Tuesday, October 15, 2019

কিশোরী জায়রার উদাহরণ

মানুষ মানুষের পরিচয় মুছে দিতে চাইছে! এ কেমন সমাজ ও সভ্যতা? মানুষ তো পশু নয় যে, শুধু চারটা খেতে পারলেই সর্বসুখ। মানুষের আপন পরিচয় আছে, স্বকীয়তা আছে। এমন স্বাজাত্যের কারণেই মানব সমাজে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এই বৈচিত্র্য শুধু সৌন্দর্যের প্রতীকই নয়, মানবিক বিকাশের উপাদানও বটে। ভাবতে অবাক লাগে, কিছু দাম্ভিক মানুষও অপরিনামদর্শী উগ্রসমাজ কোনো কোনো জাতি-গোষ্ঠীর অস্তিত্ব মুছে দিতে চাইছে, চাইছে তাদের মুখে ভিন্ন ধর্ম-সংস্কৃতির স্লোগান তুলে দিতে। দমন-অবদমন এবং জোর-জবরদস্তির চিত্রটা এখানে খুবই উৎকট। তাই প্রশ্ন জাগে, মানব সভ্যতা এগুচ্ছে না পিছিয়ে যাচ্ছে? চীনে উইঘুর মুসলিম শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে বাধ্য করাতে কোনো ধর্ম, সংস্কৃতি কিংবা মতবাদের বিজয় হতে পারে না। স্বাধীন মানবসত্ত্বার এমন অবদমন ও অবমাননাকে কোনো ধার্মিক কিংবা মুক্তবুদ্ধির মানুষ মেনে নিতে পারে না। কিন্তু আমরা মেনে নিচ্ছি কেমন করে? আসলেই আমরা মেনে নিচ্ছি কী?
অবদমনের মাধ্যমে আসলে মানুষকে জয় করা যায় না। মানুষকে জয় করতে প্রয়োজন মুক্ত পরিবেশ, উন্নত জীবন দর্শন ও আচরণ। মানব সমাজে প্রলোভন এবং বিভ্রান্তির পরিবেশও আছে। তবে যে মানুষ আপন বিবেককে, বিশ্বাসকে সম্মান করে; সে আখেরে মানুষই থেকে যায়। কোনো কিছুই তাকে জয় করতে পারে না। ঝলমলে এই জাহেলী সভ্যতায়ও তেমন উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে কিশোরী বলিউড অভিনেত্রী জায়রা ওয়াসিমের কথা উল্লেখ করা যায়। ঈমান অটুট রাখতে গত ৩০ জুন হঠাৎ করেই বলিউডের সিনেমায় অভিনয় ছেড়ে দেয়ার কথা ঘোষণা করলেন জায়রা। বিবিসি পরিবেশিত প্রতিবেদনটি ০১ জুলাই ঢাকার বিভিন্ন দৈনিকে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে।
আমির খান অভিনীত ‘দঙ্গল’ ও ‘সিক্রেট সুপারস্টার’ ছবিতে অভিনয় করে আলোচিত হয়ে ওঠেন কাশ্মীরে জন্ম নেয়া ভারতীয় অভিনেত্রী জায়রা। খুব অল্প সময়েই তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। তবে ঘোষণায় তিনি বলেন, নিজস্ব এই পেশার ফলে ধর্ম ও বিশ্বাসের সাথে তার যে সম্পর্ক সেটা নষ্ট হচ্ছিল এবং এ কারণে তিনি মোটেও পরিতৃপ্ত ছিলেন না। জায়রা ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে অভিনয় ছেড়ে দেয়ার কথা জানালে সেটি সাথে সাথেই সোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়ে। জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী এই অভিনেত্রী তাতে লিখেছেন, ‘আমি হয়তো এখানে (বলিউড) পুরোপুরি ঠিক আছি। কিন্তু আমি এখানকার মানুষ নই।’ জায়রা ওয়াসিম আরো লিখেছেন, বলিউড আমাকে দুই হাত ভরে দিয়েছে। ভালোবাসা, সমর্থন, জীবন-যাপনের পদ্ধতি-সবকিছু। কিন্তু আমি যেভাবে কাজ করেছি, তাতে আমার ধর্মীয় বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ইসলামের সাথে আমার সম্পর্ক হুমকির মুখে পড়েছে। আল্লাহর সাথে আমার দূরত্ব বেড়েছে। আমার মানসিক শান্তি নষ্ট হয়েছে। আমি আমার জীবন থেকে বরকত হারিয়েছি।
জায়রা শেষে যে কথাগুলো লিখেছেন, তাতে উপলব্ধি করা যায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এবং সামাজিক চাপের মুখেও মানুষের ঈমান নিজেকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করতে পারে। তিনি লিখেছেন, আমি ভুলতে বসেছিলাম, পৃথিবীতে আমাদের পাঠানোর উদ্দেশ্য। আর শেষ বাক্যে জায়রা জানিয়েছেন, মনের শান্তি ও ঈমানের বিনিময়ে এসব সফলতা, তারকাখ্যাতি, কর্তৃত্ব, সম্পদ কিছুই চান না তিনি। ১৮ বছর বয়সে জায়রা যে উপলব্ধির কথা প্রকাশ করলেন, বর্তমান সময়ে পরিণত বয়সের জ্ঞানী ও ক্ষমতাবান মুসলমানদের মধ্যে তেমন উপলব্ধি কতটা আছে? এমন প্রশ্নে আত্মসমালোচনা করলে মন্দ হয় না।

তেলের মজুতে ভাগ্য ফিরবে উগান্ডার জনগণের?

২০০৬ সালে উগান্ডা প্রথমবারের মতো জানতে পারে, নিজের মজুত থেকে তারা বাণিজ্যিকভাবে তেল উত্তোলন করতে পারবে। ২০ বছরের মধ্যে আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলে সন্ধান পাওয়া সবচেয়ে বড় তেলের উৎস এটিই। খুব দ্রুত হলেও ২০২২ সালের আগে ওই তেল উত্তোলন করতে পারবে না দেশটি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের নানা হিসাব-নিকাশ বলছে, এই তেল কি উগান্ডার জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসবে, নাকি হবে আশীর্বাদরূপী অভিশাপ?
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উগান্ডার পশ্চিমাঞ্চলের লেক আলবার্টসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৬০০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর মধ্যে প্রায় ১৫০ কোটি ব্যারেল তেল উত্তোলনযোগ্য। কিন্তু এই তেল উত্তোলনের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে উগান্ডাকে। গবেষকদের আশঙ্কা, এই ‘সম্পদরূপী অভিশাপ’ অর্থনীতিকে চাপে ফেলে, রাজনীতিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে ও যুদ্ধকে উসকে দেয়। এমনকি গবেষকেরা এমনটাও বলছেন, তেল উত্তোলন শুরুর আগেই এই ‘অভিশাপ’ সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
উগান্ডায় তেলের সন্ধান পাওয়ার কাছাকাছি সময়ে ঘানা ও মোজাম্বিকে তেল-গ্যাসের বিশাল মজুতের সন্ধান মিলেছিল। কোথায় সেই তেল ও গ্যাস উত্তোলন করে দেশ দুটি নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটাবে তা না, বরং উভয় দেশই অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। গবেষকেরা তাই এখন থেকেই উগান্ডাকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বলছেন।
মূলত, উগান্ডাকে ধৈর্য ধরতে বলছেন গবেষকেরা। দ্রুত তেল উত্তোলনের আশায় বিপুল অঙ্কের অর্থ ঋণ করেছিল ঘানা। পরিকল্পনা ছিল, একবার তেল উত্তোলন শুরু হলেই সব ঋণ শোধ করে দেবে তারা। কিন্তু তেল উত্তোলন শুরুর ছয় বছর পরেও বিশাল ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হতে পারেনি ঘানা। এমনকি ঋণ শোধের জন্য ২০১৫ সালে আইএমএফের শরণাপন্নও হতে হয়েছে দেশটিকে। একইভাবে দ্রুত গ্যাস উত্তোলনের জন্য বন্ড বিক্রি থেকে শুরু করে প্রচুর ঋণ করেছে মোজাম্বিকও, কিন্তু লাভের বদলে উল্টো তারা ঋণের বোঝা বহন করে চলেছে। দেশটির সাবেক অর্থমন্ত্রী এখন দক্ষিণ আফ্রিকায় কারাবাস করছেন।
উগান্ডা
অবস্থান: আফ্রিকা মহাদেশের পূর্বাঞ্চল
রাজধানী: কাম্পালা
জনসংখ্যা: ৩ কোটি ৫৬ লাখ
মুদ্রা: উগান্ডান শিলিং
আয়তন: ২ লাখ ৪১ হাজার ৩৮ বর্গকিলোমিটার
ভাষা: ইংরেজি, সোয়াহিলি
গড় আয়ু: পুরুষ (৫৪ বছর), নারী (৫৫ বছর)
সূত্র: বিবিসি

গবেষকেরা বলছেন, অবাস্তব উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেই ঋণ গ্রহণের এই মহোৎসব শুরু হয়। ২০১৭ সালে জেমস কাস্ট ও ডেভিড মিলহালি নামের দুজন গবেষক একটি গবেষণা করেছিলেন। তাঁরা ১৯৮৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আবিষ্কৃত হওয়া ২৩৬ টি তেলের খনির বিষয়ে এই গবেষণা করেছেন। তেলের সন্ধান পাওয়ার আগে আইএমএফ দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তেলের খনি আবিষ্কৃত হওয়ার পর সেই পূর্বাভাস কতটা মিলেছে সেটি মিলিয়ে দেখাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। গবেষণার ফলাফল বলছে, তেলের খনি আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রতিবছর দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি গড়ে  শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ করে কমেছে। আর যেসব দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো একটু দুর্বল, সেসব দেশে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্তও কমতে দেখা গেছে।
তবে বাকি দেশগুলোর তুলনায় উগান্ডার একটি সুবিধাও দেখতে পাচ্ছেন কেউ কেউ। ১৯৮৬ সাল থেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনি বেশ শক্তভাবেই ক্ষমতা নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রেখেছেন। উগান্ডার বিশ্লেষক অ্যাঞ্জেলো ইজামা ও ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক স্যাম হিকি বলছেন, এই তেলের খনি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবেন মুসেভেনি, যে সুযোগ ঘানার মতো তুলনামূলক গণতন্ত্রপন্থী দেশগুলো পায়নি। ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই খনি থেকে তেল উত্তোলনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন সেসব দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানেরা। উগান্ডার তাই তেল নিয়ে বহির্বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে লাভজনক ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার সুযোগ বাকিদের তুলনায় বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন এখন এটিই, উগান্ডা কি তত দিন এই তেল সম্পদের জন্য ধৈর্য ধরতে পারবে? উগান্ডার জনগণ যতটা ধারণা করেন, আদতে তার চেয়ে অনেক কম তেল মজুত রয়েছে দেশটিতে। দেশের সব মানুষের মধ্যে সমানভাবে এই তেল ভাগ করে দিলে প্রত্যেকের ভাগে বছরে মাত্র দুই ব্যারেল করে তেল পড়বে। তিন দশকের মধ্যে এই তেল শেষ হয়ে যাবে। যেখানে অ্যাঙ্গোলার মজুত হিসাবে প্রতি নাগরিক পাবেন ৩৯ ব্যারেলের কাছাকাছি। বিশ্লেষকেরা তাই শঙ্কিত, উগান্ডার এই তেলসম্পদ কি দেশটির অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হিসেবে ধরা দেবে? নাকি ঘানা ও মোজাম্বিকের মতোই ঋণের ভারে জর্জরিত হবে তারা?

আবরারের ছবিতে ভিজেছে হাজারো চোখ by মরিয়ম চম্পা

সম্প্রতি বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নাড়া দিয়েছে সারা দেশের মানুষকে। দলমত নির্বিশেষে কাঁদিয়েছে সবাইকে। আবরারের জন্য কেঁদেছে পুরো দেশ। আবরারের খুনিদের বিচারের দাবিতে চলা আন্দোলনের মধ্যেই গতকাল হয়ে গেল বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দুই ধাপে এ পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ হাজার শিক্ষার্থী। এসেছিলেন কয়েক হাজার অভিভাবক। আবরারের খুনীদের শাস্তির দাবিতে চলা আন্দোলনে বুয়েট ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে এখন শুধু আবরারের ছবি। নির্মম নির্যাতনের শিকার জীবন হারানো আবরারের এই মুখ দেখে গতকালও কেঁদেছেন হাজারো মানুষ।
পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের অনেকে হয়েছেন আবেগ আপ্লুত।
আবরারের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন এক পরীক্ষার্থীর মা। তিনি বলেন, আমার মেয়ে মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ থেকে পাশ করেছে। তাকে পরীক্ষা দিতে নিয়ে এসেছি। ওর সঙ্গে আবরারের বিষয়ে খুব একটা আলোচনা করিনি। ঘটনার পরে সবাইতো আমরা ওর জন্য কেঁদেছি। এখন মনে হয় ও যেন আমাদের সবার নিজেদেরই ‘আবরার’। এখন সে আমাদেরই। আমি ওর মা হলে বলতাম, আবরারকে যেভাবে মারা হয়েছে ওদেরকে যেন ঠিক একইভাবেই মারা হয়। তাহলে ওরা বুঝবে যে আবরার কতটুকু কষ্ট পেয়ে মরেছে। ওই মূহুর্তে ওর কত কষ্ট হয়েছে। অন্যভাবে মরলেতো ওরা আবরারের মৃত্যুর কষ্ট বুঝবে না। এটা নিয়ে এতো আলোচনা সমালোচনার কিছু নেই। আবরারের আরেক মা হিসেবে আমি বলবো, আবরারের মত করেই খুনিদের মারা হোক। আবরারও নেই। কাজেই ওরাও থাকবে না। আবরারের তো কোনো দোষ ছিল না। ও কোনো দোষ না করে যেহেতু নেই। তাহলে দোষ করে ওরা কেনো থাকবে। ওদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। ওরা বেঁচে থেকে আবার কোনো নিরপরাধ মানুষকে থেকে থেকে মারবে। এটা তো হয় না। এক পরীক্ষার্থী কান্না করে বলেন, আবরার হত্যার ঘটনায় আমি অনেক কেঁদেছি। এখানে এসে আমি আর মা দেয়ালের গ্রাফিতি দেখে কেঁদেছি। আজ হয়তো সে বেঁচে থাকলে পরিবেশটা অন্যরকম হতো। আমরা চাই, আবরারের নামে একটি হল তৈরি করা হোক। যেটার নাম থাকবে ‘শহীদ আবরার হল’। মা-বাবা আমাকে কোনো মোবাইল ফোন দেখতে দেয়নি। মোবাইল সবসময় তাদের কাছে রেখেছে। এগুলো দেখে মন মানসিকতা খারাপ হয়ে গেলে হয়তো পরীক্ষা খারাপ হতে পারে।
একজন পরীক্ষার্থী সঙ্গে আসা তার বোন বলেন, আমি গাজিপুরে জয়দেবপুর গভ. গার্লস হাইস্কুলে পড়ি। ভবিষ্যতে এখানে পড়তে চাই। তাই ক্যাম্পাস ঘুরে দেখতে এসেছি। ক্যাম্পাস ভালো লেগেছে। আবরার ভাইয়াকে যেভাবে মারা হলো এবং তাকে যারা মেরেছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিৎ দ্রুততম সময়ের মধ্যে। পরীক্ষা দিতে আসা এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, আমরা স্বীকার করি আর না করি বুয়েট প্রশাসন তো আসলেই খারাপ। একটি ভালো শিক্ষার্থীকে শুধুমাত্র পড়া দিয়ে আটকালে হবে না। পাশাপাশি তাকে অনেক কিছু শিখাতে হবে। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে নিয়ে যে সকল মন্তব্য করা হচ্ছে ভিসি তো আসলেই তাই। একজন পরীক্ষার্থীর ব্যাংকার বাবা বলেন, আমার ছেলে পরীক্ষা দিতে এসেছে। সে যদি চান্স পায় তাহলে এখানেই ভর্তি করাবো। আমার বিশ্বাস যে এর একটি সঠিক বিচার হবে। সঠিক বিচার হলে ছাত্ররা এখানে নিরাপদে পড়ালেখা করতে পারবে। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে রাজনীতি নেই এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বুয়েট ছিল অন্যতম। এখানে নেই কোনো সেশন জট। শিক্ষার্থীরা তাদের পড়ালেখা শেষ করে চার বছরের মধ্যে কৃতিত্বের সঙ্গে ভালো ফলাফল করে বের হয়ে যাচ্ছে। বাকী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে অপরাজনীতি রয়েছে সেখানে সবসময় একটি টেনশন কাজ করে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে। আমার মনে হয়, সারা বাংলাদেশে সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সব ধরনের রাজনীতি বন্ধ করে দেয়া উচিৎ। এখন ছাত্র রাজনীতি মানে ক্যাম্পাসের হলে বসে মদ, গাজা খাচ্ছে। জুয়া খেলছে। নানা ধরনের অঘটন ঘটাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উপর টর্চার করছে। পড়ালেখার পরিবেশ নষ্ট করছে। বাংলাদেশের সেরা মেধাবী ছাত্রগুলো বুয়েটে পড়ে। সেই বুয়েটে আমরা জীবন্ত ছেলেকে পড়তে দিচ্ছি আর তার মৃত লাশ এখান থেকে নিতে হচ্ছে। উত্তরা রাজউক কলেজের শিক্ষার্থী এবং বুয়েটের পরীক্ষার্থী বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডে খুনিদের গ্রেপ্তার করার পর মনে হয়েছে, এখন মনে হয় এখানে (বুয়েটে) পড়া যাবে। নিরাপদে পড়তে পারবো। এর আগের পরিবেশ সম্পর্কে ভালো জানা ছিল না। তবে আবরার হত্যাকাণ্ডের কারণে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছিল। আমরা চাই আবরার হত্যাকারিদের উপযুক্ত শাস্তি হোক। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে পাস করা একজন শিক্ষার্থী বলেন, আবরার ভাই যে হলে থাকতেন সেই শেরে বাংলা হল দেখতে গিয়েছিলাম। অনেক খারাপ লেগেছে। কান্না পেয়েছে। আইটি ফার্মে কর্মরত এক নারী অভিভাবক বলেন, আমার ছোট বোন মিরপুর হারম্যান মেইনার কলেজ থেকে পাস করেছে। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর আমরা ওর পরীক্ষা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম। বুয়েটের মতো যায়গায় শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে সেটা জানা ছিল না।

যে কারণে হুয়াওয়েকে নিয়ে উদ্বিগ্ন পশ্চিমা বিশ্ব

গুগল ঘোষণা করেছে যে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন কোম্পানি হুয়াওয়েকে গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের কিছু আপডেট ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। এর মানে হচ্ছে যে হুয়াওয়ের নতুন স্মার্টফোনগুলোতে গুগলের বেশকিছু অ্যাপ আর ব্যবহার করা যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে 'বিদেশি শত্রুদের' কাছ থেকে তার দেশের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক রক্ষায় জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পদক্ষেপের আসল টার্গেট ছিল আসলে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে।
হুয়াওয়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার স্মার্টফোনের কারণে। কিন্তু তারা আরও বহু রকম কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্ট তৈরি করে।
যদি হুয়াওয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের যন্ত্রপাতি বিক্রি করতে নাও পারে, তারপরও বিশ্বজুড়ে কমিউউনিকেশন নেটওয়ার্কের ৪০ হতে ৬০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করবে হুয়াওয়ে।
কী কারণে হুয়াওয়েকে নিয়ে এতটা চিন্তিত বিভিন্ন দেশ?
এর পেছনে আছে খুবই জটিল কিছু অভিযোগ। এর মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি থেকে শুরু করে চুরি যাওয়া রোবট, হীরের প্রলেপ দেয়া গ্লাসস্ক্রিন থেকে ইরানের সঙ্গে গোপন চুক্তি- অনেক কিছুই আছে।
ফাইভ-জি: সুপারফার্স্ট কিন্তু নিরাপদ নয়?
মোবাইল টেলিফোনের ক্ষেত্রে পরবর্তী বিপ্লব হিসেবে ধরা হয় ফাইভ-জি নেটওয়ার্ককে। হুয়াওয়ে এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক বসানোর জন্য অনেক দেশের সঙ্গেই আলোচনা চালাচ্ছে। এই নতুন নেটওয়ার্ক এত দ্রুতগতির হবে যে এটি ব্যবহার করা হবে বহু নতুন কাজে। যেমন চালকবিহীন গাড়ি চালানোর কাজে।
এখন হুয়াওয়ে যদি কোনো দেশের ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে, চীন ঐ দেশের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালাতে পারবে বলে দাবি করছে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো। তারা চাইলে এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্কে আদান-প্রদান করা বার্তা পড়তে পারবে, চাইলে নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিতে পারবে বা সেখানে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের আগেই অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো হুয়াওয়ের সঙ্গে ব্যবসা না করার জন্য একটা চাপ সৃষ্টি করেছিল। এই দেশগুলোর মধ্যে আছে 'ফাইভ আই'স' বলে পরিচিত একটি গ্রুপ। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া গ্রুপের বাকী চারটি দেশ হচ্ছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড। এই পাঁচটি দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য খুবই ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা আছে। এর বেশিরভাগটাই করা হয় ইলেকট্রনিক উপায়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে এই পাঁচ দেশের কোনো দেশ যদি হুয়াওয়ের নেটওয়ার্ক তাদের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইনফরমেশন সিস্টেমে বসায়, তাহলে সেই দেশের সঙ্গে তারা আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শেয়ার করতে পারবেন না।
হুয়াওয়ে অবশ্য বারবার জোর দিয়ে বলেছে, তারা কখনোই চীন সরকারের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করবে না। কিন্তু সমালোচকরা একটি চীনা আইনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন যার কারণে কোনো কোম্পানির পক্ষে গোয়েন্দা তথ্য চেয়ে চীনা সরকারের অনুরোধ উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হবে।
হুয়াওয়ে আরও বলছে, যদি তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করা হয় সেটি মার্কিন ভোক্তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করবে। কারণ এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে হুয়াওয়ের বিকল্প হিসেবে তার চেয়ে অনুন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে এবং ফাইভ-জি প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্র যে এ ধরণের 'প্রযুক্তি গুপ্তচরবৃত্তির' ভয় করছে, তার কারণ হয়তো তারা নিজেরাই এরকম কাজ করেছে বছরের পর বছর। এনএসএ'র সাবেক কন্ট্রাক্টর এডওয়ার্ড স্নোডেন তার ফাঁস করা তথ্যে দেখিয়েছেন কীভাবে মার্কিন নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বড় বড় মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির নেটওয়ার্ক হ্যাক করে তথ্য চুরি করতো। এর মধ্যে গুগল এবং ইয়াহুর মতো কোম্পানি পর্যন্ত আছে।
কাজেই প্রতিদ্বন্দ্বী একটি দেশের কোম্পানিকে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ যুক্তরাষ্ট্রের আছে।
রোবট এবং অস্ত্র কেলেংকারি
অতিদ্রুত গতির ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কের উদাহরণ দিয়ে জিনিসটা বোঝানো হয়তো কঠিন। কিন্তু হুয়াওয়েকে ঘিরে অন্য কেলেংকারিটি বোঝা অতটা কঠিন নয়। তাদের এক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে একটি রোবটের হাত চুরির অভিযোগ আনা হয়। তবে এই প্রকৌশলী অভিযোগ করছেন, এটি চুরি ছিল না, দুর্ঘটনাবশত ব্যাপারটি ঘটেছে।
তিনি টি-মোবাইলের ডিজাইন ল্যাবে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি রোবটের হাত ব্যবহার করে স্মার্টফোনের স্ক্রীন পরীক্ষা করা হয়। এই যন্ত্রটি দুর্ঘটনাবশত তার ব্যাগের মধ্যে পড়ে যায়। যখন তিনি ল্যাব থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, তখন বিষয়টি খেয়াল করেননি।
জার্মান কোম্পানি টি-মোবাইলের সঙ্গে তখন হুয়াওয়ের পার্টনারশীপ ছিল। টি-মোবাইল এই কথা বিশ্বাস করেনি। এরপর দুই কোম্পানির মধ্যে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়।
নতুন কিছু ইমেল ফাঁস হওয়ার পর এই কেলেংকারি নিয়ে আবার কথাবার্তা শুরু হয়েছে। এসব ইমেলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এই প্রকৌশলী হয়তো চীনে তার উর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার নির্দেশে এই কাজ করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে গত বছর যে কানাডায় হুয়াওয়ের চীফ ফিনান্সিয়াল অফিসার মেং ওয়ানজুকে গ্রেফতার করা হয়, তার একটি কারণ এটি।
ইরানের সঙ্গে গোপন আঁতাত?
মিজ মেং ওয়ানজু তাকে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়ার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। ইরানের সঙ্গে কোনো গোপন আঁতাতের কথাও তিনি উড়িয়ে দিচ্ছেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছিল যে তেহরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কীভাবে ফাঁকি দেয়া যায়, সেরকম এক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তিনিও যোগ দিয়েছিলেন স্কাইকম নামের একটি কোম্পানির মাধ্যমে।
ইরানের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক লেনদেনের অনেক কিছুর ব্যাপারে তিনি ব্যাংকগুলোকে এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যে কথা বলেছেন বলেও অভিযোগ আছে।
মিজ মেং হচ্ছেন হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতার কন্যা। যদি তাকে বিচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয় এবং তিনি দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে ৩০ বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে তার।
স্মার্টফোনের ভাঙ্গা স্ক্রীন এবং অঙ্গীকার খেলাপ
ব্লুমবার্গের দেয়া তথ্য অনুসারে, হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই। এর একটি হচ্ছে তারা পরীক্ষা করে দেখার নামে ধার নেয়া একটি স্মার্টফোনের স্ক্রিনের নমুনা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে পাচার করে দিয়েছিল।
মোবাইল ফোনের স্ক্রিন খুব সহজেই ভেঙ্গে যায়। কাজেই এমন একটি স্ক্রিন যদি তৈরি করা যায়, যেটি কোনভাবেই ভাঙ্গবে না, সেটি যেকোন প্রযুক্তি কোম্পানির জন্যই একটি বিরাট আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে আখান সেমিকন্ডাক্টার নামের একটি কোম্পানি এরকম একটি কাঁচ তৈরি করে হুয়াওয়েকে দেয়ার প্রস্তাব দেয়। এটি নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। তারা হীরের প্রলেপ দেয়া যে কাঁচের স্ক্রিনটি হুয়াওয়েকে দেয়, সেটি যখন কয়েক মাস পর ফেরত আসে, দেখা গেল সেটি ভাঙ্গা। ব্লুমবার্গের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
এফবিআই এটি তদন্ত করছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে এভাবে এটি দেশের বাইরে নেয়া অবৈধ ছিল। হীরের প্রলেপ দেয়া কোনো জিনিস এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নেয়া যায় না, কারণ এ ধরনের জিনিস লেজার অস্ত্রে ব্যবহার করা যায়।
চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে এই অভিযোগও অস্বীকার করছে।
এখানেই গল্পের শেষ নয়
কিন্তু এসব কেলেংকারি, গুগলের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ সত্ত্বেও বিশ্বের প্রযুক্তি জগতে হুয়াওয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানি হিসেবে রয়েই যাবে।
আফ্রিকা এবং এশিয়ার অনেক দেশেই হুয়াওয়ের প্রযুক্তির দাম ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রযুক্তির চেয়ে কম। কাজেই এসব দেশে হুয়াওয়ের ব্যবসা বাড়তেই থাকবে।
এমনকি যুক্তরাজ্যে, যারা কীনা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, এখনো তীব্র বিতর্ক চলছে হুয়াওয়েকে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক তৈরি করতে দেয়া উচিত কীনা। সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হয়েছিল চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে এই বিতর্কে।
হুয়াওয়েকে ব্যবসা করতে দেয়া হবে কি হবে না, সেই সিদ্ধান্ত এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। হুয়াওয়েকে ঘিরে আর সব কিছুর মতো, এক্ষেত্রেও কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। সূত্র : বিবিসি।

অর্থনীতিতে বাঙালিসহ নোবেল পেলেন ৩ জন

দরিদ্রতা দূরীকরণে পরীক্ষামূলক কাজ করে এ বছর অর্থনীতিতে যৌথভাবে নোবেল পেয়েছেন এক বাঙালিসহ তিন ব্যক্তি। তারা হচ্ছেন, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, তার স্ত্রী এস্থার ডাফলো ও অর্থনীতিবিদ মাইকেল ক্রেমার। এই পুরস্কার ঘোষণার মাধ্যমে, অমর্ত্য সেনের পর দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল জিতলেন অভিজিৎ। এর আগে প্রথম বাঙালি হিসেবে ১৯৯৮ সালে নোবেল জিতেছিলেন অমর্ত্য সেন। এদিকে, অর্থনীতিতে নোবেলপ্রাপ্ত দ্বিতীয় নারীর সম্মান অর্জন করেছেন এস্থার ডাফলো। তার আগে ২০০৯ সালে অর্থনীতিতে প্রথম নারী হিসেবে নোবেল জেতেন এলিনর অসট্রোম। পুরস্কার পাওয়ার পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীরা গড়পড়তায় তার ও তার সহকর্মীদের চেয়ে অধিক অভিজ্ঞ হয়। তাই পুরস্কার পাওয়াটা তার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ১৯৬১ সালে মুম্বইয়ে জন্ম অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তার প্রাথমিক পড়াশোনা সেখানেই। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। সে বছরই স্নাতকোত্তর পড়তে চলে যান কলকাতার জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর পিএইচডি করেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেখানে তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘ইনফরমেশন ইকোনমিক্স।’
নোবেলজয়ীদের মধ্যে অভিজিৎ ও ডাফলো ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন। অন্যদিকে ক্রেমার হলেন, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের ‘ডেভেলপিং সোসাইটিজ’-এর গেটস প্রফেসর। অর্থনীতিতে নোবেল প্রদানকারী কমিটি পুরস্কার ঘোষণা নিয়ে জানায়, এই বছরের অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের গবেষণা উন্নয়ন বিষয়ক অর্থনীতিকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে চরম দুর্নীতি মোকাবিলার নীতিমালায় নিশ্চিতভাবেই প্রভাব ফেলেছে তাদের কাজ।
যে কারণে নোবেল পেয়েছেন তারা মানবজাতির সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে দরিদ্রতা। ন্যূনতম প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ ছাড়াই জীবনযাপন করছে বহু মানুষ। অর্থাভাবে প্রতি বছর অন্তত ৫০ লাখ পাঁচ বছরের চেয়ে কমবয়সী শিশু যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায়। পুরো পৃথিবীর অর্ধেক শিশু এখনো মৌলিক সাক্ষরতা ও হিসাবের জ্ঞান অর্জন ছাড়াই স্কুল থেকে ঝরে যায়। চলতি বছরের অর্থনীতিতে নোবেলজয়ীরা এমন একটি পদ্ধতি প্রবর্তন করেছেন, যার মাধ্যমে সবচেয়ে কার্যকরভাবে বৈশ্বিক দরিদ্রতা দূর করা যাবে। তারা দরিদ্রতার মোকাবিলার সমস্যাটিকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে সেগুলো সহজেই মোকাবিলা করার প্রতি জোর দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ- শিশুদের শিক্ষাগত অর্জন বাড়ানো বা শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকরী নিয়ামক কোনটি। তারা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে, কোনো সমস্যা নিয়ে ছোট ছোট ও নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর বেশির ভাগ সময় ওই সমস্যায় আক্রান্তদের ওপর পরীক্ষা চালানোর মাধ্যমে পাওয়া যায়।
১৯৯০ সালে মাইকেল ক্রেমার ও তার সহকর্মীরা এই পদ্ধতির গুরুত্ব প্রমাণ করেন। পশ্চিম কেনিয়ায় বেশ কয়েকটি স্কুলের সামগ্রিক ফলাফল উন্নতির মাধ্যমে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেন। পরবর্তীতে অভিজিৎ ও ডাফলো একই ধরনের পরীক্ষা অন্যান্য দেশে, অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলায় ব্যবহার করেন। বেশির ভাগ পরীক্ষায় ক্রেমার তাদের সহযোগিতা করেন। বর্তমানে উন্নয়ন অর্থনীতির জগৎজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তাদের এই পরীক্ষামূলক সমাধান বের করার পদক্ষেপ।
প্রসঙ্গত, নোবেল পুরস্কারের প্রবর্তক আলফ্রেড নোবেল তার উইলে এই পুরস্কার নিয়ে কিছু লিখে যাননি। তবে ১৯৬৮ সালে সুইডিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেভেরেজিন্স রিক্সব্যাংক তাদের ৩০০ বছর পূর্তিতে নোবেল ফাউন্ডেশনকে বিশাল অঙ্কের অর্থ দান করে। তাদের দেয়া ওই অর্থ ব্যবহার করে নোবেলের সম্মানার্থে ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতে পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। পুরস্কারটির আনুষ্ঠানিক নাম হচ্ছে ‘দ্য সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক প্রাইন ইন মেমোরি অব আলফ্রেড নোবেল’।

অলৌকিক!

এ এক অলৌকিক ঘটনা। এ জন্যই মানুষ বলে থাকে, রাখে আল্লাহ মারে কে! এ কথাই সত্য প্রমাণ করেছে ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি শিশুকন্যা। তাকে একটি পাত্রে করে দুই ফুট মাটির নিচে জীবন্ত সমাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর কি লীলাখেলা! মাটিচাপা দেয়া সেই শিশুকন্যাটিই আবার পৃথিবীর মুখ দেখছে। তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ঘটনাটি উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলি এলাকার। সেখানে অন্য একটি পরিবারে জন্ম নেয় একটি মৃত কন্যাসন্তান। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য গর্ত খোঁড়া হচ্ছিল।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ওই গর্ত খুঁড়তে গিয়ে স্থানীয়রা একটি পাত্র পান মাটির নিচে। কিন্তু তার ভিতর তারা দেখতে পান একটি মানবসন্তান। সঙ্গে সঙ্গে চোখ কপালে ওঠে সবার। তারা ওই পাত্র থেকে উদ্ধার করেন সন্তানটিকে। দেখতে পান সে তখনও শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। কাঁদছে। অন্য কিছু ভাবার আগে তারা দ্রুত তাকে নিয়ে ছুটে যান জেলা সদরের হাসপাতালে। এ সময় শিশুটির অবস্থা ছিল সঙ্কটজনক।
বর্তমানে ওই হাসপাতালের স্পেশাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটে ফুসফুসের সংক্রমণের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তাকে। উদ্ধার করা এই শিশুটির ওজন মাত্র ১.১ কেজি। তাকে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, বাচ্চাটি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব করা হয়েছে এবং সে বেঁচে আছে এ জন্য যে, নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেয়া শিশুদের কম অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। এমন হতে পারে যে, তাকে কয়েক ঘন্টা আগে সমাহিত করা হয়েছিল। স্থানীয় বিজেপি দলীয় বিধান সভার সদস্য রাজেশ মিশ্র ওরফে পাপ্পু ভারতোল তার সব চিকিৎসার খরচ বহন করছেন।
এ বিষয়ে সুভাষনগর পুলিশ স্টেশনের কর্মকর্তা হশ্চিন্দ্র যোশী বলেছেন, কে শিশুকন্যাটিকে জীবন্ত মাটিচাপা দিয়েছে তাকে সনাক্ত করার চেষ্টা করছি আমরা। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে তাকে চিহ্নিত করা হবে। এরপরই মামলা হবে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্থানীয় হিতেশ কুমারের স্ত্রী বৈশালী একটি মৃত কন্যাসন্তান প্রসব করেন। পরিবারের সদস্যরা সুভাষনগরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের স্থানে নিয়ে যান তাকে। এক পর্যায়ে একজন শ্রমিক গর্ত খোঁড়া শুরু করেন। তখন তার কোদাল গিয়ে আঘাত করে একটি পাত্রে। এরপর ওই পাত্রটি তুলে তার ভিতর থেকে উদ্ধার করা হয় ওই শিশুকন্যাটিকে। তখনও সে জীবিত এবং কাঁদছিল। হিতেশ কুমার বলেছেন, ওর কান্না শুনে আমি ভেবেছিলাম আমার মেয়েই বুঝি প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কিন্তু ওই কান্নার শব্দ আসছিল প্রকৃতপক্ষে ওই পাত্রের ভিতর থেকে। পাত্রটি উন্মুক্ত করে আমরা এর ভিতর একটি শিশুকন্যাকে দেখতে পাই। সঙ্গে সঙ্গে ডাকা হয় অ্যাম্বুলেন্স। খবর দিই পুলিশে। এভাবেই রক্ষা পায় ওই শিশুটির জীবন।

বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে যত ধরণের নির্যাতন by শাহনাজ পারভীন

নানা ধরণের নিষ্ঠুর নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ বন্ধে বাংলাদেশ সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তার একটা পর্যালোচনা এখন চলছে জেনেভায় জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত এক কমিটির সামনে।
বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সেখানে গেছে সরকারের পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরতে। অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের কথা তুলে ধরতে গেছেন বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা।
নির্যাতন বন্ধ সংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদটি বাংলাদেশ অনুমোদন করেছিল বিশ বছর আগে। এই সনদটির পুরো নাম 'কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার এন্ড আদার ক্রুয়েল, ইনহিউম্যান অর ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট অর পানিশমেন্ট।' এই প্রথম এই সনদের অধীনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক অভিযোগ
এই সনদের অধীনে বাংলাদেশ নির্যাতন এবং অন্যান্য অমানবিক আচরণ বন্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটি জেনেভা বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পেশ করার কথা। সরকার দাবি করছে এই লক্ষ্যে তারা এর মধ্যে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং আরও অনেক মানবাধিকার সংস্থা তা মানতে নারাজ।
এই বৈঠকের প্রাক্কালে হিউম্যান রাইটস বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে যে ধরণের নির্যাতন চলে তার একটি বিবরণ তুলে ধরেছে। তার কয়েকটি এরকম:
  • •বন্দীদের রড, বেল্ট এবং লাঠি দিয়ে পেটানো
  • •বৈদ্যুতিক শক্‌ দেয়া
  • •ওয়াটারবোর্ডিং (মুখের ওপর পানি ঢালতে থাকা যাতে করে পানিতে ডুবে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা হয়)
  • •সিলিং থেকে বন্দীদের ঝুলিয়ে পেটানো
  • •ইচ্ছে করে বন্দীদের গুলি করা, বিশেষ করে পায়ের নীচের অংশে। এটিকে বলা হয় 'নীক্যাপিং।' এসব ঘটনাকে পুলিশ 'ক্রসফায়ার' বলে বর্ণনা করে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলছেন, বাংলাদেশে এসব ঘটনা কোন বিচার হয়না বলেই নির্যাতনের একটি সংস্কৃতি বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে গেছে।
তিনি বলছেন, "সিকিউরিটি ফোর্সের লোকেরা বলেন টর্চার ছাড়া নাকি তারা তদন্ত করতে পারে না। এই যে একটা মনোভাব এটা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই আছে। বাংলাদেশে যেটা সেটা হল টর্চার তাদের একটা রুটিন প্র্যাকটিসের মতো। তারা টর্চার এইজন্যেই করেন কারণ তারা এটা করতে পারেন। তারা ভাবেন তাদের এটা করার অনুমতি আছে।"
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি: "বাংলাদেশে নির্যাতনের একটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে"
তিনি আরও বলছেন, "বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি হিসেবেই যেন এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। আর সেজন্যে শুধু বিরোধী মতে ব্যক্তিরাই শুধু নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভয় ঢুকে গেছে।"

সরকার কী বলছে?

জাতিসংঘের কমিটির সামনে বাংলাদেশ তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে নির্যাতন বন্ধে এবং নির্যাতনের শিকার যারা হন, তারা যাতে ন্যায় বিচার পান সেই লক্ষ্যে অনেক পদক্ষেপ তারা নিয়েছে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশে 'টর্চার এন্ড কাস্টডিয়াল ডেথ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট' নামে একটি আইন পাশ করে।
কিন্তু এই আইনের অধীনে এ পর্যন্ত খুব কম মামলাই হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এর মধ্যে একটি মামলারও এখনো পর্যন্ত নিস্পত্তি হয়নি। তারা আরও বলছে, এই আইন পাশ হওয়ার পর অন্তত ১৬০ টি নির্যাতনের ঘটনার রেকর্ড আছে। প্রকৃত নির্যাতনের ঘটনা তাদের মতে আরও বেশি।

পুলিশ হেফাজতে দুটি নির্যাতনের ঘটনা

বাংলাদেশে পুলিশের হাতে নির্যাতনের শিকার দুটি পরিবারের সদস্যরা বিবিসি বাংলার কাছে তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। সেরকম দুটি ঘটনা:
২০১৭ সালের ১৮ই জুলাই। খুলনায় শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন পিরোজপুরের সুবিদপুর গ্রামের মোঃ: শাহজালাল। সেদিন ছিনতাই-এর অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করেছিলো পুলিশ।
তার বাবা মোঃ জাকির হোসেনের অভিযোগ, তার সবজি ব্যবসায়ী ছেলেকে তিনি পুলিশে হেফাজতে দেখেছেন সেদিন সন্ধ্যায় বেলায়। কিন্তু সেদিনই হাসপাতালে রক্তাক্ত অবস্থায় পেয়েছেন তাকে।
তিনি তার বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন, "ধরেন রাত সাতটা সাড়ে সাতটার সময় থানায় গেছি। আমার ছেলেরে থানায় কাস্টডিতে দেখছি। খাবার দাবারও দিয়ে আসছি। রাত তিনটা সাড়ে তিনটায় তারা তাকে মেডিকেলে নিয়ে ফেলে গেছে। আমরা সেখানে গিয়ে দেখি আমার ছেলের সমস্ত শরীরে রক্ত।"
জেনেভায় জাতিসংঘের একটি কমিটির সামনে বাংলাদেশকে জবাবদিহিতা করতে হবে
হাসপাতালে গিয়ে দেখতে পান ছেলের দুই চোখ তুলে নেয়া হয়েছে। যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেনতা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে।
মি. হোসেন বলছেন, "ছেলেটা আমার বেঁচে আছে কিন্তু দুইটা চোখ ছেলের নাই। সে অন্ধ অবস্থায় ঘরে পরে রয়েছে।" এই কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করেন তিনি।
জাকির হোসেন বলছেন এসব অভিযোগে পুলিশের একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে তার পরিবারের করা একটি মামলা এখনো উচ্চ আদালতে রয়েছে। এই সম্পর্কিত তদন্ত প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছেন মি. হোসেন।
পুলিশি হেফাজতে একই ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মাদ ইমতিয়াজ হোসেন রকি এবং তার বড় ভাই। তিনি বলছেন, নির্যাতন সইতে না পেরে মারা যান তার ভাই।
একটি সংঘর্ষের মামলায় তাকে ও তার ভাই ইশতিয়াক হোসেন জনিকে গ্রেফতার করার পর পুলিশি হেফাজতে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার অভিযোগে ইমতিয়াজ হোসেন রকি বলছিলেন, "আমি আর আমার ভাইয়াকে দুটি হ্যান্ডকাফ পরিয়ে একসাথে একটা পিলারের মধ্যে বন্দি করে চারিদিক থেকে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প দিয়ে মারা হয়। সাত আটজন পুলিশ মিলে ... মানে মানুষ কোন মানুষকে এইভাবে মারে না। তারা যেভাবে আমাদের দুই ভাইকে মারছে।"
তিনি বলছেন, এরপর তাদের হাজতখানায় রাখা হয়। এর পরপরই তার বড় ভাইয়ের বুকে ব্যথা ওঠে।
তিনি বলছেন, "আমার ভাই যখন বুকের ব্যথায় চিৎকার করেছিলো, তখন তাকে পুলিশরা বের করে নিয়ে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ভাইয়া সেখানেই মারা যায়।"
২০১৪ সালের এই ঘটনায় তার করা একটি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টর এখনো কারাগারে আছেন বলে জানিয়েছেন ইমতিয়াজ হোসেন রকি। এই দুটি ঘটনাই বাংলাদেশে গণমাধ্যমে বহুল আলোচিত।
বাংলাদেশে পুলিশি নির্যাতনের শিকার এক তরুণ লিমন

‘আলহাজ্ব মো. মখলিছুর রহমান ডিগ্রী কলেজ’ প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে যে কলেজ by ইমাদ উদ দীন

মফস্বলের বাতিঘর। গ্রামীণ জনপদের কলেজটি এখন এ নামেই পরিচিত। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নাজিরাবাদে কলেজটির অবস্থান। নাম আলহাজ্ব মো. মখলিছুর রহমান ডিগ্রী কলেজ। প্রতিবছরই ভালো ফলাফলে জেলাজুড়ে সুনাম আর সুখ্যাতি। কলেজটিতে যেতে চোখে পড়ে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। মাঠের পর মাঠ। ধান ক্ষেত আর সবুজ দুনিয়া।
প্রধান সড়কের দু’পাশই ছায়াবৃক্ষের রাজত্ব। এমন অপরূপ রূপ মাধুর্য্যে মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার নাজিরাবাদ ইউনিয়নের ইউসুফনগর (রাতগাঁও) শমসেরগঞ্জ এলাকা জানান দেয় আবহমান গ্রাম বাংলার মনকাড়া রূপ সৌন্দর্য। এদেশের গ্রামীণ জনপদের মতো ওই এলাকাও কৃষিজীবী আর খেটে খাওয়া মানুষ প্রতিদিনই জীবন যুদ্ধে লড়ে। মাঠে মাটির সঙ্গে লড়ে সোনা ফলায়। এমনই শ্রমে-ঘামে চলে জীবন সংসার। অভাব-অনটন আর টানাপোড়েন ওদের পিছু ছাড়ে না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে ওদের আশপাশ। পরিবর্তন আসছে সর্বত্রই। তাই ওই স্রোতে গা না ভাসালেই পিছিয়ে পড়া। ওরা তা বুঝে। কিন্তু আর্থিক দৈন্যদশায় সে সাধ্য কি আর তাদের আছে। সাধ থাকলেও যে সাধ্য নেই। কৃষি ও শ্রমজীবী গ্রামীণ ওই জনপদের মানুষগুলো তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর জীবন- জীবিকা নিয়ে ভাবে। এই ভাবনার শেষ নেই। শুধু বংশ পরম্পরায় পৈত্রিক পেশার উত্তরসূরি হলেই কি হবে। এই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। কিন্তু মিলে না তার সদুত্তর। এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে জ্ঞান- বিজ্ঞানেও পারদর্শী হওয়া চাই। সে জন্য হতে হবে শিক্ষিত। ছেলে সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠাতে হবে। সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ওদের সে রকম করে তৈরিও করতে হবে। দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তারা পড়ালেখায় উচ্চ শিক্ষা না নিলেও সন্তানদের এমন প্রয়োজনীয়তা খুব ভালো করে বুঝেন।

অনুধাবনও করেন। কিন্তু মফস্বলের এই গ্রাম ওই গ্রাম। তাদের এলাকার কোনো গ্রামেই নেই উচ্চ শিক্ষা অর্জনের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যা আছে তা শহরে। কিন্তু শহরের ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত আর পড়ালেখার খরচ কুলিয়ে ওদের গন্তব্যে পৌঁছানোর সাধ্য কোথায়? সারা দিন মাঠেঘাটে কাজ করে দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা যাদের নেই তাদের সন্তান শহরে গিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে তা যেন দুঃস্বপ্ন। নিজ এলাকায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা অর্জন নিয়ে এই দুঃখ গাঁথুনি যেন তাদের চলিষ্ণু রেওয়াজ। মাধ্যমিকের গণ্ডি পাড়ি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিক্ষা জীবনের ইতি টানতে হয় ওই মফস্বল এলাকার হতদরিদ্র অধিকাংশ মেধাবী শিক্ষার্থীদের। আর উচ্চ শিক্ষা না থাকায় চাকরিতেও অংশ নিতে পারেন না তারা। তাই তাদের ভাগ্যের চাকাও সচল হয় না। এমনটিই যেন তাদের নিয়তি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিজ এলাকায় নিজস্ব অর্থায়নে এই অবস্থার পরিবর্তন করতে আগ্রহী হন ওই এলাকারই সু-সন্তান ব্রিটিশ কাউন্সিলর একাধিকবারের সিআইপি যুক্তরাজ্যে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, জনদরদি শিক্ষানুরাগী এম.এ. রহিম সি.আই.পি। তিনি নিজ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেন। এলাকার সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা অর্জনের সুযোগ করে দিতে উদ্যোগী হন।

অভিভাবকদের সঙ্গে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরাও তার এমন প্রশংসনীয় মহতী উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। এম. এ. রহিম সি.আই.পির ঐকান্তিক ইচ্ছা আর স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন ও আগ্রহকে বিবেচনায় নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১০ সালে ইউসুফনগর (রাতগাঁও) শমসেরগঞ্জ এলাকায় তাঁর মরহুম পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন আলহাজ্ব মো. মখলিছুর রহমান ডিগ্রী কলেজ। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ হয় ওই এলাকাসহ আশপাশ এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের। ২০১০ সাল থেকে উৎসবমুখর পরিবেশে চলে পাঠদান কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে কলেজটি জেলা তথা সিলেট বিভাগের মধ্যে একটি অন্যতম ভালো ফলাফলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ছড়িয়ে পড়া খ্যাতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। তাদের এমন (৮৫ শতাংশের উপরে ফলাফলে) অভিভূত এ জেলার অভিভাবক ও সচেতন সমাজ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কলেজটি তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে এগিয়ে চলছে। শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে পড়ালেখার সু-ব্যবস্থা, রয়েছেন অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী। যাতায়াতের জন্য দু’টি ফ্রি কলেজ বাস। শিক্ষার্থীদের ফ্রি চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক নানা সুযোগ-সুবিধা। সু-প্রশস্ত কম্পিউটার ল্যাব, বিশাল ক্যাম্পাস, পরিচ্ছন্ন ক্লাসরুম আর খেলাধুলার সু-ব্যবস্থা। রাজনীতিমুক্ত ও ধূমপানমুক্ত নির্মল পরিবেশে চমৎকার ক্যাম্পাস শুরু থেকেই দৃষ্টি কাড়ছে সকলের। কলেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ও স্থানীয় জনগণ কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তারা যারপর নাই আনন্দিত। কারণ কলেজটি ওই এলাকার অন্ধকার দূর করে আলোর বার্তা নিয়ে এসেছে। এখন দিন যত যাচ্ছে কলেজটি তার আলো ততই ছড়াচ্ছে। গতকাল কলেজটিতে সরজমিন গেলে এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে।

কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক ও গ্রামবাসীরা গর্বের সঙ্গে মানবজমিনকে বলেন এম.এ. রহিম সি.আই.পি ও তার ভাই মো. মুজিবুর রহমান মুজিব দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে কলেজটিকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন। নিজস্ব অর্থায়নে এত বিশাল ব্যয় বহন করছেন নিজ এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়াতে। শুধু এই কলেজ নয়, নিজ এলাকাকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন আরো একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও গ্রামবাসীর সরকারের কাছে জোর দাবি কলেজটি এমপিভুক্ত করার। বর্তমানে আলহাজ্ব মো. মখলিছুর রহমান ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৬ শতাধিক। আর শিক্ষক সংখ্যা ২৫ জন। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট শিল্পপতি, সাবেক ব্রিটিশ কাউন্সিলর, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি, শিক্ষানুরাগী এম. এ. রহিম বলেন- ইউসুফনগর  গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলোকে আমরা শতভাগ শিক্ষিত একটি মডেল গ্রাম ও এলাকা  হিসেবে  তৈরি করতে চাই। জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের জন্য এটা আমাদের প্রাথমিক পদক্ষেপ। মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও নবীগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৭টি ইউনিয়নের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা বিনা বেতনে এখানে অধ্যয়ন করে উচ্চ শিক্ষিত হচ্ছেন। কলেজটি এগিয়ে নিতে তিনি শিক্ষাবান্ধব এ সরকারসহ সকলের সহযোগিতা চান।

কেন কিছু মানুষ স্বপ্ন ভুলে যায়?

কেউ কেউ স্বপ্ন মনে রাখতে পারে। কারও কারও আবার স্বপ্ন দেখার বিষয়টি মনে থাকলেও, কী দেখেছে তা আর মাথায় থাকে না। বিজ্ঞানীদের কাছে অবশ্য এর ব্যাখ্যা আছে। তারা বলছেন, কিছু মানুষ স্বপ্নের বিষয়বস্তু মনে রাখতে পারেন না। এর কারণ লুকিয়ে আছে তাদের ঘুমানোর পদ্ধতি এবং শরীরের কিছু রাসায়নিক পদার্থের কর্মপ্রক্রিয়ায়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, যখন আমরা ঘুমাই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক চারটি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়টির নাম হলো র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম। এই পর্যায়ে ঘুমের সময় একজন ব্যক্তির চোখের পাতা দ্রুত কাঁপতে থাকে। এ সময় হৃদপিণ্ডের গতি ধীর হয় আসে এবং মানুষের শরীর আটোনিয়া নামের একটি অবস্থায় চলে যায়। এ সময় মানবদেহ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চলে যায় এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নাড়াচাড়া করা যায় না।
ঠিক এই পরিস্থিতিতে স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে মানব মস্তিষ্কের দুটি রাসায়নিক পদার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো হলো—এসিটোকোলিন ও নোরাপিনাফ্রিন। এসিটোকোলিনের উৎপাদন যত বাড়ে, মস্তিষ্কের কর্মতৎপরতা তত বেড়ে যায়। স্বপ্নের বিষয়বস্তু একজনের কাছে কতটা স্পষ্ট হবে, সেটি নিয়ন্ত্রণ করে এসিটোকোলিন। আবার নোরাপিনাফ্রিন সতর্কতা ও মানসিক চাপের মাত্রা নির্ধারণ করে। এসিটোকোলিনের উৎপাদন যত বাড়ে, নোরাপিনাফ্রিনের পরিমাণ কমতে থাকে। নোরাপিনাফ্রিনের পরিমাণ কমতে থাকলে আমাদের স্বপ্নগুলো মনে রাখার সক্ষমতাও কমতে থাকে।
যখন আমরা হুট করে ঘুমিয়ে পড়ি বা অ্যালার্মের শব্দে লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠি, তখন এই দুই রাসায়নিকের পরিমাণ সামান্য পরিমাণে বেড়ে যায়। এর ফলে মস্তিষ্কের স্বপ্ন মনে রাখার সম্ভাবনা আরও কমে যায়। আবার অনেক সময় আমাদের মস্তিষ্ক সেই সব স্বপ্নই মনে রাখে না, যেগুলো যথেষ্ট উত্তেজনাকর নয়।
হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের স্লিপ রিসার্চার রবার্ট স্টিকগোল্ড বিবিসিকে বলেন, ‘যখন আমরা প্রথমবার ঘুম থেকে উঠি, তখন স্বপ্নগুলো অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে। এই পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি হয়, তার সঠিক ব্যাখ্যা এখনো জানা যায়নি। যদি কেউ লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে দিনের কাজ শুরু করে দেন, তবে তার পক্ষে স্বপ্ন মনে রাখা সম্ভব হবে না। ছুটির দিনের প্রশান্তির ঘুমই স্বপ্ন মনে রাখার উৎকৃষ্ট উপায়।’

বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অপরাধকরণ নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অপরাধকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেসরকারি সংগঠন ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ। রোববার বাংলাদেশ ওয়াচডগ-এর ব্লগপোস্টে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অপরাধকরণ, মুক্তচিন্তা চর্চার সুযোগ কমা, অপরাধীদের দায়মুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। এ ছাড়া, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রদ ও এই আইনের আওতায় করা সকল মামলার আসামিকে মুক্ত করে দেয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে সমপ্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা করেছে তারা। বলেছে, আবরার মতপ্রকাশের দায়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। মতামত অসহিঞ্চুতা ও সাজা থেকে দায়মুক্তির সংস্কৃতির শিকার হয়েছে। তারা লিখেন, ফেসবুকে দেয়া পোস্টের জেরে অক্টোবরের ৭ তারিখ তাকে নির্মমভাবে মেরে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীরা আবরারের ওই পোস্টটি আক্রমণাত্মক হিসেবে বিবেচনা করেছে।
তাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সদস্য।
বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা আগেই বলেছি, এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ওপর হামলার স্পষ্ট উদাহরণ। ৫ই অক্টোবর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা কয়েকটি সাম্প্রতিক চুক্তির সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছিল আবরার। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, আবরার ফেসবুক পোস্টের কারণে তার ওপর ক্ষোভ ছিল সন্দেহভাজন নির্যাতনকারীদের। ওই পোস্টের জেরে ছাত্রলীগ কর্মীরা আবরারের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করেছিল। এ ঘটনা হতভম্ভকর।
বিবৃতিতে আরো লেখা হয়, পূর্বে বহু ফেসবুক ব্যবহারকারী, ব্লগার, লেখক ও সাংবাদিক হত্যাকারীরা সাজা পায়নি। ড্রাকোনিয়ান আইনের আওতায় অনলাইনে ভিন্নমত ও বাংলাদেশের সরকারি কাজকর্মের সমালোচনাকে অপরাধযোগ্য করে তোলা হয়েছে। এই আইনের আওতায় অনলাইনে মতপ্রকাশের জন্য বহু সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমরা নথিবদ্ধ করেছি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের ৫৭ ধারার প্রতি নিন্দা জানিয়েছে সংগঠনটি। বলেছে, পরবর্তীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’র মাধ্যমে ওই ড্রাকোনিয়ান আইন চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। এই আইন বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয় ও নাগরিকদের ব্যক্তি পর্যায়ে নিজের ওপর সেন্সরশিপ প্রয়োগ করতে বাধ্য করে।
তারা বলেছে, আইসিটি আইন চালুর পরপর বহু ফেসবুক ব্যবহারকারী প্রথমে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছে হয়রানির শিকার হন ও পরে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে দায়ের করা মামলার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে।
তারা বিবৃতিতে, বাংলাদেশ সরকারের কাছে পুনরায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রদ করে নেয়ার দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া, বাছবিচারহীনভাবে এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করা সকলকে মুক্ত করে দেয়ার দাবি জানিয়েছে। তারা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের চর্চাকারীদের সাইবার-অপরাধ আইনের আওতায় হয়রানি করার অভিযোগ এনে নিন্দা জানিয়েছে। বলেছে, এর ফলে নাগরিকদের মধ্যে ভীতির সংস্কৃতি ও মূলধারার গণমাধ্যমে আত্ম-সেন্সরশিপ তৈরি করেছে।
বিবৃতিটিতে ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশের ৯ জন ব্যক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এদের মধ্যে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) এর সালিম সামাদ, মানবাধিকার সংগঠন আর্টিকেল ১৯’র বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান ফারুক ফয়সাল, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) এর মইনুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) এর আহমদ উল্লাহ, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্ট (আইএফজে) এর খাইরুজ্জামান কামাল, ভয়েস এর আহমেদ স্বপন মাহমুদ, পেন ইন্টারন্যাশনাল এর বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান ড. আইরিন জামানসহ অন্যরা রয়েছেন।

একজন মিজানুর রহমান by জিয়া চৌধুরী

প্রতিবাদের আরেক নাম মিজানুর রহমান। সুপেয় পানির দাবিতে ঢাকা ওয়াসা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তার অভিনব প্রতিবাদ নজর কেড়েছে সবার। গোটা দেশে এখন তিনি প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি। তবে তার এ প্রতিবাদ নতুন নয়। এক দশক ধরে জুরাইনের মানুষের সুখ-দুখে নানা অধিকার আদায়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি।  কখনো কখনো পরিবারসহ হাজির হয়েছেন মিছিলে-সমাবেশে।
তাই মিজানুর রহমান জুরাইনবাসীর কাছে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। শুধু জুরাইনের সুখ-দুঃখ নয়, বাংলাদেশের নানা সংকট, আন্দোলন-সংগ্রামে হাজির থাকেন মিজান। নিজে একা নন, প্রতিবাদের আওয়াজ তোলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।
মিছিল, মানববন্ধন কিংবা লংমার্চের মতো নানা আয়োজনে স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে মানুষের কথা বলে যাচ্ছেন জুরাইনের মিজানুর রহমান। সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন, কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও সরব ছিলেন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মিজান। সুন্দরবন বাঁচাতে ২০১৭ সালে এক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে বুক পেতে দেন পুলিশের জল কামানের সামনে। সেবার পুলিশের লাঠিচার্জেরও শিকার হন তিনি। মাটিতে লুটিয়ে পড়া সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে দেশে-বিদেশে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘মঙ্গাবে’ নামে পরিবেশবাদী সংগঠন ফলাও করে প্রচার করে মিজানুরের অদম্য কীর্তিগাঁথা।
মঙ্গাবে’র সংবাদের পর সুইডেনের বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘রিপাবলিক’ তাকে জলবায়ু গেরিলা যোদ্ধা উপাধি দেয়। মিজানুর রহমানের ছবি ও পরিবেশ নিয়ে তার লড়াইয়ের গল্প ছাপা হয় বিশেষ নিবন্ধ আকারে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মিজানুর যেন জুরাইনেরই ছেলে, সেখানকার মানুষের সংকট-সম্ভাবনার সঙ্গী, আরেক ভরসার নাম। কয়েক বছর ধরে সেখানে বইমেলা আয়োজন, জলাবদ্ধতা নিরসন, রক্তদান কর্মসূচি কিংবা যে কোন বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাড়না তার। সবশেষ গত ২৩ শে এপ্রিল নিজের এলাকার পানি সমস্যা নিয়ে রাজধানীর ওয়াসা ভবনে প্রতীকী শরবত পান করানোর উদ্যোক্তাও এই মিজান। স্ত্রী শামীমা হাশেম খুকি ও তিন বছরের কন্যা মৃন্ময়ী হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে সেদিন ওয়াসা ভবনে যান তিনি।
সঙ্গে ছিলেন জুরাইনের আরো দুই বাসিন্দা। গতকাল সকালে জুরাইন এলাকায় কথা হয় তার সঙ্গে। সেখানকার কমিশনার রোডের মা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার নামের একটি দোকান থেকে শুরু হয় আলাপ। নিজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে ফিরে যান মিজানুর। ৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার ঠিক আগে আরো নিচু ছিল জুরাইন জনপদ। মূলত বুড়িগঙ্গা তীরের ফসলের জমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় আবাসন। জুরাইনের মানুষজনের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। দেশজুড়ে বন্যা শুরু হয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ পেরিয়ে পানি ঢুকে পড়লে সব বানের জলে ভেসে যাবে।
সে সময় প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু বানানোর কাজ শুরু হচ্ছিল। বন্যার পানি রুখতে সেতুর জন্য রাখা বালু থেকে বস্তা ভরে বাঁধটিকে আরো উঁচু করা হয়। মিজানুর রহমানের স্বেচ্ছাসেবী কাজের শুরু ৮৮’র বন্যার সময় থেকে। ছোট-বড় অনেকের সঙ্গে এলাকায় বস্তা জোগাড় করা, বালু ভরা, বস্তাভর্তি ঠেলাগাড়ি ঠেলে বাঁধের কাছে নিয়ে যাওয়া। এটাই ছিল মিজানুর রহমানের জীবনের প্রথম স্বেচ্ছাসেবী কাজ, যে পথে এখনো হাঁটছেন। এক যুগ আগের আরেক স্মৃতিতে ফিরে যান তিনি। রাতের বেলা বাড়ির সামনের সড়কে বন্ধুদের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ চলছিল তার। এমন সময় ‘ছিনতাইকারী, ছিনতাইকারী, ভাই বাঁচান, বাঁচান’ বলে চিৎকার শুনতে পান। পূর্ব জুরাইন এলাকার আশরাফ মাস্টারের স্কুলের গলির দিকে দৌড়াতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকে খুঁজে পেলেন না। এরপর রাস্তায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ধরে সামনে এগোন।
একটি বাসার সামনে গিয়ে দেখেন ছিনতাইয়ের শিকার একটি ছেলে কাতরাচ্ছে। ছেলেটার হাত থেকে রক্ত ঝরছে তখনো। মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা তিন হাজার টাকা খোয়া গেছে। টাকার অভাবে হাসপাতালে না গিয়ে তিনি বাসায় চলে আসেন ছেলেটিকে নিয়ে। পরে এক বন্ধুকে সঙ্গে করে আহত ছেলেটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। ধার করে ওষুধ আর চিকিৎসার জন্য দুই হাজার টাকা পরিশোধ করেন মিজানুর রহমান। এরপর জুরাইনের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কথা ছড়িয়ে পড়ে গোটা জুরাইনে। তাইতো জুরাইনবাসীর কাছে ‘মিজান ভাই’ যেন এক ভরসার নাম।
মহল্লায় পানি নেই, তাঁর ডাক পড়ে। পাড়ায় ময়লার ভাগাড়ের দুর্গন্ধে প্রাণ যায়, মিজান ভাইয়ের কাছে চলো। কারো আত্মীয়ের জন্য রক্ত মিলছে না? কিংবা মধ্যরাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, হাসপাতালে নিতে হবে। ভয় কী। মিজান ভাই আছে না? এলাকায় মাদকবিরোধী আন্দোলনে মিজানুরের অবদানও কম নয়। এ কারণে হামলা-মামলারও শিকার হতে হয়েছিল তাকে। জুরাইনের পানি সমস্যা নিয়েও সোচ্চার মিজানুর রহমান ও তার পরিবার। তিনি বলেন, শুধু আমার বাড়ির পানির সমস্যার জন্য এসব করছি না। জুরাইনের প্রতিটি মানুষের সুপেয় পানি পাবার অধিকার আছে।
আমাদেরকে কেন সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে আমি শুধু বার বার সেই প্রশ্নটি করার চেষ্টা করেছি। আলাপের এক ফাঁকে ২০১২ সালের একটি ভিডিও ফুটেজ দেখান তিনি। পানির সমস্যা নিরসনে সেবার নিজের দুই জমজ কন্যা প্রাপ্যতা ও পূর্ণতাকে নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়ান মিজানুর। ওই বছর সাড়ে তিন হাজার মানুষের গণসাক্ষর ও পানির নমুনা ওয়াসাকে দিলেও এত বছরে কোন উদ্যোগ না নেয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন। নিজের পরিবার কখনো এমন কাণ্ডে বাধা দেয় না?  হেসে ফেলেন তিনি। বলেন, আন্দোলনে-প্রতিবাদে পরিবারই আমার অনুপ্রেরণা। স্ত্রী ও তিন কন্যাকে নিয়ে মানুষের কথা বলার চেষ্টা করি। এ লড়াই আমার একার না, আমার পরিবারেরও। আমার কন্যাদেরও আমি এমন শিক্ষাই দিয়েছি।
এবার শোনা যাক এলাকাবাসীর কথা- গাজী আলমগীর কামাল নামে একজন বলেন,  ওয়াসার এমডি তাকে পাগল বলেছেন। আমিও বলছি, জুরাইনের সুখে-দুখে আমরা সব সময় এই পাগল মিজান ভাইকেই চাই। যে পাগল মানুষের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার থাকে। তার মতো আরো অনেক পাগল দরকার আমাদের। একটি প্রকাশনা সংস্থায় কর্মরত সাগর ইসলাম বলেন, মিজান ভাইয়ের চাওয়া খুব কম। তিনি শুধু অধিকারগুলো ঠিকঠাক বুঝে নিতে চান। এখানেই যত আপত্তি। এসব করতে গিয়ে নিজের জন্য কিছু করতে পারেননি। বাবা আব্দুস সামাদের নামে থাকা বাড়ির ভাড়া থেকে সংসার চালান। স্ত্রী শামীমা হাশেম খুকি গৃহিনী।
ঘর-সংসার সামলিয়ে স্বামীর সঙ্গেও মানুষের কাতারে দাঁড়ান। সাগর ইসলাম আরো জানান, গাড়িচালক থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করেছেন মিজান ভাই। কিন্তু তার নীতির গোঁড়ামির কারণে কোথাও স্থায়ী হতে পারেননি। ২০১০ সালের দিকে মোবাইল রিচার্জের ব্যবসাও শুরু করেন। সেসময় রিচার্জ করার জন্য প্রতি অঙ্কের বিনিময়ে অতিরিক্ত এক টাকা করে নিতেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মিজান ভাই কখনো তা নেননি। উল্টো অন্য ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়েন। মুঠোফোন কোম্পানির এক ডিলার তার দেড় লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেলে সে ব্যবসায়ও ইতি টানেন মিজানুর রহমান। মিজানুর রহমানের জন্ম বেড়ে ওঠা রাজধানীর পূর্ব জুরাইনে। সাত ভাই- বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। উচ্চ মাধ্যমিকের পর ইচ্ছা ছিল চারুকলায় পড়বেন। কিন্তু আর্থিক অনটনে তা আর সম্ভব হয়নি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে চলচ্চিত্র নিয়েও কোর্স করেছিলেন।
সেটাও বেশি দূর এগোয়নি। এখন বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চুল-দাঁড়িতে পাক ধরেছে। এই বয়সেও তরুণদের নিয়ে বইমেলা, রক্তদান কর্মসূচি, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নানা সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন পরিবেশ রক্ষার নানা আন্দোলন-সংগ্রামে। এর মধ্যে ৫০ বারের বেশি সময় রক্ত দিয়েছেন। অন্যদেরও উৎসাহিত করছেন রক্তদানে। রক্ত দিতে গিয়ে কখনো কখনো নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে রোগির ভাড়াটাও দিয়ে এসেছেন। এসবেই আনন্দ খুঁজে পান মিজানুর রহমান। জুরাইনবাসীর প্রিয় ‘মিজান ভাই’ হয়ে থাকতে চান আজীবন। আর সবার জন্য রেখে যেতে চান এক মানবিক পৃথিবী। সুন্দর পৃথিবী।

ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে এল দেড় লাখ বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া পাখি!

হাজার হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পাখির প্রজাতির ফের দেখা মিলল। জীবাশ্ম হিসাবে নয়, একেবারে জীবন্ত অবস্থায়।
বিভিন্ন নথি-পত্র বলছে, এই প্রজাতির পাখি আজ থেকে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার বছর আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে। অ্যালডব্রা রেল প্রজাতির এই পাখির চেহারা অনেকটা মুরগি আর বক মেশানো।
সাদা লম্বাটে গলা আর গোলাকার ছোট চেহারার এই পাখিটি হাজার হাজার বছরের প্রাচীন জীবাশ্ম নিয়ে একটা সময় বিস্তর গবেষণা চলেছে। ভারত মহাসাগরের অ্যালডব্রা অ্যাটল অঞ্চলে এই পাখির জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল। তাই এই প্রজাতির নাম রাখা হয় অ্যালডব্রা রেল।
ভারত মহাসাগরের অ্যালডব্রা অ্যাটল ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে ফের দেখা গিয়েছে অ্যালডব্রা অ্যাটল পাখিদের। শুধু তাই নয়, এই অঞ্চলগুলি অ্যালডব্রা অ্যাটল পাখিতে ভরে গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হাজার হাজার বছর পর প্রাকৃতিক নিয়মেই পৃথিবীর বুকে ফিরে এসেছে এই প্রজাতির পাখি। বিবর্তনের এই ধারাকে ‘ইটারেটিভ এভেলিউশন’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা।
‘জুলজিক্যাল জার্নাল অব দ্য লিনেন সোসাইটি’ নামের একটি আন্তর্জাতিক পত্রিকায় এ বিষয়ে সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে। দীর্ঘ গবেষণার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব পোর্টস মাউথ অ্যান্ড ন্যাচরাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম’-এর গবেষকদের দাবি, বর্তমানে ভারত মহাসাগরের অ্যালডব্রা অ্যাটল ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে যে পাখিদের আধিক্য লক্ষ্য করেছেন সেগুলি আর প্রায় দেড় লক্ষ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অ্যালডব্রা রেল এক এবং অভিন্ন।
মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাবে বিবর্তনের মাধ্যমে একই প্রজাতির অবলুপ্তির পরও ফিরে আসার ঘটনা বিরল হলেও প্রথম নয়। পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাসে এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। জিনিউজ

বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছেই by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

দেশে দেশে বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে এ সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়েছে। বিরোধী রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, মামলাসহ নানা কারণ দেখিয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, এক লাখ ৬০ হাজার ৭৩৭ বাংলাদেশি। আগের পাঁচ বছরের তুলনায় এ সংখ্যা  দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থাৎ, গত ২০১৪ সাল থেকে দিনে গড়ে ৮৮ জন করে আবেদন করছেন। ইউএনএইচসিআর সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত বছর বাংলাদেশের ২৮ হাজার ৪৮৮ জন নাগরিক বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুযোগ চেয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে আবেদন যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়েছে বহুগুণ।
রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশিদের প্রথম পছন্দ ইউরোপ।
গত পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ৩৪ হাজার ১১৭ বাংলাদেশি আবেদন করেন ফ্রান্সে। প্রায় সমান সংখ্যক আবেদন পড়ে ইতালিতে। রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশিদের তৃতীয় পছন্দের দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা। যেখানে গত পাঁচ বছরে আবেদন জমা পড়েছে ২৪ হাজারের বেশি। এর বাইরে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা। যদিও আবেদনের বড় একটি অংশ বাতিল হচ্ছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়েছে ৭ হাজার ৯৬৩, ইতালিতে ৪ হাজার ১৬২, গ্রিসে ২ হাজার ৪৯৮, দক্ষিণ আফ্রিকায় ২ হাজার  ৪৫৪, যুক্তরাজ্যে ২ হাজার ৪৪৯টি, যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৮৯৬টি। এ ছাড়াও জাপান, কানাডাতেও আবেদন জমা পড়েছে।
এদিকে, সবমিলিয়ে বিভিন্ন দেশে বাৎসরিক আবেদন জমা পড়েছে ২০০৯ সালে ১২ হাজার ৫২৩টি, ২০১০ সালে ১২ হাজার ৪৮৬টি, ২০১১ সালে ১৪ হাজার ৯১৯টি, ২০১২ সালে ১৬ হাজার ৩৭১টি, ২০১৩ সালে ২২ হাজার ৪৪১টি, ২০১৪ সালে ২৭ হাজার ১১৬টি, ২০১৫ সালে ২৭ হাজার ১১৬টি, ২০১৬ সালে ২৮ হাজার ৩৯৫টি, ২০১৭ সালে ৩৩ হাজার ৯০৯, ২০১৮ সালে ২৮ হাজার ৪৮৮টি। যা হিসাব করলে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা দাড়ায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৭৬৪ জন। গত পাঁচ বছরে ইতালিতে বাংলাদেশিদের মধ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে ৩৩ হাজার ৫৫১ জন, ফ্রান্সে ৩৪ হাজার ১১৭ জন, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩৩ হাজর ৫৫৪ জন, যুক্তরাষ্ট্রে ৭ হাজার ৫৯৬ জন। শুধুমাত্র ২০১৮ সালে ফ্রান্সে আবেদন করেছেন ৭ হাজার ৯৬৩ জন, ইতালিতে ৪ হাজার ১৬২জন, গ্রিসে ২৪ হাজার ৫৪ জন, যুক্তরাজ্যে ২ হাজার ৪৪৯ জন ও যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৮৯৬ জন।
জানা যায়, রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা আবেদন করার আগে বৈধ ও অবৈধ পন্থায় ওইসব দেশে গিয়ে হাজির হচ্ছেন। দেশগুলোতে যেহেতু নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে সেহেতু আদালতে নিষ্পত্তি বা সিদ্ধান্ত হওয়ার আগে কোনো বাংলাদেশিকেই সরাসরি বহিষ্কার করা হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো দেশে বিষয়টি নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত আবেদনকারীদের ভাতা দেয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফ্রান্সে বসবাসরত রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া একজন বাংলাদেশি। বলেন, ২০১২ সালে আমি একটি রাজনৈতিক হত্যা মামলার সাক্ষী ছিলাম। এর পর থেকে প্রতিপক্ষ আমাকে নানাভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। হত্যা করার হুমকি দিয়ে আসছিল। ফলে দেশে থাকা আমার জন্য খুব কষ্টকর ছিল। তাই আমি এখানে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলাম। পরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছি। যদিও এখনো আমার আবেদন গৃহীত হয়নি। জার্মানিতে রাজনৈতিক আবেদন করেছেন এমন একজন বলেন, দেশে থাকার মতো অবস্থা নেই। মামলা-হামলা চলছে। এই অবস্থায় দেশ ত্যাগ করা ছাড়া আমার সামনে বিকল্প ছিল না।
রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরুর) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী মানবজমিনকে বলেন, সারা বিশ্বে অভিবাসন প্রক্রিয়ার কোটাগুলো বন্ধ করে দিয়েছে ফলে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যাটা বাড়ছে। তাছাড়া দেশেও তো রাজনৈতিকভাবে ভুক্তভোগী আছে, তা তো মিথ্যে নয়। আরেকটি বিষয়, দেশে শিক্ষিত তরুণদের তুলনায় চাকরি নেই, সকল জায়গায় দুর্নীতির একটা মহাআখড়া। এসব কারণেও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। ইউএনএইচসিআর যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। এখন সরকারকে ভাবতে হবে, এ সংখ্যাটা কমানো যায় কিভাবে। সেক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা অবশ্যই প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন মানবজমিনকে বলেন, রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার ফলে দেশের বাইরে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রথমতঃ তথ্য সত্য কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ হয়। তথ্যগুলোকে যাচাইবাছাই করা প্রয়োজন। আরেকটি বিষয় মানুষ যখন দেশের বাইরে যায় তারা তখন দেখেন রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলে সহজে থাকতে পারে সেই জন্য আসলে এই সুযোগটা গ্রহণ করেন। আমাদের দেশের বহু লোক বিদেশে থাকতে চায়। বিদেশটাকে মনে করে খুব ভালো, স্বর্গসুখ। যদিও বিদেশ গিয়ে অনেকে বড় কষ্টও করে। বিশেষ করে আমাদের বাঙালিরা এমনটা করে। ফলে দেশের বাইরে আমাদের ভাবমূর্তি খুব নষ্ট হচ্ছে।

ইরাকে পুরুষরাই কি যৌন হয়রানির প্রধান লক্ষ্য?

বাগদাদে আসার পর সামির জীবনে পরিবর্তন আসে
আরব বিশ্বের ওপর বিবিসির এক জরিপে ইরাকের বিষয়ে একটি অপ্রত্যাশিত ফলাফল বেরিয়ে এসেছে - সেখানে নারীদের তুলনায় পুরুষরাই বেশি মৌখিক যৌন হয়রানি এবং শারীরিক যৌন আক্রমণের শিকার হন বলে জানা গেছে।
এমন ঘটনা কি আসলেও সত্যি হতে পারে?

সামির বয়স যখন ১৩ বছর

সামি (তার আসল নাম না) তার স্কুলের টয়লেটে ছিলেন, সে সময় ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী তিনটি ছেলে তাকে দেয়ালের একপাশে ঠেসে ধরে।
তারা সামির শরীরের একটি অংশে নোংরাভাবে স্পর্শ করতে থাকে।
শুরুতে সামি ভয়ে জমে গিয়েছিলেন, এতো বড় ধাক্কায় তার শরীর যেন কাজ করছিল না। কিছুক্ষণ পর তিনি তার কণ্ঠ খুঁজে পান।
"আমি চিৎকার শুরু করি।" বলেন সামি। পরে প্রধান শিক্ষককে ডাকা হয়।
এ ঘটনায় চারিদিকে তোলপাড় লেগে যায়। আর এতে অন্য শিশুরাও আরও সতর্ক হয়ে পড়ে।
ওই তিনটি ছেলেকে পরে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
কিন্তু তাদের বাবা-মাকে বলা হয়নি যে কেন তাদের ছেলেদের বের করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ সামির ওপর তারা কি ধরণের হামলা চালিয়েছিল।
পরে সামিকে যখন প্রধান শিক্ষকের অফিসে ডাকা হয়, তখন তার কাছে সেটা আরেক দফা হামলার মতোই মনে হচ্ছিল।
কারণ সেখানে তাকে বলা হয়েছিল যে, স্কুল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাটিকে সম্মতিসূচক যৌন ক্রিয়া হিসেবেই মনে করবে।
সামি ভাগ্যবান যে তাকে হামলাকারীদের মতো বের করে দেয়া হয়নি।
সামিকে স্কুলে থাকার জন্য "আরেকটি সুযোগ" দেওয়া হয়েছে।
সামি বলেন, "প্রত্যেকেরই মনে হয়েছিল আমি তাদের সাথে যোগসাজশে নাটক করছি,"
ওই হামলার পর থেকে সামি এতোটাই ভীত আর হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি এই বিষয়ে নিজের পরিবারকে কিছু বলবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেন।
বরং তিনি নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নেন। এভাবে টানা কয়েক মাস তিনি বলতে গেলে কারও সঙ্গেই কোন যোগাযোগ করেননি।
সেবারই প্রথম সামি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন।

সামির বয়স যখন ১৫

তখন ২০০৭ সাল। মাত্র এক বছর আগেই সামির বাবার মৃত্যু হয়েছিল। বাড়ির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন প্রস্থানের কারণে পুরো পরিবারের ওপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে যায়।
বাগদাদ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে ইরাকের সুদৃশ্য ব্যাবিলন প্রদেশের একটি ছোট শহরে বেড়ে ওঠেন সামি।
তার শৈশব বেশ হাসিখুশি আনন্দেই কেটেছে।
তিনি সকাল সাড়ে ৭ টার দিকে ঘুম থেকে উঠে স্কুলের জন্য বের হতেন এবং দুপুরের দিকে বাসায় ফিরে আসতেন।
এরপর সামি আরও কিছুক্ষণ পড়াশোনা করে তার ভাইবোনদের সঙ্গে সময় কাটাতেন।
সন্ধ্যাবেলায় পরিবারের সবাই তার দাদা দাদীর সঙ্গে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য দেখা করতেন।
কখনও কখনও তিনি তার বাবাকে মিষ্টির দোকানের কাজে সাহায্য করতেন - আর কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে তিনি পেতেন ডোনাট বা এমন কিছু।
কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সামির বাইরে গিয়ে কাজ করা জরুরি হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাজারের একটি দোকান তিনি একটি চাকরি পেয়ে যান।
সেখানেই তার সাথে পুনরায় নিপীড়নের ঘটনা ঘটে।
দোকানীর মালিক সামির প্রতি যে পরিমাণ মনোযোগ দেখাতেন সেটা সামির জন্য অস্বস্তিকর হয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, "তিনি আমাকে অতিরিক্ত আদর যত্নে ভাসিয়ে দিতেন।"
তারপর, একদিন, যখন তারা একা ছিল, তখন দোকান মালিক সামিকে কোণঠাসা করে জাপটে ধরে চুম্বন করতে চাইলেন, আদর করতে চাইলেন।
সামি, তার সবচেয়ে কাছে থাকা গ্লাস জারটি তুলে নেন। সেটা দিয়ে ওই ব্যক্তির মাথায় আঘাত করে দৌড়ে পালান।
দোকানীর মালিক স্থানীয় মানুষকে সামির ব্যাপারে পরে কী বলেছিলেন সেটা সামি জানেন না। তবে তার অন্য চাকরি পেতে এক বছর সময় লেগে যায়।

সামির বয়স যখন ১৬

সেদিন সামির মা এবং ভাইবোনেরা বাসার বাইরে ছিলেন। সে সময় তার চাইতে বয়সে বড় এক চাচাত ভাই দেখা করতে আসেন।
তিনি সামির পাশে বসে তার ফোন বের করেন এবং সামির সামনেই পর্নোগ্রাফিক অশ্লীল ছবি দেখতে থাকেন।
তারপর হঠাৎ তিনি সামিকে জাপটে ধরে আঘাত করেন এবং তাকে ধর্ষণ করেন।
সামির জন্য সেই সহিংস আক্রমণ খুব বেদনাদায়ক ছিল। এখনও সেই ঘটনা চিন্তা করলে তাকে দু:স্বপ্ন তাড়া করে বেড়ায়।
সামি আর বেশিদিন তার শৈশবের বাড়িতে থাকতে পারেননি।
তিনি বলেন, "আমি আমার পরিবারকে বাড়ি বদলানোর জন্য এবং এই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে মানিয়ে ফেলি। আমরা আমাদের আত্মীয় ও প্রতিবেশী বন্ধুদের সাথে বন্ধন ছিন্ন করে দেই"।
এরপর সামির পুরো পরিবার বাগদাদে চলে যান এবং সেখানে তারা সবাই কাজ পান।
ওই হামলার আতঙ্ক বার বার সামিকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে সামি রোমান্টিক সম্পর্ক থেকে নিজেকে সবসময় দূরে সরিয়ে রাখতেন।
তারপর, ধীরে ধীরে, তিনি শহরের নতুন বন্ধুদের সাথে বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলার পর সিদ্ধান্ত নেন যে; তিনি তার এই বিরূপ অভিজ্ঞতার বোঝা আর একা বহন করবেন না।
মূলত, তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ছোট একটি দলের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতেন। এ ঘটনা নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া অপ্রত্যাশিত ছিল। সামি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই অভিজ্ঞতা শুধু তার একার নয়।
তার দলের অন্যান্য বন্ধুরাও জানান যে কখনও তারাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

"আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো পাশে নেই।"

বিবিসি নিউজ আরবের ১০টি দেশ এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করে। সেখানে দেখা গেছে আরবের দুই দেশ - তিউনিসিয়া ও ইরাকে - নারীর চেয়ে বেশি পুরুষরাই বেশি মৌখিক ও শারীরিক যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন।
তিউনিসিয়ায় নারী ও পুরুষের এই ব্যবধান মাত্র ১%। সেখানকার ৩৯% পুরুষ মৌখিক যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং নারীদের মধ্যে ৩৩% কে এমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরাকের ২০% পুরুষ জানিয়েছেন যে তারা শারীরিক যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। যেখানে নারী শিকার হয়েছেন ১৭%।
ইরাকি পুরুষরা গৃহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ইরাকে নারীর অধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ বলা চলে - ইরাকি পেনাল কোড ৪১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে স্বামী যদি তার স্ত্রীকে প্রহার করেন তাহলে সেটা বেআইনি হবেনা।
তবে গবেষণা নেটওয়ার্ক আরব ব্যারোমিটার, যারা কিনা এই জরিপ পরিচালনা করেছেন, সেখানকার গবেষণা সহযোগী ডা. ক্যাথরিন টমাস, সতর্ক করে বলেছেন যে যৌন হয়রানির শিকার নারীরা হয়তো চুপ থাকাকেই শ্রেয় মনে করেন।
মিস টমাস বলেন, "হয়রানির মতো সংবেদনশীল বিষয়ে কথা বলা বা অভিযোগ দাখিল করা তাদের কাছে বিব্রতকর ও অপ্রীতিকর মনে হয়। অভিযোগ দায়ের করলে তাদের ওপরেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কাও করেন তারা।"
"পুরুষের তুলনায় নারীদের এমন হয়রানির আশঙ্কা আরও বেশি বলে ভাবা হয়।"
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইরাক বিষয়ে জ্যেষ্ঠ গবেষক বেলকিস উইলে মিস টমাসের বক্তব্যে একমত পোষণ করেন।
"নারীরা গৃহ নির্যাতন বা যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার পরও এই বিষয়গুলো সামনে আনতে চাননা। অনেকে এই শব্দগুলোর সঙ্গেই পরিচিত নন।", তিনি বলেন।
ইরাকি হাসপাতালে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে, বলে তিনি জানান।
আইন অনুসারে হাসপাতালগুলোতে সব সময় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা উপস্থিতি থাকেন এবং কোন নারী যদি জানান যে তিনি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাহলে ডাক্তার বিষয়টি ওই নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জানাতে বাধ্য থাকবেন।
তিনি বলেন, "প্রায়শই মহিলা মিথ্যা বলেন এবং অপরাধীদের রক্ষা করেন, বিশেষ করে যদি তারা তাদের পরিচিত হয়, কারণ তারা একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করতে ভয় পান। যেখানে তাদেরও শাস্তি ভোগ করার ঝুঁকি থাকে।"
"ইরাকের সমাজ পুরুষদের এই বিষয়ে কথা বলার অনুমোদন না দেয়ায় অপরাধগুলো কখনোই অভিযোগ আকারে সামনে আসেনা।"
সামি বলেন, "পুরুষকে ধর্ষণ আইন বিরোধী হলেও এ ব্যাপারে ভিক্টিম, পুলিশ এবং সমাজের সহানুভূতি সেভাবে পায়না।"
তিনি বলেন, "যদি কোন পুরুষ পুলিশের কাছে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করতে যান, তবে পুলিশ এটা নিয়ে উল্টো হাসাহাসি করতে পারে।"

পুলিশকে কিছু জানাননি সামি

তের বছর বয়সে স্কুলের সেই অভিজ্ঞতা থেকে সামি জানতে পারেন যে, হামলার শিকার হওয়ার পরও তাকে দোষ নিতে হয়েছিল।
"আমি আমার ঘটনার বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করলে পুলিশ আমাকে কেবল একজন ভিক্টিম হিসেবেই দেখবে না। হয়তো আমাকে জেলেও পাঠিয়ে দিতে পারে।"
"আইন আমার পাশে আছে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নেই।"
এ ব্যাপারে ইরাকি পুলিশের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানান, "আমাদের দরজা সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত আছে। ভিক্টিমরা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ দায়ের করার পর নির্যাতনকারীদের আটক করা হয়েছে।"
বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, ২০০৩ সালে মানবাধিকার বিষয়ে নতুন একটি কৌশল হাতে নেয়া হয়েছে এবং এই ধরনের মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

সামির বয়স এখন ২১

সামির জীবন এখন আগের চাইতে ভাল। তিনি বাগদাদে থাকতেই পছন্দ করেন। তিনি এখন একটি বড় আন্তর্জাতিক সংস্থায় ক্যারিয়ার গুছিয়েছেন।
তার অতীত সম্পর্কে জানেন এমন সহায়ক বন্ধুদের একটি দলও তার আছে।
তিনি আশা করেন যে বিবিসিকে তার গল্প বলার মাধ্যমে, তিনি অন্যান্য পুরুষদের তাদের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কথা বলতে উৎসাহিত করতে পারবেন।
কিন্তু অতীতে এখনও সামিকে তাড়া করে বেড়ায়। তিনি এখনও ভাবতে পারেন না যে তিনি কারো সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারেন।
হয়তো একদিন তিনি একজন সঙ্গী পাবেন, তিনি বলেন - যখন ‌বদলেছি, তখন ইরাকের সমাজও বদলে গেছে। নিজের ৩৫ বছর বয়সে তিনি এ বিষয়ে হয়তো আবার চিন্তা করবেন।

বিবিসির জরিপ

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা মিলিয়ে আরবের ১০টি দেশ - আলজেরিয়া, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, মরক্কো, সুদান, তিউনিসিয়া, এবং ইয়েমেন - এবং ফিলিস্তিন অঞ্চলে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে প্রশ্ন করা হয়েছিল।
মানুষের সংখ্যা, জরিপ এলাকার ব্যাপ্তি এবং প্রশ্নের গভীরতার হিসাবে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জরিপ।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা নেটওয়ার্ক আরব ব্যারোমিটার জরিপটি পরিচালনা করে।
যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও বিষয়টি সামনে আনতে চাননা ইরাকি পুরুষরা।

সময়ের স্লোগান ও বাংলাদেশ by শফিক রহমান

‘আমার ভাই মরে যায়, নৌমন্ত্রী হেসে যায়’ ঢাকা বিমানবন্দর এলাকার ফুট ওভার ব্রীজের গায়ে শিশুর হাতে লেখা এই লাইনটি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের একটি স্লোগান। গত বছর বেপরোয়া বাস চাপায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় পরিবহন শ্রমিক নেতা এবং তৎকালীন মন্ত্রী শাজাহান খানের ‘হাসিমাখা মুখে’ মন্তব্যের প্রতিবাদে এটা ছিল শিক্ষার্থীদের কড়া প্রতিবাদ।
শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলন ঝড় তুলেছিল দেশে-বিদেশে সবখানে। ব্যানার হাতে মিছিল করে সংহতি জানায় ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তারাও স্লোগান তোলে ‘চলুক গুলি টিয়ার গ্যাস, পাশে আছি বাংলাদেশ’।
এখনও আন্দেলন সংগ্রামের প্রসঙ্গ উঠলে নিকট অতীতের ওই আন্দোলনের প্রসঙ্গ্ই টেনে আনেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সরকারের ভিতকেই নাড়া দেয় শিক্ষার্থীরা যখন তারা স্লোগান তোলে- ‘রাষ্ট্রের সংস্কার চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত’।
‘স্লোগানে স্লোগানে রাজনীতি’ শীর্ষক বইয়ের লেখক সাংবাদিক, গবেষক আবু সাঈদ খান বলছেন, মিছিলই স্লোগানের সূতিকাগার। যত স্লোগান আছে; তার বিরাট একটি অংশ মিছিলেই রচিত। তবে বাস্তব বিচারে শুধু মিছিলই নয়, আন্দোলনও স্লোগানের সূতিকাগার। সেটা রাজনৈতিক বা সামাজিক যে ধরনের আন্দোলনই হোক না কেন। উন্নয়ন, লক্ষ্য অর্জন, দারিদ্র বিমোচনসহ আরও অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আন্দোলন হিসেবে ধরে নিয়ে সেখানেও স্লোগান আছে।
প্রচার-প্রপাগান্ডায় স্লোগানের ব্যবহার তাও নতুন কিছু নয়। বিমানবন্দর এলাকার সেই ফুট ওভার ব্রীজ থেকে পশ্চিম দিকে কিছু দূর এগুলেই খিলক্ষেত এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ডের প্রধান কার্যালয়। যার ১০ তলা ভবনের দেয়াল জুড়ে লম্বালম্বি ব্যানারে ঝুলছে স্লোগান ‘শেখ হাসিনার উদ্যেগ – ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’। দেশের বিদ্যুৎ খাতে তার সরকারের সাফল্যের প্রচারে এ স্লোগান।
ওই খিলক্ষেত এলাকাতেই আরেকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ডিপো। যার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তলা বা দোতলা বাসগুলোর গায়ে দেখা যায় একটি স্লোগান ‘সুনাগরিক আর দক্ষ চালক, গড়তে পারে নিরাপদ সড়ক’। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়। তার দেয়ালে লেখা রয়েছে- ‘সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়, সবাই মিলে করবো জয়’।
বলা যায়, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর এ ধরনের কয়েকটি স্লোগানই ধারণ করছে বিআরটিসি, বিআরটিএ তথা রাষ্ট্র। অথচ, গত বছরের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত টানা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে স্লোগান ছিল, ‘আর কিছু নয় নিরাপদ সড়ক চাই’; ‘We want justice’; ‘We want safe Bangladesh’; ‘We don’t want digital Bangladesh, We want safe Bangladesh’; ‘4g স্পিড নেটওয়ার্ক নয়, 4g স্পিড বিচার ব্যবস্থা চাই’।
শাজাহান খানকে উদ্দেশ্য করে শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল আরও কয়েকটি স্লোগান। যেমন, ‘স্বার্থক জনম মাগো জন্মেছি এই দেশে, গাড়ি চাপায় মানুষ মরে মন্ত্রীসাহেব হাসে’; ‘মুজিবকোটে মুজিবকেই মানায়, চামচাদের না’; ‘ছাত্রদের আন্দোলন, নৌমন্ত্রীর নির্বাসন’। বলা হয়, আক্ষরিক অর্থেই শাজাহান খানের নির্বাসন ঘটেছে। বর্তমান মন্ত্রীপরিষদে আর ঠাই পাননি তিনি।
শিক্ষার্থীদের স্লোগানে আক্রমন ছিল প্রধানমন্ত্রীকেও। ‘Dear Mother of Humanity, সন্তানের মৃত্যুতে ‘মা’ কিভাবে চুপ থাকে’; ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজের স্বজন হত্যার বিচারতো করলেন, আমাদের ভাই বোনের হত্যার বিচার কি হবে’। শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলনের মধ্যেই ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভায় খসড়া সড়ক নিরাপত্তা আইন অনুমোদন করা হয়। যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যায় মৃত্যুদণ্ড এবং বেপরোয়াভাবে চালিয়ে কারো মৃত্যু ঘটালে সর্বোচ্চ পাঁচবছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়। যদিও বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যাতেও মৃত্যুদণ্ড দাবি ছিল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের।
আন্দোলনে পুলিশ চড়াও হলেই শিক্ষার্থীদের মুখে শোনা যেত স্লোগান ‘পুলিশ ছাত্র ভাই ভাই, ভাই হত্যার বিচার চাই’। এছাড়া স্লোগানে অশ্লিল ভাষায়ও পুলিশদের আক্রমন করা হয়েছে। চড়াও এবং স্লোগানে আক্রমনের এ ঘটনাও নতুন নয়। পাকিস্তান আমলেই বহুল পরিচিত একটি স্লোগান ছিল ‘পুলিশ তুমি যতই মারো, বেতন তোমার একশো বারো’। আবু সাঈদ খান জানাচ্ছেন, সে সময়ে পুলিশের মাসিক বেতন ছিল একশো বারো টাকা। পরে বিভিন্ন সময়ে স্লোগানে হাজার বারো, দু’হাজার বারো, তিন হাজার বারো বলা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পটভূমিতে শ্রমিক আন্দোলনের প্রধান ধ্বনি- ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ সম্ভবত সবচেয়ে সাড়া জাগানো স্লোগান। ‘সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’ মুক্তিকামী মানুষের বহুল উচ্চারিত স্লোগান। ১৮৫৭ সালে উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধে সিপাহিরা আওয়াজ তুলেছিল-‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে স্লোগান ছিল ‘জয়হিন্দ’ ও ‘বন্দেমাতরম’। পাকিস্তান আন্দোলনে ধ্বনিত হয়েছিল ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রণধ্বনি ছিল ‘জয় বাংলা’। স্বাধীনতা-উত্তরকালেও জয় বাংলাই ছিল দেশের বন্দনাসূচক স্লোগান। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতি হয়ে খন্দকার মোশতাক প্রথম উচ্চারণ করেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’।
১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের স্বাধীনতাপন্থী গ্রুপটি প্রথম ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তোলে। গ্রুপটির তাত্ত্বিক নেতা ছিলেন সিরাজুল আলম খান। ১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সভামঞ্চের ব্যাকগ্রাউন্ডে এটি লেখা হয়। ওই বছর আওয়ামী লীগের জনসভা মঞ্চের সামনের অংশে ‘জয় বাংলা’ লেখা হয়েছিল। ১৯৭১ এর ৩ জানুয়ারি শেখ মুজিব ‘জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান’ উচ্চারণ করেন। তবে ৭ মার্চ তাঁর কন্ঠে ছিল কেবল ‘জয় বাংলা’।
বর্তমানে শুধু আওয়ামী লীগই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি দেয়। বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং ইসলামী দলসহ সমমনা সব রাজনৈতিক দলই দিচ্ছে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান।
১৯৭৫ সালের ওই সময়ে খন্দকার মোশতাকের আরেকটি স্লোগান ছিল-‘ধর্ম কর্ম গণতন্ত্র’। এর প্রায় কাছাকাছি ‘ধর্ম কর্ম সমাজতন্ত্র’ স্লোগানটি ছিল ন্যাপ (মোজাফফর) এর।
স্লোগানে বঞ্চনা ও বৈষম্য প্রসঙ্গ
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের মুসলিম লীগ বিরোধী স্লোগানগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিল- ‘লীগ শাসনের দুর্গতি, দু’আনা হয় ম্যাচবাতি’; ‘লীগের পোলা বিলাত যায়, মোগো পোলা মইশ খেদায়’; ‘পাটের ন্যায্যমূল্য, দিতে হবে দিতে হবে’। মাঝখানে ৬৫টি বছর পার হয়েছে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় মুসলিম লীগের স্থানে আওয়ামী লীগ। তখন দাবি উঠেছিল পাটের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে আজকে সেখানে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি। চলতি বোরো মওসুমে ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বাংলাদেশর কৃষকদের বঞ্চিত হওয়ার ঘটনায় সবাই যখন সরকারের নীতি কৌশলকে দায়ী করছেন তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে বৃদ্ধ এক রিকশা চালকের একটি ছবি। যে ছবিটিতে বৃদ্ধের পিঠে গেঞ্জির ওপর লেখা রযেছে- ‘আর করবো না ধান চাষ, দেখবো তোরা কি খাস’।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের কোটা বিরোধী আন্দোলনও ছিল ধারাবাহিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের বহিপ্রকাশ। তখনও শিক্ষার্থীদের মুখে শোনা যায়- ‘বেকাররা বৈষম্য থেকে মুক্তি চায়’; ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই’; ‘শেখ হাসিনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই’; ‘কোটা দিয়ে কামলা নয়, মেধা দিয়ে আমলা চাই’।
পরে শিক্ষর্থীদের ওই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে ওই বছেরের ১১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী এবং ৩ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের কোটা না রাখার সুপারিশ অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা।
এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজের প্রস্তাবনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চ শিক্ষার ওপর ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট চালুর প্রস্তাব করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে তা কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ করা হয় এবং ১ জুলাই ২০১৫ থেকে কার্যকর করা হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেও রাস্তায় নেমে শিক্ষার্থীরা স্লোগান তোলে- ‘বাপের টাকা ঘুষের না, ভ্যাট মোরা দেব না’; ‘ভ্যাট দিবে আমার বাপ, মজা লুটবে কার বাপ’; ‘আমরা শিক্ষার্থী, মাল না’; ‘NO VAT ON EDUCATION’; ‘শিক্ষা কোন পণ্য নয়, শিক্ষা আমাদের অধিকার’; ‘জয় বাংলা, VAT সামলা’।
পরে ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উচ্চ শিক্ষায় ভ্যাট চালুর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
ভোট ও ভোট দিবসের স্লোগান বিতর্ক
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়কে বলা হয় স্বাধীনতার প্রথম সীকৃতি। কিন্তু সেই নির্বাচন নিয়েও ছিল বিভক্তি। স্লোগানেই তার প্রমান পাওয়া যায় যেমন, ভাসানী ন্যাপ এর স্লোগান ছিল- ‘ভোটের আগে ভাত চাই/ আমরা করেছি পণ/ হতে দেব না নির্বাচন’। এর জবাবে আওয়ামী লীগের স্লোগান ছিল- ‘আমরাও করেছি পণ, হতেই হবে নির্বাচন’।
ভারতের নকশালবাড়ি আন্দোলনের অনুকরণে গঠিত বাংলাদেশের নকশালপন্থীরাও তখন নির্বাচনের বিরুদ্ধে স্লোগান তোলে যেমন- ‘তোমরা করো নির্বাচন, আমরা চললাম সুন্দরবন’; ‘ভোটের বাক্সে লাথি মার, স্বাধীন পূর্ববাংলা কায়েম কর’। এর জবাবে ছাত্রলীগের নূর আলম সিদ্দিকীর নেতৃত্বের স্বায়ত্তশাসনপন্থীরা স্লোগান তোলে- ‘বাঁশের লাঠি হাতে ধর, পাতি বিপ্লবী খতম কর’। ছাত্রলীগের আ স ম আবদুর রব সমর্থিত স্বাধীনতাপন্থীদের স্লোগান ছিল- ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’; ‘৬ দফার আসল কথা, স্বাধীনতা স্বাধীনতা’।
এর ফাঁকে জামায়াতে ইসলামী স্লোগান দেয়- ‘ভোট দিন পাল্লায়, খুশি হবে আল্লায়’ (পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় দলটিকে এই স্লোগানটি ব্যবহার করতে দেখা গেছে)। এর জবাবে আওয়ামী লীগের স্লোগান ছিল-‘ভোট দিলে পাল্লায়, দেশ যাবে গোল্লায়’; ‘স্বাধীনতার শপথ নিন, নৌকা মার্কায় ভোট দিন’; ‘পদ্মা-মেঘনা-মধুমতি, নৌকা ছাড়া নাইকো গতি’, আওয়ামী লীগে দিয়ো ভোট, বীর বাঙালী বাঁধো জোট’।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) একটি স্লোগান তোলে- ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’। পরবর্তীতে স্লোগানটি এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে, দেশের যে কোন প্রান্তের যে কোন স্তরের নির্বাচনে স্লোগানটির ব্যবহার হতে দেখা গেছে। কিন্তু ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষ সেই ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এমন অভিযোগ দেশে বিদেশে সর্বত্র। সর্বশেষ ৫ জুন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের বার্ষিক ‘মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিবেদন ২০১৮’- শীর্ষক এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য।
এদিকে গত ১ মার্চ ‘ভোটার হব, ভোট দেব’ স্লোগান নিয়ে প্রথমবারের মতো জাতীয় ভোটার দিবস পালন করে নির্বাচন কমিশন। ওই দিনই ওই স্লোগানকে ‘হাস্যকর’ হিসেবে উল্লেখ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘ভোটার যেখানে ভোট দিতে পারে না সেখানে আজকে স্লোগান হচ্ছে- ভোটার হোন, ভোট দিন।… এই সরকারই জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে এই দিবস পালন করে তামাশা সৃষ্টি করেছে। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর কারচুপির অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচন চেয়েছিল বিএনপি ও তাদের শরিকরা।
এ নির্বাচনে বিএনপি’র স্লোগান ছিল- ‘এগিয়ে যাব একসাথে, ভোট দেব ধানের শীষে’। আর আওয়ামী লীগের স্লোগান ছিল- ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটির স্লোগান ছিল- ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’। বিগত দুই মেয়াদে সে পথে বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেক দূর। সেই অর্জন প্রচারে দলটির নেতা-কর্মীরা এখন স্লোগান দিচ্ছেন- ‘শেখ হাসিনার অবদান, ডিজিটাল হল জীবন মান’; শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল সবাই করছে ভোগ’।
 ভারতের পানি আগ্রাসন ও স্লোগান
১৯৭৬ সালের ১৬ মে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন। তখন তারা স্লোগান তোলেন- ‘চল চল ফারাক্কা চল’; ‘মরণ ফাঁদ ফারাক্কা, ভেঙ্গে দাও গুঁড়িয়ে দাও’; ‘পিন্ডিকে ছেড়েছি, দিল্লিকে ছাড়ব’। এসব স্লোগান এখনও চলছে এবং এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে টিপাই নদী মুখে বাধ বিরোধী ও আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বিরোধী স্লোগান। যেমন: ‘ভারতের পানি আগ্রাসন রুখে দাঁড়াও’; ‘টিপাই বাধের পায়তারা বন্ধ কর’; ‘তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহারের পায়তারা বন্ধ কর’; সুরমা-কুশিয়ারা রক্ষা কর’; আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশের মরণ ফাঁদ’; আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান’।
এছাড়া ২০১০ সালে সরকার ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির সিদ্ধান্ত নিলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা স্লোগান তোলেন- ‘উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র বর্জন করুন, দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পকে রক্ষা করুন’; সাফটা চুক্তির দোহাই দিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি চলবে না’; ‘ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি আদেশ বাতিল কর’। যদিও সেই আদেশ আর বাতিল হয়নি। আদালতের আদেশে আমদানির সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকে।
এদিকে ফুলবাড়ি কয়লা খনি বিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সুন্দরবন বিনাশী রামপাল প্রকল্প বাতিলসহ তেল, গ্যাস ও বন্দর রক্ষার আন্দোলন চলছে। বন্ধ হয়নি সীমান্ত হত্যা। তাইতো চলছে স্লোগান- ‘সীমান্ত হত্যা বন্ধ কর’।
ইতিহাস ও স্লোগান
পাকিস্তান আন্দোলনের স্লোগান ছিল- ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’। তবে রসিকতা করে বলা হতো – ‘হাতমে বিড়ি/ মুখমে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’। ভাষা আন্দোলনের সাড়া জাগানো স্লোগান- ‘রাষ্ট্র ভাষা রাষ্ট্র ভাষা, বাংলা চাই বাংলা চাই’; ‘শহীদদের রক্ত, ‍বৃথা যেতে দেব না’। যদিও পরবর্তীতে নতুন নতুন শহীদদের নাম যুক্ত করে বিভিন্ন আন্দোলনে এই স্লোগানটি দেয়া হয়েছে।
১৯৪৭ সালে সিলেট পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হবে না আসামের সঙ্গে ভারতে থাকবে এই প্রশ্নে একটি রেফারেন্ডাম হয়েছিল। তখন যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে ছিলেন তাদের মুখে স্লোগান ছিল- ‘আসামে আর যাব না, গুলি খেয়ে মরব না’; ‘আসামে আর থাকব না, মশার কামড় খাব না’। অপরদিকে ভারতের পক্ষের স্লোগান ছিল- ‘পূর্ব বঙ্গে যাব না, নালি শাক খাব না’।
এদিকে ষাটের দশকে আইউব খান সবুজ বিপ্লবের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ভুট্টা চাষকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু তখন পাবনায় ভুট্টা খেয়ে কয়েকজন মারা গেছেন এমন একটি খবর প্রচার করা হয়। যার প্রতিবাদে স্লোগান ওঠে- ‘আমরা বাঙালী, ভুট্টা খাই না’; ‘বাংলায় ভুট্টা চাষ, চলবে না চলবে না’।
ওই ষাটের দশকের প্রথমার্ধেই মাওলানা ভাসানী আইউব খানের বিভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপ সমর্থন করেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়েও তিনি আইউবের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ব্যক্ত করেন। সে সময়ে আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ (ওয়ালী খান) স্লোগান তোলে- ‘আইউবের কোলে, ভাসানী দোলে’।
পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ স্লোগান তোলে- ‘তোমার দফা আমার দফা, ৬ দফা ৬ দফা’; ‘৬ দফা মানতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে’। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯ সালে ১১ দফা আন্দোলনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্লোগান তোলে- ‘আইউব শাহী মোনায়েম শাহী, নিপাত যাক নিপাত যাক’; ‘আইউব-মোনায়েম ভাই ভাই এক দড়িতে ফাঁসি চাই’; ‘পূর্ব-পশ্চিমে একই আওয়াজ, খতম করো আইউবরাজ’; ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে স্লোগানগুলো পরিবর্তন হয়ে যায় যেমন- ‘জেলের তালা ভেঙেছি, শেখ মুজিবকে এনেছি’; ‘তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বিএলএফ) প্রশিক্ষণ শিবির থেকে স্লোগান তোলা হয়- ‘বিশ্বে এলো নতুন বাদ, মুজিববাদ মুজিববাদ’। পরে ছাত্রলীগও (সিদ্দিকী) এই স্লোগানটি দেয় এবং সঙ্গে আরও যুক্ত করে- ‘অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, মুজিববাদে সমাধান’; ‘মার্কসবাদে লাথি মার, মুজিববাদ কায়েম কর’।
যদিও এর বিরুদ্ধে রব ও শাজাহান সিরাজরা স্লোগান তোলে- ‘মুজিববাদ, নবরূপে পুঁজিবাদ’; ‘মুজিববাদ বস্তায় ভর, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম কর’; ‘নতুন করে মশাল জ্বালো, মুজিববাদ পুড়িযে ফেলো’।
১৯৭৪ সালে স্লোগান ওঠে- ‘আট টাকা সের আটা, নৌকার তলি ফাটা’। এরই মাঝে পাকিস্তান পন্থীরা স্লোগান তোলে- ‘ভাত কাপড় বাসস্থান, নইলে আবার পাকিস্তান’; ‘আরেকবার অস্ত্র ধর, মুসলিম বাংলা কায়েম কর’।
জিয়াউর রহমান বিরোধী আন্দোলনে স্লোগান ছিল- ‘ধর্মের নামে রাজনীতি, চলবে না চলবে না’; ‘আইউব গেছে যে পথে, জিয়া যাবে সেই পথে’; ‘পাক-মার্কিন দালালেরা, হুশিয়ার সাবধান’। এর আগে স্লোগানটি ছিল- ‘রুশ-ভারতের দালালেরা, হুশিয়ার সাবধান’।
সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শত শত স্লোগানের মধ্যে যেকয়টি প্রধান হয়ে উঠেছিল তার মধ্যে দু’টি ছিল- ‘ধাক্কা মারো আরেকবার, জয় হবে জনতার’; ‘এক দফা এক দাবি, এরশাদ তুই কবে যাবি’। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও শেষের স্লোগানটি দিতে শোনা গেছে।
তবে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ‘স্বৈরাচার নীপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ কথাটি বুকে-পিঠে লিখে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন নূর হোসেন। মূলত মুক্তিকামি ও গণতন্ত্রকামি মানুষের হৃদয়েই লেখা রয়েছে এই স্লোগানটি।
উল্লেখ্য, গত ১৪ জুলাই রবিবার সকাল পৌনে ৮টায় সাবেক ওই রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। গত ২৬ জুন থেকে তিনি রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন।

মিসরে লুকানো সমাধিতে ৩৪টি মমি আবিষ্কার

মিসর ও ইতালির প্রত্নতত্ত্ববিদরা অন্তত ৩৪টি মমির সন্ধান পেয়েছেন। দক্ষিণ মিসরীয় শহর আসওয়ানের একটি সমাধিতে এগুলো পাওয়া গেছে। নারী, পুরুষ ও শিশুর এসব মমি ফেরাউন ও গ্রেকো-রোমান সময়কালের (খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে চতুর্থ শতাব্দী) মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়।
মমির পাশাপাশি বেশকিছু নিদর্শন পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। এর মধ্যে রয়েছে পটারি, হাতে আঁকা মুখোশ ও কাঠের মূর্তি। মৃতদেহ সংরক্ষণে ব্যবহৃত দাহ্য খনিজ পদার্থের কারুকাজ করা পাত্র আর সমাধিতে লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়া স্ট্রেচারও পাওয়া গেছে। দুটি মূর্তিতে দেখা যাচ্ছে মিসরীয় পক্ষী ঈশ্বর ‘বা’। কিছু পাত্রে আছে খাবার। হায়ারোগ্লিফিক তথ্যে আভাস মিলেছে, এই সমাধির মালিক ছিলেন ব্যবসায়ী নেতা টিজেটি।
আসওয়ানে খনন কাজ পরিচালনার জন্য ইউনিভার্সিটি অব মিলানের মিসরীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক পাত্রিসিয়া পিয়াসেনতিনিকে আমন্ত্রণ জানান মিসরের পুরাতত্ত্ব মন্ত্রী খালেদ আল-ইনানি। এ কার্যক্রমে পাত্রিসিয়ার সঙ্গে ছিলেন আসওয়ান ও নুবিয়া পুরাতত্ত্ব কাউন্সিলের মহাপরিচালক আব্দুল মুনায়েম সাঈদ।
সমাধিটি বালির নিচে লুকানো ছিল। এটি খুঁজে পান প্রকৌশলী গ্যাব্রিয়েল বিতেলি। এরপর আবিষ্কৃত উপকরণগুলোর ত্রিমাত্রিক গঠন তৈরি করেন তিনি। একটি দেয়াল দিয়ে সিল মেরে রাখা দুটি পৃথক কক্ষে মমিগুলো ছিল। প্রথম কক্ষে ৩০টি ও এর পাশের কক্ষে বাকি চারটি মমি পান প্রত্নতাত্ত্বিকরা। দুটি মমি মোড়ানো ছিল একসঙ্গে। ধারণা করা হয়, এগুলো মা ও তার সন্তানের। তবে সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারে।
মমির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে মার্কিন সংবাদ সংস্থা সিএনএনকে জানিয়েছেন পাত্রিসিয়া। তিনি বলেন, ‘সেই সময়ে মানুষ কী খেতো ও কোন বয়সে আর কীভাবে তারা মারা গেছেন এই সমাধির মাধ্যমে সেসব বোঝা যায়। আমাদের জন্য আরও চমক অপেক্ষা করছে।’
আসওয়ানে সব মিলিয়ে ৩০০ সমাধি খুঁজে বের করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে খনন কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন মিসর ও ইতালির প্রত্নতাত্ত্বিকরা। এর অংশ হিসেবে নতুন সমাধিটি পাওয়া গেলো। পরের কার্যক্রম পরিচালিত হবে এ বছরের নভেম্বরে।
এ মাসের শুরুতে মিসরের সোহাগ শহর থেকে চার মাইল দূরে আখমিম এলাকায় এক দম্পতির সমাধির পাশে বিভিন্ন পশু-পাখির মমি আবিষ্কৃত হয়। এর মধ্যে আছে ইঁদুর, বিড়াল, ঈগল, বাজপাখি, বুনো ছাগসহ অর্ধশত প্রাণী। গত মাসে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অন্য একটি দল মিসরে নীল নদের কাছে প্রাচীন একটি বন্দর আবিষ্কার করে। মন্দির ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে গেবেল আল-সিলসিলার খনি থেকে পাওয়া পাথর নীল নদ দিয়ে পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত প্রধান বন্দর ছিল এটি। গত বছর পিরামিড চত্বর গিজার কাছে উন্মুক্ত করা হয় চার হাজার বছরের পুরনো একটি সমাধি।