Showing posts with label অমানবিক. Show all posts
Showing posts with label অমানবিক. Show all posts

Thursday, July 16, 2026

ইরানের ক্যানসার হাসপাতালে ‘বর্বরোচিত’ মার্কিন হামলা

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন ভারী বিমান হামলার কারণে একটি ক্যানসার হাসপাতাল খালি করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালটিতে যুক্তরাষ্ট্রের এমন বিমান হামলার ঘটনাকে ‘বর্বর হামলা’ হিসেবে উল্লেখ ইরান। খরব আলজাজিরার।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর ইসরাইলের নৃশংস হামলার কথা মনে করি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা। তিনি বলেন, বর্বরোচিত এই হামলায় হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের চরম ভোগান্তি ও আতঙ্কের মুখে পড়তে হয়েছে।”

তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে কেমোথেরাপি নেওয়া ২১১ জন রোগীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

তবে ইরানের এ অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের ক্যানসার হাসপাতালে ‘বর্বরোচিত’ মার্কিন হামলা

Tuesday, July 14, 2026

ডিআইজি আনিসের ‘জঙ্গি নাটক’ ৯ বছর পর নির্দোষ চার পরিবা by আবু সুফিয়ান

যশোরে চার পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ‘জঙ্গি’ নাটক মামলা দীর্ঘ ৯ বছর পর শেষ হয়েছে। জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের পর সম্প্রতি আদালত তাদের নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দিয়েছে। এ মামলায় ভুক্তভোগী তানজির আহমেদ, মো. মহিউদ্দিন, মেহেদী হাসান পাশা ও সাদ্দাম ইয়াসির সজলের জীবন ও ক্যারিয়ার তছনছ হয়ে গেছে।

তাদের অভিযোগ, এ মামলার নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছেন যশোরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ও পরবর্তী সময়ে রাজশাহীর ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, তার নির্দেশে তরুণদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলার পাশাপাশি আবু সাঈদ নামে বিএনপির এক কর্মীকে কথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। বিচারবহির্ভূত এ হত্যার অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট যশোরে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আবু সাঈদের স্ত্রী পারভীন খাতুন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান আহমেদ অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের খুলনা রেঞ্জ ডিআইজিকে (ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল) নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি যশোরের ধর্মতলা এলাকায় ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বিতর্কিত কর্মকর্তা আনিসের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় ‘পলায়নের’ অভিযোগে তাকে গত বছরের ৩০ জুলাই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

আনিস ২০১৪ সালের ২৪ মার্চ যশোরের পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত তিনি সে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০২৩ সালের ১৬ জুলাই রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

পলাতক থাকায় অভিযোগের বিষয়ে আনিসের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। যশোরে কর্মরত অভিযুক্ত ডিবি ও থানাপুলিশের সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের সন্ধানও মেলেনি।

তানজিরের পরিবারের ওপর নির্যাতন

তানজিরের পরিবারের নারী-শিশুসহ কোনো সদস্যই বাদ যায়নি পুলিশের সাজানো মামলার হয়রানি থেকে। ভুক্তভোগী তানজির জানান, ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তাদের বাড়িতে হানা দেয় ডিবি পুলিশ। তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। পুলিশ তার বড়ভাইকে তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক দেয়। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সদস্যদের তালিকা তৈরি করে পুলিশ তার দুই বোন এবং তাদের স্বামীদেরও সাজানো মামলায় আসামি করে।

তিনি আরো জানান, ২০১৬ সালের রমজানের এক রাতে পুলিশ আবারও তাদের বাড়িতে হানা দেয়। পুলিশ তাকে এবং তার মেজো বোনকে তিন বছরের বাচ্চাসহ ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। দীর্ঘ হয়রানি ও বন্দিদশায় জেলখানায় বসেই এইচএসসি পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন তানজির। ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পেলেও পুলিশের নিয়মিত নজরদারি ও ভয়ভীতি তাদের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে।

পুলিশের মামলার অভিযোগে বলা হয়, তারা অভয়নগরের একটি মাদরাসায় গোপন মিটিং করছিলেন। মামলায় তানজির, তার ভাই, দুই বোন ও দুলাভাইসহ পরিবারের সাত সদস্যকে আসামি করা হয়। জেল থেকে জামিনে বের হওয়ার পরও পুলিশ জেলগেট থেকে পুনরায় তানজিরকে ডিবি অফিসে তুলে নিয়ে যায়। একই সময়ে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়, জামিন পাওয়ার পর তানজির পলাতক। পরবর্তী সময়ে ঢাকা থেকে তার বড়ভাই ও মেজো বোনকে ধরে নিয়ে প্রায় ৪৫ দিন আটকে রাখা হয়। শেষে পুলিশ তাদের দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করিয়ে ‘স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ’-এর নাটক সাজায়। তারা দীর্ঘ হয়রানির শিকার হন। তানজির, তার ভাই, দুই বোন ও এক দুলাভাইকে কারাভোগ করতে হয়। দীর্ঘ ৯ বছরের এ অমানবিক ভোগান্তির অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট। হাসিনার পতনের পর আইনি লড়াই শেষে তানজিরের পরিবারের সদস্যরা সব মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

মহিউদ্দিনের পরিবারের বিভীষিকাময় দিন

চাঁচড়া পশ্চিমপাড়ার মো. মহিউদ্দিন এবং তার পরিবারও এ ‘জঙ্গি’ নাটকের শিকার। ২০১৬ সালে মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে জঙ্গি মামলা দিয়ে তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিসের নির্দেশে তার স্ত্রী ও শ্বশুর-শাশুড়িকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। মহিউদ্দিনের অভিযোগ, তার নববধূকে তুলে নিয়ে ডিভোর্স দিতে চাপ দেয় ডিবি পুলিশ। এমনকি মহিউদ্দিনের বাবাকেও গ্রেপ্তার করে একই জঙ্গি মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর মহিউদ্দিনের বাবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ও স্মৃতিশক্তি হারিয়েছেন। ৩৬ বছর বয়সি মহিউদ্দিন সরকারি চাকরির সুযোগ হারিয়ে বর্তমানে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন। আদালতের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণে এ পরিবারটিও মামলা থেকে বেকসুর খালাস পায়।

পাশাকে ক্রসফায়ারের হুমকি

২০১৫ সালে যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান পাশাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে ১১ দিন ডিবি হেফাজতে চোখ বেঁধে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। পাশার অভিযোগ, পুলিশের চরম হুমকিতে তাকেসহ অন্যদের ‘জঙ্গি’ হিসেবে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়।

তার ভাষায় ১৫-২০ জন পুলিশ তাকে ঘিরে ধরে ব্যাপক মারধর ও নির্যাতন করত। এক রাতে অভিযানের কথা বলে তাকে পুরো শহর ঘুরিয়ে ‘ক্রসফায়ারে’ মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়।

তিনি জানান, জামিন পেলেও দীর্ঘ ৯ বছর তাকে পুলিশের কড়া নজরদারিতে থাকতে হয়। যশোরের বাইরে যাওয়া ছিল নিষিদ্ধ। নিয়মিত পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে অপরিচিত ব্যক্তিরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করত। ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর তাকে সব মামলা থেকে খালাস দেয় আদালত।

আরেক ভুক্তভোগী সজলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ তার স্ত্রী ও ছয় বছর বয়সি সন্তানকে তুলে নেয়। পুলিশের দুর্ব্যবহারে সে শিশু আজও ট্রমার শিকার। সজলের স্ত্রী তখন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

মামলাগুলোর আইনি দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ৯ বছর ধরে কেন চলল? এমন প্রশ্নের জবাবে ভুক্তভোগী পাশার আইনজীবী মো. মাহমুদ কবীর কাকন বলেন, ‘তখনকার সরকারের চাপে পড়ে বিচারকের কিছুই করার ছিল না।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে প্রধানমন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। এরপর থেকেই আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি ডিআইজি আনিসকে। গোপালগঞ্জের সন্তান আনিসের স্ত্রী ফাতেমা তুজ্জহুরা শ্যামলী ছিলেন সংরক্ষিত আসনের এমপি।

ডিআইজি আনিসের ‘জঙ্গি নাটক’ ৯ বছর পর নির্দোষ চার পরিবা
ফাইল ছবি

গাজায় ১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা তহবিল দেবে ইইউ

ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত গাজা উপত্যকার পুনরুদ্ধার এবং জরুরি মানবিক সহায়তার জন্য প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ একটি বড় তহবিল ঘোষণা করেছে ইউরোপীয় কমিশন।

‘টিম গাজা ইনিশিয়েটিভ’ নামে এই উদ্যোগের আওতায় ১৫টি অংশীদার দেশের সহযোগিতায় ৮৮ কোটি ৩৬ লাখ ইউরোর একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের সমান। খবর আরব নিউজের।

সোমবার (১৩ জুলাই) ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ফিলিস্তিন দাতা গোষ্ঠীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।

ইউরোপীয় কমিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই তহবিলের অর্থ গাজার চলমান ও ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন কার্যক্রমে সরাসরি ব্যয় করা হবে। এর মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে এখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের পাশে অস্থায়ী তাঁবুতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই আর্থিক সহায়তা গাজার মানুষের খাদ্য, আশ্রয় ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একইসঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটির পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় কাটছে না মানবিক সংকট। ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় কাটছে না মানবিক সংকট। ছবি: সংগৃহীত

Saturday, June 13, 2026

পরিচয় থাকার পরও ‘বেওয়ারিশ’ দুলালী, রেখে গেলেন অনেক প্রশ্ন by মানসুরা হোসাইন

মা জানতেন না, তাঁর হারিয়ে যাওয়া মেয়ে রাজধানীর কোনো এক ফুটপাতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। ভাই জানতেন না, শেষবিদায়ের আগেই বোনকে বেওয়ারিশ হিসেবে কবর দেওয়া হবে। আর যে নারী নাম ভুলে গিয়ে নিজেকে ‘দুলালী’ বলতেন, তিনি হয়তো জানতেন না—তাঁর চিকিৎসার জন্য এক যুবক এক এক করে আটটি হাসপাতাল ঘুরেছেন, প্ল্যাকার্ড হাতে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পরিচয় মিললেও বাঁচানো যায়নি দুলালীকে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্বামীর ঘর ছেড়ে এসেছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখন থেকেই পরিবারের কাছে তিনি নিখোঁজ। মানসিক ভারসাম্যহীনতায় হারিয়ে ফেলেছিলেন নিজের আসল নাম—শামীমা নাসরিন জাহান। আর ঘর হারিয়ে ঠাঁই হয়েছিল রাজধানীর মিরপুরের একটি ফুটপাতে। অবহেলা, ক্ষুধা ও অসুস্থতায় মৃত্যু হয় তাঁর। পরে তাঁর লাশ দাফন করা হয় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুলালী রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়বদ্ধতা নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন রেখে গেছেন। মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো বা নতুন করে ভাবার বিষয়টি এখন সামনে এসেছে।

আট হাসপাতাল ঘুরে ঠাঁই হলো রাস্তার পাশে

গত ২২ মে সকালে মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের ৬০ ফিট সড়কের পাশে শামীমাকে দেখতে পান সমাজসেবামূলক সংগঠন হিরোজ ফর অলের ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মুছা করিম (রিপন)। হাড় জিরজিরে শামীমা কিছু খেতে পারছিলেন না।

চিকিৎসার জন্য দুজন নারী ভিক্ষুকের সহায়তায় শামীমাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নিয়ে যান মুছা করিম। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ আটটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁকে। কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে ভর্তি করা হয়নি, কোথাও অভিভাবক চাওয়া হয়েছে, কোথাও বলা হয়েছে রোগী সামলানো কঠিন। এ কারণে তাঁর স্থায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি।

মুছা করিম প্রথম আলোকে বলেন, কেরানীগঞ্জ থেকে কাজীপাড়ার এক্সিম ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করার পরও দুলালীকে রাখা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রোগী রুমে থাকতে চাইছেন না এবং পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাই মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের নিরাময় ক্লিনিকে নেওয়া হলে এনআইডি ও আইনগত অভিভাবক না থাকায় ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন শেল্টার হোমেও চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ৮ নম্বর হাসপাতাল হিসেবে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের সুপারম্যাক্স হেলথকেয়ার লিমিটেডে চিকিৎসা শুরু হলেও সেখানেও তাঁকে রাখা হয়নি।

শেষ পর্যন্ত অসহায় হয়ে ২৪ মে ধানমন্ডির একটি রাস্তার পাশে দুলালীকে রেখে আসতে বাধ্য হন মুছা করিম। একটি হোটেলে টাকা দিয়ে তাঁর জন্য তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করে যান তিনি।

এক প্ল্যাকার্ডে বদলে গেল দৃশ্য

দুলালীদের মতো মানুষ কেন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা পাবেন না, তা প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার উদ্যোগ নেন মুছা করিম। ২৭ মে গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে তিনি একাই দাঁড়ান একটি প্ল্যাকার্ড হাতে। তাতে ইংরেজিতে লেখা ছিল— ‘নো হেলথ উইথআউট মেন্টাল হেলথ।’ আর বাংলায় লেখা ছিল— ‘দুলালীকে বাঁচাতে চাই, দুলালী কেন চিকিৎসা পাচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাব চাই।’

এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দারের সহায়তায় ২৯ মে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় দুলালীকে। জিয়া উদ্দিন হায়দার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে হাসপাতালে দুলালীকে দেখতেও গিয়েছিলেন।

কিন্তু তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে দুলালীর। পরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) নেওয়া হয়। ৩১ মে সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।

মৃত্যুর পর মিলল পরিচয়, তবু দাফন ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে

জীবিত অবস্থায় কেউ জানতেন না তিনি কে। মৃত্যুর পর অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাঁর আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে পরিচয়। তাঁর নাম দুলালী নয়, শামীমা নাসরিন জাহান। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার সিদ্ধকাঠি গ্রামে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। শামীমার বাবার বাড়ির ইউনিয়নের নাম মোল্লারহাট। বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব একদম কাছে না হলেও খুব দূরেও না। যশোরের কেশবপুরেও তাঁর আরেকটি ঠিকানা পাওয়া যায়।

নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে শামীমার স্বামীরও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ পরিবারের সদস্যদের খুঁজতে শুরু করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এলাকায় গিয়েও কাউকে খুঁজে পায়নি। এ কারণে ৩ জুন রায়েরবাজার কবরস্থানে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।

এর দুদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর দেখে ৫ জুন ছুটে আসেন তাঁর ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা। ৭ জুন মেয়ের কবর দেখতে ঢাকায় আসেন মা।

‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পারলাম না’

শামীমার বড় ভাই মিজানুর রহমান ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে শামীমা ছিলেন দ্বিতীয়। তিনি নলছিটি ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছিলেন। বাবা আবদুল খালেক ২০১৭ সালে মারা গেছেন।

মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন থেকেই শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে কারও কোনো ক্ষতি করতেন না। একা থাকতে পছন্দ করতেন। এর আগেও বিভিন্ন সময় বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলেন। কখনো কোনো মাজারে পাওয়া যেত, আবার কখনো নিজেই চলে আসতেন। তাঁর স্বামী আলাদা বাসা ভাড়া করে তাঁকে রাখতেন।

তাঁর নাম দুলালী ছিল কি না জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, না; এমন কোনো নাম ছিল না। হয়তো তাঁর বোন নিজে থেকেই এ নাম বলেছিলেন।

আক্ষেপ নিয়ে শামীমার বড় ভাই প্রথম আলোকে বলেন, ‘বোনটাকে শেষ দেখা দেখতে পেলাম না, দাফন করতে পারলাম না। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হলো। এ কষ্ট সারা জীবন থাকবে। আমরা মুছা ভাই ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁরা না থাকলে আমাদের বোনটা ফুটপাতেই মরে পরে থাকত।’

স্বামীর নীরবতা

শামীমার স্বামী শহিদুল ইসলাম হাওলাদার নিজেও একজন পুলিশ সদস্য। বর্তমানে তিনি বরগুনার আমতলি থানায় পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শামীমা নিখোঁজ হওয়ার পর স্ত্রীকে খুঁজে পেতে তিনি থানায় জিডি করা বা অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করেননি বলে অভিযোগ করছেন শামীমার বাবার বাড়ির সদস্যরা।

স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় জিডি না করার বিষয়টি স্বীকার করে শহিদুল ইসলাম হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফেসবুকে শামীমার তথ্য জানতে জানতে তাঁকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়ে গেছে।’

শামীমার কখনো চিকিৎসা করিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে শহীদুল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে শামীমা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ও আমাকে সহ্য করতে পারত না। তাই চিকিৎসা করানোর জন্য শাশুড়িকে বলেছিলাম। তবে সন্তান না হওয়ার সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেছি।’

স্ত্রীর মরদেহ আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত নেবেন কি না—এ প্রশ্নের জবাবে শহিদুল বলেন, ‘এত দিনে মরদেহ নষ্ট হয়ে গেছে। আবার কবর খোঁড়াখুঁড়ি করতে গেলে লাশ থেকে গন্ধ বের হবে, সবাই বিরক্ত হবে। অনেক ঝামেলাও করতে হবে।’

প্রশ্নের মুখে পুলিশি অনুসন্ধান

৩১ মে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি যশোরের কেশবপুর ও ঝালকাঠির নলছিটি থানায় বেতার বার্তা পাঠিয়ে দুলালী ওরফে শামীমা নাসরিন জাহানের তথ্য জানাতে বলেন। তবে ১ জুন নলছিটি থানা জানায়, স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে শামীমা নাসরিন জাহান নামে কাউকে খুঁজে পাননি এএসআই আনিসুর রহমান।

কেশবপুর থানা থেকেও একই বার্তা আসে বলে জানিয়েছেন মুছা করিম।

তবে পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর নলছিটি থানায় শামীমাকে নিখোঁজ দেখিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তাঁর মা মোসা. মনোয়ারা বেগম। ৪৫ বছর বয়সী নাসরীন জাহানের (শামীমা বাদ ছিল) স্বামী শহিদুল ইসলাম বাবুলসহ অন্যান্য তথ্য উল্লেখ করা ছিল।

এই দম্পতি আনুমানিক ২৪ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন, বিবাহিত জীবনে সন্তান হয়নি। শামীমা মাঝেমধ্যেই স্বামীর বাড়ি থেকে মায়ের বাড়ি চলে আসতেন, কারও সঙ্গে মিশতেন না, মুঠোফোন ব্যবহার করতেন না—এসব তথ্যও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

জিডির আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শামীমা ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর কেনাকাটার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেননি। এলাকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, দীর্ঘদিন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির পর থানায় জিডি করা হলো। শ্যামলা, লম্বায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, কালো বোরকা গায়ে শামীমা বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তা–ও উল্লেখ ছিল।

নলছিটি থানার তৎকালীন ওসি মো. আ. সালাম এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এএসআই সনজীব কুমার পাহলানকে দায়িত্বও দিয়েছিলেন।

কিন্তু শামীমার মৃত্যুর পর পুলিশ পরিচয় শনাক্ত করলেও সেই জিডির সূত্র ধরে পরিবারকে খুঁজে বের করা যায়নি।

শামীমার ভাই মিজানুর বলেন, তাঁর মা আর ভাই নলছিটি থানার একদম কাছেই একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। পুলিশ ভালোভাবে চেষ্টা করলে তাঁদের খুঁজে পেতেন।

নলছিটি থানার বর্তমান ওসি আরিফুল আলম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দুজন কর্মকর্তা সারাদিন এলাকায় গিয়ে পরিবারটিকে খুঁজেছেন, কিন্তু কেউ তাঁদের চিনতে পারেননি। থানার অনলাইন জিডির তথ্যও পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোনো ঘাটতি ছিল না।

শামীমার মৃত্যুর পর থেকে বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফনসহ বিষয়টি দেখভাল করেছেন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিডি থাকার পরও পরিবারকে খুঁজে না পাওয়া দুঃখজনক এবং এ দায় নলছিটি থানা এড়াতে পারে না।’

এসআই সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, পরিবারের সদস্যরা এখনো চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় কবর থেকে লাশ তুলে আবার দাফন করতে পারেন। শামীমার মৃত্যুসনদে ‘দুলালী’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সনদ শামীমার মা এবং তাঁর স্বামী দুজনই চাচ্ছেন। কাকে দেওয়া হবে, তা সুরাহা হয়নি। তাই সনদটি এখনো হস্তান্তর করা হয়নি।

দুলালী বা শামীমা যে প্রশ্ন রেখে গেলেন


জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৮-১৯) বলছে, দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী মানুষের ১৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। এসব ব্যক্তির ৯২ শতাংশ চিকিৎসা নেন না। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্যনীতি, বাংলাদেশ ২০২২ বলছে, নারীরা পুরুষের তুলনায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় বেশি ভোগেন। মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ।

২০১৮ সালের মানসিক স্বাস্থ্য আইনে মানসিক রোগী ভর্তির জন্য এনআইডির বাধ্যবাধকতা নেই। বরং অভিভাবক, আত্মীয় বা ঠিকানাবিহীন মানসিক রোগীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির মাধ্যমে নিকটস্থ সরকারি মানসিক হাসপাতালের প্রধানের কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে শুরুতে শামীমাকে হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হয়নি কেন—এ প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে।

তবে পাবনা মানসিক হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে রোগী ভর্তিতে এনআইডি, নাগরিকত্ব সনদ, জন্মনিবন্ধন, ছবি, রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের উপস্থিতি ও অভিভাবকের এনআইডিসহ বিভিন্ন নথি চাওয়া হয়। অভিভাবকহীন রোগীদের আদালতের নির্দেশে ভর্তি করা হয়।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুন নাহার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক রোগী হারিয়ে গেলে, পালিয়ে গেলে, আত্মহত্যা বা সহিংসতার চেষ্টা করলে কিংবা অভিভাবক রোগীকে নিতে অস্বীকৃতি জানালে আইনগত প্রক্রিয়ায় এনআইডি ও ছবি প্রয়োজন হয়। এ কারণে ভর্তির সময় রোগীর ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়। তবে অভিভাবকহীন গুরুতর মানসিক রোগীরা জরুরি বিভাগ বা আউটডোরে এলে তাঁদের পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তির সময় মা–বাবা বা অভিভাবকের ছবি ও এনআইডি নেওয়া হয়।

তবে এ বিষয়ে বিকল্প আর কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ মনোচিকিৎসকদের নিয়ে সভা করার পরিকল্পনা আছে জানিয়েছেন সাইফুন নাহার।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিন্নমূল মানুষ হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাবেন না—এটা হতে পারে না। এটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি ত্রুটি। দুলালীর মৃত্যু রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারব্যবস্থার অনেকগুলো দিক সামনে এনেছে।

জিয়াউদ্দিন হায়দার আরও বলেন, এই নারী কেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন, পরিবারের সদস্যরা তখন কোন দায়িত্ব পালন করলেন, তা দেখতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, সংশ্লিষ্ট থানাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সব মিলে আইনের কোন কোন জায়গায় পরিবর্তন করতে হবে, তা দেখতে হবে।

মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখনো জানা যায়নি তিনি শামীমা নাসরিন জাহান
মানসিক ভারসাম্যহীন দুলালী। তখনো জানা যায়নি তিনি শামীমা নাসরিন জাহান। ছবি: মুছা করিমের সৌজন্যে

Tuesday, February 24, 2026

ভারতের ঝাড়খন্ডে কালোজাদুর অভিযোগে নারী ও তাঁর শিশুসন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা

প্রকাশ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খন্ডে ‘জাদুটোনা’ করার অভিযোগে এক নারী ও তাঁর ১০ মাসের শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার জ্যোতি সিংকু নামের ওই নারীকে পুড়িয়ে হত্যার সময় তাঁর স্বামীর ওপরও হামলা চালানো হয়। তিনি গুরুতর দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

এ ঘটনায় অন্য সন্দেহভাজনদের ধরতে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। ইতিমধ্যে, আটক হওয়া ব্যক্তিরা পুলিশ হেফাজতে আছেন। তাঁরা এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।

ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশটিতে কালোজাদু করা সন্দেহে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগই নারী।

মঙ্গলবার জ্যোতি সিংকু ও তাঁর শিশুপুত্রকে হত্যার ঘটনার কয়েক মাস আগে প্রতিবেশী বিহার রাজ্যে জাদুটোনার অভিযোগে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ আছে, তাঁদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।

এ ধরনের ঘটনা সাধারণত ভারতের দরিদ্র ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় বেশি দেখা যায়। এসব অঞ্চলের অনেকে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তা ছাড়া, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা না থাকায় সেখানকার বাসিন্দারা চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শের জন্য হাতুড়ে চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

ঝাড়খন্ড রাজ্যে কুদসাই নামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জ্যোতি সিংকুকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যের রাজধানী রাঁচি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে গ্রামটির অবস্থান। এখানে প্রায় ৫০টি মাটির ঘর রয়েছে।

গ্রামে ঘটা সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ওই সহিংসতাকে উসকে দিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ঘটনার মধ্যে আছে—হঠাৎ গবাদিপশুর মৃত্যু এবং পুস্তুন বিরুয়া নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির অসুস্থতা ও মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া গুজব।

পুস্তুন বিরুয়ার স্ত্রী জানো বিরুয়া বলেন, তাঁর স্বামী উদ্বেগজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন এবং বারবার অচেতন হচ্ছিলেন। এ অবস্থায় স্বামীর চিকিৎসার জন্য একজন হাতুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর শরণাপন্ন হন। যেসব গ্রামে সচরাচর চিকিৎসকদের পাওয়া যায় না, সেসব গ্রামে চিকিৎসার জন্য এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদেরই শরণাপন্ন হয়ে থাকে মানুষ। ওই স্বাস্থ্যসেবা কর্মী জানোকে বলেন, তাঁর স্বামী কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন না।

স্বামীকে হাসপাতালে না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে জানো বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, তাই এত দূরে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি।’

এদিকে গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে স্থানীয় বাসিন্দা জ্যোতি সিংকু জাদুটোনা করেন এবং ওই ব্যক্তির অসুস্থতার জন্য তিনিই দায়ী।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুস্তুন বিরুয়ার মৃত্যু হয়। আর সেই রাতেই হামলা হয় জ্যোতির বাড়িতে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জ্যোতির স্বামী কোলহান সিংকুর ভাষ্যমতে, প্রায় এক ডজন লোকের একটি দল তাঁদের বাড়িতে হামলা চালান এবং তাঁর স্ত্রী ও শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে মারেন।

হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে কোলহান বলেন, ‘বিষয়টি গ্রাম পরিষদে মীমাংসা করার জন্য আমি হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু হামলাকারীরা আমার কথা শোনেননি।’

কোলহান সিংকু ও তাঁর পরিবারের আরেক সদস্যের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে জেলা পুলিশ এ ঘটনায় হত্যা ও ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা করেছে।

পুলিশ বলেছে, চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হামলাকারী দলের অন্য সদস্যদের ধরতে একটি বিশেষ পুলিশ দল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে গ্রামীণ এলাকাগুলোয় বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হবে বলে জানায় পুলিশ।

জাদুটোনা করার সন্দেহে এই জায়গায় জ্যোতি সিংকু নামের ওই নারী ও তাঁর শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়
জাদুটোনা করার সন্দেহে এই জায়গায় জ্যোতি সিংকু নামের ওই নারী ও তাঁর শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

Sunday, July 20, 2025

গাজায় দুর্ভিক্ষে শুরু হচ্ছে মৃত্যুর ঢেউ: কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, ইসরাইলের উন্মাদ পরিকল্পনা

গাজা উপত্যকার চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শুক্রবার জানিয়েছেন, উপত্যকাজুড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের লক্ষণ মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। শত শত মানুষ চরম অপুষ্টি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, স্মৃতিভ্রংশ এবং চরম ক্লান্তিতে ভুগছে- যা দীর্ঘস্থায়ী অনাহারের সরাসরি লক্ষণ।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রচণ্ড তাপদাহ এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। এ খবর দিয়েছে ইসরাইলের প্রভাবশালী পত্রিকা অনলাইন হারেৎজ। গাজার আল-শিফা হাসপাতালে শুক্রবার কর্মকর্তারা জানান, শত শত রোগী মারাত্মক অনাহারের উপসর্গ নিয়ে আসছেন। তার মধ্যে বহু শিশু ও নবজাতকের অবস্থা সংকটাপন্ন। মুয়াসি মানবিক অঞ্চলের ফিল্ড হাসপাতালের পরিচালক ডা. সুহাইব আল-হামস সতর্ক করে বলেন, পুষ্টির অভাবে অঙ্গ বিকল হয়ে শিগগিরই মৃত্যুর ঢেউ শুরু হতে পারে। রাস্তায় পড়ে থাকা বহু মানুষকে আমরা এখানে আনছি, যাদের ওষুধের আগেই খাবারের প্রয়োজন।

হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকায় প্রায় ১৭০০০ শিশু ভয়াবহ অপুষ্টিতে ভুগছে। দুর্ভিক্ষে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২০ জনে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৬৯টি শিশু। শুক্রবার দেইর আল-বালাহ এলাকায় ১৮ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে সরাসরি পুষ্টি ঘাটতির কারণে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও গাজায় কার্যরত আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে হাসপাতালগুলোতে আর কোনো খালি বেড, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম বা ওষুধ নেই- ক্রমবর্ধমান রোগীর স্রোত সামাল দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে। মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, চলমান অবরোধ ও পর্যাপ্ত সাহায্যের অভাবই এই ক্ষুধা সংকটকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। অনেকেই গাজার পরিস্থিতিকে দারফুর ও সোমালিয়ার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

হামাস শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছে, গাজায় এই দুর্ভিক্ষ ও অবরোধ হলো মানবতার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপরাধ। তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে খাদ্য ও পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক ব্যর্থতার পর এখন একমাত্র সমাধান হলো একটি চুক্তি। হামাসের গণমাধ্যম শাখা ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, তারা গণহত্যার নৈতিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়- ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক বিচারের আওতায় আনার জন্য। >> হারেৎজের রিপোর্ট

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, অবৈধ নির্দেশ ও যুদ্ধাপরাধ: ইসরাইলের উন্মাদ পরিকল্পনা

গাজার দক্ষিণে মিশর সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৬ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক একটি বিশেষ শিবিরে (যা তারা ‘মানবিক শহর’ বলছে) আটকে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল গণউচ্ছেদ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি নয়, বরং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। কাটজ প্রকাশ্যে জানান, গাজার রাফাহ এলাকায় ৬ লাখ মানুষের জন্য একটি ঘনবসতিপূর্ণ ‘মানবিক শহর’ গড়ে তোলা হবে। সেখানে যেসব মানুষকে পাঠানো হবে, তাদেরকে হয় সেখান থেকে বিদেশে পাঠানো হবে অথবা খাবার ও পানির অভাবে থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীকে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন হারেৎজ।

ইসরাইলি সরকার পরিকল্পনাটিকে ‘মানবিক বলে প্রচার করলেও বাস্তবে এটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের আদলে তৈরি হবে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। সেখানে কোনো পর্যাপ্ত পানি, বিদ্যুৎ বা অবকাঠামো থাকবে না। মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে তাঁবুতে থাকতে হবে এবং এলাকা ছাড়ার অনুমতি থাকবে না। তবে শুধু বিদেশে চলে যাওয়ার শর্তে তাদেরকে সেখান থেকে ছাড়া হবে। ইসরাইলের ১৬ জন শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এক যৌথ চিঠিতে বলেছেন, এটি সুস্পষ্টভাবে অবৈধ আদেশ, যা ইসরাইলি সেনাদের কালো পতাকা নীতি অনুযায়ী অমান্য করার অধিকার আছে। তারা সতর্ক করেছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ‘যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার পর্যায়ে’ পড়তে পারে।

সামরিক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিখায়েল মিলস্টেইন বলেছেন, রাফাহ থেকে সমুদ্র পর্যন্ত যে ফিলিস্তিনি করিডোর, সেখানে ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষকে রাখা একেবারেই অসম্ভব। কোনো ঘরবাড়ি নেই, পানি বা বিদ্যুতের নেটওয়ার্ক নেই- ফলস্বরূপ মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্র হবে। এই পরিকল্পনা মিশরের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কায়রো ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, সীমান্তে এই ধরনের শিবির মিশরের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও খারাপ করছে। ইসরাইলের ভেতরেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি- একে জাতিগত নিধন এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মূলধারার মিডিয়াও ‘জনসংখ্যা পাতলা করা’ বা ‘কনসেন্ট্রেশন’ শব্দ ব্যবহার না করে পরিকল্পনাটি ব্যাখ্যা করতে পারছে না।

এ অবস্থায় প্রশ্ন থেকে যায় ১. এই পরিকল্পনা কি আদৌ বাস্তবায়িত হবে, নাকি সেনাবাহিনীর অনীহার কারণে থেমে যাবে? ২. যদি এগিয়ে যায়, তবে কি এটি গাজায় নতুন করে সামরিক শাসন কায়েমের পথ প্রশস্ত করবে, যেটি ধর্মীয় জায়নিস্ট মন্ত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করছেন? ৩. আন্তর্জাতিক আদালত ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো কি এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেবে, নাকি বিশ্ব আবারও নীরব থাকবে?

mzamin

Tuesday, December 10, 2024

সিরিয়ার সেদনায়া কারাগারে হাজারো মানুষের ভিড়, খোঁজ নেই প্রিয়জনদের

সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর দেশটিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সেদনায়া নামক গোপন সামরিক কারাগার। কুখ্যাত এই কারাগারে জড়ো হচ্ছেন হাজার হাজার সিরিয়ার নাগরিক। তারা খোঁজ নিচ্ছেন আসাদ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তাদের প্রিয়জনেরা এখনও সেখানে রয়েছেন কি-না। কিন্তু তারা হতাশ হচ্ছেন। কেননা যারা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাদের অনেকেরই কারাগারে কোনো চিহ্ন নেই। এ খবর দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি বলছে, সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদের পতনের পর হাজার হাজার জনতা প্রথম যে স্থানটিতে ছুটে যায় সেটি হচ্ছে সেদনায়া কারাগার। দীর্ঘ যন্ত্রণাদায়ক শাসনে পিষ্ট হওয়ার পর প্রিয়জনদের খোঁজে আসাদের ওই কুখ্যাত কারাগারটির গোপন বন্দিশালায় প্রবেশ করে জনগণ। এই কারাগারের ভয়াবহতার জন্য এটি ‘কসাইখানা’ নামেও পরিচিত ছিল। গত দুই দিন ধরে দামেস্কের অনতিদূরে অবস্থিত গোপন কারাগারটিতে কয়েক দশক ধরে নিখোঁজ থাকা প্রিয়জনদের খোঁজে জড়ো হচ্ছেন সিরিয়ার বহু নাগরিক। তবে কারাগারের ফটকগুলো ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে হতাশায় মূক হয়ে পড়েন অনেকেই। তারা বলছেন, তাদের মনে হয়েছে তারা অন্ধকার কোনো গুহায় প্রবেশ করেছেন। তাদের আশা ছিল তারা সেখানে প্রিয়জনদের মুখগুলোর খোঁজ পাবেন। কিন্তু সেখানে নিস্তব্ধ আর অন্ধকার কক্ষ ছাড়া কিছুই নেই।

রোববার বিদ্রোহীরা দামেস্ক দখলের পর সেদনায়া সামরিক কারাগার থেকে মাত্র কয়েক ডজন মানুষকে মুক্ত করা হয়। এরপর সেখানে আর কাউকেই খুঁজে পাওয়া যায়নি।

গদা আসাদ নামের এক নারী প্রিয়জনের খোঁজে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন সবাই কোথায়? কোথায় আমাদের সন্তানরা? নিজের ভাইকে খুঁজে পাওয়ার আশায় অসাদ সরকারের পতনের পর দামেস্কের বাড়ি থেকে রাজধানীর উপকণ্ঠে কারাগারে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি।

গদা বলেছেন, তার ভাইকে ২০১১ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। সেসময় তার ভাই আসাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ায় তাকে আটক করে আসাদ বাহিনী। এরপর থেকে তিনি আর ভাইয়ের খোঁজ জানেন না। ওই নারী বলেন, বিগত ১৩টি বছর ধরে আমার হৃদয় জ্বলছে। আমি ভাইকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।কান্নায় জর্জরিত এই নারী বলেন, গত সপ্তাহে যখন বিদ্রোহীরা আলেপ্পো দখলে নেন তখন আমি প্রার্থনা করছিলাম তারা যেন দামেস্কে পৌঁছান এবং কুখ্যাত এই কারাগারটি উন্মুক্ত করেন।

প্রিয়জনদের খোঁজ নিতে আসা লোকজনকে সহায়তাকারী সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারাও সেখানে কোনো বন্দি না থাকায় হতাশ হয়েছেন। তবে এর কোনো কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেননি তারা। প্রিয়জনদের খোঁজে আসা অনেকেই হাল ছেড়ে দিয়েছেন। সেদনায়া কারাগার আসাদ সরকারের নৃশংসতার প্রতীক বলে উল্লেখ করেছেন অনেকে। তারা বলছেন, রাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্রে এমন কারাগার থাকা সিরিয়ানদের ওপর বর্বর নৃশংসতার উজ্জ্বল প্রমাণ।
আসাদের শাসনামলে ২০১১ সালে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর আটক হওয়াদের সেদনায়া কারাগারে বন্দি রাখার ইঙ্গিত ছিল।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অনুমান বলছে, ২০১৭ সালে ১০ থেকে ২০ হাজার বন্দিকে আটক রাখা হয়েছিল আসাদের ওই কুখ্যাত কারাগারটিতে। কার্যকরভাবে এদের সকলকেই নির্মূলের জন্য আটক করা হয়েছিল বলে ধারণা মানবাধিকার সংস্থাটির।
মুক্ত হওয়া বন্দি এবং কারা কর্তৃপক্ষের বরাতে অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, কারাগারের অভ্যন্তরে গণহত্যায় নিহত হয়েছে অন্তত কয়েক হাজার বন্দি। প্রতিনিয়ত কারাবন্দিদের ওপর চালানো হতো ভয়াবহ নির্যাতন। এছাড়া প্রচণ্ড মারধর ও ধর্ষণের শিকার হয়েছে অনেক কারাবন্দি। প্রায় প্রতিদিনই এমন বর্বরতা চালাত কারারক্ষীরা। নির্মম এই অত্যাচারেও অনেক বন্দির মৃত্যু হয়েছে। দিনের পর দিন তাদের অভুক্ত রেখে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।

সিরিয়াতে এমন কোনো ঘর নেই বা এমন কোনো নারী নেই যিনি তার ভাই, সন্তান, স্বামী বা পরিবারের অন্য কাউকে না হারিয়েছে। এমনটি বলছিলেন আসাদ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হওয়া ৫৪ বছর বয়সী খায়রিয়া ইসমাইল নামের এক ব্যক্তি। বিক্ষোভের প্রথম দিকে তার দুই ছেলেকে আটক করা হয়। যাদের একজন এখনও নিখোঁজ।

২০১১ সাল থেকে সিরিয়ায় আটক বা নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখে পৌঁছেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। যাদের কয়েক হাজার বন্দিকে সেদনায়া কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল। তবে এই কারাগারে রাখা অনেক বন্দিরই কোনো হদিশ পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার।

mzamin

Monday, December 9, 2024

আসাদের পতন হতেই শিরোনামে সিরিয়ার কুখ্যাত 'সেদনায়া' কারাগার

হোয়াইট হেলমেট নামে পরিচিত সিরিয়ার সিভিল ডিফেন্স গ্রুপ বলেছে যে, তারা দেশের কুখ্যাত সেদনায়া কারাগার থেকে মুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া বয়ানের তদন্ত করে দেখছে। ভূগর্ভস্থ এই কক্ষে দীর্ঘদিন ধরে তাদের আটকে রেখে অত্যাচার চালানো হতো। এক্সে একটি পোস্টে গ্রুপটি বলেছে যে, তারা এই  কারাগারে পাঁচটি ‘বিশেষ দল’ মোতায়েন করেছে, যাদের সাহায্য করছে কারাগারের লে-আউটের সাথে পরিচিত একজন গাইড । বিদ্রোহীরা দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় বন্দিদের মুক্ত করা হয়েছে এমন কারাগারগুলোর মধ্যে সেদনায়া অন্যতম। দামাস্কাস প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, বন্দিদের মুক্ত করার সময় দেখা গেছে কারাগারের অবস্থা এমন দুর্বিসহ ছিল যে কিছু বন্দি বায়ুচলাচলের অভাবে প্রায় দম বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছিল। দামাস্কাস কান্ট্রিসাইড গভর্নরেট সোশ্যাল মিডিয়ায় আসাদ সরকারের প্রাক্তন সৈন্য এবং কারাগার কর্মীদের কাছে বিদ্রোহী বাহিনীকে ইলেকট্রনিক আন্ডারগ্রাউন্ড দরজায় কোড সরবরাহ করার জন্য আবেদন করেছে। তারা জানিয়েছে যে, সিসিটিভি মনিটরে দেখা যায় এমন ১ লক্ষ বন্দিকে  মুক্ত করার জন্য ইলেকট্রনিক আন্ডারগ্রাউন্ড দরজায় কোড প্রয়োজন। কারাগারের নীচের অংশে প্রবেশের প্রচেষ্টার ভিডিওটি অনলাইনে এবং আল জাজিরাসহ নিউজ আউটলেটের মাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।

অন্যান্য ফুটেজে দেখানো হয়েছে বন্দিদের মুক্তি দেয়া হচ্ছে, যার মধ্যে একটি ছোট শিশুকে তার মায়ের কাছে রাখা হয়েছে। তুরস্ক-ভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন অফ ডিটেনিস অ্যান্ড দ্য মিসিং ইন সেদনায়া প্রিজন (এডিএমএসপি) দ্বারা পোস্ট করা বন্দি মুক্তির একটি ভিডিওতে তাকে দেখানো হয়েছে। ভিডিওতে একটি  কণ্ঠস্বরকে বলতে শোনা যায়, ‘ভয় পাবেন না, আসাদ সরকারের পতন হয়েছে।’

এএফপি দ্বারা যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে যে সিরিয়ানরা সেদনায়া থেকে মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে তাদের আত্মীয়স্বজন ছিল কিনা তা দেখতে ছুটে আসছে, এই কারাগারে  আসাদ সরকারের অধীনে হাজার হাজার বিরোধী সমর্থককে নির্যাতন করা হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিদ্রোহী বাহিনী সিরিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, সরকারী কারাগার থেকে বন্দিদের  মুক্ত করেছে।

শনিবার হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) বলেছে যে তারা শহরটি দখল করার সাথে সাথে হোমস সামরিক কারাগার থেকে ৩৫০০ জনের বেশি বন্দিকে মুক্ত করেছে। সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নামগুলোর একটি হল সেদনায়া কারাগার। দামাস্কাসের কাছে এই জেলে বন্দি ছিলেন সরকার বিরোধী হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দি।

২০১১ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ শুরুর পর, সরকার বিরোধী প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে চালানো নিপীড়নের এক বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে সেদনায়া। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং সিরিয়ান অবজার্ভেটরি ফর হিউমান রাইটস -এর রিপোর্ট অনুসারে অনুমান  করা হচ্ছে, ২০১১ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নির্যাতন, চিকিৎসা সেবার অভাব বা অনাহারে ৩০ হাজারেরও জনেরও বেশি বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে বা মারা গেছে। মুক্তি পাওয়া কয়েকজন বন্দির বয়ান মোতাবেক ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে কমপক্ষে আরও ৫০০ বন্দিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেদনায়াকে ‘মানব কসাইখানা’ হিসাবে বর্ণনা করেছে। সেই সময়ে সরকার অ্যামনেস্টির দাবিগুলিকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘সত্য বর্জিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। জোর দিয়েছিল যে সিরিয়ায় সমস্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সেদনায়ায় নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন এবং গণহত্যা  ছিল স্বাভাবিক বিষয়। অনেকেই বহু বছর ধরে জানে না যে তাদের পরিবারের সদস্যটি এখনো জীবিত নাকি মৃত। এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষা থেকে বেঁচে যাওয়া একজন ওমর আল-শোগ্রে রবিবার বিবিসিকে বলেছেন, কিশোর বয়সে তিন বছরের কারাবাসের সময় তিনি কী নির্যাতন সহ্য করেছিলেন।

ওমর বলেন, 'আপনি সেখানে যে ব্যথা, একাকীত্ব, হতাশা অনুভব করবেন তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। তারা আমার চাচাতো ভাই, যাকে আমি খুব ভালোবাসতাম তাকে দিয়ে আমার ওপর নির্যাতন চালাতে বাধ্য করেছিল। অন্যথায়, আমাদের দুজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ভয় দেখানো হতো '। সিরিয়ার একটি মানবাধিকার নেটওয়ার্ক অনুমান করে যে ২০১১ সাল থেকে ১ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি লোককে এই পরিস্থিতিতে আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী লেবাননেও, সিরিয়ার অন্ধকূপে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ভয় বহু বছর তাড়া করে বেড়িয়েছে। আর তাই কয়েক দশকের অন্ধকার থেকে আলোতে উদ্ভাসিত হওয়া সিরিয়ার  এই মানুষগুলি এখনো বিশ্বাস করিতে পারছেন না যে আসাদ সরকারের পতন হয়েছে।  

সূত্র: বিবিসি

mzamin

Friday, November 29, 2024

‘বাঁইচে থাকা যে কত কষ্টের, তা আমার মতোন আর কেউ বুঝবে না’ by ইমতিয়াজ উদ্দীন

চার বছর ধরে রাস্তার পাশে খাস জমিতে ঝুপড়ি ঘর বেঁধে শিশুসন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের জোড়শিং গ্রামের স্বপ্না বেগম। নিচু দোচালা ঘরটির গা ঘেঁষে বয়ে গেছে একটি খাল। ভাঙাচোরা ঘরটির আসবাব বলতে তেমন কিছু নেই। কয়েকটি কাঁথা ও বালিশই সম্বল। ঘরটির মধ্যেই চলে রান্না ও ঘুম। মাটিতে কাঁথা-কাপড় বিছিয়ে কোনোরকমে রাত কাটান তাঁরা। স্বপ্নার স্বামী আবদুর রউফ গাজী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। এখানে আর তাঁদের খোঁজ নিতেও আসেন না।

গত বুধবার দুপুরে প্রচণ্ড রোদে খালের পাড় থেকে কাদামাটি তুলে ঘরের ভিত ঠিক করছিলেন স্বপ্না বেগম (৪২)। এ কাজে তাঁর সহযোগী ৯ বছরের মেয়ে মরিয়ম। নিচু ঘরটির মেঝেতে তখন থালায় ভাত নিয়ে বসে ছিলেন ছোট দুই ছেলে সাত বছরের আরিফুল ও পাঁচ বছরের রকিবুল। ঘরের সামনে অচেনা মানুষ দেখে এগিয়ে আসেন স্বপ্না বেগম। এ প্রতিনিধিকে জানান, তাঁর বড় ছেলে মেহেদী হাসানের (১৪) সামান্য রোজগারে সন্তানদের নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। কোনো দিন অর্ধাহারে, কোনো দিন থাকতে হয় অনাহারে।

জীবনের গল্প শোনাতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্বপ্না বেগম বলেন, ‘নিজির গতর খাটায়ে চার ছাওয়াল-মাইয়ের খাবার জোগাড় করতি হয়েছে। কখনো রাস্তার কাজে, কখনো মানুষির বাড়িতে ঝিয়ের কাজ, আবার কখনো গাঙে জাল টানতি হয়। শরিলি আর কুলাই ওঠে না। অসুখবিসুখ লাইগেই আছে। টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতি পারি না। বড় ছেলেটারে নদীতে পাঠাইছি। কয়দিন ধরে তার সামান্য রোজগারেই নুন-ভাত জোটে। বাঁইচে থাকা যে কত কষ্টের, তা আমার মতোন আর কেউ বুঝবে না।’

বলতে বলতে গলা ধরে আসে স্বপ্নার। মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায় ছোট ছেলেমেয়েরা। শিশুরা অপলক তাকিয়ে আছে। আঁচলে চোখের পানি মুছে স্বপ্না বলেন, ‘একখান ঘরের জন্যি অনেকের কাছে গেছি। সবাই খালি আশ্বাস দেয়, ঘর দেয় না। চার বছর ধইরে রাস্তার পাশে পইড়ে আছি। আয়রোজগার নাই। ছোট ছাওয়াল দুটো বুঝতি চায় না। খালি এইটা-সেইটা খাইতে চায়। ভালো খাবার ছাওয়াল-মাইয়েগের কপালে নাই। মাঝেমধ্যি মনে হয়, গাঙে ডুইবে যাই। কিন্তু চার ছাওয়াল-মাইয়ের মুখির দিকি তাকায়ে তা করতি পারিনে।’

পাশের শাকবাড়িয়া নদী পার হলেই সুন্দরবন। সেখানে অন্যের ডিঙি নৌকায় করে মাছ ধরতে যান স্বপ্না বেগমের বড় ছেলে মেহেদী। যে বয়সে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সে বয়সে মায়ের অসুস্থতার কারণে সব দায়িত্ব পড়েছে তার কাঁধে। নদীর পাড়েই দেখা হয় কিশোর মেহেদীর সঙ্গে। মেহেদী বলে, ‘খুব ভোরে গাঙে আসি। মানুষের সাথে ডিঙি নৌকায় বাদার খালে মাছ-কাঁকড়া ধইরে কোনো দিন দুই শ, কোনো দিন তিন শ টাকা পাই। যেদিন কেউ নৌকায় না নেয়, সেদিন নদীতে জাল টেনে বাগদা চিংড়ির রেণু ধরি। কামাই (রোজগার) একটু কম হয়। সেদিনটা অনেক কষ্টে যায় আমাগের।’

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ছোটবেলায় মা মারা যান স্বপ্নার। তারপর বাবা আরেকটি বিয়ে করলে স্বপ্নার ঠাঁই হয় নানাবাড়িতে। সেখানেই বেড়ে ওঠেন স্বপ্না। ১৫ বছর আগে বিয়ে হয় আবদুর রউফের সঙ্গে। সন্তানদের জন্মের পর নানাবাড়ি থেকে চলে এসে রাস্তার পাশে ঝুপড়িতে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। স্বপ্নার স্বামী রউফ গাজী আরেকটি বিয়ে করে চলে যান। সেই থেকে সন্তানদের নিয়ে নিদারুণ কষ্টে জীবন যাপন করছেন স্বপ্না।

স্বপ্নার প্রতিবেশী আমেনা খাতুন বলেন, ‘ছোট বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে স্বপ্নার কষ্ট দেখতি না পাইরে মাঝেমধ্যি চাল-ডাল যা পারি, দেই। দুর্মূল্যের বাজারে গ্রামের সব মানষির টানাটানির মধ্যি দিন কাটাতি হয়। এর মধ্যি মন চালিও সব সময় সহযোগিতা করতি পারিনে।’

স্বপ্নার ঝুপড়ি ঘরে থাকার মতো অবস্থা নেই বলে জানান জোড়শিং গ্রামের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন। তিনি আরও বলেন, স্বপ্নার বাচ্চারা বাড়িতে না খেয়ে থাকলেও খবর নেওয়ার কেউ নেই। সরকারি কিংবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাঁকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে দিলে ভালো হতো। ছেলে–মেয়েরা পড়াশোনার নিশ্চয়তা পেত।

স্থানীয় দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবদুস সালাম বলেন, পরিবারটির খাওয়ার কষ্টের সঙ্গে বড় সমস্যা ঘরের। তাঁদের থাকার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। অন্যান্য সরকারি সহায়তার পাশাপাশি এবার ভিজিডির একটি কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

তিন সন্তানের সঙ্গে মা স্বপ্না বেগম। বুধবার খুলনার কয়রা উপজেলার জোড়শিং গ্রামে
তিন সন্তানের সঙ্গে মা স্বপ্না বেগম। বুধবার খুলনার কয়রা উপজেলার জোড়শিং গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

আয়নাঘর: অভিজ্ঞতা এত ভয়াবহ যে সরকার কথা বলতে বললেও তাঁরা বলেন না: নাহিদ ইসলাম

তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, গত ১৫ বছরে ‘আয়নাঘরের’ ভয়াবহ অভিজ্ঞতাসহ অসংখ্য নিপীড়নের ভয়াবহ গল্প আছে। সেগুলো এতটাই ভয়াবহ যে যাঁরা এর শিকার হয়েছেন, তাঁরা এখন সেগুলো নিয়ে কথা বলতে চান না। তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়ে কথা বলতে তাঁদের বারবার অনুরোধ করেছে। তারপরও তাঁরা বলতে চান না; এতটাই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ছিল তাদের।

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে কথাগুলো বলেন নাহিদ ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে ‘বিদ্রূপ ও উপহাসের রাজনীতি: জুলাই বিদ্রোহের সময় কার্টুন ও গ্রাফিতি’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

আলোচনায় অংশ নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গত ১৫–১৬ বছরের যে এত এত নিপীড়ন এবং মানুষের যে এত এত গল্প, এগুলো মানুষ আর্টওয়ার্কের (শিল্পকর্ম) মধ্য দিয়ে জানছে। মেইনস্ট্রিম (মূলধারার) পত্রিকাগুলোতেও কিন্তু তখন কার্টুন আঁকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।’

এ সময় নিজের আয়নাঘরে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আয়নাঘর, যেখানে মানুষকে গুম করা হতো, আমারও আয়নাঘরের অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেখানে ২৪ ঘণ্টা থাকার। আমি থেকেছি সেই রুমেয় এবং দেখেছি দেয়ালে তাঁদের লেখা, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বন্দী ছিলেন।’

শিল্পীরা যদি তাঁদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে নিপীড়নের বিষয়গুলো নিয়ে আসেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে, মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে, তাহলে বিগত রেজিমটা (আওয়ামী লীগের শাসনামল) আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্দোলনটাও আসলে দেয়াললিখন এবং আর্টওয়ার্কের (শিল্পকর্মের) মাধ্যমে এগিয়েছে। আমরা এখন চিন্তা করছি এগুলো সংরক্ষণ করার। মানুষ আসলে কী বলতে চেয়েছিল এবং মানুষ আসলে কী বলতে চায়, এগুলোর উপাদান আমরা সেখানে পাব।’

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, আয়নাঘর–গুম এসব বিষয় নিয়ে আগে কেউ কথা বলতে পারতেন না। তিনি বলেন, গুম কমিশনে প্রায় এক হাজার ছয় শতাধিক আবেদন করা হয়েছে। এই সংখ্যা বেড়ে পাঁচ হাজার হতে পারে। গত ১৫–১৬ বছরে পাঁচ হাজার মানুষের গুমের অভিজ্ঞতা হয়েছে।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। তিনি ছাত্র–জনতার আন্দোলনে দেয়াললিখন, ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কীভাবে আন্দোলনকে বিস্ফোরিত করেছে, তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, ‘আন্দোলনের সময় কয়েক দিন আগেও যারা আমাদের ছেলেদের মেরেছে লাঠি দিয়ে, আওয়ামী লীগের এমন লোকের প্রমোশনের জন্যও এখন তদবির করে বিএনপির লোক, তদবির করে জামায়াতের লোক।’

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাভিন মুরশিদ প্রমুখ।

তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম
তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। ফাইল ছবি

Wednesday, November 13, 2024

মৃত্যুকূপ গাজা

মৃত্যুকূপ গাজা। একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্ব জনমানুষের সামনে ক্ষুধায়, একতরফা বোমার আঘাতে সেখানে মরছে অসহায় গাজাবাসী। যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাসকে নির্মূলের নামে পুরো একটি জনপদকে, একটি ভূখণ্ডকে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে ‘দাজ্জালের’ মতো ইসরাইল। কোনো কিছুতেই থামছে না তারা। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ফিলিস্তিন বিষয়ক জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এবং আটটি মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ বলেছে, গাজায় বুভুক্ষু মানুষের জন্য ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট করছে না ইসরাইল। ওইসব সংস্থা এবং গ্রুপ বলেছে, গাজায় দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে। মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে এই উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সেখানে উপস্থিত ইসরাইলি দূত সে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। অক্সফাম, সেভ দ্য চিলড্রেন সহ ওই ৮টি সংগঠন বলেছেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় এখন গাজার মানবাধিকার পরিস্থিতি। মঙ্গলবার গাজায় প্রতিদিন ‘নিষ্ঠুর বর্বরতা’র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা লুইস ওয়াটারিজ।
mzamin

Thursday, October 31, 2024

শহীদ রেফায়েত উল্লাহর শিশুকন্যা লামিয়ার মানবেতর জীবন by মুহাম্মদ শাহ্‌ আলম

মা-বাবা হারা এক অনাথ শিশু লামিয়া। বর্তমান বয়স ১৬ মাস। বাবা রেফায়েত উল্লাহ সরকার পতনের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। মা রাজিয়া আক্তার মিম নিজের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শিশু লামিয়াকে দাদা-দাদির আশ্রয়ে রেখে পিত্রালয়ে চলে যান,  তখন লামিয়ার বয়স মাত্র ৫ মাস। পুত্রশোকে কাতর কাউসার দম্পতি এখন ওই শিশুর পিতা-মাতা, দাদা- দাদি সবকিছু। দাদা কাওসার মিয়া চা বিক্রেতা, দাদি মোছা. হাসনা  বেগম গৃহিণী। জন্মের পর লামিয়া বাবার স্পর্শ পেয়েছিল মাত্র ৪ মাস। বাবা এবং মায়ের আদর, স্নেহ ভালোবাসা উপলব্ধি করার মতো বয়স হওয়ার আগেই লামিয়া পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সম্পদ হারিয়ে এতিম।

গত বছর এদিন বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের একদফা দাবিতে বিরোধী জোটের ডাকা ৭২ ঘণ্টার অবরোধের প্রথমদিনে কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ডে বিএনপি নেতাকর্মী ও তার বন্ধুদের সঙ্গে অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে রেফায়েত উল্লাহ। আন্দোলনে অংশগ্রহণের আগে রেফায়েত উল্লাহ তার দাদি সখিনা বেগমের কাছে  দোয়া চেয়ে বলেছিল ফিরে আসতেও পারি না-ও আসতে পারি। আগের দিন রাতে তার নিজস্ব ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল আগামীকাল আন্দোলনে যাচ্ছি বাঁচতেও পারি মরতেও পারি। সকলের নিকট দোয়া চাই। ৩১শে অক্টোবর সকালে অবরোধ কর্মসূচির শুরুতেই উপজেলার ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুলিশ কর্মসূচিতে বাধা  দেয়। বাধা উপেক্ষা করে অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল ৮ কিংবা সাড়ে ৮টার দিকে কুলিয়ারচর থানা পুলিশ আন্দোলনরত বিএনপি নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি ছুড়ে। এতে উপজেলার বড়ছয়সূতী গ্রামের কাউসার মিয়ার বড় ছেলে ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ তনয় (২৪) এবং মাধবদী গ্রামের কাজল মিয়ার ছেলে কৃষকদলের  নেতা বিল্লাল হোসেন রনি (৪০) ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ডে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ সময় পুলিশের গুলিতে আরও বেশক’জন গুরুতর আহত হন। এই হত্যাযজ্ঞের পর পুলিশ আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তড়িঘড়ি করে নিহতদের জানাজা  শেষে দাফন কার্য সম্পন্ন করতে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের বাধ্য করে। ফলে অনেকটা ইচ্ছার বিরুদ্ধে মধ্যরাতে তড়িঘড়ি করে নামাজে জানাজা শেষে শহীদদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। এমনকি বিএনপি  নেতাকর্মীরা যাতে জানাজায় অংশগ্রহণ করতে না পারে সেইজন্য জানাজার স্থানে পুলিশের একাধিক গাড়ি অবস্থান নেয়। তাছাড়া পুলিশের গুলিতে নিহত ও আহত  বিএনপি’র নেতাকর্মীদের নামে পুলিশ বাদী হয়ে পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করে। মামলায় পুলিশের গুলিতে নিহত রেফায়েত উল্লাহ তনয় (২৪) ও বিল্লাল হোসেন রনি (৪০), বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি মো. শরীফুল আলমসহ ৪৩জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১৫০০/১৬০০ জনকে আসামি করে মামলা করে। মামলায় পুলিশ শরীফুল আলম সহ প্রায় ৫০জনকে গ্রেপ্তার করে। নিহত  রেফায়েত উল্লাহ তনয় (২৪) ও বিল্লাল হোসেন রনি (৪০) সাধারণ পরিবারের সন্তান। রেফায়েত উল্লাহ বিয়ের এক বছরের মাথায় একমাত্র সন্তান লামিয়াকে রেখে এবং বিল্লাল  হোসেন ৩ সন্তান, ছেলে টুটুল (১০),  মেয়ে জান্নাত (৬) সবার ছোট ছেলে জাকির (২) ও স্ত্রী আন্না বেগম (২৭)কে রেখে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে দেশের গণতন্ত্র মানবাধিকার আইনের শাসন বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। এই অবস্থায় অসহায় দুই পরিবারের শিশুসন্তানের ভরণ- পোষণের জন্য বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত  চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং  কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (ময়মনসিংহ বিভাগ) ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপি’র সভাপতি মো. শরীফুল আলম প্রতি মাসে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার দিনটিতে আজ দুপুরে শহীদ  রেফায়েত উল্লাহর গ্রামের বাড়িতে এক মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে হয়েছে এবং ওইদিনই বিকালে ছয়সূতী ইউনিয়ন বিএনপি’র কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের অনুষ্ঠিত হবে। এতে উপজেলা বিএনপি’র নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করবেন।

mzamin

Tuesday, October 22, 2024

‘নির্দেশ আছে তোকে ক্রস ফায়ারে মেরে ফেলার’ by রাশিম মোল্লা

হুমায়ুন কবির। ২০১৮ সালের ২৭শে অক্টোবর। পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলায় হাজিরা দিতে ঢাকা থেকে স্টিমার এমভি টার্ন যোগে পিরোজপুর যাচ্ছিলেন। পথে সদরঘাট টার্মিনালের ঢাকা-হুলারহাটগামী স্টিমার থেকে সন্ধ্যা ৬টার দিকে সাদা পোশাকের অস্ত্রধারী ৫ ব্যক্তি তাকে  তুলে নেয়। এমন অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম ও লোমহর্ষক নির্যাতনের তদন্তের জন্য অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগে বলেন, সদরঘাট থেকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে উঠিয়ে প্রথমে তার দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে ভেজা গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। অজ্ঞাতস্থানে নিয়ে চোখ বাঁধা অবস্থায় জিজ্ঞাসা করে- সরকারের বিরুদ্ধে ব্লগার হিসেবে বিভিন্ন ব্লগ ও ফেসবুকে সরকার বিরোধী কেন লেখালেখি করি? বিএনপি’র কোন কোন নেতার নির্দেশে এইসব লেখালেখি করি? প্রধানমন্ত্রী ও সজীব ওয়াজেদ জয়-এর বিরুদ্ধে কেন লিখি? প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ আছে তোকে মেরে ফেলার। একপর্যায়ে তাদেরকে বলতে শুনি যে আমাকে গুম করে নির্যাতন ও মেরে ফেলতে উপর মহলের নির্দেশ আছে।

লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ণনা: হুমায়ুন কবির বলেন, চোখ বাঁধা অবস্থায় সারারাত তাকে বেধড়ক মারধর করে। কানে ইলেক্ট্রিট শক দেয়। সারা রাত শারীরিক নির্যাতন করে। ফজরের আজানের পর অর্ধচেতন অবস্থায় অজ্ঞাত একটা রুমে আটকে রাখে। সেই রুমের ছাদ তার শারীরিক উচ্চতা থেকে কম হওয়ায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না। চোখ বাঁধা এবং দুই হাত পেছনে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে নগ্ন করে প্রতিদিন শারীরিক নির্যাতন নিপীড়ন করেছে। তিনি বলেন, আমার গোপনাঙ্গে ইলেক্ট্রিক শক দিয়েছে। আমার হাঁটু এবং পায়ের গোড়ালিতে বুট পায়ে থেতলিয়ে দিয়েছে। কাঁধে কোমরে ভারী বস্তু দিয়ে পিটিয়েছে। আমার কোমরে এবং পায়ের নখে সুই ফুটিয়েছে, একটা আঙ্গুলের নখ তুলে ফেলেছে। কয়েকদিনই তারা আমাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার কথা বলেছে। একপায়ে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে পেটানো অবস্থায় আমার চোখের বাঁধন খুলে যায়। তখন আমি কয়েকজন লোককে দেখতে পাই- মধ্যে স্টিমার থেকে উঠিয়ে আনার সময় যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন তাকে চিনতে পারি। তবে আমি কাদের হাতে বন্দি, কোথায় আমার অবস্থান কিছুই জানতাম না। বাথরুম এবং খাবারের সময় একহাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দিতো তবে কখনো চোখের বাঁধন খুলত না, গোসল করতে দিতো না। কখন দিন-রাত আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। মাঝে মধ্যে ‘আচ্ছালাতু খাইরুম মিনান্নাউম’ শুনে ফজরের আজান হচ্ছে বুঝতে পেরেছি। এভাবে কতোদিন কেটে গেছে তাও বুঝতে পারিনি।

হঠাৎ একদিন চোখের বাঁধন এবং হ্যান্ডকাফ খুলে দিয়ে গোসল করতে বলে। অনেকদিন পর বাঁধন খুলে দেয়ার পর আমি দীর্ঘ সময় চোখে দেখতে পাইনি। ধীরে ধীরে সবকিছু ঝাঁপসা দেখতে পাই। আমার পরনের শার্ট-প্যান্টে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ, সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন, নাক-মুখ থ্যাতলানো, রক্তাক্ত দেখতে পাই। স্বাভাবিক শব্দ কানে শুনতে পাই না। তখন তাদের কাছে জানতে চাই- আজ কতো তারিখ, কি বার, কয়টা বাজে? ওদের একজন বলে- ৭ তারিখ, সন্ধ্যা ৬টা। একজন এসে আমাকে শেভ করে দেয়। আমার লাগেজ ট্রলি ফিরিয়ে দিয়ে নতুন প্যান্ট-শার্ট পরতে বলা হয় এবং আমার পরনের রক্তাক্ত শার্ট-প্যান্ট ওরা নিয়ে যায়। আমাকে ছেড়ে দেয়া হবে জানায়।

অজ্ঞাত তারিখে আনুমানিক রাত ৮টা নাগাদ তিনজন লোক এসে আমার প্যান্টের দুই পকেটে দু’টি মোবাইল ফোন সেট এবং একটা রুমালে বাধা কিছু টাকা ঢুকিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে অজ্ঞাতস্থানের এক বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখে। তখন একটা বড় কম্পাউন্ডে র‌্যাব-১০ লেখা অনেকগুলো গাড়ি দেখে দীর্ঘ বন্দিদশায় এই প্রথম বুঝতে পারি- আমি র‌্যাব-১০ হেফাজতে আছি। ৫ জন সিভিল পোশাক পরিহিত লোক আমাকে একটা মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে সায়েদাবাদ পীরের বাড়ি এলাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা বাস কাউন্টারে মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে বলা হয়। যারা আমাকে নিয়ে এসেছিল- তাদেরই দুইজন আমার দুইপাশে হাঁটছিল। আমি কয়েক কদম হেঁটে যেতেই র‌্যাব-১০ লেখা একটা পিকআপ, একটা কালো রঙের ল্যান্ড ক্রুজার জীপ এবং অনেক সশস্ত্র ইউনিফর্ম পরা র‌্যাব সদস্যদের দেখতে পাই। ২০১৮ সালের ২৭শে অক্টোবর  সন্ধ্যায় আমাকে তুলে নেয়ার সময় যিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং আমাকে ঝুলিয়ে পেটানোর সময় যাকে দেখেছিলাম সেই অফিসারকে দেখে চিনতে পারি। আমি র‌্যাব সদস্যদের দেখে ভয় পেয়ে দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করলে আমার পাশে থাকা দুইজন দুইপাশ থেকে আমার পাঁজরে পিস্তল ঠেকিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বলে- দৌড় দিলেই তোকে গুলি করে দেবো! তখন র‌্যাবের পোশাক পরিহিত ৪/৫ জন এসে আমাকে জাপটে ধরে টেনে শ্যামলী পরিবহনের বাসের টিকিট কাউন্টারে ঢুকিয়ে আমার পকেট থেকে ফোন আর টাকা বের করে বলে-  এই লোক সন্ত্রাসী, অনেক দিন ধরে তাকে ধরার জন্য খুঁজতেছি।

ফোন দেখিয়ে বলে- ‘এই দেখেন, সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখি করার প্রমাণ- একে আমরা গ্রেপ্তার করলাম।’ বলে আমার দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে দেয়। তারপর, উপস্থিত লোকজনের সামনে আমার নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করে। বাস কাউন্টারের কয়েকজনকে সাক্ষী হিসেবে নাম ঠিকানা লিখে আমাকে র‌্যাব-১০ লেখা একটা পিকআপ গাড়িতে উঠিয়ে র‌্যাব-১০ ধলপুর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নেয়ার পর আমাকে র‌্যাব-১০ এর কোম্পানি কমান্ডার এডিশনাল এসপি মহিউদ্দিন ফারুকী (রুমের সামনে নেম প্লেটে লেখা ছিল) সাহেবের রুমে নিয়ে যায়। মহিউদ্দিন ফারুকী আমাকে বলে-  ‘হুমায়ুন কবির, আগে কি হয়েছে সেইসব ভুলে যা,  তোকে আজই গ্রেপ্তার করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। তুই  ইন্টারনেটে ও ফেসবুকে সরকার বিরোধী লেখালেখি করিস। প্রধানমন্ত্রী ও সজীব ওয়াজেদ জয়-এর বিরুদ্ধে লিখিস। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্যারদের নির্দেশ আছে তোকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার। তোকে ধরার সময় ধস্তাধস্তিতে তোর গায়ে আঘাত লেগেছে। এর বাইরে একটা কথাও বলবি না। আমি র‌্যাব-২-এ বদলি হয়ে যাচ্ছি। যদি উল্টাপাল্টা কিছু বলিস তাহলে এবার তোকে র‌্যাব-২ নিয়ে স্রেফ মেরে ফেলবো।

যে ৪২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের
হুমায়ুন কবিরের আইনজীবী মাহফুজ হাসান মানবজমিনকে বলেন, গুমের অভিযোগে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ৪২ জনের নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল করেছি। এরা হলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, আসাদুজ্জামান খান কামাল, শাহরিয়ার আলম, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)-এর সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ সাইফুল আবেদীন, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল টিএম জোবায়ের,  র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) মহাপরিচালক ও সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)  বেনজীর আহমেদ, সাবেক পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া, অতিরিক্ত ডিআইজি ও র‌্যাব-১০-এর সিও   জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর, র‌্যাব-১০ এর মো. মহিউদ্দিন ফারুকী, সাবেক নায়েব সুবেদার খায়রুল ইসলাম, সাবেক এসআই, মিরপুর মডেল থানার কাজী মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক ওসি, মিরপুর মডেল থানা দাদন ফকির, এসআই আবদুল কাদের , সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার মো. হাবিবুর রহমান, সাবেক এসআই বিল্লাল হোসাইন জনি, সাবেক এএসপি র‌্যাব-১০ মো. শাহীনুর চৌধুরী ও মো. আবুল কালাম আজাদ, সাবেক এসআই র‌্যাব-১০ স্বপন কুমার সরকার, আজাহারুল ইসলাম, মো. তোতা মিয়া, মো. আনিছুর রহমান, মো. আনোয়ার হোসেন, মোছা. বিবি শারজাহান, মনোয়ারা আক্তার, মো. শিহাব, এসআই মো. রফিকুল ইসলাম, এসআই  শ্রী স্বপন কুমার সরকার, মো. মোমেন খান, এএসআই মো. তানভীর হোসেন,  এএসআই  মো. কবির হোসেন,  মো. নুরুল ইসলাম শেখ, মো. গোলাম আজম, কনস্টেবল  মো. জহিরুল ইসলাম, কনস্টেবল  মো. মাহমুদ কলি স্বপন, সৈনিক  মো. মাহতাব হোসেন, সাবেক ল্যান্স কর্পোরাল আমিনুল ইসলাম, কনস্টেবল  মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, কনস্টেবল  রিপন চন্দ্র মালো, কনস্টেবল  মো. মামুন সরকার,  রাজিন ইসলাম।

mzamin

Sunday, October 20, 2024

আওয়ামী লীগকে নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস: ১০ বছরের সাজা খাটছে কিশোর

‘আওয়ামী লীগ’ শব্দ নিয়ে ‘তিরিশ বছরের পরের গল্প শিরোনামে’ বাবা-ছেলের কথোপকথনের কৌতুক ফেসবুকে পোস্ট করার অভিযোগ করেন দলটির এক স্থানীয় নেতা। ২০১৭ সালের ২৭শে মে। তখন আব্দুল মুকিত রাজু ১৭ বছর বয়সের কিশোর। এ অভিযোগের পরদিন আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় রাজশাহীর পবা থানায় মামলা হয়। এ মামলায় ২০২২ সালের ২৪শে জানুয়ারি তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন রাজশাহীর সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. জিয়াউর রহমান। স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি সাইদুর রহমান বাদল আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় ২০১৭ সালের ২৮মে রাজশাহীর পবা থানায় মুকিতের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিলেন। বাদীর অভিযোগ ছিল, আসামি নিজের ফেসবুক আইডির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ব্যঙ্গ করেছেন। মামলা হওয়ার পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান মুকিত। পরে জামিনে মুক্ত হন। তবে ২০২২ সালে রায় হওয়ার পর থেকে এখনো তিনি কারাগারে আছেন।

মুকিত কোরআনের হাফেজ। জেলে অবস্থানকালে সেখান থেকে ফাজিল (স্নাতক) ও কামিল (স্নাতকোত্তর) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন। গত ৩রা অক্টোবর তার কামিল পরীক্ষার ফল বের হয়েছে। তিনি জিপিএ-৩.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। মুকিত রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর গ্রামের মো. রিয়াজুল ইসলামের ছেলে। তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
তার আইনজীবী এডভোকেট হাসানুল বান্না সোহাগ জানান, ফেসবুকে আওয়ামী লীগ নিয়ে একটি গল্প লেখা স্ক্রিনশটের অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। হাইকোর্ট জামিন দিলেও চেম্বার আদালত তা স্থগিত করে। যা নজিরবিহীন। হাফেজ মুকিত একজন ফ্যাসিবাদ পতনের স্বপ্নদ্রষ্টা। ফ্যাসিবাদের পতনের পরও কেনো তাকে কারাগারে থাকতে হবে। তাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে।

মুকিতের দিনমজুর বাবা আক্ষেপ করে বলেন, আওয়ামী লীগের পতনের পরে অনেকের মুক্তি হলেও আমার ছেলের মুক্তি হচ্ছে না।
মুকিতের আরেক আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘মুকিতের ১০ বছরের সাজা হওয়ার পর এটি নিয়ে ওই সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এই রায়ের বিপক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করলে ২০২৩ সালের ১২ই জানুয়ারি তিনি জামিনও পান। কিন্তু ওই বছরের ২০শে জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মামলা স্টে করে দেন। চলতি বছরের ৩ই জানুয়ারি আপিল বিভাগ সেই স্টে বহাল রাখেন এবং আপিল নিষ্পত্তি করতে বলেন। কিন্তু পরে আপিল নিষ্পত্তি না করেই গত ২রা সেপ্টেম্বর ফের তার জামিন দেয়া হয়। তবে আপিল বিভাগ ফের তার সেই জামিন বাতিল করেন। ফলে এখনো তিনি কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
তার মা আশরাফুন্নেছা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকারের মিথ্যা মামলায় ছেলের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ফ্যাসিবাদী সরকার পালিয়েছে। তবে আমার ছেলে এখনো জেলে। মিথ্যা মামলা থেকে আমার ছেলে যেন দ্রুত মুক্তি পায়, তার জন্য এই সরকারের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

রাজশাহী মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি সিফাত আলম বলেন, তাকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যখন মামলা দেয়া হয় তখন এইচএসসি পরীক্ষার্থী তার বয়স বিবেচনায় মামলা শিশুকোর্টের হলেও তাকে সাইবার ট্রাইব্যুনালে নেয়া হয়। মামলার সাক্ষ্য প্রমাণে গুরুত্ব না দিয়ে সরকারকে খুশি করতে এ রায় দেয়া হয়।

mzamin

Sunday, September 8, 2024

হোমনায় ট্রিপল মার্ডার ‘মাত্র ৪৭ হাজার টাকার জন্য খুন করে আক্তার’

কুমিল্লার হোমনায় একদিনের ব্যবধানে মা-ছেলেসহ চাঞ্চল্যকর ৩ খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটন ও ঘাতককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের কাছে হত্যার কারণ বর্ণনা ও দায় স্বীকার করার পর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেয়ার জন্য আসামি মো. আক্তার হোসেন (২৭)কে গতকাল কুমিল্লার আদালতে নেয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, খুন হওয়া নারীর সঙ্গে টাকা পয়সার লেনদেনের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

বুধবার রাতে ভিকটিমের ঘরে ঢুকে মাহমুদা আক্তার (৩০) ও তার ছেলে শাহাদাত হোসেন প্রকাশ সাহাদ (০৯) এবং ভাতিজি তাইফা সিনহা তিশা (১৫)কে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ ও মাথায় লাঠির আঘাতে হত্যা করে পালিয়ে যায়। বৃহস্পতিবর সকালে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্দের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। খুন হওয়া মাহমুদা আক্তারের পিতা মো. আবুল হোসেন বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে হোমনা থানায় মামলা করেন। পুলিশ শুক্রবার বিকালে প্রযুক্তির মাধ্যমে আসামি আক্তার হোসেনকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। আসামি উপজেলার শ্রীমদ্দি চরের গাঁও গ্রামের হক মিয়ার ছেলে।

লাশের ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার বিকালে উপজেলার বড় ঘাগুটিয়া ঈদগাহ মাঠে জানাজা ও স্থানীয় কবরস্থানে পাশাপাশি ৩টি কবরে তাদের দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। হোমনা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মীর মহসীন মাসুদ রানা বলেন, আসামি আক্তার হোসেন মাহমুদাকে চাচি সম্বোধন করতো।

তিনি গ্রেপ্তার আক্তারের বরাত দিয়ে বলেন, মাহমুদা আক্তার হোসেনের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে সাতচল্লিশ হাজার টাকা ধার নেন। বুধবার তাকে ওই টাকা দেয়ার কথা বলেই মাহমুদা তাকে (আক্তারকে) বাড়িতে নেন। রাত ৮টার সময় সে ওই বাড়িতে যায়। সেখানে আখ, সিঙ্গারা খেয়ে-দেয়ে রাত ১০টার মধ্যে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। আক্তারকেও ঘরের মেঝেতে ঘুমাতে দেন। এর আগে টাকা পয়সার লেনদেন নিয়ে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও মনোমলিন্য হয়। এরই রাগে ক্ষোভে রাত প্রায় ২টার দিকে প্রথমে মাহমুদা আক্তার প্রকাশ মাহফুজাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দিয়ে স্বাশরোধ করে হত্যা করে। পরে একে একে তার ছেলে শাহাদাত হোসেন প্রকাশ সাহাদ এবং ভাতিজি তাইফা সিনহা তিশাকে হত্যা করে। পরে কাঠের একটি লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে থেতলে রক্তাক্ত জখম করে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করে। পরে ফজরের নামাজের আগেই ঘাতক আক্তার পালিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ৩ খুনের আসামি আক্তার হোসেনকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছি। ৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তির জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। থানা সূত্রে জানা যায়, মাহমুদা আক্তার প্রকাশ মাহফুজার একই উপজেলার বড় ঘাগুটিয়া গ্রামের শাহ-পরানের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। তাদের বিবাহিত জীবনে শাহাদাত হোসেন প্রকাশ সাহাদের জন্ম হয়। ভিকটিমের স্বামী মো. শাহ-পরান ঢাকায় একটি জুতা কোম্পানিতে চাকরি করেন। স্বামী ঢাকায় চাকরি করার কারণে মাহমুদা তার সন্তানকে নিয়ে রাতের বেলায় ঘুমাতে ভয় পেতো। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভিকটিমের দূরসম্পকের ভাতিজি পার্শ্ববর্তী বাড়ির তাইফা সিনহা তিশাকে সঙ্গে রাখতেন। প্রতিদিনের মতো রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বুধবার রাত ১০টার মধ্যে তাদের দো-চালা টিনের ঘরের পশ্চিম পাশের রুমে ঘুমিয়ে পড়েন।

পরের দিন বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে ভিকটিমের বাড়িতে নিহত তাইফা সিনহা তিশাকে তার ছোট বোন মীম ডাকতে আসেন। এসেই ভিকটিমের বসতঘরের পূর্বপাশের দরজা ও শয়ন কক্ষের দক্ষিণ পাশের জানালা খোলা দেখতে পায়। মীম ওই জানালা দিয়ে ভিকটিম মাহমুদা আক্তার প্রকাশ মাহফুজা ও তার ছেলে শাহাদাত হোসেন প্রকাশ সাহাদ এবং তাইফা সিনহা তিশাকে খাটের ওপর গলায় ওড়না  পেঁচানো ও মাথায় রক্তাক্ত জখম অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। এমন অবস্থা দেখে বোন মীম চিৎকার শুরু করেন। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে এসে তাদের ঘরে ঢুকে মাহমুদা ও তার ছেলে শাহাদাত এবং তিশাকে মৃত অবস্থায় খাটের ওপর ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস লাগানো এবং তাদের মাথা কাটা রক্তাক্ত জখম দেখতে পায়।

Thursday, September 5, 2024

ভারতে গরুর গোশত নিয়ে সন্দেহে মুসলিম যুবককে হত্যার বিষয়ে যা জানা যাচ্ছে

নয়া দিগন্তঃ ভারতের দিল্লি থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে হরিয়ানার চরখি দাদরির বাধরা এলাকায় এক মুসলিম যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে গো-রক্ষক দলের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।

নিহত ব্যক্তির নাম সাবির মালিক। তিনি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার বাসিন্দা। ওই ব্যক্তি পরিবারের সাথে চরখি দাদরির একটি বস্তিতে থাকতেন। পেশায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি ২৭ আগস্টের। গো-রক্ষক দলের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা একটি পাত্রে এক টুকরো গোশত দেখতে পায়। তাদের সন্দেহ ছিল ওই টুকরোটি গরুর গোশত।

এর জেরে ওই যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় গত ২৯ আগস্ট পুলিশ সাতজনকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, এদের মধ্যে দু’জন নাবালক রয়েছে।

গত ৩১ আগস্ট এক ব্যক্তিকে লাঠি দিয়ে পেটানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

সেখানে যে যুবককে মারধর করা হচ্ছিল তিনি ২৪ বছরের সাবির। তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায় একদল ব্যক্তিকে।

ওই ঘটনায় যুবকের মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ্যে এলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পক্ষ থেকে সাবির মালিকের পরিবারের একজন সদস্যকে চাকরি এবং তাদের আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়াব সিং সাইনি এই ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। যদিও তার মতে, একে ‘গণপিটুনির ঘটনা’ বলা ঠিক নয়।

ঘটনার নিন্দা রাজনীতিবিদদের
এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হরিয়ানার নুহ শহরের কংগ্রেস বিধায়ক আফতাব আহমেদ। ওই রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন তিনি।

আফতাব আহমেদ বলেন, ‘হরিয়ানায় আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। একজন দরিদ্র পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে টার্গেট করা হয়েছে, যা উদ্বেগজনক। তিন-চার দিন আগে এই ঘটনা ঘটেছে, সেটি জানতে এত সময় লাগল কেন?’

উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতীও এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।

তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, গরুর গোশত খাচ্ছে এই সন্দেহে চরখি দাদরিতে এক দরিদ্র যুবককে নৃশংসভাবে পিটিয়ে পিটিয়ে মারার ঘটনাটি মানবতার জন্য লজ্জাজনক এবং এটি আইনের শাসনকে উন্মোচিত করে।

প্রসঙ্গত, মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকেও সম্প্রতি একই ধরনের একটি অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে।

ইগতপুরীর কাছে একটি এক্সপ্রেস ট্রেনে গরুর গোশত সাথে নিয়ে যাচ্ছেন সন্দেহে সত্তোর্ধ এক মুসলিম ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন যাত্রীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ২৮ আগস্টের।

এই দুই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তীব্র নিন্দায় সরব হয়েছেন অনেকেই।

লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীও চরখি দাদরিতে যুবককে হত্যা এবং নাসিকে গরুর গোশত নিয়ে যাচ্ছেন এই সন্দেহে এক বৃদ্ধকে মারধরের ঘটনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন।

এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে রাহুল গান্ধী লেখেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ঘৃণ্য উপাদানগুলো আইনের শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রকাশ্যে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। সংখ্যালঘুরা, বিশেষত মুসলমানদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং রাষ্ট্র নীরব দর্শকের মতো সব দেখছে।’

গরুর গোশত কেন্দ্র করে মারধর ও হত্যার যে ঘটনা দুটি প্রকাশ্যে এসেছে সেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘এ ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা উচিত।’

ঘটনা নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
এখন পর্যন্ত যে তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে সেখান থেকে জানা গেছে, চখরি দাদরি অঞ্চলের বাধরা বাসস্ট্যান্ডের সামনে এক মুসলিম বস্তি রয়েছে, যেখানকার বাসিন্দারা গরুর গোশত খাচ্ছেন বলে গো-রক্ষা দলের ব্যক্তিদের সন্দেহ হয়।

গত ২৭ আগস্ট ‘গো-রক্ষা’ দলের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা ওই বস্তির লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তারা একটি পাত্রে এক টুকরো গোশত দেখতে পান, যা গরুর গোশত বলে সন্দেহ করেন তারা।

এ সময় তারা ওই বস্তিতে বসবাসকারী শবরুদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, যিনি নিহত সাবিরের আত্মীয় হন। জিজ্ঞাসাবাদের ঘটনার ভিডিও করা হয়।

এফআইআর অনুযায়ী, পাত্রে থাকা গোশত গরুর কিনা জানতে চাইলে তিনি ওই গোশত মহিষের এ কথা জানিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন।

কিন্তু গো-রক্ষক দলের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা তাকে আবার ধরে আনে এবং ক্যামেরার সামনে স্বীকার করায় যে পাত্রে রাখা টুকরোটি গরুর গোশত।

এরপর গো-রক্ষকরা বাধরা পুলিশকেও এই বিষয়ে জানায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গোশতের টুকরোসহ কয়েকজনকে থানায় নিয়ে যায়।

এদিকে, সাবির মালিকের হত্যার ঘটনায় যিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি নিহত যুবকের শ্যালক সাজাউদ্দিন সর্দার।

অভিযোগকারী জানান, ‘২৭ আগস্ট কিছু লোক এসেছিল। ওরা আমাকে এবং আমার সাথে যারা আবর্জনা সংগ্রহ করছিল তাদের বলতে শুরু করে যে তোমরা এখনো মঙ্গলবারে গোশত খাও বা হতে পারে এটাই (পাত্রে থাকা গোশতের টুকরোকে ইঙ্গিত করে) গরুর গোশত। এরপর আমাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েকজন আবার আমার ভগ্নিপতি সাবির মালিককে বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যায়।’

ঘটনার দিনের বিবরণ দিতে গিয়ে সাজাউদ্দিন সর্দার যোগ করেন, ‘ওকে কিছু আবর্জনা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। ওই কথা বলেই বাসস্ট্যান্ডে ভগ্নিপতিকে (সাবির মালিক) ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর, আসিরুদ্দিন নাম আরেকজনকেও ডেকে আনা হয়। সেখানে ওদের দু’জনকে চার-পাঁচজন ছেলে মিলে মারধর করে। আমার ভগ্নিপতি ও আসিরুদ্দিনকে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। ভাইরাল ভিডিওটি আমিও দেখেছি।’

আসিরুদ্দিন জানান, গো-রক্ষকরা পুলিশের সাথে থানায় গিয়েছিলেন। তারা বস্তির লোকেদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার জন্য চাপও দেয়।

আসিরউদ্দিনের অভিযোগ, তাকে এবং সাবির মালিককে বাধরা বাসস্ট্যান্ডের কাছে ডেকে নিয়ে লাঠি দিয়ে মারধর হয়।

তিনি জানান, স্থানীয়রা হস্তক্ষেপ করায় গো-রক্ষক দলের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা সাবির মালিককে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়।

এফআইআর অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট রাতে ভান্ডওয়া গ্রামের কাছে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া যায়। পরে সেটি সাবির মালিকের লাশ বলে শনাক্ত করা হয়।

নিহতের শ্যালক সাজাউদ্দিন সর্দারের অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২৮ আগস্ট বাধরা থানার পুলিশ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। তাদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে দু’জন নাবালকও রয়েছে।

এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ
গরুর গোশত নিয়ে কথা বলতে রাজি নয় নিহত যুবকের বাড়ির কেউই। তার পরিবারের সদস্যরা ৩০ আগস্ট চরখি দাদরি ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যায়।

ওই সময় পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের নিরাপত্তা দেয়া হয়েছিল।

বস্তির বাসিন্দারা জানায়, এই ঘটনার পরে তারা আতঙ্কে রয়েছেন এবং ওই এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছেন।

পুলিশ কী বলছে?
চরখি দাদরির বাধরা জেলার ডিএসপি ভূষণ জানান, ঘটনার ঠিক পরদিনই পুলিশ একটি মামলা দায়ের করে এই ঘটনায় অভিযুক্ত সাতজনকে গ্রেফতার করেছে।

অভিযুক্ত দুই নাবালক ছাড়া সকলেই পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন। বাকিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

হরিয়ানা পুলিশের কর্মকর্তা ধীরজ কুমার জানান, এলাকায় উত্তেজনা এড়াতে ফ্ল্যাগ মার্চ করছে পুলিশ। বর্তমানে সেখানে শান্তি বজায় রয়েছে।

তিনি জানান, এই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত অন্য কোনো অভিযুক্তের নাম উঠে এলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সূত্র : বিবিসি

Wednesday, September 4, 2024

‘আয়নাঘরে’ থাকার যে বর্ণনা দিলেন আমান আযমী

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (বরখাস্ত) আবদুল্লাহিল আমান আযমী আট বছর গোপন স্থানে বন্দি থাকার বর্ণনা দিয়েছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পাওয়া আযমী গতকাল গণমাধ্যমের সামনে আসেন। কথিত আয়না ঘরে থাকার বর্ণনা দেন। বলেন, বন্দি অবস্থায় পৃথিবীর কোনো আলো দেখিনি। প্রতি রাতেই ক্রসফায়ারের ভয় থাকতো। তারা আমার সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করতো।

মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ভার্চ্যুয়ালি উপস্থিত হন আবদুল্লাহিল আমান আযমী। তিনি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর প্রয়াত গোলাম আযমের ছেলে। ২০১৬ সালের ২২শে আগস্ট রাতে আবদুল্লাহিল আমান আযমীকে গুম করা হয় বলে পরিবার জানায়। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বার বার মনে হতো, তারা হয়তো আমাকে ক্রসফায়ার করে হত্যা করবে। আমি তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে শুধু কান্না করতাম। আমার লাশটা যেন আমার পরিবারের কাছে যায়।

তিনি বলেন, দেশে যে বিপ্লব হয়েছে সেটি আমি জানতাম না। আগস্টের ৫ তারিখে রাত সাড়ে দশটার সময় এসে আমাকে বলা হলো আপনাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। আমি বললাম, আমি তো ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমাই। যদি দুইটার দিকে আসেন তবে সুবিধা হয়। কয়েকদিন আগেই ডাক্তার দেখে গেছেন, রক্ত পরীক্ষা করলেন। এখন আবার কোথায় নিয়ে যাবেন। পরে আমাকে মুখোশ পরিয়ে আশপাশের আরেকটি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। আমি বললাম, আট বছর ধরে আপনাদের বলেছি আমার দাঁত ভেঙে গেছে। আমার কানের সমস্যা হচ্ছে। এতদিন আপনাদেরকে বলেছি আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান, আপনারা নিয়ে যান না। আর এখন বলছেন হাসপাতালে যেতে হবে এটা কেমন কথা। পরে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে, যাচ্ছে, তার শেষ নাই। আমি বললাম ঢাকা শহরের কোনো হাসপাতাল তো এত দূরে না। আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কেউ কোনো জবাব দিলো না। রাস্তা ভাঙাচোরা। আমি জানতে চাইলাম, ঢাকা শহরের কোনো রাস্তা তো এতো ভাঙাচোরা না। আপনারা কি আমাকে কোনো গ্রামের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন নাকি? তারা কোনো জবাব দিলো না। পরে আমাকে আরেকটি বন্দিশালায় নিয়ে গেল। এখন আমি যেটা অনুমান করতে পারি, রাস্তায় ছাত্র-জনতা যেভাবে গাড়ি চেক করছিল এজন্য তারা আমাকে গ্রামের রাস্তা দিয়ে নিয়ে গেছেন। পরে তারা বললেন, আপনি এখানে থাকেন। আমি বললাম, আপনারা না আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন এটা কোথায় নিয়ে আসলেন? বলা হলো, আপনাকে পরে জানানো হবে। ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ৬ই আগস্ট আমাকে একজন জানালেন, আজ আমাকে মুক্তি দেয়া হতে পারে। একজন বললেন, আপনার কাপড়ের সাইজ বলেন। আমি বললাম, আমি তো গার্মেন্টসের কাপড় পরি না, সাইজ বলতে পারবো না। পরে একটা কাপড় নিয়ে আসা হলো। যেটা আপনারা দেখেছেন মুক্তির পরে প্যান্ট-শার্ট। ওটা পরে দেখলাম ঠিক আছে। বাইরে কি হচ্ছে সে খবরই তো নাই আমার কাছে। পরে সোয়া ৯টার দিকে আমাকে নিয়ে তারা রওনা হলো। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা সড়কের পাশে আমাকে নিয়ে তারা ছেড়ে দিলেন। বলা হলো, গাড়ি আসবে গাড়িতে উঠে আপনি চলে যাবেন। তখন রাত পৌনে বারোটা বাজে। পরে তারা আমাকে টাকা দিলো। আমি জানতে চাইলাম ঢাকায় যাওয়ার ভাড়া কতো? তারা বললেন, ঠিক জানি না। জানতে চাইলাম এখানে কতো টাকা আছে। তারা বললেন, পাঁচ হাজার টাকা। আমি বললাম, আমি আপনাদের টাকার মুখাপেক্ষী নই। এখান থেকে ঢাকার ভাড়া যতটুকু ততটুকু টাকা দেন। তারা বললেন, আপনি যা করেন, দান করেন, কিছু টাকা আপনাকে নিতে হবে। তাদের সঙ্গে এক সেকেন্ড কথা বলার আমার রুচি ছিল না। এরপর তারা আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। আমি ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলাম না। এরপর দেখলাম একটা গাড়ি আসছে। তখন আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে বাসের মধ্যে উঠি। কীভাবে যে আমি ১০০ মিটারের মতো রাস্তায় দৌড়ে বাসে উঠেছি এখনো কল্পনা করতে পারি না। পরে বাসে উঠলাম। আমার স্ত্রী এবং চাচাতো ভাইয়ের ফোন নম্বর আমার মনে ছিল। একজনের থেকে ফোন নিয়ে তাদের ফোন করে বললাম। বাস আমাকে টেকনিক্যাল মোড়ে নামিয়ে দিলো। এরপর পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করে ৮ তারিখ ভোরে বাসায় পৌঁছালাম।

গুম হওয়ার আগের ঘটনা বর্ণনা করে আবদুল্লাহিল আমান আযমী আরও বলেন, যখন আমার বাসায় তারা এলো, তখন তাদের কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম, আপনারা কারা, পরিচয় কী, পরিচয়পত্র দেখান। আমাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো ওয়ারেন্ট আছে কিনা, তা জানতে চেয়েছিলাম। তারা আমার কথার জবাব দেয়নি। তিনি বলেন, একপর্যায়ে আমাকে নিয়ে গাড়িতে ওঠায়। আমার চোখমুখ বাঁধা অবস্থায় একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ফেলে রাখা হয়, অন্ধকার এক ঘরে। টয়লেট যেতে চাইলে চোখ হাত বেঁধে নিয়ে যেত।

আযমী বলেন, আমার দিনগুলো কেমন কেটেছে মনে হলে বুক ফেটে যায়। একদিন আমাকে এসে বলা হলো, আপনার লিখিত দিতে হবে। সেখানে আপনি লিখবেন, আমি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হবো না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বিদেশে সুখে শান্তিতে থাকতে চাই। আমি বিদেশে চলে যাবো, তখন আমি বলেছি, আমি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক। আপনারা আমাকে অবৈধভাবে অপহরণ করেছেন। আটক করে রেখেছেন, আমাকে নির্যাতন করছেন। আমি এটার প্রতিবাদে মিছিল মিটিং করতে পারছি না। তাই মৌন প্রতিবাদ হিসেবে বড় চুল রেখেছি। আমি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা আমি রাজনীতি করবো কি করবো না, আমি এ দেশে থাকবো কি থাকবো না। আল্লাহ আমাকে সেই সৎ সাহসটুকু দিয়েছিলেন। আমি এটা দৃঢ়ভাবেই বলেছি।

Sunday, September 1, 2024

ভ্যানে লাশের স্তুপ করা ভিডিও আশুলিয়া থানা রোডের by শরিফ রুবেল

কি মর্মান্তিক! হৃদয় বিদারক। গা শিউরে ওঠা ভিডিও। গুলিবিদ্ধ মরদেহ গুনে গুনে প্যাডেল ভ্যানে তুলছে পুলিশ। ভ্যানে তুলেই একটি পরিত্যক্ত ব্যানার দিয়ে লাশগুলো ঢেকে দেয়া হচ্ছে। গুলিবিদ্ধ একজন তখনো জীবিত ছিলো। নিথর দেহ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। নড়াচড়া করছেন। এক মিনিট ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। যা নিয়ে তোলপাড় চলছে। মানুষ জানতে চাচ্ছে।

ঘটনাটি কোথায়। কখন, কিভাবে ঘটেছে। তবে কেউই সঠিক তারিখ ও ঘটনাস্থল বলতে পারছে না। কেউ কেউ অনুমান নির্ভর তথ্য শেয়ার করছেন। তবে মানবজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্রকৃত ঘটনা। কোথায়, কিভাবে,  এই ঘটনার পেছনের আদ্যপান্ত তুলে আনার চেষ্টা করেছে মানবজমিন।

সরজমিন জানা গেছে, পুলিশের ভ্যানের লাশের স্তুপ করে রাখা মর্মান্তিক ঘটনাটি আশুলিয়া বাইপাইল এলাকার থানা রোডের গলিতে। থানার পাশেই ইসলাম পলিমারস এন্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের দেয়াল ঘেষে গুলিবিদ্ধ ৭ শিক্ষার্থীর মরদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে ছিলো। পরে পুলিশ লাশগুলো একত্রিত করে ভ্যানের উপর স্তুপ করে রাখেন। এরপরে ঘটে আরো মর্মান্তিক ঘটনা। যে ঘটনা বর্ণনা করাও কঠিন।

৫ আগষ্টের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী মানবজমিনকে বলেন, গত ৫ আগষ্ট দুপুরে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পরপর বাইপাইল এলাকার বিজয় মিছিল বের হয়। মিছিল শেষে বিকেলে উত্তেজিত জনতা আশুলিয়া থানা ঘেরাও করেন। এতে পুলিশ সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। থানার আশপাশে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে থানা ভবনে ঢুকে পড়েন। ঢুকেই তারা থানার গেইট বন্ধ করে দেন। তখন বিকেল সাড়ে ৪টার বাজে। মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে আন্দোলনকারীরা চারদিক থেকে থানা ঘিরে ফেলেন। তারা থানা ভবনে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। কেউ কেউ গেইট ভাঙতে এগিয়ে যান। অবস্থা বেগতিক দেখে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ এ এফ এম সায়েদ আহমেদ পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র রেডি করতে বলেন। গুলি লোড করতে বলেন। এই কথা শুনে  উপস্থিতরা আরও চড়াও হন। আশপাশে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় থানা ভবন থেকে বেরিয়ে এসে ৩০ থেকে ৩৫ জন পুলিশ সদস্য থানার গেইটে অবস্থান নেন। বিকেল ৪টা বেজে ৪০ মিনিট। ওসি সায়েদ আহমেদ গেইটে এসে উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। তখন আন্দোলনকারীরা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে ওসি পুলিশ সদস্যদের অস্ত্র হাতে নিয়ে রেডি হতে বলেন। তখন ঘটনাস্থলে থাকা জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রজনতা পুলিশকে আত্মসমর্পণ করতে বলেন। তখন ওসি সায়েদ আহমেদ আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, আমরা হেরেছি। আপনারা জিতেছেন। আমাদের মাফ করে দেন। সবাই বাড়ি ফিরে যান। একপর্যায়ে এসআই মালেক, ডিবির ওসি তদন্ত আরাফাত, এসআই আফজালুল, এসআই জলিল ছাত্র-জনতাকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিতে থানার গলিতে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। মুহুর্মুহু গুলিতে লোকজন দৌড়ে পালিয়ে যান।

থানার সামনের বিল্ডিং থেকে পুরো ঘটনা স্বচক্ষে দেখা রনি আহমেদ নামের এক ব্যক্তি মানবজমিনকে বলেন, বিকেলে থানা ফটকের সামনে উত্তেজিত জনতার ওপর পুলিশ গুলি ছোড়ে। এতে থানার গেইটের সামনেই ১০ থেকে ১২ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে যান। কয়েক মিনিট ধরে ওখানে গোলাগুলি চলে। পরে জীবিত কয়েকজনকে নিচু হয়ে এসে ছাত্ররা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান। তারপরেও ৬ থেকে ৭ জন ওখানে পড়েছিল। তখন আশপাশের সব অলিগলি জনগণ ঘিরে ফেলে। রাস্তা থেকেও লোকজন থানার দিকে রওনা হয়। পরে থানা থেকে সব পুলিশ সশস্ত্র হয়ে একযোগে বেরিয়ে আসেন। তারা গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসেন।

ভ্যানে লাশের স্তুপ করা জায়গাটি পলিমারস এন্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের গেইটে। ওই গেইটের অপরপাশে সাদিয়া রাজশাহী কনফেকশনারী এন্ড মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক ফাহিমা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, ঘটনাটি আমার দোকানের সামনেই ঘটেছে। ৫ আগষ্ট বিকেলে সাড়ে ৪টা হবে। সেদিন গুলি খেয়ে থানার সামনে পড়ে থাকা মরদেহগুলো  ভ্যানে তুলছিলেন পুলিশ। আমাদের চোখের সামনেই তুলেছে। প্রথমে লাশগুলো তুলে ব্যানার দিয়ে ঢেকে থানার সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সেই ঘটনা এখনো চোখের সামনে ভাসে।

ওইদিন ঘটনাস্থলে থানা রকি আহমেদ নামের এক পোশাক শ্রমিক মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ প্রথমে গেইটে এসেই ইসলাম পলিমারস এন্ড প্লাস্টিসাইজারস লিমিটেডের অফিসার ফ্যামিলি কোয়াটারের সামনে পড়ে থাকা গুলিবিদ্ধ ৭ জনকে একটি প্যাডেল  ভ্যানে তুলেন। পরে তাদের থানার সামনে আনেন। পরে লাশগুলো থানার পার্কিংয়ে থাকা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে তুলে আগুন দেয়া হয়। ৭ জনের লাশ আগুনে পুড়িয়ে থানা থেকে সব পুলিশ বেরিয়ে থানা গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন। আর গুলি ছুড়তে থাকেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া একজনের হাতে তখনো হাতকড়া ছিলো।

লাশের স্তুপ করা জায়গাটি হাত দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে আসলাম হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ভাল করে দেখেন। ভিডিওতে যে পোস্টারটি দেখা যাচ্ছে। সেটা এখনো দেয়ালে অক্ষত আছে। কিছু বালুর বস্তা ছিলো সেগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেদিন পুরো থানা রোডেই লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। পুলিশ ভ্যান নিয়ে সব লাশ এক জায়গায় জড়ো করে। আম টোকানোর মত করে পুলিশ গলি দিয়ে লাশ টুকিয়েছে। পরে লাশগুলো থানার সামনে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এই ঘটনা দেখেনি আশপাশে এমন কোনো মানুষ ছিলো না।  এ এক ভয়ানক ঘটনা। মনে পড়লে এখনো গা শিউরে উঠে।

আশুলিয়া থানার সামনে পুড়িয়ে দেয়া লাশের মধ্য জামগড়া শাহিন স্কুলের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আসশাবুরও ছিলেন। নিহত আসশাবুরের বড় ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমার ভাই গুলিবিদ্ধ হয়ে থানার পাশেই রাস্তায় পড়ে ছিলেন। পরে পুলিশ তার নিথর দেহ রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে পিকআপ ভ্যানে ঢুকিয়ে আগুন দিয়ে দেয়। ভাইটি আমার জীবিত ছিলো নাকি মৃত সেটা জানার সুযোগও আমাদের হয়নি। গুলিবিদ্ধ ৭ জনকেই আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। কে জীবিত কে মৃত তাও পুলিশ তা দেখার সুযোগ দেয়নি। আমার ভাই নীল গেঞ্জি পরিহিত ছিলো। আমরা গেঞ্জি দেখে পোড়া লাশ শনাক্ত করি।

আফজাল হোসেন নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ থানা থেকে বের হওয়ার সময় কারও কারও হাতে দুটি অস্ত্র ছিল। অনেকে সিভিল ড্রেসে ছিলেন। অনেকের হাতে অচেনা অস্ত্র দেখেছি। তারা গুলি করতে করতে বের হন। কখনো গুলি বন্ধ করেনি। মেইন রোডে এসে একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেন। ওই পিকআপ ভ্যানেও ৫ থেকে ৬টি গুলিবিদ্ধ মরদেহ ছিল। বিকালে যারা গুলিতে মারা গেছে তাদের ওই ভ্যানেই রাখা হয়েছিল। তারা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছিল। গুলি কখনো বন্ধ করেনি। অলিগলিতে, রাস্তায়, বাসাবাড়িতে যেখানে খুশি সেখানেই গুলি করেছে পুলিশ। তারা দলবদ্ধ ছিল। ৮০ থেকে ৯০ জন হবে।

বাইপাইল বাসস্ট্যান্ডের অটোরিকশা চালক মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ থানা থেকে মেইন রোডে এসে ডান বাম দু’পাশেই গুলি চালায়। রাস্তার দু’পাশে গুলি চালাতে চালাতে তারা নবীনগরের দিকে আগাতে থাকেন। তখন মানুষ জীবন বাঁচাতে যে যার মতো দৌড়ে পালিয়েছে। এক মিনিটের জন্যও পুলিশ গুলি বন্ধ করেনি। যতক্ষণ হেঁটেছে ততক্ষণই তারা গুলি ছুড়েছে। রাস্তার দু’পাশে পথচারী, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটের শত শত মানুষ ওইদিন গুলিবিদ্ধ হয়। এমন দিন কখনো দেখেনি বাইপাইলবাসী।

সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন পথচারী মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ থানা রোড থেকে গুলি করতে করতে সোহেল হাসপাতাল পর্যন্ত যায়। তখন গুলির শব্দ ছাড়া কিছুই শোনা যায়নি। চারদিকে মানুষের চিৎকার। বাঁচাও বাঁচাও। মনে হয়েছে যুদ্ধ লেগেছে। তখন মানুষ বাসাবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। রাত তখন ৯টার বেশি বাজে। পুলিশ সামনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আর গুলি ছুড়ছিলেন। এভাবে তারা পল্লী বিদ্যুৎ পর্যন্ত চলে যায়। এই সময়ে শত শত মানুষকে গুলি খেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছি।

সেদিন নিহতের স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫ই আগস্ট সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের গুলিতে অন্তত ৩১ জন নিহত হোন। পরদিন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৫ জন মারা যান। এতে ওই ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা ৪৬ জন। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতাল, আশুলিয়ার হাবিব ক্লিনিক, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক হাসপাতাল, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সাভারের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন আছেন প্রায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ।

একটি সূত্র মানবজমিনকে জানায়, ৫ই আগস্ট সন্ধ্যায় আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ এ এফ এম সায়েদ, ওসি ইনটিলিজেন্স মিজানুর রহমান মিজান, ওসি অপারেশন নির্মল কুমার দাসের নেতৃত্বে পুলিশের ৯০ থেকে ১০০ জন সদস্য অস্ত্রসহ থানা থেকে বের হয়ে আসেন। বাইপাইলে পুলিশের নির্বিচারের গুলির খবর পেয়ে সাভার সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনীর একটি টহল টিম বাইপাইলের দিকে রওনা হয়। পল্লী বিদ্যুৎ পার হলে তারাও পুলিশের গুলির মুখে পড়েন। এতে দুই সেনাসদস্য গুলিবিদ্ধ হন। পরে সেনাবাহিনীর একাধিক টিম এসে পুলিশের সকল সদস্যকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। পরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ সদস্যদের আটক করা হয়। তখন সবার হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। এরপর শত শত মানুষ পুলিশকে ঘিরে ফেলেন। পুলিশের কাছে জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর কারণ জানতে চান। জনতাই বিচার করবে বলে পুলিশ সদস্যদের ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। এরপর সেনাবাহিনী তাদের নিরস্ত্র করে আটক করে সেনানিবাসে নিয়ে যান। সেদিন রাত ১০টার দিকে নবীনগর সেনানিবাসের গেইটে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। পরে সেনাসদস্যরা জনতাকে নিবৃত করার চেষ্টা করেন। এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সেনাবাহিনীর একজন মেজর উত্তেজিত জনতাকে নিবৃত করতে বক্তব্য দেন।

Monday, August 19, 2024

যেভাবে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন সিলেটের রুবায়েদ by ওয়েছ খছরু

‘নামাজ থেকে বের হতেই সশস্ত্র ছাত্রলীগ কর্মীরা হামলে পড়ে মসজিদের মুসল্লিদের ওপর। আমরা কয়েকজন দৌড়ে চলে যাই দোতলায়। সেখানে গিয়েও রেহাই নেই। হাতে থাকা রামদা, দা দিয়ে আমাকে উপর্যুপরি কোপাতে থাকে। আমি চিৎকার করে বলছি; ‘আমি দোকানে কাজ করি। আমাকে মেরো না।’ কে শোনে কার কথা। কোপাতেই থাকে। রক্ত ঝরছিল শরীর থেকে।- এ কথা বলছিলেন সিলেটের হাসপাতালের বেডে থাকা রুবায়েদ ইসলাম। ৪ঠা আগস্ট তার উপর চলেছে ছাত্রলীগের নির্মম অত্যাচার। বলেন, ‘আবার জীবন ফিরে পাবো, ভাবিনি।

ওরা আমাকে নির্মমভাবে কুপিয়েছিল।’ রুবায়েদ ইসলামের বাড়ি সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁওয়ের নিজগাঁও গ্রামে। নগরের নয়াসড়কের রান্না বিরানী হাউসে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছিল। ঘটনার দিন মসজিদে আসরের আজান হওয়ার একটু পর নামাজ পড়তে যান রুবায়েদ। বাইরে তখন শান্ত পরিবেশ। কিন্তু নামাজ চলার সময়ই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নয়াসড়ক এলাকা। নামাজ শেষ করে যখন মুসল্লিরা বের হচ্ছিলেন তখন তাদের উপর হামলা চালায় কয়েকজন সশস্ত্র কর্মী। পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে দৌড়ে দোতলায় উঠে যান তিনি। এমন সময় ছাত্রলীগের ৬-৭ জন সশস্ত্র কর্মী তাদের অনুসরণ করে দোতলায় ওঠে। হাতের কাছে পেয়ে যায় রুবায়েদকে। রামদা দিয়ে প্রথমেই রুবায়েদের মাথায় কয়েকটি কোপ দেয়। এরপর শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতারি কোপ। অজ্ঞান হয়ে পড়েন রুবায়েদ। কিছু বলতে পারেননি। এরপর দু’জন তার হাত ও পায়ে ধরে দোতলা থেকে নিচে আঁচড়ে ফেলে। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেতলে যায়। গতকাল মানবজমিনকে রুবায়েদ জানান, সশস্ত্র ছাত্রলীগ কর্মীরা হায়েনার মতো আমার চুল ধরে টেনে টেনে সড়কে নেয়। এরপর কয়েকজন লাথির পর লাথি মারতে থাকে। এমন সময় আমার জ্ঞান ফিরলে দেখি আমাকে সড়কে ফেলে ফুটবলের মতো লাথি দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারা কাজিটুলা পিউরিয়ার সামন পর্যন্ত নিয়ে যায়। ওখানে একটি ভবনে আমাকে ফেলে চলে যায়। তিনি জানান, এ সময় আমি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও পারিনি। শরীর দিয়ে অবিরত রক্ত ঝরছিল। ভবনের মালিক আমাকে টেনে একটি রিকশায় তোলেন। এরপর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। একদিন পর আমার জ্ঞান ফিরলে দেখি হাসপাতালের আইসিইউতে আছি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রুবায়েদ ইসলামকে গুরুতর অবস্থায় রিকশায় করে পার্শ¦বর্তী সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ার কারণে তাকে আইসিইউতে নেয়া হয়। অজ্ঞান অবস্থায় থাকার একদিন পর তার জ্ঞান ফিরে। পরে তার চিকিৎসা শুরু করা হয়। রুবায়েদ এখন হাসপাতালের ২৩নং ওয়ার্ডের ১ নম্বর বেডে ভর্তি আছেন। তার বেডের পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে জাতীয় পতাকা। কোপানোর ফলে তার গোটা শরীরই ক্ষত বিক্ষত। বামহাত ভেঙে গেছে। ডান হাতের কয়েকটি আঙ্গুলও ভেঙে গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসা ব্যয় বলতে কিছুই নিচ্ছেন না। তবে, ওষুধের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে তাকে নিজেই। জানালেন, আইসিইউতে থাকার সময় বিল হয়েছিল ২৩ হাজার টাকা। সেটি পরিশোধ করেন তার দোকানের মালিক। ওষুধ কিনতে অনেকেই সহযোগিতা করছেন। কিন্তু এখনো শরীরে শক্তি পাচ্ছেন না। দু’একদিনের মধ্যে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড় দেয়া হবে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়া হতে পারে। সব মিলিয়ে তাকে নিয়ে পরিবার এখন দুশ্চিন্তায়। হাসপাতালে দেখতে গতকাল গিয়েছিলেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. মুনতাসির আলীসহ দলের কর্মীরা। রুবায়েদের উপর চলা নির্যাতনের বর্ণনা শুনে তিনি নিজেই আপ্লুত হয়ে পড়েন। এভাবে কোনো মানুষ অন্য আরেকজন মানুষের উপর অত্যাচার করতে পারে তিনি ভাবতেও পারছেন না। তবে; বাস্তবে রুবায়েদের উপর তাই ঘটেছে। মো. মুনতাসির আলী মানবজমিনকে জানিয়েছেন, হাসপাতালে যারা এখনো জীবিত অবস্থায় ভর্তি আছেন তাদের একেকজনের গল্প খুবই মর্মান্তিক। তৎকালীন সরকারের ছত্রছায়ায় তাদের পোষ্য বাহিনী যে নির্যাতন চালিয়েছে তা অতীতে কখনোই হয়নি। এত মানুষের প্রাণও যায়নি। তিনি বলেন, আমাদের উচিত যারা হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমাদের এই বীরদের শক্তি ও সাহস দেয়া সবার কর্তব্য। তারাই আমাদের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। 

Friday, August 16, 2024

লোহার খাঁচায় আসামি রাখা ‘অমানবিক’ by আসাদুজ্জামান

গ্রেপ্তারের পর কাউকে আদালতে তোলা হলে নেওয়া হয় এজলাস কক্ষের এক পাশে থাকা একটি লোহার খাঁচার মধ্যে। আবার কোনো মামলার আসামি হয়ে কেউ হাজিরা দিতে গেলে তাঁকেও ঢুকতে হয় ওই খাঁচার মধ্যে। তবে ওই ব্যক্তি আসলেই দোষী নাকি নির্দোষ, তখনো তা প্রমাণিত হয়নি। এই বিষয় সামনে এনে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজ্ঞরা বলছেন, এজলাস কক্ষে এভাবে আসামিকে লোহার খাঁচার মধ্যে ঢোকানো অমানবিক ও সংবিধান–পরিপন্থী। এই ব্যবস্থা আর থাকা উচিত নয়।

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না প্রথম আলোকে বলেন, একটি সভ্য রাষ্ট্রের আদালতে লোহার খাঁচা থাকতে পারে না। আগে কখনো লোহার খাঁচা ছিল না। কয়েক বছর ধরে লোহার খাঁচা বসানো হয়েছে। অবিলম্বে আদালত থেকে লোহার খাঁচা তুলে নেওয়ার দাবি জানান এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

আদালতে লোহার খাঁচায় আসামি রাখাকে সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী মনে করেন সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ। এ বিষয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচারের মুখোমুখি কোনো আসামির সঙ্গে সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের চেতনার পরিপন্থী কোনো আচরণ সমর্থনযোগ্য নয়। একজন আসামিকে লোহার খাঁচায় ঢোকানো কিংবা ঢুকতে বাধ্য করা অমানবিক। এটি সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।’

সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না কিংবা কারও সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা যাবে না। এ ছাড়া নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার–সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদের (ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস–আইসিসিপিআর) ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তি দেওয়া যাবে না। আইসিসিপিআরের অনুচ্ছেদ ১৪(২) অনুযায়ী, ফৌজদারি অপরাধের জন্য অভিযুক্ত প্রত্যেকের আইন অনুযায়ী দোষী প্রমাণের আগপর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য হওয়ার অধিকার থাকবে।    

বিচারিক আদালতের এজলাস কক্ষ থেকে লোহার খাঁচা অপসারণের নির্দেশনা চেয়ে ১০ আইনজীবী গত ২৩ জানুয়ারি হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। ওই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেন। দেশের কোন কোন আদালতের ভেতরে (অধস্তন আদালতের এজলাস কক্ষ) লোহার খাঁচা রয়েছে, তা জানতে চান হাইকোর্ট।

রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে দেশের কোন কোন বিচারিক আদালতে লোহার খাঁচা রয়েছে, সেই তথ্য জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তাঁর জানামতে, লোহার খাঁচা থাকার তথ্য হাইকোর্টে জমা দেওয়া হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসও আদালতের এই লোহার খাঁচা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছিল। ওই সব মামলায় হাজিরা দিতে তাঁকে বহুবার আদালতে যেতে হয়েছে। গত ১২ জুন পুরান ঢাকার একটি আদালতে হাজিরা দেওয়ার পর আদালত চত্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘আজকে আমরা অনেকক্ষণ খাঁচার (আসামির কাঠগড়া) মধ্যে ছিলাম। বলা হয়েছিল, আপনি থাকেন। কিন্তু আমরা সারাক্ষণ লোহার খাঁচার মধ্যে ছিলাম। আমি আগেও প্রশ্ন তুলেছি, এটা ন্যায্য হলো কি না? আমি যত দূর জানি, যত দিন আসামি অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত না হচ্ছে, তত দিন তিনি নিরপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবেন।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূস আরও বলেছিলেন, ‘একজন নিরপরাধ নাগরিককে লোহার খাঁচার (আসামির কাঠগড়া) মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে শুনানির সময়, এটা আমার কাছে অত্যন্ত অপমানজনক। এটা গর্হিত কাজ। এটা কারও ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য না হয়। একটা পর্যালোচনা হোক। একটা সভ্য দেশে কেন একজন নাগরিককে পশুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে শুনানির সময়, যেখানে একজন নাগরিক দোষী সাব্যস্ত হননি। অনেক আইনজ্ঞ আছেন, বিচারপক্ষের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা পর্যালোচনা করে দেখবেন, এটা রাখার দরকার আছে কি নেই। সারা সভ্য দুনিয়ায় যেভাবে হচ্ছে, সেভাবে হবে। আমরা সভ্য দেশের তালিকায় থাকতে পারি। লোহার খাঁচা মানবতার প্রতি অপমান। কেন পশুর মতো একজন মানুষকে খাঁচার ভেতর ভরে রাখবে? এটা সরিয়ে ফেলা উচিত।’
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে গত বুধবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। তখনো তাঁদেরকে এজলাস কক্ষে থাকা লোহার খাঁচার ভেতর ঢোকানো হয়েছিল।

কী করা উচিত

সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবী জানিয়েছেন, একটা সময় পৃথিবীর অনেক দেশেই ফৌজদারি মামলার আসামিদের আদালতকক্ষের লোহার খাঁচায় রাখা হতো। তবে আইসিসিপিআরের চেতনার পরিপন্থী হওয়ায় অনেক দেশই লোহার খাঁচায় আসামি রাখার পদ্ধতিতে থেকে সরে এসেছে। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ কিংবা আমেরিকার ফৌজদারি আদালতে লোহার খাঁচায় আসামি রাখা হয় না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের ফৌজদারি আদালতগুলোয় আসামি রাখা হতো কাঠের তৈরি কাঠগড়ায়। সংবিধান অনুযায়ী, বিচারের মুখোমুখি কোনো আসামির সঙ্গে নিষ্ঠুর কিংবা অমানবিক আচরণ করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কোনো আসামিকে লোহার খাঁচায় রাখা অমানবিক বিষয়।

লোহার খাঁচায় আসামি রাখার পদ্ধতি তুলে দিয়ে আগের মতো কাঠগড়ায় তাঁদের রাখা উচিত বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। সদ্য অবসরে যাওয়া জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ সাইফুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আদালতের ভেতর লোহার খাঁচা নেই। অবিলম্বে আদালত থেকে লোহার খাঁচা তুলে নেওয়ার মত দেন তিনি।

লোহার খাঁচা রাখার আগে যেভাবে আসামিদের কাঠগড়ায় রাখা হতো কিংবা আসামিরা যেভাবে এজলাস কক্ষে অবস্থান করতেন, সেটি পুনরায় চালু করা উচিত বলে মনে করেন সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ।