Saturday, April 4, 2026

নবাবের দরবারে কপিলা...

কপিলা। মানে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র সেই কপিলা। যিনি কুবের মাঝির সঙ্গে পালিয়ে ময়না দ্বীপে গিয়েছিলেন। সমাজে তিনি কুলটা। সেই কপিলাকে এই যাত্রাপালার অনিবার্যও একটি চরিত্র হিসেবে তুলে আনা হয়েছে। কপিলা ময়না দ্বীপ থেকে কোনো নবাবের দেশে ব্যবসায়ী হয়ে যায়। ঘটনাচক্রে এই নারীর পণ্য নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়। ষড়যন্ত্র শুরু হয় নবাবের বিরুদ্ধেও। এই প্রেক্ষাপটে রচিত যাত্রাপালা ‘নবাবের দরবারে কপিলা’।

নাটোরের চলন নাটুয়া প্রযোজিত পালাটি গত (১৪ এপ্রিল ২৫) রাতে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পরীগাছা গ্রামের বৈশাখী মেলায় মঞ্চস্থ হয়েছে। পালাটি রচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন ফারুক হোসেন। যাঁরা সেদিনের পালাটি দেখেননি, তাঁদের জন্য রইল বর্ণনা। আমরা যা দেখেছি, তা–ই বলছি।
পালার শুরুতে নেপথ্যে কথকের গলা শোনা যায়—‘আপনাদের জানা, সংক্ষেপে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি কেবল। মানিক বাবুর “পদ্মা নদীর মাঝি” উপন্যাসের কপিলা কুবের মাঝির শ্যালিকা। আপনারা জানেন, কুবের মাঝির একদিকে পঙ্গু স্ত্রী আর অন্যদিকে শ্যালিকা। এ দুয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় কুবের-কপিলাদের প্রেমের মানসিকতা। অথবা কপিলা-কুবের যাতে মিলিত হয়, তার প্রেক্ষাপট তৈরি করে দেওয়ার সূক্ষ্ম কারিগর হোসেন মিয়ার কূটকৌশল কিংবা নিয়তি বলতে পারেন, সবই নির্ধারিত, কপিলাকে নিয়ে কুবেরের পালানো ভিন্ন পথ খোলা ছিল না। দর্শকশ্রোতা, হোসেন মিয়ার নতুন রাজ্য ময়না দ্বীপের কথা নিশ্চয় মনে আছে, নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে সে দেশে। কথা শেষ হতেই মঞ্চে আসেন কপিলা ও কুবের।

কুবেরের হাতে নৌকার বইঠা। কপিলা নিবেদন করে, আমারে নিবা মাঝি? বলেই রহস্যময় হাসি হাসে।
-রহস্য করবি না কপিলা।
কপিলা হাসি থামিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়, দুঃখী ভাব দেখায়। কুবের আকুতিভরা কণ্ঠে বলে, যাবি, যাবি কপিলা? কপিলা সম্মতি জানায়।
বুকে বল পাইলাম বলে কপিলাকে নিয়ে প্রস্থান করে কুবের। এবার কথক উঠে আসে মঞ্চে।... কী এক অনিবার্য আকর্ষণের কারণে কপিলার ইচ্ছায় কুবেরের সঙ্গে অথবা কুবেরই প্রলোভন দেখিয়ে কপিলাকে নিয়ে অজ্ঞাত আশার নতুন আলো জ্বালিয়ে পালিয়েছিল নতুন এক দ্বীপে। কথক দর্শককে সম্বোধন করে বলেন, বড়ই দুঃখের কথা, কপিলার কপালে সুখ সইল না। সেখান থেকে পালাতে হলো তাকে। কারণটা খোলাসা করেই বলি, কুবের মাঝি অন্য এক নারীর প্রতি আসক্ত হয়েছিল। কপিলা সেখানে কুবের মাঝির কাছ থেকে যোগ্য সম্মান পায়নি। সে অপমান সইতে না পেরে কোনো এক নবাবের দেশে আশ্রয় নেয় কপিলা।
এবার কথা দর্শকদের উদ্দেশে কতগুলো প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, ‘আপনারা এই অর্বাচীন বর্ণনাকারীকে প্রশ্ন করতেই পারেন, কোন সে নবাবের দেশ? আরও প্রশ্ন করতে পারেন, কপিলা যদি পালিয়েই এল বা গেল, স্বামীর বাড়ি কিংবা বোনের বাড়ি কেন গেল না? পরের প্রশ্নের উত্তর আগে দিই। কপিলা, হ্যাঁ কপিলার কথা বলছি, লজ্জায় যেতে পারেনি স্বামীর ঘরে। এক দর্শককে উদ্দেশ্য করে কথক বলে, এমন নাফরমানি কাজ করা আপনার স্ত্রী ফিরে এলে কি ঘরে ফিরিয়ে নিতেন?

একজন নারীকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘এই যে আপা আপনি, আপনি আপনার বোন আপনারই স্বামীকে নিয়ে পালিয়ে গেলে তাকে কি সাদর সম্ভাষণ জানাতেন? না। আপনারা হুদাই আপসোস করতেছেন। যা–ই হোক, ঘটনার ডালপালা বাড়ায়া আপনাদের যাতনা দিবার কোনো ইচ্ছা নাই। কোন নবাবের দেশ বেছে নিয়েছে, তার উত্তর আপনারাই খুঁজে বের করবেন। এটা না করতে পারলে বসে বসে কি আঙুল চুষবেন? মাফ করবেন আমাকে, আজকের পালায় বেফাঁস কথাবার্তা চলবে। থুক্কু, কি আবোলতাবোল বলছি। আসল কথায় আসি। বলছিলাম বিশিষ্ট নারী ব্যবসায়ী কপিলার কথা। ময়না দ্বীপ থেকে ফেরার পরে কপিলার একলা চলার কথা, কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। চাইলেই তো আর একলা নারী হয়ে একলা চলতে পারে না! সমাজ বলে একটা কথা আছে না! দর্শকেরা, কী ঘটে কপিলার জীবনে, বলতে পারেন মূল ঘটনা শুরু এখান থেকেই।
পণ্য বিক্রির বিনিময়ে সিপাহশালার কপিলার কাছে ঘুষ চান। মন্ত্রী বলেন, ‘এ রাজ্যে ব্যবসা করতে হলে আমাদের কিছু না কিছু দিতেই হবে। এক শ বার দিতে হবে, হাজারবার দিতে হবে। কপিলা রাজি না হলে নবাবের দরবারে তার নামে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়। সিপাহশালার দরবারে গিয়ে বলে, এই রমণীর নাম কপিলা। খুবই ডেঞ্জারাস ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে, যা দেশের জন্য চরম বিপজ্জনক। তিনি জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী কপিলাকে ভন্ড, মিথ্যুক, অসভ্য নারী বলে অপবাদ দেয়। কপিলা তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করে। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুললে সে মানহানির মামলা করার হুমকি দেয়। সব শুনে অভিযোগের প্রমাণ না পেয়ে নবাব কপিলাকে রাজ্যে ব্যবসায়ের অনুমতি দেন।
এবার মন্ত্রী ও সিপাহশালার মিলে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নামে। সিপাহশালার নবাবের বিরুদ্ধে অস্ত্র চ্যালেঞ্জ করে।

এতে সিপাহশালার পরাজিত হয়। ক্ষমা চায়। নবাব ক্ষমা করে দিয়ে নতুন করে দেশ গড়ার আহ্বান জানান। তারা এবার নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে।
মঞ্চে আসে বিবেক... ভোলামন, ঘোড়ার পিঠে হাতির আসন, আজগুবি এক বচন, পোশাক পরলেই হয় না যোগ্য রাজন...।

এবার নবাবের বিরুদ্ধে সিপাহশালার গং নতুন ষড়যন্ত্র করে। তারা গণশুনানিতে নবাবকে প্রজাদের মুখোমুখি করে। প্রজারা একে একে আট আনার রুটি এক টাকা হয়েছে, এক টাকার পণ্য দুই টাকা হয়েছে—এ রকম নানা অভিযোগ করেন।
নবাব কপিলাকে তলব করেন। কপিলা বহির্বিশ্বে কোন জিনিসের কত দাম বেড়েছে, তার ফিরিস্তি তুলে ধরেন। সেই তুলনায় দেশীয় পণ্যের দাম কমই আছে।
এই ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে নবাব অর্থমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে তার গলার উত্তরীয় কপিলার গলায় পরিয়ে দিয়ে তাকেই অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন। কপিলা দেশের দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নবাবকে বেশ কিছু কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন—ধনী–গরিব সবাইকে উৎপাদনের অংশ নিতে হবে, কৃষি খাতে নামমাত্র সুদের ঋণ দিতে হবে, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়ানোর জন্য কারখানা নির্মাণে বিশেষ ঋণ সুবিধা দিতে হবে।
এরপর নবাবের বেগম ঘোষণা করেন, এবার আমরা সুন্দর একটা পাত্র দেখে কপিলার বিয়ে দেব।

যাত্রাপালা ‘নবাবের দরবারে কপিলা’র দৃশ্য
যাত্রাপালা ‘নবাবের দরবারে কপিলা’র দৃশ্য। প্রথম আলো

ট্রাম্প নয়, ইরান যুদ্ধের চাবিকাঠি রয়েছে যার হাতে by মার্টিন কিয়ার

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় মাসে পৌঁছেছে করেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে মার্কিন-ইসরায়েল জোটের বড় ধরনের সামরিক সাফল্য এলেও ইরানের সেনাবাহিনী এবং সরকারের টিকে থাকার সক্ষমতা বর্তমান সমীকরণকে বদলে দিচ্ছে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল এই মুহূর্তে যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করার চেয়ে পরিস্থিতির বিপরীতে প্রতিক্রিয়া দেখাতেই বেশি ব্যস্ত। এই কৌশলগত স্থবিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের লক্ষ্যমাত্রার পারস্পরিক বিরোধিতা। ইরান আক্রমণের কোনো সঠিক যৌক্তিকতা তুলে ধরতেও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ তাদের পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দীর্ঘকালীন নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই নীতির ভিত্তি ছিল ১৯৮০ সালের কার্টার ডকট্রিন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঘোষণা করেছিলেন যে পারস্য উপসাগর এলাকায় অন্য কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের ওপর আঘাত এবং সামরিক শক্তি দিয়ে তা মোকাবিলা করা হবে।

পরবর্তী দশকগুলোতে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সৈন্য এবং পঞ্চম নৌবহর এই অঞ্চলে স্থায়ীভাবে মোতায়েন করা হয়েছিল তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে। বিগত মার্কিন সরকারগুলোও ইরানের হুমকি সামাল দিয়ে ওই স্থিতাবস্থা বজায় রেখেছিল। কারণ তারা জানত, সরাসরি সংঘাত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে, যা সারা বিশ্বের জন্য বিপর্যয়কর হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের লক্ষ্যমাত্রা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের নেতৃত্বাধীন হিজবুল্লাহ, হামাস এবং হুতি জোট, যা রেজিস্ট্যান্স এক্সিস নামে পরিচিত, তাদের পুরোপুরি নির্মূল করতে চায় ইসরায়েল।

২০২৩ সালের অক্টোবর পরবর্তী সময়ে মার্কিন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ায় ইসরায়েল এখন তার পুরোনো ‘ঘাস কাটা’ নামক কৌশলে ইরান এবং হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাচ্ছে। এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রতিপক্ষের নেতৃত্ব নির্মূল করা এবং তাদের অবকাঠামো ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া। দক্ষিণ লেবাননে স্থল অভিযান এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মাধ্যমে তারা এক বিশাল বাফার জোন তৈরি করতে চাইছে, যাতে হিজবুল্লাহ তাদের অবস্থান হারিয়ে ফেলে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই যুদ্ধ রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, দেশটির পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ জয়ের সাফল্যকে পুঁজি করে নেতানিয়াহু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছেন।

২০২৩ সালে হামাসের হামলার কারণে নেতানিয়াহুর ‘ত্রাতা’ হিসেবে যে খ্যাতি ছিল, তা ধসে পড়ে। এখন ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তিনি পুনরায় ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন। এর জন্য নির্বাচনে জয়ী হওয়া অপরিহার্য। কারণ, ক্ষমতায় টিকে থাকলেই তিনি তাঁর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি মামলার বিচারের মুখোমুখি হওয়া এড়াতে পারেন এবং প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে ক্ষমা নিশ্চিত করতে পারেন।

তবে এই যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। জনমত জরিপ বলছে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকলে লিকুদ পার্টির জনপ্রিয়তা বেড়েছে ঠিকই, তবে ইরানের প্রস্তাবিত কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র সায় দিলে সেই জনপ্রিয়তা আবার কমেও যেতে পারে। তা ছাড়া ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আমেরিকায় চালানো বিভিন্ন জরিপ বলছে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপের অবস্থা আরও করুণ।

ইসরায়েল প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের যে সাহায্য পায়, তা না থাকলে দেশটির অর্থনীতি এবং সামরিক শক্তি স্থবির হয়ে পড়বে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনিশ্চিত স্বভাবের কারণে এই সমর্থন চিরস্থায়ী না–ও হতে পারে।

একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি ফিলিস্তিনে চালানো যুদ্ধের জন্য ইসরায়েলি মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত করছেন। এতে বিশ্বমঞ্চে ইসরায়েল আরও একঘরে হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

ইরানের সামরিক ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শুধু টিকে থাকাকেই তেহরান তাদের জয় হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের এই বিধ্বংসী আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এখন এক নতুন এবং অপেক্ষাকৃত কট্টরপন্থী নেতৃত্বের জন্ম হচ্ছে, যারা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য আরও বড় বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে ইরানকে দমানোর এই প্রচেষ্টা ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকে এক জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিয়েছে।

* মার্টিন কিয়ার, সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-17%2Fc4yj99wp%2F%E0%A7%A8.avif?rect=1%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
(বাঁ থেকে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স


এপস্টিনের সেই আলোচিত লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে কী আছে

প্রকাশ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার দূরে ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ড। এই দ্বীপের দক্ষিণ–পূর্বে রয়েছে সবুজে ঘেরা ছোট আরেকটি দ্বীপ। নাম লিটল সেন্ট জেমস।

৭২ একর আয়তনের দ্বীপটি ওপর থেকে দেখতে তারকা আকৃতির। সাদা বালু আর নারকেলগাছে ঘেরা সৈকতগুলো ছুঁয়ে দিয়ে যায় ক্যারিবীয় সাগরের নীল জলরাশি। দ্বীপে রয়েছে একটি পাহাড়। সেখান থেকে দেখা যায় আশপাশের নয়নাভিরাম দৃশ্য।

ওপর থেকে ধারণ করা ছবিতে চোখ বোলালে দেখা যায়, লিটল সেন্ট জেমসের উত্তরে রয়েছে নীল ছাদ দেওয়া কয়েকটি ভবন। দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অবকাঠামো। এর মধ্যে চোখে পড়ে পশ্চিম দিকে আয়তাকার একটি সুইমিংপুল। আর পূর্বে একটি হেলিকপ্টার ওঠানামার স্থান।

দৃশ্য দেখে আর এর প্রকৃতির বর্ণনা শুনলে বেশ স্বর্গীয় মনে হয়। তবে এই দ্বীপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের নাম। লিটল সেন্ট জেমসের সঙ্গে নাম জড়িয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিরও। সেখানে তাঁরা নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নিপীড়ন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই মেয়েদের কেউ কেউ ছিল ১২ বছরের শিশু।

নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, দ্বীপটিতে সফর করা এক ব্যক্তি ২০১৪ সালে এপস্টিনকে পাঠানো ই–মেইলে লিখেছিলেন—‘আমোদের একটি রাতের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ...আপনার একেবারে ছোট মেয়েটি একটু দুষ্টু ছিল।’

আর বিবিসির খবর অনুযায়ী, যৌন নিপীড়ন থেকে বাঁচতে দুই মাইল সাঁতার কেটে সেন্ট টমাস দ্বীপে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী।

এপস্টিনের দ্বীপ

এপস্টিন দ্বীপটি কিনেছিলেন ১৯৯৮ সালে—৮০ লাখ ডলারে। তখনো দ্বীপটি ছিল বেশ অভিজাত। সেখানে মূল একটি বাড়ি ছিল। ছিল অতিথিদের জন্য তিনটি কটেজ, একটি হেলিপ্যাড ও নৌযানের একটি ঘাট। এ ছাড়া ছিল দ্বীপের কর্মচারীদের জন্য থাকার জায়গা এবং লবণাক্ত পানি পানযোগ্য করার ব্যবস্থা।

২০১০ সাল নাগাদ লিটল সেন্ট জেমসকে নতুন করে সাজান এপস্টিন। প্রধান বাড়ি মেরামত করা হয়। নির্মাণ করা হয় এমন আরও তিনটি বাড়ি। একটি নতুন সুইমিংপুল আর পাথরের ঘর। তৈরি করা হয় বাক্সের আকৃতির একটি রহস্যময় ভবনও। সাদার ওপর নীল ডোরাকাটা ওই ভবনটি ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুট এলাকাজুড়ে।

মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বর্গাকার ভবনটির তথ্যের নথি হাতে পেয়েছে তারা। তাদের কাছে এটি সংগীতকেন্দ্র বলে মনে হয়েছে। তবে নথিতে যেসব ভবনের তথ্য রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে বর্গাকার ওই ভবনের মিল নেই। ভবনটির কোনো জানালা নেই। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘টেম্পল’ বা মন্দির।

২০২০ সালে ধারণ করা ছবি এবং গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির ধারণ করা ছবিতে দেখা গেছে, দ্বীপটিতে ছিল আসবাবে সাজানো বড় বড় শোবার ঘর, বসার ঘর আর বাথরুম। ছিল দাঁতের চিকিৎসার জন্য হলুদ একটি চেয়ার। তবে এটি কী কাজে ব্যবহার করা হতো, তা নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে।

কারা গিয়েছিলেন দ্বীপটিতে

এপস্টিনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো বিশ্বনেতাসহ অনেক হোমরাচোমরার নাম রয়েছে। তাঁদের অনেকের নাম আবার নানা কুর্কীতির সঙ্গে জড়িয়েছে। যেমন যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে মেঝেতে শোয়া এক নারীর সঙ্গে দেখা গেছে।

নথিতে আরও রয়েছে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ, ধনকুবের ইলন মাস্ক, অভিনেতা উডি অ্যালেন, ক্যাভিন স্পেসি, হলিউড চলচ্চিত্র প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেইনের নাম। এর মধ্যে উইনস্টেইনের বিরুদ্ধে শতাধিক নারীকে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন খ্যাতনামা অভিনেত্রীরাও।

এটা ঠিক যে নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধী হওয়া নয়। নথিতে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের অনেকেই এপস্টিনের সঙ্গে বা তাঁর দ্বীপে কোনো ধরনের অপরাধে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। আবার এটাও ঠিক যে লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে এপস্টিন এবং তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েলই একমাত্র যৌন নিপীড়নকারী ছিলেন না।

এপস্টিনের অনেক ভুক্তভোগীর মধ্যে একজন ভার্জিনিয়া জিউফ্রে। তিনি গত বছরের এপ্রিলে আত্মহত্যা করেছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকথা প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, একজন পরিচিত প্রধানমন্ত্রীর (অন্য জায়গায় সাবেক মন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে) হাতে তিনি ধর্ষণ শিকার হয়েছিলেন।

অন্যদের বর্ণনায়ও এমন তথ্য পাওয়া যায়। যেমন সারাহ র‍্যানসম। তাঁকে নাকি ছুটিতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে নেওয়া হয়েছিল। নিজের লেখা বই ‘সাইলেন্সড নো মোর: সারভাইভিং মাই জার্নি টু হেল অ্যান্ড ব্যাক’ বইয়ে এমন অভিযোগই করেছেন র‍্যানসম। তিনি বলেন, নিপীড়নের কথা প্রকাশ করলে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন এপস্টিন।

লিটল সেন্ট জেমসের কী হবে

সংবাদমাধ্যম এনপিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাসে লিটল সেন্ট জেমস এবং এর উত্তরে গ্রেট সেন্ট জেমস—দুই দ্বীপই স্টিফেন ডেকঅফ নামক এক মার্কিন অর্থলগ্নিকারীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। তিনি এই দুটি দ্বীপ ৬ কোটি ডলারে কিনে নিয়েছিলেন।

আপাতত পরিকল্পনা হলো—এই দ্বীপগুলোকে একসঙ্গে নিয়ে একটি ক্যারিবীয় প্রমোদকেন্দ্র বানানো। ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের বাসিন্দা ডেকঅফ বলেন, এই প্রমোদকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে দ্বীপটির কলঙ্কিত ইতিহাস বদলে যাবে। এটি একটি বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে নতুন করে জন্ম নেবে।

দ্বীপের চারটি ভিলা
দ্বীপের চারটি ভিলা। ছবি: মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সৌজন্যে

করোনাকালের স্মৃতি নিয়ে গান, পান্থ কানাইয়ের স্বপ্নপূরণ

পান্থ কানাইয়ের গাওয়া নতুন গান প্রকাশিত হয়েছে। ‘সেই এক সময় ছিল’ শিরোনামের গানটি প্রকাশের পরই প্রশংসায় ভাসছেন শিল্পী। শ্রোতার প্রশংসা পাওয়া এই শিল্পী জানালেন, গানটি গেয়ে তাঁর স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। নিজের ফেসবুকে সেই অনুভূতি প্রকাশও করেছেন।

‘সেই এক সময় ছিল’ শিরোনামের এই গানের কথা লিখেছেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী ও সুর করেছেন পিলু খান। পান্থ কানাই বলেন, ‘সচরাচর যেমন গান করি, তার থেকে বেশ আলাদা এ গানটি। সুরকার ও গীতিকার দুজনই আমার কাছে নমস্য সংগীত ব্যক্তিত্ব। তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে পারা আমার জন্য দারুণ এক প্রাপ্তি।’

কথা প্রসঙ্গে পান্থ কানাই বললেন, ‘এই গানের কথা লিখেছেন বাংলাদেশের অসংখ্য জনপ্রিয় গানের গীতিকার, জীবন্ত কিংবদন্তি শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, সুর করেছেন আরেক জীবন্ত কিংবদন্তি সুরকার ও সংগীত পরিচালক, গায়ক ও ড্রামবাদক (রেনেসা ব্যান্ড) পিলু খান। পিলু ভাইকে প্রথম ড্রামস বাজাতে দেখেই আমার ড্রামস বাজানোর ইচ্ছা জেগেছিল; আর এবার তাঁর সুরে গাইতে পারা সত্যিই এক স্বপ্নপূরণ।’

গানটি প্রসঙ্গে শহীদ মাহমুদ জঙ্গী বলেন, ‘এই গানে আমি করোনাকালীন আমাদের জীবনের ছবি আঁকার চেষ্টা করেছি। আমাদের সবার জীবনে ছাপ রেখে যাওয়া সেই সময়ের গান “সেই এক সময় ছিল”।’

পিলু খান বলেন, ‘আমি আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি সুর করেছি জঙ্গী ভাইয়ের লেখায়। তাই তাঁর সঙ্গে কাজ আমার জন্য সব সময় আনন্দের। পান্থ কানাই দারুণ গেয়েছে। আশা করি, শ্রোতাদের ভালো লাগবে আমাদের এই প্রয়াস।’

‘সেই এক সময় ছিল’ গানটি প্রকাশ করেছে আজব রেকর্ডস। এ ছাড়া স্পটিফাই, আইটিউনস, ডিজার, স্বাধীনসহ সারা বিশ্বের স্ট্রিমিং সাইটে শোনা যাচ্ছে এই গান। গানটির অ্যানিমেশন ভিডিও তৈরি করেছেন মীর হিশাম।

পান্থ কানাই
পান্থ কানাই। সংগৃহীত

সেদিন সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কেঁদেছিলেন ফারুক আহমেদ

শীতের রাত। গ্রামের মাঠে যাত্রা হবে। সারা দিন পরিকল্পনা হলো, সন্ধ্যা নামলে বড় ভাইদের সঙ্গে যাত্রা দেখতে যাবেন। কিন্তু সন্ধ্যায় শুনলেন, বড়রা কেউ যাবেন না। মনটা ভেঙে যায় কিশোর ফারুক আহমেদের। রীতিমতো কান্না। যাত্রা দেখতে না পারার কষ্টে সেদিন মধ্যরাত পর্যন্ত কেঁদেছিলেন। তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র এই অভিনেতা। পরে অবশ্য আরও বড় হয়ে ফারুক আহমেদ বেশ কয়েকবার যাত্রাপালা দেখেছেন। যাত্রা দেখে তাঁর খুব ইচ্ছা হয়, মুখে রংচং মেখে অভিনয় করবেন।

স্কুলে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়ে একসময় মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসে থিয়েটারে নাম লেখান। হয়ে ওঠেন ভক্তদের কাছে অভিনেতা ফারুক।

তারপর কেটে গেছে চার দশকের বেশি। কিন্তু যাত্রায় আর অভিনয়ের সুযোগ হয়নি। এবার সেই সুযোগ পেয়ে ফারুক আহমেদ বলেন, ‘যাত্রাটা শৈশব থেকে আমার মধ্যে মিশে আছে। আমাদের গ্রামের বাড়ি হরিরামপুর। সেখানে অনেক সাংস্কৃতিক আবহ ছিল। নিয়মিত যাত্রা হতো। তার মধ্যে বেড়ে উঠেছি। এখনো চোখের সামনে সেই যাত্রার দিনগুলো ভাসে। সেই যাত্রায় এবার অভিনয় করতে এসে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি বারবার।’

ফারুক আহমেদ অভিনয় করবেন ‘প্রেয়সী আনারকলি’ যাত্রায়। তাঁর চরিত্রের নাম বীরবল। বেশ কদিন ধরেই তিনি ঢাকা থেকে গিয়ে অনুশীলন করছেন। একাধিকবার গিয়েছেন মানিকগঞ্জে।

ফারুক আহমেদ বলেন, ‘যাত্রার শিল্পীরাও থাকবেন। এর মধ্যে বেশ কজন আমরা ঢাকা থেকে অভিনয় করছি। আগে লুকিয়ে যাত্রাশিল্পীদের মেকআপ নেওয়া দেখতাম, রংচং মাখা দেখে অন্য এক রঙিন জগৎ মনে হতো। সেসব দিনের কথা মনে পড়ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আর যাত্রা আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে। এটা আমাদের আদি ফর্ম। সব মিলিয়ে অন্য রকম মনে হচ্ছে। আমি সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞ। ৫০ বছর আগের একটি শখ পূরণ করতে পারছি, এটা ভেবে ভালো লাগছে।’

‘প্রেয়সী আনারকলি’ পালাটি লিখেছেন কলকাতার প্রসাদ কৃষ্ণ। নির্দেশনা দিচ্ছেন পরিতোষ কুমার সাহা। পালায় সেলিম চরিত্রে অভিনয় করবেন আলী মুরতজা পলাশ ও নামভূমিকায় আনারকলি চরিত্রে অভিনয় করবেন পূরবী দত্ত। আজ শুক্রবার রাত আটটায় মানিকগঞ্জের শিবালয়ে যাত্রাটি মঞ্চস্থ হবে।

অভিনেতা ফারুক আহমেদ। ছবি: ফেসবুক
অভিনেতা ফারুক আহমেদ। ছবি: ফেসবুক