Sunday, August 2, 2026

গত ২০২৪ সালে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী তাঁর ঘনিষ্ঠজনের হাতে খুন হয়েছেন

জাতিসংঘের প্রতিবেদনঃ গত ২০২৪ সালে বিশ্বের কোথাও না কোথাও প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী তাঁর ঘনিষ্ঠজনের হাতে খুন হয়েছেন। নিহত ৬০ শতাংশ নারী তাঁর সঙ্গী বা আত্মীয় যেমন বাবা, চাচা, মা ও ভাইদের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন। এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে গত ২৫ নভেম্বর ২০২৫ সোমবার জাতিসংঘের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে। সংস্থাটি নারী হত্যার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রগতি না হওয়ার নিন্দা জানিয়েছে।

নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূলে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় এবং জাতিসংঘ নারী সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর প্রায় ৫০ হাজার নারী ও কন্যাশিশুকে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যরা হত্যা করেছেন। ১১৭টি দেশের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, গত বছর প্রতিদিন গড়ে ১৩৭ জন নারী নিহত হয়েছেন।

এই সংখ্যা ২০২৩ সালে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে সামান্য কম। তবে এটি আসলে হত্যাকাণ্ড কমার বিষয়টি নির্দেশ করে না। কেননা, বিভিন্ন দেশে তথ্য সরবরাহের তারতম্যের কারণে এ পার্থক্য দেখা গেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড প্রতিবছর হাজার হাজার নারী ও মেয়ের জীবন কেড়ে নিচ্ছে এবং কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া হত্যার ঝুঁকির ক্ষেত্রে ঘরই নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থান।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়। তবে গত বছর আফ্রিকায় সর্বোচ্চসংখ্যক, প্রায় ২২ হাজার নারীকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

জাতিসংঘের নারীনীতি বিভাগের পরিচালক সারাহ হেন্ড্রিক্স বলেন, নারী হত্যা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি প্রায়ই ধারাবাহিক সহিংসতার একটি অংশ, যা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, হুমকি এবং অনলাইনসহ হয়রানি থেকে শুরু হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই নারী নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড থেকে মুক্ত নয়। ছবি: রয়টার্স

Saturday, August 1, 2026

একজন ইসরাইলি গাজায় থাকলেও অস্ত্র ছাড়বে না হামাস

ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস ও তাদের মিত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো একটি নিরস্ত্রীকরণ রোডম্যাপে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইলের পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার, পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে কার্যকর অগ্রগতি অপরিহার্য বলে জানানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক এ ঘোষণার পর বিভিন্ন মহলে হামাস সশস্ত্র প্রতিরোধ পুরোপুরি ত্যাগ করেছে এমন আলোচনা শুরু হলেও বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। হামাসের অবস্থান অনুযায়ী, তারা সরাসরি ইসরাইলের কাছে অস্ত্র সমর্পণে রাজি নয়। বরং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর কাছেই অস্ত্র হস্তান্তরের প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইসরাইল যদি গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার করে এবং সেখানে পুনর্গঠন কার্যক্রমে বাধা না দেয়, তাহলে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো ধাপে ধাপে ভারী অস্ত্র সংরক্ষণ ও নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। ব্যক্তিগত অস্ত্র নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ধীরে ধীরে গাজার প্রশাসনিক কাঠামোর কাছে হস্তান্তর করা হবে।

তবে এ পরিকল্পনার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করছে ইসরাইলের অবস্থানের ওপর। এখন পর্যন্ত ইসরাইলের পক্ষ থেকে গাজা থেকে পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার কিংবা পুনর্গঠনের জন্য কার্যকর কোনো ইতিবাচক সংকেত পাওয়া যায়নি।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ রয়েছে। হামাসের দাবি, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী তারা ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে নতুন কোনো হামলা চালায়নি এবং প্রশাসনিক দায়িত্বও জাতীয় প্রশাসনিক কমিটির কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। অপরদিকে, তাদের অভিযোগ, ইসরাইল যুদ্ধবিরতির নানা শর্ত লঙ্ঘন করেছে, গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়েছে এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

বিশ্লেষণে আরো বলা হয়েছে, হামাস বর্তমানে মূলত দুটি লক্ষ্য সামনে রেখে এই উদ্যোগ নিয়েছে—গাজার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা। তবে ইসরাইল যদি এসব শর্ত বাস্তবায়নে অগ্রসর না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আবারো সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও এ সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ঘিরে সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাত গাজার পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, হামাসের এই প্রস্তাবকে একদিকে গাজার মানবিক সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এর বাস্তবায়ন পুরোপুরি নির্ভর করবে ইসরাইলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ভবিষ্যৎ অগ্রগতির ওপর।

সূত্র: প্যালেস্টাইন ক্রনিকল

একজন ইসরাইলি গাজায় থাকলেও অস্ত্র ছাড়বে না হামাস

গাজা ছাড়তে ইসরায়েল কী রাজি, সংকটে নেতানিয়াহু

ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস গাজায় ধাপে ধাপে অস্ত্র সমর্পণে রাজি হয়েছে। তবে এর বিনিময়ে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নিয়ে দেশটির ভেতরে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দিয়েছে।

এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, অন্যদিকে নিজ সরকারের কট্টর ডানপন্থি জোটের বিরোধিতার মুখে কঠিন রাজনৈতিক সংকটে পড়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামাসের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসরায়েল এ চুক্তিতে সন্তুষ্ট। চুক্তি অনুযায়ী, হামাস ধাপে ধাপে অস্ত্র সমর্পণ করবে। একই সঙ্গে ইসরায়েল গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে এবং ধীরে ধীরে প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

তবে ইসরায়েল সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। শুক্রবার দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, হামাস প্রকৃত অর্থে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হয়েছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত গাজায় বর্তমান অবস্থান থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই।

এদিকে চুক্তির বিরোধিতা করে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি নেতারা প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, হামাসের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করা যাবে না। তার মতে, হামাসকে ছাড় দেওয়া মানে ভবিষ্যতে আরও বড় হামলার সুযোগ করে দেওয়া।

তিনি গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার এবং ফিলিস্তিনিদের এলাকা ছাড়তে উৎসাহিত করারও পক্ষে মত দেন।

একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট। তিনি বলেন, হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি সম্পূর্ণ ধ্বংস না হলে কোনো চুক্তিকেই সফল বলা যাবে না।

তার দাবি, প্রায় তিন বছর যুদ্ধ চললেও হামাস আবারও নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েলের জনমতের বড় একটি অংশ এখনো কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে ৮২ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

আরেকটি জরিপে ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, গাজায় কোনো নিরীহ মানুষ নেই। এছাড়া অনেক মন্ত্রী ও রাজনীতিক ইতোমধ্যে গাজায় নতুন করে ইহুদি বসতি স্থাপনেরও পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডালিয়া শেইন্ডলিনের মতে, নেতানিয়াহুর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী জাতীয় নির্বাচন। দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সংকটে পড়তে পারে। তাই তিনি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চাইবেন না, যাতে তার কট্টর ডানপন্থি জোট ভেঙে যায়।

শেইন্ডলিন বলেন, নেতানিয়াহু হয়তো সীমিত পরিসরে সেনাদের অবস্থান পরিবর্তনের মতো প্রতীকী পদক্ষেপ নিতে পারেন, তবে পুরো গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা খুবই কম।

তিনি মনে করেন, ইসরায়েল হয়তো ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে নির্ধারিত কিছু অবস্থানে ফিরে যেতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করবে না।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও চায়, হামাসের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা বাস্তবায়ন হোক। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েল যদি চুক্তি বাস্তবায়ন না করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত হতাশ হবেন।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যানের মতে, নেতানিয়াহু এখন অত্যন্ত কঠিন অবস্থায় রয়েছেন। তিনি যদি চুক্তির বিরোধিতা করেন, তাহলে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। আবার চুক্তি মেনে নিলে নিজের জোটের সমর্থন হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।

ইসরায়েলি পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক নিমরোদ গোরেনের মতে, নেতানিয়াহু হয়তো ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট রাখতে কূটনৈতিকভাবে ইতিবাচক বার্তা দেবেন এবং আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন। কিন্তু বাস্তবে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবেন—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। তার মতে, নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু বরং সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারেন।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত

এবার ফিলিস্তিনের গ্রামের ভেতরে ঢুকে মিছিল করল ইহুদিরা

অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুস-সংলগ্ন ফিলিস্তিনি গ্রাম তাল এবং সারার ভেতর দিয়ে আজ মিছিল করেছে একদল ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী। এ সময় তাদের সঙ্গে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইসরাইলি সেনাদের কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বসতি স্থাপনকারীরা গ্রাম দুটির ভেতরের রাস্তা ব্যবহার করে উসকানিমূলকভাবে হেঁটে যান। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের এমন উপস্থিতি ও তৎপরতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা।

মিছিল চলাকালে পশ্চিম তীরের তাল গ্রামের কাছে একটি কবরস্থানে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা।

তাণ্ডব চালিয়ে তারা মৃত ফিলিস্তিনিদের ওপর তৈরি স্মৃতিফলক ও পাথরের কাঠামো ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।

গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের ওই মিছিলে সরাসরি সুরক্ষা দিচ্ছিল ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। বসতি স্থাপনকারীদের তাণ্ডবের প্রতিবাদ করতে গেলে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে ইসরাইলি সেনারা।

এছাড়া, ফিলিস্তিনিদের ১২০ বছরের পুরোনো একটি বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরাইল। ধ্বংস করা এই বাড়ি ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা (নাকবা) দেওয়ার অন্তত ৪০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল।

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, তাদের নিজস্ব মাতৃভূমিতে ফিলিস্তিনি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাচীন সংস্কৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলার একটি ত্বরান্বিত ও পরিকল্পিত প্রচারণার অংশ হিসেবে এই প্রাচীন স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম এজে প্লাসের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ঐতিহাসিক এই নিদর্শনের ওপর ইসরাইলি ধ্বংসযজ্ঞের কথা বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে।

এদিকে, গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ‘গাজা বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিকল্পনার আওতায় অস্ত্র সমর্পণে রাজি হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উপত্যকাজুড়ে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এই হামলায় অন্তত দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্যের বরাতে জানা গেছে, মধ্য গাজার সালাহ আল-দিন সড়কে পরিচালিত একটি ইসরাইলি বিমান হামলায় এক ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।

অন্যদিকে, পৃথক আরেকটি হামলায় গাজা শহরের সাবরা এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় আরো এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসকেরা।

ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার ইসরাইলি পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সুরক্ষায় বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিম তীরের আল-মুঘাইয়্যির গ্রামে হামলা চালায়। এ সময় তাদের ছোড়া গুলি ১০ বছর বয়সি এক ফিলিস্তিনি শিশুর শরীরে বিদ্ধ হলে সে গুরুতর আহত হয়।

ওয়াফার অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাবলুসের দক্ষিণে খাওয়ার্তা তল্লাশি চৌকির কাছে এক ফিলিস্তিনি পুরুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে ইসরাইলি বাহিনী।

নাবলুসে ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্টের অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবাকেন্দ্রের পরিচালক আমজাদ আহমেদ জানান, ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় আহত ২২ বছর বয়সি এক যুবককে তাদের উদ্ধারকারী দল প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেছে।

গত সপ্তাহে নাবলুসের কাছে অবস্থিত টেল গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের এক রক্তক্ষয়ী হামলায় চারজন ফিলিস্তিনি ও দুজন ইসরাইলি নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই রাতভর অভিযান ও গ্রেপ্তার চালাচ্ছ ইসরাইলি সামরিক বাহিনী।

অন্যদিকে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায়ও হামলা অব্যাহত রয়েছে। জরুরি উদ্ধার পরিষেবার এক সূত্রের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, গাজা শহরের সাবরা এলাকায় ইসরাইলি ড্রোন হামলায় অন্তত এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

এর আগে মধ্য গাজার সালাহ আল-দিন সড়কে পরিচালিত অপর একটি পৃথক বিমান হামলায় এক ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান বলে নিশ্চিত করেছেন আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালের চিকিৎসকেরা।

এবার ফিলিস্তিনের গ্রামের ভেতরে ঢুকে মিছিল করল ইহুদিরা
৩১ জুলাই নাবলুসের কাছে অধিকৃত পশ্চিম তীরের তাল গ্রামের মধ্য দিয়ে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের মিছিল। ছবি: এপি

শীর্ষ ১০ বৈজ্ঞানিক ভুল by জাহিদ হোসাইন খান

বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের অনেক ভুল আছে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ভুল করে বলেছিলেন, পরমাণু থেকে কোনো শক্তি পাওয়া যাবে এমন সামান্যতম ইঙ্গিত নেই। পারমাণবিক যুগ শুরুর আগে তিনি এ কথা বলেছিলেন। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার হয়। যেকোনো গবেষকই আপনাকে বলবেন বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয় চেষ্টা ও ত্রুটির মাধ্যমে। যেখানে বেশির ভাগ কাজেই ত্রুটির মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হয়। এক ধাপ এগিয়ে দুই ধাপ পিছিয়ে যাওয়াই যেন গবেষণার নীতিবাক্য। ত্রুটি ছাড়াও অনেক বড় বড় বৈজ্ঞানিক ভুল ইতিহাসে আলোচিত হয়। এসব ভুল কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃত, আবার কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃত নয় বলা যায়। বিখ্যাত জীববিজ্ঞানী স্টিফেন জে গোল্ড যুক্তি দিয়েছেন, বিজ্ঞানীরা যেন নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করেন। কখনো কখনো ভুল অত্যন্ত সৌভাগ্যজনক হতে পারে। ভুলের কারণেই একটি উন্মুক্ত পেট্রি ডিশ থেকে পেনিসিলিন আবিষ্কার হয়েছিল। এমনই কয়েকটি বৈজ্ঞানিক ভুলের তথ্য জেনে নিন।

ব্রিটিশদের মস্তিষ্কের শক্তি পরীক্ষা

১৯৯০–এর দশকে যুক্তরাজ্যের এডিনবার্গের ইনস্টিটিউট ফর অ্যানিমেল হেলথের বিজ্ঞানীরা গরু ও ভেড়ার প্রজাতি নিয়ে পরীক্ষা করেন। তাঁরা ২ লাখ পাউন্ড সরকারি অনুদান পান। পাঁচ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ভুলবশত ভেড়ার মগজের পরিবর্তে গরুর মগজ পরীক্ষা করছেন বলে ২০০১ সালে ধরা পড়ে।

বৈজ্ঞানিক ওয়াটারগেট

ইউএস ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ তদন্ত প্যানেল দেখেন, রোগ প্রতিরোধবিষয়ক বিজ্ঞানী থেরিজা ইমানিশি-কারি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ডেভিড বাল্টিমোরের সঙ্গে ১৯৮৬ সালের একটি গবেষণাপত্রের তথ্য জাল করেছিলেন। সেই গবেষণাপত্রে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার জিনগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

ডায়েরি নিয়ে জালিয়াতি

অক্সব্রিজের ইতিহাসবিদ হিউ ট্রেভর-রোপার জার্মানভিত্তিক স্টার্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হিটলারের ডায়েরিকে খাঁটি বলে প্রমাণ করেছিলেন। পরে সেই ডায়েরি নকল বলে প্রমাণিত হয়।

পানি দিয়ে জ্বালানি সমস্যা

১৯৮৯ সালে ইউটা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নবিদ স্ট্যানলি পনস ও মার্টিন ফ্লিশম্যান কোল্ড ফিউশন আবিষ্কার করে বিশ্বের জ্বালানি সমস্যার সমাধান করার দাবি করেন। তবে সেই থেকে কেউই পানির পারমাণবিক ফিউশনের মাধ্যমে জ্বালানি তৈরি করতে পারেননি।

হাবল স্পেস টেলিস্কোপ

নাসার বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভিত্তিক লেন্সের চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি শক্তিশালী একটি লেন্স তৈরি করতে হাবল টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করেন। ১৯৯০ সালের এপ্রিলে উৎক্ষেপণের পরপরই প্রধান আয়নাতে একটি গুরুতর নকশার ত্রুটি ধরা পড়ে। আয়নাটি মেরামতের জন্য নভোচারীর মাধ্যমে শত শত কোটি পাউন্ডের প্রয়োজন হয়।

এন-রে

বিজ্ঞানী রন্টজেন কর্তৃক এক্স-রে আবিষ্কারের কিছুদিন পর ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী রেনে ব্লন্ডলট এক নতুন ধরনের বিকিরণ আবিষ্কারের দাবি করেন। তবে মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট উড প্রকাশ করেন, এন-রে সামান্য বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। উড এন-রে শনাক্তকরণ ডিভাইস থেকে প্রিজমটি সরিয়ে ফেলেন, যা ছাড়া যন্ত্রটি কাজ করতে পারত না। যদিও বিজ্ঞানী ব্লন্ডলটের সহকারীর দাবি ছিল তাঁরা এন-রে খুঁজে পেয়েছেন।

শিক্ষাগত মানদণ্ড নিয়ে বিতর্ক

১৯৬০-এর দশকে ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী সিরিল বার্ট অভিন্ন যমজদের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা করেন। যমজদের শিক্ষাগত মান হ্রাস পাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। বহু বছর পরে দেখা যায়, যমজদের মধ্যে এমন প্রভাব নেই।

পিল্টডাউন মানব

১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্যে পিল্টডাউনের কাছে একটি স্থানে মানুষের দাঁতের মতো ক্ষয়প্রাপ্ত কুকুরের চোয়াল ও বানরের চোয়ালের অংশ পাওয়া যায়। ব্রিটিশ জীবাশ্ম বিজ্ঞানীরা খুলি ও চোয়ালকে বিবর্তন শৃঙ্খলে বানর ও মানুষের মধ্যেকার অনুপস্থিত সংযোগ বলে দাবি করেন। ১৯৫৩ সালে পিল্টডাউন মানবকে জালিয়াতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। মাথার খুলিটি ছিল আধুনিক ও বানরের চোয়ালের দাঁত ঘষে ক্ষয় করা হয়েছিল।

বিজ্ঞানী নিউটনের আলকেমি

স্যার আইজ্যাক নিউটনকে এককভাবে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করেন বলে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। তিনি আলকেমি নামের বিশেষ রহস্যময় রসায়নে বিশ্বাস করতেন। জীবনের বেশির ভাগ সময় ধরেই তিনি নিশ্চিত ছিলেন, সাধারণ ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করা যাবে।

সমতল পৃথিবী

ক্রিস্টোফার কলম্বাস বহু বছর আগে পৃথিবী অভিযানের মাধ্যমে গোলাকার বলে প্রমাণ করেছিলেন। তারপরেও অনেকে বিশ্বাস করেন পৃথিবী সমতল। অনেকেই বিশ্বাস করেন, পৃথিবী আসলে প্যানকেকের মতো আকৃতির।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

বিশ্বখ্যাত অনেক বিজ্ঞানীই ভুল করেছিলেন
বিশ্বখ্যাত অনেক বিজ্ঞানীই ভুল করেছিলেন। ছবি: রয়টার্স

সেমিকন্ডাক্টরে চীনের বিস্ময়কর উত্থান, আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

দীর্ঘদিন ধরে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর প্রাধান্য থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে চীনের ধারাবাহিক অগ্রগতি বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত লিথোগ্রাফি মেশিনের উৎপাদন এবং চিপ নির্মাণে সাফল্য সেমিকন্ডাক্টর খাতে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, চীন প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইমার্শন ডিপ আল্ট্রাভায়োলেট (ডিইউভি) লিথোগ্রাফি মেশিন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাংহাই আইশেংনা ইলেকট্রনিক টেকনোলজি গ্রুপ এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি চীনের বিভিন্ন লিথোগ্রাফি কোম্পানির প্রকৌশলীদের সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি উন্নয়ন করেছে।

এদিকে, চীনের গবেষকরা দাবি করেছেন, তারা নিজস্ব এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট (ইইউভি) লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি উন্নয়নেরও দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন। তদের এ দাবি সফল হলে এটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ডিইউভি ও ইইউভি প্রযুক্তি

বর্তমানে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য লিথোগ্রাফি প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিইউভি প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষ প্রকৌশল কৌশলের মাধ্যমে ৭ ন্যানোমিটার পর্যন্ত চিপ তৈরি সম্ভব হলেও, ২, ৩ ও ৫ ন্যানোমিটারের অত্যাধুনিক প্রসেসর তৈরির জন্য ইইউভি প্রযুক্তি প্রায় অপরিহার্য।

এই উন্নত প্রযুক্তির বাণিজ্যিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান এএসএমএল-এর কার্যত একচেটিয়া আধিপত্য রয়েছে। তাদের তৈরি ইইউভি মেশিন বিশ্বের সবচেয়ে জটিল শিল্পযন্ত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।

নিষেধাজ্ঞার পরো থামেনি চীন

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলেও চীনের কাছে উন্নত চিপ, চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি এবং সফটওয়্যার রপ্তানিতে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে হুয়াওয়ে ও সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের (এসএমআইসি) মতো প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত বিদেশি প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার হারায়।

তবে এসব নিষেধাজ্ঞার পর চীন সেমিকন্ডাক্টর খাতকে জাতীয় কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে। গবেষণা, উৎপাদন, যন্ত্রপাতি, উপকরণ এবং জনবল তৈরিতে দেশটি কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

হুয়াওয়ের ৭ ন্যানোমিটার চিপ ছিল বড় বার্তা

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী জিনা রাইমন্ডোর চীন সফরের সময় হুয়াওয়ে তাদের ‘মেট ৬০ প্রো’ স্মার্টফোন উন্মোচন করে। পরে বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফোনটিতে ব্যবহৃত ৭ ন্যানোমিটার প্রসেসরটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এসএমআইসি তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল এমন একটি সাফল্য, যা অনেকের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের পক্ষে এমন চিপ তৈরি করা সম্ভব হবে না বলেই ধারণা করা হয়েছিল।

পুরো সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে বেইজিং

চীনের লক্ষ্য শুধু একটি বা দুটি সফল চিপ কোম্পানি তৈরি করা নয়; বরং একটি সম্পূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। চিপ ডিজাইন, উৎপাদন যন্ত্রপাতি, উপকরণ, মেমোরি চিপ এবং ফ্যাব্রিকেশন সব খাতেই সমান্তরালভাবে বিনিয়োগ করছে দেশটি।

এরই মধ্যে চ্যাংজিন মেমরি টেকনোলজিস (সিএক্সএমটি) দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বড় ডিআরএএম মেমোরি চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি ইয়াংজি মেমরি টেকনোলজিস (ওয়াইএমটিসি) উন্নত এনএএনডি ফ্ল্যাশ মেমোরি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে।

পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

চীন যদি ভবিষ্যতে নিজস্ব লিথোগ্রাফি প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে, তবে বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে এএসএমএল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ্লায়েড ম্যাটেরিয়ালস, ল্যাম রিসার্চ এবং কেএলএ-এর মতো চিপ উৎপাদন সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতে পারে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স-এর মতো মেমোরি চিপ নির্মাতারাও চীনের অগ্রগতিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

দুই ভাগে বিভক্ত হতে পারে বৈশ্বিক চিপ শিল্প

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দুটি পৃথক প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেমে বিভক্ত হতে পারে একটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে, অন্যটি চীনকে কেন্দ্র করে। তবে এখনও উন্নত চিপ ডিজাইনে যুক্তরাষ্ট্র, অত্যাধুনিক চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের টিএমএসসি এবং ইইউভি প্রযুক্তিতে এএসএমএল বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা

বিশ্লেষকদের মতে, চীন এখনো বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর দৌড়ে শীর্ষে পৌঁছায়নি। তবে সাম্প্রতিক অগ্রগতি দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি দেশের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদে থামিয়ে রাখা কঠিন। ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাবের পাশাপাশি এখন চীনের উত্থানও বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি

সেমিকন্ডাক্টরে চীনের বিস্ময়কর উত্থান, আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র

ফিলিস্তিনিদের দমনে ইসরাইলের ‘পশু-যুদ্ধ’, নতুন অস্ত্র বেন গভিরের কুমির

চলতি মাসের শুরুতে, ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির ঘোষণা করেন যে, ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের পাহারা দেওয়ার জন্য ইসরাইল নীল নদের কুমির ব্যবহার করবে।

নেগেভ মরুভূমিতে অবস্থিত ইসরাইলের সবচেয়ে বড় বন্দিশালা ‘কেতজিওট’ থেকে এ কর্মসূচিটি শুরু হবে। প্রথম ইন্তিফাদার সময় (১৯৮৮-১৯৯৫) এই কারাগারটি একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে আটকে রাখা হয়েছিল। ফিলিস্তিনিদের কাছে এটি ‘আনসার ৩’ ক্যাম্প নামে পরিচিত ছিল।

বেন গভিরের এই কুৎসিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য ইসরাইলের পরিবেশ সুরক্ষামন্ত্রী ইদিত সিলম্যান কুমিরকে ‘চাষ করা বন্য প্রাণী’ হিসেবে ঘোষণা করেন। এই নতুন শ্রেণিবিন্যাসের এই সরীসৃপ প্রাণীগুলোকে পরিখায় ছেড়ে দেওয়া হবে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের বন্দী করে পশুর মতো আচরণ করা হয়।

বেন গভির ফ্লোরিডার নতুন অভিবাসী আটক কেন্দ্র ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, যা গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিদর্শন করেছিলেন। ভয়াবহ সেই কারাগারটি একটি বিশাল উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলাভূমিতে অবস্থিত, যা অ্যালিগেটর, কুমির এবং পাইথনে ভরা। এটি মূলত এক ঔপনিবেশিক শক্তির দ্বারা আরেকটি উপনিবেশের অনুপ্রেরণা লাভের ঘটনা।

পশু-যুদ্ধের শুরু ইসরাইলের শব্দ চয়নে

ফিলিস্তিনিদের উপর আধিপত্য ও নিপীড়ন চালানোর এবং ভূখন্ডটিকে তার কল্পিত হিব্রু অতীতে ‘ফিরিয়ে দেওয়ার’ ইসরাইলি কৌশলে পশুরা দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জায়নবাদী ও ইসরায়েলি নেতারা দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের ‘পশু’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন, এবং প্রায়শই তাদের প্রজাতি নির্দিষ্ট করে দেন।

উদাহরণস্বরূপ, গাজায় গণহত্যা শুরু করার ন্যায্যতা প্রমাণ করতে ইসরাইলের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ফিলিস্তিনিদের ‘মানব পশু’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

এর বিপরীতে, ১৯৬০-এর দশক এবং ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোশে দায়ান ফিলিস্তিনিরা কোন প্রজাতির পোকামাকড় বা স্তন্যপায়ী প্রাণীর সাথে সবচেয়ে বেশি মিলে তা ঠিক করতে পারেন, তাদের তাচ্ছিল্যভরে ‘বলতা’ ও ‘কুকুর’ বলে অভিহিত করতেন।

১৯৮০-এর দশকে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিন তাদের ‘দুই পায়ের পশু’ হিসেবে আখ্যা দেন, অন্যদিকে ইসরাইলের সাবেক চিফ অফ স্টাফ রাফায়েল এইতান তাদের আবার ‘তেলাপোকা’ হিসেবে অবনমিত করেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক শামির ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘ফড়িং’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

সবচেয়ে পরিহাসের বিষয় হলো, ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক ফিলিস্তিনিদের ‘কুমির’ বলে বর্ণনা করেন। বেন গভিরের পরিকল্পনা, যা মনে হচ্ছে, তা হলো রূপক কুমিরদের পাহারা দেওয়ার জন্য আসল কুমির রাখা।

গাজায় প্রাণিসম্পদ ধ্বংস: ২০২৩ সালের নভেম্বরে আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি লেখক ও কবি রিফাত আল-আরির গাজা সিটির ধ্বংসপ্রাপ্ত চিড়িয়াখানায় মৃত ও অনাহারী প্রাণীদের চিত্র তুলে ধরেন। এর এক সপ্তাহ পরেই ইসরাইলি হামলায় তিনি ও তার পরিবার নিহত হন।

ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা প্রতিনিয়তই গবাদি পশু ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি গৃহপালিত পশু চুরি করে থাকে। এমনিভাবে ২০১৮ সালে ফিলিস্তিনিদের স্থানীয় বিষধর সাপ চুরি করে সেটিকে পরবর্তীতে ইসরাইলের ‘জাতীয় সাপ’ হিসেবে ঘোষণা করে।

পশু, বিশেষ করে সাপ নিয়ে জায়নবাদী উদ্বেগের সূত্রপাত হয় জায়নবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জেলের সময় থেকে, যিনি তার ডায়েরিতে ফিলিস্তিনের আদিবাসী ও পশুদের নিয়ে কী করা উচিত তার রূপরেখা দিয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে তাদের জায়গায় ইউরোপীয় ইহুদি উপনিবেশকারীদের বসানোর বিষয়ে আলোচনার পর তিনি লিখেছিলেন: “যদি আমরা এমন কোনো অঞ্চলে যাই যেখানে এমন বন্যপ্রাণী আছে যেগুলোর সাথে ইহুদিরা অভ্যস্ত নয় — যেমন বড় সাপ ইত্যাদি — তাহলে আমি ট্রানজিট দেশগুলোতে চাকরি দেওয়ার আগে সেখানকার স্থানীয়দের এই প্রাণীগুলোকে নির্মূল করার কাজে ব্যবহার করব। সাপের চামড়া ইত্যাদির জন্য, এমনকি তাদের ডিমের জন্যও ইহুদিরা চড়া দাম দেবে।”

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জায়নবাদী উপনিবেশ স্থাপন ও বিতাড়নের পর, ফিলিস্তিনিরা এবং তাদের সাপেরা — দুর্ভাগ্যবশত ইসরায়েল ও তার ইহুদি উপনিবেশকারীদের জন্য — এখনও সেই দেশেই রয়ে গেছে।

বাইবেলীয় ফ্যান্টাসি

ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের সময়, নিষ্ঠুর, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশরা ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী কুকুর আমদানি করে এবং ফিলিস্তিনি উপনিবেশ-বিরোধী বিপ্লবীদের উপর তাদের লেলিয়ে দেয়। ব্রিটিশরা কুকুরগুলোকে অনাহারে রেখে ও উত্যক্ত করে বন্দীদের মাংস ‘খেয়ে ফেলার’ জন্য তাদের উপর লেলিয়ে দিত।

তবে, ১৯৬৭ সাল থেকে, আরও উদ্ভাবনী ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সত্যিকারের পশু-যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। কুমির-প্রহরী প্রকল্পের অনেক আগে থেকেই তারা কুকুর, বুনো শুয়োর, ভেড়া, গরু, হরিণ, বুনো গাধা এবং পাখিদের নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে এবং এখনও তা করে চলেছে।

১৯৪৮ সালের ইসরাইলি সেনা জেনারেল আব্রাহাম ইয়োফেকে বাইবেলীয় ফ্যান্টাসিতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ইসরাইলের প্রকৃতি ও উদ্যান কর্তৃপক্ষের প্রথম প্রধান হন ইয়োফ। তিনি বাইবেলে উল্লেখিত প্রাণী প্রজাতিগুলোর ‘প্রত্যাবর্তন’ এবং ‘পুনঃপ্রবর্তন’ নামে পরিচিত একটি উদ্যোগ শুরু করেন।

এরকম দুটি প্রাণীকে ইরান থেকে ইসরাইলে ‘প্রত্যাবর্তন’ করা হয়েছিল—ঠিক যেমন ইহুদিরা ‘প্রত্যাবর্তন’ করেছে—যেখানে উভয় প্রজাতিরই অস্তিত্ব ছিল: পারস্যের হরিণ এবং এশীয় বুনো গাধা।

শাহের শাসনের পতনের আগে তেহরানের চিড়িয়াখানা থেকে ইসরাইলকে উপহার হিসেবে দেওয়ার পর ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে বুনো গাধাটিকে নাকাবে পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। অন্যদিকে, ইসলামী বিপ্লবের প্রাক্কালে চারটি হরিণকে বন্য পরিবেশ থেকে অপহরণ করে ইসরাইল এটিকে ‘উদ্ধার’ বলে চালিয়ে দেয়, যেখানে তারা এটিে নতুন শাসনের হাত থেকে ‘রক্ষা’ বলে উল্লেখ করে।

এর পাশাপাশি ফিলিস্তিনি কুকুরদের হত্যা করা এবং ফিলিস্তিনি উটদের তাড়িয়ে দেয়া হয়। এর মাধ্যমে ইসরাইল ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর এ কঠোর পরিণতি চাপিয়ে দিয়েছে। তবে ইসরাইলি আইন অধ্যাপক ও পরিবেশ আইনজীবী ইরুস ব্রাভারম্যানের যুক্তি অনুযায়ী, এই ভূমিকে বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী এবং ‘পুনরায় ইহুদিদের’ করে তোলার জন্যই এসব করা হচ্ছে।

বন্যপ্রাণীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার

ইসরাইল গোল্ডফিঞ্চ পাখি পোষার জনপ্রিয় প্রথাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। এই ছোট পাখিগুলো ফিলিস্তিন এবং প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে তাদের সুন্দর রঙ ও মনমুগ্ধকর কলতানের জন্য সমাদৃত।

কিন্তু ইসরাইলের এই পশু-যুদ্ধ হরিণ, বুনো গাধা এবং গোল্ডফিঞ্চের গল্পের চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র।

২০০৯ সাল থেকে, বা তারও আগে থেকে, ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠী পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বুনো শুয়োরকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ২০১৪ এবং ২০২২ সালেও তারা একই কাজ করেছিল, যখন ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা শুয়োরগুলোকে ট্রাকে বোঝাই করে ফিলিস্তিনি জনবসতির কাছে ছেড়ে দিয়েছিল।

বন্য শূকরগুলো ফসল নষ্ট করার পাশাপাশি মানুষ ও গবাদি পশুকে আক্রমণ করে আহত করেছে। ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের এগুলো হত্যা করতে নিষেধ করে, কারণ এগুলো একটি সংরক্ষিত প্রজাতি।

এগুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী অধিকৃত পশ্চিম তীরের নুর শামস শরণার্থী শিবিরের কাছে অবস্থিত অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনি গ্রাম ইকতাবাতে ১৮টি বন্য শূকর ছেড়ে দেয়। ইসরাইল শিবিরের বাসিন্দাদের বিতাড়িত করেছিল এবং শিবিরটি ধ্বংস করতে শুরু করেছিল। বাড়ি ফিরতে চাওয়া ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই বন্য শূকরগুলো ছাড়া হয়েছিল।

১৯৭৮ সালে আসন্ন ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের হাত থেকে হরিণদের বাঁচানোর পাশাপাশি, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর সময় গাজার গাধাগুলোকে ফিলিস্তিনি ‘দাসত্ব’ থেকে বাঁচানোরও চেষ্টা করেছে।

গাজার ফিলিস্তিনিরা যাতায়াত, পানি সরবরাহ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, কৃষিকাজ এবং সাংবাদিক ও সাহায্যকারী দল পরিবহনের জন্য গাধা ও ঘোড়ার ওপর নির্ভরশীল, যা গাধা চুরিকে ইসরায়েলের গণহত্যা প্রচেষ্টার একটি অংশ করে তুলেছে।

গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে গাজার গরু, ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া, খচ্চর ও গাধাসহ ৯৭ শতাংশেরও বেশি প্রাণী এবং ৮৪ শতাংশ গাছপালা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায়, বেঁচে থাকা শত শত গাধাকে অপহরণ করে চুরি করা হয়েছে।

পশ্চিম তীরেও বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি গবাদি পশুর ওপর নিয়মিত হামলা করে , তা চুরি করে এবং হত্যা করে । অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনে গবাদি পশুর বিরুদ্ধে এই পশু-যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের চারণভূমি ইসরাইলের দখলে নেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।

বেঁচে থাকা শত শত গাধাকে অপহরণ করে চুরি করা হয়েছিল, কারণ গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে গাজার ৯৭ শতাংশেরও বেশি প্রাণী—যার মধ্যে গরু, ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া, খচ্চর এবং গাধা অন্তর্ভুক্ত—এবং এর ৮৪ শতাংশ গাছপালা নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।

আক্রমণকারী কুকুর:

যেখানে পারস্যের হরিণ দিয়ে ইসরাইলকে আবার ‘ইহুদি’ বানানোর জন্য ফিলিস্তিনি ‘বুনো’ কুকুরদের হত্যা করা হয়েছিল, সেখানে ফিলিস্তিনিদের আক্রমণ করতে এবং অতি সম্প্রতি তাদের ধর্ষণ করতে ইউরোপীয় কুকুর আমদানি করা হয়।

১৯৪৮ সাল থেকে ফিলিস্তিনি জনগণের শত্রু নেদারল্যান্ডস এই আক্রমণকারী কুকুরগুলোর একটি প্রধান সরবরাহকারী ।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরাইল অন্তত ১৪৬টি ওকেতজ (ইসরাইলের কুকুর বাহিনী) হামলা চালিয়েছে, যাতে ডাউন সিনড্রোম ও অটিজমে আক্রান্ত ২৪ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি মোহাম্মদ বার তার বাড়িতে নিহত হন এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই কুকুর-যুদ্ধের অনেকটাই উন্মোচন করেছে।

আরও ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ইসরাইল এই বর্ণবাদী কুকুরগুলোকে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ধর্ষণ করার জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছে , যা গত এক বছরে প্রকাশিত হয়েছে। এই ভয়াবহতার মাত্রা বিবেচনা করে, এমনকি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসও অবশেষে ইসরাইলি-প্রশিক্ষিত এই ধর্ষক কুকুরগুলো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে রাজি হয়েছে।

ফিলিস্তিনি পশু ও মানুষের চেয়ে বন্যপ্রাণীদের প্রতি ইসরাইলি আইনের মানবিকতার কথা আমরা যেন ভুলে না যাই, সেজন্য ইসরায়েলি সুপ্রিম কোর্টের কোমল হৃদয়ের বিচারপতিরা ২০০৩ সালে ফোয়া গ্রা (জোরপূর্বক খাওয়ানো) নিষিদ্ধ করে বিশ্বে প্রথম সারির ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন, যা মূলত গৃহপালিত রাজহাঁস ও পাতিহাঁসকে জোর করে খাওয়ানোর নির্যাতন থেকে রক্ষার জন্য করেছিল।

অবশ্যই, সেই একই আদালত ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের অনুমতি দেয়। এর বিপরীতে, ২০১৫ সালে ইসরায়েল তার কারাগারে ফিলিস্তিনি অনশনকারীদের জোর করে খাওয়ানোকে বৈধতা দেয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে নির্যাতন হিসেবে নিন্দিত একটি প্রথা।

এই প্রেক্ষাপটে, ‘মানব কুমিরদের’ পাহারা দেওয়ার জন্য নীল নদের কুমির ব্যবহার করার বেন গভিরের প্রকল্পটি জঘন্য নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনি ‘মানব পশু’ ছাড়া অন্য সব প্রাণী প্রজাতির প্রতি ইসরায়েলের মানবিক ভালোবাসাকেই তুলে ধরে; আর এই ‘মানব পশুদের’ নির্মূল করার জন্য ইসরাইল এবার নীল নদের কুমিরকে তাদের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে বদ্ধপরিকর।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

২০১২ সালের ১৬ই মার্চ, অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রতিবাদকারী এক ফিলিস্তিনিকে আক্রমণ করতে ইসরাইলি সৈন্যরা একটি কুকুর লেলিয়ে দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত।
২০১২ সালের ১৬ই মার্চ, অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রতিবাদকারী এক ফিলিস্তিনিকে আক্রমণ করতে ইসরাইলি সৈন্যরা একটি কুকুর লেলিয়ে দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত।

পৃথিবীকে নীল বিন্দু খেতাব দিয়েছিলেন যে বিজ্ঞানী by জাহিদ হোসাইন খান

জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল স্যাগান মহাবিশ্বের সৌন্দর্যকে জনসমক্ষে নিয়ে আসার জন্য আলোচিত। তিনি ১৯৩৪ সালের ৯ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। কিংবদন্তি জ্যোতির্বিজ্ঞানী, লেখক ও বিজ্ঞান প্রচারক হিসেবে কার্ল স্যাগান আলোচিত। বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ ও কাব্যিক ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিশ্বকে মহাবিশ্বের বিস্ময়কর সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন। তাঁর কাজ কেবল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানেই সীমাবদ্ধ ছিল না।

কার্ল স্যাগানের সবচেয়ে বড় অবদান বলা যায় বিজ্ঞানবিষয়ক নানা বিষয়কে লেখালেখি ও টেলিভিশনের মাধ্যমে সবার সামনে ছড়িয়ে দেওয়া। ১৯৮০ সালে প্রচারিত তাঁর যুগান্তকারী টেলিভিশন সিরিজ ‘কসমস: এ পার্সোনাল ভয়েজ’ বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ দর্শককে মহাবিশ্বের রহস্যের প্রতি আকৃষ্ট করে। এই সিরিজ বৈজ্ঞানিক ধারণাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যা গভীর অথচ সহজে বোধগম্য। স্যাগানের বিখ্যাত উক্তি, ‘আমরা সবাই স্টারডাস্ট বা তারাধূলি দিয়ে তৈরি।

একজন পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে স্যাগানের গবেষণা মূলত ছিল গ্রহবিজ্ঞান নিয়ে। তিনি শুক্র, বৃহস্পতি গ্রহসহ অন্যান্য গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ওপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে ছিল শুক্র গ্রহের তীব্র তাপমাত্রা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা, যা পরে প্রমাণিত হয়। স্যাগান মঙ্গল গ্রহে প্রাণের অনুসন্ধান এবং এর পরিবেশ নিয়ে ব্যাপক কাজ করেন। তিনি নাসার মেরিনার, ভয়েজারসহ বিভিন্ন গ্রহ অনুসন্ধানকারী মিশনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। মঙ্গলের পৃষ্ঠে থাকা রহস্যময় ক্যানালি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ছিল। স্যাগান বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেন, এসব এলিয়েনদের তৈরি খাল নয়, বরং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য।

দূরবর্তী মহাজাগতিক প্রাণীর কাছে পৃথিবীর অস্তিত্ব জানান দিতে স্যাগান দুটি ঐতিহাসিক প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২ সালে উৎক্ষেপিত পাইওনিয়ার ১০ মহাকাশযানে একটি বিশেষ ফলক সংযুক্ত করার ধারণা দেন স্যাগান।

এই প্লেটে মানব জাতির চিত্র, আমাদের সৌরজগতের অবস্থান এবং মহাকাশযানের উৎক্ষেপণের সময়কাল চিহ্নিত করা হয়। এ ছাড়া ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড পাঠানোর সময় তাঁর ভূমিকা ছিল। এটি ছিল স্যাগানের নেতৃত্বাধীন সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত ভয়েজার ১ এবং ভয়েজার ২ মহাকাশযানে পৃথিবীর ছবি, শব্দ, সংগীত এবং বিভিন্ন ভাষার শুভেচ্ছাবার্তা নিয়ে তৈরি এই সোনালি রেকর্ড পাঠানো হয়। কার্ল স্যাগান ১৯৯৬ সালে আমাদের ছেড়ে চলে যান।

ভয়েজার ১ মহাকাশযান থেকে তোলা একটি ছবিকে জনপ্রিয় করেন তিনি। সেই ছবিতে পৃথিবীকে একটি ফ্যাকাশে নীল বিন্দুর মতো দেখায়। ৬০০ কোটি কিলোমিটার দূর থেকে ধারণ করা ছবিটি বিশ্বকে চমকে দেয়। ছবিটি তুলতে স্যাগান নাসাকে উৎসাহিত করেছিলেন। কার্ল স্যাগানের চিন্তায় প্রথমবারের মতো মানব জাতি বুঝতে পারে, মহাবিশ্বের বিশালতার পরিপ্রেক্ষিতে মানবজাতির গুরুত্ব ও ক্ষুদ্রতা কত নগণ্য।

ভয়েজার ১ মহাকাশযান থেকে পৃথিবীকে আলোর রশ্মিতে ঝুলে থাকা এক ফোঁটা নীল ধূলিকণার মতো মনে হয়। স্যাগান সেই ছবির বর্ণনায় বলেন, এই ক্ষুদ্র বিন্দুর ওপরই বাস করছে আপনার পরিচিত প্রতিটি ব্যক্তি। আমাদের সব হাসি-কান্না, আমাদের হাজারো ধর্ম, মতাদর্শ, অর্থনৈতিক বিশ্বাস, সভ্যতার উত্থান-পতন, রাজা-প্রজা, প্রেমিক-প্রেমিকা, উদ্ভাবক আর আমাদের প্রজাতির ইতিহাসে যত পাপি ও সাধু এসেছে সবাই। তারা সবাই ছিল সূর্যের আলোয় ভেসে থাকা ধূলিকণার এক কণামাত্র।
তথ্যসূত্র: আমেরিকান সায়েন্টিস্ট

দূর থেকে পৃথিবীকে বিন্দুর সঙ্গে তুলনা করে বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন কার্ল স্যাগান
দূর থেকে পৃথিবীকে বিন্দুর সঙ্গে তুলনা করে বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন কার্ল স্যাগান। ছবি: নাসা