Thursday, January 10, 2019

কুষ্ঠরোগের ঝুঁকিতে রাজনগরের চা শ্রমিকরা by আবদুর রহমান সোহেল

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ফাঁড়ি বাগানসহ ১৪টি চা বাগানের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ কুষ্ঠরোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। বাগান ছাড়াও সমতল এলাকার বাসিন্দারাও আছেন এই ঝুঁকিতে। গত বছর উপজেলার সবগুলো বাগানে জরিপ করে ৭১ জন রোগীকে লক্ষণ দেখে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাদের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এসব এলাকায় পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং চিকিৎসকের পরামর্শ না নেয়ায় এ ঝুঁকি আরো বাড়ছে বলে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এই উপজেলায় ২০১৬ সালে একজন রোগীকে শনাক্ত করে চিকিৎসা দেয়া শুরু করে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। পরবর্তীতে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে আরো একজন আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত করে চিকিৎসা শুরু করা হয়। বর্তমানে এই উপজেলায় ৭ জন কুষ্ঠরোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। কুষ্ঠরোগের চিকিৎসায় ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩ জন রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়েছেন।
এ পর্যন্ত উপজেলার ১৪টি বাগানের সকল চা বাগানে জরিপ করেছে বেসরকারি সংস্থা লেপ্রা বাংলাদেশ। এ সময় বাগানগুলো থেকে ৭১ জনের শরীরে কুষ্ঠরোগের লক্ষণ দেখতে পান তারা। তবে তাদের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ রোগ ছোঁয়াছে কিংবা বংশগত নয়। তবে সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় বলে জানান চিকিৎসকরা। চা বাগান ছাড়াও সম্প্রতি সমতল এলাকার বেশ কয়েকজন রোগীর মাঝে প্রাথমিক লক্ষণ পাওয়া গেছে। গতকাল সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হল রুমে কুষ্ঠরোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে উপজেলার চিকিৎসাধীন রোগী, প্রাথমিক লক্ষণ থাকা রোগী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এক ট্রেনিংয়ের আয়োজন করে এনজিও সংস্থা লেপ্রা বাংলাদেশ।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বর্ণালী দাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন লেপ্রা বাংলাদেশের সিলেট বিভাগীয় মনিটরিং অফিসার শ্যামল কুমার চৌধুরী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. শম্পা রানী পাল, জেলা প্রজেক্ট অর্গানাইজার দিপঙ্কর ব্রহ্মচারী, রাজনগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি আউয়াল কালাম বেগ, উপজেলা টিএলসিএ হরিপদ দেব প্রমুখ। মাঠপর্যায়ে এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা না থাকায় এ রোগে আক্রান্তের ঝুঁকি বাড়ছে। রোগ সম্পর্কে ধারণা না থাকায় রোগীরাও অবহেলা করছেন চিকিৎসা নিতে এমনটাই জানিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বর্ণালী দাশ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ এই উপজেলা থেকে পুরোপুরি কুষ্ঠ নির্মূলে কাজ করছে। এ রোগে খুব কম মানুষ আক্রান্ত হয়। তবে চা-বাগান এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও অপুষ্টির শিকার মানুষেরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কুষ্ঠরোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা দিলে রোগটি নির্মূল করা যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে ২-৫ বছর পর রোগীর শরীরে লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় অনেক সময় রোগী বিকলাঙ্গ হয়ে যান। আবার এর চিকিৎসা দীর্ঘ মেয়াদি হওয়ায় অনেক রোগী মাঝ পথেই চিকিৎসা নেয়া বন্ধ করে দেন।

ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছেন আতঙ্কিত রোহিঙ্গারা -এএফপি’র রিপোর্ট

মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে এমন ভয়ে আতঙ্কিত ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা। এ ভয়ে তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে। এরই মধ্যে কয়েক দিনে কয়েক ডজন রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। গত সপ্তাহে ৫ সদস্যের একটি রোহিঙ্গা পরিবারকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছে ভারত। এভাবে জোর করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কড়া সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো। তারা অভিযোগ করছে, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ভয়াবহতার মধ্যে ফেরত পাঠিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অমর্যাদা করছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
এতে বলা হয়, মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের যেসব সদস্য ভারতে অবস্থান করছেন তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত জোরালোভাবে জানিয়েছে ভারত।
এরই মধ্যে দু’দফায় জোর করে কিছু রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের হাতে তুলে দিয়েছে ভারত। জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন মিয়ানমারে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেখানকার সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে এবং তা অব্যাহত আছে- এমন রিপোর্ট করা সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের হাতেই তুলে দিচ্ছে ভারত।
এএফপি আরো লিখেছে, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নয় ভারত। তারা ২০১৮ সালে গ্রেপ্তার করেছে ২৩০ রোহিঙ্গাকে। সেখানে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা এসব রোহিঙ্গাকে সদলবলে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছে।
বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষাকারী কর্মকর্তারা ও পুলিশ বলেছে, গত সপ্তাহে ভারত থেকে পালিয়ে আসা কয়েক ডজন রোহিঙ্গাকে আটক করেছেন তারা। তাদের বাংলাদেশের দক্ষিণে শরণার্থীদের শিবিরে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ওই শিবিরগুলোতে কঠিন জীবনযাপন করছে বাস্তুচ্যুত ও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছে, ভারতে যেভাবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর আতঙ্ক বিরাজ করছে তার জন্যই ভারত থেকে এভাবে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন।
বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় শহর ব্রাহ্মণপাড়ার পুলিশ প্রধান শাহজাহান কবির আটক রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে বলেন, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভারত যখন আটক করা শুরু করে এবং তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে থাকে তখন থেকেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। তিনি বলেছেন, গত বৃহস্পতিবারেই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর আটক করা হয়েছে ১৭ রোহিঙ্গাকে। তাদের সীমান্তের ৩১টি    পয়েন্ট থেকে আটক করা হয়। এদের বেশির ভাগই ভারতে বসবাস করছিলেন ৬ বছর ধরে। ওদিকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের শিবিরে ঠাসাঠাসি অবস্থা। সেখানে ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্টের পর আশ্রয় নিয়েছেন কমপক্ষে ৭ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা। সেখানকার স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, এরপরও গত কয়েকদিনে এসেছেন কমপক্ষে ৫৭ জন রোহিঙ্গা। কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের প্রশাসক রেজাউল করিম সর্বশেষ যাওয়া রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে বলেন, তারা এসেছেন হায়দরাবাদ, জম্মু-কাশ্মীরের মতো এলাকা থেকে। উল্লেখ্য, হায়দরাবাদ হলো ভারতের দক্ষিণের বড় শহর। আর জম্মু-কাশ্মীর হলো ভারত নিয়ন্ত্রিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা।
দশকের পর দশক মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্যের শিকার। এমনকি তাদেরকে নাগরিকত্ব পর্যন্ত দেয় নি সরকার। ফলে তারা রাষ্ট্রীয় যেকোনো সেবা থেকে বঞ্চিত। তাদেরকে মিয়ানমার দেখে থাকে ‘বাঙালি’ হিসেবে। তারা মনে করে, এরা অবৈধ অভিবাসী। তাদের বসবাস মিয়ানমারের রাখাইনে।

ডাকসু’র গঠনতন্ত্র সংশোধনে সভা আজ: সবার আগে সহাবস্থান নিশ্চিত করার দাবি ছাত্র সংগঠনগুলোর by মুনির হোসেন

প্রায় তিন দশক ধরে বন্ধ থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন আবারো আলোচনায়। অচল ডাকসুকে সচল করার লক্ষ্যে কাজ করছেন অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হলেও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ইতিমধ্যে বর্তমান প্রশাসন পরিবেশ সংসদের সভা করেছেন, খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশও হয়েছে। আগামী ৩১শে মার্চের মধ্যে নির্বাচন করার লক্ষ্যে গত ৬ই জানুয়ারি ডাকসুর গঠনতন্ত্র যুযোপযোগী ও সংশোধন করার জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটি করা হয়েছে। আজ সে কমিটি বসছে- ডাকসুর গঠনতন্ত্র যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় সভায়। সকাল ১১টায় প্রশাসনিক ভবনে ভিসির কার্যালয় সংগলগ্ন লাউঞ্জে এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে সভায় অংশগ্রহণ ও নিজ নিজ সংগঠনের পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা দিতে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনসহ ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে।
গত ৬ই জানুয়ারি ইস্যুকৃত চিঠিতে বলা হয়, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ গঠনতন্ত্র যুযোপযোগী করার জন্য ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনী/পরিমার্জনের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য মাননীয় ভিসি একটি কমিটি গঠন করেছেন। এতদুদ্দেশ্যে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনসমূহের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা আগামী ১০ই জানুয়ারি সকাল ১১টায় উপাচার্যের কার্যালয় সংগলগ্ন লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত সভায় উপস্থিত হয়ে অথবা লিখিতভাবে আপনার সংগঠনের বক্তব্য/সুপারিশমালা উপস্থাপনের জন্য আপনাকে সবিনয় অনুরোধ করছি।’ এদিকে সব ছাত্র সংগঠন নিজ নিজ অবস্থান থেকে গঠনতন্ত্র নিয়ে পর্যালোচনা করে নিজেদের প্রস্তাবনাও ঠিক করেছে। আজকের সভায় সেগুলো তুলে ধরা হবে বলে মানবজমিনকে জানিয়েছে সংগঠনগুলোর নেতারা। তবে এত আয়োজনেও শাসকদলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছাড়া জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলসহ অন্যান্য ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নেই বলে দাবি করেছে। সংগঠনগুলো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ক্যাম্পাসে সবার জন্য সমান সুযোগ সহাবস্থান নিশ্চিতের দাবি করে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান আছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একে এম গোলাম রব্বানী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সহাবস্থান রয়েছে। বর্তমানে ডাকসু নির্বাচন দেয়ার মতো পরিবেশ রয়েছে তা সবাই স্বীকার করে এবং এটি বাস্তবতা। তারপরও কেউ অভিযোগ করলে সহাবস্থানের বিষয়টি আমরা দেখবো।’ এ ছাড়াও ডাকসু নির্বাচনে প্রার্থীদের বয়স শিথিল করার লক্ষ্যে নিজ নিজ সংগঠনের প্রস্তাবনা তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনগুলো। বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজীর মানবজমিনকে বলেন, ‘সবার আগে ডাকসু নির্বাচনের জন্য সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এখনো পর্যন্ত ক্যাম্পাসের যে পরিবেশ তাতে সহাবস্থান আছে বলে আমরা মনে করছি না। আগামীকালকের (আজ) মিটিংয়ের পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি সত্যিকার অর্থে ৩১শে মার্চের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন করতে চান, তাহলে তাদেরই দায়িত্ব হবে সব ছাত্র সংগঠনের জন্য সহাবস্থান ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।’ তিনি বলেন, ‘গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমাদের একটি বিষয় নজরে এসেছে যে ডাকসুর প্রেসিডেন্ট চাইলে একক সিদ্ধান্তে যেকোনো কিছু করতে পারে। এটা আমাদের কাছে অগণতান্ত্রিক মনে হয়েছে। এটা সময়ের প্রেক্ষিতে পর্যলোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এটা স্বৈরতান্ত্রিকও বটে। এটা নিয়ে বিবেচনা করার সময় হয়েছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে যে প্রার্থিতা। যেহেতু গত ২৮টি বছর ডাকসু নির্বাচন হয়নি, ফলে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে প্রশাসন কিছুটা আইন শিথিল করতে পারে কিনা, সেই বিষয়ে প্রস্তাবনা থাকবে।’ ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার মানবজমিনকে বলেন, ‘আমাদের প্রথম দাবি হচ্ছে- সব ছাত্র সংগঠনের জন্য সহাবস্থান নিশ্চিত করা। সবাই যেন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ারভাবে নির্বাচনের কাজ করতে পারে। সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকে। এর আগে পরিবেশ সংসদের একটি সভা হয়েছে। সেখানে আমাদের প্রতিনিধিরা গিয়েছিলেন। কিন্তু যেভাবে পাহারা দিয়ে আমাদের ক্যাম্পাসে নেয়া হয়েছে, এর থেকেই প্রমাণ হয় যে সহাবস্থান নেই। এভাবে এলে নির্বাচনের পরিবেশ হয় না। আমরা চাই আগে সহাবস্থান, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হোক।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ডাকসুর গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করেছি। দীর্ঘদিন যেহেতু ডাকসু নির্বাচন হয়নি, সেহেতু এর গঠনতন্ত্রে অনেকগুলো বিষয় রয়েছে যা সংশোধন করা এখন সময়ের দাবি। প্রার্থীদের বয়সের বিষয়টিও আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়াও অনেকগুলো বিষয় যুগোপযোগী করা দরকার বলে আমাদের মনে হয়েছে। আমরা সেগুলো মতবিনিময় সভায় তুলে ধরবো।’ ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন মানবজমিনকে বলেন, ‘আমাদের গঠনতন্ত্র নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা থাকবে। কিন্তু আমরা চাই গঠনতন্ত্র যুগোপযোগী, আধুনিক ও অ্যাকাডেমিক হোক।’ তিনি বলেন, ‘কালকের মিটিংয়ে আমরা অংশগ্রহণ করবো সর্বোচ্চ ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে। কারণ, আমরা জানি যে দীর্ঘ তিন দশক যাবৎ নির্বাচন না হওয়ার কারণে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ হতে পারে। আমরা যে প্রস্তাবনাই দিয়ে থাকি, আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে যেন ডাকসু নির্বাচন হয়। এতে কে বিজয়ী হবে কে প্রার্থী হবে এটা আমাদের কাছে একেবারেই মুখ্য বিষয় নয়। আমরা চাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটাধিকার ফিরে পাক। সে জায়গা থেকে আমরা সর্বোচ্চ উদারতা, গণতান্ত্রিক মানসিকতা এবং সর্বোচ্চ ছাড় দেয়ার মানসিকতা নিয়ে গঠনতন্ত্র সংশোধন বিষয়ক মতবিনিময় সভায় অংশ নিবো।’
উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর থেকে বন্ধ রয়েছে জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির কারখানা হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচন। বিভিন্ন সময় ভিসিরা উদ্যোগ নিয়েও ডাকসু নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

ছেলেতে ছেলেতে প্রেম ও বিয়ে, অতঃপর... by রুদ্র মিজান

পিনু জামান ও মাহমুদ হাসান। দু’জনেই ছেলে। বন্ধুত্ব থেকে দু’জনের সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে। এখানেই শেষ না, বিষয়টি পৌঁছে যায় বিয়ের আলোচনা পর্যন্ত। বিয়ের শপিং করা হয়েছিল লাখ লাখ টাকার। আমন্ত্রণ করা হয়েছিল বহু আত্মীয়স্বজনকে। পারিবারিকভাবেই সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন হাসান। ঘটনাটি ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়।
বাস্তব এই ঘটনাটি হার মানিয়েছে ফিল্মের কাহিনীকেও। তবে এই গল্পের সমাপ্তিটা মোটেও সুখকর না। স্বপ্ন ও বিশ্বাসভঙ্গের মধ্য দিয়ে এর শেষ। শেষ দৃশ্যে প্রকাশিত হয় ভালোবাসার মানুষের আসল চেহারা। তিনি মূলত একজন প্রতারক।
মাহমুদ হাসান দেশের বাইরে লেখাপড়া করেছেন। দেশে ফিরেই ব্যস্ত হন নিজের কাজ নিয়ে। ফিল্ম ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন। প্রতিদিনই সুন্দরী তরুণীদের সঙ্গে সময় কাটে। কাজে, বন্ধুতায়, আড্ডায়। কিন্তু কেউই তার মন ছুঁয়ে যেতে পারেননি। সুদর্শন মাহমুদ হাসানের সঙ্গে বেশ আগেই পরিচয় হয়েছিল পিনু জামানের। জামান নিজেকে একজন ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দেন। রাজধানীর একটি খ্যাতনামা মেডিকেলে কর্মরত বলে জানান তিনি। ডাক্তার জামানের প্রতিই আকৃষ্ট হন সুদর্শন হাসান। তবে ভালোবাসার এই মানুষটিকে কখনও সরাসরি দেখেননি তিনি। কথা হতো ফোনে। চ্যাট হতো ম্যাসেঞ্জারে। সম্পর্কের সূত্রপাত ফেসবুকের মাধ্যমে।
রাত জেগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন তারা। সারাদিনের কার্জ-কর্ম, কৌতূক, আদর-আহলাদ কোনো কিছুই বাদ যেত না তাদের। দেখা না হলেও জামানের প্রতি এতটুকু ভালোবাসার কমতি ছিল না হাসানের। খাওয়ার আগে একটা কল দিয়ে জেনে নিতেন জামান খেয়েছেন কি-না। অথবা খাওয়া হয়ে গেলে কোথায় কি খেয়েছেন। বিশেষ কোনো সমস্যা হলে ফোনে ফোনে সমাধানের চেষ্টা করতেন। এমনকি আর্থিক সমস্যাও সমাধান করে দিতেন হাসান। দামি দামি গিফট পাঠাতেন পিনু জামানকে। লোক মারফত এসব গিফট পাঠাতেন হাসান। মাঝে-মধ্যেই জামানকে দেখতে ব্যাকুল হয়ে যেতেন তিনি। জামান তাকে বুঝাতেন- বিয়ের আগে দেখা না। এতে আকর্ষণ থেকে যাবে। এই আকর্ষণ ধরে রেখেই হাসানের বাসরে যাবেন জামান। ইউরোপে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হাসানও এক সময় মেনে নেন, বিয়ের আগে দেখা না।
পরিবার থেকে হাসানকে বিয়ে করতে চাপ দেয়া হচ্ছিল।  একপর্যায়ে হাসান জানিয়ে দেন, তার সঙ্গে পিনু জামানের প্রেমের সম্পর্কের কথা। যে কোনোভাবেই তাকেই বিয়ে করতে চান তিনি। পরিবারের তীব্র আপত্তি। কিন্তু হাসান তা মানতে নারাজ। তিনি তার ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে সংসার করতে চান। একপর্যায়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রাজি হয়ে যান মাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। হাসানের পরিবারের সদস্যরা কথা বলেন জামানের সঙ্গে। জামান প্রথমে বিয়ের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। কিন্তু হাসানের আগ্রহ ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি সম্মতি জানান। গত ২১শে সেপ্টেম্বর ছিল বিয়ের নির্ধারিত দিন।
বিয়ে উপলক্ষে বাসায় বর্ণিল সাজসজ্জা। বিপুল টাকা ব্যয় করে শপিং করা হয়। পিনু জামানের জন্য ক্রয় করা হয়  ৬ লাখ টাকার গহনা। নানা ধরনের ১২ লাখ টাকার কেনাকাটা করা হয়। জামানের কাছে পাঠানো হয় ১০ কেজি মিষ্টি ও ১২ হাজার টাকা মূল্যে কেনা শাড়ি। বিয়ের দিন এই শাড়ি পরতে হবে জামানকে। সেইসঙ্গে পাঠানো হয় দামি মোবাইলফোন, ঘড়ি ইত্যাদি।
বিয়ের আগের দিন ঘটে ঘটনা। জামানের বাসায় যেতে চান হাসানের পরিবারের সদস্যরা। এতদিন গিফট আদান প্রদান হচ্ছিল জামানের পক্ষের এক ব্যক্তির মাধ্যমে। জামানের বাসার ঠিকানা নেই হাসানের কাছে। ঠিকানা চাইলে শান্তিনগর, সিদ্ধেশ্বরী রোডের একটি অসম্পূর্ণ ঠিকানা দেয়া হয়। এমনকি রহস্যজনকভাবে বিয়ে ভাঙ্গার নানা বাহানা করতে থাকে জামান।
সন্দেহ ঘনীভূত হয়। তারপরই সহযোগিতা নেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সেইসঙ্গে নিজস্ব বিভিন্ন সোর্সের। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রহস্য উন্মোচন হতে থাকে। আর হতভম্ব হন হাসান ও তার পরিবারের সদস্যরা। এ বিষয়ে হাসানের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে,  পিনু জামান যে ছেলে এটা জানা ছিল না হাসানের। পিনু জামান একজন যুবক হলেও তিনি হুবুহু মেয়ে কণ্ঠে কথা বলতে পারেন। ফেসবুকে নন্দিনী চৌধুরী নামে একটি আইডি পরিচালনা করতেন পিনু জামান। নিজেকে মেয়ে পরিচয় দিয়েই হাসানের সঙ্গে প্রেম করেছিলেন। হাসানের কাছ থেকে দামি দামি গিফট গ্রহণ করেছিলেন।
বিষয়টি জানাজানির পর কলাবাগান থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলার তদন্ত করে সিটিটিসি’র সাইবার ক্রাইম ইউনিট। গ্রেপ্তার করা হয় নন্দিনী চৌধুরী নামের পিনু জামান সিদ্দিকীকে। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য দিয়েছে  জামান। হাসান ছাড়াও বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে মেয়ে সেজে, কথা বলে নানা গিফট আদায় করেছে। লুটে নিয়েছে নগদ টাকাও। পিনু জামানের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের পূর্ব মেড্ডায়। সে গাজীপুরের একটি ডায়িং মিলে প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিল।

চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের বিপক্ষে বৃটিশ পার্লামেন্ট

খসড়া ব্রেক্সিট চুক্তি, নয়তো কোনো চুক্তি ছাড়াই বিচ্ছেদ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ তথা  ব্রেক্সিট ইস্যুতে বৃটিশদের সামনে এ দুইটি পথ খোলা রেখে এগোচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’। খসড়া ব্রেক্সিট চুক্তির বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে বৃটেনে সমালোচনার ঝড় বইছে। চেকার্সের ওই খসড়া চুক্তির সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করে ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন বৃটিশ সরকারের প্রভাবশালী একাধিক মন্ত্রী। এবার চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বৃটিশ এমপিরা। পার্লামেন্টে মঙ্গলবার একটি অর্থ বিলে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটকে বাধার মুখে ফেলবে এমন সংশোধনী আনার জন্য ভোটাভুটি হয়। এতে ৩০৩-২৯৬ ভোটে এমপিরা জানিয়ে দেন, তারা চুক্তি ছাড়া বৃটেনের ইইউ ত্যাগ মেনে নেবেন না। আর এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’ পার্লামেন্টে লজ্জাজনক পরাজয়ের মুখে পড়লেন।
অর্থাৎ তার কোনো বিকল্পের ওপরই আস্থা রাখতে পারছেন না বৃটিশরা। আগামী ১৫ই জানুয়ারি খসড়া ব্রেক্সিট চুক্তির ওপর ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, ওই ভোটেও বড় ব্যবধানে হারবেন প্রধানমন্ত্রী।
বৃটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, নিজ দলীয় ও লেবার পার্টির এমপিদের কাছে লজ্জাজনক হারের মুখোমুখি হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’। এসব এমপি চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের ক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট রোধ করতে লেবার পার্টির এমপি ইভেতি কুপার মঙ্গলবার একটি অর্থ বিলে সংশোধনী আনার প্রস্তাব দেন। এ সংশোধনীতে বৃটিশ প্রশাসনের ক্ষমতা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের পর কর আইনে পরিবর্তন করার জন্য বৃটিশ প্রশাসনকে পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতে হবে। শুধুমাত্র প্রশাসনিক ক্ষমতা এক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে না। এ ছাড়া এই বিলের কারণে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট প্রতিরোধে পার্লামেন্টের আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবারের ভোটে কনজারভেটিভ পার্টির ২০ সদস্য সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এদের মধ্যে সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মাইকেল ফ্যালন ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী জাস্টিন গ্রিনিংও রয়েছেন। এদিন কনজারভেটিভ পার্টির এমপি অলিভার লিটউইন এক আবেগঘন বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি আমার সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছি। অনেকটাই আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। মার্চের শেষ পর্যন্ত আমি এটাই করে যাবো।’
সংস্কার বিল পাস করানোর ক্ষেত্রে যারা বেশি উদ্যমী ছিলেন, তাদের মতে এই বিল হয়তো চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের প্রস্তুতিতে তেমন প্রভাব ফেলবে না। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পার্লামেন্ট সদস্যদের উজ্জীবিত করা যে, এখানে চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট রুখে দেয়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। পার্লামেন্টে ভবিষ্যতে উত্থাপিত বিলগুলোতেও দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব পড়বে। হাউস অব কমন্সে দেয়া বক্তৃতায় লেবার পার্টির এমপি কুপার বলেন, পার্লামেন্টারিয়ানরা এখন চুক্তিবিহীন বিচ্ছেদের ভয়াবহতার বিষয়ে একমত। তিনি বলেন, আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম যে, হয়তো সফল হবো না। পার্লামেন্ট হয়তো চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিট রুখে দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে না। এ অবস্থায় আমাদের কিছু দায়িত্ব পালন করা দরকার।

হঠাৎ বেড়েছে হত্যা, নৃশংসতা by শুভ্র দেব

সারা দেশে হঠাৎ করেই বেড়েছে হত্যাকাণ্ড-নৃশংসতা। বিদায়ী বছরের শেষ সময়ে সারা দেশেই অপরাধপ্রবণতা অনেকটা কম ছিল। কিন্তু নতুন বছরের শুরু থেকে অপরাধ ও অপরাধীদের তৎপরতা অনেকটা বেড়ে গেছে। গত নয়দিনে সারা দেশে শতাধিক হত্যাকাণ্ড ও নারী শিশু ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অপরাধ বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, দিনের পর দিন অপরাধীদের মানসিকতা বিকৃত হয়ে যাচ্ছে। আর পেছনে কাজ করছে মাদকের কুফল। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার লোভ, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া, সম্পত্তির লোভ, হিংসা-প্রতিহিংসা, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক স্খলনের কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, যেকোনো ধরনের অপরাধ ও অপরাধীদের দমন করতে পুলিশ তার সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে।
যখনই কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় তখনই পুলিশ সেই ঘটনার তদন্ত শুরু করে। পুলিশ সবসময়ই চেষ্টা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে আসামিকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে।
৩০শে ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের দিন রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় গণ ধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ। তার স্বামী সন্তানকে বেঁধে নির্যাতনের পাশপাশি ওই নারীকে দল বেঁধে ধর্ষণ করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সারা দেশে ব্যাপক নিন্দার ঝড় উঠে। যদিও পরে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ৩০শে ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন সারা দেশে সহিংসতায় অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনের আগে প্রচার প্রচারণা চলার সময় রাজনৈতিক সংহিসংতায় মারা যায় আরও কয়েকজন।
সর্বশেষ গত সোমবার ঢাকার ডেমরা এলাকায় ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুই শিশুকে হত্যা করে দুই দৃর্বৃত্ত। এ ঘটনায় জড়িত দুজনকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই ধরনের অন্য একটি ঘটনা ঘটেছে গেন্ডারিয়া এলাকায়। ওই এলাকায় দুই বছরের এক শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তিনতলা থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
৩রা জানুয়ারি রাজধানীর মিরপুর পল্লবী বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় নিজের বৃদ্ধ মাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে মাদকাসক্ত ছেলে। নিহত ওই নারীর নাম কাজল রেখা (৫০)। তিনি মিরপুর ৫নং ওয়ার্ড যুবদল নেতা  রহিমের দ্বিতীয় স্ত্রী। ৬ই জানুয়ারি রাতে মিরপুরে কামরুজ্জামান ওরফে সুমন নামের এক যুবক (৩০) দুর্বৃত্তদের হামলায় মারা যায়। হামলায় গুরুতর আহত হয় আরও দুজন। তারা আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। ওইদিন রাতে কামরুজ্জামান মিরপুরের প্যারিস রোডে তাদের নির্মাণাধীন ভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এসময় মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন যুবক তাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ৭ই জানুয়ারি  ডেমরার কোনাবাড়ীতে ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ৪ বছর বয়সী দুই শিশুকে হত্যা করেছে গোলাম মোস্তফা ও আজিজুল নামের দুই দুর্বৃত্ত। পাশাপাশি এলাকায় থাকতো এই দুই শিশু। তারা একই স্কুলে পড়তো। এ ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দুই জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গেন্ডারিয়া এলাকায় খিচুড়ি খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে দুই বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টা চালিয়েছিল ওই এলাকার ৪৫ বছর বয়সী নাহিদ। ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে সে ওই শিশুকে তিনতলার ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করে। এ ঘটনার পর এলাকাবাসীর বিক্ষোভ ও থানা ঘেরাও করে দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল অভিযুক্ত ব্যক্তির ১২ বছর বয়সী মেয়ে বাবার বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছে।
৮ই জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলায় নিচের ক্লাসের এক ছাত্রকে নাম ধরে ডাকতে নিষেধ করার জের ধরে মেহেদী (১৬) নামের এক শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। সর্বশেষ যশোরের মনিরামপুরে শিশু তারিফ হোসেনকে হত্যা করে অপহরণকারীরা। তাকে অপহরণ করে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সন্দেহভাজন অপহরণকারী মারা যায়। গতকাল রাজধানীর বংশালে ইউনূস নামের এক লন্ড্রি দোকানের কর্মচারী খুন হন ওই দোকানের আরেক কর্মচারীর হাতে। এ ছাড়া নোয়াখালীর সুবর্ণচরে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ভাতিজার হাতে চাচা দুলালের মৃত্যু হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম মানবজমিনকে বলেন, অপরাধ থেমে নাই। অপরাধীরা সবসময় অপরাধ করে যায়। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পরে সব মানুষই যখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ঠিক তখনই বেশ কিছু নৃশংস ঘটনা ঘটে গেল। বিশেষ করে শিশুদের ওপর বর্বরতা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। কারণ অপরাধীদের প্রথম টার্গেট থাকে শিশুরা। কারণ তারা কিছু বলতে পারে না, প্রতিবাদ করতে পারে না। সামান্য চকলেট বা অন্য কিছুর লোভ দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইনের জায়গাটা অনেক পলিটিক্যাল হয়ে গেছে। আইন ঠিকই আছে তবে যারা আইন প্রয়োগ করে তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে যান। আর যারা অপরাধ করে এসব সন্ত্রাসী বা দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক একটা সম্পৃক্ততা থাকে। ফলে তারা বারবারই হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন করেই যায় এবং ছাড় পেয়ে যায়। আমাদের দেশের পুলিশ অন্যান্য কাজ যত দ্রুততার সঙ্গে করতে পারে যখন কোনো হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তখন তাদের এত দ্রুততা আমরা দেখতে পাই না। তাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আমাদের সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এজন্য আমি মনে করি অত্যন্ত কঠিনভাবে এগুলো দমন করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে দিয়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। না হলে এসব অপরাধ কমবে না। এ ছাড়া এসব ঘটনা কমাতে হলে মাদকের ভয়াবহত কমাতে হবে বলে মনে করেন এই সমাজবিজ্ঞানী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনের পরবর্তী সময় ও নতুন বছরের শুরুতে যেভাবে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে গেল সে তুলনায় নির্বাচনকালীন সময় ও তার আগে বড় ধরনের কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটেনি। কারণ ওই সময়টা রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সহনশীল আচরণ করে থাকে। ভোটের হিসাব নিকাশের কথা চিন্তা করে তারা তখন নিজেকে আদর্শবান ব্যক্তি বা দল হিসাবে প্রমাণ করতে চায়। সেই ভোটের হিসাবের সঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়া বা না যাওয়ার বিষয়টি কাজ করে। ওই সময়টাতে যে একপক্ষের সঙ্গে আরেক পক্ষের মনমালিন্য হয়নি বিষয়টি এমন না। তখনও সহিংসতা হওয়ার মতো অনেক বিষয় ছিল। ঘটনার ইস্যু তৈরি হয়েছে তবে সহিংসতার দিকে যায়নি। তিনি বলেন, এ বছরের শুরুতেই অনেকগুলো ঘটনা আমাদের চিন্তিত করে তুলছে। বিশেষ করে নোয়াখালীতে যে ঘটনা ঘটেছে সেটি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের আচরণের নেতিবাচক ইঙ্গিতের জানান দেয়। এর বাইরে বেশ কিছু সামাজিক নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেরকম তৎপরতা ছিল সেটি এখন অনেকটা শিথিল হয়েছে। আর এই সুযোগেই সামাজিক অপরাধ বেড়ে  গেছে। তৌহিদুল হক বলেন, মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা সবসময়ই থাকবে। সেগুলো পরস্পর সহনশীলতা, সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দেশের প্রচলিত আইন মোকাবিলা করা সম্ভব।

ওয়াশিংটন গেলেন মিলার by মিজানুর রহমান

ঢাকায় দায়িত্ব নেয়ার ১ মাস ১০ দিনের মাথায় ওয়াশিংটনে গেলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। গতকাল তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ছেড়ে গেছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো রাষ্ট্রদূতের ওয়াশিংটন যাত্রার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কী কারণে চটজলদি তার যেতে হলো তা এখনো অস্পষ্ট। একটি সূত্র অবশ্য দাবি করেছে, স্টেট ডিপার্টমেন্টে জরুরি আলোচনা বা কনসালটেশনের জন্য রাষ্ট্রদূত গেছেন।
তবে সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতদের বার্ষিক সম্মেলন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ‘রাজনৈতিক আলোচনা’র কর্মসূচিও রয়েছে। সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সব মিলেই রাষ্ট্রদূত মিলার জরুরিভিত্তিতে ওয়াশিংটন যাচ্ছেন বলে সরকারকে আগে জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক। আগামী ২২শে জানুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রাজনীতি বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ডেভিড হ্যালের সঙ্গে সচিবের বৈঠকের সূচি নির্ধারিত হয়েছে। ওয়াশিংটনে সেই বৈঠক হবে।
সেখানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত আল রবার্ট মিলারও উপস্থিত থাকছেন। বৈঠকে ৩০শে ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে আলোচনা হবে বলে আভাস দিয়েছেন ঢাকার কর্মকর্তারা। তারা এ-ও জানান, ওই বৈঠক এবং রাষ্ট্রদূতের ওয়াশিংটন যাত্রাকে সামনে রেখে গত ২রা জানুয়ারি আর্ল রবার্ট মিলার পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। সেখানে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয় এবং ওয়াশিংটনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন আর্ল মিলার। নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভেশন থাকলেও তারা বাংলাদেশ তথা সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করে যাবে বলে আগেই স্পষ্ট করেছে।
ভোটদানে বিরত রাখাসহ নির্বাচনে যেসব অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বলা হয় এমনটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। অনিয়মের বিষয়ে সব পক্ষকে নিয়ে গঠনমূলকভাবে সমাধান করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোরালো আহ্বানও জানায় ওয়াশিংটন। ঢাকার একাধিক কর্মকর্তা মানবজমিনকে গতকাল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক যাই হোক না কেন, দু’দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভীত অনেক শক্তিশালী। একক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগেও দেশটির অবস্থান সবার উপরে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অগ্রাধিকার মেগা প্রকল্প ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্যাটেজি নিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর স্বতন্ত্র অবস্থান থাকলেও গোড়া থেকেই বাংলাদেশ এর সমর্থক।
বৈশ্বিক ওই প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভবান হতে পারে তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা চলছে। নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিলার ২৯শে নভেম্বর প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের কাছে পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন। বঙ্গভবনের ওই আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের জনগণ তথা এ অঞ্চল এবং বিশ্ব সমপ্রদায়ের স্বার্থেই দুই দেশের বন্ধন আরো সুদৃঢ় করার তাগিদ দেন রাষ্ট্রদূত।

চার দেশে আশ্রয় চাইলেন আলোচিত সৌদি যুবতী কুনুন

থাইল্যান্ডে অবস্থানকারী বহুল আলোচিত সৌদি আরবের যুবতী রাহাফ মোহাম্মদ আল কুনুন তৃতীয় কোনো দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তার এমন পছন্দের দেশের মধ্যে রয়েছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া অথবা বৃটেন। বর্তমানে তিনি থাই সরকারের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। তবে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক এজেন্সি ইউএনএইচসিআর তার বিষয়টি দেখাশোনা করছে। এরই মধ্যে থাইল্যান্ডে পৌঁছেছেন কুনুনের পিতা ও ভাই। কিন্তু তাদের সঙ্গে তিনি সাক্ষাত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
সম্প্রতি তিনি কুয়েত থেকে থাইল্যান্ডে আসেন।
সোমবার তাকে ব্যাংকক থেকে বিমানে করে কুয়েতে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু কুনুন দেশে ফিরতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তার পরিবার তাকে হত্যা করবে। কারণ, তিনি ধর্মের সমালোচনা করেন। সৌদি আরবে একে দেখা হয় নাস্তিক্যবাদ হিসেবে। আর এর শাস্তি হলো মৃত্যুদন্ড। এমন অজুহাতে তিনি ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে একটি হোটেলে নিজেকে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
ওদিকে রাহাফ মোহাম্মদ আল কুনুনকে তার পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হয়েছে। গত শনিবার তিনি যখন কুয়েত থেকে থাইল্যান্ডে আসেন তখন এই পাসপোর্টটি জব্দ করেছিলেন সৌদি আরবের একজন কূটনীতিক। পাসপোর্ট ফেরত পাওয়ার পর বিবিসিকে কুনুন বলেছেন, তিনি সুস্থ আছেন। আশা করছেন তৃতীয় কোনো দেশ তাকে আশ্রয় দেবে।
এরই মধ্যে সরাসরি টুইটারে টুইট করে তিনি সারা বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। নতুন একটি টুইট একাউন্ট খুলেছেন। দেড় দিনের মাথায় তা অনুসরণ করছেন ৫০ হাজার মানুষ।
কি কারণে আশ্রয় চাইছেন কুনুন?
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, আমার জীবন বিপদের মুখে। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো, আমাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে পরিবার।
সৌদি আরবের হেইল প্রদেশের আল সুলাইমি শহরের গভর্নর তার পিতা। তার পরিবারের এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না। তারা সবাই চান কুনুনের নিরাপত্তা। কুনুনের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্যান্য অধিকার বিষয়ক গ্রুপ।
কুনুন মূলত অস্ট্রেলিয়ার একটি ফ্লাইটে করে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার জন্য প্রথমে থাইল্যান্ড আসেন। টিকিটও সেভাবে করা। তার আশা ছিল, অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। কিন্তু থাইল্যান্ডে পৌঁছার পর তার পাসপোর্ট নিয়ে নেন সৌদি আরবের একজন কূটনীতিক। ফলে কুনুন আটকা পড়ে যান। শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। তিনি নিজেকে হোটেলের ভিতর অবরুদ্ধ করে ফেলেন। তারপর অনেক ঘটনা। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার সকালে নতুন করে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেন। এ সময় আশ্রয়ের জন্য বেছে নেন কানাডাকে।
তাকে সহযোগিতা দেয়ার জন্য ইউএনএইচসিআরের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছে অস্ট্রেলিয়া সরকার। সেখানকার স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ইউএনএইচসিআর প্রক্রিয়া সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করার পর আল কুনুনের পক্ষ থেকে যদি কোনো মানবিক ভিসার আবেদন আসে তা বিবেচনা করবে অস্ট্রেলিয়া। ওদিকে থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষ কুনুনকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফেরত না পাঠানোয় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ইউএনএইচসিআর।

এমন ইলেকশন হলে দেশে শান্তির ঢল নামতো by জাবেদ রহিম বিজন, মাহবুব খান বাবুল ও ইসহাক সুমন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) নির্বাচনী এলাকার আশুগঞ্জে স্থগিত ৩ কেন্দ্রে সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের মডেল সৃষ্টি করেছে নির্বাচন কমিশন। আর এই ব্যবস্থায় খুশি ভোটাররা। সোহাগপুর কেন্দ্রে সলিম মিয়া নামের এক ভোটার বলেন- এমন শান্তির ইলেকশন হলে বাংলাদেশে শান্তির ঢল নামতো। সোহাগপুর কেন্দ্রে ফারুক হোসেন বলেন- জীবনে অনেক ভোট দিছি। এমন অবস্থা কখনো পাইনি। গত ৩০ তারিখ কি অবস্থাডা না অইছিল। এরে মাইরালা, হেরে ধইরালা। কি যে ভয়াবহ কাণ্ড।
আজকের দিন একটা ইতিহাস।
গতকাল ওই তিন কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক শ’ সদস্য মোতায়েন করা হয়। ১২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৩জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দায়িত্ব পালন করেন এসব কেন্দ্রে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে আসা ৩ জন কর্মকর্তাও সার্বক্ষণিক উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রে। তবে ভোটারের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। ৩ কেন্দ্রের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গোটা উপজেলাকে ঢেকে ফেলা হয় নিরাপত্তার চাদরে। ৩০ ডিসেম্বর ভোটের দিন নানা অনিয়মের অভিযোগে আশুগঞ্জ উপজেলার যাত্রাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সোহাগপুর দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাহাদুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। ওই তিন কেন্দ্রের ১০৫৭৪ জন ভোটারের ভোট গ্রহণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো। ৩৩৯ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয় কেন্দ্র ৩টিতে। পুলিশের ১৩টি মোবাইল টিম এবং ৭টি স্ট্রাইকিং ফোর্স কেন্দ্র তিনটি ছাড়াও টহল দেয় গোটা উপজেলা। একেক কেন্দ্রে ২৪ জন পুলিশ ও ১২ জন আনসার সদস্য নিয়োজিত করা হয়। এ ছাড়া ২ প্লাটুন বিজিবি ও ২ প্লাটুন র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার এ বিষয়টিও হয়ে উঠে দেখার মতো। প্রত্যেক কেন্দ্রের মাঠ ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের গাড়িতে ঠাসা। সোহাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. শফিকুর রহমান বলেন- সরকার এবং নির্বাচন কমিশন চাচ্ছে নির্বাচন যেন সুষ্ঠু হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সেজন্য সবধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
ভোটাররা খুশি এই নিরাপত্তায়। তবে ব্যাপক কড়াকড়ির কারণে এবং পরিচয়পত্র দেখিয়ে ভোট দেয়ার কথা বলায় ভোটার উপস্থিতি ছিল নগণ্য। তবে সোহাগপুর কেন্দ্রটিতে ভোটারদের উপস্থিতি সকাল ১০টা পর্যন্ত ছিল উল্লেখ করার মতো। এরপরই কেন্দ্রটি ফাঁকা হয়ে যায়। এর আগে প্রত্যেক সারিতে ৪০/৫০ জন করে ভোটার ছিল। বাহাদুরপুর কেন্দ্রে সকাল সোয়া ১০টায় পুরুষের ভোটের সারিতে ৫/৬ জন ভোটার দেখা গেছে। মহিলা সারিতেও ছিল একই অবস্থা। যাত্রাপুর কেন্দ্র সকাল থেকেই ছিল ফাঁকা। মাঝেমধ্যে ২/১ জন করে এসে ভোট দিয়েছেন। বেলা ১২টা পর্যন্ত এই কেন্দ্রে ভোট পড়ে ৯শ’। কেন্দ্রের মোট ভোটার ৩০১২। এই কেন্দ্র থেকে ভোট দিয়ে ফেরার পথে হালিমা বেগম (৭০) বলেন- আগের ভোটে বিরাট গ্যাঞ্জাম হয়েছে। কেন্দ্রের বাইরে অনেক ঝামেলা ছিল। ভোট দিতে ভয় পাইছি। সারাক্ষণ চিন্তায় ছিলাম না জানি কি হয়। এবার আগের অবস্থা আর নাই। খুব ভালো লাগছে। শান্তি পাইছি। এমন ভোটই আমরা চাই। সঙ্গে থাকা তার মেয়ে ফরিদা ইয়াছমিন (২৮) বলেন- প্রশাসনের এত লোক আগে কোনো সময় দেখিনি। এদের কারণেই আজকে নিরিবিলি ভোট দিলাম। আজকে কেন্দ্রে আসতে কোনো ভয় পাইনি। তাজুল ইসলাম (৭৩) নামের আরেক ভোটার বলেন-লোক একদম কম। এমন পরিবেশে জীবনে কোনোদিন ভোট দিতে পারিনি।
৩০ ডিসেম্বর এই আসনের মোট ১৩২ কেন্দ্রের মধ্যে ১২৯ কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে বিএনপির উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া পান ৮২ হাজার ৭২৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগ যুগ্ম সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবকলীগ সহসভাপতি মো. মাঈন উদ্দিন মইন ‘কলার ছড়ি’ প্রতীকে পান ৭২ হাজার ৫৬৪ ভোট। তাদের দু-জনের ভোটের পার্থক্য দাঁড়ায় ১০ হাজার ১৫৯। আর স্থগিত তিন কেন্দ্রে ভোট রয়েছে ১০৫৭৪টি।

সুবর্ণচরে গণধর্ষণ: সোহেল ও জসিমের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গণধর্ষণের ঘটনায় ২ আসামি সোহেল ও জসিম গতকাল বিকালে নোয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নবনীতা গুহের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা ৩০শে ডিসেম্বর রাতে জঘন্যতম বর্বরতার সঙ্গে জড়িত বলে স্বীকার করেছে। এ নিয়ে ৪ জন আসামি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলো। ডিবি অফিস সূত্র জানায়, রিমান্ডে থাকা ৭ জনের মধ্যে সোহেল ও জসিম ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় বেলা ২টায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেন মামলার ১নং আসামি সোহেল ও এজাহার বহির্ভূত আসামি জসিমকে আদালতে পাঠান।
এলাকার ভূমিহীন বিবি মরিয়ম (৫০) জানায়, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় রুহুল আমিনের প্রধান সহযোগী আবদুর রব, সুবর্ণচর উপজেলার এক কর্মী সিজার ও সেলিম আমাকে হুমকি দিয়েছে এলাকা ছেড়ে চলে না গেলে আমাকেও ঐ নির্যাতিতার মতো করবে। তারা এলাকায় এ বলে হুমকি দিচ্ছে কয়েক দিনের মধ্যে রুহুল আমিনকে বের করে তারপর সবাইকে এলাকা ছাড়া করবে। ভূমিহীন বিধবা মরিয়ম জানান, আবদুর রব হুমকি দিয়ে বলেছে মুখ খুললে আমার ৩ মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে এবং সরকার থেকে পাওয়া বাড়ি ও জমি দখল করবে। তিনি জানান, রুহুল আমিন মেম্বার, আবদুল খালেক, রুবেল, মনির ২০১৮ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর তার মেয়ে ইয়াসনুর বেগম (১৮) কে তার স্বামীর বাড়িতে নির্যাতন করে হত্যা করে। হত্যার পরদিন থেকে ৪-৫ বার চরজব্বর থানায় গেলেও ওসি মামলা না নিয়ে উল্টো ধমক দিয়ে থানা থেকে বের করে দিয়েছে।
পরে উপায় না দেখে ১৮-৯-২০১৮ নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মোহাম্মদ শামছুউদ্দিন খালেদের আদালতে মামলা করলে আদালত অভিযোগটি এফ.আই.আর হিসেবে প্রতিপালন প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেন।
এ আদেশ পাওয়ার পরও থানা পুলিশ অনেক ঘোরাঘুরির পর ১৪-১০-১৮ইং মামলা রেকর্ড করতে বাধ্য হন। তারপরও চরজব্বর থানা পুলিশের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও রুহুল আমিন বাহিনীকে রহস্যজনক কারণে গ্রেপ্তার করেনি। এলাকার আমেনা খাতুন (২৫) জানায়, রুহুল আমিন এ চরের যে মহিলার দিকে চোখ দিয়েছে তাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। তার ভয়ে কেউ মুখ খোলেনি।
কেউ থানা পর্যন্ত গেলে পুলিশের ধমক খেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। এভাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো ৮-১০ জন মহিলার সঙ্গে এ প্রতিনিধির কথা হয়েছে। রুহুল আমিন তাদের স্বামীদের ডেকে নিয়ে তার ক্লাব ঘরে আটকে রাখতো এবং তাদের বাড়ি গিয়ে দলবল নিয়ে মহিলাদের নির্যাতন করতো। যারা নির্যাতনে রাজি হতো না তাদের স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে ২০-২৫ হাজার টাকা দিতে হতো রুহুল আমিনকে। এ বছর সে ভূমিহীনদের জমি দখল করে একটি ব্রিকফিল্ড চালু করে। হাসপাতালের একজন ডাক্তার জানায়, পাশবিক নির্যাতনের শিকার গৃহবধূকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা পিজি হাসপাতালে দ্রুত নেয়া দরকার। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরজুবলি ইউনিয়নের মধ্য বাগ্যা গ্রামে ভোটের রাতে গণধর্ষণের শিকার নির্যাতিত গৃহবধূকে সকল ধরনের আইনি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে নোয়াখালী আইন সহায়তা কমিটি ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।
গতকাল দুপুরে নোয়াখালী প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ ঘোষণা দেয়া হয়। সংগঠনের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র দাস লিখিত বক্তব্যে বলেন, নির্যাতিত গৃহবধূকে সকল আইনি সহায়তা দেয়া হবে। সর্বোচ্চ আইনি সহায়তার মাধ্যমে ওই গৃহবধূর পাশে দাঁড়ানো হবে যাতে ধর্ষকরা কোনোভাবে যেন আইনের ফাঁকে বের হতে না পারে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের আইনজীবীদের নিয়ে আইনি সহায়তা কমিটি করা হয়েছে। আমরা সবসময় নির্যাতিত নারীদের পাশে আছি। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জেলা আহ্বায়ক ও সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) কাজী মানছুরুল হক খসরু, আইনি সহায়তা কমিটি নোয়াখালীর সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সহিদ উল্যা বাবু, সদস্য অ্যাডভোকেট রিপন চক্রবর্তী প্রমুখ।

ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয় ডেমরার দুই শিশুকে

সবেমাত্র বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল  তারা। পাশাপাশি বাসা হওয়ায় গড়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠতা। এক সঙ্গে খেলার ফাঁকে তাদের লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নিয়েছিল দুই দুর্বৃত্ত। দরজা বন্ধ করে তাদের লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়েও ছিল। এরপরই বেরিয়ে আসে তাদের আসল চেহারা। অবুঝ দুই শিশুকে তারা ধর্ষণ চেষ্টা চালায়। এতে তারা চিৎকার দিতে শুরু করলে ফারিয়া আক্তার দোলা ও নুসরাত ফারিয়াকে গলাটিপে ও শ্বাসরোধে হত্যা করে গোলাম মোস্তফা ও আজিজুল। গত সোমবার চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের হাতে ধরা পরে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছে খুনিরা।
গতকাল রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সাংবাদিকদের জানান পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে ডেমরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ফরিদ উদ্দিন বলেন, ঘটনার দিন লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ওই দুই শিশুকে বাসায় ডেকে নিয়ে যায় গোলাম মোস্তফা ও আজিজুল বাউনিয়া। ঘরের দরজা বন্ধ করে তারা প্রথমে লিপস্টিক দিয়ে নুসরাত ও ফারিয়াকে সাজিয়ে দেয়। এরপর মোস্তফা ও আজিজুল দুজনেই ইয়াবা সেবন করে। স্পিকারে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে তারা ওই দুই শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এসময় শিশুরা চিৎকার করতে থাকে। আশেপাশের লোকজন চিৎকার শুনে ফেলবে- এই ভেবে ফারিয়ার গলা টিপে ধরে আজিজুল। এক পর্যায়ে ফারিয়া মারা যায়। আর নুশরাতকে গলায় গামছা পেঁছিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে মোস্তফা। হত্যার পর আজিজুল পালিয়ে চলে যায়। আর মোস্তফা নিজে নুসরাত ও ফারিয়ার মরদেহ খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে।   
ডিসি বলেন, ওই দুই শিশুকে সকাল থেকে খুঁজে না পাওয়াতে এলাকায় মাইকিং করায় তাদের পরিবার। এলাকার বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাদের কোনো সন্ধান পায়নি নিখোঁজ দুই শিশুর পরিবার। সন্ধ্যার দিকে মোস্তফার পোশাককর্মী স্ত্রী বাসায় ফিরে তার স্বামীর অস্বাভাবিক আচরণ দেখতে পান। ঘরের মেঝেতে শিশুদের স্যান্ডেল পরে থাকতে দেখে তার সন্দেহ বাড়ে। এক পর্যায়ে তিনি ঘটনা জানতে পারেন। এসময় মোস্তফা ও তার স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। তাদের চিৎকার ও চেঁচামেচিতে আশেপাশের বাসিন্দারা ঘটনার কথা জেনে যায়। তখন বাসা থেকে পালিয়ে যায় মোস্তফা। প্রতিবেশীরা তখন পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে মোস্তফার বাসার খাটের নিচ থেকে নুসরাত ও ফারিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে। ডিসি বলেন, মোস্তফা ও আজিজুল সম্পর্কে চাচাতো ভাই। মোস্তফা সিরামিকের কারখানায় ও আজিজুল একটি বেকারিতে কাজ করতো।
পাশাপাশি তারা দুজন খুচরা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল ও নিজেরাও মাদকাসক্ত ছিল। এ ছাড়া তাদের দুজনের নামে যাত্রাবাড়ী থানায় ডাকাতির মামলা আছে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা এই কাজ করেছে। কারণ মোস্তফা আগে থেকেই আজিজুলকে ফোন করে ডেকে নিয়েছিল। এবং মূলত ধর্ষণের উদ্দেশ্যেই তারা শিশু দুটিকে লোভ দেখিয়ে নিয়ে যায়। অপরাধীরা শিশুদের কেন টার্গেট করছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ডিসি বলেন, মাদকাসক্তি ও বিকৃত মানসিকতার কারণে এমনটা হচ্ছে। এ ছাড়া অসচেতন অভিভাবকদের কারণেও এমনটা হচ্ছে। ৭ই জানুয়ারি সকাল থেকে নিখোঁজ থাকার পর রাত পৌনে ১০টার দিকে ফারিয়া আক্তার দোলা ও নুসরাত ফারিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।  দোলা কোনাপাড়ার সামিউল আহসান রোডের আট নম্বর লেনের ৮ নম্বর বাড়ির নিচ তলায় পরিবারের সঙ্গে থাকতো। সে পলাশ হাওলাদার ও পারভিন আক্তার দম্পতির মেয়ে। দোলা কোনাপাড়া একে আইডিয়াল স্কুলের নার্সারিতে লেখাপড়া করতো। আর নুসরাত একই এলাকার ফাহিমা বেগমের মেয়ে। দোলা ও নুসরাত দুজনেই সহপাঠী ও তারা পাশাপাশি বাসায় থাকতো। নুসরাত ঘটনার দিনে দোলার স্কুলেই ভর্তি হয়েছিল।

ইতিহাসের সেই দিন আজ

ঐতিহাসিক ১০ই জানুয়ারি। ইতিহাসের আবেগঘন এক দিন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন পা রাখেন স্বাধীন মাতৃভূমিতে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি সংগ্রামের সূচনা করেছিলেন এদিন এর সফল পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯৭২ সালের   এদিনে পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা প্রিয় নেতার আগমনে এদিন আবেগে কেঁপেছিল দেশের বাতাস। লাখ লাখ মানুষের আবেগমথিত অভ্যর্থনায় সিক্ত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
জনতার স্রোতে ভেসে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়ে বিমানবন্দর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) জনসভায় পৌঁছান বঙ্গবন্ধু।
সেখানে দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণে সবাই মিলে দেশ গড়ার ডাক দিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরের জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত পর পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে তাঁকে গ্রেপ্তার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে আটক রাখা হয়। ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে নয় মাস যুদ্ধের পর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে জাতি বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করে। জাতির পিতা পাকিস্তান থেকে ছাড়া পান ১৯৭২ সালের ৭ই জানুয়ারি ভোর রাতে। এদিন বঙ্গবন্ধুকে বিমানে তুলে দেয়া হয়। সকাল সাড়ে ৬টায় তিনি পৌঁছান লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে। বেলা ১০টার পর থেকে তিনি কথা বলেন, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেকের সঙ্গে। পরে ব্রিটেনের বিমান বাহিনীর একটি বিমানে করে পরের দিন ৯ই জানুয়ারি দেশের পথে যাত্রা করেন।
১০ই জানুয়ারি নামেন দিল্লিতে। সেখানে ভারতের প্রেসিডেন্ট ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সমগ্র মন্ত্রিসভাসদস্যসহ সাধারণ জনগণের উষ্ণ সংবর্ধনা পান তিনি। বঙ্গবন্ধু ভারতের নেতৃবৃন্দ এবং জনগণের কাছে তাদের অকৃপণ সাহায্যের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা হিসেবে।’ বঙ্গবন্ধু বিকালে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানানোর জন্য প্রাণবন্ত অপেক্ষায়। আনন্দে আত্মহারা লাখ লাখ মানুষ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত তাঁকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানায়। বিকাল পাঁচটায় রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেন। সশ্রদ্ধ চিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন। দেশে ফেরার পর ১২ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২৩ সদস্য বিশিষ্ট আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে।
১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ জারিকৃত প্রেসিডেন্সিয়াল আদেশ বলে গণপরিষদ গঠন করে নভেম্বর মাসের মধ্যেই দেশের জন্য একটি সংবিধান উপহার দেয়া হয় যা কার্যকর হয় ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, আজ সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে দলীয় ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন এবং বিকাল ৩টায় রাজধানীর ফার্মগেট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা।
এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়াও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের জন্য বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে আওয়ামী লীগ এবং সংগঠনের সব সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন কেন্দ্রীয় কমিটির অনুরূপ কর্মসূচির আয়োজন করেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে আয়োজিত আলোচনা সভাসহ সব কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের জন্য দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীসহ সংগঠনের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

রিকশা চালিয়ে পড়াশোনার খরচ যোগায় কাওসার

যে বয়সে হাতে থাকার কথা বই খাতা কলম আর অন্য ছাত্রছাত্রীদের মতো খেলাধুলা করার কথা সে বয়সে দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে  রিকশা চালিয়ে ও নিজের পড়াশোনার খরচ যোগায় ৯ম শ্রেণির ছাত্র কাওসার। সকালে ২ ঘণ্টা বিকালে ৪ ঘণ্টা রিকশা চালায় ১৩ বছরের শিশু মো. কাওসার (১৩)। পিতার নাম মো. ইব্রাহিম। গ্রামনাচনাপাড়া আমতলী সদর ইউনিয়ন। সে আমতলী সদর ইউনিয়নের মানিকঝুড়ি মাহমুদিয়া দাখিল মাদরাসার ৯ম শ্রেণির ছাত্র। সোমবার সকালে আমতলী নুতন বাজার বাধঘাট বটতলা থেকে  প্রেস ক্লাবে  আসার পথে কথা হয় কাওসারের সঙ্গে। কাওসার জানায়, পিতা ইব্রাহিম মা শাহিনুর বোন ফারজানা ও কাওসারকে নিয়ে চার জনের সংসার। চারজনের সংসারে উপাজনক্ষম পিতা ইব্রাহিম।
দিন মজুর রিকশা ও ইটখলায় কাজ করে পরিবারের ব্যয়বার বহন করেন। জমিজমা বলতে ৪ শতক বাড়িঘরসহ। বর্তমানে কাওসারের পিতা আমতলীর একটি ইটভাটায় কাজ করেন। গত ২-৩ মাস আগে হঠাৎ ইব্রাহিম অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থ হয়ে পরায় পরিবারের সদস্যরা  অনাহারে দিনাতিপাত করতে থাকে। এমনি সময়ে মানিকঝুড়ি দাখিল মাদরাসার ৯ম শ্রেণির ছাত্র কাওসার পরিবারের খাবার ও নিজের পড়াশোনার খরচের জন্য রিকশার হ্যান্ডেল ধরে। সকালে বিকাল ও রাতে  ৬ ঘন্টা রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করে সেই টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের খাবার ও নিজের পড়াশোনার খরচ যোগাড় করেন।  আমতলীর মানিকঝুড়ি দাখিল মাদরাসার সুপার তত্ত্বাবধায়ক মাওলানা মো. আবু তাহের বলেন কাওসার একজন ভালো ছাত্র ও অষ্টম শ্রেণির জেডিসি পরীক্ষায় ৪.৩৯ পেয়েছে। সে নিয়মিত ক্লাসে আসে। ওর কাছ থেকে আমরা মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কোনো প্রকার টাকা পয়সা নেই না। ও যেভাবে রিকশা চালিয়ে পড়ালেখা করেন এ যুগে  এ রকম ছেলে খুঁজে পাওয়া যাবে না।  আমতলী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো. আকমল হোসেন বলেন  খোঁজ নিয়ে  কাওসারকে  সার্বিক সুযোগ সুবিদা দেয়া হবে। আমতলী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. সরোয়ার হোসেন বলেন খোঁজ নিয়ে সরকারিভাবে সুযোগ সুবিধা নেয়া হবে।