Sunday, April 15, 2018

আমেরিকায় ফের বাড়ছে অবৈধ অভিবাসন

নিশ্চিতভাবেই একে ‘ট্রাম্প ইফেক্ট’ বলে মনে হচ্ছিল। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করার সপ্তাহখানেকের মধ্যেই দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশের অপরাধে আটককৃতদের সংখ্যা ১৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থায় পৌঁছায়। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তৎকালীন মন্ত্রী জন কেলির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা ছিল ১১১২৭। অবৈধ অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যা হ্রাসের নেপথ্যে ট্রাম্পের অভিবাসন সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশকে কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন জন কেলি। তবে একই বিভাগের উপমন্ত্রী ইলাইন ডিউক এ জন্য অভিবাসন আইনের অধিকতর ভালো প্রয়োগকে কৃতিত্ব দিয়েছিলেন। অপরদিকে ট্রাম্প একে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন এক অর্জন’ হিসেবে।
এ ধরণের কোনো ইফেক্ট যদি সত্যি সত্যিও থেকে থাকে, তাহলে তা ক্ষণস্থায়ী বলে প্রমাণিত হচ্ছে। এপ্রিলের শুরুতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, বর্ডার প্যাট্রল এজেন্টরা মার্চ মাসে ৩৭ হাজার ৩৯৩ জন মানুষকে অবৈধ সীমান্ত পারাপারের সময় আটক করেছে। গত বছরের চেয়ে এই সংখ্যা ২০০ শতাংশেরও বেশি। অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় আটককৃত একাকী শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে ৩০০ শতাংশ। অপরদিকে আটককৃত পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে ৭০০ শতাংশ। এ খবর দিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট।
ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণী খবরে বলা হয়, এই অবৈধ অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যা স্থায়ীভাবে কমানোর জন্য ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর যথেষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, কথিত ‘ক্যাচ অ্যান্ড রিলিজ’ প্রথা তিনি বন্ধ করবেন। ‘ক্যাচ অ্যান্ড রিলিজ’ বলতে তিনি বুঝিয়েছিলেন, অনথিভুক্ত অভিবাসীদের ধরার পর আদালতে মামলা শেষে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার চর্চাকে। কিন্তু এই চর্চা বন্ধ করা কঠিন হবে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বলছে, প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ ৩৯ হাজার অভিবাসীকে আটক রাখার সামর্থ্য তাদের রয়েছে। ট্রাম্প এই সংখ্যাকে ৪৮ হাজারে উন্নীত করতে চান। তবে কয়েক দশক ধরে কার্যকর একটি রায় মোতাবেক, অভিবাসন কর্তৃপক্ষ একাকী শিশুদেরকে সর্বোচ্চ ২০ দিন আটক রাখতে পারবে। এরপর তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে তার কোনো পরিবারের সদস্য বা স্পন্সরের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। আইনানুযায়ী, যেসব আশ্রয়প্রার্থীকে দেশে ফেরত পাঠালে তার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাকে অবশ্যই মুক্তি দিতে হবে, যদি না তিনি কোনো নিরাপত্তা হুমকির কারণ হন।
এই আইনি সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ট্রাম্প অভিবাসন-বিরোধী ধরপাকড় অব্যাহত রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ৪ঠা এপ্রিল তিনি ঘোষণা দেন, মেক্সিকান সীমান্তে কেন্দ্রীয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করতে ন্যাশনাল গার্ডের ২০০০-৪০০০ সৈন্য মোতায়েন করা হবে। তিনি নিজের এই অর্জনের কথা বলে বেড়ানো অব্যাহত রাখেন। পরেরদিনই তিনি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় একদল সমর্থকের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা সীমান্ত কঠোর করছি। আমরা শ’ শ’ সংখ্যায় তাদেরকে ছুড়ে ফেলছি।’ কিন্তু ট্রাম্প হয়তো হতাশ হবেন এটা জেনে যে, ২০১৭ সালে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ মোট ২ লাখ ২৬ হাজার ব্যক্তিকে ফেরত পাঠাতে পেরেছে, যা কিনা পূর্বের বছরের চেয়ে ১৪ হাজার কম।

আতঙ্ক এখন রাশিয়া

পার্লামেন্টের অনুমোদন না নিয়েই সিরিয়া হামলায় যোগ দিয়েছে বৃটেন। এতে জনক্ষোভের মুখে পড়েছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। আতঙ্ক দেখা দিয়েছে বৃটেনে। বলা হচ্ছে, সিরিয়া হামলার প্রতিশোধ নিতে পারে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের মিত্র রাশিয়া। তারা বিভিন্ন হাসপাতাল, ব্যাংক, পানি  ও গ্যাস সবররাহ ব্যবস্থা, বিমান চলাচল ব্যবস্থা এমনকি বিমানবন্দরে সাইবার হামলা চালাতে পারে। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন ডেইলি মেইল। এতে বলা হয়েছে, পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া এমন হামলায় জড়িয়ে যাওয়ায় তেরেসা মের বিরুদ্ধে জনমত বেশি দেখা দিয়েছে। এমন অভিযানের বিরোধিতা করছেন দু’জন। পক্ষে রয়েছেন একজন। এমন জরিপ করেছে সারভেশন। তাতে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তার ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, বৃটেনের রাজনীতিতে অস্থিরতার লক্ষণ স্পষ্ট। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেবিনেট সদস্য মন্ত্রী ডেভিড ডেভিস, এস্থার ম্যাকভে ও সাজিদ জাভিদ। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে কোনো সাইবার আগ্রাসন চালানো হচ্ছে কিনা তা নজরদারি করছে জিসিএইচকিউ। ওদিকে সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের পর রাশিয়া প্রতিশোধ নিতে সামরিক পদক্ষেপ নেবে না বলে মনে করেন থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠাস আরইউএসআই-এর সাবেক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক পরিচালক, সন্ত্রাস বিরোধী ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মাইকেল ক্লার্ক। তিনি বলেছেন, আমার মনে হয় না যে, রাশিয়া প্রতিশোধ নিতে সামরিক পদক্ষেপ নেবে। তবে এক্ষেত্রে সাইবার যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়া এমন হামলা চালাতে পারে। এমন ঝুঁজিই প্রবল। তারা হামলা চালাতে পারে জাতীয় অবকাঠামো বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এতে বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এমন প্রেক্ষিতে বৃটেনে শনিবার জরিপ চালানো হয়। তাতে দেখা যায়, প্রতি ১০ অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৬জনই বলছেন, আর যেন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো না হয়। সিরিয়ার যুদ্ধে শনিবার অংশ নেয় বৃটেনের চারটি টর্নেডো জেট। তা থেকে ছোড়া হয় স্টর্ম শ্যাডো ক্ষেপণাস্ত্র। বৃটেনের নিরাপত্তা বিষয়ক সূত্রগুলো বলছে, রয়েল এয়ার ফোর্সের যুদ্ধবিমানগুলো টার্গেট করেছে হোম শহরের হিম শিনশার রাসায়নিক অস্ত্রাগারে। গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত ৭ই এপ্রিল সিরিয়ার দুমা শহরে যে ক্লোরিন গ্যাস হামলা চালানো হয় তার সঙ্গে এই স্থাপনার যোগসূত্র আছে। তবে যা-ই হোক। দিনশেষে সমীকরণ কিন্তু বলছে অন্য কথা। কূটনৈতিক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বলা হচ্ছে, সিরিয়ায় এ হামলার জবাব দিতে পারে রাশিয়া। এমন কি পরিস্থিতি এমন উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে যে, তাতে বিশ্বযুদ্ধের রূপ ধারণ করতে পারে।

কাশ্মীরের ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে সরব হতে এত দেরী কেন?

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ৮ বছরের শিশু হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনায় পুরো রাজ্য ক্ষোভে ফেটে পড়লেও সেই বিক্ষোভের উত্তাপ পৌঁছায়নি দিল্লিতে।
২০১২ সালের দিল্লির গণধর্ষণের ঘটনায় পুরো রাজ্য যেভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছিলো। আসিফা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কেউ এতোটা সরব হয়নি।কাশ্মীর উপত্যকার গণমাধ্যমগুলো এই ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে প্রচার করলেও বেশিরভাগ জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোয় পায়নি কোন কভারেজ।
কাশ্মীরের স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ তারা জানুয়ারি মাসেই এই খবরটি প্রচারে দিল্লি অফিসে যোগাযোগ করেছিলো। তাদের কাছে এই রোমহর্ষক ঘটনার চাইতে কাশ্মীর উপত্যকায় টিউলিপ বাগান উদ্বোধনের খবরটিকে বেশি জরুরি মনে হয়েছে।
পরে এপ্রিলের মাঝামাঝি কেন্দ্রীয় নিউজ নেটওয়ার্কগুলো হঠাৎ করেই সংবাদটি প্রচারে উঠেপড়ে লাগে।
প্রশ্ন ওঠে, ঘটনার ৪ মাস পর হঠাৎ কেন নড়েচড়ে বসলো দিল্লি মিডিয়া? হিন্দু ডানপন্থী দলগুলো তাদের কমিউনিটির এক ব্যক্তিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানানোই কি তাদের নজর আকর্ষণের কারণ?এ বিষয়ে ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সম্পাদক শেখর গুপ্ত জানান, এ ধরণের আচরণ দিল্লির সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকৃত চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। যেখানে তারা জাতীয় সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে দ্বিধাবিভক্ত এবং প্রভাবিত। বিশেষত সেনা নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের খবর প্রচারে তারা বরাবরই পক্ষপাতদুষ্ট।
এর পেছনে জাতীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুভূতিকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। বিশেষ করে হিন্দু ডানপন্থী সংগঠনগুলো এমনকি ক্ষমতাসীন বিজেপির দুজন মন্ত্রী গ্রেফতারকৃতদের প্রতি সমর্থন জানানোর পর এটি আলোচনায় উঠে আসে।
এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিশ্চুপ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন কম ওঠেনি। তিনি তার টুইট বার্তায় সুবিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েই চুপ করে যান।এ বিষয়ে সমাজ বিশ্লেষক ডক্টর বিশ্বনাথান বলেন, দিল্লির সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত হত্যা , ধর্ষণ, সহিংসতা, নির্যাতন, লুটপাটের খবর প্রচার করতে করতে গা সওয়া হয়ে গেছে। প্রতিটি খবরেই তারা অতিরঞ্জন কিছু খুঁজতে চায়। যা তাদের নৈতিক বোধকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তিনি বলেন, মিডিয়া আর রাজনীতিবিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ধর্ম, গোত্র ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ায় এখন আর মানবাধিকার বলে কিছু নেই। তার মতে, এখনকার মানুষের বিবেক অনেকটা রিপ ভ্যান উইঙ্কলের ঘুমের মতো।
সূত্রঃ বিবিসি

জাতিসংঘে কালো তালিকাভুক্ত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

যৌন সহিংসতার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে জাতিসংঘ। ‘বিশ্বাসযোগ্য সন্দেহের’ কারণে বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকেও একই তালিকায় আনা হয়েছে। প্রথমবারের মতো ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করা হলো। এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রস্তুত করছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। তার একটি আগাম কপি চলে এসেছে বার্তা সংস্থা এপি’র হাতে। তাতে বলা হয়েছে, নৃশংস যৌন নির্যাতনের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা নারী। এ বিষয়টি প্রামাণ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মেডিকেল স্টাফ ও অন্যরা। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুঁতেরা বলেছেন, এসব অপরাধ ঘটিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। স্থানীয় উগ্রপন্থিদের বিরুদ্ধে অপারেশন ক্লিয়ারেন্স চালানোর সময় সেনাবাহিনী এই নৃশংসতা চালিয়েছে ২০১৬ সালের অক্টোবরে এবং ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে। এ খবর দিয়েছে পাকিস্তানের অনলাইন ডন। এতে বলা হয়, অ্যান্তনিও গুঁতেরা বলেছেন, রোহিঙ্গাদেরকে তাদের দেশছাড়া হতে বাধ্য করতে এবং দেশে ফেরত যাওয়া বন্ধ করতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ব্যাপক হুমকি ও যৌন সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। তারা সমন্বিতভাবে এ সহিংসতার আশ্রুয নিয়েছে। মানবিকভাবে নির্যাতন করেছে। রোহিঙ্গাদেরকে উগ্র করে তুলেছে। গত আগস্টে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর আউটপোস্টে হামলা চালায় আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা)। প্রায় ৩০টি পোস্টে এমন হামলায় নিহত হন কয়েকজন নিরাপত্তা রক্ষী। এর ফলে ২৫ শে আগস্ট শুরু হয় সেখানে নৃশংসতা। নির্মম এক নির্যাতন অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, যা পৃথিবী অনেকদিন দেখে নি। তাদের এ অভিযানকে জাতিসংঘ, মানবাধিকার বিষয়ক গ্রুপ, যুক্তরাষ্ট্র সহ অনেক দেশ ও সংস্থা জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। জাতিসংঘের এই রিপোর্টটি সোমবার উত্থাপন করার কথা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে। সেখানে ৫১ টি দেশের সরকার, বিদ্রোহী ও কট্টরপন্থি গ্রুপগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে।

১ লাখ রুপিতে ছেলে হত্যার চুক্তি করে মা প্রেমলতা

জমি নিয়ে বিরোধ। তাই ছেলেকে খুন করতে ঘাতকের সঙ্গে এক লাখ রুপিতে চুক্তি করে মা প্রেমলতা সুতার। চুক্তি মতো কাজও হয়ে যায়। খুন করা হয় তার ছেলে মোহিতকে। কিন্তু ঘটনা ধামাচাপা পড়ে থাকে নি। ৭ই এপ্রিল ভারতের রাজস্থানে ন্যাশনাল হাইওয়ে-১১৩ এর নিম্বাহিদায় পরিত্যক্ত একটি স্থানে পাওয়া যায় মোহিতের মৃতদেহ। এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়। তাতে বেরিয়ে আসে অবিশ্বাস্য সব কাহিনী। এতে দেখা যায়, মা প্রেমলতা তার ছেলে মোহিতকে খুন করতে জামাই ও চার খুনির সঙ্গে চুক্তি করে। প্রতাপগড়ে ছোটি সাদরি এলাকায় তাদের জমি নিয়ে ছেলের সঙ্গে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জের ধেরে মা প্রেমলতা খুনিদের হাতে তুলে দেয় এক লাখ রুপি। তদন্তে এসব ফাঁস হওয়ার পর বেরিয়ে আসে সব তথ্য। পুলিশ গ্রেপ্তার করে মা প্রেমলতা সুতার, তার জামাই কৃষ্ণ সুতার, মহাদেভ ঢাকাড় ও গণপত সিংকে। উল্লেখ্য, নিহত মোহিত মানসিকভাবে সুস্থ ছিল না। নেশাসক্ত ছিল সে। তার পিতা মারা যাওয়ার পর মায়ের ওপর মাঝে মাঝেই নির্যাতন করতো। ছেলের এমন নির্যাতনে অতীষ্ঠ হয়ে মা প্রেমলতা দেড় মাস আগে চলে যান বামবোরি গ্রামে জামাইবাড়ি। সেখানে মেয়ে ও তার জামাইয়ের সংসারে বসবাস করতে থাকেন তিনি। কিন্তু নিজের গ্রামে ৪ বিঘা জমি ছিল প্রেমলতার। তিনি ওই জমি একজন মহাদেবের কাছে বিক্রি করতে চান। এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ছেলে মোহিত। সে কিছুতেই জমি বিক্রি করতে দেবে না। অন্যদিকে যে করেই হোক জমি বিক্রি করতে হবে প্রেমলতাকে। তাই তিনি ও জামাই মিলে বুদ্ধি বের করেন। তারা মোহিতকে হত্যা পরিকল্পনা করেন। এক্ষেত্রে তারা ওই মহাদেবের সহযোগিতা চান। তিনি মোহিতকে হত্যা করতে আগাম ৫০ হাজার রুপি পরিশোধ করেন। হত্যার পর বাকি অর্থ পরিশোধ করার সিদ্ধান্ত পাকা হয়। ৬ই এপ্রিল মোহিত খেতে যায় একটি ধাবায় (হোটেল)। এ সময় তার খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেয় গণপত। এমনকি তাকে বিয়ার পানের আমন্ত্রণ জানায়। ওদিকে মোহিত খাওয়া শেষ করে তার মোটর সাইকেলে আরোহণ করে। এ সময় তার সঙ্গে যায় গণপতের কর্মী অনীল নায়ক। তাদেরকে অনুসরণ করতে থাকে গণপত। শিবানা এলাকায় যাওয়ার পর তাকে আবারো বিয়ার পান করানো হয়। এ সময় মোহিত চেতনা হারায়। এই সুযোগ ব্যবহার করে গণপত। সে গায়ের পোশাক দিয়ে মোহিতকে শ্বাসরোধ করে। ঠান্ডা মাথায় এই হত্যাকা- ঘটিয়ে তারা দু’জনেই ফিরে যায় ধাবায়। সেখানে তারা এমনভাবে কাজ করতে থাকেন যেন, কিছুই ঘটেনি। কিন্তু মৃতদেহ পাওয়ার পর ক্লাইম্যাক্স জমতে থাকে। কে হত্যা করেছে? কেন হত্যা করা হয়েছে? নানা  রকম প্রশ্ন আসতে থাকে। মোহিত মানসিকভাবে সুস্থ নয়। তাকে কে হত্যা করবে। তাই ঘাতককে খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। তবে পাপে তো ছাড়ে না বাপেরে। তাই টোল প্লাজার সিসিটিভির ফুটেজে ধরা পড়ে যায় ঘাতক। তাতে দেখা যাওয়ার পর গণপতকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে দায় স্বীকার করে। এরপরই মোহিতের মা প্রেমলতাকে নিরাপত্তা হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকিদে নেয়া হয়েছে পুলিশি রিমান্ডে। পঞ্চম অভিযুক্ত অনীল নায়েক রয়েছে পলাতক। তার সন্ধান করছে পুলিশ।

রোহিঙ্গাদের ফেরত আনাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে: পর্যবেক্ষকরা বলছেন ভাঁওতাবাজি

মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ এবং পুনর্বাসন বিষয়ক মন্ত্রী উইন মিয়াট আয়ে কক্সবাজারের উখিয়ায় কুতুপালং শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে গিয়ে দাবি করেছেন, বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি তার সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। মিয়ানমারের ৫০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন।
শরণার্থীদের অবস্থা খতিয়ে দেখার জন্য কক্সবাজার সফরে গিয়ে মিয়ানমারের এ মন্ত্রী দাবি করেন তার সরকার যত দ্রুত সম্ভব শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করবে। তিনি রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিক অধিকার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দাবি করেন, তার সরকার রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে, মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ, ত্রাণ এবং পুনর্বাসন বিষয়ক মন্ত্রীর সফরের ফলে দেশটির সরকার যত দ্রুত সম্ভব শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে বলে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা আশা করছেন। মিয়ানমারের এই মন্ত্রী যদিও দাবি করেছেন, তার সরকার শরণার্থী প্রত্যাবাসনের জন্য পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছে কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গত বছরের নভেম্বর দু'দেশের মধ্যে শরণার্থী প্রত্যাবাসন বিষয়ে যে চুক্তি হয়েছিল মিয়ানমারের কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত রয়েছে। মিয়ানমার ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে ওই চুক্তি সই হয়েছিল।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিস্ময়কর হচ্ছে, মিয়ানমারের মন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে দাবি করেছেন রোহিঙ্গা মুসলমানদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়টি তার সরকার সবচেয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অথচ দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি মিয়ানমার সরকার মুসলমানদেরকে ফিরিয়ে না নিয়ে বাংলাদেশে বসবাসকারী বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে রাখাইনে স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছে এবং এ লক্ষ্যে তারা কাজও শুরু করে দিয়েছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বাংলাদেশি বৌদ্ধদের মিয়ানমারে স্থানান্তরের পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায় এটা মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশের জনসংখ্যার কাঠামোয় পরিবর্তন আনার জন্য গভীর চক্রান্ত এবং এর ফলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। মিয়ানমার সরকার একদিকে রাখাইনে বাংলাদেশি বৌদ্ধদের স্থানান্তর করছে অন্যদিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে মূলত বিশ্ববাসীকে ধোঁকা দিচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক সমাজ মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর জুলুম নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার সরকারের ওপর যখন ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে তখন মিয়ানমারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং শরণার্থী শিবিরে মন্ত্রীর পরিদর্শন এসবই লোক দেখানো কাজ যাতে আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনার মাত্রা কমিয়ে আনা যায় এবং এ অঞ্চলে কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা যায়।
নিউইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মহাসচিব বিল ফেরলিক বলেছেন, শরণার্থীদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার আগে এখনো অনেক কাজ বাকি। আন্তর্জাতিক সমাজকে অবশ্যই এ নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, আন্তর্জাতিক তত্বাবধান ছাড়া শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়া হবে না। কারণ দেশে ফেরার পর শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে এবং জুলুম নির্যাতনেরও অবসান ঘটাতে হবে। কিন্তু এখনো এবিষয়ে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।

সিরিয়ার যুদ্ধ: বড় দেশগুলির কার কাছে কী অস্ত্র আছে?

সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণের জন্যে রাশিয়াকে প্রস্তুত থাকার কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাজধানী দামেস্কের কাছে কথিত রাসায়নিক হামলার জবাবে মি. ট্রাম্প এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের আক্রমণের পরিকল্পনা করছে তাতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সহযোগিতা নেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তাতে যেসব সমরাস্ত্র ব্যবহার করা হবে সেগুলো যুদ্ধজাহাজ, জঙ্গিবিমান ও ডুবোজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যেসব যুদ্ধবিমান থেকে অস্ত্র নিক্ষেপ করা হবে সেগুলো সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করবে এবং সেখান থেকেই হামলা চালাবে। অথবা ড্রোন দিয়ে আক্রমণ করা হবে যা নিয়ন্ত্রণ করা হবে রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে।
রুশ কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন, এসব ক্ষেপণাস্ত্রকে গুলি করে মাটিতে নামিয়ে আনার পাশাপাশি যেসব জায়গা থেকে এসব নিক্ষেপ করা হবে সেগুলোকেও তারা ধ্বংস করে দেবে।
কিন্তু এই যুদ্ধে যেসব শক্তিধর দেশ অংশ নেবে বলে এখনও পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছে তাদের কাছে কি ধরনের অস্ত্র আছে? রাশিয়া এবং সিরিয়া এর জবাব দিতে পারে কিভাবে?
যুক্তরাষ্ট্র: প্রতিরক্ষা বাজেট- ৬০,০০০ কোটি ডলার
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস ডোনাল্ড কুক ইতোমধ্যেই ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এখান থেকে সিরিয়ার রাসায়নিক স্থাপনাগুলোতে ক্রুজ মিসাইল দিয়ে আঘাত করা হবে।
এর ফলে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঝুঁকি কমে আসবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা
এক বছর আগে, যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মার্কিন নৌবাহিনির দুটো ডেস্ট্রয়ার থেকে ৫৯টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিলো। সেটা চালানো হয়েছিলো সিরিয়ার হম্স প্রদেশের শায়রাত বিমানঘাঁটিতে।
ওয়াশিংটন বলেছে, এই বিমানঘাঁটি রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ করে রাখার জন্যে ব্যবহার করা হচ্ছিলো। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক আক্রমণের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে এসব রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিলো বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত একটি শহরের উপরে।
এই টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু দিক আছে- এটি খুব নিচ দিয়ে উড়ে যায় এবং এটিকে শনাক্ত করা কঠিন। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি থেকে অল্প তাপ নির্গত হয় যার ফলে ইনফ্রারেড ডিটেকশনের মাধ্যমে এটি ধরা সম্ভব হয় না।
টমাহক ক্রুজ মিসাইল
যুদ্ধবিমান বহনকারী বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজও পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করছে মার্কিন নৌবাহিনি। তবে সেগুলোর এখনই সিরিয়ার আকাশসীমার ভেতরে ঢুকে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নেই।
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি হচ্ছে কাতারে। সেখানে আছে এফ-১৬ জঙ্গিবিমান, যা ওয়ার্টহগ নামেও পরিচিত। তুলনামূলকভাবে এগুলো খুব দ্রুত পরিচালনা করা সম্ভব।
এফ- ১৬ খুব নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে পারে বলে এর সুখ্যাতি আছে। সারা বিশ্বে যতো সামরিক বিমান আছে তার মধ্যে এটিকে সবচেয়ে কার্যকর উপায়ে ব্যবহার করা যায়। এর পাল্লা প্রায় ২,০০০ মাইল। এর ফলে অন্য যেকোন যুদ্ধবিমানের চেয়ে এটি বেশি সময় ধরে রণাঙ্গনে অবস্থান করতে পারে।
আমেরিকার এছাড়াও আছে সাবসনিক বি-৫২ বোমারু বিমান। এই যুদ্ধবিমানটিকে ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে এর আগেও ব্যবহার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগে উত্তর সিরিয়ার সাথে তুরস্কের সীমান্তে কুর্দীদের ছোট্ট একটি শহর কোবানেকে তাদের বিমানঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। সেখানে সামরিক ট্রান্সপোর্ট বিমান সি ১৩০ এবং সি ১৭ পরিচালনা করা হয়েছে, যাতে করে সৈন্য এবং যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সি ১৭ সামরিক পরিবহন বিমান
রাশিয়া: প্রতিরক্ষা বাজেট -৬,৯০০ কোটি ডলার
রাশিয়া যে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোন আক্রমণ প্রতিহত করার হুমকি দিয়েছে তাতে প্রশ্ন উঠেছে যে রাশিয়া কি তাদের উন্নত এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করবে? এটি এখনও পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।
রাশিয়ার একটি জেট বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর তারা বহুস্তরের এই বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত সেটি কাজ করেছে নিরোধক হিসেবে কিন্তু কখনো ব্যবহৃত হয়নি।

রাশিয়ার ক্ষমতা
এটি তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। করতে পারে খুব দ্রুত গতিতে ও নিখুঁতভাবে। ২৫০ মাইলের মধ্যে বিমান কিম্বা ক্ষেপণাস্ত্রকেও লক্ষ্য করতে পারে। এর সাহায্যে সিরিয়ার বেশিরভাগ এলাকাকেই হামলার হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে কভারেজ দেওয়া সম্ভব।
রাশিয়া বলছে, এই ব্যবস্থার সাহায্যে এর সাহায্যে তারা যেকোন যুদ্ধবিমানকে ধ্বংস করতে সক্ষম।
কিভাবে কাজ করে এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
উপরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে এস ৪০০ প্রতিরোধী ব্যবস্থা থেকে কিভাবে কোন বস্তুকে চিহ্নিত করে, সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাই এর পর সেটিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া হয়। এটি একসাথে ১২টি ক্ষেপণাস্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একসাথে হামলা চালাতে পারে ৬টি বস্তুকে লক্ষ্য করেও।
কিংস কলেজ লন্ডনে ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের ড. মার্টিন এস নাভিয়াস বলেছেন, এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে যুদ্ধের কৌশল জটিল হয়ে পড়েছে। সাধারণত বিমান হামলা চালিয়ে কোন একটি দেশের ভূমি থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হয় কিন্তু সিরিয়ার ভেতরে রাশিয়ার এই প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাধা হয়ে উঠতে পারে।
এর পাল্লা সিরিয়ার আকাশসীমার বাইরেও বিস্তৃত। এর অর্থ হলো সিরিয়াকে লক্ষ্য করে কিছু নিক্ষেপ করা হলে সেটি সিরিয়ার ভেতরে আসার আগেই ধ্বংস করে ফেলা সম্ভব। অনেক বিশ্লেষক এস-৪০০ প্রতিরোধী ব্যবস্থার ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
সিরিয়াতে রাশিয়ার আরো কয়েক ধরনের যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সুখয় -২৪ বোমারু বিমান, সুখয়-২৫ যুদ্ধবিমান, বহু ভূমিকা পালন করতে পারে এরকম জঙ্গি বিমান, পরিবহন বিমান, গোয়েন্দা বিমান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ।
এসবের অনেকগুলোই আছে হেমেইমিম বিমানঘাঁটিতে। বিদ্রোহীদের উপর বিমান হামলার জন্যে এটিই রাশিয়ার প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাশিয়ার সামরিক বাহিনী শায়রাত ঘাঁটিও ব্যবহার করছে বলে খবরে বলা হচ্ছে। সেখান থেকে মিগ ২৪ এবং মিগ ৩৫ অ্যাটাক হেলিকপ্টার পরিচালনা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার হেলিকপ্টার গানশিপ
ক্রেমলিন বলেছে, ভূমধ্যসাগরে রস্তভ-অন-ডন ডুবোজাহাজ থেকে তারা সিরিয়ায় বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে এর আগে কালিবর ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করেছে।
কাসপিয়ান সাগরের যুদ্ধজাহাজ থেকেও তারা রকেট ছুঁড়েছে যা কিনা সিরিয়াতে আই এসের উপর আঘাত হেনেছে বলে রাশিয়া দাবি করেছে।
রাশিয়া সম্প্রতি সিরিয়ার বন্দর শহর তারতুস থেকে তাদের রণতরী প্রত্যাহার করে নিয়েছে বলে বিভিন্ন খবরে জানা গেছে।
ব্রিটেন: প্রতিরক্ষা বাজেট - ৫,০০০ কোটি ডলার
বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, সিরিয়ার যুদ্ধে সামরিক বিমান মোতায়েন করতে ব্রিটেন প্রস্তুত।
এসবের মধ্যে রয়েছে, যুদ্ধবিমান যা সাইপ্রাসে রাফ এক্রোতিরি ঘাঁটিতে অবস্থান করছে। এবং যেকোন সময় এসব বিমানকে যুদ্ধের জন্যে কাজে লাগানো যেতে পারে।
ওই ঘাটিতে আছে ব্রিটেনের আটটি সুপারসনিক টর্নেডো যুদ্ধবিমান।
ব্রিটেনের ক্ষমতা
এগুলো নামানো হয়েছিলো ১৯৮২ সালে। সম্প্রতি এগুলোর সাথে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা হয়েছে।
ওই অঞ্চলে সক্রিয় আছে রাফ টাইফুন যুদ্ধিবিমানও। গত কয়েক বছরের এসবের সাহায্যে ইরাকে বেশ কয়েকটি হামলা চালানো হয়েছে। এর সাহায্যে লেজার নিয়ন্ত্রিত পেভওয়ে বোমা এবং ব্রিমস্টোন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে।
বিমান থেকে মাটিতে আঘাত হানার ব্রিমস্টোন ক্ষেপণাস্ত্র রাডার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এগুলোর একটির ওজন ৪৯কেজি। ১ দশমিক ৮ মিটার লম্বা এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেনের মনুষ্যবিহীন বিমান আছে, আছে ১০টি রিপার ড্রোন। ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধে এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
রিপার ড্রোন ৫০,০০০ ফুট উপরে যেতে পারে এবং এর পাল্লা ১,১৫০ মাইল। এটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র বহন করে।
এছাড়াও যুক্তরাজ্যের আছে নজরদারি বিমান রিভেট। যেকোন ধরনের আবহাওয়ার মধ্যে এটি কাজ করতে পারে। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে এটি ব্যবহার করা হয়েছে।
রিপার ড্রোন এমকিউ-৯ রিমোট দিয়ে ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়
ভূমধ্যসাগরে ব্রিটেনের বর্তমানে কোন ডুবোজাহাজ নেই। এবং সেখানে এরকম সাবমেরিন পাঠাতে হলে সময়ও লাগবে।
ফ্রান্স: প্রতিরক্ষা বাজেট - ৩৪০০ কোটি ডলার
ফরাসী নৌবাহিনীর পরমাণু শক্তি পরিচালিত শার্ল দ্য গল এয়ারক্রাফ্ট কেরিয়ার ওই অঞ্চলে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে বর্তমানে সেটিতে বড় ধরনের মেরামতের কাজ চলছে।
এই জাহাজের ওজন ৩৮,০০০ টন। এরকম জাহাজ ফ্রান্সের একটিই আছে। এটি বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা বহন করতে পারে। বহন করতে পারে ১,৯০০ সৈন্যও।
বর্তমানে ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারক্রাফ্ট কেরিয়ার ইউএসএস জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশে তাদের সৈন্য মোতায়েন করেছে প্রশিক্ষণ ও যৌথ অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্যে।
ফ্রান্সের শার্ল দ্য গল রণতরী
এছাড়াও ফ্রান্স জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমীরাতে তাদের বেশ কিছু মিরাজ ও রাফাল বিমান মোতায়েন করেছেন। সিরিয়া ও ইরাকে ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে তারা এটি ব্যবহার করেছে। এক একটি যুদ্ধবিমান ২৫০কেজি ওজনের লেজার নিয়ন্ত্রিত চারটি বোমা বহন করতে পারে।
ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ বলেছেন, সাম্প্রতিক রাসায়নিক হামলার জেরে যদি সিরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয় তাহলে তাতে সিরিয়ার সরকারের মিত্রদের উপর কোন হামলা পরিচালিত হবে না। হবে সিরিয়ার সরকারের রাসায়নিক ক্ষমতার উপর। তবে কি ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটা তিনি বলেন নি।
সিরিয়া: প্রতিরক্ষা বাজেট- ২০০ কোটি ডলার
ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।। তবে তারপরেও এটি যেকোন যুদ্ধবিমানের জন্যে হুমকি। কারণ এর ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র খুব দ্রুত যেকোন যুদ্ধবিমানকে আঘাত করে মাটিতে নামিয়ে আনতে পারে।
এই ব্যবস্থা একসময় ছিলো খুবই ক্ষমতাসম্পন্ন। এটি থেকে এস-২০০ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। নেটো এটির নাম দিয়েছে এসএ-৫ গামন। তবে এটি সম্প্রতি আরো উন্নত করা হয়েছে। তাতে রাশিয়ার এসএ-২২ এবং এসএ-১৭ ধরনের অস্ত্র যুক্ত করা হয়েছে।
সিরিয়ার কাছে রয়েছে রাশিয়ার এসএ-২২ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র
একটি রাডার দিয়ে এস-২০০ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটি ২১৭কেজি ওজনের বিস্ফোরক বহন করতে পারে।
সিরিয়ার আছে চীনের সরবরাহ করা স্পর্শকাতর কিছু রাডার ব্যবস্থা।
এরই মধ্যে সিরিয়ার সামরিক বাহিনী শায়রাত বিমানঘাঁটি পুনর্দখল করে নিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিলো।
এর আছে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ দুটো রানওয়ে। এক ডজনেরও বেশি হ্যাঙ্গার, ভবন ও মজুদ রাখার ব্যবস্থা। সিরিয়ান এয়ার ফোর্স সু ২২ এবং মিগ ২৩ এই ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে।
তবে বেশিরভাগ বিমানই পুরনো। এগুলো ব্যবহার করতে হলে বড়ো ধরনের মেরামত-কাজের প্রয়োজন।

বিশ্ব গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ: এই হামলা থেকে কী অর্জন করলো পশ্চিমা দেশগুলো?

সিরিয়া বিষয়ে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য রাখছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ম্যাটিস এবং সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চীফস অব স্টাফ জেনারেল ডানফোর্ড
বিবিসির নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদদাতা ফ্রাংক গার্ডনার তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের এই হামলার লক্ষ্য ছিল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের সরকারকে এমন একটা ধাক্কা দেয়া যাতে করে তারা আবার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত থাকে। তবে এই হামলা এত ব্যাপক নয় যে তা সিরিয়ার যুদ্ধের ভারসাম্য পাল্টে দেবে বা রাশিয়া এর শোধ নেয়ার জন্য পাল্টা হামলা চালাবে।
ফ্রাংক গার্ডনার আরও বলছেন, প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে রাজকীয় বিমান বাহিনীকে হামলার সবুজ সংকেত দেয়ার আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ নিয়ে এটর্নি জেনারেলের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তারা এই হামলার আইনগত বৈধতার খুঁটিনাটি পর্যালোচনা করেন।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় ব্রিটেন যে ভুল করেছিল, সে ব্যাপারে 'চিলকট তদন্ত রিপোর্টে' যেসব সুপারিশ ছিল, সেগুলো মাথায় রেখেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তিনি জানতে পারছেন। কারণ এই সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতাও হয়তো একদিন আইনজীবীরা পরীক্ষা করে দেখবেন। আর হামলার লক্ষ্য বস্তু বাছাইয়ের সময় রাশিয়ার কথাটাও তারা মাথায় রেখেছেন। হামলার পরিকল্পনাকারীদের বিশ্বাস ছিল, রাশিয়া যেন শোধ নিতে পাল্টা হামলা না চালায় সেই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে ভালো উপায় তাদেরকে আগে থেকে সতর্ক করে দেয়া এবং সিরিয়ায় তাদের কোন অবস্থানে হামলা না চালানো।
নিউ ইয়র্ক টাইমস
"প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত সপ্তাহে যত কড়া হাঁকডাকই দিন, শেষ পর্যন্ত তিনি যে পথ বেছে নিয়েছেন তাতে প্রেসিডেন্ট আসাদের 'ব্যাপক যুদ্ধ যন্ত্রকে' বা সামরিক বাহিনীর ওপর তার সরকারের যে কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ, তার ক্ষতি করার কোন আপাত চেষ্টা এতে ছিল না। এক রাতের এই বোমা হামলা সিরিয়ায় বিভিন্ন শক্তির সার্বিক ভারসাম্যে কোন পরিবর্তন আনবে এমন সম্ভাবনা কম। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আশা করছেন এটি হয়তো প্রেসিডেন্ট আসাদকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারে বিরত রাখতে যথেষ্ট।"
ওয়াশিংটন পোস্ট
"যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রেসিডেন্ট পুতিনকে কোনঠাসা করে, তাহলে তিনি চুপচাপ বসে থাকার সম্ভাবনা কম। যদি কোন কিছুই তিনি না করেন, তাহলে সিরিয়ায় রাশিয়ার কষ্টার্জিত বিজয় হুমকিতে পড়বে, রাশিয়ার মর্যাদা এবং তার 'কঠোর ভাবমূর্তি'র ক্ষতি হতে পারে।"
গার্ডিয়ান, লন্ডন
"আগে থেকে জল্পনা ছিল যে এরকম হামলা হলে তা থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে। আসলে এটা তার ধারে-কাছেও না। এই হামলা একটিতেই সীমাবদ্ধ, নতুন করে হামলার কোন পরিকল্পনা নেই। যদি না বাশার-আল-আসাদ ভবিষ্যতে আবার রাসায়নিক হামলা চালান।
মোটামুটি সার্বিক উদ্দেশ্যটা ছিল প্রেসিডেন্ট আসাদকে রাসায়নিক হামলা থেকে বিরত রাখতে একটি বার্তা পাঠানো। একই সঙ্গে রুশ এবং ইরানী অবস্থানগুলো থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকা, যাতে করে তাদের সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার মাধ্যমে সংঘাত আরও বিস্তৃত না হয়।"
আল জাজিরা
কাতার ভিত্তিক আল জাজিরা টেলিভিশনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের এই হামলা আসলে এই সংকটের সামান্যই সমাধান করতে পেরেছে, কারণ, তাঁর ভাষায়, "যে ব্যক্তি সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার জন্য দায়ী, তার কিছুই হয়নি।"
"এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন জড়িয়ে পড়েছিলেন মনিকাই লিউনস্কি কেলেংকারিতে, তাই হামলা করেছিলেন সুদান এবং পরে আফগানিস্তানে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন 'স্টর্মি ডানিয়েল' এবং তার আইনজীবীর কেলেংকারি নিয়ে সংকটে আছেন, কাজেই নিজেকে প্রেসিডেন্টসুলভ প্রমাণের জন্য তিনি এই হামলা করেছেন।"

পশ্চিমা হামলা: সিরীয় জনগণকে পরিত্যাগ করেছে বিশ্ব?

সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের রাসায়নিক হামলায় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের সর্বোচ্চ যে সংখ্যা পাওয়া যায় তা ৪ হাজারের বেশি নয়। সিরিয়ার দীর্ঘ সাত বছরের গৃহযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যার তা এক শতাংশেরও কম। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সিরীয় শাসকের বিরুদ্ধে দুইবার হামলা চালিয়েছে। প্রথমবার ২০১৭ সালের এপ্রিলে খান শাইখৌনের সারিন হামলার পর। আর শুক্রবার (১৩ এপ্রিল) হামলা চালানো হয় গত সপ্তাহে দৌমাতে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রাসায়নিক বোমা নিক্ষেপের অভিযোগে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাথিস শুক্রবার রাতে বিচ্ছিন্ন এসব হামলাকে ‘ওয়ান-টাইম শট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় সিরিয়ার জনগণকে পরিত্যাগ করেছে বিশ্ব। রাশিয়া, ইরান ও হেজবুল্লাহ’র সহযোগিতায় সিরীয়রা নিজেদের শাসকদের হাতে নিহত হতে পারে। এই হত্যাকাণ্ড যেকোনও উপায়ে হতে পারে, বেশিরভাগ সময় যা রাসায়নিক অস্ত্র দ্বারা ঘটছে।
খুব কম সময়েই যখন নিজেদের বাড়িতে গ্যাসের হামলায় নিহত শিশুদের ছবি পশ্চিমা টেলিভিশনের পর্দায় উঠে আসে তখন প্রতীকী অবস্থান নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বা সত্যিকার কোনও পরিকল্পনা নেওয়া হয় না এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে এবং সিরীয় প্রেসিডেন্ট আসাদকে জবাবদিহীতায় রাখতে।
শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ থেকে সিরিয়ায় শতাধিক ক্রজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সিরিয়ার ৮টি স্থাপনা, যেগুলো রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদনে সম্পর্কিত বলে এসব দেশের দাবি। এসব স্থাপনার মধ্যে একটি হচ্ছে ডুমাইর বিমানঘাঁটি, যেখান থেকে এমআই-এইট হেলিকপ্টার গত শনিবার ক্লোরিন ও সারিন গ্যাস নিয়ে হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত এটা স্পষ্ট নয় রাশিয়ার সেনাবাহিনী আগেই কেমন ধরনের সতর্কতা পেয়েছে এসব লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে। কিন্তু কোনও সন্দেহ নাই যে সিরীয় বাহিনী এসব স্থাপনা থেকে হামলার পূর্বেই গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে পেরেছে।
সাত বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধে সিরীয় শাসকরা নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর ২০১৩ সালে যখন রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনে স্বাক্ষর করার পর থেকে নিজেদের রাসায়নিক অস্ত্রের সামর্থ্য অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রিভেনশন অব কেমিক্যাল উইপন্স টিমের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে আরও বেশি দক্ষতা দেখিয়েছে। শুক্রবার রাতের হামলার সময় সিরিয়া এই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এসব রাসায়নিক অস্ত্র এখনও সিরিয়ার হাতে রয়েছে, পুনরায় তা ব্যবহার করা হতে পারে।
রাসায়নিক হামলা পুনরায় না চালানোর কোনও কারণ নেই আসাদের। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন হামলাটি সাজানো হয়েছে তাকে এবং তার সমর্থকদের জানানোর জন্য যে, ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে কোনও চ্যালেঞ্জিং প্রবণতা বা সিরিয়া ও রাশিয়াকে দমানোর উদ্দেশ্য ছাড়াই। এমন কোনও লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়নি যাতে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বা বোমা হামলার সামর্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত সাত বছরে পশ্চিমারা সিরিয়ার বিমান বাহিনী ও অস্ত্রঘাঁটিতে আরও বিস্তৃত হামলা চালাতে পারত। বিদ্রোহীদের ছিটমহলগুলোর আকাশসীমাকে নো ফ্লাই জোন হিসেবে ঘোষণা করা যেত। এসব স্থানে প্রতিদিনি বাড়িঘর, স্কুল ও হাসপাতালে সিরীয় বাহিনী বোমা হামলা চালানো হয়। আসাদকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হতো সবচেয়ে বড় হুমকি।
২০১৫ সালে সেপ্টেম্বরের আগে সিরিয়ায় রাশিয়া যুদ্ধবিমান মোতায়েনের আগেই এসব পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেত। এমনকি এরপরেও যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা এমন পদক্ষেপ নিতে পারত। সিরিয়ায় রাশিয়ার সেনা উপস্থিতি কম এবং আকারে ছোট। রুশ সেনাবাহিনী দেশটিতে কার্যকর রয়েছে কারণ বাকিরা সিরিয়ার জনগণকে পরিত্যাগ করেছে।
সরাসরি কৌশলগত বা সামরিক সাফল্যের আসাদ রাসায়নিক হামলা চালাননি। ছিটমহলে বসবাসকারী বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্যও করেননি।
অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক অবাক হন, কেন আসাদ এই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি নিচ্ছেন। এজন্য ধন্যবাদ পেতে পারে রাশিয়া ও ইরান। এসব স্থানে হামলা চালানোর মতো যথেষ্ট আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে বেজমেন্টে পুরো পরিবারকে শ্বাসরোধে হত্যা করে আসাদ ত্রাস সৃষ্টি করতে চাইছেন।
পশ্চিমা হামলার ধরনের কারণে আসাদের হয়ত রাসায়নিক অস্ত্রের কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু পুনরায় এমন হামলা চালানোর জন্য যথেষ্ট সরঞ্জাম রয়েছে। হামলার স্থান থেকে অন্যত্র তা এরই মধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবারের রাতের হামলার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তাদের এই হামলার নির্দেশে ভয়াবহ দুর্দশা সৃষ্টিকারী সিরিয়া যুদ্ধের কোনও পরিবর্তন ঘটাবে না। এটা ফাঁকা কোনও পদক্ষেপ ছাড়া কিছুই নয়। পশ্চিমারা কিভাবে সিরিয়ার জনগণকে পরিত্যাগ করেছে সেটির একটি উদাহরণ।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ অবলম্বনে।

সিরিয়ায় পশ্চিমা ক্ষেপনাস্ত্র হামলার পর আসাদ এখন কোথায়?

সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের যৌথ বিমান হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন থাকে যে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ কোথায়? কেমন আছেন তিনি?
সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে টুইটারে পোস্ট করা ছয় সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট আসাদ হাতে একটি ব্রিফকেস নিয়ে মার্বেলের তৈরি মেঝের ওপর দিয়ে হেঁটে বড় একটি ঘরে প্রবেশ করেছেন।
সেটিকে প্রেসিডেন্টের অফিস হিসেব দাবী করা হচ্ছে।
সে সময় মি: আসাদ কালো স্যুট পরিহিত ছিলেন।
তবে সে ভিডিওতে প্রেসিডেন্ট আসাদের চেহারা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল না।
প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে বলা হচ্ছে ,হামলার পর সকালে প্রেসিডেন্ট আসাদ তাঁর অফিসে এসেছিলেন এবং এ ভিডিওটি সে সময় ধারণ করা হয়েছে।
বিবিসির সংবাদদাতা জানাচ্ছেন, মিসাইল হামলার পর সকালে দামেস্কের রাস্তা অন্যান্য দিনের মতোই ব্যস্ত ছিল।
শহরের বিভিন্ন জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশিচৌকিগুলো অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে ছিল। অন্যান্য দিনের মতো কড়াকড়ি ছিল না।
দোকানপাট যথারীতি খুলেছে এবং মানুষজন তাদের কাজে গিয়েছে। দামেস্ক শহরের কেন্দ্রস্থলে সিরিয়ান টেলিভিশন ভবনের সামনে বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছে।
তাঁরা সিরিয়া, সেনাবাহিনী এবং প্রেসিডেন্ট আসাদের পক্ষে শ্লোগান দিয়েছেন।
তাঁরা বলেছেন, ডেনাল্ড ট্রাম্পের ভয়ে তারা ভীত নন এবং কোন অবস্থাতে সিরিয়ার সেনাবাহিনী এবং বাশার আল আসাদের প্রতি তাদের সমর্থন যাবে না।
মিসাইল হামলা চালানোর পরে প্রথম প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ জানিয়েছেন, এর ফলে সিরিয়ার মানুষ সন্ত্রাসবাদ শেষ করতে আরও বদ্ধপরিকর হয়ে উঠবেন।
প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে টুইট করে জানানো হয়েছে, "এই হামলার পরে সিরিয়া এবং সেখানকার নাগরিকরা দেশের প্রতিটি ইঞ্চি থেকে সন্ত্রাসবাদকে ধ্বংস করতে আরও বদ্ধপরিকর হয়ে উঠবে।"
ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে এক টেলিফোন-বার্তায় বাশার আল আসাদ এই মন্তব্য করেন বলে জানানো হয়েছে তাঁর দপ্তরের টুইট অ্যাকাউন্ট থেকে।
মি. আসাদ এই অভিযোগও করেছেন, পশ্চিমা দেশগুলি সিরিয়াতে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন যোগাচ্ছে।
অন্যদিকে, মি. রুহানি ওই টেলিফোন বার্তার সময়েই সিরিয়ার প্রতি আবারও ইরানের পূর্ণ সমর্থনের কথা উল্লেখ করেন বলে দাবী করা হয়েছে ওই টুইট বার্তায়।
শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খামেনির সঙ্গে এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সিরিয়ার ওপরে আজ ভোরের হামলার নিন্দা করেছেন।
"মৃত্যু আর ধ্বংস ছাড়া মধ্য প্রাচ্যে মার্কিন হামলার অন্য কোনও ফল হবে না। এই হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের উপস্থিতির স্বপক্ষে যুক্তি তৈরি করতে চেয়েছে পশ্চিমা শক্তিগুলি," মন্তব্য মি. রুহানির।
সিরিয়ায় মি. আসাদের সরকারকে ইরান সৈন্য এবং অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে বলে মনে করা হয়।
পশ্চিমা মিসাইল হামলা যে সিরিয়ায় বিশেষ কোনও প্রভাবই ফেলতে পারে নি, তা প্রমাণ করার জন্য একদিকে যেমন প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে একটি ছোট্ট ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, তেমনই দামেস্ক-এর রাস্তায় নেমে এসেছেন বহু মানুষ।
এঁদের হাতে রয়েছে সিরিয়ার পতাকা আর প্রেসিডেন্ট আসাদের ছবি।
গাড়িতে চেপে তারা পতাকা নাড়াতে নাড়াতে যাচ্ছেন।
আবার সামরিক পোশাক পরিহিত পুরুষ ও নারীদেরও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে উল্লাস করতে দেখা যাচ্ছে।
তবে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিরাশ সিরিয়ান বিদ্রোহীরা।
সিরিয়ার আসাদ বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি আশা করেছিল, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সিরিয়ার সরকারী বাহিনী যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কিন্তু এখনও পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, তাতে অন্তত একজন বিদ্রোহী নেতা মুহাম্মদ আলাউশ এই পশ্চিমা ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে গুরুত্ব দিতেই নারাজ।
তিনি বলেছেন, মিসাইলগুলো 'অপরাধের সরঞ্জামের ওপরে আঘাত হেনেছে - কিন্তু পেছনে থাকা অপরাধীকে নয়।"

সিরিয়ায় হামলা কি আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ?

যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন-ফ্রান্স এই হামলা চালিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া
সিরিয়ায় একযোগে যে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন-ফ্রান্স, আন্তর্জাতিক আইনের চোখে তার বৈধতা কতটা? এর পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি বিশ্লেষণ করেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক মার্ক ওয়েলার:
এর পক্ষে দেশ তিনটি যেসব যুক্তি দেখাচ্ছে, তা প্রধানত জোর দিচ্ছে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার ওপর। তারা বলছে, এই হামলার লক্ষ্য প্রেসিডেন্ট আসাদের রাসায়নিক অস্ত্রের মওজুদ ধ্বংস করা এবং সিরিয়ায় বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে এরকম রাসায়নিক হামলা প্রতিরোধ করা।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে যুক্তি দেখাচ্ছেন যে ব্রিটেন সবসময় বিশ্বের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। এটা ব্রিটেন করেছে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ এবং সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থে।
কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে বিচার করলে, এসব যুক্তি কিন্তু বিশ্বকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় জাতিসংঘ সনদ গৃহীত হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে।
জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, কোন দেশ আত্মরক্ষার্থে এবং কোন জনগোষ্ঠী, যারা নির্মূল হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে, তাদের রক্ষায় সামরিক বল প্রয়োগ করতে পারে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার মত বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনেও বল প্রয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটা হতে হবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন সাপেক্ষে।
তবে জাতিসংঘ সনদের এই ধারাটি কেবল ব্যবহার করা যাবে যখন কোন দেশ, যার বিরুদ্ধে সত্যিকারের বা আসন্ন হুমকি আছে, তার নিরাপত্তা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা চাল হিসেবে এটিকে যেন ব্যবহার করা না যায়, সেই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা আছে জাতিসংঘের সনদে।
সিরিয়ায় হামলা প্রশ্নে একমত হতে পারছে না নিরাপত্তা পরিষদ
কাজেই ১৯৪৫ সালের জাতিসংঘ সনদ পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিশোধ হিসেবে সামরিক বল প্রয়োগ বা কোন দেশকে 'শিক্ষা দেয়ার' জন্য সামরিক হামলা চালানো যায় না। 'প্রতিশোধমূলক' ব্যবস্থা তো নীতিগতভাবেই বেআইনি। তবে সেটাকে মেনে নেয়া যায় যদি তার লক্ষ্য হয় কোন দেশকে আন্তর্জাতিক আইন-কানুন মানতে বাধ্য করা।
১৯৮১ সালে ইসরায়েল যখন ইরাকের পারমাণবিক চুল্লীতে হামলা চালিয়ে সেটি ধ্বংস করে দেয়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কিন্তু তার নিন্দা করেছিল এই কারণেই। ইসরায়েলের যুক্তি ছিল এই পারমাণবিক চুল্লী ব্যবহার করে ভবিষ্যতে 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' তৈরি করা হতে পারে। কেনিয়া এবং তাঞ্জানিয়ার মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলার জবাবে ১৯৯৮ সালে সুদানের এক 'কথিত রাসায়নিক অস্ত্র কারখানায়' যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেয়। সেটারও নিন্দা করেছিল জাতিসংঘ।
যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন-ফ্রান্স যুক্তি দিচ্ছে যে রাসায়নিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে সিরিয়াকে বাধ্য করতে তারা এই বিমান হামলা চালাচ্ছে। ২০১৩ সালে সিরিয়া রাসায়নিক অস্ত্র নিরোধ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সনদে সই করে।
কিন্তু এই সনদে সই করার পরও সিরিয়া তা লঙ্ঘন করে চলেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
সিরিয়ায় এসব ঘটনা কিভাবে অর্গেনাইজেশন ফর দ্য প্রহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপনস (ওপিসিডাব্লিউ) তদন্ত করবে, তা নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরোধ দেখা দেয়। তদন্তের ব্যাপারে রাশিয়ার প্রস্তাবে আপত্তি জানায় পশ্চিমা দেশগুলি। আর পশ্চিমা দেশগুলির প্রস্তাবে ভেটো দেয় রাশিয়া। ফলে এ নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটা অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।
হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের এই কথিত 'রাসায়নিক অস্ত্র গবেষণা স্থাপনা'
ঠিক এরকম একটা অবস্থায় নিরাপত্তা পরিষদের তিন সদস্য, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং ফ্রান্স যুক্তি দিচ্ছে যে, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সিরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন পাওয়ার কোন বাস্তব সম্ভাবনা নেই।
এ অবস্থায় সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে তারা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজটিই করছেন। সেই সঙ্গে রাসায়নিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞাটি কার্যকর করছেন।
কিন্তু এই যুক্তিটি যেন ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের যুক্তিটিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদ ইরাকের ওপর কিছু অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই তখন যুদ্ধে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন এবং আর কিছু মিত্র দেশ।
এবার যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন-ফ্রান্স সিরিয়ার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নিয়েছে, তাকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করে রাশিয়া। অন্যদিকে জাতিসংঘ মহাসচিবও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে নিরাপত্তা পরিষদের মূখ্য ভূমিকাকে সবার শ্রদ্ধা জানাতে হবে।

কোনও অশুভ শক্তি যেন ক্ষমতায় আসতে না পারে: প্রধানমন্ত্রী

নববর্ষে গণভবনে বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (ছবি: ফোকাস বাংলা)
উৎসব উদযাপনে যত বাধাই আসুক, বাঙালি কখনও কোনও বাধা মানে না বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা বাঙালি, বাংলাদেশ আমাদের দেশ এবং বাংলা আমার ভাষা। বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্য আমাদের সর্বদা স্মরণ রাখতে হবে। ফলে কোনও অশুভ শক্তি যেন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে, এ জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’ শনিবার (১৪ এপ্রিল) সকালে  গণভবনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাংলা নববর্ষ ১৪২৫-এর শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশে-বিদেশের সব বাঙালিকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশে নববর্ষ উদযাপন একটি সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসবটা ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে সবাই একাত্ম হয়ে একত্রে উদযাপন করে। এমনকি প্রবাসে বসবাসকারী বাঙালিরাও উদযাপন করে। আমাদের সরকারি, বেসরকারি পর্যায়ে, সাধারণ জনগণ সবাই উৎসবটা উদযাপন করেন। এমনকি আমাদের একদম গ্রাম পর্যায় পর্যন্তও এ উৎসব উদযাপন হয়। কারণ, এখানে সবাই খুব মন খুলে একাত্ম হয়ে উদযাপন করতে পারে। সেই সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে। সব দেশেই নববর্ষের অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র এই উপমহাদেশে শুধু বাংলাদেশ। কাজেই এখানে নববর্ষের উৎসব এক ভিন্নমাত্রা লাভ করে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি, বাংলায় হাসি, বাংলায় কাঁদি, বাংলায় জীবনচর্চা করি।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সবাই মন খুলে একাত্ম হয়ে যেন এ উৎসব পালন করতে পারে, সেজন্য  বৈশাখী ভাতার ব্যবস্থা করেছে সরকার। সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে এখন এ ভাতা চালু হয়েছে।’
দেশে অতীতে বর্ষবরণ উৎসবে নানারকম প্রতিবন্ধকতা থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ষড়যন্ত্র ছিল। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের অনেককেও বাঙালির বর্ষবরণে বাধা দিতে দেখা গেছে।’ তিনি বলেন, ‘১৯৯২ সালে আমরা ১৪০০ বঙ্গাব্দকে বরণ করতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু সেখানে তৎকালীন খালেদা জিয়া সরকার বাধা দেয়। আমরা কবি সুফিয়া কামালকে নিয়ে সেসব বাধা উপেক্ষা করে রমনা পার্কে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নতুন শতককে বরণ করি।’
এর আগে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ফুলের তোড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান। সাম্যবাদী দলের নেতা দিলীপ বড়ুয়া তার দল এবং ১৪ দলীয় জোটের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, মহিলা আওয়ামী লীগ, ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন, যুব লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান।
অনুষ্ঠানে বাঙালি ঐতিহ্যপূর্ণ খাবার মিঠাই, মোয়া, মুড়ি-মুড়কি, মুড়লি, কদমা, জিলেপি দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়। সূত্র: বাসস

সিরিয়ায় হামলাকারীরা অপরাধী; ওদের পরাজয় নিশ্চিত: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

  • ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
    ইরানের সর্বোচ্চ নেতা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী সিরিয়ায় আজ ভোরের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ইরাক ও আফগানিস্তানের মত সিরিয়ায় এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা নিশ্চিতভাবে পরাজিত হবে। ইরান অতীতের মতো এখনও প্রতিরোধ সংগ্রামীদের পাশে রয়েছে বলে তিনি জানান।  
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন হচ্ছেন অপরাধী। আজ (শনিবার) রাজধানী তেহরানে দেশের পদস্থ কর্মকর্তা ও মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আরও বলেছেন, মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমা কোনো কোনো সরকার ঔপনিবেশিক ও আন্তর্জাতিক একনায়কতান্ত্রিক নীতিমালার আলোকে কাজ করছে। কিন্তু ডিক্টেটর বা একনায়করা বিশ্বের কোথাও সফল হবে না এবং মার্কিন সরকারও এ অঞ্চলে তার লক্ষ্যগুলো অর্জনে সুনিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হবে। 
আয়াতুল্লাহিল উজমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য তুলে ধরেছেন যেখানে ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে সাত ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও কোনো কিছুই পায়নি। যত অর্থই মার্কিন সরকার মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয় করুক না কেন ভবিষ্যতেও তারা সেখানে কিছুই পাবে না বলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা সতর্ক করে দেন।  
তিনি বলেন, মার্কিন সরকারের লক্ষ্য কেবল সিরিয়া, ইরাক ও আফগানিস্তান নয়, আসলে তারা মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করছে। তাই মুসলিম সরকারগুলোর উচিত নয় মার্কিন ও আগ্রাসী কোনো কোনো পশ্চিমা সরকারের লক্ষ্যগুলোর সহযোগী হওয়া।
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী আরও বলেছেন, সিরিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের উপস্থিতির কারণ হল জুলুমের মোকাবেলায় গড়ে-ওঠা প্রতিরোধ সংগ্রামকে সহায়তা দেয়া।  আর  এসব সহায়তা পেয়ে সিরিয় সেনারা সাহসিকতার সঙ্গে সন্ত্রাসীদের পরাজয় ঘটাতে সক্ষম হয়েছে যদিও ঐসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমাদের ও সৌদি সরকারের মত তাদের অনুচর সরকারগুলোর হাতে।   
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলেই কোনো মজলুম যদি সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয় ইরান সেখানে হাজির হবে এবং মজলুম ফিলিস্তিনি জাতির প্রতি ইসলামী ইরানের সমর্থনের দর্শনও হচ্ছে এটাই।
তিনি এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, মজলুম ফিলিস্তিনি জাতি প্রতিরোধ সংগ্রামের সুবাদে আজ শক্তিশালী ফিলিস্তিনে পরিণত হয়েছে এবং নিঃসন্দেহে ইহুদিবাদী দখলদারদের ওপর তাদের বিজয় ঘটবে ও ফিলিস্তিন তার প্রকৃত মালিক ফিলিস্তিনিদের কাছেই ফিরে আসবে।

৭১ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে সিরিয়া: রাশিয়া

  • ৭১ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে সিরিয়া: রাশিয়া
আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স সিরিয়ায় ১০৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্যে ৭১টি ক্ষেপণাস্ত্রকে ভূপাতিত করেছে সিরিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। রুশ সেনাবাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তা সের্গেই রুদসকই মস্কোয় আজ (শনিবার) এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
এর আগে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রিয়া নভোস্তি জানিয়েছিল, যুদ্ধজাহাজ ও বিমান থেকে আমেরিকা ও তার মিত্ররা সিরিয়ার সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে একশ'রও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে এবং এর উল্লেখযোগ্য অংশ ভূপাতিত করেছে সিরিয়ার  ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইউনিট।  ওই বিবৃতির মাধ্যমে রাশিয়া এটাও পরিষ্কার করেছে যে, ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিতের ঘটনায় রুশ সেনারা জড়িত নয়।
সিরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড বলেছে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ বলেছে, সিরিয়া সাফল্যের সঙ্গে ত্রিদেশীয় আগ্রাসন মোকাবেলা করেছে।

'অজেয় টোমাহক' ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করায় দামেস্কে আনন্দ মিছিল

  • ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করায় আনন্দ প্রকাশ করছেন দামেস্কের নাগরিকরা
    ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করায় আনন্দ প্রকাশ করছেন দামেস্কের নাগরিকরা
সিরিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ছোঁড়া ৭১টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার পর সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের নাগরিকরা আনন্দ মিছিল করেছেন। আমেরিকার কথিত “অজেয় টোমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র’ ভূপাতিত করার পর এই আনন্দ মিছিল করেন তারা। মিছিলে অংশ নেয়া লোকজন তাদের দেশের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন প্রতিহত করা অব্যাহত রাখারও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শনিবার সিরিয়ার স্থানীয় সময় ভোর চারটায় আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স সিরিয়ার বিভিন্ন সামরিক এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। তারা মোট ১০৩টি ক্রুজ ও আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর মধ্যে সিরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইউনিট ৭১টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়।
আনন্দ মিছিলে দামেস্কের নাগরিকরা
কোনো কোনো সূত্রে জানা গেছে, শুধু রাজধানী দামেস্কের আকাশ থেকে ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার খবর নিশ্চিত করেছে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তবে পেন্টাগন তা অস্বীকার করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলাকে সফল বলে দাবি করেছেন।
এদিকে, সিরিয়ার লোকজন ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার বিষয়ে আনন্দ মিছিল করলেও একইসঙ্গে তারা মার্কিন হামলার প্রতিবাদ করেছেন। জাতীয় পতাকা নিয়ে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিলে যোগ দেন। এসময় তারা সিরিয়ায় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে স্লোগান দেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার মিত্ররা সিরিয়ার ওপর অপরাধমূলক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে বলে বিক্ষোভ দেখান।

সড়ক দুর্ঘটনার গ্লানি অঙ্গ হারিয়ে পঙ্গু ওরা by হাফিজ মুহাম্মদ

সড়কে চলছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় যোগ হচ্ছে শত শত মানুষের নাম। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন দেশে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৬৪ জন। আহতের সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি। আহতদের বেশিরভাগকেই বরণ করতে হয় আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব। স্বাভাবিক কর্মক্ষম অবস্থায় তারা আর কখনো ফিরতে পারেন না। শুধু সড়ক দুর্ঘটনার কারণেই বাংলাদেশকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানই ভয়ঙ্কর সব তথ্য দিয়েছে। তারা বলেছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিরূপণ করা গেলেও যারা দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যান, তাদের হিসাব কেউ রাখে না। দেশে প্রতিদিন এত সড়ক দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে তেমন কোনো প্রভাব পড়তে দেখা যায় না। ছোটখাটো দুর্ঘটনা নিয়ে কোনো আলোচনা-সমালোচনা তেমন হয় না। তবে গত সপ্তাহে রাজধানীর কাওরানবাজারে দুই বাসের রেশারেশিতে হাত হারানো তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের দুর্ঘটনা মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। যানবাহন এবং সড়কের করুণ পরিস্থিতি ফুটে উঠছে সেদিনকার এ দুর্ঘটনাতে। শরীরের একটি মূল অঙ্গ হারিয়ে টগবগে তরুণ রাজিবকে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়। সেদিনকার দুই বাসের মাঝে আটকে রাজীবের বিচ্ছিন্ন এক হাত ঝুলতে দেখা যায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে। যে ছবি দেখে টনক নড়ে সরকার ও দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের। রাজিবের চিকিৎসা নিয়ে হাইকোর্টে একটি রুলে জরিমানার আদেশও এসেছে। এর আগে গত মাসে রংপুরের মহাসড়কে লোহা বোঝাই ট্রাক উল্টে ১০ শ্রমিক নিহত হন। তখনও সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে হইচই পড়ে যায়। এসব দুর্ঘটনা কিছুদিন আলোচনায় থাকলেও মানুষ আবার চুপসে যায়।
বাংলাদেশের সড়ক এখন মৃত্যুপুরী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর প্রতিবেদনই তা ফুটে উঠেছে। তাদের রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার। এ রিপোর্টের তথ্যমতে দিনে প্রাণহানি ঘটে ৬৪ থেকে ৬৫ জনের। ডব্লিউএইচও আরও বলেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বিশাল অঙ্কের। তাদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটিতে ক্ষতি হয় মোট জিডিপির ১ দশমিক ৬ ভাগ। আর বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ যায় ১২ হাজারের অধিক। আহতের সংখ্যা এর থেকে আরো চার-পাঁচ গুণ বেশি। তাদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯২টি দেশের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯০তম।
সেন্টার ফর ইনজ্যুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিচার্স বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) তাদের গবেষণায় বলেছে, দেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন ৬৪ জন। সর্বশেষ জরিপ বলছে, ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ১৬৬ জন। দুর্ঘটনায় নিহতের মধ্যে ১৪টি শিশু এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হচ্ছে ৫০ জন। সড়কে দুর্ঘটনায় পঙ্গুদের সংখ্যা আলাদাভাবে উল্লেখ করেনি। তবে বাংলাদেশে বিভিন্ন অপঘাতে পঙ্গুত্ববরণ করেন ৬৬০ জন এবং ৩০০ মানুষ নিহত হন বলে জানান। সিআইপিআরবি তাদের জরিপে সড়ক দুর্ঘটনার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে। সেগুলো হচ্ছে চালকদের বেপরোয়া গতি, প্রতিযোগিতা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতাই দায়ী। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই)। তারা প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি গবেষণা প্রকাশ করে। আর এ কাজে সড়ক দুর্ঘটনায় পুলিশের তথ্য এবং পত্রিকায় প্রকাশিত দুর্ঘটনার প্রতিবেদন নিয়েই মূলত তারা জরিপ প্রকাশ করে। তাদের মতে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১১ থেকে ১২ হাজার। ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ করে এআরআই বলেছে, দেশে ৫৩ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। দুর্ঘটনার ৩৭ ভাগের কারণ হচ্ছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও মাত্রাতিরিক্ত গতি। তাদের গবেষণা আরো বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশই ঘটছে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে। আর এ দুর্ঘটনার ৭৪ ভাগই হয় শুধু রাজধানী ঢাকায়। দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরে এমআরআই বলেছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর জিডিপির ২ ভাগ হারাতে হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের মোট জিডিপি ১৭ লাখ কোটি টাকা। এর দুই ভাগ হয় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। তবে এই ক্ষতি বাস্তবে আরো অনেক বেশি হবে বলেও তারা মনে করেন। কেননা দুর্ঘটনার ১০০ ভাগ পরিসংখ্যান কেউ তুলে আনতে পারে না।
সরকারিভাবে বাংলাদেশে দুর্ঘটনার হিসাব রাখে পুলিশ বিভাগ। এর বাইরে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এবং ফায়ার সার্ভিস মাঝে দুই একটি জরিপ পরিচালনা করে। পুলিশের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যায় মাত্র আড়াই থেকে তিন হাজার। ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তারা এখনো প্রকাশ করেনি। তবে ২০১৫ সালে ২ হাজার ৪০০ জন এবং ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১০০ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে পুলিশের বিগত দশ বছরের হিসাবে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস পেয়েছে। যা বেসরকারি তথ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। এসব গবেষণার বাহিরে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি, নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এবং সড়ক দুঘর্টনার সঠিক কারণ উদ্ঘাটন নিয়ে গবেষণা করেছে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক।
আর বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০১৭ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন। যা দিনে ২০ জন। আর আহত হয়েছে ১৬ হাজার ১৯৩ জন। সংগঠনটির ২০১৬ সালের হিসাবের তুলনায় ২০১৭ সালে বছর ২২ দশমিক ২০ ভাগ প্রাণহানি বেড়েছে।
নিরাপদ সড়ক চাই নিসচার হিসাবে ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৫ হাজার ৬৪৫ জন। দিনে নিহতের সংখ্যা ১৫ জনের অধিক। তাদের হিসাবে ২০১৬ সালের চেয়ে নিহতের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার বেড়েছে।
এদিকে সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা নিয়ে যৌথভাবে একটি গবেষণা পরিচালনা করছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক ও পিপিআরসি। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুর্ঘটনার ২৮ ভাগ ঘটেছে মহাসড়কে গড়ে ওঠা বাজারে, ১৮ ভাগ সড়কের মোড়ে। তাদের রিপোর্টে দুর্ঘটনার জন্য চালকের বেপরোয়া যান চালানো, বেপরোয়া গাড়ি চালানো ড্রাইভারদের শাস্তি না হওয়া, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, চালকের প্রশিক্ষণের অভাব, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার অভাব, পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও আইনি দুর্বলতাসহ নয়টি কারণকে দায়ী করা হয়েছে। তাদের এ গবেষণায় আরো দেখা বলা হয়েছে, দেশের মহাসড়কগুলোয় মোট ২০৯টি ব্ল্যাকস্পট রয়েছে। আর এই ২০৯টি স্থানের ৫৫ কিলোমিটারজুড়েই দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি।
প্রতিদিন এত সংখ্যক দুর্ঘটনার পরেও বেসরকারি সংস্থাগুলো বলেছে, তাদের হিসাব থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা অনেক বেশি হবে। কেননা তারা যেসব সূত্র থেকে তথ্য নিয়েছেন তার বাইরেও দুর্ঘটনার তথ্য বাদ পড়ে যায়। সেসব দুর্ঘটনার খবর পুলিশের হিসাবে কিংবা পত্রিকায় আসে না। যে কারণে প্রকৃত সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা আর নিরূপণ করা যায় না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনিস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার বলেন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে সাধারণ জনগণ, বাস মালিক, পুলিশ ও বাস কেউ নিয়মের মধ্যে আসে না। বর্তমানে একটি মৎসল অবস্থায় আছে। এক কথায় সড়কে অরাকজতা চলছে। আমাদের দেশে দুর্ঘটনার পরিমাণ এর থেকেও আরো বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তুলনামূলকভাবে তা কমই হয়। সড়কে চলতে গেলে দেখবেন একটি গাড়ির সঙ্গে অন্যটি ঘষাঘষি করে, ওভারটেকিংয়ে প্রতিযোগিতায় চলে। বাংলাদেশে সবাই কথা বলতে পারে কেউ কাজের কাজ করে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতিদিন কত সংখ্যক পঙ্গুত্ব বরণ করেন তার কোনো পরিসংখ্যান নেই জানিয়ে বুয়েটের এ অধ্যাপক বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশে নিহতের পরিসংখ্যানটাই স্টান্ডার্ড নয়। জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী দুর্ঘটনায় আহত একজন ব্যক্তিকে ৩০ দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ রাখতে হয়। এরমধ্যে সে মারা গেছে নাকি পঙ্গু অথবা সুস্থ হয়েছে তা রেকর্ড করতে হয়। যারা আহত হন তাদের একটা পরিসংখ্যান থাকলেও সেটাও শতভাগ ঠিক নয়। সেখানে পঙ্গুত্বর সংখ্যা কেউ বলতে পারছে না। তিনি মনে করেন, দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোয় যথাযথ বরাদ্দ থাকলে তা নিরূপণ করা সম্ভব।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রায় ৫০টির অধিক কারণ রয়েছে। সড়কে প্রতিবছর আমাদের যে পরিমাণ মানুষের জীবনহানী ঘটে তার দ্বিগুণেরও বেশি পঙ্গুত্ববরণ করেন। এ কারণে আমাদের জিডিপির প্রায় দুই ভাগ ক্ষতি হয়। ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে দরকার চালকদের সঠিক ট্রেনিং। তাদেরকে ঠিকভাবে ট্রেনিং দেয়া হলে তারা সঠিকভাবেই লাইসেন্স পেত। তাদের ট্রেনিং নেই বলে তারা সঠিকভাবে লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে না। আর এ কারণেই প্রতিদিন দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন নিবন্ধিত গাড়ি আছে ৩৩ লাখ অথচ সেখানে নিবন্ধিত চালকের সংখ্যা মাত্র ১৩ লাখ। ২০ লাখ চালকই নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চালায়। যে কারণে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। এরপরে আমাদের পথচারী সাধারণ মানুষ যারা রয়েছেন তারাও জানেন না সড়ক কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। রাস্তায় যে সতর্কতার সঙ্গে হাঁটা-চলা করতে হবে, রাস্তা পাড়ি দিতে হবে, সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে- এটা তাদের মধ্যে দেখা যায় না।

সিরিয়ায় হামলার পরিণতি ভোগ করতে হবে: আমেরিকায় নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত

সিরিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
আমেরিকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আনাতোলি অ্যান্তানভ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সিরিয়ায় সমন্বিত হামলার জন্য আমেরিকা ও তার মিত্রদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। 
তিনি গতকাল (শুক্রবার) রাতে এক বিবৃতিতে বলেছেন, সিরিয়ায় হামলার জন্য রাশিয়া হুমকি অনুভব করছে এবং মস্কো মনে করে সিরিয়ায় যে রাসায়নিক হামলার কথা বলে সামরিক আগ্রাসন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা ছিল সাজানো নাটক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “পূর্ব-পরিকল্পিত চিত্রের বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং আমরা এতে হুমকি অনুভব করছি। আমরা সতর্ক করছি যে, এ ধরনের হামলার জন্য পরিণতি ভোগ করতে হবে।” অ্যান্তানভ বলেন, “এ হামলার সমস্ত দায়-দায়িত্ব নিতে হবে ওয়াশিংটন, লন্ডন ও প্যারিসকে।”
রাশিয়ার বার বার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ায় সামরিক হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। হামলার আগে সিরিয়ায় মোতায়েন রুশ বাহিনীকে কোনো রকমের আগাম খবর দেয়া হয় নি।  
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করছেন, সিরিয়া যাতে রাসায়নিক অস্ত্রের উৎপাদন, বিস্তার ও ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য এই হামলা। এ বক্তব্যের জবাবে রুশ রাষ্ট্রদূত অ্যান্তানভ বলেন, আমেরিকা হচ্ছে রাসায়নিক অস্ত্রের সবচেয়ে বড় মজুদকারী দেশ এবং অন্যকে দোষারোপ করার নৈতিক কোনো অধিকার তার নেই।
রাসায়নিক হামলার ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য সিরিয়ায় যখন আন্তর্জাতিক তদন্ত দল পৌঁছেছে তার কিছুক্ষণ পরই এ হামলা হলো। এর অর্থ হলো আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স রাসায়নিক হামলার অভিযোগ করছে কিন্তু আন্তর্জাতিক তদন্তের কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না।
আমেরিকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আনাতোলি অ্যান্তানভ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ইউএনএইচসিআর সমঝোতা স্মারক সই: মিয়ানমারের পরিবেশ সহায়ক হওয়ার পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

মিয়ানমারের পরিবেশ সহায়ক হওয়ার পরই রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন শুরু করার বিষয়ে একটি সমঝোতা সই করেছে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা, ইউএনএইচসিআর। গতকাল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় স্থানীয় সময় সকালে এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করে দু’পক্ষ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক এতে সই করেন। সমঝোতা স্মারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শরণার্থীদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনে পারস্পরিক সহযোগিতার একটি কাঠামো প্রস্তুত করা হয়েছে।
ইউএনএইচসিআর এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, গত আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। আগে থেকেই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে রয়েছে আনুমানিক ২ লাখ রোহিঙ্গা। বিগত দশকগুলোতে দফায় দফায় তারা বাংলাদেশে ঢুকেছে। এসব শরণার্থীর জন্য আতিথেয়তা এবং তাদের সুরক্ষা ও সহাযোগিতা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও দেশের জনগণের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানায় ইউএনএইচসিআর। 
ইউএনএইচসিআর, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় কোনো চুক্তি না থাকায়, ইউএনএইচসিআর উভয় দেশের সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পৃথক দুটো সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে সংলাপের চেষ্টা করছে সংস্থাটি। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে ইউএনএইচসিআর নিশ্চিত হতে চায়- ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন যেন স্বেচ্ছা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে হয়।
মিয়ানমারের পরিবেশ এখনও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ, মর্যাদার এবং টেকসই করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক নয়। এমন পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের। আর সে লক্ষ্যে অবশ্যই প্রয়োজনীয় মালপত্র সরবরাহ সহজতর করার অবকাঠামোগত কাজের প্রস্তুতি পর্যন্ত আটকে থাকলে হবে না।
বাংলাদেশে অবস্থানরত শরণার্থীরা বলেছে, মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার কথা ভাবার আগে, কয়েকটি বিষয়ে তারা সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি দেখতে চান। এর মধ্যে রয়েছে, তাদের বৈধ পরিচয়, নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা প্রাপ্তি এবং  রাখাইন রাজ্যে নিজেদের বাড়িঘরে মৌলিক অধিকার উপভোগ করতে পারার সুযোগ।
এই ভিটামাটি ছাড়ার পেছনে মূল কারণগুলো মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে বারবার মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। রাখাইন রাজ্য নিয়ে উপদেষ্টা কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এসব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
মিয়ানমার সরকার চাইলে একটি পদক্ষেপ এখনই নিতে পারে। সেটা হলো রাখাইন রাজ্যে শরণার্থীদের আদি আবাসের স্থানগুলোতে ইউএনএইচসিআর ও সংশ্লিষ্ট অন্য সংগঠনগুলোকে পূর্ণাঙ্গ ও অবাধ প্রবেশগম্যতা দেয়া। এতে করে সেখানকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে পারবে ইউএনএইচসিআর। শরণার্থীদের কাছে তাদের বাসস্থানের পরিবেশ নিয়ে তথ্য দিতে পারবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে আবারো ফেরত যাওয়ার সম্ভাব্য ঘটনা এবং শরণার্থীদের পুনরায় অঙ্গীভূত হওয়ার মতো পরিস্থিতিগুলোতে নজর রাখতে পারবে। আরেকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে, রাখাইন রাজ্যের মাঝামাঝি অঞ্চলের শহরগুলোতে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা শিথিল করা। এমন পদক্ষেপ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের মধ্যেও আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠতে সহায়ক হবে। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ  শরণার্থীদের কাছে এটা তুলে ধরতে পারবে যে স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের সরকার সংকল্পবদ্ধ।
ওদিকে, মিয়ানমারে জাতিসংঘের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, ইউএনডিপি ও ইউএনএইচসিআর একত্রে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে। রাখাইন রাজ্যে এসব সংস্থা এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।  
এই চুক্তির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শরণার্থীদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে একটি কাঠামো প্রস্তুত করা। স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং রাখাইন রাজ্যের সকল জনসাধারণকে মানবিক ও উন্নয়নমূলক সহায়তা দেয়া।

বৈশাখে ব্যস্ত ছিলেন যারা... by মো. নজরুল ইসলাম

ছাঁচ শিল্পীরা
মো. মতিউর রহমান, সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ): সাটুরিয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ছাঁচ তৈরির শিল্পীরা। ডিসেম্বর মাস থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বিভিন্ন মেলায় এ সাজ চাহিদা বেশি হওয়ায় রাতদিন কাজ করছে পরিবারের ছোট-বড় সবাই। বালিয়াটি ইউনিয়নের ভাটারা গ্রামে ৯ পরিবারের বণিক সদস্যরা পহেলা বৈশাখকে ঘিরে ছাঁচ তৈরিতে এ ব্যস্ত সময় পার করছে।
শুক্রবার ভাটারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ননী গোপাল বণিক গুড়ের বাতাসা তৈরি করছেন। সঙ্গে জোগান দিচ্ছেন স্ত্রী আলো রানী বণিক। চুলার মধ্যে আখের গুড় জাল করে একটি ছিদ্র পাত্র দিয়ে ঢেলে বড় বড় বাতাসা ছাঁচ তৈরি করছেন। এ বাতাসা বিন্নি দিয়ে খেতে খুবই মজা বলে জানান। প্রায় ৪০ বছর ধরে এ পেশায় জড়িত তিনি। ননী বণিক আরো জানান, খাঁটি আখের গুড় ছাড়া এ ছাঁচ বানানো যায় না। রাজশাহী থেকে ১ মণ খাঁটি গুড় কিনতে ২ হাজার ৭০০ টাকা লাগে। আর এক মণ গুড় দিয়ে ৩৫-৩৬ কেজি বাতাসা তৈরি হয়। মণে ১০০ টাকা লাভ করে বিভিন্ন জায়গায় পাইকারি বিক্রি মূল্যে ২৮ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। তবে এলাকার হাট-বাজারে আখের গুড়ে চিনি মেশানো থাকায় এ গুড় দিয়ে সাজ তৈরি করা যায় না বলে জানান তিনি।  
বাসুদেব বণিক তিনি চিনি দিয়ে তৈরি করছেন মুকুট, হাতি, ঘোড়া, মাছ, নৌকা, পাখি ও লিচুসহ বিভিন্ন সাজ। চিনি জাল করে কাঠের ফ্রেমে ঢেলে দিয়ে ৫ মিনিট পর তৈরি হচ্ছে এসব সাঁচ। সে জানায়, এক মণ চিনিতে ১ মণ ছাঁচ হয়। এতে ২ হাজার ৭০০ টাকা খরচ হয়। ১০০ টাকা লাভে পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয় ২৮ টাকা দরে। এসব ছাঁচ মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মধুপুর সখিপুর, গাজীপুর, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় পহেলা বৈশাখ চাহিদা থাকে। প্রতিদিন গড়ে এক মণ ছাঁচ তৈরি করা যায়। সে বাপ-দাদার আগের কাজ এখনো ধরে রেখেছেন বলে জানান। এ পেশা ছাড়া অন্য কোনো পেশা নেই তার। পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে এ সাঁচের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।
কথা হয়, শ্যামল বণিকের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বাধীনতার আগে ও পরে এই ভাটারা গ্রামে ৭৮২ পরিবার বণিক ছিল। তারা সবাই ওই সময় তাঁতের কাজ করতেন। বেশির ভাগ বণিক ভারতে চলে যাওয়ায় এখন মাত্র ৯টি পরিবার ছাঁচের পেশা ধরে রেখেছেন। বিশেষ করে বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে বেশি ছাঁচ বিক্রি হয়ে থাকে। বছরের চার মাস পুরোদমে সাঁচের অর্ডার পাই। বাকি মাসগুলো বসে বসে খেতে হয়।
দেবেশ বণিক, নীলকান্ত বণিক, গোবিন্দ বণিক ও কমল বণিক জানান, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমাদের এ ছাঁচ দেশের বাইরে রপ্তানি করা যেতে পারে। গ্যাসের ব্যবস্থা থাকলে এ ছাঁচ তৈরি করতে খরচ কম হতো। আমরা বিভিন্ন এনজিও থেকে টাকা নিয়ে এ সাঁচের ব্যবসা করে থাকি।
এ বিষয়ে বালিয়াটি ইউপি চেয়ারম্যান মো. রহুল আমীন বলেন, বাংলার কৃষ্টি কালচার এই বণিকরাই ধরে রেখেছেন। তারা বিভিন্ন মেলায় তাদের হাতের তৈরী ছাঁচ দিয়ে মেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। তাদের পৃষ্টপোষকতা করা গেলে আরো উন্নতি করতে পারবে বলে তিনি মনে করেন। 
মৃৎশিল্পীরা
জাবেদ ইকবাল, রংপুর ও রেজাউল করিম পান্না, বদরগঞ্জ: আর কয়েকদিন পরেই পহেলা বৈশাখ। বৈশাখী মেলায় পুতুল, বাসন, হাড়িপাতিলসহ নানা তৈজসপত্রের পসরা সাজাতে শেষ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় পার করছেন পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। আর এ সামগ্রী তৈরি করতে আগে থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে কুমোর মাটি। এসব সামগ্রী তৈরি করে রোদে শুকিয়ে খড় দিয়ে ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে। অনেকে আবার পোড়ানোর পর তৈরি পণ্যগুলোতে নিপুণ হাতে রংতুলি দিয়ে রঙ করছেন। এমনিই চিত্র দেখা গেছে রংপুরের কয়েকটি পালপাড়ায়। রোববার রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর পালপাড়ায় ঘুরে দেখা গেছে, পাল সম্প্রদায়ে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার বংশ পরম্পরায় এ কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। তারা সামনে বৈশাখী মেলায় মাটির তৈরি সামগ্রী তৈরি করতে বাড়ির সামনে মাটির স্তূপ করে রেখেছেন। ওই মাটি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ফুলদানি, ফুলের টব, হাড়িপাতিল, বাঘ, সিংহ, ব্যাঙ, বিভিন্ন সবজি, কলসসহ শিশুদের বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী। এসব সামগ্রী রোদে শুকানোর পর খড় দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে। পোড়ানোর পর রংতুলির আঁচড়ে রাঙ্গিয়ে তোলা হচ্ছে ওইসব সামগ্রী। সেখানে কথা হয় মৃৎশিল্পী রম্বিকা পাল ও জীবন কুমার পালের সঙ্গে। তারা বলেন, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন সামগ্রী বাজারে আসায় এ শিল্পের কদর আগের মতো নেই। এ পরও অনেকে বাপ-দাদার এ পেশাকে আকড়ে ধরে রেখেছে। তারা আরো বলেন, কয়েকদিন পরেই পহেলা বৈশাখ। বৈশাখী মেলায় এসব মাটির পণ্যের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। এ কারণে বছরের এ সময় আমাদের দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়। একই কথা বলেন, নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার চওড়াবাজার পালপাড়া গ্রামের মৃৎশিল্পী সুখদেব চন্দ্র পাল ও পুতুল চন্দ্র পাল।
মাটির তৈরি এসব সামগ্রী বিক্রেতা হানিফুল ইসলাম বলেন, আগের দিনে এসব জিনিসপত্রের অনেক চাহিদা ছিল। এখন এসব জিনিসপত্র মানুষ আর কিনতে চায় না। সবাই শুধু প্লাস্টিকসহ আধুনিক জিনিস চায়। এ কারণে এ পেশা ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
ক্রেতা আবুল হোসেন জানান, এক সময় মাটির তৈরি এসব পণ্য সংসারের অনেক কাজে লাগতো। কিন্তু প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন আধুনিক জিনিসপত্র বের হওয়ায় এখন আর এসব পণ্যের চাহিদা নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুর বিভাগে এক সময়ে পাল সম্প্রদায়ের লোকজন তৈজস জিনিসপত্র তৈরি করে হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা অর্চনা, বিভিন্ন মেলা, বারুনী ও হাট বাজারে বিক্রি করতো। কিন্তু প্লাস্টিকসহ আধুনিক বিভিন্ন সামগ্রী বাজারে আসায় এ শিল্প এখন মৃত প্রায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃৎশিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে এ শিল্প একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
বৈশাখী মেলাকে সামনে রেখে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ধনবাড়ীতে নিজেদের মাটির তৈরি জিনিসপত্রের পসরা সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। মেলার চাহিদা মেটাতে পৌর শহরের সেনবাড়ী পালপাড়া গ্রামের মৃৎশিল্পীরা তাদের মাটির তৈরি জিনিসপত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাত করতে পরিবারের সবাই দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে। তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে বিভিন্ন মাটির তৈরি খেলনার আকৃতি দিচ্ছেন।
সরজমিন পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীরা মাটি দিয়ে বিভিন্ন প্রকারের হাড়ি-পাতিল, কেউবা বিভিন্ন পশু-পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর আকৃতি তৈরিতে ব্যস্ত, কেউবা তুলি নিয়ে মনের মাধুরী দিয়ে রং দিচ্ছে। অনেকেই আবার কাঁচা মাটির খেলনাগুলো রোদে শুকাচ্ছে।
কথা হয় ধনবাড়ী উপজেলার মৃৎশিল্পী তুলসী পাল, উজ্জল পাল, নির্মল পাল, বাসনা পাল, অর্চনা পাল, রেখা পাল, বাণী পাল ও সন্ধ্যা রানী পালের সঙ্গে। তারা জানান- মাটির তৈরি এসব জিনিসপত্র ডিজাইন করা, রং করা, রোদে শুকানো, আগুনে পোড়ানোসহ বিভিন্ন কাজ করতে হচ্ছে।
পালপাড়ার গোবিন্দ পাল জানান- আমরা এ বছর হরিণ, গরু, ঘোড়া, হাতি, খরগোশ, উটপাখি, হাঁস, বক, টিয়া, গন্ডারসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণীর আকৃতি তৈরি করেছি। আমাদের উৎপাদিত মাটির পণ্যগুলো বিভিন্ন মার্কেটে সরববাহ করা হবে। একই এলাকার বয়োবৃদ্ধ সুমতি রানী পাল বলেন- আমরা এ বছর সোনালী রংয়ের পাতিল, ঢোল, মগ, কারি বল, জগ, লবণ বাটি, শালকি (বসনা), তরকারির বাটি তৈরি করেছি। এ ছাড়াও তৈরি করা হয়েছে মাটির সাধারণ ফুলের টব। আধুনিক নানা ধরনের খেলনাও। রাসায়নিক কোনো পদার্থ ছাড়াই তৈরি করা হয় মাটির এসব পণ্য। পণ্যের রং করা হয় প্রাকৃতিক উপায়ে। আর এসব রং সংগ্রহ করা হয় নানা ধরনের গাছের কষ থেকে। যাতে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না।

হত্যা রহস্যের কিনারা: সাদা রঙের স্মার্টফোনটিই কাল হয়েছিল মাহিদের by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

স্যামসাং ডুওস মডেলের সাদা রঙের স্মার্ট ফোন। এ ফোনটিই কাল হয়েছিলো শাহ্‌জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) অর্থনীতি বিভাগের ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী মাহিদ আল সালামের। মোবাইল আর টাকার জন্য ছিনতাইকারীরা ছুরির আঘাতে তার প্রাণ কেড়ে নেয়। তবে সে মোবাইল ফোনটি নিজেদের কবজায় রাখতে পারেনি ছিনতাইকারীরা। পুলিশ ঠিকই সেটি উদ্ধার করেছে। আর এর মধ্য দিয়ে বলতে গেলে পুরোই উন্মোচিত হয়েছে মাহিদ হত্যা রহস্য। তদন্তও অনেকটা শেষই হয়ে গেছে। এ মামলার সকল আসামিই এখন পুলিশের খাঁচায়। অপেক্ষা শুধু চার্জশিট জমা দেওয়ার। সবশেষে আটক হওয়া মোবাইল ব্যবসায়ী শুক্রবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন।
মাহিদ হত্যা মামলায় আসামী ছিলো ৪ জন। ৩ জনকে আগেই পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিলো। পলাতক থাকা অপর আসামি শাকিল গত সোমবার আদালতে আত্মসমর্পণ করে। আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে ওইদিনই পুলিশ তাকে রিমান্ডে নেয়। অপরদিকে আগে থেকে গ্রেপ্তার হওয়া মির্জা আতিককে এয়ারপোর্ট থানার অন্য একটি ছিনতাই মামলার আসামি হিসেবে বুধবার রিমান্ডে  নেয় পুলিশ। ওইদিনই দুই পেশাদার ছিনতাইকারী আতিক এবং শাকিলকে মুখোমুখি করা হয়। চতুর শাকিল প্রথমে পুরো ঘটনা অস্বীকার করে। কিন্তু পুলিশের জেরার মুখে বেশিক্ষণ টিকতে পারে না। এক পর্যায়ে ঘটনার বর্ননা দিতে থাকে। রহস্যের গেরো খুলতে শুরু করে এক এক করে। সেই জানায় কার কাছে রয়েছে ছিনতাইকৃত মোবাইলটি। জনৈক জসিমের কাছে মোবাইল ফোনটি রয়েছে জানালেও শাকিল কৌশলে জসিমের ঠিকানা জানি না বলে এড়িয়ে যায়। তবে পুলিশ বসে থাকার পাত্র নয়। তারা ঠিকই সন্ধান পায় জসিমের। মো. জসিম উদ্দিন একজন মোবাইল ব্যবসায় ী। সিলেট নগরীর বন্দরবাজারস্থ করিমউল্লাহ মার্কেটের ৩য় তলায় জসিম টেলিকম নামে তার মোবাইলের দোকানও রয়েছে। সে নগরীর শেখঘাট খুলিয়াটুলা নিলিমা-২২ নম্বর বাসার ইব্রাহীম আলীর ছেলে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) সহকারী উপ-কমিশনার (দক্ষিণ, অপরাধ) জ্যোতির্ময় সরকারের নেতৃত্বে জসিমের খোঁজে বের হয় পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে খুলিয়াপাড়া থেকে জসিমকে মোবাইলসহ আটক করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে জসিম উদ্দিন জানায়, ২৫শে মার্চ দিবাগত রাতে মির্জা আতিকের মাধ্যমে শাকিল তার কাছে  মোবাইলটি বিক্রি করে। ২৫শে মার্চ গভীর রাতে সুরমা নদীর উপরে কিন ব্রিজের দক্ষিণ পাশের অন্ধকার এক কোনে খুন হয়েছিলেন মাহিদ আল সালাম। পুলিশের সামনে তখন কোনো ক্লুই ছিলো না। তবে মাহিদকে যে রিকশার যাত্রী ছিলেন মাহিদ সে রিকশার পেছন দিকের একটি ছবিই পুলিশের সামনে রহস্য সন্ধানের দ্বার খুলে দিয়েছিল। সে ছবির সূত্র ধরে ওই রাতেই পুলিশ নগরীর আখালিয়া থেকে রিকশাচালক জয়নাল আবেদীন ভাণ্ডারীর সন্ধান পায়। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ছিনতাইকারীদের সম্পর্কে একটি ধারণা পায়। সে ধারণা থেকেই ২৬শে মার্চ ভোররাতে পুলিশ ঘেরাও দেয় পুরো সুরমার দক্ষিণ পারের ভার্থখলা এলাকা। দুপুরের দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে ওই এলাকায় আসে ভার্থখলা এলাকার সোয়াব মীর্জার ছেলে মীর্জা আতিক। মীর্জা আতিক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তায়েফ মুহাম্মদ রিপন। ঘাতক হিসেবে পুলিশ এদেরই সন্দেহ করছিলো। পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে মোটরসাইকেল ফেলে দৌড় দেয় আতিক ও রিপন। ঢুকে যায় ভার্থখলা কবরস্থানে। পুলিশ কবরস্থান ঘেরাও করে তাদের আটক করে। ২৮শে মার্চ রাত ১টার দিকে গ্রেপ্তার করা হয় আরো এক ছিনতাইকারী- দক্ষিণ সুরমার বারোখলার বাসিন্দা রাসেলকে। বেশ কিছুদিন লুকোচুরির পর ৯ই এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করে ভার্থখলার বাসিন্দা শাকিল আহমদ। এ শাকিলই মাহিদের শরীরের ছুরির আঘাত করেছিল। মাহিদ হত্যা রহস্য উন্মোচনে শুরু থেকেই নেতৃত্ব দেন এসএমপি’র এডিসি দক্ষিণ (অপরাধ) জ্যোতির্ময় সরকার। মানবজমিন-এর কথা হয় তার সঙ্গে। মাত্র ১৬/১৭ দিনের মধ্যে রহস্যের কিনার করতে পারায় তাকে বেশ সন্তুষ্টই মনে হলো। জানালেন, ক্লু-লেস এ মামলার সকল আসামিকেই ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি জানান, ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত দু’টি মোটরসাইকেল, ছুরি এবং ছিনতাইকৃত মোবাইলও উদ্ধার করা হয়েছে। মোটরসাইকেল দু’টির মালিক শাকিল ও রিপন। পুলিশের এ কর্মকর্তা বললেন, এখন দ্রুততম সময়ে চার্জশিট জমা দেয়া হবে।