Thursday, February 5, 2026

৫ হাজার কিলোমিটার পথ উড়ে কীভাবে ক্যালিফোর্নিয়ায় গেল গ্যালাপাগোসের অ্যালবাট্রস

প্রকাশ ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মধ্যাঞ্চলে উপকূলের কাছে একটি জাহাজে গবেষণার কাজ করছিলেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি তাঁরা এক বিরল অতিথি পাখির দেখা পেয়েছেন। এর নাম ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস (ওয়েভড অ্যালবাট্রস)। নথিভুক্ত হিসাব অনুযায়ী, মধ্য আমেরিকার উত্তরাঞ্চলে এ প্রজাতির পাখি এবার নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বার দেখা গেছে।

হলুদ ঠোঁট, কালো বোতাম-চোখের এই পাখির ডানার বিস্তার প্রায় ৮ ফুট (২ দশমিক ৪ মিটার)। এই পাখি জীবনের বেশির ভাগ সময় সমুদ্রে ওড়াউড়ি করে কাটায়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে প্রজননকারী এ পাখি কীভাবে এবং কেন প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার (৩ হাজার মাইল) দূরে ক্যালিফোর্নিয়ায় এল? বিজ্ঞানীরা এ ধাঁধার কূলকিনারা পাচ্ছেন না।

বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি একটি ‘ভ্যাগ্রান্ট’ পাখি। অর্থাৎ এমন এক ধরনের পাখি, যা তার স্বাভাবিক বিচরণ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে যায়। পাখিটিকে পয়েন্ট পিয়েদ্রাস ব্লাঙ্কাস উপকূল থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে, সান ফ্রান্সিসকো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঝামাঝি এলাকায় দেখা গেছে।

গবেষণা জাহাজে থাকা সামুদ্রিক পাখিবিদ ট্যামি রাসেল বলেন, পাখিটির ‘শিগগিরই দক্ষিণে (গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে) ফিরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।’ গত অক্টোবরেও পাখিটিকে সম্ভবত উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে দেখা গিয়েছিল।

রাসেল বর্তমানে সান ফ্রান্সিসকো শহরের ফারালন ইনস্টিটিউটের চুক্তিভিত্তিক বিজ্ঞানী এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান ডিয়েগোর স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশানোগ্রাফির পোস্টডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করছেন।

রাসেল ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যা দেখেছি, তা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। বিষয়টি আমার কাছে এখনো বিস্ময়কর। পাখিটি এত দূরে কীভাবে এল, তা নিশ্চিত করে বলা প্রায় অসম্ভব।’

সম্ভবত কোনো ঝড় পাখিটিকে উত্তরে (ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে) ঠেলে দিয়েছে। তবে কিছু পাখির স্বভাবই এমন—তারা অন্যদের চেয়ে অনেক দূরে ঘুরে বেড়ায়।

ই–মেইলে রাসেল লিখেছেন, ‘গত মৌসুমে পাখিটি সম্ভবত প্রজনন করেনি। কারণ, প্রাপ্তবয়স্ক অ্যালবাট্রসরা বসন্তে ডিম পাড়ে। জানুয়ারির মধ্যে ছানারা বাসা ছাড়ে। প্রজননবিহীন এই সময়ে হয়তো সে ঘুরে বেড়াতে বেরিয়েছে। হয়তো শিগগির গ্যালাপাগোসে ফিরে সঙ্গীর সঙ্গে পরের মৌসুমে মিলিত হবে।’

তবে কিছুটা সংশয়ের সুরে এই পাখি–গবেষক বলেন, কে জানে, এটা আর কত দিন এখানে থাকবে বা আদৌ ফিরে যাবে কি না?

নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাখিবিদ্যা গবেষণাগারের (ল্যাব অব অরনিথোলজি) ইবার্ড প্রকল্পের প্রধান মার্শাল ইলিফ বলেন, অ্যালবাট্রসের মতো সামুদ্রিক পাখিরা খাবারের খোঁজে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে।

ই-মেইলে ইলিফ লেখেন, ‘কখনো কখনো (এ প্রজাতির) কোনো পাখি একাকী স্বাভাবিক বিচরণ এলাকা ছাড়িয়ে অনেক দূরে, এমনকি ভুল গোলার্ধে বা খুব বিরল ক্ষেত্রে ভুল মহাসাগরেও চলে যেতে পারে। খাদ্যের সংকট পাখিকে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য করতে পারে। আবার এটি নিছক একধরনের দুর্ঘটনাও হতে পারে। এখন পর্যন্ত এটিকে নিছক ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া অন্য কিছু বলার প্রমাণ নেই।’

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) গ্যালাপাগোসের সবচেয়ে বড় এই অ্যালবাট্রস প্রজাতিকে চরম বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

আমেরিকান বার্ড কনজারভেন্সির তথ্যমতে, এ প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র মূলত উষ্ণমণ্ডলে সীমাবদ্ধ। আগ্নেয়গিরির গলিত পাথরের তৈরি বিস্তীর্ণ মাঠ, ছড়িয়ে থাকা পাথর ও বিরল উদ্ভিদের মধ্যে এরা বাসা বাঁধে।

ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস সর্বোচ্চ ৪৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। মাছ, স্কুইড ও ক্রাস্টেশিয়ান (কাঁকড়া ও চিংড়িজাতীয় প্রাণী) এদের প্রধান খাবার।

ট্যামি রাসেল বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে একাধিক ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস দেখা গেলে তা পরিবেশগত কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারত।

এই নারী পাখিবিদ আগে লিখেছিলেন, ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে এখন পাঁচ প্রজাতির বুবি পাখির বিচরণ সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উষ্ণতা বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের কারণে এটা হয়েছে।

কিন্তু এই নিঃসঙ্গ ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস সম্পর্কে রাসেলের মতে, ‘এটা যদি এ প্রজাতির পাখির ভবিষ্যতে উত্তর দিকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত হয়, তাহলে কখন এ প্রজাতির প্রথম পাখিটি এখানে শনাক্ত হয়েছিল, সেটার একটি সূত্র আমরা পেয়ে গেলাম।’
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মধ্যাঞ্চলের উপকূলে সম্প্রতি একটি ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস শনাক্ত হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মধ্যাঞ্চলের উপকূলে সম্প্রতি একটি ঢেউখচিত অ্যালবাট্রস শনাক্ত হয়েছে। ছবি: সামুদ্রিক পাখিবিদ ট্যামি রাসেলের ফেসবুক থেকে

মহেশখালীর মাতারবাড়ী: সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্নের আড়ালে ভিন্ন গল্প by আবুল কালাম আজাদ

তেপ্পান্ন হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সীমানাদেয়ালের পাশে আক্ষরিক অর্থেই বস্তিতে পরিণত করা মহেশখালীর মাতারবাড়ী দ্বীপের পুষ্টিহীন রোগাক্রান্ত শিশুদের নির্লিপ্ত অসহায় চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, এই মেগা প্রকল্প জনগণের অর্থের যথেচ্ছ অপচয়।

মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বড় বড় রাজনৈতিক নেতা বিরাট বিরাট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কেউ বলেছেন, মাতারবাড়ী হবে সিঙ্গাপুর, কেউ বলেছেন মালয়েশিয়া, কেউ বলেছেন সুইজারল্যান্ড। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের স্বপ্ন দেখানোর বিষয়টি বেশ উচ্চারিত হয়েছে। বলা হয়েছে, মাতারাবাড়ীর সবাই কাজ পাবেন, ভালো বেতনে কাজ পাবেন। আর লবণ চাষ করতে হবে না, চিংড়ি–কাঁকড়ার চাষ করতে হবে না, নদী-সাগরে মাছ ধরতে হবে না। ২১ ধরনের ক্ষতিপূরণের আওতায় সবাই ক্ষতিপূরণ পাবেন। মাতারবাড়ীতে গরিব থাকবে না।

এরপর মাতারবাড়ীর পশ্চিম উপকূলে গোল সূর্য বঙ্গোপসাগরের নীল জলে অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে বহুবার অস্তমিত হয়েছে। আর অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে নেমে এসেছে মাতারবাড়ীর ঘরে ঘরে।

মাতারবাড়ী সত্যিই সিঙ্গাপুর হয়ে গেছে! মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের চার লেনের মসৃণ সংযোগ সড়ক দিয়ে নতুন ব্রিজ পার হয়ে সেলফি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া পেছনে রেখে সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে একটা সিঙ্গাপুরসুলভ অনুভূতি পাওয়া যায়।

কোহেলিয়া নদী ভরাট করে চার লেনের চকচকে সড়কে এক-দেড় শ মাইল গতিতে গাড়ি চালিয়ে সুইজারল্যান্ডের অনুভূতি লাভ করা যায়। কয়লা জেটির পাশের কোনো দোকানে বসে চা–কফিতে চুমুক দিতে দিতে কয়লা খালাসকারী জাহাজ বা ক্রেন দেখে হয়তো কারও কারও মনে মালয়েশিয়ার অনুভূতি খেলা করতে পারে। কিন্তু মাতারবাড়ীর এক লাখ অধিবাসীর জীবনে এগুলো অভিশাপের মতো। কারণ, উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেই তাঁদের জীবনে বস্তি নেমে এসেছে, দুনিয়ার নিকৃষ্টতম বস্তি। কাজ নেই, খাবার নেই, সম্মান নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই।

ডিসেম্বর মাস, লবণ চাষের ভরা মৌসুমে মাতারবাড়ীর মানুষের কোনো কাজ নেই। শুকনা মুখে অবসরের ক্লান্তি। অথচ দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের লবণ উৎপাদনকারী জনগোষ্ঠী এখন ভীষণ ব্যস্ত। লবণমাঠ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে নিয়মিত পরিচর্যা, লবণ জমিতে সাগরের পানি তোলা, এক প্লট থেকে আরেক প্লটে পানি সরবরাহ, লবণ স্তূপ করা, ওজন করা, বহন করে নৌকায় বা গোডাউনে নিয়ে যাওয়া, নৌকায় করে মোকামে নেওয়াসহ হাজার রকম কাজ। নারীদেরও এ সময় অবসর থাকে না—লবণমাঠের চাষির জন্য খাবার প্রস্তুত করা, মাঠে পৌঁছে দেওয়া, চাষের উপকরণ তৈরি করা ও মেরামত করা, লবণ বহনের ঝুড়ি বোনাসহ অনেক অনেক ব্যস্ততা।

অথচ লবণের মৌসুমে একসময় বাইরে থেকে শ্রমিক আসত মাতারবাড়ীতে কাজ করার জন্য। মাতারবাড়ী হিন্দুপাড়ার রমা দাসের (ছদ্ম নাম) স্বামী বছরখানেক আগে কক্সবাজারে একটি আবাসিক হোটেলে কাজ নিয়েছেন। কারণ, এখানে কোনো কাজ নেই। রমা দাস জানালেন, তাঁদের পরিবারের কোনো সদস্য এই প্রথম মাতারবাড়ীর বাইরে কাজের জন্য গিয়েছেন। বলতে বলতে লজ্জায় মুখ ঢাকলেন!

মাতারবাড়ী থেকে অভিবাসী হওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কেউ সাময়িক কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন, কেউ স্থায়ীভাবে মাতারবাড়ী ছেড়ে শহরের বস্তি, দূরের পাহাড় বা অন্য কোনো এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন, কপর্দকশূন্য শ্রম বিক্রি করতে।

কক্সবাজার জেলার অপার সুন্দর পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী উপজেলার একটি ছোট্ট দ্বীপ মাতারবাড়ী। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই দ্বীপের লক্ষাধিক অধিবাসী বঙ্গোপসাগর ও পার্শ্ববর্তী কোহেলিয়া নদীতে মৎস্য আহরণ, শুকনা মৌসুমে লবণ উৎপাদন, বর্ষাকালে চিংড়ি, কাঁকড়া ও মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পাশাপাশি দ্বীপের ভেতরে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের চাষ তো হতোই। আর সব দ্বীপের মতোই এখানেও প্রচুর গবাদিপশু হতো। ফলে মাতারবাড়ী ছিল অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীপ এবং এখানকার অধিবাসীরা ছিলেন তুলনামূলকভাবে সচ্ছল।

মাতারবাড়ী দ্বীপ ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাস্তবায়নাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কারণে। তৎকালীন সরকার মাতারবাড়ী দ্বীপটিকে একটি পাওয়ার (বিদ্যুৎ) হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে এই হাব গড়ে তোলা হবে। এরই অংশ হিসেবে ১২০০X২=২৪০০ মেগাওয়াট মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও ১৩২০ মেগাওয়াট কোহেলিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে দুটি বৃহৎ কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এই প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করার জন্য প্রায় তিন হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি এই দ্বীপে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্যও বিপুল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। অবশ্য যে প্রক্রিয়ায় এসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তাকে অধিগ্রহণ না বলে জবরদখল বলাই উত্তম। এসব জমি ছিল মাতারবাড়ীর মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। লবণ, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের জমি। পার্শ্ববর্তী কোহেলিয়া নদী ছিল মাছের আধার, জীবন-জীবিকার আরেক উৎস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। পাশাপাশি অবারিত সাগরে মৎস্য আহরণ চলত ১২ মাস।

২০২১ সালে সরকার কোহেলিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাতিল করে দেশের আরও ১০টি পরিকল্পনাধীন কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে। কিন্তু মাতারবাড়ী ২৪০০ মেগাওয়াটের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াটের নির্মাণকাজ চলতে থাকে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ছিল জাপানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাইকা। নির্মাণকাজে জড়িত ছিল আরেক জাপানি প্রতিষ্ঠান সুমিটোমো করপোরেশন।

প্রকল্পটির মালিকানায় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গঠিত, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। ২০২২ সালে দ্বীতিয় পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াট প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করে জাইকা। একই সঙ্গে সুমিটোমো করপোরেশন দরপত্রে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। ফলে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াট আর আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু এই প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ১ হাজার ৫০০ একর ভূমি পুরোটাই ব্যবহার করছে ১২০০ মেগাওয়াটের মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি।

২০১৪ সালে মাতারবাড়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের আগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যথাযথভাবে পরামর্শ করা হয়নি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়নি। সে সময় স্থানীয় মানুষ জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন, আন্দোলন করেছেন। নারীরা ঝাড়ু হাতে মিছিল করেছেন, ভূমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে।

প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ শুরু হলে এই দ্বীপের পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সব কটি (১১টি) স্লুইচগেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে দ্বীপের ভেতরের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের সব ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের বর্ষাকাল থেকেই দ্বীপে জলাবদ্ধতা শুরু হয়। ২০১৮ সালে জলাবদ্ধতা চরম রূপ নেয়। সে সময় ১০ হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষভাবে এবং পুরো দ্বীপের জনগোষ্ঠী পরোক্ষভাবে জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হন।

মাতারবাড়ী মূল সড়কটি পানির নিচে চলে যাওয়ার কারণে, মাতারবাড়ীবাসী একরকম বন্দিদশায় পর্যবসিত হন। স্থানীয় লোকজনের দাবির মুখে রাঙ্গাখালী খাল—যেটা কোহেলিয়া নদীর সঙ্গে দ্বীপের মূল পানিপ্রবাহের পথ—তার মুখে পাইপ বসিয়ে সাময়িক জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা করা হয়। সুবিশাল কোহেলিয়া নদী এখন একটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই কোহেলিয়া নদীতে মৎস্য আহরণ এবং ওই পথে সাগরে যাওয়ার ওপর বাধা প্রদান করতে শুরু করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। নির্মাণকাজের বর্জ্যে নদী ভরাট হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে নদীর ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হয় প্রকল্পের সংযোগ সড়ক।

কোহেলিয়া নদীর ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার জেলে পরিবার এখন বেকার, অস্তিত্বের সংকটে জীবন্মৃত। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মানুষের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমেই মাতারবাড়ী দ্বীপের শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র পানি ব্যবস্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। যা মাতারবাড়ীর মতো দ্বীপের মানুষ ও প্রকৃতির টিকে থাকার প্রধান শর্ত। মাতারবাড়ীতে ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির কোনো সংকট ছিল না। স্থানীয় মানুষ বলছেন, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ার পর পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।

অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে ভূমিমালিকদের কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে ক্ষতিপূরণের টাকা তোলার জন্য মাতারবাড়ী থেকে কক্সবাজার ভূমি অফিসে যাওয়া-আসা, রাতে থাকা, ফাইল এগোনোর জন্য নিয়মিত ঘুষ দিতে গিয়ে তাঁদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অর্থের ৩০ শতাংশই অপচয় হয়েছে। আপত্তি মামলা থাকায়, এখনো কিছু ভূমিমালিক তাঁদের ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি।

প্রকল্প এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ৪০–৫০টি পরিবার তাদের পুনর্বাসনের বাড়ী পেয়েছেন উচ্ছেদ হওয়ার ছয়–সাত বছর পরে। এই পরিবারগুলোকে প্রকল্পে স্থায়ী কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তেমন কোনো কাজ পাননি। মাতারবাড়ীর মাত্র ১ হাজার ১০০ শ্রমিককে চিহ্নিত করে তাঁদের সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সে টাকাও তাঁরা পেয়েছিলেন প্রকল্প শুরুর পাঁচ–ছয় বছর পর।

প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলার সময়, বাইরের শ্রমিকের পাশাপাশি মাতারবাড়ীর লোকজনও এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা চাহিদার তুলনায় ছিল নগণ্য। তার চেয়ে বড় কথা, প্রকল্পে যে ধরনের কাজে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়, সে ধরনের কাজে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষে, আবার তাঁরা বেকার হয়ে পড়েছেন। ভূমি ও কাজ হারানো মাতারবাড়ীর হাজার হাজার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মাতারবাড়ীর মানুষ তাঁদের জীবন–জীবিকার মূল উৎস ভূমি হারিয়েছেন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে। মাথাগোঁজার ঠাঁই অবশিষ্ট জমিও এখন আর নিরাপদ নয়, বড় বড় কোম্পানি নানান ছলচাতুরী করে তা–ও কুক্ষিগত করছে।

মাতারবাড়ীর মানুষ ভয়ংকর বিপদে পড়েছেন। তাঁদের কোনো কাজ নেই। জীবিকার জমি হারিয়েছেন। কোহেলিয়ায় মাছ নেই, সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেন না, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দর কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে। অনেক ঘুরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার মতো বড় নৌকা তাঁদের নেই।

মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৪ সাল থেকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। চিমনি দিয়ে অবিরাম কয়লা পোড়া ধোঁয়া নির্গত হয়। চিমনির নিচে লক্ষাধিক মানুষের জীবন অনিরাপদ রেখে, তাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা না করে পৃথিবীর আর কোথাও এমন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ রকম কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র পাওয়া যাবে না।

পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে, জ্বালানি হিসেবে কয়লার যুগ শেষ হতে চলেছে। সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর কয়লায় চালিত মাতারবাড়ী প্রকল্পও হয়তো, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যাবে। প্রকল্পটি ইতিমধ্যে কয়লা সরবরাহ না থাকায় ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একাধিকবার বন্ধ থেকেছে। চূড়ান্তভাবে পরিত্যক্ত হওয়ার আগে এই প্রকল্প মাতারবাড়ী প্রাণ-প্রকৃতি, জীবন–জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির যা ক্ষতি করার, তা করে যাবে।

পরিহাস্যকর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানির কোনো মজুত না থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি খাত গড়ে তোলা হয়েছে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থাকা সত্ত্বেও সেদিকে সরকারের তেমন নজর নেই।

মাতারবাড়ীর বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠছে, অনিরাপদ হয়ে উঠছে খাওয়ার পানি, মিশে যাচ্ছে কয়লা পোড়া ছাই, সিসার মতো প্রাণঘাতী ভারী ধাতু। কোহেলিয়া পাড়ের বৃদ্ধ জেলে মোহাম্মদ আলী (ছদ্ম নাম) বলেন, ‘আমরা আর বেশি দিন এই দ্বীপে থাকতে পারবে না। বাপ-মা, দাদা-দাদির স্মৃতি ফেলে রেখে অচিরেই অজানার উদ্দেশ্যে পালাতে হবে।

* আবুল কালাম আজাদ, পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী
- মতামত লেখকের নিজস্ব

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের এই সড়কটি সাজানো হয়েছে নান্দনিকভাবে। যদিও এ সড়কের অতিরিক্ত নির্মাণব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের এই সড়কটি সাজানো হয়েছে নান্দনিকভাবে। যদিও এ সড়কের অতিরিক্ত নির্মাণব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ছবি: প্রথম আলো

এপস্টিন ফাইলস: বিশ্ব এলিটদের গোপন ও ভয়াবহ সব রহস্যের উন্মোচন

বিশ্বের ক্ষমতাধর এলিটদের নোংরা লেনদেনের যদি কোনো লিখিত দলিল থেকে থাকে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ‘এপস্টিন ফাইলস’। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প থেকে বিল ক্লিনটন, এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজাতদের খুব কম মানুষই আছেন, যাদের নাম এই কুখ্যাত অর্থলগ্নিকারী জেফ্রি এপস্টিনের নেটওয়ার্কের ছায়া থেকে মুক্ত। এ খবর দিয়ে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন বলছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির শুরু থেকেই যে কেলেঙ্কারি তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল, তা এবার আরও বিস্ফোরক রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন মন্ত্রণালয় কুখ্যাত এপস্টিন ফাইলসের নতুন একটি বড় অংশ প্রকাশ করেছে। এটা রাজনৈতিক অঙ্গনে একেবারে বোমা ফাটানোর মতো। এতে প্রকাশ্যে চলে এসেছে বিশ্বনেতা, স্বঘোষিত দানবীর যেমন বিল গেটস, এবং প্রযুক্তি জগতের প্রভাবশালী ধনকুবের ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিদের নাম। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে এলিটদের বিলাসিতা, প্রভাব এবং গোপন অনৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত এই বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। নথিগুলো দেখতে গেলেই একটি অস্বাভাবিক সতর্কবার্তা চোখে পড়ে। ফাইলসে প্রবেশের আগে দর্শনার্থীকে নিশ্চিত করতে হয় যে, তিনি ১৮ বছরের বেশি বয়সী। এই সতর্কতাই ইঙ্গিত দেয়, বিষয়বস্তু কতোটা ভয়ঙ্কর ও অস্বস্তিকর। নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে রহস্যজনক মৃত্যুর সাত বছরেরও বেশি সময় পরও জেফ্রি এপস্টিনের রেখে যাওয়া অন্ধকার লিগ্যাসি কীভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনাম দখল করে আছে, তা এসব নথিতে স্পষ্ট। নতুন প্রকাশিত ফাইলগুলো ইঙ্গিত দেয়, এই কলঙ্কিত অর্থলগ্নিকারীর প্রভাব বিশ্ব ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নথিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, হিলারি ক্লিনটন এবং জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সঙ্গে এপস্টিনের যোগসূত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়।

সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সাবেক এক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে একটি ইয়টে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। যদিও এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো এপস্টিনের গোপন জগতকে ঘিরে এলিটদের অতিরিক্ত ভোগ, গোপনীয়তা ও কথিত শোষণের বিষয়টিকে আরও ঘনীভূত করে। এপস্টিনের পরিধিতে ঘোরাফেরা করেছেন প্রায় সব ক্ষেত্রের প্রভাবশালী ‘এ-লিস্টার’রা। ফুটবল তারকা ডেভিড বেকহ্যাম, প্রিন্স অ্যানড্রু, বৃটিশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সবাই এই কলঙ্কিত অর্থলগ্নিকারীর বিশাল কুখ্যাতির গ্যালারিতে হাজির। আইন মন্ত্রণালয়ের লাখ লাখ নথির মাধ্যমে সেগুলো এখন জনসমক্ষে হাজির।
একটি তথ্য বিশেষ নিষ্ঠুর বিদ্রুপ তৈরি করে। বিল গেটসের নাম উঠে এসেছে এমন নথিতে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এপস্টিনের ব্যবস্থাপনায় হওয়া এক সাক্ষাতের ঘটনা ঘটে। এরপর তিনি যৌনরোগে আক্রান্ত হন। এপস্টিন নিজে শুধু মানব পাচারের অভিযোগেই নয়, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধী হিসেবেও কুখ্যাত। এই নথির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ২০১৫ সালের একটি ই-মেইল বিনিময়। তাতে এপস্টিনের সহযোগীরা নিজেদের স্বার্থে মালালা ইউসুফজাই ও তার ফাউন্ডেশনকে সমর্থন দেয়ার কথা নিয়ে আলোচনা করেন। মালালা আদৌ কোনো সহায়তা পেয়েছিলেন কিনা, তা স্পষ্ট নয়। তবে এই আলোচনাই দেখিয়ে দেয় যে, এপস্টিন কীভাবে বিশ্ব জুড়ে সম্মানিত ব্যক্তি ও মহৎ উদ্যোগগুলোর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিতে চাইতেন। আরেকটি ই-মেইলে তার দীর্ঘদিনের সহকারী লেসলি গ্রফ মালালা ফান্ডে এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের শূন্যপদের কথা উল্লেখ করেন- যেন এপস্টিনের কোনো যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সেখানে বেতনভুক্ত পদ পাওয়া যায় কিনা, তা যাচাই করছিলেন।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, দেশটির পোলিও নির্মূল কর্মসূচি এপস্টিনের নজরে ছিল। নরওয়ের প্রভাবশালী কূটনীতিক ও অসলো চুক্তির অন্যতম স্থপতি তেরিয়ে রড-লারসেন তাকে এ বিষয়ে নিয়মিত তথ্য দিচ্ছিলেন। এমনকি বিল গেটসের পোলিও নির্মূল সংক্রান্ত উদ্যোগ- পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠক ও যোগাযোগ, এসব সম্পর্কেও এপস্টিন অবগত ছিলেন। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে পাঠানো আই-মেসেজগুলোতে, গ্রেপ্তারের এক বছর আগে, পাকিস্তানের নতুন নেতৃত্বের প্রতি এপস্টিনের প্রকাশ্য বিদ্বেষও ফুটে ওঠে। ইমরান খানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় তিনি তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, শান্তির জন্য তিনি এরদোগান, খোমেনি, শি বা পুতিনের চেয়েও বড় হুমকি। এক্ষেত্রে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত নেতাদের সঙ্গে তুলনা টেনে আনেন সামনে।
শুনতে দুঃসাহসিক লাগলেও, এপস্টিনের কাছে কোনো বিষয়ই নিষিদ্ধ ছিল না। একটি আংশিক গোপন অ্যাকাউন্ট থেকে ফরওয়ার্ড করা ২০১৮ সালের আরেকটি ই-মেইলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিতর্কিত সিন্ধু পানি চুক্তি বা ‘ওয়াটার ওয়ার্স’ নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায়, যা বহু বছর পর ভারতের চুক্তি স্থগিতের হুমকির মধ্যদিয়ে আবার আলোচনায় আসে।

এই ই-মেইলটি পাঠানো হয়েছিল অ্যাডাম লুপেলকে এবং কপি ছিল নাদিয়া আল সাইদের কাছে। দু’জনই তখন ইনস্টিটিউট অব পিসে কর্মরত। এতে বোঝা যায়, জনসমক্ষে আসার বহু আগেই এপস্টিন সংবেদনশীল ও উচ্চঝুঁকির ভূরাজনৈতিক বিরোধে আগ্রহী ছিলেন। পাকিস্তানের পাশের দেশ ভারতে এপস্টিন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রবেশাধিকার পেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদির কাছে। যার হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি তাকে দেশের ভেতরে প্রায় পূজনীয় করে তুলেছে। ই-মেইল ও টেক্সট বার্তাগুলোতে দেখা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত এই অর্থলগ্নিকারী ভারতীয় রাজনৈতিক মহলে প্রভাব বিস্তারের জন্য সক্রিয় চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এমনকি মোদির হিন্দুত্ববাদী জাতীয়তাবাদী দলের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। যা দেখিয়ে দেয় যে, পশ্চিমা দুনিয়ার বাইরেও ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেকে জড়িয়ে নেয়ার উচ্চাকাক্সক্ষা ছিল এপস্টিনের। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মোদি এপস্টিনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক অস্বীকার করলেও, প্রতিবেদনে বলা হয়- ইসরাইল সফর নিয়ে তিনি নাকি এপস্টিনের পরামর্শ চেয়েছিলেন। যেখানে তিনি গান গেয়েছিলেন ও নেচেছিলেন বলেও দাবি রয়েছে।

এপস্টিন ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের দুই মাসেরও কম সময় আগে মোদি ও ট্রাম্পের সাবেক কৌশলবিদ স্টিভ ব্যাননের মধ্যে একটি বৈঠকের ব্যবস্থাও করতে চেয়েছিলেন। এপস্টিন সংযোগ নিয়ে যারা নথিগুলো বিশ্লেষণ করেছেন, তাদের মতে, এগুলো শুধু একজন বিশ্বমঞ্চে মন্তব্য করতে ভয় না পাওয়া ব্যক্তির ছবি ফুটিয়ে তোলে না। বরং এতে এমন একজন মানুষের চিত্র ফুটে ওঠে, যিনি রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে জটিল এক প্রভাবের জাল বুনেছিলেন। যখন ও যেখানে তার প্রয়োজন হয়েছে, সেখানেই ক্ষমতার করিডোরে নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন শীতল হিসাবনিকাশে। নতুন নথিতে আরও রয়েছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসা তথ্য ও অভিযোগের অভ্যন্তরীণ মেমো ও সারসংক্ষেপ। এর অনেকগুলোতেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম যৌন অসদাচরণের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত। নথিগুলো আরও দেখায়, অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে এপস্টিনের যোগাযোগ। ২০১২ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে ফ্লোরিডা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য বৈঠকের আয়োজন নিয়ে ই-মেইলে ইলন মাস্কের নাম পাওয়া যায়, যদিও তিনি বারবার কোনো সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। বিল গেটসের নামও বৈঠক ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চিঠিপত্রে এসেছে, যা তিনিও অস্বীকার করেছেন। এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, বৃটিশ ধনকুবের রিচার্ড ব্র‍্যানসন এবং হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টারা- স্টিভ ব্যানন ও ক্যাথি রুমলার বারবার নথিতে উঠে এসেছেন। যা প্রমাণ করে এপস্টিনের জালের কোনো সীমানা ছিল না।

সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো এপস্টিনের নির্যাতনের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বহু আগেই জানতো। এফবিআইয়ের অভ্যন্তরীণ নথিতে দেখা যায়, ২০০৬-২০০৭ সালেই এপস্টিনের ফ্লোরিডার বাড়িতে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের জড়িত একাধিক অভিযোগ সম্পর্কে এজেন্টরা অবগত ছিলেন। কিন্তু ফেডারেল কৌঁসুলিরা সেগুলো প্রায় উপেক্ষা করেন। শেষ পর্যন্ত এপস্টিন অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে এক সমঝোতা চুক্তি করেন। অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌনসেবা নেয়ার দায় স্বীকার করেন এবং মাত্র ১৮ মাস কারাভোগ করেন। এপস্টিনের আন্তর্জাতিক প্রভাবের পরিধি আরও স্পষ্ট হয় বৃটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক থেকে।
https://mzamin.com/uploads/news/main/201652_1.webp

ইরান নিয়ে ট্রাম্পের অঙ্ক যে কারণে মিলছে না by মার্কো কার্নেলোস

ইরানে সাম্প্রতিক অস্থিরতা শাসনব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটায়নি। আবার সেখানে ভেনেজুয়েলার মতো কোনো অভ্যুত্থানের পথও তৈরি করেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর পন্থা নেয়। ইন্টারনেট বন্ধ করা হয় এবং বিক্ষোভের সরাসরি সম্প্রচার সীমিত করা হয়, যেন আন্দোলন আর ছড়িয়ে না পড়ে। একই সঙ্গে হাজার হাজার স্যাটেলাইটনির্ভর স্টারলিংক ডিভাইস নিষ্ক্রিয় করা হয়।

ইরানের রাস্তায় কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, কতজন বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন—এসব বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান রয়েছে। তবে একটি অনুমান মোটামুটি নিশ্চিত, নিহতের সংখ্যা ছিল ভয়াবহ রকম বেশি। আগামী কয়েক সপ্তাহে হয়তো আরও স্পষ্ট তথ্য সামনে আসবে।

ইসরায়েলের জোরালো তাগিদ সত্ত্বেও তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক হামলা চালায়নি। এর কারণ স্পষ্ট নয়। হয়তো ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত সামরিক সক্ষমতা ছিল না, অথবা সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দ্রুত ও নিরঙ্কুশ বিজয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।

ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি প্রায়ই বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। গত অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে তিনি দাবি করেছিলেন, তিন হাজার বছর ধরে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছেন। বাস্তবে এটি কল্পনা ছাড়া কিছু নয়—যদি না আমরা ধরে নিই যে ইসরায়েল বোমা ফেললে তা শান্তি, আর অন্য কেউ করলে তা যুদ্ধ।

এ ছাড়া কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক মিত্ররাও সম্ভবত ট্রাম্পকে সতর্ক করেছে। তারা জানিয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা পরিস্থিতিকে এমন অস্থির ও নিয়ন্ত্রণহীন করে তুলতে পারে, যার পরিণতি সামাল দেওয়া কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে একটি বিষয়ই নিশ্চিত—অনিশ্চয়তা। দাভোসে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর হুমকির মধ্যেই তা স্পষ্ট হয়েছে। এখন আবার দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক দ্বিধার পর বিপুল মার্কিন সামরিক শক্তি ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলার সম্ভাবনা বাতিল হয়নি, কেবল পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই উত্তেজনার মধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে তারা কী ধরনের নেতিবাচক নজির স্থাপন করল, সে বিষয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা হয়নি।

তবু একটি বিষয় পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু কট্টরপন্থী যে ভেঙে পড়া ইরানের স্বপ্ন দেখেন, তা বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কঠোর শাসনের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বেশি ভয়ংকর হবে। ইরান ভেঙে পড়লে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, তা ইরাকের বিপর্যয়কেও তুচ্ছ করে দেবে।

সহজে শাসন পরিবর্তনের ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। ৫০ বছর আগেই ক্লান্ত কোনো রাজবংশে ফিরে যাওয়া কিংবা কার্যত অস্তিত্বহীন বিরোধী শক্তির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়াও অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়ার শামিল। ভেনেজুয়েলায় যেভাবে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর ঘনিষ্ঠরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, ইরানের ক্ষমতা ও নিরাপত্তাকাঠামোর ভেতরে তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।

এ ছাড়া ইরানি নেতৃত্ব আবারও যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁদে পড়বে—এমন আশঙ্কাও কম। গত জুনে ওমানে আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই ইসরায়েল হামলা চালিয়েছিল। পরে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা হয়েছে। বাস্তবে সেই দাবি প্রমাণিত হয়নি; এমনকি ইসরায়েলি সূত্রও বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।

এখন ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলার আলোচনা দুটি বিষয় সামনে আনে। প্রথমত, আগের হামলা কোনোভাবেই চূড়ান্ত ছিল না। দ্বিতীয়ত, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের কিছু মহল মনে করছে, এখনই তেহরানে শাসনব্যবস্থা বদলের উপযুক্ত সময়।

ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা ও দাভোসের ঘটনার পর ট্রাম্প হয়তো ভাবছেন, আরেকটি দ্রুত বিজয় তাঁকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে শক্ত অবস্থানে রাখবে। তবে ইরানে শাসন পরিবর্তন ইতিহাসে জায়গা দিলেও দেশে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়বে—এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ইরান বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিকভাবে সংবেদনশীল। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরিবর্তন উল্টো ফল দিতে পারে—ইরাকের শিক্ষা এখানেও প্রযোজ্য।

আরও কিছু প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। নব্বই মিলিয়ন মানুষের, দক্ষ জনশক্তিসম্পন্ন ও বিপুল তেল–গ্যাসসম্পদের দেশ ইরান যদি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়, তাহলে সেটি কি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য সত্যিই স্বস্তিকর হবে?

নভেম্বরের নির্বাচনের পর রাজনীতিতে টিকে থাকা নিয়ে ট্রাম্প যদি সত্যিই চিন্তিত হন, তাহলে দেশের ভেতরেই তাঁর করার মতো অনেক কিছু আছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তায় অভিবাসন পুলিশের দমনমূলক তৎপরতা বন্ধ করা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ প্রশমিত করা হয়তো কোনো বিদেশি যুদ্ধের চেয়েও তাঁর জন্য বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।

* মার্কো কার্নেলোস, ইতালীয় কূটনীতিক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-04%2Fxkh1giyr%2Firan.jpg?rect=71%2C0%2C1058%2C705&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইরানি নেতৃত্ব আবারও যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁদে পড়বে—এমন আশঙ্কা কম। ফাইল ছবি

কৌশলগত ‘চিকেনস নেক’ করিডরে ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা ভারতের

টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টঃ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করা পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডরে শিগগিরই ভূগর্ভস্থ রেললাইন বসাতে যাচ্ছে ভারত। সোমবার এই ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। এতে আরও বলা হয়, ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত এই করিডরটি সবচেয়ে সংকীর্ণ স্থানে মাত্র ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার চওড়া। এটি ভারতের অন্যতম সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। করিডরটির এক পাশে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশ। আর তারও বাইরে রয়েছে চীন।

রিপোর্টে আরও বলা হয়, ভারত সরকারের ভূগর্ভস্থ রেললাইন বসানোর এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময় এলো, যখন বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল থেকে প্রকাশ্যেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিচ্ছিন্ন করতে ‘চিকেনস নেক চেপে ধরা’র কথা বলছে। আরও কিছু কণ্ঠ এই অঞ্চলকে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ ধারণার অংশ হিসেবেও তুলে ধরছে। তিস্তা নদী প্রকল্প ঘিরে ঢাকার সঙ্গে চীনের যোগাযোগ ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যগুলো নিছক উসকানি নয়; বরং এর পেছনে একটি সুস্পষ্ট ভূরাজনৈতিক কৌশল কাজ করছে।

কেন্দ্রীয় বাজেটে রেল মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলতে গিয়ে অশ্বিনী বৈষ্ণব সাংবাদিকদের বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করা ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কৌশলগত করিডরের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এখানে ভূগর্ভস্থ রেললাইন বসানো এবং বিদ্যমান রেলপথকে চার লাইনে উন্নীত করার পরিকল্পনা চলছে।

নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ে (এনএফআর)-এর মহাব্যবস্থাপক চেতন কুমার শ্রিবাস্তব জানান, পশ্চিমবঙ্গের তিন মাইল হাট থেকে রাঙাপানি স্টেশনের মধ্যবর্তী অংশে এই ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মিত হবে। তিনি বলেন, নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভূগর্ভস্থ অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের কাছে শিলিগুড়ি করিডর দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত। ২০১৭ সালের ডোকলাম সংকটের সময় সামরিক পরিকল্পনাকারীরা প্রকাশ্যেই এই অঞ্চলের ভঙ্গুরতার কথা বলেন। এখানে সামান্য কোনো বিঘ্ন ঘটলেই উত্তর-পূর্বাঞ্চল কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। যোগান ব্যবস্থা ও সেনা চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো সেই পুরোনো আশঙ্কাকেই আবার উসকে দিয়েছে এবং শক্তিশালী অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
রেললাইন ভূগর্ভে নিয়ে যাওয়া এবং পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে নয়াদিল্লি সংকটকালেও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করতে চায়। এই পরিকল্পনা শুধু রেলপথ নিয়ে নয়, এটি দৃঢ় সংকেত দেওয়ার বিষয়ও। ভারত স্পষ্ট করে দিতে চায় যে, কোনো বাহ্যিক হুমকি বা অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জীবনরেখা বিপন্ন হতে দেয়া হবে না।

এদিকে বাংলাদেশে বিভিন্নজনের বক্তব্য নিজ দেশেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতীয়তাবাদী কিছু গোষ্ঠী যেখানে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ ধারণাকে এগিয়ে নিচ্ছে, সেখানে অন্যরা সতর্ক করে দিচ্ছে- এ ধরনের অবস্থান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অস্থিতিশীল করতে পারে। যে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। তবুও ‘চিকেনস নেক’-এর প্রতীকী গুরুত্ব প্রবলভাবেই রয়ে গেছে, এটি মনে করিয়ে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার নাজুক নিরাপত্তা বাস্তবতায় ভূগোল নিজেই এক ধরনের অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201740_Untitled-8.webp

আমলারা প্রকৃতিগতভাবে সংস্কারবিরোধী: আসিফ নজরুল

আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সমালোচনা করে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘আমলারা বাংলাদেশে প্রকৃতিগতভাবে সংস্কারবিরোধী।’ এমন পরিস্থিতি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিজে সরকারে থাকার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে এই উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা উনাদের ব্যক্তি হিসেবে দোষ, নাকি আমাদের সিস্টেমের দোষ, আমি জানি না।’

সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন আসিফ নজরুল। ‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ নামক বইটির লেখক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।

আমলাদের কাজে হতাশ হয়ে যান উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমাদের এখানে যারা ইয়াং অফিসার (তরুণ কর্মকর্তা) আছে যাদের স্নেহ করি, আমি তাদের বুঝাই, বাবা, তুমি কিন্তু কেরানি না…ইউ আর আ অফিসার। অফিসারের স্বাধীন বিচার-বুদ্ধি-ক্ষমতা থাকতে হবে।’

উপদেষ্টা হওয়ার আগে শেখ হাসিনার সমালোচনা করার ফলে মানুষ তাঁকে মাথায় তুলে নাচত উল্লেখ করে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি প্রচণ্ড পপুলার একটা মানুষ ছিলাম। আর এখন সারা দিন কাজ করি। কালকে রাতে দুবাই থেকে মিটিং করে এসে রাত আড়াইটা পর্যন্ত কাজ করেছি। সকালে উঠে সাড়ে সাতটা থেকে কাজ করেছি, আমার চোখ জ্বলতেছে, মাথা ব্যথা হয়ে গেছে, সারা দিন কাজ করি আর সারা দিন গালি শুনি।’

আইন উপদেষ্টা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির গল্প অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি ইউটিউব ভিডিওর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক জনপ্রিয় ইউটিউবার দাবি করেছিলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান নাকি কাউকে শত কোটি টাকা দিয়েছেন। বক্তার ভাষায়, এসব গল্প শেষ পর্যন্ত বিনোদনের উপকরণে পরিণত হয়।

‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে আসিফ নজরুল বলেন, এ ধরনের বই ও লেখা কেবল স্মৃতিকথা নয়, এগুলো রাষ্ট্র, মানবিকতা ও নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দেয়। এসব লেখা আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছানো জরুরি।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, তথ্য ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুবউল্লাহ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে
‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। ছবি: মীর হোসেন

এপস্টেইনের নথিতে মোদির নাম: ভারত সরকারের দাবি ‘ভিত্তিহীন’, বিরোধীদের মতে ‘জাতীয় লজ্জা’

প্রকাশ ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত প্রয়াত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইন–সংক্রান্ত আরও নতুন নথি প্রকাশ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। গত শুক্রবার এসব নথি থেকে বেশ কয়েক লাখ পৃষ্ঠা উন্মোচন করার পর রীতিমতো হইচই পড়ে গেছে ভারতেও। কেননা, বেশকিছু নথিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম এসেছে।

এ ঘটনায় গতকাল শনিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে মোদির নাম আসার বিষয়টিকে ‘ভিত্তিহীন ও নিন্দনীয়’ বলা হয়েছে। তবে এতে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হওয়া বিতর্ক থামেনি। দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস বলেছে, এপস্টেইনের নথিতে মোদির নাম থাকাটা ‘জাতীয় লজ্জা’।

ভারত সরকারের প্রতিক্রিয়া

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গতকাল এক ভিডিও বিবৃতিতে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির নাম উল্লেখ থাকার দাবি পুরোপুরি ‘ভিত্তিহীন ও নিন্দনীয়’। তাঁর মতে, এর বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। এগুলো সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিত।

রণধীর জয়সওয়াল ওই ভিডিও বিবৃতিতে বলেন, জেফরি এপস্টেইনের ‘কথিত’ ই–মেইলে প্রধানমন্ত্রী মোদির নাম থাকার বিষয়টি ‘একজন দণ্ডিত অপরাধীর ভিত্তিহীন ও নিন্দনীয় কল্পনাপ্রসূত গালগল্প’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তথাকথিত এপস্টেইন ফাইলসে একটি ই–মেইল বার্তার কথা দেখেছি। সেখানে প্রধানমন্ত্রী মোদি আর তাঁর ইসরায়েল সফরের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে থাকা ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির ইসরায়েলে সরকারি সফরের তথ্য ছাড়া বাকি সব দাবিই “চরম অবজ্ঞার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যানযোগ্য”।’

এ বিষয়ে ভারত সরকার দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মূলত ‘জল ঘোলা করা’ বন্ধ করতে—জানান জয়সওয়াল। তিনি বলেন, এসব নথি আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা হয়নি।

বিরোধীদের সমালোচনা

এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিতে মোদির নাম উল্লেখ থাকার ঘটনায় সমালোচনায় সরব হয়েছে কংগ্রেসসহ ভারতের বিরোধী পক্ষ। এ ঘটনায় ‘আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা’ চাওয়া হয়েছে।

রাজ্যসভায় কংগ্রেসের সদস্য জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে অবমুক্ত করা সর্বশেষ নথিগুলোয় মোদির নাম একাধিকবার এসেছে। এটা নিয়ে সরকারের (ভারতের) মুখপাত্রকে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়েছে। এরপরও অনেক প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।

এ ঘটনায় সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছ থেকে ব্যাখ্যা চেয়েছেন কংগ্রেস নেতা পবন খেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এ বিষয়টি আমাদের জন্য “জাতীয় লজ্জা”।’

কংগ্রেসের এই নেতা পোস্টে উল্লেখ করেছেন, এপস্টেইন লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর ‘পরামর্শ’ নিয়েছিলেন এবং ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বার্থে’ ইসরায়েলে নেচে-গেয়ে অনুষ্ঠান করেছেন। শেষে ‘এটা কাজ করেছে!’ বলেও নথিতে উল্লেখ আছে।

অভিযোগ জানিয়ে পবন খেরা লিখেছেন, এই বিষয়টি ভারতের ‘জাতীয় মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক সুনামকে’ প্রভাবিত করেছে।

নতুন নথি প্রকাশ

এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রকাশ করেছে। গত শুক্রবার এসব নথির ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠা, ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং ২ হাজার ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। দেশটির নতুন ট্রান্সপারেন্সি আইন অনুসারে এসব নথি প্রকাশ করা হয়েছে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।

সর্বশেষ প্রকাশিত এপস্টেইনের নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ধনকুবের ইলন মাস্ক, মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন নথিতেও তাঁদের নাম দেখা গিয়েছিল। এ ছাড়া সর্বশেষ নথিতে ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের নামও রয়েছে।

উল্লেখ্য, এপস্টেইনকে ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় ১৮ বছরের কম বয়সী একজনের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করার চেষ্টার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। যৌনপণ্য পাচারের মামলায় বিচারাধীন থাকাকালে তিনি ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের কারাগারে আত্মহত্যা করেন। তবে একের পর এক অবমুক্ত করা তাঁর নথিগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

অনলাইনে গেম খেলা নিয়ে পিতামাতার আপত্তি, একসঙ্গে তিন নাবালিকার ‘আত্মহত্যা’

গেম খেলা নিয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। এতে ১০ তলা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে একসঙ্গে আত্মহত্যা করেছে তিন বোন। তাদের বয়স ১২, ১৪ ও ১৬ বছর। এই তিন বোন অনলাইন গেমসে ভয়াবহভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে। এতে বাধা দেন পিতামাতা। ফলে তারা অভিমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

এ খবর দিয়ে অনলাইন আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, মঙ্গলবার রাত দু’টা নাগাদ ঘটনাটি ঘটে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ওই তিন বোনের। করোনা মহামারির সময় থেকেই মোবাইলে গেমের প্রতি ঝোঁক বাড়তে থাকে তাদের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন গেমের প্রতি আসক্তিও বৃদ্ধি পায় তিন বোনের। এমনকি মাঝেমধ্যে স্কুলে না গিয়ে গেম খেলতে বসে যেত তিনজনই। মেয়েদের অনলাইন গেমের প্রতি এমন আসক্তি পছন্দ ছিল না পিতামাতার। সারাক্ষণ তারা মোবাইলে মুখ গুঁজে গেম খেলতো। তা নিয়ে প্রায়শই বাকবিতণ্ডাও চলত। মঙ্গলবার রাতেও গেম খেলা নিয়ে অশান্তি বাধে বাড়িতে। পিতামাতা গেম খেলতে দিচ্ছিলেন না তাদেরকে। এর পরেই তিন বোন একসঙ্গে আবাসনের ১০তলা থেকে ঝাঁপ দেয়। ঘটনার খবর পেয়ে রাতেই গাজিয়াবাদের লোনি এলাকার ওই আবাসনে পৌঁছে যায় টিলা মোড় থানার পুলিশ।

দেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। মৃত ওই নাবালিকাদের পরিবার এবং আবাসনের অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করেন কর্মকর্তারা। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলেই মনে করছে পুলিশ। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসার পরেই এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা। সম্প্রতি অনলাইনে একটি টাস্ক-বেস্ড গেম (যেসব গেম খেলার সময়ে গেমের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে হয় এবং তার ভিত্তিতে লেভেল বৃদ্ধি পায়)-এর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে ওই তিন বোন। ওই গেম খেলা নিয়েই পিতামাতার সঙ্গে তাদের ঝামেলা হয়। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, পিতামাতার বকাবকি এবং গেম খেলায় আপত্তির কারণেই তিন বোন এই চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201788_suicie.webp

আরব সাগরে ইরানের ড্রোন ভূপাতিত যুক্তরাষ্ট্রের

প্রকাশ ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা আরব সাগরে একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ড্রোনটি তাদের একটি বিমানবাহী রণতরীর দিকে ধেয়ে আসছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা হ্রাসে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে মঙ্গলবার এ ঘটনা ঘটল।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-এর সুরক্ষার স্বার্থে ইরানি ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়েছে। সেন্টকমের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেন, রণতরী থেকে একটি এফ-৩৫সি যুদ্ধবিমান ড্রোনটি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ড্রোনটি ইরানের দক্ষিণ উপকূল থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থানরত মার্কিন রণতরীর দিকে ‘আক্রমণাত্মকভাবে’ এগিয়ে আসছিল।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও ড্রোনটি রণতরীর দিকে আসা অব্যাহত রাখায় সেটিকে ভূপাতিত করা হয়। ভূপাতিত ড্রোনটি ‘শাহেদ-১৩৯’ মডেলের ছিল বলে শনাক্ত করেছে তারা।

এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম দেশটির একটি অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা তাদের একটি ড্রোনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ড্রোনটি নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) কাছে সফলভাবে তথ্য পাঠাচ্ছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখছে তেহরান।

এমন এক সময়ে এই ড্রোন ভূপাতিত করার খবর এল, যখন উভয় দেশ আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলার হুমকি দেওয়ার পর রণতরীটি ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল। তবে কূটনৈতিক তৎপরতার জেরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘ন্যায্য ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে’ আলোচনার নির্দেশ দিয়েছেন।

জানা গেছে, আগামী শুক্রবার দুই পক্ষের মধ্যে এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। তুরস্ক বা ওমান এই আলোচনার আয়োজক হতে পারে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলবেন।

এদিকে মঙ্গলবার অন্য এক ঘটনায় সেন্টকম অভিযোগ করেছে, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের দুটি বোট এবং একটি ড্রোন দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘন করে একটি জাহাজ তাদের জলসীমায় ঢুকে পড়ায় সেটিকে সতর্ক করা হয়েছিল।

আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সরবরাহ করা ছবি
আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সরবরাহ করা ছবি। এএফপি