয়ে দেন খালেদা জিয়া। এছাড়া বিএনপির টিকিটে এমপি নির্বাচিত হওয়া ৬ জনের সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে রাজনৈতিক মহলে যে গুঞ্জন রয়েছে সেটা নিয়েও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন তিনি। বিএনপির সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। সূত্রগুলো জানায়, বাইরে খালেদা জিয়ার পরিবার বা দলের নেতাকর্মীরা আবেগের বশবর্তী হয়ে একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারবেন বড়জোর। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা একমাত্র খালেদা জিয়ার। তিনি অনাগ্রহী হওয়ায় হালে পানি পায়নি প্যারোলের মুক্তির আয়োজন।
বাংলা নববর্ষের দিন তার সঙ্গে সাক্ষাত শেষে নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোন বক্তব্য দেননি গণমাধ্যমে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়ার ব্যাপারে নেতারা নিশ্চিত হন আগের দিন। তবে নববর্ষ উপলক্ষে খালেদা জিয়ার জন্য তারা কোন উপহার নিয়ে যাননি। বিএসএমএমইউ’র কেবিন ব্লকের ৬ তলায় দুইটি কক্ষের একটি কেবিনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন খালেদা জিয়া। সামনের কক্ষে বসে তার সঙ্গে কথা বলেছেন নেতারা। সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়াকে শারীরিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল। আলাপের সময় কখনো কখনো তিনি হাত তুলে বা নেড়ে কথা বলতে পারছিলেন না। আর্থ্রাইটিসের ব্যথার কারণে তিনি পা নাড়াতে পারছিলেন না। কখনো কখনো তার মুখের কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। তবে তার প্রতিটি বাক্য ছিল গোছালো। নিজে অসুস্থ হলেও দলের কয়েকজন নেতার মৃত্যু ও অসুস্থতার ব্যাপারে খোঁজ-খবরও নিয়েছেন তিনি। জানিয়েছেন, স্বাভাবিক খাবার গ্রহণেও অসুবিধা হচ্ছে তার। সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, সাক্ষাত করতে যাওয়া তিন নেতার সঙ্গে আলাপকালে তিনি প্যারোল নিয়ে কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের একটি বক্তব্যের উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, ৭ই এপ্রিল বিএনপির গণঅনশনে কাদের সিদ্দিকী বলেছিলেন- ‘প্যারোলে মুক্তি মানে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু, গণতন্ত্রের মৃত্যু।’ তিনি তার মামলাগুলোর ব্যাপারে জানতে চেয়েছেন। এ সময় তিনি কয়েকবার বলেন, ‘আমি কি করেছি- আমার বিরুদ্ধে কেন মামলা হবে? আমার বিরুদ্ধে কেন সাজা হবে?’ দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও জানতে চান তিনি। নেতারা জানান, সাক্ষাতের পুরো সময় খুবই স্বাভাবিক ছিলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু নেতারা চলে আসার সময় কিছুটা বেদনার ছাপ দেখা গেছে খালেদা জিয়ার চেহারায়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের একদিন পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্যারোল ও সংসদে যোগ দেয়ার ব্যাপারে মুখ খুলেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের নবগঠিত কমিটির নেতাদের নিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজার জেয়ারত করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের বিষয়। তাই এ নিয়ে দলীয় চেয়ারপারসনের সঙ্গে খুব বেশি আলোচনা হয়নি।’ বিএনপির কতিপয় এমপির সংসদে যোগ দেয়ার গুঞ্জনের ব্যাপারে তিনি বলেন- ‘এই ধরনের কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই।’
খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির পরোক্ষ সরকারি প্রস্তাব নিয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, প্যারোলের নামে সরকার মূলত আরেকবার দেশবাসীর সামনে জনপ্রিয় এই নেত্রীকে হেয় করতে চায়। তিনি বলেন, সরকার যদি প্যারোলে মুক্তিই দেবে তাহলে তার স্বাভাবিক জামিন প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি করে কেন? সরকার যদি বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ না করে তাহলে খালেদা জিয়া বহু আগেই জামিনে মুক্তি পেতেন। তার প্রতিটি মামলাই জামিন যোগ্য এবং মামলার অন্য আসামীরাও জামিনে মুক্ত রয়েছেন। নানামুখী প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে খালেদা জিয়া যখনই কোন  মামলায় জামিন পান তখনই নতুন কোন মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। এটা কোনভাবেই সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের লক্ষণ নয়। আসলে প্যারোলে মুক্তির মাধ্যমে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে ফের হেয় করতে চায় সরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার মনোবল যতটুকু দৃঢ়তার সঙ্গে অটুট রয়েছে তাকে দলের কোন নেতা বা সরকার সে সুযোগ পাবে না।
বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা সংসদে গেলে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখাবে সরকার- এমন গুঞ্জন রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু এ গুঞ্জনের বাস্তবতা কতটুকু? বিএনপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা জানান, খালেদা জিয়া চাইলে নির্বাচনের আগেই আপস করতে পারতেন। খালেদা জিয়াকে রাজী করাতে বা তেমন পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের তরফে নানা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে। বিএনপির কোন কোন নেতাও সরকারের সে প্রচেষ্টায় যুক্ত হয়েছেন আবেগের বশবর্তী বা সরকারের কৌশলে বিভ্রান্ত হয়ে। কিন্তু প্রতিটি প্রচেষ্টাই নাকচ হয়ে গেছে খালেদা জিয়ার দৃঢ় মনোবলে। এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সবুজ সংকেত ছাড়া বিএনপির এমপিরা শপথ নিয়ে সংসদে যাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, আইনী প্রক্রিয়ায় জামিনে মুক্তির বাইরে কিছুই ভাবতে নারাজ খালেদা জিয়া। এমনকি অনির্ধারিত সময় পর্যন্ত কারাভোগের মানসিক প্রস্তুতিও রয়েছে তার।

Sunday, April 14, 2019

নতুন আশা নতুন স্বপ্ন by কাফি কামাল

‘নিশি অবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত/আমি আজি ধূলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত/বন্ধু হও শত্রু হও যেখানে যে রও, ক্ষমা কর আজিকার মত/পুরাতন বরষের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’ আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পর্দা উঠবে নতুন বঙ্গাব্দের। চৈত্রসংক্রান্তির মাধ্যমে গতকাল ১৪২৫ সনকে বিদায় জানিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে আজ যুক্ত হয়েছে নতুন বছর ১৪২৬। স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে   ঘটনাবহুল ১৪২৫। জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরে প্রবেশ করেছে বাঙালি জাতি।
ব্যতিক্রমহীনভাবেই কবিগুরুর গানে নতুন বছরকে জানানো হবে আহ্বান। অনেকটা প্রার্থনাসংগীতের মতোই জরা ও গ্লানির পুরাতন মুছে ঘোষিত হবে মঙ্গলময় আগামী নির্মাণের প্রত্যয়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজন আর মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আজ ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানানো হবে। শুভ বাংলা নববর্ষ, স্বাগত অভিবাদন।
নববর্ষ আসে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয় নিয়ে।
সব অশুভ ও অসুন্দরকে পেছনে ফেলে নতুন কেতন উড়িয়ে বৈশাখ আসে। বিপুল বৈভব, সম্ভাবনা, নতুনের আহ্বান, পুরাতন দিনের হতাশা কাটিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাবে আজ বাঙালি। পহেলা বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে মাতবে দেশ। স্নাত হই বৈশাখের রৌদ্র খরতাপে, দূর করি বৎসরের যত আবর্জনা। গ্লানি মুছিয়ে, জরা ঘুচিয়ে শপথ নিই বিশুদ্ধতার। নতুন বছরে সবার আশা এক বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। যেখানে থাকবে না কোনো ভয়, হতাশা কিংবা অশুভ শক্তির। গণমানুষের অধিকার আদায় আর শান্তি-স্বস্তির স্মারক হয়ে উঠুক আজ। হাজার বছরের বয়ে চলা লোকজ সংস্কৃতি আমাদের নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে। নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয়ে নতুন কুঁড়ির মতো আমাদের সমাজ, জীবনে এবং রাষ্ট্রে সম্ভাবনার নতুন নতুন পালক যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা গণমানুষের। বিশ্বকবির ভাষায়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুছে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ পহেলা বৈশাখে আমরা সুন্দর, সুচি আর চিরমঙ্গলের জয়গান করি।
পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এ উৎসবের সার্বজনীনতা অসাধারণ। বাঙালি জাতি তার নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, আর এ ধারা চলে আসছে গানে-কবিতায়, লোকাচারের নানা অনুষঙ্গে, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দেশের বৃহত্তম অসামপ্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের সঙ্গে বাংলার সাহিত্য, বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই বাংলা সন গণনার শুরু মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন।
পরে যুক্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। অমর্ত্য সেন তার আর্গুুমেন্টিভ ইন্ডিয়ানে বলেছেন- ‘আকবর সব ধর্মবিশ্বাসীর সমান উপযোগী একটি বর্ষপঞ্জি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।’ আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল ‘আকবরনামা’য় লিখেছেন-  ‘ফসল সংগৃহীত হয় সৌর বর্ষপঞ্জি অনুসারে। তাই হিজরি সালের পাশাপাশি একটি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন ছিল। দ্বীন-এ-ইলাহির মতো আকবর সেটির নাম দিয়েছিলেন তারিখ-ই-ইলাহি।  বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয় ১৫৫৬ সালে। নক্ষত্রের নাম থেকে নেয়া হয় মাসগুলোর নাম। তারিখ-ই-ইলাহি চালুর পর ১৪টি নতুন উৎসবের কথা ঘোষণা করেন আকবর। এই রকম এক নওরোজেই শাহজাদা খুররমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল মমতাজের। এ কারণে অনেকে বলতে চান, পহেলা বৈশাখ না হলে সৃষ্টি হতো না প্রেমের অমর স্মৃতি তাজমহল।
বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। পয়লা বৈশাখ এখন সব বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সমপ্রদায়নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব। কৃষকসমাজ আজও অনুসরণ করছে বাংলা বর্ষপঞ্জি। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও পরে সংযোগ ঘটে রাজনৈতিক ইতিহাসের। আমাদের পরাধীনতার কালে এই উৎসব আয়োজনে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালিও সোচ্চার ছিল প্রতিবাদে। ষাটের দশকে রমনা বটমূলে সূচিত ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে করেছে বেগবান। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্ব্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা।
২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইউনেসকো এ শোভাযাত্রাকে দিয়েছে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা। প্রথমদিকে পয়লা বৈশাখের উৎসব ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। শহরে-বন্দরেও তা সীমিত ছিল হালখাতায়। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের চেয়ে বর্ণিল, বর্ণাঢ্য আয়োজনে এ উৎসব পালিত হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি নগর-মহানগরে। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের আদলে প্রায় সর্বত্র আয়োজিত হয় এ অনুষ্ঠান। বাংলা নববর্ষে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ রীতি এখনো এ দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির আমেজ নিয়ে উৎসবের পরিধির বিস্তার ঘটিয়েছে। আধুনিক বাঙালি তাদের বাংলা নববর্ষকে সাজিয়ে তুলছে মাতৃভূমির প্রতিটি আঙিনায় আরো বেশি উজ্জ্বলতায়। দেশের পথেঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসবমুখরতার বিহ্বলতা। পয়লা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারা দেশ। বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। সর্বত্র দেখা যায় নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস। কবির ভাষায়- ‘অনাগত আগামীর অফুরান বাদ্য/নতুনের আবাহনে হয়’।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে চাকমা, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা জনজাতি বছরের হিসাব করে বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী। নববর্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান উৎসব বৈসাবি। ত্রিপুরা জনজাতির বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাইং, চাকমাদের বিজু মিলিয়ে এ বৈসাবি। বাংলা নববর্ষকে উপলক্ষ্য করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, বাংলা ভাষাভাষি মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়ি জনপদে এখন উৎসবের অনিন্দ্য আমেজ। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিও মেতে উঠবে বর্ষবরণের নানা আয়োজনে। নববর্ষে উৎসব-পার্বণে ভোজনপ্রিয় বাঙালির খাদ্যতালিকায় রসগোল্লা, নকশিপিঠা, কদমা-বাতাসা, ভর্তা, আচার, খই, মুড়ি-মুড়কি, পায়েস অনিবার্য। পালা-পার্বণ, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় উৎসবে এসব সুস্বাদু খাবার শত বছর ধরে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। নববর্ষ উপলক্ষে চারদিকে ধুম পড়বে বাঙালির বাংলা খাবার আস্বাদনে।
নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। কেবল রাজধানী ঢাকাই নয় এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব) ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক (ডিজি) কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর আলম শুক্রবার রমনা বটমূলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে বলেছেন, পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নগরীর রমনা পার্ক, সোহরওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নাশকতা ঠেকাতে জোরদার করা হয়েছে র‌্যাবের নিরাপত্তা বলয়।
পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীর উৎসবস্থলগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকবে এবং তা সার্বক্ষনিক মনিটরিং করবে র‌্যাব। নববর্ষকে ঘিরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যে কোন ধরনের নাশকতা ঠেকাতে প্রস্তুত রয়েছে র‌্যাব। এছাড়া রমনা বটমূলসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ভেন্যুতে ডগ স্কোয়াডসহ বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিট সুইপিং করবে। এছাড়া টহল টিম, ফুট পেট্রোল, ওয়াচ টাওয়ার, মোটরসাইকেল পেট্রোল ও অবজারভেশন পোস্ট থাকবে। বড় ভেন্যুগুলো মনিটরিংয়ের জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন, মোবাইল কোর্টসহ মেডিকেল টিম থাকবে, যাতে দেশের মানুষ নিবিঘ্নে নববর্ষ উদযাপন করতে পারে।
বর্ষ আবাহনে মূল অনুষ্ঠান: বর্ষবরণে আজ রাজধানী জুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজন থাকবে। প্রতিবছরের মত দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ছায়ানট’ ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সরোদবাদন দিয়ে শুরু করবে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ ১৪২৬ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইমেলাসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, জাতীয় জাদুঘর, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, কপিরাইট অফিস, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বিসিক নববর্ষ মেলা, আলোচনাসভা, প্রদর্শনী, কুইজ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ আায়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠানমালার। বাংলা নববর্ষের দিন সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হবে।
শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে- শিশু-কিশোর, ছাত্র-ছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের বিনা টিকিটে প্রবেশ করতে পারবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। অভিজাত হোটেল ও ক্লাব বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের আয়োজন করবে। বর্ষবরণ উপলক্ষে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র্র প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। বিকাল তিনটায় নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সকাল থেকেই আয়োজন করেছে খৈ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ও বাঙালি খাবার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

Friday, March 29, 2019

বনানী ট্র্যাজেডি: মৃত্যুর কাছাকাছি থেকে তাদের বাঁচার অপেক্ষা by কাফি কামাল

ভবনে হঠাৎ আগুন। প্রতিটি ফ্লোরে নানা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়গুলো দারুণ কর্মব্যস্ত তখন। আগুনের ধোঁয়ার সঙ্গে মৃত্যু আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ভবনজুড়ে। ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে অন্ধকার হয়ে আসছে চারপাশ। বন্ধ হয়ে আসছে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস। আগুনের তীব্রতায় নিচে নেমে আসতে পারছেন না সিঁড়ি বেয়ে। প্রতিমুহূর্তে উত্তাপ বাড়ছে  ভবনের। উপরের দিকের ফ্লোরগুলোতে অবস্থানকারীরা নিঃশ্বাস নিতে আর সাহায্যের আকুতি জানাতে জানালার কাঁচ ভেঙেছেন।
কাঁচভাঙা জানালা দিয়ে হাত নাড়িয়ে আর চিৎকার করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। জীবনের আকুতি নিয়ে বাড়ানো হাতগুলো অনেক উপরে। ভবনের ১০ম তলা থেকে উপরে। কিন্তু উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়া লোকজন নিচে রাস্তায়। সাহায্য করতে না পেরে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়া অনেকেই দোয়া করছিলেন উপরের দিকে হাত তুলে। আর আটকে পড়ারা তখন স্বজনদের কাছে ফোন করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাহায্য চাইছেন।
ভবনটির ৬ থেকে ৯ তলায় তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছানোর আগেই উদ্ধার কাজে যুক্ত হন আশেপাশের বিভিন্ন অফিসের লোকজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পৌঁছানোর পর তাদের চেষ্টা ছিল প্রাণান্তকর। তারা আটকে পড়াদের আশ্বস্ত করছেন। উঁচু ফ্লোরগুলোতে আটকে পড়াদের উদ্ধারে পাঠানো হচ্ছে ক্রেন লেডার (যন্ত্রচালিত মই)। কিন্তু সে লেডার কাছাকাছি গিয়েও উদ্ধার করতে পারছেন না।
দুয়েকজন ভাগ্যবান  লেডারের সাহায্যে উদ্ধার পেলেও অন্যদের ভাগ্য তখনও দোদুল্যমান। ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না দীর্ঘ সময়ে। ধোঁয়া থেকে বাঁচার জন্য নিচ থেকে পাঠানো হচ্ছে ভেজা টাওয়াল। আতঙ্কে কেউ ভবনের উপরের ফ্লোরের দিকে ছুটছেন। কেউ কেউ চেষ্টা করছেন পাশের ভবনে যাবার। অনেকেই নিচে নেমেছেন উঁচু ভবনে ঝুলে থাকা ক্যাবল বেয়ে। জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ নিচে লাফিয়ে পড়ছেন। ফায়ার সার্ভিস কর্মীসহ উৎসুক জনতার চোখের সামনে তারা আহত হচ্ছেন। অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করছেন।
এভাবেই বিভীষিকাময় পরিবেশে মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের অপেক্ষায় কাটাতে হয়েছে উদ্ধারের আশায়। উদ্ধার পেতে যখন আটকে পড়ারা হাত নাড়াচ্ছেন তখন নিচে অপেক্ষারত স্বজনসহ উৎসুকদের অশ্রুতে ভিজছে কপোল। চারদিকে তখন কেবলই বাঁচার আকুতি। বাঁচানোর তাগিদ। এমন দৃশ্য ছিল বনানীর ১৭ নম্বর রোডের বহুতল ভবন এফআর টাওয়ারের। আতঙ্ক কেবল আগুন লাগা এফআর টাওয়ারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বন্ধ করে দেয়া হয় আশেপাশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয় বিদ্যুৎসহ জরুরি সেবার সংযোগ।
এক পর্যায়ে দমকল কর্মীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ভবনের উপর থেকে বালি, গ্যাস ও পানি দিয়ে বিমান বাহিনী ও নিচ থেকে সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ শুরু করেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতার কাজই করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। কিন্তু এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ধোঁয়ার তীব্রতার কথা বলেছেন তাদেরই একজন। এক উদ্ধারকর্মী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আগুনের চেয়ে ধোঁয়া বেশি। আর এই ধোঁয়ার কারণে ব্যাঘাত ঘটছে উদ্ধারে। উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি অগ্নিদগ্ধ ও আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছেন প্রভা হেলথ নামে একটি সংস্থার কর্মীরা।
প্রভা হেলথের কর্মকর্তা ফয়সাল রহমান বলেন, ‘এখানে আমরা সাতজন ডাক্তার, ১৪ জন নার্স ও ২০ জন সাপোর্ট স্টাফ আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছি।’ আগুন লাগার পরপরই নিজের ফেসবুকে পোস্ট দেন ওই ভবনে কর্মরত একজন মডেল ও অভিনেতা। তার নাম রিপন আহমেদ। তিনি ওই ভবনের লিফটে আটকে পড়েছেন উল্লেখ করে লেখেন- ‘আগুন, আগুন। হতে পারে এটা আমার লাস্ট (শেষ) পোস্ট। আমি এফআর টাওয়ারের লিফট ১৩’তে আছি। ক্ষমা করে দিয়েন।’ প্রথম পোস্টের এক ঘণ্টা পরে রিপন আরেকটি পোস্টে লেখেন- ‘মাফ করে দিয়েন। লিফট ১৩ বনানী এফআর টাওয়ার।’ পরে জানা গেছে, বিকালের দিকে দমকল বাহিনীর সদস্যরা রিপনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
এফআর টাওয়ারের ভেতর থেকে নিজের ফেসবুকে একটি ভিডিও আপলোড করেন সেজুতি স্বর্ণা নামে একজন। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ফ্লোরে অবস্থানরত সবাই নাকে-মুখে কাপড় চেপে ধরে হাঁটছেন, ভেতরটা ধোঁয়ায় পুরোটাই অন্ধকার। এ সময় তিনি সাহায্য চেয়ে বলছিলেন- ‘আমাদের সিঁড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। সিঁড়ি না পাঠালে আমরা ধোঁয়ায় মারা যাবো।’
পাশের ভবনে কর্মরত একজন জানান, বাঁচার আকুতি নিয়ে অনেকেই নিচে নামছিলেন ঝুলন্ত ক্যাবল বেয়ে। এভাবেই নিচে নামছিলেন এক তরুণী। কয়েক ফুট নামার পরপরই হাত ফসকে পড়ে যান নিচের এক ভবনের এসির ওপর। ভাগ্যক্রমে ক্যাবল ধরে ঝুলে রইলেন তিনি। সেখানে ক্যাবল ধরে ঝুলে থাকা আরেকজন লোক সেই তরুণীকে  নামতে সাহায্য করলেন। কিছুক্ষণ বাদে এক তরুণ একইভাবে নামছিলেন। আগুনের লেলিহান শিখা তার খুব পাশেই যেন। কয়েক সেকেন্ড বাদেই হাজার হাজার মানুষ ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠলেন। হাজারো মানুষের চোখের সামনেই ৮তলা উঁচুতেই কয়েক পাক খেয়ে নিচে পড়ে গেলেন সেই তরুণ।
বনানীর সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মাসুম বিল্লাহ সহযোগিতা করছেন এফআর ভবন থেকে নামানো আহতদের উদ্ধার তৎপরতায়। ভবনটিতে তখন আটকে পড়েছিলেন তারই চাচাতো ভাই সুমন হোসেন। উদ্ধার তৎপরতায় অংশগ্রহণের পাশাপাশি কাঁদছিলেন চিৎকার করে। বলছিলেন- ‘আল্লাহ তুমি তাদের বাঁচিয়ে দাও। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই ওদের। কতগুলো মানুষ ভেতরে তা আমরা জানি না। বাঁচার জন্য অনেক মানুষ হাত বাড়াচ্ছেন। তাদের তুমি নিচে নামার ব্যবস্থা করো।’
এফআর টাওয়ারের ১২ তলায় ডাট গ্রুপে কাজ করতেন আইটি ইঞ্জিনিয়ার ফাহাদ ইবনে কবীর। আগুন লাগার পরপরই ফাহাদ তার মাকে ফোন দিয়ে বলেছেন- ‘ভেতরে আগুনের ধোঁয়ায় আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। আমি দম নিতে পারছি না।’ ছেলের ফোন পেয়েই সেখানে ছুটে যান তার মা ফরিদা ইয়াসমিন। তিনি ভবনের নিচে দাঁড়িয়ে ছেলের ফোনালাপের কথা বলে আর্তনাদ করছিলেন, আর ছেলের জন্য দোয়া করছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন- ‘ছেলের সঙ্গে এক ঘণ্টা আগে আমার কথা হয়েছে। এখন মোবাইল নম্বর বন্ধ পাচ্ছি।’
দুপুরে এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার পর ওই ভবনে কর্মরত হাসনাইন আহমেদ রিপন বাঁচার আকুতি জানিয়ে ফেসবুকে দুটি পোস্ট দেন। প্রথম পোস্টে তিনি লেখেন- ‘আগুন আগুন, এটা শেষ পোস্ট হতে পারে। প্লিজ ফরগিভ মি (এফআর টাওয়ার লিফট ১৩)।’ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন কক্ষের ভেতরের সেলফিসহ দ্বিতীয় পোস্টে তিনি আপনজনদের বিদায় জানিয়ে লেখেন- ‘মা, মিনা, মিলন, আপু, ফাহিম ভাই সবাই আমারে মাফ করে দিস। আগুন এফআর টাওয়ার, লিফট ১৩।’ তবে ভাগ্যক্রমে উদ্ধার পেয়েছেন তিনি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ক্রেন লেডারের মাধ্যমে যাদের উদ্ধার করেছেন তাদের একজন রিপন। রিপনের বন্ধুরা ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, উদ্ধারের পর বর্তমানে ইউনাইটেড হাসপাতালে চলছে তার চিকিৎসা।
রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারের নিরাপত্তা প্রহরী জাহাঙ্গীর আলম ২২তলা ভবনের ছাদে অবস্থান করছিলেন। যেখানে এ ভবনের নিরাপত্তা প্রহরীদের থাকার জায়গা। ডিউটি না থাকায় ছাদেই ছিলেন তিনি। আগুন লাগার কথা জেনেই নিচে নামার চেষ্টা করলেও নবম তলায় পৌঁছে তীব্র গরম আর ধোঁয়ায় বাধাগ্রস্ত হন। পরে ছাদে ফিরে গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে লাফিয়ে চলে যান লাগোয়া পাশের বিল্ডিংয়ে। জাহাঙ্গীর বলেছেন- ‘সাত ও আট তলায় আগুন লাগছে বইল্যা মনে হয়। পরে এইটা নয়তলায় গিয়া লাগে।’
এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছিলেন হাবিবুর রহমান নামে একজন। কারণ সেখানে ২০তলায় কাশেম গ্রুপে কর্মরত ছিলেন তার ফুফাতো ভাই আহসান হাবিব। তার মোবাইলটি ছিল বন্ধ। এক অজানা আশঙ্কায় ছটফট করছিলেন তিনি। এমন সময় হঠাৎ করেই সুস্থ অবস্থায় তার সামনে এসে দাঁড়ায় আহসান হাবিব। ভাইকে অক্ষত পেয়ে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাবিবুর। অফিসের বাইরে থাকায় তিনি নিরাপদ থাকলেও তার সহকর্মীদের ব্যাপারে কিছু বলতে পারেননি। আহসান হাবিব জানান,  ‘বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অফিসের কাজে তাকে পাঠানো হয় বাংলামোটরে। অগ্নিকাণ্ডের সময় বাইরে থাকায় তিনি বিপদমুক্ত আছেন।’
টাওয়ারে স্ক্যান ওয়্যার নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন মির্জা আতিকুর রহমান। অগ্নিকাণ্ডের পর তিনি স্ত্রীকে ফোন করে জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তার স্ত্রী অ্যানি আক্তার পলি। সেখানে তার খোঁজ না পেয়ে আর্তনাদ করছিলেন পলি। পরে তিনি স্বামীর খোঁজে ছুটে যান কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে।
আগুনের উত্তাপ ও ধোঁয়ার তীব্রতা যখন ক্রমেই বাড়ছিল তখন জীবন বাঁচাতে ভবন থেকে লাফ দেন রেজাউল আহমেদ নামে একজন। নিচে পড়ে হাত-পা ভেঙে যাওয়া রেজাউল বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রেজাউলের মামাশ্বশুর জনি সাংবাদিকদের জানান, ‘যখন আগুন বাড়তে থাকে, তখন রেজাউল ওইখান থেকে লাফ দেন। হাসপাতালে নেয়ার পর জ্ঞান ফিরলে রেজাউল আমাকে জানায়, এমুন গরম হইছে আমি আর টিকতে পারছিলাম না। তাই লাফ দিছি।’
এফআর টাওয়ারের ১৪তলায় মিকা সিকিউরিটিস লি. কোম্পানিতে কাজ করতেন লালমনিরহাটের পাটগ্রামের আবু বকর সিদ্দিক বাচ্চুর ছেলে আবির। আগুন লাগার পর মোবাইলে একবার যোগাযোগ করতে পারলেও পরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি। আবিরের ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন তার চাচা সাংবাদিক শিমুল রহমান।
অল্পের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছেন ডিএইচএল-এর ডেলিভারিম্যান সুজন সরকার। যখন আগুন লেগেছে তখন তিনি নিচে মোটরসাইকেল পার্ক করে এফআর টাওয়ারের ৮ম তলার একটি অফিসে যেতে লিফটে উঠছিলেন। ঠিক এমন সময় লিফট থেকে বেরিয়ে একজন তাকে বলেন, উপরে আগুন লেগেছে। সেটা শুনেই তিনি ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। 
অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন ১২ তলায় ইইউআর সার্ভিস বিডি লিমিটেডের সেলস ম্যানেজার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক। উদ্ধারের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলেও শরীরের ৯০ভাগ পুড়ে যাওয়া ফারুককে বাঁচাতে পারেননি চিকিৎসকরা। হাসপাতালে গিয়ে ফারুককে শনাক্ত করেন তার বন্ধু ও পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম রাজু। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ফারুক ডেমরা এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। ফেসবুক প্রোফাইলে ছোট্ট কন্যাকে কোলে নিয়ে হাসিমুখে যে ছবিটি দিয়েছিলেন সেটাই এখন ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

Tuesday, February 19, 2019

আমাদের পেছনে কেউ নেই অনেকের সমর্থন আছে -সাক্ষাৎকারে মজিবুর রহমান মঞ্জু by কাফি কামাল

রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেই দলের সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে নতুন এক সংকটের মধ্যে পড়েছে জামায়াতের রাজনীতি। সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে সামনে রেখে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন লন্ডনে অবস্থানরত সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। সংস্কার প্রস্তাব দিয়ে তার পক্ষে জনসমর্থন সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়ায় দল থেকে বহিষ্কার হয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু।
জামায়াতের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রচর্চার দাবিসহ নানা ইস্যুতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্বস্তির মধ্যে ছিলেন জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব। সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যদিয়ে নতুন করে সংকটের মধ্যে পড়ছে দলটি। অবশ্যই রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে দেখা যাচ্ছে- মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন, নতুন কৌশলে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে জামায়াত; আবার কেউ বলছে, জামায়াতে ভাঙন ধরাতে আমাদের কৌশল বাস্তবায়নের উদ্যোগ এটি। জামায়াতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের দায়, অদূরদর্শিতা, নতুন উদ্যোগ, উদ্যোগের নেপথ্যে, ইসলামী রাজনীতির উপযোগিতাসহ নানা বিষয়ে মানবজমিনের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলেছেন জামায়াতের সদ্য বহিষ্কৃত নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জু।
প্রশ্ন: জামায়াতের সংস্কারের যে আওয়াজ তুলেছেন, সেটার পেছনে কারা আছে?
মঞ্জু: আমার পেছনে দেয়াল দেখা যাচ্ছে। আমার সামনে যারা আছে তাদের নিয়ে আমি এগিয়ে যেতে চাই। আমি বলেছি, ক্লেইম করছি- এ ধরনের চিন্তাটা আমাদের সবার মাঝেই আছে। আমি একটু ঝুঁকি নিয়ে কথাগুলো বলেছি। দায় নিয়েই বলেছি। বাংলাদেশের এ ধরনের পরিস্থিতিতে তরুণদের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলেছি। যারা বাংলাদেশ নিয়ে ভাবেন। তারাই আমাদের পথ নির্দেশক। আমার কথাগুলো যৌক্তিক হলে অবশ্যই তাদের সাড়া পাব, এটাই বিশ্বাস।
প্রশ্ন: সংস্কার প্রস্তাবটি রাজনীতির এই মুহূর্তে এসে কেন? এ উদ্যোগ কি জামায়াতকে আরো খাদের কিনারে ঠেলে দেবে?
মঞ্জু: এই কথাগুলো এই মুহূর্তে বলিনি। এগুলো আমাদের দলের মধ্যে বিভিন্ন পর্ষদে আমরা বলেছি। এ আলোচনাগুলো বিভিন্ন সময়ে হয়েছে। এ বিষয়ে কবে থেকে কথা বলছেন সেটা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক ডকুমেন্টারি আকারে লিখেছেন। ফলে এখন এসব বিষয়ে বলছি বা আলোচনায় এসেছে বিষয়টি কিন্তু তা নয়। বিভিন্ন সময়ে ব্যাপারগুলো আলোচনায় এসেছে। এটা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায়। তিনি বলেন, দলে এসব আলোচনা হয়েছে। দল বলেছে, আমরা একটি প্রোগ্রেসিভ চিন্তা করছি। দল বলছে, আমি যে ওয়েতে কথাগুলো বলেছি, এটা গঠনতান্ত্রিকভাবে শুদ্ধ নয়। আমি আমার পরিতৃপ্তি হচ্ছে, আমি আমার কথাগুলো বলতে পেরেছি। আমার মনে হয় প্রসেসকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে আমার কথাগুলোর যৌক্তিকতার গুরুত্ব দেয়া উচিত। আমার কথাগুলো দাবি গুলো যদি যুক্তিপূর্ণ হয় তবে দল গ্রহণ করবে। বহিষ্কার নিয়ে দ্বিমত নেই। তবু অনেক দিনের সম্পর্ক তাই খারাপ তো লাগেই।
প্রশ্ন: অতীতে জামায়াত-শিবিরের সংস্কারের উদ্যোগ যারা নিয়েছেন তারা এবং তাদের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে, আপনারা কতটুকু আশাবাদী?
মঞ্জু: সাফল্য-ব্যর্থতা আপেক্ষিক ব্যাপার। আমি মনে করি কোনো উদ্যোগই ব্যর্থ হয় না। সংস্কার প্রক্রিয়াটা জটিল এবং কঠিন। পৃথিবীতে যারাই সংস্কারের কথা বলেছেন, তারাই কিন্তু নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়েছেন। তাদের কথাগুলো একটা পর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়েছে। অতীতের ব্যর্থতার ব্যাপারে দ্বিমত করে বলবো, কাউকে ব্যর্থ বলতে চাই না। কে সফল কে ব্যর্থ সেটা বলা কঠিন। আমি মনে করি এ সমস্ত প্রয়াসের ফল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ভোগ করবে এবং এগিয়ে যাবে। 
প্রশ্ন: সংস্কারের এই উদ্যোগ নিয়ে দুই ধরনের গুঞ্জন এখন রাজনৈতিক মহলে। কেউ বলছে, জামায়াতের ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল এটা আবার কেউ বলছে, জামায়াতে ভাঙন ধরানোর জন্য সরকারের কৌশল- আসলে কি?
মঞ্জু:  এগুলো সবই ধারণাপ্রসূত এবং অপপ্রচার। এ ধরনের অভিযোগ, ব্লেইম গেম বাংলাদেশের রাজনীতিতে আছে- এগুলো নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমরা যে চেষ্টা করছি সেটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য অনেকে অনেক কথা বলবে। সেটা সময়ই বলে দেবে কোনটি সত্য। আমি দৃঢ়ভাবে বলছি, আমরা সিনসিয়ারলি চাইছি এবং আমরা সে চেষ্টাটা করে যাবো। এটা আমাদের কমিটমেন্ট।
প্রশ্ন: ইতিমধ্যে কেমন সাড়া পেয়েছেন বা পাচ্ছেন?
মঞ্জু: এটা মিশ্র। অনেকেই সাড়া দিচ্ছেন, ফোন করছেন, সাধুবাদ জানাচ্ছেন। মেইন স্ট্রিমের অনেকেই আমাকে ফোন করেছেন। তারা বলছেন, তোমরা যেটা বলছো সেটা যদি সিনসিয়ারলি বলে থাকো তাহলে আমাদের জন্য দোয়া করছেন। আসলে ভালোবাসা যেমন পেয়েছি, তেমনি প্রতিকূলতাও পেয়েছি। কটু বাক্যবানেও জর্জরিত হয়েছি। যারা কটুবাক্য বলছেন, তারা হয়তো তাদের বিশ্বাস থেকে বলছেন। এটা আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আমি সারাজীবন কাজ করেছি, এখনো এটা আমার প্রত্যয়। তিনি বলেন, আমি যে কথাগুলো বলেছি সেগুলো অনেকের মনের কথা। অনেকেই অনেক কারণে হয়তো সেগুলো বলতে পারছে না। আমি হয়তো একটি শক্তি দিয়ে বলেছি। অনেকের সমর্থন আছে। আমি মনে করি এটা নিয়ে ওপেন বিতর্ক হতে পারে। একটা জরিপ তো চলতে পারে। দলে এসব দাবিও করেছি। আমাদের বেশিরভাগ লোকদের মধ্যে এটা আছে আমি মনে করছি। এটার সঙ্গে অনেকের সমর্থন থাকবে, অনেকেরই সায় আছে।
প্রশ্ন: উদ্যোগের নেপথ্যে কারা আছেন সেটার জবাবে বারবার বলছেন- ‘আমরা’, এই আমরা কারা?
মঞ্জু: আমরা হচ্ছে, আমাদের কমন এপ্রোচ। আমি যখন একটি কথা বলি তখন তো অনেকেই আমাকে সমর্থন করেন। তারা তো আমার সহযাত্রী। যখন আমি বলি তখন এটা শক্তিশালী হয়।
প্রশ্ন: বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ইসলামী মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কি?
মঞ্জু: জাতীয়তাবাদী না বলে আমি বলবো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে বিশ্বাস সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা। মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনার সঙ্গে ধর্মীয় অনুপ্রেরণার সমন্বয়ে কল্যাণের চিন্তা নিয়ে যে রাজনীতি হবে সেটাই হবে বাংলাদেশে শক্তিশালী রাজনীতি। আপনি যে ধারার কথা বলেছেন, এটা তার চেয়েও শক্তিশালী হবে। আমরা যেটা বলছি সেটা এখনও তাত্ত্বিক, যখন আমরা সেটা নিয়ে কাজ করবো, আহ্বান করবো তখন অনেক চিন্তাযুক্ত হবে, অনেক গতিশীলতার সঙ্গে কাজ করতে পারবো।
প্রশ্ন: আপনারা যাদের জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির ব্যাকগ্রাউন্ড আছে তারা নতুন উদ্যোগের নেতৃত্বে থাকলে রাজনীতিতে কতটুকু গ্রহণযোগ্য পাবেন বলে মনে করেন?
মঞ্জু: আমরা সফল হবো কিনা সেটা নির্ভর করবে আমরা কি নিয়ে পথ চলছি তার ওপর। আমাদের মধ্যে যদি সিনসিয়ারিটি থাকে, আমাদের কথাগুলো যদি প্রোপারলি বলতে পারি, কথাগুলো যদি যুক্তিপূর্ণ হয় তবে অবশ্যই সফল হব। যদি আমাদের কথাগুলো কৃত্রিমতা নিয়ে, কোন ধরনের ইশারা ইঙ্গিতের মধ্যদিয়ে চলতে চাই তাহলে তো সফল হবো না। আমি তো একটি আন্তরিক পরিবেশের মধ্যে ছিলাম। আমাদের এই বিদ্রোহ করতে, এই সত্য কথা বলতে যারা শিখিয়েছেন, তাদের কথাই তো আমরা বলছি। আমরা প্রলুব্ধ হলে, হতাশ হলে বা প্রতিবন্ধকতায় টলে গেলে তাহলে নিশ্চিত পরাজয় ঘটবে। আশা করছি, সবার সহযোগিতা আমরা পাবো।
প্রশ্ন: এ উদ্যোগের মাধ্যমে কি প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পেয়েছেন বা পাচ্ছেন?
মঞ্জু: আমি সবসময় প্রকাশ্যে ছিলাম। আর আমি তো এমন বড় কিছু করেছি বা করছি তা নয়। আমি কিছু ভয়েস রেস করেছি, কিছু লেখালেখি করেছি, দলের কাছে লিখিতভাবে কিছু দাবি দিয়েছি এই তো। এখন এটাকে তো কোন অপরচুনিটি বলা ঠিক হবে না। 
প্রশ্ন: সংস্কারের এই উদ্যোগ নিয়ে নতুন পথচলায় কতদূর যেতে চান?
মঞ্জু: দেশের একটি ক্রান্তিলগ্নে জাতির মুক্তির যে আন্দোলন, একটি সুশাসনের যে আন্দোলন, ছাত্র ও শ্রমিক অধিকারের যে আন্দোলন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন- সবমিলিয়ে এগুলোই আমাদের জাতীয় মুক্তির আন্দোলন হওয়া উচিত। এখন আমাদের যে অপ্রাপ্তিগুলো- জাতীয় ঐক্য, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার যে কাজগুলো আমরা করতে পারিনি সেটা করতে আমরা কমিটেড। আমরা এটার জন্য কাজ করবো। দেশের প্রয়োজনে কাজ করবো।
প্রশ্ন: যে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির শীর্ষ নেতা ছিলেন সে সংগঠনের ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির বিকাশ অব্যাহত আছে নাকি, স্থবিরতা তৈরি হয়েছে? 
মঞ্জু: ক্যাডার শব্দটি শুনতে আমরা একটু অন্যভাবে মনে করি। আসলে এটা স্তরবিন্যাস। আমি মনে করি, ছাত্রছাত্রীদের মেধা ও নেতৃত্ব বিকাশে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক পন্থা। এটাতে আমরা যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছি। ছাত্রদের মান উন্নয়নের জন্য, একটি স্তরে পৌঁছে দেয়ার জন্য এক ধরনের ইম্প্রেশন বা আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে কাজ করে। এই রাজনীতিতে ছাত্রদের গঠনমূলকভাবে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা আমি ইতিবাচকভাবে দেখি। ছাত্রদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কমাতে হবে। রাজনীতি বোধটা থাকতে হবে। আমাদের দেশে ছাত্রদের যেভাবে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় সেটা বন্ধ করতে হবে। আমরা যে নতুন রাজনীতির কথা বলছি, সেখানে এটা আমাদের প্রত্যয়। ছাত্ররা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলবে, ছাত্ররা কাউকে এমপি বানানো, মন্ত্রী বানানো বা কোনো সরকারকে উঠানো বা নামানোর জন্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে না।
প্রশ্ন: নেতৃত্ব নির্বাচন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে জামায়াতের অভ্যন্তরে কতটুকু গণতন্ত্র চর্চা হয়?
মঞ্জু: অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তুলনা করলে বলব জামায়াতের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চাটা বেটার। কিন্তু আরো যুগোপযোগী করার প্রয়োজন আছে। জামায়াতের চেয়ে ছাত্ররাজনীতিতে আমার ভূমিকা বেশি ছিল এবং সেখানে গণতান্ত্রিক চর্চা করেছি। জামায়াতের এখনকার যে পরিবেশ যেটা, যেসব ত্রুটি আছে সেগুলোকে যদি দূর করা যায় তাহলে গণতন্ত্র চর্চা আরো শানিত হবে।
প্রশ্ন: দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের কতটুকু দায় আছে বলে মনে করেন?
মঞ্জু: নেতৃত্বের দায় তো থাকেই। নেতৃত্বই তো দলকে পরিচালিত করেন। তবে জামায়াতকে একটি কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাদের শীর্ষ সারির নেতাদের বিচারে আইনের প্রক্রিয়ায় বিষয়গুলোর ফায়সালা করা হয়নি। প্রবল প্রতিরোধ তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের ওপর যে বিরাট ডিফ্রেশন সেটাকে মোকাবিলা করা কঠিন। তাই নেতৃত্বের সফলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। যারা এ আদর্শের আন্দোলনটা করে এসেছেন তাদের অনেক অ্যাসিভমেন্ট আপনারা পাবেন। কিন্তু কতটুকু তারা করতে পারতো সেটা যদি আপনি দেখেন তবে তাদের ঘাটতিগুলো ধরা পড়বে। নেতৃত্বের দায়তো আছেই।
প্রশ্ন: রাজনীতিতে জামায়াতের কোন সিদ্ধান্তগুলো ভুল ছিল বলে মনে করেন?
মঞ্জু: জামায়াত যে আদর্শ ভিত্তিক আন্দোলন সংগ্রাম করেছে বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে, দার্শনিক তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে এটা সময়ে সময়ে যুগোপযোগী করা দরকার ছিল। এই জায়গায় আমরা বলতে চেয়েছি যে, সঠিকভাবে যুগোপযোগী করা হয়নি। বলেছি, সময়ের দাবির সঙ্গে সঙ্গে সংস্কার করতে হবে। বর্তমান দাবি এবং পরিস্থিতির সঙ্গে আপডেটেশন করতে হবে। তিনি বলেন, রাজনীতি একটি কঠিন কার্যক্রম। রাজনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুলত্রুটি থাকবেই। মৌলিক জায়গায় যে ভুল বা সীমাবদ্ধতাটা আমরা দেখতে পাচ্ছি সেটা হচ্ছে- স্বাধীনতা যুদ্ধের জায়গায় পরিস্কার একটি অবস্থান জামায়াতকে ঠিক করতে হবে।
প্রশ্ন: শিবিরের রাজনীতির আগে কি অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
মঞ্জু: আমি শৈশবে সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ছোটবেলায় ছাত্র ইউনিয়নের প্রতি একটি প্যাসিনেশন ছিল। তাদের ভালো ভালো দেয়াল লিখন থাকতো। কিন্তু অন্য কোনো সংগঠন করতাম না। আমি শিবিরে যুক্ত হয়েছি ১৯৮৮ সালে। আমার আব্বা ও বোনের জামাইরা সবাই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে আমাদের পারিবারিকভাবে একটি শ্রদ্ধাবোধ আছে। যখন শিবির করি তখন বড় বোনের বাসায় ছিলাম। তার স্বামী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তারা এটা ভালোভাবে নেয়নি। বিভিন্ন জায়গায় আমাকে পালিয়ে থাকতে হয়েছে।
দুলাভাই পুলিশ দিয়ে খুঁজেছেন। তখন সংগঠনের নেতারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমার জীবনে শিবিরের অবদান অনেক বেশি। ছাত্রশিবিরের কাছ থেকে আমি একটি বিপ্লবী অনুপ্রেরণা পেয়েছি। এটা আমি আমার জীবন থেকে আলাদা করতে পারি না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার আমার উপর হামলা হয়েছিল। মাথায় ইটের আঘাত পেয়ে আমি সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। হামলাকারীরা মৃতভেবে চলে যাওয়ার পর আমার সহপাঠী ও শিক্ষকরা এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। ঢাকায় ২৮শে অক্টোবর একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আমরা তো জীবন দেয়ার প্রেরণা নিয়েই ছাত্ররাজনীতি করেছি।

Saturday, February 9, 2019

কারাগারে খালেদার একবছর by কাফি কামাল

কারাবন্দিত্বের একবছর পূর্ণ হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। ২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ৫ বছরের সাজার রায় দেন বিশেষ আদালত। রায়ের পরপরই কড়া প্রহরায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। আগেই পরিত্যক্ত ঘোষিত ওই কারাগারের ডে কেয়ার সেন্টারে শুরু হয় খালেদা জিয়ার কারাবাস। সেই থেকে পরিত্যক্ত ওই কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে দিন কাটছে তার।
২০১৯ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি একবছর পূর্ণ হয়েছে তার কারাভোগের। কারাগারে খালেদা জিয়াকে প্রথম ডিভিশন দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীকে রাখা হয়েছে সাধারণ কয়েদিদের মতো।’ বয়স বিবেচনা করে একজন সহায়তাকারী হিসেবে গৃহকর্মী ফাতেমাকে তার সঙ্গে থাকার সুযোগ দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
তবে বিভিন্ন সময় দলটির নেতা ও আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন ‘নির্জন কারাবাস বলতে যা বোঝায়, কারাবাসে খালেদা জিয়ার দিন কাটছে তেমন। খাবার থেকে আবাস কোনো ক্ষেত্রেই বিশেষ সুবিধা পাননি তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ৭৪ বছর বয়স্ক খালেদা জিয়া।’
ওয়ান ইলেভেন সরকারের আমলে দায়েরকৃত এ মামলায় সাড়ে ৯ বছর আইনি লড়াই করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। ২০১৪ সালে এ মামলায় অভিযোগ গঠনের পর মামলাটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা আখ্যায়িত করে বিএনপি। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক উত্তাপ গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্ত। বিচারিক কার্যক্রমের শেষের দিকে মামলার কার্যক্রম চলে দ্রুত। এ সময় খালেদা জিয়াকে বকশিবাজারের কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী আদালতে হাজির হতে হয়েছে সপ্তাহে দুই থেকে তিনদিন।
নিম্নআদালতের রায়ের পর সে রায় বাতিল ও জামিনের জন্য উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। কিন্তু নিম্নআদালত থেকে রায়ের কপি উচ্চ আদালতে পৌঁছাতেই সময় লাগে বেশ কয়েকদিন। ১২ই মার্চ হাইকোর্ট চার মাসের জামিনের আদেশ দিলেও তার বিরুদ্ধে আপিল করে দুদক। চেম্বার জজ মামলাটি পাঠিয়ে দেন আপিল বিভাগে। আপিল বিভাগ তার জামিন বহাল রাখেন। কিন্তু ততদিনে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় কুমিল্লায় দায়েরকৃত একটি নাশকতার মামলায়। যে মামলায় খালেদা জিয়াকে করা হয়েছিল হকুমের আসামি। জিয়া অরফানেজ মামলায় ৫ দফা জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কারণে আটকে যায় তার মুক্তির পথ। ৩০শে অক্টোবর উচ্চ আদালতে মামলাটির চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হয়।
সেখানে নিম্নআদালতের দেয়া ৫ বছর সাজার রায় বাড়িয়ে ১০ বছর করেন হাইকোর্ট। তার আগের দিন ২৯শে অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেন বিশেষ আদালতের বিচারক। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে কারাকর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়াকে বকশীবাজার প্যারেড গ্রাউন্ডের আদালতে না আনায় চ্যারিটেবল মামলার চূড়ান্ত বিচার কার্যক্রমে পরিচালিত হয় কারাগারের অভ্যন্তরে স্থাপিত বিশেষ আদালতে। পরিবেশ ও নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে বারবার কারাঅভ্যন্তরে স্থাপিত আদালতের হাজির হওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ পোষণ করেন। খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্বের একবছর পূর্ণ হওয়ার দিন গতকাল গ্যাটকো মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, কেবল ন্যায়বিচার হলেই হবে না- জনগণের কাছে প্রতীয়মান এবং জনমনে আস্থা জন্মাতে হবে যে ন্যায়বিচার হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দুটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তিরিশের অধিক মামলা চলমান রয়েছে। প্রথম দুটি মামলায় সঠিক বিচার হলেও আমার ধারণা জনগণের একটি বিরাট অংশ এ মামলাগুলোতে ন্যায়বিচার হচ্ছে বলে মনে করছে না। বলাবাহুল্য, সরকার এবং সরকারি দলের সমর্থকদের কাছে ন্যায়বিচার হয়েছে বলে আস্থা জন্মেছে। এই যে দ্বিধাবিভক্তি এটা দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতার পক্ষে বিরাট অন্তরায়। যতদিন জনগণের একটি বিরাট অংশ মনে করবে যে, বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে, ততদিন তার জনপ্রিয়তা বহাল থাকবে।
ওদিকে কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ দিতে অব্যাহত দাবি জানান খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও তার নেতৃত্বাধীন দল বিএনপির নেতারা।
কিন্তু কারাকর্তৃপক্ষ সে দাবি নাকচ করছে বারবার। পরে কারাকর্তৃপক্ষ সরকারি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে। সে বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী ২০১৮ সালের ৮ই এপ্রিল তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য নেয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। দুই মাস কারাভোগের পর প্রথমবারের মতো তাকে দেখা যায় জনসম্মুখে। তার জন্য হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করা হলেও তিনি গাড়ি থেকে নেমে হেঁটেই কেবিন ব্লকে যান। কয়েকটি এক্সরে করিয়ে সেদিনই তাকে ফেরত নেয়া হয় কারাগারে। এদিকে ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সরকারি চিকিৎসকদের পরামর্শ মতো ওষুধ সেবনে অনীহা প্রকাশ করেন খালেদা জিয়া। কারাগারে ধীরে ধীরে অবনতি ঘটে তার স্বাস্থ্যের। এক পর্যায়ে তার আইনজীবী ও দলের নেতাকর্মীরা বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করে তার চিকিৎসার দাবি তোলেন। এমনকি তার চিকিৎসার খরচ বহনের ঘোষণাও দেন।
কিন্তু সে দাবি বারবার অগ্রাহ্য করে কারাকর্তৃপক্ষ। বিএনপির তরফে অভিযোগ করা হয়, ওয়ান ইলেভেনের সময় কারাবন্দি হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পছন্দমতো হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু এখন খালেদা জিয়াকে সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ নিয়ে দীর্ঘ বাহাসের পর উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। বিএনপি নেতারা দাবি করেন ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ হয়েছে খালেদা জিয়ার। এ সময় রিউম্যাটিকআর্থ্রাইটিসের কারণে হাত-পা ফুলে যায়, ফ্রোজেন শোল্ডার, পিঠে ব্যথা, চোখের সমস্যাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। হাঁটতে অক্ষম হয়ে পড়ায় একবার তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া পরিবারের স্বজনদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করতে পারেননি। তার শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার দাবি থেকে সরে আসে বিএনপি।
অন্যদিকে হাইকোর্টের নির্দেশে ৬ই অক্টোবর তাকে স্থানান্তর করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। তবে এবার গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে করেই তাকে নেয়া হয় ছয়তলার কেবিন ব্লকে। সেখানে ভর্তি করে তাকে কেবিন ব্লকের একটি ভিআইপি কেবিনে রাখা হয়। কেবিন ব্লকের ৬১২ নম্বর কেবিনে তার চিকিৎসা চলে পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীনে। বিএনপির তরফে অভিযোগ করা হয়, মেডিকেল বোর্ড পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা মানা হয়নি। পরবর্তী দুই মাস সেই কেবিনেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। হাসপাতালের কেবিন ব্লকে ভিআইপি কেবিনগুলো দুই রুমের। কিন্তু একরুমে পাহারাদার কারারক্ষীরা অবস্থান করায় সেখানেও ছোট একটি রুমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে খালেদা জিয়ার চলাচল। তবে কারাগারের চেয়ে কিছুটা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পান হাসপাতালে।
জেলখানার চেয়ে হাসপাতালের কেবিনে চিকিৎসাধীন এক মাস দুই দিন তিনি কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটান। ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের সময় এক বছরের বেশি সময় তিনি কারাভোগ করলেও সেবার শীর্ষ দুই নেত্রীকে রাখা হয়েছিল সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের দুটি ভবনে। এদিকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ৮ই নভেম্বর হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়াকে ফিরিয়ে নেয়া হয় কারাগারে। বর্তমানে তিনি পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডে কেয়ার সেন্টারে বন্দি রয়েছেন। কারাগারে নেয়ার পর থেকে তার পরিবারের সদস্যরা সপ্তাহে একবার দেখা করার সুযোগ পান। কারাগারে নেয়ার প্রথমদিকে ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে দুইবার বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরামের কয়েকজন তার সঙ্গে দেখার করার সুযোগ পান। তবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একা কয়েকবার দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন।
এদিকে কারাগারে যাওয়ার আগে নেতাকর্মীদের রাজপথ উত্তপ্তকারী কোনো আন্দোলন কর্মসূচি না দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। ফলে বিগত এক বছরে কয়েকটি মানববন্ধন, অনশন, স্মারকলিপি পেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে বিএনপি। অন্যদিকে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। কিন্তু সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দলীয় সরকারের অধীনে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিজের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানান দলটির নীতিনির্ধারকদের।
এমন কি কারাবন্দি অবস্থায় নির্বাচনে লড়ার জন্য তিনটি আসনে তিনি দলের প্রার্থীও হন। কিন্তু তার প্রার্থিতা বাতিলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তটি উচ্চ আদালত বহাল রাখলে নির্বাচনে লড়তে পারেননি তিনি। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ কখনো দীর্ঘসূত্রিতা, কখনো অতিদ্রুততা, কখনো নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো আবার কখনো অন্য মামলায় জামিন বাতিলের কারণে তার জামিনে মুক্তির আইনি পথের প্রতিবন্ধকতা এখনো কাটেনি। কুমিল্লার একটি মামলায় অভিযুক্তদের সবাই জামিনে থাকলেও জামিন মেলেনি খালেদা জিয়ার। একাদশ জাতীয় নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার কারামুক্তি।

Monday, February 4, 2019

কারা অভ্যন্তরে দিন কাটে যেভাবে by কাফি কামাল

বন্দি আধিক্যের কারণে অমানবিক এক পরিবেশ বিরাজ করছে দেশের প্রতিটি কারাগারে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে লকআপ অবস্থায় দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে বন্দিদের। সকালের নাস্তার পর কিছুক্ষণের জন্য কারাঅভ্যন্তরের আঙ্গিনায় যাওয়া যায় পর্যায়ক্রমে। ঘণ্টা দুই মুক্ত হাঁটাচলার সুযোগ মেলে পড়ন্ত বিকালে। রাতের খাবার সংগ্রহ করে সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হয় ওয়ার্ডের লকআপে।
৫টার পর সব ওয়ার্ড বন্ধ করে দেয়া হয়। দিনে তিনবার বসতে হয় গুনতি ফাইলে। সন্ধ্যাকালীন ফাইল গুনতির পর দ্রুত খাবার-দাবার সেরে রাত সাড়ে আটটার মধ্যেই বাধ্যতামূলক শুয়ে পড়তে হয় বিছানায়। অন্যথায় হজম করতে হয় কটুকথা বা মারপিট।
এককাত হয়ে ঘুমোতে হয় ইলিশ ফাইলে। বন্দিদের ঝগড়া-বিবাদ, বাল্বের তীব্র আলো আর মশার উৎপাতে ঘুম ভেঙে যায় বারবার। বাথরুমে যাতায়াতের পথে একের পা পড়ে অন্যের শরীরে। কারাগারের দিনগুলো হয় নিয়ন্ত্রিত, রাতগুলো দীর্ঘ। নিম্নমানের খাবার, অপরিচ্ছন্ন বাথরুম, চিকিৎসা ও বিনোদনের অভাব, নতুনদের ওপর পুরনোদের এবং হাজতি-কয়েদিদের সঙ্গে কারারক্ষীদের দুর্ব্যবহার মিলিয়ে অমানবিক এক জগৎ প্রতিটি কারাগার। রাজনৈতিক ও অন্যান্য মামলায় নানা মেয়াদে কারাভোগের পর সম্প্রতি জামিনে মুক্ত বেশ কয়েকজন পুরুষ ও নারী কারাগার সম্পর্কে এমন তথ্য জানিয়েছেন।
ব্যবসা সংক্রান্ত মামলায় কিছুদিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পাওয়া এক ব্যবসায়ী জানান, কারাগারের আমদানি ওয়ার্ডেই প্রথম রাত কাটে বন্দিদের। ফলে সব সময় এই ওয়ার্ডে বিরাজ করে অন্যরকম এক অমানবিক পরিবেশ। আমদানি ওয়ার্ডের নেয়ার পর রাতেই সওদা বসে সেখানে। যারা আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান তাদের ভালো থাকা ও ভালো খাওয়ার টোপ দিয়ে মক্কেল ওয়ার্ডে (কারাবন্দিদের ভাষায়) নেয়া হয়। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালীরা যান মেডিকেল বা নির্দিষ্ট সেলে। মক্কেল ওয়ার্ডে সিটের জন্য (সোজা হয়ে শোয়ার জায়গা) প্রথম সপ্তাহে পাঁচ হাজার ও পরে প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকা করে পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে মেডিকেল প্রথম সপ্তাহে ১৫ হাজার ও পরে আলোচনা সাপেক্ষে অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
আর যারা সাধারণভাবে কারাকর্তৃপক্ষের মর্জি অনুযায়ী যেকোনো ওয়ার্ডে যায় তাদেরও প্রথমবার সিটের জন্য এক হাজার ও ওয়ার্ড পাস হিসেবে ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হয়। ওই ব্যবসায়ী জানান, কারাকর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সাজাপ্রাপ্ত ও প্রভাবশালী পুরোনো কয়েদি বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালীরা ওয়ার্ডগুলোর আনুষ্ঠানিক ইজারা নেন। তারপর নির্দিষ্ট সময় ধরে তারা সাধারণ হাজতিদের কাছে এ অর্থ আদায় করেন। যারা নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে পারেন না তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়। বাথরুমের আশেপাশে শুতে বাধ্য করার পাশাপাশি তাদের দিয়ে করানো হয় বাথরুম পরিষ্কারসহ নানা ধরনের কায়িক কাজকর্ম।
দেশের নানা কারাগার থেকে মুক্ত কয়েকজন জানান, কারাগারে নারী ও পুরুষ বন্দিদের আলাদা কমপ্লেক্সে রাখা হলেও তাদের ব্যবস্থাপনা ও নিয়মকানুন একইরকম। কারাবন্দিদের প্রতিটি দিন শুরু হয় ভোরবেলা ঘুম ভাঙা চোখে গণনার জন্য ফাইলে বসার মাধ্যমে। কয়েকজন নারী জানান, কারাগারের আমদানি ওয়ার্ডেই কাটে যেকোনো বন্দির প্রথম রাত। সকালে গুনতি শেষে তাদের মামলার তথ্য, রক্ত পরীক্ষা, পিরিয়ডের তারিখসহ নানা শারীরিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তারপর নতুন বন্দিদের নানা ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে যারা সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী প্রথমদিনই তাদের পাঠিয়ে দেয়া হয় পছন্দমতো ওয়ার্ডে বা সেলে। কারাবন্দিদের প্রতিটি দিন শুরু হয় ভোরবেলা ঘুম ভাঙা চোখে গণনার জন্য ফাইলে বসার মাধ্যমে। সবক’টি ওয়ার্ডে গণনা সম্পন্ন হওয়ার পর এক ওয়ার্ড থেকে একবারে ৭-৮ জনের মতো করে পর্যায়ক্রমে আঙ্গিনায় যেতে পারে।
তখন কেউ কেউ মনিং ওয়ার্ক করেন। এরই মধ্যে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আসে সকালের নাস্তা লাল আটার রুটি ও গুড় বা সপ্তাহে একদিন খিচুড়ি। তারপর প্রতিদিনের কর্ম, কারা আঙ্গিনাজুড়ে বন্দিদের হাঁটাচলা, গালগল্প বা সশ্রম দণ্ডপ্রাপ্তদের কাজকর্ম চলে। বেশ আগেভাগেই সংগ্রহ করতে হয় দুপুরের খাবার। বেলা ১২টায় দিনের দ্বিতীয় দফা গুনতি চলে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে। এভাবে প্রতিদিন ভোরে, দুপুর ১২টায় এবং সন্ধ্যার পর তিন দফা ফাইলে গুনতি হয় কারাবন্দিদের। সপ্তাহে একবার হয় সুপার ফাইল। শীতকালে লকআপ হয় বিকাল সাড়ে চারটায়। সন্ধ্যা ফাইলের পর আটকে দেয়া হয় ওয়ার্ডের দরোজা। রাত সাড়ে আটটার মধ্যে শুয়ে পড়তে হয়। প্রতিটি ওয়ার্ডেই বন্দিদের ঘুমাতে হয় তিনটি সারি করে। দুই দেয়ালের দিকে মাথা রেখে দুই সারি এবং মধ্যখানে আরেক সারি। ওয়ার্ডে প্রতিজন বন্দি পান দুইটি কম্বল। সাম্প্রতিক সময়ে কারাবন্দিদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ হচ্ছে একটি করে বালিশ। বন্দিদের গোসলের জন্য রয়েছে দুইটি পানির হাউস। একটি কয়েদিদের, অন্যটি হাজতিদের। পানির অপর্যাপ্ততা নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে থাকেন কারাবন্দিরা। দিনে তিন বেলা পানি মেলে। একই পানিতে খাবার, গোসলসহ সবকিছুই সারতে হয়। পানির অপর্যাপ্ততা নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে থাকেন কারাবন্দিরা।
রাজনৈতিক মামলায় ৬ মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর কয়েকদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এক নেতা। তিনি জানান, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের এক একটি ওয়ার্ডে সাধারণত ২০-২৫ জন বন্দি রাখার কথা। বর্তমানে একেকটি ওয়ার্ডে ৬০-৭০ জন বন্দি কারাভোগ করছেন। বিশেষ করে ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে এক অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কারগারে। প্রতিটি ওয়ার্ডে বন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১০০’র বেশি। প্রতিটি ওয়ার্ডের বারান্দাগুলোতে পা ফেলার জায়গা ছিল না। নির্বাচনের ৪-৫ দিন আগে থেকে বন্দি আধিক্যের কারণে রাতে কারা আঙ্গিনায় তাঁবু টাঙানো হয়েছিল। রাতে তাঁবু টাঙানো হতো, দিনে সেসব সরিয়ে নেয়া হতো। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেখানে সাধারণ ৬ হাজার বন্দি রাখার কথা। কিন্তু নির্বাচনের আগে গণগ্রেপ্তারের কারণে সেখানে প্রায় ১৫ হাজার বন্দি রাখা হয়েছিল।
কাশিমপুর-২ এ নারী বন্দিদের জন্য রয়েছে একটি আলাদা কমপ্লেক্স। সেখানে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন প্রায় সাড়ে নয়শ’ নারী। যার মধ্যে মায়ের সঙ্গে ৩৫ জন শিশুবন্দি হিসেবে রয়েছে। যদিও শিশু সন্তানসহ মায়েদের রাখা হয় আলাদা একটি ওয়ার্ডে। প্রতিটি ওয়ার্ডেই বন্দিদের ঘুমোতে হয় তিনটি সারি করে। দুই দেয়ালের দিকে মাথা রেখে দুই সারি এবং মধ্যখানে আরেক সারি। ওয়ার্ডে প্রতিজন বন্দি পান দুইটি কম্বল। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বা কারাঅভ্যন্তরে শাস্তিপ্রাপ্ত সেলের বাসিন্দাদের জীবন আরো কঠিন। দিনে মাত্র এক ঘণ্টা সেলের বাইরে বের হওয়ার সুযোগ মেলে তাদের। মুক্তি পাওয়া নারীরা জানান, তিনটি জিনিসের ব্যাপক চল রয়েছে কারাগারে। সেগুলো হচ্ছে- ‘ডাইল, ফাইল ও গাইল’। প্রতি বেলায় খাবারে মেলে ডাইল (ডাল)। প্রতিদিন তিনবার এবং সপ্তাহে বিশেষ একবারসহ চারবার বন্দিদের নিজেদের সাজাতে হয় ফাইলে। আর গাইল (গাল) প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তের বিষয়। কে কেমন জোরালোভাবে গাল দিতে পারে তার ওপর নির্ভর করে ওয়ার্ডে তার প্রভাব। প্রাত্যহিক কাজগুলো সশ্রম দণ্ডপ্রাপ্তদের করার কথা থাকলেও হাজতিদের দিয়েই সেগুলো করানো হয়। বিশেষ করে বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ইচ্ছা করেই এমন দুর্ব্যবহার করা হয় যাতে তাদের আত্মসম্মানবোধে লাগে এবং আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। দুইজন নারী জানিয়েছেন, কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই তারা মানসিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন। 
বন্দিজীবন কাটানো কয়েকজন পুরুষ জানান, সব কারাগারেই চিকিৎসা সমস্যা নিয়ে দিন কাটে বন্দিদের। প্রতিটি কারাগারে মেডিকেল ওয়ার্ড থাকলেও সেগুলো দখলে থাকে প্রভাবশালী বন্দিদের। কিছু কিছু অসুস্থ এবং কারাবন্দি পাগলদের বসবাসও হয় সেখানে। কারাগারে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সহজে চিকিৎসকের দেখা মেলে না।
প্রাথমিকভাবে মেডিকেল ওয়ার্ডে চিকিৎসার কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে তেমন কয়েদিরাই হন প্রাথমিক ভরসা। পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে দেখা মেলে চিকিৎসকদের। রাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যথাসময়ে চিকিৎসক ও চিকিৎসা না মেলায় হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ কারাবন্দিদের জীবন সংকটাপন্ন হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে কারাঅভ্যন্তরে মৃত্যুবরণের পর আনুষ্ঠানিকতা সারতে হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রতিবেদনে লেখা হয় হাসপাতালে নেয়ার পথে মৃত্যু। অন্যদিকে একজন নারী জানান, দীর্ঘদিন ধরে কোনো চিকিৎসক নেই কাশিমপুর কারাগারের নারী কমপ্লেক্সে। কারাগারের মহিলা চিকিৎসক বদলি হয়েছেন দীর্ঘদিন হলো। কাশিমপুর কারাগারে কোনো নারী বন্দি অসুস্থ হলে চিকিৎসা দেয়ার কেউ নেই। মেডিকেল বন্দি দুয়েকজন নারী কয়েদিই তাদের ভরসা। মাঝে মধ্যে বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয় হাতুড়ে ডাক্তার। বিশেষ করে রাতে কোনো বন্দি অসুস্থ হয়ে পড়লে তার চিকিৎসা প্রায় হয় না বলেই চলে।
রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তেত্রিশ দিন কাশিমপুর কারাগারে কাটিয়ে কয়েকদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন একজন নারী নেত্রী। তিনি জানান, কারাগারের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই বন্দিদের। দিনে তিন বেলা খাবারই মেলে। সকালে রুটি-গুড় কিংবা খিচুড়ি। অন্য দুই বেলায় তরকারি হিসেবে ডাল-সবজি এবং সপ্তাহে দুইদিন তেলাপিয়া বা পাঙ্গাশ মাছ ও মাংস। যদিও ঝোল-ঝালের মধ্যে মাছ-মাংসের টুকরো খুঁজে পাওয়া কঠিন। সীমিত ও বৈচিত্র্যহীন খাবার খেয়েই দিনযাপন করতে হয় বন্দিদের।
এর বাইরে কেউ বাড়তি বা উন্নত খাবার সংগ্রহ করতে চাইলে রয়েছে পিসি (পুলিশ ক্যান্টিন)। বন্দিদের নামে সেখানে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে বাইরে থেকে আত্মীয়-স্বজন টাকার জোগান দিলে বন্দি নিজের চাহিদা অনুযায়ী কারাঅভ্যন্তরে নিষিদ্ধ জিনিসগুলো সবই সংগ্রহ করতে পারে। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান বন্দিরা কারাগারে যাওয়ার পর প্রথমদিনই নিজের নামে খুলে নেন। পিসি থেকে সংগৃহীত প্রতিটি খাবার বা জিনিসের কয়েকগুণ মূল্য পরিশোধ করতে হয়। জামিনে মুক্ত বন্দিরা জানান, কারাগার ভেদে এ মূল্য সামান্য কমবেশি হয়। তবে পিসি থেকে একটি মুরগি রান্না করে নিলে পরিশোধ করতে হয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। এক কেজি গরুর মাংসের জন্য চার থেকে পাঁচ হাজার ও এক কেজি মাছের জন্য দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়।
তিনি জানান, কাশিমপুর কারাগার-২ এর নারী কমপ্লেক্সটি চারদিকে ফুলের বাগানসহ গাছপালায় সাজানো গোছানো খুবই দৃষ্টিনন্দন। প্রতি সপ্তাহে একদিন জেলসুপারের পরিদর্শনের দিনে সকালে পরিচ্ছন্নতা অভিযান হওয়ায় ওয়ার্ডের পরিবেশও পরিচ্ছন্ন। সপ্তাহের যেদিন সুপার ফাইল হয় সেদিন সকাল থেকেই নানামুখী তৎপরতা শুরু হয় কারগারে। ওয়ার্ডের সবকিছু পরিষ্কার, ধোয়া মোছার মাধ্যমে ঝকঝকে ও সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা হয়। চারতলাবিশিষ্ট কলমিলতা নামের মূল ভবনটির দোতলা থেকে চারতলা প্রতিটি ফ্লোরেই দুইটি করে ৬টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই রয়েছে দুইটি করে কক্ষ এবং বারান্দা। কক্ষে একটি করে অ্যাটাচড বাথরুম। প্রতিটি কক্ষে বসবাস করতে হয় ৬০-৭০ জন। কখনো কখনো এ সংখ্যা একশ’ পেরিয়ে যায়। প্রতিটি ওয়ার্ডের সামনে থাকা একচিলতে বারান্দায়ও রাত কাটাতে হয় শত শত বন্দিকে। গরমের দিনে বারান্দায় ঘুমানো সহজ হলেও শীতের দিন সেটা হয় বাড়তি সাজা। যদিও কারাগারে সরবরাহকৃত কম্বল দিয়ে জানালার গ্রিল আটকে দেয়া হয় কিন্তু তাতে আটকে রাখা যায় না শীতল হাওয়া। তারপরও কম্বলে গুটিসুটি মেরে রাত কাটানো ছাড়া কোনো উপায় নেই।
একজন করে মেড ও রাইটার (সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দি) প্রতিটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি বলেন, কমপ্লেক্সের মূল ভবন ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি বাংলো। সবচেয়ে বড় বাংলোটি হচ্ছে ভিআইপি ও ভিভিআইপি বন্দিদের। এর বাইরে অন্য বাংলোগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে পিসি, মেডিকেল, টেইলার্স, পার্লার ইত্যাদি। এ ছাড়াও রয়েছে কারাসেল। সম্প্রতি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কারামুক্ত কয়েকজন জানান, কারাগারে বড় বড় অপরাধীর জন্য রয়েছে সেল। সামর্থ্যবান বন্দিরা একটি প্রাইভেসি নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে থাকার জন্য অর্থের বিনিময়ে সেসব সেলে যান। আবার সাধারণ ওয়ার্ড থেকে নানা অপরাধের জন্য কাউকে কাউকে পাঠানো হয় এসব সেলে। এছাড়া ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরাও থাকেন সেলে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি সেলে কয়েক মাস বন্দি জীবন কাটানো একজন জানান, একটি সেলে এক বা দুইজন থাকার কথা। কিন্তু একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে সেলগুলোতে বন্দি রাখা হয়েছিল ৬-৭ জন করে।
রাজনৈতিক মামলায় কয়েক মাস কারাভোগের পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত একজন জানান, কারাগারে সবচেয়ে বড় একটি সংকট বিনোদনের অভাব। কারাবন্দিরাও যে মানুষ, তাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখার জন্য যে বিনোদনের প্রয়োজন সেটা কর্তৃপক্ষ ভাবেন না। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে টেলিভিশন সেট থাকলেও সেখানে প্রচারিত হয় কেবল বিটিভির অনুষ্ঠান। তাও রাত ৮টা পর্যন্ত। পত্রিকা পাওয়া যায় দুইটি। ফলে বন্দিদের সময় কাটে না। বন্দিদের মধ্যে যারা বিত্তশালী তারা কারাকর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে টিভি সেট নেন। দুয়েকজন ঝুঁকি নিয়ে পেন ড্রাইভের মাধ্যমে নাটক-সিনেমা দেখেন। কিন্তু ধরা পড়লে তাদের আর্থিক জরিমানা (অনানুষ্ঠানিক) ও কারাঅভ্যন্তরে শাস্তি দেয়া হয়। সে শাস্তির মধ্যে রয়েছে অন্য কারাগারে চালান, সেলে স্থানান্তর, হাতকড়া পরানো, মারধরসহ নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মামলায় দুই মাস কারাভোগ করে কিছুদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন একজন ছাত্রনেত্রী। তিনি জানান, কারাবন্দিদের বেশির ভাগই টিনেজ ও কমবয়সী। যাদের বেশির ভাগই কারাভোগ করছেন মাদক মামলায়। অনেকেই কারাভোগ করছেন রাজনৈতিক মামলা, খুন, চেক জালিয়াতি, অবৈধ দেহ ব্যবসার অভিযোগে। স্বামী ও কাজের মেয়ে হত্যার অভিযোগে বন্দি রয়েছেন কয়েকজন অভিজাত ঘরের সুন্দরী নারী। তিনি জানান, কারাগারের বন্দিরা নিরাপদ থাকলেও কাউন্সেলিং না থাকায় অপরাধীদের মনে অনুশোচনা নয়, রাগ-ক্ষোভ-হতাশা বাড়ে। কারাগারে যাওয়ার পর অনেক অপরাধী আছে যাদের অন্যান্য অপরাধীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে এবং তাদের অপরাধের জগৎ সম্প্রসারিত হয়।
বিশেষ করে যারা মাদক ও দেহ ব্যবসার অভিযোগে কারাগারে যান তারা জামিনে বের হয়ে ফের পুরনো পেশায় জড়িয়ে পড়েন। ফের গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ফেরত আসেন। ওই ছাত্রনেত্রী জানান, কারাগারে বিনোদনের তেমন ব্যবস্থা নেই। একটিমাত্র টিভি সেট আর একটি লাইব্রেরি। সাজাপ্রাপ্ত পুরনো বন্দি ছাড়া নতুনদের সেখান থেকে বইপত্র সরবরাহ করা হয় না। হ্যান্ডবল-ভলিবলের মতো খেলাধুলা ও শরীর চর্চার কোনো সুযোগ নেই। কমপ্লেক্সে রয়েছে একটি ডে কেয়ার সেন্টার। তবে তা প্রায়ই বন্ধ থাকে।
কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত একজন জানান, কারাগার এমন একটি জায়গা যেখানে একই সঙ্গে ইবাদত বন্দেগি ও নানারকম অনিয়ম হয়। বন্দিদের একাংশ নিয়মিত নামাজ রোজা করেন। আরেকাংশ সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন তাস পেটানো, গালগল্প আর হৈ চৈ ঝগড়া-বিবাদ করে। একজন নারী জানান, কারাবন্দিদের অনেকে এবাদত বন্দেগি বা ছোটখাটো কুটির শিল্পের কাজ করলেও বেশির ভাগের সময় কাটে গালগল্প আর ঝগড়া-বিবাদে। এছাড়া কারাগারে দীর্ঘ নিঃসঙ্গতার কারণে বন্দিদের অনেকেই সমলিঙ্গের প্রতি অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। কারাগারে মাঝে মধ্যেই দেখা মেলে তেমন জুটির। ধরা পড়লেই বিচারের মাধ্যমে তাদের সেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

Monday, January 28, 2019

ডাকসু নির্বাচন: সিদ্ধান্তহীনতায় ছাত্রদল by কাফি কামাল

দিন-তারিখ ঘোষণার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের তৎপরতা চলছে জোরেশোরে। আগামী ১১ই মার্চ অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনের ভোটার তালিকা প্রণয়ন, প্রধান ও অন্যান্য রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ, নির্বাচনী আচরণবিধির খসড়া প্রণয়নসহ সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আজ বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের সভায় ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনী ও নির্বাচনী আচরণবিধি চূড়ান্ত হবে। দীর্ঘ ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন আয়োজন নিয়ে জমজমাট এখন ক্যাম্পাস। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন ইস্যুতে এখনও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ছাত্রদল।
কয়েকদিন আগে ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভিসির আমন্ত্রণে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান। সেখানে ভিসির সঙ্গে সকল ছাত্রসংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি। পরে তার সঙ্গে কোলাকুলি করেছেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী।
এ দৃশ্য সকল রাজনৈতিক সংগঠনের সহাবস্থানের একটি দৃশ্য হলেও ছাত্রদল নেতারা বলছেন, সেটা ছিল ক্ষণিকের। বাস্তবে ক্যাম্পাসে সকল ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থানের ন্যূনতম পরিবেশ নেই। সে পরিবেশ তৈরিতে কোনো আন্তরিক উদ্যোগও নেই ছাত্রলীগের। এমন পরিস্থিতিতে, ডাকসু নির্বাচন ইস্যুতে এখনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি ছাত্রদল। তবে এ ইস্যুতে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কয়েকদফা বৈঠক করেছেন নেতারা। সংগঠনের একাংশ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে এবং অন্য অংশটি বিপক্ষে তাদের যুক্তিতর্ক তুলে ধরেছেন দলীয় ফোরামে। যারা বিপক্ষে তারা ৩০শে ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের উদাহরণ টেনে আনছেন। অন্যদিকে যারা অংশগ্রহণের পক্ষে তারা বলছেন, পরিবেশ ও ফলাফল যাই হোক নির্বাচনে  অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের রাজনীতিকে নতুন করে বিকশিত করার সুযোগটি হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আলমগীর হাসান সোহান বলেন, আমরাও নির্বাচনে যেতে চাই। কিন্তু ছাত্রসংগঠনগুলো সহাবস্থানের পরিবেশ, রাজনীতি করার অধিকার কোনোটিই এখন বিরাজমান নয় ক্যাম্পাসে। এ সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে ডাকসু নির্বাচন আয়োজন খুব বেশি ফলপ্রসূ হবে না। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা চলছে। শিগগিরই একটি সিদ্ধান্ত আসবে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক কাজী মোকতার হোসেন বলেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ছাত্রদলে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। এ নির্বাচন নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে দুই ধরনের মতামত আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের অনমনীয় আচরণের কারণে ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ ও ফলাফল কি হবে তা নিয়ে সবাই সন্দিহান। ফলে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসেনি ছাত্রদল। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি- এ নির্বাচনে অংশ নিয়ে কোনো লাভ হবে না। কোটা বিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেবে ঘোষণা দেয়ার পর তাদের ওপর ছাত্রলীগ তাদের স্বভাবগত আচরণ করছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের সঙ্গে ছাত্রলীগের বর্তমান আচরণ বাহ্যিক। তারা ছাত্রদলকে নির্বাচনে নিয়ে ৩০শে ডিসেম্বরের মতো নির্বাচন ও ফল অনুকূলে নিতে চায়। সেটাকে বৈধতা দেয়ার জন্যই ছাত্রদলের সঙ্গে মেকি এ আচরণ করছে। কেন্দ্রীয় সমাজসেবা সম্পাদক আবদুর রহিম বলেন, এখনও সাংগঠনিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সকল ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থানের যে দাবি ছাত্রলীগ এখন পর্যন্ত তার আন্তরিক কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব বিরাজ করছে।
এদিকে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হলেও তারা অংশ নিলে কাদের প্রার্থী করা হতে পারে সে নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। ছাত্রদলের সম্ভাব্য ভিপি-জিএস-এজিএস প্রার্থীদের নাম আলোচিত হচ্ছে ক্যাম্পাসের আলাপ-আলোচনায়। ছাত্রদলের নেতারা জানান, নিয়মিত ছাত্র, সাধারণ ছাত্রদের কাছে জনপ্রিয় এবং তাদের ভোট ও সমর্থন কাড়তে সমর্থ হবেন, এমন নেতাদেরই প্রার্থী করা হবে। ছাত্রত্ব না থাকায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সিনিয়র নেতারা এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি হল শাখার সিনিয়র নেতারাও অংশ নিতে পারবেন না। ফলে নির্বাচনে অংশ নিলে হল শাখার জুনিয়র নেতাদেরই ছাত্রদলকে বেছে নিতে হবে। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা জানান, ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে কারা প্রার্থী হবেন এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
ক্যাম্পাসের আলোচনায় উঠে আসা ছাত্রদলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন- মাস্টার দা সূর্য সেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম, আবদুল খালেক, মো. কাইউম-উল-হাসান, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মাহফুজ চৌধুরী, জিয়া হল ছাত্রদলের সদস্য মো. ইমন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান রাফসান, ফজলুল হক মুসলিম হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরে আলম ভূঁইয়া ইমন, মহসিন হলের মো. মিনহাজুল হক, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বোরহান উদ্দীন নয়ন, জিয়া হলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান অনিক, এসএম হলের আরএম ইমন, বিজয় একাত্তর হলের তানজিল হাসান, এএফ রহমান হলের মো. জারিফ রহমান ও মো. হাসিবুল হাসান রাসেল। ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা জানান, ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী ছাত্রদলের আলোচিতদের মধ্যে সূর্যসেন হলের যুগ্ম আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনসহ ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক আন্দোলন কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মাহফুজ চৌধুরীসহ কয়েকজন প্রতিকূল পরিবেশেও ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিলেন।

Tuesday, January 22, 2019

মামলার প্রস্তুতিতে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা by কাফি কামাল

ভোট জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা। নির্বাচনের পরপরই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বৃহত্তর এ প্ল্যাটফরম। এই দাবিতে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দেয়ার পাশাপাশি কূটনীতিকদের কাছে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনের দিন ও আগে-পরে সংঘটিত অনিয়ম, হামলা-মামলা, গ্রেপ্তার-হয়রানি, হতাহতের ঘটনাসহ ৮টি বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ছবি-অডিও-ভিডিওর সমন্বয়ে সিডিসহ কেন্দ্রীয় দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন ধানের শীষের প্রায় পৌনে দুইশ’ প্রার্থী। পাশাপাশি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও প্রায় শেষ করেছেন।
এখন কেন্দ্রের নির্দেশনা পেলে প্রার্থীরা একযোগে মামলা দায়ের করবেন। তবে কবে নাগাদ ট্রাইব্যুনালে মামলাগুলো দায়ের করা হবে সে ব্যাপারে পরিষ্কার কিছুই বলতে পারছেন না নেতারা। এদিকে নির্বাচনের পরপরই মামলার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফ্রন্টের নেতারা। কিন্তু এখনো সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
এখন তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন। বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরামের দুই সদস্যসহ ধানের শীষের বেশ কয়েকজন প্রার্থী আলাপে এমন তথ্য জানিয়েছেন। তবে বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, মূলত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের ফলাফলের কাগজপত্র হাতে না পাওয়ায় মামলার উদ্যোগটি আটকে আছে। এ ছাড়া আলাদাভাবে তিনটি কমিটি গঠন করে মামলা-হামলা- গ্রেপ্তারের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে বিএনপি।
নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলার ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। অন্যদিকে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, নির্বাচনী অনিয়ম ও মামলা-হামলার ঘটনার তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ইতিমধ্যে পৌনে দুইশ’ আসনের প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা হয়েছে। আশাকরি বাকি আসনগুলোর প্রতিবেদনও দুয়েকদিনের মধ্যে জমা পড়বে। ট্রাইব্যুনালে মামলার ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে দলীয় ফোরামে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হলে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-৭ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, ট্রাইব্যুনালে মামলার জন্য বেশিরভাগ প্রার্থীই ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরেছেন। কিছু বিষয় এখন বাকি আছে। আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করছি। চলতি সপ্তাহেই একযোগে মামলাগুলো দায়ের করা হবে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের কাগজপত্র হাতে পাইনি। এসব কাগজপত্রের জন্য অপেক্ষা করছি। কাগজপত্র পেলেই মামলার উদ্যোগ নেয়া হবে। আগামী ৩০শে জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে মামলার শেষদিন। বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আগামী ৩০শে জানুয়ারির মধ্যে এসব কাগজপত্র যদি না দেয় তাহলে প্রমাণিত হবে দেশে আইন-আদালত বলতে কিছু নেই।
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীরপ্রতীক জানান, ২০দলীয় জোটের প্রধান শরিক দল বিএনপির নির্দেশনা অনুযায়ী আমার নির্বাচনী আসনের সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ৮ই জানুয়ারি একটি প্রতিবেদন ও সিডি জমা দিয়েছি। নির্বাচনে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে আমি টকশোতে কথা বলেছি, আমার কলাম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত লিখছি। এখন আগামী দিনের পথচলা কী রকম হবে তা নিয়ে নির্দেশনার জন্য আমরা আমাদের ২০দলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপির দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। ধানের শীষের সঙ্গে ছিলাম, আছি, থাকবো।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও খুলনা-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, তার নির্বাচনী আসনের ভোট কারচুপির তথ্য-প্রমাণসহ একটি প্রতিবেদন তিনি জমা দিয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেই সঙ্গে অডিও-ভিডিওর একটি সিডিও জমা দেয়া হয়েছে। বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও যশোর সদর আসনে ধানের শীষের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, নির্বাচনের পর তিনি নেতাকর্মীদের জামিন তৎপরতা নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। পরে কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী নানা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গত সপ্তাহে ১১ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে  ছবি, অডিও-ভিডিও ক্লিপিংসহ একটি পেনড্রাইভ ও মামলার এফআইআর-রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে অভিযোগের কপিগুলোর সংযুক্তি দিয়েছেন। অমিত জানান, ট্রাইব্যুনালে মামলার ব্যাপারে প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা পেলে মামলাটি দায়ের করবো।
যে ৮ বিষয়ের ভিত্তিতে প্রতিবেদন
ধানের শীষের প্রার্থীদের আটটি বিষয়ের ভিত্তিতে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল বিএনপি। সে নির্দেশনার ভিত্তিতে প্রার্থীরা নির্বাচনের দিন ও আগে-পরে হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি, হতাহত এবং ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম ও কারচুপির তথ্য, লিখিত বর্ণনা, অডিও-ভিডিওসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্র জানায়, কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী নির্বাচনে সহিংসতা, অনিয়ম, ভোট কারচুপিসহ ৮টি বিষয়ের তথ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিবেদন। বিষয়গুলো হচ্ছে-
১. ভোটের আগের রাত ও ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে সংঘটিত ভোট জালিয়াতি;
২. প্রার্থীর নিজের ও পরিবারের অবরুদ্ধ থাকা বা হামলায় আহত ও সহায়-সম্পদের ক্ষতির তথ্য ও ছবি;
৩. নির্বাচনের দিন ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট, প্রার্থীর সমন্বয়কারী, সমর্থক ও নেতাকর্মীদের সরকারি বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী কর্তৃক ভয়ভীতি প্রদর্শন, অন্যায় আচরণ, মারধর ও কেন্দ্র থেকে জোর করে বের করে দেয়া এবং গ্রেপ্তার;
৪. ভোট কেন্দ্রে প্রকৃত ভোটের চেয়ে প্রদর্শিত ভোট সংখ্যা অধিক বা প্রায় সমসংখ্যক হয়ে থাকলে কেন্দ্রের নাম সহ প্রকৃত হিসাব।
৫. নির্বাচনের আগে-পরের সহিংসতায় সরকারি বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের আক্রমণে ধানের শীষের নেতাকর্মী, সমর্থকসহ যারা নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের নাম-পরিচয়, ঠিকানা এবং আক্রান্তের ছবিসহ ঘটনার বিবরণ;
৬. নির্বাচনের আগে-পরে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যেকোনো ধরনের অপরাধের আইনানুগ প্রতিকার লাভের জন্য থানা বা আদালতে জিডি-মামলা করা হয়ে থাকলে বা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ কর্তৃক জিডি-মামলা গ্রহণে প্রত্যাখ্যাত হয়ে থাকলে তার কপি;
৭. তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনের আগে-পরে গ্রেপ্তার অভিযানে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকসহ গ্রেপ্তারকৃতদের নাম- ঠিকানা ও পরিচয় এবং
৮. নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন বা অন্য যেকোনো ধরনের অভিযোগের বিষয়ে রিটার্নিং অফিসার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে থাকলে তার ফটোকপি। নেতারা জানিয়েছেন, প্রতিবেদনগুলোর ভিত্তিতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন ও একটি তথ্যচিত্র তৈরি করা হবে। যা পরে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যম ও বিদেশি কূটনীতিকদের কাছেও তা তুলে ধরা হবে।
তথ্য সংগ্রহে বিএনপির তিন কমিটি গঠন
দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে হামলা-মামলা ও লুটপাটের তথ্য সংগ্রহে আলাদা তিনটি কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুযায়ী ইতিমধ্যে কমিটিগুলো তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। সারা দেশে মামলা-হামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য সংগ্রহ ৬ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। মামলা- গ্রেপ্তারের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আইনগত সুবিধার বিষয়টি দেখবে এই কমিটি। অন্যদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, আহত-নিহতের সংখ্যা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, দলের কার্যালয় ভাঙচুর সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে ৬ সদস্যবিশিষ্ট আরেকটি কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী। দলের স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানাকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি তথ্য সংগ্রহ করবে নারী প্রার্থী ও নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা-মামলা বিষয়ে।

Saturday, December 29, 2018

যেভাবে নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট by কাফি কামাল

নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দশবছর পর নির্বাচনের মাঠে বিএনপি। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্বাচন প্রশ্নে দলটির অবস্থান ছিল কৌশলী। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে অনড় ছিল তাদের মনোভাব। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মাস সেপ্টেম্বর জুড়ে গায়েবি মামলা ও গণগ্রেপ্তারে নাভিশ্বাস উঠেছিল দলটির নেতাকর্মীদের। এমন এক পরিস্থিতি কয়েকটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের বিষয়টি সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সামনে আসে। অবশ্যই এই প্ল্যাটফর্ম গঠনে দীর্ঘ অর্ধযুগ ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিল বিএনপি। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার ব্যানারে ২২শে সেপ্টেম্বর বিএনপি, গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য ও বিকল্পধারার শীর্ষ নেতারা একমঞ্চে আসেন।
মহানগর নাট্যমঞ্চের সে নাগরিক সমাবেশে ১লা অক্টোবর থেকে দেশব্যাপী আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণাও আসে।
কিন্তু পরের দুই সপ্তাহে নানা ঝঞ্ঝার মুখে পড়ে এ উদ্যোগ। বিএনপি’র নেতৃত্বে জামায়াতসহ ২০টি দলের সমন্বয়ে একটি বিরোধী রাজনৈতিক জোট একদশক ধরে রাজনীতি করে আসছিল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনকে ২০দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছিল জটিলতা। তবে ২০দলীয় জোটকে আলাদা রেখে ঐক্যফ্রন্ট গঠনে সায় দেয় শরিকদলগুলো।
গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য কৌশলটি মেনে নিলে কেটে যায় জটিলতা। কিন্তু এ ঘনঘটার মধ্যে জোট ছেড়ে যায় দুইটি রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে জামায়াত প্রশ্নে ‘বিকল্পধারা’ বেঁকে বসলে তাদের ছাড়াই ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ১৩ই অক্টোবর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের। ৭ দফা দাবি ও ১১টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণায় ‘সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্য সরকার গঠন ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির’ মুক্তির দাবি করা হয়।
সেদিন ড. কামাল হোসেন পরিষ্কার ঘোষণা দেন- ‘এই ঐক্য কোনো দলের স্বার্থে নয়, জাতীয় স্বার্থে।’ অক্টোবরের প্রথমদিন থেকে দেশব্যাপী কর্মসূচি পালনের প্রাথমিক ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত সংলাপের পথেই হাঁটে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। সংলাপের তাগিদ দিয়ে ২৮শে অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে দুইটি চিঠি দেন ফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। এ চিঠির দ্রুত সাড়া মেলে। নভেম্বরের প্রথমদিন গণভবনে সংলাপের ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ফ্রন্টের ২০ নেতা সাড়ে তিনঘণ্টাব্যাপী সে সংলাপে অংশ নেন।
সংলাপেও ৭ দফা দাবি তুলে ধরে বক্তব্য দেন ফ্রন্টের নেতারা। ঐক্যফ্রন্টের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দেয়া। বাক্‌-ব্যক্তি ও গণমাধ্যম এবং সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন, সামাজিক গণমাধ্যমে মতপ্রকাশের অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মৃক্তি দিতে হবে। নির্বাচনের ১০দিন আগে থেকে সরকার গঠন পর্যন্ত বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া। নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা এবং তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনো মামলা দায়ের না করার নিশ্চয়তা।
সংলাপের পরিবেশ আন্তরিক থাকলেও অর্জন ছিল শূন্যের কোঠায়। বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবির সবক’টি নাকচ করে দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে গায়েবি মামলা দায়ের ও গণগ্রেপ্তার বন্ধ এবং সভা-সমাবেশ করা ও নির্বাচনে পর্যবেক্ষকদের সুযোগ দেয়ার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেন তিনি। সংলাপ শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেছিলেন- ‘তারা সংলাপে সন্তুষ্ট নন।’ পরে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘সংলাপের আলোচনায় বিশেষ কোনো সমাধান আসেনি।’ সংলাপের ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চয়তার মেঘে ঢেকে যায় তখনও হাল ছাড়েননি ফ্রন্টের নেতারা। সরকারপক্ষ যখন সংবিধানের বাইরে যেতে চূড়ান্ত অনীহা প্রকাশ করে তখন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংবিধানের ভেতর থেকেই সমাধানের পথ বের করেন ফ্রন্টের নেতারা। ৭ই নভেম্বর সে সমাধান সূত্রের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপে বসেন তারা। কিন্তু এবারও সরকারের অনড় অবস্থানের মধ্যদিয়ে শেষ হয় সংলাপ পর্ব।
পরিস্থিতি যখন অনিশ্চয়তার ঘূর্ণাবর্তে মধ্যে তখনই ২৩শে ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের দিনধার্য্য করে ৮ই নভেম্বর একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইস্যুতে একটি বড় প্রশ্নের মুখে পড়ে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট। সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়ায়- যে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি, আন্দোলন করেছিল বছরব্যাপী সে দাবি আদায় ছাড়াই পাঁচবছর পর দলটি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না? সিদ্ধান্তগ্রহণে ১০ই নভেম্বর দলের শীর্ষ নেতা ও জোটের শরিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব।
কিন্তু সব হিসাবনিকাশ এড়িয়ে পরদিন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বিএনপি’র তরফে আলাদা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়া হয়। আন্দোলনের অংশ হিসেবেই এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ বলে জানিয়ে দেয় বিএনপি। ১২ই নভেম্বর দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় পাঁচ নেতা। এভাবেই নির্বাচনী ট্রেনে চড়ে বিএনপি। এদিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়ার পর দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি ও জমাদান, প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার পর্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। সেই সঙ্গে নির্বাচন পেছানোর দাবিতেও তারা ছিলেন সোচ্চার। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবির মুখে এক সপ্তাহ পিছিয়ে ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও ন্যূনতম স্বস্তি পায়নি বিএনপি’র নেতাকর্মীরা।
হামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশি হয়রানি ছিল অব্যাহত। বিশেষ করে ৯ই ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ দেয়ার পর নতুন করে হিড়িক পড়ে গায়েবি মামলা দায়ের ও গণগ্রেপ্তারের। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৮দিনে সারা দেশে গ্রেপ্তার হয়েছে ১০ হাজার ৩২৯ জন নেতাকর্মী। কেবল বিরোধী নেতাকর্মীই নয়, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮ জন প্রার্থী। এ সময়ে গায়েবি ও মিথ্যা মামলা দায়ের হয়েছে ৮৪৪টি। নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে ২ হাজার ৮৯৬টি। ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকদের হামলা ও পুলিশের লাঠিচার্জ-ছররা গুলিতে আহত হয়েছেন ১৩ হাজার ২৫২ জন। হত্যার শিকার হয়েছেন ৯ জন। হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি, আইনি জটিলতার পাশাপাশি প্রচারণার সুযোগও পায়নি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। যেখানেই গণসংযোগে নেমেছেন সেখানেই পড়েছেন হামলার মুখে। হামলায় রক্তাক্ত হয়েছেন বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতা ও প্রার্থী গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, হাবিবুর রহমান হাবিব, ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী ও রুমানা মাহমুদ।
সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটে ২৩শে ডিসেম্বর সেনা মোতায়েনের পর। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হামলার মুখে পড়েছেন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, সুব্রত চৌধুরী, আফরোজা আব্বাস, হাসিনা আহমেদ, হাফিজ ইব্রাহিম ও ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা অনেকেই। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ চাইতে গিয়ে উল্টো সিইসি’র দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। ফলে ধানের শীষের প্রার্থীদের প্রচারমাধ্যম ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউব। একদিকে হামলা ও গ্রেপ্তার-হয়রানিতে নাভিশ্বাস উঠেছে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের, অন্যদিকে খুলতে খুলতে ক্লান্ত হয়েছেন আইনের ঘেরো। উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগের পরও সে পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি মর্মে বাতিল হয় অন্তত ৩০ প্রার্থীর মনোনয়ন। ঋণখেলাপিসহ অন্যান্য অভিযোগেও বাতিল হয় অনেকের।
কোনো কোনো প্রার্থীকে রিটার্নিং কর্মকর্তার পর নির্বাচন কমিশন ও পরে উচ্চ আদালতের সহায়তা নিয়ে টিকাতে হয়েছে তাদের প্রার্থিতা। নির্বাচন কমিশন বৈধ ঘোষণার পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর আপিলের কারণে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে বাতিল হয়েছে অনেকের প্রার্থিতা। পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে পড়ে যে, আগের দিন যে প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক পান, পরের দিন তা বদলে যায়, এক-দুইদিন পর ফের প্রথম প্রার্থীই প্রতীক পান। উচ্চ আদালতে চক্কর কাটার এ পর্বটি চলে বুধবার ২৫শে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এতে একদিকে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের বিলম্বের কারণে ১৮টি আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শূন্য হয়ে পড়ে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট। এক্ষেত্রে নতুন এক জটিলতা হয়ে সামনে আসে আরপিওর নতুন বিধি।
যার কারণে বিকল্প প্রার্থী রাখার সুযোগও পাননি বিএনপি। অন্যদিকে যারা শেষ বেলায় প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন তারাও সময় পাননি প্রস্তুতি নেয়ার। কোনো দাবি আদায় ছাড়া এবং নানামুখী প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ঐক্যফ্রন্ট নেতারা শেষ পর্যন্ত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচনে। কারণ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে আনাকেই এই নির্বাচনের লক্ষ্য ঠিক করেছেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। তারা আস্থা রাখতে চান জনগণের উপর। তাদের বিশ্বাস ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারলে নীরব ভোট বিপ্লব ঘটবে। গণসংযোগ, মাইকিং, পোস্টারিংয়ের সুযোগ পাননি ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা। নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে এসে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা পড়েছেন প্রতিবন্ধতকার নতুন এক পর্বে।
বিগত তিনদিন ধরে বগুড়ায় মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকায় মির্জা আব্বাস, আফরোজা আব্বাস, সালাহউদ্দিন আহমেদ, বরিশালে জহিরউদ্দিন স্বপন, চাঁদপুরে শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকসহ অনেকেই নিজ নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। পুলিশ, র‌্যাব’র উপস্থিতিতে তাদের বাড়িঘর ঘিরে রেখেছে ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকরা। ধানের শীষের প্রার্থীদের বাড়িতে কেউ গেলে বা বাড়ি থেকে কেউ বেরুলেই তাদের গ্রেপ্তার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা জানিয়েছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ ও ফোনে সহায়তা চাওয়ার পরও ন্যূনতম সহায়তা পাচ্ছেন না। সবমিলিয়ে নীরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হতে চান এই অসম প্রতিযোগিতায়।

Monday, November 19, 2018

মনোনয়নে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি by কাফি কামাল

তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্তির প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করছে বিএনপি। এছাড়া মহাজোট সরকারের আমলে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা, মামলা-মোকদ্দমা, গুম-কারাভোগসহ ত্যাগ-স্বীকার ও শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বস্ততাকে প্রাধান্য দিয়ে নির্ধারণ করা হচ্ছে প্রার্থীর স্কোর। তবে সামাজিকভাবে ও ভোটের মাঠে যাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে এমন প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিল থাকবে অন্য বিষয়গুলো।
এছাড়া বিশেষ পরিস্থিতিতে বিএনপি এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে যাঁরা নিজ নিজ এলাকায় বিরূপ পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে ভোটের মাঠে থাকতে পারবেন, ভোটারদের সঙ্গে থাকতে পারবেন বলে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে প্রতীয়মান হবে, তারাই অগ্রাধিকার পাবেন মনোনয়নে। প্রতিটি আসনে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে প্রার্থীদের আমলনামা। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে কথা বলছেন তারেক রহমান।
অন্যদিকে ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থান ও ভোট ব্যাংক বিবেচনা করেই ছাড় দেবে বিএনপি। দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নির্বাচন কমিশনে তাদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন মনোনয়ন বোর্ড। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন, আগামী ৮ই ডিসেম্বর দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। যিনি দলের চিঠি পাবেন তিনিই প্রার্থী হবেন, বাকিরা তাকে সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করবেন।
দলটির নীতিনির্ধারক ফোরাম সূত্রে জানা গেছে বিএনপির এমন নীতিগত অবস্থানের কথা।
সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অন্তত ১০টি জরিপ চালিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এসব জরিপে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় দলের সাংগঠনিক অবস্থান, আন্দোলন সংগ্রামে সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ভূমিকা, তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও মামলা-মোকদ্দমাসহ সার্বিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিটি আসনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা বা সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্য রয়েছে।
অন্যদিকে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার পর্বের আগেই তিনি একটি নির্দেশনা দিয়েছেন মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যদের। তাদের বলা হয়েছে, মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মনোনয়ন চূড়ান্তকরণে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো যেন দ্রুত সংগ্রহ করে নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাক্ষাৎকার পর্বে প্রতিটি আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সামনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একটি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে, একাদশ জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে মানুষের অধিকার আদায় ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের একটি অংশ। তাই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে সবাইকে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে দলের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ও সিনিয়র নেতাদের প্রতি তিনি প্রার্থীদের ব্যাপারে সুপারিশ করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে দলের বৃহত্তর স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের একচেটিয়া ক্ষমতা বজায় রাখার কৌশল নিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করেছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। তারা বলেছেন, যোগ্য প্রার্থী থাকার পরও বেশ কয়েকটি জেলার দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ তাদের নিজস্ব অনুসারীদের মনোনয়ন দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন। নানা উপায়ে নিজ জেলায় ভালো প্রার্থী বাছাইয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চাইছেন।
এ ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রাম চলাকালে ও দলের দুঃসময়ে নিরাপদে বিদেশে অবস্থান করে নির্বাচনের সময়ে দেশে ফিরে মনোনয়ন আদায়ে নানামুখী লবিং-তদবির করছেন। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে শীর্ষ নেতৃত্বকে শক্ত অবস্থান নেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। এদিকে সাক্ষাৎকার পর্বে মনোনয়ন বোর্ড থেকে প্রত্যেক মনোনয়ন প্রার্থীকে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা জানানো হবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে। দলের তরফে যিনি মনোনয়নের মূল চিঠি পাবেন তিনি ছাড়া বাকিরা সরে দাঁড়িয়ে মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।  
সাক্ষাৎকার দেয়া অন্তত ২০ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী জানান, সাক্ষাৎকারের শুরুতেই দলের পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্যরা বলছেন- কোন নেতার কী অবদান, বিগত ১২ বছর কে কী করছেন, সে খবর দলের কাছে আছে। এরপরই প্রার্থীর কাছে প্রশ্ন করা হয়, এই ১২ বছর প্রার্থী সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি দলের মাধ্যমে কী ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন? তৃণমূলের নেতাকর্মীদের পাশে কীভাবে ছিলেন? নিজে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং মামলা কতটি? এরপর সাক্ষাৎকারে জানতে চাওয়া হয়, এলাকায় প্রার্থীর অবস্থান কতটা শক্তিশালী।
সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে ভোটের লড়াইয়ে থাকতে পারবে কি না? যেসব প্রার্থীর কর্মকাণ্ড, নিজ নিজ আসনে অবস্থা ভালো এবং মনোনয়ন পাওয়ার সব যোগ্যতা আছে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়- ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবে কিনা? মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা জানান, মূলত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এসব কথা জানতে চেয়েছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও নির্দেশ দেন তিনি।
বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ডের এক সদস্য জানান, জাতীয় রাজনীতির এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে এবার নির্বাচন করছে বিএনপি। ফলে এটি নিশ্চিত হওয়া দরকার প্রার্থী আগেই মাঠ ছেড়ে দেবেন নাকি শেষ পর্যন্ত বিরূপ পরিস্থিতিতেও থাকবেন। সূত্র জানায়, মাঠের রাজনীতি ও তৃণমূলে প্রার্থীর শক্ত অবস্থান, সাহস ও দৃঢ় মনোবলের বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দুইটি নামও উল্লেখ করেছেন। সিলেট ও রাজশাহী সিটি নির্বাচনে দল মনোনীত দুই প্রার্থী যে সাহসিকতা দেখিয়েছেন তা উদাহরণ হিসেবে সামনে আনেন তিনি।
দিনাজপুর-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে সাক্ষাৎকার দেয়া জেলা বিএনপি নেতা আবদুল হালিম বলেন, এই আসনে আমরা ৪ জন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছি। আমার কাছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জানতে চেয়েছেন কেন দল আমাকে মনোনয়ন দেবে? মনোনয়ন দিলে আমার জয়ের সম্ভাবনা কতটুকু? উত্তরে আমি বলেছি, দীর্ঘ ২৫ বছর আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আর এই আসনে অপর দুই মনোনয়ন প্রত্যাশীর মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। আমার সঙ্গে কারও দ্বন্দ্ব নেই। তাই আমাকে মনোনয়ন দিলে ধানের শীষকে বিজয় উপহার দিতে পারবো।
পঞ্চগড়-২ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ফরহাদ হোসেন বলেন, আমার কাছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম জানতে চেয়েছেন কেন আমি নির্বাচন করতে চাই? অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলে আমি কাজ করবো কিনা। এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জানতে চেয়েছেন, নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কেমন। ফরহাদ হোসেন বলেন, জবাবে আমি বলেছি- খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চাইবো।
ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী পীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমান জাহিদ বলেন, আমার কাছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রশ্ন ছিল- আপনি তো এর আগেও নির্বাচন করেছেন। কিন্তু জয়লাভ করতে পারেননি। এখন কেন আবার নির্বাচন করতে চান? উত্তরে আমি বলেছি- আগে তিনবার ধানের শীষে নির্বাচন করেছি। এবার দলের সবাই আমার সঙ্গে থাকলে আমি জয়লাভ করতে পারবো। এই আসনের জন্য বিএনপি থেকে ১০ জন নেতা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন জানিয়ে জাহিদ বলেন, পরে জানিয়ে দেয়া হবে কাকে দল নির্বাচনের জন্য দলীয় মনোনয়ন দিয়েছে।
দিনাজপুর-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের আসনে যতগুলো প্রার্থী আছে সবাইকে একবার ডাকা হয়েছে। মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা সাক্ষাৎকারে প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেছেন।
নাটোর-৪ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছাত্রদলের সহ-সভাপতি তারিকুল ইসলাম টিটু বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রার্থীদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরাসরি কথা বলছেন। কোনো রেকর্ড নয়। এ ছাড়া সাক্ষাৎকারের শুরুতে একটি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখছেন তিনি।
দিনাজপুর-১ আসনের আরেক প্রার্থী মামুনুর রশীদ চৌধুরী বলেন, তাদের কাছে প্রশ্ন করা হয়েছে- জয়ী হতে পারবেন কী না? দল থেকে যাকে নমিনেশন দেয়া হবে তার পক্ষে কাজ করবেন কী না? তিনি বলেন, এসব প্রশ্নের জবাবে আমি বলেছি- আমি এখন রানিং উপজেলা চেয়ারম্যান। প্রতিকূলতার মধ্যেও জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছি। আমাকে দল থেকে মনোনয়ন দিলে অবশ্যই আমি নির্বাচিত হবো বলে আশা রাখি।
এ ছাড়া দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার জন্যও প্রস্তুত আছি। এ আসনে ধানের শীষের টিকিট চান ৯ প্রার্থী। একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী বলেন, সমপ্রতি অনুষ্ঠিত বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে মনোনয়ন বোর্ডের সদস্যরা জানতে চেয়েছেন, ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত তিনি টিকে থাকতে পারবেন কি না। যুক্তি হিসেবে নেতারা বলছেন, তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্যে সিলেটে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী আরিফুল হক ও রাজশাহীর মেয়রপ্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল ভোটের মাঠে শেষ পর্যন্ত ছিলেন। আরিফুল হক জয় পেয়েছেন আর বুলবুল একাই লড়াই করছেন। সেখানে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে সাহস নিয়ে রুখে দাঁড়াতে পারলে তিনিও জয় পেতেন। মনোনয়ন প্রত্যাশী আরেক নেতা জানান, বোর্র্ড সদস্যরা বলেছেন- এখানে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে টিকে থাকতে হবে। ভোটের মাঠ ছেড়ে দেয়া যাবে না।
বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে প্রথমদিন দলের মনোনয়ন বোর্ডের কাছে সাক্ষাৎকার দেন দুই বিভাগের ১৮টি জেলার ৭২টি নির্বাচনী এলাকার মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। দেশের সর্ব উত্তরের নির্বাচনী আসন পঞ্চগড়-১ আসন থেকে শুরু হয় এ সাক্ষাৎকার পর্ব। সকালে রংপুর ও বিকালে রাজশাহী বিভাগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ডে ছিলেন- দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যাারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
প্রতিটি নির্বাচনী আসনের মনোনয়ন প্রার্থীদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নির্দেশনা দেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রথম সাক্ষাৎকার দেন ওই আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ইউনুস আলী। এরপর পর্যায়ক্রমে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, বগুড়া, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে সংশ্লিষ্ট মহানগর ও জেলার নির্বাচনী এলাকার দলের মহানগর ও জেলার বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে, সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় দিনে আজ সকাল ৯টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বরিশাল বিভাগ, দুপুর আড়াইটা থেকে খুলনা বিভাগ, আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগ ও দুপুর আড়াইটা থেকে কুমিল্লা ও সিলেট বিভাগের সাক্ষাৎকার পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। সবার শেষে বুধবার সকালে ময়মনসিংহ ও ফরিদপুর বিভাগ এবং দুপুরে ঢাকা বিভাগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
আমার দলের সাক্ষাৎকার কিভাবে নেব এটা আমার সিদ্ধান্ত: ফখরুল
এদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমার দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার কিভাবে নেব এটা আমার সিদ্ধান্ত। ভিডিও কনফারেন্সে নাকি সরাসরি সাক্ষাৎকার নেয়া হবে সেটা নিজেদের ব্যাপার। তারেক রহমান সাক্ষাৎকার নেয়ায় নির্বাচনী আচারণ বিধি ভঙ্গ হচ্ছে বলে ক্ষমতাসীনরা ইসিতে যে অভিযোগ করেছেন তার জবাবে সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি একথা বলেন।
মির্জা আলমগীর বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও খালেদা জিয়ার মুক্তির অংশ হিসেবে আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছি। সেই জন্য প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার কাজগুলো করছি। আজকে আমাদের দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু হয়েছে। আমরা মনে করছি না অবাধ সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যে নির্বাচনের জন্য আমরা দীর্ঘকাল আন্দোলন সংগ্রাম করছি। সরকার একতরফা, একদলীয় নির্বাচন করার পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ২০দল, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ একটি ফলপ্রসূ ও অর্থবহ নির্বাচনের দাবি সব সময় তুলে ধরছে।
আমরা নিজেরাও সংলাপে গিয়েছি। কিন্তু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সমতলক্ষেত্র এখনো তৈরি হয়নি। সংসদ ভেঙে দেয়া হয়নি। বিটিভি, সংবাদ সংস্থা, বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো সরকারের তথাকথিত উন্নয়নগুলো প্রচার করছে। নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে না। বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার বন্ধ হয়নি। বারবার বলার পরও গ্রেপ্তার চলছে। এগুলো সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। আমরা চাই সুষ্ঠু অবস্থা তৈরি হোক।
দলগুলো যে অবস্থায় স্বস্তিবোধ করবে। এই জন্য মামলা মোকদ্দমা দায়ের বন্ধ করা হোক। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিটিভিকে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। তথাকথিত উন্নয়ন প্রচার বন্ধ রাখতে হবে। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদেরও সমান সুযোগ দিতে হবে। এই বিষয়গুলো ইসিকে জানানো হয়েছে। আরো অন্যান্য বিষয়গুলো জানানো হবে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কি নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে যেভাবে প্রস্তুতি দরকার সেভাবে প্রস্তুতি নিন। কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। সজাগ থাকতে হবে। একতরফা নির্বাচনের জন্য যেন কেউ কেন্দ্র দখলে নিতে না পারে।