Friday, September 19, 2025

মালয়েশিয়ায় হালাল পণ্যের মেলায় প্রাণের ৫০০ পণ্য by শফিকুল ইসলাম

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে চলছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ হালাল পণ্যের মেলা। সেখানে বাংলাদেশের পণ্যও আছে।

এই হালাল পণ্যের তালিকায় বিভিন্ন ফ্লেভারের নুডলস, বিস্কুট, জুস কিংবা মাছ–মাংসের মতো প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের সমাহার আছে। পাশাপাশি পোশাক, লিপস্টিক ও সুগন্ধির মতো জীবনযাপন ও সৌন্দর্যবর্ধনের সামগ্রী আছে। আরও আছে হালাল পণ্য তৈরি করার নানা যন্ত্রপাতি।

এ ধরনের হাজার হাজার হালাল পণ্য প্রদর্শিত হচ্ছে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত মিহাস ফেয়ার বা হালাল পণ্যের প্রদর্শনীতে। মালয়েশিয়া বহির্মুখী বাণিজ্য উন্নয়ন করপোরেশনের (ম্যাট্রেড) আয়োজনে আজ বুধবার সকালে এ মেলা শুরু হয়েছে। চার দিনব্যাপী এ মেলা চলবে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এতে বিশ্বের ৯০টি দেশ থেকে ২ হাজার ৩০০টি স্টলে পণ্য প্রদর্শন করছে হালাল পণ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দেশের কোম্পানি।

রাজধানী কুয়ালালামপুরের মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও প্রদর্শনী কেন্দ্রে (মিটেক) মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল হালাল শোকেস বা মিহাসের এটি ২১তম আসর।

সরেজমিনে যা দেখা গেল

এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড প্রাণ অংশ নিয়েছে। বাংলাদেশি প্রাণ ব্র্যান্ডের ৫০০–এর বেশি পণ্য মেলায় প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। প্রাণের পণ্য নিয়ে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের মধ্যেও বেশ আগ্রহ আছে। এবারের আসরে প্রাণ দুটি স্টলের মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক পণ্য প্রদর্শন করছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে স্ন্যাকস, জুস ও ড্রিংকস, কালিনারি (নুডলস, সস প্রভৃতি) পণ্য, বিস্কুট ও বেকারি এবং বিভিন্ন কনফেকশনারি (চকলেট, বাবলগাম, ক্যান্ডি) পণ্য।

সরেজমিন মেলা ঘুরে দেখা গেছে, প্রাণের স্টল দুটিতে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা এসে পণ্যের খোঁজ নিচ্ছেন।

দর্শনার্থীদের একজন সিঙ্গাপুরের ভোগ্যপণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ী শিবা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেলায় এসে প্রাণের তৈরি কারি ফ্লেভারের নুডলস খেয়ে দেখলাম। এটি বেশ সুস্বাদু। আশা করছি, সিঙ্গাপুরেও এটির ভোক্তা চাহিদা পাব।’

শিবা আরও বলেন, ‘আমি শুধু নেসলের নুডলস বিক্রি করি। এখন নতুন আরেকটি ব্র্যান্ডও যুক্ত করতে চাই। এ জন্য প্রাণের কারি ফ্লেভারের এক কনটেইনার নুডলস অর্ডার করব ভাবছি।’

মালয়েশিয়ায় প্রাণের পণ্যের একমাত্র আমদানিকারক পিনাকল ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা নতুন কিছু পণ্যে বেশি জোর দেব। এর মধ্যে রয়েছে কোরিয়ান নুডলস, বিভিন্ন বিস্কুট ও বাসিল সিড ড্রিংকস।’

সেলিম ভূঁইয়া বলেন, ‘এবারের মেলায় প্রাণের প্রধান লক্ষ্য, আসিয়ানভুক্ত দেশ, দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের দেশে হালাল পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা। এর মাধ্যমে মেলা থেকে ২০ লাখ ডলার সমমানের পণ্যের সরাসরি রপ্তানি আদেশ পাব বলে আশা করছি আমরা।’

মালয়েশিয়াকে হালাল পণ্যের অন্যতম বৃহৎ বাজার উল্লেখ করে প্রাণের কর্মকর্তারা জানান, এর পাশাপাশি প্রতিবেশী ব্রুনেই ও ইন্দোনেশিয়ায় হালাল পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। এসব বাজারে রপ্তানি পণ্যের সম্প্রসারণ করতে চায় প্রাণ গ্রুপ।

পিনাকল ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম ভূঁইয়া জানান, মালয়েশিয়ার মিহাস ফেয়ার হালাল অর্থনীতিতে প্রবেশের জন্য ব্যাপক সুযোগ তৈরি করে। কারণ, মিহাস ফেয়ারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা তাঁদের প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের জন্য হাজির হন। আবার অনেক ব্যবসায়ী এখান থেকে হালাল পণ্যের বাজার সম্পর্কে ধারণা পান এবং সে অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থায় নিজেদের তৈরি করেন। তাই বিশাল এই অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে মিহাস ফেয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৯০টি দেশ অংশ নিয়েছে

মালয়েশিয়া বহির্মুখী বাণিজ্য উন্নয়ন করপোরেশন (ম্যাট্রেড) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মিহাস ২০২৫–এ বাংলাদেশসহ ৯০টি দেশের ২ হাজার ৩০০ বুথ ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শক অংশ নিচ্ছেন। প্রায় ৪৫ হাজার দর্শনার্থীর উপস্থিতি আশা করছে আয়োজকেরা।

হালাল খাদ্য ও পানীয়, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ইসলামিক অর্থায়ন, ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল পণ্য, ব্যক্তিগত যত্ন, প্রসাধনী ও মুসলিমবান্ধব পর্যটন—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত প্রদর্শনীর সুযোগ তৈরি হয়েছে এ মেলায়। ২০২৪ সালে মিহাস মেলা থেকে ৪৩০ কোটি রিঙ্গিত বিক্রির রেকর্ড হয়েছিল। এ বছর নতুন মাইলফলক সৃষ্টির আশা করছে তারা।

বাংলাদেশের প্রাণের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বিশ্বে হালাল পণ্যের বাজার প্রায় তিন লাখ কোটি (তিন ট্রিলিয়ন) ডলারের কাছাকাছি। বিশ্বের ২০০ কোটির বেশি মুসলিম জনসংখ্যা এই পণ্যের প্রধান ক্রেতা। এ ছাড়া অন্য গ্রাহকের কাছেও মান ও পুষ্টিগুণের বিবেচনায় এ পণ্যের চাহিদা রয়েছে। মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ছাড়া বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় হালাল পণ্যের বাজার তৈরি হয়েছে।

২০০৪ সাল থেকে প্রতিবছর মিহাস মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে মালয়েশিয়ার প্রাণকেন্দ্র কুয়ালালামপুরে। ২০১৩ সাল থেকে এ প্রদর্শনীতে অংশ নিচ্ছে প্রাণ। মিহাস মেলা ছাড়া প্রাণ সংযুক্ত আরব আমিরাতে গালফ ফুড ফেয়ার, জার্মানির আনুগা, ফ্রান্সের সিয়াল ফেয়ারসহ খাদ্যপণ্যের জন্য বিখ্যাত সব মেলায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছে।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে চলছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ হালাল পণ্যের মেলা। মেলায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি ব্র্যান্ড প্রাণের স্টলে আসা ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে চলছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ হালাল পণ্যের মেলা। মেলায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি ব্র্যান্ড প্রাণের স্টলে আসা ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা। ছবি: প্রথম আলো

দলিত জনগোষ্ঠীকে আর কত পিছিয়ে রাখা হবে by ফারাহ্ কবির

বাংলাদেশে দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও মানবাধিকারের প্রশ্নটি আমাদের জাতীয় বিবেকের সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জনগোষ্ঠী সামাজিক বঞ্চনা, জাতিগত বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের শিকার। তাদের প্রতি ‘অস্পৃশ্যতা’ বা ‘অচ্ছুত’ ধারণা এখনো সমাজের গভীরে প্রোথিত, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকার লাভে প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী যে বৈচিত্র্যময়, আমরা কি এই বৈচিত্র্যের শক্তি ধরে রাখতে পারছি? একশনএইড বাংলাদেশ, দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে আসছে। এ অভিজ্ঞতার আলোকে, দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য এবং এর সমাধানে একটি কার্যকর পথরেখা তুলে ধরা এ লেখার মূল উদ্দেশ্য।

অদৃশ্য জনগোষ্ঠী: কারা এই দলিত

‘দলিত’ শব্দটি সংস্কৃত এবং হিন্দি ভাষায় ‘ভগ্ন’ বা ‘ছিন্নভিন্ন’ অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা নিপীড়িত ও অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীকে নির্দেশ করে। বাংলাদেশে এই জনগোষ্ঠী বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন হরিজন, বেদে, ঋষি, মেথর, ধাঙড়, নাপিত, ধোপা, পাটনী, কামার, কুমার, জেলে, চামার ইত্যাদি; যাদের পেশা প্রায়ই সমাজের নিম্নস্তরের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্রিটিশ আমলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, চা-বাগানের কাজ, পয়োনিষ্কাশন ইত্যাদি কাজের জন্য ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দরিদ্র দলিতদের এ দেশে আনা হয় এবং কাজের স্থানেই কলোনিতে তাদের থাকতে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও ভিন্নতা বিদ্যমান, যা তাদের জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়নে একটি বড় বাধা। বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সংখ্যা ৪৫ লাখ থেকে ৬৫ লাখ পর্যন্ত হতে পারে, এমনকি গণমাধ্যমের কোনো কোনো প্রতিবেদনে তা ৭৫ লাখও উল্লেখ করা হয়েছে। এই অস্পষ্টতা দলিতদের ‘অদৃশ্য’ করে রাখে, যা ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মূলনীতির পরিপন্থী। যদি সরকারের কাছে তাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকে, তাহলে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা আবাসনের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব?

বৈষম্যের বহুমুখী চিত্র

দলিত জনগোষ্ঠী সমাজে এখনো গভীর বৈষম্যের শিকার। তাদের অস্পৃশ্য মনে করার কারণে সব জায়গায় প্রবেশে বাধা, একই জায়গায় বসতে অনীহা, জমি বিক্রি না করা বা ঘরবাড়ি ভাড়া না দেওয়ার মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। ৩৮ শতাংশ দলিত হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার খেতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। জন্ম ও জাতপাতের কারণে শত বছরের বঞ্চনা তাদের মধ্যে একধরনের বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি জন্ম দিয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবেও তারা চরম দুর্বল। মাত্র ৩৯ শতাংশ দলিত আয়মূলক নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে সংযুক্ত, যার বেশির ভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অস্থায়ী। ৫৬ শতাংশ দলিত পরিবারের মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার কম, যা দিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটানো অসম্ভব। ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ দলিত ঋণগ্রস্ত, যাঁদের ৫৮ শতাংশ শুধু খাবারের খরচ মেটানোর জন্য ঋণ করেছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বিশ্বায়নের ফলে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী পেশাগুলো সংকুচিত হচ্ছে, বাড়ছে বেকারত্ব।

শিক্ষাক্ষেত্রে দলিতদের অবস্থা উদ্বেগজনক। প্রায় ৬৩ শতাংশ দলিত শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে, যার প্রধান কারণ দারিদ্র্য ও জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য। মাধ্যমিক পর্যায়ে দলিত শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের হার মাত্র ১২ দশমিক ৫ শতাংশ, উচ্চশিক্ষায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের প্রতি অবজ্ঞা ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। একশনএইডের সহায়তায় দলিত সংস্থা কাজ করে দলিত শিশুদের উপবৃত্তিপ্রাপ্তি ও শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও দলিতরা পিছিয়ে। ৪৪ শতাংশ দলিত প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন না। দলিত ও আদিবাসী গর্ভবতী নারীদের টিকা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যা নিশ্চিত না করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। ৭০ শতাংশ দলিত নারী স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পেতে সমস্যায় পড়েন। একজন দলিত নারীর গড় আয়ু ৪০ বছর, যেখানে উচ্চবর্ণের নারীদের আয়ু ৫৫ বছর, যা এক বিশাল বৈষম্য। ২৫-৪৯ বছর বয়সী ৫৬ শতাংশ দলিত নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেও অস্পৃশ্যতার চর্চা দেখা যায়।

দলিত নারীরা তিন স্তরে বৈষম্যের শিকার: দলিত হওয়ার কারণে, নারী হওয়ার কারণে এবং দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে। জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাঁরা অমানবিক কর্মপরিবেশ, মজুরিবৈষম্য ও যৌন হয়রানির সম্মুখীন হন। ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ দলিত নারী গৃহিণী হিসেবে কাজ করেন। কারণ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাঁদের ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত।

পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা, যাঁদের অধিকাংশই দলিত, সমাজে অবহেলিত এবং তাঁদের সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। তাঁদের বেতন অন্যান্য চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের তুলনায় নামমাত্র। পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রীর অভাব, শোভন কর্মপরিবেশের অভাব, বিশ্রামাগারের অভাব এবং পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের ভয় তাঁদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।

সাংবিধানিক অঙ্গীকার ও আইনের দীর্ঘসূত্রতা

বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিকের জন্য সমতা ও বৈষম্যহীনতার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২–সহ অন্যান্য ধারায় আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী–পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধকরণ, সরকারি নিয়োগে সুযোগের সমতা এবং আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকার–সংশ্লিষ্ট প্রধান সনদগুলোকেও স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবে সংবিধানের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বৈষম্য দূরীকরণের জন্য দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন নেই, যা আইনি প্রতিকার লাভে বাধা সৃষ্টি করে। ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ প্রণয়নের দাবি নিয়ে অনেক সংগঠন ২০০৭ সালে কাজ শুরু করে। ২০১৪ সালে আইন কমিশন এর খসড়া সুপারিশ করে। ২০১৮ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন খসড়াটি পরিমার্জন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। অবশেষে ২০২২ সালে সংসদে ‘বৈষম্যবিরোধী বিল ২০২২’ উত্থাপন করা হয়। এই বিলের উদ্দেশ্য ছিল সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, জাতীয় নির্বাচনের কারণে বিলটি আর আইন আকারে পাস হয়নি। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ করার দাবি জানানো হলেও উত্থাপিত আইনে ‘বিরোধী’ শব্দের অবতারণা করা হয়েছে। এ ছাড়া এই আইনে ‘দলিত’দের সংজ্ঞা নেই, যা থাকা উচিত বলে মনে করা হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা ও শব্দগত পার্থক্য আইনের কার্যকারিতা ও এর চূড়ান্ত লক্ষ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। নেপালে ২০১১ সালে ‘কাস্ট বেজড ডিসক্রিমিনেশন অ্যান্ড আনটাচেবিলিটি (অফেন্স অ্যান্ড পানিশমেন্ট) অ্যাক্ট’ প্রণীত হয়েছিল এবং তার বাস্তবায়নের জন্য একটি দলিত কমিশনও গঠিত হয়েছিল, যা বাংলাদেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

করণীয়: একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পথে

দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা কেবল তাদের মৌলিক অধিকার নয়; বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। এ সমস্যার সমাধানে একটি সমন্বিত ও বহুমুখী পদ্ধতির প্রয়োজন। একশনএইড বাংলাদেশ, ফারাহ্ কবিরের নেতৃত্বে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিরন্তর অ্যাডভোকেসি ও মাঠপর্যায়ের কাজ করে যাচ্ছে।

১. আইনি ও নীতিগত সংস্কার:

• বৈষম্য বিলোপ আইন দ্রুত পাস: ‘বৈষম্যবিরোধী বিল ২০২২’–কে প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ দ্রুত ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ হিসেবে পাস করা সময়ের দাবি। এই আইনে ‘দলিত’দের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা এবং ‘বিলোপ’ শব্দটি ব্যবহার করা উচিত।

• দলিত কমিশন গঠন: দলিতদের অধিকার সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে একটি স্থায়ী দলিত কমিশন গঠন করা জরুরি। কমিশনের প্রথম কাজ হবে দলিতদের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ শুমারি করা।

• সাংবিধানিক স্বীকৃতি: দলিতদের পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা উচিত।

• শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্তিকরণ: পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাঁদের কাজের নিশ্চয়তা ও নির্দিষ্ট বেতন স্কেল নিশ্চিত করা।

২. শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন:

• শিক্ষায় কোটা ও উপবৃত্তি: দলিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে কোটা রাখা এবং উপবৃত্তি নিশ্চিত করা।

• কারিগরি প্রশিক্ষণ: দলিতদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান, যা তাঁদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।

৩. স্বাস্থ্য ও জীবনমান উন্নয়ন:

• কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা: দলিত পাড়াগুলোতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন এবং বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন–সুবিধার অপর্যাপ্ততা দূর করা।

• আবাসন ও পুনর্বাসন: ভূমিহীন দলিত জনগোষ্ঠীর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাসজমির বন্দোবস্ত করা। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য মহানগর ও পৌরসভায় আবাসনের ব্যবস্থা করা। পুনর্বাসন ছাড়া দলিত কলোনি/বসতি উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করা।

৪. অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা:

• বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি: দলিতদের জন্য ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি’র আওতায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা এবং এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

• কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি: দলিতদের জন্য ঐতিহ্যগত পেশা সংকীর্ণ হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

৫. সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিনিধিত্ব:

• জনপরিসরে অভিগম্যতা: দলিতদের জনপরিসরে প্রবেশে বাধা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।

• স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব: স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন কমিটিতে দলিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। দলিত নারীদের নেতৃত্বে আনা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো।

• সচেতনতা বৃদ্ধি: বৈষম্য দূর করতে সমাজে সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।

৬. তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা:

• সঠিক পরিসংখ্যান: দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক জনসংখ্যা নির্ধারণে জরুরি ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা।

• পৃথক ডেটাবেজ: দলিত জনগোষ্ঠীকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের জন্য একটি পৃথক ডেটাবেজ তৈরি করা।

বাংলাদেশে দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা কেবল তাদের মৌলিক অধিকার নয়; বরং দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন ও একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। সংবিধানের অঙ্গীকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

জন্মগতভাবে প্রত্যেক মানুষ পূর্ণ মানবাধিকার ও সমমর্যাদার অধিকারী। প্রায় ৬৫ লাখ দলিত মানুষ, যার প্রায় অর্ধেকই নারী, জাতপাত ও পেশাগত পরিচয়ের কারণে নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হন। এমন বঞ্চনার প্রতিকারে কোনো আইনি সুরক্ষা না থাকাটা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান বহুমুখী বৈষম্য দূরীকরণে একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান সংগ্রহ এবং তাদের স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন ও মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত হবে। সর্বোপরি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অস্পৃশ্যতার মতো প্রথাগত বৈষম্য বিলোপে ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা অপরিহার্য।

একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার পথে দলিত ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের কান্না শুনতে পাওয়া এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।

* ফারাহ্ কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও ভিন্নতা বিদ্যমান, যা তাদের জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়নে একটি বড় বাধা।
বাংলাদেশে দলিত জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও ভিন্নতা বিদ্যমান, যা তাদের জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়নে একটি বড় বাধা। ফাইল ছবি

দুবাইয়ে বিকৃত যৌন ব্যবসা চক্রের প্রধানকে চিহ্নিত করল বিবিসির এক অনুসন্ধান

বিবিসি আই ইনভেস্টিগেশনসের রুনাকো সেলিনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে নির্বাচিত অংশ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের সবচেয়ে চাকচিক্যপূর্ণ এলাকায় একটি যৌন ব্যবসা এবং অসহায় নারীদের শোষণ–নির্যাতনের মূল হোতাকে চিহ্নিত করেছে বিবিসির অনুসন্ধানী দল।

চার্লস মোসিগা নামের ওই ব্যক্তি পরিচয়-গোপনকারী বিবিসি প্রতিবেদককে বলেন, এক সেক্স পার্টির জন্য তিনি ন্যূনতম এক হাজার ডলার দরে নারী সরবরাহ করতে পারবেন। তাঁরা অনেকেই গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে ‘প্রায় সবকিছুই’ করতে পারবে। মোসিগা লন্ডন শহরের সবেক একজন বাসচালক হিসেবে নিজের পরিচয় দেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উন্মত্ত ‘সেক্স পার্টি’ নিয়ে বহু বছর ধরেই নানা কথা চালু আছে। টিকটকে এ-সংক্রান্ত একটি হ্যাশট্যাগ ৪৫ কোটি বারেরও বেশি দেখা হয়েছে। এটা ধরে অনেক ব্যঙ্গাত্মক ও জল্পনামূলক তথাকথিত অনুসন্ধানী কনটেন্ট ছড়িয়েছে। সেগুলোতে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে অর্থলোভী কিছু নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনফ্লুয়েন্সারের ভূমিকা নেন এবং তাঁরা গোপনে মানুষের যথেচ্ছ যৌন চাহিদা মিটিয়ে বিলাসী জীবনযাপনের খরচ জোগান।

বিবিসির অনুসন্ধানী দলকে বলা হয়েছে, বাস্তবতা আরও ভয়াবহ।

উগান্ডার কয়েকজন তরুণী বিবিসিকে বলেছেন, তাঁরা কখনো ভাবেননি, মোসিগার অধীনে তাঁদের যৌনকর্ম করতে হবে। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, তাঁরা সুপার মার্কেট বা হোটেলের মতো কোনো জায়গায় কাজ করার জন্য আরব আমিরাতে যাচ্ছেন।

‘মিয়া’ (ছদ্মনাম) বলেন, মোসিগার আনা গ্রাহকদের অন্তত একজন নিয়মিত মেয়েদের গায়ে মলত্যাগ করতে চান। তিনি বলেন, মোসিগার চক্র তাঁকে ফাঁদে ফেলে এ কাজে জড়িয়েছে।

মোসিগা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি শুধু বাড়িওয়ালাদের মাধ্যমে নারীদের বাসা পেতে সহায়তা করেন। আর তাঁরা মোসিগার সঙ্গে বিভিন্ন পার্টিতে যান, কারণ তাঁর সঙ্গে দুবাইয়ের অনেক ধনাঢ্য মানুষের যোগাযোগ আছে।

অনুসন্ধানে বিবিসি আরও জানতে পেরেছে, মোসিগার সঙ্গে যোগসূত্র থাকা দুই নারী দুবাইয়ের সুউচ্চ ভবন থেকে পড়ে মারা গেছেন। যদিও তাঁদের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের স্বজন ও বন্ধুরা মনে করেন, পুলিশের আরও তদন্ত করা উচিত ছিল।

মোসিগা বলেন, ঘটনা দুটি দুবাই পুলিশ তদন্ত করেছে। এ–সংক্রান্ত তথ্যের জন্য তিনি বিবিসিকে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু পুলিশ বিবিসির অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

মারা যাওয়া দুই নারীর একজন মোনিক কারুঙ্গি। তিনি পশ্চিম উগান্ডা থেকে দুবাইয়ে আসেন। মোসিগার জন্য কাজ করা আরও অনেক মেয়ের সঙ্গে একটি ফ্ল্যাটে মোনিকের ঠাঁই হয়।

একজন নারী বলেন, তিনি ২০২২ সালে মোনিকের সঙ্গে ওই ফ্ল্যাটে থেকেছেন। বিবিসি এই নারীর নাম দিয়েছে কেইরা।

কেইরা বলেন, ‘(মোসিগার) ওই ফ্ল্যাটটি ছিল বাজারের মতো। সেখানে প্রায় ৫০টি মেয়ে একসঙ্গে থাকত। সে (মোনিক) খুশি ছিল না। কারণ, সে যা চেয়েছিল, তা পায়নি।’

মোনিকের বোন রিতা বলেন, একটি সুপার মার্কেটে কাজ করবেন ভেবে তাঁর বোন দুবাই গিয়েছিলেন।

মোনিকের সঙ্গে মিয়ারও পরিচয় ছিল। বিবিসিকে মিয়া বলেন, ‘আমি বাড়ি ফিরেতে চাইলে তিনি (মোসিগা) সহিংস হয়ে ওঠেন। তিনি জানান, দুবাই আসার পর মোসিগা তাঁকে বলেছিলেন—তিনি ইতিমধ্যে মিয়ার কাছে ২ হাজার ৭১১ ডলার পান। ঠিক সময়ে পরিশোধ না করলে দুই সপ্তাহের মধ্যে এটা দ্বিগুণ হবে।

মিয়া বলেন, ‘বিমান টিকিট, ভিসা খরচ, বাসা ভাড়া, খাবার খরচ মেটাতে তোমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। পুরুষদের কাছে অনুনয় করতে হবে, যাতে তারা কাছে আসে ও শয্যাসঙ্গী হয়।’

মাইকেল (ছদ্মনাম) নামে মোনিকের এক আত্মীয় বিবিসিকে বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মোসিগার কাছে মোনিকের প্রায় ২৭ হাজার ডলার ঋণ জমে গিয়েছিল। মোনিকে প্রায়ই মাইকেলকে কাঁদতে কাঁদতে ভয়েস নোট পাঠিয়ে এ কথাগুলো বলত।

মিয়া বলেন, তাঁদের গ্রাহকদের বেশির ভাগই ছিলেন ইউরোপের শ্বেতাঙ্গ মানুষ। এদের অনেকের চরম বিকৃত যৌন চাহিদা ছিল। নিচু গলায় তিনি বলেন, একজন গ্রাহক মেয়েদের ওপর মলত্যাগ করে সেটা খেতে বলতেন।

লেক্সি নামের (ছদ্মনাম) আরেক নারী বলেন, অন্য একটি চক্রের ফাঁদে পড়ে তিনি এই কাজে জড়িয়েছেন। তিনিও বলেন, গ্রাহকেরা প্রায়ই এমনটা করতে চাইতেন। একজন গ্রাহকের অমানুষিক ঘৃণাপূর্ণ বিকৃত চাহিদা বর্ণনা করেন তিনি। বলেন, এমন অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর বিশ্বাস জন্মেছে যে, এসব চরম বিকৃত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে জাতিবিদ্বেষ বা বর্ণবিদ্বেষের ব্যাপার থাকতে পারে।

লেক্সি বলেন, ‘প্রতিবার যখন আমি বলতাম, এগুলো করতে চাই না, তাঁরা আরও মজা পেত। তাঁরা এমন কাউকে চাইত, যে কিনা কাঁদবে, চিৎকার করবে ও পালাতে চাইবে। এমন কেউ, যে হবে কৃষ্ণাঙ্গ।’

লেক্সি বলেন, তিনি পুলিশের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাঁকে বলেছিল, ‘তোমরা আফ্রিকানরা একে অপরের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছ। আমরা এতে জড়াতে চাই না। তারপর তাঁরা ফোন কেটে দেয়।

দুবাই পুলিশের কাছে বিবিসি এই অভিযোগ তুলে ধরলেও তারা কোনো উত্তর দেয়নি।

পরবর্তী সময়ে অবশ্য লেক্সি উগান্ডায় ফিরতে সক্ষম হন। বর্তমানে তিনি এ ধরনের চক্রের ফাঁদে পড়া নারীদের উদ্ধার ও সহায়তায় কাজ করছেন।

চার্লস মোসিগাকে খুঁজে পাওয়ার কাজটি সহজ ছিল না। বিবিসির অনুসন্ধানকারী দলটি শুধু অনলাইনে তাঁর একটি ছবি পেয়েছিল। সেটিও ছিল পেছন থেকে তোলা, তা ছাড়া, নানা নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন মোসিগা।

উন্মুক্ত উৎস থেকে নেওয়া তথ্য, ছদ্মবেশে অনুসন্ধান এবং মোসিগা চক্রের এক সাবেক সদস্যের দেওয়া তথ্য—সব মিলিয়ে অনুসন্ধানকারী দল তাঁকে দুবাইয়ের মধ্যবিত্ত এলাকা জুমেইরাহতে খুঁজে পায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিল, মোসিগার ব্যবসা মূলত অবমাননাকর যৌনকর্মের জন্য নারীদের সরবরাহ করা। বিষয়টি যাচাই করতে অনুসন্ধানী দল একজন ছদ্মবেশী প্রতিবেদককে পাঠায়। তিনি নিজেকে একজন অনুষ্ঠান আয়োজক হিসেবে পরিচয় দেন, যিনি বিলাসবহুল পার্টিগুলোর জন্য নারী খুঁজছেন।

অনুসন্ধানকারী দল যখন মোসিগার সঙ্গে তাঁর ব্যবসার বিষয়ে কথা বলছিল, তখন তাঁকে শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছিল।

মোসিগা বলেন, ‘আমাদের কাছে ২৫ জনের মতো মেয়ে আছে। এদের অনেকেই মুক্তমনা…তারা প্রায় সবকিছুই করতে পারে।’

খরচের ব্যাপারে মোসিগা বলেন, রাতপ্রতি একেকজনের জন্য এক হাজার ডলার থেকে শুরু। তবে অস্বাভাবিক কাজের জন্য বেশি অর্থ দিতে হবে। তিনি বিবিসির রিপোর্টারকে একটা নমুনা রাতের দাওয়াত দেন।

মোসিগা বলেন, এই ব্যবসা তাঁর অতি প্রিয়। লটারিতে ১০ লাখ পাউন্ড জিতলেও তিনি এ ব্যবসা চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, ‘এটি এখন আমারই একটি অংশ হয়ে গেছে।’

ট্রয় নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি মোসিগার চক্রের অপারেশনস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। চক্রটি কীভাবে পরিচালিত হয় সে বিষয়ে তিনি বিবিসির অনুসন্ধানী দলকে তথ্য দেন।

ট্রয় বলেন, মোসিগা বিভিন্ন নৈশক্লাবের নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা দেন, যাতে তাঁর পাঠানো নারীরা ভেতরে ঢুকে গ্রাহক খুঁজতে পারে।

ট্রয়ের দাবি, মোসিগা এত দিন এ ব্যবসা চালিয়ে যেতে পেরেছেন কারণ, তিনি আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রে কখনো নিজের নাম ব্যবহার করতেন না। গাড়িচালক, গাড়ি ও বাড়ি ভাড়াসহ সব কাজে ট্রয় এবং তাঁর মতো অন্যদের নাম ব্যবহার করা হতো।

২০২২ সালের ২৭ এপ্রিলে দুবাইয়ে প্রবাসীদের মধ্যে জনপ্রিয় আবাসিক এলাকা আল বারশায় একটি সেলফি তুলে পোস্ট করেছিলেন মোনিক। এর চারদিন পরই তিনি মারা যান। দুবাইয়ে আসার চার মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয়।

মিয়ার বলছেন, মোনিক যত দিন ছিলেন, মোসিগার সঙ্গে তাঁর নিয়মিত ঝগড়া হতে দেখেছেন। মোনিক মোসিগার চাহিদা পূরণ করতে অস্বীকার করছিলেন এবং চক্র থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজে পেয়েছিল।

মিয়া বলেন, মোনিক একটি চাকরি পেয়েছিলেন। তিনি উচ্ছ্বসিত ছিলেন। ভেবেছিলেন, অবশেষে ঘৃণ্য জীবন থেকে মুক্তি পাবেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।

মোসিগার ভাড়া করা ফ্ল্যাট ছেড়ে প্রায় ১০ মিনিট হাঁটা দূরত্বে অন্য একটি ফ্ল্যাটে চলে যান মোনিক। ২০২২ সালের ১ মে ওই বাসার বারান্দা থেকে তিনি নিচে পড়ে যান।

মোনিকের আত্মীয় মাইকেল তখন দুবাইতে ছিলেন। তিনি বলেন, মোনিকের মৃত্যুর কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন। পুলিশ তাঁকে বলেছিল, তারা তদন্ত বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ, মোনিকের বাসা থেকে মাদক ও অ্যালকোহল পাওয়া গেছে। বারান্দায় শুধু মোনিকের আঙুলের ছাপ ছিল।

মাইকেল হাসপাতাল থেকে মোনিকের মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু এতে উল্লেখ ছিল না, তিনি কীভাবে মারা গেছেন।

মোনিকের পরিবারের জন্য এখন শোকের সঙ্গে ভয় মিলেমিশে গেছে। ভয় অন্য পরিবারগুলোর জন্য, যারা একই ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

বিবিসি চার্লস অ্যাবি মোসিগার কাছে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি অবৈধ যৌন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এগুলো সব মিথ্যা।’

এদিকে মোনিকের পরিবার তাঁর লাশ পায়নি। বিবিসির অনুসন্ধান বলছে, তাঁকে দুবাইয়ে আলকুসাইস কবরস্থানের ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ অংশে দাফন করা হয়েছে। -বিবিসি

চার্লস মোসিগা
চার্লস মোসিগা। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

অচলাবস্থা কাটাতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধতা অন্তর্বর্তী সরকারের আছে by সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন

সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। তবে এই সংবিধান কিন্তু নিজে আমাদের বলতে পারে না যে আমাদের সেটা মানতে হবে। আমরা সেটা মানি কারণ, সেই বিষয়ে দেশের মানুষের একটা মৌন সম্মতি থাকে। ঠিক তেমনই, যখন একটা গণ-অভ্যুত্থান হয়ে সরকারের পতন হয়, তখন সেই অভ্যুত্থান নিজেই একটা আইনি ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়। কারণ, তার প্রতি নাগরিকদের মৌন সম্মতি থেকে। এমনকি তরবারির জোরে এলেও একসময় নাগরিকেরা মেনে নিলে সেটাই সর্বোচ্চ আইনি ভিত্তি পায়।

আইনের চিন্তাভাবনার ভেতরও (অস্ট্রিয়ান-আমেরিকার জুরিষ্ট ও আইন বিশারদ হান্স কেলসনের ‘পিউর থিওরি অব ল’ বা গ্রুন্ডনর্ম) আইনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে সাধারণের বৈধতার ভাবনা স্বীকৃত। সরকার পতনের পর নতুন সাংবিধানিক কাঠামো সৃষ্টির বৈধতাকেও এই তত্ত্ব স্বীকৃতি দেয়। ব্রিটিশ আইন তাত্ত্বিক এইচ এল এ হার্টের ‘রুল অব রিকগনিশন’—আরও বলে যে রাষ্ট্রের সব অঙ্গের প্রতিনিধিরা যদি কোনো শাসককে মেনে নেয়, তবে সেই শাসন বৈধ। তার মানে, রাষ্ট্রের সব অঙ্গের নিয়ন্ত্রণ যে শক্তি নিতে পারবে, সেই শক্তিই বৈধ।

এই দুই ধারণা ধর্তব্যে নিলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৈধতা পেতে সংবিধানের প্রয়োজন ছিল না। তারা জন-আন্দোলন থেকে তৈরি বলে সরকার হিসেবে তারা স্বয়ম্ভূ। যদি তারা সংবিধানের ১০৬ ধারার মাধ্যমে সাংবিধানিক পরম্পরা বজায় রাখতে চেষ্টা করে থাকে, তবে সেটা ছিল তাদের মর্জি। সেটা করার কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের ছিল না। হাইকোর্টের নির্দেশনা নয়, আইনের মৌলিক ভিত্তিবলেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তখন যেমন বৈধ ছিল, এখনো বৈধ।

শেখ সাহেবকে হত্যা করার পর ফারুক বা রশিদরা ক্ষমতা নেননি কারণ, তাঁরা জানতেন, সামরিক বাহিনীর ওপর তাঁদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই  অতএব দেশের মানুষের সম্মতি পাওয়ার কোনো উপায় তাঁদের নেই। এই অবস্থায় তাঁদের দেশের মানুষের সম্মতি এবং সেনাবাহিনীর সম্মতি আদায় করতে খন্দকার মুশতাককে ক্ষমতায় বসাতে হয়। একই কারণে কর্নেল তাহেরের অভ্যুত্থানের পর বিদ্রোহীরা সক্রিয় থাকায়, উপসামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমানের সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সামনে রাখার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর জিয়া প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়ে যান এবং পরে সায়েমের অবসরের পর রাষ্ট্রপতি হতে তাঁর আর কোনো বাধা থাকে না।

জিয়াউর রহমানের বৈধতা নিয়ে যতটুকু প্রশ্ন বাকি থাকে, সেটাও সমাধান করেন সাজানো হ্যাঁ/ না ভোট দিয়ে। ইতিহাস নিশ্চয়ই সেই গণভোটকে জিয়ার বৈধতার উৎস বলে মনে করে না। তাঁকে আবার কেউ অবৈধও বলে না। অবৈধ না বলার কারণ, আমার মতে, ডকট্রিন অব নেসেসিটি নয়, বরং রুল অব রিকগনিশনের জন্য বলে না। ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদলের নাটকে সাংবিধানিক বৈধতা খুব কম অঙ্কেই ভূমিকা রাখে, বরং সংবিধানই দেখা যায় নাটকের নায়ককে অনুসরণ করে।

জুলাই অভ্যুত্থান সাংবিধানিক পথে হয়নি, সে জন্য তার সাংবিধানিক ভিত্তি খুঁজে বের করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অভ্যুত্থানকারীরা জানতেন যে সেনাবাহিনীর কিছু অংশও তাঁদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তেমনি সেনাবাহিনীও জানত যে তাদের সমর্থনের গণভিত্তি খুবই দুর্বল। শক্তির এই ভারসাম্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সৃষ্টি। সৃষ্টির পর সাংবিধানিক প্রশ্নের বোঝাপড়ায় এবং সমাজের পণ্ডিতদের চাপে ১০৬-এর মাধ্যমে তাদের বৈধতার সিল দিতে বিচার বিভাগের মতামত চাওয়া হয়। লক্ষণীয় যে সৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পরই বৈধতার প্রশ্নের মীমাংসা চাওয়া হয়েছে। আমার মতে, এই প্রক্রিয়া একাডেমিক কারণ, আওয়ামী দলদাস এবং উপদেষ্টারা নিজেরা ছাড়া তত দিনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে দেশের মানুষের এবং প্রশাসনের নিরঙ্কুশ সমর্থন এসে গিয়েছিল।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইচ্ছা করলে নতুন সংবিধান তৈরি করতে কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি তৈরি করতে পারত বা ইচ্ছা করলে সাংবিধানিক পরম্পরা রক্ষা করার একটা উপায় বের করতে পারত আবার কিছু না করে দুদিন পর নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণাও দিতে পারত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, যত দিন জনপরিসরে তাদের বৈধতা আছে, তত দিন তারা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে। তাদের কাজ যত প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এবং বিশেষত রাষ্ট্রের সব অঙ্গের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ যত দুর্বল বলে প্রকাশ পাচ্ছে, ততই তাদের দিন ফুরিয়ে আসছে। সে জন্যই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এখন আমাদের সামনে।

এই সরকার এই দেশের নাগরিকদের আকাঙ্ক্ষাকে বুঝে চলার চেষ্টা করছে এবং সেই লক্ষ্যেই তাদের কাজ সাজানোর চেষ্টা করছে। জন-অসন্তোষ থেকে বাঁচার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটা সাংবিধানিক পরম্পরায় নিজেদের যুক্ত করতে চেষ্টা করেছে। জন-আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দেওয়ার জন্যই তারা ঐক্য কমিশন সৃষ্টি করে গণতান্ত্রিকভাবে সব রাজনৈতিক দলকে যুক্ত করে সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি করেছে।

একই জন-আকাঙ্ক্ষাকে মাথায় রেখে বাস্তবায়নের পথও তারা খুঁজে নিতে পারে। সংস্কার প্রস্তাবের মতো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও গণতান্ত্রিকভাবে খুঁজে নেওয়ার প্রক্রিয়া এখন চলমান। এই প্রক্রিয়ায় যদি ঐকমত্যে না পৌঁছাতে পারে, তবে তাদের বুঝতে হবে যে নেতৃত্ব মানে শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পালন করা নয়। দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা তাদের যে দায়িত্ব দিয়েছে, তাতে অচলাবস্থা নিরসনের জন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধতা তাদের আছে। শুধু খাস নিয়তের বিষয়ে আপস না করলেই হবে।

খাস নিয়ত নিয়ে ভাবলে বাস্তবায়নের সীমারেখাগুলো কী হবে, সেটা তারা নিজেরাই পেয়ে যাবে। ঐক্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব দেখলে কোন প্রস্তাব সর্বোত্তম, সেটা আরও পরিষ্কার হবে। তারা নিজের মনের ভেতর খুঁজলেই দেখবে যে রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপন দিয়ে সংবিধানের পরিবর্তন করলে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার হবে। গণভোট ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির জন্য হুমকি হলেও তারা বুঝতে পারবে যে সেটা জন-আকাঙ্ক্ষার পক্ষে যাবে। আবার দেখবেন, সংবিধানের ১০৬ ধারা ব্যবহার করে আপিল বিভাগ দিয়ে আগামী সংসদকে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চাপ দেওয়ার চেষ্টার পক্ষেই ঐক্য কমিশনে সমর্থন বেশি। গণপরিষদ করে সংবিধান নতুন করে লেখার ঝুঁকি এই প্রস্তাবে নেই। সনদে লেখা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাবনা যেমন এই প্রস্তাবে বেশি, তেমনি নতুন সংসদ নির্বাহী দায়িত্ব নিয়ে দেশকে নিরাপদ করার বিষয়ও এই প্রস্তাবে সংযুক্ত।

ঐক্য কমিশনের সভায় এটা পরিষ্কার যে সভার পরিসমাপ্তিতে কমিশন কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারবে না এবং তারা কেবল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে কিছু সুপারিশ রাখবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি তার বৈধতা এবং দায়িত্বের প্রতি সজাগ থাকে, তবে তাদেরই সেই প্রস্তাব থেকে একটা পদ্ধতি বেছে নিতে হবে। দেশের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে দেশের মানুষ সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবে।

* সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের একজন কর্মী hasibh@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-13%2Ffd07lb5t%2FScreenshot-2025-08-13-161006.jpg?rect=98%2C0%2C1154%2C769&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ছবি: সংগৃহীত


এক পরিবারের অ্যাকাউন্টে ৮ হাজার কোটি টাকা লেনদেন by মারুফ কিবরিয়া

ব্যবসায়ী শওকত আলী চৌধুরী। ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যানও তিনি। মূলত শিপিং ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রামের এই ব্যবসায়ী ও তার পরিবারের সদস্যদের আট হাজার কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ টাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে লেনদেনের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। গত আগস্ট মাসে তৈরি হওয়া সংস্থাটির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বিএফআইইউ বলছে, শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন সন্দেহজনক। সংস্থাটির ধারণা, নানা অনিয়মের মাধ্যমে অর্থপাচার করে বিদেশে সম্পদও গড়েছেন শওকত আলী চৌধুরী। যা বিএফআইউ’র অনুসন্ধানে রয়েছে। এ ছাড়া গত আগস্ট মাসে তৈরি হওয়া প্রতিবেদনটি ইতিমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) পাঠানো হয়েছে। দুদকও প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য সংস্থাটির যাচাই-বাছাই কমিটিতে (যাবাক) দিয়েছে।

বিএফআইইউ’র খসড়া প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে,  শওকত আলী চৌধুরী, তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীন মেয়ে জারা নামরীন ও ছেলে জারান আলী চৌধুরী চারজনের এখন পর্যন্ত ২৮টি ব্যাংকে ১৮৭টি হিসাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইবিএল চেয়ারম্যানের নামে ১৪টি হিসাব, তার স্ত্রীর নামে ১৫টি হিসাব, জারা নামরীন এর নামে ৯টি হিসাব ও মো. জারান আলী চৌধুরীর নামে ০৩টি হিসাব এবং তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ১৪৬টি হিসাব পাওয়া গেছে।
চলতি বছরের ১৫ই জুন পর্যন্ত আসা হিসাব অনুযায়ী এসব ব্যাংক হিসাবে ৮ হাজার ৪০৭ কোটি ৯১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮২.২২ টাকা জমা করা হয়েছে।  একই সময়ে ৮ হাজার ২৪৭ কোটি, ৫৬ লাখ ৯২ হাজার ৭৬০.৩১ টাকা  উত্তোলন করা হয়েছে। উক্ত সময়ে স্থিতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৩ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার ১৫৮.১৬ টাকা। উল্লিখিত হিসাবসমূহের কেওয়াইসি, হিসাব বিবরণী এবং অন্যান্য দলিল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বিএফআইইউ’র প্রাথমিক অনুসন্ধানে, শওকত আলী চৌধুরীর পরিচালিত নানাবিধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মধ্যে স্ক্র্যাপ ভেসেল আমদানির উদ্দেশ্যে ২০১২ সাল থেকে তাদের মালিকানাধীন এসএন করপোরেশনের পক্ষে ১৪১টি এলসি সংশ্লিষ্ট দলিল পর্যালোচনাধীন রয়েছে। তার মধ্যে ১১টি এলসি’র দলিল বিশ্লেষণে উক্ত এলসি সংশ্লিষ্ট স্ক্র্যাপ ভেসেলগুলো আদৌ শেষ গন্তব্য হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর কি-না তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে লয়েড লিস্ট ইন্টেলিজেন্স অনুযায়ী একই জাহাজের দুই রকম তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে বৃটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডের একই ঠিকানায় রেজিস্ট্রেশনকৃত ০৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে স্ক্র্যাপ ভেসেল কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে যা যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি করে। পরবর্তীতে শওকত ও তার পরিবারের সদস্যরা এবং তাদের অন্যান্য ব্যবসার তথ্যও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়।

বিএফআইইউ’র অনুসন্ধানে বলা হয়, শওকত আলী চৌধুরীর ঢাকা ব্যাংকের জুবিলী রোড শাখায় পরিচালিত ঢাকা ব্যাংক প্লাটিনাম হিসাবটি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, তিনি হিসাবটি ২০০৪ সালের ১লা জানুয়ারি খোলেন এবং ২০১৭ সালের ৩১শে ডিসেম্বর বন্ধ করেন। এই ব্যাংক হিসাবে মোট জমার পরিমাণ ৩ হাজার ৯৮৭ কোটি ৯৬ লাখ ৩ হাজার ২৭৪.৩১ টাকা। এ ছাড়া মোট উত্তোলনের পরিমাণ মোট ৩ হাজার ৯৮৬ কোটি ২৩ লাখ ২ হাজার ৮৩৫.২৪ এবং বন্ধকালীন স্থিতি (ক্লোজিং ব্যালান্স) ছিল ১৭ লাখ ৩০ হাজার ৪৩৯.০৭ টাকা। এ হিসাব ব্যবহার করে তিনি তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এসএন করপোরেশনের লেনদেন করেছেন যা পরোক্ষভাবে ট্যাক্স ফাঁকির উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকতে পারে বলে বিএফআইইউ’র অনুসন্ধানে সন্দেহ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শওকত আলী চৌধুরীর ব্যক্তিগত ইবিএল প্রিমিয়াম সেভিংস ধরনের সঞ্চয়ী হিসাব থেকে ১২৫ বার ইস্টার্ন ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন নগদ অর্থ উত্তোলন করেন। ব্যক্তিগত হিসাব থেকে ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারির এ অর্থ উত্তোলন ক্ষমতার অপব্যবহার নির্দেশ করে বলেও সংস্থাটির অনুসন্ধান সূত্র জানিয়েছে।

অবশ্য আব্দুল্লাহ আল মামুন মানবজমিনকে বলেছেন, আমি এসব জানি না। এগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততাও নেই। বিএফআইইউ একটি তার ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজ করার বিষয়টি নিউজে দেখতে পেয়েছি।

বিএফআইইউ সূত্র জানায়, অনুসন্ধানে শওকত আলী চৌধুরী কন্যা জারা নামরীনের অনিয়মও খুঁজে পাওয়া গেছে। ইস্টার্ন ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় তার ব্যক্তিগত হিসাবে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে ৩১ কোটি টাকার জমা হয়েছে যা তার আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং মাসের শেষের দিকে একটি ক্লিয়ারিং চেকের মাধ্যমে অন্য হিসাবে ৩০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে যা সন্দেহজনক। এসব লেনদেনের প্রাথমিক উৎস হিসেবে কয়েকটি লেনদেনের ক্ষেত্রে শেয়ার লেনদেনের উল্লেখ রয়েছে এবং এ হিসাব থেকে এসএন করপোরেশনের উল্লেখ রয়েছে যা কর ফাঁকির দিকে ইঙ্গিত প্রদান করে। অনুসন্ধানে জারা নামরীন এসএন কর্পোরেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন বলে কোনো দলিলও পাওয়া যায়নি বলে বিএফআইইউ’র ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সংস্থাটির অনুসন্ধানে জানা যায়, শওকত আলীর ছেলে জারান আলী চৌধুরীর মিডল্যান্ড ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে ট্রানজেকশন প্রোফাইলের অতিরিক্ত অর্থ জমা ও উত্তোলন করা হয়েছে। এ সঞ্চয়ী হিসাবে এস. এন করপোরেশন থেকে অর্থ জমা হয়েছে এবং সে অর্থ রয়েল ক্যাপিটালের মাধ্যমে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। অর্থাৎ সঞ্চয়ী হিসাব হলেও এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করা হয়েছে যা কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। তাছাড়া, অ্যাকাউন্ট ওপেনিং ফরমে জারান আলী চৌধুরী এর পেশা দেখানো হয়েছে  বেকার এবং আয়ের উৎস হিসেবে মায়ের ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ দেখানো হয়েছে। একজন ছাত্রের সঞ্চয়ী হিসাবে বিপুল পরিমাণ ব্যবসায়িক অর্থ জমা করা এবং সে অর্থ শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করা অত্যন্ত সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড বিধায় এ বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করা প্রয়োজন বলেও জানানো হয় বিএফআইইউ’র প্রতিবেদনে।
এস. এন করপোরেশনের নামে পরিচালিত মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সিসি (হাইপো) ধরনের হিসাব থেকে শওকত আলী চৌধুরী ও তার স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীনের মালিকানাধীন আরেকটি প্রতিষ্ঠান নামরীন এন্টারপ্রাইজে অর্থ জমা করা হয়েছে এবং শিপ ব্রেকিং খাতের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা করা হয়েছে। তাছাড়া, নিড ড্রেসেস প্রা. লি. নামক একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানে ৫০ কোটি ৪০ লাখ টাকা জমা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া সিটি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় ২০১০ সালের ২৫শে জুলাই শওকত আলী চৌধুরীর ব্যক্তিগত হিসাবে এস. এন করপোরেশন থেকে ৩ কোটি টাকা জমা হয়েছে এবং সে অর্থ ওই দিনই মিডওয়ে সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হয়েছে। তাছাড়া, এই হিসাবে ২০১৩ সালের ২৯শে জুন ১০৬ কোটি ৮০ কোটি টাকা জমা হয়েছে এবং পরবর্তীতে এ অর্থ এস. এন করপোরেশনে প্রেরণ করা হয়। অর্থাৎ ব্যক্তিগত হিসাব ব্যবহার করে ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে যা কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকতে পারে বলে অনুসন্ধানে বলা হয়।

বিএফআইইউ’র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫ সালের ৫ই অক্টোবর প্রিমিয়ার ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা কর্তৃক গ্রাহক এস. এন করপোরেশনের একটি ঋণপত্রের  বিপরীতে গ্রাহকের আমদানি দায় পরিশোধের জন্য গ্রাহককে একই বছরের ১৫ই অক্টোবর ২৬৯ কোটি ৪৬ লাখ ৭ হাজার ৬৪৬.৯০ টাকার এলটিআর সুবিধা প্রধান করে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই শওকত আলীর ওই প্রতিষ্ঠানকে উক্ত সময়ে গ্রাহককে বর্ণিত এলটিআর সুবিধা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ১০ই অক্টোবর ২০১৫ প্রধান কার্যালয় থেকে শাখা বরাবর উক্ত এলটিআর পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদন প্রেরণ করা হয় যা শাখা কর্তৃক ১৪ই অক্টোবর গৃহীত হয়। অর্থাৎ, ঋণ সুবিধা প্রদানের কোনো অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও গ্রাহককে সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে ব্যাংকিং রীতি নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে উক্ত এলটিআর দেয়া হয়।

বিএফআইইউ’র প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখা কর্তৃক এসএন করপোরেশনের পক্ষে খোলা তিনটি ঋণপত্রের বেনিফিসারি ছিল তিনটি বৃটিশ আইল্যান্ড নিবন্ধিত কোম্পানি। বেনিফিসিয়ারি প্রতিষ্ঠান তিনটি বৃটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নিবন্ধিত যা গাইডলাইন্স ফর প্রিভেনশন অব ট্রেড বেজড মানি লন্ডারিংয়ে একটি এলার্ট হিসেবে উলেখ রয়েছে এবং এক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃক এনহেন্স ডিউ ডিলিজেন্স করার জন্য নির্দেশনা রয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক কর্তৃক সঠিকভাবে ইডিডি না করে উক্ত ঋণপত্রগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও, গাইডলাইন্স ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন্স-২০১৮, ভলিউম-১ এর ০৭ অধ্যায়ের সেকশন-(রর) এর ২৩ (বি) নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত নিদের্শনা লংঘনপূর্বক বিদেশি সরবরাহকারীর আর্থিক সচ্ছলতাসহ গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ না করেই শাখা কর্তৃক বর্ণিত এলসি স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও, বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান তিনটি একই ঠিকানায় নিবন্ধিত। এ ছাড়াও, উন্মুক্ত অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠান তিনটির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

বিদেশে সম্পদের তথ্য: বিএফআইইউ’র একটি সূত্র জানিয়েছে, শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যের নামে সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরে দু’টি বাড়ির তথ্য পাওয়া যায়। আর অন্য দুই দেশের সম্পদের তথ্যগুলো নিয়ে তদন্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানিয়েছে সূত্রটি।

ব্যাংক হিসাব স্থগিত: গত ১লা জুলাই শওকত আলী চৌধুরী ও তার পরিবারের সদস্যদের সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত করে বিএফআইইউ। পরে ৩০শে জুলাই সেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. তানভীর হাসান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত এক আদেশে ওই সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘মো. শওকত আলী চৌধুরী, তাসমিয়া আম্বারীন, যারা নামরীন ও মো. জারান আলী চৌধুরী এবং তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত হিসাবের লেনদেনের ওপর আরোপিত স্থগিতাদেশ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ২৩(১) (গ) ধারার আওতায় ৩১ জুলাই  থেকে ২৯শে আগস্ট পর্যন্ত ত্রিশ দিন বর্ধিত করার জন্য আপনাদের নির্দেশ প্রদান করা হলো। স্থগিতাদেশের ক্ষেত্রে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা, ২০১৯ এর ২৬(২) বিধি প্রযোজ্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।’

অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএফআইইউ’র উপপ্রধান আমির উদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত তেমন তথ্য নেই। অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে। পুরো প্রতিবেদন পেতে সময় লাগবে।

বিএফআইইউ’র অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে শওকত আলী চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার দুইটি মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে কোম্পানির সেক্রেটারি আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, স্যারের সঙ্গে আমার কথা হয়নি। মঙ্গলবার ঢাকায় এসেছেন। এখন তিনি ঢাকায় নেই। আসলে আমার সঙ্গে তার কথা হয় না। 

mzamin

বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের ‘গেমপ্ল্যান’টা কী by হাসান ফেরদৌস

গত বছরের ‘বর্ষাবিপ্লবের’ পর থেকেই ভারতের আতিথ্যে রয়েছেন বহিষ্কৃত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পারিষদবর্গ। ঠিক কোন আইনগত মর্যাদায় তাঁরা আছেন, রাজনৈতিক আশ্রয়ে, না অন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থাধীনে, এ কথা হাসিনা অথবা ভারত কেউই খোলাসা করেননি। তবে আছেন, বেশ বহাল তবিয়তেই আছেন।

কেমন আছেন, তার একটি বেশ জমকালো বিবরণ দিয়েছে ভারতের অনলাইন পোর্টাল দি প্রিন্ট। তার একটি সারসংক্ষেপ প্রথম আলোতেও মুদ্রিত হয়েছে। এতে বিগত সরকারের একজন বাক্‌চতুর সহকারী মন্ত্রী, মোহাম্মদ আরাফাত বলেছেন, তাঁরা রাত–দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন কী করে শেখ হাসিনাকে ফের ক্ষমতায় বসানো যায়।

তিনি একা নন, আরও হাজার দুয়েক আওয়ামী নেতা-কর্মী রয়েছেন, যাঁরা বেশ আরামেই ভারতীয় আতিথ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ জিমে যাচ্ছেন, কেউ মাথায় নকল চুল বসাচ্ছেন, কেউ অনলাইন বৈঠকে যুক্ত হচ্ছেন। অবশ্য তিনি অর্থাৎ জনাব আরাফাত, অন্য সব আরাম-আয়েশ বাদ দিয়ে দিন–রাত খেটে যাচ্ছেন, কীভাবে ইউনূস সরকারকে হটিয়ে হাসিনাকে ফের মসনদে বসানো যায় সেই কাজে।

তাঁরা যে ভারতে আছেন, সেটা কোনো ‘হাইলি ক্লাসিফায়েড’ তথ্য নয়। খোদ হাসিনা প্রায় প্রতিদিন একটি–দুটি করে টেলিফোন-নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন কখন, কোথায় কী করতে হবে। তিনি শিগগিরই দেশে ফিরে আসছেন—এমন আশ্বাসও মাঝেমধ্যে জানাচ্ছেন।

বিগত সরকারপ্রধানের এমন প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতায় উদ্বিগ্ন হয়ে তা বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে ভারতের কাছে একটি পত্র পাঠিয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যত দূর মনে পড়ে, স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস তিন মাস আগে ব্যাংককে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁদের একমাত্র মুখোমুখি আলাপচারিতায় সেই একই অনুরোধ রেখেছিলেন।

সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক প্রেস বিবৃতি দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সে অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। এতে সাফ সাফ বলা হয়েছে, ‘না, আমরা আওয়ামী লীগের কোনো সদস্যের বাংলাদেশবিরোধী কার্যকলাপের ব্যাপারে অবহিত নই। ভারত সরকার এমন কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপ বরদাশত করে না। অন্য কথায়, অন্তর্বর্তী সরকার যে অভিযোগ করেছে, তা ভিত্তিহীন।’

ভারতের এই সরকারি বিবৃতিটি যে ডাহা মিথ্যা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দি প্রিন্ট পোর্টালের সাংবাদিক যে খবর টেলিফোন তুলে সরাসরি ঘোড়ার মুখ থেকে জেনে নিতে পারেন, ভারত সরকার নিজের তাবত গোয়েন্দা অ্যাপারেটাস ব্যবহার করেও তার সন্ধান পায়নি, সে কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

দি প্রিন্টের প্রতিবেদনে এসব আওয়ামী কর্তা কলকাতার কোন পাড়ায়, কোন অ্যাপার্টমেন্টে একা বা রুমমেট সঙ্গে নিয়ে দিন গুজরান করছেন, তার সবিস্তার বিবরণ রয়েছে। ইউটিউবেও একাধিক সচিত্র বিবরণীতে এসব রাজনীতিকের ব্যাপারে বেশ রসালো কাহিনি রয়েছে।

তার মানে ভারত সরকার সবই জানে এবং জেনেশুনেই হাসিনা ও তাঁর অনুগামীদের ভারতে অবস্থান এবং কার্যকলাপে অনুমতি দিয়েছে। যত দূর জানি, হাসিনা রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আশ্রয় পেয়েছেন। তার মানে খানাপিনা, টেলিফোন বিল ও নিরাপত্তার জন্য খাইখরচা সবই ভারত সরকারের। কোনো কোনো ভারতীয় রাজনীতিক প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন, এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা জেনেও ভারত ঠিক কোন কারণে হাসিনাকে ‘জামাই আদরে’ থাকতে দিচ্ছে।

সর্বভারতীয় মজলিশ-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের প্রধান আসাবুদ্দিন ওয়াইসি জানতে চেয়েছেন, ভারত সরকার যেখানে শুধু বাংলা বলার জন্য লোকজনকে ধরেবেঁধে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে, সেখানে হাসিনাকে এত খাতির কেন। বাংলাদেশ থেকে আগত বহিরাগতদের যদি বহিষ্কার করতে হয়, তো সেই কাজ হাসিনাকে দিয়েই শুরু করা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

এ কথা অনেকেই বলেছেন, ক্ষমতা থেকে হাসিনার পতন ভারতের জন্য একটা বড় ধরনের কূটনৈতিক বিপর্যয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি শেখ হাসিনাকে নিজের লোক মনে করে তাঁর পেছনে বিস্তর বিনিয়োগ করেছেন। সে বিনিয়োগের সুফলও পেয়েছেন। ‘ভারতের নিজের স্বার্থেই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে হবে’—এ কথা একজন আওয়ামী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে গিয়ে মামাকে মাসির গল্প শোনানোর মতো শুনিয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু একই ঝুড়িতে সব ডিম রাখার ফল কী হতে পারে, সে শিক্ষাটা ভারত মনে রাখেনি। ফলে বর্ষাবিপ্লবে হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ভারত, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর আম-ছালা দুটোই হারালেন (তার সঙ্গে ঝুড়িভর্তি ডিমও)। অনেকেই বলেছেন, এ বিনিয়োগটাই যদি শুধু হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ওপর না হয়ে বাংলাদেশ ও তার জনগণের পেছনে হতো, তাহলে আজকের এই বিপন্ন অবস্থায় ভারতকে পড়তে হতো না।

স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে ভারত এখনো হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে তার বুকপকেটে রেখে দিয়েছে কেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর, পরে কোনো এক সময় কাজে লাগবে, এই বিবেচনা থেকে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে স্ট্র্যাটেজিক লেভারেজ বা কৌশলগত সুবিধা নামে অভিহিত করে থাকেন। একে আপনারা দর-কষাকষির হাতিয়ার বা বার্গেনিং চিপ হিসেবেও ভাবতে পারেন। ভারতের হিসাবে, হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে টিকিয়ে রাখা যায়, তাহলে পরবর্তী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বাণিজ্য থেকে কূটনীতি, যেকোনো প্রশ্নেই দিল্লি সেই তাসকে দর-কষাকষির জন্য ব্যবহার করতে পারবে।

এই দুই দেশ একে অপরের প্রতিবেশী, চাইলেই ছুমন্তর করে তাকে ‘ভ্যানিশ’ করা যাবে না। আজ হোক বা কাল, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নিতেই হবে। তেমন পরিস্থিতিতে ভারত একদম মোক্ষম সময়ে এই ‘হাসিনা তাস’কে টেবিলে ছুড়ে দেবে। এ রকম কৌশলগত ‘লেভারেজের’ অনেক অভিজ্ঞতাই আমাদের জানা। যেমন কোনো না কোনো ফায়দা হবে, এই আশায় পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকায় ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। অথবা এখন ভারত যে কারণে বালুচ বিদ্রোহীদের অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে আগলে রেখেছে।

এর চেয়েও ভয়াবহ আরেকটি আশঙ্কা রয়েছে। এমন হতে পারে যে ভারত সত্যি সত্যি আঁক করে বসে আছে যে আজ হোক বা কাল, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরবেন। হাসিনা নিজে সে কথা বলেছেন, ইউটিউব তার সাক্ষী। মোহাম্মদ আরাফাতসহ তাঁর আরও কয়েক হাজার অনুগামী ভারতে বসে ভারতের মদদে সে লক্ষ্য পূরণে দিন–রাত কাজ করে চলেছেন, ভারতীয় পত্রিকা দি প্রিন্ট সে কথা জানিয়েছে। ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া এর কোনোটাই সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ যে এখনো ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার আশা করে, তার আরও একটি আলামত আমরা সপ্তাহ দুয়েক আগে সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে জেনেছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মরত অফিসারের নেতৃত্বে শ চারেক আওয়ামী কর্মী নাশকতামূলক কাজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

অন্য কথায়, হাসিনা ক্ষমতায় ফিরবেন এটা কেবল থিওরি নয়, প্র্যাকটিসও বটে। উর্বর মস্তিষ্কের কেউ কেউ অনায়াসেই ভাবতে পারেন, বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের কাছ থেকে সবুজসংকেত ছাড়া খোদ রাজধানীতে এমন দুঃসাহসী কর্মযজ্ঞে তাঁরা নামবেন, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।

কোনো ষড়যন্ত্র তুলে ধরার জন্য আপনাদের আমি এই গল্প শোনাচ্ছি না। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, শুধু সে ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়ার জন্যই এই নিরীক্ষার অবতারণা।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আগামী নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করেছে। আওয়ামী সমর্থকেরা এই যুক্তি দিয়ে থাকেন, অন্তর্বর্তী ইউনূস সরকার অবৈধ। ফলে তাঁকে হটানোর দাবিটা তাঁদের চোখে মোটেই অগণতান্ত্রিক নয়। কিন্তু সরকার গঠনের লক্ষ্যে পরবর্তী নির্বাচন যদি একবার নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, হাসিনার বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। সেই বিবেচনায় স্বাভাবিকভাবেই হাসিনা বা আরাফাতদের লক্ষ্য হবে এই নির্বাচন ঠেকানো।

অনুমান করি, বাংলাদেশ সরকার এই বিপদ সম্পর্কে অবগত। অন্যথায় তাঁরা ভারতের কাছে আওয়ামী তৎপরতার প্রতিবাদ জানাতেন না। কিন্তু তাঁদের দায়িত্ব শুধু এই প্রতিবাদ জানানোর মধ্যে শেষ করলে চলবে না। বিষয়টা পৃথিবীর সামনে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরতে হবে। সবাইকে জানাতে হবে, দেশের ভেতরে, দেশের বাইরে বাংলাদেশকে নিয়ে এক ষড়যন্ত্রের ছক পাতা হচ্ছে।

* হাসান ফেরদৌস, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোলাজ: প্রথম আলো