Wednesday, December 30, 2015

বসতবাটি রক্ষা করা কি উন্নয়নবিরোধী?

আন্দোলনে হবিগঞ্জের চা–শ্রমিকেরা
চান্দপুরের চা-শ্রমিকেরা ১৮৯০ সাল থেকে বংশপরম্পরায় যে জমি চাষাবাদ করে আসছেন, আজ হঠাৎ করে সেই জমি থেকে তাঁরা উচ্ছেদ হতে চলেছেন! সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চান্দপুর চা-বাগানের তিন ফসলি ধানিজমি ও বসতভিটা উচ্ছেদ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করবে। হঠাৎ করে নিজের বসতি থেকে উচ্ছেদ হতে যাওয়া মানুষগুলো সংগত কারণেই জানতে চায় ভূমির ওপর মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয় কীভাবে? কীভাবে মালিকানা তৈরি হয় জবরদখলকারী বেজার (অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ) কিংবা ব্রিটিশ কোম্পানি ডানকানের! এই সেই কোম্পানি, যে ১৫০ বছর আগে ক্ষমতার জোরে লিজের নামে হাজার হাজার একর ভূমি দখলের সঙ্গে সঙ্গে মানুষগুলোকে দাসে পরিণত করেছিল। তাই দাসদের ভূমি হারানোর ব্যাপারটি তাদের কাছে কোনো বিশেষ গুরুত্ব বহন করে না। তা ছাড়া উচ্ছেদকৃত জমিতে যেহেতু চা-গাছ নেই, তাই তাদের কোনো লোকসানের ভীতিও নেই। আমরা বুঝতে পারি যে ডানকানের সঙ্গে একধরনের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়েই সরকার এটা করেছে। অন্যদিকে ১২৫ বছর আগে যারা জঙ্গল কেটে এই ভূমিকে আবাদযোগ্য জমি হিসেবে গড়ে তুলল এবং বংশানুক্রমে শ্রম ও ঘাম দিয়ে ফসল ফলাল, তারা এর মালিক নয় কি! ভূমির মালিকানা নির্ধারণ হবে কিসের ভিত্তিতে? আমরা জানতে চাই, এই মানুষগুলোর সঙ্গে আলোচনা-বোঝাপড়া কিংবা তাদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করার কোনোই কি দরকার নেই? নাকি সেটুকুর প্রয়োজন এ সরকার বোধ করে না। চা-শিল্পের জন্মলগ্ন থেকে সাঁওতাল, রাজবংশী, ওঁরাও, মাঝি, ভূমিজসহ আরও বেশ কিছু নৃগোষ্ঠী ও জাতির বসবাস এই বাগানগুলোতে। প্রায় ১৫০ বছর ধরে তারা বসতি স্থাপন করেছে। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে এত দীর্ঘ সময় ধরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা এখন অনেক কম। জীবিকার তাগিদে মানুষকে সব সময় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হচ্ছে। আজ এই চা-শ্রমিকদের আর্থসামাজিক অবস্থাটা আলোচিত হওয়া সময়ের প্রয়োজন। আমাদের চা-শ্রমিকেরা শোষণের শিকার হয়ে আসছেন। বাংলাদেশে প্রায় স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে সোয়া লাখ চা-শ্রমিক রয়েছেন। গত ১ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখ থেকে চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৮৫ টাকা দেওয়ার কথা এবং রেশনসহ তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫০ টাকা। কিন্তু সেই আগের ৭৯ টাকাই শ্রমিকেরা পাচ্ছেন। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন করতে গিয়ে নির্যাতন সহ্য করে দৈনিক ছয় টাকা বৃদ্ধির যে চুক্তি আদায় হয়েছিল, তা-ও আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। একজন চা-শ্রমিককে দৈনিক ২৩ কেজি চা উত্তোলন করতে হয়। ২৩ কেজি থেকে ১ কেজি কম উত্তোলন করলে দ্বিগুণ টাকা কেটে রাখে। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার কিংবা সংগঠিত হওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার নেই বললেই চলে। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ নেই, চিকিৎসা থেকে তাঁরা বঞ্চিত। যেন একজন চা-শ্রমিকের সন্তান চা-শ্রমিক হওয়ার জন্যই জন্মায়। ১৫০ বছর ধরে তাঁরা এই চক্র থেকে বের হতে পারেননি।
তাঁদের ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় শোষণ-শাসন অব্যাহত রয়েছে। বাগানের মধ্যে চাষাবাদযোগ্য ভূমি ‘ক্ষেতল্যান্ড’ নামে পরিচিত। যে ‘ক্ষেতল্যান্ড’ আজ চা-শ্রমিকদের প্রাণ ও জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত। এমন ভূমিতেই তাঁরা চাষাবাদের মাধ্যমে কোনোরকমে বাঁচেন বসত করে। এবার মড়া চা-শ্রমিকদের উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এসেছে ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন’। চান্দপুর চা-বাগানের ৫১১ একর জমি বেজার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী কৃষিজমি রক্ষা করেই অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ার কথা। হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইতিমধ্যে বলে দিয়েছেন, চা-শ্রমিকেরা এত দিন ধরে সরকারি জমিতে অবৈধভাবে চাষাবাদ করছেন। উল্লেখ্য, ভূমি মন্ত্রণালয় তিন ফসলি আবাদি জমিকে অকৃষি খাসজমি হিসেবে দেখিয়ে এই বন্দোবস্তের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। রেকর্ড সংশোধন করে তারা গত ২১ নভেম্বর এ জমি বেজার কাছে হস্তান্তর করে। চা-বাগানের জমি অন্য কাজে ব্যবহার করার আইনগতভাবে ভিত্তি নেই। সরকার সেটা অমান্য করে দেশি-বিদেশি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার নানান প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যস্ত। এর মধ্য দিয়ে শুধু চা-শ্রমিকদের জীবনই বিপন্ন নয়, চা-শিল্পও আজ চরম হুমকির মুখে। অথচ চা একটি রপ্তানিমুখী খাত এবং বাংলাদেশের বাজারেও চা একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। চান্দপুরে ‘জোন’ হলে স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে ১ হাজার ৯৫৫ জন শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের প্রায় আট হাজারের ওপরে মানুষকে ভূমিহীন হয়ে পথে বসতে হবে। বাধ্য হয়ে চান্দপুর বেগমখান, রামুগঙ্গা ও জায়ালভাঙ্গার হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে এসেছেন। ১২ ডিসেম্বর জমি অধিগ্রহণের জন্য গেলে চা-শ্রমিকদের প্রতিরোধের মুখে তা করতে ব্যর্থ হয় প্রশাসন। এখন পর্যন্ত অবস্থান, কর্মবিরতি, সমাবেশের মধ্য দিয়ে চলছে তাঁদের আন্দোলন। প্রতিদিন কোনো না-কোনো কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে কয়েক হাজার শ্রমিক তাঁদের ভূমি রক্ষার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। ইদানীং একটা উপাধি বেশ ব্যবহৃত হচ্ছে, তা হলো ‘উন্নয়নবিরোধী’। মানুষকে তার ভিটেমাটি থেকে সমূলে উচ্ছেদ করা হবে, প্রাণ-প্রকৃতি উজাড় করা হবে, কিন্তু এর বিরোধিতা চলবে না! যদি কেউ দেশের প্রচলিত আইনের কথা বলে, যদি মাটির দোহাই দেয়, কেউ যদি অধিকারের কথা বলে, বনভূমি-জলা-বসতভিটা রক্ষার দাবি তোলে, তারাই নাকি ‘উন্নয়নবিরোধী’। যে উন্নয়ন মানুষকে বাদ দিয়ে, যে উন্নয়নের নাম উন্মুক্ত কয়লাখনি যা দিগন্তজোড়া উর্বর ভূমিকে মরুভূমিতে পর্যবসিত করবে, যার নাম টিপাইমুখ বাঁধ কিংবা সুন্দরবনের ফুসফুসে যে উন্নয়ন কয়লা পোড়া চিমনির ধোঁয়া, সেই উন্নয়ন কার জন্য? রবি ওঁরাও—যিনি চান্দপুর বাগানের দুই হাজার শ্রমিকের একজন। তিনি বলেছেন, তাঁর মাতৃসম ভূমি তিনি ছাড়বেন না, কেউ কেড়েও নিতে পারবে না। এখন এই মানুষগুলোকে কি উন্নয়নবিরোধী আখ্যা দেবেন, নাকি তাঁদের ভূমির অধিকারের পক্ষে দাঁড়াবেন?
জলি তালুকদার: শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক।
joly_talukder@yahoo.com

বিতর্কপ্রিয় বাঙালি

তেল দুই প্রকার: এক প্রকারের তেল মাথায় দেয়, আরেকটি খায়। বিতর্কও এক প্রকারের তেল: কোনোটা লাগে মাথা খাটানোর কাজে, কোনোটা লাগে অকাজের ঝগড়ায়। এই দুই তেল ছাড়া বাঙালির জীবন চলেই না। বিতর্কের তেল না মাখালে কোনো ইস্যুই জনমনে সাড়া তোলে না, চিন্তার চাকা ঠিকমতো ঘোরে না। এ বছর আমরা বহু রকম বিতর্কেই মেতে ছিলাম। রাজনীতির পাড়ায় অবিরত বিতর্কের তির বর্ষিত হয়েছে, মিডিয়া সেগুলোকে আচ্ছামতো শাণ দিয়ে আরও ধারালো করেছে। অনলাইন থেকে অফলাইন—সবখানেই বিতর্কে মজে যাওয়ার মজারু মানুষের ঘাটতিও ছিল না। তর্ক ছাড়া টেলিভিশন থেকে চায়ের দোকান, ফেসবুক থেকে উজবুক, কাউকেই চাঙা করা যায় না। অথচ যেখানে সবচেয়ে বেশি তর্ক হওয়া উচিত, সেই সংসদ বিতর্কহীন। রাজনৈতিক মঞ্চে যে তর্ক চলে তার সম্পর্কে কবি জীবনানন্দ দাশ তো বলেই রেখেছেন, ‘অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই’। ২০১৫ সালের এসব বিতর্কের বেশির ভাগই আসলে অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। এ রকম কিছু বিতর্কের নমুনা:
আইএস আছে আইএস নেই
গত বছরগুলোতে বিশেষত সরকারি মহল থেকে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল, জঙ্গিবাদকে ঠেকানোর জন্যই সরকারের হাতকে শক্তিশালী করা দরকার। কঠোর আইন, নিরাপত্তা কার্যক্রমের বিস্তার, গ্রেপ্তার, গণমাধ্যম ও অনলাইন নজরদারির মাধ্যমে হাত শক্তিশালী করা চলতে থাকল। সেই হাত কতটা শক্তিশালী হলো বলা কঠিন, তবে যে জঙ্গিবাদ জুজু ভয় হয়ে ছিল, সেটা সত্যিই শক্তিশালী হয়ে দেখা দিল। চীনারা ড্রাগন পূজা করত। তো ভক্তের অতি ডাকাডাকিতে ড্রাগন দেখা দিল। তার ভয়াল মূর্তি, মুখের অগ্নিবর্ষণ দেখে ভক্তের যে অবস্থা, জঙ্গি জঙ্গি করতে আমাদেরও বুঝি সে দশাই হয়েছে। তাই যেই জঙ্গিরা স্বরূপে দেখা দিল, অমনি সরকারের মুখপাত্ররা ‘আইএস’ নেই বলতে থাকলেন। একের পর এক নাশকতা ও হত্যার ঘটনা ঘটেই চলল। র্যাব-পুলিশের হাতে সন্দেহভাজন ‘আইএস’ ‘জেএমবি’ ধরা পড়ায়ও বিরতি চলল না। কিন্তু সরকারের এই অস্বীকারের গূঢ় কারণ হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়ে সরকার-সমর্থক অনেকেই ফেসবুক ও গণমাধ্যমে জঙ্গিদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে থাকলেন। আইএস আছে কি নেই সেই প্রশ্নটা আন্তর্জাতিক মাত্রাও অর্জন করে ফেলল। বিতর্ক জমে উঠল বটে, কিন্তু জনগণ নিরাপদ ও নির্ভয় হলো না।
বিদেশি-ব্লগার-প্রকাশক-পুলিশ হত্যার দায়
এ বছরের ফেব্রুয়ারির বইমেলার প্রাঙ্গণে অভিজিৎ হত্যা থেকে শুরু হয়ে প্রকাশক-লেখক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার কোনো কূলকিনারা না হলেও এ নিয়ে বিতর্কের হাওয়া গরম হয়। জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিসহ বিদেশিদের ওপর হামলা কারা করেছে, সে নিয়ে সরকারি ও বিরোধী পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে আঙুল তুলল। সেই আঙুলের ইশারা মেনে সমর্থকেরাও বিতর্কের মাঠে ধুলা ওড়াল। বিতর্ক যত ছড়ায়, জনমনে ততই সম্ভব-অসম্ভব সব গুজব ও ‘ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব’ আছর করে। এতে করে সত্যের সন্ধান আরও কঠিনই হলো। সত্যের অভাব সাহসের অভাব সৃষ্টি করে। তথ্য–প্রমাণ ছাড়াই বিরোধী পক্ষকে অভিযুক্ত করা যায় কি না, তা নিয়েও বিতর্কের ধোঁয়া উড়ল। ফলে অবিশ্বাস আর সন্দেহের বাতাস আরও জোরদার হলো।
ফেসবুক বন্ধ ও নজরদারি
হত্যা-নাশকতার প্রেক্ষাপটে কয়েকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার ঘটনা বিপুল বিতর্কের জন্ম দেয়। বছরের গোড়ায় তিন দিনের জন্য পাঁচটি ভয়েস ও মেসেজিং সেবা বন্ধ করা হয়। কিন্তু বড় করে বিতর্ক শুরু হয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে গত ১৮ নভেম্বর থেকে ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপসহ ইন্টারনেটে যোগাযোগের বেশ কিছু মাধ্যম বন্ধ করার পর। ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এর সমালোচনায় মুখর হয়। পৃথিবীর আর কোনো দেশে নিরাপত্তার অজুহাতে ফেসবুক বন্ধ হয় না এমন যুক্তি জনপ্রিয়তা পায়। ফেসবুক বন্ধ থাকা অবস্থায় বগুড়ায় শিয়া মসজিদে হামলা হলে বন্ধের পক্ষে যুক্তি আরও সমালোচিত হয়। কেবল সরকার বনাম সংখ্যাগরিষ্ঠ ফেসবুক ব্যবহারকারীই নয়, সরকার বনাম ফেসবুক কর্তৃপক্ষের মধ্যেও চিঠিতে ও সামনাসামনি বিতর্ক চলে। টানা ২২ দিন ফেসবুক বন্ধ থাকার পর অবশেষ ফেসবুক খোলে বটে, কিন্তু মত প্রকাশে ভয় ও জড়তা পেয়ে বসে অনেককেই।
সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা
সুন্দরবনের বাঘ গণনা জরিপ-২০১৫-এ জানা গেল, এক দশকে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা বাড়ার অর্ধেক তথা ১০৬টিতে নেমে এসেছে। এ তথ্যে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হলে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মন্তব্য করেন, ‘সুন্দরবনের বাঘ ভারতে বেড়াতে গেছে।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘যখন ওই বাঘগুলো ফিরে আসবে, তখন সংখ্যা বাড়বে।’ (প্রথম আলো, ৩০ জুলাই ২০১৫) তাঁর এ মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষত সুন্দরবন ঘেঁষে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, বনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং দুর্ঘটনায় তেল ও কয়লাডুবিতে বনের ক্ষতি হওয়ার প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীর বক্তব্য বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। বন ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী কীভাবে এ রকম কল্পনাপ্রসূত ও দায়িত্বহীন মন্তব্য করেন, সেই প্রশ্নও ওঠে। বাঘ-বিতর্ক আরও চাঙা করে সুন্দরবনের কাছে কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের পক্ষে-বিপক্ষের বিতর্ককে।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা
মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তির ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে সব সময়ই বিতর্ক জারি ছিল। এই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, ‘বলা হয় এত লক্ষ লোক শহীদ হয়েছে। এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে যে আসলে কত শহীদ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে...।’ সঙ্গে সঙ্গেই বিপুল সমালোচনা উঠতে থাকে। তাঁর পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত আসতে থাকে। যখন এক বছরে ৭৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে, যখন একের পর এক নাশকতা ও হামলায় মানুষের মৃত্যু ঘটছে, তখন সেসব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা না করে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক কেন? স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় স্তরে মতৈক্য না থাকার ফলে বারবার এমন প্রসঙ্গগুলো বিতর্ক-যুদ্ধে বারুদের সরবরাহ করছে।
বিতর্কপ্রিয় অসতর্ক বাঙালি
নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বই তর্কপ্রিয় ভারতীয়। বাংলাদেশিরা এ ক্ষেত্রে এক কাঠি সরেস। জাতীয় কোনো বিষয়েই আমরা একমত হতে পারি না। তবে ওপরের বিতর্কগুলোর বিষয় ও যুক্তিই বলে দেয়, এগুলো অসতর্ক মনের কথা। রাজনীতিবিদ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অসতর্কতায় অহেতুক ও নিষ্ফল বিতর্কে যে কত সময় চলে যায়! অভিধান বলে, সতর্ক মানে হলো তর্কের সহিত। আমরা সতর্ক বটে, কিন্তু যুক্তির সহিত তর্ক করি কি না, এ প্রশ্ন করতে হবে নিজেদের। তর্ক আর কুতর্কের মধ্যেও পার্থক্য করা জরুরি। কেননা এ-জাতীয় কুতর্ক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অবিশ্বাস আর দূরত্ব বাড়াতেই থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, এসব বিতর্কে রাজনৈতিক মতাদর্শের ঝাঁেজর কাছে সত্য, যুক্তি ও ন্যায় পরাজিত হয়। মতবাদের বিতর্কে তখন হেরে যায় মানুষ।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

ভূরাজনীতিতে রাশিয়ার পুনরুত্থান

সিরিয়ায় রুশ সেনা
২০১৫ সালের প্রধান আন্তর্জাতিক ঘটনা কী, এই প্রশ্নের জবাব পণ্ডিতেরা তিনভাবে দিয়েছেন: ইসলামি জঙ্গিবাদ ও আইসিস, ইউরোপের উদ্বাস্তু সংকট ও রাশিয়ার প্রত্যাবর্তন। তিনটি ঘটনাই একে অপরের সঙ্গে জড়িত এবং এগুলোর অভিন্ন উৎস মধ্যপ্রাচ্য। এ কথা অবশ্যই রাশিয়ার ক্ষেত্রে সত্য, মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলিকে ঘিরেই রাশিয়ার পুনরুত্থান। কিন্তু রুশ ভালুকের এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ঘটনা, না এর সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য রয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। রাশিয়ার প্রত্যাবর্তন মুখ্যত সামরিক অর্থে। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় তার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল, সে অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। তা সত্ত্বেও ‘পরিকল্পিত ঝুঁকি’ নিয়ে রাশিয়া সামরিকভাবে তার পেশির ভাঁজ দেখানো শুরু করেছে।
ব্যাপারটা ওয়াশিংটনের নজরে পড়েছে। মাস দু-এক আগে মস্কো সরকারিভাবে ঘোষণা করে, হাজার কোটি ডলার খরচ করে রুশ সামরিক বাহিনীর নতুন ‘কমান্ড সেন্টার’-এর উদ্বোধন করা হয়েছে। সরকারিভাবে বলা হয়, এই সেন্টার শুধু আমেরিকার কমান্ড সেন্টারের সমতুল্যই নয়, তার চেয়ে তিন গুণ উত্তম। চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমস রুশ সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, গত এক বছরে মস্কো তার সামরিক বাজেটে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় বরাদ্দ করেছে। একই সময়ে প্রায় এক লাখ সৈন্যবহর নিয়ে সে ব্যাপক সামরিক মহড়া শুরু করেছে, যে ব্যাপারটা কার্যত সবারই নজর এড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি তার অস্ত্রবহর সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে মস্কো। ‘রুশ ভালুকের প্রত্যাবর্তনের’ গন্ধ পেয়ে আমেরিকার সামরিক লবি তাকে ‘যেভাবে পারো ঠেকাও’ বলা শুরু করেছে। তাদের বিশেষ আপত্তি, মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সামরিক প্রশ্নে কোনো সমঝোতা। ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদক পরিষদ এক যৌথ সম্পাদকীয়তে সাবধান করে দিয়েছে, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিকভাবে যেকোনো সহযোগিতা আমেরিকার জন্য বড় ধরনের ভুল হবে। কন্ডোলিৎসা রাইস ও বব গেইটস, জর্জ বুশের দুই অঘটনঘটনপটীয়সী, একই পত্রিকায় এক যৌথ প্রবন্ধে ওবামাকে বুদ্ধি দিয়েছেন, আর যা-ই করো বাপু, সিরিয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে হাত মেলাতে যেয়ো না। যদিও ওবামা প্রশাসন ঠিক সেই কাজটি করার উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের সে কথায় একমত হয়ে ওবামার যুদ্ধমন্ত্রী অ্যাশ কার্টার ঘোষণা করেছেন, ওয়াশিংটন নতুন কোনো শীতল যুদ্ধ শুরু করতে চায় না, তবে সে যেকোনো মূল্যে চলতি বিশ্বব্যবস্থা রক্ষায় রাশিয়া ও চীনের হস্তক্ষেপ রুখবে। তার সে কথার ব্যাখ্যা হিসেবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ‘বিশ্বব্যবস্থা’ মানে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্য, সে ব্যবস্থা রক্ষায় আমেরিকার পরিকল্পনা কোনোভাবে বিঘ্নিত হোক, চীন বা রাশিয়াকে তেমন কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা একজন সরকারি মুখপাত্রের কথা উদ্ধৃত করে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে নিজের আধিপত্য বিস্তারে মস্কোকে কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ছত্রখান হওয়ার পর মস্কো এত দিন মুখ্যত নিজেদের ঘর ও তার আশপাশ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। অক্টোবরের গোড়া থেকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে আকস্মিকভাবে হস্তক্ষেপের ভেতর দিয়ে রাশিয়া তার নজর মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তৃত করে। মুখে ‘ইসলামিক স্টেট’-এর সন্ত্রাসীদের শায়েস্তা করা বলা হলেও ওয়াশিংটনের চোখে সে হস্তক্ষেপের লক্ষ্য যে মস্কোর পুরোনো মিত্র বাশার আল-আসাদকে বাঁচানো, তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। ওয়াশিংটনের রণকৌশলবিদেরা এ কথা বোঝানো শুরু করলেন, মস্কো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামাতে নয়, দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্য নিয়েই সিরিয়ায় হামলা শুরু করেছে। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় রাশিয়ার অর্থনীতির ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থা। এই অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে যদি দীর্ঘস্থায়ী একটা যুদ্ধ লাগিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে আজ হোক কাল হোক, তেলের দাম বাড়বেই। তা ছাড়া, যুদ্ধটা যদি ছড়িয়ে পড়ে, সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো তাতে যুক্ত হয়, তাহলে সেখানে ভারী অস্ত্র ও বিমান বহর বিক্রির এক নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এত দিন এক ওয়াশিংটন এই ফায়দা ভোগ করেছে, এখন মস্কো সেখানে বখরা চাইছে। মোটামুটি অঙ্কটা এ রকমই ছিল, কিন্তু এর মধ্যে ঘটল দুটি অঘটন। ইসলামিক স্টেট মিসরের সিনাই থেকে ওড়ার সময় একটি রুশ বিমান বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়, তাতে নিহত হয় প্রায় আড়াই শ যাত্রী, যাদের অধিকাংশই রুশ। তার পরে পরেই প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হলো ১৩০ জন, আহতের সংখ্যা প্রায় ৩০০। এই দুই ঘটনা মস্কো, পশ্চিম ইউরোপ, আমেরিকা—ক্ষমতার এই তিন বলয়কে অভিন্ন স্বার্থসূত্রে আবদ্ধ করল।
ইউরোপের কাছে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল আইসিসকে নির্মূল করা। প্যারিস থেকে উড়ে এলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওলাঁদ, ওবামা ও পুতিনের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে এক নতুন ‘গ্র্যান্ড অ্যালায়েন্স’ গড়ার পথ পরিষ্কার হলো। এদিকে ভিয়েনায় মস্কো ও পশ্চিমা দেশগুলোর বৈঠক শেষে ঠিক হলো, আপাতত বাশারকে রেখেই সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে যুদ্ধবিরতি অর্জন করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে হাজার হাজার উদ্বাস্তু এসে পশ্চিম ইউরোপে ভিড় জমাচ্ছে, তা ঠেকাতে প্রথম কাজ হলো সিরিয়ায় যুদ্ধ থামানো। এই নতুন মেরুকরণের সরাসরি প্রভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থামাতে একটি শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তাতে মস্কোর একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা ওয়াশিংটন মেনে নিয়েছে। এই নতুন আঁতাতের পূর্ণ সদস্য হিসেবে অংশ নিতে রাশিয়ার আগ্রহ বোঝা কঠিন নয়। আইসিস পশ্চিমের যেমন মাথাব্যথা, তেমনি মস্কোর জন্য এক মস্ত সমস্যা। যে হাজার হাজার বিদেশি সৈন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যোগ দিতে সিরিয়ায় এসে জড়ো হয়েছে, তার এক বড় অংশই এসেছে রাশিয়ার চেচনিয়া ও অন্যান্য মুসলিমপ্রধান অঞ্চল থেকে। এরা যখন নিজ নিজ শহরে-গ্রামে ফিরে যাবে, সঙ্গে থাকবে জিহাদি মন্ত্র। মস্কোকে এসব ঘরোয়া চূড়ান্তপন্থীর কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে। অন্য কারণ, মস্কো গত এক-দেড় দশক কার্যত একঘরে হয়ে রয়েছে, ইউক্রেনে হঠকারীমূলক হামলার কারণে পুতিন ‘নতুন হিটলার’ উপাধি পেয়েছেন। মস্কো এই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে পশ্চিমা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত হতে চায়। আইসিস ও সিরিয়া তাকে সে সুযোগ করে দিয়েছে। এই কথার একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন, যা আমরা করতে পারি মস্কোর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-বিষয়ক স্টেট ইনস্টিটিউটের নামজাদা অধ্যাপক আন্দ্রা নিকমিগ্রানিয়ানের যুক্তি ধার করে। ক্রেমলিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এই রুশ অধ্যাপক ইজভেস্তিয়ায় লিখেছেন, একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে তার আদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবত, সে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবেই এশিয়ায় ও আফ্রিকায় এই দুই দেশ ‘প্রক্সি যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই, আদর্শগত কারণে নিজের ‘মডেল’ চাপিয়ে দেওয়ার কোনো বাড়তি আগ্রহও তার নেই। মস্কোর জন্য অনেক বেশি জরুরি নিজের ঘর সামলানো, তার অর্থনীতি টেনে ধরা। সে লক্ষ্যেই মস্কো বাস্তবসম্মতভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। কিছুটা বাঁকাভাবে হলেও সে কথাটাই লিখেছেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রুশ বিশেষজ্ঞ ইরোস্লাভ ত্রফিমফ। তিনি লক্ষ করেছেন, সোভিয়েত আমলে মস্কো নিজেকে তৃতীয় বিশ্বের ত্রাতা হিসেবে প্রমাণে ব্যস্ত ছিল। ফিলিস্তিনিদের পক্ষাবলম্বন করে সে একসময় ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখত, কিন্তু এখন এই দুই দেশের সঙ্গেই মস্কোর গভীর সখ্য। অস্ত্র বিক্রি একটা বড় লক্ষ্য, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের সঙ্গেই সে যোগাযোগ রাখতে চায়। তথাকথিত ‘আরব বসন্তের’ পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ওবামা প্রশাসন এই পরিবর্তনের পক্ষে ছিল, কিন্তু আরব বসন্তের ফলাফল তার পক্ষে যায়নি। মিসর থেকে সৌদি আরব, এই অঞ্চলের দেশগুলো দেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পুরোনো মিত্রদের ছুড়ে ফেলতে ইতস্তত করেনি। মোবারক তো আমেরিকারই সৃষ্টি, কিন্তু তাঁর বিপদের সময় ওয়াশিংটনকে সে কাছে পায়নি। এই বোধ থেকেই মিসরের নতুন শাসক জেনারেল সিসি মস্কোর সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। সৌদি আরব ও একাধিক উপসাগরীয় দেশও মস্কোর সঙ্গে সামরিক চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে। একইভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে মস্কোর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে গভীর। অন্য কথায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজস্ব গুরুত্ব নিয়ে মস্কোর প্রত্যাবর্তনের একটি বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আমেরিকা আর আগের মতো পেশিবহুল নয়, সে চাইলেও আগের মতো বোম্বেটেপনা করতে সক্ষম নয়, এই বাস্তবতা মস্কোকে উৎসাহী করেছে। কিন্তু অন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ, আইসিসের বিরুদ্ধে সব পক্ষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ বাস্তবায়িত হবে কি না, তার আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। অভিন্ন শত্রু সামনে রেখে সব হাত এক হলেও সে বিপদ সরে গেলে পুনরায় বিভক্তি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে বিভক্তি ও উত্তেজনা বজায় রাখার পক্ষে ওয়াশিংটন ও মস্কোতে আগ্রহী লোকের অভাব নেই, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত তীব্র হয়, তাতে এঁদের ততই পোয়াবারো।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেম-পরিণতি

বিশ্ববিদ্যালয় সহপাঠীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত মেলামেশার অপরাধে নুর এলিকাকে (২০) আচেহ প্রদেশের বায়তুররাহুমির মসজিদ প্রাঙ্গণে জনসম্মুখে দোররা মারছেন মুখোশ পরা ইন্দোনেশিয়ার পুলিশ। এ সময় লজ্জা-ঘৃণা-যন্ত্রণায় চিৎকার করছেন এলিকা। দেশটির শরিয়াহ আইন (স্থানীয়দের কাছে ‘কানুন’ বলে পরিচিত)
ভঙ্গ করায় ৫ ঘা বেতের সাজা পান তিনি (উপরে)। দেশটির শুধু আচেহ প্রদেশেই ২০০৩ সাল থেকে এ আইন প্রযোজ্য। একই অপরাধে এলিকার বন্ধু ওহউদি সাপুত্রাকেও (২৩) অনুরূপ শাস্তি দেয়া হচ্ছে (ডানে)। বেত্রাঘাতে আহত এলিকাকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন আইনশৃংখলা বাহিনীর নারী সদস্যরা (নিচে)। মঙ্গলবারের ছবি রয়টার্স

সম্পাদক, প্রতিবেদক সবাই পথশিশু

পত্রিকার সম্পাদকীয় বৈঠক নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে একদল পথশিশু। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠক নিয়ে সবার মধ্যেই বেশ উত্তেজনা কাজ করছে। কারণ যেনতেন সংবাদপত্র নয়, এটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ধারার একটি কাগজ। বালকনামা নামে ৮ পৃষ্ঠার এ ত্রৈমাসিক পত্রিকার সম্পাদক থেকে শুরু করে প্রতিবেদক- সবাই পথশিশু। ২০০৩ সালে মাত্র ৩৫ জন প্রদায়ক নিয়ে দিল্লিতে যাত্রা শুরু করে বালকনামা। বর্তমানে শিশু-কিশোরদের কাছে এর জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গেছে যে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের পথশিশু এখানে লেখা পাঠায়। হিন্দিতে ছাপা পত্রিকাটি প্রকাশের দায়িত্বে রয়েছে চেতনা নামে একটি অলাভজনক সংস্থা। পত্রিকা প্রকাশ হওয়ার পর তারা নামমাত্র মূল্যে সেগুলো বিক্রি করে। প্রতি কপি এক রুপিতে বিক্রির পর সামান্য যা লাভ হয়, সেগুলো তারা ব্যয় করে পথশিশুদের কল্যাণে। বালকনামায় শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে, যৌন নির্যাতনসহ যেসব অপরাধ হাজার হাজার ভারতীয় বস্তির শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে সেসব বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হয়। যেমন একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে উত্তর ভারতের কনকনে শীতে শিশু কীভাবে টিকে থাকতে পারে,
তার বিশদ বিবরণ দেয়া হয়। এ শীতে কীভাবে গরম থাকা যায়, তা নিয়ে মূলধারার পত্রিকাগুলোতে প্রচুর খবর থাকে। কিন্তু যেসব শিশু রাস্তায় বা ব্রিজের নিচে ঘুমায়, তাদের বিষয়ে আসলে কিছুই বলা হয় না। কিন্তু বালকনামার প্রতিবেদনে পথশিশুদের নির্দেশনা দেয়া হয় কঠিন শীতের মধ্যে তারা কোথায় অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয় পেতে পারে। এক হিসাব অনুযায়ী, ভারতে এক কোটিরও বেশি পথশিশু রয়েছে। ফলে এসব পথশিশুর একটা বড় অংশের পছন্দের পত্রিকা হয়ে উঠেছে বালকনামা। পত্রিকার একজন প্রতিবেদক ১৭ বছরের বিকাশ কুমার। তার ভাষায়, ‘যদি কোনো বলিউড তারকাকে কুকুর কামড় দেয়, সেটা ভারতের সব টেলিভিশন ও পত্রিকায় ব্রেকিং নিউজ হয়ে যায়। অথচ যদি কোনো পথশিশু রেলের প্লাটফর্মে বা দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মারা যায়, সেটাকে কেউ কিছু মনে করে না। আমরা চাই, পথশিশুদের অন্য সব নাগরিকের মতোই সমানভাবে বিবেচনা করা হোক। তাদের কথা যেন শোনা হয়, এজন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। বালকনামার সম্পাদক হিসেবে একসময় কাজ করতেন সানো। বর্তমানে তিনি এ প্রকল্পের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। সানো বলেন, যখনই আমরা সম্পাদকীয় বৈঠকে বসি, তখন আমরা কঠোর পরিশ্রম করি প্রথম পৃষ্ঠায় কী সংবাদ ছাপা হবে, তা নির্ধারণ করতে। অন্য কোথাও যেসব খবর কাভার করা হয় না, সেসব অসাধারণ খবর আমাদের সরবরাহ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন আমাদের রিপোর্টাররা। বালকনামার সম্পাদক ১৮ বছরের চাঁদনি। এক বছর আগে তিনি যখন পত্রিকার দায়িত্ব নেন তখন প্রচার সংখ্যা ছিল চার থেকে পাঁচ হাজার কপি। আর বর্তমানে এর পাঠকসংখ্যা লক্ষাধিক। বিবিসি, আলজাজিরা।

পৌরসভা নির্বাচন ও জনরায় by আসিফ নজরুল

নির্বাচন এলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ চলে আসে। সঙ্গে থাকে নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর জল্পনা-কল্পনা। নির্বাচনে সব দল অংশ নিল কি না, নির্বাচনের আগে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলো কি না, নির্বাচনের প্রচারণা ঠিকমতো চালানো গেল কি না—এসব উৎকণ্ঠা থাকে প্রায় সব নির্বাচনে।
আমাদের দেশে এখন নির্বাচনের দিনও শুরু হয় নানা প্রশ্ন নিয়ে। যেমন ভোট দেওয়া গেল কি না, জাল ভোট পড়ল কি না, ভোটারের ভোটের ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচিত হলেন কি না। প্রশ্ন থাকে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ঠিক ভূমিকা পালন করল কি না, তা নিয়েও। নির্বাচন হলে আমরা নাগরিক ও রাজনৈতিক সমাজ এসব প্রশ্নে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে একসময় নিরস্ত হই।
কিন্তু গোটা প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্ন, তা-ই থেকে যায় অনেকটা অনালোচিত। প্রশ্নটি হচ্ছে, নির্বাচনের মাধ্যমে উল্টো সরকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল চেহারা হারিয়ে যাচ্ছে কি না? সংবিধান অনুসারে নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটাই লক্ষ্য থাকে আদতে। তা হচ্ছে জনগণের ভোটে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে শাসনভার অর্পণ করা। তবে আদৌ নির্বাচিত ব্যক্তিরা ঠিকভাবে নির্বাচিত হলেন কি না, তাঁরা জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি কি না, সাংবিধানিক গণতন্ত্র এতে রক্ষা হলো কি না—এসব প্রশ্ন যেন ক্রমেই পরিত্যাজ্য হতে চলেছে সমাজে।
২.
আগামীকাল হতে যাচ্ছে ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন। দলীয় প্রতীকে এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই নির্বাচন হতে পারে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তারও একটি পরীক্ষা। কিন্তু তা আসলে হবে কি না, সন্দেহ। এই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ের বহু কারণ ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি জোটের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছেন সরকারের সঙ্গে জোটে থাকা বেশ কয়েকটি দলের নেতারাও।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য দাবি করেছে যে তারা নিরপেক্ষ। আওয়ামী লীগের নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছিলেন যে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রতি নির্দয়, অন্যদের প্রতি সদয়। নির্বাচন কমিশনের কাছে এই অভিযোগই হয়ে ওঠে নিরপেক্ষতার মাপকাঠি! ক্ষমতাসীন দল এর আগে ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেনি, অন্য সবাই তা করেছিল। তাহলে কি বলা যায় যে এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করেছিল?
আসলে শুধু কারও অভিযোগ বা অনুযোগ নয়, নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে কি হচ্ছে না, তার আলামত পাওয়া যায় বিভিন্ন ঘটনায়, বিশেষ করে এসব ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়া বা নিষ্ক্রিয়তায়। নির্বাচনের আগেই বর্তমান নির্বাচন কমিশন এমন কিছু করে বসেছে, তাতে এই সন্দেহ জোরদার হয় যে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের পর্যাপ্ত তাগিদ, সদিচ্ছা বা সাহস নির্বাচন কমিশনের নেই।
৩.
পৌরসভা নির্বাচন যে দলীয় প্রতীকে হবে বা দ্রুতই হবে—এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই গ্রহণ করে। এরপর নির্বাচন পেছানো ও সেনাবাহিনী মোতায়েনে বিরোধী দলগুলোর দাবি নাকচ করা, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনে শাস্তি প্রদানে অনীহা, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা রোধে ব্যর্থতা, নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা, নারী প্রার্থীদের অবমাননাকর প্রতীক বরাদ্দসহ নানা বিতর্কের জন্ম দেয় নির্বাচন কমিশন।
কমিশন যেসব প্রার্থিতা বাতিল করেছে, তা নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। ফেনী, চাঁদপুর, সিলেট, কুমিল্লাসহ কিছু এলাকায় বিএনপি জোটের মনোনীত প্রার্থীদের এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করে নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে, তা–ও সমালোচিত হয়। ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়ে এবং পরে সেখানে সাংবাদিকদের বেশি সময় অবস্থান না করার নির্দেশ দিয়ে কারচুপিবান্ধব পরিবেশ উৎসাহিত করার দায়ে কমিশন সমালোচিত হয়।
নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন আখ্যায়িত করেছিল বিএনপি। এখন এরশাদও কমিশনের মেরুদণ্ড আছে কি না, তা প্রমাণ করার কথা বলছেন। কমিশনের মেরুদণ্ড নিয়ে সম্ভবত সন্দেহ আছে এডিসি, রিটার্নিং কর্মকর্তা, এসপি, ওসিদেরও। বিভিন্ন অনিয়ম রোধে ব্যর্থতার জন্য নির্বাচন কমিশনের নোটিশের জবাব দেননি তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে, কমিশনও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। একটিমাত্র ক্ষেত্রে সাতক্ষীরার কলারোয়ার রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, অথচ অনিয়মের সুবিধাভোগী সরকারদলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রশ্ন রয়েছে তাদের সৎসাহস নিয়েও। নানা অভিযোগের ভিত্তিতে একপর্যায়ে ২৩ জন মন্ত্রী ও সাংসদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে ২৪ ডিসেম্বর দুজন সাংসদকে সতর্ক করে দিয়েই দায় সেরেছে কমিশন। বিতর্ক রয়েছে যথেষ্ট লোকবল থাকা সত্ত্বেও ২৩৪টি পৌরসভার মধ্যে ১৭৫টি পৌরসভায় নির্বাচনের সার্বিক দায়িত্ব পালনের ভার প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া নিয়েও। গত আট বছরের দলীয়করণের পর যেভাবে জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে সাজানো হয়েছে, তাতে প্রশাসনিক খবরদারিতে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। নির্বাচনী এলাকাগুলোতে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ব্যাপক ধরপাকড় ও মামলা দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়ে উঠেছে।
৪.
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কোনো হাতবদল হয় না। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মতামত, মর্যাদা ও স্বার্থরক্ষার জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই নির্বাচনের গুরুত্ব নিহিত রয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্রের মধ্যেই।
বাংলাদেশ একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র। এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে একটি মাত্র সংসদ, একটি উচ্চ আদালত ও একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার থাকে বলে সেখানে স্থানীয় সরকারের বিশাল গুরুত্ব রয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আগে কখনো এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার অধীনে ছিল না। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে মূলত যেসব রাষ্ট্রের সংবিধানের সাহায্য নেওয়া হয়েছে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত) এবং যেসব আগেকার সংবিধানের (১৯৩৫, ১৯৫৬ ও ১৯৬২) কিছু বিধান অনুসৃত হয়েছে, সেগুলোও মূলত যুক্তরাষ্ট্রীয় বা ফেডারেল ধারার সংবিধান। ফলে ১৯৭২ সালে এককেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের সময় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের জন্য স্থানীয় সরকারব্যবস্থার দিকে জোর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। তা দেওয়াও হয়েছিল। বাংলাদেশ সংবিধানে অনেকটা নজিরবিহীনভাবে স্থানীয় সরকার বিষয়ে একটি আলাদা চ্যাপ্টার বা অধ্যায় সংযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দিকে জোর দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের আদি সংবিধানের শর্ত ছিল এমন একটি স্থানীয় সরকারব্যবস্থা, যা অবশ্যই জনপ্রতিনিধিত্বশীল ও শক্তিশালী। কিন্তু বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার আদতে কতটুকু শক্তিশালী, তা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন কাঠামো নিয়ে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের আমলে কিছু নিরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন এরশাদ উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে। এরপর ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সরকারকে বিভিন্নভাবে দুর্বল করা হয় কেন্দ্রীয় সরকার বা আরও নির্দিষ্টভাবে বললে ক্ষমতাসীন দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য।
স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও প্রকাশ্যে অবহেলা করা হয় এর জনপ্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র নষ্ট করে। ১৯৯০ সালের পরও বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকারকাঠামোতে নির্বাচন না করে সরকার–মনোনীত ব্যক্তিদের অধিষ্ঠিত করা হয়। নির্বাচন যেখানে অনুষ্ঠিত হয়, সেখানেও কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কারচুপি ও অনিয়ম নতুন মাত্রা লাভ করে ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর। এর কয়েক মাস পরে প্রথম দুটি ধাপের উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি জোটের বিজয়ের পর পরবর্তী ধাপগুলোতে ব্যাপক কারচুপি করে সরকারদলীয় প্রার্থীদের বিজয়ী করা হয়। এরপর বিভিন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও প্রকাশ্যে ব্যাপকভাবে কারচুপি করা হয়।
নির্বাচনের পরও চলে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পদে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার বিভিন্ন কৌশল। বিরোধী দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কঠিন মামলা দিয়ে তাঁদের বরখাস্ত করে সরকারদলীয় ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা আগের যেকোনো আমলের চেয়ে অনেক বেশি হয় এখন। নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের পরও বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের রায় নাকচ করে এভাবেই স্থানীয় প্রশাসনের জনপ্রতিনিধিত্ব ও জনভিত্তিকে আঘাত করা হয়। ৩০ ডিসেম্বরের পৌরসভা নির্বাচনের পরও যে সেরকমটি হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি?
৫.
আমাদের মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের উদ্দেশ্য হচ্ছে জনরায় প্রতিফলিত করা; বিভিন্ন কৌশলে একে নাকচ করা নয়। নির্বাচনে বিভিন্নভাবে জনগণের রায় বানচাল করার ধারা অব্যাহত থাকলে শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড নিয়েই প্রশ্ন উঠবে বিভিন্ন মহলে।
তাই আশা করি, অভাবিতভাবে হলেও আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে দ্রুত।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

রাষ্ট্র ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

কোনো একটি রাষ্ট্র, তার ভৌগোলিক আকার ও জনসংখ্যা যা-ই হোক, একটি মস্ত বড় জিনিস। মানবদেহের মতো তারও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে। শুধু হাত আর পা থাকলেই একজন মানুষকে সুস্থ মানুষ বলা যায় না। তার চোখ, কান, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, লিভার প্রভৃতি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে মানুষটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক কি না। দেহযন্ত্রের ক্ষেত্রে যেমন, রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষেত্রেও তা-ই। শুধু নির্বাহী বিভাগ নয়, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র নড়বড়ে ও দুর্বল হয়ে যায়।
সাত বছর যাবৎ বাংলাদেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে, এটা একটা ইতিবাচক দিক। যেভাবেই নির্বাচিত হোক, একটি সংবিধানসম্মত সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাস্তবায়িত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিভিন্ন ফোরামে অংশ নিচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে এত কথা উঠছে কেন? গত দুই বছরে পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলগুলোতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই অপরিণত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংশোধনে বাস্তবসম্মত ও বলিষ্ঠ কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে শুধু সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে তা নয়, সরকারের বাইরের রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি দরকার।
রাষ্ট্র পরিচালনা করে প্রধানত নির্বাহী বিভাগ, যার অধীনে থাকে প্রশাসন। প্রশাসন পরিচালিত হয় স্থায়ী আমলাতন্ত্র দ্বারা। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের নাম শুনলেই আজকাল অনেকে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তাঁদের মতামতকে ফেলে দেওয়ার জন্য শক্তিশালী যুক্তি এখনো পর্যন্ত দুর্লভ। এঙ্গেলস তাঁর ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ শীর্ষক রচনায় বলেছেন, ‘যেহেতু রাষ্ট্রের আবির্ভাব শ্রেণি বিরোধকে সংহত করার প্রয়োজন থেকে, সেই সঙ্গে তার উদ্ভব হয় শ্রেণি বিরোধের মধ্যেই, সেই জন্য রাষ্ট্র হলো সাধারণত সবচেয়ে শক্তিশালী ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রভুত্বকারী শ্রেণির রাষ্ট্র; এই শ্রেণি রাষ্ট্রের মাধ্যমে রাজনীতির ক্ষেত্রেও আধিপত্যকারী শ্রেণি হয়ে ওঠে; এবং তার ফলে দুর্বল ও নিপীড়িত শ্রেণির দমন এবং তার শোষণে নতুন হাতিয়ার লাভ করে। এভাবে প্রাচীন যুগে রাষ্ট্র ছিল প্রধানত ক্রীতদাস দমনের জন্য দাস-মালিকদের রাষ্ট্র, যেমন সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল ভূমিদাস কৃষকদের বশে রাখার জন্য অভিজাতদের সংস্থা। বর্তমানে আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র হচ্ছে পুঁজি কর্তৃক মজুরি শ্রম শোষণের হাতিয়ার।...অধিকাংশ রাষ্ট্রেই দেখা যায়, নাগরিকদের অধিকার নির্ধারিত হয় ধনসম্পত্তির অনুপাতে,...রাষ্ট্র হচ্ছে বিত্তহীন শ্রেণির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিত্তশীল শ্রেণির একটি সংগঠন।’
রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী। যদিও সব গণতান্ত্রিক দেশেই পার্লামেন্টকে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা। যদিও তার সেই ক্ষমতাও নির্বাহী বিভাগের আমলাদের মাধ্যমেই প্রয়োগ হয়ে থাকে। ক্ষমতা হাতে পেয়ে নির্বাহী বিভাগ যদি অন্যায় করে, ভুল করে অথবা থাকে তার দুর্বলতা, তার প্রতিবিধান করবে কে? আধুনিক রাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারির জন্য বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিচার বিভাগ রয়েছে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য। সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটির সঙ্গে যদি রাষ্ট্র অবিচার করে, বিচার বিভাগ দুর্বলের পক্ষে রায় দিয়ে রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে থাকে। তা ছাড়া রাষ্ট্রে রয়েছে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেমন নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। যেমন মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন। এসবই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অতি আবশ্যকীয় অংশ। এগুলোর প্রতিটির আলাদা আলাদা কাজ এবং প্রতিটিই অন্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত, যেমন মোটরগাড়ির ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাধারণ নাগরিকেরা ন্যায়বিচার ও সুশাসন আশা করতে পারে না।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ও সুষ্ঠু নির্বাচন করে সম্ভাব্য ক্ষতি ডেকে আনার কাজটি সরকার কেন করতে যাবে? তা করার কথা নির্বাচন কমিশনের। সে ক্ষমতা সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে। জেলা প্রশাসক হোন, পুলিশ সুপার হোন বা কোনো জনপ্রতিনিধিই হোন, তাঁরা যখন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কে ব্যবস্থা নেবেন? নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা হোন বা যেকোনো ক্ষমতাবান হোন, নির্বাচনকেন্দ্রে বসে ব্যালট পেপারে কারও পক্ষে যদি সিল মারতে থাকেন, তাঁকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তা যখন তারা করে না, তখন তারা জনগণ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। বিশ্বাসঘাতক মানুষকে দিয়ে ভালো রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
রাষ্ট্র চলে যে অর্থে, রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, তাঁদের আরামদায়ক বাড়ি-গাড়ির ব্যয়, তার প্রতিটি পয়সাই জনগণের; সরকারি দলের তহবিল থেকে আসে না। ওই অর্থের অপব্যবহার করার অধিকার রাষ্ট্রের কারও নেই। এবং সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা তদারকের জন্য রয়েছেন মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক। অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ। অতি গুরুদায়িত্ব তাঁর। তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে সংবিধান বলে দিয়েছে:
‘মহা হিসাব নিরীক্ষক প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব এবং সকল আদালত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীর সরকারি হিসাব নিরীক্ষা করিবেন এবং অনুরূপ হিসাব সম্পর্কে রিপোর্ট দান করিবেন এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি কিংবা সেই প্রয়োজনে তাঁহার দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির দখলভুক্ত সকল নথি, বহি, রসিদ, দলিল, নগদ অর্থ, স্ট্যাম্প, জামিন, ভান্ডার বা অন্য প্রকার সরকারি সম্পত্তি পরীক্ষার অধিকারী হইবেন।’
সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা তাঁরা করছেনও। মহা হিসাব নিরীক্ষক তাঁর বার্ষিক রিপোর্ট রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেন। রাষ্ট্রপতি সেটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে পাঠিয়ে দেন। সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, যা সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি, ওই রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়। ব্রিটেন, ভারতসহ পৃথিবীর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সব দেশেই মহা হিসাব নিরীক্ষকের রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। সাধারণত পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হন বিরোধী দলের নেতা। কমিটিতে কোনো মন্ত্রী থাকেন না। মহা হিসাব নিরীক্ষকের অফিস ঠিকমতো কাজ করলে সরকারি অফিসে চুরি, অপচয়, দুর্নীতি প্রভৃতি যথেষ্ট পরিমাণে কমে যেতে পারে। কিন্তু বহু শিক্ষিত মানুষকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, মহা হিসাব নিরীক্ষকের দায়িত্ব সম্পর্কে শুধু নয়, তাঁর পদটি সম্পর্কেই তাঁদের ধারণা নেই। মহা হিসাব নিরীক্ষক এবং সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি অন্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো যদি বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করত, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজ বারো আনা কমে যেত।
আমাদের সংবিধান বলেছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে’ এবং ‘কারও প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না’। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের জন্য রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকমিশন। এই কমিশনের প্রধানতম দায়িত্ব হলো ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগদানের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদিগকে মনোনয়নের উদ্দেশ্যে যাচাই ও পরীক্ষা পরিচালনা’ করা। সংবিধান এ কথা বলেনি যে পরীক্ষার্থীদের ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস করিবার অধিকারও তাহাদের থাকিবে’। রাষ্ট্রে একটি দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ভূমিকাই প্রধান। সরকারি দলের নিম্ন মেধার ও অযোগ্য ক্যাডারদের নিয়োগ দিলে একসময় প্রশাসন ভেঙে পড়বে। আমরা এখনো পর্যন্ত যা দেখে এসেছি, তাতে বলা যায়, দলীয়করণের কারণে যোগ্যতর ও মেধাবীদের অনেকেই আপ্রাণ চেষ্টা করেও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। গরিব-মেধাবী তরুণেরা হতাশ। রাষ্ট্রীয় নিয়োগে বিপুল অর্থ অবৈধভাবে লেনদেন হয়। এই প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে একসময় রাষ্ট্র দুর্বল এমনকি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন আগে ছিল না। বর্তমানে এ দুটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। দুদক সম্পর্কে সাবেক এক চেয়ারম্যান নিজেই বলেছিলেন, এটি ‘নখদন্তহীন বাঘ’। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সদিচ্ছা ছাড়া দুদকের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করা অসম্ভব। যদিও গত তিন-চার বছরে বেশ কয়েকজন ক্ষমতাশালীকে তাদের অফিসে তলব করেছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু যেভাবে দুদক এখন কাজ করছে, এই গতিতে চললে দেশে দুর্নীতি বাড়বে ছাড়া কমার সম্ভাবনা কম।
মানবাধিকার কমিশনের মিডিয়া প্রচার ছাড়া সাবলীল ভূমিকা এখনো দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। অথচ অসহায় ও দুর্বলের প্রধান সহায়ক হওয়ার কথা মানবাধিকার কমিশন। বরং বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দুর্বলের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট কাজ করছে। আমাদের রাষ্ট্রে দুর্বলের পাশে মিডিয়া ছাড়া দাঁড়ানোর কেউ নেই। ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সংখ্যালঘু নৃজাতি, নারী এবং শিশুর ওপর প্রবলের আঘাতকে প্রত্যাঘাত করার জন্য যেসব সংস্থা দায়বদ্ধ, তাদের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। বিরোধী নেতা-কর্মীর অপহরণ, গুম, হত্যা প্রভৃতির সঙ্গে রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জড়িত থাকলে তাঁদের বিচারের আওতায় আনার জন্য যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের কথা, সেগুলোর ওপর মানুষের আস্থার সৃষ্টি হয়নি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক যা তা হলো নাগরিক সমাজের যেসব সংগঠন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ও মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার, সেগুলোর কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে খুবই কঠোরভাবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও মানবাধিকার নিয়ে দেশে ও বিদেশে সমালোচনা ও উদ্বেগের ঘাটতি নেই। গত দুই-আড়াই বছরে তার মাত্রা বেড়েছে। সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে বাধাহীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে দিলেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব। আশা করি নতুন বছরে জাতীয় এজেন্ডায় এ বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বিএনপি হেরেছে, আওয়ামী লীগও জেতেনি by হায়দার আকবর খান রনো

সহিংসতা ও অত্যন্ত ভীতিকর রাজনৈতিক ঘটনাবলি দিয়ে বছর শুরু হলেও ২০১৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে রাজনীতি সুস্থ ধারায় না এলেও কিছুটা ভীতিমুক্ত হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে দুই প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলেছিল ‘গণতন্ত্র বিজয় দিবস’। অন্যদিকে বিএনপি এই দিনটিকে কালো দিবস হিসেবে পালন করার কথা বলেছিল। বিএনপিকে কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি সরকার। জনসভা করতে বাধা দিয়েছিল। এমনকি খালেদা জিয়াকে নিজ অফিসে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, গেটের সামনে বালুর ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে।
সরকারের আচরণে গণতান্ত্রিক নীতিবোধ কাজ করেনি। কিন্তু তার পাল্টা বিএনপি অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দিয়ে ভয়াবহ পেট্রলবোমার সন্ত্রাস চালিয়ে গিয়েছিল প্রায় তিন মাস পর্যন্ত। এই তিন মাসে সারা দেশে ৭০ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন (সূত্র: ৩ এপ্রিল, প্রথম আলোয় প্রকাশিত বদিউল আলম মজুমদারের নিবন্ধ)। পেট্রলবোমা-সন্ত্রাস যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে কোনো কার্যকর ফল আনতে পারে না, সেটা শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়া, তারেক জিয়াসহ বিএনপির নেতৃত্বের উপলব্ধিতে এসেছে বলে মনে হয়।
বিএনপির এই সন্ত্রাসী পদ্ধতিকে উৎসাহিত করেছিল একই জোটভুক্ত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামী। সন্ত্রাসী কাজে জামায়াতের কর্মীরাই বেশি অংশ নিয়েছিলেন। জামায়াতের অবশ্য নিজস্ব স্বতন্ত্র এজেন্ডা ছিল। দলটির প্রবীণ নেতারা সবাই যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। ইতিমধ্যে চারজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকরও হয়েছে। সর্বশেষ জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির দণ্ডাদেশ কার্যকর হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়াকে ভন্ডুল করার জন্য জামায়াত সহিংসতার পথ নিয়েছিল। কিন্তু সন্ত্রাস দিয়ে সরকারকেও ক্ষমতাচ্যুত করা যায়নি, বিচারপ্রক্রিয়া ও অপরাধীদের ফাঁসি বন্ধ করাও যায়নি। আন্তর্জাতিক চাপ কিন্তু ছিল। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন মহলও ফাঁসি কার্যকর না করার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ, তুরস্ক—এসব দেশেরও চাপ ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে দৃঢ়তার সঙ্গে চাপকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছেন, তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।
বিএনপি-জামায়াত সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়ে লাভ কিছুই করতে পারেনি, কিন্তু পরোক্ষভাবে উপকার করেছে সরকারেরই। রাজনীতির খেলায় বিএনপি হেরে গেছে। কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগ যে জিতেছে এমনটাও বলা যাবে না। দলটি যত বেশি কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে, তত বেশি তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে র্যাব, পুলিশ ও দলীয় মাস্তানদের ওপর। আসলে পরাজিত হয়েছে ‘গণতন্ত্র’।
বিএনপি বাসে ও বাসযাত্রীদের গায়ে আগুন লাগাতে গিয়ে নিজের কপালে এমনই আগুন লাগিয়েছে যে এখন দলটিকে রক্ষা করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের বাইরে কিছু বাম দল এবং কতিপয় উদারপন্থী রাজনীতিবিদ থাকলেও তাঁরা এখনো তেমন বড় ধরনের শক্তি হয়ে উঠতে পারেননি। ফলে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের একক একাধিপত্য বিরাজ করছে। কার্যকর বিরোধী দল না থাকলে রাজনীতি জমে না, গণতন্ত্রও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালের শেষ প্রান্তে এসে সেই চিত্রটাই দেখা যাচ্ছে।
প্রচারমাধ্যম, রাজপথ ও বিলবোর্ড দেখলে মনে হবে দেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া বুঝি আর কোনো দলই নেই। তার মানে এই নয় যে দলটি ভীষণ জনপ্রিয়। তবে, বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। এই বছরই ঢাকা ও চট্টগ্রামে সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়েছিল। আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা, ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে না দেওয়া ইত্যাদি যা প্রত্যক্ষ করা গেল তাতে নির্বাচনের ওপরই সাধারণ মানুষের আস্থা উঠে গেছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না। তারপরও যদি সেই ক্ষেত্রেও এমন কারচুপি করা হয়, তাহলে তো গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে সত্যিই শঙ্কিত হতে হয়। এখন পৌরসভা নির্বাচনকে ঘিরে যে সহিংসতা চলছে, তাতে প্রথম আলোর সম্পাদকীয়তে (২৩ ডিসেম্বর) উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দৈনিকটির একই সংখ্যায় প্রথম পৃষ্ঠায় এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভোটারদের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রবল সন্দেহ-সংশয় রয়েছে।...ভোটারদের এই অংশটি উদাহরণ টানছেন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয়, এরপর উপজেলা ও সর্বশেষ তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের।’
বিপদের দিক হচ্ছে এই যে সরকার জনগণের ওপর নির্ভর করার চেয়ে প্রশাসন ও র্যাব-পুলিশের ওপর নির্ভর করে বেশি। এতে বিশেষ করে র্যাব-পুলিশ একধরনের আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় দেখা গেল র্যাবের কিছু দুর্নীতিবাজ সদস্য ভাড়াটে খুনিতে পরিণত হয়েছেন। প্রশাসন ও র্যাব-পুলিশ ছাড়াও সরকারকে নির্ভর করতে হয় দলীয় মাস্তানদের ওপরও। যারা ভোটকেন্দ্র দখল করবেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, তারা ওখানেই থেমে থাকবে। এরপর তারা জমি দখল, সম্পত্তি দখল, টেন্ডার বাক্স দখল ও নারী দখলের জন্যও তৎপর হবে। হচ্ছেও তা–ই। ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, মাস্তানদের দৌরাত্ম্য বেড়ে গেছে, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার ঘটেছে এবং নিজ দলের মধ্যে খুনোখুনিও বেড়ে গেছে। লুটের ভাগ অথবা প্রতিপত্তির লড়াইয়ে ছাত্রলীগের-যুবলীগের নিজের মধ্যে সংঘর্ষ ও খুনোখুনির সংখ্যা ব্যাপক। এমনই এক বন্দুকযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল মাতৃগর্ভের কন্যাসন্তানও। এ রকম অরাজক পরিস্থিতি যেন সর্বকালের রেকর্ড ও সব রকম মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন ও হত্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। খালেদা জিয়ার আমলে ক্লিন হার্ট অপারেশনের সময় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে যাঁরা নির্যাতিত হয়েছেন বা নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন, তাঁদের হত্যাকারী ও নির্যাতনকারীদের রক্ষার্থে দায়মুক্তির আইন পাস করা হয়েছিল। অত্যন্ত অন্যায় ও গণতন্ত্রবিরোধী কাজ করেছিলেন তিনি। এখন অবশ্য দায়মুক্তির দরকার হচ্ছে না। হত্যার ঘটনাকেই স্রেফ অস্বীকার করা হচ্ছে। গুপ্তহত্যা, গুম, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার নতুন নতুন পদ্ধতি বের হচ্ছে। এই বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকার মিরপুরের কাজীপাড়ায় তিনটি যুবকের লাশ পাওয়া গেল। পুলিশ বলল, গণপিটুনিতে মারা গেছে। পুলিশেরই দেওয়া মেডিকেল পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে, তিন যুবকের গায়ে মোট ৫৬টি বুলেট পাওয়া গেছে। জনগণ কি অস্ত্র ব্যবহার করেছিল?
একদিকে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সন্ত্রাস (যা এখন আর দেখা যাচ্ছে না), অপর দিকে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত শিক্তপ্রয়োগ ও কঠোরতা—সব মিলিয়ে যখন খুবই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি, তখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মৌলবাদী জঙ্গি সন্ত্রাস। এটাই এখন সবচেয়ে বড় বিপদ বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। এ বছরই পাঁচজন মুক্তবুদ্ধির লেখক, ব্লগার ও প্রকাশককে হত্যা করা হয়েছে। এই পর্যন্ত একটি হত্যারও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়নি। আশিকুর রহমান বাবুকে যারা প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে হত্যা করেছিল, তাদের দুজনকে হাতেনাতে ধরে পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছিল দুজন সাহসী ব্যক্তি, যাদের আমরা তৃতীয় লিঙ্গ বলে অবজ্ঞা করি। সেই হত্যার বিচারকার্য এখনো শুরু হয়নি। সরকারের নির্লিপ্ত ভাব দেখে অবাকই হতে হয়। দীপন হত্যার পর সরকারের ভূমিকা নিয়ে অনেক বুদ্ধিজীবীও ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। বিশিষ্ট লেখক ও পদার্থবিদ অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল তো সন্দেহ প্রকাশ করে বলছেন, সরকারের জন্য কোনো দুর্বোধ্য সমীকরণ কাজ করছে নাকি। ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। আমি অবশ্য অতদূর সন্দেহ করতে চাই না। কিন্তু মনে হয় সরকার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ঘায়েল করার জন্য যতটা আগ্রহী, মৌলবাদীদের নির্মূল করার ব্যাপারে ততটা তৎপর নয়। বরং মৌলবাদীদের ভাবাদর্শের কাছে ক্রমাগত আত্মসমর্পণের বহু দৃষ্টান্ত আছে।
মৌলবাদী সন্ত্রাস আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিদেশি হত্যা, শিয়া মসজিদে বোমা বিস্ফোরণ, শিয়া-সুন্নি বিরোধ লাগানোর চেষ্টা (যা বাংলাদেশে কখনোই ছিল না), তাজিয়া মিছিলে বোমা, খ্রিষ্টান যাজককে গলা কেটে হত্যা প্রচেষ্টা, মন্দির প্রাঙ্গণে বোমাবাজি ও হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে সত্যিই এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। এর সঙ্গে বিদেশি চক্র জড়িত থাকা খুবই স্বাভাবিক। সরকার অবশ্য বারবার বলছে, বাংলাদেশে আইএস নেই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী একবার এ কথাও বলেছেন যে আইএস আছে বললে নাকি ‘ওরা হামলে পড়বে’। ওরা কারা, স্পষ্ট করে না বললেও ইঙ্গিতটা অস্পষ্ট নয়। ওরা মানে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারী শক্তি। তাহলে দুর্ভাবনাটা আরও বেশি।
ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করার উপায় কী? একমাত্র জনগণের ঐক্য ও গণতন্ত্রই পারে সব জাতীয়, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও মৌলবাদী জঙ্গি তৎপরতাকে মোকাবিলা করতে। অগণতান্ত্রিক পরিবেশে অন্ধকারের শক্তি বল পায়, বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়।
এ বছরই পরপর কয়েকটি শিশুহত্যার নির্মম কাহিনি যখন প্রকাশ হচ্ছিল, তখন (আগস্ট মাসে) জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছিলেন, ‘আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে শিশু নির্যাতন হচ্ছে।’ এবং ‘রাজনৈতিক আশ্রয় থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না।’
আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, অর্থনৈতিক বৈষম্য যে ধর্মীয় মৌলবাদ ও চরমপন্থী রাজনীতির বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে, এটা কোনো অজানা বিষয় নয়। ২০১৫ সালের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারি, গণতন্ত্রকে যত বিস্তৃত করা যাবে, সন্ত্রাস ও মৌলবাদী আশঙ্কাকে তত দূরে ঠেলে দেওয়া সম্ভব হবে। আশা করি, আগামী বছরে সবারই শুভবুদ্ধির উদয় হবে। গণতন্ত্রের ক্ষেত্র উন্মুক্ত হবে। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদী জঙ্গি তৎপরতা পরাভূত হবে।
২০১৫ সালে আমাদের অর্জনও কম ছিল না। আমরা মুস্তাফিজের মতো ক্রিকেটার পেয়েছি। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা দেশে-বিদেশে নাম করেছেন। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা ১৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়েছেন। কৃষকেরা অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও উৎপাদন বৃদ্ধি করেছেন অবিশ্বাস্য হারে। সব মিলে আমাদের জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও ধনবৈষম্যও বেড়েছে আতঙ্কজনক হারে।
আমাদের সব অর্জন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকে এবং মৌলবাদী জঙ্গি তৎপরতাকে এখনই নির্মূল না করা যায়। তবে আমি আশাবাদী, আগামী বছরের মধ্যে আমরা উভয় ক্ষেত্রেই বিজয় অর্জন করতে পারব। কারণ, আমি জনগণের শক্তির ওপর আস্থা রাখি। রবীন্দ্রনাথই তো বলে গেছেন, ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ইসির ভূমিকা by এম সাখাওয়াত হোসেন

৩০ ডিসেম্বর ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশের বহু পৌরসভা, বিশেষ করে দেশের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল। অবশ্য এ জায়গাগুলো সব নির্বাচনের সময়ই অন্যান্য অঞ্চল থেকে বেশি উত্তপ্ত থাকে। এখন পর্যন্ত সংঘর্ষ যা হয়েছে, তা বিগত ২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলে প্রতীয়মান হয় যে আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা বিগত নির্বাচন থেকে নিম্নগামী, যা ভোটারদের শঙ্কিত করে তুলেছে।
ওপরের বক্তব্যের সত্যতা প্রতিদিনের পত্রিকা খুললেই দেখা যায়। মারাত্মক কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে চৌদ্দগ্রামে দুই পক্ষের সংঘাতের কারণে শুধু উভয় পক্ষের সমর্থকেরা আহতই হননি, বরং জাতীয় মহাসড়ক বন্ধ করে গাড়ি পোড়ানো ও দোকান ভাঙচুরের মহা উৎসব লেগেছিল। সাভারে সরকার-মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকেরা প্রতিপক্ষ বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে হামলা করেছেন বলে পত্রপত্রিকায় তথ্য প্রকাশ। পটুয়াখালীতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির নেতা আলতাফ হোসেনের গাড়িবহরে প্রতিপক্ষের হামলা, গাড়ি ভাঙচুর এবং ২০ জনের ওপরে আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম, নাটোর, চাঁদপুর, লক্ষ্ণীপুর, পাবনা, নেত্রকোনা, সরিষাবাড়ীতে। নড়িয়ায় আওয়ামী লীগ–সমর্থিত প্রার্থীর ওপর হামলা করেছেন একই দলের বিদ্রোহী পার্থীর সমর্থকেরা। নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে আচরণবিধি লঙ্ঘন। সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রথম বড় ঘটনা ঘটেছিল ফুলপুর পৌরসভায় দুই মন্ত্রীর উপস্থিতি এবং একজন মন্ত্রীর প্রচারণায় অংশগ্রহণ দিয়ে। অবশ্য স্থানীয় তদন্তে ওই দুই মন্ত্রী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে প্রমাণিত না হওয়ায় ইসি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অথচ নির্বাচনী আচরণবিধির ২২ অনুচ্ছেদ এবং এর শর্তাংশ পাঠে প্রতীয়মান হয় যে দুই মন্ত্রী মহোদয়ের উপস্থিতিই যথেষ্ট ছিল। একজন স্থানীয় মন্ত্রী হওয়ার সুবাদে তাঁর সঙ্গে মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন দলীয় মেয়র পদপ্রার্থী—এমনই সংবাদ প্রকাশিত হয় পত্রপত্রিকায়।
এমতাবস্থায় নির্বাচনী পরিবেশ যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অনুকূলে থাকছে না, তা তাদের কিছু বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান। একপর্যায়ে একজন কমিশনার সরকারপ্রধানের হস্তক্ষেপের আকুতি জানিয়ে একধরনের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন।
সংবিধান মোতাবেক নির্বাচনের দায়দায়িত্ব একমাত্র ইসির, তা হোক না সংবিধানের আওতায় পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণোদিত আইন দ্বারা পরিচালিত স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সংবিধানের ১১৯ ধারা মতে, নির্বাচন কমিশনকে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন পরিচালনার জন্য। বস্তুতপক্ষে নির্বাচন কমিশনকে যতখানি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা অন্য কোনো সাংবিধানিক অথবা আইন দ্বারা গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয়নি। কাজেই কমিশনকে কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। যেসব জায়গায় হানাহানি হয়েছে, সেসব জায়গায় নির্বাচন স্থগিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের প্রার্থিতা বাতিল করার মতো পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশন নিতে পারে বা নেওয়া উচিত বলে মনে করি। এখনো সময় আছে, নির্বাচন কমিশন তাদের প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা দেখাতে পারে। কয়েকটি জায়গায় পৌরসভা বিধিমালার ধারা ৩২ অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিলের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে মনে করি, মুখে সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকারের সঙ্গে সঙ্গে শক্ত অবস্থান থেকে তৃণমূল পর্যায়ে গুরুতর বিধি ভঙ্গের মতো ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে আইন শুধু কাগজে–কলমেই থেকে যাবে।
যদিও সংবিধানে নির্বাচন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য অনুষ্ঠিত করার মূল দায়িত্ব ইসির। তবে দশক দুয়েকের মধ্যে বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান যে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে প্রয়োজন শরিকদের পূর্ণ সহযোগিতা। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের মধ্যে সরকার, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মিডিয়ার সহযোগী ভূমিকা স্বীকৃত। এ ধরনের সহযোগিতা যেমন সহজে পাওয়া যায় না, তেমনি সহযোগিতা আদায় করার প্রচেষ্টা সচরাচর দৃষ্টিগোচর হয় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এই পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন কী কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে, তা অনেকটা উপলব্ধি করা গিয়েছিল বিগত উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়। অতীতের অনিয়মগুলো আমলে নিয়ে শরিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারত। কিন্তু সেটি হয়নি। মূলত এ কারণে মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে আসছে এবং কমিশনকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।
বর্তমানে পৌরসভা নির্বাচনের একাংশ, বিশেষত মেয়র পদে দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তটিও অতি দ্রুত নেওয়া হয়েছে। ততোধিক ত্বরিতগতিতে নির্বাচন অায়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় শরিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করা সম্ভব হয়নি, যে কারণে নির্বাচন কমিশনকে বেগ পেতে হচ্ছে। অপর দিকে রাজনৈতিক দলগুলোও প্রথম থেকেই আচরণবিধির খুব একটা তোয়াক্কা করেনি, যা দলের তরফ থেকেও দলীয় প্রার্থী ও সমর্থকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। স্থানীয় নির্বাচন দলীয় পরিচয়ে পরিবর্তন করার পেছনের জোরালো যুক্তি ছিল, এসব নির্বাচনে প্রার্থীদের ওপর দলের কর্তৃত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা। তেমনটা শুধু দলের স্বার্থেই হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া বা প্রশাসনে সহযোগিতা করা হয় না, যা এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। নির্বাচনী আইন ও বিধির প্রতি সম্মান দেখানোর দায়িত্বও দলের এবং দলের প্রার্থীদের। কিন্তু আমাদের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কমিশন রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা তো পায়ই না, বরং উল্টো নানা চাপের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়।
সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পেতে হলে ইসির সহযোগী হয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য করার শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলের সক্রিয়তা প্রয়োজন। এর প্রথম ধাপ রাজনৈতিক দল কর্তৃক প্রার্থী নির্বাচন। দলের প্রার্থী নির্বাচনের বাঁধাধরা নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি বিশ্বের কয়েকটি দেশে আইন ও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সিংহভাগ দেশে এ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া প্রতিটি দলের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া বলেই স্বীকৃত। তবে উঠতি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আইন দ্বারা কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি উত্থাপন করা হচ্ছে। তবে স্বীকৃত দুটি পদ্ধতি হচ্ছে—এক. দলের তৃণমূলে তৈরি তালিকা থেকে শীর্ষস্থানীয় বোর্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত করা, তবে শর্ত থাকে যে তৃণমূল পর্যায়েও স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে গঠিত বোর্ড কর্তৃক ক্রম অনুযায়ী তালিকা প্রস্তুত করা। দুই. তৃণমূল পর্যায়ে গোপন ভোটের মাধ্যমে প্যানেল তৈরি করা। সূত্রমতে, প্রথম প্রক্রিয়াটিও পুরোপুরিভাবে গ্রহণ না করার কারণে তথাকথিত ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’র জন্ম দেয়, যার উদাহরণ এই নির্বাচনে বিদ্যমান। পৌরসভা নির্বাচনে তথাকথিত বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে বিপাকে দেশের দুই বৃহত্তর দল। এ কারণেও আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে। নির্বাচনী পরিবেশ হয়ে উঠছে উত্তপ্ত। এসব যেমন দলের কাঠামো ও নির্বাচনী পরিবেশের হিতে যায় না, তেমনি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অবশ্য একটি স্বীকৃত ধারায় প্রার্থী নির্বাচন করা উচিত, তা না হলে নতুন রাজনীতিবিদদের যেমন উত্থান হবে না, তেমনি মেধাবী তরুণদের রাজনীতিতে আকৃষ্ট করা যাবে না।
সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী মিডিয়া। ইসিকে হতে হবে মিডিয়াবান্ধব এবং সহযোগিতা নিতে হবে তাদের কাছ থেকেও। অতীতে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া উভয়ই নির্বাচন কমিশনকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছিল। নির্বাচনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক তুলে ধরতে মিডিয়াকে অবাধ বিচরণ করতে দেওয়া উচিত। নির্বাচনের দিন কেন্দ্রে প্রবেশ করার ওপর কড়াকড়ি আরোপ এবং ভোটের অগ্রগতি ও আইনশৃঙ্খলা স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার প্রক্রিয়াকে সীমিত করা অথবা রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। মিডিয়া, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে নির্বাচন কমিশনের চোখ-কান হিসেবে গণ্য করা হয়। অতীতে মিডিয়ার সহযোগিতা নির্বাচনের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। তাই মিডিয়াকে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হতে পারে। তারা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, একটি বলিষ্ঠ, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশনই যে শুধু একটি সুষ্ঠু, অবাধ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারে, তেমনটি নয়। কারণ, এর সহযোগী শরিকদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের জন্য স্বাধীনচেতা ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন এবং স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিকল্প নেই।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

নতুন বছরে মাঠ কি গরম হচ্ছে? by মলয় ভৌমিক

তখন মনে হয়েছিল বিএনপির নেতারা এটা কী বললেন? নির্বাচন যে সুষ্ঠু হবে না, তা প্রমাণের জন্যই বিএনপি পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেবে—কোনো বড় দলের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মূল লক্ষ্য এমন হতে পারে? এখন দেখা যাচ্ছে বিএনপি সেই পথেই হাঁটছে এবং নির্বাচন কমিশনও যেন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পৌর নির্বাচনকে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্নের ওপর দাঁড় করানোর দিকে।
বিএনপি নেতারা এ কথা বলেছিলেন পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির পক্ষে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার সময়ে। এরপর থেকে বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপির সব পর্যায়ের নেতার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায় তা হলো, তাঁরা নির্বাচনে জয়লাভের চেয়ে নির্বাচনটি যে সুষ্ঠু হবে না, সেদিকেই বেশি জোর দিচ্ছেন। এর অর্থ হলো নির্বাচনের আগেই বিএনপি জেনে গেছে নির্বাচনটি কোনোভাবেই সুষ্ঠু হবে না। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, বিএনপি পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে কেন?
পৌরসভা নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ওপর ক্ষমতার রদবদল নির্ভর করে না। কিন্তু এই নির্বাচনের অব্যবস্থাকে পুঁজি করে জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতির মাঠ গরম করার সূচনা করা যেতে পারে। বিএনপি তাদের এই আকাঙ্ক্ষার কথা এখন প্রকাশ্যেই ব্যক্ত করছে। সুতরাং আমরা অনুমান করতে পারি, গতবারের মতো এবারও বছরের শুরুতেই জাতীয় রাজনীতির মাঠ গরম করতে চাইছে বিএনপি।
পৌরসভা নির্বাচন ৩০ ডিসেম্বর। এরপরই শুরু হচ্ছে নতুন বছর। জানুয়ারি হলো পৌষের শেষ আর মাঘের শুরুর মাস। মাঘের শীতে বাঘ কতটা কাঁপে তা জানা না গেলেও মানুষ যে কাঁপে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন দেখার বিষয় হলো, মানুষের হাড়কাঁপানো শীতের এই মাসে বিএনপি কতটা উত্তাপ ধরে রাখতে পারে। আগুন পোহানোর জন্য খড়কুটোর কিছুটা জোগান হয়তো দিয়ে বসতে পারে স্বয়ং নির্বাচন কমিশনই। কিন্তু কথা হলো বিএনপি নিজ উৎস থেকে কতটা জ্বালানি সরবরাহ করতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করছে উত্তাপ ছড়িয়ে দেওয়ার মাত্রা। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো যে পেট্রল উন্নত মানের জ্বালানি হওয়া সত্ত্বেও গত বছরের ব্যর্থ-অভিজ্ঞতার পর এবার এই জ্বালানিটি সম্ভবত ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না।
পৌরসভা নির্বাচনের গরম হাওয়াকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে বড় দুর্বলতা বোধকরি বিএনপির দিশাহীনতা। আসলে বিএনপি ঠিক কী লক্ষ্য অর্জনের জন্য আন্দোলন করতে চায় তা স্পষ্ট নয়। অবশ্য মোটা দাগে একটা লক্ষ্য তাদের আছে। সেটা হলো ক্ষমতায় যাওয়া। কিন্তু কীভাবে, এ প্রশ্নেই রয়েছে অস্পষ্টতা। তারা একবার বলছে সরকার পতনের আন্দোলন করবে, আর একবার বলছে নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকারের পতন ঘটাবে। আবার সে নির্বাচন মধ্যবর্তী নির্বাচন কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। তত্ত্বাবধায়ক না নির্দলীয়-নিরপেক্ষ—এ প্রশ্নের মীমাংসাও তারা করতে পারেনি। তাদের তরফ থেকে তুলে ধরা হয়নি সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখাও। বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজ কদিন আগে বললেন, তাঁদের আন্দোলন শুরু হবে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। এ বক্তব্যের মধ্যেও আছে ধোঁয়াশা। তিনি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের অপসারণের কথা বলছেন, নাকি কমিশনের সংস্কার দাবি করছেন, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কমিশনের ত্রুটিগুলো দূর করে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠন অবশ্যই সময়ের দাবি। তবে এ দাবি যৌক্তিক করে তুলতে হলে সুস্পষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করতে হবে। আমরা বিএনপির কর্মকাণ্ডে এ ধরনের লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। তাদের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও এসব প্রশ্নে রয়েছে চরম বিভ্রান্ত। এই বিভ্রান্তি নিয়ে কতটা পথ হাঁটা যাবে, তা বিএনপিকে ভেবে দেখতে হবে।
পৌরসভা নির্বাচনে যদি ব্যাপক অনিয়ম হয়, তাহলে এই অনিয়মকে কেন্দ্র করে পরাজিত প্রার্থী এবং তঁাদের সমর্থকদের ক্ষোভ নিচ থেকে কতটা ওপরমুখী হবে তা কিন্তু পরীক্ষিত নয়। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় এ দেশের বড় দলগুলোর সব সিদ্ধান্তই হয় শীর্ষ থেকে নিম্নমুখী। তৃণমূলের কমিটিতে কারা থাকবেন, নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন কে, তা এ দেশে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে ঠিক করে দেওয়া হয়। আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে প্রযোজ্য। অর্থাৎ যেকোনো আন্দোলন কেন্দ্র বা রাজধানীতে গড়ে না উঠলে তা নিচের পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে না। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিতে বিএনপির রয়েছে বেশ দুর্বলতা। তারা ঢাকায় নেতা-কর্মীদের ব্যাপক হারে মাঠে নামাতে পারেনি। সম্ভবত এই দুর্বলতা ঢাকতেই বিএনপি নিজের শক্তির ওপর নির্ভর না করে হেফাজতের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ফল যা ঘটার তা–ই ঘটেছে। পুলিশের তাড়া খেয়ে হেফাজতের কর্মীরা সরে পড়তেই ঢাকার রাজপথ ফাঁকা হয়ে যায়। একই ধারাবাহিকতায় এবার বিজয় দিবসেও বিএনপির অনেক নেতাকে তঁাদের দলীয় শোভাযাত্রায় শামিল হতে দেখা যায়নি।
পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থীদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপিতে কোটিপতির সংখ্যা অনেক বেশি। এসব ব্যবসায়ী কোটিপতি নেতারা তাঁদের সম্পদ রক্ষার চেয়ে আন্দোলনের পথকে শ্রেয় ভাববেন, এমন মনে করার কারণ নেই। এ ছাড়া রয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী। দলের মনোনয়নবঞ্চিত এসব নেতা চটজলদি দলের পক্ষে মাঠে না-ও নামতে পারেন। এটা ঠিক, মাঠপর্যায়ে বিএনপির একটা বড় সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। কিন্তু কেবল সমর্থক দিয়ে যে আন্দোলন হয় না, বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বিএনপি নিশ্চয়ই তা বুঝতে পেরেছে।
শরিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াত ছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামে অন্য দলগুলোর তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। মাঠের আন্দোলনে বিএনপি বহুল অংশেই জামায়াত-শিবিরের ওপর নির্ভরশীল। সরকার পতনের আন্দোলনের চেয়ে যেকোনো মূল্যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-প্রক্রিয়া বন্ধ করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষাই বর্তমানে জামাতের এক নম্বর এজেন্ডা। কিন্তু এ প্রশ্নে বিএনপির দোদুল্যমান অবস্থান জামায়াতকে যথেষ্ট পরিমাণেই নাখোশ করে। সম্ভবত এ কারণেই পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২০-দলীয় জোট সভায় জামায়াত অনুপস্থিত ছিল। অনেকেই মনে করেন ভোটব্যাংক ও আন্দোলন—এই দুই ব্যাপারেই বিএনপির কাছে জামায়াতের কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া বিএনপিপন্থীদের সিংহভাগের মাথায় এখনো রয়েছে পাকিস্তানি ভাবাদর্শ। কাজেই যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নে বিএনপির এখন আর দ্বিমুখী অবস্থানের সুযোগ নেই। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর খালেদা জিয়া কর্তৃক বিস্ময়করভাবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন মূলত এই ভাবনারই ফল। ২২ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া কেবল শহীদদের সংখ্যা নিয়ে অসম্মানজনক উক্তিই করেননি, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যেন যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান, সে দাবি জানিয়েছেন। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই বক্তব্য যে মূলত জামায়াতকে খুশি করার জন্য, সে ব্যাপারে আর সন্দেহ থাকছে না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে বিএনপি তাদের এত দিনের দোদুল্যমান অবস্থানেরও ইতি টানল বলে মনে করা হচ্ছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম ইদানীং বারবার বলছেন, বিএনপি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলবে। সহিংস আন্দোলন যে দলের জন্য ভালো কোনো ফল বয়ে আনেনি, সম্ভবত এটা মাথায় রেখেই মির্জা ফখরুল এ কথা বলেছেন। কিন্তু শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জন্য যে প্রজ্ঞা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়, তা জামায়াতনির্ভর বিএনপির আছে কি না, বিএনপিকে ভেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধী প্রশ্নে খালেদা জিয়া তথা বিএনপির বর্তমান সুস্পষ্ট অবস্থানের পর জামায়াত-শিবির যে নতুন উদ্যমে সহিংস হয়ে উঠবে না, এর নিশ্চয়তা কোথায়।
পৌরসভা নির্বাচনের ‘অব্যবস্থা’কে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে তোলা না গেলেও বিএনপি তার সংগঠনকে নড়বড়ে অবস্থান থেকে শক্ত অবস্থানে আনার একটা সুযোগ হয়তো সৃষ্টি করতে পারত। কিন্তু তারা যে পথে হাঁটছে তাতে মনে হয় না ওই সুযোগকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে তাদের আগ্রহ আছে। মোটকথা, লেখকের প্রশ্নে এককেন্দ্রিক কোনো অবস্থানে তাদের এখনো দেখা যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় নেতারাও নির্বাচনী মাঠে নেই। সাধারণের আকাঙ্ক্ষাকে তারা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেনি। এ অবস্থায় তারা বরং মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের ‘সংখ্যাতত্ত্ব’ নিয়ে নতুনরূপে হাজির হলো। নতুন এই তত্ত্বের উদ্দেশ্য কী এবং এতে শীতের এই মাঠ কি সত্যি সত্যি গরম হবে, নাকি আরও বেশি কুয়াশাচ্ছন্ন হবে, তা জানার জন্য আমাদের হয়তো আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে।
মলয় ভৌমিক: অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নাট্যকার।

‘বিয়ে দেবে’ নাকি ‘বিয়ে করব’ by আব্দুল কাইয়ুম

লজ্জার কথা যে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম আর বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রতি তিনটি বিয়ের দুটিতেই কনের বিয়ের বয়স ১৮ বছর বা প্রাপ্ত বয়সের নিচে। মানে শিশু বয়সে বিয়ে, তারপর শিশু স্ত্রীর কোলে আরেক শিশুর আগমন। দুজনেরই স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। সারা জীবন রোগশোকে কাটাতে হয়।
এর সমাধান কোথায়? নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, বখাটেদের উৎপাত, প্রলোভন দেখিয়ে নারী পাচার, নির্যাতন–জুলুমের বিরুদ্ধে যেমন দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ, তেমনি দরকার সামাজিক প্রতিরোধ। মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে হবে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততা চলবে না। নারী নির্যাতন বন্ধে যাকে বলে ‘জিরো টলারেন্স’, তার বাস্তবায়ন অবশ্যই চাই।
এরপরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। মেয়ে একটু বড় হলেই বাবা-মা মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠেন। এই মনোভাব বদলাতে হবে। ২২ ডিসেম্বর ব্র্যাক ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিষয়টা খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। তিনি বলেন, ‘বিয়ে দেব’ কেন, কেন ‘বিয়ে করব’ নয়। আমাদের দেশে বাবা-মা বলেন, মেয়ের ‘বিয়ে দেব’, মেয়েরা কিন্তু ‘বিয়ে করব’ এই সম্মতিটুকু দেওয়ার সুযোগও পায় না। অথচ এটি তাদের অধিকার।
কখন কার সঙ্গে বিয়ে, সে বিষয়ে মা-বাবা, অভিভাবকের মতামত তো অবশ্যই থাকবে, কিন্তু মেয়ের সম্মতি এক নম্বরে স্থান পাবে। ১৮ বছরের আগেই মেয়ের আপত্তি সত্ত্বেও জোর করে কারও সঙ্গে বিয়ে দেওয়া যাবে না। যেদিন আমাদের বাবা-মায়েরা মেয়েদের ‘বিয়ে দেওয়ার’ প্রচলিত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবেন, মেয়েরা বলতে পারবে, কেউ ‘বিয়ে দেবে’ কেন, আমরা ‘বিয়ে করব’; সেদিন পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন শুরু হবে। বাল্যবিবাহ বন্ধের ক্ষেত্রে ঘটে যাবে বিপ্লব।
আর একটু খুলে বলি। বাবা-মা ভাবছেন বখাটে ছেলেরা উত্ত্যক্ত করে, কবে উঠিয়ে নিয়ে যায়, মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। তার চেয়ে ভুয়া জন্ম সনদ নিয়ে বিয়ে ‘দিয়ে দিই’! সংসারের খরচ যেটুকু বাঁচবে, তা ছেলের পেছনে ব্যয় করে তাকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে। অথচ মেয়ে পড়াশোনা করছে। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা দিল। চোখে তার স্বপ্ন—বড় হবে, বিদেশে লেখাপড়া করে স্বাবলম্বী হবে। সে কিন্তু বলতে পারছে না, এখন বিয়ে দিতে হবে না, সময় হলে, বয়স হলে, জীবনে কিছুটা প্রতিষ্ঠা পেলে ‘বিয়ে করব’। জোর দিয়ে এ রকম কথা বলার মতো আত্মবিশ্বাস তার নেই। এটা প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।
বাল্যবিবাহ নিয়ে বিভ্রান্তি চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে মেয়েদের ১৮ বছরের নিচে বিয়ে নয়। আবার মন্ত্রিপরিষদের সভায় মাঝেমধ্যে ‘কিন্তু, তবে, যদি’—এ রকম শর্ত আইনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার কথাও উঠছে। যদি আইনে বিয়ের বয়স ১৮ রেখেও ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ অভিভাবক, মা-বাবা অথবা আদালতের অনুমোদনে ১৬ বছরের সুযোগ রাখা হয়, তাহলে কেউ কি আর ১৮ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে? ১৬ বছরই আইনসিদ্ধ হয়ে যাবে। সরকার ঠেকাবে কীভাবে?
বলা হচ্ছে, যদি বিয়ে হয়েই যায়, কী করা যাবে? এটা সমস্যা, সন্দেহ নেই। এই সমস্যা তো আগেও ছিল। আইন অনুযায়ী এ সমস্যার নিষ্পত্তিও হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। যদি সরকার কঠোর হয়, আর যদি সবাই বোঝেন বাল্যবিবাহ দিয়ে মেয়ে পার করতে গেলে কাঠগড়ায় যেতে হবে, কেউ পার পাবেন না, তাহলে ধীরে ধীরে সমস্যাগুলো কমে আসবে। একদিন দেশে বাল্যবিবাহ বলে কিছু থাকবে না।
আমরা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলি। কিন্তু যদি বিয়ের ব্যাপারে মেয়ের ইচ্ছার দাম না থাকে, তাহলে কিসের ক্ষমতায়ন? এখনো এই আসল জায়গাতেই কিন্তু মেয়েরা অসহায়, ক্ষমতাহীন। এখানে পরিবর্তন আনতে হবে।
আমাদের দেশের মানুষ কখনো নারী-শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা সমর্থন করে না। সিলেটে শিশু রাজন ও খুলনায় রাকিবকে নির্মম অত্যাচার করে মেরে ফেলার ঘটনায় অভাবনীয় জনরোষ সে কথাই বলে। ত্বরিতগতিতে বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়ে বিচার বিভাগ, সরকার ও প্রশাসন উদাহরণ স্থাপন করেছে। নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে যদি একই রকম উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে গ্রামেগঞ্জে, পাড়ামহল্লায় বখাটে, গুন্ডা, বদমায়েশরা পালানোর পথ পাবে না। সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।
ব্র্যাক কাজ করছে। কাজ করছে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, স্বর্ণ কিশোরী নেটওয়ার্ক, ব্লাস্ট, মহিলা আইনজীবী সমিতি, ইউএনএফপিএ, ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন। এ রকম শত শত বেসরকারি সংস্থার নাম উল্লেখ করা যায়। ওরা সারা দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের চেষ্টায় প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ গড়ে উঠছে। প্রথম আলো ইউএন উইমেনের সঙ্গে ‘হি ফর শি ক্যাম্পেইনে’ (নারীর পক্ষে পুরুষ) কাজ করছে। ফলে পরিবর্তন আসছে। নারীর প্রতি সমাজে বিদ্যমান ত্রুটিপূর্ণ ও বৈরী দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে বদলে যাবে নিশ্চয়ই।
গত কয়েক মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রথম আলো অন্তত এক ডজন গোলটেবিল বৈঠক করেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করেছেন। সুপারিশগুলো তুলে ধরেছেন।
ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় প্রথম আলো প্রতি মাসে ‘আমাদের কথা শোনো’ নামে ক্রোড়পত্র বের করছে। সেখানে কিশোর-কিশোরী-তরুণদের কথা আমরা ছাপাচ্ছি।
সরকারও কাজ করছে। আমাদের গোলটেবিল বৈঠকে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বললেন, তাঁরা বাল্যবিবাহ বন্ধে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন। খবর পেলেই বাল্যবিবাহ রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেন। তাঁদের উপজেলায় নিয়মিত মা-সমাবেশ করেন। এতে মা ও মেয়েদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস দৃঢ়তর হয়।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি তো আমাদের এক গোলটেবিল বৈঠকে বেশ জোর দিয়েই বললেন, মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছরই থাকবে, কোনো তবে-টবে থাকবে না। এ রকম দৃঢ় অবস্থান আমাদের আশান্বিত করে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টি সেক্টোরাল প্রকল্প মহিলা অধিদপ্তরের আওতায় কাজ করছে। তাদের একটি টোল ফ্রি হেল্পলাইন রয়েছে। আপদে-বিপদে যে কেউ একদম বিনা পয়সায় ১০৯২১ নম্বরে ফোন করলেই সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকশন! ২৪ ঘণ্টা ৩০টি লাইন চলছে। আরও আছে। ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, নির্যাতিত নারীদের জন্য সেইফ হোম। তাদের বিনা পয়সায় সরকারি আইন সহায়তা ব্যবস্থা। আরও কত কী।
ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন জানালেন, বিয়ের বিষয়ে সম্মতি মেয়েদের মৌলিক অধিকার। এ বিষয়ে আদালতের একটি খুব শক্তিশালী রায় আছে। কোনো মেয়েকে বাল্যবিবাহে বাধ্য করা যাবে না।
সংবিধানে অন্তত তিন-চারটি অনুচ্ছেদে নারীর অধিকার সুরক্ষার কথা আছে। অন্তত ছয়টি শক্তিশালী আইন দেশে আছে। এখন দরকার এগুলোর কার্যকর প্রয়োগ। সরকার বিভিন্ন এনজিওর সঙ্গে একত্রে কাজ করছে। আরও দরকার। এসব এনজিওকে একেবারে বিনা বাক্যব্যয়ে কাজ করতে দিলে বাল্যবিবাহ রোধসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি সহজ হবে।
একটি সমাজ কতটা আধুনিক, তা বোঝার অন্যতম শর্ত হলো সেই সমাজে নারীর অবস্থান কতটা উন্নত তা দেখা। যদি নারীর সম–অধিকার থাকে, মর্যাদা নিশ্চিত হয়, ১৮ বছরের আগে বিয়ে বন্ধ করা যায়। যদি তাদের শিক্ষার দ্বার অবারিত হয়। যদি শুধু বাইরে না, ঘরেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষের সমান অধিকার নারীর থাকে, তাহলে সত্যিকারভাবেই সেই সমাজ আধুনিক। সভ্য। আমরা এখনো সেই ‘আধুনিক ও সভ্য’ অবস্থানের সনদ প্রাপ্তি থেকে বেশ দূরে আছি।
কিন্তু এ রকম তো হওয়ার কথা নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদের স্পিকার, বিরোধী নেত্রী, নির্বাচিত মেয়র ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্তরে অনেক পদেই রয়েছেন নারী। আনুষ্ঠানিক ক্ষমতায়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সমাজটা এখনো চলছে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
এখানে পরিবর্তন আনতে হবে। নারী-পুরুষ সবাইকে এক হয়ে দাঁড়াতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

শরণার্থী, আইএস ও পুতিনের বছর ২০১৫ : বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়াদি বিভাগের সম্পাদকের বিশ্লেষণ

বছরটি ছিল ‘শরণার্থী, আইএস আর পুতিনের’। এই তিন ‘জন’ বছরজুড়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের পুরোভাগে তাদের সদম্ভ উপস্থিতি ঘোষণা করেছে। বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়াদি বিভাগের সম্পাদক জন সিম্পসনের বিশ্লেষণধর্মী একটি লেখায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সিম্পসনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সিরিয়ার বাস্তুচ্যুত শরণার্থীদের বিপৎসংকুল পথে ইউরোপযাত্রা, তাদের করুণতম প্রাণহানি ও তাদের পুনর্বাসন নিয়ে বিশ্ব নেতাদের নানা পদক্ষেপ গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে।
এরপরই বছরটিতে আলোচ্য বিষয় ছিল মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কর্মকাণ্ড। এ সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আলোচনায় এসেছেন নানাভাবে।
সিম্পসন লিখেছেন, বিপদসংকুল সাগর কিংবা দীর্ঘ সড়কপথ পাড়ি দিয়ে দেশ ছেড়ে আসা আশ্রয়-ব্যাকুল বিপর্যস্ত শরণার্থীদের মুখের ছবি বছরজুড়ে বিশ্ববাসী দেখেছে। এসব শরণার্থীর সবাই যে নজরদারি এড়িয়ে ঢুকতে পেরেছে তাদের কাঙ্ক্ষিত দেশে, তা নয়। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির একটি কারাগারে সীমান্ত অতিক্রম করতে ধরা পড়া শত শত বন্দীকে দেখা গেছে। ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী এসব তরুণ এসেছেন উত্তর আফ্রিকা বা পাকিস্তান থেকে। তাঁদের লক্ষ্য ছিল কাজের জন্য ইউরোপে ঢোকা।
বন্দীদের মধ্যে এক মানব পাচারকারী ছিলেন। নৌকা ডুবে ৭০০ মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগে তাঁকে ধরা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে তাঁর সাজা হয়েছে। তিনি বলছিলেন, ‘আমার বুকের ভেতরটা দেখলে বুঝতেন কী কষ্ট ও দুঃখ আছে সেখানে।’
বছরজুড়ে উত্তপ্ত ছিল ইরাক ও আফগানিস্তান। ইঙ্গো-মার্কিন বাহিনীর রেখে যাওয়া ব্যবস্থা দুটি দেশেই চরম হুমকির মধ্যে পড়েছে এ বছর। এ বছরের মে মাসে আইএসের হাতে ইরাকি শহর রামাদির পতন ছিল খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আইএসের প্রকাশ্যে গলা কেটে মানুষ হত্যা করার বিষয়টি বিশ্ববাসীকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। আইএসের আক্রমণের পর ইরাকি সেনারা স্রেফ পালিয়ে বেঁচেছেন। এখন পর্যন্ত বাগদাদ পুরোপুরি নিরাপদ থাকলেও কিছুটা দুর্বলতা রয়ে গেছে। রামাদি পতনের পরপরই ইরাকের নতুন প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-আবাদি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে নিশ্চিত করতে পারি আমরা শিগগিরই শহরটি ফিরে পাব।’
তাঁর কাছে প্রশ্ন ছিল, শিগগির বলতে কয় মাস? উত্তরে তিনি বললেন, ‘না না, আমি বলছি কয়েক দিন।’
রামাদির দখল ফিরে পেয়েছে ইরাকি বাহিনী। কিন্তু তা পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে সাত মাস।
আফগানিস্তানের হেলমান্দসহ এবং নানা জায়গায় তালেবান বাহিনীর বাড়তে থাকা তৎপরতা চোখে পড়েছে এ বছর।
প্রায় এক বছর আগে মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। সেখানে সাংবাদিকদের ইচ্ছেমতো প্রশ্ন করার অধিকার ছিল। তাঁকে সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘আপনি কি একটি বার্তা পশ্চিমকে দিতে চান যে আপনি আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধ চান না?’ পুতিনের জবাব ছিল, ‘রাশিয়া যা করছে, তা শুধু তার জাতীয় স্বার্থে। আমরা আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চাই। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার আছে।’
এ বছরটিতে পুতিনের নানা কর্মকাণ্ড প্রমাণ করেছে, তিনি রাশিয়াকে আবার প্রবল ক্ষমতাধর হিসেবে দেখাতে চান। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ থাকলেও সের্গেই আকসিয়োনভকে ক্রিমিয়ার প্রধানমন্ত্রী করতে দ্বিধা করেনি রাশিয়া। দেশটি বলেছে, ক্রিমিয়া কখনোই ইউক্রেনের অংশ হবে না। চিরদিনের জন্য এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গত অক্টোবরে প্যারিসের ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া ও ইউক্রেনের শীর্ষ সম্মেলনে দেখা গেল, পুরো নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে পুতিনের হাতে। আলোচ্য বিষয় ইউক্রেন হলেও আলোচনা পরিবর্তিত হয়ে গেল সিরিয়ায় আইএস জঙ্গিদের হামলা নিয়ে।

আওয়ামী লীগে দুই রকম চিত্র

বছরের শুরুতে ৫ই জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মুখোমুখি হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ৫ই জানুয়ারিকে আওয়ামী লীগ অভিহিত করে গণতন্ত্র মুক্তি দিবস হিসেবে। আর বিএনপি একে আখ্যায়িত করে গণতন্ত্রের হত্যা দিবস হিসেবে। শুরু হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধ ও হরতাল। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অবরোধ-হরতাল মোকাবিলায় মাঠে নামার ঘোষণা দেন। তবে, ঘোষণা অনুযায়ী মাঠে সক্রিয় ছিল না আওয়ামী লীগের তৃণমূল। শুধুমাত্র ঢাকায় সভা-সমাবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল সরকারি দলের কার্যক্রম। সংলাপ ও নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের টানা অবরোধ-হরতালের মুখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা মূলত ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সারা দেশে তৃণমূলে দলটির চেহারা ছিল ভিন্ন। বিএনপির সহিংস আন্দোলন মোকাবিলায় জেলা-উপজেলায় দৃশ্যমান তেমন কোন সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল না। কেন্দ্র থেকে দলীয় সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় থেকে আন্দোলন মোকাবিলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দেয়া হলেও সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ছিলেন নিষ্ক্রিয়। ফলে আন্দোলন মোকাবিলায় অনেকটাই নিষপ্রাণ ছিল আওয়ামী লীগ। এছাড়া, বিএনপি-জামায়াতের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৪ দলের নেতাদের সমন্বয়ে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হলেও দেশের অধিকাংশ জেলা- উপজেলায় কমিটি গঠন হয়নি। ফলে, নেতাকর্মীরাও গড়ে তুলতে পারেননি পাল্টা প্রতিরোধ। যে কারণে বছরজুড়েই পুলিশ ও প্রশাসন নির্ভর হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ২০দলীয় জোটের অবরোধ ও হরতাল অব্যাহত থাকলেও এর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয়ভাবে সংবাদ সম্মেলন, বক্তব্য-বিবৃতি ছাড়া আওয়ামী লীগের দলীয় তেমন কোন কর্মসূচি ছিল না। উপরন্তু নানা ঘটনা-রটনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতারা ছিলেন আলোচনা ও সমালোচনায়। এছাড়া, দলের উপদেষ্টা, নেতা ও মন্ত্রীদের নানা বেফাঁস মন্তব্যের কারণে বছরের প্রায় সময়ই আওয়ামী লীগ ও সরকারকে বিব্রত হতে হয়েছে। 
এদিকে বছরজুড়েই আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে  দ্বন্দ্ব সংঘাত ছিল অব্যাহত। এতে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটেছে নিয়মিত। বিশেষ করে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশজুড়ে ছিলেন বেপরোয়া। তুচ্ছ কারণে নিজেদের মধ্যে হানাহানি, সংঘাত ও সংঘর্ষে জড়িয়েছেন তারা নিয়মিতই। রাজধানী থেকে তৃণমূল সবখানেই ছিল একই অবস্থা। নিজেদের মধ্যে নিয়মিতই সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ছাত্রলীগ ছিল বেপরোয়া। ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘাতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনগুলোতেও রক্ত ঝরেছে নিয়মিত। ঘটেছে হতাহতের ঘটনাও। ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দলীয় পদ-পদবি নিয়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে বিদায়ী বছরে রক্তক্ষরণ হয়েছে আওয়ামী লীগে। রাজধানী থেকে তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বলি হয়েছেন নিজ দলের নেতাকর্মীরা।
২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষে অসংখ্য নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। বিদায়ী বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্বের জের ধরে সারা দেশে ১শ’র বেশি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন হাজারের বেশি নেতাকর্মী। এমনকি শোকের মাস আগস্টেও থেমে থাকেনি সংঘাত ও সংঘর্ষ। আগস্টেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংস ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারেননি আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ মাসেও সারা দেশে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বেশক’জন নেতাকর্মী নিজ দলেরই প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। দ্বন্দ্ব ও কোন্দল নিরসনে বিগত বছরে দলের তরফে বার বার উদ্যোগ নেয়া হলেও দলীয় কোন্দল, দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও খুনোখুনি নিরসন করা যায়নি কিছুতেই। তবে, নিজেদের দলীয় কোন্দল ও দ্বন্দ্বের জের ধরে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে-এমন বিষয়টি স্বীকার করতে নারাজ ছিলেন আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতা। সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনাগুলোকে তারা আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন।
এদিকে বছরজুড়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও তাদের সন্তানদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং শীর্ষ নেতাদের অযাচিত বক্তব্যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে আওয়ামী লীগ। প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বিভিন্ন সময়ে তারা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্যও রাখেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় ২০০৮ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০০৯ সালের ২৫শে মে হাইকোর্টে আপিল করেন তিনি। ২০১০ সালের ২৭শে অক্টোবর সাজার রায় বাতিল করেন হাইকোর্ট। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করলে গত ১৪ই জুন আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে এ বিষয়ে হাইকোর্টে পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন। এতে করে সংবিধান অনুযায়ী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর পদে থাকা বৈধ কি-না এ প্রশ্ন দেখা দেয়। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম জড়িয়ে পড়েন ব্রাজিল থেকে আমদানি করা পচা ও পোকায় খাওয়া ‘গম’ কেলেঙ্কারিতে। এছাড়া, মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পিনু খানের পুত্র বখতিয়ার আলম রনির আলোচিত জোড়া খুনের ঘটনাও আলোচিত ছিল বছরজুড়ে। নিজেদের দলের শীর্ষ নেতাদের এহেন কর্মকাণ্ডে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। শোকের মাস আগস্টে সরকারের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)কে জড়িয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিমের একটি মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা- সমালোচনার ঝড় তোলে। তিনি বলেন, জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। এর দুদিন পর দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফও প্রায় একই বক্তব্য দেন। এমন ঘটনায় দেশব্যাপী আলোচনা- সমালোচনার ঝড় উঠে। সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয় আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে। তবে, জাসদকে নিয়ে এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায় দলটির সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ শীর্ষ নেতারা।
২০১৫ সালে আলোচনায় ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনসহ ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন  বৈঠকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই কাউন্সিল সম্পন্নের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শীর্ষ নেতারা। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তারা আশা করেছিলেন ডিসেম্বরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল। এ লক্ষ্যে সারা দেশের সাংগঠনিক জেলাগুলোর কাউন্সিল সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয় সরকারি দল। নেতারা জানিয়েছিলেন সারা দেশের কাউন্সিল সম্পন্ন করে ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে, বিদায়ী বছরে আওয়ামী লীগের অর্ধেকের বেশি জেলার কাউন্সিল সম্পন্ন হলেও সেই আকাঙ্ক্ষিত কেন্দ্রীয় কাউন্সিল আর হয়নি। এ জন্য পৌরসভা নির্বাচন ও সাংগঠনিক সকল জেলার কাউন্সিল না হওয়াই অন্যতম কারণ বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের অনেকে। 
বছরের শেষদিকে এসে পৌরসভা নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয় সরকারের তরফে। এ লক্ষ্যে শুরু হয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া। ২৩৫ পৌরসভায় একক ও যোগ্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করে আওয়ামী লীগ। জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের  মতামতের ভিত্তিতে তৃণমূল থেকে নাম পাঠানো হয় কেন্দ্রে। কিন্তু এ প্রক্রিয়াও বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। অভিযোগ ছিল বিভিন্ন পৌরসভায় স্থানীয় এমপি ও মন্ত্রীদের প্রভাব ও প্রত্যক্ষ মদতে জেলা- উপজেলার নেতারা নিজেদের পছন্দের নাম কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। এছাড়া, মনোনয়ন নিয়ে অর্থ বাণিজ্যের পাশাপাশি স্বজনপ্রীতিরও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। ২৩৫ পৌরসভায় একক প্রার্থী বাছাইয়ের পর দেখা যায় বিভিন্ন পৌরসভায় অনেক প্রার্থী মনঃক্ষুণ্ন হয়ে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচয়ে পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। যদিও বিদ্রোহীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। দল থেকে আজীবন বহিষ্কারের হুমকিসহ দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেয়া হয় তাদের। কারণ দর্শাও নোটিশের পাশাপাশি কোন কোন পৌরসভায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কারও করা হয়। এতকিছুর পরও দমিয়ে রাখা যায়নি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী পৌর নির্বাচনে অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে ছিলেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ দু’ভাগে ভাগ হলেও বিদায়ী বছরে হয়নি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি। চলতি বছরের ২৭শে ডিসেম্বর সম্মেলন হওয়ার পর ৩ বছর পার করলো মহানগর আওয়ামী লীগের পুরনো কমিটি। বছরের শুরু থেকেই মহানগর কমিটি হচ্ছে, হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। কিন্তু এর প্রতিফলন দেখা যায়নি বাস্তবে। ফলে, সারা বছরই হতাশা কাজ করেছে মহানগর কমিটির নেতা এবং থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনে। বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীরা হতাশা প্রকাশ করে জানান, কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় কোন্দল, দ্বন্দ্ব, সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যে কারণে রাজধানীর দলীয় কার্যক্রমও বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

বিএনপির আন্দোলনে শুরু, নির্বাচনে শেষ

বছরের শুরুতে ৫ই জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মুখোমুখি হয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। ৫ই জানুয়ারিকে আওয়ামী লীগ অভিহিত করে গণতন্ত্র মুক্তি দিবস হিসেবে। আর বিএনপি একে আখ্যায়িত করে গণতন্ত্রের হত্যা দিবস হিসেবে। শুরু হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের ডাকা টানা অবরোধ ও হরতাল। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অবরোধ-হরতাল মোকাবিলায় মাঠে নামার ঘোষণা দেন। তবে, ঘোষণা অনুযায়ী মাঠে সক্রিয় ছিল না আওয়ামী লীগের তৃণমূল। শুধুমাত্র ঢাকায় সভা-সমাবেশেই সীমাবদ্ধ ছিল সরকারি দলের কার্যক্রম। সংলাপ ও নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটের টানা অবরোধ-হরতালের মুখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা মূলত ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সারা দেশে তৃণমূলে দলটির চেহারা ছিল ভিন্ন। বিএনপির সহিংস আন্দোলন মোকাবিলায় জেলা-উপজেলায় দৃশ্যমান তেমন কোন সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল না। কেন্দ্র থেকে দলীয় সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় থেকে আন্দোলন মোকাবিলায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দেয়া হলেও সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ছিলেন নিষ্ক্রিয়। ফলে আন্দোলন মোকাবিলায় অনেকটাই নিষপ্রাণ ছিল আওয়ামী লীগ। এছাড়া, বিএনপি-জামায়াতের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৪ দলের নেতাদের সমন্বয়ে সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হলেও দেশের অধিকাংশ জেলা- উপজেলায় কমিটি গঠন হয়নি। ফলে, নেতাকর্মীরাও গড়ে তুলতে পারেননি পাল্টা প্রতিরোধ। যে কারণে বছরজুড়েই পুলিশ ও প্রশাসন নির্ভর হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ২০দলীয় জোটের অবরোধ ও হরতাল অব্যাহত থাকলেও এর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয়ভাবে সংবাদ সম্মেলন, বক্তব্য-বিবৃতি ছাড়া আওয়ামী লীগের দলীয় তেমন কোন কর্মসূচি ছিল না। উপরন্তু নানা ঘটনা-রটনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতারা ছিলেন আলোচনা ও সমালোচনায়। এছাড়া, দলের উপদেষ্টা, নেতা ও মন্ত্রীদের নানা বেফাঁস মন্তব্যের কারণে বছরের প্রায় সময়ই আওয়ামী লীগ ও সরকারকে বিব্রত হতে হয়েছে।
এদিকে বছরজুড়েই আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে  দ্বন্দ্ব সংঘাত ছিল অব্যাহত। এতে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটেছে নিয়মিত। বিশেষ করে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দেশজুড়ে ছিলেন বেপরোয়া। তুচ্ছ কারণে নিজেদের মধ্যে হানাহানি, সংঘাত ও সংঘর্ষে জড়িয়েছেন তারা নিয়মিতই। রাজধানী থেকে তৃণমূল সবখানেই ছিল একই অবস্থা। নিজেদের মধ্যে নিয়মিতই সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ছাত্রলীগ ছিল বেপরোয়া। ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘাতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনগুলোতেও রক্ত ঝরেছে নিয়মিত। ঘটেছে হতাহতের ঘটনাও। ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দলীয় পদ-পদবি নিয়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে বিদায়ী বছরে রক্তক্ষরণ হয়েছে আওয়ামী লীগে। রাজধানী থেকে তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বলি হয়েছেন নিজ দলের নেতাকর্মীরা।
২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষে অসংখ্য নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। বিদায়ী বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্বের জের ধরে সারা দেশে ১শ’র বেশি সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী নিহত হন। আহত হন হাজারের বেশি নেতাকর্মী। এমনকি শোকের মাস আগস্টেও থেমে থাকেনি সংঘাত ও সংঘর্ষ। আগস্টেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংস ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারেননি আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ মাসেও সারা দেশে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বেশক’জন নেতাকর্মী নিজ দলেরই প্রতিপক্ষের হাতে খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। দ্বন্দ্ব ও কোন্দল নিরসনে বিগত বছরে দলের তরফে বার বার উদ্যোগ নেয়া হলেও দলীয় কোন্দল, দ্বন্দ্ব, সংঘাত ও খুনোখুনি নিরসন করা যায়নি কিছুতেই। তবে, নিজেদের দলীয় কোন্দল ও দ্বন্দ্বের জের ধরে এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে-এমন বিষয়টি স্বীকার করতে নারাজ ছিলেন আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল কেন্দ্রীয় নেতা। সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনাগুলোকে তারা আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন।
এদিকে বছরজুড়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও তাদের সন্তানদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং শীর্ষ নেতাদের অযাচিত বক্তব্যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে আওয়ামী লীগ। প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বিভিন্ন সময়ে তারা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্যও রাখেন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় ২০০৮ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে ২০০৯ সালের ২৫শে মে হাইকোর্টে আপিল করেন তিনি। ২০১০ সালের ২৭শে অক্টোবর সাজার রায় বাতিল করেন হাইকোর্ট। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করলে গত ১৪ই জুন আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে এ বিষয়ে হাইকোর্টে পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন। এতে করে সংবিধান অনুযায়ী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর পদে থাকা বৈধ কি-না এ প্রশ্ন দেখা দেয়। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম জড়িয়ে পড়েন ব্রাজিল থেকে আমদানি করা পচা ও পোকায় খাওয়া ‘গম’ কেলেঙ্কারিতে। এছাড়া, মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পিনু খানের পুত্র বখতিয়ার আলম রনির আলোচিত জোড়া খুনের ঘটনাও আলোচিত ছিল বছরজুড়ে। নিজেদের দলের শীর্ষ নেতাদের এহেন কর্মকাণ্ডে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। শোকের মাস আগস্টে সরকারের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)কে জড়িয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিমের একটি মন্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা- সমালোচনার ঝড় তোলে। তিনি বলেন, জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। এর দুদিন পর দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফও প্রায় একই বক্তব্য দেন। এমন ঘটনায় দেশব্যাপী আলোচনা- সমালোচনার ঝড় উঠে। সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয় আওয়ামী লীগ ও জাসদের মধ্যে। তবে, জাসদকে নিয়ে এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায় দলটির সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ শীর্ষ নেতারা।
২০১৫ সালে আলোচনায় ছিল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনসহ ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন  বৈঠকে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই কাউন্সিল সম্পন্নের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শীর্ষ নেতারা। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তারা আশা করেছিলেন ডিসেম্বরেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দলের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল। এ লক্ষ্যে সারা দেশের সাংগঠনিক জেলাগুলোর কাউন্সিল সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেয় সরকারি দল। নেতারা জানিয়েছিলেন সারা দেশের কাউন্সিল সম্পন্ন করে ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে, বিদায়ী বছরে আওয়ামী লীগের অর্ধেকের বেশি জেলার কাউন্সিল সম্পন্ন হলেও সেই আকাঙ্ক্ষিত কেন্দ্রীয় কাউন্সিল আর হয়নি। এ জন্য পৌরসভা নির্বাচন ও সাংগঠনিক সকল জেলার কাউন্সিল না হওয়াই অন্যতম কারণ বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের অনেকে।
বছরের শেষদিকে এসে পৌরসভা নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয় সরকারের তরফে। এ লক্ষ্যে শুরু হয় প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া। ২৩৫ পৌরসভায় একক ও যোগ্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করে আওয়ামী লীগ। জেলা, উপজেলা ও পৌরসভার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের  মতামতের ভিত্তিতে তৃণমূল থেকে নাম পাঠানো হয় কেন্দ্রে। কিন্তু এ প্রক্রিয়াও বিতর্কমুক্ত থাকতে পারেনি। অভিযোগ ছিল বিভিন্ন পৌরসভায় স্থানীয় এমপি ও মন্ত্রীদের প্রভাব ও প্রত্যক্ষ মদতে জেলা- উপজেলার নেতারা নিজেদের পছন্দের নাম কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। এছাড়া, মনোনয়ন নিয়ে অর্থ বাণিজ্যের পাশাপাশি স্বজনপ্রীতিরও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। ২৩৫ পৌরসভায় একক প্রার্থী বাছাইয়ের পর দেখা যায় বিভিন্ন পৌরসভায় অনেক প্রার্থী মনঃক্ষুণ্ন হয়ে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচয়ে পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। যদিও বিদ্রোহীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। দল থেকে আজীবন বহিষ্কারের হুমকিসহ দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দেয়া হয় তাদের। কারণ দর্শাও নোটিশের পাশাপাশি কোন কোন পৌরসভায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কারও করা হয়। এতকিছুর পরও দমিয়ে রাখা যায়নি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী পৌর নির্বাচনে অন্তত ৬০ থেকে ৭০ জন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে ছিলেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ দু’ভাগে ভাগ হলেও বিদায়ী বছরে হয়নি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি। চলতি বছরের ২৭শে ডিসেম্বর সম্মেলন হওয়ার পর ৩ বছর পার করলো মহানগর আওয়ামী লীগের পুরনো কমিটি। বছরের শুরু থেকেই মহানগর কমিটি হচ্ছে, হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। কিন্তু এর প্রতিফলন দেখা যায়নি বাস্তবে। ফলে, সারা বছরই হতাশা কাজ করেছে মহানগর কমিটির নেতা এবং থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মনে। বিভিন্ন সময়ে নেতাকর্মীরা হতাশা প্রকাশ করে জানান, কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় কোন্দল, দ্বন্দ্ব, সংঘাত মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যে কারণে রাজধানীর দলীয় কার্যক্রমও বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।