Sunday, March 1, 2026

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি: আজকের ইরানকে গড়ে তুলেছিলেন তিনি

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

আজ রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে আলী খামেনির নিহত হওয়ার খবর জানানো হয়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে শনিবার যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার কথা বলেছিলেন।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। এর আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে তিনি ইরানে ইসলামি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন।

১৯৭৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে গঠিত সরকারে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ (ধর্মীয় নেতাদের একটি পর্ষদ) আলী খামেনিকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করে; যদিও তাঁকে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দিতে সংবিধান সংশোধন করার প্রয়োজন পড়েছিল।

আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন সেই আদর্শগত শক্তি, যিনি ইরানে পাহলভি রাজতন্ত্র অবসানের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন সেই নেতা, যিনি ইরানের সামরিক ও আধা সামরিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালীরূপে গড়ে তুলেছিলেন। এ ব্যবস্থা শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে ক্ষান্ত হননি, বরং দেশের সীমার বাইরে গিয়েও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। আজকের ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা তিনিই গড়ে তুলেছিলেন।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে দেশটির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

দীর্ঘ যুদ্ধ, সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার কারণে ইরানিদের ভেতর একধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আলী খামেনির অবিশ্বাস আরও গভীর হয় বলে মত বিশ্লেষকদের।

আর এই মনোভাবই তাঁর দশকব্যাপী শাসনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। তাঁর এই ধারণাকে দৃঢ় করেছিল যে ইরানকে সব সময় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় থাকতে হবে।

এই মনোভাব থেকেই তিনি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীকে (আইআরজিসি) আধা সামরিক বাহিনী থেকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। পরে এই বাহিনী পুরো অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা গ্রহণ করে।

খামেনি ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখেও স্বনির্ভরতা বাড়ানো যায়। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে গভীরভাবে সন্দিহান থাকতেন।

আলী খামেনির প্রতিরক্ষামূলক নীতি প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে—এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতেন।

শুধু তা–ই নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভেতরেও তাঁর শাসন মারাত্মক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। এর মধ্যে ২০০৯ সালে কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে ‘ছলনা’ দাবি করে বহু মানুষ সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। আলী খামেনি কঠোর হাতে ওই বিক্ষোভ দমন করেন।

এরপর ২০২২ সালে তেহরানে মাসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণীর পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে তীব্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। কয়েক মাস ধরে ওই আন্দোলন চলে। সেবারও কঠোর হাতেই বিক্ষোভ দমন করেছিলেন আলী খামেনি।

তবে ৩৭ বছরের শাসকজীবনে আলী খামেনি খুব সম্ভবত এ বছর জানুয়ারিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়ালের ব্যাপক দরপতন ঘিরে গত বছর ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে ব্যবসায়ী ও দোকানদারেরা বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে পুরো দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, বিক্ষোভকারীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের ডাক দেন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর বাবা একজন খ্যাতনামা মুসলিম নেতা ছিলেন। তিনি (বাবা) পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাকের আজারবাইজানি জাতিসত্তার ছিলেন।

আজারবাইজানি পরিবারটি প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ইরানের তাবরিজে বসবাস শুরু করেছিল, পরে মাশহাদে চলে আসে। শহরটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের পছন্দের স্থান। সেখানে আলী খামেনির বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের প্রধান ছিলেন।

আলী খামেনির মায়ের নাম খাদিজা মিরদামাদি। খামেনি নিজের মাকে পবিত্র কোরআন ও অন্যান্য বইয়ের একজন একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

খাদিজা মিরদামাদি তাঁর সন্তানের মধ্যে সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা জন্মিয়েছিলেন। পাহলভি রাজবংশের শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আন্দোলনে যোগ দেওয়াতেও মায়ের সমর্থন ছিল।

চার বছর বয়সে আলী খামেনি লেখাপড়া শুরু করেন। তিনি পবিত্র কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং মাশহাদের প্রথম ইসলামি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি হাইস্কুল শেষ করেননি; এর পরিবর্তে ধর্মতাত্ত্বিক স্কুলে ভর্তি হন এবং সে সময়ের খ্যাতনামা ইসলামি পণ্ডিতদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে তাঁর বাবা এবং শেখ হাসেম গাজভিনিও ছিলেন।

পরবর্তী বছরগুলোয় আলী খামেনি নাজাফ ও কোমের আরও খ্যাতনামা শিয়া উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলোয় লেখাপড়া চালিয়ে যান।

কোমে কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুসলিম ধর্মীয় নেতার সঙ্গে আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যাঁদের একজন ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। শাহ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে রুহুল্লাহ খোমিন তরুণ ধর্মশিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন।

এভাবেই আলী খামেনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শাহ শাসনের সময় তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁকে ইরানের প্রত্যন্ত শহর ইরানশাহরে নির্বাসিত করা হয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে শাহ পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লব শুরু হলে তিনি বিক্ষোভে অংশ নিতে ফিরে আসেন।

সর্বোচ্চ নেতা

১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব সফল হয়। ইরানে পাহলভি রাজবংশের শাসনের অবসান হয়। নতুন শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় চলে আসেন আলী খামেনি।

আলী খামেনি ১৯৮০ সালে অল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সূচনার পর তিনি ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন।

১৯৮১ সালটি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেবার অল্পের জন্য তিনি গুপ্তহত্যার চেষ্টা থেকে প্রাণে রক্ষা পান। তবে তাঁর ডান হাতটি অকেজো হয়ে যায়। ওই বছরই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনিই ইরানের প্রথম ধর্মীয় নেতা, যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ইসলামি বিপ্লবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

খোমেনি মৃত্যুর আগেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বহু বছর আগে থেকে নির্ধারিত আয়াতুল্লাহ হোসেইন আলী মন্তাজেরিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আলী মন্তাজেরি ১৯৮৮ সালে বন্দীদের গণমৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন।

পরে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত একটি পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে।

খামেনিকে নিয়োগ দিতে ওই পর্ষদকে দেশের শীর্ষপদে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার শর্তগুলো শিথিল করতে হয়েছিল। কারণ, খামেনির কাছে হুজতুলইসলাম পদবি ছিল না। এটি উচ্চপদস্থ শিয়া আলেমদের একটি পদবি।

নিয়ম শিথিল করে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার পর এক ভাষণে খামেনি বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমি এই পদটির যোগ্য নই; হয়তো আপনি এবং আমি এ বিষয়টি জানি। এটি প্রতীকী নেতৃত্ব হবে, বাস্তব নেতৃত্ব নয়।’

প্রতীকী নয়, সত্যিকারের নেতা ছিলেন খামেনি

দায়িত্ব গ্রহণ করেই আলী খামেনি দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। খামেনি যখন ক্ষমতায় আসেন, ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এ যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়।

ইরানের সেনা ও সাধারণ মানুষের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল ইরাক। এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিশ্ব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি বলে মনে করা হয়। ফলে এ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইরানের ক্ষোভ উসকে দিয়েছিল।

ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় খামেনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সে সময় তিনি প্রায়ই যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে যেতেন। সেখান থেকেই তিনি আইআরজিসি আনুগত্য অর্জন করেন এবং যুদ্ধের বাস্তবতা সরাসরি উপলব্ধি করেন।

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তিনি সামরিক এবং আধা সামরিক ব্যবস্থাকে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন, যেন দেশের বিরুদ্ধে অবিরাম আক্রমণ মোকাবিলা করা যায় এবং ধারাবাহিক প্রতিরোধ নিশ্চিত হয়।

‘শান্তিও না, যুদ্ধও না’

শুধু কট্টর ধর্মীয় নেতা নয়, খামেনি একজন বাস্তববাদীরা নেতাও ছিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি বিশ্বাস করতেন যে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াই ভিন্ন কৌশলে পরিচালনা করতে হবে; প্রতিরোধ করতে হবে, কিন্তু প্রয়োজনে আলোচনাও করতে হবে।

২০১৫ সাল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তত দিনে দেশটির ওপর নানা কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ধুঁকছিল।

আলী খামেনি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং সরকারের বৈধতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন।

আলী খামেনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় অনুমোদন দেন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তির সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তিতে উপনীত হয় ইরান। এটি ইরান পরমাণু চুক্তি নামে পরিচিত। ওই চুক্তিতে বলা ছিল, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনবে, বিনিময়ে ধাপে ধাপে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।

যদিও ওই চুক্তি হওয়ার তিন বছর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে বের করে আনেন এবং দেশটির ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এর জেরে আলী খামেনিও আবার তাঁর আগ্রাসী অবস্থানে ফিরে আসেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা বাতিল করেন এবং ধীরে ধীরে চুক্তি লঙ্ঘনের সমর্থন দেন।

২০১৯ সালে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ আরও বাড়ে। এর ফলে ইরানে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়, সে সময়ে সরকার পেট্রোলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে ইরানজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়।

নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, শতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হন।

বিক্ষোভের পেছনে প্রতিবিপ্লবীদের এবং বিদেশের ‘ইন্ধন’ আছে বলে অভিযোগ করেছিলেন খামেনি।

২০২২ সালে তেহরানে হিজাব আইন লঙ্ঘন করার অভিযোগে মাসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণীকে আটক করে ইরানের নীতি পুলিশ। পুলিশি হেফাজতে মাসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল।

এবারও কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করেন খামেনি। কয়েক মাস ধরে চলা ওই বিক্ষোভে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হয়।

প্রতিরোধ অক্ষ

খামেনির দৃষ্টিতে স্বাধীনতা ও শক্তি দেশের সীমার বাইরে থেকেও প্রয়োজন। তাহলে সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শত্রুর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করতে একটি ‘অগ্রগামী প্রতিরক্ষা’ ব্যবস্থা বজায় রাখা যায়।

এ ভাবনা বাস্তবে পরিণত হয় ইরানের বাইরে সহযোগী দেশ ও গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিলে বিকল্প বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে। ওই বাহিনীকে অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে ইরান। এই বাহিনীই ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ নামে পরিচিত। এটি ছিল খামেনির সবচেয়ে প্রভাবশালী কৌশলগত প্রকল্প।

খামেনির এই কৌশলের প্রধান স্থপতি ছিলেন কাসেম সোলাইমানি। তিনি খামেনির দৃঢ় সমর্থক এবং ইরানের কুদস বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে হত্যা করে।

গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের এই অক্ষ জোরালোভাবে আত্মপ্রকাশ করে।

এরপর ২০২৫ সালের ১৩ জুন ইসরায়েল ইরানে হামলা করে। যুক্তরাষ্ট্র এ হামলার বিষয়ে অবগত ছিল এবং পরে ইরানের কয়েকটি পারমাণবিক ক্ষেত্রে বোমা হামলা চালায়। ১২ দিন ধরে ওই যুদ্ধ চলে।

সর্বশেষ গত ২৮ ডিসেম্বর আবারও ইরান বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। সে সময়ে ট্রাম্প বারবার ইরানে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন। প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরিসহ নৌবহর পাঠিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন।

এদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনাও চলছিল। ওই আলোচনায় যখন অগ্রগতির খবর পওয়া যাচ্ছিল, ঠিক সে সময়ে গতকাল শনিবার ইরানে যৌথভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায়। হামলায় নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: এএফপি

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কঠিন করে তুলছে ইসরায়েল

পশ্চিম তীরে জমি দখলে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহায়তা করতে পদক্ষেপ নিয়েছে ইসরায়েল। এ ভূখণ্ডের যেসব অংশে ফিলিস্তিনিদের কিছুটা হলেও স্বশাসন রয়েছে, সেখানে ইসরায়েলিদের ক্ষমতা বাড়াতে তৎপরতা শুরু করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো ইসরায়েল–ফিলিস্তিন দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণার ওপর সর্বশেষ আঘাত। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের এই রূপকল্প ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অসলো চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এ সমাধানের পথে বাধা বেড়েছে। ফলে দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশা।

ইসরায়েলের নতুন সিদ্ধান্তগুলো কী

পশ্চিম তীরের জমির গোপন দলিলগুলো সামনে আনার মাধ্যমে বসতি স্থাপনকারীদের সেখানে জমি দখলের গতি বাড়াবে ইসরায়েল। এ ছাড়া পশ্চিম তীরে জমি কেনা-সংক্রান্ত জর্ডানের একটি আইন বাতিল করা হবে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিম তীর জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

অসলো চুক্তিতে পশ্চিম তীরকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—তিন অংশে ভাগ করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘এ’ ও ‘বি ’ অংশে ‘তদারকি ও আইন প্রয়োগমূলক পদক্ষেপ’ বাড়াবে ইসরায়েল। ‘এ’ অংশে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ‘বি’ অংশে তারা বেসামরিক বিষয়গুলো পরিচালনা করে। তবে নিরাপত্তা ইসরায়েলের হাতে। আর ‘সি’ অংশে ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের শুরু কোথায়

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্রে ভাগ করার পরিকল্পনা অনুমোদন করে। ইহুদিরা ভূখণ্ডের ৫৬ শতাংশ জমি পেয়েছিলেন। আরব লিগ তখন এটি প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। এর এক দিন পর পাঁচটি আরব দেশ ইসরায়েল আক্রমণ করে। যুদ্ধ শেষে দেখা যায়, ইসরায়েল ৭৭ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।

পরে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম এবং মিসরের কাছ থেকে গাজা দখল করে নেয় ইসরায়েল। সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও ইসরায়েলের দখল করা ভূখণ্ডে প্রায় ৯০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন। আরও ২০ লাখ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের নাগরিক হিসেবে দেশটিতে বাস করছেন।

ব্যর্থ যত প্রচেষ্টা

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাত অসলো চুক্তিতে সই করেছিলেন। এই চুক্তিতে ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার ও সহিংসতা ত্যাগের কথা বলা হয়েছিল। ফিলিস্তিনিরা আশা করেছিল, এটি পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে একটি পদক্ষেপ হবে।

কিন্তু উভয় পক্ষ থেকেই এই প্রক্রিয়া একাধিকবার হোঁচট খেয়েছে। ২০০৭ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গাজা দখল করে নেয় হামাস। এর আগে ২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাককে ক্যাম্প ডেভিডে নিয়ে আসেন। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। এর প্রধান বাধা ছিল জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ।

আজ বাধাগুলো কতটা জটিল

২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের প্রত্যাহার করলেও পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসতি সম্প্রসারিত হয়েছে। ইসরায়েলি সংস্থা পিস নাউর মতে, এই বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা ১৯৯৩ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে তিন দশক পর ৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এটি একটি কার্যকর রাষ্ট্রের ভিত্তি নষ্ট করছে।

২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত। এ সরকারের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা বসতি স্থাপনকারীদের সমর্থন দিয়ে থাকেন। তাঁদের ভাষ্য, ফিলিস্তিনি জাতি বলে কিছু নেই।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

খামেনির মৃত্যু হলে থমকে যাবে না ইরান, রয়েছে মাস্টারপ্ল্যান

ইরানের ওপর ইসরায়েলি বা যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কিংবা শীর্ষ নেতাদের গুপ্তহত্যার আশঙ্কার মধ্যে এক ‘মাস্টারপ্ল্যান’ হাতে নিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, খামেনির অবর্তমানে বা যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানিকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদি কোনো কারণে সর্বোচ্চ নেতা বা দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব নেতৃত্ব দানে অক্ষম হন বা নিহত হন, তবে দেশকে টিকিয়ে রাখা এবং প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান। খামেনি নিজেই এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং হামলার হুমকির মুখে এই আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান। মূলত সম্ভাব্য রাজনৈতিক শূন্যতা বা নেতৃত্বহীনতা এড়াতে খামেনির এ আগাম সিদ্ধান্ত ইরানজুড়ে নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ার মতো মিত্র নেতাদের ওপর সফল গুপ্তহত্যার ঘটনা ইরানকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খামেনি মনে করছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড বা নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এই শূন্যতা পূরণে এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে আলী লারিজানি বা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্য ও উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বরাতে গত রোববার নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

খামেনির নির্দেশনা অনুযায়ী, তার নিয়োগ দেওয়া সামরিক ও সরকারি পদগুলোর জন্য চার স্তরের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো কর্মকর্তা নিহত হলে তার পর ধাপে ধাপে কোন চারজন নিয়োগ পাবেন, তা ঠিক করা হয়েছে। এ ছাড়া, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও নিজেদের অন্তত চারজন উত্তরসূরির নাম ঠিক করে রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লারিজানি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে নেই বললে চলে। কারণ, এই পদের জন্য জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেম হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব যদি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে দেশ পরিচালনার জন্য যারা যোগ্য প্রার্থী, তিনি তাদের অন্যতম।

কে এই আলী লারিজানি

আলী লারিজানি ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান। গত আগস্টে এই নিরাপত্তাপ্রধানকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই কাউন্সিল মূলত দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি–সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখে। তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব গুপ্তহত্যার শিকার হলে ইরানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে খামেনি যেসব ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগীকে দায়িত্ব দিয়েছেন বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, আলী লারিজানি তাদের মধ্যে অন্যতম।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার এ প্রেক্ষাপটে খামেনির পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে নানা জল্পনা চলছে। চলতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও আদতে উত্তেজনা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ এড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার খামেনেয়ি ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস’ করতে পারবেন না।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ডিক্রির মাধ্যমে খামেনেয়ি বিশ্বকে দুটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। যেমন- নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও ইরানের নীতি বা প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হবে না এবং শত্রুপক্ষকে জানানো যে, শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেও ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্র অচল করা সম্ভব নয়।

প্রসঙ্গত, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিন ধরে চলা সংঘাতের সময় খামেনি তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নাম ঘোষণা করেছিলেন।

এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব ইরানের এই নতুন সাংগঠনিক বিন্যাসকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা খামেনি।

অপরদিকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য ঠিক কী, তা এখনও স্পষ্ট করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সামরিক শক্তি মোতায়েনের পাশাপাশি তিনি কূটনৈতিক সমঝোতার কথাও বলছেন। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে ক্রমেই উত্তেজনা বাড়লেও সম্ভাব্য সংঘাত শেষ পর্যন্ত কোন পথে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।

বার্তাসংস্থা এএফপি বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিলেও, দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা স্পষ্ট করেননি। ইতোমধ্যে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ ও বহুসংখ্যক যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছেন। ফলে পরিস্থিতি যে কোনও সময় বড় আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি ইরানের ক্ষমতাসীন ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ওপর সীমিত আঘাত হানতে চান? নাকি ইসরায়েলের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে চান? এমনকি তেহরানে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টাও কি তার পরিকল্পনায় আছে? অবশ্য ইরান আগেই সতর্ক করেছে যে হামলা হলে কঠোর প্রতিশোধ নেয়া হবে। 

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি : সংগৃহীত
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ছবি : সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে by টোবিয়াস বুন্ডে ও সোফি আইজেনত্রাউট

বিশ্বরাজনীতি এখন যেন একধরনের ‘ধ্বংসকারী শক্তি’র রাজনীতির যুগে ঢুকে পড়েছে। এমন সব নেতা উঠে এসেছেন, যাঁরা সংস্কারের বদলে ব্যাপক ভাঙচুরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন। সমস্যা হলো এই মনোভাব কেবল কয়েকজন চরমপন্থী নেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আজকের এই ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক এজেন্ডার পেছনে আছে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ব্যাপক হতাশা এবং নীতিনির্ধারকদের প্রকৃত পরিবর্তন আনার সক্ষমতার ওপর আস্থার গভীর সংকট।

২০২৬ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের জন্য করা এক জরিপে দেখা গেছে, জি-৭ দেশগুলোর খুব অল্পসংখ্যক মানুষই মনে করেন, তাঁদের বর্তমান সরকারের নীতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে ভালো করবে। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করেন, বর্তমান নীতির ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অবস্থা আরও খারাপ হবে।

এখনকার পরিস্থিতিতে যে নেতারা নিয়মকানুন ভেঙে জোর করে সবকিছু বদলাতে চান, তাঁদের আর শুধু মেনে নেওয়া হচ্ছে না, অনেক সময় মানুষ উল্টো তাঁদের বাহবা দিচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বাঁধাধরা নিয়ম ভেঙে দেওয়ার কথা যাঁরা বলেন, তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে সাজাতে গিয়ে সেই ভিত্তিগুলোকেই নড়বড়ে করে দিয়েছেন, যেগুলোর ওপর প্রায় ৮০ বছর ধরে আমেরিকার বিশ্বনীতি দাঁড়িয়ে ছিল।

এই ভিত্তি ছিল মূলত তিনটি। এক. জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা আর নিয়মকানুন মেনে চলা। দুই. বিশ্ব অর্থনীতিকে খোলা রাখা—দেশে দেশে বাণিজ্য ও পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানো। তিন. গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর গণতান্ত্রিক দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতাকে জোর দেওয়া।

ট্রাম্পের নীতিতে এই তিন ক্ষেত্রেই আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে দেখা গেছে।

এর ফল হিসেবে, যে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ভাঙতে চেয়েছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো নেতারা, সেই তালিকায় এখন যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই—যে দেশটি এত দিন এ ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্ত রক্ষক ছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী ‘প্যাক্স আমেরিকানা’র কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা এখন ভেতর থেকেই ক্ষয়প্রাপ্ত ও ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে।

ট্রাম্পের কিছু সমর্থকের কাছে তাঁর এই ধ্বংসাত্মক রাজনীতি নতুন করে কিছু ভালো গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ জোসেফ শুম্পেটার যাকে বলেছিলেন ‘সৃজনশীল ধ্বংস’—তার সঙ্গে মিল রেখে তাঁরা মনে করেন, প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য ধাপে ধাপে সংশোধন নয়, বরং মৌলিক ভাঙন দরকার।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে বৈশ্বিক ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যবাহী জোটগুলোর ওপর ‘ট্রাম্প ধাক্কা’ প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ভেঙে দিতে পারে এবং নীতিনির্ধারকদের এমন সব সমস্যার মোকাবিলায় বাধ্য করতে পারে, যেগুলো দীর্ঘদিন অচলাবস্থায় আটকে ছিল।

ন্যাটোতে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রগতি এবং ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতিকে উদাহরণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যেন ট্রাম্পীয় ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ ইতিমধ্যেই ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। নীতি আর আদর্শের ভিত্তিতে দেশগুলোর যে সহযোগিতা থাকার কথা, তার জায়গা এখন দখল করছে সুযোগসন্ধানী চুক্তি, যেগুলো অনেক সময়ই ক্ষমতাবানদের নিজের লাভের জন্য করা।

নীতিনির্ধারকেরা সাধারণ মানুষের স্বার্থের বদলে নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে চলার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, আর তার জায়গায় শক্তিশালী দেশগুলোর ইচ্ছাই বড় হয়ে উঠছে।

এ কারণেই মিউনিখ নিরাপত্তা সূচক ২০২৬-এর জরিপে প্রায় সব দেশেই মানুষ এই ‘সবকিছু ভেঙে ফেলার’ রাজনীতিকে নেতিবাচক চোখে দেখছে। এমনকি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতেও—যারা শুরুতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে কিছুটা আশাবাদী ছিল—এই মনোভাব বদলে গেছে।

জরিপে দেখা গেছে, চীন ও ভারত ছাড়া সব দেশেই বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন না যে ট্রাম্পের নীতিগুলো তাঁদের দেশ বা পুরো বিশ্বের জন্য ভালো। চীন ও
ভারতেও সংখ্যাগরিষ্ঠ না হলেও অনেক মানুষ এ নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্র খুব শক্তিশালী দেশ—এ কারণে তার পররাষ্ট্রনীতির বদল গোটা বিশ্বে প্রভাব ফেলবে, এটা ঠিক। কিন্তু তাই বলে বাকি দেশগুলো একেবারে অসহায় নয়। যারা আবার পুরোনো ধাঁচের বড় শক্তির রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না, তাদের এখনই একসঙ্গে এগোতে হবে।

* টোবিয়াস বুন্ডে, বার্লিনের হার্টি স্কুলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ের অধ্যাপক এবং সোফি আইজেনত্রাউট, মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি

ট্রাম্পের দর্শন ঘরে চলছে না, বিদেশে রপ্তানির তোড়জোড়

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রকে আবার মহান করে তোলা। এ লক্ষ্যে তিনি মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন (মাগা) দর্শন নিয়ে কাজ করছেন। মাগা মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয় করে তোলা রাজনৈতিক স্লোগান। ট্রাম্প ২০১৬ ও ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রচারের সময় এ স্লোগান তোলেন।

ট্রাম্প প্রায়ই একধরনের হতাশা ব্যক্ত করছেন এই ভেবে যে তাঁর দেশের নাগরিকেরা সম্ভবত তাঁদের জীবনের ‘সোনালি সময়ে’ বাস করছেন—এটি তাঁরা যথেষ্ট উপলব্ধি করতে পারছেন না। তবে দেশের মানুষের এই অনীহা ট্রাম্পকে থামিয়ে রাখতে পারছে না। নিজের আদর্শকে বিদেশে রপ্তানি করতে উঠেপড়ে নেমেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে কট্টর ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী নেতাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা বা তাঁদের উত্থান নিশ্চিত করাই তাঁর লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্যপূরণেই হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানকে সমর্থন জোগাতে বুদাপেস্টে হাজির হয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। অরবান রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হলেও মার্কিন স্বার্থে তাঁকে ক্ষমতায় রাখতে চান ট্রাম্প।

ট্রাম্পের আদর্শ

জনতুষ্টিবাদী ও একনায়কতন্ত্রের অনুসারী অরবান ট্রাম্পের মাগা নামের রাজনৈতিক আদর্শ আসার আগে থেকেই এর চর্চা করছেন। বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, অভিবাসনে কঠোর নীতি, অনুগত শক্তিশালী অভিজাত শ্রেণির ক্ষমতার দাপট আর সংবাদপত্রের টুঁটি চেপে ধরা—অরবানের এই কৌশলগুলোই যেন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীলনকশা। তবে অরবান এখন তাঁর টানা ১৫ বছরের ক্ষমতার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ।

ইউক্রেন ইস্যু থেকে শুরু করে মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ কিংবা জ্বালানিনীতি—সব কটি ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া অরবানের সঙ্গে মার্কো রুবিওর এই সাক্ষাৎ মূলত একটি শক্তিশালী বার্তা। গত সপ্তাহে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে রুবিওর নমনীয় সুর দেখে যাঁরা ভেবেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের উত্তেজনা এবার হয়তো কমতে শুরু করেছে, তাঁদের সেই আশায় কার্যত জল ঢেলে দিলেন তিনি।

রুবিওর উচ্চাকাঙ্ক্ষা

রুবিওর এই অবস্থান তাঁর নিজের রাজনৈতিক বিবর্তনেরও এক বড় প্রমাণ, যা ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে বেশ জরুরি। ফ্লোরিডার এই তৎকালীন সিনেটর রুবিও ২০১৯ সালের এক বিবৃতিতে অরবানের অধীনে হাঙ্গেরির গণতন্ত্রের ‘মারাত্মক অবক্ষয়’ নিয়ে কথা বলেছিলেন। আর গত সোমবার সেই রুবিও অরবানের মুখোমুখি হয়ে বললেন, ‘আমরা আমাদের দুই দেশের সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ে প্রবেশ করছি। এটি কেবল জনগণের ঐক্যের কারণে নয়; বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আপনার সুসম্পর্কের কারণেই সম্ভব হয়েছে।’

তবে এখানে রুবিওর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাই শেষ কথা নয়। হাঙ্গেরির নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের অরবানের পাশে দাঁড়ানো আসলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে এক বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত। এতে বোঝা যায়, ঐতিহ্যগত অবস্থানগুলোকে এক পাশে সরিয়ে কট্টর ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছে ওয়াশিংটন। ইউরোপের অনেক নেতা এখন তাঁদের দীর্ঘদিনের ‘রক্ষাকর্তা’ যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।

অন্য দেশে হস্তক্ষেপ

এ বছরই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন; কিন্তু ট্রাম্প এর আগেই মার্কিন নির্বাচনী ব্যবস্থা জালিয়াতিতে ভরা বলে দাবি করেছেন। দেশের অভ্যন্তরে নিজের মতাদর্শ নিয়ে হোঁচট খেলেও তিনি অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নাক গলানোর এক প্রবল ইচ্ছা দেখিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্প ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, হন্ডুরাস ও পোল্যান্ডের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন। এমনকি নিকোলা মাদুরোকে তুলে আনার পর ওভাল অফিস থেকেই ভেনেজুয়েলা চালানোর দাবিও তুলেছেন। ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ কোনো সাময়িক খেয়াল নয়। তিনি তাঁর লক্ষ্যগুলোকে নতুন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বিধিবদ্ধ করেছেন।

ট্রাম্পের বার্তাবাহক

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ট্রাম্পের বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপের জনতোষণবাদী দলগুলোর সমর্থকদের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। তবে ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, এই জনতোষণবাদী শক্তিগুলো স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি। তাঁরা ট্রাম্পের নীতিকে ঘৃণা করেন এবং অভিবাসন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া বার্তাগুলোকে ইউরোপীয় মানবাধিকার ও সংহতির পরিপন্থী বলে মনে করেন।

মাগা নিয়ে সন্দেহ

ট্রাম্পের মাগা বার্তা বিদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার পেছনে এক বড় ধরনের বিদ্রূপও লুকিয়ে আছে। কারণ, নিজ দেশে তিনি এখন ইতিহাসের অন্যতম নাকি অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। জনমত জরিপে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে এবং রিপাবলিকান নেতারা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কা করছেন। খোদ মার্কিন জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই যেখানে তাঁর বিশ্বদর্শন গ্রহণ করছে না, সেখানে ইউরোপে তাঁর আদর্শ রপ্তানির চেষ্টা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি: সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল, গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে ওঠে

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ ইকবাল করিম এই জবানবন্দি দেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল–১–এর অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো.মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দি অসমাপ্ত রয়েছে। আগামীকাল সোমবার তাঁর আবার জবানবন্দি দেওয়ার কথা। ইকবাল করিম ভূঁইয়ার দেওয়া প্রথম দিনের জবানবন্দির পূর্ণ বিবরণ এখানে দেওয়া হলো—

‘আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক সেনাপ্রধান। আমি ২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলাম। আমি সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুম ও খুনের সংস্কৃতি কীভাবে বেড়ে উঠেছে, সে সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে এসেছি। পাশাপাশি আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে র‍্যাব সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে এসেছি।’

সেনাবাহিনীতে খুনের সংস্কৃতি আগে থেকেই ছিল। গুমের সংস্কৃতি পরে গড়ে উঠেছে। আমরা যদি ধরে নিই যে ২০০৮ সাল থেকে খুন শুরু হয়েছে, তবে সেটা ভুল বলা হবে। প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতার পর থেকেই খুনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সেনানিবাসের বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে। সে সময় কথিত অপরাধীদের ধরে সেনা ক্যাম্পে এনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন করা হয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তবে তার সংখ্যা ছিল সীমিত। পরে তদন্ত আদালতের মাধ্যমে এবং আইন প্রয়োগ করে সেগুলোকে নিয়মিত করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলাকালে বেশ কিছু মৃত্যু হয়েছে। যেগুলো কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে, সেগুলোকে ধর্তব্যে নিয়ে দোষী ব্যক্তিদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ হচ্ছে বহিঃশত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক বাহিনীকে তাদের সাহায্যে সময়–সময় মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া দুর্যোগকালেও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। এমনকি নির্বাচনকালেও সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করা হয়। সবার ধারণা সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, তাই এটি একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সেনাবাহিনীকে যখনই বাইরে মোতায়েন করা হয়, অধিনায়কদের মনে একটি সার্বক্ষণিক চাপ থাকে তাদের কত তাড়াতাড়ি সেনানিবাসে ফেরত আনা হবে। কারণ, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে প্রাণঘাতী অস্ত্র থাকে এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ ‘এক গুলি, এক শত্রু’ নীতির ওপর পরিচালিত হয়ে থাকে। বস্তুত এটি না হলে সেনাবাহিনী কখনো যুদ্ধ করতে পারবে না। এ জন্য প্রশিক্ষণকালে সেনাসদস্যদের ডিহিউম্যানাইজ করা হয়। তারা ধীরে ধীরে মানুষকে মানুষ মনে করা ভুলে যায়, মানুষকে টার্গেট বলতে শুরু করে। ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটের ওপর গুলি করে তাদের মানুষ হত্যার মনস্তাত্বিক বাধা দূর করা হয়। এ কথা মনে রেখে সেনাবাহিনীকে কখনো বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। অথচ সেটাই ঘটেছে ২০০৩ সালে, যখন র‍্যাব গঠন করা হয়। এটি ছিল একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। সেনাসদস্যদের যে প্রশিক্ষণ তা র‍্যাবে নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ছিল না। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে কিছু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। র‍্যাব গঠনের পূর্বে অপারেশন ক্লিনহার্টে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেনাসূত্র অনুযায়ী ১২ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এই সংখ্যাটি ছিল ৬০ জন। পরে ক্লিন হার্টের সব সদস্যকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়। বস্তুত এই ইনডেমনিটি ছিল হত্যার লাইসেন্স প্রদান।

২০০৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর জন্য যে সংঘাত শুরু হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্টেট অব ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়। ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে ডিজিএফআই হয়ে ওঠে দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক। বিভিন্ন সময়ে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে তাদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করত। এর মধ্যে অনেক মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ছিলেন। তাঁরা বিএনপির জনাব তারেক রহমানকেও উঠিয়ে এনে নির্যাতন করে। এ সময় থেকে বস্তুত বেসামরিক ব্যক্তিদের উঠিয়ে এনে আটক রাখার সেলের মধ্যে রাখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। বস্তুত যেকোনো ব্যক্তিকে উঠিয়ে এনে যা ইচ্ছা তাই করা যায় মর্মে তারা ভাবতে শুরু করে। তারা ভাবতে শুরু করে যা কিছুই তারা করুক না কেন শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। জরুরি অবস্থায় সেনাসদস্যদের সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। তারা রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করে, তাদের মধ্যে আধিপত্যবোধের জন্ম হয়, সিনিয়র ও জুনিয়রের মধ্যে একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়, নগদ সংস্কৃতির উত্থান হয় এবং উপরস্থদের আদেশ অন্ধভাবে পালন করার প্রবণতা জন্ম হয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিডিআর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে ৫৭ জন সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৭ জন বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। পরে বিদ্রোহ দমন করার পর বিডিআর সদস্যদের অন্তরিণ করা হয় এবং সেখানে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। জিজ্ঞাসাবাদকালে পিলখানায় (বিডিআর সদর দপ্তর) র‍্যাব ও সামরিক সদস্য দ্বারা নির্যাতনের কারণে আনুমানিক ৫০ জন বিডিআর সদস্য মৃত্যুবরণ করেন বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়। পরে দায়রা আদালত কর্তৃক ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ অনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা অফিসারদের মধ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষ তীব্রতর হয়, সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে, পেশাদার অফিসারদের এক পাশে সরিয়ে অনুগত অফিসারদের ওপরে নিয়ে আসা হয় এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীকে নিয়োজিত করে বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়। এর বড় কারণ হলো শেখ হাসিনা ভাবতেন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ।

পরে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের শাসন আমলের দুর্বল দিকগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও প্রশাসনের ওপর তার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেন। এ জন্য তিনি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অনেক রাজনৈতিক নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেন এবং সংবিধান লঙ্ঘনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংবিধানে সংযোজন করেন।

এ সময় তিনি তাঁর আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর মাধ্যমে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সচেষ্ট হন। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি অচিরেই প্রধানমন্ত্রী ও বাহিনী প্রধানদের মধ্যে সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব, এনটিএমসি, আনসার, বিজিবি ইত্যাদি সংস্থাগুলোকে তাঁর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এর মাধ্যমে চারটি চক্রের উদ্ভব ঘটে। প্রথম চক্রটি হচ্ছে অপরাধ চক্র, যেটি ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব ও এনটিএমসিকে নিয়ে তিনি পরিচালনা করতেন। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন, হত্যা ও গুমের মতো ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে। দ্বিতীয় চক্রটি ছিল ডিপ স্টেট। এটি তিনি পরিচালনা করতেন এমএসপিএম (প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব), ডিজিএফআই, এনএসআই ইত্যাদির মাধ্যমে। এর মাধ্যমে তিনি তিন বাহিনী সম্পর্কে সব নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো বাহিনী প্রধানদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তৃতীয় চক্রটি ছিল কেনাকাটা চক্র। এটিতে সংযুক্ত ছিল পিএসও, এএফডি, ডিজিডিপি, বাহিনী প্রধান ইত্যাদি। এই চক্রের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কেনাকাটায় প্রভাব বিস্তার করতেন। চতুর্থ চক্রটি ছিল সামরিক প্রকৌশলী চক্র। মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের অফিসার হওয়ায় তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলাদা চক্র গড়ে তোলেন। এদের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে তাঁর প্রভাব বিস্তার করা শুরু করেন। এটি ছিল অবৈধ অর্থের প্রধান উৎস।

এবার র‍্যাবের কথা বলছি। সেনাপ্রধান হওয়ার পূর্ব থেকেই অন্য সামরিক সদস্যদের মতোই র‍্যাব সদস্যদের অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। সেনাপ্রধান হওয়ার পরপরই আমি র‍্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তী সময় লে. জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র‍্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরবর্তী কিছুদিন আমি পত্রিকাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারি ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও বদলে যায় যখন বেনজীর আহম্মেদ র‍্যাবের ডিজি হয়ে আসেন এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমি আমার ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (যিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আছেন) জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান এসে আমাকে জানান তিনি কথা বলেছেন কিন্তু কোনো ভালো প্রতিশ্রুতি তাঁর কাছ থেকে পাননি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল এসে আমাকে জানান কথা বলে কোনো লাভ হয়নি, ওর মাথা ইট ও পাথরের টুকরা দিয়ে ঠাসা। পরে আমাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল জানায় জিয়াউল আহসান তার বাসায় অস্ত্র রাখে, গার্ড মোতায়েন রাখে ও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে। তাকে সামরিক কোয়ার্টারে থাকার নিয়মকানুন মেনে এগুলো পরিত্যাগ করতে বলা হয়। পরে জিয়াউল আহসান, মেজর জেনারেল সিদ্দীকি ও তার কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ছত্রচ্ছায়ায় আমার আদেশ অমান্য করতে শুরু করে। দুজন অফিসারকে বিভিন্ন নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে শান্তি দেওয়ার জন্য র‍্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য পোস্টিং আদেশ জারি করার পরও সে তাদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। আমি জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করি। এটি কার্যকরী করার জন্য লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে দায়িত্ব দেই। পরে তিনি বিষয়টি মেজর জেনারেল তারেক আহম্মেদ সিদ্দীকিকে না জানানোর জন্য তার বিরাগভাজন হন। অচিরেই আমি এমএসপিএম মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে ফোন পাই। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন জিয়াউল আহসানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তা তুলে নেওয়ার জন্য। আমি না বলেছি। আমাকে তখন মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন জিজ্ঞাসা করেন কোনো চাকরিরত অফিসারকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা কি বিশেষ পদক্ষেপ? আমি বলি হ্যাঁ, এটি বিশেষ পদক্ষেপ এবং তুমি যদি সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করো, তাহলে তোমারও একই অবস্থা হবে। দুদিন পর সংঘাত এড়ানোর জন্য আমি নিজে থেকেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেই।

আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত তা হলো আমরা সেনাবাহিনী থেকে র‍্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দেই র‍্যাব, ডিজিএফআই এবং বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার পূর্বে ও পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে। যারা র‍্যাবে যেত তাদের আমি এই বলে মোটিভেট করতাম যে নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে। একজনকে হাত–পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। সত্যিকারের সাহস হচ্ছে হাত–পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। যারা ফেরত আসত, তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীর র‍্যাব সদস্যদের সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করলেন র‍্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।

পরে আমি ইন্টারভিউতে আসা অফিসারদের এই বলে সাহস জোগালাম যদি কাউকে কোনো কিলিং মিশনের জন্য বলা হয়, সে যেন আমাকে সরাসরি ফোন করে। আমি তাদের সেনাবাহিনীতে সম্মানের সঙ্গে ফেরত নিয়ে আসব এবং পুনর্বাসিত করব। আমার পাশাপাশি যারা র‍্যাবে নতুন যাচ্ছেন, তাঁদের মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল আনোয়ার, ডিএমআই এবং আমার পিএস কর্নেল সাজ্জাদও (বর্তমানে মেজর জেনারেল) মোটিভেট করতে থাকেন। কিছুদিন পর ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল আমাকে এসে জানান, আমাদের মোটিভেশনে কোনো কাজ হচ্ছে না। র‍্যাবে যোগদানের পরে অফিসারদের ডিমোটিভেট করা হচ্ছে। তবুও দুজন অফিসারকে যখন প্রথম রাত্রেই কিলিং মিশনে যেতে বলা হয়, তাঁরা ওখান থেকে চলে এসে ঢাকা সেনানিবাসের এমপি চেকপোস্টে রিপোর্ট করেন। আমি তাঁদের সসম্মানে সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করি।

এর মধ্যে ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরাগভাজন হন। তাঁকে মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দীকি ডিএমআই পদ থেকে সরিয়ে দেন। সাধারণত ডিএমআই সেনাপ্রধানের পছন্দের ব্যক্তি হয়ে থাকেন এবং তাঁকে সেনাপ্রধানই নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বদলি করে দেওয়া হয়, যা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার ফজলকেও বদলি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমার প্রবল বিরোধিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়।

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ছবি: তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে

ইরানকে কি চীন উদ্ধার করতে আসবে? by নেলসন ওয়ং

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ সংকটের ( উল্লেখ্য শনিবার ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র) দিকে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন বিশ্বের রাজধানীগুলো, সংবাদকক্ষ এবং নীতিনির্ধারণী মহলে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সেটি হলো চীন কি ইরানকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে? যদি আসে, সেই সাহায্য কেমন হবে?

এর উত্তরটি প্রচলিত সামরিক জোটে ‘দুই পক্ষের একটিতে থাকা’—এই দ্বিমাত্রিক ধারণাকে ভেঙে দেয়। চীন সরাসরি সেনা পাঠাবে বা কোনো যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়াবে—এ সম্ভাবনা কম। কিন্তু এটাকে নিষ্ক্রিয়তা বলে ধরে নেওয়া হলে তা হবে একবিংশ শতাব্দীর মহাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রকৃতি ভুলভাবে বোঝা।

ইরানের প্রতি চীনের সমর্থন বাস্তব, বহুস্তরীয় এবং সামরিক হস্তক্ষেপের তুলনায় বেশ টেকসই। এটি কেবল ভিন্ন একটি কৌশলগত পরিসরে পরিচালিত হয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন নিয়মিতভাবে তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। নীতির ওপর দাঁড়িয়ে চীন তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে।

গত মাসে জরুরি বৈঠকে জাতিসংঘে চীনের দূত সান লেই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে কঠোরভাবে বলেন, ‘বলপ্রয়োগ কখনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না। এটি সমস্যাকে আরও জটিল ও দুরূহ করে তুলবে। যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ এই অঞ্চলকে একটি অননুমেয় অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।’

এটা নিছক কথার কথা নয়। চীনের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্টভাবে ‘ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা সংরক্ষণে’ সমর্থন করে।

জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নিজের অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে চীন তেহরানকে একটি অমূল্য সুবিধা দিচ্ছে। সেটি হলে বিশ্বমঞ্চে ইরানকে বৈধতা প্রদান এবং পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী পাল্টা বয়ান তৈরি।

২০২১ সালে ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) পূর্ণ সদস্য হিসেবে অনুমোদন দেওয়ার পর চীনের কূটনৈতিক সমীকরণে মৌলিক পরিবর্তন আসে। এর মধ্য দিয়ে ইরান চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়। এর পরপরই তেহরান ব্রিকস জোটেও অন্তর্ভুক্ত হয়।

এগুলো কোনো সামরিক জোট নয়, কিন্তু এই জোটগুলো এমন কিছু তৈরি করে, যা সামরিক জোটের চেয়েও বেশি স্থায়ী।

গত বছর চীন, রাশিয়া ও ইরানের কূটনীতিকেরা বেইজিংয়ে বৈঠক করেন এবং ব্রিকস ও এসসিওর মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনে ‘সমন্বয় জোরদার’ করার বিষয়ে একমত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ঘনিষ্ঠতার অর্থ হলো—ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিষয়টি মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তিগুলোর জন্যও একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

চীন যদিও সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না, তবু দৃশ্যমান সামরিক সহযোগিতা থেকে বেইজিং পিছিয়ে থাকেনি। চলতি মাসের শুরুতে রাশিয়া, চীন ও ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে যৌথ নিরাপত্তা মহড়ার জন্য নৌযান মোতায়েন করে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের এক সহকারী এই মহড়াকে পশ্চিমা আধিপত্য মোকাবিলায় ‘সমুদ্রভিত্তিক বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ গড়ে তোলার প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন।

আরও বাস্তব বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে চীনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার খবর এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মিডল ইস্ট আই গত বছর জানায়, ইরান তার আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য চীনে তৈরি ভূমি থেকে আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা পেয়েছে। এটি ছিল তেলের বিনিময়ে অস্ত্র চুক্তির অংশ। এর মাধ্যমে তেহরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।

সংবাদমাধ্যমের খবরে এটাও এসেছে যে চীন থেকে ইরান জে–২০ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান, জে–১০সি বিমান এবং এইচকিউ–৯ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পেতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এখানে প্রতীকী একটি ঘটনাও তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি মাসে ইরানের বিমানবাহিনী দিবসে একজন চীনা সামরিক অ্যাটাশে ইরানি বিমানবাহিনীর এক কমান্ডারের হাতে জে–২০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের একটি মডেল তুলে দেন। প্রতীকী এ ঘটনাটিকে ব্যাপকভাবে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

চীনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সমর্থন মাঠযুদ্ধে দৃশ্যমান না হলেও, ইরানের জাতীয় হিসাব-নিকাশে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও চাপ সত্ত্বেও চীন ইরানের প্রধান জ্বালানি অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ ইরানি তেল কিনছে চীনা ক্রেতারা।

যুক্তরাষ্ট্র এটি লক্ষ করেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট শানদং প্রদেশের চীনা তেল পরিশোধনাগারকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে। ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দেয় ইরানের অবৈধ তেল রপ্তানি শূন্যে নামানো হবে। ওয়াশিংটনে চীন দূতাবাস এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানায়।

যদিও চীন–ইরান অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার মাঝে মাঝে মার্কিন আর্থিক ঝুঁকি এড়াতে ইরান থেকে তেল কেনা স্থগিত করে। তবে সামগ্রিক চিত্রটি হলো, বহিরাগত চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখার জন্য ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে ‘অক্সিজেন’ সরবরাহ করে যাচ্ছে চীন।

তাহলে এখানে প্রশ্নটি হলো চীন যদি ইরানকে ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক আশ্রয়, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, সামরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক ‘অক্সিজেন’ প্রদান করে, তাহলে কেন আরও এগিয়ে যায় না? কেন যুদ্ধজাহাজ পাঠায় না বা হস্তক্ষেপের সরাসরি হুমকি দেয় না?

উত্তরটি খুঁজতে হবে চীনের কৌশলগত অগ্রাধিকারের ভেতরে। বেইজিংয়ের সবচেয়ে জরুরি কৌশলগত লক্ষ্য হলো জাতীয় পুনর্মিলন অর্জন করা। এই লক্ষ্য পূরণের আগে, যেকোনো পদক্ষেপ যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যাপক সংঘাত ঘটাতে পারে, তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করবে চীন।

এ ছাড়া চীন বিশ্বাস করে যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় সামরিক পদক্ষেপ ইরানে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু দেশটির শাসকদের পরিবর্তন ঘটাবে না। এই পরিস্থিতিতে বেইজিং হয়তো ইরানের ক্ষেত্রেও ইউক্রেন সংঘাতের মডেল অনুসরণ করতে পারে। এর অর্থ হলো, ইরানের সঙ্গে চীন সরাসরি সম্পৃক্ততা এড়িয়ে চলবে। আক্রমণের শিকার দেশটির সঙ্গে রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্র সম্পর্ক বজায় রাখবে। জাতিসংঘে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন দেবে। এমন সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে, যা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে না।

চীন ইরানকে ‘উদ্ধার’ করবে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরটি সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে। যদি উদ্ধারের অর্থ সৈন্য ও যুদ্ধজাহাজ বোঝানো হয়, উত্তরটি হবে না। যদি উদ্ধারের অর্থ হয় ইরানকে টিকে থাকতে, প্রতিরোধ করতে এবং দর–কষাকষি করার ক্ষেত্রে ইরান যাতে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারে সে জন্য সহায়তা করা, তাহলে উত্তরটি নীরবে, স্থায়ীভাবে এবং কৌশলগতভাবে হবে হ্যাঁ।

* নেলসন ওয়ং, চীনের সাংহাইয়ে অবস্থিত সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-28%2F1bvoc597%2Firan-israel-us-conflict-070728.jpg?rect=0%2C0%2C6061%2C4041&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ছবি : রয়টার্স

হামলার মধ্যেই তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ

ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে আজ হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেই তেহরানের রাস্তায় নেমে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলিবিরোধী বিক্ষোভ করেছেন ইরানিরা।

এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা দেখা যায়। কেউ কেউ দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছবি নিয়ে যোগ দেন বিক্ষোভে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে নারী–শিশু উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়।

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয় এই নারী।  ইরান, ২৮ ফেব্রুয়ারি
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয় এই নারী। ইরান, ২৮ ফেব্রুয়ারি
ছবি: রয়টার্স
জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে তেহরানের সড়কে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ।  ইরান, ২৮ ফেব্রুয়ারি
জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে তেহরানের সড়কে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ। ইরান, ২৮ ফেব্রুয়ারি
ছবি: রয়টার্স
ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ছবি ও জাতীয় পতাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন ইরানিরা। ইরান, ২৮ ফেব্রুয়ারি
ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের ছবি ও জাতীয় পতাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন ইরানিরা। ইরান, ২৮ ফেব্রুয়ারি
ছবি: রয়টার্স

ইরানের রেডক্রিসেন্ট জানিয়েছে, দেশটির ৩২ প্রদেশের মধ্যে অন্তত ২০টিতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর মধ্যে শুধু দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ হরমোজগানে দুটি হামলায় ৭০ জন নিহত হয়েছে।

তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয় ইরানিরা। ইরান, ২৮ ফেব্রুয়ারি
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয় ইরানিরা। ইরান, ২৮ ফেব্রুয়ারি। ছবি: রয়টার্স