Sunday, December 13, 2009

ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা করবে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার দেশ তথা এই অঞ্চলের ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর বাসভবন যমুনায় এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) একটি প্রতিনিধিদল দেখা করতে এলে তিনি এ কথা বলেন।
১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ বিন হাম্মাম। খবর বাসস ও ইউএনবির।
কোপেনহেগেন যাচ্ছেন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোপেনহেগেনে চলমান জলবায়ুবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে সোমবার ঢাকা ত্যাগ করবেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের

হূদরোগ প্রতিরোধে সচেতন হওয়ার আহ্বান

যেকোনো বয়সে মানুষ হূদরোগে আক্রান্ত হতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরা, অপরিমিত খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে হূদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। হূদরোগের চিকিত্সা অনেক ব্যয়বহুল। সবার পক্ষে এ ব্যয়বহুল চিকিত্সা করানো সম্ভব হয় না। এ কারণে হূদরোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দিতে হবে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে হূদরোগসংক্রান্ত সম্মেলনে বক্তারা এ কথা বলেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেডট্রোনিক, ভিটাট্রোন ও পপুলার ফার্মা যৌথ উদ্যোগে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে দেশের বিশেষজ্ঞসহ ভারত থেকে আসা বিশেষজ্ঞেরাও অংশ নেন।

কুষ্টিয়ায় রাজাকারের তালিকা প্রকাশ

কুষ্টিয়ায় ১২৯ জন রাজাকারের নামের তালিকা প্রকাশ করেছে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি। গতকাল ১১ ডিসেম্বর শুক্রবার কুষ্টিয়ামুক্ত দিবসে শহরের মজমপুরে রাজাকার চত্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে এ তালিকা প্রকাশ করেন কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহরিয়ার কবির।
রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করতে পারা মানে তাদের বিচারের কাজে অনেকটা এগিয়ে যাওয়া।’

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার আহ্বান

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।
গতকাল শুক্রবার পার্টির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দলের পলিট ব্যুরোর সভায় এ আহ্বান জা নানো হয়। সভায় বলা হয়, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদী শক্তির উত্থান মোকাবিলায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য দৃঢ় করার বিকল্প নেই।
পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন বিমল বিশ্বাস, ফজলে হোসেন বাদশা, নুরুল হাসান প্রমুখ।

শিবচরে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখম

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নে গত বৃহস্পতিবার সকালে এক ব্যবসায়ীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। টিটু হাওলাদার (৩০) নামের এই ব্যবসায়ীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশ ও আহতের পারিবারিক সূত্র জানায়, ওই ইউনিয়নের মৃত হাসেন হাওলাদারের ছেলে মো. টিটু হাওলাদার ঢাকার কালীগঞ্জের আসিয়া সোয়েটার কারখানার মালিক। গত বৃহস্পতিবার সকালে তিনি বাড়ি থেকে ট্রলারযোগে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। ওত পেতে থাকা পাঁচ-ছয়জন দুর্বৃত্ত হাজরা এলাকায় টিটুকে ট্রলার থেকে নামায়। তারা টিটুকে নলবাধা এলাকায় নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথা ও হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। দুপুরে চরজানাত ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. বজলুর রহমান সরকার মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে উন্নত চিকিত্সার জন্য টিটুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আহত ব্যবসায়ী টিটু হাওলাদার অভিযোগ করেন, ‘হায়দার সরকার, শামিম সরকার, শাহিন সরকার, খোকনসহ পাঁচ-ছয়জন আমাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়। জ্ঞান ফেরার পর আমি চিত্কার করলে এলাকাবাসী আমাকে উদ্ধার করে।’
শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ. জলিল জানান,এ ব্যাপারে অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবনের নকশা চূড়ান্ত

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবনের নকশা চূড়ান্ত হয়েছে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত এই নকশাটি গতকাল শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে দর্শকদের সামনে উন্মুক্ত করা হয়। নকশাটির অন্যতম স্থপতি নাহিদ ফারজানা ভবনটিকে নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও এর তাত্পর্য দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে শিগগিরই এ নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালায় গতকাল ‘জাদুঘরের নতুন ভবন: নকশা, প্রত্যাশা ও স্বপ্ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট বাংলাদেশের (আইএবি) সাধারণ সম্পাদক স্থপতি কাজী গোলাম নাসির বলেন, এবারই প্রথম দেশে কোনো উন্মুক্ত নকশা প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি—৭০ জন স্থপতি অংশ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নবীন-প্রবীণ দুই-ই ছিলেন। তাঁদের নকশাগুলো বিশ্লেষণ করেছেন আটজন বিচারক। এরপর বিজয়ী নির্বাচন করা হয়েছে। তিনি প্রতিযোগিতার সেরা ১০টি নকশা অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করেন।
এই নকশা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন স্থপতি দম্পতি তানজিম হাসান সেলিম ও স্থপতি নাহিদ ফারজানা। সেলিম এখন দুবাইয়ে কর্মরত। দ্বিতীয় হয়েছেন যৌথভাবে স্থপতি এহসান খান, ইসতিয়াক জহির, ইকবাল হাবিব, জুবায়ের হাসান, মেহেদী আমিন ও শোয়েব আল রাহী। আর তৃতীয় হয়েছেন স্থপতি নাজমুল হাসানসহ পাঁচজন।

রমনায় তরু-পল্লবের গাছ চেনার আয়োজন

আমাদের চারপাশে ছোট-বড় অনেক গাছপালা। তার কটিকেই বা আমরা চিনি? রমনা উদ্যানে গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন সকালে বৃক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের সংগঠন তরু-পল্লব গাছপালার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছিল। গাছপালা চিনতে-জানতে এসেছিলেন নানা শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সী শতাধিক আগ্রহী মানুষ। তাঁদের গাছপালা চিনিয়ে দিয়েছেন তরু-পল্লবের সভাপতি উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা ও কথাসাহিত্যিক বিপ্রদাস বড়ুয়া। গাছপালার সঙ্গে পাখির সম্পর্ক ও পাখপাখালির বিষয়ে কথা বলেছেন পাখি-পর্যবেক্ষক ও লেখক শরীফ খান। আয়োজনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন মোকাররম হোসেন।
তরু-পল্লবের ছিল এটি গাছপালা চেনানোর তৃতীয় আয়োজন। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়েছিল কার্যক্রম। মোট ৩০টি গাছ চিনিয়ে দেওয়া হয়েছে আগ্রহী ব্যক্তিদের। শুরুতে এই গাছগুলোর বিস্তারিত পরিচিতি ও বিবরণ-সংবলিত একটি ছোট নির্দেশিকা আগ্রহী ব্যক্তিদের হাতে দেওয়া হয়। পরে নির্দেশিকার ক্রম-অনুসারে প্রতিটি গাছের কাছে গিয়ে প্রত্যক্ষভাবে গাছগুলো দেখিয়ে দেওয়া হয়। গাছগুলোর বৈশিষ্ট্য কী, কেমন করে সহজে তা চেনা যাবে—এসব বিস্তারিত হাতে-কলমে দেখিয়ে দেওয়া হয় উপস্থিত বৃক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের।
তরু-পল্লবের এই কর্মসূচি চলতে থাকবে বলে জানালেন সংগঠনের সম্পাদক মোকাররম হোসেন। পরবর্তীকালে তাঁরা বলধা গার্ডেন ও জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে গাছ চেনার আয়োজন করবেন বলে জানালেন তিনি।

দীঘিনালায় জেএসএস নেতা নিহত

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় প্রতিপক্ষের গুলিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) এক নেতা নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায় এ ঘটনা ঘটে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
নিহত শান্তি বিকাশ চাকমা (৩২) জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী গ্রুপের নেতা ছিলেন। তাঁর বাড়ি দীঘিনালার আমতলী গ্রামে।
দীঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুভাষ চন্দ্র পাল ঘটনার সত্যতা নিশিচত করে বলেছেন, পুলিশ লাশ উদ্ধারে ঘটনাস্থলে গেছে। তবে তিনি ঘটনার কারণ জানাতে পারেননি।

চট্টগ্রামে বিএনপির বিবদমান ৩ পক্ষের মিছিল ও সমাবেশ

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির বিবদমান তিনটি পক্ষ গতকাল শুক্রবার পৃথকভাবে সমাবেশ ও মিছিলের মধ্য দিয়ে নবনির্বাচিত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে। নগরের নাসিমন ভবনের দলীয় কার্যালয়, বহদ্দারহাট ও জেলা পরিষদ মার্কেট প্রাঙ্গণে পৃথক এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ ছাড়া দক্ষিণ জেলা বিএনপি নগরের দোস্ত বিল্ডিং এলাকায় সমাবেশ ও মিছিল করে।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন নগর বিএনপির একাংশ গতকাল বিকেল চারটায় নগরের নাসিমন ভবনের দলীয় কার্যালয়ে সমাবেশ করে। সমাবেশ শেষে এক শোভাযাত্রা নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। সমাবেশে বক্তব্য দেন নগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিল্পপতি শামসুল আলম ও অপর যুগ্ম আহ্বায়ক শাহাদাত্ হোসেন, মনোয়ারা বেগমসহ বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতারা।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন একাংশ বহদ্দারহাট চত্বরে সমাবেশের পর আনন্দ মিছিল বের করে। সমাবেশে আবু সুফিয়ান ছাড়াও অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহবুবুল আলম, নাজিম উদ্দিন ও আনোয়ার হোসেন।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক এম নাজিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে পৃথক আরেকটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় নগরের জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে। সমাবেশ শেষে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। এতে বক্তব্য দেন বিএনপি নেতা এম এ সবুর, কাজী আকবর, আবদুস সাত্তার, আবুল হাশেম, শওকত হোসেন, কাজী জাহাঙ্গীর, সেকান্দর হোসেন প্রমুখ।
নগরের দোস্ত বিল্ডিং চত্বরে গতকাল বিকেলে দক্ষিণ জেলা বিএনপির উদ্যোগে এক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে দলের দক্ষিণ জেলার আহ্বায়ক জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ও যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ মো. মহিউদ্দিনসহ অন্যদের নেতৃত্বে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে এসে শেষ হয়। গত ২২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত দক্ষিণ জেলা বিএনপির একাংশের কাউন্সিলে জাফরুল ইসলাম চৌধুরী ও শেখ মো. মহিউদ্দিন যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এসব সমাবেশ থেকে অবিলম্বে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মামলা তুলে নেওয়ার জন্য দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সরকারদলীয় নেতারা অপপ্রচার বন্ধ না করলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণারও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন বিএনপির নেতারা।

রাজধানীতে র্যাবের দুই সোর্সসহ তিনজন খুন

রাজধানীতে পৃথক ঘটনায় তিনজন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মিরপুর ১৩ নম্বরে সন্ত্রাসীদের গুলিতে হিউম্যান হলারের চালক আমিরুল ইসলাম (২৫) ও হলারের সহকারী শাহেদ আলী (২০) খুন হন। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার রাতে সূত্রাপুরে রনি (২০) নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়।
পুলিশ ও নিহত ব্যক্তিদের পারিবারিক সূত্র জানায়, আমিরুল ও শাহেদ হিউম্যান হলার ‘চ্যাম্পিয়ন’ চালানোর পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সোর্স ছিলেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে স্থানীয় একদল সন্ত্রাসী কাফরুল থানার ভাসানটেকের ১ নম্বর বস্তিঘর থেকে আমিরুল ও শাহেদকে ধরে মিরপুর ১৩ নম্বর বালুর মাঠে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা তাঁদের এলোপাতাড়ি গুলি করে চলে যায়। গতকাল শুক্রবার সকালে পুলিশ আমিরুল ও শাহেদের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। প্রত্যেকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি করে গুলি বিদ্ধ হয়।
আমিরুলের ভগ্নিপতি জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, আমিরুল ও শাহেদকে ধরে নেওয়ার পর কাফরুল থানা ও র্যাব-৪-এর কার্যালয়ে জানানো হয়। এরপর র্যাব ও পুলিশের সঙ্গে তাঁরাও বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেন, কিন্তু রাতে কোনো সন্ধান পাননি। গতকাল সকাল সাতটার দিকে ভাসানটেক বস্তির লোকজন বালুর মাঠে দুজনের লাশ পড়ে থাকতে দেখে। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেলোয়ার আহাম্মদ বলেন, নিহত আমিরুল ও শাহেদ সন্ত্রাসী ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা আছে। নিহত ব্যক্তিরা সন্ত্রাসী জব্বার গ্রুপের সদস্য। মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিপক্ষ ইব্রাহিম গ্রুপের হাতে এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে।
নিহত আমিরুলের বাবার নাম আলম গাজী। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর মাটিভাঙ্গায়। নিহত শাহেদের বাবা মৃত সাহাবউদ্দিন।
এদিকে পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১১টার দিকে কয়েকজন সন্ত্রাসী সূত্রাপুরের লালমোহন সাহা স্ট্রিটের ১৮ নম্বর বাড়ির সামনে রনিকে গুলি করে পালিয়ে যায়। তাঁর বুকের ডান দিকে গুলি বিদ্ধ হয়। আজাদ রহমান নামের এক ব্যক্তি তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। রনি পুরান ঢাকার নাসিরউদ্দিন সরদার লেনে থাকতেন।
সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, রনি ফেনসিডিল ব্যবসায়ী। মাদক ব্যবসার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জের ধরে এ হত্যার ঘটনা ঘটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তুত, আজ ৪৫তম সমাবর্তন

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫তম সমাবর্তন আজ শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।
গতকাল শুক্রবার সমাবর্তনে অংশ নিতে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিয়েছেন। সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে উত্সবের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সমাবর্তনের পোশাক পরে দলে দলে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ছবি তুলতে দেখা গেছে। ডিগ্রি পাওয়ার আনন্দে উজ্জ্বল হয়েছে তাঁদের সবার চোখ-মুখ।
এবারের সমাবর্তন বক্তা ১৯৮৬ সালে রসায়নে নোবেল বিজয়ী ইমেরিটাস অধ্যাপক ইউয়ান টি. লি। তিনি তাইওয়ানের তাইপের জেনোমিক রিসার্স সেন্টারের ইনস্টিটিউট অব অ্যাটোমিক অ্যান্ড মলিকুলার সায়েন্সেসের একাডেমিয়া সিনিকার প্রেসিডেন্ট। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি দেওয়া হবে।
এ ছাড়া সমাবর্তনে আরও দুজন বিশ্বখ্যাত অধ্যাপককে সম্মানসূচক ডিগ্রি দেওয়া হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক ছাত্র অধ্যাপক আবুল হুস্সামকে ‘সনো ফিল্টার’ উদ্ভাবনের জন্য সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স এবং ভারতবর্ষের ইতিহাস চর্চার নতুন ধারার প্রবর্তক অধ্যাপক রণজিত্ গুহকে ডক্টর অব লিটারেচার ডিগ্রি দেওয়া হবে।
অধ্যাপক ইউয়ান টি. লি গতকাল শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোকাররম হোসেন ভবনে রসায়ন বিভাগ আয়োজিত ২৪তম মুকাররম হোসেন খন্দকার স্মারক বক্তৃতা দেন। মুকাররম হোসেন ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও রসায়নবিদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অধ্যাপক তাজমেরী এস এ ইসলাম প্রমুখ।
এ বছর সমাবর্তন অনুষ্ঠান থেকে নয় হাজার ৫৮ জন শিক্ষার্থীকে ডিগ্রির সনদ দেওয়া হবে। পরীক্ষায় অসামান্য ফলাফল করায় ৩৪ জনকে মোট ৪৩টি স্বর্ণপদক দেওয়া হবে।
সমাবর্তনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। ক্যাম্পাসের প্রবেশপথে প্রহরা দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কে এম সাইফুল ইসলাম খান বলেন, যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর। ওই সমাবর্তনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেনকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিতে ভূষিত করা হয়। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম সমাবর্তন যথাক্রমে ২০০১, ২০০৪, ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছরই (সর্বমোট ২৪ বার) সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে শেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালের ২১ নভেম্বর। পাকিস্তান আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ বার সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সমাবর্তন হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ এবং শেষবার সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের ৮ মার্চ।

মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা -জনগণ আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা করেনি by গোলাম মুরশিদ

২৫ মার্চের রাতেও শেখ মুজিব তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তা থেকে মনে হয়, হামলার আশঙ্কা করলেও, অথবা একাধিক সূত্র থেকে খবর পেলেও, সেই রাতেই সেনা-হামলা হবে—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হতে পারেননি। তাই তিনি স্বাধীনতার কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। অথবা কোনো ঘোষণা রেকর্ড করেও রাখেননি। সেদিন সন্ধের পরও বেতার-টেলিভিশনের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল। ইচ্ছে করলে তিনি তা ব্যবহার করতে পারতেন। অনেকে বলেন, তিনি যুদ্ধের ঘোষণা পুলিশের বেতার মারফত দিয়েছিলেন। এ ছাড়া পাকিস্তানি লেখক আহমদ সালিম লিখেছেন, তিনি কেন্দ্রীয় টেলিগ্রাফ অফিসে ফোন করে একটি বার্তা দিয়েছিলেন, সবাইকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এতে তিনি বলেছিলেন—
‘পাকসেনারা মধ্যরাতে রাজারবাগের পুলিশের দপ্তর আর পিলখানায় ইপিআর-এর ওপর হামলা চালিয়েছে। প্রতিরোধের শক্তি সংগ্রহ করো এবং স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্যে তৈরি হও।’ (সালিম, ১৯৯৭)
শেখ মুজিব নিজেও দাবি করেছেন, ঝটিকা আক্রমণ আরম্ভ হওয়ার পর তিনি প্রতিরোধ তৈরির ঘোষণা দিয়েছিলেন (মুজিব, ‘শোষিতের গণতন্ত্র চাই’, ২৬ মার্চ, ১৯৭৫-এর বক্তব্য)। তাঁর নিজের স্বীকৃতি এবং আহমদ সালিমের কথায় মিল থেকে মনে হয়, সত্যি সত্যি তিনি এই বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বার্তা পাঠানোর পরই টেলিগ্রাফ যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। সে জন্য বার্তাটি কোথাও পাঠানো যায়নি। এ ছাড়া সিদ্দিক সালিকের মতে, রাত ১২টার দিকে একটা অজ্ঞাতপরিচয় বেতারকেন্দ্র থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে তাঁর ঘোষণা শোনা গিয়েছিল (সালিক, ১৯৮৮)। কিন্তু এই ঘোষণা তিনি নিজে শোনেননি, অথবা অন্য কেউ শুনেছেন বলেও উল্লেখ করেননি। তবে মুজিব ৭ মার্চ যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য তা-ই ছিল যথেষ্ট। পাকিস্তানি সৈন্যরা আক্রমণ করে স্বাধীনতা আন্দোলন দমন করতে পারে, তিনি তখনই তারও আশঙ্কা করেছিলেন। তাই সেদিন তিনি বলেছিলেন, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে। বস্তুত, এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা এবং প্রতিরোধ—উভয় ঘোষণাই দেওয়া হয়েছিল—আগে থেকেই দেওয়া হয়েছিল।
তার চেয়ে বড় কথা, মুজিব সমগ্র বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য পুরোপুরি মানসিকভাবে তৈরি করেছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া, অন্য কিছুতেই তাঁরা সন্তুষ্ট হতেন না। শেষ দিকে তিনি যে রকম স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন—পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার (কামাল হোসেন, ২০০৬)—তা পেলে জনগণ সে পর্যায়ে আদৌ সন্তুষ্ট হতো বলে মনে হয় না। সে জন্যই ২৬ মার্চ থেকে বাঙালিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশের সর্বত্র প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য তারা অপেক্ষা করেনি। অথবা অন্য কারও ঘোষণার পর প্রতিরোধ আরম্ভ করেনি। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন তিনিই দেখিয়েছিলেন। এবং তিনিই বহু দলে বিভক্ত বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন স্বাধীনতার নামে। সেই ঐক্যবদ্ধ জনগণ তাঁদের প্রিয় নেতার ৭ মার্চের ভাষণ অনুযায়ী সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল—এ কথা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না।
অনেকে দাবি করেন, ২৬ মার্চ দুপুরবেলায় চট্টগ্রাম বেতার থেকে তাঁর একটি ঘোষণা প্রচারিত হয়। ‘বীর উত্তম’ রফিকুল ইসলামের বিবরণ থেকে জানা যায়, সেদিন সকালে বেতারে এই ঘোষণা দেওয়ার জন্য তিনি আওয়ামী লীগের নেতাদের অনুরোধ করেন। তারপর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা মিলে এই ঘোষণাটি লেখেন এবং এটি শুদ্ধ করেন ড. জাফর (রফিক, ১৯৮৬)। চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ লিখেছেন, সেদিন দুপুরের পরে পাঁচ মিনিটের জন্য প্রচারিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবের নামে এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এম এ হান্নান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ আর মল্লিক এ ঘোষণা শুনেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। মীর্জা নাসিরউদ্দীন ছিলেন চট্টগ্রাম বেতারের আঞ্চলিক প্রকৌশলী। তিনিও জানান, এম এ হান্নান তাঁকে এই বিশেষ অধিবেশন প্রচারে বাধ্য করেন।
কাজেই সেদিন শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা পাঠ করা হয়েছিল, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অনির্ধারিত এবং সংক্ষিপ্ত অধিবেশনের কারণেই হোক, অথবা অন্য কোনো কারণেই হোক, এই ঘোষণা বেশি লোকে শুনেছিল বলে জানা যায় না। বেলাল মোহাম্মদও বেতারের কর্মচারীদের কাছে এই ঘোষণার কথা শুনেছিলেন, কিন্তু নিজের কানে ঘোষণাটি শোনেননি। ২৬ মার্চ আগরতলা থেকেও এ ঘোষণাটি শোনা গিয়েছিল বলে ২৭ মার্চের লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় খবর বেরিয়েছিল। তা ছাড়া আগেই বলেছি, শেখ মুজিব ৭ মার্চই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তিনি আবার ঘোষণা না দিলেও জনগণ যেন সংগ্রাম চালিয়ে যায়। সুতরাং হান্নানকে তিনি ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন কি না, তা বেশি প্রাসঙ্গিক নয়। জিয়াউর রহমানও লিখেছেন, মুজিব ৭ মার্চই গ্রিন সিগন্যাল দিয়েছিলেন—
‘৭ই মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আমাদের কাছে এক গ্রীন সিগন্যাল বলে মনে হলো। আমরা আমাদের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত রূপ দিলাম। কিন্তু কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে জানালাম না।’ (জিয়াউর রহমান, বিচিত্রা, স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা, ১৯৭৪)
শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে হান্নানের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার পর বেতারকর্মীরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন। পাহারা দেওয়ার জন্য রফিকুল ইসলাম আগের দিন যে জওয়ানদের বেতার ভবনে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁরাও আসেননি। তাই ২৭ মার্চ বেলাল মোহাম্মদ পটিয়ায় যান, সেখানে যে বাঙালি সৈন্যরা ছিলেন, বেতার ভবন পাহারা দেওয়ার জন্য তাঁদের সাহায্য চাইতে। সেখানে গিয়ে শোনেন, সেখানকার সৈন্যদের মধ্যে মেজর জিয়াউর রহমান সবচেয়ে সিনিয়র। তিনি তাঁকে অনুরোধ করেন, বেতার ভবন এবং কালুরঘাটে ট্র্যান্সমিটার ভবন পাহারার জন্য কিছু সৈন্য দিতে। তিনটি লরিতে সৈন্য নিয়ে জিয়াউর রহমান তখন নিজেই আসেন কালুরঘাটে।
সম্প্রচার ভবনে বসে বেলাল মোহাম্মদ জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার একটা প্রস্তাব দেন। ঘোষণা দেওয়ার এই সুযোগটি জিয়া সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। বেলাল মোহাম্মদের দেওয়া এক খণ্ড কাগজে তিনি ইংরেজিতে ঘোষণাটি লিখে তারপর বেতারে পড়েছিলেন সন্ধে সাড়ে সাতটার দিকে। এটির অনুবাদ করেন বেলাল মোহাম্মদ নিজে আর এর ভাষা ঠিক করে দেন নাট্যকার মমতাজ উদ্দীন। জিয়া প্রথমে নিজেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে লিখলেও, পরে অন্যদের পরামর্শে ‘জাতির সর্বোচ্চ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’-এর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছেন বলে সংশোধন করেন। তিনি নিজে ঘোষণা দেওয়ার পর তাঁর ঘোষণার বাংলা অনুবাদ বারবার পড়ে শোনানো হয় (বেলাল, ২০০৬)। ক্যাপ্টেন অলি আহমদ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে বেলাল মোহাম্মদ লেখেননি, যদিও অলি আহমদের লেখা থেকে মনে হয়, এই ঘোষণা দেওয়ার ব্যাপারে তিনিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। (অলি আহমদ, ২০০৪)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জিয়া বিচিত্রা পত্রিকায় তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, ১৯৬৫ সালের শেষ দিকেই, ‘...উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ক্যাডেটদের শেখানো হতো—আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন ওদের [পশ্চিম পাকিস্তানীদের] সবচেয়ে বড়ো শত্রু’ (জিয়াউর রহমান, বিচিত্রা, ১৯৭৪)। যখনকার কথা এখানে জিয়া লিখেছেন, আসলে তখনো শেখ মুজিব জাতির পিতা অথবা বঙ্গবন্ধুতে পরিণত হননি। বোঝা যায়, এটা ছিল তাঁর অতিভক্তির কথা।
একাত্তরের মার্চ মাসে মেজর জিয়ার নাম দেশে সাধারণ মানুষের জানা ছিল না। বাঙালি সৈন্যদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে সিনিয়রও ছিলেন না। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি ঘোষণা দেওয়ার অন্তত ৪০ ঘণ্টা আগে থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বাঙালি নিরাপত্তাকর্মী এবং ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু করেছিল। তাঁর ঘোষণা শুনে কেউ সংগ্রাম আরম্ভ করেনি। কিন্তু এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, তাঁর ঘোষণা বাংলাদেশের যেসব জায়গায় শোনা গিয়েছিল, সেসব জায়গার লোকেরা দারুণ উত্সাহিত হয়েছিল। আমীর-উল ইসলাম লিখেছেন, তাজউদ্দীন এবং তিনি ফরিদপুর অথবা কুষ্টিয়ার কাছে একটা জায়গায় বসে এই ঘোষণা শুনতে পান। তাঁরাও উত্সাহিত বোধ করেন (আমীর-উল ইসলাম, ১৯৯১)। যাঁরা বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, এ ঘোষণা শুনে তাঁরাও অনুভব করেন, তাঁরা একা নন, দেশের অন্যত্রও যুদ্ধ হচ্ছে। সেদিক থেকে বিচার করলে, জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণা ছিল ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাই বলে, ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বলে তাঁর নাম ভাঙিয়ে একদল লোক যে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাকে অসাধু চেষ্টা এবং সুবিধাবাদ ছাড়া কিছুই বলা যায় না।
[প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিতব্য গোলাম মুরশিদের বই মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর থেকে]
গোলাম মুরশিদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক

বার্সা-রিয়াল প্রসঙ্গ মানেই মেসি-রোনালদো

পয়েন্ট তালিকায় বার্সেলোনা এখনো শীর্ষে। ৫ পয়েন্ট পিছিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রিয়াল মাদ্রিদ। এক ম্যাচ অবশ্য কম খেলেছে রিয়াল। মৌসুমের প্রথম ‘এল ক্লাসিকো’ও জিতেছে বার্সা। কিন্তু তার পরও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের সেরা মানতে রাজি নন রিয়াল কোচ ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনি, ‘এক ম্যাচ জেতার মানে কিন্তু এই নয় যে, ওরাই শ্রেষ্ঠ দল। আমরা যদি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলি, বার্সেলোনার সঙ্গে আমরা ঠিকই পাল্লা দিতে পারব।’
গত মৌসুমের মতো না হলেও এবারও দুর্দান্ত খেলছে বার্সেলোনা। তবে দুদলের খেলার ধরন নিয়ে কোনো তুলনায় যেতে রাজি নন পেলেগ্রিনি। চিলিয়ান কোচ বলছেন, ‘দুদলের স্টাইল সম্পূর্ণ আলাদা। তবে দুই ম্যাচ আগে (এল ক্লাসিকোতে) কিন্তু আমরাই ওদের চেয়ে বেশি সুযোগ পেয়েছিলাম। মাদ্রিদে অনেক খেলোয়াড় আছে যারা সরাসরি আক্রমণে যায়। বার্নাব্যুর খেলোয়াড়েরা প্রতিপক্ষের বক্সে দ্রুত ঢুকে পড়ে, বিপদ ছড়ায় এবং দ্রুত গোল করে।’
কোচের মতোই শিষ্য সার্জিও রামোস বলছেন, গত মৌসুমের বার্সা আর এই মৌসুমের বার্সা এক নয়। রিয়াল ফুলব্যাকের কথা, ‘ওরা গতবারের দলটাই খেলাচ্ছে। কিন্তু অবশ্যই গতবারের মতো ওরা খেলতে পারছে না।’ তবে বার্সাকে উড়িয়েও দিতে পারছেন না রামোস, ‘এ বছর তারা গত মৌসুমের মতো খেলতে পারছে না ঠিকই, কিন্তু তারপরও তাদের সমীহ করতেই হবে। ঐতিহাসিক শিরোপাত্রয়ী জিতেছে ওরা। তাই ওরা যে দুর্দান্ত দল সেই স্বীকৃতি আমাদের দিতেই হবে।’
পেলেগ্রিনি আর রামোস যখন রিয়াল-বার্সার তুলনামূলক আলোচনায় ব্যস্ত, বার্সা মিডফিল্ডার জাভি তখন তুলনা করছেন লিওনেল মেসির সঙ্গে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। দুই বছর ধরেই এই দুই তারকার তুলনা হচ্ছে। তবে এবারকার তুলনাটা এসেছে ভিন্ন একটি কারণে। ইনজুরির কারণে মেসি আর আগের ম্যাচে লাল কার্ড দেখায় নিষেধাজ্ঞার কারণে রোনালদো আজ নিজ নিজ দলের হয়ে খেলতে পারবেন না।
জাভি জানাচ্ছেন, রোনালদোর শূন্যতা যতটুকু অনুভব করবে রিয়াল, তার চেয়ে ঢের বেশি মেসির অভাব বোধ করবে বার্সা, ‘আমার দৃষ্টিতে মাদ্রিদে ক্রিস্টিয়ানো না থাকার চেয়ে মেসির না থাকা বার্সেলোনার জন্য বড় ক্ষতি।’ জাভির মতে, বিশ্বের আর কোনো ফুটবলারের সঙ্গে মেসির তুলনা চলে না, ‘দলে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়টির পাশে খেলা অসাধারণ এক অনুভূতি। ওর সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। বাকি সব ফুটবলারের চেয়ে ও অনেক উঁচু মাপের। এ কারণেই পয়েন্টের রেকর্ড ব্যবধানেই ও (ব্যালন ডি’অর) জিতেছে।’ শুধু তা-ই নয়, ‘মেসি সব সময় দলের মঙ্গল চিন্তা করে খেলে’ মন্তব্য করে হয়তো ‘স্বার্থপর’ রোনালদোকে একটু খোঁটাও দিয়ে দিলেন জাভি!

জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে বুঝছি by মুহাম্মদ ইব্রাহীম

বিজ্ঞানীদের গবেষণায় গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি জানা গেছে প্রায় শত বছর আগে। অন্তত চার দশক ধরে সচেতন বিশ্ব এটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, সম্মেলন করছে, সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিকারের চেষ্টাও করছে। তা সত্ত্বেও এতে অবিশ্বাসীদের পক্ষও প্রবল ছিল, এই সেদিন পর্যন্ত। আর এই অবিশ্বাসীদের নেতৃত্বে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। ১৯৯২ সালের ধরিত্রী সম্মেলনে রিও ডি জেনিরোর গ্লোরিয়া সমুদ্রসৈকতে প্রতিবাদী এনজিওদের তাঁবু থেকে বের হওয়া বিক্ষোভে আমিও ছিলাম—অবিশ্বাসী নির্বিকার জর্জ বুশের (সিনিয়র) মুণ্ডুপাত করতে। ওই তাঁবুতেই অনানুষ্ঠানিক আলাপে বক্তব্য শুনি কেনিয়ার পরিবেশবাদী তরুণী ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের। আমাদের হিরো হয়ে এসেছিলেন তরুণ সিনেটর আল গোর, মার্কিন প্রশাসনকে ধিক্কার জানাতে। তাঁরা দুজনই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৫ ও ২০০৭ সালে। ২০০৭ সালে এসেই মনে হলো, জলবায়ু পরিবর্তনে অবিশ্বাসীরা হঠাত্ হালে পানি হারিয়ে ফেলেছে। এটি ঘটতে পেরেছে প্রধানত বৈজ্ঞানিক গবেষণার সর্বশেষ ফলাফলগুলোর অনিবার্যতা ও স্পষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণের কারণে। এই লেখায় তার সামান্য পরিচিতি দিতে চাই।
গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার মূল কথা হলো বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড (ও অন্যান্য আরও দু-একটি গ্যাস) বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কারণে ভূপৃষ্ঠের গড় উত্তাপ বাড়ছে। গড় উত্তাপ বহুদিন ধরে মাপা গেলেও বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ সরাসরি সূক্ষ্মভাবে মাপা যাচ্ছে মাত্র ১৯৫০ সাল থেকে। উত্তাপের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক দেখাতে হলে আরও প্রাচীন উপাত্ত দরকার। সেটি সম্প্রতি পাওয়া যাচ্ছে লাইব্রেরিতে, তবে বইয়ের লাইব্রেরিতে নয়, বরফের লাইব্রেরিতে। চির বরফের অঞ্চলে নলকূপ খোঁড়ার মতো প্রক্রিয়ায় বহু মিটার লম্বা নিরেট নলাকৃতি বরফ আস্ত তুলে আনা হয়—যাকে বলা হয় আইসকোর। প্রতিবছরের তুষারপাতে নতুন এক স্তর বরফ জমে জমে এই আইসকোরে রয়েছে হাজার বছরের বরফ। গত বছরেরটি সবার ওপরে, আর প্রাচীনতমটি সবার নিচে। স্তরের অবস্থান থেকে বলা যায়, কোন বরফ কোন বছরের। আর তাতে আটকা পড়া বুদবুদের মধ্যে জমা বাতাস বিশ্লেষণ করে জানা যায় সে বছর বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কত ছিল। তা ছাড়া সাধারণ পানির সঙ্গে সব সময় খুব সামান্য পরিমাণে ভারী আইসোটোপ গঠিত ভারী পানি থাকে। ওই স্তরের বরফে ভারী পানির অনুপাতটি তখনকার গড় উত্তাপটিও নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারে।
এতে দেখা যাচ্ছে, এক হাজার বছর আগে থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ প্রায় সমান থেকেছে ২৮০ পিপিএম (পার্ট পার মিলিয়ন)। এই সময় গড় উত্তাপও প্রায় সমান থেকেছে ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর পর থেকে হঠাত্ আশ্চর্যজনকভাবে দুটিই সমানে বেড়েছে, ক্রমবর্ধমান হারে। স্পষ্টত শিল্পবিপ্লবই এর কারণ। অতি সাম্প্রতিককালে এসে বাড়ার হার অত্যন্ত দ্রুত হয়েছে—২০০৭ সালে হয়েছে ৩৫০ পিপিএম আর ১৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি। এই শূন্য দশমিক ৬ ডিগ্রি উত্তাপ বৃদ্ধি সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু এর তাত্পর্য অনেক।
উত্তাপ বৃদ্ধির প্রথম নাটকীয় ফল হয়েছে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর চারদিকে অনেকখানি জায়গায় বহু যুগ ধরে সঞ্চিত বরফ গলতে থাকা। সম্প্রতি উপগ্রহ থেকে পর পর বছরগুলোতে ছবি নিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এই বরফ এলাকা দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বরফ গলা পানি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াচ্ছে—যার বড় ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। অকুস্থলে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) স্থাপন করে ক্রমে দ্রুততর বরফ গলার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। বড় আশঙ্কার কথা হলো, এর মধ্যে চক্রবৃদ্ধি হারের একটি পাগলা ঘোড়া কাজ করছে। উত্তাপ বাড়ছে বলে বরফ গলছে। বরফ গলছে বলে চকচকে বরফ থেকে আগে সূর্যকিরণ প্রতিফলিত করে উত্তাপ যেটুকু কমত, এখন আর তা হচ্ছে না। ফলে উত্তাপ আরও দ্রুত বাড়ছে। তাই বরফ আরও দ্রুত গলে প্রতিফলন আরও দ্রুত কমছে। এভাবে একটি আর একটিকে ক্রমাগত উসকে দিয়ে চলেছে চক্রবৃদ্ধি। এ রকম চক্রবৃদ্ধি আরও কয়েকটি রয়েছে। সমুদ্রের পানি আগে যত কার্বন ডাই-অক্সাইড দ্রবীভূত করে আটকে রাখতে পারত, উত্তপ্ত হলে তা পারে না, বাতাসে ছেড়ে দেয়। তাতে উত্তাপ আরও বাড়ে, ফলে বাতাসে ছেড়ে দেওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডও বাড়ে। আরও একটি চক্রবৃদ্ধি হলো, উত্তরের বিস্তীর্ণ জায়গায় একটু তলার মাটি রয়েছে বরফ-শীতল হয়ে পার্মাফ্রস্ট রূপে। উত্তাপ বাড়াতে এর সঙ্গে জমে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেন (উভয়ে গ্রিনহাউস গ্যাস) বাতাসে যাচ্ছে। ফলে উত্তাপ আরও বাড়ছে, পার্মাফ্রস্ট আরও দ্রুত গ্যাস ছাড়ছে।
প্রশ্ন হলো, সামনে এরা কোথায় গিয়ে ঠেকবে? এর উত্তর পাচ্ছি সম্প্রতি অতি উন্নত কম্পিউটার মডেলিং থেকে। জোয়ার মাপার টাইডগেজ থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা অনেক দিন ধরে মাপা হচ্ছে, এখন উপগ্রহের সাহায্যেও মাপা হচ্ছে। ১৯৯২ সালের কাছাকাছি বছরগুলোতে এটি বছরে ২ দশমিক ৮ মিমি হারে বেড়েছে। বর্তমানে এই বার্ষিক বৃদ্ধি ৪ মিমিতে দাঁড়িয়েছে। আমাদের খুলনার কাছে স্থানীয় পরিমাপে বৃদ্ধি ৫ দশমিক ১৮ মিমিও পাওয়া গেছে। সমুদ্রে এই পানি বৃদ্ধির পুরোটা বরফ গলার ফল নয়, এর বেশির ভাগ অধিক তাপে পানি আয়তনে সম্প্রসারিত হওয়ার ফল। সমুদ্রে উষ্ণতর পানির আরেকটি ফল হলো অধিক বাষ্পীভবন, যা আবার জমে পানি হওয়ার সময় প্রচুর সুপ্ততাপ বের হয়ে আসে। এটিই ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি জোগায়। ১৯৭০ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত জরিপে দেখা গেছে, এ সময় তীব্রতর ঘূর্ণিঝড়গুলোর সংখ্যা (ক্যাটাগরি ৪ ও ক্যাটাগরি ৫) ১৬ থেকে বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছে। আমাদের সিডর বা আইলাজাতীয় ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ক্রমে যে বাড়বে, এ তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
এসব উপাত্ত নিয়ে আমাদের মডেল ভবিষ্যত্ সম্পর্কে কী বলছে, তা আগামী দশকগুলোতে, পঞ্চাশ বছর কিংবা এক শ বছর পর কী হবে, তার প্রায় নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী দিতে পারছে। অবশ্য ভবিষ্যতে আমাদের আচরণের বিভিন্ন দৃশ্যকল্পের জন্য এই ভবিষ্যদ্বাণী বিভিন্ন হচ্ছে। সবচেয়ে নৈরাশ্যজনক দৃশ্যকল্পে আমরা যেভাবে চলছি, সেভাবে বা তার চেয়েও খারাপভাবে চলব। উন্নত, উন্নয়নশীল—সবাই যেকোনো মূল্যে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি ও উচ্চতর ভোগের দিকে ছুটব। সমানে জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়ব, উন্নয়নশীল দেশে জনসংখ্যা ক্রমে বাড়বে, বাড়বে জৈব বর্জ্য ও তার থেকে মিথেন নিঃসরণ। এসবের প্রতিকারে কথা হবে মেলা, কাজ হবে নগণ্য। যারা সুবিধায় আছে তারা আসলে ছাড় দেবে খুবই সামান্য। সে ক্ষেত্রে মডেল দেখাচ্ছে এ পর্যন্ত শূন্য ৬ ডিগ্রি উত্তাপ বৃদ্ধি এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ বেড়ে ১০ গুণ হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে অন্তত এক মিটার। বাংলাদেশের অন্তত ১৭ শতাংশ সমুদ্রে চলে যাবে। আরও ভয়ানক আশঙ্কা হলো উত্তাপ বৃদ্ধি ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি অতিক্রম করলে সেই পাগলা ঘোড়া এমন লাফ দেবে যে মেরু অঞ্চলের সব বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠ কয়েক মিটার বাড়বে। এ রকম পরিস্থিতি কল্পনা করতেই শিউরে উঠতে হয়। সেই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, কৃষি ও খাদ্য ধ্বংস ইত্যাদি যোগ করলে তো কথাই নেই। এরপর পৃথিবীটি আর কত দিন মানুষের বা অন্যান্য প্রাণীর বাসযোগ্য থাকবে, সেটিই হবে চিন্তার বিষয়।
অন্যদিকে সবচেয়ে কাম্য দৃশ্যকল্পটিতে সর্বত্র মানুষের সব কর্মকাণ্ড নবায়নযোগ্য শক্তিতে চলবে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সহযোগিতা এমন পর্যায়ে যাবে যে ভোগ বাড়ানো নয়, পৃথিবীকে সবার জন্য স্বচ্ছন্দ করাটাই হবে লক্ষ্য। দারিদ্র্য দূর হয়ে শেষোক্তদের পক্ষেও এতে অবদানের ক্ষমতা বাড়বে, জনসংখ্যা কমবে, সব জৈব বর্জ্য রিসাইকেল হবে, জ্ঞান ও সেবানির্ভর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেশে দেশে সমতা ও সুবিচার বাড়াবে। মডেল বলছে, এই দৃশ্যকল্প পূর্ণ বাস্তবায়িত হলেও অতীত পাপের কারণে কিছু ক্ষতি হবেই, তবে তা সহনশক্তির মধ্যে থাকবে। শতাব্দীর শেষে গিয়ে গড় উত্তাপ বৃদ্ধি ২ দশমিক ৪ ডিগ্রির নিচে থাকবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ ১০ সেন্টিমিটারের বেশি বাড়বে না। আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা নিজকে রক্ষার ও উন্নত জীবন গড়ার সুযোগ পাব।
এখন কোপেনহেগেনে বিশ্বসমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কোন দৃশ্যকল্প বেছে নেব।
মুহাম্মদ ইব্রাহীম: অধ্যাপক, পদার্থবিদ্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইংলিশ মৌসুমের সূচনা আবুধাবিতে

২০১০ সালে ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেট মৌসুমের সূচনা হবে আবুধাবিতে। ইংলিশ কাউন্টির চ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে এমসিসির মৌসুম সূচনার ম্যাচটি এত দিন ধরে হয়ে আসছিল লর্ডসে। মূলত দুটি কারণে আগামী বছর এর ব্যতিক্রম হচ্ছে—খেলাটি হবে আরও উষ্ণ আবহাওয়ায় এবং ফ্লাডলাইটের আলোয় গোলাপি বলে।
সূচি অনুযায়ী লর্ডসে কাউন্টি চ্যাম্পিয়ন ডারহাম ও এমসিসির ম্যাচটি হওয়ার কথা এপ্রিলের শুরুতে। কিন্তু তখন ইংল্যান্ডে প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকে। চার দিনের ম্যাচটি তাই এবার শুরু হবে ২৯ মার্চ, আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে। ফ্লাডলাইটের আলোয় গোলাপি বলে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পরীক্ষামূলকভাবে। টেস্ট ক্রিকেটে দর্শক বাড়াতে ফ্লাডলাইটে এবং গোলাপি বলে খেলার চিন্তাভাবনা হচ্ছে অনেক দিন থেকেই। আবুধাবির পরীক্ষা সফল হলে টেস্ট ক্রিকেটেও এটা চালু করা যেতে পার বলে মনে করছে এমসিসি।

মালয়েশিয়া থেকে ফিরে হতাশার কথা

কুয়ালালামপুরে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির হাইপারফরম্যান্স ট্রেনিং সেন্টারে উচ্চতর প্রশিক্ষণ বাংলাদেশের পাঁচ অ্যাথলেটের জন্য হতে পারত আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সঞ্জীবনী। কিন্তু দুর্ভাগ্য আর আগেভাগে প্রশিক্ষণ শেষ করে চলে আসতে হওয়ায় দেশে ফিরে কিছুটা হতাশই তাঁদের কণ্ঠ।
মালয়েশিয়ার রাজধানীতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন পাঁচ অ্যাথলেট নাজমুন নাহার বিউটি, আফজাল হোসেন সূর্য, ইমরান হোসেন, মোহাম্মদ আল-আমিন ও জেসমিন আক্তার। প্রশিক্ষণ শেষে গত ৩ ডিসেম্বর দেশে ফিরেই তাঁরা যোগ দিয়েছেন বিকেএসপিতে এসএ গেমসের ক্যাম্পে।
৪০০ মিটার হার্ডলসে নিজের প্রস্তুতিতে সন্তুষ্ট হলেও আফজাল মনে করেন, গেমসের আগ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণ চালিয়ে আসতে পারলে ভালো হতো, ‘প্রস্তুতি খুবই ভালো হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়া থেকে আসতে পারলে আমাদের এই পাঁচজনের মধ্য থেকে অন্তত একটা সোনা পাওয়া সম্ভব ছিল।’ তিনি জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া থেকে আগে আগে চলে আসার কারণ বাজেটের স্বল্পতা, ‘আমরা চেয়েছিলাম আরও দুই মাস থাকতে। কিন্তু বাজেটের স্বল্পতার কারণে ফিরে আসতে হয়েছে। আমাদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার ১০ জন অ্যাথলেট প্রশিক্ষণ নিয়েছে। মালদ্বীপ, পাকিস্তানের অনেকেই ছিল। আসার আগে ওরা আমাদের জিজ্ঞাসা করছিল, আমরা কেন এত আগে ফিরে যাচ্ছি।’
নাজমুন নাহার বিউটি নিজের প্রশিক্ষণ নিয়ে খুব বেশি খুশি হতে পারছেন না। মালয়েশিয়ায় দুর্ভাগ্য সঙ্গী হয়েছিল তাঁর। গত ১০ অক্টোবর মালয়েশিয়া ওপেনে খেলতে গিয়ে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়েন। এর পর সেখানে আর কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া হয়নি তাঁর। তবে অনুশীলন করেছেন নিয়মিত। এসএ গেমস নিয়ে এখনই কোনো আশার কথা শোনাতে চাইলেন না বিউটি, ‘আমার ইনজুরিটা তত গুরুতর নয়। তবে এখনই এসএ গেমস নিয়ে কিছু বলব না। আগামী ২০ ডিসেম্বর ট্রায়ালের পর নিজের অবস্থা বুঝতে পারব।’ এসএ গেমসের ক্যাম্প কমান্ড্যান্ট ফরিদ উদ্দিন অবশ্য এই পাঁচ অ্যাথলেটকে নিয়ে বেশ আশাবাদী, ‘ওদের নিয়ে আমরা খুবই আশাবাদী। তবে ওখানে ওরা কি করেছে সেটা এখানে বসে বোঝা সম্ভব নয়। ওখানে আসলেই ভালো করেছে কি না, সেটা দেখতে হলে ওদের ট্রায়াল নিতে হবে।’

ওয়ানডের বদলে টেস্টের প্রস্তাব ভারতের

হওয়ার কথা ছিল সাত ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। কিন্তু সাত ম্যাচ সিরিজ নিয়ে নানা দিক থেকে বিরক্তির কথা শুনে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড প্রথমে চাইছিল সিরিজটি পাঁচ ম্যাচে নামিয়ে আনতে। শেষ পর্যন্ত ভারত প্রস্তাব দিয়েছে ওয়ানডে আরও দুটি কমিয়ে দুটি টেস্ট খেলার।
টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যত্ নিয়ে যখন চারদিকে শঙ্কা, তখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড ওয়ানডের বদলে বাড়তি টেস্ট খেলতে চাইছে, এই খবর কিছুটা হলেও স্বস্তি আনতে পারে ক্রিকেট বিশ্বে। তবে অনেকে আবার এর পেছনে অন্য কারণও দেখছে। আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে ভারত শীর্ষে ওঠার পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল আগামী বছর বেশি টেস্ট ম্যাচ না থাকায় শীর্ষে বেশি দিন থাকা হবে না তাদের। আইসিসির এফটিপি অনুযায়ী আগামী ১১ মাসে মাত্র দুটি টেস্ট খেলার কথা ভারতের। শীর্ষস্থান ধরে রাখতেই নাকি লাভের চিন্তা বাদ দিয়ে টেস্ট খেলতে চাইছে ভারত।
ভারতের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধান নির্বাহী জেরাল্ড মাজোলা, ‘তারা আমাদের তিন ওয়ানডে ও দুটি টেস্ট খেলার প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা বিষয়টি ভাবছি। এখনো আমরা দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে কথা বলিনি। এ ছাড়া বোর্ড, টিম ম্যানেজমেন্ট, ফিকশ্চার কমিটির সঙ্গেও আলোচনা করতে হবে। টেস্ট খেললে সফরের দৈর্ঘ্য সপ্তাহখানেক বেড়ে যাবে। তবে আমাদের এটা সমন্বয় করতে হবে, আমি এতে কোনো সমস্যা দেখছি না।’ ধারণা করা হচ্ছে, ভারতের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়া হবে। কারণ বিসিসিআইয়ের সঙ্গে কোনো রকম বিবাদে যেতে চায় না ক্রিকেট দক্ষিণ আফ্রিকা।

আফ-পাক যুদ্ধ -ভারত-পাকিস্তানের পারস্পরিক অবিশ্বাসের বিপদ by কুলদীপ নায়ার

কিছুদিন আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানি যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন আফগাননীতি প্রণয়নের সময় পাকিস্তান ও তার স্বার্থের বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানান। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সঙ্গে পরামর্শ করার ওপরও তিনি জোর আরোপ করেন। আফগানিস্তানে ৩০ হাজার সেনা বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইসলামাবাদকে উপেক্ষা করেছেন, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। পাকিস্তানের কাছ থেকেও কোনো প্রতিবাদ আসেনি যে, দেশটির স্বার্থের কথা এতে বিবেচিত হয়নি।
২০ হাজার বাড়তি মার্কিন সেনা এরই মধ্যে আফগানিস্তানে পৌঁছে গেছে। সেনাসংখ্যা বাড়ানোর যথার্থতা যা-ই হোক, এই অঞ্চলের জন্য এটি কোনো সুখকর অগ্রগতি নয়। জেনারেল স্টানলি ম্যাকক্রিস্টালকে বলতে শোনা গেছে, প্রচণ্ড ইতিবাচক অনেক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আফগানিস্তানে ম্যাকক্রিস্টাল সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর এমন বক্তব্যের সময় এখনো হয়নি। কারণ, অতীতের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, ভিয়েতনাম, ইরাক বা অন্য কোনো জায়গায় যেখানেই মার্কিন বাহিনী গেছে, সেখানেই পেছনে ফেলে গেছে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ। তাদের তেজোদীপ্ততার প্রমাণ তারা রাখতে পারেনি।
আফগানিস্তানের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, ব্রিটিশ বা সোভিয়েত—কোনো শক্তিই আফগানিস্তানের স্পর্ধিত উপজাতিদের বাগে আনতে পারেনি, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা। বিদেশি সেনারা তাদের প্রচারণায় ইসলামের প্রভাবের কথা বলেছে। অশিক্ষিত জনগণ, যাদের লাভজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ কম, তারা দারিদ্র্য দূরীকরণের পথে না হেঁটে মৌলবাদের দিকে অনেক বেশি ঝুঁকে পড়ে। সমাজের অধিপতিরা অর্থের বিনিময়ে চুপ থাকার পথ বেছে নেয়; তারা কাউকে ভবিষ্যতের ওপর আস্থাশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে না। তাই উপজাতীয় জনগণ সীমাহীন
দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে যায়।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ, যার এ কাজে প্রয়োজনীয় সামর্থ্য আছে। কিন্তু দেশটির জন্য সমস্যা হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের দিক থেকে কারজাইয়ের শাসনাধীন আফগানিস্তানের চেয়ে তালেবানের শাসনাধীন আফগানিস্তান অনেক বেশি বন্ধুসুলভ ও নির্ভরযোগ্য। তালেবানের শাসনের অধীনে স্বেচ্ছাচারী উপজাতিদের অনেকটা বাগে আনা সম্ভব হয়েছিল। পাকিস্তানের অন্য একটি আতঙ্কের বিষয় হলো, অর্থনৈতিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ওপর ভারতের প্রভাব অন্য দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেড়েছে। ইসলামাবাদ এখনো স্বপ্ন দেখে, একসময় পাকিস্তানের কৌশলগত গভীরতা অর্জনে আফগানিস্তান গুরুত্বপূর্ণ হবে। উপজাতীয় হুমকি চিরতরে অবসানে পাকিস্তান কতটুকু কাজ করবে, সেটিও তাই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
পাকিস্তানি সেনারা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সীমান্তের সোয়াত উপত্যকা থেকে তালেবানদের হটিয়েছে এবং দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে তাদের পরাস্ত করেছে—এসব সত্যি। সোয়াত পাকিস্তানের অংশ, যে শরণার্থীরা সেখানে এখন ফিরে গেছে, তারা সব পাকিস্তানি। তাদের আনুগত্য প্রশ্নাতীত। কিন্তু ওয়াজিরিস্তানের বিজয় ধরে রাখা মুশকিল হবে, যদি স্থানীয় জনগণ পাকিস্তানকে তাদের মুক্তিদাতা মনে না করে, পাকিস্তানের পেছনে তাদের সমর্থন না জানায়। এ সংশয় হয়তো ইসলামাবাদকে কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান খোঁজার পথে না গিয়ে বরং তালেবানদের সঙ্গে আলোচনার পথে যাওয়া অধিকতর গ্রহণযোগ্য—এমন উপলব্ধি তৈরি করেছে। এ ছাড়া, সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাগুলোয় তালেবানরা যে রকম ধ্বংসাত্মক বোমা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে, লাহোর যেমন আবারও হামলার লক্ষ্যস্থল হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায়, ইসলামাবাদ বা পশ্চিমের থেকে তালেবানের সহযোগী-সংখ্যা বেশি। অতি সুরক্ষিত জায়গায় যেভাবে তারা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চলেছে, তাতে ভেতরের অনেকে যে জড়িত, এমন কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আর একই সময়ে ওবামা যখন বলেন, নতুন সেনাদের জন্য ১৮ মাসের সময়সীমা বাঁধা, এরপর তাদের অল্প অল্প করে আফগানিস্তান ছাড়তে হবে—এ কথার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে তিনি পাকিস্তানকেও এ সময়সীমার সঙ্গে দেশটির ভূমিকাকেও জড়িত করার কথাই বলেন। এর মানে হলো, মার্কিন সেনাদের অনুপস্থিতিতে পাকিস্তান যেন এই এলাকার নিরাপত্তা বিধান করার সামর্থ্য অর্জন করে। সে সময় পর্যন্ত তালেবানকে নীরবে ঘাপটি মেরে থাকার পথ খুঁজে পেলেই হবে। এ কারণেই হয়তো এখন মার্কিন আক্রমণ তেমন কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়ছে না। শত শত বছর ধরে যে উপজাতীয় জনগণ কর্তৃপক্ষের তোয়াক্কা করেনি, তাদের ১৮ মাসে হারানো যাবে না—এ কথা পাকিস্তান বা যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই জানা। একই কথা পাকিস্তানে তালেবানবিরোধী যুদ্ধের ব্যাপারেও খাটে—এ যুদ্ধে জনসমর্থন বেশ কম।
সম্প্রতি পাকিস্তানে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, দেশটিতে গণতান্ত্রিক ও শরিয়া শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন সমান, উভয়ই ৩০ শতাংশ করে। জনগণ মৌলবাদীদের যতটুকু বিরোধী, ততটুকুই বিরোধী যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের জন্য এটি সন্তোষজনক না হলেও দিনের পর দিন এ বিরোধিতা স্পষ্ট হচ্ছে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জনগণের অংশীদারি আছে, যুদ্ধবিগ্রহে নয়। বছরের পর বছর তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন তারা দেখছে না। আসলে তারা ধর্মকে প্রবলভাবে আঁকড়ে থাকাকে ‘পশ্চিমা খেলায়’ অর্থ নষ্টের চেয়ে অনেক বেশি স্বস্তিদায়ক মনে করে।
তালেবানবিরোধী নীতি করতে গিয়ে পাকিস্তান আগামী পাঁচ বছরে ৭৫০ বিলিয়ন ডলার সাহায্য পেতে যাচ্ছে, এ বিষয়টি পরিষ্কার। কিন্তু এই অর্থ পেতে অবমাননাকর শর্ত মেনে নেওয়ার কারণ ঘোলাটে। অতীতে যেমন ঘটেছে, এবারও তেমনি যদি কিছু কর্তাব্যক্তির পকেট ভারী বা অস্ত্র ও সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে এই অর্থ ঢালা হয়, তাহলে জনগণের অংশটা কি থাকে? শাসকেরা যে দলেরই হোক, আগামী পাঁচ বছরে পাকিস্তানকে এক ধরনের কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকে চালিত করবে, এমন কল্পনা বেশ দুরূহ। শুরুতে হটাতে হবে সামন্ততন্ত্র। এ লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তেমন কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
তবুও সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করতেই হবে, কারণ তা এই অঞ্চলের জনগণের জীবন অনিরাপদ করে তুলেছে। যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গায় সন্ত্রাসবাদের শিকারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে জনগণ কীভাবে জীবন যাপন করবে। এ জন্য আঞ্চলিক মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল। পাকিস্তান, ভারত ও আফগানিস্তান মিলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি সাধারণ কৌশল নির্ধারণ এবং যৌথ ফ্রন্ট গঠন করা উচিত ছিল।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনার সম্পর্ক না থাকা দুর্ভাগ্যজনক। ইসলামাবাদের কাছে নয়াদিল্লির অবস্থান অনমনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু নয়াদিল্লি যদি মনে করে, পাকিস্তানি শাসকেরা তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির বিস্তার ঘটাতে সন্ত্রাসবাদ ব্যবহার করে, তাহলে নয়াদিল্লির দৃঢ়প্রত্যয় উত্পাদনের জন্য ইসলামাবাদের কেবল বিবৃতি দিলেই চলবে না, আরও বেশি কিছু করতে হবে। এখানে একটি শূন্যতা রয়ে গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র এখন পূরণ করছে। নয়াদিল্লি, ইসলামাবাদ—উভয়ই ওয়াশিংটনকে এ ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে পারস্পরিক অবিশ্বাস শুধুই গভীরতর হয়েছে। সমস্যার মূলে আছে অবিশ্বাস, কাশ্মীর নয়। অবিশ্বাস দূর না হলে, পারস্পরিক দূরত্ব ঘুচবে না। বর্তমান কাশ্মীর-সমস্যার হয়তো সমাধান হবে, কিন্তু তখন গজিয়ে উঠবে আরেক কাশ্মীর-সমস্যা।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

আগামী বিশ্বকাপটা রোনালদোর?

রোমারিও, রোনালদো, অলিভার কান, জিনেদিন জিদান...এর পর কে? ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো? প্রথম চারজন ছিলেন গত চার বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়। ২০১০ সালে সেই কাতারে কোন তারকা বসবেন সেই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে এখনই। অনেকেই অনেকের নাম বলছেন। ভবিষ্যতেও বলবেন। তবে কার্লোস কুইরোজের মনে কোনো সন্দেহ নেই, ২০১০ বিশ্বকাপটা হতে যাচ্ছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরই বিশ্বকাপ।
তবে অনেকেই যে বলেন, রোনালদো ক্লাবের হয়ে যতটা দুর্দান্ত, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে ততটা নন। পর্তুগালের কোচ কুইরোজ বাতিল করে দিচ্ছেন এই ‘হাইপোথিসিস’, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোনালদো ততটা সফল নয়, এমন মন্তব্য করা ঠিক নয়। ও এখনই আমাদের জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এটাই তো সব বলে দেয়।’
ইনজুরি কোনো ঝামেলা না বাধালে আগামী বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলটা রোনালদোর হাতে দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কুইরোজ, ‘ও যে বছর ইনজুরিতে পড়েনি, ওই বছরই ও বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হয়েছে। এটা ওর পারফরম্যান্সে বড় প্রভাব ফেলে। ইনজুরি থেকে ফিরে ও আবার ধীরে ধীরে নিজের সেরা খেলায় পৌঁছে যাচ্ছে। আশা করব, বিশ্বকাপে ও একাই আমাদের বেশ কিছু ম্যাচ জিতিয়ে দেবে।’
রোনালদোকে সেই ১৮ বছর বয়স থেকে চেনেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সহকারী কোচ থাকার সময় আরও ভালো করে চিনেছেন। সেই চেনা থেকেই এই আত্মবিশ্বাস তাঁর। তবে গতবারের সেমিফাইনালিস্টদের কাজটা এবার কঠিন হচ্ছে গ্রুপ পর্বেই। ব্রাজিল, উত্তর কোরিয়া, আইভরিকোস্টের সঙ্গে শক্ত এক গ্রুপে পড়েছে তারা। যেটিকে এবার বলা হচ্ছে ‘গ্রুপ অব ডেথ’। যদিও কুইরোজের কথা শুনে মনে হচ্ছে, এ ধরনের তত্ত্বে তাঁর বিশ্বাস নেই, ‘ব্রাজিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন। গ্রুপের সেরা হওয়ার লড়াইয়ে ওরা সব সময়ই ফেবারিট। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো আসরে আসলে সবাই সমান। ফেবারিটদের একটা ভুলের ফলাফল হতে পারে ব্যর্থ হওয়া। আমার বিশ্বাস, এই বিশ্বকাপটা আমাদের জন্য হবে দারুণ।’
এর জন্য রোনালদোকেই জ্বলে উঠতে হবে। রোনালদো পারবেন সেই বিশ্বাস আছে গতবারের গোল্ডেন বল বিজয়ী জিদানের। শুধু তা-ই নয়, রোনালদোকে নিজের চেয়েও সেরা বলে রায় দিয়ে দিলেন এই সাবেক তারকা, ‘ও দারুণ খেলছে। কখনো কখনো আমার চেয়েও ভালো। ও একটা ব্যবধান গড়ে দেয়। কিছু কিছু খেলোয়াড় অন্যদের চেয়ে আলাদা, কারণ তারা যা করতে পারে, অন্যরা সেটি পারে না।’

‘রাজনীতির’ ব্যাপারে হাম্মামের হুঁশিয়ারি

এটি ছিল দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশনের (সাফ) অভিষেক সভা। এখানেই নতুন নির্বাচিত সাফ কমিটি দায়িত্বভার গ্রহণ করল আনুষ্ঠানিকভাবে। আনুষ্ঠানিকতায় অলংকার ছিল এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) সভাপতি মোহাম্মদ বিন হাম্মামের উপস্থিতি। অভিষেক সভা বলেই হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে গৃহীত হয়েছে বেশ কিছু প্রস্তাব। সবই সাফের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনাবিষয়ক। গত অক্টোবরে সাফের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর যা আগেই বলেছেন কাজী সালাউদ্দিন। কিন্তু মোহাম্মদ বিন হাম্মাম এই সভা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কাল যা বললেন, তা একটু অন্য রকম শোনাল।
হঠাত্ করেই ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের’ প্রসঙ্গটি টেনে আনলেন এএফসি সভাপতি। ফুটবল ফেডারেশনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফল কী হয়, বাংলাদেশের মানুষ তা ভালো করেই জানে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাতিল করে দিয়েছিল বাফুফের আগের নির্বাচিত কমিটি। তারপর ফিফা-এএফসি থেকে নেমে এসেছিল বহিষ্কারাদেশের খড়্গ। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ওই কালো দাগটি বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস থেকে কখনো মুছে ফেলা যাবে না। তবে ওই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের ফুটবল তো ঠিক পথেই পা ফেলছিল। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত আরেকটি কমিটি এসেছে। যাতে সভাপতির পদ আলো করে আছেন দেশের ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় কাজী সালাউদ্দিন। তাহলে হঠাত্ করেই এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গটি উঠল কেন?
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বলতে হাম্মাম শুধু বাংলাদেশের প্রসঙ্গ তোলেননি, ইঙ্গিত করেছেন গোটা দক্ষিণ এশিয়ার দিকেই। এএফসি থেকে সাফকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়ার সঙ্গে নিত্যশুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে সাহায্য করার ধারাটি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাম্মাম বললেন, ‘আমি চাই না বাংলাদেশের ফুটবলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আসুক। এই অঞ্চলের ফুটবলের ওপরই কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চাইব না আমরা।’ বাফুফে ও সাফ সভাপতি সালাউদ্দিন, এএফসি সহসভাপতি মণিলাল ফার্নান্দো এবং সাফের নতুন সাধারণ সম্পাদক আলবার্তো কোলাসোকে পাশে নিয়ে বাংলাদেশের ফুটবলকে কী বার্তা দিতে চাইলেন হাম্মাম?
রাজধানীর এক হোটেলে আয়োজিত নবনির্বাচিত সাফের প্রথম সভায় যে প্রস্তাবগুলো এসেছে তা হলো, সাফ ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ চালু করা যাতে ইরান ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত মধ্য এশিয়ার দেশ যেমন উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তানের ক্লাবগুলোকে যুক্ত করার চেষ্টা থাকবে। যুব ফুটবলকে গুরুত্ব দিয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৮ দক্ষিণ এশীয় প্রতিযোগিতার প্রবর্তন। সেই সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় মহিলা ও দক্ষিণ এশীয় অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজন। সাফের বিদায়ী সভাপতি গণেশ থাপা এই অঞ্চলের ফুটবলারদের অবাধে খেলার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রস্তাব করেছেন। যে প্রস্তাব পাস হলে সাফের আট দেশে ‘বিদেশি’ কোটায় খেলতে হবে না কোনো দক্ষিণ এশীয় ফুটবলারকে। সর্বশেষ প্রস্তাব ছিল সাফের গঠনতন্ত্রের সংশোধনীবিষয়ক। অন্যান্য আঞ্চলিক ফুটবল ফেডারেশনের গঠনতন্ত্র দেখে নতুন ও যুগোপযোগী একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করবে সাফ। এসব প্রস্তাব সিদ্ধান্ত আকারে চূড়ান্ত হতে পারে আগামী ফেব্রুয়ারি কলম্বোতে অনুষ্ঠেয় সাফের পরবর্তী সভায়।

শেখ হাসিনার ‘সিংহাসন’ প্রত্যাখ্যান ক্ষমতাধরদের মানসিকতা পরিবর্তনের বার্তা

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে গতি সঞ্চারের লক্ষ্যে দুই দিনের এক মেলার আয়োজন করা হয়েছিল ঢাকায়। গত মঙ্গলবার মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসনটি অলংকৃত না করে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পাঠক, ভাববেন না, প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত প্রধানমন্ত্রী ওই অনুষ্ঠানে যাননি। গিয়েছিলেন, কিন্তু মেলার আয়োজকেরা তাঁর জন্য যে আসনটি নির্ধারণ করেছিলেন, তিনি সেটিতে বসেননি। কারণ চেয়ারটি ছিল সিংহাসনের মতো। মনে হয়, অন্যান্য অতিথির জন্য রাখা আসনগুলোর চেয়ে ওই ‘সিংহাসন’কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমনই বিষম ও দৃষ্টিকটু ঠেকেছিল যে তিনি সেটি বদলে দিতে বলেন।
যে ঘটনা সচরাচর ঘটে না, যা অত্যন্ত বিরল, তা-ই খবর সৃষ্টি করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ব্যতিক্রমী আচরণ সংবাদ শিরোনাম হয়েছে যথার্থ কারণেই। যে সমাজে ক্ষমতাধর পদাধিকারী ব্যক্তিদের মানসিকতায় সামন্তযুগীয় প্রভাব প্রবলভাবে রয়ে গেছে, যে দেশে রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীরা নিজেদের রাজা-রানিদের মতো দেখেন, সেখানে শেখ হাসিনা ছোট্ট হলেও এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তাঁর এই ব্যক্তিগত আচরণ দিনবদলের পক্ষে তাঁর সরকারের অঙ্গীকারের একটি ইঙ্গিতময় দৃষ্টান্ত হিসেবেও গণ্য হতে পারে।
আমাদের সমাজে ক্ষমতা ও পদের অধিকারী ব্যক্তিদের চাটুকারিতা ও তোষামোদীর মানসিকতা অত্যন্ত প্রবল। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও দেখা যায় ক্ষমতাধর, উচ্চপদে আসীন বা সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অতিরিক্ত সম্মানের আয়োজন—অভ্যর্থনার ধরনে, আসনের ব্যবস্থায়। দেখা যায়, সমাজের অনেক বর্ষীয়ান জ্যেষ্ঠ নাগরিকের পাশে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী কিন্তু একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তির জন্য বিশেষ আসনের ব্যবস্থা করা হয়। এবং ক্ষমতাধর অতিথি ওই আসনে বসতে একটুও অস্বস্তি বোধ করেন না; বরং জ্যেষ্ঠ, ক্ষমতাহীন নাগরিকদের মধ্যে নিজেকে আলাদা উচ্চ আসনে আসীন দেখতে পেয়ে শ্লাঘা বোধ করেন। বয়স্ক বা মুরব্বিদের শ্রদ্ধা-সমীহ করার যে চিরায়ত সংস্কৃতি আমাদের সমাজের ঐতিহ্য, তার ব্যত্যয় ঘটে ক্ষমতা ও পদের ক্ষেত্রে। আসলে, সম্মান বা শ্রদ্ধা প্রকাশের আড়ালে এটাও ক্ষমতাবানের তোষামোদী, একধরনের উদ্দেশ্যমূলক মেকি আচরণ। এর কারণও বোধহয় এই যে, ক্ষমতাধরেরা তোষামোদী পছন্দ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেদিনের ‘সিংহাসন’ প্রত্যাখ্যানের ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাবান ও পদাধিকারী ব্যক্তিরা কি মানসিকতা পরিবর্তনের বার্তা শুনতে পান?

নিষিদ্ধ নোটবই ও গাইড উচ্চ আদালতের রায়ের বাস্তবায়নই কাম্য

অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নোটবই ও গাইডের ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা যে সঠিক ছিল, সর্বোচ্চ আদালতের রায়েও তা প্রমাণিত হলো। ১৯৮০ সালে জাতীয় সংসদে এ-সংক্রান্ত একটি আইন পাস হলেও এর যথাযথ প্রয়োগ সম্ভব হয়নি। ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অনুমতি ছাড়া কেউ নোটবই ও গাইড ছাপতে পারবে না। এ আদেশ কার্যকর করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করলে তা নাকচ হয়ে যায়। প্রথমে হাইকোর্ট এবং সবশেষে গত বুধবার আপিল বিভাগের রায়ে সরকারের আদেশই বহাল রাখা হয়।
এটি দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জন্য সুখবর। নোটবই ও গাইডের বাড়তি বোঝা তাদের বইতে হবে না। তবে আইন পাস হওয়ার পরও বাজারে দেদার নোটবই ও গাইড বিক্রি হওয়া দুঃখজনক। এ জন্য প্রশাসক ও বিক্রেতারা যেমন দায়ী তেমনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবিও দায় এড়াতে পারবে না। নোটবই ও গাইড ছাপার কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে সময়মতো পাঠ্যবই পৌঁছানো যাচ্ছে না বলে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তা আংশিক সত্য। প্রথমত, সব প্রকাশক পাঠ্যবই ছাপেন না; দ্বিতীয়ত, নোটবই ও গাইড ছাপা বন্ধ হলেই যে সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছাবে, তার নিশ্চয়তা কী?
সম্প্রতি এনসিটিবির গুদামে সাত কোটি টাকার বই পুড়ে যাওয়ার পেছনে মহলবিশেষের ষড়যন্ত্র ছিল বলে তদন্ত কমিটি জানিয়েছে। দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের অন্তর্ঘাত চলতেই থাকবে। প্রতিবছর পাঠ্যবই ছাপা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগও কম হয়নি। কিন্তু সমস্যাটি যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। শিক্ষামন্ত্রী বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছানোর যে আশ্বাস দিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন করতে হলে এখনই মুদ্রণকাজ শেষ করতে হবে।
প্রতিবছর পাঠ্যবই নিয়ে যে কেলেঙ্কারি ঘটে, এবার তার পুনরাবৃত্তি হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস। নোটবই ও গাইড বন্ধ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, আদেশ জারি হয়েছে। কিন্তু কেন নোটবই ও গাইড বন্ধ করা যায়নি, সেটি খতিয়ে দেখা হয়নি। প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠক্রম, পাঠ্যবই ও পরীক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা নোটবই ও গাইডের প্রতি আগ্রহী না হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরই অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তাঁরা যদি ঠিকমতো ক্লাস নেন এবং শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণ নিশ্চিত করেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা নোটবই ও গাইডের প্রতি ঝুঁকবে না।
সরকার নোটবই ও গাইডের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তা বহাল রাখার পাশাপাশি শিক্ষাক্রম, পাঠ্যবই ও পরীক্ষার পদ্ধতিতেও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে কিছু বিতর্ক উঠলেও এটিই হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ। পাঠক্রম ও পাঠ্যবই নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় অনভিজ্ঞ লেখকদের দিয়ে যেসব বই লেখানো হয়, তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করে না। শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষক, উপযুক্ত পাঠক্রম এবং মানসম্মত পাঠ্যবই। আইনি নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সরকার এসবের প্রতি অধিক নজর দিলে নোটবই ও গাইড বন্ধ হয়ে যাবে।